“দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণদেরকেই কমিউনিস্ট আন্দোলন পুনরায় গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা নিতে হবে”- রেনু দাহাল
সাক্ষাৎকার: মারজিয়া প্রভা
রেনু দাহাল। নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য এবং নারী উইংসের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক। ২০১৭ এবং ২০২২ দুই দফায় তিনি নেপালের ভরতপুর মেট্রোপলিটন সিটির মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। ২০২৫ সালে দশটি কমিউনিস্ট গ্রুপ মিলে ‘নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি’ তৈরি হবার পূর্বে তিনি কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (মাওবাদী সেন্টার) এর কেন্দ্রীয় সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর আরেকটি পরিচয় হচ্ছে তিনি কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (মাওবাদী সেন্টার) এর চেয়ারপারসন এবং নেপালের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দাহাল (প্রচন্ড) এর কন্যা। গত ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ এ নেপালে অবস্থানকালে আমার সুযোগ হয়েছিল রেনু দাহালের একটি সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার নেওয়ার। তিনি নেপালে আসন্ন নির্বাচনে চিতওয়ান জেলার মেম্বার অব পার্লামেন্ট হবার জন্য নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁর সাথে সাক্ষাৎকারে নেপালে সংঘটিত সাম্প্রতিক জেনজি বিপ্লব, নেপালের জনযুদ্ধ থেকে সংসদীয় গণতন্ত্র এবং নারীর রাজনীতি প্রসঙ্গে কিছু উল্লেখযোগ্য আলাপ উঠে এসেছে। এই সাক্ষাৎকার গ্রহণের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য অগ্রজ কমরেড এবং নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য আরতি লামা এবং সরকার লামাকে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানাই। রেনু দাহাল এই সাক্ষাৎকারটি দিয়েছেন নেপালী ভাষায়, সরকার লামা উপস্থিত থেকে ইংরেজিতে তা অনুবাদ করে দিয়েছেন। সেই অনুবাদ থেকেই সর্বজনকথার জন্য এই সাক্ষাৎকারটি সাজানো হয়েছে।
বাংলাদেশে কারো সঙ্গে কি যোগাযোগ আছে?
রেনু দাহালঃ এখন যোগাযোগ নেই। তবে ১৯৯৬ সালের দিকে, বিশেষ করে নেপালের জনযুদ্ধের সময়ে কিছু কমিউনিস্ট বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল।
সম্প্রতি নেপালে জেনজি বিপ্লব সম্পন্ন হলো। সিপিএন (মাওবাদী কেন্দ্র) দলটিকে আমরা দেখেছি এই বিপ্লবে আন্দোলনকারীদের সংহতি দিতে এবং এবং বর্তমান নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির সমন্বয়কারী পুষ্প দাহাল প্রচন্ড এই বিপ্লবকে “নতুন রাজনৈতিক চেতনা” হিসেবে বলেছেন। আপনার চোখে জেনজি আন্দোলনের পুনর্মূল্যায়ন কী?
রেনু দাহালঃ জেনজি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিলো দেশের বাস্তব সংকটের প্রেক্ষাপটে। সরকারের প্রবল দুর্নীতি, অপশাসনের কারণে শহুরে জেনজি ফোর্স এই আন্দোলন শুরু করেছিল। কিন্ত পরবর্তীতে এই জেনজি বিপ্লবটি বেহাত হয়।
নেপালের পূর্বে পাশ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশ এবং শ্রীলংকাও ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। সেই গণঅভ্যুত্থানগুলো সম্পর্কে আপনার ভাবনা কী?
রেনু দাহালঃ নেপালে যেভাবে কেপি ওলি একধরনের আধিপত্যমূলক অপশাসনের সূচনা করেছিল, আমি মনে করি শ্রীলংকা এবং বাংলাদেশেও একইরূপ অপশাসন ও আধিপত্যের বিরুদ্ধেই তরুণরা জেগে উঠেছিল। নেপালের মতো এই দুই দেশেও সরকারের জনবিরোধী ভূমিকা দেখা গিয়েছিল। কেপি ওলির শাসনামলের অধীনে সরকারি নানান ব্যবস্থাপনায় যেই অনৈতিকতা ও নিষ্ক্রিয়তা তৈরি হয়েছিল সেখানে এই বিপ্লব অনিবার্য ছিল। আর এই বিপ্লবের পেছনে বাংলাদেশ এবং শ্রীলংকার গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাগুলোও ক্রীড়নক ভূমিকা রেখেছিল।
নেপালে রাজনীতিতে নারীর অবস্থান কী? একজন নারী হিসেবে আপনার কমিউনিস্ট পার্টিতে কোন আন্তঃসংগ্রাম করতে হয়েছে কি না? নেপালে নারীদের এই মূহুর্তে প্রধান রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট কী কী দেখতে পান? নারী মুক্তি আন্দোলন নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
রেনু দাহালঃ নেপালে জনযুদ্ধের সময় নারীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে আমার ভূমিকা ছিল এবং আমি দীর্ঘ সময় ধরে পার্টির নারী শাখার কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছি। জনযুদ্ধ থেকে গঠিত নয়া সংবিধানে সংসদীয় ব্যবস্থায় আনুপাতিকভাবে ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্ত দলের অন্তর্গত পরিবারতন্ত্র এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার জন্য নারীদের এখনো লড়াই করে যেতে হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, নেপালী সংবিধানমতে প্রতিটি স্থানীয় প্রশাসনে মেয়র অথবা ডেপুটি মেয়র পদে নারী প্রার্থী হওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু সামন্তবাদী চিন্তাচেতনার কারণে এখনো নারীদের প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে নানা বাধা তৈরি করা হয়। নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করার জন্য এই পুরুষবাদী চেতনা দূর করতে হবে।
জনযুদ্ধ থেকে গঠিত নয়া সংবিধানে সংসদীয় ব্যবস্থায় আনুপাতিকভাবে ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্ত দলের অন্তর্গত পরিবারতন্ত্র এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার জন্য নারীদের এখনো লড়াই করে যেতে হচ্ছে।
গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের সংগ্রামের ভিত্তিতে পার্টি ও জনগণের ব্যাপক লড়াইয়ে রাজতন্ত্রের পতন ও সংবিধান প্রণীত হয়। কিন্ত নেপালে জেনজি বিপ্লবের সময় রাজতন্ত্র ফিরে আসার প্রতি একটি জনমত দেখা গিয়েছে। এই ব্যাপারে আপনার মতামত কী?
রেনু দাহালঃ দীর্ঘ জনযুদ্ধের পরে রাজতন্ত্রের পতন ঘটেছে। কিন্ত রাজতন্ত্রের পক্ষটি সর্বদাই পুনরায় ক্ষমতা দখলের জন্য উদগ্রীব। সেটির চেষ্টাই আমরা জেনজি বিপ্লবের সময়েও দেখতে পেয়েছি। তাদের পক্ষটি জনপরিসরে ভীতি তৈরি করেছে, অনেক পাবলিক প্রতিষ্ঠানে তারা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। কিন্ত আমি মনে করি, নেপালি জনগণ গণতন্ত্রকামী এবং প্রজাতন্ত্রপ্রিয় (republican lover)। তাই রাজতন্ত্র এখানে অধিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ নেই।
একসময়ে সিপিএন (মাওসেন্টার) দলটি আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট সংস্থা RIM (Revolutionary International Movement) তৈরি করেছিল। এখন এরকম আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট সংস্থা নিয়ে কোন ভাবনা আছে কিংবা আপনার এবং আপনার পার্টির কি কোন পরিকল্পনা আছে নেপালের নানাবিধ কমিউনিস্ট লিটারেচার বাংলাদেশে কমিউনিস্ট কমরেডদের কাছে পৌঁছানোর?
রেনু দাহালঃ RIM এখন পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। আর আমি স্থানীয় প্রশাসনের কাজ নিয়েই এখন মনোযোগী। তাই আন্তর্জাতিক সংহতি নিয়ে কেন্দ্রীয় ভাবে পার্টি কী ভাবছে তা আমি জানিনা।
বাংলাদেশে কমিউনিস্ট বন্ধুদের পক্ষ থেকে শুভকামনা। আপনার তরফ থেকে তাঁদের জন্য কি বার্তা দিতে চান?
রেনু দাহালঃ দক্ষিণ এশিয়ায় কমিউনিস্ট আন্দোলন অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই আমি মনে করি পুনরায় কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণদেরকেই ভূমিকা নিতে হবে।
রেনুজি, আপনাকে ধন্যবাদ
রেনু দাহালঃ আসন্ন নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত বলে বেশি সময় দিতে পারলাম না বলে দুঃখিত। তোমাকে ও তোমাদের বন্ধুদের ধন্যবাদ।
মারজিয়া প্রভা: একটিভিস্ট ও সদস্য, গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি। ইমেইল: marzia.hassan1992@gmail.com
