ধর্ষণের সামাজিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিপ্রেক্ষিত: ইসলামে নারী-পুরুষ সম্পর্ক অনুসন্ধান

ধর্ষণের সামাজিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিপ্রেক্ষিত: ইসলামে নারী-পুরুষ সম্পর্ক অনুসন্ধান

মির্জা তাসলিমা সুলতানা

ছবি: এহসান-উল ইসলাম তানিম

ঘরে বাইরে পথে ঘাটে কর্মস্থলে শিক্ষাঙ্গনে ধর্ষণসহ যৌন নিপীড়ন কী কী কারণে বেড়ে যাচ্ছে তার অনুসন্ধান খুব গুরুত্বপূর্ণ। নারী পুরুষের সম্পর্ক এবং যৌনতা বিষয়ে সমাজ ধর্মের অবস্থান, অনুশাসন, বিধিনিষেধ বিশ্লেষণও এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আইনী প্রশ্নের পাশাপাশি ধর্ষণের পরিপ্রেক্ষিত বুঝতে প্রয়োজন বিদ্যমান সামাজিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ বিশ্লেষণ- এই উপলব্ধি থেকেই বর্তমান লেখাটির প্রয়াস। 

যদি একটি দিন নেই, ধরা যাক দিনটি ২২শে অক্টোবর, ২০২০। এই দিনের প্রথম আলোর প্রথম পাতার নারী ও শিশু নির্যাতন বিভাগের খবর, “দরজা ভেঙে অস্ত্রের মুখে প্রবাসীর স্ত্রীকে ধর্ষণ করা হয়েছে” (প্রথম আলো, ২২.১০.২০২০)। অভিযুক্ত নোয়াখালির নোয়াখোলা ইউনিয়নের যুবলীগ সভাপতি। এই খবরেই আছে যে স্থানীয় যুবলীগ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে তাৎক্ষণিকভাবে। তবে ঐ খবরে এও জানা যাচ্ছে, ২০১৮ সালে ৭ইফেব্রুয়ারি পুলিশ পরিচয়ে এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একজন কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ ছিল। সাধারণভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে আগের অভিযোগের যদি সঠিক তদন্ত ও শাস্তি ইতোমধ্যেই হতো, তাহলে দ্বিতীয় অপরাধটি ঘটতো কি? নোয়াখালির বেগমগঞ্জের নারীকে উলঙ্গ করে নির্যাতনের ভিডিও (সেপ্টেম্বর ২ এর ঘটনা) অক্টোবর ৫ এ ছড়িয়ে দেওয়ার পরসারা দেশের মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে।

এই পরিস্থিতিতে সরকার তড়িঘড়ি করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির বিধান করে আইনের সংশোধনী আনে অক্টোবর ১৩, ২০২০ তারিখে। সরকার থেকে এই শাস্তি বিধানের পক্ষে অন্যতম যুক্তি ছিল, সর্বোচ্চ শাস্তির বিধানে ধর্ষকেরা ভয় পাবে এবং ধর্ষণ কমবে। অথচ ২২শে অক্টোবর প্রথম আলোর পূর্বোক্ত খবরে অক্টোবর ১৩ থেকে অক্টোবর ১৯ পর্যন্ত সারাদেশে আরো ৯ টি ধর্ষণের খবর প্রকাশ করেছে। এই সংখ্যার ভিত্তি হল রিপোর্টেড ঘটনাসমূহ, বা যেই ঘটনাগুলোর জন্য আইনের দ্বারস্থ হয়েছে মানুষ তার হিসাব। ধারণা করা যায়, এই সময়ে আরো অনেক ঘটনা চাপা রয়েছে, প্রতিবিধান চাওয়া হয়নি, ফলে খবরেও নেই। এই লেখা যখন লেখা হচ্ছে তখনও প্রতিদিন পত্রিকায় রিপোর্টেড ধর্ষণের খবর প্রকাশিত হয়ে চলেছে। প্রকাশিত হচ্ছে, ছেলে শিশু ধর্ষণ ও মৃত্যুর খবর। এই আইন সংশোধনী নিয়ে প্রচার প্রচারণা সরকারের তরফ থেকে ভালোই হয়েছে। তা সত্ত্বেও ধর্ষণের ঘটনার কমতি নাই, ফলে  মনে হয় না, ধর্ষণেচ্ছুরা এই আইনের ফাঁসির বিধানের ফলে বিশেষ ভয় পেয়েছে। এইটাই যে হতে যাচ্ছে সে সতর্কবাণী নানান মহল থেকে আগেই উঠেছিল, কিন্তু ক্ষমতাসীনেরা তাতে কর্ণপাত করেননি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে কখনও কোনো অপরাধ দমন করা যায়নি। তার উপরে যদি ধর্ষণের উপাদান সমাজে যাপিত জীবন ও আধিপত্যকারী সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্যেই থাকে তখন তাকে কমিয়ে আনার জন্য আরো গভীরতর বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে। এছাড়া এই আমরা আরো ঘটনার অভিজ্ঞতায় যখন ঘরপোড়া গরু, তখন নানাজনের সৃজনশীল আপত্তি উপেক্ষা করে সরকার তাড়াহুড়া করে যে পদক্ষেপ নিল তার আন্তরিকতা নিয়ে আমাদের সন্দেহ হয় বৈকি! বলা বাহুল্য দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে ইতোমধ্যেই সাতটি ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও এই অপরাধ কমেনি। তার উপরে হিসাবে দেখা যায় থানায় দেয়া অভিযোগগুলো থেকে শতকরা মাত্র এক ভাগের ক্ষেত্রে শাস্তি হয়েছে। নোয়াখোলা ইউনিয়নের ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত, কিংবা বেগমগঞ্জের নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্তরা যদি বিশ্বাস করতো যে অপরাধ করলে ছাড় পাবে না, কিংবা কোনো দল, দলপতির আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত হবে, বিদ্যমান ব্যবস্থাতে শাস্তি হবেই, তাহলে হয়তো অপরাধগুলো কমতে পারতো। বরঞ্চ আমরা দেখি, বাগে পেয়ে যেমন কোনো নারী বা কিশোরীকে দলগত ধর্ষণ করা হচ্ছে, আবার পরিবারের মধ্যেও নারী ও শিশুদের ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা, ধর্ষণ সংজ্ঞাকে যুগোপযোগী না করা, সাক্ষ্য আইনে পরিবর্তন ইত্যাদি প্রসঙ্গে দেশে নারীবাদী ও আইনজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবী তুলে আসছে। এইবারে আন্দোলনে ফুঁসে উঠার পাশাপাশি এই প্রসঙ্গগুলো বারংবার নানান মাধ্যমে এসেছে। কুমিল্লা সেনানিবাসে তনু ধর্ষণ ও হত্যার তীব্র আন্দোলন সত্ত্বেও পুলিশের তদন্ত আজও শেষ করতে না পারা, পাহাড়ে একের পর এক সেনা বাহিনীর উপস্থিতিতেই ধর্ষণের ঘটনার কোনো বিহিত না হওয়ায় জনমনের অবিশ্বাস এখন চূড়ান্ত অবস্থায় আছে।

নোয়াখোলা ইউনিয়নের ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত, কিংবা বেগমগঞ্জের নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্তরা যদি বিশ্বাস করতো যে অপরাধ করলে ছাড় পাবে না, কিংবা কোনো দল, দলপতির আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত হবে, বিদ্যমান ব্যবস্থাতে শাস্তি হবেই, তাহলে হয়তো অপরাধগুলো কমতে পারতো।

আইনী প্রশ্নের পাশাপাশি ধর্ষণের পরিপ্রেক্ষিত বুঝতে প্রয়োজন বিদ্যমান সামাজিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ বিশ্লেষণ; এই উপলব্ধি থেকেই বর্তমান লেখাটির প্রয়াস। 

সাম্প্রতিক প্রতিবাদ প্রতিরোধের মধ্যে বাংলা চলচ্চিত্রের নায়ক অনন্ত জলিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্ষণের কারণ হিসাবে পোশাককে চিহ্নিত করে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন, তাঁর বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ ছিল চোখে পড়ার মত। জলিলের নিজেরই “সঠিক” পুরুষের শরীরের অভাব আছে ও সেই কারণে তার পরিহিত পোশাকও “অশালীন” এইরকম যুক্তিতে এই নায়ক ট্রলের মুখে পড়েন। তাকে কাউন্টার করতে গিয়ে আবার আধিপত্যকারী ধারণারই আশ্রয় নিতে দেখা যাচ্ছে। যাইহোক, প্রতিবাদের মুখে উল্লেখিত ভিডিও সরিয়ে নতুন ভিডিও প্রকাশ করতে তিনি বাধ্য হন, যেখানে বক্তব্য ছিল, ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাক নয় দায়ী ধর্ষক। ধর্ষণের কারণ হিসাবে নারীকেই দায়ী করা, “শালীন”পোশাক না পরার জন্য, “অনুচিত” সময়ে রাস্তায় চলাচলের জন্য  বা কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়াকে বরাবরই ধর্ষণের কারণ হিসাবে দেখানো হয়। এমনকি সাক্ষ্য আইনের গুণে এই সব কারণে আদালতে বলা সম্ভব যে ঐ নারী চরিত্রহীন, ফলে তার ধর্ষণ হওয়াটা জায়েজ, আদতে যা ঘটেছে তা ধর্ষণই নয়। ফলে নায়ক অনন্ত জলিল ভিডিও সরিয়ে নিতে বাধ্য হলেও এই আন্দোলনের এক পর্যায়ে পোশাকসহ ধর্ষণের কারণ হিসাবে অন্যান্য  আধিপত্যকারী ধারণাগুলোকে হারিয়ে যেতে দেখি না বরং জাঁকিয়ে বসানোর প্রচেষ্টা দেখতে পাই।

দুটি ঘটনা এখানে প্রণিধানযোগ্য, এক. সরকারের আইন সংশোধনের দিনে অক্টোবর ১৩ তারিখে ইসলামি শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে শাহবাগে “যিনা, ব্যাভিচার ও ধর্ষণ বিরোধী সমাবেশ”  অনুষ্ঠিত হয়;ও দুই. অক্টোবর ১৯ তারিখে কলরব শিল্পীগোষ্ঠী তাদের হলি টিউন নামক ইউ টিউবে “পর্দা নিয়ে সময়ের সেরা গজল” নামে একটি সঙ্গীত উন্মুক্ত করে। লক্ষণীয় উভয় ক্ষেত্রেই ধর্ষণের বিচার চেয়েই তারা তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক লক্ষ্য প্রচার করছেন।

এই গান নারীর শালীনতার ডিসকোর্সকেই পুনরারোপ করতে চায়। অথচ তনু বা নুসরাত হিজাব পরেও রক্ষা পায়নি। শিশু থেকে বৃদ্ধা কেউই সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণ থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

অসম্মতিতে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপনকে সাধারণভাবে ধর্ষণ বলা হয়। ইসলামি শাসনতস্ত্রের অনুসারী শিক্ষার্থীরা মূল ব্যানারে ধর্ষণ বিরোধিতার পাশাপাশি যিনা ও ব্যাভিচারের বিরোধিতারও ঘোষণা দিয়েছে, তবে এই দুটো প্রসঙ্গে অসম্মতির বিষয়টি নেই। অনেকের কাছে তাই ধর্ষণ প্রসঙ্গে এদের এই অবস্থানকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হতে পারে, এবং তাই তাদেরকে ইতোমধেই চলমান ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের সারথী মনে না হওয়াও যুক্তিযুক্ত। অপরদিকে কলরবের গানে নারীকে আহ্বান জানানো হচ্ছে, পর্দা করতে, কারণ গানের ভাষায় পর্দাই নারীর মর্যাদা ও “সেইফটিবিধান” করবে। পুরুষকেও আহ্বান করা হয়েছে “নিম্নগামী”চোখ ও “খোদাভীতি” নিয়ে চলতে। নারীর চলতে হবে “শালীন” হয়ে কিন্তু বলতে হবে “কঠোরভাবে”; নারীর নানান কর্মক্ষেত্রের অংশগ্রহণ কাম্য হলেও পরপুরুষের সাথে অপ্রয়োজনে কথা বলা নারীর জন্য অমর্যাদাকর বলা হচ্ছে গানে। বলা বাহুল্য এই গান নারীর শালীনতার ডিসকোর্সকেই পুনরারোপ করতে চায়। অথচ তনু বা নুসরাত হিজাব পরেও রক্ষা পায়নি। শিশু থেকে বৃদ্ধা কেউই সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণ থেকে রেহাই পাচ্ছে না। তদুপরি এই গানে সবশেষ লাইনটি হচ্ছে, “শুনতে চাই না মুখরোচক নারীবাদী স্লোগান”। যদিও “নারী বলনে কঠোর” হবে সেটা এই গানেই আছে, তাহলে নারীবাদী স্লোগানে তাদের আপত্তিটা কোথায়? কেন নারীবাদীদের মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছেন তাঁরা? কেনই বা ধর্ষণের বিরুদ্ধে যাঁরা আছেন তাঁদের সবাইকে সাথে নিয়ে ধর্র্ষণ বিরোধী জোরালো লাগাতার আন্দোলনে তাঁদেরকে আমরা আগ্রহী দেখি না? ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনে পর্দার বিরুদ্ধে কোনো স্লোগান ছিল না। ছিল না ধর্মীয় কোনো বিশ্বাসের বিরুদ্ধেও। আপনাআপনি তাঁরা কেন নারীবাদী স্লোগানকে গায়ে মাখালো? তাহলে নারীবাদীরা ধর্ষণের কারণ হিসাবে সমাজে নারী-পুরুষের অসমতাকে যেভাবে কারণ হিসাবে দেখেন তাঁরা এই অসমতাকেই সমর্থন করেন? ইসলামি শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের জমায়েতে কোনো নারীর উপস্থিতি আমরা দেখিনি। আর কলরবের গানটিও খুবই সুরেলা কণ্ঠে গেয়েছেন দুজন পুরুষ। উল্লেখযোগ্য  হলো, নারীর কর্ত্রীসত্তা বা এজেন্সি এই দুই ঘটনায় অনুপস্থিত। কিন্তু পাশাপাশি একইসময় রাজপথে স্লোগানে স্লোগানে নানান বয়সী নারী এই আন্দোলনে সক্রিয় আছেন। রেকর্ড দেখাচ্ছে কলরবের গানটির চার দিনেই তিন লক্ষ বিরাশি হাজার চারশ আটাশিটি ভিউ হয়েছে। তার অর্থ হচ্ছে এই গানের শ্রোতা আছে এই দেশে, যাদের প্রাণের খুব কাছের হয়তো এই গানের বাণী। নারীর সক্রিয় স্লোগানকে “মুখরোচক” হিসাবে হেয় করে নারীর কর্ত্রীসত্তার বিরোধীতা করার বার্তা সকলকে দেওয়া হচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হয়। রেহনুমা আহমেদকে (২০০৬) অনুসরণ করে মুসলিম প্রধান দেশের সমাজচিন্তক হিসাবে ইসলামপন্থী এইসমস্ত কাজগুলোকে তাই আর একপাশে রেখে দেওয়াকে আমি সমীচীন বলে আমি মনে করি না। সেকারণে এই প্রশ্ন তোলাও জরুরি যে, ইসলাম কি আসলেই নারীর কর্ত্রীসত্তাকে জায়গা দেয়না? পুরুষ নারীর জন্য সঠিক মনে করে যে বিধান প্রচার করে, সেটা কি ইসলাম সম্মত?

ইসলামি শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের জমায়েতে কোনো নারীর উপস্থিতি আমরা দেখিনি। আর কলরবের গানটিও খুবই সুরেলা কণ্ঠে গেয়েছেন দুজন পুরুষ। উল্লেখযোগ্য  হলো, নারীর কর্ত্রীসত্তা বা এজেন্সি এই দুই ঘটনায় অনুপস্থিত। কিন্তু পাশাপাশি একইসময় রাজপথে স্লোগানে স্লোগানে নানান বয়সী নারী এই আন্দোলনে সক্রিয় আছেন।

ইসলামি চিন্তার পুনঃপঠনমূলক (আহমেদ, ২০০৬) কাজগুলো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাকে সাহায্য করে। নারী ইসলামি স্কলার আসমা বারলাস (২০০২) তাঁর কাজে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখেন, পুরুষকে কি কোরআনে নারীর উপরে স্থান দেওয়া হয়েছে? পুরুষেরই কি এখতিয়ার নারীর জন্য ভালোমন্দ নির্ধারণের? তিনি দেখেন এমন কিছু কোরআনে বলা হয়নি। তিনি বলেন, পুরুষের কোরআনের পিতৃতান্ত্রিক পঠনের মাধ্যমে নারীবিদ্বেষী নানা তাফসির বা ব্যাখ্যা হাজির করা হয়েছে। কিন্তু নারী মুক্তির জন্য কোরআনের পঠন সম্ভব। কোরআনে আল্লাহ নিজের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যে ঘোষণা দেন তা অনুধাবনের মাধ্যমে বোঝা যায়, তিনি নারী-পুরুষ উভয়ের যৌন কর্ত্রী/কর্তাসত্তাকে সমানভাবে জায়গা দিয়েছেন। আল্লাহর একত্ব বা তৌহিদের সুদূর প্রসারী অর্থ বুঝলে দেখা যায় তাঁর একত্ব ও সার্বভৌমত্বে অন্য কারো ভাগ নেই। ফলে তিনি পুরুষকে তার স্ত্রী ও সন্তানদের শাসন করবার অধিকার দেন নি, কিংবা আল্লাহর ও নারীর মাঝে পুরুষের কোনো মধ্যবর্তী যোগসূত্র হওয়ারও সুযোগ নেই। সেইজন্য বারলাসের পঠন বলে, পিতৃতন্ত্র বা পিতার শাসনের কোনো সুযোগ ইসলামে নেই (বারলাস, ২০০২: ১৪)। আল্লাহর দ্বিতীয় মূল বৈশিষ্ট্য হল, আল্লাহ ন্যায়পরায়ণ। তিনি কারো প্রতি জুলুম করেন না। সুতরাং আল্লাহর বাণীরও নারী বিদ্বেষী হওয়ার সুযোগ নেই। সুতরাং ইসলামের শিক্ষা নারীর উপর কোনো আধিপত্য ও জুলুম সমর্থন করে না। তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হল আল্লাহ কারো সাথে তুলনীয় নন। আসমা বারলাস বলছেন কোরআনে বিরামহীনভাবে বলা হয়েছে, যে আল্লাহর যৌনপরিচয় নেই, ফলে আল্লাহকে পুরুষের মত বা পুরুষের প্রতি আল্লাহর পক্ষপাতিত্ব থাকবে এমন ভাবার কোনো  সুযোগ নেই (বারলাস, ২০০২:১৫)। আল্লাহর তৌহিদের বৈশিষ্ট্যকে আমরা অন্যান্য ধর্মের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেভাবে প্রাসঙ্গিক করে বিবেচিত হতে দেখি, নারী-পুরুষের সম্পর্কের সমতা প্রসঙ্গে আল্লাহর সকল বৈশিষ্ট্যকে আমরা একইভাবে বিবেচনা করতে দেখি না। 

এই প্রশ্ন তোলাও জরুরি যে, ইসলাম কি আসলেই নারীর কর্ত্রীসত্তাকে জায়গা দেয়না? পুরুষ নারীর জন্য সঠিক মনে করে যে বিধান প্রচার করে, সেটা কি ইসলাম সম্মত?

কোরআনের পিতৃতান্ত্রিক পঠনের ক্ষেত্রে বারলাস মনে করেন যে সমাজ ও সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে কোরআনের আবির্ভাব হয়েছে তা বিবেচনায় নেওয়া হয় না। কোরআনের যে দুই আয়াতের (৩৩:৫৯-৬০ ও ২৪:৩০-৩১) ভিত্তিতে রক্ষণশীলরা পর্দাকে সকল মুসলমান নারীর জন্য বৈধ করেছেন, সেখানেও এই আয়াতসমূহ কার উদ্দেশ্যে ও কোন পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয়েছে তা বিবেচনা করা হয়নি। এই দুই আয়াতেই নবীকে উদ্দেশ্য  করে বলা হয়েছে, যেন তাঁর স্ত্রীগণ ও কন্যাদেরকে জিলবাবে (চাদর) ঢেকে রাখতে বলেন। তার মানে, যা নবীজী বলতে পারেন তা সকল পুরুষ তার স্ত্রীদের বলতে বা বাধ্য করতে পারেন, তা নয় (২০০২: ৫৩-৫৫)। এবং কোরআনে (২:২৫৬) বলা হয়েছে “ধর্মের ক্ষেত্রে কোনো জবরদস্তি যেন না থাকে।” তদুপরি এই আয়াতসমূহে সাধারণ কাপড় বা শাল দিয়ে বক্ষ ও ঘাড় ঢেকে রাখার কথা বলা হয়েছে, মুখমন্ডল, মাথা বা চুল, হাত বা পা ঢাকবার কথা বলা হয়নি। বারলাস বলছেন, আরব নারীরা নবম শতক পর্যন্ত পর্দা ছাড়াই মসজিদে নামায পড়েছেন এবং হজ্জ্বে অংশ নিয়েছেন। এই দুই আয়াতে নবীজীর আত্মীয়াদের জিলবাব ব্যবহার করতে বলা হয়েছে, অন্যান্য মুসলমান পুরুষদের কাছ থেকে আড়ালে থাকবার জন্য না, বরং যাতে প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে পারেন সেইজন্যে।

মনে রাখতে হবে সেসময়টা দাসের মালিকানা সমাজ ব্যবস্থায় স্বীকৃত ছিল এবং অমুসলিম পুরুষদের, যাদের জাহিলী বলা হচ্ছে, যৌন নিপীড়ন করা নীতি সিদ্ধ ছিল। এক খণ্ড শাল বা কাপড়ের ব্যবহার হজরত মুহাম্মদ (সঃ) এর আত্মীয়দের অন্য নারীদের থেকে পৃথক করবে এবং তারা যে অন্যান্য পুরুষের জন্য সহজলভ্য নয় তারও প্রকাশ করবে। তার মধ্যে তখন জাহিলী পুরুষেরা মুসলমানদের আক্রমণ করার ঘোষণা দিয়েছিল, যার মধ্যে  মুহাম্মদ (সঃ) এর স্ত্রী বিবি আয়শাকে অপবাদ দিয়ে তাঁর সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টাও ছিল। বারলাস বলছেন পরবর্তীতে রক্ষণশীলরা এই জাহিলী দৃষ্টিভঙ্গীকে গ্রহণ করে নারীর জন্য বিপদজনক ও চরিত্রহীন বৈশিষ্ট্যই শুধু আরোপ করেনি, নীতি ভ্রষ্ট পুরুষের যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে নারীকেই অদৃশ্য করতে চেয়েছে, যে বিধান আসলে কোরআনে নেই (২০০২:৫৫-৫৬)। বলে নেওয়া প্রয়োজন বারলাস কিংবা আমি কেউই, যে সব নারীরা স্বেচ্ছায় পর্দা ব্যবহার করেন তাদেরকে পর্দা ব্যবহারের বিরুদ্ধাচারের জন্য এই আলোচনা করছি না, বরং প্রচলিত জানার বাইরে কোরআনের ভিন্ন পঠন যে সম্ভব সেইখানে মনোযোগ নিতে চাচ্ছি। 

বারলাস কোরআনের পঠনে নারী পুরুষের যৌনতার মধ্যে সমতা দেখতে পেয়েছেন। পুরষের যৌনতা তৃপ্তির জন্য আর নারীর যৌনতা কেবল সন্তান ধারণ করবার জন্য এমন কোনো কিছু কোরআনে নেই। বরং যৌনতাকে দেখা হয়েছে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হিসাবে। যৌন সতীত্বের ধারণা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। উভয়েরই যৌন কামনা ও পূর্ণতার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং নৈতিক চর্চায় সন্তান পুনরুৎপাদন ছাড়াও নারী-পুরুষের পূর্ণতা প্রাপ্তি, উভয়ের পারস্পরিক ভালোবাসা, সুসম্পর্কের ও আনন্দের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সাথী হিসাবে একজন আর একজনের কাছ থেকে সুকুন বা ভালোবাসা লাভ করবে, যা মানুষকে আল্লাহ দিয়েছেন। পুরুষের শুধু যৌন লালসা থাকবে এমনটা বলা হয়নি, বরং সকল যৌন লালসা নিয়ন্ত্রণ করতে বলা হয়েছে, বিয়ের সম্পর্কে না যাওয়া পর্যন্ত। পর্দার প্রসঙ্গে পূর্বে উল্লেখকৃত দ্বিতীয় আয়াতে সাধারণ নারী-পুরষের উভয়ের জন্য দৃষ্টি সামলে রাখতে বলা হয়েছে, সেখানে নারীর জন্য পোশাকের মাধ্যমে আর পুরুষের জন্য শুধু দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে যৌন কামনা সংযত রাখতে বলা হয়নি (বারলাস, ২০০২, ১৫২-১৬০)। পুরুষের একাধিক বিয়েকে কোরাআনে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, শুধুমাত্র এতিম নারীর সম্পদ দেখা শোনা করতে যদি মনে হয় বিয়ে করলে আরো ভাল ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব, তখনই একজন স্ত্রী থাকলে আর একটি বিয়ে করা যায়, কিন্তু শর্ত থাকে যে সকল স্ত্রীকে একই চোখে দেখতে হবে, কোনো ভিন্নতা করা যাবে না। বারলাস মনে করেন, যেহেতু সকল স্ত্রীকে একই চোখে দেখা সম্ভব না, সুতরাং এই শর্ত আসলে এক বিয়ের জন্যই দেওয়া হয়েছে (বারলাস, ২০০২, ২৫, ১২৭-১২৮)।

বারলাস কোরআনের পঠনে নারী পুরুষের যৌনতার মধ্যে সমতা দেখতে পেয়েছেন। পুরষের যৌনতা তৃপ্তির জন্য আর নারীর যৌনতা কেবল সন্তান ধারণ করবার জন্য এমন কোনো কিছু কোরআনে নেই। বরং যৌনতাকে দেখা হয়েছে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হিসাবে।

বারলাসের আলোচনা থেকে আমরা পাই যে, কোরআনের প্রচলিত পঠনের ও ব্যাখ্যাতে পরবর্তীতে ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজের প্রচলিত অনেক চর্চাকে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। এর ফলাফলে, সমাজগুলোতে নারী-পুরুষের সম্পর্কের মধ্যে নারীর উপরে পুরুষের আধিপত্যকে জায়গা দেওয়া হয়েছে। পুরুষের যৌন চাহিদা নারী বিয়ের সম্পর্কের মধ্যে যে কোনো সময় পূরণ করবে এমন ধারণা থাকায় নারীর ভোগান্তি সবসময়। দক্ষিণ আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের এক গবেষণা কাজে দেখা যায়, ইসলামি এই শিক্ষার কারণে নারীরা পরিবারে প্রশান্তির জন্য এমনকি যখন তাদের নিজেদের যৌন বাসনা অনুপস্থিত তখনও স্বামীর যৌন চাহিদা পূরণ করে। বলা হচ্ছে, এটা নারীর যৌন ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপরখারাপ প্রভাব ফেলে (খান ও সিদাত, ২০১৭)। অন্যদিকে সোনিয়া আহসান (২০১৭) আফগানিস্তানে তালিবান শাসনের পর “খানা-এই আমানে” অবস্থিত নারীদের বয়ানের মাধ্যমে স্পষ্টকরেন যে সেখানেপ্রচলিত ইসলামের চর্চায় যে মর্যাদা ব্যবস্থা রয়েছে যাকে স্থানীয়ভাবে পশতুনওয়ালী বলে, তার কারণে নারীরা কীভাবে “বাছবিচারহীন যৌনসম্পর্ক” (promiscuity) ও “ব্যাভিচারের” অপরাধে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে। খান-এই আমান মানে হোল আশ্রয়, বা শাব্দিক অর্থে শান্তির ঘর, যেখানে ঐসব নারীরা থাকে যারা যৌনতার রীতি লঙ্ঘন ও নৈতিক স্খলনের জন্য বিচারের মুখোমুখি হয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থায়নে পরিচালিত এই কেন্দ্রগুলো হলো, পুরুষের অভিভাবকত্বের বাইরে এমন জনপরিসর যেখানে এইসব অভিযুক্ত নারীরা কোনো শারীরিক আক্রমণের আতঙ্কে থাকে না। পাঁচ জন নারীর অভিজ্ঞতার বয়ানের ভিত্তিতে করা কাজে দুইজন নারীর ক্ষেত্রে দেখা যায় ধর্ষণের শিকার হওয়ার পরও তাদেরকে নৈতিক স্খলনের দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। একজনের ক্ষেত্রে এমনকি ১৪ বছর বয়সে নিজ চাচা দ্বারা ধর্ষিত হওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্তের পিতা সব জেনেও, পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় অপর এক পুরুষের সাথে অর্থের বিনিময়ে বিয়ে দেয়। বিয়ের সময় মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা থাকায় মেয়েটিকে এবং ঐ পুরুষটিকে জেলে প্রেরণ করা হয়। পরবর্তীতে মেয়েটির সন্তান এবং সেই পুরুষটি জেলেই মারা যায়। অথচ, ধর্ষক চাচা শাস্তি ব্যাতিরেকে সমাজে নির্বিঘেœ জীবন যাপন করতে থাকে। জানা যায় পুরো আফগানিস্তানে এমন বিশটি খানা-এই আমান রয়েছে। যেখানে অনেক নারী, সমাজে প্রচলিত নারী-পুরুষের মধ্যে অসম যৌন ব্যবস্থার কারণে সমাজ ও পরিবার চ্যুত হয়ে নিদারুণ অভিজ্ঞতা নিয়ে বসবাস করে। খানা-এই আমানে অবস্থানকালে তাঁরা অবসর সময়ে একসাথে হয়ে তাঁদের এই দুঃখের বয়ানগুলো সুরে সুরে গানের মাধ্যমে প্রকাশ করে। 

পুরুষের যৌন চাহিদা নারী বিয়ের সম্পর্কের মধ্যে যে কোনো সময় পূরণ করবে এমন ধারণা থাকায় নারীর ভোগান্তি সবসময়। দক্ষিণ আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের এক গবেষণা কাজে দেখা যায়, ইসলামি এই শিক্ষার কারণে নারীরা পরিবারে প্রশান্তির জন্য এমনকি যখন তাদের নিজেদের যৌন বাসনা অনুপস্থিত তখনও স্বামীর যৌন চাহিদা পূরণ করে। বলা হচ্ছে, এটা নারীর যৌন ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপরখারাপ প্রভাব ফেলে

মুসলমান প্রধান বাংলাদেশে, নারী- পুরুষ প্রশ্নে ইসলাম চর্চা হুবহু দক্ষিণ আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের মতো নয় বা তালেবান উত্তর আফগানিস্তানের মতোও নয়। কিন্তু নারী-পুরুষের সম্পর্ক অর্থে, যৌনতা অর্থে বিধান কী হবে, তা অনেক ক্ষেত্রেই বারলাসের কোরআন পঠনের সাথে মেলে না, বরং তার বিবেচিত রক্ষণশীলদের ব্যাখ্যাকে প্রচলন করতে চাওয়ার প্রচেষ্টা আছে। ধর্মভীরু এই দেশে এই সময়ে অসংখ্য ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন ঘটে চলেছে, যার খতিয়ান এই লেখার শুরুতেই দেওয়া হয়েছে। বেগমগঞ্জে  নির্যাতিত নারীর সাথে ৯ই অক্টোবর ছয় জন নারীর  একটি দল সাক্ষাৎ করতে যান, তারা ঐ নারীর নাম দেন সাহসিকা। এই দলের সাথে সাক্ষাতের সময় সাহসিকার আবেদন ছিল:

আপনি উদিলা [বিবস্ত্র] থাকলে কি আমার শরম হবে না? [অস্পষ্ট]আমারে উদাম [বিবস্ত্র] করছে আপনাদের লজ্জা লাগে নাই? কলিজা ফাটি যায় নাই?একটা কথা বললে কার গায়ে লাগবে? আমরার নারীর গায়ে লাগবে, দশজনারে দশজনের লাগবে না? পুরুষের [কিন্তু] লাগবে না। … কেউ যদি আমাকে সহযোগিতা করত, কেউ সহযোগিতা করে নাই। আমাদের এলাকায় তিন শ’ মানুষ হবে। আমারে উলঙ্গ [বিবস্ত্র] করি লই [নিয়ে] যায়। বলতেছি, একটু কাপড়টা পরব, তখন [যারে] বলছি, হেও ভিডিও করে। আপনারা নারীরা…আপনারা প্রতিবাদ করেন, [ভিডিওর] আগে কী হইছে সেটা দরকারি বিষয় না। দৃষ্টিটা [ভিডিও] ক্য̈ামনে ঘটল? আমি বলছি নারীর জাত এককারী [একইরকম, পার্থক্য নাই]।হ্যাঁ, [বলতে পারে] ওই মহিলা [‘সাহসিকা’ নিজে] খারাপ ছিল, কিন্তু এটা ছেলেরা কেন করল? [অস্পষ্ট]কয়টা পাইছে খারাপ [আমার কয়টা দোষ পাইছে]? কারো সাথে কারো মিল নাই, এইটা হইতে পারে। কেউ কারো সাথে মিলে না, নয় [পরস্পরের] ঘরে যায় না। জায়গা-জমি লই [নিয়ে] ভেজাল, এইটা হইতে পারে। ওই ধরনের বাজে কারবার আমার কাছে আছে? [অস্পষ্ট, দেলোয়ার বাহিনী সারভাইভারকে দিয়ে মাদক বিক্রি করাতে চেয়েছিল, সেটা ইঙ্গিত করে বলছেন]

সাহসিকার এই বয়ানে তাঁর যে আকাক্সক্ষা পরিদর্শনকারী নারীদের মাধ্যমে আমাদের কাছে তথা দেশের সকল নারীদের কাছে পৌঁছায় তা হলো, নারীর অপমান অন্য নারীদের যেভাবে গায়ে লাগবে, তিনি মনে করছেন পুরুষদের তেমনভাবে গায়ে লাগবে না। হয়তো তাঁর যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেখান থেকেই তাঁর এই উপলব্ধি। কারণ তিনি বলছেন তাঁর গ্রামের অনেক মানুষ ঐসময় সেখানে এসেছিল, তাদের কাছে কাপড় চেয়েছিলেন তিনি, তারা কোনো সহযোগিতা করেনি, বরং তারাও ভিডিও করতে থাকে। এটা তো আমাদের সকলকেই ভাবিয়ে তোলার কথা; দেলোয়ার ও তার বাহিনী অপরাধী, এলাকায় ক্ষমতাধর মাস্তান, তাদেরকে অন্যরা ভয় পায়, তাই হয়তো ওদের নিপীড়ন থামাতে পারে না। কিন্তু সাধারণ গ্রামবাসী যখন নিজেরাও এই ভিডিও করে তখন তো তারা নিস্ক্রিয় অসহায় দর্শক না, তারাও সক্রিয় এবং ভয়্যারিস্টিক  কামনা চরিতার্থ করতে ব্যস্ত। একটা সমাজের পুরুষেরা কীভাবে এইরকম পুরুষ হয়ে উঠে, যেখানে তাদের যৌন নৈতিকতা এইরকম আগ্রাসী, সেটা কি আজকে আমাদের সকলকে ভাবিয়ে তুলবে না?

দেলোয়ার ও তার বাহিনী অপরাধী, এলাকায় ক্ষমতাধর মাস্তান, তাদেরকে অন্যরা ভয় পায়, তাই হয়তো ওদের নিপীড়ন থামাতে পারে না। কিন্তু সাধারণ গ্রামবাসী যখন নিজেরাও এই ভিডিও করে তখন তো তারা নিস্ক্রিয় অসহায় দর্শক না, তারাও সক্রিয় এবং ভয়্যারিস্টিক  কামনা চরিতার্থ করতে ব্যস্ত। একটা সমাজের পুরুষেরা কীভাবে এইরকম পুরুষ হয়ে উঠে, যেখানে তাদের যৌন নৈতিকতা এইরকম আগ্রাসী, সেটা কি আজকে আমাদের সকলকে ভাবিয়ে তুলবে না?

এছাড়াও তাঁর সম্পূর্ণ বয়ানে দুই জায়গায় উল্লেখ আছে, তাঁকে দিয়ে দোলোয়ার বাহিনী মাদক বিক্রি করাতে চেয়েছিল। এই ভিডিও করে শাসিয়েছিল যদি তিনি এদের কথামত রাজী না হন, তাহলে এই ভিডিও সর্বত্র ছড়িয়ে দেবে। এই ঘটনার পর তিনি এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, আমারে বলছে যদি আমি নাকি ওদের সাথে থাকলে ওরা এটা [ভিডিও] ছাড়বে না। ওটারে ’দি আমারে সবসময় জব্দ দিত [কাবু করার চেষ্টা করত]আমি বলছি ডাল-ভাত খেয়েও আমি যদি সুখি থাকি [অস্পষ্ট, আমি ওদের সাথে জড়াব না]।” তিনি তাদের শর্তে রাজী না হওয়াতেই ভিডিওটি ছেড়ে দেওয়া হয়। সমাজে সর্বব্যাপী মাদকের যে কারবার, তার সাথে সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিষয়গুলো দেশের ক্ষমতা ও শাসন তরিকার সাথে সম্পর্কিত বলে প্রত্যয় জাগে। বেগমগঞ্জ ছাড়াও সাম্প্রতিক নারী নিপীড়নগুলো দেখে মনে হয়, বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্ট্র মাদক ও নারী নিপীড়নসহ অপরাপর নিপীড়ন লাঘবে মোটেই সচেষ্ট নয়। বরং এই সব অপরাধ সংঘটিত হতে সমাজে প্রচলিত নারী-পুরুষের অসমতার ধারণাকে পুঁজি করা হয়, ভিত্তি হিসাবে ইসলাম ধর্মের বিধানের কথাই বলা হয়। অথচ আমরা দেখেছি নারীর অভিজ্ঞতা থেকে কোরআন পঠনে নারী-পুরুষের সমতার ধারণার দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

সাম্প্রতিক নারী নিপীড়নগুলো দেখে মনে হয়, বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্ট্র মাদক ও নারী নিপীড়নসহ অপরাপর নিপীড়ন লাঘবে মোটেই সচেষ্ট নয়। বরং এই সব অপরাধ সংঘটিত হতে সমাজে প্রচলিত নারী-পুরুষের অসমতার ধারণাকে পুঁজি করা হয়, ভিত্তি হিসাবে ইসলাম ধর্মের বিধানের কথাই বলা হয়। অথচ আমরা দেখেছি নারীর অভিজ্ঞতা থেকে কোরআন পঠনে নারী-পুরুষের সমতার ধারণার দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

সাহসিকা বলেছেন “যে পর্যন্ত ফাঁসি না হয় আপনারা প্রতিবাদ ছাড়িয়েন্না [ছাড়বেন না]।” সত্যিকারের শাস্তি বলতে তিনি হয়তো “ফাঁসিই” বোঝেন। শাস্তির ক্ষেত্রে আমরা নিজেদের অবস্থান আমাদের বিচার বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই নেব কিন্তু তার প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বানকে উপেক্ষা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। ফলে, সাহসিকার নিপীড়নসহ সকল নারীর ধর্ষণ, নিপীড়ন ও হত্যার বিচার দাবী করার পাশাপাশি, এই পরিবেশ জারি থাকার পেছনের কারণগুলো অনুসন্ধান আমরা অব্যাহত রাখবো, চিহ্নিত করবো ও সে কারণগুলো অপসারণে আওয়াজ তুলবো। সেসব  কারো কাছে “মুখরোচক নারীবাদী স্লোগান” মনে হোক বা নাই হোক।

মির্জা তাসলিমা সুলতানা: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

ইমেইল: shouptik@gmail.com

টীকা:

১। https://www.facebook.com/iscabd91/videos/637934946869768, ২২.১০.২০২০ তারিখে এই লিঙ্কে প্রবেশ করা হয়।

২। https://www.youtube.com/watch?v=OUub8-7cqYI ২২.১০.২০২০ তারিখে প্রবেশ করা হয়।

৩।এই দলে ছিলেন: তাসলিমা আখতার (শ্রমিক ও নারী আন্দোলন সংগঠক এবং আলোকচিত্রী), শিপ্রা বোস (উন্নয়ন কর্মী), মাহফুজা হক (সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার কর্মী), জান্নাতুল মাওয়া(রাজনৈতিক কর্মী, বাসদ (মার্ক্সবাদী) কেন্দ্রীয় পাঠচক্র ফোরাম এবং আলোকচিত্রী), বীথি ঘোষ (শিক্ষক, শিল্পী/সমগীত, সাংস্কৃতিক সংগঠক) ও রেহনুমা আহমেদ (লেখক ও নৃবিজ্ঞানী)। সমগ্র যোগাযোগ করেছিলেন খুশী কবির (সমন্বয়কারী, নিজেরা করি), যদিও তিনি কোভিড-১৯ এর কারণে সরাসরি বেগমগঞ্জে যাননি। এই দলের কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। কারণ, তাঁরা এই পদক্ষেপ না নিলে আমরা সাহসিকার সাহস ও টিকে থাকার সংগ্রামের কথাগুলো সরাসরি জানতে পারতাম না। পরর্তীতে ১৯.১০.২০২০ তারিখে “Begumganj Survivor er Boyan o Koronio Ki” নামক জুম মিটিংয়েএই বয়ানটি উপস্থাপনার পাশাপাশি, বয়ানটি মিটিংএ অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে লিখিতভাবে বিলি করা হয়। বয়ানটি লিখন প্রসঙ্গে দলটি বলেন, “রেকর্ডিং ভালো না হওয়ার কারণে স্কোয়ার ব্র্যাকেটের ভিতরে লেখা কথা, স্মৃতির ভিত্তিতে যোগ করা হয়েছে বাক্য অর্থবহ বা শেষ করার লক্ষ্যে। রেকর্ডিং যেখানে যেখানে ‘অস্পষ্ট’ তার উল্লেখও স্কোয়ার ব্র্যাকেটে করা হয়েছে।” আমি তাদের লিখিত বয়ানের অংশবিশেষ তাদের ব্যবহৃত রীতি অবিকৃত রেখে এইখানে বিদ্যাজাগতিক রীতি অনুসারে লিখেছি।

৪।ভয়্যারিস্টিক মানে অপরকে উলঙ্গ বা যৌনকর্ম করতে দেখে কামতারিত হওয়া বা যৌনানন্দ লাভ করা। এর অর্থ এও, অপরের বেদনা ও কষ্ট দেখে আনন্দলাভ করা। ফ্রয়েড (১৯০৫, উদ্ধৃত মালভী, ১৯৭৫) মনস্তত্ত্বের আলোচনায় এই ধারণাকে স্কপোফেলিয়া বলছেন, তার অর্থ দেখার মাধ্যমে মানুষের যৌনানন্দ লাভ। অন্যদিকে লরা মালভী (১৯৭৫) সিনেমা প্রসঙ্গে বলেন মানুষ দেখে আনন্দলাভ করে। কিন্তু সেখানে পুরুষের গেইজে সিনেমা নির্মাণ হয় যেখানে নারী দেখার সামগ্রী বা বস্তু, পুরুষ নিষ্ক্রিয় নারীকে দেখে আনন্দলাভ করে। মালভী আরো বলেন পুরুষের এই গেইজ সমাজেও বিদ্যমান থাকে, কেবল সিনেমাতেই এটা ঘটে না।

তথ্যসূত্র:

আহমেদ, রেহনুমা (সংকলক ও অনুবাদক) (২০০৬): ইসলামী চিন্তার পুনর্পঠন: সমকালীন মুসলমান বুদ্ধিজীবিদের সংগ্রামঢাকা: একুশে পাবলিকেশনস লিমিটেড।

Ahsan, S. (2017): “When muslims become feminists: Khana-yi Aman, Islam, and Pashtunwali” in Green, N. (ed.) Afghanistan’s Islam: from conversion to the Taliban, University of California Press, pp. 225-241.

Barlas, A. (2002): “Believing women” in Islam: Understanding patriarchal interpretations of the Qur’an, Austin: University of Texas Press.

Khan, M. B. and Seedat, F. (2017): “Secure between god and man: peace, tranquility and sexuality through the pietistic aspirations of believing women” Journal for the Study of Religion, Vol. 30(1), pp. 137-160.

Mulvey, L. (1975): “Visual pleasure and narrative cinema” Screen, vol 16(3), pp. 6-18.

Social Share
  • 439
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    439
    Shares
  •  
    439
    Shares
  • 439
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *