অক্ষয় দত্ত ও ঈশ্বরচন্দ্র

স্মরণ

অক্ষয় দত্ত ও ঈশ্বরচন্দ্র

চৌধুরী মুফাদ আহমদ

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও অক্ষয়কুমার দত্ত ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার খুবই গুরুত্বপূর্ণ দুই ব্যক্তিত্ব, যাঁদের বহুমুখী অবদানে বাংলার ভাষা, সাহিত্য, শিক্ষা ও সমাজ সমৃদ্ধ হয়েছে। এই দুজনের বন্ধুত্বও ছিল একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এবছর তাঁদের দু’জনেরই দ্বিশততম জন্মবার্ষিকী। তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই রচনা।

অক্ষয়কুমার ও বিদ্যাসাগর দু’জন ভিন্ন পরিবেশ ও পটভুমি থেকে উঠে এসে বাংলা সাহিত্যে ও তৎকালীন সমাজে অভিন্ন প্রকৃতির কিছু অবদান রেখেছিলেন। তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়েছিল এবং দুজনের মিলিত অবদানে গুরুগম্ভীর বিষয় ও সাহিত্যচর্চার উপযোগী বাংলা গদ্য সৃষ্টি হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে ‘বঙ্গভাষা’ এই দু’জনেরই ‘শ্রেষ্ঠ কীর্তি’ । অলৌকিক-পারলৌকিক চিন্তায় আচ্ছন্ন ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলায় ইহজাগতিক চিন্তা-ভাবনা প্রসারের প্রচেষ্টায়ও তাদের অবদান উল্লেখযোগ্য। অক্ষয় দত্ত ও বিদ্যাসাগরের বন্ধুত্ব ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার জাগরণের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

বর্ধমান জেলায় নবদ্বীপের কাছে চুপী গ্রামে ১৮২০ সালের ১৫ জুলাই জন্মেছিলনে অক্ষয়কুমার দত্ত। তাঁর পিতা পীতাম্বর দত্ত কলকাতার কুতঘাটের পুলিশ-কার্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন এবং পরে সাব-ইন্সপেক্টর হয়েছিলেন। পাঁচ বছর বয়সে হাতে খড়ি হলেও অক্ষয় দত্তকে পড়াবার মত শিক্ষক না পাওয়ায় সাত বছরের আগে তাঁর লেখাপড়া শুরু হয়নি। লেখাপড়ার বিষয়ে তাঁর প্রচন্ড উৎসাহ থাকলেও এর জন্য প্রয়োজনীয় পারিবারিক সমর্থন তিনি পাননি। গ্রামের স্কুলে কিছুদিন পড়ার পর অক্ষয় দত্ত কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে আড়াই বছরের মতো কৃতিত্বের সাথে পড়াশোনা করেছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অবসান হয়। কিন্তু অদম্য ছিল তাঁর জ্ঞানস্পৃহা। তাই বাড়িতেই নিজ উদ্যোগে পড়াশোনা চালিয়ে যান। স্কুলের ইংরেজ শিক্ষক, বহুভাষাবিদ পন্ডিত জেফ্রয়ের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিলেন তিনি। তাঁর কাছে গ্রিক, ল্যাটিন, জার্মান, ফরাসি ও হিব্রু ভাষা ছাড়াও শিখেন পদার্থবিদ্যা, ভূগোল, জ্যামিতি, বীজগণিত, ত্রিকোণমিতি, সাধারণ বিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব প্রভৃতি। আর আমিরউদ্দীন মুন্সির কাছে শিখেন ফারসি ও আরবি ভাষা। পরবর্তিকালে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদক থাকার সময় কিছুদিন তিনি কলিকাতা মেডিকেল কলেজে গিয়ে অতিরিক্ত ছাত্র হিসেবে উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা, রসায়নশাস্ত্র ও প্রকৃতি বিজ্ঞান পড়েছিলেন।

অপরদিকে ঈশ্বরচন্দ্র ছিলেন দরিদ্র ব্রাহ্মণ সন্তান। তাঁদের পরিবার ছিল পুরুষানুক্রমে সংস্কৃত পন্ডিত। ঈশ্বরচন্দ্র জন্মেছিলেন অক্ষয় দত্তের দুইমাস পর ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, মেদিনীপুরের বীরসিংহ গ্রামে। তাঁর পিতা দারিদ্রের কারণে কুলপ্রথা গ্রহণ করেতে পারেন নি, কিন্তু পুত্রকে কুলপ্রথার জন্য উপযুক্ত করে তোলার জন্য চেষ্টার ত্রুটি করেননি। শিক্ষকের অভাবে অক্ষয় দত্তের লেখাপড়া শুরু করতে দু’বছর বিলম্ব হয়েছে। কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্রের পিতা পুত্রের শিক্ষার জন্য উত্তম শিক্ষক হিসেবে পরিচিত কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায়কে অন্যগ্রাম থেকে বীরসিংহ গ্রামে এনে পাঠশালা করে দিয়েছেন। নয় বছর বয়সে ঈশ্বরচন্দ্র সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন। সংস্কৃত কলেজে পড়তে বেতন লাগতো না। তাঁর পিতা সংস্কৃত না জানলেও পুত্রের পড়াশোনার বিষয়টি প্রতিরাতে তদারক করতেন। নিয়মিত বৃত্তি পেয়ে একটানা বারো বছর সংস্কৃত কলেজে পড়েছিলেন বিদ্যাসাগর।

সংস্কৃত কলেজে পড়ার সময়ই ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি পেলেও এবং কৃতিত্বের সাথে পড়া শেষ করলেও বিদ্যাসাগরের বিদ্যা সংস্কৃতেই সীমাবদ্ধ ছিল। তিনি সেখানে স্মৃতি, ন্যায়, বেদান্ত ইত্যাদি ছাড়া অন্যকিছুই পড়েননি, অন্য ভাষা দূরে থাক ইংরেজিও শিখেননি। সেদিক দিয়ে অক্ষয় দত্তের শিক্ষায় অনেক বৈচিত্র্য ছিল। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরের লেখাপড়াই দু’জনের মনোজগতকে আধুনিক করে তোলায় নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছে।

বিদ্যাসাগর ও অক্ষয় দত্ত দুজনই চৌদ্দ-পনেরো বছরে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাল্যবিবাহ করতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং এর অভিজ্ঞতা দুজনের জন্যই খুব সুখকর ছিল না। পিতা পীড়িত হয়ে পড়ায় অক্ষয় দত্তকে বিয়ে করতে হয় আর বিদ্যাসাগরকে বিয়েতে রাজি হতে হয় পিতার ভয়ে। ছাত্রাবস্থায় একটি কন্যা সন্তান হওয়ার খবর পেয়ে অক্ষয় দত্তের মনে হয়েছিল তিনি অসময়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে পড়েছেন এবং নতুন কর্তব্যকর্মের জালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছেন।  আর বিয়ের ষোল বছর পর ১৮৫০ সালে, বিদ্যাসাগর ‘বাল্য বিবাহের দোষ’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেন। এই প্রবন্ধে তিনি, সম্ভবত নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই, বাল্যদম্পতিরা একে অন্যের হৃদয়ের কথা জানতে বুঝতে না পারার কারণে সমস্যা হওয়ার কথা বলেছেন।

বিয়ের ষোল বছর পর ১৮৫০ সালে, বিদ্যাসাগর ‘বাল্য বিবাহের দোষ’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেন। এই প্রবন্ধে তিনি, সম্ভবত নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই, বাল্যদম্পতিরা একে অন্যের হৃদয়ের কথা জানতে বুঝতে না পারার কারণে সমস্যা হওয়ার কথা বলেছেন।

দুই

১৮৪১ সালে সংস্কৃত কলেজ থেকে পাশ করার পর পরই বিদ্যাসাগর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে প্রধান পন্ডিত বা সেরেস্তাদারের চাকুরি পেয়ে গেলেন। সেখানে বিলেত থেকে আসা তরুণ ইংরেজ সিভিলিয়ানদের বাংলা পড়াতে হত। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগরের ইংরেজি পড়ার সুযোগ পাননি বললেই চলে। কিন্তু এখানেতো ইংরেজি ছাড়া চলবে না। তাই ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে ইংরেজি শেখার পরামর্শ দেন।

এর ফলে বিদ্যাসাগর বেশ কয়েকজন ব্যক্তির কাছে ইংরেজি শিখতেন। তাঁদের অন্যতম ছিলেন শোভাবাজারের রাধাকান্ত দেব-এর দৌহিত্র আনন্দকৃষ্ণ বসু। ইংরেজি শিক্ষিত হিসেবে তাঁর তখন বিশেষ সুনাম ছিল। বিদ্যাসাগর তাঁর কাছে শেক্‌সপীয়ার পড়তে যেতেন।

এদিকে অক্ষয় দত্ত কলকাতায় তাঁর পিসতুতো ভাইয়ের বাসায় থাকার সময় একদিন দেখতে পান এক লোক সেখানে পুরাতন বই বিক্রি করতে আসে। একটু অনুসন্ধানে তিনি জানতে পারেন যে সেই লোক শোভাবাজারের রাধাকান্ত দেব-এর বাড়ির ভৃত্য এবং বইগুলো তাঁদের পারিবারিক লাইব্রেরির। অক্ষয় দত্ত অন্যের মাধ্যমে এই বই চুরির তথ্য বইয়ের মালিকদের জানান এবং চুরি যাওয়া বই ফেরত দেন। সেই থেকে রাধাকান্ত দেবের দৌহিত্র আনন্দকৃষ্ণ বসুর সঙ্গে অক্ষয় দত্তের ঘণিষ্ট সম্পর্ক স্থাপিত হয়। অক্ষয়কুমার দত্ত ও আনন্দকৃষ্ণ বসু কাছে ইংরেজি, সাহিত্য ও গণিত পড়তে যেতেন। কিন্তু তিনি ও বিদ্যাসাগর যেতেন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে। তাই তাঁদের দেখা হতো না।

অক্ষয়কুমার দত্ত তখন ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার’ সম্পাদক। বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তাঁর পরিচিত হওয়ার কাহিনী লিখেছেন বিহারীলাল তাঁর ‘বিদ্যাসাগর’ গ্রন্থে:

‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় যিনি যাহা লিখিতেন, আনন্দকৃষ্ণবাবু প্রমুখ কৃত্যবিদ্য ব্যক্তিদিগকে তাহা দেখিয়া আবশ্যকমত সংশোধনাদি করিয়া দিতে হইত। একদিন বিদ্যাসাগর মহাশয় আনন্দবাবুর বাড়িতে বসিয়া ছিলেন, এমন সময় অক্ষয়কুমার বাবুর একটা লেখা তথায় উপস্থিত হয়। আনন্দকৃষ্ণ বাবু বিদ্যাসাগর মহাশয়কে অক্ষয়কুমার বাবুর লেখাটা পড়াইয়া শুনাইয়া দেন। অক্ষয়কুমারবাবু পূর্বে যেসব অনুবাদ করিতেন, তাহাতে কতকটা ইংরেজি ভাব থাকিত। বিদ্যাসাগর মহাশয় অক্ষয়কুমার বাবুর লেখা দেখিয়া বলিলেন, ‘লেখা বেশ বটে ; কিন্তু অনুবাদে স্থানে স্থানে ইংরেজি ভাব আছে।’ আনন্দকৃষ্ণ বাবু বিদ্যাসাগর মহাশয়কে তাহা সংশোধন করিয়া দিতে বলেন। বিদ্যাসাগর মহাশয় সংশোধন করিয়া দেন। এইরূপ তিনি বারকতক সংশোধন করিয়া দিয়াছিলেন। অক্ষয় বাবু এই সুন্দর সংশোধন দেখিয়া বড়ই আনন্দিত হইতেন। তখনও কিন্তু তিনি বিদ্যাসাগর মহাশয়কে জানিতেন না। লোক দ্বারা প্রবন্ধ প্রেরিত হইত এবং লোক দ্বারা ফিরিয়া আসিত। তিনি সংশোধিত অংশে বিশুদ্ধ প্রাঞ্জল বাঙ্গালা দেখিয়া ভাবিতেন,এমন বাঙ্গালা কে লেখে? কৌতুহল নিবারণার্থ তিনি একদিন স্বয়ং আনন্দবাবুর নিকট উপস্থিত হন এবং তাঁহার নিকট বিদ্যাসাগর মহাশয়ের পরিচয় পান। আনন্দকৃষ্ণ বাবুর পরিচয়ে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সহিত পরে তাঁহার আলাপ পরিচয় হয়। ইহার পর অক্ষয়বাবু যাহা কিছু লিখিতেন, তাহা বিদ্যাসাগর মহাশয়কে দেখাইয়া লইতেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ও সংশোধন করিয়া দিতেন। পরস্পরের প্রগাঢ় সৌহার্দ্য সংগঠিত হয়।’

‘অক্ষয়চরিত’ এর লেখক নকুড়চন্দ্র বিশ্বাস বিদ্যাসাগর ও অক্ষয়কুমার দত্তের প্রথম পরিচয় সম্পর্কে বিদ্যাসাগরের নিজমুখে যা শুনেছিলেন বিনয় ঘোষ ‘বিদ্যাসাগর ও বাঙ্গালী সমাজ’ গ্রন্থে তা বর্ণনা করেছেন:

‘একদিন আনন্দবাবু বিদ্যাসাগরকে বললেন: অক্ষয়বাবু আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান। বিদ্যাসাগর মহাশয় বলেন: ‘বেশ তো তাঁকে একদিন আসতে বলবেন।’ কথামত অক্ষয়বাবু একদিন ঈশ্বরচন্দ্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বলেন: ‘আমার প্রবন্ধগুলি আপনি অনুগ্রহ করে দেখে দিয়ে যে কত উপকার করেছেন, তা বলা যায় না। এইভাবে যদি আপনি কষ্ট করে দেখে দেন তাহলে চির বাধিত হবো।’ ঈশ্বরচন্দ্র সন্তুষ্টচিত্তে সম্মত হন।

নকুলচন্দ্র লিখেছেন, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সহিত দত্তজার এই প্রথম আলাপ পরিচয়। ইহার পর অর্থাৎ ১৭৭০ শকের ২৩ শ্রাবণ তারিখের অধ্যক্ষসভার অধিবেশনে তিনি পেপার কমিটির সভ্যশ্রেনী-ভুক্ত হন।

নকুলচন্দ্রের এই বর্ণনা অনুযায়ী বিদ্যাসাগর ও অক্ষয়দত্তের পরিচয় হয় ১৮৪৮ সালে।[খ্রিস্টাব্দ বের করতে হলে শকাব্দের সঙ্গে ৭৮ যোগ করতে হয়।] এ থেকে আমরা এই তথ্যও পাই যে, অন্তত ১৮৪৮ সাল পর্যন্ত বিদ্যাসাগরের ইংরেজি শিক্ষা অব্যাহত ছিল। তিনি যদি ১৮৪২ সাল থেকে ইংরেজি শেখা শুরু করেন তবে কমপক্ষে ছয় বছর তিনি ইংরেজি শিখেছিলেন। রাজনারায়ণ বসু তাঁর আত্মচরিতে উল্লেখ করেছেন যে বিদ্যাসাগর তাঁর কাছেও ইংরেজি শিখেছেন। রাজনারায়ণ বসুর সঙ্গে তাঁর পরিচয় খুব সম্ভব ১৮৪৮ এর পর তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সূত্রে হয়েছিল। সেক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের ইংরেজি শিক্ষা ১৮৪৮ এর পরও অব্যাহত ছিল।

তিন

ঈশ্বর গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় অক্ষয় দত্ত লিখতেন। অক্ষয় দত্তের লেখা দেখে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর প্রতি আগ্রহী হন এবং তাঁর সঙ্গে পরিচিত হতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। ১৮৩৯ এর ডিসেম্বরে উনিশ বছর বয়সে ঈশ্বর গুপ্তের মাধ্যমেই দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে অক্ষয় দত্তের পরিচয় হয় এবং অক্ষয় দত্ত দেবেন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’র সদস্য হন। ঠিক এরকম কোন এক সময় বিদ্যাসাগর ল’ কমিটির পরীক্ষা পাশ করে জজ-পন্ডিত হন এবং ত্রিপুরায় জজ-পন্ডিত পদে আবেদন করে নিয়োগ লাভ করেন। পিতার অমত থাকায় তিনি ঐ পদে যোগ দেননি।

দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে অক্ষয় দত্তের পরিচয় নানাবিধ কারণে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল। দেবেন্দ্রনাথের মতো একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সংস্পর্শে আসায় এবং তত্ত্ববোধিনী সভার সদস্য হওয়ায় অক্ষয় দত্তের যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছিল তেমনি তিনি বাংলা ভাষা চর্চার এবং তাঁর প্রতিভার বিকাশের সুযোগ পেয়েছিলেন। অক্ষয় দত্ত দেবেন্দ্রনাথের কাছে তাঁর ঋণ সবসময় কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করেছেন। পরবর্তিকালে ব্রাহ্মসমাজের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে অক্ষয় দত্ত নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৮৪৩ সালের ১৬ আগস্ট দেবেন্দ্রনাথ তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং অক্ষয় দত্ত পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হন। এই পত্রিকা ও তার সম্পাদক সম্পর্কে দেবেন্দ্রনাথ তাঁর আত্মজীবনীতে বলেছেন,

‘আমি তাঁহার (অক্ষয় দত্ত) ন্যায় লোককে পাইয়া তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার আশানুরূপ উন্নতি করি। অমন রচনা সৌষ্ঠব তৎকালে অতি অল্প লোকেরই দেখিতাম। তখন কেবল কয়েকখানা সংবাদপত্রই ছিল; তাহাতে লোকহিতকর জ্ঞানগর্ভ কোন প্রবন্ধই প্রকাশ হইত না। বঙ্গদেশে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা সর্বপ্রথম এই অভাব পূরণ করে। বেদ বেদান্ত ও পরব্রহ্মের উপাসনা প্রচার করা আমার যে মুখ্য সংকল্প ছিল তাহা এই পত্রিকা হওয়াতে সুসিদ্ধ হইল।’

দেবেন্দ্রনাথের পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্য ‘বেদ বেদান্ত ও পরব্রহ্মের উপাসনা’ থাকলেও অক্ষয় দত্ত তত্ত্ববোধিনী পত্রিকাকে ধর্মপ্রচারে সীমাবদ্ধ না রেখে  সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস ও সমাজসংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে সে সময়ের একটি অগ্রণী পত্রিকায় পরিণত করেন। পত্রিকা বিষয়বস্তু নিয়ে দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর যে মতভেদ হত দেবেন্দ্রনাথের লেখা থেকেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়:

‘তিনি যাহা লিখিতেন তাহাতে আমার মত বিরুদ্ধ কথা কাটিয়া দিতাম, এবং আমার মতে তাঁহাকে আনিবার চেষ্টা করিতাম; কিন্তু তাহা আমার জন্য বড় সহজ ব্যপার ছিল না। আমি কোথায় আর তিনি কোথায়। আমি খুঁজিতেছি ঈশ্বরের সহিত আমার কী সম্বন্ধ৷ আর তিনি খুঁজিতেছেন বাহ্য বস্তুর সহিত মানব প্রকৃতির কী সম্বন্ধ৷ আকাশ–পাতাল প্রভেদ।’

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৪৭ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির অনুকরণে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার জন্য একটি পেপার কমিটি গঠন করেছিলেন। পেপার কমিটির কাজ ছিল পত্রিকায় প্রকাশের জন্য প্রাপ্ত পান্ডুলিপির উপর মতামত প্রদান। এই কমিটির সদস্যদের গ্রন্থাধ্যক্ষ বলা হত। বিদ্যাসাগরকে পেপার কমিটির সদস্য করতে পেরে অক্ষয় দত্তের খুবই সুবিধা হয়েছিল সন্দেহ নেই। কারণ দেবেন্দ্রনাথ-রাজনারায়ণ দত্তের মতো রক্ষনশীলদের বিরুদ্ধে একা সংগ্রাম করে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকাকে ব্রাহ্মসমাজের মুখপত্রে পরিণত হওয়া থেকে তিনি বাঁচাতে পারতেন না।

বিদ্যাসাগরকে পেপার কমিটির সদস্য করতে পেরে অক্ষয় দত্তের খুবই সুবিধা হয়েছিল সন্দেহ নেই। কারণ দেবেন্দ্রনাথ-রাজনারায়ণ দত্তের মতো রক্ষনশীলদের বিরুদ্ধে একা সংগ্রাম করে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকাকে ব্রাহ্মসমাজের মুখপত্রে পরিণত হওয়া থেকে তিনি বাঁচাতে পারতেন না।

এ প্রসঙ্গে বিনয় ঘোষের মন্তব্য উল্লেখযোগ্য:

‘ঈশ্বরচন্দ্রের সহানুভুতি ও সমর্থন ভিন্ন অক্ষয়কুমার একা কখনও তত্ত্ববোধিনীর হাল ধরে রাখতে পারতেন না। দেবেন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতার আকর্ষণে সভা ও পত্রিকা দুইই হয়তো ধর্মতত্ত্বের বিচ্ছিন্ন দ্বীপে ভেসে যেত। খ্রীস্টধর্মের প্রচারে উত্তর-প্রত্যুত্তর দেওয়াই হতো তার অন্যতম কর্তব্য। সমাজ-জীবনের বৃহত্তর ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব হতো না। অক্ষয়কুমার তা হতে দেননি। সম্পাদকীয় কর্তব্যপালনে তিনি যে চারিত্রিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিলেন তা অতুলনীয়। তত্ত্ববোধিনীর গ্রন্থাধ্যক্ষ বিদ্যাসাগরের অকুন্ঠ উৎসাহ তাঁর দৃঢ়তাকে অনেকক্ষেত্রে আরো অনমনীয় ক’রে তুলেছিল।’

পেপার কমিটির একজন সদস্য হিসেবে কাজ করা ছাড়াও বিদ্যাসাগর তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে মহাভারতের উপক্রমণিকাভাগ অনুবাদ করে প্রকাশ করেন। তিনি তত্ত্ববোধিনী সভারও সদস্য হন এবং পরবর্তিকালে এর সম্পাদকও হয়েছিলেন। বিদ্যাসাগর ১৮৫০ সালের জানুয়ারি মাসে ‘বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব’ নামে একটি পুস্তক লিখেন। পুরো পুস্তিকাটি তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং এর সমর্থনে অক্ষয় দত্ত সম্পাদকীয় লেখেন। বিধবাবিবাহকে সমর্থন করতে গিয়ে অক্ষয় দত্ত বিদ্যাসাগরের মতো শাস্ত্রের যুক্তিতে যান নি। তিনি নিজের মতো করে বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এই প্রশ্ন উত্থাপন করেন। পরের বছর বিদ্যাসাগর ‘বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা’ নামে আরেকটি পুস্তিকা রচনা করলে সেটিও তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় ছাপা হয়। তবে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় ধর্মতত্ত্বের চেয়ে বিধবা বিবাহ প্রচারে বিদ্যাসাগরের অধিক উৎসাহ দেবেন্দ্রনাথের পছন্দ হয়নি।

তবে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় ধর্মতত্ত্বের চেয়ে বিধবা বিবাহ প্রচারে বিদ্যাসাগরের অধিক উৎসাহ দেবেন্দ্রনাথের পছন্দ হয়নি।

একবার মেদিনীপুর ব্রাহ্মধর্ম সমাজে দেয়া রাজনারায়ণ দত্তের একটি বক্তৃতা পেপার কমিটি তত্ত্ববোধিণী পত্রিকায় ছাপার উপযুক্ত বিবেচনা না করায় দেবেন্দ্রনাথ মন্তব্য করেছিলেন, ‘কতকগুলান নাস্তিক গ্রন্থাধ্যক্ষ হইয়াছে, ইহাদিগকে এই পদ হইতে বাহির করিয়া না দিলে আর ব্রাহ্মধর্ম প্রচারের সুবিধা নাই।’ এই গ্রন্থাধ্যক্ষদের অন্যতম ছিলেন বিদ্যাসাগর। একপর্যায়ে অক্ষয় দত্ত ও বিদ্যাসাগর দু’জনই তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা ত্যাগ করেন।

চার

আমরা মনে করি  ১৮৪৮ থেকে ১৮৫৫ সাল পর্যন্ত সময়ের বন্ধুত্ব অক্ষয় দত্ত ও বিদ্যাসাগর দুজনের মনোজগতের গঠন নির্দিষ্ট করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই সময়ের মধ্যেই দুজনকেই অপার্থিবতা ও ভাববাদিতার বিরুদ্ধে আলোড়ন জাগানো কিছু কিছু বক্তব্য,অভিমত দিতে দেখি। ১৮৪৩ সালে দেবেন্দ্রবাবুর সঙ্গে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহন করলেও চিন্তা-ভাবনায় তিনি সেসময়ের ব্রাহ্মদের চেয়ে আলাদা ছিলেন। অক্ষয় দত্তের কারণেই ব্রাহ্মসমাজ বেদের ঐশ্বরিকতা বর্জন করেছিল। এবিষয়ে শিবনাথ শাস্ত্রী লিখেছেন,

‘ব্রাহ্মসমাজের ধর্ম্ম অগ্রে বেদান্তধর্ম্ম ছিল। ব্রাহ্মগণ বেদের অভ্রান্ততায় বিশ্বাস করিতেন। অক্ষয়কুমার দত্ত মহাশয় এই উভয়ের প্রতিবাদ করিয়া বিচার উপস্থিত করেন। প্রধানত তাঁহারি প্ররোচনাতে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর উভয় বিষয়ে গভীর চিন্তায় ও শাস্ত্রানুসন্ধানে প্রবৃত্ত হন। … তাঁহাকে বেদান্তধর্ম ও বেদের অভ্রান্ততা হইতে মুক্তবিচলিত করিতে অক্ষয়বাবুকে বহু প্রয়াস পাইতে হইয়াছিল। ১৮৫০ সালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় বহু অনুসন্ধান ও চিন্তার পর অক্ষয়বাবুর অবলম্বিত মত যুক্তিসিদ্ধ জানিয়া, বেদান্তবাদ ও বেদের অভ্রান্ততাবাদ পরিত্যাগ করিলেন।’

১৮৫১ সালের  জানুয়ারি মাসে দেবেন্দ্রনাথের অনুমতিক্রমে ব্রাহ্মসমাজের এক বক্তৃতায় অক্ষয় দত্ত ঘোষণা করেন যে, বেদ-বেদান্ত ঈশ্বর প্রত্যাদিষ্ট নয় এবং ব্রাহ্মসমাজের ধর্ম নয়।

বেদ-বেদান্ত সম্পর্কে অক্ষয় দত্তের অভিমত বিদ্যাসাগরের মতকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে। কারণ ১৮৫৩ সালে আমরা বিদ্যাসাগরকে বলতে শুনছি, ‘সাংখ্য আর বেদান্ত যে ভ্রান্ত দর্শন, সেসম্পর্কে এখন আর বিশেষ মতভেদ নেই’।

বেদ-বেদান্ত সম্পর্কে অক্ষয় দত্তের অভিমত বিদ্যাসাগরের মতকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে। কারণ ১৮৫৩ সালে আমরা বিদ্যাসাগরকে বলতে শুনছি, ‘সাংখ্য আর বেদান্ত যে ভ্রান্ত দর্শন, সেসম্পর্কে এখন আর বিশেষ মতভেদ নেই’। সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হওয়ার পর বিদ্যাসাগর কলেজের পাঠ্যক্রম ও পাঠদান পদ্ধতিসহ নানা বিষয়ে ব্যাপক সংস্কার শুরু করেন এবং তা বিপুলভাবে প্রশংসিত  হয়। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষা পরিষদ বারাণসী সংস্কৃত কলেজের প্রিন্সিপাল জেমস.আর. ব্যালেন্টাইনকে কলিকাতা সংস্কৃত কলেজ পরিদর্শন করে একটি রিপোর্ট দিতে বলেন। ব্যালেন্টাইন পরিদর্শন শেষে যে রিপোর্ট দেন তাতে তিনি অন্যান্য প্রস্তাবের মধ্যে সংস্কৃত কলেজের ছাত্রদের পাশ্চাত্যের ভাববাদী দার্শনিক বার্কলের Inquiry পড়ানোর পরামর্শ দেন। তাঁর মতে বার্কলের ভাববাদী দর্শন যেহেতু ভারতীয় দর্শনের মতো তাই ছাত্ররা এই দুই দর্শনের মিল দেখতে পারবে। ব্যালেন্টাইনের এই রিপোর্টের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে, ১৮৫৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বিদ্যাসাগর শিক্ষা কাউন্সিলকে লিখেছিলেন,

‘কতগুলো কারণে সংস্কৃত কলেজে বেদান্ত ও সাংখ্য আমাদের পড়াতেই হয়। কি কারণে পড়াতে হয় তা এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু সাংখ্য আর বেদান্ত যে ভ্রান্ত দর্শন, সেসম্পর্কে এখন আর বিশেষ মতভেদ নেই। তবে ভ্রান্ত হলেও এই দুই দর্শনের প্রতি হিন্দুদের গভীর শ্রদ্ধা আছে। সংস্কৃতে যখন এগুলো পড়াতেই হবে তখন তার প্রতিষেধক হিসেবে ছাত্রদের ভাল ভাল ইংরেজি দর্শনশাস্ত্রের বই পড়ানো দরকার। বার্কলের বই পড়ালে সেই উদ্দেশ্য সাধিত হবে বলে মনে হয় না, কারণ সাংখ্য ও বেদান্তের মতো বার্কলেও একই শ্রেণির ভ্রান্তদর্শন রচনা করেছেন। ইউরোপেও এখন আর বার্কলের দর্শন খাঁটি দর্শন হিসেবে বিবেচিত হয় না। কাজেই তা পড়িয়ে কোন লাভ হবে না। তাছাড়া হিন্দু ছাত্ররা যখন দেখবে যে বেদান্ত ও সাংখ্যের মতামত একজন ইউরোপীয় দার্শনিকের মতের অনুরূপ, তখন এই দুই দর্শনের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা আরো বাড়তে থাকবে। এই অবস্থায় বিশপ বার্কলের বই পাঠ্য হিসেবে প্রচলন করতে আমি ব্যালেন্টাইনের সঙ্গে একমত নই।’ (বিনয় ঘোষের অনুবাদ)

সাংখ্য ও বেদান্তের মতো বার্কলেও একই শ্রেণির ভ্রান্তদর্শন রচনা করেছেন। ইউরোপেও এখন আর বার্কলের দর্শন খাঁটি দর্শন হিসেবে বিবেচিত হয় না। কাজেই তা পড়িয়ে কোন লাভ হবে না। তাছাড়া হিন্দু ছাত্ররা যখন দেখবে যে বেদান্ত ও সাংখ্যের মতামত একজন ইউরোপীয় দার্শনিকের মতের অনুরূপ, তখন এই দুই দর্শনের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা আরো বাড়তে থাকবে।

ব্যালেন্টাইন জন স্টুয়ার্ট মিলের লজিকের একটি সংক্ষিপ্তসার রচনা করেছিলেন এবং তিনি সংস্কৃত কলেজে সেই বইটি পড়ানোর প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন সংক্ষিপ্তসার নয় মিলের মূল বই-ই পড়ানো একান্ত জরুরি।

অক্ষয় দত্ত আবার তাঁর ঈশ্বরবিষয়ক একটি সমীকরণের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। হিন্দু হোস্টেলের ছাত্ররা একবার তাঁর কাছে, প্রার্থনার গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি একটি সমীকরণ দিয়ে উত্তর দিয়েছিলেন—

পরিশ্রম=শস্য, পরিশ্রম+প্রার্থনা=শস্য
অতএব, প্রার্থনা=শূণ্য। অর্থাৎ প্রার্থনায় কিছু যায় আসে না।

তত্ত্ববোধিনী সভা ও পত্রিকার সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তাঁদের মধ্যে অক্ষয় দত্ত ও বিদ্যাসাগর তাঁদের ইহজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য পরিচিত ছিলেন। এঁদের মতো লোক ব্রাহ্মসমাজের তত্ত্ববোধিনী সভা ও তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সঙ্গে দীর্ঘদিন সংশ্লিষ্ট থাকতে পেরেছেন, এটি একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। দেবেন্দ্রনাথ এই দু’জনকে সহ্য করে গেছেন তাঁদের প্রতিভা ও লেখনি-শক্তির কারণে। আর ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’ তৎকালীন সময়ের আধুনিক চিন্তাভাবনাসম্পন্ন ব্রাহ্ম-অব্রাহ্ম রুচিশীল মানুষের মিলনস্থল ছিল, হয়ে উঠেছিল এবং ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’ ছিল বাংলাভাষা চর্চার একটি উচ্চমানের পত্রিকা। তাই আর্থিক অস্বচ্ছলতা সত্ত্বেও অক্ষয় দত্ত এখান থেকে যেতে চান নি এবং বিদ্যাসাগরও মতের অমিল সত্ত্বেও এখানে জড়িত থেকেছেন।

পাঁচ

অক্ষয়কুমার দত্ত আদৌ বিষয়ী লোক ছিলেন না। ১৮৪০ সালে তত্ত্ববোধিনী পাঠশালা গঠিত হলে অক্ষয় দত্ত মাসিক মাত্র আট টাকা বেতনে সেখানে ভূগোল ও পদার্থবিদ্যার শিক্ষক হন, কিছুদিন পর বেতন বেড়ে চৌদ্দ টাকা হয়েছিল। তত্ত্ববোধিনী পাঠশালা ১৮৪৩ সালে কলকাতা থেকে হুগলি জেলার বাঁশবেড়ে গ্রামে স্থানান্তরিত হলে দেবেন্দ্রনাথ দ্বিগুণ বেতনে সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হতে বললে অক্ষয় দত্ত রাজি হননি। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে প্রথমে তিনি ত্রিশ টাকা পেতেন পরে সেটি বেড়ে ষাট টাকা হয়।  অন্য কেউ অক্ষয় দত্তের আর্থিক অবস্থা নিয়ে না ভাবলেও পরার্থপর বিদ্যাসাগর এনিয়ে ঠিকই ভেবেছিলেন। বিদ্যাসাগর যখন সংস্কৃত কলেজের প্রিন্সিপাল ও স্কুল ইন্সপেক্টর, তখন ডেপুটি স্কুল ইন্সপেক্টরের পদ সৃষ্টি হয়। ওই পদের বেতন ছিল ১৫০ টাকা । বিদ্যাসাগর অক্ষয় দত্তকে সেই পদে যোগদানের প্রস্তাব দিলে অক্ষয় দত্ত তাতে রাজী হননি। শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য ১৮৫৫ সালে ‘নরমাল স্কুল’ স্থাপিত হলে বিদ্যাসাগর তাঁকে সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদে নিয়োগ করতে চান । এ প্রসঙ্গে অক্ষয়চরিত-এ নকুলচন্দ্র লিখেছেন,

‘পীড়া ও অন্য কোন কারণবশতঃ অক্ষয়বাবু তখন তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা ও ব্রাহ্মসমাজের নিকট হইতে বিদায় গ্রহনেচ্ছুক হন। এ অবস্থায় যখন বিদ্যাসাগর মহাশয় তাঁহাকে প্রধান শিক্ষকের পদ গ্রহণ করিতে বলেন তখন তিনি অত্যন্ত আহ্লাদের সহিত বলিলেন, ‘তা হলে বাঁচি।’১০

পরে অক্ষয় দত্ত একটু ইতঃস্তত করছিলেন। কিন্তু ততদিনে বিদ্যাসাগর ইংরেজ সরকারের নিকট থেকে উক্ত পদে অক্ষয় দত্তের নিয়োগ অনুমোদন করিয়ে নিয়েছেন। তবে জন্য নরমাল স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি বেশিদিন এই পদে চাকরী করতে পারেননি। মস্তিষ্কের জটিল রোগে তিনি সকল কাজ থেকে অবসর গ্রহণ করে গঙ্গার তীরে বালিগ্রামে একটি বাড়ি কিনে সেখানে অবশিষ্ট জীবন যাপন করেন।

অবসর নেয়ার পর তিনি কিভাবে চলবেন সে বিষয়টিও তাঁর বন্ধু বিদ্যাসাগর ভুলেননি। অক্ষয়কুমার দত্তের জন্য তত্ত্ববোধিনী সভা থেকে মাসিক বৃত্তি নির্ধারণের বিষয়ে অক্ষয় দত্তের চরিতকার মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত জানাচ্ছেন যে, ‘দেশমান্য পন্ডিতবর শ্রীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় এ বিষয়ের জন্য বিশেষ উদ্‌যোগ পাইয়াছিলেন’।১১

আবার বিহারীলাল সরকারের লেখা থেকে জানা যাচ্ছে, যাঁর পত্রিকায় সামান্য বেতনে কাজ করে অক্ষয় দত্ত শরীরপাত করেছিলেন সেই দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তত্ত্ববোধিনী সভা থেকে অসুস্থ অক্ষয় দত্তকে বৃত্তি দেয়ার প্রস্তাবে আপত্তি করেছিলেন ! তত্ত্ববোধিনী সভায় বৃত্তি দেয়ার প্রস্তাব করা হলে তিনি বলেছিলেন তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার আয় দ্বারা যদি বৃত্তি যায় তবে দেয়া যেতে পারে, তত্ত্ববোধিনী সভা ও তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা দু’জায়গার আয় যোগ করে তা থেকে বৃত্তি দেয়া উচিত নয়। তবে সভায় দেবেন্দ্রনাথের আপত্তি টিঁকেনি।১২

তত্ত্ববোধিনী সভার উক্ত সিদ্ধান্ত ১২৩৪ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসের তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। সিদ্ধান্তটি লিখেছিলেন বিদ্যাসাগর। তিনি লিখেছিলেন,

তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা প্রকাশিত হওয়াতে এতদ্দেশীয় যে নানা উপকার লাভ হইয়াছে, ইহা বোধ হয় বিশিষ্ট ব্যক্তিমাত্রেই স্বীকার করিয়া থাকেন। আদ্যোপান্ত অনুধাবন করিয়া দেখিলে শ্রীযুক্ত অক্ষয়কুমার দত্ত এই তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা সৃষ্টির জন্য এক প্রধান উদ্যোগী এবং এই মহোপকারিণী পত্রিকার অসাধারণ শ্রীবৃদ্ধি লাভের অদ্বিতীয় কারণ বলিয়া বোধ হইবে। তাঁহারই যত্নে ও পরিশ্রমে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা সর্ব্বত্র এরূপ আদরভাজন ও সর্ব্বসাধারনের এরূপ উপকার সাধন হইয়া উঠিয়াছে। বস্তুতঃ তিনি অনন্যমনা ও অনন্যকর্ম্মা হইয়া কেবল তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার শ্রীবৃদ্ধি সাধনে নিয়ত নিবিষ্টচিত্ত ছিলেন। তিনি এই পত্রিকার শ্রীবৃদ্ধিসাধনে কৃতসঙ্কল্প হইয়া অবিশ্রান্ত অত্যুৎ পরিশ্রমের দ্বারা শরীর পাত করিয়াছেন, বলিলে বোধহয় অত্যুক্তি দোষে দূষিত হইতে হয় না। তিনি যে অতি বিষম শিরোরোগে আক্রান্ত হইয়া দীর্ঘকাল অশেষ ক্লেশ ভোগ করিতেছেন, তাহা কেবল ঐ উৎকৃষ্ট মানসিক পরিশ্রমের পরিণাম তাহাতে সন্দেহ নাই। অতএব যিনি তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার নিমিত্ত শরীরপাত করিয়াছেন, সেই মহোদয়কে সহস্র সাধুবাদ প্রদান করা ও তাঁহার প্রতি তথোচিত কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করা অত্যাবশ্যক, না করিলে তত্ত্ববোধিনী সভার সভ্যদিগের কর্ত্তব্যানুষ্ঠানের ব্যতিক্রম হয়।’১৩

বিদ্যাসাগরের লেখা এই সিদ্ধান্তে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার জন্য অক্ষয় দত্তের পরিশ্রম ও ত্যাগের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি যেমন আছে তেমনি সভায় দেবেন্দ্রনাথের উত্থাপিত আপত্তির ফলে বিদ্যাসাগরের অসন্তোষের আভাসও হয়তো আছে।

তবে অক্ষয় দত্তকে পাঁচ বছরের বেশি তত্ত্ববোধিনী সভার বৃত্তি নিতে হয়নি। ইতিমধ্যে তাঁর লেখা বইগুলোর বিক্রি বাড়ার ফলে তাঁর আয় বৃদ্ধি পায় ও তাঁর অবস্থা বেশ স্বচ্ছল হয়েছিল।

বিদ্যাসাগরের যেরূপ বন্ধুর জন্য ভালবাসা ছিল অক্ষয় দত্তেরও তেমনি বিদ্যাসাগরের প্রতি গভীর ভালবাসা ছিল। এই ভালবাসা কতটুকু আন্তরিক ছিল তা রাজনারায়ণ বসুকে লেখা অক্ষয় দত্তের একটি পত্রের অংশ থেকে বোঝা যায়। অক্ষয় দত্ত লিখেছেন,

আপনি মেদিনীপুর অঞ্চলে বিধবাবিবাহ সম্পাদনার্থ সচেষ্টিত আছেন শুনিয়া সুখী হইয়াছি। আমাকে তদ্বিষয়ে সমাচার লিখিতে আলস্য করিবেন না । বিদ্যাসাগরকে মনের সহিত আশীর্বাদ করিতেও ত্রুটি করিবেন না। জয়োস্ত! জয়োস্ত!১৪

এখানে বিদ্যাসাগরের প্রতি অক্ষয় দত্তের মনোভাব ছাড়াও বিধবা বিবাহ সংঘটনে তাঁর গভীর আগ্রহের কথা জানা যাচ্ছে। বিধবাবিবাহকে তিনি কতটুকু সমর্থন করতেন, পৌত্র সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনীতে বর্ণিত একটি ঘটনা থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। একবার অক্ষয় দত্তের এক কর্মচারী কয়েক হাজার টাকা নিয়ে পালিয়ে যান। তাঁকে চিঠি লিখে জেল-পুলিশের ভয় দেখালে তিনি জবাবে অক্ষয়কুমারকে জানান, ‘আপনি আমাকে বলেছিলেন আমি বিধবাবিবাহ করলে আমাকে পুরস্কার দেবেন। আমি বিধবাবিবাহ করেছি।’ অক্ষয়কুমার খোঁজ নিয়ে জানলেন, সত্যিই তিনি একজন বিধবাকেই বিয়ে করেছেন। তিনি সেই কর্মচারীকে চিঠি লিখলেন, ‘তোমার সকল অপরাধ ক্ষমা করলাম’।১৫

বিদ্যাসাগর সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘তাহার শ্রেষ্ঠ কীর্তি বঙ্গভাষা’। এই উক্তিটি অক্ষয় দত্তের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। আধুনিক বাংলা গদ্য নির্মাণেও এই দুই বন্ধুর কাজ পরস্পরের পরিপূরক।

বিদ্যাসাগর সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘তাহার শ্রেষ্ঠ কীর্তি বঙ্গভাষা’। এই উক্তিটি অক্ষয় দত্তের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। আধুনিক বাংলা গদ্য নির্মাণেও এই দুই বন্ধুর কাজ পরস্পরের পরিপূরক। তত্ত্ববোধিনী পাঠশালার ভূগোল ও পদার্থবিদ্যার শিক্ষক থাকার সময় অক্ষয় দত্ত ১৮৪১ সালে ‘ভূগোল’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২১। তখনো বিদ্যাসাগরের কোনো বই প্রকাশিত হয়নি। এই গ্রন্থটি অক্ষয় দত্তের প্রথম গদ্যগ্রন্থ হলেও তাঁর ভাষা পূর্ববর্তী বাংলা গদ্যের তুলনায় অনেক প্রাঞ্জল ও সরল। এই সেই ভাষার নমুনা:

‘যে বিদ্যা দ্বারা পৃথিবীর আকার পরিমাপ এবং তাহার উপরিভাগস্থ স্থান সমূহ সমুদয় জ্ঞাত হওয়া যায় তাহার নাম ভূগোল বিদ্যা।

‘ভূ শব্দের অর্থ পৃথিবী এবং গোল শব্দের অর্থ গোলাকার, অতএব গোলাকার পৃথিবী বিষয়ক বিদ্যাকে ভূগোল কহা যায়।’

‘পৃথিবীর আকৃতি প্রায় গোল যেমন কমলালেবু গোলাকার। অথচ তাহার বোঁটার নিকট কিঞ্চিৎনিম্ন, সেইরূপ পৃথিবীও গোল কিন্তু উত্তর দক্ষিণে কিঞ্চিৎ চাপা।’১৬

রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগর সম্পর্কে বলেছিলেন যে তিনিই বাংলা ভাষাকে ‘সর্বপ্রকারব্যবহারযোগ্য’ করে তুলেছিলেন এবং ‘গ্রাম্য পাণ্ডিত্য ও গ্রাম্য বর্বরতা’—এইদুইয়ের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। ‘ভূগোল’–এর ভাষা দেখে মনে হয় রবীন্দ্রনাথ তাঁর জন্মের বিশ বছর আগে প্রকাশিত ও পরবর্তীকালে দুর্লভ এই গ্রন্থটি তখনো দেখেননি।

এই বইটি ইংরেজি থেকে অনুদিত ছিল এবং এতে তিনিই প্রথম বাংলা ভাষায় যথাযথভাবে যতি চিহ্ন ব্যবহার করেন। বিদ্যাসাগর আরো বহু পরে তাঁর ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ এর দশম সংস্করণ থেকে যতি চিহ্ন ব্যবহার শুরু করেন। তবে অক্ষয় দত্তের ভাষা বিদ্যাসাগরের হাতে মার্জিত হয়ে আরো সমৃদ্ধ হয়েছিল। বিদ্যাসাগরের ব্যক্তিগত পরিচিতি যেমন অনেক বেশি ছিল তেমনি তাঁর সাহিত্যিক রচনা অক্ষয় দত্তের গুরুগম্ভীর রচনার চেয়ে অনেক বেশি পঠিত ও পরিচিত ছিল। ইংরেজ সিভিলিয়ানদের জন্য লেখা তাঁর ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ বাংলা ভাষায় প্রথম গল্পের বই হিসেবে ঘরে ঘরে পঠিত হয়েছে। বাঙালি শকুন্তলার কাহিনী কালিদাসের নাটক থেকে জানেনি, জেনেছে বিদ্যাসাগরের ‘শকুন্তলা’ পড়ে। অক্ষয় দত্ত বিদ্যাসাগর দু’জনই বাংলা সাহিত্যকে তাঁদের অনুবাদ দিয়ে সমৃদ্ধ করেছিলেন, শিক্ষার্থিদের বিজ্ঞান বিষয়কে জনপ্রিয় করেছেন।

আধুনিক বাংলা গদ্য নির্মাণেই যে তাঁরা পথিকৃৎ ছিলেন তাই নয় বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে তাঁদের যুগপৎ প্রচেষ্ঠাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিদ্যাসাগরের শিক্ষাচিন্তার মূলে ছিল সমৃদ্ধ বাংলা সাহিত্য সৃষ্টি। এই চিন্তার ভিত্তিতেই তিনি একদল পাশ্চাত্ত্য শিক্ষায় শিক্ষিত,সংস্কৃত-জানা আবার ভাববাদিতামুক্ত মানুষ তৈরির জন্য সংস্কৃত কলেজের শিক্ষাসংস্কার করেছিলেন। অক্ষয় দত্ত মাতৃভাষায় বিদ্যাচর্চার সপক্ষে শুধু প্রবন্ধই রচনা করেননি কিংবা অফিস–আদালত ও উচ্চশিক্ষাসহ সব স্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের কথা বলেননি, প্রখ্যাত শিক্ষাব্রতী ডেভিড হেয়ারের মৃত্যুর পর প্রথা ভেঙে বাংলায় বক্তৃতা দিয়েছিলেন।

বিধবা বিবাহ প্রচলন, নারী শিক্ষা প্রসার, বাল্যবিবাহ রোধ, বহুবিবাহ বন্ধ করা ইত্যাদি সকল বিষয়েই এই দুই বন্ধুর কাজ একে অন্যের পরিপূরক ছিল। বিদ্যাসাগর শাস্ত্র না মানলেও যেভাবে শাস্ত্র থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করেন যে বিধবাবিবাহ শাস্ত্রসম্মত, তেমনি শাস্ত্র না-মানা অক্ষয়ও নারী শিক্ষার সমর্থনে হিন্দু শাস্ত্র থেকে উদাহরণ দিয়ে সেগুলোকে নারীশিক্ষার সমর্থক বলে ব্যাখ্যা করতেন।

বিধবা বিবাহ প্রচলন, নারী শিক্ষা প্রসার, বাল্যবিবাহ রোধ, বহুবিবাহ বন্ধ করা ইত্যাদি সকল বিষয়েই এই দুই বন্ধুর কাজ একে অন্যের পরিপূরক ছিল। বিদ্যাসাগর শাস্ত্র না মানলেও যেভাবে শাস্ত্র থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করেন যে বিধবাবিবাহ শাস্ত্রসম্মত, তেমনি শাস্ত্র না-মানা অক্ষয়ও নারী শিক্ষার সমর্থনে হিন্দু শাস্ত্র থেকে উদাহরণ দিয়ে সেগুলোকে নারীশিক্ষার সমর্থক বলে ব্যাখ্যা করতেন।

অক্ষয় দত্ত আর বিদ্যাসাগর জন্মেছিলেন একই বছর, আজ থেকে দুই শ বছর আগে, ১৮২০ সালে। তাঁদের এই কীর্তিময় বন্ধুত্ব তাঁদের সমসাময়িক দুজন যুগপ্রবর্তক জার্মান দার্শনিকের বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়,যদিও তাঁদের কর্মক্ষেত্র ভিন্ন ছিল এবং তাঁদের প্রভাব বিশ্বব্যাপি অনেক গভীর, যুগান্তকারি ও সুদূরপ্রসারী ছিল। এঁদের একজন তাঁদেরই সমান বয়সী, এবছর তাঁরও জন্মের দু’শবছর হলো,তাঁর নাম ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস। অন্যজন দুই বছরের বড়, নাম কার্ল মার্কস।

[এই লেখার মূল সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্পাদিত ত্রৈমাসিক পত্রিকা নতুন দিগন্ত, সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর ২০২০ সংখ্যায়।]

চৌধুরী মুফাদ আহমদ: প্রাবন্ধিক

ইমেইল: cmahmed@gmail.com

গ্রন্থপঞ্জী:

১।দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর: আত্মজীবনী। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ২০১২

২। বিহারীলাল সরকার: বিদ্যাসাগর । দ্বিতীয় অরিয়েন্ট সংস্করণ ১৯৯১

৩। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়:অক্ষয়কুমার দত্ত । বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ ১৩৪৯ বঙ্গাব্দ

৪। বিনয় ঘোষ: বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ। ওরিয়েন্ট লংম্যান লিমিটেড, ১৯৮৪

৫।শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন: বিদ্যাসাগর-চরিত কলিকাতা ১২৯৮ বঙ্গাব্দ ।

৬। রাজনারায়ণ বসু: আত্মচরিত কলিকাতা ১৩১৫ বঙ্গাব্দ ।

৭। মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম: অক্ষয়কুমার দত্ত ও উনিশ শতকের বাঙলা, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি ২০০৯।

তথ্যসূত্র

১। বিহারীলাল সরকার: বিদ্যাসাগর দ্বিতীয় অরিয়েন্ট সংস্করণ ১৯৯১ পৃষ্ঠা-৭৬-৭৭

২। বিনয় ঘোষ: বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ, ওরিয়েন্ট লংম্যান লিমিটেড ১৯৮৪ পৃষ্ঠা ১৩৮ -এ বর্ণিত

৩। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর: আত্মজীবনী । বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ২০১২,পৃষ্ঠা ৫১

৪। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর: ঐ পৃষ্ঠা ৫১

৫। বিনয় ঘোষ: ঐ , পৃষ্ঠা ১৩৯

৬। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর: ঐ,পরিশিষ্ট ৫৫

৭। শিবনাথ শাস্ত্রী: রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ নিউ এজ পাবলিশার্স ১৯৭৭ পৃষ্ঠা ১৮১

৮। বিনয় ঘোষ: ঐ পৃষ্ঠা ১৭৮

৯। মহেন্দ্রনাথ রায়: শ্রীযুক্ত বাবু অক্ষয়কুমারের জীবন-বৃত্তান্ত কলিকাতা ১২৯২ বঙ্গাব্দ পৃষ্ঠা ৯৩

১০। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়: অক্ষয়কুমার দত্ত, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ ১৩৪৯ বঙ্গাব্দ পৃষ্ঠা ২০ এ উদ্ধৃত

১১। মহেন্দ্রনাথ রায়: ঐ পৃষ্ঠা ২৩৩

১২। বিহারীলাল সরকার: ঐ পৃষ্ঠা ৮০-৮১

১৩। মহেন্দ্রনাথ রায়: ঐ পৃষ্ঠা ২৩৩-২৩৪

১৪। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়: ঐ পৃষ্ঠা ৪৩ এ উদ্ধৃত

১৫। অক্ষয়কুমার দত্তের ‘চারুপাঠ’  তৃতীয় ভাগ এর একত্রিংশতম সংস্করণের প্রারম্ভে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত লিখিত ‘গ্রন্থকারের জীবন-কথা’১৩১৬ বঙ্গাব্দ।

১৬। অক্ষয়কুমার দত্ত: ভুগোল  কলিকাতা ১৭৬৩ শকাব্দ পৃষ্ঠা ১

Social Share
  • 32
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    32
    Shares
  •  
    32
    Shares
  • 32
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *