সামরিক–বেসামরিক সম্পর্কের ছয় ধরন

আয়েশা সিদ্দিকার ‘পাকিস্তানের সামরিক অর্থনীতির অন্দরমহল’-২

সামরিক–বেসামরিক সম্পর্কের ছয় ধরন

মেহেদী হাসান

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কিছুদিনের মধ্যেই সেখানে সামরিক বাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্য শুরু হয় যা এখন পর্যন্ত  অব্যাহত আছে। এই দেশের রাজনীতি অর্থনীতি পররাষ্ট্র নীতি সবকিছুতেই সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্ব প্রশ্নাতীত। এর বাইরে বের হবার চেষ্টা হয়েছে কিন্তু কুলায়নি। এই ক্ষমতার বিন্যাস তৈরিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ অবদান আছে। তাদের সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতা বিস্তারে পাকিস্তান বরাবর একটা খুটি হিসেবে কাজ করেছে। এটি টিকিয়ে রাখায় তাই তাদের বরাবর সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা থেকেছে। বরাবর ব্যবহৃত হলেও পাকিস্তানে সাম্রাজ্যবাদী হামলা এবং অপমানেরও নজির অনেক। পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর একক কর্তৃত্ব অর্থনীতি ক্ষেত্রে কী রূপ নিয়েছে তার বিশদ বিশ্লেষণ করেছেন পাকিস্তানের সমাজবিজ্ঞানী আয়েশা সিদ্দিকা। তাঁর গ্রন্থ (Ayesha Siddiqa; Military Inc.: Inside Pakistan’s Military Economy, Pluto Press, London, 2007, 2017)-এর ওপর ভিত্তি করে এই ধারাবাহিক লেখার দ্বিতীয় পর্ব।

আয়েশা সিদ্দিকা উপরোক্ত গ্রন্থে রাষ্ট্র ও সমাজের সামরিক ও বেসামরিক শক্তির পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে তার ছয়টি ধরণ সনাক্ত করেছেন। প্রতিটি ধরনের বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত হয় মূলত তিনটি উপাদানের মাধ্যমে—ক) রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রকৃতি, খ) নাগরিক সমাজের পরিণত অবস্থা এবং গ) রাজনৈতিক অর্থনীতিতে সামরিক বাহিনীর অনুপ্রবেশ বা প্রভাবের স্তর। তবে তিনি এই সম্পর্কগুলোর ধরন নির্দিষ্ট করেছেন একটি শক্তিশালী বহুত্ববাদী রাষ্ট্র ধারণা এবং শাসন সম্পর্ককে কেন্দ্র করে। তাঁর ধারণা অনুযায়ী, রাষ্ট্র যদি শক্তিশালী হয় তাহলে সামরিক বাহিনী মূলত বেসামরিক রাজনীতির নিয়ন্ত্রণে থাকে। আর রাষ্ট্র যদি দুর্বল হয় তাহলে তার বিপরীতটি ঘটে। তিনি যে ছয় ধরনের কথা উল্লেখ করেছেন সেগুলোর কাঠামো সাধারণত নির্দিষ্ট কিন্তু তার ভেতরের বৈশিষ্ট্যগুলো গতিশীল। অর্থাৎ, কাঠামোর ভেতরের বৈশিষ্ট্যগুলো পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বদলে যেতে পারে। সম্পর্কগুলো রূপান্তরিত হয়ে ভিন্ন কাঠামোতে অবস্থান করতে পারে। এই রূপান্তর নির্ভর করে অভ্যন্তরীণ শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গী, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দশা, সামরিক বাহিনীর ‘হয়ে ওঠা’ এবং তাদের প্রতি সমাজের অপরাপর শ্রেণি-পেশা-গোষ্ঠী-সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গী, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ইত্যাদির উপর। নীচে এই ছয়টি ধরন ব্যাখ্যা করা হলো।  

. বেসামরিক–সামরিক অংশীদারিত্ব ধরন (The Civil–Military Partnership Type)

এই ধরনের রাষ্ট্রের ভিত্তি হলো স্থিতিশীল বুর্জোয়া গণতন্ত্র, শক্তিশালী বেসামরিক প্রতিষ্ঠান ও সক্রিয় নাগরিক সমাজ যেখানে সামরিক বাহিনী সর্বদা বেসামরিক কর্তৃত্বের অধীন থাকে। এসব রাষ্ট্রে সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের নীতির একটি অংশ; প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি নয়। তাদের ভূমিকা মূলত বাহ্যিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বেসামরিক নির্দেশে সীমিত অভ্যন্তরীণ ভূমিকা পালন করা। শক্তিশালী গণমাধ্যম, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, মানবাধিকার সংস্থা ও রাষ্ট্রীয় নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী থাকায় সামরিক বাহিনী সবকিছুর উপর খবরদারি করতে পারে না। রাজনৈতিকভাবে এই কাঠামো রাষ্ট্র–কর্পোরেটবাদী (state corporatist) ধাঁচের। সেখানে রাষ্ট্র একদিকে সামাজিক স্বার্থ নিয়ন্ত্রণ করে, অন্যদিকে সমঝোতা ও অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়। ফলে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ভিন্ন মতের প্রতিফলন দেখা যায়। এর মধ্যে যেমন শিল্পোন্নত পুঁজিতান্ত্রিক দেশ (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স) রয়েছে, তেমনি ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের মতো ‘উদীয়মান গণতন্ত্র’ও অন্তর্ভুক্ত। ভারতীয় উদাহরণে দেখা যায়, সামরিক বাহিনী কখনো রাজনৈতিক নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেনি বরং জওহরলাল নেহরুর সময় থেকেই বেসামরিক নিয়ন্ত্রণকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায়ও, চরম বর্ণবৈষম্যবাদী যুগের পর নিরাপত্তা খাত সংস্কারের মাধ্যমে উদার বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।

রাজনৈতিকভাবে এই কাঠামো রাষ্ট্র–কর্পোরেটবাদী (state corporatist) ধাঁচের। সেখানে রাষ্ট্র একদিকে সামাজিক স্বার্থ নিয়ন্ত্রণ করে, অন্যদিকে সমঝোতা ও অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়। ফলে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ভিন্ন মতের প্রতিফলন দেখা যায়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, ‘শীতল যুদ্ধে’র পরবর্তী সময়ে যখন পাবলিক সেক্টরের ভূমিকা সংকুচিত করা হয় তখন সামরিক বাহিনীর ভূমিকারও রূপান্তর ঘটে। রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় সামরিক বাহিনীর আপেক্ষিক শক্তি বৃদ্ধি পায়। এর ফলে বর্তমান ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ বেড়ে যায়। সেই সাথে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, যুক্তরাজ্য প্রভৃতি দেশে সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্বে রূপ পায়। সেপ্টেম্বর ১১, ২০০১ এর পর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় সামরিক বাহিনী নীতিনির্ধারণে আরও সম্পৃক্ত হয়। সিআইএ, এফবিআই এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তারা শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নয় বরং রাষ্ট্রের সার্বিক নীতি–প্রক্রিয়া ও বৈদেশিক কর্মকৌশলেও ভূমিকা রাখতে শুরু করে। 

ইসরায়েলে ইন্তিফাদা দমন অভিযানে সেনাবাহিনীর চরম ভূমিকা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় তাদের প্রভাব বাড়িয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রের অংশীদার হিসেবে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে যদিও বেসামরিক কর্তৃত্ব অটুট রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো আধুনিক বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক শাসন কাঠামোতে সামরিক-বেসামরিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের মাত্রা এবং পরিমাণ ব্যাপক। Private Military Enterprises (PMEs) ও নিরাপত্তা সংস্থার মাধ্যমে সেখানে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তারা বিশ্বের অন্যান্য দেশের ‘সংঘাত–প্রবণ’ (যেমন বসনিয়া, রুয়ান্ডা, ক্রোয়েশিয়া, সোমালিয়া, সিয়েরা লিওন এবং ইরাকের মতো সংঘাত–প্রবণ অঞ্চলে) অঞ্চলে কাজ করে রাষ্ট্র ও বেসরকারি খাতের যৌথ ‘নিরাপত্তা–অর্থনীতি’ তৈরি করছে। 

এই ধরনের অংশীদারিত্বের ফলে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলো সরাসরি হস্তক্ষেপ না করেই বেসরকারি সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ আরও সহজে ও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে পারে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে, এই বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এমনসব কাজ সম্পাদন করতে পারে, যেগুলোতে সরকার বা আনুষ্ঠানিক সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক ঝুঁকির কারণে সরাসরি যুক্ত হতে চায় না। নিরাপত্তা খাতে ‘rightsizing’ কর্মসূচি গ্রহণের পর সামরিক খাতে যে প্রাতিষ্ঠানিক ও মানবসম্পদ ক্ষমতা অব্যবহৃত অবস্থায় ছিল, সেটিকে অপচয় না করে কাজে লাগানোর জন্যই PMEs–এর এই ব্যবহারকে এক সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়।

এই প্রক্রিয়ায় Halliburton, MPRI, Kellogg Brown & Root এবং DynCorp-এর মতো বহু বেসরকারি সামরিক প্রতিষ্ঠান (MNC) ইরাক যুদ্ধ থেকে সরাসরি বিপুল মুনাফা অর্জন করে। এই যুদ্ধের মাধ্যমে বেসরকারি খাত, রাজনৈতিক সমাজ ও সামরিক বাহিনীর জন্য নানা ধরনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়। এজন্য PMEs–গুলোর নিজস্ব প্রশিক্ষণ ব্যয়ের প্রয়োজন হয়নি। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তারা নিজেদের সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন অমূল্য যুদ্ধ–অভিজ্ঞতা ও পেশাদার প্রশিক্ষণ এবং যার ফলে বেসরকারি খাতের লাভ ছিল আকাশচুম্বি। অন্যদিকে, রাজনীতিবিদরাও এতে রাজনৈতিক ও আর্থিক—দুই ধরনের সুবিধা লাভ করেন। প্রতিরক্ষা চুক্তি থেকে লাভবান শীর্ষ ১০০ কোম্পানির বেশীরভাগই যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ও সিনেটের প্রতিরক্ষা বরাদ্দ উপকমিটির সদস্যদের নির্বাচনী প্রচারণায় অর্থ সহায়তা দিয়েছে। এই বেসামরিক–সামরিক সম্পৃক্ততা সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য অবসর–পরবর্তী লাভজনক কর্মসংস্থানের পথ খুলে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রে ওয়াশিংটন ডিসির বাইরের অঞ্চলগুলোতে এই ধরনের নিরাপত্তা–সংক্রান্ত চাকরিগুলো অবসর–ভাতার পাশাপাশি আরও দুই বা তিনটি আয়ের উৎস থেকে উপার্জনের সুযোগ করে দিয়েছে।

Halliburton, MPRI, Kellogg Brown & Root এবং DynCorp-এর মতো বহু বেসরকারি সামরিক প্রতিষ্ঠান (MNC) ইরাক যুদ্ধ থেকে সরাসরি বিপুল মুনাফা অর্জন করে।

আয়েশা সিদ্দিকার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এটি সরকারের জন্য নিশ্চিত আর্থিক ক্ষতি। কারণ সরকার অর্থব্যয় করে যে সামরিক কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়, সেই কর্মীরাই পরে PMEs–এ যোগ দেয়। ফলে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের সুবিধা বেসরকারি খাতে স্থানান্তরিত হয়। ব্যয় রাষ্ট্রের (জনগণের), লাভ বেসরকারি কোম্পানির। এছাড়া সরকারি কাজ সম্পাদন করে দিতে PMEগুলো স্বাভাবিকের চাইতে অতিরিক্ত মূল্য সরকারের কাছ থেকে আদায় করে নেয়, যা সরকারি ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয়। অবশ্য সরকারি হিসাবরক্ষকরা যুক্তি দেন, নিরাপত্তা খাতের বেসরকারিকরণ দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক ও কূটনৈতিকভাবে লাভজনক, কারণ এতে রাষ্ট্রের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমে। এছাড়াও যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য হতাহতের ফলে দেশের অভ্যন্তরে সরকারি দলের জন্য যে রাজনৈতিক বিব্রতকর পরিস্থিতি (body bags issue) তৈরি হয়, তা থেকেও সরকার রক্ষা পায়।

লাভবান শীর্ষ ১০০ কোম্পানির বেশীরভাগই যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ও সিনেটের প্রতিরক্ষা বরাদ্দ উপকমিটির সদস্যদের নির্বাচনী প্রচারণায় অর্থ সহায়তা দিয়েছে। এই বেসামরিক–সামরিক সম্পৃক্ততা সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য অবসর–পরবর্তী লাভজনক কর্মসংস্থানের পথ খুলে দেয়।

এই ধরনের ব্যবস্থায় সরকারি দল যদিও কিছুটা সুবিধা আদায় করতে পারে কিন্তু এতে স্বচ্ছতার অভাব ও দুর্নীতির ঝুঁকি বেড়ে যায়। এছাড়া এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয় যেখানে লাভবান বেসরকারি ও সামরিক গোষ্ঠীগুলো নিজেদের স্বার্থে রাষ্ট্রীয় নীতি প্রভাবিত করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এর বড় প্রমাণ ইরাক যুদ্ধ। ২০০৩ সালে হ্যালিবার্টন যে ৪.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের চুক্তি পেয়েছিল, তার মধ্যে মাত্র অর্ধেক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে অর্জিত ছিল। এছাড়াও বেসরকারি সামরিক ঠিকাদার MPRI নিজেই যুদ্ধক্ষেত্রে ঠিকাদারদের আচরণবিধি তৈরি করেছে, এমনকি গোয়েন্দা কার্যক্রমেও অংশ নিয়েছে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এ ধরনের বিতর্কিত বহু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। 

এভাবে, PME এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে যেখানে সামরিকমুখী নীতি গ্রহণের তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে, বিশেষত সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ স্তরে, যেখানে অধিকাংশ অর্থনৈতিক সুবিধা কেন্দ্রীভূত। ফলে দেশীয় বা আন্তর্জাতিকভাবে আগ্রাসী সামরিক নীতি গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। একদিকে তা সামরিক বাহিনীর গুরুত্ব বাড়ায় অন্যদিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ওপর অধিকতর মাত্রায় নির্ভরতা তৈরি করে। একটি পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে সামরিক কর্মকর্তারা প্রাচীন বা প্রাক–পুঁজিবাদী সমাজের মতো ব্যক্তিগত সম্পদ সঞ্চয়ের পরিবর্তে সাধারণত পুঁজি সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় অংশীদার হতে চান। যদিও এই মনস্তত্বকে স্বাভাবিক হিসেবে গণ্য করা হয়, তবে এই প্রবণতা মোটেও নিরীহ নয়। যদি এটিকে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ না করা হয়, তবে এই ধরনের মিল-বিজ রাষ্ট্রের কার্যকারিতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যতের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

এ ধরনের অংশীদারিত্ব থেকে যারা লাভবান হয় তারা প্রায়ই এমন এক স্বৈরাচারী রাজনৈতিক কাঠামো সমর্থন করে যেখানে নাগরিক সমাজের কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে না বা নীতিগত ভুল সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে এই ধরনের মিল-বিজের উপস্থিতি গণতন্ত্র ও নাগরিক সমাজের ওপর এক ধরনের হুমকি সৃষ্টি করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘military–industrial complex’-এর প্রভাবের দিক বিবেচনায় নিয়ে রাষ্ট্রপতি ডুইট ডি. আইজেনহাওয়ার ১৯৬১ সালেই সতর্ক করেছিলেন এই বলে যে, এই ক্রমবর্ধমান সামরিক–অর্থনৈতিক খাতের ‘অযৌক্তিক প্রভাব’ একদিন রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

সামরিক কর্তৃত্ববাদী দেশগুলোর তুলনায় উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের অস্তিত্ব যদিও সামরিক প্রভাবকে পুরো অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রবেশ থেকে বিরত রাখে, ‘‘তার অর্থ এই নয় যে, এটি গণতন্ত্রের একটি আদর্শ ধরন’’। (পৃঃ ৪৩)

২. কর্তৃত্ববাদী-রাজনৈতিক-সামরিক অংশীদারিত্ব (Authoritarian-Political-Military Parternship)

আয়েশা সিদ্দিকা চীন, উত্তর কোরিয়া, কিউবা, সিরিয়া, মিশর, ইরাক, রাশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও ইসলামী বিপ্লব পরবর্তী ইরানকে এমন ধরনের রাষ্ট্রের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন যেখানে রাজনৈতিক দলই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে এবং সামরিক বাহিনী সেই দলের অধীন থেকে কাজ করে। নাগরিক সমাজ এখানে প্রথম ধরনের তুলনায় দুর্বল এবং শাসক রাজনৈতিক দল প্রশাসন ও অর্থনীতির কর্তৃত্ব-নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আধিপত্য বজায় রাখে। এক্ষেত্রে সামরিক বাহিনী শাসক দলের সমাজ–রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়ন, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রধান হাতিয়ার। রাজনৈতিক দল ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সম্পর্ক থাকলেও বেসামরিক রাজনৈতিক সরকারই সামরিক বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। অন্যদিকে, সামরিক বাহিনী রাষ্ট্র ও দলের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে। চীন, কিউবার মতো রাষ্ট্রে পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়েই উভয়ের শক্তি বৃদ্ধি পায়। তবে শ্রীলঙ্কায় সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রীয় দমনযন্ত্রে পরিণত হলে সংখ্যালঘু অপরাপর জাতিগোষ্ঠীর অধিকার হরণের মতো ঘটনাগুলোও ঘটে থাকে এই কাঠামোতে। 

মিল বিজ-এর পরিপ্রেক্ষিতে গবেষক দেখিয়েছেন যে, এই সামরিক বাহিনীগুলোকে অর্থনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য অনুমোদন দেওয়ার প্রথা রয়েছে। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি গড়ে তোলার মূল উদ্দেশ্য সম্পদ জমা করা নয় বরং শাসক দলের সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক সুবিধার জন্য পুঁজি বা তহবিল তৈরি করা। অর্থনীতিতে সামরিক বাহিনী জড়িত হওয়ার পেছনে তার ইতিহাস থাকে। রাষ্ট্র বা জাতি গঠনে সামরিক বাহিনীগুলো রাষ্ট্র পরিচালনায় আরও বড় ভূমিকা পালন করবে— এমন আকাঙ্ক্ষায় এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এই সংগঠনের ভূমিকার কারণেই তারা অর্থনীতিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। যেমন: চীন, সিরিয়া, কিউবা এবং ইরান। এই ধরনে শাসক দলকে রাষ্ট্র পরিচালনায় পদ্ধতিগতভাবে সাহায্য করার জন্য সশস্ত্র বাহিনীকে ব্যবহার করা হয় এবং নানা উপায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়। 

এসব রাষ্ট্রে প্রতিরক্ষা খাতের আর্থিক সম্পদের ঘাটতি মেটাতে সামরিক বাহিনী প্রায়শই মুনাফামুখী বা ব্যবসায়ী কার্যকলাপে লিপ্ত হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে সামরিক বাহিনীর পুরো খরচ মেটানোর মতো সক্ষমতা বা পর্যাপ্ত তহবিল না থাকায় তাদের অর্থনৈতিক ভূমিকাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক দলের একটি হাতিয়ার হিসেবে সামরিক বাহিনী বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজও হাতে নেয়। তবে সামগ্রিক অর্থনীতিতে একটি নির্দিষ্ট অবস্থান তৈরি করলেও রাজনৈতিক দলের হাতে সার্বিক ক্ষমতা থাকার কারণে সামরিক বাহিনীকে তার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে চীনের উদাহরণ উল্লেখযোগ্য। ১৯৯৮ সালে people’s army-কে পেশাদার রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে সশস্ত্র বাহিনীর সব ধরনের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের অংশীদারিত্ব বাতিল করার নির্দেশ দেয় বেইজিং। অন্যদিকে ১৯৯১-পরবর্তী রাশিয়ায় রাষ্ট্রের আর্থিক সংকট ও দুর্বল নজরদারির কারণে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে সামরিক বাহিনীর অর্থনৈতিক লুটপাট চালানোর মতো ঘটনাও ঘটতে দেখা যায় এই কাঠামোতে। ব্যতিক্রমী ধরনের ঘটনা সত্ত্বেও এই কাঠামোতে সাধারণত বেসামরিক সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ক্ষমতা দখলের মতো কোনো ঘটনা ঘটতে দেখা যায় না, যেমনটি দেখা যায় শাসক ধরনের সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রে। 

৩. শাসক ধরনের সামরিক বাহিনী (The Ruler Military Type) 

এটি হলো এমন এক ধরনের সামরিক শাসনব্যবস্থা, যেখানে সামরিক বাহিনী নিজেকে রাষ্ট্রের একমাত্র বৈধ ও সক্ষম প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখে, তথাকথিত আধুনিক সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং স্থায়ীভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে। তারা মনে করে, বেসামরিক কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্র পরিচালনায় অক্ষম। তাই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অখণ্ডতা ও উন্নয়ন কেবল তাদের মাধ্যমেই সম্ভব। এই কারণে তারা বেসামরিক শাসনের বিকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। গণতন্ত্রে ফেরার কোনো প্রতিশ্রুতি ছাড়াই রাজনীতিতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত হয়। 

‘‘যেসব রাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক সংকট সমাধানের জন্য নিছক দমনমূলক এবং সামরিক সমাধানের পথ বেছে নেয়, তারা সম্ভবত দেখতে পাবে যে তাদের সামরিক বাহিনী এমন সব কাজ ও দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছে, যেমন: আইন প্রয়োগ, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, কর আদায়, আদমশুমারি, ম্যাগাজিন প্রকাশনা, রাজনৈতিক দল নিবন্ধন, খাদ্য সহায়তা বিতরণ ইত্যাদি; যার সাথে ঐতিহ্যগত বা স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা দায়িত্বের কোনো সম্পর্কই নেই।’’ (পৃ ৫৩) 

এই ধরনের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তারা তাদের শাসনের বৈধতা যৌক্তিক করার চেষ্টা চালায়; জনগণের সম্মতি আদায় করতে চেষ্টা করে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে চেপে বসে।

রাষ্ট্রের এই মডেলটি গবেষক আয়েশা সিদ্দিকা পার্লমাটারের ‘praetorian military’ ধারণা থেকে নিয়েছেন যেখানে দেখানো হয়েছে যে, এই ধরনের সামরিক বাহিনী মধ্যস্থতাকারী বা অভিভাবক-প্রতিপালক ধরনের সামরিক শাসনের তুলনায় চরম একনায়কতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদী ও স্থায়ী বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো: দীর্ঘমেয়াদী সামরিক শাসন, বেসামরিক নেতৃত্বের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে অনীহা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। উদাহরণ হিসেবে ১৯৭০–৮০-এর দশকের চিলি, আর্জেন্টিনা, ইকুয়েডর, পেরু, নিকারাগুয়া, হাইতি এবং আধুনিক মিয়ানমার উল্লেখযোগ্য।

এই ধরনের সামরিক বাহিনী মধ্যস্থতাকারী বা অভিভাবক-প্রতিপালক ধরনের সামরিক শাসনের তুলনায় চরম একনায়কতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদী ও স্থায়ী বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো: দীর্ঘমেয়াদী সামরিক শাসন, বেসামরিক নেতৃত্বের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে অনীহা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। উদাহরণ হিসেবে ১৯৭০–৮০-এর দশকের চিলি, আর্জেন্টিনা, ইকুয়েডর, পেরু, নিকারাগুয়া, হাইতি এবং আধুনিক মিয়ানমার উল্লেখযোগ্য।

দীর্ঘ সামরিক শাসনের পেছনে মূল কারণ হিসেবে গবেষক দায়ী করেছেন দুর্বল নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাবকে। এই শাসন শুরুতে গণতান্ত্রিক ‘পুনরুদ্ধার’ বা ‘সংস্কার’-এর নামে বৈধতা পেলেও, সময়ের সঙ্গে তাদের নৈতিক অবস্থান ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। মানবাধিকার লঙ্ঘন, দমননীতি ও দুর্নীতি চরম পর্যায়ে যায় যার কারণে সমাজে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। বহিরাগত চাপ ও নাগরিক আন্দোলনের ফলে বহু দেশ পরবর্তীতে গণতন্ত্রে ফিরে আসে (যেমন: চিলি ও আর্জেন্টিনা)।

‘শাসকধর্মী’ সামরিক শাসনকে তিনটি উপধরনে বিভক্ত করে দেখিয়েছেন গবেষক। এই উপধরনগুলো বেসামরিক-সামরিক সম্পর্কের বিভিন্ন স্তর বা মাত্রাকে নির্দেশ করে। প্রতিটি উপধরনেই শাসনের জন্য সামরিক নেতৃত্ব বেসামরিক আমলা, টেকনোক্র্যাটদের (প্রযুক্তি বা জ্ঞাননির্ভর কর্মকর্তা) ওপর যথেষ্ট মাত্রায় নির্ভরশীল। তবে বেসামরিক সহযোগীরা সশস্ত্র বাহিনীর অধীনস্ত এবং নির্ভরশীল। শাসক ধরনের সামরিক বাহিনী দ্বারা শাসিত রাষ্ট্রগুলোতে Kleptocratic (চৌর্যবৃত্তিক বা লুণ্ঠনমূলক) সম্পদ বণ্টনের প্রকৃতি বোঝার জন্য এই তিনটি বিভাগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হলো:

১. ব্যক্তিগত: একনায়ককেন্দ্রিক শাসন (যেমন ইদি আমিনের উগান্ডা, সোমোজার নিকারাগুয়া, দুভালিয়েরের হাইতি), যেখানে ক্ষমতা ও সম্পদ এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। 

২. অলিগার্কিক: একদল অফিসার রাষ্ট্র পরিচালনা করে। যেমন পেরু, চিলি, ইকুয়েডর ও মিয়ানমারে এরা নিজেদেরকে আধুনিকায়নের বিকল্প প্রতিষ্ঠান মনে করে। 

৩. কর্পোরেট ধরন: সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক অংশে পরিণত হয়। যেমন, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা যেখানে সামরিক বাহিনী টেকনোক্র্যাট ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জোট গড়ে ‘আমলাতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করে। 

লুণ্ঠনমূলক বা চৌর্যবৃত্তিক পুনর্বণ্টনের বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় ক্ষতিকর একচেটিয়া ব্যবসা বা মনোপলি সৃষ্টির মাধ্যমে, বিশেষ করে ব্যক্তিগত এবং অলিগার্কিক শাসন ব্যবস্থায়, যেখানে একচেটিয়া ব্যবসার জন্ম নেয়। শাসক সামরিক বাহিনী তার ঘনিষ্ঠ দোসরদের মধ্যে সম্পদ বিতরণ করে থাকে। এই উপ-প্রকারগুলোতে পর্যায়ভেদে সুবিধাভোগীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যে কর্পোরেট মডেলটি নিজেদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি সম্পদ পুনর্বণ্টন করে। এই ধরনে সুবিধা দেওয়ার মধ্য দিয়ে অন্যান্য গোষ্ঠীর সাথে বন্ধুত্ব বজায় রাখার চেষ্টা চালানো হয়। ব্রাজিলের উদাহরণে দেখা যায়, সামরিক বাহিনী এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকা একদল টেকনোক্র্যাট ও ব্যবসায়ী নিজেদের মধ্যে আয় ও সম্পদ ভাগ-বাটোয়ারা করে শ্রেণিগত শক্তি বৃদ্ধি করেছিল।

সামরিক কর্তৃত্ববাদ সম্পর্কে ম্যানকুর ওলসনের উদাহরণ দিয়ে গবেষক বলেছেন যে, এ ধরনের সামরিক বাহিনী সামাজিক ও অর্থনৈতিক অরাজকতা তৈরি করে, সহিংসতা বৃদ্ধি করে, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পদের ওপর সীমাহীন লুটতরাজ চালায় এবং এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে দক্ষ-অদক্ষ জনশক্তির দেশত্যাগের হিড়িক পড়ে যায়। মিয়ানমার এই প্রক্রিয়ার সমসাময়িক উদাহরণ, যেখানে সামরিক বাহিনীর আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ — সবকিছুকেই বিপর্যস্ত করেছে।

মোটকথা শাসক সামরিক বাহিনী হলো এমন এক কর্তৃত্ববাদী কাঠামো, যা বেসামরিক নেতৃত্বকে সম্পূর্ণভাবে প্রতিস্থাপন করে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ, ক্ষমতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সমাজের ওপর সামরিক একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। এর পরিণতি হয় রাজনৈতিক স্থবিরতা, অর্থনৈতিক অরাজকতা ও নাগরিক সমাজের দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা।

৪. মধ্যস্থতাকারী বা সালিশী সামরিক  ধরন (Arbitrator military Type)

এটি এমন এক শাসনব্যবস্থা যেখানে সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক সংকটের সময় স্বল্পমেয়াদী হস্তক্ষেপ করে। এর বৈশিষ্ট্য হলো, বাহিনী “back-seat driver” মনোভাবাপন্ন। অর্থাৎ সরাসরি নয় বরং তারা আড়াল থেকে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক — উভয় ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রকে রক্ষা করার ব্যাপারে রাজনীতিবিদদের যোগ্যতার ওপর সন্দেহ থাকায়, এই ধরনের সামরিক বাহিনীগুলো বেসামরিক শাসকদের দুর্নীতি বন্ধ করতে নিজেদের এক ধরনের Watchdog বা পাহারাদার হিসেবে হাজির করে এবং এর মাধ্যমে তারা তাদের পর্যায়ক্রমিক হস্তক্ষেপের যুক্তি তৈরি করে নেয়। 

এই শ্রেণির উদাহরণ পাওয়া যায় ইন্দোনেশিয়া (সুহার্তোর পূর্বে), পাকিস্তান (১৯৭৭-এর আগে), তুরস্ক (১৯৬১-এর আগে), দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশে। এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো, সামরিক বাহিনী বেসামরিক কর্তৃত্বের সম্পূর্ণ অবলুপ্তি ঘটায় না বরং সংকটকালে ক্ষমতা নেয় এবং পরে বেসামরিক নেতৃত্বের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। পাশাপাশি সংকটকালীন ‘মধ্যস্থতাকারী শক্তি’ হিসেবে নিজেদের বৈধতা আদায় করতে সচেষ্ট থাকে। দীর্ঘমেয়াদী শাসনের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও তা স্থায়িত্ব লাভ করতে পারে না। কারণ –

  • বিদ্যমান সামাজিক ব্যবস্থার স্বীকৃতি বা তা মেনে নেওয়া,
  • ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ,
  • সামরিক বাহিনীর নিজস্ব কোনো স্বাধীন রাজনৈতিক সংগঠন না থাকা,
  • সামরিক শাসনের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার ধারণা থাকা,
  • একটি চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী (প্রেসার গ্রুপ) হিসেবে সামরিক বাহিনীর চরিত্র বজায় রাখা,
  • জাতীয় চেতনার স্তর,
  • বেসামরিক জনগণের প্রতিশোধ বা শাস্তির ভয়,
  • পেশাদারিত্বের প্রতি গভীর উদ্বেগ বা তা বজায় রাখার চিন্তা।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, সুশীল সমাজ খণ্ডিত হলেও সশস্ত্র বাহিনীর দীর্ঘস্থায়ী সর্বগ্রাসী নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়ার মতো এতটা দুর্বল নয় এবং নাগরিক সমাজের সংগঠিত প্রতিরোধ সামরিক শাসনের স্থায়িত্ব রোধ করে। একইভাবে তুরস্ক ও পাকিস্তানে সামরিক বাহিনী সংবিধানিকভাবে নিজেদের ‘রাষ্ট্রের অভিভাবক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেও, তারা স্থায়ী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

এই ধরনের সামরিক বাহিনীর দুটি উপধরন রয়েছে— 

১️. ইন্দোনেশীয় মডেল: সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উভয় ধরনের সুবিধার জন্যই বেসামরিক অংশীদারদের সন্ধান করে। ইন্দোনেশিয়া হলো আরবিট্রেটর সামরিক বাহিনীর একটি আদর্শ উদাহরণ। সেখানে বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্বের ‘মিল বিজ’-এ প্রায় সমান অংশীদারিত্ব রয়েছে। সুকার্ণোর সময় থেকে শুরু করে সুহার্তো এবং পরবর্তী সকল রাজনৈতিক নেতার অধীনেই সামরিক বাহিনীকে জাতীয় সম্পদ ব্যবহারের অংশীদারিত্ব বা শেয়ার দেওয়া হয়েছিল। মূলত ১৯৪৫-৪৯ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ওলন্দাজ বা ডাচ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামরিক বাহিনীর ভূমিকার ফলেই ইন্দোনেশীয় রাষ্ট্রের সূচনালগ্ন থেকে সশস্ত্র বাহিনী বেসামরিক নেতাদের সাথে অংশীদার হিসেবে যুক্ত ছিল। বিপ্লবী রাজনৈতিক কাঠামো, ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি (পিকেআই) এবং ইন্দোনেশিয়া প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনী (এবিআরআই)-এর মধ্যকার উত্তেজনা এবং সেই সাথে দুর্বল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের সমস্যা সামরিক বাহিনীর বারবার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই রাজনৈতিক অরাজকতা সামরিক বাহিনীর বেসামরিক ভূমিকা প্রতিষ্ঠা করে, যা তিনটি মৌলিক দলিলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়েছিল: ১৯৪৫ সালের সংবিধান, পঞ্চশীলা (রাষ্ট্রীয় আদর্শ), এবং ‘সপ্ত মার্গ’—যা এবিআরআই (ABRI)-এর একটি সম্মানসূচক কোড বা আচরণবিধি, যা সেনাবাহিনীকে পঞ্চশীলা রক্ষা করার নির্দেশ দেয়। এই ধরনের আইনি বিধানগুলো রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে সামরিক বাহিনীর ভূমিকাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

২️. তুরস্ক–পাকিস্তান–বাংলাদেশ মডেল: এ প্রসঙ্গে আয়েশা সিদ্দিকা কিছু প্রশ্ন হাজির করেছেন, যেমন: যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা সামরিক বাহিনীকে আর্থিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান করে, তা কি সামরিক বাহিনীর প্রভাব হ্রাস করার জন্য সুশীল সমাজকে শক্তিশালী করতে পারে? যে আরবিট্রেটর সামরিক বাহিনী নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থ গড়ে তুলেছে, তারা কি চিরকাল কেবল একজন মধ্যস্থতাকারী হিসেবেই থাকবে এবং কেবল সংকটের সময়ই সরকারের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে? সামরিক বাহিনীর ভূমিকা কেবল বাংলাদেশের মতো ক্ষেত্রেই মধ্যস্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে, যেখানে সরকার পদ্ধতিগতভাবে সশস্ত্র বাহিনীকে তাদের আর্থিকভাবে টিকে থাকার জন্য অন্যান্য বিকল্প খুঁজতে উৎসাহিত করেছে? 

গবেষকের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর আর্থিক স্বায়ত্তশাসন প্রক্রিয়ার এই প্রবণতা পাকিস্তান কাঠামোর ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার ফসলও বটে। এছাড়া, ঢাকার সামরিক বাহিনী আর্থিক সুবিধা অর্জনের জন্য জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনের ওপর নির্ভর করে এবং এর ফলে ১৯৯০-৯১ সাল থেকে তারা ক্ষমতার বাইরে রয়েছে। বাংলাদেশী সশস্ত্র বাহিনী শান্তি রক্ষা মিশনগুলোতে অংশগ্রহণের আরও বড় সুযোগ পাওয়ার জন্য বেসামরিক সরকারের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখে। বাংলাদেশী সামরিক বাহিনীর বাণিজ্যিক উদ্যোগগুলোও শান্তি রক্ষা মিশন থেকে অর্জিত আয়ের ওপর নির্ভরশীল। বছরের পর বছর ধরে ঢাকার সশস্ত্র বাহিনী হোটেল ব্যবসা, টেক্সটাইল ও পাট উৎপাদন এবং শিক্ষা খাতে তাদের অংশীদারিত্ব বা স্টেক তৈরি করেছে। বাংলাদেশী সুশীল সমাজ হয়তো সরলভাবেই এই ধরনের উন্নয়ন বা অগ্রগতিতে আতঙ্কিত বা শঙ্কিত নয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই বাণিজ্যিক উদ্যোগগুলোকে ১৯৭১-পূর্ব পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছ থেকে প্রাপ্ত একটি ঐতিহ্য হিসেবে দেখেন। তা সত্ত্বেও, এটি বিশ্বাস করা হয় যে সামরিক বাহিনী জাতিসংঘের মিশনের মাধ্যমে অর্জিত এই লাভজনক সুযোগগুলো হারানোর ঝুঁকি নেবে না। তবে এই সম্ভাবনার কথা খুব কমই ভাবা হয় যে, কোনো সময় সামরিক বাহিনীকে যদি জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এমন সুযোগ দেওয়া না হয়, তবে তারা আর্থিক সুবিধা পাওয়ার জন্য অন্য কোনো বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হতে পারে। (পৃ. ৫৭)

পাশাপাশি জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনে জড়িত থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান, তুরস্ক এবং ইন্দোনেশিয়ার সামরিক বাহিনী বিভিন্ন লাভজনক ব্যবসায়িক উদ্যোগে লিপ্ত থাকে। তাদের এই মুনাফামুখী অর্থনৈতিক তৎপরতা মূলত তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতারই ফল। এই তিনটি সামরিক বাহিনীই স্বাধীনতার প্রথম দিন থেকে সম্পৃক্ত থাকার কারণে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী। এই ধরনের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সশস্ত্র বাহিনীগুলোর আর্থিক স্বায়ত্তশাসন তাদের রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের ওপর নির্ভরশীল। যতক্ষণ না তাদের কর্তৃত্ব অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিকভাবে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে, ততক্ষণ তাদের রাজনৈতিক প্রভাব অবাধে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে বা অন্তত তা হ্রাস করা সম্ভব হয় না।

অতএব সালিশী সামরিক ধরন মূলত এক পেশাদার, সংকটকালীন ও মধ্যস্থতাকারী সামরিক কাঠামো যা বেসামরিক লোকদের মধ্য থেকে আমলা, টেকনোক্র্যাট, ব্যবসায়ী এবং ধর্মীয় ও জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর মধ্য থেকে নিজেদের অংশীদার খুঁজে নেয়। যাতে উভয় পক্ষেই তাদের পারস্পরিক সুবিধার জন্য বিদ্যমান ক্ষমতার সম্পর্কটিকে টিকিয়ে রাখতে পারে। অন্যদিকে আবার তা কিন্তু একনায়কতান্ত্রিক ধরনের মতো স্থায়ী বা সর্বগ্রাসী শাসক নয়। তবুও তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থের সম্প্রসারণ ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রভাব টিকিয়ে রাখার ঝুঁকি তৈরি করে।

৫. অভিভাবক-প্রতিপালক সামরিক ধরন (The Parent-Guardian Military Type)

এই ধরনের সামরিক কাঠামো মূলত সালিশী বা মধ্যস্থতাকারী সামরিক ধরন থেকে বিবর্তিত হয়ে গঠিত হয়। এতে সামরিক বাহিনী সাময়িক সংকট-সমাধানকারী শক্তি থেকে ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের স্থায়ী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উপাদানে পরিণত হয়। এর আদর্শ উদাহরণ হলো পাকিস্তান, তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়া। যেখানে সামরিক বাহিনী তাদের রাজনৈতিক ভূমিকা সংবিধান ও আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। Bureaucratic Militarism ধরনের এই প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ঘটে বেসামরিক অংশীদারদের সহযোগিতায়, যারা নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য সামরিক পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভরশীল। ফলে উচ্চ ও মধ্য পর্যায়ের অফিসারগোষ্ঠী রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে আর বেসামরিক নেতৃত্ব patron–client সম্পর্কে আবদ্ধ থাকে। এখানে সামরিক বাহিনী পৃষ্ঠপোষক, বেসামরিক অংশীদাররা অনুসারী সুবিধা গ্রহীতা।

তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ায় সামরিক প্রভাব সংবিধানিক বৈধতা পেয়েছে National Security Council (NSC) বা সংসদীয় অনুমোদনের মাধ্যমে। যেমন: ইন্দোনেশিয়ায় ১৯৬৬ সালে সামরিক বাহিনীর ‘Dwifungsi’ বা “দ্বৈত ভূমিকা” (নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ) আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়। তুরস্কে NSC গঠন সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক ক্ষমতা স্থায়ী করে। পাকিস্তানে জিয়া উল হক ও মুশাররফের সময় NSC প্রবর্তনের মাধ্যমে সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। এই ধরনে সামরিক বাহিনী নিজেদের রাজনৈতিক ভূমিকার যুক্তি দেয় ‘রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষার দায়িত্ব’ পালনকারী হিসেবে। তারা দাবি করে, সরকারের উচ্চপর্যায়ে সামরিক উপস্থিতি বেসামরিক ‘দায়িত্বহীনতা’র বিরুদ্ধে একটি নিরাপত্তা বেষ্টনী (firewall) হিসেবে কাজ করে। বাস্তবে, এটি ক্ষমতার সহ-অংশীদারিত্বের বৈধকরণ।

সামরিক বাহিনীর প্রভাব কেবল রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, তারা অর্থনীতিতেও ক্রমশ প্রবেশ করে এবং সামরিক পুঁজির পরিচিত একটি অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। এতে সক্রিয় ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এবং নির্বাচিত বেসামরিক অংশীদাররা যুক্ত থেকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও ব্যবসা ভাগাভাগি করে নেয়। এই কাঠামো crony capitalism বা স্বজনতোষী পুঁজিবাদ সৃষ্টি করে। যেখানে বড় ব্যবসায়ীরা সামরিক পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা হারায়। এই কাঠামো তিন স্তরে গঠিত: ১. অভিভাবক প্রতিষ্ঠান, ২️. সহযোগী প্রতিষ্ঠান, ৩️. ব্যক্তিগত সদস্য। তিন স্তরই পারস্পরিকভাবে সম্পদ আহরণে যুক্ত এবং মুনাফা মূলত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়।

সামরিক বাহিনীর প্রভাব কেবল রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, তারা অর্থনীতিতেও ক্রমশ প্রবেশ করে এবং সামরিক পুঁজির পরিচিত একটি অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। এতে সক্রিয় ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এবং নির্বাচিত বেসামরিক অংশীদাররা যুক্ত থেকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও ব্যবসা ভাগাভাগি করে নেয়। এই কাঠামো crony capitalism বা স্বজনতোষী পুঁজিবাদ সৃষ্টি করে।

অর্থনৈতিক স্বার্থ ও রাজনৈতিক প্রভাব একত্রে সামরিক বাহিনীকে রাষ্ট্রের সম্পদ পুনর্বণ্টন প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করে। এই কাঠামো সমাজ ও অর্থনীতিতে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি সৃষ্টি করলেও বেসামরিক সমাজের দুর্বলতা ও রাজনৈতিক বিভাজন সামরিক প্রভাবকে টিকিয়ে রাখে। অবশেষে এই সামরিক ধরন এক দীর্ঘমেয়াদী ক্ষমতা–সংরক্ষণ প্রকল্প ‘হয়ে ওঠে’। যেখানে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রের অভিভাবক রূপে নিজেদের স্থায়ী অবস্থান নিশ্চিত করে। রাজনৈতিক অংশীদারদের মাধ্যমে প্রভাব ছড়িয়ে দেয় এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ঘটায়।

সামরিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা একধরনের ‘patronage system’ বা দান–অনুগ্রহভিত্তিক কাঠামো এদের রাজনৈতিক ক্ষমতার অন্যতম ভিত্তি। রাষ্ট্রে NSC–এর মতো প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য দেশের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর স্থায়ী অবস্থানের নির্দেশক। এই শক্তির বাস্তবতা অনেক বেসামরিক রাজনীতিককে বাধ্য করে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে আপস করতে। আর সামরিক বাহিনীও নিজেদের অবস্থান অটুট রাখতে তাদের ব্যবহার করে। সামরিক বাহিনীর arbitrator ধরন থেকে parent–guardian ধরনের দিকে রূপান্তর একটি ধীরগতি ও দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া, যা মূলত সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠে। আর এই ‘হয়ে ওঠা’র জন্য সামরিক বাহিনী বিভিন্ন ধরনের যুক্তি হাজির করে সমাজে এবং তারা দাবী করে যে, এই প্রক্রিয়া ‘গণতন্ত্র শক্তিশালী হওয়ার পূর্বশর্ত’। 

৬. যুদ্ধবাজ ধরন (The Warlord Type) 

যুদ্ধবাজ বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা যেখানে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং ‘কার্যকর’ সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়। এই শূণ্যস্থান পূরণ করে এমন সব ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যারা নিজেদের সামরিক শক্তিকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। আফ্রিকা ও এশিয়ার বহু রাষ্ট্র যেমন ইথিওপিয়া, লাইবেরিয়া, সিয়েরা লিওন, সোমালিয়া, রুয়ান্ডা, আফগানিস্তান — এই শাসনধারার উদাহরণ।

সরকার জনগণকে মৌলিক সেবা দিতে ব্যর্থ, প্রশাসন দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত, রাজনীতি ক্লায়েন্টবাদী, যেখানে স্থানীয় নেতারা জনগণের আনুগত্য কেনে সুরক্ষা ও সুবিধার বিনিময়ে – অনেকটা সামন্ততান্ত্রিক পৃষ্ঠপোষকতার মতো। এই কাঠামোয় নেতৃত্ব সাধারণত জাতিগত বা কৌমভিত্তিক এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেয় নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ভিত্তিক গোষ্ঠী। ওয়ারলর্ডদের ক্ষমতার ভিত্তি নির্ভর করে মূলত সামরিক শক্তি ও সম্পদ আহরণের ক্ষমতার ওপর। তাদের বাহিনী স্থানীয় হতে পারে আবার বিদেশী ভাড়াটে সৈন্যের মাধ্যমেও গঠিত হতে পারে। সিয়েরা লিওনের মতো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নেতারাই নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস করেছে এবং পরে নিজেরাই ওয়ারলর্ডে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতা ও শোষণের পরিমাণ নির্ধারিত হয় ‘যার যত সামরিক ক্ষমতা, তার তত লুণ্ঠনের অধিকার’ — এই নীতিতে।

এ অবস্থায় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ধারণা অকার্যকর হয়ে যায়। রাজস্ব ও প্রশাসনিক সক্ষমতা এত দুর্বল হয় যে সরকার নিজ সেনাবাহিনী চালাতেও অক্ষম। ফলে ওয়ারলর্ডরা হয়ে ওঠে প্রকৃত সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির কেন্দ্র। এই ব্যবস্থায় পেশাদার সামরিক বাহিনীর বিকাশ অসম্ভব। সৈন্যরা স্বল্পবেতনের কারণে লুটপাট ও চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়ে। শাসকগোষ্ঠী নিরাপত্তা রক্ষার অজুহাতে বিদেশী ভাড়াটে সেনা ব্যবহার করে। যা রাষ্ট্রকে আরও বিদেশী শক্তি নির্ভর ও অস্থিতিশীল করে তোলে। ক্রমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং অপেশাদার, বিপ্লবী ওয়ারলর্ড-নির্ভর বাহিনী-ই বাস্তবে শাসনের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। তবে তুলনামূলকভাবে সংগঠিত বা শক্তিশালী সামরিক বাহিনী নিজের স্বার্থ রক্ষায় সরাসরি লুটপাটে নয় বরং বৈধ প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব ব্যবহারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অংশীদার হতে চায়।  

গবেষক আয়েশা সিদ্দিকার বিশ্লেষণ অনুযায়ী এই পর্বের শেষে বলা যায় যে, বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রেই সামরিক প্রতিষ্ঠান কোনো না কোনোভাবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে, অবস্থা-অবস্থানবিশেষে কেবল তার রূপ ও মাত্রা ভিন্ন হয়। (চলবে)

আগের পর্ব: আয়েশা সিদ্দিকার ‘পাকিস্তানের সামরিক অর্থনীতির অন্দরমহল’

মেহেদী হাসান: লেখক, গবেষক। ই-মেইল: mehedihassan1@gmail.com

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •