ডি.ডি.কোসাম্বী: পণ্ডিত ও মানুষ
মীরা কোসাম্বী
অনুবাদঃ চৌধুরী মুফাদ আহমদ
দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বী বা ডি.ডি. কোসাম্বী ((৩১ জানুয়ারী ১৯০৭- ২৯ জুন ১৯৬৬) ছিলেন একজন প্রথিতযশা গণিতজ্ঞ ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। ইতিহাস বিষয়ে তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া বা ডিগ্রী ছিল না, ইতিহাসচর্চা তাঁর পেশাও ছিল না। কিন্তু তিনি ভারতের প্রাচীন ইতিহাসচর্চার একটি নতুন ধারা প্রবর্তন করেছিলেন এবং বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা পদ্ধতি প্রয়োগ করে তিনি ভারতের ইতিহাসচর্চার খোল্নলচে পাল্টে দিয়েছিলেন। তিনিই প্রথম মার্কসবাদের আলোকে ভারতের প্রাচীন ইতিহাস ব্যাখ্যা করে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসকে নিজেদের মনের মতো করে সাজানোর যে প্রবণতা ভারতের বর্তমান শাসকগোষ্ঠির মধ্যে দেখা যাচ্ছে তার প্রেক্ষাপটে বস্তনিষ্ঠ ইতিহাস চর্চার অন্যতম পথিকৃৎ ডি ডি কোসাম্বীর প্রাসঙ্গিকতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমান নিবন্ধের লেখিকা মীরা কোসাম্বী ছিলেন ডি.ডি. কোসাম্বীর কন্যা । তিনি মুম্বাইয়ের এস.এন.ডি.টি. উইমেন’স ইউনিভার্সিটির ‘রিসার্চ সেন্টার ফর উইমেন’স স্টাডিজ’-এর প্রাক্তন অধ্যাপক এবং পরিচালক ছিলেন। তিনি ভারত, সুইডেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন সমাজবিজ্ঞানী এবং তিনি নারী শিক্ষা (উইমেন’স স্টাডিজ) ও নগর বিদ্যায় (আরবান স্টাডিজ) বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। পাঠকদের সুবিধার্থে ব্যবহৃত পাদটীকাগুলো অনুবাদকের।
Some have greatness thrust upon them’১—কারো কারো উপর মহত্ত্ব চাপিয়ে দেয়া হয়; আবার কারো কারো উপর চাপিয়ে দেয়া হয় মহত্ত্বের প্রত্যাশা— যেমন কোসাম্বীর তৃতীয় প্রজন্ম হিসেবে আমার উপর এক মহত্ত্বের প্রত্যাশা অর্পিত হয়েছে। আমার পুরো একাডেমিক জীবন কেটেছে ওই বিখ্যাত নামের মর্যাদা রক্ষা করার, যে নামটা শোনামাত্র যেকোনো বিদগ্ধ মহলে সবাই ধরে নেয় আমি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেক্ষাপট থেকে এসেছি। আমার পিতা ডি. ডি. কোসাম্বী (D D Kosambi)-কে নিয়ে লেখা কোনো সহজ কাজ নয়, কারণ তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান নানাবিধ শাস্ত্র জুড়ে বিস্তৃত। এই নিবন্ধে আমি তাঁর কাজের বিস্ময়কর পরিধি তুলে ধরার চেষ্টা করব—শুরুতে একটি সংক্ষিপ্ত জীবনলেখ্য থাকবে এবং শেষে তাঁর ব্যক্তিত্বের কিছু দিক নিয়ে আলোচনা করব।
১. প্রাথমিক শিক্ষা
ডি. ডি. কোসাম্বী ১৯০৭ সালের ৩১ জুলাই গোয়ার এক গৌড় সারস্বত ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশবের প্রথম কয়েক বছর সেখানেই কাটে এবং তাঁর মাতৃভাষা ছিল কোঙ্কানি। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় পুণেতে, যেখানে তাঁর পিতা আচার্য ধর্মানন্দ কোসাম্বী একজন অগ্রণী ‘বৌদ্ধ পণ্ডিত’ হিসেবে ফার্গুসন কলেজে পালি ভাষা পড়াতেন। ধর্মানন্দ এর আগেই পালি বৌদ্ধ গ্রন্থ নিয়ে কাজ করার জন্য হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। ১৯১৮ সালে হার্ভার্ডে তাঁর দ্বিতীয় সফরের সময় তিনি তাঁর বড় মেয়ে ১৯ বছর বয়সী মাণিক এবং ১১ বছর বয়সী ছেলে দামোদরকে (যিনি সবার কাছে ‘বাবা’২ নামে পরিচিত ছিলেন) সাথে নিয়ে যান। তাঁর ছোট দুই মেয়ে গোয়াতে তাঁদের মায়ের কাছেই রয়ে যায়।

মানিক র্যাডক্লিফ কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন, যা তখন ছিল একটি মহিলা কলেজ (এই কলেজ হার্ভার্ডের অধিভুক্ত ছিল। হার্ভার্ড তখন ছিল পুরুষদের কলেজ।)। আর বাবা ভর্তি হয়েছিলেন কেমব্রিজ গ্রামার স্কুলে এবং পরে কেমব্রিজ ল্যাটিন স্কুলে। চার বছর পর মানিক যখন র্যাডক্লিফ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করলেন, তখন ধর্মানন্দ তাকে নিয়ে ভারতে ফিরে আসেন; তবে ‘বাবা’ ১৯২৪ সালে স্কুল শেষ না করা পর্যন্ত সেখানেই একা একটি হোস্টেলে থেকে যান। (ধর্মানন্দ তাঁর খরচের টাকা জোগাতেন, পাশাপাশি বাবা খামার এবং ফলের বাগানে গ্রীষ্মকালীন কাজও করতেন।)
পরবর্তীতে তিনি তাঁর পিতা-মাতার সঙ্গে এক বছর ভারতে কাটান, এবং আচার্য ধর্মানন্দ কোসাম্বী তাঁকে ভারতে কোনো কলেজে ভর্তি করানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু দুই দেশের ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার কারণে তা কঠিন হয়; ফলে ধর্মানন্দ বাবাকে (অর্থাৎ পুত্র কোসাম্বীকে) আবার যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যান এবং ১৯২৬ সালের জানুয়ারিতে হার্ভার্ড কলেজে ভর্তি করান।
পড়াশোনার পাশাপাশি স্কুলজীবনে (যখন তিনি বয় স্কাউট ছিলেন) এবং পরে কলেজ জীবনেও বাবা শারীরিক সক্ষমতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। জিমনেশিয়ামে ব্যায়াম করা, সাঁতার কাটা, নৌকা বাইচ, দীর্ঘ পদব্রজ—ইত্যাদির মাধ্যমে তিনি দারুণ সুঠাম দেহ গড়ে তোলেন। লেখাপড়ায়ও তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন। কলেজের এক বন্ধু তাঁর স্মৃতিচারণে বাবার সাদামাটা ঘরের কথা বলেছেন—যেখানে কেবল মহাত্মা গান্ধীর একটি ছবি ছিল, আর চারপাশে তাকে ঠাসা ছিল নানা বিষয়ের উপর ও নানা ভাষার লেখা বই। তিনি বলেন যে, বাবা ছিলেন একজন আনন্দপ্রিয় ও প্রাণোচ্ছল স্নাতক শিক্ষার্থী । তাঁর প্রবন্ধ ‘Steps in Science’-এ তাঁর আত্মজীবনীর একটি রূপরেখা পাওয়া যায়। এখানে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রাপ্ত তাঁর চমৎকার স্কুল ও কলেজ শিক্ষার প্রশংসা করেছেন।
তাঁর অধ্যয়নের মূল বিষয় ছিল গণিত। অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি তিনি পড়েছিলেন বাধ্যতামূলক ইউরোপীয় ভাষা—গ্রিক, লাতিন, ফরাসি ও জার্মান— যেগুলোর ওপর ভিত্তি করেই পরে তাঁর জ্ঞানভিত্তি গড়ে ওঠে। সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারের সংগ্রহ তাঁকে জ্ঞানের সব শাখার বিস্ময়কর জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। তিনি আলেকজান্ডার ফন হুমবোল্ট, আইনস্টাইন, ফ্রয়েড এবং এইচ. জি. ওয়েলসের লেখা এবং পাস্তুর ও ক্লদ বার্নার্ডের জীবনী দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। মেধা ও কর্মশক্তির মাধ্যমে কোসাম্বী এই শাখাগুলোর যেকোনো একটিতেই নিজের ছাপ রাখতে পারতেন, কিন্তু তিনি গণিতকেই বেছে নিয়েছিলেন কারণ এর আকর্ষণ তিনি এড়াতে পারেননি।
১৯২৯ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ সম্মানসহ (‘summa cum laude’) স্নাতক সম্পন্ন করার পর, কোসাম্বীর জন্য উচ্চতর শিক্ষার বৃত্তি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। এর কারণ ছিল প্রথমত তৎকালীন অর্থনৈতিক মন্দা, এবং দ্বিতীয়ত তাঁর গণিতের অধ্যাপকের দ্বিধা। কোসাম্বী (তাঁর পিতার উৎসাহে) নানা বিচিত্র বিষয়ে বিচরণ করতেন বলে অধ্যাপক তাঁর গণিতের প্রতি একনিষ্ঠতা নিয়ে নিশ্চিত হতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তিনি পাকাপোক্তভাবে ভারতে ফিরে আসেন। পরবর্তীকালে তাঁর পশ্চিমে পাড়ি দেওয়ার সুযোগ থাকলেও, তিনি ভারতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নিজের সাংস্কৃতিক শিকড় এবং ভারতবিদ্যা (ইন্ডোলজি) বিষয়ক গবেষণার উপকরণের কাছাকাছি থাকার জন্য তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তবে মাঝে মাঝে তিনি বিদেশ সফরে যেতেন।
২. গণিতবিদ কোসাম্বী
ভারতে ফিরে আসার পরপরই কোসাম্বী বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন (১৯২৯-৩১)। এরপর থেকে অবসর গ্রহণ করা পর্যন্ত সারাজীবন তিনি গণিত পড়িয়েছেন। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও উপাচার্য পণ্ডিত এম. এম. মালব্যের আদর্শিক চিন্তাধারার সঙ্গে কোসাম্বীর বনিবনা হয়নি; যদিও পণ্ডিত মালব্য ছিলেন তাঁর পিতা ধর্মানন্দের বন্ধু। তবে তিনি প্রচুর উৎসাহ নিয়ে পড়াতেন এবং ছাত্রদের জন্য অতিরিক্ত জার্মান ক্লাসও নিতেন, কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিল বিজ্ঞানচর্চার ভাষা জার্মান।
ফরাসি গণিতবিদ অধ্যাপক আন্দ্রে ওয়েইল আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন। তিনি কোসাম্বীকে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসেন। এখানে তিনি তাঁর সহকর্মী ড. বিজয় রাঘবনের সাথে গাণিতিক গবেষণায় যুক্ত হন। বেনারস ও পরে আলিগড়ে থাকাকালীন তিনি ভারতীয়, ফরাসি ও জার্মান সাময়িকীতে গণিতবিষয়ক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। ছাত্ররা এই প্রচলিত-নিয়ম-ভাঙা, তরুণ অধ্যাপককে খুব পছন্দ করত—কারণ তিনি তাদের সঙ্গে প্রায়ই একসঙ্গে খেতেন এবং হকিও খেলতেন।
১৯৩৩ সালে তাঁর দুই গণিত সহকর্মী বিদায় নেওয়ার পর কোসাম্বী আলিগড় ত্যাগ করে পুণের Fergusson College-এ যোগ দেন। সেখানে তিনি এমন একজন কড়া অধ্যাপক হিসেবে পরিচিত হন, যাঁকে বোঝা সহজ ছিল না এবং যারা মুখে তুলে খাওয়ানোর মতো পড়াশোনা আশা করত তাদের কাছে যিনি জনপ্রিয় ছিলেন না; তবে মেধাবী ও পরিশ্রমী ছাত্রদের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধেয়। পাশাপাশি তিনি তখন Indian Mathematical Society-এর গ্রন্থাগারও সামলাতেন। তাঁর গণিত বিভাগের সহকর্মীরা উচ্চশিক্ষিত হলেও গবেষণা ছেড়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাজেই মনোযোগ দিয়েছিলেন। কোসাম্বীর বুদ্ধিবৃত্তিক সাধনা এবং তাঁর কথিত ‘অহংকার’ নিয়ে তাঁদের যে ক্ষোভ ছিল, তা মূলত দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা ও সংস্কৃতির সংঘাত: হার্ভার্ড বনাম পুণে। একদিকে Harvard University-এর ধারা, অন্যদিকে পুণের সেই পরিবেশ যেখানে গাণিতিক দক্ষতা পরিমাপের একমাত্র মাপকাঠি ছিল ব্রিটিশ ডিগ্রি ‘র্যাংলার’ (wrangler)৩। একই সঙ্গে এটি ছিল তুলনামূলকভাবে সমতাভিত্তিক মার্কিন মানসিকতার সঙ্গে প্রথানিষ্ঠ ও স্তরবিন্যস্ত ভারতীয় সংস্কৃতির অনন্য সংঘর্ষ।
চৌদ্দ বছর পর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে গুরুতর মতপার্থক্যের কারণে তিনি ফার্গুসন কলেজ ত্যাগ করেন এবং ১৯৪৬ সালে মুম্বাইয়ের নবপ্রতিষ্ঠিত টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ (TIFR)-এ যোগদান করেন। তাঁকে সেখানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক, তাঁর সমবয়সী, বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. হোমি ভাবা । তাঁদের প্রাথমিক উষ্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কয়েক বছর পর মূলত ব্যক্তিত্বের সংঘাতের কারণে তিক্ত হয়ে ওঠে । তাঁদের মধ্যে বড় ধরনের মতাদর্শগত পার্থক্য ছিল—পুঁজিবাদী বনাম মার্কসবাদী বিভাজন ছাড়াও পারমাণবিক শক্তির বিষয়ে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। পণ্ডিত নেহেরুর পূর্ণ সমর্থনে ভাবা ভারতের পারমাণবিক শক্তি উন্নয়নের কাজে নিয়োজিত ছিলেন, অপরদিকে কোসাম্বী ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সৌর শক্তিকে সবচেয়ে উপযুক্ত বিবেচনা করতেন। এছাড়া, গণিত ছাড়া অন্য বিষয়েও কোসাম্বীর আগ্রহকে তাঁর বিরুদ্ধে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। ১৯৬২ সালে TIFR-এ তাঁর চুক্তির মেয়াদ আর নবায়ন করা হয়নি; তিনি নিজেও পরিস্থিতি সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন এবং ভেবেছিলেন চুক্তি শেষ হওয়ার আগেই হয়তো তিনি পদচ্যুত হবেন।
পণ্ডিত নেহেরুর পূর্ণ সমর্থনে ভাবা ভারতের পারমাণবিক শক্তি উন্নয়নের কাজে নিয়োজিত ছিলেন, অপরদিকে কোসাম্বী ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সৌর শক্তিকে সবচেয়ে উপযুক্ত বিবেচনা করতেন।
৩. প্রত্নতাত্ত্বিক মাঠ সমীক্ষা
১৯৬৪ সালে তিনি বৈজ্ঞানিক ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (CSIR) কর্তৃক ‘সায়েন্টিস্ট ইমেরিটাস’ নিযুক্ত হন এবং পুণের ‘মহারাষ্ট্র অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অব সায়েন্স’-এর সাথে যুক্ত হন। এ সময়ে তিনি পুণের নিকটবর্তী খড়কওয়াসলার ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমির ‘hobbies’ বিভাগে একটি প্রত্নতাত্ত্বিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করার জন্য অ্যাকাডেমির কমান্ড্যান্ট মেজর জেনারেল ই. বি. হাবিবুল্লাহর আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। একদল উৎসাহী প্রশিক্ষক ও ক্যাডেট সঙ্গে নিয়ে তিনি দাক্ষিণাত্য অঞ্চল জুড়ে মাইক্রোলিথ৪ (microliths), মেগালিথ৫ (megaliths), শিলালিপি এবং অন্যান্য প্রত্নবস্তু খুঁজে বেড়ান (যেমন তিনি তাঁর একনিষ্ঠ ছাত্রদের নিয়ে করতেন)। এই প্রক্রিয়ায় তিনি পশ্চিম ঘাটের৬ পাদদেশের জঙ্গলে, ভাজে গুহার (Bhaje caves) নিচে কারসাম্বলা গুহা আবিষ্কার করেন। হাবিবুল্লাহ এই গুহার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন যে, ‘সেখানে এমন সব দেয়ালচিত্র এবং অলঙ্করণের প্রমাণ পাওয়া যায় যার কাছে অজন্তাকেও নিতান্ত সাধারণ মনে হতো’—যদিও আবহাওয়া ও প্রকৃতির সংস্পর্শে আসার কারণে সেগুলো তখন ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় ছিল। এই আবিষ্কারটি সম্ভব হয়েছিল কোসাম্বীর এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে যে, বৌদ্ধ গুহাগুলো মুনি-ঋষিদের জন্য উপযুক্ত দুর্গম অপ্রবেশযোগ্য স্থানে অবস্থিত ছিল না (যেমনটা আগে বিশ্বাস করা হতো), বরং সেগুলো অবস্থিত ছিল প্রধান বাণিজ্য পথগুলোতে, বণিকদের কাফেলার একদিনের যাত্রাপথের দূরত্ব অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্থানে।
৪. আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কর্মকাণ্ড
এরকম সময়ে তিনি বেশ কিছু পুরস্কার লাভ করেন—যার মধ্যে ছিল ১৯৩৪ সালে প্রথম রামানুজন স্মৃতি পুরস্কার এবং ১৯৪৭ সালে একটি বিশেষ ভাবা পুরস্কার। নানা আমন্ত্রণে তিনি অনেকবার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। ১৯৪৮-৪৯ সালে তিনি ইউনেস্কো ফেলো হিসেবে ইলেকট্রনিক গণনা যন্ত্র বিষয়ক গবেষণার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যে ছিলেন। ১৯৪৯ সালের শীতকালীন সেমিস্টারে তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পাথ-জ্যামিতি’র (Path-Geometry) একজন অতিথি অধ্যাপক ছিলেন এবং পরবর্তীতে অতিথি হিসেবে প্রিন্সটনের ‘ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডি’-তে যান। এখানে আইনস্টাইনের সঙ্গে তাঁর বিস্তৃত আলোচনা হয়েছিল। ১৯৫৫ সালে ‘সোভিয়েত একাডেমি অফ সায়েন্সেস’ তাঁকে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য এবং পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের ওপর তাদের প্রথম সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। শিল্পক্ষেত্রে মান নিয়ন্ত্রণ এবং খাদ্যশস্য ফলনের পূর্বাভাসের জন্য পরিসংখ্যানগত পদ্ধতি প্রয়োগের বিষয়ে পরামর্শ দিতে তাঁকে চীনের ‘অ্যাকাডেমিয়া সিনিকা’ (বেইজিং) আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। ভারত ইতিহাসের ওপর বক্তৃতা দেওয়ার জন্য তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় এবং ‘স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ’ থেকে আমন্ত্রিত হন, যেখানে অধ্যাপক এ. এল. ব্যাশামের৭ সাথে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ হয়। তিনি বিশ্বের অধিকাংশ দেশে নানান সম্মেলনে যোগ দেন ও বক্তৃতা করেন এবং বিশ্বব্যাপী সক্রিয় পত্রালাপ বজায় রাখতেন।
১৯৫০ সাল থেকে কোসাম্বী ‘বিশ্ব শান্তি পরিষদ’-এর (World Peace Council) সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫৫ সালের জুন মাসে ফিনল্যান্ডের হেলসিংকি-তে অনুষ্ঠিত বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে তিনি ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। বিখ্যাত ফরাসি নোবেল বিজয়ী ফ্রেডেরিক জোলিও-কুরি৮ এই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন এবং এতে অন্যান্যের মধ্যে জে. ডি. বার্নাল৯ ও জঁ-পল সার্ত্র১০ উপস্থিত ছিলেন। অধ্যাপক ব্যাশামের নিজের ভাষায়, কোসাম্বীর জীবনে কেবল তিনটি আগ্রহ ছিল এবং তা ছিল অন্য সবকিছুর ঊর্ধ্বে—প্রাচীন ভারত সংক্রান্ত সমুদয় বিষয়, গণিত এবং বিশ্ব শান্তি । তিনি তাঁর গভীর বিশ্বাস অনুযায়ী এই তিনটি বিষয়ের জন্যই নিষ্ঠার সাথে কঠোর পরিশ্রম করে গেছেন।
৫. পারিবারিক জীবন
কোসাম্বী ১৯৩১ সালে মুম্বাইয়ের নলিনী মাদগাভকরকে বিয়ে করেন। নলিনী উইলসন কলেজ থেকে গণিত এবং সংস্কৃতে স্নাতক করেছিলেন। এই অগ্নিদীপ্ত বুদ্ধিজীবী ও নিবেদিতপ্রাণ মার্কসবাদীর সঙ্গে এক ধনী ও প্রগতিশীল পরিবারের মৃদুভাষী ও শান্ত তরুণীর এই আয়োজিত বিবাহ অনেকের কাছেই ছিল এক ধাঁধা । এই তরুণীর সাধারণ গুণাবলীর পাশাপাশি কিছু অসাধারণ দক্ষতাও ছিল যেমন—টেনিস খেলা, সাঁতার কাটা এবং অশ্বারোহণ। এই বিয়ের পেছনে আসল কারণটি সম্ভবত ছিল নারীদের সান্নিধ্যে কোসাম্বীর চরম লজ্জাশীলতা।
পরবর্তীতে এই দম্পতি পুণের তৎকালীন ভাণ্ডারকর ওরিয়েন্টাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট কলোনিতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁদের দুই মেয়ে, মায়া এবং মীরা, বাড়ির কাছের একটি মারাঠি মাধ্যম স্কুলে পড়াশোনা করেন (কারণ বাবা জেদ ধরেছিলেন যে স্কুলের শিক্ষার জন্য মাতৃভাষাই একমাত্র উপযুক্ত মাধ্যম)। এরপর তাঁরা ফার্গুসন কলেজে পড়াশোনা করেন।
মায়া মনোবিজ্ঞানে এম.এ করেন এবং ১৯৬০ সালে বিয়ে করে বিদেশ চলে যান। আমি ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ করি এবং কিছুকাল ফার্গুসন কলেজে শিক্ষকতা করি। আমি কোসাম্বী পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম হিসেবে এই কলেজে শিক্ষকতা করার গৌরব অর্জন করি—সেখানে ধর্মানন্দ পালি পড়াতেন এবং ডি.ডি. কোসাম্বী গণিত ও পরিসংখ্যান পড়াতেন। ১৯৬৬ সালে বাবার মৃত্যুর (২৯ জুন) ঠিক পর পরই, তাঁর ঊনষাটতম জন্মদিনের মাত্র কিছুদিন আগে, আমি উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যাই।
৬. অন্যান্য শাস্ত্রে অভিযাত্রা
নানা বিষয়ে কোসাম্বীর বিস্ময়কর ও বিচিত্র বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা প্রমাণ করে যে কোনো শাস্ত্রের চর্চা একটি ধরাবাঁধা গণ্ডীতে সীমাবদ্ধ থাকা অর্থহীন এবং কেবল আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ও ডিগ্রিকেই জ্ঞানের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে গণ্য করা সমীচীন নয়। প্রায় বিশ বছর ধরে কোসাম্বীর প্রধান কাজ ছিল টেনসর বিশ্লেষণ (Tensor Analysis) এবং ‘পাথ-জ্যামিতি’ (এই পরিভাষাটি তিনিই চালু করেন) নিয়ে। মূলত গণিত নিয়ে কাজ করার সময়ই তিনি জিনতত্ত্বের উপর একটি গবেষণা প্রবন্ধ লেখেন, যা অত্যন্ত সফল হয়। ‘ক্রোমোজোম ম্যাপিংয়ের জন্য কোসাম্বী সূত্র’ (The Kosambi formula for chromosome mapping) নামে পরিচিত, সেই গবেষণা উদ্ভূত পদ্ধতিটি পেশাদার বংশগতিবিদদের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। বংশগতির বিদ্যমান ক্রোমোজোম তত্ত্বের চেয়ে এই সূত্রটি এক ধাপ এগিয়ে ছিল, কারণ এটি জিনের বিন্যাস এবং ‘ক্রসিং ওভার’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের পুনর্সংযোজন ব্যাখ্যা করতে সক্ষম ছিল।
মূলত গণিত নিয়ে কাজ করার সময়ই তিনি জিনতত্ত্বের উপর একটি গবেষণা প্রবন্ধ লেখেন, যা অত্যন্ত সফল হয়। ‘ক্রোমোজোম ম্যাপিংয়ের জন্য কোসাম্বী সূত্র’ (The Kosambi formula for chromosome mapping) নামে পরিচিত, সেই গবেষণা উদ্ভূত পদ্ধতিটি পেশাদার বংশগতিবিদদের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়।
একজন গণিতজ্ঞ হিসেবে কোসাম্বী নিজে নিজেই পরিসংখ্যান শিখেছিলেন এবং এর জন্য তিনি সমাধানের জন্য কয়েকটি বাস্তব সমস্যা বেছে নেন। এর মধ্যে একটি ছিল ‘ছাপযুক্ত মূদ্রার’ (punched marked coin) উপর একটি গবেষণা, যা তিনি ১৯৪০ সালের দিকে শুরু করেন। তখন তক্ষশিলায় প্রাপ্ত মুদ্রাগুলোই ছাপমুদ্রার একমাত্র বৃহৎ ভাণ্ডার ছিল। গবেষণার কাজে তুলনামূলক বিশ্লেষণের জন্য (control group হিসেবে) তিনি আধুনিক মুদ্রা ব্যবহার করেন। ৭,০০০-রও বেশি আধুনিক মুদ্রাসহ মোট প্রায় ১২,০০০টি মুদ্রা ওজন করার পর, তাঁর ভাষায় “মুদ্রাবিদ্যাকে শিলালিপি ও প্রত্নতত্ত্বের একটি শাখা হিসেবে নয়, বরং একটি বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপন করা সম্ভব হয়েছিল।” মুদ্রাতত্ত্ব (Numismatics) নিয়ে তাঁর লেখা প্রবন্ধের সংখ্যা কম ছিল না। তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পর সেগুলো ‘ইন্ডিয়ান নিউমিসম্যাটিকস’ নামে একটি আলাদা বই হিসেবে প্রকাশিত হয়।
প্রাচীন মুদ্রা নিয়ে গবেষণা কোসাম্বীর মনে সেই মুদ্রাগুলো যারা প্রচলন করেছিলেন সেই রাজাদের সম্পর্কে কৌতূহল জাগিয়ে তোলে। পুরনো বইপত্র পড়ার জন্য সংস্কৃত ভাষায় দক্ষ হওয়া প্রয়োজন ছিল এবং তাঁর ভাষায় ‘কোনো নিয়মিত পড়াশোনা ছাড়া নিজের অজান্তে আমি সামান্য সংস্কৃত রপ্ত করেছিলাম’—এটি সম্ভব হয়েছিল পিতার সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ করার ফলে । তিনি তাঁর স্বভাবজাত সমস্যা-সমাধানের পদ্ধতি প্রয়োগ করে এই ভাষায় প্রয়োজনীয় পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তিনি নির্দিষ্ট গ্রন্থ নিয়ে কাজ শুরু করেন—যার মধ্যে সবচেয়ে সহজ ছিল ভর্তৃহরির লেখা তিনটি ‘শতক’ বা শত শ্লোকের সংকলন (সুভাষিত)। এই বিষয়ের উপর তাঁর প্রথম প্রবন্ধগুলো প্রকাশিত হয় ১৯৪৫ সালে। কিন্তু ভর্তৃহরির মূল পাঠটি ত্রুটিপূর্ণ থাকায় তার পাঠ-সমালোচনা (text-criticism) করা প্রয়োজন পড়ে। এর জন্য তিনি প্রায় ৪০০টি পাণ্ডুলিপি অধ্যয়ন করেন।
এই কাজটি সম্পূর্ণ হতে পাঁচ বছর লেগেছিল। এসময় তিনি ‘সংস্কৃতপ্রেমীদের দ্বারা সম্পূর্ণ বিস্মৃতির অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত পঞ্চাশেরও বেশি কবিকে’ উদ্ধার করেছিলেন; এছাড়া আরও অনেকের সম্পর্কে আমাদের অতি সামান্য জ্ঞানভাণ্ডারে নতুন তথ্য সংযোজন করেছিলেন। এই কাজ করতে গিয়ে, তাঁর নিজের ভাষায়, ‘যেন ছাদ ভেদ করে হঠাৎ করেই ভারতবিদ্যার (Indology) জগতে পড়ে গিয়েছিলাম।’
ইতোমধ্যে পাঠ-সমালোচনার দক্ষতার জন্য কোসাম্বী এতটাই খ্যাতি অর্জন করেন যে তাঁকে হার্ভার্ড ওরিয়েন্টাল সিরিজের জন্য বিদ্যাকর-রচিত সুভাষিতরত্নকোষ সম্পাদনার আমন্ত্রণ জানানো হয়। (তাঁর পাঠ-সমালোচনার পদ্ধতি পিতা ধর্মানন্দের পালি বিশুদ্ধিমার্গ১১-এর সংস্করণের আদলে নির্মিত ছিল, যা হার্ভার্ড ওরিয়েন্টাল সিরিজ থেকেই প্রকাশিত হয়েছিল এবং যার সম্পাদনায় তিনি সম্ভবত পিতাকে সহায়তা করেছিলেন।)
হার্ভার্ড ওরিয়েন্টাল সিরিজের সম্পাদক অধ্যাপক ড্যানিয়েল এইচ. এইচ. ইঙ্গালস তাঁর ভূমিকায় স্বীকার করেছেন যে, ‘কোসাম্বী এখানে বিপুল পরিমাণ সূক্ষ্ম ও নিখুঁত তথ্য সংগ্রহ করেছেন, যা কেবল বর্তমান সংকলনটি বোঝার ক্ষেত্রেই সহায়ক নয়, সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাসবিদদের জন্যও অমূল্য উপাদান সরবরাহ করে।’ সংস্কৃত গ্রন্থ এবং পরবর্তীকালে প্রাচীন পৌরাণিক কাহিনীগুলোকে কেবল বিশ্লেষণের ঊর্ধ্বে থাকা পবিত্র বাণী হিসেবে না দেখে, বরং সেগুলোকে সংশ্লিষ্ট সময়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন বিশ্লেষণের উৎস বা উপাত্ত হিসেবে বিবেচনা করার উপর গুরুত্ব দেওয়ায় ভারতের রক্ষণশীল সংস্কৃত পণ্ডিতদের কাছে কোসাম্বীকে একজন প্রতিমাভঞ্জক কালাপাহাড় (iconoclast) হিসেবে পরিচিত করে তুলেছিল।
৭. ঐতিহাসিক হিসেবে কোসাম্বী
ইতিমধ্যে, কোসাম্বীর জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র বহুদূর সম্প্রসারিত হয়। সংস্কৃত ভাষায় তাঁর অসাধারণ দখল থাকার কারণে তিনি স্বাভাবিকভাবেই সংস্কৃত সাহিত্যের সামাজিক প্রেক্ষাপট, প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে কোসাম্বী ইতিহাসের প্রকৃতি ও পরিধিকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন ।
প্রথমত, তিনি ভারতীয় ইতিহাসকে—প্রাচীন, মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগ— এই নির্দিষ্ট সময় বিভাগে বিভাজনের প্রচলিত ধারণা ভেঙে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, তিনি ইতিহাসের বিভিন্ন ধরণের উৎস ব্যবহারের একটি সমন্বিত পদ্ধতি বা ‘ইন্টিগ্রেটেড মেথডোলজি’ তৈরি করেন। তাঁর বিখ্যাত এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ (যাকে তিনি কেবল একটি ‘নোট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন)—’কম্বাইন্ড মেথডস ইন ইন্ডোলজি’-তে তিনি কেবল ভাষাতাত্ত্বিক উৎসের ওপর নির্ভর করার তৎকালীন প্রচলিত প্রবণতার সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, ‘প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির সমস্যাবলীর ভাষাতাত্ত্বিক নিরীক্ষা আরও ফলপ্রসূ হবে যদি এর সাথে প্রত্নতত্ত্ব, নৃবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং একটি উপযুক্ত ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গির বুদ্ধিদীপ্ত সমন্বয় ঘটানো হয়।’ সেই অনুযায়ী, তিনি দালিলিক বা আর্কাইভভিত্তিক উৎসের পাশাপাশি ব্যাপক মাঠপর্যায়ের গবেষণা বা ফিল্ডওয়ার্কের মাধ্যমে ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহ করতেন।
প্রথমত, তিনি ভারতীয় ইতিহাসকে—প্রাচীন, মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগ— এই নির্দিষ্ট সময় বিভাগে বিভাজনের প্রচলিত ধারণা ভেঙে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, তিনি ইতিহাসের বিভিন্ন ধরণের উৎস ব্যবহারের একটি সমন্বিত পদ্ধতি বা ‘ইন্টিগ্রেটেড মেথডোলজি’ তৈরি করেন।
প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের ওপর কোসাম্বীর প্রথম ও যুগান্তকারী বই, ‘অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য স্টাডি অফ ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি’ (১৯৫৬), এতটাই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল যে, অধ্যাপক ইরফান হাবিবের মতে, প্রকাশের পাঁচ বছরের মধ্যেই এটি সারা বিশ্বের ভারতীয় ইতিহাসের অধ্যাপক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য অপরিহার্য পাঠ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। এই বইটি এবং পরবর্তী আরও দুটি বই— ‘মিথ অ্যান্ড রিয়েলিটি’ (১৯৬২) এবং ‘দ্য কালচার অ্যান্ড সিভিলাইজেশন অফ অ্যানশিয়েন্ট ইন্ডিয়া ইন হিস্টোরিক্যাল আউটলাইন’ (১৯৬৫)—ভারতের ভেতরে ও বাইরের অনেক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ঐতিহাসিকদের মধ্যে এই বইগুলোর প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে, অধ্যাপক রোমিলা থাপারের মতো কেউ কেউ তাঁর অধীনে সরাসরি পড়াশোনা না করেও তাঁকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘গুরু’ হিসেবে গণ্য করেছেন।
প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের ওপর কোসাম্বীর প্রথম ও যুগান্তকারী বই, ‘অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য স্টাডি অফ ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি’ (১৯৫৬), এতটাই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল যে, অধ্যাপক ইরফান হাবিবের মতে, প্রকাশের পাঁচ বছরের মধ্যেই এটি সারা বিশ্বের ভারতীয় ইতিহাসের অধ্যাপক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য অপরিহার্য পাঠ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।
কোসাম্বী ঠিক কীভাবে মার্কসবাদকে তাঁর ইতিহাস চর্চার মূল কাঠামো হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তা জানা যায়নি।১২ তবে বিংশ শতাব্দীর শুরুর কয়েক দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মার্কস ও সমাজতন্ত্র নিয়ে প্রবল আগ্রহ দেখা গিয়েছিল। ডি.ডি. সম্ভবত তাঁর পিতার কাছ থেকে এবং তাঁর চারপাশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ থেকে মার্কসবাদ সম্পর্কে জ্ঞান ও আগ্রহ অর্জন করেছিলেন এবং অগাধ পড়াশোনার মাধ্যমে তা আরও প্রসারিত করেছিলেন।
কোসাম্বী মার্কসের এই তত্ত্বের সঙ্গে একমত হননি যে—ভারতীয় গ্রামগুলো ছিল ছোট, অপরিবর্তনীয় ও স্বয়ংসম্পূর্ণ; এবং তারা নিজেদের যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই উৎপাদন করত, বিনিময়ের জন্য পণ্য উৎপাদন করত না। কোসাম্বী এই বিশ্লেষণকে ‘বিভ্রান্তিকর’ বলে মনে করেন, কারণ তাঁর মতে ভারতীয় গ্রামগুলোর স্বয়ংসম্পূর্ণতা সম্পর্কে বাড়িয়ে বলা হয়েছে।
ভারতীয় সামন্তবাদের প্রকৃতি সম্পর্কে কোসাম্বীর মৌলিক বিশ্লেষণ এবং তাঁর ‘উপর থেকে সামন্তবাদ’ (feudalism from above) ও ‘নিচ থেকে সামন্তবাদ’ (feudalism from below)-এর ধারণাগুলো ভারতের ঐতিহাসিকদের মধ্যে প্রচুর আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেয়। ইতিহাসের এই ব্যাপক পুনর্লিখন প্রত্যাশিতভাবেই পরস্পরবিরোধী প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। কেউ কেউ তাঁকে ভারতীয় অতীতের খাঁটি মার্কসবাদী গবেষণার পথিকৃৎ হিসেবে প্রশংসা করেছিলেন, আবার কেউ কেউ তাঁকে চিহ্নিত করেছিলেন একজন জঘন্য প্রথা-ভঙ্গকারী কালাপাহাড় হিসেবে, যিনি ভারতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অধ্যয়নের জন্য একটি অনুপযুক্ত ও বিদেশি কাঠামো ব্যবহার করছেন।

৮. ব্যক্তিত্ব
কোসাম্বী সারা জীবন স্বাস্থ্য এবং শারীরিক সক্ষমতা সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। তিনি প্রতিদিন সকালে মুম্বাইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ (TIFR)-এ যাওয়ার জন্য পিঠে বইভর্তি ব্যাগ ঝুলিয়ে তিন মাইলেরও বেশি পথ হেঁটে রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে ‘ডেকান কুইন’ ট্রেনটি ধরতেন (বসবাসের জন্য মুম্বাইয়ের আবহাওয়া তাঁর কাছে খুবই অনুপভোগ্য ছিল বলে তিনি মুম্বাই না থেকে পুণেতে থাকতেন )। প্রকৃতপক্ষে, তাঁর বই অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য স্টাডি অফ ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি-র মুখবন্ধে তিনি নিজের ঠিকানা হিসেবে ‘ডেকান কুইন’-এর নাম উল্লেখ করেছেন।
বৈপরীত্য ও জটিলতা প্রতিটি মানুষের মধ্যেই থাকে, কোসাম্বীর ক্ষেত্রে তা যেন আরও বেশি প্রকট ছিল। ব্যক্তিগতভাবে তিনি কখনও উষ্ণ ও আন্তরিক, আবার কখনও খিটখিটে ও রূঢ আচরণ করতেন—সবই নির্ভর করত তাঁর মানসিক অবস্থার ওপর। তবে খ্যাতনামা শিক্ষাবিদদের সাথে সবসময় তাঁর সুসম্পর্ক না থাকলেও, মাঠপর্যায়ের গবেষণায় গেলে গ্রামের মানুষের সাথে তিনি সবসময় সহজেই মিশে যেতেন।
তাঁর সামাজিক জীবন তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনেরই অংশ ছিল (এবং উভয়ই ছিল পারিবারিক পরিমণ্ডলের বাইরে)। কোসাম্বীর ভক্ত একদল শিক্ষার্থী প্রায়ই তাঁর বাড়িতে আসতেন এবং তাঁর সাথে গবেষণামূলক ভ্রমণে যেতেন। এই দলে ভারতীয়রা তো ছিলেনই, তার পাশাপাশি ছিলেন মার্কিন, ইউরোপীয়, জাপানি এবং অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীরা। তাঁরা আমাকে প্রায়ই বলতেন যে তিনি তাঁদের অনেক কিছু শিখিয়েছেন এবং তাঁদের কাছ থেকে তাঁর অনেক উচ্চ প্রত্যাশাও ছিল—যেমন প্রত্যাশা পরোক্ষভাবে ছিল তাঁর নিজের দুই সন্তানের কাছ থেকে। প্রখ্যাত জার্মান ভারততত্ত্ববিদ (Indologist) ও নৃতাত্ত্বিক গুন্টার সোন্থাইমার, যিনি কোসাম্বীকে গুরুর মতো শ্রদ্ধা করতেন, তিনিও সম্ভবত একই ধরনের চাপ অনুভব করতেন। গুন্টার আমার পিএইচডি (PhD) থিসিসের খুব প্রশংসা করেছিলেন এবং মন্তব্য করেছিলেন যে আমার বাবা এটি দেখলে কতই না গর্ববোধ করতেন। উত্তরে কোসাম্বী-সুলভ অকপটতা ও সততার সাথে আমি বলেছিলাম যে, আমার বাবা হয়তো এই বাজে গবেষণার জন্য আমাকে চরমভাবে বকাঝকা করতেন, কারণ তাঁর মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হওয়া খুব কঠিন ছিল। গুন্টার এর জবাবে বলেছিলেন যে, যদি তিনি নিজের প্রতিটি লেখার ক্ষেত্রে আমার বাবার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভাবতেন, তাহলে হয়তো তাঁকে কাছাকাছি কোনো গাছে গলায় দড়ি দিয়ে মরতে হতো!
সাংস্কৃতিকভাবে কোসাম্বী প্রকৃত অর্থেই একজন বিশ্বনাগরিক ছিলেন । বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতা ও ব্যাপ্তি, ভারতের সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং মার্কিন অভ্যাস ও আচরণের অনন্য সম্মিলন তাঁকে সর্বত্রই খানিকটা ‘বেমানান’ করে তুলেছিল। তিনি ছিলেন এক অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্তস্বরূপ। তাঁর ব্যক্তিগত এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ছিল প্রশ্নাতীত। তাঁর ব্যক্তিত্বের ভিত্তিমূলে ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা । তিনি ধর্ম, বর্ণ, জাতি বা লিঙ্গের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করতেন না এবং একই ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শে তাঁর সন্তানদের বড় করেছিলেন। বহু জ্ঞানের শাখায় পদচারণা করা একজন মেধাবী, প্রাজ্ঞ এবং মৌলিক পণ্ডিত হিসেবে তাঁর একটি অনন্য আন্তর্জাতিক পরিচয় সবসময় ছিল। এবং যতদিন জ্ঞানচর্চা টিকে থাকবে, ততদিন তাঁর এই পরিচয়ও অম্লান থাকবে।
টীকা:
১। শেকসপিয়ারের ‘টুয়েলফথ্ নাইট’ নাটকের বিখ্যাত ও বহুল উদ্ধৃত লাইন।
২। দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বীর ডাক নাম ছিল ‘বাবা’। এই লেখায় বাবা শব্দটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোসাম্বীর নাম অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, পিতা অর্থে নয়। Father এর অনুবাদ হিসেবে ‘পিতা’ এবং দুয়েকটি ক্ষেত্রে ‘আমার বাবা’ ব্যবহার করেছি।
৩। Wrangler- যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতে প্রথম শ্রেণীর অনার্স।
৪। Microlith-ক্ষুদ্রাশ্ম, পাথরের ক্ষুদ্রাকৃতি হাতিয়ার।
৫। Megalith – বিশাল পাথর দিয়ে নির্মিত প্রাগৈতিহাসিক স্তম্ভ।
৬। পশ্চিমঘাট পর্বতমালা, যা ভারতের পশ্চিমভাগে প্রসারিত একটি পর্বতশ্রেণী। এই পর্বতমালা দাক্ষিণাত্য মালভূমির পশ্চিমসীমা বরাবর উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রসারিত হয়ে আরব সাগরের তীরবর্তী ভারতের পশ্চিম উপকূলভাগকে মালভূমি থেকে পৃথক করেছে।
৭। আর্থার লেভেলিন ব্যাশাম (২৪ মে ১৯১৪ – ২৭ জানুয়ারি ১৯৮৬) ছিলেন একজন ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ, ভারততত্ত্ববিদ এবং লেখক। তিনি লন্ডনের ‘স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ’-এর অধ্যাপক ছিলেন। The Wonder That Was India
প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উপর লেখা তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ। রামশরণ শর্মা ও রোমিলা থাপারের মতো ভারতের অনেক বিখ্যাত ঐতিহাসিক তাঁর অধীনে পিএইচডি গবেষণা করেছেন।
৮। জিন ফ্রেডেরিক জোলিও-কুরি ( ১৯ মার্চ ১৯০০ – ১৪ আগস্ট ১৯৫৮) ছিলেন একজন ফরাসি রসায়নবিদ এবং পদার্থবিজ্ঞানী। কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা (induced radioactivity) আবিষ্কারের জন্য তিনি এবং তাঁর স্ত্রী আইরিন জোলিও-কুরি ১৯৩৫ সালে যৌথভাবে রসায়নে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ওয়ার্ড পিস কাউন্সিল ১৯৫০ সালে তাঁর নামে জোলিও কুরি শান্তি পদক প্রবর্তন করে। ১৯৭৩ সালে শেখ মুজিবুর রহমান এই পদক পেয়েছিলেন।
৯। জন ডেসমন্ড বার্নাল (১৯০১–১৯৭১) ছিলেন একজন আইরিশ বিজ্ঞানী। তৎকালীন প্রখ্যাত ‘লাল বিজ্ঞানীদের’ (বামপন্থী বিজ্ঞানী) মধ্যে অন্যতম বার্নালের ১৯৩০-এর দশকের অগ্রগামী কাজগুলো আধুনিক আণবিক জীববিজ্ঞানের (molecular biology) ভিত্তি স্থাপন করেছিল। ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির আজীবন সমর্থক বার্নাল ফ্যাসিবাদ ও পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে এবং ঔপনিবেশিক বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের পক্ষে একজন উচ্চপর্যায়ের প্রচারক ছিলেন।
১০। জঁ-পল সার্ত্র (জন্ম ২১ জুন ১৯০৫, প্যারিস, ফ্রান্স — মৃত্যু ১৫ এপ্রিল ১৯৮০, প্যারিস) ছিলেন একজন ফরাসি দার্শনিক, ঔপন্যাসিক এবং নাট্যকার। বিংশ শতাব্দীতে অস্তিত্ববাদের (existentialism) প্রধান প্রবক্তা হিসেবে তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত।
১১। বিশুদ্ধিমার্গ: পালি ভাষায় ‘বিমুত্তিমাগ্গ’। পঞ্চম শব্দাব্দীতে শ্রীলঙ্কায় বুদ্ধঘোষ কর্তৃক থেরবাদী মতবাদের উপর লেখা সারগ্রন্থ। সারব্যাখ্যা। খ্রিস্টীয় ১২শ শতাব্দীর পর থেকে বুদ্ধঘোষের এই ব্যাখ্যাই থেরবাদী বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থগুলির প্রথাগত ধারণার মূল ভিত্তি হিসেবে গণ্য হয়েছে। বিশুদ্ধিমার্গ বৌদ্ধ দর্শনমতে দুঃখাদি থেকে মুক্তিলাভের সাধন পথ। এর শাব্দিক অর্থ বিশুদ্ধ পথ। ধর্মানন্দ কোসাম্বীকে এই গ্রন্থটি সম্পাদনার জন্য হার্ভার্ডে আমন্ত্রণ জানান হয়।
১২। অধ্যাপক ইরফান হাবিব -এর Koshambi, Maxism and Indian History প্রবন্ধে কোসাম্বীর মার্কসবাদে আকৃষ্ট হওয়ার পটভূমি সম্পর্কে কিছু ইংগিত আছে। বর্তমান অনুবাদক কোসাম্বী, মার্কসবাদ ও ভারতের ইতিহাস’ নামে প্রবন্ধটি অন্যত্র (সংস্কৃতি — জুন,২০২৩ সংখ্যা) অনুবাদ করেছেন।
প্রস্তাবিত পাঠ্য তালিকা:
১. ডি. ডি. কোসাম্বী, Steps in Science, in Science and Human Progress, ১৯৭৪
২. ডি. ডি. কোসাম্বী, Indian Numismatics, Orient Longman, ১৯৮১
৩. ডি. ডি. কোসাম্বী, An Introduction to the Study of Indian History, Popular Prakashan, সংশোধিত ২য় সংস্করণ, ১৯৭৫
৪. ডি. ডি. কোসাম্বী, The Culture and Civilisation of Ancient India in Historical Outline, Routledge and Kegan Paul, ১৯৬৫; এছাড়াও Ancient India: A History of Its Culture and Civilization, Random House, ১৯৬৫
