সমাপ্তি ও ধারাবাহিকতা: বার্কবেক বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া ভাষণ

অ্যাঞ্জেলা ডেভিসের সাথে কথোপকথন-৫

সমাপ্তি ও ধারাবাহিকতা: বার্কবেক বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া ভাষণ

অনুবাদ: ফাতেমা বেগম

মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদী লেখক ও অধিকার আন্দোলনে সক্রিয় ব্যক্তিত্ব অ্যাঞ্জেলা ডেভিসের সাথে লেখক এ্যাক্টিভিস্ট ফ্রাংক বারাতের দীর্ঘ কথোপকথনের ওপর এই লেখা তৈরি করা হয়েছে। ২০১৪ সালে বেশ কয়েক মাস ধরে ই-মেইলের মাধ্যমে এই কথোপকথন পরিচালিত হয়েছে। এতে মার্কিন সমাজে বৈষম্য, বর্ণবাদী আক্রমণ, ফিলিস্তিনি জনগণ সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের লড়াই নিয়ে অ্যাঞ্জেলা ডেভিসের বক্তব্য বিস্তারিতভাবে উপস্থিত করেছেন ফ্রাংক বারাত। পরে এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়, নাম: Freedom is a Constant Struggle: Ferguson, Palestine and the Foundations of a Movement|  এর অনুবাদ ধারাবাহিকভাবে সর্বজনকথায় প্রকাশিত হচ্ছে। এবারে পঞ্চম পর্ব। অ্যাঞ্জেলা এখানে দেখিয়েছেন কীভাবে মুক্তির সকল লড়াই কীভাবে পরস্পর যুক্ত।

তারা বলে যে স্বাধীনতা একটি অবিরাম সংগ্রাম।

তারা বলে যে স্বাধীনতা একটি অবিরাম সংগ্রাম।

তারা বলে যে স্বাধীনতা একটি অবিরাম সংগ্রাম।

হে প্রভু, আমরা লড়েছি দীর্ঘকাল।

আমরা অবশ্যই মুক্ত হবো।

আমরা অবশ্যই মুক্ত হবো।

বিংশ শতাব্দীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে স্বাধীনতা আন্দোলনে অনবরত গেয়ে চলা মুক্তির গান থেকে আমার বইয়ের শিরোনাম নেয়া হয়েছে। গানের অন্যান্য পংক্তিতে আছে কান্না, দুঃখ, শোক, মৃত্যু-

তারা বলছে স্বাধীনতা হচ্ছে ক্রমাগত মৃত্যু

আমরা  বহু আগে মৃত্যুবরণ করেছি

আমাদের অবশ্যই স্বাধীন হতে হবে।

প্রত্যেক স্তবকের শেষ বাক‌্যের বিদ্রুপগুলি আমার পছন্দের:

আমরা বহুদিন যাবৎ সংগ্রাম করেছি

আমরা বহুদিন যাবৎ কেঁদেছি

আমরা বহুদিন যাবৎ দুঃখ করেছি

আমরা বহুদিন আগে মৃত্যুবরণ করেছি

আমাদের স্বাধীন হতেই হবে

আমাদের স্বাধীন হতেই হবে।

বাক্যগুলিতে একইসাথে সমর্পন এবং প্রতিশ্রুতি আছে, সমালোচনা এবং অনুপ্রেরণা আছে-আমাদের স্বাধীন হতেই হবে, আমাদের স্বাধীন হতেই হবে। কিন্তু আমরা কি আসলেই স্বাধীন?

 ২০০৭ সালে যুক্তরাজ্যে দাসত্ব অবসানের দ্বিশততম বর্ষীয় উৎসব উদযাপন অনুষ্ঠানে বারোনেস লোলা ইয়াং আমাকে এখানে একজন বক্তা হিসাবে আমন্ত্রণ করেছিলেন। কিন্তু লন্ডনের উদ্দেশ্যে যাত্রার দিনে আমার মা মৃত্যুবরণ করেন। তাই আমি শেষ মুহুর্তে সফর বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিলাম। কাকতালীয়ভাবে, এই বছরটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ স্বাধীনতা সংগ্রামের বার্ষিকী উদযাপিত হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণার দেড়শতবর্ষপূর্তিতে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রধান কৃষ্ণাঙ্গ সংগ্রামের পঞ্চাশতম বার্ষিকী উদযাপনকালে আমাকে স্বাধীনতার অর্থ সম্পর্কে কিছু বলতে অনুরোধ করা হয়েছে।

তাই আমি প্রথমে পঞ্চাশতম বার্ষিকীর কিছু ঘটনা উল্লেখ করছি। তা হলো, ডঃ মার্টিন লুথার কিং এর “লেটার ফ্রম আ বার্মিংহাম জেল” এর পঞ্চাশতম বার্ষিকী। বার্মিংহামে তিনি একজন বহিরাগত আন্দোলনকারী হিসাবে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। এই চিঠিতে তিনি সেই অভিযোগের বিরুদ্ধে বলেন, “রাষ্ট্র এবং সম্প্রদায়গুলির মধ্যে আন্তঃসম্পর্কের ব্যাপারে আমি অবগত আছি। বার্মিংহামে কী ঘটছে সে ব্যাপারে উদ্বিগ্ন না হয়ে আটলান্টায় আমি নিশ্চুপ বসে থাকতে পারি না। যে কোনো এক স্থানে ঘটা অবিচার অন্য সবখানেই ন্যায় বিচারের জন্য হুমকিস্বরূপ।”

আপনারা সম্ভবত তার এই উক্তির সাথে পরিচিত: “আমরা অবিচ্ছেদ্য এক পারস্পরিকতার জালে আটকে আছি, আমরা অদৃষ্টের একটিমাত্র পোশাকে বাধা রয়েছি। যা কিছু একজনকে সরাসরি প্রভাবিত করে, তা অন্য সকলকে পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে।”

তারপর ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করে তিনি লিখেছেন: “দুই শতকের বেশি সময় যাবৎ আমাদের পূর্বপুরুষ বিনা মজুরিতে শ্রম দিয়েছে; তারা সুতার রাজা প্রতিষ্ঠা করেছে;  ভয়াবহ অবিচার এবং লজ্জাজনক অপমান ভোগের বিনিময়ে তারা প্রভুদের জন্য বাড়ি তৈরি করেছে। তবুও নিরলস জীবনীশক্তি নিয়ে তারা নিজেদের সমৃদ্ধি এবং বিকাশকে চলমান রেখেছে। যদি দাসত্বের অবর্ণনীয় নিষ্ঠুরতা আমাদেরকে রুখতে না পেরে থাকে, তাহলে নিশ্চিতভাবেই আমাদের বর্তমান বিরোধীপক্ষও অকৃতকার্য হবে।”

আমরা আজ বার্মিংহামে শিশুদের প্রতিবাদ আন্দোলনের পঞ্চাশতম বার্ষিকীও উদযাপন করছি। অনেকেরই হয়তো জানা নেই যে, বার্মিংহামের আন্দোলন সফল হয়েছিল বিপুল সংখ্যক ছেলে এবং মেয়ে শিশুর কারণে। ১৯৬৩ সালের মে মাসের শুরুর দিকে তারা এই বিক্ষোভ করতে গিয়ে পুলিশী কুকুর এবং শক্তিশালী জলকামানের শিকার হয়েছিল। তাদের এই বিক্ষোভ টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়েছিল। সৌভাগ্যক্রমে, টেলিভিশনের ব্যবহার তখন মাত্র শুরু হয়েছিল, এবং প্রথমবারের মত দক্ষিণের বাইরের মানুষের পক্ষে এই বিক্ষোভ দেখার সুযোগ হয়েছিল। বিশ্ববাসী জানতে পেরেছিল যে কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায় স্বাধীনতার সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য কতটা সংকল্পবদ্ধ ছিল।

১৯৬৩ সালের মে মাসের শুরুর দিকে তারা এই বিক্ষোভ করতে গিয়ে পুলিশী কুকুর এবং শক্তিশালী জলকামানের শিকার হয়েছিল। তাদের এই বিক্ষোভ টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়েছিল। সৌভাগ্যক্রমে, টেলিভিশনের ব্যবহার তখন মাত্র শুরু হয়েছিল, এবং প্রথমবারের মত দক্ষিণের বাইরের মানুষের পক্ষে এই বিক্ষোভ দেখার সুযোগ হয়েছিল।

আলাবামার বার্মিংহামে বর্ণবাদী বৈষম্যের বিরুদ্ধ আন্দোলনকারী শিশুদের কাছ থেকে প্ল্যাকার্ড কেড়ে নিচ্ছেন এক পুলিশ, ৩ মে, ১৯৬৩, ছবিসূত্র: encyclopediaofalabama.org

১৯৬৩ সালে চাকুরী এবং স্বাধীনতার জন্য ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্যে একটি প্রতিবাদ মিছিল (মার্চ অন ওয়াশিংটন ফর জবস এন্ড ফ্রিডম) হয়েছিল। এই মিছিলে প্রায় ২৫০,০০০ জন মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল। সেই সময়ের প্রেক্ষিতে, এই মিছিলে স্মরণাতীতকালের মধ্যে বৃহত্তম সমাবেশ হয়েছিল। 

কনস্টিটিউশান এভিনিউতে ওয়াশিংটন মার্চের নেতৃবৃন্দ, ছবি: উইকিপিডিয়া

গত আগস্ট মাসে, ওয়াশিংটনে দুইটি মিছিল হয়েছে। একটি মিছিল ওবামা এবং ক্লিনটনের আহবানে করা হয়েছিল। আরেকটি মিছিল হয়েছিল তাদের মাধ্যমে যারা বর্তমান নাগরিক অধিকার নেতৃত্বে প্রতিনিধিত্ব করছেন। আমি তাদের নাম উল্লেখ করছি না।

পঞ্চাশতম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে একটানা কয়েকটি অনুষ্ঠান ছিল। অনেকেই বুঝতে পারেননি ঠিক কোনটাতে যোগ দেবেন (সম্ভবত একটি অনুষ্ঠান ২৪শে আগস্ট এবং আরেকটি অনুষ্ঠান ২৮শে আগস্ট অনুষ্ঠিত হয়েছিল)।কিন্তু গত সেপ্টেম্বর মাসে বার্মিংহাম এবং আলাবামায় কয়েকটি অনুষ্ঠান হয়েছিল। আপনারা জানেন যে আমি আলাবামায় জন্মেছি এবং সেখানে বেড়ে উঠেছি।

এই অনুষ্ঠানগুলির আয়োজন করা হয়েছে সিক্সটিনথ স্ট্রিট ব্যাপটিস্ট চার্চে বোমা নিক্ষেপের ফলে চার(৪) জন কৃষ্ণাঙ্গ তরুণী নিহত হওয়ার পঞ্চাশতম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষ্যে। এই উদযাপনের মধ্যে সর্বোচ্চ যে কাজটি করা হয়েছে তা হলো বোমা হামলায় নিহত চার মেয়ের পরিবারকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সন্মান “কংগ্রেসনাল গোল্ড মেডালে” ভূষিত করা হয়েছে। অথচ এই পরিবারেরই একজন মেয়ে সারা কলিন্স (অ্যাডি মে কলিন্সের বোন) যিনি মারা না গেলেও একটি চোখ হারিয়েছিলেন এবং গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলেন, তিনি আজ অবধি চিকিৎসার খরচ নিয়ে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পাননি।

বোমা হামলায় নিহত চার মেয়ের পরিবারকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সন্মান “কংগ্রেসনাল গোল্ড মেডালে” ভূষিত করা হয়েছে। অথচ এই পরিবারেরই একজন মেয়ে সারা কলিন্স (অ্যাডি মে কলিন্সের বোন) যিনি মারা না গেলেও একটি চোখ হারিয়েছিলেন এবং গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলেন, তিনি আজ অবধি চিকিৎসার খরচ নিয়ে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পাননি।

অনেক উদযাপন সম্পর্কে আমার আশঙ্কা হলো যে, এর মাধ্যমে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনাবলির চূড়ান্ত সমাপ্তি টেনে ফেলা হয়। এসব ঘটনাকে গণতন্ত্রের বিজয়ের পথের এক একটি ঐতিহাসিক চূড়ান্ত মূহুর্ত হিসেবে হাজির করা হয়; যেন এগুলো বিশ্বের কাছে একেকটি মডেল বা আদর্শ, যা রক্ষার জন্য এমনকি সামরিক আগ্রাসনও জায়েজ। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে এসব সামরিক আগ্রাসনে ক্রমশ আরো বেশি করে ড্রোন ব্যবহার হচ্ছে যার ফলে বিশেষত পাকিস্তানের মত দেশে বিপুল সংখ্যক মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে।

ক্রমাগত ড্রোন ব্যবহার বাড়ানোর জন্য ওবামা প্রশাসনের সমালোচনা করার সাথে সাথে মার্চ অন ওয়াশিংটন এর পঞ্চাশতম বার্ষিকীতে ওবামার ভাষণকে স্বীকৃতি দিতে চাই। এই ভাষণে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামকে অসমাপ্ত বলেছেন। তিনি অন্তত এই স্বাধীনতা সংগ্রামকে অব্যাহত রাখার সপক্ষে দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছেন। তবে, পুরানো প্রবাদ বাক্যের উদ্ধৃতি টেনে আমাকে বলতেই হচ্ছে, কথার চেয়ে কাজ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এটা অনস্বীকার্য যে, বিংশ শতাব্দীর কৃষ্ণাঙ্গ স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রসঙ্গটি বিশ্বে একটি জনপ্রিয় সংস্কৃতি হিসাবে সম্পৃক্ততা পেয়েছে। আমরা জানি যে, ডঃ মার্টিন লুথার কিং (জুনিয়র) বিশ্বের অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসাবে সুপরিচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চল্লিশটি রাজ্যে, ওয়াশিংটন এবং পিওরটো রিকোতে নয় ৯শ’রও বেশি সংখ্যক রাস্তা ডঃ কিং এর নামে নামকরণ করা হয়েছে। তবে এই নামকরণের চর্চা নিয়ে গবেষণা করেছেন এমন ভূগোলবিদদের মতে, বিভিন্ন অমিমাংসিত সামাজিক সমস্যা থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে নিতে অনেক সময় এই নামকরণকে ব্যবহার করা হয়েছে। এসব সমস্যার মধ্যে রয়েছে শিক্ষা, বাসস্থান, ও কর্মসংস্থানের সংকট ও এসব সংকট ঢেকে রাখার জন্য মানুষকে কারাবন্দী করে রাখার কৌশল।

ডঃ কিং এর নামে নয় শতাধিক রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে, আবার একই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জেল, কারাগার, তরুণ-সংশোধনাগার কেন্দ্র, সামরিক কারাগার, এবং ইন্ডিয়ান রাজ্যের জেলগুলিতে ২৫ লক্ষাধিক মানুষ বন্দী হয়ে আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫ ভাগ মানুষের বসবাস হলেও বিশ্বের মোট কারাবন্দীর শতকরা ২৫ ভাগের অবস্থান এই দেশের কারগারগুলোতে। বিশ্বের ২৫ শতাংশ কারাবন্দী এমন এক কারাগার-শিল্প কমপ্লেক্সের রসদ হিসেবে ব‌্যবহৃত হচ্ছে যা দাসযুগ থেকেই উপেক্ষিত সামাজিক সমস্যাগুলোকে আড়াল করে রাখার কৌশল থেকে মুনাফা অর্জন করে।

ডঃ কিং এর নামে নয় শতাধিক রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে, আবার একই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জেল, কারাগার, তরুণ-সংশোধনাগার কেন্দ্র, সামরিক কারাগার, এবং ইন্ডিয়ান রাজ্যের জেলগুলিতে ২৫ লক্ষাধিক মানুষ বন্দী হয়ে আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫ ভাগ মানুষের বসবাস হলেও বিশ্বের মোট কারাবন্দীর শতকরা ২৫ ভাগের অবস্থান এই দেশের কারগারগুলোতে।

অধিকন্তু, পুলিশ এবং বিভিন্ন বর্ণবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সহিংসতা এখন চরম শিখরে অবস্থান করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্র্যাভিয়ন মার্টিনের মামলা আমাদেরকে স্টিফেন লরেন্সেরমামলাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। আবার, কৃষ্ণাঙ্গ-বর্ণবাদ বিরোধী সহিংসতার ইতিহাস ইসলামভীতিজনিত সহিংসতাকে প্রতিপালন করে। বিভিন্ন ভৌগলিক অঞ্চলে কৃষ্ণাঙ্গ মুক্তি আন্দোলনের সংস্কৃতির ব্যাপক মাত্রায় উপস্থিতি এবং সেই আন্দোলন সম্পর্কে ভাসাভাসা জ্ঞানের বাইরে তেমন কিছু না জানার বাস্তবতা একই সাথে বিরাজ করছে।

আমি একটু সাহস করেই বলতে চাই, বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ ডঃ মার্টিন লুথার কিং সম্পর্কে জানলেও, খুব কম সংখ্যক মানুষই তাঁর একটি স্বপ্ন আছে- এর চেয়ে বেশি কিছু তাঁর সম্পর্কে জানে না! আমাদের সকলেরই স্বপ্ন থাকে। অবশ্যই। বাস্তবিকভাবে, তার সকল বক্তব্যের মধ্যে “আমার একটি স্বপ্ন আছে” শীর্ষক ভাষণটি সর্বাধিক প্রচারণা লাভ করেছে।

ভিয়েতনামের উপরে তার রিভারসাইড চার্চ ভাষণ এবং তিনি যেভাবে কৃষ্ণাঙ্গ স্বাধীনতা আন্দোলন ও ভিয়েতনামে আগ্রাসন অবসানের দাবীর মধ্যে একটি আন্তঃসম্পর্ক ও আন্তঃসংযোগ উপস্থাপন করেছেন, সেব্যাপারে খুব কম মানুষ ভালোভাবে অবগত আছেন। কাজেই, বিংশ শতাব্দীর স্বাধীনতা আন্দোলনের জ্ঞান যার মাধ্যমে ভৌগোলিক জটিলতা এবং স্বাধীনতার ক্ষণস্থায়ীত্বের বিষয়ে আমাদের আরও জানার সুযোগ ছিল, তা দমিত হয়ে যায়।  

ভিয়েতনামের উপরে তার রিভারসাইড চার্চ ভাষণ এবং তিনি যেভাবে কৃষ্ণাঙ্গ স্বাধীনতা আন্দোলন ও ভিয়েতনামে আগ্রাসন অবসানের দাবীর মধ্যে একটি আন্তঃসম্পর্ক ও আন্তঃসংযোগ উপস্থাপন করেছেন, সেব্যাপারে খুব কম মানুষ ভালোভাবে অবগত আছেন।

মূলত ১৯৫৫ সালের মন্টোগোমারী বাস বর্জনসহ বিচ্ছিন্ন ধারাবাহিক কিছু ঐতিহাসিক মুহুর্ত কৃষ্ণাঙ্গ স্বাধীনতা আন্দোলনকে সর্বোচ্চ প্রতিনিধিত্ব করে। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র এই বর্জন আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে খ্যাতিমান হয়ে উঠতে শুরু করেছিলেন। তথাপি নাগরিক অধিকার আন্দোলনে তিনি সবসময়ের জন্য এবং ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত একজন বক্তা ও নেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠা পান।

যদিও স্কলারলি এবং জনপ্রিয় অনেক বইয়ে ১৯৫৫ সালের বর্জন আন্দোলনে নারীর ভূমিকা লিখিত হয়েছে, তথাপি ইতোমধ্যে সংগঠিত আন্দোলনে সম্পূর্ণ অপরিচিত ডঃ কিং একজন মুখপাত্র হিসাবে আমন্ত্রিত হয়েও একজন প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসাবে পরিচিত থেকেছেন।

আমরা কি সত্যি কখনো ইতিহাসের সামষ্টিক নির্মাতাদের সনাক্ত করতে পারব, রেডিক্যাল সাংগঠিনক তৎপরতার মধ্যে দিয়ে যাদের জন্ম হয়েছিল? আমি এব্যাপারে সন্দিহান। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৩০/১৯৪০ এর দশকের প্রথম দিককার, সাউদার্ন নিগ্রো ইয়ুথ কংগ্রেস নামে পরিচিত একটি সংগঠনকে সরকারি ইতিহাসের খাতা থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে। কারণ এই সংস্থার কিছু প্রধান নেতা কমিউনিস্ট ছিলেন।

ক্যারোল বয়েস ডেভিস তারক্লডিয়া জোনস এর উপর লেখা অসাধারণ বই লেফট অফ কার্ল মার্ক্স-এ  এব্যাপারে উল্লেখ করেছেন। ক্লডিয়া জোনস নিগ্রো ইয়ুথ কংগ্রেস (দ্যা এমেরিকান নিগ্রো ইয়ুথ কংগ্রেস দ্য সাউদার্ণ নিগ্রো ইয়ুথ কংগ্রেস) এর একজন অন্যতম নেত্রী ছিলেন। জোনস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে তার কাজের প্রেক্ষিতে গ্রেফতারের পর নির্বাসিত হয়ে এখানে ব্রিটেনে ক্যারিবিয়ান সম্প্রদায়ের সংগঠনের ব্যাপারে একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা রেখেছেন। এই উভয় কারণে আমি তাকে উল্লেখ করতে চাই।

আমরা কীভাবে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদেরকে ক্ষমতাবান ব্যক্তি কিংবা ক্ষমতাবান পুরুষ হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতার বিপরীতে, উদাহরণ স্বরূপ, কৃষ্ণাঙ্গ মুক্তি সংগ্রামে কৃষ্ণাঙ্গ নারী গৃহকর্মীদের ভূমিকা তুলে ধরতে পারি?

বর্ণ বৈষম্য ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটার কারণ নেতা, রাষ্ট্রপতি এবং আইনসভার সদস্যদের ভূমিকা নয়। বরং সাধারণ মানুষ যেভাবে বাস্তবতার সাথে তাদের নিজেদের সম্পর্ককে উপলব্ধি করে সেই ভিত্তিতে একটি কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছিল, সেটাই মূল ভূমিকা পালন করেছিল। যে সামাজিক বাস্তবতা একসময় অপরিবর্তনীয় ও অলঙ্ঘনীয় মনে হতো, এক সময় তা মানুষের কাছে নমনীয় ও পরিবর্তনযোগ্য মনে হলো আর মানুষ কল্পনা করতে শিখল সাদা আধিপত্যের নীতি দ্বারা পরিচালিত নয় এমন একটি সমাজে বেঁচে থাকার অর্থ কী হতে পারে। সামাজিক সংগ্রামের প্রেক্ষিতেই এই সম্মিলিত চেতনাটির উদ্ভব ঘটেছিল।

বর্ণ বৈষম্য ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটার কারণ নেতা, রাষ্ট্রপতি এবং আইনসভার সদস্যদের ভূমিকা নয়। বরং সাধারণ মানুষ যেভাবে বাস্তবতার সাথে তাদের নিজেদের সম্পর্ককে উপলব্ধি করে সেই ভিত্তিতে একটি কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছিল, সেটাই মূল ভূমিকা পালন করেছিল। 

ওরল্যান্ডো প্যাটারসন যুক্তি দিয়েছিলেন যে স্বাধীনতার মৌলিক যে ধারণাটি সমগ্র পশ্চিমে জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং সারা বিশ্বে অনেক ঐতিহাসিক বিপ্লবে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে- সেই স্বাধীনতার ধারণাটি অবশ্যই প্রথমে দাসদের কল্পনা থেকে জন্মলাভ করেছিল। বিংশ শতাব্দীর কৃষ্ণাঙ্গ মুক্তি আন্দোলনের যুগে যে মানুষদের অবস্থা তাদের দাস পূর্ব-পূরুষদের মতোই ছিল, তারা হলেন কৃষ্ণাঙ্গ নারী গৃহকর্মী। আমরা সেই সকল নারীর কথা বলছি যারা ঘর-বাড়ি পরিষ্কার, রান্না-বান্না আর কাপড় ধোয়ার কাজ করতেন।

এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, ১৯৫০ এর দশকে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের শতকরা প্রায় ৯০ ভাগই গৃহকর্মী ছিলেন। সেই ভিত্তিতে ১৯৫৫ সালে আলাবামার মন্টোগোমারিতে অধিকাংশ বাস আরোহী ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ গৃহকর্মী। তাহলে এই সকল কৃষ্ণাঙ্গ গৃহকর্মী অন্তর্ভুক্ত একটি জাতিগত, লিঙ্গীয় এবং অর্থনৈতিক নিপীড়নহীন ভবিষ্যত-বিশ্ব কল্পনা করা ও স্বীকার করা এতটা কঠিন কেন?

আলাবামার মন্টোগোমারিতে যে সকল নারী দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত এলাকা থেকে উচ্চবিত্ত সাদা অধ্যুষিত এলাকার দিকে বাসযাত্রায় অস্বীকার করেছিলেন, তাদের সকলের নাম আমরা না জানলেও অন্তত তাদের সম্মিলিত অর্জনকে তো স্বীকৃতি জানাতে পারি। তাদের কঠিন প্রত্যাখ্যান  ছাড়া এই বর্জন আন্দোলন সফল হতো না। এবং তা না হলে ডঃ মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র হয়তো কখনোই এত খ্যাতিমান হয়ে উঠতেন না।

যে সকল নারী দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত এলাকা থেকে উচ্চবিত্ত সাদা অধ্যুষিত এলাকার দিকে বাসযাত্রায় অস্বীকার করেছিলেন, তাদের সকলের নাম আমরা না জানলেও অন্তত তাদের সম্মিলিত অর্জনকে তো স্বীকৃতি জানাতে পারি। তাদের কঠিন প্রত্যাখ্যান  ছাড়া এই বর্জন আন্দোলন সফল হতো না। এবং তা না হলে ডঃ মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র হয়তো কখনোই এত খ্যাতিমান হয়ে উঠতেন না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের ইতিহাস যারা পড়েছেন, তারা হয়তো ফ্যানি লু হ্যামার (Fannie Lou Hamer) নামটি পেয়েছেন। ফ্যানি লু হ্যামার একজন বর্গাচাষী এবং গৃহকর্মী নারী ছিলেন। ১৯৬০ দশকে তিনি তুলা রোপন খামারে সময় রক্ষকের কাজ করতেন। তিনি স্টুডেন্ট ননভায়োলেন্ট কো-অর্ডিনেটিং কমিটি (SNCC) এবং মিসিসিপি ফ্রিডম ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (MFDP) নেতার ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি একবার বলেছিলেন, “সারাটা জীবন আমি অসুস্থ এবং ক্লান্ত থেকেছি। এখন আমি আমার এই ক্রমাগত অসুস্থতা ও ক্লান্তির বিষয়টি নিয়েই অসুস্থ ও ক্লান্ত।”

১৯৬৪ সালে, তিনি জাতীয় পর্যায়ে খ্যাতি লাভ করেন। কারণ তিনি দাবি করেছিলেন যে তাঁর বর্ণনিরপেক্ষ দল মিসিসিপি ফ্রিডম ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদস্যদের জাতীয় ডেমোক্র্যাটিক পার্টি কনভেনশনে আসন বরাদ্দ দিতে হবে। তখন এই আসনগুলি সম্পূর্ণভাবে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সাদা প্রতিনিধি দলের অধীনে ছিল। তিনি বহু দিক থেকেই বারাক ওবামার পথ সুগম করেছেন। তবে সেটি অন্য আরেক গল্প।

এটি কেবল পঞ্চাশতম বার্ষিকী উদযাপনের বছর নয়, এটি স্বাধীনতা ঘোষণার দেড়শত বর্ষপূর্তি উদযাপনেরও বছর। মজার বিষয়, দুর্ভাগ্যক্রমে, আমাদেরকে জাতীয় পর্যায়ে কোনও বার্ষিকী অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়নি। আমার মনে আছে আপনাদের এখানে অন্তত দাসত্ব বিলুপ্তির দ্বিশততমবার্ষিকী উদযাপন করার সুযোগ হয়েছিল। আমি অবশ্য মনে করি যে আপনাদের প্রতীকী মূর্তি ছিলেন উইলবারফোর্স। সুতরাং আপনাদের এই প্রশ্নটিও করা উচিৎ ছিল যে উইলবারফোর্সের মতো ব্যক্তিত্ব কী করেএখানে দাসত্ব বিলোপের প্রতীকী হতে পারেন।

তবে প্রকৃত অর্থে, আমাদেরকে বড় কোনও উদযাপনে অংশ নিতে বলা হয়নি। সম্ভবত জনপ্রিয় চলচ্চিত্র লিংকন এর সাথে আমরা সবচেয়ে বেশি নৈকট্য লাভ করেছি। চলচ্চিত্রটি মূলত ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করার প্রয়াসকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে তার দেড়শতবর্ষপূর্তি সংক্রান্ত উদযাপন আসবে। স্বাধীনতা ঘোষণার ঐতিহাসিক তাৎপর্য এত বেশি নয় যে এটি আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষের মুক্তি কার্যকর করেছিল; বরঞ্চ, এটি একটি সামরিক কৌশল ছিল। তবে আমরা যদি এই ঐতিহাসিক মুহুর্তটির অর্থ যাচাই করি তবে মুক্তির সাফল্যের সাথে সাথে তার ব্যর্থতাগুলি আরও ভালো ভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হতে পারি।

আমার মনে হয় সম্ভবত স্বাধীনতার ঘোষণার তাৎপর্য সম্পর্কে আমাদের ভাবতে বলা হয়নি কারণ তাহলে তো আমরা বুঝে যাব যে আমরা আসলে কখনোই মুক্তি লাভ করিনি। তবে যাইহোক, কমপক্ষে আমরা মুক্তির অন্তর্নিহিত দ্বান্দ্বিকতা বুঝতে সক্ষম হতে পারি। কারণ লিংকন দাসদের মুক্তি দিয়েছিলেন- এরকম একটি রূপকথা এখনো চালু আছে যা জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে স্থায়ীভাবে টিকে আছে, এমনকি এই লিংকন চলচ্চিত্রটিতেও। লিংকন দাসদের মুক্ত করেননি।

লিংকন দাসদের মুক্তি দিয়েছিলেন- এরকম একটি রূপকথা এখনো চালু আছে যা জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে স্থায়ীভাবে টিকে আছে, এমনকি এই লিংকন চলচ্চিত্রটিতেও। লিংকন দাসদের মুক্ত করেননি।

বিশ শতকের মাঝামাঝি নাগরিক অধিকার আন্দোলন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকদের মুক্তি দিয়েছিল সেই রূপকথার সাথেও আমরা বসবাস করছি। নাগরিক অধিকার অবশ্যই স্বাধীনতার একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হিসেবে ছিল, যা সেই সময়ের দাবি ছিল। তবে এটি পুরো গল্প ছিল না। সম্ভবত আমরা পরে সেই ব্যাপারে আলোচনা করবো। এরিক ফোনার তার রচিত দ্য ফায়ারি ট্রায়ালঃ আব্রাহাম লিংকন এন্ড আমেরিকান স্লেভারি নামক বইতে যা লিখেছিলেন, আমি তা উদ্ধৃত করছি-

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি সম্ভবত আমেরিকার ইতিহাসের উপর প্রভাব বিস্তারকারী নথিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুলবোঝা একটা নথি। লিংকন তার কলমের এক খোঁচায় ৪০ লক্ষ দাসকে মুক্তি দিয়েছিলেন- এরকম একটি কিংবদন্তী চালু থাকলেও তা সঠিক নয়। চারটি সীমান্তের রাজ্যে ক্রীতদাসরা যেহেতু বিদ্রোহী ছিল না, তাই তাদের উপর এর কোনও প্রভাব ছিল না। এই ঘোষণাটি ইউনিয়ন কর্তৃক দখলকৃত কনফেডারেসির কিছু অংশকেও ছাড় দিয়েছে। সবমিলিয়ে, ঘোষণাটি সম্ভবত ৭৫০,০০০ ক্রীতদাসদের দাসত্বের বন্ধনের মধ্যে রেখে দিয়েছিল।  

অবশ্যই আব্রাহাম লিংকনের ঘোষিত এই মুক্তির দলিলটিতে দাসত্বের অবসানের জনপ্রিয় বিবরণগুলিতে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতিনিধিত্বকে মুছে ফেলেছে। তবে, এমন কিছু বিষয় আছে যার জন্য লিংকন প্রশংসিত হওয়ার যোগ্য বলে আমি বিশ্বাস করি। তিনি বিচক্ষণতার সাথে বুঝতে পেরেছিলেন যে নিজস্ব স্বাধীনতার জন্য কৃষ্ণাঙ্গদের লড়াই করার সুযোগ তৈরি করার উপর গৃহযুদ্ধে বিজয়ের একমাত্র আশা নির্ভর করছিল। স্বাধীনতা ঘোষণার তাৎপর্য এর মধ্যেই প্রতিফলিত হয়।

সেই চলচ্চিত্র কি এখানে প্রদর্শিত হয়েছে? আপনারা কি প্রথমদিকের একটি দৃশ্যে দুইজন কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্যের মধ্যে আলাপচারিতার কথা স্মরণ করতে পারছেন? আমার মনে হয় সম্ভবত এটিই চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য। তাই যে সকল দর্শক দেরিতে এসেছিলেন তারা চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহুর্তটি দেখতে ব্যর্থ হয়েছেন।

এই প্রসঙ্গে আমি W.E.B. Du Bois এবং তার লেখা বই ব্ল্যাক রিকনস্ট্রাকশন এর চতুর্থ অধ্যায়ের কথা উল্লেখ করতে চাই। সেখানে একটি সাধারণ ধর্মঘটকে স্বাধীনতার ঘোষণার ফলাফল হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। তিনি শ্রমিক আন্দোলনের শব্দ ভাণ্ডার ব্যবহার করেছেন। প্রকৃতপক্ষে, অধ্যায় চার-এ “সাধারণ ধর্মঘট” কে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে-

“যেভাবে গৃহযুদ্ধ স্বাধীনতার কথা বলেছে এবং যেভাবে কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকেরা সাধারণ ধর্মঘটের মাধ্যমে যুদ্ধে জয়লাভ করল যার ফলে কনফেডারেট প্ল্যান্টার থেকে তার শ্রম উত্তর থেকে আসা আক্রমণকারীর দখলে চলে গেল। উত্তরের আক্রমণকারীর সৈন্য শিবিরের কর্মীরা নতুন শ্রমশক্তিতে পরিণত হয়েছিল।

ডু বোইস তাই বলেন, দাস শ্রমের এই প্রত্যাহার ও পুনর্বন্টনের মাধ্যমেই যুদ্ধে জয়লাভ করা সম্ভব হয়েছিলে। এবং তিনি যাকে “ধর্মঘটকারী শ্রমিক সেনাবাহিনী” বলছেন তা শেষ পর্যন্ত দুই লক্ষ সৈন্য সরবরাহ করেছিল, “যাদের লড়াইয়ের স্পষ্ট ক্ষমতা ফলাফল নির্ধারণ করে দিয়েছিল।” আর এই সৈন্যদের মধ্যে হ্যারিয়েট টুবম্যানের মতো নারীও ছিলেন, যিনি একজন সৈনিক এবং গুপ্তচর ছিলেন। একজন সৈনিক হিসাবে তার প্রাপ্য পেনশন মঞ্জুর হওয়ার জন্য তাকে অনেক বছর সংগ্রাম করতে হয়েছিল।

যুদ্ধের পর শুরু হলো রেডিক্যাল রিকনস্ট্রাকশান বা মৌলিক পুনর্গঠনের যুগ যা প্রকৃতপক্ষে মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে অপ্রকাশিত একটি অধ্যায়। নিশ্চিত ভাবেই এই সময়টা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে রেডিক্যাল একটা যুগ। ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলিতে এই যুগটি খুব কমই স্বীকৃত হয়েছে। সেই সময় আমাদের নির্বাচিত কৃষ্ণাঙ্গ কর্মকর্তা ছিল, জনশিক্ষার বিকাশ হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, প্রাক্তন দাসরা জনশিক্ষার অধিকারের জন্য লড়াই করেছিল। যার ফলে, এখানে আপনাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মত সেখানে শিক্ষা গ্রহণের জন্য আর অর্থ ব্যয় করতে হয়নি। প্রথম কথা হচ্ছে – লড়াইটি ছিল অ-বাণিজ্যিক শিক্ষার জন্য। প্রকৃতপক্ষে দক্ষিণের দরিদ্র সাদা শিশুরা যাদের পড়াশোনার সুযোগ ছিল না তারা প্রাক্তন দাসদের লড়াইয়ের প্রত্যক্ষ ফলাফল হিসাবে শিক্ষায় প্রবেশাধিকার অর্জন করেছিল। পুরুষ আধিপত্য বিরোধী প্রগতিশীল আইন পাস হয়েছিল। এটি এমন একটি যুগ যা খুব কমই স্বীকৃত।

প্রকৃতপক্ষে দক্ষিণের দরিদ্র সাদা শিশুরা যাদের পড়াশোনার সুযোগ ছিল না তারা প্রাক্তন দাসদের লড়াইয়ের প্রত্যক্ষ ফলাফল হিসাবে শিক্ষায় প্রবেশাধিকার অর্জন করেছিল। পুরুষ আধিপত্য বিরোধী প্রগতিশীল আইন পাস হয়েছিল। এটি এমন একটি যুগ যা খুব কমই স্বীকৃত।

আজকের দিনে যেগুলো ঐতিহাসিকভাবে কৃষ্ণাঙ্গ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত সে সময় সেগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং সেই সাথে অর্থনৈতিক উন্নয়নও হয়েছিল। এই সময়কাল খুব দীর্ঘ স্থায়ী হয়নি। দাসত্ব বিলুপ্তির পরে, ১৮৬৫ থেকে ১৮৭৭ অবধি সময়কাল ছিল কাঠামোগত পুনর্গঠনের যুগ, এরপর পুরো প্রক্রিয়াকে উল্টে দেওয়া হয়েছিল। কেবল উল্টে দেয়াই নয়, ঐতিহাসিক রেকর্ড থেকেও তা মুছে ফেলা হয়েছিল। সুতরাং একশত বছর পরে ১৯৬০ এর দশকে আমরা এমন সব সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি যেগুলির সমাধান ১৮৬০ এর দশকেই হওয়া উচিত ছিল। 

মধ্য-বিংশ-শতাব্দীর স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়কালে কু-ক্লাক্স ক্লান এবং বর্ণবাদী বিভাজনকে নাটকীয়ভাবে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, তা দাসত্বযুগে সৃষ্টি হয়নি, বরং মুক্ত কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতিহত করার প্রয়াসে তা তৈরি করা হয়েছিল। অন্যথায়, মুক্ত  কৃষ্ণ মানুষেরা গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আরও সফল হতে পারতো।

তাই আমরা কৃষ্ণাঙ্গ মুক্তি আন্দোলনের একটি দ্বান্দ্বিক বিকাশ দেখতে পাচ্ছি। স্বাধীনতা আন্দোলন আছে এবং তারপর আবার তাকে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের মত অনেক ছোটতর ফ্রেমে সংযুক্ত করে সংকীর্ণ করে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। নাগরিক অধিকারের অপরিসীম গুরুত্ব অনস্বীকার্য, তবে নাগরিক অধিকারের চেয়ে স্বাধীনতার গুরুত্ব আরও ব্যাপক।

এই স্বাধীনতা আন্দোলনের সম্প্রসারণ ও বিকাশের প্রক্রিয়ায় আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার মুক্তি সংগ্রাম অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে, এবং বিনিময়ে, নিজেদের সংগ্রামও অনুপ্রাণিত হয়েছে। এই আন্দোলন কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে সামাজিক অধিকার অর্জনের প্রশ্নে সীমিত ছিল না। আরো মৌলিক অধিকার যেমন কর্মসংস্থান, বিনামূল্যে শিক্ষা, বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন, এবং কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়গুলিতে বর্ণবাদী পুলিশ দখলদারিত্বের অবসানের ব্যাপারে এই আন্দোলন বিস্তৃত ছিল।

তাই ১৯৬০ দশকে ব্ল্যাক প্যান্থার পার্টির মত (বিপিপি) প্রতিষ্ঠানগুলির জন্ম হলো (এবং আমার বলা উচিৎ যে বিপিপি যেহেতু ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেহেতু তার পঞ্চাশতম বার্ষিকী উদযাপন সমাগত)। ভাবছি, আমরা কীভাবে বিপিপির দশ দফা কর্মসূচি উত্থাপন করবো। আমি বিপিপির দশ দফার শুধু সারসংক্ষেপ উল্লেখ করলে আপনারা বুঝতে পারবেন কেন বিপিপির পঞ্চাশতম বার্ষিকী বৃহদাকারে উদযাপন আয়োজনের কোনো নিশ্চয়তা নেই। 

প্রথমঃ “আমরা স্বাধীনতা চাই।”

দ্বিতীয়ঃ “সম্পূর্ণ কর্মসংস্থান চাই।”

তৃতীয়ঃ “পুঁজিবাদ যে কৃষ্ণাঙ্গ এবং নিপীড়িত সম্প্রদায়কে লুণ্ঠন করেছে তার সমাপ্তি চাই”-এটা পুঁজিবাদ বিরোধী ছিল।

চতুর্থঃ “আমরা উপযুক্ত বাসস্থান চাই।”

পঞ্চমঃ “আমরা একটি যথাযোগ্য শিক্ষাব্যবস্থা চাই যার মাধ্যমে ক্ষয়িষ্ণু মার্কিন সমাজ ব্যবস্থার প্রকৃত চেহারা উন্মোচিত হবে। আমরা এমন শিক্ষা ব্যবস্থা চাই যা আমাদের প্রকৃত ইতিহাস এবং বর্তমান প্রেক্ষিতে আমাদের ভূমিকা সম্পর্কে শিক্ষা দিবে।”

ষষ্ঠঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দরিদ্র জনগণের স্বাস্থ্য সেবা দেওয়ার জন্য ওবামা প্রশাসনের খুবই ক্ষুদ্র পদক্ষেপকে বাতিল করার জন্য ডানপন্থীদেরপ্রয়াসের প্রেক্ষিতে এই দাবীটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ- “আমরা কৃষ্ণাঙ্গ এবং নিপীড়িত সম্প্রদায়ের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা চাই।”

সপ্তমঃ “আমরা অনতিবিলম্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কৃষ্ণাঙ্গ, অশ্বেতাঙ্গ, এবং সকল নিপীড়িত মানুষের উপর পুলিশের বর্বরতার অবসান চাই।”

অষ্টমঃ “আমরা অনতিবিলম্বে সকল ধরনের আগ্রাসনী যুদ্ধের অবসান চাই।” আপনারা দেখছেন এখনও এটি কতটা প্রাসঙ্গিক শোনায়।

নবমঃ “মার্কিন যুক্তরাষ্টের কেন্দ্র, অঙ্গরাজ্য, কাউন্টি, শহর পর্যায়ের জেলখানা ও সামরিক কারাগারে আটক কৃষ্ণাঙ্গ এবং নিপীড়িত সম্প্রদায়ের বন্দীদের মুক্তি চাই। আমরা এই দেশের আইনের অধীনে তথাকথিত অপরাধের জন্য অভিযুক্ত সকল ব্যক্তির জন্য সমবয়সী জুরির দায়িত্বাধীনে বিচার চাই।”

এবং সবশেষে, দশমঃ “আমরা ভূমি, রুটি, আবাসন, শিক্ষা, বস্ত্র, ন্যায়বিচার, শান্তি, এবং আধুনিক প্রযুক্তির উপর জন-সম্প্রদায়ের নিয়ন্ত্রণ চাই।”

এই ইশতেহারের আকর্ষণীয় ব্যাপার হলো এটি উনবিংশ শতাব্দীর বিলোপবাদী বিষয়সূচির পুনরুক্তি করে। উনিশ শতকের সবচেয়ে অগ্রগামী বিলোপবাদীরা অবশ্যই উপলব্ধি করেছিলেন যে কেবলমাত্র নেতিবাচকভাবে দাসপ্রথা শেষ হলেই দাসত্ব বিপুপ্ত সম্ভব ছিল না। বরং সম্পূর্ণ বিলুপ্তির জন্য পূর্ববর্তী দাসদের একটি নতুন এবং বিকাশমান গণতন্ত্রে অন্তর্ভুক্তকারী সব প্রতিষ্ঠান তৈরি করা আবশ্যক ছিল।

১৯৬৬ সালে ব্ল্যাক প্যান্থার পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়। তারা উনবিংশ শতাব্দীর বিলোপবাদী বিষয়সূচির পুনরাবৃত্তি করে। এবং তারা একুশ শতকে এই বিলোপবাদী বিষয়সূচির প্রতিধ্বনি অব্যাহত রাখেন।

ব্ল্যাক প্যান্থার পার্টির সদস্য হারমান ওয়ালেসের সাথে আপনাদের অনেকের পরিচয় থাকতে পারে। অ্যাঙ্গোলা থ্রি-এর একজন হিসাবে রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেওয়ার জন্য প্রচার-প্রচারণায় অব্যাহত থেকে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। এই মাসের প্রথম দিকে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। হারমান একচল্লিশ বছর একাকী বন্দিজীবন কাটিয়েছিলেন, এবং মুক্তি পাওয়ার তিন দিন পরে ৪ঠা অক্টোবর তিনি মারা যান। আপনারা যদি হারম্যান ওয়ালেসের ব্যাপারে আগ্রহী হন, তবে দ্য হাউস দ্যাট হারম্যান বিল্ট শিল্পকর্মের দিকে নজর দিতে পারেন যার সৃষ্টিকর্মে ওয়ালেস একজন সহযোগী ছিলেন। একজন চারুশিল্পী তাকে কল্পনা করতে বলেছিলেন যে তিনি প্রকৃতপক্ষে কোন ধরনের ঘরে থাকতে চান। প্রায় অর্ধ্বশত বছর যাবৎ ছয় বাই নয় ফুটের একটি নির্জন খুপরিতে ওয়ালেসের বসবাস করার সূত্রে এই কল্পনাটি করতে বলা হয়েছিল।  

ব্ল্যাক প্যান্থার পার্টির আরেকজন সদস্য আসসাতা শাকুর, ১৯৮০ এর দশকে ছেষট্টি বছর বয়সে মার্কিন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর কিউবায় রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। তিনি অতি সম্প্রতি শীর্ষ দশ পলাতক সন্ত্রাসীদের একজন হিসাবে মনোনীত হয়েছেন। লেখক এবং শিল্পী, আসসাতা শাকুর, কিউবাতে নিজের উপযোগী জীবন তৈরি করেছেন। কিন্তু এখন সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্তির সাথে তাকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য দুই মিলিয়ন ডলার পুরষ্কার ঘোষণা করা হয়েছে। তাই এই অর্থ পুরষ্কার পাওয়ার চেষ্টায়  ব্ল্যাকওয়াটার-ধরণের ভাড়াটে বাহিনীর ব্যাপারে আসসাতাকে ভীত থাকতে হবে।

ব্ল্যাক প্যান্থার পার্টির আরেকজন সদস্য আসসাতা শাকুর, ১৯৮০ এর দশকে ছেষট্টি বছর বয়সে মার্কিন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর কিউবায় রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। তিনি অতি সম্প্রতি শীর্ষ দশ পলাতক সন্ত্রাসীদের একজন হিসাবে মনোনীত হয়েছেন। লেখক এবং শিল্পী, আসসাতা শাকুর, কিউবাতে নিজের উপযোগী জীবন তৈরি করেছেন।

প্রসঙ্গত, আমি যখন মে মাসে এই সম্পর্কে জানতে পেরেছিলাম তখন আমার মনে পড়েছিল কখন আমাকে শীর্ষ দশ পলাতকের তালিকায় রাখা হয়েছিল। আমাকে শীর্ষ দশ পলাতক সন্ত্রাসীদের তালিকায় রাখা হয়নি। আমার মনে হয় সে সময় তাদের সন্ত্রাসী তালিকা ছিল না। তবে আমি শীর্ষ দশ পলাতক অপরাধীদের  তালিকাভুক্ত হয়েছিলাম। আমাকে সশস্ত্র এবং বিপজ্জনক ব্যক্তি হিসেবে হাজির করা হয়েছিল। আমার মনে আছে, আমি নিজের কাছে অন্যতম যে প্রশ্নটি করছিলাম তা হলো, এগুলি কী ব্যাপার? আমি আসলে কী করেছি? তারপর আমি বুঝতে পেরেছি এটি মোটেই আমার সম্পর্কে ছিল না; এটা মোটেই কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে ছিল না। এটি ছিল মুক্তি সংগ্রামে জড়িত থাকা বিপুল সংখ্যক মানুষকে নিরুৎসাহিত করার জন্য একটি বার্তা প্রেরণের বিষয়।

আমি শীর্ষ দশ পলাতক অপরাধীদের  তালিকাভুক্ত হয়েছিলাম। আমাকে সশস্ত্র এবং বিপজ্জনক ব্যক্তি হিসেবে হাজির করা হয়েছিল। আমার মনে আছে, আমি নিজের কাছে অন্যতম যে প্রশ্নটি করছিলাম তা হলো, এগুলি কী ব্যাপার? আমি আসলে কী করেছি? তারপর আমি বুঝতে পেরেছি এটি মোটেই আমার সম্পর্কে ছিল না; এটা মোটেই কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে ছিল না। এটি ছিল মুক্তি সংগ্রামে জড়িত থাকা বিপুল সংখ্যক মানুষকে নিরুৎসাহিত করার জন্য একটি বার্তা প্রেরণের বিষয়।

হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এবং এফবিআই অনুসারে আসতা শাকুর বিশ্বের শীর্ষ দশজন বিপজ্জনক সন্ত্রাসীর মধ্যে একজন হিসাবে চিহ্নিত হয়েছিলেন। আমার তরুণ বয়সে আলবামার বার্মিংহ্যামে সহিংসতার কথা স্মরণ করতে পারি। সেখানে অনবরত বোমা বিস্ফোরিত হয়েছিল, ঘরবাড়ি ধ্বংস করা হয়েছিল এবং গির্জাগুলি ধ্বংস করা হয়েছিল। আমরা কিন্তু এখনও সেসব কাজকে সন্ত্রাসীদের কাজ হিসাবে উল্লেখ করতে পারি না।

সন্ত্রাসবাদ, যাকে একটি বাহ্যিক ঘটনা হিসাবে তুলে ধরা হয়, তা আসলে একটি খুব আভ্যন্তরীণ ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের আকার তৈরিতে সন্ত্রাসবাদ যথেষ্টভাবে গুরুত্বপূর্ণ। উনিশ শতকের দাসত্ব-বিরোধী সংগ্রাম, বিংশ শতাব্দীর নাগরিক-অধিকার সংগ্রাম, একবিংশ শতাব্দীর বিলুপ্তিবাদী সংগ্রামের মধ্যে ধারাবাহিকতা স্বীকার করছি। যখন আমি বিলুপ্তিবাদী সংগ্রামের কথা বলি তখন আমি মূলত শাস্তির প্রধান মাধ্যম কারাবাস বাতিল হওয়ার কথা বলি, কারাগার-শিল্প-কমপ্লেক্সের বিলুপ্তির কথা বলি। এইগুলির ধারাবাহিকতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য বিংশ শতাব্দীর স্বাধীনতা আন্দোলনকে পূর্ববর্তী শতাব্দী এবং পরবর্তী শতাব্দী থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রয়াসের বিরুদ্ধে একটি চ্যালেঞ্জের প্রয়োজন।

কেবল সাময়িক ধারাবাহিকতাকে স্বীকৃতি দেওয়া নয়, পুরো আন্দোলন এবং সংগ্রামের সাথে সংযুক্ত অনুভূমিক ধারাবাহিকতাকে স্বীকৃতি দেওয়াও আমাদের কর্তব্য। আমি খুব স্পষ্টভাবে ফিলিস্তিনে চলমান সার্বভৌমত্বের লড়াইয়ের ব্যাপার উল্লেখ করতে চাই। খুব বেশি দিন আগে নয় যখন ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার আরোহীরা ইসরায়েল রাষ্ট্রের বর্ণবাদী রীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য যাত্রা শুরু করেছিল।

বিশ্বজুড়ে মানুষ বলছে, আমরা বিশ্ব সম্প্রদায় হিসাবে বিদেশাতঙ্ক এবং বর্ণবাদমুক্ত একটি বিশ্ব তৈরি করতে একসাথে লড়াই করতে চাই। এমন একটি দারিদ্র্য বিলুপ্ত বিশ্ব যেখানে খাদ্যের প্রাপ্যতা পুঁজিবাদী মুনাফার চাহিদার সাথে সম্পর্কিত নয়। আমি এমন এক পৃথিবীর কথা বলব যেখানে মনসান্টোর মতো কর্পোরেশন অপরাধী হিসাবে বিবেচিত হবে।

আমি অনেকক্ষণ যাবৎ কথা বলছি। সমাপ্তি  টানার ব্যাপারে অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে আজ সন্ধ্যায় আমার কথা শেষ করতে বাধ্য হচ্ছি। তবে আলোচনা শেষে আমি একটি ‘শুরু’ তৈরি করে যেতে চাই। বিশ্বজুড়ে মানুষ বলছে, আমরা বিশ্ব সম্প্রদায় হিসাবে বিদেশাতঙ্ক এবং বর্ণবাদমুক্ত একটি বিশ্ব তৈরি করতে একসাথে লড়াই করতে চাই। এমন একটি দারিদ্র্য বিলুপ্ত বিশ্ব যেখানে খাদ্যের প্রাপ্যতা পুঁজিবাদী মুনাফার চাহিদার সাথে সম্পর্কিত নয়। আমি এমন এক পৃথিবীর কথা বলব যেখানে মনসান্টোর মতো কর্পোরেশন অপরাধী হিসাবে বিবেচিত হবে। এমন এক পৃথিবী যেখানে সমকামিতা বিরোধিতা সত্যিকার অর্থে ঐতিহাসিক ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে। এমন এক পৃথিবী যেখানে শাস্তির জন্য কারাগারে বন্দী রাখা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিষ্ঠানে আবদ্ধ রাখা বন্ধ হয়েছে। এমন একটি পৃথিবী যেখানে প্রত্যেকে পরিবেশ এবং সমস্ত প্রাণীদের সম্মান করতে শিখেছে। মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণী, যাদের সাথে আমরা পৃথিবীতে একসাথে বসবাস করছি, তাদেরকে অভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছি।

ফাতেমা বেগম: অনুবাদক। কানাডা প্রবাসী।

ইমেইল: fatemaorama@gmail.com 

টীকা

১) ১৯৯৩ সালের ২২শে এপ্রিল ১৮ বছর বয়সী কলেজে অধ্যয়নরত আফ্রিকান-ব্রিটিশ স্টিফেন লরেন্স বর্ণবাদীতার শিকার হয়ে লন্ডনে একটি বাসস্টপে অপেক্ষমান অবস্থায় কয়েকজন শ্বেতাঙ্গ তরুণের আকস্মিক আক্রমণে ছুরিকাঘাতে নিহত হন। ২০১৯ সাল থেকে ২২শে এপ্রিলকে ‘স্টিফেন লরেন্স’ দিবস হিসাবে পালন করার সরকারি সিদ্ধান্ত হয়েছে। 

২) উইলিয়াম উইলবারফোর্স (১৭৫৯-১৮৩৩) একজন ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ, লোকহিতৈষী, এবং দাস বাণিজ্য বিরোধী আন্দোলনের নেতা ছিলেন। পার্লামেন্টের সদস্য হিসাবে স্লেইভ ট্রেড এক্ট অফ ১৮০৭ প্রবর্তন পর্যন্ত প্রায় বিশ বছর দাস বাণিজ্য প্রথার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। উইলবারফোরস বিদ্যমান রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা পাল্টানোর বিষয়ে ছিলেন ভীষণ রকম রক্ষণশীল। ধর্ম ও নারী অধিকার বিষয়েও তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল রক্ষণশীল। তিনি দাসপ্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠনে নারীদের অংশ গ্রহণের বিরোধী ছিলেন। তার রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবেচনায় রক্ষণশীল বিভিন্ন আইন প্রণয়নে সমর্থন দিয়েছিলেন যেকারণে তার বিরুদ্ধে একটা সমালোচনা ছিল এই যে, তিনি দেশের বাইরের দাস প্রথার বিরুদ্ধে লড়লেও দেশে বিদ্যমান নিপীড়নের বিরুদ্ধে নীরব ছিলেন।

৩) ডু বোইস প্রথম আফ্রিকান আমেরিকান যিনি ১৮৯৫ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি এইচ ডি ডিগ্রী অর্জন করেন। বিশ শতকের প্রথমার্ধে আফ্রিকান-আমেরিকান অধিকার আন্দোলনে তিনি সর্বাধিক পরিচিত মুখপাত্র ছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি বিস্তৃত লিখেছিলেন। ডু বোইস ১৯০৯ সালে ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর অ্যাডভান্সমেন্ট অফ কালার্ড পিপল (এনএএসিপি)এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।

৪) আমেরিকাতে গণতন্ত্র পুনর্গঠনে কৃষ্ণাঙ্গদের যে প্রচেষ্টা (১৮৬০-১৮৮০) হয়েছিল, সেই পুনর্গঠন যুগের উপর ডু বোইস রচিত একটি বই। এটি ১৯৩৫ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। 

৫) জেল পূর্ববর্তী তিন(৩)জন সহকর্মী (রবার্ট কিং, আলবার্ট উডফক্স এবং হারম্যান ওয়ালেস) দশকের পর দশক নির্জন কারাগারে রাজনৈতিক বন্দীত্ব অতিবাহিত করেন। ওয়ালেস এবং রবার্ট ফক্স প্রত্যেকে চল্লিশ বছরের অধিক সময়, আমেরিকার ইতিহাসের দীর্ঘতম সময়ব্যাপী নির্জন কারাগারে বন্দী ছিলেন।

৬) চিত্রশিল্পী জ্যাকি সামেল এবং কারাগারে বন্দী হারম্যান ওয়ালেসের যৌথ উদ্যোগে একটি শিল্পকর্ম। মানুষের কল্পনায় এবং জেলখানার বাসস্থানের মধ্যে পার্থক্যের তীব্রতা এই শিল্পকর্মে প্রকাশিত হয়েছে।

৭) ১৯৯৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি সামরিক বাহিনী। ২০০৯ সালে ‘এক্সে সার্ভিসেস’ নামকরণ হয়। ২০১১ সালে কয়েকজন বিনিয়োগকারী কর্তৃক প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা বদল হয় এবং নামকরণ হয় ‘একাডেমি’।

৮) ২০১১ সালের ১৫ নভেম্বর ৬ জন ফিলিস্তিন আন্দোলনকারী ইসরাইলের জাতিবিদ্ধেষী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অংশ হিসেবে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারিদের জন্য নির্ধারিত একটি বাসে চড়ে বসেন।

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *