রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও স্থানীয় জনজীবন

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও স্থানীয় জনজীবন

শেখ সাদিয়া আক্তার

২০১১ সালে প্রধানত রাশিয়ার ঋণে এবং রাশিয়ান কোম্পানি রোসাটম কর্তৃক পাকিস্তান আমলে নির্বাচিত অঞ্চল পাবনার রূপপুরে বিপুল ব্যয়বহুল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। পদ্মা নদীর তীরে রূপপুরের মতো ঘনবসতি এলাকায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করার বিপদ ও ঝুঁকি নিয়ে বিজ্ঞানী ও সচেতন মহল বিভিন্নভাবে তাদের প্রতিবাদ জানিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি-তথ্য হাজির করেছেন। কিন্তু বিপদ ঝুঁকির কোনো যুক্তি না শুনে, স্বচ্ছতা-আলোচনা-জনসম্মতি অগ্রাহ্য করে এই প্রকল্পের কাজ অব্যাহত রাখা হয়। এর আগে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিপুল আর্থিক বোঝা, ভয়াবহ বিপদ ও ঝুঁকি নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ সর্বজনকথায় প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৩ সালে ইউপিএল পারমাণবিক বিদ্যুৎ: বাংলাদেশে রূপপুর প্রকল্প ও বিশ্ব অভিজ্ঞতা শিরোনামে একটি সম্পাদিত গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। এই সংখ্যায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বাসস্থানচ্যুতি, তাদের কর্ম ও পেশাজীবন এবং পারিপার্শ্বিক ও পরিবেশগত পরিবর্তন বিষয়ে মাঠ গবেষণার ভিত্তিতে রচিত এই লেখা প্রকাশ করা হলো। 

একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প এক দশকের ব্যবধানে রূপপুরের মতো গ্রামীণ অঞ্চলকে যান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী শহরাঞ্চলে পরিণত করেছে। ২০১১ সালে বাংলাদেশ-রাশিয়া চুক্তি স্বাক্ষরের পর পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুর ইউনিয়নে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণের জন্য এই স্থান নির্বাচন করা হয় পাকিস্তান আমলে–১৯৬৫ সালে (রামানা ও মিয়া ২০২১)। রূপপুরের মতো ঘনবসতি এলাকায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করার যৌক্তিকতা নিয়ে পরিবেশবাদী কর্মীদের আপত্তি সত্ত্বেও বিগত সরকার তাদের ‘উন্নয়নের জোয়ার’ বয়ান রক্ষার তাগিদে ও বৈশ্বিক পরমাণু ক্লাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার তাড়নায় তড়িঘড়ি করেই প্রকল্পের কাজে হাত দেয় (সুলতানা ২০২১)।

এই প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক চুক্তিসমূহের রাজনীতি, যান্ত্রিক ত্রুটি ও দুর্ঘটনার সম্ভাবনা, এবং পরিবেশের ওপর এর প্রভাব নিয়ে বিস্তর আলাপ হয়েছে (প্রথম আলো ২০১৭)। কিন্তু এটি গড়ে ওঠার ফলে রূপপুরের স্থানীয় জনগোষ্ঠী কী কী অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছে, তাদের জীবনে কী ধরনের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটছে, তা নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো গুণগত গবেষণা এখনও হয়নি। রূপপুরে এই মেগা প্রজেক্টকে ঘিরে স্থানীয় জনজীবনের পরিবর্তন ও উন্নয়নের নৃবৈজ্ঞানিক অধ্যয়ন প্রয়োজন। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর যে বাসস্থানচ্যুতি ঘটেছে, তাদের কর্ম ও পেশাজীবনে যে পরিবর্তন এসেছে, এবং পারিপার্শ্বিক ও পরিবেশগত যে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে তার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল জনসাধারণের জীবনে – এই বিষয়ে তাই গবেষণার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। আমার গবেষণার ফলাফল থেকে দেখা যায়, রূপপুর প্রকল্পের ফলে একদিকে যেমন নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধার বিকাশ ঘটেছে, অন্যদিকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পুঁজি, রাজনৈতিক যোগসাজশ ও ক্ষমতার অসম বিন্যাসের ওপর ভিত্তি করে সেসব সুযোগ-সুবিধায় স্থানীয়দের অধিকারে অসমতা ও প্রান্তিকীকরণ ঘটেছে। যার ফলে রূপপুর প্রকল্পকে ঘিরে ‘উন্নয়ন’-এর বয়ান তৈরি হলেও তার অভিজ্ঞতা স্থানীয় সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নয়৷ ফলে নৃবিজ্ঞানী জেমস ফার্গুসনের (২০১০) উত্তরাধুনিক তাত্ত্বিক আলাপ অনুসারে বলা যায়, রূপপুরের ‘উন্নয়ন’-এ স্থানীয়দের অধিকারের অসমতা একইসঙ্গে ‘অনুন্নয়ন’-এর ধারণাও তৈরি করছে।

২০২৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞানে স্নাতক চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নকালে আমি এই গবেষণাটি সম্পন্ন করি৷ গবেষণার খাতিরে রূপপুরে গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের বাড়িতে অবস্থান করে ১৫ দিনের স্বল্পমেয়াদি বা শর্ট টার্ম এথনোগ্রাফি করি (Pink & Morgan 2013)। গুণগত এই গবেষণাটির তথ্য সংগ্রহের জন্য অংশগ্রহণমূলক পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি ১০টি in-depth interview, ১টি key-informant interview ও ছয়জন অংশগ্রহণকারী নিয়ে ১টি focus group discussion পরিচালনা করি। সংগৃহীত তথ্য লিপিবদ্ধ করে Reflexive thematic analysis পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করি (Byrne 2021)। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী সবাই ছিল চর-রূপপুর ও চর-সাহাপুর গ্রামের বাসিন্দা, যাদের দৈনন্দিন জীবন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বা প্রকল্পটিকে ঘিরে গড়ে ওঠা গ্রিন সিটি আবাসিক এলাকার নির্মাণ দ্বারা প্রভাবিত। লিঙ্গ-নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য গবেষণায় অংশগ্রহণকারী হিসেবে প্রাপ্তবয়স্ক (২৭-৭০ বছর বয়সী) নারী ও পুরুষ উভয়ের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। অংশগ্রহণকারীদের অনুমতি সাপেক্ষে মুঠোফোনে তাদের বয়ান রেকর্ড করি এবং মূল প্রবন্ধে ছদ্মনাম ব্যবহার করি।

বাংলাদেশ সরকারের (তৎকালীন) রূপপুর প্রকল্প নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে একটি উন্নয়নমূলক প্রকল্প। কিন্তু প্রশ্ন থাকে– এই ‘উন্নয়ন’ কে নির্ধারণ করছে? এর অংশীদার কারা? এর ফলে কে/কারা কী ধরনের পরিবর্তনের মুখোমুখি হচ্ছে? স্থাপনা-ভিত্তিক প্রকল্পগুলোর প্রথমেই আসে ‘স্থান’-এর প্রসঙ্গ। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে পূর্বে (পাকিস্তান আমলে) বরাদ্দকৃত জমি যথেষ্ট ছিল না। সুতরাং, নতুন করে আরও জমির দরকার পড়েছিল। আর সেই জমির সংকুলান দিতেই রূপপুরের অনেক মানুষ বাসস্থান হারিয়েছে। অর্থাৎ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রক্রিয়ায় স্থানীয় মানুষ বাপ-দাদার ভিটেমাটি থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তাদের অনেকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ পেলেও তাতে ছিল আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা। 

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রক্রিয়ায় স্থানীয় মানুষ বাপ-দাদার ভিটেমাটি থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তাদের অনেকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ পেলেও তাতে ছিল আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা।

গবেষণার সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে এমনসব গল্প, যেখানে একই জমিতে বাপ-দাদার আমল থেকে বাস করে আসা মানুষেরা কেবল প্রশাসনের চাপে উচ্ছেদকৃত হয়েছে। প্রথমত, জমির বিনিময়ে যে আর্থিক ক্ষতিপূরণ তাদের প্রস্তাব করা হয়েছিল, তা ছিল একপাক্ষিকভাবে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত। সেখানে ভুক্তভোগীর মতামতের সুযোগ ছিল না। দ্বিতীয়ত, আর্থিক ক্ষতি ছাপিয়েও উচ্ছেদকৃত মানুষের বয়ানে উঠে এসেছে তাদের বঞ্চিতকরণের গল্প। এক খণ্ড জমি যে শুধু আর্থিক সম্পত্তিই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ব্যক্তির পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক – তাদের গল্পে এ বিষয়টি ছিল স্পষ্ট। জমি হারানোর পাশাপাশি তারা হারিয়েছে তাদের শৈশব, প্রকৃতির সঙ্গে স্মৃতিবিজড়িত সব সম্বন্ধ, আবেগ, নাড়ির টান, সামাজিক মর্যাদা, ও পারিবারিক বন্ধন। 

রূপপুরে স্থানচ্যুত মানুষদের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে এখানে কিছু কেস স্টাডি তুলে ধরা হলো:

ঘটনা-১

গবেষণায় অংশগ্রহণকারী সাহারা বানু (৭০) তার বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে বাড়ির যে অংশ পেয়েছিলেন, বিয়ের পরও তিনি স্বামী, সন্তান-সন্ততি নিয়ে সেখানেই থাকতেন। সেই বাড়িতে তার বাবার রোপণ করা একটা গাছের বয়স তার বয়সের সমান। ফলে সেই বাড়ির সঙ্গে মিশে ছিল তার শৈশব, বাল্যকাল, আত্মপরিচয়। হঠাৎ একদিন প্রকল্পের কর্মকর্তারা তার বাড়িতে আসে এবং জানায়, সরকার থেকে জমি দখলের আদেশ জারি হয়েছে। বিনিময়ে তারা নির্ধারিত পরিমাণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রস্তাব করে। অর্থের বিনিময়েও সাহারা বানু পূর্বপুরুষের সেই ভিটে ছাড়তে সম্মত ছিলেন না। কিন্তু সরকারি আদেশের সামনে তারা ছিল নিরূপায়।

ঘটনা-২

যৌথ পরিবারে বাস করত শ্যামল (৩৫)। গ্রিন সিটি নির্মাণের কাজ শুরু হলে প্রকল্প থেকে তাদের বাড়ির একটা অংশের জমি দাবি করা হয়। তার বিনিময়ে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিলেও শ্যামলের মতে তা যথেষ্ট ছিল না। এই ক্ষতিপূরণের টাকা নির্ধারণে তাদের মতামত দেওয়ারও কোনো সুযোগ ছিল না। উপরন্তু টাকাটা পেতে মাসের পর মাস আইনি জটিলতা ভোগ করতে হয়েছে তার পরিবারকে। অন্যদিকে বাড়ি ছোট হয়ে যাওয়ায় শ্যামলের ভাইয়েরা তাদের স্ত্রী নিয়ে অন্য এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে উঠে পড়ে। ফলে শ্যামলদের যৌথ পরিবারের বন্ধন ক্রমেই আলগা হয়ে পড়ে।

ঘটনা-৩

বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া ছিল একটি ধানের চাতাল। জলিলের পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস ছিল সেই চাতাল। বাড়ি ও চাতালের জমি হারানোর পর পার্শ্ববর্তী বাড়িতেই ভাড়া থাকে তার পরিবার। জলিলের মতে, রাজনৈতিক দাপট কিংবা ক্ষমতাবান ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকায় ক্ষতিপূরণের টাকা তুলতে এখনো তারা হিমশিম খাচ্ছে। অন্যদিকে, অবিবাহিত বোনের বিয়ে নিয়ে করতে হচ্ছে দুশ্চিন্তা। জলিলের মতে, নিজ বাড়ি ছাড়া কেবল ভাড়াটে হিসেবে বসবাসের ফলে তাদের সামাজিক অবস্থান ও মর্যাদার হানি হচ্ছে, যা তার বোনের জন্য ‘যোগ্য পাত্র’ পেতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার ক্ষতিপূরণের টাকা সম্পূর্ণ বুঝে পেলেও সেই টাকা দিয়ে এখন আর আগের জমির সমপরিমাণ জায়গায় বাড়ি করা বা চাতাল দেওয়া সম্ভব নয়। কেননা, রূপপুরের উন্নয়ন কাঠামোর সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে অত্র এলাকায় ততদিনে জমির দামও বেড়ে গেছে প্রায় দ্বিগুণ।

রূপপুরে বাসস্থান পরিবর্তনের পাশাপাশি স্থানীয়দের জীবনে ঘটেছে পেশাগত পরিবর্তন। পূর্বে যে রূপপুর ছিল সম্পূর্ণ কৃষিভিত্তিক একটি অঞ্চল, এখন সেখানে নদীর পানি ও চাষাবাদের জমি কমে গিয়ে গড়ে উঠছে নগরায়ন। নির্মাণ হচ্ছে শপিংমল, রেস্টুরেন্ট, সুপারশপ, এবং প্রকল্পের দেশি-বিদেশি কর্মকর্তাদের বসবাসের জন্য আধুনিক ভবন। নবনির্মিত পিচঢালা মহাসড়কে বেড়েছে মাইক্রোবাস ও অটোমোবাইলের সংখ্যা। বাজারে উঠছে বিদেশি ফলের জাত। সুপারশপে পাওয়া যাচ্ছে বৈদেশিক ভোগ্যপণ্য। ফলে স্থানীয় মানুষ, যারা আগে বাগান কিংবা কৃষি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল, তারা এখন পেশা বদলে হয়ে উঠছে ব্যবসায়ী, ড্রাইভার, বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক। রূপপুর প্রকল্পকে ঘিরে এই পেশাগত পরিবর্তনকে একভাবে যেমন ‘উন্নয়ন’-এর সূচক হিসেবে দেখা যায়, একইভাবে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত সামাজিক ও পরিবেশগত পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করলে উন্নয়নের আড়ালের চিত্রটাও উঠে আসে।

পূর্বে যে রূপপুর ছিল সম্পূর্ণ কৃষিভিত্তিক একটি অঞ্চল, এখন সেখানে নদীর পানি ও চাষাবাদের জমি কমে গিয়ে গড়ে উঠছে নগরায়ন। নির্মাণ হচ্ছে শপিংমল, রেস্টুরেন্ট, সুপারশপ, এবং প্রকল্পের দেশি-বিদেশি কর্মকর্তাদের বসবাসের জন্য আধুনিক ভবন। নবনির্মিত পিচঢালা মহাসড়কে বেড়েছে মাইক্রোবাস ও অটোমোবাইলের সংখ্যা। বাজারে উঠছে বিদেশি ফলের জাত। সুপারশপে পাওয়া যাচ্ছে বৈদেশিক ভোগ্যপণ্য।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারী একজন রেস্টুরেন্ট কর্মচারী (২৮) জানান, রূপপুর প্রকল্প হওয়ায় তার মতো অনেক যুবকের বেকারত্ব ঘুচেছে। অন্যদিকে প্রকল্পের অধীন কর্মরত শ্রমিকরা জানান, তাদের চাকরি চুক্তিনির্ভর। সাধারণত দালালদের ঘুষ দিয়ে তারা বিদ্যুৎকেন্দ্রে তিন থেকে ছয় মাসের চুক্তিতে কাজ নিয়ে থাকেন। মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে অর্থ দিয়ে পুনরায় চুক্তি নবায়ন করে নিতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় একদিকে যেমন স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের আশা তৈরি হয়, অন্যদিকে দালালকে টাকা দিয়ে প্রতারিত হওয়ার ঘটনাও ঘটে অহরহ। আর প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ ও রুশ ভাষার দক্ষতা কাজে লাগিয়ে দালালরা নিয়ন্ত্রণ করে উন্নয়নের অসম-বিস্তার। অর্থাৎ, রূপপুর প্রকল্পকে ঘিরে যে উন্নয়নের বয়ান প্রচলিত আছে, তা স্থানীয় সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। বরং, যাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পুঁজি (Bourdieu 1986) আছে তারাই হচ্ছে এই উন্নয়নের একচেটিয়া অংশীদার। উন্নয়নের এই অসম সুবিধাপ্রাপ্তির বিষয়টি প্রখ্যাত সামাজিক অর্থনীতিবিদ নায়লা কবীরের ‘সামাজিক বিচ্যুতি’ (২০০২)-এর ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। তিনি তার লেখায় দাবি করেন, কোনো ব্যক্তি বা দল তাদের নিজ নিজ পুঁজির সাপেক্ষে সমাজে নানান সুযোগ-সুবিধায় নানান স্তরে অংশীদার লাভ করেন। যেমন, কারো যদি প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান, প্রশাসনিক দক্ষতা, বা রাজনৈতিক যোগসাজশ থাকে; তবে সে অন্য সবার চেয়ে অধিক সুবিধা ভোগ করবে। এর ফলে যেসব মানুষ উন্নয়নের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে, তাদের প্রান্তিকীকরণ কোনো দুর্ঘটনাজনিত বিষয় থাকে না, বরং কাঠামোগত ‘সামাজিক বিচ্যুতি’-এর বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

সাধারণত দালালদের ঘুষ দিয়ে তারা বিদ্যুৎকেন্দ্রে তিন থেকে ছয় মাসের চুক্তিতে কাজ নিয়ে থাকেন। মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে অর্থ দিয়ে পুনরায় চুক্তি নবায়ন করে নিতে হয়।

কৃষির পাশাপাশি আম, লিচুর মতো মৌসুমি ফল উৎপাদনেও রূপপুরের খ্যাতি আছে। বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন না করলেও রূপপুরে প্রায় সবার বাড়িতেই দেখা যায় সবজির বাগান। স্থানীয়দের মতে, বিগত কয়েক বছর ধরে ফলন কমতে শুরু করেছে। অথচ বিদ্যুৎকেন্দ্রে এখনো বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়নি। তার আগেই প্রকল্পের প্রভাবে ফলন কমে যাওয়ার দাবি কতটা বিজ্ঞানসম্মত; সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো পরিবেশবিজ্ঞানী, কৃষিবিদ, ও পারমাণবিক বিশারদরা দিতে পারবেন। কিন্তু নৃবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে আমার আগ্রহের কেন্দ্র ছিল পারমাণবিক প্রকল্পের প্রভাব নিয়ে স্থানীয় মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও বোঝাপড়া। আর তাদের মতে, নিকট ভবিষ্যতে রূপপুরের জমি আগের মতো ফলন দিতে পারবে না। রূপপুর প্রকল্প নিয়ে স্থানীয়দের সচেতন করতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না, তা জানতে দেখা করেছিলাম পারমাণবিক তথ্য কেন্দ্রের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে। তিনি জানান, পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প সম্পর্কে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সচেতন করতে প্রায় প্রতি বছরই তারা নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়ে থাকেন। প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে অবগত রাখতে এবং এ বিষয়ে সংশয় দূর করতে বিভিন্ন ধরনের ফ্রি ক্যাম্পেইন করেন ও স্থানীয় স্কুলগুলোতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পর্কিত কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। কিন্তু সেসব ক্যাম্পেইন কতটা ফলপ্রসূ, সেই প্রশ্ন উঠে যখন গবেষণায় অংশগ্রহণকারী একজন নারী (২৫) বিদ্যুৎকেন্দ্রের অভ্যন্তরে নির্মাণকাজ থেকে তৈরি হওয়া শব্দ নিয়ে আতঙ্ক প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগের সুরে জানান, রাতভর সেই শব্দের চোটে তাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। অথচ নিরাপত্তা রক্ষী দ্বারা ঘেরা উঁচু উঁচু পাঁচিলের ভেতর থেকে এত শব্দ কেন হয়–এই বিষয়ে তার কোনো ধারণাই নেই বলে তিনি জানান। ফলে পারমাণবিক তথ্য কেন্দ্রের ক্যাম্পেইনগুলো সমাজের কোন স্তর পর্যন্ত পৌঁছায়, সে বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখার সুযোগ থেকে যায়। এথনোগ্রাফির অভিজ্ঞতা থেকে অনুধাবন করি, এই প্রকল্পের বিষয়ে স্থানীয় পুরুষরা কিছুটা অবগত থাকলেও, নারীরা সে তুলনায় অধিকতর বিচ্ছিন্ন। রূপপুর প্রকল্পকে ঘিরে স্থানীয় নারীদের প্রান্তিকীকরণের ঘটনাও রয়েছে।

যেসব মানুষ উন্নয়নের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে, তাদের প্রান্তিকীকরণ কোনো দুর্ঘটনাজনিত বিষয় থাকে না, বরং কাঠামোগত ‘সামাজিক বিচ্যুতি’-এর বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

ঘটনা-৪

আরজুর (৩২) বাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৪ নম্বর গেট সংলগ্ন। তার স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, প্রকল্পটি নির্মাণ কাজের আগে আরজু ও আশপাশের বাড়ির মেয়ে-বউরা অবসরে ঘুরতে বের হতো। গ্রামের পথে যেসব পুরুষের সঙ্গে তাদের দেখা হতো, তারা সবাই ছিল পরিচিত ও আত্মীয়। ফলে নির্বিঘ্নে তারা নদীর পার যেত হাওয়া খেতে। বাড়ির পাশেই ছিল খেলার মাঠ। গ্রামের বাচ্চারা বিকেল হলে সেখানে খেলত। কিন্তু এখন সেসব সুযোগ-সুবিধা বন্ধ হয়ে গেছে। নদীর পাড়ের খোলা হাওয়া আটকা পড়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রাচীরের ওপার। খেলার মাঠে গড়ে উঠেছে শ্রমিকদের সাইকেল রাখার গ্যারেজ। বাড়ি থেকে বের হলেই এখন গ্যারেজে শ্রমিকদের ভিড় দেখা যায়। সেসব শ্রমিকের অনেকেই গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা নয়। ফলে অপরিচিত পুরুষদের সামনে রূপপুরের নারীরা আর নিঃসংকোচে বের হতে পারছেন না।

অন্যদিকে, গ্রিন সিটির পাঁচিল ঘেঁষে যাদের বাড়ি আছে তারাও এই ‘জাতীয় উন্নয়ন’-এর ‘স্থানীয় ভুক্তভোগী’।

নদীর পাড়ের খোলা হাওয়া আটকা পড়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রাচীরের ওপার। খেলার মাঠে গড়ে উঠেছে শ্রমিকদের সাইকেল রাখার গ্যারেজ। বাড়ি থেকে বের হলেই এখন গ্যারেজে শ্রমিকদের ভিড় দেখা যায়। সেসব শ্রমিকের অনেকেই গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা নয়। ফলে অপরিচিত পুরুষদের সামনে রূপপুরের নারীরা আর নিঃসংকোচে বের হতে পারছেন না।

ঘটনা-৫

সাথীর (৪৫) বসতবাড়ির পাঁচিল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে গ্রিন সিটি আবাসিক এলাকা। এলাকাটি সিসিটিভি ও নিরাপত্তা প্রহরী দ্বারা সংরক্ষিত। সেখানে স্থানীয় জনসাধারণের প্রবেশ নিষেধ। গ্রিন সিটির উঁচু উঁচু ভবন প্রস্তুত করা হয়েছে রাশিয়ান নাগরিক ও প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত দেশি কর্মকর্তাদের বসবাসের জন্য। ভবনগুলোর প্রতিটি লেভেলেই সংযুক্ত আছে এয়ার কন্ডিশনার। এতে গ্রিন সিটিতে বসবাসরত সমাজের ‘উচ্চশ্রেণির’ মানুষরা গরমের দিনে স্বস্তি পেলেও সেসব এয়ার কন্ডিশনারের তাপ নির্গত হয়ে পড়ে পার্শ্ববর্তী বাড়িগুলোতে। অর্থাৎ, পাঁচিলের ভেতরে বসবাসরত মানুষের স্বস্তির জন্য ভোগান্তি পোহায় পাঁচিলের বাইরে বাস করা স্থানীয় জনসাধারণ। ফলে বাধ্য হয়েই পার্শ্ববর্তী সেসব বাড়িতে এয়ার কন্ডিশনার যুক্ত করতে হয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে এয়ার কন্ডিশনারের মতো বিলাসবহুল ও যান্ত্রিক সংযুক্তি ছিল সাথীর আর্থিক সামর্থ্যের বাইরে। তবুও মানবসৃষ্ট অতিরিক্ত উত্তাপ সইতে না পেরে লোন নিয়ে তারা একটি এসি ইনস্টল করেছে। এভাবে একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ‘উন্নয়ন’-এর সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে কিছু কিছু পরিবার লোনের বোঝা বইতে বাধ্য হচ্ছে, যা সেসব পরিবারকে উন্নয়নের ছক থেকে ছিটকে ফেলছে।

স্থানীয়দের এসব অভিজ্ঞতা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পকে ঘিরে উন্নয়নের বয়ানকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। পারমাণবিক বিজ্ঞানের মতে, এই প্রকল্প গ্রিন এনার্জির সোর্স – কেননা এটা বিদ্যুৎ উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করে। কিন্তু এই গ্রিন ক্যাপিটালিজমকে ঘিরে রূপপুরে যে সামাজিক ও পরিবেশগত পরিবর্তন ঘটেছে, তার সরাসরি ভুক্তভোগী কেবল সেখানকার স্থানীয় মানুষরাই। এই লেখা পড়ে পাঠকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে– রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পকে ঘিরে স্থানীয়দের জীবনে নানান ‘সমস্যা’র কথা তুলে এনে আমি এই প্রকল্পের বিরোধিতা করছি কি না। এই গবেষণাপত্রে নৃবিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি এই প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত স্টেকহোল্ডারদের, বিশেষ করে রূপপুরের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর, অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে চেয়েছি। সেসব অভিজ্ঞতায় যেমন উন্নয়নকে ঘিরে তাদের আশার কথা ব্যক্ত হয়েছে, একইসঙ্গে হতাশার গল্পও উঠে এসেছে। যেহেতু ‘উন্নয়ন’ বিষয়ক বয়ান (নগরায়ন, নতুন রাস্তাঘাট নির্মাণ, বেকারত্ব হ্রাস, বিদেশিদের সমাগম, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান, জাতীয়ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নিশ্চয়তা লাভ ইত্যাদি) প্রচারের দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়, তাই এই প্রবন্ধে উন্নয়নের জোয়ার থেকে ছিটকে পড়া প্রান্তিক মানুষদের অভিজ্ঞতার গল্পগুলোই আমি তুলে ধরলাম।

পাদটীকা

১. পিঁয়েরে বূর্দ্যোর মতে (১৯৮৬), সমাজে কোনো ব্যক্তির অন্যের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক ও যোগাযোগ হলো তার Social capital বা সামাজিক পুঁজি। অন্যদিকে, ব্যক্তির জ্ঞান, দক্ষতা, ও সাংস্কৃতিক পারদর্শিতা হলো Cultural capital বা সাংস্কৃতিক পুঁজি।

২. এই প্রবন্ধে উল্লিখিত গবেষণায় অংশগ্রহণকারী সব ব্যক্তির ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।

৩. গ্রিন ক্যাপিটালিজম বা ইকো-ক্যাপিটালিজম ধারণার মতে, পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া ও পুঁজিবাদী মনোভাব বজায় থেকে অর্থ লাভ করা – দুটো একইসঙ্গে সম্ভব।

শেখ সাদিয়া আক্তার: শেখ সাদিয়া আক্তার। শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। 

ইমেইল: mshanta2020@gmail.com 

তথ্যসূত্র

    • Bourdieu, P. (1986). “The forms of capital”. in J. G. Richardson (Ed.), Handbook of theory and research for the sociology of education. Greenwood Press. 241-258.
    • Byrne, D. (2021). “A worked example of Braun and Clarke’s approach to reflexive thematic analysis”. in Quality & Quantity. 1391-1412.
  • Ferguson, J. (2010). “Development”. in The Routledge Encyclopedia of Social and Cultural Anthropology. 2nd ed. by Bernard, A. & Spencer, J. London: Routledge. Pp.189-195.
  • Kabeer, N. (2002). “Citizenship, Affiliation and Exclusion: Perspectives from the South”. IDS Bulletin. 33(2). 1-15.
  • Pink, S. & Morgan, J. (2013). Short-Term Ethnography: Intense Routes to Knowing, Symbolic Interaction, 36(3), 351-361.
  • Ramana, M.V. & Mian, Zia. (2021). “The Rooppur Nuclear Power Plant: The Long, Troubled, Costly and Dangerous Life and After-Life of a Very Old Idea”. in Shorbojonkotha. https://sarbojonkotha.info/rooppur-npp-long-troubled-costly-dangerous-life/ 
  • গোলটেবিল বৈঠক – ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প: স্বপ্ন ও বাস্তবতা’। প্রথম আলো। (২০১৭)
  • সুলতানা, মোশাহিদা। (২০২১)। ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে বাংলাদেশ-রাশিয়া আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ’। সর্বজনকথা
Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •