পূর্ববাংলা ব্যবস্থা পরিষদের সদস্য প্রভাসচন্দ্র লাহিড়ীর স্মৃতিচারণ

শতবর্ষে ইলা মিত্র

পূর্ববাংলা ব্যবস্থা পরিষদের সদস্য প্রভাসচন্দ্র লাহিড়ীর স্মৃতিচারণ

২০২৫ সাল ছিল ইলামিত্রের জন্মশতবার্ষিকী। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে দুটো স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকায় প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থের শিরোনাম- বঞ্চনা ও বৈষম্য বিরোধী সাঁওতাল কৃষক বিদ্রোহের কিংবদন্তি নেত্রী ইলা মিত্রের জন্মশতবর্ষ। সম্পাদক: শামসুল হুদা। প্রকাশক টাঙ্গন ও এএলআরডি, পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৮৮। কলকাতায় প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থের শিরোনাম- শতবর্ষে ইলা মিত্র অন্য চোখে। সম্পাদনা: ওমর তারেক চৌধুরী ও শুভাশিস মুখোপাধ্যায়। প্রকাশক পিপলস বুক সোসাইটি, পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৯২।      


পূর্ববাংলা ব্যবস্থা পরিষদের সদস্য প্রভাসচন্দ্রের এই স্মৃতিচারণটি দ্বিতীয় স্মারকগ্রন্থের একটি অধ্যায়। অধ্যায়টি সর্বজনকথা  পত্রিকার পাঠকদের জন্য তুলে ধরে ওমর তারেক চৌধুরী লিখেছেন: ‘ইলা মিত্র ও নাচোল সম্পর্কিত যাবতীয় লেখা ও আলাপ-আলোচনায় প্রভাসচন্দ্র লাহিড়ীর (১৮৯৩-১৯৭৪) এই স্মৃতিচারণটির কোনো উল্লেখ কোথাও দেখেছি বলে মনে হয় না। প্রধানত বদরুদ্দীন উমরের পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি গ্রন্থের সূত্রে প্রভাসচন্দ্র লাহিড়ীকে কেবল উল্লেখ করা হয় পূর্ববাংলার ব্যবস্থা পরিষদে ‘মুলতবী প্রস্তাব উত্থাপনকারী’ হিসেবে। কিন্তু সেই মুলতবী প্রস্তাব উত্থাপনের পূর্বে তিনি নাচোলে সংঘটিত পাকিস্তানের পুলিশ, ইপিআর ও সেনাবাহিনীর ধ্বংস ও হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি অনুসন্ধান করতে তৎকালীন এমএলএ হিসেবে নাচোলে গিয়েছিলেন। দেখা করেছিলেন নাচোলের গির্জা ও হাসপাতালের ইটালীয় পাদ্রী রেভারেন্ড ফাদার ক্যাটিনিওর সঙ্গে। ফাদার ছিলেন নাচোলে চালানো তাণ্ডবলীলার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী এবং তার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রতিবেদনের লেখক। ফাদার তাঁর টাইপ করা মোটা প্রতিবেদনটির কপি প্রভাসচন্দ্রকেও দিয়েছিলেন। প্রতিবেদনটি তিনি ঢাকার ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশন ও দিল্লীস্থ ইটালি দূতাবাসেও পাঠিয়েছিলেন বলে জানা যায়। কোনো পরিশ্রমী ও উদ্যমী গবেষক ফাদার ক্যাটিনিওর পাঠানো প্রতিবেদনটি ভারত ও ইটালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে উদ্ধার করতে পারলে, আমরা নিঃসন্দেহে একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বিশদ বিবরণ দেখার সুযোগ পেতে পারি। ১৯৪৭ সালে ভারতভাগের পরও তিনি পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যান এবং ‘পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেসের’ রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। প্রাদেশিক ব্যবস্থা পরিষদের সদস্য এবং দু’ দফায় পূর্ব পাকিস্তানের কারা ও অর্থ দপ্তরের মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৬২ সালে তিনি চিকিৎসার জন্য ভারতে যাবার পর আর পাকিস্তানে ফিরতে পারেননি। প্রভাসচন্দ্র লাহিড়ীর এই স্মৃতিচারণটি ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত তাঁর বই ‘পাক-ভারতের রূপরেখা’ (১৬৮-১৮৩ পৃষ্ঠা) থেকে নেয়া হয়েছে।’

…দেশ-বিভাগের আগে থেকেই ভাগ-চাষীদের (Share Croppers) ব্যাপার নিয়ে একটা ঢিমে-তেতালা গোছের আন্দোলন চলতে থাকে। দেশ-বিভাগের তথা স্বাধীনতার পরে ১৯৪৯ সালে সেই আন্দোলন অত্যন্ত জোরদার হয়ে ওঠে উত্তরবঙ্গের কোনও কোনও জেলায়। পূর্ববঙ্গের পূর্ব-দিনাজপুর ও রাজশাহী জেলা তার মধ্যে প্রধান স্থান নেয়। পূর্ব-দিনাজপুরের রাজবংশী সম্প্রদায়ের এবং রাজশাহী জেলার সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মধ্যেই তা বিশেষভাবে প্রসার লাভ করে। উভয় সম্প্রদায়ই কৃষক ও বর্তমানে অধিকাংশ‍ই ভাগ-চাষী। রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী থানায় বহু সাঁওতালের বাস আগে থেকেই ছিল। দেশবিভাগের পরে, রাজশাহী জেলার সাথে এসে যুক্ত হয়েছে মালদহ ও দিনাজপুর জেলার কয়েকটি থানা। মালদহের নাচোল ও নবাবগঞ্জ থানায়ও অনেক সাঁওতালের বাস। কয়েকটি থানার সাথে ঐ দুটি থানাও রাজশাহী জেলায় আসে। গোদাগাড়ী থানার সাথে ঐ দুটি থানার পরিস্থিতি সংলগ্ন এবং সাঁওতালদের মধ্যেকার পরিবেশও এক ও অভিন্ন। গোদাগাড়ী থানার সাঁওতালদের সম্পর্কে আমার কিছু অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ এসেছিল, গান্ধীজীর নেতৃত্বে পরিচালিত ১৯২১ সালের কংগ্রেস-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।

…গোদাগাড়ী থানাকে বলা হত রাজশাহী জেলার শস্যভাণ্ডার কিন্তু অতীতে সে অবস্থা ছিল না। শুনেছি গোদাগাড়ী থানা অঞ্চল বিরাট বন-জঙ্গলে ভর্তি ছিল। সেখানে বাঘ, হরিণ, ময়ূর প্রভৃতি নাকি চরে বেড়াত। সেই অবস্থায় সাঁওতালরা এসে না কি সেখানে বসতি স্থাপন করে এবং নিজেদের জীবন বিপন্ন করেই বন-জঙ্গল ‘সাফ’ করে তাকে আবাদী জমিতে রূপান্তরিত করে। যখন তারা বন কেটে জমি বের করে, জমিদার তখন তাদের খাজনা নেননি এবং যে যতটা জমি বের করবে, সে ততটা জমির দখলদারিত্বও পাবে,—এই ছিল জমিদারদের মৌখিক আদেশ। জমি বের করে সাঁওতালরা যখন জমিতে ‘সোনা’ ফলাতে শুরু করলো, তখন জমিদার থেকে আরম্ভ করে অন্য সকলেরই দৃষ্টি সেদিকে পড়লো। জমিদারগণ তাদের একটা নামমাত্র খাজনা ধার্য করে জমির স্বত্ব ভোগের অধিকার তাদের দেয়।… 

তাদের বসতি অঞ্চলে হিন্দু-মুসলমান বাঙালীরাও ক্রমশ গিয়ে বসতি করে এবং ছোট-খাটো মুদীর দোকান খুলে বসে। আজকে যেমন পাক-ভারতে মুদ্রা-স্ফীতি (inflation) হয়ে লোকের হাতে টাকা-পয়সার ‘ছড়াছড়ি’ হয়েছে, আমি যে সময়ের কথা বলছি সে সময়ে সে অবস্থা ছিল না। লোকের হাতে টাকা-পয়সা কম ছিল, সাঁওতালদের তো টাকাপয়সা কিছুই ছিল না। তারা টাকা সংগ্রহের দিক দিয়ে যেতও না, কারণ টাকার হিসাব জানা তো দূরের কথা, টাকা-পয়সা গুণতেও জানতো না। মুদীরা তেল-নুন প্রভৃতি ছোট-খাটো আবশ্যকীয় জিনিষগুলো তাদের ধারেই দিয়ে যেত এবং সাঁওতালদের সততা ও সরলতার সুযোগ নিয়ে ফসল উঠলে দেনাগ্রস্ত সাঁওতালদের একটা কাল্পনিক হিসাব শুনিয়ে দিয়ে দেনা শোধ করতে বলতো। সাঁওতালরাও মুদীদের দাবিমত দেনা (সুদ ও সুদের সুদসহ) ফসল দিয়েই শোধ করে দিত। এইভাবেই চলছিল কিন্তু ক্রমশ এমন একটা সময় আসে, যখন সাঁওতাল খাতকদের দেনা আর তাদের উৎপন্ন ফসল দিয়েও শোধ হয় না। তখন জমি দিয়েই দেনা শোধ করা আরম্ভ হয়৷ 

এইভাবেই যে সাঁওতালরা নিজেদের পরিশ্রম দিয়ে, নিজেদের জীবন বিপন্ন করে জমি বের করেছিল, জমিতে ‘সোনা’ ফলিয়েছিল, তারাই ক্রমশ জমিহীন ভাগ-চাষী হয়ে পড়ে; আর, সামান্য পুঁজির মুদীরাই দেখা দেয় জোতদাররূপে। এটাই রাজশাহীর সাঁওতালদের ইতিহাস। এই অবস্থা দেখে, আমরা জেলা কংগ্রেস থেকে ১৯২১ সালে দু’জন কংগ্রেস কর্মীকে স্থায়ীভাবে তাদের মধ্যে রেখে তাদের শিক্ষার ও দোকান পরিচালনার শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করি। সেই দু’জন কর্মী ছিল (১) আমার খুড়তুতো ভাই—শ্রীমণীন্দ্রচন্দ্র লাহিড়ী ও (২) শ্রীশিবেন মণ্ডল। শিবেন এখন কোথায় কীভাবে আছে, তা জানি না। আমার ভাই—শ্রীমান মণীন্দ্র এখন কালিকানন্দ নামে সন্ন্যাসী হয়ে পরলোকগত পূজ্যপাদ রামদাস স্বামীজীর ‘আনন্দাশ্রমে’ (দক্ষিণ ভারতে) বর্তমানে আছে।

এইভাবেই যে সাঁওতালরা নিজেদের পরিশ্রম দিয়ে, নিজেদের জীবন বিপন্ন করে জমি বের করেছিল, জমিতে ‘সোনা’ ফলিয়েছিল, তারাই ক্রমশ জমিহীন ভাগ-চাষী হয়ে পড়ে; আর, সামান্য পুঁজির মুদীরাই দেখা দেয় জোতদাররূপে। এটাই রাজশাহীর সাঁওতালদের ইতিহাস।

অন্যান্য অনুন্নত সম্প্রদায়ের মত রাজশাহীর সাঁওতালদের মধ্যেও ১৯২১ সালের ও পরবর্তীকালের কংগ্রেস আন্দোলনই একটা জাতীয় ও সম্প্রদায়গত নব-জাগরণের সূত্রপাত করে। দেশ-বিভাগের পরে রাজশাহীর এই নব-জাগ্ৰত সাঁওতালদের সাথে এসে যুক্ত হয়, ভূতপূর্ব মালদহ জেলার কয়েকটি থানার—বিশেষ করে, নাচোল ও নবাবগঞ্জ থানার বিদ্রোহের ঐতিহ্যবাহী সাঁওতালরা। ইংরেজ আমলে মালদহের সাঁওতালদের মধ্যে বিদ্রোহ দেখা দেয়। আমার যতটা মনে পড়ে তাতে মনে হয়, শ্রীজে. এন. তালুকদার, আই-সি-এস মহাশয় বোধহয় তখন মালদহের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। সাঁওতালরা তাদের প্রধান অস্ত্র তীর-ধনুক নিয়ে সংগ্রাম করে এবং সরকার পক্ষের পুলিশ তাদের হাতিয়ার বন্দুক নিয়ে বিদ্রোহীদের ওপর গুলীবর্ষণ করে। সাঁওতালদের দলপতি জিতু সাঁওতাল নিহত হয়। বিদ্রোহ দমিত হয় কিন্তু মালদহের সাঁওতালদের মধ্যে অন্যায় অবিচার-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করার একটা ঐতিহ্য গড়ে ওঠে। সেই ঐতিহ্যবাহী মালদহী সাঁওতালরা দেশ-বিভাগ, তথা বাংলা বিভাগের ফলে, রাজশাহীর সাথে যুক্ত হয়ে রাজশাহী জেলার অধিবাসী হয়েছে এবং রাজশাহীর আদি অধিবাসী সাঁওতালদের সাথে ‘এক’ হয়ে গিয়েছে। 

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে, পূর্ববঙ্গে যদিও খাতাপত্রে এবং কাগজ-কলমে ‘পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেস’ নামে একটা রাজনীতিক প্রতিষ্ঠান ছিল, তার পক্ষে আর কোনও সংগ্রামী আন্দোলন করা সম্ভবপর ছিল না। কোনও হিন্দু পরিচালিত রাজনীতিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই সম্ভবপর ছিল না। সেরূপ আন্দোলন করলে ব্যাপক আকারে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হওয়ার বিশেষ আশঙ্কা পূর্ববঙ্গের সর্বত্রই তখনও ছিল, কারণ, তখন পর্যন্ত মুসলমান রাজনীতিকদের মধ্যে কোনও বিরোধী দল গড়ে ওঠে নি। তখন পর্যন্ত সকলেই একটি মাত্র রাজনীতিক দল—‘মুসলিম লীগের’ সদস্য; আর, সেই মুসলিম লীগ অনবরত জনসাধারণের মধ্যে প্রচার করে চলেছে যে, ‘হিন্দুস্থান সরকার’ (ভারত সরকারকে মুসলিম লীগ ‘হিন্দুস্থান সরকার’ বলেই, প্রচার করে—তখনও করেছে, আজও সমানভাবেই করে চলেছে) ও হিন্দুরা (পূর্ববঙ্গের হিন্দুরাও) পাকিস্তানকে ধ্বংস করার চক্রান্ত করছে। ‘পাকিস্তান’ নামটির উপরে মুসলমান জনসাধারণের মধ্যে তখন তো একটা অত্যন্ত প্রীতি ও ভালবাসা ছিলই, যার রেশ আজও চলছে, সেই অবস্থায় কোনও হিন্দু পরিচালিত রাজনীতিক দল যদি কোনও সংগ্রামী আন্দোলন করতো, তার ফল যে কী বিষময় হতে পারতো তা সকলেই বুঝতেন। 

পাকিস্তান কংগ্রেসের পক্ষে তা আরও সম্ভবপর ছিল না; কারণ ভারতে শাসন-ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠান। পাকিস্তানে যদিও প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয়েছিল—‘পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেস’ বলে, তবু মুসলমানদের মধ্যে প্রচার করা হয়েছে যে ভারতের কংগ্রেস ও পাকিস্তানের কংগ্রেস একই মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ মাত্র, একই উদ্দেশ্য নিয়েই চলে। কোনও রাজনীতিক প্রতিষ্ঠান যদি জনসাধারণের সত্যিকারের অভাব-অভিযোগ নিয়ে আন্দোলনে না নামেন, তাহলে শুধু ভাল ভাল কথার মালা গেঁথে বক্তৃতা করে চিরকাল জনসাধারণের উপর প্রভাব বজায় রাখতে পারে না। সেই অবস্থায় ক্রমশ সেই সব প্রতিষ্ঠান গণ-সংযোগ হারিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়। পাকিস্তানে তথা পূর্ববঙ্গে আমরা কংগ্রেসীরা জনসাধারণের মধ্যে কোনও আন্দোলন গড়ে তুলে তাদের সাথে সংযোগ রাখতে পারি নি। আমরা গণ-সংযোগ যেটুকু রাখতেম, তা হল জনসাধারণের দুঃখ-দুর্দশার কথা এসেম্বলি’তে তুলে ধরে। এ ছাড়া আমাদের আর সুষ্ঠু কোনও পথ ছিল না। আমরা যখন সাক্ষাৎভাবে সংগ্রামী কোনও আন্দোলন না করে, জনগণ থেকে কিছুটা দূরে সরে পড়ছিলেম, তখন ‘কম্যুনিষ্ট পার্টি’ কিন্তু দূরে সরে থাকে নি। তাঁরা এগিয়ে গিয়েছেন, তে-ভাগা আন্দোলনের নেতৃত্ব নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে। দিনাজপুরের কম্যুনিষ্ট সদস্য শ্রীরূপনারায়ণ রায় (১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভায় নির্বাচিত এবং পরে দিনাজপুর জেলা বিভক্ত হওয়ার ফলে তাঁর এবং শ্রীনিশিথনাথ কুণ্ডুর সদস্যপদ বাতিল হয়ে যায়) এবং রাজশাহীতে শ্রীমতী ইলা মিত্র ঐ আন্দোলনের নেতৃত্ব করেন। যদিও ঐ তে-ভাগা আন্দোলনটি কোনও সম্প্রদায়গত আন্দোলন ছিল না, তবু কিন্তু দিনাজপুরে ভাগ-চাষী রাজবংশী সম্প্রদায়ের মধ্যে কিছুটা এবং রাজশাহীতে সাঁওতালদের মধ্যে বিশেষভাবেই প্রভাব বিস্তার করে এবং কম্যুনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব বেশ একটা দৃঢ় ভিত্তির উপরই গড়তে থাকে।

দিনাজপুরের কম্যুনিষ্ট সদস্য শ্রীরূপনারায়ণ রায় (১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভায় নির্বাচিত এবং পরে দিনাজপুর জেলা বিভক্ত হওয়ার ফলে তাঁর এবং শ্রীনিশিথনাথ কুণ্ডুর সদস্যপদ বাতিল হয়ে যায়) এবং রাজশাহীতে শ্রীমতী ইলা মিত্র ঐ আন্দোলনের নেতৃত্ব করেন।

এই প্রসঙ্গে ভারতের কংগ্রেস প্রতিষ্ঠান সম্পর্কেও একটা কথা এখানে তুলে ধরছি। দেশ-বিভাগ, তথা স্বাধীনতার পরে, ভারতের শাসন-ক্ষমতায় গিয়েছেন, ‘কংগ্রেস’। ‘কংগ্রেস’ শাসন-ক্ষমতায় যাওয়ার পর কংগ্রেস-প্রতিষ্ঠান আর কোনও আন্দোলনে যায় নি। সংগ্রামের যে ঐতিহ্য তাঁরা স্বাধীনতা আন্দোলনে গড়ে তুলেছিলেন, তাকেই মূলধন করে নির্বাচনে জয়যুক্ত হতে থাকেন। কিন্তু এই অবস্থা তো চিরকাল চলতে পারে না। চলেও নি। কংগ্রেস-প্রতিষ্ঠান ক্রমশ জন-সংযোগ হারিয়ে ফেলেছে। ১৯৬১ সালের সাধারণ নির্বাচনে, তাই, দেখছি ভারতের অনেকগুলো প্রদেশেই কংগ্রেসের আসন কেঁপে উঠেছে ৷ কংগ্রেসের সংগ্রামী ঐতিহ্যের মূলধন ভাঙিয়ে খেতে খেতে ক্রমশ তা ক্ষীয়মাণ হয়ে এসেছে।…

যাক, পূর্ববঙ্গের—বিশেষ করে, উত্তরবঙ্গের—যে তে-ভাগা আন্দোলনের কথা বলছিলেম, তাতে আবার ফিরে যাই। এতকাল পর্যন্ত জোতদার ও তাঁর ভাগচাষীর মধ্যে আদান-প্রদানের সম্পর্ক ছিল যা তা হচ্ছে, চাষীরা জমির চাষবাস সবই করবেন, জমি ও ফসলের তদারকীও তাঁরাই করবেন, ফসল কাটার সময় জোতদার বা তাঁর লোককে খবর দিয়ে ফসল কেটে জোতদারের বাড়িতে বা তাঁর নির্দিষ্ট স্থানে তা ওঠাবেন এবং ফসল মাড়াই হলে তার অর্ধেক অংশ পাবেন ভাগ-চাষী বা আধিয়াররা। এখন চাষীদের দাবি হয়েছে যে, তাঁরাই জমিতে মেহনত করে, ‘বুকের রক্ত জল করে’ ফসল ফলাবেন; সুতরাং তাঁরা নেবেন, উৎপন্ন ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) এবং জমির মালিক, মালিকানা হিসাবে পাবেন এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) ফসল, ফসল কাটার আগে তাঁরা (চাষীরা) জোতদারকে কাটার দিন সম্পর্কে জানাবেন বটে, তবে কাটা ফসল তাঁরা নিজের বাড়িতে বা নিজেদের এক্তিয়ারের মধ্যে তাঁদেরই নির্দিষ্ট স্থানে ওঠাবেন এবং ফসল মাড়াই হলে জোতদার তাঁর প্রাপ্য (১/৩) অংশ নিজের লোক দিয়ে নিয়ে যাবেন। 

১৯৪৯ সাল থেকেই রাজশাহী জেলার নাচোল, গোদাগাড়ী প্রভৃতি থানায় সেইভাবেই কাজ আরম্ভ করে দেন—ঐ সব অঞ্চলের ভাগ-চাষীরা বিশেষ করে, সাঁওতালরা। জোতদারদের মধ্যে কেউ কেউ বিশেষ প্রতিষ্ঠাবান বহু জমির মালিক বড় জোতদারও ছিলেন। রাজশাহী শহরের রায়বাহাদুর শ্রীব্রজেন্দ্রমোহন মৈত্র এবং রায়বাহাদুর শ্রীধরণীমোহন মৈত্র (বর্তমানে পরলোকগত) রাজশাহীর অতি প্রতিষ্ঠাবান জমিদার ও জোতদার ছিলেন। ‘সরকার’ জমিদারী দখল করে নেওয়ার পরেও তাঁরা উভয়েই গোদাগাড়ী ও নাচোল থানায় বিস্তর জমির মালিক-জোতদার ছিলেন। তাঁরা চাষীদের ঐ ব্যবস্থা মেনে নিতে পারেন নি। . . . গোদাগাড়ী ও নাচোল থানায় তে-ভাগা আন্দোলনের ঐ পরিস্থিতিতে শ্রীধরণীমোহন মজিদ সাহেবের [রাজশাহীর ম্যাজিস্ট্রেট] কাছে গিয়ে তাঁর ও অন্যান্য জোতদারদের পক্ষ থেকে তাঁদের অভিযোগ দাখিল করে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করেন। ব্রজেন্দ্রমোহন, সেই দরবার করার ব্যাপারে ধরণীমোহনের সাথী হয়েছিলেন বলে কারো কাছে শুনি নি। . . . 

সুতরাং তাঁর আবেদনেই ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব সাড়া দিয়ে একদল সশস্ত্র পুলিশ ঐ অঞ্চলে অবিলম্বে পাঠিয়ে বিহিত ব্যবস্থা করার জন্য পুলিশ সাহেবের উপর  ‘অর্ডার’ দেন। তখন রাজসাহীতে পুলিশ সাহেব ছিলেন, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ঢাকার খাজা সাহাবুদ্দিন সাহেবের জামাই (তাঁর নামটা বর্তমানে মনে নেই)। সঙ্গে সঙ্গে ‘হুকুম’ তামিল হয়। একদল টহলদারী সশস্ত্র পুলিশ নাচোল থানায় যান। মজিদ সাহেবের শাসননীতি সম্পর্কে আগে বলেছি যে, তাঁর শিক্ষা ছিল- ‘Terrorise first, then administer’—অর্থাৎ,  আগে সন্ত্রাস সৃষ্টি কর, তারপরে শাসন কর। এটাই নাকি আই-সি-এস পরীক্ষার শিক্ষার্থী হিসাবে তিনি শিখেছিলেন। এখানেও বোধ হয় পুলিশ সাহেবের মাধ্যমে সেই উপদেশই তিনি পুলিশ দলকে দিয়ে থাকবেন। দেখা যায় পুলিশরা গিয়েই ঐ অঞ্চলে সন্ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেন। সাঁওতালদের বাড়ি থেকে তাঁদের পালিত হাঁস-মুরগী, পাঁঠা, খাসী প্রভৃতি তো প্রতিদিনই নিতে থাকেনই (বিনা দামেই জোর করেই উপঢৌকন হিসাবে!) উপরন্তু ফসল কেটে এনে যখন সাঁওতালরা তাঁদের পূর্ব-নির্ধারিত ব্যবস্থামত নিজেদের বাড়িতে তোলেন, তখন সেই সব চাষীর উপরে চরম শারীরিক উৎপীড়ন ও নিপীড়ন করেই পুলিশরা ক্ষান্ত থাকেন না তাঁদের বাড়ির উপরেও নানা ধরণের অত্যাচার করতে থাকেন। সেই সব অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সাঁওতালরাও প্রতিরোধ করতে থাকেন। ফলে পুলিশ ও চাষীতে সঙ্ঘর্ষও বাধতে থাকে। একদিনের ঐরূপ একটি সঙ্ঘর্ষে ৪ জন পুলিশ (৩ জন মুসলমান ও ১ জন হিন্দু) নিহত হন। 

একদল টহলদারী সশস্ত্র পুলিশ নাচোল থানায় যান। মজিদ সাহেবের শাসননীতি সম্পর্কে আগে বলেছি যে, তাঁর শিক্ষা ছিল- ‘Terrorise first, then administer’—অর্থাৎ,  আগে সন্ত্রাস সৃষ্টি কর, তারপরে শাসন কর। এটাই নাকি আই-সি-এস পরীক্ষার শিক্ষার্থী হিসাবে তিনি শিখেছিলেন।

তারপরেই শুরু হয়ে যায় পুলিশি তাণ্ডব। কত যে বাড়ি পোড়ে, কত যে সাঁওতাল রমণী বে-ইজ্জৎ হন, কত যে লোক নিহত হয়, তার সঠিক সংখ্যা জানা অসম্ভব ছিল। কারণ ঐ অঞ্চল তখন কোনও রাজনীতিক কর্মীর পক্ষে নিষিদ্ধ অঞ্চল হয়েছিল। ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সাহেব দু’জন উপস্থিত থেকেই সেই তাণ্ডব চালিয়ে ছিলেন। সাঁওতালরা তাঁদের বাড়ি-ঘর ছেড়ে বনে-জঙ্গলে অথবা ‘যত্রতত্র’ সব পালিয়েছিলেন। সাঁওতালভ্রমে কাল রং-এর মানুষেরও নিষ্কৃতি ছিল না। এক দিন সন্ধ্যার পরে কলম গ্রামের কতক মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের লোক (জেলে) আমনুরা স্টেশন থেকে ট্রেনে রাজশাহীতে আসছিলেন। তাঁদেরই সাঁওতাল মনে করে মারতে মারতে পুলিশ নিয়ে আসে রাজশাহী শহরে বোয়ালিয়া থানাতে। তাঁরা যতই বলেন যে, তাঁরা সাঁওতাল নন—তাঁরা কলম গ্রাম নিবাসী মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের লোক—তাঁদের জমিদার সুরেন্দ্রমোহন মৈত্র ও শ্রীসত্যেন্দ্রমোহন মৈত্র (‘বাগু’ নামে পরিচিত) এই শহরেই থাকেন। সেই বাড়ির কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই তাঁদের কথার সত্যতা যাচাই করা যাবে। কে কার কথা শোনে! অবশেষে একজন দারোগা এসে সব শুনে বলেন যে, বাগুবাবুর বাড়ি তো থানা থেকে এক মিনিটের রাস্তাও নয়। তাঁকেই ডেকে একবার দেখা যাক না কেন, ওদের কথা সত্য কি না! তা-ই অবশেষে হয়। ‘বাবু’ থানায় যেতেই ওই লোকগুলো হাউ-মাউ করে কেঁদে ওঠেন৷ বাগু তাঁদের কথা সত্য বলে বলায় তাঁরা মুক্তি পান এবং সে রাত তাঁরা কাটান তাঁদের জমিদার বাবুদের, অর্থাৎ বাগুবাবুদের বাড়িতেই।

তারপরেই শুরু হয়ে যায় পুলিশি তাণ্ডব। কত যে বাড়ি পোড়ে, কত যে সাঁওতাল রমণী বে-ইজ্জৎ হন, কত যে লোক নিহত হয়, তার সঠিক সংখ্যা জানা অসম্ভব ছিল। কারণ ঐ অঞ্চল তখন কোনও রাজনীতিক কর্মীর পক্ষে নিষিদ্ধ অঞ্চল হয়েছিল। ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সাহেব দু’জন উপস্থিত থেকেই সেই তাণ্ডব চালিয়ে ছিলেন। সাঁওতালরা তাঁদের বাড়ি-ঘর ছেড়ে বনে-জঙ্গলে অথবা ‘যত্রতত্র’ সব পালিয়েছিলেন। সাঁওতালভ্রমে কাল রং-এর মানুষেরও নিষ্কৃতি ছিল না।

এই অবস্থা যখন ঐ অঞ্চলে চলছিল, তখন স্বভাবতই এসেম্বলির সদস্য হিসাবে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে সবিশেষ জানা আমার অবশ্য কর্তব্য বলে মনে করি। এমন সময়ে একদিন বাগুদের বাড়িতেই দেখি তাদেরই তহশিলদার সাগ্রাম মাঝি (সাঁওতাল) বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বাগুর বাড়িতে এসে লুকিয়ে আছেন। তাঁকে গোপনে ডেকে তাঁর কাছে সেই অঞ্চলের অত্যাচার কাহিনীর কিছু কিছু খবর নিই। তাঁর কাছেই শুনি, আঁধারকোঠা গ্রামের রোমান ক্যাথলিক মিশনারী সাহেব ফাদার ক্যাটানিও (Father Cataneo) [১] ঐ অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে সাঁওতালদের সব খোঁজখবর নিচ্ছেন। তিনি সাদা চামড়ার ইতালীয় সাহেব; সুতরাং তাঁর গায়ে বিশেষভাবে হাত লাগাতে বা তাঁর কাজে বাধা দিয়ে তাঁর ঐ অঞ্চলে ঘোরা-ফেরা একদম বন্ধ করে দিতে কালো চামড়ার পুলিশ একটু ইতস্তুত করে বৈ কি তবে, তিনিও একেবারে রেহাই যে পান নি, সে কথা পরে বলছি।

সেদিনের সেই পলাতক সাঁওতাল সাগ্রাম মাঝিকে আমরা ১৯৫৪ সালে পূর্ববঙ্গের সাধারণ নির্বাচনে তপশিল সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসাবে বিধান সভার সদস্য করেছিলেম। ফাদার ক্যাটানিও সম্পর্কে সাগ্রামের কাছ থেকে খবর শুনে স্থির করি যে, আঁধারকোঠায় গিয়েই ফাদারের সাথে দেখা করবো। সব তথ্য আমাকে সংগ্রহ করতেই হবে। আঁধারকোঠা গ্রামটি পদ্মার তীরে এবং রাজশাহী শহর থেকে ৬৭ মাইল দূরে, গোদাগাড়ীর দিকে। পরদিন সকালেই রওনা হয়ে বেলা প্রায় দশটার সময় মিশনারী সাহেবদের ‘আস্তানায়’ পৌঁছই। 

সাহেব খবর পেয়েই লোক মারফৎ আমাকে জানান যে, তিনি তখন—পীড়িত সাঁওতাল রোগীদের দেখে ঔষধ দিচ্ছেন। কাজ শেষ করেই তিনি আসবেন। আমাকে নিয়ে গিয়ে ফাদারের লোক, হল ঘরের মধ্যে একখানি চেয়ারে বসাল। সামনেই একটা বড় ‘dining table’ (খাওয়ার জন্য টেবিল) পাতা৷ টেবিলে দেখি, একটা চায়ের ডিসে খানিকটা ঝোলা গুড় এবং তা থেকে যে চামচ দিয়ে কিছুটা গুড় তুলে নেওয়া হয়েছে, তা চামচের দাগ দেখেই বোঝা যায় ৷ সেই গুড় যে ওখানে কি উদ্দেশ্যে রাখা ছিল, তা তখনও বুঝি নি। আমি বসে বসে সব দেখছি এবং ভাবছি সাহেবের সাথে কীভাবে কথা আরম্ভ করবো। সাহেব যদি তাঁর সংগৃহীত তথ্যাদি আমাকে না জানাতে চান, তাহলেই বা কি করবো—এই সব কথা নিয়েই মনে মনে চিন্তা করছিলেম। 

এমন সময়, ফাদার আসেন এবং আমাকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথেই অভ্যর্থনা করেন। তাঁকে যখন আমি তাঁর কাছে আসার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানাই, তখন তিনি বলেন—সব হবে। আমি ঐসব ঘটনা সম্পর্কে একটা বিস্তারিত রিপোর্ট তৈরী করেছি। তোমাকে তার একটা নকলও আমি দেখ। পাকিস্তান সরকারের এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সকলের কাছেও তার নকল পাঠাব। তুমি ব্যস্ত হয়ো না। তোমাকে তো এখন ছাড়ছি না। দুপুরে তোমাকে আজ আমার সাথে খেতে হবে। এখন আগে একটু চা খাও৷ এই বলেই ‘ফাদার’ আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই কেটলি নিয়ে ছোটেন চায়ের জন্য। সাহেব নিজেই জল গরম করে এনে চা তৈরী করেন এবং বলেন যে,—‘দেখ, আমি থাকি এই গ্রামে। শহর ও সভ্যতা থেকে দূরে এখানে আমি চিনি পাই না; তাই, গুড় দিয়েই চা খাই। তুমি কি তাই খাবে?’ এতক্ষণে বুঝলেম, টেবিলের উপর প্লেটে গুড় কিসের জন্ম। ফাদারের কথা শুনে আমি একটু লজ্জিতই হই এবং সানন্দে আমার সম্মতি জানাই। চা-পর্ব শেষ হওয়ার পর, সাহেব সাঁওতালদের উপর নৃশংস-অত্যাচারের এক ভয়াবহ বর্ণনা দিয়ে চলেন এবং বলেন—

‘আমি ৩৫ বছরকাল এই গ্রামে থেকে সাঁওতালদের মধ্যে কাজ করছি। এমন অত্যাচার হতে আমি আর কোন দিনই দেখি নি। আমি সব অঞ্চল ঘুরে স্বচক্ষে সব দেখে এসেছি। তোমাদের তো সেখানে ঢুকতেই দেবে না সরকারের পুলিশ দল। আমাকেও তাঁরা কম বেগ দেন নি। একদিন তো দুজন পুলিশ এসে রাস্তার মাঝেই আমাকে বলেন যে, তাঁরা আমাকে গ্রেপ্তার করলেন এবং আমাকে গোদাগাড়ী থানায় নিয়ে গেলেন। থানার দারোগাবাবু বলেন যে, তাঁদের খবর আমার কাছে নাকি ‘রিভলভার’ আছে!’ 

সাহেব তার উত্তরে বলেন—‘রিভলভারের চেয়েও বড় শক্তিশালী অস্ত্র আছে। সর্বদাই সেই অস্ত্র নিয়েই তো আমি ঘোরাফেরা করি।’ দারোগাবাবু ঐ কথা শুনে হকচকিয়ে ওঠেন এবং অস্ত্রটি বের করতে আদেশ করেন। সাহেব তখন তাঁর পাদরীর সাদা পোষাকের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিয়ে বুকের উপর থেকে বের করেন সেই অস্ত্রটি। সেটি আর কিছুই নয়—‘ব্রঞ্জ’ বা ঐ জাতীয় একটি ধাতু দিয়ে তৈরি পরমপিতা যীশুর একটি ক্রুশবিদ্ধ প্রতিমূর্তি। এই অস্ত্র নিয়েই ৩৫ বছরকাল এক মাঠের মধ্যে একাকী তিনি কাটালেন! আদর্শের প্রতি কী অসীম বিশ্বাস ও আনুগত্য।… 

সাহেব সব ঘরগুলো ঘুরিয়ে আমাকে দেখান। কোথাও বিলাসিতার একটু চিহ্নমাত্রও দেখি না। তাঁর শয়নঘরে দেখি, একটা দড়ির খাটিয়া। তাতে একখানি কম্বল ও একটা চাদর। মাথার ধারে একটা ছোট বালিশ মাত্র।…তারপরে দুপুরে সাহেবের সাথে ভাতও খেলেম। সে কী খাওয়া! মোটা-মোটা চালের ভাত আর তাঁরই বাগানের উৎপন্ন ফুলকপির (তাও আবার ফুটে গিয়েছে) একটা ঝোলা তরকারী। তাই দিয়েই সাহেব নির্বিকারচিত্তে এক থালা ভাত খেলেন। আর আমি? একে আমি বরাবরই খাই খুব কম ভাত। তার ওপর ভাতের চেহারা দেখেই আমার অন্তরাত্মা শুকিয়ে ওঠে। আমার দুর্বল হজমশক্তিতে কি ঐ ভাত হজম হবে? ভয়ে ভয়ে আমি অতি সামান্যই খাই৷ খাওয়ার পরে আমি বিদায় নেওয়ার কথা তাঁকে জানাতেই তিনি তাঁর টাইপ করা প্রকাণ্ড রিপোর্টের একটি নকল এনে আমার হাতে দেন। সাহেবের ঐ রিপোর্টের[২] নকল ঢাকার ভারতীয় ডেপুটি হাই কমিশনার পান এবং তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহরুজীর বৈদেশিক দপ্তরেও নাকি তার নকল পাঠান। কিন্তু ফল হয়েছে কি? শুধু গর্জন, বর্ষণ হয় নি!

আঁধারকোঠা থেকে রাজশাহীতে ফিরেই শুনি, মালদহগামী ট্রেনের একটি কামরায় কম্যুনিষ্ট নেত্রী শ্রীমতী ইলা মিত্র, তাঁর একজন সহকর্মী শ্রীবৃন্দাবন সাহা সহ, রোহনপুর স্টেশনে ধরা পড়েছেন। তারপরে ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সাহেবের নির্দেশে তাঁদের উপরে—বিশেষ করে শ্রীমতী ইলা মিত্রের উপরে যে কী বীভৎস, নৃশংস ও পাশবিক অত্যাচার হয়েছে, তার সম্পর্কে আর এতদিন পরে লিখে লেখনীকে কলঙ্কিত করতে চাই না। সে অত্যাচারের যথাযথ বর্ণনা দেওয়ার ভাষাও আমার নেই। কোন প্রথম শ্রেণীর সাহিত্যিক হয়তো তাকে সভ্যতার আচ্ছাদনে ঢেকে, লোকসমাজে প্রকাশ করতে পারেন।… 

আঁধারকোঠা থেকে রাজশাহীতে ফিরেই শুনি, মালদহগামী ট্রেনের একটি কামরায় কম্যুনিষ্ট নেত্রী শ্রীমতী ইলা মিত্র, তাঁর একজন সহকর্মী শ্রীবৃন্দাবন সাহা সহ, রোহনপুর স্টেশনে ধরা পড়েছেন। তারপরে ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সাহেবের নির্দেশে তাঁদের উপরে—বিশেষ করে শ্রীমতী ইলা মিত্রের উপরে যে কী বীভৎস, নৃশংস ও পাশবিক অত্যাচার হয়েছে…

শ্রীমতী ইলা মিত্রের সহযোগী ও সহযাত্রী শ্রীবৃন্দাবন সাহাকে আমি বহুদিন আগে থেকে চিনতেম ও জানতেম। সে যে গ্রামের একটি প্রাথমিক স্কুলে পণ্ডিতের কাজ করতো সেই গ্রামে আমি কংগ্রেসের কাজ উপলক্ষে এসেম্বলির সদস্য হিসাবে বহুবার গিয়েছি। গ্রামটির নাম (সম্ভবত) বাঁশবাড়িয়া-রঘুরামপুর রেল স্টেশন থেকে মাইল দু’য়েক দূরে বিলের মধ্যে একটি গ্রাম। পাকিস্তানে তখন প্রাইমারী স্কুলের পণ্ডিতের মাসিক বেতন মাত্র ৮/১০ টাকা ছিল। সেই বেতন নিয়েই বৃন্দাবন গ্রামে বসে দিনের পর দিন নিঃশব্দে তার কাজ করে গিয়েছে। সেই বৃন্দাবন জীবনের পরিপূর্ণ ঝুঁকি নিয়ে তার আদর্শের জন্যই ইলা মিত্রের সাথী হয়েছিল। তার আদর্শকে আমি পুরোপুরি সমর্থন না করতে পারি, কিন্তু অতীতের একজন আদর্শবাদী রাজনীতিক কর্মী হিসাবে আদর্শের প্রতি নিষ্ঠা ও আনুগত্যকে আমি অ-মর্যাদা করি কেমন করে?

আমি বৃন্দাবনের নিষ্ঠার প্রতি আমার শ্রদ্ধা জানাই। এই বৃন্দাবনের উপর যে কী অত্যাচার হয়েছিল, তা অনেকেই জানেন না। সেই অত্যাচারের ফলে জেলেই তার যক্ষারোগ দেখা দেয়। জানি না, আজও সে বেঁচে আছে কি না এবং থাকলেই বা কীভাবে আছে! বৃন্দাবন শ্রেণীর কিছু কর্মী সব বিপ্লবী দলগুলোতেই ছিলেন। বাংলাদেশে স্বাধীনতার সংগ্রামের জন্মও দেন তাঁরাই এবং কংগ্রেসের স্বাধীনতা সংগ্রামকে জোরদার করে বাংলাদেশে বাঁচিয়েও রাখেন তাঁরাই। . . .

বৃন্দাবনকে আমি চিনতেম, জানতেম কিন্তু শ্রীমতী ইলা মিত্রকে আমি কোনও দিনই দেখি নি। ইলা মিত্রের গ্রেপ্তারের পরে রাজশাহী শহরের প্রতিটি লোকের মুখে মুখেই ইলার নাম।… অনেক দিন পরে একদিন ইলাকে আমার দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল।… দেখি জেলখানার দুই জন ‘মেট্রনের’ কাঁধের উপর ভর দিয়ে শ্রীমতী ইলা সাহেবের চেম্বারে এলেন। শরীরে এক ফোঁটাও যেন রক্ত নেই। ঘাড়টা ভেঙে পড়েছে একজন মেট্রনের কাঁধের উপরে। এসেই ইলা তার উপর যে অত্যাচার হয়েছে তার কথা বলতেই ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব বলেন—‘আপনার উপর অত্যাচার হয়েছে নাকি?’ বলতেই আর যায় কোথায়? পিঞ্জরাবদ্ধ সিংহিনী যেন একটা মরণোম্মুখ হুঙ্কার দিয়ে গর্জে উঠলেন। বললেন—‘নেকা আর কি। তিনি কিছুই জানেন না!’ এমদাদ আলি সাহেব বেশ একটু ঘাবড়িয়ে গিয়ে নেহাৎ আমতা আমতা করে বলেন ‘আপনি যখন গ্রেপ্তার হন, তখন আমি তো অন্য জেলায় ছিলেম। আমি এসেছি অনেক পরে।’

ইলার চেহারা দেখে মনে খুব দুঃখ হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু তাঁর বেপরোয়াভাব ও দুর্জয় সাহস দেখে, সেদিন আনন্দ ও গর্বে আমার বুক ভরেও উঠেছিল। প্রীতিলতা, মাতঙ্গিনী, কল্পনা, শান্তি, সুনীতি প্রমুখের কথা শুনেছি। কিন্তু সত্যি-সত্যিই আজ যে মায়ের রূপ দেখলেম, তা দেখে মনে হল, মহিষ-মর্দিনী দশভূজা মাতৃরূপই বোধহয় দেখলেম।

ফাদার ক্যাটানিও সাহেবের রিপোর্ট ও অন্যান্য আরো নানাভাবে সংবাদ যতটা পারলেম তা সংগ্রহ করলেম। ঢাকা থেকে ডাক এসেছে, এসেম্বলি সেশনের। ১৯৫০ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারী তারিখ এসেম্বলির অধিবেশন বসবে। খবর পেয়েই আমি তে-ভাগা আন্দোলন থেকে উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনার জন্য একটি মুলতবী (adjournment motion) প্রস্তাবের নোটিশ ডাকযোগেই স্পীকারের নামে পাঠিয়ে দিয়ে ৪ঠা ফেব্রুয়ারী আমি রাজশাহী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হই।

৬ই ফেব্রুয়ারী যথারীতি এসেম্বলির অধিবেশন আরম্ভ হল।… প্রশ্নের পরই আমি আমার মুলতুবী প্রস্তাবটি উত্থাপন করতে চেষ্টা করলেম। কয়েক ঘন্টা ধরেই অনেক বাক-বিতণ্ডা হোল কিন্তু স্পীকার শেষ পর্যন্ত মুলতবি প্রস্তাব তুলতে অনুমতি দিলেন না।…

টীকা:

১) ক্যালকাটা গেজেটের একটি বিজ্ঞপ্তি (২২ মে ১৯৩১) দেখে অনুমান করা যায় যে অন্তত সেই সময়ে ফাদার রেভারেন্ড ক্যাটানিও মালদাহতে বসবাস করতেন। তাঁর ক্ষেত্রে বিদেশীবিষয়ক ১৯১৮ সালের আইনটি প্রযোজ্য নয় বলে গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে জানান হয়। –সম্পাদকদ্বয়

২) লেখককে লেখা তাঁর বন্ধু সত্যেন্দ্রনাথ মৈত্রর (বাগু) ১৯৬৭ সালের চিঠি থেকে জানা যায়: ‘. . . নাচোলের সাঁওতালদের উপর অমানুষিক অত্যাচার যার রিপোর্ট আঁধারকোঠার Most Reverend Father দিল্লীতে তাঁদের ইটালীয় দেশের এমব্যাসিতে পাঠিয়েছিলেন এবং সেই ‘এমব্যাসি’ থেকে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল পেয়ে রেডিও মারফত নাচোল সম্বন্ধে বলেছিলেন …। (পাক-ভারতের রূপরেখা। পৃ-২০৯) —সম্পাদকদ্বয়

 

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •