অপরিকল্পিত উন্নয়নে বিপন্ন কক্সবাজার

অপরিকল্পিত উন্নয়নে বিপন্ন কক্সবাজার

গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলন এ বিষয়ে বর্তমান পরিস্থিতি এবং দাবিদাওয়া উপস্থিত করে। প্রত্যক্ষ অনুসন্ধানের ভিত্তিতে সংগঠনের পক্ষ থেকে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন জাকির হোসেন। অধ্যাপক নূর মোহাম্মদ তালুকদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এবং কক্সবাজারের সংগঠক করিমউল্লাহ কলিম। সঞ্চালনা করেন আলমগীর কবির।  জনগুরুত্ব বিবেচনা করে এই অনুসন্ধানপত্র এখানে প্রকাশ করা হলো।

পাহাড়, বন, নদী আর বন্যপ্রাণীর অপার বৈচিত্র্যভরা চট্টগ্রাম বিভাগ। এই বিভাগের অন্যতম জেলা হচ্ছে কক্সবাজার, যা বাংলাদেশের প্রধান গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয়, পর্যটন ও জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ এলাকা। একইসঙ্গে এই জেলার বালিয়াড়ি, উপকূলীয় বন, পাহাড়ি বন, প্যারাবন ও জলাভূমি উপকূলের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এখানে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে শুধু সড়ক বা অবকাঠামো নির্মাণ ও ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনা করলে চলবে না; প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় অধিবাসী ও ইকোটুরিজমকে বিবেচনায় নিতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশ আইন ভঙ্গ করে কক্সবাজারের সুগন্ধা-কলাতলী সৈকতের বালিয়াড়িতে সড়ক নির্মাণ, মহেশখালীর সংরক্ষিত পাহাড়ি বনের মধ্যে দিয়ে কালারমারছড়া সড়ক নির্মাণ এবং সোনাদিয়া দ্বীপের প্যারাবন ধ্বংস ও চিংড়ি ঘের সম্প্রসারণ–এই তিনটি ঘটনা স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন ধারণাকে ও দেশের প্রচলিত পরিবেশ-সংক্রান্ত আইনকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) মনে করে– উন্নয়ন ও পরিবেশ একে অপরের বিপরীত নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য পরিবেশগত নিরাপত্তাকে অবকাঠামোর অংশ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন। এখানে আমরা তিনটি পরিবেশগত বিপর্যয় আপনাদের সামনে উল্লেখ করতে চাই।

সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশ আইন ভঙ্গ করে কক্সবাজারের সুগন্ধা-কলাতলী সৈকতের বালিয়াড়িতে সড়ক নির্মাণ, মহেশখালীর সংরক্ষিত পাহাড়ি বনের মধ্যে দিয়ে কালারমারছড়া সড়ক নির্মাণ এবং সোনাদিয়া দ্বীপের প্যারাবন ধ্বংস ও চিংড়ি ঘের সম্প্রসারণ–এই তিনটি ঘটনা স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন ধারণাকে ও দেশের প্রচলিত পরিবেশ-সংক্রান্ত আইনকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

১. কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়ি ও সড়ক নির্মাণ

সম্প্রতি কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রায় ১.৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ২৮ মিটার প্রশস্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬৩.৫০ কোটি টাকা। প্রকল্পটি জাইকার অর্থায়নে কক্সবাজার পৌরসভার Urban Development and Urban Governance Project-এর আওতায় নেওয়া হয়েছে।

পরিবেশ অধিদফতর জানায়, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী দেশে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন ১৩টি এলাকার (ইসিএ) একটি কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (Ecologically Critical Area) ইসিএ আইনমতে, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করে এমন যে কোনো স্থায়ী বা অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ, শিল্পকারখানা স্থাপন, মাটি, পানি ও বায়ুর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন বা নষ্ট করতে পারে, এমন সব কাজ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী দেশে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন ১৩টি এলাকার (ইসিএ) একটি কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (Ecologically Critical Area) ইসিএ আইনমতে, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করে এমন যে কোনো স্থায়ী বা অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ, শিল্পকারখানা স্থাপন, মাটি, পানি ও বায়ুর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন বা নষ্ট করতে পারে, এমন সব কাজ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

কক্সবাজার সৈকতে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ না করা এবং স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে নির্মিত সব স্থাপনা ভেঙে ফেলার বিষয়ে উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এ ছাড়া ২০১৩ সালে কক্সবাজার নিয়ে একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে সরকার। ওই মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী কক্সবাজার পৌরসভা এলাকার জোয়ার-ভাটার মধ্যবর্তী লাইন থেকে সৈকতসংলগ্ন প্রথম ৩০০ মিটার ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অথচ সেই সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট ও দখল করে সড়ক নির্মাণ পরিকল্পনা পরিবেশবাদীদের মধ্যে গভীর হতাশা ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এই নির্মাণকাজে বালিয়াড়ি ভরাট ও প্রাকৃতিক বালুর স্তর পরিবর্তনের অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িতে জন্মানো লাল কাঁকড়াসহ উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।

বালিয়াড়ি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বালিয়াড়িকে শুধু পর্যটকদের হাঁটার জায়গা বা খালি বালু হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যায় না। উপকূলীয় বালিয়াড়ি সমুদ্রের ঢেউ, জলোচ্ছ্বাস ও ঝড়ের সময় স্থলভাগের ওপর আঘাত কমাতে প্রাকৃতিক প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ এটি একটি প্রাকৃতিক উপকূলীয় অবকাঠামো। সেই সঙ্গে এটি সামুদ্রিক কচ্ছপ, কাঁকড়া, কচ্ছপসহ বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। একটি কংক্রিটের বাঁধ বা সড়ক নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়; কিন্তু একটি প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি ব্যবস্থা বহু বছর ধরে বিনা রক্ষণাবেক্ষণে উপকূলকে সুরক্ষা দিয়ে যেত। ফলে বালিয়াড়ি ধ্বংসের অর্থ শুধু কিছু বালু সরানো নয়; এটি ভবিষ্যতের উপকূলীয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।

প্রেক্ষাপট ও আইনি অবস্থা

এই প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (BELA) আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার পর হাইকোর্ট গত ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নির্মাণকাজে আট সপ্তাহের নিষেধাজ্ঞা দেন। আদালত ইতোমধ্যে নির্মিত অংশ অপসারণ করে সৈকত ও জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যাও চেয়েছেন। পরবর্তী সময়ে ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ আপিল বিভাগ হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখেন। সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িতে স্থাপিত অবৈধ দোকানের লাইসেন্স বাতিল ও উচ্ছেদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর আগে সুগন্ধা সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট ও দখল করে নির্মিত সড়ক বন্ধ, সৈকতের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং উপকূলীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়ে গত ২৩ আগস্ট জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-সহ অন্যান্য পরিবেশবাদী সংগঠন।

পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলার পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক জানাচ্ছেন যে, সুগন্ধা-কলাতলী অংশের এই প্রকল্পের জন্য কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি। সুতরাং বিষয়টি আদালতের বিচারাধীন হওয়ায় চূড়ান্ত আইনগত সিদ্ধান্ত আদালতের মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত।

২. মহেশখালীর সংরক্ষিত পাহাড়ি বন ও কালারমারছড়া সড়ক

কক্সবাজারের পরিবেশগত আলোচনায় মহেশখালীর সংরক্ষিত পাহাড়ি বনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। মহেশখালী বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ। এর ১২ নম্বর পাহাড় মৌজার ১৮,২৮৬.৪০ একর ভূমি ১৯৫৪ সালে বন বিভাগের কাছে ১০০ বছরের জন্য হস্তান্তর করা হয় এবং ১৯৫৭ সালে তা সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। নথি অনুযায়ী, বনভূমিটি আরএস ও বিএস রেকর্ডেও বন বিভাগের নামে খতিয়ানভুক্ত। এই বনভূমি তাই সাধারণ উন্নয়নযোগ্য সরকারি জমি নয়। এর রয়েছে একটি নির্দিষ্ট সংরক্ষণগত ও আইনগত মর্যাদা। এ কারণেই জে এম ঘাট থেকে কালারমারছড়া সংযোগ সড়কের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রকল্প-সংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের (SCRDP) আওতায় প্রায় ৪৮.৮৮০ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে এবং এর ৩.৭০ কিলোমিটার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্প ব্যয় প্রায় ২২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা এবং কাজ শুরু হয় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে একই প্রকল্পের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪.৮৮ কিলোমিটার বা প্রায় ৫ কিলোমিটার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই জনসমক্ষে তথ্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে মোট প্রকল্পের দৈর্ঘ্য এবং সংরক্ষিত বনের ভেতরের অংশ–এই দুটি আলাদা করে উল্লেখ করাই সবচেয়ে নিরাপদ।

উন্নয়নের প্রয়োজন আছে, কিন্তু সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে উন্নয়ন কেন?

মহেশখালীর স্থানীয় জনগণের যোগাযোগের প্রয়োজন অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিপণ্য পরিবহন, জরুরি সেবা, বাজারে যাতায়াত এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা প্রয়োজন। স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের চলাচলের পথকে উন্নত করার দাবিও রয়েছে। কিন্তু একটি পুরোনো পাহাড়ি পথকে উন্নত করার সুবিধা এবং একটি সংরক্ষিত বনকে স্থায়ীভাবে বিভক্ত করার পরিবেশগত ক্ষতি–দুটির তুলনামূলক মূল্যায়ন কি করা হয়েছে? বন বিভাগের নথিতে উল্লেখ রয়েছে, সংরক্ষিত বনের প্রায় ২ কিলোমিটার অংশে আগে পাকা রাস্তা ছিল না; সেখানে সরু পাহাড়ি মেঠোপথ ছিল, যার প্রস্থ প্রায় ২ থেকে ৮ ফুট। ফলে প্রস্তাবিত RCC সড়ককে শুধু একটি সাধারণ ‘রাস্তা সংস্কার’ হিসেবে দেখার আগে প্রকৃত ভূমি পরিবর্তনের মাত্রা নিরূপণ করা জরুরি।

মহেশখালীর বনে পরিবেশগত প্রভাব

বন বিভাগ ও পরিবেশ-সংশ্লিষ্ট নথিতে যে ঝুঁকিগুলো তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলো কয়েকটি ভাগে দেখা যায়।

ক. বন খণ্ডিত হওয়ার ঝুঁকি

একটি অখণ্ড বনভূমির মধ্যে দিয়ে স্থায়ী সড়ক গেলে বন দুটি বা একাধিক অংশে বিভক্ত হতে পারে। এটিকে ecological fragmentation বলা হয়। বনভূমি শুধু গাছের সমষ্টি নয়। গাছ, ঝোপঝাড়, মাটি, পানি, পোকামাকড়, পাখি, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী প্রাণী মিলে একটি আন্তঃসংযুক্ত ecosystem তৈরি করে। সড়ক সেই সংযোগ ভেঙে দিলে ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন habitat তৈরি হতে পারে।

খ. বন্যপ্রাণীর ওপর প্রভাব

মহেশখালীর বনে হরিণ, বানর, মুখপোড়া হনুমান, অজগরসহ বিভিন্ন প্রাণীর উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নির্মাণকাজের শব্দ, যানবাহনের শব্দ, হেডলাইট এবং মানুষের চলাচল এসব প্রাণীর খাদ্য সংগ্রহ, চলাচল ও প্রজননে প্রভাব ফেলতে পারে।

গ. বন দখলের ঝুঁকি

একটি দুর্গম বনাঞ্চলে স্থায়ী পাকা রাস্তা পৌঁছে গেলে সেখানে মানুষের প্রবেশের খরচ ও সময় কমে যায়। এরপর যদি কার্যকর ভূমি ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি না থাকে, তাহলে রাস্তার পাশে বসতি, দোকান, কৃষিকাজ, পানবরজ কিংবা অন্যান্য স্থাপনা গড়ে উঠতে পারে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত রাস্তার আশপাশে দখল-সংক্রান্ত ঘটনায় বন বিভাগের ছয়টি POR মামলার কথা উল্লেখ রয়েছে। যা ভবিষ্যৎ ঝুঁকিকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে।

ঘ. গাছের বাজারমূল্য দিয়ে বনভূমির মূল্য নির্ধারণ করা যাবে না

বন বিভাগের নথিতে প্রস্তাবিত সড়কের কারণে প্রায় ১৮.৫০ হেক্টর বা ৮৫.৭১ একর বনভূমি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা এবং প্রায় ১,৫০০ গাছের ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। গাছগুলোর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। গাছ কাটার পাশাপাশি ধ্বংস হবে ঝোপ-ঝাড়, বন্যপ্রাণীর RPE ও প্রজননক্ষেত্র, ভরাট হবে ঝিরিপথ, কাটতে হবে পাহাড় ও বনের মাটি, যার Ecosystem Service Valuation (IESE TAT মূল্যায়ন) সরাসরি ২৮২, ৯৭, ৮০, ৩৫০ (দুইশ বিরাশি কোটি সাতানব্বই লাখ আশি হাজার তিনশ পঞ্চাশ টাকা) টাকা। কিন্তু পরিবেশগত অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো– একটি গাছের কাঠের বাজারমূল্যই কেবল তার পূর্ণ মূল্য নয়।

ঙ. অবৈধ দখল ও বনের একক ইকোসিস্টেম (IESE) দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা

বনের একক ইকোসিস্টেম (IESE) দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাবে, যার ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে যোগাযোগ সহজলভ্যতার সুযোগে বনের অন্তত ১,০০০ (এক হাজার) একর বনভূমি বসতবাড়ি ও পানের বরজ নির্মাণসহ চাষাবাদ ও অন্যান্য কারণে জবরদখল হয়ে যেতে পারে। ছোট-বড় বিভিন্ন প্রজাতির অন্তত ১,০০০ X ৪০০ = ৪০০,০০০ (চার লাখ) গাছ রয়েছে। যার আর্থিক মূল্য আনুমানিক ৪০০ (চারশ) কোটি টাকা।

সর্বোপরি একটি পাহাড়ি বনের Ecosystem Service Valuation (সেবা মূল্যায়ন) পরিমাপ করলে এ সড়ক নির্মাণের ফলে দীর্ঘ মেয়াদে মোট ৬১,৯০০,০০০,০০০ (ছয় হাজার একশ নব্বই কোটি) টাকার পরিবেশগত ক্ষতি সাধিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আইনগত প্রশ্নটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পরিবেশ, বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে রাষ্ট্র সাংবিধানিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর অধীন প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার ব্যবস্থা রয়েছে। কক্সবাজার-টেকনাফ সমুদ্রসৈকত ১৯৯৯ সালে ECA ঘোষিত হওয়ায় সৈকতের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য রক্ষার বিষয়টি বিশেষ আইনগত গুরুত্ব পেয়েছে। মহেশখালীর ক্ষেত্রে সংরক্ষিত বনভূমির বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বন আইন, ১৯২৭-এর বিধান অনুযায়ী সংরক্ষিত ঘোষিত বনভূমিতে বন অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়া সকল কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে (ধারা ২৬)। বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন, ২০২৬-এর বিধান অনুযায়ী কোনো প্রাকৃতিক বন বনবিরুদ্ধ বা বনবহির্ভূত কাজে ব্যবহার করা যাবে না। তবে, অন্যান্য বনভূমির ক্ষেত্রে শুধু অপরিহার্য জাতীয় প্রয়োজনে এবং বিকল্প না থাকলে নিরপেক্ষ পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব নিরূপণ, ক্ষতিপূরণমূলক বনায়ন, বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি, বিপদাপন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণীর ঝুঁকি বিবেচনা করে মন্ত্রিসভার অনুমোদন সাপেক্ষে সরকার বনভূমির বনবহির্ভূত ব্যবহার (Non-Forest Use) অনুমোদন করতে পারবে (ধারা ৭)। এছাড়া, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬-এ বন ও FEA আবাসস্থল সংরক্ষণের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে সীমানা নির্ধারণপূর্বক কোনো বন বা বনের অংশ অভয়ারণ্য ও জাতীয় উদ্যান ঘোষণার বিধান রয়েছে এবং ঘোষিত অভয়ারণ্য বা জাতীয় উদ্যানে অননুমোদিত প্রবেশ, চাষাবাদ, শিল্প কারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণসহ একাধিক বনবিরুদ্ধ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে (ধারা ১৮ ও ১৯)

সরকার ঘোষিত সংরক্ষিত বনের মধ্যে দিয়ে সড়ক নির্মাণের বিরুদ্ধে এবং বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) একটি জনস্বার্থমূলক মামলা (নং- ৯২৭৫/২০২৬) দায়ের করে। প্রাথমিক শুনানি শেষে বিগত ৬ আগস্ট, ২০২৬-এ বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের ডিভিশন বেঞ্চ রুল জারি করেন। জারিকৃত রুলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন গ্রহণ ব্যতিরেকে সংরক্ষিত বনের মধ্যে দিয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ এবং তা প্রতিরোধে অন্যান্য বিবাদীগণের ব্যর্থতা ও নিষ্ক্রিয়তা সংবিধান ও দেশে প্রচলিত আইন ও নীতির পরিপন্থি হওয়ায় কেন তা আইনবহির্ভূত, আইনি কর্তৃত্ববিহীন ও জনস্বার্থবিরোধী ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়েছেন মহামান্য আদালত৷ একইসঙ্গে উল্লিখিত প্রকল্পটির অধীন সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে প্রভাবিত ৩.৭০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ বাতিল, বনের ভেতরে ইতোমধ্যে তৈরি করা সড়কের পাকা অংশ অপসারণ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও সংরক্ষণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে মহেশখালী পাহাড় মৌজার ১৮,২৮৬.৪০ একর সংরক্ষিত বন এবং বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও সংরক্ষণের নির্দেশ কেন প্রদান করা হবে না, তা-ও জানতে চেয়েছেন আদালত৷ রুল জারির পাশাপাশি সড়ক নির্মাণ সংক্রান্ত সব কার্যক্রমের ওপর ২ (দুই) মাসের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ। পরবর্তী সময়ে ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মহামান্য আপিল আদালত উল্লিখিত রাস্তার প্রস্থ ৫.৫ মিটার অতিক্রম না করার নির্দেশনা দিয়ে হাইকোর্ট প্রদত্ত পূর্ববর্তী আদেশ স্থগিত করে দেন।

সর্বোপরি বিষয়টি এখন এমন এক পর্যায়ে রয়েছে যেখানে আদালতের নির্দেশনা, বন বিভাগের অবস্থান, পরিবেশগত আইন এবং স্থানীয় জনগণের প্রয়োজনীয় উন্নয়ন সব কটিকে একসঙ্গে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া একান্ত প্রয়োজন।

৩. সোনাদিয়া দ্বীপের প্যারাবন ধ্বংস

মহেশখালীর সঙ্গে ভৌগোলিকভাবে যুক্ত হলেও সোনাদিয়া একটি স্বতন্ত্র উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সোনাদিয়ার প্যারাবন ধ্বংসের ব্যাপক চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত প্রথম আলো পত্রিকার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে গত চার বছরে অন্তত ৭,০০০ একর প্যারাবন ধ্বংস এবং ৮২টি চিংড়িঘের তৈরির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ জুলাই বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার অন্য একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রায় ১০,০০০ একর ম্যানগ্রোভ বন হারিয়ে যাওয়ার হিসাব পাওয়া যায়। দুই প্রতিবেদনের হিসাবের মধ্যে পার্থক্য থাকায় সঠিক সরকারি GIS inventory জরুরি। তবে উভয় প্রতিবেদনই ক্ষতির ব্যাপকতা সম্পর্কে একটি শক্তিশালী সতর্কসংকেত দেয়।

সোনাদিয়ার প্যারাবন উপকূলের প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। প্যারাবন ধ্বংস হলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় দ্বীপ ও আশপাশের মানুষের ঝুঁকি বাড়তে পারে। সোনাদিয়ার জীববৈচিত্র্যও অসাধারণ। একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রায় ২৫০ প্রজাতির মাছ, ১৫০ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ৫০ প্রজাতির কাঁকড়া, ৪০ প্রজাতির চিংড়ি, ১৭০ প্রজাতির পাখি, ৫০ প্রজাতির বালিয়াড়ি উদ্ভিদ এবং ১৫ প্রজাতির ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের উপস্থিতির তথ্য দেওয়া হয়েছে। ডলফিন, সামুদ্রিক কাছিম, মেছো বাঘ, শিয়াল, সাপ ও গুইসাপের মতো প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবেও সোনাদিয়ার গুরুত্ব উল্লেখ করা হয়েছে। সোনাদিয়ার ক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ঘটনা রয়েছে। ২০২৪ সালে হাইকোর্ট সোনাদিয়ার বনভূমি ও ECA-সংক্রান্ত একটি ইজারা চুক্তির কার্যকারিতা স্থগিত করে এবং ইতোমধ্যে হওয়া বনক্ষতির ওপর প্রতিবেদন ও পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেয়।

কক্সবাজারের বালিয়াড়ি, মহেশখালীর পাহাড়ি বন এবং সোনাদিয়ার প্যারাবন–এই তিনটি পরিবেশগত ব্যবস্থা দেখতে আলাদা হলেও তাদের কাজের মধ্যে একটি মিল রয়েছে। বালিয়াড়ি, সমুদ্রের ঢেউ ও উপকূলীয় দুর্যোগের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা। পাহাড়ি বন, মাটি, পানি, জীববৈচিত্র্য ও পাহাড়ি ভূ-প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। প্যারাবন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সামুদ্রিক ঢেউয়ের অভিঘাত কমাতে প্রাকৃতিক উপকূলীয় বেষ্টনী হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ এগুলোকে শুধু ‘খালি জমি’ হিসেবে বিবেচনা করা ভুল।

৪. তিনটি ঘটনা একই সমস্যার তিনটি রূপ

কক্সবাজারের বালিয়াড়ি, মহেশখালীর পাহাড়ি বন এবং সোনাদিয়ার প্যারাবন–এই তিনটি পরিবেশগত ব্যবস্থা দেখতে আলাদা হলেও তাদের কাজের মধ্যে একটি মিল রয়েছে। বালিয়াড়ি, সমুদ্রের ঢেউ ও উপকূলীয় দুর্যোগের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা। পাহাড়ি বন, মাটি, পানি, জীববৈচিত্র্য ও পাহাড়ি ভূ-প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। প্যারাবন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সামুদ্রিক ঢেউয়ের অভিঘাত কমাতে প্রাকৃতিক উপকূলীয় বেষ্টনী হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ এগুলোকে শুধু ‘খালি জমি’ হিসেবে বিবেচনা করা ভুল। এগুলো হলো Natural Infrastructure। একটি কংক্রিটের বাঁধ, রাস্তা বা ড্রেনেজ অবকাঠামোর মতোই–বরং অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও দীর্ঘমেয়াদি মূল্য রয়েছে এই প্রাকৃতিক অবকাঠামোর।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর প্রস্তাবসমূহ:

ক. কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত রক্ষায়:

  • সুগন্ধা সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িতে চলমান রাস্তা নির্মাণ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। 
  • হাইকোর্টের মামলা নং ২২৬/২০১১-এর রায় ও নির্দেশনা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
  • ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী অবৈধ স্থাপনা ও দখল উচ্ছেদ করতে হবে। 
  • বালিয়াড়িতে কোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) ও বিশেষজ্ঞ মতামত বাধ্যতামূলক করতে হবে।
  • বালিয়াড়ি, সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রজননক্ষেত্র ও উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
  • সৈকতের ECA, নো-ডেভেলপমেন্ট জোন ও সংরক্ষিত এলাকার সীমানা ডিজিটালি পদ্ধতিতে প্রকাশ করতে হবে;
  • ভবিষ্যতের সব প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ছাড়পত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
  • পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

খ. মহেশখালীর সংরক্ষিত পাহাড়ি বন রক্ষায়:

  • সংরক্ষিত বনের মধ্যে কোনোভাবেই সড়ক নির্মাণ করা যাবে না।
  • বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ ও করিডোর চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় wildlife crossing/culvert রাখতে হবে।
  • বন বিভাগ, LGED, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণকে নিয়ে যৌথ পরিবেশ ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করতে হবে।
  • মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষিপণ্য পরিবহন ও দৈনন্দিন যোগাযোগের প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে বন রক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন পরিকল্পনা নিতে হবে।
  • বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫, বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইন, ২০১৭ ও অন্যান্য আইনের কঠোর ও যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

গ. সোনাদিয়া দ্বীপের প্যারাবন রক্ষায়:

  • অবৈধভাবে দখল করা প্যারাবন ও চিংড়িঘের/ লবণ মাঠ পর্যায়ক্রমে উচ্ছেদ করে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার করতে হবে।
  • বাইন, কেওড়াসহ স্থানীয় ম্যানগ্রোভ প্রজাতি দিয়ে বৈজ্ঞানিক Ecological Restoration Programme নিতে হবে।
  • প্যারাবনকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সমুদ্রের ঢেউ থেকে প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করে উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
  • সোনাদিয়ার ECA অবস্থান ও পরিবেশগত বিধিনিষেধ কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে; নতুন করে বন কাটা বা বাণিজ্যিক রূপান্তর বন্ধ করতে হবে।
  • বন রক্ষায় শুধু মামলা নয়, নিয়মিত টহল, পর্যাপ্ত জনবল ও স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইনের কঠোর ও যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
  • স্থানীয় জেলে, লবণচাষি ও বননির্ভর জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করে Community-based Mangrove Conservation চালু করা যেতে পারে।

কক্সবাজারের পর্যটন অর্থনীতি, স্থানীয় জীবিকা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ পরস্পরের পরিপূরক। সমুদ্রসৈকত নষ্ট হলে পর্যটন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্যারাবন নষ্ট হলে উপকূলীয় ঝুঁকি বাড়বে। আর পাহাড়ি বন নষ্ট হলে ভূমিক্ষয়, জলপ্রবাহের পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি বাড়বে। আর এসবের সম্মিলিত ফল হবে স্থানীয় মানুষের জীবনহানি, অর্থনৈতিক চাপ আর নানামুখী প্রাকৃতিক বিপর্যয় আর যার ফলাফল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দেশের সব মানুষই ভোগ করবে। তাই কক্সবাজারের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত উপকূলীয় পরিবেশ বন ব্যবস্থাপনা–যেখানে সৈকত, বালিয়াড়ি, পাহাড়, সংরক্ষিত বন, প্যারাবন, দ্বীপ, জলাভূমি এবং পর্যটন অবকাঠামোকে আলাদা আলাদা নয়; বরং একই প্রাকৃতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •