মৌলবাদের সংঘর্ষ: ক্রুসেড, জিহাদ এবং আধুনিকতা-১৪
পাকিস্তানের অনস্বীকার্য গল্প-৩
তারিক আলি
অনুবাদ: ফাতেমা বেগম
২০০২ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী তৎপরতা অনেক বিস্তৃত এবং ইসলামি মৌলবাদ বিশ্বজুড়ে আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয় তখন তারিক আলির বই The Clash of Fundamentalisms: Crusades, Jihads and Modernity প্রকাশিত হয়। তারিকের এই বইয়ে অনুসন্ধান করা হয়েছে ধর্মীয় বিভিন্ন মত-পথ, বিভিন্ন ধরনের মৌলবাদী শক্তি, তার ইতিহাস ও রাজনীতি এবং সর্বোপরি তার ভাষায় ‘সবচেয়ে বড় মৌলবাদী শক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ’-এর সঙ্গে এর সম্পর্ক। সর্বজনকথার জন্য এই বই (প্রকাশক ভার্সো, 2003)-এর ধারাবাহিক অনুবাদের এবারে ত্রয়োদশ পর্ব। এখানে আলোচিত হয়েছে গত সংখ্যায় প্রকাশিত পাকিস্তানের কাহিনির বাকি অংশ।
একটি খণ্ডিত দেশের নেতা হয়ে ভুট্টোর আকাঙ্ক্ষা পূরণ হলো। তবে সমর্থকদের দেওয়া তার প্রতিশ্রুতিগুলো খুব কমেই বাস্তবায়িত হয়েছিল।১ যুক্তরাষ্ট্র যখন তাঁকে সরিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নেয় তখন সহজেই অনুমেয় ছিল যে তারা সেনাবাহিনীকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে। ভুট্টো তোষামোদে সহজে প্রভাবিত হতেন এবং বরাবরই মানুষ চিনতে দুর্বল ছিলেন। তাই অন্য চারজন জেনারেলকে অধীন করে জেনারেল জিয়াউল হককে পদোন্নতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। অদূরদর্শী বিচারে ‘উরিয়া হিপের’ মতো ব্যক্তিত্ব জিয়াকে তিনি তার ‘পকেটের পুতুল’ ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু ফোর্ট ব্র্যাগে প্রশিক্ষিত অফিসার জিয়ার আনুগত্য ছিল জাতীয় সীমানার বাইরে। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরে জর্ডানে একটি সশস্ত্র আক্রমণ চালিয়ে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে তিনি ইতোমধ্যে সাহসী খেতাব অর্জন করেছিলেন। জর্ডানের হোসেনকে বাঁচানোর এই অভিযানের মূল পরিকল্পনাকারী ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিগেডিয়ার জিয়াউল হক ইসলাম রক্ষা নিয়ে খুব একটা চিন্তিত ছিলেন না। সাত বছর পর জেনারেল জিয়া পাকিস্তানে ক্ষমতা দখল করেন এবং ভুট্টোকে ক্ষমতাচ্যুত করেন।
ভুট্টোকে গ্রেপ্তার করে পরবর্তী সময়ে তাকে আগের এক হত্যার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। কিন্তু রাতারাতি ভুট্টো আবার জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ক্ষমতাচ্যুত রাজনীতিবিদ ভুট্টোকে জামিন দিলে তিনি বন্ধুদের সঙ্গে পরামর্শ করতে লাহোরে গেলেন। বিমান থেকে অবতরণ করার পর, রাস্তার ধারে সারিবদ্ধভাবে লাখ লাখ সমর্থক তার মুক্তিকে স্বাগত জানায়। কিন্তু এই সমর্থনই তার মৃত্যু পরোয়ানা হয়ে দাঁড়াল।২ জিয়া জানতেন যে জীবিত থাকলে ভুট্টো একদিন ক্ষমতায় ফিরে আসবেন। এটি ছিল দুজন ব্যক্তি, এক কফিনের ঘটনা।
আবারও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতা প্রাপ্ত জিয়ার সামরিক একনায়কতন্ত্র ছিল দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সময়। নির্বোধ, বধির এবং হৃদয়হীন অনুচর পরিবেষ্টিত জিয়ার নতুন শাসনব্যবস্থা ইসলামকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এবং অবিশ্বাস্যরকম বোকা অনেক সমর্থক একেবারে মজ্জাগতভাবে সুবিধাবাদী ছিলেন। তারা ধর্মের সঙ্গে জঘন্যতম অকথ্য ভাষার মিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। জিয়ার শাসনামলে স্বৈরাচার ও মিথ্যাচার একটি গোটা প্রজন্মকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছিল। ইসলামি শাস্তি চালু করা হয়েছিল। প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত এবং ফাঁসি প্রথা প্রবর্তন করা হয়েছিল। পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বর্বর করে তোলা হয়েছিল। তা থেকে এখনো দেশটির নিরাময় ঘটেনি। দেশের নির্বাচিত নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সময় ওয়াশিংটন ও লন্ডন নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল। ওয়াশিংটন তখন পাকিস্তানে পারমাণবিক কর্মসূচির প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করতে থাকে। কারণ, ততদিনে মস্কোপন্থি আফগান বামপন্থিরা কাবুল দখল করে নিয়েছিল।
স্বৈরাচার ও মিথ্যাচার একটি গোটা প্রজন্মকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছিল। ইসলামি শাস্তি চালু করা হয়েছিল। প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত এবং ফাঁসি প্রথা প্রবর্তন করা হয়েছিল। পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বর্বর করে তোলা হয়েছিল। তা থেকে এখনো দেশটির নিরাময় ঘটেনি। দেশের নির্বাচিত নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সময় ওয়াশিংটন ও লন্ডন নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল।
শীতল যুদ্ধ তখন চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। তাই মস্কোকে উসকানি দেওয়া, বিচ্ছিন্ন করা এবং পরাজিত করার লোভ খুব প্রবল হয়ে উঠেছিল। এক জঘন্য সামরিক স্বৈরশাসক এই অভিযান পরিচালনার হাতিয়ারে পরিণত হলেন। অন্য সবকিছু এই একটিমাত্র লক্ষ্যের অধীনস্থ ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরাজিত করার জন্য পাকিস্তান ও আফগানিস্তান–এই দুটি দেশকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেওয়া হলো। মৌলবাদী ইসলাম ও হেরোইন উৎপাদন দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেল।
১৯৮৮ সালে জেনারেল জিয়া তার শাসনকালের দশম বার্ষিকী উদ্যাপন করে দেশবাসীকে জানালেন যে তার অবসর গ্রহণের কোনো ইচ্ছা নেই। পরের বছর কঠোর নিরাপত্তা বিধানে বিশেষভাবে নির্মিত একটি বিমান বিস্ফোরণে তিনি নিহত হন। তার ভ্রমণসঙ্গী আরেকজন জেনারেল এবং মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্নল্ড রাফায়েলও একইসঙ্গে নিহত হন। কে ছিল জিয়ার হত্যাকারী? তার স্ত্রী দর্শনার্থীদের প্রায়ই বলতেন, ‘আমাদের নিজেদের লোকেরাই এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী।’ তার মানে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সামরিক বাহিনী জড়িত ছিল। কিন্তু তদন্তে কিছু প্রমাণ করা যায়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা পাকিস্তানের কোনো গোয়েন্দা সংস্থাই এই বিশেষ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেনি।
জিয়ার সমর্থক এবং তার লালিত ইসলামপন্থি গোষ্ঠীগুলো বাদে সমগ্র পাকিস্তানে বাঁধভাঙা আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। অনেক শহরে মিষ্টি বিতরণ করে তার মৃত্যু উদ্যাপন করা হয়। তার উত্তরসূরি সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা করতে বাধ্য হন। বেনজির ভুট্টো এবং পিপলস পার্টি ইতোমধ্যেই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে একটি আন্দোলন শুরু করেছিল এবং তাকে আবারও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এখন তার প্রচারণায় বিপুল জনসমাগম হতে শুরু করে। প্রাক্তন সামরিক একনায়কতন্ত্রের সৃষ্টি নওয়াজ শরীফ তার প্রতিপক্ষ ছিলেন। বেনজির নির্বাচনে জয়লাভ করে প্রধানমন্ত্রী হন। এই ফলাফলে সামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা খুব অসন্তুষ্ট হলেন। একদিকে সামরিক বাহিনী এবং অন্যদিকে এক প্রতিকূল আমলাতন্ত্র বেনজিরকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। রাষ্ট্রপতি তার বাবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরীতে সহায়ক ব্যক্তি ছিলেন। নওয়াজ শরীফ পাঞ্জাবের গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশটি জয় করেছিলেন। অন্যদিকে মোল্লারা যুদ্ধ করতে প্রস্তুত। সব ধরনের সাধারণ মানের ব্যক্তি এবং সুযোগসন্ধানীদের দ্বারা বেনজির পরিবেষ্টিত ছিলেন। কয়েক বছর পর তার পঙ্গু সরকারকে অপসারণ করা হয়। আমলাতন্ত্রের সহযোগিতায় নওয়াজ শরীফ পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসেন।
ভুট্টোর কন্যা বেনজির এবং মুহাম্মদের পুত্র নওয়াজ শরীফের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক জমজমাট নেপথ্য কাহিনি রয়েছে। পূর্ব পাঞ্জাবে (বর্তমানে ভারতে) শরীফ পরিবার পেশায় কামার ছিল। পরবর্তী সময়ে নতুন মুসলিম ভূমিতে তারা আশ্রয় লাভ করেন। ১৯৪৭ সাল থেকে লাহোরে এই পরিবারের পৈতৃক নিবাস। ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিতে অনাগ্রহী পরিবারটির কঠোর পরিশ্রমে তাদের কারখানাগুলো সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। ১৯৭২ সালে বেনজিরের বাবা জুলফিকার আলী ভুট্টোকে শরীফ পরিবারের কারখানাটি জাতীয়করণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। দলীয় অনুগতদের খুশি করলেও এটি অর্থনৈতিকভাবে অপরিণত একটি সিদ্ধান্ত ছিল। এই সিদ্ধান্ত গ্রামাঞ্চলে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ভূমি সংস্কার বাস্তবায়নে ভুট্টোর ব্যর্থতা থেকে মনোযোগ সরিয়ে রেখেছিল। জমিদাররা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে ছোট-বড় শিল্পের এরকম অপরিণত জাতীয়করণকে সমর্থন করেছিলেন। তবে এর গুরুত্বপূর্ণ একটি ফলাফল হিসেবে পরিবারের কর্তা মুহাম্মদ শরীফ ভুট্টোর আজীবনের শত্রুতে পরিণত হন। ১৯৭৭ সালের জুলাই মাসে জেনারেল জিয়া ক্ষমতা গ্রহণকালে শরীফ পরিবার উচ্চস্বরে উল্লাস করেছিল। এরপর যখন জিয়া একটি সাজানো বিচারের মাধ্যমে ভুট্টোর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন, তখন শরীফ পরিবার তাদের প্রার্থনা কবুল হওয়ায় আল্লাহকে ধন্যবাদ জানায়।
নওয়াজ শরীফ প্রয়াত জেনারেল জিয়ার শিষ্যের ভূমিকা গ্রহণ করেন। দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান আইএসআই (ইন্টার-সার্ভিসেস ইনটেলিজেন্স)-এর একজন আনাড়ি ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা হিসেবে তার রাজনীতিতে প্রবেশ ঘটে। বেনজিরকে প্রথমবার ক্ষমতাচ্যুত করার পর তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। পরিবারের সবচেয়ে চতুর ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত তার ভাই শাহবাজকে গৌণ ভূমিকায় রাখা হয়। কিন্তু এই সরকারও বেশিদিন টেকেনি। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বেনজির পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসেন। এবার বেনজিরের আর কোনো অজুহাত অবশিষ্ট ছিল না। তিনি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে পারতেন। কিন্তু তার পরিবর্তে তার সরকার দুর্নীতির জালে জড়িয়ে পড়ে।
১৯৯৭ সালে পাকিস্তানে গেছি, একদিন কৃত্রিম এক আপাত শান্ত পরিবেশের ইসলামাবাদে আমার মায়ের প্রিয় রেস্তোরাঁয় মধ্যাহ্নভোজ করছিলাম। পাশের টেবিল থেকে এক হাসিখুশি গোঁফওয়ালা ভদ্রলোক, বিনিয়োগ প্রতিমন্ত্রী এবং সিনেটর আসিফ জারদারি, আমাদের অভিবাদন জানাতে এলেন। তার স্ত্রী, বেনজির ভুট্টো, তখন রাষ্ট্রীয় সফরে বিদেশে ছিলেন। বাচ্চাদের বিনোদনের দায়িত্ব পালনে একটি বিশেষ আপ্যায়ন দিতে তিনি সেখানে এসেছিলেন। আমাদের কুশল বিনিময় হলো। আমি তার কাছে দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলাম। ‘ভালো,’ তিনি এক মনোহর হাসি দিয়ে উত্তর দিলেন, ‘সব ঠিকঠাক চলছে।’ তবে তার আরেকটু ভালোভাবে খবরাখবর রাখা দরকার ছিল। কারণ রাজধানী ইসলামাবাদের রুদ্ধদ্বার কক্ষগুলোতে তখন একটি প্রাসাদ অভ্যুত্থান দানা বাঁধছিল। বেনজির ভুট্টো এক জাঁকালো বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হতে চলেছিলেন। তারই মনোনীত রাষ্ট্রপতি, ফারুক লেঘারি সেনাবাহিনী এবং বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে গোপন আলোচনার পর তার সরকারকে অপসারণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
একই সপ্তাহে এক নৈশভোজকালে বেনজিরের পুরোনো পরিচিত এবং ভক্ত একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাকে হতাশায় আচ্ছন্ন হতে দেখলাম। তিনি বর্ণনা করলেন, সংকট নিরসনের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি লেঘারি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটি বিশেষ বৈঠক আহ্বান করেছিলেন। বেনজির যথারীতি তার স্বামী সিনেটর জারদারিকে সঙ্গে নিয়ে বৈঠকে হাজির হলেন। এতে লেঘারি বিরক্ত হলেন। কারণ তার স্বামীর কিংবদন্তিতুল্য লোভ ও লালসার ব্যাপারটি বেনজিরের সঙ্গে অন্যতম আলোচ্য বিষয় ছিল। বিরক্তি সত্ত্বেও তিনি সংযত থেকে রাজকীয় দম্পতিকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে, দুর্নীতির মাত্রা এবং তার ফলস্বরূপ প্রশাসনের অবক্ষয় একটি জাতীয় কেলেঙ্কারিতে পরিণত হয়েছে। কেবল তাদের চিরাচরিত রাজনৈতিক শত্রু বা স্বল্পবুদ্ধির লোকেরাই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে না। সেনাবাহিনী এবং উদ্বিগ্ন নাগরিক গোষ্ঠীগুলোও দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তাদের প্রতিহত করার জন্য লেঘারি বেনজিরের সাহায্য চাইলেন। তিনি বেনজিরকে তার স্বামী এবং অন্যান্য লাগামহীন মন্ত্রীদের শায়েস্তা করার জন্য অনুরোধ করলেন। এই পর্যায়ে নিজের বস্তুগত স্বার্থ রক্ষায় অবিচল জারদারি মুচকি হেসে রাষ্ট্রপতিকে বিদ্রুপ করে বললেন, লেঘারিসহ পাকিস্তানের কারোরই অতীত কলঙ্কমুক্ত নয়। হুমকিটা ছিল স্পষ্ট। তা ছিল- আমাদের পিছু নিলে আমরা তোমাদের মুখোশ খুলে দেব।
লেঘারি তার পদমর্যাদার চরম অবমাননা অনুভব করলেন। রাগে কাঁপতে কাঁপতে তিনি বিনিয়োগ মন্ত্রীকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বললেন। বেনজিরের সম্মতিতে জারদারি বেরিয়ে গেলেন। কেবল প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে তিনি আবারও তার বিশৃঙ্খল স্বামীকে সংযত করার জন্য অনুরোধ করলেন। বেনজির বিনীত হাসি হেসে রাষ্ট্রপতির প্রতি তার আনুগত্যের গুরুত্বের সপক্ষে একটি নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন। তিনি জানালেন, অভিযোগকারীরা আসলে তার স্বামীর ব্যবসায়িক দক্ষতার ব্যাপারে ঈর্ষান্বিত। তারা শীর্ষ পদ বণ্টনের সময় উপেক্ষিত কিছু খিটখিটে, নিঃশেষিত, ক্ষুব্ধ এবং শঠ পেশাদার ব্যক্তি। বেনজির রাষ্ট্রপতির অভিযোগের সঙ্গে কোনো আপসে গেলেন না।
পাকিস্তানি মানদণ্ডের বিচারে লেঘারি একজন সৎ, সরল মানুষ ছিলেন। বেনজির ভেবেছিলেন যে উচ্চাকাঙ্ক্ষায় উদাসীন এই রাষ্ট্রপতি তার ইচ্ছা পালনে ভক্ত কুকুরের ভূমিকায় থাকবেন। তাই তিনি লেঘারিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে পছন্দ করেছিলেন। এই পছন্দে হতাশ পদপ্রার্থীদের বলা হয়েছিল: ‘তিনি হয়তো খুব মেধাবী নন এবং কিছুটা অনমনীয়, তবে তার হৃদয় সঠিক জায়গায় রয়েছে।’
১৯৯৯ সালের জানুয়ারিতে একটি সংক্ষিপ্ত কথোপকথনের সময় লেঘারি আমাকে বলেছিলেন যে এই বৈঠকটি শেষ সিদ্ধান্ত টেনেছিল। তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল। বেনজিরের বাড়াবাড়ি তার সহ্যের সীমা অতিক্রম করেছিল। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, বেনজির পদে থাকলে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করবে এবং ক্ষমতার অদল-বদলের অস্থির ইতিহাসের দেশে চতুর্থবারের মতো গণতন্ত্রকে হত্যা করা হবে। তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও তিনি ঘৃণ্য অষ্টম সংশোধনী (প্রয়াত স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়াউল হক প্রদত্ত জাতিকে দেওয়া একটি উপহার, যা প্রয়োগ করে রাষ্ট্রপতি একটি নির্বাচিত সরকারকে বরখাস্ত করার ক্ষমতা পেয়েছিল) ব্যবহার করে সরকারকে বরখাস্ত করেন। পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন হওয়ার কথা।
দুর্নীতি ছিল বেনজির ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে আনীত প্রধান অভিযোগ। প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি ব্যবহার করে এই দম্পতির ব্যক্তিগত সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা এবং বিদেশে তাদের সম্পদ স্থানান্তর করার অভিযোগ আনা হয়। ভাগ্যের এই উপহারের মূল্য সাধারণত এক বিলিয়ন ডলার বলে উল্লিখিত হয়।
বেনজিরের পতনের পরপরই সিনেটর জারদারি গ্রেফতার হন। অদ্যাবধি তিনি করাচি কারাগারে বন্দি রয়েছেন। যদিও পাকিস্তানের আদালতে যারপরনাই কম মানের প্রমাণ গ্রহণযোগ্য হয়, তথাপি তার বিরুদ্ধে গৃহীত একাধিক অপরাধের অভিযোগের সপক্ষে সরকারি আইনজীবীরা এখনো গ্রহণযোগ্য কোনো প্রমাণ খুঁজে পাননি। এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রে নির্ভরযোগ্য সাক্ষীর অভাব রয়েছে। জারদারির ব্যবসায়িক সহযোগী ও বন্ধুরা তার প্রতি অনুগত থেকেছে। ব্যাপারটি এখন এনরন কেলেঙ্কারির অনুরূপ একটি মহড়া মনে হচ্ছে। তাদের একজন, পাকিস্তান স্টিল-এর সভাপতি, তার প্রাক্তন পৃষ্ঠপোষকের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার পরিবর্তে আত্মহত্যা করা বেছে নিয়েছিলেন।
এখনো বর্তমান আছেন এমন কয়েকজন বেনজিরের ঘনিষ্ঠ সমর্থক তার রাজনৈতিক প্রতিপত্তি ধ্বংস হওয়ার জন্য একজন প্রতারক, ভণ্ড, অপব্যয়ী, নারী-আসক্ত এবং আরও খারাপ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী তার স্বামীকে জোরালোভাবে দায়ী করেছেন। সরকার বিরোধী নেতৃত্বে ফিরে এসে ইসলামাবাদে একটি সেমিনারে বন্ধুত্বপূর্ণ সমাবেশে বেনজির ভাষণ দেন। তখন তিনি প্রাক্তন বিনিয়োগ মন্ত্রী জারদারিকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিলেন। জারদারির ব্যাপারে অনেক ভুল বোঝাবুঝি ছিল, এটা বলা শুরু করতেই শ্রোতাদের সদস্যরা অস্বীকৃতিতে মাথা নাড়তে শুরু করেন এবং চিৎকার করেন ‘না! না! না!’ বেনজির একটু থেমে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন: ‘আমি ভাবছি, আমি যখনই তাকে উল্লেখ করি তখনই কেন আমি একই প্রতিক্রিয়া পাই?’ প্রশ্নটি হয় ছিল বিদ্রুপাত্মক, নয়তো ছিল জারদারির প্রতি তার আকর্ষণের অন্ধত্ব।
আমি মনে করি না যে জারদারিই তার অ-জনপ্রিয়তার একমাত্র কারণ ছিল। দুর্ভাগ্যবশত তার পিপলস পার্টি সরকার শহর ও গ্রামে এমনকি তার নির্বাচনী এলাকায় দরিদ্রদের জন্য খুব সামান্যকিছুই করেছে। জাতীয় ও প্রাদেশিক পর্যায়ে তার বেশিরভাগ মন্ত্রী তাদের নিজেদের পকেট ভারী করতে এতই ব্যস্ত ছিলেন যে খাদ্য এবং সঠিক পুষ্টির অভাবে ক্ষুধার্ত শিশুদের শরীর কী দাঁড়াচ্ছে তা লক্ষ করার সময় তাদের ছিল না। তার দায়িত্বে থাকাকালীন শিশুমৃত্যুর পরিসংখ্যান অপরিবর্তিত ছিল।
পদলেহনকারী সহযোগী এবং দালাল দ্বারা স্থায়ীভাবে পরিবেষ্টিত বেনজির তার ভোটারদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন। বাস্তব পরিস্থিতির ব্যাপারে তিনি অসচেতন ছিলেন। ক্ষমতা থেকে অপসারণের পর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে তাই তার পিপলস পার্টির লজ্জাজনক পরাজয় হয়। পাকিস্তানি সাধারণ ভোটারদের অধিকাংশ হয়তো নিরক্ষর, কিন্তু তাদের রাজনৈতিক প্রত্যাশার মান উঁচু ছিল। তাদের মোহভঙ্গ ঘটেছিল। হতাশায় তারা উদাসীন এবং ক্লান্ত হয়েছিলেন। তবে বেনজিরের সমর্থকরা তাকে ভোট দিতে চাননি, আবার শত্রুকেও ভোট দিতে নারাজ ছিলেন। তারা নির্বাচনের দিন বাড়িতেই অবস্থান করেন। ফলে সংখ্যালঘু ভোটের ভিত্তিতে মুসলিম লীগ তার বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে (তারা জাতীয় পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন দখল করেছে)। ভোটারদের শতকরা ৩০ শতাংশেরও কম ভোটকেন্দ্রে গেছেন।
শরীফ পরিবার ক্ষমতায় ফিরে এলো। এবার নওয়াজ প্রধানমন্ত্রী হলেন। আর তার ছোট ভাই শাহবাজ পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হন। তাদের আবাজি (‘প্রিয় পিতা’) মুহম্মদ শরীফও সক্রিয় হলেন। তিনি নির্বোধ স্নেহে পুরোনো বন্ধুদের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এবং এমনকি রফিক তারার নামে তার একজন সহকারীকে দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত করে পুলকিত হন। আহলে হাদিস নামে একটি মৌলবাদী মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি রাষ্ট্রপতি তারার-এর প্রকাশ্য সহানুভূতি পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক করে তোলে। এই মৌলবাদী সম্প্রদায়ের নিজস্ব একটি সশস্ত্র সংগঠন ছিল।
দুই ভাইয়ের মধ্যে শাহবাজকে অধিকতর পরিশীলিত রাজনীতিবিদ বিবেচনা করে মার্কিন দূতাবাস হোয়াইট হাউসে স্যান্ডি বার্গারের সঙ্গে তার বৈঠকের আয়োজন করেছিল। ওয়াশিংটন ভাইদের অদল-বদল করতে চায়, এই গোপন ব্যাপারটি আসলে সর্বজনবিদিত ছিল। সেই পরিকল্পনায় শাহবাজকে প্রধানমন্ত্রিত্ব দিয়ে নওয়াজকে লাহোরে তার পুরোনো চাকরিতে আসীন করার কথা ছিল। কিন্তু আবাজির কারণে সেই পরিকল্পনা কার্যকর হতে পারেনি।
নির্বাচনে শরীফ ভাইদের জয়ের পর পরিবর্তন সামান্য হলেও তখন মুষ্টিমেয় কয়েকজনই যে কোনো কিছু ঘটার চিন্তা করছিল। সর্বস্তরে দুর্নীতি এতটাই বিস্তৃত হয়ে পড়েছিল যে বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের পরিদর্শনকারী অর্থনীতিবিদরা, যেমন: কনরাডের হার্ট অব ডার্কনেস-এর কার্টজ, সেই ভয়াবহতার মাপকাঠিতে আতঙ্কিত হয়েছিলেন। স্থানীয় বুদ্ধিজীবীরা বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে নাইজেরিয়ার শীর্ষস্থান লাভের খবরে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তারা বিদ্রুপাত্মক অশ্রুপাতের সঙ্গে বললেন, ‘এমনকি এখানেও আমরা পুরোপুরি শীর্ষে উঠতে পারি না। আমরা পরিসংখ্যান সংকলনকারী সংস্থাকে ঘুষ দিলাম না কেন?’
রাজনীতিবিদদের নেতৃত্বে অভিজাত অংশ দেশের সম্পদ লুট করতে থাকে। প্রথমে বেনজির গ্যাং এবং তারপর শরীফ ভাইদের পালা। এই সময় জনসংখ্যার ১ শতাংশেরও কম কোনো আয়কর জমা দিয়েছে। রাজনীতিবিদদের অনেকেই ভূস্বামী ছিলেন। তাই তারা গুরুত্বপূর্ণ কৃষি কর অনুমোদন করেননি। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো নির্লজ্জভাবে লুট করা হচ্ছিল। রাজনীতিবিদ, জমির মালিক এবং ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়ার জন্য একের পর এক সরকার ব্যাংকগুলোকে বাধ্য করে এবং বকেয়া পুনরুদ্ধারে ব্যাংক অনুৎসাহিত থাকে। মন্দ ব্যাংক ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২০০ বিলিয়ন রুপি {£\ =৮৫ রুপি), যা দেশের বাজেটের মোট রাজস্ব ভিত্তির প্রায় ৭০ শতাংশের সমতুল্য। নতুন মিলিনিয়ামে পাকিস্তানে ৪২ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ এবং ৭০ বিলিয়ন ডলারের অভ্যন্তরীণ ঋণ জমা হয়। এই ঋণের সমষ্টি সেসময়ে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) চেয়ে ৫০ বিলিয়ন ডলার বেশি।
আর এসবের তলে দেশটিতে পচন ধরে। আগেও রাষ্ট্রটি কখনোই জনগণের জন্য বিনা মূল্যে শিক্ষা বা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা করেনি। এখন ব্যর্থতার মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেল। তারা আর ভর্তুকিযুক্ত গম, চাল বা চিনির নিশ্চয়তা দিতে পারে না, বা যত্রতত্র খুনাখুনি থেকে নিরীহ জীবন রক্ষা করতে পারে না। পুরো এক দশক দেশের বৃহত্তম শহর করাচি রীতিমতো গৃহযুদ্ধের মধ্যে থেকেছে। একপক্ষ হলো, ১৯৪৭ সালে ভারত থেকে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে নতুন স্বদেশে আসা উদ্বাস্তুদের উর্দুভাষী সন্তানদের সংগঠন, এমকিউএম (মুহাজির কামি মাহাজ – শরণার্থীদের জাতীয় সংস্থা)। তারা একই সঙ্গে অন্যপক্ষ স্থানীয় সিন্ধি এবং সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়েছে। এই সময়ে সশস্ত্র সংঘর্ষে উভয় পক্ষের কয়েক হাজার মানুষ নিহত হন।
পুরো এক দশক দেশের বৃহত্তম শহর করাচি রীতিমতো গৃহযুদ্ধের মধ্যে থেকেছে। একপক্ষ হলো, ১৯৪৭ সালে ভারত থেকে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে নতুন স্বদেশে আসা উদ্বাস্তুদের উর্দুভাষী সন্তানদের সংগঠন, এমকিউএম (মুহাজির কামি মাহাজ – শরণার্থীদের জাতীয় সংস্থা)। তারা একই সঙ্গে অন্যপক্ষ স্থানীয় সিন্ধি এবং সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়েছে। এই সময়ে সশস্ত্র সংঘর্ষে উভয় পক্ষের কয়েক হাজার মানুষ নিহত হন।
এরকম পরিস্থিতিতে মানুষের নিজ জীবনের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হয়। আত্মহত্যার হার বেড়ে চলে। সাধারণত দারিদ্র্যের কারণে বিপর্যস্ত নারী এবং পুরুষরা নিজ সন্তানদের আহার জোগাতে অক্ষম হয়। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারিতে সিন্ধের হায়দরাবাদে দুই বছর মজুরি পাননি এরকম একজন ভুক্তভোগী পরিবহন শ্রমিক প্রেসক্লাবে গিয়ে নিজ শরীরে পেট্রোলে ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেন। তিনি একটি চিঠি রেখে গেলেন:
আমি সব ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছি। আমি এবং আমার সহকর্মীরা দীর্ঘদিন যাবৎ বেতন বকেয়া রাখার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু কেউ কোনো গুরুত্ব দেয়নি। গুরুতর অসুস্থ আমার স্ত্রী এবং মায়ের চিকিৎসার জন্য আমার কাছে কোনো টাকা নেই। আমার পরিবার ক্ষুধার্ত, আর আমি আর ঝগড়া করতে করতে বিরক্ত। আমার বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। তবে আমি নিশ্চিত যে আমার জ্বলন্ত শরীরের আগুনের শিখা একদিন ধনীদের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে।
স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ক্ষয়িষ্ণু রাষ্ট্রটির অবহেলার সঙ্গে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ইমামদের থেকে মৌলবাদী নব্য-উদারবাদী অর্থনৈতিক প্রেসক্রিপশন মিলিত হয়ে পাকিস্তানে রাজনৈতিক ইসলামের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচনে সাহায্য করে। একের পর এক সাধারণ নির্বাচনগুলোতে জনগণ কট্টর ধর্মীয় দলগুলোর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইসরায়েলের ভোটারদের তুলনায় পাকিস্তানের ভোটাররা আনুপাতিকভাবে ধর্মীয় মৌলবাদীদের কম ভোট দেয়। এখন পর্যন্ত জনসমর্থনের চেয়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাই ধর্মীয় উগ্রবাদকে শক্তিশালী করছে। প্রয়াত জেনারেল জিয়াউল হক সৃষ্ট দলগুলো দুই দশক ধরে দেশকে পঙ্গু করে রেখেছে। পাকিস্তানের স্বৈরশাসকের ভূমিকায় জিয়াউল হক এগারো বছর যাবৎ যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের রাজনৈতিক, সামরিক ও আর্থিক সহায়তা পেয়েছিলেন। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে আফগান যুদ্ধের জন্য জিয়ার অংশগ্রহণ পাওয়া ছাড়া পশ্চিমের কাছে অন্য আর কোনো বিষয়ের গুরুত্ব ছিল না। আফগান যুদ্ধে অর্থায়নের জন্য হেরোইন বিক্রির ব্যাপারটি সিআইএ না দেখার ভান করে। ১৯৭৭ সালে পাকিস্তানে আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত হেরোইন আসক্তের সংখ্যা ছিল ১৩০ জন। ১৯৮৮ সালে আসক্তের সংখ্যা বেড়ে ৩০,০০০ জন-এ পৌঁছায়।
স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ক্ষয়িষ্ণু রাষ্ট্রটির অবহেলার সঙ্গে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ইমামদের থেকে মৌলবাদী নব্য-উদারবাদী অর্থনৈতিক প্রেসক্রিপশন মিলিত হয়ে পাকিস্তানে রাজনৈতিক ইসলামের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচনে সাহায্য করে।
এই সময়কালে (১৯৭৭-৮৯) সারা দেশে মাদ্রাসার একটি নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে বিভিন্ন বৈদেশিক উৎস থেকে প্রাপ্ত বৈদেশিক সাহায্যে এর বেশিরভাগ অর্থায়ন হয়েছিল। ধর্মীয় আবাসিক স্কুলগুলো একটি নতুন ধাঁচের ধর্মীয় ‘পণ্ডিত’-এর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। বিনা মূল্যে শিক্ষা এবং আবাসন ব্যবস্থায় বিশেষ সুবিধা থাকায় কেবল দরিদ্র আফগান শরণার্থীদের সন্তানরা মাদ্রাসায় ভিড় করেনি, দরিদ্র কৃষক পরিবারগুলোও মাদ্রাসায় তাদের একটি পুত্র দান করতে খুব আগ্রহী ছিল। তারা ভেবেছিল বাড়িতে একজন খাওয়ার সদস্য কমবে এবং ছেলেটি শিক্ষিত হয়ে শহরে বা যদি সে সত্যিই ভাগ্যবান হয়, উপসাগরীয় রাজ্যগুলোর একটিতে চাকরি খুঁজে পাবে।
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে আফগান যুদ্ধের জন্য জিয়ার অংশগ্রহণ পাওয়া ছাড়া পশ্চিমের কাছে অন্য আর কোনো বিষয়ের গুরুত্ব ছিল না। আফগান যুদ্ধে অর্থায়নের জন্য হেরোইন বিক্রির ব্যাপারটি সিআইএ না দেখার ভান করে। ১৯৭৭ সালে পাকিস্তানে আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত হেরোইন আসক্তের সংখ্যা ছিল ১৩০ জন। ১৯৮৮ সালে আসক্তের সংখ্যা বেড়ে ৩০,০০০ জন-এ পৌঁছায়।
কোরআনের আয়াত (মুখস্থ করে শেখা) এবং একটি ধার্মিক জীবনযাপন করার প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সঙ্গে মাদ্রাসার শিক্ষার বিষয়বস্তুতে শিশুদের সমস্ত সংশয় এবং প্রশ্ন দূর করতে শেখানো হয়েছিল। একমাত্র সত্য ছিল ঐশ্বরিক সত্য। কোরআন এবং হাদিসে লেখা বিধানসমূহ হতে হবে একমাত্র আচরণবিধি এবং অচিন্ত্যনীয় আনুগত্যের মধ্যে পুণ্য নিহিত থাকবে। ইমামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার অর্থ আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা। এর উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার- এই মাদ্রাসাগুলোর একক কাজ ছিল শিক্ষার মাধ্যমে শিশুদেরকে ধর্মোন্মত্ত ব্যক্তিতে পরিণত করা। উদাহরণস্বরূপ, প্রথম পাঠ্যপুস্তকে (আদর্শলিপি) ছিল: উর্দু অক্ষর ‘জিম’ দিয়ে জিহাদ; ‘তায়’ দিয়ে তোপে (কামান); ‘কাফ’ দিয়ে কালাশনিকভ (AK-47-জাতীয় রাইফেল) এবং ‘খায়’ দিয়ে খুন বা রক্ত।
কেবল দরিদ্র আফগান শরণার্থীদের সন্তানরা মাদ্রাসায় ভিড় করেনি, দরিদ্র কৃষক পরিবারগুলোও মাদ্রাসায় তাদের একটি পুত্র দান করতে খুব আগ্রহী ছিল। তারা ভেবেছিল বাড়িতে একজন খাওয়ার সদস্য কমবে এবং ছেলেটি শিক্ষিত হয়ে শহরে বা যদি সে সত্যিই ভাগ্যবান হয়, উপসাগরীয় রাজ্যগুলোর একটিতে চাকরি খুঁজে পাবে।
বয়স বাড়লে আইএসআই এজেন্টদের প্রশিক্ষণ ও তত্ত্বাবধানে ছাত্রদের অত্যাধুনিক হাতের অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। বোমা তৈরি এবং তা রোপণ করতে শেখানো হয়েছিল। এজেন্টদের পর্যবেক্ষণে অধিকতর অঙ্গীকারবদ্ধ ছাত্রদেরকে বা তালেবানদের বাছাই করা হয়। তাদেরকে আফগানিস্তানে অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে ‘পবিত্র যুদ্ধ’ লড়াইয়ের জন্য আরও বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য গোপন সেনা ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছিল।
জিয়ার আমলে জামায়াতে ইসলামীর প্রভাব বিস্তার লাভ করে। এর নেতারা নিশ্চিত ছিলেন যে এই ধর্মীয় স্কুলগুলো তারাই পরিচালনা করবেন। দলটি গুপ্ত ছোট ছোট কোষের ‘লেনিনবাদী মডেল’-এর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ক্যাডার সংগঠনের জন্য সবসময়ই গর্বিত ছিল। হয়তো জনসাধারণ তাদেরকে পরিত্যাগ করছিল বলে তারা গণ সদস্যতা এড়িয়ে চলছিল। নেতারা ভাবলেন, এখন তাদের সময় এসেছে। তারা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের তাদের দলে সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু নতুন একটি সমস্যার কারণে তাদেরকে হতাশ হতে হলো। অবাধ ডলারের সরবরাহে উদ্ভূত বিভিন্ন ইসলামিক উপদলের মধ্যে স্কুলগুলো কর্তৃত্ব লাভ করে গনিমত ভাগাভাগি করার জন্য একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। আইএসআই আন্তঃধর্মীয় বিরোধের সালিশকারী হিসেবে কিছু গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাতিত্ব করে।
কিছু সময়ের জন্য আফগান যুদ্ধ তাদের প্রধান মনোযোগের বিষয় ছিল। প্রথম যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পাকিস্তান রাষ্ট্র আফগানিস্তানে একটি জোট সরকার মেনে নিতে অস্বীকার করে। বেনজির ভুট্টোর সরকারই কাবুল দখলের লক্ষ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডো ইউনিট সমর্থিত তালেবানদের মুক্ত করেছিল। এই অঞ্চলে ইরানের প্রভাবে ভীত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিল। ২৫০০টি মাদ্রাসায় যে ড্রাগন বীজ রোপণ করা হয়েছিল তা থেকে ২২৫,০০০ জন ধর্মান্ধের বিকাশ হয়, যারা ধর্মীয় নেতাদের নির্দেশে নিজ নিজ বিশ্বাসের তাগিদে কাউকে খুন করতে এবং নিজের জীবননাশে প্রস্তুত ছিল। বেনজির ভুট্টোর দ্বিতীয় মেয়াদে জেনারেল নাসিরুল্লাহ খান বাবর অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী ছিলেন। বন্ধুদের কাছে তার স্বীকারোক্তি ছিল যে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে একটি হুমকি হয়ে ওঠা চরমপন্থি তালিবান সমস্যার একমাত্র সমাধান হিসেবে তিনি তাদেরকে নিজস্ব দেশ দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এই যুক্তিটি তখন অসার মনে হয়েছিল। কিন্তু পরের বছরগুলোতে যা কিছু ঘটেছে তাতে বাবরের একজন যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার হওয়া উচিৎ।
মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য পূরণে অনেক ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এটা বিস্ময়কর নয় যে, কাজ শেষ হবার পর যুক্তরাষ্ট্র তাদের জন্য আর তহবিল এবং অস্ত্র সরবরাহ করার প্রয়োজন বোধ করে না।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সঙ্গে সঙ্গে শীতল যুদ্ধের অবসান ঘটে, বিভিন্ন মহাদেশে কিছু রাষ্ট্র এতিম হয়ে যায়। পাকিস্তানে এর প্রভাব ছিল প্রলয়ংকরী। মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য পূরণে অনেক ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এটা বিস্ময়কর নয় যে, কাজ শেষ হবার পর যুক্তরাষ্ট্র তাদের জন্য আর তহবিল এবং অস্ত্র সরবরাহ করার প্রয়োজন বোধ করে না। এর ফলে মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো রাতারাতি মার্কিন-বিরোধী সহিংস ভূমিকায় নামে, প্রতিশোধের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। ১৯৫১ সাল থেকে পাকিস্তানের যে রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারা একনাগাড়ে বিশ্বস্ততার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেবা করেছেন তারাও ওয়াশিংটনের উপেক্ষায় অপমানিত বোধ করলেন। একজন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল আমার বোঝার সুবিধার জন্য সংক্ষেপে বললেন:
‘আফগানিস্তানে প্রবেশের জন্য পাকিস্তান ছিল আমেরিকানদের ব্যবহৃত কনডম। আমরা তাদের উদ্দেশ্য পূরণ করার পর তারা আমাদেরকে টয়লেটে ফ্লাশ করার জিনিষ মনে করে।’
এশিয়ায় পেন্টাগনের অন্যতম বখাটে সন্তান পাকিস্তান সেনাবাহিনী কুয়েতের মর্যাদায় নামতে অস্বীকার করে। মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য এই সন্তান একটি পারমাণবিক উত্তেজনা শুরু করে। উত্তেজনার বিস্ফোরণ কাঙ্ক্ষিত প্রভাব তৈরি করল। এর ফলে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের ‘বি’ তালিকাভুক্ত দেশগুলোতে পাকিস্তান অন্তর্ভুক্ত হলো। ১৯৯৮ সালের ২৯ নভেম্বর পররাষ্ট্রমন্ত্রী সারতাজ আজিজ পশ্চিমা মতামত প্রভাবিত করার চেষ্টা করে বলেছিলেন: ‘আমি পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে আকস্মিক কোনো পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনা দেখছি না। …পাকিস্তানের কার্যকর শাসন ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে।’ এটি পুরোপুরি বাজে কথা, এমনকি যদি কেউ বক্তব্য গ্রহণও করে, তারপরও সাথে সাথে একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন আসে। যদি কট্টর ইসলামপন্থিরা পাকিস্তান সেনাবাহিনী দখল করে এবং এই দুঃস্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে, তাহলে? পাকিস্তানের প্রতিটি রাজনৈতিক নেতা সেই বিপদ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। নওয়াজ শরীফ রাজনৈতিক ইসলামের কিছু বৈশিষ্ট্য চুরি করে তাকে দখল করার আনাড়ি প্রচেষ্টা নেন, তার ব্যর্থতা স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল।
বর্তমান পরিস্থিতির পরিহাস এই যে পাঞ্জাবে ধর্ম সবসময়ই একটি ঢিলেঢালা ব্যাপার ছিল। সুফি রহস্যবাদের পুরোনো ঐতিহ্য গ্রামাঞ্চলে তার গভীর শিকড় খুঁজে পেয়েছিল। স্রষ্টার সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগকেন্দ্রিক ধর্মচর্চায় তারা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম প্রচারকদের বিরোধী ছিলেন। বহু শতাব্দী ধরে প্রাচীন সুফি সাধকদের সমাধিতে বার্ষিক উৎসব পালিত হতো, সেখানে আত্মার সন্তুষ্টির জন্য অংশগ্রহণকারীদের গান, নাচ এবং পান করাসহ ভাং নেওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। জেনারেল জিয়া সামরিক আইনের অধীন এগুলো নিষিদ্ধ করেছিলেন। জনগণকে সাধারণ আনন্দ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল।
পাকিস্তানে অদ্ভুত অ-পাঞ্জাবি ধরনের ধর্মের বাড়াবাড়ি আকাশ থেকে পড়েনি। এর নেপথ্যে ছিল ওয়াশিংটনের অনুমোদন এবং সৌদি পেট্রোডলার, আর জেনারেল জিয়ার যত্নে তা পুষ্ট হয়ে উন্মাদনার জন্ম দিয়েছে। বিগত পাঁচ বছরে যে দলগুলোর বিস্ফোরণ ঘটেছে তাদের ভারসাম্যহীন এবং আত্মধ্বংসাত্মক চরিত্র নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। পাকিস্তানের নব্বই শতাংশ মুসলমান সুন্নি। বাকিরা মূলত শিয়া। সুন্নিরা নিজেরাই দুটি প্রধান চিন্তাধারায় বিভক্ত। দেওবন্দিরা গোঁড়া অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করে। বেরেলভিরা স্থানীয় অবস্থার দ্বারা প্রভাবিত এবং সমন্বিত এক ইসলামে বিশ্বাস করে। বহু বছর ধরে এদের মধ্যে তাত্ত্বিক বিরোধ ছিল। প্রায়ই জনসমক্ষে মোল্লা এবং ধর্মীয় পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক হতো। কিন্তু সেটা এখন অনুপস্থিত। প্রতিটি দলই এখন নৈতিক ও রাজনৈতিক ইসলামের দাবি করে। আলোচনার মাধ্যমে আর নয়, মেশিনগান এবং খুনাখুনির মাধ্যমেই বিরোধ নিষ্পত্তির পথ দেখা হয়। কিছু দেওবন্দি উপদল শিয়াদেরকে বিধর্মী হিসেবে ঘোষণা করা, এমনকি তাদেরকে শারীরিকভাবে নির্মূল করার দাবি করে। বহু বছর ধরে সাম্প্রদায়িক গৃহযুদ্ধ চলছে। সুন্নি সিপাহ-ই-সাহাবা (প্রথম চার খলিফার সৈন্য) লাহোরের কেন্দ্রস্থলে শিয়া মসজিদে হামলা করেছে এবং নামাজরত শিয়া বিশ্বাসীদের হত্যা করেছে। শিয়ারা এর জবাব দিয়েছে। তারা সিপাহ-ই-মুহাম্মদ (মুহাম্মদের সৈন্য) গঠন করে, ইরানি সমর্থনে ঢোল বাজিয়ে একটি ভয়ংকর প্রতিশোধ নিতে শুরু করে। এই আন্তঃমুসলিম গণহত্যায় কয়েক শতাধিক লোক, প্রধানত শিয়ারা নিহত হন।
প্রতিটি দলই এখন নৈতিক ও রাজনৈতিক ইসলামের দাবি করে। আলোচনার মাধ্যমে আর নয়, মেশিনগান এবং খুনাখুনির মাধ্যমেই বিরোধ নিষ্পত্তির পথ দেখা হয়। কিছু দেওবন্দি উপদল শিয়াদেরকে বিধর্মী হিসেবে ঘোষণা করা, এমনকি তাদেরকে শারীরিকভাবে নির্মূল করার দাবি করে।
১৯৯৯ সালের জানুয়ারিতে একটি সশস্ত্র তালেবান দল পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের হাঙ্গু জেলার কয়েকটি গ্রাম সম্পূর্ণভাবে দখল করে। তারা এলাকাটিতে ‘ইসলামি আইন’ চালু করে। জারগারি নামে এক গ্রামে প্রকাশ্যে টিভি এবং ডিশ এন্টেনা ধ্বংস করা হয়। এর পর লুক্কি গ্রামের ছোট চত্বরে তিন হাজার ‘অশ্লীল’ ভিডিও ও অডিও ক্যাসেট পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
টেলিভিশনের প্রতি এই আক্রোশ কিছুটা হাস্যকর এবং এটি ষাটের দশকের একটি পরিস্থিতিবাদী দর্শনের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু আফসোসের ব্যাপার হলো, হাস্যরস তালেবানদের মনমতো নয়। আন্দোলনের নেতা হুসেইন জালালি পাকিস্তানে আফগান অভিজ্ঞতা প্রসারিত করতে চান। তাই তিনি টেলিভিশন পোড়ানোর পর ঘোষণা করেন: ‘চোরদের হাত-পা কেটে ফেলা হবে এবং সব অপরাধীকে ইসলামি আইন অনুযায়ী বিচারের মুখোমুখি করা হবে।…’
‘আমরা কী করতে পারি?’, শরীফ ভাইদের একজন সমর্থক হতাশায় হাত মুছতে মুছতে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন। ‘এই শয়তানরা সবাই সশস্ত্র!’
সরকার প্রতিবেশী কাশ্মীরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে এদের কিছুজনকে সশস্ত্র করছে, কিন্তু আমাদের বেড়ে ওঠা সেনাবাহিনীও তো সশস্ত্র, আমি উল্লেখ করলাম। কেন তাদেরকে এই দলগুলোকে নিরস্ত্র করতে বলা হয়নি? এখানেই আলাপের যবনিকা পতন ঘটে। কারণ, সেনাবাহিনীতে ব্যাপকভাবে মৌলবাদীদের অনুপ্রবেশ কোনো গোপন বিষয় নয়। পুরোনো ধাঁচের ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো থেকে তাদের পার্থক্য হলো যে তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করতে চায়। এবং এই আকাঙ্ক্ষা পূরণে তাদের সেনাবাহিনীকে প্রয়োজন।
প্রকৃতপক্ষে সবচেয়ে ভয়ংকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইএসআই-এর সৃষ্টি হয়। এর রাজনৈতিক শাখা আহলে হাদিস পাকিস্তানে রাজতন্ত্র বাদে পুরো সৌদি মডেল প্রবর্তন করতে চায়। ব্রিটেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বে তাদের সমর্থক এবং মসজিদ রয়েছে। বিশ্বব্যাপী জিহাদের জন্য ক্যাডার এবং অর্থ সরবরাহ করা এই দলের লক্ষ্য। এটি সুন্নি সম্প্রদায়ের মধ্যে সবচেয়ে গোঁড়া সংখ্যালঘু একটি দল। তবে দেশের রাষ্ট্রপতি তাদের সমর্থক এবং সরকারের মন্ত্রীরা এর সভাগুলোকে অলংকৃত করে৷ তখন লাহোরের ৫ চেম্বার লাইন রোডে তাদের সাব-অফিস ছিল। আমি তাদের সাক্ষাৎকার নিতে আগ্রহী হয়ে সেখানে গিয়েছিলাম। কিন্তু ত্রিশজন ভারী সশস্ত্র প্রহরীর উপস্থিতি আমাকে এই উদ্যোগ থেকে বিরত করে।
সেনাবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এর সশস্ত্র শাখা, লস্কর-ই-তৈয়বার (মদিনার সৈন্য) অস্তিত্ব থাকতে পারে না। ভারতীয় কাশ্মীরকে ‘মুক্ত’ করার জন্য জিহাদে নেতৃত্বদানকারী ৫০,০০০ জঙ্গি সদস্য সমৃদ্ধ দলটি আজাদ (পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত) কাশ্মীরের আটটি বিশেষ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। সৌদি আরব ও পাকিস্তান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সেনাবাহিনী এর পদাতিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয়। দরিদ্র পরিবার থেকে কিশোরদের নিয়োগ করা হয়। কাশ্মীরে জিহাদে কয়েকশ সদস্য প্রাণ হারায়। প্রতিটি লাশ ফেরত দেওয়ার সময় সরকার তাদের পরিবারের জন্য ৫০,০০০ রুপি (প্রায় ৫০০ পাউন্ড) বরাদ্দ করে। এর মধ্যে ‘শহীদ’ পরিবার মাত্র পনেরো হাজার রুপি পায়, আর বাকি অর্থ সংস্থার তহবিলে যোগ হয়।
২০০১ সালে স্টেট ডিপার্টমেন্ট, এককালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে এবং আইএসআই সমর্থিত হরকাতুল আনসারকে (স্বেচ্ছাসেবক আন্দোলন) একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। অবিলম্বে হরকাতুল মুজাহিদিন নামে সংগঠনটির নামান্তর ঘটে। তালেবানদের মধ্যে সবচেয়ে নিবেদিত এর যোদ্ধারা তাদের প্রশিক্ষণ শিবিরগুলো পাঞ্জাব থেকে আফগানিস্তানে স্থানান্তরিত করে। দলের নেতা ওসামা বিন লাদেন ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইএসআই-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। ১১ সেপ্টেম্বরের আগে তার সমর্থকরা সরকারকে সতর্ক করে যে ওসামাকে অপহরণ করার বা তার সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার যে কোনো প্রচেষ্টা পাকিস্তানকে তাৎক্ষণিক গৃহযুদ্ধের দিকে নিয়ে যাবে। তাদের দম্ভ ছিল যে সেনাবাহিনী কখনোই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে রাজি হবে না। কিন্তু আমেরিকায় আক্রমণের ফলে পরিস্থিতি বদলে যায়। সাময়িকভাবে হলেও সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ইসলামপন্থিদের বিচ্ছিন্ন করা হয়।
দলগুলো পাকিস্তান দখল করতে চেয়েছিল। ইরানের ‘ধর্মদ্রোহী’ প্রজাতন্ত্রকে এড়িয়ে তারা লাহোর থেকে সমরখন্দ পর্যন্ত বিস্তৃত তালেবান কর্তৃত্বের একটি ইসলামিক ফেডারেশনের স্বপ্ন দেখেছিল। জীবনে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য আকুল একটি স্তরের জনসংখ্যার কাছে তাদের সমস্ত অসংলগ্নতা এবং অর্থহীন রাগের বার্তা আকর্ষণীয় ছিল। যদি ধর্মান্ধরা তাদের আহার এবং তাদের সন্তানদের শিক্ষিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়, তবে তারা সিএনএন এবং বিবিসি ওয়ার্ল্ড-এর আনন্দ পরিত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিল।
সরাসরি একটি বিস্ফোরক মোকাবিলার সিদ্ধান্ত হয়। নিজেদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকলেও সেই ভয়ংকর আকাঙ্ক্ষার বাস্তবতা ছিল। এটাই হলো পাকিস্তানে ইসলামি জঙ্গিদের নতুন তরঙ্গ। ভাগ্যক্রমে তারা এখনো দেশের সংখ্যালঘু অংশ। কিন্তু অন্য কিছু না বদলালে এটি বদলে যেতে পারে। তবে কিছু পরিবর্তন ঘটেছে।
কিছুটা পুরোনো, আর কিছুটা নতুনের সমন্বয়ে এই পরিবর্তন। হ্যাঁ, আরেকটি অভ্যুত্থান ঘটল। অভ্যুত্থান নতুন কিছু নয়। তবে এই প্রথম ওয়াশিংটনের অনুমোদন ছাড়াই সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে। ১৯৯৯ সালের অক্টোবরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মোশাররফ একটি সরকারি সফরে শ্রীলঙ্কায় গেলে নওয়াজ শরীফ, মার্কিন সমর্থনে, তাকে অপসারণের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাতে পাল্টা প্রতিরোধ তৈরি হলো। জেনারেলরা তাদের প্রধানকে অপসারণে সমর্থন দিতে অস্বীকার করেন। মোশাররফ নাটকীয় কায়দায় বাড়ি ফেরেন এবং শরীফ ভাইদের অবরুদ্ধ করেন। নতুন সামরিক প্রধান নির্বাহী শিগগিরই আবিষ্কার করেন যে দুর্নীতি নির্মূল করা, দেশকে আধুনিক করা বা সর্বোপরি সশস্ত্র মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোকে দমন করা সহজ নয়। এবং এরপর ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, ইসলামপন্থিদের একটি ছোট দল পেন্টাগন এবং নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার উড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটায়। যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশোধ চেয়েছিল। অঞ্চলে শকুন অবতরণ করেছে। অল্প সময়ের জন্য পাকিস্তান আবার পশ্চিমের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে ওঠে। এবং আবারও এই উত্থানের কারণ হলো আফগানিস্তান।
আফগানিস্তানে যুদ্ধের অস্থিতিশীলতার প্রভাব সবসময় প্রথমে এখানেই অনুভূত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে আফগানিস্তানের তালেবানদের প্রধান ঘাঁটি তৈরি করা হয়। এই অঞ্চলের পশতুন জনগোষ্ঠী তালেবানদের সঙ্গে তাদের ভাষাগত এবং জাতিগত সম্পর্কে অভিন্ন। সীমান্তের দু-পাশে একই মতাদর্শের দেওবন্দি ইসলাম তখন শক্তিশালী। এটা বলা অপরিহার্য যে গত শতাব্দীর এক-চতুর্থাংশ সময়ের তুলনায় ২০০১ সালের শেষ তিন মাসে প্রকৃত যুদ্ধ কম হয়েছে। এই ব্যক্তিরা যুদ্ধ করতে অনিচ্ছুক ছিল। পাকিস্তানে আসা মানে তালেবান বাহিনীর একটি বড় অংশের জন্য কেবল বাড়ি ফেরা ছিল। তাদের মধ্যে হতাশাগ্রস্ত কেউ কেউ নিঃসন্দেহে জীবিত থাকতে পেরে খুশি ছিল। তবে সম্ভবত একটি বৃহৎ সংখ্যালঘু অংশ ইসলামাবাদের বিশ্বাসঘাতকতায় ক্ষুব্ধ হয়ে দেশে ইতোমধ্যে সক্রিয় সশস্ত্র মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যোগ দিতে আগ্রহী ছিল।
উগ্রতম জিহাদি অংশের নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কিন্তু অন্য জঙ্গিদের কে নিরস্ত্র করবে? ২০০০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশটি পাকিস্তানি শহরে ইসলামিক আইন আরোপ করার ব্যাপারে কিছু ইসলামপন্থি নেতারা দম্ভভরে দাবি করছিল। স্পষ্ট একটি হুমকি ছিল যে, কোনো কর্তৃপক্ষ তাদের এই অভিযানে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করলে, তারা গৃহযুদ্ধ শুরু করবে। ২০০১ সালের অক্টোবরে যখন আফগানিস্তানে যুদ্ধ শুরু হয় তখন ব্যাপক পশ্চিমা হস্তক্ষেপে প্রকাশ্যে পাকিস্তানকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের প্রধান ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়। এর ফলে ভয়ানক বিশৃঙ্খলা, এমনকি সহযোগী শাসকের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটতে পারে–ওয়াশিংটনের সেরকম আশঙ্কা ছিল। ইসলামাবাদের সক্রিয় সহযোগিতার সম্মতি নিশ্চিত করার বিনিময়ে পাকিস্তানের শাসক জেনারেল মোশাররফের ক্ষমতায় টিকে থাকা নিশ্চিত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় সবকিছুই করেছিল। এর বিনিময়ে পাকিস্তানের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। এবং আবার অর্থ ও সর্বাধুনিক অস্ত্রের চালান আসতে থাকে।
কিন্তু তালেবানরা পরাজিত হলেই কি লুকিয়ে থাকা বিভিন্ন ছদ্মবেশীরা আসলেই বিশ্বাসীদের ক্রোধ থেকে পাকিস্তানকে রক্ষা করবে? সেই নিশ্চয়তা আছে? সবকিছু সামরিক কর্মকর্তাদের ঐক্যের ওপর নির্ভর করছে। ঠিক কতজন সুন্নি মৌলবাদী সশস্ত্র বাহিনীতে অনুপ্রবেশ করেছে তা পরিমাপ করা কঠিন হলেও সেখানে তাদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত। সংখ্যালঘু হলেও দেশ জুড়ে কোনো না কোনো এক ধরনের উগ্র ইসলামবাদ সক্রিয় থাকবেই। উপরন্তু আবারও ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল এবং সামান্য ইতিবাচক বেসামরিক সমর্থনসহ জেনারেল মোশাররফের অতি সাম্প্রতিক সামরিক শাসন নিজেই দুর্বল অবস্থায় আছে।
নিজেদের সৃষ্ট আফগানিস্তান পরিত্যাগ করা সেনাবাহিনীর অনেকের জন্য একটি তিক্ত বিষয় ছিল, বিশেষ করে সেনাবাহিনীর নিম্ন স্তরে, যেখানে ধর্মীয় প্রভাব সবচেয়ে শক্তিশালী। এমনকি অধিকতর ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাবাপন্ন কর্মকর্তারাও এই ফলাফলে খুশি হননি। কারণ, তালেবানের কাবুল দখল ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইতিহাসে একমাত্র বিজয়। ব্যক্তিগতভাবে শাসক, অভিজাত অফিসার, আমলা এবং রাজনীতিবিদরা একটি নতুন প্রদেশ লাভের জন্য একে অপরকে অভিনন্দন জানিয়েছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পরাজয়ের গ্লানি যেন প্রায় ঢেকে গিয়েছিল। ১৯৪৭ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত সময়কালের মতো আফগানিস্তানের উত্তর জোট এবং তার ওয়াশিংটন-মনোনীত প্রধানমন্ত্রী হামিদ কারজাই ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার ইচ্ছা ঘোষণা করলে তা কাটা গায়ে নুনের ছিটা দেওয়ার মতো কাজ করে। এবং পাকিস্তানের জেনারেলদের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও দুর্বল করে দেয়।
অপেক্ষাকৃত প্রবীণদের স্তরে, তালেবানের বিরুদ্ধে আমেরিকান জিহাদকে এক ঈশ্বরের দান হিসেবে দেখা হয়েছে। কারণ, এর মাধ্যমে তারা ওয়াশিংটনের ঐতিহ্যগত আঞ্চলিক অগ্রাধিকারকে পুনরুদ্ধার করার অনুমতি লাভ করেছে। যেমন অতি প্রয়োজনীয় ঋণের আশ্বাস পেয়েছে এবং তাদের পারমাণবিক অস্ত্রাগারের বিরোধিতা বাতিল হয়েছে। আরব দেশগুলোর মতো এখানে কখনোই ক্যাপ্টেন, মেজর বা কর্নেলদের নেতৃত্বে অভ্যুত্থান ঘটেনি। তার বিপরীতে পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলে সবসময় জেনারেলদের একত্রিত উদ্যোগ এবং নিয়ন্ত্রণ মুখ্য ভূমিকা রেখেছে (ঔপনিবেশিক শাসন থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে শৃঙ্খলার ঐতিহ্য)।
আরব দেশগুলোর মতো এখানে কখনোই ক্যাপ্টেন, মেজর বা কর্নেলদের নেতৃত্বে অভ্যুত্থান ঘটেনি। তার বিপরীতে পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলে সবসময় জেনারেলদের একত্রিত উদ্যোগ এবং নিয়ন্ত্রণ মুখ্য ভূমিকা রেখেছে।
দীর্ঘকাল যাবৎ প্রায় বিরতিহীন এমন ঘটনা প্রবাহে অভ্যস্ত পাকিস্তানি শীর্ষস্থানীয় শাসকগোষ্ঠীর ওপর বর্ষিত রুপার টুকরো থেকে খুব বেশি জখম তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে পাকিস্তানি পরাজয়ের মাত্রা এমন যে, একবার অর্থ ও অস্ত্রের প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে অভ্যন্তরীণ শক্তি জেনারেল মোশাররফকে উৎখাত করতে পারে। পাকিস্তানে ক্ষমতার জন্য ক্ষুধার্ত জেনারেলরা কখনোই দুর্লভ পণ্য ছিল না।
এই কারণে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা একটি সম্ভাব্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি। মজার ব্যাপার হলো, পাকিস্তানের নেতৃত্বে একজন ধর্মনিরপেক্ষ জেনারেল এবং ভারতের নেতৃত্বে একজন মৌলবাদী হিন্দু রাজনীতিবিদ ছিলেন। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এটি একটি আদর্শ সমন্বয় হলেও একপর্যায়ে উভয় পক্ষ একটি ছোট যুদ্ধকে স্বাগত জানাবে। জেনারেল মোশাররফ প্রমাণ করতে চাইবেন যে তিনি পুরোপুরি কারোর হাতের পুতুল নন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী নির্বাচনে জিততে চাইবেন। কাশ্মীরি জনগণের ভোগান্তি অব্যাহত থাকবে। কিন্তু ছোট যুদ্ধের নিশ্চয়তা কে দিতে পারত?
ইসলামাবাদের অর্থ এবং রসদ সাহায্যে, লস্কর-ই-তৈয়বা এবং জাইশ-ই-মুহাম্মদের মতো জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর একটি বিকল্প সামরিক শক্তি, ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে অনুপ্রবেশ করে। কিন্তু ঠিক তালেবানের মতো পাকিস্তান এই বিকল্প শক্তিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আরও গুরুতর সংঘাত উসকে দেওয়ার জন্য গোষ্ঠীগুলোর একটি ভারতীয় সংসদে হামলা পরিচালনা করে। কিছু জিহাদি পাকিস্তানকে একটি পৃথক সত্তা হিসেবে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। তাদের লক্ষ্য ভারতে মুসলিম শাসন পুনরুদ্ধার করা। তারা কি পাগল? হ্যাঁ। তবে তারা সশস্ত্র, এবং উভয় দেশেই তারা ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম।
ওয়াশিংটন ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ চালাতে পারলে দিল্লি কেন তা পারবে না? কেবল জাতিসংঘ থেকে পূর্ববর্তী অনুমোদন না পাওয়ার জন্য? কিন্তু যে কোনো দ্বিতীয় বিশ্বের রাজনীতিবিদ আপনাকে বলবে, জাতিসংঘ বুঝতে হলে যুক্তরাষ্ট্র বুঝুন/পড়ুন। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের হুমকি ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণকে প্রভাবিত করেছে: পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল না করে কীভাবে ভারতীয়দের স্বার্থ পূরণ করা যায়? পাকিস্তানে গণতন্ত্র ফেরানোর নামে জেনারেল মোশাররফকে অবশ্যই বলি দেওয়া যেতে পারে। সমস্যা হলো, সেনাবাহিনী যে কোনো রাজনৈতিক দলের চেয়ে বেশি সময় ধরে দেশ শাসন করেছে এবং তাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কোনো বেসামরিক রাজনীতিবিদ যথেষ্ট শক্তিশালী বা অটল নন।
আগের পর্ব: মৌলবাদের সংঘর্ষ: ক্রুসেড, জিহাদ এবং আধুনিকতা-১৩
ফাতেমা বেগম: লেখক শিক্ষক অনুবাদক। ই-মেইল: fatemaorama@gmail.com
পাদটীকা
১। আমি দুটি বইয়ে পুরোনো ও নতুন পাকিস্তান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি: পাকিস্তান- মিলিটারি রুল অর পিপলস পাওয়ার? ১৯৭১, এবং ক্যান পাকিস্তান সারভাইভ?, ১৯৮৩।
২। মানুষের এমন সাড়া দেখে ভুট্টো গভীরভাবে আলোড়িত ও অভিভূত হয়েছিলেন। সেদিন রাতে নৈশভোজের সময় তিনি আমার বাবাকে বলেছিলেন যে অভিজ্ঞতাটি তাকে কতটা বিনম্র করে তুলেছে: ‘আমি তাদের সঙ্গে যা করেছি, তা সত্ত্বেও তারা এখনো আমার জন্য বেরিয়ে আসে।’
