সম্পাদকীয়
১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে এই সংখ্যা প্রকাশিত হচ্ছে। বহুবছর দেশে যথাযথ নির্বাচন হয় নাই। সেকারণে এবারের নির্বাচন নিয়ে মানুষের অনেক উৎসাহ সেই সাথে উদ্বেগও কম নয়। আওয়ামী লীগ তার আমলে অন্যদের নির্বাচন থেকে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল, এবারে আওয়ামী লীগ নিজেই নির্বাসিত। কিন্তু দীর্ঘদিনের অগণতান্ত্রিক স্বেচ্ছাচারী শাসনে সমাজে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী বিভিন্ন গোষ্ঠীর শক্তিবৃদ্ধি ঘটেছে। তাদের আস্ফালন এখন সর্বত্র। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ বিভিন্ন স্থানে যে মব সন্ত্রাস দেখা যাচ্ছে; প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট, উদীচীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঘোষণা দিয়ে যেসব হামলা অগ্নিসংযোগ হয়েছে তাতে এদের ভূমিকাই মুখ্য। তাছাড়া আইন ও সালিশ কেন্দ্রের অনুসন্ধান অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে যে, গত এক বছরে মবসন্ত্রাস, খুন, ধর্ষণ, পুলিশ বা সেনাসদস্যের হেফাজতে মৃত্যু আগের চাইতে বেড়েছে। দীপু চন্দ্র দাশকে পিটিয়ে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের নিষ্ক্রিয়তা বা পৃষ্ঠপোষকতার ভূমিকাই বেশি উদ্বেগ তৈরি করছে।
এবারের নির্বাচনে জুলাই সনদ এবং গণভোট একটি বড় বিতর্কের বিষয়। অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে দীর্ঘ আলোচনা শেষে তৈরি করে ‘জুলাই সনদ’। এখানে সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য হয়নি, অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্তও হয়নি। তবে নির্বাচনের দিন এই সনদের উপরই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে গণভোট। জুলাই সনদে কী আছে, কী নেই; বাস্তবায়ন হবে কতটুকু এ বিষয়ে লিখেছেন কল্লোল মোস্তফা। এবারে বিভিন্ন দলের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশিত হবার আগেই আমাদের প্রকাশনার কাজ শেষ হয়েছে। তবে দলগুলোর অবস্থানের তুলনামূলক আলোচনা কিংবা ধারাবাহিকতা দেখার জন্য ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের কয়েকটি ধারার বিভিন্ন দলের ইশতেহারের মূল দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন মাহতাব উদ্দীন আহমেদ।
বিভিন্ন কারণে তিস্তাসহ বাংলাদেশের প্রায় সব নদী এখন অস্তিত্বের সংকটে। তিস্তা সংকট এবং সমাধানের পথ খুঁজতে গেলে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের নদী সংক্রান্ত নীতিমালা, প্রকল্প এবং ফলাফলের দিকে মনোযোগ দেয়া দরকার। নদী বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ডক্টর নজরুল ইসলাম এই প্রশ্নের বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন যা ‘তিস্তা সংকট নিরসনের জন্য কী ধরণের মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন’ শিরোনামে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে। প্রথম পর্বে নদীর সমস্যা সমাধানে যে দুই ধরনের সম্ভাব্য পন্থা আছে তা আলোচনা করা হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপদ-আপদ নিয়ে লিখেছেন মওদুদ রহমান। এর উপর আমাদের নির্ভরতা বাড়ছেই। গুগল, মেটা, অ্যামাজন, অ্যাপল, এনভিডিয়া, মাইক্রোসফটসহ নানা প্রতাপশালী কোম্পানির আগ্রাসী কৌশল এবং এই প্রযুক্তির শক্তি ও বিপদের ক্ষেত্রগুলো অনুসন্ধান করা হয়েছে এই লেখায়।
সম্প্রতি ট্রাম্প নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন চালিয়ে সেদেশের প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক তুলে নিয়ে গেছে নিউইয়র্কে। আন্তর্জাতিক সব আইন ন্যূনতম বিধি বিধান অগ্রাহ্য করে তেলের জন্য ভেনেজুয়েলায় এই সাম্রাজ্যবাদী নগ্ন আগ্রাসন নিয়ে লিখেছেন মেহেদী হাসান। পুঁজিবাদের কট্টর চেহারায় যখন যুক্তরাষ্ট্র ভয়ংকর চেহারা নিচ্ছে তখন নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানির বিজয় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। জোহরান মামদানির বিজয়ের নেপথ্য লড়াই নিয়ে লিখেছেন নিশাত তাসনিম। এই সংখ্যার জন্য নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য এবং নারী উইংসের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রেনু দাহালের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মারজিয়া প্রভা।
২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনস গার্মেন্টস কারখানায় আগুন পুড়ে মারা যান শতাধিক শ্রমিক। অবহেলাজনিত হত্যার অভিযোগে মামলা এখনও শেষ হয়নি। এই মামলার টাইমলাইন তৈরি করেছেন সায়দিয়া গুলরুখ ও শহীদুল ইসলাম সবুজ।
‘শিশু খায় না’, অর্থনৈতিক সামাজিক শ্রেণী নির্বিশেষে দৈনন্দিন জীবনে বহু উৎকণ্ঠায় ভোগা অভিভাবকদের একটি অন্যতম সমস্যা। এই সমস্যার উৎস সন্ধান করেছেন শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা বনানী চক্রবর্তী। বীথি ঘোষের সংকলন ও ভূমিকা নিয়ে ‘২৪-এর গণআন্দোলনের গান-৬’ প্রকাশিত হলো এবার। এছাড়া ‘বাংলাদেশের ৫০ বছর ও তারপর’ ধারাবাহিক লেখার ১০ম পর্বে ‘স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন থেকে ৯০ এর গণঅভ্যুত্থান’ নিয়ে লেখা হয়েছে। ফাতেমা বেগমের অনুবাদে তারিক আলীর মৌলবাদের সংঘাত-এর এবারের পর্বে পাকিস্তানের স্বাধীনতা উত্তর ইতিহাসে সহিংসতা, ধর্মীয় ও জাতিগত বিভেদ আর স্বৈরতন্ত্রী শাসনের ভূমিকা আলোচনা করা হয়েছে। সেইসাথে এই সংখ্যায় রণজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সুন্দরবন নিয়ে ধারাবাহিক লেখার শেষ পর্ব প্রকাশিত হলো।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নৈরাজ্য এবং মবসন্ত্রাসের আরেকটি ঘটনা ঘটেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক (ইউএপি)’-এ। এখানে দুইজন দায়িত্বশীল শিক্ষককে অন্যায়ভাবে চাকুরিচ্যুত করা এবং বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার উপর আক্রমণের প্রতিবাদে গত ২১ জানুয়ারি ২০২৬ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সবার অবগতির জন্য লিখিত বক্তব্যের পুরোটা এই সংখ্যায় প্রকাশ করা হলো।
গত ১৮ জানুয়ারি বেশ কয়েকটি সংগঠন ও আগ্রহী ব্যক্তিবর্গ ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে কৃষি ও কৃষক বিষয়ে ২০ দফা প্রস্তাব/দাবি উপস্থিত করেন। তা এখানে প্রকাশ করা হচ্ছে। এছাড়া গত ২১ জানুয়ারি ২০২৬ ঢাকায় ‘গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি’র উদ্যোগে সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ২৫ দফার ইশতেহার প্রকাশ করা হয়। এতে জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ-বিশ্বাস-শ্রেণী-পেশা নির্বিশেষে মানুষের জীবনের শান্তি-স্বস্তি নিরাপত্তার সংকটগুলোকে চিহ্নিত করে তা সমাধানের পথ প্রস্তাব করা হয়েছে। এই ইশতেহারের সংক্ষিপ্তরূপ এখানে প্রকাশ করা হলো।
আমরা মনে করি এসব বিষয় নিয়ে জনপন্থী রাজনৈতিক দল, কৃষক মজুর সংগঠন, শিক্ষার্থী-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিদ্বৎসমাজসহ বিভিন্ন পর্যায়ে বিস্তর আলাপ আলোচনা ও উদ্যোগ দরকার। আমরা এসব বিষয়ে আরও মতামত বিশ্লেষণ প্রকাশে আগ্রহী।
আনু মুহাম্মদ
২৫ জানুয়ারি ২০২৬
