মাহতাব উদ্দীন আহমেদ
দীর্ঘদিন পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কেন্দ্রীয় ও হল সংসদ নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার অনুকূল গণতান্ত্রিক পরিবর্তন নিশ্চিত করার জন্য যেসব বিষয়ে শিক্ষক শিক্ষর্থীদের ঐকমত্য ও কার্যকর পদক্ষেপ অপরিহার্য সেগুলো নিয়ে বিস্তর আলোচনা দরকার যাতে সমাজে এর পক্ষে প্রবল জনমত তৈরি হয়। এই লেখায় গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু বিষয় সনাক্ত করা হয়েছে যেগুলো নিয়ে সবার অংশগ্রহণে ‘ক্যাম্পাস সনদ’ তৈরি হতে পারে। গুরুত্ব বিবেচনা করে আমরা এই লেখা অনলাইনে আগাম প্রকাশ করছি।
এই মুহূর্তে ডাকসু, জাকসু, রাকসু নিয়ে দেশের অন্যতম শীর্ষ তিন বিশ্ববিদ্যালয় সরগরম রয়েছে। এই শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন হওয়াটা একটা ইতিবাচক পরিবর্তন। তবে অস্বীকার করার কোনো উপায় নাই যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পার হয়ে গেলেও দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোর ক্যাম্পাসে শুধুমাত্র ছাত্রলীগের দখলদারিত্ব ও আওয়ামী লীগের দলীয় লেজুড় প্রশাসনের পরিবর্তন হওয়া ছাড়া পরিস্থিতির আর কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। গণঅভ্যুত্থানের পরে শিক্ষার্থীদের আশা কী ছিল? তারা চেয়েছিলেন একটি নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস, একটি সন্ত্রাস ও দখলদারিত্ব মুক্ত ক্যাম্পাস, সেটা তারা এখনও পাননি। তারা চেয়েছিলেন একটি দলীয় প্রশাসনমুক্ত ক্যাম্পাস, সেটাও তারা এখনও পাননি। তারা চেয়েছিলেন একটি শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস, একটি গবেষণাবান্ধব ক্যাম্পাস কিংবা পড়াশোনাবান্ধব ক্যাম্পাস, সর্বোপরি একটি অধ্যয়নের উপযোগী রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগতভাবে স্বাস্থ্যকর ক্যাম্পাস– এর কোনোটাই গত এক বছরে শিক্ষার্থীরা পাননি।
শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন: কল্পিত শত্রু বনাম আসল বাধা
শিক্ষার্থীদের এই আকাঙ্ক্ষাগুলোর বাস্তবায়নের বিপরীতে কয়েকটি রাজনৈতিক মহল নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সকল সমস্যার উৎস হিসেবে দুটি কল্পিত শত্রুকে নির্মাণ করেছে শিক্ষার্থীদের মনোজগতে। এতে অন্তর্বর্তী সরকারেরও প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল বলে মনে হয়েছে। এই দুটি শত্রু হচ্ছে প্রথমত, ছাত্র রাজনীতি (শব্দটা হওয়া উচিত শিক্ষার্থী রাজনীতি, তবে বহুল প্রচলিত হওয়ায় এখানে ছাত্র রাজনীতিই ব্যবহার করা হবে); দ্বিতীয়ত, ক্যাম্পাসে আগত ‘বহিরাগত’রা।
গত এক বছর ধরে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আমরা ‘ছাত্র রাজনীতি’ বন্ধের দাবি তুলতে দেখলাম। এটা সত্য যে এই দাবি তোলার পিছনে বহু প্রকৃত সাধারণ শিক্ষার্থীও ছিল। কারণ তাদের মনে ছাত্রলীগের সন্ত্রাস, অপকর্ম, দখলদারিত্ব নির্যাতন-নিপীড়নের স্মৃতি এখনো তাজা। তবে শিক্ষার্থীদের এই ট্রমাকে পুঁজি করে এই দাবি তোলার পিছনে যে, সাধারণ শিক্ষার্থী সেজে গুপ্ত রাজনীতির চর্চা করা, ক্ষমতার আশীর্বাদপুষ্ট একটি গোষ্ঠীও ছিল সেটাও এখন সর্বজনবিদিত। যেসব ক্যাম্পাসে আগেও ছাত্র রাজনীতি বন্ধ ছিল সেখানে আমরা ওই গোষ্ঠীর গুপ্ত রাজনীতির বিকাশ হতে দেখেছি। সেসব ক্যাম্পাস থেকে একটি বিশেষ রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের নেতাদেরকেও আমরা বের হতে দেখেছি। এরই সর্বশেষ নজির আমরা দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যখন ছাত্রদল হল কমিটি দিল তখন নতুন করে হলে হলে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তোলা হল। অথচ হলগুলোতে যে ইতোমধ্যেই একটি বিশেষ সংগঠনের গুপ্ত রাজনীতির দাপট চলছে, প্রশাসনের চোখের সামনে যে নানা রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের উপঢৌকন রাজনীতি চলেছে সেই অভিযোগও শিক্ষার্থীরাই করেছেন। দেখা গেল যে, গভীর রাতে মাত্র কয়েকশো শিক্ষার্থীর দাবির মুখে ঢাবি প্রশাসন এক আজব ঘোষণা দিল, হলে হলে ‘গুপ্ত ও প্রকাশ্য রাজনীতি’ নিষিদ্ধ করল। প্রশ্ন হল, যে রাজনীতি গুপ্ত তার উপর আসলে নিষেধাজ্ঞা কীভাবে কার্যকর হবে? এর কোনো সদুত্তর ঢাবি প্রশাসন দিতে পারে নাই। দেখা গেল একমাত্র শিবির ছাড়া বাকি সব ছাত্র সংগঠনই এর সমালোচনা করলো। শিবিরের সমালোচনার না করার কারণটা সহজেই বোধগম্য।
অন্যদিকে ‘রাজনৈতিক দল করি না’, কিংবা ‘লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতি করি না’ বলে আসলে ক্ষমতার রাজনীতি করা একদল শিক্ষার্থী নেতা হলে রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিকে সমর্থন দিল। গতবছর গণঅভ্যুত্থানের সময় হল থেকে সন্ত্রাসী ছাত্রলীগকে বিতাড়ন করতে আবাসিক হলে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করার ঘোষণাগুলোকে তারা সামনে আনলো পক্ষে যুক্তি হিসেবে। সেই ঘোষণাগুলো কেউ যদি ভাল করে পড়েন তাহলে দেখা যাবে সেখানে শিক্ষার্থীরা হলে রাজনীতি নিষিদ্ধ করার জন্য মূলত সেসব সংগঠনের নামই নিয়েছিলেন যেগুলো অতীতে সরকারের সাথে যুক্ত ছিল, যেগুলো সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের সাথে যুক্ত ছিল। ওই সকল ঘোষণার মর্মবস্তু একই ছিল, যেমন – শিক্ষার্থীরা হলের মধ্যে রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে চান কারণ তারা হলে হলে আর কোনো পলিটিক্যাল গণরুম, নির্যাতন, সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব, সিটবাণিজ্য, সিটনিয়ন্ত্রণ দেখতে চান না। তার মানে হলো শিক্ষার্থীরা তখন হলে হলে ‘প্রতিরোধের রাজনীতি’ দিয়ে ‘সন্ত্রাস-দখলদারিত্বের রাজনীতির’ বিরুদ্ধে একজোট হয়েছিলেন। তাদের ওই নিষিদ্ধের ঘোষণাটি একটি প্রবল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডই ছিল। হলে হলে শিক্ষার্থীরা তখন খোদ রাজনীতিকে নয়, আসলে সন্ত্রাসের রাজনীতিকে বিরোধিতা করেছিলেন। হলে হলে গণঅভ্যুত্থানের সময় কিংবা গণঅভ্যুত্থানের পরে সমন্বয়করা যা করেছেন সেটা কি রাজনীতি ছিল না? ছিল তো। ফলে সেই ঘোষণা দেখিয়ে এখন হলের ভেতর সকল রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি তুলে ভবিষ্যতের প্রতিরোধের রাজনীতি গড়ে তোলার পথে বাধা সৃষ্টি করাটা খুবই স্ববিরোধী একটি অবস্থান।
শিক্ষার্থীরা হলের মধ্যে রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে চান কারণ তারা হলে হলে আর কোনো পলিটিক্যাল গণরুম, নির্যাতন, সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব, সিটবাণিজ্য, সিটনিয়ন্ত্রণ দেখতে চান না। তার মানে হলো শিক্ষার্থীরা তখন হলে হলে ‘প্রতিরোধের রাজনীতি’ দিয়ে ‘সন্ত্রাস-দখলদারিত্বের রাজনীতির’ বিরুদ্ধে একজোট হয়েছিলেন।
এখন প্রশ্ন হলো, ছাত্রদল, শিবির কিংবা অন্য কোন ক্ষমতাবান রাজনৈতিক সংগঠনের হল কমিটি যদি নাও থাকে, তাহলেও তার ক্যাম্পাস কমিটির নেতারা যখন হলে থাকবেন তখন তারা কি চাটুকার বলয় তৈরি করে দলীয় প্রশাসনের সহায়তায় হলে দখলদারিত্ব সন্ত্রাস চালাতে পারবে না? ঠিকই পারবে। বরং এক্ষেত্রে উল্টো তাদের যে সুবিধা হবে সেটি হল হলের ভেতর তাদের সদস্য নয় এমন চাটুকারদের দিয়ে সন্ত্রাস আর দখলদারিত্ব চালালে তাদেরকে দলীয়ভাবে কোনোরকম জবাবদিহিও করতে হবে না। কোনো কোনো ছাত্র সংগঠন এখন সেভাবেই কাজ করছে, হলের সিটও নিয়ন্ত্রণ করছে। অন্যদিকে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করার বৈধ পথ থাকবে না।
দ্বিতীয়ত, কিছু হলেই ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের ঘাড়ে সব দোষ চাপানোর চর্চার মধ্যে আমরা দেখলাম প্রশাসনের নাকের ডগায় আবাসিক হলে পিটিয়ে ‘বহিরাগত’ মারা হল, ক্যাম্পাস এলাকায় শিক্ষার্থী খুনও হলেন। শব্দ দূষণের কথা বলে, বহিরাগত ঠেকানোর নামে, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের নামে ঢাবি ক্যাম্পাসকে কার্যত ক্যান্টনমেন্ট বানানোর চেষ্টাও চলল । সেখানে আবার আইডি চেক করার নামে খোদ ক্যাম্পাসের শিক্ষকরাও হেনস্তার শিকার হলেন। অন্যদিকে ক্যাম্পাসের কর্মচারী কর্তৃক নারী শিক্ষার্থীকে প্রকাশ্য রাস্তায় যৌন নিপীড়ন করাও চলল। সেই নারী নিপীড়ককে আবার যখন সত্যিকারের ‘বহিরাগত’ ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করা মব ছাড়িয়ে আনতে গেল তখন আবার ক্যাম্পাস প্রশাসন নীরব।
ফলে শিক্ষার্থীদের বোঝা দরকার যে এসব কল্পিত শত্রুর উদ্ভব ঘটানোর মাধ্যমে আসলে তাদেরকেই আড়াল করা হচ্ছে যারা ক্যাম্পাসগুলোতে গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে মূল বাধা হিসেবে কাজ করছে। সত্যিকারের এই মূল বাধা কারা? বাধা হলো দুটি- প্রথমত, দলীয় (ক্ষেত্রবিশেষে অথর্ব) ও মেরুদন্ডহীন ক্যাম্পাস প্রশাসন এবং দ্বিতীয়ত, ক্ষমতার সাথে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো, যারা অতীতে কিংবা বর্তমানে কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতার আশীর্বাদপুষ্ট ছিল এবং আছে, যারা সন্ত্রাস, দখলদারিত্বের সাথে সম্পৃক্ত কিংবা নানারকম ফ্যাসিবাদী চর্চার সাথে সংযুক্ত।
বাধা হলো দুটি- প্রথমত, দলীয় (ক্ষেত্রবিশেষে অথর্ব) ও মেরুদন্ডহীন ক্যাম্পাস প্রশাসন এবং দ্বিতীয়ত, ক্ষমতার সাথে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো, যারা অতীতে কিংবা বর্তমানে কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতার আশীর্বাদপুষ্ট ছিল এবং আছে, যারা সন্ত্রাস, দখলদারিত্বের সাথে সম্পৃক্ত কিংবা নানারকম ফ্যাসিবাদী চর্চার সাথে সংযুক্ত।
আমাদের বোঝা দরকার যে, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সমস্যা যেমন আবাসন সংকট, নিম্নমানের খাদ্য, গবেষণায় বরাদ্দ না থাকা, লাইব্রেরির বেহাল দশা, পড়াশোনার পরিবেশ না থাকা, সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব, নিপীড়ন, শব্দ ও পরিবেশ দূষণ, গণতন্ত্রহীনতা, দলীয় শিক্ষকদের স্বেচ্ছাচারীতা, পাঠদানে অবহেলা, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল লিঙ্গের শিক্ষার্থীর নিরাপত্তাহীনতা – এগুলো আসলে রাজনৈতিক সমস্যাই। এগুলোর পাওয়ার হাউজ আসলে দলীয় বিশ্ববিদ্যালয়/কলেজ প্রশাসন এবং সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের রাজনীতি। ফলে, এই সকল সমস্যার সমাধান পেতে হলে বিশেষ গোষ্ঠী উদ্ভাবিত কল্পিত শত্রুর পিছনে ছোটা বন্ধ করে জায়গামতো আঘাত করতে হবে। সেজন্য দলীয় বিশ্ববিদ্যালয়/কলেজ প্রশাসন এবং সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের রাজনীতি করা ক্ষমতার সাথে সংশ্লিষ্ট ছাত্রসংগঠনগুলোর শুভবুদ্ধির উদয় হওয়ার জন্য বসে না থেকে বরং এই দুই পাওয়ার হাউজকে সর্বতোভাবে নিয়ন্ত্রণ ও চাপের মুখে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। সেজন্য রাজনীতি বন্ধ করার হঠকারী দাবি তোলার বদলে বরং সকল হলে, সকল বিভাগে এবং ক্যাম্পাসের সর্বত্র পাল্টা প্রতিরোধের রাজনীতিকেই গড়ে তুলতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়/কলেজ প্রশাসন এবং সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের রাজনীতি করা ক্ষমতার সাথে সংশ্লিষ্ট ছাত্রসংগঠনগুলোর শুভবুদ্ধির উদয় হওয়ার জন্য বসে না থেকে বরং এই দুই পাওয়ার হাউজকে সর্বতোভাবে নিয়ন্ত্রণ ও চাপের মুখে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। সেজন্য রাজনীতি বন্ধ করার হঠকারী দাবি তোলার বদলে বরং সকল হলে, সকল বিভাগে এবং ক্যাম্পাসের সর্বত্র পাল্টা প্রতিরোধের রাজনীতিকেই গড়ে তুলতে হবে।
ক্যাম্পাস সনদ (চার্টার): শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার উপায়
কিন্তু প্রশ্ন হল ক্যাম্পাসের সকল সমস্যার মূল হোতা এই দুই পাওয়ার হাউজকে সেই সর্বতোভাবে নিয়ন্ত্রণ ও চাপের মুখে রাখার জন্য শিক্ষার্থীদের উপায় কী হবে? যথাযথভাবে এই কাজের জন্য শিক্ষার্থীদের একটা মোক্ষম অস্ত্র হতে পারে ক্যাম্পাস চার্টার বা ক্যাম্পাস সনদ। এই ক্যাম্পাস চার্টার শিক্ষার্থীদের গণভোটের মধ্য দিয়ে পাস হবে অথবা এই ক্যাম্পাস চার্টার ঘোষণা দিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বাধ্য করতে হবে। যেভাবেই আসুক, এই ক্যাম্পাস চার্টারকে বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশে কিংবা ক্যাম্পাস পরিচালন নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই ক্যাম্পাস চার্টারে উল্লেখ করা থাকবে যে ক্যাম্পাসে কোনো রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন কিংবা ব্যক্তি এবং ক্যাম্পাস প্রশাসন কী কী কাজ করতে পারবে না এবং কী কী কাজ করতে বাধ্য থাকবে।
ক্যাম্পাস সনদে ন্যূনতম কয়টি দফা:
ক. ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব বন্ধ এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা সংক্রান্ত
১. রাজনৈতিক জবরদস্তি: কোনো রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের কোনো সদস্য কিংবা কোনো ব্যক্তি জোর করে কোনো শিক্ষার্থীকেই (সে হলে থাকুক বা না থাকুক) কোনোপ্রকার মিছিল, রাজনৈতিক প্রোগ্রাম, বাধ্যতামূলক আড্ডা কিংবা শোডাউনে নিয়ে যেতে পারবে না। অন্যদিকে কেউ যদি স্বেচ্ছায় কোনো মিছিল, রাজনৈতিক প্রোগ্রাম, আড্ডা বা সার্কেলে যায় তাহলে তার উপর অন্য কোনো রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের কোনো সদস্য কিংবা কোনো ব্যক্তি কোনোপ্রকার হামলা, হয়রানি করতে পারবে না কিংবা ভয়ভীতি দেখাতে পারবে না অথবা জবাবদিহি চাইতে পারবে না।
২. আবাসন সংকট: হলে গণরুম বিলুপ্ত করতে হবে। প্রথম বর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীদেরকে নিজস্ব বিছানা, নিজস্ব পড়ার জায়গা এবং পড়ার ঘরের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। হলে সিট বরাদ্দ সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মাধ্যমে হবে। এই বরাদ্দের ফলাফলও প্রকাশিত হতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশের সাথে সাথেই। ভর্তি হওয়ার সাথে সাথেই হল প্রশাসন শিক্ষার্থীকে তার সিট বুঝিয়ে দেবে। ভর্তি পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীর পারিবারিক আয়-এর প্রমাণ জমা দিতে হবে এবং তার ভিত্তিতে হলে সিট বরাদ্দের ক্ষেত্রে গরীব, নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীরা অগ্রাধিকার পাবে। সিট সংকট থাকলে লটারি হবে। মাস্টার্স পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের ১ সপ্তাহের মধ্যে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়তে হবে।
৩. হলের নিরাপত্তা: প্রতিটি হলের প্রত্যেক তলায় সিঁড়িতে, বারান্দায় এবং ছাদসহ হল কম্পাউন্ডের সকল কোণে সিসি ক্যামেরা কার্যকর থাকা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. র্যাগিং: হলসহ ক্যাম্পাসের যেকোনো জায়গায় যেকোনো প্রকার র্যাগিং, ‘ম্যানার শেখানো’ ইত্যাদি নিষিদ্ধ করতে হবে।
৫. অস্ত্র প্রদর্শন ও মজুদ: ক্যাম্পাসে কোনো ছাত্র সংগঠনের কোনো সদস্য কিংবা কোনো শিক্ষার্থীই কোনো প্রকার আগ্নেয়াস্ত্র বা দেশীয় অস্ত্র বা হকিস্টিক, স্ট্যাম্প, লাঠি, বাঁশ ইত্যাদি নিজের হলে মজুদ করতে পারবে না এবং কোনো প্রকার অস্ত্রের শোডাউনও করতে পারবে না।
৬. টেন্ডারবাজি: কোনো ছাত্র সংগঠনের কোনো সদস্য কিংবা কোনো শিক্ষার্থীই যেকোনো টেন্ডার সংক্রান্ত কোনো ধরনের প্রক্রিয়ায় কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারবে না বা জড়িত থাকতে পারবে না।
৭. চাঁদাবাজি, ফাও খাওয়া: কোনো ছাত্র সংগঠনের কোনো সদস্য কিংবা কোনো শিক্ষার্থীই ক্যাম্পাসের ভেতরে কিংবা বাইরে কোনোপ্রকার চাঁদাবাজিতে অংশ নিতে পারবে না। দোকানে, ক্যান্টিনে ‘ফাও খাওয়া’ চালাতে পারবে না।
৮. শারীরিক হামলা: মত কিংবা মতাদর্শের জন্য (সেটি রাজনৈতিক কিংবা ধর্মীয় যাই হোক না কেন) অথবা ব্যক্তিগত কোনো কারণে কেউ কারো উপর কোনো হামলা চালাতে পারবে না।
৯. যৌন নিপীড়ন: ক্যাম্পাসে ‘যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা’ থাকতে হবে এবং যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল কার্যকর থাকতে হবে। কোনো ছাত্র সংগঠনের কোনো সদস্য কিংবা সাধারণ শিক্ষার্থী যেই হোক যৌন নিপীড়ন কিংবা অন্য কোনো প্রকার নিপীড়ন বা হয়রানির সাথে জড়িত থাকলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
১০. শাস্তির বিধান (শিক্ষার্থী ও ছাত্র সংগঠন): যদি কোনো শিক্ষার্থী কিংবা ক্যাম্পাসের কোনো ব্যক্তি ক্যাম্পাস চার্টারের কোনো ধারা লংঘন করে তাহলে তার বিরুদ্ধে এবং সে যদি কোনো ছাত্র সংগঠনের সদস্য হয় তাহলে সেই ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধেও সাত কার্যদিবসের মধ্যে ক্যাম্পাস প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে হবে। এবং এক্ষেত্রে যদি তদন্ত করতে হয় তাহলে চৌদ্দ কার্যদিবসের মধ্যে সেটি সমাপ্ত করে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী দোষীকে শাস্তি দিতে হবে। সেই শাস্তি হবে অপরাধের ধরণ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর সর্বোচ্চ সাজা হবে আজীবন নিষিদ্ধ করা এবং অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ছাত্র সংগঠনের সর্বোচ্চ সাজা হবে ক্যাম্পাসে ৫ বছরের জন্য তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা। তবে ফৌজদারি অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থাও প্রশাসনকে নির্দিষ্ট কার্যদিবসের মধ্যে নিতে হবে।
১১. শাস্তির বিধান (ক্যাম্পাস প্রশাসন): যদি উপরে উল্লিখিত সময়সীমার মধ্যে ক্যাম্পাস প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয় তাহলে উল্লিখিত সময়সীমা অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে ক্যাম্পাসের প্রক্টর ও উপাচার্যকে পদত্যাগ করতে হবে।
১২. শাস্তির বিধান (অযোগ্য কিংবা ফাঁকিবাজ শিক্ষক): শিক্ষকেরা যেমন শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করেন তেমনি দলীয়ভাবে নিয়োগ পাওয়া অযোগ্য শিক্ষকদের জন্য শিক্ষার্থীদের হাতে শিক্ষক মূল্যায়নের কিছু ব্যবস্থা থাকতে হবে। যদি কোনো শিক্ষক কোনো ছুটি ছাড়াই নিয়মিতভাবে পাঠদানে অনুপস্থিত থাকেন কিংবা ক্লাসের ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী যদি মনে করেন যে উক্ত শিক্ষক তাদের পড়াতে পারছেন না, কিংবা তিনি তার পাঠদানে অবহেলা করছেন তাহলে উক্ত শিক্ষককে পরিবর্তন করতে হবে। যদি কোনো শিক্ষকের চাকুরীকালে এমন ঘটনা পাঁচবারের অধিক ঘটে তাহলে তার নিয়োগ বাতিল করতে হবে।
১৩. শিক্ষার্থী সংসদ: প্রত্যেক বছর নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন দিতে হবে।
খ. শিক্ষার্থীদের নিত্যনৈমিত্তিক প্রয়োজন মেটানো সংক্রান্ত
১৪. খাবার: ক্যাম্পাসের সকল ক্যাফেটেরিয়া এবং ক্যান্টিন ক্যাম্পাস প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিজস্ব কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে চালাতে হবে। কোনো প্রকার ইজারা দেয়া চলবে না। সেখানে ভর্তুকি মূল্যে মানসম্পন্ন খাবার নিশ্চিত করতে হবে।
১৫. চিকিৎসা সেবা: ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স, ডাক্তার, নার্স ও ওষুধসহ একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল সেন্টার নিশ্চিত করতে হবে। সেখানে দিবারাত্রি ২৪ ঘন্টাই ডাক্তার, নার্স, অ্যাম্বুলেন্স, ড্রাইভার মজুদ থাকতে হবে।
১৬. টয়লেট: ক্যাম্পাসে যথেষ্ট সংখ্যক টয়লেটের ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যবহার অযোগ্য টয়লেটগুলোর সংস্কার করতে হবে। ক্যাম্পাস ও হলের সকল টয়লেট দুই বেলা স্বাস্থ্যকরভাবে পরিস্কার রাখার জন্য পর্যাপ্ত কর্মচারী নিয়োগ করতে হবে।
১৭. নিরাপদ পানি: ক্যাম্পাসের সর্বত্র নিরাপদ পানি পাওয়ার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
১৮. স্যানিটারি প্যাড: নারীদের হল, শিক্ষার্থী-শিক্ষক কেন্দ্র ও বিভাগগুলোতে পর্যাপ্ত সংখ্যক স্যানিটারি প্যাডের ভেন্ডিং মেশিন বসাতে হবে।
১৯. পরিবহন: শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য পরিবহন পুলে পর্যাপ্ত যানবাহন নিশ্চিত করতে হবে। সেই সাথে রাত ১১টা পর্যন্ত ক্যাম্পাসের পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
গ. শিক্ষা ও গবেষণা সংক্রান্ত:
২০. ফি বৃদ্ধি/আরোপ: ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থীর সম্মতি ব্যতীত কোনো বিভাগই কোনো প্রকার ফি বৃদ্ধি কিংবা নতুন কোনো ফি আরোপ করতে পারবে না।
২১. গবেষণায় বরাদ্দ: সকল বিভাগের জন্য আলাদা করে গবেষণা বাবদ বরাদ্দ দিতে হবে। সেই বরাদ্দ দিয়ে কী কী গবেষণা করা হলো সেটা বছর শেষে বিভাগের শিক্ষার্থীসহ সকলকে জানাতে হবে।
২২. গ্রন্থাগার: ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে বসে বাইরের কোনো বই পড়া যাবে না এই নিয়মও করতে হবে।
ঘ. পরিবেশের সুরক্ষা সংক্রান্ত:
২৩. গাছ: শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অংশগ্রহণে তৈরি মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া কিংবা শিক্ষার্থীদের সম্মতি ব্যাতীত ক্যাম্পাসের কোথাও কোনো প্রকার গাছ কাটা যাবে না।
২৪. জলাধার: ক্যাম্পাসের জলাধার ভরাট কিংবা মাছচাষের জন্য ইজারা দেয়া যাবে না।
২৫. যানবাহনের হর্ন: ক্যাম্পাসে যানবাহনের হর্ন নিয়ন্ত্রণে প্রক্টরিয়াল টিমে পর্যাপ্তসংখ্যক কর্মচারী নিয়োগ দিতে হবে।
এখানে বিভিন্ন ক্ষেত্রের জন্য ক্যাম্পাস সনদের যে দফাগুলো দেয়া হল সেগুলো ন্যূনতম। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে সেখানকার পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে এর প্রয়োজনীয় সংযোজন/বিয়োজন করতে হবে শিক্ষার্থীদের। কিংবা ক্যাম্পাসের পরিস্থিতির সাথে সঙ্গতি রেখে প্রয়োজনীয় পরিমার্জন করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা যদি একবার এই ক্যাম্পাস সনদ পাস করে ফেলতে পারে তাহলে ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস ও দখলদারিত্ব চালানো যেমন ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলোর জন্য কঠিন হয়ে উঠবে তেমনি ক্যাম্পাস প্রশাসনের দলবাজিকেও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। আর সেটি করতে পারলে তখন এর ইতিবাচক প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতেও পড়বে।
মাহতাব উদ্দীন আহমেদ: লেখক, গবেষক ও সর্বজন অধিকার কর্মী। ইমেইল: mahtabjuniv@gmail.com