স্থান, সময়, ক্রিয়া, এবং জেমস বেনিংয়ের “ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা”

স্থান, সময়, ক্রিয়া, এবং জেমস বেনিংয়ের “ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা”

মুহম্মদ আনোয়ার হোসেন

“ফিল্ম ধারণের আগে আমাকে জায়গাটা চিনতে হবে।” –জেমস বেনিং

জেমস বেনিংয়ের সিনেমা

অতি চর্চিত “চরিত্র” ও “গল্প/বয়ান”-নির্ভর সিনেমার বাইরে যারা সিনেমা এবং চলচ্ছবির ভাষার, সীমানার নতুনতম ভাবনা, সীমানা প্রসারণ, অক্ষর উদ্ভাবন, সংযোজন, নতুন ভাব ও দার্শনিকতা যোগ করে চলেছেন তাদের অন্যতম প্রধানদের একজন মার্কিন ভূদৃশ্যনির্ভর কাঠামোবাদী চিত্রনির্মাতা, শিল্পী ও শিক্ষক জেমস বেনিং। তিনি ৭০-এর দশক থেকে সিনেমা নির্মাণ শুরু করে এখন অবধি কমবেশি শ-খানেক নানা দৈর্ঘ্য ও ধরনের সিনেমা নির্মাণ করেছেন, প্রায় একা, একা। তার সিনেমায় রয়েছে নানান স্থান বা অনেক অনেক ভূদৃশ্য, পাখির চোখে দেখলে মনে হয় তার সিনেমা যেন ভূদৃশ্য চিত্রমালার অংশবিশেষ, কিন্তু এখানেই শেষ নয়; বরং তার সিনেমা বোঝাপড়ার যাত্রা শুরু। উপভোগ্য ধ্যানমগ্ন এক যাত্রা তার সিনেমা, যেখানে সময়ের দৈর্ঘ্যের তথাকথিত বাহুল্য আরম্ভ করে যে সূচনার তার শুরু হয়তো বেনিংয়ের যে কোনো সিনেমা, কিন্তু অশেষ অন্তর্যাত্রা শুরু হয় দর্শকের ভেতরে, যা প্রবহমান থাকে অবিরাম। 

উপভোগ্য ধ্যানমগ্ন এক যাত্রা তার সিনেমা, যেখানে সময়ের দৈর্ঘ্যের তথাকথিত বাহুল্য আরম্ভ করে যে সূচনার তার শুরু হয়তো বেনিংয়ের যে কোনো সিনেমা, কিন্তু অশেষ অন্তর্যাত্রা শুরু হয় দর্শকের ভেতরে, যা প্রবহমান থাকে অবিরাম।

“১৩টি লেক” (২০০৪, ১৩৩ মিনিট) বা “দশ আকাশ” (২০০৪, ১০১ মিনিট) সিনেমার শটগুলোর দৈর্ঘ্যের বাহুলতা এবং খুব কমের সমাহার আমাদের ভাবনার বিস্তারে কাজ করে গোপনে, নিবিড়ভাবে কারণ আমরা “দেখার” সুযোগ পাই। তার সিনেমা “দেখা” মানে “দেখা”, তাকানো নয় বা অন্যের বানানো অতিরিক্ত চড়া কোনো ফেনিয়ে তোলা গল্প বা বয়ান গলাধঃকরণ করে প্রেরণার বানানো বুদ্বুদের সাগরে গড়াগড়ি খাওয়া নয়। শুধু পাপড়ির পরে পাপড়ি খুলে যাওয়ার মতো করে ভাবনার বিস্তার, সংযোজন, বিয়োজন, ব্যথা-বিরহ-সংগ্রাম।

যেহেতু অধিকাংশ সিনেমার মতো করে বেনিংয়ের সিনেমা আমাদের মন ভোলায় না; বরং জাগাতে সাহায্য করে, ফলে আপনাকে/আমাকে শিখতে হবে “দেখা” ও “শোনা”, তারপরে ভাবনার বিস্তার এবং বাড়তি-অপ্রয়োজন থেকে নিস্তার। বেনিংয়ের সিনেমা দেখা সচেতনতার প্রয়াস এবং তিনি আমাকে/আপনাকে সজাগ হয়ে, স্বচিন্তাসহ তার সঙ্গে সহযাত্রী হতে আমন্ত্রণ জানান। তার সিনেমায় কোনো জায়গার সময়ের প্রবহমানতা সিনেমার কর্মরূপে ব্যবহৃত। তিনি তার নানান সীমাবদ্ধতাকে সুযোগে পরিণত করে তুলে ধরছেন মূলত তার দেশের চারপাশের দৃশ্যমান ভূদৃশ্য ও তার অংশ হিসেবে মানুষকে। মানুষকে তিনি প্রান্তিক করে চারপাশের পরিপার্শ্বের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করে মানবিক ভাবনার ভিতে নাড়া দিতে চান। তিনি সূক্ষ্ম রসিকতাসহ সিনেম্যাটিক উপাদান ব্যবহার করে নির্মাণ করেছেন তার ভাবনা সমৃদ্ধ ভাবসিনেমার জগৎ। এরূপ দর্শন, ভাব-ভাবনা বাংলাতেও বিরল নয়, যদিও তার প্রকাশ সিনেমায় খুব বিরল। আর ভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ বিষয়ে প্রেক্ষাপট ও আঙ্গিক মিলিয়ে রয়েছে বিশাল তফাত।

“দি ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা” নামক ২০২২ সালের ৯৮ মিনিটের সিনেমাও বেনিংয়ের ভূদৃশ্য-কেন্দ্রিক, কাঠামোনির্ভর নির্মাণ ঢঙের ব্যতিক্রম নয় (যদিও ডাউনলোড করে দেখা আমার সংস্করণে রয়েছে ১০২ মিনিট। প্রথমে শিরোনামসহ কাট ছাড়া স্ট্যাটিক প্রায় দুই মিনিট করে ৫০টি স্টেট ও দুই ডিস্ট্রিক্ট। আবার কোথাও ৯৭ মিনিট [এল.এ ফিল্মফোরাম, উইকিপিডিয়া] লেখা আছে, এখানে উল্লিখিত ৯৮ মিনিটের সময়কাল আইএমডিবি থেকে উল্লিখিত হয়েছে)। বর্তমান আলাপে বেনিংয়ের সিনেমার নানান বৈশিষ্ট্য ও তার নিজ কথা, ভাবনা, দর্শন, অবস্থান ইত্যাদি সহকারে বিভিন্নজনের বয়ান ও আলাপের সূত্র ধরে “দি ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা” (২০২২, ৯৮ মিনিট) কেন্দ্র করে জেমস বেনিং ও তার সিনেমা-দর্শন সম্পর্কিত ভাবনা উপস্থাপিত হয়েছে। 

দর্শকের ভূমিকা

“প্রশ্ন: বার্লিনের প্রদর্শনীতে সবচেয়ে বেশি হাসির ঘটনা ঘটে যখন জানা যায় যে ছবিটির (“দি ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা” [২০২২, ৯৮ মিনিট]) পুরো শুটিং ক্যালিফোর্নিয়ায় করা হয়েছে।

জেমস বেনিং: (সম্মতিসহ) লস অ্যাঞ্জেলেসে প্রদর্শনীতে কেউ হাসছিল না, হয়তো তারা ভয় পেয়েছিল, কারণ আমি ছিলাম। (হাসি) তাদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “কেউ কেন হাসেনি? মাঝে মাঝে হাসাও বেশ মজার।”

তবে এটা এমন কোনো চলচ্চিত্র নয় যা আমি কাউকে বোকা বানানোর জন্য তৈরি করেছি, তারাও (দর্শকরাও) সে কথা বুঝেছিল। আমার মনে হয় এটা এক ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য যে, আমরা কীভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে যা ভাবি তা তৈরি করতে পারি এবং এটাকে বাস্তব হিসেবে গ্রহণ করতে পারি, এমনকি যখন সম্পূর্ণ বানানো বা মিথ্যাও হয় (যা সব ভাবমূর্তি, ব্যক্তি চরিত্র ও দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)। আমার মনে হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অর্থের যে কোনো (একমাত্র) গঠন কেবল মিথ্যা হতে পারে, কারণ আপনি কীভাবে সবকিছু অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন (এক জায়গায়)? সবসময় যখন দ্বন্দ্ব বিরাজমান। *ক

“আমি চাই (আমার দর্শকেরা) যখন কোনো চলচ্চিত্র দেখবে তখন তাদের খানিক পরিশ্রম করতে হবে”, তিনি ১৯৭৮ সালে ওয়াইড অ্যাঙ্গেলের সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন। মানে তার সিনেমা দেখার জন্য তিনি প্রস্তুতি দাবি করেন যা অযথা নয়। জেমস বেনিংয়ের সিনেমা যেহেতু কথ্য ভাষার চেয়ে অনেক বেশি ভাব প্রধান, ফলে তার সিনেমা দেখা যেমন একেবারে খুব সহজ তেমনি আবার একইসঙ্গে অনেক কঠিন। কারণ বাস্তব জীবনেও আমরা খুব কম দেখি। আর প্রথাগত সিনেমাগুলো দ্রুতকাট, ক্লোজ-মিড-ওয়াইড, চড়া কর্মকাণ্ড ইত্যাদি ইত্যাদি করে এক ধরনের বিভ্রম তৈরি করে যা আসলে কিছু দেখায় না, শুধু দেখেছিল অর্ধকল্প ভাবনার উসকানি ঘটায় (এক ধরনের লো গ্রেড ইউফোরিয়া তৈরি করে)। ফলে বেনিংয়ের সিনেমা দেখার জন্য এক ধরনের শিশুসুলভ সরলতা দরকার যেন দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা মনে রাখতে পারি নিজের মতো করে, কোনো প্রকার উপদেশমূলক উপস্থাপনা ছাড়া। ফলে স্বভাবতই বেনিংয়ের অধিকাংশ সিনেমার ফ্রেম ওয়াইড এবং দীর্ঘ স্ট্যাটিক শট (স্বভাবতই তার ভিন্ন মেজাজ ও কাটেরও রয়েছে অনেক কাজ)। মানে আপনাকে সজাগভাবে পছন্দ করতে হবে সামনে পর্দায় যা প্রদর্শিত হবে তা দেখবেন এবং ভাববেন, খুঁজবেন, মনে রাখবেন বা মনে থাকবে কারণ আপনি স্বয়ং স্বচক্ষে তা দেখেছেন। ধ্যানের মতো এক জায়গায় স্থির থাকবেন, এই প্রক্রিয়াই শুরু করে দেবে মূল ক্রিয়ার, এভাবেই হয়তো তিনি দৃশ্যের পর দৃশ্য দেখিয়ে মন্তাজের মাধ্যমে দর্শকের মনের ভেতর তৈরি করে দিতে চান আসল সিনেমা। আপনি হয়তো খুঁজবেন নানাভাবে তার প্রদর্শিত চেনা কোনো জায়গা, সম্পর্কিত তথ্য এবং নিজের মতো করে তৈরি করবেন কাহিনি। তিনি এক ধরনের শহীদ হিসেবে মৃত্যুবরণ করেন প্রদর্শিত জায়গা এবং দর্শকের মাঝে নির্মাতার জায়গা দখল না করে, ফলে তার সিনেমা পর্দার বাইরে চলে আসে দর্শকের সঙ্গে সঙ্গে। এহেন “আত্মদীপ ভবো” হয়ে ভাবনার বিস্তার বা বাংলার প্রচলিত “আমার আর আমার খোদার মাঝে কোনো পর্দা নাই (বা পর্দার দরকার নাই)”-এর দার্শনিক প্রস্তাবনা বেনিং বুনে চলেন তার সিনেমায়। মানে তার সিনেমায় তিনি নির্মাতার ভূমিকা এতই নাই করে ফেলেন যে মনে হবে, আপনার এবং প্রদর্শিত চলমান চিত্রের মাঝে কেউ নাই (কোনো নির্মাতা নাই এবং এটা সিনেমা নয়!)। বিপরীতভাবে তিনি সিনেমায়, তার পরিচিত নির্মাণ ঢং নিয়ে এতই প্রকটভাবে উপস্থিত যে চোখে পড়ে! ফলে আপনাকে/আমাকে সজাগ থাকার দায় নিয়ে, ভালো-মন্দ অনবরত আবিষ্কারের মনোভাব নিয়ে, খোলা মনে তার দর্শক হতে হবে। দেখতে হবে, শুনতে হবে, না হলে “বেনিং বোরিং” অথবা “জাস্ট সামথিং লাইক সেঞ্চুরি ওল্ড ল্যান্ডপেইন্টিংস”।

জেমস বেনিংয়ের সিনেমা যেহেতু কথ্য ভাষার চেয়ে অনেক বেশি ভাব প্রধান, ফলে তার সিনেমা দেখা যেমন একেবারে খুব সহজ তেমনি আবার একইসঙ্গে অনেক কঠিন।

স্থানের গুরুত্ব

বেনিংয়ের সিনেমায় রয়েছে অসংখ্য ভূদৃশ্য, নানা ধরনের, নানা ঋতুর, নানা জলাশয়ের, নানা শহরের। প্রায় গোটা দেশ একাধিকবার বেড়িয়ে তার নির্যাস তুলে ধরেছেন নির্মিত প্রায় শ-খানেক সিনেমায়। যেখানে সরাসরি মানুষ প্রায় নেই এবং অনেক অনেক পরিমাণে রয়েছে নানান ধরনের জায়গা বা স্থান, যে জায়গাগুলো আবার মানুষের দ্বারা নামকৃত এবং ব্যবহৃত। তার স্থান বা জায়গা শুধু সিনেমার চেয়ে বেশি হয়ে যায় জায়গার সঙ্গে তার চেনাজানা, বোঝাপড়ার সূত্র ধরে ধারণ প্রক্রিয়ার জন্য। যেখানে তিনি প্রচলিত ক্ষমতাদর্শী মতবাদের বিপরীত ভাবনাও বোঝার অবকাশ তৈরি করেন চলচ্ছবি, শব্দ এবং সময়ের নবক্রিয়ার সহজিয়া উন্মোচনের মাধ্যমে। ফলে “দি ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা”র (২০২২, ৯৮ মিনিট) তুলাক্ষেত শুধু তুলাক্ষেত থাকে না অডিও বক্তব্যের সূত্রে, বা ভিন্ন দৃশ্যে যখন বেজে ওঠে উডি গুইথার। উল্লিখিত সিনেমায় আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি স্টেট এবং দুটি ফেডারেল ডিস্ট্রিক্ট-এর প্রতিনিধিত্বমূলক ৫২টি আনকাট ওয়াইড স্ট্যাটিক শট দেখি, প্রথমে উক্ত জায়গার নাম, সঙ্গে স্টেটের নাম ইংরেজি বর্ণমালার ক্রমানুসারে তারপর একক চলচ্ছবি। এসব চলচ্ছবিতে কাছে ধারে কোথাও সরাসরি মানুষ নেই; রয়েছে নদী, পাহাড়, রাস্তা, রেইল রোড, লেক, শহর, পেট্রোল পাম্প, পানি, ক্ষেত এমন অনেক স্থান।

তিনি এক ধরনের শহীদ হিসেবে মৃত্যুবরণ করেন প্রদর্শিত জায়গা এবং দর্শকের মাঝে নির্মাতার জায়গা দখল না করে, ফলে তার সিনেমা পর্দার বাইরে চলে আসে দর্শকের সঙ্গে সঙ্গে।

“স্থানের প্রতি বেনিংয়ের দীর্ঘস্থায়ী আকর্ষণ এবং আনুষ্ঠানিক সংগঠনের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার ক্রমেই একটি অবহেলিত, প্রকৃতপক্ষে মূলত অন্তর্নিহিত, পরিবেশগত রাজনীতির জন্য কাজ করে। তার ক্যালিফোর্নিয়া ট্রিলজি “এল ভ্যালি সেন্ট্রো” [১৯৯৯, ৯০ মিনিট], “লস” [২০০০, ৯০ মিনিট], এবং “সোগোবি” [২০০১, ৯০ মিনিট] এবং তার সাম্প্রতিক তিনটি চলচ্চিত্র “১৩টি লেকস” [২০০৪, ১৩৩ মিনিট], “দশ আকাশ” [২০০৪, ১০১ মিনিট], এবং “আরআর” [২০০৭, ১১১ মিনিট] মার্কিন বাণিজ্যিক মিডিয়া দ্বারা আদর্শায়িত এবং বিক্রি করা হিস্টোরিক্যাল ভোগের মুখোমুখি হয়। যারা সিনেমা দেখতে আসেন তাদের পুনরায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার চেষ্টা করে, দর্শকদের ধৈর্য পরীক্ষা করে তাদের উপলব্ধি ক্ষমতা পুনরুজ্জীবিত করে। তিনটি ক্যালিফোর্নিয়ার চলচ্চিত্র রাজ্যের মানচিত্র তৈরি করার জন্য একটি অভিন্ন কাঠামো (পঁয়ত্রিশটি কঠোরভাবে মেনে চলা আড়াই মিনিটের শট তৈরি), ব্যবহার করে পানি এবং জাতিগত রাজনীতি পরীক্ষা করার সময় এর সৌন্দর্য কল্পনা করে।” *খ

প্রশ্ন: লোকেশন স্পষ্টতই বেনিংয়ের কাজের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যখন নতুন লোকেশনে শুটিং করার সিদ্ধান্ত হয় তখন প্রি-প্রোডাকশন গবেষণা প্রক্রিয়া কেমন হতে পারে তা জানার আগ্রহ আছে, এবং যখন এমন কোনো প্রকল্প হচ্ছে যা খুব নির্দিষ্টভাবে একটি নির্দিষ্ট লোকেশনের জন্য তৈরি, যেমন: “অ্যালেন্সওয়ার্থ” (২০২২, ৬৫ মিনিট), অথবা সম্ভবত “নর্থ অন এভার্স” (১৯৯১, ৮৭ মিনিট) বা “দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা” (২০২২, ৯৮ মিনিট), যেখানে অনেক বিস্তৃত প্রতিকৃতি (এসব ক্ষেত্রে কীভাবে গবেষণা হয়?)।

জেমস বেনিং: ফিল্ম থেকে ফিল্মে পদ্ধতি পরিবর্তিত হয়। আমি বলতে চাইছি, ১৯৭৫ সালে বেট গর্ডন এবং আমি যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রিমেকটি তৈরি করেছিলাম, তা কেবল যুক্তরাষ্ট্র অতিক্রম করার সময় ছিল এবং মাঝে মাঝে গাড়ির পেছন থেকে শট নেওয়া হয়েছিল। এবং কোথাও দেখানো হয়েছিল – আমার মনে নেই, এবং এই সিনেমা কিছু সময়ের জন্য স্ট্রিমিংয়ে ছিল (“দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা” [১৯৭৫, ২৭ মিনিট] দ্য ক্রাইটেরিয়ন চ্যানেলে স্ট্রিম করা হয়েছিল) এবং দুর্দান্ত সাড়া ফেলেছিল। তারপর আমি ভাবলাম, আচ্ছা, আমি ছবিটি রিমেক করব, কিন্তু আসলে রিমেক করব না, তারপর আমি আবার একই শিরোনাম ব্যবহার করেছি! আর তাই, কোভিডের সময়টা (হাতে) ছিল এবং আমি ভেবেছিলাম, আমি এমন একটি ছবি বানাতে চাই যা পুরো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করবে, কিন্তু কোভিডের সময় আমি খুব বেশি ভ্রমণ করতে চাই না (বা সম্ভবও নয়), তবে আমি ঘর থেকে বের হতে চাই। আর আমি জানি ক্যালিফোর্নিয়া খুব ভালো কাজ করবে এই সিনেমায় (সমগ্র আমেরিকা হিসেবে), তাই ক্যালিফোর্নিয়ায় সবকিছুর শুটিং করা ঠিক করি। এটা এক ধরনের মজার রসিকতা, এবং আমি শেষে সেটা প্রকাশ করি। কিন্তু আমার মনে হয় এটা অন্যান্য বিষয়ের কথাও বলেছে। হলিউডের সিনেমাগুলো কীভাবে সবসময় এই টেকনিক ব্যবহার করে (রিয়েল লোকেশন আর সিনেমায় দেখানো লোকেশন এক নয়) – তারা কোথায় থাকে এবং কোথায় শুটিং হয়। এবং (এমন ভাবনা থেকে) জর্জিয়ার প্রতিনিধিত্ব করার জন্য ক্যালিফোর্নিয়ায় যাওয়া আমার জন্য এক ধরনের মজার প্রকল্প হয়ে ওঠে, উদাহরণস্বরূপ। *গ

সহজ স্থির কাব্যিক ধারাবাহিকতা

খুব কম উপাদান রয়েছে বেনিংয়ের অধিকাংশ সিনেমাসহ আলোচিত “দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা” (২০২২, ৯৮ মিনিট) সিনেমার ক্যানভাসে। খুব কম উপাদানের সমাহারে তিনি ইমেজে তৈরি করেন এক ধ্যানমগ্নতা, শূন্যতার ভেতর দিয়ে কিছু বোধের অনুভূতি, যেমন করে আমাদের ভেতরে প্রবাহিত হয় কবিতা বা মিনিমাল সংগীত। প্রায় দুই মিনিট ধরে কোনো জায়গা দেখার ভেতর দিয়ে এক ধরনের নিজস্ব অভিজ্ঞতার উন্মোচন ঘটে। যে ধরনের গভীর অনুভূতি তৈরি করে আরও বিস্তৃতরূপে “১৩টি লেক” (২০০৪, ১৩৩ মিনিট) বা “দশ আকাশ” (২০০৪, ১০১ মিনিট) সিনেমা। তার অধিকাংশ চলচ্ছবি প্রায় ফাঁকা, এক ধরনের শূন্যতায় মোড়ানো, যেন জেন চিত্রের অনুরূপ এক যুক্তরাষ্ট্র যা বুঝতে হলে প্রবেশের উপায় জানা জরুরি। তার সিনেমা কবিতা বা সংগীতের অনুরূপ বিভিন্ন স্তরভেদে অর্থ বদলায়। তিনি জানান, 

‘আমার ছবিতে প্রবেশের অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন উপায় আছে। অবশ্যই আনুষ্ঠানিক এবং নান্দনিক স্তরটি সবচেয়ে স্পষ্ট, এবং সম্ভবত তাৎক্ষণিকভাবে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। শুরু থেকেই আমি একটি নতুন চলচ্চিত্র ভাষা, তথ্য প্রদানের (অথবা গল্প বলার) একটি নতুন উপায় সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছি। যখন আমি প্রথম “১১ x ১৪” (১৯৭৭, ৮০ মিনিট) দেখিয়েছিলাম, তখন অর্ধেক দর্শক হারিয়ে ফেলেছিলাম কারণ তারা ছবিটি কীভাবে দেখতে হয়, তা জানত না। কিন্তু লোকেরা যখন আমাকে বলত যে তারা প্রায় চলে যাওয়া মনস্থির করেও বরং ছবিটির সঙ্গেই থেকে গেছে এবং অনুভব করেছিল যে (বেনিংয়ের সিনেমার) অভিজ্ঞতা তাদের ভিন্নভাবে দেখতে, আরও মনোযোগ দিতে এবং দর্শক হিসেবে আরও সক্রিয় হতে শিখিয়েছে। ছোট ছোট বিবরণের জন্য (ক্লোজআপের অপেক্ষা না করে) ফ্রেমের চারপাশে তাকাতে এবং চলচ্চিত্র তাদের কাছে আসার জন্য অপেক্ষা না করে নিজেই উদ্যোগী হয়ে (ফ্রেমের ভেতর) খুঁজে নিতে (বেনিংয়ের সিনেমা) শিখিয়েছে। এসব শুনে ভালো লেগেছিল।’ *খ

দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকাসহ জেমস বেনিংয়ের সিনেমা বোঝাপড়া বা ক্রমেই জেমস বেনিংয়ের সিনেমার নানান বৈশিষ্ট্য সম্পর্কিত আলাপ-

দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা

বেনিংয়ের সিনেমার পরিষ্কার বিভাজিত কাঠামো ধরে “প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে, তিনি বিশেষ ধরনের এক রিমেক নিয়ে “দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা” (২০২২, ৯৮ মিনিট),-এর পুনর্বিবেচনা ও পুনর্নির্মাণ করেছেন। নতুন ছবিতে, ৭৯ বছর বয়সী শিল্পী মূল ছবির কেন্দ্রীয় ভাবমূর্তিকে জাতির একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রতিকৃতিতে প্রসারিত করেছেন। দেশের প্রতিটি স্টেটের ৫২টি স্থিরচিত্রের একটি সিরিজ উপস্থাপন করেছেন, যার মধ্যে ওয়াশিংটন ডিসি এবং পুয়ের্তো রিকোও রয়েছে, বর্ণানুক্রমিকভাবে। মধ্য-পশ্চিমের জনশূন্য সমভূমি এবং সবুজ কৃষিভূমি থেকে শুরু করে উপকূলীয় মহানগরীর সুসজ্জিত লন এবং নগর বিস্তৃতি পর্যন্ত, চিত্রগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত ম্লান গৌরবের বিস্তৃত দৃশ্য উপস্থাপন করে। এরইমধ্যে, সাউন্ডট্র্যাকে চলে, ক্যানোনাইজড পপ এবং রক গানসহ, শিল্পী এবং কর্মীদের বক্তৃতা এবং দেশকে জর্জরিত করে চলেছে এমন সামাজিক-রাজনৈতিক সংগ্রাম সম্পর্কে চিন্তাভাবনা। কেবল সূচি নয়, ছবিটি দর্শকদের জন্য জাতির অনেক দ্বন্দ্ব বিবেচনা করার জন্য একটি জায়গা (ও জানালা খুলে দেয়), একইসঙ্গে এর সারাংশ সংজ্ঞায়িত বা চিত্রিত করার অসম্ভবতা প্রদর্শন করে। যদিও সিনেমা শেষের শিরোনাম কার্ড প্রকাশ করে ছবিটি সম্পূর্ণরূপে ক্যালিফোর্নিয়ায় চিত্রায়িত হয়েছিল, (রিয়েল লোকেশনে নয়)। এটা ধূর্ত রসিকতার চেয়েও অনেক বেশি, এই ধারণাগত কৌশলটি একটি কার্যকর অনুস্মারক যে আমেরিকা, তার সমস্ত পৃষ্ঠ-স্তরের মিল থাকা সত্ত্বেও, একটি বিশাল ক্যানভাস যার ওপর এখনো নতুন ইতিহাস লেখা যেতে পারে।” *ক

“বিশুদ্ধ পর্যবেক্ষণমূলক সৌন্দর্য বাহিত জেমস বেনিং-এর “দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা” (২০২২, ৯৮ মিনিট), যা তার এবং বেট গর্ডনের যৌথ পরিচালনাকৃত ১৯৭৫ সালের একই নামের (২৭ মিনিট) সংক্ষিপ্ত চলচ্চিত্র দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মিত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি স্টেটের (ওয়াশিংটন ডিসি এবং পুয়ের্তো রিকোসহ, সমস্ত বর্ণানুক্রমিকভাবে এবং আধা-নিয়মিত বিরতিতে উপস্থাপিত) পৃথক স্ট্যাটিক শটগুলোকে রাজনৈতিকভাবে কেন্দ্রীভূত রেডিও ট্রান্সমিশন এবং লোক-পপ কামানের অংশগুলোর সঙ্গে যুক্ত করে, বেনিং আমেরিকান ভূদৃশ্যের স্বাতন্ত্র এবং মিল এবং একটি জাতির সামাজিক-ঐতিহাসিক ক্রসকারেন্টের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে আলোকপাত করেন যা অগ্রগতির দিকে ক্রমবর্ধমান ইঙ্গিত সত্ত্বেও পার্শ্বীয়ভাবে বিকশিত হতে থাকে। ছবিটি শেষ হয় পূর্ববর্তী ৯৫ মিনিটের দর্শকদের বোঝার একটি ধূর্ত উত্থানের সঙ্গে চালাকি প্রকাশ করে, যা সূক্ষ্ম রসিকতার সঙ্গে অভিজ্ঞ পরীক্ষাবিদদের দীর্ঘ অবমূল্যায়িত পথের সর্বশেষ উদাহরণ।” *ঘ

“দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা”র শব্দ নকশার ক্ষেত্রে “বেনিং নির্দিষ্ট স্টেটে মনোযোগ সহকারে বাজানো অডিওর মাধ্যমে অর্থের আরেকটি স্তর যোগ করেছেন – আর্কাইভাল রেকর্ডিংগুলো স্পষ্টভাবে আমেরিকার সবচেয়ে বড় এবং কোনোভাবে নির্দিষ্ট সমস্যাগুলোকে স্পর্শ করে। আমরা মিসিসিপিতে তুলাক্ষেতে ম্যালকম এক্সের সাক্ষাৎকার শুনতে পাই, নেব্রাস্কায় একটি খ্রিষ্টান ধর্মোপদেশ, উটাহের ভূদৃশ্যে আদিবাসী আমেরিকানদের গণহত্যা সম্পর্কে একটি সাক্ষাৎকার। ডেলাওয়্যারে শুনি সামরিক শিল্প কমপ্লেক্স এবং এর বিপদ সম্পর্কে একটি বক্তৃতা – একটি বৃহৎ প্রাসাদের ইঙ্গিতপূর্ণ শটসহ। এসব দৃশ্য গভীর দীর্ঘমেয়াদি বা ঐতিহাসিক বিষয়গুলোর সমষ্টি তৈরি করে, যা দৈনন্দিন জীবনে কিছু বাস্তব কিন্তু স্পষ্ট দৃষ্টিতে লুকানো কিছু দ্বারা সম্পন্ন হয়, যেমন: ক্যালিফোর্নিয়ার শট, একটি সেতুর নিচে তাঁবুতে বসবাসকারী মানুষ এবং নিউ ইয়র্কের আর্থিক জেলা, অথবা ফ্লোরিডার কি বিস্কেনে দেখা ইয়ট এবং নৌকাগুলোর মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করে। প্রতি শটের মাধ্যমে, প্রতিটি চলচ্ছবির সঙ্গে আরেকটি যোগ করে, এবং শেষে, সমস্তগুলোর (সমস্ত চলচ্ছবির) সমষ্টি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি গীতিমূলক বোঝাপড়া নির্মাণ করে কিন্তু (একরৈখিক) আদর্শিক কিছু যোগ করে না।” *ঙ

সময়কাল বা শটের দৈর্ঘ্য বিষয়ক ভাবনা

ম্যাকডোনাল্ড: “১৩টি লেক” (২০০৪, ১৩৩ মিনিট) এবং “দশ আকাশ” (২০০৪, ১০১ মিনিট) অস্বাভাবিকভাবে ন্যূনতম–প্রতিটি ছবিতে মাত্র দশ মিনিটের কিছু অতিরিক্ত শট ব্যবহার করা হয়। এই কৌশলটি আপনাকে কী করতে পরিচালিত করেছে? এবং দর্শকদের জন্য আপনার কী মনে ছিল?

বেনিং: শুরু থেকেই সময়কাল/দৈর্ঘ্য আমার কাজের অংশ। “১১ x ১৪” (১৯৭৭, ৮০ মিনিট)-তে আমি শিকাগো শহরের কেন্দ্রস্থলে যাওয়া ইভানস্টন এক্সপ্রেস রেকর্ড করার জন্য চারশ ফুট ম্যাগাজিন (এগারো মিনিট) ব্যবহার করেছি। “ওয়ান ওয়ে বুগি উগি মিলওয়াকি”র (২০০৫, ১২১ মিনিট একই নামের তার নির্মিতব্য ১৯৭৭ [৬০ মিনিট] সাল ও ২০১২ [৯০ মিনিট] সালের সিনেমা রয়েছে) শিল্প উপত্যকায় আমার তৈরি বা পাওয়া ন্যূনতমবাদী বয়ান ধারণ করার জন্য টানা একষট্টি মিনিটের শট ব্যবহার করেছি। কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়া ট্রিলজি তৈরি করার আগে পর্যন্ত আমি সত্যিই সেই জায়গাটিকে পুরোপুরি উপলব্ধি করতে শুরু করিনি যা কেবল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায়; অর্থাৎ, সেই জায়গাটি সময়ের একটি ক্রিয়া। এবং ট্রিলজির চিত্রগ্রহণের সময়, আমি দেখতে পেলাম যে আড়াই মিনিটের শট দৈর্ঘ্য (ওই তিনটি ছবিতে প্রতিটি শটের দৈর্ঘ্য) সবসময় কাজ করে না। তাই যখন আমি “১৩টি লেক” তৈরি শুরু করি, তখন আমি জানতাম যে আমি আরও লম্বা পোর্ট্রেট করতে চাই, এমন পোর্ট্রেট যা স্থানের বর্ণনা আরও ভালোভাবে দেবে, এমন পোর্ট্রেট যা এমন জায়গায় সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো রেকর্ড করতে পারে যা কেবল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনুভব করা যায়। আরও উল্লেখ করতে চাই যে শ্যারন লকহার্টের “গোশোগাওকা” (১৯৯৭, ৬৩ মিনিট) আমার জন্য খুবই চ্যালেঞ্জের ছিল। তিনি ছবিটি শেষ করার পরপরই আমি ছবিটি দেখেছিলাম এবং কাঠামোগত চলচ্চিত্রের সঙ্গে তার সংযোগ (ওয়ারহলের কাজ, এবং হলিস ফ্র্যাম্পটনের কাজ এবং আমার কাজ) দেখে আমি খুব মুগ্ধ হয়েছিলাম, কিন্তু তিনি কীভাবে কাঠামোকে র‍্যাডিকালাইজ করেছিলেন, সময়কালকে একটি নতুন নান্দনিক স্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন তা দেখে আমি আরও বেশি মুগ্ধ হয়েছিলাম। “গোশোগাওকা” দেখার পর, আমার নিজের কাজ আরও র‍্যাডিকাল হয়ে ওঠে। দর্শকদের জন্য, এই নতুন (বড় দৈর্ঘ্যের ওয়াইড স্ট্যাটিক শটের) কৌশলটি তাদের আরও কঠোর পরিশ্রম করতে বলছে; আমরা যতটা দেখতে অভ্যস্ত তার চেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠভাবে না দেখলে আপনি সূক্ষ্ম কিছু অনুভব করতে পারবেন না এবং আরও ঘনিষ্ঠভাবে দেখা সহজ নয়। প্রথমে আমি চিন্তিত ছিলাম যে দর্শকরা বিরক্ত হবে, কিন্তু বিপরীত দৃশ্যও সত্য বলে মনে হচ্ছে। এই ছবিগুলো বিভিন্ন দর্শকদের মাঝে সফলভাবে প্রদর্শিত হয়েছে। *খ

বেনিংয়ের সিনেমা থেকে প্রাপ্তি

“১৩টি লেক” (২০০৪, ১৩৩ মিনিট)-এর পৃথক ছবির গঠন এবং একের পর এক লেকের ধীর, স্থির প্রকাশ এক ধরনের স্থানিক-কালিক গ্রিড তৈরি করে যার মধ্যে দর্শকরা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি শটের মধ্যে ঘটে যাওয়া সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো পরিমাপ করতে পারে এবং একটি লেক/হ্রদ থেকে অন্য লেকের মধ্যে পার্থক্য নিবন্ধন করতে পারে। যদিও কিছু লেকের চলচ্ছবি অন্যদের তুলনায় দৃশ্যত আকর্ষণীয় (বেনিং অবশ্যই অত্যাশ্চর্য চিত্রকল্প তৈরি করতে সক্ষম কিন্তু সাধারণত তিনি “সুন্দর” শট তোলা থেকে বিরত থাকেন), এবং যদিও লেক থেকে লেকে কিছু রূপান্তর অন্যদের তুলনায় বেশি নাটকীয়, (এখানে) দর্শকের নিজস্ব উপলব্ধি সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান সচেতনতাই চলচ্চিত্রের মধ্যে চরিত্র এবং আখ্যানকে প্রতিস্থাপন করে। শেষের দিকে যখন লেকগুলোর রিয়েল লোকেশন প্রকাশিত হতে শুরু করে, তখন বেনিং তার দর্শকদের মডেলিং করে, বিশ্বের আরও সংবেদনশীলভাবে সক্রিয় ইন্দ্রিয়গত সচেতনতার দাবি করে রূপান্তরিত করেছেন। এই সচেতনতা যুক্তি দেয় যে আমাদের সংস্কৃতির অবিরাম বিক্ষেপ এবং হিস্টিরিয়াজনিত ভোগের প্রবণতা (এবং পরবর্তীকালের গ্রহ-ধ্বংসকারী প্রভাব) আধুনিক জীবনের অনিবার্য পণ্য হওয়ার প্রয়োজন নেই। এবং আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যেমন থোরো আমাদের “ওয়াল্ডেন”-এ মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে, ভৌত জগতের মুহূর্তের পর মুহূর্তের আবর্তনের ধীরগতি উপলব্ধি আমাদের, আমরা কি এবং ব্যক্তি ও (সমষ্টি) সংস্কৃতি হিসেবে কী – প্রয়োজন? এই ধারণাকে রূপান্তরিত করতে পারে। *খ

দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকার ভাব নির্মাণ প্রকল্প

“দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা” (২০২২, ৯৮ মিনিট) সিনেমার সঙ্গে “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জটিল সংযোগ হলো ১৯৭৫ সালে বেনিং ও বেট গর্ডনের একই নামের ২৭ মিনিটের একটি প্রাথমিক কাজ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে এই প্রথম ছবিতে আমরা একজন পুরুষ এবং একজন নারীকে একটি গাড়িতে দেখতে পাই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জেমস বেনিং গাড়ি চালাচ্ছেন, কখনো কখনো গর্ডনও। পেছনের সিটে থাকা ক্যামেরাটি দুটি চরিত্রের মাথার ওপর এবং উইন্ডশিল্ডের মধ্যদিয়ে গাড়িটি যে জায়গাগুলো দিয়ে যায় সেগুলো চিত্রায়িত করে। নতুন ছবির (২০২২, ৯৮ মিনিট) কঠিন কাটের পরিবর্তে, এই আগের ছবিতে মৃদু দ্রবীভূতকরণগুলো রোড ট্রিপের সময় সম্মুখীন বিভিন্ন ল্যান্ডস্কেপকে একে অপরের সঙ্গে প্রবাহিত হতে দেয় – গাড়ির বিভিন্ন গতিশীলতা এবং মেজাজের সঙ্গে। অর্থাৎ তিনি আগের ভাবকল্প ঠিক রেখে নতুনভাবে, নতুন ঢঙে পরিবেশন করেন নতুন সিনেমা।

“দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা” সিনেমা নামের ভেতর “রাষ্ট্রগুলো” “একীভূত” (বা না) হয়ে যায়, এবং “আমেরিকা” (বা না)-এর সঙ্গে এর কী সম্পর্ক রয়েছে – দুটি ছবিতে খুব আলাদাভাবে ধরা হয়েছে। কিন্তু নতুন ছবিটি পুরোনোটির একটি দিকের সঙ্গে যুক্ত – বেনিংয়ের প্রথম দিকের কাজগুলোতে প্রায় সবসময়ই সামনে এবং কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এমন একটি দিক যা সিনেম্যাটিক চিত্রের সমস্যা এবং সম্ভাবনা উভয়ই হিসাবে কাল্পনিকীকরণ। কেবল “দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা”-তে নয়, উদাহরণস্বরূপ “১১ x ১৪” (১৯৭৮, ৮০ মিনিট), “সে এবং আমি” (১৯৮২, ৮৮ মিনিট) এবং “ল্যান্ডস্কেপ সুইসাইড” (১৯৮৬, ৯৫ মিনিট)-এও, আমেরিকান ল্যান্ডস্কেপের দৃষ্টিভঙ্গি চরিত্রের আখ্যানের টুকরোগুলোর সঙ্গে একত্রিত হয়, কখনো কখনো কিছুটা আত্মজীবনীমূলক, কখনো কখনো আধা-তথ্যচিত্র হিসেবে। তবে, গত দুই দশকের কাজগুলোতে, এই ধরনের কৌশলগুলো খুব কমই দেখা যায় বা কমপক্ষে চিত্রের প্রান্তে আরও দূরে ঠেলে দেওয়া হয়, অথবা সম্পূর্ণরূপে দৃষ্টির বাইরে। বিশেষ করে “দশ আকাশ” বা “১৩টি লেক”-এর মতো হাইপার-মিনিমালিস্ট কাজগুলোতে, অর্থ কেবল চিত্রগুলো থেকে বা তাদের ধারাবাহিক উপস্থাপনার বাইরে বেরিয়ে আসে (সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে নয়)। একটি নির্দিষ্ট অর্থে, নতুন ছবিতে, কাল্পনিকীকরণ বেনিংয়ের সিনেমায় নবভাবে ফিরে আসে। কিন্তু “দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা” ২০২১ (মূল লেখার উল্লিখিত সাল, কিন্তু বর্তমান লেখায় বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত সাল ধরে আলোচিত হয়েছে), “দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা” ১৯৭৫-এর মতো নয়, এখানে সিনেমা আর চরিত্রের সঙ্গে আবদ্ধ নয়। পরিবর্তে, কৃতিত্বের মাধ্যমে, এটা (চরিত্র) এমন ভূদৃশ্যে অবস্থিত যেখানে নিজেকে (দর্শককে) নিয়ে যায় – অর্থাৎ আমেরিকার সারমর্মে, যা জেমস বেনিংয়ের কাজে, কখনো নিজের সঙ্গে পুরোপুরি মানানসই না-ও হতে পারে। *চ

২০২২ সালের “দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা” আগের ১৯৭৫ সালের সমনামের বেনিংয়ের যৌথ নির্মিত সিনেমার রিমেক বা পুনর্নির্মাণ। রিমেক নানা ধরনের হতে পারে, বেনিং নিজেই তার আগের সিনেমা “ওয়ান ওয়ে বুগি উগি”র (২০১২, ২০০৫, ১৯৭৭) রিমেক করেছেন, যেমন আলোচিত সিনেমা। বলাই বাহুল্য “দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা”র রিমেক যতটা-না কাহিনি বা চরিত্র-কেন্দ্রিক তারচেয়ে অনেক বেশি ভাবনা-কেন্দ্রিক। সরলভাবে বলা যায়, ১৯৭৫ সালে তিনি আমেরিকা বলতে যা বুঝতেন বা যেভাবে দেখতেন এখন আর ঠিক সেভাবেই বোঝেন না বা দেখেন না, বা এখন আবার আগের মতো করে দেখার বা দেখানোর প্রচেষ্টা হানিকর। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই সিনেমার শেষ হয় বিশাল এক চমক দিয়ে বা সিনেম্যাটিক ভাষার রসিকতাপূর্ণ ব্যবহার দিয়ে এবং প্রায় একই কায়দায়, ১৯৭৫ সালে চলচ্ছবি দিয়ে এবং ২০২২ সালে টেক্সট দিয়ে! ১৯৭৫ সালের সিনেমায় আমরা শেষ দৃশ্য হিসেবে দেখি একটা খালি গাড়ির পেছন থেকে ক্যামেরা দেখায় সামনে অনন্ত সমুদ্র, সামনের আসনের নারী-পুরুষ উধাও, এতক্ষণ যে সত্য ডকুমেন্টারি হিসেবে সিনেমা চলছিল তার ঠিক বিপরীত ধরনের চলচ্ছবি ও অর্থ নির্মিত হয়ে সম্পূর্ণ সিনেমাকেই পুনঃসংজ্ঞায়িত করতে চায়! ঠিক একই কাজ ২০২২ সালের সিনেমাতে ঘটে চলচ্ছবির পরিবর্তে শেষের রিয়েল লোকেশনের নামের তালিকা প্রদর্শন করে।

কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই সিনেমার শেষ হয় বিশাল এক চমক দিয়ে বা সিনেম্যাটিক ভাষার রসিকতাপূর্ণ ব্যবহার দিয়ে এবং প্রায় একই কায়দায়, ১৯৭৫ সালে চলচ্ছবি দিয়ে এবং ২০২২ সালে টেক্সট দিয়ে!

পুঁজিবাদ বিরোধী অবস্থান

ম্যাকডোনাল্ড: চলচ্চিত্র নির্মাণকে সমসাময়িক ভোক্তা সংস্কৃতির প্রতিষেধক হিসেবে কতটা মনে করেন?

বেনিং: একটা ভারগ্রস্ত প্রশ্ন। আমরা কীভাবে ভোগবাদ থেকে মুক্তি পেতে পারি? আমি ১৩টি লেকের শুটিংয়ের জন্য পনেরো হাজার মাইলেরও বেশি গাড়ি চালিয়েছি। আমার অনেক ছবির জন্য আমি ব্যাপক ভ্রমণ করেছি। আর চলচ্চিত্র নির্মাণ কোনো পরিষ্কার শিল্প নয়। যেমন পোগো বলেছিলেন, “আমরা শত্রুর সঙ্গে দেখা করেছি এবং সে (শত্রু) আমরা!” আমি যখন নিউ ইয়র্ক সিটিতে থাকতাম, তখন সোহো ছিল শিল্পীদের পাড়া। এখন (অবস্থা) দেখুন। শিল্পীরা ভদ্রতা এবং মূলধন বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান অনুঘটক। আর শিল্প জগতের সঙ্গে (শিল্পীর সঙ্গে) বাজার ও অর্থের (রয়েছে) সম্পর্ক প্রত্যক্ষ। ভিন্নভাবে আমার চলচ্চিত্রগুলো ভোগবাদের প্রতিষেধকও বটে। এগুলো যতটা সম্ভব সস্তায় তৈরি করা হয় – বেশিরভাগ সময় বিশ হাজার ডলারেরও কম অর্থে – এবং এগুলো বেশি খরচ করার বিষয়ে নয়; এগুলো আপনার চারপাশে এরইমধ্যে যা আছে তা আরও বেশি দেখা এবং শোনার বিষয়ে। আমি আমার চলচ্চিত্রগুলোকে ভোগবাদী পণ্যে রূপান্তর করার জন্য কাজ করি না। আমার সিনেমার ডিভিডি কেনা যায় না, আর যদিও সিনেমাগুলো নিজেরাই খরচ করে, তবুও তারা আমাকে ধনী বানায় না। “১৩টি লেক”, “দশ আকাশ”, এবং “ওয়ান ওয়ে বুগি উগি/২৭ ইয়ার্স লেটার” (২০০৫ সালে বেনিং “ওয়ান ওয়ে বুগি উগি”র একটি শট-বাই-শট রিমেক শেষ করেছিলেন, যার নাম ছিল “ওয়ান ওয়ে বুগি উগি/২৭ ইয়ার্স লেটার্”) সম্প্রতি নিউ ইয়র্কের অ্যান্থোলজি ফিল্ম আর্কাইভে এক সপ্তাহ ধরে চলেছিল, এবং প্রিন্টের ক্ষয়ক্ষতির খরচ মেটানোর জন্য আমি যথেষ্ট টাকা আয় করতে পারিনি (সে প্রদর্শনী থেকে)। *খ 

তারপরও তিনি তার কর্মে পুঁজিবাদী কোনো উপাদানের ব্যবহার করে চিত্তহরণকারী সিনেমা নির্মাণের ঘোরতর বিরোধী অবস্থানে অবিচল এবং ফলপ্রসূভাবে কয়েক দশক ধরে নির্মাণ করে চলেছেন ভাবনা সমৃদ্ধ ভূদৃশ্য-কেন্দ্রিক কাঠামোবাদী চলচ্চিত্র।

জেমস বেনিংয়ের নির্বাচিত কিছু কথা

বেনিং নকল করতে ভালোবাসেন। যখন যার পেইন্টিং ভালো লাগে, তাকে নকল করে তিনি উক্ত শিল্পীর মতো করে ছবি আঁকেন। তিনি এমন চর্চার মাধ্যমে তার ভালোলাগা, শিল্পী ও শিল্প সম্পর্কে গভীর অভিজ্ঞতার অনুসন্ধান করেন। তিনি থোরো ও টেড ক্যাজিনস্কির কেবিনের নকল করে তার জমিতে ঠিক সেরকম কেবিন বানিয়েছিলেন, সে নিয়ে কাজও করেছেন (“২ কেবিন” ২০১২, ৩১ মিনিট, ২ স্ক্রিন)। তার মতে, একই কর্মপ্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গেলে উক্ত বিষয় ও ব্যক্তি সম্পর্কিত জ্ঞানের গুণগত পরিবর্তন সাধিত হয়।

বেনিংয়ের কিছু কথাবার্তা:

“শিল্পী হলেন এমন একজন যিনি মনোযোগ দেন এবং প্রতিক্রিয়া জানান।”

“আধুনিক আখ্যান, হাস্যরস এবং তীক্ষ্ণ সম্পাদনার মাধ্যমে আমেরিকা বোঝার ক্ষেত্রে এটা এক প্রবেশপথ তৈরি করে (“দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা”)।” 

“যখন আমি (জেমস বেনিং) সিনেমা বানাতে শুরু করি, তখন ভাবতাম, আমি রাজনৈতিক সিনেমা বানাব না। কারণ রাজনীতি করতে হলে আমাকে তৃণমূল স্তরে ফিরে যেতে হবে এবং দেখতে হবে কী হয়। ধীরে ধীরে, স্ব-অভিজ্ঞতা আমার ভাবনায় ফিরে আসতে থাকে আর এখন আমার ছবিতে সবসময় রাজনীতি থাকে। আশা করি কোনো গোঁড়ামিপূর্ণ উপায়ে নয়, যেখানে আমি আপনাকে কীভাবে ভাবতে হবে তা বলব, তবে আমি দর্শককে ভাবতে বলি। আমার মনে হয় আমার সিনেমাগুলো মাঝে মাঝে অতিরিক্ত সূক্ষ্ম হয়ে ওঠে, তবে সবসময় না-ও হতে পারে।”

“চলচ্চিত্র কী তা সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে, সেগুলোকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করে, দৃশ্যপট, কাহিনি ইত্যাদি বিষয় অধ্যয়ন করার ক্ষেত্রে খুবই বাস্তববাদী, কিন্তু আমি কখনো এ ধরনের চলচ্চিত্রের কথা ভাবিনি (এবং এভাবে বিভক্ত করে টেকনিক্যাল নাম ধরে চলচ্চিত্র অনুধাবন করিনি), আমার কাছে এ ধরনের চিন্তাভাবনা বেশ রক্ষণশীল (ও সীমাবদ্ধ) বলে মনে হয়েছে।”

“সব মৌলিক বিষয়ই সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ–আমি এসবকে ছোট করে দেখতে চাই না। কিন্তু মৌলিক বিষয়গুলো (প্রায়ই) এমনভাবে আবদ্ধ করতে পারে যেখানে সেগুলো অতিক্রম করার জন্য একটি দরজা খোলার প্রয়োজন হয়।”

দেশনা

বেনিংয়ের দার্শনিক প্রস্তাবনা “সময়ের এক ক্রিয়া হিসেবে ভূদৃশ্য” এবং ধারণারূপে “দেখা এবং শোনা” তার সিনেমার প্রধান এক সারবত্তা। নির্ধারিত কাঠামো ধরে স্থির চলচ্ছবির মাধ্যমে তিনি পরিবেশন করেন নতুন নতুন সিনেমা, যেসবে প্রদর্শিত প্রধানত জায়গার চলচ্ছবির চেয়ে তার ভাব ও ভাবনা প্রধান করে নির্মিত তার ভাবসিনেমার জগৎ। তার সিনেমা দৃশ্যত সরল, ন্যূনতমবাদী এবং স্বল্প ব্যয়ে নির্মিত কিন্তু গভীর কাব্যিক দার্শনিকতায় মোড়ানো জায়গা ও মানুষের ভাবতত্ত্বে সমৃদ্ধ। এসব ভাব-ভাবনা অনেকাংশে বাংলার বাউল-সহজিয়া-সুফি সংস্কৃতির ন্যায়, ইশারায় কথা বলে, যা বলে, তা সে বলে না, ভিন্ন গোপন কোনো সংকেতের ইশারা জানায়। তার সিনেমার অংশ হিসেবে টেক্সটের ব্যবহার শুধু তথ্য পরিবেশনের জন্য বা গল্পের গাড়ি চালিয়ে নেওয়ার জন্য নয় বরং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত। আবার কখনো কখনো তিনি টেক্সট ব্যবহার না করে এক ধরনের মসৃণ সম্পাদনা গতি তৈরি করেন কিন্তু তার লক্ষ্য মনোরঞ্জন নয়, আরও বৃহৎ কিছু। সংগত কারণেই এমন সদিচ্ছার চর্চা জনপ্রিয় “চরিত্র” ও “গল্প” নির্ভর ফেনিয়ে তোলা চলচ্চিত্রে সম্ভব নয়; কারণ সেখানে চমকানোর প্রবৃত্তির চর্চা সীমাহীন ও বহুল প্রচলিত। বরং তিনি আমাদের ভাবনানির্ভর বুদ্ধিবৃত্তিক কল্পনাকে তার দৃষ্টিকোণ থেকে চলচ্ছবিতে রূপান্তরিত করে সম্পাদনা ও শব্দনকশা সম্পন্ন করে সিনেমা হিসেবে উপস্থাপন করেন। এসব কর্ম সিনেমা হয়েও অনেক বেশি ধারণাগত শিল্পকর্ম আবার ভিন্ন বিপরীত ভাবনাও সত্য, অর্থাৎ একটা বিরাজমান দ্বন্দ্ব নির্মিত হয় তার সিনেমার একক পরিচয় নির্ধারণে।

জেমস বেনিংয়ের সিনেমা নির্মাণের অন্যতম কারণ এমন জায়গা যেখানে তিনি সময় কাটাতে স্বচ্ছন্দবোধ করেন এবং ওই জায়গা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করা, আর দ্বিতীয় কারণ তার নিজের জীবনকে আরও ভালো ও গভীরভাবে উপলব্ধি করা। যেন তিনি জানেন দুনিয়াবি বাকি সব বৃথা ও ক্ষণস্থায়ী, তাই আকর্ষণীয় হলেও এসব নকল সংহতি, উত্তেজনা বর্জনীয়। ফলে কখনো অর্থের সংস্থানের কমবেশি বা খ্যাতির মোহ তাকে নতুন নতুন চলচ্চিত্র নির্মাণের বাধা হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি বরং একে তিনি আউটসাইডার আর্টিস্টদের মতো তার স্বকীয় স্বাধীনতা হিসেবে উদ্‌যাপন করেছেন একের পরে এক খুব স্বল্প বাজেটের সিনেমা নির্মাণ করে, যার বাজেট অনেক সময় শুধু তার যাত্রা খরচ। বেনিংয়ের সিনেমায় পরিচিত সব প্রধান সিনেমা উপাদান (মন্তাজ, শেষ-শুরু, শট, শব্দ) থাকা সত্ত্বেও তাৎপর্যপূর্ণভাবে ব্যবহার ভিন্নতার কারণে শুরু হয় দর্শকদের দেখার ও শোনার এবং জগৎকে নতুন করে উপলব্ধি করার এক যাত্রার। তিনি প্রধানত এ কর্মে কৌশল হিসেবে স্ট্যাটিক দীর্ঘ কোনো মিনিমাল ভূদৃশ্যের সঙ্গে মানুষের ন্যূনতম ও পরোক্ষ উপস্থাপনের ভেতর দিয়ে নির্মাণ করেন তার ভাবনা সমৃদ্ধ সিনেমাজগৎ।

কুড়ি বছরের গোড়ার সময় নানা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে অংশগ্রহণ করেন বেনিং, যে অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক বিশ্বাস তার চলচ্চিত্রে এবং কর্মজীবনের কাজগুলোকে পূর্ণ করেছে ধারাবাহিকভাবে। সেসব কেবল নীতিবাক্যমূলক, সরলবাদী, কথার কথা নয় তার জন্য। শুধু সিনেমায় আদর্শবাদী বুলি না আউড়িয়ে তিনি নিজের যাপিত জীবনকে বদলেছেন এবং যাপন করেছেন, যে প্রভাব ও চর্চা তার শিল্পকর্মেও প্রসারিত। স্বভাবতই তিনি শিল্পের সঙ্গে অর্থ ও খ্যাতির সম্পর্ক জেনেও নিজের কর্মপ্রণালি এবং বোধ বিক্রি করে সেই ইঁদুর দৌড়ে শামিল হননি। বেনিং নিজ কর্মের বিবর্তন সম্পর্কে সজাগ কিন্তু মনে করিয়ে দেন, তার সিনেমা সম্পর্কে যেসব ভাবি সেসব “ছবির মধ্যেই ছিল না, বরং এটা আমাদের দেখার পদ্ধতিতে ছিল” যা তিনি বদলের আশা করেন তার নির্মিত সিনেমার ভেতর দিয়ে।

জেমস বেনিং চলচ্চিত্রে সময় এবং স্থানকে এক ধরনের কাঠামোর মধ্যদিয়ে কাব্যিক রূপান্তরের ভেতর দিয়ে উপস্থাপন করেন যা উল্লিখিত সিনেমা “দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা” (২০২২, ৯৮ মিনিট)-তেও বিদ্যমান।

জেমস বেনিং চলচ্চিত্রে সময় এবং স্থানকে এক ধরনের কাঠামোর মধ্যদিয়ে কাব্যিক রূপান্তরের ভেতর দিয়ে উপস্থাপন করেন যা উল্লিখিত সিনেমা “দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা” (২০২২, ৯৮ মিনিট)-তেও বিদ্যমান। এরূপ ভাবনা ও নানান ভাব, একই পথ অনুসরণ করে নির্মাণ উপযোগী উপাদান বাংলার মাটি, হাওয়ায় ভেসে বেড়ালেও এরূপ ভাবসিনেমা এখানে খুব কম, বিরল। হয়তো পুঁজির যে পরিমাণ সঞ্চার, যেরূপ যোগাযোগ কাঠামো, সামাজিক সংস্কৃতি, রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও নীতি তৈরি হলে এমন সূক্ষ্মরসের অবতারণা করা যায় সেরূপ এখানে কখনো ঘটেনি বা ঘটার সুযোগ পায়নি। কারণ ব্যক্তি, পুঁজি, পরিবেশ, রাজনীতি, রাষ্ট্র, সংগঠন, পরিবার, সমাজ, ধর্ম, বাজার, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি ইত্যাদি একে অপরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এবং শিল্পী ও শিল্পও এসবের সামগ্রিক প্রভাবের বাইরের কিছু নয়।

মুহম্মদ আনোয়ার হোসেন: চলচ্চিত্রকার, সমালোচক। ই-মেইল: maangorepublik@gmail.com

দোহাই

ইংরেজির বাংলা অনুবাদে গুগল ট্রান্সলেট ব্যবহৃত হয়েছে। নানাজনের লেখার নানা অংশ সূত্র উল্লেখসহ বর্তমান লেখায় ব্যবহৃত হয়েছে। বন্ধনীর ভেতরের লেখা বর্তমান লেখকের। বিদেশি নামধামের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাহীনতা ও অজ্ঞতার কারণে ভিন্ন বা ভুল হতে পারে।

https://en.wikipedia.org/wiki/James_Benning_(film_director) 

https://www.imdb.com/name/nm0072159/ 

https://www.lafilmforum.org/archive/winter-2022/the-united-states-of-america-by-james-benning/ 

https://www.filmcomment.com/blog/interview-james-benning-on-the-united-states-of-america/ *ক 

TESTING YOUR PATIENCE: AN INTERVIEW WITH JAMES BENNING By Scott MacDonald * খ 

https://www.artforum.com/features/testing-your-patience-an-interview-with-james-benning-180723/ 

A Contract with the Audience: An Interview with James Benning, October 13, 2023, by Zach Lewis

https://inreviewonline.com/2023/10/13/james-benning-interview/ *গ 

https://mubi.com/en/notebook/posts/berlinale-dispatch-back-to-the-future *ঘ 

Window Dressing: ‘The United States of America’ at 50, By Saffron Maeve, Fri, 07/04/2025

https://www.documentary.org/online-feature/window-dressing-united-states-america-50 

https://lwlies.com/festivals/the-united-states-of-america-first-look-review/ 

A sense of place, Review written by, Bianca-Olivia Nita, March 11, 2022, *ঙ 

https://www.moderntimes.review/united-states-of-america/ 

Please Remain Seated! THE UNITED STATES OF AMERICA seems to be firmly rooted in James Benning’s decades-long engagement with the landscape of his native country—until the last moment, when a twist pulls the rug out from under our feet … By Lukas Foerster. Translation: From German Hilda Hoy. *চ 

https://www.arsenal-berlin.de/en/forum-forum-expanded/forum-program/forum-main-program/the-united-states-of-america/essay-please-remain-seated/ 

Joshua Minsoo Kim | Film Show 019: James Benning | An interview with filmmaker James Benning about growing up in Milwaukee, his organizing experiences, and various films from throughout his career | Oct 21, 2022

https://toneglow.substack.com/p/film-show-019-james-benning

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •