যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি যেভাবে দেশের স্বার্থবিরোধী

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি যেভাবে দেশের স্বার্থবিরোধী

কল্লোল মোস্তফা

গত ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে অস্থায়ী একটি সরকার কর্তৃক কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি নানা কারণেই গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এই লেখায় চুক্তির শর্তগুলো বিশ্লেষণের পাশাপাশি এর সাথে যুক্তরাষ্ট্র-মালয়েশিয়ার চুক্তির তুলনামূলক পর্যালোচনা করা হয়েছে। এই চুক্তির বিভিন্ন ধারা উপধারা কীভাবে বাংলাদেশকে অধীনতায় বেঁধে অর্থনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগত দিকে দীর্ঘমেয়াদী বিপদের মধ্যে ফেলেছে এই লেখায় তা স্পষ্ট করা হয়েছে। 

গত ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্বাক্ষরিত ‘বাণিজ্য’  চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্কহার ১৯ শতাংশ ধার্য করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য প্রবেশে বিদ্যমান সাধারণ গড় শুল্কহার সাড়ে ১৫ শতাংশ। এর ওপর বাড়তি পাল্টা শুল্ক আরোপ হয় ১৯ শতাংশ। অর্থাৎ দেশটির বাজারে বাংলাদেশি পণ্যে মোট শুল্কের পরিমাণ দাঁড়ায় সাড়ে ৩৪ শতাংশ। (অনামা ২০২৬ক) যুক্তরাষ্ট্রের তুলা বা সুতা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে যে ‘পাল্টা শুল্ক’ অব্যাহতি পাবে বলে প্রচার করা হয়েছে, সেটাও নানা শর্তযুক্ত। এসব শর্ত মেনে বাংলাদেশ ঠিক কতটা সুবিধা আদায় করতে পারবে তা নিয়ে ব্যবসায়ীরাই প্রশ্ন তুলেছেন। (অনামা ২০২৬খ) অথচ বিনিময়ে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় বাণিজ্য, অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে নানান শর্ত মেনে চলার অঙ্গীকার করতে হয়েছে।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র ১১ দিনের মাথায় ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের গ্লোবাল রেসিপ্রোকাল ট্যারিফকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। (ব্রয়নিঙ্গার ২০২৬) এর ফলে যে উচ্চশুল্ক কমানোর কথা বলে তাড়াহুড়ো করে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করা হলো, সেই শুল্কেরই কোনো আইনি ভিত্তি থাকল না। অবশ্য এরকম যে একটা কিছু হবে তা বোঝা খুব কঠিন ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর থেকেই এই উচ্চ শুল্কের বিরোধিতা হচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি রাজ্য সরকার ও ব্যবসায়ীদের দায়ের করা মামলায় নিউ ইয়র্কভিত্তিক ইউএস কোর্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ২০২৫ সালের মে মাসেই ট্রাম্পের রেসিপ্রোকাল ট্যারিফকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছিল। (উইল্কি ও অন্যান্য ২০২৫) এর পর ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে ফেডারেল আপিল কোর্ট সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে (ব্রয়নিঙ্গারম্যাঙ্গান ২০২৫) এবং সবশেষে ২০২৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট চূড়ান্তভাবে এই শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করে।

এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিরোধিতাকে মাথায় রেখে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির ব্যাপারে ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করেছিল। অথচ বিগত অন্তর্বর্তী সরকার তাড়াহুড়ো করে নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে চুক্তি স্বাক্ষর করে ফেলে। যদিও তারা খুব সহজেই আসন্ন নির্বাচনের কথা বলে চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারটি এড়িয়ে যেতে পারত। এতে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর বাংলাদেশ চুক্তি নিয়ে ধীরে চলো নীতি অবলম্বনকারী দেশগুলোর মতোই সুবিধাজনক অবস্থায় থাকতে পারত। যেমন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ভারত জানিয়েছে তারা আপাতত চুক্তি স্বাক্ষর করবে না, যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক শুল্ক নতুন করে চূড়ান্ত করার পর চুক্তি নিয়ে আলোচনা হবে। (অনামা ২০২৬গ)

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিরোধিতাকে মাথায় রেখে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির ব্যাপারে ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করেছিল। অথচ বিগত অন্তর্বর্তী সরকার তাড়াহুড়ো করে নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে চুক্তি স্বাক্ষর করে ফেলে। যদিও তারা খুব সহজেই আসন্ন নির্বাচনের কথা বলে চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারটি এড়িয়ে যেতে পারত।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর মার্চের শুরুতে বাংলাদেশ সফরে এসে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে হওয়া বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যাপারে তাগাদা দিয়ে গেছেন। (রাহীদ ২০২৬) নির্বাচিত বিএনপি সরকারও এই চুক্তি পর্যালোচনা বা বাতিল করার ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেনি। বরং চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়ে চুক্তির ধারাবাহিকতা রক্ষার বার্তাই দিয়েছে। (কাদির ২০২৬)

অথচ দেশের ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদসহ প্রায় সব মহল থেকেই বলা হচ্ছে চুক্তিটির মাধ্যমে দেশের স্বার্থ রক্ষা হয়নি। বিশেষ করে শুল্ক চুক্তির নামে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, বাজার উন্মোচন, জাতীয় নিরাপত্তাসহ কৌশলগত নানা শর্ত যুক্ত হওয়ায় তা ব্যাপক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। (অনামা ২০২৬খ)

এই লেখায় চুক্তিতে থাকা শর্তগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা হবে এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি, ভর্তুকি, বাজার উন্মোচন, জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়ে কী ধরনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। সেইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মালয়েশিয়ার চুক্তির কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ ধারার সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তির অনুরূপ ধারার তুলনামূলক পর্যালোচনা করা হবে। যা থেকে বোঝা যাবে চুক্তিতে কোন দেশের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিপুল শুল্ক ছাড়

এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে শুল্কছাড় দেবে, বিনিময়ে বাংলাদেশ পাবে ১ হাজার ৬৩৮ পণ্যে পাল্টা শুল্ক ছাড়ের সুবিধা। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই ৪ হাজার ৫০০টি পণ্য বাংলাদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এগুলোকে ইআইএফ (এন্টার ইনটু ফোর্স) শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গবাদি পশু, মাংস, মাছ, রাসায়নিক দ্রব্য, বস্ত্র, যন্ত্রপাতি ও নানা শিল্পপণ্য। এ ছাড়া বি-৫ শ্রেণিতে থাকা ১ হাজার ৫৩৯টি পণ্যের শুল্ক চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্ধেক কমানো হবে। বাকি অর্ধেক পরবর্তী চার বছরে সমানভাবে কমবে। পঞ্চম বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এসব পণ্য পুরোপুরি শুল্কমুক্ত হবে। বি-১০ শ্রেণির ৬৭২টি পণ্যের ক্ষেত্রেও শুরুতে শুল্ক অর্ধেক কমবে। বাকি অর্ধেক পরবর্তী ৯ বছরে সমান ধাপে কমিয়ে দশম বছরের ১ জানুয়ারি থেকে সম্পূর্ণ শূন্যে নামানো হবে। এই বিপুল শুল্ক ছাড়ের কারণে স্থানীয় কৃষি ও শিল্পপণ্য যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারে এবং শুল্ক বাবদ রাজস্ব আয় কমতে পারে। (শিডিউল ১, এনেক্স ১) 

এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে শুল্কছাড় দেবে, বিনিময়ে বাংলাদেশ পাবে ১ হাজার ৬৩৮ পণ্যে পাল্টা শুল্ক ছাড়ের সুবিধা। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই ৪ হাজার ৫০০টি পণ্য বাংলাদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এগুলোকে ইআইএফ (এন্টার ইনটু ফোর্স) শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গবাদি পশু, মাংস, মাছ, রাসায়নিক দ্রব্য, বস্ত্র, যন্ত্রপাতি ও নানা শিল্পপণ্য।

মার্কিন শিল্পপণ্য রপ্তানিতে অ-শুল্ক বাধা অপসারণ

চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য রপ্তানিতে অশুল্ক-বাধা কমানোর ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এমনভাবে আমদানি লাইসেন্সিং নীতির প্রয়োগ করতে পারবে না, যাতে সেসব পণ্যের আমদানি বাধাগ্রস্ত হয়। (আর্টিকেল ২.২) মার্কিন শিল্প ও চিকিৎসা পণ্য সে দেশে অনুমোদিত হলেও বাংলাদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে আবার পরীক্ষা ও বিপণন অনুমোদন নিতে হতো। যুক্তরাষ্ট্র এটাকে অ-শুল্ক বাধা হিসেবে চিহ্নিত করে দূর করার প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের কাছ থেকে আদায় করেছে। (অ্যানেক্স ৩, সেকশন ১) এর ফলে বাংলাদেশকে যেসব ছাড় দিতে হবে তার মধ্যে রয়েছে—চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধের ক্ষেত্রে এফডিএ সনদ ও পূর্ববর্তী বিপণন অনুমোদন গ্রহণ করা (আর্টিকেল ১.১, অ্যানেক্স ৩); মার্কিন ফেডারেল মোটরযান নিরাপত্তা ও নির্গমন মান অনুযায়ী নির্মিত যানবাহন গ্রহণ করা (আর্টিকেল ১.২, অ্যানেক্স ৩); এবং মার্কিন পুনঃ উৎপাদিত পণ্য বা যন্ত্রাংশের ওপর যে কোনো আমদানি নিষেধাজ্ঞা বা লাইসেন্সিং শর্ত তুলে নেওয়া (আর্টিকেল ১.৩, অ্যানেক্স ৩)।

মার্কিন কৃষি ও জৈব প্রযুক্তি পণ্যের রপ্তানিতে অ-শুল্ক বাধা অপসারণ

অ-শুল্ক বাধা দূর করার নামে মার্কিন কৃষি ও জৈব প্রযুক্তি পণ্যের প্রবেশের ক্ষেত্রেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। (অ্যানেক্স ৩, সেকশন ১) প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে রয়েছে: মার্কিন খাদ্য ও কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি ব্যবস্থা এবং অন্যান্য মানদণ্ডকে বাংলাদেশের মানদণ্ডের বিকল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া (আর্টিকেল ১.৪, অ্যানেক্স ৩); মাংস-পোলট্রি-ডিম ইত্যাদির ক্ষেত্রে ইউএসডিএ ফুড সেফটি অ্যান্ড ইন্সপেকশন সার্ভিসের মানদণ্ডকে স্বীকৃতি দেওয়া (আর্টিকেল ১.৫, অ্যানেক্স ৩); চুক্তি স্বাক্ষরের ২৪ মাসের মধ্যে এমন নীতিমালা তৈরি করা যেন যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপদ বলে স্বীকৃত বায়োটেকনোলজি বা জৈবপ্রযুক্তি পণ্য বিনা পরীক্ষা ও বাড়তি কোনো লেবেলিং ছাড়াই বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে (আর্টিকেল ১.৬, অ্যানেক্স ৩); যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঞ্চলের পোলট্রি খাত এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে আক্রান্ত অঞ্চলের ১০ কিমির বেশি দূরত্বের পোলট্রি পণ্যের ওপর আমদানি নিষেধাজ্ঞা না দেওয়া (আর্টিকেল ১.৮, অ্যানেক্স ৩) ইত্যাদি। এসব কথিত অ-শুল্ক বাধা দূর করার অর্থ হলো খাদ্য ও কৃষিপণ্য আমদানিতে জৈব নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষমতা হারানো। আগে মার্কিন তুলা দেশে আসার পর পোকা মারার রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতো। এখন সেটা সম্ভব হবে না। বিতর্কিত জেনিটিক্যালি মোডিফাইড পণ্য আমদানিতে বাধা দেওয়া যাবে না, এমনকি লেবেল দিয়ে চিহ্নিতও করতে বাধ্য করা যাবে না, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাড়তি খরচে বাধ্যতামূলক পণ্য আমদানি

চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কিনতে হবে। আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার মার্কিন জ্বালানি, বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনতে হবে। সেইসঙ্গে ৩৫০ কোটি ডলার বা ৪২ হাজার কোটি টাকার মার্কিন কৃষিপণ্য কিনতে হবে। এর মধ্যে গম কিনতে হবে প্রতি বছর ৭ লাখ টন হারে ৫ বছর ধরে। সয়াবিন কিনতে হবে এক বছরের মধ্যে ১২৫ কোটি ডলার বা ২৬ লাখ টন পরিমাণ। এ ছাড়া বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনাকাটা বাড়াতে হবে এবং অন্য দেশ থেকে কেনা কমাতে হবে। (সেকশন ৬, অ্যানেক্স ৩) 

বাংলাদেশ প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কৃষি ও জ্বালানি পণ্য আমদানি করলেও খরচ ও সময় বেশি লাগায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলনামূলক কম আমদানি করা হতো। এখন চুক্তি অনুসারে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে পণ্য আমদানি বাড়াতে হলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে তুলনামূলক কম দরে ও কম সময়ে পণ্য আমদানি থেকে বঞ্চিত হতে হবে। এর ফলে দেশ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীদেরকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়াতে হলে ভর্তুকি বা বিশেষ সুবিধা দিতে হতে পারে। সামরিক সরঞ্জাম আমদানি বাড়াতে হলে বাড়তি খরচের পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিও বাড়বে।

যুক্তরাষ্ট্রকে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মতো সুবিধা প্রদান

চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ খনিজ সম্পদ উত্তোলন ও রপ্তানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের সহযোগিতা করতে হবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন, টেলিকমিউনিকেশন, পরিবহন ও অবকাঠামো খাতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সমান সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে হবে। (আর্টিকেল ৫.১) এ ছাড়া তেল-গ্যাস, বিমা ও টেলিযোগাযোগ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজি বিনিয়োগে কোনো সীমা আরোপ করা যাবে না। (আর্টিকেল ১.১৬, অ্যানেক্স ৩) বর্তমানে দেশি-বিদেশি বেসরকারি কোম্পানি কর্তৃক রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বিমা করপোরেশনে ৫০ শতাংশ পুনর্বিমা করার যে বাধ্যবাধকতা আছে তা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমা কোম্পানিকে ছাড় দিতে হবে। (আর্টিকেল ১.১৫, অ্যানেক্স ৩)

যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাংলাদেশের দেশীয় প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেক বেশি। এসব বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানকে যদি দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সমান সুযোগ-সুবিধা দিতে হয় তাহলে দেশীয় খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ছাড়া এসব খাতের ওপর দেশের স্বার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ খর্ব হবে। যেমন দেশে গ্যাস সংকট থাকার পরও যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিকে গ্যাস রপ্তানির অনুমোদন দিতে হবে।

দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি ও সুরক্ষা দিতে বাধা

আর্থিক ও প্রযুক্তিগত ঘাটতি মোকাবিলার জন্য উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে অনেক দেশীয় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকি ও প্রণোদনা দিতে হয়। নতুবা কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কৌশলগত খাতে বিদেশ নির্ভরতা বাড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশকে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে অ-বাণিজ্যিক সহায়তা বা অন্য কোনো ধরনের ভর্তুকি প্রদান থেকে বিরত থাকতে হবে। শুধু তাই নয়, দেশের ভেতরের সমস্ত ম্যানুফ্যাকচারিং প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকি ও প্রণোদনার তথ্য যুক্তরাষ্ট্রকে জানাতে হবে এবং বাজারের প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করে এমন ভর্তুকি বন্ধ করতে হবে। (আর্টিকেল ৫.২) শুধু তাই নয়, বাংলাদেশকে যত দ্রুত সম্ভব মৎস্য খাতে ভর্তুকি বিষয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চুক্তি মেনে চলতে হবে এবং মৎস্য খাতে ‘ক্ষতিকর’ ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ও ভর্তুকি ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। (আর্টিকেল ১.২৩, অ্যানেক্স ৩) চুক্তি কার্যকর হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় সব ধরনের ভর্তুকির তথ্য জমা দিতে হবে। (সেকশন ৬, অ্যানেক্স ৩)

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা-জালে জড়ানো

চুক্তির নামে পারস্পরিক বাণিজ্যের কথা বলা হলেও এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে। চুক্তি অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্র যদি জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় সীমান্ত বা বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেয়, তাহলে বাংলাদেশকেও তাদের সঙ্গে মিল রেখে ‘পরিপূরক বিধিনিষেধ’ গ্রহণ করতে হবে। (আর্টিকেল ৪.১) বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘন ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এর ফলে বৃহৎ শক্তিগুলোর দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ নিরপেক্ষ থাকতে পারবে না, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা বা বাণিজ্যযুদ্ধে বাংলাদেশকে কার্যত একই অবস্থানে দাঁড়াতে হবে।

এ ছাড়া বাংলাদেশের বন্দর, টার্মিনাল, লজিস্টিক নেটওয়ার্কে এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে যেন তৃতীয় দেশের কাছে তথ্য পাচার না হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর এমন সফটওয়্যার ব্যবহার সীমিত করতে হবে। (আর্টিকেল ১- ৫, সেকশান ৩)

তৃতীয় দেশের সঙ্গে চুক্তি ও বাণিজ্যে বাধা

যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে চুক্তিতে এমনসব শর্ত রাখা হয়েছে যা বাংলাদেশের স্বাধীন স্বার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করবে। চুক্তি অনুসারে, বাংলাদেশ তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি বা সমঝোতায় যেতে পারবে না যেখানে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন, বৈষম্যমূলক বা পক্ষপাতমূলক কারিগরি মানদণ্ড থাকবে এবং যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। (আর্টিকেল ২.৩) যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়–এমন কোনো ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করতে পারবে না। (আর্টিকেল ৩.২) শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ যদি ‘অ-বাজারভিত্তিক’ কোনো দেশ (যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনায় চীন ও রাশিয়া)-এর সঙ্গে এমন কোনো মুক্ত বাণিজ্য বা অগ্রাধিকারমূলক অর্থনৈতিক চুক্তি করে, যা এই চুক্তিকে অবমূল্যায়ন করে; তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি বাতিল করে আবার শাস্তিমূলক উচ্চ শুল্ক আরোপ করতে পারবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, জ্বালানি রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনতে পারবে না, যে দেশ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত। তবে এমন যেসব পণ্যের কোনো বিকল্প সরবরাহকারী বা প্রযুক্তি নেই, অথবা এই চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই যেসব পণ্যের চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে ছাড় পাওয়া যাবে। (আর্টিকেল ৪.৩) 

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার বাণিজ্য চুক্তির তুলনা

কর সুবিধাবিষয়ক অভিযোগ

বাংলাদেশ: যুক্তরাষ্ট্র তার রপ্তানির ওপর কর ছাড় দিলে বা কর না নিলে বাংলাদেশ তার বিরুদ্ধে কোনো পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে না বা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) কোনো অভিযোগ করবে না। (আর্টিকেল ২.১)

মালয়েশিয়া: কোনো পক্ষই অন্য পক্ষের এই ধরনের কর নীতির বিরুদ্ধে ডব্লিউটিও-তে অভিযোগ করবে না। (আর্টিকেল ২.১)

মন্তব্য: মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে ডব্লিউটিও-র কাছে অভিযোগ না জানানোর শর্তটি যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়া উভয় দেশের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি একতরফা। এ ছাড়া মালয়েশিয়ার চুক্তিতে পাল্টা পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার কোনো অঙ্গীকার নেই।

ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি

বাংলাদেশ: বাংলাদেশ যদি অন্য দেশের সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি করে যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি বাতিল করে আবার উচ্চ শুল্ক আরোপ করতে পারবে। (আর্টিকেল ৩.২)

মালয়েশিয়া: মালয়েশিয়া অন্য দেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি করার আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করবে। (আর্টিকেল ৩.৩)

মন্তব্য: বাংলাদেশ কার্যত যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি বাতিল করার ক্ষমতা দিয়েছে। মালয়েশিয়া শুধু আলোচনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ফলে মালয়েশিয়া নিজের পররাষ্ট্র বাণিজ্য নীতির স্বাধীনতা বেশি ধরে রেখেছে।

ডিজিটাল কনটেন্টে শুল্ক

বাংলাদেশ: বাংলাদেশ ডিজিটাল কনটেন্টে কোনো শুল্ক আরোপ না করার অঙ্গীকার করেছে। (আর্টিকেল ৩.৩)

মালয়েশিয়া: উভয় দেশ ডিজিটাল কনটেন্টে কোনো শুল্ক আরোপ না করার অঙ্গীকার করেছে। তবে চুক্তিতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার গ্যাট চুক্তির নিয়ম মেনে অভ্যন্তরীণ কর বা ফি আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে। (আর্টিকেল ৩.৫)

মন্তব্য: মালয়েশিয়া ভবিষ্যতে ডিজিটাল কন্টেন্ট থেকে রাজস্ব সংগ্রহের সুযোগ রেখে দিয়েছে। বাংলাদেশ সেই সুযোগ হাতছাড়া করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা অনুসরণ

বাংলাদেশ: যুক্তরাষ্ট্র যদি অর্থনৈতিক বা জাতীয় নিরাপত্তার কারণে কোনো বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেয়, বাংলাদেশকে তার সঙ্গে মিল রেখে একই ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে। (আর্টিকেল ৪.১-১)

মালয়েশিয়া: যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে অথবা ব্যবস্থা গ্রহণের সময়সীমা ঠিক করবে। এই ব্যবস্থা দুই দেশের যৌথ অর্থনৈতিক বা জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে সদিচ্ছা ও পারস্পরিক অঙ্গীকারের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। (আর্টিকেল ৫.১-১)

মন্তব্য: বাংলাদেশ বাধ্যতামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করার অঙ্গীকার করলেও মালয়েশিয়া এরকম একতরফা কোনো অঙ্গীকার করেনি। আলোচনার সুযোগ রেখেছে এবং নিষেধাজ্ঞা অনুসরণের ক্ষেত্রে দুই দেশের যৌথ অর্থনৈতিক বা জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলার শর্ত দিয়েছে।

বিদ্যমান অধিকারের স্বীকৃতি

বাংলাদেশ: বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বিদ্যমান অধিকারগুলোর কোনো স্বীকৃতি চুক্তিতে নেই।

মালয়েশিয়া: যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়া উভয়েই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অধীন থাকা তাদের অধিকার এবং দায়িত্বগুলো মেনে চলবে। এর মধ্যে রয়েছে একটি দেশের সেই বিশেষ ক্ষমতা বা অধিকার, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারে, অন্যায্য ব্যবসা বা বাণিজ্য বন্ধ করতে পারে এবং জনগণের স্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। (আর্টিকেল ৭.১)

মন্তব্য: বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে অধিকারগুলোর স্বীকৃতি আদায়ের মাধ্যমে মালয়েশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের অন্যায্য শর্ত মোকাবিলার পথ খোলা রেখেছে।

তৃতীয় দেশের কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ

বাংলাদেশ: তৃতীয় কোনো দেশের কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কম দামে পণ্য রপ্তানি করলে তা ঠেকানোর ব্যবস্থা নিতে হবে বাংলাদেশকে। (আর্টিকেল ৪.১-২)

মালয়েশিয়া: তৃতীয় কোনো দেশের কোম্পানি মালয়েশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কম দামে পণ্য রপ্তানি করলে মালয়েশিয়া নিজস্ব আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। (আর্টিকেল ৫.১-২)

মন্তব্য: বাংলাদেশ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব মেনে নিলেও মালয়েশিয়া নিজস্ব আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।

বিনিয়োগ সুবিধা

বাংলাদেশ: জ্বলানি ও খনিজ সম্পদ উত্তোলন ও রপ্তানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের সহযোগিতা করতে হবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন, টেলিযোগাযোগ, পরিবহন ও অবকাঠামো খাতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সমান সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে হবে। (আর্টিকেল ৫.১) তেল-গ্যাস, বিমা ও টেলিযোগাযোগ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজি বিনিয়োগে কোনো সীমা আরোপ করা যাবে না। (আর্টিকেল ১.১৬, অ্যানেক্স ৩) 

মালয়েশিয়া: মালয়েশিয়া নিজস্ব আইন অনুযায়ী খনিজ, জ্বালানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, টেলিযোগাযোগ, পরিবহন ও অবকাঠামো খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ সহজ করবে। (আর্টিকেল ৬.১) মালয়েশিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রপ্তানি নিষিদ্ধ করা থেকে বিরত থাকবে। (আর্টিকেল ৬.২, অ্যানেক্স ৩)

মন্তব্য: মালয়েশিয়া নিজ দেশের আইন অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাংলাদেশের মতো নিজ দেশের কোম্পানির মতো সমান সুযোগ দেওয়ার অঙ্গীকার করেনি, তেল-গ্যাস-বিমা-টেলিযোগাযোগের মতো কৌশলগত খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ সীমা তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়নি এবং তেল-গ্যাসের মতো জ্বালানি রপ্তানি অনুমোদনের অঙ্গীকার করেনি।

ভর্তুকি সংক্রান্ত তথ্য

বাংলাদেশ: যুক্তরাষ্ট্রের লিখিত অনুরোধে বাংলাদেশকে দেশের ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে দেওয়া সব ধরনের ভর্তুকির তথ্য দিতে হবে এবং বাজারের প্রতিযোগিতায় ভর্তুকির ক্ষতিকর প্রভাব প্রশমনের উদ্যোগ নিতে হবে। (আর্টিকেল ৫.২) চুক্তি কার্যকর হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশকে ডব্লিউটিও-র কাছে সব ধরনের ভর্তুকির পূর্ণ বিবরণ জমা দিতে হবে। (সেকশন ৬, অ্যানেক্স ৩)

মালয়েশিয়া: মালয়েশিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে ‘গোপনীয় নয়’ এমন ভর্তুকির তথ্য প্রদান করবে এবং বাজারের প্রতিযোগিতায় ক্ষতিকর প্রভাব প্রশমনের উদ্যোগ নেবে। (আর্টিকেল ৬.২)

মন্তব্য: মালয়েশিয়া শুধু গোপনীয় নয়, এমন ভর্তুকির তথ্য যুক্তরাষ্ট্রকে প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এবং ডব্লিউটিও-কে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভর্তুকির তথ্য দেওয়ার কোনো অঙ্গীকার না করে দেশীয় শিল্পের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করেছে।

কৃষি প্রযুক্তি পণ্য

বাংলাদেশ: চুক্তি স্বাক্ষরের ২৪ মাসের মধ্যে এমন নীতিমালা তৈরি করতে হবে যেন যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপদ বলে স্বীকৃত বায়োটেকনোলজি বা জৈবপ্রযুক্তি পণ্য বিনা পরীক্ষা ও বাড়তি কোনো লেবেলিং ছাড়াই বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে। (আর্টিকেল ১.৬, অ্যানেক্স ৩)

মালয়েশিয়া: দেশের আইন অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের জৈব প্রযুক্তি পণ্য মালয়েশিয়ার বাজারে প্রবেশে সহযোগিতা করবে। (আর্টিকেল ২.১১, অ্যানেক্স ৩)

মন্তব্য: বাংলাদেশ জেনেটিক্যালি মডিফাইড কৃষি ও খাদ্যপণ্য আমদানির নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। এমনকি লেবেল দিয়ে চিহ্নিত করতে বাধ্য করতে পারবে না, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। মালয়েশিয়া দেশের আইন অনুযায়ী সহযোগিতার কথা বলে এই বাধ্যবাধকতা পাশ কাটিয়েছে।

কাজেই দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া বেশ কৌশলী অবস্থান নিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কমানোর জন্য বাধ্য হয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করলেও চুক্তির সমস্ত শর্ত বাংলাদেশের মতো একতরফাভাবে মেনে নেয়নি। দক্ষতার সঙ্গে দরকষাকষির মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে চুক্তির শর্তগুলো উভয় পক্ষের জন্য প্রযোজ্য রেখেছে। চুক্তিতে দেশীয় কিংবা আন্তর্জাতিক আইন মানার শর্ত যুক্ত করেছে। অনেক ক্ষেত্রে আলোচনার সুযোগ রেখেছে। অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতাগুলো স্রেফ একতরফা, নিজস্ব আইন বা আন্তর্জাতিক চুক্তির রক্ষাকবচ অনুপস্থিত। মালয়েশিয়ার চুক্তিতে নেই এরকম ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক ধারাও বাংলাদেশের চুক্তিতে রয়েছে। যেমন: বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনাকাটা বাড়াতে হবে এবং অন্য দেশ থেকে কেনা কমাতে হবে। (সেকশন ৬, অ্যানেক্স ৩) যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সমান সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে হবে। (আর্টিকেল ৫.১) চুক্তি কার্যকর হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় সব ধরনের ভর্তুকির তথ্য জমা দিতে হবে। (সেকশন ৬, অ্যানেক্স ৩)

চুক্তির বিভিন্ন ধারা পর্যালোচনা ও মালয়েশিয়ার চুক্তির সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে চুক্তিটিতে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে দেশের অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের হাত-পা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, যা দেশের সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ন করেছে।

বাংলাদেশের করণীয়

চুক্তির বিভিন্ন ধারা পর্যালোচনা ও মালয়েশিয়ার চুক্তির সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে চুক্তিটিতে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে দেশের অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের হাত-পা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, যা দেশের সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ন করেছে। তা ছাড়া যে উচ্চ শুল্ক হ্রাসের কথা বলে চুক্তিটি স্বাক্ষর করা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সেই উচ্চ শুল্ক বাতিল হয়ে যাওয়ায় চুক্তিটির কোনো ভিত্তিও অবশিষ্ট নেই। নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার চুক্তিটি কার্যকর করে যেতে পারেনি। নিয়ম হলো, উভয় দেশে অভ্যন্তরীণ আইনগত অনুমোদন সম্পন্ন হওয়ার পর এবং আনুষ্ঠানিকভাবে নোটিফিকেশন বিনিময়ের ৬০ দিন পর চুক্তিটি কার্যকর হবে। (আর্টিকেল ৬.৬) কাজেই বিএনপি সরকারের সামনে চুক্তিটি কার্যকর না করে বাতিল করার সব ধরনের সুযোগই রয়েছে। সরকারের উচিত জাতীয় স্বার্থে চুক্তিটি বাতিল করা। সেইসঙ্গে দেশের জনপন্থি রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে দেশের স্বার্থবিরোধী এই চুক্তি বাতিলে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগে সোচ্চার হতে হবে।

কল্লোল মোস্তফা: লেখক, গবেষক। ই-মেইল: kallol_mustafa@yahoo.com

সহায়ক রচনাপঞ্জি

অনামা ২০২৬ক ।। ‘রপ্তানির ক্ষতি এড়াতে নানা শর্তের বেড়াজালে দেশ’, দৈনিক সমকাল, শাহেদ মুহাম্মদ আলী সম্পাদিত, ঢাকা, ১১ ফেব্রুয়ারি।

অনামা ২০২৬খ ।। ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি জনস্বার্থবিরোধী’, দৈনিক সমকাল, শাহেদ মুহাম্মদ আলী সম্পাদিত, ঢাকা, ১৮ ফেব্রুয়ারি।

অনামা ২০২৬গ।। ‘India-US trade deal: Commerce secretary shares important update; ‘actual signing when new architecture of tariffs in place’’, Times of India, Mar 16

উইল্কি ও অন্যান্য ২০২৫।। Christina Wilkie, Erin Doherty, Lora Kolodny and Kevin Breuninger, ‘Federal trade court strikes down Trump’s reciprocal tariffs’, cnbc, May 28

কাদির ২০২৬।। কাদির কল্লোল, “খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা নিয়ে বিএনপিতেও ‘বিস্ময়’”, বিবিসি নিউজ বাংলা, ১৯ ফেব্রুয়ারি

ব্রয়নিঙ্গার ২০২৬।। Kevin Breuninger, ‘Supreme Court strikes down Trump tariffs, rebuking president’s signature economic policy’, cnbc, Feb 20

ব্রয়নিঙ্গারম্যাঙ্গান ২০২৫।। Kevin Breuninger and Dan Mangan, ‘Most Trump tariffs ruled illegal by appeals court, dealing major blow to trade policy’, cnbc, Aug 29

রাহীদ ২০২৬।। রাহীদ এজাজ, ‘বাণিজ্য চুক্তির বাস্তবায়নসহ আরও যেসব বিষয়ে জোর দিয়ে গেলেন পল কাপুর’, দৈনিক প্রথম আলো, মতিউর রহমান সম্পাদিত, ঢাকা, ৯ মার্চ।

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •