সাম্প্রতিক গণ-আন্দোলনের প্রিজম: রাষ্ট্র বনাম জনগণ

সাম্প্রতিক গণ-আন্দোলনের প্রিজম: রাষ্ট্র বনাম জনগণ

আলমগীর খান

বিশ্বজুড়ে একদিকে যেমন নিপীড়ন শোষণ জাতিবিদ্বেষ সংঘাত সন্ত্রাস বাড়ছে অন্যদিকে তেমনি তার বিরুদ্ধে জনপ্রতিরোধও তৈরি হচ্ছে নানা মাত্রায়। কিন্তু জনপ্রতিরোধ কি লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে বারবার? সাম্রাজ্যবাদী- স্বৈরতন্ত্রী শাসকদের ক্ষমতার খুঁটি কি আরও শক্ত হচ্ছে? নিপীড়নের ব্যবস্থাবলী কি আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে? এর কারণ কী? এবিষয়ে এই লেখায় কিছু প্রশ্ন ও পর্যবেক্ষণ রাখা হয়েছে। আমরা এবিষয়ে আরও লেখা আশা করি।   

সম্প্রতি বিশ্বের মানুষ অনেকগুলো গণ-আন্দোলনের সাক্ষী হয়েছে; কিন্তু খুব কমই এগুলো সাফল্যের মুখ দেখেছে। অতীতে এমন ছিল না। লোকজন তখন বেশ নিরীহ ও নরমসরম ছিল, অকল্পনীয় অত্যাচারেও সাধারণত টুঁ শব্দ করত না। গণপ্রতিবাদ ও প্রতিরোধ কালেভদ্রে ঘটত। তবে যদি একবার জনগণ ফুঁসে উঠত ক্ষমতাসীনদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হতো, সাধারণত তারা আর টিকতে পারত না। বাংলাদেশে আমরাও এমন অপ্রতিরোধ্য গণ-আন্দোলন দেখেছি। ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জেল থেকে মুক্ত করে আনার আন্দোলন লৌহমানব আইয়ুব খানের পতন ঘটিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনল। এই ছিল গণ-আন্দোলনের সাধারণ ধর্ম যা সম্প্রতি কিছু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে এবং বর্তমানে নিয়ম হিসেবে ভালো খাটছে না।

১৯৮৯ সালে তিয়েনয়ানমেন স্কয়ারে ছাত্রগণ-অভ্যুত্থান শেষ হলো চীনের কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে। পরের বছর অবশ্য বাংলাদেশে একটি ছাত্র-আন্দোলনের মুখে ‘নরম একনায়ক’ এরশাদকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের ফল নয়; বরং তিয়েনয়ানমেনের ঘটনাই এখন নিয়ম হিসেবে বেশি কার্যকর। গণ-আন্দোলন হচ্ছে বটে, ক্ষমতাসীনরা যাচ্ছে না–এই হলো সাধারণ চিত্র। সাম্প্রতিক গণ-আন্দোলনে ক্ষমতার ভিত সরে যাওয়ার ঘটনা হয়েছে আরব বসন্তে। ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন, হংকংয়ের আন্দোলন, বেলারুশে গণ-আন্দোলন, ভারতে কৃষকদের প্রতিবাদ ও এখন মিয়ানমারে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে আন্দোলন–এগুলো আজকালের ঘটনা।

বাংলাদেশে আমরাও কিছু গণ-আন্দোলন দেখেছি যেগুলোর ফল আশানুরূপ নয়। দেখেছি শাহবাগ আন্দোলন, কিশোর বিদ্রোহ ও আরও কিছু সাম্প্রতিক আন্দোলন-সংগ্রাম। কিন্তু এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের পর থেকে আর কোনো উল্লেখযোগ্য সফল গণ-আন্দোলন দেখা যায়নি যাতে বহু দলের, গোষ্ঠীর ও মতের মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ ঘটেছে। দেখা যাচ্ছে, এদেশের আন্দোলন-সংগ্রামও বৈশ্বিক গণ-আন্দোলনের পরিবর্তিত বৈশিষ্ট্যের অনুরূপ। যদিও বিশ্বব্যাপী এসব আন্দোলন বৈশ্বিক গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে বহু মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। শেষপর্যন্ত এসবের ফল মোটের ওপর ব্যর্থতায়ই পর্যবসিত হয়েছে, অতীতে যা অকল্পনীয় ছিল।

বর্তমানে এমনটা হচ্ছে কেন? সাম্প্রতিক গণ-আন্দোলনগুলোর রয়েছে কিছু অন্তর্নিহিত সমস্যা ও কিছু বাইরে থেকে আরোপিত। ভেতরের সমস্যা হলো, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অভাব, বৃহৎ দাবির অনুপস্থিতি, ক্ষমতা পরিবর্তনের পরের করণীয় অনির্ধারিত, ডিজিটাল প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতা ইত্যাদি। প্রতিবাদকারীরা সাধারণত দু-একটা বিশেষ সমস্যার সমাধান চায়, ব্যাপক পরিবর্তন নয়। ক্ষমতার পরিবর্তন তারা চাইলেও দাবি করে না। আশা করে যে, ক্ষমতার পরিবর্তনটা ভেতর থেকে ঘটবে, অর্থাৎ তাদের আন্দোলনে উৎসাহিত হয়ে প্রাসাদের মধ্যে থেকে কেউ ক্ষমতাসীনকে সরিয়ে দিক। ক্ষমতার অভ্যন্তরে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিসমূহকে তারা আন্দোলনের মাধ্যমে পরিবর্তন ঘটানোর সবুজ বার্তা ও সেই শক্তিকে নৈতিক সমর্থনের নিশ্চয়তা দেয়। কিন্তু তাদের নিজেদের ক্ষমতা গ্রহণের কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা থাকে না।

দেখা যাক আরববসন্তে কী ঘটেছিল। অনেক সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হয়েছিল সে ওলটপালট করা আন্দোলন। তিউনিশিয়ায় শুরু হয়ে তা লিবিয়া, মিশর, ইয়েমেনসহ অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়ল। আন্দোলনের মুখে বেন আলী, গাদ্দাফি, মুবারক ও আবদুল্লাহ সালেহকে ক্ষমতা ছাড়তে হলো। কিন্তু এসব দেশের কোনোটাই এগোতে পারল না। ফেসবুকবিপ্লব বলে পরিচিত এসব আন্দোলন ফেসবুকের মতোই সাময়িক উত্তেজনা নিরসন করল মাত্র, দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন তো আনলই না; বরং দেশগুলো এক বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে গেল। তিউনিশিয়াই কেবল নিয়মিত গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মতো কিছু অগ্রগতি লাভ করল। অন্যদের বেলায় প্রাসাদের ভেতর ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে মাত্র বা বাহিরের শক্তির নিয়ন্ত্রণ আরোপিত হয়েছে।

রাষ্ট্রের হাতে মানুষকে সার্বক্ষণিক চোখে চোখে রাখার, ভয় দেখানোর ও নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সে প্রযুক্তির ক্ষমতাও প্রতিদিন বেড়ে চলেছে। অন্যদিকে জনগণের সংগঠিত হওয়ার এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আগের চেয়ে কমছে। আর এ কারণে রাষ্ট্র ও জনগণের টানাপোড়েনের সম্পর্কটি আরও খারাপ ও ভারসাম্যহীন হচ্ছে। জনগণের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতা বাড়ছে আর রাষ্ট্রের ওপর থেকে জনগণের নিয়ন্ত্রণ ক্রমে কমছে। সেইসঙ্গে রাষ্ট্র ক্ষুদ্র মুনাফাখোরগোষ্ঠীর খপ্পরে পড়ছে আর জনগণ হারিয়ে যাচ্ছে।

গণ-আন্দোলনের এ চরিত্র পরিবর্তনের কারণ রাষ্ট্রের ও জনগণের আলাদা বিবর্তন। রাষ্ট্র ও জনগণ সবসময় টানাপোড়েনের সম্পর্কে আবদ্ধ। দুয়ের বিকাশ সমান্তরাল হলেও তারা ভিন্ন পথে ও ভিন্ন গতিতে চলে। সাম্প্রতিক দশকগুলোয় রাষ্ট্র বিপুল ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে। সেই তুলনায় জনগণ হয়েছে দুর্বল, অসম ও বিভক্ত। দেশে দেশে এখন জর্জ অরওয়েলের ‘১৯৮৪’-এর বাস্তব মঞ্চায়ন ঘটছে যেখানে শাসকগোষ্ঠী উপন্যাসের বিগ ব্রাদার চরিত্রটির মতো ক্ষমতাবান, অসহিষ্ণু, তদারককারী, নির্যাতক ও নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠছে। রাষ্ট্রের হাতে মানুষকে সার্বক্ষণিক চোখে চোখে রাখার, ভয় দেখানোর ও নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সে প্রযুক্তির ক্ষমতাও প্রতিদিন বেড়ে চলেছে। অন্যদিকে জনগণের সংগঠিত হওয়ার এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আগের চেয়ে কমছে। আর এ কারণে রাষ্ট্র ও জনগণের টানাপোড়েনের সম্পর্কটি আরও খারাপ ও ভারসাম্যহীন হচ্ছে। জনগণের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতা বাড়ছে আর রাষ্ট্রের ওপর থেকে জনগণের নিয়ন্ত্রণ ক্রমে কমছে। সেইসঙ্গে রাষ্ট্র ক্ষুদ্র মুনাফাখোরগোষ্ঠীর খপ্পরে পড়ছে আর জনগণ হারিয়ে যাচ্ছে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দুয়ের বিকাশের এই আলাদা পথকে বাস্তবায়ন ও দ্রুততর করছে। এর বাইরেও রাষ্ট্রগুলো পোষে বিশেষ বিশেষ বাহিনী। তারা নির্যাতনের মাধ্যমে ব্যাপক ভয় উৎপাদন করে মাঠের কাজ সারে। গণমাধ্যমসমূহকে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে গিলে খেতে থাকে। তখন আর তাদের স্বাধীন চরিত্র বলে কিছু থাকে না। তাদের কণ্ঠ হয় প্রকারান্তরে রাষ্ট্রেরই। এভাবে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কেবল একটি কণ্ঠই শোনা যায়, রাষ্ট্রের। অথবা বিভিন্ন কণ্ঠে কেবল এক রাষ্ট্রই কথা বলে, আর কেউ নয়। প্রকৃত ভিন্নমত বলে আর কিছু বেঁচে থাকে না। গণতন্ত্রের পোশাকপরা একনায়কতন্ত্র আগের দিনের অন্য যেকোনো একনায়কতন্ত্রের চেয়ে অনেক ঝামেলামুক্তভাবে রাষ্ট্র চালাতে ও প্রায় যেকোনো কিছু করতে পারে। এমনকি গণ-আন্দোলনের গতিপ্রকৃতিও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তার আয়ুষ্কালও নির্ভর করছে ক্ষমতাসীন সরকারের ইচ্ছের ওপর। আর তাই ক্ষমতাসীন শক্তি এখন গণ-আন্দোলনকে তত ভয় পায় না, যতটা পায় তার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ওঠার ওপর। যখনই কোনো আন্দোলন ক্ষমতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখনই তারা ডিজিটাল প্রযুক্তির সুইচ অফ ও নির্যাতন-মেশিনের সুইচ অন করে দিতে পারে। গত দু-বছর ধরে বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯-ও ক্ষমতাসীনদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে। লকডাউন, সামাজিক দূরত্ব ইত্যাদি কেবল ভাইরাসের বিস্তার রোধেই সাহায্য করেনি, আন্দোলনকে দমিয়ে রাখতেও সাহায্য করেছে। তবুও গত দু-বছরে বহু দেশে গণ-আন্দোলনের জোয়ার বয়ে গেছে।

যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কেবল একটি কণ্ঠই শোনা যায়, রাষ্ট্রের। অথবা বিভিন্ন কণ্ঠে কেবল এক রাষ্ট্রই কথা বলে, আর কেউ নয়। প্রকৃত ভিন্নমত বলে আর কিছু বেঁচে থাকে না। গণতন্ত্রের পোশাকপরা একনায়কতন্ত্র আগের দিনের অন্য যেকোনো একনায়কতন্ত্রের চেয়ে অনেক ঝামেলামুক্তভাবে রাষ্ট্র চালাতে ও প্রায় যেকোনো কিছু করতে পারে। এমনকি গণ-আন্দোলনের গতিপ্রকৃতিও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

এই যে রাষ্ট্র ক্রমে শক্তিশালী ও তুলনায় জনগণ দুর্বল হয়ে পড়ছে এ চিত্র স্থানিক নয়, বৈশ্বিক অর্থাৎ সবখানেই হচ্ছে। যেমন, সবকিছুই এখন বৈশ্বিক। তবে বৈশ্বিকতার মাত্রায় বিভিন্ন কিছুর আকাশ-পাতাল পার্থক্য আছে। যেমন, পণ্য ও শ্রমিকের বৈশ্বিকতায় পার্থক্য। পণ্য এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাচ্ছে আলোর গতিতে আর শ্রমিক যাচ্ছে শামুকের গতিতে। একইভাবে রাষ্ট্র যে পরিমাণে বৈশ্বিক, জনগণ সেই পরিমাণে অবৈশ্বিক বা স্থানিক। রাষ্ট্রের চালকরা এক দেশ থেকে আরেক দেশে উড়ে যান, ক্লাবে বসেন, মিটিং-ফিটিং করেন প্রতিদিন চব্বিশ ঘণ্টা। দরিদ্র মানুষকে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যেতে হয় সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে, বন-জঙ্গল দিয়ে হেঁটে, পাহাড় ডিঙিয়ে বা সমুদ্র সাঁতরে। মিটিং-ফিটিং দূরে থাক, তারা তো ঘুমেরই সময় পায় না।

অতএব এখনকার গণ-আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বহীনতা, বড় লক্ষ্যের অভাব এবং টিকে থাকার জন্য ক্ষমতাসীনদের ওপর নির্ভরশীলতা। সাধারণত আন্দোলন বেশিদূর এগোয় না, আর বেশি এগোলে প্রায়ই তা খাদে পড়ে। প্রতিবাদকারী বিশেষত তাদের নেতৃবৃন্দ ও জনগণের পক্ষের চিন্তাবিদগণকে ভাবতে হবে কীভাবে এ সংকট থেকে উত্তরণ লাভ করা যায়। তবে এ সমস্যা সমাধানের জন্য সবার আগে শ্রমিক-কৃষককে অবশ্যই বেশি বেশি করে গণ-আন্দোলনে যুক্ত করতে হবে।

আলমগীর খান: সম্পাদক, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি ইমেইল: alamgirhkhan@gmail.com

তথ্যসূত্র

১. Gilbert Achcar: interview taken by Jeff Goodwin, The Arab Spring, a Decade Later, Catalyst, Vol 4 No 3 Fall 2020

২. Gilbert Achcar: interview taken by Nada Matta, ‘What Happened to the Arab Spring?’, Jacobin, 12.17.2015

৩. Claire Parker and Kareem Fahim, ‘Braving its own course’, The Washington Post, Feb. 8, 2021

৪. জর্জ অরওয়েল, ১৯৮৪, Penguin Books, ২০১১

৫. ইউভাল নোয়া হারারি, 21 Lessons for the 21st Century, Jonathan Cape Ltd, ২০১৮, লন্ডন

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *