পাওয়ার-চায়নার তিস্তা মহাপরিকল্পনা কী?

তিস্তা সংকট নিরসনের জন্য কী ধরনের মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন?-৩

পাওয়ার-চায়নার তিস্তা মহাপরিকল্পনা কী?

নজরুল ইসলাম

তিস্তা সংকট সমাধানের জন্য চীনের পাওয়ার-চায়না নামক কোম্পানি ‘তিস্তা নদী সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ (ইংরেজিতে– তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট এবং রেসটোরেশন প্রজেক্ট) নামক একটি প্রকল্প প্রণয়ন করেছে, যেটা সাধারণভাবে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ নামে পরিচিত। প্রশ্ন হলো– এই প্রকল্প কি তিস্তা সংকটের সমাধান দিতে পারবে, নাকি ভিন্ন ধরনের মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন? এই প্রশ্নের আলোচনার জন্য এই প্রবন্ধের প্রথম পর্বে নদ-নদীর প্রতি সাধারণভাবে যে দুই ধরনের পন্থা অনুসরণ করা যেতে পারে তার মধ্যে বাংলাদেশের জন্য তার কোনটি বেশি উপযোগী, তা তুলে ধরা হয়েছিল। প্রবন্ধের দ্বিতীয় পর্বে তিস্তার সংকট কীভাবে সৃষ্টি হলো তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তৃতীয় পর্বে পাওয়ার চায়নার তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিভিন্ন দিক যা এর বাস্তবায়নযোগ্যতার প্রশ্নের সাথে জড়িত সেই দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করা হল।

তিস্তাপাড়ের জনগণ দীর্ঘকাল ধরে তিস্তা নদীর সংকটের সমাধানের প্রত্যাশা করছেন এবং তার জন্য আন্দোলন করছেন। বিগত সরকার বহু বছর ধরে জনগণকে আশ্বাস দিয়ে আসছিল যে, ভারতের সঙ্গে তিস্তা নদীর পানি ভাগাভাগি নিয়ে শিগগিরই একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে এবং তাহলেই তিস্তা সংকটের সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ভারত (বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ সরকার) এ ধরনের কোনো চুক্তি স্বাক্ষরে রাজি নয়। তদুপরি ভারত কর্তৃক তিস্তার ওপর আরও ১৬টি বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা প্রমাণ করে যে, কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও সেটা হবে নেহাতই লোক-দেখানো চুক্তি। কারণ, ভারত তিস্তার শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা প্রদানে উৎসাহী নয়। এক পর্যায়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন যে, বাংলাদেশকে দেওয়ার মতো পানি তিস্তার নেই (Bangla Tribune, এপ্রিল ১১, ২০১৭)। তদুপরি, ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ভারত-বাংলাদেশ চুক্তির অভিজ্ঞতা দেখায় যে, চুক্তি হলেও ভারতের আচরণের কারণে বাংলাদেশে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়া নিশ্চিত হয় না। ফলে, এ নিয়ে বাংলাদেশ সরকার এক অচলাবস্থায় উপনীত হয়। এই অচলাবস্থা নিরসনের উপায় হিসেবেই পাওয়ার-চায়নার ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’র উদ্ভব ঘটে।

৩.১ পাওয়ার-চায়নার তিস্তা প্রকল্পের পটভূমি ও প্রণয়ন প্রক্রিয়া

২০১৩ সালে চীনের নেতা শি জিনপিং ঘোষিত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ কর্মসূচির অধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে চীনের কারিগরি ও ঋণ সহায়তার প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের তিস্তা নদী সংকটের একটি বিকল্প সমাধানের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। এই পটভূমিতেই ২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের প্রাক্কালে চীনের ‘পাওয়ার কনস্ট্রাকশন কোম্পানি’ (সংক্ষেপে পাওয়ার-চায়না) সক্রিয় হয়। এই কোম্পানি এরইমধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে একাধিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের কাজে জড়িত ছিল। শি-র সফরের প্রাক্কালে পাওয়ার-চায়না এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)-এর সঙ্গে একটি স্মারকলিপি স্বাক্ষরিত হয় যাতে বলা হয়, পাওয়ার-চায়না বাংলাদেশের সব বড় নদ-নদীকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি ‘স্থায়িত্বশীল নদী ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি’ প্রণয়ন করবে। সূচনায় এই কর্মসূচিতে যমুনা নদীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা ছিল।

২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের প্রাক্কালে চীনের ‘পাওয়ার কনস্ট্রাকশন কোম্পানি’ (সংক্ষেপে পাওয়ার-চায়না) সক্রিয় হয়। এই কোম্পানি এরইমধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে একাধিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের কাজে জড়িত ছিল।

২০১৭ সালের ২৪ জুলাই অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ‘স্থায়িত্বশীল নদী ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি’ হালনাগাদ করার সময় পাওয়ার-চায়না ‘তিস্তা নদী সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা’ সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন পেশ করে। এ সময় পাউবোর কর্মকর্তারা পাওয়ার-চায়নাকে তিস্তা প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। এই বৈঠকের পর তিস্তা প্রকল্প ত্বরান্বিত হয় এবং তা ‘তিস্তা নদী সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’-এর রূপ ধারণ করে। পাওয়ার-চায়না এই প্রকল্পের একটি ‘সম্ভাব্যতা-সমীক্ষা’ (ফিজিবিলিটি স্টাডি) সম্পাদন করে এবং ২০১৯ সালে তা পানি উন্নয়ন বোর্ডকে প্রদান করে। প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্পের বাজেট ধরা হয় প্রায় ১০০ কোটি ডলার (আনুমানিক ১২,০০০ কোটি টাকা)। ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে পাওয়ার-চায়না চীনের মিনশেং ব্যাংকিং গ্রুপের কাছ থেকে এর প্রায় ৮০ শতাংশ, তথা ৮০ কোটি ডলার ঋণের নিশ্চয়তা লাভ করে। এসব অগ্রগতির ভিত্তিতে পানি মন্ত্রণালয় এই ‘উন্নয়ন প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তাবনা’ (প্রিলিমিনারি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল, সংক্ষেপে, পিডিপিপি) অনুমোদন করে তা ২০১৯ সালের মে মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বহির্সম্পদ বিভাগের নিকট প্রস্তাবিত বৈদেশিক ঋণ অনুমোদনের জন্য প্রেরণ করে। অর্থায়ন বিষয়ক এবং অন্যান্য অনুমোদন পাওয়ার পর এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু, বিভিন্ন সূত্রমতে, এ পর্যায়ে ভারত চীনের সহায়তাভিত্তিক তিস্তা প্রকল্পের বিরোধিতা করে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর চীনের প্রভাব বৃদ্ধি নিয়ে ভারত শঙ্কিত হয়। তদুপরি ভারতের সঙ্গে উত্তর-পূর্বের ৭টি রাজ্যের সংযোগ রক্ষাকারী বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যকার সরু ‘হংস-গ্রীবা’র নিকট চীনাদের উপস্থিতি ভারতের নিকট কাম্য মনে হয় না। ভারত নাকি বাংলাদেশ সরকারের নিকট নিজেই পাওয়ার-চায়নার প্রস্তুতকৃত প্রকল্প বাস্তবায়িত করে দেওয়ার প্রস্তাব করে। ভারতের এই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার দোটানায় পড়ে এবং পিছুটান দেয়। চীন এতে অসন্তুষ্ট হয় এবং ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরকালে এ অসন্তুষ্টির কথা বাংলাদেশকে জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তদানীন্তন সরকার তিস্তা প্রকল্পের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত, তা জানার উপায় নেই। কারণ, তার কিছুদিনের মধ্যেই (৫ আগস্ট) এই সরকারের পতন ঘটে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ফলে পাওয়ার-চায়নার প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. ইউনূস ২০২৫ সালের মার্চ মাসে চীন সফরে গেলে চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে তিস্তা প্রকল্প নিয়েও আলোচনা করেন। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, সেখানে তিনি চীনাদের জানান, তিস্তা প্রকল্প চীনা কোম্পানির সহায়তায়ই বাস্তবায়িত হবে। শুধু তা-ই নয়, তিনি বাংলাদেশের সব নদ-নদী নিয়ে একটি ৫০ বছরের পরিকল্পনা করে দেওয়ার জন্যও চীনাদের আহ্বান জানান (দ্রষ্টব্য: ইসলাম ২০২৫)। তারই ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকার চীনা সহায়তায় পাওয়ার-চায়নার প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে বলে ধারণা করা যায়।

দুর্ভাগ্যজনক যে, বিপুল ব্যয়সাপেক্ষ এবং অত্যন্ত জনগুরুত্বসম্পন্ন হলেও তিস্তা প্রকল্প সম্পর্কে বাংলাদেশের বিগত সরকার জনগণকে অবহিত করেনি। এমনকি সরকারি মহলের বহু কর্তাব্যক্তিও এই প্রকল্প সম্পর্কে তেমন ওয়াকিবহাল ছিলেন না। অথচ পাওয়ার-চায়না এক ভিডিওর মাধ্যমে এই প্রকল্পের গুণাবলি ব্যাপকভাবে প্রচার করে। ফলে বাংলাদেশের জনগণকে এই প্রকল্প সম্পর্কে নিজ সরকারের পরিবর্তে একটি বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে জানতে হয়। তবে অনুসন্ধানী কিছু সাংবাদিক পিডিপিপি-টি সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন। এই পিডিপিপি, পাওয়ার-চায়নার ভিডিও এবং প্রাপ্ত আরও কিছু তথ্যের ভিত্তিতে তিস্তা প্রকল্প সম্পর্কে বর্তমান লেখক এবং যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিষয়ের অধ্যাপক খালেকুজ্জামান ইতঃপূর্বে আলোচনা করেছিলেন (দ্রষ্টব্য: Islam 2022, ইসলাম ২০২৩ এবং খালেকুজ্জামান ২০২০, ২০২৪)। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার সম্ভাব্যতা-সমীক্ষাটি (BWDB and Power China 2023) সীমিত পরিসরে লভ্য করে। দেখা যায়, এতে পরিবেশিত প্রকল্পের বিবরণ ২০১৯ সালের পিডিপিপি ও পাওয়ার-চায়নার ভিডিওতে পরিবেশিত বিবরণ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ভিন্ন

বিপুল ব্যয়সাপেক্ষ এবং অত্যন্ত জনগুরুত্বসম্পন্ন হলেও তিস্তা প্রকল্প সম্পর্কে বাংলাদেশের বিগত সরকার জনগণকে অবহিত করেনি। এমনকি সরকারি মহলের বহু কর্তাব্যক্তিও এই প্রকল্প সম্পর্কে তেমন ওয়াকিবহাল ছিলেন না। অথচ পাওয়ার-চায়না এক ভিডিওর মাধ্যমে এই প্রকল্পের গুণাবলি ব্যাপকভাবে প্রচার করে।

৩.২ পাওয়ার-চায়নার তিস্তা প্রকল্পের মূল লক্ষ্যসমূহ

৩.২.১ তিস্তা নদীর সরুকরণ

পাওয়ার-চায়নার তিস্তা প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো তিস্তা নদীকে একটি ‘বিনুনি’ (ব্রেইডেড)। নদী থেকে একটি একক চ্যানেলসম্পন্ন ‘সর্পিল’ (সিঙ্গেল-চ্যানেল মিয়েনডারিং) নদীতে রূপান্তরিত করা। সেই উদ্দেশ্যে তিস্তা নদীর প্রস্থ ডালিয়া-কাউনিয়া অংশে ৭০০ মিটারে এবং কাউনিয়া-চিলমারী অংশে ১,০০০ মিটারে হ্রাস করা হবে (চিত্র-৩.১)। এটাকে বলা হচ্ছে তিস্তার ‘মূলখাত (মেইন চ্যানেল),’ যদিও পাওয়ার-চায়নার প্রস্তাবনা অনুযায়ী এটাই হবে তিস্তার একমাত্র খাত। ডালিয়া-কাউনিয়া অংশের মোট দৈর্ঘ্য ৬৩ কিলোমিটার, যার মধ্যে দুটি অংশ চিহ্নিত করা যায়। একটি হলো ডালিয়া-মহীপুরঘাট অংশ, যার দৈর্ঘ্য ৩৯ কিলোমিটার এবং অন্যটি হলো মহীপুরঘাট-কাউনিয়া অংশ, যার দৈর্ঘ্য ২৪ কিলোমিটার। কাউনিয়া-চিলমারী অংশের দৈর্ঘ্য ৩৯ কিলোমিটার। সুতরাং, পাওয়ার-চায়নার প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তিস্তা নদীর ‘ভরযুক্ত গড়’ (ওয়েটেড এভারেজ)) প্রস্থ হবে ৮১৬ মিটার। বর্তমানে তিস্তার গড় প্রস্থ আনুমানিক ৩ কিলোমিটার এবং স্থানভেদে তা ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। সুতরাং, পাওয়ার চায়নার প্রকল্পের ফলে তিস্তার গড় প্রস্থ বর্তমানের প্রায় এক-চতুর্থাংশে হ্রাসকৃত হবে

পাওয়ার-চায়নার প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তিস্তা নদীর ‘ভরযুক্ত গড়’ (ওয়েটেড এভারেজ)) প্রস্থ হবে ৮১৬ মিটার। বর্তমানে তিস্তার গড় প্রস্থ আনুমানিক ৩ কিলোমিটার এবং স্থানভেদে তা ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। সুতরাং, পাওয়ার চায়নার প্রকল্পের ফলে তিস্তার গড় প্রস্থ বর্তমানের প্রায় এক-চতুর্থাংশে হ্রাসকৃত হবে

চিত্র-৩.১: পাওয়ার-চায়নার প্রকল্পের অধীন তিস্তা নদীর সরুকরণ
  
Source: PowerChina (2023)

৩.২.২ খনন ও ভূমি উদ্ধার

তিস্তা নদীর সরুকরণ লক্ষ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটি মূল লক্ষ্য হলো ভূমি উদ্ধার। পিডিপিপি এবং পাওয়ার-চায়নার ভিডিওতে বলা হয়েছিল যে, খননের মাধ্যমে তিস্তার মূলখাতের গড় গভীরতাকে বর্তমানের ৫ মিটার থেকে ১০ মিটারে বৃদ্ধি করা হবে এবং এর ফলে ১৪ কোটি ঘনমিটার মাটি খননকৃত হবে। এই মাটি দিয়ে সরুকৃত তিস্তার বাইরে যে নদীগর্ভ থাকবে তা ভরাট করে জমি উদ্ধার করা হবে, যার পরিমাণ হবে ১৭০.৮৭ বর্গকিলোমিটার। এই জমির ৪২.৭ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্প স্থাপন, ৩২ শতাংশ উন্নত কৃষি, ২১.৩ শতাংশ জনবসতি স্থাপন এবং ৪ শতাংশ নগরায়নের জন্য ব্যবহৃত হবে (সারণি-৩.১)।

সরুকৃত তিস্তার বাইরে যে নদীগর্ভ থাকবে তা ভরাট করে জমি উদ্ধার করা হবে, যার পরিমাণ হবে ১৭০.৮৭ বর্গকিলোমিটার। এই জমির ৪২.৭ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্প স্থাপন, ৩২ শতাংশ উন্নত কৃষি, ২১.৩ শতাংশ জনবসতি স্থাপন এবং ৪ শতাংশ নগরায়নের জন্য ব্যবহৃত হবে

সারণি-৩.১: উদ্ধারকৃত জমির পরিমাণ, মূল্য ও ব্যবহারের পরিকল্পনা

 

উদ্ধারকৃত জমি ব্যবহারের উদ্দেশ্য 

আয়তন

(বর্গকিলোমিটার) 

মোট উদ্ধারকৃত জমির অংশ (%)প্রতি বর্গমিটার জমির (ভ্যাটসহ) মূল্য (ডলার)

মোট মূল্য 

(কোটি ডলার) 

নগরায়ন ৬৮.২৪.০৯.১৯৩৬.২৭০
ফটো ভোল্টায়িক বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অন্যান্য শিল্প ৭২.৯৩৪২.৭৯.১৯৩৬৭.০৪৬
কৃষি উন্নয়ন৫৪.৬৭৩২.০৯.১৯৩৫০.২৫৮
জনবসতি স্থাপন ৩৬.৪৫২১.৩৯.১৯৩৩৩.৫১০
মোট ১৭০.৮৭১০০.০৯.১৯৩১৫৭.০৮৪
সূত্র: BWDB and Power-China (2023) 

৩.২.৩ পাওয়ার-চায়নার তিস্তা প্রকল্পের অন্যান্য লক্ষ্য

নাব্যতা বৃদ্ধি 

খননের মাধ্যমে গভীরতা বৃদ্ধির ফলে তিস্তা নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি পাবে এবং তার সদ্ব্যবহারের জন্য নদীর তীরে ২টি বন্দর (টার্মিনাল) এবং ১৫টি জেটি নির্মিত হবে।

সেচের সুযোগ বৃদ্ধি

খননের মাধ্যমে গভীরতা বৃদ্ধির ফলে তিস্তা নদী খাতে আরও বেশি পানি লভ্য হবে এবং তার ফলে সেচের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।

পাড় ভাঙন ও বন্যা সমস্যার প্রশমন

প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তিস্তা নদী মূলখাতে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং তার ফলে পাড়ভাঙন হ্রাস পাবে। একইভাবে নবনির্মিত এবং পুনর্নির্মিত বাঁধের ফলে বন্যার প্রকোপ প্রশমিত হবে।

সড়ক উন্নয়ন

নবনির্মিত এবং পুনর্নির্মিত বাঁধকে সড়কে রূপান্তরের ফলে তিস্তা অববাহিকায় সড়ক যোগাযোগ উন্নত ও বৃদ্ধি পাবে।

কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং তিস্তাপাড়ের জনগণের জীবনের মানোন্নয়ন

১৭০.৮৭ বর্গকিলোমিটার জমির পুনরুদ্ধার এবং তার উপরোল্লিখিত বিভিন্ন ব্যবহারের ফলে এবং সড়ক ও নৌ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতির কারণে তিস্তা অববাহিকায় কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধি পাবে এবং জনগণের জীবনমানের উন্নতি হবে।

পাওয়ার-চায়নার তিস্তা প্রকল্পের এসব লক্ষ্য বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা কতখানি তা এই প্রবন্ধে অনুসন্ধানের মূল বিষয়। তার আগে দেখে নেওয়া প্রয়োজন কীভাবে পাওয়ার-চায়না এসব লক্ষ্য অর্জন করতে চায়।

৩.৩ পাওয়ার-চায়নার তিস্তা প্রকল্পের লক্ষ্যসমূহ অর্জনের কৌশল ও পদ্ধতি

৩.৩.১ সংকুচিত তিস্তার গতিরেখা নির্ধারণ

পাওয়ার-চায়না জানায়, তিস্তা প্রকল্পের লক্ষ্যসমূহ অর্জনের জন্য প্রথমে এই নদীর প্রস্তাবিত মূলখাতের গতিরেখা চিহ্নিত করা হবে। ২০২৩ সালের সম্ভাব্যতা-সমীক্ষা জানায় যে, বিনুনি নদীতে রূপান্তরিত হওয়ার আগে তিস্তা সর্পিল নদী ছিল এবং এখনো তিস্তার গতিপথে এই সর্পিল বৈশিষ্ট্য অনেকাংশে অক্ষুণ্ন আছে। সুতরাং, পাওয়ার-চায়নার মতে এই নদীকে পুনরায় সর্পিলে রূপান্তরিত করার প্রয়াস একেবারে অস্বাভাবিক হবে না। সম্ভাব্যতা-সমীক্ষা আরও জানায়, সেই লক্ষ্যে অনেকগুলো স্থানে তিস্তার তলদেশের প্রস্থচ্ছেদের সমীক্ষা করা হয়েছে এবং সেসব স্থানে তিস্তার মূলখাত কোথায় অবস্থিত তা চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া ডালিয়া ব্যারাজ, মহীপুরঘাট সেতু, কাউনিয়া সেতু এবং ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মিলনস্থল–এই চারটি স্থানে তিস্তার অবস্থান পূর্বনির্ধারিত। এসব তথ্যের ভিত্তিতে পাওয়ার-চায়না তিস্তার মূলখাতের যে গতিরেখা প্রস্তাব করে তা ৩.২ নম্বর চিত্রে দেখানো হলো।

চিত্র-৩.২: পাওয়ার-চায়না প্রস্তাবিত সংকুচিত তিস্তার গতিরেখা
সূত্র: BWDB and Power-China (2023)

এ প্রসঙ্গে সম্ভাব্যতা-সমীক্ষা আরও লক্ষ করে যে, তিস্তার প্রস্থ ডালিয়া ব্যারাজে ৬১৫ মিটার এবং মহিপুরঘাট ও কাউনিয়া সেতুতে ৭০০ মিটারে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং তা বহু দশক ধরে অটুট আছে। ফলে পাওয়ার-চায়নার মতে ডালিয়া-কাউনিয়া অংশের জন্য তিস্তার মূলখাতের জন্য প্রস্তাবিত ৭০০ মিটার প্রস্থ অসংগত হবে না। সম্ভাব্যতা-সমীক্ষা আরও লক্ষ করে যে, যদিও কাউনিয়া-চিলমারী অংশে তিস্তার গড় প্রশস্ততা অনেক বেশি, তবে চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মিলনস্থলে তিস্তার প্রশস্ততা প্রাকৃতিকভাবেই ৭০০ মিটারে সীমাবদ্ধ আছে। সুতরাং পাওয়ার-চায়নার মতে কাউনিয়া-চিলমারী অংশের জন্য তিস্তা মূলখাতের জন্য প্রস্তাবিত ১,০০০ মিটার প্রস্থও অসংগত হবে না। এভাবে সম্ভাব্যতা-সমীক্ষা রূপান্তরিত তিস্তার প্রস্তাবিত পথরেখা এবং প্রশস্ততার পক্ষে যুক্তি জোগায়।

৩.৩.২ নদীকে প্রস্তাবিত মূলখাতে পরিচালিত করার জন্য গ্রোয়েনের ব্যবহার 

তিস্তাকে প্রস্তাবিত মূলখাতের দিকে পরিচালিত করার জন্য পাওয়ার-চায়না গ্রোয়েন ব্যবহারের প্রস্তাব করেছে। সে অনুযায়ী ৫০টি নতুন গ্রোয়েন নির্মিত হবে যার ২৩টি ডান তীরে এবং ২৭টি বাম তীরে স্থাপিত হবে। এ ছাড়া বিদ্যমান যে ১৫টি গ্রোয়েন আছে সেগুলোকে মেরামত এবং পুনর্বাসিত করা হবে (সারণি-৩.২)। পাওয়ার-চায়না আশা করে যে, এসব গ্রোয়েন নদীর প্রবাহকে এই মূলখাতের দিকে পরিচালিত করতে সক্ষম হবে। মূলখাতের প্রস্থ কম হওয়ায় সেখানে প্রবাহের গতিবেগ বাড়বে এবং তার ফলে তলদেশের ক্ষয় বৃদ্ধি পাবে। এভাবে মূলখাত স্থিতিশীলতা অর্জন করবে

সারণি-৩.২: তিস্তা প্রকল্পে গ্রোয়েনের ব্যবহার

 

অবস্থাননবনির্মিত পুনর্বাসিত মোট 
ডান তীরে২৩  
বাম তীরে২৭  
মোট৫০১৫৬৫
সূত্র: BWDB and Power-China (2023)

সম্ভাব্যতা-সমীক্ষা জানায়, উভয় তীরের গ্রোয়েনসমূহের শীর্ষে প্রস্থ হবে ৬ মিটার এবং দুই দিকে ঢালের অনুপাত হবে ১:৩। তবে যেখানে ডান তীরের গ্রোয়েনসমূহের গড় উচ্চতা হবে ৩.৪ মিটার, সেখানে বাম তীরের গ্রোয়েনসমূহের গড় উচ্চতা হবে ২.৫ মিটার। এগুলোর বহিরঙ্গ কংক্রিট ব্লক এবং জিওব্যাগ দ্বারা সুরক্ষিত হবে এবং ভেতরটা বালু দ্বারা ভরাটকৃত হবে। ডালিয়া থেকে চিলমারী পর্যন্ত তিস্তার দৈর্ঘ্য প্রায় ১০২ কিলোমিটার এবং দুই তীরের মোট দৈর্ঘ্য ২০৪ কিলোমিটার। ফলে ৬৫টি গ্রোয়েন মোটামুটি সমদূরত্বে স্থাপিত হলে এগুলোর একটির সঙ্গে অপরটির গড় দূরত্ব হবে ৩ থেকে ৩.৫ কিলোমিটার। গ্রোয়েনের মাথা নদীর নিয়ন্ত্রণ রেখার সঙ্গে ৯০ ডিগ্রি করে স্থাপিত হবে এবং এগুলোর লেজ নদীতীরের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। সম্ভাব্যতা-সমীক্ষা প্রদত্ত তথ্যমতে, এসব গ্রোয়েন ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ইমারতের উজানে ও ভাটিতে, নদীর তীব্র বাঁকের স্থানে এবং অবতল (কনকেভ) তীরের শেষে লম্বালম্বি ডাইক (স্বল্পদৈর্ঘ্যের বাঁধ) নির্মিত হবে।

৩.৩.৩ বাঁধের মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ

বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য পাওয়ার-চায়নার প্রস্তাব হলো বাঁধ নির্মাণ এবং পুনর্বাসন। উপরে আমরা লক্ষ করেছি, ষাটের দশকে ব্রহ্মপুত্র ডান তীর বাঁধ প্রকল্পের অংশ হিসেবে বেলকা থেকে কাউনিয়া পর্যন্ত প্রায় ৪০ কিলোমিটার এবং আশির দশকে তিস্তা বাঁধ প্রকল্পের অংশ হিসেবে তিস্তার তীরে আরও ৮০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মিত হয়েছিল। সময়ে এসব (বিশেষত ডান তীরের) বাঁধ অবক্ষয়ের সম্মুখীন হয়েছে পাওয়ার-চায়নার প্রকল্পের অধীন এসব পুরোনো বাঁধের মধ্যে ডান তীরের ২২.৮ কিলোমিটার এবং বাম তীরের ৫৬.৮ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্বাসিত হবে। এ ছাড়া ডান তীরে ৭৭.৮ কিলোমিটার এবং বাম তীরে ৪৬.৪ কিলোমিটার নতুন বাঁধ নির্মিত হবে (সারণি-৩.৩)। এসব বাঁধ ৫০ বছরের বন্যা (অর্থাৎ, যে ধরনের বন্যা ৫০ বছরে গড়ে একবার হয়) প্রতিরোধে সক্ষম হবে।

সারণি-৩.৩: তিস্তা প্রকল্পে বাঁধের ব্যবহার (কিলোমিটার)

 

অবস্থান নবনির্মিত পুনর্বাসিত মোট 
ডান তীরে ৭৭.৮২২.৮১০০.৬
বাম তীরে৪৬.৪৫৬.৮১০৩.২
মোট ১২৪.২৭৯.৬২০৩.৮ 
সূত্র: BWDB and Power-China (2023)

এসব বাঁধ তিস্তা নদীর প্রস্তাবিত মূলখাতের কোথায় এবং কত দূরে অবস্থিত হবে, তা নির্ধারণের জন্য সম্ভাব্যতা-সমীক্ষা নিম্নরূপ ৪টি নির্ণায়ক প্রস্তাব করে:

(ক) বাঁধসমূহকে তিস্তার প্রস্তাবিত মূলখাতের গতিরেখার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে;

(খ) বিদ্যমান বাঁধসমূহকে যতটা সম্ভব ব্যবহার করতে হবে; 

(গ) বাঁধের কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা যথাসম্ভব কমাতে হবে; এবং

(ঘ) বন্যা-সুরক্ষিত এলাকা যথাসম্ভব বেশি রাখতে হবে।

এসব নির্ণায়কের ভিত্তিতে সম্ভাব্যতা-সমীক্ষা তিনটি বিকল্প চিহ্নিত করে এবং তার মধ্যে দ্বিতীয়টি বেছে নেয়। এই বিকল্পের অধীন বাঁধসমূহ বেশিরভাগ স্থানে মূলখাত থেকে ১.৫ কিলোমিটার দূরে হবে। (কেবল নগরায়নের জন্য চিহ্নিত স্থানে এই বাঁধ মূলখাতের ২০০ মিটার দূরত্বে অবস্থিত হবে।) দুই তীরের বাঁধের মধ্যে দূরত্ব হবে ২.২ কিলোমিটার থেকে ৪.৬ কিলোমিটার এবং গড় দূরত্ব হবে ২.৮ কিলোমিটার। এই বিকল্পের অধীন তিস্তার পানির সর্বোচ্চ উচ্চতা ডালিয়া থেকে মহীপুরঘাট পর্যন্ত ০.৫ মিটার; মহীপুরঘাট থেকে কাউনিয়া পর্যন্ত ১.০৬ মিটার এবং কাউনিয়া থেকে ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত ০.৪৮ মিটার বৃদ্ধি পাবে। ফলে বাঁধসমূহকে এই উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য উপযোগী করে নির্মাণ করতে হবে এবং এর সঙ্গে বায়ু এবং ঢেউয়ের প্রভাব মোকাবিলা এবং নিরাপত্তার প্রয়োজন মেটানোর জন্য অতিরিক্ত উচ্চতা যোগ করার কথাও ভাবতে হবে। সব মিলিয়ে, সম্ভাব্যতা-সমীক্ষা প্রস্তাব করে যে, ডান তীরের বাঁধের উচ্চতা হতে হবে ০.৪৮ থেকে ৩.৬৮ মিটার এবং বাম তীরের বাঁধের উচ্চতা হতে হবে ০ থেকে ৩.৩৬ মিটার।

৩.৩.৪ খননের মাধ্যমে মূলখাতের গভীরতা বৃদ্ধি এবং নদীগর্ভ থেকে ভূমি পুনরুদ্ধার

উপরে আমরা লক্ষ করেছি, তিস্তা প্রকল্পের পিডিপিপি এবং পাওয়ার-চায়নার তথ্য অনুযায়ী খননের মাধ্যমে তিস্তা নদীখাতের গড় গভীরতা বর্তমানের ৫ মিটার থেকে ১০ মিটারে বর্ধিত করা হবে এবং খননসৃষ্ট ১৪ কোটি ঘনমিটার মাটি দ্বারা সরুকৃত তিস্তা খাতের বাইরে থাকা নদীগর্ভ ভরাট করে ১৭০.৮৭ বর্গকিলোমিটার জমি উদ্ধার করা হবে। পিডিপিপি এবং পাওয়ার-চায়নার ভিডিও থেকে আরও ধারণা হয়েছিল যে, বন্যা-নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সরুকৃত নদীপাড়ের নিকটবর্তী হবে এবং উদ্ধারকৃত জমি এসব বাঁধের বাইরে অবস্থিত হবে। কিন্তু এই উভয় দিক থেকেই ২০২৩ সালের সম্ভাব্যতা-সমীক্ষা খুব ভিন্ন ধরনের প্রস্তাব উত্থাপন করে। এই সমীক্ষা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে তিস্তার তলদেশের যে প্রস্থচ্ছেদ হবে তার একটি নমুনা নিচের ৩.৩ নম্বর চিত্রে দেখানো হলো।

চিত্র-৩.৩: পাওয়ার-চায়নার প্রকল্প বাস্তবায়নের পর তিস্তা নদীর তলদেশের নমুনা রেখাচিত্র
সূত্র: BWDB and Power China (2023, p. 100).

এই চিত্র দেখায় যে, প্রথমত, ৭০০ মিটার প্রশস্ত প্রস্তাবিত মূলখাতের মূল অংশের গড় গভীরতা হবে ১.৫ মিটার। দ্বিতীয়ত, এই মূলখাতের মধ্যে থাকবে ১৫০ মিটার প্রশস্ত একটি সরু খাত, যেটাকে বলা হচ্ছে ‘প্রবাহক্ষয় নিষ্ক্রমণ পথ’ (প্যাসেজ ফর ফ্লো স্কাওয়ার) যার গভীরতা হবে আরও ২ মিটার এ ছাড়া আরও রয়েছে একটি প্রাকৃতিক সরু গিরিখাত (ক্যানিয়ন), যার ফলে পাওয়ার-চায়নার প্রকল্পে ৭০০ মিটার প্রস্থসম্পন্ন তিস্তার ভরযুক্ত গড় গভীরতা হবে মাত্র ৩.৩ মিটার। তৃতীয়ত, আমরা জানতে পারি, ‘প্রবাহক্ষয় নিষ্ক্রমণ পথ’টি ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে সৃষ্টি করা হবে। মূলখাতের বাকি অংশের জন্যও ড্রেজিংয়ের প্রয়োজন হবে, তবে কিছু (অর্থাৎ, পানির ওপরের) অংশের জন্য এক্সকাভেশন পদ্ধতিও প্রয়োগ করা হবে। চতুর্থত, আমরা দেখি যে, বাঁধসমূহ মূলখাত থেকে বেশ দূরে অবস্থিত হবে। বাম তীরে নবনির্মিত বাঁধ ১,৫০০ মিটার দূরত্বে থাকবে; অন্যদিকে ডান তীরে পুনর্বাসিত পুরাতন বাঁধ আনুমানিক ৫০০ মিটার দূরত্বে থাকবে। পঞ্চমত, নদীখাত থেকে দুই ধারের বাঁধ পর্যন্ত নদীগর্ভ মাটি ফেলে ভরাট করা হবে এবং এই ভরাটকৃত জমির উচ্চতা হবে দ্বিবার্ষিক বন্যাসীমার (অর্থাৎ, যে ধরনের বন্যা প্রতি দুই বছরে গড়ে একবার হয়) উচ্চতার সমান। ষষ্ঠত, নদীগর্ভের ভরাটকৃত জমির সিংহভাগ (৫০ বছরের) বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভেতরে এবং বাকি অংশ এই বাঁধের বাইরে অবস্থিত হবে। তবে ১৭১ বর্গকিলোমিটার পুনরুদ্ধারকৃত জমির ঠিক কতটা বাঁধের ভেতরে এবং কতটা বাইরে থাকবে সে সংক্রান্ত পরিসংখ্যান সম্ভাব্যতা-সমীক্ষা প্রদান করে না। সম্ভাব্যতা-সমীক্ষা শুধু জানায় যে, ‘ভূমি উন্নয়ন এলাকাটি তিস্তা নদীর উভয় তীরে ব্যবস্থাপনা রেখা বরাবর অবস্থিত হবে এবং তা সাধারণত ৫০০ থেকে ৪০০০ মিটার প্রস্থসম্পন্ন হবে এবং সর্বোচ্চ প্রস্থ ৫৬০০ মিটার হবে (BWDB and Power China 2023, p. 100, পৃ. ৩৩)’।

৩.৩.৫ প্রকল্প বাস্তবায়নের দুই ধাপ

পাওয়ার-চায়না জানায়, প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্প দুই ধাপে বাস্তবায়িত হবে। প্রথম ধাপে পরিকল্পিত সব নতুন গ্রোয়েন নির্মিত হবে এবং পুরোনো গ্রোয়েনসমূহ ও বাঁধের নির্ধারিত অংশ পুনর্নির্মিত হবে। এই ধাপের জন্য ৫ বছর সময়ের প্রয়োজন হবে। দ্বিতীয় ধাপে থাকবে সড়ক নির্মাণ, নাব্যতা সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড, পর্যবেক্ষণ, সবুজায়ন অভিমুখী প্রকৌশল কাজ এবং সংরক্ষণমূলক নদী খনন। (চলবে)

আগের পর্ব: তিস্তা সংকট নিরসনের জন্য কী ধরনের মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন?-২

ড. নজরুল ইসলাম: অধ্যাপক, এশীয় প্রবৃদ্ধি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং জাতিসংঘের উন্নয়ন গবেষণার সাবেক প্রধান। ইমেইল: nislam13@yahoo.com.

টীকা

১। পিডিপিপি এবং পাওয়ার-চায়নার ভিডিওতে পরিবেশিত তথ্যের ভিত্তিতে তিস্তা প্রকল্পের যেসব পর্যালোচনা আগে পরিবেশিত হয়েছিল তার মধ্যে রয়েছে Islam (2022), ইসলাম (২০২৩), এবং খালেকুজ্জামান (২০২৪)। প্রকল্পের কিছু বিষয়ে পাওয়ার-চায়নার ভিডিওতে প্রদত্ত তথ্যের সঙ্গে পিডিপিপির তথ্যেরও অসংগতি পরিলক্ষিত হয়।

২। অথবা ‘অনির্দিষ্ট ভ্রমণকারী’ (wandering)।

৩। তিস্তা প্রকল্পের পিডিপিপি ও পাওয়ার-চায়নার ভিডিওতে ডালিয়ার উজানে কিছু করা হবে কি না অথবা কী করা হবে, সে বিষয়ে তেমন কিছু বলা হয় না। পক্ষান্তরে, সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় এ বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য প্রদান করা হয়। যেমন: বলা হয় যে,
“তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণকাজ ১৯৭৯ সালে শুরু হয়েছিল এবং সেচ-ব্যবস্থা নির্মাণকাজ ১৯৮৪ সালের দিকে শুরু হয়েছিল। ব্যারাজটি নির্মিত হওয়ার পর থেকে, জলাধার পরিচালনার প্রক্রিয়ার সময় জলপ্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে পলি প্রায়শই জলাধার এলাকায় জমা হয়। পলি কেবল জলাধারের ক্ষমতা হ্রাস নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ এবং সংরক্ষণ ক্ষমতার পাশাপাশি সেচ ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করে। সুতরাং, তিস্তা ব্যারাজের উজানের জলাধার এলাকা খনন করা প্রয়োজন। তিস্তা ব্যারাজ থেকে উজানের দিকে ০.১৩ কিলোমিটার থেকে তিস্তা ব্যারাজের ৮.২ কিলোমিটার উজান পর্যন্ত ড্রেজিং কাজ করা হবে (সম্ভাব্যতা-সমীক্ষা, পৃ. ৪৬)।”

আরও যোগ করা হয় যে, “তিস্তা ব্যারাজের বন্যা-বাইপাসের বামতীরে বসবাসকারীদের বন্যা থেকে রক্ষা এবং জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ৪ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্নির্মাণ করা হবে এবং বন্যা-বাইপাসের অফ-টেক থেকে ভাটিতে কোনো জমি না থাকলে সে স্থানে বন্যা-প্রাচীর (ফ্লাড-ওয়াল) নির্মাণ করা হবে (সম্ভাব্যতা-সমীক্ষা, পৃষ্ঠা ৭৩)।”

৪।বেশ কয়েকটি স্থানে, আমরা তিস্তা নদীর স্থিতিশীল চ্যানেলের উদ্ভব প্রক্রিয়া নিয়ে পাওয়ার-চায়নার চিন্তাভাবনা সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য পাই। মূলত, ধারণাটি হলো যে, একবার নদীটি একটি সংকীর্ণ সীমানার মধ্যে সংকুচিত হয়ে গেলে (স্পার ডাইক/গ্রোয়েন, আনুদৈর্ঘ্যিক ডাইক এবং ‘রিভেটমেন্ট’ এবং ‘রিপর‍্যাপ ব্যাকফিলিং’ ইত্যাদি ব্যবহারের মাধ্যমে) প্রবাহের বেগ বৃদ্ধি পাবে, যার ফলে আরও তলদেশ ক্ষয় হবে এবং গভীরতা বৃদ্ধি পাবে। সঙ্গে ড্রেজিং এবং কিছু জায়গায় খননও করা হবে (সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, পৃ. 41)।

৫। সম্ভাব্যতা-সমীক্ষা জানায় যে, “বর্তমান বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যত বাঁধ দিয়ে গঠিত, যা মূলত ডানতীরে অবস্থিত। বছরের পর বছর ধরে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি এবং ভাঙনের কারণে বিদ্যমান বাঁধগুলি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাউবোর শ্রেণীকরণ অনুসারে এসব বাঁধ ৫০ বছরের রিটার্ন পিরিয়ডের বন্যা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হওয়ার কথা। দক্ষিণ দিকে থাকা, তথা ডানতীরের বাঁধগুলি বেশি বন্যার চাপের সম্মুখীন হয়েছে এবং বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। সে কারণে এই প্রকল্পে ডানতীরে বাঁধের মাত্র ২২.৮ কিলোমিটার পুনর্নির্মাণ এবং ৭৭.৮ কিলোমিটার নতুন বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে, বামতীরের বাঁধ উত্তর দিকে থাকায় তুলনামূলকভাবে কম বন্যার চাপের সম্মুখীন হয়েছে এবং কম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। সম্ভবত সে কারণে প্রকল্পে বামতীরে তুলনামূলকভাবে বেশি (৫৬.৮ কিলোমিটার) পুরোনো বাঁধ পুনর্নির্মাণ এবং কম (৪৬.৪ কিলোমিটার) নতুন বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।”

৬। “প্রধান চ্যানেলের অভ্যন্তরে একটি ছোট চ্যানেল প্রবাহ স্কাওয়ারিংয়ের জন্য পথ হিসেবে ড্রেজিং করা হবে। এই ছোট চ্যানেলটি প্রায় 300 মিটার প্রশস্ত এবং গড় ড্রেজিং/খনন গভীরতা প্রায় 1.9 মিটার। তিস্তা ব্যারাজ থেকে মোহনা পর্যন্ত তিস্তার দৈর্ঘ্য প্রায় 102 কিলোমিটার বিবেচনা করে, মূল চ্যানেল থেকে কাটা মাটির আয়তন হবে প্রায় 58 মিলিয়ন m³। খননের পরিমাণ ড্রেজিং করা আয়তনের প্রায় 10%, যা প্রায় 5 মিলিয়ন m³ হবে। অবশিষ্ট অংশগুলো ড্রেজিং দ্বারা ড্রেজ করা হবে এবং এর ফলে সৃষ্ট মাটির পরিমাণ হবে প্রায় 53%।

 

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •