মুখের ভাষা ও শহীদ মিনারের পবিত্রতা

নৈতিক স্মৃতিচারণ হিসেবে ইতিহাস। সিপি গ্যাং-এর ‘বেশ্যা’ ব্যানার-৯

মুখের ভাষা ও শহীদ মিনারের পবিত্রতা

রেহনুমা আহমেদ

এই ধারাবাহিক লেখার এই পর্বে আমরা জানবো ভাষার ধরন, ভাব প্রকাশের ধরন নিয়ে পর্যালোচনা। কীভাবে প্রতিবাদের ভাষা থেকেও পুরুষালী লিঙ্গীয় আক্রমণের দিকটি বাদ পড়ে যায়।

“ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়, ওরা কথায় কথায় শিকল পরায়…” কিংবদন্তী গায়ক (ও গীতিকার) আব্দুল লতিফের গাওয়া ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন স্মরণে লেখা কালজয়ী গানের প্রথম কলি।

আর কিছু’ক্ষণ পর, “কইতো যাহা আমার দাদায়, কইছে তাহা আমার বাবায়।”

প্রায় সাড়ে চার দশক আগে বাংলাদেশ যখন একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে পরিষ্ফুটিত হয় তখন ভাষা আন্দোলনের প্রধান দাবি – বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা প্রদান – পূরণ করা হয়। কিন্তু নিরন্তর বাংলার গুণকীর্তন করার পরিবর্তে (“আমরাই একমাত্র দেশ যারা ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি,”“ভাষার জন্য আমাদের ত্যাগ স্বীকারকে বিশ্ববাসী স্বীকৃতি দিয়েছে” ইত্যাদি) সময় এসেছে এই ভাষার অন্তর্গত যৌনবাদ যার কারণে এক শব্দের বিষাক্ত অর্থ আরেক শব্দে চুইয়ে পড়ে আর ভাষা ব্যবহারকারী মেয়েদের ও নারীদের বাকশক্তিকে হরণ করে, তার ফরেন্সিক পরীক্ষা সম্পাদন করার। বিশ্লেষণের খাতিরে আমরা এই ভাষাকে অপরাপর ভাষা যা একই-ধরনের পিতৃতান্ত্রিক সমাজে প্রচলিত, তার পাশাপাশি রেখে অনুসন্ধান করতে পারি অন্যান্য ভাষায় ম্যাসকিউলিন শ্রেষ্ঠত্বকে কীভাবে জাহির করা হয়। যেমন ধরেন, উর্দু ভাষায় গণতন্ত্র হচ্ছে “জামহুরিয়াত”, অনলাইন সার্চের মাধ্যমে জানতে পারি এই শব্দের উৎস রোমান ভাষা (সংস্কৃত নয়)। আরবি ভাষায় গণতন্ত্র হচ্ছে “হুকুম আশ-শাব,” জনগণের সরকার। এদুটো শব্দের কোনোটাই সতীত্বের সাথে বা নারীর যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালিত করার পুরুষ-জর্জরিত একাগ্রতার (obsession) সাথে সংশ্লিষ্ট না। আমাদের মন ও মননকে বেশ্যাকরণ থেকে মুক্ত করার জন্য বাংলা ভাষার অন্যান্য ভাষার সাথে ফরেন্সিক ও তুলানামূলক বিশ্লেষণ শুরু করা অত্যন্ত জরুরি।

স্মরণ করতে চাই আফ্রিকান-আমেরিকান নারীবাদী তাত্ত্বিক বেল হুক্সএর কথা, “[খোদ] ভাষাই লড়াইয়ের জায়গা।”

সিপি গ্যাংয়ের “বেশ্যা” ব্যানারের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ সমাবেশ কি অনুষ্ঠিত হয়েছিল? না। কেউ কি প্রতিবাদ করেছিলেন? আমি শুধু দুজনের কথা উল্লেখ করতে পারি ।

মানবাধিকার কর্মী ও নারী সংগঠনের “সম্পূর্ণ নিস্তব্ধতা”য় সি আর আবরার তাঁর বিমূঢ়তার কথা লেখেন, বিবেক রক্ষাকর্তাদের নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘“বুদ্ধিবেশ্যা’ অজুহাতে শহীদ মিনারে কাউকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা” শুধু আপত্তিকর নয়, এটি পুরোদস্তুর অপরাধ।

ক’দিন পর একটি টক শো’তে নূরুল কবীর তাচ্ছিল্যের স্বরে ব্যানারকে “অশ্লীল” বলেন। আরো বলেন, শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত “লাশের ভার” সমাবেশে যারা অংশগ্রহণ করেছিল তারা “অর্বাচীন” ও “জোকার।”

আব্রার ভাই ও কবীরের মতো দু’জন স্পষ্টভাষী পাবলিক বুদ্ধিজীবী, বিশেষ করে কবীরের মতো লড়াকু একজন, কিভাবে“বেশ্যা” শব্দের অন্তর্নিহিত যৌনবাদিতা বুঝতে অক্ষম হলেন, আমি এর মাথামুণ্ডু বুঝে পাই না।

এ প্রসঙ্গে খুব একটা কিছু বলার নেই আমার। প্রবন্ধের এই অংশটি শেষ করছি জেরাল্ডিন ফর্বসের সুমন্ত ব্যানার্জীর আন্ডার দা রাজ: প্রস্টিটিউশান ইন কলোনিয়াল বেঙ্গল এর গ্রন্থালোচনা দিয়ে। একটি প্যারা উদ্ধৃত করছি কারণ আমার মনে হয় ফর্বস যা বলছেন তা আমাদেও সমস্যার বহু দিকের একটি দিকের উপর আলোকপাত করতে সাহায্য করবে,

[আন্ডার দা রাজ বইয়ের] উত্তরকথনে ব্যানার্জী বলেন [প্রস্টিটিউশান নিয়ে গবেষণা] সবে শুরু, তিনি অন্য ইতিহাসবিদদের বেশ্যাবৃত্তির প্রতি মনোযোগী হতে বলেন। ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ ও ভদ্রলোকরা কেন বেশ্যাবৃত্তিকে গুরুত্ব দেননি এই প্রশ্ন উত্থাপন করার পর ব্যানার্জী প্রস্তাব করেন, ভদ্রলোক পিতাদের ইতিহাসবিদ-পুত্রসন্তানরা মানুষ যেমন সংক্রামক রোগ থেকে দূরে থাকে সেভাবেই দূরে ছিলেন। আমার মনে হয়েছে ব্যানার্জী এখানে অধ্যয়ন ও অধ্যয়নকেন্দ্রিক অনুসন্ধানের লিঙ্গায়িত চরিত্রের ব্যাপারে তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করছেন। প্রথমেই বলা জরুরি, ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত পশ্চিম ও ভারত, সব দেশগুলোর ইতিহাসবিদরাই নারী ও লিঙ্গীয় বিষয়ের প্রতি বিদ্রƒপাত্মক মনোভাব পোষণ করেন। এবং এখনো লিঙ্গ ও নারী বিষয় খুব সামান্যই ভারতীয় ইতিহাসের মেটা-ন্যারেটিভে [মহা বয়ানে] অন্তর্ভুক্ত করা হয়। (Forbes, Journal of Colonialism and Colonial History, 2001)।

নারীবাদের সাথে আলাপরত না হওয়া? সেটিকে গুরুত্ব না দেওয়া? বাংলাদেশের পুরুষ অ্যাকাডেমিক ও পাবলিক বুদ্ধিজীবীদের বেলায়ও এটি সত্য (পাঠকদের কাছে নিশ্চয়ই স্পষ্ট যে আমি ‘নারী সমস্যা’র নামকাওয়াস্তে উল্লেখের কথা বলছি না)। কিন্তু একইসাথে এটি যোগ করাও জরুরি যে, নারী সংগঠনগুলোও নারীবাদের সাথে দায়বদ্ধভাবে যোগাযোগ (বহমধমব) করে না। যে, নারী সংগঠন ও অ্যাক্টিভিস্টদের মধ্যে নারীবাদী তর্কবিতর্ক অনুপস্থিত। যে,তাদের অধিকাংশরা বুদ্ধিবৃত্তিক দিকনির্দেশনার জন্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও বিশ্ব ব্যাংকের পলিসি ডকিউমেন্টের উপর নির্ভরশীল (‘নারীর ক্ষমতায়নের’ তত্ত্ব)। তবে নারী আন্দোলনের অবস্থা এই প্রবন্ধের আলোচনার বিষয় না।

যদিও আমি মনে করি যে বিদ্যাচর্চা লিঙ্গায়িত হওয়ার ব্যাপারে ফর্বসের মন্তব্য আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক — আর আগেই বলেছি যে প্রধানত দাতা অনুদানপ্রাপ্ত এনজিওরূপী নারী সংগঠন আর কিছু মানবাধিকার সংস্থা এ দেশের নারী আন্দোলনকে আত্মসাৎ করে ফেলেছে—আমার মনে হয় সংক্রমনাত্মক রোগের বিষয়টি সীমান্তের এপারেও বিরাজ করে।

অ্যাকাডেমিক, গবেষক ও বুদ্ধিজীবীরা যে এতোদিনেও (বাম ঘরানা’সহ) যৌনতার প্রসঙ্গ থেকে মধ্যবিত্ত পিতপিতানি আলাদা করতে পারেননি, এটি অভাবনীয়। যৌনতা প্রসঙ্গে পাবলিক আলাপ-আলোচনা চাঞ্চল্যকর ধর্ষণ মামলার চারপাশে ঘুরপাক খায় আর এতেই নিঃশেষিত হয়, ধর্ষণ নির্মিত হয় নিচু শ্রেণীর বর্বর পুরুষদের যৌন আক্রমণ হিসেবে। যদি জিজ্ঞেস করি কেন যৌনতাকে নিয়ে তাত্ত্বিকভাবে-সমৃদ্ধ পাবলিক আলাপ গড়ে তোলা হয়নি, নিশ্চয়ই অনেকেই ‘মৌলবাদ’কে দোষারোপ করবেন; এটি নিজ শ্রেণী ও লিঙ্গীয় শ্রেষ্ঠত্ববোধকে আড়াল করার একটি ভালো অজুহাত।

আর যদি ভদ্রলোকদের ভয়ের কথা বলতে হয়, আমি আবারো উদ্ধৃত করতে চাই তারা ব্যানার্জীকে। একজন মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা ধানম-ির পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে স্ত্রীকে বাড়ি নিতে অস্বীকৃতি জানান, এ ঘটনাটি উল্লেখ করে তিনি বলেন,

“আমার কি মনে হয় জানো, মুসলমানরা লেখাপড়া শিখে বেশি বেশি ভদ্র হয়েছে, হিন্দুদের অনুকরণ করে তাদের সমান হয়েছে।” (ইব্রাহিম, আমি বীরাঙ্গনা বলছি, ২০১৩, পৃ. ৩৪-৩৫)।

হামিদুর রহমান (১৯২৮-১৯৮৮) ও নভেরা আহমেদ (১৯৩৯-২০১৫) এর পরিকল্পনায় শহীদ মিনারের মূল নকশা। নকশা জমা দেওয়া হয় ১৯৫৬ সালে, নির্মাণ শুরু হয় নভেম্বর ১৯৫৭।
হাসিনা বিবি, ভাষা শহীদ বরকতের মা

হাইকোর্টের নির্দেশনা: শহীদ মিনারের পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে

ফেব্রুয়ারি ২০১০ সালে সরকারের বিরুদ্ধে বিচারপতি নাঈমা হায়দার ও বিচারপতি মোহাম্মদ মমতাজউদ্দিন আহমেদ এর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আদালত অবমাননার রুল জারি করেন। শহীদ মিনারের পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষা করার জন্য সরকার কেন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি এ বিষয়ে তাঁরা ব্যাখ্যা চান। একটি মানবাধিকার সংস্থার হাইকোর্টে দাখিল করা রিট পিটিশনে অভিযোগ করা হয় যে একুশে ফেব্রুয়ারি বাদে বাকি বছর স্থানটি মাদকাসক্তদের আড্ডার জায়গা, অসামাজিক কার্যকলাপ ও গৃহহীনদের নিদ্রাস্থলে পরিণত হয়েছে। জাতীয় স্মরণসৌধের জন্য এটি মর্যাদাহানিকর।

আগস্ট মাসে হাইকোর্ট আট দফা নির্দেশনা দেয় যার মধ্যে রয়েছে ভাষা আন্দোলনের সৈনিকদের তালিকা প্রণয়ন, সকল বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার স্থাপন, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একটি জাদুঘর ও লাইব্রেরি নির্মাণ ইত্যাদি। পত্রিকার সংবাদ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ি, আরো বেশি আগ্রহ বোধ করি হাইকোর্ট যাদের বিরুদ্ধে অবমাননার অভিযোগ এনেছে, সেই তালিকায়:

নিম্নোল্লিখত দপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের সচিব’সকল: (ক) প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর (খ) সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় (গ) মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় (ঘ) ঢাকা শহরের মেয়র (ঙ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (চ) প্রধান প্রকৌশলী (ছ) প্রধান স্থপতি, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়১০

যদি হাইকোর্টের মনে হতো যে সিপিগ্যাংয়ের“বেশ্যা” ব্যানার ভাষা আন্দোলনের চেতনার প্রতি অসম্মানজনক, যদি হাইকোর্ট আদালত অবমাননার জন্য একটি রুল জারি করতেন, আসামীপক্ষ/তাদের আইনজীবীরা কি বলতেন?

সবাই কি সমষ্টিগতভাবে ক্ষমা চাইতেন নাকি কেউ কেউ দলছুট হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের উপর চড়াও হতেন? (যেমনটি ঘটেছিল কিছুদিন আগে যখন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম শেখ মুজিবকে হত্যা করার পথ প্রশস্ত করার জন্য জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের প্রধান এবং তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে অভিযুক্ত করেন)।১১

মহারথীরা কী করতেন কে জানে।

‘ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ভাবগাম্ভীর্য মর্যাদা রক্ষার জন্য সরকারকে নির্দেশ প্রদান করা হলো’ – হাইকোর্টের বিচারপতি নাঈমা হায়দার ও বিচারপতি মোহাম্মদ মমতাজউদ্দিন আহমেদ এর নির্দেশ, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১০।© শহিদুল আলম

রেহনুমা আহমেদ: লেখক, নৃবিজ্ঞানী। ইমেইল: rahnumaa@gmail.com

তথ্যসূত্র:

১) Orin Hargraves, “Translating Democracy,” visualthesaurus.com, May 2, 2011

২) আরো পরে সোহরাব হাসান এর এই লেখাটি চোখে পড়ে, দেখুন, সোহরাব হাসান, “সিপি গ্যাং, গং এবং ‘নিষিদ্ধ শহীদ মিনার’,” প্রথম আলো, ২৩ অক্টোবর ২০১৪। সোহরাব হাসানের লেখার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধো সঠিক ইতিহাস প্রবক্তাদের একজন, দেখুন, অছ্যুৎ বলাই, ““বুদ্ধিবেশ্যা” শব্দটি যেভাবে মিথ্যাজীবীদের ভিত নাড়িয়ে দিলো,” সচলায়তন, ২৩ অক্টোবর ২০১৪, www.sachalayatan.com ।

৩) C R Abrar, “Demonising dissenters: Dead or alive. New low in Bangladesh politics,” The Daily Star, October 22, 2014|

৪) ‘ফ্রন্টলাইন,’ বাংলা ভিশন, ২০ অক্টোবর ২০১৪। লক্ষণীয়, অনুষ্ঠানের উপস্থাপক মানবজমিন এর সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর ছবিও সিপি গ্যাংয়ের ব্যানারে ছিল। প্রথম আলো তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি “ক্ষোভ ও বিস্ময়” প্রকাশ করে বলেন, “কী আর বলব। ফ্রি স্টাইলে চলছে সবকিছু। একটা অসুস্থ সমাজে বাস করছি আমরা। কথা নেই বার্তা নেই, তারা কীভাবে হঠাৎ অবাঞ্ছিত ঘোষণা করল? দেশে গণতন্ত্রের চর্চা না থাকায় আজ এ অবস্থা।” তিনি আরো বলেন, “যাঁদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হলো, তাঁদের ব্যাকগ্রাউন্ড দেখেন। আমি একাত্তর সালের ২৬ মার্চ সকালে রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়া অবস্থায় গ্রেপ্তার হয়েছি। চার দিন পর মুক্তি পাই। আমার সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়ার [অবিকল উদ্ধৃত] চারজনকে পাকিস্তানি সেনারা গুলি করে মেরে ফেলেছিল।” “নয়জন বিশিষ্ট নাগরিককে শহীদ মিনারে অবাঞ্ছিত ঘোষণা,” প্রথম আলো, ১৮ অক্টোবর ২০১৪।

৫) Bangla Vision channel, `Frontline.’ Filmed October 20, 2014. Youtube video. Posted October 20, 2014|https://www.youtube.com/watch?v=NnX1XNTtBYg

নিউ এইজ সম্পাদক নূরুল কবীর এর প্রতিক্রিয়া জানতে চায় তেহরান রেডিও, উদ্ধৃত করছি, “এটা অত্যন্ত হাস্যকর। কেননা তারা যাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে তারা প্রতেক্যেই সরকারের অগণতান্ত্রিকতা, অন্যায় অত্যাচার, সরকারের অবৈধতা, বিরোধী দল ও বিরোধী মতের প্রতি অসহিষ্ণুতাসহ নানা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেন। মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদ মিনারকে ব্যবহার করে এ ধরনের সংগঠনগুলো অবৈধ সরকারকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে। কেউ অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে এরা বরাবরই সেইসব ব্যক্তির বদনাম রটানোর চেষ্টা করে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান যারা আছে তারা ভুল করছেন উল্লেখ করে নূরুল কবির [অবিকল উদ্ধৃত] বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি কোনো নাগরিকের শ্রদ্ধা না থেকে পারে না। কেননা তাদের কারণেই দেশটা স্বাধীন হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা যদি আওয়ামী লীগের রাজনীতি বুঝতে পারতেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বুঝতে পারতেন তাহলে লুটপাট ও অগণতান্ত্রিকার বিরুদ্ধে যারা কথা বলছেন তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেন না। তাদের বয়স কম; তারা যখন প্রকৃত অবস্থা বুঝবেন তখন তারা আজকের অবস্থানের জন্য পরিতাপ করবেন।”

লেখক ও কলামিস্ট ফরহাদ মজহারের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি তেহরান রেডিওকে বলেন, “দেশ বিরোধী শক্তি, বিদেশী শক্তির দালালদের এ ধরনের কা- দেখে আমি হাসছি। কেননা শহীদ মিনার ছিল এ দেশের স্যেকুলারদের প্ল্যাটফর্ম বা প্রতীক। যারা অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে একাট্টা। কিন্তু যারা গণতন্ত্রের জন্য, জনগণের অধিকারের কথা বলে, সংগ্রাম করে তাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার মাধ্যমে তারা শহীদ মিনারকেই ফ্যাসিবাদের প্রতীক এবং দিল্লির বেদীতে পরিণত করেছে। দেশের জনগণ এটা মেনে নেবে না।”

দেখুন, “শহীদ মিনারে এবারে অবাঞ্ছিত ৯ বিশিষ্ট ব্যক্তি; তাদের প্রতিক্রিয়া,” ইরান বাংলা রেডিও, ইরিব ওয়ার্ল্ড সারভিস, ১৭ অক্টোবর ২০১৪।

এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য যে প্রথম আলো-র উপরোল্লিখিত প্রতিবেদনে পত্রিকাটির সংবাদদাতা অধ্যাপক আসিফ নজরুলের কাছেও তার প্রতিক্রিয়া জানতে চান। উদ্ধৃত করছি, “অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, সরকারের বিপক্ষে যাঁরা যৌক্তিক ও বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা করেন, তাঁদের হেয় করার জন্য সরকারের মদদপুষ্ট ২০-২৫ জন মানুষ এ কর্মসূচি পালন করেছে। এ ধরনের কর্মসূচি পালন করার মধ্য দিয়ে সরকারের ফ্যাসিবাদী চেহারার আরেকটা রূপ ফুটে উঠেছে।” “নয়জন বিশিষ্ট নাগরিককে শহীদ মিনারে অবাঞ্ছিত ঘোষণা,” প্রাগুক্ত।

“অপরাধ,” “অশ্লীল,” “অশালীন,” “বদনাম রটানো,” “হেয় করা,” “কটুক্তি,” “সরকারের ফ্যাসিবাদী চেহারা” ইত্যাদি – লক্ষ্য করুন, কোনো কলামিস্ট, লেখক বা এই আক্রমণের শিকার বুদ্ধিজীবীদের কেউ “বেশ্যা” শব্দকে নারী-পুরুষের ক্ষমতা-সম্পর্কের মধ্যে অবস্থিত করে বিশ্লেষণের চেষ্টা করেননি। তাদের প্রতিক্রিয়ায় পিতৃতন্ত্র অদৃশ্য থেকে যায়, পুরুষালি এই আক্রমণকে কাউন্টার করার জন্য তারা ভর করেছেন মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের উপর যা লিঙ্গায়িত। এই মবহফবৎরহম এর একটি প্রধান খুঁটি হচ্ছে সতী-অসতীর বাইনারি অপোজিশান।

অধ্যাপক পিয়াস করিমের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে নারীবাদী চিন্তাধারা-সম্বলিত বিশ্লেষণাত্মক একটি লেখা সম্প্রতি চোখে পড়ে ইন্টারনেটের কল্যাণে, দেখুন, মাসুদ রানা, “পিয়াস করিম প্রসঙ্গ ধরে যৌনতা বিষয়ক কিছু কথা,” www.gournadi.com, ২৩ অক্টোবর ২০১৪।

৬) Geraldine Forbes, review of Under the Raj: Prostitution in Colonial Bengal (book review), Journal of Colonialism and Colonial History, Vol. 2, No. 1, Spring 2001|

৭) নীলিমা ইব্রাহিম, “তারা,” আমি বীরাঙ্গনা বলছি, পৃ. ৩৪-৩৫।

৮) হিউমান রাইটস অ্যান্ড পিস্ ফর বাংলাদেশ।

৯) “Sanctity of Shaheed Minar: Contempt rule against DCC mayor, cultural secretary,” Daily Star, May 5, 2011|

১০) “8 HC directives to protect sanctity, dignity of Shaheed Minar,” Daily Star, August 26, 2010|

১১)“বঙ্গবন্ধু হত্যায় বেকায়দায় জাসদ,” www.jagonews24.com, ২৮ আগস্ট ২০১৫।

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *