পদ্মা/গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্প: উদ্বেগ ও প্রশ্ন
ইকবাল কবির জাহিদ
গত ৬ জুন ২০২৬ জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় ‘পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প’ নিয়ে সরকারি সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন এবং উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ আয়োজিত এই মতবিনিময় সভায় মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ। এসব প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে সরকার প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। গুরুত্ব বিবেচনা করে এই লিখিত বক্তব্য এখানে প্রকাশ করা হলো।
গত ১৩ মে ২০২৬ বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে একনেক সভায় পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের জন্য ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকার প্রকল্প পাস করেছে। তবে যে ‘সম্ভাব্যতা সমীক্ষা’র (ফিজিবিলিটি স্টাডি) ভিত্তিতে এ প্রকল্প অনুমোদিত হলো, সেটা কাউকে দেখার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘পদ্মা ব্যারেজ’ নামে একটি প্রস্তাব অনুমোদন করে। সেই প্রস্তাবই বর্তমান সরকার একনেকে পাস করেছে। অতীতের সরকারগুলোর মতো জনগণকে অন্ধকারে রেখে এবং সংসদকে পাশ কাটিয়েই তা একনেকে পাস করা হলো। এই মহাপরিকল্পনা গ্রহণে সরকার দেশের জনগণ, সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ ও দেশীয় বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেনি, যা এধরনের প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ব্যত্যয়।
পাকিস্তান আমলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৌশলীদের পরামর্শে ফারাক্কা বাঁধের বিপরীতে ‘গঙ্গা ব্যারেজ’ প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছিল। তারপর থেকেই গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্পের অসারতা, লাভ-ক্ষতি নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে আলোচনা-সমালোচনা বিতর্ক চলে আসছে। সে বিষয়গুলো আমলে না নিয়ে সরকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওপর নির্ভর করেছে। এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে ফারাক্কার উজানে পলি ভরাট, বিহার ও উত্তর প্রদেশের বন্যা পরিস্থিতি আমলে নেওয়া হয়নি, ফারাক্কা থেকে পদ্মা ব্যারেজ পর্যন্ত পলি ব্যবস্থাপনা ও সুন্দরবন পর্যন্ত নদী-পানি-পলি ব্যবস্থাপনার কী হবে, সেসব বিষয়েও সুস্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই। দক্ষিণাঞ্চলে নদী পানি ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন আমলে নেওয়া হয়নি, নেওয়া হয়নি তিস্তা ব্যারেজের তিক্ত অভিজ্ঞতাও।
এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে ফারাক্কার উজানে পলি ভরাট, বিহার ও উত্তর প্রদেশের বন্যা পরিস্থিতি আমলে নেওয়া হয়নি, ফারাক্কা থেকে পদ্মা ব্যারেজ পর্যন্ত পলি ব্যবস্থাপনা ও সুন্দরবন পর্যন্ত নদী-পানি-পলি ব্যবস্থাপনার কী হবে, সেসব বিষয়েও সুস্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই। দক্ষিণাঞ্চলে নদী পানি ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন আমলে নেওয়া হয়নি, নেওয়া হয়নি তিস্তা ব্যারেজের তিক্ত অভিজ্ঞতাও।
অভিজ্ঞতা হলো ষাটের দশকে মার্কিন ক্রুগ মিশনের পরামর্শ অনুযায়ী উন্নয়ন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে কর্ডন পলিসি বাংলাদেশের নদী পানি ব্যবস্থাপনা ও দেশের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ভূমি গঠন প্রক্রিয়াকে বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলেছে। পানি পলি ব্যবস্থাপনার স্বাভাবিক পদ্ধতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে, যা এখন একটি স্থায়ী সংকটে রূপ নিয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেও এর সুরাহা করা সম্ভব হচ্ছে না। ভারতে গজল ডোবা ব্যারেজের বিপরীতে তিস্তা ব্যারেজে সমস্যার সমাধান হয়নি; বরং এখন হাজার হাজার কোটি টাকার তিস্তা প্রকল্প গ্রহণে বিদেশিদের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। তাতেও সমস্যার সমাধান অনিশ্চিত। পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পেরও একই পরিণতি হবে। এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা গ্রহণের জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সুদীর্ঘকাল ধরে নদীবাহিত পলিদ্বারা বঙ্গীয় ব-দ্বীপ গঠিত হয়েছে। সে ভূমি গঠনের কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। পৃথিবীর অন্যান্য ব-দ্বীপ এক এবং অভিন্ন নদীর পলিদ্বারা গঠিত। যেমন: নীলনদ, মিসিসিপি, ইয়াংসি প্রভৃতি নদীর মোহনায় গঠিত ব-দ্বীপ। বঙ্গীয় ব-দ্বীপের বৈশিষ্ট্য হলো– ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা ও মেঘনা–তিনটি মহাশক্তিধর নদীবাহিত পলি দ্বারা গড়ে উঠেছে। তিনটি নদী ও তার শাখা-প্রশাখা নদীসহ মোট ৮১৩টি শাখানদী জালের মতো বিস্তার লাভ করে প্রবাহিত হচ্ছে এই দেশের ওপর দিয়ে। বঙ্গীয় ব-দ্বীপ বৈশিষ্ট্য বিচারে পানি ও ভূমির বিষয় বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, বাংলাদেশের মোট নদীর মধ্যে ৫৫টি ভারত থেকে, ৩টি মিয়ানমার থেকে প্রবেশ করেছে।
গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা অববাহিকার ৯২ শতাংশ বাংলাদেশের উজানে অবস্থিত। এর বড় অংশটি ভারত, নেপাল, ভুটান এবং চীনে। অনেক গবেষকের মতে, নদ-নদী দিয়ে আগে বছরে প্রায় ২০০ কোটি টন পলিবালি আসত। এখন তা হ্রাস পেয়ে আসছে ১০০ টনেরও কম। এর মধ্যে ব্রহ্মপুত্র দ্বারা ৫৯ কোটি টন, গঙ্গা দ্বারা ৫৫ কোটি টন, মেঘনা দিয়ে ১ কোটি টন পলিবালি আসে। সে কারণে তিনটি নদীর সম্মিলিত প্রবাহই বঙ্গোপসাগরে পৌঁছায় ও ব-দ্বীপ গঠনের প্রক্রিয়ায় জোরালোভাবে ভূমিকা রাখছে। ধারণা করা হয়– প্রতিবছর ১৯ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রগর্ভ থেকে উত্থিত হয়ে দেশের ভূ-সীমানায় যুক্ত হচ্ছে। অপরদিকে, বাংলাদেশের গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৮০ ইঞ্চি। এই পানি ব্যবহারের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই।
বাংলাদেশের নদী-পানি-ভূমি গঠন ইত্যাদি বিষয়ে নিম্নোক্ত তিন ধরনের সমস্যা আমলে নিতে হবে। যেমন:
এক. অভ্যন্তরীণ: অভ্যন্তরীণ নদীর পানির ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ব-দ্বীপ গঠন প্রক্রিয়ার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নিজস্ব কর্মপরিকল্পনার বিপরীতে, উন্নয়ন বাণিজ্যের নামে বৈদেশিক পরামর্শ ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণই পন্থা হিসেবে গৃহীত হয়ে আসছে। ৬০-এর দশকে ক্রুগ মিশনের ফর্মুলা ও কর্ডন পলিসি অনুযায়ী নদীকে প্লাবন ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করে নদীর পানি ব্যবস্থাপনাকে বিপর্যস্ত করেছে। পাউবোর ২০১২ সালের হিসাবমতে, পোল্ডার ৯২টি, বাঁধের দৈর্ঘ্য ১০২২৪ কিমি। স্লুইস গেট বানানো হয়েছে ১৪১২৬টি। কেবল দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে ৩৭টি পোল্ডার, ১৫৫৬ কিমি বেড়িবাঁধ, ২৮২টি স্লুইচ গেট নির্মাণ করা হয়েছে; যে কারণে ভবদহসহ ১৩০ কিমি নদী অববাহিকা এবং উপকূলীয় অঞ্চল স্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার হয়। তা থেকে উদ্ভূত সংকট নিরসনে পুনর্বাসনের নামে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ, ডেল্টা প্ল্যান-২১০০-সহ নানা ধরনের বৃহৎ ইঞ্জিনিয়ারিং কর্মকাণ্ডে হাজার হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি-লুটপাটের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ তছরুপ করা হচ্ছে। ক্রুগ মিশনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ওয়াপদা বা পূর্ব পাকিস্তান পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হয়। শুরু থেকেই এই প্রতিষ্ঠানটি প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যতার বিপরীতে পোল্ডার, স্লুইচ গেটসহ নানা ধরনের প্রকল্প গ্রহণে অভ্যস্ত। এসব কাজে অর্থায়নে বিশ্বব্যাংক, এডিবির ভূমিকাই প্রধান।
পাউবোর ২০১২ সালের হিসাবমতে, পোল্ডার ৯২টি, বাঁধের দৈর্ঘ্য ১০২২৪ কিমি। স্লুইস গেট বানানো হয়েছে ১৪১২৬টি। কেবল দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে ৩৭টি পোল্ডার, ১৫৫৬ কিমি বেড়িবাঁধ, ২৮২টি স্লুইচ গেট নির্মাণ করা হয়েছে; যে কারণে ভবদহসহ ১৩০ কিমি নদী অববাহিকা এবং উপকূলীয় অঞ্চল স্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার হয়। তা থেকে উদ্ভূত সংকট নিরসনে পুনর্বাসনের নামে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ, ডেল্টা প্ল্যান-২১০০-সহ নানা ধরনের বৃহৎ ইঞ্জিনিয়ারিং কর্মকাণ্ডে হাজার হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি-লুটপাটের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ তছরুপ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের। নদী-পানি ব্যবস্থাপনার ওপর দুই ধরনের কর্তৃত্ববাদী আচরণ লক্ষণীয়। ভারতের পানি প্রত্যাহার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ফায়দা হাসিলের অন্যতম কৌশল, আর মার্কিন প্রতিষ্ঠান অর্থায়নে ভূমিকা পালন করে কর্তৃত্বের আসনে থাকে। দেশের সরকারগুলোর কাছে কখনো দেশ ও জনগণের স্বার্থ অগ্রাধিকার পায়নি। এটা নীতিনির্ধারণে বড় ধরনের সমস্যা। বিদেশি অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান, কনসালট্যান্সী প্রতিষ্ঠান এবং এনজিও প্রধান সহযোগী ভূমিকা পালন করে থাকে। সর্বক্ষেত্রে জনগণের মতামত উপেক্ষিত হয়। পাকিস্তান আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত শাসকগোষ্ঠীর যারাই ক্ষমতায় থেকেছে তারা সবাই নদী-পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করেছে।
দুই. আঞ্চলিক. গঙ্গাসহ ৫৪টি নদীর পানি প্রত্যাহারে ভারত আন্তর্জাতিক নীতিমালা লঙ্ঘন করে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও সার্বভৌম অধিকারকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। লক্ষণীয়, ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের জন্য ন্যূনতম ৪০ হাজার ৫০০ কিউসেক পানি পাওয়ার বিধান ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৭ সালে, ১৯৮২ ও সবশেষ ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ-ভারত ৩০ বছর মেয়াদি ‘গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। যার মেয়াদ চলতি বছর ডিসেম্বর মাসে শেষ হবে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে– প্রতিবার চুক্তিতে যে পরিমাণ পানি বাংলাদেশের পাওয়ার কথা তা না দিয়ে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছে ভারত। উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক নদী কনভেনশন ভারত-চীন অনুমোদন দেয়নি, বরং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে চলেছে। তার বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে পদ্মা ব্যারেজ করা ভারতের স্বার্থ রক্ষার নামান্তর।
প্রতিবার চুক্তিতে যে পরিমাণ পানি বাংলাদেশের পাওয়ার কথা তা না দিয়ে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছে ভারত। উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক নদী কনভেনশন ভারত-চীন অনুমোদন দেয়নি, বরং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে চলেছে। তার বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে পদ্মা ব্যারেজ করা ভারতের স্বার্থ রক্ষার নামান্তর।
তিন. বৈশ্বিক: পুঁজিবাদী কেন্দ্র দেশগুলো উন্নয়নের নামে প্রতিনিয়ত বিশ্বকে উষ্ণায়ন করছে। যার ফলে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। সমুদ্রতলের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে। তন্মধ্যে দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল পানির তলে চলে যাওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তেমনটা হলে সৃষ্টি হবে আর এক মানবিক বিপর্যয়। এই তিনটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশকে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
ফারাক্কা বাঁধের অভিজ্ঞতা
ভারত সরকার ১৯৫১ সালে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা সমস্যাকে মুখ্য করে ফারাক্কা ব্যারেজ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের সেচ বিভাগের চিফ ইঞ্জিনিয়ার কপিল ভট্টাচার্য এই প্রকল্পের বিরোধিতা করার কারণেই তাকে চাকরিচ্যুত হতে হয়েছে – সেই সঙ্গে পাকিস্তানের চর বলেও তাঁকে গালাগাল করা হয়েছে। তিনি বলেছিলেন,
‘ফারাক্কা ব্যারেজ বানালে গঙ্গার সমস্যা আরও জটিল হবে। ফারাক্কা বাঁধের উজানে পলি ভরাট হবে। বিহার, উত্তর প্রদেশে বন্যা বাড়বে, বাঁধের ভাটিতে পানিপ্রবাহ কমে যাবে। কলকাতা বন্দরের নাব্যতা অর্জিত হবে না।’
তার কথার সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। কিছুদিন আগে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার ফারাক্কা বাঁধ অপসারণের দাবি তুলেছেন। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের জনগণও ফারাক্কা বাঁধ অপসারণের দাবিতে সংগ্রাম করেছে। ভারত কর্তৃক ফারাক্কা প্রকল্প গ্রহণ করার পর ১৯৬৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ফারাক্কা ব্যারেজের বিকল্প হিসেবে গঙ্গা ব্যারেজ করার জন্য পাকিস্তান সরকারকে প্রস্তাব দেয়। পাকিস্তান সরকার গঙ্গা ব্যারেজ করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। বর্তমানে পদ্মা ব্যারেজ তারই ধারাবাহিকতা।
স্যান্ডর্প ও কল্যাণ রূদ্রের গবেষণায় দেখা গেছে,
‘ফারাক্কা বছরে গড়ে ৩০ থেকে ৬০ কোটি টন পলি আটকে রাখে। এর ফলে উজানে ব্যাপক পলি জমা হয়েছে, নদীর পানি বহন ক্ষমতা কমেছে এবং জলাবদ্ধতা, বন্যা ও ভাঙন বেড়েছে। ভারতের মালদায় প্রায় ৪০ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে ভাটির দিকে মুর্শিদাবাদে পানির সংকট প্রায়ই দেখা দেয়। আবার হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি ছাড়লে ভাঙন তীব্র হয়। প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার জমি বিলীন হয়েছে এবং প্রায় ৫০ হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে।’
একইভাবে গঙ্গার অববাহিকায় বাংলাদেশও তার শিকার।
পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন,
‘বর্তমানে গঙ্গা প্রতিবছর আনুমানিক ৪০ থেকে ৬০ কোটি টন পলি বাংলাদেশে নিয়ে আসে। ….আরেকটি ব্যারাজ নির্মাণ করা হলে ভাটির দিকে পলির সরবরাহ আরও কমে যাবে এবং অধিকাংশ পলি উজান ও ব্যারাজের আশপাশেই জমা হতে থাকবে।’
কিন্তু পাউবোর ২০১৬ সালের প্রকল্প সমীক্ষায় বলা হয়, ‘ব্যারেজের কারণে উজানে পলিপতন বেশি হবে না এবং ৬০ বছরে নদীতল মাত্র ৩ দশমিক ২৮ ফুট বৃদ্ধি পাবে।’ তবে ফারাক্কার ক্ষেত্রে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, গত ৫২ বছরে ফারাক্কার উজানে কোথাও কোথাও নদীতলের উচ্চতা প্রায় ২০ ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিস্তার শিক্ষা
তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব শিক্ষা। উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারেজের পানি নিয়ন্ত্রণের কারণে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার প্রবাহ প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়, যা কোনো কোনো সময় ৭০০ থেকে ১২০০ কিউসেকে নেমে আসে। এর ফলে ১,৫৪৯ কোটি টাকায় নির্মিত তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প কার্যত অচল হয়ে পড়ে। তার নকশায় সেচ সক্ষমতার কথা বলা আছে ৭.৫ লাখ হেক্টর জমির। কিন্তু বাস্তবে মাত্র ৮০ হাজার থেকে এক লাখ হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে।
উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারেজের পানি নিয়ন্ত্রণের কারণে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার প্রবাহ প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়, যা কোনো কোনো সময় ৭০০ থেকে ১২০০ কিউসেকে নেমে আসে। এর ফলে ১,৫৪৯ কোটি টাকায় নির্মিত তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
একই সঙ্গে উজানে পলি আটকে যাওয়া এবং ব্যারেজের ভাটিতে পানি প্রবাহ না থাকায় ধুধু বালুচর হয়ে গেছে। ব্যারেজ থেকে তিস্তা নদীর মিলনস্থল ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত ১১৫ কিলোমিটার নদী বর্ষা মৌসুমে বন্যা প্লাবিত হচ্ছে। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও গবেষণায় দেখা যায়, এর ফলে নদীভাঙন তীব্র হয়ে ১৯৯৮ থেকে ২০২২ সময়কালে ৮৭৫২ হেক্টর কৃষিজমি বিলীন হয়েছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১২ ফুটেরও বেশি নিচে নেমে গেছে। যার বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতি ২১৮৭ কোটি টাকা।
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প: প্রথমেই বলা দরকার স্লুইস গেটসহ নানাবিধ অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে পাউবো গঙ্গার বড়ালসহ শাখা নদীগুলোর স্বাভাবিক গতি আটকে দিয়েছে। এসব অপকর্মের শিকার গঙ্গা অববাহিকাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। কিন্তু তারা গঙ্গার পানি সংক্রান্ত ভ্রান্ত নীতি স্বীকার করতে নারাজ। বরং আরেকটি ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত দেশের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে– এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত বিশাল অর্থ-বাণিজ্য।
১। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সমস্যার সমাধানকল্পে ভৈরব নদী কাঠামোকে কেন্দ্র করে ১৫/১৬টি নদী-শাখানদী, নৌ চলাচল, মোংলা পোর্টের নাব্যতা, সুন্দরবন, জলাবদ্ধতা-লবণাক্ততা ও পোল্ডার, স্লুইস গেট ও বিভিন্ন অবকাঠামোর বিষয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
২। গঙ্গা নদী গোয়ালন্দে যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়ে পদ্মা নামে (যদিও রাজশাহী থেকে পদ্মা নামে পরিচিত) ১২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে চাঁদপুরে মেঘনার সঙ্গে মিলিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। গঙ্গা ব্যারেজ থেকে পদ্মা ব্যারেজ নামকরণ করা বা রাখা ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক আইনের দিক দিয়ে মারাত্মক ভুল। কারণ, তাতে ভাটি দেশের অধিকার যেচে ছেড়ে দেওয়া হবে, যেটা ভারতের চাওয়া।
৩। ফারাক্কা বাঁধের কারণে পলি ভরণ, বন্যা, নদীভাঙন ইত্যাদি এবং শুষ্ক মৌসুমে ভাটি অঞ্চল নাব্যতাহীন থাকার ফলে নদীর অস্তিত্ব হুমকির মধ্যে পড়েছে। পদ্মা ব্যারেজ একই সংকটের জন্মই শুধু দেবে না, এই সংকটকে আরও প্রকট করবে।
৪। পদ্মা ব্যারেজের উজানে পলি পড়ে বন্যার পরিস্থিতির জন্ম দেবে। এই পলি অপসারণ বা ব্যবস্থাপনায় যে পরিকল্পনাই করা হোক তা ব্যর্থ হতে বাধ্য। এবং প্রস্তাবিত প্রকল্পে ব্যারেজের ভাটিতে পাংশা থেকে মেঘনার মোহনা পর্যন্ত উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনো মন্তব্য নেই। গোয়ালন্দে গঙ্গার পানিপ্রবাহ ও যমুনার পানিপ্রবাহ মিলিত হয়ে দীর্ঘপথ অতিক্রম করে সমুদ্রে পতিত হয়েছে। ফলে ব্যারেজের কারণে শুধু যমুনার পানি প্রবাহই প্রধান প্রবাহ হবে। সে ক্ষেত্রে উভয় নদীর প্রবাহ ভাটিতে যে গতিতে প্রবাহিত হতো তা ব্যাহত হবে। সমুদ্রের লোনা পানি দেশের প্রধান ও শাখা নদীগুলোর আরও উজানে প্রবেশ করবে। ফলে মৎস্য ও কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ইতোমধ্যে পদ্মা নদী যেভাবে সংকুচিত হচ্ছে তা ভয়াবহ রূপ নিয়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বিঘ্নিত করবে– সে বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। পদ্মা থেকে আড়িয়াল খাঁ, কীর্তনখোলাসহ পদ্মা অববাহিকার শাখা-প্রশাখা অস্তিত্ব হারাবে। এই বাস্তব সত্যকে আমলে নেওয়া হয়নি। ফলে তিস্তা ব্যারেজের ভাটিতে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে এখনকার পরিস্থিতি হবে তার থেকেও ভয়াবহ।
৫। গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার সব শাখানদীর মুখে বাধা অপসারণ করে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। মাথাভাঙ্গা নদী সংস্কার ও মাথাভাঙ্গা-ভৈরব নদী সংযোগই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারে। তাহলে সুন্দরবনের মিঠা পানি ও মোংলা পোর্ট পর্যন্ত নদীগুলোর নাব্যতা বৃদ্ধি পাবে।
৬। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ক্ষেত্রে এই প্রকল্প আপাতত কিছু সুবিধা পেলেও দু-দশ বছরের মধ্যে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যেমন: ক্রুগ মিশনের কর্ডন পলিসি আট-দশ বছর কিছু সুবিধা দিলেও দেশের অধিকাংশ নদ-নদী, উপকূলীয় অঞ্চলে ভবদহের মতো পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে তা ব্যত্যয় ঘটবে না বলে অনুমান করা যায়। প্রকল্পে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গড়াই, হিসনা, মাথাভাঙ্গা নদীর নাব্যতা ও সুন্দরবনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে যারা জরিপ করেছে তারা তাদের দীনতা প্রকাশ করেছে। ভৈরব হলো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান নদীপ্রবাহ। ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৮ সালে দর্শনায় ভৈরব নদীমুখে দর্শনা সুগার মিল স্থাপন করে। যার ফলে পদ্মা, মাথাভাঙ্গা পানিপ্রবাহ থেকে ভৈরব বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে চিত্রা, কপোতাক্ষসহ জালের মতো বিস্তৃত অসংখ্য নদী সুন্দরবনের মিঠা পানি ও সমুদ্র পর্যন্ত পানি প্রবাহের উৎস– এই মৌলিক বিষয়টি সামনে আনা হয়নি।
৭। দেশের গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৮০ ইঞ্চি। এই বৃষ্টিপাতের পানি গড়িয়ে সমুদ্রে চলে যায়। এই বিপুল পানি সম্পদকে ব্যবহার করার চিন্তা করা হয় না। বিলে-খালে জলাধার পদ্ধতিতে এই পানি নদীর নাব্যতা, ভূগর্ভস্থ পানি সংকট, কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। বৃষ্টির এই পানি অন্যতম বিকল্প হতে পারার বাস্তবতা রয়েছে।
৮। অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ খাত থেকে এই অর্থ সংকুলান করা হবে। তা যদি সত্য হয় তাহলে দেশের ভঙ্গুর চলমান অর্থনীতিতে জনগণের কী বেহাল দশা হতে পারে তা অনুমান করা যায়। অপরদিকে লক্ষ করা যায়, দেশীয় সংস্থানের কথা বললেও বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেই অর্থ সংকুলানের জন্য ধরনা দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটবে না। সে ঋণের বোঝাও জনগণের ওপর চেপে বসবে। ব্যর্থ তিস্তা প্রকল্পের ফলে নতুন প্রকল্প গ্রহণে বিদেশিদের কাছে ধরনা দেওয়া হচ্ছে, পদ্মা ব্যারেজের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটবে। উন্নয়নের মিথ্যা ফানুস ও পানির ন্যায্য হিস্যা বঞ্চিত হয়ে ভারতের শাসকদের স্বার্থ রক্ষা আমাদের কাম্য নয়।
ব্যর্থ তিস্তা প্রকল্পের ফলে নতুন প্রকল্প গ্রহণে বিদেশিদের কাছে ধরনা দেওয়া হচ্ছে, পদ্মা ব্যারেজের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটবে। উন্নয়নের মিথ্যা ফানুস ও পানির ন্যায্য হিস্যা বঞ্চিত হয়ে ভারতের শাসকদের স্বার্থ রক্ষা আমাদের কাম্য নয়।
প্রস্তাব
১। পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প স্থগিত করে প্রকল্পের উজান ও ভাটির সংশ্লিষ্ট মানুষ ও দেশীয় বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে সুদূরপ্রসারী লাভক্ষতির পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
২। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনাসহ উজানের নদ-নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবি জোরদার করতে হবে। আন্তর্জাতিক নদী কনভেনশনে অবস্থান গ্রহণ ও জাতিসংঘসহ বিশ্ব ফোরামে ভারতের আন্তঃসীমান্ত নদী নীতিমালা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করতে হবে।
৩। গঙ্গার পানি ভাগাভাগি সংক্রান্ত ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-ভারত চুক্তির মেয়াদ এ বছরের ডিসেম্বরে শেষ হবে। গঙ্গা চুক্তি নবায়নে অবিলম্বে দেশীয় বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে দেশের স্বার্থে প্রয়োজনীয় শর্তের ভিত্তিতে সর্বাত্মক উদ্যোগ নিতে হবে।
৪। পানি কূটনীতিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, সংযোগ ও ট্রানজিটের কারণে ভারতের কাছে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য পানি ও পলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোতে আমাদের অধিকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। সেই অধিকার নিশ্চিত করার জন্য দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সমমর্যাদায় উন্নীত করতে হবে।
৫। কর্ডন পলিসি, ডেলটা প্ল্যান ২১০০-সহ সব অবরুদ্ধ ও ক্ষতিকর প্রকল্পসমূহ বাতিল করতে হবে। কর্ডন পদ্ধতি নয়, পর্যায়ক্রমে উন্মুক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।
৬। বৃষ্টির জলরাশি সংরক্ষণের (জলাধার) মাধ্যমে নদীর পানি ব্যবস্থাপনা, ভূগর্ভস্থ পানি সংকট নিরসন, কৃষি, মৎস্য উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
৭। পাউবো, এলজিইডি, সড়ক জনপথ, বিএডিসি কর্তৃক উন্নয়নের নামে নদী, খাল, বিল, হাওড়-বাওড়-এর ওপর অপরিকল্পিত ও অবৈধ নির্মাণ কাজ উচ্ছেদ করে নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
৮। সব নদী-খালের সীমানা সিএস রেকর্ড অনুযায়ী নদী পুনরুদ্ধার, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ, নদীতট আইন প্রয়োগ, প্রয়োজনমতো নদী-খাল খনন করতে হবে। নদী নেটওয়ার্ক পুনর্জীবিত করতে হবে।
৯। নদীর পানি ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র করে আমলা, রাজনীতিক, বিদেশি সংস্থা, পাউবোর সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নদী, প্রাকৃতিক পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করতে হবে। দুর্নীতি ও লুটপাটকারীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
উপরোক্ত বিশ্লেষণ থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প দেশের জন্য আরেকটি বিষফোঁড়া হতে যাচ্ছে। এটা শুধু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমস্যা নয়, জাতীয় সমস্যাও বটে। এই সমস্যার সঙ্গে জড়িত রয়েছে– নদী ও পানির ন্যায্য হিস্যা এবং বাংলাদেশের অস্তিত্ব, সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক অধিকারের প্রশ্ন। সমস্যাটি ভারতীয় আধিপত্যবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে জড়িত। এই সমস্যা মোকাবিলায় সঠিক রাজনৈতিক উদ্যোগের বিকল্প নেই।
ইকবাল কবির জাহিদ: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ। ইমেইল: media.uclb@gmail.com
তথ্যসূত্র:
১। ড. নজরুল ইসলাম, পদ্মা ব্যারেজ কি সমস্যার সমাধান দেবে, পদ্মা ব্যারেজ বিতর্ক, প্রথম আলো ১৮-১৯ মে ২০২৬।
২। ড. খালেকুজ্জামান, সাক্ষাৎকার, ডেইলি স্টার, ২০ মে ২০২৬।
৩। কপিল ভট্টাচার্য, চিপ ইঞ্জিনিয়ার, সেচ বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।
৪। সতীশ চন্দ্র মিত্র, যশোহর খুলনার ইতিহাস।
৫। অনিল বিশ্বাস ও ইকবাল কবির জাহিদ, ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ : প্রেক্ষিত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল।
৬। পানি উন্নয়ন বোর্ড।
