বর্তমান সরকারের শিক্ষাভাবনা: উদ্বেগ, প্রশ্ন ও সুপারিশ

বর্তমান সরকারের শিক্ষাভাবনা: উদ্বেগ, প্রশ্ন ও সুপারিশ

রাখাল রাহা

বাংলাদেশের শিক্ষাখাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগসমূহ দীর্ঘদিন ধরে বিচিত্র সব পরিকল্পনা আর ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যাওয়ার ফলে পুরো খাত নৈরাজ্যের মধ্যে পতিত হয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও তৎপরবর্তী নির্বাচিত বিএনপি সরকার ও সরকারের প্রধান হিসেবে তারেক রহমান বাংলাদেশের শিক্ষা নিয়ে যে পরিকল্পনার কথা আগে বলেছেন, নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করেছেন এবং এখন তা বাস্তবায়নের পথে চলেছেন, এই তিনটি বিষয়ই বিশ্লেষণ করা জরুরি। এই লেখা বিশ্লেষণের গণ্ডি মূলত শিক্ষার নিম্নস্তর অর্থাৎ প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত রাখা হয়েছে।

১. ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব কর্মসূচি

নির্বাচনের আগে জনাব তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে তার ১০ মিনিটের শিক্ষাভাবনায় বলেছিলেন, তিনি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচির আওতায় সাড়ে তিন লক্ষাধিক শিক্ষকের সবাইকে ধারাবাহিকভাবে একটা করে ট্যাব দেবেন ও জেলা পর্যায়ে তা ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেবেন। জেলায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে বাকিদের শিখিয়ে দেবেন। এরপর ঢাকা থেকে বা বাংলাদেশের যে কোনো এলাকা থেকে ভালো প্রশিক্ষক বা টিচার অনলাইনে সারা দেশের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেবেন। শিক্ষকরা নিজ নিজ এলাকায় থেকেই ট্যাব ব্যবহার করে শিক্ষকতাসহ নানা ধরনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবেন। এতে রাষ্ট্রের খরচ ও সময় বাঁচবে।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার-২০২৬-এর দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৬ষ্ঠ উপশিরোনাম ‘শিক্ষা ও মানব সম্পদ উন্নয়ন’। সেখানে দ্বিতীয় কর্মসূচি হিসেবে এই পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এখানে শুধু প্রাথমিক স্তর নয়, মাধ্যমিক ও সমমানের স্কুলেও এই ট্যাব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে এভাবে:

ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও সমমানের শিক্ষকদের আধুনিক ও সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা অর্জনসহ সার্বিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ট্যাবলেট কম্পিউটার প্রদান করা হবে।

কোনো সন্দেহ নেই বাংলাদেশের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। ইউনেস্কোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট অনুযায়ী মানের বিচারে বাংলাদেশের শিক্ষক প্রশিক্ষণও কম, আবার মানও খারাপ। কিন্তু যে কোনো প্রশিক্ষণ পরিকল্পনার শুরুতে বিবেচনা করতে হয় যারা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবেন তারা নিজেরা তা গ্রহণের এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনা সেই প্রশিক্ষণ প্রদানের অনুকূলে আছে কি না, কিংবা প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর তা বাস্তবায়ন করা যাবে কি না। এটা বিচার করতে গেলে আমরা দেখব যে, এখানে দীর্ঘকাল ধরে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া ত্রুটিপূর্ণ। নানাজন নানা কারণে এখানে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করে নানাজনকে নিজ নিজ বিবেচনায় শিক্ষক বানিয়েছেন। শিক্ষাকে কেন্দ্রে রেখে এখানে শিক্ষকদের যোগ্যতার মানদণ্ড যেমন নির্ধারিত হয়নি, নিয়োগও দেওয়া হয়নি। সুতরাং এখানে শিক্ষক মানেই শিক্ষক, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। তার ওপর নানা সরকার ও তার আমলাতন্ত্র শিক্ষার সাফল্য দেখাতে বা রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারে এসব শিক্ষককে দিয়ে নানা অসাধু উপায় অবলম্বন করতে শিখিয়েছে এবং ক্ষেত্রবিশেষে বাধ্যও করিয়েছে। 

সুতরাং প্রায় নিশ্চিতভাবে অনুমান করা যায় যে, প্রশিক্ষণ দিলেও ট্যাব চালাতে প্রতি ১০ জনে ১ জন শিক্ষক সক্ষম হবেন না। ফলে তারা পরবর্তী সময়ে অনলাইনে প্রশিক্ষণও ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারবেন না। দ্বিতীয়ত ট্যাব যারা চালাতে পারবেন তাদের একটা বড় অংশ বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট সংযোগসহ বিচিত্র কারণে অনলাইন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে সক্ষম হবেন না। অনেকে সক্ষম হলেও অনিচ্ছুক বা অনাগ্রহী থাকবেন এবং গ্রহণ করবেন না। উপরন্তু ট্যাব পরিচালনা, সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ জটিলতা ও নানা পর্যায়ে জবাবদিহি করতে গিয়ে যেটুকু স্বাভাবিক শ্রেণি কার্যক্রম রয়েছে সেটাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ক্ষমতা গ্রহণের খুব অল্প সময়ের মধ্যেই গত ২৪ মার্চ প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচিতে ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব প্রকল্প’কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এক বছরের মধ্যে সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের হাতে অত্যাধুনিক ট্যাব সরবরাহ করা হবে। ট্যাবে থাকবে লেসন প্ল্যান টেমপ্লেট, প্রশ্ন ব্যাংক, অ্যাটেনডেন্স সিস্টেম, লার্নিং এভিডেন্স আপলোড টুল, মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট ইত্যাদি। এর মাধ্যমে শিক্ষকদের ডিজিটাল লিটারেসি, এআই অ্যাওয়্যারনেস এবং সাইবার সেফটিও শেখানো হবে। প্রথম পর্যায়ে ৫০ হাজার ট্যাব বিতরণ করা হবে এবং ২০ হাজার শিক্ষককে বিশেষ ডিজিটাল প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ১৮০ দিনের মধ্যে প্রথম পর্যায় শুরু হয়ে ১ বছরের মধ্যে সব প্রাথমিক, কারিগরি, মাদ্রাসা ও স্কুল-কলেজ শিক্ষকের (প্রায় ৮-১০ লাখ!) হাতে ট্যাব পৌঁছে যাবে এবং পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণও সম্পন্ন হবে। বলা হচ্ছে এই কর্মসূচি প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের চক-ডাস্টার যুগ থেকে ডিজিটাল ও এআই যুগে নিয়ে যাবে।

আগে প্রয়োজন ছিল স্কুল ও শিক্ষকদের যথাযথ প্রক্রিয়ায় মূল্যায়নের মাধ্যমে গ্রেডিং করা এবং তার ভিত্তিতে বিশেষ স্কুল ও বিশেষ শিক্ষককে বিশেষ প্রণোদনা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে এই কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসা। এতে কর্মসূচি বাস্তবায়নের ঝুঁকি যেমন কমত, তার সাফল্য যেমন পরিমাপ করা যেত, তেমনি গ্রেডিংয়ে পেছানো স্কুল ও শিক্ষকদের প্রয়োজন অনুসারে ধারাবাহিকভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেত।

২. বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা

নির্বাচনের আগে তারেক রহমান তার শিক্ষাভাবনায় দ্বিতীয় যেটা বলেছিলেন তা হলো: বাংলা-ইংরেজির পাশাপাশি চাইনিজ, জাপানিজ, আরবি, ফরাসি, স্প্যানিশ, কোরিয়ান প্রভৃতির যে কোনো একটা তৃতীয় ভাষা শেখানোর কথা, যাতে শিক্ষার্থীরা দেশ-বিদেশে কাজের ক্ষেত্রে সুবিধা পেতে পারে। কখন এই ভাষা শেখানো শুরু হবে সেটা তখন উল্লেখ না করলেও বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার-২০২৬-এর দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৬ষ্ঠ উপশিরোনামের ৫ম কর্মসূচিতে এটা এভাবে উল্লেখ আছে:

বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা: দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরিতে বাংলা-ইংরেজির পাশাপাশি আরবি, জাপানিজ, কোরিয়ান, ইতালিয়ান, ম্যান্ডারিন ইত্যাদি তৃতীয় ভাষা শিক্ষা মাধ্যমিক পর্যায় থেকে চালু করা হবে।

এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখাতে হবে। অল্প কিছু বিশেষায়িত স্কুল ও মাদ্রাসায় মাধ্যমিক পর্যায়ে পালি-সংস্কৃত, আরবি প্রভৃতি তৃতীয় ভাষা হিসেবে শেখার সুযোগ এখনো আছে। এখন যদি মাধ্যমিক স্তরের বাকি সব স্কুলে, সব শিক্ষার্থীর জন্য তৃতীয় ভাষা সমানভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়, তবে তা কতখানি সফল হতে পারে, সেটা আমরা বুঝতে পারব যদি শিক্ষার্থীদের প্রথম ভাষা বাংলা শেখার অবস্থা খতিয়ে দেখি। এ বিষয়ে বিভিন্ন জরিপ বলছে, বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেও এ দেশের প্রায় ৬০ ভাগ শিশু সহজ বাংলা টেক্সট পড়ে বুঝতে পারে না। বাংলা বইকে করে তোলা হয় নানা পক্ষের নানামুখী চাহিদায় ঠাসা একটা সংকলন গ্রন্থের মতো। গণিত-বিজ্ঞান বা অন্যান্য বিষয় পড়েও শিশুরা বুঝতে পারে না। কারণ, সেগুলো বাংলা বইয়ের চেয়েও অনেক জটিল বাক্যবিন্যাস ও তার না-জানা শব্দ-পরিভাষায় সাজানো থাকে। তা ছাড়া অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত শিক্ষকের দ্বারা অপর্যাপ্ত ক্লাস-সময় নিয়ে শিক্ষার্থীরা সেই বই পড়ে ঠিকমতো অর্থ অনুধাবন করতে পারে না।

এরপর দ্বিতীয় ভাষা ইংরেজির অবস্থা দেখলে বোঝা যাবে ১২ বছর ইংরেজি শিখেও আমাদের ৮০ ভাগ শিক্ষার্থী ন্যূনতম দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। কারণ, ভাষা শেখার স্বাভাবিক রীতিপদ্ধতি শোনা-বলা-পড়া-লেখা অনুসরণ করে এখানে ইংরেজি শেখানো হয় না। যে ভাষা তারা একটুও শুনতে বা বলতে শেখেনি, তাকে শুরুতেই লিখতে ও পড়তে শেখানো হয়। প্রায় সেরকম করেই পাঠ্যপুস্তক তৈরি করা হয়, বা শিক্ষকরা সেভাবেই পড়াতে অভ্যস্ত থাকেন। আবার অধিকাংশ স্কুলে ইংরেজির বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকও নেই। ফলে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজি শিখছে এমন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মানের অবস্থান একেবারে নিচের দিকে। 

১২ বছর ইংরেজি শিখেও আমাদের ৮০ ভাগ শিক্ষার্থী ন্যূনতম দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। কারণ, ভাষা শেখার স্বাভাবিক রীতিপদ্ধতি শোনা-বলা-পড়া-লেখা অনুসরণ করে এখানে ইংরেজি শেখানো হয় না।

প্রথম ও দ্বিতীয় ভাষা শিক্ষার যেখানে এমন দশা, সেখানে তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক করে দিলেই শিক্ষার্থীরা তা শিখতে পারবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। বরং তা অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ভাষা শেখার ক্ষমতাকেই নিঃশেষ করে দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, এত ভাষা শেখানোর শিক্ষক রাতারাতি কোথা থেকে আসবে? সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বাংলাদেশে প্রায় শ-দুয়েক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়েও ল্যাঙ্গুয়েজ ইনস্টিটিউট নেই। তাহলে ক্লাস কীভাবে হবে? অনলাইনে? এ দেশে অনলাইন ক্লাসের অভিজ্ঞতার কিছু জরিপ রয়েছে এবং সেখানে যা সাফল্যের হার, তা একেবারেই ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না, বিশেষ করে গ্রাম এলাকায় তা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। সুতরাং এ ক্ষেত্রেও যদি এই কর্মসূচি সফল করতে হয়, তবে অবশ্যই স্কুলগুলোকে নানাভাবে মূল্যায়ন করে গ্রেডিংয়ের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে যেতে হবে। বাধ্যতামূলক করলেই শিক্ষায় সত্যিকার অর্থে কিছু অর্জন হয়, জাতির কল্যাণ সূচিত হয়, বিষয়টা সবসময় এমন নয়; বরং তা বহুমুখী ক্ষতিরও কারণ হতে পারে।

৩. খেলাধুলা, সংগীত, আর্ট, নাটক ইত্যাদি পাঠ্যক্রম

প্রধানমন্ত্রী তার শিক্ষাভাবনায় তৃতীয় যে কথা বলেছিলেন, তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত বিষয় হিসেবে বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা, ছবি আঁকা, সংগীত চর্চা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করবেন। এতে শিক্ষার্থীরা যার যার আগ্রহ ও দক্ষতা অনুযায়ী বিষয় বেছে নিতে পারবে এবং ভবিষ্যতে নিজের ভালোলাগা বিষয়ের দিকে এগিয়ে যেতে ও সফল হতে পারবে।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার-২০২৬-এর দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৬ষ্ঠ উপশিরোনামে ৭ম কর্মসূচিতে এটা এভাবে উল্লেখ আছে:

ক্রীড়া ও দেশীয় সংস্কৃতি শিক্ষা অন্তর্ভুক্তি: মননশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষার্থীদের ফুটবল, ক্রিকেট, সাঁতার ইত্যাদি খেলা এবং সংগীত, নাটক ইত্যাদি সাংস্কৃতিক বিষয় পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হবে।

বস্তুত বাংলাদেশে সংগীত বা খেলাধুলাকেন্দ্রিক কিছু বিশেষায়িত স্কুল-কলেজ রয়েছে, যেখানে এগুলো বিষয় মূল কারিকুলাম হিসেবে চালু আছে, যেমন: সংগীত বিদ্যালয় বা বিকেএসপি ইত্যাদি। আর বাকি সব স্কুলে এগুলো মূলত এক্সট্রা-কারিকুলাম হিসেবে একভাবে চালু ছিল এবং ক্রীড়াদিবস, নানা জাতীয় দিবস, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আয়োজন ইত্যাদি উপলক্ষ্যে এগুলোর এক ধরনের চর্চা হতো বা এখনো হয়। এসব বিষয়ের জন্য নির্ধারিত শিক্ষক কিছু বাড়লেও বিদ্যালয়ের পরিবেশ, ব্যবস্থাপনা এবং রাজনীতি ও প্রশাসনের নানা ধরনের নোংরামি আর খবরদারিতে এগুলোর সুযোগ অনেক কমে গেছে। 

২০১২ সালে অবজেক্টিভ বেজড কারিকুলাম ও সৃজনশীল মূল্যায়ন পদ্ধতি পুরোদমে চালুর সময়ে মাধ্যমিক স্তরে হঠাৎ করে সংগীত, চারু ও কারুকলা, শারীরিক শিক্ষা, কৃষি, গার্হস্থ্য, ক্যারিয়ার ইত্যাদি শিক্ষার অনেকগুলো বই বানিয়ে সেগুলোকে মূল কারিকুলাম হিসেবে সবার জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়। এসব বিষয়ের বার্ষিক লিখিত মূল্যায়ন থেকে শুরু করে বোর্ড পরীক্ষাও নেওয়া শুরু হয়। তখন থেকে অতিরিক্ত বিষয়ের চাপে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের গণিত, বিজ্ঞান ও ভাষা শেখার সুযোগ আরও কমে যায়। পরবর্তী সময়ে নানা সমালোচনার মুখে এসব বিষয়ে বার্ষিক লিখিত মূল্যায়ন ও বোর্ড পরীক্ষা হবে না, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু এখনো সেসব বই মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে, যা সেভাবে পড়ানোও হয় না, মূল্যায়নও হয় না; কিন্তু কেন আছে তা কেউ জানে না।

এগুলো এখন আবার নতুন করে পাঠ্যক্রমে বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত হলে কী হতে পারে? ভাষা শিক্ষার মানের বিষয়ে আমরা আগেই আলাপ করেছি, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম পরিচালিত গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষার মান জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১০৫ থেকে ১১০-এর মধ্যে, স্কোর ১-৭ স্কেলে ৩-এর কাছাকাছি, যেখানে ভারতের অবস্থান ১৬ থেকে ২০-এর মধ্যে এবং স্কোর ৫-এর কাছাকাছি। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে– শিক্ষার্থীদের প্রথম ভাষা বাংলা, দ্বিতীয় ভাষা ইংরেজি এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষার এই যে ভয়াবহ দশা, তা কাটানোর জন্য বিএনপি সরকারের কি কোনো পরিকল্পনা আছে? কিংবা বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে কি এ বিষয়ে কিছু ছিল? এই প্রশ্নের হতাশাজনক উত্তর হচ্ছে, না। সুতরাং ভাষা, গণিত, বিজ্ঞান শিক্ষার এই ভয়াবহ দশা কাটানোর পরিকল্পনা না থাকলে এক্সট্রা কারিকুলামকে কারিকুলাম করার তোড়জোড়ে মূল কারিকুলামে আগ্রহী শিক্ষার্থীরাই মূলত ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং শেষাবধি এক্সট্রা কারিকুলাম-মূল কারিকুলাম সবই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যা কিছু শিক্ষায় সুফল আনার কথা, আনন্দদায়ক হওয়ার কথা, তার সবকিছু তথ্য, বর্ণনা ও তত্ত্ব জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে শিক্ষার্থীদের আরও ক্ষতি করে। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, আইসিটির মতো বিষয়ও এখন শিক্ষার্থীদের কাছে আতঙ্কের নাম।

শিক্ষার্থীদের প্রথম ভাষা বাংলা, দ্বিতীয় ভাষা ইংরেজি এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষার এই যে ভয়াবহ দশা, তা কাটানোর জন্য বিএনপি সরকারের কি কোনো পরিকল্পনা আছে? কিংবা বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে কি এ বিষয়ে কিছু ছিল?

৪. বাধ্যতামূলক কারিগরি শিক্ষা

তারেক রহমান তার শিক্ষাভাবনায় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বিষয় হিসেবে কারিগরি বা কর্মমুখী ও প্রযুক্তিগত নানা থিওরি পড়ানোর কথা বলেছিলেন। এরপর দশম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সেগুলোর প্র্যাকটিক্যাল বা হাতে কলমে শেখার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানিয়েছিলেন। তার মতে, এতে কোনো শিক্ষার্থী স্বাধীন ও স্বনির্ভরভাবে কাজ করে দেশে বা বিদেশে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হবে না।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার-২০২৬-এ এটা স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে এভাবে:

সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা: আত্মকর্মসংস্থান এবং দেশ ও বহির্বিশ্বে চাকরির সুযোগ তৈরিতে শিক্ষার্থীদের দক্ষ এবং যোগ্য করে গড়ে তুলতে মাধ্যমিক পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে। সিলেবাস এমনভাবে সাজানো হবে যেন একটা পরিবার যদি তার সন্তানকে এসএসসি কিংবা ইন্টারমিডিয়েটের বেশি না পড়াতে পারে, তাহলে সেই শিক্ষা দ্বারাই যেন সে নিজের জন্য কর্মসংস্থান করে নিতে পারে।

কোনো দ্বিমত করার সুযোগ নেই যে আমাদের শিক্ষার্থীদের কারিগরি, প্রযুক্তি ও কর্মমুখী জ্ঞান-দক্ষতায় পারদর্শী করে গড়ে তুলতে হবে। কারণ, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে কারিগরি ও সাধারণ ধারার শিক্ষায় শিক্ষার্থীর অনুপাত প্রায় সমান সমান। কিন্তু আমাদের কারিগরি শিক্ষার হার কাগজে-কলমে ১৭ শতাংশ দেখানো হয় (প্রকৃতপক্ষে আরও কম) এবং অবস্থান বিশ্বের মধ্যে ১১০-এর কাছাকাছি। খেয়াল করি ইশতেহারে দেওয়া ‘সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে সিলেবাস এমনভাবে সাজানো হবে’ এই বাক্যাংশটুকু। নির্বাচনের আগে তারেক রহমানের শিক্ষাভাবনায় যে অংশটা অস্পষ্ট ছিল, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে তা খুবই স্পষ্ট রয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে– কারিগরি, প্রযুক্তি ও কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বা দক্ষতা বাড়ানোর উপায় কী? সাধারণ ধারা এবং কারিগরি ধারা পৃথক রাখা, নাকি সাধারণ ধারার মধ্যেই কারিগরি ধারা ইনক্লুসিভ করা? বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার কারিগরি, প্রযুক্তি ও কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের নিতে ব্যর্থ বা স্বেচ্ছাব্যর্থ হয়ে সাধারণ ধারা-ই যাতে ক্রমেই কারিগরি ধারা হয়ে যায় সেই কারিকুলাম তৈরি করেছিল। মনে রাখা দরকার, হাসিনার সরকারের সেই একমুখী কারিকুলাম-২০২১ ছিল মূলত বিএনপি সরকার প্রণীত একমুখী কারিকুলাম-২০০৩-এরই ভিন্নতর রূপ। বিএনপি সরকার ২০০৫ সাল পর্যন্ত এটা নিয়ে অনেক টাকা খরচ করেও আন্দোলনের কারণে তার বাস্তবায়ন থেকে সরে আসে, আর হাসিনা সরকার করোনার সুযোগ নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রায় ২ বছর ঘরবন্দি রেখে তার পাইলটিং নামের প্রতারণা করে ২০২৩ সালে সেটা চালু করে দেয়। সেই সরকারের গৃহীত একমুখী কারিকুলাম-২০২১ শিক্ষায় চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিল। সেই একই জিনিস ভিন্ন মোড়কে বিএনপি ও তারেক রহমান সরকার যদি আনতে চায়, তবে তা আবারও শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য সৃষ্টি করবে।

বর্তমান শিক্ষা পরিস্থিতিতে কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার হার বাড়ানোর জন্য প্রথমে প্রয়োজন যেসব কারিগরি স্কুল-কলেজ রয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে শুধু সার্টিফিকেটসর্বস্ব শিক্ষার্থী উৎপাদন করে, সেগুলোকে সত্যিকার অর্থে কারিগরি স্কুল-কলেজ করে দ্রুত গড়ে তোলা এবং এ ধরনের মানসম্মত স্কুল-কলেজ আরও প্রতিষ্ঠা করা, যাতে অভিভাবকরা নিশ্চিত হতে পারেন যে, পঞ্চম শ্রেণির পর এসব স্কুলে ভর্তি করালে শিক্ষার্থী দ্রুত সফলভাবে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারবে। আবার সে যদি অষ্টম শ্রেণি থেকে সাধারণ ধারায় ফিরতে চায়, তবে তার বার্ষিক মূল্যায়ন অনুযায়ী ফিরতেও পারবে। দ্বিতীয়ত, অষ্টম শ্রেণি শেষে সারা দেশের সব শিক্ষার্থীর সকল পর্যায়ের দক্ষতার সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমে গ্রেডিং করে তাকে নির্দিষ্ট দিকে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা, এবং তাদের প্রয়োজনীয় গাইড করা। একইসঙ্গে সাধারণ ধারার স্কুলগুলোকেও কারিগরি বিষয় পড়ানো ও প্রশিক্ষণের জন্য শিক্ষক নিয়োগ, অবকাঠামো নির্মাণ, ল্যাব প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে ক্রমেই ধারাবাহিকভাবে গড়ে তোলা, যাতে নবম শ্রেণিতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা অষ্টম শ্রেণির মূল্যায়ন অনুযায়ী সাধারণ ও কারিগরির মধ্য থেকে পছন্দের বিষয় বেছে নিতে পারে, তাদেরকে আর স্কুল পরিবর্তন করতে না হয়। এতে সরকার যে উদ্দেশ্যে কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে চাইছে তা হয়তো সফল হতে পারে।

৫. শিক্ষাখাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষাখাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার কথা রয়েছে। কোনো সন্দেহ নেই, স্বনির্ভর ও আত্মমর্যাদাশীল দেশ হতে হলে শিক্ষায় এই বরাদ্দটা দ্রুত দেওয়া লাগবে, যেটা এখন পৃথিবীর মধ্যে বলতে গেলে সর্বনিম্ন হয়ে আছে। তবে এই জনপ্রিয় দাবির আড়ালে চাপা পড়ে যায় বরাদ্দের বিলিবণ্টনের নয়ছয়ের বিষয়টা। বরাদ্দ জিডিপির দুই বা পৌনে দুই যেটাই এযাবৎকাল দেওয়া হয়েছে, সেই বরাদ্দের বিলিবণ্টন কীভাবে করা হয় সেটার নমুনা বিএনপির এই নির্বাচনী ইশতেহারের মধ্যেও রয়েছে। যেমন: তারা বলছে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করবে। এটা নতুন কিছু নয়, বিগত শেখ হাসিনা সরকারের কর্মসূচিরই ধারাবাহিকতা। 

যেখানে দেশের প্রায় ৬৬ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অর্ধেক বিদ্যালয়েই প্রধান শিক্ষক নেই, প্রায় ৬০০ সরকারি হাইস্কুলেও একই অবস্থা, প্রায় ২০ হাজার বেসরকারি হাইস্কুলে গড়ে প্রতি ৪টি স্কুলের মধ্যে ১টিতে প্রধান শিক্ষক নেই, প্রতি ২টি স্কুলের মধ্যে ১টি স্কুলে বিজ্ঞান ল্যাব সেই অর্থে নেই, প্রতি ৪টি স্কুলের মধ্যে মাত্র ১টি স্কুলে ব্যবহারযোগ্য বিজ্ঞান ল্যাব আছে, এবং প্রাথমিক স্তরে ক্লাসরুম লাগবে প্রায় অর্ধলক্ষ আর মাধ্যমিক স্তরে লাগবে সিকি লক্ষ – সেখানে এগুলোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব না রেখে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের মতো প্রকল্প হলো বরাদ্দের পূর্বতন নয়ছয়েরই ধারাবাহিকতা। বরং প্রয়োজন ছিল এগুলোর পুনর্মূল্যায়ন।

যেখানে দেশের প্রায় ৬৬ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অর্ধেক বিদ্যালয়েই প্রধান শিক্ষক নেই, প্রায় ৬০০ সরকারি হাইস্কুলেও একই অবস্থা, প্রায় ২০ হাজার বেসরকারি হাইস্কুলে গড়ে প্রতি ৪টি স্কুলের মধ্যে ১টিতে প্রধান শিক্ষক নেই, প্রতি ২টি স্কুলের মধ্যে ১টি স্কুলে বিজ্ঞান ল্যাব সেই অর্থে নেই, প্রতি ৪টি স্কুলের মধ্যে মাত্র ১টি স্কুলে ব্যবহারযোগ্য বিজ্ঞান ল্যাব আছে, এবং প্রাথমিক স্তরে ক্লাসরুম লাগবে প্রায় অর্ধলক্ষ আর মাধ্যমিক স্তরে লাগবে সিকি লক্ষ – সেখানে এগুলোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব না রেখে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের মতো প্রকল্প হলো বরাদ্দের পূর্বতন নয়ছয়েরই ধারাবাহিকতা।

সরকার একদিকে উচ্চশিক্ষাকে অবৈতনিক করবে বলছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষায় যাবে যে ১০-২০ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদেরকে মাধ্যমিক স্তরে ভাষা-গণিত-বিজ্ঞানসহ অন্যান্য বিষয়ে এগিয়ে দেওয়ার সুযোগ সীমিত করছে কারিগরি বাধ্যতামূলক করে। এগুলো ছাড়াও সরকারের অনন্য ডিজিটাল এডু আইডির মতো কর্মসূচি ঘোড়ার আগে গাড়ি জোড়ার প্রকল্প হয়ে বাজেটের নয়ছয় আর শিক্ষায় মিছে হাঙ্গামা সৃষ্টির পথ সুগম করে দেবে। এর আগে সরকারের দেখা উচিত সব বিদ্যালয়ে সব শিক্ষা সরঞ্জাম আছে কি না, শিক্ষকরা সেগুলো ব্যবহার করতে পারছেন কি না।

৬. বিএনপির ইশতেহারে নেই, কিন্তু সরকার করছে

ইশতেহারে নেই এমন অনেক কিছুই সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে করছে বা করবে বলে বলছে। যেমন: কোচিং-গাইড বন্ধ করে দেবে, বিদ্যালয়েই কোচিংয়ের ব্যবস্থা করবে, নকল একেবারে দূর করে দেবে, প্রথম শ্রেণি থেকেই ভর্তি পরীক্ষা শুরু করবে ইত্যাদি। বস্তুত শিক্ষা কোনো যুদ্ধ বা জিহাদের ক্ষেত্র না। এখানে অপ্রত্যাশিত যা কিছু হচ্ছে তার কারণ দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং তার দ্বারা সৃষ্ট দুষ্টচক্র। এর থেকে বের হওয়ার জন্য এই চক্র সঠিকভাবে শনাক্ত করে অগ্রপশ্চাৎ বুঝে ধারাবাহিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। বস্তুত পাঠ্যপুস্তকের মান, শিক্ষকের মান, বিদ্যালয়ের মান, সর্বোপরি শিক্ষাব্যবস্থার মানের সঙ্গে কোচিং-গাইডের সম্পর্ক বিপরীতমুখী। এগুলোর মান অপরিবর্তিত রেখে কোচিং-গাইড তুলে দেবার কথাবার্তা অর্থহীন। 

পাঠ্যপুস্তকের মান, শিক্ষকের মান, বিদ্যালয়ের মান, সর্বোপরি শিক্ষাব্যবস্থার মানের সঙ্গে কোচিং-গাইডের সম্পর্ক বিপরীতমুখী।

দ্বিতীয়ত, নকল ছাড়াও আরও অনেক সমস্যা আছে। যেমন: প্রশ্নফাঁস, শিক্ষকের উত্তর বলে দেওয়া, সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করবে এমন পরীক্ষাকেন্দ্র বেছে নেওয়া, না লিখলেও খাতায় নম্বর দেওয়া, মূল্যায়নে শিথিলতা করা, জিপিএ ইঞ্জিনিয়ারিং করা ইত্যাদি। সব কটি মিলিয়েই এ দেশে প্রায় শতভাগ পাস নিশ্চিত হয়েছে এবং তার সঙ্গে সংগতি রেখে সারা দেশে গাদা-গাদা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টি হয়েছে। 

শেষ কথা

সহজ ভাষায় বললে, এই মৃতপ্রায় শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে তাই আগে প্রাণ সঞ্চার করতে হবে। প্রাণ সঞ্চারের জন্য প্রথমে শিক্ষার সব স্তর থেকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক এলোমেলো খবরদারি ও হস্তক্ষেপ কীভাবে দ্রুত দূর করা যায়, শিক্ষকদের এলোমেলো কাজের বোঝা কীভাবে কমানো যায়, কী কী করলে শিক্ষকরা যা-যা বইপুস্তক আছে সেটাই স্বাধীনভাবে ক্লাসে পড়ানোর সুযোগ ও সময় বেশি পেতে পারেন সেটা আগে ভাবতে হবে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষার নানা দপ্তর, অধিদপ্তর, কমিশন, একাডেমি, বোর্ড, পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ইত্যাদিকে কীভাবে যোগ্য, দক্ষ ও সৎ মানুষ দ্বারা চালিত করা যায়, কোনটার কোন বিধিমালায় কী কী পরিবর্তন আনলে এটা স্থায়ী ও কার্যকর করা সহজ হয়, অযোগ্য-অদক্ষ-অসৎরা কাছে ভেড়ার সুযোগ না পায়–সেটা নিয়ে ভাবতে হবে।

তৃতীয়ত, পাঠ্যপুস্তকগুলো যে খাপছাড়া, বেখাপ্পা তথ্যে গাদানো, গদগদে আবেগ, রাজনীতি আর কোটারি লেখার চাপে পর্যুদস্ত, কোথাও যে ধারাবাহিক নয়, কোনোটা যে অর্থহীন বাকওয়াজি, অধিকাংশই যে গ্রেড ও বিষয়ের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ নয়, অনেকগুলোর যে ভাষা ও বিষয়ের আনুভূমিক ও উলম্ব সমন্বয় নেই, শিক্ষার্থীরা পড়ে অনেক কিছুই যে মাথামুণ্ডু বুঝতে পারে না, ইংরেজি ভার্সনের ইংরেজির যে ভয়াবহ অবস্থা–এগুলো নিরসনের জন্য একদল যোগ্য লেখক, সম্পাদক, অনুবাদক ও শিক্ষাবিশেষজ্ঞকে কীভাবে ধারাবাহিকভাবে নিযুক্ত রেখে স্বাধীনভাবে তাদের কাজ করতে দেওয়া যায় সেটা নিয়ে ভাবতে হবে।

চতুর্থত, শিক্ষক নিয়োগে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের অন্তত এক বছর বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী শিক্ষক হিসেবে ন্যূনতম বেতনে রেখে যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে তাদের মধ্য থেকে কীভাবে চূড়ান্ত বাছাই নির্ভেজালভাবে করা সম্ভব সেটা ভাবা, যোগ্যতা-দক্ষতা-অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে কোন প্রক্রিয়ায় সৎ ও নিবেদিত প্রধান শিক্ষক নির্বাচন করা যায় তার উপায় বের করা, এবং ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত যে ভয়াবহ রকমের প্রতিকূল হয়ে আছে তাকে দ্রুত অনুকূলে কীভাবে আনা যায় সে বিষয়ে করণীয় ঠিক করা।

পঞ্চমত, মূল্যায়ন পদ্ধতি, পাবলিক পরীক্ষা, কেন্দ্র বণ্টন, কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা ও মূল্যায়ন নির্দেশনায় যে চরম অরাজকতা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, সেখানে কোথায় কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করলে এবং কীভাবে প্রয়োগ করলে আমাদের শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকরা ধীরে ধীরে আবার শিক্ষা ও শিক্ষকতায় স্বাভাবিকভাবে ফিরতে পারে তার ব্যবস্থা করা।

ষষ্ঠত, সব স্তরের শিক্ষকের বেতন-কাঠামো যা আছে আগামী তিন বছরের মধ্যে তিন ধাপে তিন গুণ করে তা শুধু যারা দক্ষতা ও যোগ্যতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে তাদের ক্ষেত্রে কীভাবে প্রয়োগ করা যায় এবং অযোগ্যদের ক্লাস কার্যক্রম থেকে সরিয়ে যোগ্য করে তোলার জন্য কী কী করা সেটা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া। কারণ, একজন অযোগ্য শিক্ষক দশ বছর শিক্ষকতায় থাকা মানে হাজারো অযোগ্য মানুষ সৃষ্টির সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলা।

একজন অযোগ্য শিক্ষক দশ বছর শিক্ষকতায় থাকা মানে হাজারো অযোগ্য মানুষ সৃষ্টির সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলা।

এই ছয়টি কাজ করা সম্ভব হলে শিক্ষায় প্রাণ সঞ্চার হতে পারে এবং তখন তার ধারাবাহিকতার সঙ্গে সংগতি রেখে হয়তো স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব, নতুবা এলোমেলো ডামাডোলে শিক্ষার আরও সর্বনাশ ঘটবে।

রাখাল রাহা: আহ্বায়ক, শিক্ষা ও শিশু রক্ষা আন্দোলন (শিশির)। 

ইমেইল: rakhalraha@gmail.com

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •