সংবাদপত্রের পাতা থেকে(২৭ জানুয়ারি- ২৬ এপ্রিল ২০২৪)

সংবাদপত্রের পাতা থেকে(২৭ জানুয়ারি- ২৬ এপ্রিল ২০২৪)

শ্রমজীবি মানুষের কথা

২০২৩ সালে দেশে এসেছে রেকর্ড ৪৫৫২ প্রবাসীর মরদেহ

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

পরিবারের দারিদ্র ঘোচাতে ২০১৯ সালে শ্রমিক হিসেবে সৌদি আরব যান ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার হাবিব খালাসী। কিন্তু গত বছর লাশ হয়ে দেশে ফেরেন তিনি।

রিয়াদে মেটাল-স্ক্র্যাপ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন এক সন্তানের পিতা হাবিব (৩৩)। সৌদি রাজধানীর বাইরে একটি এলাকায় পুরোনো ক্যামেল শেডে কাজ করার সময় গত ৩ মে মাথায় লোহার বড় টুকরো এসে পড়লে মৃত্যু হয় হাবিবের।

হাবিবের ছোট ভাই মাহবুব খালাসী টেলিফোনে দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, হাবিব যখন সৌদিতে যান, তখন তার পরিবারে ব্যাপক আর্থিক সংকট ছিল। কিন্তু সৌদিতে যাওয়ার পর হাবিব যখন টাকা পাঠাতে শুরু করেন, তখন তার পরিবার ভেবেছিল তাদের টানাপোড়েন শেষ হয়েছে।

হাবিবের মৃত্যুর পর এখন তার বৃদ্ধ বাবা-মা ও নাবালক সন্তানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের (ডব্লিউইডব্লিউবি) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৩ সালে রেকর্ড চার হাজার ৫৫২ প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে। তাদের একজন হাবিব। এর আগের বছর দেশে আসে তিন হাজার ৯০৪ প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ।

স্বপ্ন নিয়ে প্রতি বছরই বিপুল সংখ্যক অভিবাসী শ্রমিক বিদেশে যান। বিশেষ করে, বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের প্রধান গন্তব্যস্থল মধ্যপ্রাচ্যে। কিন্তু তাদের অনেককেই দেশে ফিরতে হয় লাশ হয়ে।

ডব্লিউইডব্লিউবি ১৯৯৩ সালে প্রথম এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ৫১ হাজার ৯৫৬ প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে। গত ১০ বছরে এসেছে ৩৪ হাজার ৩২৩ প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ।

ডব্লিউইডব্লিউবির বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ২০১৭ সালের জুন থেকে ২০২২ সালের জুনের মধ্যে বাংলাদেশে এসেছে ১৭ হাজার ৮৭১ প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ। এর ৬৭ দশমিক চার শতাংশই এসেছে উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার (জিসিসি) আওতাভুক্ত ছয় দেশ থেকে। দেশগুলো হলো—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইন।

মরদেহগুলোর মধ্যে পাঁচ হাজার ৬৬৬টি এসেছে সৌদি আরব থেকে, এক হাজার ৯১৩টি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও এক হাজার ৮৯৩টি ওমান থেকে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, ১৯৭৬ সাল থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া এক কোটি ৬০ লাখ শ্রমিকের ৭৬ দশমিক তিন শতাংশই গিয়েছেন জিসিসির ছয় দেশে।

মৌলভীবাজারে শনাক্ত কুষ্ঠ রোগীর ৮৩ শতাংশ চা জনগোষ্ঠীর

ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৪, বণিক বার্তা

কুষ্ঠ একটি দীর্ঘমেয়াদি সংক্রামক ব্যাধি। দেশের ১১টি জেলায় এখনো এ রোগের প্রাদুর্ভাব রয়ে গেছে। চা জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ রোগের হার সবচেয়ে বেশি। মৌলভীবাজারে শনাক্ত কুষ্ঠ রোগীদের ৮৩ শতাংশই চা জনগোষ্ঠীর সদস্য বলে সরকারের তথ্যে উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চা শ্রমিকরা এ রোগের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন। মূলত বসবাসের স্থান, অপুষ্টি ও অস্বাস্থ্যকর জীবনাচারের কারণে রোগটির প্রাদুর্ভাব তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে।

জেলা সদরের মৌলভী চা বাগানের শ্রমিক বিনয় চাষার পায়ের ত্বকে ক্ষত দেখা দেয় দেড় বছর আগে। ক্ষত একসময় বাড়তে থাকলে নিজ উদ্যোগে ওষুধ সেবন করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ক্ষত না শুকালে তিনি চা বাগানের নার্সের পরামর্শ নেন। বেসরকারি সংস্থা হিড বাংলাদেশের চিকিৎসক ক্ষতটিকে কুষ্ঠ রোগ বলে শনাক্ত করেন। নিয়মিত চিকিৎসা নেয়ার কারণে পঞ্চাশোর্ধ্ব বিনয় এখন অনেকটা সুস্থ। তবে তার স্ত্রীও এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।

শুধু বিনয় চাষাই নন, এমন রোগী মৌলভীবাজারের চা বাগানগুলোয় অনেক পাওয়া যাচ্ছে বলে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে। তারা বলছে, কুষ্ঠ রোগী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার বিড়ম্বনা এড়াতে শুরুতে আক্রান্তরা চিকিৎসকের কাছে আসতে চান না। একই সঙ্গে অসচেতনতা ও রোগের বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকার ফলে স্থানীয়দের মধ্যে এ রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। কুষ্ঠ রোগীদের সামাজিক বৈষম্যের শিকার হওয়ার শঙ্কাও থাকে। ফলে রোগীদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা প্রায় কঠিন।

সরকারের তথ্য বলছে, দেশে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত কুষ্ঠ রোগী চা জনগোষ্ঠীর সদস্যরা। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে এ রোগ বেশি দেখা যাচ্ছে। ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরাও। কুষ্ঠ রোগের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে অন্তত ১১টি জেলা। এগুলো হলো মৌলভীবাজার, জামালপুর, বান্দরবান, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারী, পঞ্চগড়, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, জয়পুরহাট ও মেহেরপুর। এসব জেলায় প্রতি লাখে পাঁচজন বা তারও বেশি রোগী শনাক্ত হচ্ছে।

লিবিয়ায় নির্যাতনের শিকার ৭৯ শতাংশ বাংলাদেশি: ব্র্যাকের গবেষণা

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, সমকাল

বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে পাঠানো ও ভালো চাকরির প্রলোভন দেখায় দালালরা। এ ফাঁদে পা দিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন শত শত বাংলাদেশি। তাদের লিবিয়া নিয়ে বিভিন্ন ক্যাম্পে বন্দি রেখে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। জিম্মি করে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে আদায় করা হয় অর্থ। ইউরোপগামী এ বাংলাদেশিদের ৭৯ শতাংশই নির্যাতনের শিকার। কিন্তু এত কিছুর পরও ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইউরোপের স্বপ্নে লিবিয়া যাওয়ার এ প্রবণতা থামছে না।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। লিবিয়াফেরত ৫৫৭ বাংলাদেশির কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি করা হয়।

আজ শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলা হয়, এক দশকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টা করা লোকজনের মধ্যে যেসব দেশের নাগরিক আছেন, বাংলাদেশ ওই তালিকার শীর্ষ দশে আছে।

মজুরি বৈষম্যের আখ্যান

০৩ মার্চ ২০২৪, সমকাল

যে পাখি ভোরের প্রথম সূর্যের রোসনাই মেখে ডানা মেলেছে নয়নাভিরাম সবুজ শ্যামলীমায়, তার চোখ ভরা শস্যের সমারোহ। ফসলের মাঠে দোলুল হাওয়ায় আঁকাবাঁকা মেঠোপথের বয়ে যাওয়া সমৃদ্ধির অদম্য এগিয়ে যাওয়া আগামীর স্বনির্ভর বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। তবে এতেও মিশে আছে মজুরি বৈষম্যের গাথা।

কড়া রোদ্দুর মাথায় করে ভরদুপুরে কোদালের ধারালো ফলায় তখনও কঠিন লাল মাটির বুক আলগা করছেন ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙামাটিয়া গ্রামে হলুদ শ্রমিক পাঁচ সন্তানের জননী সুন্দরী বেগম। মাটির বুক আলগা হলেও হাপর চলা ফুসফুসে তাঁর ক্লান্ত এখন দমের গাড়ি। মাটি ভেঙে হলুদ সংগ্রহ করছেন অন্য নারী শ্রমিকদের সঙ্গে। জন্মের পর গায়ের রং ছিল দুধে আলতা; তাই দেখে শখ করে দাদি আলতা বানু তাঁর নাতনির নাম রাখেন সুন্দরী বেগম। অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা সুন্দরীর কম বয়সেই বিয়ে হয় পাশের গ্রামের দিনমজুর আব্বাসউদ্দীনের সঙ্গে; বিয়ের পর সুন্দরী জানতে পারেন অসুন্দরে ভরা এই জীবন আদতে নিকষ কালো। তাই সংসারে অসুস্থ স্বামীসহ সন্তানদের ভরণ পোষণের খরচ আসে সারাদিনের হলুদ উত্তোলনের কাজ করে পাওয়া ২৫০ টাকা থেকে। সে তুলনায় একজন পুরুষ শ্রমিক মজুরি পান ৬০০ টাকা। শ্রমের হাটে মজুরির এই বৈষম্য শুধু সুন্দরী বেগমের নয়, তাঁর সঙ্গে কাজ করা উপজেলার হাজারো নারী শ্রমিকের।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) আন্তর্জাতিক কৃষি ব্যবস্থায় নারীর ভূমিকা নিয়ে ‘স্ট্যাটাস অব উইমেন ইন এগ্রিকালচার সিস্টেম-২০২৩’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কৃষিতে ২০০৫ সালে নারীর ভূমিকা ছিল ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১৯ সালে তা ৯ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ৪৫ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়ায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশ্বিকভাবে কৃষিতে নারীর ভূমিকা প্রায় ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশে এই হার বৈশ্বিক গড় হারের চেয়ে ৫ শতাংশ বেশি। তবে মজুরি বৈষম্য ও মালিকানার প্রশ্নে দেশের নারী কৃষকদের অবস্থানকে অগ্রসর বলার সুযোগ নেই।

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলায় দারিদ্র্য আর অভাব-অনটন ছিল যাদের নিত্য সঙ্গী, কয়েক দশকে বদলে গেছে কৃষিতে ভর করে তাদের জীবন-জীবিকা। ধান-পাট সবজিসহ মসলাজাতীয় ফসল চাষাবাদে বদলেছে কৃষকের ভাগ্য। এ জনপদে আনারস, কচু, কলা, আলু, হলুদসহ বিভিন্ন মৌসুমি সবজি আবাদ হয় বেশির ভাগই নারীদের হাতে। তবে দিনশেষে ভাগ্য বদলায় না সকাল-সন্ধ্যা মজুর খাটা নারী শ্রমিকের। হাতিলেইট গ্রামের ছফুটা বেগম, শারমিন, লাইলি, নুরজাহানরা অভিযোগ করেন, ‘সকাল থেইক্কা সইন্ধা বেলা আমরা কাম করি, আমগর লগে পুরুষরাও কাম করে। পুরুষরা পান ৬০০ আর আমরা পাই ২৫০ টেহা। কামকি কম করি আমরা? তেল, নুন, চাইল, ডাইল সবকিছুর দাম বাড়তি। এই ময়নায় কেমনে কাম করমু আমরা?’

বাংলালিংক কর্মীরা ছাঁটাই আতঙ্কে

০৭ মার্চ ২০২৪, আমাদের সময়

বেশ কিছু টাওয়ার বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর চাকরি নিয়ে আতঙ্কে ভুগছেন বাংলালিংকের সংশ্লিষ্ট কর্মীরা। ইতোমধ্যে দেশের অন্যতম শীর্ষ এই মোবাইল অপারেটরটির ১২ কর্মীকে নতুন চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে অন্যরা আশঙ্কা করছেন, পরবর্তী সময় তাদের সঙ্গেও এমন আচরণ করা হবে। এ নিয়ে গত মঙ্গলবার শ্রম অধিদপ্তরে চিঠি দিয়েছে বাংলালিংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন। তবে বাংলালিংক বলছে, টাওয়ার খাতের আগ্রহী কর্মীদের সব সুযোগ-সুবিধাসহ নতুন চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, গত ২০ ফেব্রুয়ারি প্রধান কার্যালয়ে কর্মীদের নিয়ে একটি সভার আয়োজন করে বাংলালিংক। সেখানে ১২ কর্মীকে অন্য একটি কোম্পানিতে যোগদানের প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরে কর্মীদের কেউ কেউ অস্বীকৃতি জানান। তারা বলছেন, তাদের ওপর নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলালিংকের এক কর্মী আমাদের সময়কে বলেন, ‘আমাদের বেশ কিছু টাওয়ার বিক্রি হয়ে যাওয়ায় কিছু কর্মীকে এখানে প্রথমে চাকরি থেকে পদত্যাগ করার জন্য বলা হয়েছে। অথচ আমাদের এখানে চর্চা হলো সুযোগ-সুবিধা দিয়ে কর্মীকে ছাড়ার। কিন্তু কোম্পানি সেটি করতে চায় না। তারা চাকরি ছাড়তে আমাদের মানসিক চাপ দিচ্ছে।’

অপর এক কর্মী বলেন, ‘কোম্পানি কোনো ধরনের ডকুমেন্ট দিচ্ছে না। কিন্তু তারা অন্য একটি কোম্পানির অফার লেটার দিচ্ছেন, চাপ দিচ্ছেন। এ নিয়ে আমাদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। একজন অসুস্থও হয়ে পড়েছে।’

কোম্পানির সিদ্ধান্তকে শ্রম আইনের বিধি লঙ্ঘন বলছে বাংলালিংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন। এ নিয়ে মঙ্গলবার শ্রম অধিদপ্তরে চিঠি দিয়েছে সংগঠনটি। চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলালিংক ডিজিটাল থেকে বিপুল সংখ্যক কর্মীদের মৌখিকভাবে বলা হচ্ছে এবং চলে যাওয়ার জন্য রীতিমতো জোর খাটানো হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য বাংলালিংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর চিঠি দেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয় শ্রম অধিদপ্তরে পাঠানো ওই চিঠিতে।

শ্রম পরিস্থিতি নিয়ে আইএলওতে প্রশ্নের মুখে বাংলাদেশ

১৩ মার্চ ২০২৪, প্রথম আলো

বাংলাদেশের শ্রম পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) চলতি অধিবেশনে পশ্চিমা দেশগুলো প্রশ্ন তুলেছে। শ্রম অধিকার চর্চা, শ্রমিকদের ওপর হামলা–নির্যাতন বন্ধসহ শ্রম আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার হয়নি বলে তারা মন্তব্য করেছে।

একই অধিবেশনে ভারত, চীন, সৌদি আরব, ইরানসহ বেশ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশের শ্রম পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে।

গতকাল মঙ্গলবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আইএলওর চলতি ৩৫০তম অধিবেশনে বাংলাদেশের শ্রম পরিস্থিতির অগ্রগতি নিয়ে এক পর্যালোচনা হয়। অধিবেশনটি অনলাইনে সম্প্রচারিত হয়।

আলোচনার শুরুতে আইনমন্ত্রী আইএলওর পথনকশা অনুযায়ী বাংলাদেশ কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটি উপস্থাপন করেন। তিনি শ্রম আইন সংশোধনে বাংলাদেশের জোরালো রাজনৈতিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, পরিস্থিতির উন্নয়নে বাংলাদেশের উদ্যোগের যথাযথ স্বীকৃতি না দিলে আইএলওসহ আন্তর্জাতিক অংশীজনদের সঙ্গে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের পর বিভিন্ন দেশ, জোট, সংগঠন ও আইএলওর পরিচালনা পরিষদের সদস্যসহ ২৪ জন বাংলাদেশের শ্রম পরিস্থিতি ও প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাঁদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। 

ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে ১০ লাখ শিশু

১৪ মার্চ ২০২৪, সমকাল

দেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ৩৫ লাখ ৪০ হাজার। এদের মধ্যে ১০ লাখ ৭ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত। আর ঝুঁকিপূর্ণ ৪৩ খাতের মধ্যে পাঁচটিতেই নিয়োজিত রয়েছে ৩৮ হাজার ৮ জন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পৃথক দুটি জরিপ প্রতিবেদন থেকে এই পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে জরিপ প্রতিবেদন দুটি প্রকাশ করা হয়। জরিপে ৫ থেকে ১৭ বছরের বয়সী শিশুদের শিশুশ্রমিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) নীতি অনুসরণে এ জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। 

জরিপ প্রকাশ উপলক্ষে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিসংখ্যান ভবনে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. শহীদুজ্জামান সরকার এতে প্রধান অতিথি ছিলেন। আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশে আইএলওর কান্ট্রি ডিরেক্টর টোমু পোটিয়াইনেন, ঢাকায় যুক্তরাজ্যের ডেপুটি হাইকমিশনার মাতো ক্যানেল, পরিসংখ্যান ও তথ্য বিভাগের সচিব ড. শাহনাজ আরেফিন প্রমুখ। বিবিএসের মহাপরিচালক মিজানুর রহমান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।

গতকাল প্রকাশিত জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০২২ প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী মোট শিশুর সংখ্যা ৩ কোটি ৯৯ লাখ ৬ হাজার। এদের মধ্যে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ৩৫ লাখ ৪০ হাজার। এদের ১০ লাখ ৭ হাজারই ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত। ২ কোটি ৭৬ লাখ ৩ হাজার খানায় এসব শিশুর বসবাস। এসব শিশুর ৩৪ দশমিক ৮১ শতাংশ স্কুলে যায়। 

জরিপ অনুযায়ী, ২০ লাখ ১ হাজার শিশু গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে, যারা কোনো পারিশ্রমিক পায় না। কৃষি, শিল্প ও পরিষেবা খাতে যথাক্রমে ১০ লাখ, ১১ লাখ ৯০ হাজার ও ১২ লাখ ৭০ হাজার শিশু কাজ করে। জরিপের তথ্য নেওয়া হয়েছে গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ মে পর্যন্ত। ৩০ হাজার ৮১৬টি খানা থেকে জরিপের তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

৫ খাতে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমিক ৩৮ হাজার

একই দিনে সেক্টরভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত শিশুশ্রম জরিপ-২০২৩ নামে আরও একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, মাত্র পাঁচটিতে নিয়োজিত রয়েছে ৩৮ হাজার ৮ শিশু। এ খাতগুলো হচ্ছে মাছ, কাঁকড়া, শামুক বা ঝিনুক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ (শুটকি মাছ উৎপাদন), পাদুকা উৎপাদন (চামড়ার তৈরি পাদুকা শিল্প), লোহা ও ইস্পাত ঢালাই (ওয়েল্ডিং বা গ্যাস বার্নার মেকানিকের কাজ), মোটর যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত (অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ) এবং ব্যক্তিগত ও গৃহস্থালি সামগ্রীর মেরামত (অনানুষ্ঠানিক এবং স্থানীয় টেইলারিং ও পোশাক খাত)। এর মধ্যে অটোমোবাইল ওয়ার্কশপে সবচেয়ে বেশি ২৪ হাজার ৯২৩ শিশু কাজ করে। অন্য চার খাতের মধ্যে শুঁটকি মাছ উৎপাদনে ৮৯৮ শিশু, চামড়ার তৈরি পাদুকা তৈরিতে ৫ হাজার ২৮১, ওয়েল্ডিং বা গ্যাস বার্নার মেকানিকের কাজে ৪ হাজার ৯৯ এবং অনানুষ্ঠানিক ও স্থানীয় টেইলারিং বা পোশাক খাতে ২ হাজার ৮০৫ শিশু কাজ করে। অর্থাৎ পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ খাতের মধ্যে শ্রমজীবী শিশুদের সবচেয়ে বড় অংশ নিয়োজিত রয়েছে অটোমোবাইল খাতে। এই খাতে কর্মরত শিশুর ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ গ্রাম এবং ৬৪ দশমিক ৩ শতাংশ শহর এলাকায় বসবাস করে।

এ জরিপের তথ্য সংগ্রহ করা হয়, গত বছরের ৩ জুন থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত সময়ে। জরিপের প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী, এই পাঁচটি খাতের ৪০ হাজার ৫২৫ প্রতিষ্ঠানে শিশুরা কাজ করে। ঝুঁকিপূর্ণ খাতে কাজে নিয়োজিত শিশুদের মধ্যে ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশ ছেলে এবং ২ দশমিক ৫ শতাংশ মেয়ে শিশু।

কর্মে থেকেও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় দেশের ২২ শতাংশ মানুষ

মার্চ ১৯, ২০২৪, বণিক বার্তা

রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন আল-মামুন। চাকরির বেতন দিয়ে দুজনের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। তাই অফিসে যাওয়া-আসার পথে মোটরসাইকেলে ‘রাইডশেয়ার’ করেন তিনি। আরেক চাকরিজীবী মাহমুদুল হাসান (ছদ্মনাম) বেতনের টাকায় সংসার চালাতে না পেরে ঋণের জন্য ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়েছেন। গত এক বছরে দুটি ক্রেডিট কার্ডও নিয়েছেন তিনি। এভাবে চাকরির বাইরে অন্য কাজ করে কিংবা ঋণ নিয়েও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে মামুন ও হাসানদের। এমনকি কর্মে থেকে নিজেদের খাদ্যনিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে পারছেন না তারা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘‌খাদ্যনিরাপত্তা পরিসংখ্যান-২০২৩’-এ উঠে এসেছে, মামুন ও হাসানের মতো কর্মে থেকেও দেশের ২১ দশমিক ৭৭ শতাংশ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

বিবিএসের পরিসংখ্যান বলছে, যারা গৃহস্থালির কাজ করেন কিংবা কর্মের সন্ধানে আছেন, খাদ্যনিরাপত্তায় তাদের চেয়েও পিছিয়ে আছেন কর্মজীবীরা। গৃহস্থালির কাজে যুক্ত ২১ দশমিক ৬৭ শতাংশ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। কর্মের সন্ধানে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে এ হার ১৮ দশমিক ৫১ শতাংশ। তবে যারা কোনো কাজ করেন না, তাদের মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার হার সবচেয়ে বেশি; ২২ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

বিবিএসের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, দেশের ২১ দশমিক ৯২ শতাংশ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। এদের মধ্যে গ্রামে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার হার ২৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ। শহরে এ হার ২০ দশমিক ৫৬ শতাংশ। সবচেয়ে কম সিটি করপোরেশন এলাকায়, ১৩ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে ১৮ শতাংশ মানুষ। আর ২২ শতাংশ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তার মানে, যারা দারিদ্র্যসীমার ওপরে আছে, তারাও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে পড়েছে।

বিবিএসের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, শ্রেণীভিত্তিক বিভাজনে অতিদরিদ্রদের মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার হার ৭০ দশমিক ৩৭ শতাংশ। দরিদ্রদের মধ্যে ২২ দশমিক ৯ শতাংশ। মধ্যবিত্তদের মধ্যে এ হার ১৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। ধনীদের মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভোগে ১ দশমিক ১১ শতাংশ।

ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে পাথর ভাঙছেন শ্রমিক

২৪ মার্চ ২০২৪, সমকাল

জীবন সংগ্রামী মমেনা বেগম। জটিল রোগে নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও পাথর ভাঙার কাজ করে জীবন গড়ার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। বাড়ি পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার সাকোয়া এলাকায়। কাজ করেন তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর এলাকায় পাথরের সাইটে। ৪৫০ টাকা হাজিরায় সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। দীর্ঘদিন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করায় শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রোগ। জটিল সিলিকোসিস ও হৃদরোগে আক্রান্ত মমেনা মাঝে মধ্যেই হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান পাথরের স্তূপে।

ষাটোর্ধ্ব মমেনার ছেলেসন্তান নেই, স্বামী কিডনি রোগে শয্যাশায়ী। তিন মেয়েকে লালন-পালন করতে হয়। এখন নিজেই অসুস্থ। ১১ বছর ধরে পাথর ভাঙার কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি।

এদিকে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর এলাকায় অবাধে চলছে অবৈধ পাথর ভাঙার মেশিন। তিন শতাধিক ট্রাকে চলে পাথর ওঠানামা। চার শতাধিক মেশিনে উৎপাদিত পাথরের গুঁড়া আর বালুকণায় অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে থাকে গোটা এলাকা। এতে মারাত্মক হুমকির মুখে প্রকৃতি ও পরিবেশ। নষ্ট হচ্ছে ফসলের ক্ষেত, ফল-ফুলের মুকুল। শ্রমিকদের পাশাপাশি স্থানীয়রা আক্রান্ত হচ্ছেন জ্বর, সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্টসহ মরণব্যাধি সিলিকোসিসে।

বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে ভুটান, নেপাল ও ভারত থেকে প্রতিদিন ৩৫০ থেকে ৪০০ ট্রাকে বোল্ডার পাথর আমদানি হয়। দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মেশিনে চলছে পাথর ভাঙার কাজ। এসব গুঁড়া পাথর বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে এখানে কাজ করেন বিভিন্ন এলাকার নারী-শিশুসহ পাঁচ হাজারের বেশি শ্রমিক। সকাল থেকে শুরু হয় মেশিনের উচ্চ শব্দ। শ্রমিকের নাক, মুখ, শরীরসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের বাড়িঘর, ফসলের ক্ষেতেও জমে থাকে ধুলার স্তূপ। শ্রমিকদের মাস্ক ব্যবহার করার উপায় নেই। কারণ মাস্ক পরলে তাতে ধুলা জমে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। এই এলাকায় ‘স্টোন ক্রাশিং জোন’ করার দাবি দীর্ঘদিন থেকেই উপেক্ষিত। শ্রমিকদের ন্যূনতম স্বাস্থ্য সচেতনতায় কারও কোনো উদ্যোগ নেই।

সিলেটে পাথর ভাঙার কলে জীবন ‘বিকল’

২৯ মার্চ ২০২৪, সমকাল

সিলেটে একের পর এক গড়ে উঠছে পাথর ভাঙার (ক্রাশিং) মিল। কয়েক বছরের মধ্যে জেলার পাঁচ উপজেলায় মিল ছাড়িয়েছে দেড় হাজার। এর মধ্যে ৯ শতাধিকই গড়ে উঠেছে অনুমোদন ছাড়া। ফসলি জমি নষ্ট করে অপরিকল্পিত এসব মিলের কার্যক্রমে বিপর্যস্ত পরিবেশ। পাথর ভাঙার শ্রমিক ছাড়াও স্থানীয়রা আক্রান্ত হচ্ছেন নানা রোগব্যাধিতে। সব জেনেশুনেও নির্বিকার প্রশাসন। খোদ পরিবেশ অধিদপ্তরও রয়েছে ঘুমিয়ে। পাথর ভাঙার জন্য পৃথক জোন করার কার্যক্রমও থমকে গেছে।

কয়েক বছর ধরে সিলেটে পাথর কোয়ারি বন্ধ। স্বাভাবিকভাবেই কমে যাওয়ার কথা পাথর ভাঙার যন্ত্র। কিন্তু হিতে বিপরীত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ আদালতে মামলা চলমান থাকায় এখন মিল করতে পরিবেশের ছাড়পত্র নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। এ সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা গড়ে তুলছেন স্টোন ক্রাশার মিল। প্রকৃতিকন্যা জাফলংয়ে যত্রতত্র মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। ভয়াবহ অবস্থা কোম্পানীগঞ্জেও।

সরেজমিন সিলেট-তামাবিল-জাফলং মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে মিল দেখা গেছে। বিশেষ করে জৈন্তাপুরের ৪ নম্বর বালাবাজার, চাংগিল, কদমখাল, বিরাইমারা, আসামপাড়া আদর্শ গ্রাম, শ্রীপুর, মোকামপুঞ্জি এলাকায় অন্তত ১০০ মিলের কার্যক্রম চলছে। এসব মিলের কোনোটি বাজারে, কোনোটি জনবসতি এলাকায়। অথচ নীতিমালায় রয়েছে– হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫০০ মিটার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ির ১০০ মিটার এবং প্রধান সড়ক-মহাসড়কের ৫০ মিটারের মধ্যে পাথর ভাঙার কল করা যাবে না। নীতিমালা না মেনে সিলেটের পাঁচ উপজেলায় দেড় হাজারের বেশি মিল গড়েছেন মালিকরা। এসব মিলের ৯ শতাধিকই কোনো অনুমতি নেয়নি।

এমনকি সিলেট শহরতলির ধোপাগুলে ওসমানী বিমানবন্দরের সীমানা প্রাচীর-সংলগ্ন এলাকায় বছরের পর বছর চলছে অর্ধশতাধিক মেশিন। বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক হাফিজ উদ্দিন জানিয়েছেন, তারা বহুবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বললেও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

সিলেট-তামাবিল সড়কের জৈন্তাপুর অংশের মতো পার্শ্ববর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলংয়ের চিত্রও নাজুক। ওই এলাকার মোহাম্মদপুর, মামার বাজার ও বল্লাঘাটে সড়কের পাশে চলছে অর্ধশতাধিক মিল। কোম্পানীগঞ্জের সিলেট-ভোলাগঞ্জ সড়কের পারুয়া বাজার এলাকা থেকে ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি পর্যন্ত চলছে অন্তত ৮০০ ক্রাশার মেশিন। একইভাবে কানাইঘাট ও সিলেট সদরের লোভাছড়া, ধোপাগুল ও দক্ষিণ সুরমা এলাকায়ও গড়ে উঠেছে অসংখ্য মিল।

ক্রাশার মেশিনের শব্দ ও পাথরের ডাস্টে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। এলাকাবাসী নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। শব্দ ও ধুলোবালিতে নাকাল বসতবাড়ির লোকজনও। ভোলাগঞ্জ বাজার এলাকার ব্যবসায়ী এম এ করিম বলেন, ‘সকাল-বিকেল দোকানের সামনে ও বাড়ির ধুলো পরিষ্কারে পানি মারতে হয়। দিনকে দিন বসবাস কঠিন হয়ে উঠছে। অন্যত্র চলে যাওয়ার চেষ্টা করছি।’ গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রউফ বলেন, উপজেলা ও পুলিশ প্রশাসনকে বারবার বলা হলেও অভিযানে তাদের আগ্রহ নেই।

অবশ্য গত রোববার বিকেলে হঠাৎ করেই অভিযান চালায় পরিবেশ অধিদপ্তর। এ সময় বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত কয়েকটি লিস্টার মেশিন ভেঙে ফেলা হয়। আর ৩০-৪০টি মেশিন জব্দ করে। সিলেট বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক এমরান হোসেন জানান, প্রথমে কাউকে জানানো হয়নি। অভিযান শুরুর সময় স্থানীয় প্রশাসনকে সঙ্গে নেওয়া হয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘চার বছর সিলেটে আছি, এ সময় কাউকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। উচ্চ আদালতে মামলার কারণে ছাড়পত্র দেওয়া বন্ধ রয়েছে। এমনকি নবায়নও করা হয় না।’

বসতবাড়ি ও সড়কের পাশে মিল স্থাপনের কথা স্বীকার করে কোম্পানীগঞ্জ স্টোন ক্রাশার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলকাছ আলী বলেন, ‘পাথর না পেয়ে মিল মালিকরা এখন সমস্যায় রয়েছেন।’

পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) সিলেটের সমন্বয়ক শাহ শাহেদা আক্তার বলেন, জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে বালু তোলা ও মাটি কাটা হচ্ছে। রিট করলে ২০১৭ সালে আদালত সিলেটের অবৈধ ক্রাশার মেশিন উচ্ছেদ ও বাকি মিলগুলো নির্দিষ্ট স্থানে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। এর পর জৈন্তাপুর ও জাফলংয়ে পৃথক অঞ্চল গঠনের তৎপরতা শুরু হলেও, এখন থমকে আছে। যত্রতত্র স্টোন ক্রাশার মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। লোক দেখানো অভিযানে এসব বন্ধ করা যাবে না।

সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলের নির্মাণাধীন ব্রিজ ধসে শ্রমিক নিহত, আহত ২

এপ্রিল ২, ২০২৪, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

সিরাজগঞ্জে নির্মাণাধীন অর্থনৈতিক অঞ্চলে একটি ব্রিজের গার্ডার ধসে এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছে আরও দুইজন।

আজ মঙ্গলবার সকালে সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত মো. জুবায়ের হোসেন (২০) সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার মিরপুর গ্রামের বাসিন্দা।

সিরাজগঞ্জ সদর থানার পরিদর্শক মো. সুমন দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, নির্মাণাধীন ব্রিজে কাজ করার সময় হঠাৎ গার্ডার ভেঙে ব্রিজটি ধসে পরে। এ সময় তিন শ্রমিক চাপা পড়েন।

শিল্পাঞ্চলে ৫১ শতাংশের বেশি কারখানায় মার্চের বেতন হয়নি

এপ্রিল ০৯, ২০২৪, বণিক বার্তা

ঈদুল ফিতরের আগে শেষ কর্মদিবস আজ। অথচ শিল্প অধ্যুষিত এলাকাগুলোর ৫১ শতাংশের বেশি কারখানা গতকাল পর্যন্ত তাদের শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ করেনি। দেশের আট শিল্প ও শ্রমঘন এলাকায় মার্চের বেতন পেয়েছে কেবল ৪৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ কারখানার শ্রমিক। শিল্প পুলিশের হালনাগাদ তথ্যে এমনটাই উঠে এসেছে। আশুলিয়া, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, খুলনা, কুমিল্লা ও সিলেট—এ আট শিল্প অধ্যুষিত এলাকায় মোট কারখানা রয়েছে ৯ হাজার ৪৬৯টি। শিল্প পুলিশের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বিকাল ৫টা পর্যন্ত এসব এলাকার ৫১ দশমিক ২১ শতাংশ কারখানার শ্রমিক মার্চের বেতন পাননি। তবে ঈদ বোনাস পরিশোধ করেছে ৮১ দশমিক ৩৫ শতাংশ কারখানা।

শিল্প অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় শ্রমঘন কারখানাগুলো মূলত পোশাক ও বস্ত্র খাতের। আট শিল্প এলাকায় তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সদস্য কারখানা সংখ্যা ১ হাজার ৫৬১। এর মধ্যে কেবল ৪১ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ কারখানার বেতন পরিশোধ হয়েছে। গতকাল বিকাল পর্যন্ত বকেয়া ছিল ৫৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ কারখানার বেতন। বোনাস পরিশোধ করা হয়ে ৮৮ দশমিক ৪০ শতাংশ কারখানায়।

ঈদের দিনেও চুলা জ্বলেনি তাদের বাড়িতে, বাসি পান্তা-খিচুড়িতেই ভরসা

১১ এপ্রিল ২০২৪, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

গত মার্চ থেকে নদীতে জাল ফেলার নিষেধাজ্ঞা থাকায় বিপাকে পড়তে হয়েছে মাছ শিকার করে বেঁচে থাকা এই মানুষদের। তাই এই সংকটময় সময়ে ঈদ আসলেও আনন্দ নেই।

ভোলা জেলার সদর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের মেঘনা তীরে শত শত জেলে নৌকা নোঙর করে আছে। দূর থেকে উচ্চ শব্দে গান বাজছে। কাছে গিয়ে দেখা গেল ছোট ছেলে ছোট ছেলেমেয়েরা নতুন জামা পড়ে আনন্দে মেতেছে। কেউ কেউ লটারি খেলছে। চারদিকে উৎসবের আবহ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় এখানে যেন আনন্দের কমতি নেই।

কিন্তু বয়োজ্যেষ্ঠদের দিকে তাকালে বোঝা যায় এই ঈদ আনন্দের ছিটেফোঁটাও নেই তাদের মধ্যে। এমনকি অনেকের বাড়িতে চুলা পর্যন্ত জ্বলেনি, আগের দিনের পান্তা-খিচুড়ি খেয়েই ঈদ কাটাচ্ছেন তারা।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিনে এ চিত্র দেখা যায়।

গত মার্চ থেকে নদীতে জাল ফেলার নিষেধাজ্ঞা থাকায় বিপাকে পড়তে হয়েছে মাছ শিকার করে বেঁচে থাকা এই মানুষদের। তাই এই সংকটময় সময়ে ঈদ আসলেও আনন্দ নেই।

ঈদের দিন স্ত্রীকে মাংস কিনে খাওয়াতে না পেরে চিরকুট লিখে আত্মহত্যা

১২ এপ্রিল ২০২৪, দেশ রূপান্তর

জামালপুরের বকশিগঞ্জে স্ত্রীকে মাংস কিনে খাওয়াতে না পেরে স্বামী হাসান আলী (২৬) নামে এক যুবক আত্মহত্যা করেছেন। শুক্রবার (১২ এপ্রিল) সকালে উপজেলার বগারচর ইউনিয়নের বান্দের পাড় গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত হাসান আলী ওই এলাকার রহমত আলীর ছেলে। তিনি রাজমিস্ত্রীর কাজ করতেন।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, হাসান আলী প্রতিদিনের মতো বৃহস্পতিবার রাতে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে যান। শুক্রবার শ্বশুর বাড়ি থেকে স্ত্রী আফরোজা বেগমকে নিজ বাড়িতে আনার কথা ছিল হাসানের। সকাল ১১টা পর্যন্ত শ্বশুর বাড়িতে না যাওয়ায় তার স্ত্রী আফরোজা বেগম স্বামী হাসানের বাড়িতে চলে আসেন এবং ঘরের দরজা বন্ধ দেখতে পান। এ সময় তিনি ঘরের বেড়ার ফাঁক দিয়ে হাসান আলীকে ঘরের আরার সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে ডাক-চিৎকার দিলে স্থানীয় লোকজন এসে পুলিশকে খবর দিলে বিকেলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহটির উদ্ধার করে। এ সময় পাশে একটি চিরকুট দেখতে পায় পুলিশ।

চিঠিতে হাসান আলী লিখেছে, ‘মা-বাবা তোমরা ক্ষমা করে দিও। আমি মরার পরে আমার বউ বাচ্চাকে দেখে রেখো। আমি জানি আমার বউ আমার সাথে রাগ করছে। ঈদে সবাই গুছ (গোস্ত) খাইছে, কিন্তু আমি বউকে গুছ খাওয়াইতে পারি নাই। আমি আমার বউয়ের মুখ ঈদের দিন বেজার (মন খারাপ) দেখছি। যদি পারো আমাকে ক্ষমা করে দিও।

তিনি আরও লিখেন, ‘তার স্ত্রী আফরোজা বেগমকে অনেক ভালবাসেন এবং তাকে ও তার সন্তানকে দেখে রাখার জন্য নিজ বাবা-মার প্রতি অনুরোধ করেন।’

স্ত্রীর উদ্দেশে তিনি লেখেন, ‘আফরোজা তোমার জীবন স্বাধীন করে দিলাম। তোমার জীবনে কেউ নাই।’

ঈদের আগে মার্চের পুরো বেতন পাননি সব শ্রমিক

১৬ এপ্রিল ২০২৪, প্রথম আলো

পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকেরা বোনাস পেলেও মার্চ মাসের পুরো বেতন পাননি অনেকে। এমন প্রেক্ষাপটে ঈদ ও নববর্ষের ছুটি শেষে পোশাক কারখানা খুলতে শুরু করেছে।

শ্রমিকনেতারা অভিযোগ করে বলেন, কম হোক, বেশি হোক—কারখানাগুলো বোনাস দিয়েছে। তবে ছোট ও মাঝারি অনেক কারখানা মার্চের পুরো বেতন দেয়নি। বিষয়টি নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ থাকলেও চাকরি হারানোর ভয়ে আন্দোলনের ঘটনা ঘটেনি। অন্যদিকে মালিকপক্ষের নেতারা বলছেন, যেসব কারখানা মার্চের পুরো বেতন দেয়নি, তারা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অসংগতির কথা শ্রমিকদের জানিয়েছে। ছুটির পর শ্রমিকদের বকেয়া বেতন দিয়ে দেবে কারখানাগুলো।

ঈদের আগে কত শতাংশ পোশাক কারখানা বোনাস ও বেতন দিয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে শিল্প পুলিশ সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, খুলনা, কুমিল্লা ও সিলেটের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য শিল্পের সাড়ে ৯ হাজার কারখানার বেতন-ভাতা পরিশোধের বিষয়টি তদারক করেছে। সর্বশেষ ৯ এপ্রিল দুপুর ১২টা পর্যন্ত বেতন-ভাতা পরিশোধের তথ্য গণমাধ্যমকে দিয়েছিল।

শিল্প পুলিশের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তাদের তদারকির আওতায় থাকা বিজিএমইএর ১ হাজার ৫৬১ কারখানার মধ্যে ২৭২টি বা ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ কারখানার বেতন বকেয়া ছিল। আর ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ কারখানার ঈদ বোনাস বাকি ছিল। অন্যদিকে বিকেএমইএর ৬২৬ কারখানার বোনাস ১ দশমিক ৭৯ শতাংশ বাকি থাকলেও বেতন বাকি ছিল ১৩ দশমিক ৪২ শতাংশ অথবা ৮৪টি কারখানায়।

জানতে চাইলে বিজিএমইএর সভাপতি এস এম মান্নান গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের জানামতে, একটি কারখানা শ্রমিকদের বেতন দিতে পারেনি। তবে তারা বোনাস দিয়েছে। এর বাইরে অনেক কারখানায় বেতনের একটি অংশ বকেয়া ছিল। এটা স্বাভাবিক বিষয়। অতীতেও ঈদের আগে কেউ কেউ বেতনের একটি অংশ দিত, ঈদের ছুটির পর বাকিটা পরিশোধ করত।’

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আর্থিক সংকটের কারণে আমাদের সংগঠনের অল্প কিছু সদস্য মার্চের পুরো বেতন দিতে পারেনি। তাদের কেউ কেউ বেতনের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ দিয়েছে। বেতনের একটা অংশও দেয় নাই, এমন কোনো কারখানা নেই।’ তিনি জানান, আজ (গতকাল) থেকে কারখানা খুলতে শুরু করেছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ছোট ও মাঝারি কারখানায় লামছামভাবে বোনাস দিলেও মার্চ মাসের পুরো বেতন দেয়নি। বিষয়টি নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ থাকলেও তারা তা প্রকাশ করেনি। কারণ, আন্দোলনে গেলে চাকরি হারানোর ভয় আছে। বর্তমানে পোশাক কারখানায় চাকরির সংকট রয়েছে। তাই কেউ ঝুঁকি নিতে চাননি। অনেক কারখানা শ্রমিকদের বেতন দিলেও কর্মচারীদের বেতন দেয়নি। ফলে অন্যবারের মতো এবারও অনেক পোশাকশ্রমিকের ঈদ নির্ঝঞ্ঝাট হয়নি।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের শোষণের অভিযোগ জাতিসংঘের

১৯ এপ্রিল ২০২৪, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা। তারা অভিবাসী শ্রমিকদের শোষণের হাত থেকে রক্ষা করতে মালয়েশিয়াকে বিশেষ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণেরও আহ্বান জানিয়েছেন।

আজ শুক্রবার দেশটির স্থানীয় অনলাইন ফ্রি মালয়েশিয়া টুডেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন যে, তারা বাংলাদেশিদের সঙ্গে প্রতারণা সম্পর্কিত এক প্রতিবেদন দেখে হতাশ হয়েছেন, মালয়েশিয়ায় কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ে এসে যাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।

এ বিবৃতিতে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে পরিচালিত অপরাধমূলক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অভিবাসী শ্রমিকদের প্রতারণামূলক নিয়োগের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করা হচ্ছে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, অভিবাসীরা প্রতারিত হচ্ছেন, কারণ তাদের ভুয়া কোম্পানি দ্বারা নিয়োগ করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত নিয়োগ ফি দিতে বাধ্য করা হয়েছে, যা তাদের ঋণের জালে বন্দি করেছে।

তারা উল্লেখ করেন যে, অনেক অভিবাসী মালয়েশিয়ায় পৌঁছে দেখেন প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ নেই এবং প্রায়ই তাদের ভিসাহীন থাকতে বাধ্য করা হয়। যার ফলে তাদের গ্রেপ্তার হয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে দুর্ব্যবহার এবং নির্বাসনের ঝুঁকিতে পড়তে হয়।

এ বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ায় কয়েক মাস বা তার বেশি সময় ধরে কর্মহীন বাংলাদেশি অভিবাসীদের অবস্থা খুবই নাজুক এবং অসম্মানজনক।

রানা প্লাজা ধসের ১১ বছর

শেষ হলো না খুনের মামলার বিচার

২৪ এপ্রিল ২০২৪, প্রথম আলো

ঢাকার উপকণ্ঠে সাভারের রানা প্লাজা ধসের ১১ বছরেও খুনের মামলার বিচার শেষ হয়নি। মামলার ৫৯৪ সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ৮৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। এত দিনেও বিচার শেষ না হওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগী শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা।

ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর বিমল সমাদ্দার প্রথম আলোকে বলেন, কয়েকজন আসামির পক্ষে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকায় দীর্ঘদিন মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ বন্ধ ছিল। এক বছরের বেশি সময় ধরে নিয়মিত সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, গত জানুয়ারিতে খুনের মামলাটি ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির চেষ্টা চালাচ্ছে রাষ্ট্রপক্ষ।

ইমারত আইনের মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ বন্ধ

রানা প্লাজা ভবন নির্মাণে ত্রুটি ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগে ২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল সোহেল রানাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। পরের বছর ২০১৬ সালের ১৪ জুন অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। তবে ওই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে কয়েকজন আসামি উচ্চ আদালতে আবেদন করেন।

অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আনোয়ারুল কবীর প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক আসামির পক্ষে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকায় মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ বন্ধ। বর্তমানে মামলাটি ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন।

অর্থনীতি

ডলার–সংকটের মধ্যে বিদেশি ঋণ শোধে চাপ আরও বাড়ছে

২৯ জানুয়ারি ২০২৪, প্রথম আলো

চলমান ডলার-সংকটের মধ্যে বিদেশি ঋণ পরিশোধে চাপ বাড়ছে। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং চীন, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে নেওয়া কঠিন শর্তের অনেক ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়েছে। এ কারণে দ্রুত বাড়ছে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ, যা আগামী বছরগুলোতে আরও বাড়বে।

সরকার ১০ বছর আগে বছরে যে পরিমাণ বিদেশি ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধ করত, এখন পরিশোধ করতে হয়েছে তার দ্বিগুণের বেশি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, যদি সরকার নতুন করে আর বিদেশি ঋণ না নেয়, তারপরও সাত বছর পরে ঋণ পরিশোধে বাংলাদেশকে এখনকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ অর্থ খরচ করতে হবে।

দ্বিপক্ষীয় ঋণ নিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা সেতুর রেল-সংযোগ, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বেশ কিছু বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আরও অনেক প্রকল্প হচ্ছে বিদেশি ঋণে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব ঋণ পরিশোধের সময়কাল কম। এসব ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ায় সার্বিক ঋণ পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তবে এসব ঋণে বাস্তবায়িত বড় প্রকল্পের সুফল পুরোপুরি পাওয়া শুরু হয়নি।

যেমন ১৮ হাজার কোটি টাকা খরচে চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ করা হয়। এতে ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি চীনা ঋণ নেওয়া হয়েছে। এই পথে এখন দিনে দুটি ট্রেন চলাচল করে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের সব মিলিয়ে ৩২৮ কোটি ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হবে। আগামী অর্থবছরে তা ৪০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে। পরের বছরগুলোতে ঋণ পরিশোধ বাড়তেই থাকবে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন শুরু হয়নি। ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়ে গেছে। ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে রাশিয়ার কাছ থেকে ১ হাজার ১৩৮ কোটি মার্কিন ডলার (১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন) ঋণ নেওয়া হচ্ছে, যা বর্তমান মূল্যে বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ।

বিদেশি ঋণ পরিশোধের এই চাপ বাড়ছে এমন সময়ে, যখন দেশ দীর্ঘ সময় ধরে ডলার-সংকটের মধ্যে রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভ কমছে। কারণ, প্রবাসী আয় কাঙ্ক্ষিত হারে আসছে না। রপ্তানি আয়ও আশানুরূপ নয়।

ডলার সংকটেও রপ্তানি প্রণোদনায় সংকোচন

৩১ জানুয়ারি ২০২৪, সমকাল

ডলার সংকটের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়ানোর জরুরি প্রয়োজন থাকলেও হঠাৎ রপ্তানিতে ব্যাপকভাবে প্রণোদনা কমিয়েছে সরকার। বস্ত্র ও পোশাক খাতে পাঁচ ধরনের পণ্যে নগদ সহায়তা পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় প্রায় ৫৬ শতাংশ রপ্তানি হয়। এ ছাড়া অন্য সব খাতে নগদ সহায়তার হার কমানো হয়েছে। এমন একসময়ে প্রণোদনায় বড় ধরনের সংকোচন করা হলো, যখন বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের বেতন বৃদ্ধি, সুদহার বেড়ে যাওয়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে চাপে আছেন উদ্যোক্তারা। ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ব্যবসায়ী ও ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, এমনিতেই চরম ডলার সংকট রয়েছে। সংকট কাটাতে রপ্তানিতে উৎসাহ দেওয়ার পরামর্শ আসছে। এর মধ্যে হঠাৎ করে এমন সিদ্ধান্তে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানিকারকরা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এতে রপ্তানি আরও কমতে পারে। সে ক্ষেত্রে ডলার সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

জানা গেছে, আশানুরূপ রাজস্ব আদায় না হওয়া, বিদেশি ঋণ কমাসহ বিভিন্ন কারণে সরকার এখন আর্থিক সংকটে আছে। যে কারণে বিভিন্ন খাতের প্রণোদনা ও পাওনা যথাসময়ে দিতে পারছে না সরকার। শুধু সার ও বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি বাবদ সরকারের কাছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাওনা রয়েছে ৪২ হাজার কোটি টাকার মতো। এর মধ্যে ব্যাংকগুলোর পাওনা ২৫ হাজার কোটি টাকা দায়দেনার বিপরীতে বন্ড ইস্যু করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে রপ্তানি প্রণোদনা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে বলা হয়েছে, বস্ত্র খাতের পাঁচটি এইচএস কোডের আওতায় রপ্তানি হওয়া পণ্যে কোনো নগদ সহায়তা দেওয়া হবে না। এইচএস কোডগুলো হলো– ৬১০৫, ৬১০৭, ৬১০৯, ৬১১০ এবং ৬২০৩। এই পাঁচটি কোডে বস্ত্র খাতের মোট ৫৬ শতাংশ রপ্তানি হয় বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। যেহেতু রপ্তানি আদেশ নেওয়ার সময় ভর্তুকিসহ হিসাব করে তারা পণ্যের দর নির্ধারণ করেন, ফলে কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়া সরকার মাঝপথে এসে এভাবে হঠাৎ ভর্তুকি তুলে নেওয়া এবং কমানোয় তারা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন।

তরুণদের ৪১% কাজে নেই, শিক্ষায়ও নেই

০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, প্রথম আলো

বাংলাদেশের প্রায় ৪১ শতাংশ তরুণ নিষ্ক্রিয়। মানে হলো তাঁরা পড়াশোনায় নেই, কর্মসংস্থানে নেই; এমনকি কোনো কাজের জন্য প্রশিক্ষণও নিচ্ছেন না। মেয়েদের মধ্যে নিষ্ক্রিয়তার হার বেশি, ৬১ দশমিক ৭১ শতাংশ। ছেলেদের মধ্যে এ হার কম, ১৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এই ধরনের তরুণের সংখ্যা বাড়ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস, ২০২২ প্রতিবেদনে নিষ্ক্রিয় তরুণের এই হার তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি গত বুধবার প্রকাশ করা হয়। বিবিএস নিষ্ক্রিয় তরুণের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে বয়সসীমা ধরেছে ১৫ থেকে ২৪ বছর। তাদের হার ধরে হিসাব করে দেখা যায়, নিষ্ক্রিয় তরুণের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২৯ লাখ।

অর্থনীতিবিদ ও শ্রমবাজারবিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেয়েদের বাল্যবিবাহ, কাজ পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাব, শিক্ষার মানে ঘাটতি, যথেষ্ট কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়া, শোভন কাজের অভাব ও সামাজিক পরিস্থিতি নিষ্ক্রিয় তরুণের হার বেশি হওয়ার কারণ।

যখন পাঙাশ মাছের কাঁটাই শেষ ভরসা

০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড অনলাইন বাংলা

আপনি যদি কখনো যাত্রাবাড়ি গিয়ে থাকেন তাহলে এলাকাটির ঠিক মাঝখানে অবস্থিত মাছ বাজারের কথা আপনার হয়তো জানার কথা।

এই বাজারের কিছু দোকানিকে দেখা যাবে পাঙাশ মাছের কাঁটা বিক্রি করতে। কাঁটাসহ মাছের মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত সম্পূর্ণ থাকলেও মাছ বলতে তেমন কিছুই থাকে না এতে। ছোট এই টুকরোগুলোর প্রতিটির দাম পড়ে ২০–৩০ টাকা।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এ বাজারে অনেক পরিবারের কাছে এখন এ কাঁটাই ভরসার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাজারে প্রতি কেজি পাঙাশ মাছের দাম ১৫০ থেকে ২২০ টাকারও বেশি। অনেকেরই একটি মাছ পুরোটা কেনার সামর্থ্য থাকে না। তাদের জন্য এই ছেঁটে ফেলা মাছই একমাত্র অবলম্বন। ক্রেতারা যারা এই মাছের কাঁটা কেনেন, তারা সাধারণত মুড়িঘণ্ট রান্নায় এটি ব্যবহার করে থাকে। একসময়ের বনেদি এ খাবারটি এখন নিয়মিত হয়ে গিয়েছে নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের পাতে।

স্থানীয়দের মতে, মাছের বাজারের পাইকারি মাছ সরবারহকারী ‘রাজীব ফিস সাপ্লাই’ এই ব্যবসার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় এখানকান ব্যবসায়ীদের।

রেস্তোরাঁগুলোতে কাঁটাবিহীন পাঙাশ বিক্রি হয় ৪০০ টাকা কেজি দরে। এসব মাছের বেঁচে যাওয়া কাঁটাগুলোই চলে আসে এই বাজারে।

দুই সন্তানের মা ৩৭ বছর বয়সি জেসমিন মাছের কাঁটা কিনতে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমার গোটা মাছ কেনার সামর্থ্য নেই। তাই মাছের এই অবশিষ্ট কাঁটাই কিনি। অন্তত মাছের ঘ্রাণ আর একটু স্বাদ তো পাওয়া যায়।’

মাছের মাংসল অংশ কেটে নেওয়ার পর খুবই সামান্যই থেকে যায় কাঁটার গায়ে। এর সঙ্গে ডাল মিশিয়ে তৈরি করা পাঙাশ মাছের মুড়িঘণ্ট। অনেক সময় এটিই জেসমিনের পরিবারের একমাত্র প্রোটিনের উৎস। জেসমিনের মতো আরও অনেক পরিবারেরই এমন অবস্থা।

রাজীব ফিস সাপ্লাইয়ের এক দোকানির ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি প্রতিদিন প্রায় ৫০০টির বেশি মাছের কাঁটা বিক্রি করেন।

৫৯ বছর বয়সি রিকশাচালক ইদ্রিস দুর্মূল্যের এই বাজারে সম্পূর্ণ পাঙাশ মাছ খাওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না। তাই নিরুপায় হয়ে পাঙাশ মাছের কাঁটা কিনতে তারও এই লাইনে দাঁড়ানো।

‘ঘরের সবাই প্রতিদিন ডিম খেতে খেতে বিরক্ত। তাই সপ্তাহে দুইবার কেনা হয় এ কাঁটাগুলো,’ বলছিলেন তিনি।

রফতানি তথ্যে সাত মাসে সাত বিলিয়ন ডলারের ফারাক

ফেব্রুয়ারি ০৬, ২০২৪, বণিক বার্তা

রফতানি পণ্যের চালান দেশ থেকে সমুদ্র, নৌ, আকাশ বা স্থলপথে বেরিয়ে যাওয়ার আগে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট নথির সঙ্গে তা যাচাই-বাছাই করে। নিয়ম অনুযায়ী বন্দরে পণ্যবাহী চালান পরিবহনের আগে কাস্টমস তথা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সফটওয়্যার অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে রফতানির তথ্য প্রবেশ করানো হয়। এ পদ্ধতিতে এনবিআরের হিসাব রক্ষণাবেক্ষণের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা অ্যাসাইকুডায় স্থান পায় রফতানির শুল্কায়ন মূল্য বা অ্যাসেসড ভ্যালু। কাস্টমস কর্তৃক সর্বশেষ সাত মাসে মোট রফতানির অ্যাসেসড ভ্যালু ২৬ বিলিয়ন ডলার। আবার গত ৪ ফেব্রুয়ারি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, এ সময়ে বাংলাদেশ থেকে রফতানি হয়েছে ৩৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। যদিও ইপিবির দাবি, এনবিআর তথা কাস্টমসের তথ্যের ভিত্তিতেই তারা এ পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে।

অ্যাসাইকুডার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সাত মাসে ৩৮ লাখ ৫২ হাজার ৫০৩ টন পণ্য রফতানি হয়েছে। এ পরিমাণ পণ্য রফতানির অর্থমূল্য ছিল ২ লাখ ৮৬ হাজার ৫২৪ কোটি ৬০ লাখ ৭২ হাজার ৮২০ টাকা। ডলারপ্রতি ১১০ টাকা বিনিময় হার ধরে হিসাব করলে অর্থমূল্যে রফতানির পরিমাণ দাঁড়ায় ২ হাজার ৬০৪ কোটি ৭৪ লাখ ৯১ হাজার ৫৭১ বা ২৬ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি।

দুই সংস্থার পরিসংখ্যানে ৭ বিলিয়ন ডলারের বৈসাদৃশ্যের কারণ নিয়ে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বৈদেশিক বাণিজ্যের পর্যবেক্ষকরা। তারা বলছেন, অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক রফতানির তথ্য নিয়ে এ ধরনের বিভ্রান্তি কাম্য নয়। বিষয়টি এখন জাতীয় অর্থনীতির লক্ষ্য নির্ধারণ, নীতি প্রণয়ন থেকে শুরু করে সার্বিক পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। পরিসংখ্যানের এ বড় ফারাক কোনোভাবেই কাম্য নয়। আবার উভয় তথ্যেরই উৎস এক দাবি করা হচ্ছে। এ অবস্থায় সরকারের গোটা বাণিজ্য পরিসংখ্যান নিয়েই বড় ধরনের অনাস্থা তৈরি হচ্ছে।

ঢাকা ওয়াসা

‘শ্বেতহস্তী’ প্রকল্পের বোঝা গ্রাহকের কাঁধে

০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, সমকাল

কাগজপত্রে ঢাকা ওয়াসা লাভজনক প্রতিষ্ঠান হলেও সেবার মান নিয়ে আছে নানা প্রশ্ন। অন্য বড় শহরগুলোর তুলনায় রাজধানীতে পানির দাম অনেক বেশি। তবে আবারও দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াসা শ্বেতহস্তীর মতো কিছু প্রকল্প নিয়েছে। সেগুলোর ঋণের কিস্তি পরিশোধ করার জন্য পানির দাম বাড়ানো হয়। কর্তৃপক্ষের দুর্নীতি, প্রকল্প বাস্তবায়নে অস্বচ্ছতাসহ ব্যর্থতার দায় কেন সাধারণ মানুষ নেবে?

দেশে পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ওয়াসা) আছে চারটি। এগুলোর পানি উৎপাদন খরচ প্রায় একই রকম। ঢাকা ওয়াসা বিদেশি ঋণে কয়েকটি বড় প্রকল্প নিয়েছে। এগুলো থেকে যে পরিমাণ পানি পাওয়ার কথা, তা পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে ঋণের কিস্তি শুরু হয়ে গেছে। এই কিস্তির টাকা যুক্ত করে পানির উৎপাদন খরচ নির্ধারণ করা হয়। এ কারণেই দাম বাড়ছে।

চারটি ওয়াসার পানির উৎপাদন খরচের হিসাব নিয়েও আছে নানা প্রশ্ন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পানি উৎপাদন খরচে তেমন পার্থক্য না থাকলেও কাগজপত্রে থাকে অনেক ফারাক। ঢাকা ওয়াসার প্রতি ইউনিট (১ হাজার লিটার) পানির উৎপাদন খরচ ২৫ টাকা। আবাসিক গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে ১৫ টাকা ৯৮ পয়সা। বাণিজ্যিক গ্রাহককে গুনতে হয় ৪২ টাকা। খুলনা ওয়াসার উৎপাদন খরচ ১৬ টাকা ৫০ পয়সা।

আবাসিকে বিক্রি করে ৮ টাকা ৯৮ পয়সা। বাণিজ্যিক মূল্য ১৪ টাকা। রাজশাহী ওয়াসার উৎপাদন খরচ ৮ টাকা ৯০ পয়সা। আবাসিকে ৬ টাকা ৮১ পয়সা, বাণিজ্যিকে ১৩ টাকা ৬২ পয়সায় বিক্রি করে। রাজশাহীর সঙ্গে ঢাকা ওয়াসার উৎপাদন খরচের ব্যবধান প্রতি ইউনিটে ১৬ টাকার বেশি। বিক্রির ব্যবধান আবাসিকে ১০ টাকা ও বাণিজ্যিকে ২৮ টাকার বেশি। চট্টগ্রাম ওয়াসার উৎপাদন খরচ ১৯ টাকা। তাদের ৯০ শতাংশ পানিই ভূউপরিস্থ উৎসের এবং তা শোধন করা হয়। তারা আবাসিকে বিক্রি করছে ১৮ টাকা। তবে বাণিজ্যিকে ঢাকা ওয়াসার চেয়ে ৫ টাকা কমে ৩৭ টাকায় বিক্রি করছে।

ঢাকা ওয়াসার উৎপাদিত পানির ৭৫ শতাংশ গভীর নলকূপের। বাকি ২৫ শতাংশ পাওয়া যায় ভূউপরিস্থ উৎস থেকে শোধনের মাধ্যমে। শোধন করা পানির উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি। সে বিবেচনায় ঢাকার পানির দাম চট্টগ্রামের তুলনায় বেশি। খুলনায় ৬০ শতাংশ পানি শোধন করা হয়। রাজশাহীতে ৯০ শতাংশ পানি আসে গভীর নলকূপ থেকে। খুলনা ওয়াসার পানির দামও ঢাকার তুলনায় অনেক কম। এ ছাড়া মানের বিবেচনায় ঢাকা ওয়াসার পানি সবচেয়ে নিম্ন বলে অভিযোগ আছে। সরবরাহ ব্যবস্থায়ও আছে ত্রুটি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা ওয়াসার একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিদেশি ঋণে নেওয়া মেগা প্রকল্পগুলোর ঋণের কিস্তি শুরু হয়ে গেছে। কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে যে অর্থ প্রয়োজন, তা পানির দাম বাড়িয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করে সমন্বয় করতে হচ্ছে।

বন্ধ হয়ে গেল ব্যক্তিগত পেনশন বিমা পলিসি

০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, প্রথম আলো

দীর্ঘদিন ধরে জীবন বীমা করপোরেশনের (জেবিসি) সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিমা পলিসির নাম ছিল ‘ব্যক্তিগত পেনশন বিমা পলিসি।’ যেকোনো শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য এ ব্যবস্থা চালু ছিল। কিন্তু সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু হওয়ায় এ পলিসি এখন ইতিহাস হয়ে গেছে। কারণ, জেবিসি গত ১ ডিসেম্বর থেকে এটাকে চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে।

জেবিসির মহাব্যবস্থাপক হান্নানুর রশীদ স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত পেনশন বিমা পলিসি অলাভজনক। এ কারণে অ্যাকচুয়ারিয়াল পরামর্শক পলিসিটির বিপণন বন্ধ করার সুপারিশ করেছেন। ফলে এর বিক্রি কার্যক্রম বন্ধ করা হলো। এ সুপারিশ জেবিসির পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদন করেছে বলে গত বছরের ২৮ নভেম্বর সংস্থার এক অফিস আদেশে সবাইকে জানানো হয়েছে।

দেশে অবস্থানরত বিদেশীর সংখ্যা ১ লাখের ওপরে সবচেয়ে বেশি ভারত-চীনের

ফেব্রুয়ারি ০৭, ২০২৪, বণিক বার্তা

বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক বিদেশী নাগরিক কর্মরত রয়েছেন। তাদের অনেকেরই কাজের অনুমতি নেই। কিন্তু এ বিদেশীদের হাত ধরে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। আবার কর ফাঁকির কারণে রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। পাশাপাশি সংকুচিত হচ্ছে স্থানীয়দের কাজের সুযোগ। এ পরিস্থিতি উন্নয়নে কাজ শুরু করেছে সরকার। প্রাথমিকভাবে ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে অবস্থানরত বিদেশীদের একটি পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, দেশে অবস্থানরত বিদেশীদের সংখ্যা ১ লাখ ৭ হাজার ১৬৭। তাদের বেশির ভাগই ভারত ও চীনের নাগরিক।

কাজের অনুমতি ছাড়াই বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশী কর্মী বা নাগরিকদের বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে গতকাল রাজধানীতে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) আয়োজনে আগারগাঁওয়ের বিনিয়োগ ভবনে আয়োজিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া। সভায় অনুমতি ছাড়া দেশে অবস্থানরত বিদেশী কর্মী বা নাগরিকদের বিষয়ে করণীয় নির্ধারণের লক্ষ্যে বিভিন্ন সুপারিশ ও মতামত তুলে ধরা হয়।

রিজার্ভ থেকে অর্থ জমা রেখে আইটিএফসি থেকে ঋণ

ফেব্রুয়ারি ০৮, ২০২৪, বণিক বার্তা

ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) সহযোগী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইটিএফসি) সঙ্গে ২১০ কোটি ডলারের একটি ঋণ চুক্তি করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এ চুক্তির আওতায় জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে পারবে বাংলাদেশ। আইটিএফসির সঙ্গে এ ঋণ চুক্তিতে উল্লিখিত অর্থের ৭৬ শতাংশের অর্থের জোগান দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এজন্য ঋণ তহবিলটিতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে জমা হবে ১৬০ কোটি ডলার। আর আইটিএফসির কাছ থেকে পাওয়া যাবে বাকি ৫০ কোটি। প্রসঙ্গত, সদস্য মুসলিম দেশগুলোর জ্বালানি খাতে ঋণসহায়তা দিয়ে থাকে আইটিএফসি। এক্ষেত্রে সংস্থাটি সবসময় অর্থায়ন করে কো-ফাইন্যান্সের ভিত্তিতে। এজন্য ঋণ তহবিলে গ্রহীতা দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ অর্থায়ন থাকতে হয়।

সংস্থাটির সঙ্গে গতকালের চুক্তিটি সইয়ের পর এটিকে স্বাগত জানিয়েছেন জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা। যদিও অর্থনীতিবিদ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এটি হলো অনেকটা নিজেদের রিজার্ভ থেকেই নিজেরা ঋণ নেয়া। এ চুক্তির আওতায় অতিরিক্ত হিসাবে আইটিএফসির কাছ থেকে প্রকৃতপক্ষে ঋণ সহায়তা পাওয়া যাবে কেবল ৫০ কোটি ডলার। যেখানে দেশের রিজার্ভ আটকা পড়বে ১৬০ কোটি ডলার। নতুন এ চুক্তির ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার নিট রিজার্ভ আরো চাপে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পিপিপিতে সংস্কার হবে সিইটিপি

০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, প্রথম আলো

ঢাকার সাভারের চামড়াশিল্প নগরের কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের (সিইটিপি) নকশাতেই ত্রুটি ছিল। এর কিছু যন্ত্রপাতি ইতিমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে, কিছু যন্ত্রপাতির জীবনকালও এখন শেষ পর্যায়ে। আবার গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলোর কার্যক্ষমতা কমে গেছে। সে জন্য যথাযথ মাত্রায় পরিশোধন করা যাচ্ছে না বর্জ্য। এ ছাড়া কিছু ট্যানারি প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ আছে।

সচিবালয়ে গতকাল বুধবার অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এসব তথ্য তুলে ধরেন শিল্পসচিব জাকিয়া সুলতানা। তিনি বলেন, এসব কারণে চামড়াশিল্পে ইউরোপীয় মান নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ অর্জন করা যাচ্ছে না। এসব কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে।

শিল্পসচিব তাই ‘কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের সংশোধন ও মানোন্নয়ন এবং বিসিক চামড়াশিল্প নগর, ঢাকায় কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্থাপন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার সভাপতিত্বে গত বছরের অক্টোবরে এক বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে তিনি দাবি করেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে হবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) ভিত্তিতে।

রেশমশিল্প নিভু নিভু

১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, সমকাল

কর্মসংস্থানের পাশাপাশি রেশম চাষ বৃদ্ধি ও জনপ্রিয় করতে গত এক দশকে শতকোটি টাকার তিনটি প্রকল্পের কাজ হয়েছে। তবে রেশম উৎপাদন বৃদ্ধিতে তা কোনো কাজে আসেনি। দেশে বর্তমানে রেশম সুতার চাহিদা রয়েছে ৪০০ টন। তবে সরকারিভাবে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র এক থেকে দেড় টন। বেসরকারিভাবে উৎপাদন হয় আরও তিন থেকে চার টন। তবে রেশম উন্নয়ন বোর্ড তাদের ‘গোঁজামিলে’র হিসাবে দাবি করছে, দেশে ৪১ টন সুতা উৎপাদনের।

এদিকে, সরকারিভাবে পরিচালিত দুটি রেশম কারখানায় লুম বা তাঁত রয়েছে ৬২টি। এর মধ্যে রাজশাহীর কারখানার ৪২টির মধ্যে চালু থাকে পাঁচ থেকে ছয়টি। তবে পর্যায়ক্রমে ১৯টি চালু রাখা হয়। অন্যদিকে, ঠাকুরগাঁওয়ের ২০টি পাওয়ার লুমের কারখানাটি পাঁচ বছরের জন্য গত মে মাস থেকে বেসরকারিভাবে পরিচালনার জন্য লিজ দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ী ও বেসরকারি কারখানার মালিকরা জানান, দেশে রেশম সুতার চাহিদা পূরণ করা হয় বিদেশ থেকে বিশেষ করে চীন থেকে আমদানি করা সুতায়। তবে সুতা সংকটে রাজশাহীর ৭৬টি কারখানার মধ্যে ৫৮টি বন্ধ রয়েছে দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ ধরে। বিদেশি সুতায় কোনো রকম টিকে আছে অবশিষ্ট কারখানাগুলো। এগুলোও নিভু নিভু অবস্থায় চলে একবেলা বা আধবেলা। ফলে দিন দিন বেকার হচ্ছেন রেশম শিল্পের কারিগররা। ঐতিহ্য হারাচ্ছে রাজশাহীর রেশম শিল্প।

দেশে অতিধনী, অতিদরিদ্র পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে

১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, সমকাল

দারিদ্র্য বিমোচনে নানামুখী উদ্যোগ আছে সরকারের। কয়েক বছর ধরে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো হয়েছে। নতুন নতুন কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থ বরাদ্দও দেওয়া হচ্ছে আগের চেয়ে বেশি। তারপরও দেশে অতিদরিদ্র পরিবারের হার বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে অতিধনী পরিবারের সংখ্যাও।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএসের) স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস জরিপের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসে এসেছে। এতে দেখা যায়, ২০২২ সালে দেশের ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবার ছিল অতিধনী। আগের বছর এটা ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে গ্রাম এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় অতিদরিদ্র পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে। অবশ্য, দেশের সামগ্রিকভাবে অতিদরিদ্র পরিবারের হার জানায়নি বিবিএস।

চাহিদার মাত্র ৩৮% ডাল উৎপাদন, উদ্যোগ নেই আবাদ বাড়ানোর

১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, সমকাল

বছরজুড়ে প্রায় ২৬ লাখ টনের চাহিদা থাকলেও দেশে মাত্র ১০ লাখ টন ডাল উৎপাদন হচ্ছে, যা চাহিদার মাত্র ৩৮ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে প্রতিবছর অর্ধেকেরও বেশি বিদেশ থেকে আনতে হচ্ছে। বছরে ১৩ থেকে ১৪ লাখ টন ডাল আমদানিতে ব্যয় হয় প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা। উৎপাদন কম হওয়ায় সব রকম ডালের দামই এখন বেশি। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের অন্যতম ভরসার এই খাদ্যপণ্যও নাগালে নেই। এবার রমজানের আগে বেড়েছে সব ধরনের ডালের দাম। গেল এক মাসে মসুর ডালের দাম বেড়েছে ২৬ শতাংশ পর্যন্ত। আমদানিকারকরা বলছেন, ডলার সংকট আর এলসি জটিলতায় চাহিদার তুলনায় আমদানি কম হচ্ছে। এ কারণে শেষ কয়েক মাস ধরেই দাম ঊর্ধ্বমুখী। তবুও ডালের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির তেমন উদ্যোগ নেই।

এখনও আর্থিক হিসাবে বড় ঘাটতিতে দেশ

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, সমকাল

আমদানি কমাতে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা অব্যাহত আছে। রপ্তানি আয়ে সামান্য হলেও প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এতে করে বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে। প্রবাসী বা রেমিট্যান্স আয়ও কিছুটা বেড়েছে। ফলে বহির্বিশ্বের সঙ্গে চলতি হিসাবে এখন আর ঘাটতি নেই। তবে প্রত্যাশিত অনুযায়ী বিদেশি ঋণের ছাড় না হওয়া, ঋণ পরিশোধ বেড়ে যাওয়া, বিনিয়োগ কমাসহ বিভিন্ন কারণে আর্থিক হিসাবে বড় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। গত ডিসেম্বর শেষে আর্থিক হিসাবে ঘাটতি রয়েছে ৫ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন বা ৫৩৯ কোটি ডলার। অথচ গত বছরের একই সময়ে এ হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল ১৪ কোটি ডলার। আর্থিক হিসাবের বড় ঘাটতির কারণে সামগ্রিক লেনদেনেও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। সামগ্রিক লেনদেন পরিস্থিতির উন্নতির ওপর ডলার সংকটের সমাধানের অনেকটাই নির্ভর করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক গতকাল চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের ব্যালান্স অব পেমেন্ট বা বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যের হিসাব প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যাচ্ছে, প্রথম ৬ মাসে আমদানি ১৯ দশমিক ৮০ শতাংশ কমে ৩০ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। একই সময়ে রপ্তানি শূন্য দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়ে ২৫ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। এতে বাণিজ্য ঘাটতি কমে এখন ৫ দশমিক ৬০ বিলিয়ন বা ৫৬০ কোটি ডলারে নেমেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ১২ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার।

পোশাকের ৫ পণ্যের প্রণোদনা পুনর্বহাল

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, প্রতিদিনের বাংলাদেশ

পোশাক রপ্তানিকারকদের আপত্তির মুখে ভর্তুকি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন এনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ধাপে ধাপে ভর্তুকি প্রত্যাহারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল সেটি বহাল থাকলেও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সময়সীমা তথা রোডম্যাপেও পরিবর্তন এসেছে। এতে নিট কাপড়ের টি-শার্ট, শার্ট, ট্রাউজার, ওভেন কাপড়ের জ্যাকেট ও ব্লেজার পোশাক খাতের এই পাঁচটি পণ্য ভর্তুকি ফিরে পেয়েছে। বাকি পণ্যেরর ক্ষেত্রে সময় বেড়েছে এক মাস।

এর আগে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তৈরি পোশাক ও চামড়াসহ ৪৩ খাতের রপ্তানি পণ্যে প্রণোদনা কমানোর সিদ্ধান্ত হয়। এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সরকারের এমন সিদ্ধান্তকে অর্থনীতিবিদরা সাধুবাদ জানালেও আপত্তি তোলে ব্যবসায়ীরা। রপ্তানিকারকদের দাবির মুখে অবশেষে কিছুটা পরিবর্তন  করে ফের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আগের সিদ্ধান্তের ১২ দিন পর সোমবার (১২ ফেব্রুয়ারি) প্রণোদনা কমানোর সিদ্ধান্ত কার্যকরের সময় এক মাস বাড়িয়ে জানুয়ারির বদলে ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকরের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ। এতে সবপণ্যই রপ্তানির বিপরীতে আরও এক মাস আগের হারেই নগদ সহায়তা পাবে।

এ ছাড়া পোশাক খাতের পাঁচটি পণ্যের রপ্তানির বিপরীতে প্রণোদনা আগামী জুন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে বলে সার্কুলারে বলা হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, পুরুষদের শার্ট (এইচএস কোড ৬১০৫), পুরুষদের অর্ন্তবাস ও রাতে ব্যবহৃত শার্ট, পাজামা, গোসলের আগে ও পরে ব্যবহৃত পোশাক (এইচএস কোড ৬১০৭), টি-শার্ট, শরীর চর্চার জন্য আটসাঁটো জাতীয় পোশাক (এইচএস কোড ৬১০৯), জার্সি, কার্ডিগান, ওয়েস্ট কোটস জাতীয় পোশাক (এইচএস কোড ৬১১০), পুরুষদের জ্যাকেট, স্যুট, ব্লেজার, ট্রাউজারস, শিশুদের গলাবন্ধনী, ব্রেসওয়ারঅলস, ব্রিচেস অ্যান্ড শর্টস (সাঁতারের পোশাক বাদে) জাতীয় পোশাকে (এইচএসব কোড ৬২০৩) রপ্তানি প্রণোদনা ও নগদ সহায়তা অব্যাহত থাকবে।

গত ৩০ জানুয়ারি এ কয়টি খাতের পোশাকের ওপর রপ্তানির বিপরীতে প্রণোদনা ও নগদ সহায়তা তুলে নিয়েছিল সরকার।

এরপর পোশাক খাতের রপ্তানিকারকরা এ প্রণোদনা তুলে দেওয়া নিয়ে আপত্তি তোলেন। তারা এতে পোশাক খাত চাপে পড়বে বলে দাবি করেন। এ নিয়ে সরকার প্রধানসহ নীতি নির্ধারকদের সঙ্গেও দেখা করেন এ খাতের ব্যবসায়ী নেতারা।

সরকার গত অগাস্টে চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য প্রণোদনার হার নির্ধারণ করে দিয়েছিল। পরে ৩০ জানুয়ারি সার্কুলারের মাধ্যমে কিছু খাতে প্রণোদনা তুলে দিয়ে রপ্তানির বিপরীতে নগদ সহায়তার পরিমাণ কমানো হয়। অর্থবছরের বাকি সময়ের জন্য প্রণোদনার নতুন হারের তালিকাও সেদিন প্রকাশ করা হয়।

সেই তালিকা অনুযায়ী, শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ থেকে স‌র্বোচ্চ ১৫ শতাংশ প্রণোদনা পাবেন রপ্তানিকারকরা, আগে যা ছিল ১ শতাংশ থেকে স‌র্বোচ্চ ২০ শতাংশ।

ডলার–সংকটে আটকে গেছে বিদেশি কোম্পানির লভ্যাংশ

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, প্রথম আলো

ডলার–সংকটের কারণে আটকে গেছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক তিন কোম্পানির ২২০ কোটি টাকার লভ্যাংশ বিতরণ। এক বছরের বেশি সময় ধরে চেষ্টা করেও আটকে থাকা এ লভ্যাংশ বিদেশি মালিকদের কাছে পাঠাতে পারছে না বাংলাদেশে কার্যক্রম চালানো কোম্পানি তিনটি।

এই তিন কোম্পানির বাইরে দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আরও দুটি কোম্পানির ৮১৬ কোটি টাকা দীর্ঘ সময় আটকে থাকার পর সম্প্রতি এই অর্থ তারা তাদের বিদেশি মালিকদের কাছে পাঠাতে পেরেছে।

তবে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি এবং আকাশপথে পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বিদেশি বিমান সংস্থার বড় অঙ্কের মুনাফার প্রত্যাবাসনও বেশ দীর্ঘ সময় ধরে আটকে আছে। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা বা আইএটিএর গত জুনে প্রকাশ করা সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বিদেশি বিভিন্ন বিমান সংস্থার ২১ কোটি ৪১ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় ২ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা বাংলাদেশে আটকে আছে। এর বড় অংশই বিমানের টিকিট বিক্রি বাবদ পাওয়া অর্থ, যা তারা বিদেশের মূল কোম্পানিতে ফেরত নিতে পারছে না।

জানা গেছে, শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত নয় এমন একটি শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক কোম্পানির বড় অঙ্কের মুনাফাও কয়েক বছর ধরে আটকে আছে। প্রতিষ্ঠানটি এ মুনাফার অর্থ বিদেশে পাঠাতে কয়েক দফায় ডলার জোগাড়ের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। পরে বিদেশি মালিকদের সঙ্গে কথা বলে আপাতত মুনাফার অর্থ দেশে রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কোম্পানিটির এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা কয়েকবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে এখন এটিকে অগ্রাধিকার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছি। কারণ, আমরা বুঝতে পারছি ডলার–সংকট পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এ সমস্যার সমাধান হবে না।’

তালিকাভুক্ত কোম্পানির দেশীয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে লভ্যাংশের অর্থ বিতরণে কোনো অসুবিধা না হলেও সমস্যা দেখা দিয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় থাকা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে।

নিয়ম অনুযায়ী, আর্থিক বছর শেষে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো যে লভ্যাংশ ঘোষণা করে, তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ারধারীদের মধ্যে বিতরণ করতে হয়। ঘোষিত এই লভ্যাংশ কোম্পানিটির বার্ষিক সাধারণ সভা বা এজিএমে অনুমোদনের ৩০ দিনের মধ্যে বিতরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। শেয়ারধারীদের প্রাপ্য এ অর্থ কোম্পানির পক্ষ থেকে আলাদা একটি ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। পরে ব্যাংক বিনিয়োগকারীদের নিজ নিজ হিসাবে সেই অর্থ স্থানান্তরিত করে।

কিন্তু বহুজাতিক কয়েকটি কোম্পানি তাদের মালিকানায় থাকা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে লভ্যাংশ পাঠাতে পারেনি দীর্ঘ সময় ধরে চলা ডলার– সংকটের কারণে। ব্যাংকগুলো ডলার সরবরাহ করতে না পারায় লভ্যাংশের এ অর্থ এখন দেশেই আটকে আছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে মুনাফার টাকা এভাবে আটকে থাকলে তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে এ দেশ সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা দেয়। ফলে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি শেয়ারবাজারে বিদেশি পোর্টফোলিও (পত্রকোষ) বিনিয়োগকেও তা প্রভাবিত করে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এ দেশে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হন। এ ছাড়া দীর্ঘদিন মুনাফা আটকে থাকলে এর প্রকৃত সুবিধাভোগীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। কারণ, এ সময়ে টাকা অবমূল্যায়িত হলে তাদের মুনাফার পরিমাণ কমে যায়।

বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিদেশি কোম্পানিগুলোর সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি বা ফরেন চেম্বার) সাবেক সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী অবশ্য মনে করেন, আগের চেয়ে এখন পরিস্থিতির বেশ উন্নতি হয়েছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে ধাপে ধাপে লভ্যাংশ পাঠানোর সুযোগ পাচ্ছে বিদেশি কোম্পানিগুলো। ডলার না পাওয়ার কারণে কিছুটা সমস্যা হওয়ায় অনেকে অন্য মুদ্রায় লভ্যাংশ বিদেশে মালিকদের কাছে পাঠাচ্ছে। তাতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না।

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য থেকে জানা যায়, বর্তমানে বহুজাতিক তিনটি কোম্পানির মোট ২২০ কোটি টাকার লভ্যাংশ দেশেই আটকে আছে। এই কোম্পানি তিনটি হলো বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ, ম্যারিকো বাংলাদেশ এবং রেকিট বেনকাইজার বাংলাদেশ।

যাদের লভ্যাংশ আটকে আছে

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য থেকে জানা যায়, বর্তমানে বহুজাতিক তিনটি কোম্পানির মোট ২২০ কোটি টাকার লভ্যাংশ দেশেই আটকে আছে। এই কোম্পানি তিনটি হলো বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ, ম্যারিকো বাংলাদেশ এবং রেকিট বেনকাইজার বাংলাদেশ। এর মধ্যে বার্জারের সর্বোচ্চ ১৩৬ কোটি ৪০ লাখ, ম্যারিকোর ৪৫ কোটি ৩৩ লাখ এবং রেকিট বেনকাইজারের ৩৮ কোটি ৪২ লাখ টাকা আটকে আছে।

জানতে চাইলে বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের কোম্পানি সচিব খন্দকার আবু জাফর সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, ২০২২ সাল থেকে দেশে ডলার–সংকট শুরু হওয়ার পর বিদেশি মালিকদের লভ্যাংশ পাঠানো ক্ষেত্রে আমরা সমস্যায় পড়েছি। এ কারণে বেশ কিছু লভ্যাংশ আটকে আছে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জসহ (ডিএসই) একাধিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে কোম্পানিগুলো তাদের লভ্যাংশ বিতরণ–সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সেসব প্রতিবেদনের পাশাপাশি কোম্পানিগুলো সর্বশেষ আর্থিক যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে এসব বণ্টন না হওয়া লভ্যাংশকে অপ্রদেয় বা আনপেঅ্যাবল হিসাবে দেখানো হয়েছে। একাধিক সূত্রে প্রাপ্ত প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

এর বাইরে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত টেলিকম খাতের বহুজাতিক কোম্পানি গ্রামীণফোন এবং রবি আজিয়াটার প্রায় ৮১৬ কোটি টাকার লভ্যাংশ ডলার–সংকটের কারণে দীর্ঘদিন দেশে আটকে ছিল। এর মধ্যে ছিল গ্রামীণফোনের ৫৩৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ও রবি আজিয়াটার ২৮০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। সম্প্রতি এ দুটি কোম্পানি লভ্যাংশের এ অর্থ বিদেশে মালিক প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠিয়েছে বলে কোম্পানি দুটি জানিয়েছে।

তবে সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষে কোম্পানি দুটি যে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে এ অর্থ অপ্রদেয় লভ্যাংশ হিসেবে দেখানো হয়েছিল।

গ্রামীণফোনের যোগাযোগ বিভাগের প্রধান শারফুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০২২ সালের জন্য আমরা যে লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিলাম, তার মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রা–সংকটের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশটি পাঠাতে দেরি হয়েছে। সম্প্রতি আমরা লভ্যাংশের এ অর্থ বিতরণ সম্পন্ন করেছি।’

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানি ১১টি। এর মধ্যে পাঁচটি কোম্পানি গত বছর বিদেশি মালিকদের কাছে তাদের প্রাপ্য লভ্যাংশের অর্থ পাঠাতে সমস্যায় পড়ে। বিদেশি মালিকানাধীন এসব প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ সাধারণত কোম্পানিগুলো ডলারে পাঠিয়ে থাকে।

গ্রামীণফোনের শেয়ারের ৫৫ দশমিক ৮০ শতাংশের মালিকানা রয়েছে নরওয়েভিত্তিক টেলিনর মোবাইল কমিউনিকেশনসের হাতে। রবি আজিয়াটার ৯০ শতাংশ শেয়ারের মালিক মালয়েশিয়াভিত্তিক আজিয়াটা ইনভেস্টমেন্টস (লাবুয়ান) লিমিটেড ও সিঙ্গাপুরভিত্তিক ভারতী ইন্টারন্যাশনাল পিইটি লিমিটেড। বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের ৯৫ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা রয়েছে জে অ্যান্ড এন ইনভেস্টমেন্টসের (এশিয়া) হাতে। রেকিট বেনকাইজারের প্রায় ৮৩ শতাংশ শেয়ারের মালিকানায় রয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মূল কোম্পানি। এ ছাড়া ম্যারিকো বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা রয়েছে ভারতের ম্যারিকো লিমিটেডের হাতে।

কোম্পানিগুলোর মালিকানায় থাকা বিদেশি এসব প্রতিষ্ঠান প্রতিবছর কোম্পানির মুনাফার ভাগ পান লভ্যাংশ হিসেবে। যেহেতু কোম্পানিগুলোর মালিকানার বড় অংশই বিদেশিদের হাতে, তাই ঘোষিত লভ্যাংশের সিংহভাগই চলে যায় এই মালিকদের কাছে।

ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবে মাদারীপুরের ৩ যুবকের মৃত্যু, নিখোঁজ ১

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, বাংলা ট্রিবিউন

অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ইতালি যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে তিউনিশিয়ার জলসীমায় নৌকাডুবে মাদারীপুরের তিন যুবক মারা গেছেন। এদের মধ্যে একজন সদর উপজেলার এবং অন্য দুজন রাজৈর উপজেলার বাসিন্দা। এছাড়া জেলার মকসুদপুর উপজেলার আরেক যুবক এখন নিখোঁজ রয়েছেন। নিহতদের স্বজনরা এসব তথ্য জানিয়েছেন।

শুক্রবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ওই ৩ যুবকের মৃত্যুর খবর আসলে এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। আদরের সন্তানদের হারিয়ে দিশেহারা পরিবার। এ ঘটনায় দালালের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন স্বজন ও এলাকাবাসী।

গত ১৫ বছরে ২৬ বিলিয়ন আগের ৩৬ বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার

ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৪, বণিক বার্তা

২০০৮-০৯ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত সরকার বৈদেশিক ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধ করেছে ২৬ দশমিক শূন্য ৯ বিলিয়ন (২ হাজার ৬০৯ কোটি) ডলার। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩-৭৪ থেকে ২০০৭-০৮ অর্থবছর পর্যন্ত ৩৬ বছরে পরিশোধ করেছে প্রায় ১৬ দশমিক ১ বিলিয়ন (প্রায় ১ হাজার ৬১০ কোটি) ডলার। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দেড় দশকে সরকারকে বৈদেশিক ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে আগের ৩৬ বছরের তুলনায় ৬২ শতাংশ বেশি।

ইআরডির সর্বশেষ প্রকাশিত ‘‌ফ্লো অব এক্সটারনাল রিসোর্সেস’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে (২০২২-২৩) রেকর্ড সর্বোচ্চ পরিমাণ ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধ করেছে সরকার। এ সময় শুধু মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে আড়াই বিলিয়ন ডলারের বেশি, যার পরিমাণ দাঁড়ায় ২৬৭ কোটি ১৭ লাখ ডলারে। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্বল্পমেয়াদি ঋণ যুক্ত করে তা দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি। সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে সরকারকে বৈদেশিক ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে ৩৬৬ কোটি ৪৪ লাখ ডলার।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে সরকারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ সাড়ে ৪ থেকে সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে রাজস্ব ও রেমিট্যান্সসহ বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ না বাড়াতে পারলে এসব ঋণ সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

তিউনিসিয়া উপকূলে নিহত ৯ জনের অধিকাংশই বাংলাদেশি

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, সমকাল

লিবিয়া থেকে নৌকায় সাগরপথে ইউরোপ যাওয়ার সময় তিউনিসিয়ার উপকূলে নিহত ৯ অভিবাসীর অধিকাংশই বাংলাদেশের নাগরিক। বি‌ভিন্ন সূত্রে তা জানতে পেরেছে লি‌বিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস। ফেসবুক পোস্টে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

শ‌নিবার দূতাবাস জানায়, ১৫ ফেব্রুয়ারি লিবিয়া উপকূল থেকে ৫২ জনের একদল অভিবাসী সাগরপথে ইউরোপ যাত্রাকালে তিউনিসিয়ার উপকূলে তাদের বহনকারী নৌকাটিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। পরে তিউনিসিয়ার নৌবাহিনী নৌকাটি থেকে ৯ অভিবাসীর মৃতদেহ এবং ৪৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করে। জীবিত উদ্ধার হওয়া অভিবাসীদের মধ্যে ২৬ জন বাংলাদেশের নাগরিক এবং তাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণকারী অধিকাংশই বাংলাদেশি।

৮৭% ধনী ও উচ্চমধ্যবিত্ত কর দেন না

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, প্রথম আলো

দেশে ধনী ও উচ্চমধ্যবিত্ত মানুষদের ৮৭ শতাংশ কোনো ধরনের আয়কর দেন না, যা খুবই অগ্রহণযোগ্য। এই অবস্থার নিরসন করতে হবে।

গতকাল রোববার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আয়োজিত প্রাক্-বাজেট আলোচনায় বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি এসব কথা বলেছে। অর্থনীতি সমিতি আরও বলেছে, ‘এ দেশে ১৮ লাখ মানুষ কর দেন। তাঁদের মধ্যে ১০ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং অন্যান্য চাকরিতে নিয়োজিত আছেন। আমাদের হিসাবে, দেশে ধনী ও উচ্চমধ্যবিত্তদের মধ্যে আয়কর প্রদানকারীর সংখ্যা ৯-১০ লাখ হবে। এই সংখ্যা হওয়ার কথা ৭৮ লাখ ৩২ হাজার। এর মানে, ধনী ও উচ্চমধ্যবিত্তদের ৮৭ শতাংশ কোনো ধরনের আয়কর দেন না।’

রাজস্ব আদায়ের তুলনায় বাড়ছে সরকারের ঋণের বোঝা

২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, প্রথম আলো

রাজস্ব আদায়ের তুলনায় সরকারের ঋণের বোঝা বেড়ে চলেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) যত টাকার রাজস্ব আদায় করছে, তার অর্ধেকের বেশি পরিমাণ অর্থ আবার সরকারকে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ করতে হচ্ছে। প্রতিবছরই সরকারের উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন ব্যয় বাড়ছে। কিন্তু যথেষ্ট পরিমাণ রাজস্ব আদায় না হওয়ার কারণে সরকারকে ঋণ করে বাড়তি খরচ মেটাতে হচ্ছে। ফলে রাজস্ব আদায়ের অনুপাতে সরকারের ঋণের হার বাড়ছে, পাশাপাশি বাড়ছে ঋণ পরিশোধের চাপও।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, দেশে কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ১০ শতাংশের নিচে। দুই দশক ধরেই কর-জিডিপি অনুপাত পরিস্থিতি ভালো নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় কর আদায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। জিডিপির আকার যেভাবে বাড়ছে, সেই গতিতে রাজস্ব আদায় বাড়ছে না। জিডিপির তুলনায় কর আহরণের দিক থেকে বিশ্বে যেসব দেশ সবচেয়ে পিছিয়ে আছে, বাংলাদেশ তার একটি।

এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১০ বছরের ব্যবধানে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের অনুপাতে দেশি-বিদেশি ঋণের পরিমাণ ৯ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে। এর মানে, প্রতিবছর সরকারের ঋণ নেওয়া কেবল বেড়েই চলেছে। তিন-চার বছর ধরে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।

বাংলাদেশ সরকার বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাপান, চীন, রাশিয়া, ভারতের মতো দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে বেশি ঋণ নেয়। বেশির ভাগ ঋণ নেওয়া হয় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য। আর অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে মূলত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বেশি ঋণ করে সরকার। এ ছাড়া অর্থের বাড়তি চাহিদা মেটাতে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে এবং বন্ড ছেড়েও টাকা ধার নেওয়া হয়।

রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা গেছে, গত ১০ বছরের মধ্যে কোনো বছরই এনবিআর লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। ২০১৩-১৪ অর্থবছর ছাড়া অন্য কোনো বছরে সংশোধিত লক্ষ্যও অর্জন করতে পারেনি এই সংস্থা।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে অর্থাৎ ১০ বছর আগে সরকার দেশি-বিদেশি সংস্থা থেকে সব মিলিয়ে ৫৩ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। ওই বছর এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২০ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা। কিন্তু অনুন্নয়ন ব্যয় মেটাতে ও উন্নয়ন বাজেটে টাকার জোগান দিতে সরকারকে এনবিআরের আয়ের বাইরেও অতিরিক্ত অর্থ ঋণ করতে হয়েছিল, যা ছিল এনবিআরের আয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশের সমান। পরের এক দশক সময়ে এই হার শুধু বেড়েছে।

সর্বশেষ গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে সব মিলিয়ে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৭২ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। এই অর্থবছরে এনবিআরের আদায় ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এনবিআর যে পরিমাণ অর্থ আদায় করতে পেরেছিল, খরচ মেটাতে তার তুলনায় অতিরিক্ত আরও ৫৩ শতাংশ অর্থ ঋণ করতে বাধ্য হয়েছিল সরকার।

চাকরির বাজারে বেকারের সারি

২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, আজকের পত্রিকা

অর্থনীতি বড় হচ্ছে। বেসরকারি খাতের ব্যাপক প্রসার ঘটছে। সরকারও উন্নয়ন খাতে প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ করছে। এসবে ভর করে বাড়ছে জিডিপি প্রবৃদ্ধি। সরকার দাবি করছে, সার্বিকভাবে দেশের উন্নয়ন হওয়ায় বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাচ্ছে। তবে এত ভালো খবরের ভিড়ে হতাশাজনক খবর হলো, এই মুহূর্তে দেশে ২৩ লাখের বেশি বেকার চাকরি খুঁজছেন। গত বছরের শেষ তিন মাসেই বেকার বেড়েছে ৪০ হাজার। বেকারদের মধ্যে আবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের অন্তত ২৮ শতাংশ বেকার রয়েছেন। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ডলারসহ নানা সংকটের কারণে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্থর গতি চলছে। তার প্রভাবেই চাকরির বাজারও কিছুটা সংকুচিত।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে ২০১৮ সালে স্নাতক ও ২০১৯ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন আরিফুল ইসলাম। লেখাপড়া শেষ হওয়ার পর থেকেই চাকরির চেষ্টা করে যাচ্ছেন জানিয়ে আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘কোনোটার প্রিলিমিনারি পাস করি তো লিখিত পরীক্ষায় আটকে যাচ্ছি। আবার কখনো সেটা উতরে গেলে ভাইভাতে আটকে যাচ্ছি।’

আরিফুল ইসলাম আরও বলেন, প্রতিযোগিতা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছরই হাজার হাজার ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছেন। বেসরকারি খাতে চাকরির জন্য অনেক ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞতার প্রয়োজন পড়ে। ফলে চাকরিতে কোথাও ঢুকতে না পারলে অভিজ্ঞতা হয় না। অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে চাকরি হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষিত আরিফের মতো এ রকম অসংখ্য তরুণ বেকারেরই চাকরি না পাওয়া নিয়ে এমন হতাশার গল্প রয়েছে।

জানা যায়, দেশে ডলার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কম। আমদানি কড়াকড়ি করায় শিল্পের যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানি কমছে। এতে নতুন শিল্প স্থাপন, বিদ্যমান শিল্পের প্রসার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এতে নতুন কাজের সুযোগ কমছে। আর সঙ্গে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত মুদ্রানীতিতে সুদের হার বাড়িয়ে টাকার প্রবাহ কমানোর কারণে ব্যবসা ও শিল্পের প্রসার স্লথ হয়ে পড়ছে বলে উদ্যোক্তারা দাবি করেছেন। তাঁরা মনে করেন, এতে চাকরির সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষিতরা সহসাই চাকরিতে ঢুকতে পারছেন না। আর সরকারও উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ পরিকল্পনা করলেও ঠিকমতো প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সামনে এডিপির আকারও কাটছাঁট করা হবে বাস্তবায়ন অদক্ষতা ও পর্যাপ্ত তহবিলের অভাবে। এর ফলেও বেকার জনগোষ্ঠীর একটি অংশের কাজ পেতে সমস্যা হচ্ছে। পোশাক, বস্ত্র, চামড়া ও হালকা প্রকৌশল খাতের অনেক উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁদের অনেকেই ব্যবসা বাড়াচ্ছেন না, বরং পর্যাপ্ত পুঁজির অভাব ও খরচ বেড়ে যাওয়ায় কিছু জনবল কাটছাঁট করতে বাধ্য হয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই প্রবাহ কমেছে ৩৬ শতাংশ।

সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর সব শেষ তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে জানা যায়, সংস্থার শ্রমশক্তি জরিপ বলছে, গত বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে দেশে বেকারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ১০ হাজার। এর মধ্যে ৮৩ শতাংশই তরুণ-তরুণী।

তথ্য-উপাত্ত বলছে, শ্রমশক্তিতে ২ কোটি ৬৮ লাখ ২৪ হাজার যুবক-যুবতী আছেন, যাঁদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছর। তাঁদের মধ্যে ২ কোটি ৪৬ লাখ ৭৫ হাজার কাজের মধ্যে আছেন। যুবক-যুবতীদের মধ্যে ২১ লাখ ৪৮ হাজার বেকার, যা দেশের মোট বেকার জনগোষ্ঠীর ৮৩ শতাংশ।

বিবিএসের মতে, সাত দিনে কমপক্ষে এক ঘণ্টাও কোনো কাজ করেনি, কিন্তু কাজের জন্য প্রস্তুত ছিলেন, তাঁদেরই বেকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এমনকি জরিপের আগে ৩০ দিন বেতন বা মজুরি বা মুনাফার বিনিময়ে কাজ খুঁজেছেন, তাঁরাও বেকার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরে কমপক্ষে ২০ লাখ মানুষ চাকরির বাজারে প্রবেশ করেন। তাঁদের ১৩-১৪ লাখের দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান হয়। বাকিটা দেশের বাইরে যান।

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ব্যাংকঋণ বন্ধ, শেয়ার নিয়েও দ্বন্দ্ব

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, প্রথম আলো

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজের ঋণছাড় বন্ধ হয়ে গেছে। এ বছরের ৩০ মার্চের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হবে না জেনে গত ১৭ জানুয়ারি ঋণ আটকে দিয়েছে চীনের দুটি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান। এ অবস্থায় নির্মাণকাজ নিয়ে অংশীদারি বিদেশি তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) বড় এই প্রকল্পে বাংলাদেশ ছাড়াও থাইল্যান্ড ও চীনভিত্তিক দুটি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ এবং নির্মাণকাজের মাধ্যমে অংশীদার।

 প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো ইতালথাই ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কোম্পানি এবং চীনের শেনডং ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেশন গ্রুপ ও সিনো হাইড্রো করপোরেশন।

উড়ালসড়ক নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (এফডিইই) লিমিটেড নামের কোম্পানি গঠন করে ইতালথাই। এতে অংশীদার ওই তিন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার যথাক্রমে ৫১, ৩৪ ও ১৫ শতাংশ। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ হচ্ছে এক্সপ্রেসওয়ের নির্বাহক প্রতিষ্ঠান।

প্রকল্পটির মূল নির্মাণকাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। চুক্তি অনুসারে, মূল কাঠামো নির্মাণ ব্যয়ের ৭৩ শতাংশ জোগান দেবে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। আর ২৭ শতাংশ দেবে বাংলাদেশ সরকার, যা ভায়াবিলিটি গ্যাপ (ভিজিএফ) নামে পরিচিত।

প্রকল্পের তথ্য অনুসারে, বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ২০১৯ সালের ৩০ মার্চ চায়না এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ৫ হাজার ৫৯ কোটি ২১ লাখ ২২ হাজার ৩০০ (৪৬ কোটি ১০ লাখ ডলার) ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়নার (আইসিবিসি) সঙ্গে ৪ হাজার ৩৮৯ কোটি ৭৭ লাখ ২০ হাজারসহ (৪০ কোটি ডলার) মোট ৯ হাজার ৪৪৮ কোটি ৯৮ লাখ ৪২ হাজার ৩০০ (৮৬ কোটি ১০ লাখ ডলার) টাকার ঋণচুক্তি করে। ঋণবিষয়ক এ চুক্তিতে এক্সিম ও আইসিবিসির পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করে সিটি ব্যাংক এনএর ঢাকা শাখা। ইতিমধ্যে মোট ঋণ ছাড় হয়েছে ৫ হাজার ১৩৬ কোটি ৩ লাখ ২৩ হাজার ৯৯ টাকা (৪৬ কোটি ৮০ লাখ ডলার)।

এফডিইই জানিয়েছে, চুক্তি অনুসারে এফডিইইর ব্যাংককে ১৭ বছর ধরে ৭ শতাংশ হারে সুদ দেওয়ার কথা।এরই মধ্যে ব্যাংক ১২ কিস্তিতে ঋণ ছাড় দিয়েছে। ১৩তম কিস্তিতে ঋণ আটকে যায়। সেটা ১৭ জানুয়ারি দেওয়ার কথা ছিল। চুক্তিতে ছিল, ২০২৪ সালের ৩০ মার্চের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হবে এবং সে পর্যন্ত এক্সিম ও আইসিবিসি ব্যাংক ঋণ দেবে। এখন কোভিড, জমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তনসহ নানা কারণে প্রকল্পটি নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ ব্যাংক সময় বাড়াতে রাজি নয়। তারা ঋণছাড় করবে না বলেও জানিয়েছে।

‘যৌক্তিক মূল্য’র চেয়েও কেজিতে ১৯ টাকা বেশি ছোলায়

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

রোজা আসতে দুই সপ্তাহ বাকি থাকতেই ইফতারির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ছোলার দাম চড়তে শুরু করেছে। মাস খানেক আগে প্রতি কেজি ছোলা ১০০ টাকায় মিললেও এখন গুনতে হচ্ছে ১১০ টাকা।

মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটের মাদারীপুর মশলা ঘরের দোকানি রায়হান সরদারের ভাষ্য, পাইকারিতে দাম বাড়ায় খুচরাতেও বেচতে হচ্ছে বেশি দরে।

“আগে আমাদের পাইকারিতে ছোলা কিনতে হতো ৯৬ টাকা কেজি দরে। বিক্রি করতাম ১০৫ টাকায়। এখন কিনতেই হয় ১০৩ থেকে ১০৪ টাকায়। তাই বিক্রি করি ১১০ টাকা কেজিতে।”

কারওয়ান বাজারের পাইকার একতা ট্রেডার্সের জুয়েল আহমেদ বললেন, তার দোকানে এখন ১০০ টাকা কেজি দরে ছোলা বিক্রি হচ্ছে, যা মাসখানেক আগে ৮৮ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হতো। নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ থেকে তাকে ছোলা কিনতে হয় ৯৭-৯৮ টাকা কেজি দরে।

জুয়েল পাইকারিতে ১০০ টাকা দরে ছোলা বিক্রির কথা বললেও কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের বৃহস্পতিবারের তথ্যে তা দেখানো হয়েছে ৮৬ থেকে ৯৬ টাকা। সংস্থাটির ঘোষণা অনুযায়ী, রাজধানীর কারওয়ান বাজার, শ্যামবাজার, রহমতগঞ্জ ও বাবুবাজার থেকে পাইকারি এ দরের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

অবশ্য বাস্তবে সেই চিত্র মেলেনি, পাইকারির দর বেশ কিছু দিন ধরেই বেশি বলে জানাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

একতা ট্রেডার্সের জুয়েল বলেন, “(মাস খানেক ধরে) ছোলা ১ থেকে ২ টাকা করে বেড়েছে। এক লাফে বাড়েনি। সত্যি বলতে রমজান হিসেবে যে দাম বাড়ে, তা এখনও বাড়ে নাই।

“এখন সাদা ছোলা আসছে, এগুলো ভাল। আর আগে ছিল কালো ছোলা। সেটার মান খারাপ, তাই দামও একটু কম ছিল।”

রোজায় নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার পেছনে ‘হুজুগে’ ক্রেতাদের দুষছেন এই পাইকার।

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ৬ মাসে আয় কত, টোল বাড়াতে চায় কোম্পানি

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, প্রথম আলো

মোমিনুল আবেদিন একটি বেসরকারি ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট। তাঁর অফিস রাজধানীর মতিঝিলে। তিনি থাকেন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়। গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা দ্রুতগতির উড়ালসড়কের (ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে) কাওলা থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত অংশে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। তখন থেকে মোমিনুল আবেদিন ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে চলাচল করছেন।

মোমিনুল আবেদিন প্রথম আলোকে বলেন, আগে তিনি গাড়ি নিয়ে বাড্ডা হয়ে মতিঝিল যেতেন। সকাল সোয়া আটটায় রওনা দিয়ে অফিসে পৌঁছাতে তাঁর পৌনে ১০টা বেজে যেত। এখন তিনি একই সময় বাসা থেকে বের হয়ে কুড়িল থেকে এক্সপ্রেসওয়েতে উঠে তেজগাঁও নামেন। এরপর ফার্মগেট হয়ে মতিঝিলের অফিসে পৌঁছান সকাল সোয়া ৯টার মধ্যে।

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে টোল আদায়ের পরিমাণ।

নির্বাহক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ফার্স্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (এফডিইই) কোম্পানি লিমিটেডের তথ্যমতে, এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে চলতি ফেব্রুয়ারির ২১ দিন (১ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি) দিনে গড়ে ৪২ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচল করেছে। দিনে গড়ে টোল আদায় হয়েছে ৩০ লাখ টাকা। এক্সপ্রেসওয়ে চালুর মাসে (সেপ্টেম্বর) দিনে গড়ে প্রায় ৩০ হাজার যানবাহন চলাচল করেছে। দিনে গড়ে টোল আদায় হয়েছে ২৪ লাখ ৪২ হাজার টাকা।

এক্সপ্রেসওয়েতে ব্যক্তিগত গাড়ি, ট্যাক্সি, স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল (এসইউভি), মাইক্রোবাস (১৬ সিটের কম) ও হালকা ট্রাকের (৩ টনের কম) ক্ষেত্রে টোল ৮০ টাকা। সব ধরনের বাসের (১৬ সিট বা তার বেশি) টোল ১৬০ টাকা। মাঝারি ট্রাকের (৬ চাকা পর্যন্ত) টোল ৩২০ টাকা। ৬ চাকার বেশি ট্রাকের জন্য টোল ৪০০ টাকা।

এক্সপ্রেসওয়েতে যান চলাচল ও টোল আদায় বাড়লেও তা এখনো সন্তোষজনক পর্যায়ের নয় বলে মনে করছে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এফডিইই। প্রতিষ্ঠানটির মতে, দিনে গড়ে ৫০ হাজার যানবাহন চলাচল করলে কাঙ্ক্ষিত আয় হবে। এ অবস্থায় তারা টোল বাড়ানোর একটি প্রস্তাব সরকারকে দিতে চায়।

ঋণের চাপে ২ সন্তানসহ মায়ের আত্মহত্যা

ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৪, বণিক বার্তা

মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে ঋণের চাপে দুই সন্তানকে বিষপানে হত্যার পর নিজে আত্মহত্যা করেছেন সায়মা বেগম (৩৩) নামে এক নারী। রোববার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে উপজেলার কেয়াইন ইউনিয়নের উত্তর ইসলামপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

তবে স্বজনদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে হত্যার পর বসতঘরে মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে তাদের। নিহত শিশুরা হলো ছাইমুনা আক্তার (১১) ও মো. তাওহীদ (৮)।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আট বছর আগে বিভিন্ন ব্যক্তি ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সৌদি আরব যান সায়মা বেগমের স্বামী অলি মিয়া। ঋণের চাপে অলি মিয়া দেশে আসতে পারেননি। সায়মা এক এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে আরেক এনজিওর ঋণ পরিশোধ করছিলেন। প্রতিদিন বিভিন্ন ব্যক্তি ও এনজিওর লোকজন তাদের বাড়ি আসতেন। এ নিয়ে প্রায়ই স্বামী অলি মিয়ার সঙ্গে মুঠোফোনে ঝগড়া হতো সায়মা বেগমের। শনিবার রাতে স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া হয় তার। রোববার সকালে কেরানীগঞ্জের একটি এনজিওর লোকজন বাড়িতে কিস্তির টাকা নিতে আসেন। তারা ঘরের দরজা ধাক্কাধাক্কি করলে ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তারা জানালার একটি অংশ খুলে দেখতে পান সায়মা বেগম গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে আছেন।

গরুর মাংসে ‘অযৌক্তিক মুনাফা’ ১৫০ টাকা, হাত গুটিয়ে সবাই

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

গরুর মাংসের দাম কত হওয়া উচিত, তা নিয়ে তর্ক-বিতর্কের মধ্যেই দ্রুত দামের পতন এবং ফের উত্থান- দুটোই দেখলেন ভোক্তারা।

সরকারি সংস্থা হিসাব করে মাংসের সর্বোচ্চ যে ‘যৌক্তিক মূল্য’ নির্ধারণ করেছে, বাজারে বিক্রি হচ্ছে তার চেয়ে কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি দামে।

এই ‘যৌক্তিক মূল্য’ বাস্তবায়নে যে ব্যবস্থাপনা সরকার আইনে তৈরি করেছে, সেটি কাজ করছে না উদ্যোগের অভাবে।

নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে বাজার দর নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা সরকার বারবার বলে আসছে। কিন্তু বাড়তি মুনাফা ঠেকাতে কোনো উদ্যোগ না থাকায় ক্রেতারা হতাশ।

২০২৩ সালের শুরুতে দর আটশ টাকা ছুঁয়ে ফেলার পর এপ্রিল থেকে এক দুই জন করে বিক্রেতা কম দামে মাংস বেচতে থাকলে এক পর্যায়ে অক্টোবর নভেম্বরে দাম ছয়শ টাকার নিচে নেমে আসে। কেউ কেউ এমনকি ৫৫০ টাকাতেও বেচতে শুরু করেন।

সে সময় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মাংস বিক্রেতা ও ঢাকার বড় খামারিদেরকে নিয়ে একটি সেমিনার করার পর দেখা দেয় পাল্টা প্রতিক্রিয়া। খামারি আর বিক্রেতারা একজোট হয়ে যান। তারা নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ৬৫০ টাকায় মাংস বেচার ঘোষণা দেন। এরপর ফেব্রুয়ারির শেষে দাম ফের আটশ টাকা ছুঁয়েছে।

বিক্রেতাদের দাবি, গরুর দাম বেড়েছে, তাই তাদেরকে বেশি দামে বেচতে হচ্ছে। খামারিরা বলছেন উৎপাদন খরচ বাড়ার কথা। কিন্তু এত কম সময়ে খরচ লাফ দেবে, সেটা বিশ্বাস করছেন না খোদ সরকারের কর্মকর্তারাও।

কারওয়ান বাজারে মাংস কিনতে আসা আল মামুনকে যৌক্তিক মূল্যের বিষয়টি জানালে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এত বেশিতে কিনি, সেটা আমি কল্পনাও করিনি। বিক্রেতারা কত শতাংশ লাভ করতে পারবে তার একটা সীমা থাকা উচিত।”

কৃষিপণ্যের বাজারদর নিয়ন্ত্রণে ২০১৮ সালে সরকার কৃষি বিপণন আইন ও তিন বছর পর বিধিমালা করে। কৃষি পণ্যের উৎপাদন খরচের বিবেচনায় কৃষক, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে মুনাফার সর্বোচ্চ হার বেঁধে দেওয়া হয় সেখানে। একে আইনের ভাষায় বলে ‘যৌক্তিক মূল্য’।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তর এই যৌক্তিক মূল্য ঠিক করছে, তবে তা বাস্তবায়নের ক্ষমতা তাদের নেই। যাদের তা বাস্তবায়ন করার কথা, তাদের আবার নেই উদ্যোগ।

এমনকি যে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর দাম কমার সময় মাংস বিক্রেতাদের ডেকে ‘একজোট’ করেছিল, তারাও এখন কিছু করছে না। অথচ কৃষি বিপণন থেকে ‘যৌক্তিক মূল্য তালিকা’ এই অধিদপ্তরেও পাঠানো হয়।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, ‘সব কিছু’ তারা করতে পারবেন না।

যৌক্তিক মূল্য কত

কৃষি বিপণন অধিদপ্তর হিসাব করে দেখেছে, প্রতি কেজি গরুর মাংসের উৎপাদন খরচ এখন গড়ে ৫৮৭ টাকা ৫০ পয়সা। তারা খুচরায় ১৭ শতাংশ মুনাফা ধরে যৌক্তিক মূল্য ঠিক করা হয়েছে ৬৫৬ টাকা।

ঢাকার বসিলার খামারি তারেকুর রহমানের দেওয়া তথ্যেও অধিদপ্তরের এই হিসাবের মিল পাওয়া গেল।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, ৩০০ কেজি মাংস হয়, এমন একটি গরু উৎপাদনে খরচ পড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার মত। তারা ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা লাভে সেই পশু বিক্রি করেন। এই হিসাবে প্রতি কেজি দাম পড়ে ৪৮০ টাকার মত।

মাংস বিক্রেতাদের পরিবহন, বিপণন ও কাটাকাটির পারিশ্রমিক ১০ হাজার টাকা ধরলেও গরুটির পিছনে মোট ব্যয় ধরা যায় সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। এই হিসাবে সব খরচসহ প্রতি কেজি মাংসের দাম পড়ে ৫১৬ টাকা।

কিন্তু শবেবরাতের আগের দিন ঢাকায় ৮০০ টাকাতেও বিক্রি হয়েছে গরুর মাংস। আগের সপ্তাহেই তা ছিল ৭৫০ টাকা। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে দাম ছিল ৬৫০।

মিডিয়ার ভূমিকার কারণেও কিন্তু জিনিসপত্রের দাম বাড়ে: বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, প্রথম আলো

মিডিয়ার ভূমিকার কারণেও কিন্তু দেশে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে বলে মনে করেন আপিল বিভাগের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম। ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন ও আইন সাংবাদিকতা’ শীর্ষক এক কর্মশালায় আজ সোমবার তিনি এসব কথা বলেন। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের দক্ষিণ হলে সদস্যদের জন্য ওই কর্মশালার আয়োজন করে ল রিপোর্টার্স ফোরাম (এলআরএফ)।

বাংলায় রায় ও আদেশের চর্চা ও প্রবণতা নিয়ে সংবাদ উপস্থাপনের দুটি দিক টেনে কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম বলেন, ‘আপনারা যেকোনো নিউজকে ইতিবাচকভাবে দেখবেন।’

প্রসঙ্গ ক্রমে উদাহরণ টেনে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম বলেন, ‘দ্রব্যমূল্যের ব্যাপারে নিউজগুলো হয়। আমি সবার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলব, মিডিয়ার ভূমিকার কারণেও কিন্তু আমি মনে করি, আমাদের দেশে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। সকাল আটটায় কোনো চ্যানেলে যদি বলে আজ খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের সংকট; সকাল আটটায় যদি এই নিউজ করে; সকাল ১০টায় দেখবেন যে কারওয়ানবাজারে ৩০ ভাগ দাম বেড়ে যায়। ধরেন, বিকেলবেলায় শ্যামবাজারে দাম ৪০ শতাংশ বেড়ে গেল—একটা হাহাকার শুরু হয়ে যায়।…৮–১০টা টেলিভিশন যদি সারা দিন প্রচার করে ছোলার সংকট, পেঁয়াজের সংকট, রোজা আসছে, সয়াবিন তেল নেই। মজুত করা শুরু হয়ে যায়। মানুষও ঝাঁপিয়ে পড়ে। যেখানে দুই কেজি কিনলেই হয়, সেখানে সে ১০ কেজি কিনতে চায়। চাহিদা বেড়ে যায়। এই যে নিউজগুলো হয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ব্যাপারে, এটি আমার ব্যক্তিগত অভিমত যে এখানে কিন্তু মিডিয়া পজিটিভ রোল–প্লে করে না। এখানে যদি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা যায়, বেশি কিনবেন না, কম কিনবেন, চাহিদা আছে, পর্যাপ্ত আছে।’

পোকার আক্রমণ ও খাটো জাতের উচ্চাশায় ব্যাহত নারকেল উৎপাদন

ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৪, বণিক বার্তা

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে নারকেল উৎপাদনে উপযোগী দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। তবে দুই-তিন বছর ধরে নারকেলে পোকার আক্রমণ মারাত্মক আকার ধারণ করছে। পাশাপাশি ভিয়েতনামি খাটো জাতের গাছে নির্ধারিত সময় পরও ফলন আসেনি। এতে নারকেল উৎপাদন এক দশকের সর্বনিম্নে নেমেছে।

বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, উপকূলীয় জেলাগুলোসহ বিভিন্ন স্থানে নারকেল গাছে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে বিধ্বংসী সাদা মাছি, কালো মাথা ক্যাটারপিলার ও মাকড়। এদিকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় সংকট দেখা দিয়েছে নারকেলজাত তেল, ছোবড়া, মশার কয়েল, কোকোডাস্ট ও মালা শিল্পে।

দেশে ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে কমছে নারকেল উৎপাদন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত অর্থবছরে নারকেল উৎপাদন হয় ৫ লাখ ৬ হাজার টন। ২০১৬-১৭ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত উৎপাদন হয় যথাক্রমে ৬ লাখ ৮৮ হাজার টন, ৬ লাখ ৬৩ হাজার, ৬ লাখ ৫০ হাজার, ৬ লাখ ৫৩ হাজার, ৫ লাখ ১৯ হাজার ও ৫ লাখ ১০ হাজার টন।

বোরো আবাদে বিপাকে চার জেলার কৃষক

২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, সমকাল

গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পের প্রধান খাল ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে পানিতে থাকে টইটম্বুর। তবে এবার পানিশূন্য খাল। এতে জিকের পানির ওপর নির্ভরশীল কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরার কয়েক লাখ কৃষক বোরো আবাদ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।

তিনটি পাম্প নষ্টসহ নানা কারণে জিকে এবার সময়মতো খালে পানি দিতে পারেনি। বোরো চারা রোপণ করতে না পারায় নষ্ট হচ্ছে বীজতলা। চাষ দিয়ে জমি পাকানোর অপেক্ষায় আছেন অনেকে। দ্রুত সমস্যা না কাটলে বোরোর উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে বলে জানিয়েছেন চাষিরা।

সরেজমিন কুষ্টিয়া সদরের বটতৈল এলাকায় জিকের প্রধান খাল পানিশূন্য দেখা যায়। পানির স্তর একেবারে নিচে নেমে গেছে। বটতৈল চারমাইল এলাকার কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সরিষা তোলার পর মাঠে জিকের পানি আসে। ২০ থেকে ২৫ দিন আগে সরিষা তুললেও পানি আসার লক্ষণ নেই। কয়েক বিঘা জমি চাষ দিয়ে ফেলে রেখেছি, পাকাতে পারছি না। বোরো আবাদের কী হবে, বুঝতে পারছি না।

জেলার আরেক কৃষক মো. সাহাবুদ্দিন জানান, অন্যান্য বছর এ সময় মাঠে ধান রোপণ শেষ হয়ে যায়। এবার তারা শুরুই করতে পারেননি।

দু-একজন শ্যালো মেশিনের সাহায্যে পানি তুলে চারা রোপণ করেছেন। জিকের পানি দিয়ে এক বিঘা আবাদে খরচ যেখানে বছরে ৩০০ টাকা, সেখানে শ্যালোতে প্রায় ৫ হাজার টাকা। লোকসানের ভয়ে অনেকেই আবাদ শুরু করছেন না।

ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার বাগচুয়া গ্রামের কৃষক হেকমত আলী বলেন, ‘দুই বছর ধরে জিকের পানি পাচ্ছি না। সামর্থ্যবানরা শ্যালোর পানি ব্যবহার করছেন। বাকিরা পিছিয়ে পড়ছেন।’

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার বাদেমাজু গ্রামের কৃষক আশাদুল হক জানান, পানি দেরিতে দেওয়ায় বোরো রোপণে বিলম্ব হয়েছে। হঠাৎ করে খাল পানিশূন্য, জমিতে দেখা দিয়েছে ফাটল। বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত শ্যালো ইঞ্জিনের মাধ্যমে পানি দিতে গিয়ে খরচ বাড়ছে।

একইভাবে ঝিনাইদহের শৈলকুপা ও মাগুরার কয়েকটি উপজেলার কৃষকরা কোনো ফসলই আবাদ করতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন।

জিকে পানি ব্যবস্থাপনা ফেডারেশনের সভাপতি সাফায়েত হোসেন পল্টু বলেন, ‘পাম্প নষ্ট হওয়ায় কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন। দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে বোরো আবাদে ব্যাঘাত ঘটবে।’

জিকে সূত্র জানায়, ভেড়ামারায় প্রধান পাম্প হাউসের দুটির মধ্যে ২০২২ সাল থেকে একটি নষ্ট। অন্যটি দিয়ে পানি সরবরাহ করা হচ্ছিল। জানুয়ারির শুরুতে চুয়াডাঙ্গায় পানি দিলে চাষিরা বোরো রোপণ করেন। কিন্তু কুষ্টিয়া এলাকায় জানুয়ারিতে সরিষা থাকায় কর্তৃপক্ষ ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পানি ছাড়া শুরু করে। দু’দিন চলার পর পাম্পে ত্রুটি দেখা দিলে পানি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এখন পাম্প হাউসের তিনটি যন্ত্রই বিকল।

সেচ বন্ধে ক্ষতির মুখে ৫০ হাজার কৃষক

২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, সমকাল

মেয়াদ শেষে নতুন প্রকল্প অনুমোদন না হওয়ায় প্রায় তিন বছর বন্ধ সেচ কার্যক্রম। এতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ও নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ৫০ সহস্রাধিক কৃষক বাড়তি সেচ খরচ মেটাতে ক্ষতির মুখে পড়েছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে আশুগঞ্জ-পলাশ এগ্রো ইরিগেশন প্রকল্পের আওতায় ১৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো আবাদ। প্রতি মৌসুমে প্রায় ৭০ হাজার টন ধান উৎপাদন কম হচ্ছে। স্থানীয়রা প্রকল্প প্রস্তাবনা চূড়ান্ত ও বাস্তবায়ন দ্রুত না হলে আন্দোলনের হুমকি দিয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) বলছে, কিছু সংশোধন, সরেজমিন যাচাইসহ সেচ ব্যবস্থাপনায় আধুনিক ও টেকসই প্রকল্প প্রস্তাবনা চূড়ান্তের কাজ শেষ পর্যায়ে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিলেই বাস্তবায়ন শুরু হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আশুগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন ইউনিটের টারবাইন ঠান্ডা রাখতে মেঘনা নদীর বিপুল পরিমাণ পানি লাগে। পরে এই বর্জ্য পানি একটি আউটার চ্যানেল দিয়ে পুনরায় নদীতে ফেলা হয়। ১৯৭৫ সালে স্থানীয়দের উদ্যোগে বিদ্যুৎকেন্দ্রে একটি হেড রেগুলেটর নির্মিত হলে পানির গতিপথ আংশিক পরিবর্তন করে তা পার্শ্ববর্তী জমির সেচ হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়। এটিই ১৯৭৮-৭৯ অর্থবছরে বিএডিসির অধীনে ‘আশুগঞ্জ সবুজ প্রকল্প’ নামে সেচ কার্যক্রম শুরু করে। একই সময় নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় এ ধরনের প্রকল্প গড়ে ওঠে। পরে ১৯৯০-৯৫ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দুটিকে একীভূত করে যাত্রা শুরু হয় ‘আশুগঞ্জ-পলাশ এগ্রো ইরিগেশন প্রকল্প’, যার মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২০ সালের ৩০ জুন।

কৃষকরা জানায়, গভীর কিংবা অগভীর নলকূপ থেকে ভূগর্ভস্থ পানি সেচকাজে ব্যবহার করলে একরপ্রতি তাদের জ্বালানি খরচসহ লাগে ৮-১০ হাজার টাকা। বিপরীতে প্রকল্পের পানিতে একরে সেচ খরচ ২ হাজার টাকার মতো। কৃষি বিভাগের হিসাবে প্রকল্পের অধীনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ, সরাইল, সদর ও নবীনগর উপজেলার প্রায় ৩৪ হাজার এবং পলাশের ১৬ হাজার কৃষক এর সুবিধাভোগী। তারা নামমাত্র খরচে নিরবচ্ছিন্ন সেচ সুবিধা পেয়ে আসছিল। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ যেমন কমত, তেমনি গড়ে ৭০ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় হতো। কৃষকরা প্রতি বোরো মৌসুমে আশুগঞ্জ অংশে প্রায় ৭০ হাজার টন ধান উৎপাদন করে আসছিল, যা এখন একেবারে বন্ধের পথে।

জানা গেছে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) পুকুর আংশিক ভরাট ও পরে ২০২০ সালে আশুগঞ্জ নৌবন্দর-আখাউড়া স্থলবন্দর মহাসড়ক চার লেন প্রকল্প বাস্তবায়নে সেচ প্রকল্পের প্রায় ১১ কিলোমিটার ড্রেন ও খাল ধ্বংস হয়ে যায়। এর পরই সেচ ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ে। এক পর্যায়ে ‘আশুগঞ্জ সবুজ প্রকল্প রক্ষা কমিটি’র ব্যানারে স্থানীয় কৃষকরা আন্দোলনে নামলে বিএডিসির পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব পায়। ২০১৯ সালের আগস্টে বিএডিসি, সওজ ও সিইজিআইএস যৌথ জরিপ শেষে সেচ সুবিধা  অব্যাহত রাখতে মন্ত্রণালয় ও বিএডিসির কাছে তিনটি বিকল্প প্রস্তাব দেয়। ২০২০ সালের ১৭ জুন আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে প্রকল্পটি সচলে যেসব সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়, তার একটিও বাস্তবায়ন হয়নি। পাশাপাশি বিএডিসি সেচ ব্যবস্থা সচল রাখতে প্রায় ৪৭০ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প প্রস্তাবনা দেয়। কিন্তু সেটি সাড়ে তিন বছরেও অনুমোদন পায়নি।

স্টেডিয়ামে খেলাধুলা হয় না, বসে গরু-ছাগলের হাট

২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, প্রতিদিনের বাংলাদেশ

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম। উপজেলার শিয়ালকোল এলাকায় অবস্থিত এই স্টেডিয়ামের নির্মাণকাজ পাঁচ বছর আগে সম্পন্ন হলেও এখন পর্যন্ত এক দিনের জন্যও মাঠে গড়ায়নি কোনো খেলা। তবে নিয়ম করে প্রতি সপ্তাহে বসছে গরু-ছাগলসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র কেনাবেচার হাট। ফলে কোনো ধরনের খেলাধুলা ও শরীরচর্চার সুযোগ মিলছে না স্থানীয় তরুণ ও কিশোরদের।

অপরদিকে, প্রতিনিয়ত হাট বসায় অনেক আগেই নষ্ট হয়ে পড়েছে খেলার পরিবেশ। বেহাল মাঠে এখন মেলে বর্জ্যের গন্ধ। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয়রা বলেন, হাট বসিয়ে নষ্ট হয়ে পড়া মাঠটি খেলাধুলার উপযোগী করতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি কর্তৃপক্ষ। সময়ের ব্যবধানে স্টেডিয়ামটি এখন পরিত্যক্ত স্থাপনায় পরিণত হচ্ছে।

সরেজমিনে শেখ রাসেল স্টেডিয়াম ঘুরে দেখা যায়, খেলার মাঠজুড়ে খানাখন্দে ভরা, মাঠের চারিদিকে বসানো গ্যালারি বেঞ্চগুলোতে ময়লা-আবর্জনা আগাছায় ভরপুর, বৃষ্টির পানিতে মাঠের মাটি ও প্যালাসাইডিং ধসে গেছে। চরানো হয় গরু-ছাগল। বর্জ্যে মাঠের সৌন্দর্য নষ্ট, ভবনের আস্তরণ খসে পড়ছে। পাবলিক টয়লেট ভবন ও গোলপোস্টের বেহাল দশা।

সংশোধিত এডিপিতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমছে ১৬,৫০০ কোটি টাকা

২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, প্রথম আলো

উন্নয়ন খরচে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত অগ্রাধিকারের তালিকায় এখনো বেশ পিছিয়ে। উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দের দিক থেকে শীর্ষ তিন খাতের মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নেই। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এ দুই খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলে আসছেন খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তারপরও বরাদ্দ বাড়ছে না। উল্টো সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) দুই খাতেই বরাদ্দ কমানো হচ্ছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সূত্রে জানা গেছে, এবার সংশোধিত এডিপির আকার কমছে ১৮ হাজার কোটি টাকা। তাতে এডিপির আকার কমে ২ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকায় নেমে আসবে। আগামী সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় সংশোধিত এডিপি অনুমোদন দেওয়া হতে পারে।

এ খাতে বরাদ্দ কমছে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি কম থাকায় এ দুই খাতে সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ কমানো হচ্ছে। এডিপি সংশোধনে বরাদ্দ সবচেয়ে বেশি কমবে এ দুটি খাতে।

আইএমইডি সূত্রে জানা গেছে, সংশোধিত এডিপির মাত্র ৭ শতাংশের মতো বরাদ্দ রাখা হচ্ছে শিক্ষা খাতে। তাতে এই খাতের ১১৮টি প্রকল্প সব মিলিয়ে ১৭ হাজার ২২৩ কোট টাকা বরাদ্দ পাবে, যা মূল এডিপির চেয়ে অন্তত সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা কম। অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতের ৬১টি প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ১২ হাজার ৬৬ কোটি টাকা, যা সংশোধিত এডিপির প্রায় ৫ শতাংশ। এ খাতে বরাদ্দ কমছে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি কম থাকায় এ দুই খাতে সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ কমানো হচ্ছে। এডিপি সংশোধনে বরাদ্দ সবচেয়ে বেশি কমবে এ দুটি খাতে।

মূল্যবৃদ্ধির জন্য দায়ী ডলার, চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট

২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, প্রথম আলো

পবিত্র রমজান মাস শুরুর আগেই আরেক দফা বেড়েছে বেশ কিছু নিত্যপণ্যের দাম। এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য চারটি কারণ চিহ্নিত করেছেন ব্যবসায়ীরা। সেগুলো হলো ডলার-সংকট ও এর বাড়তি দাম, চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট এবং উচ্চ শুল্ক।

তবে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মাহবুবুল আলম পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীদের নিজেদের যে ‘দায়িত্ব-কর্তব্য’ রয়েছে সেটি স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, দিন শেষে একটা কথা আছে, ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফা করেন। তাঁর মতে, এই অতি মুনাফা ও মজুতদারি থেকে বেরিয়ে আসতে ব্যবসায়ীদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে।

নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির জন্য ব্যবসায়ীরা চারটি কারণের কথা তুলে ধরে বলেন, ডলারের যে দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে, সেই দরে ডলার পাওয়া যাচ্ছে না।

বরং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ‘ইচ্ছেমতো’ ডলারের দাম নিচ্ছে। সে জন্য পণ্য আমদানিতে খরচ বেড়েছে। এ ছাড়া পরিবহনসহ বিভিন্ন পর্যায়ে চাঁদাবাজির কারণে সবজি থেকে শুরু করে সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ছে। সিন্ডিকেটের কারণে ব্রয়লার ও গরুর মাংসের দাম কমছে না। উচ্চ শুল্কের কারণে আকাশচুম্বী হয়েছে চিনি ও খেজুরের দাম।

বইমেলায় বিক্রি ৬০ কোটি টাকা, দর্শনার্থী ৬০ লাখ

০২ মার্চ ২০২৪, বাংলা ট্রিবিউন

৩১ দিনের অমর একুশে বইমেলা-২০২৪ শেষ হয়েছে। ১ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই মেলা চলে শনিবার (২ মার্চ) পর্যন্ত। এবারের বইমেলায় প্রায় ৬০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে। এবং পুরো মেলায় প্রায় ৫০ লাখ লোকসমাগম হয়েছে বলে জানিয়েছে আয়োজক বাংলা একাডেমি।

শনিবার (২ মার্চ) বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বইমেলার মূল মঞ্চে সমাপনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে আয়োজক কমিটির সদস্য সচিব কেএম মুজাহিদুল ইসলামের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পাঠকালে একাডেমির উপ-পরিচালক সাহেদ মমতাজ এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, এবারের বইমেলায় প্রায় ৬০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে। আমাদের কাছে মোট হিসাব এখনও আসেনি। যেটা এসেছে, সেটি ৬০ কোটির কাছাকাছি। আজকের বিক্রিসহ আমাদের ধারণা এটি ৬০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। বইমেলায় স্থাপিত আর্চ টাওয়ারের তথ্য মতে মেলায় প্রায় ৬০ লাখ লোকের সমাগম হয়েছে।

মাসে মাথাপিছু ন্যূনতম খাদ্য গ্রহণ ব্যয়ে বিবিএসের সঙ্গে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির ফারাক ৩৪%

মার্চ ০২, ২০২৪, বণিক বার্তা

একজন প্রাপ্তবয়স্কের দিনে খাদ্য গ্রহণ করতে হয় কমপক্ষে ২ হাজার ১২২ ক্যালরি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ক্যালরির এ খাদ্য গ্রহণে গড় মাথাপিছু ব্যয় মাসে ১ হাজার ৮৫১ টাকা। এটিকেই ফুড পোভার্টি লাইন বা খাদ্য দারিদ্র্যসীমা হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে বিবিএস। আর বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) হিসাবে, গত ডিসেম্বরজুড়ে এ ন্যূনতম ক্যালরিসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ করতে দেশের মানুষকে মাথাপিছু ব্যয় করতে হয়েছে ২ হাজার ৭৯৯ টাকা। সে হিসেবে বিবিএসের মাথাপিছু ন্যূনতম খাদ্য গ্রহণের খরচ ডব্লিউএফপির তুলনায় ৩৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ বা ৯৪৮ টাকা কম।

দুই সংস্থার তথ্যে এ বড় ব্যবধানের কারণ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিবিএস যেটিকে খাদ্য দারিদ্র্যসীমা হিসেবে দেখাচ্ছে, সে মূল্যে একজন মানুষের পক্ষে খাবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। যে সময় পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে এ হিসাব দেখানো হচ্ছে, সে সময় যুদ্ধের অভিঘাতে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে গেছে বৈশ্বিক পণ্যবাজার। আবার এ-সংক্রান্ত জরিপ শেষ হওয়ার পর দেশে খাদ্যপণ্যের দাম আরো বেড়েছে। এর সঙ্গে পরিসংখ্যান পরিচালনায় পদ্ধতিগত দুর্বলতার অভিযোগও রয়েছে। সব মিলিয়ে এসব কারণেই দুই সংস্থার মধ্যে তথ্যগত ফারাক দেখা দিতে পারে।

এবার রোজা হবে আরও খরুচে

০৮ মার্চ ২০২৪, সমকাল

ইফতারে অন্তত দুইটা খেজুর আর এক গ্লাস শরবত মুখে তুলতে হয় রোজাদারকে। তবে সেই ন্যূনতম ইফতারি পণ্যেরই বেজায় দাম। খেজুরে এবার হাতই দেওয়া যাচ্ছে না, চিনির দামেও লম্ফঝম্প। আর শরবতের জন্য লেবু! এখনই আগুন দাম। রোজায় এক লেবু কত টাকা দিয়ে সদাই করতে হবে, সে চিন্তায় কপালে ভাঁজ ফেলছেন ক্রেতা।

এবার সেহরিতে আসা যাক। রোজা শুরুর আগেই ব্রয়লার ও সোনালি মুরগি দেখাচ্ছে দামের তেজ। গরুর মাংস কেজিতেই বেড়ে গেছে অন্তত ১০০ টাকা। সব মাছের দামও বাড়বাড়ন্ত। শুধু খেজুর, চিনি, লেবু, মাছ-মাংস নয়; বেশির ভাগ নিত্যপণ্যের দরই বল্গাহীন। রমজান শুরুর পাঁচ-ছয় দিন আগে পণ্যের দরের এমন উড়াল গতিই বলে দিচ্ছে, এবার হবে আরও খরুচে রোজা।

গতকাল বৃহস্পতিবার হাতিরপুল কাঁচাবাজারে কথা হয় বেসরকারি চাকরিজীবী মাইনুল ইসলামের সঙ্গে। ছোলা, চিনিসহ রোজার কয়েক পদের পণ্য কিনতে গিয়ে তিনি বেশ ক্ষুব্ধ। বললেন, ‘প্রতিবছর রোজার আগে সরকার বলে শুল্ক কমানো হয়েছে, দাম কমবে। তবে যারা বাজার করে, তারা জানে বাজারে কী হচ্ছে। শুধু মুখে বলে দিলে হয় না; কার্যকর করতে হয়।’

রোজায় পণ্যের দামের লাগাম টানতে সরকার গত ৮ ফেব্রুয়ারি খেজুর, চিনি, সয়াবিন তেল ও চাল আমদানিতে শুল্ক ছাড় দিয়েছিল। তবে সয়াবিন তেল ছাড়া অন্য তিন পণ্যের শুল্ক ছাড়ে সরকারের টোটকা কাজে দেয়নি।

রোজার বাজারে আরও অস্বস্তি

১২ মার্চ ২০২৪, প্রথম আলো

কয়েক বছর ধরে পবিত্র রমজান মাসে অন্তত কম দামে পেঁয়াজ কিনতে পারতেন মানুষ। কারণ, রোজা শুরুর সময় পেঁয়াজের মৌসুম চলে। এবার সেই পেঁয়াজের দরও চড়া।

রোজা শুরুর আগের দিন গতকাল সোমবার রাজধানীর বাজারে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৯০ থেকে ১১০ টাকা। গত বছর রোজার আগে একই পেঁয়াজের কেজি ছিল ৪০ টাকার মধ্যে।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তালিকা ধরে মোটা চাল, খোলা আটা, সয়াবিন তেল (বোতল), চিনি, মসুর ডাল (বড় দানা), অ্যাংকর ডাল, ছোলা, পেঁয়াজ, দেশি রসুন, দেশি শুকনা মরিচ, রুই মাছ, ব্রয়লার মুরগি, গরুর মাংস, ডিম (হালি) ও খেজুর—এই ১৫ পণ্যের মূল্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত রোজার তুলনায় এবার ১০টি পণ্যের দাম বেশি; ৫টির কম।

যে পাঁচটি পণ্যের দাম কম, সেগুলোর মূল্য গত বছর অনেক বেড়ে গিয়েছিল। তারপর কমেছে। তবে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নয়। ফলে সেগুলোর দামও চড়া বলা যায়।

যেমন ব্রয়লার মুরগি। ২০২২ সালের আগে ব্রয়লার মুরগি ছিল ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি। রোজা এলে দর কমত। কারণ, রোজায় রেস্তোরাঁগুলোতে মুরগির চাহিদা কমে যায়। এবার চিত্র ভিন্ন। দেশের বাজারে কয়েক মাস ধরে ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৯০ টাকার আশপাশে ছিল। এবার রোজায় দাম বেড়েছে। কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে গতকাল বাজারে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয়েছে ২১০ থেকে ২২০ টাকায়।

রোজা শুরুর আগের কয়েক দিনে এবার দাম বেড়েছে মসুর ডাল, অ্যাংকর ডাল, মুগডাল, ছোলা, চিনি, সোনালি মুরগি, গরুর মাংস, বিভিন্ন ধরনের মাছ, বেগুনসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি, লেবু, শসা, ধনেপাতা ও ফলের দাম। কমেছে শুধু সয়াবিন তেলের দাম। সব মিলিয়ে বাজার চড়া।

বাচ্চা সংকটে খামার, নেপথ্যে ‘সিন্ডিকেট’

১২ মার্চ ২০২৪, সমকাল

তাড়াশ পৌর এলাকার মো. রমজান আলীর বাড়িতে প্রায় এক দশক ধরে পোলট্রি মুরগির খামার রয়েছে। প্রতিবার ৮০০ থেকে ৯০০ ব্রয়লার মুরগি তুলে বড় করে বিক্রি করেন। আগে ৩৫ দিনে বাচ্চা, খাদ্য, ওষুধসহ খরচ পড়ত ১ লাখ ৭০ হাজার টাকার মতো। রমজানের সময় মুরগি বিক্রি করে আয় হতো ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। অথচ এখন সমান মুরগি পালনে খরচ হচ্ছে অন্তত ৩ লাখ টাকা। বেশি পুঁজি খাটিয়ে আয় হচ্ছে কম।

রমজান আলীর ভাষ্য, প্রায় চার সপ্তাহ ঘুরে কয়েক দিন আগে ডিলারের কাছ থেকে ৫৩ টাকা করে এক দিনের বাচ্চা কিনেছেন। এর দাম বছর দেড়েক আগেও ছিল ৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত। তিনি খামারটি চালু রাখতে পারলেও একই এলাকার গোলাম হাফিজ আট মাস ধরে তাঁর খামার বন্ধ রেখেছেন। বাচ্চার দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং ঠিকমতো না পাওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তাঁর মতো খামার বন্ধ রেখেছেন পৌর এলাকার কোহিত মহল্লার খামারি শফিকুল ইসলাম, আজাদ হোসেন ও সাবেন আলীও।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েকদিন আগে ৫৩ টাকায় বিক্রি হওয়া এক দিনের বাচ্চা এখন ৬৫ থেকে ৭০ টাকায়ও মিলছে না। সাত-আট মাস ধরে মুরগির খামারে চলছে বাচ্চার সংকট। এতে চলনবিল অঞ্চলের বেশির ভাগ খামারে বাচ্চা তুলতে পারছেন না খামারিরা। বাচ্চা, খাবার, ওষুধসহ আনুষঙ্গিক উপকরণের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সংকট আরও বেড়েছে। এতে অনেক খামার বন্ধ রয়েছে।

শুধু সিরাজগঞ্জ জেলায় চার হাজারের বেশি ব্রয়লার, লেয়ার ও সোনালি মুরগির খামার আছে। তবে নানা সংকটে প্রায় দুই হাজার খামার বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে দেড় হাজারই ব্রয়লার মুরগির জানিয়ে বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন সিরাজগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বাচ্চা ও মুরগির খাদ্য সরবরাহকারী বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সিন্ডিকেটের কারণে এমনটি ঘটছে। বাচ্চা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান প্যাকেজ পদ্ধতিতে খাবারও নগদ টাকায় কিনতে বাধ্য করে।

বাচ্চা ও খাবার সরবরাহ কমিয়ে কৌশলে খামারিদের পকেট কাটার অভিযোগ করে রফিকুল ইসলাম বলেন, শুধু বাচ্চা বা খাদ্য নয়, অনেক সময় খামারে উৎপাদিত মুরগি বড় হলে তাদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়। যদিও জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক জানিয়েছেন ভিন্ন তথ্য। তাঁর দাবি, সিরাজগঞ্জে ৮৪২টি ব্রয়লার মুরগির খামার রয়েছে।

বাচ্চা ও মুরগির খাদ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সিন্ডিকেটের কাছে খামারিরা জিম্মি হয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ করেন খামারি শামীম হোসেন। তাঁর ভাষ্য, অল্প সময়ের মধ্যে বাচ্চা সংকট দূর না হলে ঈদে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির মাংসের বাজারে প্রভাব পড়বে। সংকটের কারণে তিনি চার মাস চাহিদা মতো বাচ্চা তুলতে পারেননি। আয় কমে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

খেজুরের দাম বেশি বাড়ে দেশে এসে

১৩ মার্চ ২০২৪, প্রথম আলো

বাংলাদেশের বাজারে বেশি বিক্রি হওয়া খেজুরের জাতের একটি হলো ইরাকের জাইদি খেজুর। দেশের আমদানিকারকেরা এবার প্রতি কেজি জাইদি খেজুর জাহাজভাড়াসহ আমদানি করেছেন ৯৬ টাকার আশপাশের দরে। বাজারে সেই খেজুর বিক্রি হচ্ছে তিন গুণের বেশি দামে।

প্রশ্ন হলো, দাম এতটা কেন বাড়ছে, কোথায় বাড়ছে? বিষয়টি নিয়ে জানতে চট্টগ্রাম কাস্টমসের আমদানির উপাত্ত, আমদানিকারকদের ব্যয় ও বাজারদর বিশ্লেষণ করা হয়। কয়েকটি চালান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইরাক থেকে আমদানিতে জাহাজভাড়াসহ এক মেট্রিক টন বা এক হাজার কেজি জাইদি খেজুরের (প্যাকেটজাত) দাম পড়েছে ৮০০ মার্কিন ডলার (ডলারপ্রতি ১২০ টাকা ধরে কেজিপ্রতি ৯৬ টাকা)। এই খেজুরের দাম কেজিপ্রতি আড়াই ডলার ধরে (ট্যারিফ ভ্যালু বা শুল্ক আরোপের নির্দিষ্ট মূল্য) শুল্ককর আদায় করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ফলে শুল্ককর পড়েছে কেজিতে প্রায় ১৩০ টাকা।

কয়েকটি চালান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৯৬ টাকা কেজির খেজুরের ওপর ১৩০ টাকা দাঁড়ায় শুল্ককর। খুচরায় দাম হয় ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা।

এ হিসাবে জাইদি খেজুর আমদানিতে কেজিপ্রতি আনুষ্ঠানিক ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ২২৬ টাকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন ব্যয়, ব্যাংক ঋণের সুদসহ আনুষঙ্গিক খরচ যোগ করার পর এক কেজি খেজুরে ব্যয় হয় ২৪০ টাকার মতো। তবে খেজুর আমদানিকারক থেকে পাইকারি, পাইকারি থেকে খুচরা—এভাবে কয়েকদফা হাতবদলে দাম বেড়ে হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা।

খেজুরের দাম কেন এত বেশি বাড়ছে জানতে চাইলে ফ্রেশ ফ্রুট ইম্পোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোহাম্মদ কামাল প্রথম আলোকে বলেন, সাধারণ খেজুর যে দামে আমদানি করা হয়, শুল্ক দিতে হয় তার চেয়ে বেশি। খেজুর সংরক্ষণ ও পরিবহনের খরচ অন্যান্য পণ্যের তুলনায় বেশি।

এদিকে গতকাল মঙ্গলবার খেজুরের দাম বেঁধে দিয়েছে সরকার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, অতি সাধারণ ও নিম্নমানের খেজুরের দাম কেজিপ্রতি ১৫০ থেকে ১৬৫ টাকা এবং জাইদি খেজুরের দাম কেজিপ্রতি ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজারে অবশ্য দাম এর চেয়ে বেশি। ঢাকায় দেখা গেছে, অতি সাধারণ ও নিম্নমানের খেজুরের দাম ২০০ টাকার আশপাশে ছিল।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের স্মারকে বলা হয়েছে, দেশে আমদানি করা বিভিন্ন মানের খেজুরের আমদানি মূল্য, আরোপিত শুল্ক, কর ও আমদানিকারকদের অন্যান্য খরচ বিশ্লেষণ করে এই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।

আমদানি নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার ২০২২ সালে খেজুরসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর শুল্ককর বাড়িয়ে দেয়। খেজুর আমদানিতে ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক, ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (মূসক/ভ্যাট), ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর, ৫ শতাংশ অগ্রিম কর ও ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ছিল। মোট করভার প্রায় ৫৯ শতাংশ। সম্প্রতি সরকার রোজা উপলক্ষে ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক কমিয়েছে। এতে কেজিপ্রতি দর ১৩ থেকে ৩৩ টাকা কমার কথা। কিন্তু কমেনি।

এক্সিমের সঙ্গে একীভূত হচ্ছে পদ্মা ব্যাংক

মার্চ ১৫, ২০২৪, বণিক বার্তা

শরিয়াহ্ভিত্তিক এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হতে যাচ্ছে দুর্দশাগ্রস্ত পদ্মা ব্যাংক। বেসরকারি খাতের ব্যাংক দুটির পরিচালনা পর্ষদ এরই মধ্যে একীভূতকরণ প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এ দুই ব্যাংকের মধ্যে আগামী সোমবার সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হবে। গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের উপস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এটি সই হবে বলে সংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত করেছেন।

ব্যাংক দুটির পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল এক্সিম ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পদ্মা ব্যাংক অধিগ্রহণের বিষয়ে প্রস্তাব উত্থাপন হলে এক্সিম ব্যাংকের একাধিক পরিচালক এর বিরোধিতা করেন। তবে পরিস্থিতি পর্যালোচনা শেষে পদ্মা ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হওয়ার বিষয়টি অনুমোদন পায়। এক্সিম ব্যাংকের পর্ষদে প্রস্তাব পাসের পর দুপুরে জরুরি সভা ডাকে পদ্মা ব্যাংক পর্ষদ। সভা থেকে এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত আসে। পরে ব্যাংক দুটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে এ বিষয়ে জানানো হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংকটগ্রস্ত পদ্মা ব্যাংকের যাবতীয় খেলাপি ঋণ সরকার গঠিত একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি কিনে নেবে। এতে একীভূতকরণের ফলে দুই ব্যাংকের আমানতকারীদের কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো ঝুঁকি থাকছে না। আবার পদ্মার কোনো খেলাপি ঋণ না থাকায় এক্সিম ব্যাংকও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

একীভূতকরণের মাধ্যমে দেশে ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে আনার বিষয়ে চলতি বছরের শুরুতে উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের নির্দেশনায় দুর্বল ব্যাংকগুলো সবল ব্যাংকের সঙ্গে একীভূতকরণের এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তবে একীভূতকরণের পদ্ধতি ও দায়-দেনা নির্ধারণের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এখনো কোনো নীতিমালা ঘোষণা করা হয়নি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ নীতিমালা জারির প্রস্তুতি চূড়ান্ত করে এনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে পদ্মা ব্যাংকের একীভূতকরণের মাধ্যমে এর বাস্তবায়ন শুরু হবে। একীভূতকরণ শেষে বিলুপ্তি ঘটবে পদ্মা ব্যাংকের। আর ব্যাংকটির বিদ্যমান দায়-দেনা, সম্পদ ও জনবল এক্সিম ব্যাংকের বলে পরিগণিত হবে।

আইনের বেড়াজালে বন্দি ভোক্তার প্রতিকার

১৫ মার্চ ২০২৪, সমকাল

অসাধু ব্যবসায়ীদের চক্করে পদে পদে ঠকছেন ক্রেতা। কষ্টের আয়ে থলে ভরে বাসায় ফিরছেন ‘বিষ’ কিনে। শুধু তাই নয়, কাঙ্ক্ষিত দাম নিয়েও গছিয়ে দিচ্ছে ভেজাল কিংবা নিম্নমানের পণ্য। হররোজ মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য হাজির হচ্ছে নতুন মোড়কে। ব্যবসায়ীদের এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে শহরকেন্দ্রিক যা দু-একটি অভিযোগ ভোক্তারা দিচ্ছেন; কিন্তু যথাযথ প্রতিকার পাচ্ছেন না ভোক্তা অধিকার সুরক্ষার প্রতিষ্ঠান থেকে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় নীতি, বিধিবিধান, প্রশাসনিক কাঠামো– সবকিছু এখন ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে। তারা নানা কৌশলে প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের পকেট কাটছেন। বিপরীতে ভোক্তার স্বার্থ দেখভালের একমাত্র সক্রিয় প্রতিষ্ঠান জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের হাত-পা যেন বাঁধা আইনের ফাঁকফোকরে।

 দিন দিন অভিযোগের পাহাড় জমলেও সংস্থাটি অভিযানে যেতে পারে না লোকবল সংকটে। আবার বিদ্যমান আইনে ই-কমার্স, স্বাস্থ্যসেবা, টেলিকম, বাড়িভাড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত নেই। এসব খাতে প্রতারিত হলেও ভোক্তার সামনে খোলা নেই প্রতিকার চাওয়ার কোনো পথ।

অবশ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ভোক্তার স্বার্থেই আইনে কিছু সংস্কার প্রক্রিয়াধীন। বিদ্যমান আইনে আরও পাঁচটি সেবা খাত যুক্ত হবে। জনবল সংকট নিরসনেও সৃষ্টি করা হবে নতুন পদ।

বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে আবার ঘুরবে চাকা

১৪ মার্চ ২০২৪, সমকাল

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের চাকা ঘুরছে আবার। বন্ধ থাকা ২০টি পাটকলের সবক’টিই পর্যায়ক্রমে খুলে দেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় এবার বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসছে পাটকলগুলো। কাজে ফিরছেন হাজারো বেকার শ্রমিক। অনেকেই আশা করছেন, রপ্তানি পণ্যের তালিকায় আবার দাপট বাড়বে পাট ও পাটপণ্যের। অভ্যন্তরীণ বাজারেও বাড়বে ব্যবহার। চাহিদা বাড়ার ফলে আবাদ ও উৎপাদন বাড়বে পাটের।

প্রথম পর্যায়ে আজ ছয়টি পাটকল বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব পাটকলের উৎপাদন কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় পাট দিবসের অনুষ্ঠানে এ কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন তিনি। এই পাটকলগুলো আগেই ইজারার মাধ্যমে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ইজারা হয়েছে ৩০ বছরের জন্য। মালিকানার পরিবর্তে মাসিক ভাড়াভিত্তিক ব্যবহার হবে। আগের যেসব শ্রমিক কাজে আগ্রহী কিংবা সক্ষম, নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার শর্ত রয়েছে ইজারা চুক্তিতে।

ছয়টি পাটকল হচ্ছে নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ঘোড়াশালের বাংলাদেশ জুট মিলস, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার কেএফডি, সিরাজগঞ্জের রায়পুরের জাতীয় জুট মিলস, যশোরের রাজঘাটের জুট ইন্ডাস্ট্রিজ, খুলনার দৌলতপুর জুট মিলস ও যশোরের রাজঘাটের কার্পেটিং জুট মিলস লিমিটেড।

এসব পাটকলের মধ্যে ঘোড়াশালের বাংলাদেশ জুট মিলটি ইজারা দেওয়া হয়েছে বেসরকারি মালিকানাধীন জুট অ্যালায়েন্সের কাছে। জানতে চাইলে জুট অল্যায়েন্সের মুখ্য কর্মকৌশল কর্মকর্তা (সিএসও) আল কাজী গতকাল বুধবার সমকালকে বলেন, ২০ ধরনের বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন করবেন তারা। এর মধ্যে উচ্চ চাহিদার লেমিনেটেড হেসিয়ান রয়েছে। উৎপাদিত সব পণ্যই রপ্তানিমুখী।

দৌলতপুর জুট মিলের ব্যবস্থাপনায় এসেছে বেসরকারি খাতের ফরচুন গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইউনি ওয়ার্ল্ড ফুটওয়্যার টেকনোলজি। পাটপণ্যের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি ওই পাটকলে জুতাও তৈরি করবে। গত ৪ সেপ্টেম্বর মূল কারখানাসহ পাটকলের প্রায় ১৪ একর জায়গা ইজারা দেওয়া হয় ফরচুন গ্রুপকে। মাসিক সাড়ে ৯ লাখ টাকায় ৩০ বছরের জন্য এই ইজারা দেওয়া হয়েছে। প্রতি পাঁচ বছর পরপর ১০ শতাংশ হারে ভাড়া বাড়ানো হবে। মিলটিতে উৎপাদিত পাটপণ্য ভারত, তুরস্ক, কানাডা ও ইউরোপে রপ্তানি করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ক্রমাগত লোকসানের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ২৭টি পাটকলের সব এখন বন্ধ। ২০২০ সালের ১ জুলাই ২৫টি পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। দুটি পাটকল বন্ধ হয় আরও আগেই। বন্ধ হওয়ার আগে ২৫টি পাটকলে ২৬ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। ৩৪ হাজার ৭৫৭ জন স্থায়ী শ্রমিকের পাওনা বাবদ নগদে ও সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ৩ হাজার ৫১০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

পাট মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, এসব পাটকলে বস্ত্র ও পাটের ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড লিঙ্কেজ পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সবক’টি মিল বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালু হলে ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

রেমিট্যান্সের ওপর কর আরোপের পরামর্শ আইএমএফের

১৫ মার্চ ২০২৪, দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড অনলাইন বাংলা

সরকারকে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এবং বিভিন্ন ধরনের বন্ডের ওপর দেওয়া কর সুবিধা প্রত্যাহারের পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

দেশে রিজার্ভ সংকটের এই সময়ে রেমিট্যান্স আনতে সরকারের নানামুখী উদ্যোগের অংশ হিসেবে বর্তমানে রেমিট্যান্সের ওপর পুরোপুরি কর অব্যাহতি রয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রবাসী আয়ের ওপর ২.৫৮ শতাংশ নগদ প্রণোদনাও দেওয়া হচ্ছে।

সংস্থাটির ঢাকা সফররত মিশন বৃহস্পতিবার (১৪ মার্চ) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠককালে ‘ইনকাম ট্যাক্স এক্সপেনডিচার’ শীর্ষক তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এ সুপারিশ করা হয় বলে জানিয়েছে বৈঠক সূত্র।

একইভাবে সরকারের বিভিন্ন ধরনের বন্ড, এমনকি শেয়ারবাজার থেকে আয়ের ওপর দেওয়া করছাড়ও বাতিল করার পক্ষে আইএমএফ।

বাণিজ্য মেলার অবকাঠামো

শুরুতেই নকশায় গলদ, আরও লাগবে ৪২৭ কোটি টাকা

১৬ মার্চ ২০২৪, প্রথম আলো

যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়াই ঢাকার অদূরে পূর্বাচলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার জন্য অবকাঠামো বানানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পর্যাপ্ত পার্কিং, গুদামঘর, বিদেশিদের থাকার ব্যবস্থা না রেখে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে।

দুই বছর যেতে না যেতেই এখন সেসব কাজ নতুন করে করতে চায় রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। এ জন্য খরচ হবে আরও ৪২৭ কোটি টাকা। সরকারি কোষাগার থেকে এ টাকা চেয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন এ সংস্থা।

সরকারি নথি বলছে, একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলাকে কেন্দ্র করে যেসব সুযোগ-সুবিধা থাকে, তা পূর্বাচলে নেই। বাণিজ্য মেলা এলাকায় পর্যাপ্ত গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। পণ্য রাখার জন্য নির্মাণ করা হয়নি গুদামঘর (ওয়্যারহাউস)। মেলা প্রাঙ্গণের আশপাশে বিদেশি ক্রেতা ও দেশি বিক্রেতাদের জন্য করা হয়নি বাসস্থানের (ডরমিটরি) ব্যবস্থা। পণ্য প্রদর্শনীর জন্য করা হয়নি পর্যাপ্ত এক্সিবিশন হল। কোনো বড় সম্মেলন বা বড় অনুষ্ঠান করার জন্য নেই মিলনায়তন।

মাংসসহ ২৯ পণ্যের দাম বেঁধে দিলো সরকার

১৫ মার্চ ২০২৪, সমকাল

পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে ২৯টি কৃষি পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। শুক্রবার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মাসুদ করিম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

নতুন নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, খুচরা পর্যায়ে গরুর মাংস কেজিতে ৬৬৪ টাকা ৩৯ পয়সা এবং খাসির মাংস এক হাজার ৩ টাকা ৫৬ পয়সা দাম বেঁধে দেওয়া হয়।

এছাড়া কেজিতে মুগ ডালের নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬৫ টাকা ৪১ পয়সা, মাসকালাই ১৬৬ টাকা ৫০ পয়সা, ছোলা (আমদানি) ৯৮ টাকা ৩০ পয়সা, মসুর ডাল (উন্নত) ১৩০ টাকা ৫০ পয়সা, মসুর ডাল (মোটা) ১০৫ টাকা ৫০ পয়সা, খেসারি ডাল ৯২ টাকা ৬১ পয়সা, পাঙাস (চাষের মাছ) ১৮০ টাকা ৮৭ পয়সা, কাতল (চাষ) ৩৫৩ টাকা ৫৯ পয়সা।

ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৭৫ টাকা ৩০ পয়সা, সোনালি মুরগি ২৬২ টাকা, ডিম প্রতি পিস ১০ টাকা ৪৯ পয়সা, দেশি পেঁয়াজ কেজিপ্রতি ৬৫ টাকা ৪০ পয়সা, দেশি রসুন প্রতি কেজি ১২০ টাকা ৮১ পয়সা, আমদানি করা আদা প্রতি কেজি ১৮০ টাকা ২০ পয়সা, শুকনা মরিচ প্রতি কেজি ৩২৭ টাকা ৩৪ পয়সা, কাঁচামরিচ প্রতি কেজি ৬০ টাকা ২০ পয়সা, বাঁধাকপি কেজিপ্রতি ২৮ টাকা ৩০ পয়সা, ফুলকপি কেজিপ্রতি ২৯ টাকা ৬০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।

কেজিপ্রতি বেগুন ৪৯ টাকা ৭৫ পয়সা, শিম ৪৮ টাকা, আলু ২৮ টাকা ৫৫ পয়সা, টমেটো ৪০ টাকা ২০ পয়সা, মিষ্টি কুমড়া ২৩ টাকা ৩৮ পয়সা, জাহিদি খেজুর ১৮৫ টাকা ৭ পয়সা, চিড়া (মোটা) ৬০ টাকা, প্রতি হালি সাগর কলা ২৯ টাকা ৭৮ পয়সা ও বেসন ১২১ টাকা ৩০ পয়সা দাম বেঁধে দেওয়া হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

একীভূত হয়েছিল ১৪ বছর আগে, এখনো ধুঁকছে ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক

১৮ মার্চ ২০২৪, প্রথম আলো

অপরিকল্পিতভাবে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান একীভূত করার সিদ্ধান্ত কতটা ভুল হতে পারে, তার বড় উদাহরণ সরকারি মালিকানাধীন বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল) পিএলসি। দেড় যুগ আগে দেশের দুটি বিপর্যস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক (বিএসবি) ও বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থাকে (বিএসআরএস) একীভূত করে গঠন করা হয়েছিল বিডিবিএল, যা ২০১০ সালের ৩ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে।

বিএসবি-বিএসআরএস একীভূত হয়ে নতুন নামে বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু পুরোনো খেলাপি ঋণের বোঝা বয়ে বেড়ানোর পাশাপাশি নতুন করে দেওয়া ঋণও খেলাপি হয়ে গেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসাসফল হতে পারেনি; বরং ধুঁকছে খুব। ব্যাংকটিতে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যবেক্ষক নিয়োগ করার পরও এর কোনো উন্নতি ঘটেনি। এটি ব্যাংকিং ব্যবসার পরিবর্তে শেয়ার ব্যবসা ও ভবন ভাড়া বাবদ পাওয়া আয়ের ওপর নির্ভর করেই কোনোমতে টিকে আছে।

বিডিবিএলের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, একীভূত হওয়ার পর বাণিজ্যিক চরিত্রে ফিরে ‘আগ্রাসী ব্যাংকিং’ করার কারণেই মূলত প্রতিষ্ঠানটি দুর্দশায় পড়েছে। যে কারণে ঋণের ৪২ শতাংশই খেলাপি হয়ে গেছে। গত ডিসেম্বরের শেষে বিডিবিএলের ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ৯৮২ কোটি টাকা।

গৃহিণীদের ব্যাংক হিসাবে ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের চেয়ে বেশি অর্থ!

মার্চ ১৮, ২০২৪, বণিক বার্তা

দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে ২০২৩ সাল শেষে গৃহিণীদের নামে জমা ছিল ২ লাখ ১ হাজার ৮৪২ কোটি টাকার আমানত। পরিমাণের দিক থেকে তা দেশের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের আমানতের চেয়েও বেশি। ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের ব্যাংক হিসাবে মোট আমানতের পরিমাণ ২ লাখ ৬৩৯ কোটি টাকা। আবার আমানতে প্রবৃদ্ধির দিক থেকেও দেশের ব্যবসায়ী, প্রবাসী, শিল্পপতি, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবীদের চেয়ে গৃহিণীরা এগিয়ে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ২০১৯ সালেও গৃহিণীদের ব্যাংক হিসাবে আমানতের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। সে অনুযায়ী ওই সময় থেকে এ পর্যন্ত তাদের আমানতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৬৯ শতাংশ।

যদিও বিভিন্ন সংস্থার গবেষণা ও জরিপ বলছে, দেশের প্রায় ৭৪ শতাংশ নারীর কাছে এখনো ব্যাংক সেবা পৌঁছেনি। শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের বিচারেও দেশের নারীরা এখনো বেশ পিছিয়ে। আবার যৌক্তিক মজুরির ক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তারা। উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে অধিকার নিয়েও শোনা যায় নারীর বঞ্চনার অনেক অভিযোগ। উদ্যোক্তা হিসাবে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও নারীরা ব্যাংকগুলোর বৈষম্যের শিকার বলে অভিযোগ রয়েছে। এত অপ্রাপ্তি, বৈষম্য, বঞ্চনা ও উপেক্ষার গল্পের বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে ব্যাংকে গৃহিণীদের গচ্ছিত আমানতে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন শিডিউলড ব্যাংকস স্ট্যাটিস্টিক্সের সর্বশেষ সংখ্যার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট আমানতের স্থিতি ছিল ১৭ লাখ ৪৯ হাজার ১৩২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯ লাখ ২৬ হাজার ১৭১ কোটি টাকা ছিল ব্যক্তিশ্রেণীর। চাকরিজীবী, গৃহিণী, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, অনিবাসী বাংলাদেশী, কৃষক ও মৎস্যজীবী, অবসরে যাওয়া ব্যক্তি, ছাত্র, বাড়ির মালিকসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের নামে এ আমানত ব্যাংকে জমা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ২ লাখ ৯২ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার আমানত রয়েছে চাকরিজীবীদের। আমানতের স্থিতির দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানেই রয়েছে গৃহিণী বা বেগমরা। সে হিসাবে ব্যক্তিশ্রেণীর আমানতের ২১ দশমিক ৭৯ শতাংশের মালিকানাই গৃহিণীদের। তৃতীয় সর্বোচ্চ ২ লাখ ৬৩৯ কোটি টাকার আমানত রয়েছে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের ব্যাংক হিসাবে। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবীসহ স্বাধীন পেশাজীবীদের ব্যাংক হিসাবে জমা আছে ৬৪ হাজার ২৮২ কোটি টাকা।

দেশে রেস্তোরাঁর সংখ্যা কত, ব্যবসা কত টাকার, জানেন কি

১৮ মার্চ ২০২৪, প্রথম আলো

রাজধানীর মোড়ে মোড়ে এখন রেস্তোরাঁ। জেলা ও উপজেলা শহরেও রেস্তোরাঁ বাড়ছে। বিনিয়োগ করছেন তরুণ উদ্যোক্তারা।

রেস্তোরাঁগুলোতে গ্রাহকও বাড়ছে। পরিবার নিয়ে, স্বজনদের নিয়ে, বন্ধুদের নিয়ে মানুষ রেস্তোরাঁয় খেতে যাচ্ছেন। ফলে রেস্তোরাঁগুলো দেশের অর্থনীতিতে বড় অঙ্কের মূল্য যোগ করছে, কর্মসংস্থান তৈরি করছে মানুষের।

এক দশকে রেস্তোরাঁ ৫৮% বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৩৬ হাজারে। নিরাপদ করতে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ।

সমস্যা হলো, অনেক রেস্তোরাঁ হয়েছে আবাসিক ভবনে। অনেক রেস্তোরাঁ হয়েছে অফিস হিসেবে ব্যবহারের অনুমোদন নেওয়া ভবনে। অনেক রেস্তোরাঁর নানা ধরনের সনদ ও অনুমোদনে ঘাটতি আছে। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ ও মানসম্পন্ন খাবার সরবরাহের ক্ষেত্রেও ঘাটতি আছে অনেক রেস্তোরাঁয়।

রাজধানীর বেইলি রোডে গ্রিন কোজি কটেজ নামের ভবনটিতে গত ২৯ ফেব্রুয়ারি আগুনে ৪৬ জনের মৃত্যুর পর রেস্তোরাঁর অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি সামনে আসে। ওই ভবনে আটটি রেস্তোরাঁ ছিল, কিন্তু ভবনটিতে রেস্তোরাঁ প্রতিষ্ঠার কোনো অনুমোদনই ছিল না।

আগুনে মারা যাওয়া ব্যক্তিরা কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ স্বজনদের নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে খেতে গিয়েছিলেন। কেউ কেউ ভবনে থাকা রেস্তোরাঁগুলোতে কাজ করে সংসার চালাতেন।

রেস্তোরাঁশিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে কীভাবে পুরো ব্যবস্থা নিরাপদ করা যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

আদিল মুহাম্মদ খান, সভাপতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স

বেইলি রোডের আগুনের পর রাজধানীজুড়ে অভিযান শুরু করে সরকারের পাঁচ সংস্থা—রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর। সংস্থাগুলোর ‘বিচ্ছিন্ন’ অভিযানে রেস্তোরাঁ ভেঙে ফেলা, সিলগালা করে দেওয়া, কর্মীদের গ্রেপ্তার ও জরিমানার ঘটনা ঘটে। এর বাইরে সারা বছরই রেস্তোরাঁয় অভিযান চালায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সংস্থা। রেস্তোরাঁর মালিকদের অভিযোগ, সারা বছর সংস্থাগুলোর অসাধু কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করেই তাঁদের চলতে হয়।

আরও পড়ুন

‘রেস্তোরাঁর অনুমতি কারা দিল, তাঁদের গ্রেপ্তার করুন’

‘রেস্তোরাঁর অনুমতি কারা দিল, তাঁদের গ্রেপ্তার করুন’

নগর–পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতিরা বলছেন, রেস্তোরাঁয় উদ্যোক্তাদের কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। এতে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। রেস্তোরাঁগুলোকে নিয়মের মধ্যে আনা দরকার। কিন্তু বিচ্ছিন্ন অভিযানে কোনো সমাধান আসবে না।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, এক দিনে সব অনিয়ম বন্ধ করা যাবে না। রেস্তোরাঁশিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে কীভাবে পুরো ব্যবস্থা নিরাপদ করা যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

রেস্তোরাঁগুলো বছরে কত টাকার কেনাবেচা করে, তার হিসাবও উঠে এসেছে বিবিএসের জরিপে। বলা হয়েছে, এর পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা (গ্রস আউটপুট), যা এক দশক আগের তুলনায় তিন গুণের বেশি।

রেস্তোরাঁ কত

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০২১ সালে দেশের রেস্তোরাঁ খাত নিয়ে একটি জরিপ করে। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এ খাতের অবদান জানতে জরিপটি করা হয়।

জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে মোট হোটেল ও রেস্তোরাঁ ছিল ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৭৪টি, যা ২০০৯-১০ অর্থবছরের চেয়ে ৫৮ শতাংশ বেশি। সরকারি সংস্থার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৮৫২টি। বাকি সব ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন।

আরও পড়ুন

রেস্তোরাঁয় ভরা ঢাকার এসব ভবন আসলে ‘টাইম বোমা’: স্থপতি ইকবাল হাবিব

রেস্তোরাঁয় ভরা ঢাকার এসব ভবন আসলে ‘টাইম বোমা’: স্থপতি ইকবাল হাবিব

বিগত এক দশকে বহু তরুণ রেস্তোরাঁ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উদ্যোক্তা হয়েছেন। তাঁদের একজন ঢাকার প্রনীল শামসাদ জাদিদ। ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে তিনি চাকরি করতে যাননি। বন্ধুদের মতো বিদেশেও যাননি; বরং পরিবারের কাছ থেকে মূলধন নিয়ে রেস্তোরাঁ করেছেন। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় তিনটি ব্র্যান্ড নামের অধীনে তাঁর ১১টি রেস্তোরাঁ রয়েছে। বেইলি রোডে আগুনের পর অভিযানে তাঁর দুটি রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সন্তানেরা এখন বিভিন্ন এলাকার রেস্টুরেন্টগুলোতে যাওয়ার মধ্যেই বিনোদন পায়।

শরীফ আল নূর, চিকিৎসক

প্রনীল প্রথম আলোকে বলেন, ‘রেস্তোরাঁ করার সময় কেউ বলেনি এত অনুমোদন লাগবে। আমরা জানতাম ট্রেড লাইসেন্স হলেই হয়। এখন ১০-১১টি সনদের কথা বলা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, এখন যে আচরণ করা হচ্ছে, তা অমানবিক। মনে হচ্ছে দেশে না থেকে বিদেশে চলে গেলেই ভালো হতো।

বিনিয়োগ বাড়ায় রেস্তোরাঁয় কর্মসংস্থানও দ্বিগুণ হয়েছে। বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, রেস্তোরাঁ খাতে যুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ ৭২ হাজার। এক দশক আগে সংখ্যাটি ছিল ৯ লাখের মতো। শুধু পুরুষ নন, রেস্তোরাঁগুলোতে এক লাখের বেশি নারীও কাজ করেন। কর্মীরা রেস্তোরাঁগুলো থেকে বছরে ৩১ হাজার ৪২৯ কোটি টাকা পান বেতন, মজুরি ও অন্যান্য ভাতা পান। একেকজন কর্মী বছরে গড়ে পান ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা।

বাংলাদেশে পথশিশু রয়েছে ৩৪ লাখ

মার্চ ১৮, ২০২৪, বণিক বার্তা

বাংলাদেশে ৩৪ লাখ পথশিশু রয়েছে। পথশিশুরা তাদের দৈনন্দিন জীবনে নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। নিরাপত্তহীনতা, খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই তারা বেড়ে উঠছে। তাদের সুন্দর শৈশব হারিয়ে যাচ্ছে।

‘‌দ্য কোয়ালিটি স্টাডি অন চিলড্রেন লিভিং ইন স্ট্রিট সিচুয়েশনস ইন বাংলাদেশ ২০২৪’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

বিদেশি ঋণ দুই বছরে বেড়ে হবে দ্বিগুণ

১৯ মার্চ ২০২৪, সমকাল

বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে ২০২২-২৩ অর্থবছরে সরকারের ব্যয় হয়েছে ২৬ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা। সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রাক্কলন হলো, আগামী অর্থবছরে (২০২৪-২৫) এ বাবদ ব্যয় দাঁড়াবে ৫৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে আসল ৩৬ হাজার ৫০০ কোটি এবং সুদ ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মানে দুই বছরের মাথায় বিদেশি ঋণ পরিশোধে সরকারের ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হবে। ক্রমবর্ধমান পরিশোধের চাপ মাথায় রেখে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করতে হচ্ছে সরকারকে।

সরকারের পক্ষে বিদেশি ঋণ ও সুদ পরিশোধের দায়িত্বে রয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ-ইআরডি। পরিশোধের চাপ বাড়তে থাকায় সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়কে নির্ধারিত ব্যয়সীমা ১৬ হাজার কোটি টাকা বাড়াতে চিঠি দিয়েছে ইআরডি। ইআরডি সচিব মো. শাহ্‌রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী স্বাক্ষরিত চিঠিতে জানানো হয়, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিদেশি ঋণের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে সরকার। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অধিক হারে বৈদেশিক ঋণ আহরণ করা হয়েছে। ফলে পরিশোধিত ঋণের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। তাছাড়া নতুন ঋণের পরিশোধও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

কৃষি বিপণনের ‘যৌক্তিক’ দামে বাজারে তালগোল

২০ মার্চ ২০২৪, সমকাল

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ২৯ পণ্যের দর বেঁধে দেওয়া নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলা চলছে। রাজধানীসহ দেশের কোথাও নেই ‘যৌক্তিক মূল্য’ নির্ধারণের প্রভাব। উল্টো সব পণ্যের দাম আরও চড়েছে। পণ্যের দর বেঁধে দিয়েই ‘বিচারিক ক্ষমতা’ নেই– এমন ধুয়া তুলে পুরোদমে মাঠছাড়া কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। বাজারের এমন অস্থির সময়েও বন্ধ অধিদপ্তরের ‘কৃষকের বাজার’। এমনকি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) পরিচালিত বাজারেও মানা হচ্ছে না নির্ধারিত দাম। অন্য মন্ত্রণালয় যেখানে নিজেরাই সুলভ দরে পণ্য বিক্রি করছে, সেখানে বাজারে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত রাখার মতো তেমন পদক্ষেপ নেই কৃষি মন্ত্রণালয়ের।

উল্টো কোনো বাতচিৎ ছাড়াই হঠাৎ ২৯ পণ্যের দাম বেঁধে দিয়ে বাজারের চলমান আগুন দামে যেন ঘি ঢেলেছে। বিতর্কের মুখে পড়েছে মূল্য তালিকা; তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। অসামঞ্জস্যপূর্ণ এ তালিকা ধরে অভিযানে গিয়ে তালগোল পাকাচ্ছে অন্য সংস্থা। ব্যবসায়ীদের যুক্তির মুখে হার মানতে হচ্ছে কখনও কখনও। ফলে রোজার আগে থেকেই বিভিন্ন পণ্যের দামে উত্তাপ থাকলেও নতুন করে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। সরকারের হুঁশিয়ারি, অভিযান আর পণ্য আমদানিতেও বাজার পরিস্থিতি বাগে না আসায় ক্রেতারা ক্ষোভে ফুঁসছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মনগড়া মূল্য তালিকার কারণে বাজার হয়ে যাচ্ছে আরও নিয়ন্ত্রণহীন। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরকে দ্রুত তাদের দরের তালিকা নিয়ে সব পক্ষের সঙ্গে বসা দরকার। অন্যদিকে বেঁধে দেওয়া ২৯ পণ্যের দরকে অসার, অর্থহীন ও কল্পনাপ্রসূত বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি। সংগঠনটি বলেছে, যথেষ্ট যাচাই-বাছাই ও বিবেচনা ছাড়াই সরকারি সংস্থাটি দাম নির্ধারণ করেছে। এ জন্য তারা প্রজ্ঞাপন স্থগিতের দাবি জানিয়েছে।

পরের বেলা ভাত জুটবে কিনা জানে না ৩৪ লাখ মানুষ

২০ মার্চ ২০২৪, সমকাল

খাদ্যের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ বেশ কঠিন হয়ে উঠেছে অনেকের জন্য। একবেলা খাবারের শেষে পরের বেলার চালের জোগান নেই– দেশে এ রকম পরিবারের হার ২ শতাংশ। আটা মজুত থাকে না ৬০ শতাংশ পরিবারে। নিত্যপণ্যের মধ্যে ডালের সংস্থান নেই ১৯ শতাংশ পরিবারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খাদ্য নিরাপত্তা-সংক্রান্ত জরিপের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

খানা আয় ও ব্যয় জরিপের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে পরিবারের সংখ্যা এখন ৪ কোটি ১০ লাখ। সংস্থার জনশুমারি ও গৃহগণনার চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯১১ জন। সে হিসাবে দেশের ৩৩ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮০ জন মানুষের একবেলা খাওয়ার পর পরের বেলার চালের জোগান নেই।

খাদ্য নিরাপত্তা পরিসংখ্যান-২০২৩ নামে এ প্রতিবেদন গত শুক্রবার বিবিএসের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে খাদ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে বলা হয়, খাদ্য এবং সুষম খাদ্য গ্রহণ দেশের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে বড় উদ্বেগের বিষয়। এতে আরও বলা হয়, ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে জর্জরিত জনগোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করে কোনো দেশ অর্থনীতির ভিত গড়তে পারে না। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে উন্নীত হতে চাইলে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টিতে ব্যাপক পরিমাণে কার্যকর বিনিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

জানতে চাইলে বিবিএসের সংশ্লিষ্ট জরিপের প্রকল্প পরিচালক আবদুল হালিম সমকালকে বলেন, মজুত বলতে পরিবারের কতটুকু খাদ্য আছে, তা দিয়ে কীভাবে চলতে পারে– তা বোঝানো হয়েছে। সরাসরি প্রশ্নের জবাব থেকে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, জাতীয় পর্যায়ে খাদ্যের মজুত নিয়ে একাধিক সংস্থার কাছে তথ্য-উপাত্ত আছে। তবে পরিবার পর্যায়ে খাদ্য পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা দেশে এটিই প্রথম। দেশে খাদ্য নিরাপত্তা-সংক্রান্ত এ ধরনের জরিপও এটিই প্রথম। এ কারণে খাদ্য গ্রহণের এ নাজুক পরিস্থিতির প্রবণতা আগের তুলনায় বাড়ল, না কমলো– তা তুলনা করা যাচ্ছে না।

জরিপে নিত্যপণ্য হিসেবে প্রধান খাদ্য চাল, আটা ও মসুর ডালের মজুত জানতে চাওয়া হয়েছে। এতে দেখা যায়, ২ শতাংশ পরিবারে জীবিকা নির্বাহের জন্য চালের কোনো মজুত নেই। অর্থাৎ আগামী বেলার খাবার অনিশ্চিত এসব পরিবারের। সিটি করপোরেশনের বাইরের চিত্র আরও খারাপ। গ্রামাঞ্চল ও শহরাঞ্চল মিলে ২ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবারে চালের কোনো মজুত নেই।

প্রায় ৬৯ শতাংশ খানাপ্রধান বলেছেন, কেনার মাধ্যমে তারা চালের মজুত করে থাকেন। বাকিরা নিজস্ব উৎপাদন এবং সরকারি সংস্থা থেকে চাল পেয়ে থাকেন।

আটার ক্ষেত্রে মজুত আরও কম। ৬০ দশমিক ২ শতাংশ পরিবারে আটার মজুত নেই। মজুত থাকে না গ্রামের ৬৮ শতাংশ পরিবারের। যেসব পরিবারে পণ্যটির মজুত থাকে, তাদেরও চলে সাড়ে ৯ দিন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধান খাদ্য হিসেবে চালের ওপর নির্ভরতার কারণে আটার মজুত এত কম হয়ে থাকতে পারে। একইভাবে মসুর ডালের মজুত নেই ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবারে।

লাভজনক প্রতিষ্ঠান এখন লোকসানে

২০ মার্চ ২০২৪, প্রথম আলো

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) দীর্ঘদিন ধরে লাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিল। তাদের আয়ের প্রধান উৎস ফেরিতে যানবাহন ও যাত্রী পারাপার। ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট আয়ের ৯৪ শতাংশই এসেছিল ফেরি খাত থেকে। তবে এই খাতে আয় ব্যাপক হারে কমে গেছে। এতে গত অর্থবছরে (২০২২-২৩) বড় ধরনের লোকসানে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিআইডব্লিউটিসি সূত্র জানিয়েছে, গত অর্থবছরে ফেরি খাতে আয় কমেছে ২৩ শতাংশ, যার পরিমাণ ৯৩ কোটি টাকা। এতে ওই অর্থবছরে সরকারি প্রতিষ্ঠানটির লোকসান হয়েছে ৩৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এর আগে কখনো তারা এত বড় লোকসানে পড়েনি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গত কয়েক বছরে পদ্মাসহ কয়েকটি সেতু চালু হওয়ায় ফেরি খাতে বিআইডব্লিউটিসির আয় কমছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিআইডব্লিউটিসিকে লোকসান থেকে তুলে আনা কঠিন হবে। কারণ, আয়ের প্রধান উৎস ফেরি খাত সংকুচিত হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে এই খাতে আয় আরও কমতে পারে। কারণ, ফেরিতে যানবাহন ও যাত্রী পারাপার নিয়মিত কমছে।

১৩ অর্থবছরের নথি ঘেঁটে দেখা যায়, এই সময়ের মধ্যে বিআইডব্লিউটিসি প্রথম লোকসানে পড়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরে। ওই বছর প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৬ কোটি টাকা লোকসান হয়। পরের বছর লাভ করলেও গত দুই অর্থবছর টানা লোকসান দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিআইডব্লিউটিসিকে লোকসান থেকে তুলে আনা কঠিন হবে। কারণ, আয়ের প্রধান উৎস ফেরি খাত সংকুচিত হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে এই খাতে আয় আরও কমতে পারে। কারণ, ফেরিতে যানবাহন ও যাত্রী পারাপার নিয়মিত কমছে।

দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যাতায়াতে একসময় ফেরিপথে পদ্মা নদী পাড়ি দিতে হতো। ২০২২ সালের জুনে পদ্মা সেতু চালুর পর এই পথে যাতায়াতের অন্যতম নৌপথ শিমুলিয়া-বাংলাবাজার-মাঝিরকান্দি বন্ধ হয়ে যায়।

উত্তরাঞ্চলে খুলছে সম্ভাবনার দুয়ার

২৩ মার্চ ২০২৪, সমকাল

পিছিয়ে পড়া উত্তরাঞ্চলে অনেকেই বিনিয়োগে আগ্রহ দেখান না। তাই গড়ে ওঠেনি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, তৈরি হয়নি নতুন উদ্যোক্তা। ফলে বেকারের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি পিছিয়ে রয়েছে এখানকার জেলাগুলো। তবে এবার খুলছে সম্ভাবনার দুয়ার।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) উত্তরের বেশ কয়েকটি জেলায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনুমোদন দিয়েছে। ইতোমধ্যে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার সিরাজগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাড়ে যমুনা নদীর তীরে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে গড়ে উঠছে দেশের প্রথম শতভাগ সবুজ অর্থনৈতিক অঞ্চল। আর সীমান্ত জেলা কুড়িগ্রামে হচ্ছে ভুটানের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। এ ছাড়া রাজশাহী, রংপুর, নাটোর, পঞ্চগড়, দিনাজপুর এবং গাইবান্ধায় প্রকল্পের কাজ প্রক্রিয়াধীন।

ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বঙ্গবন্ধু সেতু চালুর পরও উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো বাস্তবায়ন হলে এ জনপদের মানুষের জন্য তা হবে আশীর্বাদ।

ইতোমধ্যেই এ অঞ্চলের নীলফামারী ও পাবনায়  গড়ে ওঠা দুটি ইপিজেড পেয়েছে দারুণ সাফল্য। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি এই অঞ্চলে গড়ে উঠছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থান।

অবস্থানগত কারণে কুড়িগ্রামের সঙ্গে ভারত ও ভুটানের যোগাযোগ বেশ ভালো। বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল, কাঁচামাল তৈরির সম্ভাবনা এবং মানবসম্পদ মিলিয়ে কুড়িগ্রামে যৌথ অর্থনৈতিক অঞ্চল হলে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নতি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী মোট ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা ও এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির  প্রচেষ্টায় যুক্ত রয়েছে বেজা।

সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বেজা ২০১৮ সালে এই অঞ্চলকে চূড়ান্ত নিবন্ধন দেয়। বিভিন্ন উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি উদ্যোক্তা যৌথভাবে এর মালিকানায় রয়েছে। ১ হাজার ৪১ একর জায়গায় এ অঞ্চল গড়ে উঠছে।

এখানে ভূমি উন্নয়নের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। দেশি ও বিদেশি ১৪টি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে ১১০ একর জমি বরাদ্দ নিয়েছে। বাকি জমির জন্য সৌদি আরব, জাপান, চীন, আমেরিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, নরওয়েসহ কয়েকটি দেশের বিনিয়োগকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা করছে কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে যোগাযোগও করা হয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে ভূমি উন্নয়নের কাজে প্রকৌশলগত সহায়তা দিচ্ছে জাপান ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (জেডিআই)।

সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিচালক শেখ মনোয়ার হোসেন জানান, প্রাথমিকভাবে ১৪টি প্রতিষ্ঠান বস্ত্র, তৈরি পোশাক, ডাইং ফ্যাক্টরি, সুতা উৎপাদন, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ পণ্য ও ইলেট্রিক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্লট বরাদ্দ পেয়েছে। এখানকার শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ৫ লাখেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে তারা মনে করছেন। তাদের মূল এলাকায় সব মিলিয়ে ৪০০ প্লট থাকছে।

সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আবু ইউসুফ সূর্য বলেন, বঙ্গবন্ধু সেতু চালুর পর উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলায় মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা যে হারে উন্নতি হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। ওই সেতুর পর বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এ জনপদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রকল্প। এখন আমাদের আশার আলো এই অর্থনৈতিক অঞ্চল। এগুলো বাস্তবায়ন হলে এ অঞ্চলের বেকার সমস্যা দূর হবে। বিনিয়োগকারীরাও কাঁচামাল আনা ও উৎপাদিত পণ্য পরিবহনে বাড়তি সুবিধা পাবেন।

এদিকে বাংলাদেশ ও ভুটান সরকারের যৌথ উদ্যোগে কুড়িগ্রামে জিটুজি ভিত্তিক প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাই করতে ভুটানের একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি কুড়িগ্রাম ঘুরে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কুড়িগ্রাম জেলার বৃহৎ এলাকা চরাঞ্চল। এখানকার পিছিয়ে পড়া মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নয়নের জন্য জেলায় কলকারখানা প্রয়োজন। এখান থেকে ভুটান অনেক কাছে। ফলে ভুটানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে পারলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্রুত হবে। মানুষের সক্ষমতা বাড়বে।

কুড়িগ্রামের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিজানুর রহমান বলেন, এ প্রকল্পের জন্য প্রাথমিকভাবে ১৩৩ দশমিক ৯২ একর খাস জমি বেজা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আরও ৮০ একর ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কুড়িগ্রামের সোনাহাট স্থলবন্দর হয়ে ভুটানের ফুন্টশোলিং এলাকার দূরত্ব কম। সহজে যাতায়াত করা যায়। ফলে ভুটানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি হলে জেলার আর্থসামাজিক অবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। নতুন নতুন ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্বার উন্মুক্ত হবে। সর্বোপরি জেলার স্থল সীমান্ত পথে বহুল প্রতীক্ষিত ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা চালু ত্বরান্বিত হবে।

পরিকল্পনায় যেসব অঞ্চল

বগুড়ার শাজাহানপুরে ২৫১ একর জমিতে তৈরি হবে অর্থনৈতিক অঞ্চল। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বেজা এবং জেলা প্রশাসন যৌথভাবে এটা নিয়ে কাজ করছে। শাজাহানপুর উপজেলার আশেকপুর ইউনিয়নের পাঁচটি মৌজার জমি অধিগ্রহণের প্রস্তুতি চলছে।

বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র সহসভাপতি মাহফুজুল ইসলাম রাজ জানান, বগুড়ায় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা হলে অন্তত এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এই মুহূর্তে ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত কিছু জটিলতা রয়েছে। তবে জেলা প্রশাসন উদ্যোগী হলে সহজেই সমাধান করা যাবে। আর সরকারের অনুমতি পেলে প্রকল্পটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমেও বাস্তবায়ন সম্ভব।

নাটোরের লালপুরের আরজী-বাকনাই রসুলপুর, বন্দোবস্ত গোবিন্দপুর, বালিতিতা, লালপুর ও চরজাজিরা মৌজায় পদ্মা নদীর বিস্তীর্ণ চর এলাকায় ৩ হাজার ৪১৮ একর সরকারি খাসজমির ওপর প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের এলাকা থেকে পদ্মা নদীর দূরত্ব ৬ কিলোমিটার, ঈশ্বরদী জংশন থেকে ১৫ কিলোমিটার ও ঈশ্বরদী বিমানবন্দর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। কৃষিনির্ভর এলাকা হওয়ায় এখানে কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা বিকাশের সুযোগ রয়েছে। গ্যাস ও প্রয়োজনীয় কাঁচামালের পর্যাপ্ত সুবিধা পাওয়া যাবে।

এ প্রসঙ্গে বেজা চেয়ারম্যান শেখ ইউসুফ হারুন বলেন, নাটোরে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে পারলে এলাকার প্রায় ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। এখানে কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উপযোগী স্থান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লালপুরে পদ্মার চরে প্রস্তাবিত ‘নাটোর অর্থনৈতিক অঞ্চল’ ২০১৫ সালেই অনুমোদন দেন। এ কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো বাধা নেই।

রাজশাহীর পবা উপজেলার কয়রা, জয়কৃঞ্চপুর, মাড়িয়া, বালানগর ও ভবানীপুর এলাকায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। মোট জমির পরিমাণ ২০৪ একর। প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলটি রাজশাহীর হারিয়ান রেলস্টেশন থেকে ১০ কিলোমিটার এবং বিমানবন্দর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে। স্থানটির সঙ্গে সড়ক, রেল ও বিমান যোগাযোগের সুবিধা রয়েছে।

রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাসুদুর রহমান বলেন, কৃষিপ্রধান রাজশাহী অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্যের উৎপাদন হয়। এখানে আমসহ কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে উঠলে স্থানীয় কৃষকরা যেমন লাভবান হবেন, তেমনি এই অঞ্চলে কর্মসংস্থান বাড়বে।

রাজশাহীর জেলা প্রশাসক শামীম আহম্মেদ বলেন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল রাজশাহীর পবায় করা যাবে কিনা, তা জানার জন্য চার মাস আগে আমাদের মতামত চাওয়া হয়। আমরা করা যেতে পারে বলে মতামত দিয়েছি। পবায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করার জন্য খাস জমি আছে। এটা হলে রাজশাহীতে শিল্প-কারখানা হবে।

তিনি বলেন, এই এলাকার উপযোগী এবং কৃষিনির্ভর শিল্প হলে এলাকার আম, টমেটো ও সবজির বহুমুখী ব্যবহার হবে। এতে এলাকার অর্থনীতির বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটবে।

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার টেপামধুপুর ইউনিয়নে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। টেপামধুপুর ইউনিয়নের হয়বৎ খাঁ মৌজায় ২৫৪ একর খাস জমিতে এ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠবে। ইতোমধ্যে জমি নির্বাচনের কাজ চূড়ান্ত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এ-সংক্রান্ত পত্র প্রেরণ করা হয়েছে। রংপুর বিভাগীয় কমিশনার হাবিবুর রহমান এ তথ্য জানান।

রংপুরের গুরুত্ব তুলে ধরে গবেষক ও লেখক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, এ বিভাগটি দারিদ্র্যের শীর্ষে আছে। এখানে উন্নয়ন বৈষম্য কমেনি। রংপুর বিভাগের সঙ্গে ঢাকা বিভাগের বৈষম্য তিন গুণ। ঢাকা বিভাগের দারিদ্র্য ১৬ শতাংশ, রংপুর বিভাগে ৪৭ দশমিক ২৩ শতাংশ।

গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী পৌর বন্দর থেকে জেলা শহর পর্যন্ত ৫০০ একর জমিতে সরকারি উদ্যোগে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হবে। রংপুর চিনিকলের সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের ১ হাজার ৮৪২ একর জমিতে রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকা (আরইপিজেড) স্থাপনের এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। সে অনুযায়ী শিল্প মন্ত্রণালয় এ জমি বেপজার অনুকূলে হস্তান্তরের নির্দেশনা দেয়।

রয়েছে নানা জটিলতা

উত্তরের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ অর্থনৈতিক জোন করার ক্ষেত্রে নানা জটিলতাও রয়েছে। বগুড়ায় জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে ভূমি মালিকদের নামে ২০১৭ সালে অধিগ্রহণের নোটিশ ইস্যু করা হয়। তবে ভূমি মালিকদের পক্ষ থেকে জমির মূল্য দেড় গুণের পরিবর্তে ২০১৭ সালের আইন অনুযায়ী তিন গুণ চেয়ে উচ্চ আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। এখন জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মামলার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু করা যাচ্ছে না।

বগুড়ার সাবেক জেলা প্রশাসক জিয়াউল হক বলেন, এত বেশি টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে প্রকল্পটি লাভজনক হবে কিনা, সে ব্যাপারে বেজা কর্তৃপক্ষ নতুন করে ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা যাচাই) করতে চায়।

রংপুরের ব্যাপারে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, বিভাগের আয়তন, জনসংখ্যা এবং প্রয়োজনের হিসাব করলে এখানে অন্তত ২০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল হওয়া প্রয়োজন। রংপুর, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুরের অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি। কারণ রংপুর বিভাগে চার কোটি মানুষের খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়। দেশের খাদ্য জোগানদাতা হিসেবে নাম থাকবে রংপুর বিভাগের আর উন্নয়নের তলানিতে পড়ে থাকবে, এটি মেনে নেওয়া যায় না। সরকারের উচিত বৈষম্য দূরীকরণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

আগেরগুলো কেমন চলছে

পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা থাকায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের বিশেষ অঞ্চল পাবনার ঈশ্বরদী ইপিজেড। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা) সূত্র জানায়, ঈশ্বরদী ইপিজেডে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীর সংখ্যা ১৭ হাজার ১২৫ জন। ব্যাটারি, প্রক্রিয়াজাত প্লাস্টিক, অ্যাগলোমারেট, টেক্সটাইল কেমিক্যাল, প্লেন পলি, রেডিমেড গার্মেন্ট, ক্রাফট, হেয়ার, ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্লাভস, গার্মেন্ট এক্সেসরিজ ও অন্যান্য বায়োকেমিক্যাল পণ্য উৎপাদন হচ্ছে এখানকার কারখানাগুলোয়।

ঈশ্বরদী ইপিজেডে ২১টি কারখানা চালু রয়েছে। এর মধ্যে ১২টিই বিদেশি। বাস্তবায়নাধীন ২০টি প্রতিষ্ঠান। ৩২৪টি প্লটের সবগুলোই চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গতিশীল হয়ে উঠছে স্থানীয় অর্থনীতি। এখানে চীন, হংকং, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, মার্শাল আইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া কারখানা গড়ে তুলেছে।

উত্তরের সীমান্ত জেলা নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেডও জীবনযাত্রা পরিবর্তনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ২০০১ সালে উত্তরা ইপিজেড প্রতিষ্ঠার পর এক সময়ের দারিদ্র্যপীড়িত এই এলাকাটি এখন শিল্পোন্নত এলাকায় পরিণত হয়। বর্তমানে এই ইপিজেডে ২৫টি চালু শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩৫ হাজার কর্মী কর্মরত রয়েছেন। এখানে এখন পর্যন্ত ২৩.৫ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে এবং ২৩৪.২ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্যসামগ্রী রপ্তানি করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সরাসরি চীনের সঙ্গে লেনদেনে যাচ্ছে

২৪ মার্চ ২০২৪, সমকাল

ডলারের বিকল্প মুদ্রায় লেনদেন বাড়াতে এবার চীনের সঙ্গে সরাসরি লেনদেন চালু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এ জন্য দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক পিপলস ব্যাংক অব চায়নায় অ্যাকাউন্ট খুলছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক লেনদেনের বার্তা প্রেরণে সুইফটের আদলে গড়ে ওঠা চায়নার সিআইপিএসে যুক্ত হওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণ চীনের মাধ্যমে পরিশোধ করা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের প্রাথমিক কাজের জন্য নেওয়া ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না বাংলাদেশ। যে কারণে দেশটির পাওনা প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার সোনালী ব্যাংকে একটি ‘স্ক্রো’ হিসাব খুলে সেখানে জমা করা হচ্ছে। রাশিয়ার অর্থায়নে বাস্তবায়ন হতে যাওয়া এ প্রকল্পে চুক্তিমূল্যের ৯০ শতাংশ তথা ১ হাজার ১৩৮ কোটি ডলার অর্থায়ন করছে দেশটি। প্রকল্পের মূল ঋণ পরিশোধ শুরু হবে ২০২৭ সালের মার্চ থেকে। চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলা ও দেশটির লেনদেন ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে রাশিয়ার ঋণ পরিশোধের চিন্তা করা হচ্ছে। এর আগে গত বছরের এপ্রিলে রূপপুরের পাওনা সরাসরি রাশিয়াকে পরিশোধ না করে পিপলস ব্যাংক অব চায়নার মাধ্যমে পরিশোধের জন্য একটি প্রটোকল চুক্তি সই হয়। তবে বাংলাদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় অন্য যে কোনো দেশের লেনদেন নিষ্পত্তির বার্তা পাঠানোর একমাত্র উপায় ‘সুইফট’। ফলে এভাবে অর্থ পরিশোধের বিষয়টি সুইফট যুক্তরাষ্ট্রকে অবহিত করলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কায় ওই পরিশোধ করা হয়নি।

শহর ছেড়ে গ্রামে যাওয়ার হার বাড়ছে, বেড়েছে বিদেশ গমনও

মার্চ ২৫, ২০২৪, বণিক বার্তা

দ্রুত নগরায়ণের প্রভাবে শহরের পরিধি বাড়ছে। তবে শহর ছেড়ে মানুষের গ্রামে ফিরে যাওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে। ২০২৩ সালে প্রতি হাজারে প্রায় ১৪ জন গ্রামে ফিরেছে। পাঁচ বছর আগে এ হার ছিল গড়ে একজনেরও কম। গত পাঁচ বছরে বিদেশ গমনের হার বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৩’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিবিএস অডিটোরিয়ামে গতকাল এক অনুষ্ঠানে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ২৮ শতাংশ শিক্ষার্থী বেকার থাকছেন

২৪ মার্চ ২০২৪, প্রথম আলো

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলো থেকে পাস করার তিন বছর পরও ২৮ শতাংশ শিক্ষার্থী বেকার থাকছেন। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএসের) এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে।

আজ রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিআইডিএস কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে গবেষণার তথ্য তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা ফেলো বদরুন নেসা আহমেদ। তিনি জানান, বিআইডিএস সম্প্রতি (২০২৩ সাল) জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের ওপর একটি গবেষণা পরিচালনা করেছে। ওই গবেষণায় তিন বছর আগে পাস করা শিক্ষার্থীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি বর্তমানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তাদের বক্তব্যও নেওয়া হয়েছে। তাতে দেখা যায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার তিন বছর পরও প্রায় ২৮ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট চাকরি পাচ্ছেন না।

যে ২৮ শতাংশ শিক্ষার্থী বেকার, তাঁরা কোন কোন বিষয়ে পড়েছেন, তা-ও দেখা হয়েছে গবেষণায়। এতে দেখা যায়, যাঁরা বেকার থাকছেন, তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই বিএ (পাস) ডিগ্রিধারী। এ ছাড়া রাষ্ট্রবিজ্ঞান, লাইব্রেরি ব্যবস্থাপনা, বাংলা, ইসলামির ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বেকারের হার তুলনামূলক বেশি। বিপুলসংখ্যক নারীও বেকার থাকছেন।

গবেষণার তথ্য বলছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী বেতনে চাকরি করছেন। এ ছাড়া ১৬ শতাংশ আত্মকর্মসংস্থানে আছেন এবং ১৩ শতাংশের বেশি খণ্ডকালীন কাজ করছেন।

যাঁরা বেতনে ও মজুরির বিনিময়ে কর্মে নিয়োজিত আছেন, তাঁদের বেশির ভাগই শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট কর্মে নিয়োজিত আছেন। মূলত বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, কোচিং সেন্টারগুলোতে শিক্ষক পদে তাঁরা চাকরি করছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা অনেকে তৈরি পোশাক খাতের নিচু পদেও যাচ্ছেন। কৃষি খাতেও যুক্ত আছেন অনেকে।

দেশের উচ্চশিক্ষায় যত শিক্ষার্থী আছেন, তাঁদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বড় অংশ কেন এখনো চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না, সেটাও খোঁজা হয়েছিল গবেষণায়।

বদরুন নেসা আহমেদ বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে যেটি জানা গেছে তার মধ্যে একটি হলো, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রমে সমসাময়িক জ্ঞান ও দক্ষতার অভাব রয়েছে। যার কারণে পাস করেও অনেকেই চাকরি পাচ্ছেন না। ইংরেজি ভাষার ক্ষেত্রেও ঘাটতি আছে। বাংলাদেশের অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যেসব সুবিধা পায়, তা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ঘাটতি আছে। সেসব সুবিধা দেওয়া গেলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বেকারত্বের হার কমে আসবে।

ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিলাসী জীবন নিষিদ্ধ

১৩ মার্চ ২০২৪, যুগান্তর

ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমাতে এবং আদায় বাড়াতে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর অংশ হিসাবে প্রথমেই ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের কঠোরভাবে শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের চিহ্নিত করার আইনি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। যারা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হিসাবে চিহ্নিত হবেন, তারা বিমান ভ্রমণ, ট্রেড লাইসেন্স, কোনো কোম্পানির নিবন্ধন এবং শেয়ার ছাড়ার অনুমোদনও পাবেন না। একই সঙ্গে বাড়ি, গাড়ি, জমি, ফ্ল্যাট কিনে নিবন্ধন করতে পারবেন না। অর্থাৎ কোনো সম্পদ বা কোম্পানি করে নতুন ব্যবসা করতে পারবেন না। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালতে মামলার পাশাপাশি ফৌজদারি অপরাধে মামলাও চলবে। কোনো ব্যাংক বিধি ভঙ্গ করে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের ছাড় দিলে তাদের বিরুদ্ধে মোটা অঙ্কের জরিমানাসহ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটি সার্কুলার জারি করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণের তথ্য অনুযায়ী ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি চিহ্নিতকরণের কাজ ১ জুলাই থেকে বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে। ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে, এর আলোকে এ নির্দেশনা জারি হলো।

সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করেন, ইচ্ছাকৃত খেলাপির আওতায় কেবল ছোট বা দুর্বল ঋণখেলাপিরা আটকা পড়বেন। বিপরীতে প্রভাবশালী খেলাপিদের বেরিয়ে যাওয়ার ফাঁকফোকর রাখা আছে। কারণ, ইচ্ছাকৃত খেলাপি নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ব্যাংকের হাতে। এর ফলে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীসহ সমাজের বিগশর্টদের অনেকে ছাড় পেয়ে যাওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, প্রভাবশালীদের জোর তদবিরের মুখে বিদ্যমান সমাজব্যবস্থায় অনেক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কঠোর হওয়া কঠিন হবে। এজন্য ব্যাংক চাইলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ঋণ পুনর্গঠন বা নবায়ন করে ছাড় দিতে পারবে। মূলত এ সুযোগ বন্ধ করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে সার্কুলারের মধ্যে এ বিষয়টি স্পষ্ট করে বলে দিতে হতো। মোদ্দা কথা, ইচ্ছাকৃত খেলাপির সংজ্ঞায় যিনি বা যে প্রতিষ্ঠান পড়তে যাচ্ছেন তাকে নতুন ঋণ দিয়ে কিংবা ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া যাবে না। সম্ভাব্য ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বাঁচাতে ব্যাংক বড় ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গ্রাহকদের খেলাপি ঋণ বিশেষ ব্যবস্থায় নবায়ন বা নতুন ঋণ দিয়ে নবায়ন করার সুযোগ করে দিতে পারে। এতে খেলাপি ঋণ আদায় বাধাগ্রস্ত হবে। তবু ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের শনাক্ত করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা ইতিবাচক। ব্যাংক বড়দের ছাড় না দিলে তারাও এর আওতায় পড়বেন।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে বলা হয়েছে, এখন থেকে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হিসাবে চিহ্নিত হলে তিনি বা ওই প্রতিষ্ঠানের পরিচালকরা বিমান ভ্রমণ করতে পারবেন না। তারা নিজ নামে সিটি করপোরেশন থেকে কোনো ট্রেড লাইসেন্স নিতে পারবেন না। রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক অ্যান্ড কোম্পানিজ ফার্মস থেকে কোনো কোম্পানির নিবন্ধন পাবেন না। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন থেকেও কোনো কোম্পানির শেয়ার ছাড়া বা বন্ড ইস্যুর অনুমোদন পাবেন না। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তালিকা চূড়ান্ত করার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওইসব তালিকা সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোয় পাঠাবে। আইন অনুযায়ী ওইসব দপ্তর ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সংশ্লিষ্ট সেবাদানে বিরত থাকবে।

এতে আরও বলা হয়, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির তালিকা বাংলাদেশ ব্যাংক গাড়ি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, জমি ইত্যাদি নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। অর্থাৎ প্রচলিত আইন অনুযায়ী ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা গাড়ি, বাড়ি, জমি বা ফ্ল্যাটের নিবন্ধন করতে পারবেন না। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা কোনো রাষ্ট্রীয় পুরস্কার বা সম্মাননা পাবেন না। কোনো ইচ্ছাকৃত খেলাপি তার সমুদয় ঋণ পরিশোধ করার পর ৫ বছর অতিক্রম না হওয়া পর্যন্ত তিনি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হতে পারবেন না। কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হিসাবে গণ্য হলে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রচলিত আইন মেনে তার পরিচালক পদ শূন্য ঘোষণা করতে পারবে বা তাকে অপসারণ করতে পারবে। সার্কুলারে আরও বলা হয়, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হিসাবে চিহ্নিত হওয়ার পর ওই তালিকার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আপিল না করলে বা তার করা আপিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে গৃহীত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক গ্রাহকের কাছে সমুদয় পাওনা ফেরত চেয়ে ২ মাসের নোটিশ দিতে পারবে। নোটিশ প্রদানের দুই মাসের মধ্যে পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক পর্ষদের অনুমোদন সাপেক্ষে ওই গ্রহীতার বিরুদ্ধে আদালতে ফৌজদারি মামলা করতে পারবে। এ মামলা করা হলেও ঋণ আদায়ের জন্য অর্থঋণ আদালতে দায়ের করা মামলার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে না, চলমান থাকবে।

মার্চে দৈনিক গাড়ি চলাচল নেমে এসেছে আড়াই হাজারের নিচে

মার্চ ২৫, ২০২৪, বণিক বার্তা

চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের প্রবেশমুখ ছবি: ফাইল/নিজস্ব আলোকচিত্রী

চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলে যান চলাচল শুরু হয় গত বছরের ২৯ অক্টোবর। শুরুতে দৈনিক পাঁচ হাজারের অধিক গাড়ি চলাচল করত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টানেল দিয়ে গাড়ি চলাচলের হার কমেছে। চলতি মার্চে টানেল দিয়ে পার হওয়া দৈনিক গাড়ির সংখ্যা নেমে এসেছে আড়াই হাজারের নিচে। এর উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে চট্টগ্রামজুড়ে। সম্প্রতি শহরে যানজট তীব্র হয়েছে। এর পেছনে টানেলের সংযোগ ও ব্যবস্থাপনার অভাবকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) তথ্যে জানা গেছে, উদ্বোধনের পর প্রথম কয়েক মাস টানেল দিয়ে যানবাহন চলাচল ক্রমেই বাড়ছিল। লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হলেও প্রতি মাসে টানেল দেখতে আসা পর্যটক, কক্সবাজারমুখী যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকে। তবে চলতি মাসে টানেল ঘিরে যানবাহনের চাপ অস্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে গেছে। কক্সবাজারমুখী পর্যটকবাহী যানবাহনের চাপ না থাকায় টানেল দিয়ে যানবাহন চলাচল কমেছে বলে জানিয়েছে টানেল কর্তৃপক্ষ। তবে মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় তীব্র যানজট তৈরি হয়েছে।

সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারিতে প্রতিদিন গড়ে ৪ হাজার ৯৪২টি করে যানবাহন টানেল ব্যবহার করেছে। তবে প্রথম থেকে ১২তম রমজানে টানেল দিয়ে যানবাহন চলাচল করেছে গড়ে ২ হাজার ২৭৩টি। তার আগে গত বছরের অক্টোবরে যানবাহন চলাচলের গড় ছিল ৫ হাজার ৬৩৬টি, নভেম্বরে ৫ হাজার ৫৪৪, ডিসেম্বরে ৬ হাজার ২৭৩, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৪ হাজার ৯০ এবং ফেব্রুয়ারিতে দৈনিক যানবাহন চলাচলের গড় ছিল ৪ হাজার ৯৪২টি।

২০ মাস ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে বাংলাদেশ

মার্চ ২৭, ২০২৪, বণিক বার্তা

গত অর্থবছরের পুরো সময়ে ৯ শতাংশের ওপরে ছিল বাংলাদেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসেও এ ঊর্ধ্বমুখিতা বজায় থাকতে দেখা গেছে। সব মিলিয়ে টানা ২০ মাস ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নিম্ন আয়ের মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্তের জীবনযাপনও কঠিন হয়ে পড়েছে। দেশের অর্থনীতিতে তিন দশকে আর কখনই এত দীর্ঘসময় উচ্চ মূল্যস্ফীতি স্থায়ী হতে দেখা যায়নি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ গ্রহণে বিলম্বের কারণেই এটি জেঁকে বসেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

নব্বইয়ের দশকে বেসরকারি খাতের উত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতির বিকাশ শুরু হয়। ওই দশকে কখনো কখনো মূল্যস্ফীতি বাড়লেও তা খুব বেশি সময় স্থায়ী হয়নি। এক বছর বাড়লেও পরের বছরই তা কমে গেছে। ওই দশকে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি ছিল ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে ৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ। আর সর্বনিম্ন ছিল ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে ২ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এর পরের দশকের শুরুতে ২০০০-০১ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ছিল ১ দশমিক ৯৪ শতাংশ। ওই দশকে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি ছিল ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

এরপর গত দশকে সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি দেখা গেছে ২০১১-১২ অর্থবছরে, যার হার ছিল ১০ দশমিক ৬২ শতাংশ। আর সর্বনিম্ন ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ ছিল ২০১৬-১৭ অর্থবছরে। চলতি দশকের প্রথম দুই অর্থবছর ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল যথাক্রমে ৫ দশমিক ৫৬ ও ৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরেই তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির ওই ধারা অব্যাহত আছে এখনো।

গ্রামে দারিদ্র্যের হার কমলেও বেড়েছে শহরে

মার্চ ২৭, ২০২৪, বণিক বার্তা

দেশে গত পাঁচ বছরে দারিদ্র্যের সূচকে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ধরা পড়েছে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) এক জরিপে। জরিপের তথ্যানুযায়ী, গত পাঁচ বছরে গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্যের হার কমেছে। একই সময়ে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে শহরাঞ্চলে। ২০১৮ সালে গ্রামীণ দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক ৫ থেকে ২০২৩ সালে ২১ দশমিক ৬ শতাংশে নামলেও শহুরে দারিদ্র্যের হার ১৬ দশমিক ৩ থেকে বেড়ে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ায়। গতকাল সানেমের পাঠানো গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায় এমন চিত্র।

কভিড-১৯-পূর্ববর্তী ও পরবর্তী দেশের চ্যালেঞ্জ ও দারিদ্র্য নিয়ে সানেম ও ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে ‘কভিড-১৯ মহামারী, মহামারী-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ এবং দারিদ্র্যের গতিশীলতা: একটি অনুদৈর্ঘ্য পারিবারিক জরিপ থেকে প্রমাণ’ শীর্ষক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। গবেষণায় মৌলিক চাহিদার খরচ পদ্ধতি অনুসরণ করে ২০ স্তরের ভোগব্যয়ভিত্তিক দারিদ্র্যসীমা পরিমাপ করা হয়েছে। ২০ স্তরের মধ্যে আটটি গ্রামীণ, আটটি শহুরে ও চারটি মেট্রোপলিটন এলাকায় জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, উচ্চ দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের হার ২০ দশমিক ৭ শতাংশ, গ্রামীণ এলাকায় ২১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। নিম্ন দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে চরম দারিদ্র্যের হার পরিমাপ করা হয়েছে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ, গ্রামীণ এলাকায় ৮ দশমিক ৯ শতাংশ ও শহরাঞ্চলে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। এর মধ্যে বিভাগীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ দারিদ্র্যের হার পরিমাপ করা হয়েছে রংপুর ও বরিশালে। রংপুরে এ হার ৪২ দশমিক ৯ শতাংশ এবং বরিশালে ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ।

বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের সূচকেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। গ্রামীণ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ২৭ দশমিক ৬ শতাংশে। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে তা ২০১৮ সালে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ শতাংশে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সরকার প্রদত্ত সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতায় এসেছে ৩৭ শতাংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠী। এর মধ্যে টিসিবি ফ্যামিলি কার্ড সেবা সর্বোচ্চ সংখ্যক তথা ১৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ পরিবারের কাছে পৌঁছেছে। এছাড়া বার্ধক্য ভাতা ৮ দশমিক ৯ শতাংশ, বিধবা, স্বামী নিগৃহীত, দুস্থ মহিলা ভাতা ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ, আর্থিকভাবে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা ৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ভাতা ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছেছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই অর্থাৎ ৪৭ শতাংশ সেবা খাতে নিযুক্ত, ৩৬ কৃষি ও ১৮ শতাংশ শিল্প খাতে কর্মরত। জাতীয় পর্যায়ে বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। গ্রামীণ এলাকায় এ হার ৩ দশমিক ৬ ও শহরাঞ্চলে ৪ দশমিক ৬ শতাংশে রয়েছে।

চাল ‘উদ্বৃত্ত’, তবু বাড়ছে দাম

২৮ মার্চ ২০২৪, প্রথম আলো

চালের উৎপাদন ও ভোগের মধ্যে শুভংকরের ফাঁকি রয়েই গেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে চালের উৎপাদন যথেষ্ট ভালো, চাহিদার চেয়ে কমপক্ষে ৫০ লাখ টন বেশি। ফলে আমদানির দরকার নেই। কিন্তু চাল উদ্বৃত্ত থাকার পরও দেশের বাজারে দফায় দফায় দাম বাড়ছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিবিষয়ক সংস্থা ইউএসডিএর হিসাবে বাংলাদেশে চলতি বছর চাহিদার তুলনায় চালের উৎপাদন কিছুটা কম। গমের আমদানি কমে যাওয়ায় বেড়েছে চালের চাহিদা।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) হিসাবে চলতি অর্থবছরে মোট ৪ কোটি ১২ লাখ টন চাল উৎপাদন হতে পারে। এর মধ্যে বোরো ২ কোটি ৯ লাখ টন, আউশ ৩০ লাখ টন ও আমন ১ কোটি ৭০ লাখ টন। আর দেশে চালের চাহিদা ৩ কোটি ৫০ লাখ টনের কাছাকাছি। সেই হিসাবে দেশে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকার কথা।

অপরদিকে ইউএসডিএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর (২০২৩-২৪) শেষে বাংলাদেশে চালের উৎপাদন ৩ কোটি ৬৩ লাখ টনে দাঁড়াবে। একই সময়ে ভোগের পরিমাণ হবে ৩ কোটি ৭৬ লাখ টন। অর্থাৎ ভোগ আর উৎপাদনের মধ্যে পার্থক্য ১৩ লাখ টন। চাল উৎপাদন নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে ইউএসডিএর উৎপাদন তথ্যে বড় একটি ফাঁরাক রয়েছে।

বাজারে রমজানের এই সময়ে চালের চাহিদা কিছুটা কম থাকে। এতে দাম বাড়ার কথা নয়। কিন্তু দুই সপ্তাহ ধরে দাম ধীরে ধীরে বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে খাদ্য মন্ত্রণালয় শুরুতে চালকলের মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে। চালকলের মালিকেরা দাম না বাড়ানোর প্রতিজ্ঞা করেন। তারপরও দাম কমেনি; বরং বেড়েছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, প্রতি কেজি চালের দাম গত এক সপ্তাহে দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে সরকার চালের দাম কমাতে পুরোনো কৌশলই বেছে নিয়েছে। আমদানি শুল্ক ৬৭ থেকে ১৭ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। প্রাথমিকভাবে ৩০টি প্রতিষ্ঠানকে ৮৩ হাজার টন চাল আমদানির অনুমতি দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। আরও কিছু প্রতিষ্ঠানকে আমদানির অনুমতি দেওয়ার ব্যাপারে চিন্তা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে দুই লাখ টন চাল আমদানির অনুমতি দেওয়া হতে পারে।

বিবিএস’র জরিপ

কেন এই উল্টোগতি?

২৮ মার্চ ২০২৪, মানবজমিন

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের আর্থসামাজিক অধিকাংশ সূচকই নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৩’-এর জরিপে দেখা গেছে, দেশের মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু কমেছে। সেই সঙ্গে শিশুমৃত্যু, বেকারত্ব,  বাল্যবিবাহ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে খাদ্যনিরাপত্তা পরিসংখ্যান ২০২৩’-এর  তথ্য বলছে, দেশের এক-চতুর্থাংশ পরিবারকে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতে ঋণ করতে হচ্ছে। এ ছাড়া একবেলা খাবারের শেষে পরের বেলার চালের জোগান নেই দেশে এমন পরিবারও রয়েছে। আর জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ-২০২২ অনুযায়ী, শ্রমে থাকা শিশুদের মধ্যে ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রয়েছে। অর্থাৎ বিবিএসের প্রকাশিত অধিকাংশ সূচকের ধারাই নেতিবাচক লক্ষ্য করা গেছে। গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোর এই নেতিবাচক ধারা দেশের জন্য উদ্বেগের বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোর নেতিবাচক ধারার কারণ হিসেবে তারা কোভিড ও সরকারের নীতির ধারাবাহিকতা রাখার অভাবকে দায়ী করছেন।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমেছে। এ সময় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ।

আগের অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ। অর্থাৎ চলতি প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে ২ দশমিক ৬৯ শতাংশীয় পয়েন্ট।

প্রত্যাশিত গড় আয়ু কমেছে: ২০২৩ সাল শেষে দেশের মানুষের প্রত্যাশিত আয়ু কমে ৭২ দশমিক ৩ শতাংশে নেমেছে, যা ২০২২ সালে ছিল ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ। বাংলাদেশে ১৯৬০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রতিটি দশকেই এই হার বেড়েছে। এর মধ্যে কেবল ষাটের দশকের মাঝামাঝি, অর্থাৎ ১৯৬৫ সাল নাগাদ যে বৃদ্ধি ঘটেছে, দশক শেষে মানে ১৯৭০ সালে এসে তার কিছুটা অবনতি হয়েছে। পরবর্তী প্রায় সব দশকে, একটি মাত্র ব্যতিক্রম ছাড়া, পাঁচ বছর করে বেড়েছে দেশের মানুষের গড় আয়ু। এর মধ্যে ১৯৯০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে গড় আয়ু বেড়েছে সাত বছর। যদিও ২০১০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত গড় আয়ু বৃদ্ধি কিছুটা স্থবির হয়ে আছে।

আশঙ্কা বাড়িয়েছে শিশুমৃত্যু: স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশে এক বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যু প্রতি হাজারে ছিল ১৪১ জন, সেটা থেকে উন্নতির ধারাবাহিকতার সর্বোচ্চ শিখরে বাংলাদেশ পৌঁছেছিল ২০২০ সালে, তখন হাজারে মৃত্যু ছিল ২১ জন। সেই সাফল্য ম্লান হতে শুরু করেছে ২০২১ সালের পর থেকে। ওই বছর থেকে ধারাবাহিকভাবে ২০২৩ সাল শেষে শিশুমৃত্যু বেড়ে হাজারে এখন ২৭ জনে ঠেকেছে। শিশুমৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়াটা স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতাকেই ইঙ্গিত করে।

আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে বাল্যবিবাহ: এক বছরের ব্যবধানে দেশে বাল্যবিবাহের হার বেড়েছে। স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্স জরিপে দেখা যায়, ২০২৩ সালে দেশে ১৫ বছরের কম বয়সী নারীদের মধ্যে বিয়ের হার ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ, ২০২২ সালেও এই হার ছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এ ছাড়া ১৮ বছরের আগে বিয়ের হারও বেড়েছে। গত বছর দেশে এই বয়সী নারীদের বিয়ের হার ছিল ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ, অন্যদিকে ২০২২ সালেও এই হার ছিল ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ।

কমেছে নারীর প্রজনন হার: প্রজনন হার বলতে বোঝায় ১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী একজন নারী কতোজন সন্তান জন্ম দিতে পারেন। ২০২২ সালে নারীদের প্রজনন হার কিছুটা বেড়ে ২ দশমিক ২০ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু বছরের ব্যবধানে ২০২৩ সাল শেষে তা কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ১৭ শতাংশ।

জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার কমেছে: বিবিএসের তথ্য বলছে, দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন দম্পতিরা। বর্তমানে দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহারের হার ৬২ দশমিক ১ শতাংশ, ২০২২ সালেও যা ছিল ৬৩ দশমিক ৩ শতাংশ।

সন্তান জন্মদানে অস্ত্রোপচার বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে: এদিকে দেশে সিজারিয়ান সেকশন বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানের প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে সিজারের ঘটনা ৪১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫০ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর স্বাভাবিক পদ্ধতিতে সন্তান প্রসবের হার ২০২২ সালের (৫৮ দশমিক ৬ শতাংশ) তুলনায় কমে ২০২৩ সালে হয়েছে ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ।

কিশোরী নারীদের মধ্যে সন্তান জন্মের হার বৃদ্ধি পেয়েছে: ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে সন্তান জন্মের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। এসভিআরএস জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, ২০২২ সালে কিশোরী নারীদের মধ্যে সন্তান জন্মদানের হার ছিল ৪১ দশমিক ৮৭ শতাংশ আর ২০২৩ সালে সেটি বেড়ে ৪৩ দশমিক ৫৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া ১৫ বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে সন্তান জন্মদানের হার ১৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

প্রতিবন্ধিতা বৃদ্ধি পেয়েছে: ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে আশঙ্কাজনক হারে প্রতিবন্ধিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এসভিআরএসের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২২ সালে দেশে প্রতিবন্ধিতার হার ছিল ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ আর ২০২৩ সালে সেটি বেড়ে ২৮ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে।

দীর্ঘ হচ্ছে শিক্ষিত বেকারের মিছিল: দেশে গত বছরের শেষ তিন মাসে বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়েছে ৪০ হাজার। অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে দেশে বেকারের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে সাড়ে ২৩ লাখ। এর মধ্যে পুরুষ বেকারের সংখ্যা ১৫ লাখ ৭০ হাজার আর নারী বেকারের সংখ্যা ৭ লাখ ৮০ হাজার। বিবিএস’র সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে।

শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কাজ নেই ৪০ শতাংশ তরুণের: বাংলাদেশের প্রায় ৪০ শতাংশ তরুণ নিষ্ক্রিয়। এসভিআরসি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে শিক্ষা, কর্মে কিংবা প্রশিক্ষণে নেই- এমন তরুণের সংখ্যা ৩৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ হয়েছে। এই জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই নারী। তরুণদের মধ্যে মাত্র ১৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ অলস, আর তরুণীদের মধ্যে এই হার ৬০ দশমিক ৮৫ শতাংশ। জরিপের তথ্য বলছে, এই জনগোষ্ঠীর ৪১ দশমিক ৩ শতাংশই গ্রামে বাস করে। অন্যদিকে শহরের তরুণদের মধ্যে এমন অলস তরুণ জনগোষ্ঠী ৩৫ দশমিক ২১ শতাংশ।

মৌলিক চাহিদা মেটাতে ঋণ করে ২৬ শতাংশ পরিবার:  বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খাদ্যনিরাপত্তা পরিসংখ্যান ২০২৩-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের এক-চতুর্থাংশ পরিবার খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতে ঋণ করছে। এক্ষেত্রে শহরের চেয়ে গ্রামের মানুষই বেশি ঋণ করছে। শহর ও গ্রামের মানুষ এই ঋণের বড় অংশই নিচ্ছে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) থেকে চড়া সুদে।

খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় কোটি মানুষ: মাঝারি পর্যায়ে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় থাকা পরিবার বলতে বোঝানো হয়েছে নিয়মিত স্বাস্থ্যকর, সুষম খাবার গ্রহণে যারা অক্ষম তাদের। আর তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় থাকা পরিবার বলতে বোঝানো হয়েছে খাদ্য কমানোর উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে। বিবিএসের হিসাবে, জরিপকালে দেশে প্রায় ২২ শতাংশ পরিবার মাঝারি পর্যায়ের খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ছিল। আর শূন্য দশমিক ৮২ শতাংশ পরিবার তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ছিল।

পরের বেলা ভাত জুটবে কিনা জানে না ৩৪ লাখ মানুষ: খাদ্যের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ বেশ কঠিন হয়ে উঠেছে অনেকের জন্য। একবেলা খাবারের শেষে পরের বেলার চালের জোগান নেই- দেশে এমন পরিবারের হার ২ শতাংশ। আটা মজুত থাকে না ৬০ শতাংশ পরিবারে। নিত্যপণ্যের মধ্যে ডালের সংস্থান নেই ১৯ শতাংশ পরিবারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খাদ্য নিরাপত্তা-সংক্রান্ত জরিপের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। এদিকে খানা আয় ও ব্যয় জরিপের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে পরিবারের সংখ্যা এখন ৪ কোটি ১০ লাখ। আর জনশুমারি ও গৃহগণনার চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯১১ জন। সেই হিসাবে দেশের ৩৩ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮০ জন মানুষের একবেলা খাওয়ার পর পরের বেলার চালের জোগান নেই।

ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু: জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৩৫ লাখ ৪০ হাজার শিশু শ্রমজীবী। যার মধ্যে ১৭ লাখ ৮০ হাজার শিশুশ্রমে যুক্ত। শ্রমে থাকা শিশুদের মধ্যে ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রয়েছে। তাদের মধ্যে অটোমোবাইল ওয়ার্কশপে কাজ করে সবচেয়ে বেশি।

১০ বছরে গরুর মাংসের দাম বেড়েছে ১৫০%

৩০ মার্চ ২০২৪, প্রথম আলো

এক দশক আগে একজন মানুষ বাজার থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে গরুর মাংস কিনতে পারতেন। এখন এক কেজি গরুর মাংসের জন্য খরচ করতে হয় অন্তত ৭৫০ টাকা। অর্থাৎ ১০ বছরের ব্যবধানে গরুর মাংসের দাম বেড়েছে ১৫০ শতাংশ।

অথচ সরকারি হিসাব বলছে, দেশে গত এক দশকে গরুর উৎপাদন বেড়েছে। গরু-ছাগল-মুরগিসহ সব ধরনের মাংস উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, গরুর মাংসের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে কেন? বিষয়টি নিয়ে তিনজন প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা বলছেন, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকা এবং কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় গরুর উৎপাদন বৃদ্ধি না হওয়ায় মাংসের দাম বেড়েছে। অবশ্য গরুর মাংস বিক্রি করা ব্যবসায়ীরাও অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের ইচ্ছেমতো দাম বাড়াচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের তদারকিতেও ঘাটতি আছে।

ক্যাবের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংসের দাম ছিল গড়ে ৩০০ টাকা। ২০১৫ সালে তা বেড়ে হয় ৪০০ টাকা। তার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবছর দাম বেড়েছে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংসের দাম ছিল গড়ে ৩০০ টাকা। ২০১৫ সালে তা বেড়ে হয় ৪০০ টাকা। তার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবছর দাম বেড়েছে। ২০২১ সালে প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হয় প্রায় ৬০০ টাকায়।

অন্যদিকে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, ২৯ মার্চ (গতকাল শুক্রবার) ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হয়েছে ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকায়। অর্থাৎ ২০১৪ সালের তুলনায় এখন গরুর মাংস প্রতি কেজি ১৫০ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

দেশে গরুর উৎপাদন ও মূল্য বৃদ্ধির যে সম্পর্ক, তা জটিল বলে মনে করেন ক্যাবের সভাপতি গোলাম রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সরবরাহ যদি আরও বেশি হতো, হয়তো গরুর মাংসের দাম এতটা বাড়ত না। মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে চাহিদা বৃদ্ধি, গোখাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং সার্বিক মুদ্রাস্ফীতিও বড় কারণ বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালেও ঢাকা শহরে দিনে ৫ হাজার গরু জবাই হতো। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে দাম বাড়তে থাকায় মানুষ গরু মাংস খাওয়া কমিয়ে দেয়। ২০২৩ সালে দিনে গরু জবাই হতো দেড় হাজারের মতো। এই রমজান মাসে ঢাকায় দিনে ২০০০-২২০০ গরু জবাই করা হচ্ছে।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, ২৯ মার্চ (গতকাল শুক্রবার) ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হয়েছে ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকায়।

ভারত থেকে গরু আসা প্রায় বন্ধ হয়ে যায় ২০১৪ সালে। এর কারণ ভারত গরু রপ্তানি নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। এর পরের ১০ বছরে দেশে গরুর উৎপাদন–সম্পর্কিত প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য পর্যালোচনা করেছে প্রথম আলো।

২০১৪ সালের আগে প্রতিবছর গড়ে ২০ লাখ গরু ভারত থেকে বাংলাদেশে আসত। যেমন ২০১৩ সালে ভারত থেকে গরু এসেছিল ২৩ লাখ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশে গরুর সংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি ৩৫ লাখ। এরপর প্রতিবছরই গরুর সংখ্যা বেড়েছে। সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে গরুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ কোটি ৪৯ লাখে। অর্থাৎ এক দশকে দেশে গরুর সংখ্যা (উৎপাদন) বেড়েছে ১৩ লাখ ৬৮ হাজার বা প্রায় ৬ শতাংশ (৫ দশমিক ৮২ শতাংশ)।

ভারত থেকে বছরে যে সংখ্যায় গরু আমদানি করা হতো, সেই ঘাটতি এখনো পূরণ হয়নি। বছরে ঘাটতি ছিল ২০ লাখ, সেখানে পূরণ হয়েছে ১৩ লাখ। দরকার আরও প্রায় ৭ লাখ। এর সঙ্গে বাড়তি চাহিদাও যুক্ত হয়েছে গত এক দশকে। চাহিদা ও সরবরাহের এই পার্থক্য দামে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন গরুর মাংস ব্যবসায়ীরা।

৪০-৫০% বেশি দামে মুরগির বাচ্চা কিনছেন খামারিরা

মার্চ ৩১, ২০২৪, বণিক বার্তা

পোলট্রি খাতে মাংস ও ডিমের জন্য সাধারণত একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চা কেনেন খামারিরা। যেসব মোরগ-মুরগির মাধ্যমে বাচ্চা উৎপাদন হয়, সেগুলোকে বলা হয় ‘প্যারেন্ট স্টক’ (পিএস)। আর পিএস উৎপাদন হয় ‘গ্র্যান্ড প্যারেন্ট’ (জিপি) স্টক থেকে। কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ে হঠাৎ ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির একদিনের বাচ্চার সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে গেছে। এর মধ্যে বাজারে চাহিদাও বেশি। ফলে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০-৫০ শতাংশ বেশি টাকায় বাচ্চা কিনতে হচ্ছে খামারিদের।

প্রাণিসম্পদ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জিপি ও পিএসের বাজারের প্রায় পুরোটাই করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণে। গত বছরের মে মাসে একদিনের বাচ্চার দাম ৫০-৫৩ টাকা নির্ধারণ করে দেয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। এরপর সম্প্রতি আরেক দফায় ১০ টাকা বাড়িয়ে করা হয় ৬০-৬৩ টাকা।

করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বাচ্চা সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন প্রান্তিক খামারিরা। কোথাও কোথাও বাচ্চা কিনতে হচ্ছে ৮৫-৯৫ টাকায়। এতে মাস খানেক পরে মুরগি ও ডিমের দাম বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

শেয়ারবাজারে ৪৮ দিনে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি ১ লাখ কোটি টাকা

০২ এপ্রিল ২০২৪, প্রথম আলো

টানা দরপতনে মাত্র ৪৮ কার্যদিবসে দেশের প্রধান শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদেরই ক্ষতি হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। গত ১৮ জানুয়ারি থেকে গতকাল ১ এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের বাজারমূল্যের হিসাব বিবেচনায় নিয়ে এ ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে। এ সময়ে ঢাকার শেয়ারবাজারে লেনদেন হয়েছে মোট ৪৮ দিন।

তালিকাভুক্ত কোম্পানি, বন্ড ও মিউচুয়াল ফান্ডের বাজারমূল্যের ভিত্তিতে প্রতিদিন বাজার মূলধনের হিসাব করে ডিএসই। ডিএসইর হিসাবে গত ১৮ জানুয়ারি বাজার মূলধন ছিল ৭ লাখ ৮৭ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। গতকাল সোমবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৭৭ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৪৮ দিনে তালিকাভুক্ত সব সিকিউরিটিজ ১ লাখ ১০ হাজার ২৩১ কোটি টাকা বাজারমূল্য হারিয়েছে। তাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ব্যক্তিশ্রেণি থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং উদ্যোক্তারাও। কারণ, সিকিউরিটিজের দাম কমে যাওয়ায় তাঁদের প্রত্যেকেরই পোর্টফোলিও বা পত্রকোষ সংকুচিত হয়েছে। এর মধ্যে যাঁরা শেয়ার বা অন্যান্য সিকিউরিটিজ বিক্রি করে দিয়েছেন, তাঁদের বেশির ভাগই সরাসরি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আর যাঁরা বিক্রি করেননি, তাঁদের ক্ষেত্রে এ ক্ষতি অনাদায়ি (আনরিয়ালাইজড) হিসেবে পত্রকোষে হিসাবভুক্ত হয়েছে।

আরো ৩৩ গভীর নলকূপ বসাবে ওয়াসা, বাড়তে পারে পানির ব্যয়

এপ্রিল ০২, ২০২৪, বণিক বার্তা

রাজধানীতে দৈনিক পানির চাহিদা প্রায় ৩১৫ কোটি লিটার। এর মধ্যে ওয়াসা সরবরাহ করে প্রায় ২৯৮ কোটি লিটার। বাকি ১৭ কোটি লিটার পানির চাহিদা পূরণে রাজধানীতে আরো ৩৩টি গভীর নলকূপ বসাতে চায় ওয়াসা। যদিও ২০২১ সালের মধ্যে চাহিদার ৭০ শতাংশ পানি ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল সংস্থাটি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গভীর নলকূপের সংখ্যা বাড়ানো হলে পানির দাম বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া আরো নিচে নেমে যাবে পানির স্তর।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত তিন দশকে পানির স্তর প্রায় ৫০ মিটার নিচে নেমেছে। এখন প্রতি বছর দুই-তিন মিটার নিচে নামছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এ উৎস থেকে পানি তোলা কঠিন হয়ে পড়বে। আবার ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় ভূ-উপরিস্থ পানির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

পরিকল্পনা কমিশনের সূত্রমতে, নগরীতে ১৭ কোটি লিটার পানির চাহিদা মেটাতে ১৪৫টি গভীর নলকূপ বসানোর প্রস্তাব দেয় ওয়াসা। এর মধ্যে ৮০টি গভীর নলকূপ স্থাপনে ৭৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২০ সালে একটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। এ কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালে। কিন্তু আরো ৩৩টি নলকূপ অন্তর্ভুক্ত করে প্রকল্প সংশোধন করা হচ্ছে। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ছে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। এ প্রকল্পের অধীনে ৪৪৩টি গভীর নলকূপ প্রতিস্থাপনও করা হচ্ছে। পুনরায় চালু হচ্ছে ১৮০টি গভীর নলকূপ। নির্মাণ হবে ৩০০ পাম্পঘর।

গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করায় প্রতিনিয়ত ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ভূগর্ভস্থ পানি বিভাগের ২০২১ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯৫ সালে ঢাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ছিল ৩২ মিটার নিচে। ২০০০ সালে তা ৪১ মিটার নিচে নেমে যায়। ২০০৫ সালে হয় ৫৪ মিটার এবং ২০১৫ সালে তা ৭১ মিটার নিচে নেমে যায়। পানির স্তর ৭৪ মিটার গভীরে নেমে যায় ২০২০ সালে। তেজগাঁও এলাকায় এটা ৭৭ মিটার পর্যন্ত নেমে গেছে।

গবেষণায় পূর্বাভাস দেয়া হয়, ২০২৫ সালের মধ্যে পানির স্তর ৮০ মিটার নিচে নেমে যেতে পারে। আর ২০৩০ সালে তা ৮৫ ও ২০৩৫ সাল নাগাদ ১০০ মিটার নিচে নেমে যতে পারে।

সারের আমদানি ব্যয় কমেছে ৫১ শতাংশ, কৃষক সুফল পাবেন কি

এপ্রিল ০৩, ২০২৪, বণিক বার্তা

আন্তর্জাতিক বাজারে কমছে সব ধরনের সারের দাম। ফলে আগের চেয়ে কম মূল্যে পণ্যটি আমদানি করতে পারছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসের (জুলাই-জানুয়ারি) তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে সারের আমদানি ব্যয় কমেছে ৫১ শতাংশের বেশি। যদিও গুরুত্বপূর্ণ কৃষি উপকরণটি আগের দামেই কিনতে হচ্ছে কৃষকদের।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার আগের চেয়ে অর্ধেক দামে সার আমদানি করলেও এতে কৃষক লাভভান হচ্ছেন না। কেননা দেশের বাজারে আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে পণ্যটি। এতে করে কৃষি খাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। কমে যাচ্ছে কৃষকের মুনাফার মার্জিন। একই সঙ্গে তা খাদ্যের উৎপাদন এবং বাজার পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। প্রভাব ফেলছে সার্বিক মূল্যস্ফীতিতেও।

দেশে ইউরিয়া, ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি), ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ও মিউরেট অব পটাশ (এমওপি)—এ চার ধরনের সারের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। রাসায়নিক এসব সারের চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম ওঠে রেকর্ড সর্বোচ্চে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সে বছরের আগস্টে কৃষক পর্যায়ে ইউরিয়ার দাম কেজিতে ৬ টাকা বাড়ায় সরকার। গত বছরের এপ্রিলে আরেক দফায় কেজিতে ৫ টাকা করে বাড়ানো হয় সব ধরনের সারের দাম। বর্তমানে খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি ইউরিয়ার দাম ২৭ টাকা, ডিএপি ২১, টিএসপি ২৭ ও এমওপির দাম ২০ টাকা।

ঋণ নিয়ে ঋণ পরিশোধ করছে সরকার: সিপিডি

এপ্রিল ৪, ২০২৪, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) জানিয়েছে, বাংলাদেশের ঋণ ও পরিশোধের বাধ্যবাধকতা বাড়ছে, যা সরকারকে অপর্যাপ্ত রাজস্ব আদায়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধের জন্য ক্রমাগত নতুন ঋণ নিতে বাধ্য করছে।

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে আমরা পাকলিক ও পাবলিকলি গ্যারান্টিযুক্ত ঋণের দায়বদ্ধতার একটি বড় অংশ পরিশোধের জন্য ঋণ নিচ্ছি।’

তিনি এক অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা’ নিয়ে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে এ কথা বলেন।

সিপিডি ও এশিয়া ফাউন্ডেশন যৌথভাবে ঢাকার লেকশোর হোটেলে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

সিপিডি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক ঋণ এবং ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতার হার বেড়েছে।

২০২৩ সালের জুনে বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি বিদেশি ঋণ ছিল ৯৮ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, যা একই বছরের সেপ্টেম্বরে ১০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে।

ব্যাংক একীভূত নীতিমালার কিছু বিষয়ে উদ্বেগ, প্রশ্ন

০৫ এপ্রিল ২০২৪, প্রথম আলো

ব্যাংক একীভূত করা নিয়ে এমনিতেই উদ্বিগ্ন ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে এ–সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালা কিছু কিছু বিধান এ উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। দুর্বল মানের সরকারি-বেসরকারি কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্তের পর গতকাল বৃহস্পতিবার এ–সংক্রান্ত নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নতুন এ নীতিমালায় বলা হয়েছে, দুর্বল যে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান একীভূত হবে, সেটির পরিচালকেরা পাঁচ বছর পর আবার একীভূত হওয়া ব্যাংকের পর্ষদে ফিরতে পারবেন। যদিও এ ক্ষেত্রে তাঁদের কিছু শর্ত মানতে হবে। কিন্তু ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এ বিধানের মাধ্যমে সেসব পরিচালককে একধরনের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। যাঁদের কারণে ব্যাংক খারাপ হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে পাঁচ বছর বিরতির পর তাঁদের আবার পর্ষদে ফেরার বন্দোবস্ত রাখা হলো।

বিদেশি ঋণ নিয়ে প্রতারণামূলক বাস্তবতার মধ্যে আছি: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

০৪ এপ্রিল ২০২৪, প্রথম আলো

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য প্রশ্ন তুলেছেন যে সরকার বিদেশি ঋণে একের পর এক মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও তার সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না কেন। তাঁর মতে, একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বৈদেশিক ঋণের মেগাপ্রকল্পকে পুঁজি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে, এমনকি বিদেশে অর্থও পাচার করছে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমরা রাজস্ব বাজেট থেকে উন্নয়ন প্রকল্পে একটি টাকাও দিতে পারছি না। বিদেশি ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে আমরা প্রতারণামূলক বাস্তবতার মধ্যে আছি। ঋণ নিয়ে এত মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, কিন্তু শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ আর্থসামাজিক উন্নয়নে এর প্রতিফলন নেই। এত কিছু করলাম কিন্তু মানুষ সুবিধা পেল না কেন?’

আজ সিপিডি আয়োজিত ‘বাংলাদেশের সরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ এবং পরিশোধের সক্ষমতা: উদ্বেগের কারণ আছে কী?’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এ কথা বলেন। রাজধানীর এক হোটেলে এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।

প্রতারণামূলক বাস্তবতার বিষয়টি ব্যাখ্যা করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এত মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ এখনো ২৩ শতাংশে কেন আটকে আছে? সরকারি হিসাবে, জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস প্রতিবেদন অনুসারে, মানুষের গড় আয়ু কমেছে, মৃত্যুহার বেড়েছে। আবার বেকারের সংখ্যাও বেড়েছে। ২৫ শতাংশ পরিবারকে ঋণ করে চলতে হয়। গত দেড় দশকে এত কিছু করলাম; তাহলে মানুষ এসবের সুফল পেল না কেন?

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো আরও বলেন, শিক্ষা খাতে এখনো জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) ২ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে ১ শতাংশের বেশি বিনিয়োগ বাড়াতে পারিনি।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘উল্টো আমরা কী দেখলাম, ব্যাংকের টাকা ফেরত দেওয়া হয় না। শেয়ারবাজারের মাধ্যমে মধ্যবিত্তের টাকা লুটতরাজ হয়েছে। বৈদেশিক ঋণের মেগা প্রকল্পকে একশ্রেণির স্বার্থানেষী গোষ্ঠীর পুঁজি সঞ্চয়ের নতুন উৎস হিসেবে উৎসাহিত করা হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি খাতে তা বেশি হয়েছে। আমার বিশ্বাস মেগা প্রকল্পের সঙ্গে ওই বিশেষ গোষ্ঠীর টাকা পাচারের সংশ্লেষ পাওয়া যাবে।’

অনুষ্ঠানে সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কাসহ আফ্রিকার দেশগুলোর চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। কীভাবে আমরা ভবিষ্যতে বিদেশি ঋণ পরিশোধ করব, কীভাবে আমরা রপ্তানির সক্ষমতা বাড়াব—তা নিয়ে বেশি চিন্তা করা উচিত। কারণ রপ্তানি বাড়লে তা ঋণ পরিশোধকে সহজ করবে। এখন রপ্তানি আয় ১০০ বিলিয়ন (১০ হাজার কোটি) ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা করা দরকার।

রেহমান সোবহান আরও বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য একজন বিশেষ উপদেষ্টা আছে, যার একটি শক্তিশালী ব্যবসায় অভিজ্ঞতা আছে। তাকে দুর্নীতি এবং বিশেষ সুবিধাভোগীদের মোকাবিলা করতে হবে। সিপিডির চেয়ারম্যানের মতে, ঋণ করে প্রকল্প করলে ২০-৫০ শতাংশ খরচ বেড়ে যায়। এখানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, প্রকল্পের খরচ বৃদ্ধি এবং ব্যবস্থাপনা বড় ইস্যু হয়ে যায়।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসা রাজস্ব দিয়ে উন্নয়ন খরচের জোগান দেওয়া যাচ্ছে না। এমনকি ঋণ করে ঋণ পরিশোধ করা হচ্ছে। কারণ, সরকার রাজস্ব বাজেটের যে হিসাব দেয়, তাতে শুধু সুদ বাবদ বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেখানে ঋণের আসল পরিশোধ বাবদ বরাদ্দ থাকে না। এর মানে ঋণের বড় অংশ আমরা ঋণ করে পরিশোধ করছি।

বড় ছাড় গ্রুপভুক্ত ঋণখেলাপিদের

০৪ এপ্রিল ২০২৪, যুগান্তর

খেলাপি ঋণের আদায় বাড়াতে এবং নতুন ঋণখেলাপি হওয়া ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে, তখনই খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে কোনো গ্রুপভুক্ত পরিচালক, প্রতিষ্ঠান বা কো¤পানিগুলো খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে বড় ছাড় পাবে। আগের নিয়মে কোনো গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি বা কোনো ব্যক্তি খেলাপি হলে ওই গ্রুপের কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি নতুন ঋণ পেত না। খেলাপি ঋণ নবায়ন করে নতুন ঋণ নিতে হতো। এখন থেকে কোনো গ্রুপের কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান বা পরিচালক খেলাপি হলেও ওই গ্রুপের খেলাপি কোম্পানি, পরিচালক বা প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যরা ব্যাংক ও ফিন্যান্স কোম্পানি থেকে নতুন ঋণ নিতে পারবে।

এ বিষয়ে বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটি সার্কুলার জারি করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এ নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে।

সূত্র জানায়, মূলত বড় ঋণখেলাপিদের পক্ষে রাজনৈতিক চাপেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরছিল, ঠিক তখনই এমন সিদ্ধান্ত খেলাপি ঋণের ব্যাপারে এ ধরনের বড় ছাপের ফলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এটি খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উলটো যাত্রা। এতে খেলাপি ঋণ আদায় কমে যাবে। ইচ্ছাকৃত খেলাপি শনাক্ত হবে কম। একই সঙ্গে বেড়ে যেতে পারে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সিদ্ধান্ত গ্রুপগুলোর জন্য ঋণখেলাপি হওয়ার প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দেবে। কারণ, বিদ্যমান নীতির কারণে এখন গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত খেলাপি হয় না, হলেও তা দ্রুত নবায়ন করে ফেলে। কারণ, গ্রুপের একটি কোম্পানি খেলাপি হলে একই গ্রুপের অন্য কোনো কোম্পানি নতুন ঋণ পাবে না। ফলে তাদের পুরো ব্যবসা আটকে যেতে পারে। এ কারণে গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত খেলাপি হয় না। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন সার্কুলারের ফলে কোনো গ্রুপের কোনো কোম্পানি খেলাপি হলেও ওই গ্রুপের অন্য কোম্পানিগুলো নিয়মিতভাবেই নতুন ঋণ পাবে। ফলে গ্রুপের একটি কোম্পানি খেলাপি হলেও এতে কোনো সমস্যা হবে না। এ কারণে যেসব গ্রুপ অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তারা কোনো একটি ছোট বা কম গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানিকে খেলাপি করে ওই ঋণ অন্য খাতে নিয়ে ব্যবহার করতে পারে। একই সঙ্গে নতুন ঋণও নিতে পারবে। এতে ঋণখেলাপি কোম্পানির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি গ্রুপের মধ্যে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ আরও বেড়ে যাবে। জনগণের আমানত নিয়ে তা ফেরত না দেওয়ার প্রবণতাও বাড়বে।

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বেশির ভাগ জায়গায় কাজ বন্ধ, কিন্তু কেন

০৪ এপ্রিল ২০২৪, প্রথম আলো

ঋণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেশির ভাগ জায়গায় ঢাকা দ্রুতগতির উড়ালসড়কের (ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে) নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে গেছে।

গত মঙ্গলবার নির্মাণকাজের পাঁচটি জায়গা (ওয়ার্ক স্টেশন-স্টকইয়ার্ড) ঘুরে দেখা গেছে, হাতিরঝিল ছাড়া আর কোথাও কাজ চলছে না। হাতিরঝিলেও সীমিতসংখ্যক জনবল নিয়ে কাজ চলছে। বাকি চারটি জায়গায় (কাওলা, মগবাজার, মালিবাগ ও কমলাপুর) অল্পসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী, বৈদ্যুতিক মিস্ত্রিসহ কিছু কর্মী রাখা হয়েছে।

কর্মীদের ভাষ্য, কোথাও এক মাস ধরে কাজ বন্ধ, কোথাও দুই মাস।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি প্রথম আলোকে বলেন, গত দুই মাসে অন্তত ৮০ শতাংশ কর্মীকে বিনা বেতনে ছুটিতে পাঠিয়েছে এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান।

অর্থসংকটে বেশির ভাগ জায়গায় কাজ বন্ধ থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছে নির্মাণ ও পরিচালনা প্রতিষ্ঠান ফার্স্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (এফডিইই) কোম্পানি লিমিটেড। প্রথম আলোর এক ই–মেইলের জবাবে ৩ এপ্রিল এফডিইইর পক্ষ থেকে বলা হয়, কাজ চালু রাখার জন্য ঋণ পেতে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোম্পানির কাজ চলছে।

এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য এফডিইই কোম্পানি লিমিটেড নামের কোম্পানি গঠন করে ইতালিয়ান-থাই ডেভেলপমেন্ট। কোম্পানির অংশীদার তিন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার যথাক্রমে ৫১, ৩৪ ও ১৫ শতাংশ। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ হলো এক্সপ্রেসওয়ের নির্বাহক প্রতিষ্ঠান।

প্রকল্পের মূল নির্মাণকাজে ব্যয় ধরা হয় ৮ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। চুক্তি অনুসারে, মূল কাঠামো নির্মাণব্যয়ের ৭৩ শতাংশ জোগান দেবে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। আর ২৭ শতাংশ দেবে বাংলাদেশ সরকার, যা ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফান্ডিং (ভিজিএফ) নামে পরিচিত।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঋণ বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শেয়ার নিয়ে দ্বন্দ্ব থেকেও প্রকল্পের নির্মাণকাজ ব্যাহত হচ্ছে।

এফডিইইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাই নাগরিক ভাস্কন খান্নাভা গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তাঁর কার্যালয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রথম আলোকে বলেছিলেন, চলতি বছরের ৩০ মার্চের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হবে না জেনে গত ১৭ জানুয়ারি ঋণ আটকে দিয়েছে চীনের দুটি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান চায়না এক্সিম ব্যাংক ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না (আইসিবিসি)।

রাজশাহীতে ব্যবসায়ীরা এবার কেন এত আলু কিনলেন

০৬ এপ্রিল ২০২৪, প্রথম আলো

রাজশাহীতে এবার মাঠেই প্রায় তিন গুণ দামে আলু বিক্রি হচ্ছে। গত বছর কৃষকেরা মাঠপর্যায়ে যেখানে প্রতি কেজি আলু ১১-১২ টাকায় বিক্রি করেছিলেন, সেখানে এবার বিক্রি হচ্ছে ৩৩ টাকায়। কৃষকেরা বলছেন, ব্যবসায়ীরা মাঠ থেকেই চড়া দামে আলু কিনে নিচ্ছেন। সে জন্য তাঁরা সব আলু বিক্রি করে দিচ্ছেন। অন্যদিকে অভিযোগ উঠেছে, ব্যবসায়ীরা কারসাজি করে দাম বাড়িয়ে ব্যাপক হারে আলু কিনে নিয়েছেন, যাতে পরে বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে একচেটিয়া মুনাফা করতে পারেন।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা স্মরণকালে মাঠে আলুর এত দাম পাননি। এবার উৎপাদন কম হয়েছে। তাই দাম বেড়েছে। কিন্তু রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উৎপাদন ঘাটতির কথা মানতে নারাজ।

রাজশাহীতে গত বছর মৌসুমের শুরুতে মাঠে প্রতি কেজি আলু সাড়ে ১১ থেকে ১২ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এবার শুরুতে ২৫ টাকা ছিল, যা ইতিমধ্যে ৩৩ টাকায় উঠেছে। রাজশাহীর খুচরা বাজারে এখন ৪০-৪৫ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি হচ্ছে।

সরকারি বিপণন কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যবসায়ীরা কারসাজি করে দাম বাড়িয়েছেন। তাঁরা আলু কিনে গুদামজাত করে রাখছেন। এতে কৃষকেরা আপাতত লাভবান হলেও পরে ব্যবসায়ীরা বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে একচেটিয়া মুনাফা করতে পারেন।

চাষিরা বলছেন, এ বছর এক বিঘা জমিতে আলু উৎপাদনে খরচ পড়েছে প্রায় ৬০ হাজার টাকা, যা গত বছরের চেয়ে ১০-১৫ হাজার টাকা বেশি। জমির ইজারামূল্য, আলুবীজের দাম ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির কারণে খরচ বেড়েছে। গত বছর এক বিঘা জমির ইজারা মূল্য ছিল ১৫ হাজার টাকা, যা এবার বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার টাকা। গতবার বীজ কেনায় বিঘাপ্রতি খরচ হয় ১৫ হাজার টাকা, এবার হয়েছে ১৮-২০ হাজার টাকা। এ ছাড়া শ্রমিকের জনপ্রতি মজুরি ৩০০ থেকে বেড়ে ৫০০ টাকা হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী জেলার ৯ উপজেলায় এবার ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। গত বছর হয়েছিল ৩৬ হাজার ৫০০ হেক্টরে। জেলার প্রায় অর্ধেকই চাষ হয় তানোর উপজেলায়। এদিকে শর্ষের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকেরা এবার এটির চাষ বাড়িয়েছেন। এতে আলুর আবাদ কমেছে। গত বছর রাজশাহীতে ১০ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়েছিল। এবার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৯ লাখ টন। তবে রাজশাহীতে বছরে আলুর চাহিদা ৮০ হাজার টন। উদ্বৃত্ত থাকা আলু অন্য জেলাগুলোয় যায়।

তানোর উপজেলার চাষি আবদুল আওয়াল জানান, এ বছর তিনি ৮০ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। গত অক্টোবরের শেষে বৃষ্টির কারণে আলুর ফলন কম হয়েছে। আগে যেখানে এক বিঘা জমিতে ৭০ বস্তা পর্যন্ত আলু পাওয়া যেত, সেখানে এবার পাওয়া গেছে ৫৫-৫৭ বস্তা।

বিএডিসির সাবেক মহাব্যবস্থাপক আরিফ হোসেনও বলেন, এবার বৃষ্টিতে আলুর উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। আবার তীব্র শীতের সময়ে চাষিরা ছত্রাকনাশক ব্যবহার করায় তাতে আলুগাছ রক্ষা পেলেও ফলন কমে গেছে। আর ফলন কমার কারণেই আলুর দাম বেড়েছে। রাজশাহীর কৃষকেরা স্মরণকালে মাঠে এত বেশি দাম পাননি।

এদিকে ফলন কম হওয়ার কারণে রাজশাহীর সব হিমাগার এবার আলুতে ভরে যায়নি। রাজশাহী হিমাগার সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান জানান, তাঁর নিজের পাঁচটি হিমাগারের মধ্যে দুটি ভরেছে। বাকি তিনটির একটির ১০ ভাগ, একটির ২০ ভাগ ও একটির ৩০ ভাগ খালি রয়েছে। তিনি বলেন, রাজশাহী জেলায় মোট ৩৬টি হিমাগার রয়েছে। এবারের আলু তোলা শেষ হয়ে গেলেও এখনো হিমাগারের ২০ শতাংশ খালি পড়ে রয়েছে।

উৎপাদন মৌসুমে আলুর এত দাম বাড়ার বিষয়ে নতুন কথা বলছেন জেলা বিপণন কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেন। সম্প্রতি রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বদলি হয়ে যাওয়া এই কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, দাম বৃদ্ধি সম্পূর্ণ ব্যবসায়ীদের কারসাজি। যেখানে আলুর উৎপাদন খরচ ১৩ থেকে ১৪ টাকা হওয়ার কথা, সেখানে তাঁরা ২৮-৩০ টাকা কেজি দরে কিনেছেন। ভালো দাম পেয়ে চাষিরাও মাঠেই আলু বিক্রি করে দিয়েছেন। এখন ব্যবসায়ীরা সব আলু মজুত করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করবেন।

মনোয়ার হোসেন আরও বলেন, সাধারণত হিমাগারে রাখার পর চাষিদের ঘরে যে আলু উদ্বৃত্ত থাকে, তা দিয়ে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসের চাহিদা পূরণ হয়ে থাকে। জুলাই থেকে হিমাগারের আলু বাজারে আসে। নভেম্বর নাগাদ হিমাগারের আলু খালাস হয়ে যায়। গত বছর এপ্রিলের মাঝামাঝি হঠাৎ অতিরিক্ত দামে ব্যবসায়ীরা চাষিদের উদ্বৃত্ত আলু কিনে নিয়ে বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেন। কিন্তু নভেম্বরে তাঁরা আর হিমাগারের আলু ছাড়েননি। দাম বাড়িয়ে ডিসেম্বরে ছাড়েন। এবারও তা-ই হবে। কারণ, মার্চ-এপ্রিল-মে মাসের চাহিদা মেটানোর আলু চাষিদের ঘরে না উঠে ব্যবসায়ীদের গুদামে চলে গেছে। তাঁরাই এখন আস্তে আস্তে বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবেন বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা।

একই দূরত্ব, তবু কলকাতার চেয়ে ঢাকা থেকে উড়োজাহাজের টিকিটের দাম দ্বিগুণ

০৭ এপ্রিল ২০২৪, প্রথম আলো

ছুটি কাটাতে দেশের বাইরের গন্তব্যে উড়োজাহাজযাত্রা জনপ্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে আগের চেয়ে উড়োজাহাজের সংখ্যা বেড়েছে; বেড়েছে যাত্রীসংখ্যাও। এতে টিকিটের দাম কমার কথা। কিন্তু উল্টো বাড়ছে।

বিশেষ করে ঈদের মতো উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশের বাইরে উড়োজাহাজে করে অবকাশযাত্রায় বাড়তি বাণিজ্যের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। একই দূরত্বের গন্তব্যে কলকাতার চেয়ে ঢাকা থেকে দ্বিগুণের বেশি ভাড়া পড়ছে।

ঢাকা ও কলকাতা থেকে সিঙ্গাপুরের দূরত্ব প্রায় একই। উড়োজাহাজে সরাসরি ঢাকা থেকে সিঙ্গাপুরে যেতে সময় লাগে ৪ ঘণ্টা ২০ মিনিট। কলকাতা থেকে যেতে ৪ ঘণ্টা ২৫ মিনিট লাগে।

তার মানে এই গন্তব্যে উড়োজাহাজের জ্বালানি খরচে তেমন পার্থক্য হবে না। অথচ ঢাকা থেকে সিঙ্গাপুর যেতে উড়োজাহাজের টিকিটের সর্বনিম্ন দাম ২৮ হাজার টাকা। কলকাতা থেকে তা পাওয়া যাচ্ছে টাকার হিসাবে মাত্র ১৫ হাজারে।

এবার ১০ এপ্রিল থেকে ঈদুল ফিতরের ছুটি শুরু হচ্ছে। এদিনের সিঙ্গাপুর গন্তব্যের টিকিটের দাম জানতে অনলাইন টিকিট বুকিংয়ের একাধিক ওয়েবসাইট ঘুরে এই তথ্য পাওয়া যায়।

দেশ থেকে বাইরে বেড়াতে যাওয়ার আরেকটি জনপ্রিয় গন্তব্য থাইল্যান্ডের ব্যাংকক। ঢাকা ও কলকাতা থেকে উড়োজাহাজে করে আড়াই ঘণ্টায় পৌঁছানো যায় ব্যাংকক। কলকাতা থেকে টিকিট মিলছে জনপ্রতি ১২ হাজার টাকায়। ঢাকা থেকে টিকিটের দাম ৩০ হাজার টাকা।

রাজবাড়ীতে যাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে পদদ‌লিত হয়ে বৃদ্ধার মৃত্যু

৭ এপ্রিল ২০২৪, যমুনা টিভি অনলাইন

রাজবাড়ী‌তে যাকাতের কাপড় নি‌তে গিয়ে টিনের গেইট ভেঙে ঢুক‌তে গি‌য়ে ধাক্কায় মা‌টি‌তে পড়ে অজ্ঞাত (৬০) এক বৃদ্ধা ম‌হিলার মৃত্যু হয়েছে।

রোববার (৭ এপ্রিল) সকাল সা‌ড়ে ৬টার দি‌কে শহ‌রের ভবানীপুর আলহাজ মো. দে‌লোয়ার হো‌সেনের বাড়িতে এ ঘটনা ঘ‌টে।

বাড়ির দে‌লোয়ার মালিক বলেন, তি‌নি প্রতি বছ‌রের মতো এবারও ২৭ রমজা‌নে তার প্রায় সা‌ড়ে ৩ হাজার অসহায়, হত‌দিরদ্র মানু‌ষের মা‌ঝে যাকা‌তের শা‌ড়ি ও লু্ঙ্গি বিতর‌ণের ব্যবস্থা করেন। এ জন্য প্যান্ডেল ও গরমের জন্য ফ্যানের ব্যবস্থা রাখেন। সকাল ৭টা থে‌কে শা‌ড়ি ও লুঙ্গি বিতর‌ণের কথা থাক‌লেও ফজ‌রের নামাজা‌রের সময় থে‌কে মানুষ জ‌ড়ো হ‌তে থা‌কে। হঠাৎ সকাল সা‌ড়ে ৬টার দি‌কে বাড়ির একপা‌শের টি‌নের গেইট ভেঙে এক সা‌থে সবাই ধোকার চেষ্টা ক‌রে হত‌দরিদ্ররা। এ সময় এক বৃদ্ধা ম‌হিলা ধাক্কা লে‌গে মা‌টি‌তে পড়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

বিত্তশালীদের কেনাকাটা বাড়লেও কমছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা

এপ্রিল ০৮, ২০২৪, বণিক বার্তা

এবার ঈদে অভিজাত শপিংমলগুলোয় লাইন ধরে ক্রেতারা প্রবেশ করছেন। পছন্দের পোশাকও কিনছেন তারা। এর উল্টো চিত্র দেখা গেছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের মার্কেটে। ক্রেতা তুলনামূলক কম। মার্কেটে এলেও দাম শুনে পছন্দের পোশাক কিনতে পারছেন না। সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন দোকান ঘুরে এসব চিত্র দেখা গেছে।

ঈদের সময় পাঞ্জাবির দোকানে তুলনামূলক বেশি বেচাকেনা হয়। সম্প্রতি পাঞ্জাবির বাজারে জনপ্রিয়তা পেয়েছে ইল্লিয়্যিন। রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের ইল্লিয়্যিনের শোরুমে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে ক্রেতাদের সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন বিক্রয় প্রতিনিধিরা। আউটলেটটির বাইরে ক্রেতারা সারিবদ্ধভাবে অপেক্ষা করছেন। ভেতর থেকে কেউ বের হলে ঢুকছেন অন্য ক্রেতা। এ ব্র্যান্ডের পণ্যের মূল্যও আকাশছোঁয়া। কথা হয় সে শোরুমের এক জ্যেষ্ঠ বিক্রয় সহকারীর সঙ্গে। ব্যবস্থাপনা পর্ষদের নিষেধাজ্ঞা থাকায় বেচাবিক্রি সম্পর্কে সরাসরি কিছু বলতে রাজি হননি তিনি। তবে নাম প্রকাশ হবে না নিশ্চিত হয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে পাঞ্জাবির চাহিদা বেড়েছে। অনেক ক্রেতাকে আমরা ঠিকমতো পণ্য সরবরাহ করতে পারছি না। অধিকাংশ পাঞ্জাবির সাইজ শেষ। অবশিষ্ট একটি-দুটি সাইজে মিললে পাঞ্জাবি পাচ্ছেন ক্রেতারা। এর পরও দৈনিক চারশর বেশি পাঞ্জাবি বিক্রি হচ্ছে এ আউটলেট থেকে। এসব পাঞ্জাবির দাম ৩ হাজার ৬৫০ থেকে শুরু হয়ে ৯ হাজার ২৫০ টাকা পর্যন্ত রয়েছে।’

বসুন্ধরা শপিংমলে অবস্থিত পাঞ্জাবির আরেকটি শোরুম লুবনান। প্রতিষ্ঠানটির শোরুম ইনচার্জ রিয়াজ হোসেন রাজু জানান, তারা দৈনিক ২৫০-৩০০টির বেশি পাঞ্জাবি বিক্রি করছেন। দাম ২ হাজার ৫০০ থেকে শুরু হয়ে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে অনেক সময় গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী সাইজ দিতে পারেন না তারা। রিয়াজ হোসেন রাজুর ভাষ্য, লুবনানের প্রতিটি শোরুম একটি ডিজাইনের ১২টি করে পাঞ্জাবি পায়। অনেক সময় নির্দিষ্ট ডিজাইনের পাঞ্জাবি সাইজ অনুযায়ী সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ চাহিদার বিপরীতে উৎপাদনে সীমাদ্ধতা রয়েছে। দেখা গেল, প্রদর্শনী থেকে গ্রাহক পাঞ্জাবি পছন্দ করে সাইজ মিলিয়ে দিতে বলছেন, স্টোরে গিয়ে দেখা যায় ওই সাইজ বিক্রি হয়ে গেছে।

ইল্লিয়্যিন থেকে পাঞ্জাবি কিনে বেরিয়েছেন একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম। হাতে বেশ কয়েকটি ব্যাগ দেখে জিজ্ঞেস করতেই জানালেন চারটি পাঞ্জাবি কিনেছেন তিনি। কামরুল হাসান বলেন, ‘ঈদে যা কিছুই হোক সবারই নতুন পাঞ্জাবি লাগে।’ দাম বেশি হলেও পরিবারের লোকদের খুশি করতে ইল্লিয়্যিন থেকে পাঞ্জাবি কিনেছেন তিনি।

একই শপিংমলের আরেকটি শোরুম দেশী দশ। স্বনামধন্য ১০টি ফ্যাশন ব্র্যান্ড নিপুণ, কে-ক্র্যাফট, অঞ্জন’স, রঙ বাংলাদেশ, বাংলার মেলা, সাদাকালো, বিবিয়ানা, দেশাল, নগরদোলা ও সৃষ্টির সমন্বয়ে একই ছাদের নিচে ব্যবসা করছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসন ব্যবস্থাপক মো. শরীফুজ্জামান জানান, রমজানের শুরু থেকে ভালো ব্যবসা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এপ্রিলের শুরু থেকে ব্যবসা কমে এসেছে। এ সময়ে বেচাকেনা আগের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে বলে দাবি করছেন তিনি।

এখানে পোশাক কিনতে আসা ইসরাত জাহান নামে এক তরুণী বলেন, ‘‌নতুন পোশাক ছাড়া ঈদ কল্পনাই করা যায় না। আবার ঈদের পর পারিবারিক অনুষ্ঠান আছে। সেজন্য একাই তিনটি জামা নিয়েছি।’

তুলনামূলক বিপরীত চিত্র পাওয়া গেল নিউমার্কেটে। সাধারণত মধ্যবিত্তরা এখানে কেনাকাটা করতে আসেন। মার্কেটটিতে মানুষের ভিড় থাকলেও বিকিকিনি সে অনুযায়ী হচ্ছে না বলে দাবি করেছেন সেখানকার ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, ক্রেতারা মার্কেটে আসেন ঠিকই। জামাকাপড়ও হাতে নিয়ে দেখেন। তবে অধিকাংশ না কিনে চলে যান। চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের পাঞ্জাবি ব্যবসায়ী সোহেল মিয়া বলেন, ‘‌এ বছর আশানুরূপ বিক্রি করতে পারিনি। ক্রেতারা পোশাক কিনতে এসে দরদাম করে চলে যাচ্ছেন। দিনে ২০-২৫টির বেশি পাঞ্জাবি বিক্রি করতে পারছি না।’

গুলিস্তানের ফুটপাতে শার্ট-প্যান্ট নিয়ে বসেন মো. রুবেল হোসেন। ঈদ উপলক্ষে পাঞ্জাবির সংগ্রহ বাড়িয়েছেন তিনি। তবে প্রথম লটে সংগৃহীত পাঞ্জাবিই বিক্রি করে শেষ করতে পারেননি। দৈনিক সর্বোচ্চ সাত-আটটি পোশাক বিক্রি করতে পারছেন তিনি। কোনো কোনোদিন দু-তিনটিতেই থেমে থাকে এ সংখ্যা। রুবেল বলেন, ‘‌ফুটপাতে মানুষের আনাগোনা হয়, ভিড় হয়। তবে মানুষ জামাকাপড় কিনছেন না। ১০ জন মানুষ দেখে একজন কিনছেন। বাকিরা দাম জিজ্ঞেস করেই চলে যাচ্ছেন।’

একই চিত্র নিউমার্কেটের ফুটপাতেও। নিম্নবিত্ত মানুষের শেষ ভরসা ফুটপাতের দোকানে তুলনামূলকভাবে দাম কম হওয়ায় এখান থেকে পছন্দের পোশাক কেনেন স্বল্প আয়ধারীরা। তবে নিত্যপণ্যের আকাশছোঁয়া দামে তাদের সে স্বপ্নও ফিকে হয়ে যেতে বসেছে। নিউমার্কেটের প্রধান ফটকের পাশের ফুটপাতের একটি দোকানে কন্যা সন্তানের জন্য জামা নেড়েচেড়ে দেখছিলেন দিনমজুর হাকিম সবুর। অনেকক্ষণ দেখার পর একটি জামা পছন্দ করেছেন তিনি। তবে দোকানিকে দাম জিজ্ঞেস করতেই চেহারা মলিন হয়ে আসে তার। পকেটে হাত দিয়ে টাকার হিসাব করে দাম মেটাতে পারেননি। কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে পোশাকটি রেখে দেন তিনি। জিজ্ঞেস করলে হাকিম সবুর বলেন, ‘‌ছোট ছেলেটার জন্য একটা শার্ট কিনেছি। প্যান্ট কেনার টাকা নেই। মেয়েটা একটা ফ্রকের আবদার করছিল। কাল আরো কিছু টাকা জমিয়ে এসে নেব।’

ফুটপাতের আরেক দোকানি কালাম মিয়া বলেন, ‘‌মানুষ এখন আগের মতো কেনাকাটা করতে পারছে না। আমাদেরও বেচাবিক্রি কম। ঈদের বাজারের দিকে তাকিয়ে থাকি আমরা। তবে এবার খুব একটা লাভ করতে পারছি না।’

আজিমপুরের এক মুদি ব্যবসায়ী মকবুল রহমান ফুটপাত থেকেই পরিবারের জন্য পোশাক কিনছিলেন। তিনি বলেন, ‘‌মার্কেটে জামা-কাপড়ের অনেক দাম। ফুটপাতই এখন শেষ ভরসা। দুই মেয়ে আর এক ছেলের জন্য ফুটপাত থেকে পোশাক কিনে আগামীকাল বাড়ি যাব। স্ত্রীর জন্য একটা শাড়ি কিনব ভেবেছিলাম। সন্তানদের জন্য কিনতেই জোগাড় করা টাকা শেষ। নিজের জন্য কিছু কিনিনি।’

সিটি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হতে যাচ্ছে বেসিক ব্যাংক

এপ্রিল ০৯, ২০২৪, বণিক বার্তা

বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক সিটি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হতে যাচ্ছে সরকারি রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকে গতকাল অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বেশ কিছুদিন ধরেই সিটি ব্যাংকের সঙ্গে বেসিক ব্যাংকের একীভূতকরণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। এ নিয়ে ব্যাংক দুটির পরিচালনা পর্ষদে আলোচনাও হয়। তবে এক্ষেত্রে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসছিল না। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সঙ্গে সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান আজিজ আল কায়সার ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিনের বৈঠক হয়। ওই বৈঠকেই বেসিক ব্যাংককে সিটি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র বণিক বার্তাকে নিশ্চিত করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের ব্যাংক খাতে মার্জার-অ্যাকুইজিশন নিয়ে অনেক আলোচনাই হচ্ছে। আমরাও এর বাইরে নই। এক্ষেত্রে সম্ভাব্য বিকল্পগুলো নিয়ে আমরা পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করছি। নির্দিষ্ট কোনো দুর্বল ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হওয়ার বিষয়ে আমি জ্ঞাত নই। তবে দেশের অর্থনীতির স্বার্থে যদি কোনো কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে হয়, সেক্ষেত্রে সিটি ব্যাংক প্রস্তুত রয়েছে।’

মার্চে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯.৮১ শতাংশ

১০ এপ্রিল ২০২৪, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

চলতি বছরের মার্চে দেশের মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়ে ৯ দশমিক ৮১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।

গত ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতির এই হার ছিল ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

মঙ্গলবার সর্বশেষ আর্থিক পরিসংখ্যানে এ তথ্য প্রকাশ করেছে বিবিএস।

বিবিএসের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মার্চে খাদ্য ও খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশে, আর খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৬৪ শতাংশে।

৩ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার

এপ্রিল ১৬, ২০২৪, বণিক বার্তা

চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) দেশের জিডিপিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৭ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি হয়েছে শিল্প খাতে, ৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১০ শতাংশ।

সরকার চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। যদিও এ লক্ষ্যমাত্রাকে ‘উচ্চাভিলাষী’ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে তুলনামূলক রক্ষণশীল প্রক্ষেপণ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক ও এডিবিও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বড় কোনো সমস্যায় নয়, বরং উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব, ডলার সংকট ও আর্থিক খাতের দুর্দশার কারণেই জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমছে। আর আমদানি নিয়ন্ত্রণের ফলে যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল কম আসায় শিল্প খাতে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করায় প্রবৃদ্ধি কমাটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে এটাকে মেনে নেয়ারও পরামর্শ তাদের। খাতসংশ্লিষ্টরা যদিও বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট সমাধান না হলে ভবিষ্যতে শিল্পোৎপাদন আরো কমে আসবে।

আপাতত আর কোনো ব্যাংক একীভূত হবে না: বাংলাদেশ ব্যাংক

১৬ এপ্রিল ২০২৪, প্রথম আলো

আপাতত আর কোনো ব্যাংককে একীভূত করা হবে না বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বলছে, যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তার ফলাফল ও অভিজ্ঞতা যাচাইয়ের পর নতুন করে অন্য কোনো দুর্বল ব্যাংক একীভূত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে সরকারি-বেসরকারি ১০টি ব্যাংককে একীভূত করার মাধ্যমে পাঁচটিতে নামানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই পাঁচ ব্যাংকের বাইরে এখন নতুন করে আর কোনো ব্যাংককে স্বেচ্ছায় একীভূতকরণ করা হবে না। কারণ, এ বিষয়ে আমাদেরও কতটা সক্ষমতা আছে, এটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি ব্যাংক নিরীক্ষা করতে তিনটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান লাগবে। দেশে ভালো নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব আছে। এই পাঁচ ব্যাংক থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে সামনের দিনে আরও ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত আসতে পারে।’

সম্ভাবনা থাকলেও কমছে পাটজাত পণ্যের রপ্তানি

২০ এপ্রিল ২০২৪, প্রথম আলো

দীর্ঘদিন ধরে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি ছিল ৯৭ কোটি মার্কিন ডলারের। গত অর্থবছরে এই রপ্তানি কমে ৯১ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। তার মানে ১০ বছরে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়েনি, উল্টো ৬ শতাংশ কমেছে।

পাটপণ্যের রপ্তানিকারকেরা বলছেন, পরিবেশবান্ধব হওয়ায় বিশ্বজুড়ে পাটপণ্যের চাহিদা বাড়ছে। তবে কিছু সীমাবদ্ধতার জন্য সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ। যদিও বিশ্বমানের পাট উৎপাদনে বাংলাদেশের সুনাম রয়েছে। সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পাটের উৎপাদন থেকে শুরু করে পাটপণ্য নিয়ে গবেষণা, নকশার উন্নয়ন, বিপণনসহ বিভিন্ন বিষয়ে একটি সমন্বিত পথনকশা দরকার। সেই পথনকশা অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলেই পাটপণ্যের রপ্তানি বাড়বে।

পানি আমদানি হচ্ছে বছরে লাখ ডলারের

২২ এপ্রিল ২০২৪, প্রথম আলো

আমদানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশে পানি আমদানি শুরু হয় প্রায় ২৫ বছর আগে। শুরুতে বিদেশি বোতলজাত পানির ব্যবহার ছিল খুবই কম। তবে ধীরে ধীরে আমদানি করা পানির ব্যবহার বাড়তে থাকে। শুরুর দিকে ইউনিভার্সাল ট্রেডিং হাউস ও ফুডেক্স ইন্টারন্যাশনাল বোতলজাত পানি আমদানি করে। এখন এই দুটি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বসুন্ধরা মাল্টি ট্রেডিং কোম্পানি, হোলসেল ক্লাব লিমিটেডসহ ২০-২২টি প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে পানি আমদানি করছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) গত পাঁচ বছরের পানি আমদানির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরে গড়ে সাড়ে তিন লাখ লিটার বিদেশি বোতলজাত পানি আমদানি হচ্ছে দেশে। এর মধ্যে অবশ্য গত বছর পানি আমদানি কিছুটা কমে গেছে। গত বছর বোতলজাত পানি আমদানি হয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার লিটার। গত পাঁচ বছরে সবচেয়ে বেশি পানি আমদানি হয়েছিল ২০১৯ সালে। ওই বছর আমদানি হয়েছিল ৫ লাখ ১৪ হাজার লিটার। মূলত বাংলাদেশে ফ্রান্স, ফিজি ও ইতালির পানিই বেশি আমদানি হচ্ছে। এসব পানি বেশি আমদানি হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাজ্য থেকে।

চিনির বাজার: সরকারি থেকে বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে

এপ্রিল ২২, ২০২৪, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

প্রায় দুই দশক আগেও দেশের চিনি শিল্পে ১৫ রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার আধিপত্য থাকলেও এখন তা পাঁচ বেসরকারি কারখানার নিয়ন্ত্রণে।

তারপরও ২০২৩ সালে আমদানি করা ১৭ লাখ টন অপরিশোধিত চিনির প্রায় ৭০ শতাংশই ছিল দুই ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই) ও সিটি গ্রুপের দখলে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের তথ্য অনুসারে, মেঘনা গ্রুপ সাড়ে ৪০ শতাংশ ও সিটি গ্রুপ সাড়ে ২৮ শতাংশ অপরিশোধিত চিনি আমদানি করছে।

চিনির তৃতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক ছিল এস আলম গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৩ সালে দেশের চিনির চাহিদার প্রায় পাঁচ ভাগের একভাগ মিটিয়েছিল।

ওই বছর অবশিষ্ট অপরিশোধিত চিনি আমদানি করেছিল অন্য দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম লিমিটেড ও দেশবন্ধু সুগার মিলস।

ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানোয় গত অর্থবছরে দেশের নয় হাজার কোটি টাকার বেশি দামের চিনির বাজারে এখন এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য চলছে।

বাড়তি ভাড়ায় রেলভ্রমণ ৪ মে থেকে

এপ্রিল ২৩, ২০২৪, বণিক বার্তা

রেলযাত্রায় ১০০ কিলোমিটারের অতিরিক্ত দূরত্বে রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত কার্যকর হচ্ছে আগামী ৪ মে। ওই দিন বা এর পরের যেকোনো সময়ে উল্লিখিত দূরত্বের বেশি ভ্রমণের জন্য এখনকার চেয়ে বাড়তি ভাড়া পরিশোধ করতে হবে রেলযাত্রীদের। ৪ মের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হচ্ছে আগামীকাল। এ অনুযায়ী কাল থেকেই যাত্রীদের ওই দিন বা এর পরের যেকোনো সময়ের জন্য ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে বাড়তি ভাড়া পরিশোধ করে টিকিট কিনতে হবে। এ নিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে গতকালই একটি গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে।

গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ রেলওয়েতে দূরত্বভিত্তিক ও সেকশনভিত্তিক রেয়াতি সুবিধা দেয়া হয় ১৯৯২ সালে। এরপর ২০১২ সালে সেকশনাল রেয়াত বাতিল হলেও চালু ছিল দূরত্বভিত্তিক রেয়াত। সম্প্রতি রেলওয়ে যাত্রীবাহী ট্রেনগুলোয় নতুন করে ভাড়া না বাড়িয়ে দূরত্বভিত্তিক রেয়াত প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্ত ৪ মে থেকে কার্যকর হবে।

দূরত্বভিত্তিক রেয়াতি সুবিধায় ৩২ বছর ধরে মূল ভাড়ায় ১০১-২৫০ কিলোমিটার ভ্রমণে ২০ শতাংশ, ২৫১-৪০০ কিলোমিটারে ২৫ ও ৪০১ কিলোমিটার বা এর বেশি দূরত্বের জন্য ৩০ শতাংশ ছাড় দিয়ে আসছিল বাংলাদেশ রেলওয়ে। আর্থিক চাপ ও লোকসান কমাতে এখন এ সুবিধা প্রত্যাহার করে নিচ্ছে রেলওয়ে। এর পাশাপাশি ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে ট্রেনে অতিরিক্ত সংযোজিত কোচ ও আবেদনের মাধ্যমে রিজার্ভকৃত টিকিটেরও। এক্ষেত্রে রিজার্ভেশন চার্জের ভিত্তিতে অতিরিক্ত সংযোজিত কোচ ও আবেদনের মাধ্যমে রিজার্ভকৃত নন-এসি টিকিটে ব্যয় বাড়ছে মূল ভাড়ার ২০ শতাংশ। এসি টিকিটে বাড়ছে ৩০ শতাংশ।

দখল, দুর্নীতি ও অনিয়ম

গ্রাহকের টাকায় জমিবিলাস, আলেশা মার্টের চেয়ারম্যান ২ হাজার ২০ শতাংশ জমি কিনেছেন

২৭ জানুয়ারি ২০২৪, প্রথম আলো

বিতর্কিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আলেশা মার্টের চেয়ারম্যান মঞ্জুর আলম শিকদার ‘গ্রাহকের টাকায়’ ২ হাজার ২০ শতাংশ জমি কিনেছেন। দলিল সূত্রে এসব জমি খুঁজে পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

জমিগুলো কেনা হয়েছে গাজীপুরে। স্থানীয় বাসিন্দা, আলেশার নিয়োগ করা তত্ত্বাবধায়ক ও জমি কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, আলেশার কেনা জমির পরিমাণ আরও বেশি। সিআইডি যে পরিমাণ জমির হদিস পেয়েছে, তার দাম দেখানো হয়েছে প্রায় ৩২ কোটি টাকা। অবশ্য তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, দলিলে জমির দাম কম দেখানো হয়েছে। আসলে এই পরিমাণ জমির বাজারমূল্য অন্তত ১৫০ কোটি টাকা।

যেমন এক জায়গায় প্রতি শতাংশ জমির দাম দেখানো হয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার টাকা। যদিও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সেখানে জমির বাজারমূল্য প্রতি শতাংশ সর্বনিম্ন দুই লাখ টাকা।

২০২১ সালের দিকে যখন আলেশা মার্ট গ্রাহককে বড় ছাড় দিয়ে পণ্য বিক্রির নামে টাকা ওঠাচ্ছিল, তখনই জমিগুলো কেনা হয়। ওই সময় কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। এর একটি এই আলেশা মার্ট। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মঞ্জুর আলম শিকদার এখন কারাগারে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মঞ্জুর আলমের বিরুদ্ধে করা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের একটি মামলার তদন্ত করছে। তাদের তদন্তেই আলেশার বিপুল পরিমাণ জমি কেনার তথ্য বেরিয়ে আসে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক মনিরুজ্জামান গতকাল শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, আদালতের নির্দেশে মঞ্জুর আলমের ২ হাজার ২০ শতাংশ জমি জব্দ করা হয়েছে।

নীতি অবনত ব্যবস্থার উপঢৌকন কি রাজউকের প্লট

জানুয়ারি ২৮, ২০২৪, বণিক বার্তা

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় আইন সংশোধন হয় ১৯৮৬ সালে। সংশোধিত নতুন আইনে বলা হয় ‘সরকার যাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে তাকেই প্লট বরাদ্দ দিতে পারবে’। ওই ধারাটির মাধ্যমে সরকারি আবাসন প্রকল্পগুলো হয়ে ওঠে ক্ষমতাবলয়ের কাছের লোকদের সুবিধা দেয়ার হাতিয়ার। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঐতিহাসিকরা বলছেন, তৎকালীন স্বৈরশাসককে শাসন টিকিয়ে রাখতে বরাবরই সরকারি আমলা, রাজনীতিবিদসহ সমাজের প্রতাপশালী ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিদের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে বেশি। বিভিন্ন সময়ে বিচার বিভাগ, গণমাধ্যম, প্রশাসন, রাজনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের নানা ব্যক্তির সমর্থনেরও প্রয়োজন পড়েছে। এ সমর্থনের বিনিময়ে এসব মানুষকে সম্পদ বাড়ানোর পথ প্রশস্ত করে দেয়া হয়েছে নানাভাবে। পাশাপাশি উপঢৌকন হিসেবে দেয়া হয়েছে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ গৃহায়ন ও গণপূর্ত আইন পরিবর্তনের মাধ্যমে বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন। রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত আবাসিক এলাকা ও সরকারি প্রকল্পে প্লটের বরাদ্দ পেয়েছিলেন বিচার বিভাগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, সরকারি সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা, কোটিপতি ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি, চলচ্চিত্র শিল্পীসহ সরকারঘনিষ্ঠ বিভিন্ন ব্যক্তি।

এ সংস্কৃতি বজায় রাখে পরের সরকারগুলোও। তৎকালীন বিভিন্ন মাধ্যমে আসা তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালে রাজধানীর সবচেয়ে অভিজাত এলাকা গুলশান-বনানীতে ৩০১টি প্লট বরাদ্দ দেয় রাজউক। ওই বরাদ্দ প্রক্রিয়া সে সময় ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। সে সময় এসব প্লটের মধ্যে ৫৯টির জন্য বরাদ্দ দেয়ার মতো কোনো জায়গাই চিহ্নিত করা যায়নি। জায়গা না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ  দেখা দেয়, এগুলো বরাদ্দ দিতে হলে এলাকাদুটির লেক ও জলাশয় ভরাট করা ছাড়া গতি নেই। তখন ৩০১টি প্লটের জন্য ১৩ হাজার আবেদন জমা পড়েছিল। প্রতি আবেদনের জন্য জমা দিতে হয়েছে ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা করে। ১৩ হাজার মানুষের মধ্যে বাছাই করে ৩০১ জনকে নির্বাচিত করে রাজউক। নির্বাচিতদের মধ্যে ৯০ শতাংশই ছিলেন তৎকালীন সরকারি কর্মকর্তা ও সরকার দলীয় সংসদ সদস্য। প্লটের বরাদ্দ পান ১১ জন মন্ত্রী, ৬২ জন সংসদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সাত কর্মকর্তা এবং সরকারদলীয় নেতাদের শতাধিক আত্মীয়-স্বজন। এমনকি সচিব পর্যায়ের সিনিয়র ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে তুলনামূলক জুনিয়র সরকারি কর্মকর্তাদের প্লট বরাদ্দ দেয়ারও অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি সে সময় গণমাধ্যমগুলোয় বেশ আলোড়ন তৈরি করেছিল।

তৎকালীন গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদে দাবি করা হয়, রাজউক পত্রিকায় বরাদ্দের জন্য আবেদনপত্র চাওয়ার পর দেড় বছর সময় লেগে গিয়েছিল বরাদ্দপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করতে। বরাদ্দ চাহিদা চাওয়ার সময় যিনি গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ছিলেন, তিনি তার পছন্দমতো ৩০১ জনকে বাছাই করে একটি তালিকা করেন। ওই মন্ত্রী চলে যাওয়ার পর নতুন মন্ত্রী এসে সে তালিকা বদলে নিজের পছন্দমতো আরেকটি তালিকা করেন। তাতে তিনি নিজের নামও অন্তর্ভুক্ত করেন। অবশ্য সরকার পরবর্তী সময়ে বরাদ্দটি বাতিল করে।

রাজউকের প্লট ডেভেলপমেন্ট ও বরাদ্দ প্রক্রিয়া পুরোটাই সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, বৈষম্যমূলক ও দুর্নীতিসহায়ক বলে মনে করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজউকের আবাসন কার্যক্রমে আমরা এক ধরনের বৈষম্য দেখতে পাই। বরাদ্দের ক্ষেত্রে যাদের প্রাধান্য দেয়া হয় তারা কোনো না কোনোভাবে দলীয় রাজনীতি বা শাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। এর ফলে ক্ষমতা প্রবাহের একটা নমুনা তৈরি হয়। রাজউকের সম্পদ মানেই তো রাষ্ট্রের সম্পদ। সংবিধান অনুযায়ী এগুলোর বণ্টন বৈষম্যহীন হওয়ার কথা। সেটি না হয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় বরাদ্দ দিয়ে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিকভাবে আরো বৈষম্য তৈরি করেছে।’

২০০২ সালে নেয়া হয় উত্তরা আবাসিক শহর (তৃতীয় পর্ব) প্রকল্প। এখানেও প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে উচ্চ পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে বেশি। যদিও প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের আবাসন সংকট নিরসনের কথা। এখানে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও বিচারপতিদের দেয়া হয়েছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এক্ষেত্রে আইনগতভাবেই তাদের জন্য কোটামুক্ত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার কথা। সে অনুযায়ী আবেদন করলেই তারা বরাদ্দ পেয়ে যাবেন। তাদের জন্য প্লট নিশ্চিতের পরই অন্যদের জন্য কোটা মেনে বরাদ্দের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা। এ অনুযায়ী উত্তরা আবাসন প্রকল্পের তৃতীয় পর্বে সর্বাধিক ২৮ শতাংশ বরাদ্দ রয়েছে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য। এর বাইরেও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও প্রতিরক্ষা  কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে যথাক্রমে ১, ১ ও ২ শতাংশ। এছাড়া ২ শতাংশ বরাদ্দ আইনজীবীদের জন্য। স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার চাকরিজীবীদের জন্য বরাদ্দ ১২ শতাংশ। ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের জন্য বরাদ্দ ৮ শতাংশ। ১০ শতাংশ বরাদ্দ আছে বেসরকারি কর্মকর্তাদের জন্য। প্রবাসীদের জন্য ১০ শতাংশ। এছাড়া অন্যান্য ও সংরক্ষিত ব্যক্তিদের জন্য ৫ ও ১০ শতাংশ কোটা রেখেছে রাজউক।

রাজউককে সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদদের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে রাখা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা (ইউআরপি) বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেছেন, ‘রাজউকের গঠনতন্ত্রই এমন যে সরকারি আমলা কিংবা রাজনীতিবিদরা চাওয়া মাত্রই রাজউকের চেয়ারম্যান বা বোর্ড মেম্বারদের প্রভাবিত করে ফেলতে পারে। আমরা যতই বলি রাজউকের গঠনতন্ত্র সংস্কার করা হোক, কোনো সরকারই এ সুবিধাজনক অবস্থা থেকে সরে আসেনি এবং ভবিষ্যতেও কেউ আসতে চাইবে না। এসব কারণেই রাজউক পরিণত হয়েছে আজ্ঞাবাহী প্রতিষ্ঠানে। সরকার চাইলেই পার্ক-জলাশয়কে প্লট বানিয়ে বরাদ্দ দিতে বাধ্য হয় রাজউক।’

পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প হাতে নেয়া হয় ১৯৯৫ সালে। এটি হাতে নেয়া হয়েছিল মধ্যবিত্তের জন্য আবাসন প্রকল্প হিসেবে। যদিও এখন পর্যন্ত ক্রমবর্ধমান নাগরিক চাপে বিপর্যস্ত ঢাকার আবাসন সমস্যা সমাধানে কোনো কাজেই আসেনি প্রকল্পটি। বরং এখানকার বরাদ্দকৃত জমি অনেকের জন্যই খুলে দিয়েছে রাতারাতি বিত্তশালী হওয়ার পথ। প্রকল্পটিকে দেশে জমির সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে দেখছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তাদের ভাষ্যমতে, রাজউক এখানকার জমি অধিগ্রহণ করেছিল কাঠাপ্রতি সাড়ে ১৪ হাজার টাকারও কম মূল্যে। এরপর সে জমি বরাদ্দে তখন গ্রাহকদের কাছ থেকে নেয়া হয়েছিল দেড় লাখ টাকা করে। প্রতিবার মালিকানা বদলের পর এখানকার জমির দাম বাড়ছে কয়েক গুণ করে। এখন পূর্বাচলে জমির কাঠাপ্রতি গড় দাম কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

এ প্রকল্পের জমি সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছেন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। কোটা সুবিধায় প্রকল্পের আবাসিক প্লটের প্রায় এক-চতুর্থাংশই পেয়েছেন তারা। লটারির মাধ্যমে তাদের প্রকল্পের জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১০ হাজার কাঠারও বেশি। কাঠাপ্রতি ৫০ লাখ থেকে শুরু হয়ে বর্তমান বাজারদরে জমির মূল্য উঠেছে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত।

প্রকল্পটিতে প্রথম পর্যায়ের লটারির মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের ১ হাজার ৬৩২টি প্লট বরাদ্দ দেয় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এছাড়া স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার চাকরিজীবীদের ৬৫৪, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি কোটায় ৪৭২, বেসরকারি চাকরিজীবীদের ৫৯১, প্রবাসী কোটায় ৫৯১, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ২৯৬, সচিব কোটায় ২৪, আইনজীবী কোটায় ১১০, বিচারপতি কোটায় ১৪, সংসদ সদস্য কোটায় ৫৭, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কোটায় ৫৭, অন্যান্য কোটায় ১৮১, শিল্পী কোটায় ১৫১ ও সাংবাদিক কোটায় ৫৫টি প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়। এছাড়া রাজউক কর্মকর্তা, সংরক্ষিত ও প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্তদের জন্যও প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়। লটারির পরও বিভিন্ন সময় পূর্বাচলের প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্রথম বরাদ্দের পর থেকে এ পর্যন্ত জমি ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে প্রচুর প্লটের মালিকানা বদল হয়েছে।

অন্যকে সুবিধা দিতে গিয়ে বিএডিসি নিজেই গাড্ডায়

২৯ জানুয়ারি ২০২৪, সমকাল

কম দামে উন্নতমানের বীজ কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) দায়িত্ব। তবে বীজ বিতরণ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। বীজ সংকট, ভেজাল, নিম্নমান, দামে নয়ছয়, বরাদ্দে ঘাপলাসহ নানা অনিয়ম ছাপিয়ে এবার বিপুল পরিমাণ বীজ অবিক্রীত থেকে যাওয়ার তথ্য বেরিয়ে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, বেসরকারি কোম্পানিকে বীজ বিক্রির সুযোগ করে দিতে গিয়ে বিএডিসি এ গ্যাঁড়াকলে নিজেরাই পড়েছে।

চলতি রবি মৌসুমে বিএডিসির ৩৭ হাজার টনের বেশি বীজ অবিক্রীত থাকায় সরকারের প্রায় ১ হাজার ৫০ কোটি টাকার লোকসান গোনার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। এসব বীজ এখন বিএডিসির জন্য ‘গলার ফাঁস’! বাধ্য হয়ে এই বীজধান এখন চাল বানিয়ে বেচা ছাড়া আর কোনো গতি নেই। এভাবে বেচলেও মোটা অঙ্কের টাকা গচ্চা যাবে সরকারের।

বীজ অবিক্রীত থাকায় বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন কিছুটা কম হওয়ার শঙ্কা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। উচ্চফলনশীল ধানের বীজ কাজে না লাগায় প্রায় ৪ দশমিক ২ লাখ টন খাদ্য উৎপাদন কম হতে পারে বলে ধারণা করছেন তারা। এটি দেশের কৃষিতে বড় ধাক্কা বলেও মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।

অভিযোগ রয়েছে, বেসরকারি কোম্পানির বিক্রি বাড়াতে বিএডিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার একটি চক্রের আঁতাতে কৃষকের কাছে সঠিক সময়ে বিএডিসির বীজ পৌঁছে না। বেসরকারি সংস্থাগুলোর বীজ বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর বিএডিসি বীজ বাজারে দেয়। এতে প্রতিষ্ঠানটির বীজ অবিক্রীত থেকে যায়। এ ছাড়া দক্ষ জনবলের অভাব ও দায়িত্বে অবহেলার কারণেও কৃষক সরকারের কম দামের বীজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএডিসির সাবেক এক মহাব্যবস্থাপক (বীজ) বলেন, বোরো মৌসুমের শুরুতে সঠিকভাবে তদারকি করা হলে এত বীজ অবিক্রীত থাকত না। মূলত অক্টোবর থেকে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহের মধ্যে বোরো বীজ রোপণ শুরু হয়। এর পর আর বীজ রোপণের সময় থাকে না। ফলে এসব বীজ এই মৌসুমে কোনো কাজে আসে না। তিনি বলেন, বেসরকারি কোম্পানির বীজ কখনও অবিক্রীত থাকে না। প্রতি বছর দেশে আমদানি করা উচ্চমূল্যের ১২ হাজার টন ভুট্টা বীজ বিক্রি হয়। অথচ সরকার ভালো মানের ভুট্টা বীজ উচ্চ দরে সংগ্রহ করেও বিক্রি করতে পারে না।

জানা গেছে, বিএডিসির বীজ উৎপাদন করা হয় চুক্তিবদ্ধ চাষির মাধ্যমে। উৎপাদিত বীজ প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণ করে পরবর্তী মৌসুমে তা কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়। বেসরকারি এবং বিভিন্ন সংস্থার উৎপাদিত বীজের চেয়ে বিএডিসির বীজে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি ফলন হয়ে থাকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিএডিসির ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মজুত বীজের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৭২ হাজার ৯৫০ টন। আউশ, আমন, বোরো ধানের বীজ রয়েছে ৬৬ হাজার ২৪৭ টন। এর মধ্যে বোরো ধানের বীজ অবিক্রীত রয়েছে ২৮ হাজার ৫ টন। এ ছাড়া উচ্চফলনশীল গম, ভুট্টা, ডাল বীজ, তৈল বীজ, সবজি বীজ, মসলা ও পাট বীজও অবিক্রীত রয়েছে ৫ হাজার ৬১৩ টন। গম বীজ ৫ হাজার ১৯৩ টন, ভুট্টা বীজ ৩০ টন, ডাল ও তৈল বীজ  ৩৩০ টন, সবজি বীজ ১৩ টন, মসলা  ৪৪ টন। উচ্চফলনশীল বোরো বীজ বিএডিসির সারাদেশের ২৭টি অঞ্চলে ৮ হাজার ৫৩৬ ডিলার এবং ১০০টি বীজ বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে বিক্রি করা হয়। তবে এ বছর রবি মৌসুমে সব মিলিয়ে অবিক্রীত বীজ রয়েছে ৩৭ হাজার টন। কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এত বিপুল পরিমাণ বীজ অবিক্রীত থাকায় এ মৌসুমে ফসলের উৎপাদন কমে যাবে ৪ দশমিক ২ লাখ টনের বেশি। আর এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ১ হাজার ৫০ কোটি টাকারও বেশি।

দেশের দুর্নীতি উদ্বেগজনক

৩১ জানুয়ারি ২০২৪, সমকাল

সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম, প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের শূন্য সহনশীল নীতি কার্যকর না হওয়া, অর্থ পাচারসহ নানা কারণে দেশে অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়েছে দুর্নীতি। বার্লিনভিত্তিক দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) প্রকাশিত দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই)-২০২৩-এ বাংলাদেশে দুর্নীতি উদ্বেগজনক হারে বাড়ার চিত্রই ফুটে উঠেছে। এবার দুই ধাপ অবনতি হয়ে ১৮০ দেশের মধ্যে নিম্নক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান দশম। স্কোরও ১ পয়েন্ট কমে হয়েছে ২৪।

গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিকভাবে এই সূচক একযোগে প্রকাশ করা হয়। একই দিনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বাংলাদেশের দুর্নীতির সূচক প্রকাশ করে। এবার টিআই সূচকের প্রতিপাদ্য ছিল ‘দুর্নীতি ও অবিচার’। এবারের সূচকে ৯০ স্কোর পেয়ে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকার শীর্ষে আছে ডেনমার্ক। একই সঙ্গে ১১ স্কোর পেয়ে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হয়েছে সোমালিয়া। রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস ভবনের টিআইবি কার্যালয়ে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের দুর্নীতির ধারণা সূচক তুলে ধরেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। টিআইবি বলেছে, দুর্নীতির ধারণা সূচকে স্কোর ও অবস্থানের এই অবনমন প্রমাণ করে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীল নীতি ঘোষণাসহ সরকারের বিভিন্ন অঙ্গীকার-সূচকের তথ্যের সময়কালে বাস্তবিক অর্থে কার্যকর প্রয়োগ হয়নি; বরং আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতায় বাংলাদেশের অবস্থানের আরও অবনতি হয়েছে।

সুদ দিয়ে সোনালী ব্যাংক থেকে ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে ইসলামী ব্যাংক

জানুয়ারি ৩১, ২০২৪, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

নগদ অর্থ সংকটে থাকা ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং নীতিমালা লঙ্ঘন করে সুদের বিনিময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক থেকে এক হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।

নীতিমালা অনুযায়ী, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো সুদ গ্রহণ বা পরিশোধ করতে পারে না।

গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর সোনালী ব্যাংকের ৮৫১তম পর্ষদ সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংক ১০ দশমিক পাঁচ শতাংশ সুদের হারে ১৪ দিনের জন্য এই ঋণ নেয়।

সভায় ‘কল অ্যান্ড শর্ট নোটিশ ডিপোজিট’ নামে পরিচিত তারল্য সহায়তার আওতায় এই অর্থ দেওয়ার বিষয়টি অনুমোদন পায় এবং পরের দিনই এই অর্থ ইসলামী ব্যাংককে দেওয়া হয়।

এই প্রক্রিয়া সংশ্লিষ্ট সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, তারল্য সহায়তার মেয়াদ শেষ হলেও ইসলামী ব্যাংক এখনো পুরো টাকা পরিশোধ করতে পারেনি।

এই অর্থের মধ্যে সোনালী ব্যাংক তাদের অভ্যন্তরীণ ঋণসীমার বাইরে গিয়ে ৬২১ কোটি টাকা সরবরাহ করেছে এবং তারা বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংককেও জানিয়েছে।

বেনাপোল স্থলবন্দরে ‘ডিজিটাল’ কারসাজি করে রাজস্ব ফাঁকি

৩১ জানুয়ারি ২০২৪, প্রথম আলো

যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরের ওজন স্কেলে (ওজন পরিমাপক যন্ত্র) কারসাজি করে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে একটি চক্র। ওজন স্কেলের জন্য ব্যবহৃত সফটওয়্যারের আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই আমদানিকারকদের ভারত থেকে পণ্য আনার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।

এ কাজে বন্দরের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। জালিয়াতিতে জড়িত সন্দেহে ইতিমধ্যে ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করেছে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে এ ঘটনায় ছয়টি তদন্ত কমিটি করা হলেও ছয় মাসেও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্র জানিয়েছে, দেশে স্থলবন্দর আছে ২৪টি। এর মধ্যে বেনাপোল দিয়ে সবচেয়ে বেশি ৬০-৭০ শতাংশ পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়। দেশের বৃহত্তম এই স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিদিন ভারত থেকে ৭-৮ হাজার মেট্রিক টন পণ্য আমদানি করা হয়। গত অর্থবছরে বন্দর থেকে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় করেছে সরকার। বন্দর ও কাস্টমস-সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, শুধু গত অর্থবছরেই ওজন কারসাজির মাধ্যমে প্রতারকেরা প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে।

রাবির ছাদ ধসেও জড়িত বালিশ-কাণ্ডের ‘মজিদ সন্স লিমিটেড’

৩০ জানুয়ারি ২০২৪, ঢাকা পোস্ট

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান হলের নির্মাণের টেন্ডার পায় রূপপুর বালিশ-কাণ্ডের আলোচিত ‘মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’।

মঙ্গলবার (৩০ জানুয়ারি) দুপুরে নির্মাণাধীন ১০ তলাবিশিষ্ট শহীদ এএইচএম কামরুজ্জামান হলের একাংশের ছাদ ধসের ঘটনা ঘটে। এতে সাতজন নির্মাণশ্রমিক আহত হয়েছেন।

আহতদের মধ্যে পাঁচজন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তারা হলেন- গাইবান্ধার আজাদুল (৩৫), চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিফাত (২২), রাজশাহী গোদাগাড়ীর সিহাব (২৫), রাসেল এবং সুরেজ। আর দুইজন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রাবির প্রকল্পের আওতায় ১০ তলাবিশিষ্ট শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান আবাসিক হল এবং ২০ তলাবিশিষ্ট একটি একাডেমিক ভবন নির্মাণের কাজ পায় রূপপুরের বালিশ-কাণ্ডে আলোচিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’। কামারুজ্জামান হলে ৩০ ফুট উচ্চতার একটি অডিটোরিয়াম নির্মাণের কাজ চলছে। আর গতকাল থেকে অডিটোরিয়ামের ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলছে। আজ ছাদ ধসের এই ঘটনা ঘটে।

১৩ লাখের বেশি কর্মী গেলেও প্রবাসী আয় বাড়েনি: রামরু

৩১ জানুয়ারি ২০২৪, প্রথম আলো

বাংলাদেশ থেকে গত বছর বিভিন্ন দেশে গেছেন ১৩ লাখের বেশি কর্মী। দেশের ইতিহাসে এক বছরে এটি সর্বোচ্চ। আগের বছরের তুলনায় বিদেশে কর্মসংস্থান বেড়েছে ১৩ শতাংশ। তবে প্রবাসী আয় বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

তবে দেশের মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিলে প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়নি। আবার পুরুষ কর্মী বাড়লেও আগের বছরের তুলনায় নারী কর্মী কমেছে ২৭ শতাংশ।

জাতীয় প্রেসক্লাবে আজ বুধবার আয়োজিত ‘আন্তর্জাতিক শ্রম অভিবাসনের গতি ও প্রকৃতি ২০২৩: অর্জন এবং চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু) এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। প্রতিবছরই অভিবাসন খাত বিশ্লেষণ করে এমন প্রতিবেদন প্রকাশ করে তারা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১২ কর্মকর্তার দায় চিহ্নিত

০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, প্রথম আলো

আট বছর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার সরিয়ে নিয়েছিল হ্যাকাররা। ওই ঘটনায় করা মামলার তদন্ত এখন পর্যন্ত শেষ হয়নি। যদিও সিআইডি বলছে, তাদের তদন্ত শেষ পর্যায়ে।

তদন্ত–সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সুইফট সিস্টেমের নিরাপত্তাব্যবস্থা সংরক্ষণে অবহেলা ও গাফিলতির কারণে হ্যাকাররা দেশের রিজার্ভের টাকা সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দায়িত্বে অবহেলা ও গাফিলতির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নরসহ ১২ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায় পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি।

বাকি কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন তৎকালীন একজন নির্বাহী পরিচালক (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত), একজন মহাব্যবস্থাপক (বর্তমানে ডেপুটি গভর্নর), চারজন যুগ্ম পরিচালক (তাঁদের দুজন বর্তমানে উপমহাব্যবস্থাপক, একজন যুগ্ম পরিচালক ও একজন অবসরে), তিনজন উপমহাব্যবস্থাপক (দুজন বর্তমানে জিএম) ও দুজন উপপরিচালক।

তৎকালীন গভর্নর ও নির্বাহী পরিচালকের বাইরে বাকি কর্মকর্তারা তখন ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং, আইটি অপারেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগ, পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগ এবং ব্যাক অফিস অব দ্য ডিলিংস রুমের কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁদের কেউ সার্ভার কক্ষ খোলা রেখে, কেউ ইন্টারনেট সংযোগ দিয়ে, কেউবা অনুপস্থিত থেকে প্রকারান্তরে হ্যাকারদের সুযোগ করে দিয়েছেন।

তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমানের দায় সম্পর্কে তদন্তে যে বিষয়টি উঠে এসেছে, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন রিজার্ভ সুইফট (সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টার ব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন) সার্ভার একটি সংবেদনশীল ব্যবস্থা। তা সত্ত্বেও গভর্নর সুইফটের মাধ্যমে আরটিজিএসের (রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট) সংযোগ করার অনুমোদন দেন এবং বাস্তবায়ন নিশ্চিত করেন। এটাকে অপরাধমূলক উদ্দেশ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তদন্তকারীরা। আরটিজিএস একটি বিশেষায়িত তহবিল স্থানান্তর ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে তাৎক্ষণিক তহবিল স্থানান্তর করা যায়।

রাজীবের হাতে আলাদীনের চেরাগ

৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, মানবজমিন

পাঁচ বছর আগে সম্পদ বলতে ছিল পিতার রেখে যাওয়া ১০ শতাংশ জমি। একটি টিনের ঘর। এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। প্রতিষ্ঠা করেছেন রাজকীয় রাজ প্যালেস, রাজ রিয়েল এস্টেট এন্ড কনস্ট্রাকশন, রাজ এগ্রো, রাজ লেদার, রাজ বডি ফিটনেস সেন্টার, আইয়ান ফ্রেশ ডেইরি ফার্ম, রাজ মঞ্জুরী ভিলা, রিভার ভিউ রেস্টুরেন্ট এন্ড পার্টি সেন্টার, ইকোসিটি হাউজিং প্রকল্প, রূপকথা অ্যাপারেলস ও ওয়াসিল উদ্দিন ফাউন্ডেশন নামে প্রায় ডজন খানেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। গড়েছেন বিশেষায়িত শিল্প গ্রুপ ‘রাজ গ্রুপ’। বর্তমানে এই গ্রুপের আনুমানিক সম্পদের পরিমাণ অন্তত ২ হাজার কোটি টাকা। তিনি সাভার উপজেলা চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম রাজীব। উপজেলা চেয়ারম্যানের চেয়ারই তার হাতে তুলে দিয়েছে আলাদিনের চেরাগ। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম রাজনীতির শুরুতে হত্যা, চাঁদাবাজি, অপহরণ, মাদক, অস্ত্র ও হত্যাচেষ্টার ডজন খানেক মামলায় জড়িয়েও কীভাবে পার পেয়ে গেলেন? এই প্রশ্ন জনমনে। সাভার থানার শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায়ও ছিল রাজীবের নাম।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিপুল পরিমাণ টাকা আর নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করেই দ্রুতগতিতে এগিয়ে গেছেন রাজীব। এ পথে কেউ বাধা হলেই তার উপর অস্ত্র নিয়ে হামলে পড়েছেন। চাঁদাবাজি, দখলবাজি, পদ বাণিজ্য, সস্ত্রাসবাদ, টেন্ডারবাজি, গার্মেন্ট দখল, ঝুট ব্যবসার মাধ্যমে ২০১৭ সালের পর থেকে সাভার উপজেলার সর্বত্র একক আধিপত্য বিস্তার করেন রাজীব। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, হকার্স লীগ, শ্রমিক লীগ ও যুব মহিলা লীগ নিজের কব্জায় নিয়েছেন। সবখানেই তার খবরদারী। যার দাপটে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারাও তটস্থ। অল্প সময়েই ভাগ্য বদলে গেছে রাজীবের। সরকারি অফিস, ফুটপাথ, গার্মেন্টস, হাটবাজার, হাসপাতাল, ক্লিনিক, বাসস্ট্যান্ড, সিএনজি স্ট্যান্ড, মসজিদ-মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ সবই রাজীবের অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণে। কেউ চাঁদা তোলেন, কেউ আবার বালু, কুলিবিট ও ডিশ ব্যবসা করেন। পরিবহন, নদী ও আবাসন ব্যবসাও তাদের নিয়ন্ত্রণে। ফলে স্রোতের বেগে বেড়েছে সম্পদ। রাজীবের অনুকম্পায় সম্পদে ফুলে ফেঁপে উঠেছে তার সহযোগীরাও। কেউ কেউ দখল করেছেন একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট ও জমি। গত কয়েকদিনে সাভারের হেমায়েতপুর সরজমিন ঘুরে মঞ্জুরুল আলম রাজীবের জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের নানা তথ্য পাওয়া গেছে।

শুরুটা ছিল হলমার্ক থেকে:

হলমার্ক দিয়েই প্রথমে রাজীবের সম্পদের যোগান শুরু হয়। অভিযোগ আছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া হলমার্কের মেশিনারীজ বিক্রি করে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার মালিক হন মঞ্জুরুল আলম রাজীব ও তার ভাই ফখরুল আলম সমর। অনুসন্ধানে জানা গেছে, হেয়ামেতপুর তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের নন্দখোলা এলাকায় হলমার্ক গ্রুপের ৪৩টি কারখানার মেশিন, যন্ত্রাংশ, জেনারেটর, সুতা, কাপড়, হাই ভলিউম লো স্পিড ফ্যান, প্রিন্টিং, ফিনিশিং, ওয়াশিং টেস্টিং, এমব্রয়ডারি, কুলিং যন্ত্র, বয়লার, কারখানার  ছাউনি, দরজা, জানালা এমনকি মূল ফটক চুরি হয়। বিদেশ থেকে আনা এক হাজার ২০০ টন সুতা ও ফেব্রিক্সও চুরি হয়। নির্মাণকাজের ৩ কোটি ইট, ১৫০ টন রড ও ১৩০০ বস্তা সিমেন্ট কিনেছিল হলমার্ক। ২০১৪ সালে তাও নাই হয়ে যায়। হলমার্কের নিবন্ধনবিহীন ১০টির বেশি দামি গাড়ি ও কাভার্ড ভ্যানও হারিয়ে যায়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, হলমার্ক গ্রুপের এমডি জেসমিন গ্রেপ্তারের পর তার ভাই শামীম আল মামুন এই কারখানাগুলোর নিয়ন্ত্রণে ছিলেন। পরে শামীমকে হটিয়ে কারখানার নিয়ন্ত্রণ নেন সাভার উপজেলার চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম রাজীব, ফখরুল আলম সমর ও তাদের অনুসারীরা। প্রায় প্রতি রাতেই ট্রাক ভরে এসব মালামাল সরিয়ে নেন রাজীব। এ কাজে ব্যবহার করা হয় তেঁতুলঝোড়া ৪নং ওয়ার্ডের মেম্বার আইয়ূব আলী, ছোট ভাই কাইয়ূম, ২নং ওয়ার্ডের মেম্বার নাজমুল হোসেন, যুবলীগ নেতা বেলাল আহমেদ, মামুন হোসেন, রিপন, সিরাজ দেওয়ান, অন্তর রহমান, ফয়সাল আহমেদ, নগরচরের সাইফুল আলম, আলী, রবিন, রাজীবের বোন জামাই পরিচয় দেয়া রিপনকে। মালামাল লুটের পর বর্তমানে কারখানাগুলোর ভবন ভেঙে জমি দখল করে প্লট আকারে বিক্রির চেষ্টা করছেন। কিছু জমি জনতা হাউজিং নামে একটি প্রতিষ্ঠান দখলে নিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হলমার্কের পুরোনো এক নিরাপত্তাকর্মী বলেন, এখানে অনেক বড় একটি স্পিনিং মিল ছিল। ২০১১ সালে হলমার্ক স্পিনিং, আনোয়ার স্পিনিং মিলের জন্য জার্মানি ও জাপান থেকে অত্যাধুনিক ১৩০০ সুইং এন্ড নিটিং মেশিন আমদানি করা হয়। কিন্তু এমডি স্যার গ্রেপ্তার হওয়ার পর ৫ ধাপে রাতের আঁধারে এসব সরিয়ে নেয়া হয়। সরিয়ে নেয়া এলাকার অনেকেই দেখেছে। স্থানীয়রা জানান, ২০১৮ সালে কারখানার মেশিনপত্র, জেনারেটর, টিনের শেডও খুলে নিয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হলমার্কের বেশির ভাগ কারখানায় যন্ত্রপাতি নেই। খামারের দুই হাজার ৯০০ গরুর মাত্র ৯টি গরু আছে। বিক্রি হয়ে গেছে গোয়ালের অর্ধেক শেডও। আর হলমার্কের মেশিন, জেনারেটর ও যন্ত্রাংশ লুটে নিয়ে সাভার ও গাজিপুরের কয়েকটি কারখানায় বিক্রি করা হয়।

দখলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সম্পদ: হলমার্ক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের দক্ষিণে সীমানা প্রচীর ঘেঁষা হলমার্কের প্রায় ৫০ শতাংশ জমি দখলে নিয়ে শেড নির্মাণ করে আইয়ান ফ্রেশ ডেইরি নামে একটি গরুর ফার্ম করেছে রাজীব। ফার্মে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়াসহ প্রায় ৪০০ গবাদিপশু আছে। অভিযোগ রয়েছে, খামারের জমিটি ২০২০ সালে দখল করেন রাজীব। হেমায়েতপুর শহীদ রফিক সেতুর পাড়ে হলমার্কের একটি নির্মাণাধীন কারখানা দখল করে রিভার ভিউ রেস্টুরেন্ট এন্ড পার্টি সেন্টার করা হয়েছে। পাশের ধলেশ্বরী নদীর পাড় দখল করে রেস্টুরেন্টের টং তৈরি করা হয়। দখলের পর রাজীব এই স্থাপনা কাজল, শাওন, রফিকের কাছে ৩০ লাখ টাকা অগ্রিম নিয়ে মাসে ৪০ হাজার টাকায় ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। এ ছাড়া সাভার থানা স্ট্যান্ডে ল্যাব জোন হাসপাতালের পেছনে বারী রিহাব সেন্টারের ৫ তলা ভবন দখল করে আবাসিক ভাড়া দিয়ে রেখেছেন রাজীবের শ্যালক সাভার সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম রুবেল। এটা নিয়ন্ত্রণ করে সাভার সদর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি সোহেল রানা। এ ছাড়া হেমায়েতপুর নগরচর পুষ্প ব্রিকসের পাশে নগরচর মৌজা আরএস. ১৬৫নং দাগে ১৫৭ শতাংশ জমি দখল করে একেএইচ ডায়িং এন্ড নিটিং ফ্যাক্টরির কাছে ১৭ কোটি টাকায় বিক্রি করে দেন রাজীব ও তার ভাই ফখরুল আলম সমর। জমির মালিক নিলুফার হক জমি উদ্ধারে আদালতে মামলা করেন। অভিযোগ আছে, ৫ শতাংশ খাস জমি দখলের সময় ব্যক্তি মালিকানাধীন ১৫২ শতাংশ জমি বাউন্ডারি দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। সাভার আড়াপাড়া মৌজায় এসএ. ২নং দাগে রাজা হরিশচন্দ্রের বাড়ির পুকুর পাড় ঘেঁষা ৪০ শতাংশ অর্পিত সম্পত্তি দখল করে আলিশান ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করছেন মঞ্জুরুল আলম রাজীব। ৫তলা ভবনের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে জমিটি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান। মামলা নং-২৩৫২/২০১২। আমিনবাজার ইউনিয়নের বরদেশী গ্রামের শেষ মাথা থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার নদী ও ফসলি জমি দখল করে রাজউকের অনুমোদনহীন ইকোসিটি হাউজিং প্রকল্প নামে আবাসন প্রকল্পের সাইনবোর্ড লাগিয়ে শত শত বিঘা জমি দখলে নেয়া হয়েছে। রাজউক প্রজ্ঞাপন দিয়ে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে বললেও তা মানেনি। মঞ্জুরুল আলম রাজীব এই দখল কাজে আমিনবাজার ইউপি চেয়ারম্যান রকিব আহমেদকে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

খালের মাটি গেছে ইটভাটায়, রাজীবের পকেটে ১৫০ কোটি: ২০২১ সালে ভাকুর্তা ইউনিয়নে বলিয়ারপুর থেকে মুশুরীখোল ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার তেঁতুলঝোড়া ভাকুর্তা ও যাদুরচর খাল খনন করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ছিল সালেহ এন্ড ব্রাদার্স। প্রায় ৩৫০ ফিট চওড়া ও ২০ ফিট গভীর খালের পাড়ে কোনো মাটি নেই। স্থানীয়রা বলছে, ভেকু দিয়ে খননের পরে রাতের আঁধারে ডাম্প ট্রাকে করে লাখ লাখ ঘনফুট মাটি অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়। সূত্র বলছে, খালের মাটি তুরাগ ব্রিকস, সনি ব্রিকসসহ আশপাশের ইটভাটা ও হাউজিং প্রকল্পের কাছে বিক্রি করা হয়। এতে দেড় বছরে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার মাটি বিক্রি করা হয়। সাভার উপজেলা চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম রাজীবের সহায়তায় এই কাজ নিয়ন্ত্রণ করেন ভাকুর্তা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান লিয়াকত হোসেন ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী আব্দুল বাতেন। মাটি বিক্রির টাকা দুই হাত ঘুরে রাজীবের কাছে চলে যায়।

অবলোপন বাড়িয়ে খেলাপি ঋণ কমানোর চেষ্টা

০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, সমকাল

খেলাপি ঋণ আদায়ে অবলোপন নীতিমালা আরও শিথিল করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। কোনো ঋণ তিন বছরের পরিবর্তে দুই বছর ‘মন্দ মান’ হিসেবে খেলাপি হলেই তা অবলোপন করে ব্যাংকের ব্যালান্সশিট থেকে বাদ দেওয়া যাবে। এ উপায়ে ৪৩ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ কমানো হবে। পাশাপাশি আলাদা কোম্পানির কাছে অবলোপন করা ঋণ বিক্রি, এমডির কর্ম মূল্যায়নে ঋণ আদায়ের লক্ষ্য অর্জন, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোরতা, ঋণ পরিশোধে আর নমনীয়তা না দেখানোসহ একটি রোডম্যাপ বা পথনকশা অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ।

গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমানো এবং করপোরেট সুশাসন জোরদার বিষয়ে আলোচনায় সুনির্দিষ্ট ১৭টি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সভাকক্ষে গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় অন্য পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর অনুকূলে সরকার ইস্যু করা বন্ড জামানত রেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিনা সুদে ধার, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের অভিবাসন পুনর্বাসনে বঙ্গবন্ধু অভিবাসী বৃহৎ পরিবার ঋণের জন্য দ্বিতীয় পর্যায়ে ৪ শতাংশ সুদে ১ হাজার কোটি টাকার প্রাক-অর্থায়ন বিষয়ে আলোচনা হয়।

এস আলমের বিষয়ে স্বতঃপ্রণোদিত রুল খারিজ, চাইলে দুদক–বিএফআইইউ অনুসন্ধান করতে পারবে

০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, প্রথম আলো

এস আলম গ্রুপের মালিক মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম) ও তাঁর স্ত্রী ফারজানা পারভীনের অনুমতি ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগ বা অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ বিষয়ে অনুসন্ধানে নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্নে হাইকোর্টের দেওয়া স্বতঃপ্রণোদিত (সুয়োমটো) রুল খারিজ করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ।

প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের আপিল বিভাগ আজ সোমবার এ আদেশ দেন।

সংক্ষিপ্ত আদেশে বলা হয়, হাইকোর্ট বিভাগের ইস্যু করা সুয়োমটো রুল ডিসচার্জড (খারিজ) করা হলো। যা–ই হোক এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট(বিএফআইইউ) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বাধা হবে না।

হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে এস আলম ও তাঁর স্ত্রী ফারজানা পারভীনের করা আবেদন (লিভ টু আপিল) নিষ্পত্তি করে এ আদেশ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, বিএফআইইউ ও দুদক চাইলে এখন ওই অভিযোগ অনুসন্ধান করতে পারে।

গত বছরের ৪ আগস্ট ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারে “এস আলম’স আলাদিন’স ল্যাম্প” (এস আলমের আলাদিনের চেরাগ) শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। প্রতিবেদনটি আদালতের নজরে আনেন আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক। এরপর গত ৬ আগস্ট হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত রুলসহ আদেশ দেন।

অনুমতি ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগ বা অর্থ স্থানান্তর নিয়ে এস আলম ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অনুসন্ধান করে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। দুদক, বিএফআইইউ ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রতি এ নির্দেশ দেওয়া হয়।

হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে এস আলম ও তাঁর স্ত্রী গত ২১ আগস্ট লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করেন, যা গত ২৩ আগস্ট আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে শুনানির জন্য ওঠে। সেদিন শুনানি নিয়ে চেম্বার আদালত বিষয়বস্তুর ওপর সব পক্ষকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে আদেশ দেন। একই সঙ্গে লিভ টু আপিলটি আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে ৮ জানুয়ারি শুনানির জন্য নির্ধারণ করেন। এর ধারাবাহিকতায় আজ বিষয়টি ওঠে।

আদালতে আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রোকন উদ্দিন মাহমুদ, আজমালুল হোসেন কেসি ও আহসানুল করিম। দুদকের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। পত্রিকার খবর নজরে আনা আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক শুনানিতে অংশ নেন।

পরে আবেদনকারীদের আইনজীবী আহসানুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সুয়োমটো রুল খারিজ হওয়ায় হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ থাকছে না। তবে দুদক ও বিএফআইইউ যদি মনে করে তাহলে আইন অনুসারে অনুসন্ধান কার্যক্রম চালাতে বাধা নেই।’

শুনানির বিষয়ে আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, ‘হাইকোর্টের রুলে এস আলম ও তাঁর স্ত্রীকে বিচার হওয়ার আগেই অর্থ আত্মসাৎকারী ও পাচারকারী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে এস আলম ও তাঁর স্ত্রীর বক্তব্যও শোনা হয়নি। তাই রুল ভ্রান্ত ধারণাপ্রসূত ও খারিজযোগ্য, শুনানিতে বলেছি।’

পরে আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাইকোর্টের আদেশে এস আলম ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অনুসন্ধান করে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ ছিল। আজকের আদেশের ফলে হাইকোর্টের এই নির্দেশ থাকছে না। তবে দুদক ও বিএফআইইউ নিজে চাইলে নিজ উদ্যোগে অনুসন্ধান করতে পারবে।’

ডলার কারবার ব্যাংক-মানি এক্সচেঞ্জের যোগসাজশে

০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, সমকাল

দেশে ডলার সংকটের নেপথ্যে রয়েছে কিছু ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের একটি সংঘবদ্ধ চক্র। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে বিদেশ থেকে আসা যাত্রীরা প্রতিদিন যে শতকোটি টাকার বেশি মূল্যের ডলার ও বিদেশি মুদ্রা আনেন, তা জালিয়াতির মাধ্যমে কুক্ষিগত করছে চক্রটি। জাল ভাউচারে যাত্রীদের কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে পরে তা খোলাবাজারে (কার্বমার্কেট) ছাড়া হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার এক ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান দুদক সচিব মো. মাহবুব হোসেন।

দুদক সচিব বলেন, ‘গত সোমবার দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক সৈয়দ নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি বিশেষ এনফোর্সমেন্ট টিম হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে অভিযান চালিয়ে সংঘবদ্ধ চক্রটির বিদেশি মুদ্রা গ্রাস করার প্রমাণ পেয়েছে।’

এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২৫ হাজার কোটি টাকা

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দেশের বর্তমান অর্থনীতির সবচেয়ে বড় মাথা ব্যথার কারণ। নানা উদ্যেগের পরও এটা নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছেনা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা।

সোমাবার (১২ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ১৭ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে এক লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। যা ২০২২ সালের ডিসেম্বরের চেয়ে ২৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা বেশি। ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ ২০ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা।

এই খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের বিতরণ করা ঋণের ৯ শতাংশ। যদিও আন্তর্জাতিক মানদন্ডে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩ শতাংশ পর্যন্ত সহনীয় ধরা হয়।

ঠাকুরগাঁওয়ে নদী ভরাট করে রিসোর্ট নির্মাণের অভিযোগ

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪,  ইত্তেফাক

ঠাকুরগাঁওয়ে টাঙ্গন নদী ভরাট করে রিসোর্ট নির্মাণের কাজ করা হচ্ছে। সদর উপজেলার মোহম্মদপুর ইউনিয়নে ফেরসাডাঙ্গী ঘাটে ব্রিজের নিচের অনেকটা অংশ ভরাট করে ‘শ্বেতপদ্ম রিসোর্ট লিমিটেড’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রশাসন থেকে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিলেও চলমান রয়েছে নির্মাণ কাজ। জেলা প্রশাসক বরাবর কৃষকরা নির্মাণ কাজ বন্ধ ও নদী ভরাট না করার জন্য লিখিত অভিযোগ করেছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, ব্রিজের নিচের নদীর অংশ ভরাট করা হচ্ছে। নদীর গতিপথ বাধাগ্রস্ত করে এবং নদীকে সংকীর্ণ করে বাঁধ নির্মাণের জন্য ধার তৈরি করা হচ্ছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে পানির চাপ আরও বাড়লে আশেপাশের কৃষি জমিগুলো নদীগর্ভে চলে যাবে বলে অভিযোগ করছেন কৃষকরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সৈয়দ মুহাম্মদ আলী হোসেন নামে এক ব্যক্তি এ রিসোর্ট নির্মাণ করছেন। তিনি শ্বেতপদ্ম রিসোর্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান। নদীর পাশে তার নিজস্ব জমিও রয়েছে। প্রকল্প শুরুর আগে নভেম্বর ২০২৩ সালে নদী পরিমাপের জন্য জেলা প্রশাসক বরাবর একটি আবেদন করেছিলেন তিনি। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক মাহবুবুর রহমান নদীর সীমানা নির্ধারণ ও সরকারি স্বার্থ রক্ষায় একটি কমিটি গঠন করে দেন এবং প্রতিবেদন দাখিল করতে বলেন। কিন্তু এ কমিটি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগেই রিসোর্ট নির্মাণের কাজ শুরু করে দেন।

৯০৭ কোটি টাকার প্রকল্প নিতে ‘কারসাজি’

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, প্রথম আলো

জনবলের অভাবে ভবঘুরেদের জন্য সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে যথাযথ সেবা দিতে না পারলেও ভবন নির্মাণে ব্যাপক আগ্রহ দেখাচ্ছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। ছয়টি আশ্রয়কেন্দ্রের নতুন ভবন নির্মাণে ৯০৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করাতে ‘তদবির’ করছে তারা।

সমাজসেবা এই প্রকল্প নিতে ‘কারসাজির’ আশ্রয়ও নিয়েছে। ৯০৭ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজকে তারা ৮১টি ভাগে ভাগ করেছে, যাতে এই প্রকল্পের কেনাকাটায় সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদন না লাগে।

সাধারণত সরকারি ভবন নির্মাণের মতো পূর্তকাজ করে গণপূর্ত অধিদপ্তর। তাদের সে বিষয়ে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু সমাজসেবা ভবন নির্মাণ করাতে চাইছে তৃতীয় পক্ষ, অর্থাৎ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে। তারা কেন গণপূর্তকে বাদ দিয়ে ভবন নির্মাণের প্রকল্প নিচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সমাজসেবার প্রকল্পটি এখন পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। কমিশন সূত্র বলছে, তদবির থাকলেও কমিশনের কোনো কোনো কর্মকর্তা এভাবে প্রকল্পটির অনুমোদন দিতে অনীহা দেখাচ্ছেন।

সরকারি কেনাকাটার প্রস্তাব মূল্যায়নকারী সংস্থা সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ) সাবেক মহাপরিচালক ফজলুল করীম প্রথম আলোকে বলেন, একই ধরনের কাজে আলাদা আলাদা প্যাকেজ করার অর্থ এখানে কোনো দুরভিসন্ধি আছে। পছন্দের কাউকে কাজ পাইয়ে দিতে এই কৌশল নেওয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনা থেকে সরে আসা উচিত।

৯০৭ কোটি টাকার প্রকল্প

ভবঘুরে ও ভিক্ষায় নিয়োজিত মানুষদের সরকারি তত্ত্বাবধানে রেখে প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য উপায়ে সমাজে পুনর্বাসিত করার চেষ্টাটি পুরোনো। এ জন্য ১৯৪৩ সালে করা হয় ভবঘুরে আইন। নতুন করে ২০১১ সালে সরকার ভবঘুরে ও নিরাশ্রয় ব্যক্তি (পুনর্বাসন) আইন করে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন গাজীপুরে দুটি এবং নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও রাজধানীর মিরপুরে একটি করে দেশে মোট ছয়টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে চারটি নির্মাণ করা হয় ১৯৭৭ সালে। দুটি আরও আগে, ১৯৬১ সালে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ভবঘুরে, ছিন্নমূল মানুষ ও ভিক্ষুকদের আশ্রয় দেওয়া হয়। তবে ভবনগুলো জরাজীর্ণ।

এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ভবন নির্মাণে ‘বিদ্যমান ছয়টি সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র পুনর্নির্মাণ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে প্রথম পাঠানো হয় গত বছরের জুনে। তার পর থেকে প্রকল্পটি নিয়ে প্রক্রিয়াগত কাজ চলছে।

সমাজসেবার উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) ঘেঁটে দেখা যায়, প্রস্তাবিত প্রকল্পে ছয়টি আশ্রয়কেন্দ্রে কাজের ধরন প্রায় এক হলেও সেসব কাজ ছোট ছোট ৮১টি প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে। কোনোটি ১০ কোটি, কোনোটি ২০ কোটি টাকার প্যাকেজ। সর্বোচ্চ একটি প্যাকেজে ধরা হয়েছে প্রায় ৫৮ কোটি টাকা।

নথিপত্র বলছে, ৭৪টি প্যাকেজ ‘ক্রয় অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে প্রকল্প পরিচালককে রাখা হয়েছে। ছয়টি হোস্টেল ভবন নির্মাণসহ বাকি সাতটি প্যাকেজ অনুমোদনকারী হিসেবে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে রাখা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ’ শীর্ষক নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্মাণ ও পূর্ত কাজে ১০০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে যেকোনো কেনাকাটার প্রস্তাব সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করতে হবে। এই কমিটির সভাপতি অর্থমন্ত্রী। এতে মোট ১৩ জন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী থাকেন। সচিব থাকেন ৯ জন।

সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তারা বলছে, সরকারি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, অনিয়ম রোধ করা, স্বজনপ্রীতি ঠেকানোসহ নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির কাজ। পরিকল্পনা কমিশন সূত্র বলছে, মন্ত্রিসভা কমিটিকে এড়াতেই প্রকল্পটির কেনাকাটার ৮১টি প্যাকেজ করা হয়েছে।

সরকারি ক্রয়বিধির (পিপিআর) ১৭ নম্বর ধারায় বলা আছে, ‘ক্রয়কারী উহার ক্রয় পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় কোনো নির্দিষ্ট ক্রয় পদ্ধতি বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা পরিহারের উদ্দেশে সাধারণত একটি প্রকল্প বা কর্মসূচির কোনো অংশ নিম্নতর মূল্যমানের একাধিক প্যাকেজে বিভক্ত করিবে না।’

অবশ্য ভৌগোলিক অবস্থা বিবেচনায় বাস্তবায়নের সুবিধার জন্য একাধিক প্যাকেজ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে ক্রয়বিধিতে। তবে সরকারি ক্রয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাঁচটি এলাকার ছয়টি আশ্রয়কেন্দ্রের জন্য ৮১টি প্যাকেজ করা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।

নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, গাজীপুরের কাশিমপুরে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রের আসবাব কিনতে প্রায় তিন কোটি টাকা ও পুবাইলের জন্য প্রায় সাড়ে চার কোটি, ময়মনসিংহের জন্য তিন কোটি, নারায়ণগঞ্জের জন্য প্রায় চার কোটি, মিরপুরের জন্য দুই কোটি এবং মানিকগঞ্জের জন্য দুই কোটি টাকা আলাদা করে ব্যয় ধরা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণপূর্ত অধিদপ্তরের একজন নির্বাহী প্রকৌশলী প্রথম আলোকে বলেন, চাইলে আসবাব কেনার কাজ একসঙ্গে করা যেত।

একইভাবে বিছানাপত্র, ক্রীড়াসামগ্রী, যন্ত্রপাতি, বিদ্যুতের উপকেন্দ্র (সাবস্টেশন) নির্মাণ, লিফট, অস্থায়ী ছাউনি নির্মাণ ও একাডেমিক ব্লক স্থাপনে আলাদা করে প্যাকেজ করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পে ছোট ছোট প্যাকেজে কাজ করার কৌশল বিষয়ে জানতে চাইলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু সালেহ্ মোস্তফা কামাল ৫ ফেব্রুয়ারি তাঁর দপ্তরে প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি তিনি খোঁজ নেবেন। এ ধরনের কিছু হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেবেন।

অবশ্য সমাজসেবার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রকল্পটি নেওয়া হয়। পছন্দের ঠিকাদার দিয়ে কাজ করাতেই নির্মাণকাজ গণপূর্ত অধিদপ্তরকে না দিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তর ছোট ছোট ভাগে আগেও প্রকল্প নিয়েছে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণের নামে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিকে (একনেক) এড়িয়ে নেওয়া এসব প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গত বছরের আগস্টে ছয়টি প্রকল্পে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা যায়, প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে টাকা আত্মসাৎসহ নানা অনিয়ম হয়েছে। আর কাজ পেয়েছে সরকারের প্রভাবশালীদের ‘খাতিরের’ ব্যক্তিদের সংস্থা। ওই সব প্রকল্প তখন ‘খাতিরের প্রকল্প’ নামে পরিচিতি পায়।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, আশ্রয়কেন্দ্রে নতুন ভবন করা দরকার। তবে প্রকল্প নিতে হবে স্বচ্ছভাবে।

সেবা নেই আশ্রয়কেন্দ্রে

সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ছয়টি আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে ১ হাজার ৯০০টি আসন রয়েছে। এসব কেন্দ্রে আছেন ৯০৯ নিবাসী। মানে হলো, এখন যত আসন আছে, সেখানেই লোক থাকে না। পাশাপাশি জনবলের সংকট প্রকট।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু সালেহ্ মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, জনবলের সংকটের বিষয়টি তিনি জানেন। সেই কারণে নতুন প্রকল্প নেওয়ার পাশাপাশি জনবল নিয়োগের ওপর জোর দিচ্ছেন তাঁরা। তিনি আরও বলেন, মনে রাখতে হবে রাজস্ব খাতে জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়াটা বেশ দীর্ঘ। ৪৫৮ জনবল নিয়োগের একটি প্রস্তাব অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে বলা আছে, ভবঘুরে ব্যক্তিদের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা প্রদান, ভরণপোষণ, শিক্ষা, বৃত্তিমূলক ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রদান, শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানবিক উৎকর্ষ সাধন, কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে মানসিকতার সংশোধন ও উন্নয়ন; স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, সমাজে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা—এসব তাদের লক্ষ্য।

এসব কাজ কেমন চলছে, তা জানতে ৫ ফেব্রুয়ারি মিরপুর-১ নম্বরে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, একটি ভবনের নিচতলায় চার বছরের একটি শিশুকে আশ্রয়কেন্দ্রের নিবাসী আরেক শিশু (৯) দুপুরের খাবার খাওয়াচ্ছে। যদিও শিশু দুটির মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। একটি শিশু বাক্‌প্রতিবন্ধী। তার পরিচর্যায় কোনো পরিচর্যাকর্মী দেখা গেল না।

জানা গেল, ৩ ফেব্রুয়ারি মা-বাবার সঙ্গে ঘুরতে বের হয়ে চার বছরের শিশুটি রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে হারিয়ে যায়। পুলিশ খোঁজাখুঁজি করে অভিভাবককে না পেয়ে তাকে মিরপুরে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে রাখে। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিশুটিকে আজিমপুরে ছোটমণি নিবাসে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

৫ ফেব্রুয়ারি আশ্রয়কেন্দ্রের তৃতীয় তলায় গিয়ে দেখা গেল, সেখানে বিভিন্ন বয়সী প্রায় ৩০ জন একসঙ্গে খাবার খাচ্ছেন। সেখানে কোনো পরিচর্যাকর্মী নেই। একজনের শরীরে মারধরের চিহ্ন দেখা গেল। তাঁকে চিকিৎসক দেখানো হয়নি। সেখানে ভবঘুরেদের দেখাশোনায় ১০টি প্রহরীর পদ থাকলেও কোনো প্রহরী কর্মরত নেই। একজন চিকিৎসকের পদ থাকলেও সেটি খালি। প্রশিক্ষণ, কাউন্সেলিং—এসব দূরের কথা।

মিরপুরের আশ্রয়কেন্দ্রটিতে আসন আছে ২০০টি। নিবাসী রয়েছেন ৫৬ জন। কেন্দ্রের তথ্যমতে, ওই কেন্দ্রে অনুমোদিত পদ ৩০টি। এখন কর্মরত আছেন ১২ জন। তাই তাঁরা সেবা দিতে পারছেন না।

মিরপুর সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রের উপসহকারী পরিচালক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, চিকিৎসক, পরিচর্যাকারী না থাকায় নিবাসীদের অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়। ১০ জন পরিচর্যাকারী চাওয়া হয়েছে। এখনো পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, শুধু মিরপুর নয়, সব সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রেই বেশির ভাগ পদ শূন্য।

‘ভাগ-বাঁটোয়ারার নকশা’

দেশের কিছু কিছু সরকারি সংস্থার তৈরি করা ভবন নির্মাণের পর ফেলে রাখা হয়েছে। কারণ, সেগুলো জনবল ও অন্যান্য কারণে ব্যবহার হচ্ছে না। যেমন মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের প্রশিক্ষণের জন্য গত ছয় বছরে দেশের ১৪ জেলায় ১৫টি ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি (আইএইচটি) ভবন নির্মাণ করেছে সরকার। কিন্তু প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রশিক্ষক নিয়োগ না দেওয়ায় ভবনগুলো খালি পড়ে আছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভবন করলে কর্মকর্তারা লাভবান হন। পণ্য ও উপকরণ কেনাকাটায় নানা ধরনের কমিশন বাণিজ্য হয়। ঠিকাদারের ব্যবসা হয়। সে কারণে ভবন নির্মাণেই আগ্রহ বেশি। সমাজসেবা ভবন নির্মাণের আগ্রহই শুধু দেখাচ্ছে না, প্রকল্প নিচ্ছে কৌশল করে।

সমাজসেবার নতুন প্রকল্পটির বিষয়ে জানিয়ে মতামত জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, এটা স্পষ্ট যে প্রভাবশালী ব্যক্তি পারস্পরিক যোগসাজশ করে ভাগ-বাঁটোয়ারার নকশা করছে। দুর্নীতিপরায়ণরা নতুন নতুন কৌশল নিচ্ছেন। তিনি বলেন, সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতির কথা বলছে। কর্তৃপক্ষকে সমাজসেবার প্রকল্পটি খতিয়ে দেখতে হবে।

উপাচার্যদের ‘‌আত্মীয় কর্মসংস্থান কেন্দ্র’ হয়ে উঠছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো?

ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৪, বণিক বার্তা

শিক্ষক-কর্মকর্তাসহ মোট ৫৮টি পদের নিয়োগ প্রক্রিয়া গত ২ ডিসেম্বর সম্পন্ন করেছে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এসব পদে নিয়োগপ্রাপ্তদের একজন উপাচার্য অধ্যাপক স্বদেশ চন্দ্র সামন্তের ছেলে শাওন চন্দ্র সামন্ত তনু। তবে এ নিয়োগে যোগ্যতা নিরূপণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক সমিতি। এ বিষয়ে সংগঠনটির পক্ষ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অভিযোগও করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)।

এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও। অভিযোগ রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে এখন পর্যন্ত যারা উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন তাদের সবাই মেয়াদকালে কোনো না কোনো আত্মীয়কে নিয়োগ দিয়েছেন। সর্বশেষ গত ১৮ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সেকশন অফিসার হিসেবে চাকরি পেয়েছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শহীদুর রশীদ ভুঁইয়ার ছোট ছেলে হামিম আল রশীদ।

গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বশেমুরবিপ্রবি) ২০২২ সালে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত পূরণ না করে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে নিয়োগ দেয়া হয় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. ছাদেকুল আরেফিনের মেয়ে অহনা আরেফিনকে। এর কিছুদিন পরই বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগে নিয়োগ পান বশেমুরবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. একিউএম মাহবুবের মেয়ে ফারজানা মাহবুব। এছাড়া বশেমুরবিপ্রবির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দিন তার মেয়াদকালে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নিয়োগের শর্ত শিথিল করে তার ভাতিজা খন্দকার মাহমুদ পারভেজকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।

দেশের উচ্চশিক্ষার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিতে দেশে বিগত কয়েক দশকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়িয়েছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরেই এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতিসহ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। শিক্ষাবিদদের অভিযোগ, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন উপাচার্যদের আত্মীয়দের ‘‌কর্মসংস্থান কেন্দ্র’ হয়ে উঠেছে। নতুন নিয়োগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে আত্মীয়-অনুসারীসহ কাছের মানুষদের নিয়োগ দিচ্ছেন উপাচার্যরা। কম-বেশি প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই উপাচার্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় এমন অভিযোগ উঠছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক-কর্মকর্তারা বলছেন, আত্মীয়স্বজনসহ নিজস্ব লোক নিয়োগদানের মাধ্যমে উপাচার্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও প্রশাসনে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছেন। আবার কারো কারো উপাচার্য হিসেবে নিযুক্তি বেকার আত্মীয়ের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রশাসনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ার পাশাপাশি একাডেমিক কার্যক্রমে ব্যাঘাতও ঘটছে।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ মোট ৩৯ জনের নিয়োগ হওয়ার কথা ছিল। তবে গত ২ ডিসেম্বর রিজেন্ট বোর্ডে সর্বমোট ৫৮ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়। এদের মধ্যে সেকশন অফিসার পদে তিনজনের পরিবর্তে ছয়জন, ল্যাব অ্যাটেন্ডেন্ট পদে ছয়জনের পরিবর্তে নয়জন এবং অফিস সহায়ক পদে পাঁচজনের পরিবর্তে ১১ জন নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এছাড়া আইকিউএসি বিভাগের হিসাবরক্ষক পদের অনুমোদন না থাকলেও একজনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকশন অফিসার হিসেবে গত মাসের মাঝামাঝি নিয়োগ পেয়েছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শহীদুর রশীদ ভুঁইয়ার ছোট ছেলে হামিম আল রশীদ। এর আগেও তিনি বিভাগীয় শিক্ষক থাকা অবস্থায় তার বড় ছেলে আসাদুল্লাহ হিল কাফি এবং উপ-উপাচার্য থাকা অবস্থায় তার এক ভাগনি নিয়োগ পেয়েছেন।

অভিযোগ আছে, বিশ্ববিদ্যালয়টির বেশ কয়েকজন সাবেক উপাচার্যও তাদের মেয়াদকালে কোনো না কোনো আত্মীয়কে সেখানে নিয়োগ দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির একাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ নিয়োগেও প্রার্থীদের মধ্যে উপাচার্যের ছেলের তুলনায় যোগ্য প্রার্থী ছিল। আর উপাচার্যের ছেলের নিয়োগের ক্ষেত্রে ভেরিফিকিশনের নিয়ম মানা হয়নি। ১৯ ডিসেম্বরেই তারা কাজে যোগদান করেন।

আবার দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে একে অন্যের সন্তানকে শর্ত ভঙ্গ করে নিয়োগ দেয়ার অভিযোগও আছে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মো. ছাদেকুল আরেফিনের মেয়ে অহনা আরেফিনকে নিয়োগের শর্ত ভঙ্গ করে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. একিউএম মাহবুবের বিরুদ্ধে।

সে সময় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে যোগ্যতা হিসেবে মাস্টার্স ডিগ্রির কথা উল্লেখ করা ছিল। এতে বলা হয়েছিল মাস্টার্স ডিগ্রিধারী প্রার্থী না থাকলে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের বিবেচনা করা হবে। ওই বিভাগের প্রার্থীদের তালিকা অনুযায়ী যারা আবেদন করেছিলেন তাদের মধ্যে একাধিক মাস্টার্স ডিগ্রিধারী প্রার্থী ছিলেন। যদিও মাস্টার্স ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ পান অহনা আরেফিন।

তার নিয়োগের কয়েক মাস পরই বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান ড. একিউএম মাহবুবের মেয়ে ফারজানা মাহবুব। অভিযোগ রয়েছে, সেখানেও ফারজানা মাহবুবের চেয়ে ভালো ফলাফলধারী থাকলেও বশেমুরবিপ্রবি উপাচার্যের মেয়ে হিসেবে তিনি বাড়তি সুযোগ পেয়েছেন।

বশেমুরবিপ্রবিতে এর আগেও শর্ত শিথিল করে উপাচার্যের আত্মীয়দের নিয়োগ দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন তৎকালীন উপাচার্য খোন্দকার নাসিরউদ্দিনের ভাইপো খন্দকার মাহমুদ পারভেজ। তৎকালীন নিয়মানুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার জন্য স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণী বাধ্যতামূলক থাকলেও মাহমুদ পারভেজের দুটোতেই ছিল দ্বিতীয় শ্রেণী। নিয়োগসহ নানাবিধ অনিয়মের অভিযোগে পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের একটি তদন্ত কমিটি খোন্দকার নাসিরউদ্দিনকে অপসারণের সুপারিশ করে।

এমন দুর্যোগ কখনো দেখিনি, প্রতিষ্ঠান জবরদখল করে নিচ্ছে, কার কাছে যাব: ড. ইউনূস

ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৪, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

গ্রামীণ ব্যাংকের বিরুদ্ধে গ্রামীণ টেলিকম ভবনে থাকা আটটি প্রতিষ্ঠান জবরদখল করে নেওয়ার অভিযোগ তুলে নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘আমরা বহু রকমের দুর্যোগের ভেতর দিয়ে যাই। এরকম দুর্যোগ আর দেখি নাই কোনোদিন যে, হঠাৎ করে বাইরের থেকে কিছু লোক এসে বলল তোমরা সরে যাও।’

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে গ্রামীণ টেলিকম ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন ড. ইউনূস। এই ভবনে ড. ইউনূসের গড়া মোট ১৬টি প্রতিষ্ঠান আছে, যার প্রতিটির চেয়ারম্যান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে ড. ইউনূস বলেন, ‘আমরা একটা ভয়ংকর অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছি। আমরা এই সুন্দর বিল্ডিংটা বানিয়েছিলাম অতি সম্প্রতি। আমরা যখন গ্রামীণ ব্যাংকে ছিলাম, তখন আমাদের অফিস ওখানে ছিল। যখন আমাদের যাওয়ার পালা আসল তখন আমরা ভাবলাম আমরা সবাই মিলে একটা বিল্ডিং করি যেখানে আমরা শান্তিতে কাজকর্ম করতে পারব। এটাই সেই জিনিস; আমাদের স্বপ্নের বীজতলা। এটা তার একটা নমুনা।’

ড. ইউনূস আরও বলেন, ‘হঠাৎ চারদিন আগে (১২ ফেব্রুয়ারি) দেখলাম বাইরের লোক এসে এটা জবরদখল করে নিচ্ছে। আমরা বাইরের লোক হয়ে গেলাম তাদের কাছে। তারা এটা তাদের নিয়মে চালানোর চেষ্টা করছে। আমি বুঝতে পারলাম না এটা কীভাবে হয়।’

ঘটনাটি পুলিশকে জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি মন্তব্য করে এই নোবেলজয়ী আরও বলেন, ‘আমরা পুলিশকে বললাম যে এরকম কাণ্ড হচ্ছে। আপনারা এসে দেখেন। ঠিক করে দেন। পুলিশ প্রথমে (অভিযোগ) গ্রহণই করল না। তারপর একবার এসে ঘুরে গেল। কোনো অসুবিধা দেখল না। আমরা তাদের বললাম—দেখেন আমাদের দরজায় তালা দিয়ে যাচ্ছে তারা। সকাল বেলা এসে তালা খুলে দিচ্ছে। এখনো সেই পরিস্থিতি বিরাজমান।’

সোমেশ্বরীর বালুমহাল ইজারা প্রক্রিয়া স্থগিত

ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৪, বণিক বার্তা

নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায় সোমেশ্বরী নদীতে ড্রেজার দিয়ে বালি উত্তোলন ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী

নেত্রকোনার দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীতে বালুমহাল ইজারা দরপত্রসংক্রান্ত সব কার্যক্রমের ওপর গতকাল স্থগিতাদেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসকে দেয়া আদেশ নেত্রকোনা জেলা প্রশাসককে অবহিত করারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

অনিয়ন্ত্রিত বালি ও পাথর উত্তোলন থেকে সোমেশ্বরী নদী রক্ষায় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ২০১৫ সালে একটি মামলা করে। মামলার প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত একই বছরের ২৯ জুলাই রুল জারি করেন। ওই রুলে বালুমহাল ইজারাসংক্রান্ত দরপত্র বিজ্ঞপ্তি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চাওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে সোমেশ্বরী নদীকে কেন প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হবে না তাও জানতে চওয়া হয়েছিল। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বালুমহালে নতুন করে ইজারা দরপত্রসংক্রান্ত সব কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়া হয়েছে। বিচারপতি কেএম কামরুল কাদের ও খিজির হায়াতের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের একটি ডিভিশন বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক সোমেশ্বরী নদীতে পাঁচটি বালুমহাল ১৪৩১ বঙ্গাব্দের জন্য ইজারার উদ্দেশ্যে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করেন। এর মাধ্যমে আদালতের আদেশ এবং বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ লঙ্ঘন করা হয়েছে। গত ২৮ জানুয়ারি আহ্বান করা দরপত্র দাখিলের শেষ দিন ছিল গতকাল। বর্তমানে বালুমহালগুলো থেকে স্থানীয় সংসদ সদস্য মোস্তাক আহমেদ রুহীর মালিকানাধীন মেসার্স রুহী এন্টারপ্রাইজ ও মো. জাহাঙ্গীর আলমের মালিকানাধীন মেসার্স জিহান এন্টারপ্রাইজ ইজারাগ্রহীতা হিসেবে বালি উত্তোলন করছে।

রুল জারির পাশাপাশি আদালত বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক, নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক ও দুর্গাপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নদীর প্রতিবেশগত অবস্থা নিরূপণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে আইন ও ইজারা শর্ত অনুযায়ী নদী থেকে বালি ও পাথর উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ এবং উত্তোলনে পাম্প ও ড্রেজার মেশিন ব্যবহার প্রতিরোধ করতে বলা হয়েছে।

পণ্যবাহী ট্রাকে উত্তরের পথে পথে চাঁদাবাজি

১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, সমকাল

নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে গেল সপ্তাহেই খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চাঁদাবাজি বন্ধে দু’দফা নির্দেশনা দিয়েছেন। তবু উত্তরাঞ্চলের পথে পথে পণ্যবাহী ট্রাকে রাখঢাক ছাড়াই চলছে ‘সরব’ চাঁদাবাজি। অনেক ক্ষেত্রে পোশাকধারী পুলিশ সদস্য, কখনও পুলিশ পরিচয়ে তাদের দালাল পণ্যবাহী গাড়ি থেকে চাঁদা তুলছে। সমকাল অনুসন্ধান চালিয়ে এর সত্যতাও পেয়েছে। এ কারণে পণ্যমূল্যের লাগামহীন দাম কোনোভাবে বাগে আসছে না। 

সরেজমিন দেখা গেছে, নীলফামারীর সৈয়দপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত একটি ট্রাককে ১৪ স্থানে ৫  হাজার ৪০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। সঙ্গে রয়েছে ‘মান্থলি’ চাঁদা। সৈয়দপুর উপজেলা শহর হলেও জেলা সদরের চেয়েও ব্যস্ত। পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলে বাইপাস সড়ক রাতভর থাকে জমজমাট। ট্রাকে মালপত্র তোলা হয় রাতে। সকালে সেগুলো যাত্রা করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে। গত মঙ্গলবার সকাল ৯টায় আলুবাহী ট্রাকে চড়ে সাংবাদিক পরিচয় গোপন রেখে ব্যবসায়ী পরিচয়ে নারায়ণগঞ্জের মদনপুরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন এ প্রতিবেদক।

দীর্ঘ ৩৫৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে চালক তাজুল মিয়া ট্রাকের স্টিয়ারিংয়ে বসলেন ছোট্ট কালো ব্যাগ নিয়ে। আর সহকারী মজনু মিয়ার হাতে পলিথিনের ব্যাগে বোঝাই খিলিপান। মধ্যবয়স্ক তাজুল পান চিবাতে চিবাতে যাত্রা শুরু করলেন। গাড়ি বাইপাস সড়কে উঠতেই সহকারী মজনু হাঁক দিলেন, ‘ওস্তাদ, খাড়াইছে’।

দেখা গেল, ৪-৫ জন পোশাকধারী পুলিশ দাঁড়িয়ে। ট্রাক থামালে এক পুলিশ সদস্য জানালার কাছ ঘেঁষে দাঁড়াল। ২০০ টাকা চাই তার। বলল, ‘বউনি হয়নি। মালপানি ছাড়।’ ২০০ টাকা দিয়ে ট্রাক নিয়ে সামনে এগোলেন তাজুল। বললেন, ‘চাঁদা না দিয়ে কখনও এই চৌরাস্তার মোড় পার হতে পারি না। খুব ছ্যাঁচড়া এরা। ১০০ টাকা হলেও নেবে।’

এবার বোঝা গেল তাজুলের কালো ব্যাগের রহস্য। পথখরচ তথা চাঁদা মেটাতে এতে রাখা খুচরা টাকা। বাকি পথেও এভাবে ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিতে হবে?– প্রশ্নে এক গাল হেসে বললেন, ‘সবে তো শুরু। সামনে দেখেন, কী অবস্থা হয়! রাতদিন পরিশ্রম করে বাড়ি করার সাহস করি না। আর পুলিশের একজন কনস্টেবল একাধিক বাড়ির মালিক হয়। এসব না করলে তারা কীভাবে চলবে!’

সকালের ফাঁকা রাস্তায় বাড়ে ট্রাকের গতি। ছুটছে তারাগঞ্জ উপজেলা হয়ে ইকরচালী বাজারের দিকে। কিছুটা এগিয়ে বালাবাড়ী হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি তল্লাশি চৌকি। সেখানে পুলিশ সদস্যরা হাত তুলে দিল গাড়ি থামানোর সংকেত। তাজুল জোর গলায় বললেন, ‘মালটির গাড়ি।’ শুনে বাধা দিল না তারা।

‘মালটি’ কী– প্রশ্নে তাজুল বললেন, এ হলো সড়কে যাতায়াতের মাসিক চুক্তি। বিভিন্ন এলাকা পুলিশ ইজারার মতো বিক্রি করে। এতে লেনদেন ডিজিটাল। নির্দিষ্ট নম্বরে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা পাঠাতে হয়। ট্রাকপ্রতি মাসে ২ থেকে ৪ হাজার টাকা। একেই বলে মালটি। তাজুলের বক্তব্যে বোঝা গেল, শব্দটি আসলে মালটি নয়; মান্থলি।

 অর্থাৎ ট্রাকটি মাসকাবারি চাঁদা দিয়েছে। এক মাসের জন্য বালাবাড়ী হাইওয়ে পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে আর আটকাবে না ট্রাকটি। তাজুল জানালেন, মান্থলির টাকা মহাজন দেন।

বালাবাড়ী হাইওয়ে পুলিশ তল্লাশি চৌকির পর ট্রাক চলে দ্রুত লয়ে। একটানে চলে আসে পাগলাপীর বাজার এলাকায়। সড়কে যানজট নেই, তবে ট্রাকের গতি কমিয়ে দেন চালক। দেখা গেল, লাঠি হাতে ৪-৫ জন পুলিশ। তারা চালককে নামতে বলছে। তবে তাজুল সিটে বসে ১০০ টাকার তিনটি কড়কড়ে নোট ধরিয়ে দিতেই এগিয়ে যাওয়ার সংকেত পেলেন। তাজুল বললেন, ‌ভাগ্য ভালো। আজ ৩০০ টাকায় ছাড়া পেয়েছি; অন্যদিন ৫০০ নেয়।

গাড়ি ছুটছে রংপুর শহরের দিকে। শহর পার হয়ে নার্সিং কলেজ এলাকায় পুলিশ সার্জেন্ট ট্রাক থামানোর সংকেত দিলেও উপেক্ষা করে এগিয়ে যান তাজুল। একইভাবে মেডিকেল মোড় হয়ে সিটি বাসস্ট্যান্ড ছাড়িয়ে বাইপাস হয়ে মডার্ন মোড়ে আসে ট্রাক। সেখানে অপেক্ষমাণ সার্জেন্টদের হয়ে ‘কলার বয়’ এগিয়ে আসে। কথা বলার পর ৩০০ টাকা দিতে হলো।

গাড়ি চলছে এবার রংপুর-বগুড়া মহাসড়কে। শঠিবাড়ী এলাকায় আসার পর দূর থেকে মনে হলো, পুলিশের তল্লাশি চলছে। তাজুলের ভাষ্য, তল্লাশি আসলে নাটক। মিথ্যা অজুহাতে ট্রাক থামিয়ে চাঁদা আদায়ের ফন্দি। সেখানে ওভারব্রিজের নিচে আয়েশ করে বসে থাকা পুলিশ সদস্যদের দিতে হলো ৫০০ টাকা। এর পর বড়দরগা হাইওয়ে ফাঁড়ির তল্লাশি চৌকিতে ২০০ টাকা, পলাশবাড়ী মোড়ে জোরজবরদস্তি করে ৫০০ টাকা আদায় করল পুলিশ। টাকা না দিলে গাড়ি আটকের রেকার নিয়ে বসে আছে তারা।

গোবিন্দগঞ্জ এসে ফের তল্লাশি! গাড়ি থামিয়ে ট্রাকের কাগজপত্র নিয়ে নিচে নামলেন তাজুল। কিছুক্ষণ পর অস্থায়ী পুলিশ বক্স থেকে ফিরে জানালেন, এখানকার পুলিশ সদস্যরা কিছুটা ‘সৎ’। তারা চাঁদার টাকা হাত পেতে নেয় না। টেবিলের খোলা ড্রয়ারের মধ্যে ফেলে দিতে হয়। দূর থেকে যে কেউ দেখলে ভাববে, কাগজ যাচাই শেষে ছেড়ে দিচ্ছে। তবে ড্রয়ারে রাখতে হচ্ছে ৫০০ টাকা।

গাড়ি চলতে চলতে দুপুর ২টা বাজল। খাবারের বিরতিতে থামতে হলো পথের পাশের ভাতের দোকানে। বিস্তারিত কথা হয় তাজুলের সঙ্গে। জানালেন, মাসে ১৫টি ট্রিপ নিয়ে ঢাকা যান। কোথায় কী হয়, কীভাবে পুলিশের লোক দেখানো তল্লাশি থেকে ছাড়া পেতে হয়, সব মুখস্থ। টাকা না দিলে পুলিশ হয়রানি করে; মামলা দেয়। ট্রাকচালক ও গাড়ির মহাজনরা নিরুপায়। ব্যবসা করলে এসব মেনে নিয়েই তা করতে হবে।

আবার রওনা। পথ এখন বগুড়ার সীমানা ধরে। এখানে মোকামতলা এলাকায় পুলিশের তল্লাশি চৌকি থাকলেও সেদিন কেউ সড়কে ছিল না। তবে বিপত্তি ঘটল গোকুল এলাকায়। সেখানে মহাসড়কে কাগজপত্র পরীক্ষার নামে একের পর এক ট্রাক থামাচ্ছে পুলিশ। মামলাও দিচ্ছে। তাজুলের চোখেমুখে চিন্তার ছাপ। গাড়ি থেকে নেমে বেশ কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে জানালেন, সবই ঠিক আছে। তার পরও ৬০০ টাকা দিতে হলো। তাদের দাবি ছিল ১ হাজারের। হাতে-পায়ে ধরে ৪০০ কমিয়েছি। গাড়ি স্টার্ট করে তাজুল জানালেন, বগুড়ার দ্বিতীয় বাইপাস ব্যবহার করবেন। কারণ প্রথম বাইপাসে বেশ কয়েকটি পয়েন্টে চাঁদা দিতে হয়।

চাঁদা কোথায় কীভাবে আদায় হয়, তা দেখতেই যাত্রা। তাই প্রতিবেদকের অনুরোধে বাইপাস দিয়ে যেতে রাজি হলেন তাজুল। মাটিডালি চারমাথা হয়ে বনানীর দিকে গাড়ি ছোটে। এই পথে পূর্বনির্ধারিত দুটি পয়েন্ট চারমাথা ও ভবেরবাজারে টাকা দিতে হলো না। সেখানে নাকি কিছুদিন আগে র‍্যাব অভিযান চালিয়েছে। চাঁদাবাজরা কেউ বের হচ্ছে না।

গাড়ি তিনমাথা রেলগেট পার হওয়ার সময় ওত পেতে থাকা পুলিশ সদস্যরা অতিরিক্তি মালপত্র পরিবহনের অভিযোগে রেকার বিল ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিল ‘কলার বয়’কে দিয়ে। শর্ত দেওয়া হলো– ১ হাজার টাকা দিলে ছেড়ে দেবে। পুলিশকে ৫০০ আর কলার বয়কে ১০০ টাকা দিয়ে নিষ্কৃতি মিলল।

গাড়ি ছুটছে এবার বগুড়া-সিরাজগঞ্জ মহাসড়কে। এই পথে বেশ কিছু পুলিশ সদস্যের পাহারা থাকলেও কেউ সংকেত না দেওয়ায় গাড়ি থামাতে হয়নি। বিপত্তি বাধল হাটিকুমরুল মোড়ে। সেখানে গাড়ি থামিয়ে নেওয়া হলো ৫০০ টাকা। উত্তরবঙ্গের পথ শেষ হলো।

যমুনার বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়ে ট্রাক প্রবেশ করে টাঙ্গাইলে। সেখানে পুলিশ চাঁদা আদায় করে নতুন কায়দায়। কাগজপত্র ঠিক থাকলে এক রেট, না থাকলে আরেক। রেকার লাগালে সেই বিলের সঙ্গে অতিরিক্ত জরিমানা ও দালালদের স্পিডমানি দেওয়ার অলিখিত নিয়ম করা হয়েছে। যমুনা সেতুর গোলচত্বরে পুলিশ সদস্যরা তাজুলের ট্রাকের সব কাগজ নিয়ে নেয়। এখানে দিতে হলো ৮০০ টাকা। রাগে ফোঁসফোঁস করতে করতে তাজুল বললেন, ‘আর একটু পর আসলে এই ধরাটা খাইতাম না। এরা বেশি রাতে থাকে না।’

অন্ধকার হয়ে এলো সেতু পার হতে। সংযোগ সড়ক ধরে ট্রাক প্রবেশ করল এলেঙ্গায়। পুলিশের পরিচয় দিয়ে ‘কলার বয়’ নিল ২০০ টাকা। গাড়ি এবার টাঙ্গাইল-ঢাকা মহাসড়কে। দ্রুতগতিতে চলছে। রাত সাড়ে ১০টায় চন্দ্রার মোড়ে আবারও গতি কমে গেল। সেখানে পুলিশের লোক পরিচয়ে এক ব্যক্তি নিল ৩০০ টাকা। ঢাকা-বাইপাস হয়ে গাজীপুর চৌরাস্তায় আরেক দল নিল ২০০ টাকা। মীরেরবাজারে আবার থামানো হলো কাঁচপুর ব্রিজের ঢালে। একইভাবে সেখানেও দিতে হলো ২০০ টাকা। এর পর গন্তব্য শেষ হলো গাউছিয়া হয়ে নারায়ণগঞ্জের মদনপুরে। বেশি রাত না হলে এখানেও একাধিক টিম অপেক্ষায় থাকত বলে জানালেন চালক তাজুল।

আইন মেনে গ্রামীণের ৭ প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছে

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, প্রথম আলো

আইন মেনেই গ্রামীণ টেলিকম ভবনের সাতটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান এ কে এম সাইফুল মজিদ। তিনি বলেছেন, এসব প্রতিষ্ঠানে নোবেল পুরস্কারজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কোনো মালিকানা বা শেয়ার নেই।

রাজধানীর মিরপুরে গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যালয়ে আজ শনিবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাইফুল মজিদ এসব কথা বলেন। ড. ইউনূস গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, তাঁদের আটটি প্রতিষ্ঠান জবরদখল করেছে গ্রামীণ ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠান তিনি ব্যবসার মুনাফা দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ড. ইউনূসের সেই অভিযোগের জবাব দিতে আজ সংবাদ সম্মেলন ডাকে গ্রামীণ ব্যাংক।

সংবাদ সম্মেলনে ড. মুহাম্মদ ইউনূস মানি লন্ডারিং করেছেন—এমন প্রমাণ হাতে রয়েছে বলে দাবি করেন গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান। তিনি বলেছেন, গ্রামীণ টেলিকম, গ্রামীণ কল্যাণ, গ্রামীণ ফান্ড—এসব প্রতিষ্ঠান গড়তে গিয়ে ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকা সরিয়েছেন। গত সাত মাস নিরীক্ষা (অডিট) করে তাঁরা এসব তথ্য পেয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ড. ইউনূস ব্যবসার মুনাফা দিয়ে গ্রামীণ টেলিকম, গ্রামীণ কল্যাণসহ অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠান করেননি। তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের টাকায় এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।

গ্রামীণ ব্যাংক ড. ইউনূসের কোনো প্রতিষ্ঠান জবরদখল করেনি। সবকিছু আইন মেনে করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান ড. ইউনূসের নয়; বরং গ্রামীণ ব্যাংকের।

ব্রহ্মপুত্রের পানিতে যাচ্ছে ২৭৬৩ কোটি টাকা, একদিকে খনন অন্যদিকে ভরাট

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, প্রথম আলো

জামালপুর শহরের পুরাতন ফেরিঘাট এলাকায় মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি গত শনিবার বেলা দুইটার দিকে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ পার হচ্ছিলেন। নৌকায় নয়, হেঁটে। নদের মাঝখানে হাঁটুপানি। তাই পার হতে তাঁর কোনো অসুবিধাই হচ্ছিল না।

অথচ ব্রহ্মপুত্র নদের এই জায়গা গত বছরই খনন করা হয়। সরকারি প্রকল্পে ব্যয় হয় বিপুল অর্থ। কিন্তু খনন করার পর নদটি আবার প্রায় আগের মতো ভরাট হয়ে গেছে।

ফেরিঘাটে পাওয়া গেল স্থানীয় বাসিন্দা বিল্লাল হোসেনকে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, খননের নামে বালুর ব্যবসা হয়েছে। পরিকল্পিত খনন হয়নি। নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে কাজ হয়নি। তাঁর প্রশ্ন, যদি তা–ই হতো, এক বছরের ব্যবধানে নদের এই অবস্থা কেন?

অনেক ক্ষেত্রে খননের পর বালু ফেলা হয়েছে নদের চরে অথবা তীরে। বর্ষায় সেই বালু আবার নদীতে মিশে নদটি ভরাট হয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় বিপুল পরিমাণ বালু নদের তীরে রাখা আছে। আগামী বর্ষায় পানি এলে তার একাংশ নদে গিয়ে ভরাট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের খননকাজ করছে। গাইবান্ধা, জামালপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও কিশোরগঞ্জ—এই পাঁচ জেলায় নদের ২২৭ কিলোমিটার অংশ খনন করার কথা। কোনো কোনো এলাকায় খনন শেষ, কোনো কোনো এলাকায় কাজ চলছে, কোনো কোনো এলাকায় কাজ শুরু হয়নি। তবে গত কয়েক বছরে যেসব এলাকায় খনন হয়েছে, সেসব এলাকার মানুষ হতাশ। তাঁরা বলছেন, খনন করে কোনো লাভ হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে খননের পর বালু ফেলা হয়েছে নদের চরে অথবা তীরে। বর্ষায় সেই বালু আবার নদীতে মিশে নদটি ভরাট হয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় বিপুল পরিমাণ বালু নদের তীরে রাখা আছে। আগামী বর্ষায় পানি এলে তার একাংশ নদে গিয়ে ভরাট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

গ্রামীণ ব্যাংকের বক্তব্যের জবাব দিল ইউনূস সেন্টার

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, প্রথম আলো

গ্রামীণ ব্যাংকে থাকাকালে ড. মুহাম্মদ ইউনূস মানি লন্ডারিং করেছেন বলে গ্রামীণ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যে অভিযোগ তুলেছে, সেটি মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও মানহানিকর বলে উল্লেখ করে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে ইউনূস সেন্টার।

আজ রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এই প্রতিবাদের কথা জানায় ইউনূস সেন্টার।

গত শনিবার গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান এ কে এম সাইফুল মজিদ সংবাদ সম্মেলন করে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনেন। তিনি বলেছিলেন, গ্রামীণ টেলিকম, গ্রামীণ কল্যাণ, গ্রামীণ ফান্ড—এসব প্রতিষ্ঠান গড়তে গিয়ে ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকা সরিয়েছেন।

এ বিষয়ে ইউনূস সেন্টারের ভাষ্য হচ্ছে, দেশের খ্যাতিমান নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রামীণ ব্যাংকের বার্ষিক নিরীক্ষা করেছে। তারা বা বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল ও সরকারের গঠিত কমিটি এমন কোনো আর্থিক অসংগতি খুঁজে পায়নি। তা ছাড়া ড. ইউনূসের কর্মকালে গ্রামীণ ব্যাংক বোর্ড পরিচালিত হয়েছে সমাজের শ্রদ্ধাভাজন ও বিদগ্ধ ব্যক্তিদের দ্বারা।

গ্রামীণ ব্যাংকের কোনো প্রতিষ্ঠানে ড. ইউনূসের মালিকানা নেই বলে ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যান যে বক্তব্য দিয়েছেন, সে বিষয়ে ইউনূস সেন্টার বলেছে, ড. ইউনূস নিজেই বারবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলেছেন, গ্রামীণ ব্যাংকসহ তাঁর সৃষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানে তাঁর কোনো শেয়ার বা মালিকানা নেই। এ ছাড়া গ্রামীণ ব্যাংক ব্যতীত তাঁর প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ২৮ ধারা অনুসারে গঠিত। যার কোনো ধরনের মালিকানা থাকে না।

গ্রামীণ টেলিকম ও গ্রামীণ কল্যাণে ড. ইউনূস আর চেয়ারম্যান নেই, নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন। এ বিষয়ে ইউনূস সেন্টারের বক্তব্য হচ্ছে, গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের জন্মলগ্ন থেকে ড. ইউনূস চেয়ারম্যান পদে নিয়োজিত আছেন। প্রতিষ্ঠান দুটির শুরুতে তাদের আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশনে চেয়ারম্যান ও বোর্ড সদস্য মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষমতা গ্রামীণ ব্যাংকের হাতে ছিল। পরে প্রতিষ্ঠান দুটি পরিচালনার সুবিধার্থে কোম্পানি আইনের ২০ ধারা অনুযায়ী গ্রামীণ কল্যাণের আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশনের ৪৮ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হয়। সেটি ২০১১ সালের ২৫ মে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। গ্রামীণ টেলিকমের আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশনের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ ও ৩৫ নম্বর অনুচ্ছেদ সংশোধন করে আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশনের ধারাগুলো সংশোধন করা হয়। তাই গ্রামীণ ব্যাংক এখন এ দুটি প্রতিষ্ঠানে চেয়ারম্যান ও পরিচালক পদে নিয়োগ দিতে পারে না।

গ্রামীণ টেলিকম প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ২৪ কোটি টাকা অনুদান নিয়েছেন—এমন ভাষ্যের বিষয়ে ইউনূস সেন্টারের বক্তব্য হচ্ছে, গ্রামীণ টেলিকম প্রতিষ্ঠার সময়ে নরওয়ে থেকে ১৯ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। এ ছাড়া গ্রামীণ ব্যাংকের সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট ফান্ড থেকে ৩০ কোটি টাকার ঋণ চুক্তি করে। চুক্তির আওতায় ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ২৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়। ১৯৯৭ সালে ঋণ চুক্তিটি গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ডের সিদ্ধান্তের আলোকে গ্রামীণ কল্যাণের নামে ঋণ চুক্তি হয়। যেহেতু গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে ঋণ চুক্তিটি গ্রামীণ কল্যাণে হস্তান্তর করা হয়েছে, তাই এ বাবদ গ্রামীণ ব্যাংকে কোনো অর্থ প্রদানের প্রযোজ্যতা নেই।

ট্রাস্ট ব্যাংকের মামলায় গ্রেপ্তার শীর্ষ ঋণখেলাপি মাকসুদুর রহমান

২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, প্রথম আলো

ঋণখেলাপির মামলায় ইস্পাত খাতের কোম্পানি মডার্ন স্টিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাকসুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মডার্ন স্টিলের পাশাপাশি মাকসুদুর রহমান শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ইস্পাত খাতের কোম্পানি রতনপুর স্টিল রি–রোলিং মিলস বা আরএসআরএমেরও ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

বেসরকারি ট্রাস্ট ব্যাংকের করা ঋণখেলাপির এক মামলায় ৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। এ মামলায় মাকসুদুর রহমানসহ মোট চারজনকে অভিযুক্ত করা হয়। অপর তিন অভিযুক্ত ব্যক্তি হলেন কোম্পানিটির পরিচালক মো. আলাউদ্দিন এবং মাকসুদুর রহমানের ছেলে মিজানুর রহমান ও মারজানুর রহমান। এই চারজনের বিরুদ্ধেই আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। এর মধ্যে মাকসুদুর রহমানকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সাম্রাজ্য যুক্তরাজ্যে

২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, সমকাল

উত্তর-পশ্চিম লন্ডনের ব্যক্তিগত আবাসিক রাস্তায় একটি সম্পত্তি ২০২২ সালে ১ কোটি ৩৮ লাখ ডলারে (১৫২ কোটি টাকায়) বিক্রি হয়। রিজেন্টস পার্ক এবং লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ড থেকে পাথর ছোড়া দূরত্বে যুক্তরাজ্যের রাজধানীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ এলাকাগুলোর একটিতে সাদা টাউনহাউসের সারি। একটি সম্পত্তি বিপণন কোম্পানির আলোকচিত্রে দেখা যায়, এর মেঝে থেকে সিলিং পর্যন্ত জানালা, বেশ কয়েকটি ফ্লোরজুড়ে সর্পিল সিঁড়ি, রয়েছে থিয়েটার এবং ব্যায়ামাগার।

সম্পত্তি প্ল্যাটফর্মের হিসাবে বর্তমানে বাড়িটির দাম ১৮০ কোটি টাকারও (১.৩ কোটি পাউন্ড) বেশি। বাড়িটি বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদের মালিকানাধীন।

অথচ বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী দেশটির কোনো নাগরিক, বাসিন্দা এবং সরকারি কর্মচারী বছরে ১২ হাজার ডলারের (১৩ লাখ ১৭ হাজার টাকার) বেশি অর্থ দেশের বাইরে নিতে পারেন না। বাংলাদেশের আইনে করপোরেশনের বিদেশে তহবিল স্থানান্তরেও নানা বিধিনিষেধ রয়েছে। শুধু কিছু শর্ত পূরণ সাপেক্ষে অনুমতি দেওয়া হয়।

সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ গত জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ বছর ভূমিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সাল থেকে তাঁর মালিকানাধীন কোম্পানি প্রায় ২০ কোটি ব্রিটিশ পাউন্ড (২৭৭০ কোটি টাকা) মূল্যের ৩৫০টিরও বেশি সম্পত্তি কিনে যুক্তরাজ্যে রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। যুক্তরাজ্যের কোম্পানি হাউস করপোরেট অ্যাকাউন্ট, বন্ধকি চার্জ এবং এইচএম ল্যান্ড রেজিস্ট্রি লেনদেনের ওপর ভিত্তি করে এ পরিসংখ্যান পেয়েছে বার্তা সংস্থা ব্লুমবার্গ।

আর্থিক খাতে এক বছরে ৬৫ শতাংশ বেড়েছে সন্দেহজনক লেনদেন

২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, প্রথম আলো

দেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে জানিয়েছে, গত অর্থবছরে ব্যাংক খাতে ঋণসংক্রান্ত সন্দেহজনক লেনদেন বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে এ সময়ে পুরো আর্থিক খাতে সন্দেহজনক লেনদেন সার্বিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, আগের অর্থবছরের তুলনায় যা প্রায় ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। ব্যাংক খাতের বেনামি ও প্রতারণাপূর্ণ ঋণ বন্ধ করাসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির ‘রোগ’ সারাতে বাংলাদেশ ব্যাংক পথনকশা বা রোডম্যাপ ঘোষণা করার সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই এই চিত্র উঠে এসেছে।

বিএফআইইউর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে তাদের কাছে পাঠানো ঋণসংক্রান্ত সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২০, যা এর আগের ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ৩৪১টি। অর্থাৎ এ ধরনের লেনদেন প্রতিবেদনের সংখ্যা বেড়ে দেড় গুণ হয়েছে। আর গত অর্থবছরে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা, ব্রোকারেজ হাউসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিএফআইইউতে সব মিলিয়ে সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন পাঠিয়েছিল ১৪ হাজার ১০৬টি, যা ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ৮ হাজার ৫৭১টি।

খুলনার কয়রায় ভূমি অধিগ্রহণ না করেই চলছে বেড়িবাঁধ নির্মাণ

২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, প্রথম আলো

কয়রার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের জোড়শিং গ্রামের জেলে আবুল কালাম গাজী। ১৯৯২ সালে শাকবাড়ীয়া নদীর বেড়িবাঁধ-সংলগ্ন বিলে ১৫ কাঠা জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করেন। সেই থেকে নয়জনের সংসার নিয়ে সেখানে বসবাস করছেন। এখন তাঁর জমির ওপর দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে বেড়িবাঁধ। তবে রাস্তার কাজ শুরু হলেও জমি অধিগ্রহণ করা হয়নি। ফলে ক্ষতিপূরণের টাকাও পাননি।

আবুল কালাম গাজী বলেন, ‘কিছুদিন আগে খাজনাও দিয়েছি। এখন শুনছি বাড়ির ওপর দিয়ে বাঁধের রাস্তা হবে। কাজও শুরু হইছে। বিনা নোটিশে বাঁধের রাস্তার কথা বলে আমার বসতঘরটি ভেঙে ফেলতে বলছে। আমাগো তো আর অন্য কোনো জায়গাজমি নাই। সরকার যদি এই জমি নেয়, তাহলে আমাদের ক্ষতিপূরণ দিবে। তাও তো পাইনি। আর পাব কি না, সেটাও জানিনে। ঘর ভাঙলে পাশে যে কোথাও নতুন ঘর তৈরি করার মতো জমি, টাকা কিছুই নাই আমার।’

আবুল কালাম গাজীর মতো একই সমস্যায় আছেন একই এলাকার ইউনুস সরদার। গোলপাতার ছাউনি দেওয়া নিজ ঘরের চালা খুলতে খুলতে তিনি বলেন, ‘১২ কাঠা জমি কিনে বাড়িটি করেছিলাম। ৮ কাঠা চলে যাচ্ছে বাঁধে। ঠিকাদার ও পাউবোর কর্মকর্তারা এসে আমার ঘর সরিয়ে নিতে বলেছেন। তবে অধিগ্রহণ–সংক্রান্ত কোনো লিখিত নোটিশ পাইনি।’

খুলনার কয়রা উপজেলায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ না করে ব্যক্তিমালিকানাধীন ভূমির ওপর বাঁধের কাজ শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এতে বাঁধের পাশে ঘর বা জমি থাকা মানুষ দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, ক্ষতিপূরণের টাকা পাওয়ার আগেই তাঁদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। টাকা পাবেন কি না, তা নিয়েও তাঁদের শঙ্কা রয়েছে।

বহুমাত্রিক দখলবাজিতে থ্রি এঙ্গেল মেরিন

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, প্রতিদিনের বাংলাদেশ

এক দশক আগেও সবুজ ক্ষেত আর ফল-ফসলে সমৃদ্ধ ছিল মুন্সীগঞ্জ জেলার দ্বীপসদৃশ উপজেলা গজারিয়ার নয়ানগর মৌজার সদর ইউনিয়ন। তিন ফসলি জমিগুলোতে ফলত ধান, আলু, ভুট্টা। বর্ষায় পাওয়া যেত প্রচুর মাছ। বছরে শত শত কোটি টাকার ফসলই ছিল সেখানকার কৃষকদের আয়ের প্রধান উৎস। সেই সবুজ মাঠ আর কৃষিজমি এখন যেন ধু-ধু মরুভূমি। ২০১১ সালের স্যাটেলাইট চিত্রে যে ভূখণ্ডটি নদীর পানি আর সবুজ গাছগাছালিতে ছিল পরিপূর্ণ, পরের বছরগুলোতে সেখানে বাড়তে থাকে বালুভূমি। বালুতে ভরে ওঠে নদী, খাল। চাপা পড়ে যায় উর্বর কৃষিজমি। সেখানে গড়ে ওঠে ‘থ্রি এঙ্গেল মেরিন লিমিটেড’ নামের একটি জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান। রুদ্ধ হয়ে যায় শত শত কৃষকের জীবিকার পথ।

২০১১ সালে নয়ানগর মৌজায় মেঘনার কূলঘেঁষে কিছু জমি কিনে যাত্রা করে থ্রি এঙ্গেল মেরিন লিমিটেড। তখন থেকেই দৃশপট পাল্টাতে শুরু করে। মেঘনা নদী, ফুলদী নদী, কুমারিয়া খাল, বুরুরচক খাল, মালিকানার কৃষিজমি, সরকারের খাসজমি সবই ঢুকে যেতে থাকে প্রতিষ্ঠানটির পেটে।

বিভিন্ন সময়ে ওই এলাকা ঘুরে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নদী, খাল, বিল ও কৃষিজমি ভরাট করে দখল এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট করার অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ও তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে। নদী রক্ষা কমিশন, জেলা প্রশাসক কার্যালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রতিষ্ঠানটির অবৈধ দখল উচ্ছেদের জন্য চিঠিও দিয়েছে। কিন্তু নদী, খাল, জমি দখলমুক্ত হয়নি।

ট্রান্সকম গ্রুপের পাঁচ কর্মকর্তা গ্রেফতার

ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২৪, বণিক বার্তা

বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমানের মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানের শেয়ার জালিয়াতি, বিভিন্ন ব্যাংকে তার রেখে যাওয়া স্থায়ী আমানতের অর্থ আত্মসাৎ এবং জাল দলিল সৃজনের অভিযোগ তুলে তিনটি পৃথক মামলা করেছেন তার মেজো মেয়ে শাযরেহ হক। এসব মামলায় ট্রান্সকমের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমানের স্ত্রী শাহনাজ রহমান, সিইও সিমিন হোসেনসহ প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্ট ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। রাজধানীর গুলশান থানায় বৃহস্পতিবার (২২ ফেব্রুয়ারি)  মামলাগুলো নথিভুক্ত করা হয়।

এসব অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির দুই পরিচালকসহ পাঁচজনকে এরই মধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তারা হলেন—প্রতিষ্ঠানের আইন উপদেষ্টা ফখরুজ্জামান ভুইয়া, পরিচালক (করপোরেট ফাইন্যান্স) কামরুল হাসান, পরিচালক (করপোরেট ফাইন্যান্স) আব্দুল্লাহ আল মামুন, ম্যানেজার আবু ইউসুফ মো. সিদ্দিক এবং সহ-কোম্পানি সেক্রেটারি মোহাম্মদ মোসাদ্দেক।

ট্রান্সকমের দুই বোনের লড়াই: সিইও সিমিন ও মা শাহনাজের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এনেছেন শাযরেহ

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড অনলাইন বাংলা

বাংলাদেশের ট্রান্সকম গ্রুপের প্রয়াত চেয়ারম্যান লতিফুর রহমানের কনিষ্ঠ কন্যা শাযরেহ হক বুধবার (২১ ফেব্রুয়ারি) গুলশান থানায় তার বড় বোন ও মাসহ ট্রান্সকমের আট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা মামলা করেছেন।

শাযরেহের বড় বোন সিমিন রহমান ট্রান্সকমের বর্তমান সিইও।

তার মা শাহনাজ রহমান গ্রুপটির বর্তমান চেয়ারম্যান। দুটি মামলায় শাহনাজের নাম রয়েছে।

সিমিন রহমান বিশ্বাসভঙ্গ, জালিয়াতি ও দলিল জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে শাযরেহ ও তার প্রয়াত ভাই আরশাদ ওয়ালিউর রহমানকে পারিবারিক সম্পত্তির—যার মূল্য দাবি করা হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা—ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন, এই অভিযোগে এ মামলা করেন শাযরেহ।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের হাতে তিনটি মামলার নথি এসেছে। মামলাগুলোর কয়েকটি অভিযোগ নিচে তুলে ধরা হলো।

অর্থ আত্মসাৎ

মামলার নথিতে শাযরেহ লিখেছেন, তার বাবা বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট ও এফডিআরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা রেখে মারা যান। ওই অর্থের নমিনি ছিলেন তার মা শাহনাজ রহমান।

শাযরেহ অভিযোগ করেছেন, ২০২০ সালের ১ জুলাই লতিফুর রহমান মারা যাওয়ার পর ওই টাকা তার উত্তরাধিকারীদের (ওয়ারিশ) মধ্যে বণ্টন করে দেওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু তার বাবার মৃত্যুর পর তার বড় বোন (সিমিন) সব টাকা নিজের ও তার মায়ের অ্যাকাউন্টে সরিয়ে ফেলেন বলে মামলার এজাহারে দাবি করেছেন শাযরেহ।

শাযরেহ আরও দাবি করেছেন, ২০২০ সালের ৩ আগস্ট তার বড় বোন ট্রান্সকম ইলেকট্রনিক্সের ১৮ শতাংশ শেয়ার উক্ত প্রায় ১০০ কোটি টাকা থেকে ৬০ কোটি টাকা দিয়ে কিনে নেওয়ার বাহানায় নিজের নামে হস্তান্তর করেন।

শাযরেহ দাবি করেছেন, তার বোন ও মা পরস্পরের যোগসাজশে লতিফুরের অন্যান্য উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত করে এই কাজ করেছেন।

ট্রান্সকমের শেয়ার থেকে উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত করা

আরেক মামলায় শাযরেহ দাবি করেছেন, তার বোন ট্রান্সকমের আরও চার কর্মকর্তার সহযোগিতায় জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে তিনটি ফর্ম ১১৭ (হস্তান্তর দলিল) তৈরি করে রেজিস্ট্রার অভ জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসে (আরজেএসসি) জমা দিয়ে বেআইনিভাবে ট্রান্সকমের বেশিরভাগ শেয়ারের মালিকানা নিয়ে নেন।

মামলার এজাহারে আরও বলা হয়েছে, বাদীকে জানানো হয়েছিল যে তার পিতা তাকে ৪ হাজার ২৭০টি শেয়ার, তার ভাই আরশাদ ওয়ালিউর রহমানকে ৪ হাজার ২৭০টি শেয়ার এবং তার বোনকে ১৪ হাজার ১৬০টি শেয়ার হস্তান্তর করেছেন।

কিন্তু বাদী কখনোই হস্তান্তর দলিলে (ফর্ম ১১৭) স্বাক্ষর করেননি বলে দাবি করেছেন। তার বাবাও জীবিতাবস্থায় কখনও হস্তান্তর দলিলে স্বাক্ষর করেননি বলে দাবি করেছেন বাদী শাযরেহ হক। আসামিরা এসব নথি জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

ডিড অভ সেটেলমেন্ট (মীমাংসার দলিল) জালিয়াতি

আরেকটি মামলায় শাযরেহ দাবি করেছেন, তার মা ও বোন ট্রান্সকমের অন্য তিন কর্মকর্তার সহযোগিতায় তার [শাযরেহ] এবং তার ভাই আরশাদ ওয়ালিউর রহমানের স্বাক্ষর জাল করে ডিড অভ সেটেলমেন্ট (মীমাংসার দলিল) তৈরি করেছেন।

শাযরেহ দাবি করেছেন, পরে ওই ডিড অভ সেটেলমেন্ট ব্যবহার করে সিমিন ও শাহনাজ ট্রান্সকম গ্রুপের শেয়ার নিজেদের নামে হস্তগত করাসহ গ্রুপের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সিইওর পদ নিজেদের নামে করে নিয়েছেন।

শাযরেহ দাবি করেছেন, তিনি কখনও তার পরিবারের কোনো সদস্যের সঙ্গে ডিড অভ সেটেলমেন্ট করেননি।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনে চাকরিতে চোরাবালি

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, সমকাল

শিক্ষা সনদ নকল, অভিজ্ঞতার সনদেও দুই নম্বরি। এ রকম ভুয়া সনদে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে (ইফা) প্রথম শ্রেণির চাকরি জুটিয়েছেন অন্তত ২৪ জন। নিরীক্ষা কিংবা তদন্ত– কোনো কিছুতেই চাকরির গায়ে টোকা লাগেনি। অসংকোচে বছরের পর বছর  চাকরি করে যাচ্ছেন এসব চতুর কর্মকর্তা।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনে চাকরির জালিয়াতি কীর্তি এখানেই শেষ নয়। বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই কয়েক প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল এ প্রতিষ্ঠানে। তারাও চাকরি করছেন অবলীলায়। এসএসসির গণ্ডি পেরোনো জাল সনদধারী কয়েকজন বনে গেছেন কর্মকর্তা। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে প্রকৃত উত্তীর্ণ প্রার্থী নিয়োগ পেলেও চাতুরী করে চাকরি পাওয়া কর্মকর্তাও টিকে আছেন! দু’জনই তুলছেন সরকারি বেতন!

এমনকি ফাউন্ডেশনের অধীন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের ইমাম নিয়োগেও প্রবঞ্চনার প্রমাণ মেলে তদন্তে। পরে ধর্ম মন্ত্রণালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা না দিয়ে দেওয়া হয় ধামাচাপা। এ ছাড়া প্রকল্পের নিয়োগেও জাল সনদের উদাহরণ ভূরি ভূরি। বছরের পর বছর এমন অনিয়ম চলতে থাকলেও লাগাম টানার ব্যাপারে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নেই হেলদোল। উল্টো কেউ উদ্যোগী হলে তা বীরদর্পে ঠেকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রশ্নবিদ্ধ উপায়ে করা হচ্ছে অডিট আপত্তির নিষ্পত্তি।

সবাইকে ‘খুশি’ করেই জাটকা মারার মচ্ছব

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, সমকাল

১০ ইঞ্চি বা ২৫ সেন্টিমিটারের কম আকারের ইলিশের পোশাকি নাম ‘জাটকা’। এ অবয়বের ইলিশ আহরণ, পরিবহন ও বিক্রি পুরোপুরি নিষিদ্ধ। নিষেধাজ্ঞা ভাঙলেই জেল-জরিমানা। তার পরও সরকারের নিষেধাজ্ঞা মানতে যেন বয়েই গেছে! এখন জাটকা কেনাবেচা হয় না এমন মাছের বাজার খুঁজে পাওয়া মুশকিল। নদীতে আহরণ, দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় সরবরাহ, মোকামের আড়তঘরে পাইকারি বিক্রি এবং খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো– চলছে সর্বসমক্ষে। আইনবিরোধী এ কর্ম প্রতিরোধে প্রান্তিক পর্যায়ে জলে-স্থলে ‘সজাগ’ মৎস্য অধিদপ্তর, নৌ পুলিশ ও কোস্টগার্ড। তবু জাটকা নিধন, পরিবহন ও বিপণন সবকিছুই যেন বল্গাহীন। কেন হচ্ছে, কীভাবে চলছে– সেটা খোঁজার চেষ্টা করেছে সমকাল।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, প্রশাসনের প্রতিটি ধাপে ‘খুশি করে’ জাটকা ধরার যেন এক উৎসবই চলছে মেঘনাসহ আশপাশের নদনদীতে। এর পেছনে রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের প্রশ্রয়ে প্রভাবশালী চক্র। এমন দুই নম্বরি ব্যবসায় তারা বড় লগ্নি করে তুলে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা। অপকীর্তি দেখেও মুখে কুলুপ লাগানোদের তালিকায় আছেন মৎস্য অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাঠ কর্মকর্তারা। অভিযোগ রয়েছে, নিষেধাজ্ঞার সময় পুলিশের বিভিন্ন শাখায় মাসিক চাঁদা দিয়ে চলে জাটকা নিধন। শরীয়তপুরের আড়তদারদের নাকি প্রতিদিন পুলিশের মেসে খাবারের জন্যও দিতে হয় মাছ। এর মধ্যেও চলে ‘নিয়ম রক্ষার’ জাটকা নিধনবিরোধী অভিযান। তবে অভিযানের খবর ‘বাতাসের আগেই’ যেন চলে যায় মাঝনদীতে জেলে নৌকায়। এসব জমজমাট জাটকা কারবারে ‘মাছের রাজা’ ইলিশের হয়ে যাচ্ছে মহাসর্বনাশ।

বন্যপ্রাণী পাচারের ‘ট্রানজিট’ বাংলাদেশ

০৩ মার্চ ২০২৪, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

প্যাটাগোনিয়ান মারা। কিছুটা খরগোশ ও কিছুটা হরিণের মতো দেখতে এই প্রাণীর আবাসস্থল দক্ষিণ আমেরিকার প্যাটাগোনিয়ার বিশাল এলাকাসহ আর্জেন্টিনার অনেক জায়গায়। এই তৃণভোজী স্তন্যপায়ী প্রাণীটি উপমহাদেশের এই অংশে কখনও পাওয়া গেছে এমনটা জানা যায় না।

কিন্তু ২০২১ সালের মার্চ মাসে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার তুষখালী সীমান্ত এলাকায় ফেলে রাখা বস্তা থেকে সাতটি বিপন্নপ্রায় প্রাণী উদ্ধার করেন সীমান্তরক্ষী সদস্যরা।

পরের বছর, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা থেকে উল্লুক, সজারু, মেছো বিড়াল, চিতা বিড়াল এবং কালো মথুরাসহ বিপুল সংখ্যক বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়। সর্বশেষ গত বছরের জানুয়ারিতে কক্সবাজারের চকরিয়া থেকে দুটি ভালুকের বাচ্চা উদ্ধার করা হয়।

এর আগে ২০১৮ সালে যশোরের শার্শা সীমান্তের কাছে একটি গোয়ালঘর থেকে নয়টি জেব্রা এবং ২০১৭ সালে যশোর থেকে দুটি সিংহ শাবক ও একটি চিতাবাঘ উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এর অর্থ হলো, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে অনেক বিদেশি ও বিপন্ন প্রজাতির প্রাণি এদেশে পাচার হচ্ছে কারণ; বন্যপ্রাণী পাচারের ট্রানজিট হটস্পট হিসাবে কাজ করছে বাংলাদেশ।

বাস থেকে হাজার কোটি টাকা ঘুষ-চাঁদা আদায়

০৬ মার্চ ২০২৪, সমকাল

ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা ঘুষ ও চাঁদা আদায় করা হয়। সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বাসের ফিটনেস ও অন্যান্য কাগজ হালনাগাদ করতে ৯০০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ঘুষ নেয়। মামলা থেকে বাঁচতে বাস মালিকরা হাইওয়ে এবং ট্রাফিক পুলিশকে ৮৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ঘুষ দেন। রাজনৈতিক পরিচয়ে চাঁদা তোলা হয় ২৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। মালিক ও শ্রমিক সংগঠন ১২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করে বাস থেকে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভার ইজারাদাররা পার্কিং ইজারার নামে ৩৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা চাঁদা তোলেন।

দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ‘ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস পরিবহন ব্যবসায় শুদ্ধাচার’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়েছে, মালিক-শ্রমিক সংগঠন সরকারের চেয়ে ক্ষমতাধর; চলছে অনিয়ম-দুর্নীতির মহোৎসব।

এ প্রতিবেদনকে ভুয়া আখ্যা দিয়ে বিআরটিএ চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার বলেছেন আজগুবি তথ্য দেওয়া হয়েছে। পুলিশও বলছে, প্রতিবেদনটি একপেশে। তবে যাত্রী কল্যাণ সমিতির ভাষ্য, ঘুষ ও চাঁদাবাজির অঙ্ক আরও অনেক বড়।

দেশের ২৪ শতাংশ বাসের ফিটনেস নেই

৫ মার্চ ২০২৪, মানবজমিন

সড়কে বাণিজ্যিকভাবে চলাচলকারী প্রত্যেকটি বাসের জন্য নিবন্ধন ও ৩ ধরণের সনদ বাধ্যতামূলক থাকলেও ৪০.৯ শতাংশ বাস কর্মী ও শ্রমিকদের মতে, সংশ্লিষ্ট কোম্পানির এক বা একাধিক বাসের নিবন্ধন সহ কোন না কোন সনদের ঘাটতি আছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

মঙ্গলবার (৫ মার্চ) সকালে ধানমন্ডির টিআইবি কার্যালয়ে ব্যক্তি মালিকানাধীন বাস পরিবহন ব্যবসায় শুদ্ধাচার শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়।

সংস্থাটির দাবি, ১৮.৯ শতাংশ বাসের নিবন্ধন, ২৪ শতাংশ বাসের ফিটনেস, ১৮.৫ শতাংশ বাসের ট্যাক্স টোকেন ও ২২ শতাংশ বাসের রুট পারমিট নেই।

টিআইবির গবেষক মুহা: নূরুজ্জামান ফারহাদ, ফারহানা রহমান ও মোহাম্মদ নূরে আলম গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেছেন।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বাস শ্রমিকদের দৈনিক প্রায় ১১ ঘন্টা কাজ করতে হয়। যাদের মধ্যে ৮২ শতাংশের কোন নিয়োগপত্র নেই, ৬৯.৩  শতাংশের নেই নির্ধারিত মজুরি। যাত্রী সেবা প্রসঙ্গে সংস্থাটি দাবি করেছে, জরিপে অংশগ্রণকারী ৭৫.৮ শতাংশ  যাত্রী, ৪৮ শতাংশ শ্রমিক এবং ৫১.৮ শতাংশ মালিক বাসের মাত্রাতিরিক্ত গতিকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

২২.২ শতাংশ কর্মী/শ্রমিকদের মতে, মদ্যপান বা নেশা জাতীয় দ্রব্য সেবন করে চালক গাড়ি চালান এবং কন্ডাক্টর/হেলপার/সুপারভাইজার বাসে দায়িত্ব পালন করেন – সিটি সার্ভিসের ক্ষেত্রে এ হার ৪৫.৯ শতাংশ এবং আন্তঃজেলার ক্ষেত্রে ১৯.২ শতাংশ বলে জানায় সংস্থাটি।

নির্দেশনার যথাযথ প্রয়োগের অভাবে চলন্ত বাসে চালকেরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে, ফলে অনেকসময় প্রাণহানিসহ দুর্ঘটনা ঘটে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। তবে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের সাথে বিআরটিএ’র প্রকাশিত তথ্যের গরমিল রয়েছে বলে উল্লেখ করে সংস্থাটি।

বিআরটিএ’র তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৫,০২৪ জন এবং যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যানুযায়ী এ সংখ্যা ৭,৯০২ জন।

ভরাট-দখলে বিলীন বুড়িগঙ্গার ১৬ কিলোমিটার: গবেষণা

০৫ মার্চ ২০২৪, প্রথম আলো

বুড়িগঙ্গা নদীর সম্পূর্ণ দৈর্ঘ্য ৪১ কিলোমিটার। এর মধ্যে ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার ওয়াশপুর থেকে হযরতপুর পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার ভরাট, দখল ও প্রবাহশূন্যতার শিকার হয়ে বিলীন হয়ে গেছে। বাকি ২৫ কিলোমিটার প্রবহমান রয়েছে। ‘বুড়িগঙ্গা: নিরুদ্ধ নদী পুনরুদ্ধার’ শীর্ষক এক গবেষণায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

 আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর শুক্রাবাদে দৃকপাঠ ভবনে গবেষণার ফল তুলে ধরেন প্রধান গবেষক ও নদীরক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন। ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এই গবেষণা চালানো হয়েছে। গবেষণায় জিপিএস ট্র্যাকিং ও সিএস ম্যাপ ব্যবহার ছাড়াও সরেজমিন তথ্য সংগ্রহ এবং অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে।

যৌথভাবে গবেষণাটি করেছে দৃক পিকচার লাইব্রেরি ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি। গবেষণা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস), রিভারাইন পিপল, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), দ্য ডেইলি স্টার ও পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকভাবে বুড়িগঙ্গার সম্পূর্ণ অংশ শনাক্ত ও চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। নদীটির প্রকৃত উৎসমুখ ও দৈর্ঘ্য নিয়ে বিভ্রান্তি ছিল। যেমন পানি উন্নয়ন বোর্ড ২৯ কিলোমিটার, বিআইডব্লিউটিএ ৪৫ কিলোমিটার, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ২৯ কিলোমিটার এবং পর্যটন করপোরেশন ২৭ কিলোমিটার হিসেবে বুড়িগঙ্গার দৈর্ঘ্য উল্লেখ করেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, কেরানীগঞ্জের হযরতপুর ইউনিয়নের ধলেশ্বরী নদী বুড়িগঙ্গার উৎপত্তিস্থল। নদীটি সমাপ্ত হয়েছে কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ইউনিয়নের জাজিরা বাজারের কাছে ধলেশ্বরী নদীতে। এর মোট দৈর্ঘ্য ৪১ কিলোমিটার। ১৯১২ সালে যতীন্দ্রমোহন রায়ের লেখা ‘ঢাকার ইতিহাস’ বইয়েও বুড়িগঙ্গার দৈর্ঘ্য ৪১ কিলোমিটার বলে উল্লেখ রয়েছে।

বুড়িগঙ্গার প্রবহমান ২৫ কিলোমিটার অংশে সীমান্ত পিলার আছে এবং শুকনা ১৬ কিলোমিটার অংশে সীমান্ত পিলার নেই বলে জানান শেখ রোকন। তিনি বলেন, বুড়িগঙ্গার ১৬ কিলোমিটার সরকারি নথি থেকে মুছে দেওয়ার মধ্য দিয়ে দখলকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। এই শুকনা অংশে সীমান্ত পিলার দেওয়া হয়নি। পিলার দেওয়া হয়েছে কেবল বুড়িগঙ্গার প্রবহমান অংশে। প্রবহমান অংশে এক হাজারের মতো পিলার পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৭০০ পিলার অক্ষত অবস্থায় নেই।

অনলাইনে নামজারি, পদে পদে হয়রানি

১০ মার্চ ২০২৪, সমকাল

জমির নামজারির ক্ষেত্রে ডিজিটাইজেশনের কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ভূমি মন্ত্রণালয় ঘটা করে ঘোষণা দিচ্ছে সেবাগ্রহীতাদের দুর্ভোগ কমাতে সব ক্ষেত্রে ডিজিটাইজেশন বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কিন্তু জমি ও ফ্ল্যাটের নামজারির ক্ষেত্রে পদে পদে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন গ্রাহকরা।

নামজারির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র স্ক্যান করে অনলাইনে জমা দেওয়ার পরও সেগুলোর হার্ড কপি এসিল্যান্ড অফিসে দিতে হয়। আবেদন গ্রহণ করার পর এসিল্যান্ড অফিস থেকে শুনানির দিন ধার্য করা হয়। এ ব্যাপারে মোবাইলে এসএমএস পাঠানো হলেও কার কখন শুনানি হবে, তা উল্লেখ করা হয় না। সেবাপ্রত্যাশীরা সকাল থেকে সারাদিন বসে থাকার পরও অনেককে ওই দিন শুনানির জন্য ডাকা হয় না। কাউকে কাউকে পুনরায় আবেদন করতে বলা হয়। আবার এসব বিষয়ে অনলাইনে সঠিক তথ্য মেলে না।

অভিযোগ উঠছে ধাপে ধাপে হয়রানির ফাঁদ পেতে রাখা হচ্ছে ঘুষ আদায়ের জন্য। সরেজমিনও মিলেছে এর প্রমাণ।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, রাজধানীর এসিল্যান্ড অফিসে নামজারির আবেদনের জন্য গেলেই দেখা মেলে সুযোগসন্ধানী লোকদের। নানা ঝামেলার কথা শুনিয়ে এক পর্যায়ে চাওয়া হয় ঘুষ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সেবাপ্রত্যাশী সমকালকে বলেন, তিনি জমির নামজারির জন্য ধানমন্ডির এসিল্যান্ড অফিসে যাওয়ার পর ফ্রন্ট ডেস্কের সহকারী পরিচয় দেওয়া আবদুল মতিন কথা বলার এক পর্যায়ে ২০ হাজার টাকা চান। টাকা দিলে পুরো কাজটিই করে দেবেন বলে জানানো হয়। তবে সামর্থ্য না থাকায় তিনি এত টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি কাগজপত্র জমা দিয়েছেন অনেক দিন হলো, কিন্তু কোনো কূলকিনারা পাচ্ছেন না।

সূত্র জানায়, নামজারির আবেদন ফি ৭০ টাকা। আবেদনটি গ্রহণ করা হলে ডিসিআর ফি বাবদ ১ হাজার ১০০ টাকা জমা দিতে হয়। এর বাইরে আর অর্থ খরচের বিষয় নেই। কিন্তু প্রতিটি এসিল্যান্ড অফিসে নানা কৌশলে আদায় করা হয় বড় অঙ্কের অর্থ।

‘জালিয়াতি’ করে তারা সড়কের বড় ঠিকাদার

১০ মার্চ ২০২৪, প্রথম আলো

সড়কের যে পাঁচ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশিসংখ্যক কাজ পায়, তাদের তিনটিই জালিয়াত হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। নতুন নতুন ঠিকাদারি কাজ পেতে তারা নথি জাল করেছে বলে উঠে এসেছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের তদন্তে। দুটির বিরুদ্ধে অধিকতর তদন্ত চলছে।

সওজ সূত্র জানিয়েছে, তারা মোট ২৬টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতি পেয়েছে। এর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানসহ ছয়টিকে বিভিন্ন মেয়াদে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

প্রথম আলোতে গত বছরের ১৪ অক্টোবর ‘সড়কের ৫১% কাজ পেয়েছেন ‘‘প্রভাবশালীদের ঘনিষ্ঠ ’’৫ ঠিকাদার’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সড়কে গুটিকয়েক ঠিকাদারের বেশির ভাগ কাজ পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে গত বছরের ৬ নভেম্বর উচ্চ আদালতে একজন আইনজীবী রিট আবেদন করেন। আদালতের নির্দেশে গত ১৯ নভেম্বর সওজ তদন্ত কমিটি গঠন করে।

২৬টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতি পেয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। ৬টিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম রেজাউল করিমকে প্রধান করে গঠিত দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গত জানুয়ারি মাসে প্রতিবেদন জমা দেয়। ফেব্রুয়ারি থেকে ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়।

সওজের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা তদন্ত করে কিছু জালিয়াতি পেয়েছেন, ব্যবস্থাও নিয়েছেন। এটা চলমান প্রক্রিয়া। আরও যাচাই-বাছাই চলছে। যাদেরই জালিয়াতি পাওয়া যাবে, ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জালিয়াতিতে বড়রা

সওজ সূত্র জানিয়েছে, যে ২৬টি প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতি পাওয়া গেছে, তারা সড়কের ৯০ শতাংশের বেশি ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। যদিও সড়কে কাজ করা ঠিকাদারের মোট সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ১০০।

জালিয়াতি চার ধরনের: ১. জাল কর্মসম্পাদন সনদ জমা দেওয়া। অর্থাৎ যে ঠিকাদারি কাজ তারা করেনি, সেগুলোও উল্লেখ করেছে। ২. টাকার অঙ্কে কাজের পরিমাণ বেশি দেখানো। ৩. কাজ শেষ করেছে দেরিতে, কিন্তু দেখিয়েছে তারা যথাসময়ে কাজ করেছে। ৪. আর্থিক সক্ষমতা দেখাতে একটি দরপত্রে একই সনদ বারবার জমা দেওয়া। ৫. যৌথ উদ্যোগের ভুয়া তথ্য জমা দেওয়া।

সওজ সূত্র জানিয়েছে, যে ২৬টি প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতি পাওয়া গেছে, তারা সড়কের ৯০ শতাংশের বেশি ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। যদিও সড়কে কাজ করা ঠিকাদারের মোট সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ১০০।

কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), গণপূর্ত অধিদপ্তর, বাংলাদেশ রেলওয়েসহ বিভিন্ন সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতার সনদ জমা দিয়েছে, যার মধ্যে জাল সনদ রয়েছে।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে এসেছিল ২০২২-২৩ অর্থবছরে সওজর ৫১ শতাংশ কাজ পেয়েছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আবেদ মনসুর কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, মুহাম্মদ আমিনুল হক প্রাইভেট লিমিটেড, মোজাহার এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড, মো. মাহফুজ খান লিমিটেড ও হাসান টেকনো বিল্ডার্স লিমিটেড।

আবেদ মনসুর কনস্ট্রাকশনের জালিয়াতির বিষয়ে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে সাতক্ষীরা এবং একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাগেরহাট সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দুটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ৫৬টি সনদ জমা দিয়েছিল, যা ছিল জাল।

দরপত্রবিষয়ক তথ্যভান্ডার টেন্ডার ডেটাবেজ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (টিডিএমএস) তথ্য বলছে, বিগত পাঁচ বছরে সওজে সবচেয়ে বেশি ৩ হাজার ১০০টি ঠিকাদারি কাজ পেয়েছে আবেদ মনসুর কনস্ট্রাকশন। কাজগুলো টাকার অঙ্কে ছোট। সম্মিলিত পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। তারা ঢাকা অঞ্চলে বেশি কাজ পেয়েছে।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে এসেছিল ২০২২-২৩ অর্থবছরে সওজর ৫১ শতাংশ কাজ পেয়েছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আবেদ মনসুর কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, মুহাম্মদ আমিনুল হক প্রাইভেট লিমিটেড, মোজাহার এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড, মো. মাহফুজ খান লিমিটেড ও হাসান টেকনো বিল্ডার্স লিমিটেড।

জালিয়াতির বিষয়ে আবেদ মনসুর কনস্ট্রাকশন কর্তৃপক্ষের কারও বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। সওজ সূত্র জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটিকে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ সময়ে তারা সড়কে কোনো ঠিকাদারি কাজ পাবে না।

সওজে বেশি কাজ পাওয়া আরেক ঠিকাদার হাসান টেকনো। তারা পাঁচ বছরে পাঁচ শতাধিক ঠিকাদারি কাজ করেছে, যার অর্থমূল্য প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। তদন্তে এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন ধরনের জাল সনদ জমা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। যেমন হাসান টেকনো ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চারটি কাজ করে ১২০ কোটি টাকা বিল পাওয়ার অভিজ্ঞতা দেখায় আরেকটি দরপত্রে। যদিও ওই কাজগুলো তারা করেনি।

জালিয়াতির দায়ে হাসান টেকনোকে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক নাজমুল হাসান গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর টুকটাক ভুল আছে। যেসব ঠিকাদারি কাজে তিনি যৌথভাবে অংশ নিয়েছিলেন, সেগুলো নিয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন। কারণ, তাঁর অংশীদার আবেদ মনসুর কনস্ট্রাকশনসহ অন্যরা ভুয়া নথি জমা দিয়েছে।

সড়কের আরেক শীর্ষস্থানীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোজাহার এন্টারপ্রাইজকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে আগামী জুন পর্যন্ত। বিগত পাঁচ বছরে মোজাহার এন্টারপ্রাইজ সড়কে প্রায় ১ হাজার ২২০টি ঠিকাদারি কাজ করেছে, যার অর্থমূল্য প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে মেসার্স সালেহ আহমেদ ও জামান এন্টারপ্রাইজ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানকে দুই বছর এবং মাসুদ হাইটেক ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে আগামী জুন পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হয়।

কামরাঙ্গীরচরে দক্ষিণ সিটির প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন তুললেন বাসিন্দারা

০৮ মার্চ ২০২৪, প্রথম আলো

সেবামূলক কাজ করা সিটি করপোরেশনের কাজ। তা না করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে বসবাসরত প্রায় ২০ লাখ বাসিন্দাকে উচ্ছেদ করে সেখানে কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক অঞ্চল করতে চায়। শত বছর ধরে বসবাসরত ওই সব বাসিন্দাকে বাস্তুচ্যুত করে এমন প্রকল্প নেওয়া কতটা যৌক্তিক।

আজ শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘ড্যাপ-কামরাঙ্গীরচর, অপ্রয়োজনীয় উন্নয়ন এবং জনগণের ভাবনা’শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে কামরাঙ্গীরচর এলাকার বাসিন্দারা এ প্রশ্ন তোলেন। কামরাঙ্গীরচর নাগরিক পরিষদের ব্যানারে এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

গোলটেবিল বৈঠকে তাঁরা বলেন, গত বছরের ১১ অক্টোবর কামরাঙ্গীরচর এলাকায় এক অনুষ্ঠানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছিলেন, কামরাঙ্গীরচরে কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক অঞ্চল হবে। ওই দিন তাঁরা জানতে পেরেছেন পুরো এলাকার ২০ লাখ বাসিন্দাকে বাস্তুচ্যুত করে সেখানে এই প্রকল্প নেওয়া হবে। সেখানে ১ হাজার ২০০ একর জমি অধিগ্রহণ করে ৫০তলা ভবন নির্মাণ করা হবে বলেও তাঁরা মেয়রের বক্তব্যে জানতে পেরেছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের না জানিয়ে এমন প্রকল্প নেওয়ায় তাঁরা উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।

কামরাঙ্গীরচরে কী ধরনের প্রকল্প হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানতে নানা মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন জানিয়ে বৈঠকে ওই এলাকার বাসিন্দারা বলেন, কখন, কীভাবে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন হবে, তাঁরা এখন পর্যন্ত জানতে পারেননি। এমন পরিস্থিতিতে সিটি করপোরেশন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কাছে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছে, কামরাঙ্গীরচরে যাতে ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়া না হয়। সিটি করপোরেশনের চিঠি পেয়ে রাজউক এখন আর কামরাঙ্গীরচরে ভবন নির্মাণের অনুমতি দিচ্ছে না।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত কামরাঙ্গীরচর এলাকা। এই এলাকায় ২০ হাজারের বেশি ভবন রয়েছে। মিশ্র ভূমি ব্যবহারের এই এলাকায় শত শত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প রয়েছে।

গত ১১ অক্টোবর কামরাঙ্গীরচরের লোহার ব্রিজ থেকে নিজামবাগ বেড়িবাঁধ পর্যন্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট কামরুল সরণির নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছিলেন, ‘তুলনামূলক পিছিয়ে পড়া এলাকা রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে পাঁচ তারকা হোটেল বানানো হবে।’ তিনি আরও বলেন, ওই এলাকায় পরিকল্পিত আবাসন, কনভেনশন হল, ৫০ তলাবিশিষ্ট নান্দনিক ভবনসহ অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। বুড়িগঙ্গা নদীর তীর হয়ে চার সারির সড়ক নির্মাণ করা হবে। এভাবেই কামরাঙ্গীরচরকে একটি আধুনিক নগরীতে পরিণত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

কামরাঙ্গীরচর এলাকায় ঢাকা দক্ষিণ সিটির এমন পরিকল্পনার প্রতিবাদেরই আজ এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বৈঠকে কামরাঙ্গীরচর এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ৫০ থেকে ৬০ বছর ধরে কামরাঙ্গীরচরে বসবাস করে আসছেন। দক্ষিণ সিটির এই প্রকল্পকে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি তাঁদের উচ্ছেদ করা হয়, তাঁরা কোথায় যাবেন?

শাহ আলম নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘মেয়র তাঁদের বলেছেন, “তোমরা টাকা পাবা অন্য জায়গায় গিয়ে থাকবা।” এটা অবাস্তব পরিকল্পনা। এটা বাতিল করতে হবে।’

ধরে নিয়ে কিস্তিতে ঘুষ নেয় পুলিশ

১৩ মার্চ ২০২৪, কালবেলা

পরনে জিন্সের প্যান্ট, গায়ে গোল গলার গেঞ্জি, কানে ব্লুটুথ ডিভাইস, মাথায় গোল ক্যাপ। পেছনে ঝোলানো ছোট ট্রাভেল ব্যাগ। দেখে মনে হতে পারে কোনো ব্যান্ড দলের গায়ক কিংবা কমেডি মুভির নায়ক। তবে এসবের কিছুই তিনি নন। এই ব্যক্তি রাজধানীর তুরাগ থানাধীন দিয়াবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. ওয়াসিম। এমনই বেপরোয়া চলাফেরা তার। এই এসআইর অত্যাচারে ফাঁড়ি এলাকায় বসবাসকারীরা অতিষ্ঠ। অসংখ্য মানুষকে ধরে বিনা অপরাধে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অযথা কাউকে ধরে আনার পর যদি দেখেন ওই ব্যক্তির কাছে টাকা নেই, তাহলে বাকিতে ছেড়ে দিয়ে তিনি ঘুষ নেন কিস্তিতে। ঘুষের টাকা নির্ধারণ করতে ফাঁড়ির ইনচার্জ (আইসি) উপপরিদর্শক টিএম আলামিন সিভিল এভিয়েশনের গার্ড রুমে বসান ‘আদালত’; ‘বিচারক’ তিনি নিজেই। এরপর ঘুষের টাকা নির্ধারণ করে কিস্তিতে তা তোলেন এএসআই ওয়াসিম।

পুলিশের এই বেপরোয়া কর্মকর্তা ওয়াসিমের একটি কল রেকর্ড এসেছে কালবেলার হাতে। সেখানে এক ভুক্তভোগীকে বলতে শোনা যায়, ‘আসসালামু আলাইকুম স্যার।

টাকা ১৭ হাজার তো মিলাইবার পারছি না। কালকে মিলাই দিই? ওই কর্মকর্তা বলেন, বুঝি নাই।’ তখন ভুক্তভোগী বলেন, ‘টাকা তো সব মিলাইবার পারছি না।’ ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘তোরে মাইরালামু; কিন্তু এ্যাকে বারে মাইরা ফেলামুরে। স্যার, মারেন কাটেন যা করেন; আল্লাহ যদি বাঁচাই রাখে কালকে টাকা দিয়া আমু। এত কথা কয়া অবে না। তোরে তাড়াতাড়ি আইতে কইছি, তুই আয়।’

এ ছাড়া আরও কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ এসেছে কালবেলার হাতে। একটি ফুটেজে দেখা যায়, গত শনিবার রাত ৮টার দিকে বাউনিয়ার একটি গ্যারেজ থেকে পুলিশের সোর্স হিসেবে পরিচিত লাইনম্যান জসিম ৫০০ টাকা করে তুলছেন। প্রতি শনিবার ফাঁড়ির পুলিশের নাম বলে বাউনিয়া এলাকার প্রায় শতাধিক গ্যারেজ থেকে তোলা হয় এই টাকা। এ ছাড়া বৈধ-অবৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ইজিবাইক (মিশুক) ও অটো গ্যারেজ, লেগুনা স্ট্যান্ড, পাকার মাথার অটোস্ট্যান্ড, বটতলা ফুটপাতে বসা ফুচকার দোকান, চা দোকানসহ বিভিন্ন ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকে মাসে অন্তত কয়েক লাখ টাকা তোলা হয় বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা।

আইসি আলামিনের ‘আদালত’: গত ২৮ ও ২৯ ফেব্রুয়ারি সারাদিন সরেজমিন দিয়াবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ি এলাকার বাউনিয়া দক্ষিণ ও উত্তর পাড়া, বটতলা, সুলতান মার্কেট, বাউনিয়া বাজার, বাদালদি, উলুদাহা, তাফালিয়াসহ কয়েকটি এলাকা ঘুরে অন্তত ২০ ভুক্তভোগীর সন্ধান পায় কালবেলা। তারা কালবেলাকে নগদ-বাকিতে আসামি ছাড়ার বিস্তারিত জানান।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সোর্সের সহায়তায় নিজেদের খেয়ালখুশিমতো ব্যক্তিদের টার্গেট করে প্রথমে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় বাউনিয়া বটতলার সিভিল এভিয়েশনের গার্ড রুমে। এরপর সেখানে ফাঁড়ি ইনচার্জ (আইসি) সালিশ বসান। ওই সালিশি সভায় রাজাসনে বসেন আইসি আলামিন নিজেই। জরিমানা করা হয় খেয়ালখুশিমতো। তাৎক্ষণিক কেউ সেই টাকা দিতে না পারলেও কোনো সমস্যা নেই। সুযোগ রয়েছে কিস্তিতে পরিশোধের। এই গার্ড রুমের সালিশির ভিডিও কালবেলার হাতে রয়েছে। তবে কেউ কথা না শুনলে নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ। ভয়ভীতি দেখিয়ে ও মিথ্যে মামলা দিয়ে নানাভাবে করা হয় হয়রানি।

সরেজমিন খুঁজে পাওয়া যায় কল রেকর্ডের সেই ব্যক্তিকেও। তার নাম মো. জাবেদ। পেশায় রিকশাচালক। জাবেদের স্ত্রী গার্মেন্টসে কাজ করেন। জানতে চাইলে ভুক্তভোগী জাবেদ কালবেলাকে বলেন, ‘রাস্তা থাইকা ধইরে নিয়া যায় ওয়াসিম স্যার। পরে বলে আমি না কি মাদক বেচি। আমার কাছে ২০ হাজার টাকা দাবি করে। না দিলে মাদক দিয়ে চালান দেবে বলে জানান। মামলার ভয়ে ধারকর্জ করে ৩ হাজার টাকা জোগাড় করে দিই ওয়াসিম স্যারকে। বাকি ১৭ হাজার টাকা রিকশা বিক্রি করে দিতে বলে আমাকে ছেড়ে দেয়।’

মাদক কারবারিদের টাকায় ডিএনসির ‘পিকনিক’

০৯ মার্চ ২০২৪, দেশ রূপান্তর

গাজীপুরের টঙ্গীর কেরানিরটেক বস্তির ইব্রাহিম মারুফ সিনথিয়ার কাছ থেকে ২ লাখ, বাতেরটেক বস্তির সেলিম মিয়ার কাছ থেকে ২ লাখ এরকম বিভিন্নজনের কাছ থেকে চাঁদা তুলে জমকালো পিকনিকের আয়োজন করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। এসব ব্যক্তি মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত।

গত ২ মার্চ গাজীপুরের ছুটি রিসোর্টে এই পিকনিকের আয়োজন করা হয়। তবে পিকনিকের জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে কোনো চাঁদা নেয়নি ডিএনসি। পিকনিকে যোগ দিয়েছেন কিন্তু ৮০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এই পিকনিক আয়োজন করেন ঢাকা বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মুজিবুর রহমান পাটোয়ারী এবং গাজীপুর জেলার উপপরিচালক মেহেদী হাসান। তারাই পিকনিকের সব ব্যয়ভার বহন করেন। বিপুল এ ব্যয়ের উৎস বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করে পাওয়া অর্থ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএনসির কয়েকজন কর্মচারী দেশ রূপান্তরকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

মিটার রিডারদের হাতে বিলের ‘ চোরা চাবি’

১৯ মার্চ ২০২৪, সমকাল

কখনও বাণিজ্যিক ভবন হয়ে যাচ্ছে আবাসিক, কখনও ভবন নির্মাণের তথ্য হচ্ছে গুপ্ত। আবার কেউ মিটার খুলে রেখে পানির বিল কমিয়ে দেওয়ার ধান্দায় ব্যস্ত। গভীর নলকূপের তথ্য লুকাতে কেউ হয়ে ওঠেন ‘গভীর জলের মাছ’। ওয়াসার পানি ব্যবহারে এমন ছলাকলায় খোদ মিটার রিডাররাই অতিশয় দক্ষ। পানির বিল নিয়ে রকমারি কাণ্ড করে ফায়দা লুটছেন ওয়াসার এসব অসাধু বিলিং সহকারী; করছেন নিজের পকেট ভারী।

ওয়াসার পানিকাণ্ডে কালেভদ্রে দুয়েকজন শাস্তির মুখোমুখি হলেও অনেকে ছড়ি ঘুরিয়েই যাচ্ছেন। ভবন মালিক, মিটার রিডারদের তদারককারী সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও), রাজস্ব কর্মকর্তা এবং ওয়াসার দুয়েকজন অসাধু বড় কর্তাও এমন অনিয়মের সঙ্গী।

এসব কারসাজির দাঁড়ি টানতে তিন মাস অন্তর মিটার রিডারদের এলাকা বদলের নির্দেশনা থাকলেও অনেকে বছরের পর বছর খুঁটি গেড়েছেন। ফলে পানির বিল নিয়ে অনিয়মের বল্গা ছুটছেই। অবশ্য ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বলছে, দুর্নীতির ব্যাপারে শূন্য সহনশীল নীতি নিয়েছে তারা। সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা।

এদিকে, এ ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পেয়ে গত ১১ মার্চ ঢাকা ওয়াসার মডস জোন-৪ ও ১০-এ (মিরপুর এলাকা) অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযানকালে গত তিন মাসে বিচ্ছিন্ন করা সংযোগ ও নতুন সংযোগ দেওয়া হোল্ডিংয়ের তালিকা সংগ্রহ করে দলটি। এ ঘটনায় দেলোয়ার নামে এক বিলিং সহকারীকেও বরখাস্ত করে ঢাকা ওয়াসা।

জবানবন্দিতে কাকে কাকে দায়ী করেছিলেন হল-মার্কের তানভীর

২০ মার্চ ২০২৪, প্রথম আলো

স্বাধীনতার পর ব্যাংক খাতে ঋণ কেলেঙ্কারির তালিকা করলে সেটি বেশ লম্বাই হবে। একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে, যার বেশির ভাগেরই কোনো সুরাহা হয়নি। আত্মসাৎ করা অর্থও উদ্ধার হয়নি। তবে নানা কারণে এই তালিকায় ওপরের দিকেই থাকবে সোনালী ব্যাংকের হল-মার্ক কেলেঙ্কারি। কেলেঙ্কারির সেই ঘটনা ছিল ২০১১ ও ২০১২ সময়ের।

রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি, ব্যাংকের পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা এবং কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী মিলে কীভাবে ব্যাংক থেকে অর্থ আত্মসাৎ করা যায়, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ এই হল-মার্ক কেলেঙ্কারি। আবার একটি ব্যাংকের মাত্র একটি শাখা থেকে সর্বোচ্চ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা হিসেবেও এটা সবচেয়ে বড়। বলা যায়, সবার চোখের সামনে থেকেই কেলেঙ্কারির এ ঘটনা ঘটেছিল।

সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা (আগে ছিল শেরাটন শাখা, সে সময় এর নাম ছিল রূপসী বাংলা শাখা) থেকে জালিয়াতি করে অর্থ আত্মসাতের পরিমাণ ৩ হাজার ৬০৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে একা হল-মার্কই তুলে নেয় ২ হাজার ৬৬৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। একটি ব্যাংকের একটি শাখায় একটি কোম্পানির এই পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা আর কোথাও ঘটেছে বলে ব্যাংকিং খাতের কেউ এখনো বলতে পারেননি।

হল-মার্ককে প্রথম ঋণ দিয়েছিল পরিচালনা পর্ষদই। এই সুযোগ নিয়ে রূপসী বাংলা শাখা নিয়মিতভাবে হল-মার্ক গ্রুপকে জালিয়াতি করতে সব ধরনের সহায়তা দিয়েছে। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট বেশির ভাগ কর্মকর্তা এই জালিয়াতির সুযোগ করে দেন। জালিয়াতির ঘটনা যাতে উদ্‌ঘাটিত না হয়, সে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। হাতে গোনা কয়েকজন কর্মকর্তা জালিয়াতির কথা জানতে পেরে তা উদ্‌ঘাটনের ব্যবস্থা নিলে তাঁদের বদলি করা হয় এক দিনের নোটিশে। রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাশালীদের পৃষ্ঠপোষকতাও ছিল। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর একাধিক উপদেষ্টা, একজন প্রতিমন্ত্রীর নামও পাওয়া গিয়েছিল।

রূপসী বাংলা শাখার ব্যবস্থাপক উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) এ কে এম আজিজুর রহমান এ ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করেছেন। তবে তাঁকে সহায়তা করেছিলেন ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হুমায়ুন কবীরসহ ঊর্ধ্বতন অনেক কর্মকর্তাই। আজিজুর রহমান আটক অবস্থায় মারা গেছেন।

হল-মার্ক গ্রুপের এমডি ছিলেন তানভীর মাহমুদ আর চেয়ারম্যান ছিলেন তাঁর স্ত্রী জেসমিন ইসলাম। এক যুগ আগের এই ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় করা এক মামলায় গতকাল মঙ্গলবার তানভীর মাহমুদ, জেসমিন ইসলামসহ ৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১-এর বিচারক আবুল কাসেম। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, যে অপরাধীরা দেশের জনগণের আমানত, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা, দেশের অর্থনীতিকে খেলো মনে করে, তাঁদের মৃত্যুদণ্ডের মতো সাজা হওয়া উচিত বলে আদালত মনে করেন। তবে সংশ্লিষ্ট আইনে এই অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন, তাই তাঁদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া অন্য সাতজন হলেন তানভীরের ভায়রা হল-মার্ক গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক তুষার আহমেদ, টি অ্যান্ড ব্রাদার্সের পরিচালক তসলিম হাসান, ম্যাক্স স্পিনিং মিলসের মালিক মীর জাকারিয়া, প্যারাগন গ্রুপের এমডি সাইফুল ইসলাম রাজা, সাইফুল হাসান, নকশি নিটের এমডি মো. আবদুল মালেক ও আবদুল মতিন।

দণ্ডিত বাকি আট আসামি হলেন সাভারের হেমায়েতপুরের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. জামাল উদ্দিন সরকার, সোনালী ব্যাংক ধানমন্ডি শাখার জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুন্নেসা মেরি, সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সাবেক মহাব্যবস্থাপক ননী গোপাল নাথ ও মীর মহিদুর রহমান, প্রধান কার্যালয়ের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন কবির, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মাইনুল হক, উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) সফিজউদ্দিন এবং এজিএম মো. কামরুল হোসেন খান। এই আটজনের মধ্যে জামাল উদ্দিনের পাঁচ বছর কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বাকিদের ১৭ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

তানভীর মাহমুদের সেই জবানবন্দি

হল-মার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় মামলা হয়েছিল একাধিক। এর মধ্যে এক মামলায় ২০১২ সালের ১৮ আগস্ট ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দি দিয়েছিলেন তানভীর মাহমুদ। নিজেকে অনেকটা নির্দোষ দাবি করলেও কেলেঙ্কারির নানা বিবরণ দিয়েছিলেন সেই জবানবন্দিতে। সেখানে তিনি বলেছিলেন,

‘আমি ব্রাহ্মণপাড়া স্কুল থেকে ১৯৮৭ সালে মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি এবং ১৯৮৯ সাল আখাউড়া শহীদ স্মৃতি ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করি। ১৯৯৬ সালের শেষ দিকে বাবার কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়ে—পাঁচ হাজার টাকা ভাড়ায়, ২৫ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে কাফরুলের ১৯০/২ তালতলায় হল-মার্ক প্যাকেজিং ফ্যাক্টরি দিয়ে ব্যবসা শুরু করি। তারপর ধীরে ধীরে আমার ব্যবসা বাড়তে থাকে। ২০০৮ সালে ৮–৯টি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে আমি হল-মার্ক গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করি। বর্তমানে আমার ৬৫টি চলমান প্রতিষ্ঠান আছে। এর মধ্যে গার্মেন্টস ৩৪টি। সব কটি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে বর্তমানে আমার প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক আছে। গত ২০০৪–০৫ সালের দিকে গার্মেন্টস থেকে লোকাল ব্যাক টু ব্যাক এলসি পাওয়ার পর আমি সোনালী ব্যাংকের হোটেল শেরাটন শাখায় হল-মার্ক প্যাকেজিংয়ের নামে হিসাব খুলি। বর্তমানে এই শাখায় আমার ৫৭টি হিসাব রয়েছে। বর্তমানে ১৮টি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে এই লায়াবিলিটি (দায়বদ্ধতা) রয়েছে। ২০১০ পর্যন্ত আমার ব্যবসা ভালো (ফেয়ার) ছিল।

সাইফুল ইসলাম রাজা আগে আমার জিএম ছিল। পরে প্যারাগন গ্রুপের মালিক হয়। আবদুল মালেক আমার ব্যবসার পরিচালক ছিল। কিছুদিন আগে সে নকশি নিট কম্পোজিট নামে গোপনে ব্যবসা শুরু করে। তসলিম হাসান টি অ্যান্ড ব্রাদার্স গ্রুপের পরিচালক। আমার পক্ষে সব ব্যাংক হিসাব দেখত রাজা ও মালেক। অনেক সময় আমি তাদের কাছে ব্যাংক চেক দিয়ে রাখতাম। তসলিম হোসেন আগে থেকেই ভুয়া এলসির কাজ করত। আমার দুই লোক রাজা ও মালেক এই তসলিমের সঙ্গে মিলে কিছু একটা করতে পারে, আমি বিষয়টি পরে জানি। এর মাঝে তারা আমার কিছু সই জাল করে। এর মধ্যে ২০১২ সালের প্রথম দিকে হিসাবমতে আমার লায়াবিলিটি দাঁড়ায় ২০০০ কোটির ওপরে।

হোটেল শেরাটন শাখার ম্যানেজার আজিজ, এজিএম সাইফুল হাসান ও ব্যাংকের সাবেক অফিসার মতিন, অফিসার ওয়াহিদুজ্জামান (অবসরপ্রাপ্ত), ক্যাশ অফিসার সাইদুরের এসব কাজে যোগসাজশ ছিল। আমাকে বিভিন্ন দফায় সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের আতিকুর রহমান (এমডি চলতি দায়িত্ব), জিএম কার্যালয়ের জিএম ননী গোপাল, মীর মহিদুর, ডিএমডি সাইফুল ইসলাম, জিএম সিরাজী ফেব্রুয়ারি ২০১২–এর দিকে ডাকলে আমি সব দায় স্বীকার করি। আমি বলি, আমার এগুলো লিমিট করে কিস্তি করার জন্য। আমি আরও বলি, আমি সব টাকা পরিশোধ করে দেব এবং প্রয়োজনীয় মর্টগেজ যা লাগে আমি দেব। ৪–৫ দিন পর তারা বোর্ড থেকে একটা সার্কুলার করে শেরাটন শাখায় পাঠায়। তখন ম্যানেজার আজিজ ৪০টা কোম্পানির নামে আইবিপি (ইনল্যান্ড বিল পারচেজ) স্যাংশন করে প্রতিটি কোম্পানির নামে ৩০ কোটি টাকা করে।

২০১২ সালের সম্ভবত এপ্রিলে তসলিম, মালেক, রাজা, ম্যানেজার আজিজ সাহেব, ডিএনএ স্পোর্টসের মালিক শিখা আমাকে ব্যাংকের বারান্দায় ডেকে নিয়ে বলে, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ম্যানেজ করতে তিন কোটি টাকা লাগবে।

২৪ মে (পরে বলে এপ্রিলে) বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিট দল এলে আমাকে ডাকে। তারা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে, আমি কীভাবে এত টাকা নিয়েছি। আমি বলি আমি বৈধভাবে নিয়েছি। এটার দায়দায়িত্ব আজিজ সাহেবের। ২৪ মে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আমার সঙ্গে সব ব্যবসা বন্ধ করে দিয়ে বলে টাকা সমন্বয় করতে। নতুন এমডি এসে আমাকে ডাকে। সেখানে ডিএমডি ইকবালসহ সাবেক জিএমরা এবং নতুন ম্যানেজার আবুল কাশেম (আজিজ সাহেব বরখাস্ত হওয়ায়) ছিল। তারা আমাকে টাকা সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় জমি মর্টগেজ বা বন্ধক রাখতে বলে। গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি বিভিন্নভাবে ৪৫২ কোটি টাকা পরিশোধ করি। ৬১ একর জমি বন্ধক দিয়েছি। ব্যাংকের তথ্যমতে আমার মোট দায় ২ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। ৪৫২ কোটি দেওয়ার পর দায় থাকে ২ হাজার ২০২ কোটি টাকা। মর্টগেজ দেওয়া ৬১ একর জমির বর্তমান বাজারমূল্য ২ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা।

গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন জায়গায় ২৪টি চিঠি দিয়ে আমার ব্যবসা চালু করাসহ টাকা পরিশোধের জন্য ২০ বছর কিস্তি চাই। কিন্তু কোনো চিঠির উত্তর পাইনি। তবে দুদকের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ব্যাংক একটি চিঠি দিয়ে ১৫ দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধের চিঠি দেয়। যা অবাস্তব বলে আমি উত্তর দিই। গ্রেপ্তার হওয়ার পরও আমি আরও মর্টগেজসহ টাকা পরিশোধের কিস্তি চাই এবং ব্যবসা করার সুযোগ চাই। আমি কোনো টাকা বিদেশে পাচার করিনি। আমি টাকা নিয়ে শুধু ইন্ডাস্ট্রি করেছি। আমি আমার জীবনে চিকিৎসার জন্য শুধু একবার সিঙ্গাপুর গিয়েছি।

যাই হোক, এই জালিয়াতির সঙ্গে ব্যাংক ম্যানেজার আজিজ, এজিএম সাইফুল হাসান, অফিসার মতিন, অবসরপ্রাপ্ত ওয়াহিদুজ্জামান, ক্যাশ অফিসার সাইদুর জড়িত ছিল। আমার পরবর্তী জিএম তুষারের মাধ্যমে তসলিম, রাজা ও মালেক—এই তিনজন ব্যাংকের কাঁচা রেজিস্ট্রারে এন্ট্রি করে এসব কর্মকর্তাকে বিভিন্ন সময় টাকা দিত। এটা তুষারও জানত। শাখার কর্মকর্তাদের এভাবে আনুমানিক তিন কোটি টাকা দেওয়া হয়। সোনালী ব্যাংক জিএম কার্যালয়ে তসলিম, রাজা ও মালেক—তিনজন জিএম মীর মহিদুর ও অফিসার ওয়াহিদুজ্জামানকে (এই লোক বিভিন্ন সময় ব্রাঞ্চ ইনস্পেকশনে আসত) প্রায় সময়ই ২–৫ লাখ টাকা করে মোট ৮০–৯০ লাখ টাকার একটা হিসাব দেয় আমাকে। জিএম কার্যালয়ের নতুন জিএম ননী গোপালকেও নাকি আমার লোকেরা বিভিন্ন সময় টাকা দিত।

ননী গোপাল কাজে যোগদানের ১৫ দিন পর আমাকে অফিসে ডেকে নিয়ে তার চিকিৎসার জন্য পাঁচ লাখ টাকা সাহায্য চায় এবং তার মেয়ের জন্য একটি ই-৭১ মোবাইল চায়। আমি ১৫ দিনের মধ্যে ওই টাকা ও মোবাইল সাহায্য হিসেবে দিই। সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের আইটিএফডি বিভাগের সাবেক এজিএম বর্তমান ডিজিএম সফিজউদ্দিনকে তসলিম, মালেক, রাজা, ডিজিএম আজিজ সপ্তাহে এক লাখ টাকা করে মোট ৭০-৮০ লাখ টাকা দিয়েছে বলে তারা আমাকে হিসাব দেখায়। এ ছাড়া প্রধান কার্যালয়ের ডিএমডি আতিকুর রহমানকে আমি ম্যানেজার আজিজের কথামতো চিকিৎসার জন্য ১০ লাখ টাকা দিই।

২০১২ সালের সম্ভবত এপ্রিলে তসলিম, মালেক, রাজা, ম্যানেজার আজিজ সাহেব, ডিএনএ স্পোর্টসের মালিক শিখা আমাকে ব্যাংকের বারান্দায় ডেকে নিয়ে বলে, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ম্যানেজ করতে তিন কোটি টাকা লাগবে। এবং এটা বোর্ড সদস্য একজনকে দিতে হবে। আমি একপর্যায়ে রাগারাগি করলাম। তারা আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করে। তসলিম সাহেব বলে, “আমি নিজে দেব ১ কোটি ২০ লাখ টাকা, হল-মার্ক দেবে ১ কোটি এবং বাকি ৮০ লাখ মালেক, রাজা ও শিখা দেবে।” আমি রাগারাগি করে চলে আসি। আজিজ সাহেবসহ এরা সবাই আমাকে ফোন করে টাকার বিষয়ে খুব বিরক্ত করতে থাকে। তসলিম বলে, সে নাকি ইতিমধ্যে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা দিয়ে দিয়েছে।

আমাকে চাপ দেওয়ার একপর্যায়ে তুষারকে বলি ৫০ লাখ টাকা দেওয়ার জন্য। এটা এপ্রিল মাসের ঘটনা। তুষার একদিন তসলিম সাহেবের সামনে ব্যাংকের বারান্দায় ৫০ লাখ টাকা দেয়। কদিন পর তসলিম ও এক পরিচালক (ডাইরেক্টর) আমার বাসায় গিয়ে বাকি ৫০ লাখ টাকা চায়। আমি রাগারাগি করে দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তসলিম অজ্ঞান হয়ে যায়। আমার জিএম তুষার ও তসলিমের পরিচালক আতিকুর রহমান তখন তসলিমকে অ্যাপেলো হাসপাতালে নিয়ে যায়। তসলিম, মালেক, রাজা ও আজিজ সাহেব আমাকে না জানিয়ে তুষারকে চাপ দিয়ে অথবা (ডাইরেক্ট) সরাসরি ক্যাশ থেকে কাঁচা রেজিস্ট্রারে এন্ট্রি দিয়ে লাখ লাখ টাকা বিভিন্নজনকে দেওয়ার নাম করে নিয়ে যেতে। পরে তুষারকে চাপ দিয়ে, তার কাছে থাকা আমার সই করা ব্ল্যাঙ্ক চেক নিয়ে যেত। তুষার মূল ঘটনার সময় আমার গ্রুপে ছিল না। ঘটনা ঘটার পর আমি তুষারকে নিয়োগ দিই। তারা তুষারকে চাপ দিয়ে টাকা নিয়ে যেতে।

আজিজ সাহেব সব জেনেই তাদের আলাদাভাবে লোন দিয়েছে, বিভিন্ন ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে। আনোয়ার স্পিনিং, ম্যাক্স স্পিনিং, সেঞ্চুরি ইন্টারন্যাশনাল অ্যাপারেল এন্টারপ্রাইজ, স্টার স্পিনিং মিলস—রাজা ও মালেক সাজিয়েছে।

তসলিম বিভিন্ন সময় আমাকে ডিজিএফআই আর সাংবাদিকদের ভয় দেখাত। তসলিম প্রায় সময় মালয়েশিয়া যেতে এবং সেখানে গিয়ে তুষারের কাছে টাকা চাইত। আমাকে গার্মেন্টস ব্যবসায় নামায় মালেক আর রাজা। এরা দুজন তসলিম হাসানের সঙ্গে মিলে এই জালিয়াতি ঘটায় এবং আমার লায়াবিলিটি বাড়ায়। তারা আমার কোম্পানির এলসি থেকে ৩০–৪০% কমিশন খেয়ে আমার দেনা বাড়ায়। এরা প্রত্যেকে গোপনে কয়েকটা করে ইন্ডাস্ট্রি করেছে।

আজিজ সাহেব সব জেনেই তাদের আলাদাভাবে লোন দিয়েছে, বিভিন্ন ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে। আনোয়ার স্পিনিং, ম্যাক্স স্পিনিং, সেঞ্চুরি ইন্টারন্যাশনাল অ্যাপারেল এন্টারপ্রাইজ, স্টার স্পিনিং মিলস—রাজা ও মালেক সাজিয়েছে। পরে আমি নিজে বাঁচার জন্য, যেহেতু সব আমার অ্যাকাউন্টের দায়, সেহেতু আমি সব স্বীকার করে সব দায় এসব নামের কোম্পানির বিপরীতে সমন্বয় করেছি। এটা ডিজিএম আজিজ সাহেবের কথামতো মালেক, রাজা ও তসলিম সাহেব চালাকি করে করেন। (পরে বলেন) আমি করি নাই, ওরা করেছে।

আমার স্ত্রী নামমাত্র কোম্পানির পরিচালক। সরকারি নিয়মের কারণে লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে দুজন লাগে বিধায় আমার স্ত্রীকে পরিচালক করেছি। সে সম্পূর্ণ নির্দোষ। সে কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য করে না। এটা আমার জবানবন্দি।’

হল-মার্কের তানভীর, জেসমিন, তুষারসহ ৯ জনের যাবজ্জীবন, ৮ জনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড

১৯ মার্চ ২০২৪, প্রথম আলো

সোনালী ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় করা মামলায় হল-মার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদ, জেসমিন ইসলামসহ নয়জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁদের পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা করেছেন আদালত।

এ ছাড়া সোনালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন কবিরসহ ৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১-এর বিচারক আবুল কাসেম আজ মঙ্গলবার এই রায় ঘোষণা করেন।প্রথম আলোকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন দুদকের সরকারি কৌঁসুলি মীর আহমেদ আলী সালাম।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া নয়জন হলেন, তানভীর মাহমুদ, তানভীর মাহমুদের  স্ত্রী ও হল-মার্ক  গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম,  তানভীরের ভায়রা হল-মার্ক গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক তুষার আহমেদ, টি অ্যান্ড ব্রাদার্সের পরিচালক তসলিম হাসান, ম্যাক্স স্পিনিং মিলসের মালিক মীর জাকারিযা, প্যারাগন গ্রুপের এমডি সাইফুল ইসলাম রাজা, সাইফুল হাসান, নকশী নিটের এমডি মো. আবদুল মালেক ও আবদুল মতিন।

ফুলেফেঁপে উঠেছে ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ীদের ব্যাংক হিসাব

১৯ মার্চ ২০২৪, কালবেলা

দেশে ভোগ্যপণ্যের দামের লাগাম কোনোভাবেই টেনে ধরা যাচ্ছে না। সরকারের দিক থেকে একের পর এক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বাজার নিয়ন্ত্রণে তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। সর্বশেষ ২৯টি ভোগ্যপণ্যের মূল্য বেঁধে দেওয়া হলেও এর কোনোটিই নির্ধারিত দামে বিক্রি হচ্ছে না। সব মিলিয়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য না থাকায় অনেককে সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে। যাদের সেই সুযোগ নেই তারা প্রয়োজনের তালিকা কাটছাঁট করে কিংবা ধার-দেনা করে চলছেন। তবে সুযোগমতো ঠিকই অতিরিক্ত মুনাফা করে নিচ্ছেন ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায়ীরা। ভোক্তার পকেট ফাঁকা করে নিজেদের ব্যাংক হিসাব স্ফীত করছেন তারা। দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংকে খাত ও ধরনভিত্তিক আমানতের সর্বশেষ হিসাব নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত প্রতিবেদনেও এর প্রমাণ মিলেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ীদের ব্যাংক হিসাবে আমানতের পরিমাণ বেড়েছে ৪০ হাজার কোটির বেশি টাকা। অথচ একই সময়ে দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যাংক হিসাবের আমানত কমে গেছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভোগ্যপণ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও বিপণনে জড়িতদের টাকা জমা থাকে মূলত পাঁচ ধরনের ব্যাংক হিসাবে। এগুলো হলো— কৃষকের ব্যক্তিগত হিসাব, কৃষি ও কৃষিভিত্তিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের হিসাব, আমদানি-রপ্তানিকারকদের হিসাব, ভোগ্যপণ্য বিপণনকারীদের ব্যক্তিগত হিসাব এবং শিল্পপতিদের ব্যক্তিগত হিসাব।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে কৃষিপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক ও আমদানিকারকদের আমানত কমলেও বাকি তিন ধরনের হিসাবে আমানত বৃদ্ধি পেয়েছে। এরমধ্যে অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ীদের ব্যক্তিগত হিসাবে আমানতের পরিমাণ ছিল ৯ লাখ ২৬ হাজার ১৭১ কোটি টাকা। অথচ অর্থবছরের শুরুতে এই আমানতের পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৮৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে ব্যক্তি হিসাবে আমানত বেড়েছে ৪০ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।

অন্যদিকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত জমা থাকা ব্যাংক হিসাবকে ধরা হয় স্বল্প আয়ের মানুষের আমানত হিসাব। গত ডিসেম্বরে দেশের ব্যাংক খাতে এ ধরনের হিসাব সংখ্যা ছিল ১৩ কোটি ৮৯ লাখ ৬১ হাজার ৯৫টি। এসব হিসাবে মোট আমানতের পরিমাণ ৮০ হাজার ৯৬ কোটি টাকা। এর আগে গত জুনে এ ধরনের ১৩ কোটি ২০ লাখ ৮৭ হাজার ২২০টি হিসাবে টাকার পরিমাণ ছিল ৮২ হাজার ৯১ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে স্বল্প আমানতের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা বাড়লেও তাতে টাকার পরিমাণ ১ হাজার ৯৯৫ কোটি টাকা। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া ব্যাংকে জমা রাখা টাকা খরচের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

একইভাবে আর্থিক সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ সঞ্চয়পত্রও ভেঙে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে যে পরিমাণ সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, ভাঙানো হয়েছে তার চেয়ে ৭ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা বেশি। শুধু জানুয়ারি মাসে এই ব্যবধান ছিল ১ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা।

রাঙামাটিতে পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণে বসতি উচ্ছেদের প্রতিবাদে মানববন্ধন

১৯ মার্চ ২০২৪, আজকের পত্রিকা

পর্যটনকেন্দ্র ও সীমান্ত সড়ক নির্মাণের নামে বিভিন্ন গ্রামের বসতি উচ্ছেদের জন্য সেনাবাহিনী থেকে নির্দেশনা দেওয়ার প্রতিবাদে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের দাবিতে রাঙামাটিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ মঙ্গলবার সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

স্থানীয় অজিত কুমার চাকমার সভাপতিত্বে মানববন্ধনে বক্তব্য দেন পূণ্যরানী চাকমা, মদন বিকাশ চাকমা, জিকো চাকমা, ইনটুমনি তালুকদার, উলিচিং মারমা প্রমুখ। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন জেলার জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ি উপজেলার সীমান্তবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, সেনাবাহিনী সীমান্ত সড়ক নির্মাণ করতে গিয়ে গ্রামের পর গ্রাম উচ্ছেদ করছে। নতুন করে জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ির গাছবান পাড়া, থুম পাড়া মানুষকে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে সেনাবাহিনী। শত বছরের সৃজিত বাগান-বাগিচা, ধানখেত ধ্বংস করে দিচ্ছে, কিন্তু কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে না। এসব এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসী এখন প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। গ্রাম উচ্ছেদ করে নতুন নতুন নাম দেওয়া হচ্ছে। এখন এসব এলাকার মানুষের জুম চাষ করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এই অবস্থায় উদ্বাস্তু মানুষের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

বক্তারা আরও বলেন, সীমান্ত সড়ক হচ্ছে এতে স্থানীয়দের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু এই সড়ক নির্মাণ করায় যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তাঁদের পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ নেই। জোর করে সড়ক ও পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণ করছে সেনাবাহিনী। স্মারকলিপিতে গ্রাম ছাড়ার নির্দেশনা প্রত্যাহার, জুমচাষে বাধা না দেওয়া, পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ এবং বাগান-বাগিচা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের পুনর্বাসনের দাবি জানানো হয়।

এনআরবিসি ব্যাংকের বোর্ডরুমে অস্ত্রধারী

মার্চ ২১, ২০২৪, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্বে থাকছে এনআরবিসি ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি এবং বোর্ডরুমে বন্দুক নিয়ে প্রবেশের ঘটনা।

অর্থপাচার, ঋণ অনিয়ম, অতিরিক্ত ব্যয় ও নিয়োগ সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে প্রায়ই খবরের শিরোনাম হয় নন-রেসিডেন্ট বাংলাদেশি কমার্শিয়াল (এনআরবিসি) ব্যাংক। ৭০০ কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির অভিযোগে ২০১৭ সালে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া ও তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেওয়ান মুজিবুর রহমানকে অপসারণে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংককে।

তৎকালীন চেয়ারম্যান ফরাসত আলীকে বোর্ড থেকে পদত্যাগ করতে হয়। মুজিব ও ফরাসতকে পরিচালক পদ থেকে দুই বছরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নিষিদ্ধ করে এবং পরবর্তীকালে বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়।

কিন্তু নতুন পর্ষদে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়েছেন এমন একজন, যার বিরুদ্ধে আগেই অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল এবং ব্যাংকটিতে এখনো অনিয়ম অব্যাহত আছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ব্যাংকটির সভার কার্যবিবরণী এবং অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন ও সুপ্রিম কোর্টের নথির শত শত পৃষ্ঠা গত ছয় মাস ধরে বিশ্লেষণ করে দ্য ডেইলি স্টার ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ অসংখ্য অনিয়ম, এমনকি অস্ত্র দিয়ে ভীতি সৃষ্টির করার মতো ঘটনার বিষয়েও জানতে পেরেছে।

চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্বে ঋণ কেলেঙ্কারি ও বোর্ডরুমে বন্দুক নিয়ে প্রবেশ করার ঘটনা তুলে ধরা হলো।

এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৪০তম সভা হয় ২০১৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি। সভায় ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যান পারভেজ তমাল ও পরিচালক আদনান ইমামের সঙ্গে প্রবেশ করেন এক ব্যক্তি, যার হাতে ছিল একটি সাব-মেশিনগান। তমাল ও আদনান তখন ছিলেন পরিচালনা পর্ষদের সদস্য।

নথি থেকে জানা গেছে, পরিচালনা পর্ষদের আরেক সদস্য আবু বকর চৌধুরী চলে যেতে বলার আগ পর্যন্ত ওই কক্ষেই অবস্থান করছিলেন সেই বন্দুকধারী।

এর আগে ২০১৫ সালের ২০ ডিসেম্বর পরিচালনা পর্ষদের ৩৯তম সভায় পারভেজ ও অল্টারনেটিভ ডিরেক্টর আবু মোহাম্মদ সাইদুর রহমান তৎকালীন বোর্ড চেয়ারম্যান ফরাসত আলীকে লাঞ্ছিত করেন বলে অভিযোগ ওঠে।

ওই সময় পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যাংক থেকে ৬৪ কোটি টাকা পাচার ও ১৬৫ কোটি টাকা পাচারচেষ্টার অভিযোগের অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলছিল বোর্ডে।

অভিযোগটি উঠেছিল তিনজন পরিচালক—পারভেজ, আদনান ও রফিকুল ইসলাম মিয়া আরজুর বিরুদ্ধে। তাদের মধ্যে রফিকুল ব্যাংকটির বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান। এই অভিযোগ আছে আরও একজন স্পন্সর শেয়ারহোল্ডার এএম তুষার ইকবাল রহমানের বিরুদ্ধেও। ওই সময় বোর্ডে ১৮ জন সদস্য ছিলেন।

পরিচালনা পর্ষদের অল্টারনেটিভ ডিরেক্টর সাইদুর রহমান ও একেএম মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধেও বোর্ডে তদন্ত চলছিল। সাইদুর রহমানের ছেলে হলেন এএম তুষার ইকবাল রহমান।

তাদের মধ্যে পাঁচজন বর্তমানে ব্যাংকটির বোর্ড সদস্য।

গত ছয় মাসে দ্য ডেইলি স্টার ব্যাংকটির সভার কার্যবিবরণী ও অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনের পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের নথিও দেখেছে। এগুলোতে দেখা গেছে কীভাবে এই ছয়জন নিজেদের বা তাদের বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ আছে—এমন প্রতিষ্ঠানের নামে বেনামি ঋণ নিতে জোট বেঁধেছে।

পারভেজ ও আদনানসহ ছয়জনই তাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং দাবি করেছেন যে, ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তাদের ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ নিয়ে ব্যাংকের তদন্তে অসন্তুষ্ট হয়েই পারভেজ ও আদনান ‘বোর্ড কর্মকর্তাদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করতে’ সাবমেশিন গান নিয়ে আসেন। বোর্ড সভায় বন্দুক আনার এই ঘটনার দুই বছরের মধ্যে ২০১৭ সালের ১০ ডিসেম্বর সর্বসম্মতভাবে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন পারভেজ তমাল। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি এই পদে আছেন।

বোর্ডরুমে বন্দুক আনার কারণ

২০১৬ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের ৪৮তম সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়, আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ নিয়ে ব্যাংকের তদন্তে অসন্তুষ্ট হয়েই পারভেজ ও আদনান ‘বোর্ড কর্মকর্তাদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করতে’ সাবমেশিন গান নিয়ে আসেন।

এতে আরও বলা হয়েছে, সহিংসতা সৃষ্টি ও অস্ত্র প্রদর্শনের উদ্দেশ্য ছিল অভিযুক্ত পরিচালক ও তাদের সহযোগীদের বেনামি ঋণ ও বেনামি চুক্তিসহ অন্যান্য অপকর্ম আড়াল করার জন্য বোর্ডের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।

পারভেজ তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বন্দুকধারী ব্যক্তিকে বোর্ডরুমে নেওয়ার স্বপক্ষে দাবি করেছেন যে তিনি তার লাইসেন্সপ্রাপ্ত দেহরক্ষী।

বোর্ড সভায় বন্দুক আনার এই ঘটনার দুই বছরের মধ্যে ২০১৭ সালের ১০ ডিসেম্বর সর্বসম্মতভাবে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন পারভেজ তমাল। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি এই পদে আছেন। একইসঙ্গে পরিচালনা পর্ষদ ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে রফিকুল ও নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে আদনানকে মনোনয়ন দেয়।

৫৬তম বোর্ড সভার কার্যবিবরণী অনুসারে, তাদের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন সেই বছরই বাতিল করা হয়েছিল।

এনআরবিসি ব্যাংক ও রাশিয়ার করপোরেট রেজিস্ট্রি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বরিশালের বাসিন্দা পারভেজ প্রবাসী ছিলেন এবং রাশিয়ায় ‘আইটি ডিস্ট্রিবিউশন, রিয়েল এস্টেট হোল্ডিং ও লজিস্টিক কনসালটেশন’ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় জড়িত ছিলেন।

ডেইলি স্টারের হাতে আসা নথিপত্রে দেখা যায়, বোর্ড চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে পারভেজের বিরুদ্ধে বেনামি ঋণ, অবৈধভাবে মুনাফা অর্জন, ব্যাংকিং নীতি লঙ্ঘন ও আর্থিক তছরুপের আরও অভিযোগ উঠেছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যে কোম্পানিকে পারভেজ বেনামি ঋণ নেওয়ার জন্য ব্যবহার করতেন বলে বোর্ড তদন্ত করেছিল, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সেই ল্যানটা সার্ভিসেসকে কোটি কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়।

২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা স্পন্সর পরিচালক পারভেজ। ২০১৬ সালে এনআরবিসি ব্যাংকের স্পন্সর পরিচালকদের মূলধন ছিল ৫২০ কোটি টাকা।

এর মধ্যে পারভেজের ২০ কোটি, তুষারের ২০ কোটি, ফিরোজের ২০ কোটি, রফিকুলের ২০ কোটি ও আদনানের ১০ কোটি টাকার শেয়ার মূলধন রয়েছে বলে ব্যাংকের নথি সূত্রে জানা গেছে।

পরিচালনা পর্ষদের ৪৮তম সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, পূবালী কনস্ট্রাকশন, এনইএস ট্রেডিং, ভলান্টারি অর্গানাইজেশন ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (ভিওএসডি) নামে একটি এনজিও, ল্যানটা সার্ভিসেস ও অর্নিতা অ্যাগ্রোর নামে ৬৪ কোটি টাকা বেনামি ঋণ নিয়েছেন পারভেজ, আদনান, রফিকুল, তুষার ও ফিরোজ। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিচালকদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য প্রকাশ না করেই এ ঋণ নেওয়া হয়েছে।

কে কত নিল

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্যাংক একটি কমিটি গঠন করে এবং পাঁচজন পরিচালকসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে ওঠা অর্থপাচারসহ বেশ কয়েকটি অভিযোগের তদন্ত শুরু করে।

পরিচালনা পর্ষদের ৪৮তম সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, পূবালী কনস্ট্রাকশন, এনইএস ট্রেডিং, ভলান্টারি অর্গানাইজেশন ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (ভিওএসডি) নামে একটি এনজিও, ল্যানটা সার্ভিসেস ও অর্নিতা অ্যাগ্রোর নামে ৬৪ কোটি টাকা বেনামি ঋণ নিয়েছেন পারভেজ, আদনান, রফিকুল, তুষার ও ফিরোজ। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিচালকদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য প্রকাশ না করেই এ ঋণ নেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকিং পরিভাষায় এগুলোকে ‘সম্পর্কিত পক্ষের ঋণ’ বলা হয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, এই ধরনের ঋণের ক্ষেত্রে ঋণদাতা ব্যাংকের পরিচালকদের অবশ্যই ঋণগ্রহীতা কোম্পানির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ঘোষণা করতে হবে।

এই ৬৪ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে আদনান একাই এনইএস ট্রেডিং (১৯ কোটি) ও পূবালী কনস্ট্রাকশনের (নয় কোটি) নামে ২৮ কোটি টাকার দুটি ‘বেনামি ঋণ’ নিয়েছেন। ৪৬ ও ৪৮তম বোর্ড সভার কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, মোস্তাফিজুর, তুষার ও ফিরোজের সঙ্গে মিলে অর্নিতা অ্যাগ্রোর নামে আরও তিন কোটি টাকা ঋণ নেন তিনি।

ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে দেখা গেছে, অর্নিতা অ্যাগ্রো আদনান ও মোস্তাফিজুরের মালিকানাধীন এবং ঋণের তিন কোটি টাকা দুদিনের মধ্যে আইপিই ক্যাপিটালের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়।

জয়েন্ট স্টক কোম্পানির নথিতে দেখা যায়, আইপিই ক্যাপিটাল আদনান ইমামের পারিবারিক ব্যবসা এবং তিনি সেই প্রতিষ্ঠানের একজন পরিচালক।

এনআরবিসি ব্যাংকের ওয়েবসাইটে আদনানকে যুক্তরাজ্যের নাগরিক এবং বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (সিআইপি) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যার লন্ডন ও ঢাকায় রিয়েল এস্টেট ও প্রাইভেট ইক্যুইটিসহ বিভিন্ন ব্যবসা রয়েছে।

ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এনইএস ট্রেডিং আদনান এবং তার ব্যবসায়িক অংশীদার ও শ্যালকের মালিকানাধীন, যিনি লন্ডনে বাস করেন।

তদন্ত কমিটির সামনে আদনানের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, পূবালী কনস্ট্রাকশনের মালিক তারই এক কর্মচারী এবং পূবালী কনস্ট্রাকশনের জন্য নয় কোটি টাকা ঋণ আদনানের শ্বশুরের জমির বিপরীতে নেওয়া হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, পারভেজও পূবালী কনস্ট্রাকশনের সঙ্গে যুক্ত। তদন্ত শুরুর আগে তিনি পূবালী কনস্ট্রাকশনের অ্যাকাউন্টে দুই কিস্তিতে অন্তত ৮৭ লাখ টাকা স্থানান্তর করেন।

২০১৬ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ফজলে কবির তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে লেখা এক চিঠিতে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গোপন তদন্তে দেখা গেছে, আদনান অর্নিতা অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের নাম ব্যবহার করে তিন কোটি টাকার ‘বেনামি’ ঋণ নিয়েছেন।

ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের ৪৪-৪৮তম সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়, বোর্ড সদস্যরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, অডিট কমিটির চেয়ারম্যান হয়েও রফিকুল আমানতকারীদের অর্থ আত্মসাৎ করা থেকে আদনানকে বিরত রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন।

পরিচালনা পর্ষদের ৪৪তম সভায় বোর্ড সদস্যরা বলেছিলেন, আদনান তার প্রতিষ্ঠান আদ্রিতা ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে এনআরবিসি ব্যাংকের বনানী শাখার অভ্যন্তরীণ কাজের জন্য প্রকৃত ব্যয় ৫৬ লাখ টাকার বিপরীতে এক কোটি টাকার বিল জমা দিয়েছেন, যেখানে তার জালিয়াতির বিষয়টি স্পষ্ট।

৩০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া এনজিও ভিএসডিওর প্রতিষ্ঠাতা ব্যাংকটির বর্তমান পরিচালক মোস্তাফিজুর।

একাধিক বোর্ড সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, বর্তমান চেয়ারম্যান পারভেজ ল্যানটা সার্ভিসেসের নামে তিন কোটি টাকা বেনামি ঋণ নিয়েছেন।

যেদিন ল্যানটাকে তিন কোটি টাকা ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়, সেদিনই পারভেজ তার নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে লিয়েন হিসেবে এফডিআর আকারে এক কোটি টাকা ল্যানটার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করেন।

ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ল্যানটা সার্ভিসেসের অনুকূলে ঋণ বিতরণের সুবিধার্থে পারভেজ ওই অর্থ জমা রেখেছিলেন।

বোর্ডরুম থেকে কোর্টরুম

এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের এপ্রিলে পারভেজ, আদনান ও রফিকুলকে বোর্ড থেকে সরিয়ে দেওয়া হলে তারা তিনজন বিষয়টি নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন।

বিচারপতি মো. রেজাউল হাসানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই তিনজনকে পদে পুনর্বহাল করলেও তাদের শেয়ার সাময়িকভাবে জব্দ করে ব্যাংকে সংযুক্ত করেন। একইসঙ্গে যেসব বোর্ড মিটিংয়ে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত বিষয়ে আলোচনা হবে, তাদের সেসব সভার বাইরে রাখার নির্দেশও দেন আদালত।

ব্যাংকিং আইন অনুযায়ী ওই তিনজনকে অব্যাহতি দেওয়ার এখতিয়ার বোর্ডের নেই—এর ওপর ভিত্তি করেই তাদের পদে পুনবর্হাল রাখার সিদ্ধান্ত দেন আদালত। ‘তবে তার মানে এই নয় যে, ব্যাংক বা পরিচালনা পর্ষদ আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারবে না।’

আদালত রায়ে বলেন, আবেদনকারীরা (অভিযুক্ত পরিচালকরা) ফাঁকফোকরের মাধ্যমে বেনামি ঋণ নেওয়ার পথ তৈরি করেছেন।

রায় অনুযায়ী, বোর্ডের তদন্ত রিপোর্টে পূবালী কনস্ট্রাকশন ও এনইএস ট্রেডিংয়ের ঋণের সঙ্গে আদনান ইমামের যোগসাজশ এবং এসব প্রতিষ্ঠানে তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

বেঞ্চ আরও বলেন, ল্যানটার সঙ্গে পারভেজ ও রফিকুলের যোগসূত্রের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং পূবালী কনস্ট্রাকশন ও এনইএস ট্রেডিংয়ের সঙ্গে পারভেজের সংশ্লিষ্টতার দৃশ্যমান যোগসূত্র রয়েছে এবং এর মাধ্যমে প্রমাণ পাওয়া যায় যে আবেদনকারী ওই ব্যাংক থেকে বেনামি ঋণ নিয়েছেন এবং ওই দুই সংস্থার পেছনে থাকা ব্যক্তি তিনি।

মাত্র দুই মাসের মধ্যে ল্যানটার ঋণসীমা দুই কোটি টাকা বাড়িয়ে সাড়ে ছয় কোটি টাকা করা হয়। ২০২০ সালের ১৮ এপ্রিল ঋণসীমা আরও বাড়িয়ে সাড়ে নয় কোটি টাকা করা হয়। পরবর্তী আরও তিনটি সভা শেষে আরও ৫০ লাখ টাকা ‘প্রণোদনা ঋণ’ পায় ল্যানটা। ২০২১ সালে ল্যানটার সাড়ে নয় কোটি টাকার ঋণসীমা নবায়ন করা হয়। নথিপত্রে দেখা যায়, মাত্র দুই বছরে প্রতিষ্ঠানটিকে গাড়ির জন্য চার কোটি ২৮ লাখ টাকার তিনটি ঋণ দেওয়া হয়েছে।

ল্যানটা সার্ভিসেসের জন্য ভালোবাসা

ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের এসব অনুসন্ধান ও আপিল বিভাগের রায়ের তিন বছর পর ল্যানটা সার্ভিসেসকে এনআরবিসি ব্যাংক অন্তত ১৪ কোটি টাকা ঋণ দেয় বলে একাধিক সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে।

২০১৯ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পারভেজের নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদের সভায় ল্যানটাকে সাড়ে চার কোটি টাকার সমন্বিত ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়।

সভার কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, পারভেজের বিরুদ্ধে ল্যানটার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তদন্ত ও বেনামী ঋণ নেওয়ার জন্য তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্ট ব্যাংককে যে নির্দেশ দিয়েছে, সেসব নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।

মাত্র দুই মাসের মধ্যে ল্যানটার ঋণসীমা দুই কোটি টাকা বাড়িয়ে সাড়ে ছয় কোটি টাকা করা হয়। ২০২০ সালের ১৮ এপ্রিল ঋণসীমা আরও বাড়িয়ে সাড়ে নয় কোটি টাকা করা হয়। পরবর্তী আরও তিনটি সভা শেষে আরও ৫০ লাখ টাকা ‘প্রণোদনা ঋণ’ পায় ল্যানটা। ২০২১ সালে ল্যানটার সাড়ে নয় কোটি টাকার ঋণসীমা নবায়ন করা হয়।

নথিপত্রে দেখা যায়, মাত্র দুই বছরে প্রতিষ্ঠানটিকে গাড়ির জন্য চার কোটি ২৮ লাখ টাকার তিনটি ঋণ দেওয়া হয়েছে।

পারভেজ পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হওয়ার পর ল্যানটা সার্ভিসেসের সাবসিডিয়ারি কোম্পানি ল্যানটা ফরচুনা প্রপার্টিজ ২০১৯ সালের জুনে ৮৭ লাখ টাকার চুক্তিসহ একাধিকবার ব্যাংকের ইন্টেরিয়র ডিজাইনের কাজ পায়।

উভয় প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়সাল বিন আলম ব্যাংকটির একজন গ্রাহক।

প্রভিডেন্ট ফান্ড চুরি

এই দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এনআরবিসি ব্যাংকের জুনিয়র টেলার ও অ্যাসিস্ট্যান্ট টেলারদের প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকেও অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এনআরবিসি ব্যাংক চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিজেরা সম্পন্ন করে না। এনআরবিসি ম্যানেজমেন্ট নামে ভিন্ন একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়োগের কাজটি করা হয়।

নথিপত্রে দেখা যায়, ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এনআরবিসি ম্যানেজমেন্টের মালিকানায় অন্যান্যদের মধ্যে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত পারভেজ, আদনান, রফিকুল ও মোস্তাফিজুরও ছিলেন।

এনআরবিসি ম্যানেজমেন্টের প্রভিডেন্ট ফান্ড, ল্যানটা সার্ভিসেস ও এনআরবিসি ম্যানেজমেন্টের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিবরণীতে দেখা যায় যে কীভাবে ল্যানটা সার্ভিসেস বিভিন্ন সময়ে প্রভিডেন্ট ফান্ডের ব্যাংক অ্যাকাউন্টটিকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে।

ওই অর্থ ব্যাংকের কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে এনআরবিসি ম্যানেজমেন্টের অ্যাকাউন্টে এবং পরে ল্যানটা সার্ভিসেসে যায়। মূলত এই অর্থ কোথায় যাচ্ছে, সেটি আড়াল করতেই এনআরবিসি ম্যানেজমেন্টের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তা স্থানান্তর করা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে।

উদাহরণস্বরূপ, ২০২১ সালের ২৬ এপ্রিল প্রভিডেন্ট ফান্ডের হিসাব থেকে এনআরবিসি ম্যানেজমেন্টের অ্যাকাউন্টে এক কোটি টাকা স্থানান্তর করা হয়। একই দিন প্রভিডেন্ট ফান্ডের অ্যাকাউন্ট থেকে ৬০ লাখ টাকা ল্যানটা সার্ভিসেসে স্থানান্তর করা হয়।

প্রায় দেড় বছর পর ২০২২ সালের অক্টোবরে প্রভিডেন্ট ফান্ড অ্যাকাউন্টে এক কোটি টাকা ফেরত দেয় এনআরবিসি ম্যানেজমেন্ট।

কিন্তু ডেইলি স্টারের হাতে থাকা এনআরবিসি ম্যানেজমেন্টের কয়েকশ পৃষ্ঠার লেনদেন বিবরণীর কোথাও দেখা যায়নি যে ওই ৬০ লাখ টাকা ফেরত দিয়েছে ল্যানটা সার্ভিসেস।

চেয়ারম্যানের স্বেচ্ছাচারের কবলে এনআরবিসি ব্যাংক

২২ মার্চ ২০২৪, সমকাল

পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন পরিচালক মিলে কোম্পানি খুলে তার মাধ্যমে এনআরবিসি ব্যাংকে নিয়োগ দিয়েছেন প্রায় ৪ হাজার চুক্তিভিত্তিক কর্মী। পর্ষদের বৈঠকে খাবার কেনায় অস্বাভাবিক ব্যয়ের তথ্য মিলেছে। একই দিন সকালে লিখিত পরীক্ষা নিয়ে বিকেলে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। বাজেয়াপ্তযোগ্য শেয়ারের মালিকানা নেওয়া হয়েছে চেয়ারম্যানের ব্যবসায়িক অংশীদারের নামে। প্রবাসীদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি এনআরবিসি ব্যাংকে এভাবে চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে চলছে যথেচ্ছাচার। বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক পরিদর্শনে ব্যাংকটিতে এসব অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।

সম্প্রতি ব্যাংকের সাত উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডার ব্যাংকের চেয়ারম্যান এস এম পারভেজ তমালের স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়েছেন। এর আলোকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা তলব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

২০১৩ সালে কার্যক্রম শুরু করা এনআরবিসি ব্যাংকে এখন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা সাত সহস্রাধিক। দেশের অন্য কোনো ব্যাংকে এত দ্রুত কর্মীর সংখ্যা বাড়েনি। বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বেশির ভাগ নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। জনপ্রতি ৬ থেকে ৯ লাখ টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে– এমন একটি অভিযোগের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিদর্শন করে অনিয়মের সত্যতা পেয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে আসে, ১০৫ জন ট্রেইনি অফিসার নিয়োগের জন্য অনলাইনে আবেদন নেওয়া হয়। ২০২২ সালের ৯ এপ্রিল পরীক্ষার জন্য মোট ৩০৪ প্রার্থীকে আমন্ত্রণ জানায় ব্যাংক।

সকালে লিখিত পরীক্ষা নিয়ে অস্বাভাবিক দ্রুততায় একই দিন বিকেলে মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়। যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়, তাদের মধ্যে ৯৬ জনের চাকরির বয়স শেষ পর্যায় তথা ২৯ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। চারজনের বয়স-সংক্রান্ত কোনো তথ্য ছিল না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শক দল বলেছে, নির্বাচিত অধিকাংশের বয়স ২৯ বছরের বেশি হওয়া অস্বাভাবিক। এতে প্রমাণিত হয়, পূর্বনির্ধারিত ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতেই এমন পরীক্ষার আয়োজন করা হয়েছে। নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৫ জনের অনলাইন আবেদনও পাওয়া যায়নি। যদিও চেয়ারম্যানের টাকা নেওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখা সম্ভব হয়নি, তবে পরীক্ষা নেওয়ার অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া ও অপেশাদারিত্বের সঙ্গে প্রার্থী নির্বাচন করায় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি হয়ে থাকতে পারে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়।

জানতে চাইলে পারভেজ তমাল গতকাল সমকালকে বলেন, করোনার কারণে তখন তড়িঘড়ি করে একই দিন লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ওই নিয়োগ বোর্ডে ছিলেন। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আপত্তি জানানোর পর তা বাতিল করা হয়। এখানে কোনো ধরনের দুর্নীতির বিষয় সঠিক নয়।

এনআরবিসি ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালা অনুযায়ী, কর্মমূল্যায়নের ভিত্তিতে একজন কর্মকর্তাকে একবারে সর্বোচ্চ তিনটি ইনক্রিমেন্ট দেওয়া যাবে। আবার পদোন্নতির জন্য অন্তত দুই বছরের এসিআর থাকতে হবে। কাজী মো. সাফায়েত কবির, মো. জাফর ইকবাল হাওলাদারসহ কয়েকজন কর্মকর্তার পদোন্নতির ক্ষেত্রে এ নিয়ম মানা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে এসেছে, চেয়ারম্যানের আস্থাভাজন ২৭ কর্মকর্তাকে চার থেকে ১৩টি পর্যন্ত ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা ছাড়াই ব্যাংকের বোর্ড সেক্রেটারিসহ বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে চেয়ারম্যানের অপছন্দের কয়েকজন কর্মকর্তাকে নানা উপায়ে চাপ প্রয়োগ করে ব্যাংক থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে চেয়ারম্যান পারভেজ তমাল সমকালকে বলেন, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওই ইনক্রিমেন্ট দিয়েছিলেন। এটা নিয়মবহির্ভূত জানার পর পরিচালনা পর্ষদ তা বাতিল করে। অভিজ্ঞতা ছাড়া নিয়োগ কিংবা চাপ প্রয়োগ করে কাউকে বের করে দেওয়ার তথ্য সঠিক নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, চেয়ারম্যানের জন্য একটি অফিস বরাদ্দ দিতে পারে ব্যাংক। অথচ ব্যাংকের চেয়ারম্যান পারভেজ তমালের মতিঝিলে প্রধান কার্যালয়ে এবং ব্যাংকটির গুলশান শাখায় একটি করে অফিস ব্যবহার করার তথ্য পেয়েছে পরিদর্শক দল।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে পরিচালনা পর্ষদের উচ্চ ব্যয়ের কিছু উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। একটি সভায় তিনজন পরিচালকের জন্য ২০ বাস্কেট ফল কিনে ৮৫ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়। আবার নির্বাহী কমিটির এক সভায় তিনজনের দুপুরের খাবার বাবদ ২০ পিস ইলিশ, ২০ পিস চিংড়ি ভুনা, ২০ পিস চিতল, ২০ পিস রূপচাঁদা কিনে খরচ দেখানো হয় ৫৮ হাজার ৬৫০ টাকা। এভাবে পর্ষদের প্রতি সভায় সম্মানী বাদে প্রত্যেক পরিচালকের পেছনে গড়ে ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ের তথ্য পেয়েছে পরিদর্শক দল, যা অস্বাভাবিক বলা হয়েছে।

নিজেরাই প্রতিষ্ঠান খুলে কর্মী নিয়োগ

ব্যাংকের চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা, অফিস সহায়ক ও পুলের গাড়ি সরবরাহকারী নিয়োগের জন্য ২০১৮ সালে চেয়ারম্যানসহ ৯ জন পরিচালক মিলে ‘এনআরবিসি ম্যানেজমেন্ট’ নামে একটি কোম্পানি খোলেন, যার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন ব্যাংকের চেয়ারম্যান পারভেজ তমাল। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২০২১ সালের শুরু থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত ৩ হাজার ৭১৪ কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দরপত্র আহ্বান এবং অভিজ্ঞতা যাচাই ছাড়াই এসব নিয়োগের বিপরীতে সার্ভিস চার্জ বাবদ ব্যাংক থেকে ১১ কোটি ২০ লাখ টাকা নিয়েছেন তারা।

এ ছাড়া ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি কোম্পানি এনআরবিসি ব্যাংক সিকিউরিটিজের ১০ শতাংশ শেয়ার কয়েকজন পরিচালক নিজেদের নামে নেন। এ দুটি ঘটনাকে নিয়মের পরিপন্থি ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব হিসেবে উল্লেখ করে দণ্ডনীয় অপরাধ বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়, কোনো জবাবদিহি না থাকায় এ কোম্পানির মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে ইচ্ছামাফিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২০১৪ সাল ও ২০২২ সালের জুনের নির্দেশনায় পরিচালক বা তার স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যাংকের কোনো পণ্য, সেবা ও সংগ্রহ বা কেনার নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠির পর সম্প্রতি তারা কোম্পানির শেয়ার অন্যদের নামে হস্তান্তর করেছেন। যদিও এসব শেয়ারের সুবিধাভোগী বর্তমান চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন পরিচালকই আছেন। এনআরবিসি ম্যানেজমেন্টের নামে বিভিন্ন সময়ে ঋণও দিয়েছে ব্যাংক। সেই ঋণের টাকা বেশির ভাগ সময় নামসর্বস্ব কোম্পানি লানতা সার্ভিস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর হয়েছে।

জানা গেছে, এনআরবিসি ম্যানেজমেন্ট ও স্টারলিংকস হোল্ডিংস বনানীর এডব্লিউআর এনআইবি টাওয়ারে অবস্থিত। এ ভবনের মালিকানায় রয়েছে ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান আদনান ইমামের এডব্লিউআর ডেভেলপমেন্ট। পারভেজ তমালের সব শেয়ার তাঁরই ব্যবসায়িক সহযোগী স্টারলিংকস হোল্ডিংসের মালিক শফিকুল আলমের নামে হস্তান্তর করে তাঁকেই এনআরবিসি ম্যানেজমেন্টের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়েছে। শফিকুল আলমের প্রতিষ্ঠান রিলায়েবল বিল্ডার্সের নামে এনআরবিসি ব্যাংকের হাতিরপুল শাখায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। বিপুল অঙ্কের এ ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে রয়েছে বরিশালের আলেকান্দা মৌজায় অবস্থিত ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ জমি।

এসব বিষয়ে এস এম পারভেজ তমাল সমকালকে বলেন, সব পরিচালক মিলে একটি ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি খোলা হয়েছিল। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলার জারির পর শেয়ার অন্যদের নামে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে কারও কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়।

বাজেয়াপ্তযোগ্য শেয়ার হস্তান্তর

প্রবাসী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে ২০১৩ সালে তিনটি এনআরবি ব্যাংক অনুমোদনের অন্যতম শর্ত ছিল– বিদেশে কর পরিশোধিত অর্থে উদ্যোক্তা মূলধনের জোগান দিতে হবে। তবে তথ্য গোপন করে জালিয়াতির মাধ্যমে দেশ থেকে পাচারের টাকা বিদেশে নিয়ে এবিএম আব্দুল মান্নান ও কামরুন নাহার সাখীর নামে শেয়ার কেনেন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান শহীদুল আহসান। ২০১৬ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক পরিদর্শনে এ বেনামি শেয়ার চিহ্নিত করে তা বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। অথচ বাজেয়াপ্ত না করে বিভিন্ন উপায়ে এতদিন ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।

গত অক্টোবরে আব্দুল মান্নানের নামে থাকা ৪ কোটি ৭০ লাখ ১ হাজার ৮৮৬টি শেয়ারের (পরিশোধিত মূলধনের ৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ) মধ্যে ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৯৯ হাজার ৫১১টি শেয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান পারভেজ তমাল ও নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান আদনান ইমামের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে হস্তান্তর করা হয়েছে। আর কামরুন নাহার সাখীর শেয়ার মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ঋণ সমন্বয়ের জন্য দেওয়া হচ্ছে।

এনআরবিসি ব্যাংকের উদ্যোক্তা শেয়ার চলতি মার্চ পর্যন্ত লক-ইন তথা বিক্রি বা হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আবার ২০২১ ও ২০২২ সালের জন্য ঘোষিত বোনাস শেয়ারও ২০২৫ ও ২০২৬ সালের আগে বিক্রি করা যাবে না। অথচ নিয়ম অমান্য করে বিশেষ বিবেচনায় ব্লক মার্কেটে এই শেয়ার কেনাবেচার অনুমোদন দেয় বিএসইসি। এর মধ্যে গত ৩১ অক্টোবর ব্যাংকের চেয়ারম্যান পারভেজ তমালের ব্যবসায়িক অংশীদার শফিকুল আলমের অনুকূলে ১ কোটি ৬৫ লাখ ৭২ হাজার ৯৯২টি এবং নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান আদনান ইমামের স্ত্রী নাদিয়া মোমিন ইমামের কাছে ১ কোটি ৩৮ লাখ ৪৫ হাজার ৯০৪টি শেয়ার বিক্রি করা হয়। আর মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শহীদুল আহসানের মেয়ে রেহনুমা আহসানের অনুকূলে ১ কোটি ৪৫ লাখ ৮০ হাজার ৬১৫টি শেয়ার হস্তান্তর করা হয়েছে।

অর্থ পাচারের তথ্য আড়াল করেছে এনআরবিসি ব্যাংক

মার্চ ২২, ২০২৪, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে তুলে ধরা হলো কীভাবে ব্যাংকটির উত্তরা শাখা তৈরি পোশাক রপ্তানির নামে অর্থ পাচারের বিষয়টি আড়াল করতে চেয়েছে।

এনআরবিসি ব্যাংকের উত্তরা শাখার ছয়জন গ্রাহকের অন্তত ৩৪ কোটি ৪১ লাখ টাকার রপ্তানি আয় দেশে ফেরত আসেনি এবং শাখাটি এই তথ্য আড়াল করেছে বলে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও মামলার নথি থেকে জানা গেছে।

উপরন্তু, এদের মধ্যে পাঁচটি কোম্পানি ৯০ কোটি টাকার এলসির বিপরীতে কোনো ধরনের রপ্তানি করেনি। যার ফলে ব্যাংকটির ডলারের খরচ হলেও তা আর ফেরত পাওয়া যাচ্ছে না।

২০২১ সালের ১৯ আগস্টে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুসারে, উত্তরা শাখা গত চার বছরে এই অর্থ ফোর্সড লোন হিসেবে দেখায়।

তথ্য আড়াল করার সুবিধার্থে এরপর সেটিকে সাধারণ ঋণে রূপান্তরিত করে বারবার পুনঃতফশিল করা হয়েছে  বলে জানা গেছে ব্যাংকের সভার কার্যবিবরণী থেকে।

রপ্তানির অর্থ না আসার পরও রপ্তানি নথি জমা না দিয়েই অর্থ তুলে নেওয়া এই কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটির সঙ্গে বর্তমানে যুক্ত আছেন ব্যাংকের নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান আদনান ইমাম।

দ্য ডেইলি স্টারের হাতে আসা ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনটিতে বলা হযেছে, ‘বেশ কয়েকবার লক্ষ্য করা গেছে যে শাখাটি ফরেন ডকুমেন্টারি বিল পার্চেজ লোন অ্যাকাউন্ট তৈরি করে তাদের ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি বিল পরিশোধ করেছে, যেখানে এই বিলগুলো সংশ্লিষ্ট রপ্তানি আয়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা উচিত ছিল।’

গত বছরের ১১ জুলাই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ব্যাংকটির ১১ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। অভিযোগ করা হয়েছে, প্রতারণামূলকভাবে তারা ব্যাংক থেকে ৭৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এবং ইক্সোরা অ্যাপারেলস নামে একটি সোয়েটার ফ্যাক্টরির নাম ব্যবহার করে পাঁচ কোটি ৯৭ লাখ টাকা পাচার করেছে। রপ্তানি আয় দেশে না আনা ছয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি হলো এই ইক্সোরা।

এনআরবিসির সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, এনআরবিসি নিয়ে একাধিক তদন্ত হয়েছে এবং প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ইক্সোরার সঙ্গে আদনানের সংশ্লিষ্টতা

ইক্সোরার নিবন্ধন সংক্রান্ত নথির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত আছেন আদনান ইমাম। এর আগে বেনামি ঋণের মাধ্যমে অর্থপাচারের অভিযোগ তদন্ত চলাকালীন এনআরবিসি ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান পারভেজ তমালের সঙ্গে তাকেও ব্যাংকের বোর্ড থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

তারা দুজনেই অর্থ পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, একটি ‘স্বার্থান্বেষী মহলের তোলা এই অভিযোগ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’।

ইক্সোরার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন আদনান।

দুদকের তদন্ত অনুসারে, ইক্সোরা অ্যাপারেলস ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে পাঁচ কোটি ৯৭ লাখ টাকার পোশাকের ১২টি চালান যুক্তরাজ্যে পাঠিয়েছে। কিন্তু এ বাবদ রপ্তানি আয় দেশে আনেনি।

২০২৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর এনআরবিসি ব্যাংকের ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ডিভিশন থেকে তৈরি করা নথি অনুযায়ী, বর্তমানে ব্যাংকটির বৃহত্তম ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে ইক্সোরা ১৯তম।

নথিতে আরও উল্লেখ রয়েছে, কোম্পানিটি এর মোট ঋণের মধ্যে ১১৯ কোটি টাকা ২০২৭ ও ২০২৮ সাল পর্যন্ত পুনঃতফশিল করিয়ে নিয়েছে। কিন্তু এরপরও সময়মতো কিস্তি পরিশোধ না করায় কোম্পানিটির অতিরিক্ত বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ছয় কোটি টাকায়।

কোম্পানিটি ২০১৬ সালের আগস্টে এনআরবিসির সঙ্গে ব্যাংকিং শুরু করে।

ওই বছরই কোম্পানিটি যখন প্রথম ঋণ নেয়, তখন এর মালিকদের মধ্যে রুহুল আমিন ভূঁইয়া ও মাসুদ রানার কাছে ছিল ৪০ শতাংশ করে শেয়ার। এছাড়া, তাদের স্ত্রীদের প্রত্যেকের নামে ছিল ১০ শতাংশ করে মালিকানা। দুদকের মামলায় রুহুল আমিন ভূঁইয়া ও মাসুদ রানাকে আসামি করা হয়েছে।

২০২৩ সালে এনআরবিসি ব্যাংকের সবচেয়ে বড় খেলাপি ঋণগ্রহীতা পলিগনের মোট বকেয়া ঋণ গত নভেম্বরে দাঁড়িয়েছিল ৮৭ কোটি ৭০ লাখ টাকায় এবং ব্যাংকের পক্ষ থেকে এই টাকা আদায়ে অর্থ ঋণ আদালতে মামলা করা হয়েছে।

২০২১ সালে কোম্পানিটির ৮৩ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয় ভাইব্রানিয়াম নামে আরেকটি কোম্পানি।

ভাইব্রানিয়ামের নিবন্ধন নথি অনুযায়ী, এর চেয়ারম্যান বদরুল হাসান পাটোয়ারী। তিনি জেনেক্স ইনফোসিস নামে একটি কোম্পানির সেক্রেটারি। সেই জেনেক্স ইনফোসিসের চেয়ারম্যান আদনান ইমাম।

মাত্র ১০ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধন দিয়ে চালু করা হয়েছিল ভাইব্রানিয়াম। কোম্পানির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে, ২০১৯ সালে চালু করার দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে তারা এমন একটি কোম্পানি কিনেছে যাদের রয়েছে ৭৮ হাজার ১৬৪ বর্গফুটের কারখানা ও ৮০০টি মূলধনী যন্ত্রপাতি এবং কারখানার প্রতিদিন আট হাজার পিস পোশাক তৈরির সক্ষমতা আছে।

এনআরবিসি ব্যাংক কোম্পানিটির ঋণসীমা অন্তত আটবার নবায়ন করেছে এবং তিনবারই হয়েছে বদরুল হাসান পাটোয়ারী মালিকানা নেওয়ার পর।

দুদকের মামলায় বদরুল হাসান পাটোয়ারীকে আসামি করা হয়নি। অথচ, দুদকের তদন্তে দেখা গেছে, একের পর এক ঋণ নিয়েও কোম্পানিটি পরিশোধ করেননি।

দুদকের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘গ্রাহকের লেনদেন সন্তোষজনক না হওয়ার পরও ঋণ দেওয়া হয়েছিল।’

২০২৩ সালের জুনে বাংলাদেশ ব্যাংক কোম্পানিটিকে ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পাঁচটি আদেশের বিপরীতে তিন লাখ ৫৮ হাজার ২৭৩ মার্কিন ডলার মূল্যের রপ্তানি আয় সামঞ্জস্য করার জন্য ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দেয়।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে আদনান ইমাম বলেন, ‘ইক্সোরা অ্যাপারেলস এনআরবিসি ব্যাংকের ক্লায়েন্ট এবং আমার সঙ্গে এর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আমাকে বলা হয়েছিল যে, মহামারি চলাকালীন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো ইক্সোরাও আর্থিক সমস্যার মধ্য দিয়ে গিয়েছিল এবং ব্যাংক অন্য প্রতিষ্ঠানের মতো ইক্সোরাকেও সহায়তা করেছে। আমাকে আরও বলা হয়েছিল যে, পাঁচ কোটি ৯৭ লাখ টাকা সম্পূর্ণরূপে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। দুদক বিষয়টি তদন্ত করেছে এবং কোনো সমস্যা খুঁজে পায়নি।’

নিখোঁজ ডলার

এনআরবিসি ব্যাংকের ইন্টারনাল কন্ট্রোল অ্যান্ড কম্প্লায়েন্স ডিভিশনের (আইসিসিডি) ২০২১ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পলিগন ফ্যাশন লিমিটেড নামে আরেকটি কোম্পানি আট লাখ ৩৩ হাজার ৯২৮ মার্কিন ডলার বা নয় কোটি ১০ লাখ টাকার রপ্তানি আয় দেশে আনেনি।

কোম্পানিটি পোশাকের চালান পাঠাতেও ব্যর্থ হয় এবং তিন দশমিক ২৭ মিলিয়ন ডলার মূল্যের এলসি নিস্পত্তি করতে পারেনি, যা খোলা হয়েছিল উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল আমদানির জন্য।

২০২৩ সালে ব্যাংকটির সবচেয়ে বড় খেলাপি ঋণগ্রহীতা ছিল পলিগন। গত বছরের নভেম্বরে কোম্পানিটির মোট বকেয়া ঋণ দাঁড়িয়েছিল ৮৭ কোটি ৭০ লাখ টাকায় এবং ব্যাংকের পক্ষ থেকে এই টাকা আদায়ে অর্থ ঋণ আদালতে মামলা করা হয়েছে।

এরপর ব্যাংকটির উত্তরা শাখা গাজীপুরভিত্তিক কোম্পানির দায় ৭৪টি ফোর্সড লোনে পরিণত করে।

এত টাকা ঋণ পাওয়ার উপযুক্ত না হলেও পলিগনকে এই পরিমাণ অর্থ ঋণ দেওয়া হয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ফলে গ্রাহক যথাযথভাবে তহবিল ব্যবহার করতে পারেনি। তার তহবিল অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ ছিল এবং তারা হয়তো তহবিল অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে।’

ঋণ অনুমোদন করার আগে চালানের মূল্যের ওপর ভিত্তি করে গ্রাহকের ক্রেডিট রিপোর্ট সংগ্রহ করতে হয় ব্যাংককে। কিন্তু তদন্তকালে অডিট দল দেখতে পেয়েছে যে কয়েকজন গ্রাহকের ক্রেডিট রিপোর্ট নেই।

এছাড়াও, রপ্তানির প্রমাণ হিসেবে ব্যাংকটি কোম্পানিটির সব রপ্তানি নথি সংগ্রহ করেনি বলেও দেখেছে তদন্ত দল।

প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, দেনা এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে যে পলিগন এই অর্থ ফেরত দিতে পারবে না। ২০২১ সালের নভেম্বরে ঋণটি পুনঃতফসিল করা হয়।

২০২১ সালের আইসিসিডি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১১৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ব্যাংকটির ২০তম বৃহত্তম ঋণগ্রহীতা ছিল ব্লেসিং নিটওয়্যার লিমিটেড।

কোম্পানিটির ছয় লাখ ৬১ হাজার ৮৫ ডলার (সাত কোটি ২০ লাখ টাকা) মূল্যের রপ্তানি আয় ব্যাংকে জমা করা হয়নি। আরও কয়েকটি এলসির বিপরীতে চালান করতে না পারায় ব্যাংককে আরও দুই দশমিক ৩৩ মিলিয়ন ডলার (২৫ কোটি টাকা) পরিশোধেও ব্যর্থ হয়েছে কোম্পানিটি।

এসব ঘটনায় এমনটিই বোঝা যায় যে, ব্যাংকটি আমানতকারীদের স্বার্থের দিকে নজর দেয় না।

— ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো

প্রতিবেদনে বলা হযেছে, ‘দেখা গেছে যে শাখাটি রপ্তানি নিশ্চিত না করে বা অরিজিনাল অথেন্টিকেটেড বিল অব লেডিং না করে অসম্পূর্ণ নথির বিপরীতে গ্রাহককে অযৌক্তিক সুবিধা দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে।’

ফেরত না আসা এই অর্থ ফোর্সড লোনে পরিণত করা হয়েছে এবং কোম্পানিটি এই তহবিল অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে থাকতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বর এসব ঋণকে সাধারণ ঋণে পরিণত করা হয়।

ইনসাইড নিট লিমিটেড তাদের রপ্তানির তিন লাখ এক হাজার ১৯১ ডলার বা তিন কোটি ৩০ লাখ টাকা ফেরত না দিয়ে এই অর্থ ফোর্সড লোনে পরিণত করতে বাধ্য করেছে, যা ‘সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত’ বলে উল্লেখ করেছে আইসিসিডি।

কারখানা পরিদর্শনকালে আইসিসিডি টিম এলসির বিপরীতে কোনো পণ্যের মজুত দেখতে পায়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এতে প্রতীয়মান হয় যে গ্রাহকের ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলার এবং স্থানীয় বাজারে পণ্যের স্টক ইচ্ছা মতো বিক্রি করেছে।’

উপরন্তু, কোম্পানিটি আরও কিছু চালান পাঠাতে পারেনি। ফলে ব্যাংকের দশমিক নয় লাখ ডলার (নয় কোটি ৭০ লাখ টাকা) এলসির বিপরীতে কোনো ডলার আয় হয়নি।

২০২৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর এনআরবিসি ব্যাংকের ক্রেডিট রিস্ক ডিভিশনের সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, ‘ব্যাংকের মূলধনের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে নতুন গ্রাহক গ্রহণ সক্ষমতা’ এবং ‘সুনাম’ বাড়াতে এসব ঋণ পুনঃতফসিল করেছে ব্যাংক।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫এফ অ্যাপারেলস রপ্তানির ১৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ফেরত দেয়নি এবং অসম্পূর্ণ রপ্তানি নথির বিপরীতে এই ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

চালান সম্পন্ন করতে না পারায় কোম্পানিটি সাত লাখ ডলারের (সাত কোটি ৬০ লাখ টাকা) ঘাটতিও রেখেছিল।

প্রতিবেদন বলছে, ‘ব্যাংকটির শাখা কোনো শিপিং নথি ও লেডিংয়ের আসল বিল ছাড়াই আলোচনা করেছে এবং ফলস্বরূপ এই বিলের জন্য কোনো চালান সম্পন্ন করা হয়নি।’

এতে বলা হয়েছে, ব্যাংক এই অর্থ ফোর্সড লোনে পরিণত করেছে এবং কোম্পানিটি এই তহবিল অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে থাকতে পারে।

২০২১ সালের ২৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ১২৯তম বোর্ড সভার কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, কোম্পানিটির ১২ কোটি ২৩ লাখ টাকার ২৪টি ফোর্সড লোন ১০ বছরের জন্য সাধারণ ঋণে পরিণত করা হয়েছে।

রিলাক্স ফ্যাশন লিমিটেড ৮৫ হাজার ৮২০ ডলার বা ৯৪ লাখ টাকা ফেরত দেয়নি এবং এই ঋণ ফোর্সড লোনে পরিণত হয়েছে। এছাড়াও, অসম্পূর্ণ রপ্তানির ফলে ব্যাংকের আট লাখ ডলারের (নয় কোটি টাকা) অপূরণীয় এলসি খুলতে হয়েছে।

আইসিসিডি বলছে, ‘রপ্তানি নীতি লঙ্ঘন করে রপ্তানি এলসির মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অতএব, রপ্তানি আয় ব্যাক-টু-ব্যাক বাধ্যবাধকতা নিষ্পত্তির জন্য পর্যাপ্ত হবে না।’

২০২৩ সালের ১২ এপ্রিল এনআরবিসি ব্যাংকের বোর্ড সভার কার্যবিবরণী থেকে দেখা যায়, রেকর্ড থেকে অর্থ পাচারের তথ্য মুছে দিয়ে ফোর্সড লোনগুলোকে ‘সাধারণ’ ঋণে রূপান্তরিত করে পাঁচ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করা হয়েছে।

এনআরবিসি ব্যাংক: কিছু কর্মকর্তার জন্য সন্দেহজনক পুরস্কার

মার্চ ২৩, ২০২৪, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের তৃতীয় পর্বে তুলে ধরা হলো কীভাবে ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং নিজেদের মানবসম্পদ নীতি লঙ্ঘন করে তাদের ২৭ কর্মকর্তার বেতন অস্বাভাবিক বৃদ্ধি করেছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক তদন্তে দেখা গেছে, দেশের ব্যাংকিং নিয়মের পাশাপাশি এনআরবিসি ব্যাংকের নিজস্ব মানবসম্পদ নীতিরও লঙ্ঘন করে ২০২২ সালে ব্যাংকটির অন্তত ২৭ জন কর্মীর বেতন বাড়ানো হয়েছে বিস্ময়কর পরিমাণে। কিছু ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ পর্যন্তও বেড়েছে বেতন।

২০২২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি এনআরবিসি ব্যাংকের একটি অফিস আদেশ অনুযায়ী, তিনজন সিনিয়র কর্মকর্তাকে একবারে ১৩টি পর্যন্ত ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়েছিল।

দুই উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বেতন বাড়ানো হয়েছে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা থেকে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত, যা তাদের মূল বেতনের প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি। অন্তত ১০ জন কর্মকর্তার বেতন ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে এবং বাকিদের বেড়েছে ১৮ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত।

এনআরবিসির অফিস আদেশে এই ২৭ জনের মোটা অংকের বেতন বৃদ্ধিকে ‘ব্যাংকের লক্ষ্য অর্জনে ব্যতিক্রমী অবদান’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্টের (এফআইসিএসডি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের ইনক্রিমেন্ট ব্যাংকিং আইনের পাশাপাশি এনআরবিসির নিজস্ব মানবসম্পদ নীতিমালারও লঙ্ঘন।

ব্যাংকটির নীতিমালার বরাত দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘কর্তৃপক্ষ একজন কর্মীকে (প্রতি বছর) সর্বোচ্চ তিনটি ইনক্রিমেন্ট দিতে পারে।’

সেই সময়ে ব্যাংকটির মোট ৩ হাজার ৮০০ কর্মী ছিল।

ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি ডিপার্টমেন্টের এক সার্কুলার অনুযায়ী, ইনক্রিমেন্ট অবশ্যই প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মাঝে সর্বজনীনভাবে দেওয়া উচিত, নির্বাচিত কয়েকজনের জন্য নয়।

ওই ২৭ কর্মকর্তার ইনক্রিমেন্ট পরে প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক উল্লেখ করেছে যে ‘এই অনিয়মের জন্য স্পষ্টভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করার পরও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’

দ্য ডেইলি স্টারের হাতে থাকা নথি থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে এই ‘ব্যতিক্রমী অবদান’ রাখা কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্তত দু-একজন কীভাবে অনিয়মের সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে জড়িত ছিলেন।

তাদের একজন এনআরবিসি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ও ওভারড্রাফট (ওডি) অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারে জড়িত ছিলেন।

তিনি হলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ব্যাংকের আর্থিক প্রশাসন বিভাগের প্রধান মো. জাফর ইকবাল হাওলাদার। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার বেতন ৩৯ শতাংশ বেড়ে এক লাখ চার হাজার টাকা থেকে এক লাখ ৪৪ হাজার ৬০০ টাকা হয়। যদিও সিদ্ধান্তটি পরবর্তীতে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

‘অবদান’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে দেখা গেছে, এনআরবিসি শুধু অযাচিতভাবে তার বেতন বৃদ্ধিই করেনি, অযথা পদোন্নতিও দিয়েছে।

মো. জাফর ইকবাল হাওলাদার ২০১৩ সালে প্রিন্সিপ্যাল অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। এক বছরের মধ্যে তাকে ব্যাংকের নিজস্ব মানবসম্পদ নীতিমালা ভঙ্গ করে ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এফএভিপি) হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়ে। অথচ, ব্যাংকটির মানবসম্পদ নীতি অনুযায়ী এই পদোন্নতির জন্য অন্তত দুই বছরের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক। একইভাবে এফএভিপি হওয়ার এক বছরের মধ্যে তাকে আবারও নীতি ভঙ্গ করে ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

তার ওভারড্রাফট ব্যাংক অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্টগুলো বিশ্লেষণ করে এক অদ্ভুত প্যাটার্ন দেখা যায়। তার ওডি অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ অর্থ আসে, তারপর একই পরিমাণ অর্থ অন্য অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয় বা ক্রেডিট কার্ড বিল হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। এই লেনদেনগুলো কখনো একদিনের ব্যবধানে, আবার কখনো একইদিনে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যে অ্যাকাউন্ট থেকে তার অ্যাকাউন্টে টাকা এসেছে সেই একই অ্যাকাউন্টে আবার টাকা ফেরত পাঠানো হয়েছে।

অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্স শূন্য থাকলেও ওভারড্রাফট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে একজন গ্রাহক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খরচ করতে পারেন, বিল পরিশোধ করতে পারেন। এই ধরনের অ্যাকাউন্ট প্রতি বছর রিনিউ করা হয়। যার অর্থ হচ্ছে, ব্যাংকের কাছে এমন অ্যাকাউন্টের স্বাভাবিক বা অস্বাভাবিক সব ধরনের লেনদেনের সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে।

জাফরের ওডি অ্যাকাউন্টটি ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে খোলা হয়। কিন্তু ২০১৭ সালে বর্তমান চেয়ারম্যান পারভেজ তমাল দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই লেনদেনের এই প্যাটার্ন দেখতে পাওয়া যায়।

২০১৬ সালে পরিচালক থাকাকালীন ‘বোর্ডের অন্যান্য সদস্য ও কর্মকর্তাদের ভয় দেখানোর জন্য’ বন্দুকধারী একজনকে নিয়ে বোর্ডরুমে ঢুকেছিলেন পারভেজ তমাল। ব্যাংকের একাধিক কার্যবিবরণী অনুযায়ী, সেইসময়ে বেনামি ঋণ নিয়ে ব্যাংক থেকে ৬৪ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে পারভেজসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে তদন্ত করছিল বোর্ড।

পারভেজ বন্দুকধারীকে বোর্ডরুমে আনার স্বপক্ষে বলেন, বন্দুকধারী তার দেহরক্ষী। এমনকি কোনো ধরনের অর্থ পাচারে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

দ্য ডেইলি স্টার জাফরের সঙ্গে সম্পর্কিত ছয়টি ক্রেডিট কার্ড ও পাঁচটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের লেনদেন বিশ্লেষণ করেছে, যা থেকে লেয়ারিংয়ের বিষয়টি সামনে এসেছে।

২০১৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে তিনি তার অ্যাকাউন্ট ও ক্রেডিট কার্ড দিয়ে কয়েক কোটি টাকার লেনদেন করেছেন।

এই প্রতিবেদনের জন্য শুধু মাত্র সেই লেনদেনের তথ্য দেখা হয়েছে যেগুলো ২০১৭ সাল থেকে ২০২২ সালের মধ্যে হয়েছে এবং একই দিনে বা পরবর্তী দিনে প্রতিবারে ১ লাখ টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে।

প্যাটার্নে এমন অসংখ্য লেনদেন দেখা যায়, যেখানে জাফরের অ্যাকাউন্টে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদান করা হয়েছে এবং তারপরে তিনি কিছু সময় পরই সেই টাকা আবার পরিশোধ করে দিয়েছেন।

আয়ের সঙ্গে বেমানান

ব্যাংকের নিজস্ব মানি লন্ডারিং অ্যান্ড টেররিস্ট ফাইন্যান্সিং রিস্ক ম্যানেজমেন্ট নীতি অনুসারে, ‘লেয়ারিং হলো অর্থ পাচার প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় পর্যায়, যেখানে অবৈধ তহবিল বা সম্পদ স্থানান্তর করা হয়, ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং সেগুলোর উত্স গোপন করা হয়। জটিল লেনদেনের জালে আর্থিক ব্যবস্থায় তহবিল লুকিয়ে রাখা যেতে পারে।’

নীতিতে বলা হয়েছে, সন্দেহজনক লেনদেনের একটি সূচক হলো ‘গ্রাহকের ব্যবসা বা পেশার সঙ্গে মানানসই নয় এমন ঘন ঘন নগদ লেনদেন।’

জাফরের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তার অ্যাকাউন্ট ও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার লেনদেন করা হয়েছে। অথচ, এই লেনদেনের তুলনায় তার ব্যাংক থেকে পাওয়া মাসিক বেতন বহুগুণ কম।

তার অ্যাকাউন্টে টাকা এসেছে মূলত দুটি উপায়ে। একটি হচ্ছে ওয়্যার ট্রান্সফার, নগদ বা চেক জমার মাধ্যমে সরাসরি তার অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তর। অপরটি হচ্ছে তার অনেকগুলো ক্রেডিট কার্ডের মধ্যে যেকোনোটিতে টাকা জমা করা।

টাকা বিভিন্নভাবে বের হয়েছে—যে অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা এসেছে সেখানেই আবার ফেরত পাঠানো হয়েছে, এনআরবিসি বা অন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্টে গেছে, জাফরের নামে ক্রেডিট কার্ডে টাকা পাঠানো হয়েছে, একজন ব্যক্তির নামে চেক দেওয়া হয়েছে, ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা হয়েছে।

২০১৮ ও ২০২০ সালের মধ্যে এমন সাতটি ঘটনা ঘটেছে যেখানে একটি ক্রেডিট কার্ড থেকে তার অ্যাকাউন্টে টাকা এসেছে এবং একই দিনে বিল হিসেবে তিনি অন্য ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অর্থ খরচ করেছেন বা টাকা ট্রান্সফার করেছেন।

২০১৮ সালের ৯ জুলাই তিনি তার ক্রেডিট কার্ড থেকে ওভারড্রাফট অ্যাকাউন্টে পাঁচ লাখ টাকা স্থানান্তর করেন এবং কার্ড দিয়ে চার লাখ ৫৪ হাজার টাকার বিল পরিশোধ করেন। তিনি ২০২০ সালের ১১ থেকে ১৩ মে একই কাজ বারবার করেছেন। এই তিন দিনে অ্যাকাউন্টে নিয়েছেন ১৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং পরবর্তী দিনে চারটি ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ১৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা প্রদান করেছেন।

২০১৭ সালে চারটি এবং ২০২০ সালে এমন একটি উদাহরণ রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন ক্রেডিট কার্ড থেকে তার ওডি অ্যাকাউন্টে টাকা এসেছে এবং তিনি একই দিনে বা পরবর্তী দিনে এই ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়েছেন।

এ ছাড়া, ২০১৭-২০১৮ সালে চারটি ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ব্যাংকের প্রধান শাখার সঙ্গে আরেকটি এনআরবিসি অ্যাকাউন্ট থেকে জাফরের ওডি অ্যাকাউন্টে অর্থ পাঠানো হয়েছে এবং তিনি একই দিনে একই অ্যাকাউন্টে অর্থ পাঠিয়েছেন।

এনআরবিসি ব্যাংকের ৪ শীর্ষ কর্তার মধ্যাহ্নভোজে ২০ প্লেট ভাত, ১১৮ প্লেট তরকারি!

মার্চ ২৩, ২০২৪, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের শেষ পর্বে তুলে ধরা হলো এনআরবিসির ব্যবস্থাপনার শীর্ষ কর্তাদের খাবারের প্রবল রুচির তথ্য। তাদের খাবারের বিল দেখে বোঝা কঠিন যে, অফিস মিটিং চলাকালীন কেউ কীভাবে এত খাবার খেতে পারে।

অর্থপাচার, ঋণ অনিয়ম, অতিরিক্ত ব্যয় ও নিয়োগ সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে প্রায়ই খবরের শিরোনাম হয় এনআরবিসি ব্যাংক। ৭০০ কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির অভিযোগে ২০১৭ সালে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া ও তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেওয়ান মুজিবুর রহমানকে অপসারণে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংককে।

তৎকালীন চেয়ারম্যান ফরাসত আলীকে বোর্ড থেকে পদত্যাগ করতে হয়। মুজিব ও ফরাসতকে পরিচালক পদ থেকে দুই বছরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নিষিদ্ধ করে এবং পরবর্তীকালে বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়।

কিন্তু নতুন পর্ষদে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়েছেন এমন একজন, যার বিরুদ্ধে আগেই অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল এবং ব্যাংকটিতে এখনো অনিয়ম অব্যাহত আছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ব্যাংকটির সভার কার্যবিবরণী এবং অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন ও সুপ্রিম কোর্টের নথির শত শত পৃষ্ঠা গত ছয় মাস ধরে বিশ্লেষণ করে দ্য ডেইলি স্টার ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ অসংখ্য অনিয়ম, এমনকি অস্ত্র দিয়ে ভীতি সৃষ্টির করার মতো ঘটনার বিষয়েও জানতে পেরেছে।

চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের শেষ পর্বে তুলে ধরা হলো এনআরবিসির ব্যবস্থাপনার শীর্ষ কর্তাদের খাবারের প্রবল রুচির তথ্য। তাদের খাবারের বিল দেখে বোঝা কঠিন যে, অফিস মিটিং চলাকালীন কেউ কীভাবে এত খাবার খেতে পারে।

এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার শীর্ষ কর্মকর্তাদের খাবারের রুচি প্রবল।

চার কর্মকর্তার উপস্থিতিতে ২০১৬ সালের ২৪ অক্টোবর এনআরবিসি ব্যাংক পর্ষদের নির্বাহী কমিটির ৫৬তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই চারজন হলেন নির্বাহী কমিটির তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. মঞ্জুরুল ইসলাম, তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেওয়ান মুজিবুর রহমান এবং পরিচালনা পর্ষদের তৎকালীন সদস্য ফরাছত আলী ও লকিয়ত উল্লাহ।

দ্য ডেইলি স্টারের হাতে আসা বিলের কপি অনুযায়ী, গুলশানের কস্তুরী গার্ডেনে এই চার জনের মধ্যাহ্নভোজের জন্য ব্যাংকের খরচ হয়েছে ৪১ হাজার ৯১ টাকা।

বিলে ২০ প্লেট ভাত ও ১১৮ প্লেট তরকারির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে আছে—১৮ প্লেট ফুল চিকেন ভুনা, ১৮ প্লেট চিতল কোফতা, ১৭ প্লেট গরুর মাংসের আচারি কারি, ১৬ প্লেট টাকি মাছের ভর্তা, ১৭ প্লেট বাতাশি মাছের কারি, ১৭ প্লেট মিক্সড সবজি ও ১৫ প্লেট ডাল।

বিলে দুই ক্রেট পানির বোতল ও ২০ বোতল কোকও ছিল। ওই চার জনের গাড়িচালক এই ভোজে অংশ নেননি এবং দুপুরের খাবারের জন্য তাদের প্রত্যেককে ৩০০ টাকা করে দেওয়া হয়।

তাদের মধ্যাহ্নভোজ বাবদ করা এই খরচ বিধিমালা বহির্ভূত, যেহেতু নির্বাহী কমিটির সভায় যোগদানের জন্য পরিচালকরা নিয়মিত ফি ছাড়া অন্য কোনো আর্থিক বা কোনো ধরনের সুবিধা নিতে পারেন না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে দেখা গেছে, চার মাস পর ২০১৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি কার্যনির্বাহী কমিটির ৬১তম সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং তখন আটজনের মধ্যাহ্নভোজে ৪৮ হাজার ৬৯১ টাকা খরচ হয়। তাদের খাবারের তালিকায় ছিল ১৬ প্লেট করে ইলিশ, চিংড়ি কারি, মাটন কড়াই, চিংড়ি ভর্তা ও ডাল এবং ১৭ প্লেট করে রূপচাঁদা, বাটার চিকেন ও ভাত।

সভায় সদস্যদের ফি, রিফ্রেশমেন্ট ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচসহ নির্ধারিত মোট বাজেটের চেয়ে ৪৫ হাজার ৬৭০ টাকা বেশি ব্যয় করা হয়।

এক মাস পর কার্যনির্বাহী কমিটির ৬২তম সভায় থাকা আট জনের মধ্যাহ্নভোজে ব্যয় হয় ৬৭ হাজার ১৩৭ টাকা।

ভাউচারে দেখা গেছে, কার্যনির্বাহী কমিটির ৬১ ও ৬২তম বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষক মো. মাসুদ বিশ্বাসও উপস্থিত ছিলেন।

২০১৭ সালের ১৮ জুন ৫৫তম বোর্ড সভায় মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন না করা হলেও সভায় উপস্থিত নয় সদস্য ৩৫ ঝুড়ি ফল পেয়েছেন, যার মূল্য দুই লাখ টাকার বেশি বলে বিলের কপি থেকে জানা গেছে।

রমজান মাসেও তাদের খাবারের পরিমাণ কমেনি।

২০১৯ সালের ২৮ মে পরিচালনা পর্ষদের ৮১তম সভায় অংশ নেওয়া আট পরিচালক নেন ইফতারের ৬০টি বক্স। বিল কপিতে দেখা গেছে, এর জন্য খরচ হয়েছে ৬২ হাজার ১০০ টাকা।

২০১৮ সালের ১২ ডিসেম্বর পরিচালনা পর্ষদের ৭৫তম সভা ও কার্যনির্বাহী কমিটির ৮০তম সভায় ১১ জনকে ‘খাওয়াতে’ ব্যয় হয় এক লাখ ১৬ হাজার ৫২৫ টাকা। রসিদে দেখা যায়, উপস্থিত ১১ জনের পরিবর্তে ৩৭ জনের জন্য দুপুরের খাবারের বিল করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্টের (এফআইসিএসডি) এক তদন্তে ২০১৩ সাল থেকে ২০টি ব্যয়ের রেকর্ড পর্যালোচনা করে বলা হয়েছে, এসব ক্ষেত্রে ব্যাংকিং কোম্পানি আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হয়েছে।

আইনে বলা হয়েছে, ‘ব্যাংকের নির্বাহী বোর্ডের সভায় অংশগ্রহণের জন্য নিয়মিত ফি ব্যতীত কোনো ব্যাংক পরিচালক ব্যাংক থেকে কোনো আর্থিক বা অন্য কোনো সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন না।’

২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সময়ে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও কার্যনির্বাহী কমিটির আরও ১৩টি সভার ব্যয়ের তালিকা দেখেছে ডেইলি স্টার। সেগুলোর সবগুলোতেই খাবার বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে দেখা গেছে।

মেট্রোরেলের ক্যান্টিন ভাড়া ১ হাজার টাকা : তদন্তের নির্দেশ

২১ মার্চ ২০২৪, ঢাকা পোস্ট

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) উত্তরা ডিপোতে অবস্থিত ৭ হাজার ৫৮০ বর্গফুটের স্টাফ ক্যান্টিন মাসিক এক হাজার টাকায় ভাড়া দেওয়ার ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

এক মাসের মধ্যে সড়ক ও পরিবহনক সচিবকে  তদন্ত করে রিপোর্ট আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে ১ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে বিজ্ঞাপন কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন আদালত।

‘প্রয়োজন’ নেই, তবু নতুন তথ্যভান্ডার করতে চাপ

২৫ মার্চ ২০২৪, প্রথম আলো

মোবাইল অপারেটররা আগ্রহী নয়। প্রয়োজন নেই বলে মনে করে সরকারি সংস্থা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারও (এনটিএমসি)। তারপরও গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে তথ্যভান্ডার তৈরি করতে মোবাইল অপারেটরদের চাপ দিচ্ছে বিটিআরসি। গত বুধবার এ বিষয়ে নতুন করে অপারেটরদের চিঠি দেওয়া হয়।

তথ্যভান্ডার করা নিয়ে মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চিঠি চালাচালি চলছিল ২০২১ সালের নভেম্বর থেকেই। গত ২৫ জানুয়ারি দেওয়া একটি চিঠিতে তথ্যভান্ডার করার প্রস্তুতি নিয়ে গত ১৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছিল বিটিআরসি। তবে অপারেটররা তথ্যভান্ডার করেনি।

বিটিআরসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মোবাইল অপারেটরগুলো বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) বাংলাদেশ ন্যাশনাল ডিজিটাল আর্কিটেকচার (বিএনডিএ) ব্যবস্থার মাধ্যমে তথ্যগুলো নেবে। প্রক্রিয়াটিকে বলা হচ্ছে ‘ইলেকট্রনিক টেলিযোগাযোগ গ্রাহক নিবন্ধন ফরম অটোফিলকরণ’।

বিএনডিএর একটি সেবা হলো পরিচয়, যা ২০১৯ সালের জুলাই মাসে চালু হয়। এই সেবার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের এনআইডি তথ্যভান্ডার থেকে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য যাচাই সুবিধা দেওয়া হয়। পরিচয় সেবাটি পরিচালনা করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ডিজিকন টেকনোলজিস। নির্বাচন কমিশনের তথ্যভান্ডার থেকে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় সেবা দিয়ে পরিচয় যে রাজস্ব আয় করে, তার বড় অংশই (৮০ থেকে ৯০ শতাংশ) পায় ডিজিকন।

ডিজিকন টেকনোলজিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াহেদ শরীফ গত ১৮ জানুয়ারি প্রথম আলোকে বলেছিলেন, তাঁরা শুধু কারিগরি সেবা দিয়ে থাকেন। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডারে প্রবেশের সুযোগ নেই। তিনি জানান, পরিচয় কাজটি পেয়েছে সরাসরি ক্রয়প্রক্রিয়া বা ডিপিএম পদ্ধতিতে।

অপারেটররা বলছে, তারা এখন গ্রাহকের তথ্য যাচাই করে সরাসরি নির্বাচন কমিশনের তথ্যভান্ডার থেকে। এ জন্য গ্রাহকপ্রতি ৫ টাকা কমিশনকে দেয় তারা। অন্যদিকে ছবি যাচাইয়ের সুবিধা যোগ করে একই কাজে পরিচয় চাইছে গ্রাহকপ্রতি ১০ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ডিজিকনকে ব্যবসা পাইয়ে দিতেই তথ্যভান্ডার তৈরির এই চাপ।

বেনজীরের ঘরে আলাদীনের চেরাগ

৩১ মার্চ, ২০২৪, কালের কন্ঠ

ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে ধরে ভাঙ্গা চৌরাস্তা থেকে টেকেরহাট হয়ে সামনে এগোলেই গোপালগঞ্জের সাহাপুর ইউনিয়নের বৈরাগীটোল গ্রাম। নিভৃত এই পল্লীর মাঝে গড়ে তোলা হয়েছে সাভানা ইকো রিসোর্ট নামের এক অভিজাত ও দৃষ্টিনন্দন পর্যটনকেন্দ্র, যেখানে এক রাত থাকতে গেলে গুনতে হয় অন্তত ১৫ হাজার টাকা। রিসোর্টের ভেতরে ঘুরে দেখা গেছে একই সঙ্গে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর হাতে গড়া আভিজাত্যের অপরূপ মিশেল। বিশাল আকৃতির ১৫টি পুকুরের চারপাশে গার্ড ওয়াল, দৃষ্টিনন্দন ঘাট, পানির কৃত্রিম ঝরনা ও আলোর ঝলকানি।

পার ঘেঁষে রয়েছে বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স কটেজ। বিদেশি শিল্পীদের নিপুণ হাতে তৈরি হয় এসব স্থাপত্য নকশা। কটেজের ভেতর থেকে পুকুর পর্যন্ত এমন পথ নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে মাটিতে পা ফেলার প্রয়োজন নেই; সরাসরি কটেজ থেকে কাচে ঘেরা আবরণ পেরিয়ে পৌঁছানো যায় শান-বাঁধানো ঘাটে। সাভানা ইকো রিসোর্টের পরিধি এতটাই বড় যে সাহাপুর গ্রামের নাম লিখে গুগলে সার্চ দিলে এই রিসোর্টটিই আগে ভেসে ওঠে পর্দায়।

প্রায় এক হাজার ৪০০ বিঘা জমির ওপর নির্মিত এই ইকো রিসোর্টের বিভিন্ন জায়গায় মাটি ভরাট করে বানানো হয়েছে কৃত্রিম পাহাড়। সাগরের কৃত্রিম ঢেউ খেলানো সুইমিং পুলও রয়েছে এখানে। আছে হাজারের বেশি ভিয়েতনামি নারকেলগাছসহ বিভিন্ন ফলফলাদির গাছ। রয়েছে উন্নতমানের সাউন্ড সিস্টেমসহ বিশাল আকৃতির কনসার্ট হল।

দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একক পরিবারের জন্য বানানো এসব কটেজের পেছনে ব্যয় হয়েছে অর্ধকোটি টাকারও বেশি। যুগলদের কাছে কটেজের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় রিসোর্টের ভেতরে এখন আরো ৫০টি কটেজ নির্মাণ করা হয়েছে। এত সব আয়োজন যেখানে, সেই রিসোর্টের নিরাপত্তায় পাশেই বসানো হয়েছে ‘বিশেষ’ পুলিশ ফাঁড়ি। যাতায়াতের জন্য সরকারি খরচে বানানো হয়েছে সাত কিলোমিটারের বেশি পাকা সড়ক।

দেশে এ রকম নজিরবিহীন আভিজাত্যে ঘেরা পর্যটন স্পটটির মালিকপক্ষ কারা জানেন? অবিশাস্য হলেও সত্য যে রাষ্ট্রীয় শুদ্ধাচার পুরস্কারপ্রাপ্ত পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদের পরিবার।

সাভানা ইকো রিসোর্ট প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদের স্ত্রী জীশান মীর্জা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বেনজীরের বড় মেয়ে ফারহিন রিসতা বিনতে বেনজীর এবং পরিচালক ছোট মেয়ে তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীর।

শুধু এই এক ইকো রিসোর্টই নয়, পুলিশের সাবেক এই প্রভাবশালী শীর্ষ কর্মকর্তা তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ের নামে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাঁদের নামে অন্তত ছয়টি কম্পানির খোঁজ পাওয়া গেছে কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে। এর পাঁচটিই নিজ জেলা গোপালগঞ্জে। জেলা সদরের সাহাপুর ইউনিয়নের বৈরাগীটোল এলাকায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকার বেশি বলে ধারণা পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোতে রয়েছে বেনজীর আহমেদের অঢেল সম্পদ। দামি ফ্ল্যাট, বাড়ি আর ঢাকার কাছেই দামি এলাকায় বিঘার পর বিঘা জমি। দুই মেয়ের নামে বেস্ট হোল্ডিংস ও পাঁচতারা হোটেল লা মেরিডিয়ানের রয়েছে দুই লাখ শেয়ার। পূর্বাচলে রয়েছে ৪০ কাঠার সুবিশাল জায়গাজুড়ে ডুপ্লেক্স বাড়ি, যার আনুমানিক মূল্য কমপক্ষে ৪৫ কোটি টাকা। একই এলাকায় আছে ২২ কোটি টাকা মূল্যের আরো ১০ বিঘা জমি।

এই বিপুল সম্পদের মালিক পরিবারের কর্তা পুলিশের সাবেক আইজি ও র‌্যাবের সাবেক ডিজি বেনজীর আহমেদ সরকারি বেতন-ভাতা থেকে কত টাকা উপার্জন করেছেন, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, ৩৪ বছর সাত মাসের দীর্ঘ চাকরিজীবনে বেনজীর আহমেদ বেতন-ভাতা বাবদ মোট আয় করেছেন এক কোটি ৮৪ লাখ ৮৯ হাজার ২০০ টাকা। এর বাইরে পদবি অনুযায়ী পেয়েছেন আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা। বাংলাদেশ পুলিশের ৩০তম মহাপরিদর্শক ছিলেন তিনি। ২০১১, ২০১২, ২০১৪ এবং ২০১৬ সালে পেয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল (বিপিএম)। অবসরে যাওয়ার আগে ২০২১ সালে ভূষিত হন শুদ্ধাচার পুরস্কারেও। ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর অবসরে যাওয়ার পর বেরিয়ে আসে সাবেক এই পুলিশকর্তার থলের বিড়াল।

সম্পদের মালিকানায় স্ত্রী ও দুই মেয়ে

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সুকৌশলী বেনজীর আহমেদ নিজের নামে কোনো সম্পদ করেননি, করেছেন তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ের নামে। গোপালগঞ্জে সাভানা ফার্ম প্রডাক্টস, সাভানা অ্যাগ্রো লিমিটেড, সাভানা ন্যাচারাল পার্ক, সাভানা ইকো রিসোর্ট, সাভানা কান্ট্রি ক্লাব বানিয়েছেন বেনজীর আহমেদ। বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেড নামের একটি কম্পানিতে বড় মেয়ে ফারহিনের নামে এক লাখ, আর ছেটে মেয়ে তাহসিনের জন্য কেনা হয়েছে আরো এক লাখ শেয়ার। এম/এস একটি শিশির বিন্দু (রেজি. পি-৪৩০৩৬) নামের ফার্মের ৫ শতাংশের মালিকানায় নাম রয়েছে বড় মেয়ের। আরো ৫ শতাংশের মালিকানা রয়েছে ছোট মেয়ের। একই প্রতিষ্ঠানে বেনজীরের স্ত্রী জীশান মীর্জার রয়েছে ১৫ শতাংশ অংশীদারি। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটিতে মোট ২৫ শতাংশের মালিকানা রয়েছে বেনজীর আহমেদের স্ত্রী ও মেয়েদের।

যৌথ মূলধনী ফার্মসমূহের পরিদপ্তর থেকে একটি নথি কালের কণ্ঠ’র হাতে এসেছে। সেটি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সাবেক পুলিশ ও র‌্যাব কর্তা বেনজীর আহমেদ তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ের নামে গোপালগঞ্জে প্রতিষ্ঠা করেছেন সাভানা অ্যাগ্রো। ২০ কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধনধারী সাভানা অ্যাগ্রো লিমিটেডের পরিচালক তিনজন। ১০টি শেয়ারধারী স্ত্রী জীশান মীর্জা চেয়ারম্যান, সমপরিমাণ শেয়ারের অধিকারী ২৯ বছর বয়সী বড় মেয়ে ফারহিন রিসতা বিনতে বেনজীর এমডি। আর মাত্র ২৪ বছর বয়সী ছোট মেয়ে তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীর আছেন পরিচালক হিসেবে। প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে সরেজমিনে যায় কালের কণ্ঠ। সেখানে দেখা গেছে, ২০ কোটি নয়, সাভানা অ্যাগ্রোর রয়েছে কয়েক শ কোটি টাকার বিনিয়োগ ও ব্যবসা।

বেনজীর আহমেদের পরিবারের আরেকটি প্রতিষ্ঠান হলো সাভানা ন্যাচারাল পার্ক প্রাইভেট লিমিটেড। রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কম্পানির (আরজেএসসি) তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই কম্পানির অনুমোদিত মূলধন পাঁচ কোটি টাকা। সাভানা অ্যাগ্রোর মতো এই কম্পানির মালিকানায়ও আছেন স্ত্রী ও দুই মেয়ে। যথারীতি এখানেও স্ত্রী চেয়ারম্যান এবং মেয়েদের একজন এমডি, অন্যজন পরিচালক। প্রত্যেকের হাতে রয়েছে এক লাখ করে মোট তিন লাখ শেয়ার। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, এই পার্কের আয়তন প্রায় ৬০০ বিঘা। পার্কটি বড় করতে পাশে আরো ৮০০ বিঘা জমি কেনা হয়েছে। এখন ভরাট করা হচ্ছে।

যৌথ মূলধনী কম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর থেকে পাওয়া নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাভানা অ্যাগ্রোর নিবন্ধনে ঠিকানা হিসেবে দেওয়া হয়েছে ২২৮/৩, শেখপাড়া রোড, দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী, ঢাকা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ঠিকানাটি বেনজীরের শ্বশুরবাড়ি। বেনজীরের শ্বশুরের নাম মীর্জা মনসুর উল হক ও শাশুড়ির নাম লুত্ফুন নেসা মনসুর।

নথির তথ্য মতে, বেনজীরের স্ত্রী জীশান মীর্জার জন্ম ১৯৭৩ সালের ১০ জুলাই। বড় মেয়ের জন্ম ১৯৯৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। ছোট মেয়ে জন্মেছেন ২০০০ সালের ১২ এপ্রিল। দুই মেয়ে মাত্র ২৯ ও ২৪ বছর বয়সেই কয়েক শ কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে গেছেন প্রভাবশালী পুলিশকর্তা বাবার অবৈধ আয়ের ওপর ভর করে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। স্ত্রী জীশান মীর্জারও তেমন কোনো বৈধ আয়ের উৎস না থাকা সত্ত্বেও বিপুল বিনিয়োগে গড়ে তোলা ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান তিনি। জীশান মীর্জার পৈতৃক সূত্রে এত পরিমাণ সম্পদ পাওয়ার সুযোগ নেই। একইভাবে বড় মেয়ে ফারহিন রিসতা বিনতে বেনজীরের ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর বিয়ে হলেও ছোট মেয়ের এখনো বিয়েই হয়নি। বড় মেয়ের বিয়ের প্রায় ১২ বছর আগে থেকেই বেনজীর কম্পানিগুলোর জন্য জমি কেনা শুরু করেন এবং মেয়েকে কম্পানির এমডি বানান।

সরেজমিনে বেনজীরের রিসোর্ট

বেনজীরের সম্পদের খোঁজে সরেজমিন অনুসন্ধানে গোপালগঞ্জ যায় কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানী দল। বৈরাগীটোল এলাকায় সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্কটিকে স্থানীয়রা ‘বেনজীরের চক’ নামে চেনে। পুলিশের মহাপরিদর্শক ও র‌্যাবের ডিজি থাকাকালে এলাকাটিতে স্ত্রী ও দুই মেয়ের নামে প্রায় এক হাজার ৪০০ বিঘা জমি কেনেন তিনি। এসব জমির বিঘাপ্রতি ক্রয়মূল্য ছিল তিন থেকে আট লাখ টাকা।

এলাকাবাসী জানায়, বেনজীর জমিগুলো কেনার পর অন্ততপক্ষে ১৫ ফুট ভরাট করে রিসোর্ট বানিয়েছেন। কারণ এগুলো ছিল বদ্ধ জলাশয়। নিচু হওয়ায় বেনজীরের রিসোর্টটি আগে ছিল মাছের অভয়ারণ্য।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সাভানা রিসোর্টে ১৫টি কটেজ বানানো শেষ করে পর্যটকদের কাছে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। এগুলো কাপলদের কাছে শুধু দিন হিসাবে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পাঁচ থেকে আট হাজার টাকা, রাত হিসাবে সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত একই দামে, দিনরাত ২৪ ঘণ্টা ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায় ভাড়া দেওয়া হয়। রিসোর্টে চাকরিরত দায়িত্বশীলরা জানান, যেকোনো বয়সী ছেলেমেয়ে কোনো রকম প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই এসব কটেজে থাকতে পারে। চাইলে রাত যাপন করতে পারে। বেনজীর বিলাসবহুল এই রিসোর্ট চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন থাইল্যান্ডসহ পশ্চিমা বিশ্বের আদলে।

রিসোর্টটির আলোকসজ্জা করতে কোনো মিটার ছাড়াই কিলোমিটারের পর কিলোমিটার বিদ্যুতের সরকারি তার সরবরাহ করা হয়েছে কোনো খুঁটি ছাড়াই। মাটির ওপর দিয়ে নেওয়া এসব বৈদ্যুতিক তার যে কারো জন্যই প্রাণনাশের হুমকিস্বরূপ। সাগরের কৃত্রিম ঢেউ খেলানো সুইমিং পুলও রয়েছে এখানে। আছে হাজারের বেশি ভিয়েতনামি নারকেলগাছসহ বিভিন্ন ফলফলাদির গাছ।

শুধু তাই নয়, রিসোর্টটির নিরাপত্তায় পাশেই বসানো হয়েছে পুলিশ ফাঁড়ি। আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থায় উন্নতি না হলেও এই রিসোর্টে প্রবেশ স্বাচ্ছন্দ্য করতে সাত কিলোমিটার সড়ক পাকা করা হয়েছে সরকারি খরচে। রিসোর্টের ভেতরেও সর্বত্র করা হয়েছে ঢালাইয়ের রাস্তা। রিসোর্টের সব রাস্তার হিসাব করলে দেখা যায়, প্রায় ৩০ কিলোমিটার সড়ক পিচ ঢালাই করা হয়েছে। স্থানীয়রা জানায়, বেনজীরের নিজ প্রতিষ্ঠানের এসব রাস্তাও করা হয়েছে সরকারি খরচে।

জানতে চাইলে রিসোর্টের ব্যবস্থাপক আসাদুজ্জামান কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানী টিমকে বলেন, ‘বেনজীর আহমেদ এটিকে সাজাচ্ছেন দেশের সবচেয়ে বড় ইকোপার্ক ও বিলাসবহুল রিসোর্টের পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে। এ জন্য যা যা দরকার, তা-ই করা হচ্ছে।’

বেনজীরের কেনা জমির কয়েকজন মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ক্রমাগত চাপ ও ভয়ভীতি দেখিয়ে তাঁদের জমি বিক্রি করতে বাধ্য করেন বেনজীর। ভয়ভীতিতে কাজ না হলে ভেকু দিয়ে জমির মাটি নিয়ে যেতেন। গভীর গর্ত করে শেষ পর্যন্ত জমি বিক্রি করতে বাধ্য করতেন। পুলিশ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন পদে থাকায় তাঁর অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে সাহস পাননি জমির মালিকরা।

ঢাকা ও পূর্বাচলে বিপুল টাকার সম্পদ

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর গুলশানে সুবিশাল অভিজাত একটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে বেনজীর আহমেদের। গুলশান ১ নম্বরের ১৩০ নম্বর সড়কের ১ নম্বর বাড়িটির নাম ‘র‌্যাংকন আইকন টাওয়ার লেক ভিউ’। ভবনের ১২ ও ১৩তম তলায় আট হাজার ৬০০ বর্গফুটের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে তাঁর। সূত্র জানায়, আট হাজার ৬০০ বর্গফুটের এই অ্যাপার্টমেন্টের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা।

ভবনটি নির্মাণ করে র‌্যাংকন ডেভেলপমেন্টস। প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ১৯.৭৫ কাঠা জমিতে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্টের আয়তন দুই হাজার ১৫০ বর্গফুট। এখানে রয়েছে ১৩টি ফ্লোর এবং দুটি বেইসমেন্ট। সত্যতা নিশ্চিত করতে সরেজমিনে গেলে ভবনের নিরাপত্তাকর্মী মো. সবুজ কালের কণ্ঠকে জানান, ১২ ও ১৩তম তলায় রয়েছে বেনজীরের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট।

এ ছাড়া রাজধানীর মগবাজার আদ-দ্বীন হাসপাতাল সংলগ্ন ইস্টার্ন প্রপ্রার্টিজের একটি বহুতল ভবনে চার হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট কিনেছেন বেনজীর আহমেদ।

পূর্বাচলে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বাড়ি করেছেন বেনজীর আহমেদ। আনন্দ হাউজিং সোসাইটির দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকায় পোড়া মোড়ের পাশের এলাকায় অন্তত ৪০ কাঠা জমির ওপর গড়েছেন বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি। জমি ও বাড়ির মূল্য কমপক্ষে ৪৫ কোটি টাকা বলে ধারণা স্থানীয়দের।

ওই এলাকার বাসিন্দা মো. শাহাদাত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই এলাকা ডোবা ও বিল হিসেবে আমরা দেখেছি। কিছুদিন আগেও এসব এলাকায় আমরা মাছ ধরেছি। পুলিশের কর্মকর্তারা আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার পরপরই বেনজীর আহমেদ এই জায়গায় মাটি ভরাট করে বাড়ি নির্মাণ করেছেন।’

দীর্ঘদিন ধরেই আনন্দ হাউজিং সংলগ্ন এলাকায় অটো চালান মো. শহিদুল ইসলাম। তিনি জানান, সোসাইটির ভেতরে সবচেয়ে দামি বাড়ি এটি। আনন্দ হাউজিং এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি। তবে বেনজীরের ডুপ্লেক্স বাড়িটি দেখার জন্য মাঝেমধ্যে ভিড় জমায় সাধারণ মানুষ।

রাজধানীর পূর্বাচলের ফারুক মার্কেটের পেছনের দিকে ১৭ নম্বর সেক্টরের ৩০১ নম্বর রোডের জি ব্লকে ১০ নম্বর প্লটের মালিক পুলিশের সাবেক এই আইজি। স্থানীয়রা বলছেন, ১০ কাঠা পরিমাণের এই প্লটের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২২ কোটি টাকা। বেনজীর আহমেদ পুলিশের আইজি থাকাকালে এই প্লট কেনেন। তবে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, পুলিশের এই সাবেক আইজি তাঁর ১০ কাঠার প্লটটি বিক্রির পরিকল্পনা করছেন। এরই মধ্যে বেশ কিছু ক্রেতার সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। ওই এলাকার মোহাম্মদ নাঈম, আব্দুল কাদের ও মোহাম্মদ মোহসিন নামের তিন ব্যক্তি পুলিশের সাবেক এই আইজির ১০ কাঠার প্লটটির বিষয়ে কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপকালে এই তথ্য নিশ্চিত করেন।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের নাওড়ায় বেনজীর আহমেদের রয়েছে দুই বিঘা জমি, যার বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা।

কর্ণফুলীর তীর দখল করে সাম্রাজ্য আ’লীগ নেতার

৩১ মার্চ ২০২৪, সমকাল

চট্টগ্রামের প্রাণ কর্ণফুলী নদীর শাহ আমানত সেতু এলাকায় ১৯৮৫ সালে প্রশস্ততা ছিল ৯৫২ মিটার। দখল ও ভরাটে তা এখন ৪৪৬ মিটারে নেমে এসেছে। এ নদীর বুকে ভরাট হওয়া জমিতে সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন মহিউদ্দিন বকুল নামে এক আওয়ামী লীগ নেতা। ভরাট হওয়া জায়গায় তিনি বসিয়েছেন বরফকল। সাগর থেকে নিয়ে আসা মাছ সংরক্ষণের জন্য করেছেন কোল্ডস্টোরেজ। অবৈধ বিশাল বালুমহালও তৈরি করছেন নদী পাড়েই। এমনকি একটি বিশাল ট্রাকস্ট্যান্ডও খুলে বসেছেন।

নদীতীরের সরকারি জায়গায় একের পর এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা। প্রতিদিন বরফকল ও কোল্ডস্টোরেজের বর্জ্য কর্ণফুলীতে পড়ে দূষিত হচ্ছে নদীর পানি। ক্রমাগত দখল, ভরাট ও ইজারা প্রক্রিয়ার কারণে ৩৯ বছরে নদীটির প্রশস্ততা কমছেই।

উচ্চ আদালত এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করার নির্দেশ দিলেও বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে মহিউদ্দিনের অবৈধ সাম্রাজ্য। নদী কমিশন এসব বরফকল, মাছ বাজার ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য বারবার তাগাদা দিলেও রহস্যজনক কারণে কোনো পদক্ষেপই নিচ্ছে না সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

২০১৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নদীর জায়গা ইজারা নিয়ে বরফকল, কোল্ডস্টোরেজ গড়ে তোলেন মহিউদ্দিন। তার পাশাপাশি কর্ণফুলী ঘিরে মাছ বাজারসহ দুই হাজারের বেশি অবৈধ স্থাপনা গড়ে তুলেছেন প্রভাবশালীরা।

নদী রক্ষায় পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ ২০১০ সালে হাইকোর্টে এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের আবেদন জানিয়ে রিট করে। ২০১৬ সালে হাইকোর্ট কর্ণফুলী তীরে গড়ে ওঠা স্থাপনাগুলো অবৈধ উল্লেখ করে উচ্ছেদের নির্দেশ দেন। তার পর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক লোক দেখানো কিছু স্থাপনা উচ্ছেদ করলেও বেশির ভাগই রয়ে যায় অক্ষত।

চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আলীউর রহমান বলেন, ২০১৯ সালের মে মাসে কর্ণফুলী তীরের ২ হাজার ১৮১টি স্থাপনাকে অবৈধ চিহ্নিত করে সুপ্রিম কোর্ট উচ্ছেদের চূড়ান্ত নির্দেশ দেন। তবে জেলা প্রশাসন ও বন্দর কর্তৃপক্ষ এ রায় বাস্তবায়ন করছে না।

উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী, জেলা প্রশাসন ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই নদীর উভয় তীরের সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে নদীকে ২০০০ সালের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। নদীতীরে বরফকল, কোল্ডস্টোরেজ, বালুমহাল, দোকান ও ঘরবাড়ি সবই অবৈধ।

মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র: ১৪৫০০ টাকার ২ পাইপ কাটার কিনেছে ৯৩ লাখ টাকায়

এপ্রিল ১, ২০২৪, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

গত ৯ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ৩৪৪ দশমিক ৫ কেজি ওজনের একটি ছোট চালান আমদানি করে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল)। কক্সবাজারের মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আনা এ চালানটির আমদানি মূল্য দেখানো হয় ২ দশমিক ৭৫ কোটি টাকা বা ২ লাখ ৫০ হাজার ৮৬৩ মার্কিন ডলার।

আমদানির দুই দিন পর ১১ জানুয়ারি কায়িক পরীক্ষায় দেখা যায়, জার্মানির তৈরি দুটি পাইপ কাটারের দাম ৯২ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। একইভাবে একই জার্মান কোম্পানির দুটি হাতুড়ির দাম দেখানো হয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার টাকা।

এই ধরনের অস্বাভাবিক দাম দেখে বিভ্রান্ত হয়ে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ চালানটি আটকে দিয়ে সিপিজিসিবিএল ও পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের কাছে ব্যাখ্যা চায়। গত ৪ ফেব্রুয়ারি ইস্যুকৃত এরকম দুটি চিঠি দ্য ডেইলি স্টারের হাতে এসেছে।

গত ২৭ মার্চ দ্য ডেইলি স্টার দাম পরীক্ষার জন্য জার্মান কোম্পানি কেএস টুলসের ওয়েবসাইট পরিদর্শন করে। ওয়েবসাইটটি দেখায়, একই মানের একটি পাইপ কাটারের দাম ৬০ দশমিক ২৭ ইউরো বা প্রায় ৭ হাজার ২৩২ টাকা। সে হিসাবে আমদানি মূল্য ৬৪২ গুণ বা ৬৪২০০ শতাংশ বেশি দেখানো হয়েছে।

কোম্পানিটির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, আমদানি করা একটি হাতুড়ির দাম ১৩ দশমিক ৯ ইউরো বা ১ হাজার ৬৬৮ টাকা। আমদানি মূল্যে যার দাম ৫৫ গুণ বা ৫৫০০ শতাংশ বেশি দেখানো হয়েছে।

মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কেনা দুটি হাতুড়ির দাম দেখানো হয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার টাকা। ছবি: সংগৃহীত

কাস্টমস সূত্র জানায়, শুধু এই দুটি পণ্য নয়, এই চালানের ১৯টি পণ্যই অযৌক্তিক উচ্চমূল্যে আমদানি করা হয়েছে।

এনবিআরের নথিতে এসব পণ্যের আমদানি ব্যয় এনবিআরের সার্ভারের (আমদানি-রপ্তানি ডেটাবেস) রেকর্ড মূল্যের চেয়ে ৫ থেকে ১৮ হাজার ৫৪৫ গুণ বেশি দেখানো হয়েছে।

এই ডেটাবেসটি মূলত আমদানি রপ্তানি মূল্যসহ বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পর্কিত তথ্যের একটি সংরক্ষণাগার।

চালানটিতে থাকা অন্যান্য টুলসের মধ্যে রয়েছে সেট মেকানিক্যাল প্লায়ার, মাঙ্কি প্লায়ার, টুলবক্স, চিসেল অ্যান্ড স্পান্সার, স্প্যানার এবং কার ফিটার সেট। এসব পণ্য সরবরাহ করে জাপানের সুমিটোমো করপোরেশনের পক্ষ থেকে কেএস টুলস ওয়ার্কজেউজ।

কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কায়িক পরীক্ষার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাইপ কাটার টুলের দাম ডেটাবেস মূল্যের চেয়ে ১৮ হাজার ৫৪৫ গুণ, পাইপ রেঞ্চ ১ হাজার ৫৩ গুণ, মাঙ্কি প্লায়ারের দাম ৯১২ গুণ, স্ক্রু ড্রাইভারের দাম ৮৩৩ গুণ এবং হাতুড়ির দাম ১১২ গুণ বেশি।

বনের জমিতে বেনজীরের রিসোর্ট

০২ এপ্রিল, ২০২৪, কালের কন্ঠ

লোগোগাজীপুর সদর উপজেলার ভাওয়াল গড় ইউনিয়নের নলজানী গ্রামে ১৬০ বিঘা জমির ওপর বিস্তৃত ভাওয়াল রিসোর্ট। ২০১৮ সালের ৬ এপ্রিল প্রায় ১০৬ বিঘা জমির ওপর এটির যাত্রা শুরু। পরে এতে যোগ হয় আরো ৫৪ বিঘা জমি। ৬২টি ভিলার সঙ্গে হেলিপ্যাড, রেস্তোরাঁ, জিমনেসিয়াম, সুইমিংপুল, স্পাসহ অনেক কিছু রয়েছে এর ভেতরে।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই রিসোর্টের একটি বড় অংশই গড়ে তোলা হয়েছে বনের জমি জবরদখল করে। এতে নেপথ্যে থেকে সাহস জুগিয়েছিলেন বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। কেননা এই রিসোর্টের এক-চতুর্থাংশ শেয়ারের মালিকানা বেনজীরের পরিবারের হাতে।

অনুসন্ধান বলছে, বনের জমি দখল করে রিসোর্ট গড়ে ওঠার সময়কালে বেনজীর আহমেদ ছিলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার।

রীতিমতো পুলিশি পাহারা বসিয়ে বনের জমিতে সীমানাপ্রাচীর লাগিয়ে রিসোর্টের কাজ শুরু হয়েছিল বলে জানিয়েছেন বন বিভাগের কর্মকর্তা ও স্থানীয় বাসিন্দারা। ক্ষমতার অপব্যবহার করে পুলিশকর্তা বেনজীরের বনের জমি দখল করে রিসোর্ট বানানোর ঘটনায় স্তম্ভিত বন বিভাগ ও স্থানীয় বাসিন্দারাও।

রামাদা হোটেলজানা গেছে, আম্বার গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠান এই ভাওয়াল রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা। তবে প্রতিষ্ঠার কোনো একপর্যায়ে এতে যুক্ত হন বেনজীর আহমেদ।

ডিএমপি কমিশনার হিসেবে প্রভাবশালী হওয়ার সুবাদে রিসোর্টের ২৫ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা নেন তিনি।

বন বিভাগের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের ভাওয়াল রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা জানান, ভাওয়াল রিসোর্টের ভেতরে ও প্রবেশমুখে বন বিভাগের ৬.৭৩ একর জমি রয়েছে। অর্থাৎ বনের বিশাল এই জমি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে ভাওয়াল রিসোর্ট। বন বিভাগের তথ্য মতে, ভাওয়াল রিসোর্টের দখল করা জমির মধ্যে রয়েছে ৪ নম্বর বরইপাড়া মৌজার ০৩, ২৭৯ ও ২৭১ নম্বর সিএস দাগে ১১ বিঘা।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, বেনজীরের ক্ষমতার দাপটে সবাই ছিলেন নির্বিকার, নিরুপায়।

তিনি তখন ডিএমপি কমিশনার থাকার কারণে বেআইনিভাবে পুলিশ পাহারায় বনের জমিতে সীমানাপ্রাচীর দেন। নিরুপায় হয়ে বনের ওই জমি উদ্ধারে উচ্ছেদ মামলা করে বন বিভাগ। মামলাটি এখনো চলমান বলে নিশ্চিত করেন রেঞ্জ কর্মকর্তা মাসুদ রানা।

সরেজমিনে গেলে ভাওয়াল রিসোর্ট সংলগ্ন নলজানী গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, রিসোর্টের মালিকপক্ষ পারটেক্স গ্রুপ এবং সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ—এ কথা জানার পর বেনজীরের ভয়ে এলাকার কেউ ওদিকে যাওয়ার সাহসই করে না। যখন তারা বনের জমিতে সীমানাপ্রাচীর বসিয়ে দখল করেছে, তখন কারো সাহস হয়নি প্রতিবাদ করার।

স্থানীয়রা আরো জানায়, ভাওয়াল রিসোর্টের নির্মাণকাজ চলাকালে প্রায়ই এখানে আসতেন বেনজীর আহমেদ। কাজ চলার সময় স্থানীয় ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা দিনরাত পালা করে সেখানে পাহারায় দাঁড়িয়ে থাকতেন।

পরিচয় গোপন করে কথা বললে রিসোর্টের সিনিয়র রিজার্ভেশন কর্মকর্তা জাহিদ হাসান রিসোর্টটির মালিকানায় সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ভাওয়াল রিসোর্ট অ্যান্ড স্পার মালিকদের কয়েকজনের মধ্যে সাবেক আইজিপি বেনজীরও রয়েছেন।

বনানীর হোটেলএ ছাড়া ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. সালাউদ্দিন আহমেদও বলেছেন, ‘পারটেক্স গ্রুপের মালিকের ছেলে ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা বেনজীর আহমেদ রিসোর্টটির মালিক। তবে কার কত ভাগ মালিকানা তা জানা নেই।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, যথারীতি এখানেও বেনজীর আহমেদ চাতুরীর মাধ্যমে নিজের নামটি ব্যবহার করেননি। স্ত্রী জীশান মীর্জা, দুই মেয়ে ফারহিন রিসতা বিনতে বেনজীর ও তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের নামেই রিসোর্টের শেয়ার কেনা হয়। জানা গেছে, এই রিসোর্টে এক রাত থাকতে গেলে গুনতে হয় সর্বনিম্ন ১১ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার ৭৬০ টাকা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ এলাকায় প্রতি বিঘা জমির বর্তমান মূল্য ২০ লাখ টাকা।

শুধু তাই নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাবেক আইজিপির আরো সম্পদের খোঁজ পেয়েছে কালের কণ্ঠ। রাজধানীর বনানীতে অভিজাত হোটেল ইউনিক রিজেন্সিতে বেনজীর আহমেদের বিনিয়োগ রয়েছে। একইভাবে কক্সবাজারেও দুটি হোটেলে বিপুল অঙ্কের অর্থ লগ্নি করেছেন তিনি। পদ্মা ব্যাংক এবং কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানাও কিনেছেন বেনজীর।

পাচারের টাকায় বিদেশে যত সম্পদ

পুলিশের সাবেক আইজিপি ও র‌্যাবের সাবেক ডিজি বেনজীর আহমেদের দুবাই, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় বিপুল বিনিয়োগের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন পদে চাকরির সুবাদে বিভিন্ন উৎস থেকে অবৈধ উপার্জনের টাকা পাচার করে বিনিয়োগ করেছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে আসে।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, বেনজীর আহমেদের দুবাইয়ে রয়েছে শতকোটি টাকার হোটেল ব্যবসা। সিঙ্গাপুরে প্রতিষ্ঠা করেছেন অর্ধশত কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগের সোনার ব্যবসা। এ ছাড়া থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় জমি কিনেছেন বলে জানা গেছে।

তবে বেনজীর বিনিয়োগ করলেও তিনি কোথাও নিজের নাম রাখেননি। সব জায়গায় তিনি স্ত্রী জীশান মীর্জা, স্ত্রীর ভাই মীর্জা মনোয়ার রেজা, দুই মেয়ে ফারহিন রিসতা বিনতে বেনজীর ও তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের নামে বিনিয়োগ করেছেন।

দুবাইঅনুসন্ধানে জানা গেছে, দুবাই শহরের কেন্দ্রস্থল মাকতুম স্ট্রিটে অবস্থিত বিলাসবহুল কনকর্ড হোটেল অ্যান্ড স্যুইটসে মোটা অঙ্কের শেয়ার রয়েছে বেনজীরের। হোটেলটি বিখ্যাত দুবাই ক্রিকের ওপর দুর্দান্ত প্যানোরমিক ভিউ অফার করে। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, দুবাই ক্রিক, গলফ ও ইয়ট ক্লাব, সোনা ও মসলার বাজার, প্রধান কেনাকাটা ও অবসরকেন্দ্রগুলোর খুব কাছে এ হোটেল। দুবাইয়ে অবস্থিত গ্র্যান্ড মসজিদ থেকে তিন মাইল দূরে এ হোটেলের অবস্থান।

দেশ থেকে টাকা পাচার করে গড়ে তোলা বেনজীরের এই হোটেলে আছে অ্যাপার্টমেন্ট, এক্সিকিউটিভ, স্যুইটসসহ অত্যাধুনিক রুম, যেগুলোর ভাড়া প্রতিদিন ৩৫০ থেকে দেড় হাজার দিরহাম, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, সিঙ্গাপুরের জনপ্রিয় মুস্তাফা মার্টের পাশে অবস্থিত নিজি জুয়েলার্সটির মালিকানায়ও রয়েছেন বেনজীর আহমেদ। দেশ থেকে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা পাচার করে সেখানে তিনি বিনিয়োগ করেছেন।

বেনজীরের বিদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে খোঁজ নিলে জানা যায়, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ বিদেশে বিনিয়োগের কোনো অনুমতি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেননি। তাঁর কোনো প্রতিষ্ঠানের বিদেশে বিনিয়োগের অনুমোদনও দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ অর্থপাচারের মাধ্যমেই তিনি বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, এ পর্যন্ত দেশ থেকে বিদেশে বিনিয়োগের অনুমোদন নিয়েছে এমবিএম গার্মেন্টস, রেনেটা, প্রাণ ফুডস, নাসা গ্রুপের এজে সুপার গার্মেন্টস, কলাম্বিয়া গার্মেন্টস, আকিজ জুট, মবিল যমুনা বাংলাদেশ, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস, ডিবিএল, স্কয়ার ফার্মা, স্পেকট্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং, সার্ভিস ইঞ্জিন, আকিজ জুট, বেক্সিমকো ফার্মা, এসিআই হেলথকেয়ার, বিএসআরএম, সামিট পাওয়ার, টেকআউট লিমিটেড প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগের কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। কারণ দেশে ডলার সংকট চলছে। অথচ অর্থনীতির এমন সংকটময় সময়ে বেনজীর অনুমোদন না নিয়েই টাকা পাচার করে বিদেশে কয়েক শ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন।

এ ছাড়া সোনালী ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে বেনজীর আহমেদ পাচার করেছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বেনজীরের স্ত্রী ও সন্তানদের নামে ঋণ দেওয়ার কথা স্বীকার করলেও কত টাকা দিয়েছে সেটি জানাতে নারাজ।

দেশে আরো সম্পদের খোঁজ

বেনজীরের মালিকানা প্রকাশ্যে না আনলেও কক্সবাজারের কলাতলীতে দুটি বিলাসবহুল হোটেলে রয়েছে তাঁর বিনিয়োগ। হোটেল দুটির নাম হোটেল বেস্ট ওয়েস্টার্ন প্রিমিয়ার ও হোটেল রামাদা লিমিটেড।

বনানীর সি ব্লকের ১৫ নম্বর রোডের ৫৯ নম্বর বাড়ির ঠিকানায় আছে হোটেল ইউনিক রিজেন্সি। এ হোটেলেও বিনিয়োগ আছে বেনজীরের। হোটেলটিতে এক রাত থাকতে গেলে গুনতে হয় সর্বনিম্ন ১০০ ডলার বা ১২ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২৫০ ডলার বা ৩০ হাজার টাকা। এ হোটেলে আছে ডিলাক্স সিঙ্গল, ডিলাক্স টুইন, ডিলাক্স কিং, প্রেসিডেনশিয়াল স্যুইটস, ভিআইপি স্যুইটস, সুপিরিয়র কিং প্রভৃতি বিলাসবহুল রুম।

এ ছাড়া কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়েও বিনিয়োগ আছে বেনজীরের। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিটি ক্যাম্পাস র‌্যাংগস আরএল স্কয়ার, প্রগতি সরণিতে অবস্থিত। আর স্থায়ী ক্যাম্পাস হচ্ছে পূর্বাচল নিউ টাউনের ৯ নম্বর সেক্টরে।

২০১৩ সালের ৩ জুন দি ফারমার্স ব্যাংক লিমিটেড নামে যাত্রা শুরু হয় বর্তমানের পদ্মা ব্যাংক পিএলসির। ব্যাংকটির মালিকানায় আছেন বেনজীর পরিবারের সদস্যরা। ঋণ অনিয়মে ডুবতে বসা ব্যাংকটি ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি নাম পরিবর্তন করে পদ্মা ব্যাংক হিসেবে পুনরায় যাত্রা শুরু করে। কিন্তু ব্যাবসায়িক দুরবস্থায় ২০২৪ সালের ১৭ মার্চ এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হওয়ার চুক্তি করে। ২০২১ সাল পর্যন্ত পদ্মা ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসান ছাড়িয়েছে ৯০০ কোটি টাকার ওপরে। পরের দুই বছরের চূড়ান্ত হিসাব মেলেনি এখনো। তবে নাম বদলানোর পরের চার বছরে ২০২২ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটিতে নতুন করে মূলধন থেকেই ক্ষয় হয় ২৪৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।

সেন্ট মার্টিন-কক্সবাজারেও ভূ-সম্পত্তি

০২ এপ্রিল, ২০২৪, কালের কন্ঠ

পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা (ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া—ইসিএ) সেন্ট মার্টিন দ্বীপে রয়েছে পুলিশের সাবেক আইজি ও র‌্যাবের সাবেক ডিজি বেনজীর আহমেদের ৪১৮ শতাংশ জমি। এর মধ্যে মোহাম্মাদ ওয়াজিউল্লাহ নামের এক ব্যক্তির ২৫০ শতাংশ জমি ও নারকেলবাগান দখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে বেনজীরের বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, সেন্ট মার্টিনের দক্ষিণপাড়া গ্রামের সব মানুষের যত জমি আছে, তার চেয়ে বেশি জমি একাই কিনেছেন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ। দ্বীপের উত্তরপাড়ায় জমি কিনে সীমানাপ্রাচীরও দিয়েছেন তিনি।

বর্তমানে বেনজীরের জমিটির দেখভাল করছেন মাওলানা আব্দুর রহমান।

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেল, স্থানীয়রা জমিটি ‘বেনজীর স্যারের জমি’ হিসেবেই চেনে। জমির সীমানা রক্ষার জন্য কোরাল পাথর তুলে এনে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি কংক্রিটের পিলার দিয়ে জমির চারদিকে সীমানা দেওয়া হয়েছে।

বানানো হয়েছে বড় একটি গেট, যা ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া—ইসিএ আইন ১৯৯৫, বাংলাদেশ প্রকৃতি সংরক্ষণ আইন এবং পরিবেশ আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

এ ছাড়া সেন্ট মার্টিনের ১ নম্বর ওয়ার্ডের দ্বীপঘেঁষা এলাকা উত্তরপাড়া গ্রামের মোহাম্মাদ ওয়াজিউল্লাহ নামের এক ব্যক্তির ২৫০ শতাংশ জায়গা দখলের অভিযোগ উঠছে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে। ওয়াজিউল্লাহ জমিটি সেন্ট মার্টিন ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য মুক্তার আহমদ ও মাহে আলমের কাছ থেকে কিনেছেন। পুরো ঘটনাটি নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য আক্তার কামাল।

স্থানীয় ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, সেন্ট মার্টিনের জিনজিরা দ্বীপ মৌজার ১০৩০ নম্বর খতিয়ানের ১৭৮৬ দাগে ৮.২৫ শতাংশ, একই দাগে ১৪.১৪ শতাংশ, ৪৫ শতাংশ, ৩৫ শতাংশ ও ৪০ শতাংশ জমি রয়েছে বেনজীরের নিজ নামে। এ ছাড়া ১৭২৫ দাগে রয়েছে ২২ শতাংশ জমি। জমির নামজারিতে মালিকের নাম দেওয়া হয়েছে হারুনুর রশিদের পুত্র বেনজীর আহমেদ। ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে গোপালগঞ্জের সদর উপজেলার হোল্ডিং নম্বর ১৬৬। তার জমির খতিয়ানের নামজারি ও জমাভাগ মামলা নম্বর ছিল ৩৫৫ (আই)/২০১৪-১৫ এর ১২/২/২০১৫ ইং তারিখের আদেশ মতে অত্র খতিয়ান সৃজন করা হয়েছে মর্মে উল্লেখ করা হয়।

জমিটির বিক্রেতা ছিল স্থানীয় মৌলভী আব্দুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। খতিয়ানটি সত্যায়ন করেছেন কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা সহকারী ভূমি কমিশনার জাহিদ ইকবাল ও উপজেলা ভূমি অফিসের কানুনগো মোছাম্মদ মুসা। খতিয়ানটিতে দেখা যায়, বেনজীর আহমেদের মালিকানাধীন মোট জমির পরিমাণ ১ একর ৬৮.২৫ শতাংশ।

টেকনাফ ভূমি অফিসের সাবেক সহকারী তহশিলদার আবদুল জব্বার প্রতিবেদককে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘সেন্ট মার্টিনের দক্ষিণপাড়া এলাকায় বেনজীর আহমেদ সাহেবের জমি আছে। এসব জমি তিনি কিনেছেন ২০১৬ ও ২০১৭ সালে। এর পরেও উনি নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামেও কিনেছেন বেশকিছু জমি।’

২০১১ সালে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করা মৌলভী আব্দুর রহমান এলাকায় বেনজীরের খাস লোক হিসেবে পরিচিত। তিনিই ওই এলাকায় বেনজীরের জমিজমা দেখভালের দায়িত্ব পালন করেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মৌলভী আব্দুর রহমান নিজেও ২০১১ সালে তিন একর জায়গা বেনজীর আহমেদের কাছে বিক্রি করেন। বেনজীর এসব জমি প্রতি একর কেনেন মাত্র ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকায়, যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা। জমি কেনার পর বেনজীর আহমেদের নামে একটি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে রাখা ছিল। পরে ২০২১ সালের ১১ ডিসেম্বর বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা জারির পর নিজের নামের সেই সাইনবোর্ড খুলে ফেলার নির্দেশ দেন তিনি।

সেন্ট মার্টিনে জমি কেনার সত্যতা নিশ্চিত করেন সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউয়িন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. মুজিবুর রহমান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সেন্ট মার্টিনের দক্ষিনপাড়া গ্রামে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ সাহেবের মালিকানায় জমি আছে। আগে পুরো জমির চারদিকে বেড়া দেওয়া ছিল, উনার নিজের নামে সাইনবোর্ড টাঙানো ছিল, কিন্তু এখন নেই। তবে জমির পরিমাণ কত তা আমার জানা নাই।’

সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আক্তার কামাল এই প্রতিবেদককে জানান, দ্বীপের উত্তরপাড়ায় একটি নারকেলবাগানসহ এক দাগে ১২০ শতাংশ জায়গা আছে বেনজীর আহমেদের। এটা দেখভালের দায়িত্বে আছেন মৌলভী আব্দুর রহমান নামে এক ব্যক্তি। এ ছাড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণপাড়ায় ১৭৮৬ দাগে বেনজীর আহমেদের রয়েছে দেড় একর জমি।

ইনানীতে স্ত্রী ও কন্যাদের নামে ৮৭ শতাংশ জমি

বেনজীর আহমেদ র‌্যাবের ডিজি থাকার সময় কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানী মৌজায় ৮৬.৯৪ শতাংশ জমি কেনেন। কিন্তু চতুর এই সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ওই জমি নিজের নামে রেজিস্ট্রি করেননি। রেজিস্ট্রি করিয়েছেন শ্যালক মীর্জা মনোয়ার রেজা, স্ত্রী জীশান মীর্জা এবং তিন কন্যা ফারহীন রিশতা বেনজীর, তাহসীন রাইসা বিনতে বেনজীর ও জাহরা জেরিন বিনতে বেনজীরের নামে। এর মধ্যে ছোট মেয়ে জাহরা জেরিন বিনতে বেনজীর জমি রেজিস্ট্রির সময় নাবালক ছিল। এই জমির বিএস খতিয়ান ও বিএস দাগ নং ৪৭৬২, ৩৭৩৯, ৫২৮২, ৭১৮২, ৫৬৯১, ৫২৮১ ও ৭৭৬৬।

তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, জমির দলিলে মীর্জা মনোয়ার রেজা ও জীশান মীর্জার পিতা মীর্জা মনসুর-আল-হকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি বেনজীর আহমেদের শ্বশুর। দুজনেরই ঠিকানা দেওয়া হয়েছে শেখপাড়া, দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী, ফরিদাবাদ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এ ছাড়া ফারহীন রিশতা বিনতে বেনজীর, তাহসীন রাইসা বিনতে বেনজীর ও জাহরা জেরিন বিনতে বেনজীরের পিতার নাম উল্লেখ করা হয়েছে বেনজীর আহমেদ। বেনজীর আহমেদের পিতা হারুনুর রশিদের তথ্যও ওই দলিলে উল্লেখ করা হয়েছে। দলিলে বেনজীর আহমেদ ও তাঁর তিন কন্যার ঠিকানা দেখানো হয়েছে বৈশাখী রোড, সবুজবাগ, গোপালগঞ্জ সদর, গোপালগঞ্জ পৌরসভা, গোপালগঞ্জ।

সোনারপাড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর পরিশোধ রসিদের তথ্য যাচাই করে দেখা যায়, জীশান মীর্জার হোল্ডিং নম্বর ৫৬৯১, জমির শ্রেণি নাল (আবাসিক), দাগ নং ১০৩৯১ ও জমির পরিমাণ ৭.৩৩ শতক। ২০২৩ সালের ২৮ মে এই কর পরিশোধ করা হয়। জীশান মীর্জার নামে একই দিনে আরো ১৮ শতক জমির ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়া হয়। ২ নম্বর রেজিস্টার অনুযায়ী জমিটির হোল্ডিং নম্বর ৫২৭১ ও দাগ নং ১০৩৮৯।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ২৮ মে ফারহীন রিসতা বিনতে বেনজীরের ভূমি করও সোনারপাড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে জমা করা হয়। ২ নম্বর রেজিস্টার অনুযায়ী জমিটির হোল্ডিং নম্বর ৭৭৬৬, দাগ নং ১০৩৯১, ১০৩৮৯। এখানে জমির পরিমাণ ৩.৫, ৬.৫ ও ৫ শতাংশ অর্থাৎ ১৫ শতাংশ। একই দিনে মীর্জা মনোয়ার রেজাসহ অন্যদের ভূমি উন্নয়ন করও পরিশোধ করা হয়। তবে ২০২৩ সালের ২৯ মে উখিয়া উপজেলার ইনানী-২ মৌজার এই জমি গাজীপুর সদরের নলজানি, চান্দনার বাসিন্দা মোহাম্মদ নুরে আলম সিদ্দিকীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

টেকনাফ মেরিন ড্রাইভে স্ত্রীর নামে ৭০ শতাংশ জমি

কক্সবাজারের উখিয়া থানার মেরিন ড্রাইভের পাশে এলজিইডি ভবন সংলগ্ন ইনানী মৌজায় বেনজীরের স্ত্রী জীশান মীর্জার নামে রয়েছে ৭০ শতাংশ জমি। জমিটি জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নাজিম উদ্দিন মেম্বার দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করেন। জমিটি কেনা হয় ২০০৬ সালে।

কক্সবাজারের উখিয়া থানার জালিয়া পালং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শামসুল আলম নিশ্চিত করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মেরিন ড্রাইভের পাশে এলজিইডি ভবনের কাছাকাছি ইনানী মৌজায় বেনজীর আহমেদ সাহেবের ৭০ শতাংশ জমি আছে। এই জমিটি কিনে দেন আমার ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য নাজিম উদ্দিন ও একই এলাকার সোনারপাড়ার মৌলভী আবুল বাশাক। বর্তমানে তাঁরাই দুজন এই জমি দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করেন।’

গ্রুপভুক্ত ঋণখেলাপিদের ছাড়, কার স্বার্থ রক্ষা করবে

০৫ এপ্রিল ২০২৪, প্রথম আলো

ঋণখেলাপিরা কার্যত আবারও ছাড় পাচ্ছেন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংক এক প্রজ্ঞাপনে জানিয়েছে, ঋণখেলাপি ব্যবসায়ী গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলেও অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো এখন থেকে নতুন করে ঋণ পাওয়ার যোগ্য হবে। তবে প্রতিষ্ঠানটি ইচ্ছাকৃত খেলাপি, নাকি যৌক্তিক কারণে খেলাপি হয়েছে, ব্যাংক তা দেখবে। আর এসব বিবেচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ নেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই প্রজ্ঞাপন জারির পর ঋণখেলাপিরা প্রকাশ্যে উল্লাস করেছেন, এমন খবর হয়তো নেই। তবে তাঁদের হাসিমুখ কল্পনা করে নেওয়া যেতে পারে। কারণ, খেলাপি গ্রাহকদের ঋণ নেওয়ার পথ শেষ পর্যন্ত উন্মুক্ত হয়েছে। সবচেয়ে চমকপ্রদ হলো, যেভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি হয়েছে। ঋণখেলাপি গ্রাহকদের ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে ব্যাংক কোম্পানি আইনে পরিবর্তন এনে। গত জুলাইয়ে যখন সংসদে এটি পাস হয়, তখন তাতে অতিরিক্ত সংশোধনীর প্রস্তাব করেছিলেন সরকার দলীয় একজন সংসদ সদস্য, যিনি বর্তমানে সরকারের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন।

জাতীয় সংসদের ফ্লোরে কোনো আইনে সংশোধনী আনা একটি সাধারণ ঘটনা। তবে ব্যাংক কোম্পানি আইনে সংশোধনী আনতে আহসানুল ইসলামের প্রস্তাব কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না। ঠিক আগের মাসে, অর্থাৎ জুনে কয়েকজন ব্যাংক পরিচালক সরকারের উচ্চপর্যায়ে একটি লিখিত প্রস্তাবে জানিয়েছিলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলে একই গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠান যাতে ঋণের সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়। ওই প্রস্তাবে তাঁরা বলেছিলেন, ঋণ ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি না হলে বা যুক্তিসংগত কারণে ঋণখেলাপি হয়ে পড়লে, সেই ঋণকে খেলাপি হিসেবে গণ্য করা উচিত হবে না। ব্যাংক পরিচালকেরা যখন এই প্রস্তাব জমা দেন, তখন সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইনের খসড়ায় এমন কোনো ধারা ছিল না। অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সংসদে যে মতামত পেশ করে, তাতেও ব্যাংক পরিচালকদের প্রস্তাবটি স্থান পায়নি। পরে আইনটি আহসানুল ইসলামের আনা সংশোধনীসহ পাস হয়েছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংক এখন ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের সহযোগী কোম্পানিকে ঋণ পাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। তবে মন্দের ভালো যে এ ক্ষেত্রে কিছু শর্ত পালনের জন্য তারা ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে। আর অনুমোদন দেওয়ার চূড়ান্ত দায়িত্ব নিজের হাতেই রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

কিন্তু যে প্রশ্নের উত্তর বিশেষজ্ঞরা পাচ্ছেন না, তা হলো ইচ্ছাকৃত খেলাপি চিহ্নিত হবে কীভাবে। তাত্ত্বিক সংজ্ঞায়, ইচ্ছাকৃত খেলাপি তাঁরাই, যাঁরা সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ঋণের টাকা পরিশোধ করেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী প্রথম আলোকে বলেন, ইচ্ছাকৃত খেলাপি চিহ্নিত করা কঠিন কাজ, তবে তাঁর উদ্বেগ অন্য জায়গায়। তাঁর মতে, শক্তিশালী একটি গোষ্ঠী আইন পরিবর্তন করাতে সক্ষম হয়েছে। এখন তারা যে ইচ্ছাকৃত খেলাপি নয়, সেই প্রমাণও বের করবে এবং এরপর ব্যাংক থেকে টাকা বের করে নিয়ে যাবে।

ব্রহ্মপুত্র যেখানে কেবলই বালুমহা৩ল, অভিযোগ আওয়ামী লীগ নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে

০৬ এপ্রিল ২০২৪, প্রথম আলো

নদের কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও শুকনো। কোথাও আবার সরু খাল। যেখানে পানি আছে, সেখানে ‘বাংলা ড্রেজারে’ (অননুমোদিত খননযন্ত্র) বালু উঠছে। শুকনো জায়গায় নদের বুক খুঁড়ে তুলে নেওয়া হচ্ছে শত শত ট্রাক বালু। খোঁড়াখুঁড়ির কারণে যত্রতত্র বড় বড় পুকুর ও ডোবার সৃষ্টি হয়েছে। নদের মাঝখানে ও তীরে বিশাল বালুর স্তূপ।

জামালপুর শহরের পুরাতন ফেরিঘাট এলাকার ব্রহ্মপুত্র সেতুর ওপরে দাঁড়ালে চোখে পড়ে এমন দৃশ্য। এককালের খরস্রোতা নদটির ক্ষতবিক্ষত দশা দেখে মনে হয়, ব্রহ্মপুত্র এখানে যেন নদ নয়, কেবলই বালুমহাল।

পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদটি গাইবান্ধা, জামালপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও কিশোরগঞ্জ জেলা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদের জামালপুর শহরের ছনকান্দা থেকে পিয়ারপুর পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দুটি বালুমহাল গত বছর ইজারা দেয় জেলা প্রশাসন। এরপর থেকে দিন-রাত বালু তোলা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ইজারার নামে অপরিকল্পিতভাবে বালু তুলে নদটি হত্যা করছেন বলে অভিযোগ পরিবেশবিদদের।

আওয়ামী লীগ নেতারা ইজারাদার

গত বছর জেলা প্রশাসন সদর উপজেলায় নদের ২৭২ একর এলাকা দুটি বালুমহাল হিসেবে ইজারা দেয়। ছনকান্দা ও চর যথার্থপুর এলাকা নিয়ে গঠিত বালুমহালটি ৫২ লাখ টাকায় এক বছরের জন্য (বাংলা ১৪৩০ সন) ইজারা পায় মেসার্স হাজী এন্টারপ্রাইজ। এই প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী জামালপুর পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. হাজী বাহার উদ্দিন। শরিফপুর, নান্দিনা, নরুন্দি ও পিয়ারপুর এলাকা নিয়ে গঠিত অপর বালুমহালটির ইজারা পায় মেসার্স নিধি এন্টারপ্রাইজ। এর স্বত্বাধিকারী মো. আলম আলী শরিফপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। তিনি মাত্র ২ লাখ টাকায় বালুমহাল ইজারা পেয়েছেন।

‘বাংলা ড্রেজারে’ সর্বনাশ

জামালপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উত্তর পাশ ঘেঁষে ব্রহ্মপুত্র বয়ে গেছে। সড়ক থেকে অর্ধশত রাস্তা নেমেছে নদের বুকে। এসব রাস্তা দিয়ে শত শত ট্রাক একদম নদের মধ্যে চলে যায়। ভেকুর (এক্সকাভেটর) মাধ্যমে ট্রাকে বালু ওঠানো হয়। এরপর ট্রাকগুলো চলে যায় শহরের বিভিন্ন স্থানে। এক্সকাভেটরের মাধ্যমে নদের পাড় কেটেও মাটি বিক্রি করা হচ্ছে।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, কিছুদিন আগেও মহাসড়ক থেকে অনেক দূরে ছিল নদের অবস্থান। অপরিকল্পিত বালু তোলায় নদ ভাঙতে ভাঙতে মহাসড়কের একদম কাছে চলে এসেছে।

বানারেরপাড় থেকে নান্দিনা পূর্ব বাজার পর্যন্ত নদটি একদম মহাসড়কঘেঁষা। সেখানে ভাসমান নৌকার মধ্যে বাংলা ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলা হয়। পাইপের মাধ্যমে এসব বালু সড়কের সঙ্গে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। সেখানে থেকে ট্রাকে ভর্তি করে বিভিন্ন স্থানে বালু বিক্রি করা হচ্ছে। নদের তীরে দাঁড়ালে বাংলা ড্রেজারের বিকট শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যায়।

মাদক ব্যবসায়ীর সন্তানকে পড়াতে রাজি না হওয়ায় ৪ মাস জেল খাটলেন বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রী

০৬ এপ্রিল ২০২৪, প্রথম আলো

মাদক ব্যবসায়ীর সন্তানকে প্রাইভেট পড়াতে রাজি হননি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এক ছাত্রী। এ জন্য তাঁর ওপর নেমে এসেছিল অকল্পনীয় নিপীড়ন। ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগসাজশে তাঁকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসিয়ে গ্রেপ্তার করেন মাদকদ্রব্য ন