সর্বজনের বিশেষজ্ঞ: অধ্যাপক মো. নুরুল ইসলাম

সর্বজনের বিশেষজ্ঞ: অধ্যাপক মো. নুরুল ইসলাম

কল্লোল মোস্তফা

বাংলাদেশে সর্বজনের বিশেষজ্ঞ খুব দুর্লভ। উচ্চ ডিগ্রিধারী বিশেষজ্ঞ নামে আমরা যাদের দেখি তাদের অধিকাংশ আসলে কোনো না কোনো আন্তর্জাতিক পুঁজি লগ্নী প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক বা করপোরেট প্রতিষ্ঠান বা প্রকল্পের সাথে যুক্ত। কোম্পানি বা মুনাফালোভী তৎপরতা কিংবা তাদের পৃষ্ঠপোষকদের সাথে কোনো বিশেষজ্ঞ যখন যুক্ত থাকেন, বা অর্থের বিনিময়ে তাদের সেবা দান করতে নিয়োজিত হন তখন তার ভূমিকা থাকে কর্মচারির, বিশেষজ্ঞ হিসেবে স্বাধীন ভূমিকা পালনের কোনো সুযোগ তাদের থাকে না। সর্বজনের স্বার্থ, দেশের স্বার্থ বিবেচনা, আত্মমর্যাদাবোধ, নৈতিক অঙ্গীকার থেকে নিজের জ্ঞান বুদ্ধি দক্ষতাকে কাজে লাগানোর কোনো আগ্রহ বা তাগিদ তাঁদের মধ্যে দেখা যায় না। দেশ ও মানুষের ক্ষতি করার ক্ষমতাও এদের অনেক বেশি। বাংলাদেশে ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প, গ্যাস সম্পদ নিয়ে নানা চুক্তি, রামপাল প্রকল্প ইত্যাদি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা পর্যালোচনা করলে এদের চেনা যাবে। এই বাস্তবতায় ডক্টর নূরুল ইসলামের মতো মানুষ এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম এবং জাতীয় ভরসা। তাঁর এবং তাঁর মতো মানুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই লেখা।

বিশেষ একটি প্রয়োজনে কিছুদিন আগে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. নুরুল ইসলামের কাছে ইমেইল করে জ্বালানি বিষয়ে বিশেষত বিবিয়ানার গ্যাস রপ্তানি, ফুলবাড়ী উন্মুক্ত খনন প্রকল্প, কনকো ফিলিপসের সঙ্গে উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি ইত্যাদি প্রসঙ্গে তাঁর পুরোনো লেখাগুলোর কপি চাই। জবাবে উনি দুঃখ প্রকাশ করে জানান, ওনার কাছে লেখাগুলোর কোনো কপি সংরক্ষিত নেই। সেইসঙ্গে অনেকটা স্বগতোক্তি করে বলেন: ‘যখন আমি পেছন ফিরে তাকাই, ভাবি, কেমন করে আমি ওই লেখাগুলো লিখেছিলাম এবং সেগুলোর প্রভাবই বা কী ছিল?’

জবাবে লিখেছিলাম, “আমি মনে করি, তেল-গ্যাস কমিটির কথা বাদ দিলে একজন শ্রদ্ধেয় ও গ্রহণযোগ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে আপনার লেখা, বিশ্লেষণ, বক্তৃতা, কলাম এশিয়ার এনার্জি কর্তৃক ফুলবাড়ীর কয়লা লুণ্ঠন কিংবা প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানির বিরুদ্ধে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশের বিদ্যমান পরিস্থিতি এবং একাডেমিয়ার সংস্কৃতি বিবেচনায় এগুলো মোটেই সহজ কোনো কাজ ছিল না। এ কারণেই ‘সর্বজনের বিশেষজ্ঞ’ হিসেবে আপনার ভূমিকার মূল্যায়ন করা জরুরি। আপনি আমাদের সবার অনুপ্রেরণা।”

সত্যিকার অর্থেই পেছন ফিরে তাকালে অধ্যাপক মো. নুরুল ইসলামের কাজগুলোকে বিস্ময়কর মনে হয়। জ্বালানি খাতে এমন একজন বিশেষজ্ঞ খুঁজে পাওয়া সবসময়ই কঠিন, যিনি একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন, সরকারের বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী কাজে অংশ নিচ্ছেন আবার অন্যদিকে সরকারেরই বিভিন্ন পদক্ষেপের স্পষ্ট সমালোচনা করে সংবাদপত্রে কলাম লিখছেন, গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন, জাতীয় কমিটির সভায় আলোচনা করছেন, মূল প্রবন্ধ পাঠ করছেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি বিশেষ কোনো রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন কি না, তা আমার জানা নেই। কিন্তু বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের সঙ্গে সততা, দেশপ্রেম ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা মানুষকে কোন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্রোপ্রিয়েট টেকনোলজির অধ্যাপক (অব.) মো. নুরুল ইসলাম।

বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের সঙ্গে সততা, দেশপ্রেম ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা মানুষকে কোন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্রোপ্রিয়েট টেকনোলজির অধ্যাপক (অব.) মো. নুরুল ইসলাম।

শুধু বিদেশি কোম্পানির লুণ্ঠনের হাত থেকে জাতীয় সম্পদ রক্ষার প্রশ্নেই নয়, সেইসঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন শ্রেণির মাঝে জ্বালানির বণ্টনগত অসমতার দিকটি নিয়েও তিনি সোচ্চার। যে গভীর দরদ নিয়ে তিনি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জ্বালানি সমস্যাকে দেখেছেন, তা সমকালীন অনেক বিশেষজ্ঞের ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায় না। জ্বালানি সমস্যা: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত (গণপ্রকাশনী, ২০০১) শীর্ষক পুস্তকে তিনি লিখেছিলেন: ‘বাংলাদেশে টেকসই জ্বালানি পরিকল্পনা ও উন্নয়নের একটি নাজুক দিক হচ্ছে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ন্যূনতম জ্বালানির প্রয়োজন মেটানোর জন্য সাহায্য ও সহযোগিতার অভাব।’ শহরের উচ্চ আয়ভুক্ত পরিবারের অপেক্ষাকৃত কম দামের এবং উন্নতমানের জ্বালানি (যেমন: গ্যাস ও বিদ্যুৎ) ব্যবহার এবং অন্যদিকে, নিম্ন আয়ভুক্ত পরিবারের অপেক্ষাকৃত বেশি দামের এবং নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহারের (যেমন: জ্বালানি কাঠ, গোবর, কেরোসিন ইত্যাদি) বিষয়টি তাঁকে সবসময় পীড়া দিয়েছে। তিনি লিখেছেন: ‘যেখানে গরিব পরিবারের সদস্যরা তাদের স্বল্প আয় দিয়ে তাদের বাঁচার জন্য ন্যূনতম খাদ্য ‌ক্যালরির চাহিদা মেটাতে পারে না, সেই আয়ের একটি বড় অংশ যখন জ্বালানির জন্য ব্যয় করা হয়, তখন তাঁদের পক্ষে প্রয়োজনীয় পরিমাণে খাদ্য ক্রয় করা সম্ভব হয় না।’ গবেষণাকর্মের সূত্রে তিনি দরিদ্র মানুষের জ্বালানি সমস্যার নানান ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন, সেসব ঘটনা যে তাঁকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জ্বালানি সমস্যা সমাধানের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করতে প্রেরণা জুগিয়েছে, সেটা তিনি নিজেই তাঁর পুস্তকে লিখেছেন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জ্বালানি সংকট সম্পর্কে তার মনোভাব যে ধরনের ঘটনা পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে সেরকম কিছু দৃষ্টান্ত তার জবানিতেই জানা যাক:

‘ইডেন কলেজের দেওয়ালে একজন বয়স্ক মহিলা গোবরের চটা শুকাচ্ছিলেন। লেখকের ধারণা ছিল যে, মহিলা তার নিজের রান্নার জ্বালানির জন্য শুকনা গোবর ব্যবহার করেন। একদিন দেখা গেল, মহিলা বস্তাভরে শুকনা গোবর অন্য একজন মহিলার কাছে বিক্রি করছেন। প্রথম বিক্রেতা মহিলাকে গোবর বিক্রির কারণ জিজ্ঞাসা করতেই তিনি বলেছিলেন, বিক্রির টাকা দিয়ে খাবার কিনবেন। পরবর্তী প্রশ্ন ছিল: তিনি নিজে কী দিয়ে রান্না করেন? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, পলাশীর মোড়ে ডাস্টবিন থেকে কিছু দাহ্য পদার্থ সংগ্রহ করে শুকিয়ে তা দিয়ে রান্না করেন। একটু দূরেই শুকানোর অপেক্ষায় বিছিয়ে রাখা তার জ্বালানির নমুনা চোখে পড়েছিল, দেখে খুব কষ্ট লেগেছিল। তাকে অনুসরণ করে তার ঘরে গিয়ে দেখা গিয়েছিল, তার চলতি বেলার রান্নার জ্বালানি ছিল গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি থেকে ফেলে দেওয়া সিনথেটিক কাপড়ের ছোট ছোট টুকরা। আগুনের তাপে কাপড়ের টুকরাগুলো পুড়ে যে দুর্গন্ধ হচ্ছিল, তাতে লেখকের পক্ষে সেখানে বেশি সময় দাঁড়ানো সম্ভব ছিল না। যে মহিলা বস্তায় গোবর কিনছিলেন, তাকে গোবর কেনার কারণ জিজ্ঞাসা করায় বলেছিলেন, লাকড়ির চেয়ে খরচ কম পড়ে, তাই তিনি শুকনো গোবর দিয়ে রান্না করেন। তিনি কী কাজ করেন–জিজ্ঞাসা করায় বলেছিলেন, ছাদ পেটানোর সর্দারনির কাজ করেন। প্রথম জীবনে কী করতেন–জানতে চাইলে জানালেন, নরসিংদীতে কাপড় বুনতেন। বয়সের ভারে চোখের জ্যোতি কমে যাওয়ায় কাপড় বোনা ছেড়ে ছাদ পেটানোর কাজ ধরেছেন।

গ্রামের এক গরিব পরিবারে এক মহিলাকে দেখা গিয়েছিল, তিনি কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচিতে পাওয়া গম কোনোমতে চুলায় ভেজে, পাটায় পিষে, পানি দিয়ে গুলিয়ে নিজে খাচ্ছেন ও বাচ্চাদের খাওয়াচ্ছেন। গম থেকে আটা করে রুটি বানিয়ে খাওয়ার সময়, সামর্থ্য ও জ্বালানি কোনোটাই তার ছিল না।…

বারবার চুলা জ্বালালে ও নেভালে অনেক জ্বালানি খরচ হয়। সে কারণে অনেক গরিব পরিবারকে জ্বালানি বাঁচানোর জন্য এক বেলা রান্না করে তিন বেলা খেতে দেখা গিয়েছে।…

ভিক্ষার অভাব দুর্ভিক্ষ শব্দটি বাংলা ভাষায় সাধারণত খাদ্যের অভাবকে বোঝায়। জ্বালানির অভাবে যদি খাদ্য রান্না না-করা যায়, তবে তাকে এক শব্দে কী বলা হবে, তা জানা নেই। তবে তাদের যে অভাব প্রত্যক্ষ করা গিয়েছে, তা লেখকের মনে গভীর দাগ কেটেছে।”

প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অধ্যাপক নুরুল ইসলামের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল না। ওনার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় ২০০৯ সালে রপ্তানিমুখী উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি (পিএসসি) নিয়ে এক আলোচনা সভায়। সেখানে তাঁর উপস্থিতিতে তাঁরই লেখার সমালোচনা করে কিছু কথা বলেছিলাম। আলোচনা শেষ হওয়ার পর তিনি কাছে ডেকে নিয়ে ওনার লেখা সিরিয়াসলি পড়ে সমালোচনা করেছি–এজন্য বেশ তারিফ করেছিলেন। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ ও মতামতের জন্য তাঁর কাছে গিয়েছি, কথা প্রসঙ্গে জেনেছি বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী কাজে অংশ নিয়ে দেশের ও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে তাঁকে কোম্পানি ও কোম্পানির ভাড়াটে বিশেষজ্ঞদের নানান অসহযোগিতা ও বাধা মোকাবিলা করতে হয়েছে।

শহরের উচ্চ আয়ভুক্ত পরিবারের অপেক্ষাকৃত কম দামের এবং উন্নতমানের জ্বালানি (যেমন: গ্যাস ও বিদ্যুৎ) ব্যবহার এবং অন্যদিকে, নিম্ন আয়ভুক্ত পরিবারের অপেক্ষাকৃত বেশি দামের এবং নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহারের (যেমন: জ্বালানি কাঠ, গোবর, কেরোসিন ইত্যাদি) বিষয়টি তাঁকে সবসময় পীড়া দিয়েছে।

অধ্যাপক মো. নুরুল ইসলামের লেখা বই “জ্বালানি সমস্যা: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত” এর প্রচ্ছদ। বইটি প্রকাশিত হয় গণপ্রকাশনী থেকে, ডিসেম্বর ২০০১ এ।

এশিয়া এনার্জি কোম্পানি (জিসিএম) শুরু থেকেই ফুলবাড়ী উন্মুক্ত কয়লা খনি প্রকল্পকে বিদেশি বিনিয়োগ, রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ইত্যাদি নানান কথা বলে শুধু ফুলবাড়ী নয়, গোটা উত্তরবঙ্গ এমনকি সারা বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য এক প্রকল্প হিসেবে হাজির করে। কোম্পানির ভাড়াটে বিশেষজ্ঞদের এই অপপ্রচার যুক্তিতর্ক তথ্য দিয়ে মোকাবিলা করছিল স্থানীয় জনগণ ও তেল-গ্যাস কমিটি। এরকম একটা পরিস্থিতিতে অধ্যাপক নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে ১৭ নভেম্বর ২০০৫-এ সরকার কর্তৃক গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি এশিয়া এনার্জির ফুলবাড়ী উন্মুক্ত খনন প্রকল্পের আইনগত, কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিক বিশ্লেষণ করে ২০০৬ সালের শেষদিকে যে সুপারিশ করে, তা গোটা প্রকল্পকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে ফুলবাড়ীর জনগণ ও জাতীয় কমিটি আন্দোলনকে আরো শক্তিশালী করে। নুরুল ইসলাম কমিটির রিপোর্টে কয়লা উত্তোলনে এশিয়া এনার্জির কোনো পূর্বাভিজ্ঞতা না-থাকা, দেশের প্রচলিত খনি আইন ভঙ্গ, উন্মুক্ত খননের ফলে ৫০ হাজার মানুষের উচ্ছেদ এবং বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে খনি এলাকার চারদিকে ৩১৪ বর্গকিমি. ভূমি ও সেখানে বসবাসকারী দুই লাখ ২০ হাজার মানুষের জীবনযাত্রার ক্ষতি, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে ২৬.৪ বর্গকিমি. এলাকার কৃষিজমিতে ফসল উৎপাদন চিরতরে ব্যাহত হওয়া ইত্যাদি কারণ উল্লেখ করে এশিয়া এনার্জি কর্তৃক দাখিলকৃত প্রকল্প প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য নয় বলে সুস্পষ্ট মতামত দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো প্রকল্প গ্রহণের জন্য বিবেচ্য বিষয় সম্পর্কে বলা হয়: ‘শুধু প্রযুক্তিগত ও কারিগরি সম্ভাব্যতার ভিত্তিতে বিবেচনা না-করে বাংলাদেশে খনি এলাকার লোকসংখ্যার ঘনত্ব ও আর্থসামাজিক অবস্থা এবং বেসিন এলাকার পরিবেশগত বিষয়সমূহ এবং সর্বোপরি ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের স্বেচ্ছায় প্রদত্ত সম্মতি পর্যালোচনা করে যথোপযুক্ত পদ্ধতি নির্বাচন করা উচিত হবে।’

নুরুল ইসলাম কমিটির রিপোর্টে কয়লা উত্তোলনে এশিয়া এনার্জির কোনো পূর্বাভিজ্ঞতা না-থাকা, দেশের প্রচলিত খনি আইন ভঙ্গ, উন্মুক্ত খননের ফলে ৫০ হাজার মানুষের উচ্ছেদ এবং বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে খনি এলাকার চারদিকে ৩১৪ বর্গকিমি. ভূমি ও সেখানে বসবাসকারী দুই লাখ ২০ হাজার মানুষের জীবনযাত্রার ক্ষতি, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে ২৬.৪ বর্গকিমি. এলাকার কৃষিজমিতে ফসল উৎপাদন চিরতরে ব্যাহত হওয়া ইত্যাদি কারণ উল্লেখ করে এশিয়া এনার্জি কর্তৃক দাখিলকৃত প্রকল্প প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য নয় বলে সুস্পষ্ট মতামত দেওয়া হয়।

শুধু ফুলবাড়ী প্রকল্পই নয়, বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষায় বহুদিন ধরেই বিদেশি কোম্পানিবান্ধব কয়লানীতি তৈরির প্রচেষ্টা চলেছে। সেই প্রচেষ্টায় অধ্যাপক নুরুল ইসলাম কীভাবে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, সেটা তাঁর নিজের লেখা থেকেই দেখা যাক:

‘কোল পলিসির জন্ম একটা সন্দেহের মধ্যদিয়ে। এটা করা হলো আইআইএফসি নামের একটা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ তাদেরকে কনসালট্যান্ট নিয়োগ দিয়ে দ্রুত কোল পলিসি প্রণয়ন করার দায়িত্ব দিল।

১ম সংস্করণ (১ ডিসেম্বর ২০০৫) এবং ২য় সংস্করণে (২৩ জানুয়ারি ২০০৬) লিখে দেওয়া হলো যে, ২০১১ সালে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে কয়লা তোলা বন্ধ করা হবে। ওই খনি থেকে ভারতের টাটা কোম্পানি ২০১০ সাল থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তুলবে। এশিয়া এনার্জি ২০০৮ সাল থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ফুলবাড়ী কয়লা খনি থেকে কয়লা তুলবে।…

পরবর্তী সময়ে আইআইএফসি অতি দ্রুততার সঙ্গে কোল পলিসির ৩য় সংস্করণ (১২ মার্চ ২০০৬), ৪র্থ সংস্করণ (৪ এপ্রিল ২০০৬) এবং ৫ম সংস্করণ (৩০ মে ২০০৬) প্রণয়ন করে। বিদেশি প্রাইভেট সেক্টরের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কয়লা উত্তোলন এবং অবাধ রপ্তানির সুযোগ প্রদান করে আইআইএফসি কয়লা নীতির খসড়া প্রণয়ন করে। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ ৩০ মে ২০০৬-এ আইআইএফসি কর্তৃক প্রণীত খসড়া কোল পলিসির ৫ম সংস্করণ অনুমোদনের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠায়।

১ আগস্ট ২০০৬-এ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অফিসের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা আমার অফিসে এসে আমাকে খসড়া কয়লানীতির ৫ম সংস্করণের ওপর মতামত দিতে অনুরোধ করেন।…

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে প্রাপ্ত ২৯ পাতার খসড়া কয়লানীতি লাইন-বাই-লাইন পড়ে টেকসইভাবে দেশের কয়লা উন্নয়নে সহায়তার জন্য বিভিন্ন বিষয়ে আমার লিখিত মতামত ৯ আগস্ট ২০০৬-এ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অফিসে পাঠানোর ব্যবস্থা করলাম। আমার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মতামত ও সুপারিশ ছিল নিম্নরূপ:

* দেশের জ্বালানি চাহিদা নিরূপণ না-করে অবাধ কয়লা রপ্তানির সুযোগ প্রদান করা হলে জ্বালানি নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে।

* জাতীয় জ্বালানি নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কয়লানীতি প্রণয়ন করা উচিত।

* পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের দুর্বলতার সুযোগে বিশ্বব্যাংকের ইকুইটেলিয়াল প্রিন্সিপাল অনুসারে কয়লা উত্তোলনের অনুমতি প্রদান করা হলে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটবে।

* বিদেশি কোম্পানিকে কয়লা উত্তোলনের আগাম অনুমতির ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশে খনি উন্নয়নের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি প্রাক-খনন অবস্থায় পুনরুদ্ধারের পর ফসলের উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করে ওই ভূমি আগের মালিকদের কাছে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা উচিত।

* ভারতের কোল ইন্ডিয়া লিমিটেডের অনুরূপ ‘কোল বাংলা’ নামে সরকারি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে কয়লা উত্তোলনের দায়িত্ব প্রদান করা উচিত।”

অধ্যাপক নুরুল ইসলাম বহুজাতিক শেভরণ কর্তৃক পাইপলাইনে ভারতে গ্যাস রপ্তানির পরিকল্পনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। ২০০৯ সালে যখন মডেল পিএসসি ২০০৮ অনুযায়ী সাগরের গ্যাস বিদেশে রপ্তানির সুযোগ রেখে পিএসসি চুক্তি করা হয়, তখন তিনি লিখেছিলেন:

‘১৯৯৬ থেকে ২০০০ সময়কালে দুটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি বাংলাদেশে মোট তিনটি নতুন গ্যাসক্ষেত্র (সাঙ্গু, বিবিয়ানা ও মৌলভীবাজার) আবিষ্কার করার ফলে মোট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ ৩.৬৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট বৃদ্ধি পায়। আবিষ্কৃত এ গ্যাসটুকু ন্যূনতম সময়ের মধ্যে রপ্তানি করে দ্রুত মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে ওই আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো এবং তাদের শুভানুধ্যায়ী বেশ কিছু বাংলাদেশি এজেন্ট বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে গ্যাস রপ্তানির পক্ষে অনবরত প্রচারণা চালায়। …তখন যদি অতিরিক্ত গ্যাস প্রাপ্তির মিথ্যা প্রচারণা এবং আন্তর্জাতিক চাপের কারণে সরকার ২০ বছরের চুক্তিতে পাইপলাইনের মাধ্যমে তিন টিসিএফ গ্যাস রপ্তানির অনুমতি প্রদান করত, তাহলে বর্তমানে (২০০৯ সালে) দেশে কী ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হতো, তা অনুমান করাও কষ্টকর।’

রপ্তানিমুখী মডেল পিএসসির সমালোচনা করে তিনি লেখেন:

‘১৫.৫.৪ অধ্যায় পড়লে মনে হয়, উৎপাদিত গ্যাসের মালিক কন্ট্রাক্টর (আইওসি); তারা পেট্রোবাংলাকে প্রয়োজনে স্থানীয় ব্যবহারের জন্য গ্যাস সংরক্ষণ করতে দেবে। অনুবাদ করলে বোঝা যায়, যেক্ষেত্রে পেট্রোবাংলা স্থানীয় চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয় পরিবহণব্যবস্থা (পাইপলাইন) স্থাপন করতে পারবে, সেক্ষেত্রে পেট্রোবাংলা তার অংশের প্রফিট গ্যাস রাখার অধিকারপ্রাপ্ত হবে। তবে তা কোনোমতেই মোট মার্কেটেবল গ্যাসের ২০ ভাগের বেশি হবে না। পেট্রোবাংলা ১৯৭৪ সালে আবিষ্কৃত নিকট সমুদ্রে অবস্থিত কুতুবদিয়া গ্যাসক্ষেত্রকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সময়কালে উৎপাদনে এনে সে গ্যাস দেশে ব্যবহারের জন্য পাইপলাইন স্থাপন করতে পারেনি, সেক্ষেত্রে গভীর সমুদ্রে অবস্থিত দূরবর্তী ব্লক থেকে স্থলভাগে গ্যাস পরিবহণের জন্য পাইপলাইন স্থাপন করা পেট্রোবাংলার পক্ষে অসম্ভব বলে প্রতীয়মান হয়। এই অজুহাতে পেট্রোবাংলা তখন ১০০ ভাগ বাজারজাতযোগ্য গ্যাস রপ্তানির অনুমতি দিতে বাধ্য হবে।’

অনেক ক্ষেত্রেই জনগণের পক্ষে বোঝা মুশকিল হয়ে যায়, কোনটা ‘বিশেষজ্ঞ মতামত’ আর কোনটা ‘অর্থে-কেনা মতামত’, কোনটা সর্বজনের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করছে আর কোনটা বিশেষ গোষ্ঠী বা শ্রেণিস্বার্থের। তাছাড়া বিদ্যাজগতে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা হয় যে, কেউ প্রচলিত উন্নয়ন মডেলকে প্রশ্ন করলে বা সর্বজনের স্বার্থে সেটাকে চ্যালেঞ্জ করলে, তাকে উন্নয়নবিরোধী বলে নানাভাবে কোণঠাসা করা হয়। ফলে অনেক বিশেষজ্ঞকে দেখা যায়, সবকিছু জেনে-বুঝেও চুপ করে থাকেন বা তাল মিলিয়ে চলেন।

যেকোনো ধ্বংসাত্মক ও জনস্বার্থবিরোধী প্রকল্প সম্পর্কে ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলা এবং সমালোচকদের মতামতকে গুরুত্বহীন করে তোলার জন্য একটি বহুল ব্যবহৃত কৌশল হলো, প্রকল্পের সপক্ষে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের মতামত হাজির করা। এ জন্য জনগণের মতামতকে প্রভাবিত করতে প্রচারমাধ্যমে একের পর এক এসব বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎকার, মতামত, বিশ্লেষণ ইত্যাদি প্রকাশ করা হতে থাকে। কিন্তু এসব একাডেমিক মতামত ও বিশ্লেষণ যে অনেক সময় বিশেষ শ্রেণি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে গড়ে ওঠে এবং নানান সুবিধার বিনিময়ে কেনাবেচা হয়, তা আড়ালেই থাকে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই জনগণের পক্ষে বোঝা মুশকিল হয়ে যায়, কোনটা ‘বিশেষজ্ঞ মতামত’ আর কোনটা ‘অর্থে-কেনা মতামত’, কোনটা সর্বজনের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করছে আর কোনটা বিশেষ গোষ্ঠী বা শ্রেণিস্বার্থের। তাছাড়া বিদ্যাজগতে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা হয় যে, কেউ প্রচলিত উন্নয়ন মডেলকে প্রশ্ন করলে বা সর্বজনের স্বার্থে সেটাকে চ্যালেঞ্জ করলে, তাকে উন্নয়নবিরোধী বলে নানাভাবে কোণঠাসা করা হয়। ফলে অনেক বিশেষজ্ঞকে দেখা যায়, সবকিছু জেনে-বুঝেও চুপ করে থাকেন বা তাল মিলিয়ে চলেন। এরকম একটা পরিস্থিতিতে অধ্যাপক নুরুল ইসলামের মতো একজন বিশেষজ্ঞ যখন ভয়ভীতি, প্রলোভন সবকিছুকে উপেক্ষা করে নিজে যা সত্য মনে করেন, তা স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেন, বিদ্যায়তনের বাইরেও লেখালেখি, বৃক্ততা, আলোচনা ইত্যাদির মাধ্যমে তা জনগণের সামনে হাজির করেন–ধ্বংসাত্মক ও জনস্বার্থবিরোধী প্রকল্প প্রতিরোধে তার গুরুত্ব ও প্রভাব অপরিসীম। অধ্যাপক নুরুল ইসলাম একজন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাঁর সময়ে গ্যাস রপ্তানি, কয়লানীতি, উন্মুক্ত কয়লা খনন ইত্যাদি গণবিরোধী প্রকল্পের বিরুদ্ধে যেভাবে তার স্পষ্ট মতামত ব্যক্ত করেছেন, নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জন্য লেখালেখি, বক্তৃতা, আলোচনা, সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে সর্বজনের স্বার্থে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে গেছেন, তা বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলনে চিরস্মরণীয় ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

তথ্যসূত্র:

১। প্রফেসর মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম, ‘জ্বালানি সমস্যা: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’, ২০০১, গণপ্রকাশনী, ২০০১, পৃষ্ঠা: ২৯

২। পূর্বোক্ত

৩। পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা: ৩০-৩১

৪। মেসার্স এশিয়া এনার্জি করপোরেশন (বাংলাদেশ) প্রা. লি. (এইসি) কর্তৃক দাখিলকৃত ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পের Feasibility Study Report and Scheme of Development-এর মূল্যায়নের জন্য গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদন, ২০ সেপ্টেম্বর ২০০৬; পৃষ্ঠা: ১৪৩, ১৪৫, ১৪৬

৫। পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা: ১৪৬

৬। কয়লানীতি নিয়ে কিছু কথা : প্রফেসর নুরুল ইসলামের একটি বিবৃতি; ১ জুলাই ২০০৯

৭। ‘পিএসসিতে ৮০ ভাগ রপ্তানির সুযোগ দেশের স্বার্থবিরোধী’, মো. নুরুল ইসলাম, প্রথম আলো, ৭ জুলাই ২০০৯

৮। ‘সাপ্তাহিক’ কর্তৃক ১০ জুলাই ২০০৯-এ বিয়াম ভবনে আয়োজিত তেল, গ্যাস রপ্তানি, পিএসসি ও জনস্বার্থ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় উপস্থাপিত প্রবন্ধ ‘তেল গ্যাস রপ্তানি, উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) ও জনস্বার্থ’

Social Share
  • 874
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    874
    Shares
  •  
    874
    Shares
  • 874
  •  
  •  
  •  
  •  

6 thoughts on “সর্বজনের বিশেষজ্ঞ: অধ্যাপক মো. নুরুল ইসলাম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *