তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প

আগাম প্রকাশ

মো. খালেকুজ্জামান

এই নিবন্ধে প্রস্তাবিত তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পটির (তিস্তা প্রকল্প) সারবত্তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই বিশ্লেষণের ভিত্তি হল তিস্তা অববাহিকার ভৌগলিক বিন্যাস, তিস্তা নদীর বিবর্তনের ইতিহাস, পরিবেশগত সম্ভাবতা, নদীকে জীবন্ত স্বত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া শীর্ষ আদালতের রায় এবং পানি-কূটনীতির আঙ্গিকসমূহ। এই লেখকের মত হল, প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্পের নকশাটি পানিবিজ্ঞানের প্রক্রিয়াসমূহের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ফলে প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবার সম্ভাবনা নেই। এছাড়া তিস্তা প্রকল্পের কারণে বাংলাদেশ এই আন্তঃসীমান্ত নদীর প্রবাহের উপর তার আইনগত অধিকারটিকে আরও সীমিত করে ফেলবে। এই লেখক সুপারিশ করছেন যে, নদীভাঙন এবং বন্যার সমস্যাগুলোকে মোকাবেলা করতে হবে ক্যাপিটাল ড্রেজিং এবং নদীর পাড়গুলোকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে। সেই সাথে ভবিষ্যতের বিরোধ মীমাংসা এবং সালিশের জন্য বাংলাদেশের উচিত হবে জাতিসংঘের পানি প্রবাহ বিষয়ক ১৯৯৭ সালের কনভেনশনটিকে অনুমোদন করা, একই সাথে তার উজানের প্রতিবেশীদের সাথে পানি ভাগাভাগির আলোচনাকে আরও জোরালো করা যতক্ষণ পর্যন্ত একটি ন্যায়সঙ্গত, নায্য ও চলনসই হিস্যা না পাওয়া যায়। তিস্তা যে অববাহিকার অংশ সেই গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার উজানের দেশগুলোর সাথে সকল প্রকার কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উচিত পানি-কূটনীতিকে একটি ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে বিবেচনা করা। মূল লেখা “Teesta River Comprehensive Management and Restoration Project: A Preliminary Assessment”- এর অনুবাদ করেছেন মাহতাব উদ্দীন আহমেদ

ভূমিকা

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর মধ্যে চতুর্থ দীর্ঘতম নদী হল তিস্তা। তিস্তা হল ব্রহ্মপুত্র নদের সবচেয়ে বড় উপনদী। তিস্তা নদী অতীতে একসময় বছরপ্রতি ৬০ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি এবং ৪৯ মিলিয়ন টন পলি বহন করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি নেমে এসেছে যথাক্রমে প্রায় ২৫.২ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি এবং ৩.৪ মিলিয়ন টন পলিতে (Azaz, 2020; BWDB, 2019; Shi, et al., 2019) । উজানে সিকিম রাজ্যে ভারত বেশ কতগুলো জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। এছাড়াও বাংলাদেশের দোনাই-দালিয়া ব্যারেজ থেকে ১০০ কিলোমিটার উজানে পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবায় একটি ব্যারেজ বানানো হয়েছে যাতে তিস্তার পানিপ্রবাহের মুখ ঘুরিয়ে দিয়ে তিস্তা অববাহিকার বাইরে অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গের পাঁচটি জেলার জমিতে সেচ দেয়া যায়। তিস্তা নদীর পানিপ্রবাহ ও পলির পরিমাণ কমে যাওয়ার এটাই কারণ (Rudra, 200; Islam and Higano, 2001; Mullick et al., 2010; Rahaman and Mamun, 2020)। এই নদীর সামগ্রিক বারিপাত এলাকা হল ১২,৩৭০ বর্গ কিলোমিটার, যার মধ্যে ২০০০ বর্গ কিলোমিটার (১৭%) এলাকা হল বাংলাদেশের। বাংলাদেশের ভেতরে নদীর প্রশস্ততা ০.৭ কিলোমিটার থেকে ৫.৫ কিলোমিটারের মধ্যে, গড়ে ৩ কিলোমিটার (BWDB, 2019)। এই নদীর বারিপাত অঞ্চলে বসবাসরত জনসংখ্যার ৫০% বাস করে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের উৎপাদিত শস্যের ১৪% আসে তিস্তা-নির্ভর এলাকা থেকে (Haq et al., 2017; Mondal and Islam, 2017)। প্রায় ২২ মিলিয়ন মানুষের জীবন ও জীবিকা এই নদীর পানি প্রবাহের উপর নির্ভরশীল যেটি একপাক্ষিকভাবে উজানের ভারত সরকার নিয়ন্ত্রণ করছে।

 

উজানে সিকিম রাজ্যে ভারত বেশ কতগুলো জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। এছাড়াও বাংলাদেশের দোনাই-দালিয়া ব্যারেজ থেকে ১০০ কিলোমিটার উজানে পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবায় একটি ব্যারেজ বানানো হয়েছে যাতে তিস্তার পানিপ্রবাহের মুখ ঘুরিয়ে দিয়ে তিস্তা অববাহিকার বাইরে অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গের পাঁচটি জেলার জমিতে সেচ দেয়া যায়। তিস্তা নদীর পানিপ্রবাহ ও পলির পরিমাণ কমে যাওয়ার এটাই কারণ।

বিগত ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ দোনাই-দালিয়াতে একটি ব্যারেজ নির্মাণ করে তিস্তা সেচ প্রকল্পকে (টিআইপি) সাহায্য করার জন্য, যার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭,৫০,০০ হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া। যাই হোক, এখন পর্যন্ত টিআইপির মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১,১০,০০০ হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া সম্ভব হয়েছে। টিআইপির এই ক্ষণস্থায়ী সাফল্যকে অনুসরণ করে, ভারত তিস্তা থেকে পানি সরিয়ে নেয়া শুরু করে গজলডোবায় একটি ব্যারেজ বানানোর মাধ্যমে, যার উদ্দেশ্য ছিল তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পকে (টিবিপি) সহায়তা করা, যার লক্ষ্যমাত্রা ছিল পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের ৯,২০,০০০ হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া (চিত্র-১)। পানি সরিয়ে নেয়া হয় তিস্তা-মহানন্দা সংযোগ খাল এবং তিস্তা-জলঢাকা প্রধান খালের মাধ্যমে (Rudra, 2003) । ভারত তিস্তার পানিকে মহানন্দা-পুনর্ভবা-মেচি বারিপাত এলাকার দিকে ঘুরিয়ে দেয়ার পর ১৯৯৬ সালে নদীর গড় প্রবাহ ৮৫ শতাংশ কমে যায়। বাংলাদেশের দোনাই-দালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর মাসিক গড় প্রবাহ ১৯৯০-৯৬ সময়ে ছিল প্রায় ১০,০০০ কিউসেক। সেটি কমে গিয়ে ১৯৯৬-২০০০ সময়ে হয়ে গেল ২,০০০ কিউসেকেরও কম (Mullick et al., 2010; Azaz, 2020)। বিগত ২০০৬ সালে শুকনো মৌসুমে নদীর প্রবাহ ২০ ঘনমিটারেরও (৭০০ কিউসেক) নিচে নেমে যায় (Mullick et al., 2010)।

বেশ কয়েকবার বাংলাদেশ চেষ্টা করেছিল ভারতের সাথে পানি ভাগাভাগির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে। কিন্তু সেগুলো ব্যর্থ হয়। তিস্তা নদীর পানি ভাগাভাগির আলোচনার ব্যর্থতার গাঁথা এখনো বাংলাদেশ আর ভারতের মধ্যে বিবাদের একটি প্রধান বিষয় হয়ে আছে (Ahmed, 2012)।

চিত্র ১: মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গের তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প (টিবিপি) ও বাংলাদেশের তিস্তা সেচ প্রকল্পের (টিআইপি) পরিধি।

তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প (তিস্তা প্রকল্প)

প্রাকৃতিক পানি প্রবাহে ভারতের একপাক্ষিক নিয়ন্ত্রণ এবং পানি ভাগাভাগি নিয়ে কোন চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পটি গ্রহণের জন্য চীনা প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ার চায়না’র সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এতে তাদের কাছ থেকে প্রকল্পটির জন্য ৮৫৩ মিলিয়ন ডলার ঋণ এবং কারিগরি সহায়তা পাওয়া যাবে (Acharjee, 2020; Asianwater, 2020; Bhattacharjee, 2020; Chakma, 2020;Mohan, 2020; Roy, 2020)। বিগত ২০১৯ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেইজিং সফরকালে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে সমঝোতা হয়। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ব্যাপারটি নিশ্চিত করেন।

এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে দোনাই-দালিয়ার তিস্তা ব্যারেজ থেকে চিলমারী পর্যন্ত নদীর দুই পাড়ে মোট ১১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ তৈরি করা হবে। এই প্রকল্পের আওতায় তিস্তা নদীর প্রাকৃতিক প্রশস্ততা দোনাই-দালিয়া ব্যারেজ থেকে কাউনিয়া অংশে কমিয়ে আনা হবে ৭০০ মিটারে এবং কাউনিয়া থেকে চিলমারী অংশে কমিয়ে আনা হবে ১,০০০ মিটারে। নদীর পুরো দৈর্ঘ্যেই ১০ মিটার গভীর করে ড্রেজিং করা হবে যাতে এই ‍বিনুনি নদীটিকে বেঁধে ফেলা যায় নবনির্মিতব্য ১১৪ কিলোমিটার বাঁধ ও ইতোমধ্যেই বিদ্যমান বাঁধগুলোর মধ্যে (Power China 2020)। বাঁধগুলোর পশ্চাতে থাকা ১৭০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা পুনরুদ্ধার করা হবে শিল্প, আবাসন, ৫০০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং কৃষিবিষয়ক স্থাপনা নির্মাণকে সহজতর করার জন্য (Roy, 2020)। সেই সাথে নির্মাণ করা হবে ৩টি যাত্রী টার্মিনাল, ১১টি লোডিং টার্মিনাল, শুকনো মৌসুমের জন্য পানি জমা করার আধার, নতুন করে পুনরুদ্ধার করার জমিগুলোতে চলাচলের জন্য রাস্তাঘাট, নদীভাঙন ঠেকাতে ৫০টি গ্রোয়েন, ক্রসবার এবং লেভি (চিত্র-২)। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাওয়ার চায়না প্রকল্পের যে পরিবেশগত অভিঘাত মূল্যায়ন (ইআইএ) সম্পন্ন করেছে সেটি জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি (BWDB, 2019; Azaz, 2020; Roy, 2020)।

এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে দোনাই-দালিয়ার তিস্তা ব্যারেজ থেকে চিলমারী পর্যন্ত নদীর দুই পাড়ে মোট ১১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ তৈরি করা হবে। এই প্রকল্পের আওতায় তিস্তা নদীর প্রাকৃতিক প্রশস্ততা দোনাই-দালিয়া ব্যারেজ থেকে কাউনিয়া অংশে কমিয়ে আনা হবে ৭০০ মিটারে এবং কাউনিয়া থেকে চিলমারী অংশে কমিয়ে আনা হবে ১,০০০ মিটারে।

চিত্র ২: মানচিত্রে তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্য অবস্থান (স্কেল অনুযায়ী নয়)। নগরায়ন ও শিল্প বিষয়ক প্রকল্পগুলো নির্মিত হবে তিস্তা নদীর দুই পাড়ের পুনরুদ্ধার করার জমিগুলোতে (modified after Power China, 2020)।

বিনুনি নদীগুলোর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা:

বিনুনি নদীগুলো হল সবচেয়ে গতিময় নদীজ ব্যবস্থা যেগুলো সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয় পলি, পানি প্রবাহ, পানিতে উপস্থিত পলির প্রকৃতি ও পরিমাণ, জলাভূমির ঢাল এবং মানুষের হস্তক্ষেপের সমন্বিত প্রভাবে (Piegay et al., 2006)। বিনুনি নদীগুলো জটিল গাঠনিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এবং সেগুলো নদীবক্ষের প্রতি এককে সর্বোচ্চ পরিমাণে নবায়নযোগ্য জৈব পদার্থ এবং নদী দৈর্ঘ্যের প্রতি এককে সর্বোচ্চ পরিমাণ প্রাণবৈচিত্র্যকে ধারণ করতে পারে (Chalov and Alexeevsky, 2013)।

বিনুনি নদীর এই গতিময় প্রকৃতির কারণে, এইসব নদীর আচরণ নিয়ন্ত্রণে মানুষের হস্তক্ষেপ সচরাচর দেখা যায় না (Azaz, 2020)। এই বিষয়ে অন্যদের কাজগুলোকে পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, বিশ্বজুড়েই বিনুনি নদীগুলোর ব্যবস্থাপনার কাজটিকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা হয়েছে। বেশিরভাগ ব্যবস্থাপনার প্রকল্পগুলোতেই মানুষের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে মূল নদীগুলোর গাঠনিক চরিত্রের পরিবর্তন করার বিষয়টিকে সীমিত মাত্রায় রাখা হয়েছে (Piegay et al., 2006)। বিনুনি নদীর বিবর্তনের ইতিহাস এবং সেগুলোর ভূ-রূপ বোঝার জন্য চার্লভ ও অ্যালেক্সিভস্কি (২০১৩) রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ৪০টি নদীর মোট ২০০টির বেশি বিনুনি অংশ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তারা এই উপসংহার টেনেছেন যে, প্রবাহকে ভাগ করে নেয়ার বিষয়টি এইসব বিনুনি শাখা-প্রশাখার জলজ প্রভাবের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পলি প্রবাহ, পানি প্রবাহ এবং যে ভূমির উপর দিয়ে সেগুলো প্রবাহিত হয় সেই ভূ-সংস্থানের মধ্যে একটি ভারসাম্য অর্জিত না হলে বিনুনি প্রবাহগুলো ভূতাত্ত্বিক সময়ের মানদণ্ডে বিবর্তিত হতে হতে আরও স্থিতিশীল সর্পিল নদীতে রূপ নেয়, এগুলোকে কৃত্রিমভাবে স্থিতিশীল করা যায় না। যদিও একটি নদীর গড় পানি প্রবাহ এবং গড় প্রশস্ততার মধ্যে একটি সম্পর্ক আছে, তবে বিনুনি নদীগুলো এর ব্যতিক্রম। এগুলো যতটুকু পানি প্রবাহ বহন করে তার তুলনার অনেক বেশি প্রশস্ত হয়। উচ্চ পরিমাণের পলিপ্রবাহ থাকে যেসব বিনুনি নদীগুলোতে সেগুলোর ঝোঁক থাকে অধিকতর প্রশস্ত হওয়ার দিকে, যেমনটা নিউজিল্যান্ডের নর্দান আইল্যান্ডের বিনুনি নদীগুলো এবং আমাদের তিস্তা নদী। যেসব বিনুনি নদীতে মাঝারি মাত্রায় পলি প্রবাহ থাকে, যেমন নিউজিল্যান্ডের সাউদার্ন আইল্যান্ডের বিনুনি নদীগুলো এবং ফ্রান্সের বাঁধহীন ড্রোম নদী, সেগুলো চিহ্নিত করা হয় সর্বোচ্চ পরিমাণে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি প্রাণবৈচিত্রের আবাসস্থল হিসেবে (Piegay et al., 2006)।

উচ্চ পরিমাণের পলিপ্রবাহ থাকে যেসব বিনুনি নদীগুলোতে সেগুলোর ঝোঁক থাকে অধিকতর প্রশস্ত হওয়ার দিকে, যেমনটা নিউজিল্যান্ডের নর্দান আইল্যান্ডের বিনুনি নদীগুলো এবং আমাদের তিস্তা নদী।

মাঠের এবং গবেষণাগারের পরীক্ষাগুলো থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, একটি বিনুনি ধারা পলিগুলোকে নদীর দুই পাশে ঠেলে দেয়, যেমনটা দেখানো হয়েছে চিত্র ৩-এ। পানিমিশ্রিত পলিগুলো ক্ষয়কারী ঘর্ষক কণা বা “শিরিষ কাগজের” মতো আচরণ করে যেটি নদীর পাড়কে পানির কিনারা বা ধার বরাবর ক্ষয় করতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না পানি-তলের উপরের পলিকণার স্তরগুলো ধসে পড়ে এবং এভাবে নদী ক্রমশ চওড়া হতে থাকে। যেহেতু বাংলাদেশের সকল নদীর মধ্যে প্রতি একক বারিপাত অঞ্চলের প্রবাহে পানিমিশ্রিত পলির (suspended sediment) পরিমাণ তিস্তা নদীতে সর্বোচ্চ, তাই ক্ষয়কারী ঘর্ষক পলিকণার (sediment particles) উপস্থিতির কারণে এখানে নদীভাঙনের সুবিধা হচ্ছে (চিত্র ৪), যেটি চওড়া করে দিচ্ছে নদীবক্ষকে।

চিত্র ৩: একটি গতানুগতিক বিনুনি নদীর চিত্র যেটিতে পানি প্রবাহ ও পলির গতিপথ দেখানো হচ্ছে। স্মরণে রাখবেন পলি নদীর পাড়কে জড়িয়ে ধরে এবং “শিরিষ কাগজের” মতো কাজ করে, যেটি ভাঙনকে এগিয়ে দিয়ে নদীবক্ষকে প্রশস্ত করে তোলে (modified from Church, 2015)।
চিত্র ৪: বিনুনি নদীর ভূ-রূপের একটি প্রস্থচ্ছেদ। সবুজ তীরটি নদীতীরের সেই অংশটিকে চিহ্নিত করছে যেখানে পানিমিশ্রিত পলি নদীভাঙনকে সহজ করে দেবে। সবুজ তীর দিয়ে চিহ্নিত এলাকাটিতে নদী ভাঙন কমাতে এটিকে শক্ত করে তোলার প্রয়োজন পড়বে হয় পাড় বাঁধাই করা অথবা পাড়ে কোন শক্ত আবরণ (আর্মোরিং বা রিভেটমেন্ট) দেয়ার মাধ্যমে। লাল ত্রিভুজ দিয়ে নদীর পাড়ে প্রস্তাবিত বাঁধ দেখানো হচ্ছে। বাঁধ ব্যর্থ হবে যদি পানিমিশ্রিত পলির কারণে পার্শ্বীয় নদীভাঙন হয় (modified after Church, 2015)।

বিনুনি প্রবাহের ক্ষেত্রে স্থিতিশীল থাকাটা বিরল এবং এটি এমন একটি উপত্যকার তলদেশকে নির্দেশ করে যেটি এখনো সক্রিয়ভাবে নির্মিত হচ্ছে (Piegay et al, 2006)। জটিল, গতিশীল এবং বিবর্তনমুখী প্রকৃতির কারণে, প্রকৌশল কাঠামো দিয়ে বিনুনি প্রবাহের ব্যবস্থাপনা করার বিষয়টি অপেক্ষাকৃতভাবে অপ্রচলিত। বিনুনি প্রবাহে মানুষের হস্তক্ষেপের সীমিত উদাহরণের মধ্যে রয়েছে এর পরিবর্তনের গতিমুখকে উল্টে দেয়া যাতে ওই নদীগুলোর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে ফিরিয়ে আনা যায়। যেমন, দক্ষিণ ফ্রান্সের ড্রোম নদীটিকে পূর্বেকার ভূ-রূপে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছিল এটিকে প্রশস্ত করার মাধ্যমে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইয়োমিংয়ের পাইন ক্রিক নদীটিকে সরু করে এর পূর্বেকার রূপে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছিল। পিগেই ও অন্যরা (২০০৬) এটা দেখতে পেয়েছিলেন যে যখন কোন সক্রিয় বিনুনীপ্রবাহধীন উপত্যকায় (ব্রেইডপ্লেইন) কোন স্থায়ী অবকাঠামো বানানো হয় তখন অনেক ধরনের সমস্যার উদ্ভব হতে পারে। মানুষের হস্তক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় বিনুনি প্রবাহকরণ প্রক্রিয়া এমন সব এলাকায় বেড়ে যেতে পারে যেগুলো ভূতাত্ত্বিকভাবে অস্থিতিশীল, যেমনটি জাপানের পার্বত্য অঞ্চল (Marutani et al., 2001)। গজলডোবা ও দোনাই-দালিয়া ব্যারেজ বানানোর পর থেকে তিস্তা নদীর নদীভাঙনের হার বেড়ে গেছে। আশরাফী ও অন্যদের (২০১৬) একটি গবেষণা থেকে দেখা যায়, ২০০০ এর দশকে নদীর পাড় ভাঙনের হার ত্বরান্বিত হয়েছে। এমন জায়গায়ও রয়েছে যেখানে নদীপথ তার পূর্বেকার পথ থেকে ৩ কিলোমিটার পর্যন্ত সরে গেছে। বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা বিনুনিকরণ কর্মকান্ড কমানোর দাবি জানিয়েছেন, বিশেষত যেখানে মানুষের কারণে বিনুনীকরণ ঘটছে। জাপান ও নিউজিল্যান্ডে বিনুনি নদীর প্রাকৃতিক ভূ-রূপগত বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনার এমন উদাহরণ রয়েছে (Marutani et al., 2001)।

গজলডোবা ও দোনাই-দালিয়া ব্যারেজ বানানোর পর থেকে তিস্তা নদীর নদীভাঙনের হার বেড়ে গেছে। আশরাফী ও অন্যদের (২০১৬) একটি গবেষণা থেকে দেখা যায়, ২০০০ এর দশকে নদীর পাড় ভাঙনের হার ত্বরান্বিত হয়েছে।

গ্রে ও অন্যরা (২০১৮) নিউজিল্যান্ডের প্রাকৃতিক বিনুনি প্রবাহের প্রতিবেশগত মূল্য নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং তারা লিখেছেন যে, সেগুলো হল জটিল ও গতিশীল এক আবাসস্থল যেগুলো অতি মূল্যবান প্রাণবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। তারা বিদ্যমান প্রকৌশল ব্যবস্থাপনার চর্চাগুলোকে পরিবর্তন করার সুপারিশ করেছেন যাতে বিনুনি নদীর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, এর প্রাণবৈচিত্র্য ও বাস্তুসংস্থানের সুরক্ষা দেয়া যায়। ‍সীমিত ক্ষেত্রে, তারা বন্যা প্রতিরোধী বাঁধ ও গ্রোয়েনের মতো স্থায়ী অবকাঠামো বানানোর সুপারিশ করেছেন যাতে বিনুনি নদীর প্রবাহটির অভিবাসন একটি কাঙ্ক্ষিত পার্শ্বীয় মাত্রাকে ছাপিয়ে না যায়। তিস্তা নদীর পার্শ্বীয় অভিবাসনের ক্ষেত্রেও অনুরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায় যেখানে নদীভাঙন জনবসতি ও অন্যান্য মূল্যবান সম্পদকে হুমকিতে ফেলছে।

প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্পের প্রবক্তারা মনে করছেন যে, ‘পাওয়ার চায়না’ (২০২০) তাদের হুয়াঙহো নদীর সফল ব্যবস্থাপনার জ্ঞানটাকে কাজে লাগিয়ে তিস্তা নদীর বন্যা ও নদীভাঙনের মতো বিষয়গুলোকে সমাধান করতে পারবে (Islam, 2021)। এই লেখক বেশ কতগুলো কারণে এক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করেন। প্রথমত, হুয়াঙহো এবং তিস্তা নদীর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য আলাদা। হুয়াঙহো একটা সর্পিলাকার নদী যেটি চীনের সীমানার ভেতরেই বিভিন্ন ভৌগলিক বৈশিষ্ট্যের প্রদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। অন্যদিকে তিস্তা একটি বিনুনি নদী যার উৎপত্তি হয়েছে সিকিমের হিমবাহ হ্রদে এবং যেটি বাংলাদেশে প্রবেশের আগে পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দিয়ে গেছে। এর নদীপ্রবাহের ভাটি অঞ্চলের মাত্র ১৭ শতাংশ বাংলাদেশের মধ্যে। নদীর কূল উপচে পড়া নিয়ন্ত্রণ করতে এবং পলিপ্রবাহ কমাতে চীন অসংখ্য উদ্যোগ নিয়েছে তার উজানের এলাকাগুলোতে বনায়ন করা এবং উপচে পড়া পানির জন্য খাল কাটার মাধ্যমে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তিস্তার উজানের এলাকা যেটি ভারতের সিকিমে অবস্থিত সেখানকার ভূমির ব্যবহার পরিবর্তন করার এমন কোন সুযোগ নেই। পুরো তিস্তা নদীর পানি প্রবাহের অঞ্চলজুড়ে ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে সমঝোতা ও সমন্বয় করা ব্যতীত এর ভাটি অঞ্চলে গৃহীত কোন ধরনের ব্যবস্থাপনার পদক্ষেপই সফল হবে না। সেই সাথে, তিস্তা প্রকল্প প্রকৌশলগত পদক্ষেপ দিয়ে এমন একটি জটিল গতিময় ব্যবস্থার সমস্যাকে সমাধান করতে চাইছে যার জন্য আসলে বৃহৎ পরিসরে দরকার হবে একাধারে নদী প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, জলবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ, জলজ প্রানীবিদ, ভূমি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ এবং ওই অঞ্চলের বসবাসকারী মানুষদের মতামত। তবে এখন যা অবস্থা তাতে বলা যায়, তিস্তা প্রকল্প হল নদী বেষ্টনীর মাধ্যমে নদী ব্যবস্থাপনা করার আরেকটি প্রকল্প যে ধরনের উদ্যোগগুলো গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে নদীভাঙন ও বন্যা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সফল বলে প্রমাণিত হয়নি (Islam, 2020)।

হুয়াঙহো এবং তিস্তা নদীর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য আলাদা। হুয়াঙহো একটা সর্পিলাকার নদী যেটি চীনের সীমানার ভেতরেই বিভিন্ন ভৌগলিক বৈশিষ্ট্যের প্রদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। অন্যদিকে তিস্তা একটি বিনুনি নদী যার উৎপত্তি হয়েছে সিকিমের হিমবাহ হ্রদে এবং যেটি বাংলাদেশে প্রবেশের আগে পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দিয়ে গেছে।

তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা নিয়ে বিশ্লেষণ ও আলোচনা:

তিস্তা প্রকল্প নিচের লক্ষ্যগুলো অর্জনের প্রস্তাব করেছে: (১) শুকনো মৌসুমে পানির অভাব নিরসন করা, (২) বন্যা নিয়ন্ত্রণ, (৩) নদীভাঙন কমানো, (৪) পানি ধারণ ও নাব্যতা বাড়ানো, (৫) শিল্প ও নগরায়ন সম্পর্কিত কমপ্লেক্স স্থাপন করার জন্য জমি পুনরুদ্ধার করা, (৬) সেচের আওতা বাড়ানো এবং (৭) পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের গুণগত মান বৃদ্ধি। যেহেতু এই প্রকল্পের ইআইএ বা প্রতিবেশগত অভিঘাত নিরূপণ সমীক্ষা জনসম্মুখে প্রকাশিত নয়, সেহেতু এই প্রকল্পের পরিপূর্ণ মাত্রা এবং কর্মপরিকল্পনা পূর্ণাঙ্গভাবে জানা যায় নি। তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্যতার এই প্রাথমিক বিশ্লেষণ তাই সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত তথ্য এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (২০১৯) প্রস্তুত করা প্রাথমিক প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাবনার (পিপিডিপি) উপর নির্ভর করে করা হয়েছে। উপরের লক্ষ্যগুলো অর্জনের সম্ভাব্যতাকে বৈজ্ঞানিক সারবত্তার আলোকে নিচের অনুচ্ছেদগুলোতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

(১) শুকনো মৌসুমে পানির অভাব নিরসন করা: তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশে যারা বসবাস করছেন তাদের আইনগত অধিকারকে গত কয়েক দশক ধরে উজানের ভারত সরকার অস্বীকার করে আসছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমে নির্মিত গজলডোবা ব্যারেজ এবং জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর কারণে মানুষের জীবন ও জীবিকা এবং নদীকেন্দ্রিক বাস্তুতন্ত্র পানি, পলি ও পুষ্টি উপাদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই দিক থেকে, ভারতের মানুষ যেসব অর্থনৈতিক সুবিধা ও সমৃদ্ধি ভোগ করছে সেগুলোর অনেকগুলোই হয়েছে তিস্তা নদীর উপর বাংলাদেশের মানুষের অধিকার খর্ব করার বিনিময়ে। তিস্তা নদীর প্রবাহের উপর নিজেদের অধিকার ফিরে পেতে বাংলাদেশের দরকার সকল পর্যায়ে চাপ প্রয়োগ করা। শুকনো মৌসুমে তিস্তা নদীতে বাড়তি প্রবাহ নিশ্চিত করা ছাড়া প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্প পানি সংকটের সমাধান করতে পারবে না। নদীবক্ষকে আরও গভীর করার পর যে পানি সেখানে পাওয়া যাবে সেটি আসলে অগভীর স্তরের ভূগর্ভস্থ পানি। উজানে অবস্থিত ভারত থেকে যদি পানির বর্ধিত প্রবাহ না আসে, তাহলে কোন বাড়তি পানি আসলে ডেজ্রিং করার মাধ্যমে নদী গভীর করে পাওয়া যাবে না। যাই হোক, এধরনের ড্রেজিংয়ের ফলে শুকনো মৌসুমে বাড়তি জমা পানি তখনই পাওয়া যাবে যখন ভাটি অঞ্চলে কোন আড়াআড়ি বাঁধ বা ব্যারেজ বানানো হবে। এ ধরনের আড়াআড়ি বাঁধ বা ব্যারেজ বানাতে গেলে আবার অন্যান্য চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে যেগুলো পরবর্তী অংশে আলোচিত হয়েছে।

(২) বন্যা নিয়ন্ত্রণ: তিস্তা অববাহিকায় বন্যা আরেকটি প্রধান দুর্যোগ। বন্যা এবং আকস্মিক বন্যার সংখ্যা গত কয়েক দশকে বৃদ্ধি পেয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, ১৯৫০ থেকে ২০১০ এর মধ্যে ১০টি বড় বন্যা হয়েছে (১৯৫০, ১৯৫৫, ১৯৬৮, ১৯৭৩, ১৯৭৪, ১৯৭৮, ১৯৯৩, ১৯৯৬, ২০০০ এবং ২০০৩)। অন্যদিকে গত ৫ বছরে ১২ বার বন্যা হয়েছে (২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৯ সালে দুইবার করে, ২০২০ ও ২০২১ সালে তিনবার করে)। তিস্তা অববাহিকায় জানমালের ক্ষতি কমাতে পদক্ষেপ গ্রহণ করাটা খুবই জরুরী। তিস্তা নদী প্রতিবছর গড়ে ২৫ থেকে ৬০ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি বহন করে। ১৯৬৮ সালের ঐতিহাসিক বন্যায় প্রতি সেকেন্ডে ১৯,৮০০ ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হয়েছিল। এই হার অনুসারে, ১৯৬৮ সালের বন্যার সময়ে নদীটি প্রতিদিন ১,৭১০,৭২০,০০০ ঘনমিটার (১.৭১ বিলিয়ন ঘনমিটার) পানি বহন করেছিল। তিস্তা প্রকল্পের আওতায় খননকৃত তিস্তা নদীর সামষ্টিক পানি ধারণ ক্ষমতা হবে ৮২০ মিলিয়ন ঘনমিটার (উপরের দিকের জন্য ৬০ কিলোমিটার*৭০০ মিটার*১০ মিটার এবং নিচের দিকের জন্য ৪০ কিলোমিটার*১০০০ মিটার*১০ মিটার), এই পরিমাণ পানি ১৯৬৮ সালের বন্যাকালীন একদিনের পানি প্রবাহের অর্ধেকেরও কম। তিস্তার মতো বিরাট অববাহিকায় বন্যা সাধারণত একদিনের বেশি সময় ধরে চলে। যদি ১৯৬৮ সালের মতো বন্যা আবার কখনো হয় তাহলে ড্রেজিং করা খালগুলো একদিন পরেই অতিভারাক্রান্ত হয়ে যাবে এবং তখন সম্ভাবনা থাকবে যে নদী তার প্লাবনভূমি জুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। অন্যকথায়, ১৯৬৮ এর মতো বন্যা হলে ড্রেজিং করা খালগুলো এমনকি একদিনের জন্যও বন্যার পানিকে জায়গা দিতে পারবে না।

তিস্তা প্রকল্প হল একটি মানুষ-কেন্দ্রিক বাণিজ্যিক পদ্ধতি যেখানে এটি ধরে নেয়া হয়েছে যে নদীকে একটি সরু খালে বন্দী করে রাখা উচিত যাতে এটি বন্যা ও নদীভাঙনের মাধ্যমে মানুষের কোন ক্ষতি করতে না পারে। একটা নদীতে যেসব প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া সক্রিয় থাকে এবং একটা নদী যেসব প্রতিবেশগত সুবিধা দেয় সেগুলোকে এই পদ্ধতি অস্বীকার করে (Islam, 2020)।

(৩) নদীভাঙন কমানো: তিস্তা প্রকল্প হল একটি মানুষ-কেন্দ্রিক বাণিজ্যিক পদ্ধতি যেখানে এটি ধরে নেয়া হয়েছে যে নদীকে একটি সরু খালে বন্দী করে রাখা উচিত যাতে এটি বন্যা ও নদীভাঙনের মাধ্যমে মানুষের কোন ক্ষতি করতে না পারে। একটা নদীতে যেসব প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া সক্রিয় থাকে এবং একটা নদী যেসব প্রতিবেশগত সুবিধা দেয় সেগুলোকে এই পদ্ধতি অস্বীকার করে (Islam, 2020)। যাই হোক, মানুষ কর্তৃক এই ধরনের অস্বীকার প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার শক্তি ও প্রয়োজনীয়তাকে ডিঙ্গাতে পারে না। একটা নদী, বিশেষত একটা বিনুনি নদী, যেটি পলি ও পানি দিয়ে বোঝাই থাকে সেটির দরকার প্রয়োজনীয় জায়গা যাতে যেকোন পাড়ের দিকে সেটি ছড়াতে পারে, যে জায়গাটুকুকে বলা হয়ে থাকে বিনুনিপ্রবাহধীন উপত্যকা বা প্লাবনভূমি। একটি বিনুনিপ্রবাহধীন উপত্যকা এবং একটি বিনুনি নদী একে অপরের অন্তর্গত অংশ, এবং এই দুটো হাজার হাজার বছরের প্রাকৃতিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় একটি প্রাকৃতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে। এই প্লাবনভূমি ও নদীর উপর মানুষের হস্তক্ষেপ এবং দখল সেই জটিল ভারসাম্যকে অস্থিতিশীল করে দিতে পারে। তিস্তা প্রকল্পের মতো যেকোন নদী ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে, এইসব প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া এবং প্লাবনভূমির সাথে নদী যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত করেছে সেই ব্যাপারে মানুষের সতর্ক থাকা প্রয়োজন। নদীর যে কি প্রয়োজন সেটা মানুষের বোঝা দরকার এবং তাদের সাথে কিভাবে ছন্দ মিলিয়ে বাঁচা যায় সেটাও শেখা দরকার।

বিনুনিপ্রবাহধীন উপত্যকা এবং একটি বিনুনি নদী একে অপরের অন্তর্গত অংশ, এবং এই দুটো হাজার হাজার বছরের প্রাকৃতিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় একটি প্রাকৃতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে। এই প্লাবনভূমি ও নদীর উপর মানুষের হস্তক্ষেপ এবং দখল সেই জটিল ভারসাম্যকে অস্থিতিশীল করে দিতে পারে।

কোন কাঠামো-নির্ভর প্রকল্প সফল হওয়ার জন্য মানুষের কর্মপদ্ধতিতে একটি দর্শনগত দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তন প্রয়োজন। নদীর প্রাকৃতিক চরিত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার পরিবর্তে, বরং জরুরী হল নদী যাতে প্রাকৃতিক নিয়মে চলতে পারে সেজন্য প্লাবনভূমির জায়গা রাখা এবং নদীর প্রাকৃতিক জলজ প্রক্রিয়ার সাথে সাংঘর্ষিক জীবনযাপন প্রণালীগুলোকে পরিবর্তন করা। আখতার ও অন্যদের (২০১৯) গবেষণা এই মর্মে উপসংহার টানে যে, নদী যখন তার প্রবাহ পথকে সরিয়ে নেয়, তখন তার প্রবাহ সরে যাওয়ার হারের ক্ষণস্থায়ী পরিবর্তনগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রভাবিত হয় বিদ্যমান প্রবাহপথের বারিপাত অঞ্চলে উচ্চ মাত্রায় পলি পড়ার কারণে, সেখানে প্রবাহ জুড়েই যে স্থানগত পরিবর্তন হয় সেটি প্রাথমিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় নদীর দুই পাড়ের পার্থক্যের কারণে, যেমনটা তিস্তার বিভিন্ন বালুচর এলাকা গঠনের মধ্য দিয়ে দেখা গেছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, ১৯৭২-২০০০ এর মধ্যে তিস্তা নদীর বাঁক নেয়ার ক্ষমতা, নদীর মধ্যেকার বালুচর এলাকা, এবং বিনুনিকরণ সূচক (ব্রেইডিং ইনডেক্স) বৃদ্ধি পেয়েছে।

নদী প্রবাহের অনিশ্চয়তা এবং উজানে ব্যারেজ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো দ্বারা সৃষ্ট নিয়ন্ত্রণের কারণে তিস্তা নদীপ্রবাহে সৃষ্ট আকস্মিকতার প্রবণতার সাথে এই বিষয়গুলো সম্পর্কিত (Basu, 2017)। অটোরিগ্রেসিভ ইন্টিগ্রেটেড মুভিং এভারেজ (আরিমা) মডেলের ফলাফল এটাই ইঙ্গিত দেয় যে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তিস্তা নদীর মধ্যরেখা বরাবর প্রবাহটি সবচেয়ে বেশি সরবে ডানদিকে (পশ্চিমমুখী) আর ২০২৪ থেকে ২০৩১ এর মধ্যে এটি সবচেয়ে বেশি সরবে বামদিকে (পূর্বমুখী) (Akhter et al., 2019)। সাধারণভাবে, তিস্তা নদী যেভাবে সরে গেছে সেটা এরকম: ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে দোনাই-ডিমলা পর্যন্ত পশ্চিমদিকে, দোনাই-ডিমলা থেকে হাতিবান্ধা উপজেলা পর্যন্ত পূর্ব দিকে, হাতিবান্ধা থেকে গঙ্গচড়া পর্যন্ত পশ্চিমে, গঙ্গাচড়া থেকে রাজারহাট-উলিপুর পর্যন্ত এলাকায় পূর্বদিকে, উলিপুর থেকে পীরগাছা পর্যন্ত পশ্চিমে এবং পীরগাছা থেকে সুন্দরগঞ্জ পর্যন্ত আবার পূর্বদিকে। এটি দৃশ্যমান যে নদীটি তার প্রবাহজুড়ে বিস্তৃত আকারে বাঁক নেয়ার ক্ষমতা ধরে রেখেছে যার তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার (নদীর পাড়ের ভিত্তিরেখা বা ঐতিহাসিক মধ্যরেখা বরাবর প্রবাহের অবস্থান থেকে দুইটি পূর্বমূখী বা পশ্চিমমুখী স্থানচ্যুতির মধ্যেকার দূরত্ব)। নদীটির বিরাট আকারে বাঁক নেয়ার এই অন্তর্গত ক্ষমতা এর অন্তর্গত শক্তি ও প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়, যেটি আসলে একটি যথেষ্ট চওড়া বিনুনিপ্রবাহধীন উপত্যকার দাবী করে যাতে সর্বোচ্চ পরিমাণের পানি ও পলি প্রবাহকে সেটি বন্যার সময় জায়গা করে দিতে পারে। একটি জটিল ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য নদীটির জলজ চরিত্র যেমনটা দাবি করে সেভাবে নদীটি যাতে তার নিজের আকৃতি ও প্রশস্ততাকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে সেটা বিবেচনায় নেওয়া জরুরী। নদীর তলদেশে পলির ক্ষয় ও পলি জমা হওয়ার এলাকাগুলোকে নির্ধারণ করার জন্য, নির্দিষ্ট স্থানে বিভিন্ন সময় ব্যবধানে নদীস্বত্তার প্রস্থচ্ছেদ জরীপ চালানোর মাধ্যমে আরও পানিবিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণা চালানো প্রয়োজন। যতক্ষণ পর্যন্ত নদীভাঙনের অন্তর্নিহিত কারণগুলোকে চিহ্নিত করা না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৌশল কাঠামো বানানোর মাধ্যমে নদীর গাঠনিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে মানুষের হস্তক্ষেপ সফল হবে না।

নদীপাড়ের পলিকণাগুলোকে (বালু, নুড়ি, পাথার, ইত্যাদি) নদীপাড় থেকে আলাদা করার জন্য একটি নির্দিষ্ট গতিবেগ সম্পন্ন স্রোতের প্রয়োজন হয়, যা কিনা নির্ভর করে পলিকণাগুলোর ব্যাসের আকারের উপর।  এই সাধারণ নিয়মটিকে হিউলস্ট্রম একটি রেখাচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন (চিত্র ৫)। নদীর পাড় তখনই ভাঙ্গে যখন নদীর পাড় গঠনকারী পলিকণাগুলোকে ক্ষয় করার জন্য কিংবা ভাসিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় স্রোতের গতিবেগ থেকেও নদীর পানির গতিবেগ বেশি হয়। কোন একটি স্থানে নদীর পানির গতিবেগ () নির্ভর করে নদীর প্রবাহের পরিমাণের উপর (), যেটিকে মাপা হয় একটি স্থানে নদীর প্রস্থচ্ছেদ এলাকা দিয়ে প্রতিসেকেন্ড কত ঘনমিটার (কিউমেক) পানি প্রবাহিত হয় সেই মানদন্ডে। নদীর প্রস্থচ্ছেদ এলাকা () নির্ভর করে একটি স্থানে নদী গড় প্রশস্ততা ও গড় গভীরতার উপর (অর্থাৎ, এ দুটোর গুণফল)। নদীর প্রস্থচ্ছেদ এলাকা পরিমাপ করা হয় বর্গমিটারে।

এক্ষেত্রে নদীর পানির গতিবেগের সমীকরণটি হল: গ = প/এ।

বর্তমানে, তিস্তা নদীর গড় গভীরতা প্রায় ৫ মিটার এবং গড় প্রশস্ততা প্রায় ৩ কিলোমিটার। সেই হিসাবে, তিস্তা নদীর গড় প্রস্থচ্ছেদ এলাকার (এ) পরিমাণ হচ্ছে ১৫,০০০ বর্গমিটার। অন্যদিকে, প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্পের আওতায় ড্রেজিং করা প্রবাহের উপরের অংশ ও নিচের অংশের প্রস্থচ্ছেদ এলাকার পরিমাণ হবে যথাক্রমে ৭,০০০ বর্গমিটার ও ১০,০০০ বর্গমিটার। তিস্তা নদীর প্রবাহের বার্ষিক গড় পরিমাণ (প) হল প্রতি সেকেন্ডে ৪,০০০ ঘনমিটার। উপরে বর্ণিত গতিবেগের সমীকরণ অনুযায়ী, বিদ্যমান প্রাকৃতিক অবস্থায় নদীর গড় গতিবেগ দাঁড়ায় প্রতি সেকেন্ডে ২৬ সেন্টিমিটার (এ=৩০০০ মিটার x ৫ মিটার = ১৫০০০ বর্গ মিটার। ফলে গ = প্রতি সেকেন্ডে ৪,০০০ ঘনমিটার ÷ ১৫,০০০ বর্গমিটার = প্রতি সেকেন্ডে ০.২৬ মিটার বা ২৬ সেন্টিমিটার)। নদীর পানির এই গতিবেগ তিস্তা নদীর তলদেশে কিংবা পাড়ে থাকা বালু ও নুড়িকে ক্ষয় করার জন্য প্রয়োজনীয় গতিবেগ থেকে সামান্য কম। অন্যদিকে, প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্প-র আওতায় ড্রেজিং করার পরে প্রস্থচ্ছেদ এলাকার জন্য নদীর পানির গতিবেগ হবে প্রতি সেকেন্ডে উপরের অংশে ৫৭ সেন্টিমিটার এবং নিচের অংশে ৪০ সেন্টিমিটার। এই গতিবেগ প্রাকৃতিক অবস্থায় থাকা নদীর পানির গতিবেগ থেকে অনেক বেশি। ঐতিহাসিকভাবে তিস্তা নদীতে পানি প্রবাহের সর্বোচ্চ পরিমাণ ছিল সেকেন্ডে ১৯,৮০০ ঘনমিটার (Rudra, 2003)। এরকম প্রবাহের ক্ষেত্রে, ড্রেজিং করা সরু নদীর উপরের অংশে ৭,০০০ বর্গমিটারের প্রস্থচ্ছেদ এলাকার জন্যে নদীর গতিবেগ হবে সেকেন্ডে ২৭১ সেন্টিমিটারের বেশি, যেটি প্রকৃতিগতভাবেই নদীপাড়ের  বিদ্যমান পলিকণার (যা মূলতঃ বালু এবং নুড়ি দ্বারা গঠিত) জন্য ভাঙন সৃষ্টিকারী হবে। অন্যকথায়, তিস্তা প্রকল্প-র আওতায় তিস্তা নদীকে তার প্রাকৃতিক গড় প্রশস্ততা থেকে সরু করে ফেলা হলে নদীর পানির গতিবেগ বর্তমানের তুলনায় অনেক বেড়ে যাবে। গতিবেগের এমন বৃদ্ধির ফলে ড্রেজিং করা নদীতে বার্ষিক গড় প্রবাহ এবং বন্যাকালীন প্রবাহ উভয় ক্ষেত্রেই নদীভাঙন সৃষ্টিকারী গতিবেগ অর্জিত হবে।

নিচের হিউলস্ট্রম রেখাচিত্রটি (চিত্র ৫) নদীবক্ষ গঠনকারী পলিকণাগুলোকে ক্ষয় করার জন্য প্রয়োজনীয় গতিবেগ ও পলিকণার ব্যাসের আকারের মধ্যেকার সম্পর্ক দেখাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ তিস্তার নদীর তলদেশ বালু আর নুড়ি দিয়ে গঠিত, যেসব উপাদানের আকার ০.১ মিলিমিটার থেকে ৩ মিলিমিটার। রেখাচিত্রটি থেকে এটা পরিষ্কার যে প্রতি সেকেন্ডে ২৬ সেন্টিমিটারের বেশি গতিবেগ তিস্তা নদীর তলদেশ ও নদীপাড় গঠনকারী পলিকণাগুলোতে ক্ষয় ঘটাবে।

গঙ্গা কিংবা যমুনার তুলনায় তিস্তা নদী বছরে প্রতি একক বারিপাত এলাকায় সর্বোচ্চ পরিমাণে পলি সৃষ্টি করে (Shi et al., 2019; Rahman et al., 2018; Ficsher et al., 2017)। এই পলিগুকণাগুলো উচ্চ প্রবাহের ঘটনাগুলোর সময় নদীর পাড়ে শিরিষ কাগজের মতো কাজ করে, যার ফলে নদীপাড় ভেঙ্গে নদী চওড়া হয়। বৈশ্বিক নদীগুলোর সাথে যদি আমরা তুলনা করি তাহলে বছরে গড়ে প্রতি সেকেন্ডে ৪,০০০ ঘনমিটার পানি প্রবাহ নিয়ে তিস্তার গড় প্রশস্ততা হওয়া উচিত ছিল প্রায় ৫০০ মিটার, কিন্তু তার বর্তমান গড় প্রশস্ততা ৩ কিলোমিটারের বেশি (Church, 2015)। এটা উল্লেখ করাটা গুরুত্বপূর্ণ হবে যে, তিস্তা নদী তার প্রবাহে উচ্চমাত্রায় তারতম্য দেখায় যেটি বিশ্বের বেশিরভাগ নদীর সাথে মিলে না। শেখ ও অন্যদের (২০১৫) গবেষণা অনুসারে, তিস্তা নদীর বারিপাত অঞ্চলে ঘটা বৃষ্টিপাত ও পানি প্রবাহের ৭০% ঘটে বর্ষার সময়ে (জুন-আগস্ট)। তিস্তা নদীর বর্তমান প্রশস্ততা এবং বিনুনি চরিত্র তার সর্বোচ্চ প্রবাহের উপর নির্ভরশীল, যেটি তার গড় পানি প্রবাহ ও পলির পরিমাণের উপর নির্ভরশীল নয়।

চিত্র ৫: হিউলস্ট্রম চিত্রটি পলিকণার ব্যাসের আকার ও তার ক্ষয়কারী গতিবেগের মধ্যেকার সম্পর্কটি দেখাচ্ছে। মনে রাখবেন, তিস্তা নদীর বালু ও নুড়িকে ক্ষয় করার জন্য যে গতিবেগ লাগবে তা সেকেন্ডে ২৬ সেন্টিমিটারের চেয়ে বেশি (সবুজ ডট লাইন)। তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বার্ষিক গড় গতিবেগ (উপরের অংশে প্রতি সেকেন্ডে ৫৭ এবং নিচের অংশে ৪০ সেন্টিমিটার) কিংবা ১৯৬৮ সালের বন্যার মতো পরিস্থিতির – উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষয়কারী গতিবেগ অর্জিত হয়ে যাবে (লাল ডট লাইন) (modified from Kunaka (2020)।

তিস্তা নদীর তলদেশ এবং পাড় যে বালু আর নুড়ি দিয়ে গঠিত সেগুলো প্রাকৃতিকভাবে ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি স্থিতিকোণে (angle of repose) বিন্যস্ত হয় (Bobrowski and Marker, 2018)। যদি নদীর প্রশস্ততা ৫ কিলোমিটার থেকে ১ কিলোমিটার বা তার কমের মধ্যে আটকে ফেলা হয়, তাহলে নদীর পাড়ের ঢাল আরও খাড়া হবে (সম্ভবত ৫০ থেকে ৬০ ডিগ্রি কোণে)। যত সময় যাবে, নদীর পাড়ের পলিকণাগুলো তাদের প্রাকৃতিক ঢাল, অর্থাৎ ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রির মধ্যে নিজেদের সাজিয়ে নেবে। এটা করতে গিয়ে, নদীর পাড় ভাঙতে শুরু করবে এবং প্রশস্ত হতে শুরু করবে যাতে তার উপাদানগুলো প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর কোণে নেমে আসতে পারে। এর ফলে নদীভাঙন এবং নদীর প্রশস্ত হয়ে ওঠা ত্বরান্বিত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে এবং নদীর পাড়ে যেসব বাঁধ বানানো হবে সেগুলোকে সেটি হুমকির মুখে ফেলে দেবে।

(৪) পানি ধারণ ও নাব্যতা বাড়ানো: একটা পানি ধরে রাখার কাঠামো, যেমন চিলমারীতে আড়াআড়ি বাঁধ, শুকনো মৌসুমে পানি ধরে রাখতে সক্ষম হবে। ধরে রাখা পানি সেচ, মৎস্যচাষ, বাস্ততন্ত্রের সেবা ও নাব্যতার কাজে ব্যবহার করা যাবে। যাই হোক এমন ধরনের কাঠামো অবশ্য ব্রহ্মপুত্র নদের দিকে এবং ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে নৌ চলাচলকে বাধাগ্রস্ত করবে। সেই সাথে, নদীর বহন করা পলির কিছু অংশ এমন ধরনের আড়াআড়ি বাঁধের পিছনে জমা হবে, যেটি আবার ওই বাঁধের পেছনের জলাধারকে ভরাট করে ফেলবে। দেশের ভেতরের বেশিরভাগ বাঁধই পলি জড়ো করে থাকে। যদি মোট পলিকণার ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ (৩১ মেট্রিক টন বা ৩১ বিলিয়ন কেজি, যার প্রতি ঘনফুটের ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ১,৬৫০ কেজি হিসাবে ধরলে ত্রৈমাত্রিক ঘনফল হবে ১৮.৭৮ মিলিয়ন ঘনমিটার) বাঁধের পেছনে জমা হয় তাহলে চিলমারী থেকে কাউনিয়া পর্যন্ত খনন করা অংশ (৪০০ মিলিয়ন ঘনমিটার) ভরাট হয়ে যেতে ৪৪ থেকে ৮৮ বছর সময় লাগবে। সেই সাথে, জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে যে চিলমারীতে থাকা এরকম একটা বাঁধ উজানে থাকা অঞ্চলগুলোতে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাবে।

তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নদীভাঙন বৃদ্ধির কারণে নদীতে পলির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। পলিপ্রবাহের এমন বৃদ্ধির ফলে জোর সম্ভাবনা রয়েছে যে বাঁধের পেছনে পলি জমা হওয়ার হার বেড়ে যাবে, যার ফল হবে প্রাক্কলিত ৪৪ থেকে ৮৮ বছরের আগেই নদী ভরাট হয়ে যাবে।

(৫) শিল্প ও নগরায়ন সম্পর্কিত কমপ্লেক্স স্থাপন করার জন্য জমি পুনরুদ্ধার করা: তিস্তা একটি জটিল বিনুনি নদী ব্যবস্থা যার বেশ কতগুলো উপনদী ও শাখানদী আছে (Chakrabarty and Ghosh, 2010)। ওয়াদুদ (২০২১) এর একটি মাঠগবেষণা থেকে তিস্তা নদীর বহু উপনদী ও শাখানদীর সন্ধান পাওয়া যায় যেগুলোর মধ্যে রয়েছে: সানিয়াজান, পানাকুরা, নৌতারা, কুমলাল, ধুম, বুড়ি তিস্তা, আউলিয়া খান, কালিবাড়ি, সতী, স্বর্ণামতী, ভিটেশ্বর, কোটেশ্বর, মরা তিস্তা, শ্যামাসুন্দরী, শালমারা, আলাই, মানস, বুড়িয়াল এবং বাইশাদারা (চিত্র-৬)। তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এইসব নদীগুলোর কি ভবিষ্যত হবে সেটা অনিশ্চিত। পাওয়ার চায়না (২০২০) এবং পিপিডিপি (বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, ২০১৯) এর প্রচারণা থেকে যা প্রতীয়মান হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে, এইসব উপনদী ও শাখানদীর বেশিরভাগই মূল নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কাটা পড়বে। বন্যার সময় নদীর প্রবাহ এসব উপনদী ও শাখা নদীতে ভাগ হয়ে যায়, যার ফলে বন্যার তীব্রতা কমে যায়। কিন্তু তিস্তা প্রকল্পের ফলে বন্যার তীব্রতা বাড়ার সম্ভাবনা থাকবে যেহেতু মূল নদী ও তার শাখাগুলোর সংযোগের মধ্যে বাধা তৈরি করা হবে। পুনরুদ্ধার করা জমিগুলো নদীর সক্রিয় বন্যা প্রবাহের এলাকায় থাকবে এবং তাতে সেগুলোর বন্যাজনিত ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। পুনরুদ্ধার করা এলাকাগুলো স্থায়ীভাবে নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার বিপদের মধ্যে থাকবে যেহেতু খননকৃত সরু করে তোলা নদী প্রবাহের মধ্যে বর্ধিত আকারে ক্ষয়কারী গতিবেগ থাকবে যা পূর্বে আলোচিত হয়েছে।

উপনদী ও শাখানদীর বেশিরভাগই মূল নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কাটা পড়বে। বন্যার সময় নদীর প্রবাহ এসব উপনদী ও শাখা নদীতে ভাগ হয়ে যায়, যার ফলে বন্যার তীব্রতা কমে যায়। কিন্তু তিস্তা প্রকল্পের ফলে বন্যার তীব্রতা বাড়ার সম্ভাবনা থাকবে যেহেতু মূল নদী ও তার শাখাগুলোর সংযোগের মধ্যে বাধা তৈরি করা হবে। পুনরুদ্ধার করা জমিগুলো নদীর সক্রিয় বন্যা প্রবাহের এলাকায় থাকবে এবং তাতে সেগুলোর বন্যাজনিত ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তিস্তা নদী তার স্বাভাবিক প্রবাহের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলবে। নদীকেন্দ্রিক বাস্তুতন্ত্র এবং চরগুলোতে বসবাস করা জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা হুমকিতে পড়ে যাবে। প্রাকৃতিক নদীটি পরিণত হবে একটি “নিষ্কাশন নালায়”। সম্ভাবনা আছে যে কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী পুনরুদ্ধার করা জমিগুলো দখল করে নেবে। এই প্রকল্পটি হবে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাওয়া সেকেলে “নদী বেষ্টনী” অথবা বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনার কাঠামোনির্ভর ধাঁচটিরই আরেকটি মঞ্চায়ন (Islam, 2020)। এটি বাস্তবায়িত হলে তার মধ্য দিয়ে আন্তঃসীমান্ত নদী থেকে ভারতের অনায্যভাবে পানি সরানোর বিষয়টিকে বাংলাদেশ নায্যতা দিয়ে দেবে।

চিত্র ৬: তিস্তা নদী এবং এর প্রধান উপ/শাখা নদীসমূহ

(৬) সেচের আওতা বৃদ্ধি: তিস্তা প্রকল্পের একটি প্রধান লক্ষ্য হল তিস্তা নদীর ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করে সেচের আওতা বাড়ানো। বাংলাদেশে ১ কেজি ধান উৎপাদন করতে গড়ে ৩,০০০ লিটার পানি প্রয়োজন পড়ে (Shahid, 2007)। প্রতি হেক্টরে গড়ে ৫.৫ টন বা ৫,৫০০ কেজি ধান হয় (Satter, 1998)। এই হার অনুযায়ী, ধান উৎপাদনের মৌসুমে জমিতে গড়ে ১.৬৭ মিটার গভীর পানি দরকার হবে যার মানে হল, প্রতি হেক্টরে ১৬,৭০০ ঘনমিটার পানি লাগবে। ধান উৎপাদন মৌসুমে তিস্তা নদীর গড় প্রবাহ থাকে ৫০০ কিউসেকের নিচে বা সেকেন্ডে ১৫ ঘনমিটার। সেই হারে, ১২০ দিনের বোরো ধান উৎপাদনকালীন সময়ে নদী বহন করবে ১৫৫,০০০,০০০ ঘনমিটার পানি, যেটি দিয়ে ৯,৩১২ হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া যাবে। যদি ভারতের সাথে পানি ভাগাভাগির কোন চুক্তি করা না যায়, তাহলে শুকনো মৌসুমে (জানুয়ারি-এপ্রিল) এই পরিমাণ পানি চিলমারিতে প্রস্তাবিত পানি আটকানোর বাঁধের পেছনে জমা করতে হবে। যদি বাংলাদেশ সরকার ভারতের সাথে চুক্তি করে প্রতি সেকেন্ডে ১০০ ঘনমিটার (৩৫০০ কিউসেক) পানি নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে সর্বমোট ১,০৩৬,৮০০,০০০ ঘনমিটার (প্রায় ১ বিলিয়ন ঘনমিটার) পানিপ্রবাহ শুকনো মৌসুমের ১২০ দিনে উজানের ভারত থেকে বাংলাদেশে আসবে, যা ৬২,০৮৩ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের সেচ দেয়ার জন্য পর্যাপ্ত। এর আরও মানে হল এই যে পরিবেশগত প্রবাহের জন্য তখন আর কোন পানি থাকবে না। তদুপরি যদি একটি গ্রহণযোগ্য পরিমাণ পানির নিশ্চয়তা ভারতের সাথে চুক্তি করার মধ্য দিয়ে পাওয়া যায়, তাহলে সেই পানি ধারণ করা হবে দোনাই-দালিয়া ব্যারেজে তিস্তা সেচ প্রকল্পর (টিআইপি) জন্য, এবং এর ভাটিতে তিস্তা প্রকল্পের জন্য যেসব খালের নকশা করা হয়েছে সেখানে কোন পানিই পৌঁছাবে না।

একটি সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৬ লক্ষ হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে যদি তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয় (Islam, 2021)। ১০ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি লাগবে ওই ৬ লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচ দেয়ার জন্য, যার মানে হল ভারত থেকে প্রায় ১,০০০ ঘনমিটার (৩৫,০০০ কিউসেক) পানি বাংলাদেশে আসতে হবে বোরো মৌসুমে। এই বিপুল পরিমাণ পানি তিস্তা নদীতে কেবল বর্ষাকালেই প্রবাহিত হয় (জুন-আগস্ট)। তিস্তা নদীর সর্বনিম্ন গড় প্রবাহ হল সেকেন্ডে ৪০ ঘনমিটার ১৯৯৬-১৯৯৯ সময়ে (Islam, 2020)। ২০১৬ সালে শুকনো মৌসুমে পানি প্রবাহ নেমে গিয়েছিল সেকেন্ডে ৮.৫ ঘনমিটারে। ভারতের ৯২০,০০০ হেক্টর জমিতে সেচ দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা আছে, কিন্তু রুদ্রের (২০০৩) গবেষণা অনুসারে, কেবল ১২৬,১১০ হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া সম্ভব হয়েছিল ২০০১ সালে। অনুরূপভাবে যদিও টিআইপি-র আওতায় শুরুতে ৭৫০,০০০ হেক্টর জমিতে সেচ দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল কিন্তু আজ পর্যন্ত সর্বোচ্চ কেবল ১১১,০০০ হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওই ১১১,০০০ হেক্টর জমির বেশিরভাগই শুকনো মৌসুমে আবাদ করার অনুপযোগী হয়ে পড়ে পানির অভাবে। উদাহরণ স্বরূপ, ২০১৩-১৪ সালে মোট সেচের আওতায় থাকা এলাকার মাত্র ৩৫% জমিতে আবাদ হয়েছিল (Roy, 2020)। টিআইপি-র নকশা করা হয়েছিল সর্বোচ্চ পানির প্রাপ্যতার ভিত্তিতে যা সেকেন্ডে প্রায় ২৮৩ ঘনমিটার (১০,০০০ কিউসেক)। টিআইপি এবং টিবিপি দুটোই অতি উচ্চাভিলাষী সেচ প্রকল্প। বসু (২০১৭) লিখেছেন যে, এই দুই সেচ প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রায় থাকা সেচের আওতাধীন এলাকা হল ১,৬৭০,০০০ হেক্টর, যার জন্য তিস্তা নদীতে শুকনো মৌসুমে (জানুয়ারি-এপ্রিল) দরকার হবে সেকেন্ডে অন্তত ১,৬০০ ঘনমিটার (৫৬,৫০০ কিউসেক) পানি প্রবাহ।

গজলডোবা ব্যারেজ বসিয়ে পানি সরিয়ে নেয়ার আগে শুকনো মৌসুমে দোনাই-দালিয়া পয়েন্টে গড় পানি প্রবাহ ছিল সেকেন্ডে ১০০-৩৫০ ঘনমিটার (Mullick et al., 2010)। বসু (২০১৭) অনুসারে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন বলছে যে, শুকনো মৌসুমে ধান চাষে সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে, তিস্তাতে প্রয়োজনীয় পানি প্রবাহের (প্রতি সেকেন্ডে ১,৬০০ ঘনমিটার) কেবল ছয় ভাগের এক ভাগ থাকে (সেকেন্ডে ১০০ ঘনমিটার)। ধানচাষ পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার প্রধান অংশের জীবিকা। যদিও এটি পরিষ্কার নয় যে ধান চাষের টার্গেট এলাকাগুলো কোনগুলো এবং কোন কোন বারিপাত এলাকায় এই লক্ষ্যমাত্রাগুলো ঠিক করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে তিস্তা থেকে পানিকে ঘুরিয়ে দিয়ে সেটাকে অন্যান্য পানিপ্রবাহে চালান করে দেয়া হচ্ছে সেটি ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক রীতিনীতির লঙ্ঘন। এটা উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ যে, তিস্তা নদীতে গুণগতভাবে গ্রহণযোগ্য বাস্তুতন্ত্র বজায় রাখতে হলে সেখানে পরিবেশগত প্রবাহ হিসেবে অন্তত সেকেন্ডে ৯০ ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হতে হবে (Mullick et al., 2010)। এই পরিবেশগত প্রবাহ কি যেরকম দরকার সেরকম মাত্রায় বজায় রাখা হবে? যদি বজায় রাখা হয় সেক্ষেত্রে যদি কোন পানি ভাগাভাগি চুক্তি শুকনো মৌসুমে বাংলাদেশে সেকেন্ডে ১০০ ঘনমিটার পানির নিশ্চয়তা দেয়ও, তবুও নদীতে সেচের উদ্দেশ্যে উত্তোলনের মতো কোন পানি বলতে গেলে থাকবেই না।

(৭) বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশের মান উন্নয়ন: যেমনটা উপরে বলা হয়েছে, গজলডোবা ব্যারেজ আর সিকিমের একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের পর থেকে তিস্তা নদীতে শুষ্ক মৌসুমে গড় পানি প্রবাহ স্থায়ীভাবে কমে গেছে। সিকিমে এখন ৫টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোপুরিভাবে চলমান। সেই সাথে, সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গে তিস্তার গতিপথ জুড়ে আরও ১৬টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণাধীন এবং আরও ২২টি নির্মাণের অপেক্ষায় রয়েছে (Islam, 2020)। রুদ্রের (২০০৩) একটি সমীক্ষা অনুসারে, প্রতিটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নদীর প্রবাহের অন্তত ৫ শতাংশ খেয়ে ফেলে বাষ্পীভবন ও ভোগমূলক ব্যবহারের মাধ্যমে। দৃশ্যত, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর আড়াআড়ি বাঁধগুলোর পেছনে পানি আটকে ফেলার সময় সাধারণত ১ থেকে ২ শতাংশ পানি ভাটিতে ছাড়া হয় নদীর বাস্তুতন্ত্রকে বজায় রাখার জন্য (Basu, 2017)।

তিস্তা নদীর পানিকে এরকম একপাক্ষিক ও অনিয়ন্ত্রিত ভাবে আটকে ফেলা ও ব্যবহার করার ফলে সেটি ভাটি অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংস করছে। বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, নাব্যতা, মৎস্য ও বনজ সম্পদের উপর গজলডোবার তিস্তা ব্যারেজের ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে (Islam and Higano, 1999)। অন্য আরেকটি রিপোর্ট অনুযায়ী, সর্বমোট ২৯টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়েছে সিকিমে, যেগুলোর প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা ৩০ থেকে ১,২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত, সবমিলিয়ে প্রায় ৪,৪০০ মেগাওয়াট। যথাযথ বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ছাড়াই নির্মিতব্য সিকিমের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ এই উভয় অংশেই তিস্তা নদীর প্রতিবেশ ও বাস্তুসংস্থানের উপর প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। সিকিমের বেশিরভাগ “রান-অব-দ্য-রিভার” জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো পরিচালিত হচ্ছে উঁচু বাঁধ তুলে নদীকে আটকে ফেলার মাধ্যমে (Basu, 2017)। উজানে পানিকে ঘুরিয়ে দেয়া এবং ব্যবহার করার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিস্তা নদীর বার্ষিক গড় প্রবাহ ৬০ বিলিয়ন ঘন মিটার থেকে ২৫.২ বিলিয়ন ঘনমিটারে নেমে গেছে (Shi et al., 2019)। দোনাই-দালিয়া ব্যারেজের ভাটিতে নদীর প্রবাহ ৩০০ থেকে ৪০০ কিউসেকে (৮.৫-১১.৩৩ কিউমেক) নেমে এসেছে, যেটি জলজ জীবনকে সমর্থন করার জন্য যথেষ্ট নয় (Hossain, 2018)। গত কয়েক দশকে তিস্তার দুই পাড়ে বসবাসরত লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ও জীবিকার অবনমন ঘটেছে। জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিচালনার ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এবং নদী তীরের দুই দেশের মধ্যে পুরো অববাহিকা জুড়ে সমন্বিত পানি ও পলি প্রবাহের চুক্তি করা ছাড়া, এই নদী প্রবাহের হারিয়ে যাওয়া বাস্তুতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করা অসম্ভব।

যথাযথ বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ছাড়াই নির্মিতব্য সিকিমের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ এই উভয় অংশেই তিস্তা নদীর প্রতিবেশ ও বাস্তুসংস্থানের উপর প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে।

সমাধান

তিস্তা নদীর ভাটির অংশে বাংলাদেশের অংশ, যার ফলে উজানে থাকা ভারতের সহযোগিতা ছাড়া এই দেশের পক্ষে এই নদীতে শুকনো মৌসুমে পরিবেশগত প্রবাহ বজায় রাখার কাজটি করা অসম্ভব। যেহেতু তিস্তা একটি আন্তঃসীমান্ত নদী, তাই সারা বিশ্বজুড়ে সাধারণভাবে চর্চিত আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও আইনগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে উজানে এর যথাযথ ব্যবস্থাপনার ব্যাপারটি ভারতকে নিশ্চিত করতে হবে। ভাটি অঞ্চলের দেশের প্রতি কোন ক্ষতি না করার নীতি এবং তাদের নায্য হিস্যা দেয়ার বিষয়টির প্রতি ভারতকে সম্মান দেখাতে হবে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যেকার গঙ্গা চুক্তিতে অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ক্ষেত্রেও পানি ভাগাভাগির বিষয়টির মীমাংসা করার আহ্বান ছিল। শুকনো মৌসুমে সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পরিচালনা করার ক্ষেত্রে পানি আটকানো এবং বর্ষাকালে পানির অতিপ্রবাহকে ভাটির দিকে ঠেলে দেয়া বাদ দিয়ে কঠোরভাবে রান-অব-দ্য-রিভার মডেল যেভাবে ব্যবহার করার কথা সেভাবেই ব্যবহার করা প্রয়োজন। আদর্শ ক্ষেত্রে রান-অব-দ্য-রিভার মডেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার মানে হল খুবই অল্প পরিমাণে বা প্রায় কোন পানিই আটকে না রেখে কেবল নদীর প্রবাহ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা। অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রয়োজন তার সকল প্রকার কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পানি কূটনীতিকে কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত করা। ভারতকে এটা বুঝতে হবে যে আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি দুই দেশের মধ্যে একটা বন্ধুত্বের বাঁধনে পরিণত হতে পারে। পানি ও পলির একটি ন্যায়সঙ্গত ও চলনসই হিস্যা ভাগাভাগি করে নেয়া কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিপ্রস্তর হওয়া উচিত যেটা এই অঞ্চলের আঞ্চলিক শান্তি ও সমৃদ্ধিকে নিশ্চিত করবে।

যদিও সময়ের সাথে সাথে নদীভাঙনের স্থান ও দিক পরিবর্তনগুলো ভালভাবেই নথিবদ্ধ রয়েছে, তবুও এর পেছনের প্রাকৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক কারণগুলো নিয়ে গবেষণা করাটা গুরুত্বপূর্ণ। নদীভাঙন ঠেকাতে যেকোন কাঠামোনির্ভর সমাধানকে এসব পেছনের কারণগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, যতক্ষণ পর্যন্ত উজানের ভারত হতে আসা নদীর পানি ও পলি প্রবাহের পরিমাণটি অনিশ্চিত ও অনিয়ন্ত্রিত হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশে ভাটি অঞ্চলে নদীভাঙন ঠেকানো খুবই কঠিন হবে।

যতক্ষণ পর্যন্ত উজানের ভারত হতে আসা নদীর পানি ও পলি প্রবাহের পরিমাণটি অনিশ্চিত ও অনিয়ন্ত্রিত হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশে ভাটি অঞ্চলে নদীভাঙন ঠেকানো খুবই কঠিন হবে।

টিআইপি প্রকল্পের আওতায় তিস্তা নদীর ভূ-উপরিস্থ পানির উপর সেচের নির্ভরতাকে সর্বোচ্চকরণ করতে হবে শুকনো মৌসুমের সাথে সামঞ্জস্য রেখে। তিস্তা নদীর পানি দিয়ে সেচ দেয়ার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে উভয় জায়গাতেই বাস্তবসম্মত নয়। তিস্তার পানিকে আরেক নদীর অববাহিকায় নিয়ে যাওয়াটা নদীর বাস্তুতন্ত্র বজায় রাখার ক্ষেত্রে ন্যায়সঙ্গত নয়। টিআইপি প্রকল্পে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার একটি বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। তাছাড়াও, মাটির তল থেকে অবিরাম পানি তুলতে থাকলে প্রাকৃতিক পুনর্ভরণ হারকে ছাপিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আরও নিচে নেমে যাবে। টিআইপি ভুক্ত এলাকায়, ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের নিয়ন্ত্রিত কৃত্রিম পুনর্ভরণের সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখতে হবে (Horiche and Benabdallah, 2020; Bouwer, 2002)।

সেই সাথে, সেচের জন্য পানিধারণ ক্ষমতা বাড়াতে টিআইপি এলাকার পরিত্যক্ত প্রবাহগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে, যদি এবং যখন সম্ভব হয়। তিস্তার ফ্যান এলাকায় অবস্থিত বুড়ি তিস্তা, ঘাগট, মানস, বুড়াইল, জমিরজান, আত্রাই, করতোয়া, টাঙ্গন ও পুনর্ভবার মতো প্রধান নদী ও ধারাগুলোকে ড্রেজিং করতে হবে এগুলোর পানি বহন ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনর্ভরণ সক্ষমতাকে বৃদ্ধির জন্য। কৃত্রিম পুনর্ভরণের জন্য প্রবেশযোগ্য ভূপৃষ্ঠ দরকার। যেখানে এগুলো সহজলভ্য নয়, সেখানে অসিক্ত অঞ্চলগুলোতে পরিখা ও খাদ ব্যবহার করা যেতে পারে, অথবা সরাসরি কূপ খননের মাধ্যমে পানিকে সরাসরি অ্যাকুইফার বা ভূগর্ভস্ত পানির স্তরে ঢুকিয়ে দেয়া যেতে পারে (Bouwer, 2002)।

যদিও গজলডোবা ব্যারেজ দিয়ে তিস্তার পানি অন্য নদীর অববাহিকায় সরিয়ে নেয়াটাই বাংলাদেশে শুকনো মৌসুমে তিস্তার পানি না পাওয়ার প্রধান কারণ, তবে, জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পানি সরিয়ে নিচ্ছে এবং সেটাকে নিজেদের সুবিধা মতো ছাড়ছে। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ উভয় জায়গাতেই শুকনো মৌসুমে তিস্তার পানি ভয়াবহ ভাবে কমে যাওয়ার আরেকটা কারণ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর এই পানি আটকে রাখা (Basu, 2017; Rudra, 2003)। জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ও গজলডোবা ব্যারেজ দুটোই ভারত সরকারের অর্থায়ন ও সমর্থনে হয়েছে। ২০০৮-০৯ সালে ভারত সরকার টিবিপি প্রকল্পকে জাতীয় প্রকল্প হিসেবে ঘোষনা দেয় এবং এর ৯০ শতাংশ পরিচালন ব্যয় বহন করে (Giri, 2021)। তিস্তা নদীর পানি ভাগাভাগি নিয়ে চুক্তির জন্য সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের সাথে বাংলাদেশের ভবিষ্যত আলোচনায় তাদেরকে রাজি করানোর বিষয়টি ভারত সরকারের উপর নির্ভর করে। বাস্তবত, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্রেফ একটি পানি ভাগাভাগির চুক্তি যথেষ্ট নয়। নদীর উজানে যদি এমন কোন ভূউপরিস্থ পরিবর্তন আনার প্রকল্প হয় যার ফলে ভাটিতে তিস্তার পানির পরিমাণ ও গুণমান ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেক্ষেত্রে ওইসব প্রকল্প বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদে তথ্য আদানপ্রদানের বিষয়ে দুই পক্ষকেই একমত হতে হবে। বিরোধিতার কাঁটা হিসেবে নয় বরং সম্পদ ও বন্ধুত্বের বন্ধন হিসেবে নদী ভাগাভাগি করার বিষয়ে ভারত ও বাংলাদেশকে একমত হতে হবে।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্রেফ একটি পানি ভাগাভাগির চুক্তি যথেষ্ট নয়। নদীর উজানে যদি এমন কোন ভূউপরিস্থ পরিবর্তন আনার প্রকল্প হয় যার ফলে ভাটিতে তিস্তার পানির পরিমাণ ও গুণমান ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেক্ষেত্রে ওইসব প্রকল্প বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদে তথ্য আদানপ্রদানের বিষয়ে দুই পক্ষকেই একমত হতে হবে।

বাংলাদেশ সরকারকে জাতিসংঘের পানিপ্রবাহ বিষয়ক ১৯৯৭ সালের কনভেনশনটির অনুমোদন দিতে হবে এবং ভারতকেও একই কাজ করতে উৎসাহিত করতে হবে। যদি দুই দেশের মধ্যে পানি-পলি ব্যবস্থাপনার বিষয়ে কোন চুক্তিতে আসা না যায়, তাহলে তারা আন্তর্জাতিকভাবে জাতিসংঘের কনভেনশনের ভিত্তিতে বিরোধের মীমাংসা করতে পারবে।

উপসংহার

যদিও তিস্তা প্রকল্পের প্রস্তাবিত লক্ষ্যগুলো বাংলাদেশের তিস্তা অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের ঈপ্সিত আকাঙ্ক্ষাগুলোকে ধারণ করেছে, কিন্তু সেগুলো সফল হওয়ার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক সারবত্তার অভাব রয়েছে। ভারতের সাথে পানি ভাগাভাগি করার কোন চুক্তি ছাড়া এই প্রকল্প দিয়ে শুকনো মৌসুমে কোন বাড়তি পানিই পাওয়া যাবে না। অন্যদিকে বড় বড় বন্যার সময় খননকৃত প্রবাহগুলোর পানি ধারণ ক্ষমতা মোটেও যথেষ্ট হবে না। তিস্তা নদীর বারিপাত অঞ্চলে অপেক্ষাকৃত উচ্চ পরিমাণে পলি সৃষ্টি করে, যেটি নদীভাঙনের উচ্চ হারের জন্য দায়ী। এই প্রকল্প নদীর প্রস্থচ্ছেদ এলাকাকে সরু করে দিবে যার ফলেও দেখা দেবে নদীভাঙন এবং আরও বেশি বন্যার সম্ভাবনা। তিস্তা নদীর উপর কোন আড়াআড়ি বাঁধ দিলে সেটি খনন করা প্রবাহতে পলি জমিয়ে দেবে, এর ফলে উজানের অঞ্চলগুলোতে বন্যা ও নদী ভাঙ্গন বেড়ে যেতে পারে। তিস্তার প্রবাহকে কাজে লাগিয়ে যে সেচ দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে সেটা বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ উভয়ের জন্যই অবাস্তব। তিস্তা নদীতে শুকনো মৌসুমে পানি যেভাবে কমে যায় সেই বিবেচনায়, যেসব সেচ প্রকল্পের কথা বলা হচ্ছে সেটা সম্পূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্প হল নদী বেষ্টনী করে নদী ব্যবস্থাপনার আরেকটি প্রকল্প। এই ধরনের পদ্ধতি বাংলাদেশে নদীভাঙন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে গত কয়েক দশকে সফল প্রমাণিত হয়নি। তিস্তা নদীতে কোন নদী ব্যবস্থাপনার প্রকল্পকে সফল করতে হলে নদীতে সক্রিয় প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া এবং এই নদীর সাথে যে বহু উপনদী ও শাখানদী আছে, যেগুলো বাংলাদেশ ও ভারত জুড়ে ছড়িয়ে আছে, সেগুলো সম্পর্কে বোঝাপড়া থাকতে হবে।

বাংলাদেশের হাইকোর্ট ২০১৯ সালের একটি রায়ে নদীকে জীবন্ত ও আইনগত স্বত্ত্বা হিসেবে ঘোষনা দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগও এই রায় বহাল রেখেছে (Margil, 2020)। নদীকে জীবন্ত ও আইনগত স্বত্ত্বা হিসেবে চিহ্নিত করে সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছে সেটি একটি সঠিক পদক্ষেপ, উপনদী ও শাখানদীকে ছেঁটে ফেলা সেই রায়কে লংঘন করে। পুনরুদ্ধার করা জমির মালিকানার বিষয়টি নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি (Azaz, 2020)। অন্যদিকে প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্প দৃশ্যতই একটি বিনুনি নদীর নিয়ম ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াগুলোকে অস্বীকার করেছে।

নদীকে জীবন্ত ও আইনগত স্বত্ত্বা হিসেবে চিহ্নিত করে সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছে সেটি একটি সঠিক পদক্ষেপ, উপনদী ও শাখানদীকে ছেঁটে ফেলা সেই রায়কে লংঘন করে।

তিস্তা প্রকল্প-র মতো কাঠামোনির্ভর একটি প্রকল্প সফল হওয়ার জন্য নদী ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা করার ক্ষেত্রে মানুষের কর্মপদ্ধতিতে একটা দর্শনগত দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তন করানো দরকার। তিস্তা নদীর প্রাকৃতিক প্রশস্ততাকে সরু করে ফেলে এর প্রাকৃতিক আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করার বদলে, বরং আমাদের জীবনযাপনের ধরনকে তার সাথে খাপ খাইয়ে নদীর জন্য দম ফেলার জায়গা করে দেয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। নদীতে যেসব প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াগুলো সক্রিয় সেগুলোর বিরোধিতা করে মানুষ সফল হতে পারবে না। প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্পটি দৃশ্যতই একটি বিনুনি নদীর নিয়ম ও প্রক্রিয়াগুলোকে অস্বীকার করেছে।

মো. খালেকুজ্জামান পিএইচডি: অধ্যাপক, পরিবেশ, ভূগোল ও ভূ-তত্ত্ব বিজ্ঞান বিভাগ, কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া, লক হ্যাভেন, পিএ ১৭৭৪৫, যুক্তরাষ্ট্র, ইমেইল: mkhalequ@commonwealthu.edu

তথ্যসূত্র

Acharjee, D., 2020, Tk. 8500 crores to restore flow of Teesta,

http://www.theindependentbd.com/post/244804 (accessed on December 20, 2021)

Ahmed, I., 2012, Teesta, Tipaimukh and River Linking:  Danger to India-Bangladesh Relationship.  EPW, Vol. 47, Issue 16, 21 April. https://www.epw.in/journal/2012/16/river-interlinking-uncategorised/teesta-tipaimukh-and-river-linking-danger (accessed on Dec 20, 2021)

Akhter, S., Eibek, K.U., Islam, S., Islam, S. R. M. T., Shen, S., and Chu, R., 2019, Predicting spatiotemporal changes in channel morphology in the reach of Teesta river, Bangladesh using GIS and ARIMA modeling. Quaternary International, 513(1): 80-94. Doi: 10.1016/j.quaint.2019.01.022

Ashrafi, Z. M., Shuvo, S. D., and Mahmud, M. S., 2016, Change in course pattern in Teesta river:  After effect of an engineering project.  American Geophysical Union, Fall Meeting, abstract #EP51A-0859.

Asianwater, 2020, Bangladesh to seek Chinese support for Teesta River Restoration Project.

https://asianwater.com.my/bangladesh-to-seek-chinese-support-for-teesta-river-restoration-project/ (accessed on December 20, 2021)

Azaz, M., 2020, Teesta River Management Project:  How comprehensive will it be?  The Business Standard, November 19th, 2020.

https://tbsnews.net/feature/panorama/teesta-river-comprehensive-management-project-how-comprehensive-will-it-be-160042 (accessed on December 20, 2021)

Basu, J., 2017, Where are the Teesta Waters?  The Third Pole, June 19, 2017.

https://www.thethirdpole.net/en/regional-cooperation/where-are-the-teesta-waters/ (accessed on December 22, 2021)

Bhattacharjee, K., 2020, What does Chinese interest in the Teesta mean for India?

https://www.thehindu.com/news/international/the-hindu-explains-what-does-chinese-interest-in-the-teesta-mean-for-india/article32420205.ece(accessed on December 20, 2021)

Bobrowski, P. T., and Marker, B., 2018, Encyclopedia of Engineering Geology, Springer Publishers, 1200 pages.  https://pdfs.semanticscholar.org/ed27/b538b6bf5536bb76d65e91b448bbdc58638a.pdf

Bouwer, H., 2002, Artificial recharge of groundwater:  Hydrology and engineering. Hydrogeology Journal, 10, 121-142. https://doi.org/10.1007/s10040-001-0182-4

BWDB, 2019, Preliminary Development Project Proposal (PPDB) for Teesta River Comprehensive Management and Restoration Project. Ministry of Water Resources, Planning Branch-1, 12 p.

Chakma, J, 2020, Bangladesh leans to China for Teesta amidst Indian neglect.

https://www.thedailystar.net/business/news/bangladesh-leans-china-teesta-management-amidst-indian-neglect-1942561(accessed on December 20, 2021)
Chakrabarty, T., and Ghosh, P., 2010,The geomorphology and sedimentology of the Tistamegafan, Darjeeling Himalaya: Implications for megafan building processes:  Geomorphology, Vol. 115, Issue 3-4, P. 252-266

Charlov, S., Alexeevsky, N. I., 2013, Braided rivers: structure, types and hydrological effects. Hydrology Research, 46(2): 258-275.  https://doi.org/10.2166/nh.2013.023.
Church, M., 2015, Channel stability: Morphodynamics and the morphology of rivers.  In Rowinski, P., and Radecki-Pawlik (eds), Rivers – Physical, Fluvial and Environmental Processes, Geo-Planet, Earth and Planetary Sciences, Springer International Publishing, Switzerland.  doi: 10.1007/978-3-319-17719-9_12

Ficsher, S., Pietron, J., Bring, A., Throslund, J., and Jarsjo, J., 2017, Present and future sediment transport of the Brahmaputra river:  Reducing uncertainity in prediction and management.  Regional Environmental Change, 20, 515-526.  https://doi.org/10.1007/s10113-016-1039-7

Giri, P., 2021, Teesta Barrage: Former land owners demand jobs, start agitation in north Bengal.  The Hindustan Times, https://www.hindustantimes.com/cities/kolkata-news/teesta-barrage-former-land-owners-demand-jobs-start-agitation-in-north-bengal-101611905896231.html (accessed on December 28, 2021)
Gray, D. P., Grove, P., Surman, M. R., and Keeling, C., 2018, Braided rivers:  natural characteristics, threats and approaches to more effective management.  Environmental Canterbury Regional Council, Technical Report (Canterbury, New Zealand), Science Group.

Haq, S. A., A., Uzzaman, A., Goodrich, C.G., Mallick, D., Mini, G., Sharma, G., Nyima, K., Mamnun, N., Varma, N., Singh, P., Ghate, R., Triwedi, S., Sen, S., Bhadwal, S., Hassan, T., Dilshad, T., Gulati, V., Naznin, Z., (2017) The Teesta Basin: Enough water for power and agriculture for all?. HI-AWARE Working Paper 12. Kathmandu: HI-AWARE.
Horiche, F. J., and Benabdallah, S., 2020, Assessing aquifer water level and salinity for a managed artificial recharge site using reclaimed water.  Water, MDPI, Volume 12, Issue 2, 341. Doi: https://doi.org/10. 3390/w12020341

Hossain, M., 2018, Teesta River dries up, ecosystems threatened.  Dhaka Tribune, March 26, 2018.  https://www.dhakatribune.com/bangladesh/nation/2018/03/26/teesta-river-dry-ecosystem-threatened (accessed on December 22, 2021)
Islam, M., 2021, Op-Ed on TRCMRP (in Bangla), Daily BanikBarta, November 3, 2021.  https://bonikbarta.net/home/news_description/279061/ (accessed on December 22, 2021)

Islam, S. N., 2020, Rivers & Sustainable Development – Alternative approaches & their implications.  Oxford University Presss, 448 p.

Islam, M. F., and Higano, Y., 2012, Equitable Bi-lateral Sharing International: A Policy Measure of Optimal Utilization of the Teesta River. https://pdfs.semanticscholar.org/ed27/b538b6bf5536bb76d65e91b448bbdc58638a.pdf

Islam, M. F., and Higano, Y., 1999, International Environmental Issue between India and Bangladesh: Environmental and Socio-economic Effects on the Teesta River Area.  39th Congress of the European Regional Science Association: “Regional Cohesion and Competitiveness in 21st Century Europe”, August 23 – 27, 1999, Dublin, Ireland, European Regional Science Association (ERSA), Louvain-la-Neuve.

Kunaka, D., 2020, The Hjulstrom Curve of river erosion, transportation and deposition.  https://thegeoroom.co.zw/hydrology/the-hjulstrom-curve-of-river-erosion-transportation-and-deposition/ (accessed on December 27, 2021)
Margil, M., 2020, Bangladesh Supreme Court Uphold the Rights of Rivers.  Center for Democratic and Environmental Rights, Spokane, Washington. https://mari-margil.medium.com/bangladesh-supreme-court-upholds-rights-of-rivers-ede78568d8aa (accessed on December 21, 2021)

Marutani, T., Brierly, G. J., Trustrum, N. A., and Page, M. (eds), Source-to-Sink Sedimentary Cascadesin the Pacific Rim Geo-systems.  Ministry of Land, Infrastructure and Transport, Matsumoto Sabo Work Office, Japan, 183 p.

Mohan, G., 2020, China to lend Bangladesh almost 1 billion dollars for Teesta River project, reports Bangladeshi media,

https://www.indiatoday.in/world/story/china-to-lend-bangladesh-almost-1-billion-for-teesta-river-project-reports-bangladeshi-media-1712284-2020-08-17 (accessed on December 20, 2021)
Mondal, M. S. H., and Islam, M. A., 2017, Chronological trends in maximum and minimum water flows in the Teesta River in Bangladesh and its implications.  Jamba, Journal of Disaster and Risk Studies, 9(1), 373, doi:  10.4102/jamba.v9i1.373.

Mullick, R., Babel, M., and Perret, S., 2010, Flow characteristics and environmental flow requirements for the Teesta River, Bangladesh:  Proceedings of International Conference on Environmental Aspects of Bangladesh (ICEAB 10), Japan.   http://benjapan.org/iceab10/42.pdf

Piegay, H., Grant, G., Nakamura, F., and Trustrum, N., 2006, Braided river management: from assessment of river behavior to improved sustainable development. Special Publication 36, International Association of Sedimentologists, 257-275 p.

PowerChina, 2020, Promotional Video in support of TRCMRP https://m.facebook.com/watch/?v=3618953924829172&_rdr(accessed on December 20, 2021)

Rahaman, M. M., and Mamun, A. A., 2020, Hydropower development along Teesta river basin:  Opportunities and cooperation.  Water Policy, 22(4), 641-657.https://doi.org/10.2166/wp.2020.136

Rahman, M., Dustegir, M., Karim, R., Haque, A., Nicholls, R., Darby, S. E., Nakagawa, H., Hossain, M., Dunn, F. E., and Akter, M., 2018, Recent sediment flux to Ganges-Brahmaputra-Meghna delta system. Science of the Total Environment, 643, 1054-1064. DOI: 10.1016/j.scitotenv.2018.06.147
Rudra, K., 2003. Taming the Teesta.  The Ecologists Asia, Vol. 11, No. 1. http://www.actsikkim.com/docs/Rudra_Taming_the_Teesta.pdf (accessed on December 20, 2021)

Roy, P. K., 2020, Teesta River Comprehensive Management and Restoration Project.  https://prodip.wordpress.com/2020/09/12/teesta-river-comprehensive-management-and-restoration-project/

Roy, P., 2020, To India’s chagrin, Bangladesh turn to China to transform Teesta river.  The Third Pole, September 28.  https://www.thethirdpole.net/en/regional-cooperation/bangladesh-teesta-river/ (accessed on January 4, 2022.

Satter, S. A., 1998, Bridging the rice yield gap in Bangladesh.  Agronomy Division, Bangladesh Rice Research Institute, Gazipur, Bangladesh.

Shahid, S., 2007, Estimation of irrigation water demands in paddy field of Northwestern Bangladesh using remote sensing and GIS.  Department of Geography, Fredrich-Schiller Universitat, Jena, Germany, 35 p.

Sheikh, M., Reza, A., and Islam, M. T., 2015, Anthropologic impact on morphology of Teesta river in northern Bangladesh:  An exploratory study.  Journal of Geoscience and Geomatics, Volume 3, No. 3, p. 50-55. http://pubs.sciepub.com/jgg/3/3/1 (accessed on January 4, 2022)

Shi, H., Ji, W., and Wang, D., (2019), Study on fluvial processes and sediment transport capacity of Teesta river in Bangladesh.  World Environmental and Water Resources Congress, ASCE, Reston VA. https://ascelibrary.org/doi/10.1061/9780784482353.038 (accessed on December 20, 2021)
Wadud, T., 2021, Op-Ed on tributaries and distributaries of the Teesta river (in Bangla), the ProthomAlo, December 27, 2021.  https://www.prothomalo.com/opinion/column(accessed on December 28, 2021).
 

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *