নব্য ধ্রুপদ ও মার্কসীয় বিশ্লেষণ পদ্ধতির তুলনামূলক পর্যালোচনা

অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, পছন্দ বা আচরণ বিচার

নব্য ধ্রুপদ ও মার্কসীয় বিশ্লেষণ পদ্ধতির তুলনামূলক পর্যালোচনা

মোঃ মনির

অর্থশাস্ত্রে বিশ্লেষণ পদ্ধতির বিভিন্ন ধারা আছে। এসব ধারায় মতদর্শিক রাজনৈতিক বিভিন্ন মাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে সবচাইতে প্রভাবশালী বা মূলধারা বলে কথিত ধারা নব্য ধ্রুপদ এবং তার নানা সংস্করণ। এই লেখায় ব্যক্তি বা একক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা পছন্দ নির্ধারণে চর্চিত এই তাত্ত্বিক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি এর সীমাবদ্ধতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে; সেই সাথে এসব সিদ্ধান্ত বা পছন্দ বিচারে সামাজিক সম্পর্ক বা মার্কসীয় বিশ্লেষণ পদ্ধতির গুরুত্ব তুলে ধরে দুই ধারার সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে।   

ভূমিকা

অর্থনৈতিক আচরণ ব্যাখ্যা করতে কোথা থেকে বিশ্লেষণ শুরু করা উচিত, ব্যক্তির পছন্দ (Individual Choice) থেকে নাকি সমাজে বিদ্যমান উৎপাদনের সামাজিক সম্পর্ক (Social Relations of Production) থেকে, এই প্রশ্নটি মূলধারার অর্থনীতি (Mainstream Economics) এবং মার্কসীয় রাজনৈতিক অর্থনীতি (Marxian Political Economy) এর মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য তৈরি করে।

আমরা শ্রেণীকক্ষে যে মূলধারার অর্থনীতি শিখি, বিশেষ করে ব্যষ্টিক অর্থনীতির (Microeconomics) প্রধান তাত্ত্বিক ভিত্তি নব্যধ্রুপদী অর্থনীতি (Neoclassical Economics)। নব্যধ্রুপদী অর্থনীতিতে সাধারণত ব্যক্তির পছন্দ দিয়ে বিশ্লেষণ শুরু করা হয়। একজন ভোক্তা তার আয়, পণ্যের মূল্য এবং নিজের পছন্দ বিবেচনা করে এমন পণ্যসমষ্টি নির্বাচন করবে যা তার উপযোগ সর্বাধিক করবে। একইভাবে একজন উৎপাদক নির্দিষ্ট প্রযুক্তি ও উপকরণের মূল্য বিবেচনা করে এমন উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেবে যা তার মুনাফা সর্বাধিক করবে। (Stigler & Becker, 1977)

মার্কসীয় রাজনৈতিক অর্থনীতি (Marxian Political Economy) মানুষের অর্থনৈতিক আচরণ ব্যাখ্যা করতে ভিন্ন জায়গা থেকে শুরু করে। এখানে ব্যক্তি বিচ্ছিন্ন অর্থনৈতিক কর্তা (Economic Agent) নয়। একজন ব্যক্তি শ্রমিক, পুঁজিপতি, ভূমিমালিক, ঋণদাতা, ঋণগ্রহীতা কিংবা ক্ষুদ্র উৎপাদক হিসেবে এমন কিছু সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে অবস্থান করে যা তার সম্পদ, সুযোগ, দরকষাকষির ক্ষমতা এবং শেষ পর্যন্ত তার পছন্দকে প্রভাবিত করে। মার্কসের ক্যাপিটাল গ্রন্থে মজুরি শ্রমের বিশ্লেষণে এই বিষয়টি বিশেষভাবে স্পষ্ট। শ্রমিক ও পুঁজিপতি আইনগতভাবে স্বাধীন দুই ব্যক্তি হিসেবে শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের বস্তুগত অবস্থান (Material Position) সমান নয়। একজন উৎপাদনের উপকরণের (Means of Production) মালিক, অন্যজন জীবিকা নির্বাহের জন্য নিজের শ্রমশক্তি (Labour Power) বিক্রি করে (Marx, 1976)। 

এই লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো বাস্তব জীবনের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত ও আচরণ ব্যাখ্যায় ব্যক্তিগত পছন্দ (Individual Choice) এবং উৎপাদনের সামাজিক সম্পর্ক (Social Relations of Production) এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা এবং কোনটি অধিক কার্যকর বিশ্লেষণী ভিত্তি প্রদান করে তা নির্ধারণ করা।

মূলধারার অর্থনীতি ও ব্যক্তিগত পছন্দ

মূলধারার অর্থনীতির একটি বড় শক্তি হলো এটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ খুব পরিষ্কারভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে। একজন ভোক্তা  যদি চা ও কফির মধ্যে নির্বাচন করে, একজন শ্রমিক যদি অবসর  ও অতিরিক্ত কাজের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেয় কিংবা একটি পরিবার যদি ভোগ ও সঞ্চয়ের মধ্যে নির্বাচন করে, তাহলে পছন্দ, আপেক্ষিক মূল্য (Relative Prices), আয় এবং প্রণোদনা (Incentives) ভিত্তিক কাঠামো (Framework) অনেক কার্যকর (Stigler & Becker, 1977)। 

উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, একজন ডেলিভারি কর্মী প্রতিদিন অতিরিক্ত দুই ঘণ্টা কাজ করার সিদ্ধান্ত নিল। মূলধারার শ্রম সরবরাহ বিশ্লেষণ (Labour Supply Analysis) বলতে পারে, অতিরিক্ত কাজ থেকে পাওয়া আয়ের প্রান্তিক সুবিধা (Marginal Benefit) তার হারানো অবসরের প্রান্তিক সুবিধার চেয়ে বেশি। তাই তার বেশি কাজ করার সিদ্ধান্ত যুক্তিসঙ্গত (Rational)।

এই ব্যাখ্যা ভুল নয়। সমস্যা হলো এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দেয় না: কর্মীটির সামনে বাস্তব বিকল্প কী ছিল? তার যদি পর্যাপ্ত সঞ্চয় না থাকে, অন্য কোনো স্থিতিশীল চাকরি না থাকে, বেতনসহ ছুটি না থাকে এবং কাজ না করলে দৈনন্দিন খরচ মেটানো কঠিন হয়, তাহলে তার অতিরিক্ত কাজ করার সিদ্ধান্তকে শুধু আয় ও অবসরের মধ্যে পছন্দ হিসেবে দেখা অসম্পূর্ণ।

অর্থাৎ ব্যক্তিগত পছন্দের কাঠামো আমাদের বলতে পারে একটি নির্দিষ্ট পছন্দের পরিসরের (Choice Set) মধ্যে ব্যক্তি কীভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কিন্তু সেই পছন্দের পরিসরটি কেন এমন, তা ব্যাখ্যা করতে আরও গভীর কাঠামোগত বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

সামাজিক সম্পর্ক ব্যক্তিগত পছন্দের আগেই কাজ করে

মার্কসীয় রাজনৈতিক অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি এখানেই। এটি প্রশ্ন করে, ব্যক্তি কোন সামাজিক অবস্থান (Social Position) থেকে বাজারে প্রবেশ করছে। মার্কস দেখান যে মজুরি শ্রমের ক্ষেত্রে শ্রমিক আনুষ্ঠানিক অর্থে স্বাধীন। সে নিজের শ্রমশক্তি বিক্রি করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে সে উৎপাদনের উপকরণ থেকে বিচ্ছিন্ন। নিজস্ব উৎপাদনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের পর্যাপ্ত উপায় তার নেই বলেই তাকে শ্রমশক্তি বাজারে বিক্রি করতে হয়। মার্কস শ্রমিকের এই অবস্থাকে ঐতিহাসিকভাবে তৈরি সামাজিক শর্ত (Social Condition) হিসেবে দেখেছেন, প্রাকৃতিক অবস্থা হিসেবে নয়। (Marx, 1976)

এখানে স্বাধীনতা এবং বাধ্যবাধকতা একই সঙ্গে উপস্থিত থাকতে পারে। ধরা যাক, একজন পোশাক শ্রমিক কম মজুরিতে একটি চাকরি গ্রহণ করেছেন। মূলধারার ব্যাখ্যা হতে পারে, বিদ্যমান বিকল্পগুলোর মধ্যে এই চাকরিই তার কাছে সর্বোত্তম ছিল। মার্কসীয় ব্যাখ্যা আরও একটি প্রশ্ন যোগ করবে: কেন তার সামনে থাকা বিকল্পগুলো এত সীমিত?

যদি শ্রমিকের উৎপাদনশীল সম্পদ (Productive Assets) না থাকে, দীর্ঘ সময় বেকারত্ব সহ্য করার মতো সঞ্চয় না থাকে এবং পরিবারের আয় তার মজুরির ওপর নির্ভর করে, তাহলে চাকরিটি গ্রহণ করা স্বেচ্ছামূলক (Voluntary) হলেও সেই পছন্দের পেছনে বস্তুগত বাধ্যবাধকতা (Material Compulsion) রয়েছে। সুতরাং পর্যবেক্ষিত আচরণ (Observed Behaviour) একই থাকলেও ব্যাখ্যার গভীরতা ভিন্ন হতে পারে।

মূলধারার বিশ্লেষণ

সীমাবদ্ধতা + পছন্দ→ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত

মার্কসীয় বিশ্লেষণ

সম্পত্তির সম্পর্ক+শ্রেণিগত অবস্থান+প্রতিষ্ঠান+ক্ষমতা→সীমাবদ্ধতা ও সুযোগ→ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত


দ্বিতীয় কাঠামোটি  তাই শুধু সিদ্ধান্ত নয়, সিদ্ধান্ত তৈরির সামাজিক পরিবেশকেও বিশ্লেষণের অন্তর্ভুক্ত করে।

দরকষাকষির ক্ষমতা ছাড়া বাজারের আচরণ সম্পূর্ণ বোঝা যায় না

উৎপাদনের সামাজিক সম্পর্ককে বিশ্লেষণী ভিত্তি হিসেবে নেওয়ার দ্বিতীয় প্রয়োজন হলো এটি ক্ষমতাকে সরাসরি বিশ্লেষণের অংশ করে। ধরা যাক, একজন শ্রমিকের বর্তমান মজুরি ১৫,০০০ টাকা। সে ২০,০০০ টাকা চাইতে পারে, কিন্তু নিয়োগকর্তা যদি সহজে তাকে প্রতিস্থাপন (Replace) করতে পারে এবং শ্রমিক যদি কয়েক মাস বেকারত্ব সহ্য করতে না পারে, তাহলে তার দরকষাকষির অবস্থান দুর্বল। অন্যদিকে নিয়োগকর্তার আর্থিক সম্পদ এবং বিকল্প শ্রমিক পাওয়ার সুযোগ বেশি হলে দুই পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে সমান হলেও অর্থনৈতিকভাবে তাদের অবস্থান সমান নয়।

আরেকটি উদাহরণ দেয়া যাক, একটি দরিদ্র পরিবার এবং একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক উভয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বেচ্ছামূলক চুক্তিতে (Voluntary Contract) প্রবেশ করে। কিন্তু ঋণগ্রহীতা যদি জরুরি চিকিৎসা, খাদ্য কিংবা ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য ঋণ নিতে বাধ্য হয়, তাহলে চুক্তির শর্ত (Terms of Contract) গ্রহণের ক্ষেত্রে তার স্বাধীনতা এবং ঋণদাতার স্বাধীনতা একই ধরনের নয়।

এই ধরনের আচরণকে শুধু ব্যক্তিগত সর্বোচ্চকরণ (Optimization) দিয়ে ব্যাখ্যা করলে চুক্তির ভেতরের অসম দরকষাকষির ক্ষমতা আড়ালে চলে যেতে পারে (Bowles & Gintis, 1993)। 

মার্কসের শ্রমবাজার বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বিনিময়ের পর্যায়ে ক্রেতা ও বিক্রেতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমান মনে হলেও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় তাদের সম্পর্ক নতুন অর্থ ধারণ করে। শ্রমশক্তি কিনে নেওয়ার পর পুঁজিপতি উৎপাদনের সংগঠন (Organization of Production) ও শ্রম ব্যবহারের ওপর উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ অর্জন করে। তাই মজুরি সম্পর্ক (Wage Relation) কেবল একটি বাজার লেনদেন (Market Transaction) নয়, একই সঙ্গে একটি উৎপাদন সম্পর্ক (Production Relation)।

একই ধরনের কাঠামোগত অবস্থা কেন একই ধরনের আচরণ তৈরি করে

ব্যক্তিগত পছন্দভিত্তিক ব্যাখ্যার আরেকটি সীমাবদ্ধতা দেখা যায় যখন আমরা বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি নয়, বরং পুনরাবৃত্ত সামাজিক ধারা (Repeated Social Patterns) ব্যাখ্যা করতে চাই।

ধরা যাক, একটি অঞ্চলের অনেক শিক্ষিত তরুণ বিদেশে অভিবাসনের (Migration) কথা ভাবছে। প্রত্যেকের অভিবাসন সিদ্ধান্ত আলাদাভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। কারও প্রত্যাশিত আয় বেশি, কারও পারিবারিক যোগাযোগ  (Family Network) বিদেশে আছে, আবার কেউ ঝুঁকি নিতে বেশি আগ্রহী।

কিন্তু যদি একই সময়ে বিপুল সংখ্যক তরুণ একই দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ দিয়ে ব্যাখ্যা দুর্বল হয়ে যায়। তখন প্রশ্ন আসে, দেশের অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানের সুযোগ, মজুরি প্রত্যাশা, পেশাগত অগ্রগতি, সামাজিক যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মধ্যে কোনো সাধারণ কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটছে কি না।

একইভাবে যদি হাজার হাজার অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক (Informal Workers) দীর্ঘ কর্মঘণ্টা গ্রহণ করে, তাহলে প্রত্যেক শ্রমিকের আলাদা পছন্দ আছে বলা তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব। কিন্তু তাদের সবার মধ্যে যদি স্বল্প সম্পদ, দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা, অস্থিতিশীল কর্মসংস্থান এবং সীমিত দরকষাকষির ক্ষমতা সাধারণ বৈশিষ্ট্য হয়, তাহলে এই কাঠামোগত শর্তগুলো আচরণের ধারা ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে বেশি মৌলিক হয়ে ওঠে।

এখানে সামাজিক সম্পর্কভিত্তিক বিশ্লেষণ ক্ষুদ্র পর্যায়ের পছন্দকে (Micro Level Choice) বাতিল করে না। বরং ব্যক্তিগত পছন্দগুলোর মধ্যে যে নিয়মিত ধারা (Systematic Pattern) দেখা যায়, তার উৎস অনুসন্ধান করে।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে প্রোথিত

এই যুক্তি শুধু মার্কসীয় ধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অর্থনৈতিক সমাজবিজ্ঞানেও (Economic Sociology) একই ধরনের সমালোচনা পাওয়া যায়।

গ্রানোভেটার (Granovetter, 1985) যুক্তি দেন যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত আচরণ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সামাজিক সম্পর্ক ও নেটওয়ার্কের মধ্যে প্রোথিত বা সংযুক্ত থাকে।

উদাহরণ হিসেবে চাকরি পাওয়ার বিষয়টি ধরা যেতে পারে। একজন ব্যক্তি তাত্ত্বিকভাবে মজুরি, অবস্থান ও চাকরির বৈশিষ্ট্য তুলনা করে সর্বোত্তম চাকরি নির্বাচন করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে সে কোন চাকরির খবর পাচ্ছে, কার সুপারিশ পাচ্ছে, কোন নিয়োগকর্তা তাকে বিশ্বাস করছে এবং কোন পেশাগত নেটওয়ার্কে তার প্রবেশাধিকার আছে, সেগুলো তার সম্ভাব্য পছন্দকে প্রভাবিত করে।

দুইজন সমান দক্ষ স্নাতকের পছন্দ একই হলেও একজনের শক্তিশালী পেশাগত নেটওয়ার্ক থাকলে তার পছন্দের পরিসর অন্যজনের তুলনায় অনেক বড় হতে পারে। তাই বাস্তব অর্থনৈতিক আচরণ ব্যাখ্যা করতে শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ জানা যথেষ্ট নয়। সামাজিক অবস্থান ও নেটওয়ার্ক কাঠামোও জানা প্রয়োজন।

পছন্দও সবসময় বাইরে থেকে দেওয়া বিষয় নয়

মূলধারার অর্থনৈতিক মডেল প্রায়ই পছন্দকে বিশ্লেষণের বাইরে থেকে দেওয়া বা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল বিষয় হিসেবে ধরে নেয়। স্টিগলার ও বেকার (1977) এর গবেষণা এই পদ্ধতিগত অবস্থানের (Methodological Position) একটি সুপরিচিত উদাহরণ। কিন্তু বোলস (Bowles, 1998) দেখিয়েছেন যে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান নিজেরাই মানুষের রুচি (Tastes), মূল্যবোধ (Values), মানসিক প্রবণতা (Psychological Dispositions) এবং পছন্দের পরিস্থিতিকে সময়ের সঙ্গে প্রভাবিত করতে পারে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান শুধু পছন্দের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করে না, পছন্দ গঠনের প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করতে পারে।

ধরা যাক, একটি সমাজে দীর্ঘ সময় ধরে পেশাগত সাফল্যকে আয় ও ভোগের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। সেই সমাজে ব্যক্তির পেশাগত আকাঙ্ক্ষা এমনভাবে গড়ে উঠতে পারে যেখানে উচ্চ আয় নিজেই সামাজিক মর্যাদার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হয়ে ওঠে। একইভাবে অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজার মানুষের শিক্ষাগত পছন্দ, দক্ষতায় বিনিয়োগ এবং পেশাগত প্রত্যাশা পরিবর্তন করতে পারে।

তাহলে পর্যবেক্ষিত পছন্দকে ব্যাখ্যার একেবারে সূচনাবিন্দু হিসেবে নিলে একটি চক্রাকার ব্যাখ্যার  সমস্যা তৈরি হতে পারে।

ব্যক্তি কেন এমন আচরণ করছে? কারণ তার পছন্দ এমন। তার পছন্দ কেন এমন? এই দ্বিতীয় প্রশ্নটি তখন মডেলের বাইরে থেকে যায়। সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণ এই দ্বিতীয় প্রশ্নটিকেও অর্থনীতির আলোচনার মধ্যে নিয়ে আসে।

অমর্ত্য সেন এবং সংকীর্ণ  আত্মস্বার্থভিত্তিক  ব্যক্তি

ব্যক্তিগত পছন্দের দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা আসে অমর্ত্য সেনের কাছ থেকে। তার Rational Fools প্রবন্ধে সেন (Sen, 1977) দেখান যে মানুষকে শুধু সংকীর্ণ আত্মস্বার্থভিত্তিক পছন্দ সর্বোচ্চকারী (Self Interested Preference Maximizer) হিসেবে দেখলে অঙ্গীকার (Commitment), নৈতিকতা (Morality) এবং অন্যের কল্যাণ সম্পর্কে মানুষের আচরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়।

ধরা যাক, একজন শ্রমিক সহকর্মীদের ধর্মঘটে (Strike) অংশগ্রহণ করলো, যদিও এর কারণে তার ব্যক্তিগত আয় সাময়িকভাবে কমবে। তাৎক্ষণিক আত্মস্বার্থ (Immediate Self Interest) দিয়ে এই আচরণ পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা কঠিন হতে পারে। কিন্তু সংহতি (Solidarity), ন্যায্যতা (Fairness) অথবা সমষ্টিগত পরিচয় (Collective Identity) বিবেচনায় নিলে আচরণটি সহজে বোঝা যায়।

একইভাবে একজন ব্যক্তি বেশি বেতনের চাকরি প্রত্যাখ্যান করে পরিবারের কাছে থাকতে পারে। কেউ নৈতিক বিবেচনা থেকে বেশি দাম দিয়ে একটি পণ্য কিনতে পারে। কেউ নিজের তাৎক্ষণিক বস্তুগত লাভের বিরুদ্ধে গিয়ে সমষ্টিগত আন্দোলনে অংশ নিতে পারে।

এগুলো দেখায় যে অর্থনৈতিক ব্যক্তি নিজেই একটি সামাজিক সত্তা (Social Being)। তার পরিচয় (Identity), সামাজিক মানদণ্ড (Norms) এবং অঙ্গীকার সামাজিক সম্পর্কের বাইরে তৈরি হয় না।

পোলানিয়ি এবং বাজার সমাজ

কার্ল পোলানিয়ির (Karl Polanyi) কাজও সামাজিক সম্পর্কভিত্তিক ব্যাখ্যাকে শক্তিশালী করে। The Great Transformation গ্রন্থে তিনি দেখান যে অর্থনীতিকে সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন স্বায়ত্তশাসিত ক্ষেত্র (Autonomous Sphere) হিসেবে দেখা ঐতিহাসিকভাবে সমস্যাজনক। বাজার প্রতিষ্ঠানগুলোও রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হয় এবং শ্রম, ভূমি ও অর্থকে বাজারের নিয়মে সংগঠিত করার চেষ্টা সমাজে বড় ধরনের পরিবর্তন সৃষ্টি করে (Polanyi, 1944)।

এই অন্তর্দৃষ্টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাজারমূল্য নিজেও সবসময় বিশুদ্ধ প্রাকৃতিক সংকেত নয়। সম্পত্তি আইন, শ্রম আইন, শ্রমিক সংগঠনের অধিকার, করব্যবস্থা, কল্যাণনীতি (Welfare Policy), মুদ্রা প্রতিষ্ঠান (Monetary Institutions) এবং চুক্তি বাস্তবায়ন (Contract Enforcement) কোন বাজার কীভাবে কাজ করবে তা নির্ধারণ করে। সুতরাং একজন ব্যক্তি যে বাজার প্রণোদনার (Market Incentives) প্রতি প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে, সেই প্রণোদনাগুলো নিজেরাও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ফল।

ধরা যাক, একজন ক্ষুদ্র কৃষক বাজারে ফসলের দাম কমে যাওয়ার পরও উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছেন। মূলধারার দৃষ্টিভঙ্গি বলতে পারে, কৃষক প্রত্যাশিত মূল্য (Expected Price), উৎপাদন ব্যয় এবং ঝুঁকি বিবেচনা করে মুনাফা সর্বাধিককরণের (Profit Maximization) সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। কিন্তু আরও গভীরভাবে দেখলে দেখা যেতে পারে যে তার জমি নির্দিষ্ট ফসলের জন্য উপযোগী, তার ঋণ পরিশোধ করতে হবে, বিকল্প কর্মসংস্থান নেই, আগের বিনিয়োগ ইতোমধ্যে ফেরত অযোগ্য ব্যয়ে (Sunk Cost) পরিণত হয়েছে এবং বাজারে প্রবেশের জন্য তাকে স্থানীয় ব্যবসায়ীর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তখন উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ নয়। এটি ভূমি সম্পর্ক, ঋণ সম্পর্ক, বাজার ক্ষমতা (Market Power) এবং জীবিকার প্রয়োজনের সম্মিলিত ফল। সামাজিক সম্পর্কভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি তাই কৃষকের আচরণকে অযৌক্তিক (Irrational) বলার পরিবর্তে তার কাঠামোগত প্রেক্ষাপটে যুক্তিসঙ্গত করে তোলে।

তবে ব্যক্তিগত পছন্দ কেন এখনও প্রয়োজনীয়

এত কিছুর পরও ব্যক্তিগত পছন্দকে বাদ দেওয়া যাবে না। একই সামাজিক শ্রেণির দুই ব্যক্তি একই আচরণ করে না। একই মজুরি, শিক্ষা ও পারিবারিক পটভূমির দুই শ্রমিকের একজন অভিবাসন করতে পারে, অন্যজন নাও করতে পারে। একই আয়ের দুই পরিবারের সঞ্চয় আচরণ  ভিন্ন হতে পারে।

ঝুঁকি গ্রহণের প্রবণতা, প্রত্যাশা, তথ্য, ব্যক্তিত্ব, পারিবারিক সংযুক্তি, বিশ্বাস এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা (Individual Aspirations) এই পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে গুরুত্বপূর্ণ। এই জায়গায় মূলধারার অর্থনীতির ব্যষ্টিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণী উপকরণ  (Microeconomic Tools) অত্যন্ত কার্যকর। 

তাই শক্তিশালী রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অবস্থান এমন হওয়া উচিত নয় যে ব্যক্তিগত পছন্দ অর্থহীন। বরং বলা উচিত: সামাজিকভাবে কাঠামোবদ্ধ সম্ভাবনার ভেতরেই ব্যক্তিগত কার্যক্ষম কাজ করে।

সামাজিক সম্পর্ক আমাদের বলে পছন্দের পরিসর কীভাবে তৈরি হয়েছে। ব্যক্তিগত পছন্দ আমাদের বলে সেই পরিসরের মধ্যে ব্যক্তি কোন বিকল্প নির্বাচন করল। এই কারণে দুটি দৃষ্টিভঙ্গিকে একই বিশ্লেষণী স্তরের প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা সবসময় সঠিক নয়। (Granovetter, 1985)

কেন কিছু পরিবার কয়েক মাস বেকারত্ব সহ্য করতে পারে এবং অন্যরা পারে না? কেন একই অর্থনৈতিক অভিঘাত (Economic Shock) বিভিন্ন শ্রেণির ওপর ভিন্নভাবে কাজ করে? কেন শ্রমিক ও নিয়োগকর্তার দরকষাকষির ক্ষমতা সমান নয়? কেন একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিপুল সংখ্যক তরুণ অভিবাসনের কথা ভাবছে?

কোনটি বেশি মৌলিক সূচনাবিন্দু বা বিশ্লেষণী ভিত্তি

প্রশ্নটি যদি হয় একজন ভোক্তা কোকা কোলা নাকি পেপসি কিনবে, ব্যক্তিগত পছন্দভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি যথেষ্ট কার্যকর হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন যদি হয়: কেন কিছু মানুষ মজুরি শ্রমিক এবং অন্যরা নিয়োগকর্তা? কেন কিছু পরিবার কয়েক মাস বেকারত্ব সহ্য করতে পারে এবং অন্যরা পারে না? কেন একই অর্থনৈতিক অভিঘাত (Economic Shock) বিভিন্ন শ্রেণির ওপর ভিন্নভাবে কাজ করে? কেন শ্রমিক ও নিয়োগকর্তার দরকষাকষির ক্ষমতা সমান নয়? কেন একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিপুল সংখ্যক তরুণ অভিবাসনের কথা ভাবছে? কেন কিছু অর্থনৈতিক পছন্দ প্রজন্মের পর প্রজন্ম পুনরুৎপাদিত হয়? তখন সামাজিক সম্পর্কভিত্তিক বিশ্লেষণ বেশি ব্যাখ্যামূলক ক্ষমতা প্রদান করে। এর কারণ, সামাজিক সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দের আগের কার্যকারণ স্তরে (Causal Layer) অবস্থান করে।

একটি কার্যকর বিশ্লেষণী ধারা হতে পারে:

সম্পত্তি ও উৎপাদন সম্পর্ক
(Property and Production Relations)
→প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতা
(Institutions and Power)
→সম্পদ ও সীমাবদ্ধতা
(Resources and Constraints)
→সুযোগ
(Opportunities)
→ব্যক্তিগত পছন্দ ও প্রত্যাশা
(Preferences and Expectations)
→সিদ্ধান্ত
(Choice)
→পর্যবেক্ষিত অর্থনৈতিক আচরণ
(Observed Economic Behaviour)

এই ধারায় ব্যক্তিগত পছন্দ বাদ যায় না। বরং তাকে একটি বাস্তব সামাজিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করা হয়।

পাল্টা যুক্তি এবং তার উত্তর

মূলধারার অর্থনীতিবিদ আপত্তি করতে পারেন যে সামাজিক কাঠামো সিদ্ধান্ত নেয় না, শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিই সিদ্ধান্ত নেয়। এই যুক্তি সত্য। বাজারে শ্রমিক, ভোক্তা কিংবা প্রতিষ্ঠানের হয়ে বিমূর্ত শ্রেণি সরাসরি সিদ্ধান্ত নেয় না। কিন্তু এখানে কারণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীকে আলাদা করতে হবে।

একজন ব্যক্তি ছাতা খোলার সিদ্ধান্ত নিজেই নেয়, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের পেছনে বৃষ্টির মতো বাহ্যিক পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত ব্যক্তি গ্রহণ করলেও, সিদ্ধান্তটি যে পরিবেশ ও শর্তের মধ্যে গড়ে ওঠে, তা ব্যক্তির বাইরের কারণ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। একইভাবে  শ্রমিক  একটি  কম  মজুরির  চাকরি গ্রহণ করছে বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তি। কিন্তু বেকারত্ব, সম্পদহীনতা, ঋণ, পারিবারিক দায়িত্ব এবং নিয়োগকর্তার ক্ষমতা তার সিদ্ধান্তের পরিবেশ তৈরি করছে। তাই আচরণ ব্যক্তিগত স্তরে ঘটছে বলে ব্যাখ্যাও ব্যক্তিগত স্তর থেকেই শুরু করতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা নেই। বরং ভালো সামাজিক বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা বিভিন্ন কার্যকারণ স্তরকে যুক্ত করে।

একজন ব্যক্তি ছাতা খোলার সিদ্ধান্ত নিজেই নেয়, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের পেছনে বৃষ্টির মতো বাহ্যিক পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত ব্যক্তি গ্রহণ করলেও, সিদ্ধান্তটি যে পরিবেশ ও শর্তের মধ্যে গড়ে ওঠে, তা ব্যক্তির বাইরের কারণ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। একইভাবে  শ্রমিক  একটি  কম  মজুরির  চাকরি গ্রহণ করছে বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তি। কিন্তু বেকারত্ব, সম্পদহীনতা, ঋণ, পারিবারিক দায়িত্ব এবং নিয়োগকর্তার ক্ষমতা তার সিদ্ধান্তের পরিবেশ তৈরি করছে।

নব্যধ্রুপদী অর্থনীতির আদর্শিক তাৎপর্য ও সামাজিক সম্পর্কের প্রশ্ন

নব্যধ্রুপদী অর্থনীতি উৎপাদনের সামাজিক সম্পর্ককে বিশ্লেষণের কেন্দ্রীয় ভিত্তি হিসেবে না নেওয়ার পেছনে শুধু পদ্ধতিগত নয়, আদর্শিক তাৎপর্যও রয়েছে। এই ধারায় ব্যক্তিগত মালিকানা, সম্পদের প্রাথমিক বণ্টন এবং শ্রমিক পুঁজিপতি সম্পর্ককে সাধারণত প্রদত্ত কাঠামোর অংশ হিসেবে ধরে সেই কাঠামোর মধ্যে ব্যক্তিগত পছন্দ, বাজার বিনিময় ও সম্পদের দক্ষ বণ্টনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে পুঁজিবাদী মালিকানা, শ্রেণি ও ক্ষমতার সম্পর্ক কীভাবে সৃষ্টি ও পুনরুৎপাদিত হয়, তা বিশ্লেষণের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হয়ে ওঠে না (Rowthorn, 1973; Hunt, 1980; Bowles & Gintis, 1993)। এই কারণে মার্কসীয় ও অন্যান্য সমালোচনামূলক ধারার অনেক গবেষক মনে করেন, নব্যধ্রুপদী অর্থনীতি সচেতনভাবে পুঁজিবাদকে রক্ষা করার জন্য তৈরি হয়েছিল। এমন দাবি না করেও বলা যায় যে এর কিছু তাত্ত্বিক কাঠামো বিদ্যমান পুঁজিবাদী সম্পর্ককে স্বাভাবিক বা প্রদত্ত হিসেবে উপস্থাপন করার আদর্শিক ভূমিকা পালন করতে পারে (Gürkan, 2016)।

উপসংহার

বাস্তব অর্থনৈতিক আচরণ ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণী উপকরণ, কিন্তু অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রশ্নের ক্ষেত্রে এটি যথেষ্ট মৌলিক বিশ্লেষণী ভিত্তি নয়। ব্যক্তিগত পছন্দ মূলত দেখায়, প্রদত্ত সীমাবদ্ধতা ও সুযোগের মধ্যে ব্যক্তি কী সিদ্ধান্ত নেয়। মার্কসীয় রাজনৈতিক অর্থনীতি আরও গভীর প্রশ্ন করে: এই সীমাবদ্ধতা, সুযোগ এবং দরকষাকষির অবস্থান প্রথমে কীভাবে তৈরি হলো?

গ্রানোভেটার দেখান, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সামাজিক নেটওয়ার্ক ও সম্পর্কের মধ্যে প্রোথিত। সেন দেখান, মানুষকে শুধু সংকীর্ণ আত্মস্বার্থভিত্তিক সর্বোচ্চকারী হিসেবে দেখা আচরণগত বাস্তবতাকে সংকুচিত করে। বোলস দেখান, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান এমনকি মানুষের পছন্দ গঠনের প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করতে পারে। পোলানিয়ি দেখান, বাজার অর্থনীতি নিজেও বৃহত্তর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো স্বাভাবিক ব্যবস্থা নয়।

মার্কসের বিশ্লেষণ দেখায়, মজুরি শ্রম নিজেই একটি ঐতিহাসিকভাবে নির্দিষ্ট সামাজিক সম্পর্ক, যেখানে শ্রমিক ও উৎপাদনের উপকরণের মালিক ভিন্ন বস্তুগত অবস্থান থেকে বাজারে প্রবেশ করে। গ্রানোভেটার দেখান, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সামাজিক নেটওয়ার্ক ও সম্পর্কের মধ্যে প্রোথিত। সেন দেখান, মানুষকে শুধু সংকীর্ণ আত্মস্বার্থভিত্তিক সর্বোচ্চকারী হিসেবে দেখা আচরণগত বাস্তবতাকে সংকুচিত করে। বোলস দেখান, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান এমনকি মানুষের পছন্দ গঠনের প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করতে পারে। পোলানিয়ি দেখান, বাজার অর্থনীতি নিজেও বৃহত্তর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো স্বাভাবিক ব্যবস্থা নয়।

তাই বাস্তব অর্থনৈতিক আচরণের সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা হবে এমন একটি কাঠামো যেখানে উৎপাদনের সামাজিক সম্পর্ক হবে সূচনাবিন্দু এবং ব্যক্তিগত পছন্দ হবে পরবর্তী বিশ্লেষণী স্তর।

সংক্ষেপে বলা যায়: সামাজিক সম্পর্ক সম্ভাব্য পছন্দের ক্ষেত্র নির্ধারণ করে; ব্যক্তিগত কার্যক্ষমতা সেই ক্ষেত্রের মধ্যে ব্যক্তি কোন পথে চলবে তা নির্ধারণ করে। এই কারণেই বৈষম্য, শ্রম সম্পর্ক, বেকারত্ব, অভিবাসন, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, ঋণ, শ্রেণিভিত্তিক আচরণ এবং দরকষাকষির ক্ষমতার মতো বাস্তব অর্থনৈতিক ঘটনাকে বোঝার ক্ষেত্রে মার্কসীয় রাজনৈতিক অর্থনীতির বিশ্লেষণী ভিত্তি বা সূচনাবিন্দু তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যাখ্যামূলক ক্ষমতা প্রদান করে।

মোঃ মনির: সহকারী অধ্যপক, অর্থনীতি বিভাগ। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)। 

ইমেইল: monir@bup.edu.bd

তথ্যসূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি

Bowles, S. (1998). Endogenous preferences: The cultural consequences of markets and other economic institutions. Journal of Economic Literature, 36(1), 75–111.

Bowles, S., & Gintis, H. (1993). The revenge of Homo economicus: Contested exchange and the revival of political economy. Journal of Economic Perspectives, 7(1), 83–102.

Granovetter, M. (1985). Economic action and social structure: The problem of embeddedness. American Journal of Sociology, 91(3), 481–510.

Marx, K. (1976). Capital: A Critique of Political Economy, Volume I (B. Fowkes, Trans.). Penguin Books. Original work published 1867.

Polanyi, K. (1944). The Great Transformation: The Political and Economic Origins of Our Time. Farrar & Rinehart.

Rowthorn, B. (1973). Neoclassical economics and its critics: A Marxist view. Pakistan Economic and Social Review, 11(3), 316–348.

Sen, A. K. (1977). Rational fools: A critique of the behavioral foundations of economic theory. Philosophy & Public Affairs, 6(4), 317–344.

Stigler, G. J., & Becker, G. S. (1977). De gustibus non est disputandum. American Economic Review, 67(2), 76–90.

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •