নির্বাচনী ইশতেহার ১৯৯৬ ও ২০০৮: ফিরে দেখা

নির্বাচনী ইশতেহার ১৯৯৬ ও ২০০৮: ফিরে দেখা

মাহতাব উদ্দীন আহমেদ

নির্বাচনে একজন প্রার্থী/দলকে বিচার করার বা বোঝার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হল তার বা তার দলের ইশতেহার। কারণ লিখিতভাবে বলার কারণে অনেক কথাই তখন আর উহ্য রাখা যায় না। ইশতেহারগুলো থেকে সবচেয়ে প্রকটভাবে যে জিনিসটি ফুটে ওঠে তা হলো ওই ব্যক্তি বা দল আসলে গরীব-নিপীড়িত-লাঞ্ছিত-বঞ্চিতের নাকি অল্প কিছু ক্ষমতাবান মানুষের? এই লেখাটিতে ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের কয়েকটি ধারার বিভিন্ন দলের ইশতেহারের এই দিকটাতেই নজর দেয়ার সংক্ষিপ্ত চেষ্টা করা হয়েছে।

এই লেখা যখন লিখছি তখনো আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য কোন দলই তাদের ইশতেহার প্রকাশ করেনি। ফলে এই লেখাটিতে বাংলাদেশের ডান ও বাম ধারার প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো বিগত দুইটি আপাত “নিরপেক্ষ” ও “অবাধ” নির্বাচনের আগে যে ইশতেহারগুলো দিয়েছিল সেগুলোরই খুবই সংক্ষেপে তুলনামূলক পর্যালোচনা উপস্থিত করা হয়েছে ।

এখানে ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনকে বেছে নেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের সর্বশেষ শাসনামলে, বিশেষত ২০১৪-২০১৮ এবং ২০২৪ এ সাধারণ নির্বাচন যে অবস্থায় পৌছেছিল তাতে সেসব সময়ের ইশতেহার নিয়ে বিচার করার মানে হয় না। খুবই ভাল হতো যদি এবারের নির্বাচনপূর্ব বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ইশতেহারগুলোকেও পাওয়া যেত। তবে আগের কালের ইশতেহার থেকেও বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক মতাদর্শিক অর্থনৈতিক অবস্থান ধারণা করা যায়।

নির্বাচনী ইশতেহার: ১৯৯৬

১৯৯৬ সালের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারের নিচের তুলনামূলক পর্যালোচনা ছকগুলো নেয়া হয়েছে আনু মুহাম্মদ রচিত রাষ্ট্র ও রাজনীতি: বাংলাদেশের দুই দশক (সন্দেশ প্রকাশনী, ঢাকা। ২০০০) বইটি থেকে। এখানে পড়ার সুবিধার জন্য মূল বইয়ের ছক ফরম্যাটের মধ্যে কিছু পরিবর্তন এনে বিষয়ভিত্তিক ছক দাঁড় করানো হয়েছে।

বিষয়: সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় মূলনীতি

আওয়ামী লীগ

বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনাকে প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ

বিএনপি

সকল সংশোধনী রক্ষার অঙ্গীকার, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, ইসলামী মূল্যবোধ

জাতীয় পার্টি

বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, ইসলামী আদর্শ ও মূল্যবোধ

জামায়াতে ইসলামী

কোরআন ভিত্তিক, ইসলামী প্রজাতন্ত্র, প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে

বামফ্রন্ট

৭২ এর সংবিধানের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার চেতনা বাস্তবায়ন, বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রগতিশীল চেতনার প্রসার।

বিষয়: নিবর্তকমূলক আইন ও বিধান

আওয়ামী লীগ

কথা নেই

বিএনপি

কথা নেই

জাতীয় পার্টি

বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিল ও মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সঙ্গতিহীন সকল আইন সংশোধন

জামায়াতে ইসলামী

কথা নেই

বামফ্রন্ট

সংবিধানের ২য়, ৪র্থ, ৫ম, ৭ম ও ৮ম সংশোধনী বাতিল­*। অর্পিত সম্পত্তি আইন বাতিল

* অর্থাৎ জরুরি অবস্থা জারীর বিধান, রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসনব্যবস্থা, ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ এর ৫ এপ্রিল পর্যন্ত সামরিক সরকারের সকল কাজকে বৈধতাদান, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম সংযোজন, এরশাদের সামরিক শাসনের বৈধতাদান, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও ঢাকার বাইরে ৬ জেলায় হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ ইত্যাদি বাতিল করা – লেখক

বিষয়: ধর্ম ও রাষ্ট্র

আওয়ামী লীগ

কথা নেই

বিএনপি

বর্তমান অবস্থা অব্যাহত থাকবে

জাতীয় পার্টি

কোরআন ও সুন্নাহ বিরোধী কোনো আইন করবে না, সরকারকে পরামর্শদানের জন্য ইসলামিক কমিশন

জামায়াতে ইসলামী

ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র

বামফ্রন্ট

ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করা

বিষয়: কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি

আওয়ামী লীগ

প্রয়োজনে ভর্তুকি দেয়া হবে, ভূমি সংস্কার ও ব্যবস্থাপনার যুগোপযোগী ব্যবস্থা

বিএনপি

কৃষিতে ভর্তুকি বিবেচনা, পুঁজি বিনিয়োগ বৃদ্ধি

জাতীয় পার্টি

পল্লী রেশনিং ও পল্লী পরিষদ চালু, গুচ্ছগ্রাম

জামায়াতে ইসলামী

সুদমুক্ত কৃষিঋণ, ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ, ভূমি মালিকানা বহাল রেখে সমবায়

বামফ্রন্ট

‘খোদ কৃষকের হাতে জমি এবং সমবায়’ এই নীতির ভিত্তিতে ভূমি সংস্কার। কৃষিতে ভর্তুকি প্রদান। ক্ষেতমজুরদের দৈনিক সাড়ে চার কেজি চালের সমান মজুরী ও রেজিস্ট্রেশন কার্ড, রেশনিং

বিষয়: শিল্প ও বাণিজ্য

আওয়ামী লীগ

ব্যক্তিমালিকানাধীন খাততে সহযোগিতা, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকে লাভজনক করা, অবাধ বাণিজ্যনীতি, নতুন জাতীয়তাবাদ গ্রহণ

বিএনপি

দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগ বর্ধিত করা, রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ব্যবস্থাপনা দক্ষ করা, বাজার-বাণিজ্য-বিনিয়োগ করা

জাতীয় পার্টি

দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ

জামায়াতে ইসলামী

বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করা, রফতানিমুখী শিল্প গড়ে তোলা, শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের মুনাফার শ্রমিকদের অংশ প্রদানের নীতি চালু করা

বামফ্রন্ট

রাষ্ট্রায়ত্ত খাত পরিচালনা ব্যবস্থায় শ্রমিকদের অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, এই দুর্নীতিবাজ প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, অবাধে বিরাষ্ট্রীয়কৃত শিল্প-কারখানা রাষ্ট্রায়ত্ত করা, প্রকৃত উদ্যোক্তাদের সহায়তা

বিষয়: শিক্ষা

আওয়ামী লীগ

১০ বছরের মধ্যে নিরাক্ষরতা দূর, কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের আলোকে শিক্ষা ব্যবস্থা পরিবর্তন, ধর্মীয় ও মাদ্রাসা শিক্ষাকে উন্নত ও আধুনিক করা

বিএনপি

যুগোপযোগী শিক্ষা, মসজিদভিত্তিক শিক্ষাকে উৎসাহিত করা, শিক্ষার জন্য খাদ্য সম্প্রসারণ

জাতীয় পার্টি

২০০০ সালের মধ্যে সবার জন্য শিক্ষা-সুযোগ নিশ্চিত করা, স্নাতক পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা, ডাবল শিফট চালু।

জামায়াতে ইসলামী

মুসলিম উম্মাহর আধুনিক প্রয়োজন উপযোগী ধর্মীয় শিক্ষার মানোন্নয়ন, নারী শিক্ষার জন্য আলাদা প্রতিষ্ঠান, মসজিদকে শিক্ষা ও উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা

বামফ্রন্ট

সর্বক্ষেত্রে একই পদ্ধতির শিক্ষা প্রবর্তন করা, ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা চালু, বৈজ্ঞানিক, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, দেশপ্রেমিক, শ্রমজীবী, জনগণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল দৃষ্টিভঙ্গির সিলেবাস।

বিষয়: নারী

আওয়ামী লীগ

জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী অবহেলিত নারী ও শিশুদের মর্যাদা প্রকল্প নেয়া হবে

বিএনপি

দশমশ্রেণী পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা, নারী ও পুরুষের বৈষম্য দূর করবার চেষ্টা নেয়া হবে

জাতীয় পার্টি

আর্থিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নে বিশেষ কর্মসূচি

জামায়াতে ইসলামী

শরীয়তের সীমার মধ্যে জীবিকা অর্জন, সকল পরিবহণে আলাদা আসন, বাড়িতে ও পাড়ায় থেকে উপার্জনের ব্যবস্থা, পতিতাবৃত্তি উচ্ছেদ

বামফ্রন্ট

জাতিসংঘের নারী সমঅধিকার সনদ পরিপূর্ণভাবে কার্যকর করা, পারিবারিক আইন ও সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর, ইউনিফর্ম সিভিল কোড চালু করা, কর্মস্থলে শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন, সংসদে প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচনে সুযোগ বৃদ্ধি

বিষয়: অর্থনীতির ধরন

আওয়ামী লীগ

মুক্তবাজার অর্থনীতি

বিএনপি

উদার ও মুক্তবাজার অর্থনীতি

জাতীয় পার্টি

স্বাধীন জাতীয় অর্থনীতি, সরকারের ভূমিকা সহায়তামূলক-নিয়ন্ত্রণমূলক নয়

জামায়াতে ইসলামী

ইসলামী নীতিমালার ভিত্তিতে মুক্তবাজার ব্যবস্থা, সুদবিহীন আর্থিক ব্যবস্থা

বামফ্রন্ট

অবাধ খোলাবাজার অর্থনীতির নামে যে ব্যবস্থা চলছে তার পরিবর্তন ও স্বনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রবর্তন

বিষয়: বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও গ্যাটচুক্তি

আওয়ামী লীগ

কথা নেই

বিএনপি

কথা নেই

জাতীয় পার্টি

কথা নেই

জামায়াতে ইসলামী

কথা নেই

বামফ্রন্ট

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর চাপিয়ে দেয়া নীতি পরিবর্তন, অসম গ্যাটচুক্তি বাতিল ও নয়া বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম

বিষয়: আমলাতন্ত্র

আওয়ামী লীগ

দক্ষ প্রশাসনব্যবস্থা

বিএনপি

প্রশাসনের গুণগত মান উন্নয়ন

জাতীয় পার্টি

প্রশাসনের গুণগতমান ও কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য সংস্কার

জামায়াতে ইসলামী

প্রশাসনকে বিকেন্দ্রীকরণ

বামফ্রন্ট

প্রশাসন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন

বিষয়: ভারত

আওয়ামী লীগ

মৈত্রীচুক্তি নবায়ন করা হবে না, ফারাক্কার পানি আনা হবে

বিএনপি

২৫ বছরের চুক্তি নবায়ন করা হবে না’ গঙ্গার পানি আনা হবে

জাতীয় পার্টি

গঙ্গার পানি আনা হবে

জামায়াতে ইসলামী

২৫ বছরের মৈত্রী চুক্তি নবায়ন করা হবে না

বামফ্রন্ট

আঞ্চলিক সমস্যাসমূহ সমাধান করা হবে

বিষয়: স্থানীয় সরকার

আওয়ামী লীগ

স্বায়ত্তশাসিত স্থানীয় সরকার। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা ও দায়িত্ব দেয়া

বিএনপি

গ্রাম সরকার, থানা পরিষদ ও জেলা পরিষদ গঠন

জাতীয় পার্টি

উপজেলা ব্যবস্থা পুনর্বহাল, জেলাসহ সকল পর্যায়ে নির্বাচিত কর্তৃত্ব

জামায়াতে ইসলামী

কথা নেই

বামফ্রন্ট

জেলা পরিষদসহ সকল পর্যায়ে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার

বিষয়: সামরিক বাহিনী

আওয়ামী লীগ

মান উন্নয়নের ব্যবস্থা

বিএনপি

দক্ষ করে তোলার ব্যবস্থা

জাতীয় পার্টি

আধুনিক দেশরক্ষা ব্যবস্থা

জামায়াতে ইসলামী

শিল্প ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সকল সক্ষম নাগরিককে প্রতিরক্ষা ট্রেনিং, প্রতিরক্ষা শিল্পকে অগ্রাধিকার

বামফ্রন্ট

সংসদের কাছে দায়বদ্ধ গণতান্ত্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সক্ষম নাগরিকদের প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণ, সামরিকখাতে ব্যয় কমানো

বিষয়: মতপ্রকাশ

আওয়ামী লীগ

রেডিও-টিভি ও সরকারি সংবাদ সংস্থাকে স্বায়ত্তশাসন, সরকরি পত্রিকাকে বেসরকারি খাতে দেয়া

বিএনপি

অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা

জাতীয় পার্টি

রেডিও-টিভির স্বায়ত্তশাসন, সরকারি পত্রিকা বেসরকারি খাতে প্রদান

জামায়াতে ইসলামী

রেডিও-টিভিকে মনুষ্যত্ব বিকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা

বামফ্রন্ট

রেডিও-টিভিকে স্বায়ত্তশাসন, সকল তথ্য জনগণের অবগত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা

বিষয়: যুদ্ধাপরাধী

আওয়ামী লীগ

কথা নেই

বিএনপি

কথা নেই

জাতীয় পার্টি

কথা নেই

জামায়াতে ইসলামী

কথা নেই

বামফ্রন্ট

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তি। যেকোনো নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা

বিষয়: সংখ্যালঘু

আওয়ামী লীগ

ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় ও গোত্র নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের সমঅধিকার ও সুযোগের পরিপন্থী আইনের বিলোপ সাধন করা হবে

বিএনপি

সকল ধর্মবিশ্বাসীর অধিকার রক্ষা, উপজাতীয়দের সামাজিক সুযোগ অব্যাহত রাখা হবে

জাতীয় পার্টি

সকল ধর্মের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা

জামায়াতে ইসলামী

অমুসলিমদের নিরাপত্তা বিধান, উপজাতীয়দের স্বতন্ত্র জাতিসত্তাকে মর্যাদা দান

বামফ্রন্ট

বিভিন্ন সংখ্যালঘু জাতিসত্তাসমূহের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও অধিকার প্রতিষ্ঠা

বিষয়: শ্রমিক

আওয়ামী লীগ

উৎপাদনশীলতার সঙ্গে মজুরির ত্রিপক্ষীয় সমঝোতার ভিত্তিতে শ্রমনীতি

বিএনপি

মজুরি কমিশন, আইএলও কনভেনশন ও দেশের অবস্থা অনুযায়ী শ্রম আইন

জাতীয় পার্টি

শিশু শ্রম নিষিদ্ধ, নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড

জামায়াতে ইসলামী

আইএলও কনভেনশনের আলোকে শ্রমনীতি

বামফ্রন্ট

৫ মন চাউলের সমান ন্যূনতম মজুরী, বাসস্থান, রেশনিং, বেতন কাঠামো ৫:১, আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী অধিকার নিশ্চিত, নতুন শ্রমনীতি প্রণয়ন

১৯৯৬ সালের ইশতেহারের সংক্ষিপ্ত তুলনাগুলো থেকে যা যা ফুটে ওঠে:

জামায়াত বাদে নির্বাচনে অংশ নেয়া ডান ও বাম দলগুলোর রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি হয় বাঙালী কিংবা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। জামায়াতে ইসলামী মুসলমান ছাড়া বাকি সব ধর্মের মানুষকে কার্যত রাষ্ট্র পরিচালনায় অপরায়ন করার প্রস্তাবই করেছে। নিবর্তনমূলক আইন নিয়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা জামায়াতের কোন আলাপই নাই! নামকাওয়াস্তে আলাপ দিয়েছিল জাতীয় পার্টি। বামফ্রন্ট এক্ষেত্রে নিবর্তকমূলক আইন নিয়ে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য দিয়েছে। তবে তারা একধরনের স্ববিরোধী পরিস্থিতি তৈরি করেছে রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতিতে বাঙালী জাতীয়তাবাদের নিবর্তনমূলক ভূমিকাকে অগ্রাহ্য করার মাধ্যমে। আমলাতন্ত্রের সংস্কার বিষয়ে গড় কথা বলা ছাড়া কেউই সুনির্দিষ্ট কোন আলাপ তুলতে পারে নাই। রাষ্ট্রের সাথে ধর্মের সম্পর্ক প্রশ্ন বামফ্রন্ট ছাড়া বাকি সবাই আসলে সংখ্যাগুরু মানুষের ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার করে অন্য ধর্মের মানুষকে অপরায়ন করেছে।

পরিকল্পিত প্রাণপ্রকৃতি বান্ধব স্বনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার কোন আলাপ কারো ইশতেহারেই ছিল না। তবে বামদলগুলোর ইশতেহারে কৃষকের জন্য প্রয়োজনীয় রেশন, কার্ড, ভূমি সংস্কারের কথা থাকলেও বাকি বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে এগুলো হয় অনুল্লেখিত অথবা খুবই নামকাওয়াস্তে বলা হয়েছে। দেশীয় শিল্পভিত্তি তৈরি করার কোন বিস্তারিত আলাপও ছিল না কারো ইশতেহারেই, তবে এক্ষেত্রে ডান দলগুলোর ইশতেহারে মূলত সবকিছু বাজারের হাতে উত্তরোত্তর ছেড়ে দেয়ার অবস্থান স্পষ্ট। মুক্তবাজার অর্থনীতির কাছে সোৎসাহী আত্মসমর্পণ ছিল ইশতেহারগুলোতে, তবে বামফ্রন্ট এর বিরোধিতা করেছে। তবে সুস্পষ্ট কোন কর্মসূচী তাদের ইশতেহারও ছিল না। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ নিয়ে বামরা ছাড়া বাকি সবার নীরবতা ছিল। স্থানীয় সরকার বিষয়ে ডান কিংবা বাম গড় কথাই বলেছিল সবাই। ডান দলগুলোর বিশেষত জামায়াতের সামরিক বাহিনী তোষণের নীতি প্রকট ছিল ইশতেহারগুলোতে। এক্ষেত্রে একমাত্র বামফ্রন্ট পরিস্কারভাবে সামরিক বাহিনীকে জবাবদিহির আওতায় আনার কথা বলেছিল।

পরিকল্পনা তৈরি করে পূর্ণ প্রস্তুতিতে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের বক্তব্য কারো ইশতেহারেই নাই। নারীর সমান অধিকার বিষয়ে বামফ্রন্ট ছাড়া আর কারো কোন কার্যকর কথা ছিল না। তবে তাদেরও নারীর কর্মসংস্থানের পরিবেশ নিশ্চিত করা বিষয়ে সুস্পষ্ট কোন আলাপ ছিল না। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে প্রায় গৎবাঁধা কথাতেই সবাই সীমাবদ্ধ ছিল। বামফ্রন্ট বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের সাংবিধানিক স্বীকৃতি চেয়েছে। তবে সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে বাঙালী জাতীয়তাবাদের অবস্থা নিয়ে কার্যত স্ববিরোধিতার শিকার হয়েছিল। শ্রমিক বিষয়ে সবাই যান্ত্রিকভাবে আইএলওকেই একমাত্র মানদণ্ড ধরে রাখে। বামফ্রন্ট এর আলাপ অন্যদের তুলনায় অনেক ভাল। তবে কেউই জাতীয় নিম্নতম মজুরীর আলাপ তোলেনি।

ভারত প্রশ্নে ডান দলগুলোর আলাপ মূলত গঙ্গার পানি আনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, বামফ্রন্টের আলাপে আঞ্চলিক সমস্যার সমাধানের গড় কথাবার্তা ছিল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে বামফ্রন্ট ছাড়া আর কারো কোন কথা ছিল না। মতপ্রকাশের অধিকার নিয়েও প্রায় সবারই গৎবাঁধা কথাবার্তা।  

নির্বাচনী ইশতেহার: ২০০৮

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের এই তুলনামূলক ছকগুলো নেয়া হয়েছে সচলায়তন ব্লগে প্রকাশিত ব্লগার দিনমজুর এর লেখা “ইশতেহারে যায় চেনা: পাঁচটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারের তুলনামূলক আলোচনা” শীর্ষক রচনাটি থেকে।

বিষয়: শিল্প/বিনিয়োগ

আওয়ামী লীগ

বেসরকারী ও বিদেশী বিনিয়োগের জন্য বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ তৈরি করা হবে (আর্টিকেল ৯.১ ও ৯.২)

বিএনপি

বিভিন্ন শিল্প, ব্যবসা ও বাণিজ্য বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া এবং বেসরকারি খাতকে সর্বপ্রকার উৎসাহ দেয়াই বিএনপির অর্থনীতির দর্শন (আর্টিকেল ৪)

জামায়াতে ইসলামী

বেসরকারি খাতের উন্নয়নের ‍উপর যথাযথ গুরুত্বপ্রদান, বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধির চেষ্টা করা ও বিনিয়োগবোর্ডকে শক্তিশালী করা হবে (অর্থনীতি, পৃষ্ঠা ১৬)

সিপিবি

ঢালাও বিরাষ্ট্রীয়করণ, বিনিয়ন্ত্রণ, উদারীকরণের আত্মঘাতী নীতি পরিত্যাগ করা। রাষ্ট্রীয় কলকারখানাকে লাভজনক করা। একই সঙ্গে ব্যক্তিখাতে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের শিল্প-ব্যবসার পথে প্রতিবন্ধকতা দূর করা (আর্টিকেল ৬-ঙ)

বাসদ

টিএন্ডটি এবং ব্যাংক-বীমাসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-প্রতিষ্ঠানের বিরাষ্ট্রীয়করণ বন্ধ করা, অতীতে বিরাষ্ট্রীয়করণকৃত কারখানাসমূহ বন্ধ হওয়াসহ সকল দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার করা (৫-গ), বিদেশী বিনিয়োগের নামে সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানির লুটপাট বন্ধ করা (৩-ঘ)।

বিষয়: কৃষি খাত

আওয়ামী লীগ

কৃষি উপকরণে ভর্তুকি বৃদ্ধি, কৃষি উপকরণ সহজলভ্যকরণ, কৃষিজাত পণ্যের নায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ, ভূমি সংস্কার কমিশন গঠন, ভূমিহীনদের মাঝে খাস জমি বিতরণ, বাণিজ্যিক কৃষি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর বিকাশ ইত্যাদি (আর্টিকেল ৭)

বিএনপি

কৃষিকে আধুনিক করা, সার-বীজ-কীটনাশক সহজলভ্য করা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম হ্রাস করা, কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ সহজ করার জন্য কৃষি মার্কেট তৈরি করা, সার-কীটনাশকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে রক্ষার জন্য কৃষি শ্রমিককে সচেতন করা ইত্যাদি (আর্টিকেল ৭)

জামায়াতে ইসলামী

কৃষিতে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ানো, বাজার ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো, সার-বীজ-কীটনাশক সহজলভ্যকরণ, ভূমি সংস্কার, কৃষি ভিত্তিক রপ্তানী প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল গঠন ইত্যাদি (কৃষি ও খাদ্য – পৃ ১৭,১৮)

সিপিবি

খোদ কৃষক ও মেহনতি মানুষের স্বার্থে আমূল ভূমি সংস্কার, কৃষি সংস্কার ও গ্রাম জীবনের মৌলিক পুনর্গঠন করা। কৃষি ও কৃষকের উৎপাদন সমস্যাগুলোর সমাধান করা। বীজ, সার, ঋণ, কৃষি উপকরণ ইত্যাদি খোদ কৃষকের জন্য সহজলভ্য করা। ক্ষতিকর হাইব্রিড বীজ আমদানি নিষিদ্ধ করা। বহুজাতিক কোম্পানীর নিয়ন্ত্রণে কর্পোরেট ফার্মিং করার সুযোগ বন্ধ করা। কৃষিপণ্যের উৎসাহমূলক ও নায্য মূল্য নিশ্চিত করা। জাতীয় স্বার্থে কৃষিখাতে প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত সাবসিডি প্রদান করা (৪-ক)

বাসদ

জাতীয় বাজেটে কৃষিখাতে উন্নয়ন বাজেটের ৪০ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া; কৃষি ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা। সব বড় হাট-বাজারে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র চালু করা যাতে ফসল ওঠার সাথে সাথে খোদ কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্য দামে ফসল ক্রয় ও সংগ্রহ করা যায় (১-ছ)। সরকারি খাস জমি প্রকৃত ভূমিহীনদের মাঝে বরাদ্দ দেয়া। আমূল ভূমি সংস্কার। বেদখল সকল জমি-সম্পত্তি উদ্ধার। ঢাকাসহ সব বড় শহরে জমির সিলিং ঘোষণা (১-গ)। টার্মিনেটর বীজসহ জীববৈচিত্র ও পরিবেশ ধ্বংসকারী কীটনাশক ও প্রযুক্তির অনুপ্রবেশ রোধ করা। কৃষি গবেষণায় গুরুত্ব দেয়া।   

 

বিষয়: স্বাস্থ্য/চিকিৎসা খাত

আওয়ামী লীগ

সবার জন্য স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি পুনর্মূল্যায়ন করা, এই নীতির আলোকে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু, পুষ্টি, শিশু ও মাতৃমঙ্গল নিশ্চিত করা (১১.১)

বিএনপি

দেশে ‍উন্নত ও বিশেষায়িত চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো হবে যাতে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে কাউকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য যেতে না হয়। এর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম বিনা শুল্কে আমদানির সুযোগ দেয়া হবে। (৯-ক)

জামায়াতে ইসলামী

গণমূখী স্বাস্থ্য নীতি ঘোষণা, অঞ্চল গোত্র নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত প্রয়াস গ্রহণ করা হবে (চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য, পৃষ্ঠা-২৫)। স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম পরিচালনায় জনপ্রতিনিধি, বেসরকারি চিকিৎসক ও সম্ভব হলে সশস্ত্র বাহিনীর মেডিকেল কোরকে সম্পৃক্ত করা হবে (চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য, পৃষ্ঠা-২৬)।

সিপিবি

সকল নাগরিকের জন্য সুষম ও অভিন্ন গণমুখী চিকিৎসানীতি, স্বাস্থ্যনীতি ও ওষুধ নীতি চালু করা (১০-ক)। হাসপাতালগুলোতে উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রসারিত করা এবং সেখানে শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের জন্য চিকিৎসার সুযোগ বৃদ্ধি করা

বাসদ

সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে আধুনিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত ও পর্যাপ্ত করা, ঔষধ সরবরাহ নিশ্চিত করা। চিকিৎসা ব্যবসা ও দুর্নীতি বন্ধ করা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী প্রতি ৫০০ জনে ১ জন ডাক্তার নিয়োগ দেয়া। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং কারখানায় হেলথ সেন্টার চালু করা ও ডাক্তার নিয়োগ  দেয়া। স্বাস্থ্যনীতি-২০০৮ বাতিল করা। এনজিওর হাতে হাসপাতাল ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করা (৪-গ)

বিষয়: শিক্ষা খাত

আওয়ামী লীগ

যুগোপযোগী নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হবে। ২০১০ সালের মধ্যে প্রাথমিক স্তরে নিট ভর্তি ১০০ শতাংশে উন্নীত করা এবং ২০১৪ সালের মধ্যে দেশকে নিরক্ষরতা মুক্ত করা হবে। পর্যায়ক্রমে স্নাতক পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক সেবায় পরিণত করা হবে (১০.১)। মাদ্রাসা শিক্ষাকে যুগোপযোগী করে তোলা হবে (১০.২)।

বিএনপি

দেশের সকল নাগরিকের জন্য যথোপযুক্ত শিক্ষা লাভের দ্বার অবারিত করা হবে এবং আগামী ৫ বছরের মধ্যে যাতে দেশের কোন মানুষ নিরক্ষর না থাকে এবং যাতে কোন শিশু শিক্ষাঙ্গণের বাইরে না থাকে তা নিশ্চিত করা হবে (৮-খ)। দরিদ্র অথচ মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত বৃত্তির ব্যবস্থা করা হবে যাতে আর্থিক দীনতার কারণে কোন মেধাবী ছাত্রছাত্রী অকালে ঝরে না যায় (৮-জ)।

জামায়াতে ইসলামী

মেয়েদের মতো ছেলেদেরও ক্রমান্বয়ে এইচএসসি পর্যন্ত বিনা বেতনে শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে (শিক্ষা, পৃষ্ঠা-১৪)। ফোরকানিয়া মাদ্রাসাসহ মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষাকে অধিকতর গুরুত্ব দেয়া হবে (শিক্ষা, পৃষ্ঠা-১৪)। আলিয়া ও কওমী মাদ্রাসা যুগোপযোগী করার ব্যবস্থা করা হবে (শিক্ষা, পৃষ্ঠা-১৪)

সিপিবি

সার্বজনীন, বিজ্ঞানভিত্তিক, বৈষম্যহীন, একই ধারার গণমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা। ৩ বছরের মধ্যে প্রতি ২ বর্গকিলোমিটারে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৮ বছরের মধ্যে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা (৯-ক)। পর্যায়ক্রমে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করার উদ্যোগ নেয়া (৯-খ)।

বাসদ

সংবিধানের ১৭ নং অনুচ্ছেদ ও ’৯০ এর সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের ১০ দফার ভিত্তিতে সর্বজনীন, বৈষম্যহীন, বিজ্ঞানভিত্তিক, সেক্যুলার ও একমুখী গণতান্ত্রিক শিক্ষানীতি চালু করা। শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ও সর্বোচ্চ বেতন কাঠামো চালু, উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা (৪-ক)। সবার জন্য শিক্ষা উন্মুক্ত করা, শিক্ষার আর্থিক দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে রাষ্ট্রের হাতে ন্যাস্ত করা। প্রতি দুইশ পরিবারের জন্য একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চালু ও ড্রপ আউট বন্ধ করা। স্নাতক পর্যন্ত সবার জন্য বাধ্যতামূলক অবৈতনিক শিক্ষা চালু করা, প্রত্যেক জেলায় কমপক্ষে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। শিক্ষা গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি পাওয়া। টাকা দিয়ে বিদ্যা কেনার বিদ্যা-বিপনী বন্ধ করা। ব্র্যাকের হাতে প্রাইমারি স্কুল পরিচালনার দায়িত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করা (৪-খ)।

বিষয়: আবাসন খাত

আওয়ামী লীগ

আবাসন বিষয়ে এদের পৃথক কোন বক্তব্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। দারিদ্র্য বিমোচনের অংশে বলা হয়েছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের গৃহীত প্রকল্প ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ আশ্রয়ন, গৃহায়ন, আদর্শ গ্রাম, ঘরে ফেরা বাস্তবায়ন করা হবে (৪.১)।

বিএনপি

রিহ্যাবের সহায়তায় দেশের ছোট ও মাঝারি শহরে নতুন আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে (১৮)। গৃহহীন মানুষদের জন্য সরকারি পতিত জমিতে স্বল্প ব্যয়ে গৃহনির্মাণের ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং এ ব্যাপারে বেসরকারি খাত ও এনজিওদের সহায়তা নেয়া হবে (১৮)।

জামায়াতে ইসলামী

শহরে বস্তিবাসী ও নিম্নবিত্তদের আবাসন বিষয়ে জামাতের কোন প্রতিশ্রুতি নেই। “স্থানীয় সরকার ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং পল্লী উন্নয়ন” আর্টিকেলে বলা হয়েছে: “সরকারী আনুকুল্যে পল্লী গৃহনির্মাণ প্রকল্প চালু ও সুদবিহীন গৃহনির্মাণ ঋণের ব্যবস্থা করা হবে (পৃষ্ঠা-২৫)।

সিপিবি

উপযুক্ত পুনর্বাসন ছাড়া বস্তি উচ্ছেদ বন্ধ করা। দরিদ্র নিম্নবিত্তদের জন্য গৃহনির্মাণ প্রকল্প চালু করা। বস্তিবাসীর জন্য পৌরজীবনের নূন্যতম সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা। শহরের খাস জমি উদ্ধার করে সেখানে সরকারিভাবে কলোনি, ডরমেটরি ইত্যাদি নির্মাণ করে তা গরিব শ্রমজীবী মানুষের মাঝে বরাদ্দ দেয়া। বাস্তুহীন ও নিম্নবিত্ত সকল পরিবারের জন্য ৩ বছরের মধ্যে নূন্যতম বাসস্থানের ব্যবস্থা করা (১৫-ক)।

বাসদ

শহরে খাস জমিতে স্বল্পমূল্যে ঘর নির্মাণ এবং বস্তিবাসীসহ নিম্ন আয়ের মানুষদের কাছে কিস্তিতে হস্তান্তর করা, ভাড়া দেওয়া। পুনর্বাসন ছাড়া রিকশা, হকার, বস্তি উচ্ছেদ বন্ধ করা (১-খ)

বিষয়: প্রাকৃতিক সম্পদ, জ্বালানী ও বিদ্যুৎ

আওয়ামী লীগ

দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানী নীতি করা হবে। বেসরকারি খাতে ১০, ২০, ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রসহ বৃহৎ ও ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হবে (৩.১)। তেল ও নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও আহরণের কাজে অগ্রাধিকার দেয়া হবে (৩.২)।

বিএনপি

নির্বাচিত বিএনপি সরকার প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই জাতীয় স্বার্থে তেল, গ্যাস ও কয়লার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য যথার্থই অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে তাদের সুপারিশ অনুযায়ী জাতীয় জ্বালানী নীতি প্রণয়ন ও তার আলোকে প্রয়োজনীয় কর্মসূচী গ্রহণ করবে (৬)।

জামায়াতে ইসলামী

দেশের তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান এবং আহরণের প্রচেষ্টা জোরদার করা হবে।

সিপিবি

প্রাকৃতিক সম্পদ জল, জমি, বন বিরাষ্ট্রীয়করণের আওতামুক্ত করে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। প্রাকৃতিক সম্পদ শতভাগ জনগণের মালিকানায় রেখে সম্পদ আহরণ ও ব্যবহারে পরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জাতীয় স্বার্থকে সকল প্রকার বাণিজ্যিক স্বার্থের উর্ধ্বে রাখা। তেল-গ্যাস-কয়লা ও তা থেকে সৃষ্ট পণ্য আইন করে করে রপ্তানি নিষিদ্ধ করা (১৯-ক)।

বাসদ

তেল-গ্যাসের উৎপাদন বন্টন চুক্তি পিএসসিসহ জাতীয় স্বার্থবিরোধী সকল অসম চুক্তি বাতিল করা। তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ-বন্দর-রেলওয়েসহ সকল জাতীয় সম্পদ সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানির গ্রাস থেকে রক্ষা করা। মাগুড়ছড়া ও টেংরাটিলায় ছাতক গ্যাসক্ষেত্রে ধ্বংস ও সম্পদ নষ্টের ক্ষতিপূরণ আদায় করা। কথিত সিস্টেম লস ও চুরি এবং দফায় দফায় বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাসের দাম বৃদ্ধি বন্ধ করা। লোডশেডিং দূর করা। সারাদেশের ৮০% বিদ্যুৎ সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। উত্তরবঙ্গ-দক্ষিণবঙ্গসহ সারাদেশে ৯৪% সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে গ্যাস সরবরাহ করা।

২০০৮ সালের ইশতেহারের সংক্ষিপ্ত তুলনাগুলো থেকে যা যা ফুটে ওঠে:

শিল্পক্ষেত্রে ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে বিদেশীদের উপর সেই একই নির্ভরতা বিদ্যমান, সেই নির্ভরতা বরং আরও বৃদ্ধি পেয়েছে ২০০৮ সালে এসে। রাষ্ট্রায়ত্ত খাতকে দুর্বল করার নীতিও খুব পরিস্কার এসব দলের ইশতেহারে। এক্ষেত্রে বামদল দুটির ইশতেহার বরং অনেক পরিস্কারভাবে শিল্পখাতে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের গুরুত্বকে সামনে এনেছে। তবে দেশীয় শিল্পভিত্তি গড়ে তোলার বিষয় যথেষ্ট পরিষ্কারভাবে বাম দলের ইশতেহারেও ফুটে ওঠেনি। কৃষি বিষয়ক ইশতেহারে একমাত্র বাসদ ছাড়া আর কোন দলের আলাপেই প্রাণপ্রকৃতিবান্ধব কৃষির কথা স্পষ্টভাবে আসেনি।

স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও একমাত্র বাসদ ছাড়া বাকিদের ইশতেহারে গড় কথার ছড়াছড়ি। তবে অবাক করা বিষয় হল দেশের সবচেয়ে পুরনো ও বড় দুই বাম দলের কেউই ২০০৮ সালে এসেও বিনামূল্যে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা, টেস্ট, ওষুধের দাবি তোলার সাহস অর্জন করতে পারে নাই! শিক্ষার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে বড় ডান দলগুলোর ইশতেহারে নানান বাগাড়ম্বর, তবে শিক্ষার আরও বেশি ধর্মীয়করণ করার ক্ষেত্রে জামায়াতের আগ্রহ।

আবাসনের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণের কোন কথা নাই। অন্যদিকে বামদলগুলো ছাড়া বাকি তিনটি বড় ডান দলের কারোরই প্রাকৃতিক সম্পদ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত জনগণের মালিকানা ও জাতীয় সক্ষমতা তৈরির কোন বক্তব্য ছিল না। 

উপরের দুই সময়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত ইশতেহার পর্যালোচনা থেকে আরও যে বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, যারা জনগণের রাজনীতি করেন তাদেরকে নতুন বার্তা দেয়ার সক্ষমতা, বড় বড় রাজনৈতিক দলের সাথে নিজেদের বার্তার পরিস্কার পার্থক্য ও পরিকল্পনা তুলে ধরার বিষয়ে আরও দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

মাহতাব উদ্দীন আহমেদ: লেখক ও সর্বজন অধিকার কর্মী। ইমেইল: mahtabjuniv@gmail.com

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •