বাঁশখালী হত্যাকান্ড ২০১৬: সরেজমিন প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ, মিথ্যাচারের জবাব ও এলাকার মানুষের কথা

বিশেষ লেখা

২০২১ সালের ১৭ এপ্রিল বাঁশখালীতে আবারও পুলিশের গুলিতে ৫ জন নিরস্ত্র গরীব খেটে খাওয়া ক্ষুধার্ত মানুষ নিহত হলেন। বাংলাদেশের এস আলম গ্রুপ ও চীনা কোম্পানির যৌথ কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প ঘিরে দখল, বঞ্চনা ও  প্রতারণা এবং জনগণের ওপর দমন পীড়ন নির্যাতন এমনকি গুলি করে হত্যার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগেও ২০১৬ সালে এরকম হত্যাকান্ড ঘটেছিল। সেসময় জনগণকে উন্নয়ন সম্পর্কে মিথ্যাচার করে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য জমি দখল করছিল এসব কোম্পানি। সেসময়ই এলাকার মানুষ এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তখনও গুলি চালিয়ে কমপক্ষে চারজন মানুষকে খুন করা হয়েছিল, জখম ও ঘরছাড়া হয়েছিলেন আরও বহুজন। এরপর যৌথ বাহিনী মোতায়েন করে জবরদস্তির উপর কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। যে শ্রমিকেরা এখানে কাজ করছিলেন তাদের কর্মঘন্টা ও মজুরি পরিশোধে ভয়ানক জবরদস্তি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ন্যায্য বিক্ষোভ শ্রমিকদের, সেখানে আবার পুলিশের গুলি, কমপক্ষে পাঁচজন নিহত, কতজন জখম তার হিসাব এখনও হয় নাই।  জীবন নাশী এসব প্রকল্পের জন্য বারবার মানুষকে জীবন দিতে হচ্ছে।

২০১৬ সালে নিহতদের পরিবার  ও আহতসহ এলাকাবাসীর ওপরই চাপানো হয় মামলা, শুরু হয় আরেকদফা হয়রানি। এরপর হত্যাকান্ডে সরকারি প্রশাসন ও এস আলম গ্রুপের ভূমিকা আড়াল করতে এবং কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পটিকে একটি পরিবেশ বান্ধব প্রকল্প হিসেবে হাজির করতে বিজ্ঞাপন ছাড়াও শুরু হয় যথেচ্ছ মিথ্যাচার। ঘটনাগুলো একইরকম ভাবে এবারেও ঘটে যাচ্ছে। তখন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর জ্বালানী উপদেষ্টা সরাসরি সমর্থন জানান কোম্পানি ও প্রকল্পের প্রতি। সেকারণে তদন্ত, বিচার কোনোকিছুই আর অগ্রসর হয়নি। এবছরও শুরু হয়েছে, পাইকারি মামলা, হয়রানি ও মিথ্যা প্রচার।

২০২১ সালের হত্যাকান্ড বুঝতে গেলে তাই ২০১৬ সালের ঘটনাবলীর নিবিড় পর্যবেক্ষণ দরকার। সেসময় জনবিক্ষোভ ও হত্যাকান্ডের পর এ বিষয়ে বেশ কিছু অনুসন্ধান হয়েছিল। সেসব লেখা প্রকাশিত হয়েছিল সর্বজনকথা ২০১৬ সালের মে-জুলাই এবং আগস্ট-অক্টোবর সংখ্যায়। আগ্রহী সকলের সুবিধার জন্য এগুলো এখানে আমরা একসাথে হাজির করছি, এখানে পরপর চারটি লেখা দেয়া হলো। এপ্রিল মাসেই লেখক প্রকৌশলী মাহবুব সুমন, কল্লোল মোস্তফা ও নৃবিজ্ঞানী নাসরিন সিরাজ এ্যানি ঘটনাস্থলে গিয়েছেন, কথা বলেছেন বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে, এর ভিত্তিতেই তাঁদের লেখায় জানিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়। কল্লোল মোস্তফার লেখায় এস আলম গ্রুপের বিজ্ঞাপনী মিথ্যাচারের জবাব পাওয়া যাবে। ঘটনার একমাস পর একইবছরের মে মাসে এই অবরুদ্ধ এলাকা পরিদর্শন করে সেসময়ের পরিস্থিতি ও জনগণের কথা জানিয়েছেন মওদুদ রহমান

বাঁশখালী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প: এস আলম গ্রুপের বিজ্ঞাপনী অপপ্রচার ও প্রকৃত তথ্য

কল্লোল মোস্তফা

গত কয়েকদিন ধরে ‘ভুল ধারণা ও বাস্তব অবস্থা’ শিরোনামে এস আলম গ্রুপের একটি বিজ্ঞাপন চট্টগ্রামের স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিক পত্রিকার প্রায় অর্ধেক পাতা জুড়ে প্রচারিত হচ্ছে। বিজ্ঞাপনে বাঁশখালী উপজেলার গন্ডামারায় এস আলম গ্রুপের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্ল্যেখ করে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে পরিবেশিত সংবাদ সম্পর্কে এস আলম গ্রুপের একটি ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়েছে। ৪ এপ্রিলের বাঁশখালী হত্যাকান্ডে এস আলম গ্রুপের ভূমিকা আড়াল করতে ও কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পটিকে একটি পরিবেশ বান্ধব প্রকল্প হিসেবে হাজির করতে বিজ্ঞাপনটিতে যথেচ্ছ মিথ্যাচার করা হয়েছে। এখানে এস আলম গ্রুপের মিথ্যা ও প্রতারণাপূর্ণ বক্তব্যের বিপরীতে প্রকৃত তথ্য উপস্থান করা হলো-

১. কৃষিজমি, লবণমাঠ ও বসতভিটায় প্রকল্প প্রসঙ্গে:

এস আলম গ্রুপের দাবী: “প্রকল্প এলাকায় একফসলি জমি(লবণ চাষ করা হয়) ও স্বল্প ভূমিতে কিছু টিনশেড ও কুঁড়েঘর রয়েছে।”

প্রকৃত তথ্য:প্রথমত, এস আলম গ্রুপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কথা গোপন করে যে ৬৬০ একর জমি ক্রয় করেছে সেখানে লবণ মাঠ ছাড়াও দুই/তিন ফসলী জমি, বসতবাড়ি, কবরস্থান ইত্যাদি রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, প্রকল্প এলাকাটি শুধু ৬৬০ একর বা ৮৫৫ একর (বিজ্ঞাপনের দাবী মতে) জমিতেই সীমাবদ্ধ নয়। গত গত ৫ নভেম্বর ২০১৫ বাঁশখালী উপজেলার ভূমি অফিস থেকে এস আলম গ্রুপকে জমি কেনার অনুমোদন বাবদ দেয়া প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, এস আলম গ্রুপ দুইটি ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করার উদ্দেশ্যে গন্ডামারা, পশ্চিম বড়ঘোনা ও পূর্ববড়ঘোনা মৌজার মোট ৫০৩২.১৪ একর জমি হস্তগত করতে চায় যার মধ্যে ৩৩০৩ একর জমি ব্যাক্তিমালিকানাধীন এবং খাস জমি ১৭২৮.৯৭ একর। ভূমি অফিস থেকে এস আলম গ্রুপ কে ৩০০০ একর জমি ক্রয়ের অনুমোদন দেয়া হয়।

এস আলম গ্রুপ দুইটি ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করার উদ্দেশ্যে গন্ডামারা, পশ্চিম বড়ঘোনা ও পূর্ববড়ঘোনা মৌজার মোট ৫০৩২.১৪ একর জমি হস্তগত করতে চায় যার মধ্যে ৩৩০৩ একর জমি ব্যাক্তিমালিকানাধীন এবং খাস জমি ১৭২৮.৯৭ একর। ভূমি অফিস থেকে এস আলম গ্রুপ কে ৩০০০ একর জমি ক্রয়ের অনুমোদন দেয়া হয়।

তৃতীয়ত, যদিও ভূমি অফিসের প্রতিবেদনে এস আলম গ্রুপের সাথে যোগসাজসে গন্ডামারা, পশ্চিম বড়ঘোনা ও পূর্ববড়ঘোনা মৌজায় মাত্র ১৫০টি বসত বাড়ি দেখানো হয়েছে, বাস্তবে সেখানে ৭ হাজার বসত বাড়ি সহ বহু সংখ্যক স্কুল, মাদ্রাসা, কবরস্থান, বাজার ইত্যাদি রয়েছে। খোদ সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে শুধু মাত্র গন্ডামারা ইউনিয়নের জনসংখ্যা ৪৫,৭৪৮ জন, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১ টি, প্রাথমিক বিদ্যালয়- ১১টি, মাদ্রাসা- ০৬টি, কে জি স্কুল- ৪ টি। সূত্র: এক নজরে গন্ডামারা ইউনিয়ন

চতুর্থত, কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র যেহেতু চারপাশের ২০-২৫ কিমি এলাকার জন্য ক্ষতিকর, ফলে শুধু প্রকল্প এলাকার বসতিই নয়, এর চারপাশের বসতিও ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

২. গাছপালা-কৃষি-মৎস্যচাষ সহ পরিবেশ, জীব বৈচিত্র ও জনস্বাস্থ্য ধ্বংস হওয়ার ঝুঁকি প্রসঙ্গে:

এস আলম গ্রুপের দাবী: ”নিয়োগ করা আন্তর্জাতিক পরিবেশ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বলেছে, ভূগর্ভের পানি, গাছপালা এবং বায়ু মন্ডলের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ার কোন সম্ভাবনা নেই।”

প্রকৃত তথ্য:প্রথমত, আবাসিক এলাকায় এবং কৃষিজমির উপরে ১৩২০ মেগাওয়াটের বিশাল কয়লাভিত্তিক বিদুৎ কেন্দ্র নির্মাণের করতে যাওয়াটা কি ভয়ংকর একটি কাজ সেটা অনুধাবন করতে গেলে প্রথমে বোঝা দরকার একটি কয়লা ভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিবেশের উপর কী কী প্রভাব ফেলে :

ক) বায়ু দূষণ : একটি ১৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বছরে উৎপাদিত বায়দূষণকারী উপাদানগুলো হলো :

১) ৫২ হাজার টন সালফার ডাই-অক্সাইড। এই সালফার ডাই-অক্সাইড এসিড বৃষ্টির কারণ এবং অন্যান্য উপাদানের সাথে বাতাসে ক্ষুদ্র কণিকার পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে, যার ফলে ফুসফুস ও হার্টের রোগসহ বিভিন্ন অসুখবিসুখ হয়।

২) ৩১ হাজার টন নাইট্রোজেন-অক্সাইড। এই নাইট্রোজেন-অক্সাইড ফুসফুসের টিস্যুর ক্ষতি করে, যার ফলে শ্বাসতন্ত্রের নানান রোগ হতে পারে।

৩) ১৩০০ টন ক্ষুদ্র কণিকা, যার ফলে ব্রংকাইটিসসহ ফুসফুসের বিভিন্ন রোগ বেড়ে যায়।

৪) ৪৪০ পাউন্ড মারকারি বা পারদ। পারদের কারণে ব্রেন ড্যামেজসহ স্নায়ুতন্ত্রের নানান রোগ হয়।

৭) ৫৯০ পাউন্ড বিষাক্ত আর্সেনিক যার ফলে আর্সেনিকোসিস এবং ক্যানসারের বিস্তার ঘটায়।

৮) ৩০০ পাউন্ড সীসা, ১০ পাউন্ড ক্যাডমিয়াম এবং পরিবেশ ও মানব স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর অন্যান্য ভারি ধাতু।

খ) কঠিন ও তরল বর্জ্য : কয়লা পুড়িয়ে ছাই তৈরি হয় এবং কয়লা ধোয়ার পর পানির সাথে মিশে তৈরি হয় আরেকটি বর্জ্য তরল কয়লা বর্জ্য। ছাই এবং এই তরল উভয় বর্জ্যই বিষাক্ত কারণ এতে বিষাক্ত আর্সেনিক, মারকারি বা পারদ, ক্রোমিয়াম এমনকি তেজষ্ক্রিয় ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম থাকে। ছাই বা ফ্লাই অ্যাশ-কে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিকটে অ্যাশপন্ড বা ছাইয়ের পুকুরে গাদা করা হয় এবং স্লারি বা তরল বর্জ্যকে উপযুক্ত ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে দূষণমুক্ত করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ছাই বাতাসে উড়ে গেলে, ছাই ধোয়া পানি চুইয়ে কিংবা তরল বর্জ্য বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে মাটিতে বা নদীতে মিশলে ভয়াবহ পরিবেশ দূষণ ঘটে। একটি ১৩২০ মেগাওয়াটের কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বছরে ৭ লক্ষ ৫০ হাজার টন ফ্লাই অ্যাশ  এবং ২ লক্ষ টন বটম অ্যাশ  উৎপাদিত হয় যার উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা করা কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি বড় সমস্যা।

গ) পানি দূষণ : কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কঠিন ও তরল বর্জ্য বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে, সংরক্ষণ আধার থেকে চুইয়ে নানানভাবে ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠের পানির সাথে মিশে পানি দূষণ ঘটায়, যার ফলে পানির মাছ, জলজ উদ্ভিদ ইত্যাদি হুমকির মুখে পড়ে।

ঘ) শব্দ দূষণ : কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের টারবাইন, কম্প্রেসার, পাম্প, কুলিং টাওয়ার, কনস্ট্রাকশনের যন্ত্রপাতি, পরিবহনের যানবাহনের মাধ্যমে ব্যাপক শব্দ দূষণ ঘটে থাকে।

দ্বিতীয়ত,  জাইকার একটি রিপোর্টে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের পক্ষে কথা বলা হলেও, স্বীকার করা হয়েছে, সমুদ্রের যে স্থানে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পানি নির্গত হবে, সে স্থানের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে ৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস বেশি হবে, এমনকি ১.৩ কিমি দূরে পর্যন্ত ২ ডিগ্রী ও ১.৮ কিমি পর্যন্ত তাপমাত্রা ১ ডিগ্রী বেশি হবে, ফলে উক্তস্থানের মাছের ক্ষতি হবে।

সূত্র: Preparatory Survey on Chittagong Area Coal Fired Power Plant Development Project in Bangladesh. 

যেসব স্থানে কৃষি জমি ও লোকালয়ের পাশে একসময় কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, সেখানে মানুষের ফুসফুসের অসুখ বিসুখ যেমন বেড়েছে তেমনি ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

তৃতীয়ত, যেসব স্থানে কৃষি জমি ও লোকালয়ের পাশে একসময় কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, সেখানে মানুষের ফুসফুসের অসুখ বিসুখ যেমন বেড়েছে তেমনি ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। যেমন: মহারাষ্ট্রের দাহানায় রিলায়ান্সের ৫০০ মেগাওয়াট কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পর ১৯৯৫ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সফেদার ফলন প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গেছে। এই কমে যাওয়ার হার কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিকটবর্তী স্থানেই বেশি। আগে যেখানে একর প্রতি সফেদা হতো ৯.২ টন এখন সেখানে একর প্রতি ফলন ৩.৭ টন।

সূত্র: Impact of Coal-fired Thermal Power Plants on Agriculture; A case study of Chicku (Sapota) orchards of Dahanu, Maharashtra.

চতুর্থত, ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের কৃষ্ণপট্টম ও তামিল নারুর বিভিন্ন অঞ্চলের উপকূলীয় কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ঘুরে এসে শ্রীপদ ধর্মাধিকারি নামের একজন ভারতীয় বিশেষজ্ঞ “ব্রেকিং দ্যা মিথ বিহাইন্ড কোস্টাল থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্টস” শিরোনামে একটি লেখায় লিখেছেন-

“কৃষ্ণপট্টম অঞ্চলে যখন একের পর এক কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বন্দর নির্মিত হতে থাকল, তখন দেখা গেল এই অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানি ক্রমশ লবণাক্ত হতে থাকল। কয়েক বছরের মধ্যে এই পানি একেবারেই ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে গেল। এখন গ্রামবাসীকে বন্দর কর্তৃপক্ষের সরবরাহ করা ট্যাংকের পানির উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু এই পানি পান করার উপযুক্ত নয়, তাই অনেক পরিবারকে এখন বোতলের পানি কিনে খেতে হচ্ছে।”

তিনি আরো লিখেছেন- “কৃষ্ণপট্টম গ্রামের পার্শ্ববর্তী গুমাল ডিব্বা গ্রামে ভুগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততার পাশাপাশি মৎস চাষাবাদও নষ্ট হয়েছে… 

বেশ কয়েকটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে এখানে তরল বর্জ্য নির্গত হয় যার মধ্যে গরম পানিও রয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, একদিকে বিদূৎ কেন্দ্র নির্গত তরল উষ্ণ বর্জ্যের কারণে বিশেষত পোনা মাছ মারা যায় অন্যদিকে ড্রেজিং এর করণে ঘোলা পানি ও অন্যান্য বর্জ্যের কারণে বড় মাছও মারা যায়। এই দুইয়ে মিলে তাদের মৎস্য চাষাবাদ প্রায় পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।

ফলে স্থানীয়রা এখন নিজেদের খাওয়ার মতো পর্যাপ্ত মাছই পায় না, বাজারে বিক্রির জন্য পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া তো দূরের কথা। তাছাড়া জাহাজ আসা যাওয়ার কারণে মাছ ধরার নৌকা চলাচলে নিষেধাজ্ঞার কারণে মাছ ধরাও কঠিন হয়ে গেছে.. .. সেই সাথে কয়লার গুড়া ও ছাই এর সমস্যা তো আছেই- গ্রামের সর্বত্রই এমনকি পানির উৎসগুলোও এই দূষণে আক্রান্ত ।”

সূত্র:Breaking the myth behind Coastal Thermal Power Plants. 

ছবি: এস. আলমের প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন

৩. পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই প্রকল্পের কাজ শুরু প্রসঙ্গে:

এস আলম গ্রুপের দাবী: “পরিবেশবাদীদের এই ধরণের বক্তব্য অসত্য ও ভিত্তিহীন। পরিবেশ ছাড়পত্রের জন্য ফি জমা দেয়া হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছেন। ২২ মার্চ ২০১৬ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক প্রাথমিক ছাড়পত্র দিয়ে বলেছেন, সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।”

প্রকৃত তথ্য: প্রথমত, পরিবেশ বিধিমালা ১৯৯৫ অনুযায়ী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো লাল তালিকাভুক্ত প্রকল্পে যেকোনো ভৌত অবকাঠামোগত কাজ শুরু করার আগে সাইট ক্লিয়ারেন্স এবং পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) করে তার অনুমোদন নেয়া বাধ্যতামূলক। আর বিদ্যুৎকেন্দ্রে যন্ত্র স্থাপনসহ অন্যান্য কাজ করার আগে পেতে হয় পরিবেশ ছাড়পত্র। বাঁশখালীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের জন্য ওই তিন অনুমোদনের কোনোটাই এখনো পায়নি এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ার লিমিটেড। (সূত্র: প্রথম আলো, ১০ এপ্রিল ২০১৬)

দ্বিতীয়ত, এমনকি ২২ মার্চ ২০১৬ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক কর্তৃক প্রাথমিক ছাড়পত্র প্রদানের দাবীটিও পুরোপুরি মিথ্যা। গত ১১ এপ্রিল পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মকবুল হোসেন বলেছেন, গন্ডামারার বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য এখন পর্যন্ত কোন ধরণের সার্টিফিকেট বা ছাড়পত্র প্রদান করা হয় নি। (সূত্র: ডেইলি স্টার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৬)

২২ মার্চ ২০১৬ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক কর্তৃক প্রাথমিক ছাড়পত্র প্রদানের দাবীটিও পুরোপুরি মিথ্যা। গত ১১ এপ্রিল পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মকবুল হোসেন বলেছেন, গন্ডামারার বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য এখন পর্যন্ত কোন ধরণের সার্টিফিকেট বা ছাড়পত্র প্রদান করা হয় নি।

৪. চাষের জমি ও কর্মসংস্থান হারানো প্রসঙ্গে:

এস আলম গ্রুপের দাবী: “যোগ্যতা অনুযায়ী প্রত্যেক পরিবার থেকে চাকরির সুযোগ দেয়া হবে।”

“প্রথম ৫ বছরে প্রকল্প এলাকায় কাজ করবে ৭ হাজার লোক। প্রকল্প নির্মাণ শেষে স্থায়ী কর্মসংস্থান হবে প্রত্যক্ষভাবে ১ হাজার লোকের। পরোক্ষভাবে আরো ৫ হাজার লোকের।”

প্রকৃত তথ্য: একটি ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ পর্যায়ে ৪ হাজার অস্থায়ী কর্মসংস্থান এবং পরিচালনা পর্যায়ে দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৬০০ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হতে পারে। শুধু মাত্র গন্ডামারায় লবণ, চিংড়ি, সামুদ্রিক মৎস, ও কৃষির মাধ্যমে ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়। এর সাথে আশপাশের ইউনিয়নের কর্মসংস্থান যোগ করলে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ফলে কয়েক লক্ষ কর্মসংস্থান বিপন্ন হওয়ার আশংকা রয়েছে। এসব কর্মসংস্থান ধ্বংস করে মাত্র ৬০০ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি কোন গ্রহণযোগ্য সমাধান নয়।

তাছাড়া কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনায় মূলত কারিগরী জ্ঞান সম্পন্ন লোকের কর্মসংস্থান হয় বলে এসব কর্মসংস্থানের খুব সামান্যই স্থানীয় জনগণের ভাগ্যে জুটবে। চার থেকে সাড়ে চার বছরের নির্মাণ পর্যায়ে বড় জোর মাটি কাটা, মালামাল পরিবহণ, নির্মাণ কাজের শ্রমিক ইত্যাদি কিছু অস্থায়ী মজুরি ভিত্তিক কর্মসংস্থান জুটতে পারে স্থানীয় কিছু মানুষের। কিন্তু পরিচালনা পর্যায়ে যে ৬০০ কর্মসংস্থান হবে তার বেশিরভাগই কারিগরী হওয়ার কারণে সেখানে খুব কম সংখ্যক স্থানীয় মানুষেরই কাজ জুটবে।

এ বিষয়ে ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের কৃষ্ণপট্টম গ্রামের কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ভারতীয় বিশেষজ্ঞ শ্রীপদ ধর্মাধিকারি লিখেছেন-“শিক্ষিত না হওয়ার কারণে স্থানীয় জনগণের পক্ষে অন্য কোন ধরণের কাজ করা সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বন্দরে বিপুল পুঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণকে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও, খুব বেশি হলে যে কাজগুলো এলাকাবাসীর কপালে জোটে তা হলো সুইপার ও দারোয়ানের কাজ। এবং এগুলো স্থায়ী চাকুরি নয়, চুক্তি ভিত্তিতে তাদের নিয়োগ দেয়া হয়।”

সূত্র: http://indiatogether.org/water-concerns-near-coastal-thermal-power-plant-krishnapattanam-cheyyur-environment 

৫. ভারত ও চীনের কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প প্রসঙ্গে:

এস আলম গ্রুপের দাবী: “সারা বিশ্বে উৎপাদিত বিদ্যুতের ৭০ শতাংশই হলো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে। চীনে ৯০ আর ভারতে ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় কয়লা থেকে। আমেরিকা, জার্মানি ও জাপানের মতো উন্নত দেশেও এই ধরণের প্রকল্প চালু রয়েছে।”

প্রকৃত তথ্য: প্রথমত, বিজ্ঞাপনের তথ্য গুলো সঠিক নয়। বর্তমানে সারা বিশ্বের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৩৯ শতাংশ , চীনের ৬৩ শতাংশ  এবং ভারতের ৬২.১ শতাংশ কয়লা থেকে উৎপাদিত হয়।

http://www.tsp-data-portal.org/Breakdown-of-Electricity-Generation-by-Energy-Source#tspQvChart

https://www.eia.gov/beta/international/analysis.cfm?iso=CHN

http://powermin.nic.in/power-sector-glance-all-india

দ্বিতীয়ত, সন্দেহ নেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে একসময় ব্যাপক আকারে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান কালে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূষণের ভয়াবহতা দিনে দিনে উন্মোচিত হওয়ার কারণে বর্তমানে ওইসব দেশের অনেকগুলোই কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সরে আসছে। চীনে প্রতি বছর ২ থেকে ৪ শতাংশ হারে কয়লা বিদ্যুতের ব্যবহার কমছে এবং নবায়ণযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে।

http://www.theguardian.com/environment/2016/jan/19/chinas-coal-burning-in-significant-decline-figures-show

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৫ সাল এই এক বছরে কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে ১৪.৩ শতাংশ।

http://bluevirginia.us/2016/02/coal-fired-generation-declines-14-3-in-2015-wind-and-solar-energy-booms-the-changing-of-the-energy-guard-is-coming

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০২২ সাল নাগাদ ৪৬ হাজার মেগাওয়াট কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দিচ্ছে।

http://www.treehugger.com/environmental-policy/12300-megawatts-coal-power-will-shut-down-us-2015-lots-more-to-come.html

তৃতীয়ত, পরিবেশের কঠোর বিধি বিধান মেনে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন সর্বত্রই খুব কঠিন হয়ে উঠেছে, বাঁশখালীর মতো ঘনবসতি পূর্ণ জনপদে এরকম বড় আকারের কয়লা ভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের তো প্রশ্নই আসে না। উদাহরণ স্বরুপ ভারতের কথা বলা যায়। ভারতে নগর শহরের ২৫ কিমি এর মধ্যে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিরুৎসাহিত করা হয়। ২০১০ সালে জনবসতিসম্পন্ন এলাকায় দুই ফসলি কৃষিজমির ওপর তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলে ভারতের কেন্দ্রীয় গ্রিন প্যানেল মধ্যপ্রদেশে ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি)-এর ১৩২০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প বাতিল করে দেয়।

http://www.thehindu.com/news/national/ntpcs-coalbased-project-in-mp-turned-down/article819873.ece

৬. সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যবহার প্রসঙ্গে:

এস আলম গ্রুপের দাী: “আমাদের পরিবেশের সাথে সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কয়লার ব্যবহার সুনিশ্চিত করতে সর্বাধুনিক মেশিন আমদানি করা হবে।”

প্রকৃত তথ্য: তাপীয় কর্মদক্ষতা বা ইফিসিয়ান্সি অনুসারে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র তিন প্রকার: সাব ক্রিটিক্যাল, সুপার ক্রিটিক্যাল এবং আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল। সাব ক্রিটিক্যাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ন্যায় সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকেও কার্বন ডাইঅক্সাইড, সালফার ও নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড, পারদ, সীসা, আর্সেনিক মিশ্রিত বিষাক্ত ছাই ইত্যাদি নির্গত হয়। পার্থক্য হলো, সাব ক্রিটিক্যাল টেকনোলজির তুলনায় সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোজি ব্যবহার করলে দুষণের পরিমাণ সর্বমোট মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ হ্রাস পায় যা কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভয়াবহ দূষণ সামান্যই কমাতে পারে। যদি পুরাতন সাব ক্রিটিক্যাল টেকনোলজির কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে দৈনিক ১০০ টন বিষাক্ত সালফার ডাইঅক্সাইড উৎপন্ন হয়, তাহলে সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যবহার করলে সালফার ডাই অক্সাইড নির্গমন সর্বোচ্চ ১০ টন কমে ৯০ টন হতে পারে।এই সামান্য ১০ টন হ্রাস পাওয়ার ঘটনা থেকে যদি প্রচার করা হয় সুপার ক্রিটিক্যাল বা আল্ট্রাসুপার টেকনলজি ব্যবহারের ফলে কোন পরিবেশ দূষণ হবে না- তাহলে সেটা প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়।

গত ৫ নভেম্বর ২০১৫ বাঁশখালী উপজেলার ভূমি অফিসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- “ইতোমধ্যে এস আলম গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান জেনেসিস টেক্সটাইল এক্সসরিজ এন্ড এ্যাপারেলস লি: ও এস.আলম ভেজিটেবল অয়েল লি: কর্তৃক উল্ল্যেখিত মৌজাগুলোতে প্রায় ৬৬০.৪০ একর জমি ক্রয় করা হয়েছে।” এভাবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কথা গোপন করে টেক্সটাইল ও ভেজিটেবল অয়েল কারখানা তৈরীর কথা বলে জমি ক্রয় করার কারণেই স্থানীয় জনসাধারণ শুরুর দিকে কর্মসংস্থান হবে ভেবে জমি বিক্রয় করেছে কিন্তু এক পর্যায়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর থেকেই স্থানীয় জনগণ কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন।

ছবি: ৫ নভেম্বর ২০১৫ তারিখে দেয়া বাঁশখালী উপজেলার ভূমি অফিসের প্রতিবেদন

৭. তথ্য গোপন করে জমি ক্রয় প্রসঙ্গে:

এস আলম গ্রুপের দাবী: “জমি কেনার সময় মালিকদের কাছে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল। কোন ধরণের তথ্য গোপন করা হয় নি।”

প্রকৃত তথ্য: গত ৫ নভেম্বর ২০১৫ বাঁশখালী উপজেলার ভূমি অফিসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- “ইতোমধ্যে এস আলম গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান জেনেসিস টেক্সটাইল এক্সসরিজ এন্ড এ্যাপারেলস লি: ও এস.আলম ভেজিটেবল অয়েল লি: কর্তৃক উল্ল্যেখিত মৌজাগুলোতে প্রায় ৬৬০.৪০ একর জমি ক্রয় করা হয়েছে।” এভাবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কথা গোপন করে টেক্সটাইল ও ভেজিটেবল অয়েল কারখানা তৈরীর কথা বলে জমি ক্রয় করার কারণেই স্থানীয় জনসাধারণ শুরুর দিকে কর্মসংস্থান হবে ভেবে জমি বিক্রয় করেছে কিন্তু এক পর্যায়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর থেকেই স্থানীয় জনগণ কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন।

কল্লোল মোস্তফা: প্রকৌশলী। ইমেইল: kallol_mustafa@yahoo.com

সরেজমিন গন্ডামারা বাঁশখালী: খুন জখম কেন?

মাহবুব সুমন

গত ৫ এপ্রিল জাতীয় কমিটির একটি প্রতিনিধিদল চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত বাঁশখালীর অধিবাসীদের দেখতে যায়। প্রথম কিছুক্ষণ কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। কারণ যেসব ওয়ার্ডে আহত লোকজন আছে বলে জানা গেছে, বাস্তবে গিয়ে দেখা গেল সেখানে কেউ নেই। অনেকক্ষণ খোঁজার পর টের পাওয়া গেল যে গ্রেপ্তারের ভয়ে লোকজন পরিচয় দিতে চাচ্ছে না। ৫৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৬০০০ জনকে অজ্ঞাত উল্লেখ করে বাঁশখালী হত্যাকাণ্ডের আহত ও নিহতদের আত্মীয়-পরিজনের নামেই মামলা দেওয়া হয়েছে। এখন যাকে যেখানে পাওয়া যাচ্ছে তাকেই গ্রেপ্তারের আওতায় আনা হচ্ছে। সেদিনই হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া অবস্থায় অনেকে গ্রেপ্তার হন। সে কারণে জাতীয় কমিটিকে দেখে প্রথমে কোন পক্ষের লোক তা নিশ্চিত হতে না পেরে হাসপাতালের আহত এবং তাদের স্বজনরাই পরিচয় গোপন করেন। ১৯, ২৬, ২৭, ২৮ ও ক্যাজুয়ালটি ওয়ার্ডের নার্সরুমে কথা বলে কিছু রোগীর নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়। বলা হলো, যাদের হাতে-পায়ে-মাথায় নতুন ব্যান্ডেজ, হাতে হাতকড়া আর মাথার দুই দিকে দুজন করে পুলিশ, দেখবেন ওরাই বাঁশখালীর আহত রোগী। সেইভাবে নতুন করে অনুসন্ধান করা হলে পাঁচজনকে পাওয়া গেল- নুরুল ইসলাম, জহিরুল ইসলাম, মুজিব, আউয়াল ও আব্দুল আলিম। কারো পায়ে, পিঠে, গলায়, পেটে গুলি লেগেছে। কারো অপারেশন করে গুলি বের করা হয়েছে, কারো এখনো গুলি বের করা হয়নি। ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। তাঁরা এত অসুস্থ যে তাদের পক্ষে নিজের পায়ে দুই কদম হেঁটে যাওয়া সম্ভব নয়। অথচ এদের এক হাতে হাতকড়া, কোমরে মোটা রশি দিয়ে বেঁধে হাসপাতালের বিছানায় ফেলে রাখা হয়েছে। আর শিয়রে দুজন পুলিশ। মুজিব নামের একজনের গলা দিয়ে গুলি ঢুকে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। এখনো রক্তক্ষরণ চলছে। সাথে তাঁর বড় ভাই, কিছুক্ষণ পর পর তুলা দিয়ে মুখের রক্ত মুছে দিচ্ছিলেন। আধশোয়া অবস্থা থেকেই হাত উঁচু করে ইশারায় দেখানোর চেষ্টা করছিলেন যে তিনি আমাদের চিনতে পেরেছেন।

৫৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৬০০০ জনকে অজ্ঞাত উল্লেখ করে বাঁশখালী হত্যাকাণ্ডের আহত ও নিহতদের আত্মীয়-পরিজনের নামেই মামলা দেওয়া হয়েছে। এখন যাকে যেখানে পাওয়া যাচ্ছে তাকেই গ্রেপ্তারের আওতায় আনা হচ্ছে। সেদিনই হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া অবস্থায় অনেকে গ্রেপ্তার হন।

গত ২৫ মার্চ এস আলম গ্রুপের কয়েকটি গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামবাসীর ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ এবং ফাঁকা গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। তার পরিপ্রেক্ষিতে বাঁশখালীর অধিবাসী আমানুল ইসলাম (প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, যুব ইউনিয়ন, চট্টগ্রাম), অ্যাডভোকেট ইকবাল, আবু বকর, অমৃত করণসহ (সংগঠক, বাসদ-মার্কসবাদী) গণ্ডামারা ইউনিয়নের বেশ কিছু ছাত্র-শিক্ষকের আহ্বানে জাতীয় কমিটির প্রতিনিধিদল গণ্ডামারা ইউনিয়নে যান। বাঁশখালীতে ঢোকার পর সেদিন যে পরিস্থিতি দেখা গেছে তাকে এককথায় আগ্নেয়গিরির লাভা উদ্গিরণের আগের অবস্থার সাথে তুলনা করা যায়। প্রতিনিধিদলের সদস্যদের প্রথমে তাঁরা চিনতে না পেরে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। কয়েকজন বলতে থাকেন-আপনারা এস আলম গ্রুপের লোক হলে আজকে এখান থেকে কাপড়-চোপড় নিয়ে যেতে পারবেন না। তাঁদের নিশ্চিত করার জন্য বলা হলো, আপনাদের মতো আমরাও কয়লাবিদ্যুতের বিপক্ষে। বললেন (পরীক্ষা করে দেখছিলেন)-আচ্ছা, বলেন তো কেন আপনারা কয়লাবিদ্যুতের বিপক্ষে? উত্তরে আমাদের পক্ষ থেকে বলা হলো, কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হলে জমি নষ্ট হবে, মাটি নষ্ট হবে, পানি দূষিত হবে, মানুষের ক্যান্সার, জন্মগত ক্রটিসহ নানা অসুখ-বিসুখ বাড়বে- এ রকম হাজারো ঘটনা ঘটবে। এই দফায় চায়ের দোকানে প্রতিনিধিদলকে ঘিরে ধরা লোকজনের মুখের পেশি আস্তে আস্তে শিথিল হওয়া শুরু করল। একজন বলল- আপনারা আমাদের পক্ষে কথা বলছেন, এজন্য আপনাদের আমরা চা খাওয়াব। নাইলে আপনার আজকে খবর নিয়া ছাড়তাম। বাঁশখালীর মানুষের এ রকম তেজ সেদিন উপস্থিত সবাইকেই বিস্মিত করেছিল।

দুই মাস ধরেই চট্টগ্রামের স্থানীয় পত্রিকা ও অন্যান্য সূত্রে শোনা যাচ্ছিল যে এস আলম গ্রুপ চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার ৯ নম্বর গণ্ডামারা ইউনিয়নে ১৩২০ মেগাওয়াটের একটি কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে যাচ্ছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য স্থানীয় জনগণকে ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং কোথাও কোথাও জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে জমি দখল করছে। বাঁশখালী ও গণ্ডামারা এলাকার কৃষক, ছাত্র, শিক্ষক, সাধারণ মানুষ ইন্টারনেট, টিভি, পত্রিকাসহ নানা উৎস থেকে কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষতিকর বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানতে পারে। রামপাল কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র, সুন্দরবন নিয়ে জাতীয় কমিটির লংমার্চ এবং আরো অনেক ধরনের পরিবেশগত প্রচার-প্রচারণা থেকে তারা নিশ্চিত হয়, এই কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র তাদের নিঃস্ব করে দেবে। পরিবেশ ও কয়লাবিদ্যুৎ নিয়ে তাদের সাধারণ জ্ঞান এবং সচেতনতার স্তর অবাক করার মতো। ফলে বাঁশখালী-গণ্ডামারার অধিবাসীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই- ১. জীবিকা হারানোর আশঙ্কায়, ২. ভিটামাটি হারানোর আশঙ্কায় এবং ৩. পরিবেশগত ক্ষতির কথা বিবেচনা করে এই কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরোধিতা করতে শুরু করে। প্রথম দিকে এই বিরোধিতা চায়ের দোকানগুলোতে সীমাবদ্ধ ছিল। ক্রমান্বয়ে তা সারা গণ্ডামারা ইউনিয়ন এবং পুরো বাঁশখালীতে ছড়িয়ে পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গণ্ডামারা ইউনিয়নে ‘ভিটামাটি রক্ষার আন্দোলন’ নামে বেশ কয়েকটি বড় ধরনের গণজমায়েত ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেসব সমাবেশে ১৮ থেকে ২০ হাজার মানুষ উপস্থিত ছিল বলে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে জানা যায়। মার্চ মাস পর্যন্ত কিছু কিছু সমাবেশে পুলিশের গুলি, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও হতাহতের খবর চট্টগ্রাম অঞ্চলের স্থানীয় পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত হতে থাকে।

রামপাল কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র, সুন্দরবন নিয়ে জাতীয় কমিটির লংমার্চ এবং আরো অনেক ধরনের পরিবেশগত প্রচার-প্রচারণা থেকে তারা নিশ্চিত হয়, এই কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র তাদের নিঃস্ব করে দেবে। পরিবেশ ও কয়লাবিদ্যুৎ নিয়ে তাদের সাধারণ জ্ঞান এবং সচেতনতার স্তর অবাক করার মতো।

এস আলম গ্রুপের আয়োজনে অন্য এক সমাবেশে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, ‘কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করলে তেমন কোনো পরিবেশদূষণ হবে না এবং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।’ বক্তৃতায় তিনি যুক্তি উপস্থাপন করেন যে কোনো স্থানে একটি মসজিদ নির্মাণ করতে গেলে যদি নির্মাণস্থলে একটি-দুটি আমগাছ পড়ে, সেই আমগাছটিকে কেটে ফেলতে হয়। এ রকম ঘটনায় তেমন কোনো পরিবেশদূষণ হবে না এবং ৮০% লাভের জন্য ২০% ত্যাগ স্বীকার করতেই হবে।’ এ ধরনের যুক্তি উপস্থাপন করায় এলাকাবাসী আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং ক্রমান্বয়ে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যায়।

গত ২৫ মার্চ গণ্ডামারা ইউনিয়নে ঢুকলে দেখা যায়, চারপাশের প্রায় সকল জমিতে এস আলম গ্রুপ তাদের দখল চিহ্নিত করে খুঁটি গেড়ে রেখেছে। স্থানীয় লোকজনের মতে, অল্প কিছু জমি এস আলম গ্রুপ ক্রয় করেছে। ক্রয় প্রক্রিয়াধীন থাকা অবস্থায় স্থানীয় লোকজনকে তারা বলেছিল, এখানে রপ্তানিযোগ্য তৈরি পোশাক শিল্প-কারখানা এবং সেসব রপ্তানি করার জন্য সমুদ্রবন্দর স্থাপন করা হবে, যার মধ্য দিয়ে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এলাকার উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের আশায় স্থানীয় লোকজন কিছু জমি এস আলম গ্রুপের কাছে বিক্রি করে। কিন্তু কিছুদিন পরই ‘এস এস পাওয়ার ১ লিমিটেড’ এবং ‘এস এস পাওয়ার ২ লিমিটেড’ নামের সাইনবোর্ড দিয়ে এস আলম গ্রুপ নির্মাণকাজ শুরু করলে এলাকাবাসী বিভ্রান্ত হয়। তারা বুঝতে পারে, তাদের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে তারা জানতে পারে যে গোপনে এস আলম গ্রুপ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা আরিফুল্লার সাহায্যে কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য জোরপূর্বক জমি দখল এবং সরকারি খাসজমি বন্দোবস্ত নেওয়ার চেষ্টা করছে। সেখানে এলাকাবাসীর কর্মসংস্থানের তেমন সুযোগ নেই। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং চট্টগ্রাম শহরের মহসিন কলেজ, সিটি কলেজসহ অন্যান্য কলেজে অধ্যয়ন এবং কর্মরত গণ্ডামারার ছাত্র-শিক্ষকরা পত্রপত্রিকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে জানতে পারে যে এস আলম গ্রুপের করা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে তারা ক্রমান্বয়ে ভূমিহীন এবং এখানে ভয়াবহ পরিবেশদূষণ হবে। এসব জানতে পেরে এলাকাবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তারা এস আলম গ্রুপের কাছে আর জমি বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং ইতিমধ্যে যেসব জমি এস আলম গ্রুপের হাতে গেছে সেসব ফেরত চায়। প্রতিক্রিয়ায় এস আলম গ্রুপের নাসির গং ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে বেশ কিছু জমি জোরপূর্বক খুঁটি গেড়ে দখল করে। আশপাশের লোকজনকে হুমকি দেয় যে তাদেরও ক্রমান্বয়ে এলাকাছাড়া করা হবে।

স্থানীয় লোকজনকে তারা বলেছিল, এখানে রপ্তানিযোগ্য তৈরি পোশাক শিল্প-কারখানা এবং সেসব রপ্তানি করার জন্য সমুদ্রবন্দর স্থাপন করা হবে, যার মধ্য দিয়ে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এলাকার উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের আশায় স্থানীয় লোকজন কিছু জমি এস আলম গ্রুপের কাছে বিক্রি করে। কিন্তু কিছুদিন পরই ‘এস এস পাওয়ার ১ লিমিটেড’ এবং ‘এস এস পাওয়ার ২ লিমিটেড’ নামের সাইনবোর্ড দিয়ে এস আলম গ্রুপ নির্মাণকাজ শুরু করলে এলাকাবাসী বিভ্রান্ত হয়।

এস আলম গ্রুপের এসব কাজে সহায়তা করেন জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান মাওলানা আরিফুল্লা এবং স্থানীয় ভূমি প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরা। পরে ভূমি প্রশাসনে গণ্ডামারার জমির ভুয়া কাগজপত্র তৈরি প্রক্রিয়ায় জড়িত একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান যে গত ২.১১.২০১৫ তারিখে সার্ভেয়ার মোহাম্মদ মহিউদ্দিন এবং কানুনগো টিনোদ বিহারী চাকমা কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র করার জন্য এস আলম গ্রুপের পক্ষে নতুন করে ৩১০০ একর জমি ক্রয়ের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব পেশ করেন। সেখানে ইতিমধ্যে ৬৬০ একর জমি ক্রয় করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় এবং এর বাইরে আরো ৭০০ একর সরকারি খাসজমি এস আলম গ্রুপের নামে বরাদ্দ দেওয়ার সুপারিশ জানান।

এস আলম গ্রুপের এসব কাজে সহায়তা করেন জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান মাওলানা আরিফুল্লা এবং স্থানীয় ভূমি প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরা।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, এস আলম গ্রুপ কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র করার জন্য গণ্ডামারা ইউনিয়নের পূর্ব বরগনা, পশ্চিম বরগনা ও গণ্ডামারা- এই তিনটি মৌজার ৪৪০০ একর জমি নেওয়ার চেষ্টা করছে। পুরো এলাকায় ৫০ হাজারের বেশি মানুষের বাস। সরকারি ভোটার তালিকায় লিপিবদ্ধ ভোটারের সংখ্যা ২৮ হাজারের বেশি। যেখানে ৭ হাজারের বেশি পরিবার বাস করে, সেখানে কানুনগো টিনোদ বিহারী চাকমা মাত্র ১৫০টি পরিবার দেখিয়ে এই ১৫০ পরিবারকে পুনর্বাসনের প্রস্তাব দিয়ে এস আলম গ্রুপের পক্ষে ভূমি ক্রয়, অধিগ্রহণ ও বন্দোবস্তের প্রস্তাব দেন। এই তিনটি মৌজায় আরো আছে প্রায় ৭০টি মসজিদ, মক্তব, বেশ কিছু কবরস্থান এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের শ্মশান, একটি কারিগরি স্কুল, একটি হাই স্কুল, ৫টি কওমি মাদ্রাসা, দুটি আলিয়া মাদাসা, ৮টি প্রাইমারি স্কুল, ৫টি বাজার, ২০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, একটি জেটি। একই সাথে যা প্রায় ৫০০ একরজুড়ে লবণের ঘের, ১৮০০ একর ধান চাষের জমি এবং বর্ষা মৌসুমে ৫০০ একর জমির চিংড়িঘের এবং প্রায় ১৫০০ একর ম্যানগ্রোভ বনভূমির ক্ষতি করবে।

গণ্ডামারা এলাকায় গিয়ে প্রথমেই দেখা যায়, প্রায় ১৩টি সিএনজিতে করে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ করতে আসা শ্রমিকরা তাদের কাপড়-চোপড় ও অন্যান্য মালপত্র নিয়ে সাইট থেকে চলে যাচ্ছে। কিছুটা দূরে এস আলম গ্রুপের একদল লোকের সাথে দেখা হয়। সেখানে এস আলম গ্রুপের মামুনসহ আরো বেশ কয়েকজন স্থানীয়দের ভয়ভীতি দেখাচ্ছিলেন। তাঁরা অনুসন্ধানকারীদের পরিচয় জিজ্ঞেস করেন এবং একপর্যায়ে বলেন, ‘কোনো পরিবেশদূষণ হবে না, এসব কথার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।’ মামুন অনুসন্ধানকারীদের জানান যে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হয়ে পৃথিবীর বহু দেশ ঘুরেছেন এবং দেখেছেন, সেসব জায়গায় কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে সেখানে কোনো দূষণ নেই। কথা প্রসঙ্গে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি কোন কোন দেশে গেছেন। জবাবে জানান, মালি, সেনেগাল, কঙ্গোসহ কয়েকটি দেশে তিনি সফর করেন। উল্লেখ্য, আফ্রিকার দরিদ্রতম এসব দেশের বেশির ভাগেই কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র নেই। যেসব দেশে আছে সেখানে আবার সবার ঢোকার অনুমতি নেই। এ প্রসঙ্গে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো যে ‘আপনি কি কোনো কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভেতরে পরিদর্শন করেছেন?’ জবাবে তিনি ‘না’ বলেন। তাহলে আপনি যে বলছেন কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র করলে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে না এবং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে, তার ভিত্তি কী? জবাব না দিয়ে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র করলে যে পরিবেশের ক্ষতি হবে তার ভিত্তি কী? এর উত্তরে তাঁকে বলা হলো, আপনার মোবাইলসহ এখানে সবার মোবাইলে ইন্টারনেট আছে। একটু কষ্ট করে গুগলে সার্চ দিয়ে দেখেন কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভালো-মন্দ কী? তথ্য এখন সবার কাছে আছে।

পরে প্রকল্পের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া ছাত্র সাদ্দাম, নুর মোহাম্মদ, আবু বকর, আব্দুস সালেক, স্থানীয় শিক্ষক মোহাম্মদ জালাল চৌধুরী, কফিল উদ্দিন আহাম্মদ, অ্যাডভোকেট ইকবাল, আমানুল ইসলামসহ সাধারণ লোকজনের সাথে কথা বললে তাঁরা জানান, গণ্ডামারা ইউনিয়নের বেশির ভাগ শ্রমজীবী। কিছু জমিতে ফসল উৎপাদন হয়। তবে বেশির ভাগের আয় বর্ষা মৌসুমে চিংড়ি আহরণ এবং বছরের বাকি সময় লবণ চাষ। এখানে কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হলে প্রথমত তাঁরা ভূমিহীন হবেন, দ্বিতীয়ত তাঁরা তাঁদের কর্মসংস্থান হারাবেন। তাঁদের পক্ষে বাপ-দাদার ভিটামাটি-কবর ছেড়ে উপজেলা শহরে কিংবা আরো দূরে গিয়ে বাড়ি, জমি ক্রয় করা সম্ভব নয়। কয়েক দিন আগের একটি ঘটনা উল্লেখ করে তাঁরা বলেন যে এস আলম গ্রুপ একটি গভীর নলকূপ স্থাপন করে পানি ওঠানো শুরু করেছে, যার প্রভাবে ইতিমধ্যে সারা গণ্ডামারা ইউনিয়নে টিউবওয়েলে পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। যদি এস আলম গ্রুপ এখানে কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র করে এবং প্রতিদিন কোটি কোটি লিটার পানি ওঠায় তাহলে এলাকাবাসীর বেঁচে থাকাটাই কঠিন হবে। সে কারণে প্রাণ থাকতে তাঁরা এস আলম গ্রুপকে এখানে কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র করতে দেবেন না। ইউপি চেয়ারম্যান মাওলানা আরিফুল্লা, কানুনগো টিনোদ বিহারী চাকমা, এস আলম গ্রুপের স্থানীয় প্রতিনিধি নাসির, মামুনদের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে এলাকার লোকজন ক্রমেই আরো বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিল। এস আলম গ্রুপের কাউকে, এমনকি কোনো কিছুকেই এলাকার মানুষ সহ্য করতে পারছিল না।

ইতিমধ্যে সারা গণ্ডামারা ইউনিয়নে টিউবওয়েলে পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। যদি এস আলম গ্রুপ এখানে কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র করে এবং প্রতিদিন কোটি কোটি লিটার পানি ওঠায় তাহলে এলাকাবাসীর বেঁচে থাকাটাই কঠিন হবে।

হাজি মোহাম্মদ ইউনুস, রশিদ আহাম্মদ, মুন্সি মিয়া, হাসন আহাম্মদ, নুর আশা, মোহাম্মদ আজিজ এবং অন্যান্য গ্রামবাসীর ভাষ্য : ১ এপ্রিল ২০১৬ শুক্রবার এস আলম গ্রুপের মালিক মাসুদ সাহেবের বড় ভাই ১৫ থেকে ২০টি মোটরসাইকেল, ১০ থেকে ১৫টি জিপ-মাইক্রোবাস নিয়ে তাঁদের প্রকল্প এলাকায় এসেছিলেন। সেদিন গ্রামবাসী মাসুদ সাহেবের বড় ভাইকে তাঁর গাড়ি নিয়ে সসম্মানে চলে যেতে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সাথে আসা মোটরসাইকেল আরোহীরা মূলত এস আলম গ্রুপের গুণ্ডাবাহিনী ছিল। তারা এলাকার সাধারণ ক্ষিপ্ত মানুষের ভেতর ঢুকে পড়ে লোকজনকে আরো উত্তেজিত করে তোলে এবং একপর্যায়ে নিজেরাই কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করে। সেদিন রাতে এস আলম গ্রুপের চিহ্নিত সন্ত্রাসী বাহাদুর আলম হিরণ বাদী হয়ে এলাকাবাসীর বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। পরের শনি ও রবিবার দুই দিনে আটজন নিরীহ গ্রামবাসীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। গ্রামবাসী বুঝতে পারে, এটি ছিল গ্রামের নিরীহ সাধারণ মানুষকে থানা-পুলিশ, জেল-জরিমানায় হয়রানি করার জন্য একটি পরিকল্পিত ঘটনা। তারা ইতিমধ্যেই ভিটামাটি, কবরস্থান রক্ষার আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত আলীকে বিষয়টি জানান এবং এই অন্যায় ও পরিকল্পিত ভাঙচুর এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ৪ এপ্রিল বিকেলে সমাবেশ আহ্বান করেন। সেই সমাবেশস্থলে যখন গ্রামবাসী জড়ো হচ্ছিলেন তখন ১৫-২০টি মোটরসাইকেলে চড়ে এস আলম গ্রুপের গুণ্ডারা এসে বলতে থাকে যে এখানে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। তার কিছুক্ষণ পরই পুলিশ এসে জড়ো হওয়া মানুষের ওপর গুলি চালায়। এখানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষ-বিপক্ষের অর্থাৎ দুই পক্ষের গ্রামবাসী ছিল না। ছিল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধের গ্রামবাসী এক পক্ষ আর পুলিশ, এস আলম গ্রুপের গুণ্ডারা মিলে এক পক্ষ। পুলিশের গাড়িবহরে কেউ বাধা দেয়নি। বরং পুলিশ এসে প্রথমে সমাবেশ ভেঙে দেওয়ার জন্য ক্রমাগত টিয়ার গ্যাস শেল নিক্ষেপ করতে থাকে, তারপর ২০০ রাউন্ডের মতো ফাঁকা গুলি চালায়, শেষে মানুষ লক্ষ্য করে গুলি চালায়।

সমাবেশস্থলে যখন গ্রামবাসী জড়ো হচ্ছিলেন তখন ১৫-২০টি মোটরসাইকেলে চড়ে এস আলম গ্রুপের গুণ্ডারা এসে বলতে থাকে যে এখানে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। তার কিছুক্ষণ পরই পুলিশ এসে জড়ো হওয়া মানুষের ওপর গুলি চালায়। এখানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষ-বিপক্ষের অর্থাৎ দুই পক্ষের গ্রামবাসী ছিল না। ছিল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধের গ্রামবাসী এক পক্ষ আর পুলিশ, এস আলম গ্রুপের গুণ্ডারা মিলে এক পক্ষ।

৬ এপ্রিল ২০১৬ চট্টগ্রাম শহর থেকে জাতীয় কমিটির প্রতিনিধিদলের সাথে গণমুক্তি ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ নাসু, সিপিবির জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য অশোক সাহা, গণসংহতি আন্দোলনের চট্টগ্রাম জেলা সমন্বয়কারী হাসান মারুফ রুমী, বাসদের (মার্কসবাদী) জেলা সদস্যসচিব অপু দাশগুপ্ত, বাসদ নেতা আল কাদরি জয়, সিপিবির জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য অমৃত বড়ুয়া, মাওলানা ভাসানী ফাউন্ডেশনের আহ্বায়ক ছিদ্দিকুল ইসলাম, গবেষক-লেখক প্রকৌশলী মাহবুব সুমন, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের শিক্ষক নৃবিজ্ঞানী নাসরিন সিরাজ, যুবনেতা আনামুল ইসলাম, বাসদ (মার্কসবাদী) বাঁশখালীর সংগঠক অমৃত করণ, ছাত্র ইউনিয়নের জেলা সভাপতি শিমুল কান্তি বৈষ্ণব, ছাত্র ফেডারেশন চট্টগ্রাম নগরের সভাপতি ফরহাদ জামান জনি, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের জেলা সাধারণ সম্পাদক পার্থপ্রতিম নন্দী, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক আরিফ মইনুদ্দিনসহ আমরা আবার গণ্ডামারা ইউনিয়নে যাই।

ছবি: বাঁশখালী হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধ জাতীয় কমিটির প্রতিবাদ

ঐতিহাসিক জলকদর খালের ওপর নির্মিত ব্রিজ পার হতেই দূর থেকে দেখা যায়, গণ্ডামারার অগুনতি মানুষ উৎসুক হয়ে দূর থেকে তাকিয়ে আছেন। উদ্দেশ্য তাদের আন্দোলনের পক্ষের লোক হলে ঢুকতে দেবে। কাছে গিয়ে পরিচয় দিলাম। বললাম, আমরা আপনাদের দেখতে এসেছি। আমাদের ১২-১৩ জনকে তারা সাদরে গ্রহণ করে নিয়ে চললেন ঘটনাস্থলের দিকে। পথের মধ্যে গুলি খাওয়া অনেক আহত মানুষ দেখলাম ব্যান্ডেজ পরে আমাদের সাথেই হেঁটে কিংবা শ্লোগান দিয়ে চলছে। বাজার পার হয়ে মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর একটা মাটির বাড়ি। দেয়ালে গুলির দাগ। শফিউল আলম জানালেন, তাঁর স্ত্রী কুলসুমা বেগম (৩২) সাড়ে তিন বছরের ছোট বাচ্চাকে আগলে ধরে ঘরের মধ্যে বসে ছিল। পুলিশের পোশাক পরা এস আলমের লোকেরা (পুলিশ নয়) বাইরে থেকে দৌড়ে এসে কুলসুমা বেগমকে পাঁজরে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করে দেয়। জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কিভাবে বুঝলেন তারা পুলিশ নয়? বললেন- এদেরকে আমরা আগে থেকেই চিনি, এরা এলাকার লোক। এস আলমের পক্ষে কাজ করছে। এরা পুলিশে চাকরি করে না। বাড়ির উঠানে-দেয়ালে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ দেখতে দেখতে আমরা স্কুল মাঠের দিকে রওনা দিলাম, যেখানে সমাবেশ এবং মূল গোলাগুলি হয়েছিল।

সমাবেশস্থলে এখনো রক্তের দাগ শুকায়নি। আমাদের দেখে অনেক মানুষ ছুটে এলো। সবাই তাদের সেদিনকার রোহমর্ষক অভিজ্ঞতার কথা বলছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সেদিন নিরস্ত্র মানুষদের লক্ষ্য করে এক হাজারের বেশি গুলি ও টিয়ার গ্যাস শেল নিক্ষেপ করা হয়েছে। এস আলমের গুণ্ডাবাহিনী নাকি তাদের মালিককে দেখাতে চেয়েছিল যে তারা কত ভালো কাজ করে। এখানে জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে বেশ কয়েকজন বক্তৃতা দেওয়ার পর আমরা মাওলানা বশির সাহেবের বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। পথে পথে বহু লোক, বহু নারী আমাদের দেখে দাঁড়িয়ে কথা বলল। তাদের শরীরে গুলির দাগ, ব্যান্ডেজ দেখাল। বললÑটিভিতেও আমাদের খবর ঠিকমতো দেখাচ্ছে না, আমাদের কথাও শোনাচ্ছে না। আপনারা দয়া করে আমাদের কথাগুলো পৌঁছে দেবেন। তাদের কথা শুনলাম। সব ঘটনার প্রায় একই বর্ণনা। সমাবেশ উপলক্ষে সবাই জড়ো হয়েছিল। ১৪৪ ধারার কোনো পূর্বঘোষণা বা মাইকিং কিছুই হয়নি, হঠাৎ সমাবেশ লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়, যাতে ঘটনাস্থলেই চারজন নিহত হন।

যা হোক, এখান থেকে সামনে মাওলানা বশিরের বাড়ির দিকে এগোতে থাকলাম। সেখানে আরো হৃদয়বিদারক দৃশ্য। ৪ তারিখের গুলিবর্ষণে মাওলানা বশিরের আপন দুই ভাই এবং তাঁর ভাতিজিজামাই নিহত হন। প্রথমে তাঁর বড় ভাইকে গুলি করা হয়, তাঁকে বাঁচানোর জন্য অন্য ভাই ছুটে গেলে তাঁকেও গুলি করা হয়। তাঁকে বাঁচানোর জন্য তাঁর মেয়েজামাই ছুটে গেলে তাঁকেও গুলি করা হয়। তিনজনই ঘটনাস্থলে নিহত হন। তিনজনকে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে। আসার সময় আমরা আলাপ করছিলাম, কয়লা ফুলবাড়ীতে মানুষের প্রাণ নিয়েছিল, এখানেও মানুষের প্রাণ নিল। ভবিষ্যতে না জানি আরো কত নিরীহ মানুষকে কয়লার জন্য প্রাণ দিতে হয়!

প্রথমে তাঁর বড় ভাইকে গুলি করা হয়, তাঁকে বাঁচানোর জন্য অন্য ভাই ছুটে গেলে তাঁকেও গুলি করা হয়। তাঁকে বাঁচানোর জন্য তাঁর মেয়েজামাই ছুটে গেলে তাঁকেও গুলি করা হয়। তিনজনই ঘটনাস্থলে নিহত হন। তিনজনকে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে। আসার সময় আমরা আলাপ করছিলাম, কয়লা ফুলবাড়ীতে মানুষের প্রাণ নিয়েছিল, এখানেও মানুষের প্রাণ নিল। ভবিষ্যতে না জানি আরো কত নিরীহ মানুষকে কয়লার জন্য প্রাণ দিতে হয়!

পুলিশের গুলিতে নিহত মুর্তজা, আনোয়ার, জাকেরদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ৮ এপ্রিল ২০১৬ তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্যসচিব আনু মুহাম্মদ, সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক ও মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল, প্রকৌশলী মাহবুব সুমন, নৃবিজ্ঞানী নাসরিন সিরাজ, প্রকৌশলী কল্লোল মুস্তফা, গায়ক-সংস্কৃতিকর্মী অরূপ রাহী এবং গণসংহতি আন্দোলন কেন্দ্রীয় পরিচালনা কমিটির সদস্য ফিরোজ আহমেদ, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্রীয় নেতা নজরুল ইসলাম এবং চট্টগ্রামের বাম প্রগতিশীল প্রায় সব রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ গণ্ডামারার ঘটনাস্থলে যান। জাতীয় কমিটি গণ্ডামারা ইউনিয়নে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে। ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের সাথে কথা বলে, আহত ও নিহতদের পরিবারকে সমবেদনা জানিয়ে, বিকেলে জাতীয় কমিটির উদ্যোগে বাঁশখালী হত্যার প্রতিবাদে চট্টগ্রামের সমাবেশে যোগ দেওয়ার জন্য রওনা হয়।

একটি স্থানে কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হলে সেই স্থানসহ তার চারপাশের ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকার পানিতে, বাতাসে ফ্লাই অ্যাশের বিষ ছড়িয়ে পড়ে, বটম অ্যাশের বিষে মাটি বিষাক্ত হয়ে যায়, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্গত সালফার ও নাইট্রোজেনের অক্সাইড বাতাসের জলীয় বাষ্পের সাথে মিশে এসিডবৃষ্টি হয়, তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়াম মিশে মানুষসহ সকল প্রাণীর ক্যান্সার হয় এবং মহামারি আকারে স্থানীয় জনগণের অ্যাজমা, হাঁপানি দেখা দেয়। গাছপালা, সবজি, গুল্ম বিষাক্ত হয়ে পড়ে, ফসল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফুসফুসের ক্যান্সার, জš§গত ত্রুটি, বন্ধ্যাত্ব, গর্ভপাতসহ ভয়ানক সব রোগের ঝুঁকি বাড়ে । বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজনে ভূগর্ভস্থ জলাধার থেকে প্রতিদিন এক থেকে দেড় কোটি লিটার সুপেয় পানি উত্তোলন করার কারণে আশপাশের বিশাল এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবহৃত গরম পানি প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়ার কারণে পুরো এলাকার মৎস্যসম্পদ নষ্ট হয়ে যায়। সার্বিক বিচারে কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে। এ ধরনের একটি ক্ষতিকর প্রকল্প করার জন্য চীনা কোম্পানি SEPCOIII Electric Power Construction Corporation এর সাথে বাংলাদেশের এস আলম গ্রুপের চুক্তি সম্পাদন, নির্মাণপ্রক্রিয়া শুরু এবং তার ফলে স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠীর ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণ, হত্যার তীব্র নিন্দা এবং একই সাথে বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানাই।

মাহবুব সুমন : প্রকৌশলী। ই-মেইল: mahbub.sumon@mail.com

 গন্ডামারার মানুষের কথা

নাসরিন সিরাজ এ্যানি

৬ এপ্রিল তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি চট্টগ্রাম শাখার কয়েকজন গণ্ডামারা হত্যাকাণ্ড সরেজমিনে তদন্ত করতে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। দলে প্রায় ১৩ জন বাম রাজনৈতিক নেতা ও ছাত্রছাত্রী ছিলেন। তাঁদের মূলত গাইড করছিলেন বাঁশখালী উপজেলার একজন স্কুল শিক্ষক, যিনি নিজেও মার্কসবাদী এক দলের নেতা। আমিও এই দলে ছিলাম।

সাগরপাড়ের বেড়িবাঁধ আর খালের মাঝখানের চর এলাকা হলো এই গণ্ডামারা। লবণ, চিংড়ি আর ধানের চাষ হয় এখানে। জলকদর খালের ওপরের খাড়া ব্রিজটা পার হয়ে কয়েকটি ছোট চায়ের দোকানে নানা বয়সী কয়েকজন লোক ছিলেন। আমরা তাঁদের দেখে আমাদের মোটরবাহন থেকে নামলাম। লোকজন আমাদের চারপাশে জড়ো হয়ে হড়বড় করে সব বলতে থাকলেন। সেখান থেকে হেঁটে হেঁটে আমরা গ্রামের ভেতরে ঢুকতে থাকলাম। যমুনা টেলিভিশনের লাইভ চলছিল বলে একটু সামনেই আমরা একটা বড় জটলা পেলাম। পথে যেতে যেতে আমাকে যে ছেলেটি পাকড়াও করল তার বয়স ১৬-১৭ বছরের মতো। তার গালে ছ্যাঁচড়ানোর দাগ জ্বলজ্বল করছিল। তার গল্পটি নিম্নরূপ:

: (আমাদের একজন সঙ্গীর মোটরসাইকেল দেখিয়ে) তারা তো এইভাবে মোটরসাইকেলে করেই এসেছিল আর এ রকম হেলমেট পরে, যারা সেদিন আমাদের গুলি করেছিল। তাদের সাথে পুলিশ ছিল। এরা এস আলমের গুণ্ডা।

প্রশ্ন : কিভাবে চিনলেন যে তারা এস আলমের গুণ্ডা?

: তারা পুলিশের পোশাক পরে এসেছিল, মুখে মুখোশ ছিল। কিন্তু আমরা এলাকার মানুষ, আমরা এস আলমের গুণ্ডাদের চিনি না? তারা তো এখানে প্রায় সময়ই আসে।

তারা পুলিশের পোশাক পরে এসেছিল, মুখে মুখোশ ছিল। কিন্তু আমরা এলাকার মানুষ, আমরা এস আলমের গুণ্ডাদের চিনি না? তারা তো এখানে প্রায় সময়ই আসে।

(তার পাশ থেকে একজন যোগ করেন) আসার সময় এস আলমের অফিসটা দেখেছেন না? সেখানে অন্তত দুই হাজারটা পুলিশের পোশাক আছে। এগুলা পরেই গুণ্ডারা এখানে আসছে। ওইখান থেকেই গাড়িতে ওঠে।

প্রথমজন : এখানে থানায় ২০-২৫ জন পুলিশ থাকে। কিন্তু আসছে অন্তত ২০০ জন।

(পাশ থেকে কয়েকজন মন্তব্য করে) ওসি, ইউএনও, এমপি সাহেব সব বেইচা গেছে (এস আলমের কাছে)।

————————

চারপাশে সবাই একসাথে ঘটনার বর্ণনা করছে। আমরা কারা, কোত্থেকে এসেছি, কেন এসেছি-এসব জেরাও করছে। এরই মধ্যে একজনের বর্ণনা শুনে আমার গতকালের প্রথম দেখা আহত ব্যক্তিটির কথা মনে পড়ে। আমি জিজ্ঞেস করি, ‘এখানে একজন দোকানদার গুলি খাইছে না?’

সবাই একসাথে বলে, “হ, হ…এই যে তার দোকান…মদিনা…তার পায়ে (কাছ থেকে ধরে) গুলি করে এখান থেকে টানতে টানতে ওই ব্রিজের উপর তুলছে। পাকার উপর টানছে না, তাই অনেক ব্যথা পাইছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীও এত বর্বর ছিল না…মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এত অত্যাচার হয়নি…”

লক্ষ করলাম, আমরা এখনো মূল গোলাগুলির জায়গা স্কুল মাঠটি থেকে কিছুটা দূরেই অবস্থান করছি। এর মধ্যেই জাতীয় কমিটির কাফেলা তাদের সংহতি প্রকাশমূলক বক্তৃতা ও মিছিল সম্পন্ন করে।

তারপর কে যেন প্রস্তাব করেন, আমাদের আহতদের দেখতে যাওয়া উচিত। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে চট্টগ্রামের জাতীয় কমিটি এই ঘটনার জন্য একদমই প্রস্তুত ছিল না। দ্রুত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এই চলে আসা। কয়েক দিন হলো মাত্র তারা এই এলাকায় আসা-যাওয়া করছে। কাউকে ঠিকমতো চেনে না, তাই এখানে এসে কী করবে তেমন কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা তাদের ছিল না। উপস্থিত সকলে মিলে আমাদের নিয়ে গেল মরিয়ম আর কুলসুমের কাছে।

ছবি: বাঁশখালী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণের সমাবেশ

এখানে সকলে সম্মিলিতভাবে যে গল্পটি বলে তা হলো-

পুলিশ যে শুধু এলোপাতাড়ি গুলি করে কতকগুলো নিরীহ লোককে মেরেছে তা-ই নয়, উপরন্তু তারা ঘরে ঘরে ঢুকে মহিলাদের গুলি করেছে। কুলসুম তো তাঁর বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছিলেন আর মরিয়ম জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখছিলেন বাইরে কী হচ্ছে, যখন তাঁদের ঘরে ঢুকে গুলি করা হয়। আহতদের নিয়ে প্রধান সমস্যা হলো তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া। ৩০০০ অজ্ঞাত লোকের নামে মামলা হয়েছে-এই ভিত্তিতে হাসপাতালে গেলেই পুলিশ গ্রেপ্তার করছে। এই গ্রেপ্তারের ভয়ে লোকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে যেতে পারছে না বা গেলেও নিজেদের নাম-ঠিকানা গোপন রাখছে।

৩০০০ অজ্ঞাত লোকের নামে মামলা হয়েছে-এই ভিত্তিতে হাসপাতালে গেলেই পুলিশ গ্রেপ্তার করছে। এই গ্রেপ্তারের ভয়ে লোকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে যেতে পারছে না বা গেলেও নিজেদের নাম-ঠিকানা গোপন রাখছে।

মরিয়ম তাঁর গুলিতে আহত হাত দেখান। তাঁর হাত থরথর করে কাঁপছে। চোখ ছলছল। তিনি আমাকে বলেন, ‘কুলসুম চার মাসের গর্ভবতী। আর পাঁচটা বাচ্চা তার জীবিত। সবগুলা ছোট ছোট। কে তাদের দেখে! মা ছাড়া বাচ্চাগুলা।’

তারপর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য মহিলারা মিলে আমাকে কুলসুমের পরিবারের একটি ছবি সাজিয়ে দেয়।

কুলসুমের স্বামীকে জিজ্ঞেস করি-  কী অবস্থা আপনার রোগীর?

: গ্রেপ্তারের ভয়ে আমি হাসপাতালে যাইনি। রাস্তায় (গ্রাম থেকে বেরোনোর রাস্তায়) বের হলেই তো পুলিশ ধরবে…। ওনার (কুলসুমের) ভাই আছে এখন সাথে। তারাই দেখভাল করছে।

উল্লেখ্য, এঁরা সাবই দিনমজুর। হয় কৃষিকাজ, না হয় লবণ চাষ, না হয় সাগরে মাছ ধরা- এই কাজগুলো তাঁরা করে থাকেন।

অনেকে জাতীয় কমিটির সদস্যদের ঘরের ভেতরে ঢুকিয়ে নিয়ে কোথায় কী অবস্থায় গুলি হয়েছে সেগুলো দেখায়। সেখান থেকে মিছিল নিয়ে এরপর যাওয়া হয় স্কুল মাঠটির দিকে, যেটি মূল গোলাগুলির ঘটনাস্থল। আমি মিছিল না করে চুপচাপ হাঁটতেই থাকি। আমার সাথে আলাপে যোগ দেন কুলসুমের স্বামী, সাথে আরো পাঁচ-ছয়জন লোক।

আমার প্রশ্ন : মারামারিটা লাগল কেন? এখানে হইছেটা কী?

আবারও আমাকে বোম্ববার্ট করা হলো একগাদা উত্তরে। আমি সংক্ষেপে লিখছি আমি যা বুঝেছি সেগুলো।

: ৩ তারিখ (রাত ১২টার পর কিন্তু নতুন তারিখ, বুঝিয়ে দেয় একজন) ভোররাতে পুলিশ এসে কতকগুলো মানুষকে গ্রেপ্তার করে। তারা বেড়িবাঁধের ওপর ঘুমাচ্ছিল। সে কারণেই আমরা (লিয়াকত চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে) প্রতিবাদ সমাবেশ ডেকেছিলাম আর পুলিশ এসে আমাদের নির্বিচারে গুলি করে।

প্রশ্ন : কিন্তু পুলিশ এসে গ্রেপ্তার করল কেন?

: কে বা কারা বিদ্যুৎ প্রজেক্টের গাড়ি ভাঙচুর করেছে। সাংবাদিকগুলো একটাও ঠিকঠাক খবর লেখে না। তিন-চারজন এর মধ্যে আসছে, আমাদের সাথে কথা বলছে; কিন্তু এস আলমের টাকা খেয়ে সব মিথ্যা লিখছে। গাড়ি ভাঙ্গার কথা তারা নিউজ করছে, কিন্তু এইটা বলে নাই যে আমরা এখানে (কয়লা) তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র চাই না।

এস আলমের টাকা খেয়ে সব মিথ্যা লিখছে। গাড়ি ভাঙ্গার কথা তারা নিউজ করছে, কিন্তু এইটা বলে নাই যে আমরা এখানে (কয়লা) তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র চাই না।

প্রশ্ন : কিন্তু তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র হইলে আপনাদের অসুবিধা কী?

: আরে কয়লা পোড়াইলে তো অনেক ক্ষতি। সুন্দরবনে একটা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র করতেছে না? সেইটা হইলে গাছ মরে যাবে, বাঘ মরে যাবে; কিচ্ছু থাকবে না। সেই রকম অবস্থা এখানেও হবে। আমাদের গাছপালা থাকবে না, কৃষি থাকবে না। আমাদের চলে যাইতে হবে। আমাদের বাপ-মায়ের কবর এখানে, ভিটা এখানে। আমরা কই যাব? কেন যাব? তুই (এস আলম) এখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র করতে তো পারবি না, ঢুকতেই পারবি না। এই নিয়া তো অনেক দিন ধরে গণ্ডগোল চলতেছে। বেশি হইতেছে এই গত দুই-তিন মাস হইল।

: (পাশের থেকে একজন) তুই আপারে কিছুই বুঝাইতে পারতাছোস না। শোনেন আপা, সব গণ্ডগোল হইল ভাগের টাকার কারণে। সেদিনও তো এমপি সাহেবের বাসায় এই নিয়া দুই পক্ষে মারামারি হইছে। মাঝখান দিয়া এই নিরীহ মানুষগুলা মরল। আমি আজকে ৩৮ বছর আওয়ামী লীগ করি। এই যে এমপি হইছে, এরে তো আওয়ামী লীগের কেউ চিনেই না। এরা (এমপি সাহেব) শুধু টাকা চিনে…

কথা ঘুরে যায়। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে রাস্তার আশপাশের দেয়ালে, টিনে গুলির দাগ দেখাতে। বোঝা যায়, এখানে এলোপাতাড়ি গুলি করা হয়েছে।

আমার মাথায় প্রশ্ন আসে, পুলিশ কি খুব আতঙ্কে ছিল যে তাদের গ্রামবাসী আক্রমণ করবে? না হলে এভাবে এলোপাতাড়ি গুলি কেন? কিন্তু প্রশ্ন করার আগেই আমরা স্কুল মাঠে পৌঁছে যাই। জাতীয় কমিটি এরই মধ্যে একটি তাৎক্ষণিক সমাবেশ শুরু করে দিয়েছে মাঠটিতে। আমাকে লোকজন দেখাতে থাকে গুলি আর রক্তের দাগ-এই যে দেখেন, এদিকে আসেন…মর্তুজ নানা এই রুটিটা খাইতেছিলেন আমার দোকানে বসে। উনি এই রুটি শেষ করতে পারেন নাই। ওনার বুকে বন্দুক ঠেকায়া গুলি করছে।

আসেন…মর্তুজ নানা এই রুটিটা খাইতেছিলেন আমার দোকানে বসে। উনি এই রুটি শেষ করতে পারেন নাই। ওনার বুকে বন্দুক ঠেকায়া গুলি করছে।

আবারও আমি লোকজনের নানা দিক থেকে বলা গল্পগুলো শুনতে থাকি। বুঝতে চেষ্টা করি, কেন পুলিশ আক্রমণ করেছে, কতজন পুলিশ ছিল, কত রাউন্ড গুলি পুলিশ এখানে ব্যবহার করেছে পাবলিককে আক্রমণ করতে।

গল্পগুলোর ধারাবাহিকতা লক্ষ করে বোঝা যায় যে পাবলিক দাবি করছে তারা ১৪৪ ধারা জারি হয়েছে সে সম্পর্কে জানত না। পুলিশের অ্যাকশন তাই তাদের আচমকা লেগেছে। পাবলিকের ভাষ্য মোটামুটি এ রকম : আমরা তো কোনো অস্ত্র (বল্লম, টেঁটা ও লাঠি এই অঞ্চলে ঘরে ঘরেই থাকে) নিয়েই যাইনি। মিটিং হবে শুনেছি, মিটিং শুনতে গেছি। আমরা যদি প্রস্তুত হয়ে যেতাম তাহলে একটা পুলিশও সেদিন জান নিয়ে এখান থেকে পালাতে পারত না।

আবারও আমাকে অভিযোগ করা হয় যে ৪ এপ্রিলের আক্রমণে পুলিশ ও আনসারের পোশাকে এখানে এস আলমের গুণ্ডাবাহিনী গুলি করেছে। আমার সামনেই সেদিন যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা নিজেদের মধ্যে তর্কাতর্কি করলেন আসলে কতজন পুলিশ সেদিন আসল পুলিশ ছিল। মোট ২০০ জন পুলিশ, এর মধ্যে কেউ বললেন ৫০ জন, কেউ বললেন ৭০ জন আসল পুলিশ ছিল আর বাকিরা ছিল এস আলমের গুণ্ডা। প্রথমে তারা আকাশের দিকে গুলি করে, প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে তারা। মোট ১০০০ রাউন্ড গুলি চলে সেদিন, বলেন এই প্রত্যক্ষদর্শীরা।

আমি কিছুতেই বিশ্বাস করি না যে পুলিশের পোশাক এস আলমের গুণ্ডারা গায়ে চড়িয়েছে। প্রশ্ন করি আবার, কিভাবে চিনলেন এস আলমের গুণ্ডা তারা?

আবার সবাই একসাথে কথা বলতে শুরু করল:

: ওদের পরনে মুখোশ ছিল (কারণ তারা কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছিল অ্যাকশনের সময়)…মর্তুজ আর অঙ্কুরকে তো ওরা গুলি করেছে কাছে থেকে, কারণ ওরা তাদের চিনে ফেলেছিল, মুখোশ টেনে খুলে ফেলেছিল…

: আর আমরা তো স্থানীয়, আমরা তাদের চিনি- এস আলমের অফিস থেকেই তারা গাড়িতে উঠেছে (একই কথা আমি আরেকজনের কাছেও শুনেছিলাম একটু আগে)…ওইখান থেকেই তারা গাড়িতে ওঠে, ওইখানেই থাকে।

: ধুর…ঐগুলা পুলিশই…ইউএনও, ওসি-সব ছিল…(বেআইনিভাবে তাই পুলিশের পোশাক, পুলিশ নয়- এমন কেউ পরতে পারে না)

আমি বলি, তাহলে হয়তো এরা পুলিশই…

: এরা (পুলিশ ও স্থানীয় প্রসাশন) মাফিয়া ডনদের (এস আলম) হয়ে কাজ করছে। এস আলমের টাকা খেয়ে পুলিশ গুলি করেছে…

বাংলাদেশের মানুষের পুলিশ প্রশাসনের ওপর অনাস্থা, অবিশ্বাস, ক্রোধ, ক্ষোভ আমি যে এই প্রথমবার লক্ষ করেছি তা নয়। ফুলবাড়ী কয়লাখনি বিরোধী আন্দোলনকারীদের সাথে গবেষণাকাজ করতে গিয়েও আমি দেখেছি, পুলিশ, প্রশাসন, সরকার নিয়ে তাদের এ রকমই ভয়াবহ সব অভিযোগ।

জাতীয় কমিটি এর মধ্যে তাদের তাৎক্ষণিক সমাবেশ শেষ করে ফেলে আমাকে ডাকতে থাকে। লিয়াকত চেয়ারম্যান এই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু আমার মনে হয় জাতীয় কমিটি তাঁর সাথে যোগাযোগ করতে চাইল না। তারা বরং আগ্রহী নিহতদের আত্মীয়দের সাথে সাক্ষাৎ করতে, তাই আমরা সেটাই করলাম।

এই ফাঁকে বলে নিই, যদিও জায়গাটির নাম গণ্ডামারা লিখছে সবাই, কিন্তু এলাকাবাসীর সাথে আলাপ করে আমার মনে হলো, জায়গাটার নাম আসলে গণ্ডারমারা হওয়া উচিত ছিল। হয়তো সেটাই ছিল এর আসল নাম, পরে মুখে মুখে হারিয়ে গেছে গণ্ডার-এর ‘র’। এলাকার নামকরণ নিয়ে জিজ্ঞেস করলে এলাকাবাসী জানায়, একসময় এই এলাকা জঙ্গল (চকোরিয়া সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ ফরেস্টের অংশ) ছিল এবং জনবসতি স্থাপন করতে এখানে অনেক গণ্ডার মারা পড়েছিল সেই মগ রাজাদের (আরাকান শাসনামল) সময়। সেই থেকেই এ নাম।

নিহতদের বাড়ি কোথায় জিজ্ঞেস করতে করতে আমাদের মোটরবাহন চলতে থাকে এবং একটা জায়গায় এলাকাবাসীর অনুরোধে তাদের কথা শুনতে আমাদের থামতে হয়। আমাদের জন্য পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও উপস্থিত ছিলেন। আমি নারীদের দিকে এগোতেই আবার সবার একসাথে পুলিশ ও কয়লা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে ক্ষোভ, ক্রোধ ও আপত্তি জানানো শুরু হয়।

: আমার দুই মামা মারা গেছে, মামাতো বোনের স্বামী মারা গেছে। আমাকেও মেরে ফেলুক, তবু আমরা কয়লাবিদ্যুৎ চাই না। আমাদের উপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মতো অত্যাচার করতেছে। আমাদের বাপ-ভাই-স্বামী পুলিশের ভয়ে রাতে ঘরে ঘুমাতে পারে না, বিলে বিলে ঘুমায়। আর পুলিশের পোশাক পরে আসামি ধরার নাম করে এরা ঘরে ঢুকছে , আমাদের অলংকার, মোবাইল ফোন নিয়ে গেছে। আমরা ভয়ে রাতে ঘুমাতে পারি না।

আমার দুই মামা মারা গেছে, মামাতো বোনের স্বামী মারা গেছে। আমাকেও মেরে ফেলুক, তবু আমরা কয়লাবিদ্যুৎ চাই না। আমাদের উপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মতো অত্যাচার করতেছে। আমাদের বাপ-ভাই-স্বামী পুলিশের ভয়ে রাতে ঘরে ঘুমাতে পারে না, বিলে বিলে ঘুমায়। আর পুলিশের পোশাক পরে আসামি ধরার নাম করে এরা ঘরে ঢুকছে , আমাদের অলংকার, মোবাইল ফোন নিয়ে গেছে। আমরা ভয়ে রাতে ঘুমাতে পারি না।

এ সময় আমি উপলব্ধি করি যে একই পরিবারের তিনজন মারা গেছেন একসাথে। এতক্ষণে আমি বুঝতে পারলাম, মৃত আনোয়ারুল ইসলাম ও মর্তুজ আলী ছিলেন আপন দুই ভাই আর জাকির হোসেন ছিলেন মর্তুজ আলীর মেয়েজামাই। আর্দ্র চোখ নিয়ে মেয়েরা আমাকে ফরিয়াদ জানাচ্ছিল আর আমি ভাবছিলাম, এক পরিবারে এতগুলো মৃত্যু কিভাবে শোক সামলাচ্ছে এই মানুষগুলো! প্রশাসন, সরকার, ব্যবসায়ীরা এদের দেখছে জঞ্জাল হিসেবে, উন্নয়নের বাধা হিসেবে…আমরা দেখছি প্রতিবাদকারী হিসেবে, কিন্তু আমরা এঁদের মানুষ ভাবছি তো? আমার বাবা, ভাই, মামা, চাচা, দাদা, স্বামী, ছেলে পুলিশের গুলিতে না মরে স্বাভাবিকভাবে মরলেও কি আমার সমান শোক হবে না, এখন ওনাদের যেমন হচ্ছে…শেষ পর্যন্ত তো আমরা মানুষই- সবাই এক, শোকের অনুভূতিও আমাদের সমান…

মৃত আনোয়ারুল ইসলাম, মর্তুজ আলী আর জাকির হোসেনের বাড়ি গিয়ে জাতীয় কমিটির নেতারা পুরুষদের সাথে আলাপে বসেন। আমাকে ঘরের ভেতর নিয়ে যায় বাড়ির মেয়েরা। কান্নাকাটি-আহাজারির রোলের মধ্যেই বাড়ির বড় বউটি আমার পরিবার, লেখাপড়া, স্বামী-সন্তান সকলের খবরাখবর জেনে নেন, মাশাল্লাহ বলেন, আপ্যায়ন করেন শরবত, বিস্কুট আর কমলা দিয়ে। আমার পানির বোতল খালি হয়ে গেছে খেয়াল করে পানি ভরে দেয় বাড়ির এক কিশোরী। এর মধ্যেই আমাকে জানানো হয়, আনোয়ারের ছেলে আরাফাত বাপকে বাঁচাতে গিয়ে ছররা গুলতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। আমরা চলে গেলে ওর চাচু ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে।

এই বাচ্চা ছেলেটার মনের মধ্যে কী চলছে, কিভাবে এই শোক সামলাচ্ছে সে, ভাবতে গিয়ে আমার বোনের মেয়েটার কথা মনে হয়। বাবা বাবা করে তার কত আহ্লাদ, কত বায়না…

গণ্ডামারায় এস আলম গ্রুপ এরই মধ্যে ১৭০০ কানি জায়গা কিনেছে (জমির হিসাবে আমি কাঁচা, তাই অ্যাক্যুরেসিতে যাচ্ছি না)। ঝামেলাটা জমি কেনাবেচা নিয়ে নয়, বারবার পরিষ্কার করেন আমাকে উত্তরদাতারা। কারণ প্রজেক্টের জন্য এস আলমের জমি কেনা শেষ। টাকা-পয়সাও যারা জমি বেচেছে তারা পেয়ে গেছে। এখন যারা প্রতিবাদ জানাচ্ছে, তারা জমিদার লোক নয়, খেটে খাওয়া মানুষ। তাদের কথা সামান্যই, কয়লা বিষক্রিয়ায় যে মাটি, পানি, গাছপালার ক্ষতি হবে, তাতে তো এই এলাকায় আর বসবাস করা যাবে না। কিন্তু তারা কোথায় যাবে? কী করে খাবে? দুইটা রথ (শরীরের কর্মক্ষমতা) ছাড়া তো তাদের সম্বল আর কিছু নাই।

আর আমার দাবিও সামান্যই: ১. এই যে এলাকাবাসী দাবি করছে পুলিশ নিরীহ লোকদের আক্রমণ করেছে, তার তদন্ত হওয়া দরকার, দোষীদের শাস্তি হওয়া দরকার। ২. পুলিশের পোশাকে কি আসলেই গুণ্ডারা এসেছিল? প্রশাসন কি আসলেই এস আলমের প্রাইভেট বাহিনীর মতো কাজ করছে? তদন্ত চাই আমি এর। নাগরিক হিসেবে পাবলিক সারভেন্টদের এইসব ক্রিমিনাল কাজকারবারের তদন্ত ও শাস্তি চাই। ৩. অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে এই যে গ্রামবাসীদের ধরপাকড়-হয়রানি করা হচ্ছে, এইসব হয়রানি বন্ধ করতে হবে।

শেষ করব এক নিহতের ছেলের উক্তি দিয়ে। জাতীয় কমিটির নেতারা তাকে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের কথা বলে সান্ত্বনা দেওয়ার, শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। তিনি উত্তর করেন-

: ওনাকে মেডিক্যালে নিলে বাঁচানো যেত। পুলিশ নিতে দেয় নাই। আইনের লোককে অনেক সম্মান দেখানো হইছে। আর না।

নাসরিন সিরাজ এ্যানি : নৃবিজ্ঞানী। ই-মেইল : nasrinsiraj@yahoo.com

বাঁশখালীর সাইরেন

মওদুদ রহমান

অবরুদ্ধ কাশ্মীরে বন্দুকের নলের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ১০-১২ বছরের শিশুরা লড়াই করে ইটের টুকরা হাতে নিয়ে, ফিলিস্তিনে চারপাশে বের হবার সব পথ বন্ধ করে দিয়ে ট্যাংকবহর নিয়ে ঢুকে পড়া ইসরায়েলি বাহিনীর মুখোমুখি শিশুরা দাঁড়িয়ে থাকে পাথর হাতে নিয়ে, আর পুলিশি অভিযান রুখতে বাঁশখালীর শিশুরা অপেক্ষা করে ‘খাণ্ডা’ হাতে নিয়ে। পুলিশের গুলি, টিয়ার শেল আর সাউন্ড গ্রেনেডের প্রাথমিক জবাব আসে খাণ্ডা দিয়ে ইটের টুকরা ছোড়ার মাধ্যমে। খাণ্ডা ব্যবহারকারীদের কারোরই বয়স ১২ বছরের বেশি নয়। কিন্তু পুলিশি অত্যাচারের কারণে পুরুষশূন্য হয়ে যাওয়া সময়ে বাঁশখালী প্রতিরোধে এরাই হচ্ছে ‘ফ্রন্টলাইন সোলজার’। আর এই অবস্থা চলছে প্রায় ১৫ দিন ধরে।

পুলিশি অভিযান রুখতে বাঁশখালীর শিশুরা অপেক্ষা করে ‘খাণ্ডা’ হাতে নিয়ে। পুলিশের গুলি, টিয়ার শেল আর সাউন্ড গ্রেনেডের প্রাথমিক জবাব আসে খাণ্ডা দিয়ে ইটের টুকরা ছোড়ার মাধ্যমে। খাণ্ডা ব্যবহারকারীদের কারোরই বয়স ১২ বছরের বেশি নয়। কিন্তু পুলিশি অত্যাচারের কারণে পুরুষশূন্য হয়ে যাওয়া সময়ে বাঁশখালী প্রতিরোধে এরাই হচ্ছে ‘ফ্রন্টলাইন সোলজার’। আর এই অবস্থা চলছে প্রায় ১৫ দিন ধরে।

বাঁশখালী বাজার স্ট্যান্ডে নেমে সিএনজি করে গণ্ডামারার দিকে কিছুদূর যাওয়ার পরই দু’পাশের লবণের ক্ষেত জুড়ে চোখে পড়ে অসংখ্য দখলি খুঁটি। ক্ষেতের কোনায় কোনায় পুঁতে দেওয়া লাল কালি দিয়ে লেখা খুঁটিগুলো স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছে যে জমির মালিকানা আর কৃষকের হাতে নেই, এটি এখন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী এস আলমের সম্পত্তি। এর কিছু কিনে নেওয়া, কিছু কৌশলে হাতিয়ে নেওয়া আর বাকিটা দখল করা।

ছবি : ক্ষেতে পুঁতে রাখা এস আলমের দখলি খুঁটি

চায়ের দোকানের সামনে টুলে বসে জিরিয়ে নিতে নিতে কথা শুরু করলে ছোটখাটো একটা জটলার মতো তৈরি হয়ে যায়। কয়লাবিদ্যুৎ সম্পর্কে স্থানীয় মানুষের উপলব্ধি জানতে মিজান ভাই তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বাঁকা প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র করলে খারাপ কী?’ ‘আপনাদের তো বিদ্যুৎ নাই, বিদ্যুতের দরকার আছে না?’ প্রশ্ন শেষ হতে না হতেই সবাই একসঙ্গে হইহই করে ওঠে। ইলিয়াস শিকদার জোর কণ্ঠে বলেন, ‘দরকার নাই এমন বিদ্যুতের। সরকার যদি আসলেই আমাগোর উন্নয়ন চাইত তাইলে আটকায় রাখছে কিসের জন্যি? আমাগোর লবণগুলি তো ভাইসা গেল তাগোর জন্যিই। তখন কই আছিল আমাগোর উন্নয়ন? আর চাকরির কথা কইতাছেন? আমরা কি বিএ, এমএ পাস নাকি যে অফিসারের চাকরি দিব? আমরা হইলাম ক্ষেতের কামলা। নিজের জমিতে কাম কইরা খাই। বিদ্যুৎকেন্দ্র হইলে বড়জোর সুইপারের কাম মিলতে পারে। হেই কাম হেরাই করুক।’

কথা হচ্ছিল আব্দুল মালেকের সাথে। তিনি বর্গাচাষি। মৌসুমে দুজন মিলে লবণ চাষ করে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। এ মৌসুমেও লবণ করেছিলেন প্রায় ১২০০ মণ। কিন্তু পুলিশি অবরোধের কারণে সময়মতো বাজারে না নিতে পারায় ১২০০ মণ লবণের পুরোটাই ভেসে গেছে। এখন আশায় আছেন আসছে মৌসুমে চিংড়ি চাষ করে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার। আব্দুল মালেকের সাথে কথা বলে বোঝা গেল, এ জমিই তাঁদের বিপদে-আপদে একমাত্র সহায়। তাঁদের কাছে এই জমি যে কোনো ফিক্সড ডিপোজিটের চেয়ে নিরাপদ, এই জমি থেকে বছরপ্রতি প্রাপ্ত রিটার্ন যে কোনো স্কিমের চেয়ে ঢের বেশি। তাহলে এই জমি কেড়ে নিয়ে কয়েক হাজার কৃষককে কর্মহীন করে দিয়ে মাত্র কয়েকশ কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র করার পাঁয়তারা মানুষ মেনে নেবে কেন!

তাঁদের কাছে এই জমি যে কোনো ফিক্সড ডিপোজিটের চেয়ে নিরাপদ, এই জমি থেকে বছরপ্রতি প্রাপ্ত রিটার্ন যে কোনো স্কিমের চেয়ে ঢের বেশি। তাহলে এই জমি কেড়ে নিয়ে কয়েক হাজার কৃষককে কর্মহীন করে দিয়ে মাত্র কয়েকশ কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র করার পাঁয়তারা মানুষ মেনে নেবে কেন!

‘গণ্ডামারা বসতভিটা ও গোরস্তান রক্ষা কমিটি’র নেতৃত্বে থাকা লিয়াকত আলীর খোঁজে আমরা হাঁটতে থাকি আরো ভেতরের দিকে। যেতে যেতেই দেখতে পাই ১৫ দিন ধরে অবরুদ্ধ থাকা মানুষের ওপর চলতে থাকা নির্যাতনের ক্ষত। মানুষ ডেকে নিয়ে দেখাতে থাকে বুলেটে ঝাঁঝরা করে দেওয়া টিনের ঘর, বুটের লাথির চিহ্ন আর বলতে থাকে তাদের ভয়ংকর সব অভিজ্ঞতা। আব্দুল মোনাফের স্ত্রী জানান কিভাবে তাঁর বাড়ির উঠানে সাউন্ড গ্রেনেড চার্জ করা হলো, কী করে ঘরের ভেতর ঘুমাতে থাকা তাঁর বাচ্চা শত রাউন্ড রাবার বুলেট চালানোর পরও অলৌকিকভাবে বেঁচে গেল, কোন আক্রোশে চলে যাবার সময় গোয়ালে বেঁধে রাখা গরুটাকে গুলি মেরে গেল।

মানুষ ডেকে নিয়ে দেখাতে থাকে বুলেটে ঝাঁঝরা করে দেওয়া টিনের ঘর, বুটের লাথির চিহ্ন আর বলতে থাকে তাদের ভয়ংকর সব অভিজ্ঞতা। আব্দুল মোনাফের স্ত্রী জানান কিভাবে তাঁর বাড়ির উঠানে সাউন্ড গ্রেনেড চার্জ করা হলো, কী করে ঘরের ভেতর ঘুমাতে থাকা তাঁর বাচ্চা শত রাউন্ড রাবার বুলেট চালানোর পরও অলৌকিকভাবে বেঁচে গেল, কোন আক্রোশে চলে যাবার সময় গোয়ালে বেঁধে রাখা গরুটাকে গুলি মেরে গেল।

ছবি : গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার শেল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঁশখালীবাসীর লড়াই চলছে

ছবি : পুলিশি নির্যাতনের চিহ্ন

ছবি : রাবার বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া টিনের দেয়ালের একাংশ

এসব শুনতে শুনতে, দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে যাই লিয়াকত আলীর কাছে, পুলিশের কাছে যিনি মোস্ট ওয়ান্টেড, যাঁকে না পেয়ে পুলিশ ইতোমধ্যেই ধরে নিয়ে গেছে তাঁর অসুস্থ বৃদ্ধ বাবাকে। এলাকাবাসীর দৃঢ় বিশ্বাস যে কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরোধিতার কারণেই মিথ্যা অস্ত্র মামলায় তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে। জনগণের ইস্যু নিয়ে চলমান আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে থাকা লিয়াকত আলীর ওপর মানুষের ভরসার ভিত্তিটা কোথায় তা বোঝার চেষ্টা করলাম। জানতে চাইলাম, ‘এর শেষটা কোথায়?’ তিনি স্পষ্ট জানালেন, এখানকার মানুষ কয়লাবিদ্যুৎ হতে দেবে না, এটাই শেষকথা। তবে এলাকার বিদ্যুৎহীনতার সমাধান কী জানতে চাইলে তিনি দূষণমুক্ত উপায়ের কথা বললেন। বায়ুবিদ্যুৎ, সোলার, জলবিদ্যুতের কথা বললেন। মানুষের সাথে কথা বলে বুঝলাম, বাঁশখালীবাসী হাওয়ার ওপর ভর করে কয়লাবিদ্যুতের বিরোধিতা করছে না। তাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত-বিশ্লেষণ আছে। তারা এটা নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করেছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এলাকার তরুণরা ইন্টারনেট ঘেঁটে কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের লাভ-ক্ষতির হিসাব জেনেছে-জানিয়েছে। তাই উন্নয়নের ফাঁকা বুলিতে ভুলিয়ে যেনতেন প্রকারে বাঁশখালীতে কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র করা যাবে না বলেই মনে হচ্ছে।

গত ৪ এপ্রিল পুলিশ বাহিনীর সাথে মিলে চারজনকে হত্যা করে এস আলম গ্র“প সকলের মনে ভয় ছড়িয়ে চলমান আন্দোলন ভণ্ডুল করে দেওয়ার যে ফন্দি এঁটেছিল তা নিশ্চিতভাবেই ব্যাকফায়ার করেছে। এলাকার মানুষ এখন আগের চেয়েও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, আরো বেশি একতাবদ্ধ। এস আলম গ্রুপের কালো টাকার বিষে নীল হয়েছে স্থানীয় প্রশাসন, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, আইনজীবী আর এলাকার কিছু চিহ্নিত মানুষ। কিন্তু জীবন-জীবিকা বাঁচাতে এক হয়ে যাওয়া মানুষের ঐক্যে ফাটল ধরানো যায়নি। তাইতো বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি ঘুরিয়ে আনার নামে প্রমোদ ভ্রমণের আয়োজন করে আর সকলের হাতে দুই হাজার করে টাকা ধরিয়ে দিয়েও কোনো কাজ হয়নি। বরং ঐ বিদ্যুৎকেন্দ্র দেখে এলাকায় ফিরে এসে তারা আরো জোরেশোরে কয়লাবিদ্যুৎবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছে। সবাইকে জানাচ্ছে বড়পুকুরিয়া এলাকার প্রকৃত অবস্থা।

ছবি : অবরুদ্ধ বাঁশখালীবাসী

কথা বলছিলাম বড়পুকুরিয়া সফরে থাকা আকতার হোসেনের সাথে। জানতে চেয়েছিলাম তাঁর অভিজ্ঞতা। তিনি জানালেন, যাত্রার মুহূর্ত থেকে শুরু করে ফিরে আসা পর্যন্ত তিন দিনের আয়োজনে কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র এলাকায় তাঁদের রাখা হয়েছে মাত্র ৪০ মিনিট। এরপর তিনিই আমাকে পালটা প্রশ্ন করেন, ‘এই সময়ের মধ্যে কারো পক্ষে কী করে বোঝা সম্ভব?’ তার পরও কী দেখলেন, কী বুঝলেন জানতে চাইলে বললেন, “যেটা মনে হইছে যে কয়লাবিদ্যুতের কারণে ঐ এলাকায় খুব গরম। আলগা তাপ গায়ে লাগে। আমাগোরে তারা আশেপাশের গাছপালা দেখাইয়া কইছে, ‘দেখো, এইখানে ফুল হয়, ফল হয়, ফসল হয়।’ কিন্তু এইডা তো কোনো কথা না। কয়লা কেন্দ্র হইলেই যে ফল-ফসল একবারে সাথে সাথে নাই হইয়া যাইব, এই কথা তো আমরা কই নাই।” সফরে থাকা আরেকজন জানালেন, যখন তাঁরা আশপাশের মানুষের সাথে কথা বলতে চাইছিলেন তখন তাঁদের বলা হয়েছে, ‘সময় নাই।’ অথচ এরপর স্বর্ণপুরী পার্কে নিয়ে তাঁদের বসিয়ে রাখা হয়েছে তিন ঘণ্টা।

গণ্ডামারা এলাকায় এখন যেন এস আলমের রাজত্ব চলছে। কয়লাবিদ্যুৎ করতে না দেওয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে উচ্চকিত গণ্ডামারার মানুষের মনে ভীতি ছড়িয়ে দেওয়ার সব রকম ব্যবস্থাই নেওয়া হয়েছে। বাঁশখালী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বসানো হয়েছে প্রায় ১৫০০ পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্প। গণ্ডামারা থেকে বের হওয়ার অন্তত আটটি পয়েন্টে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। কয়লাবিদ্যুতের বিপক্ষের কাউকে পেলে এখানে কারো নিস্তার নাই। অজ্ঞাত আসামির নামে সাজিয়ে রাখা মামলায় আটক দেখিয়ে সাথে সাথে আটক করা হচ্ছে।

গণ্ডামারা এলাকায় এখন যেন এস আলমের রাজত্ব চলছে। কয়লাবিদ্যুৎ করতে না দেওয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে উচ্চকিত গণ্ডামারার মানুষের মনে ভীতি ছড়িয়ে দেওয়ার সব রকম ব্যবস্থাই নেওয়া হয়েছে। বাঁশখালী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বসানো হয়েছে প্রায় ১৫০০ পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্প। গণ্ডামারা থেকে বের হওয়ার অন্তত আটটি পয়েন্টে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। কয়লাবিদ্যুতের বিপক্ষের কাউকে পেলে এখানে কারো নিস্তার নাই। অজ্ঞাত আসামির নামে সাজিয়ে রাখা মামলায় আটক দেখিয়ে সাথে সাথে আটক করা হচ্ছে। আর ঠিক এ কারণেই সাইক্লোনের আগেই তৈরি হয়ে যাওয়া লবণ বিক্রি করা যায়নি। এমনকি মাটিতে গর্ত করে লবণ চাপা দিয়ে রাখার আয়োজনটুকু পর্যন্ত পণ্ড করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে গলে গেছে কয়েক কোটি টাকার লবণ। রক্ত পানি করা শ্রমে তৈরি লবণ সময়মতো হাটে পৌঁছাতে না পারায় আব্দুল মান্নান আর করিম শেখদের মতো ভূমিহীন কৃষকের এখন মাথায় হাত। কয়লা প্রকল্পে যদি কোনো ক্ষতি না-ই হয়, তাহলে প্রথমে টেক্সটাইল মিলের গল্প ফেঁদে লুকোছাপা করা হলো কেন? এস আলম যদি নিয়ম মেনেই সব কিছু করে তাহলে এমন পুলিশি নির্যাতন কেন? প্রশাসন যদি এস আলমের দলে না-ই ভিড়ে থাকে তাহলে ঘূর্ণিঝড় আঘাতের দিনে গণ্ডামারা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটতে থাকা মানুষকে পুলিশ দিয়ে আটকে দেওয়া হলো কেন? আর গণমাধ্যম যদি এস আলমের কাছে বিক্রি না-ই হয়ে থাকে তাহলে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির কোনো সংবাদ নেই কেন? বাঁশখালীবাসীর তোলা এই প্রতিটি প্রশ্ন নিয়ে ভাবার সময় হয়েছে। প্রান্তে চলতে থাকা অনাচারের দিকে না তাকিয়ে কেন্দ্রে বসে নিজেকে নিরাপদ মনে করার কোনো কারণ নেই। যে উন্নয়নের আগুনে বাঁশখালী পুড়ছে, সেই আগুন যে কখনো আমার-আপনার ঘরে লাগবে নাÑএমন ভাবনার কোনো ভরসা নেই।

কয়লা প্রকল্পে যদি কোনো ক্ষতি না-ই হয়, তাহলে প্রথমে টেক্সটাইল মিলের গল্প ফেঁদে লুকোছাপা করা হলো কেন? এস আলম যদি নিয়ম মেনেই সব কিছু করে তাহলে এমন পুলিশি নির্যাতন কেন?

ছবি : গণ্ডামারা যাওয়ার পথে শিলকুপ টাইম বাজারে স্থাপিত পুলিশ চেকপোস্ট

ফিরে আসার পথে বাঁধের ওপরের রাস্তায় দেখা হয় গরু চরিয়ে নিয়ে আসতে থাকা হালিমার সাথে। কথায় কথায় জানলাম সেই ঝড়ের দিনে গরুগুলো নিয়ে তাঁর লড়াইয়ের কথা, অন্য কোথাও যেতে না পেরে বাঁধের ওপর আশ্রয় নেওয়ার কথা। ‘সেই দিন এক পারে ছিল ৭ নাম্বার, আরেক পারে ছিল ১০ নাম্বার। ৭ নাম্বার তো কাটায়ে উঠিছি, কিন্তু ১০ নাম্বার কবে কাটব জানি না।’ বাঁশখালীর মানুষের ওপর কোম্পানি আর সরকার মিলেমিশে এক হয়ে যাওয়া দানবের ক্ষমতা প্রদর্শনের নোংরামি বর্ণনায় সাগরপারের নারীর এই সাহসী উচ্চারণ একেবারেই যথার্থ। ‘রোয়ানু’ সতর্কতায় জারি করা ৭ নম্বর বিপদসংকেতের পতাকা অনেক আগেই নেমে গেছে, কিন্তু উন্নয়নের নামে করতে যাওয়া অনাচার রুখে দাঁড়ানো বাঁশখালীর মানুষের ওপর রাষ্ট্রের আরোপিত ‘শনি’র পতাকা এখনো উড়ছে। বিপদের সাইরেন এখনো বাজছে। বাঁশখালী ঘিরে কয়েক হাজার পুলিশের উপস্থিতি যদি শক্তি প্রদর্শনের মহড়া হয় তাহলে জীবন-জীবিকা বাঁচাতে লড়াকু মানুষের বাড়তে থাকা ক্ষোভ নিশ্চিতভাবেই দ্রোহের আগ্নেয়গিরি। সরকার যত তাড়াতাড়ি এর আঁচটা উপলব্ধি করবে ততই মঙ্গল।

উন্নয়নের চেতনানাশকে আমরা যখন সবাই আক্রান্ত, একের পর এক লুটপাটের রেকর্ড ভাঙার খবর পেতে পেতে আমরা যখন ক্লান্ত, তখন কোনো এক উপলক্ষে কখনো ফুলবাড়ী আবার কখনো বাঁশখালীর মতো প্রত্যন্ত জনপদের মানুষ অনিয়মের ধারা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়, জিদ করে বলে বসে, ‘না।’ মাটির কাছাকাছি থাকা এই ‘না’ বলতে পারা মানুষগুলোই বর্তমান সময়ে আমাদের একমাত্র আশার ভেলা। আর এই ভেলা ভাসিয়ে রাখার দায় আমাদের সকলের।

উন্নয়নের চেতনানাশকে আমরা যখন সবাই আক্রান্ত, একের পর এক লুটপাটের রেকর্ড ভাঙার খবর পেতে পেতে আমরা যখন ক্লান্ত, তখন কোনো এক উপলক্ষে কখনো ফুলবাড়ী আবার কখনো বাঁশখালীর মতো প্রত্যন্ত জনপদের মানুষ অনিয়মের ধারা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়, জিদ করে বলে বসে, ‘না।’ মাটির কাছাকাছি থাকা এই ‘না’ বলতে পারা মানুষগুলোই বর্তমান সময়ে আমাদের একমাত্র আশার ভেলা। আর এই ভেলা ভাসিয়ে রাখার দায় আমাদের সকলের।

২৬ মে সরেজমিন অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে লেখাটি তৈরি করা হয়েছে। ফিরে আসার পরও লেখক স্থানীয়দের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছিলেন। সর্বশেষ অবস্থা জানতে মোবাইলে স্থানীয় একজনের সাথে কথা হয় গত ৫ জুলাই। লেখার এই অংশে শেষ পর্যন্ত প্রাপ্ত আপডেটগুলো তুলে ধরা হলো :

বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষমতার জোরে করে ফেলার আরেক নমুনা দেখা গেল গত ১৮ জুন পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিবেশগত ছাড়পত্র দিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। অথচ এই ছাড়পত্র দেওয়ার প্রক্রিয়ায় পরিবেশ সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়নি, নেওয়া হয়নি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ মতামত। সেই সাথে জনমত যাচাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ অত্যাবশ্যকীয় কাজটিও উপেক্ষিত থেকে গেছে। অপরদিকে বাঁশখালী উপজেলার সব ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। স্থানীয়দের ধারণা, বিদ্যুৎকেন্দ্রবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা লিয়াকত আলীর নিশ্চিত জয় ঠেকাতেই এ কাজ করা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফোনালাপে একজন জানান যে, এলাকায় কোম্পানি আর পুলিশের ত্রাসের রাজত্ব এখনো জারি আছে। প্রায় প্রতিদিনই ১০ থেকে ১২ জনের সন্ত্রাসী দল অস্ত্রসহ মহড়া দেয়। আর পুলিশ চেকপোস্টগুলো থেকে গ্রেপ্তার ছাড়াও ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে বলে জানা যায়। অপরদিকে স্থানীয় জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সকল আয়োজন বন্ধের দাবিতে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ব্যানারে রাজনৈতিক দলগুলোর রাজপথের আন্দোলন চলছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং এস আলম গ্র“পের পরিচালকের প্রতি এক খোলা চিঠিতে চলতে থাকা নিপীড়ন-নির্যাতন বন্ধ করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছে। সেই সাথে বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্র অবিলম্বে বাতিল করে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

আলোকচিত্র কৃতজ্ঞতা : মিজানুর রহমান

মওদুদ রহমান: প্রকৌশলী, ইমেইল :mowdudur@gmail.com

Social Share
  • 1.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.1K
    Shares
  •  
    1.1K
    Shares
  • 1.1K
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *