কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক বোকা বুড়ো

স্মরণ

কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক বোকা বুড়ো

অনিন্দ্য আরিফ

ছবি: নিউ এইজ

শত বছরে উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের বহু কমিউনিস্টের মহান আত্মত্যাগ এবং সংগ্রামের দীর্ঘ ঐতিহ্য ধারণ করে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনও অগ্রসর হয়েছে। ভোগবাদের কাছে এবং ব্যক্তিপ্রতিষ্ঠার কাছে নিজেদের সমর্পণ না করে যেসব কমরেড এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে অগ্রসর করার জন্য নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিলেন ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্রীয় সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য কমরেড আজিজুর রহমান। ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর এই আজীবন বিপ্লবীর মহাপ্রয়াণের মধ্য দিয়ে দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক অপূরণীয় শূণ্যতা সৃষ্টি হয়েছে।

আমার বাবা কমরেড আজিজুর রহমান প্রায়ই বলতেন যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে একটি দেশের বিপ্লবী সংগ্রামে চূড়ান্ত সাফল্য আসে। তাই প্রত্যেক প্রজন্মের লড়াইয়ের যে উত্তরাধিকার গড়ে ওঠে, তার মধ্যে কোনো প্রজন্মের সংগ্রামকে খাটো করে দেখবার সুযোগ নেই। সত্যিই ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, রাশিয়াতে স্বৈরাচারী জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রথম সবল প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর একেবারে প্রথমার্ধে। সেই ধারা আরও জোরালো হয়েছিল নারোদানিকদের মাধ্যমে। আর বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে বলশেভিক বিপ্লবীদের নেতৃত্বে প্রবল সংগ্রাম চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে।  আবার চীনে আফিম যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সূচনা হয়। সেই ধারায় ১৯১৯ সালের ৪ মে জাপানের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শহীদী আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে চীনের জনগণ সংগঠিত হয়। এরপর দুনিয়া কাঁপানো লং মার্চ এবং জাপ বিরোধী প্রতিরোধ যুদ্ধের সিঁড়ি বেয়ে চূড়ান্ত বিজয় আসে ১৯৪৯ সালের ১ অক্টোবর। হোসে মার্তি এবং সাইমন বলিভারের পথ ধরে ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি স্বৈরাচারি বাতিস্তা সরকারের পতন ঘটিয়ে কিউবান বিপ্লব সম্পন্ন হয় ফিদেল ক্যাস্ত্রো এবং চে গুয়েভারার নেতৃত্বে।

আমার বাবা কমরেড আজিজুর রহমান প্রায়ই বলতেন যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে একটি দেশের বিপ্লবী সংগ্রামে চূড়ান্ত সাফল্য আসে। তাই প্রত্যেক প্রজন্মের লড়াইয়ের যে উত্তরাধিকার গড়ে ওঠে, তার মধ্যে কোনো প্রজন্মের সংগ্রামকে খাটো করে দেখবার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশেও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, সাঁওতাল বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহের মতো অসংখ্য কৃষক বিদ্রোহ; সিপাহী বিদ্রোহ এবং ক্ষুদিরাম, বাঘা যতীন, ভগৎসিং, শুকদেব, মাস্টারদা সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়েদ্দেদার, মাতঙ্গিনী হাজরা, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর নেতৃত্বাধীন আজাদ হিন্দ ফৌজসহ অসংখ্য বিপ্লবীর আত্মদানে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তিকে ক্ষমতার দৃশ্যপট থেকে সরাতে পারলেও নতুন করে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর পরাধীনতায় আবদ্ধ হই। এরপর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা ভৌগলিক স্বাধীনতা লাভ করি।  কিন্তু এখনও পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা অর্থাৎ শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গঠন করা সম্ভব হয়নি। 

স্বর্গের আগুন মানবজাতির জন্য চুরি করে প্রমিথিউস যে বিদ্রোহের বীজ বপণ করেছিলেন এবং স্পাটাকার্সের দাস বিদ্রোহ যে শ্রেণি শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত বিদ্রোহের সূচনা ঘটিয়েছিল, সহস্রাব্দের পর সহস্রাব্দ ধরে সেই ধারাকে যারা বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন আমার বাবা ছিলেন তাদেরই একজন উত্তরাধিকার।

আজিজুর রহমানের জন্ম ১৯৪৪ সালে এখনকার ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা থানার পাঁচুরিয়া ইউনিয়নের ভাটপাড়া গ্রামে। তখনকার অবিভক্ত বাংলার অধিকাংশ দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মতারিখ মনে রাখার তেমন একটা প্রচলন ছিল না বলে বাবার জন্মতারিখটা কখনোই জানা যায়নি। আজিজুর রহমানের বাবা ছিলেন ব্রিটিশ জাহাজের একজন সাধারণ নাবিক। বিভিন্ন সমুদ্র এবং মহাসমুদ্রে বছরের পর বছর কাটানোর ফলে তার সান্নিধ্য বাবা শৈশবে তেমন একটা পাননি। মূলত মায়ের উৎসাহ এবং উদ্দীপনায় তার শিক্ষাজীবনের শুরু। তাঁর মা প্রয়োজনে কেরোসিনের কূপি জ্বালানোর জন্য অন্য বাড়ী থেকে কেরোসিন ধার করে আনতেন এবং বাবা সেই আলোয় পড়াশোনা করে ওই গ্রামের জুগিভরাট প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি লাভ করেন। তখনকার সময়ে তাঁর গ্রামসহ আশেপাশের অনেক গ্রামের মধ্যে তিনিই প্রথম ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করেছিলেন। এরপর গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া উন্মত্ত মধুমতি নদীর ওপার মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর থানার আরএসকেএইচ ইন্সটিটিউশনে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে পাড়ি জমান খুলনা জেলায়। খুলনার দৌলতপুরে অবস্থিত হাজী মুহাম্মদ মহসিন স্কুল থেকে ১৯৬৩ সালে এসএসসি পাশ করেন। মেধাবী ছাত্র হওয়ার কারণে পারিবারিক আর্থিক সহযোগিতা ছাড়াই তিনি ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পর্যন্ত পড়াশোনা চালাতে সক্ষম হয়েছিলেন। মোহাম্মদপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে মেধাবী ছাত্র হিসেবে বিদ্যালয় পরিদর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি কমিউনিস্ট মতাদর্শের লোক ছিলেন।  তিনি কমরেড আজিজুর রহমানকে প্রায়শই তাঁর বাসায় ডেকে সমাজতন্ত্র নিয়ে আলোচনা করতেন এবং মার্কসীয় মতাদর্শের প্রাথমিক বইপত্র পড়ার জন্য উৎসাহ দিতেন।   

এরপর খুলনার ব্রজলাল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে বিজ্ঞান শাখার একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময়ে ওই কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ প্রয়াত মুসা আনসারীর সংস্পর্শে এসে কমিউনিস্ট মতাদর্শে দীক্ষিত হন। অধ্যাপক মুসা আনসারী বিভিন্ন জেলা শহরের কলেজে শিক্ষকতার সুবাদে বিভিন্ন ছাত্রকর্মীদের বিপ্লবী  মতাদর্শে দীক্ষার মাধ্যমে তখনকার বাম আন্দোলনে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। মুসা আনসারীর দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে আজিজুর রহমান গোপন কমিউনিস্ট পার্টির গ্রুপ কমিটির অন্তর্ভূক্ত হন এবং অবিভক্ত ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী হিসাবে ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৬৪ সালে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় আমার বাবাসহ অনেকেই সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সংগ্রামের মাধ্যমে দৌলতপুর অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। 

অধ্যাপক মুসা আনসারী বিভিন্ন জেলা শহরের কলেজে শিক্ষকতার সুবাদে বিভিন্ন ছাত্রকর্মীদের বিপ্লবী  মতাদর্শে দীক্ষার মাধ্যমে তখনকার বাম আন্দোলনে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

১৯৬৫ সালের এপ্রিল মাসে ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন’ ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের কেন্দ্রীয় সম্মেলনে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে বিভক্ত হয়ে যায়।  ছাত্র ইউনিয়নের দুই অংশ মেনন গ্রুপ ও মতিয়া গ্রুপ নামে পরিচিতি লাভ করে। তখন বাবাসহ খুলনা জেলার অধিকাংশ নেতা-কর্মীরা এই বিভক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করলেও পরবর্তীতে তাদের অনেকেই ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপের সঙ্গে সংযুক্ত হন। ১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন(মেনন গ্রুপ)-এর খুলনা জেলা সম্মেলনে আজিজুর রহমান জেলা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। একই বছর তিনি বিপুল ভোটে খুলনা পলিটেকনিক কলেজের ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। 

১৯৬৭-৬৮ সালে ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি তিনি শ্রমিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন।  খুলনার বয়রা জংশন এলাকার কড়াই কারখানার শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও ৮ ঘন্টা শ্রম সময়ের দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলন সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একপর্যায়ে মালিক পক্ষ শ্রমিকদের কলোনি থেকে বের করে দিলে শ্রমিকদের জন্য লঙ্গরখানা চালু করেন। ১৭ দিন টানা ধর্মঘটের ফলে মালিকপক্ষ শ্রমিকদের দাবি মেনে নেয়। কড়াই কারখানার আন্দোলনের কারণে ১৯৬৯ সালের ২৫ জানুয়ারি আজিজুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। এই সময় থেকে ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি কারা অন্তরীণ ছিলেন। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক মতাদর্শিক মহাবিতর্কের কারণে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। আজিজুর রহমান ক্রশ্চেভ সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) বা ইপিসিপিএমএলের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন।

ছবি: সংগৃহীত

১৯৭১ সালে ইপিসিএমএলের একইসঙ্গে দুই শত্রুর মোকাবিলার ভ্রান্ত লাইন গোটা পার্টিকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলে। প্রথমে আজিজুর রহমানরা এই লাইনের পক্ষে থাকলেও কিছুদিন পরেই এর ভ্রান্তি উপলব্ধি করতে থাকেন। তিনি ১৯৭৩ সালে এই বেআইনী পার্টির খুলনা জেলা সম্পাদক এবং ১৯৭৫ সালের কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় কমিটির বিকল্প সদস্য নির্বাচিত হন। ইতিমধ্যে মাও-সে-তুংয়ের ‘দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে’ গ্রন্থের ওপর বাবার নেওয়া পার্টি ক্লাসে আমার মা প্রয়াত সুরাইয়া ইয়াসমিনের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। ১৯৭৩ সালে দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং ১৯৭৫ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমানের সামরিক আইনে আমার বাবা আবারও গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘ তিন বছরের বেশি সময় ধরে খুলনা, যশোর ও রংপুর জেলে কারান্তরীণ থাকেন। এই সময় তাঁর উপর নির্মম শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতনের ফলে ডানহাতের দুটি আঙ্গুল ভেঙে স্থায়ীভাবে অকেজো হয়ে যায়। তিনি রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের এই চিহ্ন নিয়েই এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে না ফেরার দেশে চলে গিয়েছেন। এরপর ১৯৮০ দশকে সামরিক স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময়কালেও তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন।   

বাবা আবারও গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘ তিন বছরের বেশি সময় ধরে খুলনা, যশোর ও রংপুর জেলে কারান্তরীণ থাকেন। এই সময় তাঁর উপর নির্মম শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতনের ফলে ডানহাতের দুটি আঙ্গুল ভেঙে স্থায়ীভাবে অকেজো হয়ে যায়। তিনি রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের এই চিহ্ন নিয়েই এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে না ফেরার দেশে চলে গিয়েছেন।

জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাবার জেলে থাকাকালীন সময়ে জেলের বাইরে অবস্থানরত তৎকালীর বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির (এম-এল) বেশ কয়েকজন নেতা এবং জেলের ভেতর থেকে বাবাসহ আরও কয়েকজন প্রকাশ্য পার্টি গড়ে তোলা ও গণআন্দোলন এবং গণসংঠন গড়ে তোলার লাইন গ্রহণ করেন। ১৯৭৯ সালে জেল থেকে মুক্ত হয়ে তিনি বহুধাবিভক্ত এম-এল ধারার কমিউনিস্ট পার্টিসমূহকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় ভুমিকা পালন করেন। এই সময়ে তিনি বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং পরবর্তীতে ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের পলিটব্যুরোর সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯২ সালে ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (মেনন-রনো) ঐক্যবদ্ধ হলে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০০৪ সালে এই পার্টির যশোর কংগ্রেসে তিনি পলিটব্যুরোর সদস্য নির্বাচিত হন। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা আন্তঃপার্টি সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। ২০০৯ সালে এই পার্টির সেই সময়কার বিলোপবাদী লাইনের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে সুনির্দ্দিষ্ট মতাদর্শিক পার্থক্যের ভিত্তিতে তিনিসহ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা ওয়ার্কার্স পার্টি পরিত্যাগ করেন এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (পুনর্গঠিত) গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট লীগ এবং বাবাদের নেতৃত্বাধীন পার্টি ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ গঠিত হলে তিনি পার্টির কেন্দ্রীয় সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন। তিনি সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাম গণতান্ত্রিক জোটের প্রার্থী হিসাবে সাতক্ষীরা-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।  পার্টির প্রতিনিধি হিসাবে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী চীন, ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশে বিভিন্ন পার্টি কংগ্রেস এবং গণসংগঠনের সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছেন। 

ছবি: সংগৃহীত

তিনি ১৯৬৯ সাল থেকে সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় কৃষক আন্দোলনে সম্পৃক্ত থেকেছেন। এই অঞ্চলে ১৯৯৭-১৯৯৮ সালে ঘেরবিরোধী কৃষক আন্দোলন, জলাবদ্ধতা নিরসনের আন্দোলন এবং ভূমিহীন আন্দোলন গড়ে তুলতে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন। এছাড়া খুলনার ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা, রূপসা, বাগেরহাটের রামপালসহ অসংখ্য অঞ্চলের কৃষক আন্দোলনেও তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকা রয়েছে।  তিনি কৃষক-শ্রমিক মেহনতী জনতার জীবনের সঙ্গে একাত্ম হতে পেরেছিলেন। দুঃখজনক হলেও সত্যি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে এই কাজের ধারাটি প্রায় বিলুপ্ত। সুখেন্দু দস্তিদার, আবদুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা, মনি সিংহ , খোকা রায়, অজয় ভট্টাচার্য, হেমন্ত সরকার, জ্ঞান চক্রবর্তী, শচীন বসু, অমল সেন, ভাষাসংগ্রামী আবদুল মতিনসহ অসংখ্য কমরেড রাজনৈতিক লাইনের সীমাবদ্ধতা এবং বিচ্যুতি সত্ত্বেও জনগণের জীবনের সঙ্গে যেভাবে মিশে যেতে পেরেছিলেন, আমার বাবা ছিলেন সেই ধারার প্রকৃত অনুসারী।  তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের এই ধারাটির এক ধরনের অবসান ঘটলেও আগামীতে এদেশে মানবিক সমাজ গঠনের আন্দোলনে তাদের এই ধারা যেমন অনুসরণীয় হতে পারে এবং তাদের জীবন বড় ধরনের শিক্ষাও রাখতে পারে।

তিনি ১৯৬৯ সাল থেকে সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় কৃষক আন্দোলনে সম্পৃক্ত থেকেছেন। এই অঞ্চলে ১৯৯৭-১৯৯৮ সালে ঘেরবিরোধী কৃষক আন্দোলন, জলাবদ্ধতা নিরসনের আন্দোলন এবং ভূমিহীন আন্দোলন গড়ে তুলতে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন। এছাড়া খুলনার ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা, রূপসা, বাগেরহাটের রামপালসহ অসংখ্য অঞ্চলের কৃষক আন্দোলনেও তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকা রয়েছে।

কমরেড আজিজুর রহমান সবসময়েই মনে করতেন একমাত্র জনগণই সকল ইতিহাসের প্রকৃত নায়ক এবং নির্মাতা। একসময়কায় জনবিচ্ছিন্ন বাম সংকীর্ণতাবাদী লাইনে ভেসে যাওয়া এ দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিচ্যুতি থেকে এই উপলব্ধিবোধটা তার মধ্যে তীব্র হয়ে উঠেছিল। তাই তিনি ব্যক্তি সন্ত্রাসের ভ্রান্তিকর লাইনকে পরিত্যাগ করে জঙ্গী শ্রেণী গণআন্দোলনের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করতেন। তাই তালার ঘেরবিরোধী এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের আন্দোলনেও তিনি এই মৌলিক মার্কসীয় ধারণার সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন। ১৯৯৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে তালার কৃষক আন্দোলন চলাকালে তখনকার ওই আন্দোলনের নেতা এবং বর্তমান সময়কার বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য মুস্তফা লুৎফুল্লাহকে গ্রেপ্তার করা হলে কমরেড আজিজুর রহমান প্রায় চার হাজার কৃষক এবং স্থানীয় নারীদের সংগঠিত করে তাদের নিজেদের দেওয়া চাঁদা দিয়ে বাস ভাড়া করে লাঠি হাতে মুস্তফার মুক্তির দাবীতে সাতক্ষীরা শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথিমধ্যে ঘেরমালিকদের পোষা গুন্ডাদের হামলা প্রতিহত করে তারা সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করে এবং তাদের বিপ্লবী জঙ্গীত্বের সামনে নতজানু হয়ে জেলা প্রশাসন মুস্তফাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

কমরেড আজিজুর রহমান প্রত্যক্ষ মাঠের সংগ্রামে নিজেকে বেশী সময়ে নিয়োজিত করলেও তাত্ত্বিক চর্চার ক্ষেত্রেও অগ্রগণ্য ছিলেন। তিনি পার্টির বিভিন্ন সময়কার গুরুত্বপূর্ণ দলিল, আন্তঃসংগ্রামের থিসিস এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনের পর্যালোচনা তৈরিতে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর কিছু গুরুত্বপূর্ণ রচনা বিশেষ করে  ‘মার্কস ও মার্কসবাদ’ , ‘শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি ও শ্রেণী- গণসংগঠনের আন্তঃসম্পর্ক প্রসঙ্গে’,  ‘আন্তঃপার্টি সংগ্রামের রীতি পদ্ধতি’, ‘মহান অক্টোবর বিপ্লব-বিশ্ববিপ্লবের আলোকবর্তিকা’, ‘কমিউনিস্ট ঐক্য প্রসঙ্গে’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ‘শহীদ কমরেড ডা. মোহাম্মদ ইয়াসিন স্মরণে কিছু স্মৃতিকথা’ নামক তার রচনাটি উত্তাল ষাটের দশকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিপ্লবী সংগ্রামের পটভূমি এবং ইতিহাস রচনায় গুরত্বপূর্ণ দলিল হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। সঠিক সংসদীয় কাঠামো ব্যবহারের লড়াইয়ের বড় ধরনের নির্দেশনা দিতে পারে তাঁর রচিত ‘৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর্যালোচনা ও করণীয় শীর্ষক বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বক্তব্য’ শীর্ষক রচনাটি। আবার এদেশের বিপ্লবী ধারার কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর গুরত্বপূর্ণ রচনা ‘সাতক্ষীরার তালা উপজেলার কৃষক আন্দোলন’।  

কমরেড আজিজুর রহমান যখন আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছেন তখন বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বই করোনা মহামারীর করাল গ্রাসে আক্রান্ত। আমরা প্রত্যক্ষ করছি তথাকথিত সমৃদ্ধি আর উন্নয়নের ফানুস দেখিয়ে যাওয়া সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা কীভাবে এই মহামারীর সামনে নিজেদের ব্যবস্থাগত নগ্নতা প্রদর্শন করেছে। আবার পাশাপাশি চীন, কিউবা, ভিয়েতনাম, ভারতের কেরালাসহ যেসব দেশের রাষ্ট্রকাঠামোয় জনগণের পক্ষের নীতি ও ব্যবস্থাবলী এখনও রয়েছে সেখানে পরিস্থিতি অনেক নিয়ন্ত্রণে। কমিউনিস্ট নেত্রী রোজা লুক্সেমবার্গ বলেছিলেন যে হয় আমরা বর্বরতার দিকে ধাবিত হবো নয়তো সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদের মধ্য দিয়ে মানবসভ্যতার প্রকৃত ইতিহাস রচনা করব। এখন এই অতিমারী পরিস্থিতিতে আমাদের ওপর এই ঐতিহাসিক কঠিন দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। মানব প্রজাতিকে বর্বরতার হাত থেকে রক্ষার সেই সংগ্রামে কমরেড আজিজুর রহমানের মতো বিপ্লবীরা অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাবে।    

শেষকথা

বাবার মৃত্যুর অল্প কয়েকদিন আগে সকালবেলায় ঘুম থেকে ওঠার পর তার চোখে দেখলাম অঝোর অশ্রুর ধারা। আমি পাশে গিয়ে বললাম, ‘কী হয়েছে? কাঁদছ কেন?’ তিনি তখন বললেন, তার পুরনো কমরেডদের স্মৃতি মনে পড়ছে, যারা শহীদ হয়েছেন বা মারা গিয়েছেন। তিনি বললেন, খুলনার এক কমরেড-উত্থার উদ্দিনের কথা, যার দুটি গাল কাটা ছিল এবং সেজন্য চেহারাটা বিদঘুটে লাগত। কিন্তু তিনি সুবক্তা ও অসাধারণ সংগঠক ছিলেন। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে রাজাকারদের হাতে তিনি শহীদ হন। বাবা বললেন, ডুমুরিয়ার কৃষক কমরেড বারেক মোল্লার কথা, যিনি ১৯৯১ সালে পার্টি করা অবস্থায় মারা যান। মারা যাওয়ার আগে তিনি বাবাকে বলেছিলেন, ‘আজিজ ভাই, সমাজতন্ত্র দেখতে পারলাম না।’ বাবা ছলছল চোখে বললেন, ‘আমিও সমাজতন্ত্র দেখতে পারলাম না। তোরাও হয়তো-বা দেখতে পারবি না। কিন্তু আমার নাতিরা অবশ্যই সমাজতন্ত্র দেখতে পারবে।’ আসলে, আমার বাবার মতো বিপ্লবীরা ছিলেন মাও-সে-তুংয়ের সেই বোকা বুড়োর মতো, যারা নিজেরাও না পারলে তাদের প্রচেষ্টার পথ ধরে পরবর্তী কোনো প্রজন্ম একসময় ঠিকই শোষণের পাহাড় অপসারিত করবে। বাবার ওই কথাগুলো এখনো আমার কানে বাজছে এবং সেই বিদ্যমান শোষণের পাহাড় সরানোর একজন প্রকৃত যোদ্ধা হিসাবে গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছে।

অনিন্দ্য আরিফ: আজিজুর রহমানের একমাত্র সন্তান, রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক ও লেখক। ইমেইল: anindyaarif1981@gmail.com

Social Share
  • 297
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    297
    Shares
  •  
    297
    Shares
  • 297
  •  
  •  
  •  
  •  

4 thoughts on “কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক বোকা বুড়ো

  1. প্রিয় কমরেডের বিপ্লবী স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা

  2. কমরেড আজিজুর রহমান, উনাকে কাকা বলে সব সময় ডাকতাম। ছাত্র রাজনীতি করার কারণে ২০০২ সাল কাকার সাথে পরিচয় হয়। তারপর থেকে কাকা কাকা আমার রাজনৈতিক এবং পারিবারিক ভাবে অভিভাবক ছিলেন। ছাত্র রাজনীতি থেকে বিদায় নিলে, প্রতিনিয়ত যোগাযোগ হত। সময় পেলে উনার বাসায় যেয়ে অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা হত। উনার অনুপস্থিতি, আমাদের জন্য বিশাল শূন্যতা। যা কখনই পূরণ হবার নয়। বিনম্র শ্রদ্ধা।।

  3. Bolshevik party was a reactionary capitalist party by its founding declaration and it was formed to develop capitalist mode of production in Russia. But, a communist party is a working class party to unite the workers of the world for the communist revolution by the working class alone to replace capitalism by ending wage slavery by vanishing capital by abolishing capitalist mode of production to end the exploitation of men by men for communism- a scientific society of equals thus,,its free from rule of men by men. But, Bolshevik party has captuted the state power of Russia by a planed military coup at night but claimed it as a socialist revolution which is totally lie, false and bogus but an intentional political propaganda to confuse the working class- the only and alone communist revolutionary class. Finally, Lenin – the key founder of the Boldhevik party and the planner of the said coup has founded a state of state capitalism by its constitution-1918. Nodubt, state capitalism is a waste form so waste capitalism but Lenin claimed it as socialist which is totally lie about socialism – the replacement of capitalism by the working class alone. Therefore, all stories about the Bolshevik party, the October event, USSR etc are nothing but also lie. Thus, any statement on the basis of a lie is nothing but a bundle of lies. More information : No Leninist party is communist party, a book @ http://www.icwfreedom.org

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *