বাংলাদেশের ৫০ বছর ও তারপর-৮
এরশাদের আমল: কবিতা, গণভোট ও প্রতিরোধ
আনু মুহাম্মদ
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শেষ প্রান্তে ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানের হানাদার সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এরপর ৫৩ বছর অতিক্রম করেছে এই দেশ। এই সময়ে দুইজন রাষ্ট্রপতি খুন হয়েছেন, দুই দফা প্রত্যক্ষভাবে সামরিক শাসন এসেছে, সামরিক বাহিনীর ভূমিকা বেড়েছে, সংবিধান সংশোধন হয়েছে ১৬ বার, নির্বাচনের নানা রূপ দেখা গেছে, শাসনব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে কর্তৃত্ববাদী হয়েছে। ১৯৯০ ও ২০২৪ গণঅভ্যুত্থানে দুবার স্বৈরশাসকের পতন হয়েছে। এই কয়েক দশকে অর্থনীতির আয়তন ক্রমে বেড়েছে, জিডিপি ও বিশ্ববাণিজ্যে উল্লম্ফন ঘটেছে, অবকাঠামো ছাড়াও সমাজে আয় ও পেশার ধরনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন এসেছে। সম্পদের কেন্দ্রীভবন ও বৈষম্যও বেড়েছে, কতিপয় গোষ্ঠীর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কর্তৃত্বে আটকে গেছে দেশ। এই ধারাবাহিক লেখায় এই দেশের একজন নাগরিক তাঁর ডায়েরী ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সাথে সাথে ইতিহাসের নানা নথি/ঘটনা পর্যালোচনা করে এই দেশের রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতির গতিমুখ তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন। অষ্টম পর্বে ১৯৮২ সালে দ্বিতীয় সামরিক শাসন, ১৯৮৩-৮৫ সময়কালে প্রতিরোধের প্রাথমিক পর্ব আলোচনার পাশাপাশি লেখকের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার কিছু কথা আনা হয়েছে।
১৯৮২ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে যোগ দিলাম। এই তারিখটা আমার মনে থাকার বিশেষ কারণ আছে। পরের বছর যেদিন আমার শিক্ষকতার একবছর পূর্তি হয় সেদিন আমি ক্যাম্পাসেই ঢুকতে পারিনি। গেটেই আটকে দিয়েছিল সেনাবাহিনী, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়সহ আমাদের ক্যাম্পাসও তারা তখন পুরোপুরি দখলে নিয়েছিল।
দ্বিতীয় সামরিক শাসন ও শিক্ষাঙ্গনে প্রতিবাদ
মনে আছে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চের কথা। আমরা কয়েকজন ক্লাশ শেষে সেদিন প্রান্তিকে বসে ছিলাম, তখনই খবর পেলাম দেশে আবার সামরিক শাসন জারি হয়েছে। দেশের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করেছেন জেনারেল হুসাইন মুহম্মদ এরশাদ। এই আশংকা অবশ্য আগে থেকেই তৈরি হয়েছিল। এর আগে ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়া এবং এরপর একে একে মঞ্জুরসহ বহুসংখ্যক সামরিক অফিসারকে বিভিন্ন ভাবে/অজুহাতে হত্যা করা হয় যাদের প্রায় সবাই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। আর এই সময় থেকেই তৎকালীন সামরিক বাহিনী প্রধান এরশাদের রাষ্ট্র ও রাজনীতি নিয়ে সরাসরি বক্তব্য প্রকাশ করা হতে থাকে। সামরিক বাহিনীর মধ্যে নিজের অবস্থান পাকা করতে দেশের শাসনব্যবস্থায় সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্ব ও অংশীদারীত্ব প্রতিষ্ঠার নানা প্রস্তাব/দাবি তুলতে থাকেন তিনি।
অবশেষে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ জেনারেল এরশাদ তৎকালীন নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান বিচারপতি আবদুস সাত্তারের সরকার উৎখাত করে দেশের সংবিধান স্থগিত করেন এবং জাতীয় সংসদ বাতিল করেন। ১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ বিচারপতি আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে অধিষ্ঠিত করলেও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের হাতেই ক্ষমতা কেন্দ্রীভ’ত ছিল। কিছুদিন পর ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর এরশাদ আহসানউদ্দিন চৌধুরীকেও অপসারণ করে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। এর আগে ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়া লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে এরশাদকে সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন। অভিযোগ আছে জিয়া, মঞ্জুরসহ মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের হত্যার পেছনে এই ব্যক্তিরই হাত ছিল। এবিষয়ে তদন্ত- বিচার কিছুই আর অগ্রসর হয়নি।
সামরিক শাসন পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে কাছাকাছি সময়ে সংস্কৃতিতে প্রকাশিত আমার একটি লেখা থেকে দেখা যাচ্ছে,
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ পুনরায় সামরিক শাসন জারির পর বড় বড় রাজনৈতিক সংগঠনগুলো কোনো প্রতিবাদ কিংবা প্রতিরোধের চেষ্টা করেনি। বরঞ্চ আওয়ামী লীগ সমর্থিত বাংলার বাণী পত্রিকায় এই সামরিক শাসনকে বিপ্লব হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অন্যদিকে গোপন পার্টিগুলো থেকে দু-একটি প্রতিবাদের ইশতেহার প্রচারিত হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে ঠিকই প্রতিবাদ হয়েছে। এ বিষয়ে ঐ লেখায় তথ্য তুলে ধরা হয়েছে এভাবে,
সামরিক শাসন জারির সঙ্গে সঙ্গে কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিবাদ মিছিল বের হয়। বামপন্থী কয়েকটি ছাত্রসংগঠন প্রথমে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়- সেগুলোর মধ্যে ছিল বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রী, ছাত্র ঐক্য ফোরাম, ছাত্র ইউনিয়ন (ইসরারুল), ছাত্রলীগ (মুনির-হাসিব) এবং বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন।
এখানে পর পর কয়েকটি ঘটনা/উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করা হয়,
১৬ সেপ্টেম্বর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে পোস্টার লাগাতে গিয়ে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর তিনজন কর্মী গ্রেপ্তার হন, (পরে) তাঁদের প্রত্যেককে ৭ বছর করে সশ্রম কারাদন্ড দেয়া হয়।
১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবস উপলক্ষে ক্ষুদ্র মৌন মিছিলের মাধ্যমে ১৪টি ছাত্র সংগঠন সংহতি সৃষ্টির প্রাথমিক উদ্যোগ নেয়।
কুখ্যাত শিক্ষানীতি ঘোষিত হয়।
৮ নভেম্বর কর্ণেল তাহের স্মরণে অনুষ্ঠিত ছাত্র মিছিলে পুলিশি হামলা হয়।
২১ নভেম্বর ডাকসুসহ ১৪টি ছাত্র সংগঠন প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষানীতি বাতিল, পুলিশি দমননীতি বন্ধ এবং জনগণের পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে।
সামরিক শাসনের প্রথম বছর তাই বিনা প্রতিবাদে যায়নি। এই বছরের বিভিন্ন কর্মসূচি থেকে যে ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয় তার নেতৃত্বেই সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের বৃহত্তর তৎপরতার উঠানামা দেখা যায় পরের আট বছর। এই পরিষদ ১১ জানুয়ারি শিক্ষা ভবন ঘেরাও কর্মসূচিতে সমাবেশ করে। এর ধারাবাহিকতায় বড় সমাবেশ ও প্রতিরোধের ঘটনা ঘটে ১৪ ফেব্রুয়ারি। হয় সামরিক হামলা, প্রতিবাদ দমাতে কার্ফুও জারি হয়। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধও চলে। আমার লেখায় দেখছি,
(১৪ ফেব্রুয়ারি) প্রায় ১০ হাজার ছাত্র জনতার মিছিল, আরও লক্ষ মানুষের সহানুভ’তিপূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে, সামরিক শাসকদের নিপীড়নের যন্ত্রের মুখোমুখি হয়।…সামরিক জান্তার গুলিবর্ষণ ও বেয়োনেট চার্জ, লাঠি, টিয়ার গ্যাস, দুবেলা অমানুষিক নির্যাতন ইত্যাদির মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় অঞ্চলের সংযুক্ত এলাকা রক্তে রঞ্জিত হয়। শহীদ হন কমপক্ষে চার জন। আহত হন শত শত। শিশু নারীও তার থেকে বাদ যায়নি।
১৫ ও ১৬ ফ্রেবুয়ারি কার্ফু ভঙ্গ করে হরতাল হল, বিক্ষিপ্ত বিক্ষোভ হল। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শহীদ হলেন আরও মানুষ। শ্রমিক অঞ্চলেও বিক্ষোভ, ধর্মঘট, সংঘর্ষ হল। ছাত্র আন্দোলন যুক্ত হল ব্যাপক গণআন্দোলনের সঙ্গে।১
বাংলা একাডেমি বইমেলা হচ্ছিল তখন। সেসময় বইমেলায় লেখক শিবির ও সংস্কৃতির স্টলও নেয়া হয়েছিল। ঐ স্টলে আমরা নিয়মিত বসতাম। তখন আবার সংস্কৃতি প্রেসে, তাড়া ছিল মেলায় নিয়ে আসার। পুরনো ঢাকায় প্যাপিরাস প্রেসে প্রুফ দেখা, ছাপা ও বাঁধাই নিয়ে কয়েকদিন ধরেই ব্যস্ত ছিলাম। ১৪ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে ঐ প্রেস এলাকাতেই ছিলাম। মিছিল হবে জানতাম কিন্তু মিছিলের ওপর এভাবে সামরিক বাহিনীর সরাসরি হামলা গুলি এবং হতাহতের বিষয় জানা ছিল না। তখন যোগাযোগ এত সহজ ছিল না। আমি দুপুরের পর সংস্কৃতি বিশেষ বর্ধিত সংখ্যার কাজ শেষ করে কয়েকশো কপি রিকশায় নিয়ে মেলায় রওনা হয়েছি। কিন্তু দোয়েল চত্ত্বরের কাছাকাছি এসে জানলাম শুনলাম এতকিছু হয়ে গেছে। মেলা বন্ধ। সংস্কৃতি নিয়ে তুলতে হলো তোপখানা রোডে আমাদের অফিসে।
পুরনো ঢাকায় প্যাপিরাস প্রেসে প্রুফ দেখা, ছাপা ও বাঁধাই নিয়ে কয়েকদিন ধরেই ব্যস্ত ছিলাম। ১৪ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে ঐ প্রেস এলাকাতেই ছিলাম। মিছিল হবে জানতাম কিন্তু মিছিলের ওপর এভাবে সামরিক বাহিনীর সরাসরি হামলা গুলি এবং হতাহতের বিষয় জানা ছিল না।
পরের দিন শুনলাম জাহাঙ্গীরনগরসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও সামরিক বাহিনী হামলা করেছে। ১৬ তারিখ সকালে আমার অগ্রজ বন্ধু সহকর্মী মুশতাক আহমদ সহ ক্যাম্পাসে গেলাম পাবলিক বাসে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস বন্ধ শুনলাম। বাস থেকে নামলাম প্রান্তিক গেটে। আগে থেকেই দেখা যাচ্ছিল ক্যাম্পাসের ভেতর সেনাবাহিনী ছড়িয়ে আছে। খেলার মাঠে বহু ছাত্র বসিয়ে রাখা হয়েছে। গেটেও সেনাবাহিনীর লোকজন। ঢুকতে চাইলাম, তারা বাধা দিল। শিক্ষক পরিচয় দেবার পরেও তারা বললো ঢোকা যাবে না। হতভম্ব হয়ে ক্রোধ নিয়ে গেটেই বসে থাকলাম অনেকক্ষণ। মনে পড়লো একবছর আগে এই দিনেই শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম, তার এক বছরের মাথায় এই অভিজ্ঞতার কারণে পরে আর এই তারিখ কখনোই ভুলিনি।
ঐ সময়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ছয়টি- ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, প্রকৌশল, কৃষি, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী। ১৯৮৩-র ১৫ই ফেব্রুয়ারি থেকে একে একে সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়েই সামরিক বাহিনীর অভিযান চলে। হলগুলোতে ধরপাকড়, মারপিট চলেছে কয়েকদিন ধরে। জাহাঙ্গীরনগরেও তাই। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ আগেই সরে গেছে। কিন্তু জাকসুর তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আমার পরের ব্যাচের মাসুদকে সেনাবাহিনী আরও কয়েকজনের সাথে আটক করেছে। কয়েকদিনের মধ্যে জানলাম ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক আমাদের প্রিয় কবি মোহাম্মদ রফিককে ধরে নিয়ে গেছে সেনানিবাসে। রফিকভাইকে ধরার কারণ বুঝতে দেরি হলো না। তাঁর কবিতাই তাঁর অপরাধ।
সামরিক শাসনের শুরু ও তার যাত্রাপথ বিশ্বজুড়ে প্রায় অভিন্ন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে হাঁকডাক করে পরে দুর্নীতির মধ্যে নিজেরাই ডুবে যাওয়ার বহু দৃষ্টান্ত পৃথিবীর দেশে দেশে আছে। ক্ষমতা দখলের পর সামরিক শাসন জারীর বহুল চর্চিত পথেই এরশাদ যাত্রা শুরু করেছিলেন। ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের দুর্নীতি আর সেইসাথে নৈরাজ্যের বহুল প্রচার, সকল গণতান্ত্রিক চর্চা বন্ধ করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বাগাড়ম্বর, পাইকারি গ্রেপ্তার এবং পথে ঘাটে নানা জোরজবরদস্তি করে জনমনে আতংক সৃষ্টি, দুর্নীতি দমনের কিছু শোপিস হাজির করা, কৃচ্ছ্বতাসাধনের শোরগোল, ধার্মিক ও জনমুখী চেহারা দেখানো ইত্যাদি এর অন্যতম। এরশাদ কৃচ্ছ্বতাসাধনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে গিয়ে কয়দিন সাইকেল চালিয়ে অফিসেও গেছেন।
সামরিক শাসনের শুরু ও তার যাত্রাপথ বিশ্বজুড়ে প্রায় অভিন্ন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে হাঁকডাক করে পরে দুর্নীতির মধ্যে নিজেরাই ডুবে যাওয়ার বহু দৃষ্টান্ত পৃথিবীর দেশে দেশে আছে। ক্ষমতা দখলের পর সামরিক শাসন জারীর বহুল চর্চিত পথেই এরশাদ যাত্রা শুরু করেছিলেন।
এরশাদের ক্ষেত্রে আরও এক তৎপরতা দেখা যায় কবিতা নিয়ে। ‘তিনি কবি’ এই প্রচার শুরুর সাথে সাথে বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতায় তার নামে লেখা কবিতা প্রকাশ শুরু হলো, যেখানে শীর্ষ খবর থাকার কথা সেখানে। দেশের প্রতিষ্ঠিত কয়েকজন কবিকে নিয়ে মঞ্চও গড়ে তুললেন এরশাদ, নিয়মিত কবিতা পাঠের আসর বসতে থাকলো বঙ্গভবনসহ বিভিন্ন স্থানে। একদিকে সামরিক শাসন, অন্যদিকে স্বৈরশাসকের কবি হিসেবে আকস্মিক আবির্ভাব এগুলোর প্রতিক্রিয়াতেই রফিক ভাই দীর্ঘ কবিতা লেখেন। ‘খোলা কবিতা’ নামে প্রকাশিত এই কবিতা ছিল একজন প্রকৃত কবির প্রতিবাদ ক্ষোভ এবং ক্রোধের বহিপ্রকাশ। সামরিক শাসনের মধ্যে এরকম বক্তব্যের কবিতা ছাপা এবং বিতরণ দুটোই যে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে সেটা জানাই ছিল। এটি ছাপা হয়েছিল গোপনে। মনে আছে এক ফর্মা জুড়ে ছাপা এই কবিতা। আমরা অনেকে মিলে এগুলোর বিতরণ করেছিলাম। কবিতার কয়েকটি পংক্তি:
‘সব শালা কবি হবে; পিঁপড়ে গোঁ ধরেছে, উড়বেই;
বন থেকে দাঁতাল শুয়োর রাজাসনে বসবেই;
হঠাৎ আকাশ ফুঁড়ে তৃতীয় বিশ্বে ও গঞ্জে গাঁয়ে
হুট করে নেমে আসে জলপাই লেবাস্য দেবতা;
পায়ে, কালোবুট;
হাতে, রাইফেলের উদ্ধত সঙ্গিন;
লোলুপ দুর্নীতিবাজ অপদার্থের দারুণ কামড়ে
অনুর্বর মাঠ-ঘাট, ছিন্ন ভিন্ন সমাজ- কাঠামো,
রন্ধ্রে রন্ধ্রে পুঁজিবাদী কালো থাবা লাল রক্ত ঢালে;
এইবার ইনশাআল্লাহ সমস্যার যথাযথ
সমাধান হবে; দীন গরীবের মিলবে বেহেস্ত;
জলপাই লেবাস্য দেবতা অবিশ্বাস্য বাণী ঝাড়ে;…’ (খোলা কবিতা)
নতুন নারী নেতৃত্ব
১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশাল প্রতিবাদী মিছিলে সামরিক হামলা এবং তার পরে দেশ জুড়ে অব্যাহত দমন পীড়নের পরিস্থিতিতে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর আর চুপ থাকার উপায় ছিল না। শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ প্রতিরোধের চাপ রাজনৈতিক দলগুলোকেও সক্রিয় হতে বাধ্য করলো। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ঘিরে দুটো জোট গঠিত হলো। ঘটনাক্রমে দুই বড় দলেই নতুন এবং নারী নেতৃত্ব অনিবার্য হয়ে উঠলো। আমরা জানি এর বছর দুয়েক আগে শেখ হাসিনা প্রায় ছয় বছরের প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরেছেন এবং আওয়ামী লীগের প্রধানের দায়িত্ব নিয়েছেন। অন্যদিকে প্রায় একই সময়ে জিয়া হত্যার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নতুন নেতৃত্ব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন খালেদা জিয়া।
প্রকৃতপক্ষে শেখ মুজিবের উত্তরাধিকার হিসেবে শেখ হাসিনা (জন্ম ১৯৪৭) এবং জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকার হিসেবে খালেদা জিয়া (জন্ম ১৯৪৫) দলের নেতৃত্ব গ্রহণ না করলে এগুলো ভেঙে কয়েক টুকরো হবার সম্ভাবনা ছিল। সেই কারণে অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে এই দলগুলোর নেতা কর্মীদের প্রাণপণ চেষ্টা ছিল পারিবারিক সূত্রে নেতৃত্ব সামনে আনা। আর কোনো বিকল্প না থাকায় সকলে বিপুল উৎসাহেই নারী ও তুলনামূলকভাবে তরুণ নেতৃত্ব গ্রহণ করলো। শেখ হাসিনার বয়স তখন ৩৩+, খালেদা জিয়ার ৩৫+। এই দুজনের ওপরই পড়লো দেশের সবচাইতে বড় দুটি দলের নেতৃত্ব ও সামরিক শাসন বিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনের ভার। অনেকগুলো বাম দলও ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে এই দুই নেত্রীর নেতৃত্ব গ্রহণে জমায়েত হতে থাকলো। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত হলো ১৫ দল এবং খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত হলো ৭ দল। বাম দলগুলোর মধ্যে সিপিবি, জাসদ, বাসদ, গণতন্ত্রী পার্টি, ন্যাপ ইত্যাদি ১৫ দলে এবং বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, ইউপিপি ইত্যাদি ৭ দলে অন্তর্ভুক্ত হলো। এভাবে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াই হয়ে উঠলেন দেশের সর্বজনস্বীকৃত দুই প্রধান নেতা।
ঘটনাক্রমে দুই বড় দলেই নতুন এবং নারী নেতৃত্ব অনিবার্য হয়ে উঠলো। আমরা জানি এর বছর দুয়েক আগে শেখ হাসিনা প্রায় ছয় বছরের প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরেছেন এবং আওয়ামী লীগের প্রধানের দায়িত্ব নিয়েছেন। অন্যদিকে প্রায় একই সময়ে জিয়া হত্যার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নতুন নেতৃত্ব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন খালেদা জিয়া।
১৫ দল ও ৭ দল থেকে ৫ দফা দাবি চ’ড়ান্ত হলো এসময়েই, যা পুরো দশকের আন্দোলনের মূল দাবি হিসেবে উচ্চারিত হয়েছে। ১৯৮৩ সালের ১লা নভেম্বর হরতাল, ২৮শে নভেম্বর অবস্থান ধর্মঘট ছিল এই ৫ দফার ভিত্তিতে দুই জোটের প্রথম বড় দুই কর্মসূচি। এগুলো ঘিরে সারাদেশে সরকারি ধরপাকড় ও নির্যাতনও হয়েছে ব্যাপক। ৫ দফা দাবির মধ্যে ছিল:
ক. অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্যাহার করতে হবে এবং সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে।
খ. অবিলম্বে দেশে মৌলিক অধিকারসহ গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুন:প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং রাজনৈতিক তৎপরতার ওপর থেকে সকল বিধিনিষেধ তুলে নিতে হবে।
গ. দেশে যেকোনো নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগেই আগামী শীত মৌসুমের মধ্যে সার্বভৌম জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে এবং সার্বভৌম জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসাতে হবে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে, সকল জাতীয় ইস্যুতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সার্বভৌম জাতীয় সংসদের হাতে ন্যস্ত থাকবে, সংবিধান সংক্রান্ত যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কেবলমাত্র জনগণের নির্বাচিত সার্বভৌম জাতীয় সংসদেরই থাকবে, অন্য কারও নয়।
ঘ. রাজনৈতিক কারণে আটক, বিচারাধীন এবং সামরিক আইনে দন্ডিত সকল রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে এবং সকল রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।
ঙ. মধ্য ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত ছাত্রহত্যার তদন্ত, বিচার, দোষীদের শাস্তি, নিহত-আহতদের তালিকা প্রকাশ ও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এজন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার এখতিয়ার তদন্ত কমিটিকে দিতে হবে।
পরবর্তীতে এরশাদ ‘উপজেলা নির্বাচন’ ঘোষণা করলে তা বয়কটের কর্মসূচিও এর সাথে যুক্ত করা হয়। এই নির্বাচন প্রতিরোধ করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু কর্মী আহত হন, যাদের অধিকাংশই ছিলেন বিভিন্ন বাম সংগঠনের।
কুষ্টিয়া সুনামগঞ্জ পঞ্চগড়
সামরিক শাসনের কালে প্রকাশ্য কর্মসূচি নেবার নানা সমস্যা ছিল, আমরা ১৯৮৩-র মে মাসে ৫ দিনব্যাপী কর্মশিবিরের পরিকল্পনা নিলাম। এজন্য কুষ্টিয়ার শিলাইদহে গেলাম ২৫ মে। বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশন মূলত আয়োজন করলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্রিয় কর্মীদের সমাবেশ ঘটেছিল সেখানে। পদ্মা নদীর পাশে রবীন্দ্র কুঠিবাড়ী সংলগ্ন একটা পরিত্যক্ত কাচারি বাড়ীর দোতলায় আমাদের আয়োজন। সকাল থেকে রাত আলোচনা, বিতর্ক হতো। মাঝে মধ্যে নাটক গানও হতো। পাশের খোলা জায়গায় রান্না, সেখানেই খাওয়ার আয়োজন। রাতে ঘুমানো ঐ ঘরের মেঝেতে। আমরা প্রায় চল্লিশ জন ছিলাম। বিভিন্ন অধিবেশনের বিষয়বস্তুর মধ্যে ছিল: দর্শন- বিভিন্ন ধারা ও বিতর্ক, শ্রেণী সংগ্রাম, রাষ্ট্র ও বিপ্লব, সংস্কারবাদ ও সন্ত্রাসবাদ, সংস্কৃতি ভাষা ও ধর্ম, সাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয়তাবাদ, সমরবাদ ও স্বৈরতন্ত্র, উৎপাদন পদ্ধতি, ভূমি সংস্কার ও সমবায় আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদ, বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতা, জাতীয় আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং সাংগঠনিক সমস্যা ইত্যাদি।
সুনামগঞ্জ
গণসঙ্গীত শিল্পী এবং ওস্তাদ কামরুদ্দীন আবসার সহ সুনামগঞ্জ গেলাম ১৯৮৪ সালের ৪ জানুয়ারি তারিখ। লেখক শিবির সুনামগঞ্জ শাখার সম্মেলন। সামরিক শাসনের বাধার কারণে সংগঠকেরা ঠিক করেছেন এবারে সম্মেলন করবেন ৫-৬ জানুয়ারি খাসিয়া পাহাড়ের নীচে, নারায়ণতলা গ্রামে। সেখানে যাবার জন্য হাঁটাই একমাত্র উপায়, যানবাহন চলার মত রাস্তা নাই। প্রায় ৮ মাইল দূর, বেশিরভাগ হেঁটে যেতে হবে। এই অঞ্চলে মূল দায়িত্ব মুতাসিম আলীর। তিনি অভয় দিলেন, অনেক প্রতিক’লতার মধ্যে সম্মেলন গান সবই হলো। তবে শীতে কাঁপতে কাঁপতে রাত পার হলো।
সেখানকার সম্পর্কে আপনার নোটে যা পেলাম- (১) পাশেই সীমান্ত। সীমান্তপথে নিয়মিত চোরাচালান হয়। এদেশ থেকে যায়-পুরনো কাপড়, ইলেকট্রনিক দ্রব্যাদি, ডিম, শাক, মাছ। আসে প্রধানত বিড়ি ও গরু। ঐ এলাকায় চাষাবাদে প্রধানত ভারতীয় গরুই ব্যবহৃত হয়। (২) এলাকাটি ছিল গারোদের। পরবর্তীতে ময়মনসিংহ কুমিল্লার অনেকে এসে এখানে বসতি গেড়েছেন। আর শিক্ষা, যোগাযোগ, সংখ্যাগরিষ্ঠতা ইত্যাদি কারণে তারাই এখানে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে আছে। এখানকার ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যও এখন অ-গারো মুসলিম। (৩) গারোরা এখানে এখন যতটা শিক্ষা লাভ করেছে তাদের পেছনে মিশনের ভ’মিকাই প্রধান। এখানে মিশন আছে দুটো- ব্যাপটিষ্ট এবং ক্যাথলিক। দুটি মিশনের মধ্যে যথেষ্ট প্রতিযোগিতা আছে। এই দুটি মিশনের সম্মিলিত ক্রিয়াকর্মের ফলে এলাকার অধিকাংশ গারোই এখন খ্রীষ্টান। কেউ একজন খ্রীষ্টান হলে সঙ্গে সঙ্গে তার শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আবাস, বিবাহ সবই মিশনের দায়িত্বে চলে আসে। এর ফলে চরম দরিদ্র গারোরা খুব সহজেই তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। শুধুমাত্র ক্যাথলিক মিশনের নিয়ন্ত্রণেই আছে ১ হাজারটি পরিবার।
মিশনের কেন্দ্র হচ্ছে এই এলাকা। এর বাইরে বহু মাইল প্রত্যন্ত এলাকা পর্যন্ত তাদের কাজ বিস্তৃত। কেন্দ্র এলাকাই যথেষ্ট দুর্গম। সুনামগঞ্জ থেকে হেঁটে ৮ মাইল আসতে হয়। কোনো রাস্তা নাই। কাছাকাছি কোনো হাট নাই। এরপর আরও অনেক ভেতরেও মিশনের কাজ আছে। এই মিশন এরকম প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রথম আসে ১৯৪৬ এ। সম্ভবত সেসময় হাজংদের বিদ্রোহ, গারো বিদ্রোহের সাথে এই আগমনের কোনো সম্পর্ক থেকে থাকবে। পাশেই খাসিয়া পাহাড়, হাজং পাহাড়। খাসিয়া হাজংদের বসবাসও এই এলাকাতেই।
গ্রামের ক্ষমতা বলয়ে তিনটি পক্ষ- মিশন, ধনী কৃষক-মেম্বর এবং সীমন্তরক্ষক বিডিআর। ধনী কৃষক ৩ জন, এর ১ জন মেম্বর, ২য় জন মিশনের স্কুলে- প্রধানত লগ্নীর মাধ্যমে জমি ক্রয়-প্রায় ৭৫ বিঘা জমি। ৩য় জন গারো-স্কুল শিক্ষক। এলাকায় দারিদ্র প্রকট।
দিনাজপুর পঞ্চগড়
এই মাসেই ২১-২৩ জানুয়ারি (১৯৮৪) গেলাম দিনাজপুর ও পঞ্চগড়। পঞ্চগড়ের সীমান্তবর্তী গ্রামে গিয়ে বুঝলাম নিয়মিত চোরাচালানী হয় এই এলাকা দিয়ে। এদেশ থেকে যায়- চাল, হাঁসমুরগী, ডিম, পুরান কাপড়, ইলেক্ট্রনিক দ্রব্যাদি; আসে গরু, মশলা, শীতের কাপড়, চা, ওষুধ ইত্যাদি। স্থানীয় অধিবাসীরা বংশী, এখন সংখ্যালঘু। পোশাকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে, আর কথাবার্তায় ‘তুই’ সম্বোধন বেশি। বাইরে থেকে বিশেষত ময়মনসিংহ, জামালপুর থেকে বাঙালি মুসলিম বহুজনে ক্রমে এখানে বসতি গেড়েছেন, তারাই এখন সংখ্যাগুরু।
এই অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত করতোয়া নদীর পানি দারুণ স্বচ্ছ। ওপার থেকে বালি, পাথর আসে এই নদী দিয়ে। তবে বেলে মাটি বলে এলাকার এখানে ফসল ভালো হয় না। ৪/৫ বিঘা জমির মালিককেও দিনমজুর বা রিকশাচালক হিসাবে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। খাওয়া ছাড়া দৈনিক মজুরি ১০/১২ টাকা, খাওয়া দিলে ৩/৪ টাকা। এলাকায় জনসংখ্যায় মজুরের শতকরা হার ৫০ থেকে ৬০ ভাগ। ধনী বলতে বোঝায় ৬০০ থেকে ২০০০ বিঘা জমির মালিক। গ্রামে দুতিনটি টিনের ঘর, বাকি সব ছনের।
নদীর ধারের জমির দাম বিঘাপ্রতি ২০০/৩০০ টাকা। এলাকায় সর্বোচ্চ ৪০০০ টাকা বিঘা। এলাকায় কোনো গভীর বা অগভীর নলক’প নাই। বেলে মাটি বলে ফলন কম। পঞ্চগড় থানা কেন্দ্র ছাড়া কোনো ডাক্তার নাই। পোস্ট অফিসে যেতে গেলে আটমাইল হেঁটে থানা কেন্দ্রে যেতে হবে। আখচাষ হয়, পাশেই চিনিকল। কুয়ার পানি অনেক স্বচ্ছল লোকও খেয়ে থাকে। একটি টিউবওয়েল মাত্র চোখে পড়েছে, পুরো অঞ্চলে। রেডিও আছে কয়েকটা, সেটাই একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম। এখানে পত্রিকা আসে না। ভারতে অনেক পণ্য চলে যায় বলে সেগুলোর দাম বেশি যেমন দুধ ও ডিম।
দিনাজপুরের পাশে বীরগঞ্জ- সাঁওতালদের এলাকা। একজন বৃদ্ধ সাঁওতাল বললেন তেভাগার আন্দোলনে তাদের ভ’মিকাই ছিল মুখ্য। কিন্তু জমির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অনেক কম।
শুনলাম, দিনাজপুরের পাশে ইউনিয়নে পরাজিত ইউপি প্রার্থীর গ্রামের লোকজনদের বাড়ী পুড়িয়ে দিচ্ছে।
কুমারখালী ও মেহেরপুর, কুষ্টিয়া। মজুরি ও আন্দোলন
একই বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই (১৯৮৪) পর্যন্ত পরপর কয়বার এই এলাকাগুলোতে গেলাম। দেখলাম কুমারখালির যদুবয়রা ও শিলাইদহ ইউনিয়নে ৬০ টাকা ঋণ নিলে ১ মণ ধান দিতে হয়। বর্গা ফসল সমান সমান- খরচ বর্গাচাষীর। মজুরী ৫-৭ টাকা (একসের চালের সমান) এবং তিনবেলা ভাত। মাটি কাটায় হাজারে সাড়ে তিনসের গম দেবার কথা-দিচ্ছে ২ সের গম বা তার দামের সমান টাকা। তদারক করতে এলে বলতে হচ্ছে সাড়ে তিনসেরই পাচ্ছি। এলাকায় আখচাষ আখমাড়াই হচ্ছে। গুড় মণপ্রতি এখন ২০০-২৩০ টাকা। ফসল উঠে গেলে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত হয়। ১৯৭০ এ মজুরি ১ টাকা ও ভাত, চালের সের ১০-১২ আনা। এই সময় মজুরি ৬ টাকা ও ভাত, চালের সের ৭ টাকা। কাজ মোটামুটি একই রকম। দুধ- ৫ টাকা সের, ডিম- ৪ টাকা হালি।
দেখলাম কুমারখালির যদুবয়রা ও শিলাইদহ ইউনিয়নে ৬০ টাকা ঋণ নিলে ১ মণ ধান দিতে হয়। বর্গা ফসল সমান সমান- খরচ বর্গাচাষীর। মজুরী ৫-৭ টাকা (একসের চালের সমান) এবং তিনবেলা ভাত। মাটি কাটায় হাজারে সাড়ে তিনসের গম দেবার কথা-দিচ্ছে ২ সের গম বা তার দামের সমান টাকা।
১৫ এবং ১৬ মার্চে ছিলাম মেহেরপুরের গাংনিতে। এখানে সকাল ৭টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত ক্ষেতমজুরদের কাজ। এই ৭ ঘন্টা কাজে মজুরি ৬ টাকা, খাওয়া নাই। বাড়তি ৩ ঘন্টা কাজ করলে ৩ টাকা। বর্গাপ্রথা একইরকম, খরচ বর্গাচাষীর-প্রাপ্তি অর্ধেক অর্ধেক। এখান থেকে সীমান্ত দিয়ে মুর্শিদাবাদ, কলকাতা যাতায়াত নিয়মিত ব্যাপার। ইলেকট্রনিক জিনিষপত্র এবং ডিম ইত্যাদি প্রচুর পাচার হয়।
মহেন্দ্রপুর ছিলাম ১৭ মার্চ। এই গ্রামে গানবাজনা নিষিদ্ধ। মজুরি ৬/৭ টাকা খাওয়াসহ। চরভবানীপুর ছিলাম ১৮ মার্চ। নদীর ভাঙন এখানে প্রধান সমস্যা। নতুন নতুন চর জেগে উঠছে। কাজের খুবই অভাব। বছরে ৩ মাস কাজ।
২৮ জুন আবার গেলাম গাংনি, সাহারবাটি। এখানে ১০ জুলাই থেকে বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের নেতৃত্বে মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন শুরু হবে। গোলাম মোস্তফা ও পাহাড়ীসহ অনেকে এই আন্দোলন সংগঠিত করছেন। সকাল ৭টা থেকে ২টা ছিল ২ সের গম, দাবি ৩ সের। বাকি আধবেলা ৩টা থেকে ৭টা কাজের জন্য আগে ছিল ১ সের, এখন ১.৫ সের দাবি। গমের গড়পড়তা দর ৩.৭৫ টাকা। আন্দোলনের ডাকে এই গ্রামেই মিছিলে এক হাজারের মতো অংশগ্রহণ হয়েছে। প্রায় প্রতি রাতেই সভা মিছিল। অন্যান্য গ্রাম থেকে জমিতে কাজের জন্য কৃষি শ্রমিক আসতে থাকলে আন্দোলন মার খেয়ে যাবে। এই জটিলতা মোকাবিলার জন্য ঐসব অঞ্চলেও সভা, মিছিল, গ্রাম কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
আবহাওয়া জনিত কারণে কিছু সমস্যাও হচ্ছিল। ২৬ জুন পর্যন্ত কয়দিন একটানা বৃষ্টি থাকায় সাংগঠনিক কাজকর্ম ব্যাহত হলো, মিছিল মিটিংও ঠিকমতো করা যায়নি। এর মধ্যেই কয়েকটি পাড়ায় জমির মালিকেরা দাবিদাওয়া মেনে নিয়েছে। বৃষ্টির ফলে অন্যান্য গ্রামে নির্ধারিত যোগাযোগ এবং গ্রামের সভা, মিছিল ইত্যাদি না হবার ফলে মালিকরা সুবিধা পেয়ে যায়। অন্যান্য গ্রাম থেকে আসা শ্রমিকদের ১ সের- ১.৫ সের গম দিয়ে কাজ করাতে থাকে। পরপর কয়দিন বৃষ্টিবাদলা থাকায় কাজ এমনিও কমে যায়, সংকট সৃষ্টি হয়। কাজ না পাওয়ার ফলে এলাকার শ্রমিকদের মধ্যে অনটন, অনাহার দেখা দেয়। তার ফলে কেউ কেউ কম হারেই কাজে যোগ দেয়।
২৭ জুন তারিখ রাতের সভায় শ্রমিকদের মধ্যে কিছু হতাশা ক্ষোভ দেখা দেয়। বাইরের শ্রমিকদের পেটানোর কথাও বলে কেউ কেউ। মালিকেরা যুক্তি করে ঢেরি পেটানোর সিদ্ধান্ত নেয়- কেউ আড়াই সেরের বেশি মজুরি দিয়ে মজুর রাখলে তার জমির ধান কেটে নেয়া হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা সেটা করতে পারেনি।
মজুর, ছোট কৃষক সংগঠকদের সাথে কাজ করতে করতে আমি ফসল উৎপাদন খরচ, বাজারে দাম নিয়ে হিসাব নিকাশও করছিলাম। গাংনির সংগঠকেরা সহায়তা করেছেন ।
সেসময় বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ: আউশ ধান
বীজ ১৫ সের=৭৫ টাকা, লাঙল ৪ খানা=১০০ টাকা, মই, আচড়া=৩০ টাকা, নিড়ানি=১৭০ টাকা, ধান কাটা-মলা: ৬০ টাকা, সার=১০০ টাকা, সেচ (৬ ঘন্টা শ্যালো)=২০০ টাকা, পরিবহণ=২০ টাকা। মোট=৬৫৫.০০।
মোট উৎপাদন ৮ মণ, ১২০ টাকা (সরকারি দর ১৩৫) মণপ্রতি মোট ৯৬০ টাকা।
ইরি বোরো ( ৫ মাস)। এক বিঘার উৎপাদন খরচ ও আয়
বীজ ১০ সের, চারা তৈরির খরচ=১০০ টাকা, ৬টা লাঙল= ১৫০ টাকা, সার আধমণ ফসফেট=৭০ টাকা, পটাশ ১০ সের=২৭.৫০, ইউরিয়া ৩৫ সের=১৩০ টাকা, চারা তোলা লাগানো=১২০ টাকা, নিড়ানি=৬০ টাকা, কীটনাশক ওষুধ=২৫০ টাকা, সেচ ইঞ্জিন=৫০০ টাকা, কাটামলা=১০০ টাকা, পরিবহণ=২০ টাকা। মোট খরচ=১৫২৭.৫০ টাকা। মোট উৎপাদন (গড়) ২২ মণ, প্রতিমণ ১৫০ টাকা হিসাবে মোট আয় ৩৩০০ টাকা (সরকারি রেট=১৩৫ টাকা)।
খুব ভালো জমি হলে উৎপাদন= ২৭ থেকে ৩০ মণ, খারাপ জমি হলে ১২ মণ।
এভাবে এলাকায় অন্য যেসব কৃষিপণ্য উৎপাদন হতো সেগুলোরও উৎপাদন খরচ এবং আয় হিসাব করেছি। যেমন গম, বছরে চার মাস। প্রতি বিঘা উৎপাদন খরচ ৭৯৭ টাকা। উৎপাদন ১০ মণ, আয় ১৩৫০ টাকা। পাটে আয় আরও ভালো ছিল, খরচ ৭২৫ টাকা, উৎপাদন ১০ মণ-আয় ২০০০ টাকা। তামাক উৎপাদন সবচাইতে লাভজনক। বিঘা প্রতি উৎপাদন খরচ ২০০০ টাকা, আয় ৬০০০ টাকা।
বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ- নির্মমতা ও প্রতিরোধ
কুষ্টিয়ায় আবার যাবার আগে এর মধ্যে ৪-৫ জুলাই (১৯৮৪) গেলাম বাজিতপুর। এই এলাকায় ব্রিটিশ বিরোধী ‘সন্ত্রাসবাদী’ আন্দোলন হয়েছে। ত্রৈলোক্যনাথ মহারাজসহ আরও অনেক ‘সন্ত্রাসবাদী’ ব্যক্তিত্বের এলাকা এটি। পরে এই অঞ্চল কমিউনিস্ট পার্টি, কৃষক সমিতিরও উল্লেখযোগ্য কর্মক্ষেত্র হয়। এ এলাকায় নগেন সরকার, শান্তি সেন, প্রফেসর ইয়াকুব আলীর বাড়ী। পিকিং-মস্কো বিভক্তির পর এখানে পিকিংপন্থীদেরই প্রাধান্য দেখা যায়। ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে হক-তোয়াহার নেতৃত্বাধীন ‘পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি’র নেতৃত্বের সঙ্গে এখানকার নেতাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না। স্থানীয়ভাবে ইয়াকুব আলী, সাইফুল ইসলাম যুদ্ধ- প্রশিক্ষণ পরিচালনা শুরু করেন। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভ’মিকা গ্রহণের মধ্য দিয়ে এলাকার জনগণের মধ্যে তাদের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। তারা ভারত যান নাই। সেনাবাহিনী ও রাজাকারদের সাথে একাধিকবার যুদ্ধ হয়। আবদুল হক এবং মোহাম্মদ তোয়াহা দুই ভাগে আলাদা পার্টি দাঁড় করালে এখানকার নেতৃবৃন্দ মোহাম্মদ তোয়াহার সাথে যোগ দেন।
এদিকে যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে তাদের উপর মুজিববাহিনীর আক্রমণ শুরু হয়। নেতৃবৃন্দ আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যেতে বাধ্য হন। ১৯৭২-৭৫ সময়ে মুজিববাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীর নারকীয় নির্যাতন চলে এলাকায়। খড়ের গাদায় মানুষ ঢুকিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া, গাছে ঝুলিয়ে হত্যা করা, সাম্যবাদী দলের কর্মীকে না পেয়ে তার বড় ভাইকে হত্যা করতে বাবাকে বাধ্য করাসহ যত্রতত্র লুটপাট আক্রমণ খুন চলতে থাকে। এদিক থেকেও পাল্টা সশস্ত্র তৎপরতা চলতে থাকে। এলাকার তরুণ সংগঠক সাইফুল ইসলামকে ধরে জবাই করার চেষ্টা হয়, তিনি কোনোক্রমে জানে বেঁচে যান। তাঁর গলায় এখনও কাটা দাগ আছে দেখলাম। সেসময়ে পার্টির অবস্থা সম্পর্কে সাইফুল ভাই আরও জানালেন,
‘পার্টিতে তখন কোনো শৃঙ্খলা ছিল না। পার্টির মধ্যে অনেক চোর ডাকাত, মুসলিম লীগার চলে এসেছে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি কিংবা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করার অবস্থা ছিল না তখন। আমরা অনেকসময় ধনী কৃষকদের মিত্র বানিয়ে তাদের আশ্রয়ে থাকতাম। আর তাদের কেউ কেউ সেটি ব্যবহার করে তাদের শত্রু হত্যায় আমাদের কর্মীদের ব্যবহার করতো। আমাদের বক্তব্য জনগণের কাছে পরিষ্কার ছিল না। তাদের ধারণা ছিল আমরা শুধু মুজিব বিরোধী ভারত বিরোধী। জনগণের মধ্যে অর্থনৈতিক আন্দোলন, সচেতনতা বৃদ্ধি ইত্যাদিরও কোনো কাজ ছিল না। নেতৃত্ব ও কর্মীদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ বোঝাপড়া ছিল না। মুজিব মারা যাবার পর প্রকাশ্য হবার নির্দেশ-আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো। অনেকে জেলে। কর্মীদের মধ্যে হতাশা, বিভক্তি বাড়লো।’
পরে অবশ্য এরশাদের সাথে বোঝাপড়ার ভিত্তিতে ইয়াকুব আলী উপজেলা নির্বাচন করেন।
সেপ্টেম্বর অক্টোবর ১৯৮৪
এত দীর্ঘস্থায়ী বন্যা ৭৪ এও দেখা যায়নি। পানিতে মৌসুমের ফসল শেষ। সামনের ফসলের প্রস্তুতিও নেয়া যাচ্ছে না। গরুসহ কৃষি উপকরণ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। মানুষ যারা বেঁচে থাকছে- অসহনীয় হয়ে উঠছে। যথারীতি ত্রাণসামগ্রী নিয়ে লুটপাট চলছে। হরতাল ২৭ তারিখ। হুমকি পাল্টা হুমকি। ক্যান্টনমেন্টেও উত্তেজনা। জনগণের প্রায় সকল অংশই তাদের জীবনের ক্ষোভ নিয়ে স্বতস্ফ’র্তভাবে পথে। কিন্তু সকল স্তরের বিক্ষোভ গিয়ে প্রাধান্যে অবস্থানরত বুর্জোয়া জোটগুলোর রাজনৈতিক ¯্রােতে মিশছে- যে ¯্রােতের লক্ষ্য- নির্বাচন। সর্বত্র সফল হরতাল। কিন্তু সবজায়গায় সংঘর্ষ- খুন, জখম।
এই বছরের সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর বরিশাল, যশোর ও খুলনা গেলাম। বরিশালে মূলত কাজ ছিল কৃষক ফেডারেশনের, শহরের বাইরে মেহেন্দীগঞ্জ এলাকায় নদী সিকস্তিদের পুনর্বাসনের দাবি নিয়ে গণমিছিলের প্রস্তুতি হিসেবে কয়েকটি সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। বরিশালের বাইরে বিস্তর এলাকায় নদীর ভাঙন স্থায়ী সত্য। এগুলো সমাধানের কোনো উদ্যোগ সরকারের নাই। যশোর এবং খুলনার শহর শাখা, ফুলতলা, মিকশিমিল এবং খালিশপুরে সাংগঠনিক বৈঠক ও দুটো সেমিনার।
২১ ও ২২ অক্টোবর ১৯৮৪ লেখক শিবিরের ব্যানারে ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি: সংকটকাল’ শিরোনামে কয়েকটি অধিবেশনে সেমিনার হলো। অনেকে প্রবন্ধ উপস্থাপন ও আলোচনা করেছেন এর মধ্যে ছিলেন- আতিউর রহমান, আবু আবদুল্লাহ, আবুল বারকাত, মাহবুব হোসেন, রেহমান সোবহান, সৈয়দ হাশেমী, আখলাকুর রহমান।
এই মাসেই ইন্দিরা গান্ধী নিহত। দিল্লীসহ বিভিন্ন শহরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে।
শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক ভূমিকা
৩০.১১.৮৪
গিয়েছিলাম বরিশাল। ২৩, ২৪ ছিল বরিশাল শাখার সম্মেলন। সম্মেলন অবস্থা অনুযায়ী ভালো হয়েছে। মিছিলও হয়েছে। তাছাড়া তরুণ কর্মীদের মধ্যে থেকে লালা, দুলালের প্রবন্ধ ছিল বেশ পরিষ্কার। ওখানে কাশেম ভাই-ই খুঁটি। লালাও দাঁড়াচ্ছে মনে হয়।…
ফিরলাম ২৬ তারিখ। আবার ২৯ তারিখে গেলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। আমার সঙ্গে গিয়েছিলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। খুবই প্রাণবন্ত এবং গুণী মানুষ। যাওয়ার সময়টা খুবই আনন্দে কেটেছে। হাসান আজিজুল হক এবং তিনি এক সঙ্গে হয়ে সেখানে এক দুর্লভ ঘটনার সৃষ্টি করেছিলেন। মিছিলও হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সেখানকার নতুন কর্মী কাইউমের উদ্যোগে মাত্র কদিন আগে চুয়াডাঙ্গায় পুলিশের গুলিতে দুজন ছাত্র নিহত হবার ঘটনা কেন্দ্র করে একটি পথনাটক তৈরি করা। কাইউমের প্রবন্ধটাও ছিল খুব স্বচ্ছ। ওখানে পাভেল খুব আন্তরিক এবং বুদ্ধিমান ছেলে।
লেখক শিবিরের কর্মোদ্যোগের মধ্য দিয়ে তরুণ বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী গড়ে উঠার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বরিশাল ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যার প্রমাণ পাওয়া গেল।
জাহাঙ্গীরনগরে ‘ছাত্র যুবকদের সমস্যা ও আন্দোলন’ নিয়ে তিনদিনের কর্মশিবির হলো। বিভিন্ন অধিবেশনে প্রাণবন্ত আলোচনা থেকে সমষ্টিগতভাবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেল যে, ‘বুর্জোয়া লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত এবং শ্রমিক শ্রেণীর রাজনীতি বিকাশের জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ ছাত্র যুব আন্দোলন সংগঠিত করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।’ এবারে প্রতিনিধি ছিলেন বেশি এবং অংশগ্রহণও ছিল বেশি।
ছাত্র সংগঠন করবার ব্যাপারে বেশ কিছুদিন কথাবার্তা চলার পর একটি পর্যায় শেষ হলো। বেশ কয়েকটি অঞ্চলের প্রতিনিধিদের নিয়ে এদিন ‘সংগ্রামী ছাত্র ঐক্য’ এর প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হলো। বেশকিছু প্রস্তুতিমূলক কাজ করবার পর এর আত্মপ্রকাশ ঘটবে বলে সবাই সিদ্ধান্ত নিলেন।
ছাত্র আন্দোলন সম্পর্কে আমার লেখা ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। বুর্জোয়া লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানিয়ে লেখক শিবির থেকে একটি লিফলেটও ছাড়া হয়েছে। এগুলো ঐ কাজকে সহায়তা করবে।
ডিসেম্বর ১৯৮৪
৮ ডিসেম্বর ২৪ ঘন্টা হরতাল হলো। ১৫ ও ৭ মানে ২২ দলের আহবানে। তাদের আমন্ত্রণে জামাতও আন্দোলনে জুড়ে গিয়েছে। প্রায় তিরিশটি ইসলামী দল এখন, তাদের তৎপরতাও খুব বেড়ে গেছে, কারণ সম্ভবত পেট্রোডলার। সম্পূর্ণ সফল হরতাল। জনগণের সকল অংশের সকল বিক্ষোভ এখন এই কেন্দ্রে সমবেত হয়েছে। এর মাধ্যমে উদ্ভ’ত শক্তি নিচ্ছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াত।… অর্থনীতি’৮৪ লিখলাম। এবছর আসলে লুটপাট আর সম্পদ পাচারের প্রক্রিয়া অনেক সংহত হয়েছে- তাকে র্যাশনালাইজ করা হয়েছে।
১৪ ডিসেম্বর সকল কালাকানুনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশ, গণসঙ্গীত, নাটক আর বিক্ষোভ মিছিল হলো। সামরিক জান্তার রাষ্ট্রযন্ত্রের রক্তচক্ষু- ২২, ২৩শের হরতাল চলবে না। এর আগের অন্য কোনো হরতাল নিয়ে এতটা হুমকি ছিল না।
এবারের হরতালের তাৎপর্য আলাদা। শ্রমিক কর্মচারীরাই এ হরতালের মূল উদ্যোক্তা। সেকারণে সামরিক জান্তা, মালিকপক্ষ, শোষকচক্রের ভয় অনেক বেশি। ২২ দল এখানে সমর্থন দিয়েছে মাত্র, খুব বেশি তাগিদ তাদের নেই। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মধ্যেকার চাপ অবশ্য রয়েছে।…
রাষ্ট্রযন্ত্র কাকে বলে এবং শ্রমিকদের যে কোনো উত্থানের সম্ভাবনাকে রুদ্ধ করবার জন্য তা কীভাবে সর্বব্যাপী উদ্যোগ নেয় তা এই হরতালকে কেন্দ্র করে বোঝা যাচ্ছে।…
সারাদিন ঢাকায় চুপচাপ হরতাল হয়ে গেছে। হাজারো হুমকিতেও কোনো কাজ হয়নি। পিকেটিং, মিছিল না থাকা সত্ত্বেও কোনো গাড়ী, রিকশা বের হয়নি। বিআরটিসি বাস চলেছে কিছু আর চলেছে পুলিশ আর্মির গাড়ি। বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিলের চেষ্টা হয়েছিল, এছাড়া আর কোন উদ্যোগের কথা শুনিনি।
রাজশাহীতে দুজন নিহত হয়েছেন বিক্ষোভরত অবস্থায়। এখন পর্যন্ত এই খবরই পাওয়া গেছে। সফল হরতাল হলো। সম্ভবত এই প্রথম ৪৮ ঘন্টা হরতাল, উল্লেখযোগ্য আরও দিক হচ্ছে এই হরতালের মূল শক্তি ছিল শ্রমিকেরা। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট দুটো পিছুটান দিয়েছিল।
অরওয়েলের মাধ্যমে বহুল আলোচিত ১৯৮৪ শেষ হলো। সারা বিশ্বে উত্তেজনা, মিথ্যা প্রস্তাব, সভা, সংঘর্ষ ইত্যাদি গেলো। দেশে গেল সামরিক জান্তার নিরাপদ বছর-বেসামরিক বুর্জোয়াদের কপটতার বছর-তাদের নানা ঝামেলার বছর। রাজনীতিতে শ্রমিকদের শক্তিবৃদ্ধির চিহ্ন। ইসলামী দলের সংখ্যাও বেড়েছে।…
জানুয়ারি ১৯৮৫
২ তারিখ ‘শহীদ বিপ্লবী ও দেশপ্রেমিক স্মৃতি সংসদ’-এর উদ্যোগে সিরাজ সিকদারের দশম মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপিত হলো। গণজমায়েত ছিলো জিপিও গেটে।
১৭ তারিখ লেখক শিবিরের সাংগঠনিক পক্ষ শুরু হলো। সংগঠনের আর্থিক ও শারীরিক শক্তির তুলনায় এ প্রোগ্রাম সম্ভবত বেশি হয়ে গেছে। তবু এই সময়ে দরকার ছিল। ছাপানো পোস্টার, দুটো লিফলেট প্রকাশ করা হয়েছে। বই এর কাজ চলছে। এই পক্ষকালে ছয় জায়গায় সারাদিনব্যাপী অনুষ্ঠান হবে। শুরু হলো বাহাদুর শাহ পার্ক থেকে। আশাতীত বলা যায়। কোনও ভিত্তিই নেই সেখানে। তবু সারাদিনের প্রোগ্রামে কোনো বিঘœ ঘটেনি। সাংগঠনিক পক্ষের বেশ কয়দিন গেল। বাহাদুর শাহ পার্কের পর শহীদ মিনার, ধুপখোলা মাঠ, শাহজাহানপুর, মিরপুর। কাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।…
রিয়াজদের বিতর্ক পত্রিকা প্রকাশ শুরু হয়েছে। খুবই ভালো উদ্যোগ। নির্দিষ্ট একটি গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হলেও একে আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করা দরকার। আর রিয়াজের মতো সতর্ক, দক্ষ, একনিষ্ঠ এবং সংগ্রামী তাত্ত্বিকের বিকাশও আমাদের খুবই দরকার।
ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫
ফেব্রুয়ারি মাসের ১৩ তারিখ বুর্জোয়া লেজুড়বৃত্তির বাইরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কিত সব গণসংগঠন ও অন্যান্য সংগঠন প্রায় ২৪টি, আমরা বসেছিলাম। সামরিক শাসন ও সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী মোর্চা গঠনের লক্ষ্যে- ২১শে উদযাপনের জন্য জাতীয় কমিটি হলো।…এখন বইমেলায় আমাদের স্টল থাকে, সংস্কৃতির নামে। সেখানেই সব যোগাযোগ হয়। এবছরেও ১৪ তারিখ রাতে মিছিলের উপর, সম্পূর্ণ আকস্মিকভাবে, গুলি করে এক ছাত্রনেতাকে খুন করা হলো। সামরিক জান্তার স্পষ্ট উসকানি। প্রতিক্রিয়া-আজ বিভিন্ন জায়গায় আগুন।…
সারাদিন রাত প্রেসে কাজ করে সংস্কৃতি প্রকাশ করা গেল। রাত ২টা পর্যন্ত প্রেসে কাজ করে শেষ হলো ১৮ তারিখ। ১৯ ফেব্রুয়ারি উদযাপন কমিটির প্রথম সমাবেশ। ঐক্যের প্রথম ধাপ। সে হিসেবে যথেষ্ট ভালো। মিছিলও। প্রস্তাব লেখা পরিচালনার ভার আমার উপরই ছিল। বোঝা যাচ্ছিলো এরকম একটি জোটের জন্য অনেকেই আকাঙ্খিত ছিলেন। ২১ তারিখে সকালে লম্বা মিছিল ও প্রভাত ফেরী হলো। ২২ তারিখ হলো লেখক শিবিরের সেমিনার- ‘ঐতিহ্য ও সংগ্রামের তিন কবি: গোবিন্দ দাশ, মুকুন্দ দাশ, রমেশ শীল’। ২৪ তারিখ লেখক শিবিরের উদ্যোগে হলো সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সমাবেশ। ২৮ তারিখ ‘ভাষা শ্রেণী ও সমাজ’ নিয়ে আলোচনা সভা।
এরশাদের গণভোট এবং প্রতিবাদের চেষ্টা
১ মার্চ ১৯৮৫ থেকে আবারো সামরিক শাসনের দাপট দাঁত নখ বের করলো। সামরিক জান্তা কোনোরকম চক্ষুলজ্জা না রেখে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবার বাধ্যবাধকতা উড়িয়ে দিয়ে, অনির্দিষ্টকালের জন্য সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে। রাজনৈতিক ও নির্দিষ্টভাবে ট্রেড ইউনিয়ন তৎপরতা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গত মাসাধিককাল ধরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সহিংসতা, বিভিন্ন স্থানে সংঘাত, খুনাখুনি যে পরিকল্পিত ও সাজানো ছিল তা আজ আরও পরিষ্কার হলো। লক্ষ্য সবাই বুঝতে পারছিল- ২১ মার্চ গণভোটের মাধ্যমে এরশাদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করা।
১ মার্চ ১৯৮৫ থেকে আবারো সামরিক শাসনের দাপট দাঁত নখ বের করলো। সামরিক জান্তা কোনোরকম চক্ষুলজ্জা না রেখে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবার বাধ্যবাধকতা উড়িয়ে দিয়ে, অনির্দিষ্টকালের জন্য সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে। রাজনৈতিক ও নির্দিষ্টভাবে ট্রেড ইউনিয়ন তৎপরতা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গত মাসাধিককাল ধরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সহিংসতা, বিভিন্ন স্থানে সংঘাত, খুনাখুনি যে পরিকল্পিত ও সাজানো ছিল তা আজ আরও পরিষ্কার হলো।
৯ মার্চ হক সাহেবদের বিভিন্ন সংগঠন ও সর্বহারা পার্টির লোকজনদের সাথে বৈঠক শেষে আপাতত আমরা ‘বিপ্লবী গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট’ নামে একটি মঞ্চ করলাম যেখান থেকে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের কিছু উদ্যোগ নেয়া হলো। ১৩ মার্চ সামরিক শাসন বিরোধী প্রচারপত্রের প্রাথমিক বিতরণ শেষ হলো।
১৮ মার্চ ১৯৮৫
২২ দল কিছুই করলো না। টুকটাক মিছিল আর দুএক জায়গায় বোমা পড়ছে। সংগঠিত কিছু নেই। ‘সংগ্রামী ছাত্র ঐক্য’ থেকে আরেকটি লিফলেট দেয়া হলো। অন্তত প্রতিবাদের একটি চিহ্ন আমরা রাখতে পারছি। একটি সময়ের চিত্র কীভাবে গতিশীল উপাদানকে তুলে ধরতে পারে-আরোপিত নয় খুবই স্বচ্ছন্দ গতিতে, পর্যবেক্ষণ, উপলব্ধি, দৃষ্টিভঙ্গী আর ক্ষমতার কারণে- আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখায় যেন তারই অসাধারণ প্রকাশ।
২০ মার্চ ১৯৮৫
আজকে বেশ কিছু বোমার আওয়াজ পাওয়া গেল। অবশেষে ‘চীনে সমাজতন্ত্র ও শ্রেণী সংগ্রাম’ শিরোনামে বড় লেখার কাজ শেষ হলো।
২১ মার্চ ১৯৮৫
খুবই হাস্যকর তথাকথিত গণভোট। উপস্থিতি ৪৩, অথচ হিসাবে হ্যাঁ ভোট ৪৩০। টিভিতে লক্ষ লক্ষ ভোট দেবার খবর হচ্ছে। প্রহসনের সীমা নাই। অথচ প্রতিরোধও নাই। এতবড় বিশ্বাসঘাতকতা আর দেউলিয়াত্ব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো কোনমুখে আবার জনগণের সামনে দাঁড়াবে?
কবিদের দুই দল ও ‘বিশ্ববেহায়া’র পোস্টার
সামরিক সরকারের গণভোট গণতন্ত্র উন্নয়ন নামের প্রহসনের পাশাপাশি এরশাদের কবিতা প্রহসনও চলছিল। ক্ষমতা গ্রহণের আগে তার কবিতার কথা কেউ জানতো না, ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হবার পরেও তার আর কবিতার কথা শোনা যায় নাই। কিন্তু ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যেই প্রকাশিত হয় তার প্রথম কবিতাগ্রন্থ, ‘কনক প্রদীপ জ্বালো।’ সরকারি ট্রাস্ট থেকে প্রকাশিত দৈনিক বাংলা এবং সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক তখন কবি শামসুর রাহমান। এই পত্রিকার উপরও ভর করেছিল তার কবিতা। অনেককে বলতে শুনেছি শামসুর রাহমানই এরশাদের কবিতা ঠিকঠাক করে দিচ্ছেন। তবে পরে বঙ্গভবনে নিয়মিত কবিতার আসর কিংবা এরশাদকেন্দ্রিক কবিতা উৎসবে শামসুর রাহমানকে দেখা যায়নি, বরং বিরুদ্ধ মঞ্চেই তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। এরশাদের কবিতা আসরে সরকারি কর্মকর্তাসহ অনেক কবিই যেতেন। মনজুরে মওলা, ফজল শাহাবুদ্দীন, ইমরান নুর এর অন্যতম। এরশাদের বিভিন্ন উদ্যোগে যুক্ত ছিল কবিকন্ঠ নামে একটি সংগঠন, এর নেতৃত্বে ছিলেন কবি ফজল শাহাবুদ্দীন। তার সঙ্গে ছিলেন কবি আল মাহমুদ, সৈয়দ আলী আহসানের মতো অনেকেই। এরশাদ ছিলেন এই সংগঠনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। কবিকন্ঠ বেশ সক্রিয় ছিল, এরশাদের কল্যাণে ধানমন্ডিতে একটি পরিত্যক্ত বাড়ি বরাদ্দ পেয়ে যান তারা যেখানে প্রতি মাসে কবিতার আসর বসতো। সেখানে এরশাদ থাকতেন প্রধান অতিথি। তিনি নিজেও কবিতা পড়তেন। শামসুর রাহমান এবং আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ-র উদ্যোগে কবিদের আরেকটি সংগঠন গড়ে উঠে পদাবলী নামে।২
পরে প্রথম দলের কবিরা এরশাদের ইচ্ছায় সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এশীয় কবিতা উৎসব আয়োজন করে। এতে কিছুসময় সৈয়দ শামসুল হকও যুক্ত ছিলেন বলে তখন শুনেছি। আর দ্বিতীয় দল শুরু করে জাতীয় কবিতা উৎসব, গঠিত হয় জাতীয় কবিতা পরিষদ। এই সংগঠনের সভাপতি হন শামসুর রাহমান এবং সাধারণ সম্পাদক হন খোলা কবিতার কবি মোহাম্মদ রফিক। এই কবিতা উৎসব কয়েক বছর সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে কবি শিল্পীদের অন্যতম মঞ্চ হয়ে উঠেছিল। ১৯৮৮ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি এই উৎসব অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে মঞ্চে বসে স্কেচ করছিলেন শিল্পী কামরুল হাসান (১৯২১-১৯৮৮)। স্কেচ শেষ করে তিনি এর নাম দিলেন ‘দেশ আজ এক বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে’। এর ঠিক পরেই ঐ মঞ্চেই শিল্পী শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করলেন। এরপর ঐ স্কেচ হয়ে দাঁড়িয়েছিল সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রতিরোধ চিহ্ন, এটি নিয়ে তৈরি করা পোস্টার হাজার হাজার কপি ছড়িয়ে গিয়েছিল। পুলিশ বারবার জব্দ করলেও এর প্রচার বন্ধ করতে পারেনি।
(চলবে)
আগের কিস্তি: বাংলাদেশের ৫০ বছর ও তারপর-৭
আনু মুহাম্মদ: শিক্ষক, লেখক ও সম্পাদক- সর্বজনকথা। ইমেইল: sarbojonkotha@gmail.com
টীকা:
১। এই লেখাটি লিখি ১৯৮৪ সালের মাঝামাঝি, প্রথম এটি ‘ছাত্রসমাজ, ছাত্র আন্দোলন এবং বিপ্লবী রাজনীতি’ শিরোনামে প্রকাশিত হয় বদরুদ্দীন উমর সম্পাদিত সংস্কৃতি (সেপ্টেম্বর ১৯৮৪) পত্রিকায়। পরে আমার রাষ্ট্র ও রাজনীতি: বাংলাদেশের দুই দশক (সন্দেশ, ২০০০) এ লেখাটি অন্তর্ভুক্ত হয়।
২। মোয়াজ্জেম হোসেন: ‘এরশাদ- কবিখ্যাতি পাওয়ার জন্য ব্যাকুল এক সেনাশাসক, নিষিদ্ধ কবিতা এবং একটি সংবাদ সম্মেলন’। বিবিসি বাংলা, লন্ডন। ১৪ জুলাই ২০১৯ ।