ইরানে মার্কিন-ইজরাইলি আগ্রাসন, বিশ্বব্যবস্থা ও বাংলাদেশ
মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান
ইরানে মার্কিন-ইজরাইলি আগ্রাসনে পুরো বিশ্বই রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ভাবে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তায় পড়েছে। শুধু তাই নয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশে দেশে শুল্ক আরোপে যথেচ্ছাচার, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণ, কিউবায় কয়েক দশকের অবরোধের পর তা দখলের হুমকি, গ্রীনল্যান্ড নিজেদের বলে দাবি করা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের মাস্তান পর্ব শুরু করেছেন। কিন্তু এতে কি বিশ্বব্যবস্থায় তার কর্তৃত্ব শক্ত হচ্ছে না ভেঙে যাচ্ছে? নতুন বিশ্বব্যবস্থার কি লক্ষণ দেখা যাচ্ছে? এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কী করবে? এই বিষয়ে গত ১৮এপ্রিল সর্বজনকথার উদ্যোগে আয়োজিত প্রথম ‘প্রশ্নবোধের আড্ডা’য় আলোচনার সূত্রপাত করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান। সেই আলোচনার সারসংক্ষেপ এখানে দেয়া হলো। অনুলিখন করেছেন নিশাত তাসনিম।
মার্কিন ও ইজরাইল বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অজুহাতে যুদ্ধ শুরু করেছে। কখনো বলেছে রেজিম পরিবর্তন, কখনো বলেছে পারমানবিক বোমা কিংবা প্রিএম্পটিভ স্ট্রাইক (অনুমিত আক্রমণ বন্ধে আগে আক্রমণ করা)। তার মানে হচ্ছে নির্দিষ্ট কোন কারণে আসলে আক্রমণটা হয়নি। এখানে আমি তিনটি বিষয়কে সামনে আনতে চাই। এই যুদ্ধে আসলে আক্রমণকারীদের ঘোষিত কোন লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। এমনকি ইসলামাবাদ সম্মেলনেও কোন ফলাফল আসেনি। কিন্তু অন্য সময়ের তুলনায় এবার যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রশক্তি অনেকেই এই যুদ্ধ এড়িয়ে যেতেই বেশী আগ্রহী ছিল। যেমন বৃটেনের কথা যদি বলি, ফ্রান্স কিংবা স্পেন তো যুদ্ধবিরোধী অবস্থানকে বেশ স্পষ্টই করেছে। যেটা আসলে ইউরোপের সাথে ইউএসএ-র সম্পর্কের সনাতনী ধারার স্পষ্ট ব্যতিক্রম।
ঠিক একই ভাবে হরমুজ প্রণালীর যে অস্ত্রিকরণ (উইপেনাইজেশন) আসলে ছোট দেশগুলোর ভূ-রাজনীতিকেও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জায়গায় ফিরিয়ে এনেছে। যেটা হয়েছিল ১৯৫০-এর দশকে সুয়েজ ক্যানেলকে ঘিরে। একই ধরণের প্রবণতা কিন্তু আমরা এখনো দেখছি এই সময়ে। সুয়েজ ক্যানেলকে যদি বিবেচনা করি যে সেই সময়ে ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং ইজরাইলের জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং সে কারণেই কিন্তু বিশেষভাবে ১৯৫৬ সালে ন্যাশনালাইজেশনের মধ্য দিয়ে মিশর তাদের নিয়ন্ত্রণটা রাখে। এর মধ্য দিয়ে ব্রিটেনের যে আধিপত্য তার ক্ষয় স্পষ্ট হয়। এখন হরমুজের ঘটনায় অনেকেই ভাবছেন যে প্যাক্স আমেরিকানার বদলে নতুন বিশ্বব্যবস্থার উৎপত্তি ঘটতে পারে।
চীন এবং রাশিয়া হরমুজ প্রণালী নিয়ে তাদের নিরাপত্তা পরিষদে একদম পশ্চিমাবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। বিশেষ করে নৌ চলাচল নিশ্চিত করার জন্য সামরিকীকরণের যে প্রস্তাব ছিল, যেকোনো উপায় ব্যবহারের সেই প্রস্তাবটিকে কিন্তু তারা সমর্থন দেয়নি বরং বিরোধিতা করেছে। ঠিক একই ভাবে ইসলামাবাদের যে সম্মেলন যাকে আমি অফলপ্রসূ বলছি কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের যে ডাক তাতে চীনও কিন্তু তার প্রচলিত কূটনৈতিক আচরণের ব্যতিক্রম ঘটিয়েছে। বিশেষ করে তারা যখন বলেছে যে তাদের সাথে ইরানের ট্রেড এবং এনার্জি এগ্রিমেন্ট আছে, তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেন অন্য কেউ নাক না গলায় এবং হরমুজ সবার জন্য প্রয়োজনীয়। এরকম বক্তব্য চীনের জন্য প্রথম। আমি চীনকে বলতে চাই একটি নয়া-বেনিয়া রাষ্ট্র যারা শুধু তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ দেখে। বিশেষ করে ভেনেজ্যুয়েলার ব্যাপারে তাদের অবস্থান এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তখন কিন্তু চীন সরাসরি তেমন কোন বিরোধিতা করেনি, কিন্তু হরমুজ প্রণালীর ক্ষেত্রে আমরা তার ব্যতিক্রম দেখলাম।
এই তিনটি বিষয় মাথায় নিলে খুব স্বাভাবিক ভাবেই এই প্রশ্ন আসছে যে, এখন কি আসলে নতুন বিশ্বব্যবস্থার উদ্ভব হচ্ছে কিনা! অনেকেই মনে করছেন যে আসলেই তাই হচ্ছে। তার লক্ষণ হচ্ছে, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে এর এক্টরগুলোর প্রতিক্রিয়া।
এইযে আমরা বিশ্বব্যবস্থার কথা বলছি, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে বিশ্বব্যবস্থাকে কীভাবে দেখে? আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্কলারদের জন্য তিনটি বৈশিষ্ট্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটি হচ্ছে শক্তির বণ্টন কেমন তার ওপর। ইউনিপোলার হবে নাকি বাইপোলার হবে নাকি মাল্টিপোলার হবে তার ওপর। শক্তির বিভাজনটা কীভাবে হয় তার ওপর। সেই সাথে কীধরণের রুলস এন্ড নর্মস প্রতিষ্ঠিত হলো, প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে কাজ করতে শুরু করলো এবং ঠিক একই সাথে এটার মধ্য দিয়ে কী ধরণের প্যাটার্নস অফ ইন্টারেকশন হলো। এই বিষয়গুলো যদি তুলনামূলক ভাবে দীর্ঘ সময় ধরে বলবত থাকে তখন আসলে এটাকে বিশ্বব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
এই বিশ্বব্যবস্থার ধারণাটাকে প্রথম জনপ্রিয় করেছেন ‘দ্যা ওয়ার্ল্ড ইন ডিপ্রেশন’ বইতে চার্লস পি কিন্ডলেবার্গার। উনি এই ধারণাটাকে জনপ্রিয় করেছেন তাঁর ‘হেজেমনিক স্ট্যাবলিটি’ তত্ত্ব দেওয়ার মাধ্যমে। ১৯৩০-এর যে গ্রেট ডিপ্রেশন, সেই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি আলাপ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে একটা ইন্টারন্যাশনাল অর্ডার স্ট্যাবল হবে কিনা এবং শেষ পর্যন্ত সেটা বিশ্বব্যবস্থা হিসেবে টিকে যাবে কিনা এইটা আসলে নির্ভর করে একটা ডমিন্যান্ট স্টেটের লিডারশিপের ওপর। সেইদিক থেকে যে ডমিন্যান্ট পাওয়ার, তার লিডারশিপটা টিকে থাকবে কি থাকবে না এইটা আসলে নির্ভর করে ডমিন্যান্ট পাওয়ারের রাজনৈতিক ভূমিকা, পাবলিক গুডস অফার করার ক্ষমতার (যেটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের জন্য করেছে মার্শাল প্ল্যান, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ-এর মাধ্যমে) উপর।
‘দ্যা ওয়ার্ল্ড ইন ডিপ্রেশন’ এর মাধ্যমেই এই আলাপটা এসেছে যে মার্কিন রেজিম কীভাবে হেজেমনিক হয়ে উঠলো, এদের রাইজ এন্ড ফল কীভাবে হলো। এই আলাপের সাথেই উনি বলেছিলেন, পাবলিক গুড যে তারা অফার করবে সেক্ষেত্রে পাঁচটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ওপেন মার্কেট অফার করছে কিনা, কিংবা লিক্যুইডিটি ক্রাইসিস হলে এক্সটারনাল সাপোর্ট এনশিওর করছে কিনা (যেটা আইএমএফ মাধ্যমে করে), কারেন্সি রিজার্ভের ক্ষেত্রে ওয়ার্ল্ড কারেন্সি (পেট্রো ডলার) হিসেবে কোন কারেন্সিকে প্রোমোট করছে কিনা এবং এর মধ্য দিয়ে রিজার্ভ কারেন্সি সিস্টেমকে স্ট্যাবল করতে পারছে কিনা এবং ম্যাক্রোইকোনোমিক পলিসি ম্যানেজের জন্য কোন ইকোনোমিক ইন্সটিটিউশন আছে কিনা, রুলস এন্ড নর্মস জোরদার করার বিষয়টার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উনি ডমিনেশনের সাথে হেজেমনিক পাওয়ারকে আলাদা করেছেন। ডমিন্যান্ট হলেই হবে না হেজেমনিক হতে হলে তাদের এই ক্যাপাসিটিগুলো থাকতে হবে।
এই একই ধারণা পরবর্তীতে আরও জনপ্রিয় করেছেন রবার্ট ডব্লিউ ফক্স। তবে তিনি এই আলাপটা কিন্ডেলবার্গারের থেকে কিছুটা ভিন্ন ভাবে করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে হেজেমনির হেজেমনিক হয়ে ওঠার পেছনে চারটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। একটা হচ্ছে ডমিন্যান্ট স্টেটের ম্যাটেরিয়াল পাওয়ার (অস্ত্র, অর্থনৈতিক সামর্থ্য), আরেকটি হচ্ছে তার মতাদর্শিক প্রভাব, তার ইন্সটিটিউশন এবং এগুলোর নর্মস তৈরির ক্যাপাসিটি। এখন এইসব বিষয় যদি আমরা বিবেচনায় নেই, তাহলে খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের শুরুর যে আলাপ অর্থাৎ হরমুজকে ঘিরে কিংবা ইরান যুদ্ধকে ঘিরে আমরা যে রেসপন্সগুলো দেখছি তাতে কিন্তু ভিন্ন প্রবণতার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। যার মধ্য দিয়ে এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ যে, এর মানে কি বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে?
আরও প্রশ্ন হচ্ছে বিশ্বব্যবস্থার যদি পরিবর্তন হয় তাহলে সেটা কীধরণের বিশ্বব্যবস্থা? কারো কারো মতে এই পরিবর্তনটি সুনির্দিষ্ট না আবার কারো মতে এটি সুনির্দিষ্ট এবং একধরণের মাল্টিপোলারিটি। মাল্টিপোলারিটি এই অর্থে যে আসলে বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে কোন একক শক্তি এখন আর ডমিন্যান্ট না বা সেরকম কোন রোল প্লে করতে পারছে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে যদি আমরা বিবেচনা করি, তার পাবলিক গুড অফার করার ক্যাপাসিটি যে কাজ করছে না, তার বড় উদাহরণ জাতিসংঘে চাঁদা না দেওয়া, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থায় চাঁদা না দেওয়া কিংবা ন্যাটোর বার্ডেন শেয়ারিং-এর ক্ষেত্রেও তার পিছু হটে যাওয়া, এগুলো কিন্তু তার বড় প্রমাণ। তার সাথে খুব গুরুত্বপূর্ণ, যেটা গ্রামসিকে অনুকরণ করে রবার্ট ফক্স বলেছেন, হেজেমনির একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো তার পক্ষে কনসেন্ট দাঁড় করানোর ক্যাপাসিটি, যা ইউএসএ ইকোনমিক এইডের মধ্য দিয়ে করেছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে ন্যাটোতে তার মিত্র রাষ্ট্রগুলো এখন আর কথামতো কাজ করছে না, এরকম মৌলিক পরিবর্তন কিন্তু আগে কখনো দেখা যায়নি। যার ফলে এটা খুব নিশ্চিত হয়েছে যে আগের যে ব্যবস্থা, যেটাকে আমরা প্যাক্স আমেরিকানা বলছিলাম, সেই ব্যবস্থাটা আর থাকছে না। সেক্ষেত্রে এক ধরণের মাল্টিপোলারিটির এক ধরণের প্রবণতা গ্লোবাল সিস্টেমে এরাইজ করেছে।
তবে মাল্টিপোলারিটির কিছু বিপদজনক দিক আছে। এই বিপদজনক দিকটিকে এখন অনেকেই তুলনা করছে প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ের সাথে। তুলনা করার কারণ হচ্ছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেনের যে অস্থিরতা এবং তার প্রতি অন্য রাষ্ট্রগুলোর যে সহজ আনুগত্য, সেটা কিন্তু আর আগের মতো থাকেনি। পরে ব্রিটেনও সুয়েজ খাল দখলসহ অন্যান্য অনেক ক্রাইসিস একইরকম ভাবে ফেস করছিলো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এখন যা যা দেখা যাচ্ছে তেমনি, যার ফলে অনেকেই এখন এই তুলনা করছে। এই হেজেমনিক ডিক্লাইন যখন হয় তখন গ্লোবাল পাওয়ারের ডিফিউশন হয়। আগের ঐ ইউনিপোলার অবস্থা যখন থাকে না তার মধ্য দিয়ে কিছু কমপিটেটিভ রাষ্ট্র তখন সামনে চলে আসে। সেক্ষেত্রে এখন চীন, রাশিয়া, তুরস্ক আসছে, ভারতও কোন কোন ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় আছে। এবং এর মধ্য দিয়ে গ্রেট পাওয়ার স্ট্র্যাটেজিক কম্পিটিশনটা অনেক ইনটেন্স হয়। আরও বড় একটা বিষয় হচ্ছে অল্টারনেটিভ ইন্সটিটিউশন। যেমন বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এর বিপরীতে এনডিবি কিংবা এআইআইবি এবং জেনারেল ইন্সটিটিউশনের ক্ষেত্রে ব্রিকসসহ অন্যান্য বিষয়গুলা যদি আমরা খেয়াল করি, দেখবো- ইকোনমিক অর্ডারের ক্ষেত্রেও এক ধরণের ফ্র্যাগমেন্টেশন দেখা যাচ্ছে।
নিওলিবারেল কিংবা লিবারেল যে ইকোনমিক অর্ডার আমরা দেখছিলাম সেই জায়গায় ট্র্যাম্পের এই ট্যারিফ আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে ইকোনমিক ন্যাশনালিজম এখন অনেক বেশী শক্তিশালী হয়েছে। যার ফলে ইউএসএ-র যে আদর্শিক লিডারশিপ, সেইটা কিন্তু আর থাকছে না। এধরণের পরিস্থিতিতে ইডিওলজিক্যাল যে ভ্যাকুয়াম তৈরি হয় তার মধ্য দিয়ে অনেক ধরণের এক্সট্রিম ইডিওলজি, ফ্যাসিজম যেটা আমরা প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝে দেখেছিলাম, খুব এক্সট্রিম কিছু ইডিওলজি অনেক বেশী পপুলার হয়ে ওঠে এবং আমরা কিন্তু এখনো সেরকম একটা অবস্থার মধ্যেই আছি। সত্যি সত্যিই আসলে মাল্টিপোলার হয়েছে কিনা সেই ডিবেটটা যে জায়গাতেই থাকুক, একটা জায়গায় সবাই একমত যে গ্লোবাল অর্ডার এখন খুবই ফ্রাগমেন্টেড। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলা দখলের মধ্য দিয়ে এবং ইরানের ওয়ার কিংবা কিউবাকে দখল নেওয়া, মেক্সিকোকে দখল নেওয়া, গ্রীনল্যান্ডকে দখল নেওয়ার চেষ্টার মধ্য দিয়ে এটা খুবই স্পষ্ট যে গ্লোবাল অর্ডার এখন খুবই ফ্রাগমেন্টেড। যার জন্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পপ্যুলিজমের পলিটিক্স, বিশেষ করে ইডিওলজিক্যাল টার্মে, এখন অনেক বেশী প্রমিনেন্ট।
এখন এই মুহূর্তে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের আসলে কী করা উচিৎ? এরকম একটা অস্থির বিশ্বব্যবস্থা, যেখানে মাল্টিপোলারিটির সবরকম সিন্ড্রোম আছে কিন্তু এখনো ফুললি ট্র্যান্সফর্মড হয়নি, ঐ মুহূর্তে আসলে মাল্টিপোলার ওয়ার্ল্ড-এর জন্য কী কী রিস্ক থাকে এবং ঐ রিস্কগুলো বাংলাদেশ কীভাবে সার্ভাইভ করবে? মাল্টিপোলারের ক্ষেত্রে যে রিস্কটা থাকে সেটা হলো মিসক্যালকুলেশন। কখনো কখনো ছোট্ট একটা ঘটনা বিশ্বব্যবস্থাকে অন্যদিকে ঠেলে দিতে পারে। আরেকটা হচ্ছে যে এলাইয়েন্স বিল্ডিং-এর ক্ষেত্রে কোন সুনির্দিষ্ট এলাইয়েন্স গুরুত্বপূর্ণ না। এ সময় শক্তিশালীকে তুষ্ট রাখার একটা প্রবণতা সবার মধ্যে দেখা যায়। এবং একইরকম ভাবে ইডিওলজিক্যাল পোলারাইজেশন হয় এবং ফ্যাসিবাদী তৎপরতা বেড়ে যায়। এবং ইকোনমিক ফ্রাগমেন্টেশন, এইযে প্রোটেকশনিজম আবার ফিরে এসেছে। এবং রাইভালরি অনেক ক্ষেত্রেই বাড়াচ্ছে এবং ইন্টারডিপেন্ডেন্সিকে উইপেনাইজ করা হচ্ছে। ইরান যে কাজটা করেছে হরমুজকে কেন্দ্র করে, সে কিন্তু এই ইন্টারডিপেন্ডেন্সিকেই উইপেনাইজ করেছে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে এধরণের পরিস্থিতিতে কিছু রিভিশনিস্ট পাওয়ার এরাইজ করে। জার্মানি, ইতালি, জাপানকে আমরা দেখেছিলাম ফার্স্ট এবং সেকেন্ড ওয়ার্ল্ডওয়ারের সময়। সেক্ষেত্রে এই সময়ে কোন রিভিশনিস্ট পাওয়ার ইমার্জ করবে কিনা এটাও ভাববার বিষয়। এই সমস্ত কিছু বিবেচনা করলে বাংলাদেশের জন্য আসলে অপশনটা কী?
আমার মতে, যেহেতু এক ধরণের ট্র্যানজিশনের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি এবং মাল্টিপোলার অর্ডারও যদি ইমার্জ করে সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য আসলে ফর্মাল কোন ইডিওলজিক্যাল অথবা ইকোনমিক ব্লকে থাকা গুড ডিসিশন হবে না, বরং অনেক বেশী ইস্যু বেসড কো-অপারেশনে মনোযোগী হওয়া উচিৎ। আমরা যদি ইস্যু ধরে দেখি কোন ইস্যুতে কার সাথে ভালো হবে। যে অফার এক সময় এডিবি বা ওয়ার্ল্ডব্যাংক দিতো অবকাঠামোর জন্য সেটা এখন চীন অফার করে। যার ফলে অনেকেই মনে করছেন চীনের সাথে অবকাঠামোর ক্ষেত্রে কিংবা ম্যানুফ্যাকচারিং-এর ক্ষেত্রে তাদের সাথে সম্পর্ক বাড়ানো। ভারতের ক্ষেত্রে ইন্টারনাল কানেক্টিভিটি, সিকিউরিটির কনসার্নটা আসে আর ওয়েস্টার্ন কান্ট্রিগুলোর ক্ষেত্রে আমাদের একটা বড় এক্সপোর্ট ডেস্টিনেশন হচ্ছে ইউরোপ আর ইউএসএ তাদের সাথেও সিলেক্টিভলি ইস্যু বেইজড কো-অপারেশন রাখা। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্য যা করতে হবে, ইন্টারন্যাশনাল স্কলারদের মতে, কোনরকম স্থায়ী মেম্বারশিপে না যাওয়া। কোল্ডওয়ার স্টাইলে কোন ধরণের এলাইন্সে না যাওয়া এবং এক ধরণের হেজিং মানে আগে থেকেই নিজেকে প্রোটেক্ট করার চেষ্টা করা।
দ্বিতীয় যে অপশনটা বাংলাদেশের জন্য বলা হয় যে এক ধরণের ইকোনমিক স্পেকট্রাম, বিশেষ করে এখানে ইকোনমিক ডাইভার্সিফিকেশনের কথা আসে, মাল্টিপল সাপ্লাই চেইনে কম্পিট করা (চীন, ভারত, আশিয়ান এগুলোকে মাথায় নিয়ে), আর এখন যেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ক্যাপাসিটি গ্রো করা মানে লজিস্টিক ক্যাপাবিলিটি। ঠিক একই ভাবে চীন-ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের যে ডিনামিক্স, এর সাথে ব্যালান্স করা, বিশেষ করে সিকিউরিটি, বর্ডার স্ট্যাবলিটি এগুলোর ক্ষেত্রে ভারতের সাথে এবং যেই কথাটা আগেই বললাম এক্সপোর্ট এবং সিকিউরিটি বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক ঘিরে।
আরেকটা বড় আলাপ আছে যে, গ্লোবাল যে নমর্সগুলা সেগুলো যেহেতু আগের মতো নেই এবং হেজেমনিক এবসেন্স আছে সেক্ষেত্রে রিজিওনাল ব্যাপারে অনেক বেশি মনোযোগী হওয়া। যেমন সার্ক, আশিয়ান প্লাস যেগুলো আছে সেগুলোতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানো। আরেকটা বিষয় নিয়ে অনেকেই বলছেন যে, খুব নর্মস এলিমেন্ট আবার ইউনিভার্সাল এপিল আছে যেমন ক্লাইমেট, ডেভেলপমেন্ট এসব ইস্যুতে আরও এনগেজ হওয়া। এগুলোকে মোরাল ডিপ্লোম্যাসি বলে।
খুব গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে অতিনির্ভরশীলতা কাটানো। যেহেতু এই মাল্টিপোলার বিশ্বে এক্সটারনাল ভালনারেবিলিটিটা বেড়ে যায় তাতে ইন্টারডিপেন্ডেন্সিটাও উইপোনাইজ হয়, যার ফলে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এক্সটার্নাল স্টেটের ওপর ওভারডিপেন্ডেন্সি কমানো, বিশেষ করে এনার্জি ইস্যুতে। সেক্ষেত্রে এনার্জির অল্টারনেটিভ সোর্সেস, পার্টিকুলারলি রিনিউএবল এনার্জিতে মনোযোগী হওয়া এবং একই সাথে ক্লাইমেটসহ, ডিজিটাল ইকোনমির সাথে এক ধরণের ফ্লেক্সিবল রুটিনের মাধ্যমে এনগেজ হওয়া। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো বাংলাদেশের জন্য আমার মনে হয় বেটার অপশন।
ডক্টর মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: tanzim.ir@du.ac.bd
