মৌলবাদের সংঘর্ষ: ক্রুসেড, জিহাদ এবং আধুনিকতা-১৫
আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা
তারিক আলি
অনুবাদ: ফাতেমা বেগম
২০০২ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী তৎপরতা অনেক বিস্তৃত এবং ইসলামি মৌলবাদ বিশ্বজুড়ে আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয় তখন তারিক আলির বই The Clash of Fundamentalisms: Crusades, Jihads and Modernity প্রকাশিত হয়। তারিকের এই বইয়ে অনুসন্ধান করা হয়েছে ধর্মীয় বিভিন্ন মত-পথ, বিভিন্ন ধরনের মৌলবাদী শক্তি, তার ইতিহাস ও রাজনীতি এবং সর্বোপরি তার ভাষায় ‘সবচেয়ে বড় মৌলবাদী শক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ’-এর সঙ্গে এর সম্পর্ক। সর্বজনকথার জন্য এই বই (প্রকাশক: ২০০৩, ভার্সো, ইউকে এন্ড ইউএসএ) এর ধারাবাহিক অনুবাদের এবারে পঞ্চদশ পর্ব। এখানে আলোচিত হয়েছে আফগানিস্তানের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা।
হাতুড়ি আর নেহাইয়ের মধ্যস্থলে
উনিশ শতকের শেষভাগে রুশ জার এবং ব্রিটিশ ভাইসরয়, উভয়েরই অত্যন্ত আকাঙ্খিত লক্ষ্যবস্তু ছিল আফগানিস্তান। কিন্তু দুর্ভেদ্য এবং দুর্গম ভূপ্রকৃতি দেশটিকে কোন ঔপনিবেশিক শক্তির দখলের চেষ্টা থেকে রক্ষা করেছে। ব্রিটিশদের দুটি আগ্রাসন প্রচেষ্টা, সেখানে প্রতিহত হলে তা লন্ডন ও সেন্ট পিটার্সবার্গের জন্য এক সতর্কবার্তা ছিল। আফগানিস্তান তখনও নিজস্ব রাজা-শাসিত এবং প্রাক-সামন্ততান্ত্রিক গোত্রীয় জোটের কাঠামোয় আবদ্ধ ছিল। আফগানিস্তান দখলে ব্যর্থ হয়ে জারশাসিত দখলবাজ রুশ সাম্রাজ্য এবং ভারত দখলকারী ব্রিটিশ সাম্রাজ্য শেষ পর্যন্ত আফগানিস্তানকে একটি ‘বাফার রাষ্ট্র’ হিসেবে মেনে নেয়। তবে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ব্রিটিশ রাজ কাবুলকে কড়া নজরদারির মধ্যে রাখে। এই ব্যবস্থাটি সংশ্লিষ্ট তিন পক্ষের জন্যই সুবিধাজনক ছিল। এর ফলে আফগান সমাজ কখনোই আংশিক বা পূর্ণ, কোনো ঔপনিবেশিক আধুনিকায়নের মধ্য দিয়ে যায়নি। ফলে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দেশটি কমবেশি স্থবির অবস্থায় থেকে যায়। প্রভাবশালী পশতুন ( নিজেদের মধ্যে চরমভাবে বিভক্ত গোষ্ঠী) থেকে শুরু করে তাজিক ও উজবেক, হাজারা (মঙ্গোল বংশোদ্ভূত) পর্যন্ত, নুরিস্তানি ও বেলুচ এর মতো সব বৈচিত্র্যপূর্ণ কিন্তু পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত গোত্র ও জাতিগোষ্ঠীর কারণে কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ লম্বা সময়ের জন্য ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি। এতে কাবুল এবং গ্রামীণ জনপদের মধ্যকার দুরতিক্রম্য ব্যবধান কখনোই ওভাবে দূর করা যায়নি।
অবশেষে পরিবর্তনের হাওয়া বইলো, তবে তা হলো বহিঃস্থ অনুঘটকগুলোর প্রভাবে। আফগানিস্তানের তরুণ রাজা আমানুল্লাহর শাসনকাল সাক্ষী হলো ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব এবং ১৯১৯ সালে কামাল আতাতুর্কের ‘নিউ মডেল আর্মি’র হাতে অটোমান খিলাফতের পতন। এসব ঘটনা এই তরুন রাজার মনে আধুনিকায়নের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে। ব্রিটিশ অভিভাবকত্বের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পেতে উদগ্রীব ও ইউরোপের জ্ঞানদীপ্ত আদর্শ ও পেত্রোগ্রাদের সাহসী দৃষ্টান্ত দ্বারা অনুপ্রাণিত বুদ্ধিজীবী পরিবেষ্টিত আমানুল্লাহ ক্ষণকালের জন্য হলেও দেশের শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণী ও বিপুল সংখ্যক গোত্রকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হন। এতে ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক সামরিক বিজয় অর্জন করেন। এই বিজয় পরবর্তী দশ বছরের জন্য তার সিংহাসন নিশ্চিত করে।
আমানুল্লা এক গুচ্ছ সংস্কার কর্মসূচি শুরু করার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেন। তুরস্কে কামাল আতাতুর্কের বিপ্লব দ্বারা কিছুটা অনুপ্রাণিত এই কর্মসূচি নেয়া হয়েছিল। প্রাপ্তবয়স্কদের সর্বজনীন ভোটাধিকারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আফগানিস্তানের জন্য একটি নতুন সংবিধান ঘোষণা করা হয়। এটি বাস্তবায়িত হলে, নারীর ভোটাধিকার নিশ্চিত করা বিশ্বের প্রথম দিকের দেশগুলোর তালিকায় আফগানিস্তানের নামটি অন্যতম স্থানে থাকতো।
পরবর্তীতে, অর্জিত সাফল্যে উদ্বুদ্ধ, আমানুল্লা এক গুচ্ছ সংস্কার কর্মসূচি শুরু করার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেন। তুরস্কে কামাল আতাতুর্কের বিপ্লব দ্বারা কিছুটা অনুপ্রাণিত এই কর্মসূচি নেয়া হয়েছিল। প্রাপ্তবয়স্কদের সর্বজনীন ভোটাধিকারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আফগানিস্তানের জন্য একটি নতুন সংবিধান ঘোষণা করা হয়। এটি বাস্তবায়িত হলে, নারীর ভোটাধিকার নিশ্চিত করা বিশ্বের প্রথম দিকের দেশগুলোর তালিকায় আফগানিস্তানের নামটি অন্যতম স্থানে থাকতো। তুরস্কের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আমানুল্লাহর বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করার ফলে পর্দার প্রথার বিলোপ ঘটে, পুরুষদের পশ্চিমা পোশাক পরিধানে উৎসাহিত করে, আফগানদের বিদেশে পড়াশোনার জন্য পাঠানো এবং কাবুলের স্কুলগুলোতে নারী-পুরুষের যৌথ শিক্ষার অনুমোদন দেয়া হয়। একই সময়ে, রাশিয়ার কাছ থেকে সহায়তা পাওয়ার সন্ধানে একটি প্রতিনিধিদলকে মস্কো পাঠানো হয়। বলশেভিক নেতারা নিজেরাই ‘আঁতাতবদ্ধ’ শক্তিগুলোর একাধিক সশস্ত্র আক্রমণের মুখে চাপে থাকলেও তাঁরা আফগানিস্তানের এই প্রস্তাবগুলোকে বেশ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেন। কমিন্টার্নের পক্ষ থেকে সুলতান-গালিয়েভ কাবুল থেকে আসা প্রতিনিধিদেরকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। অন্যদিকে, গৃহযুদ্ধের সম্মুখসারিতে থাকা ট্রটস্কি তাঁর সাঁজোয়া ট্রেন থেকে রাশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে একটি গোপন চিঠি পাঠান। চিঠিতে ছিল গুরুত্বপূর্ণ বার্তা:
বিশ্ব রাজনীতিতে সন্দেহাতীতভাবে, ইউরোপীয় প্রেক্ষাপটের তুলনায় এশীয় প্রেক্ষাপটে আমাদের ‘লাল ফৌজ’ এক অতুলনীয় শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে অবস্থান করছে। কেবল ইউরোপের ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার সাথে সাথে আমাদের জন্য এশীয় ক্ষেত্রে সক্রিয় কার্যক্রম পরিচালনার এক নিশ্চিত সম্ভাবনাও উন্মোচিত হচ্ছে। বর্তমান মুহূর্তে লক্ষ্যবস্তু হিসাবে সোভিয়েত হাঙ্গেরির চেয়ে ভারতমুখী পথটি আমাদের জন্য অনেক বেশি সুগম ও সংক্ষিপ্ত বলে প্রমাণিত হতে পারে। যে ধরনের সেনাবাহিনী ইউরোপীয় প্রেক্ষাপটে হয়তো খুব একটা কার্যকরী নয়, তারাই ঔপনিবেশিক নির্ভরতায় আক্রান্ত এশিয়ার অস্থিতিশীল ভারসাম্যকে ওলটপালট করে দিতে পারে, শোষিত জনগণের অভ্যুত্থানকে সরাসরি ত্বরান্বিত করে সেই অভ্যুত্থানের বিজয় নিশ্চিত করতে পারে… প্যারিস ও লন্ডনের পথটি আফগানিস্তান, পাঞ্জাব এবং বাংলার শহরগুলোর মধ্য দিয়েই অতিক্রম করেছে।
ট্রটস্কির একজন সামরিক বিশেষজ্ঞ ব্রিটিশ ভারতকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ৩০-৪০ হাজার অশ্বারোহী সৈন্যের সমারোহে একটি সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী অশ্বারোহী বাহিনী গঠনের এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
তবে ঐসব পরিকল্পনার কোনোটিই সফল হয়নি। দুই বছর পর পোল্যান্ডে তুখাচেভস্কির অভিযানের ব্যর্থতা নিঃসন্দেহে মস্কোর নীতিনির্ধারকদের বাস্তববাদী করে তুলেছিল। বলশেভিকদের কাছ থেকে কেবল বন্ধুত্ব ও পরামর্শ ছাড়া আমানুল্লাহ আর কিছুই পাননি। এতে স্বাভাবিকভাবেই অস্থির হয়ে ঊঠা ব্রিটিশ রাজ তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার সংকল্প করে। সংকল্প বাস্তবায়নে টি.ই. লরেন্স নতুন দিল্লিতে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় । কয়েকটি প্রভাবশালী উপজাতি-গোষ্ঠীর সহায়তায় রাজার বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিরোধ উসকে দেয়া হয়।১ শেষ পর্যন্ত ১৯২৯ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমানুল্লাহকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। কমিন্টার্নের জার্নাল ‘ইনপ্রেকর’-এর মন্তব্য অনুযায়ী, ‘সোভিয়েত বন্ধুত্ব’-এর কারণেই আমানুল্লাহ এক দশক টিকে থাকতে পেরেছিলেন; তবে প্রবীণ বলশেভিক নেতা রাস্কোলনিকভ এর মন্তব্যটি আরও প্রাসঙ্গিক ছিল। তিনি বলেছিলেন, আমানুল্লাহর প্রবর্তিত সব ‘বুর্জোয়া সংস্কার’ এর পেছনে কোনো ‘বুর্জোয়া শ্রেণি’র অস্তিত্ব ছিল না, বরং কৃষকদের এর দায়ভার নিতে হয়েছিল। তবে কৃষি সংস্কারের মাধ্যমে কৃষকদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় ব্রিটিশ রাজ দেশটির সামাজিক ও উপজাতীয় বিভাজনকে তাদের স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে যায়।
তবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে ব্রিটেন এমনকি তাদের সমর্থিত উপজাতীয় সর্দারদের কাছেও খুব একটা জনপ্রিয় ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আফগানিস্তান তার নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছিল। ১৯৪০ সালের ৩রা অক্টোবর জার্মানির পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে পাঠানো একটি নথি (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘এনিগমা’ ডিকোডার ব্যবহার করে বোধগম্য করা হয় ) চমৎকার একটি পাঠ্য । স্টেট সেক্রেটারি ভাইৎসাকার নথিটি কাবুলে অবস্থিত জার্মান কূটনৈতিক মিশনের উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছিলেনঃ
আফগান মন্ত্রী ৩০শে সেপ্টেম্বর আমার সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনি তাঁর দেশের প্রধানমন্ত্রী ও যুদ্ধমন্ত্রীর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও যুদ্ধের অনুকূল ফলাফলের জন্য শুভকামনা জ্ঞাপন করেন। জার্মানির এশিয়াকেন্দ্রিক পরিকল্পনা আফগানিস্তানের প্রত্যাশার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না তা তিনি জানতে চান; তিনি আরব দেশগুলোর ওপর নিপীড়নের প্রসঙ্গ টানেন এবং ভারতীয় ভূখণ্ডে বসবাসরত সেই ১ কোটি ৫০ লক্ষ আফগানের (পশতুন, মূলত উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে বসবাসকারী) দুর্দশার কথা উল্লেখ করেন। ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকা ওই অঞ্চলের জনগণের মুক্তি ও তাদের অধিকার পুনরুদ্ধারই যে জার্মানির লক্ষ্য তা জানালে আফগান মন্ত্রী সন্তুষ্ট হন। তিনি বলেন, দেশটির সীমানা সিন্ধু নদ পর্যন্ত বিস্তৃত হলেই আফগানিস্তানের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে; ভারত ব্রিটেন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও এই বিষয়টি প্রযোজ্য থাকবে… আফগান মন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, জার্মানির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য ইংরেজদের প্রবল চাপ দৃঢ়ভাবে প্রতিহত করে আফগানিস্তান তার আনুগত্যের প্রমাণ দিয়েছে। একটি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসাবে আজ তিনি আফগানিস্তানের আকাঙ্ক্ষাগুলো তুলে ধরতে চাচ্ছেন। যেহেতু আকাঙ্ক্ষাগুলি ভবিষ্যতে বাস্তবায়নের ব্যাপার, তাই তিনি এই বিষয়ে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষার অনুরোধ জানান ।
ছাব্বিশ বছর বয়সী রাজা জহির শাহ এই মন্ত্রীকে বার্লিনে পাঠিয়েছিলেন । আর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাঁর চাচা সরদার মুহাম্মদ হাশিম খান। জার্মান নথিপত্রটিতে তৎকালীন ব্রিটেনের প্রতি স্বাভাবিক বিদ্বেষের চেয়েও বর্তমান পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও এর রাজধানী পেশোয়ারকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি ‘বৃহত্তর আফগানিস্তান’ গঠনের আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি আরো বেশি চমকপ্রদ ছিল।২
আমানুল্লাহর সিংহাসনে আরোহণের পঞ্চাশ বছর পর ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে তার পরিণতি ছিল আরও ভয়াবহ। সত্তরের দশকের শুরুর দিকে তৎকালীন রাজা জহির শাহের চাচাতো ভাই দাউদ তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে স্থানীয় কমিউনিস্টদের সমর্থন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের আর্থিক সহায়তায় দেশটিকে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেন। ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে ইরানের শাহ যখন দাউদকে তাঁর সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের মধ্যকার কমিউনিস্ট গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে প্ররোচিত করেন, তখন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে কমিউনিস্ট গোষ্ঠীগুলো এক অভ্যুত্থান ঘটায় এবং পিডিপিএ (দ্য পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি অফ আফগানিস্তান) ক্ষমতা লাভ করে। তাদের নিজেদের মধ্যে তীব্র বিভেদ বিদ্যমান ছিল। এমনকি দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিস্পত্তিতে অনেক সময় রিভলবার ব্যবহৃত হতো।
কাবুল ও গুটিকয়েক শহর ছাড়া অন্য কোথাও বড় সামাজিক ভিত্তি না থাকা সত্ত্বেও আফগান কমিউনিস্টরা মূলত সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণের জোরে ক্ষমতায় টিকে ছিল। এতৎসত্ত্বেও, তারা একটি সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। নতুন সরকারের আমলে বিশেষ করে শিক্ষাখাতে বিশেষ উন্নয়ন ঘটে। গ্রামে গ্রামে মেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা এবং কিছু সহ-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও গড়ে তোলা হয়। ১৯৭৮ সালে পুরুষদের মধ্যে নিরক্ষরতার হার ছিল ৯০ শতাংশ এবং নারীদের ক্ষেত্রে তা ছিল ৯৮ শতাংশ; দশ বছর পর এই হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। আফগান তরুণ-তরুণীদের একটি নতুন প্রজন্ম চিকিৎসক, শিক্ষক, বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সংস্কার- বিরোধীদের ওপর কম্বোডিয়ার খেমারুজ নেতা পল পটের ধাঁচে উন্মত্ত দমন-পীড়নের মত অনেক নেতিবাচক দিক থাকা সত্ত্বেও, পিডিপিএ সরকার রাজা আমানুল্লাহর ক্ষমতাচ্যুতির ফলে ব্যাহত আধুনিকায়নের সেই প্রক্রিয়াটি পুনরায় শুরু করেছিল।
নতুন সরকারের আমলে বিশেষ করে শিক্ষাখাতে বিশেষ উন্নয়ন ঘটে। গ্রামে গ্রামে মেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা এবং কিছু সহ-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও গড়ে তোলা হয়।
ব্রিটেনের পুরনো ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সেনাবাহিনীর মাধ্যমে সরকার-বিরোধী ধর্মীয় দলগুলোকে সশস্ত্র করে তোলে। সরকার এর ফলে দুর্বল হতে শুরু করে। গৃহযুদ্ধ উসকে দেয়ার উদ্দেশ্যে উপজাতীয়দের অর্থ ও অস্ত্র দেওয়া হলে গ্রামগুলোতে সহিংসতা বেড়ে যায়। ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে আফগান কমিউনিস্টরা অভ্যন্তরীণ সহিংস দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। ঠিক এই সন্ধিক্ষণে সরকারকে টিকিয়ে রাখার জন্য সোভিয়েত নেতা ব্রেজনেভ কাবুলে বিশাল এক সামরিক বাহিনী প্রেরণ করেন। এমন একটি পদক্ষেপ বলশেভিকরাও চিন্তা করতে পারেনি।
সোভিয়েত পদক্ষেপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি জিম কার্টারের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক প্রধান জিবিগনিউ ব্রেজিনস্কি এর প্রত্যাশা পূরণ হয়। ১৯৯৮ সালের ১৫-২১ জানুয়ারি ফরাসি সাপ্তাহিক ‘ল্য নুভেল অবজারভেটর’-এ প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকার থেকে ব্যাপারটি নিশ্চিত হয়:
প্রশ্ন: সিআইএ’র প্রাক্তন পরিচালক রবার্ট গেটস তাঁর অনুস্মরণপুস্তকে (ফ্রম দ্য শ্যাডোজ) উল্লেখ করেছেন যে, সোভিয়েত হস্তক্ষেপের ছয় মাস আগে থেকেই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আফগানিস্তানে মুজাহিদিনদের সহায়তা দেয়া শুরু করেছিল। ওই সময় প্রেসিডেন্ট কার্টারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসাবে এই ঘটনায় আপনারও ভূমিকা ছিল। এটা কি সত্য?
ব্রেজিনস্কি: হ্যাঁ। ইতিহাসের সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৭৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর সোভিয়েত সেনাবাহিনী আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালানোর পর ১৯৮০ সালে মুজাহিদিনদের প্রতি সিআইএ’র সহায়তা শুরু হয়েছিল। কিন্তু অদ্যাবধি গোপন করে রাখা বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রকৃতপক্ষে ১৯৭৯ সালের ৩ জুলাই প্রেসিডেন্ট কার্টার কাবুলে সোভিয়েতপন্থী সরকার বিরোধীদের গোপনে সহায়তা প্রদানের প্রথম নির্দেশনায় স্বাক্ষর করেছিলেন। আর এই সহায়তা সোভিয়েত সামরিক হস্তক্ষেপকে উসকে দেবে, তা ব্যাখ্যা করে ঠিক সেই দিনই আমি প্রেসিডেন্টকে একটি নোট পাঠিয়েছিলাম।
প্রশ্ন: এত ঝুঁকি সত্বেও আপনি এই গোপন অভিযানের পক্ষে থেকেছেন। সম্ভবত আপনার নিজের চাওয়া থেকেই কি সোভিয়েত ইউনিয়নকে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে প্ররোচিত করেছিলেন?
ব্রেজিনস্কি: ব্যাপারটি ঠিক সেরকম নয়। রুশদের হস্তক্ষেপ করতে আমরা সরাসরি প্ররোচিত করিনি। তবে আমাদের জ্ঞাতসারেই তাদের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল।
প্রশ্ন: আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সোভিয়েতরা সেখানে তাদের সামরিক অভিযানের যৌক্তিকতা দাবি করেছিল। কিন্তু এই দাবির মূলে সত্যতা থাকা সত্বেও তখন মানুষ তা বিশ্বাস করেনি। আজ আপনি কি এব্যাপারে অনুতপ্ত?
ব্রেজিনস্কি: কীসের অনুতাপ? ওই গোপন অভিযান ছিল এমন একটি চমৎকার পদক্ষেপ যার ফলে রুশরা আফগানিস্তানের ফাঁদে পা দিয়েছিল। আপনি কি চান যে সে জন্য আমি অনুতাপ করি? সোভিয়েতরা আনুষ্ঠানিকভাবে যেদিন সীমান্ত অতিক্রম করল, সেদিনই আমি প্রেসিডেন্ট কার্টারকে লিখেছিলাম: এখন আমাদের সুযোগ এসেছে সোভিয়েত ইউনিয়নকে তাদের নিজস্ব ‘ভিয়েতনাম যুদ্ধ’ উপহার দেওয়ার । বস্তুত, সোভিয়েত সরকারের পক্ষে প্রায় ১০ বছর ধরে এমন এক যুদ্ধের ভার বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এই সংঘাতে তাদের মনোবল ভেঙে যায় এবং শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধই সোভিয়েত সাম্রাজ্যের পতনের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রশ্ন: এই পদক্ষেপে ইসলামী মৌলবাদকে সমর্থন করলেন। অস্ত্র ও পরামর্শ সরবরাহ করে ভবিষ্যৎ সন্ত্রাসীদের তৈরী করলেন। এর জন্যও কি আপনার কোনো অনুশোচনা নেই?
ব্রেজিনস্কি: বিশ্ব ইতিহাসের কাছে কোনটি বেশি জরুরী? তালেবানের উত্থান নাকি সোভিয়েত সাম্রাজ্যের পতন? কতিপয় উন্মত্ত মুসলিম নাকি মধ্য ইউরোপের মুক্তি ও স্নায়ুযুদ্ধের অবসান?৩
রুশ নেতারা পাতানো সেই ফাঁদে পুরোপুরি আটকে পড়ে। ওই সময়ের পলিটব্যুরোর কৌতূহলোদ্দীপক নথিপত্রগুলো জানা যায় যে, সিদ্ধান্তটি নেওয়ার ঠিক দুদিন আগ পর্যন্তও পুরো পলিটব্যুরো সামরিক হস্তক্ষেপের বিপক্ষে ছিল। কিন্তু কোনো একটা কারণে তাদের মত বদলে যায়। নিশ্চিত কারণটি এখনো অজ্ঞাত। তবে সম্ভবত সিআইএ’র নথিপত্রেই এর জবাব লুকিয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্যের কারণে পলিটব্যুরোর মত পরিবর্তনের সবচেয়ে জোরালো সম্ভাবনা থাকতে পারে। এই অপপ্রচার অনুযায়ী আফগান নেতা হাফিজুল্লাহ আমিন পক্ষ পরিবর্তনের প্রান্তসীমায় অবস্থান করছিলেন। তথ্যটি পলিটব্যুরোর সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রেখেছিল। মস্কো অবশ্য আমিনকে সিআইএ’র এজেন্ট হিসাবে দাবি করেছিল। কিন্তু সে সময় সেই দাবিকে বড় শক্তিগুলোর যে কোন সামরিক অভিযানের আগে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার চিরাচরিত কৌশল হিসেবেই দেখা হয়েছিল। আফগানিস্তানে সোভিয়েত সৈন্যের প্রবেশের মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটনের অর্থায়নে চলা অপ্রীতিকর গৃহযুদ্ধটি ‘জিহাদ’-এ রূপান্তরিত হয়। এতে ‘ধর্মযোদ্ধা’ হিসেবে মুজাহিদিনরা নিজেদের বিবেচনা করে এবং তাঁরা বিদেশি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে আফগান সার্বভৌমত্বের একমাত্র রক্ষকের ভূমিকা পালনের সুযোগ পায়। এরপর শীঘ্রই দেখা গেল, খাইবার গিরিপথে পশতুন পাগড়ি পরে ব্রেজজিনস্কি ছবি তুলছেন আর চিৎকার করে বলছেন ‘আল্লাহ তোমাদের সহায়’; এবং একই সময়ে হোয়াইট হাউস ও ডাউনিং স্ট্রিটে আফগান মৌলবাদীদের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছিল।
দেখা গেল, খাইবার গিরিপথে পশতুন পাগড়ি পরে ব্রেজজিনস্কি ছবি তুলছেন আর চিৎকার করে বলছেন ‘আল্লাহ তোমাদের সহায়’; এবং একই সময়ে হোয়াইট হাউস ও ডাউনিং স্ট্রিটে আফগান মৌলবাদীদের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছিল।
আফগান যুদ্ধে ওয়াশিংটনের ভূমিকা কখনোই গোপন না থাকলেও পশ্চিমা বিশ্বের খুব কম নাগরিকই সে ব্যাপারে অবগত ছিল। আফগানিস্তানে রুশদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য মিশর, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র ইসলামী জঙ্গিদের একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে এবং তাদের প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন করে এবং অস্ত্র সরবরাহ করে। ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর’ ও এবিসি টেলিভিশন’-এর মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সাবেক সংবাদদাতা জন কেন্ট কুলি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত কর্মকর্তাদের সাথে সহজে যোগাযোগের সুবিধাক্রমে স্নায়ুযুদ্ধের এই শেষ অধ্যায়ের এক চমৎকার বিবরণ লিখেন।৪ যদিও তিনি সকল তথ্যের উৎস উল্লেখ করেননি এবং তাঁর কিছু বক্তব্যে কিছুটা সংশয় থাকা উচিত, তবুও তাঁর দেওয়া তথ্য আশির দশকে পাকিস্তানে সর্বত্র প্রচারিত অনেক ধারণারই সত্যতা নিশ্চিত করে।
কুলি’র বিবরণ অনুযায়ী, সোভিয়েত-বিরোধী জিহাদে যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য শক্তিকেও অন্তর্ভুক্ত করেছিল। তিনি দাবি করেন যে, চীনের সহায়তা কেবল অস্ত্র যোগানেই সীমিত ছিল না। বরং জিনজিয়াং-এ আড়িপাতার কেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ দেওয়া এবং এমনকি সহায়তার পরিধি সিআইএ (CIA) এর অর্থায়নে উইঘুর স্বেচ্ছাসেবকদের জিহাদে পাঠানো পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ইসলামাবাদের জেনারেলরা ব্যক্তিগত পর্যায়ে সবসময়ই চীনের কোনো না কোনো সহায়তার কথা স্বীকার করলেও বেইজিং তা সবসময় অস্বীকার করেছে। কুলে আরো বলেন যে, সোভিয়েত-পরবর্তী ‘প্রত্যাহার-উত্তর সিনড্রোম’ —অর্থাৎ যেসব শক্তি ইসলামি জঙ্গিদের অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছিল, সেই সব শক্তির বিরুদ্ধেই জঙ্গিদের আক্রমণ—‘পিপলস রিপাবলিক’ বা চীনও এর প্রভাব থেকে মুক্ত ছিল না। তবে আফগানিস্তানে যে দেশটির ভূমিকা এই যুদ্ধের অন্যতম গোপন বিষয় হিসেবেই থেকে গেছে, সেই দেশ ইসরায়েল, তা কুলির বিবরণে অনুল্লেখিত থেকেছে। ১৯৮৫ সালে, পেশোয়ারের ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের বারে ‘দ্য মুসলিম’ পত্রিকার তরুণ পাকিস্তানি সাংবাদিক আহমেদ মনসুর আকস্মিকভাবে ইসরায়েলি ‘উপদেষ্টা’দের একটি দলের মুখোমুখি হন। জিয়াউর রহমানের স্বৈরাচারী সরকারের জন্য এই খবরটি অত্যন্ত বিস্ফোরক হবে তা অনুধাবন করে তিনি তাঁর সম্পাদক, কয়েকজন বন্ধু এবং সফররত ডব্লিউটিএন’র এক সংবাদদাতাকে বিষয়টি অবগত করেন। কয়েক দিন পর পাকিস্তানের ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের কাছ থেকে এ ব্যাপারে সতর্কবার্তা পেয়ে মুজাহিদিনরা তাকে হত্যা করে।
কুলি আরো জানান, সৌদি আরবে সিআইএ’র প্রাক্তন স্টেশন প্রধান রেমন্ড ক্লোজের সাথে ১৯৭৮ সালে বৈরুতে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হন। তবে কুলি আরও বিশদভাবে প্রশ্ন করলে জানতে পারতেন যে, এর আগে ক্লোজ পাকিস্তানে কর্মরত ছিলেন। সেখানে তাঁর বাবা লাহোরের ফরম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজে একজন মিশনারি শিক্ষক ছিলেন। ফার্সি, উর্দু ও আরবি ভাষায় ক্লোজের ভাল দখল ছিল। নামমাত্র অবসরে থেকে আফগানিস্তানে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা এবং পাকিস্তানে সেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা জোগানোর ক্ষেত্রে তিনি যথাযোগ্য অবস্থানে ছিলেন। এইক্ষেত্রে সিআইএ’র গোপন কার্যক্রমের অর্থায়নের মাধ্যম হিসাবে, এবং হেরোইন ব্যবসার লভ্যাংশ পাচারের কাজেও পাকিস্তানে ‘ব্যাংক অফ ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ইন্টারন্যাশনাল’ (বিসিসিআই) ব্যবহৃত হতো।
সিআইএ’র গোপন কার্যক্রমের অর্থায়নের মাধ্যম হিসাবে, এবং হেরোইন ব্যবসার লভ্যাংশ পাচারের কাজেও পাকিস্তানে ‘ব্যাংক অফ ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ইন্টারন্যাশনাল’ (বিসিসিআই) ব্যবহৃত হতো।
সোভিয়েত বাহিনী প্রত্যাহারের এক দশক পরেও আফগানিস্তানে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যকার আভ্যন্তরীন সহিংসতা অব্যাহত থাকে। সেই যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন যোদ্ধারা মিশর, আলজেরিয়া, ফিলিপাইন, সুদান, পাকিস্তান, চেচনিয়া, দাগেস্তান এবং সৌদি আরবে অস্থিতিশীলতা তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ১১ সেপ্টেম্বরের অনেক আগেই বোমা হামলা চালায় এবং ‘মহা শয়তান’-এর (যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বিশেষ সম্বোধন) বিরুদ্ধে তারা যুদ্ধ ঘোষণা করে। সিআইএ’র সাথে সংযুক্ত সৌদি নির্মাণ শিল্পের ব্যবসায়ী হিসেবে কর্মজীবন শুরুর পরই ওসামা বিন লাদেন মার্কিন সরকারের জন্য এক ভীতিকর ও জনমানসে একজন আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। পাকিস্তানি জেনারেলরা ‘ধর্মযুদ্ধে’র নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সৌদি রাজপরিবারের কাছে কোনো রাজপুত্রকে পাঠাতে অনুরোধ করেছিল। কিন্তু তখন রাজপরিবার থেকে কোনো স্বেচ্ছাসেবী এগিয়ে আসেনি। এর পরিবর্তে রাজপ্রাসাদের একজন বন্ধু হিসেবে ওসামাকে পাঠানো হয়। প্রত্যাশার চাইতে ভালো অবদান রেখে তিনি রিয়াদ ও ‘ফগি বটম’-এ (মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সদর দপ্তর) থাকা তাঁর পৃষ্ঠপোষকদের চমকে দেন। কুলি তাঁর বক্তব্যের সমাপ্তিতে মার্কিন সরকারের উদ্দেশ্যে এই পরামর্শ দেন :
প্রধান শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার সিদ্ধান্ত হলে, আপনাদের পেছনে থাকা সেই মানুষদের দিকে গভীর মনোযোগের সাথে ভালো করে তাকান- যাদের আপনারা বন্ধু, মিত্র বা ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ভালো করে খেয়াল করুন, এই মিত্ররা ইতিমধ্যে তাদের ছুরি কোষমুক্ত করে সেগুলো আপনাদেরই পিঠের দিকে তাক করে রেখেছে কি না।
তাঁর এই পরামর্শ জিবিগনিউ ব্রেজিনস্কিকে খুব একটা প্রভাবিত করেনি বলে মনে হয়। কারণ তিনি এব্যাপারে কোনো অনুশোচনা বা আক্ষেপ স্বীকার করেননি।
মুজাহিদিনদের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সমর্থনকারী রাষ্ট্রগুলোর সমন্বয়ে গঠিত অনানুষ্ঠানিক জোটটি ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত বাহিনী প্রত্যাহারের পর দ্রুত ভেঙে পড়ে। ইসলামাবাদ ব্যাপক পরিধিতে কোনো পুনর্গঠনমূলক সরকার গঠনের পক্ষপাতী ছিল না, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সমর্থনে নিজেদের হাতের পুতুল গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারকে দেশটির ক্ষমতায় বসাতে ইচ্ছুক ছিল । এর ফলে আবার ভয়াবহ ধারাবাহিক গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। হাজারা (ইরান-সমর্থিত), আহমদ শাহ মাসুদ (ফ্রান্স-সমর্থিত) এবং উজবেক জেনারেল দোস্তাম (রাশিয়া-সমর্থিত) প্রতিরোধ গড়ে তোলার ফলে, মাঝেমধ্যে কিছু অস্থিতিশীল যুদ্ধবিরতি হলেও, সংঘাত অব্যাহত থাকে। এসব প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে হেকমতিয়ারের বাহিনীর অক্ষমতা যখন স্পষ্ট হয়ে যায়, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সমর্থন তখন তালেবানের দিকে ঘুরে যায় । উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের ধর্মীয় স্কুলগুলোতে ১৯৮০ সাল থেকেই তারা এই তালেবানদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছিল। ১৯৯২ সালে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আমাকে বলেছিলেন যে, মাদ্রাসার এই কিশোর ধর্মান্ধরা আফগানিস্তানকে ‘মুক্ত’ করতে পারবে কি পারবে না তা অনিশ্চিত হলেও, তারা নিশ্চিতভাবেই পাকিস্তানের অবশিষ্ট স্থিতিশীলতাটুকুও নষ্ট করে দেবে।
তালেবানরা রুশ ‘কাফের’দের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অনাথ সন্তান গোষ্ঠী ছিল। আইএসআই এর প্রশিক্ষণে ও সহায়তায় সীমান্ত পেরিয়ে আসা এই যোদ্ধাদের বলা হয়েছিল, তাদের প্রতিপক্ষের মুসলিমরা কেউ প্রকৃত মুসলিম নয়। আহমেদ রশিদ তাঁর অত্যন্ত প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় বইটিতে তালেবান যোদ্ধাদের মানসিকতার এক জীবন্ত চিত্র তুলে ধরেছেন:
আশির দশকে আমার সংস্পর্শে আসা মুজাহিদিনের তুলনায় এই ছেলেরা সম্পূর্ণ এক ভিন্ন জগতের মানুষ । সেই মুজাহিদিনরা নিজেদের গোত্র ও বংশপরিচয় বলতে পারতেন, ফেলে আসা খামার ও উপত্যকার স্মৃতি রোমন্থন করতেন এবং আফগান ইতিহাসের নানা কিংবদন্তি ও গল্প শোনাতেন। আর এই ছেলেরা সেই প্রজন্মের প্রতিনিধি ছিল, যারা কখনোই নিজেদের দেশকে শান্ত অবস্থায় দেখেনি। নিজেদের গোত্র, বয়োজ্যেষ্ঠ বা প্রতিবেশীদের কোনো স্মৃতি তাদের ছিল না; এমনকি তাদের মাতৃভূমির বিচিত্র ও জটিল জাতিগত মিশ্রণ সম্পর্কেও তাদের কোনো ধারণা ছিল না। যুদ্ধই তাদের একমাত্র পেশা ছিল। এর বাইরে অন্য কোনো কাজের সাথে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা তাদের ছিল না। একক ত্রাণকর্তাকেন্দ্রিক ও কঠোর রক্ষণশীল ইসলামের প্রতি সরল বিশ্বাসই ছিল তাদের জীবনের একমাত্র অর্থবহ অবলম্বন ।৫
মূলচ্যুত ধর্মান্ধতায় পূর্ণ এক ধরণের বিষাদময় ইসলামী বিশ্বজনীনতা চর্চা তালেবানকে তাদের স্থানীয় প্রতিপক্ষদের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর এক যুদ্ধশক্তিতে পরিণত করেছিল। তালেবান নেতারা নিশ্চিত ছিলেন যে, তাদের তরুণ যোদ্ধারা জাতিগতভাবে পশতুন হওয়া সত্ত্বেও আনুগত্যের বিভাজনকারী জাতিগত বা গোত্রীয় পাঁকে তারা নিমজ্জিত হবে না। এমনকি আফগান বামপন্থীদের জন্যও এমন প্রলোভন থেকে নিজেদের মুক্ত রাখা কঠিন হচ্ছিল। যখন তালেবান যোদ্ধারা সীমান্ত অঞ্চল থেকে তাদের অভিযান শুরু করে, তখন বড় শহরগুলোর যুদ্ধক্লান্ত সাধারণ মানুষ প্রায়শই স্বস্তির সাথে তাদের স্বাগত জানিয়েছিল; কারণ সোভিয়েতরা চলে যাওয়ার পর থেকে বেসামরিক জীবনের বিনিময়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়া বাহিনীগুলির ওপর থেকে তারা আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল।
কেবল শান্তি ও অন্ন সংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তালেবান হয়তো দীর্ঘস্থায়ী জনসমর্থন লাভ করতে পারতো। কিন্তু অনতিবিলম্বে, হতভম্ব জনগনের কাছে তাদের শাসনব্যবস্থার প্রকৃত রূপ স্পষ্ট হয়ে উঠলো। নারীদের কার্যত গৃহবন্দী করে ফেলা হলো। তাদের কাজে যাওয়া, স্কুল থেকে সন্তানদের নিয়ে আসা এবং কোনো কোনো শহরে, এমনকি কেনাকাটা করার ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো। মেয়েদের স্কুলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হলো। কঠোর সামরিক শৃঙ্খলার অন্যতম শর্ত হলো, পুরুষদের মধ্যকার ভ্রাতৃত্ববোধ টিকিয়ে রাখা। সেই কারণে মাদ্রাসায় তালেবানদের নারীর প্রলোভন থেকে দূরে থাকতে শেখানো হয়েছিল। তাদের এই কঠোর ‘নৈতিকতা’ চরম পর্যায়ে পৌঁছাল। এর ফলে যে কোনো ধরণের যৌন প্রকাশকেই নির্মূল করার চেষ্টা করা হলো। অথচ এই অঞ্চলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সমকামিতা প্রচলিত ছিল। কিন্তু তালেবান কমান্ডাররা এই ‘অপরাধে’ দোষী সাব্যস্ত করে নিজেদের যোদ্ধাদেরও মৃত্যুদণ্ড দিত। সংগঠনের মূল্যবোধের বাইরে যে কোনো ধরণের ভিন্নমতকে নির্মমভাবে দমন করা হতো। নজিরবিহীন ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হলো।
নারীদের কার্যত গৃহবন্দী করে ফেলা হলো। তাদের কাজে যাওয়া, স্কুল থেকে সন্তানদের নিয়ে আসা এবং কোনো কোনো শহরে, এমনকি কেনাকাটা করার ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো। মেয়েদের স্কুলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হলো।
তালেবানদের ধর্মমত পাকিস্তানের একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের গৃহীত দেওবন্দি ইসলামেরই একটি রূপ। কিছু ক্ষেত্রে এমনকি সৌদি ওয়াহাবি মতাদর্শের তুলনায় এই ধর্মমত চরমপন্থী ছিল। কারণ সৌদি শাসকরা কোরআনের সূত্রবরাতে তাদের অর্ধেক জনসংখ্যার সব ধরনের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেননি এবং ধর্মীয় মতাদর্শে এই অপেক্ষাকৃত নমনীয়তাই ছিল তাদের প্রতি ওসামা বিন লাদেনের অন্যতম অভিযোগ । ওসামার দৃষ্টিতে, আদি ওয়াহাবি দর্শন চর্চায় মরু-রাজ্যের (সৌদি আরব) চেয়ে ‘আফগানিস্তানের আমিরাত’ অধিকতর আদর্শিক ছিল। কায়রোর আল-আজহারের সুন্নি আলেম এবং কোমের শিয়া ধর্মতাত্ত্বিকরা আফগান মোল্লাদের এই কাঠিন্যকে মহানবী (সা.)-এর জন্য মর্যাদাহানিকর হিসাবে নিন্দা করেছেন। ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ এর বাবা জীবনের শুরুর সময়টা আফগান রাজদরবারে কাটিয়েছিলেন। তিনি কাবুল ও কান্দাহার সম্পর্কে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। তাই তালেবান-শাসিত আফগানিস্তান সম্পর্কে কারাগার থেকেই তিনি এমন পঙ্ক্তিমালা রচনা করতে পেরেছেন:
হে আমার দেশ, আমাকে তোমার ফুটপাতের নিচে সমাহিত করো,
যেখানে আজ আর কেউ স্বগর্বে হেটে চলার সাহস পায় না,
যেখানে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিতে আসা তোমার প্রকৃত প্রেমিকরা
প্রাণ ও অঙ্গহানির ভয়ে চুপিচুপি পা ফেলে চলে;
সেখানে প্রয়োগ হচ্ছে এক নতুন ধাঁচের আইন-শৃঙ্খলা
পাথর ও ইটকে করা হয়েছে তালাবদ্ধ, আর কুকুরদের ছাড়া হয়েছে অবাধে—
বিচারক ও জবরদখলকারী—উভয় ভূমিকাতেই আজ দুর্জনেরা,
আমাদের পক্ষে কথা বলবে কে?
আমরা ন্যায়বিচার খুঁজব কোথায়?
নিশ্চিতভাবেই হোয়াইট হাউসের সর্বাধিনায়ক কিংবা ডাউনিং স্ট্রিটে তাঁর সহযোগীকে সেই ন্যায়বিচারকের ভূমিকায় আশা করা যায় না। কারণ, ১১ই সেপ্টেম্বরের আগে, আফগানিস্তানের ধর্মমঞ্চে চরম ও জঘন্য নিপীড়নের শিকার নারীদের জন্য মানবাধিকারের পক্ষে এই ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর ভূমিকা অনুল্লেখযোগ্য । হিলারি ক্লিনটন তাঁর স্বামীর শাসনামলে সামান্য সমালোচনামূলক কথা বলেছিলেন। তবে তার উদ্দেশ্য ছিল মূলত ‘মনিকা কেলেঙ্কারি’র প্রতিকূল সময়ে মার্কিন নারীবাদীদের ক্ষোভ প্রশমিত করা। কাবুল, কান্দাহার বা হেরাতের মতো প্রাচীন শহরগুলোর নারীদের নজিরবিহীন শোচনীয় পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানোর তুলনায় এটি বেশ সহজতর কাজ ছিল । তবে মার্কিন ব্যবসায়িক মহল এ ক্ষেত্রে কম কপটতা দেখিয়েছে। মধ্য এশিয়া থেকে আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তান পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণ বিষয়ক অভিযোগের জবাবে মার্কিন তেল কোম্পানি ইউনোক্যাল-এর এক মুখপাত্র ব্যাখ্যা করেন কেন পুঁজিবাদ লিঙ্গ-নিরপেক্ষ:
‘এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইউনোক্যালের করণীয় পদক্ষেপ নিয়ে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নারীবাদী গোষ্ঠীর সাথে দ্বিমত পোষণ করি… আমরা সেইসব দেশে অতিথি হিসেবে আছি যাদের পূর্ণ সার্বভৌম অধিকার এবং নিজস্ব রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় বিশ্বাস রয়েছে। আফগানিস্তান থেকে প্রকল্প সরালেই সমস্যার সমাধান হবে না।’
নিশ্চিতভাবে, এতে পাইপলাইনে পরিকল্পিত বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত মুনাফার হারও বাড়বে না।
ওয়াশিংটনের পৃষ্ঠপোষকতাপুষ্ট ইসলামাবাদের সামরিক ও আর্থিক সহায়তার বদৌলতে তালেবানরা সমগ্র আফগানিস্তানে দ্রুত আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছিল। সাম্প্রতিক আফগান যুদ্ধের আগে পর্যন্ত দীর্ঘদিন যাবৎ পাকিস্তানি সরকারের সরাসরি বেতনভুক্ত ছিলেন তালেবানের শীর্ষ কমান্ডার মোল্লা ওমর। তবে ক্ষমতা দখলের বিষয়টি আফগান কট্টরপন্থীদের জন্য এক ধরনের নেশায় পরিণত হয়েছিল। তালেবানের অঞ্চলকেন্দ্রিক নিজস্ব লক্ষ্য ছিল সমরকন্দ থেকে করাচি পর্যন্ত ইসলামী প্রজাতন্ত্রগুলোর একটি ফেডারেশন গঠন করে ‘প্যাক্স তালিবানা’ বা ‘তালেবানি শান্তি’ প্রতিষ্ঠা করা। হেরোইন ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত অর্থ তাদের সামরিক স্থলাভিযানের খরচ চালানোর জন্য পর্যাপ্ত ছিল। কিন্তু তারা সমুদ্রপথের দখলও পেতে চেয়েছিল এবং পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তানও একদিন তাদের দখলভুক্ত হবে এরকম বিশ্বাস প্রকাশ্য ছিল।
তালেবানের অঞ্চলকেন্দ্রিক নিজস্ব লক্ষ্য ছিল সমরকন্দ থেকে করাচি পর্যন্ত ইসলামী প্রজাতন্ত্রগুলোর একটি ফেডারেশন গঠন করে ‘প্যাক্স তালিবানা’ বা ‘তালেবানি শান্তি’ প্রতিষ্ঠা করা। হেরোইন ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত অর্থ তাদের সামরিক স্থলাভিযানের খরচ চালানোর জন্য পর্যাপ্ত ছিল। কিন্তু তারা সমুদ্রপথের দখলও পেতে চেয়েছিল এবং পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তানও একদিন তাদের দখলভুক্ত হবে এরকম বিশ্বাস প্রকাশ্য ছিল।
২০০০ সালের অক্টোবর মাস থেকে পাকিস্তান ও তালেবানের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। তাই ক্ষয়িষ্ণু বন্ধুত্বের সম্পর্ক উন্নয়নকল্পে আফগানিস্তানের সাথে একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ আয়োজন করে পাকিস্তান, সেখানে তাদের দল পাঠায়। কাবুলের স্টেডিয়ামে দুই দল মুখোমুখি হলো। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা সেখানে প্রবেশ করে পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের ফুটবল খেলার ছোট প্যান্ট এবং কারও কারও ইউরোপীয় ফুটবল তারকাদের মতো লম্বা চুলকে অশালীন হিসাবে ঘোষণা দেয়। অন্যদিকে, আফগান দলের খেলোয়াড়রা হাঁটু-ঢাকা লম্বা প্যান্ট পরেছিল। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা হয়তো ভেবেছিল যে, পুরুষ-দর্শকপূর্ণ গ্যালারিতে পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের অনাবৃত উরু উত্তেজনার সৃষ্টি করতে পারে। কে জানে! সেদিন আর কোনো ফুটবল খেলা হলো না। পাকিস্তানি দলটিকে গ্রেপ্তার করে তাদের মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া হয়। এবং সবার সামনে তাদেরকে বেত্রাঘাত করা হয়। একই সাথে স্টেডিয়ামের দর্শকদের কোরআন থেকে আয়াত পাঠ করতে বাধ্য করা হয়। মোল্লা ওমরের এমন পদক্ষেপ হয়তো পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর উদ্দেশে পাঠানো এক ধরনের কঠোর বার্তা ছিল ।
পাকিস্তানি দলটিকে গ্রেপ্তার করে তাদের মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া হয়। এবং সবার সামনে তাদেরকে বেত্রাঘাত করা হয়। একই সাথে স্টেডিয়ামের দর্শকদের কোরআন থেকে আয়াত পাঠ করতে বাধ্য করা হয়।
এরপর ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরে এক নতুন যুদ্ধ শুরু হলো। শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ওসামা বিন লাদেন এর খণ্ডিত মস্তক দাবি করে। মোল্লা ওমর বেশ ধৃষ্টতার সাথে হলেও যথার্থভাবেই বিন লাদেনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সপক্ষে প্রমাণ দেখতে চাইলেন। তখন পর্যন্ত তেমন কোনো প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই যুক্তরাষ্ট্র কোনো প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হলো। এরপর তালেবান সরকারকে ওয়াশিংটন সরাসরি আক্রমণের হুমকি দিল। অথচ বোমা হামলা শুরুর মাত্র এক সপ্তাহ আগেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাসচিব ডোনাল্ড রামসফেল্ড তাদেরকে ‘তালেবানের একটি মধ্যপন্থী অংশ’ হিসাবে অভিহিত করছিলেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ছিল -কাবুলের পতন ঘটতে ঠিক কত সময় লাগবে?
১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর, আসন্ন বিপর্যয় এড়াতে পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা ওসামা বিন লাদেনকে হস্তান্তর করার জন্য তালেবানকে রাজি করাতে ব্যর্থ হয়। তবে আরও কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নটি ছিল—আফগানিস্তান থেকে নিজেদের সৈন্য, কর্মকর্তা ও পাইলটদের সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি পাকিস্তান কি তালেবানের মধ্যে বিভাজন ঘটাতে এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল অংশগুলোকে সরিয়ে আনতে পেরেছিল? কাবুলের ভবিষ্যৎ জোট সরকারে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখার লক্ষ্যে এটি ছিল সামরিক সরকারের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। তারা তালেবান যোদ্ধাদের একটি বড় অংশকে সরিয়ে আনতে সফল হয়েছিল। কেউ কেউ পাকিস্তানে ফিরে এসেছিল। অন্যদের দাড়ি কামিয়ে ফেলে কাবুলে ক্ষমতার লড়াইয়ে লিপ্ত বিভিন্ন গোষ্ঠীর কোনো একটিতে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
আফগানদের অপরাজেয় থাকার প্রচলিত ধারণাটি আমি কখনোই বিশ্বাস করিনি। ঊনবিংশ শতাব্দীতে তারা দুবার ব্রিটিশদের পরাজিত করেছিল, এটি সত্য । তবে এটাও সত্য যে তখনো হেলিকপ্টার, বোমারু বিমান বা ক্রুজ মিসাইলের উদ্ভাবন হয়নি। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা এবং পাকিস্তানের আইএসআই এর প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপের কারণেই সোভিয়েত সেনাবাহিনী পরাজিত হয়েছিল। এরকম আক্রমণের মুখে তালেবানের নিজস্ব সক্ষমতায় প্রতিরোধ গড়ে তোলার ধারণাটি ছিল হাস্যকর। বস্তুত বোমাবর্ষণ শুরুর পরপরই আমি ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় লিখেছিলাম :
কাবুল ও কান্দাহারে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার ফলে তালেবানদের কিংবা আরবদের নিয়ে গঠিত বিন লাদেনের বিশেষ বাহিনীর যুদ্ধক্ষমতার ওপর খুব একটা প্রভাব পড়বে না। তা সত্ত্বেও, তালেবানরা কার্যত অবরুদ্ধ ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তাদের পরাজয় অনিবার্য। গুরুত্বপূর্ণ দুটি সীমান্তে পাকিস্তান ও ইরান—উভয় দেশই তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তারা কয়েক সপ্তাহের বেশি টিকে থাকতে পারবে, এমন সম্ভাবনা কম।
এই অভিযানের অনুমিত লক্ষ্য ওসামা বিন লাদেনকে ধরা, বাস্তবে ততটা সহজ মনে হচ্ছে না। দুর্গম পামির পর্বতমালায় কড়া নিরাপত্তায় তিনি সুরক্ষিত আছেন এবং পরবর্তী পদক্ষেপের পরিকল্পনা করার জন্য হাতে থাকা তিন সপ্তাহের মধ্যে তিনি হয়তো আত্মগোপন করতে সক্ষম হবেন। তবে শেষ পর্যন্ত বিজয় ঘোষিত হবেই। পশ্চিমা বিশ্ব তাদের নাগরিকদের স্বল্পস্থায়ী স্মৃতিশক্তির ওপরই ভরসা করবে। কিন্তু বিন লাদেনকে ধরে হত্যা করা হলে তাতে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ কী লাভ অর্জন করবে ? অন্য ব্যক্তিরা হয়তো ভিন্ন কোনো উপায়ে ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেবে।
বিদ্যমান স্থানীয় ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সক্রিয়তায় আফগানিস্তানকে একটি নতুন অনুগত রাষ্ট্র হিসাবে টিকিয়ে রাখা সহজসাধ্য হবে না। ইতিপূর্বে পিডিপিএ সরকারের পতনের পর মুজাহিদিনদের মধ্যে দীর্ঘ এক বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে এমন একটি প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। সৌদি বাদশাহ, পাকিস্তান ও ইরান ১৯৯৩ সালের মার্চ মাসে যুদ্ধরত ইসলামী দলগুলোকে একত্রিত করেছিল। ইসলামাবাদে আনুষ্ঠানিকভাবে ঐকমতের ভিত্তি ছিল ক্ষমতা ভাগাভাগি এবং ভারী অস্ত্রশস্ত্রের নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি জাতীয় সেনাবাহিনী গঠন এবং তার ওপর ভিত্তি করে বিস্তারিত ও আধা-সাংবিধানিক একটি পরিকল্পনা। এছাড়া, একটি বিশাল গণপরিষদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য একটি নির্বাচন কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই নির্বাচিত গণপরিষদ নতুন সংবিধানের বিষয়ে ভোট দেবে। একই কক্ষে একসাথে কথা বলার সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী যুদ্ধবাজ নেতাদের বিরক্তি দৃশ্যমান ছিল। কিন্তু পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ নিজের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত হয়ে তা উপেক্ষা করেন এবং সবাইকে একসঙ্গে পবিত্র মক্কা শহরে গিয়ে চুক্তিটি চূড়ান্ত করার প্রস্তাব দেন। মুজাহিদিনদের নয়টি দলের নেতা সৌহার্দ্যপূর্ণ হাসি উপহার দেন এবং বিমানে চড়েন। সম্পূর্ণ সুস্থ ও সজাগ বাদশাহ ফাহদের উপস্থিতিতে যথারীতি ‘মক্কা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হলো। নওয়াজ শরিফ আফগান নেতাদের সতর্ক করে বলেন যে , মক্কায় স্বাক্ষরিত কোনো চুক্তি ভঙ্গ করলে ইতিহাস এবং আল্লাহ—কেউই তাদের ক্ষমা করবেন না। কিন্তু এই সতর্কবার্তা সফল হয়নি। আফগানিস্তানে ফিরে আসামাত্র প্রধান দলগুলি আবার লড়াই শুরু করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জেনারেল সৈয়দ রাফাকাত গৃহযুদ্ধের বিষয়ে যদিও অপর্যাপ্ত, তবু একটি কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন:
জিহাদের সেই পবিত্র গর্ভ থেকে ক্রমান্বয়ে পাঁচটি অশুভ বিষয় জন্ম লাভ করে : আফগান পরিচয় দুর্বল হয়ে পড়া, জাতিসত্তার ওপর প্রবল গুরুত্ব আরোপ, সাম্প্রদায়িক বা গোষ্ঠীগত বিভাজনের উদ্ভব, যুদ্ধবাজ ধর্মীয় নেতাদের আধিপত্যবাদ এবং আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশী শক্তির হস্তক্ষেপের প্রবণতা। এর মধ্যে প্রথম বিষয়টি আফগানিস্তানের সকল মানুষের মধ্যে ‘আফগান’ হিসেবে পরিচিত ও অভিহিত হওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান গর্ববোধকে ক্ষুণ্ণ করেছিল।
একই ‘পবিত্র গর্ভ’ থেকে নগদ অর্থ, অস্ত্রশস্ত্র এবং হেরোইনের সহজ ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের প্রতি আসক্তিও জন্ম লাভ করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পরাজয়ের পর প্রথম দুটির প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলেও তৃতীয়টি মানে হেরোইন সরবরাহ অব্যাহত ছিল। আর হেরোইন চাষাবাদ, প্রক্রিয়াজাতকরণ কিংবা বিতরণের প্রক্রিয়ায় মুজাহিদিনদের সবকটি গোষ্ঠীই কোনো না কোনোভাবে জড়িত ছিল। তবে গোষ্ঠীগুলোর সরবরাহের পথ ছিল ভিন্ন ভিন্ন। পশতুনরা পাকিস্তানের করাচি বন্দর ব্যবহার করত। অন্যদিকে হাজারা ও তাজিকদের জন্য শক্তিশালী রুশ মাফিয়ার সঙ্গে কাজ করাটা লাভজনক ছিল। কারণ এই মাফিয়া গোষ্ঠীটি সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোতে হেরোইন বিতরণের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করতো। ইউরোপে সরবরাহের জন্য আলবেনিয়া ও পরবর্তীতে কসোভোতে তাদের বিশাল ঘাঁটি ছিল। গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মূলে জাতিগত বিদ্বেষের চেয়ে নিছক লোভই প্রাধান্য পেয়েছিল। ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তিতে ৪৩ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে তালেবান তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় পপি ক্ষেত ধ্বংস করতে রাজি হয়। এর ফলে হেরোইনের বাজারে ‘নর্দার্ন অ্যালায়েন্স’-এর প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলির একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো; রুশ মাফিয়া পাকিস্তানের হেরোইন ব্যবসায়ীদের পরাজিত করতে সক্ষম হলো।
হেরোইন চাষাবাদ, প্রক্রিয়াজাতকরণ কিংবা বিতরণের প্রক্রিয়ায় মুজাহিদিনদের সবকটি গোষ্ঠীই কোনো না কোনোভাবে জড়িত ছিল। তবে গোষ্ঠীগুলোর সরবরাহের পথ ছিল ভিন্ন ভিন্ন। পশতুনরা পাকিস্তানের করাচি বন্দর ব্যবহার করত। অন্যদিকে হাজারা ও তাজিকদের জন্য শক্তিশালী রুশ মাফিয়ার সঙ্গে কাজ করাটা লাভজনক ছিল।
২০০১ সালের বন (Bonn) সম্মেলনে ১৯৯৩ সালে মক্কায় সমবেত হওয়া সেই প্রাক্তন যুদ্ধবাজ নেতাদের আর দেখা যায়নি। তাদের কেউ কেউ ততদিনে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। আবার কেউ কেউ নিজ বাড়িতে অবস্থান করাকে শ্রেয়তর মনে করেন। এবার পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলির পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই- বাছাইকৃত প্রতিনিধিরা বন সম্মেলনে অংশগ্রহন করেন। জাতিসংঘের প্রবীণ মধ্যস্থতাকারী লাখদার ব্রাহিমির নিজস্ব তত্ত্বাবধানে তাদের বাছাইকরণ চুড়ান্ত হয়। প্রতিনিধিরা চমৎকার পশ্চিমা স্যুট-কোট পরে উপস্থিত হয়েছিলেন। তারা স্বচ্ছন্দে নতুন পৃষ্ঠপোষকগণ তুষ্ট হবে এমন সব বুলি আউড়াতে থাকেন। পৃষ্ঠপোষকদের খুশী করতে তারা সক্ষম হন। ইতিপূর্বে মক্কায়, তারা বিধর্মীদের বিরুদ্ধে নিজেদের বিজয়ের জন্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন। আর এবার তারা সেই ‘বিধর্মীদের’ কাছেই ‘নূহের কুলাঙ্গার সন্তান’ ও ‘ভুয়া মুসলিমদের’ বিরুদ্ধে বিজয়ের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছিলেন। তারা অত্যন্ত মধুর সুরে বলছিলেন—’একটি দেশ, একটি জাতি, যারা নিজেদের মধ্যে শান্তিতে আছে, আধুনিকতার পথে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে এবং প্রতিবেশীদের জন্য কোনো হুমকি নয়’।
মক্কায়, তারা বিধর্মীদের বিরুদ্ধে নিজেদের বিজয়ের জন্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন। আর এবার তারা সেই ‘বিধর্মীদের’ কাছেই ‘নূহের কুলাঙ্গার সন্তান’ ও ‘ভুয়া মুসলিমদের’ বিরুদ্ধে বিজয়ের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছিলেন।
ইউরোপে নিজের এতজন সন্তানের সিংহাসন লাভের ঘটনায় যখন রাজদরবারের সভাসদরা নেপোলিয়নের মাকে অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন, তখন তিনি বেশ কর্কশ সুরেই উত্তর দিয়েছিলেন: ‘কিন্তু এই অবস্থা কি টিকে থাকবে?’
সিআইএ’র প্রাক্তন সহযোগী হামিদ কারজাই অনায়াসেই উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে কাজ জুটিয়ে নিতে পারবেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি জালমে খলিলজাদ হোয়াইট হাউস বা ইউনোকাল-এ ফিরে যেতে পারবেন। কিন্তু আফগানিস্তানের মুমূর্ষু ও দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের কী হবে?
প্রকৃত অবস্থা বলে- আফগানিস্তানের পরিস্থিতি মজ্জাগতভাবেই অস্থিতিশীল। কেবল কল্পনাবিলাসীরাই এর বিপরীত কিছু ভাবতে পারে। বর্তমান কাঠামোয় আরও কয়েক বছর এই জোটটির টিকে থাকার ধারণা হাস্যকর। সরাসরি সংঘাত এড়ানো সম্ভব হলেও ‘মুক্ত’ কাবুলে ইতিমধ্যেই আধিপত্য বিস্তারের লড়াই শুরু হয়ে গেছে। এখানে অনেক কিছুই ঝুঁকির মুখে। পশ্চিমা বিশ্বের নজরদারী চলছে। অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পুতিন ও খাতামি সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন। কিন্তু বাঁধটি যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। অভিজাত পশতুন পোশাকের মডেল হিসেবে সিআইএ’র প্রাক্তন সহযোগী হামিদ কারজাই অনায়াসেই উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে কাজ জুটিয়ে নিতে পারবেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি জালমে খলিলজাদ হোয়াইট হাউস বা ইউনোকাল-এ ফিরে যেতে পারবেন। কিন্তু আফগানিস্তানের মুমূর্ষু ও দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের কী হবে? বিন লাদেনের মাথা সঙ্গে নিয়ে বা তাকে ছাড়াই যখন মেরিন সেনারা চলে যাবে, তখন জোটটি বুঝতে পারবে যে, যুদ্ধ চালানো ছাড়া কোনো কাজের জন্য এখন আর অর্থ নেই। ‘আমরা পৃথিবীকে নতুন করে গড়ছি’—এই স্কাউট-সুলভ প্রচারটি মূলত নিজ দেশের জনগণের মনস্তুষ্টির জন্যই ছিল । আফগানিস্তান বা কসোভোতে আগামী বসন্তে কিংবা তার পরের বসন্তে স্কুল, হাসপাতাল বা ঘরবাড়ি গড়ে ওঠার কোনো সম্ভাবনা নেই। এই গল্পটিও এখানেই শেষ নয়। আমার আশঙ্কা তাই বলে।
আগের পর্ব: মৌলবাদের সংঘর্ষ: ক্রুসেড, জিহাদ এবং আধুনিকতা-১৪
ফাতেমা বেগম: লেখক শিক্ষক অনুবাদক। ই-মেইল: fatemaorama@gmail.com
পাদটীকা ও তথ্যসূত্র
১। উল্লেখ্য,অন্য সবকিছুর সাথে ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা টি.ই. লরেন্স রানী সুরাইয়া (কট্টর নারীবাদী) এর ‘আপত্তিকর ভঙ্গিমার’ ভুয়া ছবি তৈরি করে উপজাতীয়দের মধ্যে বিতরণ করেছিলেন।
২। নেপথ্যে জহির শাহের প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে পাকিস্তান তীব্র বিরোধিতা করে আসছিল। কারণ তারা জানতো যে, রাজা কখনোই, এমনকি সাময়িক সীমানা হিসেবেও, মর্টিমার-ডুরান্ড লাইনকে স্বীকার করেননি। রাজার কর্তৃত্বে পশতুন জাতীয়তাবাদ পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সম্ভাবনার ব্যাপারেও তারা আশঙ্কিত ছিলেন।
৩। স্নায়ুযুদ্ধের আগে, চলাকালীন ও পরবর্তী সময়ে বিশ্বের অন্যত্র সাধারণ মানুষের অধিকার ও জীবনের প্রতি তাচ্ছল্য ওয়াশিংটনের দৃষ্টিভঙ্গির যে বৈশিষ্ট্য ছিল—এর চেয়ে সংক্ষেপে ও সারগর্ভভাবে তা আর প্রকাশ করা সম্ভব নয়; তবে ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১-এর ঘটনার পর নিউ ইয়র্কের নাগরিকরা এই প্রশ্নের জবাবে কী বলতেন, তা ভেবে দেখার বিষয়।
৪। John Cooley: Unholy Wars: Afghanistan, America and International Terrorism, London 1999.
৫। Ahmed Rashid: Taliban, Islam, Oil and the New Great Game in Asia, London 1999.
