আয়েশা সিদ্দিকার পাকিস্তানের সামরিক অর্থনীতির অন্দরমহল

আয়েশা সিদ্দিকার পাকিস্তানের সামরিক অর্থনীতির অন্দরমহল

মেহেদী হাসান

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কিছুদিনের মধ্যেই সেখানে সামরিক বাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্য শুরু হয় যা এখন পর্যযন্ত  অব্যাহত আছে। এই দেশের রাজনীতি অর্থনীতি পররাষ্ট্র নীতি সবকিছুতেই সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্ব প্রশ্নাতীত। এর বাইরে বের হবার চেষ্টা হয়েছে কিন্তু কুলায়নি। এই ক্ষমতার বিন্যাস তৈরিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ অবদান আছে। তাদের সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতা বিস্তারে পাকিস্তান বরাবর একটা খুটি হিসেবে কাজ করেছে। এটি টিকিয়ে রাখায় তাই তাদের বরাবর সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা থেকেছে। বরাবর ব্যবহৃত হলেও পাকিস্তানে সাম্রাজ্যবাদী হামলা এবং অপমানেরও নজির অনেক। পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর একক কর্তৃত্ব অর্থনীতি ক্ষেত্রে কী রূপ নিয়েছে তার বিশদ বিশ্লেষণ করেছেন পাকিস্তানের সমাজবিজ্ঞানী আয়েশা সিদ্দিকা। তাঁর গ্রন্থ (Ayesha Siddiqa; Military Inc.: Inside Pakistan’s Military Economy, Pluto Press, London, 2007, 2017) ভিত্তি করেই এই লেখা তৈরি করা হয়েছে যা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে।

সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তম্ভ। কোনো কোনো দেশে সামরিক বাহিনী কেবল শাসকশ্রেণির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে, কোথাও আবার রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে সীমাবদ্ধ থাকে না, ‘জাতীয় ঐক্য’ বা ‘রাষ্ট্ররক্ষা’ ইত্যাদির অজুহাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে কিংবা দেশের রাজনীতির অঙ্গনে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের অন্যসব প্রতিষ্ঠানকে ছাপিয়ে শাসনক্ষমতার কেন্দ্রে স্থান করে নেয়। এর কারণ কী? এটি অনেকের কাছে রহস্যময় একটি প্রশ্ন। বিভিন্ন গবেষক নানা দৃষ্টিকোণ ও পদ্ধতি ব্যবহার করে এর উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করেছেন। কেউ বলেছেন, সেনা ও বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের শক্তির ভারসাম্যের অভাব এ সমস্যার মূলে। কেউ-বা বলেছেন, সমাজের চরিত্রই সেনাদের রাজনীতিমুখী করে তোলে। কেউ আবার সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক অর্থনীতি অর্থাৎ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, এটিই মূল কারণ। তবে এ বিষয়ে সাধারণভাবে একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো, শক্তিশালী সেনাবাহিনী তাদের প্রভাবের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি করে এবং বেসামরিক সরকারকেও সেই পথে যেতে বাধ্য করে। এর ফলে তাদের অর্থনৈতিক শক্তি আরও বৃদ্ধি পায় এবং রাষ্ট্র–রাজনীতির ওপর তাদের প্রভাব ক্রমাগত বৃদ্ধি করতে পারে; আর এটিই হলো মূল নিয়ামক।

এই সমস্ত বিশ্লেষণের পাশাপাশি ড. আয়েশা সিদ্দিকা তার গবেষণামূলক গ্রন্থটিতে বিভিন্ন দেশের সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক, বিশেষ করে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর সামগ্রিক রাজনৈতিক অর্থনীতিকে ব্যাখ্যা করেছেন। অন্যান্য সাহিত্যে যেখানে সামরিক বাহিনীর অধীন অর্থনীতিকে বিশ্লেষণ করে, সেখানে তিনি সেনাবাহিনীর কাঠামোর ভেতরের এবং বাইরের অর্থনীতি ও তার সঙ্গে ‘হয়ে ওঠা’ ক্ষমতার সম্পর্ককে বিশ্লেষণ করেন। এর ফলে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক পরিসরে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ, ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান, তার প্রভাব-প্রতিপত্তি; সর্বোপরি রাষ্ট্র এবং রাজনীতিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ‘হয়ে ওঠা’র প্রক্রিয়াগুলো বোঝার ক্ষেত্রে আয়েশা সিদ্দিকার তাত্ত্বিক কাঠামোর লেন্সটি একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী হাতিয়ার। সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক-অর্থনীতির সামগ্রিকতা বোঝার ক্ষেত্রে অন্যান্য বিশ্লেষণের যে শূন্যস্থান সেটি পূরণ করেন ড. আয়েশা সিদ্দিকা।

ড. আয়েশা সিদ্দিকা তার গবেষণামূলক গ্রন্থটিতে বিভিন্ন দেশের সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক, বিশেষ করে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর সামগ্রিক রাজনৈতিক অর্থনীতিকে ব্যাখ্যা করেছেন। অন্যান্য সাহিত্যে যেখানে সামরিক বাহিনীর অধীন অর্থনীতিকে বিশ্লেষণ করে, সেখানে তিনি সেনাবাহিনীর কাঠামোর ভেতরের এবং বাইরের অর্থনীতি ও তার সঙ্গে ‘হয়ে ওঠা’ ক্ষমতার সম্পর্ককে বিশ্লেষণ করেন।

তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শক্তিশালী সেনাবাহিনীর প্রভাবে প্রতিরক্ষা বাজেটে বেশি অর্থ-সম্পদ বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং বেসামরিক সরকারগুলোকে সেই পথ অনুসরণ করতে বাধ্য করে এটি ঠিক। তবে প্রতিরক্ষা বাজেট সামগ্রিকভাবে সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক অর্থনীতির চরিত্রকে ব্যাখ্যা করতে পারে না; এটি হলো বাহিনীর অর্থনীতির একটি অংশ মাত্র। সেনাবাহিনীর দ্বারা পরিচালিত বাণিজ্যিক বা মুনাফামুখী উদ্যোগ, যেখানে সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পৃক্ততা থাকে বা প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তা সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি বৃহৎ অংশ গঠন করে; যাকে পূর্বে পদ্ধতিগতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি। সে দিক থেকে তার গবেষণা সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার একটি চালিকাশক্তি হিসেবে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং সেনা সদস্যদের ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বার্থের রাজনৈতিক অর্থনীতি পরীক্ষা করে।

সেনাবাহিনীর দ্বারা পরিচালিত বাণিজ্যিক বা মুনাফামুখী উদ্যোগ, যেখানে সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পৃক্ততা থাকে বা প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তা সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি বৃহৎ অংশ গঠন করে; যাকে পূর্বে পদ্ধতিগতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি।

তিনি তার গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, বাস্তবে অর্থনৈতিক ক্ষমতাই তাদের রাজনৈতিক প্রভাবের ভিত্তি। জেনারেল ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নিজেদের এবং সহকর্মীদের জন্য বিশেষ সুবিধা আদায় করেন, ফলে অর্থনৈতিক লাভ তাদের ক্ষমতা স্থায়ী করার প্রেরণা জোগায়। বেসামরিক শাসকগোষ্ঠী অনেক সময় এই অভ্যন্তরীণ সামরিক অর্থনীতির গুরুত্ব বোঝে না। সমীকরণটি হলো এই যে, সামরিক বাহিনীর আর্থিক সুবিধা যত বাড়ে, ততই আনুপাতিক হারে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পায়, দৃঢ় হয়। আর এই রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসনের আন্তঃসম্পর্কই হলো Military Business, সংক্ষেপে আয়েশা সিদ্দিকা যার নাম দিয়েছেন; Mil-Bus (‘মিল-বিজ’ বা ‘মিল-বাস’)। আয়েশা সিদ্দিকার গবেষণা অনুযায়ী, এই মিল-বিজ হলো সেনাবাহিনীর সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক অর্থনীতিকে দেখার একটি তাত্ত্বিক লেন্স।

মিল-বিজ কী

Bonn International Center for Conversion (BICC)-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী মিল-বিজ হলো সেনাবাহিনীর অধীন সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, যা সরকারি হিসাবের মধ্যে থাকে। তবে আয়েশা সিদ্দিকা এর সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে একে সংজ্ঞায়িত করেছেন একটু ভিন্নভাবে। তিনি দেখিয়েছেন যে, মিল-বিজ হলো সরকারি প্রাতিষ্ঠানিক হিসাববহির্ভূত এমন এক সামরিক পুঁজি, যা সেনা সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহৃত হয় এবং এটি রাষ্ট্রীয় বাজেটের হিসাববহির্ভূত একটি প্রক্রিয়া। এমনকি রাষ্ট্রীয় কোনো প্রকার জবাবদিহির মধ্যে সেনাবাহিনীর এই প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত নয়। এটি এমন এক স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক ক্ষেত্র, যার নিয়ন্ত্রণ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সেনাবাহিনীর হাতে থাকে। এই নতুন সংজ্ঞায় তিনটি মৌলিক উপাদান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে: ১. অর্থনৈতিক কার্যক্রমের উদ্দেশ্য, ২. মিল-বিজের অংশীদার বা সুবিধাভোগী গোষ্ঠী এবং ৩. জবাবদিহির কাঠামো।

মিল-বিজ হলো সরকারি প্রাতিষ্ঠানিক হিসাববহির্ভূত এমন এক সামরিক পুঁজি, যা সেনা সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহৃত হয় এবং এটি রাষ্ট্রীয় বাজেটের হিসাববহির্ভূত একটি প্রক্রিয়া। এমনকি রাষ্ট্রীয় কোনো প্রকার জবাবদিহির মধ্যে সেনাবাহিনীর এই প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত নয়। এটি এমন এক স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক ক্ষেত্র, যার নিয়ন্ত্রণ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সেনাবাহিনীর হাতে থাকে।

মিল-বিজ বলতে বোঝানো হয় এমনসব কার্যক্রমকে, যার মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা সামরিক বাহিনী কিংবা বাহিনী-সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে স্থানান্তরিত হয় অথচ এ প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি বা স্বচ্ছতার স্বাভাবিক ন্যূনতম কোনো নিয়ম অনুসরণ করা হয় না। এর মূল লক্ষ্য থাকে মুনাফাকেন্দ্রিক পুঁজির কেন্দ্রীভবন, পুঞ্জীভবন ও সম্প্রসারণ।

এই জবাবদিহিহীন এবং রাষ্ট্রীয় হিসাববহির্ভূত সম্পদ হস্তান্তর নানারূপে ঘটতে পারে, যেমন:

  • রাষ্ট্রীয় জমি সামরিক সদস্যদের ব্যক্তিগত মালিকানায় হস্তান্তর করা;
  • অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের জন্য বিলাসবহুল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। যেমন- ব্যক্তিগত সহকারী বা স্টাফ সরবরাহ, অভিজাত ক্লাবের সদস্যপদ, ইউটিলিটি বিল ও ভ্রমণে ভর্তুকি অথবা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ি আমদানিতে ছাড় প্রদান;
  • ‘মুক্তবাজার’ অর্থনীতির নীতি উপেক্ষা করে সরাসরি সেনাসদস্য বা সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবসায়িক সুযোগ দেওয়া। (মুক্তবাজার সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে খুব সতর্ক থাকা প্রয়োজন যে, এই মুক্তবাজার অর্থনীতি কিন্তু সবার জন্য মুক্ত নয়। পুঁজিবাদী মুক্তবাজার অর্থনীতির কথা বলে কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতাবান সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র/সংস্থা/শ্রেণি/গোষ্ঠী/সম্প্রদায় তাদের নিজেদের জন্য সুরক্ষার বেড়া তৈরি করে কিন্তু, অন্যদিকে অধীন/অনুগত/অনুগামী/দখলকৃত রাষ্ট্রের শাসকশ্রেণিকে বাজার উন্মুক্ত করার জন্য চাপ দেয় যাতে প্রথমোক্তরা দ্বিতীয়োক্তদের বাজার দখল করে পুঁজি-মুনাফার সম্প্রসারণ, কেন্দ্রীভবন, ঘনীভবন, পুঞ্জীভবন ঘটাতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গির রাজনৈতিক সাহিত্যিক মোড়কে দেওয়া নাম হলো ‘নয়া উদারনৈতিক মুক্তবাজার’। ৮০-র দশকে এর প্রসার ঘটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র [রোনাল্ড রেগান আমল] এবং ব্রিটেনের [মার্গারেট থ্যাচার আমল] সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির ভাড়াটে/পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত রাজনীতিবিদ/বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে।)
  • রাষ্ট্রীয় প্রশিক্ষণ ব্যয়ের অপচয়। যখন সামরিক কর্মীরা আগেভাগে অবসর নিয়ে বেসরকারি খাতে যোগ দেয় (যুক্তরাষ্ট্র) এবং সরকার পরবর্তী সময়ে অনেক বেশি পারিশ্রমিকে একই ব্যক্তিদের রাষ্ট্র নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের জন্য পুনরায় নিয়োগ দেয়।

সামরিক সদস্যদের ‘কল্যাণে’র উদ্দেশ্যে এসব ব্যয় বা মুনাফা কোনো বছরেই সরকারি প্রতিরক্ষা বাজেটের আনুষ্ঠানিক অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয় না। বর্তমানে কর্মরত উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা যেমন এই সুবিধাভোগীদের মধ্যে পড়ে, তেমনি এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে–

  • অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা এবং
  • সেই সমস্ত বেসামরিক ব্যক্তি, যারা সামরিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক বা অংশীদারিত্বের ওপর নির্ভরশীল।

উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা প্রধান সুবিধাভোগী। কারণ পদমর্যাদার কারণে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং সেইসঙ্গে নিজেদের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করার ক্ষমতা অন্যদের চেয়ে তাদের বেশি থাকে। এর ফলে তারা সহজেই রাষ্ট্র ও সরকারের সঙ্গে দরকষাকষি করে বিভিন্ন সুবিধা, প্রণোদনা ও বিশেষ অধিকার আদায় করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক ক্ষমতা যত বৃদ্ধি পায়, তাদের আর্থিক প্রাপ্তিও তত বৃদ্ধি পায়।

এই পুরো সুবিধা-ব্যবস্থাটিকে সাধারণত ভুলভাবে ‘কল্যাণমূলক কার্যক্রম’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়। কারণ, তথাকথিত এই কল্যাণ-ব্যবস্থা আসলে ‘চাহিদা-নির্ভর’ নয়, বরং ‘সরবরাহ- নির্ভর’। অর্থাৎ সামরিক বাহিনী যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে সেটি সাধারণ মানুষের সামষ্টিক চাহিদা কিংবা আকাঙ্ক্ষার কারণে দেওয়া হয়নি, বরং ঠিক এর বিপরীত। মিল-বিজের প্রকৃতি ও পরিমাণ নির্ধারণ করে সমাজ নয়, বরং সেই সামরিক গোষ্ঠীই–যারা এর সুবিধাভোগী। তাদের আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে এই সুবিধার পরিধি নির্ধারণ করা হয়। তাই একে বলা হয় ‘সরবরাহ-নির্ভর’ সুবিধা। মোটকথা, রাষ্ট্র সামরিক বাহিনীকে প্রয়োজনাতিরিক্ত যে সুবিধা সরবরাহ করে তা সর্বজনের (Public) চাহিদার ভিত্তিতে নয়। তা দেয় বাহিনীর প্রভাবের কারণে। যেমন- আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট বা সেনা কল্যাণ সংস্থার জন্য দেওয়া বিশেষ সুযোগ-সুবিধা। সমাজ কেবল তথাকথিত এই কল্যাণের ব্যয়ভার বহন করে, কিন্তু এর শর্ত বা সীমা নির্ধারণের ক্ষমতা রাখে না।

জবাবদিহি – এটি মিল-বিজের কেন্দ্রীয় একটি প্রশ্ন। আয়েশা সিদ্দিকা দেখিয়েছেন যে, অধিকাংশ দেশেই মিল-বিজ সংক্রান্ত কার্যক্রম প্রকাশ্যে আসে না। বিশেষ করে সামরিক কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলোতে সেনাবাহিনীর ‘অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি’র কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা বা তদন্ত পুরোপুরি নিষিদ্ধ। এসব বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ বা বিতর্ক শুরু হলে সেনাবাহিনী সেটিকে তাদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করে। উদাহরণস্বরূপ, তুরস্কের সংসদ সামরিক ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে না, ফলে সেখানে বিষয়টি বেসামরিক সাধারণ মানুষের জন্য অজানাই রয়ে যায়। তুরস্কের Armed Forces Mutual Assistance Fund (OYAK) অন্যতম বৃহৎ ব্যবসায়িক কংগ্লোমারেট। তবুও এর কার্যক্রম সম্পর্কে সংসদ বা জনগণ কিছুই জানতে পারে না। 

একইভাবে পাকিস্তানে Fauji Foundation (FF) হলো শীর্ষ সামরিক-বাণিজ্যিক গোষ্ঠীগুলোর একটি। যদিও সর্বজনের করের অর্থে রাষ্ট্র তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়, কিন্তু তারা এ-সংক্রান্ত কোনো হিসাব সর্বজনের সামনে প্রকাশ করতে নারাজ। এ-সংক্রান্ত একটি উদাহরণ হলো, ২০০৫ সালে জেনারেল পারভেজ মোশাররফের শাসনামলে পাকিস্তানের ‘নির্বাচিত সংসদ’ এই ফাউন্ডেশনের একটি প্রতিষ্ঠান – ফৌজি ফার্টিলাইজার-এর একটি বিতর্কিত ব্যবসায়িক চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন হাজির করে এবং সংসদে তার কারণ দর্শানোর দাবি তোলে। ফৌজি ফার্টিলাইজারের প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ আমজাদ, রাষ্ট্রের প্রধান জেনারেল পারভেজ মোশাররফের সংসদকে সাফ জানিয়ে দেন যে, সংসদের সামনে হিসাবসংক্রান্ত কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে তিনি ইচ্ছুক নন। বাস্তবিক অর্থে, সামরিক পুঁজি সংক্রান্ত সম্পদ বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংক্রান্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার নিয়ম অনুসরণ করে না, এমনকি সেগুলো সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিক প্রকল্প বা রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত কর্মসূচি হলেও না। ফলে দুর্নীতির সম্ভাবনা ও পরিসর–উভয়ই বহুগুণ বেড়ে যায়।

মিল-বিজের কাঠামো ও কার্যপ্রণালি দেশভেদে ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশ পায়। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইসরায়েল ও দক্ষিণ আফ্রিকায় সামরিক পুঁজি বেসামরিক করপোরেট খাত ও সরকারের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। অন্যদিকে ইরান ও চীনে এটি দেখা যায় শাসক রাজনৈতিক দল বা কোনো প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্বের রূপে। আবার তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে মিল-বিজ পুরোপুরি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়, অর্থাৎ এই দেশগুলোতে সেনাবাহিনীই এই অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির নির্ধারক চালিকাশক্তি। এই দেশগুলোতে বেসামরিক অংশীদার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে এক ধরনের বিপরীত অংশীদারিত্বমূলক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কারণ সেনাবাহিনী রাষ্ট্র ও রাজনীতির ওপর সর্বব্যাপী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে রেখেছে।

সামরিক পুঁজি এমন একটি প্রেরণা যা সেনাবাহিনীকে ক্ষমতা দখলের জন্য উদ্বুদ্ধ করে। অন্যদিকে এই ক্ষমতা আবার বাহিনীকে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া ও সম্পদ বণ্টনের ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রাতিষ্ঠানিক আগ্রহকে ত্বরান্বিত করে। সে হিসেবে বলা যায় তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার ও পাকিস্তানে এই পুঁজির উদ্ভব ও বিকাশ মূলত সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার ফলাফল। এবং এর ফলে গণতন্ত্র বা আইনের শাসন বাধাগ্রস্ত হয় যা রাষ্ট্রকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্থিতিশীল করে তোলে।

স্বাভাবিকভাবেই তখন একটি প্রশ্ন তৈরি হয় যে, যখন সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ লাভের উদ্দেশ্যে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীকে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক প্রভাবের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তখন তারা কি সত্যিই ইচ্ছুক থাকে নিজেদের ব্যারাকে ফিরে যেতে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশ ঘটাতে? এর উত্তর অনুসন্ধানের জন্য আয়েশা সিদ্দিকা তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়ার থেকে ভিন্ন এক প্রেক্ষাপট, পাকিস্তানকে একটি কেস স্টাডি হিসেবে গ্রহণ করেছেন, যে দেশটির শাসনব্যবস্থা মূলত সামরিক-স্বৈরতান্ত্রিক এবং যেখানে রাষ্ট্রপ্রধান প্রায়ই নিজেই একজন সেনা জেনারেল।

মিল-বিজের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক প্রকৃতি এবং এর যুক্তির ভিত্তি

মিল-বিজ মূলত দুটি বিস্তৃত কিন্তু স্বতন্ত্র ধরনের কার্যক্রমকে অন্তর্ভুক্ত করে–

১. নিরাপত্তার বেসরকারিকরণের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন: এই ধারা মূলত শিল্পোন্নত পুঁজিবাদী অর্থনীতির দেশগুলোতে দেখা যায়। ওইসব রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী সরাসরি বাণিজ্যিক খাতে প্রবেশ না করে বরং নির্বাচিত সামরিক সদস্যরা বিভিন্ন কার্যক্রম যেমন প্রশিক্ষণ প্রদান বা অস্ত্র উৎপাদনের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করে। এই উদ্যোগগুলোর জন্য পুঁজির জোগান দেয় বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা এবং অর্জিত মুনাফা সেনাসদস্য ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভাগ করা হয়। এই মডেলটি মূলত পুঁজিবাদী করপোরেট চরিত্রের, যেখানে পুঁজির বণ্টন ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন বিদ্যমান। এ ক্ষেত্রে ‘মুনাফা-শিকারি’ ধরনের আচরণ সাধারণত নিজ দেশের বাইরে, বিদেশে পরিচালিত হয়।

২. সামরিক বাহিনীর অপ্রচলিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা: এটি প্রধানত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দেখা যায়। এখানে সেনাবাহিনী নিরাপত্তা সম্পর্কিত কাজের বাইরে গিয়ে কৃষিকাজ, পণ্য উৎপাদন, হোটেল ব্যবসা, এয়ারলাইনস, ব্যাংক, রিয়েল এস্টেট সংস্থা বা অন্যান্য বেসামরিক ব্যবসা পরিচালনায় যুক্ত হয়। অর্থাৎ, তারা এমনসব খাতে সক্রিয় থাকে, যা রাষ্ট্ররক্ষা বা সামরিক নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়; বরং অর্থনৈতিক লাভ অর্জনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয় এবং এই ঘটনাগুলো ঘটে নিজ দেশের অভ্যন্তরে। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের যুগে সামরিক পুঁজিই-বা কেন বেসামরিক পুঁজির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে না!

এটি প্রধানত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দেখা যায়। এখানে সেনাবাহিনী নিরাপত্তা সম্পর্কিত কাজের বাইরে গিয়ে কৃষিকাজ, পণ্য উৎপাদন, হোটেল ব্যবসা, এয়ারলাইনস, ব্যাংক, রিয়েল এস্টেট সংস্থা বা অন্যান্য বেসামরিক ব্যবসা পরিচালনায় যুক্ত হয়।

সামরিক বাহিনীর যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে বিবেচনায় নিয়ে আয়েশা সিদ্দিকা তার তাত্ত্বিক উপরিকাঠামোর যুক্তি সম্প্রসারণ করেছেন তিনটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে। সেগুলো হলো:

প্রথমত, মিল-বিজ সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ‘শিকারি মনোভাব’কে চিরস্থায়ী করতে ইন্ধন জোগায়। ‘হয়ে ওঠা’ শিকারি মনোভাব-এর ফলাফল সম্পর্কে তিনি বলেন: 

Milbus represents the institutionalisation of economic exploitation, and this has an impact on the military’s character. This kind of economy transforms the military into a predatory institution which uses power for the economic advantages of the armed forces, especially the military elite. Already depressed by the greed of other dominant classes, common people even lose hope in the military’s ability to deliver justice as an arbitrator. The resultant alienation could push the society towards other, often extreme, ideologies. (Intro, p 34) 

এই ধরনের শিকারি পুঁজির বৈশিষ্ট্য হলো- এটি গোপন থাকে, প্রতিরক্ষা বাজেটের অংশ হিসেবে নথিভুক্ত হয় না এবং রাষ্ট্রের সরকারি খাত থেকে বেসরকারি খাতে, বিশেষ করে সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছে অজানা ও প্রশ্নবিদ্ধ উপায়ে অর্থ-সম্পদের স্থানান্তর ঘটায়। অন্যদিকে, এই পুঁজির পরিমাণ নির্ভর করে অর্থনীতিতে সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততা এবং রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর তার প্রভাব কতটা তার ওপর। ফলে মুনাফা সংবর্ধন ক্ষমতার অনুপাতে বাড়ে বা কমে। আর্থিক স্বায়ত্তশাসন সেনাবাহিনীর বেসামরিক প্রশাসনের বিপরীতে অদ্ভুত এক ক্ষমতাবোধ ও শ্রেষ্ঠত্বের আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। সামরিক বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা এই অর্থনৈতিক লাভকে ন্যায্যতা দেন এই যুক্তিতে যে, এটি আসলে রাষ্ট্রকে সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ সেনাবাহিনীর জন্য প্রদত্ত এক ধরনের ‘কল্যাণমূলক’ ব্যবস্থা। কিন্তু ‘কল্যাণ’ বলতে কী বোঝাবে এবং এর সীমা কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা ঠিক করে দেয় কেবল সেনাবাহিনীই। ফলে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও রাজনৈতিক লাভের এই পারস্পরিক সম্পর্ক সামরিক পুঁজির শিকারি প্রকৃতি ও দখলদার মানসিকতাকে আরও তীব্র করে তোলে। অন্যদিকে এর প্রভাবে রাষ্ট্রের শিকারি মনোভাব চাঙ্গা হয়। ফলে জনগণের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্রমান্বয়ে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকে।

সামরিক বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা এই অর্থনৈতিক লাভকে ন্যায্যতা দেন এই যুক্তিতে যে, এটি আসলে রাষ্ট্রকে সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ সেনাবাহিনীর জন্য প্রদত্ত এক ধরনের ‘কল্যাণমূলক’ ব্যবস্থা। কিন্তু ‘কল্যাণ’ বলতে কী বোঝাবে এবং এর সীমা কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা ঠিক করে দেয় কেবল সেনাবাহিনীই।

দ্বিতীয়ত, স্বৈরতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সেনাবাহিনীর অর্থনৈতিক লোভ ও শিকারি প্রবণতা আরও বেড়ে যায়। ব্যক্তিগত লাভের প্রেরণায় সেনা অফিসার সম্প্রদায় এমন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে, যা তাদের অর্থনৈতিক সুবিধা ও মুনাফা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এমন পরিবেশ সৃষ্টি করে, যা তাদের অর্থনৈতিক সুযোগকে বহুগুণে বৃদ্ধি করে। পাকিস্তান বা মিয়ানমারের মতো টোটালিটারিয়ান বা সর্বক্ষমতাবাদী রাষ্ট্রগুলোর সমাজ-অর্থনৈতিক কাঠামোতে এখনো প্রাক-পুঁজিবাদী উপাদানগুলো রয়েছে। এসব দেশে অর্থনীতি যথেষ্ট বিকশিত না হওয়ায় (কেন্দ্রীয় পুঁজিবাদী দেশের তুলনায়) সেনাবাহিনী সরাসরি অর্থনৈতিক শোষণের অংশীদার হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, ‘উন্নত’ অর্থনীতিগুলোতে সামরিক সরঞ্জাম ও সেবা খাতের বেসরকারি পুঁজি বিনিয়োগ থেকে যে মুনাফা আসে তা মূলত বেসরকারি খাতেই পুঞ্জীভূত হয়। সেনাবাহিনীও এই লাভজনক ব্যবস্থার দ্বিতীয় পর্যায়ের সুবিধাভোগী হিসেবে অংশগ্রহণ করে, যা তাকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

স্বৈরতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সেনাবাহিনীর অর্থনৈতিক লোভ ও শিকারি প্রবণতা আরও বেড়ে যায়। ব্যক্তিগত লাভের প্রেরণায় সেনা অফিসার সম্প্রদায় এমন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে, যা তাদের অর্থনৈতিক সুবিধা ও মুনাফা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

সামরিক বাহিনীকে যে অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয় কিংবা পুঁজির সম্প্রসারণের জন্য যে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হয় কিংবা সামরিক বাহিনীর জন্য যে ব্যয় নির্বাহ করা হয়; তার উৎস কী? চার্লস টিলির predator state ধারণা অনুযায়ী, রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনী নিরাপত্তার অজুহাতে নাগরিকদের কাছ থেকে জবরদস্তিমূলকভাবে কর বা tribute (উপঢৌকন) আদায় করে – যেমনটি ইউরোপের পুঁজিবাদের আগের সামন্তীয় যুগে দেখা গিয়েছিল। ফ্রেডেরিক লেনের বিশ্লেষণও দেখায় যে, এই জনগণ প্রদত্ত নিরাপত্তাভিত্তিক কর আসলে ক্ষমতা ও সম্পদ আহরণের উপায়। আধুনিক যুগে মিল-বিজ সেই ঐতিহাসিক tribute-এরই রূপ, যেখানে সেনাবাহিনী ‘জনকল্যাণ’ ও ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র নামে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করে। সামরিক বা কর্তৃত্ববাদী শাসনে রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীর স্বার্থে জনগণের কাছ থেকে জোরপূর্বক বহুগুণে এই উপঢৌকন আদায় করা হয়।

তৃতীয়ত, সেনাবাহিনীর অর্থনৈতিক শিকারি প্রবণতা, বিশেষ করে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে, একই সঙ্গে কারণ ও ফলাফল–উভয়ই। এটি গড়ে ওঠে এক ধরনের সামন্ততান্ত্রিক, কর্তৃত্ববাদী ও অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিতের ওপর। যেমন- সামন্ত প্রভু বা বৃহৎ পুঁজিপতি শ্রেণি নিজেদের স্বার্থে জাতীয় সম্পদ ব্যবহার করে, তেমনি সেনাবাহিনীও রাষ্ট্রের সম্পদ নিজেদের সদস্যদের সুবিধার্থে শোষণ করে। এরিক হবসবমের মতে, সম্পদ শুধু পুঁজির নয়; ক্ষমতারও উৎস। সামন্তীয় কাঠামোয় সম্পদ সঞ্চয়ই ছিল রাজনৈতিক কর্তৃত্বের ভিত্তি। আর বর্তমানে শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে অনুগত গোষ্ঠীগুলোকে সম্পদ ও সুযোগ দিয়ে পুরস্কৃত করে, ফলে সৃষ্টি হয় পারস্পরিক নির্ভরশীল ‘পৃষ্ঠপোষক–গ্রাহক’ সম্পর্ক। এই ব্যবস্থায় সেনাবাহিনী শাসক এলিটের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয় এবং মিল-বিজ হয় সেই ক্ষমতাকেন্দ্রিক সম্পদ শোষণের আধুনিক রূপ।

সেনাবাহিনীকে এক সংগঠিত ভ্রাতৃসমাজ হিসেবে বোঝা জরুরি। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এই সামরিক নেটওয়ার্কের মূল অংশ, যারা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করেন। তাদের আনুগত্য, পারস্পরিক সহযোগিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগের ফলে গড়ে ওঠে এক শক্তিশালী old boy’s network, যা সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রেই প্রভাব বিস্তার করে। অনেক অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল রাজনীতিতে প্রবেশ করে নিজস্ব দল গঠন করেন বা বিদ্যমান রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতা দেন। ফলে রাজনীতি ও সামরিক স্বার্থ  একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়। এই নেটওয়ার্ক মিল-বিজের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও মজবুত করে। (এভাবে সামরিক বাহিনীসংশ্লিষ্ট বা নেটওয়ার্কের মধ্যদিয়ে সম্প্রসারিত পুঁজির মালিক ব্যক্তিবর্গ নিজেরাই সামগ্রিক [General] পুঁজিপতি শ্রেণির মধ্যে নির্দিষ্ট [Particular] একটি শ্রেণির ভিত্তি তৈরি করে।) তবে তথ্যের অপ্রাপ্যতার কারণে এর প্রকৃত আর্থিক মূল্যায়ন প্রায় অসম্ভব।

মিল-বিজের তাত্ত্বিক লেন্সে রাষ্ট্রীয় কাঠামো

আয়েশা সিদ্দিকার পুরো তাত্ত্বিক কাঠামোটি দাঁড় করানো হয়েছে একটি স্থিতিশীল বহুত্ববাদী রাষ্ট্রীয় কাঠামোর (নির্বাহী, আইনসভা, প্রশাসন, আদালত, পুলিশ, সামরিক বাহিনী এবং অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি করপোরেশন যার অন্তর্ভুক্ত) ওপর ভিত্তি করে। তার ধারণা অনুযায়ী, নাগরিক–সামরিক সম্পর্কের ধরন নির্ভর করে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক শক্তিমত্তা ও বহুত্ববাদী কাঠামোর ওপর। শক্তিশালী বহুত্ববাদী রাষ্ট্রে বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠী স্বাধীনভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারে। ফলে সেনাবাহিনীর প্রভাব সীমিত থাকে। বিপরীতে, দুর্বল রাষ্ট্রে রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হলে সেনাবাহিনী অর্থনীতি ও রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে। রাষ্ট্রকে এখানে একক সত্তা নয়, বরং বিভিন্ন শক্তির পারস্পরিক সম্পর্কের নেটওয়ার্ক হিসেবে দেখা হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে এই সম্পর্কগুলোর সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতায়। গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদ (নির্বাচনী প্রথা, যার একটি উপাদান) রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে। কারণ, এটি বলপ্রয়োগের বদলে সম্মতির ভিত্তিতে নীতি নির্ধারণে সহায়তা করে। ফলে নাগরিক সমাজ রাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিতে পারে এবং সামরিক দখলদারিত্ব থেকে সুরক্ষা পায়। বহুত্ববাদ বলতে তিনি ‘সীমিত কিন্তু অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুত্ববাদ’কে বুঝিয়েছেন, যেখানে সেনাবাহিনীসহ সব অংশীদারই রাষ্ট্রের অংশ হলেও কেউ একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না।

সেই সাথে তিনি এ-ও বলেছেন যে, ‘রাষ্ট্র তার কার্যসম্পাদনে সবসময়ই দুটি উপায় ব্যবহার করে – বলপ্রয়োগ ও সম্মতি (It must be remembered that states use both coercion and consent to fulfil their functions.)’ (Ch. 1 p. 38)। এই গবেষণার কাঠামো তাই মূলত রাজনৈতিক বহুত্ববাদকে রাষ্ট্র-সমাজ সম্পর্কের এবং রাষ্ট্রের শক্তি মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে ধরে। এখানে বহুত্ববাদ ও গণতন্ত্রকে আবার কোনো আদর্শিক বা নৈতিক মানদণ্ডে নয়, বরং কার্যকর রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়েছে; যেখানে বিভিন্ন পক্ষ বারবার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা, প্রতিযোগিতা ও পুনর্নির্ধারণ করতে পারে। এই পরিবেশের লক্ষ্য হলো এমন এক অবস্থা সৃষ্টি করা, যেখানে সেনাবাহিনী বা অন্য কোনো শক্তিধর গোষ্ঠী স্থায়ীভাবে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষকে দমন করতে না পারে।

বস্তুত বিশ্বের প্রায় সব দেশেই সেনাবাহিনী নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী অংশীদার। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে রাজনৈতিক সমাজ ও নীতিনির্ধারকরা সশস্ত্র বাহিনীকে প্রায়ই একটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান দিয়ে থাকে। কারণ তাদের সংগঠন-ক্ষমতা এবং শৃঙ্খলা। অন্যদিকে এই বৈশিষ্ট্যগুলো আবার তাদেরকে বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারের স্বাভাবিক সুবিধা দেয়। অতএব যদি কোনো রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ না থাকে, তবে সেনাবাহিনী সহজেই রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

কিন্তু যদি এই প্রভাব নিয়ন্ত্রণহীন থাকে, তাহলে সেনাবাহিনী তার সাংগঠনিক শক্তি ও বলপ্রয়োগের ক্ষমতার জোরে অন্য সব অংশীদারকে প্রভাবিত বা এমনকি সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, এমন পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী নিজেই রাষ্ট্রে পরিণত হয়, যেমনটি পাকিস্তানের ক্ষেত্রে দেখা যায়।

কিন্তু যদি এই প্রভাব নিয়ন্ত্রণহীন থাকে, তাহলে সেনাবাহিনী তার সাংগঠনিক শক্তি ও বলপ্রয়োগের ক্ষমতার জোরে অন্য সব অংশীদারকে প্রভাবিত বা এমনকি সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, এমন পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী নিজেই রাষ্ট্রে পরিণত হয়, যেমনটি পাকিস্তানের ক্ষেত্রে দেখা যায়। অন্যদিকে, একটি শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্র তার সেনাবাহিনীকে অন্যান্য অংশীদারের মতোই একটি নীতি বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে দেখে, যা প্রয়োজনে দেশের ভেতরেও, আবার আন্তর্জাতিক পরিসরেও ব্যবহৃত হতে পারে। (চলবে)

মেহেদী হাসান: লেখক গবেষক অনুবাদক। ইমেইল: mehedihassan1@gmail.com

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •