করোনাভাইরাস, অটোমেশন ও আগামী পৃথিবী

করোনাভাইরাস, অটোমেশন ও আগামী পৃথিবী

আনিস রায়হান

প্রযুক্তিগত বিকাশ একটি অবিরাম যাত্রা। তবে সর্বশেষ প্রযুক্তিগত উল্লম্ফন একটি গুণগত পরিবর্তনের সূচনা করেছে। তা একদিকে যেমন অধিকতর কর্তৃত্ববাদী শাসন, বেকারত্বসহ নানা উদ্বেগ তৈরি করেছে তেমনি তা মানুষের জন্য অনেক সম্ভাবনারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। করোনাসংকট কালে নানা প্রযুক্তির ব্যবহারের দৃষ্টান্ত টেনে এই প্রবন্ধে এর বিপদ ও সম্ভাবনা পর্যালোচনা করা হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সম্প্রতি নতুন করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) প্রাদুর্ভাবকে বৈশ্বিক মহামারি হিসাবে ঘোষণা দিয়েছে। ইতোমধ্যে এ ভাইরাসে পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশই আক্রান্ত। এর প্রতিষেধক আবিষ্কার না হওয়ায় আক্রান্ত রোগীকে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে (কোয়ারেন্টিন) রেখেই আপাতত এই রোগ মোকাবিলার চেষ্টা চলছে। কিন্তু কোয়ারেন্টিন পদ্ধতির কুফল হল, কোথাও বেশি মানুষ আক্রান্ত হলে পুরো অঞ্চলকেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হচ্ছে। আবার এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে রোগীকে পরীক্ষা করেও অনেক ক্ষেত্রে তা শনাক্ত করা যাচ্ছে না। এ কারণে কে কার সংস্পর্শে এসে আক্রান্ত হয় তা বোঝা দুষ্কর। তাই অধিকাংশ মানুষকেই নিজ উদ্যোগে ভিড় বা অনেক মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে বলা হচ্ছে। এতে করে ভাইরাস আক্রান্ত এলাকায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কারখানা, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সমস্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। ফল হিসাবে বিভিন্ন খাতে বিপুল ক্ষতির হিসাব পাওয়া যাচ্ছে এবং আশঙ্কা করা হচ্ছে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির। তবে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ফলে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির বিস্তার যেন আগের চেয়েও বেশি গতি পেয়েছে।

‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লব’ বলতে সস্পূর্ণরূপে ডিজিটাইজড ও স্মার্ট এক নতুন আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার প্রতি নির্দেশ করা হচ্ছে। কথিত এই রূপান্তরণ বাস্তবায়িত হচ্ছে অটোমেশনের মধ্য দিয়েই। মানুষের শ্রমের জায়গাগুলোকে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিজাত যন্ত্র দ্বারা প্রতিস্থাপন করাকে অটোমেশন বলা হয়। ২০১৮ সালের ফেব্র“য়ারিতে প্রকাশিত যুক্তরাজ্যভিত্তিক বৃহৎ হিসাবরক্ষক সংস্থা ‘প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপার্স’ (পিডাব্লিউসি)-এর একটি প্রতিবেদন চলমান অটোমেশন সম্পর্কে ধারণা পেতে আমাদের সাহায্য করে। প্রতিবেদনে অটোমেশনের প্রভাবকে তারা তিনটি ওয়েভ বা ঢেউয়ে বিভক্ত করেছে। বলা হয়েছে, ‘অ্যালগরিদম ওয়েভ’ দিয়ে ইতোমধ্যে অটোমেশন শুরু হয়ে গেছে। দ্বিতীয় ধাপে বিশের দশকের শেষ ভাগে দেখা যাবে ‘অগমেন্টেশন ওয়েভ’। আর তৃতীয় ধাপে ত্রিশের দশকের মধ্যভাগে আসবে ‘অটোনমি ওয়েভ’। ‘রোবট কি সত্যিই আমাদের চাকরি চুরি করবে?’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, অটোমেশনের তিন ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পর স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ও প্রযুক্তির এতটাই প্রসার ঘটবে যে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত পুরুষদের ৩৫ ও নারীদের ২৬ শতাংশকেই তখন বিশ্রামে পাঠাতে হবে।

‘অ্যালগরিদম ওয়েভ’ দিয়ে ইতোমধ্যে অটোমেশন শুরু হয়ে গেছে। দ্বিতীয় ধাপে বিশের দশকের শেষ ভাগে দেখা যাবে ‘অগমেন্টেশন ওয়েভ’। আর তৃতীয় ধাপে ত্রিশের দশকের মধ্যভাগে আসবে ‘অটোনমি ওয়েভ’।

প্রশ্ন হচ্ছে, কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবের ফলে বিশ্বজুড়ে যেখানে সমস্ত খাতেই স্থবিরতা নেমে আসছে, এর মধ্যে কিভাবে অটোমেশন গতি পাচ্ছে? বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার আগে সংক্ষেপে ধারণা দেয়া যায় যে কোভিড-১৯-এর ধরনের কারণেই মনুষ্যস্পর্শহীন নানা ধরনের ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটাতে হচ্ছে। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলো যে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে, তার বেশির ভাগটাই খরচ হচ্ছে কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তা সমর্থিত প্রযুক্তির পিছনে। আর সেটাই অটোমেশনকে সহায়তা করছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে রোবটের ব্যবহার। পণ্য সরবরাহে ঘটছে ড্রোন প্রযুক্তির প্রসার। মুদ্রার ডিজিটাইজেশন ও চালকবিহীন গাড়ির প্রয়োজনীয়তাও অনুভূত হচ্ছে তীব্রভাবে। চালু হয়ে গেছে ইন্টারনেটভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা। দূরনিয়ন্ত্রিত চিকিৎসাব্যবস্থার বিস্তারও এর দ্বারা গতি পাচ্ছে। কোভিড-১৯ কিভাবে অটোমেশনকে সহায়তা করছে, তা বিস্তারিত তুলে ধরা হল।

প্রযুক্তিতে বরাদ্দ বৃদ্ধি
বিশ্বের প্রায় সমস্ত দেশই চলতি বছরের বাজেট অভিহিত হবে কোভিড-১৯ বাজেট হিসাবে। প্রথাগত সব বরাদ্দের জায়গা এতে সংকুচিত হবে এবং করোনাভাইরাস মোকাবিলায় বিরাট বরাদ্দ দেয়া হবে। ইতোমধ্যেই যুক্তরাজ্যের বাজেটে তা দেখা গেছে। দেশটি এ বছর ৩০ বিলিয়ন পাউন্ড অতিরিক্ত বরাদ্দ রেখেছে করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রভাব মোকাবিলার জন্য। এর বড় একটি অংশ ব্যয় হবে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে। আর করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন বলতে বোঝায় এই খাতে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের পথ প্রশস্ত করা। এ ছাড়াও যুক্তরাজ্যের বাজেটে অতিরিক্ত ৯০০ মিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বিশেষায়িত প্রযুক্তি খাতে, যেখানে অন্যতম হিসাবে গণ্য করা হয়েছে ইলেকট্রিক যানবাহনকে। এর বাইরে বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট পেয়েছে আরও ১.৪ বিলিয়ন পাউন্ড। ইন্টারনেট ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৫ বিলিয়ন পাউন্ড। ডিজিটাল খাতের বেশ কিছু জায়গায় ভ্যাট ছাড়ের ঘোষণাও দেয়া হয়েছে। (বিবিসি, ১১ মার্চ ২০২০)

যুক্তরাজ্যের বাজেটে অতিরিক্ত ৯০০ মিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বিশেষায়িত প্রযুক্তি খাতে, যেখানে অন্যতম হিসাবে গণ্য করা হয়েছে ইলেকট্রিক যানবাহনকে। এর বাইরে বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট পেয়েছে আরও ১.৪ বিলিয়ন পাউন্ড। ইন্টারনেট ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৫ বিলিয়ন পাউন্ড। ডিজিটাল খাতের বেশ কিছু জায়গায় ভ্যাট ছাড়ের ঘোষণাও দেয়া হয়েছে।

বাজেট আসার আগেই বিভিন্ন দেশে সংক্রমণ মোকাবিলায় বাড়তি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এই বরাদ্দের বড় একটি অংশ যাচ্ছে চিকিৎসা প্রযুক্তি ও মনুষ্যবিহীন যোগাযোগব্যবস্থা কার্যকরের পিছনে। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া এক প্রতিবেদনে দেশটির রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের একটি উদ্ধৃতি ছেপেছে। চীনা প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সমর্থন ব্যতীত এই মহামারির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিজয় অর্জন করা যাবে না।’ চীনের অর্থ মন্ত্রণালয় করোনা মোকাবিলায় এখন পর্যন্ত ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে। (সিএনবিসি, ৫ মার্চ) চীনা প্রেসিডেন্টের মন্তব্য থেকে পরিষ্কার যে এই অর্থ কোথায় যাচ্ছে। চীনা সরকার তার প্রযুক্তি সংস্থাগুলোকে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যোগ দিতে নির্দেশনা জারি করেছিল। এরপর তারা ড্রোনে তাপমাত্রা পরিমাপক যন্ত্র স্থাপন করেছে এবং সেগুলো বিভিন্ন শহরের রাস্তাঘাটে ঘুরে ঘুরে ভাইরাস আক্রান্ত কাউকে পেলে তার সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের কাছে মেসেজ পাঠিয়েছে। তারা এখনও এই রোগের টিকা তৈরির জন্য সুপার কম্পিউটারের শক্তিকে ব্যবহার করছে। (সিএনএন বিজনেস, ২৩ ফেব্রুয়ারি)

চীন যেভাবে করোনাভাইরাস মোকাবিলা করেছে, তাতে প্রযুক্তিই ছিল বড় হাতিয়ার। বিশ্বের সব দেশেই এর প্রতিফলন ঘটতে বাধ্য। করোনা ইস্যু সব দেশের নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর তাগিদ সৃষ্টি করেছে। এটা অবশ্যই অটোমেশনের পক্ষে জোর পদক্ষেপ।

রোবট
প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সমস্ত দেশেই করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের মধ্যে রোবট উৎপাদন ও মোতায়েনের হুল্লোড় পড়ে গেছে। চীনের ক্ষেত্রে এটা ঘটেছে প্রবলভাবে। রোবট প্রয়োজন হয়েছে সড়ক ও যানবাহন জীবাণুমুক্ত করার কাজে। কারখানায় যখন লোকের অভাব, তখন উৎপাদন অব্যাহত রাখার জন্য রোবটের প্রয়োজন পড়েছে। চীনে খাদ্য বিতরণকারী বৃহৎ প্রতিষ্ঠান মিতুয়ান বেইজিংয়ে তাদের অংশীদার কিছু রেস্তোরাঁয় রোবট চালু করেছিল। যা অর্ডার দেয়ার পর গ্রাহকদের হাতে খাবার পৌঁছাতে সহায়তা করে। তাছাড়া রান্নাঘর থেকে খাদ্য বিতরণের কাজে নিয়োজিতদেরও সাহায্য করতে পারে তারা। মিতুয়ান এটিকে একটি পরীক্ষা হিসাবে নিয়েছে এবং সফল হলে এটা তারা অন্যান্য শহরে প্রসারিত করতে চায়। (সিএনএন বিজনেস, ২৩ ফেব্র“য়ারি)
সাংহাইয়ের মোবাইল ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবটসের বিক্রয় সহসভাপতি এমিল হাচ জেনসেন বলেছেন, ভাইরাস প্রাদুর্ভাব ‘চীনে অটোমেশনের বৃদ্ধি ও রোবট ব্যবহারের এমন প্রবণতাকে নতুন করে উস্কে দিয়েছে।’ রোবট উৎপাদনের গতি এতটাই তীব্র হয়েছে যে নতুন রোবটের ডিজাইন করে সপ্তাহান্তে তার ডজনখানেকের উৎপাদনও সেরে ফেলেছে শেনঝেনের রোবট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইউয়িবট। মার্চ মাসের মধ্যে তারা বিভিন্ন কোম্পানিকে অন্তত তিন ডজন রোবট সরবরাহ করবে। এসব রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে কারখানা, সড়ক ও যানবাহনকে জীবাণুমুক্ত করার কাজে। (সিএনবিসি, ২ মার্চ)

অটোমেশন সর্বোচ্চ সস্তায় উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেয়। রোবট এ কাজে তার প্রধান অস্ত্র। উন্নত বিশ্বে তো বটেই, এমনকি চীনেও এখন আর মজুরি তেমন একটা সস্তা নয়। মজুরি যত বাড়ছে, কোম্পানি মালিকদের কাছে রোবট তত বেশি অপরিহার্য হয়ে উঠছে। গাড়ি নির্মাণ থেকে শুরু করে প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনকারী কারখানার বিরাট একটি অংশে ইতোমধ্যে রোবটের আধিপত্য চলছে। এখন যে কোন রোগ বা দুর্যোগের মধ্যে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে রোবটকে দারুণ বিকল্প হিসাবে গ্রহণ করবে বড় কোম্পানিগুলো। করোনাভাইরাস সেই সম্ভাবনাকে বেশ ভালভাবেই উন্মোচিত করেছে। এটা অটোমেশনকে ত্বরান্বিত করবে।

ভিডিও যোগাযোগ
করোনার কারণে যোগাযোগব্যবস্থা এবং কর্মপরিচালনার প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে ভিডিও চ্যাট। নেটওয়ার্ক বিশ্লেষক সংস্থা কেন্টিকের মতে, প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে উত্তর আমেরিকা এবং এশিয়ার ভিডিও কনফারেন্সিং ট্রাফিক দ্বিগুণ হয়েছে। (এক্সিওস ডটকম, ৭ মার্চ) তবে এর চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ খবর হল, টুইটার ও ফেসবুকের মত প্রযুক্তি সংস্থাগুলো তাদের কর্মচারীদের বাড়ি থেকে কাজ করার জন্য উৎসাহিত করছে। প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের থাকা শাখা ও কারখানাগুলোতে উৎপাদন ও বিপণন অব্যাহত রাখতে ভিডিও কলকেই যোগাযোগের প্রধান হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে। এতদিন সমস্যা সমাধানের শেষ স্তরে কিংবা জটিল সমস্যায় সরাসরি লোক পাঠানোকেই তারা অগ্রাধিকার দিত। কিন্তু এখন সমস্যা যত ভয়াবহই হোক না কেন ভিডিও কলের মাধ্যমে তা সমাধান করা হচ্ছে।

পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা পরামর্শক সংস্থা অ্যান্টিয়া গ্র“পের বোস্টনভিত্তিক সহসভাপতি এবং প্রযুক্তি শিল্প নেতা পাইলিনা চু বলেছেন, অনেক সংস্থা চীন, জাপান ও কোরিয়ায় পরিচালিত কারখানা ও আউটলেটগুলোতে যেখানেই সম্ভব রিমোট পদ্ধতিতে তথা দূর থেকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কাজ শুরু করেছে। (প্রটোকল ডটকম, ২৭ ফেব্রুয়ারি) বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উদ্যোক্তারা এখন টের পাচ্ছেন যে বিশাল হেডকোয়ার্টার স্থাপন এবং মুখোমুখি বৈঠকগুলো আসলে ঠিক ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ডিজিটাল সহযোগিতা সংস্থা ব্লুজকেপের সিইও পিটার জ্যাকসন বলেছেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, কোন কার্যালয়ে সময় দেয়ার চেয়ে যে কোন জায়গায় উৎপাদনশীলতার সাথে কাজকে বাঁধা যেতে পারে।’ (এক্সিওস ডটকম, ৭ মার্চ)

ভিডিও চ্যাটকে জনপ্রিয় করতে গত কয়েক বছর ধরে অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে। মেধা, অর্থ ও নানা সুযোগ-সুবিধার সমাবেশ ঘটিয়ে এতদিনে তারা যা করতে পারেনি করোনাভাইরাস তা এক ধাক্কায় করে দিয়েছে। একই বাড়িতে থাকা পরিবারের সদস্যরাও দুই ঘরে বসে ভিডিও চ্যাট করছে। রোগের বিস্তার কমলে এটা হয়ত কেটে যাবে। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের অফিসগুলো পরিচালনায় ভিডিওকে যেভাবে ব্যবহার করে চলেছে, এটা আর বন্ধ হবে না।

ড্রোন প্রযুক্তি
করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে কিভাবে ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নিয়ে বেশ কিছু প্রতিবেদন ছেপেছে চীনের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমগুলো। চায়না ডেইলির একটি প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, হুবেই প্রদেশের হানদনে একটি ড্রোনের মধ্যে জীবাণুনাশক ঢালছেন দুজন স্বাস্থ্যকর্মী। এই ড্রোন উড়ে যাবে শহরের বিভিন্ন এলাকার ওপর দিয়ে, এরপর জীবাণুনাশক ছিটিয়ে সেসব এলাকাকে জীবাণুমুক্ত করবে। জিয়াংজি প্রদেশের ইচুয়ান শহরে আরেক ধরনের ড্রোন ব্যবহার করার চিত্র প্রকাশিত হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ড্রোন ব্যবহার হচ্ছে শহরের বাসিন্দাদের শরীরের তাপমাত্রা মাপার জন্য। এই ড্রোনে আছে ইনফ্রারেড থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা। অনেক দূর থেকেই এটি লোকজনের শরীরের জ্বর আছে কি না তা মাপতে পারে। আরেক প্রতিবেদনে দেখা যায়, এক বৃদ্ধাকে মাস্ক না পরে বাইরে যাওয়ার কারণে মাথার ওপর চক্কর দিতে থাকা ড্রোন থেকে লাউডস্পিকারের মাধ্যমে হুঁশিয়ার করে দেয়া হচ্ছে। (বিবিসি বাংলা, ৯ ফেব্রুয়ারি)

বর্তমান বিশ্বে ড্রোন ক্রমাগত যোগাযোগের ও নানা ধরনের কর্ম সম্পাদনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এতে করে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক দিন ধরেই পণ্য সরবরাহে ড্রোনের ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আসছিল। এর মধ্যেই ভাইরাস প্রাদুর্ভাব মানুষ কর্তৃক সশরীরে পণ্য পৌঁছানোর জটিলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। এর ফলে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় অচিরেই বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাবে। ড্রোন উৎপাদনের ব্যয় কমিয়ে আনা এবং এর সক্ষমতা বৃদ্ধির তাগিদ দিয়ে গেছে করোনাভাইরাস। এর ফলে যদি দ্রুতই ড্রোন প্রযুক্তির গণপ্রচলন শুরু হয়ে যায়, তাহলে সেটাও অটোমেশনকে অনেকখানি এগিয়ে দেবে।

টেলিহেলথ
শিক্ষার মত চিকিৎসার ক্ষেত্রেও দূরনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার বৃদ্ধির প্রয়াস মিলেছে করোনার কল্যাণে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ইতোমধ্যেই অনেকে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। ফল চিকিৎসকদের মধ্যে এই রোগ ভীতি ছড়িয়েছে। চীনে চিকিৎসকদের কাজ করার কিছু ছবি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে দেখা যায়, মাস্ক ও অন্যান্য সরঞ্জাম টানা ব্যবহারের কারণে মুখের আকৃতিতে তার ছাপ পড়ে যাচ্ছে। আবার প্রথম এই রোগ শনাক্ত করেছেন যে চিকিৎসক, তিনি ও তাঁর সহকর্মীরাও কয়েকজন মারা গেছেন। ফলে দেশে দেশে এই রোগ মোকাবিলায় যতদূর সম্ভব ‘টেলিহেলথ’ প্রযুক্তি ব্যবহারের চেষ্টা চলছে।

এতদিন ধারণা করা হত, টেলিহেলথ বা দূর থেকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য চিকিৎসাব্যবস্থার বিস্তার ঘটাতে হলে ফাইভ-জির মতো উচ্চগতির ইন্টারনেট পরিষেবা বাধ্যতামূলক। তবে করোনা তার আগেই টেলিহেলথের প্রসার ঘটাতে ভূমিকা রেখেছে। বিশেষজ্ঞরা টেলিহেলথের প্রসারের পক্ষে অবস্থান নিতে গিয়ে বলেছে, এটা শুধু চিকিৎসকদের রক্ষাই করে না, বরং চিকিৎসকের নাগালের মধ্যে অনেক দূরের রোগীকেও নিয়ে আসে। (স্ট্যাটনিউজ, ২৮ ফেব্রুয়ারি) স্মার্টফোনসহ ইন্টারনেটভিত্তিক নানা পণ্য এবং ড্রোনের মত প্রযুক্তি এখন টেলিহেলথে ব্যবহার হচ্ছে। চীন তো রোবট ও স্বচালিত গাড়িকেও এর অন্তর্ভুক্ত করেছে।

চালকবিহীন গাড়ি
করোনাভাইরাস বিশ্বের অনেক দেশ ও প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করেছে বটে, তবে চালকবিহীন গাড়ি উৎপাদনকারীরা তার মধ্যে পড়ে না। বেইজিংভিত্তিক নিওলিক্স জানিয়েছে, তাদের অর্ডার বাড়ছে। আলিবাবা, মিতুয়ান, জেডিসহ জায়ান্ট সব প্রতিষ্ঠান তাদের গ্রাহক হয়ে বসে আছে। গত বছরের মে মাসে উৎপাদন শুরু হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি এতদিনে মাত্র ১২৫টি ইউনিট তৈরি করেছিল। অথচ এটি গত দুই মাসে ২০০টিরও বেশি যানবাহনের জন্য অর্ডার বুক করেছে। নিওলিক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইউ এনইউয়ান এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানিয়েছেন। (ব্লুমবার্গ, ৯ মার্চ)

ভাইরাসজনিত উদ্বেগের মধ্যে চীনের ব্যবসা ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বিপাকে পড়ার পর সেখানকার স্বচালিত যানবাহন উৎপাদনে জোরদার ধাক্কা লেগেছে এবং এই খাতে উৎপাদন অপ্রত্যাশিতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিওলিক্সের ছোট ভ্যান গ্রাহকদের মানুষের সংস্পর্শ এড়াতে সহায়তা করে। কোয়ারেন্টিন ও ভ্রমণ বিধি-নিষেধের কারণে শ্রমিকের অভাব পূরণেও এ ধরনের যান ভূমিকা রাখে। চীনের প্রযুক্তিবিদরা ভাইরাসের প্রভাব মোকাবিলায় চালকবিহীন গাড়িকে আদর্শ যান হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন। রোগীদের আনা-নেয়ায় এ ধরনের গাড়ি ব্যবহার করা যায়নি। তবে সেটা করা গেলে সংক্রমণের হার আরও খানিকটা নিয়ন্ত্রণ করা যেত। ই-কমার্স জায়ান্ট জেডি ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থল উহান শহরের চিকিৎসাকর্মীদের কাছে পণ্য সরবরাহ করতে স্বচালিত যানবাহন ব্যবহার করেছে। (সিএনএন বিজনেস, ২৩ ফেব্রুয়ারি)

চালকবিহীন গাড়ি নিয়ে বিশ্বের অধিকাংশ বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানই গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিশাল কর্মহানির ঝুঁকি ছাড়াও দুর্ঘটনার ভয় এবং এ নিয়ে প্রথাগত দিক থেকে বিরোধী মনোভাব বেশ শক্তিশালী। কিন্তু করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র করে চীন এই গাড়ির ব্যবহারকে কেবল যৌক্তিকতাই দেয়নি, অন্য দেশগুলোকেও তারা পথ দেখিয়েছে। ফলে অটোমেশনের অন্যতম এই ধাপটি পূরণ হতে যে আর বেশি সময় লাগবে না তা বলাই বাহুল্য।

চীন ভাইরাস আক্রান্ত এলাকাগুলো থেকে নগদ টাকা উঠিয়ে নিয়েছে। উচ্চ তাপ ও অতিবেগুনি রশ্মি দিয়ে এর একাংশ জীবাণুমুক্ত করা হয়েছে, বাকিগুলো পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকও একই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে।

মুদ্রা ডিজিটাইজেশন
টাকা দ্রুত নোংরা হয়। হাতে হাতে ঘুরতে থাকে বলে এটি ভাইরাস সংক্রমণের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। টাকায় লেগে থাকতে পারে প্রাণঘাতী জীবাণু। এমন শঙ্কার প্রেক্ষিতে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে সব দেশই নগদ টাকা নিয়ে বিপাকে পড়েছে। চীন ভাইরাস আক্রান্ত এলাকাগুলো থেকে নগদ টাকা উঠিয়ে নিয়েছে। উচ্চ তাপ ও অতিবেগুনি রশ্মি দিয়ে এর একাংশ জীবাণুমুক্ত করা হয়েছে, বাকিগুলো পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকও একই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। বন্ধ হওয়ার আগে প্যারিসের ল্যুভর জাদুঘরও নগদ লেনদেন নিষিদ্ধ করেছিল। (সিএনএন বিজনেস, ৭ মার্চ)

নগদ টাকা দিয়ে যে আর এই যুগে রাজা হওয়া যাবে না, সেটাই প্রমাণিত হয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং এবং ভিসা, মাস্টারকার্ডের পাশাপাশি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থাগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে এর সাথে সাথে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা নগদ টাকার ডিজিটাল ফর্ম কিভাবে তৈরি করবেন তা বিবেচনা করছেন। লিব্রা নামক ডিজিটাল মুদ্রার ধারণা হাজির করে ফেসবুক এক্ষেত্রে নতুন মুদ্রাব্যবস্থার ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে। (কোয়ার্টজ ডটকম, ১ মার্চ)

বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা নগদ টাকার ডিজিটাল ফর্ম কিভাবে তৈরি করবেন তা বিবেচনা করছেন। লিব্রা নামক ডিজিটাল মুদ্রার ধারণা হাজির করে ফেসবুক এক্ষেত্রে নতুন মুদ্রাব্যবস্থার ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে।

ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টস বা বিআইএস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে অর্থের স্রোত বাড়ার সাথে সাথে পুরনো ধাঁচের নোট এবং কয়েনগুলোর রূপান্তরণের জন্য এক ডজনেরও বেশি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো গবেষণা করছে। বিমান চালাচ্ছে অথবা চীনের মত চীনেরও ডিজিটাল মুদ্রাগুলোর জন্য চলছে। তারা দেখতে চাইছে, ডিজিটাল মুদ্রার জন্য কোন্ প্রযুক্তি এবং ডিজাইনগুলো সবচেয়ে অনুকূল এবং এটি কিভাবে জনসাধারণের কাছে নেয়া হবে। (বিআইএস ডটকম, ১ মার্চ)

মুদ্রাব্যবস্থার ডিজিটাইজেশন অটোমেশনের পক্ষে সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপগুলোর একটি। এই পুরনো ব্যবস্থার ফলে রাষ্ট্রের অর্থের একটি অংশ অচল হয়ে থাকে। কিন্তু এখানে পরিবর্তন ঘটানোটা অত্যন্ত ঝামেলার এবং বৃহৎ পরিসরে বিস্তৃত এক কাঠামোতে হাত দেয়া। ঝুঁকির দিকটাও খাটো নয়, কারণ অনেক মানুষ এই পদক্ষেপে সাড়া নাও দিতে পারেন। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এই পরিবর্তনটি মেনে নিতে অধিকাংশ মানুষকে প্রায় রাজি করিয়ে ফেলেছে। উন্নত রাষ্ট্রগুলো এই সুযোগের সদ্ব্যবহার না করার কোন কারণ নেই।

ই-শিক্ষা
রাষ্ট্র ও শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকীকরণে ইন্টারনেটভিত্তিক শিক্ষা তথা ‘দূরশিক্ষণ’ পদ্ধতি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করে চললেও নানা কারণে এতদিন তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। দূরশিক্ষণ বলতে বোঝানো হয় অনলাইন তথা ইন্টারনেটে ক্লাস নেয়ার ব্যবস্থাকে। যেখানে লাইভ ভিডিওতে শিক্ষক তার লেকচার দেবেন এবং শিক্ষার্থীরা মন্তব্যের মাধ্যমে বা ভিডিওতে অংশ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করে উত্তর জেনে নেবেন। শিক্ষক কোন কাগজপত্র দিতে চাইলে সেটা ই-মেইলে সরবরাহ করা হবে। শিক্ষার্থীও ইন্টারনেটের মাধ্যমেই সবকিছু বুঝে নেবেন। কেবল পরীক্ষার সময় তাকে সরাসরি ক্লাসে যেতে হবে। তবে বিদেশি শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মনোনীত বিশেষ কক্ষে লাইভ ভিডিওতে অংশ নিয়ে তিনি পরীক্ষাও দিতে পারবেন। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেও একজন শিক্ষার্থী বাংলাদেশে তাদের মনোনীত প্রতিষ্ঠান বা দূতাবাসের কোন কক্ষে বসে পরীক্ষা দিতে পারবেন। এ সময় ভিডিওর মাধ্যমে তাকে পর্যবেক্ষণ করা হবে যুক্তরাষ্ট্রের ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এতদিন মনে করা হত, এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা ঠিকঠাক সবকিছু বুঝে নিতে পারবে না। এটা শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের কাছে মোটেই গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়নি। কারণ তারা চান শিক্ষার্থী সরাসরি শিক্ষকের সংস্পর্শে থেকে তৈরি হবেন। তবে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এই সমস্যাটিকেও সমাধান করে দিয়েছে।

হার্ভার্ড, প্রিন্সটন ও কলাম্বিয়ার মত নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন অনলাইনেই ক্লাস নেয়া শুরু করেছে। ইউরোপ-আমেরিকা ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যে কাতার, আরব আমিরাত, এশিয়ায় চীন-জাপান, কোরিয়াসহ অনেক দেশেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব থেকে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে অনলাইনে ক্লাস নিতে শুরু করেছে। (ওয়াশিংটন পোস্ট, ৯ মার্চ) এতে করে শিক্ষার্থীরা নিজেদের বাড়িতে বসেই ক্লাস করতে পারছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি ঘোষণা করলেও, ছুটির মেয়াদ শেষ হবার পরও, শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে না আসার নির্দেশ দিয়েছে। করোনা উপদ্রব না কাটা অবধি তাদের অনলাইনেই ক্লাস করতে হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে তারা। বিশেষ ব্যবস্থা হিসাবে এখন শুরু হলেও এর মধ্য দিয়ে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থার পরীক্ষা-নিরীক্ষা হাতে-কলমে করা হয়ে যাচ্ছে। সামনের দিকে এই অভিজ্ঞতার আলোকে স্মার্ট এডুকেশন সিস্টেম প্রণয়ন করা সহজ হবে, যা ব্যতীত অটোমেশন সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।

কর্মসংস্থানহানি
উপর্যুক্ত বিষয়গুলোর মধ্যেই যদি বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলে বলতে হত অটোমেশনই কোভিড-১৯ মোকাবিলায় মানবজাতিকে সহায়তা করছে। না, এটা বরং তার বিপরীত। অটোমেশনের জন্য জরুরি যে কর্মসংস্থানহানি ও ছাঁটাই, কোভিড-১৯ সেটাকেও সহায়তা করছে। ‘প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপার্স’কে উদ্ধৃত করে আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে অটোমেশনের মধ্য দিয়ে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ও প্রযুক্তির এতটাই প্রসার ঘটবে যে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত পুরুষদের ৩৫ ও নারীদের ২৬ শতাংশই অবসরে যেতে বাধ্য হবে। এক্ষেত্রে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে নীতিগতভাবে কাজ করছে বিশ্বব্যাংক।

অটোমেশনের মধ্য দিয়ে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ও প্রযুক্তির এতটাই প্রসার ঘটবে যে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত পুরুষদের ৩৫ ও নারীদের ২৬ শতাংশই অবসরে যেতে বাধ্য হবে। এক্ষেত্রে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে নীতিগতভাবে কাজ করছে বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংকের ‘বিশ্ব উন্নয়ন প্রতিবেদন : কাজের পরিবর্তনশীল ধারা ২০১৯’-এ অটোমেশনের স্বার্থে শ্রমিক সুরক্ষা হ্রাসের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তাদের যুক্তি হল, প্রযুক্তির কারণে পুরনো শ্রমবাহিনী বদলে যাচ্ছে, নতুন শ্রমিক তৈরি হচ্ছে। কিন্তু বিদ্যমান বিধি-বিধানের কারণে নিয়োগকর্তারা তথা মাঝারি ও খুদে মালিকরা পুরনো শ্রমিকদের সরাতে ও নতুন শ্রমিকদের কাজ দিতে পারছে না। তাই প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে তাল মেলাতে শ্রমিক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা দরকার। তারা সুপারিশ করেছে, স্থায়ী শ্রমিক কমানোর সহজ প্রবিধান থাকতে হবে, ন্যূনতম মজুরির আবশ্যিকতা নির্মূল করতে হবে। নিয়োগকর্তাকে জরুরি প্রয়োজনে ছাঁটাইয়ের সুযোগ দিতে হবে। চুক্তির শর্তাদিতে সুযোগ-সুবিধা সীমিত করতে হবে। দেশে দেশে শ্রম ও কর্মসংস্থান সংশ্লিষ্ট আইন, নীতি ও প্রবিধানমালায় এরকম নানা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক।

তারা সুপারিশ করেছে, স্থায়ী শ্রমিক কমানোর সহজ প্রবিধান থাকতে হবে, ন্যূনতম মজুরির আবশ্যিকতা নির্মূল করতে হবে। নিয়োগকর্তাকে জরুরি প্রয়োজনে ছাঁটাইয়ের সুযোগ দিতে হবে। চুক্তির শর্তাদিতে সুযোগ-সুবিধা সীমিত করতে হবে।

অর্থনীতির এমন পুনর্গঠনের দাবি উন্নত দেশগুলোতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট তৈরি করে দিয়েছে। উদারনৈতিকদের দ্বারা এসব পরিবর্তন আনা সম্ভব নয় বিধায় দেশে দেশে কট্টরপন্থীদের উত্থান ঘটেছে এবং তারা নয়া-উদারনৈতিক ধারায় অর্থনীতিতে ওলটপালট ঘটিয়ে দিচ্ছে। সেরকম সব জোট ও ব্যবস্থা ক্রমাগত দুর্বল হচ্ছে এবং ভেঙেও পড়ছে। তা সত্ত্বেও এটা সবারই জানা যে লোকদের চাকরি থেকে তাড়ানোটা ভয়াবহ এক চ্যালেঞ্জ। শ্রমিক ও জনসাধারণের অধিকার সংকুচিত করতে গেলে বড় ধরনের প্রতিরোধের সম্ভাবনা রয়েছে। ফ্রান্সে সংঘটিত ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনে তারই ইঙ্গিত মেলে। ফলে এখানে নতুন সরকারগুলোকে বেগ পোহাতে হবে। কিন্তু করোনাভাইরাস সংক্রমণ এখানে সুবিধা করে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা জানিয়েছে, করোনার কারণে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ কাজ হারাতে বসেছে। (নিউ ইয়র্ক টাইমস, ১৮ মার্চ) সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই সুযোগ গ্রহণ করবে এবং এসব কাজের একটি অংশ যন্ত্র দ্বারা প্রতিস্থাপিত হবে।

কারখানা স্থানান্তর
করোনাভাইরাস সংক্রমণের ফলে ইউরোপ জুড়ে বিদেশ নির্ভরতা কাটিয়ে পণ্য উৎপাদনে স্বনির্ভরতা সৃষ্টির তাগিদ দেখা গেছে। (পলিটিকো, ৬ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্রের সরকারও এটাকে কেন্দ্র করে নিজ দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশে পণ্য উৎপাদনের সমালোচনা করেছে এবং চীনের ওপর আমেরিকার নির্ভরতার বিপদগুলো তুলে ধরে জোর প্রচার চালিয়েছে। (দি আটলান্টিক, ১১ মার্চ) এটা পরিষ্কার যে কারখানাগুলো নিজ দেশে ফিরিয়ে আনতে গেলে উন্নত দেশগুলোকে অটোমেশনের ওপরই নির্ভর করতে হবে। কারণ এসব কারখানা সস্তা শ্রমের প্রয়োজনে বিদেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। করোনাভাইরাস এক্ষেত্রে ঝুঁকির দিকটি সামনে নিয়ে আসায় এখন উন্নত বিশ্বে কারখানা স্থানান্তরের তাগিদ সৃষ্টি হচ্ছে, যা অটোমেশনকে ত্বরান্বিত করবে।

কর্তৃত্ব ও নজরদারি
দেশে দেশে নাগরিকদের তথ্য সংরক্ষণ ও নজরদারি ব্যবস্থার সম্প্রসারণ অটোমেশনের অন্যতম অনুষঙ্গ বিবেচিত হলেও তা কার্যকর করার ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধক ছিল। কিন্তু ভাইরাস সংক্রমণ নজরদারি ব্যবস্থা উন্নয়নের পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে, যাতে কর্তৃত্বমূলক শাসনব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে। চীনে এর বড় ধরনের মহড়া ঘটে গেছে। কোন্ নাগরিক কোথায় কবে ভ্রমণ করেছে, কে কোথায় যাচ্ছে, কোথায় থাকছে- সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের ব্যবস্থাকে কাজে লাগানো হয়েছে করোনা মোকাবিলার কথা বলে সবাইকে জানিয়েই।

ভাইরাস সংক্রমণ নজরদারি ব্যবস্থা উন্নয়নের পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে, যাতে কর্তৃত্বমূলক শাসনব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে। চীনে এর বড় ধরনের মহড়া ঘটে গেছে। কোন্ নাগরিক কোথায় কবে ভ্রমণ করেছে, কে কোথায় যাচ্ছে, কোথায় থাকছে- সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের ব্যবস্থাকে কাজে লাগানো হয়েছে করোনা মোকাবিলার কথা বলে সবাইকে জানিয়েই।

এভাবে করোনাভাইরাস প্রত্যেক নাগরিককে ট্র্যাক করার বৈধতা তৈরি করে দিয়েছে এবং বৃহৎ কোম্পানিগুলো নানা ধরনের গবেষণা চালানোর সুযোগ পেয়েছে। যেমন- ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তির বড় ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এর মাধ্যমে চালানো গেছে। চীনের একটি এআই সংস্থা সেন্সটাইম জানিয়েছে যে তারা এমন একটি অ্যালগরিদম তৈরি করেছে, যা মাস্ক না পরা লোকদের ট্র্যাক করতে পারে। (সিএনবিসি, ২৫ ফেব্রুয়ারি) এটা অটোমেশনকে শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দিচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই করোনা সতর্কতা প্রদানের জন্য নাগরিকদের মোবাইলে বিশেষ অ্যাপ ডাউনলোড করতে বলা হচ্ছে, যা দ্বারা করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে যাওয়া লোককে সতর্ক করা যাবে। গুগল ও অ্যাপল মিলে এ ধরনের একটি আধুনিক অ্যাপস তৈরির কাজে মনোযোগ দিয়েছে। যদিও তারা বলছে, এতে গোপনীয়তা লঙ্ঘন হবে না, কিন্তু নাগরিকের আরও বেশি তথ্য করপোরেশনগুলো ও সরকারের জিম্মায় যাচ্ছে। (বিবিসি বাংলা, ১১ এপ্রিল)

অটোমেশন কি সমস্যা?
করোনাভাইরাসের উৎপত্তি কিভাবে ঘটেছে, কারা কাকে শায়েস্তা করতে এ ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়েছে, এ নিয়ে সারা বিশ্বেই নানা ধরনের গল্প চালু আছে। ক্ষমতাধর দেশগুলোর সঙ্গে, এর সঙ্গে এমনকি সৃষ্টিকর্তার ক্রোধকেও যুক্ত করা হয়েছে। এ ধরনের প্রচুর ষড়যন্ত্রের খবর বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। বিস্তারিত তথ্য ও তদন্তের অভাব থাকায় সেই আলাপে যাওয়াটা মোটেও বিজ্ঞানসম্মত নয়। তবে চলমান ঘটনাবলি জোর বার্তা দিচ্ছে যে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার কারণ যাই হোক, এটি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তির প্রসার ঘটাতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে।

কিন্তু আমরা কি এতে চিন্তিত হব? পূর্বোল্লিখিত প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক অটোমেশনের ফলাফলকে যেভাবে প্রাক্কলন করেছে, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি ও বাজার সম্প্রসারণ, তা পুঁজি ও মুনাফার স্বার্থের দিক থেকে দরকারি হতে পারে। কিন্তু সমতা ও ন্যায়বিচারকে যদি সমাজের উন্নয়নের ভিত্তি গণ্য করা হয়, যেমনটা তারা বলেও থাকে টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক লক্ষ্যমাত্রাসমূহে, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে অটোমেশনের ফলে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়া বা সবকিছু বেচাকেনার আওতায় আসাটা মানবজাতির অস্তিত্বের জন্যই হুমকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

অটোমেশনের ফলে যারা কর্ম হারিয়েছে, অস্থায়ী চাকরিতে ঢুকতে বাধ্য হচ্ছে বা আরও তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে, তাদের টেকসই ও সুস্থ জীবনযাপনের অধিকার বিনষ্ট হচ্ছে। শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা কমানোর চেষ্টা, অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগদানের বিধি, দেশে দেশে বিদ্যমান শ্রম আইনগুলোকে আরও বেশি মালিকবান্ধব করে তোলাটা বৈষম্য তীব্র করবে। এভাবে ন্যায়বিচার ও সমতার ধারণাকে বাতিল করে দিয়েই এগিয়ে নেয়া হচ্ছে অটোমেশন কার্যক্রম।

কিন্তু এগুলো কি অটোমেশনের সমস্যা? স্পষ্টতই তা নয়, বরং এটা হচ্ছে মালিকানা ব্যবস্থা তথা সম্পদ বণ্টনের সমস্যা। প্রযুক্তির বিকাশ স্বাভাবিক নিয়মেই উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের শর্ত সৃষ্টি করে। তাতে করে উৎপাদনের সমস্ত উপায় বদলাতে থাকে। এরই অংশ হিসাবে অটোমেশন এসেছে। এখন তীব্র গতিতে শুরু হলেও আগেও অটোমেশন হয়েছে। তাই অটোমেশনটা কোন সমস্যা নয়। সমস্যা হল বিদ্যমান ব্যবস্থার পরিচালকরা মুনাফার স্বার্থে অটোমেশনকে ব্যবহার করছে। মানুষের কাজ কেড়ে নিতে তারা অটোমেশনকে কাজে লাগাচ্ছে। অটোমেশনের মাধ্যমে তারা উৎপাদনের অন্যতম শক্তি মানুষকে পিছিয়ে রাখার চেষ্টায় মত্ত। অথচ এর উল্টোটাও ঘটা সম্ভব ছিল।

অটোমেশনের ফলে মানুষের কাজ তথা শ্রমঘণ্টা কমে যেতে পারত। মানুষ ভরণ-পোষণের জন্য সময় ব্যয় করা থেকে আরও খানিকটা অব্যাহতি পেতে পারত। তাতে জ্ঞানচর্চা, শিল্পকলার প্রসার, মানুষের চিন্তাক্ষমতা বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হত। এর মধ্য দিয়ে সম্ভাবনার এক নতুন জগৎ উন্মোচিত হতে পারত। অটোমেশন পৃথিবীকে এক নতুন বিকাশের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেও ধনতান্ত্রিক মালিকানাব্যবস্থা তা থেকে মানবজাতিকে বঞ্চিত করছে। জগদ্বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংও বিষয়টিকে এভাবেই দেখেছেন।

অটোমেশনের ফলে মানুষের কাজ তথা শ্রমঘণ্টা কমে যেতে পারত। মানুষ ভরণ-পোষণের জন্য সময় ব্যয় করা থেকে আরও খানিকটা অব্যাহতি পেতে পারত। তাতে জ্ঞানচর্চা, শিল্পকলার প্রসার, মানুষের চিন্তাক্ষমতা বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হত। এর মধ্য দিয়ে সম্ভাবনার এক নতুন জগৎ উন্মোচিত হতে পারত। অটোমেশন পৃথিবীকে এক নতুন বিকাশের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেও ধনতান্ত্রিক মালিকানাব্যবস্থা তা থেকে মানবজাতিকে বঞ্চিত করছে। জগদ্বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংও বিষয়টিকে এভাবেই দেখেছেন।

মৃত্যুর কিছুকাল আগে হাফিংটন পোস্টে প্রকাশিত ৫ জানুয়ারি ২০১৭ সালের এক প্রতিবেদনে হকিংকে উদ্ধৃত করা হয়। তাতে তিনি বলেন, ‘আমাদের উচিত পুঁজিবাদ নিয়ে দুর্ভাবনা করা, রোবট নিয়ে নয়।’ হকিং বলেন, যন্ত্রসভ্যতার ফলে যন্ত্রের মালিকরা দ্রুত মুনাফা লাভ করবে এবং অর্থনৈতিক অসাম্য তৈরি হবে এজন্য রোবট বা যন্ত্রমানব নয়, দায়ী হচ্ছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মুনাফার প্রতি মানুষের লোভ। হকিং আরও মন্তব্য করেন, ‘আমরা যা চাই তার সবই যদি যন্ত্র দিতে পারে তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, এর মধ্যে কতটুকু পণ্য আসলে বণ্টন করা হবে? যদি যন্ত্র উৎপাদিত পণ্যের সমবণ্টন হয় তাহলে সবাই আয়েশি জীবন যাপন করতে পারবে। আর যদি মানুষ সেই পণ্য বা সম্পদের সমবণ্টন না করে তাহলে এক শ্রেণির মানুষ গরিবই থেকে যাবে। এই যন্ত্রচালিত যুগে সম্পদের বণ্টন নিয়ে মানুষের চিন্তা-ভাবনাই বৈষম্য তৈরি করে।’ দেখা যাচ্ছে, স্টিফেন হকিংয়ের আশঙ্কাই ক্রমাগত শক্তিশালী হচ্ছে। অটোমেশনের কারণে মানুষের শ্রম তো কমছেই না, বরং প্রত্যেককে কয়েকটা কাজ করতে হবে সচ্ছলভাবে বাঁচার জন্য।

এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, অটোমেশনের ফলে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোতে আরও বেশি সক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হবে। এতে করে এসব দেশে মজুদ পণ্যের পরিমাণ বাড়বে এবং পণ্য বিক্রির আশায় বড় ক্ষমতাধর দেশগুলো বিভিন্ন দেশের বাজারে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করতে চাইবে। মুনাফার জন্য প্রযুক্তির অপরিণামদর্শী বিস্তার কর্মহীনতাই শুধু নয়, পরিবেশ বিপর্যয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মানুষের দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রও তৈরি করবে।

দেশে দেশে কাজ হারানোর শঙ্কা আরও বাড়বে। কর্মসংস্থানের সংকটের মুখে বিদেশিদের দায়ী করার মানসিকতা থেকে উন্নত দেশগুলোতে তাই জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটছে, আরও ঘটবে। জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকরা এটাকে পুঁজি করে উন্নত প্রযুক্তি কুক্ষিগত করে রাখার সমস্ত চেষ্টাই চালাচ্ছে। বড় ক্ষমতাধর দেশগুলো বিশ্বায়িত ব্যবস্থার বিপরীতে নিজস্ব একক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা আরও তীব্র করছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, রাশিয়া, চীন, তুরস্কসহ অনেক দেশই এই পথে অনেকটা এগিয়ে গেছে। এর ফলে শিল্পে উন্নত দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে এবং এদের সঙ্গে অনুন্নত দেশগুলোর দ্বন্দ্ব তীব্র হবে। যা কিনা ভয়াবহ সংঘাতের আশঙ্কাকেও সামনে নিয়ে আসছে।

তবে ব্যাপক অটোমেশনের এসব প্রভাব- কর্মহীনতা, পরিবেশের ক্ষতি ও যুদ্ধের শঙ্কা- এগুলো ঠেকানোর চেষ্টা বিদ্যমান ব্যবস্থার পরিচালকরাও করবে। বাজারব্যবস্থা আরও সম্প্রসারণ করার পথ তো তারা নিয়েছেই, প্রয়োজনে অটোমেশনের রাশ কিছুটা টেনে ধরার পথেও যেতে পারে তারা। কিন্তু পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ নৈরাজ্য মোকাবিলা করে তাদের সেই পরিকল্পনা কতটুকু বাস্তবায়ন সম্ভব সেটা এক বিরাট প্রশ্নই বটে। তাছাড়া এর বিপরীতে জনগণের প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, শ্রমজীবীদের নেতৃত্বে জনগণের বিরাট উত্থানের সম্ভাবনাও রয়েছে।

সমাজে বৈষম্য বাড়তে থাকলে মানুষ বসে থাকবে না। ইতিহাস বলে, মানুষ ক্রমাগত লড়াই করেছে এবং এগিয়েছেও। মানুষের সমাজ সব মিলিয়ে সামনের দিকেই হাঁটছে। অটোমেশন বা প্রযুক্তির বিকাশ মানুষ নিজের প্রয়োজনেই এগিয়ে নেবে। কিন্তু মুনাফার জন্য প্রযুক্তির যে বিকাশ, মানুষ এই প্রবণতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। যেমন ফ্রান্সে রেলওয়ে থেকে বিপুল লোককে ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনার পাশাপাশি আর্থিক নানা সংস্কারের উদ্যোগ হাতে নেয়া হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের শেষ দিকে সেখানে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন দানা বাঁধে এবং সরকার পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ উদ্ভূত পরিস্থিতি কেবলই হতাশাজনক নয়, বরং আশা করা যায়, এর মধ্য দিয়েই আজকের রাজনৈতিক করণীয় স্পষ্ট চেহারা পেতে পারে। মুনাফার উন্মাদনায় প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত বিকাশ গণজাগরণের পক্ষে ইতিবাচক শর্ত সৃষ্টি করবে।

আনিস রায়হান: লেখক, সাংবাদিক।

ইমেইল: raihananis87@gmail.com

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *