উন্নয়নের নামে প্রাণবিনাশী সন্ত্রাস

 
সরেজমিন
মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র

উন্নয়নের নামে প্রাণবিনাশী সন্ত্রাস

মওদুদ রহমান

গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ, সমাজগবেষক, নৃবিজ্ঞানী, ভূগোলবিদ, সর্বজন অধিকার কর্মীদের একটি দল মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা পরবর্তী পরিবেশ পরিস্থিতি ও জনজীবনের অবস্থা সরেজমিনে অনুসন্ধানের জন্য এলাকা সফর করেন এবং এলাকার বিভিন্ন পেশার মানুষজনের সাথে কথা বলেন। এই লেখা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হিসাবে লেখা হয়েছে।  

‘এইখানে বাচ্চা হওনের আগে বাচ্চার বাপের দুই লাখ টাকা হাতে রাখোন লাগে’- কথাটা শুনছিলাম মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সীমানা প্রাচীরের একটু দূরে চায়ের দোকানের এক আড্ডায়। এই আড্ডার শুরুতে আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষজনদের মাঝে ছিলো একটু সন্দেহের ঝোঁক, ছিলো আড়চোখে তাকানো সতর্ক দৃষ্টি। উনারা হয়তো বুঝে নিতে চাচ্ছিলেন আমরা কী কোম্পানীর লোক, নাকি অন্য কোন ধান্দায় তাঁদের সাথে কথা বলতে চাইছি। তাঁদের এই সন্দেহের ঝোঁক আর সতর্ক দৃষ্টি আসলে ঘরপোড়া গরুর অতি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। কারণ পঞ্চাশোর্ধ আসলাম মিয়ার বর্ণনায়, সরকারকে বিশ্বাস করে তারা আম, ছালা আর ঢিল তিনটাই হারিয়েছেন। তাই এলাকায় নতুন কাউকে দেখলেই তাঁদের সন্দেহের পারদ চড়ে যায়, তাঁরা ধরেই নেন – এ বুঝি নতুন কোন প্রজেক্টের ধান্দায় নতুন টাউটের আগমন। এর সবকিছুই ধীরে ধীরে তাঁরা খোলাসা করলেন যখন তাঁরা বুঝতে পারলেন যে আমি এবং আমার বন্ধুরা কোন অসৎ উদ্দেশ্যে নয়, বরং তাঁদের সাথে কথা বলতে চাইছি প্রকৃত অবস্থা জানতে, বুঝতে, শিখতে। 

এ বছরের সেপ্টেম্বরে আমরা কয়েকজন মিলে গিয়েছিলাম কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকায়। আমাদেরকে বহনকারী গাড়িটি প্রথমেই থামলো বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিশাল ফটকের সামনে। কিন্তু সেখানে ঢোকা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। শুরুতে আধখোলা দেখা ফটকটা চোখের সামনে ধীরে ধীরে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে মনে হলো যে, সন্দেহের সম্পর্ক এ এলাকায় একতরফা নয়, বুঝলাম যে গোপনীয়তা হয়তো এসব প্রকল্পের ক্ষেত্রে অবশ্য পালনীয় ধর্ম। সেখান থেকে আমরা চলে যাই, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সামনের রাস্তা ধরে শেষ সীমানায় যেখানে পাকা রাস্তার পর শুরু হয়েছে মাটির এবড়ো-থেবড়ো সড়ক। 

মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ঢোকার প্রবেশ পথ। ছবি: মাহতাব উদ্দীন আহমেদ।

কথায় কথায় জানলাম এক পাশে সাগর আর অন্যপাশে কোহেলিয়া নদীর মাঝখানে এই বিশাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের সংযোগ সড়ক করা হয়েছে নদীর একাংশ ভরাট করে। ঝকঝকে রোদ মাখা দিনে, চকচকে নীল আকাশ আর পাশের স্বচ্ছ কোহেলিয়া নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আমরা সবাই যখন একে একে সকলেই কথা শুনছিলাম তখন মনে হচ্ছিল এই দুঃখ, কষ্ট, বঞ্চনা আর অবহেলার কথা বলতে পারার মঞ্চ আর শোনাতে পারার আয়োজন কোথায়? আর কত সময় গেলে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি আর ছলচাতুরীর পাতা ফাঁদের আড়ালে জল, জমি, জঙ্গলের উপর শিকারী আগ্রাসন শেষ হবে? আর কত কাল শিক্ষা নেয়ার পর রামপাল, বাঁশখালী, ফুলবাড়ী আর মাতারবাড়ীর খুনী প্রকল্পগুলোর আয়োজন চিরতরে শেষ হবে? মাতারবাড়ীতে যেয়ে ভুক্তভোগীদের বয়ানে যা কিছু শুনলাম, সময়ের স্বল্পতায় এরচেয়েও বেশি কিছু না শুনতে পারার আক্ষেপ নিয়েই সেখান থেকে ফিরতে হয়েছে। এ লেখায় ছদ্মনামের আড়ালে স্থানীয়দের বয়ানে যতটুকু তুলে ধরা হলো তা মূলত মাতারবাড়ীকে ঘিরে চলমান প্রকল্পগুলোর সবটুকু গল্পের সামান্য অংশ মাত্র। আশা করি আগ্রহীজনদের উৎসাহ আর উদ্যোগে তুলে আনা টুকরো টুকরো গল্পগুলো ধীরে ধীরে জোড়া লাগবে। সরকারী প্রেসনোট আর দামী সব প্রচারণার বিপরীতে সাধারণ মানুষের জীবন থেকে জড়ো করা এই উপলব্ধিগুলো হতে পারে এমন সব ধবংসাত্নক প্রকল্পগুলোর বিরুদ্ধে সর্বজনের জোট বাঁধতে পারার প্রাথমিক উপলক্ষ্য।

এই দুঃখ, কষ্ট, বঞ্চনা আর অবহেলার কথা বলতে পারার মঞ্চ আর শোনাতে পারার আয়োজন কোথায়? আর কত সময় গেলে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি আর ছলচাতুরীর পাতা ফাঁদের আড়ালে জল, জমি, জঙ্গলের উপর শিকারী আগ্রাসন শেষ হবে? আর কত কাল শিক্ষা নেয়ার পর রামপাল, বাঁশখালী, ফুলবাড়ী আর মাতারবাড়ীর খুনী প্রকল্পগুলোর আয়োজন চিরতরে শেষ হবে?

পানিতে ভাসে মরা মাছ 

‘আগে একেকবার জাল মাইরলে এক মন, আধ মন মাছ উইঠতো, এখন সারাদিন বসি পাই না আধা কেজি মাছ’- কথাটা বলছিলেন মধ্যবয়স্ক সোহরাব শেখ যিনি আগে লবণের চাষ করতেন, আবার সময়ে সময়ে মাছও ধরতেন। পুরনো জীবিকা হারিয়ে তিনি এখন ঘর ঠিক করা মিস্ত্রীর কাজ করে সংসার চালিয়ে নেয়ার লড়াই করছেন। জানতে চাইলাম যে, এই পরিবর্তন ঠিক কত দিন ধরে তাঁরা টের পাচ্ছেন? উত্তর দেয়ার সময় জড়ো হওয়া প্রায় সকলেই হাত তুলে পেছনের বিশাল উঁচু কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের চিমনিটার দিকে ইঙ্গিত করলেন, জানালেন যখন থেকে এই কেন্দ্র চালু হয়েছে তখন থেকেই সাগরে মাছ নাই হয়ে গেছে। কিন্তু কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে কী এমন হচ্ছে যা কিনা পাশের সাগরের মাছগুলোকে আরও দূরে পাঠিয়ে দিচ্ছে কিংবা মাছের পরিমাণ কমিয়ে ফেলেছে?- জানতে চাইলে উনারা জানালেন যে, কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বের হয়ে গেছে মোটা মোটা পাইপ। সেই পাইপ সরাসরি নামিয়ে দেয়া হয়েছে পাশ্ববর্তী সাগরের বুকে। সেই পাইপ দিয়ে নিয়মিতভাবে বের করা হয় রাসায়নিক মিশ্রিত গরম পানি। আর সেই পানির সংস্পর্শে আসলে মাছ মরে যায়। উনারা জানালেন বড় মাছগুলো নাকি এখন আর জালে ধরা পড়ে না, মাঝে মধ্যে কোরাল আর হরুল মাছ তাঁরা মরা অবস্থায় ভাসতে দেখেন। স্থানীয়রা সেই মাছগুলো ধরে বিক্রি করেন কখনও কক্সবাজার আবার কখনও চট্রগ্রামের ব্যাপারীদের কাছে। পালটা বললাম যে, প্রকল্প বাস্তবায়নকারীরা তো বলেন যে দূষিত পানি কিংবা ধোঁয়া প্রকৃতিতে ছাড়ার আগে শোধন করে নেয়া হয়, নদী কিংবা সাগরে কোন দূষিত বর্জ্য নাকি ফেলা হয় না। কথাটা শুনে উনারা ক্ষোভ ঝাড়লেন, বোঝা গেলো প্রকল্প করার আগে এমন সব প্রতিশ্রুতি এলাকায় বেশ ভালোই প্রচার করা হয়েছে। তাঁরা বললেন, এগুলো নাকি সবই ভুয়া দাবি। পালটা জিজ্ঞাসা করলেন, দূষণ যদি নাই ছড়ায় তাহলে সাগরে মাছ মরে ভেসে উঠছে কীভাবে? জানতে চাইলেন, যে গাছগুলোতে আগে দেড়শ থেকে দুইশ ডাব হতো সেই গাছগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে কীভাবে? 

কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বের হয়ে গেছে মোটা মোটা পাইপ। সেই পাইপ সরাসরি নামিয়ে দেয়া হয়েছে পাশ্ববর্তী সাগরের বুকে। সেই পাইপ দিয়ে নিয়মিতভাবে বের করা হয় রাসায়নিক মিশ্রিত গরম পানি। আর সেই পানির সংস্পর্শে আসলে মাছ মরে যায়।

উনারা জানালেন, কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হবার পর থেকে গত দুই বছরে উনারা এই পরিবর্তনগুলো টের পাচ্ছেন। জানতে চাইলাম যে, আর কী কী অসুবিধার মধ্যে তাঁরা আছেন? কথাটা শুনেই জালাল মিয়া ব্যঙ্গ করে হেসে বললেন, সিঙ্গাপুরে এখন সব কিছুতেই অসুবিধা। আগের মাতারবাড়ীই নাকি অনেক ভালো ছিলো। বুঝলাম, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র, কয়লা বোঝাই জাহাজ ভেড়াবার জেটি আর নদীর বুক চিড়ে পাকা সড়ক করবার আগে তাদেরকে দেখানো হয়েছিলো মাতারবাড়ীকে সিঙ্গাপুরের মত জৌলুসপূর্ণ নগরে পরিণত করার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের মরিচীকায় ভুলে মাতারবাড়ীবাসী এখন এমন এক জীবনে প্রবেশ করেছেন যেখানে এখন তাঁদের ঘরে ঘরে অভাব, ঘরে ঘরে অসুখ। জালাল মিয়া জানালেন, এখানকার প্রতিটা শিশু এখন জন্মগত নানান অসুখ নিয়ে জন্মাচ্ছে। শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া আর নানান নিশ্চিত অসুখের চিকিৎসা করাতে নাকি জন্মের আগেই বাবা-মা’র হাতে দুই লক্ষ টাকা জোগাড় করে রাখতে হয়। এই টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অধিকাংশ সময়ই তাঁরা ঋণ করেন আর নয়তো ধারদেনার জালে জড়ান। 

এই বিদ্যুৎকেন্দ্র, কয়লা বোঝাই জাহাজ ভেড়াবার জেটি আর নদীর বুক চিড়ে পাকা সড়ক করবার আগে তাদেরকে দেখানো হয়েছিলো মাতারবাড়ীকে সিঙ্গাপুরের মত জৌলুসপূর্ণ নগরে পরিণত করার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের মরিচীকায় ভুলে মাতারবাড়ীবাসী এখন এমন এক জীবনে প্রবেশ করেছেন যেখানে এখন তাঁদের ঘরে ঘরে অভাব, ঘরে ঘরে অসুখ।

আসলাম মিয়া জানালেন, এখন নাকি ধান আসা মাত্রই ফুটে যায়। কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র হবার পরে এলাকায় আশেপাশে নাকি তাপমাত্রা বেড়ে গেছে, সেই তাপে নাকি ধান গাছে থাকতেই মরে যায়। ভোরে পাতার উপর হাত দিলে নাকি ছাইয়ের পাতলা আস্তরণ আঙ্গুলে উঠে আসে, এমনকি যারা নিয়মিতভাবে বাইরে কাজ করেন, তারা নাকি নিজেদের শরীরেও কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উড়ে আসা ছাই সহ রাসায়নিক পদার্থ প্রতিনিয়ত উপলব্ধি করেন। 

কোহেলিয়া নদীর পাড় থেকে দেখা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চিমনী। ছবি: মাহতাব উদ্দীন আহমেদ।

আমাদের চারপাশে জড়ো হতে থাকা মানুষজন হাত তুলে পাশে বয়ে যাওয়া কোহেলিয়া নদী দেখিয়ে বলা শুরু করলেন, কীভাবে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকালীন সময় প্রতিনিয়ত সিমেন্ট, কাদা, বালি ও নানান ধরণের বর্জ্য ফেলে নদীর বুক ভরাট করে ফেলা হয়েছে। জানালেন কয়েক বছর আগেও যে নদীতে শত শত লবণ বোঝাই বাণিজ্যিক নৌকার নিয়মিত আনাগোনা ছিলো সেখানে এখন আর আগের মত অবাধে নৌকাগুলো চলতে পারছে না নৌ-চ্যানেল ভরাট হয়ে যাওয়া আর নানান জায়গায় চর পড়ে যাবার কারণে। এর ফলে নাকি আগের মত মাছও আর পাওয়া যাচ্ছে না নদীতে। ফলে জেলে আর মাঝিরা তাঁদের পেশা পরিবর্তন করে ফেলতে বাধ্য হয়েছে, অনেকেই কাজের খোঁজে চলে গেছে কক্সবাজার, চট্রগ্রাম আর ঢাকায়। সেখানে যেয়ে তারা কী করছেন জিজ্ঞাসা করলে জানা গেলো কেউ রিকশা চালাচ্ছেন, কেউ কাজ খুঁজে নিয়েছেন গার্মেন্টসে আর কেউ কেউ বেছে নিয়েছেন ঘুরে ঘুরে বাদাম, বেলুন আর প্লাস্টিকের জিনিসপত্র বিক্রি করা হকারের জীবন। সপ্তাহে সপ্তাহে তারা সংসারে টুকিটাকি টাকা পাঠানোর চেষ্টা করেন বিকাশের মাধ্যমে, কিন্তু এলাকায় সহজে আসতে পারেন না মূলত যাতায়াত খরচ জোগাতে না পারার কারণে। 

কয়েক বছর আগেও যে নদীতে শত শত লবণ বোঝাই বাণিজ্যিক নৌকার নিয়মিত আনাগোনা ছিলো সেখানে এখন আর আগের মত অবাধে নৌকাগুলো চলতে পারছে না নৌ-চ্যানেল ভরাট হয়ে যাওয়া আর নানান জায়গায় চর পড়ে যাবার কারণে।

বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হবার আগে অসংখ্য নৌকা চলা কোহেলিয়া নদীর দিকে তাকিয়ে জীবিকা হারানোর হাহাকার জানাচ্ছেন একজন স্থানীয় বাসিন্দা। ছবি: মওদুদ রহমান।

কথাগুলো শুনছিলাম আর ভাবছিলাম ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলাশহরে সরকারের হকার বিরোধী উচ্ছেদ অভিযানের কথা। সরকার একদিকে চাষের জমি দখল করে বাহারি প্রকল্পের পসরা সাজাবে, নদীর বুক চিরে রাস্তা করবে, নৌ-রুটগুলোর গলা চেপে ধরবে, মাছেদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ধবংস করবে, এক সময়ে জল-জমি-পানি-জীবিকার উপর একান্ত অধিকার থাকা মানুষগুলোকে একদিকে ছিন্নমূলে পরিণত করবে আর অন্যদিকে বেঁচে থাকার তাগিদে যখন এই মানুষগুলোই জীবিকা খুঁজতে রিকশার হ্যান্ডেল ধরবে, ফুটপাতে দোকান বসানোর চেষ্টা করবে, ঘুরে ঘুরে কখনও বাদাম, কখনও আইস্ক্রিম, কখনও বেলুন বিক্রির চেষ্টা করবে- তখন তাঁদের পেটের ক্ষুধা নিবারণের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি আর ঘামেভেজা আয়োজন রাষ্ট্রের আদেশে হয়ে যাবে অবৈধ- এমন বিষাক্ত চক্র কী করে একটা সভ্য সমাজে চালু থাকতে পারে! কিংবা যে সমাজে এই চক্র চলমান থাকে সেই সমাজকে কি সভ্য বলা যেতে পারে! 

সিঙ্গাপুরে কেউ স্কুলে যায় না 

আমরা যখন কথা বলছিলাম তখন এক পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতে খেতে জিরিয়ে নিচ্ছিলেন ষাটোর্ধ আবেদ আলী। মাতারবাড়ীকে সিঙ্গাপুর আর মালয়েশিয়া বানিয়ে দেয়ার স্বপ্ন দেখানো প্রতিশ্রুতিগুলো নিয়ে আলাপের মাঝে উনি হাঁক ছেড়ে আমাকে ডেকে কাছে নিলেন, বললেন, ‘আমার ঝুড়ির দিকে চাইয়া দেহেন, সিঙ্গাপুরের মাছ।’ দেখলাম কিছু কুচো চিংড়ি আর অন্যান্য কিছু গুড়া মাছ ঝুড়ির একদম তলানিতে পড়ে আছে। বললেন, ‘সারাদিন ধইরা এই কয়টা মাছই পাইসি। সিঙ্গাপুরে এরচেয়ে বেশী মাছ একদিনে আর ধরন যায় না। আগে দিনে দেড়-দুই হাজার টেকার মাছ মারতাম, এখন এই কয়টা মাছ বেঁচলে ৫০০ টেকা পামু কিনা সন্দেহ।’ বোঝা গেলো সিঙ্গাপুরের উপর ক্ষোভটা কোথা থেকে আসছে।  জিজ্ঞাসা করলাম, চাচা আপনার ছেলে-মেয়ে কয়জন? কেউ স্কুলে যায় কিনা? উনি আবারও তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন, ‘সিঙ্গাপুরে কেউ অহন আর স্কুলে যায় না।’ বলেই আমার দিকে তাকিয়ে বুঝলেন যে, আমি উনার কথাটা বুঝতে পারিনি। তখন বললেন, ‘বাবারে স্কুলে গেলে খাইবো কী! আমার তিন পোলা। একজন কাম খুঁজতে গেছে চট্রগ্রাম। একজনরে লাগাইসি বাসের হেলপারের কামে, আর ছোটগা আমার লগেই থাকে। এইডা-ঐডা আউগায় দেয়।’ বুঝতে পারলাম, সাধারণ মানুষের সাথে নীতি-নির্ধারকদের মিথ্যাচার আর তামাশা মাতারবাড়ীতে এক বীভৎস রূপ ধারণ করেছে। যে সিঙ্গাপুর পৃথিবীতে শিশুশিক্ষার যত্ন আর প্রসারে প্রসিদ্ধ সেই সিঙ্গাপুরের আদলে মাতারবাড়ীকে বদলে দেবার নাম করে জমি দখল করা হয়েছে, ব্রিজ, কালভার্ট, পোর্ট নির্মাণের উন্নতি হয়েছে কিন্তু বাবা-মা’রা এখন তাঁদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে পারছেন না টাকার অভাবে। কথাগুলো যখন শুনছিলাম তখন মনের ভেতর হাতড়ে খুঁজে ফিরছিলাম এমন অন্তত একটা উদাহরণ যেখানে- নীতি-নির্ধারকেরা তাঁদের প্রতিশ্রুতি রাখতে পেরেছিলেন, জোর-জবরদস্তি এবং নানান প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে নানান প্রক্রিয়ায় উচ্ছেদ সমাপ্ত করার পর প্রকল্প শেষে স্থানীয় মানুষরা উপকৃত হয়েছেন, যা কিছু হারিয়েছেন, বিনিময়ে পেয়েছেন তারচেয়েও বেশি কিছু- কিন্তু এমন একটা উদাহরণও পেলাম না। 

উনি আবারও তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন, ‘সিঙ্গাপুরে কেউ অহন আর স্কুলে যায় না।’ বলেই আমার দিকে তাকিয়ে বুঝলেন যে, আমি উনার কথাটা বুঝতে পারিনি। তখন বললেন, ‘বাবারে স্কুলে গেলে খাইবো কী! আমার তিন পোলা। একজন কাম খুঁজতে গেছে চট্রগ্রাম। একজনরে লাগাইসি বাসের হেলপারের কামে, আর ছোটগা আমার লগেই থাকে। এইডা-ঐডা আউগায় দেয়।’

জানতে চাইলাম, কাজ খুঁজতে সবাই বাইরে যায় কেন? এত বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র, কয়লা খালাসে জেটি- কত কত কাজ। আপনাদের তো এসব কাজেও যুক্ত হবার সুযোগ আছে। এ কথা শুনেই সবাই যেন তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। বললেন এসব কাজ পায় আপনাদের মত ঢাকার মানুষেরা। আমরা তো আর কলম ঠেলতে জানি না। এইখানে যদি আমরা কাম খুঁজি, আমাদের কাছে টাকা খুঁজে। জানতে চাই-কত টাকা? জবাব আসে, এক লক্ষ টাকা। কী কাজ পাওয়া যায়, এক লক্ষ টাকায়? জবাব আসে, এই ধরেন যে, মাটি কাটার কাজ, সিকিউরিটি গার্ডের কাজ। কী কারণে আপনাদেরকে কাজে নেয় না?- জানতে চাইলে জবাব আসে যে, স্থানীয় এলাকাবাসীদেরকে প্রকল্প কাজে নেয়ার ক্ষেত্রে উটকো ঝামেলা মনে করা হয়। তাই প্রয়োজনীয় লোকবল নেয়ার ক্ষেত্রে বাইরে থেকে আগতদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়। অর্থাৎ প্রকল্প শুরুর আগে হাজার হাজার কাজের সুযোগ তৈরী হবার কথা, কিংবা স্থানীয় বেকারত্ব সমস্যা দূর করার যে সব কথা প্রচার করা হয়েছে সেগুলো আসলে প্রতারণা ভিন্ন অন্য কিছুই নয়।      

ঘর পছন্দ না হইলে চাবি ফেরত

কথায় কথায় এক পর্যায়ে চলে আসে ক্ষতিপূরণের প্রসংগ। জানলাম একর প্রতি ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়েছিলো ২৭ লক্ষ টাকা। কিন্তু এই টাকা উঠাতে নানান ধাপে বিভিন্নজনকে ঘুষের টাকা দেয়া, দালালীর খরচ মেটানো, কক্সবাজারে গিয়ে দিনের পর দিন থেকে নানানজনকে ধরাধরি আর তদবিরে টাকা খরচ করতে করতে উনাদের ৫০ থেকে ৬০ ভাগ টাকাই নাকি খরচ করে ফেলতে হয়েছে। সব জায়গার খরচ মিটিয়ে নিজেরা হাতে পেয়েছেন ৮ থেকে ১০ লক্ষ টাকা মাত্র। সেই টাকা কী করেছেন জানতে চাইলে বলেন, কারো হাতেই সেই টাকা আর নেই। প্রকল্পের কারণে তাঁদের লবণ চাষ বন্ধ হয়ে গেছে, নদী আর সাগরে মাছের জোগান কমে গেছে, মাঠের ফলন কমে গেছে, ফলে সেই ক্ষতি তাঁদের পূরণ করতে হয়েছে হাতে আসা কাঁচা টাকা ভাঙ্গানোর মাধ্যমে। আসলাম মিয়া বলছিলেন, আগে প্রতি একর জমিতে তাঁদের আবাদ হতো ৩ লক্ষ টাকা। দুই লক্ষ টাকা খরচের পর, হাতে থাকতো এক লক্ষ টাকা। আর এখন তাঁদের আয় হয় সাকুল্যে ১ লক্ষ টাকা, সংসার চালাতে বাকি টাকার জোগান এসেছে জমির ক্ষতি পূরণের টাকা থেকে। এই করেই গত কয়েক বছরে প্রায় সকলেই ক্ষতিপূরণের সব টাকা ভেঙ্গে ফেলেছে। একদিকে জমি, অন্যদিকে ক্ষতিপূরণের টাকা, আর সর্বোপরি জীবিকার সংস্থান হারিয়ে আসলাম মিয়া যখন বলছিলেন যে, সরকারকে বিশ্বাস করে তারা আম, ছালা আর ঢিল সবই হারিয়েছেন তখন বুঝতে পারছিলাম যে, প্রকল্পের কারণে তাঁদের হয়ে যাওয়া ক্ষতির প্রকটতার মাত্রা কতটা গভীর।    

জানলাম একর প্রতি ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়েছিলো ২৭ লক্ষ টাকা। কিন্তু এই টাকা উঠাতে নানান ধাপে বিভিন্নজনকে ঘুষের টাকা দেয়া, দালালীর খরচ মেটানো, কক্সবাজারে গিয়ে দিনের পর দিন থেকে নানানজনকে ধরাধরি আর তদবিরে টাকা খরচ করতে করতে উনাদের ৫০ থেকে ৬০ ভাগ টাকাই নাকি খরচ করে ফেলতে হয়েছে।

১,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয় এখন থেকে প্রায় ১৩ বছর আগে।  ২০২৪ এর শেষ নাগাদ এই কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। স্থানীয়রা জানালেন যে, যদিও এই প্রকল্পের জন্য দরকার ছিলো ১৪০০ একরের জমি, কিন্তু কোন এক অজানা কারণে দখল করা হয় ৪২০০ একরেরও বেশী পরিমাণ জমি। এখন তারা শুনছেন যে, মাতারবাড়ীতে নাকি এলএনজি আমদানির টার্মিনালও করা হবে। আসলাম মিয়া আক্ষেপের সুরে বলছিলেন যে, এই জায়গাটা আছিলো ভূত-পেত্নীর আড্ডা। শরীরের রক্ত পানি করে তাঁর বাপ-দাদারা সাগরের পাড়ের এই জমিকে বাসযোগ্য করেছেন, চাষের উপযোগী করেছেন। অথচ সরকার এই জমি অধিগ্রহণের সময় তাঁদের কোন কথাই শোনেনি। ফলে তাঁদের লাগাতার প্রতিবাদ, মানব বন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান কোন কিছুই কাজে আসেনি। জানা গেলো, মহেশখালী, মাতারবাড়ীতে নাকি আরও ৩৪ হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে বলে স্থানীয়রা জানতে পেরেছেন। নিত্য-নতুন প্রকল্প পরিকল্পনার আয়োজনে স্থানীয়রা শংকা প্রকাশ করছেন যে, উনাদের অবস্থা সামনে আরও খারাপ হবে। 

মহেশখালী, মাতারবাড়ীতে নাকি আরও ৩৪ হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে বলে স্থানীয়রা জানতে পেরেছেন। নিত্য-নতুন প্রকল্প পরিকল্পনার আয়োজনে স্থানীয়রা শংকা প্রকাশ করছেন যে, উনাদের অবস্থা সামনে আরও খারাপ হবে।

বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকা ছিলো মূলত লবণ আর চিংড়ি চাষের জমি। সেখানে বসতি ছিলো ৪৬ পরিবারের। কথা ছিলো যে বসতভিটা থেকে উঠে যাবার ৬ মাসের মধ্যে তাঁদেরকে নতুন ঘর বানিয়ে দেয়া হবে। বলা হয়েছিলো- আপনাদের ঘর পছন্দ হইলে নেবেন, নইলে চাবি ফেরত দিবেন। কিন্তু শুনতে সুন্দর এই প্রতিশ্রুতিগুলোর কোনটাই বাস্তবে ঘটেনি। এই পরিবারগুলো ২০১৪ সালে উচ্ছেদ হয়ে দীর্ঘ চার বছর নিজেদের খরচে ভাড়া বাসায় থাকতে বাধ্য হয়েছেন। ২০১৯ সালে তাদেরকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হয়, কিন্তু তৈরী করা ঘর তাঁদের পছন্দ হয়নি। খোলামেলা উঠান সহ বাড়িতে থাকতে অভ্যস্ত পরিবারগুলোকে দেয়া হয়েছে ছোট ছোট দুইটা ঘর আর একটা রান্নাঘরের আবাসন- যা তাঁদের পছন্দ না হলেও তাঁরা বাধ্য হয়ে থাকা শুরু করেছেন। কেননা তাঁদের অভিযোগ শোনার মত কেউ আর প্রকল্প এলাকায় নেই। আগে তাঁদের বাড়ির আঙ্গিনায় তাঁরা সবজি চাষ করতেন, হাঁস-মুরগী পালতেন। কিন্তু নতুন জায়গায় স্থানান্তরিত হয়ে তাঁদের এইসব করার সুযোগ আর নাই। ফলে উনারা এখন সকল প্রয়োজনে পুরোপুরি বাজার নির্ভর হয়ে পড়েছেন যা তাঁদের সংসার চালানোর খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। আবার বসতভিটা হারানো সবাই যে ঘর পেয়েছেন-এমনও নয়। তাঁদের এসব অভিযোগ জানাতে হয় কক্সবাজার আর নয়তো ঢাকার বিভিন্ন অফিসে যোগাযোগ করতে হয়। অনেক সময় কয়েক ঘন্টা অপেক্ষা করেও অভিযোগ শোনানোর মত কাউকে না পেয়ে তাঁদেরকে ফেরত চলে আসতে হয়। 

জানতে চাইলাম, সরকার পরিবর্তনের কারণে এই দুরবস্থা কাটবার মত কোন সম্ভাবনা দেখছেন কিনা। কিন্তু স্থানীয়রা জানালেন যে সরকার পরিবর্তন হলেও নীতির কোন পরিবর্তন তাঁরা দেখছেন না। আগে  যেভাবে সবকিছু চলছিল, এখনও সেই নিয়মেই সবকিছু অগ্রসর হচ্ছে। মাতারবাড়ীতে ঘোর বর্ষার সময়ও নাকি তারা আগে কখনও পানি জমতে দেখেননি। কিন্তু এখন প্রাকৃতিকভাবে তৈরী নানা চ্যানেলে নির্মাণকালীন বর্জ্য ফেলে, পার্শ্ববর্তী রাঙ্গাখালী খাল ভরাট করে যত্রতত্র স্লুইস গেট বসানোর কারণে মাতারবাড়ী এলাকার রাস্তায় এই বছরের বর্ষায় জমেছিলো কোমর সমান পানি। উনারা আমাদের কাছেই প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, জানতে চাইলেন যে, এই এলাকার এক পাশে সাগর আর আরেকপাশে নদী থাকার পরও কী কারণে এমন জলাবদ্ধতা হতে পারে?- যেই প্রশ্নের উত্তর আমরা দিতে পারিনি। 

স্থানীয়রা এখন দাবি তুলছেন কোহেলিয়া নদী যেনো ড্রেজিং করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়, যে আড়াই হাজারের মত জেলের জীবিকা নষ্ট হয়েছে তা যেন আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসা যায়। কথাগুলো শুনতে শুনতে আমাদের নীতি-নির্ধারকদের বিবেচনাবোধ নিয়ে ভাবছিলাম। চিন্তা করছিলাম, কতটা লোভে এমন নির্বোধ হয়ে যাওয়া সম্ভব যেখানে নদী ভরাট করে নৌপথ বন্ধ করে দিয়ে বিশাল রাস্তার প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হয়! লোভের কুয়ার কতটা গভীরে নামলে কয়েকশ স্থানীয় চাকরী তৈরীর বিজ্ঞাপন প্রচার করে কয়েক হাজার মানুষের জীবিকা অর্জনের বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর আড়াল করা যায়! মাতারবাড়ীতে আসলে চলছে ধবংসের তান্ডব। এখানে কোন উন্নয়ন কর্মকান্ড চলছে না, যা চলছে তা হচ্ছে উন্নয়নের নামের আড়ালে জীবন বিনাশী সন্ত্রাস।   

কতটা লোভে এমন নির্বোধ হয়ে যাওয়া সম্ভব যেখানে নদী ভরাট করে নৌপথ বন্ধ করে দিয়ে বিশাল রাস্তার প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হয়! লোভের কুয়ার কতটা গভীরে নামলে কয়েকশ স্থানীয় চাকরী তৈরীর বিজ্ঞাপন প্রচার করে কয়েক হাজার মানুষের জীবিকা অর্জনের বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর আড়াল করা যায়!

মাতারবাড়ীতে ফসলের ফলনে ধ্বস নেমেছে, নদীতে মাছের বিচরণ কমে গেছে, মাটির নীচের পানির জোগান পড়ে যাচ্ছে আর এসবের বিপরীতে ছড়াচ্ছে লোভের বিষ। আমাদের নীতি-নির্ধারকদের রঙ্গিন চশমায় এঁটে থাকে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের স্বপ্ন, তাঁদের দৃষ্টিসীমা আটকে যায় ইকনমিক জোন, আর এলএনজি টার্মিনালের সীমানায়। কিন্তু এসবের বিপরীতে আমাদের জানতে হবে চকচকে মাছের পিঠে ঝলসে ওঠা রোদের আলোর দিপ্তিতে জেলের মুখে যে তৃপ্তির হাসি দেখা যায় সে হাসির দাম ধরা হয় কোন খাতায়! সেদ্ধ ধানের ভাপের আচে জমে ওঠা বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছতে মুছতে কিষানী নিজের সংসারের আয়-উন্নতির যে স্বপ্ন বুনতে থাকে সেই স্বপ্নের জমিন কেড়ে নেয় কোন দখলদার! জিডিপির গালগপ্পো আর ফরেন কারেন্সির হিসাব নিকাশের বিপরীতে কড়ায়-গন্ডায় আমাদের বুঝে নিতে হবে মানুষের বেঁচে থাকার দাম আর পেটের ক্ষুধার হিসাব।  

দেশি-বিদেশি কোম্পানীর চটকদার বিজ্ঞাপন আর ভদ্রলোকবেশি দালালদের যোগসাজশে আমাদের ধানের জমি পুড়বে, নদী ভরাট হবে, বাতাসে বিষ ছড়াবে, আর সাগর পরিণত হবে ভেসে থাকা মাছের গোরস্তানে-এমনটা তো চলতে পারে না।

দেশি-বিদেশি কোম্পানীর চটকদার বিজ্ঞাপন আর ভদ্রলোকবেশি দালালদের যোগসাজশে আমাদের ধানের জমি পুড়বে, নদী ভরাট হবে, বাতাসে বিষ ছড়াবে, আর সাগর পরিণত হবে ভেসে থাকা মাছের গোরস্তানে-এমনটা তো চলতে পারে না। আমাদের আয়-উন্নতির নামে করা এমন সব ধবংসাত্নক প্রকল্পগুলোতে কাদের ব্যাংক-ব্যালেন্স ফুলে ফেঁপে উঠছে, কাদের দেশে-বিদেশে নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়ে উঠছে আর এসবের বিপরীতে কারা নিজেদের জল-জমি-জীবিকার উপর অধিকার হারিয়ে সর্বশান্ত হচ্ছে সেই হিসাবটা করলেই বোঝা যায় যে উন্নয়নের নামে ধবংসের যে বুলডোজার দেশজুড়ে চলছে তাতে কার লাভ হচ্ছে আর কার ক্ষতি হচ্ছে। এই হিসাবগুলো যখন পরিষ্কারভাবে মেলানো যাবে, কেন্দ্র থেকে প্রান্তে চলতে থাকা আমাদের জীবনের সংকটের চাকা ঠিক তখনই থামবে।     

মওদুদ রহমানঃ লেখক, গবেষক, ইমেইলঃ mowdudur@gmail.com

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •