বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার উপর আক্রমণ এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষকদের অন্যায়ভাবে চাকুরিচ্যুত করার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের (ইউএপি)’ দুইজন শিক্ষককে অন্যায়ভাবে চাকুরিচ্যুত করা এবং বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার উপর আক্রমণের প্রতিবাদে গত ২১ জানুয়ারি ২০২৬ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত এই সংবাদ সম্মেলনে নেটওয়ার্কের পক্ষে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন এবং কথা বলেন। শিক্ষকদের পক্ষে বক্তব্য উপস্থিত করেন আনু মুহাম্মদ, মির্জা তাসলিমা সুলতানা, সামিনা লুৎফা, সৌমিত জয়দ্বীপ, তানভীর সোবহান। নেটওয়ার্কের সদস্য শিক্ষকদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন কামাল চৌধুরী, কাজলি শেহেরীন ইসলাম, সামিও শীশ এবং শ্যামলী শীল। এখানে লিখিত বক্তব্যের পুরোটা প্রকাশ করা হলো।
বাংলাদেশে বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা বা একাডেমিক ফ্রিডমের সংকট বরাবরই অত্যন্ত প্রকট। শাসক ও ক্ষমতাবানরা বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার গলা চিপে ধরে ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সকলকে একই সুরে কথা বলতে বাধ্য করতে চান। অতীতে এই বলপ্রয়োগের কাছে কেউ স্বেচ্ছায় নতজানু হয়েছেন; আবার কেউ সাহসের সঙ্গে ক্ষমতাবানদের চ্যালেঞ্জ করে তাদের রোষানলে পড়েছেন। উভয়ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের, বিদ্যাঙ্গনে নতুন ভাবনা ও জ্ঞান উৎপাদন এবং পাঠদানের।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা বহু সংকট কাটানোর প্রত্যাশা করেছিলাম। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ছিল গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও বাকস্বাধীনতা রক্ষা করা। বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার নিশ্চয়তা সেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও বাকস্বাধীনতা লালনেরই বহিঃপ্রকাশ, যার সঙ্গে খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক ধারণাটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং বহুমত-বহুপথের সম্মিলনই বিশ্বব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়কে সমাজের অপরাপর প্রতিষ্ঠান থেকে স্বতন্ত্র করেছে। কিন্তু, আমরা অত্যন্ত হতাশা ও উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করলাম, অভ্যুত্থানোত্তর বাংলাদেশে এই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক ধারণাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে একটি গোষ্ঠী, যারা ধর্মকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ভিন্নমত দমনের পাশাপাশি আগ্রাসী পথে ক্ষমতায়িত হতে উদগ্রীব। এ কাজে তারা ব্যবহার করছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোকে।
বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল স্বাধীন মত-প্রকাশ বা ভিন্নমত পোষণ করার কারণে অনেক শিক্ষককে হেনস্থা ও হয়রানি করা হচ্ছে এবং প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ধর্মানুভূতিকে ঢালাওভাবে ঢাল বানানো হয়েছে। এই প্রবণতারই সর্বশেষ শিকার রাজধানীস্থ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের বেসিক সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীর এবং ছাত্রকল্যাণ অধিদপ্তরের প্রাক্তন পরিচালক এবং বেসিক সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, সহযোগী অধ্যাপক ড. এ এস এম মোহসীন (সায়েম মোহসীন)।
বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল স্বাধীন মত-প্রকাশ বা ভিন্নমত পোষণ করার কারণে অনেক শিক্ষককে হেনস্থা ও হয়রানি করা হচ্ছে এবং প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ধর্মানুভূতিকে ঢালাওভাবে ঢাল বানানো হয়েছে।
ঘটনা পরম্পরা
ড. সায়েম মোহসীন ও লায়েকা বশীর বিশ্ববিদ্যালয়টিতে যথাক্রমে ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক। সচেতন মহল মাত্রই জানেন, কলা ও মানবিক এবং সামাজিক বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনে সমাজের প্রথাগত অনেক বিশ্বাস ও ধারণা নিয়ে একাডেমিকভাবেই ক্রিটিক্যাল প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। শিক্ষকরা সেভাবেই পাঠদান ও জ্ঞানচর্চা করেন। কিন্তু, একজনের সঙ্গে অন্যজনের শুধু চিন্তা ও আদর্শের পার্থক্য আছে বলে, সুপরিকল্পিতভাবে ও নানান অজুহাতে শিক্ষকের বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা খর্ব করে দঙ্গলবাজির মাধ্যমে তাঁকে চাকুরিচ্যুত করার দাবি এবং সেই দাবির মুখে নতজানু ইউনিভার্সিটি অফ এশিয়া প্যাসিফিক প্রশাসনের যথাযথ নিয়ম অনুসরণের মাধ্যমে তদন্ত না করে তড়িঘড়ি তাঁদের চাকরিচ্যুত করা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক নিন্দনীয় নজির স্থাপন করল।
লায়েকা বশীরের বিরুদ্ধে এমন এক অভিযোগ আমলে এনে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, যা সত্যিকার অর্থেই বিদ্যায়তনিক চর্চার স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য যথেষ্ট। তাঁর ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের ক্ষুদ্র একটি অংশ তাঁর বিরুদ্ধে নানা রকমের প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করেন। যে বাকস্বাধীনতার জন্য জুলাইতে লায়েকা ও মোহসীন শিক্ষার্থীদের ঢাল হয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন, সেই বাকস্বাধীনতাকে খর্ব করেই শিক্ষার্থীদের একটি উগ্র অংশ লায়েকার বিরুদ্ধে অনলাইন সহিংসতা শুরু করেন। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আনার অভিযোগ আনা হয় তাঁর বিরুদ্ধে। যে পোস্টের কারণে এ অভিযোগ, তা ধর্মীয় নয় বরং নিরাপত্তা-বিষয়ক উদ্বেগ থেকে লেখা বলে তিনি বিষয়টি পরিষ্কার করে আরেকটি পোস্ট দিলেও তাঁর বিরুদ্ধে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন একের পর এক অভিযোগ ও অনলাইন হয়রানি চলতেই থাকে।
এরপর এই হয়রানির সময় তাঁর পাশে না থেকে উল্টো কোনো রকম যাচাই-বাছাই ছাড়াই উপাচার্য ফোন করে লায়েকা বশীরকে পদত্যাগ করতে নির্দেশ দেন। সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এ চাপকে অস্বীকার করে তিনি সমস্ত বিষয়ের তদন্ত দাবি করেন। সে সময় তাঁকে প্রায় ৪ ঘণ্টা ধরে পদত্যাগে বাধ্য করার জন্য চাপ দেয় প্রশাসন। এমনকি তাঁকে হুমকি দেওয়া হয় যে, তদন্তে গেলে তাঁর সম্মানহানী হবে, ফলে আগেই যেন তিনি পদত্যাগ করেন। নিজ নিরাপত্তার স্বার্থে কারও নাম উল্লেখ না করে লায়েকা তেজগাঁও থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। তিনি তদন্তের প্রশ্নে অনড় থাকলে প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি করতে বাধ্য হয়। সেসময় পর্যন্ত আসা অভিযোগগুলো ছিল মূলত ফেসবুকে, এবং অনেকক্ষেত্রে কতগুলো বায়বীয় বিষয়কে নিয়ে, যার সিংহভাগই এসেছিল ফেইক একাউন্ট থেকে। ফলে হাতে তেমন কিছু না থাকায় তদন্ত কমিটি লায়েকা বশীরের বিরুদ্ধে গুগল ফর্ম তৈরি করে অভিযোগ আহ্বান করে, যা জমা দেবার শেষ দিন ছিল ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫। এই পুরো প্রক্রিয়াটিই বলে দিচ্ছে, লায়েকা বশীর আভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন, যেখানে অজুহাত ও ঢাল বানানো হয়েছে ধর্মানুভূতিকে এবং ব্যবহার করা হয়েছে দঙ্গলবাজদের। তদন্তের আগেই যদি সিদ্ধান্ত নিয়ে নেওয়া হয় যে, একজনকে চাকুরিচ্যুত করা হবে, তাহলে সেই তদন্ত কখনই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে পারে না; শক্তিশালীর আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নই হয়ে উঠে তদন্তকারীদের একমাত্র উদ্দেশ্য। লায়েকা বশীরের বিরুদ্ধে সেটাই করা হয়েছে বলে, এই পুরো প্রক্রিয়াটিই আইনের দৃষ্টিতে আসলে বেআইনি ও ন্যায়বিচারের ধারণার পরিপন্থি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সুস্পষ্টভাবে অন্যায্য ও বেআইনি কাজ করেছে।
এই পুরো প্রক্রিয়াটিই বলে দিচ্ছে, লায়েকা বশীর আভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন, যেখানে অজুহাত ও ঢাল বানানো হয়েছে ধর্মানুভূতিকে এবং ব্যবহার করা হয়েছে দঙ্গলবাজদের। তদন্তের আগেই যদি সিদ্ধান্ত নিয়ে নেওয়া হয় যে, একজনকে চাকুরিচ্যুত করা হবে, তাহলে সেই তদন্ত কখনই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে পারে না; শক্তিশালীর আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নই হয়ে উঠে তদন্তকারীদের একমাত্র উদ্দেশ্য।
উত্থাপিত অভিযোগসমূহ
৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আসা অভিযোগ তদন্ত কমিটি লায়েকা বশীরকে পাঠায় গত ১৫ জানুয়ারি। অভিযোগগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, কমিটির সরবরাহকৃত গুগল ফর্মে মোট ৩৪টির মতো উত্তর এসেছে। অভিযোগগুলো যেভাবে লায়েকা বশীরকে পাঠানো হয়েছে, তাতে করে অভিযোগকারীকে সনাক্তকরণের উপায় নেই, একই ব্যক্তি একাধিক অভিযোগ করেছেন কিনা তা পরিষ্কার নয়, কারণ অভিযোগকারীদের নাম পরিচয় নেই, যা অভিযুক্তের প্রতি অবিচার। অভিযোগকারীদের নাম গণপরিসরে প্রচার করা যেমন নীতিবিরুদ্ধ, তেমনই অভিযোগকারীদের নাম গোপন রেখে অভিযুক্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করাও নীতিবিরুদ্ধ কাজ। অভিযুক্তের অধিকার আছে, অভিযোগ জানার পাশাপাশি অভিযোগকারীদের নাম জানার, নইলে তিনি যথাযথ তথ্য-উপাত্ত উল্লেখ করে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, যা আইনের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বেআইনি। গুগল ফর্মে সংগৃহীত উত্তরের মধ্যে পাঁচটিতে ‘কোনো অভিযোগ নেই’ এবং ‘তাঁকে হ্যারাস করা বন্ধ করতে অনুরোধ’ করা হয়েছে। দুটি উত্তরে ক্লাসে আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে মন্তব্যের পাশাপাশি বলা হয়েছে যে, লায়েকা বশীর শিক্ষক হিসেবে কর্তব্যনিষ্ঠ। আর অভিযোগগুলোর মধ্যে আছে, তিনি ক্লাসে ও পরীক্ষার হলে নিকাব ও মাস্ক খুলতে বলেছেন, খারাপ ব্যবহার করেছেন, নামাজের কারণে ক্লাসে দেরি করে আসায় বিরক্ত হয়েছেন, ক্লাসে ইসলামে নারীর সম্পত্তিতে অধিকার সমান নয় বলেছেন, কোরবানী নিয়ে ‘বাজে মন্তব্য’ করেছেন (মন্তব্যটি কী সেটির উল্লেখ নেই), ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক বিষয় ক্লাসে আলোচনা করেছেন এবং ফেমিনিজম প্রচার করেছেন। এছাড়াও ‘তিনি নাস্তিক’ এমন মন্তব্য এসেছে দুটি উত্তরে। সমাজবিদ্যার ধারণা অনুযায়ী, এগুলোর কোনোটিই প্রমাণ বা অপ্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব, কারণ সবই ব্যক্তিগত বয়ান বা ধারণা বা মিসরিপ্রেজেন্টেশন।
উল্লেখ্য, তদন্ত কমিটির চিঠিতে লিখিত উত্তর দেবার জন্য তাঁকে সময় দেয়া হয়েছিল ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত এবং তাঁর কথা শোনা হবে সে প্রতিশ্রুতিও ছিল; অথচ এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আগেই সংঘবদ্ধ চাপের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নতজানু হয়ে তাকে চাকুরিচ্যুত করে। আর ড. সায়েম মোহসীনের ক্ষেত্রে কোনো যথাযথ প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা হয়নি। কোনো তদন্ত কমিটি করার আগেই তাঁকে চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনী ও নীতিবিরুদ্ধ কাজ। পুরোটাই সামাজিক মাধ্যমের চাপ তৈরির প্রতিক্রিয়া, যার সিংহভাগই তথ্যের মিসরিপ্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে হাসিল করা হয়েছে। সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে গল্প বানিয়ে জনমত তৈরি করা হয়েছে।
বিদ্যায়তনে শৃঙ্খলা ও স্বাধীনতার চ্যালেঞ্জ
এখানে তিনটি বিষয় আমাদের গভীরভাবে ভাবা দরকার। প্রথমত, বিদ্যায়তনের শৃঙ্খলা রাখার পক্ষে দায়িত্ব পালন করাকে ‘ধর্মবিদ্বেষ’ হিসেবে চিত্রায়িত করার অত্যন্ত আশঙ্কাজনক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে ইউএপি—এর জন্য তাদের জবাবদিহি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা ভুলুন্ঠিত হয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। তৃতীয়ত, দুজন শিক্ষকের নাগরিক ও পেশাগত অধিকার লঙ্ঘন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়।
আমলযোগ্যই না এমন কিছু যখন তদন্তের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, তখন আমাদের বলতে দ্বিধা নেই যে, উগ্রবাদী এ গোষ্ঠী এরপর উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাধীন চিন্তা ও তর্কবিতর্কের কোনো জায়গা রাখবে না। আমরা নিশ্চয়ই এমন প্রবণতাকে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার চিন্তাচর্চায় প্রশ্রয় দিতে পারি না। এসব চলতে থাকলে ভবিষ্যতে বর্হিবিশ্বে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের ভয়াবহ মাশুল দিতে হবে বলে আমরা আশঙ্কা করি, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এ অন্যায় আচরণের নেপথ্য-কারণ
লায়েকা বশীর বিগত ১৭ বছর ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা করছেন, তাঁর শিক্ষার্থী মূল্যায়ন খুবই ইতিবাচক। এই দীর্ঘ সময়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি তিনি নানাবিধ প্রশাসনিক, সাংস্কৃতিক ও আনুষ্ঠানিক কর্মে ও পদে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন, যেমন: সহকারী রেজিস্ট্রার, বিভাগীয় প্রধান, কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক ক্লাবের উপদেষ্টা, অভিযোগ কমিটির কনভেনার, পরপর ৫টি সমাবর্তনের ধারাভাষ্যকার, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রমের নির্দেশক, প্রশিক্ষক ও বিচারক, ইত্যাদি। শিক্ষকতার নৈতিক অবস্থান থেকে বিভিন্ন সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন শিক্ষার্থীদের, যার সবচেয়ে বড় নজির জুলাই আন্দোলনে সম্মুখভাগে ভূমিকা পালন করা।
ড সায়েম মোহসীনও দীর্ঘদিন ছাত্রকল্যাণ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন শিক্ষক। তাঁকে কোনোরকম যথাযথ কারণ না দেখিয়ে বা তদন্ত ছাড়া কেবল ‘আওয়ামী লীগের সমর্থক’ বলে ট্যাগ দিয়ে চাকুরিচ্যুত করার মতো একটি হাস্যকর ও নিন্দনীয় কাজের দায় কেন বিশ্ববিদ্যালয় নিল, তা আমাদের বোধগম্য নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এমন ভূমিকা অত্যন্ত অনভিপ্রেত ও অগণতান্ত্রিক।বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিচালনায় যাঁরা যুক্ত, তাঁদের জন্য এ ঘটনা অত্যন্ত গুরুতর অভিঘাত বয়ে আনবে। প্রশ্ন জাগতে পারে যে, কেন প্রশাসন বা এর ভেতরের একটি অংশ লায়েকা বশীর ও ড সায়েম মোহসীনের বিরুদ্ধে এমন অমানবিক ও নাগরিক অধিকার হরণকারী আচরণ করল? এর কয়েকটি কারণ আমরা অনুমান করতে পারি।
প্রথমত, অনেক বছর ধরে অত্যন্ত সুনামের সাথে শিক্ষকতা করে যাওয়া লায়েকা বশীর ও সায়েম মোহসীন জুলাই অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থাকা লড়াকু শিক্ষক যারা কোনো কিছুর পরোয়া না করে শিক্ষার্থীদের পাশে ছিলেন। কাজেই, জুলাইয়ে নীরব থাকা আওয়ামী আমলের প্রশাসন তাঁদের হুমকি মনে করেছে। দ্বিতীয়ত, গত নভেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের একটি যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে গঠিত অভিযোগ কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে লায়েকা কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার নিপীড়নের বিরুদ্ধে সাহসী ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন, যা আরেকটি অংশকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। তাঁর পাশে থাকার ‘অপরাধে’ সায়েম মোহসীনকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
সর্বোপরি, শিক্ষক হিসেবে তাঁরা উদার এবং প্রগতিশীল মানুষ, যাঁরা ছাত্রদের কল্যাণে নিবেদিত। এমন শিক্ষক প্রতীক হিসেবে যাদের জন্য বিপজ্জনক, তারাই এই দুই শিক্ষককে বলির পাঠা করে ইউএপিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে চেয়েছেন এবং নিজেদের ক্ষমতাকে সংহত করতে এক ধরণের ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করতে চেয়েছেন বলে আমরা মনে করি।
এমতাবস্থায় আমরা বলতে চাই, যেভাবে অবিবেচনাপ্রসূত ও অযৌক্তিক দঙ্গল সৃষ্টি করে দীর্ঘদিনের কর্মস্থল থেকে তাঁদের জবরদস্তি চাকুরিচ্যুত করা হলো, যেভাবে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনকে বিপদাপন্ন করে তোলা হলো, সেটাই কি আজকের দিনের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চূড়ান্ত পথ ও প্রবণতা? যেকোনো মূল্যে গলা টিপে মারতে হবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে? এজন্যই কি হয়েছিল জুলাই-অভ্যুত্থান?
দুইজন শিক্ষকের প্রতি এমন অন্যায় আচরণে সহকর্মী হিসেবে আমরা অত্যন্ত সংক্ষুব্ধ। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক স্বেচ্ছাচারী এই দঙ্গলবাজ শিক্ষার্থী ও তাদের প্রতি নতজানু হয়ে শিক্ষকদের চাকুরিচ্যুত করার মতো দায়িত্বহীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আচরণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
আমরা পুরো ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের দীর্ঘ কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও নীরব ভূমিকার প্রতিও নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছি। কয়েকদিন আগে একটি পাঁচতারকা হোটেলে মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে’ ইউজিসি দক্ষিণ এশীয় উচ্চশিক্ষার উন্নয়নে যে ‘ঢাকা ঘোষণা’ প্রদান করেছে, তার কেন্দ্রে আছে বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। অথচ ইউজিসির একাধিক দায়িত্বপ্রাপ্ত পদকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেও এই দুই শিক্ষকের অধিকার নিশ্চিত করতে তাঁরা সক্রিয় হননি। ‘মব ইনজাস্টিসে’র ন্যাক্কারজনক শিকার শিক্ষকদ্বয় ইউজিসির চেয়ারম্যান বরাবর তাঁদের প্রতি হওয়া অন্যায়ের প্রতিকার চেয়ে চিঠি দিলেও আমরা এখনো তাঁদেরকে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে দেখিনি, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়।
আমরা মনে করি, আক্রান্ত শিক্ষকের পাশে না-দাঁড়ানো ও যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ না-করার অত্যন্ত অপরিণামদর্শী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়, যা ভবিষ্যতের বাংলাদেশে বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার জন্য এক চরম অশনি সংকেত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
আমরা মনে করি, আক্রান্ত শিক্ষকের পাশে না-দাঁড়ানো ও যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ না-করার অত্যন্ত অপরিণামদর্শী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়, যা ভবিষ্যতের বাংলাদেশে বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার জন্য এক চরম অশনি সংকেত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। যেকোনো মূল্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে তথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চিন্তার স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক চর্চার মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক বদ্ধ পরিকর। তাই, আমাদের দাবি:
১. অনতিবিলম্বে লায়েকা বশীর ও ড. সায়েম মোহসীনকে চাকুরিতে পুনর্বহাল করতে হবে এবং এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ইউএপির অন্যান্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
২. যহাযথ প্রক্রিয়া ও আইনের শাসন চালুর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ধরনের শিক্ষাবিরোধী অপতৎপরতা বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও দায়িত্বরতদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে এবং দঙ্গলবাজদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
৩. কথায় কথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকুরিচ্যুতির হুমকি প্রদান বন্ধ করতে হবে এবং যথোপযুক্ত নীতিমালা বাস্তবায়ন করে তাঁদের কর্মজীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. বিদ্যায়তনিক শৃঙ্খলা ও স্বাধীনতার স্পিরিটকে রক্ষা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক ধারণাকে সমুন্নত রাখতে সচেষ্ট থাকতে হবে।
