ডেঙ্গু জ্বর এবং করণীয়

৯ম বর্ষ বিশেষ লেখা
ডা. মো. হারুন-অর-রশিদ

ঢাকা শহর সহ সারাদেশে ডেঙ্গুর আক্রমণ বাড়ছে। এবছর আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার আশংকাজনক। পরিস্থিতি অনুযায়ী সরকার ও সিটি কর্পোরেশনের যথাযথ উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এই রোগের উৎস, সতর্কতা ও করণীয় বিষয়ে এই লেখায় সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে।

১৯৬০ সালে প্রথম ঢাকা শহরে ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব ঘটে। তখন একে ‘ঢাকা ফিবার’ নামে চিহ্নিত করা হয়, কারণ তখন সঠিক রোগ নির্ণয় করা যায়নি। তারপর বহু বছর তার আর লক্ষণ দেখা যায়নি। ২০০০ সালে আবার এর সংক্রমণ দেখা যায়, তখন ঢাকায় ব্যাপকভাবে ডেঙ্গু আক্রমণ পরিলক্ষিত হয়। ঐ সময় আমরা কিছুটা অপ্রস্তুত ছিলাম। ফলে বিনা চিকিৎসায় বা ভুল চিকিৎসায় বেশ কিছু মৃত্যু ঘটে। এর কতগুলো হয়েছিল আমাদের অজ্ঞতার জন্য। যেমন অনেকেই জ্বর কমাতে ডাইক্লোফেনাক বা এই জাতীয় ঔষধ ব্যবহার করেছেন। এই ধরনের ঔষধ নিলে বেশি রক্তপাতের সম্ভাবনা থাকে। এখন জ্বর হলে এই জাতীয় ঔষধ ব্যবহার করা প্রায় হয়না বললেই চলে। ফলে অধিক রক্তপাতে মৃত্যুর সম্ভাবনা কমেছে।

২০১৯ সালে সারা পৃথিবীতেই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। আফ্রিকা, এশিয়া ও আমেরিকাসহ পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক মানুষ এখন ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকিতে আছে। এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বেশি সংক্রমণ হচ্ছে। সারা দুনিয়ার উষ্ণতা বৃদ্ধির সাথে ডেঙ্গু বা এই ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাবের সম্পর্ক রয়েছে। ডেঙ্গু মূলত শহর ও শহরতলীর রোগ। তবে বাংলাদেশে এখন এটা ক্রমেই মহামারীর পর্যায়ে চলে যাচ্ছে।

এডিস মশা চরিত্র বদলাচ্ছে

ডেঙ্গু ফ্লাভিভাইরাস গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। এটি একটি আরএনএ ভাইরাস। এডিস মশা এই রোগের প্রধান বাহক। আগে ধারণা ছিল যে, এডিস মশা সাধারণত জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে বংশবৃদ্ধি করে, শুধুমাত্র গৃহস্থালি কাজে ব্যবহৃত জিনিসপত্র যেমন ফুলের টব বা পুরনো টায়ার, হাড়ি-পাতিল এই জাতীয় জিনিসপত্রগুলোতে জমা পানিতে এডিস মশার বংশবৃদ্ধি ঘটে। তবে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা পরিষ্কার পানিতে বংশবৃদ্ধি ঘটায় বলে যে সাধারণ ধারণা সেটা আসলে আংশিক সত্য। কোলকাতা পৌরসভার সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এই এডিস মশা খুব ভালভাবেই ড্রেনের ময়লা পানিতেও বংশবৃদ্ধি ঘটাতে পারে। বাংলাদেশেও গবেষণা থেকে দেখা গেছে সুয়ারেজ, ড্রেন সহ সবধরণের পানিতে ডিম পাড়তে এবং জীবনচক্র সম্পন্ন করতে পারে এডিস মশা।

ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা পরিষ্কার পানিতে বংশবৃদ্ধি ঘটায় বলে যে সাধারণ ধারণা সেটা আসলে আংশিক সত্য। কোলকাতা পৌরসভার সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এই এডিস মশা খুব ভালভাবেই ড্রেনের ময়লা পানিতেও বংশবৃদ্ধি ঘটাতে পারে। বাংলাদেশেও গবেষণা থেকে দেখা গেছে সুয়ারেজ, ড্রেন সহ সবধরণের পানিতে ডিম পাড়তে এবং জীবনচক্র সম্পন্ন করতে পারে এডিস মশা।

আমাদের সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য বিভাগের আধিকারিকরা ‘এডিস শুধু স্বচ্ছ পানিতে বংশবিস্তার করে’ – এই ধারণার ভিত্তিতে বাসাবাড়ীর মানুষদের দায়ী করে নিজেদের দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তা পুরো ঠিক নয়, কর্তৃপক্ষের দায় আছে দ্রুত ড্রেন ও অন্যান্য জায়গার জলাবদ্ধতা পরিষ্কার করার এবং তা করা প্রয়োজন সারা বছর। সামগ্রিকভাবে মশক নিয়ন্ত্রণের কথাই ভাবতে হবে, শুধু এডিস মশা নয়। বাড়ির আঙ্গিনার সাথে সাথে শহর পরিস্কার ও জমে থাকা জলের দিকে কর্তৃপক্ষকে নজর দিতে হবে।

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ কী কী?

ডেঙ্গু ভাইরাসের ৪টি ধরন আছে। এর ফলে যখন কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় তখন একটি ধরনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললেও অন্য ধরনগুলোর বিরুদ্ধে কোন প্রতিরোধ গড়ে ওঠে না। সাধারণত ফিমেল এডিস মশা প্রজননের প্রয়োজনে মানুষের রক্ত শুষে নেয়। মশা কামড়ানোর দুই থেকে সাত দিনের মধ্যে ডেঙ্গুর লক্ষণসমূহ প্রকাশিত হয়। যদিও শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাসের অনুপ্রবেশের পরেও বহু লোকের মধ্যেই রোগের কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হয় না।

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণগুলো হল:

  • খারাপ লাগা
  • মাথা ব্যথা
  • জ্বর-সারাক্ষণ (Continuous); সাধারণত এমন জ্বর ৭-৮ দিন থাকে
  • সারা গায়ে ব্যথা, বিশেষ করে পিঠে ব্যথা
  • গায়ে লাল লাল ছোপ উঠা; প্রথমে ছোট ছোট, দুদিন পরে বড়ো লাল ছোপ
  • রক্তচাপ কমে যাওয়া (Shock)
  • শ্বাসকষ্ট – বুকে পানি জমা
  • পেট ফুলে যাওয়া – পেটে পানি জমা
  • সন্তান নষ্ট হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।

ডেঙ্গু জ্বরের ক্ষেত্রে প্রয়োজনভেদে কী কী ধরনের পরীক্ষা করাতে হতে পারে

  • রক্তের শ্বেতকণিকা জ্বরের সাথে সঙ্গতি রেখে বৃদ্ধি না ঘটা, অণুচক্রিকা (Platelet) কমে যাওয়া। এটা সাধারণত ২/৩ দিন পরে ঘটে।
  • Ns1 antigen+. এটা সাধারণত ২–৫ দিন পর পজেটিভ হয়।
  • ডেঙ্গু এন্টিবডি (igM)+. ৫ দিন – ২১ দিন। কিন্তু igG সারা জীবন পজিটিভ থাকতে পারে।
  • বুকের এক্সরে, পেটের আল্ট্রাসাউন্ড।

ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা কী:

  • বিশ্রাম, প্রচুর খাবার স্যালাইন ও পানি পান।
  • অবস্থা খারাপ হলে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে।
  • খেয়াল রাখতে হবে যে, বেশিরভাগ রোগী চিকিৎসায় ভালো হয়ে যায়।
  • ব্যথা কমানোর ঔষধ খাবেন না। প্রয়োজনে প্যারাসিটামল খাবেন।
  • এসময় গর্ভবতী নারীর বিশেষ যত্ন প্রদান করতে হবে। ডেঙ্গুতে নারী, বিশেষ করে গর্ভবতী নারীর ঝুঁকি বেশি।

কখন ডেঙ্গু রোগীকে হাসপাতালে নিতে হবে?

ডেঙ্গু হবার পরে শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, হাসপাতালে ভর্তির জন্যও মানুষ মরীয়া হয়ে উঠে। তাই এটাও সকলের জানা থাকা প্রয়োজন যে কোন ধরনের রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করানো জরুরী। রোগীকে হাসপাতালে নিতে হবে যদি নিচের লক্ষণগুলো থাকে:

  • অনিয়ন্ত্রিত বমি
  • প্রচণ্ড পেট ব্যথা
  • অস্থিরতা, অবসাদগ্রস্ত হওয়া
  • ত্বক ফ্যাকাসে হওয়া, ঠান্ডা হয়ে যাওয়া
  • রক্তপাত হওয়া; যেমন নাক, দাঁতের মাড়ি, প্রসাব, পায়খানার মধ্য দিয়ে, কিংবা অতিরিক্ত মাসিক হওয়া
  • ৪-৬ ঘন্টা প্রসাব না হওয়া
  • বিশেষ অবস্থা – যেমন হার্ট, লিভার বা কিডনি কার্যকর না থাকা, গর্ভবতী নারী, অতিরিক্ত মোটা মানুষ, কিংবা একা থাকা ব্যক্তি
  • ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেসার
  • লিভার বড়ো হওয়া (>২ সেমি.), হেমাটোক্রিট বেড়ে যাওয়া (>২০%)
  • পেটে বা বুকে পানি জমা।

উন্নয়ন ধরনের সাথে পুনঃপুনঃ ডেঙ্গুর সম্পর্ক থাকতে পারে

১৯৬০ সালের পরে প্রায় চল্লিশ বছর এদেশে ডেঙ্গু হয়নি। অথচ ২০০০ সালের পরে এটা প্রায় নিয়মিত বিরতিতে ঘটছে। আগে ঢাকা শহরে প্রচুর খাল ও ড্রেন থাকায় জল জমে থাকত না। বর্তমানে জনঘনত্ব যেমন বেড়েছে তেমনি আরও কতগুলো নতুন উপসর্গ নগর জীবনে যুক্ত হয়েছে। প্রায় সমস্ত খাল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বৃষ্টির জল সহসা নেমে যায় না। বাঁধ দেওয়ার ফলে জল পাম্প করে নদীতে ফেলতে হয়। মেট্রোরেল সহ অনেকগুলো নির্মাণাধীন স্থাপনার কাজ বছরের পর বছর চলছে। তাতেও জল জমে থাকে। আবাসন ব্যবসার সাথে যুক্ত নির্মাণাধীন ভবনে জল জমে থাকে এবং ঐ জলে ইতোপূর্বে প্রচুর লার্ভা পাওয়া গেছে। তাই আমাদের ‘উন্নয়ন’ ধরনের সাথে এই পুনঃপুনঃ ডেঙ্গুর সম্পর্ক থাকতে পারে। বিষয়টাকে এভাবে না দেখে শুধু ব্যক্তিকে দায়ী করা হচ্ছে মূলতঃ প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার একটা কৌশল। এছাড়াও যেটা বলা প্রয়োজন তা হল, পলিথিনের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন সেটা ঘরের চারিদিকে পানি জমে থাকতে সাহায্য করে, তেমনি ড্রেনের পানি সহসা চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। তাই অবিলম্বে পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটজাত সামগ্রী ও কাগজের ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরী।

পলিথিনের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন সেটা ঘরের চারিদিকে পানি জমে থাকতে সাহায্য করে, তেমনি ড্রেনের পানি সহসা চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। তাই অবিলম্বে পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটজাত সামগ্রী ও কাগজের ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরী।

ডেঙ্গু মহামারিতে মানুষের অধিকার

ডেঙ্গু ছড়িয়েছে সারা শহরে, সারা দেশে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বিষয়টি দেখছে দায়সারা ভাবে। ঢাকায় সরকারি হাসপাতাল – ঢাকা মেডিকেল, মিটফোর্ড, মুগদা, এমনকি কোনো কোনো বেসরকারি হাসপাতালের মেঝেতেও জায়গা নেই। পুরনো ঢাকার অবস্থা খুবই নাজুক। জুরাইনসহ নানা জায়গায় প্রয়োজনে অস্থায়ী হাসপাতাল তৈরী করা দরকার। সারা দেশের মানুষ ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে চায়। ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই শহরগুলোর পরিচ্ছন্নতা, আর সেটা শুধু ব্যক্তির উদ্যোগে সম্ভব নয়। প্রধান দায়টা সরকার ও সিটি করপোরেশনের। এই মহামারিতে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও স্থানীয়ভাবে মেডিকেল ক্যাম্প পাওয়ার অধিকার মানুষের  আছে।

মো. হারুন-অর-রশিদ: সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক, চিকিৎসক ও সংগঠক।

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *