সুরাইয়া ইয়াসমিন ও কমিউনিস্ট আন্দোলনে নারীর ভূমিকা

স্মরণ

সুরাইয়া ইয়াসমিন ও কমিউনিস্ট আন্দোলনে নারীর ভূমিকা

অনিন্দ্য আরিফ

গোষ্ঠীতান্ত্রিক পুঁজিবাদ বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জেঁকে বসলেও সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতির জোয়াল যে এদেশে এখনও বিদ্যমান, সেটা অনস্বীকার্য। যতই আমরা নারীর ক্ষমতায়ন আর নারী প্রগতির ফাঁকা আস্ফালনের বহিঃপ্রকাশ ব্যক্ত করি না কেন, পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের শিকার হয়ে এদেশের নারীরা এখনও যে কতটা সামাজিক নিগ্রহের শিকার হচ্ছে তা দেশের নারী ধর্ষণ আর নির্যাতনের মাত্রা দেখে উপলব্ধি করা যায়। তবে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের বিদ্যমান সমাজব্যবস্থায় নারীকে যতই অবদমিত করে রাখা হোক না কেন, তারা কিন্তু সমাজ প্রগতিতে পুরুষের চাইতে কম অবদান রাখেনি। দেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্রসহ মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাঁদের অনেকে শুধু সামনে থেকেই নেতৃত্ব দেননি, প্রয়োজনে শহিদি আত্মদানের মাধ্যমে জীবন উৎসর্গ করে গেছেন।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ লড়াই করতে গিয়ে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আত্মদানের কথা আমাদের জানা। জানা আছে ঝাঁসির রানি লক্ষ্মী বাঈয়ের বীরত্বকাহিনি। আরেক লক্ষ্মী অর্থাৎ আজাদ হিন্দ ফৌজের ক্যাপ্টেন ডা. লক্ষ্মী সেহগলের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামী জীবনের কথাও আমাদের জানা আছে। কল্পনা দত্ত, মনোরমা মাসিমা, কুমুদিনী হাজং কিংবা ইলা মিত্র আমাদের কাছে অনুসরণীয়। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত অসংখ্য নারীর আত্মত্যাগের ফলেই স্বাধীন দেশের জন্ম সম্ভব হয়েছে। দুই লাখ নারী ভয়ংকর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তার পাশাপাশি প্রত্যক্ষ যুদ্ধের ময়দানে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল বহু নারীর। অনেকে সরাসরি রণাঙ্গনে না গিয়েও মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছেন। অনেক প্রান্তিক নারী তাঁদের জীবনের সর্বস্ব খোয়ালেও মুক্তিসংগ্রামকে বেগবান করার কাজে পিছু হটেননি। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে এসেও মুক্তিসংগ্রামে নারীর ভূমিকার যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি, তাঁদের বেশির ভাগকেই আমরা প্রাপ্য মর্যাদা দিতেও ব্যর্থ হয়েছি, রাষ্ট্রীয় কোন স্বীকৃতিও তাঁদের কপালে জোটেনি। অবশ্য তাঁরা এসবের প্রত্যাশা করে যেমন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি, তেমনি আমৃত্যু এর জন্য কোন হাহাকার তাঁদের মধ্যে দেখা যায়নি। এমনই এক সংগ্রামী নারী আমার মা সুরাইয়া ইয়াসমিন।

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে এসেও মুক্তিসংগ্রামে নারীর ভূমিকার যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি, তাঁদের বেশির ভাগকেই আমরা প্রাপ্য মর্যাদা দিতেও ব্যর্থ হয়েছি, রাষ্ট্রীয় কোন স্বীকৃতিও তাঁদের কপালে জোটেনি। অবশ্য তাঁরা এসবের প্রত্যাশা করে যেমন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি, তেমনি আমৃত্যু এর জন্য কোন হাহাকার তাঁদের মধ্যে দেখা যায়নি। এমনই এক সংগ্রামী নারী আমার মা সুরাইয়া ইয়াসমিন।

তাঁর জন্ম ১৯৫২ সালের ৫ নভেম্বর, যশোরের খড়কীর পিরবাড়িতে। তাঁর নানা ছিলেন খড়কীর পির শাহ আবদুল খায়ের। তাঁর বাবা শহিদ এস এম জোবায়েদ আলী আর মা সখিনা খাতুন। মায়ের পৈতৃক নিবাস ছিল খুলনা জেলার ডুমুরিয়া থানার আরাজী ডুমুরিয়া গ্রামে। তাঁর বাবা ১৯৩৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাস করেন। কলকাতায় থাকাকালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র হিসাবে তৎকালীন মুসলিম লীগের নেতা ও বাংলার প্রধানমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যলাভের সুযোগ হয়েছিল। তিনি কোন রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী না হয়েও ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের অনেক সভা-সমাবেশ ও মিছিলে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি রাইটার্স বিল্ডিংয়ে চাকরিজীবন শুরু করেন এবং দেশভাগের পর ঢাকার সচিবালয়ে তাঁর চাকরি স্থানান্তরিত হয়। তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণে অনেকের হতাহতের প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দেয়। ওই ধর্মঘটে ব্যাপক ছাত্রসমাজ অংশগ্রহণ করে। শ্রমিক, কৃষক ও সরকারি কর্মচারীরাও ওই ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। জোবায়েদ আলী রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবির প্রতি সমর্থন জানানোর ফলে তাঁর ঊর্ধ্বতন এক অবাঙালি কর্মকর্তা খুবই খারাপ ব্যবহার করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত ওই কর্মকর্তার অপমানজনক আচরণের প্রতিবাদে জোবায়েদ আলী চাকরি থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

আজীবন সুফি দর্শনে অনুরক্ত জোবায়েদ আলী প্রগতিশীল রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক আইন পরিষদের সাধারণ নির্বাচনের সময় যুক্তফ্রন্টের পক্ষে নির্বাচনি প্রচারাভিযানে অংশগ্রহণ করেন এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এবং মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। মায়ের বড় মামা ছিলেন এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের কিংবদন্তিতুল্য নেতা কমরেড আবদুল হক। আর মেজো মামা অধ্যাপক আবদুল হাই ছিলেন যশোর মাইকেল মধুসূদন দত্ত কলেজ ও খুলনা ব্রজলাল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ। তিনি কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহপাঠী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তাঁদের এই বন্ধুত্ব আমৃত্যু অটুট ছিল।

২.
এরকম একটি প্রগতিশীল রাজনৈতিক পরিবারে এবং পরিবেশে আমার মায়ের বেড়ে উঠা। আবার তিনি যখন কৈশোর থেকে যৌবনে উপনীত হচ্ছেন, তখন সারা বিশ্বও এক টালমাটাল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বৃটেন, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, স্পেন-কেউই আর পৃথিবীজুড়ে তাদের উপনিবেশগুলোকে প্রত্যক্ষভাবে শাসন করার জায়গায় ছিল না। কারণ সর্বত্রই শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার জন্য তীব্র লড়াই। তাদের প্রত্যক্ষ শাসনের প্রয়োজনীয়তাও কমে আসছিল, লগ্নিপুঁজি দক্ষতা অর্জন করেছিল। দেশে দেশে এলিট বুর্জোয়া শ্রেণির জন্ম হয়ে গিয়েছিল। কোনো কোনো দেশে স্বাধীনতা উপহার হিসেবে পৌঁছাতে লাগল উপনিবেশকে নতুন রূপ দিতে-একেবারে হাতছাড়া হয়ে যাবার আগেই।

একে একে এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকার একটা না একটা দেশ স্বাধীনতা পাচ্ছিল। কেউ কেউ ছিনিয়েও নিচ্ছিল। ১৯৪৭-এ দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে জন্ম নিল দুটি পৃথক রাষ্ট্র-ভারত ও পাকিস্তান। ১৯৪৮-এ মিয়ানমার, ১৯৪৯-এ চীনের বিপ্লব, ১৯৫১-তে লিবিয়া, ১৯৫৬-তে সুদান ও মরক্কো, ১৯৫৭-তে ঘানা স্বাধীন হল। ১৯৫৮-তে ইরাকের রাজা ফজলেকে সিংহাসনচ্যুত করে গণপ্রজাতন্ত্র ঘোষিত হল। ১৯৫৯-এ সংঘটিত হল কিউবার বিপ্লব। ১৯৬০-এ মৌরিতানিয়া, আইভরি কোস্ট, কঙ্গো, দাহমে, চাদ, সেন্ট্রাল আফ্রিকা, গ্যাবন, মালি ফেডারেশন স্বাধীনতা পেল। যেসব দেশ শুধুমাত্র উপহার হিসাবে স্বাধীনতাকে দেখতে চাইছিল না, সেখানেই ঘটছিল আক্রমণ, প্রকাশ্যে বা গোপনে। যেমন-১৯৬১-তে আফ্রিকার কঙ্গোতে মুক্তিসংগ্রামী প্যাট্রিস লুমুম্বাকে সিআইএ হত্যা করল জাতিসংঘের ছাতার তলায়। এর কয়েক বছর পরই সিআইএ হত্যা করল কিউবা বিপ্লবের অন্যতম নায়ক মহান মার্ক্সবাদী নেতা আর্নেস্টো চে গুয়েভারাকে।

ঠিক একই সময় অর্থাৎ ১৯৬০-এর দশকে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে শুরু হল মতাদর্শিক মহাবিতর্ক। সংশোধনবাদী ক্রুশ্চেভের নেতৃত্বাধীন সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে অবস্থান নিল মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বাধীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ও এনবার হোক্সার নেতৃত্বাধীন আলবেনিয়ার লেবার পার্টি। দেশে দেশে বিভক্ত হতে শুরু করল কমিউনিস্ট পার্টিগুলো। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টিও বিভক্ত হয়ে গেল। একদিকে মণি সিংহ, খোকা রায়, জ্ঞান চক্রবর্তীদের পার্টি ইপিসিপি বা ইস্ট পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি নিল সোভিয়েত পার্টির সংশোধনবাদী তত্ত্বের লাইন, অন্যদিকে সুখেন্দু দস্তিদার, আবদুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহারা নেতৃত্ব দিলেন ইপিসিএমএল বা ইস্ট পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদীর। এর মধ্যে ১৯৬৭ সালের মে মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সংঘটিত হল নকশালবাড়ীর কৃষক অভ্যুত্থান। যারই পরিপ্রেক্ষিতে চারু মজুমদারের নেতৃত্বে ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনে মাত্রাতিরিক্ত সংসদীয় ঝোঁকের বিরুদ্ধে পরিচালিত হল মতাদর্শিক সংগ্রাম। তৈরি হল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী)। অবশ্য মাত্রাতিরিক্ত সংসদীয় ঝোঁকের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে এ পার্টিও শেষ পর্যন্ত সংকীর্ণতাবাদের জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিল। তবে কমরেড চারু মজুমদারের নকশালবাড়ীর কৃষক অভ্যুত্থান এবং তার আটটি দলিলের ওপর ভিত্তি করে গৃহীত লাইন গ্রহণ করে ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলন যতটা না সংকীর্ণতাবাদের চোরাগলিতে আবদ্ধ হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট আন্দোলনে। বিশেষ করে এ অঞ্চলের চীনপন্থী কমিউনিস্ট নেতৃত্ব তখন চলমান ‘জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারে’র সংগ্রামকে অনুধাবন না করে একাংশ ‘দুই কুকুরের কামড়াকামড়ি’র ভ্রান্তিকর তত্ত্বের প্রয়োগ ঘটান।

তবে গোটা ষাটের দশকের বিশ্বব্যাপী উত্তাল সংগ্রাম এবং পাকিস্তানি ঔপনিবেশিকতাবিরোধী সংগ্রাম তখন একবিন্দুতে মিলিত হয়ে অনেক তরুণ-তরুণীকে কমিউনিস্ট আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেছিল। এমনকি পার্টির ভুল লাইন সত্ত্বেও তাঁদের আত্মত্যাগ আর বীরত্বগাথা মানুষের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে চির অম্লান হয়ে থাকবে। এরকম একটা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট আমার মা সুরাইয়া ইয়াসমিনের বিপ্লবী মানসিকতা তৈরিতেও ভূমিকা রেখেছিল। এই ষাটের দশকেই তিনি যখন ক্রমশ যৌবনের দিকে যাচ্ছেন, তখন তাঁদের বাড়িতে পৌঁছে যাচ্ছে সোভিয়েত চিরায়ত সাহিত্য। তিনি একে একে পাঠ করছেন পুশকিন, গোগল, তলস্তয় আর চেখভের সাহিত্য। ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ আর নিকোলাই অস্ত্রভস্কির ‘ইস্পাত’ পড়ে তিনি বিপ্লবী চেতনার স্বাদ নিচ্ছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত নারী ‘তানিয়া’র বীরত্ব আর আত্মত্যাগ তাঁকে সংগ্রামী জীবনে উদ্বুদ্ধ করছে। আর চীনের বিদেশি ভাষা প্রকাশনালয় থেকে প্রকাশিত বইও তাঁর কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে ভবিষ্যতের সংগ্রামী জীবনের প্রেক্ষাপট তাঁর জীবনে রচিত হয়েছে সেই উত্তাল ষাটের দশকেই।

১৯৬৮ সালে তিনি এসএসসি এবং ১৯৭০ সালে এইচএসসি পাস করেন। এর মধ্যে শুরু হয় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। এ সময় তাঁর পারিবারিক জীবনে নেমে আসে মহাবিপর্যয়। ১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে খুলনার খালিশপুরের যশোর রোডে খণ্ডযুদ্ধে অবতীর্ণ হয় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল এবং তারা পাকিস্তানি হানাদারদের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের সামনে বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি। ‘শান্তি কমিটি’ মারফত খবর পেয়ে পাকিস্তানি হানাদাররা তাদের ঘেরাও ও আটক করে ফেলে। চৌদ্দজনকে একসঙ্গে সারিবদ্ধ করে ব্রাশফায়ার করা হয়। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন মায়ের বড় ভাই শহিদ শহীদুর রহমান (রনু)। তিনি তখন সদ্য পড়াশোনা শেষ করে বীণাপাণি স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছেন এবং তৎকালীন চীনপন্থী কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় কর্মী। যখন চৌদ্দজনকে ব্রাশফায়ার করা হচ্ছে, তখন মংলা বন্দরের কর্মচারী আমার মেজো মামা শহিদ লতিফুর রহমান (মোহন) ওখানে অবস্থান করছিলেন। বড় ভাইকে গুলি খেতে দেখে তিনি দৌড়ে তাঁর কাছে যান এবং জড়িয়ে ধরেন। এ অবস্থায় চলে যেতে থাকা পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর জিপ থেকে আরও একঝাঁক গুলি এসে মেজো মামাকেও ঝাঁঝরা করে দেয়। দুই ভাইকে বিচ্ছিন্ন করতে না পেরে ওই অবস্থায় কবর দেয়া হয়। গোয়ালখালীতে তাঁদের স্মৃতিরক্ষার্থে শহিদস্তম্ভ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে খুলনার খালিশপুরের যশোর রোডে খণ্ডযুদ্ধে অবতীর্ণ হয় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল এবং তারা পাকিস্তানি হানাদারদের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের সামনে বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি। ‘শান্তি কমিটি’ মারফত খবর পেয়ে পাকিস্তানি হানাদাররা তাদের ঘেরাও ও আটক করে ফেলে। চৌদ্দজনকে একসঙ্গে সারিবদ্ধ করে ব্রাশফায়ার করা হয়। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন মায়ের বড় ভাই শহিদ শহীদুর রহমান (রনু)।

১৯৭১ সালের ৬ জুলাই ডুমুরিয়ার স্থানীয় রাজাকাররা খুলনার মুসলিম লীগ নেতা খান-এ-সবুরের নির্দেশে আমার নানা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শহিদ জোবায়েদ আলীকে ডুমুরিয়া বাজারে গুলি করে এবং ওই দিন গভীর রাতেই তাঁর মৃত্যু হয়। সেরাতেই আমার মা সুরাইয়া ইয়াসমিন তাঁর মাসহ ছোট ছোট পাঁচ ভাই-বোনকে নিয়ে খুলনা শহরের উদ্দেশে নৌকাযোগে রওনা দেন, খুলনা শহরে এক আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নেন। কিছুদিনের মধ্যে একজন শুভাকাক্সক্ষীর মাধ্যমে তিনি পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের ম্যাটার্নিটি ক্লিনিকে চাকরি নেন। এসময় তাঁর সঙ্গে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সংযোগ স্থাপিত হয়। তিনি তাদের তথ্যদাতা হিসাবে কাজ করতে থাকেন। সে সময় মুক্তিযোদ্ধাদের নির্দেশে খুলনা ওয়্যারলেস ভবন উড়িয়ে দেয়ার ডিজাইন প্রস্তুত করেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে দেন। যেদিন ওই স্থাপনা উড়িয়ে দেয়া হয়, সেদিন তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বোমা বহন করেন এবং সেটি উড়িয়ে দেয়ার সময় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া তিনি খুলনা থেকে যশোরে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্ত্র সরবরাহে ভূমিকা রাখেন।

সে সময় মুক্তিযোদ্ধাদের নির্দেশে খুলনা ওয়্যারলেস ভবন উড়িয়ে দেয়ার ডিজাইন প্রস্তুত করেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে দেন। যেদিন ওই স্থাপনা উড়িয়ে দেয়া হয়, সেদিন তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বোমা বহন করেন এবং সেটি উড়িয়ে দেয়ার সময় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া তিনি খুলনা থেকে যশোরে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্ত্র সরবরাহে ভূমিকা রাখেন।

মুক্তিযুদ্ধের পর বড় মামার প্রভাবে এবং আমার বাবা কমরেড আজিজুর রহমানের সংস্পর্শে এসে তিনি গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। বিশেষ করে মাও সে তুংয়ের ‘দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে’ গ্রন্থের ওপর বাবার নেয়া পার্টি ক্লাস তাঁকে মার্ক্সীয় মতাদর্শের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টিতে সহায়তা করে। ১৯৭৩ সালে দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং ১৯৭৫ সালে পার্টির অনুমতি নিয়ে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনামলে আমার বাবা গ্রেফতার হন এবং দীর্ঘ তিন বছরের বেশি সময় ধরে খুলনা, যশোর ও রংপুর জেলে কারান্তরিন থাকেন। এ সময় আমার মা সুরাইয়া ইয়াসমিনকে তাঁর সরকারি দফতরে নানাভাবে পুলিশি হয়রানি করা হয় এবং গ্রেফতারের হুমকি দেয়া হয়। তিনি তখন খুলনার দিঘলিয়াতে কৃষকের বাড়িতে ছয় মাসের জন্য আত্মগোপনে যান। পরে তাঁর অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রচেষ্টায় স্বপদে সবেতনে পুনরায় নিযুক্ত হন। ১৯৭৯ সালের ৬ ডিসেম্বর আমার বাবা কমরেড আজিজুর রহমান জেল থেকে মুক্তি পান। ১৯৮১ সালের ১১ মার্চ সুরাইয়া ইয়াসমিনের একমাত্র সন্তান হিসাবে আমার জন্ম হয়। তিনি ২০১০ সালে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের জেলা কার্যালয়ের ক্যাশিয়ার হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন। বহু প্রলোভনেও তিনি চাকরিজীবনে দুর্নীতি থেকে সব সময় বিরত ছিলেন। অসাধারণ সততা আর সহকর্মীদের প্রতি মমত্ববোধ তাঁকে চাকরিজীবনেও সহকর্মীদের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা অর্জনে সহায়ক হয়েছিল।

আমার মায়ের ব্যক্তিজীবন আর রাজনৈতিক জীবন কখনই আলাদা করা যায়নি। বিভিন্ন সময়ে মায়ের কাছে আতিথেয়তা পেয়েছেন ভাষাসংগ্রামী আবদুল মতিন ও তাঁর স্ত্রী, কমরেড সত্য মৈত্র, কমরেড অমল সেন, কমরেড শরদিন্দু দস্তিদার, কমরেড টিপু বিশ্বাস, জননেতা রাশেদ খান মেনন, কমরেড বিমল বিশ্বাস, কমরেড আনিসুর রহমান মল্লিক, কমরেড সাইফুল হক, কমরেড রণজিৎ চট্টোপাধ্যায়, আবদুস সাত্তার, ফজলে হোসেন বাদশা, মোশাররফ হোসেন নান্নুসহ কমিউনিস্ট আন্দোলনের অসংখ্য নেতা-কর্মী। আমাদের খুলনার ৫৬ খানজাহান আলী রোডের বাড়িটি হয়ে উঠেছিল কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের আশ্রয় ও মিলনস্থল। এই বাড়িতে ইপিসিএমএলের একসময়কার পলিটব্যুরোর সদস্য কমরেড খায়রুজ্জামান যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে আশ্রয় নেন। মায়ের সেবা ও শুশ্রুষায় তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে আমাদের বাসা ছাড়েন। এমনকি আমার মা অনেক কমরেডের স্ত্রীদের সন্তান প্রসবের দায়িত্ব নিয়েছেন এবং তাঁদের অনেকেই প্রসূতিকালীন অবস্থায় আমাদের বাসায় অবস্থান নিয়েছেন। শেষ জীবনের বেশ কিছু দিন তিনি পার্টি কমিউনে জীবন কাটিয়েছেন।

সরকারি চাকরিতে থাকার জন্য তিনি সরাসরি গণ-আন্দোলনে জড়িত না থাকলেও এসব আন্দোলনের প্রতি তাঁর পূর্ণ সহমর্মিতা। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শহিদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে ছিল তাঁর অকুণ্ঠ সমর্থন। জাহানারা ইমাম খুলনায় এলে তাঁর সঙ্গে মায়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আবার তিনি স্বদেশের সম্পদের ওপর সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও সরব ছিলেন। জাতীয় স্বার্থে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি গঠিত হলে তিনি আন্দোলনের দৃঢ় সমর্থকে পরিণত হন। জাতীয় কমিটির ঢাকা-ফুলবাড়ী ও ঢাকা-সুনেত্র লংমার্চেও পুরোপুরি অংশগ্রহণ করেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সুন্দরবনের অদূরে রামপালে ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসির সাথে বাংলাদেশ সরকার যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রকৃতিবিধ্বংসী ও জনবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার বিরোধিতা করে গেছেন। তিনি সব সময়ই তাঁর নিকট ও পরিচিতজনদের এর কুফল সম্পর্কে অবহিত করতেন।

তিনি নিজে ধর্মে বিশ্বাস করলেও ছিলেন গভীরভাবে অসাম্প্রদায়িক। রবীন্দ্রসংগীত আর কীর্তনের ভক্ত ছিলেন তিনি। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আর কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন মায়ের প্রিয় রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী। শ্যামল মিত্র আর মোহাম্মদ রফির গানের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। উত্তম কুমার প্রিয় নায়ক আর সোফিয়া লরেন ছিলেন প্রিয় অভিনেত্রী। রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু কবিতার পঙ্ক্তি তাঁর কন্ঠে প্রায়ই শুনেছি। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় আর তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তাঁর প্রিয় বাঙালি কথাসাহিত্যিক। খনার অনেক বচন এবং আঞ্চলিক অনেক লৌকিক বচন তাঁর কণ্ঠস্থ ছিল। ছেলেবেলায় আমার বাবা আমাকে যেমন মার্ক্স-এঙ্গেলেস, লেনিন, স্তালিন বা চে গুয়েভারার জীবনী পড়িয়ে বিপ্লবী রাজনীতির প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করেছেন, তেমনি মা ‘ইস্পাত’, ‘মা’, ‘তানিয়া’, ‘নগুয়েন ভ্যানত্রয়ে’র সন্ধান দিয়ে আমার মানসলোক গঠনে সহায়তা করেছেন।

আমার মায়ের প্রিয় উপন্যাসের মধ্যে সমরেশ মজুমদারের ত্রয়ী উপন্যাস ‘উত্তরাধিকার’, ‘কালবেলা’, ‘কালপুরুষ’ ছিল। বিশেষ করে আমার ডাকনাম ‘অনি’ রাখা হয়েছে উপন্যাসগুলোর অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘অনিমেষে’র নামের সঙ্গে সংগতি রেখে। তবে আমার মা সুরাইয়া ইয়াসমিনের চরিত্রের সঙ্গে ওই ট্রিলজির প্রধান নারী চরিত্র ‘মাধবীলতা’র অনেক মিল খুঁজে পাই। আমার বাবা অনিমেষের মত জীবনে পরাজয় মেনে নেননি, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রবল নিপীড়নের বিরুদ্ধে এখনও লড়াই করে যাচ্ছেন। আর আমার চরিত্রও অর্কর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

গত ১৪ মার্চ রাতে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে সুরাইয়া ইয়াসমিন মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জীবন ও আত্মত্যাগ সংগ্রামী জীবনের পথে নারীদের যেমন উদ্বুদ্ধ করতে পারে, তেমনি তা শোষণহীন মানবিক সমাজ অর্থাৎ সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে প্রেরণা জুগিয়ে যাবে।

অনিন্দ্য আরিফ: প্রয়াত সুরাইয়া ইয়াসমিনের একমাত্র সন্তান, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক সংগঠক। 

ইমেইল: anindyaarif1981@gmail.com

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *