কেন যত কাছে আসি, তত দূরে সরে যাই

কেন যত কাছে আসি, তত দূরে সরে যাই

জেমি বার্টলেট

ইন্টারনেট, এবং তার মাধ্যমে ফেসবুক, ইউটিউব আমাদের চিন্তাজগতকে কীভাবে পরিচালিত করছে, কিংবা বলা যায় আমাদের ভেতরের সুপ্ত প্রবণতাগুলো কীভাবে জোরদার করছে, তা গণতান্ত্রিক চিন্তা ও বিতর্ক ক্ষেত্রে কীধরনের প্রভাব ফেলছে সেবিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করা হয়েছে এই লেখাতে। লেখাটি জিমি বার্টলেট এর “The People Vs Tech” (২০১৮, ইবুরি প্রেস, লন্ডন) পুস্তকের “The Global Village: Why the Closer We Get, the Further We are Apart” শীর্ষক অধ্যায় অবলম্বনে তৈরি। সংক্ষেপিত। অনুবাদ করেছেন কল্লোল মোস্তফা

১৯৬০ এর দশকে প্রথিতযশা একাডেমিক এবং সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিক মার্শাল ম্যাকলুহান ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন যে, সামনের ইলেক্ট্রনিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে বিদ্যমান কাঠামো ও আইডেন্টিটিজ বা পরিচয়গুলো ভেঙে পড়বে। আর এর ফলাফল স্বরূপ মানুষ আরো ট্রাইবাল বা গোত্রভিত্তিক সমাজের দিকে ফিরে যাবে। তিনি নিরবচ্ছিন্ন তথ্যপ্রবাহ ব্যবস্থাকে গ্লোবাল ভিলেজ বলে উল্লেখ করেছিলেন। মানুষ সে সময় তার এই ধারণাটিকে স্বাগতই জানিয়েছিল।

প্রযুক্তি বিপ্লবের বুদ্ধিবৃত্তিক রকস্টার ও নেতৃত্বদানকারী চিন্তাবিদ হিসেবে ম্যাকলুহান সবসময়ই সিলিকন ভ্যালির জন্য অনুপ্রেরণার। তাঁর গ্লোবাল ভিলেজ ধারণাটি এখনো পালো আলতো, মাউন্টেন ভিউ কিংবা কুপারটিনো অঞ্চলের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। যখনই আপনি “গ্লোবাল কমিউনিটি” কিংবা “টোটাল কানেক্টিভিটি”র কথা শুনবেন, জানবেন সেখানে ম্যাকলুহানের আছর আছে। ফেসবুকের সূচনার দিকে মার্ক জুকারবার্গ লিখেছিলেন, “বিভিন্ন ধরনের পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে উঠে আসা মানুষদেরকে পরস্পরের সাথে সহজে যোগাযোগ করা ও মতবিনিময়ের সুযোগ করে দেয়ার মধ্যে দিয়ে আমরা স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক সংঘাত কমিয়ে নিয়ে আসতে পারি।”

ম্যাকলুহান অবশ্য শুধু যোগাযোগের সুবিধার কথাই বলেন নি, সকলের সাথে যখন সকলে সংযুক্ত থাকবেন তখন সংঘাত ও বিরোধ তৈরি হওয়ার কথাও উল্লেখ করেছিলেন, কারণ সার্বক্ষণিক তথ্যপ্রবাহ এমন বিভ্রান্তি তৈরি করবে যে একটা গণ পরিচয় সংকটের সূচনা হতে পারে। ১৯৬৯ সালে প্লেবয় ম্যাগাজিনের কাছে এক স্বাক্ষাতকারে ম্যাকলুহান বলেছিলেন,”রাজনৈতিক গণতন্ত্র বলতে আমরা যা বুঝি তার দিন শেষ। ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষের ট্রাইবাল বা গোষ্ঠীগত রূপান্তর ঘটে, কথায় কথায় আতংকিত হতে থাকে, পাগলের মতো হারানো পরিচয় খুঁজতে থাকে এবং এক পর্যায়ে ব্যাপক মাত্রায় সহিংসতার জন্ম দেয়।” বিভিন্ন সিইও, অগ্রসর প্রযুক্তিবিদ আর রাজনীতিবিদরা ম্যাকলুহানের এই কথাগুলো এড়িয়ে গেছেন কারণ তারা সহিংসতার চেয়ে আশাবাদ বেশি পছন্দ করেন।

গণতান্ত্রিক রাজনীতি সবসময়ই কর্কশ ও প্রায়শই মারাত্বক বিভাজন সৃষ্টিকারি। ইরাক যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ কিংবা ১৯৮০ দশকে খনি শ্রমিকদের ধর্মঘটের মতো ঘটনাগুলো তারই স্বাক্ষ্য দেয়। কিন্তু মাঝে মধ্যে ক্ষোভ বিক্ষোভ তৈরি হলেও সাধারণ ভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে কতগুলো নিয়মনীতি ও বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে রাজনৈতিক বিরোধের ধরণ একেবারে পাল্টে গেছে। ধরণটা ট্রাইবাল হয়ে গেছে। দেখা দিচ্ছে অতিমাত্রায় পার্টিভক্তি, দলগত বা গোষ্ঠীগত আনুগত্য যা অনেক সময় নেতৃত্ব পূজায় পরিণত হয়, সেই সাথে নিজেদের ব্যর্থতাকে খাটো করে দেখা এবং শত্রুর ভুলকে বড় করে তোলা এবং প্রতিপক্ষের সাথে কোনো ধরনের আপোষ না করার প্রবণতা বেড়ে গেছে। রাজনীতি খেলায় পরিণত হচ্ছে। ম্যাকলুহান যেমন অনুমান করেছেন, আমরা রাজনীতির রি-ট্রাইবালাইজেশনের মধ্যে বসবাস করছি। আমি রি-ট্রাইবালাইজেশান বলছি, করণ ট্রাইবাল বা গোষ্ঠীগত আনুগত্য ও পরিচিতির বিষয়টি আধুনিক রাজনীতির সূচনার বহু আগে থেকেই মানুষ সমাজের মধ্যে ছিল। বহু গৃহযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে আমরা বুঝতে শিখেছি যে কোনো একটি দল বা গোষ্ঠীর অন্তুর্ভুক্ত থাকার আকাঙ্ক্ষার শিকড় অনেক গভীরে।

সাম্প্রতিক সময়ে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে রাজনৈতিক বিরোধের ধরণ একেবারে পাল্টে গেছে। ধরণটা ট্রাইবাল হয়ে গেছে। দেখা দিচ্ছে অতিমাত্রায় পার্টিভক্তি, দলগত বা গোষ্ঠীগত আনুগত্য যা অনেক সময় নেতৃত্ব পূজায় পরিণত হয়, সেই সাথে নিজেদের ব্যর্থতাকে খাটো করে দেখা এবং শত্রুর ভুলকে বড় করে তোলা এবং প্রতিপক্ষের সাথে কোনো ধরনের আপোষ না করার প্রবণতা বেড়ে গেছে। রাজনীতি খেলায় পরিণত হচ্ছে।

মনোবিজ্ঞানিরা বিশাল ভীড়ের মধ্যে থাকা মানুষের অযৌক্তিক আচরণ নিয়ে বহু আলোচনা করেছেন। চার্লস ম্যাকে লিখেছেন, “[মানুষ] পালের মতো চিন্তা করে… দেখা যায় তারা পালের মধ্যে উন্মত্ত আচরণ করে, আর তাদের হুঁশ ফিরে একে একে, আস্তে আস্তে।” প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের প্রবক্তাগণ বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাগণ ম্যাড মব বা উন্মত্ত জনতার উদ্দীপ্ত আবেগকে ভয় করতেন। ফলে তারা যত্নের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ এমন একটি প্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থার নকশা করেছিলেন যেখানে নিয়মিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কর্তৃত্বের ভার অর্পিত হয় এবং এর মধ্যে দিয়ে বহুমানুষের বিভ্রান্তি ও হিংসা ঠেকিয়ে রাখা যায়।

যে কোনো ব্যক্তি স্রেফ পাঁচ মিনিটি টুইটারে কাটালেই চালর্স ম্যাকের কথার অর্থ বুঝতে পারবেন। হাল আমলের প্রযুক্তিবিদরা অবশ্য মবকে উন্মত্ত মনে করেন না, বরং তারা মনে করেন মব হলো প্রাজ্ঞ ও সঠিক: তারা হাওয়ার্ড রেইনগোল্ডের “স্মার্ট মব” শীর্ষক বইয়ের মতো নানা বইপুস্তক পাঠ করেন এবং ক্রমাগত ক্রাউড সোর্সিং সলিউশন ও “উইজডম অব ক্রাউড” বা ভীড়ের প্রজ্ঞা নিয়ে কথাবার্তা বলেন। তারা “হাইভ মাইন্ড” এর উপর ভরসা রাখেন। নিশ্চয়ই কম্পিউটার বাগের মতো কারিগরি সমস্যার সামাধানের বেলায় ক্রাউড বা বহু মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা বেশি কার্যকর। কিন্তু রাজনীতি একেবারেই ভিন্ন বিষয়।

সন্দেহ নেই স্মার্ট ফোন আসার বহু আগে থেকে মানুষ একে অপরকে খুন করতে সিদ্ধহস্ত। কিন্তু অতি আশাবাদী হয়ে সার্বক্ষণিক তথ্য ও যোগাযোগ নির্ভর গ্লোবাল ভিলেজের সন্ধান করতে গিয়ে সিলিকন ভ্যালি অসাবধানবশত ট্রাইবালিজমকে প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের খাঁচা থেকে বের করে ফেলেছে।

দ্যা গ্রেট ক্লাস্টারিং

সাম্প্রতিককালে রাজনীতিতে ঘটে যাওয়া বড় একটা পরিবর্তন হলো- তথ্যের ঘাটতি থেকে তথ্যের আধিক্যের জন্ম। এখন যতরকম তথ্য পাওয়া যাচ্ছে সেগুলোকে কোনো নিয়ম নীতি অনুযায়ী সাজানো বা অনুধাবন করা সবচেয়ে গোছানো ও চিন্তাশীল মানুষটির পক্ষেও অসম্ভব। আমরা এমন এক বিভাজনের যুগে বাস করছি যেখানে তথ্যের কোনো অভাব নেই। এতরকম বিভ্রান্তিকর তথ্য এখন পাওয়া যাচ্ছে যে মানুষ খুব সহজেই নিজের পছন্দমতো সংবাদ খুঁজে নিতে পারে যার মাধ্যমে তার বিদ্যমান পক্ষপাত বা প্রবণতাগুলো (প্রিএক্সিসটিং বায়াজ) আরো শক্তিশালী হতে থাকে। অগণিত সংযোগের মধ্যে থেকে আমরা নিজের মনের মতো মানুষ ও ধারণা সহজেই খুঁজে নিতে পারি, একত্রিত হতে পারি। আর এসব কিছুকে বর্ণনার জন্য জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন শব্দ: ফিল্টার বাবল, ইকো চেম্বার, ফেইক নিউজ ইত্যাদি। “পোস্ট-ট্রুথ” কথাটা যে ২০১৬ সালের- এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়।

ইন্টারনেটের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিচয়ের যে পরিবর্তন ঘটছে তার প্রভাব ব্যাপক। বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারণাকে আমরা কীভাবে বিচার করব এবং রাজনৈতিক কর্তাসত্ত্বা হিসেবে নিজেকে কীভাবে দেখব তার ধরণটাই পাল্টে দিচ্ছে ডিজিটাল যোগাযোগ মাধ্যম। বহুধরনের ব্যক্তিগত পছন্দের সুযোগ সম্বলিত নেটফ্লিক্স ও ইউটিউব যেমন মাস-অডিয়েন্স ভিত্তিক টেলিভিশনের জায়গা দখল করেছে, তেমনিভাবে সর্বব্যাপি যোগাযোগ ও তথ্যের বাড়বাড়ন্তের কারণে রাজনৈতিক পছন্দেরও সুযোগ তৈরি হয়েছে বহু সংখ্যক।

এর ফল হলো স্থির একক আইডেন্টিটির অবসান। এখন কেউ কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সদস্যের বদলে নিজের মতো মানুষদের নিয়ে গঠিত ছোট থেকে আরো ছোট হতে থাকা বিভিন্ন গ্রুপের সদস্য হতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। অনলাইনে কেউ ইচ্ছে করলেই হাজারো সদস্য নিয়ে তৈরি যে কোনো ধরণের গ্রুপ খুঁজে নিতে পারে কিংবা প্রয়োজনে নিজেও তৈরি করে নিতে পারে। কেউ কোনো বিষয়ে বিচলিত হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কিংবা এলগরিদমের ভূমিকার কারণে সহজেই একই ভাবে বিচলিত মানুষকে খুঁজে পেতে পারে। এই বিষয়টিকে সমাজবিজ্ঞানিরা নাম দিয়েছেন হোমোফিলি, রাজনৈতিক তাত্ত্বিকরা বলছেন আইডেন্টিটি পলিটিকস বা পরিচয়ের রাজনীতি। আমি এর নাম দিয়েছি রি-ট্রাইবালাইজেশান। মানুষের খুব স্বাভাবিক একটা প্রবণতা হলো একত্রিত হওয়া কিন্তু সংযোগ যত বাড়ে, নিজের পছন্দ মতো নিখুঁত গ্রুপের সাথে একত্রিত হওয়ার সুযোগ তত বাড়ে।

এর ফল হলো স্থির একক আইডেন্টিটির অবসান। এখন কেউ কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সদস্যের বদলে নিজের মতো মানুষদের নিয়ে গঠিত ছোট থেকে আরো ছোট হতে থাকা বিভিন্ন গ্রুপের সদস্য হতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। অনলাইনে কেউ ইচ্ছে করলেই হাজারো সদস্য নিয়ে তৈরি যে কোনো ধরণের গ্রুপ খুঁজে নিতে পারে কিংবা প্রয়োজনে নিজেও তৈরি করে নিতে পারে।

যে কারণে একদল সমমনা মানুষ উদ্দীপ্ত ট্রাইব বা গোষ্ঠীতে পরিণত হয় তা হলো সংগ্রাম ও দু:খবোধের কাছাকাছি অভিজ্ঞতা। আর ইন্টারনেট হলো মানব ইতিহাসে দু:খবোধ জমা করার সবচেয়ে বড় ঠিকানা। এই ক্ষোভ বা দু:খ বোধগুলোকে খাটো করছি না, এগুলো সবই ন্যায্য। আমি শুধু বলতে চাইছি, ইন্টারনেটের কল্যাণে ব্যক্তিমানুষের ক্ষুব্ধ হওয়ার, রাগান্বিত হওয়ার কিংবা হুমকিগ্রস্ত বোধ করার হাজারটা কারণ সামনে আসতে থাকে।

আমরা বহু আগে থেকেই নানা কারণে বিভিন্ন ধরণের ট্রাইবের অন্তর্ভুক্ত হই কিন্তু ইন্টারনেটে আমাদের সামনে ক্রমশ ছোট থেকে আরো ছোট আকারের পছন্দসই ট্রাইব গঠন করার, খুঁজে নেবার বা যোগ দেয়ার সুযোগ করে দিয়েছে, কিছুদিন আগেও হয়তো আমরা এসব ট্রাইব সম্পর্কে জানতাম না। আমি সবসময়ই আমার চারপাশে এরকম ঘটতে দেখি। আমি তিরিশোর্ধ একজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ যে কম্প্রেহেনসিভ স্কুলে পড়াশোনা করেছি। এটা তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো বিষয় না। কিন্তু যতই আমি ইন্টারেনেটে শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবী পরিবারের ছেলেদের কম্প্রেহেনসিভ স্কুলে খারাপ ফলাফল কিংবা উচ্চমাত্রায় আত্মহত্যার খবর পড়ছি ততই আমি ঐ শ্বেতাঙ্গ ট্রাইবের সদস্য হিসেবে একাত্মতা বোধ করছি। ট্রাইবালিজম গণতন্ত্রের জন্য মোটেই ভাল নয় কারণ ট্রাইবালিজম আমাদের মধ্যকার ছোট ছোট ভিন্নতাকে বড় করে তোলে এবং পরস্পরের মাঝে অনতিক্রম্য বিশাল দূরত্ব তৈরি করে।

ট্রাইবালিজম গণতন্ত্রের জন্য মোটেই ভাল নয় কারণ ট্রাইবালিজম আমাদের মধ্যকার ছোট ছোট ভিন্নতাকে বড় করে তোলে এবং পরস্পরের মাঝে অনতিক্রম্য বিশাল দূরত্ব তৈরি করে।

‘সিস্টেম ওয়ান’ সিস্টেম

ম্যাকলুহান মনে করতেন লিখিত শব্দ ও সেই সুবাদে লেখাপড়া জানা মানুষ শান্ত, আকর্ষণীয় এবং যৌক্তিক আচরণকারী। এই ধরণের মানুষেরা বিভিন্ন বিষয়কে ক্যাটাগরি বা প্রকারভেদ অনুযায়ী সাজাতে পারেন, যার অর্থ সময় নিয়ে বিশ্লেষণ করতে পারেন। তারা সেই মাধ্যমেরই একটা প্রতিফলন যেই মাধ্যমে তারা তথ্য পেয়েছেন। (এখান থেকেই তার আরেক বিখ্যাত উক্তি ‘মিডিয়াম ইজ দ্যা মেসেজ’ বা মাধ্যম নিজেই একটা বার্তা- এর আবির্ভাব।) বিপরীতে তিনি মনে করতেন, ইলেক্ট্রনিক মাধ্যম বিশেষত টেলিভিশনের তথ্য, শব্দ, দৃশ্য ইত্যাদি অনুভূতি নির্ভর। ম্যাকলুহানের বক্তব্য হলো, লেখাপড়া জানা মানুষ যদি যৌক্তিক আচরণকারী হন, তাহলে ইলেক্ট্রনিক মানুষ হবেন আরো বেশি আবেগি ও স্পর্শকাতর।

মানুষের আচার আচরণের উপর প্রযুক্তির প্রভাব বিষয়ে ম্যাকলুহানের ৫০ বছরেরও বেশি পুরাতন ধারণাগুলো আজও যে কোনো টেড টকের চেয়ে বেশি কার্যকর। ম্যাকলুহান বিজ্ঞানী ছিলেন না, ফলে তিনি এ বিষয়ে কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালাননি। তবে মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পক্ষপাতিত্বের ভূমিকা বিষয়ক গবেষক ডেনিয়েল কানম্যান অবশ্য বেশ কিছু গবেষণা করেছেন। সহযোগী আমোস তাভেরস্কিকে নিয়ে দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে তিনি দেখেছেন মানুষ কী করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে-বিশেষত অযৌক্তিক সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে নেয়। আমি এখানে তার স্ট্যানফোর্ড প্রিজন এক্সপেরিমেন্ট কিংবা আল্টিমেটাম গেইম নামের পরীক্ষাগুলো বর্ণনা করতে যাচ্ছি না, কিন্তু তার মূল বক্তব্য হলো, মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণের দুটো পদ্ধতি রয়েছে। প্রথম পদ্ধতি বা সিস্টেম ওয়ানের চিন্তা পদ্ধতি হলো দ্রুত, প্রবৃত্তি নির্ভর এবং আবেগি। অন্যদিকে দ্বিতীয় পদ্ধতি বা সিস্টেম টু কাজ করে ধীরে এবং যৌক্তিক ভাবে।

আধুনিক গণতন্ত্র সিস্টেম টু বা দ্বিতীয় পদ্ধতিতে চলতে চায় আর এর নাগরিকেরা হলো ম্যাকলুহানের পড়ালেখা জানা মানুষ। প্রতিষ্ঠানগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন যুক্তি ও তথ্য নির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে ইন্টারনেট অনেকটা সিস্টেম ওয়ানের মতো কাজ করে: ইন্টারনেটে সবকিছু এবং সকলেই তাৎক্ষণিক, প্রবৃত্তিনির্ভর ও আবেগি।

ইন্টারনেট দুটো ভিন্ন উপায়ে দুনিয়াদারি সম্পর্কে নতুন ধারণা গড়ে তুলে। প্রথমত, অনলাইনের সবকিছুই দ্রুত গতির এবং পারসনালাইজড বা নিজস্ব; লক্ষ লক্ষ ওয়েবসাইটে সহজে তাৎক্ষণিক ভাবে বিনামূল্যে প্রবেশ করা যায়। আপনি জুম ইন, জুম আউট, সুয়াইপ, ট্যাপ, চ্যাট যা খুশি করতে পারেন। ডগলাস রাশকফ তার বই “প্রেজেন্ট শক”- এ যেমন বলেছেন, “আমরা তাৎক্ষণিক ভাবে যা করছি সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।” তাছাড়া আমরা “কনফার্মেশান বায়াস” এর উপর নির্ভর করি- অর্থাৎ আমরা যেসব বিষয়েই পড়াশোনা করি যেসব বিষয়ে আমরা একমত, চারপাশে নিজের পছন্দসই মানুষদেরকেই দেখতে ভালবাসি এবং দুনিয়া সম্পর্কে আমাদের বিদ্যমান ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক যে কোনো তথ্য এড়িয়ে চলি। একই ভাবে, গবেষণায় দেখা গেছে, এতসব হট্টগোলের মধ্যে যেকোনো সিরিয়াস ও চিন্তাউদ্রেককারী মতামত ও গল্পের চেয়ে আবেগ নির্ভর কন্টেন্টই অনলাইনে বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করে, বেশি বেশি শেয়ার হয়।

দ্বিতীয়ত, ইন্টারনেট মূলত একটি আবেগ নির্ভর মাধ্যম যে বৈশিষ্ট্যটির বিষয়ে অনেক প্রযুক্তিবিদই সচেতন নন। গতি এবং আবেগ পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত কারণ এই দুটির মাধ্যমে আমাদের সুনির্দিষ্ট সক্ষমতার মস্তিস্ক তথ্যের অতিরিক্ত বোঝা ও সার্বক্ষণিক যোগাযোগের ধাক্কা সামলায়। নিঃসন্দেহে, মতামত ও বিচার বিশ্লেষণের জন্য নাগরিকদের তথ্যের প্রয়োজন এবং গণমাধ্যম গণতান্ত্রিক হলে তা নানাভাবেই সুবিধাজনক। কিন্তু আধুনিক নাগরিকদেরকে এক বিপুল পরিমাণ পরস্পর বিরোধী তথ্য, নেটওয়ার্ক, ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট, দাবী, ব্লগ, ডাটা, প্রপাগান্ডা, ভুল তথ্য, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, চার্ট, মন্তব্য, প্রতিবেদন ও রিপোর্টের ধাক্কা সামলাতে হয়। এর ফলে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, মানুষ প্রচন্ড চাপের মধ্য পড়ে যায়। ফলে মানুষ এতসব হট্টগোলের মধ্য থেকে সহজে বোঝা যায় এমন আবেগি বক্তব্যের উপরই নির্ভর করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

নিঃসন্দেহে, মতামত ও বিচার বিশ্লেষণের জন্য নাগরিকদের তথ্যের প্রয়োজন এবং গণমাধ্যম গণতান্ত্রিক হলে তা নানাভাবেই সুবিধাজনক। কিন্তু আধুনিক নাগরিকদেরকে এক বিপুল পরিমাণ পরস্পর বিরোধী তথ্য, নেটওয়ার্ক, ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট, দাবী, ব্লগ, ডাটা, প্রপাগান্ডা, ভুল তথ্য, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, চার্ট, মন্তব্য, প্রতিবেদন ও রিপোর্টের ধাক্কা সামলাতে হয়। এর ফলে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, মানুষ প্রচন্ড চাপের মধ্য পড়ে যায়। ফলে মানুষ এতসব হট্টগোলের মধ্য থেকে সহজে বোঝা যায় এমন আবেগি বক্তব্যের উপরই নির্ভর করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

ইন্টারনেট নিজে থেকে এই সমস্যা তৈরি করেনি। আমরা সবসময়ই আবেগ দ্বারা বেশি তাড়িত হই। কিন্তু ইন্টারনেট এই প্রবণতাটিকে একেবারে নতুন একটা উচ্চতায় নিয়ে গেছে। অপেক্ষা করেন, দেখবেন আর কয়েক বছরের মধ্যে ভিডিও কারসাজি এমন বিশ্বাসযোগ্য ও সহজপ্রাপ্য হয়ে যাবে, যে কেউ যে কাউকে দিয়ে যে কোনো কথা বলাতে সক্ষম হবেন, ফলে কোনটা বাস্তব আর কোনটা অবাস্তব তা নির্ধারণ করা আরো কঠিন হয়ে যাবে। দেখা যাবে এমন ফেইক ভিডিও বের হয়েছে যেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করছেন যে তিনি ক্লু ক্লাক্স ক্ল্যানের গোপন সদস্য কিংবা ভিডিওতে দেখা যাবে জর্জ সরোস গণতন্ত্র বিরোধী অভ্যুত্থানে মদদ দিচ্ছেন।

ট্রাইবের সমস্যাবলী

তথ্যের অতিরিক্ত বোঝার কারণে ট্রাইবালিজম ও সিস্টেম ওয়ান চিন্তাপদ্ধতির প্রাধান্য তৈরি হয়। এইরকম একটি পরিস্থিতিতেই যে কোনো ধরনের বিভক্তি ও মতভিন্নতা অস্তিত্বের সংকট হিসেবে হাজির হয়। এমনিতে রাজনৈতিক ট্রাইব বা গোষ্ঠী সমস্যাজনক কিছু নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কিছুটা মাত্রায় দলীয় আনুগত্য থাকাই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু দলীয় আনুগত্য যদি সবকিছুকে ছাড়িয়ে যায়, তাহলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে কারণ এরফলে আপোষ রফা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আবেগ ও অন্ধ গোষ্ঠীগত আনুগত্যের কাছে যুক্তির পরাজয় ঘটে। বিভিন্ন বিরোধী পক্ষ কী করে একেবারে পরস্পরের শত্রুতে পরিণত হচ্ছে- এই প্রক্রিয়াটা অনুধাবন করা আজকের দিনের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সামনে একটা বড় প্রশ্ন।

দলীয় আনুগত্য যদি সবকিছুকে ছাড়িয়ে যায়, তাহলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে কারণ এরফলে আপোষ রফা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আবেগ ও অন্ধ গোষ্ঠীগত আনুগত্যের কাছে যুক্তির পরাজয় ঘটে।

বিভিন্ন দৈনন্দিন বিষয়কে কেন্দ্র করে বিরোধ পবিত্রতা অপবিত্রতার প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে: এক পর্যায়ে কোনো ধরনের আপোষের নীতি কাজ করে না, কাজ করে স্রেফ দলীয় আনুগত্য। ‘আমরা’ ভাল এবং পবিত্র, আর ‘তারা’ শয়তান ও দুর্নীতিগ্রস্থ। বিষয়টা এখন বিভিন্ন জনের বিভিন্ন রকম রাজনৈতিক মত থাকার মধ্যে আটকে নেই, এখন ভিন্ন মত থাকার মানেই হচ্ছে তা কোনো গভীরতর নৈতিক সমস্যার লক্ষণ। আপনি কি লক্ষ করেছেন, অনলাইনে তর্ক কী করে মৃদু মতভিন্নতা থেকে পুরোপুরি নিন্দামন্দের জন্ম দেয়? আমার ধারণা যারা ব্রেক্সিটের পক্ষে বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন তারা খাওয়ার টেবিলে বেশ ভদ্রভাবেই আলাপ চারিতা চালাবেন। তাদের মধ্যে মতভেদ থাকবেই কিন্তু সামনাসামনি অবস্থায় তারা পরস্পরের কথা শোনা ও পরস্পরের যুক্তি বোঝার চেষ্টা অন্তত করবেন। অনলাইনে অবশ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে থেকে যাওয়ার পক্ষের মানুষদেরকে আত্মতুষ্ট এলিট হিসেবে আর বিপক্ষের মানুষদেরকে দায়িত্বহীন স্বাজাতিবাদী ও ঘৃণায় পূর্ণ জঙ্গিবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ইন্টারনেটে যোগাযোগের ধরনের কারণে এইরকম প্রবণতা বাড়ছে।

লিবারেলরা মনে করেন ভিন্নমতে সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে মতভেদের অবসান ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হয়। যদিও গবেষণায় দেখা গেছে কোনো বিষয়ে কারো মনোভাব পরিবর্তন করা ভীষণ কঠিন একটা কাজ। স্নায়ু বিজ্ঞানী ট্যালি শারট লিখেছেন, ” বিশ্বাস অনেকটা দ্রুত গতির গাড়ির মতো। আমাদের ভালো থাকা এবং সুখে থাকা যার উপর নির্ভর করে…। আমরা সেইসব তথ্য দিয়ে আমাদের মস্তিস্ক পূর্ণ করি যেগুলো আমাদেরকে সঠিক ও শক্তিশালী প্রমাণিত করে এবং সেইসব তথ্যই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি যেগুলো আমাদেরকে বিভ্রান্ত করে এবং নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে।” আর একারণেই, পরস্পরবিরোধী তথ্যের সামনে পড়ে আমরা নিজের বিশ্বাসকেই আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরি। মনে করে দেখুন, ডোনাল্ড ট্রাম্প কতবারই ভুল প্রমাণিত হয়েছেন কিন্তু ভোটের ফলাফলের উপর তার প্রভাব পড়েছে সামান্যই। বেশকিছু অস্বস্তিকর গবেষণা থেকে দেখা গেছে দুই দল মানুষের তর্কের পর দেখা যায় তর্কের শুরুতে তারা যতটা চরমপন্থী মতামত ধারণ করতো, তর্কের শেষে তা আরো বেড়েছে।১০ কেউ জানেনা কী কারণে এমনটা ঘটে। নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে আমরা অবশ্যই আমাদের মনোভাবের পরিবর্তন করি। অপর মানুষটির ব্যাকগ্রাউন্ড বা মনোভাবকে মাথায় রেখে যখন যত্নের সাথে বিস্তারিত যুক্তি হাজির করা হয় তখন অনেক সময় মানুষের মতের পরিবর্তন ঘটে।১১ কিন্তু এটা বেশ ধীরগতির এবং শ্রমসাধ্য একটা প্রক্রিয়া।

বেশকিছু অস্বস্তিকর গবেষণা থেকে দেখা গেছে দুই দল মানুষের তর্কের পর দেখা যায় তর্কের শুরুতে তারা যতটা চরমপন্থী মতামত ধারণ করতো, তর্কের শেষে তা আরো বেড়েছে।কেউ জানেনা কী কারণে এমনটা ঘটে। নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে আমরা অবশ্যই আমাদের মনোভাবের পরিবর্তন করি। অপর মানুষটির ব্যাকগ্রাউন্ড বা মনোভাবকে মাথায় রেখে যখন যত্নের সাথে বিস্তারিত যুক্তি হাজির করা হয় তখন অনেক সময় মানুষের মতের পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু এটা বেশ ধীরগতির এবং শ্রমসাধ্য একটা প্রক্রিয়া।

দুর্ভাগজনক হলো, ডিজিটাল যোগাযোগ মাধ্যম এরকম আচরণের জন্য অনুকূল নয় কারণ এখানে প্রতিপক্ষের সাথে মতবিনিময় সাধারণত দ্রুতগতির, অস্থির এবং আবেগমথিত। ফলে এর মাধ্যমে বোঝাপড়া বৃদ্ধির বদলে হ্রাস পায়। ২০০১ সালে জর্জ সুলার দেখিয়েছিলেন কেন এমন ঘটে, এ জন্য তিনি কতগুলো ফ্যাক্টর বা উপাদানের একটা তালিকা করেছেন যার প্রভাবে মানুষ অফলাইনের সামাজিকতা ও নিয়মকানুনগুলো অনলাইনে না মানার পরিস্থিতি তৈরি করে। সুলার বলেছেন, যেহেতু অনলাইনে একজন আরেকজনকে দেখি না বা ভালো ভাবে চিনি না, যেহেতু যোগাযোগটা তাৎক্ষণিক ধরণের, আপাত অর্থে তেমন কোনো নিয়ম বা দায়িত্ববিহীন, এবং যেহেতু পুরো ব্যাপারটি ঘটে অল্টারনেটিভ রিয়েলিটি বলে মনে করা একটা জগতের মধ্যে, ফলে আমরা এমন সব কাজ করে বসি যা হয়তো আমরা বাস্তবে করতাম না। সুলার এটাকে “টক্সিক ডিসইনহিবিশান” বা “বিষাক্ত নি:সংকোচ” বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইকো চেম্বার বা ফিল্টার বাবল বিষয়ক লেখাগুলোতে এই দিকটি নিয়ে কোনো আলোচনা পাওয়া যায় না। ইন্টারনেটের মাধ্যমে শুধু ছোট ছোট ট্রাইবই তৈরি হয়না, এর মাধ্যমে শত্রু পক্ষের ট্রাইবেরও খোঁজ মেলে। অনলাইনে আমার মতামতের বিপরীত মত সবসময়ই আমার চোখে পড়তে থাকে কিন্তু এর ফলে খুব কম ক্ষেত্রেই আমার মতের পরিবর্তন ঘটে। বরং এর মাধ্যমে আমার এই বিশ্বাসটিই আরো গাঢ় হয় যে একগাদা ইন্টারনেট বলদের মধ্যে আমিই একমাত্র সুস্থ মস্তিস্কের মানুষ।

যেহেতু অনলাইনে একজন আরেকজনকে দেখি না বা ভালো ভাবে চিনি না, যেহেতু যোগাযোগটা তাৎক্ষণিক ধরণের, আপাত অর্থে তেমন কোনো নিয়ম বা দায়িত্ববিহীন, এবং যেহেতু পুরো ব্যাপারটি ঘটে অল্টারনেটিভ রিয়েলিটি বলে মনে করা একটা জগতের মধ্যে, ফলে আমরা এমন সব কাজ করে বসি যা হয়তো আমরা বাস্তবে করতাম না।

অবশ্য এই সবকিছুর দায় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির উপর চাপিয়ে দেয়াটা ঠিক হবেনা কারণ এর অনেক কিছুই মানবীয় দুর্বলতার কারণে ঘটছে, প্রযুক্তির দুর্বলতার কারণে নয়। প্রযুক্তি যা করেছে তা হলো এইসব দুর্বলতাকে আরো বড় করে তুলেছে। তাছাড়া ইন্টারনেটপূর্ব যুগকে নিয়ে এত রোমান্টিক হওয়ারও কোনো কারণ নেই। মানুষ সবসময়ই গোষ্ঠীবদ্ধ হয়েছে এবং রাজনীতি সবসময়ই বিভাজন সৃষ্টি করেছে। রাজনীতিতে সবসময়ই কারসাজি ও মিথ্যাচার ছিল।

কিন্তু মুশকিল হলো বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এই মানসিক দুর্বলতাগুলোকে সংবাদ ভোগের কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যে পরিণত করেছে এবং অর্থ উপার্জনের কাজে লাগিয়েছে। তাদের আর্থিক স্বার্থ অনেক ক্ষেত্রে মানুষের বিভিন্ন ধরনের উৎস থেকে সঠিক তথ্য জানার গণতান্ত্রিক অধিকারের বিপরীতে কাজ করে। সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমই দাবি করে যে তারা প্রকাশক নয়, স্রেফ প্লাটফর্ম, ফলে তাদের এখানে যেসব কন্টেন্ট পাওয়া যায় তার ব্যাপারে তাদের কোনো আইনি দায়বদ্ধতা নেই। এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি ফেসবুক কিংবা ইউটিউবের মতো কোম্পানিগুলোর জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ কারণ তা না হলে তাদের সাইটে আপলোড হওয়া শত শত কোটি কন্টেট পরীক্ষা নিরীক্ষার ভার পড়বে তাদের উপর। ফলে বিভাজন ও বিভ্রান্তিসৃষ্টিকারি কন্টেট সরানোর ব্যাপারে তারা সব সময়ই বেশ দ্বিধাগ্রস্থ থাকে কারণ না হলে আইন প্রণেতারা মনে করে বসতে পারেন যে এরা প্রকাশকের মতো আচরণ করছে ফলে এদেরকে রেগুলেশানের মধ্যে নিয়ে আসা যায়। এই দ্বন্দ্ব থেকে মুক্তির সহজ কোনো রাস্তা তাদের নেই।

কিন্তু নিরপেক্ষ থাকার সিদ্ধান্তও এক অর্থে সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সবকিছুই কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কিউরেটেড বা সযতনে বাছাইকৃত। মানুষ কর্তৃক সম্পাদনার বদলে সাধারণত এই বাছাই করার কাজটি করা হয় রহস্যময় কোনো এলগরিদমের মাধ্যমে। এই এলগরিদমের কাজ হলো আপনার সামনে এমন সব কন্টেন্ট হাজির করা যেগুলো আপনার পছন্দ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি যেন এর সাথে যুক্ত করে বেশি বেশি বিজ্ঞাপন বিক্রি করা যায়। যেমন, ইউটিউবের নেক্সট বা পরবর্তী ভিডিওগুলো নির্ধারণ করা হয় অবিশ্বাস্য রকম সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে যেন আপনাকে আরো বেশি সময় ব্যস্ত রাখা যায়। ইউটিউবের রিকমেন্ডেশান ইঞ্জিন নিয়ে কাজ করা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ গুইলামে চাসলটের বক্তব্য অনুসারে, এলগরিদমের কাজ আপনার জন্য সত্যবাদী ও সৎ কন্টেন্টগুলো বাছাই করা নয়, বরং আপনার ওয়াচ-টাইম বা দেখার সময় বাড়ানো। গার্ডিয়ানের কাছে তিনি সম্প্রতি বলেছেন, “এই বিবেচনার বাইরের আর সব কিছুকেই ডিসট্রাকশান বা মনোযোগ বিনষ্টকারী হিসেবে দেখা হয়।”১২

এই এলগরিদমের কাজ হলো আপনার সামনে এমন সব কন্টেন্ট হাজির করা যেগুলো আপনার পছন্দ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি যেন এর সাথে যুক্ত করে বেশি বেশি বিজ্ঞাপন বিক্রি করা যায়।

এই সিদ্ধান্ত না নেয়ার সিদ্ধান্তগুলোর প্রভাব কিন্তু ব্যাপক। কারণ সামান্য কনফার্মেশান বায়াস বা বিদ্যমান বিশ্বাসের সাথে সংগতিপূর্ণ তথ্যের প্রতি পক্ষপাতিত্ব একটা স্ব-আরোপিত চিরস্থায়ি চক্রের সূচনা ঘটাতে পারে। ধরা যাক আপনি বামপন্থী রাজনীতি বিষয়ক একটি লিংকে ক্লিক করলেন। দেখা গেল কোনো একটা এলগরিদম এটাকে বামপন্থী রাজনীতির প্রতি আপনার আগ্রহের প্রকাশ হিসেবে ধরে নিয়ে আপনাকে এ বিষয়ে আরো বেশি করে লিংক দেখাতে থাকল। আপনার সামনে যেহেতু বামপন্থী লেখার লিংক বেশি আসছে সেহেতু আপনার সেগুলোতে ক্লিক করার সম্ভাবনা বেশি কারণ আপনার সামনে অন্যধরণের লিংক তুলনামূলক কম- এটাকে পুনরায় বামপন্থী রাজনীতির প্রতি আপনার আগ্রহের প্রকাশ হিসেবে ধরে নেয়া হবে। ইউটিউব ছেড়ে আসার পর চেশলটের চালানো গবেষণা অনুসারে ইউটিউব পদ্ধতিগত ভাবে বিভাজন সৃষ্টিকারি ভিডিওগুলোর বেশি প্রচার করে, যদিও ইউটিউব তা অস্বীকার করেছে। সত্যি বলতে কি, প্রযুক্তি কোম্পানিতে যারা কাজ করেন তাদের কাউকেই আমার এ বিষয়টি নিয়ে সুখি মনে হয়নি, বিগত কয়েক বছরে অনেকেই এই সমস্যাটি স্বীকার করে তার সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

কিন্তু সমস্যা হলো কেউ কিন্তু ইচ্ছা করে কোনো উত্তেজনাসৃষ্টিকারী প্রোগ্রাম তৈরি করেননি- এটা হলো উত্তেজনাকর ভিডিওর প্রতি আমাদের স্বাভাবিক আকর্ষণ বিষয়ে গাণিতিক সাড়ার ফলাফল। এটা একই সাথে আয়না ও বিবর্ধক- বিগডাটার শক্তিতে চালিত বিশাল এক ফিডব্যাকলুপ। আপনি ডাটা প্রবেশ করাবেন এবং এমন ফলাফল পাবেন যা নিজেকেই অনুকরণ করতে থাকে। সংবাদপত্রগুলোও সবসময় এরকম আঘাত ও উত্তেজনা কাজে লাগিয়ে ব্যবসা করেছে কারণ এলগরিদমগুলো মানুষের যে ঝোঁকগুলোকে আবিষ্কার করেছে, তারা বহুদিন থেকেই সেগুলো সম্পর্কে জানে। কিন্তু পার্থক্য হলো সংবাদপত্র যা প্রকাশ করে তার জন্য আইনিভাবে দায়বদ্ধ আর মানুষও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকীয় অবস্থান সম্পর্কে অবগত। অথচ এলগরিদমগুলোর একটা নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি রয়েছে এবং এর জন্য কাউকে জবাবদিহিতা করতে হয় না- যদিও এক ইউটিবের এলগরিদমের মাধ্যমেই নির্ধারিত হয় দেড়শকোটি মানুষ প্রতিদিন কীকী ভিডিও দেখবেন- যে সংখ্যাটি দুনিয়ার সব সংবাদপত্রের সম্মিলিত পাঠকের চেয়েও বেশি।

তথ্যসূত্র:

১। Marshall McLuhan, The Gutenberg Galary: The Making of Typographic Man (University of Toronto Press, 1962).

২। Eric Norden, The Playboy Interview: Marshall McLuhan, Playboy, March 1969.

৩। Thomas Hawk, How to unleash the wisdom of crowds’, www.theconversation.com, 9 February 2016.

৪। See especially the following authors: Zeynep Tufekci, Eli Pariser and Evgeny Morozov. On post-truth’, see books by Matthew D’Ancona, James Ball and Evan Davies.

৫। Bruce Drake, Six new hindings about Millennials’, www.pewresearch.org. 7 March 2014. A survey repeatedly found that millennials have fewer institutional attachments than their parents, are more politically independent, but do ‘connect’ to personalised networks.

৬। Daniel Kahneman, Thinking, Fast and Slow (Farrar, Straus and Giroux, 2011).

  1. Messing and SI Westwood (2014), “Selective expo- sure in the age of social media: Endorsements trump partisan source affiliation when selecting news online’. Communication Research, +1(8), 1042-1063.
  2. Bakshy, S. Messing and LA. Adamic (2015), “Exposure to ideologically diverse news and opinion on Facebook’, Science, 348 (6259), 1130-1132.

৭। Lee Drutman, ‘We need political parties. But their rabid partisanship could destroy American democracy’, www. vox.com, 5 September 2017.

৮। Dratman, We need political parties’. com, 12 April 2017. ??

৯। Jonathan Freedland, ‘Post-truth politicians such as Donald Trump and Boris Johnson are no joke’, Guardian 13 May 2016

      Miriam Valverde, ‘Pants on Fire! Trump says Clinton would let 650 million people into the U.S., in one week’, 31 October 2016, www.politifact.com. Polling data were taken from  www.realclearpolitics.com poll tracker.

১০। B. Nyhan and J. Reifler (2010), When corrections fail. The persistence of political misperceptions’, Political Behavior, 32 (2), 303-330.

১১। Dolores Albarracin et al. (2017), “Debunking: A Meta- Analysis of the Psychological Efficacy of Messages Countering Misinformation,” Psychological Science, 28 (11), 1531-1546.

১২। Paul Lewis, “Fiction is outperforming reality”: how YouTube’s algorithm distorts truth’, Guardian, 2 February 2018.

Social Share
  • 294
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    294
    Shares
  •  
    294
    Shares
  • 294
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *