করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি এবং দুই যুক্ত বিবৃতি

করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি এবং দুই যুক্ত বিবৃতি

করোনা ভাইরাস কোভিট-১৯ চীন থেকে শুরু করে বিশ্বব্যাপী ছড়াতে শুরু করে এই বছরের জানুয়ারি মাস থেকে। এই মাসের শেষ দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ভাইরাস সংক্রমণকে বৈশ্বিক মহামারী বা পেনডেমিক হিসেবে ঘোষণা দেন। বাংলাদেশে সরকারিভাবে প্রথম রোগী শনাক্ত হয় মার্চ মাসের ৮ তারিখ। এই পুরো সময়ে সরকারের ভূমিকা ছিলো খুবই অগোছালো, দায়িত্বজ্ঞানহীন। আত্নস্তুতি ছাড়া আর কিছু দেখা যায়নি। সরকারের ভূমিকা যথাযথভাবে পালনে সুনির্দিষ্ট করণীয় নির্দেশ করে সমাজের বিভিন্ন অংশের ব্যক্তিবর্গ কয়েকদফায় সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। এর প্রথমটি ছিল প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি (২২ মার্চ, ২০২০), দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি ছিল যুক্ত বিবৃতি দেয়া হয় যথাক্রমে ৩১ মার্চ ও ২ এপ্রিল। এই খোলা চিঠি ও বিবৃতিগুলো নীচে দেয়া হলো।

২২ মার্চ ২০২০

করোনাভাইরাস মহামারি প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি

পরিস্থিতি সম্পর্কে শ্বেতপত্র এবং মহামারি মোকাবিলায়

সমন্বিত কার্যকর ব্যবস্থা চাই

কোভিড-১৯ ভাইরাস অতি দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে তা বৈশ্বিক মহামারিতে রূপ নিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাপকাঠিতে করোনা সংক্রমণের যে চারটি স্তরের কথা বলা হয়েছে বাংলাদেশ এর তৃতীয় স্তরে প্রবেশ করেছে, অর্থাৎ দেশের ভেতরেই এই রোগ কমিউনিটি সংক্রমণের পর্যায়ে ঢুকে পড়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। চতুর্থ স্তরটি হল ব্যাপক সংক্রমণ এবং ব্যাপক মৃত্যু। চীন, ইরান, ইতালি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি থেকে আমরা পরিষ্কার ধারণা করতে পারি, কিভাবে অতি দ্রুত জ্যামিতিক গতিতে এই মহামারি দাবানলের মত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে দুই মাস সময় পেলেও সরকার সমস্যার দিকে কোন মনোযোগই দেয়নি। উপদ্রুত দেশগুলো থেকে দেশে প্রত্যাবর্তনকারী প্রবাসী ভাই-বোনদের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণে কোয়ারেন্টিন করার সরকারি ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে সমন্বয়হীনতা ও প্রস্তুতির অভাব দেশকে কত বড় বিপদে ফেলতে পারে।

ঘন জনবসতি, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এবং সরকারের উদ্যোগহীনতায় বাংলাদেশ এখন প্রচণ্ড ঝুঁকির মুখে। মহাবিপদ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেই, সমন্বয় নেই, আক্রান্ত রোগী শনাক্তকরণের পর্যাপ্ত উপকরণ ও ব্যবস্থাপনা দেশে নেই; নেই চিকিৎসকদের রক্ষাব্যবস্থা, নেই যথেষ্ট মাস্ক, স্যানিটাইজার ও ভেন্টিলেটর! পরীক্ষার ব্যবস্থা ছাড়া সরকার আক্রান্ত সংখ্যার যে তথ্য দিচ্ছে সেটা তাই বিশ্বাসযোগ্যতা পাচ্ছে না।

এই বৈশ্বিক ভয়ংকর মহামারির সময়ে দেশের হাসপাতাল, চিকিৎসালয় এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার বিরাজমান দুর্বলতা ও প্রস্তুতিহীনতা অনুধাবন করে দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। উদ্বেগের আরও কারণ হচ্ছে, জাতির মহাবিপদের মুহূর্তে দুর্যোগ মোকাবিলার কোন সমন্বিত উদ্যোগ না নিয়ে উল্টো বাস্তবতা অস্বীকার করে ‘সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন’ বলে সরকারের মিথ্যা সাফল্যের বন্দনায় মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের ব্যস্ততা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য, যা আমাদের গভীরভাবে চিন্তিত, ক্ষুব্ধ ও হতাশ করে। বিভিন্ন ছাত্র-যুব সংগঠনসহ স্বেচ্ছাসেবী ব্যক্তি ও সংগঠনের দায়িত্বশীল কাজই এখন পর্যন্ত আমাদের ভরসা। কিন্তু এসব উদ্যোগ সমন্বয়েরও কোন আগ্রহ সরকারের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না।

এত বড়মাপের একটি মহামারি সামাল দেয়ার জন্য সঠিক ও সমন্বিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। আমরা চাই, সরকার আর কালক্ষেপণ না করে অবিলম্বে আন্ত মন্ত্রণালয় সমন্বয় করে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, পরিবেশবিদ এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞমণ্ডলীর সমন্বয়ে একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করবে। এই মহাপরিকল্পনা কার্যকর করার জন্য দেশের নাগরিকদের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধি নিয়ে একটি স্বাধীন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মাল্টিফাংশনাল ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করতে হবে, যারা নিয়মিতভাবে সরকারের কাজের তদারকি করবে, দিকনির্দেশনা প্রদান করবে এবং সকল নাগরিককে প্রকৃত তথ্য জানাবে। এর জন্য তথ্য ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।

উদ্বিগ্ন নাগরিক হিসেবে সরকারের প্রতি আমাদের আরও আশু দাবি হচ্ছে :

১। অবিলম্বে শ্বেতপত্রের মাধ্যমে করোনা মহামারি রোধের পরিকল্পনা এবং তা কার্যকরের প্রণালী জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। ঢাকাসহ প্রতিটি জেলা-উপজেলায় কতজন স্বাস্থ্যকর্মী আছেন এবং তাঁদের সুরক্ষার পর্যাপ্ত সরঞ্জাম কবে পর্যন্ত নিশ্চিত করা যাবে, প্রতিটি হাসপাতালে সর্বোচ্চ কতটি বেড প্রস্তুত করা যাবে, প্রতিটি হাসপাতালে কতটি ভেন্টিলেটর প্রস্তুত আছে, করোনা পরীক্ষার কতগুলো কিট আছে, প্রতিদিনের ব্যবহারের মানসম্মত গ্লাভস, মাস্ক ইত্যাদির মজুদ কত দিনের মধ্যে নিশ্চিত করা যাবে-এইসব তথ্য প্রকাশ করতে হবে। এবং সে অনুযায়ী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এই কাজে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যথাযথ বরাদ্দ দিতে হবে এবং নিয়মিত তা স্বচ্ছতার সঙ্গে জনগণকে জানাতে হবে।

২। অবিলম্বে দেশের সর্বত্র বিনা মূল্যে টেস্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় কিটসহ বিভিন্ন সামগ্রী সরবরাহ এবং তার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। মাস্ক, সাবান, স্যানিটাইজারের জোগান নিশ্চিত রাখতে হবে। কিট তৈরির কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে দ্রুত খালাস ও ট্যাক্স মওকুফের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

৩। দেশের সকল প্রবেশপথ-বিমান, নৌ, স্থলবন্দর, রেলস্টেশন, নৌঘাট সতর্ক নজরদারির আওতায় নিতে হবে। অবিলম্বে করোনা সংক্রমণের সময় আক্রান্ত দেশগুলো থেকে ফিরে আসা প্রবাসীদের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে সম্ভাব্য বা ইতোমধ্যে আক্রান্ত অঞ্চলের মানচিত্র (ম্যাপিং) তৈরি করতে হবে। গুরুত্ব অনুযায়ী অঞ্চলভিত্তিক জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের ভেতর কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ পর্যটন গন্তব্যগুলো বন্ধ করে দিতে হবে।

৪। কোয়ারেন্টিনের জন্য ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে বড় হোটেল-মোটেল-রিসোর্টসহ উপযোগী ভবনগুলো অস্থায়ীভাবে ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট করতে হবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্টেডিয়াম, জিমনেসিয়াম, খালি ভবনে অস্থায়ী হাসপাতাল নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনায় সেনাবাহিনীকে যুক্ত করা সম্ভব। সিএমএইচ, বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে সমন্বিত পরিকল্পনায় যুক্ত করতে হবে।

৫। অতি দ্রুত ডাক্তার-নার্স-চিকিৎসাকর্মীসহ সকল স্বাস্থ্যকর্মীর নিরাপদ পোশাক ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হবে। দেশের গার্মেন্টস কারখানা ব্যবহার করে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে পিপিই (পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট) সরবরাহ করতে হবে।

৬। গণপরিবহন ও গণপরিসরগুলো এবং সংক্রমণের হটস্পট নিয়মিত জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। জেলখানার ঝুঁকিপূর্ণ জনচাপ দূর করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে, জনচাপ কমাতে বিনা বিচারে আটক, মেয়াদ উত্তীর্ণদের মুক্তি দিতে হবে। ছিন্নমূল ভাসমান মানুষদের জন্য নিরাপদ স্থানে আশ্রয়শিবির খুলে তাদের সরিয়ে নিতে হবে। গাদাগাদি বাস করা বস্তিবাসীদের নিরাপত্তায় প্রতিটি বস্তিতে পরিচ্ছন্নতার উপকরণ সরবরাহ এবং করোনা মনিটর সেল/ক্যাম্প স্থাপন করতে হবে। রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্রেও অনুরূপ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।

৭। করোনাসংক্রান্ত জরুরি কাজ ছাড়া পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের আপৎকালীন সময়ে সবেতন ছুটি দিতে হবে। ছুটিকালীন শ্রমিকদের মজুরি যাতে ঠিকমত পরিশোধ হয়, সরকারকে তা নিশ্চিত করতে হবে।

৮। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মজুদদারি বন্ধ করে ন্যায্য মূল্যে বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে। নিম্ন আয়ের এবং রোজগার হারানো মানুষদের জন্য রেশনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। অতিবিপন্ন মানুষ, যেমন-উদ্বাস্তু, দিনমজুর, রিকশাওয়ালা, বস্তিবাসী, কারখানার শ্রমিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি, ছোট ব্যবসায়ী, যাদের জীবিকা হুমকির মুখে, তাদের জন্য বিশেষভাবে অর্থনৈতিক সুরক্ষা প্রদান করতে হবে। এই সুযোগে ঋণখেলাপি, চোরাই টাকার মালিকদের কোন বাড়তি সুবিধা দেয়া যাবে না।

৯। বিশেষজ্ঞ, স্বাস্থ্যকর্মী, ধর্মীয় নেতাদের সাহায্যে পাড়ায় পাড়ায় স্থানীয় ক্লাব, সংগঠন ও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ ও পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম প্রদান করে তাদের প্রচার ও রোগ প্রতিরোধে কাজের সুযোগ দিতে হবে।

১০। এর পাশাপাশি ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া মোকাবিলায় সরকারের কী পরিকল্পনা তা প্রকাশ করতে হবে। বর্ষা আসার আগেই আমাদের ডেঙ্গুতে মৃত্যু রোধ করার প্রস্তুতিও শেষ করতে হবে, যেটি একই কমিটি থেকে পরিচালিত হতে পারে।

শুধু এই সময়ের করোনাভাইরাস নয়, বাংলাদেশে উন্নয়ন ও সম্পদ কেন্দ্রীভবনের ধারা, নদী-বন-বায়ু বিনাশ আমাদের এমনিতেই বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই দেশকে নিরাপদ বাসভূমি হিসাবে গড়ে তুলতে গেলে প্রাণ-প্রকৃতিবিনাশী ‘উন্নয়ন’ ধারা বদলাতে হবে, সর্বজনের (পাবলিক) চিকিৎসাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। এসবের গুরুত্ব এই বৈশ্বিক মহামারিকালে আমরা আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করছি।

নাগরিকদের পক্ষে (স্বাক্ষরের ক্রম অনুসারে) : আনু মুহাম্মদ, তানজীমউদ্দিন খান, মোশাহিদা সুলতানা, বীথি ঘোষ, অমল আকাশ,  সায়েমা খাতুন, সামিনা লুৎফা, মাহা মির্জা, মিজানুর রহমান, সিউতি সবুর, সাঈদ ফেরদৌস, লুবনা মরিয়ম, রুশাদ ফরিদী, গোলাম মোর্তজা, ফারজানা ওয়াহিদ শায়ান, রেহনুমা আহমেদ, নাজনীন শিফা, দীনা এম সিদ্দিকী, মুক্তশ্রী চাকমা, খুশী কবির, কাজলী শেহরীন ইসলাম, রোবায়েত ফেরদৌস, সুলতানা কামাল, অরূপ রাহী, সৌভিক রেজা, নাসরীন খন্দকার, আজফার হোসেন, আইনুল ইসলাম, নায়লা আজাদ, আলী রীয়াজ, শহিদুল আলম, রেজাউর রহমান লেনিন, ইফতেখারুজ্জামান, বদিউল আলম মজুমদার, জোবাইদা নাসরীন, মীর্জা তাসলিমা সুলতানা, শাহীন আনাম, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, গীতি আরা নাসরীন, তাসলিমা আখতার, অবন্তী হারুন, মানস চৌধুরী, বীণা ডি’কস্টা, রিদয়ানুল হক, আনিসুল ইসিলাম হিরু, নোভা আহমেদ, লুৎফুর রহমান, সাদাফ নূর, লুৎফুন হোসেন, নুসরাত চৌধুরী, শিল্পী বড়ুয়া, মাইদুল ইসলাম, রোজিনা বেগম, কল্লোল মোস্তফা, জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, হাফিজ উদ্দীন খান, আইনুন নাহার, সৌম্য সরকার, কাজী মারুফুল ইসলাম, ফাহমিদুল হক, অমিতা চক্রবর্তী, আরমান হোসেন, হামিদা হোসেন,  আকমল হোসেন।

 

৩১ মার্চ ২০২০

করোনাভাইরাস সংক্রান্ত তথ্যের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও সত্যতা নিশ্চিত করার দাবিতে

উদ্বিগ্ন নাগরিকের যৌথ বিবৃতি

করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে সঠিক ও প্রকৃত তথ্য জানতে চাই

গত ৮ মার্চ সরকারি দফতর আইইডিসিআর ঘোষণা দিয়ে দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কথা নিশ্চিত করেছে। আইইডিসিআর এখন পর্যন্ত জনগণকে করোনাভাইরাস সম্পর্কিত তথ্য অবহিত করে আসছে। আমরা উদ্বেগের সাথে লক্ষ করছি যে আইইডিসিআর প্রদত্ত তথ্যাদি নিয়ে মানুষের মনে বিভিন্ন প্রশ্ন ও সন্দেহ জাগতে শুরু করেছে। তার কারণ দফতরটির ব্রিফিংয়ে দেয়া তথ্যর সাথে মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার অমিল; এবং গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোর সঙ্গে ব্রিফিংয়ে প্রদত্ত তথ্যের পার্থক্য চোখে পড়ার মত উদ্বেগজনক। উপরন্তু, ব্রিফিংটিতে তথ্য যাচাই ও ব্যাখ্যা চাইবার কোন সুযোগ নেই; যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ক্ষুণ্ণ করে বলে আমরা মনে করি।

আমাদের দেশে দুর্যোগে মানুষের মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে সরকারি এবং সরকারবহির্ভূত মহলের হিসাবের মধ্যে ব্যাপক গরমিল পাওয়া যায়। বর্তমানে করোনাভাইরাস সংক্রমণের সময়ও আমরা এমন সম্ভাব্য গরমিল, ব্যাখ্যার ভিন্নতা এবং রোগের উপসর্গকে মৃত্যুর কারণ হিসাবে উপস্থাপন করার প্রবণতা লক্ষ করছি। এমনকি একাধিক ক্ষেত্রে হাসপাতালগুলোতে রোগীকে ফিরিয়ে দেবার গুরুতর ঘটনায় আমরা উদ্বিগ্ন ও নিরাপত্তাহীন বোধ করছি।

এই পরিপ্রেক্ষিতে করোনাভাইরাস থেকে সংক্রমণ এবং মৃত্যুর যে হিসাব দেয়া হচ্ছে, প্রকৃত হিসাব তার থেকে অধিক হবার আশঙ্কা থাকতে পারে। বিদেশ প্রত্যাগত মানুষজনসহ বিপুলসংখ্যক মানুষের গণস্থানান্তর, সঙ্গনিরোধব্যবস্থা বাস্তবায়নে শিথিলতা এবং নমুনা পরীক্ষার অপ্রতুলতার কারণে সংক্রমণের সঠিক চিত্র আমরা পাচ্ছি না। একই সাথে আক্রান্তদের চিকিৎসা প্রদানে দুর্বলতায় মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবার আশঙ্কা রয়েছে। আক্রান্ত ও মৃতের বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি হিসাবে ব্যাপক পার্থক্য জনগণকে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দেবার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নমুনা পরীক্ষা এবং মূল্যবান চিকিৎসা প্রদানকেও উপেক্ষা করার পরিবেশ তৈরি করবে বলে আমরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। তাই কালবিলম্ব না করে সকল মৃত্যুর কারণ ও প্রকৃত সংখ্যা স্বচ্ছভাবে জনগণের নিকট প্রকাশ করার দাবি করছি আমরা।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের নাম (স্বাক্ষর ক্রম অনুসারে): বদরুদ্দীন উমর, আকমল হোসেন, সাইফুল হক, শহিদুল আলম, আনু মুহাম্মদ, শিরীন হক, রেজাউর রহমান লেনিন, মেঘনা গুহঠাকুরতা, সারা হোসেন, ফরিদা আক্তার, হাসিবুর রহমান, রেহনুমা আহমেদ, অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার, রোবায়েত ফেরদৌস, ডা. হারুনুর রশীদ, আফরোজা ইসলাম, আব্দুল্লাহ ক্বাফী রতন, মাহমুদুল সুমন, ড. ফাহমিদুল হক, সাদিয়া আরমান, নাজনীন শিফা, রুশাদ ফরিদী, সায়েমা খাতুন, তানজীমউদ্দিন খান, সায়দিয়া গুলরুখ, বহ্নিশিখা জামালী, ডা. আব্দুল হাকিম, নিরূপা চাকমা, বাচ্চু ভুঁইয়া, তাসলিমা আখতার, রুহি নাজ, মাহা মির্জা, মোহাম্মদ সাজ্জাদুর রহমান, সেউতি সবুর, আ-আল মামুন, পারভীন হাসান, নাসরিন খন্দকার, সৌভিক রেজা, গোলাম মোর্তোজা, স্বপন আদনান, মির্জা তাসলিমা, তাসলিমা আক্তার, সাঈদ ফেরদৌস, সাদাফ নূর, তাহেরা বেগম জলি, নূর মোহাম্মদ, হাসান ফকরী, ইফতেখার আহমেদ বাবু, মোহাম্মদ কাইউম, নাসিরউদ্দীন এলান, মাইদুল ইসলাম, ইসহাক সরকার, সৈয়দ আবুল কালাম, রঘু অভিজিৎ রায়, ভুলন ভৌমিক, আহসানুজ্জামান ফাহিম, অধ্যাপক কাজী ইকবাল, মোশাররফ হোসেন, ম. নূরুন্নবী, মুঈনুদ্দীন আহ্মদ , আব্দুল গাফফার খান , ডা. বরকত উল্লাহ, আকবর খান, আমীর আব্বাস, মজিবর রহমান, আনসার আলী দুলাল, প্রমোদ জ্যোতি চাকমা, মাসুদ রেজা, সজীব রায়, আবু হাসান টিপ, এপোলো জামালী, ফয়জুল হাকিম, হেমন্ত দাস, সুস্মিতা রায় সুপ্তি, সালমান সিদ্দিকী, বরুণ চাকমা, মোহম্মাদ বিন ইয়ামিন, পারভেজ লেলিন, জোনায়েদ হোসেন, সুনয়ন চাকমা, রোজিনা বেগম, ওমর তারেক চৌধুরী।

 

২ এপ্রিল ২০২০

উদ্বিগ্ন নাগরিকবৃন্দ এবং নাগরিক সংগঠনসমূহের যুক্ত বিবৃতি

কতিপয় গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার বদলে কয়েক কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করুন

আমরা গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্কের সঙ্গে লক্ষ করছি যে করোনাভাইরাসে বিশ্বের কয়েক শ কোটি মানুষ এখন শুধু মৃত্যুভয় নয়, অনাহার, বেকারত্ব আর দারিদ্র্যের ভয়াবহতারও মুখোমুখি। বহু দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা এমনিতেই বেশি, করোনা পরিস্থিতিতে তারা ভয়ংকর অস্তিত্বের সংকটে পতিত হয়েছে। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবার আগেই সরকারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ত্বরিত গতিতে গ্রহণ করা দরকার বলে আমরা মনে করি।

বাংলাদেশে নিয়মিত বেতন ও মজুরি পেয়ে কাজ করে এরকম মানুষ সংখ্যায় খুবই কম, যথাযথ মজুরি আরও কম। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই স্বনিয়োজিত; অনিশ্চিত, অনিয়মিত পেশাই বাংলাদেশের প্রধান জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার অবলম্বন। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, কৃষি, শিল্প আর পরিষেবা খাতে প্রায় ৬ কোটি শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ৫ কোটিরও বেশিসংখ্যক মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। তাদের বেঁচে থাকা নির্ভর করে প্রতিদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ওপর। যেখানে করোনা ছাড়াই তাদের জীবন ক্ষুধা ও অনিশ্চয়তায় বিপন্ন, সেখানে করোনাভাইরাসের আক্রমণে এই কোটি কোটি মানুষ এখন বেকার ও দিশেহারা। এদের বিপুল অংশের এমন কোন সঞ্চয়ও নেই, যা তাদের অনিশ্চিত সময় পার হতে সাহায্য করবে; বরং তাদের আরও ঋণগ্রস্ত হবার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আমরা লক্ষ করছি যে করোনা বিস্তারের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন রাষ্ট্র দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা ও বিশেষ বরাদ্দ ঘোষণা করেছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় এই যে বাংলাদেশে এখনও কোন সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি এবং বরাদ্দ ঘোষণা করা হয়নি। যাদের প্রয়োজন তাদের জেলা প্রশাসকের সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। একমাত্র স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য, যা প্রধানত তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য বরাদ্দ। কারখানা বন্ধের কোন সম্মিলিত ঘোষণা সরকার বা মালিকরা দেয়নি। উল্টো তাদের কালক্ষেপণ ও গড়িমসিতে শ্রমিকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা শতগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

সামনে কতজন ছাঁটাই হবে সেটা নিয়ে সকলেরই উদ্বেগ। এর বাইরে যে হাজার হাজার ছোট, মাঝারি ও কুটির শিল্প আছে, যেগুলো দেশের চাহিদা মেটায় এবং যাদের এখন পথে বসার দশা, তাদের জন্য কোন প্রতিশ্রুতি নেই। করোনা আক্রমণের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণখেলাপিদের জন্য সুবিধা ঘোষণা করেছে। কিন্তু যথারীতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রতি তাদের কোন নজর নেই।

আমরা মনে করি, এই মুহূর্তে জরুরি প্রয়োজন :

(১) অন্তত তিন মাসের জন্য ১ কোটি পরিবারকে বিনা মূল্যে খাদ্যসহ অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যাদির জোগান দেয়া;

(২) এই ১ কোটি পরিবারের চিকিৎসা বিনা মূল্যে নিশ্চিত করা;

(৩) কৃষকের ফসল, সবজি, ফলের সঠিক দাম নিশ্চিত করার জন্য সরকারের ক্রয়ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা;

(৪) সকল প্রতিষ্ঠানে বেতন-মজুরি নিশ্চিত করা;

(৫) ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ সহজলভ্য করা;

(৬) প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে রোহিঙ্গা এবং পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য ত্রাণ ও সরকারি সহায়তা নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রদান করা, এবং হাম-আক্রান্ত অঞ্চলে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান এবং জরুরি মানবিক সহায়তা প্রদান করা।

আমরা মনে করি, বর্তমান সময়ে শহরে ও গ্রামে এই কোটি কোটি মানুষের খাদ্য, ন্যূনতম চিকিৎসা ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করায় সমন্বিত, স্পষ্ট ও সম্মানজনক কর্মসূচি সরকারকেই নিতে হবে। এর জন্য অর্থ যেমন দরকার, তেমনি দরকার দক্ষ ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা। আমরা হিসাব করে দেখেছি, এর জন্য ৭০ থেকে ৯০ হাজার কোটি টাকার একটি প্যাকেজ বরাদ্দ প্রয়োজন। এই বরাদ্দের জন্য জনগণের ওপর করের নতুন বোঝা না চাপিয়ে কয়েকটি গোষ্ঠীর কাছ থেকে জনগণের লুণ্ঠিত সম্পদের কিয়দংশ উদ্ধার করলেই বিপন্ন জনগণকে বিপদ থেকে উদ্ধার করা সম্ভব। গত দশ বছরে দেশ থেকে বাইরে পাচার হয়েছে কমপক্ষে ৭ লক্ষ কোটি টাকা। দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে খেলাপি ঋণ প্রায় দেড় লক্ষ কোটি টাকা, এর মধ্যে দশটি গ্রুপের হাতেই আছে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। সরকারের পক্ষে এদের চিহ্নিত করা খুবই সহজ, এদের অর্থ বিদেশ থেকে ফেরত আনা সময়সাপেক্ষ হলে দেশে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে সরকার এই বিপৎকালীন তহবিল গঠন করতে পারে।

প্যাকেজ বরাদ্দ ঘোষণা করে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটি গঠন করলে সরকারের পক্ষে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। সরকার স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করলে বহু সামাজিক শক্তি এতে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে রাজি থাকবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করে কতিপয় গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার বদলে কয়েক কোটি মানুষের জীবন রক্ষায় ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের নাম (স্বাক্ষরের ক্রম অনুসারে): আনু মুহাম্মদ, হামিদা হোসেন, পারভীন হাসান, শহিদুল আলম, শাহীন আনাম, স্বপন আদনান, বদিউল আলম মজুমদার, শিরীন হক, আকমল হোসেন, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, খুশী কবির, ফসটিনা পেরেরা, বীণা ডি’কস্টা, সি আর আবরার, রেহনুমা আহমেদ, ফরিদা আক্তার, তাসলিমা আখতার, মাহবুবুর রহমান ইসমাইল, মোবাশ্বার হাসান, অরূপ রাহী, দীনা সিদ্দিক, মনজুরুল আহসান খান, আসলাম খান, সহিদুল্লাহ চৌধুরী, ওয়াজেদুল ইসলাম খান, ফজলুর রহমান, আনোয়ার হোসেন রেজা, এস এম এ সবুর, সাজ্জাদ জহির চন্দন, মন্টু ঘোষ, জলি তালুকদার, রুহুল আমীন, হযরত আলী, কুলসুম বেগম, আব্দুল বারেক, রেবেকা সরেন, আবুল হাশেম কবীর, সেকান্দর হায়াৎ, শাহাদাত খাঁ, আব্দুল কুদ্দুস, আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, রুশাদ ফরিদী, শামসুল হুদা, হাসনাত কাইয়ুম, সায়দিয়া গুলরুখ, রেজাউর রহমান লেনিন, ওমর তারেক চৌধুরী, ফিরোজ আহমেদ, মুক্তাশ্রী চাকমা সাথী, আজফার হোসেন, ইলিরা দেওয়ান, গীতি আরা নাসরীন, মাইদুল ইসলাম, রোজিনা বেগম, আব্দুল্লাহ আল-মামুন, সাদাফ নূর, নাসরিন খন্দকার, সায়েমা খাতুন, সাঈদ ফেরদৌস, রোবায়েত ফেরদৌস, পারসা সাঞ্জানা সাজিদ, মোহাম্মদ তানজীম উদ্দীন খান, মোশাহিদা সুলতানা, মাহা মির্জা।

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *