ভূমি সংস্কার, জমির বণ্টন এবং অভিজাত শ্রেণির সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক

২২ পরিবারের অতীত ও বর্তমান-৪

ভূমি সংস্কার, জমির বণ্টন এবং অভিজাত শ্রেণির সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক

মেহেদী হাসান

বাংলাদেশে পুঁজিবাদের বিকাশ উল্লেখযোগ্য আকার নিয়েছে। এই বিকাশ ধারায় একদিকে তৈরি হয়েছে পাকিস্তানের ২২ পরিবারের চাইতেও সম্পদশালী বেশ কিছু গোষ্ঠী, অন্যদিকে বৈষম্য ও পরিবেশ বিধ্বংসী তৎপরতাও অভূতপূর্ব মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে ‘উন্নয়ন’ ধারার স্বরূপ বিশ্লেষণ, পুঁজি কেন্দ্রীভবনের ধরন, শ্রেণি বিন্যাস, এই ধারার পুঁজিবাদ বিকাশে রাষ্ট্রের ভূমিকা ইত্যাদি পরীক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান প্রবন্ধ কয়েক কিস্তিতে এই অনুসন্ধান বিশ্লেষণ হাজির করবে। চতুর্থ কিস্তিতে পাকিস্তান আমলে ভূমি বণ্টন প্রক্রিয়ায় লাভবান ভূমিমালিক শ্রেণির সাথে রাষ্ট্রের পারস্পরিক ঐতিহাসিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা আলোচনা করা হয়েছে।

‘‘There’s class warfare, all right, but it’s my class, the rich class, that’s making war, and we’re winning.”    -Warren Buffett (fourth-wealthiest person on earth)

শিল্প-কারখানায় শ্রমশক্তির উদ্বৃত্ত মূল্যের উৎপাদন-পুনরুৎপাদন ঘটিয়ে বাজার ব্যবস্থায় সেই উদ্বৃত্ত মূল্য/মুনাফা উশুলের মাধ্যমে পুঁজিপতি পুঁজি কেন্দ্রীভূত পুঞ্জীভূত করে। সেক্ষেত্রে ভূমি ব্যবহৃত হয় উৎপাদনের একটি উপায় হিসেবে। উৎপাদিত উদ্বৃত্ত মূল্যের একটি অংশ শিল্প পুঁজিপতি ভাড়া বাবদ জমির মালিককে প্রদান করে। অন্যদিকে, কৃষি এবং কৃষিজ শিল্পে উদ্বৃত্ত মূল্য উৎপাদন-পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়া এবং উশুলের মাধ্যমে ভূমি মালিকও পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদনে অংশগ্রহণ করে। এক্ষেত্রে রাজস্ব আদায়ের উপর নির্ভরশীল সামন্তীয় উৎপাদন ব্যবস্থার বিপরীতে ভূমি মালিক খোদ উদ্বৃত্ত মূল্যের উৎপাদন-পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত হয়। এই দুই ক্ষেত্রেই বাজারকেন্দ্রিক উৎপাদন এবং বণ্টন পুঁজিবাদ বিকাশের অন্যতম শর্ত অর্থাৎ বাজার ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে উদ্বৃত্ত মূল্য উশুলের স্বার্থেই প্রধানত উৎপাদন সংগঠিত হয়। পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনীতির ধ্রুপদী এই উৎপাদন পদ্ধতি ইউরোপে যেভাবে বিকশিত হয়েছিল, বৃটিশ পরবর্তী পাকিস্তানে সে মাত্রায়-পরিমাণে-ধরনে এই প্রক্রিয়াটি ঘটেনি। 

বৃটিশ উপনিবেশমুক্ত পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে সাধারণত তিন ধরনের উৎপাদন পদ্ধতির ধারাবাহিকতা বিদ্যমান ছিল। বৃটিশ পরম্পরার শিল্প-কারখানা অর্থাৎ পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদন, প্রাক পুঁজিবাদী সামন্তীয় ধরন (সেমি ফিউডালিজম) এবং গোষ্ঠী/গোত্রতান্ত্রিক উৎপাদন। কোন কোন গবেষক এই তিন ধরনের উৎপাদন পদ্ধতি-সম্পর্ক বলেছেন; এশিয়াটিক, সামন্তীয় এবং আদি জাতিসত্তা/গোত্রগত ধরনের উৎপাদন পদ্ধতি।

অঞ্চলভেদে প্রাক পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতি (সেমি ফিউডালএবং গোত্রীয় ধরন) সেখানেই জোরালো আকারে বজায় থেকেছে যেসব অঞ্চলে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র সামগ্রিকভাবে পুঁজির স্বার্থকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। যদিও বৃটিশ শাসনের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে‘নতুন ধরনের উৎপাদন পদ্ধতির’প্রচলন করা হয়েছিল। কিন্তু, ভৌগোলিক অবস্থা-অবস্থান, সামাজিক শ্রেণিগত বিন্যাস, রাজনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাস প্রভৃতির কারণে সর্বত্র সে ধারা আসন গেড়ে বসতে পারেনি। আবার এ পরিবর্তন এমন হয়নি যে, সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থাই রাতারাতি একটি অন্যটির জায়গা দখল করেছে।

পাকিস্তানের কোন কোন অঞ্চলে নতুন উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে পুরাতন উৎপাদন সম্পর্ক পাশাপাশি জোরালোভাবেই দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বজায় থেকেছে। গ্রামাঞ্চলে এবং সীমান্ত প্রদেশগুলোতে বৃটিশ আমলেও সাধারণত জমিদার, জোতদারদের আধিপত্য-কর্তৃত্ব ছিল ব্যাপকভাবে। ভোটের রাজনীতিতে, জাতীয় এবং প্রাদেশিক নির্বাচনে এই চৌধুরী-খান-নওয়াবরাই পক্ষপাত-ষড়যন্ত্র-প্রহসন করে নির্বাচিত হতো।প্রকৃতপক্ষে উপনিবেশ থেকে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বৃটিশদের পরিবর্তে এই অভিজাত ‍ভূমিমালিক শ্রেণিরই একচেটিয়া রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সদ্য ‘স্বাধীনতাপ্রাপ্ত’ শিল্পে অনুন্নত অধিকাংশ দেশের সরকারগুলো যাবতীয় ঝুঁকি রাষ্ট্রের কাঁধের উপর ফেলে দিয়ে অবকাঠামো নির্মাণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান তৈরী করে ব্যক্তি পুঁজিপতিদের প্রাথমিক পুঁজির যোগান দিয়েছিল।পাকিস্তান এর ব্যতিক্রম ছিল না। উদাহরণ হিসেবে পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স কর্পোরেশন এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বলা যায়। প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তীতে, ১৯৫৭ সালে এর রূপান্তর ঘটে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ব্যাংক অব পাকিস্তান নামে। দেশের প্রথম বিনিয়োগকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠান পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্রেডিট এন্ড ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে। এই উদ্যোগে বিশ্বব্যাংক এবং ব্যক্তিমালিকদের অংশগ্রহণও ছিল।সর্বসাধারণের করের অর্থে গড়া প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত বড় পুঁজির মালিক-জমিদার শ্রেণির মুনাফা-জমির কেন্দ্রীভবনের স্বার্থে ব্যবহারের উদ্যোগ গ্রহণ করে সরকার। বাজার বিকাশের উদ্দেশ্যে নগরায়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পুঁজির মালিকদের মুনাফা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তৈরীর মাধ্যমে নীতিমালা প্রণয়ন করে বাজার ব্যবস্থায় যাবতীয় ঝুঁকি দূর করার জিম্মাদার হয়।

উদাহরণ হিসেবে নভেম্বর ৩, ১৯৫৮ সালের ‘স্টিল মিল বিতর্ক’টি উল্লেখ করা যায়। ভারী যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ইত্যাদির জন্য বিদেশী রাষ্ট্রের উপর থেকে নির্ভরতা কমানোর উদ্দেশ্যে ১৯৫৫ সালের জানুয়ারি মাসে পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন-এর চেয়ারম্যান রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি স্টিল প্ল্যান্ট স্থাপনের প্রস্তাব করেন। তাতে বাদ সাধে স্টিল আমদানিকারক এবং করাচি স্টিল রি-রোলিং মিলস এসোসিয়েশন। অর্থমন্ত্রী তখন ছিলেন আমজাদ আলী। তাঁর সহোদর ভাইয়েরা ছিলেন স্টিল আমদানিকারক এবং তারা মোট ৬,০০,০০০ টন আমদানির মধ্যে প্রায় ২,৪০,০০০ টনই আমদানি করতেন। এই ভাইসকলে মিলে প্রকাশ্যে প্ল্যান্ট স্থাপনের বিরোধিতা করলেন। বহু দিন পর বিরোধিতার মুখে হলেও, জুন ২৩, ১৯৫৮ সালে শিল্প মালিক শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে নুন সরকার  পিআইডিসি-কে স্টিল প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুমতি দেন।

এর পাশাপাশি, ‘সংরক্ষিত নীতি’র মাধ্যমে সাধারণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে বৃহৎ পুঁজিপতিদের বাঁচানোর চেষ্টা করে সরকার। এই প্রক্রিয়ায় জাতীয় আয়ের একটি বড় অংশ যেমন নির্দিষ্ট কিছু পুঁজিপতির হাতে কেন্দ্রীভবনের ব্যবস্থা করেছিল তেমনি ভূমির মালিকানা বণ্টনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ভূমিহীন কৃষকের পরিবর্তে অধিকাংশ জমি অল্পসংখ্যক ভূমি মালিকের হাতে কেন্দ্রীভূত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। 

তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে রাষ্ট্র প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নানাবিধ সহযোগিতা নিয়ে বড় ভূমির মালিকদের পাশে দাঁড়ায়। উৎপাদিত ফসলের মূল্য উশুলের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে রাস্তা-ঘাট, বাঁধ নির্মাণ, অল্প সুদে ঋণ প্রদান ইত্যাদির ব্যবস্থা করে। উল্লেখ্য যে, পাকিস্তান সরকার বৃটিশ শাসনামলের ধারাবাহিকতা রেখেই উপরোক্ত কাজগুলো করে। পাকিস্তানের পশ্চিমাংশে কৃষিজ উৎপাদন বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্য, কারখানা প্রভৃতির সম্প্রসারণ হয়েছিল মূলত বৃটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসনের ১৮৫০ সালের পর গৃহীত সেচ ব্যবস্থা, রেলওয়ে, রাস্তা-ঘাট-পরিবহণ, টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা, ব্যাংকিং এবং ‘উন্মুক্ত বাজার’ দ্বারা।উল্লেখ্য যে, সেচ-এর প্রয়োজনে সিন্ধু এবং পাঞ্জাব নদীর উপর শুখুর ব্যারেজ নির্মাণের কাজ শুরু করা হয় ১৮৫০ সালে এবং শেষ হয় ১৯৪০ সালের দিকে।

সেচ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে যেমন একদিকে ফসলের উৎপাদন বাড়তে থাকে, অন্যদিকে, ভূমি মালিকানার নির্দিষ্ট ধরনের কারণে এর ফলে লাভবান হয় অভিজাত বর্গ। এতে যারা পরবর্তীতে শিল্প মালিক বনে যায় (যদিও এর সংখ্যা খুব কম) সেসব পুঁজিপতিদের পারস্পরিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমার কারণেও তাদের মুনাফা অধিক হারে বৃদ্ধি পায়। বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, যেমন: ব্যাংক, বীমা, শিল্প ও কৃষি প্রতিষ্ঠান, পরিকল্পনা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সংসদ সদস্য এবং নির্বাহী প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজেদের প্রতিনিধি বসিয়ে নীতি-পরিকল্পনা গ্রহণ করে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া এবং বাজারের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এই দুই উদ্দেশ্যেই মালিক শ্রেণি এই কাজগুলো করে। অবশ্য পুঁজিপতি শ্রেণির মধ্যে তারাই এ নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য বজায় রাখতে পারে যারা তুলনামূলকভাবে বৃহৎ পুঁজির মালিক।

সরকার কেবলমাত্র ব্যক্তি মালিকদের বিভিন্ন সুবিধা প্রদান মারফত শিল্পায়ন প্রক্রিয়া শুরু করেনি উপরন্তু ‘ল্যান্ড একুইজিশন এ্যাক্ট’ প্রণয়ন করে যে সমস্ত ভূমি অধিগ্রহণ করে সেগুলো বাজার দরের চাইতে কমে সম্ভাব্য উদ্যোক্তাদের (সরকার ঘনিষ্ঠ) হাতে তুলে দেয় এবং নতুন শিল্প-কারখানার জন্য কর-খাজনা মওকুফের বন্দোবস্ত করে। ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত এ ছাড় চলে। এই ছাড় ছাড়াও সরকার শিল্প মালিকদের মুনাফা উশুলের গ্যারান্টি প্রদান করতে পণ্য আমদানীতে তুলনামূলক কম প্রতিযোগিতাপূর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে কর-শুল্ক ছাড়, অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের অপর্যাপ্ততার ক্ষেত্রে ভর্তুকি এবং পূর্ব বাংলার পণ্য রপ্তানি থেকে প্রাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে পশ্চিমাংশের শিল্প মালিকদের যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ভর্তুকি প্রদান করে। বিভিন্ন সময়ের এই ‘প্রণোদনা’ দেওয়ার ফলে, কোন কোন শিল্পে বার্ষিক রিটার্ন ছিল বিনিয়োগের প্রায় শতভাগ সমান। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, উচ্চ হারে মুনাফার নিশ্চয়তা এবং হঠাৎ করে পাওয়া অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নতুন, সার্থক এবং নিষ্ঠুর একটি (নব্য) শিল্প উদ্যোক্তা শ্রেণির সৃষ্টি করে।

ছক: ১২ পাকিস্তানে সম্প্রদায়/গোষ্ঠীগত শিল্প সম্পদের বিবরণ (শতকরা হার) ১৯৫৯১০

সম্প্রদায়/গোষ্ঠী/রাষ্ট্রীয়/বিদেশী  প্রতিষ্ঠান

মুসলমান মালিকানাধীন শিল্প সম্পদে পারস্পরিক অবস্থান(হার)

মোট শিল্প সম্পদে ব্যক্তি মালিক/ প্রতিষ্ঠানের অবস্থান (হার)

পুঁজিপতি গোষ্ঠী অবস্থান(হার)

ব্যক্তিমালিকানাধীন মুসলিম প্রতিষ্ঠান

১০০.০

৬৭.০

৮৮.০

হালালি মেমন

২৬.৫

১৮.০

০.১৬

চিনিওতি

৯.০

৬.০

০.০৩

দাউদি বোহরা

৫.০

৩.৫

০.০২

খোজা ইছনাশারি

৫.৫

৪.০

০.০২

খোজা ইসমাইলি

৫.০

৩.৫

০.০৬

অন্যান্য মুসলিম ব্যবসায়ী গোষ্ঠী

৫.৫

৪.০

০.০৮

সৈয়দ এবং শেখ

১৮.০

১২.০

পাঠান

৮.০

৫.৫

৭.০০

বাঙালী মুসলমান

৩.৫

২.৫

৪৩.০০

অন্যান্য মুসলিম (অপরিচিতসহ)

১৪.০

৮.৫

৩৭.৫০

ব্যক্তিমালিকানাধীন হিন্দু এবং বিদেশী প্রতিষ্ঠানসমূহ

 

২১.৫

১২.৫

বাঙালী হিন্দু

 

৮.৫

১০.০০

মারওয়ারি

 

২.০

অন্যান্য হিন্দু এবং শিখ

 

১.৫

২.৫০

পার্সী

 

১.০

০.০১

বৃটিশ

 

৭.৫

মার্কিন এবং অন্যান্য বিদেশী

 

১.০

 

সরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহ

 

১২.০

 

পিআইডিসি

 

৭.০

সরকারি

 

৫.০

সূত্র: Gustav F. Papanek, Pakistan’s Development: Social Goals and Private Incentives (Cambridge: Harvard University Press, 1967), p. 42. শিরোনাম: Industrial assests by “community” in Pakistan, 1959, Table II.12, Rounaq Jahan; Pakistan: failure in national integration, Oxford University press, 1973. page-27. 

আয়ুব খানের আমল (১৯৫৮-১৯৬৯) কে বলা হয় ‘অর্থনীতির স্বর্ণযুগ’১১। কিন্তু বিভিন্ন গবেষকের মতে, ‘‘রাজনৈতিক বিবেচনায় বাস্তবত তা ছিল একটি ‘বিভীষিকাময় অধ্যায়’’।১২ তাদের গবেষণা অনুযায়ী, ভূমি সংস্কার, সবুজ বিপ্লব এবং মৌলিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নামে আয়ুব খান মূলত বৃহৎ ভূমি মালিকদের হাতে অসীম ক্ষমতা অর্পণ করেছিলেন। প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে তিনি পুরাতন, নব্য জমিদার, ভূস্বামীসহ নব্য ধনীদের এতোটাই শক্তিশালী করেছিলেন যে, এই শ্রেণিটি তাদের নিজেদের স্বার্থে যা খুশি তাই করতে পারতো।

প্রথম ভূমি সংস্কার অকার্যকর হওয়ার কারণ হিসেবে গবেষকরা বাস্তবায়নকারী সংস্থা এবং স্থানীয় বেসামরিক প্রশাসনকেও চিহ্নিত করেছেন। গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অভিজাত শ্রেণি তাদের ব্যক্তিস্বার্থে শিল্প বিনিয়োগের ক্ষেত্রকেই কেবল প্রভাবিত করেনি, উপরন্তু, সংসদীয় এলাকাগুলোতেও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেছিল অভাবনীয় উপায়ে। স্থানীয় জনগণ এবং কৃষকদের স্বার্থ-অধিকার ইত্যাদির কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে আয়ুব আমলে এই অভিজাত শ্রেণিটিই তাদের স্বার্থকে পরিপুষ্ট করে। প্রকৃত অর্থে, সব ধরনের সরকারই রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে উক্ত নির্দিষ্ট শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করেছে। হোক সেটি মার্শাল ’ল, কিংবা ‘গণতন্ত্র’; রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভের ক্ষেত্রে সেই শ্রেণির কোন অসুবিধা হয়নি।১৩

প্রথমাবস্থায় মার্কিন বিশেষজ্ঞদের পরিকল্পনায় রাষ্ট্রীয়ভাবে বণিক পুঁজির বিকাশের পাশাপাশি পশ্চিমাংশের বিশেষ করে পাঞ্জাবের বৃহৎ পুঁজির মালিকগোষ্ঠী যেমন মাঝারি আকারের আমদানি বিকল্প শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নানান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে, অন্যদিকে, মার্কিন প্রভাবাধীনে সামরিক পুঁজির বিকাশে নানা ধরনের উদ্যোগও গ্রহণ করে। পুঁজির সামরিকায়নের তাগিদ থেকে সরকারি পরিকল্পনা গৃহীত হয় ব্যাপক আকারে। ফলে একদিকে যেমন বেসামরিক পুঁজির মালিকদের হাতে অভাবনীয় উপায়ে সম্পদ জমা হতে থাকে, অন্যদিকে, সামরিক বাহিনী এবং তার সাথে যুক্ত সিনিয়র জেনারেলরাও প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক বনে যায়।

প্রথমাবস্থায় মার্কিন বিশেষজ্ঞদের পরিকল্পনায় রাষ্ট্রীয়ভাবে বণিক পুঁজির বিকাশের পাশাপাশি পশ্চিমাংশের বিশেষ করে পাঞ্জাবের বৃহৎ পুঁজির মালিকগোষ্ঠী যেমন মাঝারি আকারের আমদানি বিকল্প শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নানান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে, অন্যদিকে, মার্কিন প্রভাবাধীনে সামরিক পুঁজির বিকাশে নানা ধরনের উদ্যোগও গ্রহণ করে। পুঁজির সামরিকায়নের তাগিদ থেকে সরকারি পরিকল্পনা গৃহীত হয় ব্যাপক আকারে। 

ভূমিকেন্দ্রিক সামরিক অভিজাত শ্রেণির (নব্য কোটিপতি জমিদার) বিকাশের প্রক্রিয়া

পাকিস্তানে শুরু থেকেই সামরিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স-এর ভিত্তি গড়ে তোলার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, ‘সামরিক বাহিনীর কর্তাব্যক্তিদের মাঝে ভূমি বণ্টন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় সামরিক শাসনের সময়।’১৪ মিলিটারি বাজেট বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে বাহিনীর হাতে বিশাল অঙ্কের অর্থ জমা হয়। পরবর্তীতে সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণে শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে সে অর্থ পুঁজিতে রূপান্তরের কাজে লাগানো হয়। উদ্বৃত্ত পুঁজি পুনর্বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে সামরিক বাহিনী নিজেই একটি পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানের রূপ লাভ করে।

অন্যদিকে, জেনারেলদের হাতে ‘দেশসেবা’র পুরস্কার হিসেবে প্রচুর কৃষি জমি বণ্টন করে দেওয়া হয়। নগর ও গ্রাম মিলিয়ে পাকিস্তানের উচ্চপদস্থ জেনারেলরা প্রত্যেকে কমপক্ষে ১৫ কোটি রুপি থেকে ৪০ কোটি রুপির সমপরিমাণের জমি নিজেদের আয়ত্তে নিতে সমর্থ হয়।১৫ ধারণা করা হয় যে, অবৈধ সম্পদের পরিমাণ তার চাইতে আরও অনেক বেশী; সরকারি নথিতে যার কোন হিসাব ছিল না। জমিকেন্দ্রিক আয় তাদের সম্পদ আহরণের বড় একটি উৎস ছিল। উপরন্তু, বৃহৎ মালিকদের কৃষিকেন্দ্রিক আয় সম্প্রসারণের জন্যও সরকারি নানা প্রকল্প গৃহীত হয়।

জেনারেলদের হাতে ‘দেশসেবা’র পুরস্কার হিসেবে প্রচুর কৃষি জমি বণ্টন করে দেওয়া হয়। নগর ও গ্রাম মিলিয়ে পাকিস্তানের উচ্চপদস্থ জেনারেলরা প্রত্যেকে কমপক্ষে ১৫ কোটি রুপি থেকে ৪০ কোটি রুপির সমপরিমাণের জমি নিজেদের আয়ত্তে নিতে সমর্থ হয়।

সামরিক কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে জমি বণ্টনের সরকারি নীতিটি অনেক পুরনো। বৃটিশ আমল থেকেই এই রেওয়াজ চালু ছিল। ১৯১২ সালের ভূমি আইন তার একটি দলিল। আয়ুব আমলে সে আইন পরিবর্ধন-পরিমার্জন করে সামরিক কর্তাব্যক্তিদের হাতে শত শত একর তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করে। ‘১৯৬৫ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত পাঞ্জাব এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের বিভিন্ন জেলার ১,৯০,০০০ একর জমি ২০-৬০ রুপি/একর ভর্তুকি দামে সামরিক কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়।’১৬

‘১৯৬৫ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত পাঞ্জাব এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের বিভিন্ন জেলার ১,৯০,০০০ একর জমি ২০-৬০ রুপি/একর ভর্তুকি দামে সামরিক কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়।’

তবে, ভূমির এই বন্টন প্রক্রিয়া সোজা পথে হয়নি। প্রথমে আইনি প্রক্রিয়ায় বাহিনীর কাছে হস্তগত হওয়ার পর সেখান থেকে কর্তাব্যক্তিদের নামে বিলি-বণ্টন করা হয়। এই উদ্দেশ্যে, ‘আয়ুব সরকারের আমলে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ভূমি আইনগুলোকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করা হয়’১৭ যাতে আরও অধিক পরিমাণে জমি সামরিক বাহিনীর আওতায় আনা যায়। ১৯৫৮-৫৯ সালের ভূমি সংস্কার আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল তাই।

ফলে, একদিকে সরকারিভাবে বৃহৎ ভূমির অধিকারী হওয়া যেমন সম্ভব হয় তার পাশাপাশি সামরিক প্রভাব খাটিয়ে নির্ধারিত জমির চাইতে আরও বহুগুণ বেশী জমি হস্তগত করা সম্ভব হয়। উদাহরণ হিসেবে, জেনারেল আয়ুব খানের কথা বলা যায়- ‘১৯৪৭ সালের পর বড় যে তিনটি বাঁধ (দক্ষিণ সিন্ধু প্রদেশের গুড্ডু, কোটরি, গোলাম মোহাম্মদ) নির্মাণ করা হয় তার জন্য ৯০ লক্ষ একর জমি অধিগ্রহণপূর্বক প্রায় ১০ লক্ষ একর জমি সামরিক বাহিনী এবং তার উচ্চপদস্থ সিনিয়র কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সে স্কিমের আওতায় অন্যান্য জেনারেলদের পাশাপাশি আয়ুব খানের নামেও বরাদ্দ দেওয়া হয় ২৪৭ একর। এছাড়া ছিলেন জেনারেল মুহাম্মদ মুসা (২৫০ একর), জেনারেল উমরাও খান (২৪৬ একর)সহ সামরিক বাহিনীর আরও বহু পদস্থ কর্মকর্তা।’১৮

‘১৯৪৭ সালের পর বড় যে তিনটি বাঁধ (দক্ষিণ সিন্ধু প্রদেশের গুড্ডু, কোটরি, গোলাম মোহাম্মদ) নির্মাণ করা হয় তার জন্য ৯০ লক্ষ একর জমি অধিগ্রহণপূর্বক প্রায় ১০ লক্ষ একর জমি সামরিক বাহিনী এবং তার উচ্চপদস্থ সিনিয়র কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সে স্কিমের আওতায় অন্যান্য জেনারেলদের পাশাপাশি আয়ুব খানের নামেও বরাদ্দ দেওয়া হয় ২৪৭ একর। এছাড়া ছিলেন জেনারেল মুহাম্মদ মুসা (২৫০ একর), জেনারেল উমরাও খান (২৪৬ একর)সহ সামরিক বাহিনীর আরও বহু পদস্থ কর্মকর্তা।

সামরিক আমলে ভূমি ব্যব্স্থার এই বণ্টনের ফলে তৎকালীন ‘অখণ্ড’ পাকিস্তানে কৃষিকেন্দ্রিক সামরিক একটি অভিজাত শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। সামরিক সরকার তাদের হাতে জমি বণ্টন করে- এক, জমির পুঁজিতান্ত্রিক কেন্দ্রীভবনের উদ্দেশ্যে; দুই, তৎকালীন পাকিস্তানের ‘অভিজাত’ শ্রেণির কাতারে জেনারেলদের শামিল করে সমাজে সামরিক শাসন-কর্তৃত্ব এবং ক্ষমতাকে স্থায়ীকরণের যৌক্তিকতা দানের উদ্দেশ্যে; তিন, সামরিক শাসনের গ্রহণযোগ্যতার জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সম্মতি আদায়ের উদ্দেশ্যে; চার, সামরিক শাসনকে পাকাপোক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী করার অভিপ্রায়ে। পাঁচ, সামরিক কর্তৃত্ব-নিয়ন্ত্রণ বিস্তার এবং বিরোধী শক্তির পাল্টা শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে।

তৎকালীন ‘অখণ্ড’ পাকিস্তানে কৃষিকেন্দ্রিক সামরিক একটি অভিজাত শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। সামরিক সরকার তাদের হাতে জমি বণ্টন করে- এক, জমির পুঁজিতান্ত্রিক কেন্দ্রীভবনের উদ্দেশ্যে; দুই, তৎকালীন পাকিস্তানের ‘অভিজাত’ শ্রেণির কাতারে জেনারেলদের শামিল করে সমাজে সামরিক শাসন-কর্তৃত্ব এবং ক্ষমতাকে স্থায়ীকরণের যৌক্তিকতা দানের উদ্দেশ্যে; তিন, সামরিক শাসনের গ্রহণযোগ্যতার জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সম্মতি আদায়ের উদ্দেশ্যে; চার, সামরিক শাসনকে পাকাপোক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী করার অভিপ্রায়ে। পাঁচ, সামরিক কর্তৃত্ব-নিয়ন্ত্রণ বিস্তার এবং বিরোধী শক্তির পাল্টা শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে।

রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা-নীতির আওতায় সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্ব-নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির পাশাপাশি জেনারেলরা এক একজন বৃহৎ নব্য ‘জমিদার’-এবং কোটিপতিতে রূপান্তরিত হয়। পুঁজিবাদী ঘরানার সামন্তীয় সংস্কৃতির এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটে নব্য এই শ্রেণিটির মধ্যে। যারা একদিকে পুঁজির পুঞ্জীভবন, কেন্দ্রীভবনের স্বার্থে কাজ করে; অন্যদিকে, সামন্তীয় সংস্কৃতিকে জিইয়ে রাখতে সচেষ্ট হয় সমাজে।

ছক:১৩ মিলিটারি নিয়ন্ত্রিত ১.১৫৮ কোটি একর জমির পরিমাণ (বিভাগ অনুযায়ী/শতকরা হার)১৯

বিভাগ

পাঞ্জাব

সিন্ধু

উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ/বালুচিস্তান

নগর

৪৮%

১৯%

৪%

কৃষি

১৪%

৮%

৭%

মোট জমি

৬২%

২৭%

১১%

Table:7.2, Division of 11.58 million acres of military-controlled land. Ayesha Siddiqa, Military Inc. Inside Pakistan’s Military Economy, Oxford University Press, 2007, Page-183.

 

ছক-১৪: সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য ভূমি বরাদ্দের পরিমাণ২০

পদ

জমির পরিমাণ

মেজর জেনারেল এবং তার উপরে

২৪০ একর

ব্রিগেডিয়ার এবং কর্নেল

১৫০ একর

লে. কর্নেল

১২৪ একর

লেফটেন্যান্ট থেকে মেজর

১০০ একর

জিসিও

৬৪ একর

এনসিও

৩২ একর

সূত্র: সিদ্দিক (১৯৯৭),Table:7.3, Land entitlement for military personnel. Ayesha Siddiqa, Military Inc. Inside Pakistan’s Military Economy, Oxford University Press, 2007, Page-183.

ভূমি সংস্কার আইন যে কেবলমাত্র জমির হাতবদলের প্রক্রিয়া তার প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে। আয়েশা সিদ্দিকা ভূমি সংস্কার কমিশন, ১৯৫৯-এর একটি রিপোর্টের উল্লেখ করে জানিয়েছেন যে, ‘পশ্চিম পাকিস্তানের বৃহৎ ভূমি মালিকরা তাদের ৩.১ কোটি একর চাষযোগ্য জমির মধ্যে কেবল ৮,৭১,০০০ একর বা শতকরা ২.৪ ভাগ জমি সমর্পণ করে সরকারকে।’২১ তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, ভূমি সংস্কার আইনের মাধ্যমে কেবল সিলিং-এর পরিমাণ কমানো হয়েছিল এবং বড় ভূমির মালিকরা আইনের কারসাজির মাধ্যমে তাদের জমি পরিবারের অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের কাছে হস্তান্তর করেছিল। রোনাল্ড হেরিং-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী তিনি বলেছেন যে, ‘কৃষি সম্পর্কিত কাঠামো পরিবর্তন না করে কিংবা সম্পদের প্রকৃত পুনর্বণ্টন না করে কেবলমাত্র সামান্য সংখ্যক বৃহৎ ভূমি মালিকের অল্প পরিমাণে প্রান্তিক জমি নির্দিষ্ট কিছু কৃষকের কাছে বিক্রি করা হয়। ভূমি সংস্কারের নামে, উপরন্তু, ৪% সরকারি বন্ড বৃহৎ ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণ বাবদ দেওয়া হয়েছে। রুপির অঙ্কে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৮.৯২ কোটি রুপি এবং বার্ষিক সুদ ০.৩৩ কোটি রুপি।’২২

গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভূমি সংস্কারের ফলে এমন কোন সংস্কার সাধিত হয়নি যাতে বলা যায় যে, কৃষি সম্পর্ক কিংবা উৎপাদন কিংবা সঞ্চালন প্রক্রিয়ায় কোন গুণগত পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে কৃষি আবাদের ক্ষেত্রে আধুনিক কোন যন্ত্রপাতি-প্রযুক্তি-অবকাঠামো নির্মাণের মধ্য দিয়ে সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুণগত কোনো পরিবর্তন সাধিত হয়নি বরং বিপরীতভাবে, সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের হাতে জমি কেন্দ্রীভূত হয়েছে দ্রুততার সাথে। অন্তর্গত বিরোধ থাকা সত্ত্বেও সাধারণ শ্রেণিগত স্বার্থের কারণে বৃহৎ জমির মালিকরা জেনারেল এবং অবাঙালী পুঁজিপতি ও আমলাতন্ত্রের সাথে মিলেমিশেই রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ করতো। কোন কোন ক্ষেত্রে জেনারেলদের একটা অংশ জমি বিক্রি করে ব্যবসা-বাণিজ্য-ঠিকাদারীতেও বিনিয়োগ করেছে।

আয়েশা সিদ্দিকা তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, ভূমি সংস্কার করে জেনারেলদের হাতে কেবলমাত্র জমি তুলে দেয়নি সরকার, উপরন্তু জমির উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুবিধাও প্রদান করেছে। যেমন: প্রযুক্তি সহায়তা এবং আর্থিক ঋণ সাহায্য, পানির সরবরাহ (বৃহৎ ভূমির মালিক এবং জেনারেল-ঊর্ধ্বতন অফিসাররা ফার্ম থেকে বাজার পর্যন্ত সংযোগকৃত রাস্তায় পানির সরবরাহ লাইন ব্যবহারের সুবিধা পেতো। ক্ষুদ্র কৃষক-ভূমিহীন কৃষক-সাধারণ সৈনিকরা এ সুবিধা ভোগ করতে পারতো না), সরকারিভাবে রাস্তা-ঘাট-অবকাঠামো নির্মাণ, সার-বীজ এবং কৃষি উৎপাদনের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ভর্তুকি রেটে ক্রয়ের সুবিধা (এসব পণ্যদ্রব্য মিলিটারি পরিবহণের মাধ্যমে তাদের সরবরাহ করা হতো) ইত্যাদি। এছাড়া বাড়তি পাওনা হিসেবে, দরিদ্র কৃষক বা সৈন্যদের জমি (যারা কোন সরকারি সুবিধা ভোগ করতো না) নামমাত্র দামে কিনে নেওয়া ছিল সাধারণ প্রপঞ্চ (জবরদখল বা জোরপূর্বক উচ্ছেদ এই হিসাবের বাইরে)।২৩

আয়েশা সিদ্দিকা তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, ভূমি সংস্কার করে জেনারেলদের হাতে কেবলমাত্র জমি তুলে দেয়নি সরকার, উপরন্তু জমির উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুবিধাও প্রদান করেছে।

১৯৫০ সাল থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত যে সমস্ত বৈদেশিক সামরিক এবং অর্থ ঋণ সরকারিভাবে নেওয়া হয়েছিল তার একটি অংশও তারা ভোগ করতেন ভূমির উন্নয়ন বাবদ। বৈদেশিক ঋণের বণ্টন প্রসঙ্গে পাঞ্জাবের অর্থমন্ত্রী নওয়াব ইফতিখার হুসাইন মামদোত-কে সংসদে সে সময় প্রশ্ন করা হলে তার উত্তরে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘foreign aid is meant for the army’।২৪ পরবর্তী সময়গুলোতে পাকিস্তান বৈদেশিক ঋণের এই ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি।

বৈদেশিক ঋণের বণ্টন প্রসঙ্গে পাঞ্জাবের অর্থমন্ত্রী নওয়াব ইফতিখার হুসাইন মামদোত-কে সংসদে সে সময় প্রশ্ন করা হলে তার উত্তরে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘foreign aid is meant for the army’।

প্রথমাবস্থায়, পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতাদের হাত ধরেই সমাজে ‘কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থা’২৫প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তীতে সামরিক শাসনামলে সামরিক আইন জারী করে সেই কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থাকে আরও সুবিন্যস্ত ও শক্তিশালী করা হয়। কর্তৃত্ববাদী বিধি-বিধান আবার পশ্চিম পাকিস্তানের অভিজাত শ্রেণির স্বার্থ সুরক্ষা-আধিপত্য বিস্তারে সুবিধা করে দেয় জনগণের ‍বৃহদাংশের স্বার্থের বিপরীতে।

আয়ুব খানের দশ বছরের শাসনামলে আন্ত:আঞ্চলিক বৈষম্য অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পায় এবং ‘জাতীয় ঐক্য’ রক্ষায় অতিরিক্ত সমস্যা সৃষ্টি করে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে আয়ুব খানে’র অর্থনৈতিক নীতির কারণে সেসময় ‘প্রবৃদ্ধি’র এক ধরনের উলম্ফন ঘটে কিন্তু তাঁর গৃহীত নীতিমালার কারণে একইসময়ে সামগ্রিকভাবে (উভয় অংশের) অর্থনৈতিক সমবণ্টন বাধাগ্রস্থ হয়। সংসদীয় ‘গণতন্ত্রের’ পরিবর্তে সামরিক একনায়কতন্ত্রের উত্থানপর্ব শুরু হয়। দেশের সম্পদ ‘বাইশ পরিবার’-এর হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার গতি বৃদ্ধি পায়। এই বাইশ পরিবারের মধ্যে আয়ুব খানের নিজের পরিবারও অন্তর্ভুক্ত ছিল, ‘‘মাহবুবুল হকের যে রিপোর্টে এই ঘটনাটির উল্লেখ ছিল সেই পরিকল্পনা কমিশনের প্রধান ছিলেন স্বয়ং আয়ুব খান।’’২৬

জমির বণ্টন এবং অভিজাত শ্রেণির সাথে রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্ক

ভূমির একপাক্ষিক বাটোয়ারা ব্যবস্থা পুঁজির ব্যবস্থাকে উল্লেখযোগ্য আকারে পরিপুষ্ট করতে পারেনি। পাঞ্জাবের জমিদার, সিন্ধের ওয়াদেরাস, সারহাদের খান, বালুচিস্তান এবং উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের সরদার (গোষ্ঠী/গোত্রপ্রধান) প্রমুখ সমাজ-অর্থনীতি-রাজনীতি পরিচালনা করতো সামন্তীয় জমিদারী কায়দায়। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে তাদের সৃষ্টি করা হয়েছিল নির্দিষ্ট রাজস্ব আদায়ের প্রয়োজনে। তারই ধারাবাহিকতায় তারা রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে পরস্পর পরস্পরের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল। যে জমি ছিল তাদের আয়ের প্রধান উৎস সে জমির প্রয়োজনীয় উন্নতকরণ এবং আধুনিকায়নের প্রতি তাদের কোন নজর ছিল না। এমনকি, প্রাপ্ত এবং পুঞ্জীভূত আয় যে পুনরায় ফসল পুনরুৎপাদন-ব্যবস্থাপনার কাজে বিনিয়োগ করবে (পুঁজিতান্ত্রিক ধরনের) তাতেও তাদের যথেষ্ট অনীহা ছিল।২৭

বৃটিশ পুঁজির বিকাশে ভারতে যা কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল বিশেষ করে বাণিজ্যিক অবকাঠামো, রেলওয়ে, যোগাযোগ, ব্যাংকিং, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইতাদি গ্রামাঞ্চলের সামন্তীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যাপক কোন প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। একদিকে বৃটিশ শাসকবর্গের এ অঞ্চলে শিল্প পুঁজি বিকাশের অনীহা এবং অন্যদিকে বৃটিশ পুঁজির অনুগত ব্যবসায়ী পুঁজির বিকাশের কারণে সামগ্রিক পুঁজিবাদী তৎপরতা এ অঞ্চলের সর্বত্র জায়গাও করে নিতে পারেনি। বিপরীত অনগ্রসরতাকেই বরং ত্বরান্বিত করেছে। ফলে একদিকে শহরকেন্দ্রিক একটি মুৎসুদ্দি-লুম্পেন বুর্জোয়া শ্রেণির বিকাশ ঘটেছিল বৃটিশদের হাত ধরেই। ভিত্তিমূলক শিল্প-কারখানা বিকাশের মাধ্যমে পুঁজির পুঞ্জীভবনের চাইতে উদ্বৃত্ত মূল্যের ভাগবাটোয়ারাতেই যাদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত ছিল বিশেষ করে মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে, যার ধারাবাহিকতা পাকিস্তান আমলেও আমরা দেখতে পাই। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে সামন্তীয় সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় অভিজাত জমিদার শ্রেণির আধিপত্য বজায় ছিল শক্তিশালীভাবেই।

বিভিন্ন প্রদেশের অভিজাত জমিদার, খান, সরদার এবং ব্যবসায়ী গোষ্ঠী-শিল্পপতিদের সমন্বয়ে গঠিত ‘জাতীয় বুর্জোয়া’ শ্রেণিটি কৃষির ‘আধুনিকায়নে’র জন্য উদ্বেলিত ছিল না; বরং এর বিপরীতে, বিভিন্ন সরকারের সময়ভূমি সংস্কার সম্পর্কিত (সরদারি প্রথার বিলোপ আইনসহ) গৃহীত আইন বাস্তবায়িত হতে পারেনি তাদের শক্তিশালী বিরোধিতার কারণে। তবে, আয়ুব সরকারের আমলে ‘সবুজ বিপ্লব’ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে গ্রামাঞ্চলে তার কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। নতুন একটি পুঁজিবাদী শ্রেণি তৈরী হয় রাষ্ট্রীয় ভরণ-পোষণের মধ্য দিয়ে, যারা ব্যবহারিক মূল্য উৎপাদনের চাইতে বিনিময় মূল্য উৎপাদন অর্থাৎ বাজারের প্রয়োজনে উৎপাদনের বিনিয়োগে উৎসাহী হয়।২৮

ভৌগোলিক এবং ঐতিহাসিক কারণে পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব বাংলায় জমিদারী প্রথার চাপ তত ব্যাপক ছিল না। ভারতের পশ্চিমবঙ্গেই মূলত বৃহৎ জমিদারী ব্যবস্থা কেন্দ্রীভূত হয় বৃটিশ শাসনামলে। এর ঐতিহাসিক কারণ- ১৭৯৩ সালের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ অনুযায়ী পূর্ব বাংলার জমিদার শ্রেণিকে প্রতিবছর উচ্চহারে কর প্রদান করতে হতো। নির্দিষ্ট সময়ের সূর্যাস্তের পূর্বে রাজস্ব পরিশোধ করতে না পারলে সরকার সে জমিদারী নিয়ে নিলামে প্রতিযোগী কোন জমিদারের হাতে তুলে দিত। এই ব্যবস্থার অধীনে পূর্বতন অনেক মুসলমান জমিদারদের জমিদারী হাতছাড়া হয়ে যায় এবং হিন্দু জমিদার বর্গ সামনের সারিতে জায়গা করে নেয়। শতকরা প্রায় ৭৫ ভাগ জমি হিন্দু জমিদারদের অধীনে চলে আসে যারা নব্য সম্পত্তিবান শ্রেণি হিসেবে আবির্ভূত হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব বাংলার এই চিত্র ক্রমান্বয়ে বদলে যেতে থাকে। পূর্ব বাংলায় হিন্দু মালিকদের পরিবর্তে মুসলিম মধ্যবিত্ত সে জায়গা দখল করে।২৯

ছক- ১৫: পূর্ব পাকিস্তানে ভূমি মালিকানার বণ্টন, ১৯৫৯৩০

জমির পরিমাণ (একর)

ভূমি মালিক (শতকরা হার)

আয়ত্তাধীন জমি (শতকরা হার)

০ থেকে ০.৪

১৩

০.৫ থেকে ০.৯

১১

১.০ থেকে ২.৪

২৭

১৩

২.৫ থেকে ৪.৯

২৬

২৬

৫.০ থেকে ৭.৪

১২

১৯

৭.৫ থেকে ১২.৪

১৯

১২.৫ থেকে ২৪.৯

১৪

২৫.০ থেকে ৩৯.৯

৪০.০  বা তদুর্দ্ধ

সূত্র: Pakistan, Ministry of Food and Agriculture, Agricultural Census Organisation, Pakistan Census of Agriculture, East pakistan, vol.1, 1962, Karachi: Government Press, 1962, Table 3. p.33, শিরোনাম: Table II:5, Distribution of land-ownership in East Pakistan, 1959 by M. Nazrul Islam: Pakistan A study in national integration, Vanguard Books Pvt Ltd, Pakistan, page-10  এবং table-11.6,  Rounaq Jahan: Pakistan: failure in national integration, Oxford University Press, 1973. page-19.

অন্য একটি গবেষণাপত্রে দেখা যায়, বিভাগপূর্ব পাকিস্তানের বৃহৎ জমিদারী জমিসহ শতকরা প্রায় ৭৫ ভাগ ভূমি ছিল হিন্দু রাজাদের অধীনস্ত। কারও কারও জমির পরিমাণ ছিল ৭,৫০,০০০ একরের মতো।৩১

ছক:১৬ পশ্চিম পাকিস্তানে ভূমি মালিকানার বণ্টন, ১৯৫৯৩২

জমির পরিমাণ (একর)

ভূমি মালিক (শতকরা হার)

আয়ত্তাধীন জমি (শতকরা হার)

৫ এর নীচে

৬৪.৫

১৫.০

৫ থেকে ২৫

২৮.৫

৩১.৭

২৫ থেকে ১০০

৫.৭

২২.৪

১০০ থেকে ৫০০

১.১

১৫.৯

৫০০ এর উর্দ্ধে

০.১

১৫.০

সূত্র: Land Reforms Commission Report, West Pakistan, 1959, Karachi:Government Press, 1959, Appendix 1. শিরোনাম: Table II:6, Distribution of landownership in West Pakistan, 1959, by M. Nazrul Islam,Pakistan A study in national integration, Vanguard Books Pvt Ltd, Pakistan, page-10 এবং table-11.4 by Rounaq Jahan; Pakistan: failure in national integration, Oxford University Press, 1973. page-15.

সামন্তীয় জমিদারীত্ব পূর্ব পাকিস্তানের চাইতে পশ্চিম পাকিস্তানে যথেষ্ট পরিমাণ বিস্তৃত ছিল সিন্ধু প্রদেশে। সেখানে অল্প কিছু জমিদারের হাতে সিংহভাগ জমি কেন্দ্রীভূত ছিল। পাঞ্জাবে জাত-পাত প্রথা যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। হিন্দু রাজপুত, জাঠ এবং আর্যদের মতো মুসলমানদের মধ্যেও জাতপ্রথা বিদ্যমান ছিল। আন্ত:বিবাহ প্রথা এবং প্রজন্ম পরম্পরায় একই পেশায় নিয়োজিত থাকা ছিল একটা রীতি।৩৩ আশরাফ-আতরাফ বিভাজন সেসমস্ত অঞ্চলে শক্তিশালীভাবে উপস্থিত ছিল যেখানে উচ্চবর্ণের হাতে সিংহভাগ ভূমির কেন্দ্রীভবন ঘটেছিল।

এম. নজরুল ইসলাম তাঁর গবেষণায় পাকিস্তান আমলে মুসলমান মালিকদের হাতে জমি কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিষয়ে একই ধরনের দু’টো কারণ দেখিয়েছেন । প্রথমত: দেশ বিভাজনের সময় হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা- সংঘাত উচ্চ রূপ নেওয়া; বিশেষ করে পূর্ব বাংলা থেকে হিন্দু জমিদারদের দেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে যাওয়া। দ্বিতীয়ত: জমিদারী প্রথা বিলোপের উদ্দেশ্যে ‘ইস্ট বেঙ্গল এস্টেটস এক্যুইজিশন এন্ড টেনেন্সি এ্যাক্ট, ১৯৫০’ প্রবর্তন এবং ৩৩ একর সিলিং নির্ধারণ। পশ্চিম পাকিস্তানে ভৌগোলিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক কারণে সামন্তীয় সম্পর্ক অনেক বিস্তৃত ছিল। অধিকাংশ জমি অল্প কিছু জমিদারের অধীনে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল; বিশেষ করে সিন্ধ অঞ্চলে। অন্যদিকে, পশ্চিম পাকিস্তানে বিশেষ করে পাঞ্জাবে মুসলমান বর্ণপ্রথার (আশরাফ-আতরাফ) ব্যাপক অস্তিত্ব থাকার ফলে ভূমির মালিকানা আশরাফ/অভিজাত শ্রেণির হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে।৩৪

পশ্চিম পাকিস্তানের কয়েকটি পরিবারের হাতে জমি কেন্দ্রীভূত হওয়া এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার পরিপ্রেক্ষিত পর্যালোচনা করে হাসান গার্দেজি এবং জামিল রশিদ তাঁদের বইতে উল্লেখ করেছেন যে,

‘‘..যদিও পাকিস্তানের কৃষিতে গত দুই যুগ ধরে নানাবিধ পরিবর্তন ঘটেছে, তা সত্ত্বেও, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নে বৃহৎ ভূমির মালিকদের শক্তি খর্ব হয়নি। ভূমি সংস্কার তার মৌলিক অবস্থা-অবস্থানের ক্ষেত্রে সামান্যই দাগ কাটতে পেরেছে। গ্রামাঞ্চলে সাধারণত যাদের জমির পরিমাণ কয়েক’শ একরের উপরে সেই বৃহৎ ভূমির মালিকদের বিভিন্ন অংশের মধ্যেই রাজনৈতিক ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারা হয়েছে। এদের উপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল ভাগচাষী, শ্রমিক, আত্মীয়-স্বজন এবং মিত্র শক্তিকে সাথে নিয়ে তাদের দলভারী করেছে। ‘মধ্যবিত্ত কৃষক’দেরও তারা তাদের দলে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এমনকি ১৯৭০ এর নির্বাচনেও, অনেক ক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)র ব্যাপক সমর্থন জোটে স্থানীয় স্তরের (বৃহৎ এবং মাঝারি) ভূমি মালিকদের মধ্যে। এও অনস্বীকার্য যে, জনপ্রিয় বুলি এবং প্রতিশ্রুতির কারণেও গ্রামাঞ্চলের সাধারণ ভোটদাতাদের পাল্লা পিপিপি’র দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোতে এভাবেই বৃহৎ ভূমির মালিকদের প্রতিনিধিত্ব তৈরী হয়। যদিও রাজনৈতিক দলগুলোতে তাদের অবস্থানের উপর রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্ব পুরোপুরি নির্ভর করতো না। এমনকি বেসামরিক উচ্চপদের আমলা এবং সামরিক ব্যক্তিবর্গকে নিযুক্ত করা হয় এই শ্রেণি থেকে; উপরন্তু, বিভিন্ন সরকারের আমলে এই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ভূমি দেওয়া হতো অনুদানস্বরূপ। এ কারণে, খোদ ভূস্বামী শ্রেণিটি (জমিদার, বৃহৎ ভূমির মালিক, অভিজাত উচ্চপদস্থ জেনারেল) রাষ্ট্রের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় খুব ভালভাবে তাদের জায়গা পাকাপোক্ত করে নিয়েছিল।’’৩৫

পাকিস্তানের কোন কোন অঞ্চলে বড় মালিকরা কৃষিজ পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি ‍কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্পও স্থাপন করে। যেমন: তুলা, তুলা প্রক্রিয়াকরণ কারখানা, আটার কল, চাল কল। ব্যক্তি মালিকানাধীন এই সমস্ত শিল্পের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বিশেষ করে, রাস্তাঘাট নির্মাণ সরকারি বরাদ্দ মারফত করা হয়েছিল।  গ্রামীণ অর্থনীতি ও রাজনীতিতে এই শ্রেণিটি সমাজ পরিচালনার নেত্বত্বে ছিল এবং পরবর্তীতে অল্প কিছু বৃহৎ ভূমির মালিক বড় আকারের শিল্প-কারখানায় বিনিয়োগের দিকে নজর দেয়।৩৬

পশ্চিম পাকিস্তানের অল্পসংখ্যক বৃহৎ মালিক খামারে যান্ত্রিক প্রয়োগে এগিয়ে ছিল। ১৯৬৯ সালের এগ্রিকালচারাল সেন্সাস অর্গানাইজেশন-এর ফার্ম ম্যাকানাইজেশন কমিটি’র একটি জরিপ অনুযায়ী, ১০০ একরের উপরে জমির মালিকদের আবাদী জমির প্রায় ৮৬.৫% যান্ত্রিকীকরণের আওতায় ছিল। ৫০০ একরের উপর যাদের মালিকানা ছিল তাদের আবাদী জমিরও প্রায় ৪৩% যান্ত্রিক প্রয়োগ ঘটানো হয়।৩৭

এর ফলে আবার উৎপাদনের কাজে নিয়োজিত শ্রমশক্তির উপর এর একটা প্রভাব পড়ে। ১৯৬০ এবং ১৯৭০ সাল নাগাদ দেখা যায়, জমিতে যান্ত্রিক প্রয়োগের ফলে ভাগচাষীদের জমি থেকে উচ্ছেদ ত্বরান্বিত হয়। তাদের মধ্যে অল্প কিছু নিয়োগপ্রাপ্ত হয় শ্রমিক হিসেবে পূর্বের জমিতেই। জমি থেকে উচ্ছেদ হওয়া বেশীরভাগ ভাগচাষীরই ফসল কাটার সময় ছাড়া সারাবছর নিশ্চিত কোন কাজ থাকতো না। ফলে, কাজের খোঁজে শহরের বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় ধরনা দিতো এবং কাজ জুটতো অনিয়মিত শ্রমিক হিসেবে। বিভিন্ন অঞ্চলের শ্রমিক আন্দোলনের ফলে আয়ুব আমলে শিল্পে নূন্যতম মজুরী কাঠামো নির্ধারিত হয়। কিন্তু তার আগে নির্দিষ্ট কোন মজুরী কাঠামো না থাকায় শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের অতিমাত্রায় উদ্বৃত্ত মূল্য উৎপাদন পুঁজির মালিকদের অতি মুনাফার একটি অন্যতম উৎস ছিল।এছাড়া শহর-নগর বিকশিত হওয়ার কারণে নির্মাণ কাজেও প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন পড়তো। জমি থেকে উচ্ছেদ হওয়া এই শ্রমশক্তি সেসব নির্মাণ কাজে নিয়োজিত হতো।৩৮

 উভয় অংশের রাজনীতিবিদদের সাথে ভূমি মালিকানার সম্পর্ক

জমিদারী প্রথা বাতিলের কথা কাগজে কলমে বলা হলেও ভূমি সংস্কারের নামে মূলত হিন্দু জমিদারদের হাত থেকে জমির মালিকানা মুসলমান আশরাফ শ্রেণির (সৈয়দ, শেখ, পাঠান এবং মোঘল) হাতে তুলে দেওয়ার উপায় তৈরী করা হয়। এর কারণ, পূর্ব বাংলার আইন সভার যে সদস্যদের কাছে (৫০ সদস্যের কমিটি) পূর্ব বাংলায় বিলটি উত্থাপন এবং পাশ করার দায়িত্ব ছিলো তাদের অর্ধেকের বেশী ছিলেন জমিদার-জোতদার শ্রেণির এবং মুসলিম লীগের সদস্য। বিপরীতে পূর্ব বাংলার অধিকাংশ কৃষক ছিলেন মুসলমান আতরাফ শ্রেণির। যাদের হাতে জমি দেওয়ার কোন প্রকার উদ্দেশ্য অভিজাত শাসকবর্গের ছিল না। উল্লেখ্য যে, আলাদা রাষ্ট্র হওয়ার পূর্বে নেতৃস্থানীয় ভারতীয় পুঁজিপতিদের একটা অংশ ভূমি সংস্কার করে ‘খোদ কৃষক উৎপাদকদের হাতে জমি দেওয়ার পক্ষে’৩৯ ছিলেন।

‘প্রায় দুই কোটি ভূমিহীন কৃষকের’৪০ হাতে জমি না দিয়ে ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে অকৃষক জোতদার-মহাজন, অনুপস্থিত ভূমি মালিক, অভিজাত মুসলমানদের হাতে জমি তুলে দেওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়। অভিবাসিত মুসলমানদের একাংশ ভারতে যে পরিমাণ জমি হারিয়েছিল তার সমপরিমাণ বা তার চাইতেও বেশি জমির মালিক বনে গেছে জমি বরাদ্দ এবং শরণার্থী পুনর্বাসনের দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে, অসদুপায়ে।৪১ একদিকে কৃষকের অবস্থার দৈন্যদশার অপরিবর্তিত অবস্থা এবং অন্যদিকে শিল্পায়নের ভিত্তিমূল থেকে দূরে সরে যাওয়া- এই দুই ঘটনা পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করে দেয় শুরুতেই।

পাকিস্তান ‍সৃষ্টির পর দুই দশকের মধ্যেই সামগ্রিক অর্থনীতি ভগ্নদশায় পৌঁছানোর নেপথ্য কারণ কী ছিল? শোষণ-বৈষম্যহীন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা কী উপায়ে তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে গেল? কী কারণে জনগণের স্বার্থের বিপরীতে ক্ষুদ্র একটি শ্রেণির হাতে বেশীরভাগ সম্পদ কেন্দ্রীভূত হলো? এসবের উত্তর মিলবে পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্ব দানকারী মূলধারার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং নেতৃত্বের শ্রেণিগত পরিচয় থেকে।

সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও বৈষম্যের সময়কালে এ অঞ্চলে হিন্দু আধিপত্যের বিরুদ্ধে মুসলমান জমিদার, জোতদার-শিল্প মালিক শ্রমিক-কৃষক, ব্যবসায়ী, পীর, ডিগ্রীধারী সমাজ ইসলামের পতাকাতলে শামিল হয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছে একজোট হয়ে। তবে কোনো কোনো মহল থেকে এ প্রশ্নও পাশাপাশি রাখা হয়েছিল যে, সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি, কুসংস্কার, অজ্ঞতা দূরীকরণে মুসলমান সমাজের ভূমিকা কী হবে? ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করে হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলমানরা লড়াই করছে; তাহলে এই ইসলাম কি জমিদারী ব্যবস্থা, শোষক এবং পীর-মোল্লাদের বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হবে? এই প্রশ্ন যারা করেছে তাদের নানাভাবে বিরুদ্ধাচরণ করা হয়েছে কিংবা এটা ‘প্রশ্ন তোলার উপযুক্ত সময় নয়’ দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে কিংবা ‘শত্রুশিবির’- ‘কমিউনিস্টদের’ চর হিসেবে তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন, ‘‘মুসলমানদের স্বার্থবিরোধী কোনপ্রকার অবস্থান মুসলিম লীগের অবস্থান নয়।’’৪২

মুসলিম লীগ সংগঠনে আধিপত্য করতো জমিদার এবং খেতাবধারী (বিশেষ করে পাঞ্জাব এবং উত্তর প্রদেশের নওয়াব, নওয়াবজাদা এবং পূর্ব বাংলাসহ অন্যান্য অঞ্চলের স্যার, প্রিন্স, চৌধুরী, সৈয়দ, শেখ প্রভৃতি অভিজাত পরিবারের) মুসলমান ব্যক্তিবর্গ। নওয়াব লিয়াকত আলী খান যিনি ছিলেন উত্তর প্রদেশের বৃহৎ জমিদার পরিবারের এবং মুসলিম লীগের সেক্রেটারি। নওয়াব ইসমাইল খান ছিলেন উত্তর প্রদেশের বড় জমিদার এবং উত্তর প্রদেশের মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট ও অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের এ্যাকশন কমিটির চেয়ারম্যান। মামদোতের নওয়াব ছিলেন পাঞ্জাব প্রদেশ মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট। স্যার মুহাম্মদ সাদউল্লাহ আসাম প্রদেশ মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট এবং কয়েক মেয়াদে আসামের প্রিমিয়ার। স্যার আবদুলা হারুন ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত আমৃত্যু ছিলেন সিন্ধু প্রদেশের মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট। এছাড়াও সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ এ্যাসেম্বলিতে বেশ কয়েকজন সদস্য ছিলেন মুসলিম লীগের যারা নাইট উপাধি প্রাপ্ত।

মুসলিম লীগ সংগঠনে আধিপত্য করতো জমিদার এবং খেতাবধারী (বিশেষ করে পাঞ্জাব এবং উত্তর প্রদেশের নওয়াব, নওয়াবজাদা এবং পূর্ব বাংলাসহ অন্যান্য অঞ্চলের স্যার, প্রিন্স, চৌধুরী, সৈয়দ, শেখ প্রভৃতি অভিজাত পরিবারের) মুসলমান ব্যক্তিবর্গ। নওয়াব লিয়াকত আলী খান যিনি ছিলেন উত্তর প্রদেশের বৃহৎ জমিদার পরিবারের এবং মুসলিম লীগের সেক্রেটারি। নওয়াব ইসমাইল খান ছিলেন উত্তর প্রদেশের বড় জমিদার এবং উত্তর প্রদেশের মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট ও অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের এ্যাকশন কমিটির চেয়ারম্যান। মামদোতের নওয়াব ছিলেন পাঞ্জাব প্রদেশ মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট।

মুসলিম লীগ কাউন্সিলে জমিদার, জোতদার এবং বৃহৎ ভূমি মালিকরাই মূলত প্রতিনিধিত্ব করতো। ৫০৩ জন কাউন্সিল সদস্যের মধ্যে ১৬৩ জনই ছিল জমিদার-ভূস্বামী শ্রেণির। এর মধ্যে পাঞ্জাবেরই ছিল সিংহভাগ- ৫১ জন। এর পরে অবস্থান ছিল উত্তর প্রদেশ এবং বাঙলার। জমিদারী প্রতিনিধিত্ব হিসেবে সিন্ধুর অবস্থান ছিল সবার উপরে। এর ২৫ সদস্যের মধ্যে ১৫ জনই ছিল জমিদার। যদিও বাঙলায় পাঞ্জাবের তিউওয়ানা, দৌলতানা, মামদোত এবং লেঘারি কিংবা সিন্ধের তালপুরের মতো বৃহৎ জমিদার ছিল না কিন্তু অল্প সংখ্যক মুসলমান জমিদার যারা ছিল তারাই ছিল এ অঞ্চলে মুসলিম লীগের প্রধান সারির নেতা। উকিলরা ছিল দ্বিতীয় বৃহত্তম অবস্থানে। প্রায় ১৪৫ জন ছিল কাউন্সিলের সদস্য। ব্যবসায়ী, ব্যাংকার এবং শিল্পপতিদের সংখ্যা অনুপাতে কাউন্সিলে অংশগ্রহণ এবং প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম ছিল। সে হিসাবে দু’টো বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র, বোম্বে এবং কলকাতার অংশগ্রহণ ছিল বেশী। আর্মির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সরকারি ঠিকাদার ও বড় ব্যবসায়ীর অংশগ্রহণ ছিল পাঞ্জাব, দিল্লী এবং উত্তর প্রদেশের গ্রুপগুলোর মধ্যে।৪৩

যদিও বাঙলায় পাঞ্জাবের তিউওয়ানা, দৌলতানা, মামদোত এবং লেঘারি কিংবা সিন্ধের তালপুরের মতো বৃহৎ জমিদার ছিল না কিন্তু অল্প সংখ্যক মুসলমান জমিদার যারা ছিল তারাই ছিল এ অঞ্চলে মুসলিম লীগের প্রধান সারির নেতা। উকিলরা ছিল দ্বিতীয় বৃহত্তম অবস্থানে।

জিন্নাহ নিজে ছিলেন উত্তরাধিকারসূত্রে গুজরাতি। গুজরাতি এবং বোম্বের মেমন, খোজা এবং বোহরা সম্প্রদায়ের কাছে তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত ব্যক্তি। মেমন সম্প্রদায় ছিল তার মূল সমর্থক এবং অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তিনি বিভিন্ন সময় এই বণিক সম্প্রদায় এবং তাদের চেম্বার অফ কর্মাসের সভায় বক্তৃতা প্রদান ‍করেছেন। ১৯৪৫-’৪৬ সালের নির্বাচনের সময় বোম্বে এবং কলকাতার ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ সহায়তা প্রদান করেছিল।   একটি হিসাবে দেখা যায় যে, সে সময় মুসলিম লীগ প্রায় ৬৭ লক্ষ রুপির তহবিল সংগ্রহ করে যার মধ্যে ৩৬ লক্ষ বিহার ত্রাণ তহবিল, ২৪ লক্ষ রুপি নির্বাচনী তহবিল এবং ৭ লক্ষ রুপি মুসলিম লীগ রিজার্ভ তহবিল বাবদ রাখা হয়।৪৪

১৯৪৫-’৪৬ সালের নির্বাচনের সময় বোম্বে এবং কলকাতার ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ সহায়তা প্রদান করেছিল।   একটি হিসাবে দেখা যায় যে, সে সময় মুসলিম লীগ প্রায় ৬৭ লক্ষ রুপির তহবিল সংগ্রহ করে যার মধ্যে ৩৬ লক্ষ বিহার ত্রাণ তহবিল, ২৪ লক্ষ রুপি নির্বাচনী তহবিল এবং ৭ লক্ষ রুপি মুসলিম লীগ রিজার্ভ তহবিল বাবদ রাখা হয়।

১৯৫১ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে পাঞ্জাব প্রদেশে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের প্রায় ৮০ শতাংশ ছিল বড় ভূস্বামী শ্রেণির সদস্য। ১৯৫৩ সালে সিন্ধু প্রদেশের নির্বাচনে ভূমিহীন কৃষক শ্রেণির কোনো প্রতিনিধিত্ব ছিল না, প্রায় ৯০ শতাংশ ছিল বৃহৎ ভূমি মালিক পরিবারের সদস্য। ১৯৫১ সালে উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রী খান আব্দুল কাইয়ুম খানের পক্ষপাতিত্বের কারণে যদিও নামকরা জমিদার (হোতি’র নওয়াব) নির্বাচিত হতে পারেনি কিন্তু উক্ত প্রদেশের অধিকাংশ সংসদ সদস্য ছিল বড় ভূমির মালিকশ্রেণির। ১৯৫৫ সালের মধ্যবর্তী সময়কার সংসদে পশ্চিম পাকিস্তানের ৩১০ জন সদস্যের মধ্যে ২০০ জন ছিল বড় ভূস্বামী এবং অর্ধডজন শিল্প মালিক। এছাড়াও পশ্চিম পাকিস্তানের দ্বিতীয় আইন সভার ৪০ জন সভ্যের ২৮ জন ছিল ভূস্বামী গোষ্ঠীর সদস্য। কী কেন্দ্রীয় কী প্রাদেশিক সর্বত্রই জমিদার-ভূস্বামী-মালিক শ্রেণির সংখ্যাগরিষ্ঠ আধিপত্যের কারণে ভূমি সংস্কারের মতো কোন উদ্যোগ সফলতার মুখ দেখতে পারেনি।৪৫

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার লড়াইয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যবসায়ী শিল্পপতি-জমিদার শ্রেণির হাতে যেমন ক্ষমতা কুক্ষিগত হয় অপরদিকে পূর্ব বাঙলায় ‘জমিদারী ভূমি অধিগ্রহণ আইন, ১৯৫১’ জারী করে জমিদারী প্রথার বিলোপ করার ঘোষণা দেওয়া হলেও শক্তিশালী কোন ব্যবসায়ী গ্রুপ বা শ্রেণির উপস্থিতি না থাকায় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের হাতে।৪৬

অন্যদিকে, পাকিস্তানের পূর্বতন পাঞ্জাব প্রদেশে আবাদযোগ্য কৃষি জমির প্রায় এক পঞ্চমাংশ জমির মালিকানা ০.৫% মালিকের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। পূর্বতন সিন্ধু প্রদেশের প্রায় ৩০% দখলকৃত (জনপ্রতি ৫০০ একরেরও বেশী) জমি প্রায় ১% এরও কম মালিকের হাতে জমা হয়। উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে প্রায় ৮ ভাগের ১ ভাগ মালিকানা ০.০১% মালিকের দখলে ছিল; যাদের প্রত্যেকের জমির পরিমাণ ছিল ৫০০ একরেরও বেশী। পুরো পাকিস্তানকে বিবেচনা করলে, জনপ্রতি ৫০০ একরের উপরে জমির মালিকানা যাদের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল সে সমস্ত ভূমি মালিকদের সংখ্যা ছিল সর্বসাকূল্যে ৬,০০০ জন।৪৭ ১৯৭০ পর্যন্ত প্রায় ‘৭০% কৃষি জমির মালিকানা প্রায় ৫% ভূমি মালিকদের (জমিদার-ভূস্বামী-পীর-জোতদার-জেনারেল) হাতে’৪৮কেন্দ্রীভূত হয়। ভূমির মালিক এই শ্রেণির হাতে জমি-অর্থনীতি যেমন কেন্দ্রীভূত হয় তেমনি, পাকিস্তানের রাজনৈতিক দিশাও নির্ধারিত হতো তাদের দ্বারা।

পুরো পাকিস্তানকে বিবেচনা করলে, জনপ্রতি ৫০০ একরের উপরে জমির মালিকানা যাদের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল সে সমস্ত ভূমি মালিকদের সংখ্যা ছিল সর্বসাকূল্যে ৬,০০০ জন।৪৭ ১৯৭০ পর্যন্ত প্রায় ‘৭০% কৃষি জমির মালিকানা প্রায় ৫% ভূমি মালিকদের (জমিদার-ভূস্বামী-পীর-জোতদার-জেনারেল) হাতে’৪৮কেন্দ্রীভূত হয়। ভূমির মালিক এই শ্রেণির হাতে জমি-অর্থনীতি যেমন কেন্দ্রীভূত হয় তেমনি, পাকিস্তানের রাজনৈতিক দিশাও নির্ধারিত হতো তাদের দ্বারা।

পাকিস্তানের পূর্বাংশে মূলধারার যে রাজনৈতিক দলগুলো ছিল তাদের বেশীরভাগ নেতৃত্ব ছিল অভিজাত শ্রেণি এবং মধ্যবিত্ত ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে গঠিত। ব্যতিক্রম ছিলেন মাওলানা ভাসানী। রাজনৈতিক ক্ষমতার্জনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিত্ত অর্জন বা সম্পদ বৃদ্ধি (এটি যখন প্রচলিত রীতি-নীতি) কখনোই তার মূল মনোযোগের বিষয় ছিল না। কৃষকের স্বার্থ রক্ষার্থে তিনি আমৃত্যু লড়াই করে গেছেন।

এছাড়া মুসলিম লীগের মধ্যে প্রধানত তিনটি ধারা ছিল। ঢাকা বা নাজিমুদ্দিন অংশ (খাজা নাজিমুদ্দিন এবং আকরাম খাঁ’র নেতৃত্বে) মূলত জমিদারী স্বার্থ রক্ষা করত এবং প্রথাগত রক্ষণশীল অংশ হিসেবে পরিচিত ছিল। গ্রামাঞ্চলে তাদের সমর্থন ছিল খুব সামান্য পরিমাণে। সোহরাওয়ার্দী অংশ ছিল মূলত কলকাতা এবং নগরকেন্দ্রিক। ছাত্র এবং শহরের শিক্ষিত অংশের মধ্যে তাদের সমর্থন ছিল বেশী। উল্লেখিত দুই অংশের মনোজগৎ গঠিত হয়েছিল বৃটিশ শিক্ষা এবং দৃষ্টিভঙ্গীর প্রভাবে। সে তুলনায় এ.কে. ফজলুল হকের অংশ ছিল গ্রামভিত্তিক অভিজাতদের সমন্বয়ে গঠিত।

ফজলুল হকদের সাংগঠনিক শক্তির জায়গাটিতে যদিও দূর্বলতা ছিল কিন্তু ঋণ শালিশী বোর্ড গঠন এবং জমিদারী প্রথা বাতিলের মতো মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার কর্মসূচির কারণে গ্রামাঞ্চলে তাদের জনপ্রিয়তা ছিল। বাহ্যিক কিছু বিরোধিতা থাকলেও উল্লেখিত ‘তিনটি গ্রুপের সাথে মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় অভিজাত নেতৃত্বের পারস্পরিক ঘনিষ্ট সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল’।৪৯ বিরোধের চাইতে শ্রেণিগত নৈকট্য বেশি থাকার ফলে ভূমির মালিকানার গুণগত বণ্টন যে কারণে কখনোই সঠিক পথে এগুতে পারেনি।

অভিজাত মালিক শ্রেণির এই নৈকট্যই ‘ইসলামিক প্রজাতান্ত্রিক (রিপাবলিক) পাকিস্তান’কে নির্মাণ করেছিল। যে রাষ্ট্রটি জন্মের পর থেকেই বিকলাঙ্গ হয়ে পথ চলা শুরু করে। বৃটিশ শাসন থেকে বেরিয়ে ইঙ্গ-মার্কিন প্রভাবাধীনে পরিচালিত এই রাষ্ট্র বৈদেশিক সাহায্যের নামে ঋণের বোঝা নিয়ে বেড়ে উঠতে থাকে। শ্রেণিগত এই নৈকট্যের মাধ্যমেই রাষ্ট্রের সামরিকীকরণ জোরদার করা হয়। সামরিক একনায়কতন্ত্র তার শাখা-প্রশাখা নিয়ে বেড়ে ওঠে। এই নৈকট্যই ভিত্তিমূলক শিল্প স্থাপনের পরিবর্তে পণ্যের কাঁচামাল রপ্তানী এবং উৎপাদনী যন্ত্রপাতির আমদানীভিত্তিক অর্থনীতির গতিধারা তৈরী করে। মূলধারার নেতৃত্বের এই নৈকট্যই ‘জনগণতান্ত্রিক’ ভূমি সংস্কারের পরিবর্তে ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর হাতে জমির কেন্দ্রিকরণ ঘটায়। শ্রেণিগত এই নৈকট্যের ফলেই কৃষক তাঁর ফসলের ন্যায্য দাম পায়নি; উদ্বৃত্ত মূল্য উৎপাদনের প্রধান উৎস শ্রমিক শ্রেণিবাঁচার মতো ন্যূনতম মজুরীর প্রশ্নে তাঁর পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অভিজাত মালিক শ্রেণির শ্রেণিগত এই নৈকট্যের কারণে বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করে পাকিস্তানের উভয় অংশে এবং সংখ্যাধিক্য মানুষের সিংহভাগ সম্পদ ‘বাইশ পরিবারে’র হাতে কেন্দ্রীভূত হয়।

(চলবে)

মেহেদী হাসান: লেখক, গবেষক। ইমেইল:mehedihassan1@gmail.com

তথ্যসূত্র:

  1. শিরোনাম: Warren Buffett ‘extraordinary’ for acknowledging class war by the rich: Kurt Andersen. Max Zahn with Andy Serwer, October 7, 2020, https://finance.yahoo.com/news/warren-buffett-extraordinary-for-acknowledging-class-war-by-the-rich-kurt-andersen-132343751.html.
  2. Hassan Gardezi & Jamil Rashid (Ed) Pakistan: The Unstable State, 1983, Vanguard Books Ltd. Pakistan, page-25.
  3. – Ibid – page-26.
  4. – Ibid – page-24.
  5. Ernest Mandel: Marxist Economic Theory, Volume Two, Translated by Brian Pearce, New York and, 1962, page. 499-500.
  6. Hassan Gardezi & Jamil Rashid (Ed) Pakistan: The Unstable State, 1983, Vanguard Books Ltd. Pakistan, page-47.
  7. Talukder Maniruzzaman, Group Interests in Pakistan Politics, 1947-1958, Source: Pacific Affairs, Vol. 39, No. 1/2 (Spring – Summer, 1966), pp. 83-98, Published by: Pacific Affairs, University of British Columbia, page:92, http://www.jstor.org/stable/2755183.
  8. Hassan Gardezi & Jamil Rashid (Ed) Pakistan: The Unstable State, 1983, Vanguard Books Ltd. Pakistan, page-32.
  9. Talukder Maniruzzaman, Group Interests in Pakistan Politics, 1947-1958, Source: Pacific Affairs, Vol. 39, No. 1/2 (Spring – Summer, 1966), pp. 83-98, Published by: Pacific Affairs, University of British Columbia, page:89, http://www.jstor.org/stable/2755183.
  10. Rounaq Jahan: Pakistan: failure in national integration, Oxford University Press, 1973. page-27.
  11. – Ibid –
  12. Mazhar Abbas, Abdul Majeed Nadeem, Bilal Hassan, Muhammad Zahid Rafique & Shaoan Huang: A study on historical development of landownership and landed aristocracy in Pakistan, Pacific Rim Property Research Journal, 2016, VOL. 22, NO. 3, 217–230, page-225, http://dx.doi.org/10.1080/14445921.2016.1235756.
  13. – Ibid –
  14. Ayesha Siddiqa: Military Inc. Inside Pakistan’s Military Economy, Oxford University Press, 2007, Page-174.
  15. – Ibid –
  16. – Ibid –page-181.
  17. – Ibid –
  18. – Ibid –page-183.
  19. – Ibid –
  20. – Ibid –
  21. – Ibid –page-184.
  22. – Ibid –
  23. – Ibid – page: 184-185.
  24. – Ibid – page-184.
  25. Nazrul Islam: Pakistan A study in national integration, Vanguard Books Pvt Ltd, Pakistan, page-234.
  26. – Ibid –page-138.
  27. Hassan Gardezi & Jamil Rashid (Ed) Pakistan: The Unstable State, 1983, Vanguard Books Ltd. Pakistan, page-31.
  28. – Ibid –page: 34-35.
  29. Nazrul Islam: Pakistan A study in national integration, Vanguard Books Pvt Ltd, Pakistan, page-9,10.
  30. Nazrul Islam: Pakistan A study in national integration, Vanguard Books Pvt Ltd, Pakistan, page-10এবং Rounaq Jahan; Pakistan: failure in national integration, Oxford University Press, 1973. page-19.
  31. Talukder Maniruzzaman: Group Interests in Pakistan Politics, 1947-1958, Source: Pacific Affairs, Vol. 39, No. 1/2 (Spring – Summer, 1966), pp. 83-98, Published by: Pacific Affairs, University of British Columbia Stable, URL: http://www.jstor.org/stable/2755183.
  32. Nazrul Islam: Pakistan A study in national integration, Vanguard Books Pvt Ltd, Pakistan, page-10 এবং Rounaq Jahan; Pakistan: failure in national integration, Oxford University Press, 1973, page-15.
  33. Rounaq Jahan: Pakistan: failure in national integration, Oxford University Press, 1973, page: 14-15.
  34. Nazrul Islam: Pakistan A study in national integration, Vanguard Books Pvt Ltd, Pakistan, page: 10-11.
  35. Hassan Gardezi & Jamil Rashid (Ed) Pakistan: The Unstable State;, 1983, Vanguard Books Ltd. Pakistan, page-46.
  36. – Ibid – page:44-45.
  37. – Ibid – page-45.
  38. – Ibid –
  39. David Lockwood: The Indian Bourgeoisie: A Political History of the Indian Capitalist Class in the Early Twentieth Century, Bloomsbury Publishing Plc, London,  New York,  Oxford, New Delhi, Sydney, 2012, page: 148.
  40. Ayesha Siddiqa, Military Inc. Inside Pakistan’s Military Economy, Oxford University Press, 2007, Page-200.
  41. Nazrul Islam: Pakistan A study in national integration, Vanguard Books Pvt Ltd, Pakistan, page: 15-16.
  42. Khalid bin Sayeed, Pakistan: The Formative Phase 1857-1948, Oxford University Press, Pakistan, page-210.
  43. – Ibid –page-207.
  44. – Ibid –page-208.
  45. Talukder Maniruzzaman, Group Interests in Pakistan Politics, 1947-1958, Source: Pacific Affairs, Vol. 39, No. 1/2 (Spring – Summer, 1966), pp. 83-98, Published by: Pacific Affairs, University of British Columbia, page:85-86, http://www.jstor.org/stable/2755183.
  46. – Ibid –page-84.
  47. – Ibid –page-85.
  48. Mazhar Abbas, Abdul Majeed Nadeem, Bilal Hassan, Muhammad Zahid Rafique & Shaoan Huang; A study on historical development of landownership and landed aristocracy in Pakistan, Pacific Rim Property Research Journal, 2016 VOL. 22, NO. 3, 217–230, page-226, http://dx.doi.org/10.1080/14445921.2016.1235756 এবং Ayesha Siddiqa: Military Inc. Inside Pakistan’s Military Economy, Oxford University Press, 2007, Page-200.
  49. Rounaq Jahan: Pakistan: failure in national integration, Oxford University Press, 1973. page-39.
Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •