করোনাভাইরাস দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ, বাস্তবতা এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মনোজগৎ

ছবি: বাংলা ট্রিবিউন, নিউ নেশন অনলাইন

করোনাভাইরাস দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ, বাস্তবতা এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মনোজগৎ

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান

করোনা ভাইরাস সৃষ্ট সংকট মোকাবিলা শিরোনামে সরকার গত কিছুদিনে কয়েক দফায় কয়েকটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এই প্যাকেজগুলো কতটা প্রকৃত সংকটকে মোকাবিলা করছে, সমাজের মধ্যে কারা বিপদগ্রস্ত, কাদের জন্য এগুলো প্রণোদনা হবে, প্যাকেজগুলোর বাস্তবায়নের ধরন কেমন এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করা হয়েছে এই প্রবন্ধে। 

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে সৃষ্ট কোভিড-১৯ কী ধরনের বিপদ আনতে পারে, তা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমরা বুঝতে পারছি এই মহামারি কী ধরনের দুর্যোগ নিয়ে এসেছে বিশ্বব্যাপী। এই দুর্যোগের প্রকোপ এত বিস্তৃত যে আমরা একে বলছি অতিমারি বা প্যানডেমিক। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, সবকিছু বিবেচনায়, বিশেষ করে জাতীয় পর্যায়ে এ পর্যন্ত গৃহীত পদক্ষেপগুলো এটা নিশ্চিত করছে, করোনাভাইরাস অতিমারির কারণে আমরা যে বহুমাত্রিক দুর্যোগের শিকার হয়েছি, তা নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে সম্ভবত অনুধাবণ করতে পারেনি। এই মহামারি বা অতিমারি শুধু স্বাস্থ্য বা রোগগত দুর্যোগ নয়। এই দুর্যোগের মোটা দাগে আরও তিন শ্রেণির বিপদ, যেমন লকডাউনজনিত কর্ম ও উপার্জনহীনতাসহ অনাহার-দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক মন্দা এবং সেইসব কারণে সামাজিক অস্থিরতা ও সহিংসতা তাৎক্ষণিকভাবে যেমন বিরাজ করছে, তেমনি স্বল্প, মাঝারি ও দীর্ঘ মেয়াদে এগুলো মহাবিপদ হিসাবেই উপস্থিত হওয়ার শক্তিশালী সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সেই প্রেক্ষাপটে এই লেখাটিতে সরকারের এখন পর্যন্ত নেয়া পদক্ষপগুলো সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করা হবে। তবে এখানে মূলত আলোকপাত করা হবে করোনাভাইরাসজনিত অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা এবং দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের রক্ষায়  এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত সরকার কর্তৃক ঘোষিত/গৃহীত মোটা দাগে চার দফায় ঘোষিত কর্মসূচিগুলো। অন্য কথায়, স্বাস্থ্য বা রোগগত দুর্যোগ এবং সামাজিক অস্থিরতা ও সহিংসতা এই লেখার আওতাভুক্ত নয়।

সরকার ঘোষিত/গৃহীত কর্মসূচিগুলো বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে এই লেখায় যেমন বিবেচনা করা হবে রাষ্ট্রের বিরাজমান এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক সামর্থ্যকে, তেমনি বোঝার চেষ্টা করা হবে শ্রমজীবী, কৃষকসহ অন্যান্য প্রান্তিক মানুষের প্রতি এই দুর্যোগের সময়ে ক্ষমতাসীন সরকারের নীতি নির্ধারকদের সার্বিক মনোজগৎ বা দৃষ্টিভঙ্গি। এই সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন তোলা হবে বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে।

লেখাটি দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে আলোচনা ও বিশ্লেষণ করা হবে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কৃষি খাত রক্ষায় সরকারঘোষিত পাঁচটি প্রণোদনা প্যাকেজ এবং দ্বিতীয় ভাগে কর্মহীন শ্রমজীবী, নিবিত্ত এবং দরিদ্র মানুষের সুরক্ষায় নেয়া মূল পদক্ষেপগুলো। উপসংহার টেনে লেখাটি শেষ হবে।

শিল্প প্রতিষ্ঠান ও কৃষি খাত রক্ষায় সরকারঘোষিত পাঁচটি প্রণোদনা প্যাকেজ ও আমাদের বাস্তবতা

করোনাভাইরাস দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে দুই দফায় যে প্যাকেজ ঘোষণা দেয়া হল তা মোটা অর্থে শুধু রফতানিমুখী ব্যবসা খাত এবং ব্যবসায়ীদের রক্ষার উদ্দেশ্যে। প্রথম দফায় ঘোষণা দেয়া হল ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা, যা মূলত রফতানিমুখী খাতের শ্রমিকদের বেতন বাবদ। এটা ঘোষণাকালে বলা হল, কাজ হারানো নিম্নআয়ের মানুষের পাশে যেন বিত্তবানরা দাঁড়ান। আরও বলা হল, সরকারের গ্রামে ফেরা কর্মসূচির আওতায় নিজ নিজ গ্রামে ফিরলে নিম্নআয়ের মানুষকে সহায়তা দেয়া হবে আর গৃহহীনদের ছয় মাস খাবার দেয়ার জন্য জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর কেউ ভাসানচরে যেতে চাইলে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে (ডিডব্লিউ, ২৫ মার্চ ২০২০)।

প্রথম দফায় ঘোষিত পদক্ষেপগুলো থেকে প্রতীয়মান, রাষ্ট্রের তরফ থেকে করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবিলায় বিশেষ করে লকডাউনের কারণে অনানুষ্ঠানিক খাতে নিযুক্ত সাধারণ মানুষের কর্মহীন হওয়া এবং অনাহারে পতিত হওয়ার যে প্রক্রিয়া শুরু হল, সেটা নিয়ে বিশেষ কোন ব্যবস্থা নেই। সরকারের বিরাজমান কর্মসূচিকেই যথেষ্ট মনে করা হল। সবচাইতে ভয়ের কথা হল, ভাসানচরে বসবাসের ব্যবস্থা করা। বসবাসের অনুপযোগী বলেই তো তিন হাজার ৯৫ কোটি টাকার এ প্রকল্পটিতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সেখানে পুনর্বাসন করা যায়নি এবং অনেক সমালোচনাই হয়েছে এই কারণে (প্রথম আলো, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২০)। অথচ এটাকে সরকার উপযুক্ত মনে করল করোনাভাইরাস দুর্যোগ মোকাবিলায় সাধারণ মানুষকে রক্ষার জন্য! আবার উল্টোদিকে, প্রথম দফার প্রণোদনা ঘোষণার আগেই বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার জারি করে নিশ্চিত করল, জুন মাস পর্যন্ত ঋণ ফেরত না দিলেও কাউকে ‘ঋণখেলাপি’ হিসাবে চিহ্নিত করা যাবে না (প্রথম আলো, ১৯ মার্চ ২০২০)!

বসবাসের অনুপযোগী বলেই তো তিন হাজার ৯৫ কোটি টাকার এ প্রকল্পটিতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সেখানে পুনর্বাসন করা যায়নি এবং অনেক সমালোচনাই হয়েছে এই কারণে (প্রথম আলো, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২০)। অথচ এটাকে সরকার উপযুক্ত মনে করল করোনাভাইরাস দুর্যোগ মোকাবিলায় সাধারণ মানুষকে রক্ষার জন্য!

দ্বিতীয় দফায় সরকার আগের প্রণোদনা প্যাকেজের সাথে যোগ করল সুনির্দিষ্ট চারটি নতুন প্যাকেজ। এই প্যাকেজগুলো দেয়ার কারণ হিসাবে মোটা দাগে দেখানো হল বাজেট ঘাটতি এবং জিডিপির প্রবৃদ্ধি হ্রাস উত্তরণে গৃহীত পদক্ষেপ হিসাবে। তার সাথে বলা হল শ্রমিক-কর্মচারী বা অন্যান্য কর্মজীবী মানুষ যাতে কর্মহীন হয়ে না পড়েন, সে জন্য এই আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ, ঋণসুবিধা। প্যাকেজ-১-এর আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সার্ভিস সেক্টরের প্রতিষ্ঠানগুলোর ৩০ হাজার কোটি টাকার একটি ঋণসুবিধা, যার সুদের হার ৯%। প্রদত্ত ঋণের ওপর ঐ সুদের ৪.৫০% সরকার ভর্তুকি হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে দেবে। প্যাকেজ-২-এ ক্ষুদ্র (কুটির শিল্পসহ) ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সুদের হার ৯% ধরে ২০ হাজার কোটি টাকার ঋণসুবিধা, যেটার ৫% হারে  সুদ ঋণগ্রহীতা শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিশোধ করবে, মোট ঋণের উপর বাকি ৪% সুদ সরকার দিবে। প্যাকেজ-৩-এ বাংলাদেশ ব্যাংকের এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (ইডিএফ) আওতায় ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানির জন্য বিরাজমান ফান্ড ৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হবে। ইডিএফের বর্তমান সুদের হার ২.৭৩% কমিয়ে ২% নির্ধারণ করা হবে। প্যাকেজ-৪-এর আওতায় প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্স স্কিম নামে হবে ৭% হার সুদে ৫ হাজার কোটি টাকার নতুন ঋণসুবিধা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক চালু করা (প্রথম আলো, ৫ এপ্রিল ২০২০)।

তবে দ্বিতীয় দফায় ঘোষিত চার প্যাকেজের এই প্রণোদনা মূলত বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক অংশীদারত্বমূলক ঋণ ব্যবস্থাপনা, যে ঋণগুলোর জন্য নির্ধারিত সুদের প্রায় অর্ধেক পরিমাণ আর্থিক দায় নেবে সরকার। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই সুদের টাকা সরকার কোন্ খাত থেকে ব্যাংকগুলোকে পরিশোধ করবে এবং তা নিয়ে কোন স্পষ্টতা নেই। তার মানে হল, মোটা দাগে অর্থ সরবরাহ প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে মনে হচ্ছে, এই ঋণের অর্থ সরবরাহের দায়িত্বটা সম্ভবত ব্যাংকিং খাতের ওপর। অথচ এই খাতটি নিজেরাই ইতোমধ্যে খেলাপি ঋণের চাপে অনেক ঝুঁকির মধ্যে আছে। অনেকেই এ জন্য আশঙ্কা করছিলেন, এই খাতে তীব্র তারল্য সংকট দেখা দেবে। কেননা সরকারেরও ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেয়ার প্রবণতা শক্তিশালী হচ্ছিল। ২০১৯ সালের জুলাই-ডিসেম্বর  মাসের হিসাবে দেখা যায়, বাংলাদেশ সরকারের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নিয়েছিলো ৫৩,৫১৪.১ কোটি টাকা যা ২০১৮ সালের একই সময়ের তুলনায় ৮৩.৩% বেশী। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেয়া এই ঋণ  ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের বাজেটের ৬৯.২%। আর ২০১৯ সালের শেষ ছয়মাসের নেয়া  মোট ঋণের ৪৪,৯৪৬.৮ কোটি টাকার সংস্থান হয়েছিলো ব্যাংকিং খাত থেকে। এর মধ্যে ৯২.৪৪% এসেছে বানিজ্যিক বাংকগুলো থেকে আর বাকিটা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে (বাংলাদেশ ব্যাংক, ২০১৯: ৫)। এর প্রভাব কলমানির বাজারেও দেখা যাচ্ছিল। ২০১৯ সালের ২৮ আগষ্ট এই বাজারে আন্তঃব্যাংক অর্থ আদান-প্রদানের গড় সুদের হার ছিল ৫.৫% যা এর আগের তিন বছরের তুলনায় বেশী ছিলো  (দেশরুপান্তর, ৩০ আগষ্ট ২০১৯) । এই মহাদুর্যোগকালেও এই হার, এ বছরের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে গড়ে ৫% এর নিচে নামেনি। যদিও এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকগুলোতে টাকার প্রবাহ বাড়াতে বহুমুখী উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছে। যেমন ব্যাংকগুলোর চাহিদা অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার জোগান, সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড কেনার বিপরীতে আটকে থাকা অর্থছাড়, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রয়োজনে অর্থের জোগান, বৈদেশিক উৎস থেকে ব্যাংকগুলোর অর্থ সংগ্রহের বিধি শিথিল করা, বৈদেশিক মুদ্রা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিক্রি করা।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই সুদের টাকা সরকার কোন্ খাত থেকে ব্যাংকগুলোকে পরিশোধ করবে এবং তা নিয়ে কোন স্পষ্টতা নেই। তার মানে হল, মোটা দাগে অর্থ সরবরাহ প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে মনে হচ্ছে, এই ঋণের অর্থ সরবরাহের দায়িত্বটা সম্ভবত ব্যাংকিং খাতের ওপর। অথচ এই খাতটি নিজেরাই ইতোমধ্যে খেলাপি ঋণের চাপে অনেক ঝুঁকির মধ্যে আছে।

এ ছাড়াও আরও কিছু পদক্ষেপ, যেমন: এক ব্যাংক অন্য ব্যাংক থেকে আমানত বা ধার নেয়া, বিধিবদ্ধ আমানত (এসএলআর) হিসাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা অর্থ কিছুটা ছাড় করতে এর হার কমানো, সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট থেকে অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়। এর বাইরে ব্যাংকগুলো তাদের শেয়ার বিক্রি করেও অর্থ সংগ্রহ করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আবার আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে বিধিবদ্ধ আমানত হিসাবে ১৩% বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখতে হয়। নিয়মানুযায়ী নগদ অর্থ রাখতে হত তার ৫.৫%, যা কমিয়ে ৫% করা হয়েছে।  এতে ব্যাংকগুলোতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থের জোগান নিশ্চিত হয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ৩ হাজার ২৯৯ কোটি ডলার, যা দিয়ে ৭ মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, কমপক্ষে তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান রিজার্ভ থাকলে নিরাপদ অবস্থা ধরে নেয়া যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে রফতানিকারকদের চাহিদা মেটাতে রফতানি উন্নয়ন তহবিলের আকার ১৫০ কোটি ডলার বাড়ানো হয়েছে। এ অর্থ জোগান দেয়া হয়েছে (যুগান্তর, ৯ এপ্রিল ২০২০) ।

তবে দুশ্চিন্তার ছায়াটা অনেক স্পষ্ট হয়ে উঠছে এই করোনাভাইরাস-পরবর্তী অর্থ সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে। কেননা করোনা-পরবর্তী যে ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, তা ভাল কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে না। যেমনঃ বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে প্রবাসীদের অর্থ এসেছিল ১৪ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা, যা করোনাভাইরাস মহামারির এ দুই মাসে বা এ বছরের ফেব্রুয়ারীতে কমে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৩৩৬ কোটি (বাংলাদেশ ব্যাংক, ২০২০)। অর্থাৎ প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের প্রবাহ ২ হাজার ২৬ কোটি টাকা কমেছে দুই মাসে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থই কিন্তু আমাদের অর্থনীতির জীবন-রক্ত।

২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই থেকে জানুয়ারি) রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৩৯ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা। জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই ঘাটতি ছিল ৩১ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে বাজেট আমাদের সোয়া ৫ লাখ কোটি টাকার।  এই বাজেটের ৬২ শতাংশের বেশি অর্থাৎ ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার জোগান দিতে হবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (প্রথম আলো, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২০)।

আবার রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর দেয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালের মার্চের সাথে তুলনা করলে দেখা যাচ্ছে, এ বছরের অর্থাৎ ২০২০ সালের মার্চে রফতানি আয় কমেছে ১৮.২৯%। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার হিসাবে গত বছরের তুলনায় রফতানি আয় কমেছে ২৮.৬১%, যা ভাল কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে না। ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩ হাজার ৮২৭ কোটি ডলার ৩ লক্ষ ২৫ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা, কিন্তু প্রকৃত আয় হয়েছে ২ হাজার ৭৩২ কোটি ডলার বা ২ লক্ষ ৩২ হাজার ২২০ কোটি টাকা  (বাংলাদেশ রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরো, ২০২০)। করোনা-পরবর্তী যে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা দেখা যাবে, সেটা বিবেচনায় নিলে এটা নিশ্চিত, এই অবস্থার পরিবর্তন শিগগিরই হবে না, বরং সামগ্রিকভাবে রফতানি আয় আরও অনেক বেশি চাপে পড়বে। মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপ, আমেরিকা সব মহাদেশই অর্থনৈতিক মহামন্দার শিকার হতে যাচ্ছে। অনেকে মনে করছে,  এই মহামন্দা ১৯৩০ এর দশকের চাইতে আরো বিপদজনক এবং দীর্ঘমেয়াদী হবে গভীরভাবে বিশ্বায়িত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে। 

আমাদের অর্থনীতির জন্য আরেকটি বড় বিপদ হল খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের হিসাব অনুযায়ী খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক দাবি করছে, মোট ঋণের ১২% খেলাপি ঋণ, কিন্তু আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, এটা ২৫%  (প্রথম আলো, ২৭ নভেম্বর ২০১৯) । আবার ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই)-এর গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৮-১৯ সালে শুধু বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালেই পাচার হয়েছে ১৫ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা (প্রথম আলো, ৪ মার্চ ২০২০)।

উপরন্তু করোনা মহামারি আগামী দুই-তিন মাসের স্থায়িত্ব বিবেচনা করলে এটা খুব স্পষ্ট, এই দুর্যোগের মুহূর্তে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে গ্রাহক কর্তৃক সঞ্চিত অর্থ উত্তোলনের চাপও ক্রমান্বয়ে বাড়বে। এদিকে আবার আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থপ্রবাহের গতিও নিচের দিকে।

তাই সবকিছু বিবেচনায় বাংলাদেশের অর্থ খাতের বাস্তবতায় সরকারঘোষিত এই পাঁচ প্যাকেজের ঋণ প্রণোদনা নিয়ে কিছু প্রশ্ন খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়- শুধু ঋণ প্রদানের প্যাকেজ কতটুকু কার্যকরী ভুমিকা রাখতে পারবে শেষ পর্যন্ত? ঠিক একইভাবে এই দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে আবারও ঋণখেলাপিরা সক্রিয় হয়ে উঠবে কি না অথবা নতুন খেলাপিদের আবির্ভাবের সুযোগ তৈরি হবে কি না? অথবা করোনা মহামারির বহুমাত্রিক সংকট বিবেচনায় এই প্যাকেজগুলোর মৌলিকত্বটা বা কোথায়? কেননা সরকার তো অনেক আগে থেকেই একক সংখ্যার সুদের হার নির্ধারণ করতে চাইছে? উপরন্তু তারল্য চাপে থাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ওই প্যাকেজগুলোর আওতায় নতুন করে ঋণ প্রদানে কতটুকু উৎসাহিত হবে? আবার ব্যাংকগুলো থেকে এই ঋণ পাবে সেইসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র, মাঝারি হোক কিংবা বৃহৎ, যাদের ইতোমধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সাথে ঋণ হিসাব আছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাংকিং লেনদেনে লিপ্ত। কিন্তু এর বাইরে যেসব ক্ষুদ্র বা মাঝারি বা প্রান্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা এনজিওর বা মহাজনের সুদনির্ভর তারা এই ঋণ প্রণোদনার সুবিধা নিতে পারবে না। সেই ক্ষেত্রে যারা ব্যাংকিং চ্যানেলে অন্তর্ভুক্ত নয়, তাদেরকে কিভাবে রক্ষা করা যাবে সে ব্যাপারে কোন ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

তবে এই সময়ের সর্বশেষ বা ষষ্ঠ প্যাকেজ এল কৃষি খাতের জন্য। আর সরকারি ঘোষণায় ১৬ কোটি মানুষের অন্নের জোগানদাতাকে বিবেচনা করা হল শ্রমিক, দিনমজুর শ্রেণিতে। এই মহামারির লকডাউনের সময়ে বলা হল, যারা কাজ পাচ্ছে না তারা কৃষিকাজে যায় ধান কাটা বা মাড়াইয়ের জন্য। বলা হল, চলমান উদ্যোগের অংশ হিসাবে পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন, আদাসহ মসলাজাতীয় কিছু উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে মাত্র ৪% সুদে ঋণ নেয়ার জন্য। এতে নতুন কী এল শুধু সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে, এটা পুনরাবৃত্তি করা ছাড়া! তবে নতুন যা এল তা হল ৫% সুদে পাঁচ হাজার কোটি টাকার ঋণ প্রণোদনার ঘোষণা। এতে আরও জানানো হল ধান কাটা-মাড়াই কাজে যান্ত্রিকীকরণের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়কে ১০০ কোটি টাকার বরাদ্দের কথা। বলা হল, আরও ১০০ কোটি টাকাসহ সর্বমোট ২০০ কোটি টাকা কৃষি মন্ত্রণালয় বরাদ্দ পাবে এই কাজে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে বীজ, চারা বিতরণের জন্য ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হবে (প্রথম আলো, ১২ এপ্রিল ২০২০)।

শিল্প খাতের মতই কৃষি খাতের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা সরকারের তরফ থেকে। কৃষকদের ফসল বিক্রি ও বাজারজাতকরণ এবং নগদ অর্থের প্রয়োজনীয়তার মত আশু সমস্যাকে বিবেচনা তো করা হলই না, ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হল এবং মনোযোগ দেয়া হলো আসলে দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনে, এই মুহূর্তের সমস্যাগুলোর সমাধানের পথে না গিয়ে! উপরন্তু খুব স্বল্প সময়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে আমাদের দেশের কৃষকদের জন্য ঋণ নেয়াটা খুব সহজ নয়, বিশেষ করে প্রান্তিক কৃষকদের জন্য এটা তো একেবারেই অসম্ভব! ফলে যারা গ্রামাঞ্চলে প্রভাবশালী এবং চালের মিলের মালিকদের জন্যই সম্ভবত এই ব্যবস্থা নেয়া হল। সবচাইতে হতাশার বিষয় হল, যেখানে একজন রফতানিকারকের জন্য ব্যাক টু ব্যাক এলসির ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার মাত্র ২%, সেখানে কৃষকের জন্য ৫%, যা পরে সমালোচনার মুখে ৪% করা হল (আরিফুজ্জামান, ২০২০)। যে কৃষককে দিনমজুর, শ্রমিক শ্রেণির কাতারে বিবেচনা করা হল, তার ঋণ পরিশোধের আর্থিক সামর্থ্য ভাবা হল একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতির চাইতে বেশি। যে সুদ নির্ধারিত হল প্রান্তিক কৃষকের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এল!

শিল্প খাতের মতই কৃষি খাতের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা সরকারের তরফ থেকে। কৃষকদের ফসল বিক্রি ও বাজারজাতকরণ এবং নগদ অর্থের প্রয়োজনীয়তার মত আশু সমস্যাকে বিবেচনা তো করা হলই না, ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হল এবং মনোযোগ দেয়া হলো আসলে দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনে, এই মুহূর্তের সমস্যাগুলোর সমাধানের পথে না গিয়ে!

আর ওদিকে ২০ লক্ষ টন ধান শ্রমিকের অভাবে কাটা যাচ্ছে না, মাঠে পড়ে আছে! অথচ এই কৃষি খাতেই নিযুক্ত আছে মোট কর্মজীবীদের ৪০%। দেশে ১৯৭২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে তিনগুণ। এমনকি খোদ বিশ্বব্যাংক তাদের ২০১৬ সালের এক প্রতিবেদনে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে, ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দারিদ্র্য বিমোচনে কৃষি খাতের অবদান ৯০% (বিশ্বব্যাংক, ২০১৬)। শুধু দেশের জিডিপিতে ক্রমহ্রাসমান অবদান বিবেচনায় নিয়ে আমাদের খাদ্যের জোগানদাতা কৃষককে অবহেলা করলে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি আমাদের আরও বাড়বে খাদ্যের জন্য পুরোমাত্রায় অন্য রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল রাষ্ট্রগুলোর মতই। বরং সবকিছু বিবেচনায় কৃষি খাত সরকারের সবচাইতে বেশি মনোযোগ এবং সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতার দাবি রাখে। খামারির, কৃষকের জন্য অপরিশোধযোগ্য নগদ অর্থ প্রদানসহ কৃষকের ফসল ও অন্যান্য খামারি পণ্যের বাজারজাত ও ন্যায্য মূল্যে বিক্রি এবং সামনে বিনা টাকায় বোরো ধান কাটার ব্যবস্থা করাটা সরকারের জন্য আশু করণীয়।

কর্মহীন শ্রমজীবী, নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র মানুষের সুরক্ষা এবং সরকার কর্তৃক ঘোষিত পদক্ষেপ

করোনাভাইরাসজনিত কারণে এবং অনানুষ্ঠানিক লকডাউনে নিশ্চিতভাবে কর্মহীন এবং অনাহারী হওয়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা এবং তাদের খাবার ও নগদ অর্থের সংকট কাটানোর জন্য সরকার এ পর্যন্ত কী কী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, তার ওপর এবার চোখ বুলানো যাক। এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত এক-তৃতীয়াংশ জেলায় লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে।

এক্ষেত্রে সরকার মোটা দাগে পাঁচটি পদক্ষেপ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে অতি সম্প্রতি। তার মধ্যে তিনটি পদক্ষেপই করোনাভাইরাসজনিত মহাদুর্যোগের আগেই নেয়া হয়েছিল। এবার শুধু এই কার্যক্রমগুলোর পরিধি বাড়ানো হয়েছে বা দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দেয়া হয়েছে বা কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। যেমন: সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসাবে পরিচালিত ‘বয়স্ক ভাতা’ ও ‘বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলাদের জন্য ভাতা’ কর্মসূচির আওতা সর্বাধিক দারিদ্র্যপ্রবণ ১০০টি উপজেলায় শতভাগে উন্নীত করা হবে বলে জানানো হয়েছে। এর জন্য বরাদ্দের পরিমাণ ৮১৫ কোটি টাকা। একইভাবে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে গৃহহীন মানুষদের জন্য গৃহীত গৃহ নির্মাণ কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়ন করার কথা বলা হয়েছে। এজন্য সর্বমোট ২ হাজার ১৩০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা জানানো হয়েছে। আবার শহরাঞ্চলে বসবাসরত নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য ওএমএসের আওতায় ১০ টাকা কেজি দরে ৭৪ হাজার টন চাল বিক্রয় কার্যক্রম চালু করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যা সাধারণত রমজানের সময় প্রতিবছরই নেয়া হয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধে (কালের কণ্ঠ, ৫ এপ্রিল ২০২০) । তবে এবার আগামী তিন মাসের জন্য এই চাল বিক্রি চালু থাকবে এবং চালের আগের দাম কেজি প্রতি ৩০ টাকা থেকে কমিয়ে ১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে (প্রথম আলো, ২ এপ্রিল ২০২০)।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, কেন করোনাভাইরাস সংক্রমণের গতি রোধে যেখানে ঘরে থাকার কথা, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে, সেখানে এই দরিদ্র, অনাহারী মানুষের জন্য সপ্তাহে একবার জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে পড়িমরি করে লাইনে দাঁড়িয়ে পাঁচ কেজি চাল নেয়ার ব্যবস্থা করা হল (প্রথম আলো, ২ এপ্রিল ২০২০)? বিষয়টা যেন দরিদ্রের শারীরিক দূরত্বের নিরাপত্তাহীনতায় কী এসে গেল? শেষ পর্যন্ত দুই-এক সপ্তাহ এটা চালু রাখা গেলেও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হওয়ার কারণে খোলাবাজারে চাল বিক্রি বন্ধ করে দিতে হয়েছে! তাহলে শুরুই বা কেন করা হয়েছিল এরকম স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকার পরেও?

ঘোষিত পাঁচটি পদক্ষেপের মধ্যে একেবারে নতুন দুটি বিশেষ কর্মসূচির একটি হল স্বল্প-আয়ের মানুষদের বিনা মূল্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ। এজন্য ৫ লাখ মেট্রিক টন চাল এবং ১ লাখ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ করা হয়েছে, যার মোট মূল্য ২ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। এজন্য ২৫১ কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হবে (সমকাল, ১৩ এপ্রিল ২০২০)। কিন্তু এই চাল বিতরণে দুর্নীতির যে রকম প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে সামাজিক গণমাধ্যম এবং সংবাদমাধ্যমে তাতে দরিদ্র মানুষ যে স্বস্তিতে নেই, সেটা স্পষ্ট। ত্রাণ চাইতে গিয়ে নির্যাতন এমনকি স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় নেতা এবং তাদের লোকজনের কাছে হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণেরও শিকার হচ্ছে। সরকারঘোষিত ত্রাণের জন্য ৩৩৩-এ ফোন দিলেও খুব সহজে ত্রাণ মিলছে তা নয়। আবার এই নম্বরে কোন কোন ক্ষেত্রে ফোন দিয়েও বিপদ তৈরি হচ্ছে। দলীয় নেতা এবং তাদের লোকজন ফোনদাতাকে শাসাচ্ছে! এতকিছুর পরও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বলা হল, দলীয় নেতা-কর্মীর সমন্বয়ে ত্রাণ বিতরণ করা হবে। এর চাইতে বড় অস্বস্তি আর কী হতে পারে!

করোনাভাইরাসজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় দিনমজুর, রিকশা বা ভ্যানচালক, মোটর শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, পত্রিকার হকার, হোটেল শ্রমিকসহ অন্যান্য পেশার মানুষের জন্য বিশেষ কর্মসূচির শেষটি হল এককালীন নগদ অর্থ সরাসরি তাদের ব্যাংক হিসাবে পাঠানো। এই খাতে ৭৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে (বণিক বার্তা, ১৪ এপ্রিল ২০২০)।

এখন একটু শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যার হিসাবটা করা যাক। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশ লেবার স্ট্যাটিস্টিকস: অ্যান ইমপিরিক্যাল অ্যানালাইসিসে দেয়া ২০১৬-১৭ এর তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৫৫% কোন না কোন কাজে নিযুক্ত (বিবিএস, ২০১৮ঃ ৫৭) । অর্থাৎ ওই বছরের জনসংখ্যা যদি ১৬ কোটি ১১ লাখ ৪০ হাজার হয়, তাহলে সেই সময় শ্রমবাজারে নিযুক্ত ছিল ৮ কোটি ৮৬ লাখ ২৭ হাজার। তার মধ্যে কৃষি খাতে নিযুক্ত ছিল ৩ কোটি ৫০ লাখ ৮২ হাজার ৫৬২ জন, যা দেশে মোট কর্মসংস্থানের ৪০.৬%। আর এই সংখ্যা সেবা খাতে ৩ কোটি ৪৫ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩০ (৩৯%) জন এবং শিল্প খাতে ১ কোটি ৮০ লাখ ৭৯ হাজার ৯০৮ (২০.৪%) জন।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৫৫% কোন না কোন কাজে নিযুক্ত (বিবিএস, ২০১৮ঃ ৫৭) । অর্থাৎ ওই বছরের জনসংখ্যা যদি ১৬ কোটি ১১ লাখ ৪০ হাজার হয়, তাহলে সেই সময় শ্রমবাজারে নিযুক্ত ছিল ৮ কোটি ৮৬ লাখ ২৭ হাজার। তার মধ্যে কৃষি খাতে নিযুক্ত ছিল ৩ কোটি ৫০ লাখ ৮২ হাজার ৫৬২ জন, যা দেশে মোট কর্মসংস্থানের ৪০.৬%। আর এই সংখ্যা সেবা খাতে ৩ কোটি ৪৫ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩০ (৩৯%) জন এবং শিল্প খাতে ১ কোটি ৮০ লাখ ৭৯ হাজার ৯০৮ (২০.৪%) জন।

তার মানে হল, কৃষি খাতের বাইরে অন্য দুই খাতে শ্রম দেয়া মোট কর্মজীবীর সংখ্যা ৫ কোটি ২৬ লাখ ৪৪ হাজার ৪৩৮। এখন যদি প্রতি পরিবারের সদস্যসংখ্যা গড়ে ৫ জন করে ধরা হয়, তাহলে এ দুই খাতে শ্রমজীবী পরিবারের মোট সংখ্যা দাঁঁড়ায় ১ কোটি ৫ লাখ ২৮ হাজার ৮৮২। ২০১৬-১৭ সালের হিসাবানুযায়ী, যদি মোট শ্রমজীবী পরিবারের সংখ্যা দিয়ে বরাদ্দকৃত নগদ ৭৬০ কোটি টাকাকে ভাগ করি তাহলে দেখা যাবে, প্রতি শ্রমজীবী পরিবার পাবে ৪৯৭.১২ টাকা! এখন এই ৭৬০ কোটি টাকা মোট কয়টা পরিবারকে কত দিন ধরে দেয়া হবে, সে ব্যাপারেও কোন সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা নেই! ২০১৯-২০ সালের তথ্য দিয়ে হিসাবটা করা গেলে দেখা যেত, এই টাকার পরিমাণটা পরিবারপ্রতি আরও কমে যেত এই সময়ের শ্রমবাজারের বিবেচনায়।

২০১৬-১৭ সালের হিসাবানুযায়ী, যদি মোট শ্রমজীবী পরিবারের সংখ্যা দিয়ে বরাদ্দকৃত নগদ ৭৬০ কোটি টাকাকে ভাগ করি তাহলে দেখা যাবে, প্রতি শ্রমজীবী পরিবার পাবে ৪৯৭.১২ টাকা!

আবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল দৈনিক মজুরি বা আয়ের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে তাদের কয়জনের ব্যাংক হিসাব পাওয়া যাবে? বা সবার কি জাতীয় পরিচয়পত্রটা আছে? এটাও জানা গেল না কতজন কর্মহীন শ্রমজীবী মানুষ নগদ অর্থ প্রদান প্রকল্পের আওতায় আসবে এবং কতদিন ধরে তা দেয়া হবে? উপরন্তু এই করোনা মহামারিকালীন বা এর পরে অনেক সংখ্যক মানুষ, যারা এত দিন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে ছিল তারাও নিশ্চিতভাবে যুক্ত হবে অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে বেঁচে থাকার তাগিদে!

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৫% মানুষের প্রতিদিনের আয় ৫০০ টাকার বেশি। তাই কর্মহীনতা এবং অনাহারের এই কয়েক মাসে সামগ্রিকভাবে বাকি ৮৫%-এর জন্য আশু প্রয়োজন নগদ অর্থের। সিপিডির প্রস্তাবটা অনেক বাস্তবসম্মত সবকিছু বিবেচনায়। সর্বশেষ খানা আয় জরিপ অনুযায়ী যাদের আয় ১০ থেকে ১১ হাজার টাকা তাদেরকে ক্ষতির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের হিসাবে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ পরিবারকে নগদ অর্থ সাহায্য দেয়ার প্রয়োজন। ওই খানা আয়-ব্যয় জরিপ দারিদ্যরেখায় থাকা পরিবারকে প্রতি মাসে ৮ হাজার টাকা করে দুই মাসে ১৬ হাজার টাকা প্রস্তাব দিয়েছে। এজন্য সরকারের প্রয়োজন হবে সর্বমোট ২৬ হাজার ৯৬২ থেকে ২৯ হাজার ৮৫২ কোটি টাকার মত। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রতি সপ্তাহে প্রত্যেক পরিবারকে ২ হাজার টাকা করে দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করার প্রস্তাব দেয় সিপিডি (প্রথম আলো, ১৩ এপ্রিল ২০২০)।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৫% মানুষের প্রতিদিনের আয় ৫০০ টাকার বেশি। তাই কর্মহীনতা এবং অনাহারের এই কয়েক মাসে সামগ্রিকভাবে বাকি ৮৫%-এর জন্য আশু প্রয়োজন নগদ অর্থের।

শেষ মন্তব্য

ওপরের আলোচনার মধ্য দিয়ে পাঁচটি বিষয় খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেগুলোর প্রথমটি হল সরকারের আর্থিক বাজারে তারল্য নিয়ে চাপটা আগে থেকেই ছিল মোটা দাগে খেলাপি ঋণ ও অর্থ পাচারের কারণে। যার কারণে এই অতিমারির সংকট মোকাবিলায় ব্যাংকে অর্থপ্রবাহ ঠিক রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে ত্বরিত বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, প্রথম পর্যায়ে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে যে পদক্ষেপগুলোর কথা জানাল তা মূলত রফতানিমুখী শিল্প খাত, বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্পের মালিকবান্ধব। আর ঘোষিত পদক্ষেপগুলো দেখে বোঝার উপায় নেই, শিল্প ও শ্রমিকের আশু প্রয়োজনগুলো রাষ্ট্র সঠিকভাবে চিহ্নিত করেছে কি না। বরং তার পরিবর্তে  রাষ্ট্রের জিডিপিকেন্দ্রিক মনোজগতে বেশি প্রাধান্য বিস্তার করে আছে করোনা দুর্যোগ পরবর্তী রফতানিমুখী শিল্পের পুনর্বাসন। তাই কর্মসংস্থানের ব্যাপ্তি এবং খাদ্য উৎপাদন ক্ষমতার বিচারে সবচাইতে সফল খাত হওয়ার পরও কৃষক এবং কৃষি  খাত নিয়ে বিশেষ মনোযোগ নেই। অথচ রাজনৈতিক বক্তৃতায় ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রীরা গর্বিত হন বাংলাদেশ খাদ্যে উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ এই কথা বলে! ভোটারের সংখ্যার দিক থেকে গ্রামে বাস করা কৃষকের সংখ্যা সবচাইতে বেশি হওয়ার পরেও তাদের রক্ষা করা আজ আর জরুরি নয়, গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক নির্বাচনের অনুপস্থিতিতে। তাই ধনপতি ব্যবসায়ী সমাজ সরকারের নির্ধারক মহলের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ!

তৃতীয়ত, জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে লাইনে দাঁঁড়িয়ে চাল কেনার সিদ্ধান্তে বোঝা যায়, করোনাভাইরাস সংক্রমণের এই দুর্যোগকালেও নিম্নবিত্ত, দরিদ্র মানুষের জনস্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা কতটা অপ্রয়োজনীয়, শ্রেণি হিসাবে রাষ্ট্রের কাছে কতটা উপেক্ষিত!

চতুর্থত, আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সবচাইতে বেশী অবদান প্রবাসী শ্রমিকের ঘামে ঝরা আয়, যা নিশ্চিত করার জন্য কোন আমদানী ব্যয় বহন করতে হয় না সরকারকে যেমনটা প্রয়োজন পড়ে গার্মেন্টস শিল্পখাতে। অথচ এই মহাদুর্যোগ মোকাবেলায় প্রবাসী শ্রমিক ও তাদের পরিবারকে রক্ষার বিষয়টিও একেবারে অবহেলিত থাকল সরকার গৃহীত পদক্ষেপে।

পঞ্চমত, ৫ কোটির ওপরে কর্মহীন শ্রমজীবী মানুষের জন্য ৭৬০ কোটি টাকার নগদ বরাদ্দ নিশ্চিতভাবে ভীষণ অপ্রতুল আগামী দেড়-দুই মাসের আর্থিক এবং অনাহারের ঝুঁকি মোকাবিলায়। শুধু তাই নয়, অন্য অনেকভাবে, যেমন- বিকাশ, রকেট, নগদ সেবার মাধ্যমে নগদ অর্থ পাঠানোর পরিবর্তে ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর সিদ্ধান্তটা একইভাবে বাংলাদেশের বাস্তবতার কতটা কাছাকাছি সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ।

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান: লেখক, গবেষক ও অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল: tanzim.ir@du.ac.bd

তথ্যপুঞ্জিঃ

আরিফুজ্জামান (২০২০), কৃষিঋণ কৃষককে কতটা রক্ষা করবে?, প্রথম আলো, ১৭ এপ্রিলশেষ প্রবেশঃ ২১ এপ্রিল ২০২০।

কালের কণ্ঠ (৫ এপ্রিল ২০২০), ১০০ উপজেলায় শতভাগ বয়স্ক-বিধবা ভাতা : প্রধানমন্ত্রী, শেষ প্রবেশঃ ২১ এপ্রিল ২০২০।

ডিডব্লিউ (২৫ মার্চ ২০২০), শ্রমিকদের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা, শেষ প্রবেশঃ ২১ এপ্রিল ২০২০।

দেশরুপান্তর (৩০ আগষ্ট ২০১৯), 
হঠাৎ বাড়ছে কলমানি সুদহারশেষ প্রবেশঃ ২১ এপ্রিল ২০২০।

প্রথম আলো (১২ ফেব্রুয়ারী ২০২০), 
রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি বেড়েই চলেছে, শেষ প্রবেশঃ ২১ এপ্রিল ২০২০।

প্রথম আলো (২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২০), 
আপাতত ভাসানচরে যাচ্ছে না রোহিঙ্গারাশেষ প্রবেশঃ ২১ এপ্রিল ২০২০।

প্রথম আলো (৪ মার্চ ২০২০), 
বাণিজ্যের আড়ালে বাংলাদেশ থেকে বছরে পাচার ৬৪ হাজার কোটি টাকাশেষ প্রবেশঃ ২১ এপ্রিল ২০২০।

প্রথম আলো  (১৯মার্চ ২০২০), 
করোনার কারণে ঋণ পরিশোধে ছাড়, শেষ প্রবেশঃ ২১ এপ্রিল ২০২০।

প্রথম আলো (২ এপ্রিল ২০২০), 
এনআইডি দেখিয়ে কিনতে হবে ১০ টাকা কেজির চাল, শেষ প্রবেশঃ ২১ এপ্রিল ২০২০।

প্রথম আলো (৫ এপ্রিল ২০২০), 
৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর,শেষ প্রবেশঃ ২১ এপ্রিল ২০২০।

প্রথম আলো (১২ এপ্রিল ২০২০), 
কৃষকদের জন্য ৫% সুদে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা, শেষ প্রবেশঃ ২১ এপ্রিল ২০২০

প্রথম আলো (১৩ এপ্রিল ২০২০),  
১ কোটি ৭০ লাখ পরিবারকে মাসে ৮ হাজার টাকা করে দেওয়ার সুপারিশশেষ প্রবেশঃ ২১ এপ্রিল ২০২০।

বণিক বার্তা  (১৪ এপ্রিল ২০২০), 
কর্মহীনদের জন্য ৭৬০ কোটি টাকা বরাদ্দশেষ প্রবেশঃ  ২১ এপ্রিল ২০২০।

[বিবিএস, ২০১৮]  Bangladesh Bureau of Statistics (BBS) (2018), Labour Statistics in Bangladesh: An Empirical Analysis, BBS: Dhaka.

[বাংলাদেশ ব্যাংক, ২০২০] Bangladesh Bank (2020),  
Monthly Data of Wage Earners’ Remittance, , accessed 21 April 2020.
 
[বাংলাদেশ রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরো, ২০২০] Bangladesh Export Promotion Bureau (2020), 
Export Performance (Goods) for FY 2019-20 (Provistional) (July-March), BEPB: Dhaka

[বিশ্বব্যাংক, ২০১৬] The World Bank (2016), 
Growing the Economy through the Advances in Agriculture, The World Bank: Washington, accessed 21 April 2020.

যুগান্তর (৯ এপ্রিল ২০২০), 
ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধির বহুমুখী উদ্যোগশেষ প্রবেশঃ ২১ এপ্রিল ২০২০।

সমকাল (১৩ এপ্রিল ২০২০), 
স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য বিনামূল্যে ৫ লাখ টন চাল, ১ লাখ টন গম, শেষ প্রবেশঃ ২১ এপ্রিল ২০২০।

Social Share
  • 106
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    106
    Shares
  •  
    106
    Shares
  • 106
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *