কুইয়ার ও লৈঙ্গিক বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর ভোট ও রাজনৈতিক প্রত্যাশা

কুইয়ার ও লৈঙ্গিক বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর ভোট ও রাজনৈতিক প্রত্যাশা

জরিপ প্রতিবেদন

বাংলাদেশে  ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে LGBTQIA+, হিজড়া ও লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর সম্ভাব্য রাজনৈতিক অবস্থান ও দিকনির্দেশনা প্রাথমিকভাবে বোঝার উদ্দেশ্যে এর আগে একটি ক্ষুদ্র অনলাইন জরিপ পরিচালিত হয়। ২৫ জানুয়ারি থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে ১২০টি উত্তর সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। তার ওপর একটি প্রাথমিক জরিপ প্রতিবেদন এখানে প্রকাশ করা হচ্ছে। প্রতিবেদন তৈরি করেছেন- হাসিবুর রহমান হাসিব, আমিনা সুলতানা সোনিয়া এবং নির্ণয় ইসলাম। 

ভূমিকা

এই জরিপটি কুইয়ার, ট্রান্স, নন-বাইনারি ও হিজড়া সহ লিঙ্গ ও যৌন বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, ভোটের পছন্দ এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তাদের প্রত্যাশা বোঝার জন্য পরিচালিত হয় যাতে নীতিনির্ধারণ ও গণআলোচনায় তাদের কণ্ঠস্বর প্রতিফলিত হয়। 

দীর্ঘদিনের প্রান্তিক অবস্থান ও ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর সহিংসতা, অপপ্রচার ও সংগঠিত আক্রমণে তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে টার্গেট করার প্রেক্ষাপটে জরিপ করা করেছে। এ সময় LGBTQIA+ অধিকারকর্মী মুনতাসির রহমানকে এনসিপি দল গঠনের পর সেখান থেকে বাদ দেওয়া হয়। শিলা চাকমা যিনি জুলাই অভ্যুত্থানের সময় বহু মানুষকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন, তাকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। শুধুমাত্র ট্রান্স নারী হওয়ার কারণে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পরও, সাহারা চৌধুরীকে মবের চাপে মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি থেকে বহিষ্কার করা হয়। তিনি LGBTQIA+ মানুষের বিয়ের অধিকার নিয়ে একাধিক আন্দোলনে নেতৃত্ব ও প্রেরণা জুগিয়েছিলেন।

জুলাই অভ্যুত্থান, শহীদতত্ত্ব, নগর পরিকল্পনা, নারীবাদ(সমূহ) এবং অন্যান্য সামাজিক প্রশ্নে LGBTQIA+ মানুষের দৃশ্যমান উপস্থিতি নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কেবল মতপার্থক্য বা তর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সহিংসতার মাধ্যমে এই উপস্থিতিকে মুছে ফেলার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। এই প্রেক্ষাপটে, ত্রয়োদশ নির্বাচনকে ঘিরে সকল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সীমাবদ্ধতা, আশঙ্কা ও আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হওয়ার মুহূর্তে, LGBTQIA+, হিজড়া ও লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় মানুষের মতামত, রাজনৈতিক অবস্থান ও অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ করা সময়োপযোগী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়।

পদ্ধতি, গবেষকের দৃষ্টিভঙ্গি ও সীমাবদ্ধতা

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য রাজনৈতিক অবস্থান ও দিকনির্দেশনা প্রাথমিকভাবে বোঝার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে LGBTQIA+, হিজড়া ও লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর একটি ক্ষুদ্র অনলাইন জরিপ পরিচালিত হয়; প্রায় ২০০০ জনের কাছে জরিপটি পৌঁছানোর চেষ্টা করা হলেও ২৫ জানুয়ারি থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে মাত্র ১২০টি উত্তর সংগ্রহ করা সম্ভব হয়, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা ছিলেন ভোটদানে সক্ষম ব্যক্তি (প্রবাসীসহ) এবং তারা ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার ইত্যাদির মাধ্যমে প্রচারিত গুগল ফর্মে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে অংশ নেন। গবেষণাটি পরিচালনায় আস্থা ও সম্পর্কভিত্তিক নেটওয়ার্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং গবেষকদলের মধ্যে দুইজন ট্রান্স এক্টিভিস্ট ও একজন ফেমিনিস্ট এক্টিভিস্ট (ally) ছিলেন, যাদের দীর্ঘদিনের কমিউনিটি-ভিত্তিক অভিজ্ঞতা গবেষণাকে সংবেদনশীল ও প্রেক্ষিত-সচেতন করেছে; পাশাপাশি লিঙ্গ-সংক্রান্ত পরিভাষা ব্যবহারে সচেতনতা রাখা হয়, যাতে অংশগ্রহণকারীদের আত্মপরিচয়ের বৈচিত্র্য সম্মানিত হয় এবং ‘সিস-দৃষ্টি’ আরোপিত না হয়। তবে গবেষণাটি কিছু সীমাবদ্ধতার মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে যেমন অনলাইন বিদ্বেষমূলক পরিবেশ, ট্রান্সফোবিয়া ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অংশগ্রহণ কমে যাওয়া, নির্বাচনের আগে প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক ঘটনার প্রভাব, এবং ভোট না দেওয়ার জন্য আলাদা অপশন না থাকা। তথ্যের সীমাবদ্ধতার ফলে এটি একটি প্রাথমিক চিত্র হিসেবে বিবেচ্য, যা এই জনগোষ্ঠীর নির্বাচন-সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির একটি সাধারণ ধারণা প্রদান করে।

অংশগ্রহণকারীদের জনতাত্ত্বিক অবস্থান/ডেমোগ্রাফিক প্রোফাইল

 

লিঙ্গ পরিচয়,  যৌন অভিমুখিতা ও ভৌগোলিক অবস্থান  

১২০ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে লিঙ্গ পরিচয়ে বৈচিত্র্য দেখা যায়, যেখানে নন-বাইনারী (২৬.৭%) ও কুইয়ার (২৭.৫%) সবচেয়ে বেশি; এছাড়া ট্রান্স নারী (১০.৪%), ট্রান্স পুরুষ (৯.২৯%), হিজড়া (৬.৭%), পুরুষ (২১.৭%), নারী (৫.৮%), সিসজেন্ডার পুরুষ (৫.৮%), সিসজেন্ডার নারী (১.৭%), “মানুষ” হিসেবে জেন্ডার-নিরপেক্ষ পরিচয় (১২.৫%) এবং আন্তঃলিঙ্গ (১.৭%) অন্তর্ভুক্ত। যৌন অভিমুখের ক্ষেত্রে সমকামী নারী ও পুরুষ সর্বাধিক (৪১.৭%), এরপর বাইসেক্সুয়াল (১৮.৩%), প্যানসেক্সুয়াল (১৩.৩%), বিষমকামী (১৫.৭%), এসেক্সুয়াল (৫%) এবং অন্যান্য বা উল্লেখ করতে অনিচ্ছুক (৪.৮%)। 

অংশগ্রহণকারীদের ভৌগোলিক অবস্থান  ঢাকা ৭০ (৫৮.৩%), চট্টগ্রাম ১৪ (১১.৭%), খুলনা ৮ (৬.৭%), রাজশাহী ৭ (৫.৮%), রংপুর ৬ (৫%), সিলেট ৪ (৩.৩%), ময়মনসিংহ ৩ (২.৫%), বরিশাল ২ (১.৭%) এবং প্রবাস/অন্যান্য ৬ (৫%)।

গণভোটে অবস্থান ও রাজনৈতিক দলীয় পছন্দ

গণভোটে ১২০ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ৫৭ জন (৪৭.৫%) ‘হ্যাঁ’ এবং ৬৩ জন (৫২.৬%) ‘না’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। রাজনৈতিকভাবে, ৫৬ জন (৪৬.৭%) বিএনপি, ৬ জন (৫%) বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি, ৫ জন (৪.৫%) বাসদ, বাকি কিছু অংশ জামায়াত, জাতীয় পার্টি, স্বতন্ত্র প্রার্থী ও অন্যান্য পার্টিকে সমর্থন করেছেন। এবং ভোট দিতে যাবেন না , যোগ্য পার্থী নেই, আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেন ও ট্রান্সজেডার হওয়ার কারণে ভোট দিতে যেতে পারবেন না (এনাইডি সম্পর্কিত সমস্যা ) ৩৯ জন (৩১.২%)। কিছু অংশগ্রহণকারী ভোট দিতে পারবেন না বা যেতে চাইছেন না, প্রধান কারণ হলো যোগ্য প্রার্থী নেই বা সমর্থিত দল নির্বাচন থেকে বাইরে। এছাড়া ট্রান্স ও হিজড়া ব্যক্তিদের জন্য এনআইডি সংক্রান্ত জটিলতা, নাম বা লিঙ্গের অমিলের কারণে ভোটকেন্দ্রে হয়রানি ও বৈষম্যের আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ভোট না দেওয়ায় কেবল রাজনৈতিক অনাগ্রহ নয়, বরং কাঠামোগত ও পরিচয়ভিত্তিক প্রতিবন্ধকতা প্রভাবিত করছে।

কিছু অংশগ্রহণকারী ভোট দিতে পারবেন না বা যেতে চাইছেন না, প্রধান কারণ হলো যোগ্য প্রার্থী নেই বা সমর্থিত দল নির্বাচন থেকে বাইরে। এছাড়া ট্রান্স ও হিজড়া ব্যক্তিদের জন্য এনআইডি সংক্রান্ত জটিলতা, নাম বা লিঙ্গের অমিলের কারণে ভোটকেন্দ্রে হয়রানি ও বৈষম্যের আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ভোট না দেওয়ায় কেবল রাজনৈতিক অনাগ্রহ নয়, বরং কাঠামোগত ও পরিচয়ভিত্তিক প্রতিবন্ধকতা প্রভাবিত করছে।

ভোটাধিকার এবং আগামী সরকারের প্রতি প্রধান প্রত্যাশা এবং  চিন্তা 

১. কৌশলগত ভোট ও ‘কম ক্ষতিকর’ বিকল্প

অনেক অংশগ্রহণকারী ভোটকে আদর্শিক বা ইতিবাচক রাজনৈতিক সমর্থনের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং কৌশলগতভাবে গ্রহণযোগ্য “কম ক্ষতিকর” বিকল্প হিসেবে দেখেছেন। ভোটের সিদ্ধান্ত প্রায়শই নির্ভর করছে কোন দলকে ভোট দেওয়া উচিত এবং কোন দলকে  উচিত নয়- এক প্রকার বাধ্যতামূলক রাজনৈতিক সমন্বয়। যেমন কেউ উল্লেখ করেছেন: “BNP is the lesser of two evils.” এখানে ভোট একটি কৌশলগত, অস্তিত্বগত বা সুরক্ষার বিষয় হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে ভোটাররা রাজনৈতিক আদর্শের চেয়ে বাস্তববাদী সমাধান বেছে নিচ্ছেন।

২. নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা 

লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় সহিংসতা থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করার ব্যাপক উদ্বেগ লক্ষ্য করা গেছে। অংশগ্রহণকারীরা মব সহিংসতা, গুম-খুন, ভিন্নমত দমন, এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশের অভাবকে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদিও অনেকেই আগামী সরকারের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তনের আশা করেননি, তবুও তারা কিছু মৌলিক বিষয় নিয়ে রাষ্ট্রের পদক্ষেপ কামনা করেছেন।

অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতা ও উদ্বেগ কেবল বর্তমান নিরাপত্তা সংক্রান্ত নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবেশ এবং রাজনৈতিক অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন তারা উল্লেখ করেছেন, “গত দুই বছরে মব সহিংসতার বিচার, ইসলামোফ্যাসিস্টদের জবাবদিহিতায় রাখা” এবং “We just want peace and respect and proper care, not a dictatorship.” ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অভাব এবং সামাজিক হুমকি তাদের জন্য বাস্তব অস্তিত্বগত সমস্যা তৈরি করছে, যা ভোট ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। 

কিছু অংশগ্রহণকারী সরাসরি আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করেছেন, যা গভীর মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের সূচক। যেমন একজন লিখেছেন: “I am gonna kill myself after Eid.” অন্য একজন জানিয়েছেন: “জবাই দেয়ার আগে আমার বডি পার্টস কাইটা ফালাক,” এই মন্তব্যগুলো নির্দেশ করে যে ব্যক্তিরা চরম মানসিক চাপ, পরিচয়গত সংকট এবং জীবনের অস্তিত্ব নিয়ে ভয় বা হতাশার মধ্যে রয়েছে। 

একজন লিখেছেন: “I am gonna kill myself after Eid.” অন্য একজন জানিয়েছেন: “জবাই দেয়ার আগে আমার বডি পার্টস কাইটা ফালাক,” এই মন্তব্যগুলো নির্দেশ করে যে ব্যক্তিরা চরম মানসিক চাপ, পরিচয়গত সংকট এবং জীবনের অস্তিত্ব নিয়ে ভয় বা হতাশার মধ্যে রয়েছে।

৩. লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর অধিকার (LGBTQ+, ট্রান্স, হিজড়া, আন্তঃলিঙ্গ) 

বাংলাদেশের লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর মধ্যে আইনি স্বীকৃতি, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার বিস্তৃত পরিসরে দাবি জানানো হয়েছে। যেমন এক ব্যক্তি উল্লেখ করেছেন, “বৈচিত্র্যময় মানুষদের আইনী অধিকার ও সুরক্ষা দিতে হবে”, অন্যজন বলেছেন, “আমাদের জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার, নাম, বিবাহ, আইনি সহায়তা চাই”, এছাড়া ট্রান্স জনগোষ্ঠীর জন্য লিগ্যাল ডকুমেন্ট সংশোধনের সহজীকরণের প্রয়োজনও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

নিরাপত্তা এবং বৈষম্যবিরোধী পরিবেশ সৃষ্টির ওপরও অংশগ্রহণকারীরা গুরুত্বারোপ করেছেন। তারা চেয়েছেন, সকল লিঙ্গের মানুষের জন্য সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক এবং সমাজে তাদের জীবনধারা সহজ ও সম্মানজনক হোক। উদাহরণস্বরূপ, “সকল লিঙ্গের মানুষের জন্য সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত করবে” এবং “Queer কমিউনিটির মানুষের জীবনধারা সহজ করা হোক।” এছাড়া ট্রান্স ব্যক্তিরা নিজেদের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন: “ আশা করি আমি হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি করতে পারবো , আমাকে ক্রিমিনালাইজ করবে না কারন আমি ট্রান্স” এবং বাস্তব জীবনের হুমকির উদাহরণ দিয়েছেন, যেমন, “জামায়াত আসলে রাস্তা ঘাটে  জামায়াত/শিবিররা আমাকে জিজ্ঞেস করবে আমি ব্যাগি ( এক ধরনের পোশাক) কেন পরেছি।” 

স্বাস্থ্যসেবা এবং চিকিৎসা অধিকার সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ দাবি উঠেছে। অংশগ্রহণকারীরা ট্রান্স স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছেন, যেমন “Make trans healthcare accessible.” এছাড়া চিকিৎসক ট্রান্স নারী হিসেবে জীবিকা নির্বাহ এবং সেবা প্রদান করার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন: “আমি একজন চিকিৎসক ট্রান্স নারী, এই দেশেই চাকরি করতে এবং বাঁচতে চাই”। 

কর্মসংস্থান এবং সামাজিক মর্যাদা সম্পর্কেও অংশগ্রহণকারীরা স্পষ্টভাবে দাবি করেছেন। তারা চেয়েছেন যে, লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর মানুষদের তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী সকল ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ প্রদান করা হোক এবং তাদের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হোক। অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি প্রণয়নের জন্য আন্তঃলিঙ্গ ও হিজড়া পরিচয়ের বিভ্রান্তি দূর করারও প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়েছে। এক ব্যক্তি বলেছেন, “আন্তঃলিঙ্গ ও হিজরা পরিচয়ের পার্থক্য ক্লিয়ার করতে হবে।”  

৪. ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম ধর্মীয় রাজনীতি

অংশগ্রহণকারীদের প্রতিক্রিয়ায় ধর্মীয় উগ্রতা, ইসলামিস্ট রাজনীতি ও মৌলবাদের সম্ভাব্য উত্থান নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা গেছে। বিশেষত জামায়াত বা অন্যান্য ধর্মভিত্তিক শক্তির ক্ষমতায় আসার সম্ভাব্য প্রভাব ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, নারী অধিকার এবং লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ হয়েছে। অনেকে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা সুপ্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন।

৫. গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও সুশাসন 

অংশগ্রহণকারীরা বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্র ও সুশাসনের অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মূলত তারা ভিন্নমত দমন, স্বৈরতন্ত্রের সম্ভাবনা এবং জবাবদিহিতার অভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। অংশগ্রহণকারীরা আশা করছেন একটি নির্বাচিত সরকার, যা দায়বদ্ধ ও জবাবদিহিতামূলক, এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করবে। গণতান্ত্রিক কাঠামোর স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার গুরুত্বও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীরা চেয়েছেন, সরকার “Neutrality, accountability, transparency” বজায় রাখুক এবং দেশের স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত হোক। নির্বাচন প্রক্রিয়ার সমন্বয় এবং অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের গুরুত্বও প্রতিফলিত করেছেন। তাদের মতে, “সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হওয়া উচিত” এবং “ব্যালটে ‘না ভোট’ যুক্ত করা হোক।” এছাড়া তারা দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও দুর্নীতির মাত্রা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।  শ্রমিক ও সাধারণ জনগোষ্ঠীর জীবিকার নিরাপত্তা এবং সামাজিক সমতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বেকার ও প্রবীণদের জন্য ন্যূনতম জীবিকা সহায়তা প্রদান করা হোক। 

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান উন্নয়নের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। অংশগ্রহণকারীরা চেয়েছেন “আইনের সুশাসন, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্য, সুশিক্ষা নিশ্চিত করা” এবং ন্যূনতম জীবনধারা নিশ্চিত করতে: “ভাত চাই, সমতা চাই”। এখানে দেখা যায় যে অর্থনীতি ও নাগরিক সুবিধা শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং সামাজিক ন্যায্যতা, নিরাপত্তা এবং নাগরিক মর্যাদার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত।

 

৬. নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা 

অংশগ্রহণকারীরা নারীর নিরাপত্তা, ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক অংশগ্রহণের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা চেয়েছেন যে নারীদের সকল ক্ষেত্রেই যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হোক: “Women representation in every sector”। এছাড়া শহর ও কর্মপরিবেশে নারীর জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে: “নারীদের জন্য নিরাপদ শহর”।

৭. আদিবাসী ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক দাবি

অংশগ্রহণকারীরা আদিবাসী সম্প্রদায়ের অধিকার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ সমস্যাগুলোর যথাযথ সমাধান করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। আদিবাসীদের স্বীকৃতি নিশ্চিত করার আহ্বান এসেছে: “আদিবাসী স্বীকৃতি দেওয়া”। পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সমাধানের জন্য যথাযথ মনোযোগ দেওয়ার দাবি করা হয়েছে: “Chittagong Hill Tracts issues will be acknowledged properly”। সামরিক উপস্থিতি সীমিত করার প্রয়োজনও উল্লেখ করা হয়েছে: “retreat army from the hill tracts”।

এই প্রসঙ্গে সামাজিক ন্যায় এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি প্রসারিত করার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে কুইয়ার ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার সমানভাবে সুরক্ষিত হবে।  

৮. পরিবেশ ও উন্নয়ন 

অংশগ্রহণকারীরা পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বননিধন কমানো এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে: “reduce deforestation”। এছাড়া বায়ু ও পানির মান উন্নয়নের জন্য যথাযথ প্রচেষ্টা নেওয়ার আহ্বান এসেছে: “proper effort to make air and water cleaner”। খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হিসেবে উঠে এসেছে: “নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে”। এছাড়া তারা রাষ্ট্রকে পরিবেশবান্ধব এবং সহমর্মী নীতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন, যেখানে মানুষের পাশাপাশি প্রকৃতি, গাছপালা, নদী ও পাহাড়ের প্রতি যত্নশীল মনোভাব বজায় থাকবে। 

বিশেষ পর্যবেক্ষণ/উপসংহার

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা প্রধান দাবি। এই দাবির মূল উৎস  নিজস্ব লিঙ্গ পরিচয়ের আইনি স্বীকৃতির অভাব। বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে শুধুমাত্র  হিজড়া সম্প্রদায়কে আনুষ্ঠানিকভাবে “হিজড়া লিঙ্গ” হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে ভোটার তালিকায় তৃতীয় লিঙ্গ করে রাখলেও এখনো পর্যন্ত লিঙ্গ বৈচিত্রের সুস্পষ্ট ও অধিকারের ভিত্তিতে কোনো আইনি ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। যদিও সংবিধানের ২৮ নং অনুচ্ছেদে (বৈষম্য নিষিদ্ধ (২৮(১)): কেবল ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, বাসস্থান বা পেশাগত কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য করতে পারবে না) “লিঙ্গ”-এর ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করলেও, কিন্তু বাস্তবে যৌন অভিমুখিতা বা লিঙ্গ পরিচিতির ভিত্তিতে সুরক্ষা নিশ্চিত করার আলাদা আইন নেই। এছাড়াও কীভাবে সরকারি নথিতে লিঙ্গ পরিবর্তন করা যাবে সে বিষয়টি সুস্পষ্ট ভাবে  না থাকায়  অনেক হিজড়া ব্যক্তি পরিচয়পত্র সংশোধন করতে গিয়ে হয়রানি ও অপমানের শিকার হচ্ছেন। তৃতীয় লিঙ্গ স্বীকৃত হলেও কুইয়ার, নন বাইনারী, ট্রান্স জেন্ডার, পরিচয়ের মানুষদের আইনি স্বীকৃতির প্রসঙ্গ এখনও নীতিমালায় অনুপস্থিত। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের উদাসীনতা উল্লেখযোগ্য শুধু তাই নয় সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে রাষ্ট্র নিরব ভূমিকা পালন করছে। 

সমকামী জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও আইনত অপরাধীর তকমা পাচ্ছে, যদিও এটি প্রাপ্তবয়স্কদের সম্মতিসূচক বিষয়। প্রতিবেশী দেশ ভারত ২০১৮ সালে এই আইন বাতিল করলেও বাংলাদেশে এটি এখনও বহাল, ফলে LGBTQIA+ জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার সীমিত। দেশে সমলিঙ্গের বিয়ে, দত্তক গ্রহণ ও শিশু লালন-পালনের ক্ষেত্রেও আইনগত ও সামাজিক বাধা রয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে একটি রাজনৈতিক দলে সমকামী অধিকারকর্মীকে প্রাথমিক কমিটিতে রাখা হয়েছিল, কিন্তু নেতাদের চাপের কারণে পদ থেকে সরানো হয়। নভেম্বর ২০২৫ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন ১,২৩০ জনকে “হিজড়া” হিসেবে শনাক্ত করেছে, যদিও বাস্তবে লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আরও বেশি, এর মধ্যে অনেকেই ভোটার তালিকায় নেই বা প্রকাশ্যে আসেননি। পাঠ্য বইয়ে হিজড়া ও ট্রান্সজেন্ডার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হলেও ধর্মীয় উগ্রবাদীদের চাপের কারণে তা সরানো হয়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে পরিচালিত এই জরিপে দেখা গেছে যে লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা, বৈষম্য এবং নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হচ্ছে, যা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করছে। নিরাপদ ও সমান অধিকারবিহীন পরিবেশে তারা অনেক সময় ভোট কেন্দ্রে যেতে অসম্মান, হয়রানি বা বৈষম্যের শঙ্কায় অনিচ্ছুক থাকেন। এমন পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে না, বরং দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্যও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

সেন্টার ফর ডাইভার্সিটি স্টাডিজ এশিয়া। ইমেইল: diversitystudiesasia@gmail.com

ফেসবুক: @diversityasia. ইনস্টাগ্রাম: @centerfordiversitystudies[underscore]asia

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •