অতিসাধারণদের কথা

অতিসাধারণদের কথা

মওদুদ রহমান

ছবি: নাভিদ বিন সাখাওয়াৎ

এরপর থিইক্যা গায়ে সেন্ট দেই

দরজাটা কাচের। বাইরে বড় একটা তালা ঝোলানো। ভেতরে ছয় ফুট লম্বা একটা বেঞ্চি পাতা। পাশেই একটা গদিওয়ালা চেয়ার। প্রায় ১৫ ফুট লম্বা করিডরের শেষ মাথায় একটা বেসিন। সাথে আয়নাও আছে। টাইলস বাঁধানো ফ্লোর আর দেয়াল। করিডরের দুই পাশে তিনটা করে ছয় ফুট বাই চার ফুট সাইজ টয়লেটের সারি। কাচের দরজার বাইরে ডান পাশে বড় পিভিসি ব্যানারে লাল কালিতে লেখা ‘পাবলিক টয়লেট’ আর বাম পাশে লেখা ‘প্রস্রাব ১০ টাকা, পায়খানা ১০ টাকা’। প্রায় ১৫ মিনিট অপেক্ষার পর দেখতে পেলাম, রাস্তার অপর পাশের হোটেল থেকে বের হচ্ছে এই পাবলিক টয়লেটের ক্লিনার কাম কেয়ারটেকার সাগর। আগের দিনের পরিচয়ে বয়স জানতে চাইলে বুকপকেট থেকে নিজের ভোটার আইডি কার্ড বের করে দেখিয়েছিলেন। ওই হিসাবে উনার বয়স ২৬ বছর। কিন্তু পান খেয়ে কাল করে ফেলা দাঁত আর খুব সম্ভবত অপুষ্টিতে বসে যাওয়া চোয়ালের কারণে প্রথম দেখায় উনার বয়স আরও বেশি বলে মনে হয়েছিল। অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি ভেবে উনি কথা না বলেই দ্রুত হাতে তালা খুলতে শুরু করলেন। দুজন ধরাধরি করে ভেতরের কাঠের বেঞ্চিটা বের করলাম। এটাতেই উনি রাতে ঘুমান আর সকালে বের করে রাখেন টয়লেট ব্যবহারকারীদের জন্য। বেঞ্চিতে বসা শুরু করতেই ব্যস্ত হয়ে গদিওয়ালা চেয়ারটা বের করে আনলেন। ওপরে ঝোলানো গামছা দিয়ে মুছে সেখানে বসাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। সকালের প্রথম ভাগে উনার ব্যস্ততা কম থাকে জেনেই সকাল সাতটায়ই উনার কাজের জায়গায় হাজির হই। উনি এর মাঝেই গোসল সেরে নাশতা করে এসেছেন।

অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি ভেবে উনি কথা না বলেই দ্রুত হাতে তালা খুলতে শুরু করলেন। দুজন ধরাধরি করে ভেতরের কাঠের বেঞ্চিটা বের করলাম। এটাতেই উনি রাতে ঘুমান আর সকালে বের করে রাখেন টয়লেট ব্যবহারকারীদের জন্য।

কাল রাতে কখন ঘুমাইছেন?

‘এগারোটার দিকে। কিন্তু ঘুমাইলে কী হইবো! রাস্তায় গাড়ির হর্নে প্রায়ই ঘুম ভাইঙ্গা যায়।’

আপনি শুয়ে পড়ার পর কেউ টয়লেট ব্যবহার করতে আসলে তখন কী করেন?

‘আগে পর্দা লাগাইতাম না। খালি লাইট নিভায় দিয়া ভিতর দিয়া দরজা বন্ধ কইরা শুইতাম। তখন অনেকেই ডাকতো। রাইতে কোন বাস আইলে অনেক যাত্রী একবারে আইতো- বারোটা, একটা, টাইমের কোন হিসাব নাই। অহন দরজা বন্ধ কইরা, পর্দা লাগায় ঘুমাই। বাইরে থিকা দেহার উপায় নাই। আর আমি শুইয়া পড়লে ডাকাডাকি কইরাও লাভ নাই। উঠি না।’

সাগর আগে ভাঙ্গারি দোকানে কাজ করতেন। বাড়ি মহেশখালী। বাবা অন্যের জমিতে কাজ করেন। নিজেদের শুধু থাকার জায়গাটুকুই আছে। তিন বোন আর এক ভাইয়ের সংসার বাবার উপার্জনে চলে না, তাই সাগর কক্সবাজারে চলে আসেন এক বছর আগে। হোটেলে কাজ করার ইচ্ছা থাকলেও কোথাও কাজ না পেয়ে নতুন বানানো পাবলিক টয়লেট ক্লিনারের কাজ নেন। শুরুতে কয়েক মাস মেসে থেকেছেন। কিন্তু ভাড়ার টাকা বাঁচাতে এর পর থেকে টয়লেটেই থাকা শুরু করেছেন।

জানতে চাই প্রতিদিন কতজন এই টয়লেট ব্যবহার করে।

‘ধরেন, ৬০-৭০ জন, কিন্তু সবাই টেকা দেয় না। ড্রাইভার, কন্টেকটার আর আশেপাশের বড় ভাইরা টেকা দেয় না। ধরেন, দিনে চারশো-সাড়ে চারশো টেকা হয়। অর্ধেক টেকা মহাজনে নেয় আর বাকি টেকা আমার।’

জিজ্ঞেস করি, পাবলিক টয়েলেটের আবার মহাজন কে? পরে জানতে পারি, জায়গাটা সরকারি হলেও প্রভাবশালীরা এর দখল নিয়েছে। সরকারি জায়গা দখল করে বিল্ডিং করে নিচতলায় দোকান ভাড়া দেয়া হয়েছে। আর অধিকাংশ বাস এখানেই যাত্রী নামানোয় পাবলিক টয়লেটের ব্যবসা চালু করার সুযোগটাও হাতছাড়া করতে চায়নি উনার মহাজন।

বাড়ি যান কয়দিন পর পর?

‘বাড়ি যাইতে পারি না। আমি গেলেই মহাজন অন্য কাউরে রাইখ্যা দিবো। মানুষের তো অভাব নাই।’

বুঝলাম যে বাড়িতে সংসার খরচের জন্য প্রতি মাসে দুই হাজারের মত পাঠানো টাকার লেনদেন বিকাশেই হয়। সাগরের কাজের পরিবেশ দেখে কেউই জানতে চাইবে না যে এখানে কাজ করতে কেমন লাগে। শুধু জানতে চাইলাম, গত এক বছরে আপনার সবচেয়ে আনন্দ হইছে এমন একটা ঘটনা বলেন।

‘একদিন এক স্যাররে ভাংতি টাকা ফেরত দিতে গেলে উনার ম্যাডাম পুরা টেকাই রাইখা দিতে কয়। আমার খুব খুশি লাগছিলো। কিন্তু উনারা হাইটা হাইটা যাইতে যাইতে শুনি ম্যাডাম স্যাররে কইতাছে, আমার গায়ে নাকি গন্ধ। এই কারণেই আমার হাত দিয়া ফিরতি টেকা নেয় নাই। এর পর থিইক্যা গায়ে সেন্ট দেই।‘

ওই ম্যাডামের কথা শুনে রাগ হয়েছিল কি না জানতে চাইলে সাগর বলেন, ‘এক বছর ধইরা এইখানে আছি। এই পায়খানাই আমার ঘরবাড়ি। এইখানেই থাকি, এইখানেই ঘুমাই। নিজের কামে ঘিন্না নাই। ওই ম্যাডামের ওপরও কোন রাগ নাই।’

হাসি দিয়ে বললেন, ‘বিদেশ যাইতে পারলে এমন কথা আর কেউ কইবো না।’

‘একদিন এক স্যাররে ভাংতি টাকা ফেরত দিতে গেলে উনার ম্যাডাম পুরা টেকাই রাইখা দিতে কয়। আমার খুব খুশি লাগছিলো। কিন্তু উনারা হাইটা হাইটা যাইতে যাইতে শুনি ম্যাডাম স্যাররে কইতাছে, আমার গায়ে নাকি গন্ধ। এই কারণেই আমার হাত দিয়া ফিরতি টেকা নেয় নাই। এর পর থিইক্যা গায়ে সেন্ট দেই।‘

খালি আল্লারে ডাকছি, স্যারের মোবাইল জানি খুইজ্যা পায়

ভ্যানগাড়িতে ৩০টার মত ডাব রাখা। আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা আছে আরও গোটা বিশেক ডাব। একটা গাড়ির আশপাশে যত দূর পর্যন্ত ডাব ছড়িয়ে রাখা যায় ততটুকু পর্যন্ত একেকজনের সীমানা। কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভে রাস্তার পাশেই চার-পাঁচটা নিয়মিত ডাবের গাড়ির মাঝে করিমুন্নেসার গাড়িটাই বেশ ভাল অবস্থানে আছে বলে মনে হল। পিচঢালা রাস্তার পাশ দিয়েই গ্রামের দিকে যাবার মেঠো পথের ওপর দশ মিটার মত দূরত্বে আরেকটা ভ্যানগাড়ি রাখা। কাজের মাঝে এখানে পালা করে জিরিয়ে নেন করিমুন্নেসা আর হোসেন আলী দম্পতি। পর পর বেশ কয়েক দিন হোসেন আলী চাচাকে দেখিনি। জানতে পারলাম, উনার কোমরের ব্যথাটা নাকি আরও বেড়েছে। আগেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতেন। এখন নাকি বিছানা থেকে উঠার মত অবস্থায়ও নেই। তাই করিমুন্নেসাকেই পুরো ব্যবসা সামাল দিতে হচ্ছে। দুপুরের দিকে ঝিমুনি আসলে দোকান খোলা রেখেই পাশের ভ্যানগাড়িতে গিয়ে একটু ঘুমিয়ে আসেন। আজকেও ঘুমাচ্ছেন। আমাকে দেখে কাস্টমার এসেছে ভেবে পাশের দোকানদার দৌড়ে গিয়ে জাগিয়ে দেয় উনাকে। মুখ কাঁচুমাচু করে বললাম- আহা! আমি আজকে না আসলেই হইতো। আপনার ঘুমটা ভাঙতো না। উনি জবাব দিলেন হাসি দিয়ে।

দুপুরের দিকে ঝিমুনি আসলে দোকান খোলা রেখেই পাশের ভ্যানগাড়িতে গিয়ে একটু ঘুমিয়ে আসেন। আজকেও ঘুমাচ্ছেন। আমাকে দেখে কাস্টমার এসেছে ভেবে পাশের দোকানদার দৌড়ে গিয়ে জাগিয়ে দেয় উনাকে।

চাচার শরীর কেমন জানতে চাইলাম।

‘বেশি সুবিধার না। ব্যথা আরও বাড়ছে।’

হোসেন আলী দশ বছর শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন ওমানে। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ধানি জমির সবটুকু বিক্রি করে যখন ওমানে যান তখন উনার বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে। বিল্ডিং থেকে পড়ে গিয়ে দশ বছর পর ফিরে আসেন পঙ্গু হয়ে। বড় ছেলের মুদি দোকানের ব্যবসার মূলধন জোগাড়ের বাইরে যতটুকু টাকা জমাতে পেরেছিলেন তার প্রায় পুরোটাই দেশে এসে খরচ হয়ে যায় ভাঙা কোমরের চিকিৎসা করাতে। কিন্তু উনার সুস্থতা ফিরে আসেনি। দুই ছেলেই আলাদা সংসার পেতেছে। একসময়ের সচ্ছল গৃহস্থ দম্পতির একমাত্র সহায় এখন কেবল এক গাড়ি ডাব।

ডাব কোথা থেকে আনেন, চাচি?

‘আমার ডাবের সাপ্লাই টেকনাফের। ডেইলি টমটমে কইরা নিয়া আসি।’ জানালেন, নিয়ে আসার জন্য গাড়ি ভাড়াতেই নাকি অনেক খরচ হয়ে যায়। প্রতিটা ডাব ২০ টাকার মত খরচে কিনে আনলেও টমটম খরচ যোগ করার পর খরচ ৩০ টাকার মত হয়ে যায়। বিক্রি করেন কখনও ৪৫, কখনও ৫০ আবার কখনও ৬০ টাকা দরে।

দোকান বন্ধ করেন কখন?

‘আমার দোকানের কোন বন্ধ নাই। এই রোডে দিনে-রাইতে গাড়ি যায়। ২৪ ঘণ্টাই খোলা রাখতে হয়। নাইলে পোষায় না।’ জানালেন, চাচার শরীর এতটা খারাপ হবার আগ পর্যন্ত দিন-রাত পালা করে দোকান চালাতেন। আর বেশি ক্লান্তি লাগলে গাড়ির ওপরেই বিশ্রাম নিয়ে নিতেন। এখন উনার দূর সম্পর্কের আত্নীয় মাঝে মাঝে এসে দোকানে বসে। আর সেই ফাঁকে উনি বাড়ি ফিরে চাচার দেখাশোনা, রান্না, ঘর পরিষ্কারের কাজগুলো সেরে আসেন। মাঝে মাঝে রাতের পালায় বাড়ি ফিরে ঘুমিয়েও নেন।

দোকানে কাউরে চাঁদা দিতে হয়?

‘না, এইখানে এইসব নাই। কিন্তু সারগো ঝামেলা তো আছেই। অনেকে ডাব খাইয়া টেকা দেয় না। তহন কিছু কই না। এত কথা কইলে তো আর ব্যবসা চালান যাইবো না।’

বললাম, তাহলে তো খুবই ভাল।

আমাদের আলাপের শুরু থেকেই পাশের দোকানদার আগ্রহ নিয়ে শুনছিলেন। চাঁদাবাজির কথা শুনে মনে হল উনার আগ্রহ আরও বেড়ে গেছে। চাচিকে প্রায় ধমকের সুরেই বললেন, ‘গত মাসের কথা মনে নাই? দোকান তিন দিন বন্ধ করায় রাখলো?’

জানতে চাইলাম কী বিষয়। তখন চাচি বললেন, ‘ওহ! ভুইলা গেছিলাম। গত মাসে আর্মির এক স্যার বউ লইয়া বিচে আইচিলো। সিটে ব্যাগ রাইখ্যা সাগর থিকা ঘুইরা আইসা দেখে মোবাইল নাই। মনে করচিলো আর্মির মোবাইল কেউ নিবো না। কিন্তু চোরের কী ঠেকা পড়ছে মোবাইল নেওনের সময় এত বাছবিচার করনের? চোর তো গেচে গা। ধরচে আমাগো। থানা থিকা এক গাড়ি পুলিশ নিয়া আইচে। সবাইরে লাইনে দাঁড় করাইয়া চেক করাইচে। মোবাইল পায় নাই। এরপর তিন দিন পর্যন্ত পুলিশ কাউরে দোকান খুলতে দেয় নাই। আমরা খালি আল্লারে ডাকচি, সারের মোবাইল জানি খুইজ্যা পায়। নাইলে তো না খাইয়া মরন লাগবো।’

চোরের কী ঠেকা পড়ছে মোবাইল নেওনের সময় এত বাছবিচার করনের? চোর তো গেচে গা। ধরচে আমাগো। থানা থিকা এক গাড়ি পুলিশ নিয়া আইচে। সবাইরে লাইনে দাঁড় করাইয়া চেক করাইচে। মোবাইল পায় নাই।

কোক খাইতে মজা লাগে

নাম ইলিয়াস। বয়স দশ কি এগারো। হাতে শামুকের মালা, মুখে পান। দেখলাম খুব দরদাম চলছে ঘুরতে আসা এক পর্যটকের সাথে। প্রথমে ১০০ টাকা চাইলেও শেষমেশ ৬০ টাকাতেই এক জোড়া মালা দিয়ে দেয়। তখন সকাল আটটা বাজে। জানতে চাইলাম, কতক্ষণ থাকবা? জানাল, নয়টা পর্যন্ত। ইলিয়াস ক্লাস টুতে পড়ে। ওদের ক্লাস শুরু হয় সকাল দশটা থেকে।

স্কুল ছুটি হয় কখন?

‘একটা বাজে।’

স্কুলে কী খেয়ে যাইবা?

‘সকালে ভাত খাইয়া বিচে আসি। এইখান থিকা বাড়ি দিয়া ব্যাগ নিয়া স্কুলে যামু। কিছু খাইয়া যামু না।’

খিদা লাগে না?

‘না, স্কুলে ক্লাস শেষে খাওন দেয়।’

কী দেয়?

‘খিচুড়ি দেয়। কোক দেয়। কোক খাইতে মজা লাগে।’

প্রতিদিন স্কুলে যাও?

‘আব্বা যেদিন সাগরে বাইর হয় সেইদিন যাই না। অনেক কাজ থাকে। জাল গুছাই। নৌকা পরিষ্কার কইরা দেই।’

ইলিয়াসের বড় ভাই ওসমান ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ার পর এখন বাবার সাথে মাছ ধরতে যায়। ছোট বোন ফাতেমা ইলিয়াসের সাথে শামুকের মালা বিক্রি করে। ভোর সাতটার মধ্যেই দুজন এখানে এসে পড়ে। দুই ঘণ্টায় তিন-চারটা মালা বিক্রি করতে পারে। সন্ধ্যায় বিক্রি বেশি হয়। তখন কখনও কখনও সাত-আটটা মালা পর্যন্ত বিক্রি করতে পারে। স্কুল থেকে ফিরে ইলিয়াস মা আর বোনকে সাহায্য করতে বসে মালা বোনার কাজে। বিকালে আবার দুই ভাই-বোন মিলে বেরিয়ে পড়ে বিচের উদ্দেশে। রাত নয়টার মধ্যেই বাড়ি ফিরে যায়। মায়ের হাতে কখনও দুই শ, কখনও আড়াই শ টাকা তুলে দিতে পারে।

ইলিয়াসের বড় ভাই ওসমান ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ার পর এখন বাবার সাথে মাছ ধরতে যায়। ছোট বোন ফাতেমা ইলিয়াসের সাথে শামুকের মালা বিক্রি করে। ভোর সাতটার মধ্যেই দুজন এখানে এসে পড়ে।

পড়ো কখন? প্রশ্ন শুনেই ইলিয়াসের পান খেয়ে দাগ বসিয়ে ফেলা দাঁত বের করা হাসি ফুটে ওঠে। পাশ থেকে ফাতেমা মিনমিনে গলায় মাথা নাড়িয়ে লাজুক ভঙ্গিতে বলতে থাকে, ‘পড়ে না, পড়ে না। খালি খেলে।’ জবাব দিলাম, ‘খেলা তো ভাল। তুমি খেলো না।’ এইবার ইলিয়াস আগ বাড়িয়ে জবাব দেয়, ‘অয়ও খেলে।’

স্কুলে বেতন কত জানতে চেয়ে জানলাম, কোন বেতন নাই। কিন্তু সপ্তাহে তিন দিনের প্রাইভেট টিউশনিতে প্রতি মাসে ২০০ টাকা দেয়া লাগে।

বড় হয়ে কী হইবা?

কিছুক্ষণ মাথা চুলকানোর পর জবাব এল, ‘মাছ ধরতে যামু।’

এবার জানতে চাইলাম ফাতেমার কাছে। ডানে-বামে মাথা নাড়িয়ে জানিয়ে দিল, জানে না অথবা বলতে চায় না। আমিও আর চাপাচাপি করলাম না। কথা চলছে নিয়মিত বিরতিতে। সৈকতে নতুন কাউকে পেলেই ভাই-বোন দুজনে ছুট লাগাচ্ছে। অধিকাংশই ওদের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। ছোট ছোট পায়ে কয়েক কদম দৌড়ে আবার চলে আসছে আগের জায়গায়। মনে হল ওরা নিজেদের মত করেই একটা সীমানা ঠিক করে নিয়েছে। কারণ এর কিছু দূরেই ডানে আর বামে দেখলাম আরও কয়েকজন ওদের মতই বয়সী একই ধরনের মালা হাতে নিয়ে হাঁটছে।

ইলিয়াসের পছন্দ ইলিশ মাছ। ওর বাবা ইলিশ মাছ ধরতে পেলে নৌকা থেকে একটা মাছ নাকি ওর জন্য আলাদা করে রাখে সব সময়। বাবা-ভাই সাগর থেকে ফেরার পর দুই-তিন দিন মাছ-ভাত খায়। বাকি সময় ভাত আর আশপাশ থেকে কুড়ানো সবজি দিয়েই খাবারের পাট চুকিয়ে ফেলে। ফাতেমার পছন্দ মাংস। ঈদের সময় মাংস রান্না হয়, ফাতেমার খুব মজা লাগে।

ইলিয়াসের পছন্দ ইলিশ মাছ। ওর বাবা ইলিশ মাছ ধরতে পেলে নৌকা থেকে একটা মাছ নাকি ওর জন্য আলাদা করে রাখে সব সময়। বাবা-ভাই সাগর থেকে ফেরার পর দুই-তিন দিন মাছ-ভাত খায়। বাকি সময় ভাত আর আশপাশ থেকে কুড়ানো সবজি দিয়েই খাবারের পাট চুকিয়ে ফেলে।

খালি মায়ের কাছে যাইতে মন চায়

এক হাতে ঝাড়ু, আরেক হাতে বালতি নিয়ে সোহেল শেখের দিন শুরু হয়। সকালের প্রথম কাজ হচ্ছে রিসোর্টে ঝরে পড়া গাছের পাতা কুড়িয়ে নিয়ে ডাস্টবিনে ফেলা। এক ঘণ্টার মধ্যেই এই কাজ সেরে নয়টার দিকে নাশতা করতে চলে যায় ক্যাফেটেরিয়ায়। সেখানে রিসোর্টের কর্মচারীদের জন্য আলাদা রান্না হয়। সোহেল শেখ রুটি খেতে পছন্দ করে। কিন্তু কিছুদিন আগ পর্যন্তও তিন বেলাই ভাত খেতে হত। ক্যান্টিন ম্যানেজারের ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর এখন ভাত আর রুটি দুটোর ব্যবস্থাই থাকে। সোহেল রুটি-ভাজি দিয়ে নাশতা সারে। এরপর শুরু হয় প্রতিটা গেস্টহাউজ পরিষ্কারের পালা। এই রিসোর্টের দশটা গেস্টহাউজের বেডরুম, কিচেন আর টয়লেট পরিষ্কারের কাজটা করে দুজন মিলে। এই করতে করতেই দুপুর হয়ে যায়। দ্রুত গোসল সেরে আড়াইটার মধ্যেই হাজির হতে হয় স্টাফ ক্যান্টিনে, তা না হলে গরম ভাত-তরকারি পাওয়া যায় না। দুপুরের খাবারের কথা বলার এক পর্যায়ে সোহেল বলল, ‘আগে ভাত নিয়া মা বইসা থাকতো। পাতে তুইলা দিতো। তখন বুঝি নাই। দুপুরে প্রায়ই খাইতে মন চাইতো না। আর এখন মনে হয়, এক বেলা যদি মায়ের হাতে খাইতে পারতাম! খালি মায়ের কাছে যাইতে মন চায়।’

‘আগে ভাত নিয়া মা বইসা থাকতো। পাতে তুইলা দিতো। তখন বুঝি নাই। দুপুরে প্রায়ই খাইতে মন চাইতো না। আর এখন মনে হয়, এক বেলা যদি মায়ের হাতে খাইতে পারতাম! খালি মায়ের কাছে যাইতে মন চায়।’

সোহেল প্রথমবারের মত কক্সবাজারে আসে গত বছরের জুন মাসে। ও তখন ক্লাস এইটে পড়ছিল। দূর সম্পর্কের এক নানা এসে সোহেলের মাকে পাঁচ হাজার টাকা বেতনের চাকরির কথা বলেন। চার ভাই-বোনের সংসারে বাকি ভাই-বোনদের পড়াশোনার খরচ চালিয়ে নিতে অনেক দিন ধরেই সোহেলকে কোন কাজে লাগিয়ে দেয়ার কথা ভাবছিলেন ওর মা। তাই নানার প্রস্তাবে আর না করেনি। প্রথম তিন মাস পর সোহেলের বেতন বেড়ে এখন সাত হাজার। বড় বোন এসএসসি পরীক্ষা দেবে আগামী বছর। আর ছোট দুই ভাই-বোনের একজন পড়ে মাদ্রাসায়, আরেকজন স্কুলে। বাবা সৌদি আরব থাকেন।

বাবা কয় বছর পর পর আসেন দেশে?

‘পাঁচ বছর হইলো গেচে। কাগজ নাই। আইলে আর যাইতে পারবো না। তাই আসে না।’

সোহেলের বাবা বিদেশ যাবার আগ পর্যন্ত ফেনীতে নিজের জমিতে কৃষিকাজ করতেন। বিদেশ যাবার টাকা জোগাড় করতে প্রায় অর্ধেক জমি বিক্রি করে দিতে হয়েছে। বাকি জমি গত বছর পর্যন্ত ভাগে চাষ করতে দিতেন, এতে নিজেদের সারা বছরের চালটুকু চলে আসত। এ বছর আর দেননি। সেখানে ওরা এ বছর নতুন ঘর তুলবে।

সোহেলের বাবা বিদেশ যাবার আগ পর্যন্ত ফেনীতে নিজের জমিতে কৃষিকাজ করতেন। বিদেশ যাবার টাকা জোগাড় করতে প্রায় অর্ধেক জমি বিক্রি করে দিতে হয়েছে।

দুপুরের খাবারের পর ওয়াশিং মেশিনে বিছানার চাদরগুলো ধুয়ে, শুকিয়ে পরের দিনের জন্য রেডি করে রাখতে হয়। এই করতে করতেই সন্ধ্যা হয়ে যায়। কখনও কাজের ফাঁকে বিকেলে সময় পেলে রিসোর্টের ভেতরেই ক্রিকেট খেলে। কর্মচারীদের গেটের বাইরে যাওয়া নিষেধ।

কেন? বাইরে যেতে দেয় না কেন?

জানাল, কয়েক মাস আগে এক বিদেশি ট্যুরিস্ট থাকতে এসে ৩০ হাজার টাকা হারিয়ে ফেলার অভিযোগ করেন। তখন থেকে ম্যানেজারের অনুমতি ছাড়া দারোয়ান কাউকে গেটের বাইরে বের হতে দেয় না।

বাড়িতে যাও কয়দিন পর পর?

‘যাই, তিন-চার মাসে একবার। ছুটি পাই না। আর যাওয়া-আসায় খরচ লাগে।’

সামনে কবে যাবা?

‘রোজার ঈদে ইচ্ছা আছে।’

জানতে চাই, তোমার প্ল্যান কী? চাকরি ভাল লাগে?

জবাব আসে, ‘খারাপ লাগলেও কিছু করার নাই।’

বাবার সাথে সোহেলের প্রায়ই কথা হয় ইমোতে। জানাল, সৌদিতে নাকি এখন অনেক ধরপাকড় চলছে। সোহেলের বাবা অনেকটা লুকিয়েই কাজ করছেন। কাগজপত্র না থাকায় ধরা পড়লে পাঠিয়ে দেবার আগে জেলও হতে পারে। তাই সোহেলের এই চাকরি চালিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই।

মওদুদ রহমান: প্রকৌশলী, লেখক
ইমেইল: mowdudur@gmail.com

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *