সংবাদ পত্রের পাতা থেকে- ২৭ জুলাই- ২৫ অক্টোবর ২০২৩

সংবাদপত্রের পাতা থেকে (২৭ জুলাই- ২৫ অক্টোবর ২০২৩)

অর্থনীতি

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসহ একাধিক বেসরকারি ব্যাংক ঋণপত্রের দায় পরিশোধ করতে পারছে না

জুলাই ৩১, ২০২৩, বণিক বার্তা

দেশের ব্যাংকগুলোর বিদেশী হিসাবে (নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট) ডলার স্থিতি কিছুটা বেড়েছে। তবে ব্যাংকগুলোর দায়ের তুলনায় ডলার সরবরাহ অনেকটাই কম। ফলে আমদানি ঋণপত্রের (এলসি) দায় মেটাতে এখনো ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি অব্যাহত রেখেছে। এতে দিন যত যাচ্ছে রিজার্ভের ক্ষয়ও তত বাড়ছে। চলতি জুলাইয়ের ২৬ দিনেই রিজার্ভে ক্ষয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫২ কোটি ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ২৬ জুন দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিদেশী হিসাবে রিজার্ভ ডলারের স্থিতি ছিল ৫৫৩ কোটি ডলার, যা মে মাসের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি। যদিও জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতের স্বল্পমেয়াদি বিদেশী ঋণ ছিল ১ হাজার ৩৬৫ কোটি ডলার। এর মধ্যে ৯৭ কোটি ডলার ছিল ডেফার্ড পেমেন্ট বা বিলম্বিত দায়। মূলত যথাসময়ে এলসি দায় পরিশোধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের এ বিদেশী ঋণ তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, আমদানি নিয়ন্ত্রণ সত্ত্বেও চলতি বছরের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত এ তিন মাসে ১ হাজার ৪৩৮ কোটি ডলারের নতুন এলসি খোলা হবে। এর মধ্যে ব্যাক টু ব্যাক এলসির সম্ভাব্য দায়ের পরিমাণ হবে ২৫০ কোটি ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক আমদানির এলসি দায় পরিশোধে প্রতিদিনই ব্যর্থ হচ্ছে। এসব ব্যাংকের মেয়াদোত্তীর্ণ দায়ের পরিমাণ এখন প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। সরকারি এলসির পাশাপাশি বেসরকারি খাতের এলসি দায়ও পরিশোধ করতে পারছে না রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। দিনের শুরুতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে ডলার সংগ্রহে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ধরনা দেয়া। প্রতিদিনই এ ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিলিয়ন ডলার কেনার প্রস্তাব পাঠাচ্ছে। যদিও এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিক্রির পরিমাণ সর্বোচ্চ ১০ কোটি ডলারে সীমাবদ্ধ থাকছে।

রিজার্ভে গড়া তহবিলের ঋণও ‘খেলাপি’

০১ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল বা ইডিএফ থেকে দেওয়া ঋণ ফেরত পাচ্ছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। কিছু রপ্তানিকারক শিল্পগ্রুপ এই ঋণ নিয়েছে, তবে সেই রপ্তানি আয় দেশে আসছে না।

আবার যেসব ব্যাংকের মাধ্যমে এই ঋণ দেওয়া হয়েছিল, সেই ব্যাংকগুলোর কাছেও ফেরত দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ডলার নেই। ফলে মেয়াদোত্তীর্ণ বা ‘খেলাপি’ হয়ে গেছে ইডিএফের ঋণ। এ জন্য জরিমানা দিচ্ছে ব্যাংকগুলো।

 বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিয়ে ১৯৮৯ সালে গঠন করা হয় ইডিএফ, যা থেকে কাঁচামাল আমদানির জন্য উদ্যোক্তাদের ডলারে ঋণ দেওয়া হয়। একাধিক ব্যাংক সূত্রে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

গত বছরের এপ্রিলে ডলার–সংকট শুরু হওয়ার পর ইডিএফ ঋণে সুদহার বাড়ানো হয়। এরপর চলতি বছরের মার্চে নানা নিয়মকানুন জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে ইডিএফের আকার ধীরে ধীরে কমছে। ইডিএফের ঋণ ৭ বিলিয়ন বা ৭০০ কোটি ডলার থেকে কমে হয়েছে ৪১০ কোটি ডলার। ইডিএফ–সুবিধা ধীরে ধীরে বন্ধের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কারণ, ইডিএফের ঋণকে আর রিজার্ভের হিসাবে দেখানো যাচ্ছে না। আবার রিজার্ভ বাড়াতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত রয়েছে। গত বুধবার আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম ৬ অনুযায়ী রিজার্ভ ছিল ২৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৩৩০ কোটি ডলার। তবে প্রকৃত বা নিট রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন বা ২ হাজার কোটি ডলারের কম।

দেড় কোটি টাকার গাড়ি কিনতে পারবেন শীর্ষ সরকারি চাকরিজীবীরা

০১ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

নতুন গাড়ি কেনা বন্ধের সিদ্ধান্তের এক মাস না যেতেই কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি থেকে সরে এসেছে সরকার। গতকাল সোমবার নতুন নির্দেশনার মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের জন্য গাড়ি কেনার পথ খুলে দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। এর আগে গত ২ জুলাই অর্থ বিভাগ এক পরিপত্রের মাধ্যমে নতুন যানবাহন কেনা বন্ধের কথা জানিয়েছিল।

সরকারি কর্মচারীদের জন্য গাড়ি কেনার পথ খুলে দেওয়ার পাশাপাশি গাড়ির বাজেটও বাড়ানো হয়েছে। তাতে সরকারে শীর্ষ কর্মচারীরা পাবেন আগের চেয়ে বেশি দামি গাড়ি। এত দিন গাড়িবাবদ সর্বোচ্চ বরাদ্দ ছিল ৯৪ লাখ টাকা। এখন তা বাড়িয়ে ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা করা হয়েছে। অর্থ বিভাগ রেজিস্ট্রেশন, শুল্ক-করসহ গাড়ির দাম নির্ধারণ করে গত সোমবার নতুন নির্দেশনাটি দিয়েছে।

চীন, রাশিয়া ও ভারতের ঋণের কারণে চাপ বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার মজুতে

০৬ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

বিদেশি ঋণ পরিশোধে চাপ বাড়ছে। সদ্য বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরেই আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩৭ শতাংশের বেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। আর গত ছয় বছরের হিসাব ধরলে পরিশোধের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রাথমিক হিসাবে জানা গেছে, বিগত ২০২২-২৩ অর্থবছরে সব মিলিয়ে ২৭৪ কোটি ডলার ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করতে হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ২০১ কোটি ডলার ঋণ পরিশোধ করেছিল বাংলাদেশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ৭৩ কোটি ডলার ঋণ পরিশোধ বেড়েছে।

সম্প্রতি তৈরি করা অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩২৮ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হবে। ছয় বছর পর (২০২৯-৩০ অর্থবছর) তা বেড়ে দাঁড়াবে ৫১৫ কোটি ডলার। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যদি আরও কোনো ঋণ না-ও নেয়, তবু ২০৬২ সাল পর্যন্ত ঋণের সুদাসল পরিশোধ করতে হবে।

অর্থনৈতিক সংকটে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রায় আয় অনেক কমে গেছে। সে তুলনায় ব্যয় বেড়েছে। এতে সরকারের চলতি ও আর্থিক হিসাবে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। রপ্তানি পরিস্থিতি ভালো হলেও প্রবাসী আয়ে ওঠানামা রয়েছে। ডলারে নেওয়া বেসরকারি খাতে ঋণের বড় অংশই আর নবায়ন হচ্ছে না। আর এমন এক সময়ে সরকারের নেওয়া ঋণ পরিশোধ করতে গিয়েও ডলার খরচ বেশি হচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভ প্রায় অর্ধেক কমে গেছে।

কর্মকর্তাদের অদক্ষতায় বাড়ছে প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ

আগস্ট ০৭, ২০২৩, বণিক বার্তা

রেলের অবকাঠামো উন্নয়নে বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের হাতে রয়েছে ৩৪টি প্রকল্প। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, কক্সবাজারে নতুন রেলপথ নির্মাণ, যমুনা নদীতে রেলের জন্য স্বতন্ত্র সেতু নির্মাণসহ নতুন রেলপথ ও সেতু নির্মাণ, বিদ্যমান রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন, রোলিং স্টক সংগ্রহ ও রেলওয়ের কারিগরি মানোন্নয়ন করা হচ্ছে প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে একটি প্রকল্পও বাস্তবায়ন করতে পারেনি রেলওয়ে। এক বা একাধিকবার সংশোধন করে ব্যয় ও মেয়াদ বা দুটোই বাড়ানো হয়েছে ২০টির বেশি প্রকল্পে। যেসব প্রকল্প এখনো সংশোধন হয়নি, সেগুলোও রয়েছে সংশোধনের অপেক্ষায়। রেলওয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নে এ দুরবস্থার জন্য প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা, বিশেষ করে প্রকল্প পরিচালকদের অদক্ষতাকে দায়ী করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। গত ২০ জুন রেল ভবনে অনুষ্ঠিত এক সভায় উপস্থাপিত প্রতিবেদনে রেলওয়ের প্রকল্প ব্যবস্থাপনা দক্ষতায় ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়। সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে না পারায় রেলপথ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ রেলওয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশ রেলওয়েতে চলমান পাঁচটি প্রকল্পের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর একটি চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন ডুয়াল গেজ রেলপথ নির্মাণ। প্রকল্পটি সরকারের অগ্রাধিকারভুক্ত (ফাস্ট ট্র্যাক) প্রকল্পগুলোর একটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ সালের ৬ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। অনুমোদনের সময় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয় ৪২ মাস। সে হিসেবে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটি শেষ হয়ওয়া কথা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটির মেয়াদ ৩০০ শতাংশ বাড়িয়ে ১৬৮ মাসে উন্নীত করা হয়। অন্যদিকে ৮৭৪ শতাংশ বাড়িয়ে রেলপথটির নির্মাণ ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা।

ঢাকা-টঙ্গী সেকশনে তৃতীয় ও চতুর্থ ডুয়াল গেজ লাইন ও টঙ্গী-জয়দেবপুর সেকশনে নতুন আরেকটি ডুয়াল গেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ৩৬ মাসের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও বর্তমানে প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়িয়ে ১৯২ মাসে উন্নীত করা হয়েছে। সে হিসেবে মেয়াদ বৃদ্ধির হার ৪৩৩ শতাংশ। অন্যদিকে ৮৪৮ কোটি টাকার প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৪২ কোটি টাকা। ব্যয় বৃদ্ধির হার প্রায় ২৯৪ শতাংশ।

প্রায় ১৩ বছর ধরে খুলনা থেকে মোংলা বন্দর পর্যন্ত নতুন একটি রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ৩৭ মাসের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও প্রকল্পটি শেষ করতে লেগে যাচ্ছে ১৬৭ মাস। সে হিসেবে মেয়াদ বৃদ্ধির হার ৩৫১ শতাংশ। একইভাবে প্রায় ১৪৮ শতাংশ বেড়ে রেলপথটির নির্মাণ ব্যয় বর্তমানে ৪ হাজার ২৬০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে সম্প্রতি উদ্বোধন হওয়া আখাউড়া-লাকসাম ডুয়াল গেজ ডাবল লাইন রেলপথটির মেয়াদ বেড়েছে ৭৫ শতাংশ। ৭২ মাসের প্রকল্পটির মেয়াদ ঠেকেছে ১২৬ মাসে। তবে ব্যয়ের দিক দিয়ে ব্যতিক্রম উদাহরণ তৈরি করেছে এ প্রকল্প। মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) তুলনায় ১৫ দশমিক ১৩ শতাংশ অর্থ কম ব্যয় হয়েছে এতে।

গত ২০ জুন প্রকল্প বাস্তবায়নবিষয়ক এক সভায় উপস্থাপিত ‘‌ইমপ্লিমেন্টেশন অব রেলওয়ে প্রজেক্টস: প্রসপেক্টস, চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড দ্য ওয়ে ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক প্রতিবেদনে প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য মোটা দাগে ১০টি কারণ চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও দক্ষ জনবলের ঘাটতি। এর বাইরে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার দুর্বলতা, ডিপিপি অনুমোদন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, জমি অধিগ্রহণে জটিলতা, ব্যয় প্রাক্কলনে দুর্বলতা, কেনাকাটা প্রক্রিয়ায় জটিলতা, উন্নয়ন সহযোগীদের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এবং বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে কাজ সমন্বয়ে জটিলতাকে দায়ী করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

সামষ্টিক অর্থনীতির বড় হুমকি ৩০-৩৫ বিলিয়ন ডলারের হুন্ডি-হাওলার বাজার

আগস্ট ০৮, ২০২৩, বণিক বার্তা

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক অপরাধমূলক কার্যক্রম। পণ্য বাণিজ্য, রেমিট্যান্স, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ পাচার, স্বর্ণ-মাদকসহ অন্যান্য দ্রব্য চোরাচালান ও মানব পাচারের মতো অপরাধমূলক কার্যক্রমে হুন্ডি-হাওলার ব্যবহার বৃহৎ রূপ ধারণ করেছে। অত্যন্ত রক্ষণশীলভাবে হিসাব করে দেখা গেছে, দেশে হুন্ডি-হাওলার বাজার এখন ৩০-৩৫ বিলিয়ন (৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার কোটি) ডলার ছাড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আরো গভীর ও গবেষণাভিত্তিক অনুসন্ধান চালালে দেখা যাবে দেশে হুন্ডি-হাওলার বাজার আকৃতি হয়তো এর চেয়েও অনেক বড়।

হিসাব অনুযায়ী, দেশে আন্তর্জাতিক পণ্য বাণিজ্যে হুন্ডি-হাওলার মাধ্যমে লেনদেনকৃত অর্থের পরিমাণ কমপক্ষে ১৫ বিলিয়ন ডলার। রেমিট্যান্স হিসেবে আসছে আরো ১০ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া দুর্নীতি ও কালোবাজারির মাধ্যমে অবৈধ অর্থ পাচার, স্বর্ণ ও অন্যান্য পণ্য চোরাচালান, মানব পাচারের মতো কার্যক্রমে হুন্ডি-হাওলার অবদান ৫ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার। 

বাংলাদেশ সরকার ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর প্রিভেন্টিং মানি লন্ডারিং অ্যান্ড কমব্যাটিং ফাইন্যান্সিং অব টেরোরিজম ২০১৯-২১’ শীর্ষক একটি কৌশলপত্র তৈরি করেছে। কৌশলপত্রে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের গন্তব্য হিসেবে ১০টি দেশের কথা উল্লেখ করা হয়। এগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত (বিশেষ করে দুবাই), মালয়েশিয়া, কেইমান আইল্যান্ড ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস। এসব গন্তব্যে অর্থ পাচারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো হুন্ডি-হাওলা।

অভিযোগ রয়েছে, পণ্য বাণিজ্যে কর ফাঁকি দেয়ার জন্য ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশ হুন্ডি বা হাওলার দ্বারস্থ হয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে তাদের অনেকেই আন্ডার ইনভয়েসিং (আমদানি মূল্য প্রকৃতের চেয়ে কম দেখানো) করে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে পণ্যমূল্যের অপ্রদর্শিত অংশটুকু পরিশোধ করা হয় হুন্ডি বা হাওলার মাধ্যমে। বিষয়টিকে এখন দেখা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য তথ্যে গরমিলের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে। চীন ও বাংলাদেশ সরকারের পরিসংখ্যানে ২০২১ সালে বাণিজ্যের আকারের গরমিল ছিল ৫ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন (৫৬৮ কোটি) ডলারের বেশি। এ গরমিলের পরিমাণ গত বছর আরো বেড়ে ৭ দশমিক ৫২ বিলিয়ন (৭৫২ কোটি) ডলার ছাড়িয়ে যায়। চীনের পর ভারতের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২১-২২ অর্থবছরের তথ্যে গরমিল রয়েছে ৩ দশমিক ১৯ (৩১৯ কোটি) বিলিয়ন ডলারের। প্রধান বাণিজ্য গন্তব্যস্থল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য পরিসংখ্যানে গরমিল রয়েছে ২ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন (২৯৩ কোটি) ডলারের। অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ব্যবধানের তথ্য বিশ্লেষণ করলেও দেখা যাবে, দেশে পণ্য বাণিজ্যের আড়ালে হুন্ডি-হাওলায় লেনদেন হচ্ছে কমপক্ষে ১৫ বিলিয়ন ডলারের।

এবার ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা থেকে সরে গেল সৌদি কোম্পানি

০৮ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

এবার ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালনা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে সৌদি আরবের কোম্পানি আরবসাস ট্রাভেল অ্যান্ড টুরিস্ট এজেন্সি। তবে কোম্পানিটি এখনো শেয়ার বিক্রি করেনি। এর আগে ইসলামী ব্যাংকের পুরো শেয়ার ছেড়ে দিয়ে পরিচালনা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিল সরকারি প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)।

তারও আগে বেশ কিছু বিদেশি প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার বিক্রি করে দেয়। ২০১৭ সালে চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ হাতে নেওয়ার পর এই শেয়ার বিক্রি শুরু হয়। এসব শেয়ার কিনে ব্যাংকটির একক নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয় এস আলম গ্রুপ। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে যে নানা অনিয়মের কারণে ব্যাংকটি এখন তারল্য সংকটে ভুগছে।

ইসলামী ব্যাংকের কোনো শাখা ঋণ দিতে পারবে না

১০ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

ইসলামী ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকেরা (ব্রাঞ্চ ম্যানেজার) আর কোনো ঋণ দিতে পারবেন না। এমনকি বিভাগীয় ও জোন প্রধানেরাও কোনো ঋণ অনুমোদন করতে পারবেন না। পাশাপাশি ঋণের সীমাও বাড়াতে পারবেন না তাঁরা। তবে কৃষি খাতে তাঁদের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা বহাল রাখা হয়েছে। ব্যাংকটির মোট ঋণের মাত্র ৩ শতাংশ দেওয়া হয়েছে কৃষিতে।

আগে সবক্ষেত্রে শাখা ব্যবস্থাপক ও জোন প্রধানেরা পদক্রম ভেদে সর্বোচ্চ ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ অনুমোদন করতে পারতেন, যার বড় অংশই যেত গ্রামীণ উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের কাছে। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়ার সুযোগ কমে এসেছে। এখন সব ঋণ দেওয়া হবে প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদনে। এর মধ্যে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ অনুমোদন করতে পারবেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)।

গত ১৯ জুন ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৩২৪তম সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়। ওই সভাতেই পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন আহসানুল আলম। তিনি চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমের ছেলে। এর আগে আহসানুল আলম ইউনিয়ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা নেওয়ার পর এবারই প্রথম পরিবারের সদস্যদের ব্যাংকে যুক্ত করে এস আলম গ্রুপ।

আগামী চার মাসে ১২ বিলিয়ন ডলার ঋণ শোধ করতে পারবে বাংলাদেশ?

১০ অগাস্ট ২০২৩, বিবিসি বাংলা

বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতকে চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে আসা এবং ডলার সংকটের কারণে বিদেশি ঋণ পরিশোধ করা জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা মুডিস ইনভেস্টর এবং এসএন্ডপি গ্লোবাল বাংলাদেশের ঋণমান কমিয়ে দেয়ায় নতুন করে ঋণ কতটা পাওয়া যাবে তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

সাধারণত এ ধরণের সংস্থার ঋণমান কমিয়ে দেয়ার কারণে বৈদেশিক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে বেশি হারে সুদ দিতে হতে পারে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ গত অর্থ বছরে প্রায় পনের বিলিয়ন ডলারের মতো ঋণ পেলেও চলতি বছর এখন পর্যন্ত এ ধরণের ঋণ তো আসেনি।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সংকটে বৈদেশিক ঋণের সুদ বাড়ছে এবং পাশাপাশি কমছে ঋণ পরিশোধের সময়। ফলে গত অর্থ বছরের তুলনায় বেড়ে গেছে ঋণ পরিশোধের চাপও।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, এ ঋণ পরিশোধের ‘সক্ষমতা’ বাংলাদেশের নেই এবং পরিস্থিতি মোকাবেলায় কার্যকর সরকারি পদক্ষেপের প্রচেষ্টাও তার দৃষ্টিতে আসেনি।

“সমস্যার মাত্রাটা অনুধাবন করতে পারছে না সরকার। করলে তারা কিভাবে বলতে পারে যে দু মাসে এ সমস্যার সমাধান হবে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

কর্মকর্তারা বলছেন, ১২ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সরকারকে শোধ করতে হবে তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি। বাকি প্রায় নয় বিলিয়ন ডলারের মতো ঋণ বেসরকারি খাতের।

৫ শরিয়াভিত্তিক ব্যাংককে ২৮১ কোটি টাকার বেশি জরিমানা

আগস্ট ১১, ২০২৩, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

নগদ ও তারল্যের ন্যূনতম সীমা ধরে রাখতে না পারায় চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে শরিয়াহভিত্তিক ৫টি ব্যাংককে ২৮১.৩ কোটি টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এর মধ্যে বেসরকারি খাতের সর্ববৃহৎ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংককে সর্বোচ্চ ১৬২ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এরপর আছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক (৬১.৩ কোটি টাকা), সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (৩০ কোটি টাকা), ইউনিয়ন ব্যাংক (২০ কোটি টাকা) ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক (৮ কোটি টাকা)।

সর্বশেষ খবর দ্য ডেইলি স্টার বাংলার গুগল নিউজ চ্যানেলে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র সারোয়ার হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘যেসব ব্যাংক সিআরআর ও এসএলআর ঘাটতিতে ভুগছে, তাদের নিয়ম অনুযায়ী জরিমানা করা হচ্ছে।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ আমানত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখতে হয়। একে বলা হয় ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সিআরআর)। এছাড়া গ্রাহকদের আমানতের ন্যূনতম শতাংশ নগদ, স্বর্ণ বা অন্যান্য সিকিউরিটিজ আকারে রাখতে হয়। একে সংবিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত (এসএলআর) বলা হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য ন্যূনতম সিআরআর প্রয়োজন নগদের ৪ শতাংশ এবং এসএলআর প্রয়োজন আমানতের ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।

সিআরআর ও এসএলআর বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে প্রতিদিনের ঘাটতির পরিমাণের ওপর যথাক্রমে ৯ শতাংশ ও ৮ দশমিক ৫ শতাংশ জরিমানা করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘গত বছরের ডিসেম্বর থেকে এই ৫টি ব্যাংক সিআরআর ও এসএলআর ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।’

যেমন, গত ৩০ জুন ইসলামী ব্যাংকের সিআরআর ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, কিন্তু তাদের এসএলআর সীমা ঠিক ছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের (এফএসআইবিএল) সিআরআর ঘাটতি ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং এসএলআর ঘাটতি ৯০০ কোটি টাকা। এই ব্যাংকটির চেয়ারম্যান এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের (এসআইবিএল) সিআরআর ঘাটতি ছিল ৭০০ কোটি টাকা এবং এসএলআর ঘাটতি ছিল ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংকের সিআরআর ঘাটতি ছিল ৬০০ কোটি টাকা এবং এসএলআর ঘাটতি ছিল ৪৬০ কোটি টাকা এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের (জিআইবি) সিআরআর ঘাটতি ছিল ৩৬০ কোটি টাকা এবং এসএলআর ঘাটতি ছিল ৪৬০ কোটি টাকা।

পরে সিআরআর ও এসএলআর ঘাটতির কারণে ৫টি ব্যাংককে ৫.৯ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংককে ২.৯ কোটি টাকা, এফএসআইবিএলকে ১.৩ কোটি টাকা, এসআইবিএলকে ৭৯ লাখ টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংককে ৫৪ লাখ টাকা এবং জিআইবিকে ৩৭ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

ভবন হয় কোটি টাকায়, পড়ে থাকে অবহেলায়

১২ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

দ্বিতল বাজার ভবনটি প্রস্তুত। রাজবাড়ী সদর উপজেলার বসন্তপুর হাটে এই ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি সাড়ে ৫৮ লাখ টাকা। কিন্তু এখন নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে ভবনটি। বৈদ্যুতিক বাতি, বেসিন, পানির কল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মেঝেতে জমেছে পানি। গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের লক্ষ্যে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দোকান বরাদ্দ দেওয়ার জন্যই ভবনটি নির্মিত হয়েছিল। কিন্তু দোকান বরাদ্দ না দেওয়ায় চালু হয়নি বাজারটি।

এই ভবনের মতোই ৮৭টি বাজারের নির্মাণকাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে ‘দেশব্যাপী গ্রামীণ বাজার অবকাঠামো নির্মাণ’ শীর্ষক এক প্রকল্পের আওতায়।

সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি টাকায় নির্মিত হাসপাতাল, মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের মতো অব্যবহৃত ভবনের বিষয় সামনে এসেছে। এ রকমই এই বাজার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। হাজার কোটি টাকা খরচ করে উপজেলা পর্যায়ে বাজার ভবন করেছে সংস্থাটি। কিন্তু দোকান বরাদ্দ দিতে না পারায় ভবনগুলো অলস পড়ে নষ্ট হচ্ছে। নির্মিত ভবনগুলোর দোকানের শাটার, টাইলস, মেঝেতেও দৃশ্যমান ত্রুটি দেখা যাচ্ছে। পড়ে থাকায় একদিকে ভবনের ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকল্পের মূল্য উদ্দেশ্যও পূরণ হচ্ছে না। প্রতিবছর রাজস্ববঞ্চিত হচ্ছে সরকার।

এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, দেশের ৬৪ জেলার সব উপজেলা এলাকায় মোট ৫০৭টি বাজার ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ১ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা। প্রতিটি বাজার নির্মাণে ব্যয় হয়েছে আড়াই থেকে তিন কোটি টাকার মতো। কিন্তু দোকান বরাদ্দের বিধিমালা জটিলতায় একটি ভবনও চালু করা যায়নি।

প্রকল্পটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে এর ডিপিপি বা উন্নয়ন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, গ্রামীণ বাজার উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষি ও অকৃষি পণ্য বাজারজাতের সুবিধা বাড়ানো, গ্রামপর্যায়ে ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টি এবং স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি। গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চারের উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।

চালুর আগেই বেঁকে গেল রেললাইন

১২ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে পর্যটন শহর কক্সবাজারে রেল যাওয়ার কথা আগামী সেপ্টেম্বরে। কিন্তু গত সপ্তাহের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় নির্মাণাধীন রেললাইনের একটি অংশে পাথর ও মাটি ভেসে গেছে। রেললাইন উঁচু-নিচু ও বাঁকা হয়ে গেছে। এতে নির্ধারিত সময়ে ট্রেন চলাচল শুরু হওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কেঁওচিয়া ইউনিয়নের তেমুহনী এলাকায় বন্যার পানিতে রেললাইন ডুবে এ অবস্থা হয়েছে। টানা অতিবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়ার বিভিন্ন এলাকা গত সোমবার সন্ধ্যা থেকে ডুবতে শুরু করে। মঙ্গলবার ভোরে রেললাইন পানিতে তলিয়ে যায়। পরদিন বুধবার পানি নামে। এরপর রেললাইন উঁচু-নিচু ও বাঁকা হয়ে যাওয়া এবং লাইন থেকে পাথর ও মাটি সরে যাওয়া দৃশ্যমান হয়। এ পরিস্থিতির জন্য অপরিকল্পিত রেলপথ নির্মাণকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞ ও এলাকাবাসী। তাঁরা বলছেন, ছোট ছোট যে কালভার্ট রাখা হয়েছে, সেগুলো পানিনিষ্কাশনের জন্য যথেষ্ট নয়।

রেলওয়ের কর্মকর্তারা গত বৃহস্পতিবার ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইন পরিদর্শন করেন। তাঁদের মতে, এক কিলোমিটারজুড়ে রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবহাওয়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তিন-চার সপ্তাহের মধ্যে সংস্কারকাজ শেষ করা যাবে। তাই নির্ধারিত সময়ে ট্রেন চালু নিয়ে সমস্যা হবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যে অঞ্চলে রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেখান দিয়ে বান্দরবানের পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে এসে সাগরে গিয়ে পড়ে। রেললাইন নির্মাণের সময় তা বিবেচনায় নেওয়া দরকার ছিল। এখন রেললাইন করার কারণে পানিনিষ্কাশনের পথ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এতে বন্যার ব্যাপকতা বেড়েছে। মানুষকে যেমন ভুগতে হচ্ছে, তেমনি রেলের সম্পদ নষ্ট হয়েছে।

গতকাল শুক্রবারও রেললাইনের দুই পাশের এলাকা ও বিলে পানি জমে ছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে তাঁদের এলাকায় এমন ভয়াবহ বন্যা হয়নি। রেললাইনের কারণে পানিনিষ্কাশনের পথ আটকে যাওয়ায় তাঁদের এলাকার বাড়িঘর ডুবে গেছে। যদি রেললাইনে পর্যাপ্ত কালভার্ট বা সেতু নির্মাণ করা হতো, তাহলে এত ক্ষতি হতো না।

রেলওয়ের কর্মকর্তারা গত বৃহস্পতিবার ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইন পরিদর্শন করেন। তাঁদের মতে, এক কিলোমিটারজুড়ে রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবহাওয়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তিন-চার সপ্তাহের মধ্যে সংস্কারকাজ শেষ করা যাবে। তাই নির্ধারিত সময়ে ট্রেন চালু নিয়ে সমস্যা হবে না। বন্যার পানিতে রেললাইনের এ অবস্থার কারণে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে এবং তা সংস্কারে কত অর্থ ব্যয় হবে, তা এখনো পরিমাপ করা হয়নি বলে জানান তাঁরা।

ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজ নরসিংদীর ৯ জন

১২ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

অবৈধভাবে লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজ হয়েছেন নরসিংদীর বেলাব উপজেলার ৯ তরুণ-যুবক। বেঁচে যাওয়া কয়েকজন ও দালাল সূত্রে এ খবর তাঁদের স্বজনদের কাছে পৌঁছার পর থেকেই পরিবারের সদস্যরা মাতম করছেন। গতকাল শুক্রবার রাতে ৯ তরুণ-যুবক নিখোঁজ থাকার তথ্য প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন তাঁদের পরিবারের সদস্যরা।

নিখোঁজ নয়জন হলেন বেলাব উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের কাঙ্গালিয়া গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে মোখলেছুর রহমান (২০), মৃত হাছেন আলীর ছেলে আনোয়ার হোসেন ওরফে কামাল (৩৪), ভাটের গ্রামের হাসান উদ্দিনের ছেলে মাসুদ রানা (২২), দুলালকান্দি গ্রামের হারুন রশিদের ছেলে মনির হোসেন (২২), আবদুল মোতালিব মিয়ার ছেলে রবিউল মিয়া (৩৩) ও রায়হান মিয়া (২২), টান লক্ষ্মীপুর গ্রামের মহরম আলীর ছেলে স্বাধীন মিয়া (২০), দেওয়ানের চর গ্রামের আলমাছ আলীর ছেলে মো. ইমন (২০) ও নিলক্ষীয়া গ্রামের আমান মিয়া (২১)।

তাঁদের স্বজনদের ভাষ্য, ১০ থেকে ১২ লাখ টাকায় তাঁরা লিবিয়া থেকে অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে যেতে চেয়েছিলেন। লিবিয়ায় থাকা মূল দালাল বেলাব উপজেলার দুলালকান্দি গ্রামের বাসিন্দা জাকির হোসেন ও তাঁর সহযোগী শাহিনুর বেগমের মাধ্যমে ওই টাকা দিয়ে দেশ ছাড়েন ৯ তরুণ-যুবক। গতকাল খবর আসে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় ওই নয়জন নিখোঁজ আছেন।

নিখোঁজ আনোয়ার হোসেন ওরফে কামালের ছোট ভাই জামাল মিয়া বলেন, ‘ঘটনা লোকমুখে শুনে লিবিয়ায় থাকা দালাল জাকির হোসেনের মোবাইলে কল করে স্থানীয় ইউপি সদস্য মিলন মেম্বার তাদের নিখোঁজ হওয়ার তথ্য নিশ্চিত হন। পরে মিলন মেম্বারের মাধ্যমেই ঘটনা জানতে পারি আমরা। নিখোঁজদের মধ্যে আমার ভাইও আছে।’

জামাল মিয়া আরও বলেন, ৫-৬ মাস আগে জাকির ও শাহিনুরের সঙ্গে ১২ লাখ টাকায় ইতালিতে নেওয়ার চুক্তি হয় তাঁর ছোট ভাইয়ের। এলাকার আরও কয়েকজনের সঙ্গে তাঁকে প্রথমে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। বেশ কিছুদিন আরও অনেকের সঙ্গে গেমঘরে (যাত্রার আগে যেখানে তাঁদের রাখা হয়) ছিলেন তাঁরা। গত বুধবার রাত ৮টায় ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালির উদ্দেশে যাত্রা করার ৪০ মিনিট পরই তাঁদের বহনকারী নৌকাটি ডুবে যায়। দালাল জাকিরের তত্ত্বাবধানে থাকা ২০ জনের মধ্যে ১১ জন বেঁচে ফিরলেও ৯ জন নিখোঁজ হন।

নিখোঁজ রবিউলের ভাই ইব্রাহিম মিয়া বলেন, আট মাস আগে ভৈরবের দালাল রবিউল্লার মাধ্যমে লিবিয়ায় যান রবিউল। কিন্তু সেখানে তাঁকে বৈধ কোনো কাগজ করে দেওয়া হয়নি। এরপর দালাল জাকির হোসেন তাঁকে ইতালিতে নিয়ে যাওয়ার লোভ দেখিয়ে তাঁদের কাছ থেকে ৯ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। এখন শুনতে পাচ্ছেন রবিউলও নিখোঁজ।

পণ্য আমদানি থেকে বিক্রি – কীভাবে সব নিয়ন্ত্রণ করছে সিন্ডিকেট

১২ অগাস্ট ২০২৩, বিবিসি বাংলা

বাংলাদেশের চট্টগ্রামের কয়েকজন ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের আমদানিকারকের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী দেশের জন্য জরুরি নিত্যপণ্যের আমদানি এখন প্রায় পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করছে হাতেগোনা কয়েকটি গোষ্ঠী।

তবে বাজারের নিয়ম অনুযায়ী পণ্য আমদানি ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতার বদলে তারা একে অন্যের সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়ে পণ্য আমদানির প্রতিটি পর্যায়ে তাদের কর্তৃত্ব তৈরি করেছে।

এর ফলে বাজারের ওপর একক ‘কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা’ হয়েছে তাদের, যার জের ধরে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে ভোক্তারা।

আবার ডলারের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ার কারণে বিপদে পড়েছেন ছোট আমদানিকারকদের অনেকে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের এসব আমদানিকারকদের অনেকেই এখন ডলার সংকট আর কথিত সিন্ডিকেট চক্রের সম্মিলিত ‘আগ্রাসনে’ টিকতে না পেরে সরে দাঁড়াচ্ছেন দীর্ঘদিনের আমদানি বাণিজ্য থেকে ।

আবার সরে গিয়েও এসব বিষয়ে তারা মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন, যদি একারণে তাদের অন্য ব্যবসাতেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়।

“এখানে বড়রা সব একজোট। আমরা ছোটোরা এমনকি এই বড়দের কাছ থেকেও আমরা নিজেদের ইচ্ছে মতো পণ্য নিতে পারি না। বরং তারাই আমাদের ঠিক করে দেয় কোন পণ্য আমরা কার কাছ থেকে কত দরে কিনবো। এভাবেই কয়েকজন মিলে সব করায়ত্ত করেছে,” – বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন চট্টগ্রামের একজন ব্যবসায়ী।

ঢাকায় গবেষক ও অর্থনীতিবিদ ডঃ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমও বলছেন গত কয়েক বছর ধরেই আমদানির ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে এবং কয়েকটি জরুরি পণ্যের মার্কেট শেয়ার এখন কয়েকটি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে।

“আমদানি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত নিজেদের বলয় তৈরি করে নিজেদের শর্তে বাজারে পণ্য দিচ্ছে তারা। তাদের কথা মতো না হলে অন্যরা ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

বাজারে প্রতারণা বা ম্যানিপুলেশন বন্ধ করে ভোক্তাদের জন্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য কাজ করা সংস্থাগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রতিযোগিতা কমিশন বলছে এ চিত্র তাদেরও জানা।

তবে কারা কীভাবে এসব করছে – এর বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্য একটি সমীক্ষা করছে এই সংস্থাগুলো।

“এছাড়া আমরা কয়েকটি স্যুয়োমটো মামলাও করেছি কথিত বড় কয়েকটি গোষ্ঠীর কার্যক্রমের বিষয়ে। এগুলো শুনানি পর্যায়ে আছে,” – বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপার্সন প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী।

প্রসঙ্গত, গত জুনেই বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের প্রসঙ্গে মন্তব্য করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, “সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব। তবে তাতে হঠাৎ করে ক্রাইসিসটা তৈরি হবে। এজন্য আলোচনার মাধ্যমে নিয়মের মধ্য থেকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করি”।

বাংলাদেশে অনেক সময় কোনো ভোগ্যপণ্যের দাম অতিমাত্রায় বাড়লে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি দাম নির্ধারণ করে দেয়।

যদিও অনেক ক্ষেত্রে বাজারে সেটিও কার্যকর হয় না।

পণ্য আমদানির জন্য সুপরিচিত কয়েকটি বড় গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল – কিন্তু তাদের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

আমদানির প্রতিটি ধাপ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সিন্ডিকেট

বাংলাদেশে চিনি, ডাল, তেলসহ সতেরটি পণ্যকে নিত্যপণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এসব মূল পণ্যগুলো আলাদা করে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এগুলোর মার্কেট শেয়ার বড় কয়েকজন আমদানিকারকদের হাতে।

চট্টগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে কীভাবে একটি চক্র জরুরি নিত্যপণ্য আমদানি করা থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে তার একটি ‘ভয়াবহ চিত্র’ পাওয়া গেছে।

“বড় ব্যবসায়ীরা একজোট হয়ে ব্যবসা ভাগাভাগি করছে বলেই আমরা ছোটোরা রেস থেকে ছিটকে গেছি। তাদের অবাধ্য হয়ে কোনো ব্যবসাই আমরা এখানে করতে পারবো না।” বিবিসিকে বলছিলেন একজন ব্যবসায়ী।

“এখানে সিন্ডিকেটের বাইরে কিছু কল্পনাও করা যায় না,” – বলেন তিনি।

এমন কয়েকজন ব্যবসায়ী যে ধারণা দিয়েছেন তা হলো – বড় ভলিউমে পণ্য আমদানি করা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একজোট হয়েছে। এখন মাঝারি পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা ওই বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে নিজের ইচ্ছে মতো পণ্য কিনতে পারেন না।

উদাহরণ স্বরূপ – একজন উদ্যোক্তা ভাবলেন, তিনি একশ কোটি টাকার চিনি বা লবণ কিনবেন। সেজন্য বড় ব্যবসায়ীদের কাছে গেলে তারাই ঠিক করে দেন যে কোন পণ্য কত দামে কার কাছ থেকে কিনতে হবে।

এতে রাজী না হয়ে উদ্যোক্তাটি যদি মনে করেন তিনি ব্রাজিল থেকে একশ কোটি টাকার চিনি আনবেন, সে অনুযায়ী তিনি আমদানি করলেও – বড় গোষ্ঠীরা “তার আমদানি মূল্যের চেয়ে কম দামে বাজারে চিনি ছেড়ে” তাকে লোকসানের মুখে ফেলে দেবে।

আবার বড় চক্রের বাইরে থেকে কেউ আমদানি করতে এলসি খুলতে চাইলেও ব্যাংক রাজী হবেনা। এমনকি বাধা আসবে কাস্টমস-ভ্যাটসহ নানা দফতর থেকে।

আর ভয়ংকর ব্যাপার হলো, সিন্ডিকেটের বাইরে গিয়ে বা তাদের সিগন্যাল ছাড়া কোনো পণ্য আনলে সেগুলো বন্দরে আনার জন্য লাইটার ভেসেল পর্যন্ত পাওয়া যায় না। এমনকি শ্রমিক গোষ্ঠীও এসব পণ্য খালাসে কাজ করতে আগ্রহী হয়না।

ফলে অন্যদের আমদানি করা পণ্য কতদিন সাগরে বা জাহাজে পড়ে থাকবে তার নিশ্চয়তা নেই। আবার খালাস হলেও কাস্টমস ও কর বিভাগ ছাড়পত্র দেবে কিনা – তা নিয়েও সংশয় থাকে।

“এভাবে প্রতিটি পদে পদে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে সিন্ডিকেট। টাকা থাকলেও এদের সাথে কেউ পেরে উঠবে না। এমনকি সরকার একটু দাম নির্ধারণ করে দিলে তারা পণ্য হয়তো জাহাজেই রেখে দেবে কিছুদিন – যাতে সংকটে পড়ে সরকারই চাপ দেয় যে দাম যাই হোক, পণ্য আনুন,” বলছিলেন একজন ব্যবসায়ী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কথিত সিন্ডিকেট বলতে যাদের বোঝানো হয় তারা একদিকে যেমন বড় আমদানিকারক, আবার নানা ভাবে ব্যাংকগুলোর মালিকানা বা ব্যবস্থাপনার কর্তৃত্বেও আছেন তারাই।

আবার সাগরের বড় জাহাজ থেকে বন্দরে খালাসের জন্য ব্যবহৃত লাইটার জাহাজগুলোও তাদের কিংবা তাদের সহযোগীদের।

ফলে শ্রমিকরাও মালিকদের বাইরে গিয়ে অন্য কারও জন্য কাজ করতে পারেন না বিপদে পড়ার ভয়ে।

সব কিছুই এই সিন্ডিকেটের হওয়ায় সরকারের রাজস্ব বিভাগের লোকজনও থাকেন চাপের মুখে।

“আপনার যত টাকা থাকুক, এদের বাইরে গিয়ে কেউ পণ্য আনার জন্য কোনো ব্যাংকে এলসিই খুলতে পারবেন না। কারণ ব্যাংকও তাদের। হাই কানেক্টেড (উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ) না হলে ব্যাংক কারও এলসি খুলবে না,” বলছিলেন ওই ব্যবসায়ী।

আবার কথিত সিন্ডিকেট কোন পণ্য এনে যাদের মাধ্যমে বাজারজাত করবে – সেসব প্রতিষ্ঠানও নামে-বেনামে তাদের পরিবারের লোকজনেরই।

এমনকি বড় বড় বাজারগুলোর জন্য এসব পণ্যের ডিলারশিপও তাদের আশীর্বাদপুষ্ট লোকজনের হাতে।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন অনেক ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা যে দামে অন্যদের কাছে পণ্য বিক্রি করেন – তারা মানি রিসিট দিতে চান না, যা রীতিমত অপরাধ।

“ধীরে ধীরে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বড়রা ধীরে ধীরে পুরো সাপ্লাই চেনটা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। আমদানি থেকে খুচরা পর্যন্ত তারা নিজেদের বলয় তৈরি করেছে। তাদের শর্ত মতোই সব হচ্ছে। তাদের কথা মতো না হলে অন্যরা ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে। যে কোনো পরিবেশেই হোক ব্যবসা বাণিজ্যে এমন পরিস্থিতি আশঙ্কা জনক,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. মোয়াজ্জেম।

তিনি বলছেন বড় গোষ্ঠীগুলো শুধু পণ্য আনাটাই নয়, জাহাজ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ শুরু করেছে।

সরকারের সঙ্গে দাম নিয়ে আলোচনা হলে, বাজেটে শুল্ক হ্রাস বৃদ্ধির বিষয় থাকলে, অথবা সরকার দাম কমানোর বা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে—সে সময় হয়তো তারা জাহাজ সাগরেই রেখে দেবেন।

“এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভোক্তারা ও ঝুঁকিতে থাকবে বাজার ব্যবস্থাপনা। বাজারের মূল্যবোধ, ভ্যালুজ, সংস্কৃতি সবই নষ্ট করে দেয়া হচ্ছে”, – বলছিলেন মি. মোয়াজ্জেম।

নিজের ঘরে ঝুলছিল কৃষকের নিথর দেহ

১৫ আগস্ট ২৩, সমকাল

রামগড়ে ঋণে জর্জরিত এক কৃষক চাপ সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল সোমবার উপজেলার পাতাছড়া ইউনিয়নের সোনারখীলে নিজ বাড়ি থেকে তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

কৃষক মো. ইসমাইল (২৫) এলাকার মো. ইদ্রিস মিয়ার ছেলে। তাঁর সংসারে স্ত্রী ও দুই সন্তান রয়েছে। নিজের দোচালা টিনের ঘর থেকে তাঁর নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ইসমাইল স্থানীয় লোকজন ও বিভিন্ন এনজিও থেকে অনেক টাকা ঋণ নিয়ে বসতঘর নির্মাণ করেন। কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে নতুন ঋণের চাপে পড়ছিলেন। কৃষি ছাড়া উপার্জনের বিকল্প উপায় না থাকায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন তিনি। পাওনাদাররা প্রায়ই বাড়িতে এসে টাকার জন্য চাপ দিতেন। এ নিয়ে তাদের সঙ্গে প্রায়ই কথা কাটাকাটি হতো। ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে ও অভাব-অনটনে তিনি হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন বলে জানান স্থানীয় ইউপি সদস্য আমান উল্লাহ।

আরও ৪ প্রকল্প বাদ দিতে চায় বাংলাদেশ

১৯ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

ভারতীয় ঋণে প্রকল্প গ্রহণের আগ্রহ কমছে বাংলাদেশের। যে কারণে গত তিন বছরে ভারতের এক্সিম ব্যাংকের লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) বা গুচ্ছ ঋণ থেকে আটটি প্রকল্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। আরও চারটি প্রকল্প প্রত্যাহারের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। মূলত ভারতীয় ঋণের কঠিন শর্ত, ঠিকাদারদের বেশি দাম চাওয়া, প্রতি পদে পদে সম্মতি নেওয়াসহ নানা কারণে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রকল্প প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। আগে প্রত্যাহার করে নেওয়া আট প্রকল্পে সব মিলিয়ে ১১৩ কোটি ডলার বিনিয়োগের কথা ছিল। নতুন করে আরও যে চারটি প্রকল্প প্রত্যাহারের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, সেগুলোতে বরাদ্দ আছে ১০১ কোটি ডলার। গত এক যুগে ভারতের তিনটি এলওসির মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রায় ৭৫০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করেছে। এর মধ্যে মাত্র ১৫০ কোটি ডলারের মতো ছাড় করা হয়েছে। এসব ঋণে সব মিলিয়ে ৪০টি প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত এক যুগে ভারতীয় ঋণের ছাড় ও প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বেশ কম। বাংলাদেশ ও ভারত—দুই দিকেই আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতা আছে। নানা নিয়মকানুনের কারণে উভয় পক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে অনেক সময় লাগে। আবার ঠিকাদারেরা যে দর দেন, তা অনেক বেশি। যেহেতু ভারতীয় ঠিকাদারদেরই কাজ দিতে হবে, তাই বেশি দর দিলেও আমরা তা নিতে বাধ্য। তাতে একধরনের জিম্মি হয়ে যাই।’

জাহিদ হোসেন আরও বলেন, ‘ভারত থেকে ৭৫ শতাংশ কেনাকাটা করে ভৌত প্রকল্প বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব। সার্বিকভাবে ভারতীয় এলওসির অভিজ্ঞতা ভালো নয়। তাই এলওসি থেকে প্রকল্প প্রত্যাহার বা বেরিয়ে আসাকে সমর্থন করি।’

প্রকল্প প্রত্যাহারের প্রস্তাব

ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, এলওসির তালিকা থেকে আরও চারটি প্রকল্প বাদ দিতে একটি প্রস্তাব ভারতের এক্সিম ব্যাংকের কাছে গত ডিসেম্বরে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনো এক্সিম ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি। প্রকল্পগুলো হলো বাংলাদেশ রেলওয়ের সৈয়দপুরে নতুন ওয়ার্কশপ নির্মাণ (৭ কোটি ডলার); প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরী স্থাপন (সাড়ে ১৬ কোটি ডলার); নৌ মন্ত্রণালয়ের চট্টগ্রাম বে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ (৪০ কোটি ডলার) এবং সৈয়দপুর বিমানবন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্প (সাড়ে ৩৭ কোটি ডলার)। চারটিই ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের প্রকল্প।

এক্সিম ব্যাংকের শর্ত অনুসারে, প্রকল্পের ৭৫ শতাংশ কেনাকাটাই ভারত থেকে করতে হবে। তবে কর্মকর্তারা মনে করেন, এই চার প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে ভারতীয় ঠিকাদারকে ইট-বালু, রড-সিমেন্ট—সবই ভারত থেকে আনতে হবে।

ব্যাংক খাতের সবচেয়ে ক্ষতের বছর কি ২০২২ সাল

আগস্ট ২০, ২০২৩, বণিক বার্তা

ব্যাংক খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ নিট মুনাফা দেখানো হয়েছে ২০২২ সালে। আগের বছরের তুলনায় এ সময় দেশের ব্যাংকগুলোর মুনাফার প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৮৩ শতাংশ। গত ৫২ বছরে খাতটিতে এ পরিমাণ নিট মুনাফা আর কখনই দেখা যায়নি। যদিও এ সময় পুনঃতফসিল করা হয়েছে খেলাপি হতে যাওয়া ৬৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ। তার পরও বছর শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বেশিতে। প্রভিশন বা সঞ্চিতি ঘাটতিও ১১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর পরও বছর শেষে ব্যাংক খাতে নিট মুনাফা দেখানো হয়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি, যার সিংহভাগই আবার লভ্যাংশ হিসেবে বের করে নিয়েছেন মালিকরা। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২১ সালে ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা ছিল ৫ হাজার ২০ কোটি টাকা। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে গত বছর ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা ১৪ হাজার ২৩০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। সে হিসেবে নিট মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৮৩ শতাংশের বেশি। কভিডের আগের বছর ২০১৯ সালে ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা ছিল ৬ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। এরপর ২০২০ সালে তা দাঁড়ায় ৪ হাজার ৬৬০ কোটি টাকায়। মূলত প্রভিশন বা সঞ্চিতি বাবদ কম অর্থ সংরক্ষণের কারণেই এ সময়ে ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফায় অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

মুনাফায় ব্যাপক উল্লম্ফনের এ বছরটিতে ব্যাংক থেকে পরিচালকদের ঋণ গ্রহণও বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ি, ব্যাংক থেকে নেয়া পরিচালকদের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা। তবে পরিচালকদের নিজের নাম ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে নেয়া এ ঋণের চেয়েও বেনামি ঋণ বেশি বলে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। আবার পরিচালকদের নেয়া ঋণই দফায় দফায় পুনঃতফসিল করছে ব্যাংকগুলো। গত বছর যেসব ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে, তার উল্লেখযোগ্য অংশের সুবিধাভোগীও ব্যাংক পরিচালকরা। এ সময় পণ্যের দাম বেশি দেখিয়ে (ওভার ইনভয়েসিং) সামর্থ্যের বাইরে আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খুলেছে ব্যাংকগুলো, যার অনেকগুলোই ছিল ব্যাংক পরিচালকদের স্বার্থের অনুকূলে। এসব এলসি দায় পরিশোধ করতে গিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও টান পড়েছে।

ব্যাংকাররা বলছেন, ২০২২ সালে ব্যাংক খাতে রেকর্ড নিট মুনাফা হওয়ার মতো কোনো ঘটনাই ঘটেনি। বরং এ সময়ে দেশের ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত আরো বেশি দুর্বল হয়েছে। নিট মুনাফা দেখানোর মাধ্যমে মালিকপক্ষ লাভবান হলেও দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি ছাড়ের কারণে অনেক খেলাপি ঋণও নিয়মিত দেখানো হচ্ছে। এ ধরনের ঋণ থেকে কৃত্রিম আয়ও দেখাচ্ছে ব্যাংকগুলো। ‘‌উইন্ডো ড্রেসিংয়ের’ মাধ্যমে করা এ মুনাফা শেষ পর্যন্ত ব্যাংক খাতকে আরো বেশি নাজুক ও দুর্বলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক মঈনউদ্দীন মনে করছেন, ২০২২ সালে দেশের ব্যাংক খাত ভালো ছিল, এটি ভাবার কোনো কারণ নেই। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌ব্যাংকগুলোর যে আয় দেখা যাচ্ছে, সেগুলো উইন্ডো ড্রেসিং বা চাতুরী বিন্যাসের ফল। প্রকৃত অর্থে গত বছর দেশের ব্যাংক খাত শক্তিশালী হয়নি। বরং উদ্যোক্তারা বড় অংকের নিট মুনাফা বের করে নেয়ায় ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’

বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংক পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এ ব্যাংকার বলেন, ‘‌তিন বছর ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ পরিশোধে বিভিন্ন ধরনের ছাড় দেয়া হয়েছে। এ কারণে ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করেও অনেক গ্রাহক খেলাপি হয়নি। আবার ব্যাংকগুলো খেলাপি হওয়ার যোগ্য এমন ঋণকেও নিয়মিত দেখানোর সুযোগ পেয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো আয় বাড়িয়ে দেখিয়েছে। গত বছর ব্যাংকগুলো রেকর্ড ৬৩ হাজার কোটি টাকার ঋণও পুনঃতফসিল করেছে। ফলে ব্যাংকগুলোকে সঞ্চিতিও কম রাখতে হয়েছে। এভাবে ব্যাংকগুলো নিট মুনাফা বাড়িয়েছে। যদিও পুনঃতফসিল ও নীতি ছাড় পাওয়া এসব ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা কম।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল শেষে দেশের ব্যাংক খাতে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি ২ লাখ ১২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত মোট ঋণের ১৪ দশমিক ৪০ শতাংশই এখন পুনঃতফসিলকৃত। এর মধ্যে ৬৩ হাজার ৭২০ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে গত বছর। রেকর্ড পরিমাণ ঋণ পুনঃতফসিল করা সত্ত্বেও ২০২২ সাল শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ১ লাখ ২০ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।

পুনঃতফসিলকৃত ঋণকে ‘স্ট্রেসড’ বা ‘দুর্দশাগ্রস্ত’ হিসেবে দেখায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত বছরের ডিসেম্বরে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২০ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। একই সময়ে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতিও ছিল ২ লাখ ১২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকার বেশি। আবার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আদায় অযোগ্য হওয়ায় ব্যাংকগুলো ৬৫ হাজার ৩২১ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করেছে। সব মিলিয়ে দেশের ব্যাংক খাতের অন্তত এক-চতুর্থাংশ ঋণই ছিল দুর্দশাগ্রস্ত। খেলাপির খাতায় ওঠা ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট কোনো কোনো গ্রাহক উচ্চ আদালতে মামলা করছে। এসব মামলায়ও আটকা পড়েছে বিপুল পরিমাণ ঋণ।

ব্যাংকগুলোর ঋণ বড় গ্রাহকদের কাছে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ার অভিযোগ অনেক পুরনো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টের তথ্যেও একই কথা উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, শীর্ষ তিন গ্রাহক খেলাপি হয়ে গেলে দেশের অন্তত ২২টি ব্যাংক ন্যূনতম মূলধন সক্ষমতা (সিআরএআর) হারাবে। গত ডিসেম্বর শেষে পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে দেশের ১১টি ব্যাংক। রেকর্ড পরিমাণ ঋণ পুনঃতফসিল করা না হলে দেশের অন্তত অর্ধেক ব্যাংকই মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থ হতো বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা।

বছর শেষে নিট মুনাফায় ১৮৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখানো হলেও এ সময় ব্যাংকগুলোর সুদ আয়ে এর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কোনো প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি। যদিও এ সুদ আয়কে দেখা হয় ব্যাংকের মুনাফার প্রধান উৎস হিসেবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল শেষে দেশের ব্যাংকগুলোর সুদ বাবদ আয় বেড়েছে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। এ সময়ে ব্যাংকগুলো বিতরণকৃত ঋণ থেকে ৯৬ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা সুদ আদায় করেছে। যেখানে এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২১ সালে সুদ আয় ছিল ৮৭ হাজার ৬০ কোটি টাকা। 

আবার গত বছর ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন ধরনের আমানতের বিপরীতে সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বেড়েছে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। এ সময়ে ব্যাংকগুলোর সুদ ব্যয় হয়েছে ৬৯ হাজার ১১০ কোটি টাকা, যা আগের বছরে ছিল ৬৩ হাজার ৮২০ কোটি টাকা। সুদ ব্যয় বাদ দিয়ে ২০২২ সালে ব্যাংকগুলোর নিট সুদ আয় হয়েছে ২৭ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা, যা আগের বছরে ছিল ২৩ হাজার ২৪০ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর নিট সুদ আয় বেড়েছে ১৮ শতাংশ।

সুদ ছাড়াও ব্যাংকের আয়ের অন্যান্য উৎসের মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগ, ফি ও ট্রেজারি খাত থেকে আয়। ২০২২ সালে এ খাত থেকে ব্যাংকগুলোর আয় হয়েছে ৪৬ হাজার ৮২০ কোটি টাকা। যেখানে আগের বছরে এ খাতে আয় ছিল ৪০ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। এ খাতে ব্যাংকগুলোর আয় বেড়েছে ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ। সব মিলিয়ে ২০২২ সালে দেশের ব্যাংকগুলোর মোট আয় হয়েছে ৭৪ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, যা আগের বছরে ছিল ৬৩ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর মোট আয় বেড়েছে ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ।

ব্যাংকগুলোর আয়ের বড় একটি অংশ ব্যয় হয় পরিচালন খাতে। ২০২২ সালে দেশের ব্যাংকগুলোর পরিচালন খাতে ব্যয় হয়েছে ৪০ হাজার ৩০ কোটি টাকা। যেখানে আগের বছরে এ খাতে ব্যয় ছিল ৩৫ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। এ সময়ে পরিচালন খাতে ব্যয় বেড়েছে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। মোট আয় থেকে পরিচালন ব্যয় বাদ দিয়ে যে মুনাফা হয় সেটি সঞ্চিতিপূর্ব মুনাফা নামে পরিচিত। ২০২২ সালে ব্যাংকগুলোর সঞ্চিতিপূর্ব মুনাফার পরিমাণ ছিল ৩৪ হাজার ২২০ কোটি টাকা। যেখানে আগের বছরে এ মুনাফা ছিল ২৮ হাজার ২১০ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর সঞ্চিতিপূর্ব মুনাফা বেড়েছে ২১ দশমিক ৩ শতাংশ।

ব্যাংক খাত শক্তিশালী হওয়ার কারণে নিট মুনাফা বেড়েছে এটি বলার সুযোগ নেই বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কিছু ব্যাংক ভালো করছে এটিও মানতে হবে। গত বছর ব্যাংকগুলো ট্রেজারি ও বিনিয়োগ থেকে ভালো আয় পেয়েছে। নিট মুনাফা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এটির ভূমিকা আছে। তবে সামগ্রিকভাবে ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান বেড়েছে এটি বলা যাবে না।’

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক এ চেয়ারম্যান বলেন, ‘‌খেলাপি হওয়ার যোগ্য এমন ঋণও আয়ের খাতে নেয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে মুনাফা বাড়লেও ব্যাংক দুর্বল হচ্ছে। কারণ এসব ঋণ ভবিষ্যতে খেলাপি হয়ে যেতে পারে। তখন খেলাপি ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি রাখতে হবে। এভাবে ব্যাংকের ক্ষতি আরো অনেক বেড়ে যাবে।’

বিতরণকৃত ঋণের ঝুঁকি কমাতে এর বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে বিভিন্ন হারে সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হয়। স্বাভাবিক শ্রেণীর ঋণের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ থেকে শুরু করে মন্দ ঋণের ক্ষেত্রে শতভাগ সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হয়। গত বছর দেশের ব্যাংকগুলো বিভিন্ন শ্রেণীর ঋণের বিপরীতে মাত্র ৮ হাজার ৭৭০ কোটি টাকার সঞ্চিতি সংরক্ষণ করেছে। যেখানে ২০২১ সালে সংরক্ষিত সঞ্চিতির পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে সঞ্চিতি সংরক্ষণের হার কমেছে ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ। যদিও ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে ব্যাংকগুলো ২১ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি সঞ্চিতি সংরক্ষণ করেছিল।

সঞ্চিতি কম সংরক্ষণের কারণে ২০২২ সালে ব্যাংকগুলোর করপূর্ব মুনাফার পরিমাণ বেড়েছে ৯৭ দশমিক ১০ শতাংশ। এ সময়ে ব্যাংকগুলোর করপূর্ব মুনাফা হয়েছে ২৫ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা, যা আগের বছরে ছিল ১২ হাজার ৯২০ কোটি টাকা। ২০২২ সালে ব্যাংকগুলো সরকারকে ১১ হাজার ২৩০ কোটি টাকার কর পরিশোধ করেছে। যেখানে আগের বছরে পরিশোধ করেছিল ৭ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। এ সময়ে কর বাবদ ব্যাংকগুলোর ব্যয় বেড়েছে ৪২ দশমিক ২ শতাংশ। সরকারকে কর পরিশোধের পর ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা দাঁড়ায় ১৪ হাজার ২৩০ কোটি টাকায়।

ব্যাংকগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২২ সালে দেশের বেশির ভাগ ব্যাংকেরই নিট মুনাফা বেড়েছে। বিশেষ করে বিদেশী ব্যাংকগুলোর মুনাফায় প্রবৃদ্ধি ছিল অস্বাভাবিক। শুধু বহুজাতিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের নিট মুনাফা ছিল ১ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা। ২০২১ সালে ৭৫৮ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছিল ব্যাংকটি।

গত বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে রেকর্ড পণ্য আমদানির এলসি খোলা হয়। এ কারণে বিদেশী ব্যাংকগুলোর মুনাফায় উল্লম্ফন হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে বেসরকারি খাতের বেশির ভাগ ব্যাংকই ঋণ পুনঃতফসিল ও নীতি ছাড়ের কারণে মুনাফা বাড়িয়ে দেখাতে পেরেছে। এর মধ্যে ২০২২ সালে রেকর্ড ৩ হাজার ২৬০ কোটি টাকা নিট লোকসান দেয় ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড। ব্যাংকটির এ পরিমাণ লোকসান না হলে ব্যাংক খাতের নিট মুনাফা আরো বড় হতো।

এক সময় ব্যাংকগুলো পুনঃতফসিলের প্রস্তাব নিজ পর্ষদে পাস হওয়ার পর তা অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠাত। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যাচাই-বাছাইয়ের পর পুনঃতফসিলের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতো। কিন্তু গত বছরের জুলাইয়ে পুনঃতফসিলের ক্ষমতা ব্যাংকগুলোর হাতে ছেড়ে দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্য দিয়ে নিজেরা ইচ্ছেমতো ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ পায় ব্যাংকগুলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নীতিকেই খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলে উল্লম্ফনের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

নিয়ন্ত্রণে নেই ডিমের বাজার

২০ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

করোনাকাল শুরুর আগে ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকার বাজারে এক হালি ডিমের দাম ছিল ২৮ থেকে ৩০ টাকা। রাজধানীর বাসিন্দাদের সেই ডিম এখন কিনতে হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়।

বাজারে ডিমের এই চড়া দাম কোনো সাময়িক সমস্যা নয়, বরং মাসের পর মাস ধরে ডিম নাগালের বাইরে থাকছে। ফলে সহজলভ্য এই প্রাণিজ আমিষ খেতে পারছেন না নিম্ন আয়ের মানুষ। শুধু ডিম নয়, চড়া মাছ ও মাংসের বাজারও। ফলে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষও বিপাকে রয়েছে।

ছোট ও মাঝারি খামারিরা বলছেন, ডিমের দাম নির্ধারণে তাঁদের ভূমিকা নেই। বাজারে ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে উঠেছে। তারা যে দাম ঠিক করে দেয়, সেই দরেই বিক্রি হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি ১৩ আগস্ট ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণে না এলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ডিম আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে।

একই দিন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম সাংবাদিকদের বলেন, দেশে যে ডিমের উৎপাদন, তাতে সঠিক ব্যবস্থায় বিন্যাস হলে আমদানির কোনো প্রয়োজন নেই।

মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর বাজারে অভিযান চালানো শুরু হয়। কিন্তু ডিমের দাম কমেছে ডজনে ১০ থেকে ১৫ টাকা। এখন বড় বাজারে এক ডজন ফার্মের মুরগির বাদামি ডিমের দাম ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা। পাড়া–মহল্লার মুদিদোকান থেকে এক হালিডিম কিনতে হচ্ছে ৫৫ টাকায়। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানে ডিমের দাম অনেকটাই কম।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রথম আলোর সংবাদদাতা অমর সাহা জানান, সেখানে গতকাল শনিবার প্রতি ৩০টি ডিম বিক্রি হয়েছে ১৬০ রুপিতে। তাতে প্রতিটি ডিমের দাম পড়েছে ৫ রুপি ৩৩ পয়সা যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৭ টাকা ৫ পয়সা।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন ভলান্টারি কনজ্যুমারস ট্রেনিং অ্যান্ড অ্যাওয়ারনেস সোসাইটির (ভোক্তা) নির্বাহী পরিচালক মো. খলিলুর রহমান ভারতের চেন্নাই থেকে গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় ফিরেছেন। তিনি জানান, গত বুধবার তিনি চেন্নাইয়ে ৬টি ডিম কিনেছেন ৪২ রুপি দিয়ে। বাংলাদেশি মুদ্রায় হালি পড়েছে ৩৭ টাকা।

ডিম খাওয়াও কমাচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ

২০ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

গাজীপুরের তিন সড়ক এলাকায় রাস্তার পাশে একটি ভাসমান ভাতের হোটেলে গত বুধবার দুপুরে খাবার খাচ্ছিলেন পোশাকশ্রমিক আবদুল আজিজ। স্পেরো নামের একটি কারখানায় কাজ করেন তিনি। আবদুল আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুপুরে বিরতির সময় বাড়িতে গেলে গাড়িভাড়া লাগে ২০ টাকা।

কিন্তু বিশ্রাম নেওয়ার সময় থাকে না। তাই বেশির ভাগ সময় দুপুরের খাবার হোটেলে খেয়ে নিই। বছর দুই আগে ভাতের সঙ্গে ডিম আর ডাল খেলে লাগত ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। এখন এক প্লেট ভাত আর ডিম খেলেই লাগে ৫০ টাকা। সঙ্গে অন্য কিছু নিলে লাগে ৬০ থেকে ৭০ টাকা। মাছ আর মাংসের কথা বাদই দিলাম।’

বাজারে পাল্লা দিয়ে একের পর এক বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বমুখী যাত্রায় সর্বশেষ সংযোজন ডিম। লাগামছাড়া দামের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ মাছ-মাংস খাওয়া আগেই কমিয়ে দিয়েছেন। প্রাণিজ আমিষ বলতে ডিমই ছিল তাঁদের ভরসা। এখন ডিমের দামও ঊর্ধ্বমুখী। বাজারে এখন প্রতি ডজন ডিমের দাম ১৫০ টাকার নিচে নেই।

তাতে নিম্ন আয় ও শ্রমজীবী মানুষ ডিম খাওয়াও কমাতে শুরু করেছেন। হোটেল-রেস্তোরাঁয় এখন একটি ডিমভাজি বিক্রি হচ্ছে গড়ে ২৫ টাকা। আর ডিমের তরকারি প্রতি বাটি ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। বাজারে সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম উচ্চমূল্যে স্থিতিশীল হয়ে আছে। তাতে শুধু গাজীপুরের মতো শ্রমিক-নির্ভর এলাকায় নয়, রাজধানীর নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার কষ্ট আগের চেয়ে আরও বেড়েছে।

গতকাল শনিবার রাজধানীর মালিবাগ, খিলগাঁও ও রামপুরা এলাকা ঘুরে ও একাধিক নিম্ন আয়ের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেও জানা যায়, সংসার চালাতে তাদের হিমশিম অবস্থা। মালিবাগ বাজারের পান বিক্রেতা মো. সোহরাব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘পাঁচজনের পরিবারে আমরা আগে প্রতি শুক্রবার মাংস খেতাম। এখন মাসে দুইবার মাংস খাই। মাছের দামও বাড়তি, তাতে মাছ খাওয়াও কমাতে হয়েছে। আর ডিমের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন শুধু ছোট ছেলের জন্য ডিম কিনি। আগে প্রতিজন একটি করে ডিম খেতাম। দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন একটি ডিম দুজনে ভাগ করে খাই।’

ডিমের বাড়তি দামের কারণে মানুষ যে এখন ডিম খাওয়া কমিয়ে দিচ্ছেন, তা বোঝা যায় ভাতের হোটেলের মালিকদের সঙ্গে কথা বলে। গাজীপুরের কড্ডা এলাকার হোটেল ব্যবসায়ী লিটন মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর হোটেলে আগে প্রতিদিন কমপক্ষে ৫০টি ডিম বিক্রি হতো। কিন্তু দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন দিনে ২০ থেকে ৩০টি ডিম বিক্রি হয়। কারখানার শ্রমিক ও রিকশাচালকেরা বেশি ডিম খেতেন। এখন শাক, ভর্তা আর ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে চলে যান।

ভারতে শুল্ক ৭ টাকা, দেশে বাড়ল ১৫ টাকা

২১ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

পেঁয়াজ রপ্তানিতে ভারত আজ সোমবার শুল্ক আদায় শুরু করেছে। প্রতি কেজিতে গড়ে শুল্ক আদায় করা হচ্ছে সাত টাকা। এ হিসাবে দেশেও প্রতি কেজিতে সাত টাকা বাড়ার কথা আমদানি করা ভারতীয় পেঁয়াজের দাম। তবে শুল্ক আরোপের খবরে গত দুই দিনে বাজারে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ১৫ টাকা।

গত শনিবার ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিতে ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা জানায়। আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পেঁয়াজ রপ্তানির ওপর এই শুল্ক বহাল রাখা হবে বলে ভারত সরকারের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়। এই খবরে আমদানিকারক, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায়। এক দিনের ব্যবধানে খুচরায় ৫৫ টাকার ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়।

দেশের নয়টি স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানির তথ্য পাওয়া গেছে। এসব স্থলবন্দরের তথ্যে দেখা যায়, ভারত থেকে গড়ে প্রতি কেজি ১৬ সেন্টে বা ১৭ টাকায় ঋণপত্র খুলে পেঁয়াজ আমদানি করছেন ব্যবসায়ীরা। এর অর্থ, ভারতের ব্যবসায়ীরা গড়ে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ১৬ সেন্টে রপ্তানি করছেন। আজ সোমবার ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এই রপ্তানিমূল্যের ওপর ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই শুল্ক আদায় করে ভারতীয় অংশ থেকে পণ্য ছাড় শুরু হয়।

আরব আমিরাতে বাংলাদেশীর সংখ্যার সঙ্গে রেমিট্যান্সের সামঞ্জস্য নেই

আগস্ট ২২, ২০২৩, বণিক বার্তা

সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র ১১ শতাংশ স্থানীয়। বাকি ৮৯ শতাংশই বিভিন্ন দেশ থেকে যাওয়া প্রবাসী। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। যদিও দেশটি থেকে পাঠানো রেমিট্যান্সের দিক থেকে বাংলাদেশী শ্রমিকদের অবস্থান ষষ্ঠ। সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পাঠান ভারতীয়রা। দ্বিতীয় স্থানটি পাকিস্তানিদের। সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স পাঠানোর দিক থেকে তৃতীয় ফিলিপাইন, চতুর্থ ইরান ও ও পঞ্চম স্থানে মিসর।

অভিযোগ রয়েছে, আরব আমিরাতে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের বড় একটি অংশই আসছে অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে। মধ্যপ্রাচ্যের সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশটি এখন বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারেরও অন্যতম প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠছে।

আরব আমিরাত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ইউএইতে বসবাসরত ৯০ লাখ বিদেশীর মধ্যে বাংলাদেশীর সংখ্যা সাড়ে ৭ লাখ। দেশটিতে বসবাসরত ১ কোটির কিছু বেশি সংখ্যক লোকের মধ্যে ৭ দশমিক ৪ শতাংশই বাংলাদেশী। কয়েক বছরে এ দেশ থেকে আমিরাতগামীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। শুধু গত দেড় বছরেই প্রায় দেড় লাখ বাংলাদেশী অভিবাসী হয়েছেন আমিরাতে। তবে সে অনুপাতে বাড়েনি রেমিট্যান্স প্রবাহ।

এডিপির সর্বোচ্চ ৩৮% বরাদ্দ পেয়েও ঢাকায় দারিদ্র্যের হার কেন বাড়ছে

আগস্ট ২২, ২০২৩, বণিক বার্তা

দারিদ্র্য বিমোচন ও এসডিজি অর্জনে সরকার গত এক যুগে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। ফলে ১২ বছর আগের তুলনায় দারিদ্র্যের হার প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। একই সময়ে চরম দারিদ্র্য প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে। জাতীয় পর্যায়ে ২০১৬ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ২০২২ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে। অর্থাৎ এ সময়ে কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ। কিন্তু সারা দেশে দারিদ্র্য কমলেও উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে ঢাকায়। এখানে দারিদ্র্য না কমে উল্টো প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে। অথচ প্রতি বছর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) সর্বোচ্চ অর্থ ব্যয় হচ্ছে ঢাকা বিভাগে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ঢাকা একাই পেয়েছিল এডিপির মোট বরাদ্দের ৩৮ শতাংশ অর্থ। দেশের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে জিডিপির বড় জোগানদাতা ঢাকা বিভাগ। বৈদেশিক রেমিট্যান্সেও বড় অবদান এ বিভাগের। এর পরও এখানে দারিদ্র্য বৃদ্ধির কারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে ঘিরে এক ধরনের গোষ্ঠীতান্ত্রিক পৃষ্ঠপোষক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ফলে রাজনৈতিক মধ্যস্বত্বভোগীরা উন্নয়ন বরাদ্দ ও সামাজিক নিরাপত্তার ভাগ নিয়ে গেলেও যাদের পাওয়ার কথা তারা পাচ্ছেন না। আর আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানও তৈরি হয়নি সেভাবে। কারো কারো মতে, বিভিন্ন এলাকা থেকে গরিব মানুষ কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসায় এখানে দারিদ্র্য বেড়েছে। কেউ কেউ করোনার প্রভাবকেও একটি বড় কারণ বলে মনে করছেন। মূল্যস্ফীতির অভিঘাতেরও ভূমিকা থাকতে পারে।

গবেষকরা বলছেন, এখানকার দারিদ্র্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত ভঙ্গুর। তাই সামান্য ধাক্কাতেই মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়। অর্থাৎ গরিব মানুষ দারিদ্র্যসীমার খুব কাছাকাছি অবস্থান করে। জরিপে প্রাপ্ত তথ্যের যথার্থতা নিয়েও প্রশ্ন আছে কারো কারো। যদিও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় উচ্চমানসম্পন্ন ডাটা দেয়া হয়েছে জরিপে।

বিবিএসের খানা আয়-ব্যয় জরিপ-২০২২-এর তথ্যমতে, গত ছয় বছরে জাতীয় পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্য বেড়েছে ঢাকায়। ২০১৬ সালে এ বিভাগে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৬ শতাংশ। ২০২২ সালে এটি প্রায় ২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ৯ শতাংশে। এ সময়ে ঢাকা বিভাগের গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্য বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় আড়াই শতাংশ। ২০১৬ সালের ১৯ দশমিক ২ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে এটি ২১ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। শহরাঞ্চলে এ হার ১২ দশমিক ৫ থেকে বেড়ে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি কমেছে রংপুর বিভাগে। সেখানে ২০১৬ সালের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ দারিদ্র্য ২০২২ সালে এসে ২৪ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

এডিপির অঞ্চলভিত্তিক বরাদ্দ নিয়ে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) কর্তৃক ‘বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দের আঞ্চলিক বিন্যাস’ শীর্ষক একটি গবেষণা করা হয়। এতে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে শুধু ঢাকা বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল মোট এডিপির ৩৭ শতাংশ অর্থ। একই অর্থবছরে বিভাগটিতে এডিপিতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল মোট এডিপির ৩৮ শতাংশ অর্থ। যেখানে সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল মোট এডিপির মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশ অর্থ। এ হিসাবে কম বরাদ্দ পাওয়া অন্য দুই বিভাগ থেকে ঢাকা প্রায় ১৩ গুণ বেশি বরাদ্দ পেয়েছিল। বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের সাধারণ সরকারি সেবা, প্রতিরক্ষা এবং জনশৃঙ্খলা ও সুরক্ষা ছাড়া বাকি ১২টি খাতের চলমান প্রকল্পের বাজেটগুলোর জেলা ও আঞ্চলিক অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে গবেষণাটি করা হয়েছিল। আইপিডির পক্ষ থেকে গবেষণাটি পরিচালনা করেন পরিকল্পনাবিদ রেদওয়ানুর রহমান ও সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান।

বুলেট ট্রেনের খোঁজ নেই, বৃত্তাকার রেলে ‘অপচয়’

২২ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে বুলেট ট্রেন চালুর লক্ষ্য নিয়ে ২০১৮ সালে সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা শুরু করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এ জন্য ব্যয় হয় প্রায় ১০০ কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্পটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

বুলেট ট্রেনের মতো বৈদ্যুতিক ট্রেন, বৃত্তাকার ট্রেনসহ নানা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছে রেলওয়ে। মানুষকে দ্রুতগতির ট্রেনে চলাচলের স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। কিন্তু প্রকল্প আর নেওয়া হয়নি।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ২০টি সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা ও কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের খোঁজ পাওয়া গেছে, যেগুলোর পেছনে ব্যয় হয়েছে ৮৩৯ কোটি টাকা।

কিন্তু সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষাগুলো শেষ করে প্রকল্প নেওয়া হয়নি। যদিও সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষায় সব কটি প্রকল্পই বাস্তবায়নযোগ্য এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক বলে দেখানো হয়েছিল। আর কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বর্তমানে রেলওয়েতে আরও আটটি সম্ভাব্যতা যাচাই ও কারিগরি সহায়তা প্রকল্প চলমান। এসব প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৬৪ কোটি টাকা।

সাধারণত বড় কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের নীতিগত সম্মতি থাকার পরই কেবল সম্ভাব্যতা যাচাই হয়। কিন্তু রেলওয়েতে খেয়ালখুশিমতো সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নামে অর্থ অপচয় করার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এ ধরনের প্রকল্প নিয়ে কমিশন-বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হয়। আবার কর্মকর্তারা বিদেশভ্রমণের সুযোগ পান। কিন্তু রেল লোকসান দিতেই থাকে।

রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন অবশ্য টাকা খরচ করে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে খারাপ কিছু দেখেন না। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থেকে সম্ভাব্যতা যাচাই করে রাখা হচ্ছে। এক প্রকল্প নিয়ে দু-তিনবারও সম্ভাব্যতা যাচাই হয়। অর্থায়ন পাওয়ার জন্য এটা মেনে নিতে হবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর রেল কেন অর্থায়ন পায় না? যেখানে অর্থায়নের অনিশ্চয়তা থাকে, সেই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই কেন হয়? আর বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলে নতুন করে সমীক্ষা করে প্রকল্প নিতে হয়।

বুলেট ট্রেন বাদ, এখন বৈদ্যুতিক ট্রেন

বুলেট ট্রেনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের খবরটি রেলওয়ে থেকেই দেওয়া হয়েছিল। তা ফলাও করে গণমাধ্যমে প্রকাশিতও হয়েছিল। এ কাজে পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল চীনের চায়না রেলওয়ে ডিজাইন করপোরেশন ও বাংলাদেশের মজুমদার এন্টারপ্রাইজকে। ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রায় ১০০ কোটি টাকা খরচ করে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নকশা প্রণয়নসহ অন্যান্য প্রতিবেদন জমা দেয়। তারা জানায়, বুলেট ট্রেন প্রকল্প বাস্তবায়নে ৯৬ হাজার কোটি টাকা লাগবে।

বুলেট ট্রেনের জন্য উড়ালপথে রেললাইন স্থাপনের পরামর্শ দেয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। সমীক্ষা অনুসারে, ঢাকা-চট্টগ্রামের প্রস্তাবিত পথে বুলেট ট্রেনে নিরবচ্ছিন্নভাবে যেতে সময় লাগার কথা ৫৫ মিনিট।

বুলেট ট্রেনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মধ্যেই চীনসহ বিভিন্ন দেশের কাছে অর্থায়নের অনুরোধ জানানো হয়। চায়না রেলওয়ে গ্রুপ ও চায়না রেলওয়ে ডিজাইন জিটুজি (সরকারের সঙ্গে সরকারের চুক্তি) পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগ্রহ দেখায়। তবে তা আর এগোয়নি।

এবার বৈদ্যুতিক ট্রেনের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে রেলওয়ে। নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এবং গাজীপুরের টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু করার লক্ষ্য নিয়ে গত জুলাইয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সমীক্ষা শুরু হয়েছে। দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তুরস্কের তুমাস তার্কিশ ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালটিং অ্যান্ড কন্ট্রাক্টিং নামে প্রতিষ্ঠানকে। রেলওয়ে সূত্র জানায়, বৈদ্যুতিক ট্রেনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

বৃত্তাকার রেলপথ ও পায়রায় ট্রেন

ঢাকার কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) বৃত্তাকার রেলপথ ও পাতালরেলের (সাবওয়ে) কোনো সুপারিশ নেই। অথচ ঢাকার চারদিকে বৃত্তাকার রেলপথ নির্মাণে ২০১৮ সালে সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্প নেয় রেলওয়ে। নিয়োগ করা হয় চায়না রেলওয়ে সিচুয়ান সার্ভে অ্যান্ড ডিজাইন গ্রুপ কোম্পানি এবং বাংলাদেশের বেটস কনসালটিং সার্ভিসেস লিমিটেড ও ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড অ্যাডভাইজারস লিমিটেডকে। ২৫ কোটি টাকা খরচ করে তিন বছর সমীক্ষা চালায় তারা।

সমীক্ষা শেষে পরামর্শকেরা জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৭১ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পে অর্থায়ন পাওয়া যায়নি। তাই প্রকল্প হয়নি।

একই সময় সরকারের সেতু বিভাগ ঢাকার ভেতরে ও চারপাশে চারটি সাবওয়ে নির্মাণে ২০১৮ সালে স্পেনের টিপসাসহ কয়েকটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জোট বা কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তি করে। এতে খরচ হয় ৩২২ কোটি টাকা। এর বাইরে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড ঢাকায় ২০৩০ সালের মধ্যে ছয়টি মেট্রোরেল লাইন নির্মাণে কাজ করছে। এই ছয়টি লাইনের কিছু অংশ উড়ালপথে এবং কিছু পাতালপথে যাবে।

রেলের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, বৃত্তাকার, সাবওয়ে ও মেট্রোরেল প্রায় একই ধরনের গণপরিবহন। তিনটি একসঙ্গে ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে নির্মাণ করা প্রায় অসম্ভব। এত বিপুল বিনিয়োগ করাও কঠিন। ফলে সাবওয়ে ও বৃত্তাকার রেল প্রকল্পে রেলওয়ে ও সেতু বিভাগের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্পগুলো অপচয় ছাড়া আর কিছুই হয়নি।

ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে বরিশাল হয়ে পটুয়াখালীর পায়রা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ২০১৬ সালে প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০১৮ সালে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের পর ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে গত বছরের জুনে নকশা প্রণয়নসহ প্রকল্পটি তৈরি করেছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা।

রেললাইনটি নির্মাণে ২০১৬ সালেই ডিপি রেল নামে যুক্তরাজ্যের একটি ‘ভুঁইফোড়’ কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছিল রেলওয়ে। এরপর আর বিষয়টি এগোয়নি। চীন, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের অর্থায়ন পেতে চেষ্টাও চালিয়েছিল সরকার। কিন্তু পাওয়া যায়নি।

নারায়ণগঞ্জ-জয়দেবপুর পর্যন্ত রেলপথে ওভারপাস/আন্ডারপাস নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য ৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে (২০১৯ সালে শেষ)। এর মধ্যে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর ঢাকায় দুটি ওভারপাস নির্মাণ করেছে। কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষ চার বছরে কিছুই করেনি।

আরও সম্ভাব্যতা যাচাই

চট্টগ্রামের জালানীহাট থেকে কাপ্তাই পর্যন্ত মিশ্র গেজ রেললাইন নির্মাণের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১৭ সালে। দুই বছরে প্রায় সাড়ে ৯ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এরপর রেলপথ নির্মাণে আর কোনো উদ্যোগ নেই।

জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ-জামালপুর পথে বিদ্যমান রেলপথের সমান্তরাল আরেকটি ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করার লক্ষ্যে প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১৫ সালের দিকে। ব্যয় হয় সাড়ে আট কোটি টাকা। এরপর চীনের সঙ্গে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে দর-কষাকষিও হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চীন সরে দাঁড়ায়। কেউ আর বিনিয়োগ করেনি।

জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চলে রেল সংযোগের সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিশদ নকশা তৈরিতে ২০১৭ সালে প্রকল্প নেওয়া হয়। দুই বছরে ব্যয় হয় পৌনে পাঁচ কোটি টাকা। একই সময়ে মিরসরাই-ফেনী অর্থনৈতিক অঞ্চলে রেললাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই ও পূর্ণাঙ্গ নকশা প্রণয়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এতেও পৌনে পাঁচ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু মূল নির্মাণকাজের আর কোনো খবর নেই।

নারায়ণগঞ্জ-জয়দেবপুর পর্যন্ত রেলপথে ওভারপাস/আন্ডারপাস নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য ৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে (২০১৯ সালে শেষ)। এর মধ্যে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর ঢাকায় দুটি ওভারপাস নির্মাণ করেছে। কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষ চার বছরে কিছুই করেনি।

কিন্তু অনেক সময় যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই প্রকল্প নিয়ে বাস্তবায়ন করে রেলওয়ে। রেলের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ডেমু ট্রেন কিনতে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। খরচ হয়েছে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। পরে দেখা গেছে, ট্রেনগুলো অকালে অকেজো হয়ে গেছে।

কারিগরি সহায়তা প্রকল্প

রেলে এখন সবচেয়ে বেশি অর্থায়ন করছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাপানের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকা, চীন ও ভারত। রেলওয়ে সূত্র বলছে, এডিবি ও জাইকা প্রায়ই কারিগরি সহায়তা প্রকল্প বাস্তবায়নের শর্ত দিয়ে থাকে।

যদিও কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের সুফল নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ ধরনের প্রকল্পের মধ্যে মূল প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বৃদ্ধির মতো বিষয় থাকে। থাকে রেলের সংস্কার প্রকল্প। কিছু প্রকল্পে রেলে কিছু নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। আর কিছু বড় বই তৈরি এবং কিছু কর্মকর্তার বিদেশভ্রমণ ছাড়া তেমন কিছুই হয়নি।

যেমন বাংলাদেশ রেলওয়ে সংস্কার প্রকল্প শুরু হয় ২০০৬ সালে। অস্ট্রেলিয়ার স্ম্যাক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রকল্পটি টেনে নেয় ২০১৯ সাল পর্যন্ত। এর আওতায় পরামর্শকদের বেতন, ভাতা ও গাড়ি, মোটা মোটা বই তৈরিতে ব্যয় হয়েছে ১৩১ কোটি টাকা।

‘চাপ থাকে’

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, রেলের শীর্ষ কর্মকর্তারা অবসরের পর পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরি নেন। চাকরিতে থাকা অবস্থায় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া এবং পরে সেখানে চাকরিতে যোগ দিয়ে ‘তদবিরের’ অভিযোগ রয়েছে।

২০১২ সাল থেকে প্রায় তিন বছর রেলের মহাপরিচালক ছিলেন মো. আবু তাহের। অবসরে গিয়ে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়া কতটা নৈতিক, জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অবসরের পর কারও চাকরি করার সামর্থ্য থাকলে তা করা তো অন্যায় হওয়ার কথা নয়।

কেন বারবার সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্প নেওয়া হয়, কিন্তু প্রকল্প হয় না, জানতে চাইলে আবু তাহের বলেন, সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্প বেশির ভাগ ওপর মহল থেকে আসে। কিন্তু অর্থায়নের সংকটে অনেক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয় না।

বিপুল বিনিয়োগ, লোকসানে রেল

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর রেলের উন্নয়নে প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু এ সময়ে রেলের সেবার পরিসর সংকুচিত হয়েছে। ট্রেন চলছে আগের চেয়ে কম। রেলের লোকসানের বোঝাও ভারী। ২০২০-২১ অর্থবছরে রেল লোকসান দিয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর: ই-গেট রইল শুধু শোভা হয়ে

২৩ আগস্ট ২০২৩, আজকের পত্রিকা

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনের ই-গেটের (ইলেকট্রনিক গেট) স্ক্রিনে নীল আলো জ্বলছে। পাশেই বড় পর্দায় প্রচার করা হচ্ছে, এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেলে দ্রুতই ইমিগ্রেশন সম্পন্ন হবে। তা দেখে দুবাইফেরত আশিকুর ইসলাম পাশে থাকা লম্বা সারি ছেড়ে নিজের পাসপোর্ট ব্যবহারের চেষ্টা করেন। কিন্তু ই-গেটে মেশিন তাঁর পাসপোর্ট পড়তে পারে না। আবার গিয়ে পাশের কাউন্টারেই দাঁড়ান তিনি। দীর্ঘ সারিতে ঘণ্টাখানেক থেকে ইমিগ্রেশন শেষ করে বেরিয়ে আসেন। যদিও ই-পাসপোর্টধারী এই যাত্রীর ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১৮ সেকেন্ডে শেষ হওয়া কথা ছিল।

আশিকুর ইসলাম গত রোববার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘শুনেছি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বপ্রথম আমরা ই-গেট সুবিধা পেয়েছি। স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব কাজ করে। কিন্তু যাওয়া-আসার সময় একবারও এই সুবিধা পেলাম না। সেই লাইনেই দাঁড়াতে হলো আমাকে। তাহলে এত টাকা খরচ আর প্রচারের কী দরকার ছিল?’

আশিকুর ইসলামের এই প্রশ্নের জবাব সংশ্লিষ্ট অনেকের কাছে জানার চেষ্টা করলেও কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি। কারিগরি ত্রুটির অজুহাতে প্রসঙ্গ এড়িয়ে দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।

ই-গেট সেবার অবস্থা জানতে চাইলে বিমানবন্দর ইমিগ্রেশনের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহরিয়ার কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

জানা যায়, কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছাড়াই বছর দেড়েক আগে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ই-পাসপোর্টধারীদের জন্য ২৭টি ই-গেট সেবা চালু করা হয়। তারও আগে ১১ মাস পরীক্ষামূলকভাবে তা ব্যবহার করতে দেওয়া হয়। শুরুতে কয়েক দিন ঠিকমতো চললেও হঠাৎ জটিলতা দেখা দেওয়ায় গেটগুলো এখন অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে।

সস্তা আমিষও এখন নাগালের ‘বাইরে’

২৪ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

বাজারে যে মাছগুলো বছরের পর বছর ‘সস্তা’ বলে পরিচিতি ছিল, তা এখন দামি হয়ে উঠেছে। যেমন পাঙাশ। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের (ডিএএম) হিসাবে, ২০১৩ সালে সারা দেশ মিলিয়ে ছোট পাঙাশের প্রতি কেজির গড় দাম ছিল ১১৪ টাকা। ২০২১ সালে এই দর ছিল ১১১ টাকা। এখন ঢাকার বাজারে ছোট পাঙাশ বিক্রি হয় প্রতি কেজি ২০০ থেকে ২২০ টাকা দরে। একটু বড় হলে দাম ২৫০ টাকার আশপাশে ওঠে।

পাঙাশের মতো তেলাপিয়া, চাষের কই, রুই, কাতলা ইত্যাদি চাষের মাছের দাম অনেকটাই বেড়ে গেছে। এসব মাছ স্বল্প আয়ের মানুষের প্রাণিজ আমিষের বড় উৎস।

মাছের বিকল্প হিসেবে নিম্ন আয়ের মানুষ ডিম বা ব্রয়লার মুরগি থেকে পুষ্টি নেবে, সে উপায়ও নেই বললেই চলে। কারণ, মাছের মতোই বেড়েছে ডিম ও ব্রয়লার মুরগির দাম। আর গরু ও খাসির মাংসের দাম তো বছর বছর বাড়ছে। বেড়েছে দুধের দামও।

বাড়িতে ফোন করলে এখন আর জানতে চাই না কী রান্না হয়েছে। কারণ, বেশির ভাগ দিনই তাঁদের নিরামিষ খেতে হয়।

টালি খাতা বিক্রেতা ফারুক আহমেদ

চাল, ডাল, তেল, চিনি ও আটার দাম অনেক দিন ধরেই চড়া। নতুন করে আলোচনায় পেঁয়াজ। গত শনিবার ভারত রপ্তানিতে ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পর দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়ে দেশি পেঁয়াজ প্রতি কেজি ৮৫ থেকে ৯৫ টাকা এবং ভারতীয় পেঁয়াজ ৭০ থেকে ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

সিলেটের বাজারে ‘বুঙ্গার চিনি’

২৪ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

ভারত থেকে চোরাই পথে আসা চিনিতে সয়লাব সিলেটের বাজার। সিলেটের পাইকারি বাজার কালীঘাটেই দৈনিক এক থেকে দেড় কোটি টাকার চোরাই চিনি কেনাবেচা হয় বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

এরপর দেশীয় নানা ব্র্যান্ডের স্টিকারযুক্ত বস্তায় ভরে এসব চিনি পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন এলাকায়। চোরাচালানে আসা এসব চিনি স্থানীয়ভাবে ‘বুঙ্গার চিনি’ নামে পরিচিত।

সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, জেলার জৈন্তাপুর, জকিগঞ্জ, কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ এবং বিয়ানীবাজার উপজেলার সীমান্তবর্তী শতাধিক স্থান দিয়ে চোরাই পণ্য সিলেটে প্রবেশ করে। সীমান্ত এলাকার অন্তত এক হাজার চোরাকারবারি এই কাজে জড়িত। প্রায়ই চোরাই চিনি আটকের খবর পাওয়া গেলেও পাচারের পরিমাণের তুলনায় তা খুবই কম বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সম্প্রতি চোরাচালানের চিনি পাইকারি বাজারে পৌঁছে দিতে ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মী সহায়তা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে কথা বলায় হামলার শিকার হয়ে এক আইনজীবী আদালতে মামলাও করেছেন। সীমান্ত এলাকার স্থানীয় মানুষদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যও চোরাচালান চক্রের সঙ্গে যুক্ত। তাদের নিষ্ক্রিয়তা ছাড়া চোরাচালানের চিনি নগরের কালীঘাট বাজার পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব নয়।

জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জুলাই থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত জেলার ছয়টি উপজেলা থেকে ১ হাজার ৪৩১ বস্তা ভারতীয় চিনি উদ্ধার করা হয়েছে। এসব বস্তায় ৭১ হাজার ৪৯ কেজি চিনি ছিল। এসব ঘটনায় ২৩টি মামলা হয় এবং পুলিশ ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করে।

বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, বিজিবি সিলেট সেক্টরের আওতাধীন সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার তিনটি ব্যাটালিয়নের সীমান্ত এলাকায় গত ১ জুলাই থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত মোট ২ লাখ ৯ হাজার ২৫২ কেজি ভারতীয় চিনি জব্দ করা হয়েছে, যার মূল্য ২ কোটি ৮৮ লাখ ৪০ হাজার ৪৩৫ টাকা।

অর্থমন্ত্রী অনিয়মিত, দেখা দেন না গভর্নর, অর্থসচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান

২৪ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

অর্থনীতির সংকট কাটছে না। ডলারের দর এখনো অনেক বেশি। সরকারের হিসাবেই মূল্যস্ফীতি কমেছে অতি সামান্য, বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের পতনও ঠেকানো যাচ্ছে না।

অথচ বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট আগের তুলনায় অনেকটা কমেছে। অনেক দেশ মূল্যস্ফীতি কমাতে সফল হচ্ছে। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব, নীতির সমন্বয়হীনতা, মনিটরিংয়ের অভাব, আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় না থাকা, অতিমাত্রায় আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা এবং জবাবদিহির অভাবের কারণেই বাংলাদেশ সংকট থেকে বের হতে পারছে না। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপে দিশাহারা মানুষ ও একটি দুর্বল অর্থনীতির ভিত্তি নিয়েই বাংলাদেশ নতুন আরেকটি নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে।

বিশ্ব অর্থনীতির এ রকম এক সংকটের সময় সারা বিশ্বেই অর্থনীতিসংক্রান্ত নীতিনির্ধারকেরা আছেন চালকের আসনে। অথচ বাংলাদেশে অর্থনীতি বিষয়ের নীতিনির্ধারকদের দেখাই পাচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অর্থমন্ত্রী নিয়মিত কার্যালয়ে আসেন না। অর্থসচিব কারও সঙ্গে কথা বলেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গেও দেখা পাওয়া দুষ্কর। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান কোনো অনুষ্ঠানেই যান না। এসব নীতিনির্ধারকের সঙ্গে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা, গবেষক বা অর্থনীতিবিদ—কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। তাঁরা কারও পরামর্শও নেন না। এতেই দেখা দিয়েছে নানা ধরনের সমন্বয়হীনতা। এর ফল ভোগ করছে দেশের সাধারণ মানুষ।

সরকারি চাকরির আবেদনে দিতে হবে ভ্যাট

আগস্ট ২৫, ২০২৩, বণিক বার্তা

সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরির অনলাইন আবেদনের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের কাছ থেকে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আদায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আবেদন ফির ওপর টেলিটক কর্তৃক আদায়কৃত ১০ শতাংশ কমিশনের ওপর এ কর আদায় করা হবে। এর ফলে চাকরিপ্রার্থীদের আবেদন ব্যয় কিছুটা বাড়বে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সম্প্রতি চাকরির আবেদন ফি পুনঃনির্ধারণ করে এ নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। প্রজ্ঞাপনে প্রথমবারের মতো প্রার্থীদের কাছ থেকে এ ধরনের কর আদায়ের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। নতুন এই প্রজ্ঞাপন জারির ফলে একই বিষয়ে গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর জারি করা প্রজ্ঞাপনটি বাতিল হলো।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, টেলিটকের মাধ্যমে অনলাইনে সরকারি চাকরির পরীক্ষা ফি বাবদ নেওয়া অর্থের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ কমিশন হিসেবে টেলিটককে দিতে হবে, আর ভ্যাট হিসেবে আদায় করা হবে কমিশনের ১৫ শতাংশ। আগে আবেদন ফির ওপর ১০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার বিধান থাকলেও এই কমিশনের ওপর কোনো ভ্যাট আদায় করা হতো না।

সংশোধিত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, টেলিটকের মাধ্যমে আবেদন ফি ২০০ টাকা প্রদেয় হলে, চাকরিপ্রার্থীকে ১০ শতাংশ কমিশন হিসাবে অতিরিক্ত ২০ টাকা এবং কমিশনের ১৫ শতাংশ ভ্যাট হিসেবে আরও ৩ টাকা দিতে হবে। অর্থাৎ প্রার্থীকে মোট ফি দিতে হবে ২২৩ টাকা।

অর্থনৈতিক অঞ্চলে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৪৫ লাখ ডলার

আগস্ট ২৬, ২০২৩, বণিক বার্তা

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) প্রতিষ্ঠা হয় ২০১১ সালের নভেম্বরে। সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করতে সংস্থাটির সময় লেগে যায় আরো চার বছর। এর পরের আট বছরে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারেনি বেজার অধীন অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় সরাসরি বা প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে মাত্র ৪৫ লাখ ডলার (সর্বশেষ বিনিময় হার অনুযায়ী ৪৯ কোটি টাকার কিছু বেশি)।

দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে পরিকল্পিত ও বিশেষায়িত শিল্প অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল সরকার। বেজাকে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল এসব অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়ন, ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনার ভিত্তিতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্দেশ্য থেকে। এজন্য ২০১০ সালে একটি আইন প্রণয়ন হয়। আর এ আইনের ভিত্তিতে পরের বছরের নভেম্বরে যাত্রা করে বেজা। শুরু থেকেই নানা বাধাবিপত্তির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে সংস্থাটিকে। সীমিতসংখ্যক কর্মীবাহিনী নিয়ে সংস্থাটির সক্রিয়ভাবে কার্যক্রম শুরু করতে সময় লেগে যায় ২০১৫ সাল। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় দেশী বিনিয়োগকারীরা সাড়া দিলেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন না বিদেশী বিনিয়োগকারীরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় বিদেশী বিনিয়োগ প্রবাহের হিসাব পাওয়া যাচ্ছে মূলত ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে। ওই অর্থবছরে অর্থনৈতিক অঞ্চলে নিট এফডিআই প্রবাহ এসেছে সাড়ে ৩ লাখ ডলার। এরপর গত অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে নিট এফডিআই প্রবাহ আসে ২১ লাখ ২০ হাজার ডলার। এর পরের প্রান্তিক জানুয়ারি-মার্চে এসেছে ২০ লাখ ৩০ হাজার ডলার। সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় নিট এফডিআই প্রবাহ এসেছে ৪৫ লাখ ডলার।

অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিদেশী বিনিয়োগ না আসার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে ইউটিলিটি সেবা নিশ্চিত করতে না পারাকে দায়ী করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে বেজার বক্তব্য হলো অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় ইউটিলিটি সেবা নিশ্চিতে বেশকিছু প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, যা সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন পেলেই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক অঞ্চলের ইউটিলিটি সেবা নিশ্চিত করা যাবে।

পরিকল্পিত শিল্পায়নের মাধ্যমে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের প্রবাহ, কর্মসংস্থান ও শিল্পোৎপাদন বৃদ্ধির তাগিদ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। বেজার তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত এর মধ্যে ৯৭টির অনুমোদন হয়েছে। অনুমোদিত অঞ্চলগুলোর মধ্যে ৬৮টি সরকারি ও ২৯টি বেসরকারি। এর মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হয়ে এখন পর্যন্ত উৎপাদনে যেতে পেরেছে ১১টি অর্থনৈতিক অঞ্চল। নির্মাণাধীন রয়েছে ২৯টি। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় এ মুহূর্তে উৎপাদনরত কারখানা আছে ৪২টি। এসব কারখানায় কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার মানুষের। এছাড়া নির্মীয়মাণ শিল্প-কারখানার সংখ্যা ৫০টি। এখন পর্যন্ত বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় মোট বিনিয়োগ হয়েছে সাড়ে ৪ বিলিয়ন (৪৫০ কোটি) ডলার। এর ৯৯ শতাংশের বেশিই দেশী বিনিয়োগ। এছাড়া সরকারি পাঁচটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ২৩ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন (২ হাজার ৩৯৭ কোটি) ডলার। সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় দেশী-বিদেশী মোট প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ২৮ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন (২ হাজার ৮৪৭ কোটি) ডলার।

ভারত চিনি রপ্তানি বন্ধ করলে কী প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে

২৬ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

আগামী অক্টোবরে শুরু হওয়া নতুন মৌসুমে ভারত চিনি রপ্তানি বন্ধের পরিকল্পনা করছে। বৃষ্টির অভাবে আখের ফলন কমে যাওয়ায় দেশটি এ রকম পরিকল্পনা করছে বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ভারত তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে চিনি আমদানিতে বাংলাদেশের খরচ বেড়ে যাবে। তবে এ নিয়ে দেশের আমদানিকারকদের কেউ কেউ অবশ্য উদ্বিগ্ন নন। তাঁরা বলছেন, ভারতের চিনি রপ্তানি বন্ধের খবরটি উদ্বেগের, তাতে খুব দুশ্চিন্তার কিছু নেই। কারণ, অন্য দেশের চিনি পাওয়া যাবে। সরকার ঋণপত্র (এলসি) খোলায় সুবিধা ও শুল্কহারে ছাড় দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির প্রভাব কমবে।

বাংলাদেশে চিনির বাজার এখন মূলত পাঁচটি পরিশোধন কারখানার হাতে। ওই পাঁচ কারখানা হলো মেঘনা সুগার রিফাইনারি, সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রি, এস আলম রিফাইন্ড সুগার রিফাইনারি, আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি ও দেশবন্ধু সুগার রিফাইনারি। এসব কারখানা অপরিশোধিত চিনি এনে পরিশোধনের মাধ্যমে বাজারজাত করে থাকে। এর বাইরে খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো পরিশোধিত চিনি এনে বাজারজাত করে। এর পরিমাণ অবশ্য মোট আমদানির ১০ শতাংশের কম।

চিনি পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন সুগার রিফাইনারি অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব গোলাম রহমান বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, ভারত রপ্তানি বন্ধ করলে বিশ্ববাজারে চিনির দাম বাড়তে পারে। তাতে দেশে আমদানি ও সরবরাহ নিয়ে খুব সমস্যা হবে না। কারণ, অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করা যাবে। তবে এ জন্য চিনি আমদানির ঋণপত্র খুলতে যাতে কোনো সমস্যা না হয়, তা এখনই নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ মূলত ব্রাজিল থেকেই অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে আসছে। করোনার আগের বছরগুলোয় মোট অপরিশোধিত চিনি আমদানির ৪–১৩ শতাংশ আনা হতো ভারত থেকে। এর বাইরে থাইল্যান্ড থেকেও মাঝেমধ্যে চিনি আমদানি করা হতো। তবে করোনার সময় বিশ্বব্যাপী জাহাজভাড়া বেড়ে গেলে ভারত থেকে আমদানি বাড়তে থাকে। কারণ, ভারত থেকে আমদানির ক্ষেত্রে পরিবহনভাড়া কম পড়ে। যেমন ২০২১–২২ অর্থবছরে অপরিশোধিত চিনির ৪৪ শতাংশ ভারত থেকে আমদানি হয়েছে। গত অর্থবছরও মোট আমদানির ৩৯ শতাংশ হয়েছে ভারত থেকে।

আমদানিকারকেরা জানান, ভারত থেকে পণ্য আমদানিতে খরচ কম পড়ে। আবার দ্রুততম সময়ে আমদানি করা যায়। ভারত রপ্তানি বন্ধ করার অর্থ হলো ব্রাজিল বা অন্য দেশ থেকে আমদানিতে পণ্য পরিবহনভাড়া বাবদ বাড়তি টাকা পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ ভারতের রপ্তানি বন্ধের প্রভাব পড়বে পণ্য আমদানির খরচে।

গত বছরের জুলাই–আগস্ট থেকে দেশের বাজারে চিনি নিয়ে অস্থিরতা দেখা দেয়। কখনো গ্যাস–বিদ্যুৎ সমস্যায় উৎপাদন ব্যাহত হয়ে বাজার অস্থিতিশীল হয়েছে। আবার কখনো বিশ্ববাজারে দাম বাড়ায় ও দেশে ডলারের বিনিময়মূল্য বেড়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। শুধু ডলারের বিনিময়মূল্য বাড়ায় এক বছরের ব্যবধানে চিনি আমদানিতে খরচ ২৭ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে আবার গত অর্থবছরে ঋণপত্র (এলসি) সংকটে চিনি আমদানি কমে যাওয়ায় সরবরাহেও সমস্যা দেখা দেয়। এভাবে এক সংকট কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আরেক সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে।

৭০% মানুষ মনে করে দেশের অর্থনীতি ভুল পথে চলছে

আগস্ট ৩০, ২০২৩, বণিক বার্তা

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভুল পথে চলছে বলে মনে করে প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ। অন্যদিকে ৮৪ শতাংশ মানুষের ধারণা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি তাদের জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। আর ৪৪ শতাংশ মনে করছে, বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি। দেশের মানুষের এ মতামত উঠে এসেছে দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক জরিপে। এশিয়া ফাউন্ডেশন গতকাল তাদের ওয়েবসাইটে জরিপ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে।

‘দ্য স্টেট অব বাংলাদেশ’স পলিটিক্যাল, গভর্ন্যান্স, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সোসাইটি: অ্যাকর্ডিং টু ইটস সিটিজেনস’ বা বাংলাদেশের রাজনৈতিক, শাসন, উন্নয়ন ও সামাজিক পরিস্থিতি: নাগরিকদের মত শীর্ষক জরিপটিতে ৬৪ জেলার মোট ১০ হাজার ২৪০ নাগরিকের মতামত নেয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলা থেকে সমানসংখ্যক নারী-পুরুষ এ জরিপে অংশ নেয়। এর মধ্যে গ্রামের বাসিন্দা ৬৪ ও শহরের ৩৬ শতাংশ। ২০১১ সালের আদমশুমারির ভিত্তিতে পরিচালিত গবেষণাটি চলে ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। উত্তরদাতাদের কাছে মূলত রাজনীতি ও জনপ্রতিনিধিদের বিষয়ে নাগরিকদের উপলব্ধি, সমাজ ও অর্থনীতির গতিশীলতা, গণতন্ত্র ও নির্বাচন, নাগরিকত্ব, নারীর ক্ষমতায়ন, ডিজিটাল বাংলাদেশ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নীতির প্রভাব এবং সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল।

২০১৭ ও ২০১৯ সালেও একই ধরনের গবেষণা করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বর্তমান তথ্যের পাশাপাশি আগের তথ্যচিত্রও তুলে ধরা হয়। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ কোন পথে রয়েছে—এমন প্রশ্নে ৬৯ দশমিক ৭ শতাংশ উত্তরদাতা জানায়, অর্থনৈতিকভাবে দেশ ভুল পথে আছে। তবে সঠিক পথে রয়েছে বলে জানিয়েছে ২৫ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা। যদিও ২০১৯ সালে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ নাগরিক মনে করত, বাংলাদেশ ঠিক পথে রয়েছে আর ২৮ শতাংশ মানুষ মনে করত ভুল পথে রয়েছে দেশ। মূলত স্বল্প আয়ের লোকজনের মতামতেই এ তথ্য বেশি উঠে এসেছে।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও আস্থার সংকট ফুটে উঠেছে এশিয়া ফাউন্ডেশন ও বিআইজিডির গবেষণা প্রতিবেদনটিতে। ২০১৯ সালে ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ লোক মনে করত, রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ সঠিক পথে রয়েছে। তবে ২০২২ সালে সে ধারণার হার কমে দাঁড়িয়েছে ৩৯ দশমিক ১ শতাংশে। আগের জরিপে ভুল পথে আছে মনে করত ৩০ শতাংশ মানুষ। নতুন জরিপে সেটিও বেড়ে হয়েছে ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

সামাজিক ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া আসেনি উত্তরদাতাদের পক্ষ থেকে। ২০১৯ সালের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশ এক্ষেত্রে সঠিক পথে ছিল বলে মনে করত ৭৭ শতাংশ মানুষ এবং ২১ দশমিক ৯ শতাংশ মনে করত ভুল পথে এগোচ্ছে দেশ। তবে ২০২২ সালে সঠিক পথে আছে বলে মনে করে ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা। সেক্ষেত্রে সাড়ে ১৯ শতাংশেরই আস্থা কমেছে। এখন ভুল পথে রয়েছে বলে মনে করে ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যা আগের চেয়ে প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি।

চীনা ঋণের জাহাজের দাম বাড়ছে ৫০%

২৭ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

চীন থেকে নতুন ঋণ নিচ্ছে বাংলাদেশ। এই ঋণের অর্থে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জন্য চারটি সমুদ্রগামী জাহাজ কেনা হবে। প্রাথমিক পরিকল্পনায় ছয়টি জাহাজ কেনার কথা ছিল। কিন্তু ডলার এবং জাহাজ নির্মাণের সরঞ্জামের দাম বেড়ে যাওয়ায় নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তাই এখন সেই দামে মিলবে চারটি জাহাজ। আড়াই বছরের দর-কষাকষির পর চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে জাহাজের দাম বেড়েছে ৫০ শতাংশ।

এসব জাহাজ কেনার জন্য সাড়ে ২৩ কোটি ডলারের সরবরাহকারী ঋণ দিচ্ছে চীন। সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে এই বাণিজ্যিক ঋণচুক্তি হতে পারে। বাণিজ্যিক ঋণচুক্তির পরপরই চীনা কোম্পানি চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন বা সিএমসিকে জাহাজ নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হবে। এই কোম্পানি দর-কষাকষির পর্যায়ে জাহাজের নকশা, পরিমাপসহ যাবতীয় বিষয় ঠিক করেছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে ডলার–সংকটের এই সময়ে সরকারিভাবে জাহাজ কেনার উদ্যোগ থেকে সরে আসার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা।

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ছয়টি জাহাজ কিনতে হলে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন এবং এর জন্য নতুন করে আলোচনা চালাতে হতো। বাকি দুটি জাহাজ আলাদা প্রকল্পের মাধ্যমে চীনা ঋণে কেনা হবে।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে চীনের সঙ্গে এই ঋণ নিয়ে আলোচনা শুরু করে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন। তখন ৮০ হাজার ডিডব্লিউটি সক্ষমতার তিনটি মাদার বাল্ক জাহাজ ও ১ লাখ ১৪ হাজার ডিডব্লিউটি সক্ষমতার তিনটি ক্রুড অয়েল মাদার ট্যাংকার কেনার কথা ছিল। পরে আড়াই বছর ধরে এ নিয়ে দর-কষাকষি চলে। কিন্তু এর মধ্য ডলারের দাম বেড়েছে, জাহাজ নির্মাণের লোহাসহ সব জিনিসের দাম বেড়েছে—এসব কারণ দেখিয়ে চীনা কর্তৃপক্ষ ছয়টি জাহাজ দিতে পারবে না বলে জানায়। বাংলাদেশ তাতেই রাজি হয়। এখন সেভাবেই বাণিজ্যিক চুক্তি হবে।

ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা কারণে গত দেড় বছরে ডলারের দাম প্রায় ২৫ শতাংশের মতো বেড়েছে। এই সময়ে প্রতি ডলারের দাম ৮৬ টাকা থেকে বেড়ে ১০৯ টাকা হয়েছে। এ ছাড়া বিশ্ববাজারে স্ক্র্যাপসহ বিভিন্ন ধরনের ইস্পাতের দাম দ্বিগুণ হয়েছে।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরবরাহকারী ঋণে ঋণদাতারা প্রথমে বেশি পণ্যের কথা বলে, পরে দর-কষাকষির চূড়ান্ত পর্যায়ে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে পণ্যের সংখ্যা কমিয়ে দেয়। এটি পুরোনো কৌশল। দর-কষাকষির নানা পর্যায়ে এ দেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের “সন্তুষ্ট” করার অভিযোগও আছে। এ ছাড়া ডলার–সংকটের এ সময়ে বিদেশি মুদ্রায় জাহাজ কেনার প্রয়োজন নেই। দিলে ছয়টি জাহাজ, না হয় চুক্তি বাতিল করা উচিত।’

প্রকল্পে যা আছে

চীনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রায় আড়াই বছর দর-কষাকষির পর গত ২৮ ডিসেম্বর প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। গত এপ্রিল মাসে ২ হাজার ৬২০ কোটি টাকার প্রকল্প পাস হয়। এর মধ্যে চীন সরকারের ঋণ ২ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা। ১৬৭ কোটি ৬৫ লাখ আরএমবির সমপরিমাণ চীনা মুদ্রায় ঋণ দেওয়া হবে। চীন সরকার তাদের এক্সিম ব্যাংক থেকে এই তহবিল নিয়ে বাংলাদেশকে দেবে। জানা গেছে, এই ঋণ পরিশোধের সময় ১৫ বছর। এর মধ্যে চার বছর গ্রেস পিরিয়ড। সব মিলিয়ে সুদের হার ২ দশমিক ২ শতাংশ।

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, আগে ছয়টি জাহাজ কেনার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ডলারের পাশাপাশি জাহাজ বানানোর জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় চারটি জাহাজ দেবে চীনা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান।

মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন আরও বলেন, ‘দর-কষাকষির শুরুতে যে পরিমাণ ঋণ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলাম, তা বাড়াতে হলে আবার নতুন করে আলোচনা করতে হতো। তাই ঋণের অঙ্ক অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বাকি দুটি জাহাজ আলাদা আরেকটি প্রকল্পের মাধ্যমে চীনা ঋণে কেনা হবে।’

জাহাজের দাম বেড়েছে ৫০%

প্রকল্পের কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, বর্তমানে একটি মাদার বাল্ক জাহাজের দাম পড়ছে বাংলাদেশি মুদ্রায় ৭৮০ কোটি টাকা। প্রথম যখন দর-কষাকষি শুরু হয়েছিল, তখন একই জাহাজের দাম ধরা হয়েছিল ৫২০ কোটি টাকা। অন্যদিকে ক্রুড অয়েল মাদার ট্যাংকারের দাম পড়ছে ৪৬২ কোটি ডলার। আগে এর দাম ছিল ৩০৮ কোটি ডলার। এখন এ ধরনের জাহাজ কিনতে অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ দাম দিতে হচ্ছে।

দর-কষাকষির প্রতিটি পর্যায়ে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন প্রতিনিধিরা ছিলেন। এই কোম্পানির প্রতিনিধিরা আগের দামে জাহাজ দিতে না পারার কথা জানিয়েছেন। কারণ, ডলার ও বিভিন্ন সরঞ্জামের মূল্যবৃদ্ধি। চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন জাহাজগুলোর নকশা ও পরিমাপসহ সবকিছু করেছে।

চীনা ঋণের বিপরীতে দরপত্র আহ্বান করা হয় না। এটি সরবরাহ ঋণ, তাই বাণিজ্যিক ঋণচুক্তি হওয়ার পর সরাসরি চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনকে জাহাজ বানানোর কার্যাদেশ দেওয়া হবে। ২০২৬ সালের মধ্যে জাহাজ চারটি বানিয়ে বাংলাদেশকে হস্তান্তর করা হবে।

সিন্ডিকেটের ‘লম্বা হাত’

৩১ আগস্ট ২৩, সমকাল

দিন দশেক আগে পেঁয়াজ রপ্তানিতে ভারতের ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপের খবরে বাংলাদেশের বাজারে পণ্যটির দাম বাড়ে কেজিতে ২০ টাকা। অথচ দেশে বাম্পার ফলন হওয়ায় কৃষকের ঘরে পেঁয়াজের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তুলকালাম কাণ্ড ঘটে কাঁচামরিচের বাজারেও। সরবরাহে ঘাটতির অজুহাতে প্রতি কেজি কাঁচামরিচের দাম ১০০ টাকা থেকে এক সপ্তাহের ব্যবধানে হাজার টাকায় পৌঁছে।

এদিকে, গত এপ্রিল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দর নিম্নমুখী। কিন্তু দেশের বাজারে পণ্যটির দাম ঊর্ধ্বমুখী। সরকার বারবার দাম বেঁধে দিলেও তা কার্যকর হয়নি। একইভাবে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেল ও গুঁড়া দুধের দাম কমলেও দেশের বাজারে কমেনি।

কিন্তু কেন এমন পরিস্থিতি? বাজার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ডলার সংকট, বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধি, উৎপাদন কম ইত্যাদি অজুহাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে মুষ্টিমেয় করপোরেট প্রতিষ্ঠান। নানা কায়দায় সিন্ডিকেট গড়ে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় তারা। ভোক্তারা বাড়তি দামের চাপে পড়লেও সরকারের মন্ত্রী-সচিবরা বলছেন, ‘সিন্ডিকেটের কাছে অসহায়’ তারা।

অর্থনীতিবিদ ও ভোক্তা অধিকার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে প্রতিযোগিতা প্রতিষ্ঠা করতে হলে সিন্ডিকেট প্রতিরোধ করতে হবে। কারা সিন্ডিকেটে জড়িত, তা সরকারের নীতিনির্ধারকরাও জানেন। তবে সিন্ডিকেটে জড়িতদের হাত এতই লম্বা যে, তা ভাঙা দুরূহ। রাজনীতির ঊর্ধ্বে এসে ব্যবস্থা না নিলে সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়। তবে রাষ্ট্র চাইলে যে কোনো সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

অর্থনীতি ভুল পথে গেছে ভুল সিদ্ধান্তে, সমন্বয়হীনতায়

৩১ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

ইতিহাসে আর্থিক হিসাবের সর্বোচ্চ ঘাটতি নিয়ে একটি অর্থবছর শেষ করেছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রার আয় ও ব্যয়ে সবচেয়ে বেশি পার্থক্য ছিল বিগত ২০২২-২৩ অর্থবছরেই। এ কারণেই বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভের পতন ঠেকাতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। আর্থিক হিসাবে সর্বোচ্চ ঘাটতির কারণে সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতাও ছিল রেকর্ড পরিমাণে।

কেবল লেনদেনের ভারসাম্যে নয়, বিগত অর্থবছর ছিল সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যই ইতিহাসের অন্যতম খারাপ অর্থবছর। এ সময় গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ শতাংশের বেশি, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ঘটেছে প্রায় ১৪ শতাংশ, রিজার্ভ কমেছে অর্ধেক, কমেছে বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্য ও মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমেছে ব্যাপকভাবে, বেড়েছে খেলাপি ঋণ, দুর্বল হয়েছে ব্যাংক খাত।

সংকট মেটাতে সরকার যতগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার বেশির ভাগই কাজ করেনি; বরং বেশ কিছু সিদ্ধান্ত উল্টো ফল দিয়েছে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় এত সব ভুলের কারণেই এখনো অর্থনীতিকে সামাল দিতে পারছে না সরকার।

সাধারণ মানুষের জন্যও গত অর্থবছরটি ছিল সীমাহীন চাপের বছর। বিগত অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই সময়ের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। এই একটি সূচকের কারণেই সাধারণ মানুষ ছিল দ্রব্যমূল্যের চাপে পিষ্ট। সে সময় বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতাটাই ছিল বেশি। আর ছিল সমন্বয়হীনতা ও জবাবদিহির ঘাটতি। একাধিক জরিপে অংশ নিয়েও মানুষ এ কারণেই বলেছে, দেশের অর্থনীতি ভুল পথে আছে।

রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করেছিল ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। কোভিডের প্রভাব কমে আসার পর অর্থনীতি যখন উত্তরণের পর্যায়ে ছিল, তখনই রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করে। এতে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিলে বেশির ভাগ দেশ মুদ্রা সরবরাহ কমানোসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কিন্তু বাংলাদেশ নেয় উল্টো পথ। এ সময়ে সংকট মেটাতে সরকার যতগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার বেশির ভাগই কাজ করেনি; বরং বেশ কিছু সিদ্ধান্ত উল্টো ফল দিয়েছে।

যেমন সুদহার ৯ শতাংশ করা, ডলারের বিপরীতে টাকার দর কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে রাখা, ডলারের চারটি হার নির্ধারণ, জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য বেশি রাখা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, খেলাপি ঋণে ছাড়, জ্বালানি খাতকে আমদানিনির্ভর করা ইত্যাদি। এর মধ্যে বিগত ২০২২-২৩ অর্থবছরের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল সুদহার না বাড়িয়ে মুদ্রা সরবরাহ বাড়িয়ে রাখার চেষ্টা। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় এত সব ভুলের কারণেই এখনো অর্থনীতিকে সামাল দিতে পারছে না সরকার।

নতুন ২০২৩-২৪ অর্থবছরেরও প্রায় দুই মাস হতে চলল। এ সময়েও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। ডলারের সংকট আগের মতোই আছে, বরং দর আরও বাড়ছে। রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারের নিচেই আছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি ধরলে এর পরিমাণ ২৩ বিলিয়ন ডলারের মতো। মূল্যস্ফীতি কমছে অতি সামান্য। অর্থবছরের প্রথম মাসে রপ্তানি পরিস্থিতি ভালো থাকলেও কমেছে প্রবাসী আয়।

রফতানিতে নয় বিলিয়ন ডলারের তথ্য তারতম্য!

আগস্ট ২৯, ২০২৩, বণিক বার্তা

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অর্থবছরে (২০২২-২৩) বাংলাদেশ থেকে বিশ্ববাজারে পণ্য রফতানি হয়েছে ৫ হাজার ৫৫৫ কোটি ডলারের। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ ড্যাশবোর্ডের হিসাবে দেখা যায়, রফতানিকারকরা গত অর্থবছরে বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে রফতানির ঘোষণা (ইএক্সপি) দিয়েছেন ৪ হাজার ৬৩১ কোটি ডলারের। এ অনুযায়ী দুই সংস্থার গত অর্থবছরের রফতানি তথ্যে গরমিল রয়েছে ৯২৪ কোটি (৯ দশমিক ২৪ বিলিয়ন) ডলারের। ইপিবি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রফতানি তথ্যে বরাবরই গরমিল থাকলেও গত অর্থবছরেই তা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

রফতানি তথ্যের এ বড় ব্যবধান এখন ভাবিয়ে তুলেছে খোদ নীতিনির্ধারকদেরও। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ১০ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষের সভাপতিত্বে ‘রফতানি পরিসংখ্যানে গরমিল দূরীকরণ’ সংক্রান্ত একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় গত অর্থবছরসহ রফতানি তথ্যের ধারাবাহিক গরমিলের পর্যালোচনা নিয়ে আলোচনা হয়। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানের জন্য সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইপিবির কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌পর্যালোচনায় দেখা গেছে ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের রফতানি তথ্যে গরমিলের যৌক্তিক কারণ রয়েছে। তবে গত অর্থবছরে ৯ বিলিয়ন ডলারের গরমিলটা অনেক বেশি। এ কারণেই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, যা দ্রুতই বাস্তবায়ন হবে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৪ হাজার ৬৩১ কোটি ডলারের পণ্য রফতানির ঘোষণা দিয়েছেন রফতানিকারকরা। ঘোষিত এ পরিমাণের মধ্যে ৪ হাজার ৫৬৭ কোটি ডলারের পণ্য রফতানির তথ্য নিশ্চিত করতে পেরেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে দেশে প্রত্যাবাসিত হয়েছে ৪ হাজার ৩৪৬ কোটি ডলার। প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় আছে প্রায় ২২১ কোটি ডলার। এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের এজেন্সি কমিশন, ব্যাংক চার্জ কেটে সর্বোচ্চ ২ বিলিয়ন ডলার অর্থ দেশে প্রত্যাবাসনের সুযোগ রয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আয়োজিত সভার পর্যালোচনায় বলা হয়, স্বাভাবিকভাবেই ইপিবির পরিসংখ্যানে রফতানির অংক বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের চেয়ে বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু পার্থক্যও সীমাবদ্ধ থাকতে পারে সর্বোচ্চ ২-৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। কিন্তু গত অর্থবছরে তারতম্য দেখা যাচ্ছে ৯২৪ কোটি ডলারের, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরের মধ্যে ২০১৮ সালে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ ড্যাশবোর্ডের সঙ্গে এনবিআরের অ্যাসাইকুডা সিস্টেমের ইলেকট্রনিক যোগাযোগ স্থাপিত রয়েছে। ব্যাংকগুলো ড্যাশবোর্ডে যে রফতানির ঘোষণা দেবে, সেটিই পণ্য রফতানি হিসেবে গণ্য হবে। এর মধ্যে পুনঃরফতানি ও পণ্যের নমুনা বা স্যাম্পল রফতানির মতো নন-ব্যাংকিং চ্যানেলের তথ্য বাদ যাবে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৪ হাজার ৬৩২ কোটি ডলারের রফতানির ঘোষণার চেয়ে বেশি অর্থমূল্যের পণ্য রফতানির সুযোগ তেমন একটা নেই।

ফেসবুক–অ্যাপে যেভাবে চলছে ডলার কেনাবেচার রমরমা ব্যবসা

৩১ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

দেশজুড়ে বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার কেনাবেচার রমরমা ব্যবসা চলছে। ডলার–সংকটের সময়ে এ ঘটনা ঘটছে সবার নজরের মধ্যেই। ডিজিটাল মাধ্যমে চলছে এ ব্যবসা। এর মাধ্যমে একদিকে দেশ থেকে বিপুল অর্থ পাচার হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া দেশে এ ধরনের ব্যবসার কোনো বৈধতা নেই।

অবৈধ এ ব্যবসা ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের যেমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না, চুপচাপ আছে সংশ্লিষ্ট অন্য দপ্তরগুলোও। কেউ অভিযোগ করেননি বলে অজুহাত তাদের। অন্য দপ্তরগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বিশেষ শাখা (এসবি), গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। সবার মধ্যেই নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে অন্যের ঘাড়ে দেওয়ার চেষ্টা রয়েছে।

ফরেক্স ট্রেডিং কী, কারা করছে

বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচার ব্যবসাকে ইংরেজিতে বলা হয় ফরেন এক্সচেঞ্জ ট্রেডিং, সংক্ষেপে ফরেক্স ট্রেডিং। কারেন্সি ট্রেডিং নামেও তা পরিচিত। যে কেউ চাইলেই তা করতে পারে এবং স্টক এক্সচেঞ্জে শেয়ার কেনাবেচার মতোই এ মাধ্যমেও ক্রেতার সঙ্গে বিক্রেতার সরাসরি দেখা হওয়ার কোনো দরকার পড়ে না।

ফরেক্স ট্রেডের সঙ্গে কতজন জড়িত, এ বিষয়ে কোনো পরিসংখ্যান দেশে নেই। তবে ব্যবসা যাঁরা করছেন, তাঁদের কেউ কেউ অনুমান করছেন, এসব প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে দেশে ৫০ হাজারের মতো ব্রোকার রয়েছে, যারা নতুন নতুন গ্রাহক ধরছে। রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি এ অবৈধ ব্যবসা প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে তরুণসমাজের একাংশ স্মার্টফোন ব্যবহার করে নেশার মতো ঝুঁকে পড়েছে এ ব্যবসায়। আর এর মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। মাত্র পাঁচ ডলার দিয়েই ব্যবসা শুরু করতে পারছেন কেউ কেউ।

ফেসবুকে ফরেক্স ট্রেডিং বিডি নামের গ্রুপটির সদস্য ৩৫ হাজার। ফরেক্স ট্রেডিং করে কীভাবে আয় করা যায়, তার বিশদ বিবরণ ফেসবুকেই রয়েছে। একই গ্রুপে রয়েছে ‘একজন ঝরে পড়া ট্রেডারের গল্প’। আল মামুন নামের একজনের স্ট্যাটাস হচ্ছে, ‘ফরেক্স এমন একটা আয়ের পথ, যেখানে পরিশ্রম দিয়ে সফলতা অর্জন করতে হবে। নতুন অনেকেই এসে কান্নাকাটি করেন না–বুঝে। মনে করেন ১০০ ডলার দিয়ে এক হাজার ডলার আয় করে ফেলবেন। ১০ ডলার দিয়ে শুরু করা ভালো।’

মনিরুজ্জামান রিবন নামের একজন একটা স্ট্যাটাস দিয়ে বলেন, ‘গিগামেক্সে আমার ৩০০ ডলার বিনিয়োগ আছে। সামনের মাস থেকে কি আমি লাভ তুলতে পারব না? আমাকে কি আরও ২০০ ডলার বিনিয়োগ করতে হবে?’

ফরেক্স ট্রেডিং বাংলাদেশ পেজ তৈরিকারী তারিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। তিনি বলেন, তিনি নিজে ব্যবসা করেন না। ডলার কেনাবেচা অবৈধ হলেও ফরেক্স ব্যবসা অবৈধ নয়। তিনি শখের বশে ব্লগ করেন, যাতে দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশিরা শিখে ফরেক্স ব্যবসা করতে পারেন।

অবৈধ এ ব্যবসা কীভাবে শুরু হয়

অবৈধ লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত দুজনের সঙ্গে কথা বলে এ ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া গেছে। জানা গেছে, ফেসবুক বা ওয়েবসাইট থেকে জেনে বা ব্যবসা করছে, এমন কারও মাধ্যমে প্ররোচিত হয়ে নতুন নতুন গ্রাহক তৈরি হচ্ছে। এরপর প্রথমেই একটি হিসাব খোলা হয়, যাতে নাম, ঠিকানা ও ক্রেডিট কার্ডের তথ্য উল্লেখ করতে হয়।

পরে বলতে হয়, কোন মাধ্যমে ব্যবসা করতে চান এবং কী ধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করতে চান—বিটকয়েন নাকি লাইটকয়েন। এর পরের ধাপ হচ্ছে ডেমো ট্রেড। অর্থাৎ নিজের অর্থে ব্যবসা শুরুর আগে ব্যবসার চর্চা। তারপর ডলার জমা করতে হয়।

ব্যাংকের মাধ্যমে ডলার জমা দিলে ধরা পড়ার ভয় থাকার কারণে নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা হয়। কারও যদি ক্রেডিট কার্ড না থাকে, তাহলে গ্রাহকের পক্ষে ব্রোকারদের কেউ ডলার জমা দেয় এমন শর্তে যে ওই ডলারের সমপরিমাণ টাকা তিনি এমএফএসের মাধ্যমে ব্রোকার বা ব্রোকারের পক্ষে কারও কাছে জমা দেবেন।

অনলাইনে এ অবৈধ ব্যবসায়ের জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম এক্সএম ও মেটাট্রেডার। মেটাট্রেডার ফোর ও মেটাট্রেডার ফাইভ—এ দুটি এখন বেশি চলছে।

বিটিআরসি গত মঙ্গলবারের বৈঠকে বলেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরের তুলনায় ২০২১-২২ অর্থবছরে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন বেড়েছে ৩৭ শতাংশ, আর এমএফএসের মাধ্যমে ২৫ শতাংশ।

আমদানি কমিয়ে অর্থনীতির সংকট সমাধান সম্ভব কি

সেপ্টেম্বর ০৩, ২০২৩, বণিক বার্তা

নিয়ন্ত্রণ সত্ত্বেও গত বছরের জুলাইয়ে দেশের ব্যাংকগুলোয় পণ্য আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছিল ৬ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন বা ৬৩৫ কোটি ডলারের। কিন্তু চলতি বছরের জুলাইয়ে ব্যাংকগুলো মাত্র ৪৩৭ কোটি ডলারের নতুন এলসি খুলতে পেরেছে। এ হিসাবে অর্থবছরের প্রথম মাসে ব্যাংকগুলোয় আমদানি এলসি খোলা কমেছে ৩১ শতাংশেরও বেশি। এর আগে ২০২২ পঞ্জিকাবর্ষের মার্চে রেকর্ড ৯৫১ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছিল। সে সময়ের তুলনায় চলতি বছরের জুলাইয়ে আমদানির নতুন এলসি অর্ধেকেরও বেশি কমেছে। এ অবস্থায় দেশের অর্থনীতিতে প্রকৃত অর্থে আমদানির চাহিদা কত, সেটি নিয়েই প্রশ্ন ওঠা শুরু করেছে।

গত দুই বছর দেশে ডলারের বিপরীতে টাকার অন্তত ২৮ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে। এর মধ্যে গত অর্থবছরে অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। অন্যদিকে গত এক বছরে দেশে প্রায় প্রতিটি পণ্যের দামও বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে আমদানিনির্ভর পণ্যে। এর বিরূপ প্রভাব দেখা যাচ্ছে মূল্যস্ফীতিতে। সর্বশেষ জুলাইয়েও দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ। যেকোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান দায়িত্ব হলো, অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখা। যদিও এ দায়িত্ব পালন করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যর্থ হয়েছে বলে অর্থনীতিবিদরা অভিযোগ তুলছেন।

দেশের অর্থনীতিতে এ মুহূর্তে আমদানির প্রকৃত চাহিদা কত, এমন প্রশ্নের উত্তর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পাওয়া যায়নি। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্ববাজারে বর্তমানে জ্বালানি তেল, শিল্পের কাঁচামাল, ভোগ্যপণ্যসহ প্রায় সব পণ্যের দাম নিম্নমুখী বা স্থিতিশীল। অনেক পণ্যের দাম ২০২১ ও ২০২২ সালের তুলনায় অর্ধেক। কিন্তু দেশের বাজারে পণ্যের দামে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় জনগণ দাম কমার সুফল পাচ্ছে না। এ কারণে চেষ্টা সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি কমছে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুলাইয়ে দেশের শিল্প খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিটি পণ্যের এলসি খোলা কমেছে। এর মধ্যে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির নতুন এলসি কমেছে ৩৬ শতাংশ। শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্য প্রায় ৩১ শতাংশ ও মূলধনি যন্ত্রপাতির এলসিও ২২ শতাংশের বেশি কমেছে। একই সময়ে ভোগ্যপণ্যের আমদানির এলসিও কমেছে ২১ শতাংশের বেশি। সবচেয়ে বেশি ৫০ শতাংশ এলসি কমেছে জ্বালানি তেল আমদানির। গত অর্থবছরেও (২০২২-২৩) এলসি খোলা কমে যাওয়ার এ হার অব্যাহত ছিল। অর্থবছরটিতে নতুন এলসি ২৫ শতাংশেরও বেশি কমেছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে উঠে এসেছে। আমদানি কমিয়ে মূলত বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সামলানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি রিজার্ভের ক্ষয় থামানোর চেষ্টাও করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে রিজার্ভের পরিমাণ ২৬ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার শর্ত রয়েছে। গত ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী (বিপিএম৬) দেশের রিজার্ভ ছিল ২৩ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলার। যদিও আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী রিজার্ভ সংরক্ষণ নিয়ে এরই মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে।

২০২১-২২ অর্থবছরজুড়ে বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি পার করে বাংলাদেশ। অর্থবছরটিতে রেকর্ড ৮৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়। এতে ৩৩ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতির পাশাপাশি সরকারের চলতি হিসাবের ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার। দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টের ঘাটতিও ৫ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকে। এ অবস্থায় ২০২২-২৩ অর্থবছরের শুরু থেকেই দেশের এলসির লাগাম টেনে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে গত অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ৬৯ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। এক্ষেত্রে আমদানি কমে যায় ১৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

দেশের প্রথম প্রজন্মের একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, আগে তার ব্যাংক প্রতি মাসে ৪০ কোটি ডলারের আমদানি এলসি খুলত। এখন সে এলসির পরিমাণ মাসে ১০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। গ্রাহকদের কাছ থেকে বিপুল চাহিদা সত্ত্বেও ডলার না থাকায় তারা এলসি খুলতে পারছে না। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধিনিষেধের কারণে বেশি দামে রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় কেনা যাচ্ছে না। এখন আমদানিকারকরা ব্যাংকের বাইরে গিয়ে রফতানিকারকদের কাছ থেকে দরকষাকষি করে ডলার কিনছেন। এতে প্রতি ডলারের দাম ১১৫-১১৭ টাকায়ও উঠে যাচ্ছে। আবার ব্যাংক এলসি খুলতে না পারায় হুন্ডির বাজার শক্তিশালী ও বড় হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই বলছেন, ২০২১-২২ অর্থবছরে পণ্য আমদানির আড়ালে দেশ থেকে অর্থ পাচার বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমদানিতে বিধিনিষেধ ও তদারকি বাড়ানোয় গত অর্থবছরে অর্থ পাচার কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে এসেছে। পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় নয় এমন সব পণ্যের আমদানিও কমেছে। গত অর্থবছর শেষে দেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ১৭ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। সরকারের চলতি হিসাবের ঘাটতির পরিমাণও ৩ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। তবে বিদেশী ঋণ পরিশোধের চাপের কারণে লেনদেনের সামগ্রিক ঘাটতি (বিওপি) ৮ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।

চাহিদা অনুযায়ী ব্যবসায়ীরা আমদানির এলসি খুলতে পারছেন বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা দাবি করলেও বিপরীত তথ্য দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদ, শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও ব্যাংক নির্বাহীরা। তারা বলছেন, ডলার সংকট ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণমূলক নীতির কারণে অর্থনীতির প্রতিটি খাতই চাপের মুখে আছে। আমদানিনির্ভর শিল্প ও সেবা খাতের ব্যবসা একেবারেই সংকুচিত হয়ে এসেছে। রফতানিমুখী শিল্প খাতেও সংকটের প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে যে ক্ষরণ চলছে, সেটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে।

আমদানি কমে যাওয়ায় দেশের রফতানিমুখী বস্ত্র ও পোশাক খাতে সংকট দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে বলে জানান বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ)। বণিক বার্তাকে এ শিল্পোদ্যোক্তা বলেন, ‘আমদানিসংক্রান্ত পরিসংখ্যানেই বোঝা যাচ্ছে যে শিল্পগুলোর কর্মকাণ্ড সংকুচিত হচ্ছে। উৎপাদন কমে আসছে। দেশের প্রতিটি শিল্প খাতেই একই অবস্থা। নির্মাণ শিল্প খাতের রড, সিমেন্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, তাদের বিক্রি ও উৎপাদন কমে গেছে। টেক্সটাইল খাতের অনেক স্পিনিং মিল এখন বসে আছে। যেগুলো চলছে সেগুলোর ৩০-৪০ শতাংশ সক্ষমতাও ব্যবহার হচ্ছে না। সরকারের নীতির কারণে হোক, নিজস্ব কারণে হোক বা বাজার চাহিদার কারণে হোক; শিল্প খাতগুলোর কর্মকাণ্ড নিম্নমুখী। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপগুলোয় মনে হচ্ছে, শিল্প প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদন কর্মকাণ্ডের চেয়েও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যাংকগুলোকে তারা কত কম ঋণপত্র খোলার অনুমতি দেবে।’

প্রায় একই ধরনের কথা বলছেন স্কয়ারের নির্বাহী পরিচালক (ফাইন্যান্স অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, ‘টেক্সটাইল খাতের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে মূলধনি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে কম। কভিডের পরপর কিছু হলেও এরপর টেক্সটাইল খাতে বড় কোনো বিনিয়োগ হয়নি। এ মুহূর্তে পোশাকের বৈশ্বিক চাহিদা নিম্নমুখী। ফলে ক্রয়াদেশ তেমন একটা আসছে না, সবাই সাপ্লাই চেইনকে শ্লথ করে দিয়েছে।’

চাহিদামতো কাঁচামাল আমদানির ঋণপত্র খুলতে না পারায় এরই মধ্যে উৎপাদন ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন ভারী শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ইস্পাত খাতের শিল্পোদ্যোক্তারা। মজুদ কাঁচামাল দিয়ে ফিনিশড পণ্য উৎপাদন অব্যাহত থাকলেও স্ক্র্যাপ গলিয়ে বিলেট কিংবা অ্যাঙ্গেল তৈরির প্লান্টের উৎপাদন কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে কোম্পানিগুলো। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঋণপত্র খুলতে ব্যবসায়ীদের এ বিড়ম্বনা না কাটলে অচিরেই অনেক শিল্প-কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

যারা বলছেন দেশের অর্থনীতি ভালো নেই, তারা অর্থনীতিই বোঝেন না

৩১ আগস্ট ২৩, সমকাল

‘যারা বলছেন দেশের অর্থনীতি ভালো নেই, তারা অর্থনীতিই বোঝেন না’- এই মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে ইউএস বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিসের সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এ মন্তব্য করেন।

‘অর্থমন্ত্রীকে পাওয়া যায় না। অর্থনীতিবিদদের অভিমত যে, ভুলনীতির কারণে দেশের অর্থনীতিতে সংকট বাড়ছে’ এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্বঅর্থনীতিতে বাংলাদেশ রোল মডেল যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। তারপরও যারা বলছেন দেশের অর্থনীতি ভালো নেই তারা অর্থনীতিই বোঝেন না।

অর্থনীতিকে বড় বিপদে ফেলছে ডলার সংকট

০৪ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে যেসব সমস্যার মুখে পড়েছে, এর মূলে রয়েছে মার্কিন ডলারের সংকট। নীতিনির্ধারকরা মনে করেছিলেন, ডলারের সংকট এবং এর দাম বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা সাময়িক। তারা দীর্ঘদিন ধরে বলছেন, অচিরেই এর সমাধান হবে। কিন্তু সেই ‘অচিরেই’ আর আসছে না। ডলার সংকট ও দর বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এর ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি হচ্ছে। জিনিসপত্রের বাড়তি ব্যয় মেটাতে মানুষের কষ্ট হচ্ছে। সব মিলিয়ে এই পরিস্থিতি অর্থনীতিকে বিপদে ফেলছে।

এর মধ্যে গতকাল রোববার আরও উদ্বেগজনক তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, গেল আগস্টে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স কমেছে ২১ শতাংশ। আগস্টের রেমিট্যান্স গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন, যা বৈদেশিক মুদ্রার কমতে থাকা রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

রেকর্ড উৎপাদনেও আলুর রেকর্ড দাম

০৬ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

রাজধানীর তেজতুরিবাজার এলাকায় বিবিএর ছাত্র তারেক হাসানের মেসজীবন। গতকাল মঙ্গলবার কারওয়ান বাজার থেকে আলু কিনতে গিয়ে তাঁকে খেতে হয়েছে দামের ধাক্কা। ৪৫ টাকা দরে দুই কেজি আলু কিনেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। বললেন, ‘খরচ ও সময় বাঁচাতে মেসে বেশির ভাগ সময় আলুভর্তা, ডিম আর ডাল রান্না হয়। এক মাস আগে যে আলু কিনেছি ৩২ টাকায়, আজ গুনতে হয়েছে ৪৫ টাকা। আলু তো আমদানি করতে হয় না। তাহলে দাম বাড়ছে কোন যুক্তিতে?’

হাতিরপুল কাঁচাবাজার থেকে ৫০ টাকা দরে তিন কেজি আলু কিনেছেন আসিফ। গ্রিন রোডের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ওয়ার্ডবয়ের চাকরি করেন তিনি। আসিফ বলেন, ‘১৫ হাজার টাকা বেতন পাই। কম মাইনের কারণে বেশির ভাগ সময় আলু-ডিমই ভরসা। সম্প্রতি ডিমের দাম বাড়ার কারণে আলুভর্তা খাচ্ছি বেশি। তবে সেটিরও দাম বাড়ায় এখন নতুন দুশ্চিন্তায় পড়েছি।’

দাম বাড়ায় ক্ষুব্ধ নিম্ন আয়ের মানুষও। নাখালপাড়া সমিতি বাজার থেকে ৪৮ টাকা দিয়ে এক কেজি আলু কিনেছেন গৃহিণী সাহানারা বেগম। তাঁর স্বামী রিকশাচালক। তিনি বলেন, ‘মাছে হাত দেওয়া যায় না। সব ধরনের সবজির দামও বেশি। সামনে আলু খাওয়াও কমাতে হবে।’

শুধু তারেক হাসান, আসিফ কিংবা সাহানারা বেগমই নন; আলুর দাম ভোগাচ্ছে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে।

দেশে এবার রেকর্ড ভেঙেছে আলুর উৎপাদন। হিমাগারেও আছে ভরপুর মজুত। তবু বাজারে  রেকর্ড দরে বেচাকেনা হচ্ছে আলু। রাজধানীর পাড়া-মহল্লায় এক কেজি আলু কিনতে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে সবজিজাতীয় এ পণ্যের দাম বেড়েছে দ্বিগুণের কাছাকাছি। আর এক মাসে কেজিতে বেড়েছে সর্বোচ্চ ১৬ টাকা। এ পরিস্থিতিতে গতকাল মঙ্গলবার থেকে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর দেশের হিমাগারে কত আলু মজুত আছে, সে তথ্য সংগ্রহে নেমেছে। কেন আলুর দাম এমন টালমাটাল? সমকাল এ তথ্য তালাশ করতে নেমে পেয়েছে ‘নানা মুণির নানা মত’!

আলুর দাম বাড়ানোর পেছনে মধ্যস্বত্বভোগী ও হিমাগারের মালিকদের হাত রয়েছে বলে মনে করেন ভোক্তা-সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, হিমাগারে মজুত আলু ও উৎপাদনের তথ্য যাচাই করলেই এক সপ্তাহের মধ্যে নাগালে চলে আসবে দাম। খোদ সরকারের কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের প্রতিবেদনেও দাম বাড়ার পেছনে অসাধু ব্যবসায়ীদের দায়ী করা হয়েছে। যদিও হিমাগার মালিকদের দাবি, চড়া দামের পেছনে তারা নেই; দাম বাড়াচ্ছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। আর বিক্রেতারা বলছেন, আলু বেশি উৎপাদন হয় উত্তরাঞ্চলে। সেসব এলাকায় এখন দাম বাড়তি। এ কারণে ঢাকার বাজারে প্রভাব পড়েছে। তবে বাজারে আলুর সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, বছরে আলুর চাহিদা রয়েছে প্রায় ৯০ লাখ টন। তবে এ মৌসুমে ফলন আগের বছরের চেয়ে বেশি হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ২ লাখ টন। পরের ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১০ লাখ টন বেড়ে উৎপাদন দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ টনে। সেই হিসাবে চাহিদার বিপরীতে প্রায় ২২ লাখ টন বেশি উৎপাদন হয়েছে।

এদিকে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এবার ৩৬৫ হিমাগারে প্রায় ২৫ লাখ টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে এখনও প্রায় ২২ লাখ টন আলু মজুত রয়েছে। যদিও হিমাগার মালিকরা বলছেন, মে মাস থেকেই হিমাগারের আলু সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত নেই।

উৎপাদন খরচের পাঁচ গুণ দাম খুচরায়

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ সাড়ে ১০ টাকা। কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজির দাম হতে পারে ১৫ টাকার মতো, যা খুচরা বাজারে সর্বোচ্চ ৩২ টাকা হতে পারে। অথচ হিমাগার থেকে এখন আলু বিক্রি হচ্ছে ৩৪ থেকে ৩৫ টাকায়, যার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। মাসখানেক আগে ঢাকার খুচরা বাজারে আলুর কেজি ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা ছিল। তবে সোম ও মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, সেগুনবাগিচা, মালিবাগ ও হাতিরপুল কাঁচাবাজারে আলুর কেজি বিক্রি হয়েছে ৪৪ থেকে ৪৫ টাকা দরে। পাড়া-মহল্লায় বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা দরে। এই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে পণ্যটির দাম বেড়েছে ৯ থেকে ১৬ টাকা।

সাধারণ মানের এসব আলুর পাশাপাশি কিছু এলাকার সুস্বাদু আলুও পাওয়া যায় বড় বাজারগুলোতে, যেগুলোর দাম দ্বিগুণের বেশি। বগুড়ার লাল আলুর কেজি ৬০ ও ময়মনসিংহ এলাকার ছোট গোল আলু বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকায়। ১৫ থেকে ২০ দিন আগে এ দুই এলাকার আলুর কেজি বিক্রি হয়েছে যথাক্রমে ৪৫ থেকে ৫০ এবং ৫০ থেকে ৫৫ টাকা দরে।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দৈনন্দিন বাজার প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, এক বছরের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ৬১ শতাংশের বেশি।

কারসাজিতে কারা?

পাইকার ও আড়তদারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আলু কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি বাজারে আসে না। মাঠ থেকে তোলার পর সিংহভাগ চলে যায় হিমাগার ও মজুতদারের কাছে। তাদের হাত ধরে তা বাজারে আসে। মাঝখানে বড় একটা সময় থাকে হিমাগারে। প্রায় বছরজুড়ে সংরক্ষণের সময়টাতে ব্যবসায়ীরাই মূলত বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। অনেক হিমাগার মালিকও আবার আলুর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। মূলত তারাই হিমাগারে আলু রেখে বাজারে সংকট সৃষ্টি ও সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ান।

গত জুলাইয়ে খোদ সরকারি সংস্থা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের প্রতিবেদনেও আলুর বাজারের কারসাজির চিত্র উঠে আসে। সংস্থাটির প্রস্তুত করা ‘বাংলাদেশে আলুর সাপ্লাই চেইন ও মূল্যবৃদ্ধি’ বিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়, হিমাগার থেকে চাহিদা অনুযায়ী আলু খালাস হচ্ছে না। একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অপকৌশল করে আলুর দাম বাড়াচ্ছে।

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন সমকালকে বলেন, দাম বাড়ানোর মূল কারিগর হিমাগারের মালিক ও মজুতদাররা। তবে দাম বাড়ার ফলে ভোক্তার খরচ বাড়লেও এর সুফল কৃষক পাচ্ছেন না। কৃষিপণ্যের প্রকৃত উৎপাদন খরচ হিসাব করতে কৃষি বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তা প্রতিনিধি নিয়ে তদন্ত করা উচিত। একই সঙ্গে আড়ত, হিমাগার পর্যায়ে কী হচ্ছে– তাও খতিয়ে দেখা দরকার। এ পদক্ষেপ নিলে বাজার নিয়ন্ত্রণে আসতে বাধ্য।

এ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, উৎপাদন একটু বেশি হলে চাষিরা আলু বিক্রি করতে পারেন না। অনেক সময় ইচ্ছা করলেও আলুর দাম বাড়ানো যায় না। এবার উৎপাদন বেশি। তার পরও আলুর দাম বেশি কেন, তা খতিয়ে দেখতে হবে। সিন্ডিকেট থাকলে তা ভাঙতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে উদ্যোগ নিতে হবে।

মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে হিমাগার মালিকদের দ্বিমত

সরকার আলুর ফলনের রেকর্ড তথ্য দিলেও কোল্ডস্টোরেজের মালিকদের দাবি, সরকারের তথ্য ঠিক নয়। এ বছর অন্তত ২০ লাখ টন আলু উৎপাদন কম হয়েছে। হিমাগার ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, গত বছরের চেয়ে এবার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ আলু কম এসেছে হিমাগারে। ফলে মে মাস থেকেই হিমাগার থেকে বাজারে আলু সরবরাহ করা হচ্ছে।

হিমাগার ব্যবসায়ীরা বলছেন, হিমাগারের আলুর মাত্র ১০ শতাংশ হিমাগার মালিকদের, ৫০ শতাংশ মজুতদার ব্যবসায়ীর আর বাকি ৪০ শতাংশ কৃষকের। এর মধ্যে কৃষকরা ২০ শতাংশ আলু রাখেন বীজের জন্য। বাকি ২০ শতাংশ বাজারে বিক্রি করে দেন। সব মিলিয়ে হিমাগারে সংরক্ষিত ৮০ শতাংশ আলু খাওয়ায় ব্যবহার হয়। চিপস ও অন্য খাদ্যপণ্য উৎপাদনের জন্য কিছু আলু সংরক্ষিত রাখে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। রপ্তানি করার জন্যও ভালো মানের কিছু আলু থাকে হিমাগারে।

বাংলাদেশ কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও এফবিসিসিআইর সিনিয়র সহসভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, উৎপাদন খরচ, হিমাগার ভাড়াসহ প্রতি কেজি আলুতে খরচ হয় ১৮ থেকে ২০ টাকা। তবে হিমাগারেই এখন আলুর কেজি ৩৪ থেকে ৩৫ টাকা। এর সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফা, পরিবহন ও অন্য খরচ যোগ হয়ে খুচরা পর্যায়ে যেতে যেতে ৫০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এটা অস্বাভাবিক।

এ ব্যাপারে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, কোন পর্যায়ে কী পরিমাণ আলু মজুত আছে, তা কৃষি বিভাগ থেকে সংগ্রহ করে দিলে ভোক্তা অধিদপ্তরের বাজার তদারকি সহজ হবে। তবে গতকাল থেকে সারাদেশের হিমাগারে মজুত আলুর তথ্য সংগ্রহে কাজ শুরু হয়েছে।

বগুড়ায় আলু আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট

বগুড়া ব্যুরো থেকে এস এম কাউসার জানান, বগুড়ায় গত বছরের এ সময়ে খুচরায় আলুর কেজি ছিল ১২ টাকা, যা এখন তিন গুণের বেশি বেড়েছে। দাম বাড়ার পেছনে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট জড়িত বলে খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ। হিমাগারে রাখা আলু চাহিদা অনুযায়ী বের না করে সংকট তৈরির মাধ্যমে দাম বাড়ানো হয়েছে।

হিমাগার মালিকরা বলছেন, বগুড়া-জয়পুরহাটের ৬২ হিমাগারে মজুত করা হয়েছে ৫ লাখ ২৫ হাজার ২৪৭ টন আলু। বগুড়া জেলা কৃষি বিপণন বিভাগের তথ্য বলছে, জুনে চাহিদার বিপরীতে হিমাগার থেকে আলু বের করা হয়েছে ৬৮ হাজার ৬০৪ টন। জুলাইয়ে বের করা হয় মাত্র ২৪ হাজার ১২৪ টন। অথচ বাজারে জুলাইয়ে চাহিদা ছিল গড়ে ৬৫ হাজার টনের। ব্যবসায়ীরা একজোট হয়ে হিমাগার থেকে আলু বের না করায় সেই থেকে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়।

জেলা হিমাগার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও শাহ সুলতান কোল্ডস্টোরেজের মালিক আবদুল গফুর বলেন, দাম কমে যাওয়ায় গেল কয়েক বছর হিমাগারে আলু রেখে লোকসান দিয়েছেন মজুতদাররা। এবার দাম বাড়ায় ব্যবসায়ীরা বেশ লাভবান হয়েছেন। তবে আলুর কোনো সিন্ডিকেট নেই। শাকসবজির দাম বাড়ায় আলুর দামও বেড়েছে।

কৃষি বিপণন বিভাগের মাঠ ও বাজার পরিদর্শক আবু তাহের বলেন, কী কারণে আলুর দাম বেড়েছে, তা আলু ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিকরা ভালো জানেন।

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা পলাশ কুমার সরকার জানান, বেশির ভাগ কৃষক আলু উৎপাদনের পরই বিক্রি করে দেন। বড় ব্যবসায়ীরা তা কিনে হিমাগারে মজুত করেন। এখন কৃষকের ঘরে আলুর মজুত নেই। হিমাগার থেকে সীমিত আকারে সরবরাহ করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে

সেপ্টেম্বর ০৭, ২০২৩, বণিক বার্তা

যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই ও আগস্ট) বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৩৭ কোটি ২ লাখ ডলার। যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৭২ কোটি ২০ লাখ ডলার। সে অনুযায়ী এক বছরের ব্যবধানে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ ৪৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে উঠে এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাত্র ১৭ কোটি ২ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে, যা একক মাসের হিসাব অনুসারে তিন বছরে সর্বনিম্ন। রেমিট্যান্স প্রবাহের দিক থেকে শীর্ষ তালিকার দ্বিতীয় স্থানটি টানা তিন বছর দখলে রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু জুলাই ও আগস্টে এসে তা চতুর্থ স্থানে নেমে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে হঠাৎ রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় পতনের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ জানাতে পারেননি বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিন বছর আগে হঠাৎ করেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়তে দেখা যায়। দেশটি থেকে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স আসছিল, তার কোনো যৌক্তিকতা পাওয়া যায়নি। এখন আবার রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় পতন হয়েছে। হঠাৎ করে তা অর্ধেকের নিচে নেমে আসারও কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

তবে এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানার চেষ্টা করেও বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. মেজবাউল হকের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ঢাকার একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে দেশটি থেকে আসা রেমিট্যান্সের উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপড়েনের কারণে প্রভাবশালীদের একটি অংশ দেশটিতে পাচার করা অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছিলেন। এর একটি অংশ রেমিট্যান্স হিসেবে বাংলাদেশে এসেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে বেশ কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এ কারণে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার পথও অনেকটাই সংকুচিত হয়ে এসেছে, যা দৃশ্যমান হচ্ছে রেমিট্যান্সে বড় পতনের মাধ্যমে।

বাজারে উত্তাপ, মানুষ দিশাহারা

৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

বাজারে গেলেই ‘বুকের ব্যথা বেড়ে যায়’ রাজশাহীর আবদুর রহমানের। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে শহরের সাহেববাজার মাস্টারপাড়া কাঁচাবাজারে সবজির দাম করছিলেন তিনি। বেসরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন ৬০ বছরের কিছু বেশি বয়সী এই মানুষ। এখন পরিবারের সবার জন্য বাজারের কাজটি তিনিই করেন। সিঅ্যান্ডবি মোড় এলাকা থেকে বাজারে এসে দেখলেন, প্রায় সব সবজির দামই চড়া। গেল সপ্তাহের তুলনায় গোল বেগুনের দামই ২০ টাকা বেড়ে হয়ে গেছে ৭০ টাকা। দাম শুনে আবদুর রহমান দোকানদারকে বললেন, সবকিছুর দাম শুনলে বুক ধড়ফড় করে, বুকের ব্যথা বেড়ে যায়।

কিংবা ধরা যাক পাবনার বেড়া উপজেলার পৌর এলাকার শেখপাড়া মহল্লার রেখা খাতুনের কথা। তাঁর স্বামী সেলুনে কাজ করে প্রতিদিন আয় করেন ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। নিজে অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে সামান্য আয় করেন। ছেলের বিধবা বউ, নাতি-নাতনিসহ পাঁচ সদস্যের সংসার এই আয়েই চালাতে হয়। প্রথম আলোর প্রতিবেদককে তিনি জানালেন, সপ্তাহখানেক আগে বাড়িতে ডিমের ঝোল রান্না হয়েছিল, খেয়েছিলেন অর্ধেক ডিম। এর পর থেকে ডাল বা একটা সবজি দিয়ে কোনোমতে সবাইকে ভাত খেতে হচ্ছে।

অথবা শোনা যাক শেরপুরের নালিতাবাড়ী পৌর শহরের কাছারিপাড়া এলাকার বাসিন্দা বিধবা ফিরোজা বেগমের (৫৫) কথা। স্বামী মারা গেছেন চার বছর আগে। এক ছেলে ও এক মেয়ের বিয়ের পর ফিরোজার খোঁজও রাখেনি কেউ। একার সংসার চালাতে ধানের আড়তে পড়ে থাকা ধান জমিয়ে বিক্রি করেন তিনি। ‘শুঁটকি ছাড়া আর কোনো মাছ শেষ কবে খাইছিলাম, মনে নাই।’ প্রথম আলোকে জানালেন তিনি।

দেশের পাঁচটি জেলা ও উপজেলায় বিভিন্ন বাজারে খবর নিয়ে, আর ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে মোটামুটি একই চিত্র দেখেছেন প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা। এই চিত্রই জানাচ্ছে নিম্ন আয় ও সীমিত আয়ের বেশির ভাগ মানুষকে সংসার চালাতে এখন প্রতিটি খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হচ্ছে।

এমন গল্প একটি-দুটি নয়, অনেক। একই গল্প দিনাজপুরের দপ্তরীপাড়া এলাকার বাসিন্দা শাহজাদার, টাঙ্গাইলের সখীপুরে বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করা ফরিদা আক্তারের, কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার বাসিন্দা করিম উল্লাহর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রিকশাচালক রমজান মিয়ার, নেত্রকোনা পৌরসভার বলাইনগুয়া এলাকার কাঠমিস্ত্রি রতন চন্দ্র তালুকদারের কিংবা সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার অটোভ্যানচালক ইব্রাহিম হোসেনের। সবজি, মাছ অথবা নিত্যপণ্যের বাজারে দামের যে উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তাতে সংকটে রয়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতারা।

ঢাকার মহাখালী কাঁচাবাজারে গতকাল সকালে বাজার করতে আসেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা তানজীলুল ইসলাম। তিনি বলছিলেন, ‘বাজার করে এখন আর শান্তি নেই। পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে যে হারে প্রতিটি জিনিসের দাম বাড়ছে, সে হারে কমছে না। এ রকম অস্বস্তি নিয়ে আর কত দিন চলতে হবে, জানি না।’

ফোর্বসের সিঙ্গাপুরে শীর্ষ ধনীর তালিকায় ৪১তম

সেপ্টেম্বর ০৮, ২০২৩, বণিক বার্তা

দেশের বেসরকারি খাতের শীর্ষ স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী (আইপিপি) প্রতিষ্ঠান সামিট পাওয়ার লিমিটেড প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৭ সালে। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে প্রথম উৎপাদনে আসে সামিটের তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র। সে সময় কোম্পানিটির বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৩৩ মেগাওয়াট। ২০০৮ সালে এ সক্ষমতা দাঁড়ায় ১০৫ মেগাওয়াটে। মূলত ২০০৯ সালের পর থেকেই বিপিডিবির সঙ্গে একের পর এক বিদ্যুৎ বিক্রির চুক্তিতে আবদ্ধ হতে থাকে কোম্পানিটি। প্রথমে কুইক রেন্টাল পরে আইপিপি স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে থাকে সামিট পাওয়ার। বিশেষ করে গত এক দশকে বেসরকারি খাত থেকে বিপিডিবির বিদ্যুৎ ক্রয়ে সামিট পাওয়ারই প্রাধান্য পেয়েছে সবচেয়ে বেশি এর সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কোম্পানির মুনাফা ও সম্পদের পরিমাণ। এ সময়ের মধ্যেই সিঙ্গাপুরে ব্যবসা চালানোর অনুমতি পায় সামিট গ্রুপ। বর্তমানে সামিটের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খান জায়গা করে নিয়েছেন দেশটির শীর্ষ ৫০ ধনীর তালিকায়।

১৯৫৫ সালে জন্ম নেয়া মুহাম্মদ আজিজ খানের উদ্যোক্তা জীবন শুরু হয় মাত্র ১৮ বছর বয়সে। বাবার কাছ থেকে নেয়া ৩০ হাজার টাকার পুঁজি দিয়ে কয়েকজন বন্ধু মিলে ছাত্রাবস্থায় ১৯৭৩ সালে পুরান ঢাকায় জুতা তৈরির মাধ্যমে তার ব্যবসায় হাতেখড়ি। এসব জুতার একটি অংশ বাটা কোম্পানিকে সরবরাহ করতেন তিনি। জুতা তৈরির পাশাপাশি পিভিসি (পলি ভিনাইল ক্লোরাইড) আমদানি শুরু করেন তিনি। এরপর তিনি চিটাগুড়ের রফতানি ব্যবসায়ও বিনিয়োগ করেন। দেশের হয়ে তিনিই প্রথম চিটাগুড় রফতানি করেন। দুই যুগের বেশি সময় ধরে তিনি ট্রেডিং ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

প্রায় অর্ধশতকের ব্যবসায়ী জীবনে ট্রেডিং থেকে শুরু করে জ্বালানি, বন্দর, ফাইবার অপটিকসহ নানা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হয়েছেন মুহাম্মদ আজিজ খান। তবে তার সমৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বিদ্যুতের ব্যবসা। এ ব্যবসার হাত ধরেই গত এক দশকে সম্পদে বড় উল্লম্ফনের দেখা পেয়েছেন সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান।

মার্কিন সাময়িকী ফোর্বসের গত বুধবার প্রকাশিত সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ৫০ ধনীর তালিকায় গত বছরের চেয়ে একধাপ এগিয়েছেন আজিজ খান। স্বীকৃতি পেয়েছেন সিঙ্গাপুরের ৪১তম ধনী ব্যক্তির। ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, মুহাম্মদ আজিজ খানের মোট সম্পদ রয়েছে ১১২ কোটি ডলারের।

ফোর্বসের ২০২২ সালের সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ধনীর তালিকায় আজিজ খানের অবস্থান ছিল ৪২ নম্বরে। সে সময় তার সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার। সে হিসাবে চলতি বছর সিঙ্গাপুরের ধনীদের তালিকায় এক ধাপ এগোনোর পাশাপাশি তার সম্পদ বেড়েছে ১২ কোটি ডলার।

সিঙ্গাপুরের ধনীদের তালিকায় আজিজ খানের অবস্থান ৪১তম হলেও ফোর্বসের করা বৈশ্বিক বিলিয়নেয়ারদের তালিকায় তার স্থান দেখানো হয়েছে ২ হাজার ৫৪০তম। ২০২১ সালেও আজিজ খানের সম্পদের পরিমাণ ছিল ৯৯ কোটি ডলারের। পরের বছরই তা ১০০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়।

২০১৮ সালে তার সম্পদের পরিমাণ ছিল ৯১ কোটি ডলারের। ২০১৯ সালে এটি কমে ৮৫ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। তবে ২০২০ সালে সম্পদ বেড়ে ৯৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার হয়। দেখা যাচ্ছে চার বছর ধরেই ফোর্বসের হিসাবে তার সম্পদ বাড়ছে। ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো আজিজ খান সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ৫০ ধনীর তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন। সে বছর তিনি ছিলেন ৩৪ নম্বরে।

ডিমের উৎপাদনের হিসাবে গরমিল

০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার রাজাবাড়ী গ্রামের নবাব আলী পেশায় একজন ভ্যানচালক। মা, স্ত্রী ও তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে তাঁর সংসার। দুটি বড় হাঁস আছে জানিয়ে নবাব আলী বলেন, ‘দুই-তিন মাস আগে আঁশে (হাঁস) ছয়-সাতটা ডিম দিছিল। তারপর আর ডিম দিছে না। আঙ্গর কিইন্না (কিনে) খাওয়ার সামর্থ্য নাই।’

 নবাব আলী ও তাঁর পরিবারের মতো স্বল্প আয়ের বহু মানুষের পাতে এখন আর ডিম পড়ে না বললেই চলে। অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়ায় অনেকেই ডিম কিনে খেতে পারছেন না।

 বাস্তবতা যখন এমন, তখন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, প্রতিবছরই ডিমের উৎপাদন বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট লোকজন বলছেন, উৎপাদন বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই দাম কমে আসে। অথচ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ডিমের বাড়তি উৎপাদন দেখালেও দাম বেড়েই চলেছে। ফলে অধিদপ্তরের হিসাবে গলদ আছে।

দেশে কী পরিমাণ দুধ, ডিম ও মাংস উৎপাদিত হয়, তার হিসাব প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাসিক ও বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকে। তাদের হিসাব বলছে, দেশে প্রতিবছর ডিমের উৎপাদন বেড়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে যেখানে দেশে ১ হাজার ৫৫২ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়েছে, সেখানে ২০২১-২২ অর্থবছরে হয়েছে ২ হাজার ৩৩৫ কোটি ডিম।

অধিদপ্তর সর্বশেষ মাসিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এ বছরের জুলাই মাসে। তাতে দেখা গেছে, পাঁচ মাস (মার্চ-জুলাই) ধরে ডিমের উৎপাদন বাড়ছে। মার্চে যেখানে উৎপাদন ছিল প্রায় ১৫৯ কোটি, জুলাই মাসে সেখানে হয়েছে প্রায় ২১০ কোটি ডিম।

কেবল তা-ই নয়, চলতি বছরের জুলাইয়ে যে পরিমাণ ডিম উৎপাদিত হয়েছে, তা সর্বশেষ চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে যেখানে ডিমের উৎপাদন ছিল ১৪০ কোটির বেশি, চলতি বছরের জুলাইয়ে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২১০ কোটি।

ডিম উৎপাদনের ভিন্ন তথ্য তুলে ধরছে এই খাতের বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজী ফার্মস। তাদের হিসাবে, ২০২২ সালের জুন মাস থেকে ধারাবাহিকভাবে দেশে ডিম উৎপাদন কমছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই মাসেও ধারাবাহিকভাবে কম ডিম উৎপাদিত হয়েছে। কাজী ফার্মসের হিসাবে, চলতি বছরের মার্চে দেশে ১১৮ কোটি ডিম এবং জুলাইয়ে হয়েছে প্রায় ১১৬ কোটি ডিম; অর্থাৎ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জুলাইয়ে ডিম উৎপাদনের যে হিসাব দিয়েছে, তার অনেক কম উৎপাদনের কথা বলছে কাজী ফার্মস।

সরকারি হিসাবে, ডিমের উৎপাদন বাড়ছে। বেসরকারি হিসাবে, কমছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এমন বিপরীতমুখী তথ্যের মধ্যে দেশে ডিমের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। পুষ্টিকর এই খাবার চলে গেছে স্বল্প আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর যে হিসাব প্রকাশ করে, তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে খোদ ওই অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যেই। নাম না প্রকাশের শর্তে এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব মনগড়া। সঠিক হিসাব না থাকায় সরকার আগাম কৌশল গ্রহণ করতে পারে না। সরকার যদি আগাম জানতে পারত এই পরিমাণ ডিমের ঘাটতি থাকবে, তাহলে উৎপাদন বাড়িয়ে কিংবা আমদানি করে ঘাটতি পূরণ করতে পারত। তা না হওয়ায় বাজারে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে। আর এর সুবিধা ভোগ করছে এই খাতের বড় বড় প্রতিষ্ঠান।

ঋণের চাপে আত্মহত্যা বাড়ছে

১০ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

ঝিনাইদহ শহর থেকে ১০ কিলোমিটারের পথ। মূল সড়ক পেরিয়ে ইট বিছানো রাস্তায় আধা কিলোমিটার পেরোলেই হলিধানী গ্রাম। শহর থেকে কাছের সুন্দর এ গ্রামের কেউ ব্যবসা করেন, কারও সংসার চলে কৃষিকাজে। দূর প্রবাসেও থাকেন কেউ কেউ। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের সংখ্যাই এখানে বেশি। কোনো রকমে কায়ক্লেশে চলছে তাদের সংসার। কঠিন জীবনের মুখোমুখি হয়ে বাধ্য হন এনজিও এবং মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিতে। আর এই ঋণের সুদ শোধ করতে না পেরে পড়েন কঠিন বিপদে। অপমান-অপদস্থ হয়ে দিন পার করেন তারা। ঋণের জ্বালা সইতে না পারাদের একজন ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম (৫৫)। শেষমেশ তিনি বেছে নেন আত্মহত্যার পথ। সুদের যন্ত্রণা তাঁর হৃদয় আঙিনা কতটা ক্ষতবিক্ষত করেছে, তা ফুটে উঠেছে জীবননাশের আগে লিখে যাওয়া চিরকুটের অক্ষরে অক্ষরে।

গত শুক্রবার চিরকুটে তিনি লেখেন, ‘সুদখোরদের অত্যাচারে বাঁচতে পারলাম না। আমার জায়গাজমি, বাড়ি সব বিক্রি করে দিয়েছি। একেকজনের কাছ থেকে যে টাকা নেওয়া, তার সাত-আট-দশ গুণ টাকা দিয়েও রেহাই দিল না তারা। কেউ কেস করেছেন, কেউ অপমান-অপদস্থ করেছেন। আমি আর সহ্য করতে পারছি না, তাই বিদায় নিলাম। আমার জানাজা হবে কিনা জানি না। যদি হয়, তখন সব সুদখোর টাকা চাইতে এলে আমার শরীরটাকে কেটে ওদের দিয়ে দেবেন। সুদখোরদের বিচার আল্লাহ করবে। সুদখোরদের নাম বললাম না, কিন্তু তারা সবাই টাকার জন্য আসবে। তখন বুঝতে পারবেন, তারা কারা। আমি ক্ষমার অযোগ্য, তবু ক্ষমা করে দেবেন।’

গতকাল শনিবার সিরাজুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, স্বজনের আহাজারি। তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ে। সিরাজের স্ত্রী সবুরা খাতুন বলেন, আমার স্বামী দীর্ঘদিন সৌদি আরবে ছিলেন। কয়েক বছর আগে দেশে ফিরে হলিধানী বাজারে একটি কনফেকশনারির দোকান দেন। হঠাৎ দুই ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়লে দোকান ছেড়ে দেন। এর মাঝে অনেক পাওনাদার তাঁকে হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিলেন। দুই বিঘা জমি ও বাড়ি বিক্রি করেও সুদ শোধ করতে পারলেন না।

ঋণ শোধ করতে না পেরে এ রকম আত্মহত্যার ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। আর প্রতিটি ঘটনার পেছনেই আছে উচ্চ সুদহারের ঋণ। এর সঙ্গে আগের মতো কাজ না পাওয়া। নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতিতে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ দিশেহারা। তারা ঋণ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে উচ্চ সুদহার তাদের আরও ঋণের ফাঁদে জড়িয়ে ফেলছে। ঋণের ফাঁদে শুধু নিম্নবিত্ত নয়, মধ্যবিত্তরাও আটকা পড়ছেন। প্রচলিত ব্যাংকের সুদহার কম হলেও সেখান থেকে ঋণ পাওয়া সহজ নয়। ফলে তারা উচ্চ সুদহারে অপ্রচলিত, ব্যক্তি খাত এবং এনজিও থেকে ঋণ নিচ্ছেন। ওই ঋণের সুদ আর কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে তারা এখন নাজেহাল। এমন পটভূমিতে আজ রোববার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘কর্মের মাধ্যমে আশা তৈরি করো’।

একের পর এক আত্মহত্যা

গতকালও নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে মাসুদ আলম নামের এক যুবক ঋণের চাপ সহ্য না করে আত্মহত্যা করেন। গত শুক্রবার কিশোরগঞ্জে লোকসানের কারণে ব্যবসা গুটিয়ে নেন রোকন উদ্দিন। ঋণে ছিলেন জর্জরিত। মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে কিশোরগঞ্জ শহরতলির চরশোলাকিয়া এলাকার নিজ বাড়িতে গলায় ফাঁস দিয়ে নিজের জীবন শেষ করে দেন।

এদিকে, গত বুধবার রাজশাহীর চারঘাটে মাছচাষি আবদুল কুদ্দুস এনজিও ঋণের চাপ সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেন। ৩০ আগস্ট কুমিল্লার তিতাসের কড়িকান্দি বাজারের কলা ব্যবসায়ী মোশারফ হোসেন এনজিও ঋণের চাপে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছিলেন মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার তাসলিমা আক্তার (৩৬)। কিস্তির জন্য মঙ্গলবার চাপ দিয়েছিলেন কর্মকর্তারা। এতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। এনজিওসহ নানাজনের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন গাজীপুরের কাপাসিয়ার খোকন আকন্দ। পাওনাদারদের চাপ সইতে না পেরে গত বুধবার গলায় ফাঁস দেন তিনি।

সাম্প্রতিক সময়ে ঋণের চাপে প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। গত তিন মাসে গণমাধ্যমের সংবাদ পর্যবেক্ষণ করে ঋণের চাপে ২৮টি আত্মহত্যার ঘটনা খুঁজে পাওয়া গেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ, দুর্গম এলাকার ঘটনা গণমাধ্যমে অনেক সময় উঠে আসে না।

এনজিওর ঋণের জাল

এনজিও ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে দেশীয় এনজিওর সংখ্যা ২ হাজার ৩১৮। এর মধ্যে অধিকাংশেরই আছে ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি। এ ছাড়া গ্রামে গ্রামে আছে মাল্টিপারপাস কোম্পানি; আছে নানা সমিতিও। সূত্র জানিয়েছে, দেশের ৩ কোটি ৫২ লাখের বেশি পরিবার ক্ষুদ্রঋণ পরিষেবার আওতায় রয়েছে। বেশ কয়েকটি জেলার বিভিন্ন গ্রামের এনজিওর ঋণগ্রহীতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঋণ নেওয়ার পরের সপ্তাহ থেকে কিস্তি আদায় শুরু হয়। কৃষকের জমিতে ফসল ভালো না হলেও ঋণগ্রহীতাকে ঘরের গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, ঘটি-বাটি বিক্রি করে সাপ্তাহিক কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। যখন তাতেও কুলায় না, তখন ভিটেমাটি ও ঘর বিক্রি করতে হয়। এমনও বহু ঘটনা ঘটেছে যে কিস্তি আদায়কারীরা ঋণের দায়ে ঋণগ্রহীতার ঘর ভেঙে নিয়ে গেছে। এ বীভৎসতায় আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে। ঋণ নেওয়ার সময় ব্যাংক চেক জমা নেওয়া হয়। আর কিস্তি দিতে দেরি হলেই সেই চেক ডিজঅনার দেখিয়ে মামলা দেওয়া হয়।

মহাজন ও সমিতি থেকে চড়া সুদে টাকা নিয়ে বিপাকে মানুষ

গত ৯ জুলাইয়ের ঘটনা। বগুড়ার গাবতলীতে সুদের টাকা পরিশোধ করতে না পারায় গৃহবধূকে আটকে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে দাদন ব্যবসায়ী গোলজারের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় অপমানে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন ওই গৃহবধূর দিনমজুর স্বামী আবদুল মালেক (৪০)।

গ্রামে গ্রামে গজিয়ে ওঠা সমিতি বা সুদের কারবারিদের কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়ে অনেকেই চাপে পড়েন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সমিতি থেকে ১০ হাজার টাকা সুদে ঋণ নিয়ে মানুষকে সপ্তাহে ৩০০ টাকা করে ৪০ কিস্তি দিতে হয়। টানা দুই সপ্তাহ টাকা দিতে না পারলে অতিরিক্ত এক সপ্তাহের টাকা গুনতে হয়।

ফেনীর সোনাগাজীর কৃষক আবদুল ওহাব সুদে টাকা নিয়ে চাষবাস করেন। কেন মহাজনের কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়েছেন– তাঁর যুক্তি, ‘ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া অনেক কঠিন। দ্রুত সার বা সেচের পানি যখন দিতে হয়, তখন কোথায় টাকা পাব? সুদের টাকা সময়মতো পরিশোধ করতে না পারলে চাপ দেওয়া হয় জেনেও টাকা নিয়েছিলাম। মজুরি বা অন্য কোনো কাজ করে টাকা শোধ করতে হয়।’

নোয়াখালীর সুবর্ণচরের পূর্বচরবাটা গ্রামের কৃষক সাইফুল ইসলাম এবার তিন একর জমিতে আমন চাষ করেছেন। এ জন্য তিনি গ্রামের মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন ১০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, গায়ে-গতরে খেটে চাষ করলে খরচ পুষিয়ে যায়। তবে চাষের খরচ সামলাতে ঋণের ফাঁদে জড়িয়ে যাচ্ছি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বলেন, গ্রামগঞ্জের ৯০ শতাংশ ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংস্থা অনুমোদনহীন। আবার যাদের লাইসেন্স আছে, তারাও ক্ষুদ্রঋণের কোনো নীতিমালা অনুসরণ করে না। তাই তাদের নীতিমালার মধ্যে আনা উচিত।

লোকসানি বিআরটিসি মুনাফায়

১০ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

সরকারি বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের মতো লোকসানে ধুঁকতে থাকা সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) ঘুরে দাঁড়িয়েছে। হাজার কোটি টাকা ঋণের ভারে ন্যুব্জ প্রতিষ্ঠানটি এখন লাভের মুখ দেখেছে। ধারাবাহিক মুনাফা করছে। গত তিন বছরে বহরে নতুন বাস ও ট্রাক যোগ না হলেও আয় আড়াই গুণ বেড়েছে। একসময় আট মাস বকেয়া পড়লেও ৮৭৩ জন নতুন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের পরও টানা আড়াই বছর নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন বিআরটিসির কর্মীরা। অপরাধের শাস্তিও পেতে হচ্ছে।

বিআরটিসির বদলে যাওয়ার চিত্র পাওয়া গেল প্রতিষ্ঠানটির নথিতে। ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠার পর মাঝে কয়েক বছর বাদ দিয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত নিয়মিত লোকসান গুনেছে প্রতিষ্ঠানটি। বাস ও ট্রাক কেনায় সরকারি ও বিদেশি ঋণের ১ হাজার ১০৭ কোটি টাকা বকেয়া পড়েছে। সরকারের কিনে দেওয়া বাস-ট্রাক চালিয়ে যে আয় হয়, তা দিয়ে চলতে হয় সংস্থাটিকে।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২৫৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা আয়ের বিপরীতে বিআরটিসির খরচ ছিল ২৬৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। সেই বছর লোকসান ৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। ৯ মাস বেতন বকেয়া পড়ায় ২০১৯ সালের ৯ জানুয়ারি রাজধানীর জোয়ার সাহারা ডিপোতে তালা দেন চালক-শ্রমিকরা। ১৬ মাসের বেতন বকেয়া পড়েছিল নারায়ণগঞ্জ ডিপোতে।

ঘুরে দাঁড়ানো শুরু

২০১৯-২০ অর্থবছরে বাস, ট্রাক, ওয়ার্কশপ এবং প্রশিক্ষণ থেকে ৩৪৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকা আয়ের বিপরীতে পরিচালন ব্যয় হয় ৩৪৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। ফলে ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা মুনাফা হয়। ওই মুনাফার কারণ ছিল ভারতের ঋণে (এলওসি) ৫৮১ কোটি টাকায় ৬০০টি বাস এবং ২১৭ কোটি টাকায় ৫০০টি ট্রাক কেনা। পরিচালনায় মুনাফা হলেও তখন পর্যন্ত ঋণের কিস্তি শোধ করতে পারেনি সংস্থাটি।

২০২১-২২ অর্থবছর থেকে বিআরটিসি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। এই সময়ে বহরে নতুন বাস ও ট্রাক যুক্ত না হলেও ওই অর্থবছরে রেকর্ড ৪৭৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা আয় করে। বিপরীতে খরচ হয় ৪৪০ কোটি ১৫ লাখ টাকা। মুনাফা হয় ৩৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এই রেকর্ড ভেঙেছে ২০২২-২৩ অর্থবছরে। গত অর্থবছরে ৬৩১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা আয় করেছে সংস্থাটি। খরচ হয়েছে ৫৮৪ কোটি ৭ লাখ টাকা। মুনাফা হয়েছে ৪৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা।

সরকারি প্রতিষ্ঠান হয়েও বিআরটিসি কীভাবে মুনাফা করছে, তা জানতে সংস্থাটির মতিঝিলের প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, এখানকার চেহারাও বদলে গেছে। ভবনের নিচতলায় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মতো চকচকে অভ্যর্থনা কক্ষ তৈরি হয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুবিশাল কক্ষটি নানা উপকরণে সুজ্জিত।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিআরটিসিতে যোগ দেন বর্তমান চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম। তিনি জানালেন, চেয়ারম্যান পদে যোগদানের আগের ১৫ দিন পরিচয় গোপন করে ডিপোতে ডিপোতে ঘোরেন। ১১১টি সমস্যা চিহ্নিত করেন।

অপরাধের শাস্তি পেতে হয়

বিআরটিসিতে অনিয়ম-দুর্নীতির সাজার নজির ছিল না। সাজা দিলেও তা প্রত্যাহার হতো। সমকালে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, অনিয়ম প্রমাণিত হলেও ২০১৯ সালের ২৭ আগস্ট তিন কর্মকর্তাকে শাস্তি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই সময়ে ছয়জনের শাস্তি কমিয়ে দেওয়া হয়। তবে এ নজির থেকে বেরোতে পেরেছে বিআরটিসি। গত আড়াই বছরে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাসহ ৩৭ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

২০২১ সালে বিআরটিসিতে ৮৭টি বিভাগীয় মামলা হয়। এতে ১৬ জনকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

পদানবতি, বেতন কর্তনসহ বিভিন্ন শাস্তি দেওয়া হয় ২৮ জনকে। ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ১৯ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়। গত আড়াই বছরে ২১০টি মামলার ১৬৭টি নিষ্পত্তি হয়েছে। মোট ৬৮ জনকে পদানবতি, বেতন কর্তনসহ বিভিন্ন শাস্তি দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরেই ৪২টি মামলায় ২০ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

তাজুল ইসলাম বলেন, শাস্তি দেওয়া মূল উদ্দেশ্য নয়। অনিয়ম করে পার পাওয়া যাবে না– এই বার্তা দেওয়াই লক্ষ্য। তা পূরণও হচ্ছে। আগে মাসে বিআরটিসির ৬০-৬৫ বাস বছরে ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানা গুনত। গত বছরে দু’বার জরিমানা হয়েছে।

ভাঙা গাড়ির জঞ্জালমুক্ত

২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিআরটিসির বহরে বাসের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৮২৪টি। কিন্তু সচল গাড়ি ছিল ১ হাজার ২১০টি। এর মধ্যে অনরুট অর্থাৎ সড়কে চলত মাত্র ৮৮৫টি। হাজারখানেক বাস অচল, নয়তো অলস বসেছিল। চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত বিআরটিসির বাসের সংখ্যা ১ হাজার ৩৫০টি। এর মধ্যে সচল ১ হাজার ২৪৮টি। অনরুট বাস অর্থাৎ সড়কে চলছে ১ হাজার ২০৩টি। লিজে চলছে ৩৮টি বাস।

৪৭৪টি বাস কোথায় গেল– প্রশ্নে বিআরটিসির চেয়ারম্যান জানালেন, অচল ও মেরামত অযোগ্য ছিল। বিক্রি করে দিয়ে জঞ্জাল কমিয়েছেন। তাজুল ইসলাম বলেন, এসব অচল বাস ডিপোতে জায়গা দখল করে রাখায় নতুন কেনা কোটি টাকার বাস রাস্তায় খোলা আকাশের নিচে রাখতে হতো। রোদ-বৃষ্টিতে নষ্ট হতো। অচলগুলো বিক্রি করায় নতুন বাস ডিপোতে সুরক্ষিত থাকে। এতে মেরামত খরচও কমেছে।

২০২০ সালের ডিসেম্বরে বিআরটিসিতে ট্রাকের সংখ্যা ছিল ৫৯০টি। বর্তমানে আছে ৫৮৫টি। এর মধ্যে ৫০০টি চলছে। ৭৯টি মেরামত অযোগ্য। বিক্রি করে দেওয়া হবে।

গাড়ি চালানোর ‘অনীহা’ কেটেছে

বাস ও ট্রাকের ভাড়া আয়ের প্রধান উৎস হলেও বিআরটিসির গাড়ি চালাতে আগ্রহ ছিল না। ২০১৬ সালের ৬ আগস্টের নথি অনুযায়ী, ওই সময় সচল বাসের ১ হাজার ৪৯টি বাসের অর্ধেক দৈনিক সড়কে চলত। এর আগে দুই বছরে এক দিন সর্বোচ্চ ৮২১টি বাস পথে নেমেছিল। সর্বনিম্ন ৪০৬টি বাস চলার নজির আছে। বাকি ছয় শতাধিক বাস ডিপোতে অলস বসে থাকত। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের একাধিকবার এ নিয়ে ক্ষোভ জানালেও ফল হয়নি।

অভিযোগ ছিল, বিআরটিসির কর্মকর্তারা বেসরকারি মালিকদের সঙ্গে যোগসাজশে বাস বসিয়ে রাখতেন। সংস্থাটি সেই ধারা থেকে বের হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ৯৬ শতাংশ বর্তমানে নিয়মিত সড়কে চলছে।

বিআরটিসির লাভের খবর জানানোর পর গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সামছুল হক সমকালকে বলেছেন, নিয়ম মেনে চললে লাভ করার কথা। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় কয়েকজন মালিক মিলে একটি বাস চালিয়ে  মুনাফা করেন। ২ হাজার বাস ও ট্রাক থাকার পরও বিআরটিসির লোকসান করার কারণ ছিল না। বসিয়ে রেখে ইচ্ছা করে লোকসান করা হতো।

ট্রাকের আয় বেড়েছে, বাসে মুনাফা

২০২০-২১ অর্থবছরে বাস চালিয়ে বিআরটিসি আয় করেছিল ২৩৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। বাসের সংখ্যা না বাড়লেও গত অর্থবছরে আয় করেছে ৪১১ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। বাস পরিচালনায় ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয়েছে ৩৮৬ কোটি ৫৫ লাখ। মুনাফা করেছে ২৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।

ট্রাক থেকে আগেও মুনাফা করত বিআরটিসি। ২০২০-২১ অর্থবছরে ট্রাক থেকে সংস্থাটির আয় ছিল ১০৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয় করেছে ১৭১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। ব্যয় হয়েছে ১৫২ কোটি ২৪ লাখ টাকা। মুনাফা হয়েছে ১৯ কোটি ২১ লাখ টাকা।

রাজধানীর কল্যাণপুর ডিপোর ম্যানেজার নূর-ই-আলম সমকালকে বলেছেন, গত আড়াই বছরে স্বচ্ছতা এসেছে। ব্যয় সংকোচন করা হয়েছে। তাই আয় বেড়েছে। নিয়মিত বেতন দিয়েও মুনাফা করা সম্ভব হয়েছে।

সড়ক পরিবহন সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, বিআরটিসি ভালো করছে। তবে আরও ভালো করা সম্ভব।

গাড়ি বেড়েছে, কমেছে মেরামত খরচ

নথি অনুযায়ী, ২০২১ সালে অনরুট ৮৮৫ বাসের নিয়মিত মেরামতে বছরে ৬৬ কোটি টাকা খরচ হতো। বর্তমানে ১ হাজার ২০০ বাসের নিয়মিত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে খরচ ৪২ কোটি টাকা। ব্যয় কীভাবে কমল– প্রশ্নে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘তিন নম্বর টায়ার লাগিয়ে এক নম্বরের বিল নেওয়া হতো। শ্রমিক-কর্মচারীদের খুব একটা দোষও নেই। তারা বেতন পেতেন না। অনিয়ম না করলে কীভাবে সংসার চালাবেন?’

২০১৬ সালের ২ জুলাইয়ের নথি অনুযায়ী, সেই বছর চট্টগ্রাম ডিপোতে ১৮ হাজার টাকার রং গাড়িতে লাগাতে ৫৩ হাজার টাকা খরচের ভাউচার জমা হয়। গাজীপুর ডিপোতে গাড়ি মেরামতে ৫৬ লাখ টাকা বরাদ্দ হলেও বাস সচল ছিল না। ২০১৬ সালের এপ্রিলে মন্ত্রীর পরিদর্শনে তা হাতেনাতে ধরা পড়ে।

বিআরটিসির জন্য ২০১৯ সাল পর্যন্ত কেনা অধিকাংশ বাস ও ট্রাকের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাসের আয়ুষ্কাল ২০ বছর ধরা হলেও বিআরটিসির বাস পাঁচ বছরও টেকে না। ২০০৯ সালে ১২২ কোটি টাকায় ২৭৯টি বাস কেনা হয়। সেগুলোর ১২৫টি সচল। ২০১৩ সালে ২৮২ কোটি টাকায় আনা হয় দক্ষিণ কোরিয়ার দাইয়ু কোম্পানির ২৫৫টি বাস। প্রতিটি বাসের দাম পড়ে কোটি টাকার বেশি। কারিগরি শাখার তথ্য অনুযায়ী, এর ৮১টি ছয় বছরের মধ্যে মেরামতের অযোগ্য হয়ে পড়ে।

৩৩ লাখ টাকার যন্ত্রাংশ ৪০ হাজারে তৈরি

২০১৩ সালে ভারত থেকে কেনা ৫০টি আর্টিকুলেটেড বাসের ৪৪টি বিকল হয়ে যায়। প্রতিটি বাসের দাম পড়েছিল ১ কোটি ১১ লাখ টাকা। তাজুল ইসলাম জানান, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার সময় মাত্র ছয়টি বাস সচল ছিল। গত বছর ২১টি আর্টিকুলেটেড বাস সচল করা হয়েছে। আরও আটটি সচলের অপেক্ষায়।

আর্টিকুলেটেড বাসের মাঝে রাবার বেলোস নামের জোড়া থাকে। এই জোড়া খুলে যাওয়ায় বাসগুলো বিকল হয়ে যায়। মেরামত সম্ভব হলেও রাবার বেলোস মেরামত করা যাচ্ছিল না। কারিগরি শাখা জানিয়েছে, প্রতিটি রাবার বেলোসের দাম ৩৩ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। ভারত থেকে আনতে হয়। সেই রাবার বেলোস গাজীপুরের ওয়ার্কশপে বিআরটিসির পরিচালক (কারিগরি) কর্নেল মো. জাহিদ হোসেনের টিম ৪০ হাজার ৬৯৯ টাকায় তা তৈরি করেছে। তাজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ওয়ার্কশপটিকে বিশ্বমানে উন্নীত করার সুযোগ রয়েছে।

পেনশনও মিলছে

বাস-ট্রাকের আয়ের টাকা প্রতিদিন জমা দেওয়ার নিয়ম বিআরটিসিতে মানা হতো না। ডিপো ম্যানেজাররা হাতে রাখতেন। ২০১৬ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, আট কোটি টাকার বেশি জমা হয়নি। ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সংস্থাটিতে বকেয়া বেতন ছিল ২০ কোটি ২১ লাখ টাকা। গত ৩০ জুন পর্যন্ত এর মধ্যে ১২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। ৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা বকেয়া থাকার বিষয়ে তাজুল ইসলাম বলেছেন, এগুলো সব আগের। গত আড়াই বছরে মাসের ১ তারিখে বেতন হচ্ছে। আগের বকেয়াসহ অনেকে এখন একসঙ্গে দুই মাসের বেতন পাচ্ছেন।

চাকরি শেষে পেনশন গ্র্যাচুইটি না পাওয়া বিআরটিসিতে সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ২৩১ জন কর্মীর গ্র্যাচুইটির ২৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বকেয়া ছিল। এখনও বকেয়া ২২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। তাজুল ইসলাম বলেছেন, আড়াই কোটি টাকার বেশি দেওয়া হয়েছে। বিআরটিসি যে ধারায় চলছে, তা অব্যাহত থাকলে কিছুই বকেয়া থাকবে না। চালক-শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ভাতা দেওয়া হচ্ছে। ফলে তারা বৈধভাবেই বাড়তি টাকা পাচ্ছেন।

আর্থিক সংকটের সময় দেশে বিলিয়নেয়ার আরো বেড়েছে

সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৩, বণিক বার্তা

লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, ক্ষয়িষ্ণু রিজার্ভ, রেমিট্যান্সে ভাটাসহ সামষ্টিক অর্থনীতির নানামুখী সংকটের মুখে রয়েছে বাংলাদেশ। প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে সরকার ও সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। এমন অবস্থায়ও একশ্রেণীর মানুষের ধনসম্পদ আরো ফুলে-ফেঁপে উঠছে। সুইজারল্যান্ডের ইউবিএস ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশীয় মুদ্রায় ১০০ কোটি টাকার কাছাকাছি বা এর ওপরে সম্পদশালী ব্যক্তির সংখ্যা বাংলাদেশে প্রায় এক হাজার ৭০০, যাদের মোট সম্পদের পরিমাণ ৪০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে, স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ চার লাখ কোটি টাকার বেশি। যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০ শতাংশ।

এক বছরের বেশি সময় ধরে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে। সর্বশেষ গত আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। ডলার সংকটের কারণে চাহিদা অনুসারে আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। এতে আমদানির পরিমাণ কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। ফলে উৎপাদনমুখী শিল্পের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ক্রমাগত ক্ষয়ের কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি ক্রমেই নাজুক হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে (বিপিএম৬) দেশের রিজার্ভ এখন ২ হাজার ১৭০ কোটি ডলার বা ২১ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান খাত রফতানিতে গত অর্থবছরে প্রত্যাশিত হারে প্রবৃদ্ধি হয়নি। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম আরেক খাত রেমিট্যান্স পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক নয়। গত অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে নামমাত্র প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রেমিট্যান্সের পরিমাণ কমেছে। দেশের ব্যাংক খাতের পরিস্থিতিও নাজুক। সুশাসনের ঘাটতির পাশাপাশি খেলাপি ঋণ খাতটির জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি ২ লাখ ১২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ১৪ দশমিক ৪০ শতাংশ। তবে অর্থনীতির এসব সংকটের আঁচ লাগছে না দেশের বিলিয়নেয়ারদের গায়ে।

ব্যবসায়িক কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সম্পদশালীদের তথ্য সংগ্রহ করে থাকে জুরিখভিত্তিক ক্রেডিট সুইস ব্যাংক। প্রায় দেড় দশক ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সম্পদশালীদের আর্থিক পরিসংখ্যান নিয়ে ডাটাবেজ তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা উইং, যা প্রকাশ হয় গ্লোবাল ওয়েলথ রিপোর্ট শিরোনামে। তবে এ বছর ক্রেডিট সুইসকে অধিগ্রহণ করে নেয় সুইজারল্যান্ডের আরেক ব্যাংক ইউবিএস। ফলে এবার বিশ্বের সম্পদশালীদের ডাটাবেজ প্রকাশ করেছে ইউবিএস ব্যাংক। ডাটাবেজটির সর্বশেষ প্রকাশিত ২০২৩ সালের সংস্করণে দেখা যায়, ২০২২ সাল শেষে দেশে ৫০ কোটি ডলার বা সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার (প্রতি ডলার ১১০ টাকা ধরে) বেশি পরিমাণের সম্পদ আছে ২২ ব্যক্তির কাছে। যেখানে ২০২১ সাল শেষে এ ক্যাটাগরির সম্পদশালীর সংখ্যা ছিল ২১ জন। ১০ কোটি থেকে ৫০ কোটি ডলার বা ১ হাজার ১০০ কোটি থেকে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে ৪৪ জনের কাছে। ২০২১ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪৩ জন।

২০২২ সাল শেষে বাংলাদেশে ৫ থেকে ১০ কোটি ডলার বা ৫৫০ কোটি থেকে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদ ছিল এমন ব্যক্তির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ জনে, যা ২০২১ সালে ছিল ৩৯ জন। ১ থেকে ৫ কোটি ডলার বা ১১০ থেকে ৫৫০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে এমন ব্যক্তির সংখ্যা ২০২২ সাল শেষে ছিল ৪২৩ জন। যেখানে ২০২১ সালে এ ক্যাটাগরির সম্পদশালীর সংখ্যা ছিল ৪০০ জন। সব মিলিয়ে দেশে ১১০ কোটি থেকে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি সম্পদ রয়েছে এমন ব্যক্তির সংখ্যা ২০২২ সাল শেষে ৫২৯ জনে দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালে এ সংখ্যা ছিল ৫০৩ জন। দেখা যাচ্ছে এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশে শতকোটি টাকার বেশি সম্পদ রয়েছে এমন ব্যক্তির সংখ্যা বেড়েছে ২৬ জন। এর মধ্যে ১১০ কোটি থেকে ৫৫০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে এমন ব্যক্তির সংখ্যা বেড়েছে সবচেয়ে বেশি ২৩ জন। ইউবিএসের প্রতিবেদনে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি ডলারের সম্পদ রয়েছে এমন বাংলাদেশীর সংখ্যা ২০২২ সাল শেষে ১ হাজার ১৫৬ জনে দাঁড়িয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২১ সাল শেষে যা ছিল ১ হাজার ১২৫ জন। বর্তমান বিনিময় হার বিবেচনায় নিলে ৯০ লাখ ৯১ হাজার ডলারের সম্পদ থাকলে বাংলাদেশী মুদ্রায় তা ১০০ কোটি টাকায় দাঁড়াবে। ফলে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি ডলারের সম্পদ থাকা ১ হাজার ১৫৬ জন ব্যক্তির মধ্যে কিছুসংখ্যক শত কোটিপতির তালিকায় স্থান পাবে। এতে প্রকৃত হিসাবে বাংলাদেশের শত কোটিপতির সংখ্যা ৫২৯ জনের বেশি হবে। স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে ২০২১ সালে এসব সম্পদশালীর টাকার অংকে সম্পদের পরিমাণ ২০২২ সালের তুলনায় কিছুটা কম ছিল।

ব্যাংক খাতে অস্বস্তি বাড়ছে

১১ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

ডলার সংকটের মধ্যে ব্যাংক খাতে চলছে টাকার টানাটানি। দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে অনেক ব্যাংক নিয়মিত ধার করছে। এর পরও কিছু ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিধিবদ্ধ নগদ জমা (সিআরআর) রাখতে পারছে না। এই সংকটের মূলে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আস্থাহীনতা ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের শর্ত অনুযায়ী খেলাপি ঋণ কমানো ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা নিয়ে চাপে রয়েছে ব্যাংক খাত। এমন সময়ে একের পর এক পদত্যাগ করছেন বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। এ নিয়ে ব্যাংক খাতে তৈরি হয়েছে নতুন অস্বস্তি।

মালিকানা বদল বা পরিচালকদের চাপে পড়ে ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে কয়েকটি ব্যাংকের এমডি পদত্যাগে বাধ্য হন। করোনা শুরুর পর ২০২০, ২০২১ ও ২০২২ সালে ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত শিথিলতা। তখন এমডিদের ওপর তেমন চাপ ছিল না বলে মনে করা হয়। ওই তিন বছরে পদত্যাগ করেন একজন এমডি। তবে চলতি বছর যেন এমডিদের পদত্যাগের হিড়িক পড়েছে।

গত ১৬ জানুয়ারি ন্যাশনাল ব্যাংকের কর্তৃত্বে থাকা ‘সিকদার পরিবার’-এর চাপে পদত্যাগ করেন ব্যাংকটির এমডি মেহমুদ হোসেন। এর পর গত জুলাইয়ে পদত্যাগ করেন ব্যাংক এশিয়ার এমডি আরিফ বিল্লাহ আদিল চৌধুরী। গত সপ্তাহে পদত্যাগ করেন পদ্মা ব্যাংকের এমডি তারেক রিয়াজ খান এবং সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের এমডি হাবিবুর রহমান। এত কম সময়ে চার এমডির পদত্যাগ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। এসব এমডি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করলেও পরিচালকদের চাপেই তারা পদ ছাড়তে বাধ্য হন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

খাদ্য মূল্যস্ফীতি সাড়ে ১১ বছরে সর্বোচ্চ, মানুষের কষ্ট আরও বাড়ল 

১১ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ যে তথ্য গতকাল রোববার প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি সাড়ে ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। বিবিএসের হিসাবে, গত আগস্ট মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা গত ১১ বছর ৭ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১২ দশমিক ৭৩ শতাংশে উঠেছিল। এক দশকের মধ্যে গত আগস্ট মাসে হঠাৎ খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রথমবারের মতো দুই অঙ্কের ঘরে উঠে যায়। বিবিএস ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, দুই মাস কিছুটা কমার পর গত আগস্ট মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির হার এখন প্রায় ১০ শতাংশ ছুঁই ছুঁই করছে। জুলাই মাসে যেখানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ, আগস্টে তা বেড়ে হয়েছে ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ। সেই তুলনায় খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যআগস্টে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ হওয়ার মানে হলো, ২০২২ সালে আগস্টে একজন মানুষ যে পণ্য ও সেবা ১০০ টাকায় কিনতেন, চলতি বছরের আগস্টে একই পণ্য কিনতে তাঁর খরচ হয়েছে ১০৯ টাকা ৯২ পয়সা।স্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ।

মানুষ কুলিয়ে উঠতে পারছে না

১২ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

কোনো জরিপ না করেই বলা যায়, বর্তমানে দেশের প্রধান সমস্যা দ্রব্যমূল্যের অসহনীয় ঊর্ধ্বগতি। সাম্প্রতিক একটি জরিপের ফলাফলও তাই। এশিয়া ফাউন্ডেশন এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) পরিচালিত দেশব্যাপী ১০ হাজার মানুষের ওপর এক জরিপে ৯৭ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামবৃদ্ধি তাদের জীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর মধ্যে ৮৪ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছে, এই প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক।

জরিপটি করা হয় গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারির মধ্যে। তখন সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ শতাংশের কাছাকাছি। এখন তা প্রায় ১০ শতাংশ। ফলে বাজারের উত্তাপ এবং টিকে থাকার কষ্ট এখন আরও বেড়েছে। নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক দরের সঙ্গে সমাজের বেশির ভাগ মানুষ কুলিয়ে উঠতে পারছে না। গরিব ও  নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর জিনিসপত্রের বাড়তি দামের চাপ আরও বেশি। কেননা তাদের ব্যয়ের বেশির ভাগ অংশ খাদ্য কিনতে ব্যয় হয়। বিবিএসের সর্বশেষ  হিসাবে আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা প্রায় একযুগের মধ্যে সর্বোচ্চ।

দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ব্যাখ্যায় অর্থমন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ নীতিনির্ধারকরা কয়েক মাস ধরে বিশ্ববাজারকে দায়ী করছেন।

কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারদর পর্যবেক্ষণের বিভিন্ন প্রতিবেদন বলছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এখন বিশ্ববাজারে বেশির ভাগ পণ্যের দাম কম। সর্বশেষ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টে খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক মূল্যসূচক দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য কমতে থাকায় এবং এর সঙ্গে নিজেদের ব্যবস্থাপনার দক্ষতার মাধ্যমে অনেক দেশ সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি কমাতে পেরেছে। বাংলাদেশে কমছে না, বরং বাড়ছে। চরম সংকটে পড়ে শ্রীলঙ্কার  মূল্যস্ফীতি  এক বছর আগে ৭০ শতাংশে উঠেছিল। গত জুলাই মাসে তাদের মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশে নেমেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডসহ বেশ কিছু দেশ বেড়ে যাওয়া মূল্যস্ফীতি বাগে আনতে পেরেছে। যারা মূল্যস্ফীতি কমিয়েছে, তাদের বেশির ভাগই বাজারে চাহিদা কমানোর পদক্ষেপ নিয়ে বিশেষত সুদের হার বাড়িয়ে এ ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। বাংলাদেশেও গত মুদ্রানীতিতে সুদের হার বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আর আগে থেকেই আমদানি নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ ছিল। সরকারের ব্যয় সংকোচনেরও নানা উদ্যোগ ছিল। তারপরও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। বাজারে একেক সময় একেক পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে মানুষের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সম্প্রতি এমন পণ্যের মধ্যে রয়েছে আলু, ডিম, পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি।

সরকারি ঋণের ৩৮% প্রবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা কি

সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৩, বণিক বার্তা

বৈদেশিক বাণিজ্যের চাপ সামলাতে আমদানি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিও এক অংকের ঘরে নেমে এসেছে। যদিও সরকারি ঋণের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে বিপরীত চিত্র। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই-পরবর্তী এক বছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ বেড়েছে ৩৮ শতাংশের বেশি। এ সময়ে সরকারের নেয়া ১ লাখ ৭ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা নিট ঋণের সিংহভাগের জোগান দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্পদ সৃষ্টি না হলেও নতুন টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ দেয়ার এ নীতি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে কিনা, সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন অর্থনীতিবিদরা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুসারে, গত অর্থবছরে দেশে মূল্যস্ফীতির গড় হার ছিল ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ, যা এক যুগে সর্বোচ্চ। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই ও আগস্ট) মূল্যস্ফীতির হার আরো বেড়েছে। জুলাইয়ে ৯ দশমিক ৬৯ শতাংশের পর আগস্টে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৯২ শতাংশে। বাংলাদেশে ঊর্ধ্বমুখী হলেও বিশ্বের অন্যান্য দেশে মূল্যস্ফীতির হার এখন নিম্নমুখী। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দামও নেমে এসেছে এক বছর আগের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আমদানি কমানোর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনীতিতে পণ্যের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার রেকর্ড অবমূল্যায়নের বিরূপ প্রভাবও বাজারে পড়েছে। আবার সরকারের আয়ের উৎসগুলোও সংকুচিত হয়ে এসেছে। কমেছে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে ঋণপ্রাপ্তিও। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে সরকারকে যে ঋণ দিয়েছে, সেটি মূল্যস্ফীতি উসকে দেয়ায় বড় ভূমিকা রাখছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে সরকারের ঋণ গ্রহণ ও ব্যয় কমাতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিধারা এখন খুবই খারাপ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌অর্থের সংকট সত্ত্বেও সরকার একের পর এক মেগা প্রকল্প নিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণের জোগান দিচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড চলতে থাকলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। আবার কোনো দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে যেসব উদ্যোগের মাধ্যমে সেটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়, বাংলাদেশে সে ধরনের কোনো উদ্যোগই নেয়া হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিটি পণ্যের দাম কমেছে। কিন্তু দেশের বাজারে তার কোনো প্রভাব নেই। যেসব পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে, সেগুলো আর কমবে বলে মনে হয় না। কারণ দেশের বাজার ব্যবস্থার ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনো ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল করতে পারেনি। কার্ব মার্কেটের সঙ্গে ব্যাংকে ডলারের দরে ১০ টাকার ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এটি চলতে থাকলে অর্থনীতি আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

দুই বছর আগে আর্থিক সংকটে পড়ে ক্রমাগত রুপি ছাপিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করেছিল শ্রীলংকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সম্পদ সৃষ্টি না করেই নতুন মুদ্রা ছাপানোর প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছে দেশটির সাবেক রাজাপাকসে সরকারকে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে শ্রীলংকার মূল্যস্ফীতি ঠেকেছিল প্রায় ৬০ শতাংশে। বিপর্যয়কর সে পরিস্থিতি সামাল দিতে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী নীতি গ্রহণ করে গভর্নর পি নন্দলাল বীরাসিংহের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সুদের হার এক ধাক্কায় ১০ শতাংশ বাড়িয়ে মুদ্রা সরবরাহের লাগাম টেনে ধরা হয়। আর্থিক খাতের সংস্কারে নেয়া হয় নানামুখী উদ্যোগ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেয়া উদ্যোগের সুফল এরই মধ্যে পেতে শুরু করেছে শ্রীলংকার জনগণ। গত মাসে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্রটির সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার নেমে আসে মাত্র ৪ শতাংশে।

অন্যদিকে বাংলাদেশে নতুন টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ নেয়ার নীতি চালু রয়েছে এখনো। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ২৪ হাজার ১২২ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ৭৮ হাজার ১৪০ কোটি টাকা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য স্থির করেছে। অন্যান্য উৎস থেকে সরকারের আরো ১ লাখ ২ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার কথা রয়েছে। তবে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বলছে, সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ঋণ দেয়ার সক্ষমতা এ মুহূর্তে দেশের ব্যাংক খাতের নেই। আবার সঞ্চয়পত্র বিক্রিসহ দেশের অভ্যন্তরীণ অন্যান্য উৎস থেকেও পরিকল্পনা অনুযায়ী ঋণ নেয়া সম্ভব হবে না। বিদেশী উৎস থেকেও সরকারের ঋণপ্রাপ্তি কমে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি বছরের শেষে কিংবা আগামী বছরের প্রথম সপ্তাহে দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকারের বিভিন্নমুখী ব্যয় আরো বাড়বে। এক্ষেত্রে সরকারের ব্যয় নির্বাহে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরো বেশি হারে নতুন টাকা ছাপাতে হবে। সেটি হলে দেশে মূল্যস্ফীতির হার আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই শেষে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেয়া ঋণের স্থিতি ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ২০২২ সালের জুলাইয়ে এ ঋণের স্থিতি ছিল ২ লাখ ৮১ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে সরকারের ব্যাংকঋণ স্থিতি ১ লাখ ৭ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা বেড়েছে। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধিতে উল্লম্ফন হলেও দেশের বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ১ অংকের ঘরে নেমে গেছে। জুলাই শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯ দশমিক ৮২ শতাংশ। যদিও দেশের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সিংহভাগই বেসরকারি খাতনির্ভর।

৮৪% মানুষের জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি

৩০ আগস্ট, ২০২৩, দৈনিক বাংলা

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভুল পথে যাচ্ছে বলে মনে করেন আগের চেয়ে অনেক বেশি মানুষ। অন্যদিকে বেশির ভাগ মানুষ বলেছেন, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি তাদের জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।

দেশের মানুষের এই মতামত উঠে এসেছে দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক জরিপে। এতে বলা হয়, অর্থনীতির ক্ষেত্রে দেশের ভুল পথে যাওয়ার কথা বলেছেন প্রায় ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা। আর নিজেদের জীবনে দ্রব্যমূল্যের আঘাত মারাত্মকভাবে পড়ার কথা বলেছেন ৮৪ শতাংশ উত্তরদাতা।

জরিপটি গতকাল মঙ্গলবার এশিয়া ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। দেশের ৬৪ জেলার ১০ হাজার ২৪০ জন মানুষের ওপর করা এই জরিপে তথ্য নেয়া হয় গত নভেম্বর থেকে জানুয়ারি সময়ে। প্রতিটি জেলা থেকে ১৬০ জন উত্তরদাতা নেয়া হয়েছে। উত্তরদাতাদের মধ্যে অর্ধেক ছিলেন নারী।

এশিয়া ফাউন্ডেশন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি অলাভজনক উন্নয়ন সংস্থা। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোতে এটি সুশাসন, নারীর ক্ষমতা, জেন্ডার বৈষম্য দূর করা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি নিয়ে কাজ করে। অন্যদিকে বিআইজিডি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা সংস্থা।

দুই সংস্থার জরিপ ‘দ্য স্টেট অব বাংলাদেশ’স পলিটিক্যাল, গভর্ন্যান্স, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সোসাইটি: অ্যাকোর্ডিং টু ইটস সিটিজেনস’ (বাংলাদেশের রাজনৈতিক, শাসন, উন্নয়ন ও সামাজিক পরিস্থিতি: নাগরিকদের মত) ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালেও করা হয়।

জরিপে একটি প্রশ্ন ছিল এমন, আপনি কি মনে করেন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সঠিক পথে যাচ্ছে। জবাবে ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, বাংলাদেশ ভুল পথে যাচ্ছে। ২৫ শতাংশের মত হলো, বাংলাদেশ সঠিক পথে যাচ্ছে। আর ৪ শতাংশ বলেছেন, তারা এ বিষয়ে জানেন না। ১ শতাংশ উত্তরদাতা উত্তর দেননি।

এই প্রশ্নে ২০১৯ সালের জরিপে কী উত্তর এসেছিল, তা-ও তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে। দেখা যায়, ওই বছরের জরিপে ৭০ শতাংশের কিছু বেশি উত্তরদাতা বলেছিলেন, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সঠিক পথে রয়েছে। তখন ২৮ শতাংশ ভুল পথে যাওয়ার কথা বলেছিলেন।

উল্লেখ্য, যাদের আয় কম, সেই সব উত্তরদাতার অর্থনৈতিক দিক দিয়ে দেশ ভুল পথে যাওয়ার মতামত বেশি এসেছে।

রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক নিয়েও জরিপে উত্তরদাতাদের মতামত নেয়া হয়। সাড়ে ৪৭ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, রাজনৈতিক দিক দিয়ে বাংলাদেশ ভুল পথে যাচ্ছে, হারটি ২০১৯ সালে ছিল প্রায় ৩১ শতাংশ। অন্যদিকে ৩৯ শতাংশ উত্তরদাতার মতে, রাজনৈতিক দিক দিয়ে বাংলাদেশ সঠিক পথে রয়েছে। ২০১৯ সালে হারটি ছিল প্রায় ৬৪ শতাংশ।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক দিক দিয়ে বাংলাদেশ ভুল পথে যাচ্ছে, এমন মতামত দিয়েছেন আগের চেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ।

২০১৯ সালের জরিপ অনুযায়ী, সামাজিক দিক দিয়ে সঠিক পথে রয়েছে বলে মনে করেন ৭৭ শতাংশ মানুষ। ২০২২ সালে হারটি কমে নেমেছে সাড়ে ৫৭ শতাংশে। সামাজিক দিক দিয়ে দেশ ভুল পথে যাচ্ছে বলে মনে করেন প্রায় ৩৯ শতাংশ মানুষ, এটা ২০১৯ সালে ছিল প্রায় ২২ শতাংশ।

দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলো কী কী- এই প্রশ্নের উত্তরে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ সামনে এনেছেন নিত্যপণ্যের দামকে। এরপর রয়েছে অর্থনীতি অথবা ব্যবসার মন্দা, বেকারত্ব অথবা জীবিকার সমস্যা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অথবা অসহিষ্ণুতা, দুর্নীতি ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি।

নিত্যপণ্যের দামকে ৪৪ শতাংশ মানুষ সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা ২০১৯ সালে ছিল ৩৩ শতাংশ। অর্থনীতি অথবা ব্যবসার মন্দা সামনে এসেছে ১১ শতাংশের উত্তরে, যেটা ২০১৯ সালে ছিল ৫ শতাংশ। বেকারত্ব অথবা জীবিকার সমস্যা সামনে এনেছেন ১০ শতাংশ মানুষ, যেটা ২০১৯ সালে ছিল ১৮ শতাংশ। দুর্নীতিকে সামনে এনেছেন ৩ শতাংশ মানুষ, যা ২০১৯ সালে ছিল ১১ শতাংশ।

১৮ শতাংশ অন্যান্য সমস্যাকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ৪ শতাংশ উত্তরদাতা প্রশ্নটির উত্তর জানেন না বলে জানিয়েছেন।

জরিপে প্রশ্ন ছিল, সাম্প্রতিক দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি কি আপনার জীবনে আঘাত হেনেছে। উত্তরে ৮৪ শতাংশ বলেছেন, আঘাত ছিল মারাত্মক। ১৩ শতাংশের উত্তর ছিল, তারা কোনো না কোনোভাবে আঘাত পেয়েছেন।

দ্রব্যমূল্যের কারণে আঘাত না পাওয়া মানুষের হার খুবই কম। যেমন খুব একটা আঘাত পাননি বলে জানিয়েছেন মাত্র ১ শতাংশ উত্তরদাতা। আর ২ শতাংশ বলেছেন, তারা মোটেও আঘাত পাননি।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক দলের কর্তৃত্ব দেখা যায়- এই মতের সঙ্গে শক্তভাবে ও মোটামুটিভাবে একমত পোষণ করেছেন ৭২ শতাংশ উত্তরদাতা। হারটি ২০১৯ সালে ৮৬ শতাংশ ছিল।

রাজনীতিতে প্রভাবশালী দলটির ভূমিকা নেতিবাচক মনে করেন ৫৫ শতাংশ উত্তরদাতা, যা ২০১৯ সালে ছিল ৩৮ শতাংশ। দলটির ভূমিকা ইতিবাচক বলে মনে করেন ৩৬ শতাংশ, যা ২০১৯ সালে ছিল ৫৯ শতাংশ।

জরিপে উঠে আসে, রোহিঙ্গাদের প্রতি মানুষের সহানুভূতি কমে যাচ্ছে। ২০১৯ সালে ১৫ শতাংশ মানুষ রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে ইতিবাচক মতামত দিয়েছিলেন, যা ২০২২ সালে কমে ১৩ শতাংশে নেমেছে। ৪৪ শতাংশ মানুষ মনে করেন, সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য যথেষ্ট করেছে ও করছে।

সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ (৭২ শতাংশ) বলেছেন, পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। সেতু নির্মাণের কৃতিত্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দিয়েছেন জরিপে অংশ নেয়া প্রায় অর্ধেক মানুষ (৪৭ শতাংশ)। ২৮ শতাংশ মানুষ কৃতিত্ব দিয়েছেন সরকারকে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে কৃতিত্ব দিয়েছেন ১ শতাংশ করে উত্তরদাতা।

পেঁয়াজ কেনাবেচার তথ্য গোপন, নিয়ন্ত্রণে আসছে না দাম

১২ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

আল মদিনা স্টোর দেশের ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের পেঁয়াজ বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান। পাইকারিতে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৫৮ টাকা দরে বিক্রি করছে তারা। ওই পেঁয়াজ কত টাকা দরে কেনা, তার কোনো কাগজপত্র নেই তাদের হাতে। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. কাশেম বলেন, ‘আমরা কমিশনে ব্যবসা করি। স্থলবন্দরের আমদানিকারক ও ব্যাপারীরা পেঁয়াজ সরবরাহ করেন। তারা কোনো রসিদ দেন না।’ 

বাজারের কাঁচা পণ্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান কাজী স্টোরে গিয়ে জানা যায়, তারাও একইভাবে ব্যবসা করছে। পেঁয়াজ আমদানির কোনো রসিদ তাদের কাছে নেই। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী জাবেদ ইকবাল বলেন, ‘এখানে ব্যবসায়ীরা অল্প কয়েক টাকা লাভে পেঁয়াজ বিক্রি করেন। তাই রসিদ বা ভাউচার থাকে না।’

তবে বাজার-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পণ্য কেনার রসিদ না রাখা খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের একটি কৌশল। পেঁয়াজসহ বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানির রসিদ না রেখে কেউ কেউ চড়া দামে তা বিক্রি করেন। পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে।

কেন দাম বাড়ছে, সংকট কোথায়

৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

বাজারে আলুর কেজি ৫০ টাকা ছুঁয়েছে, যা ১৫ দিন আগেও ছিল ৪০ টাকার নিচে। ঠিক এক বছর আগে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হয়েছিল ২৮ টাকা দরে; অর্থাৎ এক বছরে আলুর দাম ৭৮ শতাংশ বেড়েছে।

সরকারি তথ্য বলছে, দেশে এ বছর আলুর উৎপাদন গত বছরের চেয়ে বেশি হয়েছে। এমনকি চাহিদার তুলনায়ও অনেক বেশি আলু উৎপাদিত হয়েছে। সে জন্য আলুর দাম বাড়ার কথা নয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, চলতি বছর হিমাগারগুলোতে আলু সংরক্ষণ কম হয়েছে। তাই আলুর চাহিদা বাড়ায় দাম বেড়ে গেছে।

এদিকে আলুর দাম বাড়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, এটির চাহিদা, উৎপাদন ও সংরক্ষণ (মজুত) নিয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের তথ্যে বড় ধরনের গরমিল রয়েছে।

উৎপাদন বাড়লেও দাম বেশি

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২১-২২ মৌসুমে দেশে মোট ১ কোটি ১০ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়। আর গত অর্থবছরে (২০২২-২৩) দেশে আলু উৎপাদিত হয় ১ কোটি ১১ লাখ ৯১ হাজার টন; অর্থাৎ এক বছরে উৎপাদন বেড়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার টন।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) তথ্য অনুসারে, ২০২১ সালে দেশে আলুর চাহিদা ছিল ৯৫ লাখ ৬৩ হাজার টন। সেই হিসাবে দেশে চাহিদার বিপরীতে ১৬ লাখ টনের মতো উদ্বৃত্ত হওয়ার কথা।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তর আলুর মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বলেছে, একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিমভাবে আলুর দাম বাড়াচ্ছেন। তাঁরা হিমাগার থেকে চাহিদা অনুসারে আলু খালাস করছেন না। এ ছাড়া পরিবহনের সমস্যা, ফেরি ও টোল প্লাজায় আলু বহনকারী গাড়ি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পার হতে না পারাও দাম বাড়ার কারণ বলে উল্লেখ করে সংস্থাটি।

হিমাগারে সংরক্ষণ কমেছে

চলতি বছর দেশে ৪৩ জেলায় ৩৬৫টি হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। এসব হিমাগারের আলু ধারণক্ষমতা ৩০ লাখ টনের বেশি। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২২ সালে এসব হিমাগারে মোট ২৭ লাখ ৮ হাজার টন আলু সংরক্ষণ করা হয়। তবে চলতি ২০২৩ সালে তা নেমে আসে ২৪ লাখ ৯২ হাজার টনে। এর মধ্যে খাওয়ার আলু ১৮ লাখ ২১ হাজার টন; বাকিটা বীজ আলু।

যেসব জেলায় আলু উৎপাদন ও হিমাগারে সংরক্ষণ বেশি হয়, তার মধ্যে মুন্সিগঞ্জ অন্যতম। এই জেলার রিভারভিউ হিমাগারের ব্যবস্থাপক রেজাউল করিম প্রথম আলোকে জানান, তাঁদের হিমাগারের আলু ধারণক্ষমতা ১ লাখ ৮০ হাজার বস্তা। এ বছর আলু এসেছে মাত্র ৭৫ হাজার বস্তা।

হিমাগারে আলু সংরক্ষণকারী ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকারি তথ্যে উৎপাদন বেশি দেখালেও আসলে আলু উৎপাদন কমেছে। এ কারণে চলতি বছর হিমাগারগুলোতে গত বছরের তুলনায় কম পরিমাণে আলু সংরক্ষণ করতে পেরেছেন তাঁরা।

মুন্সিগঞ্জের আলু ব্যবসায়ী রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, আলু উৎপাদনের সরকারি তথ্য ও বাস্তবতার মধ্যে মিল নেই। এ বছর হিমাগারে প্রয়োজনের তুলনায় আলু মজুত হয়েছে কম। তাতে অবশ্য এখনই বাজারে প্রভাব পড়ার কথা নয়।

ঢাকার কারওয়ান বাজারের ব্যাপারী আবদুর রহিম বলেন, হিমাগার থেকে বেশি দামে আলু কিনতে হচ্ছে। এ জন্য খুচরা পর্যায়েও দাম বাড়তি।

তথ্যের গরমিল

দেশে নভেম্বর মাসে আলুর আবাদ করা হয়। জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ফসল তোলা হয়। উৎপাদিত আলুর একটি অংশ হিমাগারে সংরক্ষণ না করেই জানুয়ারি-মে পর্যন্ত বাজারে বিক্রি হয়। অবশিষ্ট অংশ কৃষকদের কাছ থেকে কিনে হিমাগারে রাখেন ব্যাপারী ও পাইকারি বিক্রেতারা। সাধারণত জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাজারে হিমাগারের আলু সরবরাহ হয়।

বিএআরসির হিসাবে, পাঁচ মাসে হিমাগারের বাইরে থাকা আলু বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় সাড়ে ৪০ লাখ টন। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, চলতি বছরে হিমাগারে মোট ২৪ লাখ ৯২ হাজার টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে ৬৫ লাখ ২০ হাজার টন আলুর হিসাব মেলে। অথচ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে আলু উৎপাদিত হয়েছে ১ কোটি ১১ লাখ ৯১ হাজার টন।

এ বিষয়ে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তথ্যে বড় তারতম্য রয়েছে। এ জন্য আলুর চাহিদা ও উৎপাদনের তথ্যে মিল নেই।

নগদ ডলারের চরম সংকট

১৪ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

ডলার সংকটের কারণে চাহিদামতো এলসি খুলতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। এর পাশাপাশি বিদেশ ভ্রমণ, চিকিৎসা, টিউশন ফিসহ বিভিন্ন কাজে প্রয়োজনীয় নগদ ডলারেরও চরম সংকট চলছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেমিট্যান্স বাড়ানোর চেয়ে দর নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। কখনও ব্যাংকে পরিদর্শন আবার কখনও মানিচেঞ্জারে বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে। অভিযান আতঙ্কে কিছু মানিচেঞ্জার এখন বন্ধ রয়েছে। এতে সংকট আরও বেড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, হুন্ডিতে ডলারের চাহিদা এখন অনেক বেশি। যে কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যস্থতায় ঠিক করা রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের বিপরীতে ১০৯ টাকা ৫০ পয়সায় ডলার কিনতে পারছে না বেশির ভাগ ব্যাংক। আমদানিকারকদের চাহিদা মেটাতে অনেক ব্যাংক এখন ১১৬ টাকা পর্যন্ত দরে ডলার কিনছে। আর বিক্রি করছে ১১৭ টাকায়। বাড়তি দরে ডলার বেচাকেনার কারণে সম্প্রতি ১৪টি ব্যাংককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সময়ে সাতটি মানিচেঞ্জারের লাইসেন্স স্থগিত, চার মানিচেঞ্জারের মালিক গ্রেপ্তার এবং ১০টি মানিচেঞ্জারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

ডিম, আলু ও পেঁয়াজের দাম নির্ধারণ করল সরকার

আজকের পত্রিকা, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩

আলু, পেঁয়াজ, ডিমের দাম নির্ধারণ করল সরকার। প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৬৪ থেকে ৬৫ টাকা, আলু ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা এবং প্রতিটি ডিম সর্বোচ্চ ১২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি নতুন এই মূল্যতালিকা ঘোষণা করেন। বৈঠকে কৃষিসচিব উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া সয়াবিন তেলের দাম লিটারে পাঁচ টাকা কমানো হয়েছে। প্রতি কেজি বোতলজাত সয়াবিন ১৬৯ টাকা, খোলা সয়াবিন তেল ১৪৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাম তেলের দাম লিটারে চার টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১২৪ টাকায়।

আবাদ বেড়েছে, দামে হতাশ পাটচাষিরা

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

মানিকগঞ্জে এবার পাটের আবাদ বাড়লেও কৃষকের মনে উচ্ছ্বাস নেই। কেননা, এ বছর প্রতি মণ পাটের দাম কমেছে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা। পাট বিক্রি করে উৎপাদন খরচ মিটিয়ে লাভ পাচ্ছেন না কৃষকেরা। পাটের দাম নিয়ে তাঁদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ ও হতাশা।

কয়েকজন পাটচাষি ও ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি পাটকলগুলো বন্ধ ঘোষণা করায় স্থানীয় অনেক ব্যবসায়ীই এবার পাট কিনছেন না। এতে বাজারে পাটের দাম কমে গেছে। বাজারে বর্তমানে প্রতি মণ পাট ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই দামে পাট বিক্রি করে চাষিদের কোনোরকমে উৎপাদন খরচ উঠছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার সাতটি উপজেলায় পাটের আবাদ হয়ে থাকে। গত বছর জেলায় ৩ হাজার ৯৭৩ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিল। এতে উৎপাদন হয়েছিল ১০ হাজার ৬৩ মেট্রিক টন পাট। এ বছর তা বেড়ে ৪ হাজার ৬৫৬ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। পাট উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৭৫৭ মেট্রিক টন। গতবার ভালো দাম পাওয়ায় এবার বেশি জমিতে পাটের আবাদ করেছিলেন কৃষকেরা।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবার প্রতি বিঘা জমিতে হালচাষ ও বীজ বপণ থেকে শুরু করে সার-কীটনাশকের খরচ, পানি সেচ, শ্রমিক খরচ, জাগ দেওয়া, আঁশ ছড়ানো শেষে শুকিয়ে ঘরে তোলা পর্যন্ত খরচ পড়েছে ১৩ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় ৭ থেকে ৮ মণ ফলন পাওয়া যায়। পাটবীজ, কীটনাশক সবকিছুরই দাম বেড়েছে। এবার শ্রমিকের মজুরি ব্যাপক বেড়ে গেছে। ফলে পাট চাষে খরচ বেশি বেড়েছে।

দেশের অন্যতম পাটের মোকাম হলো ঘিওর পাটের হাট। সপ্তাহের বুধবার এখানে হাট বসে। ওই হাটে গতকাল সরেজমিন দেখা গেছে, ছোট–বড় বিভিন্ন যানবাহনে করে চাষিরা হাটে পাট নিয়ে আসছেন। এ ছাড়া নদীপথেও পাট নিয়ে আসছেন অনেকে। হাটে আসার পর দরদাম কষে ব্যবসায়ীদের কাছে পাট বিক্রি করছেন চাষিরা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গতকাল হাটে প্রায় তিন হাজার মণ পাট কেনাবেচা হয়েছে। দাম কম থাকায় কৃষকেরা হাটে পাট কম আনছেন। হাটের ইজারাদার শামসুল আলম খান বলেন, মানভেদে প্রতি মণ পাট ১ হাজার ৯০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায় পাট কেনাবেচা হয়েছে।

তিন মণ তোশা পাট নিয়ে হাটে আসেন জেলার দৌলতপুর উপজেলার ধামশ্বর গ্রামের সপু মিয়া (৬৫)। প্রতি মণ পাট ১ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি করেন তিনি। এই দামে পাট বিক্রি করে হতাশা প্রকাশ করে এই পাটচাষি বলেন, ‘হালচাষ থেকে শুরু করে হাটে পাট নিয়ে আসতে যা খরচ হচ্ছে, তাতে লাভ হচ্ছে না। টেনেটুনে চালান (উৎপাদন খরচ) উঠছে। এর থেকে ভুট্টার আবাদ করলেও ভালো আছিল।’

দৌলতপুরের খলসি গ্রামের পাটচাষি আবদুল মালেক বলেন, ‘কামলার (শ্রমিক) সাথে পরিবারের মানুষজন মিল্যা আমরা হাড়ভাঙা খাটুনির কাজ করি। কিন্তু সেই খাটুনির কোনো দাম পাওয়া গেল না। প্রতি মণ পাটের দাম আড়াই হাজার টাকা পাওয়া গেলে আমরা কিছুটা হইলেও লাভ পাইতাম।’

জামালপুর সদরের পিয়ারপুর গ্রাম থেকে এই হাটে পাট কিনতে আসেন বাদল দাস (৫০)। তিনি বলেন, চার বছর ধরে এই হাটে পাট কিনে কুমিল্লার চান্দিনায় বেসরকারি পাটকল জনতা জুট মিলে বিক্রি করে আসছেন। ভরা মৌসুমে এবার হাটে পাট কম উঠেছে। গত বছর এই সময়ে ২ হাজার ৩০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা দরে প্রতি মণ পাট কিনলেও এবার কিনছেন ২ হাজার টাকা দরে।

হাটের ইজারাদারের লোকজন, কয়েকজন কৃষক ও পাট ব্যবসায়ী বলেন, সরকারি পাটকলগুলো বন্ধ ঘোষণা করার পাশাপাশি পাটের চাহিদাও কমে গেছে। ফলে স্থানীয় পাট ব্যবসায়ীরা পাট কিনছেন না। বেসরকারি পাটকলগুলোর জন্য দূরের পাট ব্যবসায়ীরা হাটে এসে পাট কিনছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়লে চাহিদা ও দাম বাড়বে। এতে চাষিরা লাভবান হবেন। আরও বেশি পাট আবাদ করবেন।

সরকার দাম বেঁধে দিলেও কার্যকর নিয়ে সংশয়

১৫ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

নিত্যপণ্যের বাজার নাগালের বাইরে চলে গেলে বাধ্য হয়ে দাম বেঁধে দেয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কিংবা অধিদপ্তর। তবে বেঁধে দেওয়া দাম কার্যকর করা নিয়ে সব সময় প্রশ্ন ওঠে। দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় প্রথমবারের মতো ডিম, আলু ও পেঁয়াজের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। নির্ধারিত দরে বিক্রি না হলে আমদানির হুমকিও দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। গতকাল বৃহস্পতিবার এই তিন পণ্যের দর বেঁধে দেওয়ার পরও বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বিক্রেতারা দাম রাখছেন যে যার মতো।

এর আগে যতবারই ভোজ্যতেল ও চিনির দর নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল, খুচরা থেকে সরবরাহকারী কাউকেই তা মানতে দেখা যায়নি। ফলে ভোক্তারা দাম কমার সুফল পান না।

 বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দাম নির্ধারণের সিদ্ধান্তটি যৌক্তিক। তবে মুখে মুখে দাম বেঁধে দিলেই হবে না। এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পণ্য সরবরাহ না বাড়িয়ে দাম নির্ধারণ করলে তা কার্যকর হবে না। পাশাপাশি কৃত্রিম সংকট হচ্ছে কিনা, তা তদারকি করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্ববাজারে প্রতিটি ডিম ৫.৬১ টাকা, দেশে সাড়ে ১২ টাকা

১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

বিশ্ববাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের বর্তমান দামের সঙ্গে দেশের বাজারে একই পণ্যের দামে বড় রকমের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের তুলনায় বিশ্ববাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় কয়েকটি পণ্য অনেক কম দামে বিক্রি হচ্ছে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা নথিতে দেখা গেছে। সামগ্রিকভাবে দামের পার্থক্য অনেক বেশি। বিশেষ করে দেশের বাজারে ডিমের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। যদিও বাংলাদেশে ডিম আমদানি হয় না।

গত বুধবার কৃষিপণ্যের মূল্য পর্যালোচনাসংক্রান্ত সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যে উপস্থাপনা দেওয়া হয়েছে, সেখানে এই চিত্র উঠে এসেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক মাসে পেঁয়াজ, আদা, কাঁচা মরিচ ও ডিমের দাম কমেছে। এই সময়ে পেঁয়াজের দাম প্রতি মেট্রিক টনে কমেছে ১২ শতাংশ, আদার দাম কমেছে ১৭ দশমিক ৮০ শতাংশ, কাঁচা মরিচের দাম ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং ডিমের দাম প্রতিটিতে ৪ দশমিক ৯০ শতাংশ কমেছে। নিত্যব্যবহার্য পণ্যের মধ্যে শুধু রসুনের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।

গত এক মাসে দেশের বাজারে প্রতি কেজিতে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম কেজিতে বেড়েছে ৩৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ, আমদানি করা রসুনের দাম বেড়েছে ৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ, আমদানি করা আদার দাম বেড়েছে ১৩ দশমিক ১৬ শতাংশ।

অন্যদিকে গত এক মাসে দেশের বাজারে প্রতি কেজিতে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম কেজিতে বেড়েছে ৩৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ, আমদানি করা রসুনের দাম বেড়েছে ৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ, আমদানি করা আদার দাম বেড়েছে ১৩ দশমিক ১৬ শতাংশ। তবে কাঁচা মরিচ ও ডিমের দাম কিছুটা কমেছে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপনায় দেখানো হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ১১ সেপ্টেম্বর বিশ্ববাজারে পেঁয়াজের দাম ছিল প্রতি কেজি ২৬ দশমিক ৭০ টাকা (প্রতি ডলার ১০৯.৫০ টাকা হিসাবে)। ওই দিন রসুনের দাম ছিল প্রতি কেজি ১৯৩ দশমিক ৫৯ টাকা, আদার দাম ছিল ১২৩ দশমিক ৫২ টাকা, কাঁচা মরিচের কেজি ছিল ১২০ দশমিক ১৮ টাকা। ডিমের দাম প্রতি পিস ছিল ৫ দশমিক ৬১ টাকা। উপস্থাপনায় অন্য পণ্যের দাম ডলারে উল্লেখ করা হলেও ডিমের দাম টাকায় দেওয়া হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপনায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, দেশে চলতি বছর ডিমের চাহিদাতিরিক্ত সরবরাহের পরিমাণ ১৩৪ দশমিক ৫৮ কোটি পিস। উপস্থাপনার পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত সরবরাহ বিবেচনায় দেশে ডিমের মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিক কারণ নেই। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রতিটি লাল ডিম বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬ দশমিক ৫০ টাকা এবং প্রতিটি সাদা ডিম পাঁচ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আরও বলছে, দেশের পাইকারি বাজারে গত ২২ আগস্ট প্রতি কেজি আলুর বিক্রয়মূল্য ছিল ৩৩ দশমিক ৮৪ টাকা এবং ১১ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪২ টাকায়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ দিনে পাইকারি বাজারে আলুর দাম বেড়েছে ২০ শতাংশ, যার সঙ্গে অতিরিক্ত ব্যয়ের সম্পৃক্ততা নেই।

কৃষিপণ্যের মূল্য পর্যালোচনাসংক্রান্ত সভায় জানানো হয়েছে, দেশে এ বছর আলুর উৎপাদন ছিল ১ দশমিক ১২ কোটি মেট্রিক টন, যা গত বছরের চেয়ে ২ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেশি। তবে আলু মজুতের পরিমাণ কমেছে বলে তথ্য দেওয়া হয়েছে।

চাষি যে আলু ১০ টাকা কেজি বিক্রি করেছিলেন, সেই আলু এখন ৫২ টাকায় কিনছেন

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

মৌসুমে চাষিদের কাছে ব্যবসায়ীরা আকারভেদে আলু কিনেছিলেন গড়ে কেজি ১০ টাকায়। এসব আলু হিমাগারে মাস দুয়েক রাখার পরেই বিক্রি শুরু হয় কেজি ২৮-৩০ টাকা। বর্তমানে সেই আলু হিমাগার থেকেই পাইকারি বিক্রি হচ্ছে গড়ে ৪৪ টাকা কেজি। বাজারে তা খুচরা বিক্রি হচ্ছে ৪৮ থেকে ৫২ টাকা। এভাবে দাম বেড়ে যাওয়ায় খোদ চাষিরাও অনেকে খাওয়ার জন্য আলু কিনে খেতে পারছেন না। আলুর বাজারের এমন চিত্র রংপুরের আট উপজেলাসহ আশপাশের জেলাগুলোয়।

রংপুর অঞ্চলে সাধারণত কার্ডিনাল, স্থানীয় জাত সাদা পাটনি, শীল ও ঝাউ বিলেতি আলুর চাষ হয়। বর্তমানে কার্ডিনাল জাতের আলু খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ৪৩ টাকা, সাদা আলু ৫০ টাকা, শীল ও ঝাউ বিলেতি আলু কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫২ টাকায়। খুচরা ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, তাঁদের হিমাগার থেকেই কিনতে হচ্ছে প্রতি কেজি আলু গড়ে ৪৪ টাকায়।

১০ টাকা কেজির আলু কীভাবে ৫০ থেকে ৫২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, তা জানতে ৯ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৫ জন আলুচাষি, ২৫ জন ব্যবসায়ী, চারজন কৃষি কর্মকর্তা, ২০ জন শ্রমিক ও ১০ জন হিমাগার ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁদের ভাষ্য, আলু উৎপাদনে কেজিপ্রতি চাষিদের খরচ পড়েছে প্রায় ৯ টাকা। গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আলু তুলে চাষিরা জমি থেকে বিক্রি করেছেন ১০-১১ টাকা কেজি। গত মার্চে ব্যবসায়ীরা ৫০ কেজির বস্তায় ভরে আলু হিমাগারে রেখেছেন। প্রতিটি বস্তা কিনতে হয়েছে ৫৫ টাকায়। হিমাগার ভাড়া দিতে হচ্ছে বস্তাপ্রতি ৩০০ টাকা। প্রতি কেজি আলুতে শ্রমিকসহ পরিবহন খরচ পড়েছে দুই টাকা। সব মিলিয়ে প্রতি কেজি আলুতে ব্যবসায়ীদের খরচ পড়েছে ২০ টাকা। আর কৃষক পর্যায়ে খরচ ১৮ টাকা। সেই আলু প্রকারভেদে বর্তমানে পাইকারি বিক্রি হচ্ছে কেজি গড়ে ৪৪ টাকা এবং খুচরা বিক্রি হচ্ছে গড়ে ৪৮ টাকা। তবে মানভেদে কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫২ টাকা পর্যন্ত।

মেরিন ড্রাইভ সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প

সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৩, বণিক বার্তা

কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়কের ভাঙন রোধে রাস্তাটি আরো প্রশস্ত করার জন্য একটি প্রকল্প নিয়েছে সেতু ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। গত বছরের জুনে এটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পাস হয়। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৯২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। সড়কটি প্রশস্ত করা হলে প্রকল্প এলাকায় আরো গাছ ও পাহাড়ি বন কাটা পড়বে বলে জানিয়েছেন মেরিন ড্রাইভের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে গবেষণাসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এর ফলে হুমকির মুখে পড়বে সামুদ্রিক কাছিম ও লাল কাঁকড়ার আবাস। ব্যাহত হবে এ অঞ্চলের প্রাণবৈচিত্র্য। সড়ক প্রশস্ত করে নয় বরং ভাঙন রোধে বিজ্ঞানসম্মত অবকাঠামো নির্মাণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

পর্যটন শিল্পের বিকাশে ২০০৮ সালে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণ শুরু হয়। প্রথম পর্বে কলাতলী থেকে ইনানী পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ হয়। দ্বিতীয় পর্বে ২০১৬ সালে ইনানী থেকে শিলখালি পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার এবং তৃতীয় পর্বে শিলখালি থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করা হয় ২০১৮ সালে। সড়কটি পর্যটক আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে। কিন্তু গত বছর হঠাৎ করেই সড়কটিতে ভাঙন শুরু হয়, চলতি বছরে যা তীব্র আকার ধারণ করে।

মেরিন ড্রাইভ সড়কের ভাঙন রোধে গত বছর ‘কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক প্রশস্তকরণ’ প্রকল্প হাতে নেয় সড়ক বিভাগ। প্রকল্পের তথ্যানুযায়ী, প্রথম ধাপে ১ হাজার ৯২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে কক্সবাজার শহরের কলাতলী থেকে উখিয়া উপজেলার পাটুয়ারটেক পর্যন্ত ৩০ দশমিক ৪০ কিলোমিটার রাস্তা প্রশস্ত করা হবে। এছাড়া রেজুখালের ওপর নির্মাণ করা হবে ৩০৫ মিটারের দুই লেনের সেতু। এ প্রকল্পের মাধ্যমে কক্সবাজারের রামু, উখিয়া ও টেকনাফের নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, পর্যটন শিল্পের প্রসার এবং প্রকল্প এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদকাল ধরা হয়েছে ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২৫ সালের জুন পর্যন্ত।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক প্রশস্ত করতে গেলে কক্সবাজারের পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়কের দুই পাশে কয়েক লাখ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রয়েছে। মেরিন ড্রাইভের তীরঘেঁষেই রয়েছে সমুদ্রসৈকতের লাল কাঁকড়া, কচ্ছপ, ডলফিন ও সাগরলতাসহ জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাঁচটি নির্ধারিত স্থান। এছাড়া রয়েছে পাহাড় ও পাহাড়ি বন। তারা বলছেন, সড়কটি প্রশস্ত করার ক্ষেত্রে এ অঞ্চলের সার্বিক পরিবেশ ও প্রাণীদের আবাস ক্ষতির মুখে পড়বে।

মিরসরাইয়ে চারণভূমি সংকট মহিষ কমেছে ৪৩ শতাংশ

সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৩, বণিক বার্তা

চারণভূমি সংকটে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অথনৈতিক অঞ্চলের সড়কে চরে বেড়াচ্ছে মহিষ ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে পরিত্যক্ত চরগুলোয় সরকার অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলায় কমে গেছে চারণভূমি। যার প্রভাব পড়েছে মহিষের খামারে। চারণভূমি সংকটে গত পাঁচ বছরে মহিষ পালন কমেছে ৪৩ শতাংশ।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রতি পাঁচ বছর পরপর উপজেলায় পশু শুমারি হয়। এতে দেখা গেছে, ২০১৮ সালে মিরসরাইয়ে মহিষের সংখ্যা ছিল ১০ হাজার। কিন্তু বর্তমানে মহিষ আছে চার হাজার ৭২৫টি। পাঁচ বছরে মহিষের সংখ্যা কমেছে ৪৩ শতাংশ। উপজেলার সবচেয়ে বেশি মহিষ ছিল ইছাখালী ও সাহেরখালী ইউনিয়নে। ওই দুই ইউনিয়নে হাজার হাজার একর চর থাকায় খামারিরা নির্বিঘ্নে মহিষ পালন করতেন। কিন্তু পরিত্যক্ত চরগুলোয় সরকার অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলায় কমে গেছে মহিষের চারণভূমি। তাই মহিষ পালনে আগ্রহ হারাচ্ছেন খামারিরা।

জানতে চাইলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জাকিরুল ইসলাম ফরিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মিরসরাইয়ে গত বছর মহিষের সংখ্যা কমেছে প্রায় ৪৩ শতাংশ। মহিষের চারণভূমি কমে যাওয়ায় পালনের আগ্রহ হারাচ্ছে কৃষক। চরাঞ্চলে অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারণে মূলত মহিষের সংখ্যা কমেছে।’

ইছাখালী ইউনিয়নের চরশরৎ এলাকায় মহিষ পালক নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘চরাঞ্চলের মানুষের আয়ের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে পশু পালন। তার মধ্যে মহিষ অন্যতম। ২০১৪ সালে আমার দুটি মহিষ জলদস্যুরা লুট করে নিয়ে যায়। পরে আরো দুটি মহিষ কিনেছিলাম। এখন এগুলো বিক্রি করে দিয়েছি। এখন মহিষ পালনের জায়গা না থাকায় চরের মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।’

আরেক মহিষ পালক বাবুল সওদাগর বলেন, ‘মহিষ পালন করে চরাঞ্চলের অনেক মানুষ স্বাবলম্বী হয়েছে। কিন্তু দিন দিন মহিষ পালন কমে যাচ্ছে। মহিষ পালনের জন্য অনেক বেশি জায়গা প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে চরাঞ্চলে মহিষ পালন অনেক সুবিধা। কিন্তু চরাঞ্চল কমে যাওয়া মহিষ পালন করতে চাচ্ছে না অনেকে।’

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, প্রাকৃতিক চারণভূমি কমে যাওয়ায় গবাদিপশু লালন-পালনে বিকল্প খাদ্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে খামারিদের। হয় দুই বা তিন ফসলি জমিতে ঘাসের চাষ করতে হচ্ছে অথবা বাজার থেকে কৃত্রিম খাবার কিনতে হচ্ছে। এতে গবাদি পশু লালন-পালনে ব্যয় বাড়ছে। কৃত্রিম গো-খাদ্যের ওপর চাপ পড়ায় এক দশকে গো-খাদ্যের দামও বেড়েছে তিন গুণ। এ পরিস্থিতিতে মহিষ পালনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন খামারিরা।

সাহেরখালী ইউনিয়নের দুই ব্যবসায়ী আবুল কালাম বলেন, ‘আগে বিভিন্ন চরে গিয়ে মহিষের দুধ কিনে আনতাম। সে দুধকে দইয়ে পরিণত করে বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করতাম। প্রতি কেজি মহিষের দুধের দই বিক্রি হতো ৬০-৮০ টাকা। কিন্তু এখন মহিষের দুধ পাওয়া কঠিন। এখন এক কেজি দই ১২০-১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।’

পেনশন স্কিম থেকে উন্নয়ন কাজে ঋণ নেবে সরকার: পরিকল্পনামন্ত্রী

ইন্ডিপেন্ডেন্টট টিভি অনলাইন, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩

উন্নয়ন কাজের জন্য পেনশন স্কিম থেকে সরকার ঋণ নেবে। এর ফলে বিদেশ থেকে ঋণ গ্রহণের প্রবণতা কমবে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। শনিবার সকালে রাজধানীর এফডিসিতে পেনশন স্কিম বিষয়ে ‘ইউসিবি পাবলিক পার্লামেন্ট’ শিরোনামে এক ছায়া সংসদ বিতর্কে তিনি একথা বলেন।

প্রকল্প বিলম্বের খেসারত: আমদানির ভর্তুকি দিয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ

দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩

ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি– সার আমদানির অর্থ দিয়ে ঋণের একটি কিস্তি পরিশোধ করেছে। শুধুমাত্র প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরির কারণে– দেশের সর্ববৃহৎ ইউরিয়া উৎপাদকটি এ কাজ করতে বাধ্য হয়েছে।

আগামী দুই-এক মাসের মধ্যে কারখানাটিতে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এরমধ্যেই প্রকল্পের জন্য জাপান থেকে নেওয়া একটি ঋণের প্রথম কিস্তির ৫২১.৩৭ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। 

সার কারখানা প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, জাপানি ঋণের প্রথম কিস্তি দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল ১৩ সেপ্টেম্বর। আর তা দেওয়ার কথা ছিল, কারখানায় উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে। কিন্তু, প্রকল্প বাস্তবায়ন ৬ মাস পিছিয়ে দেওয়ায় পরিস্থিতি এ মোড় নেয়।

এই টাকা ঘোড়াশাল পেয়েছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)-র থেকে। সরকার বিসিআইসির মাধ্যমে ইউরিয়া সার আমদানি করে। ঘোড়াশাল প্রকল্পের দায়িত্বেও রয়েছে সংস্থাটি, অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শেই বিসিআইসি এ টাকা দেয় বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।  

জানা যায়, কিস্তি পরিশোধের টাকা চেয়ে বেশ কয়েকবার অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় বিসিআইসি। কিন্তু, মন্ত্রণালয় তা দিতে পারেনি।

প্রকল্প পরিচালক রাজিউর রহমান মল্লিক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ‘টাকার ব্যবস্থা নিয়ে একটু জটিলতা তৈরি হয়েছিল, পরবর্তীতে আমরা নির্ধারিত সময়েই সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রথম কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে পেরেছি। সারে ভর্তুকির টাকা থেকে এই কিস্তি পরিশোধ করা হয়েছে।’

সুদ-মুক্ত এই ঋণ আপাতত বিসিআইসির ঘোড়াশাল প্রকল্পের দেনার সমস্যার সমাধান করলেও – এতে সার আমদানির টাকা পরিশোধে নতুন চাপের মধ্যে পড়লো সংস্থাটি। ইউরিয়া সার আমদানিতে বিসিআইসির ইতোমধ্যেই প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে।    

নব-নির্মিতব্য কারখানাটির (ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার পিএলসি) বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৯.২৪ লাখ টন। নতুন এ কারখানায় গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে পুরোনো দুটি সার কারখানা বন্ধ করতে হয়েছে সরকারকে।

বিসিআইসির সূত্রমতে,  সর্বশেষ প্রতি কেজি ইউরিয়া আমদানিতে সরকারের খরচ হয়েছে ৭০ টাকা। তবে আমদানিকৃত এই সার কৃষক পর্যায়ে ২৭ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়। এ হিসাবে, প্রতি কেজি ইউরিয়াতে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে ৪৩ টাকা।

চীন ও জাপানের ঋণে কারখানা নির্মাণ

নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে সার কারখানাটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ১০ হাজার ৯২০ টাকা ঋণ দিচ্ছে চীন ও জাপানের ঋণদাতারা। কারখানাটির মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে ইউরিয়ার উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা ও খরচ কমানোর লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। 

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে, তুলনামূলক কঠিন শর্তে – জাপানি ও চীনা ঋণদাতাদের একটি কনসোর্টিয়াম – ব্যাংক অব টোকিও-মিতসুবিশি ইউএফজে লিমিটেড এবং হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং কর্পোরেশন লিমিটেড (এইচএসবিসি)-র থেকে ঋণ নেওয়া হয়।

সূত্রগুলো জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের তারিখ ছয় মাস পিছিয়ে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হলেও, ঋণ পরিশোধের সময় পেছাতে রাজি হয়নি জাপানের ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান।

ঋণ চুক্তি অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের মধ্যে জাপানি ঋণদাতাটিকে মোট তিনটি কিস্তিতে এক হাজার ২৯০ কোটি টাকা দিতে হবে।

৫১৭.৫৭ কোটি টাকার দ্বিতীয় কিস্তিটি আগামী অর্থবছরের মার্চে এবং ২৫৫ কোটি টাকার তৃতীয় কিস্তি মে মাসে দিতে হবে বলে জানান প্রকল্প কর্মকর্তারা।

ইউরিয়া আমদানিতে প্রভাব পড়বে?

জানা যায়, গত ৭ সেপ্টেম্বর বিসিআইসির বোর্ড সভায় ঋণের কিস্তি পরিশোধের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।

সভার বিষয়ে অবহিত কর্মকর্তারা টিবিএসকে জানান যে, আলোচনায় বিসিআইসির পরিচালকরা বলেন, নির্ধারিত তারিখের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করতে না পারলে- তা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করবে। একারণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে তারা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সারের ভর্তুকি বরাদ্দ থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেন। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিসিআইসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, ‘কিস্তি দেওয়ার ফলে সার আমদানির ব্যয় মেটানোর ক্ষেত্রে বিসিআইসি-র ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হলো। কারণ এই টাকা দেওয়া হয়েছে সারের ভর্তুকির বরাদ্দ থেকে, যা আসে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে।’

তিনি আরো জানান যে, আপাতত আমদানি কমিয়ে আনারও সুযোগ নেই বিসিআইসির হাতে। কারণ, গ্যাস সংকট ও ঘোড়াশাল কারখানায় পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে– তাদের আওতাধীন তিনটি সার কারখানা বন্ধ করে রাখতে হয়েছে।

বিসিআইসির সূত্রমতে, সারের আমদানির অর্থ পরিশোধে সংস্থাটি এমনিতেই চাপে রয়েছে। কারণ ইতোমধ্যেই ইউরিয়া আমদানি বাবদ প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা বকেয়া আছে।

কৃষি ভর্তুকির তহবিল অযৌক্তিকভাবে অপসারণের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান। এ ধরনের বিচ্যুতি ঘটলে অবিলম্বে তা সংশোধন করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। নাহলে দেশের সার আমদানিতে তার বিরূপ প্রভাব পড়বে।

জাহাঙ্গীর আলম খান সরকারের প্রতি দুটি সুপারিশ করেন: প্রথমত, বকেয়া বিল দ্রুত নিষ্পত্তি এবং দ্বিতীয়ত,উৎপাদন শুরুর সুবিধার্থে স্থানীয় সার কারখানাগুলোয় ধারাবাহিক গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা।

ঘোড়াশাল চালু করতে পুরোনো কারখানা বন্ধ

বিসিআইসি বর্তমানে চারটি সার কারখানা পরিচালনা করছে। এগুলো হলো- শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (এসএফসিএল), যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (জেএফসিএল), চিটাগং ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (সিইউএফএল) এবং আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (এএফসিসিএল)।

তবে ২০২২ সালের নভেম্বরে চিটাগং ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড, এবছরের এপ্রিলে আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড এবং ৯ সেপ্টেম্বর যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড বন্ধ করা হয়। কারণ নির্মাণাধীন ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজারে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে সরকার এসব কারখানায় গ্যাস সরবরাহ হ্রাস করে।

অর্থাৎ, নতুন কারখানায় সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগে পুরাতন কারখানাগুলিকে বন্ধ রাখতে হয়েছে। এতে সরকারের আমদানি নির্ভরশীলতা কমানোর লক্ষ্যও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

ঘোড়াশাল কারখানা বর্তমানে পরীক্ষামূলক উৎপাদনে থাকলেও, প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নভেম্বরের আগে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে না।

অবশ্য প্রকল্প পরিচালক রাজিউর রহমান মল্লিক বলেন, ‘গ্যাসের সরবরাহ ঠিক থাকলে নতুন এ কারখানাটি অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে উৎপাদনে আসবে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি যাতে দ্রুত স্থানীয় উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানি কমানো সম্ভব হয়।’

৬ পণ্যের একটিরও সরকারি দর কেউ মানছে না

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

সরকার খুচরা বাজারে ছয়টি পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। যদিও নির্ধারিত দর কেউ মানছে না। বাজারে অভিযান চলছে। কিন্তু তাতেও নতুন দর কার্যকর করানো যাচ্ছে না।

যেমন নির্ধারিত দর অনুযায়ী প্রতি কেজি আলু খুচরা বাজারে ৩৫ থেকে ৩৬ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা দরে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় গত বৃহস্পতিবার আলু, ডিম ও দেশি পেঁয়াজের দাম ঠিক করে দেয়। এর কোনোটিই বাজারে কার্যকর হয়নি। প্রায় প্রতি মাসেই বেঁধে দেওয়া হয় ভোজ্যতেল ও চিনির দাম। যদিও বাজারে দাম থাকে বেশি।

নির্ধারিত দর বনাম বাজারদর

দেশে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে ২০২০ সালের মার্চে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর থেকে। তখন আতঙ্কের কেনাকাটা বাজারে সরবরাহ–সংকট তৈরি করেছিল। এরপর সরবরাহ–সংকট, দেশীয় পরিস্থিতিসহ নানা কারণে দর বাড়তিই ছিল। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর সরবরাহ–সংকট, মার্কিন ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া, দেশে জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের দাম বাড়ানোর কারণে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। এতে লাফিয়ে লাফিয়ে পণ্যের দাম বেড়েছে।

এসব কারণে দেশে মূল্যস্ফীতি উঠে গেছে ১০ শতাংশের কাছাকাছি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ১০ সেপ্টেম্বর জানায়, গত আগস্ট মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা গত ১১ বছর ৭ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

বিবিএস উদ্বেগজনক মূল্যস্ফীতির হার প্রকাশের চার দিন পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় বৈঠক করে তিন পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেয়।

দাম ঠিক করে দেওয়া পণ্যের একটি আলু। বিগত কয়েক বছর আলু নিয়ে এমন পরিস্থিতি হয়নি। সাধারণত মৌসুমের শুরুতে আলু প্রতি কেজি ১৫ টাকা এবং শেষ দিকে নভেম্বর-ডিসেম্বরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হয়। এবার সেপ্টেম্বরেই আলুর কেজি ৫৫ টাকায় উঠে যায়। এমন অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার প্রতি কেজি আলুর দাম ঠিক করে দেওয়া হয় ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান গত শনিবার মুন্সিগঞ্জে হিমাগার পরিদর্শনে গিয়ে বলেছিলেন, হিমাগার থেকে রসিদের মাধ্যমে ২৬ থেকে ২৭ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করতে হবে। গতকাল সকালে দুটি হিমাগারে গিয়ে দেখা যায়, নির্ধারিত দরে আলু বিক্রি হচ্ছে না। রিভারভিউ কোল্ড স্টোরেজ নামের একটি হিমাগার থেকে মূল্য নির্ধারণ ছাড়াই আলু চট্টগ্রামের আড়তে পাঠানোর কাজ চলছিল।

ঢাকার কারওয়ান বাজার, নতুন বাজার ও গুদারাঘাট বাজার ঘুরে দেখা যায়, আলু বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে। এ দর তিন দিন আগের তুলনায় কেজিতে প্রায় ৫ টাকা কম। তবে নির্ধারিত দরের চেয়ে ১০ থেকে ১৪ টাকা বেশি।

প্রতি হালি ডিমের দর নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪৮ টাকা, যা বাজারদরের চেয়ে সামান্য কম। সেই দরও কার্যকর হয়নি। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তালিকা বলছে, প্রতি হালি ডিম বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫২ টাকা দরে।

দেশি পেঁয়াজের দাম কিছুটা কমেছে। কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা। বাজারে এখন দেশি পেঁয়াজ ৮৫ থেকে ৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা নির্ধারিত দরের চেয়ে ২১ থেকে ২৫ টাকা বেশি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৫ টাকা কমিয়ে ১৬৯ টাকা নির্ধারণ করে দেয়, যা কার্যকর হওয়ার কথা গতকাল থেকে। তবে এখনো নতুন দামের তেল বাজারে আসেনি। অবশ্য ভোজ্যতেল বেশির ভাগ সময় নির্ধারিত দরে বিক্রি হয়। কিন্তু চিনিতে দর মানা হয় না। এখন প্রতি কেজি খোলা চিনির নির্ধারিত দর ১৩০ টাকা। বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা কেজিতে।

সরকার যদি তেল, চিনি, আলু, পেঁয়াজ ও ডিমের নির্ধারিত দর কার্যকর করতে পারে, তাহলে একটি পরিবারে মোটামুটি ২৫০ টাকা সাশ্রয় হবে এক মাসে। কিন্তু এই টাকার প্রায় দ্বিগুণ চলে যাবে রান্নার গ্যাসের বাড়তি দামের পেছনে।

বিইআরসি চলতি মাসের জন্য ১২ কেজির প্রতিটি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ঠিক করেছে ১ হাজার ২৮৪ টাকা, কিন্তু বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৩৫০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। পাঁচজনের একটি পরিবারে মাসে দুটি সিলিন্ডার লাগে। এতে বাড়তি দিতে হয় ১৩২ থেকে ৬৩২ টাকা। ঢাকায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দাম নেওয়া হয় ১ হাজার ৫০০ টাকা। ফলে রাজধানীর পরিবারগুলোর বাড়তি ব্যয় হয় মাসে ৪৩২ টাকা।

সর্বজনীন পেনশন

এক মাসে গ্রাহক ১৩ হাজার, সাড়া নেই প্রবাস কর্মসূচিতে

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

সর্বজনীন পেনশন স্কিমে নিবন্ধন করে গতকাল রোববার সকাল পর্যন্ত ১২ হাজার ৮৮৯ জন বাংলাদেশি চাঁদা পরিশোধ করেছেন। গত ১৭ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই পেনশন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এরপর এক মাসে নতুন এই কর্মসূচির প্রতি যে সাড়া পাওয়া গেছে, বিশ্লেষকেরা তাকে ‘যথেষ্ট নয়’ বলে বর্ণনা করেছেন।

বহুল প্রতীক্ষিত এ কর্মসূচির উদ্বোধনের দিন থেকেই সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়। সেদিনই জাতীয় পেনশন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হতে অন্তত ৮ হাজার মানুষ অনলাইনে নিবন্ধন করেছিলেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৭০০ জন আবেদনের পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে সেদিন চাঁদা পরিশোধ করেন।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা প্রথম আলোকে বলেন, পেনশন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হতে অনেকে নিবন্ধন করলেও চাঁদা পরিশোধকারীদের সংখ্যা গতকাল সকাল পর্যন্ত ছিল ১২ হাজার ৮৮৯ জন। কর্মকর্তারা বলেন, যাঁরা কিস্তির চাঁদা পরিশোধ করেছেন, কেবল তাঁরাই পেনশন কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন বা এনরোলমেন্ট করেছেন বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে।

গত এক মাসে পেনশন স্কিমে সব মিলিয়ে ৭ কোটি ৫৮ লাখ ৭১ হাজার টাকার কিস্তি পরিশোধ করা হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

৫,৬০০ কোটি টাকার নির্মাণ ব্যয় ১০,৬৯০ কোটিতে

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩, শেয়ার বিজ

চীনের অর্থায়নে চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মাণ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু টানেল। জিটুজি ভিত্তিতে এটি নির্মাণ করছে চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি)। এজন্য উচ্চ সুদে ঋণ দিয়েছে চীনের এক্সিম ব্যাংক। ২০১৫ সালের নভেম্বরে অনুমোদিত প্রকল্পটি আগামী ২৮ অক্টোবর উদ্বোধনের কথা রয়েছে। তবে এরই মধ্যে কয়েক দফা বেড়েছে এর নির্মাণব্যয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে টানেলটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল পাঁচ হাজার ৬০০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। তবে গত জানুয়ারিতে সর্বশেষ হিসাবে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। অর্থাৎ টানেল নির্মাণব্যয় বেড়েছে পাঁচ হাজার ৮৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা বা ৯০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। টোল দিয়ে চলতে হবে এ টানেলে।

সেতু বিভাগের সূত্রমতে, দেশের প্রথম টানেল নির্মাণে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) চূড়ান্ত করা হয় ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে। সিসিসিসি ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠান হংকংয়ের ওভিই অরূপ কনস্ট্রাকশন যৌথভাবে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই করে। এর ভিত্তিতেই এর নির্মাণব্যয় চূড়ান্ত করা হয়েছিল। তখন টানেল নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় পাঁচ হাজার ৬০০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। তবে অর্থায়নের নিশ্চয়তা না থাকায় সে সময় ডিপিপি ফেরত দেয় পরিকল্পনা কমিশন। পরে টানেলটি নির্মাণে সিসিসিসির সঙ্গে নির্মাণ চুক্তি সই করে সেতু বিভাগ।

সিসিসিসির প্রস্তাবনার ভিত্তিতে ২০১৫ সালে জুনে প্রকল্পটি ব্যয় ধরা হয় সাত হাজার ৭৮৪ কোটি ছয় লাখ টাকা। তবে সিসিসিসির কিছু প্রস্তাবে আপত্তি তুলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি)। এরপরও নির্মাণব্যয় না কমে উল্টো বেড়ে দাঁড়ায় আট হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। ২০১৫ সালের নভেম্বরে ওই ব্যয়েই প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়।

এদিকে ঋণচুক্তি সম্পাদনে দেরি হওয়ায় টানেলের নির্মাণকাজ শুরু হয় দুই বছর পর। তবে জমি অধিগ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধি, ভ্যাট ও কর পরিশোধের হার বৃদ্ধি, সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি, পরিষেবা সংযোগ লাইন স্থানান্তর ইত্যাদি খাতে ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাতে ২০২০ সালে টানেলটি নির্মাণব্যয় বেড়ে যায়। সে সময় এ ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ৮৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

ওই সময় প্রকল্পটিতে পাঁচ হাজার ৯১৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা ঋণ দেয়ার কথা ছিল চীনের এক্সিম ব্যাংকের। বাকি তিন হাজার ৯৬৭ কোটি ২১ লাখ টাকা সরকারের তহবিল থেকে সরবরাহ করতে হবে। দুই শতাংশ সুদে ২০ বছরে চীনের ঋণ শোধ করতে হবে। তবে পরবর্তীতে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

নির্মাণ শুরুর পরও টানেল ব্যয় স্থির থাকেনি। এর মধ্যে একবার জরুরি ভিত্তিতে ৪৯৪ কোটি দুই লাখ টাকা ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব বিশেষ অনুমোদন দেয়া হয়। তবে নির্মাণব্যয় বৃদ্ধির পরিমাণ প্রকল্প ব্যয়ের পাঁচ শতাংশের মধ্যে থাকায় তা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় (একনেক) পাঠানো হয়নি। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (অবকাঠামো) এ প্রস্তাব অনুমোদন করেন।

অন্যদিকে, গত জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু টানেলের ব্যয় আরেক দফা বাড়ানো হয়। সে সময় এ নির্মাণব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন চার হাজার ৬১৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং চায়না এক্সিম ব্যাংকের ঋণ ছয় হাজার ৭০ কোটি টাকা। ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বলা হয়Ñপ্রাইজ কন্টিনজেন্সি খাতে প্রদত্ত অতিরিক্ত অর্থ রাখা, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে ব্যয় বৃদ্ধি, প্রকল্পের কার্যক্রমের পরিধি পরিবর্তন, সার্ভিস এরিয়ার তৈজসপত্র, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী, আসবাবপত্র এবং গৃহসজ্জা সামগ্রী ক্রয়, নতুন অঙ্গ সংযোজন/বিয়োজন, ভ্যাট ও আইটি বৃদ্ধি এবং প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি।

এরই মধ্যে কর্ণফুলীর কাজ প্রায় শেষ। এখন চলছে উদ্বোধনের আগে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। এছাড়া গত জুলাইয়ে টানেলটির টোল নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু টানেল পারাপারে সর্বনি¤œ

 টোল ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রাইভেটকার, জিপ ও পিকআপের জন্য। আর সর্বোচ্চ টোল দিতে হবে ট্রাক ও ট্রেইলারকে। ট্রেইলারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত টোলের সঙ্গে প্রতিটি এক্সেলের জন্য আরও ২০০ টাকা করে বাড়তি দিতে হবে। তবে টানেলে বাইক চলাচলের অনুমতি নেই।

ব্যাংক ঋণ

বড়রা লুট করলেও কৃষকরা ফেরত দিচ্ছেন

সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৩, বণিক বার্তা

দেশের ব্যাংক ঋণের প্রায় ৯০ শতাংশই বড় শিল্প, ব্যবসা ও সেবা খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি প্রায় একই। ব্যাংকের খেলাপ হওয়া ঋণের সিংহভাগই বড় গ্রাহকদের নেয়া। খেলাপি এসব বড় গ্রাহক ব্যাংকের টাকা ফেরত না দিলেও আইনি প্রক্রিয়ারও বাইরে থেকে যাচ্ছেন। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেশের কৃষকরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের কৃষকরা ব্যাংক থেকে যে পরিমাণ ঋণ নিচ্ছেন, সুদসহ তার চেয়ে বেশি পরিশোধ করছেন।

দেশের ব্যাংকগুলো থেকে গত অর্থবছরে (২০২২-২৩) কৃষকরা ৩২ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। বিপরীতে তারা পরিশোধ করেছেন ৩৩ হাজার ১০ কোটি টাকা। এর আগেও কৃষকরা ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের চেয়ে বেশি পরিশোধ করেছেন। এমনকি কভিড-১৯ সৃষ্ট দুর্যোগের মধ্যেও কৃষি খাতে ঋণ বিতরণের চেয়ে আদায় হয়েছে বেশি। ২০২০-২১ অর্থবছরে কৃষি খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ২৫ হাজার ৫১১ কোটি টাকা। ওই বছর কৃষকরা ২৭ হাজার ১২৪ কোটি টাকা ব্যাংকে পরিশোধ করেছেন।

যদিও ব্যতিক্রম চিত্র দেখা যাচ্ছে শিল্প খাতে মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যাংকগুলো শিল্প খাতে মেয়াদি ঋণ বিতরণ করেছিল ৭২ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় করতে পেরেছিল ৬৪ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের শিল্প ঋণ বিতরণ ও আদায়ের চূড়ান্ত হিসাব এখনো প্রকাশ করতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরেও এ খাতে বিতরণের চেয়ে আদায় কম হয়েছে। এর আগের পাঁচ অর্থবছরের তথ্য পর্যালোচনায়ও দেখা গেছে, প্রতিবারই ব্যাংকগুলো শিল্প খাতে যে পরিমাণ ঋণ বিতরণ করেছে, আদায় হয়েছে তার চেয়ে অনেক কম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ১৪ লাখ ৯৪ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫২ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা ছিল কৃষি খাতে। সে হিসাবে ব্যাংক খাতের বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে কৃষকরা পেয়েছেন মাত্র ৩ দশমিক ৫২ শতাংশ। কৃষি খাতে বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৬ শতাংশ এখন খেলাপি। যদিও দেশের ব্যাংক খাতের বিতরণকৃত ঋণের খাতভিত্তিক গড় খেলাপির হার ৯ শতাংশ।

৩ মাসে কোটি টাকার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বেড়েছে ৩৩৬২

সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৩, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন- এই তিন মাসে ১ কোটি টাকার বেশি জমা আছে এমন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বেড়েছে ৩ হাজার ৩৬২টি।

আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত এক কোটি টাকার বেশি জমা থাকা অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ১৯২টি। জুন শেষে তা বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৫৪টি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৫৪টি অ্যাকাউন্টে মোট ৭ লাখ ৩১ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা জমা ছিল। এছাড়া, মার্চ শেষে ১ লাখ ১০ হাজার ১৯২টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মোট জমা ছিল ৬ লাখ ৯০ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য থেকে জানা গেছে, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতের মোট আমানতের ৪৩ শতাংশ এসব ধনীদের। তিন মাস আগে যা ছিল ৩২ দশমিক ২৮ শতাংশ।

বেসরকারি প্রভিডেন্ট ফান্ডে ২৭.৫ শতাংশ কর আরোপ

সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৩, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

চলতি অর্থবছর থেকে বেসরকারি কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর্মচারী কল্যাণ তহবিল থেকে অর্জিত আয়ের ওপর কর রিটার্ন দাখিল করতে হবে। শুধু তাই নয়, এই আয়ের ওপর ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।

২০২৩ সালের আইনে প্রভিডেন্ট ফান্ডের ওপর কর আরোপের এই বিধানটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও বেসরকারি খাতের প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি তহবিল ও শ্রমিকদের লভ্যাংশের তহবিলে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক এবং করছাড় তুলে নেওয়া হয়েছে।

৯ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বন্ধকি সম্পত্তির বুদবুদের ওপর ব্যাংক

সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৩, বণিক বার্তা

ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে সহায়ক জামানত হিসেবে এখনো জমি বা ফ্ল্যাটের মতো স্থাবর সম্পত্তিনির্ভর দেশের ব্যাংক খাত। যদিও ব্যাংকের কাছে বন্ধক থাকা সম্পদ বিক্রি করেও খেলাপি ঋণ আদায় সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, জামানতের সম্পদ বিক্রি করে দেশের ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের মাত্র ১২ দশমিক ৭৭ শতাংশ আদায় করতে পারছে। সে অনুযায়ী, জামানত থাকার পরও অনাদায়ী থেকে যাচ্ছে ৮৭ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ। জামানত বিক্রি করে অবলোপন করা ঋণ আদায়ের পরিস্থিতি আরো খারাপ।

জামানতের সম্পদ বিক্রি করে ঋণ আদায় সম্ভব না হলেও ব্যাংকগুলো জমি-বাড়ি বন্ধক রেখে ঋণ বিতরণ বাড়িয়েছে। এক যুগ আগে ২০১০ সালে জমি বন্ধকের বিপরীতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা, যা ছিল ওই সময় বিতরণকৃত মোট ঋণের ৪৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ। চলতি বছরের জুন শেষে জমি বন্ধক রেখে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ৯ লাখ ২০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। সে অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৬৩ দশমিক ৬৮ শতাংশই গেছে জমি-ফ্ল্যাট-বাড়িসহ রিয়েল এস্টেট সম্পত্তি বন্ধকের বিপরীতে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ব্যাংক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঋণের নামে অর্থ লোপাটের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সংগতি রেখেই জমি বন্ধক রেখে ঋণ বিতরণ বেড়েছে। জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে ঋণ বের করা অপেক্ষাকৃত সহজ। সরকারি খাসজমি, বিতর্কিত মালিকানার জমি বন্ধক রেখেও ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ বের করে নেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংক কর্মকর্তারা সহযোগীর ভূমিকা পালন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রভাবশালীদের বন্ধকি জমির মূল্য কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে। এ কারণে জামানতের সম্পদ বিক্রি করে খেলাপি ঋণ আদায় সম্ভব হচ্ছে না।

এক মাসে রিজার্ভ কমলো ২ বিলিয়ন ডলার

২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩, বাংলা ট্রিবিউন

রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে আসার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও কমেছে। গত এক মাসের ব্যবধানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার (১৯৮ কোটি) বা প্রায় ২ বিলিয়ন কমে গেছে।

বৃহস্পতিবার (২১ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বুধবার (২০ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত গ্রস রিজার্ভ ছিল ২ হাজার ৭৩৩ কোটি ডলার। এর আগে গত ২৩ আগস্ট গ্রস রিজার্ভ ছিল ২ হাজার ৯৩২ কোটি ডলার।

সংকটের মধ্যে সরকারের ‘গাড়িবিলাস’

২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

করোনাকালে দেশের অর্থনীতি সংকটে পড়েছিল। এখন চলছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধপরবর্তী সংকট। এই সংকটে সরকার মিতব্যয়িতা, অর্থাৎ কৃচ্ছ্রসাধনের ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই চলছে সরকারি কর্মচারীদের জন্য গাড়ি কেনা।

সরকারি কর্মচারীদের সরকার সুদমুক্ত ঋণে গাড়ি দেয়। এর বাইরে নতুন করে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) জন্য গাড়ি কেনা হচ্ছে। ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের জন্য গাড়ি কেনার প্রস্তাব জমা হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ে। প্রকৌশলী ও পুলিশের গাড়ি কেনার প্রস্তাবও জমা আছে।

সরকার গাড়ি কেনার ব্যয়সীমাও সম্প্রতি বাড়িয়েছে। এখন ৯৪ লাখ টাকার বদলে সর্বোচ্চ ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা দামের গাড়ি কেনা যাবে।

যদিও সরকার টাকার সংকটে রয়েছে। কয়েকটি খাতে ভর্তুকির অর্থ যথাসময়ে দেওয়া হচ্ছে না। জ্বালানি খাতে ভর্তুকি তুলে নেওয়া হয়েছে। সারে ভর্তুকি কমাতে দাম বাড়ানো হয়েছে দুই দফা। বিদ্যুৎ ও পানির দাম বাড়ানো হয়েছে দফায় দফায়। চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো কিছু খাদ্যপণ্যে শুল্কছাড়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব নাকচ করে দেওয়া হয়েছে।

কৃচ্ছ্রসাধনের জন্য চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের আওতায় সরকারি দপ্তরে সব ধরনের যানবাহন কেনা বন্ধ থাকবে বলে গত জুলাইয়ে পরিপত্র জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়। পরিপত্রে বলা হয়েছিল, ১০ বছরের পুরোনো গাড়ি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের অনুমোদন নিতে হবে।

গাড়ি কেনা বন্ধের কথা জানিয়ে ২০২০ সালের জুলাইয়ে এবং ২০২২ সালের জুলাইয়ে দুটি পরিপত্র জারি করেছিল অর্থ বিভাগ।

নতুন গাড়ি

ডিসি ও ইউএনওদের জন্য ২৬১টি নতুন গাড়ি কিনতে ৩৮০ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রস্তাবে গত ২৭ আগস্ট অনুমোদন দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। ৬৪ জেলার মধ্যে ৬১ জেলার ডিসিরা পাবেন নতুন গাড়ি। আর ইউএনওদের জন্য কেনা হচ্ছে ২০০টি গাড়ি। শর্ত শিথিল করে তাঁদের ২৭০০ সিসির (ইঞ্জিনক্ষমতা) গাড়ি দেওয়া হচ্ছে, যা গ্রেড-১ ও ২ (সচিব ও অতিরিক্ত সচিব) পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের প্রাধিকার।

১৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের জন্য নতুন গাড়ি কিনতে ২০ কোটি টাকা চেয়ে ১১ সেপ্টেম্বর অর্থ বিভাগকে চিঠি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।

গাড়ি চান স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপজেলা প্রকৌশলীরাও। তাঁরা চান ৪৩৩টি গাড়ি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির গত ২৭ আগস্টের একটি বৈঠকের কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, ওই প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পায়নি। তাই রাজস্ব বাজেট থেকে ক্রমান্বয়ে কেনা হবে।

পুলিশ গত বছর সেপ্টেম্বরে গাড়িসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কিনতে একটি প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে। এর মধ্যে গাড়ি কিনতে চাওয়া হয়েছে ২২৬ কোটি টাকা।

মুরগির বাচ্চার দাম ঊর্ধ্বমুখী, ডিম ও মুরগির দাম আরও বাড়তে পারে

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

বাজারে এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চার দাম বেড়েছে। চাহিদার তুলনায় মুরগির বাচ্চা কম উৎপাদন হওয়ার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে খামারিদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে যা ডিম ও মুরগির দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। এদিকে সরকার আইন করে এক দিনের মুরগির বাচ্চার আমদানি বন্ধ করতে যাচ্ছে। ফলে এ বাজার গুটিকয়েক কোম্পানির হাতে জিম্মি হয়ে পড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রান্তিক খামারিদের।

খামারি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক মাস আগে বাজারে একদিন বয়সী ব্রয়লার মুরগির একটি বাচ্চার দাম ছিল ২৭ থেকে ৩৫ টাকা। এখন যা ৪৯ থেকে ৫০ টাকা। প্রতিটি বাচ্চার দাম কমবেশি ২০ টাকা বাড়ার কারণে উৎপাদন খরচে তা যোগ হবে। খামারিরা মুরগি বিক্রির সময় এই অতিরিক্ত দাম রেখে দিতে চাইবেন।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস নেতিবাচকে নামিয়ে আনল ফিচ

সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৩, বণিক বার্তা

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পূর্বাভাসকে স্থিতিশীল থেকে নেতিবাচকে নামিয়ে এনেছে আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা ফিচ রেটিংস। তবে ঋণমানের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রায় দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা বা লং টার্ম ফরেন কারেন্সি ইস্যুয়ার ডিফল্ট রেটিং (আইডিআর) ‘‌বিবি মাইনাসে’ বহাল রেখেছে সংস্থাটি।

অর্থনৈতিক পূর্বাভাস স্থিতিশীল থেকে নেতিবাচকে আনার বড় কারণ হিসেবে ফিচের গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদনে রিজার্ভের পতন ও ডলার সংকটকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে নেয়া নীতিগত পদক্ষেপ এবং বিদেশী আনুষ্ঠানিক ঋণদাতাদের ক্রমাগত সহায়তাও রিজার্ভের পতন ও স্থানীয় বাজারে ডলার সংকট প্রশমন করতে পারেনি।

ফিচের ভাষ্যমতে, অর্থনীতিতে দেশের বাইরে ঘটা ঘটনাবলির অভিঘাত প্রশমনের মতো উপাদান (বাফার) কমে এসেছে। এসব বাফার দুর্বল হয়ে পড়ায় অর্থনীতিতে বহিঃস্থ অভিঘাত মোকাবেলায় বেশ নাজুক অবস্থানে পড়ে গেছে বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশের বিদেশী ঋণ প্রোফাইল এখনো নিয়ন্ত্রণযোগ্য অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও এখনো অনুকূলে। আবার সরকারের ঋণ সমতুল্য অনেক দেশের তুলনায় বেশ কম। এ কারণে ঋণমান এখনো বিবি মাইনাসে বহাল রাখা হয়েছে। যদিও এসব ইতিবাচক বিষয়ের বিপরীতে সরকারের রাজস্ব আহরণ ও মাথাপিছু আয় কম হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকিং সেক্টরের দুর্বলতা এবং সুশাসনের সূচকগুলোর ঘাটতির মতো বিষয়গুলোরও মোকাবেলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

দেশে রাশিয়ান ওলিগার্কের মতো শ্রেণি তৈরি হয়েছে

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩, মানবজমিন

দেশে রাশিয়ান ওলিগার্কের মতো শ্রেণি তৈরি হয়েছে। যারা সম্পদশীল ও রাজনৈতিকভাবে খুবই প্রভাবশালী। যার ফলে আয় বৈষম্য খুব দ্রুতই বাড়ছে। আর এই বৈষম্য বাড়ার পেছনে রয়েছে মূলত ৪টি কারণ। সেগুলো হলো- ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি না পাওয়া, রাজস্ব আদায় অগ্রগতি না হওয়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে স্বল্প বরাদ্দ দেয়া এবং সামাজিক সুরক্ষায় ঘাটতি থাকা। এদিকে গত এক যুগে দেশে ধনী-গরিব বৈষম্য বেড়েছে ৮০ গুণ। দেশের উন্নয়ন হলেও এর সুফল পৌঁছায়নি সবার কাছে, যা আগামীতে টেকসই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে।

গতকাল রাজধানীর কেআইবিতে ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন আখ্যান ও সমান্তরাল বাস্তবতা: পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ভাবনা’ শীর্ষক নাগরিক প্লাটফর্মের সংলাপ ও জনপ্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব বলেন সংগঠনটির আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

দুবাইয়ে ১১ হাজার কোম্পানি বাংলাদেশিদের, ছয় মাসে বেড়েছে ৪৭ শতাংশ

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) বাংলাদেশিদের মালিকানাধীন নিবন্ধিত কোম্পানির সংখ্যা বাড়ছে। দেশটির একটি রাজ্যে নিবন্ধিত কোম্পানির যে পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে, তাতে এই চিত্র দেখা গেছে। চলতি বছরের কেবল প্রথমার্ধেই (জানুয়ারি থেকে জুন) দুবাই চেম্বার অব কমার্সে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের সদস্যপদ নেওয়ার হার ৪৭ শতাংশ বেড়েছে।

ছয় মাসে বাংলাদেশিদের মালিকানাধীন ১ হাজার ৪৪টি কোম্পানি দুবাই চেম্বারের সদস্যপদ নিয়েছে। তাতে দুবাই চেম্বারের সদস্যপদ পাওয়া বাংলাদেশিদের মালিকানাধীন কোম্পানির মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৯৭৫টি।

১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত দুবাই চেম্বার অব কমার্স চলতি মাসে নিজেদের ওয়েবসাইটে এই তথ্য প্রকাশ করে। এই চেম্বারের সাড়ে তিন লাখের বেশি সদস্য কোম্পানি চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ১৩ হাজার ৭০০ কোটি দিরহাম বা ৩ হাজার ৭২৯ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি ও পুনরায় রপ্তানি করেছে বলে ওয়েবসাইটে তথ্য দেওয়া হয়েছে।

টেলিটকে বিনিয়োগ করতে চায় বসুন্ধরা গ্রুপ

সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৩, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

খুঁড়িয়ে চলা রাষ্ট্রায়ত্ব সেল ফোন অপারেটর টেলিটকে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপ। কৌশলগত বিনিয়োগকারীর হওয়ার এই প্রস্তাবটি যাচাই করে দেখছে টেলিটক। এটি এমন একটি পদক্ষেপ যা দেশের মোবাইল ফোন ব্যবসার চিত্র পাল্টে দিতে পারে।

১৯ বছরের পথচলায় প্রথম দুই বছর ছাড়া বাকি সব বছরেই লোকসানে থাকা টেলিটকের জন্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে জমা দেওয়া এই প্রস্তাবে নেটওয়ার্কের উন্নয়ন, গ্রাহক পরিসেবা বৃদ্ধি এবং টেলিটকের সিস্টেম আপগ্রেড করার একটি রূপরেখা দেওয়া হয়েছে বসুন্ধরা টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেডের পক্ষ থেকে।

টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের নির্দেশে, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২২৩ দশমিক ১ কোটি টাকা অর্থাৎ ২৭ দশমিক ২ শতাংশ সার্বিক লোকসানে থাকা টেলিটক এই প্রস্তাব মূল্যায়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে।

কঠিন শর্তের দ্বিপাক্ষিক ঋণ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধকে কঠিন করে তুলতে যাচ্ছে

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩, দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড অনলাইন বাংলা

আগামী বছরগুলোতে ঋণ পরিশোধের বোঝা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের ব্যালান্স অভ পেমেন্টের ওপর চাপ বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কারণ নমনীয় শর্তের বহুপাক্ষিক ঋণের চেয়ে কঠিন শর্তের দ্বিপাক্ষিক ঋণ নেওয়া দ্রুত বাড়ছে।

দ্বিপাক্ষিক ঋণ সাধারণত বহুপাক্ষিক ঋণের তুলনায় কম নমনীয় হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশ ঋণের শর্তাবলি আলোচনার বা প্রয়োজনে পেমেন্ট পুনর্নির্ধারণের সুযোগ কম পেতে পারে।

এ ধরনের ঋণে সুবিধাজনক শর্ত সাধারণত বহুপাক্ষিক ঋণের চেয়ে কম থাকে। দ্বিপাক্ষিক ঋণের সুদের হার বেশি হয়, সেইসঙ্গে গ্রেস পিরিয়ডও পাওয়া যায় কম এবং এ ঋণের শর্তগুলোও আরও কঠিন হয়ে থাকে।

দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতারা প্রায়ই প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়ার ওপর শর্তারোপ করে, যার জন্য ঋণগ্রহীতাদের নির্দিষ্ট দেশ বা কোম্পানি থেকে ঠিকাদার নিয়োগ করতে হয়। অন্যদিকে বহুপাক্ষিক ঋণদাতারা সাধারণত উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি অনুসরণ করতে দেয়, ফলে ঋণগ্রহীতাও সুবিধামতো ঠিকাদার বাছাই করতে পারে।

তাছাড়া দ্বিপাক্ষিক ঋণে উপকরণ কেনার ক্ষেত্রে অন্যান্য শর্তও আরোপ করা হয়। যেমন, ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ঋণ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে নির্মাণসামগ্রীর ৮৫ শতাংশ কিনতে হবে ভারত থেকে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট বিদেশি ঋণে বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার ঋণের হিস্যা ছিল ৫৯ শতাংশ; ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বহুপাক্ষিক সংস্থার ঋণের অংশ ছিল ৬৯ শতাংশ। এই সময়ে বাংলাদেশের মোট ঋণে দ্বিপাক্ষিক ঋণের হিস্যা ২৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪১ শতাংশ হয়েছে।

এছাড়া, তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের দায় বেড়ে হয়েছে ৬২.৩১ বিলিয়ন ডলার। পাঁচ বছরে মোট বৈদেশিক ঋণের দায় বেড়েছে ৬২ শতাংশ।

ইআরডির কর্মকর্তারা বলেন, বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় হওয়ায় ঋণ-দায় বাড়ছে। মেগা প্রকল্প ছাড়াও কোভিড পরিস্থিতি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকার যে বাজেট সহায়তা নিয়েছে, তার কারণেও বৈদেশিক ঋণের দায় বেড়েছে বলে জানান তারা।

বৈদেশিক ঋণের দায় বাড়ার কারণে ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়বে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সরকার ২.৬৭ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করেছে। বর্তমানে চলমান মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য সরকার যে ঋণ নিয়েছে, সেইসব ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হলে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে বলে ধারণা করছে ইআরডি।

ইআরডির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ঋণ পরিশোধ বেড়ে ৩.৫৬ বিলিয়ন ডলার হবে। আর ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হবে যাথাক্রমে ৪.২১ বিলিয়ন ও ৪.৭২ বিলিয়ন ডলার।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের সিংহভাগই এসেছে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো বড় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে।

ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে পাইপলাইনে বৈদেশিক ঋণ রয়েছে ৪৪.৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এ ঋণের জন্য সরকার ইতিমধ্যে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করেছে।

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন যে, এই পরিবর্তন দেশের ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে এবং ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য দেশের ওপর আরও চাপ তৈরি করতে পারে।

ইআরডির তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট বৈদেশিক ঋণে বিশ্বব্যাংকের অংশ কমে হয়েছে ৩১.৩৪ শতাংশ, আগের অর্থবছরে যা ছিল ৩২.৬০ শতাংশ। যদিও এ সময়ে বিশ্ব্যাংকের ঋণের দায় ১৮.১২ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১৯.৫৩ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। মাত্র দুই বছর আগে, ২০২০-২১ অর্থবছরে, বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক বকেয়া ঋণে বিশ্বব্যাংকের অংশ ছিল ৩৬ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের মতোই বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের দায়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) হিস্যাও কমেছে। ২০২১-২২ অর্থবছর শেষে মোট বৈদেশিক ঋণের দায়ে এডিবির অংশ ছিল ২৩.৮৮ শতাংশ, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২২.৬৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

অন্যদিকে ২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের দায়ে জাপানের অংশ ১৭.৬৫ শতাংশ, রাশিয়ার অংশ ৯.৪৭ শতাংশ এবং চীনের অংশ ৮.৬২ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া মোট ঋণের দায়ে ২০১৬ সালে চীনের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) অংশ বেড়ে ২.৪ শতাংশ হয়েছে।

ইআরডির তথ্য আরও বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে সরকারের বৈদেশিক ঋণের দায় বেড়ে হয়েছে ৬২.৩১ বিলিয়ন ডলার। এর আগের অর্থবছর শেষে বৈদেশিক ঋণের দায় ছিল ৫৫.৬০ বিলিয়ন ডলার। পাঁচ অর্থবছর আগে বৈদেশিক ঋণের দায় ছিল ৩৮.৪৭৫ বিলিয়ন ডলার।

প্রবাসী আয়ে বড় ধস, ৪১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন

০১ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

দেশের চলমান ডলার–সংকটের মধ্যে বড় ধরনের দুঃসংবাদ নিয়ে এল প্রবাসী আয়ের তথ্য। ডলার–সংকট কাটাতে অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যখন প্রবাসী ও রপ্তানি আয় বাড়িয়ে ডলার–সংকট মোকাবিলার কথা বলছেন, তখনই প্রবাসী আয়ে এ দুঃসংবাদ মিলল। গত ৪১ মাসে সর্বনিম্ন প্রবাসী আয় দেশে এসেছে সেপ্টেম্বর মাসে। প্রবাসী আয়সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের শেষ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

দেশে এক-তৃতীয়াংশ মানুষের নেই মানসম্মত বাসস্থান

০২ অক্টোবর ২০২৩, ইনডিপেনডেন্ট অনলাইন

নিজের কোনো জমি নেই- দেশে এমন মানুষের সংখ্যা ৯১ লাখ। আর মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ (এক-তৃতীয়াংশ) মানুষের নেই মানসম্মত আবাস। এমন পরিস্থিতিতে আজ সোমবার বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব বসতি দিবস। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে কেউ ভূমিহীন থাকবে না- এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে এরই মধ্যে ২ লাখ ১৫ হাজার ৮২৭ পরিবারকে জমিসহ নতুন ঘর দিয়েছে সরকার।

রাজধানীর কড়াইল বস্তির বাসিন্দা ঝর্না বেগম। পরিবারের পাঁচ সদস্যের বসবাস এই ঘরে। পশুপাখি এবং মানুষের একসঙ্গে বসবাস। রান্নাও একই ঘরে।

ঝর্না বেগম বলেন, ‘পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। চলফেরা করতে সমস্যা হয়। একটু খোলামেলা পরিবেশ পেলে ভালো হতো।’

এমন গল্প রাজধানীর প্রতিটি বস্তিতে। কারও আবার নেই এক টুকরো জমিও। মানসম্মত আবাস তাদের কাছে কেবলই স্বপ্ন। রাজধানীতে অনেকের আবার সেই সামর্থ্যটুকুও নেই, থাকতে হচ্ছে ফুটপাতে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা জরিপের তথ্য বলছে, নিজের কোনো জমি নেই, দেশে এমন মানুষের সংখ্যা ৯১ লাখ। আরেক পরিসংখ্যান বলছে, মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ মানুষের নেই মানসম্মত বাসযোগ্য ও নিরাপদ আবাস।

ডলারের সব উৎসে ভাটা

০৩ অক্টোবর ২৩, সমকাল

বিদেশি ঋণের ছাড়, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই, রপ্তানি কিংবা প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স)– কোনো উৎস থেকেই নেই সুখবর। ডলারের সব উৎসে চলছে ভাটার টান। অন্যদিকে বিদেশি ঋণের সুদাসল পরিশোধ করতে হচ্ছে আগের চেয়ে ঢের। এ ঋণে সুদের হারও এখন বেশি। একে তো ডলার আসছে কম, আবার পরিশোধ করতে হচ্ছে বেশি। এ দ্বিমুখী পরিস্থিতি রিজার্ভ সংকটের চাপকে আরও অসহনীয় করে তুলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ গত ২৬ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, রিজার্ভ ২১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এক বছরের ব্যবধানে রিজার্ভ কমেছে ১০ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পদ্ধতিতে এ হিসাব করা হয়েছে।

আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলে না

০৪ অক্টোবর ২৩, সমকাল

ঈশ্বরদী পৌর এলাকার সাঁড়াগোপালপুর গ্রামের শাবানা খাতুন। মাসিক ১১ হাজার টাকা বেতনে কাজ করেন ঈশ্বরদী ইপিজেডের একটি কারখানায়। সেই হিসাবে তাঁর প্রতিদিনের আয় ৩৬৬ টাকা। একই গ্রামের গৃহবধূ টিয়া খাতুন মাসিক ৯ হাজার টাকা বেতনে কাজ করেন আরেক প্রতিষ্ঠানে। তাঁর প্রতিদিনের আয় ৩০০ টাকা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে এ টাকায় স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

এ দুই শ্রমিক জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের তুলনায় বেতন কম। যাতায়াত, চাল, ডাল, তেল, লবণ, সবজিসহ অনেক জিনিসপত্র কিনতে নাভিশ্বাস উঠছে। অনেকটা নুন আনতে পানতা ফোরানোর মতো অবস্থা। এক কেজি বেগুন ৬০ টাকা। কচুর লতি ৭০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। অন্য সবজিও ৪০ থেকে ৫০ টাকা। একটি ডিমও এখন ১৩ টাকা। প্রয়োজনীয় অনেক জিনিসের দাম নাগালের বাইরে। সপ্তাহে একদিন ডিম রান্না করেন। তাও সন্তানদের পাতে একটির পরিবর্তে অর্ধেক দিতে হচ্ছে।

ইপিজেডের বিভিন্ন কারখানায় শাবানা ও টিয়ার মতো প্রায় ১৩ হাজার নারী শ্রমিক রয়েছেন। বড় অংশই ঈশ্বরদীর বাসিন্দা। পাশের লালপুর, বাঘা, চারঘাট, বড়াইগ্রাম, আটঘরিয়া, চাটমোহর, টেবুনিয়া, পাবনা, কুষ্টিয়া, ভেড়ামারা, দৌলতপুরের শ্রমিকও আছেন। শ্রমিকরা বলছেন, সামান্য আয়ে প্রতিদিন ভর্তা, সবজি কিংবা ডাল-ভাত ঠিকমতো জোগাড় করতে পারছেন না। পরিবারের সদস্যদের জন্য মাছ-মাংস কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। সন্তানরা মাছ কিংবা মাংস দিয়ে ভাত খেতে চাইলে লজ্জায় মুখ লুকাতে হয়। দ্রব্যমূল্য অনুযায়ী বেতন বাড়ানো হয়নি। কথা বললে চাকরি হারানোর ভয় থাকে। বাধ্য হয়ে এ বেতনেই কাজ করছেন। যদিও কর্তৃপক্ষ বলছে, বেপজার নিয়ম অনুসরণ করেই শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হয়।

ইপিজেড কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ৪১টি কারখানার মধ্যে চালু আছে ২০টি। চালুর অপেক্ষায় ও নির্মাণাধীন রয়েছে ২১টি। শ্রমিক-কর্মচারী আছে প্রায় ১৮ হাজার। এর মধ্যে নারী শ্রমিক ১২ হাজার ২০০ জন। বিদেশি ৭৬ জন কর্মরত রয়েছেন। প্রতিদিন সকাল ৮টায় কাজে যোগ দেন শ্রমিকরা। সে কারণে নারীদের ঘুম থেকে উঠতে হয় ভোরে। রান্না ও সংসারের কাজ সেরে কারখানার উদ্দেশে রওনা হন ৬টার মধ্যে। রাতে বাড়ি ফেরেন। কয়েক ঘণ্টা ঘুমের পর ফের শুরু হয় কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি।

জানা গেছে, সাধারণ নারী শ্রমিকদের মাসে গড়ে বেতন ৯ থেকে ১১ হাজার টাকা। তাদের প্রতিদিনের মজুরি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। তবে অভিজ্ঞ কিছু শ্রমিকের বেতন বেশি। টিয়া খাতুন জানান, দক্ষ শ্রমিক হলেও প্রতিষ্ঠান বদল করায় তাঁর বেতন ১০ হাজার থেকে কমিয়ে ৯ হাজার টাকা করা হয়েছে। নারী শ্রমিকরা বলছেন, দিনে ৫০০-৬০০ টাকা না হলে ন্যূনতম বাজার খরচ হয় না। আগে কর্মস্থলে যাতায়াতে ২০-৩০ টাকা খরচ হতো। এখন বেড়ে হয়েছে ৬০-৭০ টাকা। বিদ্যুৎ বিল, জ্বালানি, পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা, ওষুধ কেনা, কাপড়-চোপড়সহ অনেক ধরনের খরচ রয়েছে। সামান্য আয়ে সব জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মুদি দোকান থেকে অধিকাংশ শ্রমিকই বাকিতে জিনিসপত্র কেনেন। বেতন পেলে দেনা শোধ করে আবার বাকিতে পণ্য নেওয়া শুরু করেন। তবে শাক-সবজি, ডিম কিংবা পাঙাশ-সিলভার কার্প মাছ কেউ বাকিতে দেয় না। এতে কষ্ট বাড়ে জানিয়ে নারী শ্রমিকরা জানান, মুদি দোকানে হিসাবের খাতায় বাকির পরিমাণ বাড়ছে। অনেকের খেয়ে না খেয়ে চলতে হচ্ছে। মাসের শুরুতে কিছুদিন স্বাচ্ছন্দ্যে চলে। বাকি দিনগুলো কষ্টে চলতে হয়।

দুঃসহ জীবন

৫ অক্টোবর ২০২৩, মানবজমিন

তিন বছর বয়সী নুহা। মাছ-মাংস ছাড়া কিছুই খেতে চায় না। প্লেটের পাশে ডিম দেখলে বেজায় খুশি। মায়ের দিকে তাকিয়ে মিটমিটিয়ে হাসতে থাকে। কিন্তু তিন-চার মাস ধরে বড্ড অভিমান তার। মাছ-মাংসের দেখা নেই। খাবারের প্লেট দেখলেই এদিকে-সেদিকে ছোটাছুটি করে। কখনো লুকিয়ে থাকে টেবিলের নিচে আবার কখনো দেয়ালের পাশে। মা শিরিনা বেগম সন্তানের মুখে খাবার দিলেই কান্নাকাটি করে। শাক-সবজি দিয়ে খেতে চায় না।

নুহা ঠিকমতো খাবার না খাওয়ায় তার অসহায় বাবা-মাও চিন্তিত। নুহার বাবা সিহাব বলেন, তিন-চার মাস ধরে মাছ-মাংস আগের মতো কিনতে পারি না। কয়েকদিন আগেও বাচ্চার পাতে ডিম দিতাম। কিন্তু সেটিরও দাম বাড়ছে। মেয়েটি শাক-সবজি দিয়ে ভাত খেতে চায় না। আগে প্লেটে মাছ-মাংস দেখলে নিজেই দৌড়ে আসতো খেতে। শাক-সবজি খেতে খেতে ও নিজেই এখন বিরক্ত। আয় নেই অথচ দিন দিন সব জিনিসের দাম নাগালের বাইরে চলে গেছে।

নুহার মা শিরিনা বেগম বলেন, আমার স্বামী একটি হোটেলের কর্মচারী। মাস শেষে ১০ হাজার টাকা বেতন পান। তা থেকে ঘর ভাড়া ৬ হাজার টাকা দিতে হয়। মেয়েটার জন্য কোনো বাড়তি খাবারও কিনতে পারি না। গত তিন মাস ধরে আমি একটা বাসায় কাজ করি। সেখান থেকে সারাদিন কাজ করে মাসে ৪ হাজার টাকা পাই। এই দু’জনের টাকা দিয়ে কিছুই হয় না। নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম শুধু বাড়তি নয়, একদম নাগালের বাইরে চলে গেছে। সামনের দিনগুলো কীভাবে যাবে তা নিয়ে চিন্তায় আছি।

শুধু নুহার পরিবার নয়, কম আয় করেন এমন পরিবারের মানুষেরা দুঃসহ সময় পার করছেন নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে। নানা প্রয়োজনে যারা শহরে মেসে থাকেন তাদেরও বেড়েছে ভোগান্তি। শুধু কম আয়ের মানুষই না মধ্যবিত্ত ও মধ্যম আয়ের মানুষদেরও নাভিশ্বাস অবস্থা নিত্যপণ্যের উচ্চ দামের কারণে। প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতা থেমে নেই। কোনো না কোনো অজুহাতে বাড়ছে বিভিন্ন পণ্যের দাম।  এ কারণে কম বা সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে।

সারাদিন যা আয় করেন তা দিয়ে সংসারের খরচ চালান হেলাল উদ্দিন। তিনি পেশায় একজন রিকশাচালক। কিছুটা বয়সও হয়েছে তার। তিনি বলেন, দিনের আয় দিনে খাই। কখনো ১ হাজার, কখনো ৭০০-১০০০ টাকা আয় হয়। স্ত্রী ও তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে আমার সংসার। ঢাকার রাজাবাজারে থাকি। ঘর ভাড়া দিতে হয় ৭ হাজার টাকা। যে টাকা আয় হয় তা দিয়ে আলু ভর্তা দিয়েই খেতে পারি। বাজার করতে গেলে পকেটে টাকা থাকে না। কী দিয়ে কী কিনবো সব কিছুর দামই তো বাড়তি। এই আয়ের টাকা দিয়ে মাছ-মাংস কেনা যায় না, এগুলো আমরা কল্পনাও করতে পারি না। শুধু খাওয়া ছাড়া কি সংসারে আর কোনো খরচ নেই? ওষুধপাতিও কিনতে হয়। ছোট সন্তানদের অনেক বাড়তি কিছুর চাহিদা থাকে কিন্তু মিটাতে পারি না। মেজো মেয়েটা কয়েকদিন মাংস খেতে চাচ্ছে কিন্তু দিতে পারছি না। অল্পকিছু মাংস কিনতে গেলেও পকেট থেকে ৫০০-৬০০ টাকা খরচ হয়ে যায়।

কাওরান বাজারের মদিনা হোটেলের ম্যানেজার রাজ বলেন, বর্তমান যে পরিস্থিতি তাতে আমাদের লসে ব্যবসা করতে হচ্ছে। বাজারে গেলে কোনোকিছু কম দামে পাওয়া যায় না। দাম কমার আশায় হোটেল চালিয়ে রাখতে হচ্ছে। আজ যে ব্যবসা খারাপ যাচ্ছে হয়তো কাল দাম কমলে ভালো যাবে। সামনে নির্বাচন এটিও ভাবাচ্ছে।

এই ব্যবসায়ী মনে করেন নিত্যপণ্যের দামের কারণে মানুষ খাবারের পরিমাণটা আগের চেয়ে কমিয়ে দিয়েছে। বাড়তি দামের কারণে মানুষ হোটেলে খাবার কমিয়ে দিয়েছে। আগে যারা হোটেলে আসলে মাছ, মাংস দিয়ে ভাত খেতো তারা এখন কোনোমতে সবজি বা ডাল-ভর্তা খেয়ে চলে যাচ্ছে। ডাল-সবজি, ভর্তা শেষ হয়ে যায় কিন্তু মাছ-মাংস ধরা থাকে। তিনি বলেন, আর্থিক সংকটের কারণে কর্মচারীও কমিয়ে দিয়েছি।

তেজতুরি বাজারের একটি মেসে থাকেন শিউলি আক্তার। তিনি বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি ছোট একটি চাকরিতে যুক্ত রয়েছি। মাসে ৪-৫ হাজার টাকা আয় হয়। গতকাল বাজারে গিয়ে আধা কেজি ঢেঁড়স, আলু আর মরিচ কিনেছি তাতেই অনেক টাকা খরচ। আগে নিয়ম করে একটা ডিম খেতাম কিন্তু সেটি গত দুই মাস ধরে খাচ্ছি না। দুই মাস ধরে কোনো ডিম কিনছি না। মাছ-মাংস তো কিনতেই পারি না। এই টাকা দিয়ে বাসা ভাড়া দিতে হয় ৩ হাজার টাকা। সবকিছুর এত দাম বাড়লে আমরা খাবো কী? কীভাবে চলবো। অনেক কঠিন হয়ে যাচ্ছে জীবন।

দিনমজুর জসিম বলেন, স্ত্রী- সন্তান ঢাকায় ছিল। দুই মাস হলো তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি। নাখালপাড়ার এক রুমের একটি বাসায় তাদের নিয়ে থাকতাম। আমি দিনমজুরের কাজ করি। দিনে ৭০০-৯০০ টাকা আয় হয়। এই টাকা দিয়ে ঘর ভাড়া দেয়ার পরে কিছুই থাকে না। উপায় না পেয়ে দুই সন্তান ও স্ত্রীকে গ্রামের বাড়ি রংপুরে পাঠিয়ে দিয়েছি। কয়েকমাস আগেও ভালো চলছিল। কিন্তু গত চার মাস ধরে এই টাকায় কিছুই হয় না। বাজারে গেলে কিছুই কিনতে পারি না।

রাস্তায় ফেরি করে আচার বিক্রি করেন মোজাম্মেল হোসেন। তিনি বলেন, সবকিছুর দাম বাড়ছে কিন্তু মানুষের দাম বাড়েনি। আমরা কার কাছে বলবো এই কষ্টের কথা, কে আছে আমাদের। আমরা নিরুপায়, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে আরও আগে। এই টাকা দিয়ে কী করবো খাবো না বাসা ভাড়া দিবো। বাসায় গেলে ছোট মেয়েটা দৌড়ে আসে কী নিয়ে এসেছি- তাদের হাতে বাড়তি কোনো খাবার দিতে পারি না। বাজারে গেলে কম দামের মধ্যে কিছুই পাই না। তেল কিনতে গেলে টাকা শেষ। মাছ-মাংস কিনতে পারে না। অথচ এক বছর আগেও এই টাকার মধ্যে অনেক কিছু খেয়েছি।

রিজার্ভ কমছেই, পতন ঠেকানো যাচ্ছে না

০৫ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভ কমছেই। আমদানি নিয়ন্ত্রণসহ নানা চেষ্টার পরও রিজার্ভের পতন ঠেকানো যাচ্ছে না।

২০২১ সালের আগস্টে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভ ছিল ৪ হাজার ৮০০ কোটি বা ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। সেই রিজার্ভ এখন কমে হয়েছে ২ হাজার ৬৭৪ কোটি (২৬ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন) ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবপদ্ধতি বিপিএম ৬ অনুযায়ী, রিজার্ভ বর্তমানে ২ হাজার ৯০ কোটি (২০ দশমিক ৯০ বিলিয়ন) ডলার।

এর বাইরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিট বা প্রকৃত রিজার্ভের আরেকটি হিসাব রয়েছে, যা শুধু আইএমএফকে দেওয়া হয়। প্রকাশ করা হয় না। আইএমএফ সূত্রে জানা গেছে, সেই হিসাবে দেশের প্রকৃত রিজার্ভ এখন প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি বা ১৭ বিলিয়ন ডলার। গত দুই বছরে প্রতি মাসেই রিজার্ভ গড়ে ১০০ কোটি বা ১ বিলিয়ন ডলার করে কমেছে।

‘শুধু আমদানি না, সব ধরনের বিদেশি খরচ যাতে মেটানো যায়, এ জন্য নিট রিজার্ভ ধরে রাখাটা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, দুর্যোগ হলে খাদ্য ও সরঞ্জাম প্রয়োজন হবে, কৃষির জন্য সার আনতেই হবে।

সালেহউদ্দিন আহমেদ, সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এখন যে প্রকৃত রিজার্ভ আছে, তা দিয়ে শুধু তিন মাসের আমদানি খরচ মেটানো যাবে, অন্য কোনো খরচ নয়। সাধারণত একটি দেশের ন্যূনতম তিন মাসের আমদানি খরচের সমান রিজার্ভ থাকতে হয়। সেই হিসাবে বাংলাদেশ এখন শেষ প্রান্তে রয়েছে। একটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম সূচকই হলো বৈদেশিক মুদ্রার এই রিজার্ভ। কিন্তু এই রিজার্ভের পতনই ঠেকানো যাচ্ছে না।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের আর্থিক ভঙ্গুরতা বেড়েছে

অক্টোবর ০৮, ২০২৩, বণিক বার্তা

দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আর্থিক পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে। চলতি বছরের জুন শেষে এ ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ২৫ শতাংশই খেলাপির খাতায় উঠেছে। গত ডিসেম্বর শেষেও এ ব্যাংকগুলোর খেলাপির হার ২০ শতাশের নিচে ছিল। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর মূলধন কাঠামো আরো ভঙ্গুর হয়েছে। বেড়েছে ব্যাংকগুলোর সঞ্চিতি (প্রভিশন) ঘাটতির পরিমাণও। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সম্পদের বিপরীতে আয় (আরওএ) এবং ইকুইটির বিপরীতে আয়ও (আরওই) নেতিবাচক (ঋণাত্মক) ধারায় চলে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে সরকার মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর দীনতার এ চিত্র উঠে এসেছে।

সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল)—এ ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে এ ছয়টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৪ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। এর মধ্যে এক জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা। ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ৬৪ শতাংশই এখন খেলাপি। অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণও ১৬ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ২৩ দশমিক ৫১ শতাংশ। সোনালী ব্যাংকের ১২ হাজার ৩৮২ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। সরকারি খাতের সর্ববৃহৎ এ ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের হার ১৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ। আর রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮ হাজার ৩৯ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত এ ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ১৯ শতাংশের বেশি। লুণ্ঠনের শিকার হওয়া বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন ৮ হাজার ২৫ কোটি টাকা। এ ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ৬২ দশমিক ৬৬ শতাংশই খেলাপি। বিডিবিএলের খেলাপি ঋণের হারও ৪৪ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে, যার পরিমাণ ৯৭১ কোটি টাকা।

দেশের ব্যাংক খাতের জন্য অনুসরণীয় ব্যাসেল-৩-এর মানদণ্ড অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণের হার (সিআরএআর) ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ থাকার কথা। যদিও চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এ ব্যাংকগুলো মাত্র ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ সিআরএআর রাখতে পেরেছে। খেলাপি ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতিও রাখতে পারেনি এ ব্যাংকগুলো। ফলে জুন শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত এ ছয় ব্যাংকের নিট খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশে। অর্থাৎ, এ ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ১১ শতাংশের কোনো সুরক্ষা কবচ নেই।

যেকোনো ব্যাংকের লাভ-লোকসানের চিত্র ফুটে ওঠে সম্পদের বিপরীতে আয় (আরওএ) এবং ইকুইটির বিপরীতে আয়ে (আরওই)। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ এ দুটি সূচকই নেতিবাচক ধারায় চলে গেছে। মার্চ শেষে ব্যাংকগুলোর সম্পদের বিপরীতে আয় (আরওএ) ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ। আর ইকুইটির বিপরীতে আয় (আরওই) ঋণাত্মক ২ দশমিক ৭৪ শতাংশে নেমে গেছে। অর্থাৎ, সমন্বিতভাবে এ ব্যাংকগুলো লোকসানে পড়েছে। যদিও এর আগের তিন প্রান্তিকে দুটি সূচকই ধনাত্মক ধারায় ছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন

০৯ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

নতুন করে দেশি-বিদেশি আরও চার ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। ফলে গত জুন শেষে দেশে মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন করে যে চারটি ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে সেগুলো হলো নতুন প্রজন্মের বেসরকারি বেঙ্গল ব্যাংক ও সিটিজেনস ব্যাংক এবং বিদেশি মালিকানাধীন হাবিব ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। চারটি ব্যাংকে গত মার্চ শেষেও মূলধন উদ্বৃত্ত ছিল।

ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকায় তাতে ব্যাংকগুলোর প্রভিশনিং বা নিরাপত্তা সঞ্চিতিও বাড়ছে। ফলে কোনো কোনো ব্যাংকে নতুন করে মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। আবার আগে থেকে ঘাটতি থাকা কিছু ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি আরও বেড়েছে।

আমানতকারীদের অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যাংকিংয়ের আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী, সব ব্যাংককে একটি নির্দিষ্ট হারে মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের অর্থ ও প্রতিবছরের মুনাফা থেকে এ মূলধন সংরক্ষণের বিধান রয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে মূলধন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ব্যাসেল-৩ নীতিমালা অনুসরণ করা হয়। ব্যাসেল-৩ নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ বা রিস্ক ওয়েটেড অ্যাসেটের ১০ শতাংশ বা ৪০০ কোটি টাকার মধ্যে যেটি বেশি, সেই পরিমাণ মূলধন সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যেসব ব্যাংক এ নীতিমালা অনুযায়ী মূলধন সংরক্ষণ করতে পারে না, সেসব ব্যাংককে মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মূলধন ঘাটতিতে থাকা সেসব ব্যাংক শেয়ারধারীদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুন শেষে যে ১৫টি ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে তার মধ্যে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক ৫টি, বেসরকারি খাতের ব্যাংক ৬টি, বিদেশি মালিকানাধীন ব্যাংক ২টি ও বিশেষায়িত ব্যাংক ২টি। জুন শেষে এ ১৫ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা। গত মার্চে মূলধন ঘাটতিতে ছিল ১১টি ব্যাংক। ওই ১১ ব্যাংকের সম্মিলিত ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩৩ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা। সেই হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে মূলধন ঘাটতির পরিমাণ বেড়েছে ১৬৯ কোটি টাকা। আর ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকের সংখ্যা বেড়েছে ৪।

গত জুন শেষে মূলধন ঘাটতিতে থাকা রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলো হলো অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংক। বেসরকারি খাতের ছয় ব্যাংক হলো বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, বেঙ্গল ব্যাংক, সিটিজেনস ব্যাংক, আইসিবি, ন্যাশনাল ব্যাংক ও পদ্মা ব্যাংক। এর মধ্যে বেঙ্গল ও সিটিজেনস ব্যাংক নতুন করে গত জুন শেষে মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। এ ছাড়া বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে হাবিব ব্যাংক ও ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং বিশেষায়িত ব্যাংকের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। জুন শেষে ব্যাংকটির ঘাটতির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ হাজার ৫৪১ কোটি টাকায়। গত মার্চ শেষে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪ হাজার ৯৪ কোটি টাকা।

নতুন করে যে চারটি ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি দেখা দিয়েছে সিটিজেনস ব্যাংকের। জুন শেষে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯৭ কোটি টাকার বেশি। অথচ মার্চ শেষে ব্যাংকটির প্রায় ৩ কোটি টাকা মূলধন উদ্বৃত্ত ছিল। এ ছাড়া জুন শেষে বেঙ্গল ব্যাংক, হাবিব ব্যাংক ও ব্যাংক অব পাকিস্তানের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৮৮, ৩৬ ও সাড়ে ৪২ কোটি টাকায়।

১৫ দুর্বল ব্যাংকের আরও অবনতি

০৮ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

কোনো ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতির অবনতি হলে বা অবনতির আশঙ্কা থাকলে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। দুর্বল ব্যাংকগুলোতে পর্যবেক্ষকের পরিবর্তে সমন্বয়ক নিয়োগ দেওয়া শুরু হয় গত বছরের জুলাইয়ে, বর্তমান গভর্নরের যোগদানের পর থেকে।

পর্যবেক্ষক ও সমন্বয়ক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা এসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বিভিন্ন সভায় যোগদানের পাশাপাশি সার্বক্ষণিক তদারকি করে আসছেন। এরপরও গত এক বছরে বিশেষ তদারকিতে থাকা বেশির ভাগ ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

দেশের এক–চতুর্থাংশ বা ১৫টি ব্যাংক এখন এমন বিশেষ তদারকির আওতায় রয়েছে। এই তদারকির কাজে যাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের বাড়তি ভাতাও দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, তদারকির আওতায় থাকা একাধিক ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাহিদামতো তারল্য জমা রাখছে না, বন্ধ হয়নি এদের ঋণের অনিয়মও।

এসব ব্যাংকের বাইরে আরও তিনটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ও কিছু বেসরকারি ব্যাংক অনিয়মের কারণে সংকটে পড়েছে। কিন্তু এরপরও কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের বিশেষ তদারকির আওতায় আনছে না। এসব কারণে ‘তদারকি মডেল’ কার্যত ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করছেন কোনো কোনো কর্মকর্তা। ফলে এসব ব্যাংক কোন উপায়ে সঠিক পথে ফিরবে, তা কেউ বলতে পারছেন না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ের ইঙ্গিত ছাড়া ব্যাংক খাত সঠিক পথে ফিরবে না। কারণ, এসব ব্যাংকের মালিকানার সঙ্গে জড়িত ও বড় গ্রাহকদের অনেকে প্রভাবশালী ও সরকারঘনিষ্ঠ। তাঁদের অনেকে সরকারের পদেও রয়েছেন। ফলে তাঁদের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো নীতি প্রয়োগ করছে না। এর ফলে অনেক ভালো ব্যাংক দিন দিন খারাপ হয়ে পড়ছে। আমানতকারীদের স্বার্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।

তদারকিতে থাকা ১৫ ব্যাংকের মধ্যে ৭টি চলছে সমন্বয়ক দিয়ে। এই ব্যাংকগুলো হচ্ছে ন্যাশনাল ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল)। এ ছাড়া পর্যবেক্ষক বসানো হয়েছে ৮ ব্যাংকে—সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। এসব ব্যাংকের মধ্যে গত এক বছরে (জুলাই ২০২২-জুন ২০২৩) ১২টিতেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে। আবার নতুন নতুন ঋণ অনিয়মের ঘটনাও ঘটেছে। আর খেলাপি ঋণ কমেছে শুধু বেসিক ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংকের।

৩ মাসে বৃদ্ধি পাওয়া খেলাপি ঋণের ৯৩ শতাংশই মাত্র ১১ ব্যাংকের

৮ অক্টোবর ২০২৩, দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা অনলাইন

দেশের ব্যাংকিংখাতে চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২৪,৪১৯ কোটি টাকা। এরমধ্যে ৯৩ শতাংশ খেলাপি ঋণই মাত্র ১১টি ব্যাংকের।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৪.৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের শর্ত পূরণের মধ্যে ব্যাংকগুলোর অস্বাভাবিক হারে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত সপ্তাহে এক প্রতিবেদনে এমনটিই জানিয়েছে তারা। কেন খেলাপি ঋণ বাড়ছে তা নির্ধারণে বিশেষ তদারকি জরুরি বলেও মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

এ বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রেকর্ড করেছে অগ্রণী, বেসিক, জনতা, রূপালী, এবি, আইএফআইসি, মার্কেন্টাইল, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক ও সাউথইস্ট ব্যাংক।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১০টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ তিন মাসে বেড়েছে ৪০০ কোটি টাকা থেকে প্রায় ১,৮০০ কোটি টাকা

এছাড়া, রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের একাই খেলাপি ঋণ বেড়ছে  ১৩,৬৫৫ কোটি টাকা। এতে ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮,৫৪২ কোটি টাকায়, যা ব্যাংকটির মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২.৬৪ শতাংশ।

আলোচ্য সময়ে বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি বেড়েছে এবি ব্যাংকের ১,৮৮৩ কোটি টাকা। এরপরে রয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংকের ১,৬১৫ কোটি টাকা।

অর্থনীতি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে

অক্টোবর ১০, ২০২৩, বণিক বার্তা

বাংলাদেশের অর্থনীতি যে এত দ্রুত পরিবর্তন হবে সেটি কেউ ভাবতে পারেনি। সরকারের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে অর্থনীতিবিদ এমনকি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধিদের কাছেও এ পরিস্থিতি যথেষ্ট উদ্বেগের। বেসরকারি খাতও স্নায়ুচাপে। তারাও মনে করছে না যে বাংলাদেশ সহজেই এ থেকে বের হতে পারবে। বাংলাদেশের অন্যতম বাণিজ্য অংশীদার দেশের দূতাবাসগুলো তাদের দেশের কোম্পানির পাওনা আদায়ে দৌড়ঝাঁপ করছে। বিদেশী অনেক ব্যাংক বাংলাদেশের এলসি খুলছে না কিংবা অনীহা দেখাচ্ছে। এমনকি সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভিত্তিতে ব্যবসা বাড়িয়েছেন এমন অনেক ব্যবসায়ীও (বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতের) এখন সরকারের কাছ থেকে পাওনা অর্থ ছাড় করতে না পেরে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণ না করায় এ সংকট তৈরি হয়েছে।

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সব সূচকই এখন চাপের মধ্যে রয়েছে। মূল্যস্ফীতির বাড়-বাড়ন্তে নাভিশ্বাস উঠছে মানুষের। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে। গত সেপ্টেম্বর শেষে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগের মাসের তুলনায় এ সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা ১২ শতাংশের নিচে নামানো যায়নি।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমেই কমছে। সর্বশেষ ৪ অক্টোবর আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুসারে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২১ দশমিক শূন্য ৫ বিলিয়ন ডলার। নিট রিজার্ভ ছিল ১৭ বিলিয়ন ডলার। গত সেপ্টেম্বরেই রিজার্ভ কমেছে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যেখানে গত দুই বছরে প্রতি মাসে গড়ে ১ বিলিয়ন ডলার করে রিজার্ভ কমেছে। রিজার্ভের ক্রমপতনে সরকারের আমদানি সক্ষমতাও দিন দিন কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি আইএমএফের লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে রিজার্ভ সংরক্ষণে ব্যর্থ হওয়ায় ঋণের দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ছাড় নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

রিজার্ভের পতন ঠেকাতে সরকার আমদানি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, মূলধনি যন্ত্রপানি ও মধ্যবর্তী পণ্য আমদানির পরিমাণ কমেছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিল্প প্রবৃদ্ধিতে। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিও এক অংকে নেমে গেছে। অন্যদিকে দেশের বৈদেশিক আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস রফতানিতেও সুখবর নেই। তৈরি পোশাক থেকে রফতানি আয় বাড়লেও অন্যান্য খাতের রফতানি কমেছে। পাশাপাশি বৈদেশিক আয়ের আরেক বড় উৎস রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধিও এখন নিম্নমুখী। গত সেপ্টেম্বরে ৪১ মাসের মধ্যে দেশে সবচেয়ে কম রেমিট্যান্স এসেছে। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বাজারে ডলারের দামে বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে। এতে ডলারের প্রাপ্যতার সংকট আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এমনকি অনেক ব্যাংকই ডলারের অভাবে এলসি খুলতে পারছে না।

অর্থনীতিবিদদের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও এখন বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন। তারা বলছেন, টেকসই উন্নয়ন আর্থিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কিন্তু এক্ষেত্রে যথেষ্ট দক্ষতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি আছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এখানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। অর্থনীতির ব্যবস্থাপনায় টেকসই ও কার্যকর পদক্ষেপ না থাকলে সুষ্ঠুভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব হবে না।

এবার আইডিবিও ইসলামী ব্যাংক ছেড়ে গেল

১১ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

এবার ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের মালিকানা ও পরিচালনা থেকে সরে দাঁড়াল সৌদি আরবভিত্তিক ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি)। ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে যুক্ত ছিল আন্তর্জাতিক ঋণদাতা এই সংস্থা। আইডিবির পক্ষে সবশেষ ব্যাংকটিতে পরিচালক ছিলেন মোহাম্মদ আল-মিদানী। এখন তিনি আর পর্ষদে নেই, ব্যাংকটি শেয়ারও ছেড়ে দেওয়া শুরু করেছে। এর আগেও অনেক বিদেশি সংস্থা ব্যাংকটি ছেড়ে যায়। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে এই তথ্য পাওয়া গেছে।

২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা নেয় চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপ। গ্রুপটির চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের ছেলে আহসানুল আলম এখন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান। তিনি জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি হিসেবে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান।

পণ্য আমদানিতে জাহাজ ভাড়া

কনটেইনারে কমেছে ৭০-৮০ শতাংশ, বাল্কে কমেছে ২০-৪২%

অক্টোবর ১২, ২০২৩, বণিক বার্তা

দেশে পণ্য আমদানিতে সবচেয়ে বড় উৎস দেশ চীন। দেশটি থেকে ৪০ ফুট কনটেইনারে সরাসরি পণ্য আনায় ভাড়া কমেছে ৭১-৭৫ শতাংশ, ট্রান্সশিপমেন্টের ক্ষেত্রে ভাড়া কমেছে ৭০ থেকে প্রায় ৭৩ শতাংশ। চীন থেকে ২০ ফুটের কনটেইনারে সরাসরি পণ্য আমদানিতে গত এক বছরে জাহাজ ভাড়া কমেছে ৭২-৭৩ শতাংশ। ৮০ শতাংশ কমেছে ট্রান্সশিপমেন্টের ক্ষেত্রে।

গত এক বছরে কনটেইনারের মতো বাল্কেও পণ্য আমদানিতে জাহাজ ভাড়া কমেছে ব্যাপক হারে। এ সময় কৃষ্ণ সাগরীয় দেশগুলো (রাশিয়া-ইউক্রেন) থেকে বাল্কে গম আমদানিতে জাহাজ ভাড়া কমেছে ২০-৩০ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়া-ভিয়েতনাম থেকে সিমেন্ট ক্লিংকার আমদানিতে ভাড়া কমেছে ৩০-৩৩ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে চট্টগ্রামে বাল্কে স্ক্র্যাপ আমদানিতে ভাড়া কমেছে ৪০ থেকে প্রায় ৪২ শতাংশ।

সমুদ্রপথকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গত এক বছরে জাহাজ পণ্য পরিবহন খরচ ব্যাপক মাত্রায় কমেছে। আমদানিনির্ভর দেশগুলোর প্রায় প্রতিটির ভোক্তা মূল্যসূচকে এর প্রভাবও দেখা যাচ্ছে। যদিও ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। গত এক বছরে এখানে পণ্যের দাম ও ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ক্রমাগত বেড়েছে। বিভিন্ন সময় এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে পণ্যের পরিবহন খরচকে বারবার দায়ী করেছেন ব্যবসায়ীরা। যদিও চট্টগ্রাম বন্দর ও পরিবহন কোম্পানিগুলো থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে গত এক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজ ভাড়া ব্যাপক মাত্রায় কমেছে।

ব্যয় সংকোচনের মধ্যে ২৬১ গাড়ি কেনার অনুমোদন

১২ অক্টোবর ২৩, সমকাল

আর্থিক সংকটে রয়েছে সরকার। এ জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ব্যয় সংকোচনের নীতি ঘোষিত রয়েছে। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারি যানবাহন কেনা বন্ধ রাখা হয়েছে। এই কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যেই জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের জন্য ৩৮০ কোটি ৬৫ লাখ টাকায় ২৬১টি জিপ কেনার প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। কোনো দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে এসব দামি গাড়ি কিনবে সরকারি যানবাহন অধিদপ্তর।

গতকাল বুধবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিটির ভার্চুয়াল সভায় এ প্রস্তাবের অনুমোদন দেওয়া হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। সাধারণত এ বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী নিজে কিংবা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। কিন্তু গতকালও কোনো ব্রিফ করা হয়নি।

এবার ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের রেকর্ড

অক্টোবর ১৩, ২০২৩, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

বাংলাদেশ ব্যাংক, খেলাপি ঋণ, ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, এনবিএফআই, ব্র্যাক ব্যাংক, আহসান এইচ মনসুর,

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত ইতোমধ্যে রেকর্ড খেলাপি ঋণে জর্জরিত। তবে, দেশের অর্থনীতির জন্য আরেকটি উদ্বেগজনক খবর হলো, ব্যাংকের পর এবার ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (এনবিএফআই) রেকর্ড খেলাপি ঋণে পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুন শেষে এ খাতে খেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মোট ঋণের ২৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

জুন শেষে ৩৫টি এনবিএফআইয়ের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৯৫১ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ২৫ দশমিক ২ শতাংশ বেশি (৪ হাজার ১৫ কোটি টাকা)।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে যেসব কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে, এই খাতে প্রকৃত খেলাপি ঋণ তার চেয়ে অনেক বেশি।’

খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় দেশের ২৪% মানুষ

১৬ অক্টোবর, প্রথম আলো

দেশের প্রতি চারজনের একজন খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় আছেন। আর হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৪৬ শতাংশ আছেন এ অবস্থায়। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) থেকে চলতি মাসে প্রকাশ করা এক জরিপ প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।

‘বাংলাদেশ ফুড সিকিউরিটি মনিটরিং রিপোর্ট: মে-আগস্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে ৩ অক্টোবর। দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে যাওয়া এবং এ কারণে মানুষের ক্ষয়ক্ষতির বৃদ্ধি খাদ্য পরিস্থিতির অবনতির অন্যতম কারণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় গ্রীষ্মকালে কম বৃষ্টি হয়েছে ও টানা তাপপ্রবাহ ছিল। বিশেষ করে রাজশাহী বিভাগে তাপপ্রবাহের তীব্রতা ছিল বেশি। গত আগস্টে চট্টগ্রাম ও সিলেট হঠাৎ বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে। এ ছাড়া ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিধসের ঘটনাও ঘটেছে। গত বছরও একই ধরনের আবহাওয়ার কারণে খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছিল।

এর আগে গত সেপ্টেম্বরে ‘বাংলাদেশ মার্কেট মনিটর: মে-জুলাই’ শীর্ষক আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ডব্লিউএফপি। সেখানে সংস্থাটি প্রবাসী আয় কমে যাওয়া এবং রিজার্ভ-সংকটের (বৈদেশিক মুদ্রা) কারণে বাংলাদেশে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে বলে উল্লেখ করে। একই সঙ্গে সার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় চাল ও সবজির মতো খাদ্যপণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে বলেও ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল। গত আগস্টে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৫ শতাংশ কমেছে এবং টাকার মান এযাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কমেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।

এ ছাড়া ২০২২ সালের এপ্রিলে প্রকাশ করা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানা ও ব্যয় জরিপে দেশে দারিদ্র্য ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ বলা হয়েছিল। করোনা মহামারি ও ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও দারিদ্র্যের হার কমেছে বলে এ জরিপে উঠে আসে।

দেশের নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর অবস্থা বুঝতে মিরপুরের পূর্ব কাজীপাড়ার বাসিন্দা মিনারা বেগমের সঙ্গে কথা হয়। অন্যের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করেন তিনি। পরিবারের অন্য তিনজনের দুজন দিনমজুরির কাজ করেন। সব মিলিয়ে পরিবারের আয় মাসে ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা। পরিবারে তিন বেলার খাবার জোগাতে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা খরচ হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, চালের দাম কিছুটা কমেছে, কিন্তু সবজি-ডিমের খরচ তো বেড়েছে।

এ পটভূমিতে আজ সোমবার বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব খাদ্য দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য, ‘পানিই জীবন, পানিই খাদ্য। কাউকে পেছনে ফেলে এগোনো যাবে না।’

ডব্লিউএফপির প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ইসমাইল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি গুদামে ১৫ লাখ টনের ওপরে চাল ও দেড় লাখ টনের মতো গম আছে। আর স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বিস্তৃত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় চাল ও গম বিতরণ করছে সরকার। খাদ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত কর্মসূচির বাইরে সরকার টিসিবির মাধ্যমে এক কোটি দরিদ্র মানুষের জন্য চাল, গমসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য সাশ্রয়ী মূল্যে বিক্রির ব্যবস্থা করছে। ফলে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি যে ২৪ শতাংশ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় আছেন বলে তথ্য দিচ্ছে, তা সঠিক মনে হয় না।

খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার চিত্র ও কারণ

ডব্লিউএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামগ্রিকভাবে দেশের ২৪ শতাংশ মানুষ এবং হতদরিদ্র পরিবারগুলোতে ৪৬ শতাংশ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করছেন। তবে মধ্য আয়ের পরিবারগুলোর ৯ শতাংশ এবং উচ্চ আয়ের পরিবারের ৩ শতাংশ এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়েছে।

এদিকে জাতিসংঘের পাঁচটি সংস্থার বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টিসংক্রান্ত ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের সোয়া পাঁচ কোটির বেশি মানুষ খাদ্যে তীব্র থেকে মাঝারি ধরনের নিরাপত্তাহীন অবস্থায় আছেন। এর মধ্যে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন ১ কোটি ৮৭ লাখ মানুষ।

ডব্লিউএফপির জরিপে ৭১ শতাংশ পরিবার খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়াকে সর্বোচ্চ উদ্বেগের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রতি ১০ জনের ৭ জন জীবনযাত্রার মান কমিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। যাঁদের বড় অংশ আগের চেয়ে খাবার খাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন, ঋণ করছেন এবং উৎপাদনশীল সম্পদ বিক্রি করছেন ও বাকিতে খাবার কিনছেন।

খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার কারণ হিসেবে সংস্থাটি প্রতিবেদনে বলেছে, মূলত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে ও ধারাবাহিক দারিদ্র্য (ক্রনিক পোভার্টি) পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার চিত্র উঠে আসে।

বাড়ছে ঋণগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা

খাবার কিনতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে বলে ডব্লিউএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে বাকিতে খাবার কিনতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এ ধরনের মানুষের সংখ্যা চলতি বছরের মে মাসে ছিল ৩২ শতাংশ। আগস্টে তা বেড়ে ৪৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বাকিতে খাবার কিনতে চাওয়া মানুষের সংখ্যা সিলেটে ৫৩ শতাংশ ও চট্টগ্রামে ৫৮ শতাংশ। এসব মানুষ সরকারি ও বেসরকারিভাবে খুব বেশি সহায়তাও পাননি। মাত্র ২০ শতাংশ মানুষ আগস্ট মাসে সহায়তা পেয়েছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি ১০ পরিবারের ৩টি পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে না। আর দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় এ হার জনসংখ্যার অর্ধেক। দেশের ৭৪ শতাংশ মানুষ কম পরিমাণে ও সস্তা খাবার কিনছেন। সামগ্রিকভাবে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরিমাণ কমেছে।

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের (ইআরজি) নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাদ জহির প্রথম আলোকে বলেন, দেশে যে অভাবী মানুষ বেড়েছে, তা রাস্তায় বেরোলেই বোঝা যায়। তাই একটি অংশের মানুষ যে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছেন, তা সবার আগে স্বীকার করে নিতে হবে। ‘দেশে বিপুল পরিমাণে খাদ্য মজুত আছে, উৎপাদন ভালো হয়েছে’—এসব কথা বললেই দরিদ্র মানুষের পেটে খাবার যাওয়া নিশ্চিত হয় না। এ জন্য বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নিতে হবে।

ডব্লিউএফপি ২০২২ সালের জুলাই থেকে খাদ্যনিরাপত্তা ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে জরিপ করছে। সারা দেশ থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে নেওয়া ১ হাজার ২০০ মানুষের ওপরে এ জরিপ করা হচ্ছে। শুরুতে অতিমারি করোনার প্রভাব ও পরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে মানুষের আয় কমে যাওয়া এবং ব্যয় বেড়ে যাওয়ার চিত্র উঠে আসে। সর্বশেষ জরিপে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার চিত্র উঠে এল।

ভারতে যে ফাঁদে পড়ে মানুষ আত্মহত্যা করছেন, সেই ঋণের অ্যাপ বাংলাদেশে

১৬ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলৌ

ভারতের মুম্বাইয়ের আইনজীবী ভূমি সিনহা মুঠোফোনের অ্যাপভিত্তিক একটি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৪৭ হাজার রুপি নিয়েছিলেন। পরে সুদ ও আসলে তাঁর কাছে দাবি করা হয় ২০ লাখ রুপি।

ঋণ শোধ করেও পার পাননি ভূমি। ব্ল্যাকমেল (প্রতারণা) আর ফোনের অত্যাচারে তিনি শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যাকেই ভরসা মনে করেছিলেন। পরে স্বজনেরা তাঁকে রক্ষা করেন।

অবশ্য ভারতে অ্যাপভিত্তিক ঋণের ফাঁদে পড়ে ৬০ জনের মতো মানুষ আত্মহত্যা করেছেন বলে গত সপ্তাহে বিবিসির একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়। উদ্বেগজনক দিক হলো, বাংলাদেশেও ঋণ দেওয়ার অ্যাপ বাড়ছে। আর ওই সব অ্যাপ আইন মানছে না।

যেমন ‘সান ওয়ালেট সিকিউর লোন’ নামের একটি অ্যাপ ব্যক্তিপর্যায়ে ৬ থেকে ২৪ শতাংশ সুদে ৫ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের প্রস্তাব দিচ্ছে। অ্যাপটি চলতি বছরের এপ্রিলে গুগলের প্লে স্টোরে আসে। এখন পর্যন্ত এক লাখের বেশিবার ডাউনলোড করা হয়েছে।

বাংলাদেশে অ্যাপ খুলে ঋণ দেওয়ার নামে প্রতারণার ঘটনায় পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট আটটি মামলার তদন্ত করছে। এসব মামলায় গত আগস্টে চীনের ৭ নাগরিকসহ ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অ্যাপটির মূল্যায়ন (রিভিউ) অংশ ঘেঁটে দেখা যায়, বেশির ভাগ ব্যক্তিই নেতিবাচক মতামত দিয়েছেন। বাবু মিজি নামের একজন লিখেছেন, ‘অ্যাপটি কিছু ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে আমার সঙ্গে প্রতারণার চেষ্টা করছে। তার প্রমাণ আছে।’

বাংলাদেশে অ্যাপ খুলে ঋণ দেওয়ার নামে প্রতারণার ঘটনায় পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট আটটি মামলার তদন্ত করছে। এসব মামলায় গত আগস্টে চীনের ৭ নাগরিকসহ ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, চীনের নাগরিকেরা অ্যাপভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণের প্রলোভন দেখান। বিনা জামানতে ঋণ দেওয়ার কথা বলে মানুষকে ফাঁদে ফেলেন। ওই অ্যাপের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, ই-মেইল, মুঠোফোনের নম্বরসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে নেওয়া হয়। এরপর কাউকে ৫ হাজার টাকা ঋণ দিয়ে ৫০ হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা দাবি করা হয়। গ্রাহক টাকা দিতে অস্বীকার করলে ব্যক্তিগত তথ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়াসহ মামলার ভয় দেখানো হয়।

অনলাইনে কিছু অ্যাপের মাধ্যমে ঋণ দেওয়ার প্রচারণা নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক প্রথম আলোকে জানান, এগুলো শুনেছেন। কিছু বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাকি যেগুলোর নাম আসছে, সেগুলোর ব্যাপারে খোঁজ নিতে হবে।

ছয় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে ১.১২ লাখ কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি

১৬ অক্টোবর ২০২৩, দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড অনলাইন বাংলা

ছয়টি বড় অবকাঠামো প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়ন করতে না পারায় ১.১২ লাখ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্রকল্পগুলোর নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এই অর্থ দিয়ে চারটি পদ্মা সেতুর নির্মাণ করা যেত।

প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির ফলে উদ্ভূত সরাসরি ক্ষতি রয়েছে এই অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশে। আরেকটি বড় অংশ হলো টোল এবং যাত্রী ও মাল পরিবহন থেকে ভাড়া না পাওয়ার ফলে উদ্ভূত আর্থিক ক্ষতি।

এছাড়া এ বিলম্বের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি যেমন হয়েছে, তেমনি দেশ ও নাগরিকরা সুফল পেতেও বিলম্বের শিকার হয়েছে।

পদ্মা সেতু, খুলনা-মোংলা রেললাইন, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট, ঢাকা-টঙ্গী-জয়দেবপুর রেলপথ সম্প্রসারণ ও দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন—এই ছয়টি প্রকল্পের নথির তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এসব তথ্য জানতে পেরেছে।

অদক্ষতা, অর্থায়ন সংগ্রহে বিলম্ব, ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এবং সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশায় ত্রুটির কারণে এই প্রকল্পগুলো ৪ থেকে ১২ বছর বিলম্বের শিকার হয়েছে।

অনুমোদন দেওয়ার সময় কাজ শেষ করতে প্রত্যেকটি প্রকল্পের জন্য গড়ে ৫ বছর সময় দেওয়া হয়েছিল। তারপরও প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে চ্যালেঞ্জে পড়তে হয়েছে।

প্রাক্কলিত অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং ব্যয়বৃদ্ধির হিসাবে সবচেয়ে ব্যয়বহুল হবে দোহাজারী-কক্সবাজার রেল প্রকল্প। কারণ এই প্রকল্পের কাজ শেষ করতে সময় লাগছে প্রাথমিক পরিকল্পনার চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি, আর ব্যয় বেড়েছে প্রাথমিক হিসাবের চেয়ে ১০ গুণ বেশি। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পদ্মা সেতু। এরপর রয়েছে খুলনা-মোংলা রেললাইন, ঢাকা-টঙ্গী-জয়দেবপুর রেলপথ সম্প্রসারণ, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট এবং কর্ণফুলী টানেল।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ডিস্টিংগুইশড ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান টিবিএসকে বলেন, কাজ শেষ করতে দেরি হওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যাওয়া ছাড়াও আরও একাধিক ক্ষতি হয়।

প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়ায় ভোক্তার অধিকার বঞ্চিত হয়েছে, দেশ বিনিয়োগ বঞ্চিত হয়েছে, মন্থর হয়েছে কর্মসংস্থান ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতি এবং ঋণ পরিশোধে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির পাশাপাশি ভবিষ্যতের ওপরও চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘অবকাঠামো প্রকল্পগুলো ব্যবসার খরচ হ্রাস, গণপরিবহনে যাতায়াত সহজ এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে পারত। প্রকল্প বাস্তবায়নের বিলম্ব এসব খাতে বিরূপ প্রভাব ফেলে।’

এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, প্রকল্পগুলো সময়মতো শেষ করা গেলে তা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সাহায্য করতে পারত, যা উৎপাদনের পাশাপাশি আয় বাড়াত। ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ত, যা আরও বিনিয়োগ আকর্ষণ করত।

সামগ্রিক ক্ষতি

এই ছয়টি প্রকল্পের মধ্যে গত বছর শুধু পদ্মা সেতু প্রকল্পটি বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করেছে, তা-ও অনেক বিলম্বের পর। আর কর্ণফুলী টানেল, খুলনা-মোংলা বন্দর রেল সংযোগ এবং দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন চলতি মাসের শেষের দিকে ও আগামী মাসে উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে।

সরকার যখন এই প্রকল্পগুলোর অনুমোদন দেয়, তখন টোল আদায় থেকে তাৎক্ষণিক আর্থিক লাভ ও অন্যান্য অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। এ ছয়টি প্রকল্প যানবাহন পরিচালনার ব্যয় হ্রাস, সময় সাশ্রয়, যাত্রী ও মাল পরিবহনের সুবিধা, ট্রাফিক ডাইভারশন, জ্বালানি খরচ হ্রাস, দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং দূষণ কমানোসহ সম্ভাব্য ৫০ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুফল এনে দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। 

এই ছয় প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৫ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা, কিন্তু পরে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩ হাজার ২০১ কোটি টাকা। শুধু বিলম্বের জন্যই সরাসরি ক্ষতি হয়েছে ৩৭ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা।

টিবিএসের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ছয়টি প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে ২৩ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকার আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে সরকার।

গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামানের মতে, প্রকল্প অনুমোদনের পর্যায়ে অপর্যাপ্ত জরিপ, ত্রুটিপূর্ণ নকশা এবং অসম্পূর্ণ প্রাক্কলনের মতো বেশ কিছু দুর্বলতার কারণে প্রাথমিকভাবে বেঁধে দেওয়া সময় ও ব্যয় অনুসারে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, প্রথমে প্রকল্পের ব্যয় এবং বাস্তবায়নের সময় কম দেখানো হয়। এছাড়া অনুমোদন পাওয়ার জন্য প্রস্তুতি পর্যায়ে প্রত্যাশিত রিটার্ন অনেক বেশি দেখানো হয়। ত্রুটিপূর্ণ প্রাক্কলনের ওপর ভিত্তি করে প্রকল্পগুলো নেওয়ার ফলে সময়মতো বাস্তবায়ন ও সুফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কনসালটেন্ট, প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা এবং ঠিকাদারদের মধ্যে দক্ষতা ও নিষ্ঠার অভাব রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন হাদিউজ্জামান।

দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন

চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০১০ সালে। অনুমোদনের সময় প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল সাড়ে তিন বছরে।

কিন্তু বিলম্বের কারণে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে প্রায় ১৬ হাজার ১৮২ কোটি টাকা।

রেললাইনটি নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ বলে জানিয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। আগামী মাসে এই লাইনের মাধ্যমে রেলসেবার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুসারে, বিলম্বের কারণে এই লাইনে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে ভাড়া বাবদ যে ৫ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা আয় করতে পারত, তা থেকে বঞ্চিত হয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

এছাড়া যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয়ে সাশ্রয়, জ্বালানির ব্যবহার ও পরিবেশ দূষণ কমে আসায় আরও ৯ হাজার ৫৭ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারত।

নির্ধারিত সময়ে রেলসেবা চালু না হওয়ায় বঞ্চিত আর্থিক ও অর্থনৈতিক সুবিধাগুলোর মূল্য যোগ করলে বিলম্বের মোট খেসারত দাঁড়ায় ৩০ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা।

পদ্মা সেতু

২০০৭ সালে ১০ হাজার ১৬২ কোটি টাকা ব্যয় ধরে পদ্মা সেতু প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১১ সালে প্রকল্পটির ব্যয় বাড়িয়ে ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা করা হয়, সেইসঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদও বাড়ানো হয় ২০১৫ সাল পর্যন্ত।

কিন্তু সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয় গত বছর, ২০২২ সালের জুন মাসে।

বিলম্বের কারণে এই অবকাঠামোর নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে ১২ হাজার ৯৮ কোটি টাকা।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে করা একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষার তথ্য অনুসারে, ২০১৪ সালে সেতুটি চালু হলে গত নয় বছরে মোট টোল আদায় হতো ৭ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা।

এছাড়া যানবাহন পরিচালনা এবং ভ্রমণের সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ের মাধ্যমে দেশ অর্থনৈতিকভাবে ২০ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে উঠে এসেছে প্রকল্পের নথিতে।

খুলনা-মোংলা রেলপথ

প্রকল্পটি ২০১০ সালে শুরু হয়, ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। ২০১৩ সালের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে এ প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ২ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকা।

আগামী মাসে লাইনটি উদ্বোধন হওয়ার কথা থাকলেও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের তারিখ এখনও চূড়ান্ত করেনি বাংলাদেশ রেলওয়ে।

২০১৫ সালের মধ্যে ৬৪.৭৫ কিলোমিটার রেল সংযোগের কাজ শেষ হলে চলতি অর্থবছর নাগাদ যাত্রী ও মাল পরিবহন থেকে আয় হতো ৩ হাজার ২০৭ কোটি টাকা।

এছাড়া ট্রাফিক ডাইভারশন, জ্বালানি খরচ সাশ্রয়, দুর্ঘটনা হ্রাস এবং আর্থ-সামাজিক সুফল মিলিয়ে এ প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে ৭ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় করত।

তিন দিক মিলিয়ে এ প্রকল্পের কাজ শেষ করায় বিলম্বের কারণে সম্মিলিত ক্ষতি হয়েছে ১৩ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা।

ঢাকা-টঙ্গী-জয়দেবপুর রেলপথ সম্প্রসারণ

২০১২ সালের জুলাইয়ে ঢাকা-টঙ্গী-জয়দেবপুর রেললাইন সম্প্রসারণের প্রকল্প নেওয়া হয়। লক্ষ্য ছিল আড়াই বছর, অর্থাৎ ২০১৪ সালের জুনের মধ্যে এর কাজ শেষ হবে।

কিন্তু প্রকল্পটির কাজ এখনও সম্পন্ন হয়নি। কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ২০২৭ সালের আগে প্রকল্পটির কাজ শেষ হবে না—অর্থাৎ বাস্তবায়িত হতে ১২ বছরের বেশি বিলম্ব হবে।

এ বিলম্বের কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা, যা প্রাথমিক প্রাক্কলনের চেয়ে ২ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা বেশি।

১২ বছরের বিলম্বের কারণে বাংলাদেশ রেলওয়ে ৪ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা আয়ের সুযোগ হারিয়েছে।

এছাড়া ট্রাফিক ডাইভারশন, দুর্ঘটনা হ্রাস, ভ্রমণের সময় হ্রাস এবং আর্থ-সামাজিক সুফলের মাধ্যমে এ প্রকল্প থেকে ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকার সুফল পাওয়ার কথা ছিল।

বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে এ প্রকল্প থেকে মোট ১১ হাজার ৯১ কোটি টাকার পুঞ্জীভূত ক্ষতি হচ্ছে।

বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট

বিমানবন্দর এলাকা থেকে ৩৫ মিনিটে জয়দেবপুর যাতায়াতের জন্য ২০.৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) নির্মাণ প্রকল্পটি ২০১২ সালে অনুমোদন পায়। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের মধ্যে বিআরটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু কর্তৃপক্ষ এখনও সেবাটি চালু করার প্রত্যাশিত তারিখ ঠিক করেনি। এর মধ্যে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এ প্রকল্পে সরাসরি ২ হাজার ২২৮ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

গত আট বছরে যাত্রী ভাড়া থেকে ১ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা আয় করার কথা ছিল বিআরটির। আর যানবাহন পরিচালনার ব্যয়, যাতায়াতের সময়, দুর্ঘটনা এবং দূষণ কমার ফলে এ প্রকল্প থেকে ৫ হাজার ৭৭ কোটি টাকার সুফল পাওয়ার কথা ছিল।

এ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বিত হওয়ায় মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা।

বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট

বিমানবন্দর এলাকা থেকে ৩৫ মিনিটে জয়দেবপুর যাতায়াতের জন্য ২০.৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) নির্মাণ প্রকল্পটি ২০১২ সালে অনুমোদন পায়। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের মধ্যে বিআরটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু কর্তৃপক্ষ এখনও সেবাটি চালু করার প্রত্যাশিত তারিখ ঠিক করেনি। এর মধ্যে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। ব্যয় বাড়ার ফলে সরাসরি ২ হাজার ২২৮ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

প্রকল্পের নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত আট বছরে যাত্রী ভাড়া থেকেই সরাসরি ১ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা আয় আনার কথা ছিল বিআরটির। আর যানবাহন পরিচালনার ব্যয়, যাতায়াতের সময়, দুর্ঘটনা এবং দূষণ কমার ফলে এ প্রকল্প থেকে ৫ হাজার ৭৭ কোটি টাকার সুফল পাওয়ার কথা ছিল।

এ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বিত হওয়ায় মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা।

কর্ণফুলী টানেল

কর্ণফুলী নদীর তলদেশে মাল্টি-লেন রোড টানেল প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয় ২০১১ সালে। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা। ২০২০ সালের মধ্যে টানেলটি চালু হওয়ার কথা ছিল। বিলম্বের কারণে এ প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ২ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা।

নির্ধারিত সময়ের চার বছর পর, চলতি মাসে অবকাঠামোটি চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্পের নথি অনুসারে, বিলম্বের ফলে ১ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকার টোল আদায়ের সুযোগ হারিয়েছে সরকার।

এছাড়া ভ্রমণের সময়, দুর্ঘটনা ও পরিবহন ব্যয় হ্রাস হিসাবে নিয়ে প্রকল্পটি থেকে ৩ হাজার ৯২৯ কোটি টাকার সুফল পাওয়ার কথা ছিল।

এ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়ায় সার্বিক ৭ হাজার ৭১১ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

জলবায়ু তহবিলের ৫৩৬ কোটি টাকা ফেরত না দেওয়ায় পদ্মা ব্যাংকের এমডিকে তলব

১৭ অক্টোবর ২০২৩, আজকের পত্রিকা

জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের এফডিআরের ৫৩৬ কোটি টাকা আদায়ের জন্য পদ্মা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তারেক রিয়াজ খানকে তলব করেছে সংসদীয় কমিটি। আজ মঙ্গলবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে তাঁকে তলবের সিদ্ধান্ত হয়। গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছেন কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী।

সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম—কিছু অর্থ দিয়েছিলাম ফারমার্স ব্যাংকে, পরবর্তীতে সেটা হয়েছে পদ্মা ব্যাংক। সেটা নিয়ে আমরা আপডেট চেয়েছি। যা কমিটির পরবর্তী বৈঠকে আসবে। প্রাথমিকভাবে আমরা জেনেছি ওই ব্যাংক থেকে রি-পেমেন্টের একটা নতুন শিডিউল দেওয়া হয়েছে। সেটা জানুয়ারি মাস থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল। সেই শিডিউল অনুযায়ীও আমরা পেমেন্টগুলো পাচ্ছি না।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মাসে দেশে বৈধ পথে প্রবাসী আয় এসেছে ১৩৪ দশমিক ৩৬ কোটি মার্কিন ডলার। এর আগে শেষবার এর চেয়ে কম প্রবাসী আয় এসেছিল ২০২০ সালের এপ্রিলে। ওই মাসে প্রবাসী আয় এসেছিল ১০৯ কোটি মার্কিন ডলার।

ডাবল কাউন্টিং: রপ্তানির হিসাব বেশি হওয়ার নেপথ্য রহস্য

২০ অক্টোবর ২০২৩, দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড অনলাইন বাংলা

রপ্তানির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশের রপ্তানির পরিমাণে ভুল হিসাব করা হচ্ছে। এর ফলে প্রকৃত পরিমাণের চেয়ে বেশি দেখানো হচ্ছে রপ্তানি। বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন।

এই সমস্যাটি ‘ডাবল কাউন্টিং’ নামে পরিচিত। বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশ এই সমস্যায় ভুগছে। কারণ রপ্তানিকারকরা স্থানীয় রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলো (ইপিজেড) থেকে যে পণ্য ও অ্যাকসেসরিজ কেনে, তা দুইবার রপ্তানির হিসাবের মধ্যে আসছে—একবার রপ্তানিকারকের রপ্তানি হিসেবে, আরেকবার ইপিজেডের প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি হিসেবে।

স্টেকহোল্ডাররা বলছেন, রপ্তানির ডাবল কাউন্টিংয়ের ফলে দেশের রপ্তানির পরিমাণ বেশি দেখাচ্ছে। এতে রপ্তানি খাতের প্রকৃত পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

কর্মকর্তারা টিবিএসকে বলেন, এনবিআর ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে রপ্তানির পরিসংখ্যান হিসাব করায় এই বিভ্রান্তিকর তথ্যের সৃষ্টি হয়েছে।

রপ্তানির ডাবল কাউন্টিং ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের রপ্তানি পরিসংখ্যানের মধ্যে বড় ব্যবধানের কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইপিবির হিসাব অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ৫৫.৫৬ বিলিয়ন ডলার। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এর মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি আয় দেশে আসেনি।

স্টেকহোল্ডারর বলছেন, দেশে না আসা রপ্তানি আয়ের মধ্যে ডাবল কাউন্টিংয়ের অংশও রয়েছে।

ডাবল কাউন্টিংয়ের ব্যাপারটি নারায়ণগঞ্জের এমবি নিট ফ্যাশনস লিমিটেডের উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক। প্রতিষ্ঠানটি গত অর্থবছরে প্রায় ১,০০,০০০ ডলারের গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ কিনেছে ইপিজেড থেকে, যা দিয়ে পোশাক তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি রপ্তানি করেছে। এই অ্যাকসেসরিজের খরচসহ রপ্তানিকৃত পোশাকের মূল্য এমবি নিট ফ্যাশনসের রপ্তানির হিসাবে যুক্ত হয়েছে; আবার যে প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তারা অ্যাকসেসরিজ কিনেছে, ওই প্রতিষ্ঠানের রপ্তানির হিসাবেও যুক্ত হয়েছে। 

এভাবে শত শত কোম্পানির রপ্তানি এই পদ্ধতিতে ডাবল কাউন্ট করা হচ্ছে। এই সংখ্যাটি বেশ বড়।

ইপিবির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে স্থানীয় রপ্তানি কোডের মাধ্যমে রপ্তানি হয়েছে ১.৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এই পরিমাণ রপ্তানির অর্থ ডাবল কাউন্ট হয়েছে এবং তা বছরের পর বছর ধরে চলছে বলে উল্লেখ করছেন স্টেকহোল্ডাররা।

ইপিবির তথ্যানুসারে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ডাবল কাউন্টের পরিমাণ ছিল ১.০৬ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে তা ছিল ০.৪৯ বিলিয়ন ডলার।

খুলনার দৌলতপুর পাটকল

বন্ধ কারখানা বেসরকারি উদ্যোগে চালু হচ্ছে

২১ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

সাড়ে তিন বছর বন্ধ থাকার পর খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল দৌলতপুর জুট মিলটি ফরচুন গ্রুপের কাছে ইজারা দেওয়া হয়েছে। এখন বেসরকারি খাতের ফরচুন গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইউনি ওয়ার্ল্ড ফুটওয়্যার টেকনোলজি সেখানে নতুন করে উৎপাদন কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরই মধ্যে নিয়োগ করা হয়েছে শ্রমিক-কর্মচারী। কেনা হয়েছে পাটও। পাটপণ্যের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি ওই পাটকলে জুতাও তৈরি করবে।

এদিকে বন্ধ সব রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সরকারি মালিকানায় চালু ও শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধের দাবিতে নাগরিক ও শ্রমিকদের বেশ কয়েকটি সংগঠন আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

গত রোববার দৌলতপুর পাটকল সরেজমিনে দেখা যায়, মিলের প্রধান ফটকে বড় করে লেখা—‘দৌলতপুর জুট মিলস লিমিটেড, পরিচালনায় ইউনিওয়ার্ল্ড ফুটওয়্যার টেকনোলজি’। কারখানার ভেতরে শ্রমিকেরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করছেন। পাটকলের পুরোনো যন্ত্রপাতিগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। কৃষকের কাছ থেকে কেনা পাটের মান যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে।

বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি)  সূত্রে জানা গেছে, ১৯৫৩ সালে স্থাপিত দৌলতপুর জুট মিলটি ২০০২ সালে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর ২০১২-১৩ অর্থবছরে মিলটি পুনরায় চালু করা হয়েছিল। কিন্তু লোকসানের কারণে ২০২০ সালের জুলাইয়ে আবারও বন্ধ হয়ে যায় পাটকলটি। গত ৪ সেপ্টেম্বর মূল কারখানাসহ পাটকলের প্রায় ১৪ একর জায়গা ইজারা দেওয়া হয় ফরচুন গ্রুপকে। মাসিক সাড়ে ৯ লাখ টাকায় ৩০ বছরের জন্য এই ইজারা দেওয়া হয়েছে। প্রতি ৫ বছর পরপর ১০ শতাংশ করে ভাড়া বাড়ানো হবে। এরই মধ্যে তিন বছরের ভাড়া অগ্রিম পরিশোধ করেছে ফরচুন গ্রুপ।

ফরচুন গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ) মো. ইসহাক আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘নতুন করে মিলটি আমরা আবার চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। আশা করছি, আগামী মাসে উৎপাদনে যেতে পারব। এ মিলে উৎপাদিত পাটপণ্য ভারত, তুরস্ক, কানাডা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হবে।’

মো. ইসহাক আলী আরও বলেন, ‘জুতার ব্যবসা থেকে পাটের ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছি। জুতা তৈরিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি লাগবে। এ জন্য নতুন যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র বা এলসি খোলা হয়েছে। জুতার কারখানার জন্য আমাদের অন্য কারখানা থেকে ১০০ কর্মীকে প্রাথমিকভাবে খুলনায় বদলি করে আনা হয়েছে। জুতার কারখানার জন্য প্রায় ১ হাজার ২০০ শ্রমিক লাগবে। চলতি বছরের শেষে জুতা উৎপাদন শুরু করার আশা করছি।’

আমির হোসেন হাওলাদার ২০২০ সালে পাটকল বন্ধের সময় তিনি দৌলতপুর জুট মিলে লাইন সরদার ছিলেন। তিনি বলেন, এখন বেতন  কম। তারপরও কাজের সংস্থান হওয়ায় খুশি।

নতুন করে চালু হতে যাওয়া এ কারখানার ব্যবস্থাপক ফরচুন গ্রুপের মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, কারখানাটিতে প্রায় ২৫০ তাঁত আছে। এর মধ্যে ১৫০ তাঁত ঠিক করা হয়েছে। এরই মধ্যে এ অঞ্চলের বিভিন্ন পাটকলে কাজ করা শ্রমিকদের মধ্য থেকে ৭০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মিল চালুর আগে সব মিলিয়ে ৫০০ শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হবে।

বিজেএমসি সূত্রে জানা গেছে, খুলনা অঞ্চলের বন্ধ হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকলের মধ্যে যশোরের জেজেআইকে আকিজ গ্রুপের কাছে, খুলনার দৌলতপুর জুট মিল ফরচুন গ্রুপের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ইজারাগ্রহীতারা এসব মিলে পাটপণ্যই উৎপাদন করবেন। এ ছাড়া খুলনার ক্রিসেন্ট, খালিশপুর, ইস্টার্ন এবং যশোরের কার্পেটিং জুট মিলেরও ইজারার বিষয়ে অনুমোদন মিলছে। খালিশপুর জুট মিল রেডিয়্যান্ট গ্রুপ, যশোরের কার্পেটিং ও ইস্টার্ন জুট মিলকে ভারতের একটি কোম্পানি নিতে চাচ্ছে। আর খুলনার স্টার ও প্লাটিনাম জুট মিল ইজারা দেওয়ার জন্য আবারও দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া চলছে।

বিজেএমসির খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের সমন্বয়কারী গোলাম রব্বানী বলেন, ইজারা দেওয়ার উদ্যোগটা খুব ভালো। আবার এ অঞ্চলে শ্রমিকদের কর্মচঞ্চলতা ফিরবে। আর পুরো মিল ইজারা দেওয়া হচ্ছে না, আবার দীর্ঘ মেয়াদেও দেওয়া হচ্ছে না। ইজারার বাইরে যে অংশ, সেটি বিজেএমসির ব্যবস্থাপনায় থাকছে।

পাটকল রক্ষায় গঠিত সম্মিলিত নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক কুদরত ই খুদা বলেন, অতীতে দেখা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত থেকে বেসরকারি খাতে দেওয়া কোনো পাটকলই ভালোভাবে চলেনি। এসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে লুটপাট করার জন্য এসব মিল ইজারা নেয়। মিলগুলো শ্রমিকের কারণে লোকসান হয়নি, লোকসান হয়েছে ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি ও দুর্নীতির কারণে। তাই ইজারার মাধ্যমে নয়, রাষ্ট্রীয় মালিকানায় মিলগুলো চালু করা দরকার।

১০ টাকায় উৎপাদিত সবজির বাজারমূল্য ১২০ টাকা

অক্টোবর ২২, ২০২৩, বণিক বার্তা

সরকারের কৃষি বিপণন অধিদপ্তর প্রতি মৌসুমেই বিভিন্ন সবজির উৎপাদন খরচের হিসাব রাখে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী এক কেজি বেগুন উৎপাদনে খরচ হয় ১০ টাকার কিছু বেশি। অথচ বিভিন্ন হাত ঘুরে রাজধানীর খুচরা বাজারে সেই সবজি ভোক্তাকে কিনতে হচ্ছে ১০ গুণেরও বেশি দামে। আকার ও মানভেদে লম্বা ও গোল বেগুন বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি পর্যন্ত। এর কারণ জানতে চাইলে ব্যবসায়ীরা সামনে আনেন নানা অজুহাত।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি কেজি কাঁচা পেঁপে উৎপাদনে ৯ টাকা খরচ হলেও বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়। মিষ্টি কুমড়া প্রতি কেজির উৎপাদন খরচ ৭ টাকা ২২ পয়সা। রাজধানীর বাজারে এ সবজি এখন ৪০-৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি করলা উৎপাদনে সাড়ে ৯ টাকা খরচ হলেও ঢাকায় বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। ১০ টাকা ২৬ পয়সায় উৎপাদিত প্রতি কেজি লম্বা বেগুন ৮০-৯০ টাকা ও গোল বেগুন ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আবার লাল গোল বেগুনের দাম গিয়ে ১৫০-১৬০ টাকায় ঠেকেছে।

রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ঢেঁড়স ৮০-৯০ টাকা, শসা ৫০-৮০ টাকা, চিচিঙ্গা ও ধুন্দল ৮০, কাঁকরোল ৯০, কাঁচামরিচ ১৬০-২২০, শিম ১৮০-২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর প্রতি পিস লাউ ৭০-৮০ টাকা, জালি ৫০-৭০, ফুলকপি ৫০ ও বাঁধাকপি বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকায়। যদিও কৃষি বিপণনের হিসাবে, প্রতি কেজি পটোল উৎপাদনে খরচ হয় ৯ টাকা ৬৯ পয়সা, ঢেঁড়স ১২ টাকা ৪০ পয়সা, শসা ১০ টাকা ৮৪ পয়সা, চিচিঙ্গা ১১ টাকা ৪৭ পয়সা, কাঁচামরিচ ৪০ টাকা ১৭ পয়সা। আর প্রতি পিস লাউ ১৩ টাকা ২০ পয়সা ও জালি উৎপাদনের পেছনে ৯ টাকা ১৯ পয়সা খরচ হয়।

উৎপাদন খরচের সঙ্গে খুচরা বাজারের দামে অনেক বেশি তফাত থাকলেও কৃষকরা এর অংশীদার হতে পারছেন না। বগুড়ার বাজারে প্রতি কেজি শিম ১৮০ টাকায় বিক্রি হলেও কৃষক পাচ্ছেন কেবল ৮০ টাকা। ঠিক একইভাবে খুচরা বাজারে ৮০ টাকায় বিক্রি হওয়া পটোল ৩০ টাকা, ৪০ টাকার পেঁপে ৭-৮ টাকা, ৬০ টাকার লাউ ৩০ টাকা ও ১২০ টাকার বেগুন কৃষক বিক্রি করছেন ৭০ টাকায়।

সবজি উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কৃষকরা বলছেন, খেত থেকে সবজি তুলে পাইকারিতে তারা অল্প দামে বিক্রি করেন। তবে সেটি বিভিন্ন হাত ঘুরে অনেক মূল্য বেড়ে যায়। বগুড়ার সদর উপজেলার আব্দুলপুর ইউনিয়নের কৃষক রবিউল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাজারে দেখি সব সবজির আকাশছোঁয়া দাম। কিন্তু আমরা তো এত পাচ্ছি না।’ 

আবার সবজির পাইকারি থেকে খুচরা বাজারে যেতেই দাম বাড়ে প্রায় দ্বিগুণ। পাইকারিতে প্রতি কেজি শসা ৩২-৪০ টাকায় বিক্রি হলেও খুচরায় বিক্রি হচ্ছে ৫০-৮০ টাকায়। ৬০ টাকার করলা ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে খুচরা বাজারে। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অস্বাভাবিক পরিবহন ব্যয়, রাস্তায় চাঁদাবাজি, উৎপাদন কেন্দ্র থেকে বিক্রয় কেন্দ্র পর্যন্ত দফায় দফায় আড়তদারি (কমিশন) খরচসহ নানা ব্যয়ের কারণে সবজির দাম অস্বাভাবিক হচ্ছে। আবার চলতি অক্টোবরের প্রথম দুই সপ্তাহে বৃষ্টি থাকায় আগাম শীতকালীন সবজি আবাদ বিলম্বিত হয়েছে। বৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিভিন্ন স্থানের সবজির উৎপাদন। এতে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে বলে দাবি করছেন ব্যবসায়ীরা। আবার রাজধানীতে সবজি আনতে বিভিন্ন স্থানে বাড়তি চাঁদার কারণেও দাম বেড়ে যায় বলে তারা জানান।

সর্বজনীন পেনশন তহবিল থেকে ১১ কোটি টাকা বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে: অর্থমন্ত্রী

২২ অক্টোবর ২০২৩, দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড অনলাইন বাংলা

সর্বজনীন পেনশন তহবিলে জমা হওয়া অর্থ থেকে ১১ কোটি ৩১ লাখ টাকা ১০ বছর মেয়াদি বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

রোববার (২২ অক্টোবর) এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের বিনিয়োগের উদ্যোগ রয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, অনেক দেশই পেনশন তহবিল থেকে পুঁজি সংগ্রহ করে থাকে। আগে প্রভিডেন্ট ফান্ড গ্র্যাচুইটি ছিল, এখন পেনশন তহবিল তার বিকল্প।

প্রেস ব্রিফিংয়ে অর্থ সচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার ব্যক্তি চাঁদা দিয়ে পেনশন তহবিলে নিবন্ধন করেছেন। রোববার (২২ অক্টোবর) পর্যন্ত তহবিলে ১২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা জমা হয়েছে।

‘এর মধ্যে ১১ কোটি ৩১ লাখ টাকা দশ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে। সুদহার ১০.৫ শতাংশ।’

তিনি আরও বলেন, পেনশন তহবিলে জমা হওয়া টাকা সুরক্ষিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে সরকার। তারই অংশ হিসেবে ১১ কোটি ৩১ লাখ টাকা ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে।

নগদ ও কড়ি পাচ্ছে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংক

২২ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

দেশে প্রথমবারের মতো ডিজিটাল ব্যাংক গঠনের প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আজ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় ৮ প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল ব্যাংক গঠনের প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠানকে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংক গঠনের অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিন প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল উইং চালুর অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাকি তিন প্রতিষ্ঠান পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংকের অনুমতি পাবে। তবে এখন অনুমতি পাওয়া দুই প্রতিষ্ঠানের সেবা কেমন, তা পর্যালোচনার পর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান। তিনি বলেন, ৯ প্রতিষ্ঠানের নাম পরিচালনা পর্ষদে উপস্থাপন করা হয়। একটির সঙ্গে বিমা কোম্পানি যুক্ত থাকায় ৮টিকে বিবেচনা করেছে পরিচালনা পর্ষদ।

মেজবাউল হক জানান, নগদ ডিজিটাল ব্যাংক ও কড়ি ডিজিটাল ব্যাংককে পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি ১০ ব্যাংকের উদ্যোগে গঠিত ডিজিটেন ডিজিটাল ব্যাংক, বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক ও ব্যাংক এশিয়ার ডিজিটাল ব্যাংককে ডিজিটাল উইং চালুর অনুমোদন দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া দুই পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংক চালুর ৬ মাস পর সেবা পর্যালোচনা করে আরও তিন ব্যাংককে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংক দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এগুলো হলো স্মার্ট ডিজিটাল ব্যাংক, নর্থ ইস্ট ডিজিটাল ব্যাংক ও জাপান-বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংক চালুর অনুমতি পাওয়া নগদ ডিজিটাল ব্যাংকের সঙ্গে বর্তমান উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি রয়েছে সামিট ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান ফরিদ খানসহ অন্যরা। আর কড়ি ডিজিটাল ব্যাংকের মূল উদ্যোক্তা হাবিবুল্লাহ এন করিম, তিনি সাবেক অর্থসচিব ফাতিমা ইয়াসমিনের স্বামী। এই লাইসেন্স পাওয়ার জন্য ৫২টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছিল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সরকারের পক্ষ থেকে আগামী নির্বাচনের আগেই বহুল কাঙ্ক্ষিত ডিজিটাল ব্যাংক চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। দেশে এর আগে প্রচলিত ধারার ব্যাংক অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পেত। এবার ব্যবসায়ী ও আমলাদের প্রাধান্য দেখা গেল মনে করছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।

ঘোষণার ৩-৪গুণ বেশি রপ্তানি, টাকা আসে কম

২৩ অক্টোবর ২০২৩, শেয়ার বিজ

রপ্তানির ঘোষণা দেয়া হয়েছে প্রায় দুই লাখ রেডিমেড গার্মেন্ট পণ্য। কায়িক পরীক্ষায় পাওয়া গেল প্রায় তিন লাখ পণ্য। জালিয়াতি এখানে শেষ নয়। প্রতি কেজি পণ্যের মূল্য ঘোষণা দেয়া হয়েছে শূন্য দশমিক ৩৫ থেকে এক দশমিক ১৭ ডলার। একটি, দুটি নয়- ৩৭টি চালানে অতি নিন্মমূল্য বা নামমাত্র মূল্য ঘোষণা দিয়ে টি-শার্ট, সুইপ শার্ট, প্যান্ট,  ট্রাউজার, ক্যাপ প্রভৃতি রপ্তানির চেষ্টা করেছে একটি বাণিজ্যিক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। শুধু এই প্রতিষ্ঠান নয়, বেশিরভাগ ‘বাণিজ্যিক রপ্তানিকারক’ প্রতিষ্ঠানের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। মাত্র এক সপ্তাহে একটি বেসরকারি ডিপোয় রেডিমেড গার্মেন্টে ১১টি চালান যাচাই করেন কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তারা, যাতে প্রতিটি চালানে ৯ থেকে ১৮৬ শতাংশ পর্যন্ত অনিয়ম পেয়েছেন।

অনিয়মের মধ্যে রয়েছেÑঘোষণার তিন-চারগুণ বেশি পণ্য, ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য, নামমাত্র মূল্য ঘোষণা, অ্যাসাইকুডায় শুল্কায়ন না করে ম্যানুয়ালি শুল্কায়ন করা প্রভৃতি। অথচ এসব চালান কাস্টমস কর্মকর্তারা পরীক্ষণ করে ‘ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্য’ পেয়েছেন মর্মে প্রতিবেদন দিয়েছেন। অনিয়মের সঙ্গে রপ্তানিকারক, কাস্টমস কর্মকর্তা ও ডিপো কর্মকর্তারা জড়িত রয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাণিজ্যিক রপ্তানিকারকরা ঘোষণার তিন-চারগুণ বেশি পণ্য রপ্তানি করছেন। অথচ রপ্তানির এই টাকা দেশে আসে না। তাদের রপ্তানির আড়ালে অর্থপাচার রোধ করতে হলে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

এনবিআর সূত্রমতে, রপ্তানির আড়ালে অর্থপাচার প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগ রপ্তানিতে জালিয়াতি করছে। পণ্য রপ্তানিতে কখনও কম, কখনও বেশি ঘোষণা দিচ্ছে। আবার কখনও অতি নি¤œমূল্য ঘোষণা দিয়ে পণ্য রপ্তানি করছে। কখনও এক পণ্য ঘোষণা দিয়ে আরেক পণ্য রপ্তানি করছে। এর মাধ্যমে একদিকে রাজস্ব ফাঁকি হচ্ছে, অন্যদিকে রপ্তানির টাকা দেশে আসছে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস দিয়ে অহরহ এসব ঘটনা ঘটছে। কখনও কাস্টম হাউস আবার কখনও কাস্টমস গোয়েন্দা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পণ্য আটক, মামলা ও জরিমানা করছে। কিন্তু এসব বাণিজ্যিক আমদানিকারক যেন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। তবে রপ্তানির ক্ষেত্রে জালিয়াতিতে কাস্টম হাউসের গাফিলতি রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

একাধিক সূত্রমতে, রপ্তানির ক্ষেত্রে কাস্টমসের তদারকি নেই বললেই চলে। প্রায় ক্ষেত্রেই রপ্তানির পণ্য চালান অ্যাসাইকুডায় শুল্কায়ন না করে ম্যানুয়ালি শুল্কায়ন করেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। কাস্টম হাউসের কর্মকর্তারা যেসব রপ্তানি পণ্য চালান শুল্কায়ন করে সঠিক পেয়েছেন, সে চালান কাস্টমস গোয়েন্দা শুল্কায়ন করার পর জালিয়াতির তথ্য পেয়েছেন, এমন নজিরও রয়েছে।

সূত্রমতে, কাস্টমস গোয়েন্দা মাত্র এক সপ্তাহে ১১টি রপ্তানি চালান যাচাই করে, সবকটিতে অনিয়ম পেয়েছে। এসব চালানে অস্বাভাবিক পরিমাণে মিথ্যা ঘোষণাসহ অতিরিক্ত ‘রেডিমেড গার্মেন্ট’ পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে অর্থপাচারের  বিষয়টি উদ্ঘাটন করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা। কাস্টমস গোয়েন্দা এসব চালান পরীক্ষণের সময় কাস্টম হাউসের প্রতিনিধি, একটি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। ইহছাক ব্রাদার্স নামে বেসরকারি ডিপোয় থাকা বাণিজ্যিক রপ্তানিকারকদের এসব চালান ‘ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্য রয়েছে’Ñউল্লেখ করে কাস্টমস কর্মকর্তারা পরীক্ষণ করে ছেড়ে দিয়েছে। এসব রপ্তানিকারক রপ্তানির আড়ালে প্রচুর অর্থপাচার করেছে। এছাড়া এসব চালানের মাধ্যমে অর্থপাচারের চেষ্টা করেছেন। কাস্টমস গোয়েন্দা সেই ১১টি চালানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রতিবেদনসহ কাস্টম হাউসকে চিঠি দিয়েছে। ‘রপ্তানির আড়ালে অর্থপাচার রোধে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ’ করতে অনুরোধ জানিয়ে ১৭ অক্টোবর চিঠি দেয়া হয়।

প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ওই ১১টি চালানে ঘোষণাবহির্ভূত বা ঘোষণা অতিরিক্ত প্রায় ৯ থেকে ১৮৬ শতাংশ পর্যন্ত পণ্য পাওয়া গেছে। সি নাম্বার অনুযায়ী, ৫ অক্টোবরের একটি চালানে ৫৩ হাজার ৪০০টি রেডিমেট গার্মেন্ট পণ্য ঘোষণা দেয়া হয়েছে। পরীক্ষণে ঘোষণার অতিরিক্ত ৯৯ হাজার ৩০৮টি পণ্য পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ঘোষণার তুলনায় এই চালানে ১৮৬ শতাংশ বেশি পণ্য পাওয়া গেছে। অথচ কাস্টমস এই চালান পরীক্ষণ করে ‘ঘোষণার সঙ্গে সামসঞ্জ রয়েছে’ বলে উল্লেখ করে প্রতিবেদন দিয়েছে। একইভাবে ২৪ সেপ্টেম্বরের একটি চালানে ৫৩ হাজার ৭৩৫টির স্থলে ৮৩ হাজার ২৫৯টি অতিরিক্ত পাওয়া গেছে। এই চালানে অতিরিক্ত পাওয়া পণ্যের পরিমাণ ১৮১ শতাংশ। ৫ অক্টোবরের একটি চালানে ৫৩ হাজার ৭৩৫টি পণ্যের বিপরীতে অতিরিক্ত পাওয়া গেছে ৮৩ হাজার ২৫৯টি পণ্য, যা ঘোষণার অতিরিক্ত প্রায় ১৫৫ শতাংশ। ২৫ সেপ্টেম্বরে একটি রপ্তানিকারকের তিনটি চালানে ৯১ হাজার ৯৩১টি ঘোষণা অতিরিক্ত পণ্য পাওয়া গেছে, যা ঘোষণার চেয়ে ৭০, ৫৮ ও ৫১ শতাংশ বেশি। ৫ অক্টোবরের অপর এক রপ্তানিকারকের দুটি চালানে ৫৮ হাজার ৮১৮টি অতিরিক্ত পাওয়া গেছে, যা ৩৯ ও ৩৪ শতাংশ বেশি। ২৫ সেপ্টেম্বরের একটি চালানে ঘোষণার চেয়ে ১৪ হাজার ৮৭৪টি বেশি পাওয়া গেছে, যা ঘোষণার চেয়ে ৩০ শতাংশ বেশি। ২২ সেপ্টেম্বরের একটি চালানে ঘোষণার চেয়ে ছয় হাজার ১৩৯টি বেশি পাওয়া গেছে, যা ঘোষণার ১০ শতাংশ বেশি। ৫ অক্টোবরের একটি চালানে ছয় হাজার ১৩৭টি বেশি, যা ঘোষণার চেয়ে ৯ শতাংশ বেশি।

 ১১টি চালান পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পরীক্ষিত সব রপ্তানি চালানেই অস্বাভাবিক মিথ্যা ঘোষণা পাওয়া গেছে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই পণ্য চালান ‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম’-এ শুল্কায়ন না করে ম্যানুয়ালি শুল্কায়ন করে রপ্তানি অনুমতি দেয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে অর্থপাচারের অপচেষ্টার বিষয়টি সুষ্পষ্ট। এতে সব ঘটনার সঙ্গে আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ছাড়াও শুল্কায়নকারী কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতার বিষয়টি কাস্টমসসহ অন্যান্য সংস্থার প্রতিনিধিদের নজরে এসেছে। এছাড়া ডিপো কর্তৃপক্ষের অ্যাসাইকুডা পর্যবেক্ষণের সুযোগ না থাকায় বিল অব এক্সপোর্টের হার্ড কপির বিপরীতে পণ্য চালান রপ্তানির উদ্দেশ্যে ছাড় প্রদান করে থাকে, যার মাধ্যমে কৌশলে পণ্য জাহাজীকরণের পর শুল্কায়ন কার্যক্রম অ্যাসাইকুডাতে সম্পন্ন করা হয়। রপ্তানি চালান পরীক্ষণ বা শুল্কায়নসহ অন্য সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে এ-জাতীয় ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে না বলে কাস্টমস গোয়েন্দা মনে করে।

অন্যদিকে বাণিজ্যিক রপ্তানিকারকদের রপ্তানি চালানের মাধ্যমে অর্থপাচার রোধে কাস্টম হাউসকে দেয়া চিঠিতে আটটি সুপারিশ করে কাস্টমস গোয়েন্দা। যার মধ্যে রয়েছেÑম্যানুয়ালি পণ্য চালান শুল্কায়ন দ্রুত বন্ধ করা, বিশেষ করে বাণিজ্যিক রপ্তানিকারকসহ অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ চালানের ক্ষেত্রে; শুল্কায়ন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ আয়োজন; জড়িত আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, শুল্কায়ন ও পরীক্ষণকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ; ঝুঁকিপূর্ণ বা অস্তিত্বহীন রপ্তানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের পণ্য চালান নজরদারির ব্যবস্থা গ্রহণ; ডিপো কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের অ্যাসাইকুডা পর্যবেক্ষণের জন্য আইডি, পাসওয়ার্ড সরবরাহকরণ; সব রপ্তানি চালান পাঁচ বা দুই শতাংশ পরীক্ষণ না করে ঝুঁকিপূর্ণ চালান চিহ্নিত করে, বিশেষ করে বাণিজ্যিক রপ্তানিকারকের পণ্য চালান ১০০ শতাংশ পরীক্ষণ; বন্দরের ন্যায় সব ডিপো গেটে নজরদারির ব্যবস্থা গ্রহণে কর্মকর্তা-কর্মচারী পদায়ন করা।

সরকারি বহুতল এই ভবনগুলো এখন বোঝা

২৩ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

ঢাকা জেলা পরিষদের ২০ তলা একটি ভবন সাত বছর ধরে খালি পড়ে রয়েছে। পুরান ঢাকার জনসন রোডের মোড়ে অবস্থিত এ বহুতল ভবনটি নির্মাণের সময় নিয়মনীতি মানা হয়নি। ২০১৬ সালে অনিয়ম ধরা পড়ার পর এর নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এর পর থেকে ভবনটি অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে।

‘বিপুল ব্যয়ের ভবনটি খালি পড়ে আছে, নথি গায়েব’ শিরোনামে গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রথম আলো। প্রতিবেদনটি প্রকাশের এক বছর পর ‘ঢাকা টাওয়ার’ নামে ওই ভবনের সর্বশেষ অবস্থা জানতে খোঁজ নেন এ প্রতিবেদক। দেখা গেল, এটি আগের মতোই খালি পড়ে আছে।

অব্যবহৃত থাকায় ভবনটি দিন দিন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এক বছরে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। ভবন নির্মাণসংক্রান্ত ফাইলের নথি এখনো পাওয়া যায়নি। পাওয়া যায়নি এর নকশাও।

ঢাকায় গত কয়েক বছরে ঢাকা টাওয়ারের মতো সরকারি বেশ কিছু বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এসব ভবনের খালি পড়ে থাকা নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে প্রথম আলো। প্রতিবেদন প্রকাশের পর এসব স্থাপনার অবস্থা এখন কী, সে ব্যাপারে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেল, কিছু ভবন চালু হয়েছে। যেমন রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভবন, তথ্য কমিশন ভবন, ডাক ভবন, মিরপুরের শিয়ালবাড়িতে সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসন ভবন। তবে কিছু ভবন এখনো আগের মতোই খালি পড়ে আছে।

ঢাকা টাওয়ার নামের ভবনটি নির্মাণ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশন। ভবনটি নির্মাণে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অনুমোদন নেয়নি ঢাকা জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে প্রশাসনিক অনুমোদন নেওয়া হয়নি। এমনকি নকশাও পরিবর্তন করে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা যাতে ধরা না পড়েন, সে জন্য সব ধরনের নথি গায়েব করে ফেলা হয়েছে। এসব অনিয়মের সঙ্গে কারা জড়িত, তাঁদের নাম প্রকাশ করছে না কেউ। জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে না। আবার রহস্যময় কারণে ভবনটি চালুও করা হচ্ছে না। ফলে ১৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটি এখন বোঝায় পরিণত হয়েছে। ভবনে দোকান ও জায়গা (স্পেস) ভাড়া নিতে যাঁরা টাকা বিনিয়োগ করেছেন, তাঁরা বিপাকে পড়েছেন।

ঢাকা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সবার চোখের সামনে ২০ তলা ভবন হয়ে গেল। অথচ এর নকশা পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো নথি পাওয়া যাচ্ছে না। এটা কীভাবে সম্ভব?’ তিনি আরও বলেন, ‘পাঁচ বছর ধরে জানার চেষ্টা করছি কেন ভবনটি বন্ধ, মন্ত্রী-সচিব কিছুই বলছেন না।’

ডলার–সংকটে আমদানি ব্যয় কমছে, অনিশ্চয়তায় উৎপাদন খাত

২৫ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

ডলার–সংকটের পরিস্থিতিতে সরকার আমদানি নিয়ন্ত্রণে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। তাতে বিলাস পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি কিছুটা কমেছে বটে। তবে ডলার–সংকট কমেনি, বরং বেড়েছে। এ কারণে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমতে শুরু করেছে। ফলে শিল্প খাতে উৎপাদন কমার প্রবণতা শুরু হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২৩–২৪ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক জুলাই–সেপ্টেম্বরে শিল্প খাতে কাঁচামালভেদে আমদানি ৩ থেকে ৫৭ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য খাতগুলো হচ্ছে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক, বস্ত্র, সিমেন্ট, প্লাস্টিক, প্রাণিখাদ্য, জাহাজ নির্মাণ, সমুদ্রগামী জাহাজ, ওষুধ, রাসায়নিক ইত্যাদি।

উদ্যোক্তারা বলছেন, বিদেশি ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় রপ্তানিমুখী বিভিন্ন খাতের কাঁচামাল আমদানি কমেছে। তবে আমদানি প্রতিস্থাপকশিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমার কারণ দুটি; এক. ডলার–সংকট, দুই. চাহিদা কম। তা ছাড়া আসন্ন সাধারণ নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় ব্যবসায়ীরাও ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, কাঁচামাল আমদানি কমার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে শিল্প খাতে উৎপাদন কমতে থাকবে। আর ধারাবাহিকভাবে এই প্রবণতা কর্মসংস্থান ও জিডিপির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, অর্থনীতিতে দুষ্টচক্র তৈরির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। শক্ত হাতে জরুরি ভিত্তিতে এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হবে। অর্থ পাচার ও হুন্ডি রোধে কঠোর পদক্ষেপ এবং প্রবাসী আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ, ডলার–সংকট আরও তীব্র হলে অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ে যাবে।

শ্রমজীবি মানুষ

নির্মাণকাজে ছিল না কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা

৩১ জুলাই ২০২৩, প্রথম আলো

গাজীপুরের টঙ্গীতে সিটি করপোরেশনের নালা নির্মাণকাজের সময় একটি বাড়ির সীমানাপ্রাচীর ধসে তিন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। গত শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে টঙ্গীর ঝিনু মার্কেটের দেওয়ানবাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। সেখানকার কর্মরত শ্রমিক ও স্থানীয় ব্যক্তিদের দাবি, নির্মাণকাজে প্রয়োজনীয় কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকার কারণেই সীমানাপ্রাচীর ধসে ওই শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার পর বন্ধ রয়েছে কাজ। খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না নির্মাণকাজের দায়িত্ব পাওয়া ঠিকাদারের।

নিহত ব্যক্তিরা হলেন ময়মনসিংহের নান্দাইলের কড়ইকান্দি গ্রামের আলী হোসেনের ছেলে বকুল হোসেন (৩৫), নর্দানগর গ্রামের মো. আকন্দের ছেলে মো. সুলতান (৫০) ও কুমিল্লার দাউদকান্দির গৌরীপুর গ্রামের ধনু মিয়ার ছেলে মো. সবুজ (৩৫)। নিহত তিনজনেরই মাথায় আঘাত ছিল। এ ছাড়া নয়ন (২৫) ও মাহাতাব (৩০) নামের আরও দুজন আহত হন। এর মধ্যে অবস্থা গুরুতর হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য মাহাতাবকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টঙ্গীর ঝিনু মার্কেটের দেওয়ানবাড়ি এলাকায় (৪৩ নম্বর ওয়ার্ড) সিটি করপোরেশনের নালা নির্মাণের কাজ চলছে। কয়েক দিন ধরে খননকাজ করছেন শ্রমিকেরা। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে কাজ। শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে সেখানে কাজ করছিলেন ১৫ থেকে ২০ জন শ্রমিক। এর মধ্যে হঠাৎ নালাঘেঁষা একটি বাড়ির সীমানাপ্রাচীর ধসে পড়ে কর্মরত শ্রমিকদের ওপর। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয় ব্যক্তি ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পাঁচজনকে উদ্ধার করে নিয়ে যান টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে। পরে সেখানে তিনজনকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শ্রমিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘কিছুদিন আগেও দেয়ালটির কিছু অংশ ভেঙে পড়ছিল। আমরা তখন বাঁশের ঠেকা দিয়ে নিছিলাম। কিন্তু তারপরও আমরা ঠিকাদারের কথামতো কাজে গেলে এ ঘটনা ঘটে। আমাদের চোখের সামনে তিনটা লোক মারা গেল।’

গতকাল রোববার দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণকাজ চলমান নালাটি একটি সরু গলির মতো জায়গায়। দুই পাশে বহুতল ভবন। সমতল থেকে নালার গভীরতা প্রায় আট ফুট। সীমানাপ্রাচীরটি ছিল একদম নালাঘেঁষা। ঘটনাস্থলে এখনো পড়ে আছে ধ্বংসাবশেষ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নালাটি নির্মাণের ঠিকাদারের দায়িত্ব পান স্থানীয় ঈমান আলী নামের এক ব্যক্তি। তাঁর তত্ত্বাবধানে ২৫ থেকে ৩০ জন শ্রমিক তিন থেকে চার মাস ধরে নালা নির্মাণ করছেন। এ বিষয়ে জানতে ঈমান আলীর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সংযোগ বন্ধ পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে ঠিকাদারের কোনো গাফিলতি পাওয়া গেলে অবশ্যই তাঁর বিরুদ্ধে আমাদের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তা ছাড়া এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে।’

মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে টঙ্গী পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আশরাফুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা পুরো ঘটনাটি তদন্ত করছি।’

অযত্নে নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রপাতি, শ্রমিকেরা এখনো বেকার

০৫ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

১৯৫৬ সালে খুলনার খালিশপুরে ১১৩ একর জমির ওপর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাটকল ক্রিসেন্ট জুট মিল প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রায় ৬৫ বছর চলার পর লোকসানের কারণে ২০২০ সালের জুলাই মাসে এটির উৎপাদন বন্ধ করে দেয় সরকার। শ্রমিকদের পাওনাও কিছুটা বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

পাটকলটি তিন মাস পর আবার চালু হবে, এমন প্রতিশ্রুতিও তখন দেওয়া হয়; কিন্তু তিন বছরেও তা চালু হয়নি। অযত্নে-অবহেলায় অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে ক্রিসেন্ট জুট মিলের যন্ত্রপাতি। কোনো বরাদ্দ না থাকায় রক্ষণাবেক্ষণও নেই। ফলে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীন এই পাটকলের শত শত তাঁত মেশিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

ক্রিসেন্ট জুট মিল বন্ধ করে দেওয়ায় চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ছয় হাজার শ্রমিক। তাঁদের অনেকেই এখন মানবেতর জীবন যাপন করছেন। কেউ কেউ মুটে-মজুরের কাজ করে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। নারায়ণগঞ্জের আদমজী জুট মিলের পর ক্রিসেন্ট জুট মিলই হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় জুট মিল।

সম্প্রতি খুলনার খালিশপুরের ক্রিসেন্ট জুট মিলে গিয়ে দেখা গেছে, একসময়ের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর এলাকাটি অনেকটাই পোড়োবাড়ির মতো পড়ে আছে। শ্রমিক কলোনির ভবনগুলোর জীর্ণদশা। ভবনের দেয়ালে গুল্মজাতীয় গাছ জন্মে গেছে। দু-একজন নিরাপত্তারক্ষী ও কয়েকটি শ্রমিক পরিবার ছাড়া সেখানে আর কেউ থাকেন না। তবে গাছগাছালিতে ভরা কলোনিটির কিছুই বদলায়নি। শুধু মানুষ নেই। তিন বছর আগে দুই হাজার শ্রমিক পরিবারকে কলোনি থেকে বের করে দেওয়া হয়।

কলোনি পেরিয়ে একটু এগোলেই মূল কারখানার গেট। নিরাপত্তারক্ষীরা প্রবেশে বিধিনিষেধের কথা শোনান। পরে বিশেষ অনুমতি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই মন খারাপের আরও গল্প শুরু। ২ নম্বর কারখানার ভেতরে কয়েক শ তাঁত মেশিন, যেখানে একসময় বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কাজ করতেন। কারখানা ভবনজুড়ে পাট থেকে সুতা তৈরির যন্ত্রপাতি, চট সেলাইয়ের মেশিন, ওজন করার যন্ত্র, চটের বস্তায় ছাপ দেওয়ার যন্ত্রগুলো সারি সারি সাজানো। তবে তাঁত মেশিনে জং ধরেছে, এটা-সেটা খুলে পড়ে গেছে। অনেক সেলাই মেশিন ভাঙা। ওজন করার যন্ত্র অকেজো। জানা গেল, যন্ত্রগুলো ঠিকঠাক রাখতে কোনো বরাদ্দ ও কর্মী নেই।

জানা গেছে, ক্রিসেন্ট জুট মিলের ৩টি কারখানায় এখন মোট ১ হাজার ১০০ তাঁত মেশিন আছে। পঞ্চাশের দশকে যখন মিলটি চালু করা হয়, তখন যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত জেমস মেকি অ্যান্ড সন্স কোম্পানি থেকে এসব স্বয়ংক্রিয় তাঁত মেশিনসহ অন্য যন্ত্রপাতি আনা হয়েছিল। দৈনিক ১০০ টন পাটের বস্তা ও চট—এসব পণ্য বানানোর সক্ষমতা ছিল মিলটির। পাটের সোনালি দিনে এই কারখানার পণ্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হতো।

কারখানা ভবন থেকে বেরিয়ে একটু এগোতেই চোখে পড়ল পাট বিভাগের ভবন। এটি ছিল চাষি ও ব্যাপারীদের কাছ থেকে পাট কেনার জায়গা। পাটকল বন্ধ হয়ে গেলেও জীর্ণ ভবনের দেয়ালের বোর্ডে এখনো ২০২০ সালের ২০ জুলাইয়ের পাটের দর লেখা রয়েছে।

আরেকটু এগোতেই কামারশালা, যেখানে মেশিনের লোহালক্কড় সারাই করা হতো। ওই ভবনও এখন পোড়োবাড়ির মতো দাঁড়িয়ে আছে। পাশেই জীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে কার্পেন্টার ভবন। এর সামনেই যানবাহন বিভাগ। সেখানে একটি বাস ও  ট্রাক পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশনের (বিজেএমসি) খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয় কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপক রইছ উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘মিলটির যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিজেএমসির পক্ষ থেকে কোনো বরাদ্দ নেই। মাঝেমধে৵ কারখানার ভেতরের ময়লা-আবর্জনা ঝাড়ামোছা করা হয়। এসব মেশিন রক্ষণাবেক্ষণ করতে তেল কিনতে হবে। ১০০-এর মতো মিস্ত্রি লাগবে। আগের মিস্ত্রিরা তো চাকরি হারিয়ে চলে গেছেন। তাঁদের কোথায় পাব?’

শ্রমিকদের মানবেতর জীবন

ক্রিসেন্ট জুট মিলে ৩ হাজার ৮০০ স্থায়ী শ্রমিক ও ২ হাজার অস্থায়ী শ্রমিক ছিলেন। অস্থায়ী শ্রমিকেরা ‘বদলি শ্রমিক’ হিসেবে পরিচিত। উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করার পর তাঁদের বেশির ভাগের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি কর্তৃপক্ষের। কিন্তু শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, তাঁদের দাবি অনুযায়ী টাকা দেওয়া হয়নি। অস্থায়ী শ্রমিকেরা এই অভিযোগ বেশি করেছেন। তাঁদের দাবি, নামের বানান ঠিক না থাকায় অনেকে টাকা পাননি।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ-নন সিবিএ ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক সোহরাব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, শ্রমিকদের প্রাপ্য অর্থ দেওয়া হয়নি। বদলি শ্রমিকদের অনেকে টাকা পাননি। তিন মাস পর পাটকল চালু হবে আশ্বাস দিয়ে শ্রমিকদের বের করে দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের অনেকেই এখন আশপাশের এলাকায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, ক্রিসেন্ট জুট মিলের গেটের কাছে প্রতিদিন সকালে ২০-২৫ জনের জটলা থাকে। কারণ, পাশেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের গুদাম। সেখানে মালবোঝাই ট্রাক এলে তা নামানোর কাজ করেন পাটকলের এসব সাবেক শ্রমিক। তবে সব দিন কাজ মেলে না। তাঁদের কেউ একসময় মেকানিক ছিলেন, কেউবা ছিলেন মিস্ত্রি। কেউ মেশিন-সহায়ক ছিলেন। এখন তাঁরা মুটে-মজুরের কাজ করে কোনোমতে জীবন যাপন করছেন।   

ক্রিসেন্ট বাজারে কথা হলো মো. খলিল নামের একজনের সঙ্গে। তিনি জানান, নিজে বদলি শ্রমিকের কাজ করতেন। কাজ পেতেন রাতের পালায়। খলিলের দাবি, তিনি ক্ষতিপূরণের কোনো টাকা পাননি। নিঃস্ব অবস্থায় চাকরি হারিয়েছেন। এখন ভাড়ায় ইজিবাইক চালিয়ে কোনো রকমে সংসার চালান।

জানা গেছে, ক্রিসেন্ট জুট মিল চালানো হয়েছে ২০২০ সালের ৩ জুলাই পর্যন্ত। কিন্তু কাগজে-কলমে দেখানো হয়েছে, ৩০ জুন উৎপাদন বন্ধ করা হয়েছে। ফলে স্থায়ী শ্রমিকদের একটি ইনক্রিমেন্ট যোগ করা হয়নি। এ কারণে ১৫-২০ বছর ধরে কাজ করা শ্রমিকেরা এক থেকে দেড় লাখ টাকা কম পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন।

চীনের আগ্রহ

এদিকে ক্রিসেন্ট জুট মিল বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে গত তিন বছরে তিনবার দরপত্র আহ্বান করে বিজেএমসি। কিন্তু সাড়া মেলেনি। তবে সম্প্রতি বে গ্রুপ আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে এই শিল্পগোষ্ঠী চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে জুতার কারখানা করতে আগ্রহী বলে জানা গেছে। গত সপ্তাহে চীনের একটি প্রতিনিধিদল ক্রিসেন্ট জুট মিল এলাকা পরিদর্শন করে গেছে। কোরিয়া ও ভারতের একটি কোম্পানির সঙ্গেও কথাবার্তা চলছে বলে শোনা যায়।

শুধু ক্রিসেন্ট জুট মিল নয়, খালিশপুর জুট মিল, প্লাটিনাম জুটি মিল, দৌলতপুর জুট মিল—তিনটি পাটকলও ২০২০ সালে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে ওই তিন পাটকলের প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। এসব পাটকলের যন্ত্রপাতিও নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি শিল্পনগর হিসেবে খুলনার সেই জৌলুশও যেন মুছে যাচ্ছে।

ঐতিহ্যবাহী ক্রিসেন্ট বিদ্যালয়ও দুরবস্থায়

ক্রিসেন্ট জুট মিল চালুর বছরই; অর্থাৎ ১৯৫৬ সালে এর চত্বরেই প্রতিষ্ঠিত হয় খুলনার ঐতিহ্যবাহী ক্রিসেন্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ২০২০ সালে ক্রিসেন্ট জুট মিল বন্ধ হওয়ার পর অনেক শ্রমিক এই অঞ্চল ছেড়ে চলে যান। ফলে গত তিন বছরে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। ২০২০ সালে যেখানে প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী ছিল, সেখানে এখন আছে ৩৫০ জনের মতো। শিক্ষকের সংখ্যাও ২৫ থেকে কমে ১০-এ নেমেছে।

বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক খাদিজা খানম প্রথম আলোকে বলেন, ‘কত প্রিয় শিক্ষার্থী ছিল আমাদের। তাদের বাবারা (শ্রমিক) চাকরি হারিয়েছেন। শহরে থেকে পড়াশোনার সামর্থ্য নেই। তাই পরিবারের সঙ্গে গ্রামে কিংবা অন্য কোথাও চলে গেছে আমাদের সেসব ছাত্রছাত্রী। তাদের অনেকেই হয়তো পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। তাদের কথা মনে পড়লে খুব কষ্ট লাগে।’

লাঠিপেটা করে মালিবাগে রেললাইন থেকে অস্থায়ী শ্রমিকদের সরিয়ে দিল পুলিশ

০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

রাজধানীর মালিবাগে রেললাইন আটকে কর্মসূচি পালন করা রেলের অস্থায়ী শ্রমিকদের লাঠিপেটা করে সরিয়ে দিয়েছে পুলিশ। আজ রোববার সকাল ১০টার পর থেকে তাঁরা এই কর্মসূচি পালন শুরু করেন। বেলা দুইটার পর তাঁদের সরিয়ে দেওয়া হয়।

শ্রমিকদের অভিযোগ, রেলওয়ের অস্থায়ী শ্রমিকেরা চাকরি স্থায়ী করার দাবিতে বেশ কিছুদিন ধরে কর্মসূচি পালন করছেন। এর ধারাবাহিকতায় আজও কর্মসূচি পালন করছিলেন। দুপুরে হঠাৎ পুলিশ তাঁদের লাঠিপেটা করে রেললাইন থেকে সরিয়ে দেয়।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, পুলিশের লাঠিপেটার সময় অনেকেই আঘাত পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত তিনজনকে পুলিশ হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলে গাড়িতে তুলে নিয়ে গেছে।

হাসেম ফুডে অগ্নিকাণ্ড

৫৪ জনের মৃত্যুর ঘটনায় মালিক ও তাঁর চার ছেলেকে বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র দাখিল

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুড কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ৫৪ জনের মৃত্যুর ঘটনায় মালিকপক্ষকে অব্যাহতি দিয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। যদিও তদন্তে কারখানার মূল নকশা না মানা, শর্ত ভঙ্গ করে অন্য পণ্য উৎপাদন, অনুমতি ছাড়া কারখানা সম্প্রসারণ, অগ্নিনির্বাপণে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না রাখাসহ নানা ধরনের অনিয়ম পেয়েছে সিআইডি। অভিযোগপত্রে কারখানার চার কর্মকর্তা ও সরকারের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের দুই পরিদর্শককে আসামি করা হয়েছে।

গতকাল রোববার দুপুরে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের পরিদর্শক মোকছেদুর রহমান ১৩ পৃষ্ঠার এই অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ঘটনার দুই বছর এই অভিযোগপত্র দাখিল করা হলো। আসামিদের বিরুদ্ধে অবহেলার দ্বারা মৃত্যু সংঘটের অভিযোগ আনা হয়েছে। এই ধারায় একজন আসামির সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। মামলাটি করা হয়েছিল হত্যা মামলা হিসেবে।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নারায়ণগঞ্জ আদালত পুলিশের পরিদর্শক মো. আসাদুজ্জামান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, হাসেম ফুডে আগুনে পুড়ে ৫৪ জনের মৃত্যুর ঘটনায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে সিআইডি। আদালতে অভিযোগপত্র গ্রহণের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

অভিযোগপত্রে অব্যাহতি পাওয়া এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন হাসেম ফুডের মালিক আবুল হাসেম (৭০), তাঁর চার ছেলে হাসিব বিন হাসেম (৩৯), তারেক ইব্রাহিম (৩৫), তাওশীফ ইব্রাহিম (৩৩) ও তানজীম ইব্রাহিম (২১)। অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন—কারখানার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহনে শাহ আজাদ (৪৩), উপমহাব্যবস্থাপক মামুনুর রশিদ (৫৪), সিভিল ইঞ্জিনিয়ার কাম প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. সালাউদ্দিন (২৬) ও প্রধান প্রকৌশলী (মেকানিক্যাল ও ইলেট্রিক) ওমর ফারুক (৩৮), কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের পরিদর্শক নেছার উদ্দিন (৪০) ও সৈকত মাহমুদ (৩৭)।

দুর্ঘটনাকবলিত ভবনে শ্রমিকদের বের হতে ভেতর ও বাইরে থেকে খোলার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। প্রতিটি ফ্লোর নেট দিয়ে শ্রমিকদের আবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। সিঁড়িও তালাবদ্ধ ছিল। কারখানায় শ্রমিকদের ফায়ার প্রশিক্ষণ ও ফায়ার কর্মী ছিল না।

২০২১ সালের ৮ জুলাই রূপগঞ্জের হাসেম ফুড কারখানায় আগুনে পুড়ে কর্মকর্তা-শ্রমিকসহ ৫৪ জনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ভুলতা পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক নাজিম উদ্দিন বাদী হয়ে কারখানার মালিক আবুল হাসেম ও তাঁর চার ছেলেসহ আটজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। আবুল হাসেমসহ ছয় আসামি বর্তমানে জামিনে।

এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মোকছেদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তার আগে আরও চার কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করেছেন। তদন্তে তাদের প্রাপ্ত ফলাফল তিনি নতুন তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করেন। এরপর কারখানার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় কারখানার মালিকসহ পাঁচজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। মামলার ফলাফল বাদীকে জানানো হয়েছে। মামলায় বাদীসহ ৯১ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।

মামলার বাদী নাজিম উদ্দিন আহমেদ বর্তমানে চট্টগ্রামে পুলিশের বিশেষ শাখায় (এসবি) কর্মরত। এ বিষয়ে তিনি মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, মামলার ফলাফলের বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা তাঁকে কিছু জানাননি। এই ঘটনায় কারখানার মালিক দায় এড়াতে পারেন না। এ কারণে হত্যা মামলা হয়েছিল। অভিযোগপত্রে কী আছে, তা দেখে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

হাসেম ফুডে যত অনিয়ম

তদন্তকারী কর্মকর্তা তাঁর দাখিল করা অভিযোগপত্রে কারখানার বিভিন্ন অনিয়মের কথা তুলে ধরেছেন। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ৩৪ হাজার ৫০০ বর্গফুটের হাসেম ফুড কারখানার মূল নকশায় তিনটি সিঁড়ি থাকলেও নির্মাণকালে দুটি সিঁড়ি রাখা হয়। ২০২০ সালের ২ মে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ম্যাংগো জুস উৎপাদনের জন্য ছাড়পত্র নেওয়া হলেও কারখানায় শর্ত ভঙ্গ করে লাচ্ছা সেমাই, টোস্ট, মুড়ি, ক্যান্ডি, জ্যাম জেলি, আচার, ম্যাংগো বার, সফট ড্রিঙ্ক ইত্যাদি খাবার উৎপাদন হতো। দুই দশমিক ৫৯ একর জমির ছাড়পত্র নেওয়া হলেও অনুমতি ছাড়া নসিলা উৎপাদনের জন্য কারখানা সম্প্রসারণ করা হয়।

কারখানায় পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখা হয়নি উল্লেখ করে অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, দুর্ঘটনাকবলিত ভবনে শ্রমিকদের বের হতে ভেতর ও বাইরে থেকে খোলার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। প্রতিটি ফ্লোর নেট দিয়ে শ্রমিকদের আবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। সিঁড়িও তালাবদ্ধ ছিল। কারখানায় শ্রমিকদের ফায়ার প্রশিক্ষণ ও ফায়ার কর্মী ছিল না। দুর্ঘটনাকবলিত ভবনের নিচতলা থেকে ছয়তলা পর্যন্ত প্রতিটি ফ্লোরে দাহ্য পদার্থ মজুত ছিল। সেই দাহ্য পদার্থের সঙ্গে উৎপাদিত মালামাল মজুত করে রাখা হয়েছিল। কারখানার ভবনের ভেতরে মেশিন স্থাপনে দূরত্বের লেআউট প্ল্যান মানা হয়নি। এগজাস্ট ফ্যানও ভবনের ভেতরে রাখা ছিল। নকশা অনুযায়ী কারখানার দক্ষিণ পাশে ২০ ফুট রাস্তা ও পূর্ব পাশে ১০ ফুট এবং পশ্চিম পাশে ২০ ফুট রাস্তা রাখার কথা থাকলেও তা রাখা হয়নি। শিশু আইন অমান্য করে শিশুশ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। আগুনে পোড়া অধিকাংশ মৃতদেহ শিশুর বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর নিয়মিত কারখানাটি পরিদর্শন করেনি। অথচ কারখানার লাইসেন্স অসাধুভাবে নবায়ন করে গেছেন। প্রতিষ্ঠানের উপমহাপরিদর্শক সৌমেন বড়ুয়া ও পরিদর্শক নেছার উদ্দিন কারখানা পরিদর্শনে উদাসীনতা দায়িত্বে অবহেলার কারণে ৫৪ শ্রমিক আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক শাহ্ আলম যথাযথভাবে কারখানা পরিদর্শন না করে সনদ নবায়ন করেছেন। অবেহলার কারণে ৫৪ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। তাঁরা যদি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতেন, তাহলে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটত না।

আগুন লাগার কারণ

হাসেম ফুডসের মালিক ও তাঁদের নিয়োগতকৃত কর্মকর্তাদের অপরিকল্পনা অব্যবস্থাপনাজনিত কারণে বৈদ্যুতিক গোলযোগে সৃষ্ট আগুন থেকে অগ্নিকাণ্ড ঘটে বলে তদন্তে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

হাসেম ফুড সেন্ট্রাল স্টোরে কম্প্রেসোর মেশিনের গরম বাতাস বের হতে দুটি এগজাস্ট ফ্যান খোলা জায়গায় না লাগিয়ে ফ্লোরের ভেতরে লাগানো ছিল। এগজাস্ট ফ্যানের গরম বাতাস দাহ্য পদার্থের ওপর পরে উত্তপ্ত থাকত। কেব্‌লের ইনসুলেশন গলে একটা আরেকটার ওপর লেগে ভোল্টেজ কারণে আগুনের স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়ে তা কেব্‌লের ইনসুলেশনের ওপর পড়ে। একপর্যায়ে আগুন নিচতলার দাহ্য বস্তুর ওপর ধরে যায়। এগজাস্ট ফ্যানের কারণে আগুন ধরে যায়। আগুন সিঁড়ি, লিফট, নিচতলা, থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত কনভয়ের বেল্ট, কেব্‌ল ডকেট, জানালার কাছে রক্ষিত ফিনিস গুডস, রেজিন, ভোজ্যতেল, প্লাস্টিক, বিভিন্ন ধরনের মালামাল, গুদামের কারণে আগুন নিচতলা থেকে ষষ্ঠতলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

মালিক ও চার ছেলের বিরুদ্ধে ‘সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই’

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মামলার এজারনামীয় আসামি কারখানার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহেন শাহ, উপমহাব্যবস্থাপক মামুনুর রশিদ, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার কাম এডমিন সালাউদ্দিন, প্রধান মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ওমর ফারুক ও কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পদিরর্শন অধিদপ্তর পরিদর্শক নেছার উদ্দিন ও সৈকত মাহমুদ পেনাল কোডে ৩০৪ (ক) ৩৪ ধারায় (অবহেলাজনিত মৃত্যু) প্রাথমিকভাবে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে।

তদন্তকালে আবুল হাসেম ও তাঁর চার ছেলের বিরুদ্ধে মামলায় জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য–প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অভিযোগে বর্ণিত পেনাল কোড ৩০২ (হত্যা)/৩২৩/৩২৪/৩২৫/৩২৬/৩০৭ ধারায় সত্যতা পাওয়া যায়নি। আবুল হাসেম ও তাঁর চার ছেলে বিরুদ্ধে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য–প্রমাণ না পাওয়ায় তাঁদের অব্যাহতি প্রদান করা হলো।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সার্বিক তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা, সাক্ষ্য প্রমাণে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, ভিডিও ফুটেজ, মরদেহ সুরতহাল, ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন, হাসেম ফুডসের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলা, অব্যবস্থাপনা ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য কার্যকলাপ, উদাসীনতাসহ নিজেদের খুশিমতো কারখানা পরিচালনা করার কারণে এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। এতে কারখানা কর্মকর্তা-শ্রমিক ৫১ জন আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। আগুনের ঘটনায় তিনতলা থেকে লাফিয়ে পড়ে মারাত্মক আহত হয়ে তিন শ্রমিকের মৃত্যু হয়।

পোশাকশিল্পে ৩৫ বছর বয়স হলেই বেকার হওয়ার শঙ্কা

১১ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

অন্যান্য দিনের মতোই গত ২৭ জুন কারখানায় কাজ করতে গিয়েছিলেন পেয়ারা বেগম। গাজীপুরের টিআরজেড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে তিনি জুনিয়র ফিনিশিং অপারেটর। পরদিন থেকে ঈদুল আজহার ছুটি শুরু হবে। বেলা ১১টার দিকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা তাঁকে ডেকে পদত্যাগ করতে বললেন। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুসারে তাঁর বয়স ৫০ বছর। পেয়ারা বেগমের পুরো পরিবারের ঈদের আনন্দ মাটি হয়ে গেল।

এই বছরেরই ২৮ জানুয়ারি গাজীপুরের আরেক পোশাক কারখানা লিজ অ্যাপারেলস লিমিটেডের ৫৩ বছর বয়সী কর্মী রওশন আরার চাকরি চলে যায়। তিনি সেখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছিলেন।

একই এলাকার তাজ নিটিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে দুই বছর কাজ করার পর গত ১৫ মে ছাঁটাই হন ৪৮ বছর বয়সী ফায়েজা বেগম। তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ অপারেটর।

গত ২৭ ও ২৮ জুলাই এই তিন নারীর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলো। কোনো পোশাক কারখানায় গেলে পেয়ারা, রওশন ও ফায়েজাদের বয়সী নারীদের উপস্থিতি বিরল। বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বলছে, পোশাক কারখানায় নারীদের গড় বয়স ২৫ বছর। ৩৫ বছরের বেশি বয়সী নারীর হার ১০ শতাংশের বেশি নয়। অন্যান্য চাকরি থেকে অবসরের স্বাভাবিক বয়স যেখানে ৫৯ বছরের কম নয়, সেখানে পোশাক কারখানায় ৩৫-৪০ বছর বয়স মানেই ‘বুড়ো’ হয়ে যাওয়া। অথচ ৪ হাজার ৬৯৯ কোটি ডলারের (২০২২-২৩ অর্থবছর) রপ্তানি আয়ের এই খাতে অভিজ্ঞতার কোনো মূল্য নেই। কখনো তাঁদের চাকরি হারাতে হয়, কখনো চাকরি ছাড়তে বাধ্য হতে হয়।

এশিয়ান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্টের (এসিডি) তৈরি ‘পোশাক কারখানার কর্মীদের ওপর জরিপ প্রতিবেদনে’ (আ সার্ভে রিপোর্ট অন গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স অব বাংলাদেশ ২০২০) বলা হয়েছে, দেশে পোশাককর্মীদের গড় বয়স ২৬ বছর। নারীদের গড় বয়স ২৫ ও পুরুষের ২৭ বছর। জরিপটি পরিচালনা করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

বন্ধ পাটকল পুনরায় চালুর দাবি পাট চাষী ও ব্যবসায়ী সমিতির

১১ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশনের (বিজেএমসি) আওতাধীন বন্ধ ঘোষিত রাষ্ট্রায়ত্ত ২৬টি পাটকলের মধ্যে কমপক্ষে ১০টি পাটকল সরকারিভাবে পুনরায় চালু করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পাট চাষী ও পাট ব্যবসায়ী সমিতি।

সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে বাংলাদেশ পাট চাষী ও পাট ব্যবসায়ী সমিতির এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল আজিজ বলেন, ২০২০ সালের ১  জুলাই একটি নোটিশের মাধ্যমে বিজেএমসি’র অধীন দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ২৬টি পাটকল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কথা ছিল পাটকলগুলো তিনমাসের জন্য সাময়িক বন্ধ করা হবে। কিন্তু প্রায় সাড়ে তিন বছর পার হলেও এখনও কোনো মিল চালু হয়নি। সরকার বিভিন্নভাবে ব্যক্তি মালিকানায় লিজ দিয়ে মিলগুলো চালাতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে কেউ কেউ কিছু কিছু মিল লিজ নিয়েও উৎপাদন করছেন না। ফলে মিলগুলোর মেশিনপত্র মরিচা পরে অকেজো হয়ে যাচ্ছে।

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, পাটকলগুলো বন্ধ হওয়ায় শ্রমিকরা কলোনি ছেড়ে অন্যত্র মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তাদের সন্তানদের লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে গেছে। এর ওপর নির্ভরশীল পাটচাষী ও ক্ষুদ্র পাট ব্যবসায়ীরাও চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। অথচ মিলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বহাল আছেন। এমনকি কোনো কাজ না করেও সাড়ে তিন বছর যাবৎ বিজেএমসি’র প্রধান কার্যালয়সহ ২৬টি জুট মিলের প্রায় তিনশত কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রতি মাসে বেতন নিয়ে যাচ্ছেন।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে কেমন আছেন রিকশাচালক, মুচি কিংবা ভেলপুরি বিক্রেতারা?

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড অনলাইন বাংলা

দেশে দিনদিন বেড়েই চলেছে দ্রব্যমূল্য। ক্রমাগত বাড়তে থাকা পণ্যমূল্যে ধুঁকছে নিম্ন আয়ের মানুষ। আগস্টে প্রধান খাদ্যদ্রব্যগুলোর বৈশ্বিক মূল্য দুই বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছালেও, বাংলাদেশে এই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১২.৫৪%, যা ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ৯.৯২%।

সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম যতটুকু খাবার প্রয়োজন, তা যোগাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে এ শ্রেণির মানুষকে। কিভাবে চলছেন তারা?

মুচি রামপ্রসাদ  

‘ঢাকা শহরে পানিটাও তো কিনা খাইতে হয়। ঘরের পানির কল কোনো সময় নষ্ট হয়া গেলে টাকার অভাবে কয়েকদিন পানি ছাড়াই চলি। বাজার করতে গেলে দিশাহারা লাগে।’ বলছিলেন ৪৬ বছর বয়সী রামপ্রসাদ। রাজধানীর ব্যস্তমত রাস্তার পাশে বসে প্রায় ২৯ বছর যাবত মুচির কাজ করছেন তিনি।

বারডেম জেনারেল হাসপাতালের গেটের কোণায় রামপ্রসাদের বসার জায়গা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এখানে বসেই জুতা সেলাই করেন। সারাদিনের কাজ শেষে হাতে থাকে সর্বোচ্চ ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা।

মধ্যবয়সী লোকটি থাকেন রাজধানীর গোপীবাগের ভাড়া বাসায়। মা, স্ত্রী, দুই সন্তান নিয়ে এক ঘরেই বসবাস। ঘরের ভাড়া ছয় হাজার টাকা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনশীল ব্যক্তি তিনি।

ছয়-সাত বছর আগের তুলনায় বর্তমানে কয়েকশো টাকা দৈনিক রোজগার বেড়েছে রামপ্রসাদের। কিন্তু আগের চেয়ে তার জীবন এখন অনেক কঠিন। কোনো কোনো দিন পরিবার নিয়ে থাকতে হয় না খেয়েও। তার ভাষ্যে, ‘আগে ইনকাম হয়তো কম ছিল, কিন্তু তখন চলছি ভালো। জিনিসপত্র সস্তা ছিল, সবকিছু মোটামুটি কিনতে পারছি।’

নিত্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় পণ্যের আকাশছোঁয়া দামের কথা উল্লেখ করে বলছিলেন, ‘পোল্ট্রি মুরগির মাংস ছয় মাসেও একবার খাওয়া পড়ে না। খাসির মাংসের কথা তো চিন্তাও করি না। যেইডা গরীবেরা খাইতাম, নিম্নতম খাবার, পাঙ্গাস মাছ, তেলাপিয়া মাছ- এডিরও আমরা ধারেকাছে যাইতে পারি না এহন। বাচ্চাকাচ্চাদের জন্য ডিম কেনারও উপায় নাই। সবজির দামও অনেক। ভালোগুলা তো কিনতে পারি না। আলু-টালু যেগুলা নষ্ট আলাদা কইরা রাখে, ওইডা কিনা আনতে হয়।’

ঘরে বৃদ্ধা মা অসুস্থ, স্ত্রীর শরীরও দুর্বল খুব। লো প্রেশারের কারণে প্রায়ই মাথা ঘুরে পড়ে যান তিনি। রামপ্রসাদ নিজেও ভুগছেন হার্টের অসুখে। কিন্তু চিকিৎসা করানোর সাহস করে উঠতে পারেন না। হাসপাতালের সামনে বসে কাজ করেন বলে ডাক্তার হয়তো সহজেই দেখাতে পারবেন, কিন্তু শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধপত্র কেনার ক্ষমতা নেই বলে টিকে থাকতে হয় শরীরকে পাত্তা না দিয়েই।

বড় দুই মেয়ের বিয়ের সময় ঋণ হয়েছে অনেক। প্রতি মাসেই ধারদেনায় চলতে চলতে এখন তার ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সাড়ে তিন লাখ টাকায়। তিন দশক আগে হবিগঞ্জের মাধবপুর থেকে এসে রাজধানীতে জীবিকার খোঁজে আশ্রয় নেওয়া রামপ্রসাদের রোজ কাটে পরের দিন খেতে পাবেন কি না সেই দুশ্চিন্তায়।

ভেলপুরি বিক্রেতা মুজিবুর রহমান

রোজ সকাল ১১টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত ঢাকার ইস্কাটন গার্ডেন উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে ভেলপুরি বিক্রি করেন মুজিবুর রহমান। স্কুল ছুটির পর কাজে বিরতি নিয়ে বাসায় ফিরেন কিছুক্ষণের জন্য। এরপর আবার বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বসেন হাতিরঝিলের পাশে। দুইবেলা ভেলপুরি বিক্রি করে মুজিবুরের দৈনিক আয় হয় হাজার-বারোশো টাকার মতো।

দুই ছেলে-মেয়ে আর স্ত্রী নিয়ে তার সংসার। মেয়েটা এবার অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে ইস্পাহানী বালিকা বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ে, ছেলেটা উচ্চমাধ্যমিকে পড়ছে ঢাকা উদ্যান সরকারি কলেজে।

পরিবার নিয়ে দিলুরোড এলাকায় সাবলেট থাকেন মুজিবুর রহমান। সব বিলসহ মাস শেষে বাসা ভাড়া দিতে হয় প্রায় সাড়ে ১১ হাজার টাকা। মেয়ের স্কুল আর প্রাইভেটের মাসিক বেতনে যায় ছয় হাজার টাকার মতো। ছেলের প্রায় তিন হাজার টাকা। মাসের বাকি সব খরচ চালাতে প্রতিনিয়তই হিমশিম খেতে হয় মুজিবুরকে।

‘কোনোরকমে বাঁইচা আছি এইখানে। ঢাকা শহরে থাকতে গেলে সব খরচই বেশি। অন্যকোনো খরচ তো কমানোর উপায় নাই, খাবার-দাবারেই যত কমানো যায়। শাক, ডাল বা অন্য সবজিই কিনি বেশি। সপ্তাহে একদিন হয়তো তেলাপিয়া মাছ কিনতে পারি। ছয় মাস আগে মুরগি খাওয়া হইছিল, বাসায় মেহমান আসা উপলক্ষে। কুরবানির ঈদ ছাড়া গরু চোখে দেখার সুযোগ নাই। জীবনের এখন নাভিশ্বাস অবস্থা,’ বলছিলেন মুজিবুর।

আট বছর আগে ভেলপুরির ব্যবসা শুরু করেছিলেন। তখনের চেয়ে এখন সব কাঁচামালের দাম অন্তত তিনগুণ বেড়েছে বলে জানান তিনি। আটবছর আগের ও পরের দাম তুলনা করে বলেন, ‘টক বানাই যে তেঁতুলটা দিয়া এইডার দাম ছিল ৫৫ টাকা কেজি, এখন এইডা কিনি ১৫০ টাকায়। এক কেজি শুকনা মরিচ কিনতাম ১৭০ টাকায় আর এখন এইডার দাম ৪৪০ টাকা। পুরিগুলা আগে কারখানা থেইকা কিনতাম ৭০ পয়সা-১ টাকা পিস কইরা। এখন তিন টাকা হয়া গেছে।’

নিজে কষ্ট করে হলেও ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাদের পড়ালেখায় কখনো ছাড় দিতে চাননি মুজিবুর রহমান। কিন্তু দিন দিন দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত পরিবার নিয়ে শহরে টিকে থাকতে পারবেন কি না তা নিয়েই এখন সন্দিহান তিনি।

রিকশার চাকায় দুলাল শেখের কঠিন জীবন

‘যখন জমা খরচ ২০ টাকা ছিল, তখন থেইক্যা রিকশা চালাইতেছি। এখন রিকশার জন্য প্রতিবেলা জমা দেই ৭০ টাকা। দুই বেলা মিলাইয়া অখন খরচ হয় ১৪০ টাকা। আরো খরচ তো আছেই,’ বলছিলেন রিকশা চালক দুলাল শেখ। গত ৩৩ বছর ধরে ঢাকা শহরের অলিগলিতে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। 

গত ৩৩ বছরে দুলাল দেখেছেন ঢাকার অনেক উত্থান-পতন। শহুরে জীবনে আয়-ব্যয়ের সাথে খাপ খাওয়াতে গিয়ে হাপিত্যেশ করেছেন বহুবার। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার খরচের পাশাপাশি জীবনমানের ব্যয় সবই পাল্লা দিয়ে বেড়েছে গত কয়েক বছরে। সবশেষে চলতি বছরের খাদ্য মুদ্রাস্ফীতির (১২.৮২ শতাংশ) সাথে তাল মিলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে।

খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি কী- তা বোঝেন না দুলাল। কিন্তু বোঝেন খাবারের দাম বেড়েছে। তাই অনেকটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলেই বলেন, ‘মাছ, আলু, ডিমের দাম আগের থেইক্যা অনেক বাড়ছে।’ 

দুলাল শেখের রিকশা চালানো শুরু অভাব থেকেই। ১৯৮৯ সালের শেষদিকে জামালপুর থেকে প্রথম ঢাকা শহরে আসেন তিনি। নিরিবিলি জামালপুর ছেড়ে মনে খানিকটা খেদ নিয়েই ব্যস্ত শহর ঢাকায় পা রেখেছিলেন। মাথায় তখন অজস্র চিন্তা। একে তো পরিবার ছেড়ে নতুন জায়গা, তার উপর খুঁজতে হবে কাজ। শহর থেকে অর্থ উপার্জন করে পাঠাতে হবে পরিবারের কাছে।

নব্বই দশকের শুরুতে ঢাকায় কাজ খুঁজতে এসে বেশ বিপাকে পড়তে হয়েছিলো তাকে। পড়ালেখার ডিগ্রিও সেভাবে ছিল না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু পারিবারিক অনটনে মাধ্যমিকের গণ্ডি পার করতে পারেননি। জামালপুরে থাকাকালীন যদিও বাবাকে মাঠের কাজে সাহায্য করতেন, কিন্তু তাতে সংসারের অভাব কিছু কমেনি। তাই বাধ্য হয়ে জীবিকার তাগিদে ঢাকায় আসা আর এখানেই জীবিকার অবলম্বন হিসেবে সঙ্গী করেন রিকশাকে। 

গত ৩৩ বছরে রিকশার চাকার সাথে সাথে ঘুরেছে দুলালের জীবনের চাকাও। পরিবার বড় হয়েছে, চুল দাঁড়িতেও পাক ধরেছে। কিন্তু খরচের খেরো খাতায় আয় ব্যয়ের হিসাব যেন মিলতেই চাইছে না। যাপিত জীবনের হিসাব মেটাতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাচ্ছে তার। 

দুলাল শেখ ঢাকায় বর্তমানে একাই থাকেন। ঢাকার তেজগাঁওয়ের দিকে একটি সাবলেটে থাকেন তিনি। স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের বাকি সদস্যরা থাকেন জামালপুরে।

রিকশা চালিয়ে প্রতি মাসে ১২-১৩ হাজার টাকা উপার্জন করলেও খরচের দিক থেকে তা দু ভাগে ভাগ হয়ে যায়। ঢাকায় নিজে থাকার জন্য ৪ হাজার টাকা আর কিছুটা হাতখরচ রেখে বাকিটা পাঠিয়ে দেন বাড়িতে। তাতেই চলছে দুলালের সংসার।

ঢাকায় থাকার জন্য এই ৪ হাজার টাকায় কোন কোন খাতে খরচ নির্বাহ করেন, তা জানতে চাইলাম দুলাল শেখের কাছে। দুলাল বলেন, ‘আমি ফ্যামিলির খরচ, নিজের খরচ, ঘর ভাড়া, ভাতের বিল, গোসলের জন্য পাম্পের বিল দেই। পাম্পে গোসল করলে মাসে ৪৫০ টাকা লাগে। দুইবেলায় ভাতের বিল মিলায়ে মাসে ৩ হাজার টাকা দেই। সিট ভাড়া দেই ৫০০ টাকা। সব মিলাইয়া ৪ হাজার থেকে ৫০ টাকা কম।’

অর্থাৎ, খাবার পিছু দুলালের দুপুর আর রাতের জন্য নির্ধারণ থাকে দৈনিক ১০০ টাকা। তবে সকালের খাবারের হিসাব আলাদা। অধিকাংশ দিন সকালে চা-বনরুটি খেয়েই কাটিয়ে দেন দুলাল। তাতেও দৈনিক ২০ থেকে ২৫ টাকা খরচ হয়। ঢাকা শহরে থাকতে গিয়ে দুলালকে গুণতে হয় গোসলের হিসাবও। পাম্পে গোসল বাবদ দৈনিক খরচ হয় ১৫ টাকা। সিট ভাড়া বাবদ প্রতিদিনের খরচ হয় ১৬.৬৭ টাকা।

দৈনিক থাকা, খাওয়া গোসল বাবদ দুলালের খরচের তালিকায় থাকে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। যদি একবেলা রিকশা চালান তাহলে খরচের ফর্দে যোগ করতে হয় ৭০ টাকা আর দুইবেলা রিকশা চালালে আরো ১৪০ টাকা।

দুলালের খরচ প্রতিদিন নির্ধারিত থাকলেও আয় প্রতিদিনের ভিত্তিতে হচ্ছে না। কোনো কোনোদিন অসুস্থ থাকলে কাজেও যেতে পারেন না। সেদিন আয় না হলেও খরচ কিন্তু ঠিকই হয়।

রিকশাচালক হিসেবে ৩৩ বছরের জীবনে রিকশা ভাড়া অনেকবার বাড়লেও বাড়েনি দুলালের আয়। বরং পাল্লা দিয়ে বাড়ছে খরচ। যাত্রীর সাথেও ভাড়া নিয়ে বচসা লেগে থাকে নিত্যদিন। তার উপরে শহরে বেড়েছে রিকশাচালকের সংখ্যা। প্রতিযোগিতা ও নানান প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েই প্রতিদিন লড়াই করে যাচ্ছেন দুলাল শেখ।

টাকা পয়সার সংকট নিয়ে বাড়ি থেকেও নানান সময়ে আসে অভিযোগ। বছর কয়েক আগে মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। মেয়ের শ্বশুরবাড়ির আপ্যায়নের দিকেও তাই তাকে খেয়াল রাখতে হয় নিয়মিত।

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধির সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকার উপায়ও বাতলেছেন দুলাল শেখ। দুলাল বলেন, ‘এই বছর আমি ৫০ টাকা কেজি আলু কিনছি। তবে এমন ভুল আর জীবনে হবে না। কেমনে হবে না? পরের সিজনে বিশ কেজি, চল্লিশ কেজি অথবা এক মণ আলু কিন্যা দেশে ফালায়ে রাখমু’।

পাল্টা প্রশ্নে জানতে চাইলাম, বেশি আলু কিনে রাখলে তো নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বীরের মতো হেসে দুলাল শেখ উত্তর দেন, ‘খাটের নিচে বালু শুকায়ে আলু থুয়ে দিলে অমনেই থাকবো। আলু নষ্ট হইবো না।’

নারী শ্রমিকরা শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন কি?

সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৩, বণিক বার্তা

দেশের শিল্প, কৃষি ও সেবাসহ সব খাতের কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে এক দশক ধরে নারীদের জন্য সংকুচিত হচ্ছে শহরের কর্মসংস্থান, যার প্রভাবে শহরকেন্দ্রিক কর্মে নারীর অংশগ্রহণ কমেছে। বিপরীতে এ সময়ে গ্রামে বেড়েছে তাদের কর্মসংস্থান। এছাড়া অনেকে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন অভিবাসী হিসেবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপে নারীর শহরকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান হ্রাস ও গ্রামাঞ্চলে বৃদ্ধি পাওয়ার পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শহরে শিল্পায়নের প্রসার, কর্মক্ষেত্রের পরিসর

বৃদ্ধি এবং নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও জীবনযাত্রার ধারাবাহিক ব্যয় বৃদ্ধি, কভিডের প্রভাব ও মূল্যস্ফীতির কারণে নারীরা শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ৭ কোটি ৩৪ লাখ শ্রমশক্তি রয়েছে। এর মধ্যে ৪ কোটি ৭৪ লাখ পুরুষ ও ২ কোটি ৫৯ লাখ নারী। ২০১৩ সালে গ্রামীণ এলাকায় নারী শ্রমশক্তি ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ, যা ২০২২ সালে ২ কোটি ৯ লাখে দাঁড়ায়। সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র দেখা যায় শহর এলাকায়। ২০১৩ সালে ৪৫ লাখ নারী শ্রমশক্তি শহর এলাকায় কাজ করলেও ২০২২ সালে তা ৪০ লাখে দাঁড়ায়। শতাংশের হিসাবে এক দশকে গ্রামে ১৭ দশমিক ১৯ শতাংশ নারী শ্রমশক্তি বেড়েছে। অন্যদিকে শহরে এক দশকে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ শ্রমশক্তি কমেছে।

আধুনিক ফ্ল্যাটে কেমন আছেন বস্তির বাসিন্দারা?

০৪ অক্টোবর ২০২৩, বাংলা ট্রিবিউন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৭ সালের ২৬ অক্টোবর বস্তির বাসিন্দাদের জন্য ভাড়াভিত্তিক আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণের নির্দেশনা দেন। সে অনুযায়ী জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অর্থায়নে মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের কালশী সংলগ্ন বাউনিয়া বেড়িবাঁধ এলাকায় ছয় বিঘা জমির ওপর বস্তিবাসীদের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত ১৪ তলা বিশিষ্ট পাঁচটি ভবন নির্মাণ করা হয়। ইতোমধ্যে তিনটি ভবনের ভাড়াভিত্তিক ৩০০টি ফ্ল্যাট বস্তিবাসীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অন্য দুটি ভবনে আরও ২৩৩টি ফ্ল্যাটের নির্মাণ কাজ শেষে হস্তান্তরের অপেক্ষায় আছে।

সোমবার (২ অক্টোবর) সরজমিন প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায় বুঝে পাওয়া এসব ফ্ল্যাটে ইতোমধ্যে মিরপুরের কলাবাগান বস্তির কার্ডধারী বাসিন্দারা বসবাস শুরু করেছেন। অবাসযোগ্য ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ থেকে নির্মল পরিবেশে এসে সন্তুষ্ট প্রকাশ করেছেন তাদের সবাই। কারও কারও ঘরে শোভা পাচ্ছে নতুন আসবাবপত্র। অধিকাংশ ফ্ল্যাটের বারান্দায় বেড়ে উঠছে নানা রকমের ফুল গাছ।

বাসিন্দারা জানান, ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকার অধরা স্বপ্ন এখন বাস্তব। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত এসব ফ্ল্যাটে এসে নিজেদের এখন আর বঞ্চিত মনে হচ্ছে না। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি আর স্বল্প আয়ের কারণে এসব ফ্ল্যাটের সহনীয় ভাড়াও এখন চাপ বলে মনে হয় কারও কারও।

সার্ভিস চার্জসহ ৫৯০০ টাকার থাকার সুবিধা পাচ্ছেন বরাদ্দ পাওয়া বস্তিবাসী। ৬২০ থেকে ৭১৯ বর্গফুট আয়তনের প্রতিটি ফ্ল্যাটে রয়েছে দুটি করে বেডরুম, একটি বারান্দা, একটি ড্রয়িং রুম, বেসিন, রান্নাঘর, একটি আলাদা টয়লেট ও একটি আলাদা বাথরুম। টাইলস করা এসব ফ্ল্যাটের দুই পাশে বাতাস চলাচলের জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত ফাঁকা জায়গা।

এছাড়া প্রতিটি ভবনে রয়েছে দুটি লিফট ও প্রশস্ত সিঁড়ি, কমিউনিটি হল, অগ্নিনির্বাপণ ও সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা, ৪০ কেভিএ জেনারেটর ও ২৫০ কেভিএ সাব-স্টেশন, প্রশস্ত ওয়াকওয়ে ও সৌন্দর্যবর্ধনের লাইটিংসহ আধুনিক সুবিধা। প্রতিটি ভবনের নিচতলা বরাদ্দপ্রাপ্তদের সাধারণ ব্যবহার ও ছোট ছোট শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার জন্য ভবনের সামনে ফাঁকা জায়গা রাখা হয়েছে।

কথা হয় ফ্ল্যাট বরাদ্দ পাওয়া সেলিনা বেগমের সঙ্গে। স্বামী, এক মেয়ে, এক ছেলে ও ছেলের বউ মিলে বর্তমানে এখানে রয়েছে। স্বামী ভ্যানে করে মুরগী বিক্রি করেন, ছেলে বেনারসি কারচুপির কারিগর। এর আগে গত ৩০ বছর ধরে ছিলেন মিরপুর কলাবাগান বস্তিতে।

তিনি বলেন, বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় আইসা বস্তিতে উঠি, কিন্তু কোনোদিনই এই পরিবেশ ভালো লাগতো না। খুপরি ঘর। গোছলের জায়গা ছিল না। লজ্জা লাগতো। আবার মেয়ে বড় হইতাছে। কিন্তু উপায় ছিল না। স্বামী যেইখানে রাখছে সেইখানেই মানায়া নিতে হইছে। মনে একটা ইচ্ছা ছিল, আল্লাহ যদি তৌফিক দেয় ছেলে মেয়ে নিয়ে ভালো জায়গায় থাকবো। কিন্তু আয় রুজি ভালো না হওয়ায় সেই ইচ্ছা আর পূরণ হয় না। গত বছর থেকে এই ফ্ল্যাটে থাকার সুযোগ পাইছি। ঢাকা শহরে ফ্ল্যাট বাড়ির যে ভাড়া, কখনও কল্পানাও করি নাই। এখন সেইটা সম্ভব হইতাছে। চারদিক কি বাতাস! নিজের ঘর দুয়ার।

মর্জিনা আক্তার নামে আরেক বসিন্দা বলেন, ছেলে-মেয়েগুলারে ভালো জায়গায় রাখতে পারতাছি। এইটাই ভালো। কিন্তু আমাদের তো আয় কম। বস্তিতে থাকার কোনও খরচ ছিল না। বিদ্যুৎ আর পানির জন্য ৫০০ টাকা দিলেই হইতো। এখন এইখানে আইসাই ছয় হাজার টাকা ঘর ভাড়া। গ্যাস বিল, বিদ্যুৎ বিল নিয়া আরও খরচ। এইসব খরচ দিয়া পেটে খাওন দিতে কষ্ট হইয়া যায়। ভাড়া যদি আরও কম দিতো তাইলে আমাগো জন্য উপকার হইতো।

বাসিন্দারা জানান, শুরুতে এসব ফ্ল্যাটে আসার আগ্রহ ছিল না বস্তিবাসীর। তাই ফ্ল্যাটের চাবি বুঝে পাওয়ার পরও অপেক্ষায় ছিলেন ভালো কোনও সুবিধা পাওয়া যায় কিনা। তবে সর্বশেষ সবার সঙ্গে মিল করে আসতে বাধ্য হন তারা। কিন্তু চাবি বুঝে পাওয়ার পর থেকেই এসব ফ্ল্যাটের ভাড়া গণনা শুরু হয়। ফলে প্রথমে না ওঠার পরও অনেকেই চার বা পাঁচ মাসের বকেয়া ভাড়ার দায় মাথায় নিতে হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, আমাদের প্রথমে বলা হইছিল ফ্ল্যাট কিস্তিতে বুঝায়া দিবো। কিন্তু পরে শুনি ভাড়া থাকতে হইবো। আমরা বংশ ধইরা ভাড়াটিয়াই থাইকা যামু! আর আমাদের আয় আর কত? ফ্ল্যাট ভাড়া ৬ হাজার টাকা, গ্যাস লাগে দুই সিলিন্ডারে ৩ হাজার টাকা, বিদ্যুৎ কার্ডে হাজার পনেরোশো। সিব মিলায়া ১০ হাজার টাকা। এইখানের বেশির ভাগ মানুষের আয় ১৫ হাজার টাকা। বাকি ৫ হাজার টাকা দিয় খামু কী আর সংসার চালামু কী। এইখানে সুবিধা ভালো কিন্তু তার আমাদের পোষায় না।

সিপিডির পর্যালোচনা

পোশাকশ্রমিকের জন্য ন্যূনতম ১৭,৫৬৮ টাকা মজুরি দরকার

০৯ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে একটি শ্রমিক পরিবারের প্রয়োজনীয় খাবারের খরচ মাসে ১৬ হাজার ৫২৯ টাকা। আর খাদ্যবহির্ভূত খরচ ১২ হাজার ৮৮২ টাকা। একেকটি শ্রমিক পরিবারের গড় সদস্যসংখ্যা ৩ দশমিক ৭। তার মধ্যে উপার্জনক্ষম সদস্য ২। সেই হিসাবে শ্রমিকের মাসিক নিম্নতম মজুরি হওয়া দরকার ১৭ হাজার ৫৬৮ টাকা।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশ্রমিকের নিম্নতম মজুরি নিয়ে এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। সংস্থাটি সর্বনিম্ন গ্রেডের জন্য সাড়ে ১৭ হাজার টাকা মজুরির প্রস্তাব করে, যার ৫৫ শতাংশ মূল মজুরি এবং মূল মজুরির ৫০ শতাংশ বাড়িভাড়া।

এ ছাড়া মোট মজুরির ৭ শতাংশ খাদ্য ভাতা, ৫ শতাংশ চিকিৎসা ভাতা, সাড়ে ৩ শতাংশ যাতায়াত ভাতা এবং সন্তান লালন–পালনের জন্য ২ শতাংশ ভাতার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি ৫ ও ৬ নম্বর গ্রেডকে একীভূত করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

সিপিডি মনে করে, বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান যদি প্রতি পিস পোশাকের জন্য মূল্য হিসেবে অতিরিক্ত ৭ সেন্ট করে দেয়, তাহলে বাড়তি মজুরি দিতে কারখানার মালিকদের ওপর কোনো চাপ পড়বে না।

রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে গতকাল রোববার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ক্রিশ্চিয়ান এইডের সহায়তায় ‘তৈরি পোশাক খাতে ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ পর্যবেক্ষণ ও প্রস্তাবনা’ অনুষ্ঠানে মজুরিসংক্রান্ত গবেষণার তথ্য তুলে ধরে সিপিডি। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের ৭৬ কারখানা ও ২২৮ পোশাকশ্রমিকের ওপর করা জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে এই গবেষণা করা হয়।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ও জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহকারী তামিম আহমেদ। তাঁরা বলেন, জরিপে অংশ নেওয়া ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ কারখানার ব্যবস্থাপনায় যুক্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার থেকে ২১ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে তাঁদের আপত্তি নেই। অন্যদিকে শ্রমিকদের প্রত্যাশা ১৮ হাজার ২৮৮ টাকা। আর বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন দাবি করেছে ২৫ হাজার টাকার ন্যূনতম মজুরি।

পোশাক শিল্পে সবচেয়ে কম মজুরি বাংলাদেশে

অক্টোবর ০৯, ২০২৩, বণিক বার্তা

দেশের রফতানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক। এ খাতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ রফতানিকারক বাংলাদেশ। অথচ শীর্ষস্থানীয় রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম মজুরি পান এ দেশের শ্রমিকরা। আর সবচেয়ে বেশি মজুরি চীনে। দেশটিতে একজন শ্রমিকের ন্যূনতম বেতন ৩০৩ ডলার ৫৯ সেন্ট। ইন্দোনেশিয়ায় ন্যূনতম মজুরি ২৪২ ডলার ৯৪ সেন্ট। কম্বোডিয়ায় এর পরিমাণ ২০০ ডলার। আর প্রতিবেশী ভারতে এ খাতে একজন শ্রমিকের সর্বনিম্ন বেতন ১৭১ ডলার ১৮ সেন্ট। বাংলাদেশে একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ৭২ ডলার ৪২ সেন্ট। রাজধানীতে গতকাল সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক সংলাপে উঠে এসেছে এমন তথ্য।

‘গার্মেন্টস খাতে ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ: পর্যবেক্ষণ ও প্রস্তাবনা’ শীর্ষক এ সংলাপের আয়োজন করে সিপিডি ও বেসরকারি সংস্থা ক্রিশ্চিয়ান এইড। সংলাপে পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১৭ হাজার ৫৬৮ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে সিপিডি। মূল্যস্ফীতি ও শ্রমিকের আর্থিক নিরাপত্তা বিবেচনায় এ প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি।

সিপিডি বলছে, ৭৬টি কারখানার ২২৮ জন শ্রমিকের ওপর গবেষণা করে মজুরি বাড়ানোর এ প্রস্তাব দিয়েছে তারা। ক্রেতারা যদি প্রতি পিস পণ্য মাত্র ৭ সেন্ট (প্রায় ৮ টাকা) বেশিতে নেয় তাহলে এ মজুরি দিতে কোনো চাপ তৈরি হবে না। আগামী নভেম্বরে পোশাক শ্রমিকদের নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণার কথা রয়েছে। তবে ঘোষণার পর সেটি কার্যকর হচ্ছে কিনা সেটি অন্তত তিন মাস পর্যবেক্ষণের তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি। কেননা ২০১৮ সালে ঘোষিত মজুরি কাঠামো এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি।

সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ও সিনিয়র গবেষণা সহকারী তামিম আহমেদ। বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান, বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, ন্যূনতম মজুরি বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি সিদ্দিকুর রহমান, শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘দুজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে সামনে রেখে একটি পরিবারের ন্যূনতম খরচ হিসাব করে এ প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। একজন পোশাক শ্রমিকের পরিবারের খাওয়া খরচ ১৬ হাজার ৫২৯ টাকা। অন্যান্য খরচ ১২ হাজার ৮৮১ টাকা। মোট মাসিক খরচ দাঁড়ায় ২৯ হাজার ৪১০ টাকা। এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতি যোগ করলে দাঁড়ায় ৩১ হাজার ৯৪২ টাকা।’

দখল, দুর্নীতি ও অনিয়ম

মডেল মসজিদে ‘মডেল অনিয়ম’

০১ আগস্ট ২০২৩, প্রতিদিনের বাংলাদেশ

রাজশাহীর গোদাগাড়ী। ২০২১ সালের জুনে মডেল মসজিদ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নির্মাণকাজ শেষ হয় এখানে। কিন্তু পরিদর্শনে দেখা গেছে, মডেল মসজিদটির কাঠের দরজা ত্রুটিপূর্ণ। চারটি প্লাস্টিকের দরজাও নিম্নমানের। ঝড়বৃষ্টি হলে রয়েছে জানালার গ্লাস খুলে পড়ার আশঙ্কা। মসজিদ ভবনের বৈদ্যুতিক কাজের মানও ভালো না। বৃষ্টি হলে বিদ্যুৎ লাইনে পানি চলে আসে। ফ্যানের সুইচবোর্ড একেবারেই নিম্নমানের। সেপটিক ট্যাংকের সম্মুখে প্লাস্টার নেই। পিলার, দেয়াল ও মিনারে ফাটল ধরেছে। মার্বেল পাথর ভাঙা। মসজিদের গেটের সামনে পানি জমে যায়। সার্বিক কাজের মানও ভালো না।

শুধু এই মসজিদ নয়, দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একটি হিসেবে মোট ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপনে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এই প্রকল্পের অধিকাংশ মসজিদ নির্মাণেই এমন চিত্র দেখা গেছে। সম্প্রতি প্রকল্পটির নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষার জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) ডেভেলপমেন্ট টেকনিক্যাল কনসালট্যান্টস (প্রা.) লিমিটেডকে (ডিটিসিএল) পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগ দেয়। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি ৫৬০টি মডেল মসজিদ থেকে সম্পন্ন এবং কাজ চলমান রয়েছে এরকম ১৭৫টি নমুনা মডেল মসজিদ পরিদর্শন করে নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন দিয়েছে। এতে মডেল মসজিদ নির্মাণে অনিয়মের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। অনিয়মকারীরা সরকারের এই মডেল প্রকল্পটিকে যেন ‘অনিয়মের মডেল’ হিসেবেই বেছে নিয়েছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের ‘খাতিরের’ প্রকল্প

করের টাকায় মন্ত্রী-সচিবের মা-বাবার নামে প্রতিষ্ঠান

০২ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদের গ্রামে তাঁর মায়ের নামে ‘করিমপুর নূরজাহান-সামসুন্নাহার মা ও শিশু বিশেষায়িত হাসপাতাল’ নির্মিত হচ্ছে ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে। পাঁচতলা ভবনের এই হাসপাতাল নির্মাণের জন্য ৮০ শতাংশ অর্থ বা ৩৫ কোটি টাকা দিচ্ছে সমাজসেবা অধিদপ্তর, যেটি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি প্রতিষ্ঠান। হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করছে মন্ত্রীর মায়ের নামের এনজিও (বেসরকারি সংস্থা) করিমপুর নূরজাহান-সামসুন্নাহার উন্নয়ন সংস্থা। নির্মাণকাজ পেয়েছে মন্ত্রীর ভাইয়ের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

নির্মাণকাজ চলতে থাকা হাসপাতালটির এক কিলোমিটারের মধ্যেই সরকারি উপজেলা হাসপাতাল রয়েছে।

দুর্নীতি প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করা সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, মন্ত্রীর অধীন প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পের মাধ্যমে মন্ত্রীর মায়ের নামে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা স্বার্থের সংঘাত। মন্ত্রীরা শপথ নেন এই বলে যে ‘তাঁরা অনুরাগ অথবা বিরাগের বশবর্তী হয়ে কোনো কাজ করবেন না।’ নিজের মায়ের নামে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় নিজের অধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনগণের অর্থ ব্যয় শপথের বিপরীতমুখী সিদ্ধান্ত।

অবশ্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু মন্ত্রী নন, আমলারাও নিজের মা-বাবা অথবা স্বজনের নামে হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, প্রশিক্ষণকেন্দ্র ইত্যাদি স্থাপনা করেছেন। সমাজসেবা অধিদপ্তর ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ১৮টি প্রকল্পের (ডায়াবেটিক হাসপাতাল ছাড়া) মাধ্যমে এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করেছে অথবা করছে, যার অন্তত ১১টি মন্ত্রী অথবা আমলাদের মা-বাবা অথবা স্বজনের নামে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনুদানে হাসপাতাল, প্রশিক্ষণকেন্দ্র বা সমজাতীয় স্থাপনা নির্মাণ ও পরিচালনা করে এনজিও। নিয়ম হলো, শহর এলাকায় প্রকল্প করতে মোট ব্যয়ের ৬০ শতাংশ ও গ্রাম এলাকায় ৮০ শতাংশ অর্থ সরকার দেবে, বাকিটা দেবে এনজিও। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, যেসব এনজিও প্রকল্প পাচ্ছে, সেগুলোর এ ধরনের প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার সক্ষমতা নেই। এনজিওগুলো মূলত নিজেদের স্বজনের নামে মন্ত্রী-সচিবেরা প্রতিষ্ঠা করেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থাপনা নির্মিত হলেও সেবাদান কার্যক্রম চালু হচ্ছে না।

চতুর্থ প্রজন্মের ৯ ব্যাংকও ডুবছে খেলাপি ঋণে

০২ আগস্ট ২০২৩, প্রতিদিনের বাংলাদেশ

দেশের ব্যাংক খাতের উন্নতিতে বড় বাধা হয়ে উঠেছে খেলাপি ঋণ। দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। ২০১৩ সালে অনুমতি পাওয়া চতুর্থ প্রজন্মের ৯টি ব্যাংকও রক্ষা পায়নি এই খেলাপি ঋণের কবল থেকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত মার্চ শেষে এই ৯টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৬ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। পাঁচ বছর আগে তাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৯৪০ কোটি। অর্থাৎ পাঁচ বছরে নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা।

৯টি ব্যাংকের মধ্যে দেশীয় উদ্যোক্তাদের পরিচালনায় অনুমোদন পাওয়া ব্যাংকগুলো হলোÑ মধুমতি, মিডল্যান্ড, ইউনিয়ন, সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স, মেঘনা ও পদ্মা ব্যাংক (সাবেক ফারমার্স ব্যাংক)। আর প্রবাসীদের মালিকানায় অনুমোদন পায় এনআরবি ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী (সাবেক এনআরবি গ্লোবাল) ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড। এর মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় আছে পদ্মা ব্যাংক। এ ব্যাংকের খেলাপির পরিমাণ মোট ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ।

প্রসঙ্গত, বেসরকারি খাতে বাংলাদেশে প্রথম ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮২ সালে। ওই বছর ১২ এপ্রিল আরব-বাংলাদেশ (এবি) ব্যাংক লিমিটেড যাত্রা শুরু করে। পরবর্তী এক দশকে দেশে বেসরকারি ব্যাংকের সংখ্যা দাঁড়ায় আটটিতে। যেগুলোকে প্রথম প্রজন্মের ব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এরপর ১৯৯১ থেকে ২০০০ সালে অনুমোদন পাওয়া ব্যাংকগুলোকে দ্বিতীয় এবং ২০০৮ সাল পর্যন্ত সময়কে ব্যাংকের তৃতীয় প্রজন্ম ধরা হয়। এই সময়ে ডাচ্-বাংলা, ইস্টার্ন, এক্সিম, আল-আরাফাহ, সাউথইস্ট, প্রাইম, প্রিমিয়ারসহ মোট ২২টি ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পুনরায় ক্ষমতায় এসে ২০১২ থেকে ১৩ সালের মধ্যে ৯টি ব্যাংকের অনুমোদন দেয়। এই ব্যাংকগুলোকে চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবসা শুরুর ৯ বছর পার হলেও ব্যাংকসেবায় বিশেষ কোনো নতুনত্ব আনতে পারেনি চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলো। গতানুগতিক ধারায় কার্যক্রম চালাচ্ছে তারা। পর্ষদের স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম-দুর্নীতি আর বিভিন্ন ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ছে ব্যাংকগুলো। নানা অব্যবস্থাপনায় নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে নিজেদের ইচ্ছামতো চালাচ্ছে প্রতিষ্ঠান। ঋণের নামে চলছে লুটপাট। দিন দিন বাড়ছে খেলাপি ঋণের বোঝা। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা ব্যাংকপাড়ায় বেশ আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের আরও ৭টি ‘খাতিরের’ প্রকল্প আসছে, ব্যয় ১৬০ কোটি টাকা

০৩ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

বিধবা ও স্বামীর হাতে নিগৃহীত নারী এবং অবহেলিত, দুস্থ ও বেকারদের জীবনমান উন্নয়নে প্রশিক্ষণ দিতে আরও সাতটি প্রকল্প নিয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। প্রকল্পগুলোতে ব্যয় হবে ১৬০ কোটি টাকা।

যদিও এ ধরনের প্রকল্পে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এর আগে নেওয়া এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও সুফল না পাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে প্রথম আলোর অনুসন্ধানে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসব প্রকল্পের নাম দিয়েছেন ‘খাতিরের প্রকল্প’। কারণ ‘খাতিরের’ ভিত্তিতে প্রকল্পগুলো নেওয়া হয় এবং পরে ইচ্ছেমতো অনিয়ম করা হয়।

নতুন করে সাতটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য গত মাসে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। কমিশন এখন তা পর্যালোচনা করছে। এর আগে সমাজসেবা অধিদপ্তরের এ ধরনের প্রকল্পে কী সুফল পাওয়া গেছে, তার মূল্যায়ন কারও কাছে নেই।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু সালেহ মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগের প্রকল্পগুলোতে কী হয়েছে, তা আমার জানা নেই। এই দপ্তরে আমি নতুন এসেছি। তবে নতুন করে যেসব প্রকল্প অনুমোদনের জন্য পাঠানো হচ্ছে, সেগুলো ভালো করে দেখা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, পরিকল্পনা কমিশন যদি মনে করে তাহলে নতুন প্রকল্পগুলো অনুমোদন দেবে।

এর আগে নেওয়া প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে কত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে জানতে চাইলে মহাপরিচালক বলেন, এটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) বলতে পারবে।

বেস্ট হোল্ডিংসকে শেয়ারবাজারে আনতে আইনি ছাড়

০৩ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

রাজধানীর পাঁচ তারকা হোটেল লা মেরিডিয়ানের মূল মালিকানা প্রতিষ্ঠান বেস্ট হোল্ডিংসকে শেয়ারবাজারে আনতে এবার আইনি ছাড় দিল বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এর আগে ২০২০ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রভাবশালী একটি পক্ষ লা মেরিডিয়ানকে ‘সরাসরি তালিকাভুক্তির’ উদ্যোগ নিয়েছিল। তখন সেই প্রক্রিয়া আটকে দিয়েছিল পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। এখন সেই নিয়ন্ত্রক সংস্থাই আইনি ছাড় দিয়ে কোম্পানিটিকে শেয়ারবাজারে আসার পথ সহজ করে দিয়েছে।

বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেড সাধারণ মানুষের কাছে অপরিচিত হলেও রাজধানীর নিকুঞ্জ এলাকার ‘লা মেরিডিয়ান’ হোটেলটি অনেকেই চেনেন। লা মেরিডিয়ান হোটেল ছাড়াও বেস্ট হোল্ডিংসের আওতায় ম্যারিয়টসহ আরও কয়েকটি হোটেল এবং বিলাসবহুল ভিলা ও রিসোর্ট উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে। কোম্পানিটি গত বছর শেয়ারবাজারে আসার জন্য বিএসইসিতে আবেদন জমা দেয়।

বিএসইসি সূত্রে জানা যায়, বেস্ট হোল্ডিংস বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারবাজারে আসতে চায়। কারণ, কোনো কোম্পানি শেয়ারের দাম অভিহিত মূল্য বা ফেসভ্যালুর বেশি চাইলে ওই কোম্পানিকে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আইপিওর মাধ্যমে বাজারে আসতে হয়। এই পদ্ধতি ছাড়াও স্থিরমূল্য বা ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও ছেড়ে শেয়ারবাজারে আসা যায়। সে ক্ষেত্রে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যে আইপিওতে শেয়ার বিক্রি করতে হয়। বেস্ট হোল্ডিংস তাদের শেয়ারের জন্য প্রিমিয়াম বা অধিমূল্য নিতে চায় বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। বেস্ট হোল্ডিংস বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারবাজার থেকে ৩৫০ কোটি টাকা তুলতে চায়।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা যায়, আগেরবার সরাসরি তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হওয়ায় এবার আইপিও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শেয়ারবাজারে আসার উদ্যোগ নিয়েছে বেস্ট হোল্ডিংস কর্তৃপক্ষ। শেয়ারবাজারে আসার আগেই প্রাইভেট প্লেসমেন্ট ও বন্ডের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যাংকের কাছ থেকে বড় অঙ্কের মূলধন সংগ্রহ করেছে। প্রাইভেট প্লেসমেন্টে কোম্পানিটির শেয়ার কিনেছেন বা মালিকানায় শরিক হয়েছেন শতাধিক রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিকভাবে ক্ষমতাশালী ব্যক্তি ও তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানিটিতে ওই সব ব্যক্তি ও রাষ্ট্রমালিকানাধীন বিভিন্ন ব্যাংকের বিনিয়োগ আটকে আছে। তাই কোম্পানিটিকে দ্রুত বাজারে এনে ওই সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ ফেরত দিতে পুনরায় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কাজটি যাতে নির্বিঘ্নে হতে পারে, সে জন্য আইপিও আবেদনের ক্ষেত্রে যেসব আইনি প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলোয় ছাড় দেওয়া হয়েছে।

সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের পাবলিক ইস্যু আইন অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি আইপিওতে আবেদনের দুই বছর আগে থেকে শুধু বোনাস শেয়ার ইস্যু ছাড়া অন্য কোনোভাবে মূলধন বাড়াতে পারে না। কিন্তু কোম্পানিটি এ রকম সময়ের মধ্যে বন্ড ছেড়ে বড় অঙ্কের মূলধন সংগ্রহ করেছে। বন্ডের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে আবার শেয়ারেও রূপান্তর করা হয়েছে। তাতে আইন অনুযায়ী কোম্পানিটির আইপিও আবেদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। এ কারণে আইনি বিধানে কোম্পানিটিকে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে। আইনি ছাড়ের বিষয়টি গত ২৭ জুলাই গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে।

গেজেটে বলা হয়েছে, আইপিও আবেদনের আগে কোম্পানিটি যত ধরনের শেয়ার ইস্যু করেছে, সেগুলোর ওপর তিন বছরের বিক্রয় নিষেধাজ্ঞা বা লক-ইন থাকবে। যেদিন থেকে কোম্পানিটির শেয়ার পুঁজিবাজারে লেনদেন হবে, সেদিন থেকে এ লক-ইনের সময় গণনা শুরু হবে। এ ছাড়া আইপিও অনুমোদনের আগে নতুন করে আর কোনো শেয়ার ইস্যু করতে পারবে না কোম্পানিটি।

দুর্নীতি হচ্ছে তাই বাংলাদেশে উন্নয়ন হচ্ছে : কুবি উপাচার্য

৩১ জুলাই ২০২৩, যায়যায় দিন

‘অনেকেই বলে দেশে দুর্নীতির কারণে উন্নয়ন হচ্ছে না। কিন্তু আমি বলব উল্টো কথা। দেশে দুর্নীতি হচ্ছে বলেই উন্নতি হচ্ছে। এটা নিয়ে অনেকেই বিভিন্ন কথা বলতে পারে। যে ঘুষ খায়, সে পদ্মা পাড়ে যায় ইলিশ খেতে। এতে পদ্মা পাড়ের গরীব মানুষেরা ধনী হচ্ছে। দুর্নীতি এভাবে অর্থনীতিতে অবদান রাখে। তাই অর্থনীতিবিদগণ দুর্নীতি কখনো কোনো বিরূপ মন্তব্য করে না। তবে যারা পলিটিক্যাল ইকোনমি নিয়ে কাজ করে তারা দুর্নীতি নিয়ে কথা বলে থাকে। নৈতিকতার জায়গায়ও এটি প্রশ্নবিদ্ধ। তবে অর্থনীতির জায়গা থেকে যদি বলি, দুর্নীতি কখনোই উন্নয়নের জন্য বাঁধা নয়।’

সোমবার (৩১ জুলাই) দুপুর আড়াই টায় ব্যবসা শিক্ষা অনুষদের কনফারেন্স রুমে মার্কেটিং বিভাগের ১৫ তম আবর্তনের শিক্ষার্থী তানভীর সালাম অর্ণব এবং তাসমিয়া মাহমুদ এর সঞ্চলনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন উপাচার্য অধ্যাপক ড এ এফ এম আবদুল মঈন।

এস আলমের আলাদিনের চেরাগ

 আগস্ট ৪, ২০২৩, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

এস আলম গ্রুপের মালিক মোহাম্মদ সাইফুল আলম সিঙ্গাপুরে কমপক্ষে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। যদিও বিদেশে বিনিয়োগ বা অর্থ স্থানান্তরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে এ সংক্রান্ত কোনো অনুমতি তিনি নেননি বলে দ্য ডেইলি স্টারের অনুসন্ধানে জানা গেছে।

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের বাইরে বিনিয়োগের জন্য এ পর্যন্ত ১৭টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দিলেও চট্টগ্রামভিত্তিক বিশাল এই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাম সেই তালিকায় নেই। কাগজপত্রে আরও দেখা যায়, গত এক দশকে সিঙ্গাপুরে এস আলম অন্তত দুটি হোটেল, দুটি বাড়ি, একটি বাণিজ্যিক স্পেস এবং অন্যান্য যে সম্পদ কিনেছেন এবং সেখানেও বিভিন্ন উপায়ে কাগজপত্র থেকে তার নাম সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশ থেকে ৪০ দশমিক ১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে বিনিয়োগের জন্য নেওয়া হয়েছে।

তবে, এই পরিমাণ অর্থ ২০০৯ সালের পর সিঙ্গাপুরে এস আলমের কেবল দুটি হোটেল ও একটি বাণিজ্যিক স্পেস কেনা ৪১১ দশমিক ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের দশ ভাগের এক ভাগ মাত্র।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নথিতে আরও দেখা যায়, এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বৈধ উপায়ে সিঙ্গাপুরে ১ লাখ ৭ হাজার মার্কিন ডলার পাঠিয়েছে, যার মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানও এস আলমের মালিকানাধীন নয়।

বিদেশে এস আলমের বিনিয়োগ সম্পর্কে জানতে ডেইলি স্টার বাংলাদেশ ব্যাংকে লিখিতভাবে যোগাযোগ করলেও তারা কোনো সাড়া দেননি।

বিদেশে বিনিয়োগ দাপ্তরিকভাবে কোনো গোপনীয় বিষয় নয়। তারপরও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গোপনীয় বিষয় হিসেবে দেখে বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তিন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এস আলম তাদের কাছ থেকে কখনো বিদেশে অর্থ নেওয়ার কোনো ধরনের অনুমতি নেননি।

তাদের মধ্যে একজন ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন যে এস আলম বিদেশে অর্থ পাঠানোর জন্য কোনোদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নেয়নি।’ অন্য দুই জনও এই তথ্য আলাদাভাবে নিশ্চিত করেছেন।

বাংলাদেশের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছাড়পত্র ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগ নিষিদ্ধ। এই অপরাধের শাস্তি সর্বোচ্চ ১২ বছর কারাদণ্ড এবং যে পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে তার দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থদণ্ড।

১৯৮৫ সালে সাইফুল আলম এস আলম গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন এবং তখন থেকে এটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।

তার ব্যবসার পরিধি পণ্য বাণিজ্য থেকে মাছ ধরা, নির্মাণ সামগ্রী থেকে আবাসন ব্যবসা, টেক্সটাইল থেকে মিডিয়া, আন্তঃনগর বাস থেকে শিপিং এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ থেকে ব্যাংকিং, বীমা পর্যন্ত বিস্তৃত।

ডেইলি স্টারের অনুসন্ধান বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্যে গত ৬ জুলাই ও ২৩ জুলাই দুই দফা লিখিতভাবে এস আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। আমরা বিদেশে তার বিনিয়োগ ও তহবিলের উৎস সম্পর্কে জানতে বেশ কিছু লিখিত প্রশ্ন তাকে পাঠাই, তাতে এ বিষয়ে তার বক্তব্যের জন্য অনুরোধ করা হয়। দুই বারই তিনি তার আইনজীবী এ হোসেন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের মাধ্যমে উত্তর দেন। এতে বলা হয়, প্রকাশিত হওয়ার আগে পুরো সংবাদ প্রতিবেদনটি তাকে না পাঠালে তিনি জবাব দেবেন না—যেটি সাংবাদিকতার চর্চা নয়।

সিঙ্গাপুর থেকে সাইপ্রাস হয়ে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস

এস আলম ও তার স্ত্রী ফারজানা পারভীন অফশোর বিজনেসের যে বিস্তৃত জাল বুনেছেন, তার কিছু অংশ ডেইলি স্টারের কাছে থাকা নথি থেকে জানা গেছে। আমাদের অনুসন্ধানে এস আলম ও তার স্ত্রীর সিঙ্গাপুর, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস এবং সাইপ্রাসে বিনিয়োগের সন্ধান পাওয়া গেছে।

ভূমধ্য সাগরীয় ছোট দেশ সাইপ্রাস ২০০৭ সালে তাদের ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ কর্মসূচি চালু করে। বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক পরামর্শদাতা সংস্থার মতে, এই প্রকল্পের আওতায়, দেশটির আবাসনখাতে প্রায় ২ মিলিয়ন ইউরো (২ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) বিনিয়োগ এবং সাইপ্রাস সরকারের গবেষণা ও ভূমি উন্নয়ন তহবিলে আরও ২ লাখ ইউরো অনুদানের বিনিময়ে ধনী বিদেশিদের সাইপ্রাসের নাগরিকত্বের সুযোগ দেওয়া হয়।

সিঙ্গাপুরের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড করপোরেট রেগুলেটরি অথরিটি (এসিআরএ) থেকে পাওয়া প্রতিষ্ঠানের প্রোফাইলের তথ্য অনুযায়ী, এর দুই বছর পর ২০০৯ সালের ২৭ আগস্ট সাইফুল আলম ও ফারজানা পারভীন নিজেদের সাইপ্রাসের নাগরিক এবং সিঙ্গাপুরের বাসিন্দা দেখিয়ে সিঙ্গাপুরে ক্যানালি লজিস্টিকস প্রাইভেট লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেন।

সে সময় কোম্পানিটির ইস্যু করা ও পরিশোধিত শেয়ার মূলধনের পরিমাণ ছিল ২২ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (৩০ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার)। এস আলম ও তার স্ত্রী একমাত্র শেয়ারহোল্ডার ছিলেন। আলম ৩০ মিলিয়ন শেয়ারের ৭০ শতাংশ এবং তার স্ত্রী বাকি ৩০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন।

সিঙ্গাপুরে বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশটিতে রেসিডেন্স পারমিট বা বিদেশিদের থাকার অনুমতি দেওয়া হয়।

বিশ্বের বেশ কিছু বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুর থেকেই পরিচালিত হয়, যার মধ্যে বাংলাদেশের কিছু ব্যবসায়িক গোষ্ঠীও রয়েছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়ামের (আইসিআইজে) তৈরি অফশোর লিকস ডেটাবেস অনুযায়ী, প্রায় ৬ হাজার শেল কোম্পানি (নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান) সিঙ্গাপুরের সঙ্গে যুক্ত।

এ ছাড়াও এস আলম ও তার স্ত্রী ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের আরও একটি অফশোর শেল কোম্পানি পিকক প্রপার্টি লিমিটেডের সঙ্গেও যুক্ত। সিঙ্গাপুর থেকে ১৭ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরের ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস এমন এক ট্যাক্স হ্যাভেন বা কর স্বর্গ যেখানে আয়কর, করপোরেট কর বা মূলধনী কর নেই।

আরেক কর স্বর্গ সাইপ্রাসে ২০১৬ সালে এস আলম অ্যাকলেয়ার ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান কেনেন। সাইপ্রাসের কোম্পানির রেজিস্ট্রার বিভাগ এবং অফিসিয়াল রিসিভারের নথি অনুসারে, পরবর্তীতে কোম্পানিটির নাম পরিবর্তন করে অ্যাকলেয়ার ইন্টারন্যাশনাল রাখা হয়।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এটি অবৈধ আর্থিক লেনদেনের একটি পরিষ্কার উদাহরণ। বিশেষ করে যদি কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া না যায় যে গোল্ডেন পাসপোর্টের জন্য দেওয়া অর্থ, দেশের বাইরে বিনিয়োগ ও সম্পদ ক্রয় এবং কর স্বর্গগুলোতে অফশোর কোম্পানি—এসব কিছু বৈধ বৈদেশিক আয় থেকে এসেছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দুটি বৈধ উপায়ে ব্যবসা বা বিনিয়োগের জন্য বিদেশে টাকা পাঠানো যায়। তার একটি হলো, রপ্তানিকারকদের রিটেনশন কোটার একটি নির্দিষ্ট অংশ ‘শুধু রপ্তানিকারক বা তাদের সহায়ক সংস্থা এবং সহযোগীদের আমদানি ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের জন্য’। অন্যটি হলো বিদেশে বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে।

তিনি কোনো নাম উল্লেখ না করে বলেন, ‘কিন্তু তার মানে এই না যে, তারা সেখানে আলাদা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে ব্যবসা করবে। সহায়ক কিছু করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানিকে বিদেশে বিনিয়োগের অনুমতি দিয়েছে।’

সোনার হরিণ চাই

চালু হওয়ার পাঁচ বছর পর ২০১৪ সালের ২৬ আগস্ট এস আলমের ক্যানালি লজিস্টিকস সিঙ্গাপুরের ‘লিটল ইন্ডিয়া’য় ১৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে ৩২৮ কক্ষের গ্র্যান্ড চ্যান্সেলর প্রাইভেট লিমিটেড হোটেলটি কেনার জন্য চুক্তি সই করে। হোটেল মালিকদের পক্ষ থেকে তাদের শেয়ারহোল্ডারদের এবং সিঙ্গাপুর সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জের কাছে পাঠানো এক সার্কুলারে এ তথ্য জানানো হয়।

চুক্তিপত্র অনুযায়ী, ‘চুক্তিমূল্য কয়েকটি কিস্তিতে নগদে পরিশোধ করা হবে।’ সার্কুলারে আরও বলা হয়েছে, চুক্তির শর্ত পূরণ করে ক্যানালি ইতোমধ্যেই ‘প্রাথমিক আমানত ও ব্যালেন্স ডিপোজিটসহ ১৮ দশমিক ৬ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার (প্রায় ১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) পরিশোধ করেছে।’

সিঙ্গাপুরের একটি ল ফার্ম এই চুক্তিতে হোটেলের প্রতিনিধিত্ব করে।

ডেইলি স্টারের পাওয়া সাম্প্রতিক নথিতে দেখা যায়, সিঙ্গাপুরের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসিআরএর কাছে হোটেল গ্র্যান্ড চ্যান্সেলরের দাখিল করা নথিতে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের শেষে হোটেলটির মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ৩১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বার্ষিক আয় ছিল প্রায় ৭ দশমিক ৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

অধিগ্রহণের এক বছর পরে হোটেলটির নাম পাল্টে গ্র্যান্ড ইম্পেরিয়াল হোটেল প্রাইভেট লিমিটেড করা হয় এবং এখন সিঙ্গাপুরের কেন্দ্রস্থলে হিল্টন গার্ডেন ইন সেরাঙ্গুনের ব্র্যান্ড নামে হোটেলটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

সিঙ্গাপুরের গণমাধ্যম দ্য বিজনেস টাইমস অনুসারে, ২০১৬ সালে সিঙ্গাপুরের ১৯তলা সেন্ট্রিয়াম স্কয়ারে ২৭ হাজার বর্গফুটের একটি বাণিজ্যিক স্পেস ১০০ দশমিক ৫৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে কিনে নেয় ক্যানালি।

অধিগ্রহণের এক বছর পর ক্যানালি লজিস্টিকস তার নাম পরিবর্তন করে উইলকিনসন ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেড করে, ২০২১ সালে যার সম্পদের মোট মূল্য ছিল প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (১০ হাজার কোটি টাকা)। এই প্রতিবেদন লেখার সময় সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষের কাছে ২০২২ সালের কোনো কাগজপত্র ছিল না।

প্রতিষ্ঠানটি যখন একের পর এক সম্পত্তি ক্রয় করেছে, এর তিন বছরের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের বিবরণীর তথ্য থেকে জানা যায়, কোম্পানির আয়ের চেয়ে ব্যয় ছিল বেশি।

উইলকিনসনের আর্থিক বিবরণীতে দেখা গেছে, ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে তার বার্ষিক আয় কখনই ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেনি। ২০২০ সালে এটি ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০১৯ সালে ৩৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ছিল।

উইলকিনসনের আর্থিক বিবরণীতে আরও দেখা যায়, ২০১৯ ও ২০২১ সালের মধ্যে কোম্পানিটি কমপক্ষে ৫৬৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে, যা তাদের অর্জিত পরিমাণের কয়েকগুণ বেশি।

একই সময়ে কোম্পানিটি ৪৫৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থায়ন পেয়েছে।

যদিও অর্থায়ন মূলধন বা ঋণ আকারে আসতে পারে, তবে কাগজপত্র দেখে বিশ্লেষকরা বলছেন যে, আলম ও তার স্ত্রী যেহেতু অন্তত ২০২০ সালের শেষ নাগাদ একমাত্র শেয়ারহোল্ডার ছিলেন, তাই এই অর্থ ব্যাংক ঋণ বা নগদ ঋণ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

ধোঁয়াশার আড়ালে

সিঙ্গাপুরের এই বিপুল ব্যবসায়িক সম্রাজ্য এমন এক ঠিকানার আড়ালে চলে, যার অস্তিত্ব কেবল কাগজে-কলমে আছে।

ডেইলি স্টার উইলকিনসনের নিবন্ধিত ঠিকানায় একজন সোর্স পাঠিয়েছিল, যিনি উইলকিনসনের অফিশিয়াল ঠিকানা কোলিয়ের কোয়ে রোডের ওশেন ফাইন্যান্সিয়াল সেন্টারে ব্যবসার নির্দেশিকা (বিজনেস ডিরেক্টরি) দেখেছিলেন। সেখানে উইলকিনসন ইন্টারন্যাশনালের নাম ছিল না। কিন্তু কোম্পানির হোটেল কেনার চুক্তিতে জড়িত আইনি প্রতিষ্ঠানটির নাম একই ঠিকানায় খুঁজে পান।

সিঙ্গাপুরের সরকারি উন্মুক্ত ডেটা পোর্টালের ২০২৩ সালের জুনের তথ্য অনুসারে, ওই ভবন থেকে ৫০০ শেল কোম্পানি (নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান) তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। যদিও তাদের মধ্যে বেশ কয়েকটির এখন আর অস্তিত্ব নেই।

আলম ও তার স্ত্রী ২০২০ সালের ১৬ ডিসেম্বর উইলকিনসনের পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসের পিকক প্রপার্টি হোল্ডিংস লিমিটেড নামে একটি অফশোর কোম্পানিতে তাদের মালিকানা হস্তান্তর করেন। ২০১৭ সালে প্যারাডাইস পেপারস ফাঁস হলে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও কোম্পানির অফশোর কার্যক্রম উন্মোচন হয়। এরমধ্য দিয়ে কর স্বর্গ হিসেবে শিরোনামে উঠে আসে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসের নাম।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, নিবন্ধিত ঠিকানায় পিকক প্রপার্টিকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। একই ঠিকানায় ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসের আর্থিক পরিসেবা কমিশনে নিবন্ধিত একটি অফশোর এজেন্ট নিউহ্যাভেন করপোরেট সার্ভিসেসের নাম পাওয়া গেছে।

২০১৭ সালের প্যারাডাইস পেপারস ফাঁসের পর জানা যায়, চার তলা এই হলুদ বিল্ডিংটি ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসের রাজধানী রোড টাউনে জেমস ওয়াল্টার ফ্রান্সিস হাইওয়ের গোল চত্বরের কাছে অফশোর কোম্পানিগুলোর জন্য পোস্টাল অফিস বক্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

গ্রাহককে যথাযথভাবে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত না করা বা গুরুত্বের সঙ্গে না নেওয়া এবং যেখানে সামনা-সামনি গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ নেই সেক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক ব্যবস্থা বা অতিরিক্ত ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতার কারণে ২০১৫ সালে নিউহ্যাভেন করপোরেটকে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসের মানি লন্ডারিং আইনে ২৫ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানা করা হয়েছিল।

নাম মুছে ফেলা

সিঙ্গাপুরের কোম্পানি থেকে নিজের নাম সরিয়ে ফেলার পর এস আলম অং লে কিম নামে সিঙ্গাপুরের এক নাগরিককে উইলকিনসন কোম্পানির একমাত্র পরিচালক হিসেবে মনোনীত করেন। তবে ডেইলি স্টার দৃশ্যত তার কোনো অনলাইন উপস্থিতি পায়নি।

তার প্রতিষ্ঠান থেকে ২০১৯ সালে ১২৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে কেনা হোটেল আইবিস সিঙ্গাপুর নোভেনার কাগজপত্রেও আলমের নাম পাওয়া যায়নি।

সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হোটেলটির কাগজপত্রে দেখা যায়, এটি বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন, যার সবগুলোই উপরে উল্লিখিত আইনি প্রতিষ্ঠান এবং এর চূড়ান্ত মালিক ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসের একটি অফশোর কোম্পানি।

হোটেলটি ২০১৩ সাল থেকে ক্যানোপাস টু প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন, কিন্তু কোম্পানির বর্তমান ঠিকানা আর উইলকিনসের ঠিকানা হুবহু এক, এমনকি প্রতিটি ইউনিট নম্বরও।

ক্যানোপাসের একমাত্র শেয়ারহোল্ডার ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসভিত্তিক হ্যাজেল ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি সংস্থা, যা উইলকিনসনের অফিসের ঠিকানায় নিবন্ধিত। সিঙ্গাপুরের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড করপোরেট রেগুলেটরি অথরিটির কাছ থেকে পাওয়া নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জুনে এস আলমের কাছে বিক্রির মাত্র ৩ মাস আগে কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

ট্যাক্স হ্যাভেন সুবিধার পাশাপাশি ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে তথ্য গোপন রাখার অধিকার রয়েছে, এবং সেই দেশে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো অফিসিয়াল কাগজপত্রে তাদের শেয়ারহোল্ডার বা পরিচালকদের নাম দিতে আইনতভাবে বাধ্য নয়।

পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের দেশগুলো সাধারণত শেল কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না। কারণ দেশটি চায় এই অর্থ তাদের দেশেই থাকুক।’

‘তাদের ট্যাক্সের প্রয়োজন নেই। তাদের বিনিয়োগ দরকার। সুতরাং, তারা ট্যাক্স ছাড় দিতে পারে। কিন্তু আমাদের ট্যাক্স দরকার এবং সে অর্থ দেশের বাইরে নিয়ে গিয়ে তারা (অর্থ পাচারকারীরা) আমাদের দেশকে কর থেকে বঞ্চিত করছে,’ বলেন ব্র্যাক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আহসান এইচ মনসুর।

তিনি এও বলেন যে, উৎসেই এটি বন্ধ করা দরকার, যেমন—এই লোকদের ব্যাংকের মালিক হতে না দেওয়া।

পুতুল পরিচালক

২০১২ সালের ২৫ অক্টোবর এস আলম তার সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠানে ‘ক্যাসিনো কিংপিন’ শাহেদুল হককে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেন। শাহেদুল তখন এস আলম গ্রুপের আংশিক মালিকানাধীন ঢাকার ইউনিয়ন ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন। এস আলমের ছেলে আহসানুল আলম ২০২৩ সালের জুনের মাঝামাঝিতে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হন। এর আগ পর্যন্ত তিনি ইউনিয়ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। ইসলামী ব্যাংকে এস আলম গ্রুপের উল্লেখযোগ্য অংশীদারত্ব রয়েছে।

২৮ বছর বয়সী আহসানুল আলম এস আলম গ্রুপের বর্তমান পরিচালকও।

শাহেদুল ২০১৮ সাল পর্যন্ত ইউনিয়ন ব্যাংক ও উইলকিনসনের পরিচালক ছিলেন।

ইউনিয়ন ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সময়ে এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন বাংলাদেশি কোম্পানি রিলায়েন্স ফাইন্যান্স ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে ২ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকার বেশি প্লেসমেন্ট পেয়েছে। বর্তমানে রিলায়েন্স ফাইন্যান্স নাম পরিবর্তন করে হয়েছে আভিভা ফাইন্যান্স।

প্লেসমেন্ট হলো মূলধন সংগ্রহের জন্য বিনিয়োগকারীদের কাছে সিকিউরিটিজ বা বন্ড বিক্রি করা।

গত বছরের শেষের দিকে এস আলম গ্রুপ কীভাবে ইসলামী ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিচ্ছে, তা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক দেখতে পায়, ইউনিয়ন ব্যাংকের মোট ঋণের সিংহভাগই গেছে ৩০০টি স্থানীয় শেল কোম্পানি বা নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের কাছে। বাংলা দৈনিক প্রথম আলো সে সময়ে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

২০১৯ সালে অবৈধ ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানে ক্যাসিনো ব্যবহার করে অর্থপাচারে জড়িতদের মধ্যে শাহেদুলকে শনাক্ত করা হয়। পরবর্তীতে তার নামের সঙ্গে ‘ক্যাসিনো’ উপাধিটি জড়িয়ে হয় ‘ক্যাসিনো শাহেদুল’।

গত বছরের নভেম্বরে ৩২ কোটি টাকা অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় তাকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেন ঢাকার একটি আদালত। দুদকের তদন্তকারীরা জানান, শাহেদুল দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন এবং কখনো আদালতে হাজির হননি।

যুক্তরাষ্ট্রের উন্মুক্ত ভোটার রেকর্ড থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, শাহেদুল ও তার স্ত্রী সারিনা তামান্না হক মিশিগানের ক্যান্টনের নিবন্ধিত ভোটার এবং সেখানে তাদের সম্পত্তিও রয়েছে।

দুই বাড়ির বৃত্তান্ত

সিঙ্গাপুরের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব কর্তৃপক্ষ থেকে পাওয়া রেকর্ডে দেখা যায়, এস আলম ও তার স্ত্রী ২০২১ সাল পর্যন্ত মধ্য সিঙ্গাপুরের নোভেনায় ১২ হাজার ২৬০ বর্গফুটের একটি বাড়ির মালিক ছিলেন।

২০১৮ সালে এই সম্পদের বার্ষিক রেন্টাল ভ্যালু ছিল ৫ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার। তবে ২০২২ সালে সিঙ্গাপুরের জিকো ট্রাস্ট লিমিটেড এর বৈধ মালিক হয়।

জিকো ট্রাস্টের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য বলছে, ‘একটি ট্রাস্ট গঠনের সুবিধার মধ্যে রয়েছে গোপনীয়তা ও সম্পদ সুরক্ষা। ট্রাস্টগুলো অফশোর (সেটেলরের নিজ দেশের বাইরে) ও ব্যক্তিগতভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, যার ফলে সেটলরের গোপনীয়তা নিশ্চিত করা যায়।’

‘ব্যক্তিগত ট্রাস্টের অন্যতম সুবিধা হলো—সম্পদ সুরক্ষা। যেহেতু ট্রাস্টি সম্পদের আইনি মালিক, সেহেতু সেটলরকারী তার অধিকার ত্যাগ করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি ঋণদাতা, দেউলিয়াত্ব ও বিনিময় নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদির বিরুদ্ধে এক ধরনের সুরক্ষা নিশ্চিত করে’, বলা হয়েছে ওয়েবসাইটে।

সিঙ্গাপুরে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় বাড়ির মালিক ছিলেন এই দম্পতি। এর মালিকানাও পেদাং ট্রাস্ট সিঙ্গাপুর প্রাইভেট ট্রাস্টের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

সিঙ্গাপুর ২০০৮ সালে এস্টেট শুল্ক বাতিল করে। সুতরাং, সিঙ্গাপুর ট্রাস্ট থেকে মূলধনের আয় বণ্টন কর মুক্ত এবং সিঙ্গাপুরের ট্রাস্টের উত্তরসূরিদের কোনো এস্টেট শুল্ক ছাড়াই সুবিধাভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়।

রিজার্ভ চুরির সব সন্দেহজনক যোগসূত্রই গভর্নর সচিবালয়কেন্দ্রিক

আগস্ট ০৫, ২০২৩, বণিক বার্তা

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্ভার হ্যাকের উদ্দেশ্যে রিজার্ভ চুরির আগে একটি ফিশিং ই-মেইল বার্তা পাঠিয়েছিল হ্যাকাররা। ওই বার্তায় সাড়া দেয়া হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর সচিবালয়ের তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক এএফএম আসাদুজ্জামানের ব্যবহৃত কম্পিউটার ডিভাইস থেকে। চাকরির জন্য সাক্ষাতের ডাক পাওয়ার প্রত্যাশা জানিয়ে প্রেরক রাসেল আহলাম একটি কভার লেটার ও একটি জীবনবৃত্তান্ত বা বায়োডাটা পাঠিয়েছিলেন ওই ই-মেইল বার্তায়। যে সময় ওই বার্তায় সাড়া দেন এএফএম আসাদুজ্জামান, নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী তখন তার কাজের জায়গায় থাকার কথা না। ওই ফিশিং বার্তাকে কাজে লাগিয়েই গভীর রাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় হ্যাকাররা। পরে রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্টের (আরটিজিএস) মাধ্যমে সরিয়ে নেয়া হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ। এছাড়া রিজার্ভ চুরির আগে একজন ডেপুটি গভর্নরকে অনুপস্থিত দেখিয়ে তড়িঘড়ি করে এ আরটিজিএসের ফাইল অনুমোদনের ঘটনাটিও ঘটে এ দপ্তর থেকেই। রিজার্ভ চুরি নিয়ে সন্দেহজনক এসব সূত্রের প্রায় সবক’টিই গভর্নর সচিবালয়কেন্দ্রিক বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

অর্থ ও তথ্য আত্মসাৎ করে নেয়ার উদ্দেশ্যে কোনো মেইল বা লিংক ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইন্টারনেট ফিশিং পরিভাষাটি ব্যবহার হয়। মূলত কোনো সংগঠন বা ব্যক্তিকে টার্গেট করে প্রতারণামূলক ই-মেইল পাঠিয়ে স্পর্শকাতর তথ্যে ঢুকে পড়াই হচ্ছে স্পিয়ার-ফিশিং। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রিজার্ভ চুরির ঘটনায় হ্যাকারদের বার্তা গ্রহণকারী ডিভাইসটি শনাক্তের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জব্দ করা কম্পিউটারসহ অন্যান্য ডিভাইস ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য হেফাজতে নিয়েছিল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। পাশাপাশি অধিকতর ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর সচিবালয় থেকে জব্দ করা ডিভাইসের নমুনা সংগ্রহ করে নেয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) ল্যাবে। কয়েক দফা এসব নমুনা পরীক্ষার পর সংস্থাটি নিশ্চিত হয় রাসেল আহলাম নামে হ্যাকারদের পাঠানো ফিশিং মেইলটি সর্বপ্রথম ক্লিক করা হয় যে ডিভাইস থেকে, সেটি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সচিবালয়ের কর্মকর্তা এএফএম আসাদুজ্জামানের। তিনি তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর সচিবালয়ে মহাব্যবস্থাপক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। ব্যাংকের নিজস্ব সার্ভার ব্যবহার করে তিনি ফিশিং মেইলে সাড়া দেন। মেইলটিতে সিভি সংযুক্ত করা ছিল। সেই ফাইলটিতে ক্লিক করার পরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুইফট সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় হ্যাকাররা। রাতে বেশ কয়েক ঘণ্টা সময় নিয়ে আরটিজিএসের মাধ্যমে কয়েকটি ট্রানজেকশনে সরিয়ে নেয়া হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের ১০১ মিলিয়ন (১০ কোটি ১০ লাখ) ডলার।

নতুন ভবনও ঝুঁকিপূর্ণ

০৫ আগস্ট ২০২৩, প্রতিদিনের বাংলাদেশ

‘বাইরে ফিটফাট, ভেতরে সদরঘাট’- এই কথার সঙ্গে মিল আছে রাজধানীতে গড়ে ওঠা বেশ কিছু সরকারি বহুতল ভবনের। ঝাঁ-চকচকে এসব অট্টালিকা দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। অথচ বাইরে থেকে যতটা সুন্দর, ভেতরের কাঠামোটা ঠিক ততখানি মজবুত নয় এসব ভবনের। খোদ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ- রাজউকের পরীক্ষানিরীক্ষার ফলই বলছে সে কথা। সম্প্রতি রাজধানীর বেশ কিছু সরকারি ভবনের মান পরীক্ষা করে দেখেছে রাজউক। এরপর তারা ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার ২২৯টি ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে; যার মধ্যে ৩৭ শতাংশই নতুন ভবন। এগুলো নির্মাণ করা হয়েছে ২০০০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে। যদিও সরকারি স্থাপনা নির্মাণের সময় আয়ুষ্কাল ধরা হয় কমপক্ষে ১০০ বছর।

গত মার্চে বিভিন্ন সরকারি ভবন পরীক্ষা করে রাজউক ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের যে তালিকা প্রকাশ করে তা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এমন সব অনিয়মের চিত্র বেরিয়ে আসেÑ যা দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়। যেমনÑ রাজধানীর বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভবন রয়েছে চারটি। এর মধ্যে একটি আশির দশকে নির্মিত। রাজউকের তালিকা অনুযায়ী এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুটি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। এ খবর শুনে স্কুল কর্তৃপক্ষ ভেবেছিল সবচেয়ে পুরনো ভবনটিই হয়তো তালিকায় রয়েছে। কিন্তু তাদের সেই সন্দেহ ভুল প্রমাণ করে সদ্য পাঠদান শুরু হওয়া সবচেয়ে নতুন ছয়তলা দৃষ্টিনন্দন ভবনটিই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকায় চলে এসেছে। রাজউকের নথি অনুযায়ী, ভবনটির নির্মাণ কাজ শেষ হয় ২০১৭ সালে। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ ভবন ২০২২ সালের শেষদিকে তাদের বুঝিয়ে দেয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। এরপর চলতি বছরের শুরুতে সেখানে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির পাঠদান শুরু হয়। সে হিসাবে ব্যবহার শুরু করার মাত্র দেড়-দুই মাসের মধ্যে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে রাজউক। এই তালিকায় থাকা স্কুলের অপর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি ২০০৮ সালে নির্মিত।

হাজারীবাগের সালেহা উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০১৮ সালে নির্মিত আটতলা একটি ভবনও ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। এ বিদ্যালয়ে ১৯৯৮ সালে নির্মিত পাঁচতলা আরও একটি ভবন রয়েছে এ তালিকায়। সাভারের আশুলিয়ায় দোসাইদ এ কে স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি চারতলা ভবনÑ যা ২০১৭ সালে নির্মিত, সেটিও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে মূল্যায়ন করে কাঠামো পুনর্নির্মাণের সুপারিশ করেছে রাজউক।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়ম না মেনে নির্মাণের কারণে নতুন ভবনগুলোও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। রাজউক এখন পর্যন্ত সরকারি মালিকানাধীন অল্প কিছু ভবন পরীক্ষা করেছে। বাকি ভবনগুলো পরীক্ষা করলে নির্মাণকাজে অনিয়মের আরও ভয়াবহ চিত্র সামনে আসতে পারে।

পরীক্ষানিরীক্ষার পর রাজউক সরকারি ৪২টি ভবন ভেঙে ফেলার কথা বলেছে। এর মধ্যে ২০০৭ সালে নির্মাণ করা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) একটি ১৭ তলা ভবন রয়েছে। পাশাপাশি বনানী বিদ্যানিকেতন, দোসাইদ এ কে স্কুল অ্যান্ড কলেজে ও সালেহা উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ১৮২টি ভবন রেট্রোফিটিং (রেট্রোফিটিং হচ্ছে নির্মিত স্ট্রাকচারের ক্যাপাসিটি বাড়ানো। সাধারণত পুরোনো স্ট্রাকচার, যা লোড নিতে পারছে না বা ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত; এ রকম বিল্ডিংয়ে রেট্রোফিটিং করা হয়) করার সুপারিশ করা হয়েছে।

ভূমিকম্প সহনশীল স্থাপনা গড়তে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের আওতায় রাজউকের ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় অর্থাৎ ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জ এলাকার কিছু প্রতিষ্ঠানে জারিপ চালানো হয়। সেই জরিপে ৩ হাজার ২৫২টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে সংস্থাটি। তার মধ্যে ২২৯টি ভবনে ত্রুটি খুঁজে পায় বিশেষজ্ঞ দল। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শুধু পাবলিক স্ট্রাকচার নিয়ে এই জরিপ পরিচালিত হয়েছেÑ যার মধ্যে রয়েছে হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন। ব্যক্তিগত ও বেসরকারি ভবনগুলো পরিদর্শন করা হয়নি।

বিশেষজ্ঞ দলের পর্যবেক্ষণে তৈরি তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর বেশিরভাগই শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্মাণ করা। তা ছাড়া গণপূর্ত অধিদপ্তর ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য বিভাগের কিছু ভবন রয়েছে তালিকায়। এসব ভবনের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও হাসপাতাল রয়েছে। ভূমিকম্প বা স্বাভাবিক সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ এসব ভবন ধসে পড়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তা ছাড়া কোনো দুর্যোগ বা বিপর্যয়ে এসব ভবনে দ্রুত উদ্ধার কাজ চালানো কঠিন হবে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নতুন ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বিপদের মাত্রা অনেকগুণ বেশি বলে গণ্য করা হচ্ছে।

তালিকা বিশ্লেষণ করে আরও দেখা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ ২২৯টি ভবনের মধ্যে ৮৫টি ২০০০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে নির্মিত, যা তালিকায় থাকা মোট ভবনের শতকরা ৩৭ দশমিক ১১ শতাংশ। এর মধ্যে ২০১৭ সালে নির্মাণ করা হয়েছে ৮টি ভবন। ২০১০ সালের পরে ৪৯টি এবং ২০১৪ সালের পর ২৯টি ভবন নির্মাণ করা হয়। এত কম সময়ে সরকারি ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

জাহাজ ত্রুটিপূর্ণ দেখালেই পকেট ভরে সার্ভেয়ারের

০৬ আগস্ট ২৩, সমকাল

দেশি জাহাজ ও ট্রলারের ফিটনেস যাচাই করে নৌ-বাণিজ্য দপ্তর। বাংলাদেশে আসা বিদেশি জাহাজের চলাচল উপযুক্ততাও যাচাই হয় এই দপ্তর থেকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক নৌ-সংস্থার (আইএমও) নিয়ম মেনে জাহাজের ফিটনেস সনদ দেওয়ার কথা থাকলেও সেটি হচ্ছে না এবং এ ক্ষেত্রে নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন এই দপ্তরের কর্মকর্তারা। সম্প্রতি প্রকাশিত আন্তর্জাতিক এক রিপোর্টে উঠে এসেছে এই কথা।

বিভিন্ন ক্যাটাগরির নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ৪ হাজার ৭০০ জাহাজ এবং ট্রলারের জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জামের সার্ভে, লাইটহাউস পরিদর্শন, নাবিকদের চোখ পরীক্ষা, বিদেশি জাহাজের পোর্ট স্টেট কন্ট্রোল সার্ভেসহ ৩০ ধরনের কাজ করতে হয় নৌ-বাণিজ্য দপ্তরের কর্মকর্তাদের। জাহাজ মালিকদের অভিযোগ, ঘুষ না পেলে এই দপ্তরের কর্মকর্তারা তাদের সনদ পাল্টে ফেলছেন। ত্রুটিপূর্ণ নৌযানের তালিকায় ফেলছেন ভালো নৌযানও। যত বেশি জাহাজ তাঁরা ত্রুটিপূর্ণ দেখাতে পারেন, তত বেশি পুষ্ট হয় তাদের পকেট।

নৌ-বাণিজ্য দপ্তরের অধীনে থাকা জাহাজের মধ্যে সমুদ্রগামী ৯২, কোস্টাল ও তেলবাহী ৩২০, ফিশিং ট্রলার ১৪০, ফিশিং বোট ১ হাজার ৮০০, কার্গো বোট ২ হাজার ২০০ এবং অন্যান্য ক্যাটাগরির ১৫০টি জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজ বা ট্রলারের মান ও নিরাপত্তা নিয়ে সন্তুষ্ট না হলে সনদ যাচাই করতে পারেন দপ্তরের সার্ভেয়াররা। এখন বন্দরে জাহাজ এলেই পরিদর্শনে যেতে যেন মরিয়া হয়ে ওঠেন নৌ-বাণিজ্য দপ্তরের কর্মকর্তারা। পরিদর্শনে গিয়ে জাহাজের বিভিন্ন ত্রুটি দেখিয়ে তাঁরা ঘুষ নেন। কেউ কেউ নেন সিগারেট, প্রসাধনী, মদ কিংবা অন্য উপঢৌকন। এ নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছে আইএমও।

আমলাদের পদোন্নতির জন্য মন্ত্রীদের ‘তদবিরের’ হিড়িক

০৯ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

সরকারি কর্মকর্তাদের পদোন্নতির জন্য মন্ত্রীদের আধা সরকারি পত্র (ডিও) দেওয়া বন্ধ হচ্ছে না। সাম্প্রতিককালে ১০ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিতে ৯ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ডিও দিয়েছেন।

কোনো মন্ত্রী ডিও দিয়েছেন কোনো কর্মকর্তাকে সচিব করতে। কেউ ডিও দিয়েছেন উপসচিবকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির অনুরোধ জানিয়ে। ডিওগুলো পাঠানো হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন ও জ্যেষ্ঠ সচিব মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরীর কাছে।

ডিও দেওয়া মন্ত্রীরা হলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দারও এক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিতে ডিও দিয়েছেন।

হাজার কোটি টাকা গিলল ১২ প্রতিষ্ঠান

১১ আগস্ট ২০২৩, আজকের পত্রিকা

নজিরবিহীন ঋণ কেলেঙ্কারি আর গ্রাহকের আমানতের টাকা লোপাটের কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিসেস লিমিটেড (আইএলএফএসএল) এখন দেউলিয়া হওয়ার পথে। প্রশান্ত কুমার হালদার (পি কে হালদার) ছাড়া আরও ডজনখানেক প্রতিষ্ঠান হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এ কে এম শহীদ রেজা ও প্রাইম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানও আছে। হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে আইএলএফএসএলে নিরপেক্ষ পর্ষদ বসানো হলেও আগেই গ্রাহকের জমানো প্রায় সব টাকা চুষে নিঃশেষ করা হয়েছে। পর্ষদ এখন টাকা ফেরত চাইলে খেলাপিরা উল্টো হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আবার কেউ কেউ ঋণের প্রায় পুরো টাকাই মেরে দিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন।

জানতে চাইলে আইএলএফএসএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক। আমরা তা আদায়ের চেষ্টা করছি। ঋণখেলাপিরা বলেন, আমরা তাদের খেলাপি বাড়িয়ে দেখাচ্ছি। বাড়িয়ে দেখানোর সুযোগ নেই। কারণ, আদালতে অসত্য তথ্য দিলে তার দায়

তো আমাদের ওপর বর্তাবে। আশা করি, সামনে আমাদের বকেয়া ঋণ আদায় বাড়বে।’

বাংলাদেশ ব্যাংক, আইএলএফএসএলসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রে জানা যায়, ঋণ কেলেঙ্কারিতে বর্তমানে প্রায় পুরো ব্যাংক ও আর্থিক খাতই প্রশ্নবিদ্ধ। পরিচালকেরা পরস্পর যোগসাজশে একে অপরের ব্যাংক থেকে লোপাট করছেন টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকের আমানতের টাকা নামে-বেনামে লুটে নেওয়ায় এরই মধ্যে দেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্রায় দেউলিয়া হয়েছে। এ রকমই ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে আইএলএফএসএল। এর দেওয়া মোট ৪ হাজার ১৩০ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপিই ৯১ শতাংশ বা ৩ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা। জানা গেছে, মাত্র ১২টি প্রতিষ্ঠানই হাতিয়েছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। এর আগে পি কে হালদার একাই প্রতিষ্ঠানটি থেকে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা লুটে নেন।

প্রথম আলোসহ চারটি পত্রিকাকে এস আলমের আইনি নোটিশ

১২ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

প্রকাশিত প্রতিবেদনের সূত্র ধরে সরকারের দুই সচিব, প্রথম আলোসহ চার পত্রিকার সম্পাদক ও সাতজন সাংবাদিক বরাবর আইনি নোটিশ দিয়েছেন এস আলম গ্রুপ ও এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম। নোটিশে আগামীকাল রোববার সকাল ১০টার আগে এস আলম গ্রুপ ও এর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন পাবলিক ডোমেইন থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্রসচিব এবং তথ্য ও সম্প্রচারসচিবকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি এ জাতীয় সংবাদ প্রকাশ না করার দাবি জানানো হয়েছে।

মোহাম্মদ সাইফুল আলমের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আজমালুল হোসেন কেসি গত বৃহস্পতিবার ওই নোটিশ পাঠান। নোটিশে বলা হয়, ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা বা এর আগে প্রতিবেদনগুলো সরানো না হলে সাইফুল আলম এবং এস আলম গ্রুপের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার জন্য যথাযথ প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হবে।

নোটিশে তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এসব প্রতিবেদনের কারণে এস আলম গ্রুপের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর ৪৩ হাজার ৩২২ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

প্রথম আলো পত্রিকায় গত বছরের ২৪ নভেম্বর প্রকাশিত ‘ইসলামী ব্যাংকে ভয়ংকর নভেম্বর’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদনের প্রসঙ্গটি উল্লেখ করে প্রথম আলো সম্পাদক ও প্রকাশক মতিউর রহমান এবং প্রতিবেদক সানাউল্লাহ সাকিব বরাবর নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকায় নোটিশ দেওয়া হয়েছে দুটি প্রতিবেদনের জন্য। এর একটি প্রকাশিত হয়েছিল গত বছরের ৬ ডিসেম্বর, এস আলম গ্রুপের সম্পদের তদন্ত বিষয়ে। আরেকটি প্রকাশিত হয় ৪ আগস্ট ‘এস আলম গ্রুপের আলাদিনের চেরাগ’ শীর্ষক শিরোনামে। এ জন্য ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক ও প্রকাশক মাহ্‌ফুজ আনাম, নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আশফাকুল হক, সাংবাদিক পার্থ প্রতিম ভট্টাচার্য ও জাইমা ইসলামকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

নিউএজ পত্রিকায় গত ৩০ নভেম্বর ‘এস আলম গ্রুপ একাই ইসলামী ব্যাংক থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা ঋণ তুলে নিয়েছে’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ জন্য নিউএজ-এর সম্পাদক নূরুল কবীর এবং প্রতিবেদক মোস্তাফিজুর রহমানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার সম্পাদক ইনাম আহমেদ, রিপোর্টার জেবুন নেছা আলো ও সাখাওয়াত প্রিন্সকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে গত বছরের ২৭ নভেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনের জন্য। যার শিরোনাম ছিল ‘কীভাবে ২৪ বছর বয়সী গ্রিনহর্ন ৯০০ কোটি টাকা ঋণ পেলেন’।

প্রসঙ্গত, ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার-এ ‘এস আলম’স আলাদিন’স ল্যাম্প’ (এস আলমের আলাদিনের চেরাগ) শিরোনামে ৪ আগস্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি নজরে আনার পর ৬ আগস্ট বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি খিজির হায়াতের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত রুলসহ আদেশ দেন। অনুমতি ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগ বা অর্থ স্থানান্তর নিয়ে এস আলম গ্রুপের মালিক মোহাম্মদ সাইফুল আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অনুসন্ধান করে দুই মাসের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডির) প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়।

এর আগে ইসলামীসহ তিন ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যমে আসা প্রতিবেদন নজরে আসার পর গত বছরের ৪ ডিসেম্বর হাইকোর্টের একই বেঞ্চ অনুসন্ধানের নির্দেশ দেন। ওই ঘটনা অনুসন্ধান করে দুদক, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএফআইইউ এবং সিআইডিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।

খেলাপির চেয়ে পুনঃ তফসিল ঋণ বেশি

১৪ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

ব্যাংকগুলো সর্বশেষ ২০২২ সালে ৬৩ হাজার ৭১৯ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃ তফসিল করেছে। তা অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, আবার ব্যাংকগুলো নিজেরাও পুনঃ তফসিল করেছে। ফলে এসব ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। এরপরও গত বছরের শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা। পুনঃ তফসিল করা ঋণকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ২০ শতাংশেন কাছাকাছি হতো।

ব্যাংকগুলো এত খেলাপি ঋণ পুনঃ তফসিল করার ফলে গত বছর তাদের নিট মুনাফা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ হাজার ২২৬ কোটি টাকা, যা ২০২১ সালে ছিল ৫ হাজার ২২ কোটি টাকা। ২০২২ সালে ব্যাংকগুলোর ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি কমে ৮ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকায় নামে, যা ২০২১ সালে ছিল ১৫ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। ব্যাংকের মুনাফা বেশি হলে মালিক ও শেয়ারধারীরা যেমন বেশি মুনাফা পান, তেমনি সরকারও বেশি কর পায়।

এদিকে গত বছরের শেষে পুনঃ তফসিল করা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা, যা ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ১৪ দশমিক ৪০ শতাংশ। ফলে খেলাপি ঋণের চেয়ে পুনঃ তফসিল করা ঋণ এখন বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন ২০২২-এ এসব তথ্য পাওয়া গেছে, যা গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের জন্য ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার শর্ত দিয়ে রেখেছে। আইএমএফ পুনঃ তফসিল করা ঋণ ও আদালতের স্থগিতাদেশ দেওয়া ঋণকে খেলাপি হিসেবে দেখানোর পক্ষে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুনঃ তফসিল করা ঋণও খেলাপি, আইএমএফ এ কথাই বলে। পুনঃ তফসিল করা ঋণ হিসাবে ধরলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়াবে ২৫ শতাংশ। প্রতিবেদনে দেখলাম পুনঃ তফসিলের হার ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গড় খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের একটু কম। এর বাইরে মামলায় আটকা আরও ১ লাখ কোটি টাকা।’

আহসান মনসুর আরও বলেন, ‘কার্পেটের নিচে ময়লা রাখলে কি আর ঘর পরিষ্কার হয়? ময়লা তো ঘরে থেকেই যায়। অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, খেলাপি ঋণ এক টাকাও বাড়বে না। এসব বলে সর্বনাশ করে ফেলেছে। পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধি ছাড়া চোখের সামনে কোনো আশাবাদ নেই।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২০২২ সাল পর্যন্ত ৬৫ হাজার ৩২১ কোটি টাকা ঋণ অবলোপন করে আর্থিক প্রতিবেদন থেকে মুছে ফলা হয়েছে। ২০২১ সাল পর্যন্ত যা ছিল ৬০ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ পুনঃ তফসিল করা হয়েছে ২০২২ সালে। এই বছরে পুনঃ তফসিল করা হয় ৬৩ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা, যা ২০২১ সালে ছিল ২৬ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। আর ২০২০ সালে ছিল ১৯ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। এর আগে ২০১৯ সালে পুনঃ তফসিল করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৫২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। পুনঃ তফসিল করা ঋণের ৭১ শতাংশ বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর, ২৪ শতাংশ সরকারি ব্যাংকগুলোয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পুনঃ তফসিল করা ঋণের ২০ শতাংশ আবার খেলাপি হয়ে পড়েছে। ৮০ শতাংশ ঋণ নিয়মিত রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঋণ পুনঃ তফসিল করা হয়েছে শিল্প খাতে। পুনঃ তফসিল করা ঋণের প্রায় ৩১ শতাংশ শিল্প খাতের। এরপরই রয়েছে পোশাক ও টেক্সটাইল খাত। পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে রয়েছে পুনঃ তফসিল করা ঋণের ২০ দশমিক ৫০ শতাংশ। বাণিজ্যিক ঋণ ও চলতি মূলধন ঋণের ক্ষেত্রে এই হার ৯ শতাংশ। তবে এখন সবচেয়ে বেশি পুনঃ তফসিল করা ঋণের স্থিতি দেখা যায় জাহাজভাঙা ও নির্মাণ খাতে, যা প্রায় ৩৩ দশমিক ৮০ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২২ সালের শেষে ব্যাংক খাতের আমানতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। আর ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে ব্যাংকগুলোতে তারল্যের ওপর চাপ ছিল। এ জন্য গত বছর বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে ৯ লাখ ১০ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা ধার দেয়। অন্যদিকে ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে ৮ লাখ ৬০ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা ধার দেওয়া-নেওয়া করে। ২০২১ সালে এই পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৬০ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা।

ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণের ৪ ভাগের ১ ভাগই ঝুঁকিপূর্ণ

১৪ আগস্ট, ২০২৩, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

২০২২ সাল শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা, বকেয়া পুনঃতফসিল করা ঋণ ২ লাখ ১২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা ও বকেয়া খেলাপি ঋণ ৪৪ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা।

গত বছরের শেষে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের মোট পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৯২২ কোটি টাকা। এটি অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ খাতের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে।

গতকাল রোববার প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে মোট খেলাপি ঋণ (এনপিএল), বকেয়া পুনঃতফসিলকৃত ঋণ ও বকেয়া পুনর্গঠিত খেলাপি ঋণের হিসাব কষে অর্থের এই পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে।

২০২২ শেষে মোট অনাদায়ী ঋণ ছিল ১৪ লাখ ৭৭ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে মোট ঋণের চার ভাগের এক ভাগই ঝুঁকিপূর্ণ।

২০২২ সাল শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা, বকেয়া পুনঃতফসিল করা ঋণ ২ লাখ ১২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা ও বকেয়া খেলাপি ঋণ ৪৪ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আহসান এইচ মনসুর দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের এই পরিমাণ চলতি অর্থবছরের বাজেটের প্রায় অর্ধেক। ব্যাংকিং খাত যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তা এই চিত্র দেখে বোঝা যায়।’

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের শর্ত হিসেবে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের হিসাব দিতে হচ্ছে।

এক সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতি জুনে বার্ষিক আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ প্রকাশ করত। আইএমএফ শর্ত দিয়েছে যে তা আবার শুরু করা উচিত।

গত জানুয়ারিতে আইএমএফ স্টাফ রিপোর্টে বলা হয়েছিল—কোভিড-১৯ আর্থিক সহায়তা নীতিমালার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২২ সালের ডিসেম্বরে। যেহেতু এই নীতিগুলো শিথিল করায় ব্যাংকিং ব্যবস্থার লোকসান ধীরে ধীরে উঠে আসতে পারে, তাই সম্পদের শ্রেণিবিন্যাস, বিশেষ করে পুনর্গঠিত ঋণের বর্তমান ব্যালেন্স শিটের ঝুঁকিগুলো সঠিকভাবে তুলে ধরা উচিত। ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ যথাযথভাবে প্রকাশ করা উচিত।

আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসারে, ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে খেলাপি ঋণের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ প্রকাশ করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতের সম্পদের গুণগতমানে সামান্য অবনতি হয়েছে। কেননা, খেলাপি ঋণের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে।

২০২২ সালের শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ মোট বকেয়া ঋণের ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ ছিল। এটি আগের বছর ছিল ৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ ভাঙাশিল্পে খেলাপি ঋণ ২২ দশমিক ৪৩ শতাংশ। অন্যসব খেলাপি ঋণের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ।

চামড়া ও চামড়াজাত শিল্পে খেলাপি ঋণ আছে ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ, বস্ত্রশিল্পে ১১ দশমিক ৫৪ শতাংশ ও তৈরি পোশাকশিল্পে ১১ দশমিক ১২ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নিয়মিত ও পুনঃতফসিলকৃত বা পুনর্গঠিত ঋণের যথাযথ পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা এবং খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের গতি ব্যাংকিংশিল্পের সম্পদের মান উন্নত করতে পারে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া এবং অন্যান্য ভূ-রাজনৈতিক ঘটনার কারণে ব্যবসায় ধীর গতির পাশাপাশি ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা কমে যেতে পারে। এটি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সম্পদের গুণমানকে নেতিবাচক করে দিতে পারে।

মহামারির সময় চালু করা ঋণ স্থগিতের সুবিধা বাতিল হওয়ায় ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে।

২০২২ সালে ৬৩ হাজার ৭২০ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়। এটি আগের বছর ছিল ২৬ হাজার ৮১০ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘করোনাপূর্ব পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করলে সেই বছরে পুনঃতফসিলের পরিমাণ খুব বেশি ছিল না।’

২০১৯ সালে পুনঃতফসিল করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৫২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা।

২০২২ সালের শেষে পুনঃতফসিল করা ঋণের ৮০ দশমিক ৮ শতাংশ অশ্রেণিবদ্ধ রয়ে গেছে।

বকেয়া পুনঃতফসিলকৃত ঋণের ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ ভাঙাশিল্প, ২৯ দশমিক ২ শতাংশ শিল্প খাত ও ২১ দশমিক ১ শতাংশ বস্ত্র ও তৈরি পোশাকশিল্পে রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুসারে, বেশিরভাগ খাতেই শ্রেণিকৃত বকেয়া পুনঃতফসিলকৃত ঋণের অনুপাতিক হার বেড়েছে।

জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ ভাঙা খাতের পর শিল্প, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র এবং রপ্তানি-ঋণ খাতে শ্রেণিকৃত বকেয়া পুনঃতফসিলকৃত ঋণের আনুপাতিক হার সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।

ব্যাংকের পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি ২ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা

আগস্ট ১৪, ২০২৩, বণিক বার্তা

খেলাপি ঋণ কম দেখাতে পুনঃতফসিলের নীতি উদার করে চলছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এখন চাইলে নিজেরাই যেকোনো ঋণ পুনঃতফসিল করতে পারছে। নীতি ছাড়ের এ সুযোগে ব্যাংকগুলোও ঋণ পুনঃতফসিলের রেকর্ড গড়েছে। শুধু ২০২২ সালেই ব্যাংকগুলোর পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৩ হাজার ৭২০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছর শেষে দেশের ব্যাংক খাতের পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ২ লাখ ১২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত মোট ঋণের ১৪ দশমিক ৪০ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে শিল্প খাতের। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২০ দশমিক ৫ শতাংশ ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের। পুনঃতফসিল করা ঋণের ৭১ শতাংশই করেছে দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলো। গ্রাহককে খেলাপি হওয়া থেকে বাঁচাতে ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, পুনঃতফসিল করা ঋণের ১৯ শতাংশ আবারো খেলাপির খাতায় উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২২’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ব্যাংক খাতের পুনঃতফসিলকৃত ঋণ স্থিতির ৩৬ শতাংশই বাড়ে কভিড-১৯ সৃষ্ট দুর্যোগের পর। ২০১৯ সাল শেষেও ব্যাংকগুলোর পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ২৪০ কোটি টাকা। ২০২২ সাল শেষে এ ধরনের ঋণের স্থিতি ২ লাখ ১২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকে। অর্থাৎ ২০২০ সাল-পরবর্তী সময়ে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি বাড়ে ৭৬ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা।

আগে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত এককালীন বা ডাউন পেমেন্ট জমা দিতে হতো। কিন্তু খেলাপিদের প্রতি নমনীয় হতে গিয়ে ২০১৯ সালে ডাউন পেমেন্টের হার ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। যদিও ব্যাংকের প্রভাবশালী বড় গ্রাহকরা কোনো ডাউন পেমেন্ট না দিয়েও খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গ্রাহকের অনুকূলে ঋণসীমা বাড়িয়ে দিয়েও ব্যাংকগুলো খেলাপি হওয়ার যোগ্য ঋণকে নিয়মিত দেখাচ্ছে।

অন্যদিকে ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষমতাও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের হাতে ছেড়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগে ব্যাংকগুলো নিজ পর্ষদে পুনঃতফসিলের প্রস্তাব পাস করে সেটি অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠাত। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যাচাই-বাছাইয়ের পর পুনঃতফসিলের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করত। কিন্তু গত বছরের জুলাইয়ে পুনঃতফসিলের ক্ষমতা ব্যাংকগুলোর হাতে ছেড়ে দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রজ্ঞাপনটি জারি হওয়ার পর ব্যাংকগুলো নিজেদের খেয়ালখুশিমতো ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ পায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ ‘উদারতাকেই’ খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলে উল্লম্ফনের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে চেয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণপ্রাপ্তির শর্তের মধ্যেও খেলাপি ঋণ কমানোর বিষয়টি রয়েছে। আবার ব্যাংকগুলোও নিজেদের স্বার্থে খেলাপি ঋণ কমানোর চেষ্টা করেছে। সব পক্ষের চাওয়া এক হয়ে যাওয়ায় খেলাপি ঋণ কিছুটা কমেছে। কিন্তু বিপরীতে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেছে।

পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেলাপি ঋণ লুকানোর চেষ্টা করছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আগে ঋণ পুনঃতফসিলের নীতিমালা অনেক কঠোর ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেস-টু-কেস পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত দিত। নির্দিষ্ট অংকের ডাউন পেমেন্ট পরিশোধ না করলে কোনো ঋণই পুনঃতফসিল হতো না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। প্রভাবশালী গ্রাহকরা এখন ডাউন পেমেন্ট না দিয়েও ঋণ পুনঃতফসিল করে নিচ্ছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজের ক্ষমতা ও দায়িত্ব ব্যাংকগুলোর হাতে দিয়ে দিয়েছে। এ কারণে ব্যাংক নিজের ইচ্ছামতো ঋণ পুনঃতফসিল করছে। এতে আপাতদৃষ্টিতে ব্যাংকের ঋণ পরিস্থিতি ভালো দেখালেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি হবে ভয়াবহ। বাছবিচার না করে পুনঃতফসিল করা ঋণ আদায় হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।’

পুনঃতফসিলকৃত ঋণকে ‘স্ট্রেসড’ বা ‘দুর্দশাগ্রস্ত’ হিসেবে দেখায় আইএমএফ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত বছরের ডিসেম্বরে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২০ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। একই সময়ে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতিও ছিল ২ লাখ ১২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকার বেশি। আবার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আদায় অযোগ্য হওয়ায় ব্যাংকগুলো ৬৫ হাজার ৩২১ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করেছে। সব মিলিয়ে দেশের ব্যাংক খাতের অন্তত এক-চতুর্থাংশ ঋণ এখন দুর্দশাগ্রস্ত।

২০১২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পুনঃতফসিলের পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরবর্তী সময়ে দুই দফায় প্রজ্ঞাপন জারি করে ওই নীতিমালার কিছু শর্ত শিথিল করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ নীতিমালার সুবিধা নিয়ে ২০১২ সালে ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করে ব্যাংকগুলো। এর পরের বছর থেকে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায় ব্যাংকগুলোর ঋণ পুনঃতফসিলের গতি। ২০১৩ সালেই ১৮ হাজার ২০ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ পান খেলাপি গ্রাহকরা। এরপর ২০১৪ সালে ১২ হাজার ৩৫০ কোটি ও ২০১৫ সালে ১৯ হাজার ১৪০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়। ২০১৬ সালে পুনঃতফসিল করা হয় ১৫ হাজার ৪২০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। এর পর থেকে ঋণ পুনঃতফসিলের পরিমাণ বাড়ছেই।

২০১৭ সালে দেশের ব্যাংকগুলোর পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৯ হাজার ১২০ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে পুনঃতফসিল করা হয় আরো ২৩ হাজার ২১০ কোটি টাকার ঋণ। আর ২০১৯ সালে পুনঃতফসিলের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। ডাউন পেমেন্ট মাত্র ২ শতাংশে নামিয়ে আনায় ওই বছর পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পরিমাণ ৫২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এরপর ২০২০ সালে কভিড-১৯ সৃষ্ট দুর্যোগে পুনঃতফসিলের হার কিছুটা কমে আসে। ওই বছর ব্যাংকের কোনো টাকা পরিশোধ না করেও গ্রাহকরা খেলাপি হওয়া থেকে নিষ্কৃতি পান। তার পরও ২০২০ সালে ব্যাংকগুলোর পুনঃতফসিলের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৯ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। ২০২১ সালে পুনঃতফসিল করা হয় ২৬ হাজার ৮১০ কোটি টাকার ঋণ। আর ২০২২ সালে সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ৬৩ হাজার ৭২০ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশের শিল্প উদ্যোক্তারা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ঋণ পুনঃতফসিল করেছেন। ২০২২ সাল শেষে পুনঃতফসিলকৃত ঋণ স্থিতির ৩১ দশমিক ৭ শতাংশই ছিল শিল্প খাতের। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্থানে ছিল বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাত। এ খাতের উদ্যোক্তারা ২০ দশমিক ৫ শতাংশ ঋণ পুনঃতফসিল করেছেন। এছাড়া পুনঃতফসিলকৃত ঋণের প্রায় ১০ শতাংশ ব্যবসায়িক, ৯ দশমিক ৫ শতাংশ চলতি মূলধন, ৬ দশমিক ২ শতাংশ নির্মাণ, ৫ শতাংশ আমদানির আর ৪ দশমিক ৪ শতাংশ কৃষি খাতের।

পুনঃতফসিলকৃত ঋণ আবারো খেলাপি হচ্ছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, ২০২২ সাল শেষে পুনঃতফসিলকৃত মোট ঋণ স্থিতির ১৯ দশমিক ২ শতাংশ আবারো খেলাপি হয়ে গেছে। এ ধরনের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪০ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। পুনঃতফসিলের পরও খেলাপি হওয়া ঋণের ৬১ শতাংশই বৃহৎ শিল্পের। এক্ষেত্রে সামনের সারিতে রয়েছে জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙা শিল্প, শিল্প খাত এবং তৈরি পোশাক খাত।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে শত শত শিক্ষার্থীকে মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়েছে: সিআইডি

১৩ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

১৬ বছরে ১০ বার মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়া। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে শত শত শিক্ষার্থীকে মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়েছে।

আজ রোববার ঢাকায় সিআইডির সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ আলী মিয়া এই তথ্য জানান।

মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সম্প্রতি সিআইডির হাতে গ্রেপ্তার ১২ ব্যক্তির বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ৩০ জুলাই থেকে ৯ আগস্ট রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে এই ১২ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—ময়েজ উদ্দিন আহমেদ, সোহেলী জামান, মো. আবু রায়হান, জেড এম সালেহীন ওরফে শোভন, মো. জোবাইদুর রহমান ওরফে জনি, জিলুর হাসান ওরফে রনি, ইমরুল কায়েস ওরফে হিমেল, জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া ওরফে মুক্তার, রওশন আলী ওরফে হিমু, আক্তারুজ্জামান তুষার, জহির উদ্দিন আহমেদ ওরফে বাপ্পী ও আব্দুল কুদ্দুস সরকার। সিআইডি বলছে, গ্রেপ্তার ১২ ব্যক্তির মধ্যে কয়েকজন চিকিৎসক আছেন।

সিআইডিপ্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়া বলেন, ২০২০ সালের প্রশ্নপত্র ফাঁস-সংক্রান্ত একটি মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে জসীম উদ্দীন ও মোহাম্মদ সালামকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের মূল হোতা ছিলেন জসীম। তাঁর খালাতো ভাই সালাম স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রেসের মেশিনম্যান। তাঁরা আদালতে ৬৪ ধারার জবানবন্দি দেন। তাঁদের জবানবন্দিতে সবশেষ গ্রেপ্তার ১২ জনের নাম আসে। তাঁরা পলাতক ছিলেন। অবশেষে তাঁদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলো।

সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদ আলী মিয়া বলেন, ২০০১ থেকে পরবর্তী ১৬ বছরে চক্রের সদস্যরা ১০ বার মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছেন বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। শিক্ষিত লোকজন এই চক্রে জড়িত। প্রশ্নপত্র ফাঁস করে তাঁরা বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে অনেক ব্যাংক চেক ও পরীক্ষার প্রবেশপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। চক্রের সদস্যদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বিশ্লেষণ করে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁরা মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে অপরাধ করেছেন কি না, তাও খতিয়ে দেখা হবে।

মশা মারতে আনা বিটিআই আমদানি নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠানের

১৫ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

মশার লার্ভা নিধনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আমদানি করা জৈব কীটনাশক বাসিলাস থুরিনজেনসিস ইসরায়েলেনসিস বা বিটিআই নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠেছে। আমদানিকারক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ওই কীটনাশক সিঙ্গাপুরের বেস্ট কেমিক্যাল লিমিটেডের প্রস্তুত করা বলে দাবি করলেও সেটা সত্য নয় বলে দাবি করছে কোম্পানিটি। এ নিয়ে সিঙ্গাপুরের ওই কোম্পানি নিজেদের ফেসবুক পেজে একটি সতর্কবার্তাও দিয়েছে।

সিঙ্গাপুরের স্থানীয় সময় গতকাল সোমবার সকাল সাতটার দিকে ওই বার্তা শেয়ার করা হয়। এ ঘটনা জানার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মার্শাল অ্যাগ্রোভেটকে বেস্ট কেমিক্যাল থেকে পণ্য কেনার প্রমাণ দিতে বলেছে উত্তর সিটি করপোরেশন।

সতর্কবার্তায় যা বলা হয়েছে

‘জালিয়াতির সতর্কবার্তা’ (স্ক্যাম অ্যালার্ট) শিরোনামে দেওয়া ওই বার্তায় লেখা হয়, ‘এটা আমাদের নজরে এসেছে যে বাংলাদেশের মার্শাল অ্যাগ্রোভেট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড পাঁচ টন বিটিআই লার্ভিসাইড পণ্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) সরবরাহ করেছিল। এতে তারা জালিয়াতির মাধ্যমে (ফ্রডলি) আমাদের কোম্পানির নাম (বেস্ট কেমিক্যাল) বিটিআইয়ের প্রস্তুতকারক হিসেবে ব্যবহার করেছে।’

খেলাপি ঋণের ৪০ শতাংশই বাণিজ্যিক ও পোশাক খাতে

১৮ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

সাম্প্রতিক সময়ে যেসব ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত অনিয়ম নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তার সবই ছিল ট্রেডিং বা বাণিজ্যিক ঋণ। এসব ঋণের বেশির ভাগই পণ্য আমদানির বিপরীতে দেওয়া হয়েছে। দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে বড় উদ্বেগ এখন বাণিজ্যিক ঋণে। ব্যাংকগুলো এককভাবে সবচেয়ে বেশি ঋণও দিয়েছে এই খাতে। মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ২৪ শতাংশই এই খাতের ঋণ।

বাণিজ্যিক ঋণের পরেই খেলাপির শীর্ষে আছে তৈরি পোশাক খাতের ঋণ। দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের প্রায় ৪০ শতাংশই এ দুই খাতের। অর্থাৎ দেশের খেলাপি ঋণের এক-তৃতীয়াংশই এ দুই খাতে পুঞ্জীভূত। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন, ২০২২ থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

ব্যাংকাররা বলছেন, বাণিজ্যিক ঋণের ক্ষেত্রে খুব বেশি নথিপত্র প্রয়োজন হয় না। কিছু ব্যাংক সহজেই এই ঋণ দিয়ে থাকে। এর আগে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের এই খাতের ঋণ দিয়ে অনেক ব্যাংক আটকা পড়েছিল। এরপর এখন আবারও কিছু ব্যাংক এই খাতের ঋণে ঝুঁকছে, যা পুরো ব্যাংক খাতে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

বাণিজ্যিক ঋণের মাধ্যমে অর্থ পাচারও সহজ। কারণ, পণ্যের পরিমাণ অনেক হওয়ায় তা সব সময় যাচাই করা হয় না। এ জন্য ব্যাংকগুলোর এসব ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভালোভাবে বাছবিচার করে দেওয়া উচিত।

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যিক ঋণে অনেক ব্যাংকের টাকা আটকে গেছে। বাণিজ্যিক ঋণের মাধ্যমে অর্থ পাচারও সহজ। কারণ, পণ্যের পরিমাণ অনেক হওয়ায় তা সব সময় যাচাই করা হয় না। এ জন্য ব্যাংকগুলোর এসব ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভালোভাবে বাছবিচার করে দেওয়া উচিত। ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায় একধরনের প্রতিযোগিতাও থাকে, যা ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে।

 সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আরও বলেন, অন্য ঋণের চেয়ে শিল্প খাতের ঋণ তুলনামূলক ভালো। এসব ঋণ নিয়ে কী হচ্ছে, তা দেখা যায়। ফলে তদারকি সহজ হয়।

আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সাল শেষে ব্যাংক খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪ লাখ ৭৭ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ঋণ গেছে ট্রেড ও কমার্স বা বাণিজ্যিক খাতে। এই খাতে ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ৮৮ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা, এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৮ হাজার ৯০২ কোটি টাকা বা ১০ শতাংশ। ২০২১ সালে এই খাতে ঋণ ছিল ২ লাখ ৫৫ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপির পরিমাণ ছিল ২৭ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা।

গত বছর শেষে দেশের খেলাপি ঋণের ২৪ শতাংশই ছিল বাণিজ্যিক ঋণ। আর ১৬ শতাংশ ছিল পোশাক খাতের।

ঋণের দিক থেকে দ্বিতীয় শীর্ষে রয়েছে বড় শিল্প খাত। এ খাতে ২০২২ সাল শেষে ঋণ ছিল ২ লাখ ৯ হাজার ১৫৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপির পরিমাণ ৯ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা বা ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এরপরই পোশাক খাতে ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৭০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। পোশাক খাতে ২০২২ সাল শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকায়।

নির্মাণ, পরিবহন ও যোগাযোগ এবং অন্য সেবা খাতে ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৬৮ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা বা ৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। টেক্সটাইল খাতে ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ২৭ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা, এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৪ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা। ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ আছে, এমন খাতগুলোর মধ্যে আরও আছে কৃষিভিত্তিক শিল্প। এসব খাতে ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ২ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ৯ হাজার ৪১ কোটি টাকা।

এদিকে খেলাপি ঋণের হারে শীর্ষে রয়েছে জাহাজভাঙা ও নির্মাণশিল্প। এই খাতে ২০২২ সাল শেষে ঋণ ছিল ২১ হাজার ২১৯ কোটি টাকা, এর মধ্যে খেলাপি ৪ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা বা ২২ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এরপরই খাতভিত্তিক খেলাপি ঋণের হারে শীর্ষে টেক্সটাইল ও পোশাক খাত।

গত বছর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ২০ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩১ হাজার ৬২০ কোটি টাকা, যা ব্যাংকিং খাতের মোট বিতরণ করা ঋণের ৮ দশমিক ৮০ শতাংশ।

এর বাইরে পুনঃ তফসিল করা ঋণের স্থিতি গত বছর শেষে ২ লাখ ১২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। পাশাপাশি অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৬৫ হাজার ৩২১ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৯ হাজার ৭২১ কোটি টাকায়।

ফলে ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিএআর) অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সর্বনিম্নে রয়েছে। ২০২২ সালে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ছিল ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। তবে ওই সময়ে পাকিস্তানের ব্যাংকগুলোর এই অনুপাত ছিল ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ, ভারতের ১৬ শতাংশ ও শ্রীলঙ্কার ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ।

যেসব ঋণ কখনো নেওয়াই হয়নি, গ্রামবাসীদের তা পরিশোধ করতে বলছে ব্যাংক

১৮ আগস্ট ২০২৩, দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড অনলাইন বাংলা

২০২১ সালের ১৯ জুন মারা যান সালেহা বেগম। এর দুই বছর পর জনতা ব্যাংকের স্থানীয় শাখা থেকে গত ১০ আগস্ট দুটি পৃথক নোটিশ পান তার স্বামী ফয়েজ উল্লাহ। দুটি নোটিশেই তাকে দেড় লাখ টাকা করে ঋণ পরিশোধ করতে বলা হয়।

সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের মান্ডারিতলা গ্রামের অধিবাসী ফয়েজ উল্লাহ, এর কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। কারণ, কোনো ঋণ নেওয়া তো দূরের কথা– তিনি বা তার স্ত্রী কখনো ঋণের জন্য আবেদনও করেননি।

নোটিশ পাওয়ার পরই তড়িঘড়ি করে জনতা ব্যাংকের বাড়বকুণ্ড শাখায় ছোটেন ফয়েজ। সেখানকার কর্মকর্তারা তাকে জানান, ২০২১ সালে সালেহা ৪ লাখ ২০ হাজার টাকার তিনটি ঋণ নেন, যার সবগুলোই খেলাপি রয়েছে।

এরমধ্যে দুটি ঋণ ছিল কৃষি ও গবাদিপশু পালনের জন্য, আর তৃতীয় ঋণটি ছিল করোনার প্রণোদনা প্যাকেজ সংক্রান্ত।

ফয়েজ জানতে পারেন, তার স্ত্রীর নামে দুটি ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে, যেখানে ২০২২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লেনদেন নথিভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, ঋণগ্রহীতার মৃত্যুর ১৫ মাস পরেও হয়েছে লেনদেন। এসব হিসাবে ঋণের কিস্তি হিসেবে টাকা জমাও দেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকের নথি অনুসারে, তার স্ত্রী যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছিলেন, সেই একই পরিমাণ ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং একই প্যাকেজের তিনটি ঋণ খেলাপি করেছেন পেশায় কৃষক ফয়েজ উল্লাহ নিজেও। 

এ ঘটনা শুধু ফয়েজের বেলাতেই ঘটেনি।

একই গ্রামের আরো অন্তত ৩৩ ব্যক্তি খেলাপি ঋণ পরিশোধের দাবি সংক্রান্ত একই রকম নোটিশ পেয়েছেন। এদের সকলেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী – কৃষক, দিনমজুর বা তাদের গৃহিণী – যারা কোনোদিন ব্যাংক ঋণের আবেদনই করেননি।

এসব ঘটনার একটি একক যোগসূত্র আছে– ঋণের নথিপত্রে, ফয়েজসহ সকলের ঋণের গ্যারান্টর বা জামিনদার হিসেবে আহমেদুর রহমান নামের এক গ্রামবাসীর উল্লেখ আছে। 

নোটিশ পাওয়া ১৪ জন গ্রামবাসী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সাথে আলাপকালে জানান, করোনাকালীন ১,০০০ টাকা সহায়তা পেতে তাদের ব্যাংকে নিয়ে যান আহমেদুর রহমান। এই টাকা পেতে তাদের ব্যাংক হিসাব খুলতে হয়।

ফয়েজ অবশ্য জানান, আহমেদুর তাকে এবং তার স্ত্রীকে একটি ঋণের জামিনদার হতে অনুরোধ করেন। পরে এই দম্পতি কিছু কাগজে সই-ও করেছিলেন।

ইমাম হোসেন ও নাসরিন আখতার নামের আরেক দম্পতি আবিস্কার করেন, তাদের নামে এ ধরনের ছয়টি ঋণ নেওয়া হয়েছে। এমনকী ঋণের কিস্তি হিসেবে ব্যাংক হিসাবে অর্থ জমাও করা হয়েছে, যদিও এসম্পর্কে কিছুই জানতেন না তারা।

ইমাম টিবিএসকে বলেন, ‘করোনাকালীন ১,০০০ টাকা অনুদান পাইয়ে দিতে আহমেদুর আমাদের ব্যাংকে নিয়ে যান। এরপর তিনি ও ব্যাংকের কর্মকর্তারা আমাদের বলেন, সহায়তা পেতে হলে একাউন্ট খুলতে হবে।’

৩৫ বছর বয়সী দিনমজুর করিম উদ্দিন জানান, নোটিশ পাওয়ার পর তিনি হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। তার স্ত্রী ও মায়ের নামে অবশ্য মাত্র একটি করে ঋণ নেওয়া হয়েছে। সেটুকুই যা বাঁচোয়া। 

নথি অনুসারে, ২০২১ সালের জুন মাসে করিম উদ্দিন ও তার মায়ের জন্য ঋণ মঞ্জুর করে ব্যাংক। এর একমাস পর তার স্ত্রীর নামেও ঋণ মঞ্জুর করা হয়।

করিম বলেন, ‘সহায়তা পেতে কেন ব্যাংক হিসাব খুলতে হবে- একথা জিজ্ঞেস করলে ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেছিলেন, স্বচ্ছতার জন্যেই এটা করতে হবে।’

আরেক নোটিশপ্রাপ্ত রেহানা বেগম জানান, ‘কর্মকর্তারা বলেন, সরকার আমাদের ব্যাংক হিসাবে ১,০০০ টাকা জমা দেবে, এজন্য ব্লাঙ্ক চেকেও সই নেওয়া হয়। এখন আমরা আইনি ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার ভয়ে দিন কাটাচ্ছি।’

মাণ্ডারিতলার গ্রামবাসীদের কাছে পাঠানো নোটিশগুলো অনুসারে, সবকয়টি ঋণ ২০২১ সালের মার্চ থেকে নভেম্বরের মধ্যে ছাড় করা হয়েছে।

ব্রাঞ্চ ম্যানেজার মিটন ঘোষ স্বাক্ষরিত নোটিশগুলোয় সতর্ক করে বলা হয়, ঋণগ্রহীতারা ১৫ দিনের মধ্যে সুদসহ সম্পূর্ণ ঋণের অংক পরিশোধে ব্যর্থ হলে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নোটিশের বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যাংকের কর্মকর্তারা ঋণগ্রহীতাদের সাথে একাধিকবার সরাসরি দেখা করেছেন ও ফোনে কথা বলেছেন, কিন্তু তারপরও তারা ঋণ পরিশোধ করেননি। তাই ‘আগামী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে পরিশোধ করা না হলে, গ্রহীতার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এসবের মূলে যিনি

করোনা মহামারির সময় অনেক গ্রামবাসী তাদের চাকরি বা আয়ের উৎস হারান। এসময় তাদের করোনাকালীন সরকারি অনুদান পেতে সহায়তা করার উছিলায় ব্যাংকে নিয়ে যান আহমেদুর রহমান। 

একই গ্রামের বাসিন্দা আহমেদুরের বাড়বকুণ্ড বাজারে একটি দোকান আছে। তার মাধ্যমেই ব্যাংক কর্মকর্তারা এসব ব্যক্তির সাথে পরিচিত হন বলে উল্লেখ করেন মিটন ঘোষ।

ওই সময়ে ব্যাংকের ম্যানেজার ছিলেন ইমতিয়াজুল আলম, বর্তমানে তিনি ব্যাংকের লালদীঘি শাখায় কর্মরত আছে। ইমতিয়াজুল এবং সিনিয়র অফিসার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ এসব ঋণ প্রদানে ভূমিকা রেখেছিলেন বলে জানান মিটন ঘোষ।

মঙ্গলবার ইমতিয়াজুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঋণ জারি ও ছাড়ের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা আহমেদুর রহমানের থেকে কোনো সুবিধা নেইনি। তিনি তার আত্মীয়স্বজনকে ব্যাংকে পাঠাতেন। তার কথার ভিত্তিতে, আমরা সেসব ব্যক্তির নামে ঋণ দেই। এখন আমরা বুঝতে পারছি, তিনি সরকারি অনুদান পাইয়ে দেওয়ার নাম করে এসব মানুষের সাথে প্রতারণা করেছেন।’

ঋণ ছাড়ের ক্ষেত্রে বিধিমালা ভঙ্গ করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে ইমতিয়াজুল আলম স্বীকার করেন যে, ‘প্রক্রিয়ায় কিছু ঘাটতি ছিল’।

তিনি আরো বলেন, ‘এসব ঋণের সুদ ৪ শতাংশ হওয়ায়, রহমান হয়তো লাভবান হয়েছে। ব্যাংকে তার ভালো অংকের এফডিআর থাকায় আমারা তাকে বিশ্বাস করেছিলাম। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, বৃহস্পতিবারেই সকল খেলাপি ঋণ পরিশোধ করে দেবেন।’

কিন্তু, বৃহস্পতিবার মিটন ঘোষ জানান, কোণো ঋণই এখনো পরিশোধ করা হয়নি।

সিনিয়র অফিসার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, এসব ঋণের জামিনদার আহমেদুর রহমান, সেই সবকিছু জানে।

এদিকে নোটিশ পাওয়ার পর থেকেই ঋণের বিষয়ে জানতে আহমেদুরের বাড়িতে ভিড় করছেন গ্রামের মানুষজন। কিন্তু, তিনি কোনো দায়িত্ব নিতে নারাজ। বরং, সব দোষ দিচ্ছেন ব্যাংককে।

‘আমি ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে কোনো টাকা নেইনি। তারা আমার গ্রামের বাসিন্দা ছিল বলে, আমি জামিনদার হিসেবে ব্যাংকের অনুরোধে কাগজপত্রে সই করেছিলাম। এজন্য ব্যাংক দায়ী। গ্রামবাসীরা ঋণ নিয়ে কিস্তি পরিশোধ করেনি। এখন তারা মিথ্যা বলছে,’ রহমান বলেন।

রহমানের কাছ থেকে কোনো প্রতিকার না পেয়ে গ্রামবাসী বিষয়টি মিমাংসা করার উদ্দেশ্যে পুলিশ ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের কাছে যান।

টিবিএস-এর সঙ্গে আলাপকালে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জালাল উল্লাহ বলেন, ‘কৃষকদের কাছ থেকে কিছু অভিযোগ পাওয়ার পর আমি ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন তারা কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ দিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যাংক কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি।’

‘শুধু ব্যাংক কর্মকর্তারা জানেন কীভাবে ঋণ দেওয়া হয়েছে। মাঝেমধ্যে ব্যাংক আমাদের কাছে এসে তাদের গ্রাহকদের ঠিকানা যাচাই করে দেখে যে তারা আমাদের এলাকায় থাকেন কি-না।’

ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাদাকাতুল্লাহ মিয়াজাই মনে করেন, ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আহমেদুর রহমানের যোগসাজশ রয়েছে। ‘আমার এলাকায় আমরা এমন অন্তত ৫০টি অভিযোগ পেয়েছি,’ তিনি বলেন।

পুলিশ আরও জানিয়েছে, এ শাখার অধীনে ৫০–৫৫ জন এমন সন্দেহজনক ঋণের শিকার হয়েছেন।

সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তোফায়েল আহমেদ টিবিএসকে বলেন, ‘আমরা বেশ কিছু অভিযোগ পেয়ে তদন্ত শুরু করেছি। তারা সবাই বলেছেন, তারা ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ নেননি। আমাদের প্রাথমিক তদন্তে আমরা তাদের দাবির সত্যতাও পেয়েছি।’

এখন যা বলছে ব্যাংক

জনতা ব্যাংকের বাড়বকুণ্ড শাখার ব্যবস্থাপক মিটন ঘোষ টিবিএসকে বলেন, ‘আমাদের কাছে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের সুপারিশসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র রয়েছে। আর ঋণগ্রহীতারা নিজেরাই তাদের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলেছেন।’

তিনি বলেন, ব্যাংকের নিয়মিত গ্রাহক আহমেদুর রহমান ব্যাংকটির সঙ্গে বেশ কয়েকজন ঋণগ্রহীতার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।

তিনি আরও বলেন, ‘ঋণ নেওয়ার পর ঋণগ্রহীতারা হয়তো আহমেদুর রহমানের সঙ্গে ওই টাকা বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু, এখন তাদের নোটিশ দেওয়ার পর তারা ব্যাংককে দায়ী করছেন।’

‘ঋণ বিতরণের সময় আমি দায়িত্বে ছিলাম না। যদিও সমস্ত নথিপত্র ঠিকঠাকই রয়েছে, তবে ঋণ পর্যবেক্ষণে কিছু ত্রুটি থাকতে পারে,’ তিনি বলেন।

ডিমের বাজার থেকে প্রতিদিন ৮-১২ কোটি টাকা বাড়তি মুনাফা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে: ভোক্তা অধিদপ্তর

১৪ আগস্ট ২০২৩, দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড অনলাইন বাংলা

দেশে দৈনিক চার কোটি ডিমের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে প্রতি ডিম ২-৩ টাকা বেশি দামে বিক্রি করে প্রতিদিন ৮ থেকে ১২ কোটি টাকা বাড়তি মুনাফা করা হয়েছে—যা খামারি, পাইকারি ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সবার পকেটে ঢুকেছে বলে জানিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (ডিএনসিআরপি)।

সোমবার ডিমের উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে ভোক্তা অধিদপ্তরের সভাকক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা তুলে ধরেন ডিএনসিআরপির মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান।

এমএলএম এমটিএফই বন্ধ, বাংলাদেশ থেকে চলে গেলো কয়েক হাজার কোটি টাকা

১৯ আগস্ট ২০২৩, বাংলা ট্রিবিউন

আবারও এমএলএম কোম্পানির প্রতারণায় জড়িয়ে সর্বস্বান্ত হলো দেশের লক্ষাধিক যুবক। হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেছে অবৈধ অনলাইন গ্যাম্বলিং ক্রিপ্টো ট্রেডিং করা এমএলএম কোম্পানি এমটিএফই।

ধারণা করা হচ্ছে, এই কোম্পানির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ক্রিপ্টো কারেন্সির মাধ্যমে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকাপাচার হয়েছে। একইসঙ্গে রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার স্বপ্নে বিদেশি একটা অ্যাপের ফাঁদে অনলাইনে বিনিয়োগ করে সর্বস্বান্ত হয়েছেন হাজারও মানুষ।

দুবাইভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি মাল্টিলেভেল মার্কেটিং বা এমএলএম পঞ্জি মডেলে ব্যবসা করতো। ভারত ও বাংলাদেশ থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিনিয়োগকারী ছিল। তবে অধিকাংশই বাংলাদেশি বিনিয়োগকারী বলে অভিমত সাইবার বিশ্লেষকদের।

দেশজুড়ে জাল বিছালেও প্রশাসন ছিল নিশ্চুপ

২১ আগস্ট ২৩, সমকাল

মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ; সংক্ষেপে এমটিএফই। দেশজুড়ে বহুধাপ বিপণন (এমএলএম) কারবারের ডিজিটাল জাল বিছিয়ে তুলে নিয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। বিদেশি ভুঁইফোঁড় এই অনলাইন প্রতিষ্ঠানের চাতুরীর ফাঁদে পড়ে বরিশাল, ময়মনসিংহ, খুলনা, কুষ্টিয়া, উত্তরাঞ্চলসহ অনেক এলাকার লাখ লাখ মানুষ এখন ফতুর। দেশে অবৈধ ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে অনলাইনের সব কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে অ্যাপসভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি। কেউ কেউ বলছেন, হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে যে পরিমাণ অর্থ গায়েব করেছে, এর চেয়ে ১০ গুণ টাকা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লুট করেছে এমটিএফই।

২০২১ সালের পর থেকে এমটিএফই বাংলাদেশে ভার্চুয়ালি কার্যক্রম চালালেও তা কেন প্রশাসনের নজরে এলো না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দেশের আনাচে-কানাচে সভা-সেমিনার করে কোম্পানিতে যুক্ত হলে কেমন সুবিধা মিলবে– এর জাদুকরি বয়ানও দেওয়া হয়েছিল। এসব সেমিনারে উপস্থিত থাকতেন এমটিএফইর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে বিনিয়োগ করে কীভাবে ‘শিকড় থেকে শিখরে’ ওঠা যায়, সেই গল্প শোনাতেন তারা। নিয়ম না থাকলেও প্রলুব্ধ করতে দেশের বিভিন্ন জেলায় তিনশর বেশি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগ দেওয়া হয়। অনেকে আবার ফেসবুকসহ অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এমটিএফইর সভা-সেমিনারের ছবি প্রকাশ করে অন্যদের আকৃষ্ট করতেন। ৭ আগস্ট প্রথমে কারিগরি ত্রুটির কথা বলে গ্রাহকদের টাকা উত্তোলন সেবা বন্ধ করে প্রতিষ্ঠানটি। হাজার হাজার কোটি টাকা মেরে গত বৃহস্পতিবার অনলাইন থেকে একেবারেই হাওয়া হয়ে যায় এমটিএফই।

২২ হাজারের চাকরি পেতে ২২ লাখ

২০ আগস্ট, ২০২৩, দেশ রুপান্তর

প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরি ‘সোনার হরিণ’। বিসিএসে, কিছু ব্যতিক্রম বাদে, একজন প্রার্থীকে প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরি পেতে সর্বোচ্চ মেধার স্বাক্ষর রাখতে হয়। প্রার্থীরা একমনে চার-পাঁচ বছর অনুশীলন করেন। তাও লাখ লাখ প্রার্থীর মধ্যে চাকরি হয় অল্পজনেরই। প্রথম শ্রেণির নন-ক্যাডার চাকরির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা।

পুরোপুরি ভিন্ন পরিস্থিতি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সেকশন অফিসারসহ নানা পদে। এগুলো প্রথম শ্রেণির চাকরি। মেধা বা যোগ্যতা নয়, টাকা আর তদবির থাকলে সেখানে চাকরি হয়। সম্প্রতি বেশ কিছু নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগে লেনদেন হয়েছে বলে ইউজিসি সূত্র জানিয়েছে।

প্রত্যেক জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় করার নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয় মানেই শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী শুরুতেই কয়েকশ চাকরি। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে তেমন মন না থাকলেও নিয়োগের মহোৎসব চলছে। শিক্ষক নিয়োগে লেনদেন কম হলেও তদবির চলে, তবে মেধাবীরাও নিয়োগ পান। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ পুরোটাই তদবিরে আর লেনদেনের মাধ্যমে হয়। আত্মীয়করণও আছে। লিখিত পরীক্ষা লোকদেখানো। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিতে ঘুষের রেট অনেকটাই নির্ধারিত। সবখানে প্রায় এক রেট। যত টাকা স্কেলের চাকরি প্রায় তত লাখ টাকা ঘুষ। সবচেয়ে লোভনীয় সেকশন অফিসার পদ। এ পদে বেতন স্কেল ২২ হাজার টাকা, আর ঘুষের রেট ২২ লাখ টাকা। ২০ লাখেও কখনো হয়। দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে ১২ থেকে ১৫ লাখ, তৃতীয় শ্রেণির চাকরিতে ৮ থেকে ১০ লাখ এবং চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে ঘুষের রেট ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা।

‘বিশেষ বিবেচনায়’ বেক্সিমকোকে ২২ হাজার কোটি টাকা ঋণ

২২ আগস্ট ২০২৩, প্রতিদিনের বাংলাদেশ

নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বিশাল অঙ্কের ঋণ দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন শাখার এক প্রতিবেদনে সম্প্রতি জনতা ব্যাংক থেকে দেশের অন্যতম বৃহৎ একটি শিল্প গ্রুপকে ২১ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকার এই ঋণ দেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করে বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার এই ঋণ দিয়েছে জনতা ব্যাংক। হিসাব অনুযায়ী, এর মাধ্যমে তারা কেবল একটি গ্রুপকেই ব্যাংকের মূলধনের ৯৪৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ ঋণ সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু কোনো একক গ্রাহককে মূলধনের ২৫ শতাংশের (ফান্ডেড ও ননফান্ডেড) বেশি ঋণ দেওয়ার নিয়ম নেই। একাধিকবার গ্রুপের সার্বিক তথ্য চেয়ে চিঠি দিলেও তা পরিপালন করেনি জনতা ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে গ্রুপের মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য দেয় ব্যাংকটি। এরপর নতুন করে আরও ৪৭৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকার ঋণের আবেদন করেছে বেক্সিমকো। এর সূত্র ধরে বিষয়টি আলোচনায় চলে আসে। কেননা এত বড় সিদ্ধান্ত ব্যাংকের পক্ষে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি চেয়ে আবেদন করে জনতা ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ জুলাই জনতা ব্যাংকের ৭৭৮তম পর্ষদ সভায় বেক্সিমকো গ্রুপের ২৬টি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ বিবেচনায় এই সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু কোনো গ্রাহককে বিশেষভাবে একক গ্রাহক ঋণসীমা এবং ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা দেওয়ার আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতির বিধান রয়েছে। প্রচলিত নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলেও জনতা ব্যাংককে এই ঋণের বিষয়ে অনুমতি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

পরিদর্শন শাখার প্রতিবেদনে এ বিষয়ে দেশের রপ্তানি খাতে বেক্সিমকো গ্রুপের অবদানের কথা উল্লেখ করে বলা হয়- ‘বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময়েও উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের রপ্তানির ধারা অব্যাহত রাখার মাধ্যমে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট নিরসনে অবদান রাখছে। এ ছাড়া এই সকল প্রতিষ্ঠানসমূহে দেশের প্রায় ৬০ হাজার শ্রমিক কর্মরত রয়েছে। এই সার্বিক বিবেচনায় ব্যাংকের আবেদনের প্রেক্ষিতে উল্লিখিত গ্রাহকদের হিসাবে রপ্তানি ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য জনতা ব্যাংক লিমিটেড ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে স্বাক্ষরিত এমওইউতে (সমঝোতা স্মারক) একক গ্রাহক ঋণসীমা সংক্রান্ত উপধারা ৪(১) ও (২) থেকে অব্যাহতি প্রদানের ক্ষেত্রে অনাপত্তি প্রদান করা সমীচীন হবে মর্মে প্রতীয়মান হয়।’

বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতফসিল ও একক গ্রাহক ঋণসীমা অতিক্রমের দায় থেকে জনতা ব্যাংককে মুক্তি দিলেও দুটি শর্ত জুড়ে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ১. ব্যাংকে গ্রাহকের মোট ঋণের পরিমাণ আর বাড়ানো যাবে না। ২. ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে গ্রাহকের ঋণসুবিধা ২৫ শতাংশ সীমার মধ্যে নামিয়ে আনতে হবে।

এর আগে গত ১৮ জুলাই ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের ৭৭৬তম সভায় বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো লিমিটেডের অনুকূলে ১২০ দশমিক ৪৮ কোটি টাকার ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ও ১২৪ দশমিক ৬৪ কোটি টাকার রপ্তানি বিল ও সার্টিফিকেট ক্রয় বাবদ সাময়িক আগাম, ক্রিসেন্ট ফ্যাশনস অ্যান্ড ডিজাইনের অনুকূলে (প্রায়) ৪০ দশমিক ৩৯ কোটি টাকার ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ও ১২ দশমিক ৯২ কোটি টাকার প্যাকিং ক্রেডিট সুবিধা, ইন্টারন্যাশনাল নিটওয়্যার অ্যান্ড অ্যাপারেলসের অনুকূলে (প্রায়) ৪৮ দশমিক ৬৫ কোটি টাকার ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ও ১১ দশমিক ১২ কোটি টাকার প্যাকিং ক্রেডিট সুবিধা, নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজের অনুকূলে (প্রায়) ৪৮ দশমিক ২৬ কোটি টাকার ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ও ১১ দশমিক ৯২ কোটি টাকার প্যাকিং ক্রেডিট সুবিধা এবং শাইনপুকুর গার্মেন্টসের অনুকূলে (প্রায়) ৪৯ কোটি টাকার ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ও ১১ দশমিক ৯৮ কোটি টাকার প্যাকিং ক্রেডিট সুবিধাসহ সর্বমোট ৪৭৯ দশমিক ৩৬ কোটি টাকার ঋণসুবিধা অনুমোদন করা হয়। এর মধ্যে ৩০৬ দশমিক ৭৮ কোটি টাকা ননফান্ডেড ও ১৭২ দশমিক ৫ কোটি টাকা ফান্ডেড ঋণ।

সেই অনুমোদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২৩ জুলাই ব্যাংকের গ্রাহকদের অনুকূলে একক গ্রাহক ঋণসীমা অতিক্রম করায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি চাওয়া হয়।

এ বিষয়ে জনতা ব্যাংকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বলছে, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংকের সাথে ব্যাংকসমূহের সার্বিক আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও আর্থিক পরিস্থিতির উন্নয়নের লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়ে থাকে। সমঝোতা স্মারকের নানা শর্ত ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে ব্যাংকের জন্য, যা সকল গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ব্যাংকসমূহের সাথে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের কোনো শর্ত কোনো সুনির্দিষ্ট গ্রাহকের জন্য নির্ধারণ বা আরোপ করা হয় না বিধায় আলোচ্য গ্রাহক প্রতিষ্ঠানসমূহের জন্য চুক্তির শর্ত পরিপালন হতে অব্যাহতি প্রদানের বিষয়টি যুক্তিসঙ্গত নয়।’

জনতা ব্যাংকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট সভাসমূহের বোর্ড মেমো পর্যালোচনায় দেখা যায় ৩০ জুন ২০২৩ তারিখ ভিত্তিতে জনতা ব্যাংকে বেক্সিমকো লিমিটেড ও এর অন্য ২৯টি প্রতিষ্ঠানের ফান্ডেড দায় রয়েছে ২১ হাজার ৬১২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা, যা ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ২ হাজার ৩১৪ কোটি টাকার ৯৩৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এ ছাড়া ফান্ডেড ও ননফান্ডেড মিলিয়ে মোট দায় ২১ হাজার ৯৭৮ কোটি ৩ লাখ (ননফান্ডেড ঋণের ৫০ শতাংশ নিয়ে মোট ঋণ হিসাবায়ন করা হয়েছে) কোটি টাকা। যা ব্যাংকের মূলধনের ৯৪৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

এই মুহূর্তে বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে নতুন করে ৪৭৯ দশমিক ৩৬ কোটি টাকা অনুমোদন করা হলে ব্যাংকে বেক্সিমকো লিমিটেড ও এর অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ফান্ডেড দায় দাঁড়াবে ২১ হাজার ৭৮৫ কোটি ১২ লাখ টাকা। যা ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের ৯৪১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এবং ফান্ডেড ও ননফান্ডেড মিলিয়ে মোট দায় দাঁড়াবে ২২ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। যা ব্যাংক মূলধনের ৯৬৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

ইতঃপূর্বে এ বিভাগ থেকে জনতা ব্যাংকের লোকাল অফিস, ঢাকা শাখার গ্রাহক বেক্সিমকো লি., বেক্সিমকো ফার্মা লি. ও ইন্টারন্যাশনাল নিটওয়্যার অ্যান্ড অ্যাপারেলস লি. ও ইন্টারন্যাশনাল নিটওয়্যার অ্যান্ড অ্যাপারেলস লিঃ ইউনিট-২-এর ঋণ সুবিধার ক্ষেত্রে একক গ্রাহক ঋণসীমা অতিক্রমণে অনাপত্তি দেওয়া হয়েছে। ওই গ্রাহকদের মধ্যে বেক্সিমকো লি. ও বেক্সিমকো ফার্মা লি. পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি বিধায় তাদের সঙ্গে গ্রুপের অন্য কোনো সহযোগী প্রতিষ্ঠানের দায় যুক্ত হবে না। তবে ইতঃপূর্বে ইন্টারন্যাশনাল নিটওয়্যার অ্যান্ড অ্যাপারেলস লি. ও ইন্টারন্যাশনাল নিটওয়্যার অ্যান্ড অ্যাপারেলস লি. ইউনিট-২-এর ঋণসুবিধা একক গ্রাহক ঋণসীমা অতিক্রম করায় এ বিভাগের কাছ থেকে অনাপত্তির জন্য আবেদন করার সময় জনতা ব্যাংক থেকে বেক্সিমকো ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের দায়-দেনার পরিপূর্ণ হিসাব পাঠানো হয়নি। তখন কেবল ইন্টারন্যাশনাল নিটওয়্যার অ্যান্ড অ্যাপারেলস লি. ও ইন্টারন্যাশনাল নিটওয়্যার অ্যান্ড অ্যাপারেলস লি. ইউনিট-২Ñ এই দুটি প্রতিষ্ঠানের দায়-দেনার হিসাব পাঠানো হয়। বর্তমানে গ্রুপের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের দায়-দেনার হিসাব পাঠানোর পর দেখা যায় ব্যাংকে বেক্সিমকো লি. ও এর অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ফান্ডেড দায় রয়েছে ২১ হাজার ৬১২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা এবং মোট দায় ২১ হাজার ৯৭৮ কোটি ৩ লাখ টাকা।

বর্তমানে জনতা ব্যাংকের লোকাল অফিসে ক্রিসেন্ট ফ্যাশনস অ্যান্ড ডিজাইন লি.-এর ফান্ডেড দায়ের পরিমাণ ১ হাজার ২৯৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা, যা ব্যাংকের মোট মূলধনের ৫৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ। ইন্টারন্যাশনাল নিটওয়্যার অ্যান্ড অ্যাপারেলস লি. ও ইন্টারন্যাশনাল নিটওয়্যার অ্যান্ড অ্যাপারেলস লি. ইউনিট-২-এর ফান্ডেড দায়ের পরিমাণ ১ হাজার ৬৬৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, যা ব্যাংক মূলধনের ৭২ দশমিক ০৫ শতাংশ। এ ছাড়া নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ লি.-এর ফান্ডেড দায়ের পরিমাণ ৭৮৮ দশমিক ২২ কোটি টাকা, যা ব্যাংক মূলধনের ৩৪ দশমিক ০৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন বিবেচনা করার কারণে ব্যাংকের সেই মূলধন কমে যাওয়ায় গ্রাহকদের ঋণগুলো ‘অসঙ্গতিপূর্ণ বা নন কনফার্মিয়’ হয়ে পড়েছে। কোনো গ্রাহকের ঋণ অসঙ্গতিপূর্ণ হলে তাকে নতুন ঋণ দেওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে সব গ্রাহককে নতুন ঋণ দেওয়ায় ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটেছে।

এস আলম ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অনুসন্ধান-সম্পর্কিত বিষয়ে স্থিতাবস্থা

২৩ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

অনুমতি ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগ বা অর্থ স্থানান্তর নিয়ে এস আলম গ্রুপের মালিক মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম) ও তাঁর স্ত্রী ফারজানা পারভীনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অনুসন্ধান–সম্পর্কিত বিষয়বস্তুর ওপর সব পক্ষকে আগামী ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে আদেশ দেওয়া হয়েছে।

হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে এস আলম দম্পতির করা আবেদনের (লিভ টু আপিল) শুনানি নিয়ে আজ বুধবার আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম এ আদেশ দেন।

আদালত বলেছেন, সব পক্ষকে বিষয়বস্তু নিয়ে আগামী ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে বলা হলো। ৮ জানুয়ারি আপিল বিভাগে শুনানির জন্য নির্ধারণ করা হলো। সেদিন কার্যতালিকার ১০ নম্বর ক্রমিকের পরে বিষয়টি থাকবে।

এর আগে ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারে ‘এস আলম’স আলাদিন’স ল্যাম্প’ (এস আলমের আলাদিনের চেরাগ) শিরোনামে ৪ আগস্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি নজরে আনার পর শুনানি নিয়ে ৬ আগস্ট হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত রুলসহ আদেশ দেন।

অনুমতি ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগ বা অর্থ স্থানান্তর নিয়ে এস আলম গ্রুপের মালিক মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তাঁর স্ত্রী ফারজানা পারভীনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অনুসন্ধান করে দুই মাসের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডির) প্রতি এ নির্দেশ দেওয়া হয়।

হাইকোর্টের এই আদেশের বিরুদ্ধে এস আলম ও তাঁর স্ত্রী ২১ আগস্ট আপিল বিভাগে আবেদন করেন, যার ওপর আজ চেম্বার আদালতে শুনানির জন্য ওঠে।

আদালতে আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আজমালুল হোসেন কেসি, আহসানুল করিম ও মোহাম্মদ সাঈদ আহমেদ। দুদকের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খুরশীদ আলম খান শুনানিতে অংশ নেন।

পরে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এস আলম গ্রুপ নিয়ে ওই প্রতিবেদনের অভিযোগ অনুসন্ধান–সম্পর্কিত বিষয়ে সব পক্ষকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে বলেছেন চেম্বার আদালত। ফলে এস আলম গ্রুপ সম্পর্কিত বিষয়ে বিভিন্ন সংস্থাকে অনুসন্ধান করতে যে আদেশ দেওয়া হয়েছিল, তা স্থগিত থাকবে।’

অনিয়মের ঋণে খেলাপির শীর্ষে এখন জনতা ব্যাংক

২৪ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

রাষ্ট্রমালিকানাধীন জনতা ব্যাংক একসময় দেশের ভালো ব্যাংক হিসেবে পরিচিত ছিল। উদ্যোক্তাদেরও অর্থায়নের প্রধান উৎস ছিল ব্যাংকটি। জনতা ব্যাংকের অর্থায়নে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন দেশের অনেক শিল্পোদ্যোক্তা। সেই ব্যাংকটি এখন দেশের খেলাপি ঋণে শীর্ষ ব্যাংক।

জনতা ব্যাংকের নিজস্ব নথিপত্র অনুযায়ী, গত তিন মাসে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এর ফলে ব্যাংক খাতের সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ এখন এ ব্যাংকের। গত মার্চ শেষে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা। জুনে তা বেড়ে হয়েছে ২৮ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। তাতে ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণের ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশই এখন খেলাপি। মার্চেও এ হার ছিল ১৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। খেলাপি ঋণের বড় অংশ অনিয়মের মাধ্যমে দেওয়া।

জনতা ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের মধ্যে ৪০ হাজার কোটি টাকায় বড় তিন প্রভাবশালী শিল্প গ্রুপের, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৪২ শতাংশ। গত জুন শেষে ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৪ হাজার ২০৭ কোটি টাকায়। এক যুগের বেশি সময় ধরে ব্যাংকটি ধীরে ধীরে খারাপ হতে শুরু করে। একে একে ব্যাংকটি ছেড়ে যায় ভালো শিল্প গ্রুপগুলো। আর তার বিপরীতে শীর্ষ গ্রাহকের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে বিতর্কিত ও বেনামি অনেক গ্রুপ।

এই সময়ে বড় ধরনের ঋণ অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনাও ঘটেছে ব্যাংকটিতে। তাতে খেলাপি হয়ে পড়েছে এসব ঋণ। বারবার পুনঃ তফসিল করার পরও এসব ঋণ আদায় হচ্ছে না। পুরো ব্যাংক খাতের সার্বিক খেলাপি ঋণ যেখানে ১০ শতাংশের কম, সেখানে জনতা ব্যাংকের খেলাপি তিন গুণ বেশি। একদিকে তিন গ্রুপের কাছে ঋণের বড় অংশ পুঞ্জীভূত, অন্যদিকে খেলাপি ঋণে শীর্ষে—এ দুইয়ে মিলিয়ে বড় ধরনের সংকটে এখন রাষ্ট্রমালিকানাধীন জনতা ব্যাংক।

এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সম্প্রতি বাংলাদেশকে ৪৭০ কোটি ডলারের যে ঋণ দিয়েছে, তার বিপরীতে শর্ত দেওয়া হয় ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। আইএমএফের ওই শর্তের পর বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেয় জনতা ব্যাংককে। এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা ব্যাংকটিতে পর্যবেক্ষক ও সমন্বয়কের দায়িত্বে রয়েছেন।

নতুন করে বেশি পরিমাণ ঋণ দেওয়ার ও চাহিদামতো আমানত না বাড়ায় ব্যাংকটি তারল্যসংকটে পড়েছে। আবার কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের কাছে দেওয়া আমানতও ব্যাংকটি ফেরত পাচ্ছে না।

তাতেও আর্থিক পরিস্থিতির কোনো উন্নতি ঘটছে না। বরং কিছু গ্রুপকে নতুন করে ঋণ ও অন্যান্য সুবিধা দেওয়া অব্যাহত রেখেছে ব্যাংকটি। বিশেষ বিবেচনায় যার অনুমোদনও দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ অবস্থায় ব্যাংকটিকে দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ধার করতে হচ্ছে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অর্থ দিয়ে গঠিত রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে নেওয়া ডলারের ঋণও ফেরত দিতে পারছে না ব্যাংকটি। ফলে জনতা ব্যাংকের গ্রাহকদের ইডিএফ সুবিধা বন্ধ হয়ে গেছে।

ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে গত মে মাসে যোগ দিয়েছেন আবদুল জব্বার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্রাহকেরা কিস্তির টাকা ফেরত না দেওয়ায় অনেক ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মের মধ্যে থেকে কোনো গ্রাহক ঋণ নিয়মিত করতে চাইলে তা করা হবে। কাগজে-কলমে আমরা ব্যাংকের স্বাস্থ্য ঠিক করতে চাই না। প্রকৃত যা অবস্থা, তাই দেখানো হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেসব বড় গ্রাহক বিশেষ বিবেচনায় একক গ্রাহকের সীমার বেশি ঋণ নিয়েছেন, তাঁদের ঋণের পরিমাণ আর বাড়াবে না। এসব গ্রাহক যে পরিমাণ ঋণ পরিশোধ করবেন, শুধু সেই পরিমাণ ঋণ নতুন করে নিতে পারবেন।

আমানত বেড়েছে কম, ঋণ বেড়েছে বেশি

২০২১ সাল শেষে জনতা ব্যাংকের আমানত ছিল ১ লাখ ১ হাজার ৬২০ কোটি টাকা, ওই সময়ে ঋণ ছিল ৬৯ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা। গত জুন শেষে আমানত বেড়ে হয় ১ লাখ ৭ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। আর ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৯৪ হাজার ২০৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ দেড় বছরে ব্যাংকটির আমানত বেড়েছে ৬ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা। আর এ সময়ে ঋণ বেড়েছে ২৪ হাজার ২৪২ কোটি টাকা। অর্থাৎ আমানত যতটা বেড়েছে তার চার গুণ বেড়েছে ঋণ। গত দেড় বছরে ব্যাংকটি একাধিক সিন্ডিকেট বা জোটভুক্ত ঋণে যুক্ত হয়, আবার বড় গ্রাহকদেরও নতুন করে ঋণ দেয়।

জনতা ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির শীর্ষ গ্রাহক বেক্সিমকো গ্রুপ। এরপরই শীর্ষ গ্রাহকের তালিকায় আছে এস আলম ও ওরিয়ন গ্রুপ। এই তিন গ্রুপের কাছে ব্যাংকটির ঋণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে একক গ্রাহকের যে ঋণসীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, এ তিন গ্রাহকের ঋণ সেই সীমার বেশি। এসব ঋণের ক্ষেত্রে বিশেষ অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। জনতা ব্যাংকের মতিঝিলের স্থানীয় কার্যালয়ের ৩১ হাজার কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ২২ হাজার কোটি টাকা বেক্সিমকো গ্রুপের। জনতা ভবন করপোরেট শাখার ৩০ হাজার কোটি টাকা ঋণের বড় অংশই ওরিয়ন, এননটেক্স ও থার্মেক্স গ্রুপের। আর চট্টগ্রামের সাধারণ বিমা করপোরেট শাখার প্রায় সব ঋণই এস আলম গ্রুপের।

নতুন করে বেশি পরিমাণ ঋণ দেওয়ার ও চাহিদামতো আমানত না বাড়ায় ব্যাংকটি তারল্যসংকটে পড়েছে। আবার কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের কাছে দেওয়া আমানতও ব্যাংকটি ফেরত পাচ্ছে না। ফলে এখন দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন টাকা ধার করতে হচ্ছে ব্যাংকটিকে। মূলত সরকারি আমদানি দায় পরিশোধে ডলার কেনার জন্য ব্যাংকটিকে এ টাকা ধার করতে হচ্ছে।

নাসা গ্রুপের ২৬১ কোটি টাকা সুদ মাফ জনতা ব্যাংকের

২৭ আগস্ট ২০২৩, আজকের পত্রিকা

ঋণ কেলেঙ্কারিতে বিপর্যস্ত জনতা ব্যাংক সুদ মওকুফেও উদার হস্ত। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি শুধু যে নিজেই উদারভাবে ঋণ দিয়েছে তা নয়, অন্য ব্যাংকের ঋণ কিনে নিয়ে বিপুল অঙ্কের সুদও মওকুফ করেছে। আর এই সুবিধাটি নিয়েছে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের  ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নাসা গ্রুপ।

জানা গেছে, নাসা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান নাসা তাইপে স্পিনার্স ও নাসা স্পিনার্সের ঋণ কিনে ২৬১ কোটি টাকার সুদ মওকুফ করেছে জনতা ব্যাংক। এই সুদ মওকুফের কারণে ৪১৭ কোটি টাকার বকেয়া ঋণ কমে দাঁড়ায় ১৫৬ কোটি টাকায়। পরে জনতা ব্যাংকের লোকাল অফিসে এই পাওনা পরিশোধ করেন গ্রাহক। কিন্তু এভাবে সুদ মওকুফ অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জনতা ব্যাংকের নিয়মের শতভাগ লঙ্ঘন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষকও।

বিমানবন্দরে সরকারি সংস্থার লকার থেকে ৫৫ কেজি সোনা গায়েব

০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শুল্ক বিভাগের গুদামে থাকা লকার থেকে ৫৫ কেজির বেশি সোনা চুরি হয়ে গেছে। টার্মিনাল ভবনের ভেতরে সুরক্ষিত স্থান থেকে কীভাবে এমন চুরির ঘটনা ঘটল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সোনা চুরির চাঞ্চল্যকর এই ঘটনা ঢাকা শুল্ক বিভাগের নজরে আসে শনিবার। তবে বিষয়টি জানাজানি হয় আজ রোববার। এ ঘটনায় শুল্ক বিভাগ একজন যুগ্ম কমিশনারের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

শুল্ক বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, চুরি হওয়া এসব সোনা ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময় উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু এত দিন ধরে এত পরিমাণ সোনা বিমানবন্দরের গুদামে রাখা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। 

১ বিলিয়ন ডলার পাচার হলো কি না, তদন্ত করতে অর্থমন্ত্রীকে নির্দেশ দিন

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

বাংলাদেশের একজন বড় ব্যবসায়ী সিঙ্গাপুরে এক বিলিয়ন ডলার পাচার করেছেন কি না, সেটি তদন্ত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক।

আজ সোমবার রাতে জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য মুজিবুল হক বলেন, ‘এত বড় একটা ঘটনায়…যেখানে তথ্যপ্রমাণসহ আমরা পড়েছি, যেগুলো অবিশ্বাস করাটাও সমস্যা। বিষয়টি গুরুতর, রাষ্ট্রের জন্য। প্রধানমন্ত্রী, আপনি অর্থমন্ত্রীকে নির্দেশ দিন, বিষয়টি নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত করে দেখার জন্য, আসলে কোনো বাংলাদেশি গিয়ে ওখানে (সিঙ্গাপুরে) এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছেন কি না। করলে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে কীভাবে টাকাটা পেলেন, না হয় কোন সোর্স (উৎস) থেকে আনলেন। বাংলাদেশ থেকে না আনলে কীভাবে আসল।’

মুজিবুল হকের বক্তব্যের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদের অধিবেশন কক্ষে ছিলেন। তবে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ওই সময় অধিবেশন কক্ষে ছিলেন না। উল্লেখ্য, জরুরি কোনো ঘটনায় স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নেন সংসদ সদস্যরা।

রপ্তানির আড়ালে ৮২১ কোটি টাকা পাচার

সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৩, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

তৈরি পোশাক রপ্তানির আড়ালে ৩৩টি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের ৮২১ কোটি টাকা পাচারের তথ্য পেয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

দেশের সবচেয়ে বড় অর্থপাচার কেলেঙ্কারির অন্যতম এই ঘটনা সম্প্রতি উদ্ঘাটন হলেও এসব পণ্য রপ্তানি হয়েছে ২০১৭ সাল থেকে ২০২৩ সালের মে মাস পর্যন্ত।

সর্বশেষ খবর দ্য ডেইলি স্টার বাংলার গুগল নিউজ চ্যানেলে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠান ১৩ হাজার ৮১৭টি চালানে ৯৩৩ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি করলেও দেশে এনেছে মাত্র ১১১ কোটি টাকা। বাকি ৮২১ কোটি টাকা সিঙ্গাপুর, দুবাই, মালয়েশিয়া, কানাডাসহ ২৫টি দেশে পাচার করতে ভুয়া রপ্তানি নথি ব্যবহার করেছে প্রতারকচক্র।

সংস্থাটির তদন্ত নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব পণ্য রপ্তানি করতে পণ্যের প্রকৃত দামের চেয়ে অন্তত ১০ গুণ কম মূল্য দেখানোর পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যকে ‘নমুনা’ পণ্য হিসেবে দেখানো হয়েছে। নমুনা পণ্য হিসেবে দেখানোর কারণে এসব পণ্যের বিপরীতে দেশে কোনো টাকা প্রবেশের সুযোগ নেই।

সম্প্রতিকালে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংস্থাটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘এসব অর্থ পাচারের সঙ্গে একাধিক চক্র জড়িত। আমরা দেশে-বিদেশে অনেক সুনামধন্য প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছি। খুব শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।’

রপ্তানি নথি অনুযায়ী, ঢাকাভিত্তিক বায়িং হাউস এশিয়া ট্রেডিং করপোরেশন ২০২২ সালে ৩০৮ কোটি টাকার (২৮ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের ১৪ হাজার ৮৫ টন টি-শার্ট ও প্যান্ট সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াতে পাঠিয়েছে। তবে এই চালানের বিপরীতে একটি ডলারও দেশে আসেনি।

রপ্তানি নথিতে কোম্পানিটি ১ হাজার ৩৪২টি চালানের সবগুলোই ‘নমুনা পণ্য’ হিসেবে দেখিয়েছে। শুল্ক নিয়ম অনুযায়ী, নমুনা পণের কোনো রপ্তানি আয় দেশে আসে না।

একইভাবে, গাজীপুরভিত্তিক রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান হংকং ফ্যাশন ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের মে মাসের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা ও মালয়েশিয়াসহ ৭টি দেশে ৪৩ দশমিক ২১ কোটি টাকা মূল্যের ১ হাজার ১৬০ টন পণ্য রপ্তানি করে। এর বিপরীতে মাত্র ১২ দশমিক ৭৩ কোটি টাকা ফেরত আনা হয়েছে। বাকি ৩০ দশমিক ৪৮ কোটি টাকা পাচার হয়েছে বলে সংস্থাটির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

‘আমরা এর আগে এত বড় আকারের রপ্তানি জালিয়াতি শনাক্ত করিনি। অতীতে আমরা সর্বোচ্চ ১০ বা ১০টি চালান মানি লন্ডারিংয়ের তথ্য নিয়ে কাজ করেছি। একসঙ্গে এতগুলো চালান জড়িত থাকার অনিয়ম আমাদের নজরে আসেনি।’

তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ৩৩টি প্রতিষ্ঠানের ১৩ হাজার ৮১৭টি চালানে অর্থ পাচারের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেছি। এ সংখ্যা আরও বাড়বে।’ 

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি) চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু করে ৩ ধাপে ৬ মাসের তদন্তের পর এ জালিয়াতি উদঘাটন করেছে।

এসব অর্থ পাচারের নথি দ্য ডেইলি স্টার সংগ্রহ করেছে। প্রাপ্ত নথি অনুসারে,পাচার হওয়া ৮২১ কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা গেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে। বাকিগুলো কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, কাতার, স্পেন, কুয়েত, ফিলিপাইন, সুইডেন, রাশিয়া, পানামা, থাইল্যান্ড, জর্জিয়া এবং ফিলিস্তিন অঞ্চলসহ ২২টি দেশে পাঠানো হয়েছে।

শুল্ক গোয়েন্দা তদন্তে যে ৩৩টি রপ্তানিকারক ও বায়িং হাউসের নাম উঠে এসেছে তাদের অধিকাংশই ঢাকা ও গাজীপুরে অবস্থিত।

দ্য ডেইলি স্টার এই ৩৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৭টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলেছে এবং তাদের প্রত্যেকে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে।

রপ্তানি নথিতে অন্তত ১২টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। এই প্রতিবেদক ৬টি ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলেছে। ৩টি ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রশ্নবিদ্ধ রপ্তানিকারকরা তাদের গ্রাহক নন। অন্য ৩টি ব্যাংক বলেছে, তারা অন্যান্য কোম্পানির রপ্তানি অনুমতিপত্রের (ইএক্সপি) বিপরীতে ঋণপত্র জারি করেছে যা এই কোম্পানিগুলোর নয়।

এদিকে গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সিআইআইডি জানায়, রপ্তানির নামে ১০টির মতো আরএমজি কারখানা প্রায় ৩০০ কোটি টাকা পাচার করেছে। যা এই ৩৩টি প্রতিষ্ঠানের পাচার হওয়া ৮২১ কোটি টাকার মধ্যে অন্তভুক্ত।

কাস্টমস কর্মকর্তারা বলেছেন, অর্থ পাচারের জন্য প্রতারকরা এনবিআর সার্ভারে কোড-২০ ব্যবহার করে, যা প্রকৃত রপ্তানির আগে আমদানিকারকদের কাছে ‘নমুনা’ প্রেরণকে নির্দেশ করে। এ ক্ষেত্রে রপ্তানি আয়ের প্রশ্নই আসে না।

অর্থ পাচারের আরেকটি জনপ্রিয় উপায় হলো আন্ডার ইনভয়েসিং বা প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম মূল্য দেখানো বা পণ্যের পরিমাণ কম দেখানো। এই ৩৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৯টি প্রতিষ্ঠানই এ উপায় অবলম্বন করেছে।

উদাহরণস্বরূপ, ৪টি কোম্পানি— এশিয়া ট্রেডিং করপোরেশন, সাবিহা সাইকি ফ্যাশন, ইমু ট্রেডিং করপোরেশন এবং ইলহাম—জানুয়ারি ২০২০ থেকে ডিসেম্বর ২০২২ সালের মধ্যে কমপক্ষে ১ হাজার ৭৮০টি চালান পাঠানোর জন্য কোড ২০ ব্যবহার করেছে। যদিও সাধারণত নমুনা পণ্য ১০ কেজি থেকে ১০০ কেজি পর্যন্ত হয়। এই চালানের প্রতিটির ওজন ছিল ১০ হাজার কেজির বেশি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এনবিআর সার্ভার এবং কাস্টমস কর্মকর্তারা রপ্তানির সময় সঠিকভাবে তদারকি বা যাচাই-বাছাই না করাই এসব চালান কোন ধরনের বাধা ছাড়াই চট্টগ্রাম বন্দর ছেড়ে যেতে পেরেছে।

আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বাকি ২৯ রপ্তানিকারক ৫৫৪ কোটি টাকার ১৪ হাজার ৮৭৮ টন গার্মেন্টস পণ্য পাঠালেও তারা রপ্তানি আয় দেখিয়েছে মাত্র ১১১ কোটি টাকা।

এসব নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, একটি টি-শার্টের গড় দাম দেখানো হয়েছে ১২ টাকা থেকে ২১ টাকা এবং এক জোড়া প্যান্টের দাম দেখানো হয়েছে ১৭ থেকে ৫৪ টাকা, যা প্রকৃত দামের চেয়ে ৪ থেকে ১০ গুণ কম।

নির্দিষ্ট সময়ে দেশে আসেনি রপ্তানির ৪৪৫৭ কোটি টাকা

০৬ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

পণ্য জাহাজীকরণের চার মাসের মধ্যে রপ্তানির সম্পূর্ণ মূল্য দেশে আনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ২০২১-২২ অর্থবছরের নির্ধারিত সময়ে দেশে আসেনি রপ্তানির ৫৩ কোটি ৩৮ লাখ ডলার; স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা। আবার পণ্য আমদানির অর্থ পরিশোধের পরও নির্ধারিত সময়ে দেশে পণ্য না আসায় গত পৌনে দুই বছরে গ্রাহকের কাছে ব্যাংকের অনাদায়ী অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ৬০২ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়সহ আটটি শাখা অফিসের হিসাব সম্পর্কিত কমপ্লায়েন্স অডিট ইন্সপেকশন রিপোর্টে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তর গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নিরীক্ষা চালিয়ে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে। অধিদপ্তর তাদের প্রতিবেদনে আমদানি-রপ্তানির আড়ালে অর্থ পাচারের আশঙ্কা করেছে।

আমদানি-রপ্তানির আড়ালে অর্থ পাচার নতুন কিছু নয়। সম্প্রতি পোশাক রপ্তানির আড়ালে ৩৩টি গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠানের ৮২১ কোটি টাকা পাচারের তথ্য পেয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। এসব প্রতিষ্ঠান ১৩ হাজার ৮১৭টি চালানে ৯৩৩ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি করলেও দেশে এনেছে মাত্র ১১১ কোটি টাকা। বাকি ৮২১ কোটি টাকা সিঙ্গাপুর, দুবাই, মালয়েশিয়া, কানাডাসহ ২৫টি দেশে পাচার করতে ভুয়া রপ্তানি নথি ব্যবহার করেছে।

অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, তদারকি না থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়সহ চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা অফিসের আওতায় ২০২১-২২ অর্থবছরে মেয়াদোত্তীর্ণের দীর্ঘদিন পরও রপ্তানি মূল্য অপ্রত্যাবাসিত থাকায় দেশের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৩ কোটি ৩৮ লাখ ৬৪ হাজার ৭৮১ ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক  মুদ্রানীতি বিভাগের এক্সপোর্ট ও এনফোর্সমেন্ট শাখার নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে মালপত্র রপ্তানি হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রধান কার্যালয়ের আওতাধীন ৪০টি তপশিলি ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ৫১ কোটি ডলার বা ৪ হাজার ২৫৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা অপ্রত্যাবাসিত রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম অফিসের আওতাধীন বিভিন্ন তপশিলি ব্যাংকের মাধ্যমে ১ কোটি ৭০ লাখ ডলার এবং খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর অফিসের আওতায় ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে অপ্রত্যাবাসিত রয়েছে ৬১ লাখ ডলার। বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তর বলেছে,  পণ্য জাহাজীকরণের চার মাস সময়সীমার মধ্যে রপ্তানি মূল্য প্রত্যাবাসনে ব্যর্থতা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ছাড়া মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী, বিষয়টি অনুসন্ধান বা তদন্তের জন্য বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে পাঠানোর কথা। অথচ তা পরিপালন করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থ আসার নির্ধারিত মেয়াদের পর ১২ মাস অতিবাহিত হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি। এ বিষয়ে অডিট অধিদপ্তর ব্যাখ্যা চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ও অপ্রত্যাবাসিত রপ্তানি বিলের বিবরণী তৈরি করে ব্যাংকগুলোকে রপ্তানি মূল্য প্রত্যাবাসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও জানায়, রপ্তানি মূল্য প্রত্যাবাসন না হওয়ার বিবিধ কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য– রপ্তানি পণ্যের শর্ট শিপমেন্ট হওয়া, রপ্তানিকারক বা বিদেশি ক্রেতার দেউলিয়া হয়ে যাওয়া, জাল-জালিয়াতি, ভুয়া রপ্তানি বা প্রতারণা এবং রপ্তানি মূল্য আদায়ের ক্ষেত্রে মামলা চলমান থাকা। মানি লন্ডারিং বা সন্ত্রাসী কাজে অর্থায়নের উপাদান পাওয়া গেলে কেস টু কেস ভিত্তিতে অনুসন্ধানের জন্য বা স্বপ্রণোদিত হয়ে বিএফআইইউতে পাঠানো হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন কারণে রপ্তানি মূল্য অপ্রত্যাবাসিত থাকে। সব মেয়াদোত্তীর্ণ রপ্তানি বিল মানি লন্ডারিং বিবেচনার যৌক্তিক কারণ নেই।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জবাবে সন্তুষ্ট হতে পারেনি বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তর। তাদের যুক্তি, নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি মূল্য প্রত্যাবাসিত হয়নি এবং বাংলাদেশ ব্যাংক তদারকিও করেনি। বিভিন্ন বছরে নিয়মিত শর্ট শিপমেন্ট হলেও এ বিষয়ে তদন্ত করা হয়নি। শর্ট শিপমেন্টজনিত পণ্য পরবর্তী সময়ে রপ্তানি হওয়ার বিষয়ে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। জাল-জালিয়াতি, ভুয়া রপ্তানি, প্রতারণা ইত্যাদি বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা সংক্রান্ত কোনো তথ্য বা প্রমাণ সরবরাহ করা হয়নি।

আমদানি সংক্রান্ত অনিয়ম

নিরীক্ষাকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ অপারেশন ডিপার্টমেন্টের ২০২১ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত মোট এক বছর ৯ মাসের আমদানি নথি, সরবরাহ করা অসমন্বিত বিল অব এন্ট্রির বিবরণী পর্যালোচনা করা হয়। এ সময় বিভিন্ন তপশিলি ব্যাংকের গ্রাহকের নামে আমদানি করা মালপত্রের মেয়াদোত্তীর্ণ বিল অব এন্ট্রির বিপরীতে ৫১১ কোটি ১১ লাখ ডলারের সমপরিমাণ প্রায় ৪২ হাজার ৬০২ কোটি ১৯ লাখ টাকা অনাদায়ী ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নীতিমালা অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রা ছাড়ের চার মাসের মধ্যে দেশে আমদানি হওয়ার সপক্ষে বিল অব এন্ট্রি জমায় ব্যর্থ আমদানিকারক তথা প্রতিষ্ঠানের জন্য এলসি খোলা, বন্ধ রাখাসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বিল অব এন্ট্রিগুলো ওভারডিউ থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংক আইনগত ব্যবস্থা নেয়নি। ডলার ছাড়ের চার মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরও পণ্য না আসায় বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে অডিট অধিদপ্তর ব্যাখ্যা চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, আমদানির পক্ষে কাস্টম কর্তৃপক্ষ বিল অব এন্ট্রি ইস্যু করে। বাংলাদেশ ব্যাংক ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে মেয়াদোত্তীর্ণ বিল অব এন্ট্রির বিবরণী তৈরি করে সমন্বয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে পাঠায়। বিল অব এন্ট্রি দাখিল না করলে আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগে পাঠানো হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানায়, বিশ্বব্যাপী করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে ২০২১ সালে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের এডি শাখা ও গ্রাহককে বিল অব এন্ট্রি সমন্বয়ে বাড়তি সময় দেওয়া হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে অডিট অধিদপ্তর বলেছে, নীতিমালা অনুযায়ী বিল অব এন্ট্রি অসমন্বিত থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন ব্যতীত ওই আমদানিকারকের অনুকূলে নতুন ঋণপত্র খোলা যাবে না। তারপরও ক্রমাগত এলসি খোলা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হিসেবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হিসেবে এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের যথাযথ তদারকি না থাকায় এ ধরনের আর্থিক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হচ্ছে। দায়-দায়িত্ব নির্ধারণপূর্বক অসমন্বিত বিল অব এন্ট্রিগুলো অতিসত্বর সমন্বয় করে অডিট অধিদপ্তরকে জানাতে বলা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ২৫২ বাড়ি আমলা-পুলিশের

০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ইত্তেফাক

দেশের টাকা পাচার করে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি কিনেছেন এমন ২৫২ জন আমলা, পুলিশসহ সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি তালিকা পাওয়া গেছে। সরকারের শীর্ষ মহলে পাঠানো হয়েছে সেই তালিকা। এই তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই ২৫২ জনের মধ্যে অন্তত ৩০-৩৫ জন পুলিশের ওসি (ইন্সপেক্টর) রয়েছেন। এদের কারও আবার একাধিক বাড়িও আছে। যুক্তরাষ্ট্রে কারা বাড়ি কিনেছেন? এই বিষয় নিয়ে কয়েকমাস ধরে তদন্ত করছিল একটি গোয়েন্দা সংস্থা। সেই রিপোর্টটি এখন সামনে এসেছে। এদের সবাই দেশ থেকে টাকা পাচার করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়েছেন। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

সরকারের সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা ছাড়াও পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাও আছেন এই তালিকায়। যারা সরকারের আস্থাভাজন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। শুধু এই সরকারের আমলে নয়, বিগত সরকারগুলোর সময়ও আমলা, পুলিশ কর্মকর্তাসহ সরকারী কর্মকর্তারা বিদেশে টাকা পাচার করেছেন। তখনও কয়েকশ’ সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিদেশে সম্পদ থাকার তালিকা প্রকাশ হয়েছিল। এমন অনেকেই এখন বিদেশে নিজেদের সেই সব বাড়িতে অবস্থান করে দেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছেন। বর্তমান সরকার ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করেছে। ফলে জনগণের ভোট নিয়ে তাদের চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এসব অসৎ কর্মকর্তাদের কারণে দেশে বিদেশে প্রধানমন্ত্রীকেই নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে।   গত জানুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদে বিদেশে বাড়ি-গাড়ি আছে এমন আমলাদের তালিকা সংসদে প্রকাশের দাবি করেছিলেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারি। তখন তিনি বলেছিলেন, গণমাধ্যমে এসেছে আমলাদের বিদেশে প্রচুর সম্পদ আছে। আমলাদের মধ্যে কাদের বিদেশে বাড়ি-গাড়ি আছে তাদের তালিকা সংসদে প্রকাশ করা উচিৎ। তাদের বরখাস্ত করে বিচারের আওতায় আনা উচিৎ। এমনকি তাদের ফাঁসি দেওয়া উচিৎ বলে মন্তব্য করেন এই সংসদ সদস্য।

বিদেশে বাড়ি আছে এমন একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর (ওসি) ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘একটি থানায় পোস্টিং নিতে আমাদের ২০ থেকে ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়। তারপরও এক বছর থাকা যায় না। এখন টাকা কামানো ছাড়া আমাদের কী করার আছে? মানুষের সেবা দেবো কখন? এর মধ্যে আবার রাজনৈতিক তদবির আছে। এখন আপনি যদি দুর্নীতি করেন বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে যান তাহলে তো আপনাকে নিরাপত্তা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতেই হবে। সরকার বদল হলে আমি যে দেশে থাকত পারব, চাকরি করতে পারব তার নিশ্চয়তা কী? ফলে আমাকে আগে থেকেই বিদেশে থাকার সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। স্ত্রী-সন্তানদের আগেই সেখানে পাঠিয়ে নাগরিকত্বসহ পুরো পরিবার থেকে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।’

সিঙ্গাপুরের ধনীদের তালিকায় এক ধাপ এগোলেন সামিটের আজিজ খান

০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ৫০ ধনীর তালিকায় আবারও স্থান পেয়েছেন বাংলাদেশের মুহাম্মদ আজিজ খান। তিনি সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান। গতকাল বুধবার মার্কিন সাময়িকী ‘ফোর্বস’ সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ৫০ ধনীর যে তালিকা প্রকাশ করেছে, সেই তালিকায় আজিজ খানের অবস্থান ৪১তম।

গতকাল যখন এ তালিকা প্রকাশিত হয়, তখন আজিজ খানের মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১১২ কোটি ডলার। আজ এ প্রতিবেদন লেখার সময় অবশ্য তাঁর সম্পদের পরিমাণ কিছুটা কমেছে। ‘ফোর্বস’ সাময়িকীর তথ্যানুসারে, আজ আজিজ খানের সম্পদের পরিমাণ ১১০ কোটি ডলার, অর্থাৎ দুই কোটি ডলার কমেছে।

 ‘ফোর্বস’–এর ২০২২ সালের সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ধনীর তালিকায় আজিজ খানের অবস্থান ছিল ৪২ নম্বরে। সেবার তাঁর সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার। সেই হিসাবে চলতি বছর ধনীদের তালিকায় আজিজ খান এক ধাপ এগিয়েছেন এবং তাঁর সম্পদ বেড়েছে ১২ কোটি ডলার।

সিঙ্গাপুরের জন্য করা তালিকায় মুহাম্মদ আজিজ খানের অবস্থান ৪১তম হলেও ‘ফোর্বস’–এর করা বিশ্বের শতকোটিপতিদের তালিকায় তাঁর স্থান দেখানো হয়েছে ২৫৪০তম। এ অবস্থানে তিনি অবশ্য আরও বেশ কয়েকজনের সঙ্গে আছেন।

কুষ্টিয়ায় সরকারি চাল কেনায় চালবাজি

০৭ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

কুষ্টিয়ায় বোরো মৌসুমে সরকারি চাল কেনায় নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। খাদ্য অফিসকে ‘ম্যানেজ’ করে রেশন, জিআর ও কাবিখা প্রকল্পের চাল কিনে পলিশের পর খুদ মিশিয়ে বস্তায় ভরে গুদামে সরবরাহ করা হচ্ছে। মূলত সরকারি চাল কিনে সরকারের কাছেই বেশি দামে বিক্রি করছেন মিল মালিকরা। পুরো এ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করছেন সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ওমর ফারুকসহ কয়েক নেতা ও তাদের স্বজন।

খাদ্য অফিসকে কেজিপ্রতি ৪০ পয়সা ‘কমিশন’ দিয়ে নিম্নমানের চাল জায়েজ করা হচ্ছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। এর বাইরে ট্রাকপ্রতি গুদামের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আলাদা অর্থ দিতে হয়। বিল তুলতেও গুনতে হয় কড়ি। আবার কুষ্টিয়া থেকে খুলনায় চাল পাঠাতেও অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা পকেটে ভরছেন খাদ্য অফিসের অসাধু কর্মকর্তারা।

বোরো মৌসুমে কুষ্টিয়ায় মিল মালিকদের কাছ থেকে ৬১ হাজার টনের বেশি চাল সংগ্রহ করছে সরকার। প্রতি টন ৪৪ হাজার টাকা দরে ২৬৮ কোটি টাকার বেশি চাল কেনা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, কুষ্টিয়ায় চলতি বোরো মৌসুমে প্রথম পর্যায়ে ৩৮ হাজার ৪৮২ টন চাল সংগ্রহের বরাদ্দ দেয় সরকার। এগুলো সরবরাহে জেলার ১৬৫ মিল মালিক চুক্তি করেন। দ্বিতীয় দফায় ৫ হাজার ২০০ টন চাল অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব সরবরাহে দায়িত্ব পান আওয়ামী লীগ নেতা ওমর ফারুক ও তাঁর ভাইদের প্রতিষ্ঠান। বিষয়টি নিয়ে মিল মালিকরা অসন্তোষ দেখালে আরও ১৮ হাজার ৭২ টন চাল বরাদ্দ দিয়ে ১২৫ মিল মালিককে সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এস আলমের বিদেশে সম্পদের বিষয়ে সংবাদ প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

এস আলম গ্রুপের মালিক মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তাঁর স্ত্রী ফারজানা পারভীনের বিদেশে সম্পদের বিষয়ে সংবাদ, বিবৃতি, মতামত ও অনলাইনে কোনো ভিডিও প্রকাশ বা সম্প্রচারের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়েছে।

 এস আলম ও তাঁর স্ত্রীর পক্ষে আজ মঙ্গলবার আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় আবেদনটি দায়ের  করা হয়। আবেদনটির ওপর কাল বুধবার আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে শুনানি হতে পারে বলে তাঁদের একজন আইনজীবী জানান।

এর আগে ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার-এ ‘এস আলম’স আলাদিন’স ল্যাম্প’ (এস আলমের আলাদিনের চেরাগ) শিরোনামে ৪ আগস্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে অনুমতি ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগ বা অর্থ স্থানান্তর নিয়ে এস আলম গ্রুপের মালিক ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অনুসন্ধান করে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল দিয়ে আদেশ দেন হাইকোর্ট। গত ৬ আগস্ট দেওয়া ওই আদেশের বিরুদ্ধে এস আলম ও তাঁর স্ত্রী আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করেন। ২৩ আগস্ট আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত বিষয়বস্তু সম্পর্কে সব পক্ষকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে আদেশ দেন এবং আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে লিভ টু আপিলটি শুনানির জন্য আগামী বছরের ৮ জানুয়ারি দিন ধার্য করেন।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিশেষ সুবিধা নিয়ে লিগেসির শেয়ারে বড় কেলেঙ্কারি

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

ব্যাংক ও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) দেওয়া বিশেষ সুবিধায় শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত লিগেসি ফুটওয়্যারের শেয়ারের বড় ধরনের অনিয়ম ও কারসাজির ঘটনা ঘটেছে। আর অনিয়ম ও কারসাজির বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই ‘বিশেষ সুবিধা’।

কোম্পানিটির শেয়ার নিয়ে অনিয়ম ও কারসাজিতে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন গুটিকয় উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী। আর বেশির ভাগ সাধারণ বিনিয়োগকারী বঞ্চিত হয়েছেন তাঁদের প্রাপ্য সুবিধা থেকে।

গত ছয় মাসে শেয়ারবাজারে যেসব কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, তার মধ্যে লিগেসি ফুটওয়্যার অন্যতম। মাত্র ছয় মাসে কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের বাজারমূল্য বেড়েছে ১৩৯ শতাংশ বা ৬৬ টাকার বেশি। গত ১৩ মার্চ কোম্পানিটির শেয়ারের বাজারমূল্য ছিল ৪৭ টাকা ৭০ পয়সা। গতকাল মঙ্গলবার দিন শেষে সেই দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৩ টাকা ৫০ পয়সায়।

বিএসইসি যে সুবিধা দিল

লিগেসি ফুটওয়্যারের বর্তমান পরিশোধিত মূলধন ১৩ কোটি টাকা। ২০২১ সালে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির এক নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, শেয়ারবাজারের মূল বোর্ডে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ৩০ কোটি টাকার কম থাকতে পারবে না। সেই নির্দেশনা পরিপালনে নতুন শেয়ার ইস্যু করে মূলধন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় লিগেসি ফুটওয়্যার। লিগেসি ফুটওয়্যারের এ উদ্যোগ ছিল অভিনব।

নিয়ম অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোম্পানির মূলধন বৃদ্ধির কয়েকটি উপায় আছে। তার মধ্যে রয়েছে অধিকারমূলক বা রাইট শেয়ার ইস্যু, পুনঃ প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা রিপিট আইপিও বা প্রাইভেট প্লেসমেন্ট ব্যবস্থা। এসব ব্যবস্থার মধ্যে রাইট শেয়ার ও রিপিট আইপিওর ক্ষেত্রে সব শেয়ারধারীর বিপরীতে সমানুপাতিক শেয়ার ইস্যু করতে হয়। এর বাইরে প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে পছন্দের লোকের বিপরীতে নতুন শেয়ার ইস্যু করেও মূলধন বাড়ানো যায়। লিগেসি ফুটওয়্যার শেষের পথটি বেছে নেয়। কোম্পানিটি মোট ১৭ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে নতুন করে ৩ কোটি শেয়ার ছেড়ে ৩০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। যার মধ্যে কোম্পানির তিনজন উদ্যোক্তা-পরিচালক রয়েছেন। বাকি ১৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কোম্পানির বিশেষ পছন্দের।

বাজারে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়ে ১১৩ টাকায় উঠলেও প্লেসমেন্টে প্রতিটি শেয়ার ইস্যু করা হয়েছে মাত্র ১০ টাকা ফেসভ্যালু বা অভিহিত মূল্যে। গতকালের দাম অনুযায়ী, এসব শেয়ারের বাজারমূল্য হওয়া উচিত ৩৩৯ কোটি টাকা। তবে ৩৩৯ কোটি টাকার শেয়ার ১৭ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পাচ্ছে মাত্র ৩০ কোটি টাকার বিনিময়ে।

ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ অ্যাননটেক্সের প্রতি উদার জনতা ব্যাংক

সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৩, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

গত ১৩ বছর ধরে ঋণের অর্থ ঠিকমতো ফেরত না পাওয়ার পরেও অ্যাননটেক্স গ্রুপের অতি নমনীয় আচরণ অব্যাহত রেখেছে জনতা ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকের শীর্ষ ৫ ঋণগ্রহিতার মধ্যে অন্যতম এই গার্মেন্টস কোম্পানিটি।

গত বছরের ২৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৭৪৬তম সভায় চলতি বছরের ১৫ জুনের মধ্যে ঋণের মূল অর্থ পরিশোধের শর্তে অ্যাননটেক্সকে ৩ হাজার ৩৫৯ কোটি ১৯ লাখ টাকার সুদ মওকুফ করা হয়।

অন্যথায় এই ঋণটি খেলাপি হিসেবে দেখানো হবে বলে বলা হয়।

২০২২ সাল শেষে জনতা ব্যাংকের কাছে অ্যাননটেক্সের দেনার পরিমাণ ৭ হাজার ৭২৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের ৩৩৪ শতাংশ। নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি ব্যাংক তাদের পরিশোধিত মূলধনের ২৫ শতাংশের বেশি অঙ্কের ঋণ কোনো গ্রাহককে দিতে পারবে না। জুন শেষে জনতা ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা।

অ্যাননটেক্স এই অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ তাদের ওয়েবসাইটে ব্রিটিশ ব্র্যান্ড টেসকো, নিউ লুক ও স্পেনের জারাকে ক্লায়েন্ট হিসেবে দেখানো হয়েছে। একইসঙ্গে বার্ষিক টার্নওভার দেখানো হয়েছে ১৫০ মিলিয়ন ডলার।

সর্বশেষ গত ২৫ জুলাই অনুষ্ঠিত জনতা ব্যাংকের বোর্ডের ৭৭৮তম সভায় গার্মেন্টস প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানটিকে এ অর্থ ফেরত দিতে চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। অর্থাৎ আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অ্যাননটেক্সের নাম ঋণখেলাপির তালিকায় উঠবে না।

তবে ব্যাংকটি এবার একটি নতুন শর্ত আরোপ করেছে। তা হলো—অ্যাননটেক্সকে তাদের দুটি কোম্পানি বিক্রি করে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মোট দায়ের একটি অংশ পরিশোধ করতে হবে।

মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতের শীর্ষ ঋণখেলাপি অ্যাননটেক্সের প্রতি এটিই জনতা ব্যাংকের নমনীয় আচরণের একমাত্র উদাহরণ নয়।

২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে অ্যাননটেক্স গ্রুপের ২২টি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৩ হাজার ৫২৭ কোটি ৯ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছে জনতা ব্যাংক।

২০১৮ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই ঋণের সিংহভাগই জালিয়াতি ও অনিয়মের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে এবং এ ধরনের ঋণ সুদ মওকুফের মতো কোনো অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নয়।

২৯ সচিবের ৪৩ সন্তান বিদেশে

আজকের পত্রিকা, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩

প্রশাসনের ২৯ সচিবের ৪৩ সন্তান বিদেশে বসবাস করছেন। এর মধ্যে ১৮ জন সচিবের ২৫ সন্তান বাস করছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। বাকি ১৮ জন আছেন কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড ও ভারতে। এই ৪৩ জনের মধ্যে বেশির ভাগই পড়াশোনা করছেন। বাকিরা ব্যবসা বা চাকরি করছেন। একটি দায়িত্বশীল সংস্থার অনুসন্ধানে এসব তথ্য মিলেছে।

সূত্র বলেছে, গত মে মাসে নতুন মার্কিন ভিসা নীতি ঘোষণার পর প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাসহ সচিব পদমর্যাদার ৮৬ জনের সন্তানদের কে কোথায় আছেন এবং কী করছেন, তা নিয়ে অনুসন্ধান চালানো হয়। অনুসন্ধানের পর ৮৬ সচিবের মধ্যে ২৯ জনের সন্তানদের বিদেশে থাকার তথ্য প্রতিবেদন আকারে তৈরি করা হয়। পর্যায়ক্রমে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সন্তানদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে বলে জানা যায়। ওই তালিকায় থাকছে দেশের ৮ বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশের ৮টি রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি), ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপার (এসপি)।

২৪ মে রাতে যুক্তরাষ্ট্র নতুন ভিসা নীতি ঘোষণা করে। এই নীতির আওতায় বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য দায়ী বা জড়িত বলে মনে হলে যেকোনো বাংলাদেশি ব্যক্তির জন্য ভিসা দেওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে বলে জানায় দেশটি। বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা, সরকারপন্থী এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্য, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার বিভাগ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নতুন এই ভিসা নীতির অন্তর্ভুক্ত হবেন।

জানতে চাইলে সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান গতকাল বুধবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘যাঁরা দেশের বাইরে গেছেন, তাঁরা আইন মেনেই গেছেন। এখন কোনো সচিব যদি নির্বাচনকেন্দ্রিক কার্যক্রমে আইনবিরোধী কিছু করেন, তাহলে তাঁরা ভিসা নীতির আওতায় সমস্যায় পড়তে পারেন। আর সেই কারণে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা তাঁদের সন্তানদেরও কিছু সমস্যা হতে পারে। তবে সচিব সরাসরি নির্বাচনী কাজ করেন না। তাঁরা আইন মেনে কাজ করলে কোনো সমস্যা দেখছি না। আর তাঁদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে বিদেশি কোনো শক্তি কিছু করতে অন্যায় কিছু করাতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না।’

ওই সংস্থার তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, ১৮ জন সচিবের ২৫ সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। এর মধ্যে পরিকল্পনা সচিব সত্যজিত কর্মকারের দুই মেয়ে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব শেখ মোহাম্মদ সলীম উল্লাহর দুই মেয়ে, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান (সচিব) মো. ফয়জুল ইসলামের দুই ছেলে, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) মোসাম্মৎ নাসিমা বেগমের এক ছেলে, পাবর্ত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মশিউর রহমানের এক ছেলে, তথ্য ও সম্প্রচারসচিব মো. হুমায়ুন কবীর খোন্দকারের এক মেয়ে ও এক ছেলে, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. কামাল হোসেনের এক মেয়ে, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিনের এক মেয়ে, সেতু বিভাগের সচিব মো. মনজুর হোসেনের এক ছেলে, সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) সচিব হাসানুজ্জামান কল্লোলের এক ছেলে ও এক মেয়ে, সংস্কৃতিসচিব মো. খলিল আহম্মেদের এক ছেলে, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর সিকদারের এক ছেলে ও এক মেয়ে (দুজনেই চাকরি করেন), মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) মো. মাহমুদুল হোসাইন খানের এক ছেলে, পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেনের এক ছেলে এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্তসচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিনের এক মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। এ ছাড়া মৎস্য ও প্রাণিসম্পদসচিব ড. নাহিদ রশীদের এক মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন।

পররাষ্ট্রসচিবের এক মেয়ে কানাডায় এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্তসচিবের এক ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদসচিবের এক মেয়ে ভারতে আছেন।

জানতে চাইলে গণপূর্তসচিব কাজী ওয়াসি উদ্দিন গতকাল বুধবার নিজ দপ্তরে আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে দেশের বাইরে আছে। তাঁরা পড়াশোনা করতে গেছে।’

সন্তানের বিষয়ে কথা বলতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) মো. মাহমুদুল হোসাইন খানের ব্যক্তিগত মোবাইলে ফোন করে বন্ধ পাওয়া যায়। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব শেখ মোহাম্মদ সলীম উল্লাহর ব্যবহৃত দুটি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করলেও ধরেননি।

সংস্কৃতিসচিব মো. খলিল আহম্মেদ বলেন, ‘আমার ছেলে দুই বছর সাত মাস আগে স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকা গেছে। ছেলে মূলত পড়াশোনা করছে।’ 

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মশিউর রহমান বলেন, ‘আমার ছেলে এক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করতে গেছে।’

দায়িত্বশীল সংস্থার প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, কানাডায় বসবাস করছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব সোলেমান খানের দুই ছেলে, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের সচিব মো. আজিজুর রহমানের এক মেয়ে। যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন নৌপরিবহনসচিব মো. মোস্তফা কামালের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) আবদুল বাকীর এক ছেলে স্ত্রীসহ নিউজিল্যান্ডে এবং পরিকল্পনা কমিশনের আরেক সদস্য (সচিব) এ কে এম ফজলুল হকের এক ছেলে ফিনল্যান্ডে পড়াশোনা করছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) নির্বাহী চেয়ারম্যান (সচিব) নাসরীন আফরোজের এক ছেলে এবং পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব ড. শাহনাজ আরেফিনের এক ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করছেন।

এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন রেলপথসচিব ড. মো. হুমায়ুন কবীরের এক ছেলে, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন সচিব ড. ফারহিনা আহমেদের এক ছেলে ও এক মেয়ে এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদসচিব মো. মইনুল কবিরের এক মেয়ে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব শরিফা খানের এক ছেলে কানাডায় ও আরেক ছেলে পোল্যান্ডে বাস করছেন।

এস আলমের আবেদন

পত্রিকা কী নিউজ প্রকাশ করবে, এমন আশঙ্কা থেকে কী নিষেধাজ্ঞা দেব: চেম্বার বিচারপতি

১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

এক শুনানিতে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম বলেছেন, পত্রিকাগুলো কী নিউজ প্রকাশ করবে, কী করবে না, এমন আশঙ্কা থেকে কী নিষেধাজ্ঞা দেব? এস আলম গ্রুপের মালিক মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তাঁর স্ত্রী ফারজানা পারভীনের বিদেশে সম্পদের বিষয়ে সংবাদ, বিবৃতি, মতামত ও অনলাইনে কোনো ভিডিও প্রকাশ বা সম্প্রচারের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে করা আবেদনের শুনানিতে বৃহস্পতিবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম আবেদনকারীদের আইনজীবীর উদ্দেশে এ প্রশ্ন রাখেন।

শুনানিতে আবেদনকারীদের আইনজীবী আজমালুল হোসেন কেসি বলেন, তাইওয়ান পর্যন্ত চলে গেছে। সেখানকার একটি মিডিয়ায় প্রতিবেদন এসেছে। তখন আদালত বলেন, কেউ যদি নিউজ করে, তাহলে কীভাবে বিরত রাখবেন? আদালতের আদেশ লঙ্ঘন করে কোনো সংবাদ বা প্রতিবেদন করলে সেজন্য আলাদা কার্যধারা আছে। আর এখন পত্রিকাগুলো কী নিউজ প্রকাশ করবে, কী নিউজ প্রকাশ করবে না—এমন আশঙ্কা থেকে কী নিষেধাজ্ঞা দেব? এমনও দেখছি না যে আদালতের স্থিতাবস্থা বা ওই বিষয়বস্তু সম্পর্কে লিখেছে। 

গত ৪ আগস্ট দ্য ডেইলি স্টারে ‘এস আলমস আলাদিনস ল্যাম্প’ (এস আলমের আলাদিনের চেরাগ) শিরোনামে প্রতিবেদন ছাপা হয়। এটি আদালতের নজরে আনেন আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক। এরপর ৬ আগস্ট হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত রুল দিয়ে অনুমতি ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগ বা অর্থ স্থানান্তর নিয়ে এস আলম গ্রুপের মালিক ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে ওই প্রতিবেদনে আসা অভিযোগ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দিতে আদেশ দেন হাইকোর্ট। এই আদেশের বিরুদ্ধে এস আলম ও তাঁর স্ত্রী আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করেন। গত ২৩ আগস্ট আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত বিষয়বস্তু সম্পর্কে সব পক্ষকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে আদেশ দেন। একই সঙ্গে আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে লিভ টু আপিলটি শুনানির জন্য আগামী ৮ জানুয়ারি দিন ধার্য করেন। এরপর নিষেধাজ্ঞা চেয়ে ১২ সেপ্টেম্বর আবেদনটি করেন এস আলম ও তার স্ত্রী। এদিন আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী রোকন উদ্দিন মাহমুদ, আজমালুল হোসেন কেসি ও মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ মামুন। দুদকের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খুরশীদ আলম খান।

‘নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার মতো প্রাথমিক উপাদান কিছু দেখছি না’

সৈয়দ সায়েদুল হকের দেওয়া বক্তব্য তুলে ধরে শুনানিতে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আজমালুল হোসেন কেসি বলেন, এস আলম সম্পর্কে একটা অভিযোগ এসেছে, বিষয়টি বিচারাধীন। বিচারাধীন বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এ নিয়ে একটি মিডিয়া-ট্রায়াল হচ্ছে।

আদালত বলেন, আপনি যাদের (গণমাধ্যম) বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা চাইলেন, তারা কেউ স্বতঃপ্রণোদিত রুলের পক্ষ নয়। লিভ টু আপিলেও পক্ষ নয়। যারা পক্ষ নয়, তাদের ক্ষেত্রে বিরত রাখার আদেশ কীভাবে দেব?

এক পর্যায়ে আজমালুল হোসেন কেসি বলেন, প্রধানত দরকার ডেইলি স্টারের বিষয়ে। আদালত বলেন, ডেইলি স্টার, ডেইলি স্টারের কথা ছাপিয়েছে। আপনি আপনার কথা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে ছাপিয়েছেন। নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার মতো প্রাইমাফেসি (প্রাথমিক উপাদান) কিছু দেখছি না যে এদের (গণমাধ্যম) বিরত রাখতে হবে। স্থিতাবস্থার আদেশের পর তারা কোনো নিউজ করেছে কি না? মিডিয়া ট্রায়াল হয় বলছেন বা বিচার বিঘ্নিত হতে পারে—এমন কোনো উপাদান দেখছি না।

একাধিক মামলার প্রসঙ্গ টেনে আজমালুল হোসেন কেসি বলেন, বিরত রাখার নির্দেশনা চাওয়া হচ্ছে, এই কারণে যে নিউজ করে জনগণকে ধারণা দিতে। হাইকোর্টে যেতে পারছি না। কারণ, স্থিতাবস্থার আদেশ আছে। মিডিয়া ট্রায়াল রোধে চাচ্ছি।

‘রায় পক্ষে গেলে ঐতিহাসিক, বিপক্ষে গেলে ফরমায়েশি’

শুনানির এই পর্যায়ে আদালত বলেন, ‘সবাই আমরা ট্রায়ালের শিকার। এখন বিচারকেরা আদেশ দিলেও যার পক্ষে যায়, তিনি বলেন রায়–আদেশ ঐতিহাসিক। যার বিপক্ষে যায়, উনি বলেন ফরমায়েশি। প্রতিক্রিয়া যে যার যার মতো করে বলে। ফেসবুকেও দিচ্ছে। এসব বিষয়ে আমরা অসহায় অবস্থায় আছি। আপনারা বারের (আইনজীবী সমিতির) জ্যেষ্ঠ সদস্য, আপনাদের দায়িত্ব আছে, সকলেরই দায়িত্ব আছে, আদালতের মর্যাদা ও আদালতে আদেশ সমুন্নত রাখা।’

আইনজীবীর উদ্দেশে আদালত বলেন, ‘ফলোআপ যদি কিছু থাকত, যদি দেখতাম এটির ওপর এখনো বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছে। স্থিতাবস্থার আদেশের পরে নানা কথাবার্তা হচ্ছে—তাহলে এক রকম কথা ছিল।’

আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণের হার ২৫%

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

আলোচিত প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের অনিয়মের জের এখনো টানছে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। তাঁর মালিকানা আছে এমন চার আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণের হার অত্যন্ত উঁচু। আবার তাঁর প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত অন্য প্রতিষ্ঠানেও বাড়ছে খেলাপি ঋণ। এর প্রতিফলন দেখা গেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের সার্বিক চিত্রে। ফলে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ২৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, বছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশের ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ২৬টিতেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এর মধ্যে ১৬টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশের বেশি। এদের মধ্যে ৬টির অবস্থা বেশ নাজুক। এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ৮০ থেকে ৯৯ দশমিক ৬২ শতাংশ পর্যন্ত। তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণ অপরিবর্তিত আছে, কমেছে ৬টিতে।

যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণ ৮০ শতাংশের বেশি, সেগুলো হলো পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেড, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেড ও ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। এর মধ্যে প্রথম চারটি প্রতিষ্ঠানে মালিকানা আছে পি কে হালদারের। আবার এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ টাকা তিনি নামে-বেনামে তুলে নিয়েছেন, যা এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে।

পি কে হালদার ছিলেন আভিভা ফাইন্যান্স (সাবেক রিলায়েন্স ফাইন্যান্স) ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এই দুটি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন। পি কে হালদার এই পদে থেকেই অন্য চার প্রতিষ্ঠানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

অ্যাননটেক্সের বন্ধ কারখানায় ইসলামী ব্যাংকের ৭০০ কোটি টাকা ঋণ

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

জনতা ব্যাংকের আলোচিত গ্রাহক অ্যাননটেক্স গ্রুপের এক বন্ধ প্রতিষ্ঠানের জন্য ৭০০ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করেছে তারল্যসংকটে থাকা ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। ঋণ পাওয়া প্রতিষ্ঠানটি হলো শব মেহের স্পিনিং মিলস লিমিটেড। ইতিমধ্যে এই ঋণ থেকে চলতি মাসের প্রথম ২ দিনে ১৪০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটির কারখানা নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার সাধারচর ইউনিয়নের তাতারকান্দী গ্রামে। গত মঙ্গলবার কারখানায় গিয়ে জানা যায়, কারখানাটি এক বছর ধরে বন্ধ আছে।

 ব্যাংকটির নির্বাহী কমিটির (ইসি) ১৯৯৭তম সভায় এই ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এই সভা হয়েছে গত ২৪ আগস্ট। ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আহসানুল আলম নিজেই ব্যাংকটির নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান। তিনি এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমের ছেলে। ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয় এস আলম গ্রুপ। নানা অনিয়মের কারণে গত বছরের ডিসেম্বরে ব্যাংকটিতে যাকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, তিনিও ওই সভায় যোগ দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

গত জুলাই থেকে ইসলামী ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকদের (ব্রাঞ্চ ম্যানেজার) ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়। এমনকি বিভাগীয় ও জোনপ্রধানদেরও ঋণ অনুমোদনের ক্ষমতা বন্ধ করা হয়। তবে কৃষি খাতে তাঁদের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা বহাল রাখা হয়েছে। ব্যাংকটির মোট ঋণের মাত্র ৩ শতাংশ কৃষিতে। এরপরই ব্যাংকটির পরিচালকেরা নতুন এই ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

জানতে চাইলে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাংকের ইসি সভায় প্রতিষ্ঠানটির ঋণ অনুমোদন হয়েছে। বন্ধ কোম্পানিতে ঋণ দেওয়ার কারণ ও ঋণের অর্থ ইতিমধ্যে তুলে নেওয়া বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো জবাব দিতে রাজি হননি।

এদিকে ইসলামী ব্যাংক এখনো আমানতের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকে চাহিদামতো নগদ জমা (সিআরআর) ও বিধিবদ্ধ জমা (এসএলআর) রাখতে পারছে না। এ জন্য প্রতিদিন জরিমানা হলেও জরিমানার টাকা দিতে পারছে না ব্যাংকটি। এ অবস্থায় মাঝেমধ্যে টাকা ধার দিয়ে ইসলামী ব্যাংকের চেক ক্লিয়ারিং ও অনলাইন লেনদেনব্যবস্থা সচল রাখছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে বন্ধ প্রতিষ্ঠানে নতুন করে ঋণ দেওয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।

ঋণ অনুমোদন যেভাবে

জানা যায়, শব মেহের স্পিনিং মিলস লিমিটেড মূলত জনতা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে গড়ে ওঠা একটি কারখানা। গত বছর পর্যন্ত ব্যাংকটিতে প্রতিষ্ঠানটির ঋণ ছিল প্রায় ১৮০ কোটি টাকা। জনতা ব্যাংকের বড় গ্রাহকদের একজন অ্যাননটেক্স গ্রুপ। গত বছরের নভেম্বরে অ্যাননটেক্সের ঋণের ৩ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকা সুদ মওকুফ করার সিদ্ধান্ত নেয় জনতা ব্যাংক। জুন মাসের মধ্যে অ্যাননটেক্সকে ৪ হাজার ৮২০ কোটি টাকা শোধ করার শর্ত দেওয়া হয়। তবে গ্রুপটি এতে ব্যর্থ হয়। এরপর জনতা ব্যাংকের বোর্ডের পরিচালনা পর্ষদ গত ২৫ জুলাই ঋণটি শোধের জন্য চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেয়। তবে এবার নতুন শর্ত হিসেবে অ্যাননটেক্সকে তাদের দুটি প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রাপ্য অর্থ জনতা ব্যাংকে জমা দিতে বলা হয়।

গত ২৪ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় অ্যাননটেক্সের প্রতিষ্ঠান শব মেহের স্পিনিং মিলস লিমিটেডের ৭০০ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করা হয়। এর মধ্যে ৫০০ কোটি টাকা নন–ফান্ডেড (ঋণপত্র, গ্যারান্টি) ও ২০০ কোটি টাকা ফান্ডেড (সরাসরি ঋণ)। এর আগে ১৬ জুলাই ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়সংলগ্ন ফরেন এক্সচেঞ্জ করপোরেট শাখায় শব মেহের স্পিনিং মিলসের নামে হিসাব খোলা হয়। এই হিসাবে জমা হওয়া ঋণের অর্থ থেকে ৫ সেপ্টেম্বর ৩ দফায় ৭০ কোটি টাকা ও ৭ সেপ্টেম্বর ৪ দফায় ৭০ কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়। ব্যাংকটি মুরাবাহা টিআর পদ্ধতিতে এই ঋণ বিতরণ করে। যার মাধ্যমে কোনো পণ্য কেনার জন্য ঋণ ছাড় করা হয়। তবে বাস্তবে কোনো পণ্য কেনার তথ্য পাওয়া যায়নি।

ইসলামী ব্যাংকের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা বলছেন, অ্যাননটেক্সের কিছু কোম্পানি কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে এস আলম গ্রুপ। এই কারণে ঋণটি তড়িঘড়ি করে ছাড় করা হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মে এক ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে অন্য ব্যাংকের ঋণ শোধ দেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই।

জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল জব্বার গত বুধবার তাঁর কার্যালয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘অ্যাননটেক্স গ্রুপের ঋণ পুনঃ তফসিল করা আছে। জুন পর্যন্ত এর মেয়াদ ছিল, যা ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। গ্রুপটি তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো বিক্রির চেষ্টা করছে বলে শুনেছি। আমরাও দুটি প্রতিষ্ঠান বিক্রি করার অনুমতি দিয়েছি। বিক্রি করতে হলে আমাদের সব ঋণ শোধ করে দিতে হবে। এখন পর্যন্ত কোনো টাকা পাইনি।’

টাকা দিলেই মাদক ব্যবসা করতে দেবেন ওসি, অডিও ফাঁস!

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩, যুগান্তর

পাঁচ লাখ টাকা দিলেই মাদক ব্যবসা করতে দেবেন রাজশাহীর চারঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুল আলম। শুধু তাই নয়, আরও ২ লাখ টাকা দিলে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার ওসিকে বদলির ব্যবস্থা করবেন তিনি।

এক ‘মাদক ব্যবসায়ীর’ স্ত্রীর সঙ্গে আলাপের এমন অডিও রেকর্ড ফাঁস হয়েছে।

এ ঘটনায় শনিবার রাজশাহীর এসপি বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী ওই নারী। অভিযোগের অনুলিপির সঙ্গে ৬ মিনিটি ৫৩ সেকেন্ডের কথোপকথনের অডিও রেকর্ডও পেনড্রাইভে সরবরাহ করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে রাজশাহীর পুলিশ সুপার (এসপি) সাইফুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি লিখিত অভিযোগ ও অডিও রেকর্ড পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। এসপি বলেন, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করবেন। গুরুতর কিছু হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে ওসি তার কোয়ার্টারের শয়নকক্ষে ডেকে নিয়ে সাহারা বেগম (২৮) নামে ওই নারীর কাছে ৫ লাখ টাকা দাবি করেন। এ ঘটনার পর থেকে ভয়ে বাড়ি ছাড়া ওই গৃহবধূ।

গৃহবধূ সাহারা বেগম চারঘাট থানার চামটা গ্রামের আব্দুল আলিম কালুর স্ত্রী। মাদক মামলায় গ্রেফতার হয়ে কালু বেশ কিছুদিন ধরে কারাগারে। জেলা ডিবি পুলিশের ওসি তাকে গ্রেফতার করেছিলেন। কালু গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে শলুয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড থেকে সদস্য পদে নির্বাচন করেন। এতে স্থানীয় প্রতিপক্ষের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। এর জেরে মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন সাহারা বেগম।

লিখিত অভিযোগে সাহারা বলেছেন, গত ১৩ সেপ্টেম্বর থানায় চাঁদাবাজির অভিযোগ করতে গেলে গৃহবধূ সাহারা বেগম ও তার ছেলে রাব্বিকে নিজের শয়নকক্ষে ডেকে নেন ওসি মাহবুবুল আলম। প্রথমে ওসি তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে নেন। এরপর কথা বলতে শুরু করেন।

ফাঁস হওয়া ওই অডিও রেকর্ডে ওসি মাহবুবুল আলমকে বলতে শোনা যায়, ‘নির্বাচন করতে মন্ত্রী আমাকে গাইবান্ধা থেকে এখানে নিয়ে এসেছেন। আমি তার কথা ছাড়া কারও কথা শুনি না।’

চারঘাট এলাকায় গিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের ধরে মামলা দেওয়ার কারণে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসির সমালোচনা করেন তিনি। এরপর বলেন, ‘দুই লাখ টাকা দেন, কালকেই ডিবির ওসিকে বদলি করে দেব।’

এরপর গৃহবধূ সাহারা বেগমকে ওসি বলেন, ‘আপনার স্বামী আমার অনেক ক্ষতি করে গেছে (ওসির বিরুদ্ধে এসপি অফিসে অভিযোগ করেছিলেন)। এবার আপনার পরিবারের কাউকে ধরলে ১০ লাখ টাকার কমে ছাড়াতে পারব না।’

এরপর ওসি বলেন, ‘এখনো তোমার গায়ে আঁচড় দেইনি। বহুত ফাঁকি দিয়েছ। কালকে ৫ লাখ টাকা নিয়ে আসবা। এখন সেরকম সময় নয় যে কেউ পয়সা খায় না। সবাই পয়সা খাচ্ছে। এমন কেউ বাদ নেই যে পয়সা খাচ্ছে না। পুরো জেলা পয়সা খাচ্ছে। এখানে আমার থানা চালাতে মাসিক অনেক টাকা লাগছে। আমি স্যারকে কথা দিয়ে এসেছি। স্যারকে বলেছি, এখানে মাদক ছাড়া কিছু নেই।’

ওসি আরও বলেন, ‘মুক্তা (চারঘাটের মাদক সম্রাট নামে পরিচিত) অ্যাকশন নিতে পারবে না, শুভ (ছাত্রলীগ নেতা ও মাদক কারবারি) অ্যাকশন নিতে পারবে না। তোমরা ৫ লাখ টাকা দিতে পারবা? ধরে ওদের চালান দিয়ে দেব। থাকি না থাকি ওদের সাইজ করব। তোমরা বাইরে থেকে ব্যবসা (মাদক ব্যবসা) করবে।’

জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি আতিকুর রেজা সরকার আতিকের আবারও সমালোচনা করে ওসিকে বলতে শোনা যায়, ‘নির্বাচনের আগে শুভকে ধরতে পারব না। কথা সব ভেঙে বলব না। কথা সব হয়ে গেল; যদি আতিকের বদলি চাও ২ লাখ টাকা দাও। কালকেই আতিকের বদলি হয়ে যাবে।’

চারঘাট থানার ওসি মাহবুবুল আরও বলেন, ‘৫ লাখ আর ২ লাখ ৭ লাখ টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করো। আতিক বাদ, ওই দুইজনকে (মুক্তা ও শুভ) ট্যাকেল দেওয়ার দায়িত্ব আমার। নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পরে মন্ত্রীকে বলে ওই দুইজনকে ধরে অ্যারেস্ট করে চালান করে দেব। আমার সব ওপরের লাইন। যে টাকা দিবা এই টাকাই ওপরে কাজ করবে।’

‘বালুখেকো’ চেয়ারম্যান সেলিম খানকে ২৬৭ কোটি টাকা দিতে ডিসির চিঠি

২০ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

‘বালুখেকো’ চেয়ারম্যান সেলিম খানকে সরকারি কোষাগারে ২৬৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকা জমা দিতে বলেছে চাঁদপুর জেলা প্রশাসন। ৪ সেপ্টেম্বর এক চিঠিতে অনতিবিলম্বে এই টাকা জমা দিতে বলা হলেও আজ বুধবার পর্যন্ত কোনো টাকা জমা দেননি তিনি।

উচ্চ আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে চাঁদপুরের পদ্মা ও মেঘনার ডুবোচর থেকে ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বালু তোলার বিপরীতে (র‌য়্যালটি আদায়) ওই টাকা দিতে বলা হয়। জেলা প্রশাসনের চিঠিতে বলা হয়, সরকারি কোষাগারে টাকা জমা না দিলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

সেলিম খান সরকারি কোষাগারে টাকা জমা দিয়েছেন কি না, জানতে সন্ধ্যায় চাঁদপুরের জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রথম আলো। জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান বলেন, ‘এখনো টাকা জমা দেননি তিনি (সেলিম খান)।’

সেলিম খান চাঁদপুর সদর উপজেলার ১০ নম্বর লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। তিনি মেসার্স সেলিম এন্টারপ্রাইজের মালিক। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি পদ্মা ও মেঘনার ডুবোচর থেকে বালু তুলেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করার অভিযোগ রয়েছে। সেলিম খানের এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে গত বছরের ২ মার্চ প্রথম আলোতে ‘বালুখেকো’ চেয়ারম্যান তিনি শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

সেলিম খানকে চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের দেওয়া চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২২ সালের আগস্ট মাসে জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় চার বছরে সেলিম খানের প্রতিষ্ঠান মেসার্স সেলিম এন্টারপ্রাইজ কী পরিমাণ বালু তুলেছে, এর বিপরীতে সরকারি কোষাগারে কত টাকা জমা দিতে হবে, তা নির্ধারণ করতে একটি উপকমিটি গঠন করা হয়। বিভিন্ন জরিপ ও প্রযুক্তির মাধ্যমে উপকমিটি চার বছরে সেলিম খান কী পরিমাণ বালু তুলেছেন, তা নির্ধারণ করে।

চিঠিতে বলা হয়, ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ২১টি মৌজা থেকে সেলিম খান ৬৬৮ কোটি ৩৩ লাখ ২৯ হাজার ৫৮৫ ঘনফুট বালু তুলেছেন। হাইকোর্ট বিভাগের একটি রিট আবেদনের রায়ের ভিত্তিতে প্রতি ঘনফুট বালুর বিপরীতে ৪০ পয়সা রাজস্ব নির্ধারণ করা হয়। এই হিসাবে ২৬৭ কোটি ৩৩ লাখ ৩১ হাজার ৮৩৪ টাকা জমা দিতে বলেছে জেলা প্রশাসন।

সুদসহ জলবায়ু তহবিলের ৮২৭ কোটি টাকা আটকে আছে ফারমার্স ব্যাংকে

সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৩, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের জমা করা ৫৩৮ কোটি টাকা সুদসহ ২০১৬ সালে ফেরত দেওয়ার কথা ছিল তৎকালীন ফারমার্স ব্যাংকের। কিন্তু এর সাত বছর পর এখন পর্যন্ত পাওয়া গেছে ৭৪ কোটি টাকা।

সহসাও এই অর্থ ফেরত পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ গত বছরের ডিসেম্বরে ব্যাংকটিকে অর্থ ফেরত দিতে আরও আট বছর সময় দিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। ফারমার্স ব্যাংক নাম পাল্টে বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক হিসেবে আছে।

গত ডিসেম্বরে হওয়া বৈঠকে উপস্থিত একটি সূত্র দ্য ডেইলি স্টারকে জানায়, আমানত ফেরত দিতে আরও ১৫ বছর সময় চাওয়া হলেও পরিবেশমন্ত্রী পদ্মা ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ২০৩০ সালের মধ্যে টাকা ফেরত দিতে বলেছেন।

সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি পরিবেশমন্ত্রী শাহাব উদ্দিন।

পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এই ট্রাস্টের কর্মকর্তারা জানান, তারা এই অর্থ ২০১৫ সালে ফারমার্স ব্যাংকে এক বছরের জন্য ফিক্সড ডিপোজিট করেছিলেন। অর্থাৎ ২০১৬ সালে ব্যাংকটির এই অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা ছিল।

ব্যাংকটির মতিঝিল, গুলশান ও গুলশান অ্যাভিনিউ শাখায় এ টাকা জমা দেওয়া হয়।

এক কর্মকর্তা জানান, ৯ শতাংশ সুদসহ এখন ব্যাংকটির কাছে মোট পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮২৭ কোটি টাকা।

গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি না পাওয়া ওই কর্মকর্তা বলেন, গত সাড়ে সাত বছরে ব্যাংকটি ৭৪ কোটি টাকা ফেরত দিয়েছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০ বছরেরও বেশি সময় সময় নেওয়ার পাশাপাশি ফারমার্স ব্যাংক ও ট্রাস্টের সম্মতি অনুযায়ী ৯ শতাংশ সুদে নয়, ৬ শতাংশ সুদে অর্থ পরিশোধ করতে চায় ব্যাংকটি।

১১ বছরে একক ঠিকাদারের দরপত্রে ৬০ হাজার কোটি টাকার কার্যাদেশ

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

কেবল একজন ঠিকাদার অংশ নিয়েছিলেন, এমন দরপত্রের মাধ্যমে গত ১১ বছরে ৬০ হাজার ৬৯ কোটি টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। ই-জিপি ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব দরপত্রের প্রতিটিতে একজন ঠিকাদার অংশ নিয়েছিলেন এবং সেই ঠিকাদারই কাজ পেয়েছিলেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) মনে করছে, এ ধরনের চর্চায় দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়ে।

টিআইবির ‘বাংলাদেশে ই-সরকারি ক্রয়: প্রতিযোগিতামূলক চর্চার প্রবণতার বিশ্লেষণ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। ওই গবেষণায় দেখা গেছে, গত ১০ বছরে প্রতি পাঁচটি দরপত্রের একটি একক দরপত্রের ভিত্তিতে হয়েছে।

এই গবেষণা করতে নেতৃত্ব দেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের সমন্বয়ক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। অন্য দুজন গবেষক টিআইবির রিফাত রহমান ও কে এম রফিকুল আলম।

গবেষণা প্রতিবেদনে কাজের ভিত্তিতে একক দরপত্রপ্রবণ শীর্ষ ১০টি ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের তালিকাও দেওয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে নোয়াখালী সদর উপজেলার প্রকৌশল অফিস; হবিগঞ্জের বিপিডিবির বিক্রয় ও বিপণন বিভাগ-৫; সোনাইমুড়ী পৌরসভা; চট্টগ্রামের বিপিডিবির বিক্রয় ও বিপণন বিভাগ-৫; মাধবদী পৌরসভা; গৌরনদী পৌরসভা; ফেনীর পৌরসভা বিভাগ; সিলেটের বিপিডিবির বিক্রয় ও বিপণন বিভাগ-৫; সিলেটের বিপিডিবির বিক্রয় ও বিপণন বিভাগ-৩।

একইভাবে টাকার অঙ্কে একক দরপত্রে কাজ পাওয়া শীর্ষ ঠিকাদার হলো ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড, নাভানা লিমিটেড, মেসার্স আহসান এন্টারপ্রাইজ, ক্রিয়েটিভ ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড, র‍্যাংগস লিমিটেড, মেসার্স এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স ফন ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স বকলি এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স ভূঁইয়া বিল্ডার্স ও মেসার্স তেলিখালী কনস্ট্রাকশন। গবেষণায় এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক কারা, তা বলা হয়নি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ফেনী ও নোয়াখালী জেলা সবচেয়ে বেশি একক দরপত্রপ্রবণ এলাকা। সেখানে প্রতি দুটি কার্যাদেশের মধ্যে একটি একক দরপত্রে দেওয়া হয়েছে। এরপরে আছে কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জ। এই তালিকায় ঢাকার অবস্থান পঞ্চম।

১ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণের রেকর্ড

অক্টোবর ১, ২০২৩, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

দেশের ব্যাংকিংখাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এ বছরের জুন পর্যন্ত ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্যাংকিংখাতে করপোরেট সুশাসনের অভাবে খেলাপি ঋণ এই রেকর্ড পর্যায়ে এসেছে।

গত এপ্রিল, মে ও জুন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২৪ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত মোট খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩৯ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ১০ দশমিক ১১ শতাংশ।

২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকিংখাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ৪২ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা।

সিডিএর প্রকল্প মানেই বিদেশে ‘আনন্দ ভ্রমণ’

০৩ অক্টোবর ২৩, সমকাল

আবাসন সংকট নিরসনে ২০১৭ সালে ‘অনন্যা আবাসিক এলাকার উন্নয়ন (দ্বিতীয় পর্যায়)’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। প্রকল্পটির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা সফর করেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিবসহ ৫ কর্মকর্তা। এতে সিডিএর ব্যয় হয় ১ কোটি ৮ লাখ ৮৪ হাজার টাকার বেশি। অথচ সিডিএ এখন বলছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নযোগ্য নয়! প্রকল্পটি বাতিল করতে চিঠিও পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ে।

এভাবে সিডিএর ছয়টি প্রকল্পের অধীনে ৩৪ জনের বিদেশ সফরের তথ্য মিলেছে সমকালের অনুসন্ধানে, যাদের ২৩ জনই প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নন। বিদেশ সফরকারীর ওই তালিকায় রয়েছেন সিডিএর বোর্ড সদস্য, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি। তারা যুক্তরাষ্ট্র-কানাডাসহ ১৪টি দেশ সফর করেন। এসব সফরের খরচ বহন করে সিডিএ এবং পরামর্শক ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

দক্ষিণ এশিয়ায় খেলাপি ঋণের হার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাংলাদেশে

০৩ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে খেলাপি ঋণের হার কমলেও বাংলাদেশে বাড়ছে। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে দুর্দশায় থাকা শ্রীলঙ্কায় খেলাপি ঋণের হার বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। অন্য দেশগুলোতে কম। এমনকি পাকিস্তানেও খেলাপি ঋণের হার বাংলাদেশের চেয়ে কম। সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় খেলাপি ঋণের হার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাংলাদেশে।

বাংলাদেশ ব্যাংক গত রোববার খেলাপি ঋণের হালনাগাদ পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, দেশে খেলাপি ঋণ দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। জুন শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩৯ কোটি টাকা, যা এপ্রিল-জুন সময়ে ২৪ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা বেড়েছে।

বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে মোট ঋণের ১০ দশমিক ১১ শতাংশ। অর্থনৈতিক সংকটে থাকা শ্রীলঙ্কায় খেলাপি ঋণের হার ১৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। পাকিস্তানে তা ৭ দশমিক ৪ শতাংশ।

ভারতে খেলাপি ঋণের হার অনেক কম। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) ভারতে খেলাপি ঋণের হার ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) ধারণা হলো, ভারতে আগামী বছর খেলাপি ঋণের হার ৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসবে।

বিওপির হদিসবিহীন লেনদেনের তথ্যে পুঁজি পাচারের প্রতিফলন

অক্টোবর ০৫, ২০২৩, বণিক বার্তা

দেশে ২০২১-২২ অর্থবছর শেষে বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যের (ব্যালান্স অব পেমেন্ট বা বিওপি) ঘাটতি ছিল ৬৬৫ কোটি ডলারের বেশি। গত অর্থবছর (২০২২-২৩) শেষে তা ৮২২ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়। এ ঘাটতি হিসাবের সময় ভুলভাবে উপস্থাপিত, একপাক্ষিক বা বাদ পড়া লেনদেনের (নিট এররস অ্যান্ড ওমিশনস বা এনইও) তথ্য সমন্বয় করতে হয়েছে ৩২২ কোটি ডলারের (ঋণাত্মক), যা ২০২২-২৩ অর্থবছরের মোট বিওপি ঘাটতির ৩৯ শতাংশেরও বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেও (জুলাই-আগস্ট) বিওপি ঘাটতির প্রায় ৪৭ শতাংশই ছিল এররস অ্যান্ড ওমিশনসজনিত।

গত অর্থবছর শেষে ব্যালান্স অব পেমেন্টের ঘাটতি দাঁড়ায় ইতিহাসের সর্বোচ্চে। এ ঘাটতির বড় অংশজুড়ে রয়েছে এররস অ্যান্ড ওমিশনস। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের ভাষ্যমতে, বৈদেশিক লেনদেনের আন্তঃ ও বহিঃপ্রবাহের হিসাবের সঙ্গে প্রকৃত ব্যালান্সের যে পার্থক্য পাওয়া যায়, সেটিকেই নিট এররস অ্যান্ড ওমিশনস হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। দীর্ঘ সময় এনইও ঋণাত্মক অংকে থাকলে এটিকে চিহ্নিত করা হয় সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে পুঁজি বের হয়ে যাওয়ার লক্ষণ হিসেবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কমিটি অন ব্যালান্স অব পেমেন্ট স্ট্যাটিস্টিক্সের ৩২তম বৈঠকে উপস্থাপিত নিট এররস অ্যান্ড ওমিশনস সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছিল, এনইও ঋণাত্মক পর্যায়ে নেমে আসার অর্থ হলো সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে সম্পদ বের হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নিট এররস অ্যান্ড ওমিশনসের অংকটি দীর্ঘদিন ধরেই ঋণাত্মক পর্যায়ে অবস্থান করছে। মোট বিওপিতে এর অংশটিও অনেক বড়। সে হিসেবে বলা চলে দেশে বিওপি ঘাটতির বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে ভুল বা বাদ পড়া লেনদেনের অংক, যার বড় একটি অংশের কোনো হদিস কারো কাছে নেই। ভুল বা বাদ পড়ে যাওয়ার এ পরিসংখ্যানকে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার বেড়ে যাওয়ার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। একই কথা উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের এক পর্যবেক্ষণেও। সংস্থাটির চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনের অক্টোবর সংস্করণের ভাষ্যমতে, এনইও পরিসংখ্যানে মিসইনভয়েসিংসহ (বৈদেশিক বাণিজ্যে আমদানি-রফতানির প্রকৃত তথ্য আড়াল) অবৈধ নানা পন্থায় পুঁজি পাচারের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বলে প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন গবেষণায় ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। আবার বিনিময় হারে ওঠানামার কারণে রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাপ্য অর্থ প্রত্যাবাসন বিলম্বিত করার বিষয়টিও এক্ষেত্রে আংশিক ভূমিকা রাখতে পারে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ আরও বেড়েছে

অক্টোবর ৫, ২০২৩, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেড়েছ। ফলে, চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ রেকর্ড ছুঁয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, এ বছরের জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৭৪ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা, যা তিন মাস আগের চেয়ে ২৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেশি। তিন মাস আগে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ৫৭ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা।

এতে জুনে শেষ হওয়া প্রান্তিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত তাদের মোট ঋণের ২৫ দশমিক ০১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

এই সময়ে বেসরকারি ব্যাংক ও বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋনের পরিমাণ ও  বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোর ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ বেড়ে দেশে ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৪০ কোটি টাকা।

ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ এই খাতের মোট ঋণের ১০ দশমিক ১ শতাংশ, যা ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের পর সর্বোচ্চ এবং এ বছরের মার্চে ছিল ৮ দশমিক ৮ শতাংশ।

পি কে হালদারের ২২ বছরের জেল

০৮ অক্টোবর ২৩, সমকাল

অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের মামলায় গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এমডি প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারকে ২২ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে তাকে ৩৩৩ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। রোববার দুপুরে  ঢাকার ১০ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম এ রায় ঘোষণা করেন।

পি কে হালদারকে অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় ১০ বছর আর অর্থপাচারের মামলায় ১২ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী মীর আবদুস সালাম এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।

পি কে হালদারের দুর্নীতির নেপথ্যের ব্যক্তিরা অধরা

০৯ অক্টোবর ২৩, সমকাল

অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় দণ্ডিত প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পি কে হালদারের দুর্নীতির পেছনে যাদের হাত, তারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাঁর ক্ষমতার উৎস ছিল এক অদৃশ্য শক্তি। ওই শক্তির ছত্রছায়ায় ছিলেন পি কে হালদার।

তাদের নির্দেশেই তিনি গ্লোবাল ইসলামী (সাবেক এনআরবি গ্লোবাল) ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) পদ থেকে রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের এমডি ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের পরিচালকের দায়িত্ব নেন। সেখান থেকে তিনি পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের যাবতীয় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতেন।

পি কে হালদারের নির্দেশ ছাড়া ওই চার আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কোনো কাজ হতো না। অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান, ভুয়া কাগজপত্র ও জামানত ছাড়াই এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হয় হাজার হাজার কোটি টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পি কে হালদারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও তাঁর পেছনের শক্তিকে এখন পর্যন্ত খুঁজে বের করতে পারেনি। এ ব্যাপারে দুদকের একটি সূত্র জানায়, দৃশ্যমান রেকর্ডপত্র না থাকার কারণে অন্য কাউকে আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না।

অভিযোগ রয়েছে, জালিয়াতি করে অর্থ আত্মসাতের যাবতীয় ঘটনা জায়েজ করতে পি কে হালদার হাত করেছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তাকে। গ্রেপ্তার হওয়ার পর ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক এমডি রাশেদুল হক আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এই তথ্য দেন। পি কে হালদার তাঁর দুর্নীতির সহযোগী হিসেবে রাশেদুল হককে ওই প্রতিষ্ঠানের এমডি করেছিলেন।

খেলাপি ঋণের দায় নিয়ে এক দশকে দেশ ছেড়েছেন চট্টগ্রামের ৩৩ ব্যবসায়ী

অক্টোবর ১০, ২০২৩, বণিক বার্তা

ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে দেশের অগ্রসর অঞ্চলগুলোর একটি বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। ভোগ্যপণ্য, ইস্পাত, জাহাজ ভাঙা, সিমেন্ট, গার্মেন্টসহ বিভিন্ন ব্যবসায় পথপ্রদর্শক এখানকার অনেক ব্যবসায়ী। ব্যবসাও সামলিয়েছেন সুনামের সঙ্গেই। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে তাই ঋণ মিলেছে সহজেই। তবে গত এক দশকে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ না করে লাপাত্তা হয়েছেন চট্টগ্রামের অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ী। তাদের মধ্যে অন্তত ৩৩ জন দেশ ছেড়েছেন খেলাপি ঋণের দায় নিয়ে। কেউ আবার রয়েছেন আত্মগোপনে, কেউ কেউ ব্যাংকের দায় এড়াতে উত্তরসূরিদের দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন নামে বা কৌশলে ব্যবসা পরিচালনা করছেন।

বিদেশে ব্যবসা, চিকিৎসা, পর্যটন কিংবা অভিবাসনে শীর্ষে রয়েছে চট্টগ্রাম। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে ইউরোপ-আমেরিকায় এ অঞ্চলের মানুষের নিত্য যাতায়াত। গত দেড় দশকে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও পথ দেখিয়েছেন এখানকার ব্যবসায়ীরা। ঋণখেলাপি হয়ে তাদের অনেকেই ইউরোপ, আমেরিকা এবং মালয়েশিয়া, দুবাই, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে স্থায়ী আবাস গড়েছেন। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালতের অধিকাংশ মামলায় ঋণখেলাপিদের দেশে ফেরত আনা, দেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা কিংবা পাসপোর্ট জব্দের আদেশ আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা ও উদাসীনতায় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের শোকজের ঘটনাও বেড়েছে আগের চেয়ে অনেক বেশি।

সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, অর্থঋণ আদালত ও থানা সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের কাছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে গত এক দশকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ২০-২২ হাজার কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ না করেই দেশ ত্যাগ করেছেন অন্তত ২২ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ৩৩ ব্যবসায়ী। অর্থঋণ আদালত ও নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট (এনআই) অ্যাক্টে তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা। এর মধ্যে ১১ ব্যবসায়ী বর্তমানে কানাডা, সাতজন যুক্তরাজ্য, চারজন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তিনজন মালয়েশিয়া, দুজন তুরস্ক, একজন আরব আমিরাত, একজন অস্ট্রেলিয়া, একজন মন্টেনিগ্রো ও একজন সিঙ্গাপুরে আবাস গড়েছেন বলে জানা গেছে।

নিয়মের শিথিলতায় ব্যাংকে দুর্দশা আরও বেড়েছে

১১ অক্টোবর ২৩, সমকাল

বিভিন্ন ছাড় দিয়ে ব্যাংক খাতের আসল চিত্র আড়াল করার সুযোগ দিয়ে আসছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে নানা ছাড়ের পরও খেলাপি ঋণ বেড়ে রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে মূলধন ঘাটতি বেড়েছে। ঋণ চাহিদা কমার পরও প্রতিদিন কিছু ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং মুদ্রাবাজার থেকে বড় অঙ্কের ধার করতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বছরের পর বছর নীতি শিথিলতায় ব্যাংক খাতের দুর্দশা বেড়েছে। আর্থিক খাতের বেশির ভাগ সূচকের অবনতি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্যাংক খাতের সুস্থতা বোঝার সবচেয়ে বড় সূচক খেলাপি ঋণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর বিভিন্ন উপায় বের করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে খেলাপি ঋণ ৩৫ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা বেড়ে গত জুন শেষে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩৯ কোটি টাকা হয়েছে। মোট ঋণের যা ১০ দশমিক ১১ শতাংশ। কাগজ-কলমে খেলাপি ঋণ যতটুকু, প্রকৃত অবস্থা তার চেয়ে আরও খারাপ।

আইএমএফের শর্ত মেনে অবলোপন ও পুনঃতপশিলের পর আদায় না হওয়া ঋণকেও দুর্দশাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে। ২০২২ সাল পর্যন্ত ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা মোট ঋণের ২৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ ছিল দুর্দশাগ্রস্ত। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পুনঃতপশিল হয়েছে ১৪ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা। নতুন করে পুনঃতপশিল হওয়া ঋণ বিবেচনায় না নিলেও ব্যাংক খাতে চাপে থাকা ঋণ এখন ৪ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা মোট ঋণের প্রায় ২৭ শতাংশ। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত অবলোপন ও পুনঃতপশিলের পর আদায় না হওয়া ঋণস্থিতি ছিল ২ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকার বেশি।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সমকালকে বলেন, সর্বশেষ ২০২২ সালভিত্তিক প্রতিবেদনে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ দেখানো হয় ২৫ শতাংশের বেশি। এর পর চলতি বছর আরও ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ বেড়েছে। ছাড় না থাকলে খেলাপি ঋণ আরও বাড়ত। ঋণের টাকা ফেরত না এলে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতি হারায়। আবার প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যায়। এর ফলে মূলধন ঘাটতি বেড়ে যায়। বছর দুয়েক আগেও বেশির ভাগ ব্যাংকে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল। এখন তাতে ভাটা পড়েছে। এর একটি বড় কারণ ডলার বিক্রির বিপরীতে বাজার থেকে টাকা উঠে আসছে। আবার আস্থাহীনতার কারণে আমানত প্রবৃদ্ধি কমছে।

ব্যাংকাররা জানান, ঋণ পরিশোধে ঢালাও শিথিলতা এবং ব্যাপক ছাড় ব্যাংক খাতকে দুর্দশায় ফেলেছে। একসময় ১০ থেকে ৩০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে সর্বোচ্চ ৩৬ মাসের জন্য পুনঃতপশিল করা যেত। তবে গত বছর মাত্র আড়াই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে একটি ঋণ চার দফায় সর্বোচ্চ ২৯ বছরের জন্য পুনঃতপশিলের সুযোগ দেওয়া হয়। এর পর গত বছর আগের সব রেকর্ড ভেঙে ৬৩ হাজার ৭২০ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতপশিল হয়েছে। অবশ্য বিশেষ বিবেচনায় পুনঃতপশিলের সংস্কৃতি শুরু হয় ২০১৪ সাল থেকে। ওই বছর মাত্র ৫ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতপশিলের সুযোগ দেওয়া হয়। এর পরের বছর ৫০০ কোটি টাকার বড় ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়।

২০১৮ সালে আবার ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট নিয়ে ১২ বছরের জন্য পুনঃতপশিল করা হয়। এ রকম বিশেষ সুবিধার মধ্যে করোনার সংক্রমণ শুরু হয়। করোনা শুরুর পর ২০২০ সালে এক টাকা না দিলেও কাউকে আর খেলাপি করা হয়নি। পরের বছর যে পরিমাণ কিস্তি দেওয়ার কথা, কেউ ১৫ শতাংশ দিলে নিয়মিত দেখানোর সুযোগ পেয়েছে। ২০২২ ও ২০২৩ সালে কিস্তির অর্ধেক দিলেই নিয়মিত দেখানো যাচ্ছে। এভাবে ব্যাংক খাতের আসল চিত্র আড়ালে আছে।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এসব বিষয় উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতের পীড়িত বা দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ ঊর্ধ্বমুখী। প্রভিশন সংরক্ষণের হারও কম। গত মার্চ পর্যন্ত খেলাপি ঋণের মাত্র ৫৮ শতাংশের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয়েছে। মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত কমেছে। নিয়মকানুন শিথিল এবং দুর্বল তদারকির কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রির বিপরীতে বড় অঙ্কের টাকা উঠে আসা, আমানতে নিম্ন প্রবৃদ্ধি, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন ব্যাংকে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের ফলে অনেক ব্যাংকে আমানত কমেছে। এসব ব্যাংক তারল্য সংকটে পড়েছে।

তিন লাখ কোটি টাকার অডিট আপত্তি

১৪ অক্টোবর ২, সমকাল

রাষ্ট্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘অনিষ্পন্ন’ অডিট আপত্তির সংখ্যা খুব একটা কমছে না। অন্যদিকে এসব অডিট আপত্তিতে জড়িত অর্থের পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। গত মার্চ শেষে যা ছাড়িয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫৮ শতাংশই আবার ‘অগ্রিম আপত্তি’ বা গুরুতর অনিয়ম সম্পর্কিত।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের আওতায় থাকা এসব প্রতিষ্ঠানে এমন প্রবণতা উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, নিয়মকানুন পরিপালনে ব্যত্যয় ঘটলেই অডিট আপত্তি ওঠে। আর অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তিতে জড়িত অর্থের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার মানে হচ্ছে, সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হচ্ছে না। এ ছাড়া দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি ও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে দুর্নীতি-অনিয়ম ও অপচয় আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সড়কের ৫১% কাজ পেয়েছেন ‘প্রভাবশালীদের ঘনিষ্ঠ’ ৫ ঠিকাদার

১৪ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের ঠিকাদারি কাজের অর্ধেক পেয়েছে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান। সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে হিসাবে হারটি ৫১ শতাংশ। যদিও সড়ক ও জনপথে কাজ করে প্রায় ১ হাজার ১০০ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে এত বেশি কাজ পেয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অর্ধেক কাজ পাওয়া পাঁচ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হলো আবেদ মনসুর কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, মুহাম্মদ আমিনুল হক প্রাইভেট লিমিটেড, মোজাহার এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড, মো. মাহফুজ খান লিমিটেড ও হাসান টেকনো বিল্ডার্স লিমিটেড। এসব প্রতিষ্ঠান মূলত সড়ক তৈরি, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের ছোট ছোট কাজ করে। তবে সব মিলিয়ে কাজগুলোর টাকার অঙ্ক বড়—২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে কিছু কাজ তারা যৌথভাবে পেয়েছে।

সওজ অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, ২০২২–২৩ অর্থবছরে উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন মিলিয়ে তারা বরাদ্দ পেয়েছিল ২৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে চলমান কাজের বরাদ্দ বাদ দিলে নতুন কাজের ঠিকাদার নিয়োগ করা হয় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার। ফলে দেখা যাচ্ছে, অর্থমূল্যের দিক দিয়ে মোট নতুন কাজের প্রায় অর্ধেক পেয়েছেন পাঁচ ঠিকাদার।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত নন। তবে ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেন। অভিযোগ রয়েছে, কাজ পেতে ঠিকাদারেরা কমিশন দেন এবং উপহার ও অন্যান্য ব্যবস্থা থাকে।

ঠিকাদারের সঙ্গে সওজ অধিদপ্তরের কোনো কোনো প্রকৌশলীর যোগসাজশ রয়েছে। নাম এসেছে তিনজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর, যাঁরা সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে ‘বিশেষ পছন্দের’ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত।

অতীতে দেখা যেত, ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ ঠিকাদারদের দরপত্র জমা দিতে বাধা দিতেন। সেটি থামাতে ২০১১ সালে চালু হয় ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থা (ই-জিপি), যেখানে অনলাইনে দরপত্র জমা দেওয়ার ব্যবস্থা হয়, যাতে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হয়। কিন্তু এই ব্যবস্থায়ও যে সুফল পাওয়া যায়নি, তা স্পষ্ট হয়েছে ঘুরেফিরে গুটিকয় ঠিকাদারের কাজ পাওয়ার মাধ্যমে।

ব্যাংক খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গত ৫ বছরে

অক্টোবর ১৫, ২০২৩, বণিক বার্তা

দেশের ব্যাংক খাতে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেয়ার সংস্কৃতিটি বহুদিনের। তবে গত পাঁচ বছরে এ চিত্র অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, এ সময়েই দেশের ব্যাংক খাতের ক্ষত গভীর হয়েছে সবচেয়ে বেশি। ‘দুর্দশাগ্রস্ত’ ঋণের অর্ধেকের বেশি সৃষ্টি হয়েছে গত পাঁচ বছরে। ২০১৮ সাল শেষেও ব্যাংকগুলোর দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৮৬ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা। অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়া এ ঋণের পরিমাণ চলতি বছরের জুন শেষে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১৩ হাজার ৩০৯ কোটি টাকায়। সে হিসাবে পাঁচ বছরের ব্যবধানে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১২১ শতাংশের বেশি। দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ২৬ দশমিক ৭৯ শতাংশই এখন দুর্দশাগ্রস্ত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত পাঁচ বছরে প্রভাবশালীরা দেশের ব্যাংক খাত থেকে নামে-বেনামে কয়েক লাখ কোটি টাকার ঋণ বের করে নিয়েছেন। এসব ঋণ এখন ফেরত আসছে না। খেলাপির ঝুঁকিতে পড়ছে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বিতরণকৃত ঋণ। এ কারণে পুনঃতফসিল করে ঋণগুলো নিয়মিত দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে দেশের ব্যাংক খাতে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি বেড়েছে ১৫৩ দশমিক ৭০ শতাংশ।

২০১৮ সাল-পরবর্তী সময়ে ঋণ পুনঃতফসিল নীতিমালায় ব্যাপক ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ডাউন পেমেন্ট মাত্র ২ শতাংশে নামিয়ে আনার পাশাপাশি পুনঃতফসিলের ক্ষমতাও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এ সুযোগে ব্যাংকগুলোও বাছবিচার ছাড়াই পুনঃতফসিল করে খেলাপিযোগ্য ঋণ নিয়মিত হিসেবে দেখানোর সুযোগ পেয়েছে। এ পুনঃতফসিল সুবিধা আরো সম্প্রসারণ করা হয়েছে কভিড ও কভিড-পরবর্তী সময়ে। ২০২২ সালে রেকর্ড সর্বোচ্চ ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়, যার পরিমাণ ছিল ৬৩ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। চলতি বছরেও বিপুল পরিমাণ ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বারবার পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়ার কারণে গ্রাহকরা খেলাপি হতে উৎসাহিত হচ্ছেন বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌খেলাপিদের নামমাত্র ডাউন পেমেন্টে বারবার ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। এ কারণে ভালো গ্রাহকরাও খেলাপি হতে উৎসাহিত হয়েছেন। করপোরেট সুশাসন ভেঙে পড়ার কারণেই ব্যাংক খাত এতটা বিপর্যস্ত হয়েছে।’

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক এ মহাপরিচালক বলেন, ‘‌দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় আগে থেকেই সুশাসনের ঘাটতি ছিল। এ কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হারও ছিল বেশি। কিন্তু গত পাঁচ-সাত বছরে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোও দুর্দশার মধ্যে পড়েছে। ব্যাংকগুলোর পরিচালকরা নিজ ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ঋণ নিয়েছেন। পারস্পরিক যোগসাজশের মাধ্যমে অন্য ব্যাংক থেকেও ঋণের নামে অর্থ বের করেছেন। সেসব ঋণই এখন খেলাপি হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর না হলে আগামীতে ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।’

খেলাপি, পুনঃতফসিল ও অবলোপন করা ঋণকে ‘স্ট্রেসড’ বা ‘দুর্দশাগ্রস্ত’ হিসেবে দেখায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। দাতা সংস্থাটির সুপারিশ মেনে বাংলাদেশ ব্যাংকও ঝুঁকিতে থাকা এসব ঋণকে দুর্দশাগ্রস্ত হিসেবে দেখিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সাল শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২০ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। একই সময়ে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতিও ছিল ২ লাখ ১২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। এছাড়া ব্যাংকগুলো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আদায় অযোগ্য ৪৪ হাজার ৪৯০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অবলোপন করেছিল। সব মিলিয়ে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের স্থিতি ছিল ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৯২০ কোটি টাকা, যা ব্যাংক খাতের বিতরণকৃত ঋণ স্থিতির ২২ দশমিক ৮০ শতাংশ। চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩৯ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। একই সঙ্গে পুনঃতফসিলকৃত ঋণ স্থিতিও বেড়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেক বছর ধরেই দেশের ব্যাংক খাত কোনো রীতিনীতি মেনে পরিচালিত হয়নি। প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা আইনের ঊর্ধ্বে বলে বিবেচিত হয়েছেন। তারা যেভাবে চেয়েছেন, ব্যাংক খাত সেভাবে পরিচালিত হয়েছে। এরই মধ্যে বের করে নেয়া ঋণ এখন খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। বারবার পুনঃতফসিল ও সুদ মওকুফ করে প্রভাবশালীদের ঋণ নিয়মিত দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তার পরও খেলাপি কিংবা দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের উদ্বেগজনক চিত্র গোপন রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আগামী দিনে ব্যাংক খাতের আরো করুণ চিত্র ফুটে উঠবে, যা দেশের অর্থনীতিকে আরো ভঙ্গুর করে তুলবে।’

ডলারের সংকট কাটাতে আইএমএফ থেকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা নিচ্ছে সরকার। এ ঋণপ্রাপ্তির শর্তের মধ্যে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার বিষয়ে জোর দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি হওয়া ঋণের পরিমাণ কমানোর বিষয়ে জোর তাগিদ দিয়ে আসছে বহুজাতিক সংস্থাটি। যদিও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমার পরিবর্তে উল্টো বেড়ে চলেছে। আইএমএফের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টে’ দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের তথ্য তুলে ধরার শর্তও দেয়া হয়। এ শর্ত পরিপালন করতে গিয়ে ২০২২ সালের রিপোর্টে ব্যাংক খাতের দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের তথ্য সংযুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

চলতি বছর ব্যাংক খাতের ভঙ্গুরতা আরো বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৮ সালে ব্যাংক খাতের বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ৯ লাখ ১১ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে এ ঋণের স্থিতি ১৫ লাখ ৪২ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। সে হিসেবে দেশের ব্যাংক খাতের মোট ঋণ স্থিতি বেড়েছে ৬৯ দশমিক ২৪ শতাংশ। পাঁচ বছর আগে ২০১৮ সাল শেষে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের জুন শেষে খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। এ হিসাবে গত পাঁচ বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। এ পাঁচ বছরে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি বেড়েছে ১৫৩ দশমিক ৭০ শতাংশ। ২০১৮ সালে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি ছিল মাত্র ৮৩ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা। ২০২২ সাল শেষে এ ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকায়। সব মিলিয়ে চলতি বছরের জুন শেষে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ অন্তত ৪ লাখ ১৬ হাজার ৩০৯ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের এক-চতুর্থাংশের বেশি বা ২৬ দশমিক ৭৯ শতাংশই দুর্দশাগ্রস্ত।

মিলেমিশে পদ্মা দখল

নেপথ্যে রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও বিজিবি

২২ অক্টোবর ২৩, সমকাল

রাজশাহীর লালন শাহ মুক্তমঞ্চের স্থানে কয়েক বছর আগেও ছিল প্রমত্ত পদ্মার জলধারা। ছিল তীব্র স্রোত ও গর্জন। তবে কয়েক বছর আগে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে সেখানে চর জেগেছে। বর্ষায় কিছুদিন পানি উঠলেও সারাবছর থাকে শুকনো। নদী আরও দক্ষিণ দিকে সরে গিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেগে ওঠা সেই চর আবার নদীতে বিলীন হয়ে নগরীর কূলঘেঁষে নদী ফিরবে সেই আশা আর নেই। কেননা, জেগে ওঠা চরগুলো দখল করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে দোকানপাট ও স্থায়ী পাকা স্থাপনা। ব্যক্তিগত দখল যেমন রয়েছে, তেমনি রাজশাহী সিটি করপোরেশন এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) নির্মাণ করেছে একাধিক পাকা ভবন। শুধু তাই নয়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) শহর রক্ষা বাঁধ ঘিরে নদী দখলে রেখেছেন আরও ৬০০ দখলদার। এসব দখলদারকে উচ্ছেদের জন্য তালিকা করে জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়েছে পাউবো।

নদী গবেষক মাহাবুব সিদ্দিকী সমকালকে বলেন, বিজিবি এবং সিটি করপোরেশন যেসব স্থাপনা করেছে তা শতভাগ নদীর মধ্যে। বিজিবি নদীতে স্থাপনা করে ব্যবসা করছে। ১৮৫৫ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে বুলনপুর থেকে তালাইমারী পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার শহর রক্ষা বাঁধ ব্রিটিশ প্রকৌশলীরা নির্মাণ করেন। এই বাঁধটি নদীর মধ্যে। নদীর বাঁধের দক্ষিণে সব জমি পদ্মা নদীর। নদী দখল করে স্থাপনা করা খুবই অন্যায় কাজ।

রাজশাহীতে পদ্মার জমি দখলে চলছে এক ধরনের প্রতিযোগিতা। শহর রক্ষা বাঁধের দক্ষিণে নদীর বুক দখল করে বিনোদন কেন্দ্র ও স্থায়ী পাকা স্থাপনা তৈরির রীতিমতো সংস্কৃতি চালু হয়েছে। নগরীর পদ্মা নদীতীরবর্তী লালন শাহ মুক্তমঞ্চের পূর্ব ও পশ্চিমে নদীর ভেতরে নির্মাণ করা হয়েছে একাধিক পাকা ভবন। সিটি করপোরেশনের নির্মাণাধীন ভবনে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাসুদ পাইলট লিজ নিয়ে করছেন রেস্টুরেন্ট ব্যবসা। ‘নোঙর’ নামের এই রেস্টুরেন্টের পূর্ব পাশ বিশাল এলাকা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে করেছেন বিনোদন কেন্দ্র। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই বিনোদন কেন্দ্র ও রেস্টুরেন্টে বেড়াতে আসেন।

এর ঠিক পশ্চিমে বিজিবি নদীর বিশাল এলাকা দখল করে তৈরি করে রেখেছে সীমান্তে অবকাশ ও সীমান্তে নোঙর নামে দুটি রেস্তোরাঁ, সম্মেলন কেন্দ্র, ফাস্টফুড ও কফিশপ। নদীর ভেতরে বাতায়ন নামে করেছে আরও একটি দ্বিতল ভবন। এখানে প্রকাশ্যেই চলে স্কুল, কলেজগামী তরুণ-তরুণীদের আড্ডা। এর পাশেই নিজেদের জমি উল্লেখ করে দখল নিয়েছে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারা কর্তৃপক্ষ। এই দখল নিয়ে ২০১৬-১৭ সালে কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিজিবি সদস্যদের দেখা দেয় তীব্র উত্তেজনা।

এ ছাড়া স্থানীয় কাউন্সিলরের কথিত অনুমতিতে চরে বসেছে অসংখ্য দোকানপাট। নদীর চরে বানানো হয়েছে ইট-সিমেন্টের দোকান। প্রভাবশালীরা নিজ প্রভাবেও দখলে রেখেছেন নদীর অনেক জমি।

সরেজমিন দেখা যায়, নগরীর পাঠানপাড়া এলাকায় কেন্দ্রীয় কারাগারের দক্ষিণে দুটি রেস্তোরাঁ ছাড়াও বিজিবি পদ্মা দখল করে বেশ কিছু এলাকায় গাছ লাগিয়ে পার্ক নির্মাণ করেছে। বেশ কয়েক বছর আগে এসব স্থাপনা নির্মাণ করেছে তারা। এখানে বিজিবির দখলকৃত অংশের কিছু জমি নিজেদের বলে দাবি করে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারা কর্তৃপক্ষ। কয়েক বছর আগে এই জমির মালিকানা নিয়ে বিজিবি ও কারা কর্তৃপক্ষ মুখোমুখি অবস্থানও নিয়েছিল। লাঞ্ছিত করা হয় রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের তৎকালীন সিনিয়র জেল সুপার হালিমা বেগমকে। সীমান্তে অবকাশের দোতলা রেস্তোরাঁর ওপর তলায় সম্মেলন কেন্দ্র এবং নিচতলায় খাবার পাওয়া যায়। যে কেউ ভাড়া নিয়ে সম্মেলন কক্ষে কর্মসূচি বা অনুষ্ঠান করতে পারেন। এ ছাড়া রয়েছে ফাস্টফুড ও কপিশপ। এর পাশেই শহর রক্ষা বাঁধ ঘেঁষে অস্থায়ী কুঁড়েঘর তৈরি করেছে বিজিবি পরিচালিত সীমান্তে অবকাশ। খড়ের চালা ও বাঁশের চাটাইয়ের বেড়া দেওয়া ঘরগুলোতে বসার জন্য মাচার ব্যবস্থাও রাখা আছে। অবকাশ যাপনে আসা মানুষজনের বসার জায়গা করা হলেও সেখানে সব সময়ই তরুণ-তরুণীদেরই দেখা যায়। তাদের প্রকাশ্যেই ঘনিষ্ঠভাবে আড্ডায় মিলিত হতে দেখা যায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরাও ক্লাস ফাঁকি দিয়ে এখানে আসেন। বিজিবি এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয় না। তবে সম্প্রতি রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পোশাক পরে নদীপাড়ে আড্ডা দেওয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছেন। তাই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ড্রেস পরা শিক্ষার্থীদের আড্ডা কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে, বিজিবির সীমান্তে নোঙরেরও একই অবস্থা। তারা নদী জমিতেই আম বাগান, ফাস্টফুড ও কফিশপ তৈরি করেছে। রাস্তার পাশে টিনের বেড়া দিয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে। ভেতরে পিলার ও টিনের চালার ছোট ছোট ঘর রয়েছে। যেগুলোতে বসে যে কেউ আড্ডা দিতে পারেন।

নগরীর পাঠানপাড়ায় লালন শাহ মুক্তমঞ্চের পশ্চিম পাশেই নদীর বুকে দোতলা ভবন গড়েছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন। মুক্তমঞ্চের পূর্ব পাশে নদীর কূলঘেঁষে তাদেরও রয়েছে বিনোদন কেন্দ্র। যেটি এখন লিজ দেওয়া রয়েছে। লালন শাহ মুক্তমঞ্চের নিচে পদ্মার চর দখল করে ইটের দোকানপাট করা হয়েছে। এখানে নদীর বুকে বাঁধ তৈরি করে মাটির রাস্তা করা হয়েছে। কয়েকশ ফুট দৈর্ঘ্যের এই রাস্তার দু’পাশে বসানো হয়েছে অসংখ্য অস্থায়ী দোকান। দোকানিরা দাবি করেন, স্থানীয় কাউন্সিলরের অনুমতিতে তারা সেখানে দোকান বসিয়েছেন। এজন্য কোনো ভাড়া দিতে হয় না। ওয়ার্ডের বাসিন্দা হলেই অনুমতি মিলবে দোকান বসানোর। এ ছাড়া বড় কুঠি, শহীদ মিনার, তালাইমারী ফুলতলা ঘাটেও এ ধরনের স্থাপনা করেছে সিটি করপোরেশন।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর ইসলাম তুষার বলেন, রাজশাহীতে তেমন কোনো বিনোদন কেন্দ্র নেই। বিনোদন কেন্দ্র বলতে শুধু পদ্ম নদীটাই। মানুষের বসার জন্য কিছু ব্যবস্থা করা হয়েছে। খালেদ মাসুদ পাইলট জায়গাটি উন্নয়ন করার শর্তে লিজ পেয়েছেন। তবে এটা যেহেতু নদীর জমি, তাই জেলা প্রশাসন বা পানি উন্নয়ন বোর্ড যখন চাইবে তখনই আমরা এসব স্থাপনা সরিয়ে নেব। এসব স্থাপনা করতে লিখিত অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলেও জানান তিনি।

দখলে হাজার কোটি টাকার সার্ভিস লেন, কমছে না দুর্ঘটনা

২২ অক্টোবর ২৩, সমকাল

দুর্ঘটনা রোধে মহাসড়কের পাশে ধীরগতির যানবাহন চলাচলে হাজার হাজার কোটি টাকায় আলাদা লেন (এসএমভিটি) নির্মাণে তোড়জোড় থাকলেও সেগুলোর ব্যবহার নিশ্চিত করতে আগ্রহ নেই সরকারি সংস্থার। নির্মাণের পরই দখল হয়ে যায় এসব লেন। আর অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, নছিমন, করিমনের মতো ধীরগতির যানবাহন দাপিয়ে চলে মূল মহাসড়কে। এতে ঘটছে দুর্ঘটনা, যাচ্ছে প্রাণ।

মহাসড়কের এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে আজ রোববার পালিত হবে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আইন মেনে সড়কে চলি, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলি’। সরেজমিন আইন মেনে চলার ছিটেফোঁটাও দেখা গেল না প্রায় সোয়া ৬ হাজার কোটি টাকায় নির্মিত জয়দেবপুর-চন্দ্রা-এলেঙ্গা মহাসড়কে। ৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়কের দু’পাশে আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করে ধীরগতির যানবাহনের পৃথক লেন (স্লো মুভিং ভেহিকুলার ট্রাফিক লেন- এসএমভিটি) নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু তা ব্যবহার হচ্ছে পার্কিং, বাজার ও ময়লার ভাগাড় হিসেবে। কৃষিজমি অধিগ্রহণ করে বানানো এই এসএমভিটি লেনের দখলদারের তালিকায় রয়েছে পুলিশও।

১১ হাজার কোটি টাকায় নির্মিত ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের এসএমভিটি লেনে অবশ্য দখলের সমস্যা কম। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক্সপ্রেসওয়েতে টোল লাগে বলে দখলমুক্ত রাখা হয়।

দেশে মহাসড়ক প্রশস্তের অধিকাংশ প্রকল্পেই এখন সার্ভিস লেন রাখা হচ্ছে। ১৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা হচ্ছে ১৬ হাজার ৬৬২ কোটি টাকায়। এখানে উভয়মুখী যান চলাচলে মহাসড়কের দুই পাশে ১৮ থেকে ২৪ ফুট প্রশস্ত সার্ভিস লেন করা হচ্ছে। ১৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকায় ২০৯ কিলোমিটারের ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পেও থাকছে এসএমভিটি। আশুগঞ্জ-আখাউড়া, সিলেট-তামাবিল, পাঁচদোনা-ডাঙ্গা-ঘোড়াশাল মহাসড়কেও ধীরগতির যানবাহনের লেন থাকছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার নির্দেশ দিয়েছেন, সড়ক নিরাপত্তায় মহাসড়কের পাশে সার্ভিস লেন বানাতে হবে। তাই পরিকল্পনায় থাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার, ভাঙ্গা-বেনাপোল, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কেও একই সুবিধা যুক্ত করে প্রকল্প নিতে যাচ্ছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)।

তবে হাজার হাজার কোটি টাকায় নির্মাণ করা এসব পৃথক লেনের ব্যবহার কতটা হবে– তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জয়দেবপুর-চন্দ্রা-এলেঙ্গার অভিজ্ঞতায়। সড়ক বানানো সওজের কাজ হলেও আইন প্রয়োগ পুলিশের দায়িত্ব বলে দাবি করলেন সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান। তাহলে হাজারও কোটি টাকায় সার্ভিস লেন বানিয়ে কী লাভ– প্রশ্নে তিনি সমকালকে বলেন, ব্যবহার উপযোগী রাখার চেষ্টা করছি। সরকারি হিসাবে বছরে প্রায় ৫ হাজার এবং বেসরকারি হিসাবে ৮ হাজার মানুষের প্রাণ যায় সড়ক দুর্ঘটনায়। এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ মহাসড়কে ধীরগতির এবং অবৈধ যানের চলাচল। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সেপ্টেম্বরের হিসাবে, ২৩ শতাংশ দুর্ঘটনায় ধীরগতির গাড়ির সংশ্লিষ্টতা ছিল। আর প্রাণহানিতে ২৬ শতাংশ ক্ষেত্রে যুক্ত এসব যান।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. হাদীউজ্জামান সমকালকে বলেন, বাংলাদেশে সড়ক-মহাসড়কে একই লেনে ১৮ ধরনের যানবাহন চলে। দুর্ঘটনা রোধে গতি অনুযায়ী লেন পৃথক করতেই হবে। তবে এই লেন নির্মাণে যেমন কৃষিজমি নষ্ট হয়, তেমনি প্রকল্প ব্যয়ও বাড়ে। তাই সার্ভিস লেন বানিয়ে ভুলে গেলে চলবে না। সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ধীরগতির গাড়ি যেন চলে, সে জন্য পৃথক লেন দখলমুক্ত রাখতে হবে। নয়তো নির্মাণ ব্যয় জলে যাবে, দুর্ঘটনাও কমবে না।

তাই ঘটছে জয়দেবপুর-চন্দ্রা-এলেঙ্গা মহাসড়কে। ২০১৩ সালে ২ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা ব্যয় ধরে এই মহাসড়কের নির্মাণ শুরু হয়। তখন সড়কটির একপাশে সার্ভিস লেন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। নির্বিঘ্ন যান চলাচলে পরে দু’পাশে ৭০ কিলোমিটার করে লেন নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য ৮৫ দশমিক ৩১ একর জমি বাড়তি অধিগ্রহণ করতে হয়। ধীরগতির যান মহাসড়কের একপাশ থেকে অন্যপাশে নিরাপদে যেতে নির্মাণ করা হয় ২১টি ওভারপাস ও আন্ডারপাস। এতে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা। ৩ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধির বড় অংশ আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি বেড়েছিল পৃথক লেন নির্মাণে।

সরেজমিনে দেখা গেল, এই পৃথক লেন ব্যবহার উপযোগী রাখার কোনো চেষ্টাই নেই। ভোগড়া বাইপাস থেকে পশ্চিম দিকে পেয়ারাবাগান এলাকায় মহাসড়ক দিয়ে বাইসাইকেল চালিয়ে আসছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব আবুল ফজল। দূরপাল্লার দ্রুতগামী গাড়ির বাতাসের ঝাপ্টায় সাইকেল চালাতে কষ্ট হচ্ছিল। সার্ভিস লেন থাকতে কেন মহাসড়কে চলছেন– প্রশ্নে আবুল ফজল বলেন, ‘ওইটা চলার জন্য? জানি না তো। আমি তো মনে করছি, ব্যবসায়ীদের দোকান করতে দিছে সরকারে।’

শুক্রবার সন্ধ্যার পর ভোগড়া থেকে কালিয়াকৈর পর্যন্ত ১৯ কিলোমিটার অংশ ঘুরে ২০টি বাজার দেখা গেল সার্ভিস লেনে। কোথাও যান চলাচলের অবস্থা নেই। ভোগড়া বাইপাস, কড্ডা বাজার, কোনাবাড়ী মৌচাক, সফিপুর বাজার, চন্দ্রার পল্লী বিদ্যুৎ, জোড়াপাম্প, চন্দ্রা-ত্রিমোড়, হরতকীতলা, খাড়াজোড়া, গোয়ালবাথান ও সাহেববাজার এলাকায় সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত স্থানীয় নেতাদের ‘ভাড়া’ দিয়ে দোকান বসে ধীরগতির লেনে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর গাড়িও পার্ক করা হয় এই লেনে। পণ্যবাহী যানবাহনও দিনের বেলায় রাখা হয়। কয়েকটি স্থানে সার্ভিস লেন পুরো বন্ধ ইট-বালু রাখায়। লেনের ৭৬টি কালভার্টও অব্যবহৃত।

মহাসড়কের পাশেই গাজীপুর মহানগর পুলিশের বাসন থানা। সেখানে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা ভাড়া করা ভবনে চলে কার্যক্রম। থানার নিজস্ব জমি নেই। ফলে যেসব গাড়ি জব্দ করা হয়, সেগুলো রাখা হয় ধীরগতির লেনে। এ কারণে ওই এলাকা দিয়ে ধীরগতির যানবাহন নির্ধারিত লেনে চলতে পারে না। চলে মূল মহাসড়ক দিয়ে। তাও আবার উল্টো পথে চলে। ঘটে দুর্ঘটনা। পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, জমি সংকটে বাধ্য হয়ে সার্ভিস লেনে গাড়ি রাখতে হয়েছে। সওজের গাজীপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী খ ম শরীফুল আলম স্বীকার করলেন, ধীরগতির লেন কাজেই আসছে না। ভাসমান দোকান, গাড়ি পার্কিং বন্ধে বারবার বললেও দখলদারদের থামানো যাচ্ছে না। পুলিশ কমিশনার, জেলা প্রশাসক এবং এসপিকে জানানো হয়েছে; বৈঠক হয়েছে। পার্কিং ও উচ্ছেদের কিছুদিন পরই আগের মতো দখল হয়ে যায়।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা

হাসপাতালে যন্ত্রের ‘রোগ’

০২ আগস্ট ২৩, সমকাল

লিনিয়ার এক্সিলারেটর। ক্যান্সার রোগীকে রেডিওথেরাপি দিতে যন্ত্রটি কেনা হয়েছিল সেই ২০১২ সালে। তখনই দাম পড়েছিল অন্তত ১০ কোটি টাকা। তবে ১১ বছর পরও খোলা হয়নি ওই বাক্সের গিঁট। বাক্সবন্দি হয়ে এটি পড়ে আছে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের রেডিওথেরাপি বিভাগের সামনে ধুলার আস্তরণে। এত বছর পর যন্ত্রটি কার্যকর আছে কিনা, তাও জানা নেই কারও! শুধু বাঙ্কার না থাকায় চালু হয়নি যন্ত্রটি। দামি লিনিয়ার এক্সিলারেটরের এ করুণ পরিণতির জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দুষছে খুমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এদিকে, রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১৮ কোটি টাকা দামের ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং (এমআরআই) যন্ত্রটির দম ফুরিয়েছে, তাও সাড়ে তিন বছর। ২০১৬ সালের অক্টোবরে যন্ত্রটি হাসপাতালে সরবরাহ করেছিল ‘মেডিটেল’। ওয়ারেন্টি ছিল তিন বছর। ওয়ারেন্টি শেষ হতে না হতেই ২০২০ সালের শুরুতে যন্ত্রটি বিগড়ে যায়। মেরামতের জন্য ৩২ লাখ টাকা নিলেও এমআরআই যন্ত্রটি সচল করতে পারেনি মেডিটেল। এর পর থেকে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মধ্যে চলছে ‘ইঁদুর-বিড়াল খেলা’। জটিলতার গাড্ডায় পড়ে আর হয়নি মেরামতকাজ।

শুধু শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল নয়; ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতাল, গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল, মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, খুলনার শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালসহ অনেক সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে একদম বন্ধ এমআরআই সেবা।

প্লাটিলেট কিটের দাম ইচ্ছামতো, ঔষধ প্রশাসন ঘুমে

০৭ আগস্ট ২৩, সমকাল

ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গেল দুই দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে  চিকিৎসা নিচ্ছেন আজিমপুরের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম। তাঁর প্লাটিলেট কমে ৮ হাজার মিলিলিটারে নামে। চিকিৎসকের পরামর্শে রোববার তাঁর শরীরে দেওয়া হয় এক ব্যাগ (২৫০ মিলিলিটার) অ্যাপারেসিস প্লাটিলেট। এতে খরচ পড়ে সবকিছু মিলিয়ে ২ হাজার টাকা। হাসপাতালটিতে তিনটি যন্ত্রের মাধ্যমে দিনে ২০ থেকে ২৫ জনের অ্যাপারেসিস প্লাটিলেট দেওয়া সম্ভব। তবে দৈনিক চাহিদা একশর বেশি। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক রোগীকে বেসরকারি হাসপাতাল থেকে অ্যাপারেসিস প্লাটিলেট নিতে হচ্ছে।

ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন আতিকুর রহমান। ২৫ হাজারে নেমে যাওয়ায় তাঁকে প্লাটিলেট দেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসক। তবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্লাটিলেট পেতে আবেদনের দীর্ঘ সারি। তাই স্বজনরা তাঁকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে এক ব্যাগ অ্যাপারেসিস প্লাটিলেটের দাম রাখা হয় ১৫ হাজার টাকা।

গত সপ্তাহে ফরিদপুর থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরিফুল ইসলাম রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতাল ভর্তি হন। তাঁর প্লাটিলেট ৩৫ হাজারে নামে। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁকে এক ব্যাগ অ্যাপারেসিস প্লাটিলেট শরীরে দিয়ে দাম নেওয়া হয় ২৮ হাজার টাকা।

ডেঙ্গুর জটিল রোগীর জন্য প্রয়োজন পড়ছে অ্যাপারেসিস প্লাটিলেটের। জটিল সময়টা পার করতে রোগীর শরীরে দিতে হচ্ছে তিন থেকে চার ব্যাগ প্লাটিলেট। তবে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে প্লাটিলেটের দামে সাদা-কালোর ফারাক। এ ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালে এক ব্যাগ প্লাটিলেট যেখানে ২ হাজার টাকা লাগছে, বিপরীতে বেসরকারিতে খরচ পড়ছে ২৫ থেকে ২৮ হাজার টাকা। একই রোগের চিকিৎসা খরচে এত বড় ব্যবধানকে অযাচিত মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, সবমিলিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে অ্যাপারেসিস প্লাটিলেটের দাম ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা হতে পারে। এর চেয়ে বেশি কোনোভাবেই উচিত নয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢামেক হাসপাতালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় অ্যাপারেসিস প্লাটিলেটে নিতে খরচ হয় দেড় থেকে ২ হাজার টাকা। এ দামে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল, জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালে এ সেবা দেওয়া হচ্ছে। সেখানে ল্যাবএইড, স্কায়ার, গ্রিনলাইফ, মাল্টিকেয়ার, বেটার লাইফ, পুলিশ লাইন্স, সেন্ট্রাল হাসপাতালসহ রাজধানীর অন্তত ২০টি বেসরকারি হাসপাতালে অ্যাপারেসিস প্লাটিলেটে ২৫ থেকে ২৮ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুর সাধারণ চিকিৎসায় এক রোগীর খরচ যেখানে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা, সেখানে বেসরকারি হাসপাতালে লাখ টাকা। দেশের সর্বোচ্চ মানের বেসরকারি হাসপাতালে এ খরচ গিয়ে ঠেকে ৩ থেকে ৪ লাখে। লাগামছাড়া স্বাস্থ্য খরচ নিয়ন্ত্রণে বেসরকারি হাসপাতালে তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

হাসপাতালের বাইরে পাঁচ গুণ ডেঙ্গু রোগী

১১ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

ডেঙ্গু নিয়ে যত রোগী হাসপাতালে আসছেন, আক্রান্তের সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, হাসপাতালের বাইরে আরও পাঁচ গুণ ডেঙ্গু রোগী রয়েছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীর নিপসম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ: সামনের করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে তাঁরা এ কথা বলেন। পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এই সেমিনারের আয়োজন করে। জনস্বাস্থ্য–বিশেষজ্ঞ ছাড়াও সেমিনারে সরকারি পদস্থ কর্মকর্তা, সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা, কীটতত্ত্ববিদ, টিকা–বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক, গবেষক, সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।

হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগী লাখ ছাড়াল, ২৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ শনাক্ত-মৃত্যু

আগস্ট ২১, ২০২৩, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসেই হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়ে গেছে, মৃত্যু হয়েছে ৪৮৫ জনের।

আজ সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ৯ জন মারা গেছেন। একই সময়ে আরও ২ হাজার ১৯৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

এ নিয়ে এ বছর ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ১ লাখ ২ হাজার ১৯১ জন। তাদের মধ্যে ঢাকার ৪৯ হাজার ৩২৮ জন এবং ঢাকার বাইরের ৫২ হাজার ৮৬৩ জন।

এ ছাড়া, এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট মৃত্যু দাঁড়ালো ৪৮৫ জনে।

দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় এডিসের বাড়বাড়ন্ত

২৭ আগস্ট ২৩, সমকাল

এ মৌসুমে ডেঙ্গুতে এখন পর্যন্ত এক লাখের বেশি আক্রান্ত ও পাঁচ শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে– সরকারি হিসাবে এমনটি বলা হলেও বাস্তবে আক্রান্ত ও মৃত্যু অনেক বেশি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিয়ে আছে নানা প্রশ্ন। মশা নিধন কার্যক্রমে দুর্নীতি-জালিয়াতিরও অভিযোগ উঠছে

রাজধানীতে চলতি বছরের শুরুতেই মাথাচাড়া দেয় ডেঙ্গু। দিন যত গড়িয়েছে, ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে ভাইরাসটি। তবে গত আট মাসেও বাসিন্দাদের সচেতন কিংবা তাদের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায়নি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১০ নম্বর ওয়ার্ড (মতিঝিলের একাংশ) কাউন্সিলর মারুফ আহমেদ মনসুরকে। অন্যদিকে, বেঘোরে মানুষ আক্রান্ত হলেও এলাকাবাসীর কাছে ‘ডুমুরের ফুল’ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড (উত্তরখান) কাউন্সিলর মো. শফিক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হত্যা মামলায় সম্প্রতি মারুফ জেলে গেছেন। আর স্বর্ণ চোরাচালানের অভিযোগে আড়ালে-আবডালে শফিক। তাদের মতো সারাদেশেই স্থানীয় সরকারের বেশির ভাগ জনপ্রতিনিধি ডেঙ্গুবাহী মশা নিধনে জনগণকে সচেতন করতে মাঠে নামেননি। পাশাপাশি আরও যেসব ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার এ বিষয়ে দায়িত্ব, তাদের কার্যক্রমে গাফিলতি স্পষ্ট। সিটি করপোরেশনের মেয়ররা মাঝেমধ্যে সক্রিয় হয়েছেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত লার্ভা শনাক্তের পর জরিমানায় দায় সেরেছে। মশা নিধনে ভুল পদ্ধতির সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় দুর্বলতার কারণে এবার ডেঙ্গুর এত বাড়বাড়ন্ত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও মশক বিশেষজ্ঞ ড. কবিরুল বাশার সমকালকে বলেছেন, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে এবার বড় দুর্বলতা হলো, জনগণকে সম্পৃক্ত করতে না পারা। রাজধানীতে তাও কিছু পদক্ষেপ হয়েছে; ঢাকার বাইরের অবস্থা যাচ্ছেতাই। ঈদুল আজহা উপলক্ষে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকা থেকে গ্রামে গেলেন। এর পরই জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত বেড়ে গেল। তিনি আরও বলেন, এতদিন এডিস মশাকে ‘মৌসুমি’ হিসেবে দেখা হলেও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আর সে সুযোগ নেই। সত্যিকার অর্থে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সেবা সংস্থা ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর যে ধরনের কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা, তা নেওয়া হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পরিচ্ছন্নতার কাজে জনগণকে সম্পৃক্ত করা। এ ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা রাখতে পারেন জনপ্রতিনিধিরা। কিন্তু বেশির ভাগ জনপ্রতিনিধির মধ্যে এ বিষয়ে আন্তরিকতার ঘাটতি দেখা গেছে। অন্যদিকে, রাজধানীর নির্মাণাধীন স্থাপনাগুলোকে মশার বংশ বিস্তারের আধার বলা হলেও এখানে কার্যক্রম সঠিকভাবে মনিটর করা হয়নি। রাজউক, গণপূর্ত, গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ওয়াসার মতো সেবা সংস্থাগুলোর তেমন তৎপরতা চোখে পড়েনি। থানায় থানায় জব্দ গাড়িতে মশা গিজগিজ করলেও বেখবর পুলিশ। ফলে এবার বাহিনীর রেকর্ড সংখ্যক সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন; মারা গেছেন চারজন।

ডেঙ্গুর প্রকোপ কমছেই না, মৃত্যু ছাড়াল সাড়ে ৫০০

২৮ আগস্ট ২৩, সমকাল

সারাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় (রোববার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আরও ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে ৫৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২ হাজার ৩৩১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে

০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এক দিনে ২১ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ নিয়ে দেশে এ বছর ডেঙ্গুতে ৬১৮ জনের মৃত্যু হলো। বিশ্বে শুধু ব্রাজিলেই এর চেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে এ বছর। দেশটিতে ৯১২ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তথ্য পর্যালোচনায় বাংলাদেশের চেয়ে বেশি মৃত্যুহার আর কোনো দেশে দেখা যাচ্ছে না।

গতকাল শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম জানিয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ২ হাজার ৩৫২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ বছর ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ২৭ হাজার ৬৯৪। তাঁদের মধ্যে মারা গেছেন ৬১৮ জন। সরকারি হিসাবে মৃত্যুহার শূন্য দশমিক ৫।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোলের (ইসিডিসি) সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বরাবরের মতো এ বছরও বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্রাজিলে। দেশটিতে এ বছর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ১১ লাখ ৮৭ হাজার ৭০৮ জনের। এর মধ্যে মারা গেছেন ৯১২ জন। মৃত্যুহার শূন্য দশমিক শূন্য ৭ ।

বাংলাদেশের পরে মৃত্যুর সংখ্যায় এগিয়ে আছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরু। দেশটিতে আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ৫৩ হাজার ৫৪৭ জন এবং মারা গেছেন ৩৯৯ জন। দেশটিকে মৃত্যুহার শূন্য দশমিক ৩ । আর্জেন্টিনা ও বলিভিয়াতেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ একটু বেশি। দেশ দুটিতে মৃত্যুহার যথাক্রমে শূন্য দশমিক শূন্য ৫ ও শূন্য দশমিক ৩ ।

বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ও এশিয়ার মধ্যে ডেঙ্গু বেশি মালয়েশিয়ায়। মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাবে দেশটিতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৭৫ হাজার ৯২৮। এর মধ্যে মারা গেছেন ৫৪ জন। দেশটিতে মৃত্যুহার শূন্য দশমিক শূন্য ৭ । এই অঞ্চলে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ভারতেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ একটু বেশি। কিন্তু এই তিন দেশেও মৃত্যুহার বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম। ভারতে মৃত্যুহার শূন্য দশমিক ১।

বিশ্বের যেসব দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, তার পরিসংখ্যান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইসিডিসির ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়। এসব দেশের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, চলতি বছর আগস্টের শেষ পর্যন্ত মৃত্যুহার বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে ২০০ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে তাঁর মধ্য থেকে একজন মারা যাচ্ছেন। আবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানে ১০০ জন ভর্তি হলে তাঁদের মধ্যে ২ জন মারা যাচ্ছেন।

২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে মৃত্যু ২১, নতুন রেকর্ড

০২ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

সারাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। যা একদিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের মৃত্যুর রেকর্ড। এর আগে একদিনে সর্বোচ্চ ১৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ২১ জনের মধ্যে ঢাকায় ১৭ জন আর ঢাকার বাইরে ৪ জন মারা গেছেন।

এ নিয়ে ডেঙ্গুতে এ বছর সর্বমোট মৃত্যু হয়েছে ৬১৮ জনের। এর মধ্যে ঢাকা সিটিতে মৃত্যু হয়েছে ৪৫৬ জনের আর ঢাকার বাইরে মৃত্যু হয়েছে ১৬২ জনের।

ডেঙ্গুতে স্বজনহারাদের নীরব লড়াই, পাশে নেই কেউ

০৩ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

দুই যুগ ধরে রাজধানীর মিরপুরের মধ্য পাইকপাড়ায় বসবাস করেন রেন্ট-এ-কারের ব্যবসায়ী মো. ইব্রাহিম। এলাকার অলিগলি তাঁর চেনা। তাই বিয়ের পর সেখানেই নতুন বাসা নিয়ে সংসার সাজান। পরিবারে আসে দুই সন্তান– আরাফাত হোসেন রাউফ ও ইসনাত জাহান রাইদা। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সুখী পরিবার। কিন্তু ডেঙ্গুতে এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুই সন্তানকে হারিয়ে এলোমেলো তাঁর জীবন।

ইব্রাহিম থাকতেন মধ্য পাইকপাড়ার ৮০/১০ বাসার দ্বিতীয় তলায়। বাসার কোনায় কোনায় এখন ৯ বছরের রাউফ ও ৭ বছরের রাইদার স্মৃতিচিহ্ন। সন্তানদের এসব স্মৃতিচিহ্ন ঘিরে এখন ইব্রাহিম ও স্ত্রী রাবেয়া আক্তারের হাহাকার। যন্ত্রণা সইতে না পেরে তারা ছেড়ে দিয়েছেন সেই বাসা।

ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গত ১৮ আগস্ট মারা যায় রাউফ। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ২৫ আগস্ট না-ফেরার দেশে চলে যায় ছোট্ট রাইদা। তারও ডেঙ্গু হয়েছিল। দিনভর পরিশ্রম করে বাসায় ফিরে সন্তানদের মুখ দেখলেই হারিয়ে যেত ইব্রাহিমের সব কষ্ট। আজ সেই বাসায় শুধু হাহাকার, যেন সবকিছু মুখ থুবড়ে পড়েছে! দেয়ালের দিকে তাকালেই ইব্রাহিম-রাবেয়ার চোখ জলে ভরে ওঠে, সেখানেও যে লেগে আছে সন্তানদের হাতের চিহ্ন! এ এক অন্য রকম লড়াই। দুই সন্তান হারিয়ে একাকী সে লড়াই করছেন ইব্রাহিম-রাবেয়া দম্পতি। এই বাসায় কষ্ট সইতে না পেরে গেছেন নতুন ঠিকানায়, আপাতত মিরপুর ১ নম্বরের ধানক্ষেত মোড়ে। এটি রাউফ-রাইদার মামার বাড়ি। অক্টোবরে উঠবেন নতুন বাসায়।

একেবারে কাছের স্বজন ছাড়া এই দম্পতির পাশে কেউ নেই!

অথচ করোনার সময় বহু সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও ব্যক্তিকে আমরা ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়াতে দেখেছি। ডেঙ্গুতে স্বজনহারা পরিবারগুলো যেন বড়ই অসহায়। মন্ত্রী, এমপি, সিটি করপোরেশন, ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও রাজনৈতিক নেতা– কেউই পাশে নেই। ধারকর্জ করে চিকিৎসা ব্যয় মেটানোর পর স্বজন হারানো অনেক পরিবার পড়ছে নতুন সংকটে। সংসারের হিসাবে টান পড়েছে তাদের।

ডেঙ্গুতে মৃত্যু ৭০০ ছাড়ালো

০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩, বাংলা ট্রিবিউন

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন আরও ১৫ জন। এ নিয়ে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো ৭০৬-এ। এই সময়ে নতুন করে আরও ১ হাজার ৮৭৬ জন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

শুক্রবার (৮ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের দেওয়া তথ্য থেকে এসব জানা যায়।

গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে ৮৪২ জন ঢাকার এবং ঢাকার বাইরে অন্যান্য বিভাগে ১ হাজার ৩৪ জন।

স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, সারা দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে ৯ হাজার ৭৩০ জন রোগী ভর্তি আছে। এর মধ্যে ঢাকাতেই ৪ হাজার ২৬৫ জন। বাকি ৫ হাজার ৪৬৫ জন ঢাকার বাইরে অন্যান্য বিভাগে।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৪২ হাজার ৫৮৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। ছাড়া পেয়েছেন ১ লাখ ৩২ হাজার ১৫১ জন।

ডাক্তার নার্সের সংকট, পরীক্ষার যন্ত্রপাতিও সিংহভাগ নষ্ট

সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৩, বণিক বার্তা

স্বাস্থ্যসেবা খাতে গত এক দশকে সরকারের বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। এ বিনিয়োগের অধিকাংশই ব্যয় হয়েছে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে। নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি কেনা হয়েছে নতুন যন্ত্রপাতি। শয্যা ও সক্ষমতা বাড়াতে বাস্তবায়ন হয়েছে নানা প্রকল্প। বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও এসব হাসপাতালে কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলছে না বলে অভিযোগ তুলছেন রোগীরা।

দেশের জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয় দক্ষ চিকিৎসক ও নার্সের সংকট নিয়ে অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। মেডিকেল যন্ত্রপাতি পরিচালনা ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের মতো দক্ষ জনবলেরও সংকট রয়েছে। বেশির ভাগ সময়ই নষ্ট থাকছে বিপুল অর্থ ব্যয়ে কেনা যন্ত্রপাতিগুলো। ওষুধ সরবরাহের ঘাটতি ও স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের পেশাদারত্বের অভাবের অভিযোগও রয়েছে অনেক। জটিল রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে নিজ জেলা-উপজেলায় চাহিদামাফিক সেবা না পেয়ে রোগীদের বড় একটি অংশ হয়ে পড়ছে ঢাকামুখী।

শুধু জটিল নয়, মৌলিক রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতিতে ভুগছে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলো। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সির (জাইকা) ‘ডাটা কালেকশন সার্ভে অন হেলথ সেক্টর ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে মৌলিক ছয়টি রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা যন্ত্র আছে প্রয়োজনের তুলনায় ৬১ শতাংশের কিছু কম। সে অনুযায়ী এসব হাসপাতালে এসব যন্ত্রের অপ্রতুলতার হার ৩৯ শতাংশের বেশি। আবার যেসব জায়গায় যন্ত্রপাতি রয়েছে, সেখানেও বড় একটি অংশ অকেজো ও নষ্ট। এসব যন্ত্রের মধ্যে রয়েছে আল্ট্রাসনোগ্রাফি, ইসিজি, করোনারি কেয়ার ইউনিটের (সিসিইউ) মনিটর, মাইক্রোস্কোপ ইত্যাদি। জেলা হাসপাতালগুলোয় নষ্ট যন্ত্রপাতির ৯৩ শতাংশ অকেজো পড়ে রয়েছে এক বছরের বেশি সময় ধরে। উপজেলা পর্যায়ের ক্ষেত্রে এ হার ৯৭ শতাংশ।

প্রতিবেদনে নগর ও গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যায় অপ্রতুলতার চিত্রও তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, দেশের শহর এলাকায় প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে চিকিৎসক ও নার্স রয়েছেন ১৮ দশমিক ২ জন। গ্রামাঞ্চলে এই হার ১ দশমিক ১ জন।

সারা দেশে অন্তত দশটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘুরে দেখা গেছে, ‌এগুলোর চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে বড় ধরনের অসন্তুষ্টি রয়েছে। অবকাঠামোগত সমস্যা, চিকিৎসক ও জনবল সংকটে ভুগছে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল। আড়াইশ শয্যার হাসপাতালটিতে গড়ে রোগী ভর্তি থাকছে পাঁচ শতাধিক।

হাসপাতালে সেবাদানের সক্ষমতায় ঘাটতির কথা স্বীকার করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও। দায়িত্বপ্রাপ্তরা বলছেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে জনবলের ঘাটতি এখানে সক্ষমতার দ্বিগুণ রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে উঠেছে। ১৯৯৭ সালে ১০০ থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত হওয়া সরকারের মাধ্যমিক পর্যায়ের এ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে কাঠামো অনুযায়ী লোকবল নেই। অর্ধেকের বেশি চিকিৎসকের পদ খালি। অনুমোদিত পদের বিপরীতে নার্স নেই ৩০ শতাংশ।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোমিনুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকে গুরুত্বপূর্ণ পদে চিকিৎসকের সংকট রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।’

১৯৮৪ সালে স্থাপিত গাইবান্ধা জেলা হাসপাতালকে কয়েক দফায় শয্যা বৃদ্ধি করে আড়াইশ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে উন্নীত করা হয়েছে। এ হাসপাতালেও জনবলের ঘাটতি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে শুধু ব্যবস্থাপনার অভাবেই প্রত্যাশিত সেবার ঘাটতি দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেডিকেল এডুকেশনের (ডব্লিউএফএমই) সাবেক জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দেশের স্বাস্থ্য নীতি বদলিয়ে জনস্বাস্থ্য নীতি করা দরকার, যেটা জনবান্ধব হবে। দেশে মানুষ সঠিকভাবে সেবা পাচ্ছে না। ফলে বিরাটসংখ্যক মানুষ দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছে। ধনী লোকের পাশাপাশি দরিদ্র মানুষও বিদেশে যাচ্ছে। তারা সেবায় সন্তুষ্ট না। তাদের মানসম্মত সেবা দিতে গেলে বাজেটের সদ্ব্যবহার করা দরকার। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অদক্ষতা, অপচয় ও দুর্নীতির কারণে বাজেট ঠিকমতো ব্যবহার না হয়ে ফেরত চলে যায়। উপজেলা থেকে কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যায় পর্যন্ত মানুষ সঠিক সেবা পায় না। এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র শক্তিশালী করা জরুরি। সঠিক জনবল ও ল্যাব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এর পরের ধাপে রোগীকে জেলা হাসপাতালে রেফার্ড করা হবে। রেফারেল ব্যবস্থাপনা না থাকায় রোগীরা কোথায় সঠিক সেবা পাবেন তা বুঝতে পারে না। জেলায় কাজ না হলে পরে ওপরের পর্যায়ে সেবা নেবে। দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান ভালো নয় এর বড় প্রমাণ বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়া। বড় অংকের বৈদেশিক মুদ্রা চলে যায় বিদেশে সেবা নিতে গিয়ে। তাই সেবা ও প্রশিক্ষণের মান উন্নয়ন করতে হবে। দেশে প্রশিক্ষণ এখন সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এখানে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে।’

নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার সাত লাখ মানুষের একমাত্র ভরসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। গড়ে দৈনিক প্রায় একশ রোগী হাসপাতালটিতে ভর্তি থাকে। এর মধ্যে শিশু ও নারীদের সংখ্যা বেশি। তবে বর্তমানে হাসপাতালটিতে সি সেকশনের অস্ত্রোপচার ও প্রসূতিদের বিশেষায়িত সেবা পাওয়া যাচ্ছে না বলে সেবাপ্রত্যাশীরা জানিয়েছেন। নোয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. মাসুম ইফতেখার বণিক বার্তাকে জানান, জেলার প্রতিটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে প্রতিদিন ভর্তি হচ্ছে ৮০-৯৫ জন রোগী। কোথাও কোথাও শতাধিকও ভর্তি হচ্ছে। বহির্বিভাগে পাঁচশ থেকে আটশ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। জেলার আটটি উপজেলায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে দৈনিক হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে।

নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘শয্যা ও প্রয়োজনীয় জনবল সংকটের কারণে সেবা দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক ও নার্স দেয়া হলে বিশেষায়িত সেবা এবং নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র চালু করা যাবে।’

জেলা-উপজেলাসহ নানা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে বছর বছর বরাদ্দ বাড়িয়েছে সরকার। পরিকল্পনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরে শুধু স্বাস্থ্যসেবা বিভাগেই উন্নয়ন বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। এক দশকের ব্যবধানে ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা পাঁচ গুণ বেড়ে ১৫ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এছাড়া খাতটির উন্নয়নে সরকার বিনিয়োগ করেছে ৮২ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা।

অন্যদিকে সরকারের বাজেট প্রক্ষেপণেও স্বাস্থ্য খাতে মোট বরাদ্দ বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২৯ হাজার ৪২৯ কোটি টাকা, যা আগামী অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৩২ হাজার ৩৭২ কোটি টাকায়। একই সঙ্গে জেলা-উপজেলা এবং জেনারেল হাসপাতালে বরাদ্দও বাড়বে। এ দুই পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় গত অর্থবছরে পরিচালন ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়াবে ৪ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। একইভাবে উপজেলা স্বাস্থ্য অফিস, সিভিল সার্জন কার্যালয় এবং নার্সিং ইউনিটের বরাদ্দও বছর বছর বাড়বে।

এর পরও সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে মানুষের। এতে বাড়ছে চিকিৎসা খাতে জনগণের অতিরিক্ত ব্যয় (আউট অব পকেট পেমেন্ট)। শুধু ব্যবস্থাপনাগত সংকটের কারণেই জেলা-উপজেলা পর্যায়ে মানুষকে বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত এক দশকে স্বাস্থ্য খাতে যে উন্নয়ন ব্যয় করা হয়েছে, তা জনসাধারণের সেবার কথা চিন্তা করে হয়নি। যদি এমন হতো তাহলে জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের এত বড় বড় ভবন পড়ে থাকত না। লোকবলের সংকট থাকত না। সুদৃঢ় একটি পরিকল্পনা প্রয়োজন ছিল। প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি। কিন্তু সে তুলনায় লোকবল নেই। আবার যন্ত্রাংশ ক্রয়ের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা নেই। ভালো মানের যন্ত্র কেনা হয় না। এখানে একটি স্বার্থান্বেষী মহল রয়েছে, যারা নিজেদের পকেট ভারী করে। সরকারি হাসপাতালে নির্ধারিত মূল্য দিয়ে যখন মানুষ সেবা পায় না, তখন তারা বেসরকারি হাসপাতালে যেতে বাধ্য হয়। তখন খরচ বেড়ে যায়। আবার সরকারি হাসপাতালে সেবা নিতে হলে অনানুষ্ঠানিক খরচও করতে হয়। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি, অপরিকল্পনা ও স্বচ্ছতার অভাবে দেশের স্বাস্থ্য খাত রুগ্‌ণ হয়ে পড়েছে। রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ঠিকই কিন্তু সেবা বাড়েনি।’ 

জরুরি চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়েছে রাজশাহীর পুঠিয়ার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কে যানবাহনে দুর্ঘটনাকবলিতদের জরুরি চিকিৎসার জন্য স্থাপিত একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠানটিতে চারঘাট, বাগাতীপাড়া, বাঘা, দুর্গাপুর ও নাটোর সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে প্রতিদিন শতাধিক রোগী সেবা নিতে আসছে। হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, পুরো কমপ্লেক্সে অপরিচ্ছন্নতা। দীর্ঘদিন ধরে বিশুদ্ধ  খাবার পানির সংকট চলছে। কমপ্লেক্সের অধিকাংশ লাইট ও ফ্যান অকেজো। বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা থাকলেও তা চালু নেই। অপারেশন থিয়েটার, এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাফিসহ মৌলিক বিভিন্ন রোগ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আধুনিক যন্ত্র স্থাপন করা হলেও তা অব্যবহৃত রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। কুকুর ও সাপে কাটা রোগীদের চিকিৎসা মিলছে না।’

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে একজন চিকিৎসক বলেন, ‘বর্তমানে একজন এমবিবিএস চিকিৎসক টানা ২৪ ঘণ্টা করে জরুরি বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন। দুর্ঘটনায় আহত রোগীরা জরুরি সেবা পাচ্ছে না।’

কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয় সেবাগ্রহীতার হার দিনে দিনে কমে আসছে বলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয়-ব্যয় জরিপ-২০২২-এ উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, ২০১৬ সালে সারা দেশের চিকিৎসা সেবাপ্রার্থীদের মধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবাগ্রহীতার হার ছিল ৫ দশমিক ২২ শতাংশ। ২০২২ সালে তা নেমে এসেছে ২ দশমিক ৪৭ শতাংশে। আর জেলা বা সদর হাসপাতালে ২০১৬ সালে সেবাগ্রহীতার হার ছিল ৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। ২০২২ সালে তা নেমে এসেছে ২ দশমিক ৯৯ শতাংশে। যদিও এ সময় বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সেবা নেয়ার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৬ সালে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। ২০২২-এ তা ১৩ দশমিক ১২ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে।

ব্যাপক বিনিয়োগের মাধ্যমে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও দক্ষ জনবল এবং জনবান্ধব স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা যায়নি বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা ও মান বৃদ্ধির জন্য বেশকিছু বিষয়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এর মধ্যে অবকাঠামো একটি অংশ মাত্র। এর সঙ্গে পর্যাপ্ত ওষুধ বা রসদ দরকার হয়। দক্ষ জনবল, নার্স-ডাক্তার লাগে। সর্বোপরি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য একটি সুসমন্বিত ব্যবস্থাপনা দরকার হয়। এখানে বিনিয়োগ করে প্রচুর অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু রসদ, সুষ্ঠু সেবার জন্য জনবল গড়ে ওঠেনি। অদক্ষ এবং অপূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা চালু রয়েছে। তাই মানুষ আসছে না। সেজন্যই সেবার জন্য মানুষ বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে যায়।’

নওগাঁ জেনারেল হাসপাতাল তিন বছর আগে আড়াইশ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে উন্নীত হলেও প্রয়োজনীয় জনবল, ওষুধ ও খাবারের প্রশাসনিক অনুমোদন দেয়নি স্বাস্থ্য বিভাগ। হাসপাতালে ৬৭ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে রয়েছে মাত্র ১৭ জন চিকিৎসক। এমআরআই, সিটি স্ক্যানসহ বেশ কয়েকটি ব্যয়বহুল রোগ নিরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় স্থানীয় বেসরকারি রোগ নিরীক্ষা কেন্দ্রে যাচ্ছে রোগীরা। রাঙ্গামাটি জেলা হাসপাতালেও একই চিত্র দেখা যায়।

৭৮ টাকার স্যালাইন ৪০০ টাকা, তিন মাস ধরে চলছে কারসাজি

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, বাংলা ট্রিবিউন

লিবরা ফার্মাসিউটিক্যালস ও অপসো কোম্পানির উৎপাদিত নরমাল স্যালাইনের গায়ে মূল্য লেখা আছে ৮৭ টাকা। অথচ এই স্যালাইন চট্টগ্রামের বিভিন্ন ফার্মেসিতে বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। একইভাবে অন্যান্য স্যালাইন তিন-চারগুণ বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। অনেক ফার্মেসিতে বেশি টাকা দিয়েও মিলছে না। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।

ফার্মেসি মালিক, স্যালাইন উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর বিক্রয় প্রতিনিধি এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার পর গত তিন মাস ধরে সব ধরনের স্যালাইন সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে কোম্পানিগুলো। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় নিজেদের মতো করে দাম নিচ্ছে ফার্মেসিগুলো।

রোগী ও তাদের স্বজনরা বলছেন, গত তিন মাস ধরে স্যালাইনের দাম নিয়ে অরাজকতা চলছে। ফার্মেসিগুলো বেশি দামে বিক্রি করলেও নেই তদারকি সংস্থাগুলোর পর্যাপ্ত অভিযান।

রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী এলাকার বাসিন্দা নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘আমার ছোট ভাই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। গত ছয় দিন ধরে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাকে প্রতিদিন চিকিৎসকের পরামর্শে ডিএনএস (ডেক্সট্রোজ নরমাল স্যালাইন) স্যালাইন দিতে হয়। এটির দাম ৮৭ টাকা। এখন ফার্মেসিগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে না। যেগুলোতে পাওয়া যায়, সেগুলো কখনও ৩৫০ আবার কখনও ৪০০ টাকা দাম নিচ্ছে।’

কেন সংকট?

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনের ফাতেমা ফার্মেসির এক কর্মচারী বলেন, ‘যেসব ওষুধ কোম্পানি স্যালাইন উৎপাদন করে সেগুলো গত তিন মাস ধরে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। ফলে রোগীদের চাহিদামতো দেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস, ওরিয়ন ফার্মাসিউটিক্যালস, লিবরা ফার্মাসিউটিক্যালস, একমি ল্যাবরেটরিজ এবং অপসো কোম্পানি স্যালাইন সরবরাহ করে থাকে। গত তিন মাস ধরে তারা সরবরাহ একেবারেই কমিয়ে দিয়েছে। অপরদিকে ডেঙ্গুর কারণে চাহিদা বেড়েছে। এ অবস্থায় চাহিদার তুলনায় খুব কম স্যালাইন কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে। কোনও কোনও প্রতিষ্ঠান একেবারেই সরবরাহ করছে না। ফলে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।’

রংপুর মেডিকেলে ৫৩৭ যন্ত্র নষ্ট, রোগীর কষ্ট

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

নজির হোসেনের বাড়ি রংপুর সদরের বড়বাড়ি এলাকায়। বয়স ৭৫ বছর। ৯ সেপ্টেম্বর তাঁর স্ট্রোক হয়। সেদিন তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। মস্তিষ্কের নালিতে রক্ত জমাট বেঁধেছে, নাকি রক্তনালি ফেটে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে, তা জানার জন্য সিটি স্ক্যান করানোর পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। হাসপাতালে সিটি স্ক্যান করানো হয়নি। কারণ, দুটি যন্ত্রই বহুদিন ধরে নষ্ট।

১০ সেপ্টেম্বর সকালে নজির হোসেনকে নেওয়া হয় জেল রোডের মেডিকেল মোড়ের বেসরকারি রোগনির্ণয় সেন্ট্রাল ল্যাবরেটরিতে। সিটি স্ক্যান শেষে তাঁকে ফেরত আনা হয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। রাত আটটায় সিটি স্ক্যান রিপোর্ট ও ফিল্ম হাতে পান নজির হোসেনের ছেলে মহুবার রহমান।

সেন্ট্রাল ল্যাবরেটরি থেকে বের হয়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঢোকার মুখে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে মহুবার রহমানের কথা হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আব্বাকে হাসপাতালের বাইরে নিতে অনেক ঝামেলা হয়েছে, আব্বারও অনেক কষ্ট হয়েছে। হাসপাতালে যন্ত্র ঠিক থাকলে আমাদের এত দুর্ভোগ হতো না।’

সিটি স্ক্যান যন্ত্র পরিচালিত হয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগ থেকে। বিভাগের প্রধান নাজমুন নাহার প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতালে সিটি স্ক্যান যন্ত্র দুটি। ২০১৯ সাল থেকে যন্ত্র দুটি নষ্ট।

শুধু দুটি সিটি স্ক্যান যন্ত্র নয়, শত শত যন্ত্র এই হাসপাতালে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, ছোট-বড়-মাঝারি ৫৩৭টি যন্ত্র এই হাসপাতালে অচল হয়ে আছে। এর মধ্যে এমআরআই বা সিটি স্ক্যানের মতো বড় যন্ত্র যেমন আছে, পালস্ অক্সিমিটারের মতো ছোট যন্ত্রও আছে। প্রথম আলো জুলাইয়ের মাঝামাঝি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের যন্ত্রপাতির হালনাগাদ যে তথ্য পেয়েছিল, তাতে অচল যন্ত্রের এই সংখ্যা পৃথকভাবে দেওয়া আছে।

ডেঙ্গু বাড়ছে, শিরায় দেওয়া স্যালাইনের সংকট কাটছে না

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

বিভিন্ন জেলায় শিরায় দেওয়া স্যালাইনের সংকট চলছে। একাধিক সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চাহিদামতো স্যালাইন দিতে পারছেন না চিকিৎসকেরা। এমন পরিস্থিতিতে ভারত থেকে স্যালাইন আমদানি শুরু করেছে সরকার।

গতকাল শনিবার বরিশাল, খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগের ৯ জেলার সরকারি হাসপাতালের শিরায় দেওয়া স্যালাইনের পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করেছেন প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা। সাত জেলায় সরকারি হাসপাতালে স্যালাইনের সংকট দেখা গেছে। একাধিক জেলায় বাজারেও শিরায় দেওয়া স্যালাইন কিনতে পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে বেশি দাম দিয়ে স্যালাইন কিনতে হচ্ছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্যালাইন উৎপাদন হয় না। শিরায় দেওয়া স্যালাইন উৎপাদন করে ছয়টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। সরকারিভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে স্যালাইন কেনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একমাত্র ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল)। ইডিসিএল সেসব স্যালাইন সরকারি হাসপাতালে সরবরাহ করে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই ছয় কোম্পানি মাসে সাড়ে ৪৬ লাখ ব্যাগ স্যালাইন উৎপাদন করে। এর মধ্যে আছে সাধারণ স্যালাইন, গ্লুকোজ মিশ্রিত সাধারণ স্যালাইন ও কলেরার স্যালাইন।

ইডিসিএলের বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাকির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগস্টে আমরা সাড়ে আট লাখ ব্যাগ স্যালাইন সরকারি হাসপাতালে সরবরাহ করেছি। সেপ্টেম্বরের ১৪ দিনে সরবরাহ করেছি সাড়ে তিন লাখ ব্যাগ।’

বাজারে কেন স্যালাইন সংকট চলছে—এমন প্রশ্নের উত্তরে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক মো. সালাহউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ডেঙ্গু রোগীর কারণে স্যালাইনের চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। ওষুধ কোম্পানিগুলো ২৪ ঘণ্টা উৎপাদনে আছে। তারপরও চাহিদার পুরোটা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমস্যার কথা শোনা যাচ্ছে। আমদানি করা স্যালাইন দেশে পৌঁছালে সমস্যা আর থাকবে না।

রাজধানীর বাইরে ডেঙ্গু চিকিৎসায় বিশৃঙ্খলা

১৮ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

রাজধানী তো বটেই, জেলা-উপজেলা আর বিভাগীয় নগরও এখন ডেঙ্গু রোগীতে ঠাসা। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে বেশ। লম্বা হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। চিকিৎসা উপকরণের অপ্রতুলতায় অতিরিক্ত রোগী সামাল দিতে খেই হারাচ্ছেন চিকিৎসক-নার্সরা। এরই মধ্যে বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু শনাক্তের কিট ও শিরায় দেওয়া স্যালাইনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ের অনেক চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানে রয়েছে রোগী ব্যবস্থাপনার ঘাটতি। জটিল রোগীর জন্য প্লাটিলেট আলাদাকরণে ব্যবহৃত অ্যাফেরেটিক যন্ত্র নেই অধিকাংশ হাসপাতালে। এ ছাড়া যন্ত্রপাতি নষ্টের কারণে কিছু কিছু হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যাচ্ছে না। এতে প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগী ও স্বজনরা। বেসরকারি হাসপাতালে এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে কয়েক গুণ টাকা গুনতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে রাজধানীর বাইরে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়ে দেখা দিয়েছে বিশৃঙ্খলা।

এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যেই গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জেলা-উপজেলা থেকে ডেঙ্গু রোগী ঢাকায় না পাঠাতে নির্দেশনা দিয়েছে। সরকারি সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, এখন থেকে জটিল রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থা জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে নিশ্চিত করতে হবে।

ডেঙ্গুতে এত মৃত্যু, তবু গা ছাড়া ভাব

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দেশে ৯৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এত মৃত্যুর পরও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গা ছাড়া ভাব যাচ্ছে না। তারা গতানুগতিক ধারায় কাজ করছে।

জনস্বাস্থ্যবিদ, কীটতত্ত্ববিদ ও ডেঙ্গু রোগবিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ যেন প্রকৃতির ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে ঠিক সময়ে ঠিক কাজ করেনি। তাদের উদাসীনতায় ডেঙ্গু ৬৪ জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার আরও ১৫ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে তাঁরা মারা গেছেন। একই সময়ে হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন ৩ হাজার ১২৩ জন। এ নিয়ে এ বছর দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ১ লাখ ৯৩ হাজার ৮৮১। আর মারা গেছেন মোট ৯৪৩ জন। জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলেন, হাসপাতালে যত রোগী ভর্তি হন, তার চার থেকে পাঁচ গুণ রোগী বাড়িতে থাকেন।

দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ১২০০ ছাড়ালো

১৮ অক্টোবর ২০২৩, ইত্তেফাক

দেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যু ১২০৬ জনে দাঁড়িয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ২ হাজার ৪৯৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন মোট ৮ হাজার ২৯৯ জন ডেঙ্গু রোগী।

বন্যা ও জলাবদ্ধতা

৭ মাসে ১০ বার ডুবল চট্টগ্রাম

০৭ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

ভারী বর্ষণ ও পূর্ণিমার অস্বাভাবিক জোয়ারে গতকাল রোববার টানা তৃতীয় দিনের মতো ডুবল দেশের বাণিজ্যিক রাজধানীখ্যাত চট্টগ্রাম নগর। তিন দিনের জলাবদ্ধতায় নগরের অন্তত ৪০ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। রাস্তাঘাট, অলিগলি ও বসতঘর ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত পানিতে ডুবে থাকায় নগরের অন্তত ১৫ লাখ মানুষ অসহনীয় কষ্টের শিকার হন। ক্ষতির মুখে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা।

চলতি বছরের সাত মাসে ১০ বার ডুবল চট্টগ্রাম নগর। আগের বছর ডোবে ১২ বার। ভুক্তভোগীদের মতে, গত পাঁচ বছরের মধ্যে এবারের জলাবদ্ধতার ব্যাপকতা ছিল সবচেয়ে বেশি।

এবার জলাবদ্ধতায় দেশের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে তেমন ক্ষতি না হলেও অলিগলির দোকান, বিপণিকেন্দ্র ও কাঁচাবাজার পানিতে তলিয়ে যায়। দোকানপাটের মালামাল পানিতে নষ্ট হয়ে যায়। তিন দিনে কত টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে ব্যবসায়ীদের ধারণা, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমপক্ষে ১৫০ কোটি টাকা।

তিন দিন ধরে পানি জমে রয়েছে। কোনোরকম সেচে পানি কমাই। এরপর রান্না করি। আবার পানি উঠে যায়। বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি।

গৃহিণী ফারজানা আক্তার

২০২১ সালে এক গবেষণায় উঠে আসে, জলাবদ্ধতার কারণে শুধু খাতুনগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় এক বছরে ৪৬৩ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে এ যাত্রায় রক্ষা পেলেও যেভাবে বৃষ্টি ও জোয়ার হচ্ছে, তাতে ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় আছেন খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা।

ভারী বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে জলাবদ্ধতা যাতে না হয়, সে জন্য অনেক ব্যয়বহুল উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিটি করপোরেশনের একটি, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) দুটি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রকল্পের আওতায় ১১ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকার কাজ চলছে। এর মধ্যে গত ৬ বছরে ৫ হাজার ৭৯০ কোটি টাকা খরচ হলেও খুব বেশি সুফল আসেনি। জোয়ার ঠেকাতে নগরের বিভিন্ন খালের মুখে ৪০টি জলকপাটের (স্লুইসগেট) মধ্যে মাত্র ৫টির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। বাকি ৩৫টির কাজ ছয় বছর ধরেই চলছে।

৭ হাজার কোটি টাকাই জলে!

০৮ আগস্ট ২৩, সমকাল

দুই দশক ধরে চট্টগ্রামের দুঃখ হয়ে আছে জলাবদ্ধতা। প্রধান এই সমস্যা সমাধান করার আশ্বাস দিয়ে গত ২০ বছরে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন চারজন। ইশতেহারে এটি এক নম্বরে রেখে নির্বাচনী বৈতরণী পার হলেও জনগণকে এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে পারেননি কোনো মেয়রই। অথচ দুই হাজার ১০২ কোটি টাকা খরচ হয়েছে তাদের হাত দিয়ে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও (সিডিএ) জলাবদ্ধতা নিরসনে টাকা খরচ করেছে দুই হাতে। এই খাতে তাদের খরচ হয়েছে ৪ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা। পানি উন্নয়ন বোর্ডও আলাদা করে খরচ করেছে ২৩৬ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে তিন সংস্থা প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা খরচ করলেও জলাবদ্ধতা রয়ে গেছে সেই তিমিরেই। উল্টো জলাবদ্ধতার প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়ার পর থেকে নিত্যনতুন মাত্রা পাচ্ছে দুর্ভোগ। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। আগে যেখানে হাঁটুপানি হতো, এখন সেখানে জমছে কোমরপানি।

তবে সরকার অঢেল টাকা বরাদ্দ দেওয়ার পরও এ সমস্যা থেকে মুক্তি না মেলার তিনটি কারণ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করা সরকারি দুই সংস্থা চসিক ও সিডিএর মধ্যে সমন্বয় নেই। যথাযথভাবে সমীক্ষা না করে প্রকল্প গ্রহণ করা ও নিজ দায়িত্ব পালন না করে একে অন্যের ওপর দায় চাপানোর মানসিকতাও এ প্রকল্প থেকে সুফল না আসার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তারা।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, বিপর্যস্ত জনজীবন

আগস্ট ০৯, ২০২৩, বণিক বার্তা

সপ্তাহজুড়ে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি। পানির নিচে তলিয়ে গেছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের অনেক জায়গায় কোমরসমান থেকে বুকসমান পানি উঠে যাওয়ায় মাঝপথে আটকে গেছে বেশকিছু যাত্রীবাহী বাস। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কে মঙ্গলবার সকাল থেকে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বন্যার কারণে অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় দুর্ভোগ বেড়েছে মানুষের। ফোনে চার্জ দিতে না পারায় যোগাযোগ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে গতকাল আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বুধবার থেকে চট্টগ্রাম বিভাগে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমতে শুরু করবে।

ক্ষুধা পেটে অসহায় মানুষ কাঁদছে

০৯ আগস্ট ২৩, সমকাল

কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর, আবার কেউ কেউ ভাসছেন বুকসমান পানিতে। ডুবে আছে ঘরবাড়ি, দোকানপাট। অনেকের রান্নাঘর পানিতে থইথই, চুলায় ওঠেনি হাঁড়ি। চারদিকে জলের চলন, তবে সুপেয় পানির সংকটে খাবি খাচ্ছে মানুষ। কয়েক দিনের তুমুল বৃষ্টি আর জোয়ারের স্রোতে বন্দর নগরী চট্টগ্রাম ভালো নেই। একইভাবে ধুঁকছে পাহাড়ের তিন জেলা আর সমুদ্র শহর কক্সবাজারও। বিশেষ করে বান্দরবানে দেখা দিয়েছে মানবিক বিপর্যয়।

সাধারণত প্রাকৃতিক দুর্যোগে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষকে।

এবারের বিপর্যয়ে এমন তৎপরতা চোখে লাগছে না খুব একটা। বিচ্ছিন্নভাবে ব্যক্তি উদ্যোগে কিছু মানুষ বস্তি এলাকায় রান্না করা ও শুকনা খাবার বিতরণ করলেও অনেক অসহায় মানুষকে রীতিমতো না খেয়ে থাকতে হচ্ছে। ক্ষুধা পেটে অনেক অসহায় মানুষ নিভৃতে কাঁদছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পক্ষ থেকে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে নির্দেশনা দেওয়া হলেও গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত তেমন তৎপরতা দেখা যায়নি।

একটু বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় নগরীর চকবাজারের কাপাসগোলা। এবার ভারী বৃষ্টির সঙ্গে জোয়ারের পানি তেড়ে আসায় পরিস্থিতি ভয়ংকর চেহারা নেয়। দিনমজুর আবদুস সালামের কাপাসগোলার গলিতে বাস। জলাবদ্ধতায় কাজের ছুটি, তাই রোজগারেও পড়েছে তালা। থইথই পানি ডিঙিয়ে ঘর থেকে বের হওয়ারও জো নেই। দিনমজুর সালাম যেখানে ভাড়া থাকেন, সেই বাসার পাশের ভবনের মালিকের কলেজপড়ুয়া মেয়ে ইরফাত ফাতেমা রিফা জানতে পারেন– না খেয়ে আছে সালামের পরিবার। তখন রিফা তাদের কিছু খাবারের ব্যবস্থা করেন।

ইরফাত ফাতেমা রিফা বলেন, ‘এলাকার হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি। তাদের অনেকের ঘরে খাবার নেই। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দল ও সংগঠনের তরফ থেকে সহযোগিতা করা হয়। এবার এমনটি দেখা যাচ্ছে না। আমি সাধ্যমতো প্রতিবেশীদের খবর নিচ্ছি। আমি তো সবার খাবার ব্যবস্থা করতে পারছি না।’

পরিকল্পনায় ভুল, নকশায় ত্রুটি

১৩ আগস্ট, ২০২৩, কালের কন্ঠ

পরিকল্পনায় ভুল এবং প্রকল্পের নকশায় ত্রুটির কারণে পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নতুন এই রেলপথ দক্ষিণ চট্টগ্রামে বিশেষ করে সাতকানিয়ায় সাম্প্রতিক বন্যার অন্যতম কারণ বলেও মনে করছেন তাঁরা।

পরিকল্পনায় ভুল, নকশায় ত্রুটিনদী ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অন্য অঞ্চলে প্রাকৃতিক পানির প্রবাহ উত্তর থেকে দক্ষিণমুখী হয়ে থাকে। কিন্তু এই অঞ্চলের পানির স্রোত ও পাহাড়ি ঢল পূর্ব থেকে পশ্চিমমুখী।

নকশাআর রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে উত্তর থেকে দক্ষিণমুখী। এতে নির্মীয়মাণ নতুন রেললাইন পানির স্রোতের মুখোমুখি হয়ে চাপ নিতে ব্যর্থ হয়। এর মাধ্যমে যথাযথ পরিকল্পনার অভাব এবং প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে যে দুর্বলতা ছিল তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফলে এর ভিত্তিতে প্রকল্পের যে নকশা করা হয়েছে তা-ও ত্রুটিপূর্ণ হয়েছে।

পানির গতিপথের আড়াআড়ি রেলপথ করা হলেও যে সংখ্যায় ও আকারের ওয়াটারপাস বা পানিপ্রবাহের পথ করার দরকার ছিল তা করা হয়নি। ১০০ বছরের বন্যার তথ্য পর্যালোচনা করে এই প্রকল্প পরিকল্পনা করা হয়েছে বলা হলেও এই ক্ষয়ক্ষতি মূলত পর্যালোচনার অসারত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে। এই রেলপথ নির্মাণ শুরুর পর গত পাঁচ বছরে তিনবার বন্যা বা বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালের আগস্টে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় রেলপথের কারণে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল।

কক্সবাজারে মাথাপিছু বরাদ্দ ১১ গ্রাম চাল ও ১.২০ টাকা

১৩ আগস্ট ২৩, সমকাল

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলায় গত সপ্তাহের বন্যায় ১০ লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মেলেনি চাহিদার অর্ধেক ত্রাণ। চট্টগ্রাম জেলার ১৪টি উপজেলায় বন্যাদুর্গত মানুষ রয়েছে প্রায় ৫ লাখ। সেখানে এখন পর্যন্ত যে ত্রাণ গেছে তার মাথাপিছু হিসাব টানলে দাঁড়ায় এক কেজি ১৪ গ্রাম চাল ও ৩ টাকা ৬৫ পয়সা। বান্দরবানের লক্ষাধিক মানুষের কাছে মাথাপিছু ত্রাণ গেছে ৮৫ গ্রাম চাল ও নগদ ৪ টাকা ২০ পয়সা। কক্সবাজারের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা হচ্ছে চকরিয়া। সেখানে বরাদ্দ গেছে আরও কম, মাথাপিছু ১১ গ্রাম চাল ও ১ টাকা ২০ পয়সা।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বলেন, ‘১৪টি উপজেলায় দুর্গতদের সাহায্যে গত শুক্রবার পর্যন্ত ৫৭০ টন চাল, ১৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।’ এ হিসাবে জনপ্রতি চাল পড়েছে এক কেজি ১৪ গ্রাম আর টাকা পড়েছে ৩ টাকা ৬৫ পয়সা। এর বাইরে চট্টগ্রামে সরকারিভাবে ২ হাজার ৯৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ৩ হাজার ৩০০ প্যাকেট টোস্ট বিস্কুট, ৩ হাজার ৫০০ পিস ওরস্যালাইন এবং সাড়ে ৬ হাজার পিস পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

বান্দরবান জেলা প্রশাসক শাহ মোজাহিদ উদ্দিন বলেন, ‘বন্যায় জেলায় ১৫ হাজার ৮০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত, ৩ হাজার ৫৭৮ পরিবার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড় ধসে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ হাজার ৮৭৮টি ঘর। সব মিলিয়ে জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা লক্ষাধিক। এখন পর্যন্ত জেলার ৭টি উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা ও ৮৫ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’ তাঁর এই হিসাব আমলে নিলে প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্ত মাথাপিছু চাল পেয়েছে মাত্র ৮৫ গ্রাম ও নগদ ৪ টাকা ২০ পয়সা।

কক্সবাজারের চকরিয়ায় বসবাস করে ৬ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ। বন্যায় এখানকার একটি পৌরসভা ও ১৮টি ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ৫ লাখ মানুষ। অথচ এখন পর্যন্ত সেখানে সরকারিভাবে সহায়তা হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৫৫ টন চাল ও ৬ লাখ টাকা। এই হিসাবে বরাদ্দকৃত চাল মাথাপিছু পড়ে ১১ গ্রাম আর নগদ মাত্র ১ টাকা ২০ পয়সা।

৬ বছরে ৬ হাজার কোটি টাকা খরচা, তবু ডুবছে চট্টগ্রাম শহর

১৮ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান চারটি প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হচ্ছে না। গত ছয় বছরে এসব প্রকল্পের পেছনে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা খরচ হলেও নগরবাসী এর সুফল পাননি; বরং জলাবদ্ধতা এবার বেড়েছে। চলতি বছরের ৭ মাসে চট্টগ্রাম শহর ডুবেছে ১০ বার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত কাজ এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে আগামী দুই বছরেও জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বলছেন, শেষ মুহূর্তে এসে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না পাওয়া, ভূমি অধিগ্রহণ ও প্রকল্প সংশোধন জটিলতার কারণে নির্মাণকাজ স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে আগামী বছরের জুনে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। প্রকল্পের মেয়াদ আরেক দফা বাড়াতে হবে।

চট্টগ্রাম নগরের দীর্ঘদিনের সমস্যা জলাবদ্ধতা দূর করতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) দুটি, সিটি করপোরেশন একটি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। চার প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১১ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা। ছয় বছরে এসব প্রকল্পের আওতায় খরচ হয়েছে ৫ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা।

রেগুলেটরগুলোর নকশা চূড়ান্ত করা হলেও নানা জটিলতায় কাজ করতে বেগ পেতে হচ্ছে। তাঁরা আগামী বছরের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার চেষ্টা করছেন। তবে সংস্থাটির এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, যে বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে, তাতে কাজ শেষ করা সম্ভব নয়। মেয়াদ বাড়াতে হবে।

শিবেন্দু খাস্তগীর, প্রকল্প পরিচালক ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী

এত বড় অঙ্কের টাকা খরচের পরও ৪ থেকে ৭ আগস্ট টানা চার দিন নগরে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে নগরের ৪০ শতাংশ এলাকা তলিয়ে যায়। অন্তত ১৫ লাখ মানুষ দুর্ভোগে পড়েন। ডুবে যায় মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর বহদ্দারহাটের বাড়ির উঠান ও সামনের সড়কও। বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে প্রতিবছর চট্টগ্রাম শহর এভাবে ১০ থেকে ১৪ বার ডুবে যায়।

শহর বারবার ডুবলেও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী মূল দুই সংস্থা সিটি করপোরেশন ও সিডিএর মধ্যে সমন্বয় নেই; বরং জলাবদ্ধতার দায় একে অপরের কাঁধে চাপাতে ব্যস্ত। নগরে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজে সিডিএ সমন্বয় করছে না অভিযোগ তুলে ক্ষোভ জানিয়ে ৬ আগস্ট ফেসবুকে পোস্ট দেন মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। তিনি বলেন, এই প্রকল্পে সিটি করপোরেশনের ভূমিকা নেই। তারা (সিডিএ) করপোরেশনকে কোনো কিছুই জানায়নি। ইচ্ছেমতো কাজ করছে। এত বড় একটি প্রকল্প, চট্টগ্রামবাসীর বাঁচা-মরারও প্রশ্ন, এরপরও তারা সমন্বয় করছে না।

৯ আগস্ট সংবাদ সম্মেলন করে সিডিএর চেয়ারম্যান এম জহিরুল আলম দোভাষ সিটি করপোরেশনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন জলাবদ্ধতার কাজ ঠিকভাবে করতে না পারায় তার দায়িত্ব সিডিএকে দেওয়া হয়েছে। মেয়রও ভুল তথ্য দিয়ে সিডিএকে দোষারোপ করছেন। আর প্রকল্প বাস্তবায়নে সিডিএর কোনো গাফিলতি নেই।

আরও পড়ুন

৭ মাসে ১০ বার ডুবল চট্টগ্রাম

সিডিএর দুই প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ছে

চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পগুলোর মেয়াদ আগামী বছরের জুন পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হচ্ছে না বলে নিশ্চিত করেছেন প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ইতিমধ্যে প্রকল্পগুলোর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে দুই থেকে ছয় বছর পর্যন্ত। আবার মেয়াদ বাড়াতে হবে।

এই চারটি প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি হচ্ছে সিডিএর। ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার এই প্রকল্প একনেকে অনুমোদিত হয় ২০১৭ সালের আগস্টে। কোনো ধরনের সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া প্রকল্পটি নেওয়া হয়। পরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডকে।

খালগুলো পরিকল্পিতভাবে পুনঃখনন, সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের মাধ্যমে চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসন ছিল প্রধান উদ্দেশ্য। এই প্রকল্পের আওতায় নগরের ৩৬টি খাল খনন, এর দুই পাশে প্রতিরোধদেয়াল ও রাস্তা, নালা-নর্দমা ও ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ, পাঁচটি খালের মুখে রেগুলেটর (জোয়ার প্রতিরোধক ফটক) স্থাপন এবং তিনটি জলাধার নির্মাণ। ২০২০ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। ২০২৩ সালের জুলাই পর্যন্ত সবচেয়ে বড় এ প্রকল্পের অগ্রগতি ৮৬ শতাংশ। এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

আরও পড়ুন

চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা দূর করতে খরচ ৫৭৯০ কোটি টাকা, এরপরও সুফল নেই

প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ শেষ হলেও ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) সংশোধন করেছে সিডিএ। সংশোধিত ডিপিপিতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক লাফে বাড়ছে ৩ হাজার ১৩ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের পরিচালক ও সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী আহমদ মঈনুদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্পের আওতায় এখনো খালের দুই পাশে প্রতিরোধদেয়াল, সড়ক, ফুটপাত, সিল্টট্র্যাপ (বালু বা কাদা আটকানোর ফাঁদ) নির্মাণের কিছু কাজ বাকি রয়ে গেছে। এসব কাজ শেষ করতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে।

এই প্রকল্পের পাশাপাশি নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ‘কর্ণফুলী নদীর তীর বরাবর কালুরঘাট সেতু হতে চাক্তাই খাল পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ’ শীর্ষক আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সিডিএ। নগরে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি কমানো, যানজট নিরসন এবং কর্ণফুলী নদীর তীরের চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ, বাকলিয়া, কল্পলোক আবাসিক এলাকা, কালামিয়া বাজার, কালুরঘাট শিল্প এলাকা, বহদ্দারহাট ও চান্দগাঁও এলাকার জোয়ারজনিত জলাবদ্ধতা নিরসনে এই প্রকল্প নেয় সিডিএ। শুরুতে এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই হাজার কোটি টাকা। দুই দফা বৃদ্ধির পর এখন ব্যয় হচ্ছে ২ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত খরচ হয়েছে দেড় হাজার কোটি টাকা।

অপরিকল্পিত উন্নয়নে বাড়ছে বন্যার ঝুঁকি

১৮ আগস্ট ২৩, সমকাল

চট্টগ্রাম নগরকে জলোচ্ছ্বাস থেকে বাঁচাতে ৩ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে আউটার রিং রোড। এই প্রকল্পে আছে ১১টি স্লুইসগেট। কিন্তু খালের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ নেই এগুলোর। এটি নগরের একাংশে জলাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে বলে ২০১৮ সালে প্রকল্পটির নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে উঠে আসে। কিন্তু সে প্রতিবেদন উপেক্ষা করে এখন বাস্তবায়ন হচ্ছে রিং রোড প্রকল্প। তাই সামান্য বৃষ্টিতেই এখন জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে চট্টগ্রামের একাংশে। ডুবে যাচ্ছে কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলার বিস্তীর্ণ ভূমি।

এসব জেলায় নির্বিচারে উজাড় হয়েছে প্রাকৃতিক বন। পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে স্থাপনা। হচ্ছে অপরিকল্পিত উন্নয়ন। এখন বৃষ্টি হলেই পানির সঙ্গে নেমে আসছে পাহাড়ের মাটি। এতে ভরাট হচ্ছে ভাটির নদী কর্ণফুলী, শঙ্খ ও মাতামুহুরী। গবেষণা অনুযায়ী, দুই দশকে কর্ণফুলী নদীর প্রশস্ততা ৫০ থেকে ২৫০ মিটার পর্যন্ত কমে গেছে। নাব্য হারিয়েছে শঙ্খ ও মাতামুহুরী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব কারণে চট্টগ্রামসহ পার্বত্যাঞ্চলে নতুন করে বেড়েছে বন্যার ঝুঁকি। প্রতিবছর ক্ষতি হচ্ছে হাজার কোটি টাকা।

মিরপুরে জলাবদ্ধ রাস্তায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এক পরিবারের তিনজনসহ নিহত ৪

২২ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

বৃষ্টির মধ্যে ঢাকার মিরপুরে বিদ্যুৎস্পষ্ট হয়ে একই পরিবারের তিনজনসহ চারজনের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে মিরপুরে কমার্স কলেজ–সংলগ্ন ঝিলপাড় বস্তির বিপরীত পাশে রাস্তায় এ ঘটনা ঘটে।

পুলিশের মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসীন রাত সাড়ে ১২টায় প্রথম আলোকে বলেন, প্রবল বৃষ্টিতে ওই এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। তখন বজ্রপাত হলে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পানিতে পড়ে। এতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে পাঁচজন গুরুতর আহত হন। তাঁদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা চারজনকে মৃত ঘোষণা করেন।

চার মৃত্যুর জন্য দায়ী বিদ্যুতের ‘চোরাই লাইন’, ১০ লাখে দফারফার প্রস্তাব!

২২ সেপ্টেম্বর ২০২৩, বাংলা ট্রিবিউন

বৃষ্টির পানিতে হেঁটে যাওয়ার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে চার জনের মৃত্যু হয়েছে রাজধানীতে। বৃহস্পতিবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাতে মিরপুর কমার্স কলেজের পাশে ঝিলপাড় বস্তির বিপরীতে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে এই চার জনের প্রাণ যায়। এরপরই বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগের বিষয়টি উঠে এসেছে। বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই দুর্ঘটনার সঙ্গে মিরপুর ২ নম্বরে ডুইপ আবাসিক এলাকার বি ব্লকের ২ নম্বর লেনের একাধিক ট্রান্সফরমার থেকে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার যোগসূত্র থাকতে পারে। অবৈধ সংযোগদানকারীদের পক্ষে ভুক্তভোগী দুই পরিবারকে ১০ লাখ টাকা দিয়ে বিষয়টি দফারফার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার ঝিলপাড় বস্তি থেকে পাশেই আত্মীয়ের বাড়িতে রাতের খাবার খেতে যাওয়ার সময় পরিবারের চার সদস্য জমে থাকা পানিতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়। এ সময় ঘটনাস্থলে স্বামী মিজান, স্ত্রী মুক্তা, সাত বছর বয়সী লিনার মৃত্যু হয়। পানিতে পড়ে গিয়েও বেঁচে যায় তাদের আরেক সন্তান ছয় মাস বয়সি হোসাইন। তাদের বাঁচাতে এগিয়ে এসে মারা যান রিকশাচালক অনিক।

ঢাকার জলাবদ্ধতা: অচল উচ্চ ক্ষমতার পাম্প, অকেজো স্লুইসগেটও

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

রাজধানীর কমলাপুর স্টেডিয়াম–সংলগ্ন এলাকায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) পাম্পস্টেশন দিয়ে মিনিটে ৮ লাখ ৫৫ হাজার লিটার পানি নিষ্কাশন করা যায়। কিন্তু ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা দেখা দেওয়ার পরও স্টেশনটি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। কারণ, স্টেশনটিতে পানি যাওয়ার জন্য যেসব নালা–নর্দমা ও বক্স কালভার্ট রয়েছে, সেগুলো পুরোপুরি সচল নয়।

বৃষ্টি হলে তিনটি মাধ্যমে রাজধানীর পানি চারপাশের নদ–নদীতে গিয়ে পড়ে। এর একটি পাম্পস্টেশন। বাকি দুটি স্লুইসগেট ও খাল। ঢাকা দক্ষিণ সিটির আওতাধীন স্লুইসগেটগুলোরও বেশির ভাগ অকেজো। আর খালগুলো পানিপ্রবাহের জন্য পুরোপুরি উপযুক্ত নয়। এসব কারণে নগরবাসীকে বছরের পর বছর জলাবদ্ধতার ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। নগর–পরিকল্পনাবিদ ও প্রকৌশলীরা বলছেন, জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধানে সিটি করপোরেশন যে প্রক্রিয়ায় কাজ করছে, তা বিজ্ঞানসম্মত নয়। বৃষ্টির পানি সরাতে যা যা প্রয়োজন, এর সবই আছে। কিন্তু ঠিকভাবে কাজে লাগাতে না পারায় নগরবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

পরিবেশ

বায়ুদূষণে দেশে গড় আয়ু কমছে ৬ বছর ৮ মাস

৩০ আগস্ট ২৩, সমকাল

দূষিত বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়ার কারণে বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু কমছে প্রায় ৬ বছর ৮ মাস। তবে এলাকাভেদে পরিস্থিতি আরও করুণ। যেমন, বায়ুদূষণের কারণে ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা গাজীপুরে মানুষের গড় আয়ু কমছে ৮ বছর ৩ মাস। গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।

‘এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স, ২০২৩’ শীর্ষক বৈশ্বিক এই গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট। গবেষণায় স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ২০২১ সালের বাতাসের গুণমান বিশ্লেষণ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার পার্শ্ববর্তী গাজীপুর বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি দূষিত বায়ুর জেলা। বায়ুদূষণের কারণে এই জেলায় বসবাসকারী মানুষের গড় আয়ু কমছে ৮ বছর ৩ মাস। আর সবচেয়ে কম দূষিত যে জেলা, সেই সিলেটেও বাতাসে দূষণ কণা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডের চেয়ে ৯ দশমিক ৭ গুণ এবং জাতীয় মানের চেয়ে ৩ দশমিক ২ গুণ। বায়ুদূষণের ফলে মানুষের গড় আয়ুতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে। এ দুই অঞ্চলে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ মানুষের বসবাস। দূষিত বায়ুতে শ্বাস নেওয়ার কারণে ঢাকা ও চট্টগ্রামে মানুষের আয়ু কমছে গড়ে ৭ বছর ৬ মাস।

দেশে সীসা দূষণে বছরে ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের মৃত্যু

১৩ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

ভয়ংকর সীসা দূষণের কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর হৃদরোগে আক্রান্ত ১ লাখ ৩৮ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। একই কারণে শিশুদের  বুদ্ধিমত্তা (আইকিউ) কমে যাচ্ছে, ফলে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। মঙ্গলবার প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

‘গ্লোবাল হেলথ বার্ডেন অ্যান্ড কস্ট অব লেড এক্সপোজার ইন চিলড্রেন অ্যান্ড অ্যাডাল্টস: এ হেলথ ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড ইকোনমিক মডেলিং অ্যানালাইসিস’ শিরোনামে গবেষণাটি করেছেন বিশ্বব্যাংকের একদল গবেষক।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীসা দূষণের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। এর ফলে এক দিকে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অস্বাভাবিক হারে হৃদরোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, তেমনি শিশুদেরও আইকিউ কমে যাচ্ছে। আর্থিক ক্ষতির হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৮৬৩ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশের ২০১৯ সালের মোট জিডিপি’র প্রায় ছয় থেকে নয় শতাংশের সমান। সীসা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে শিশুদের। মাত্রাতিরিক্ত সীসা শিশুদের শরীরের বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে।

নদী গ্রাসে ২৬৫ বালুখেকো

২৪ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

দখল-দূষণে সংকুচিত হয়ে আসছে দেশের নদনদী। আবার অনেক নদী হারিয়েও গেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ২৬৫ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নদনদী থেকে অবৈধ প্রক্রিয়ায় বালু উত্তোলন করছে। যাদের মধ্যে ৫৪ জন সরাসরি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী নেতা, ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। ছয়জন ব্যবসায়ী, ১২ জন ড্রেজার মালিক-বালু ব্যবসায়ী এবং ১৯৩ জন প্রভাবশালী। রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে আইনের কোনো তোয়াক্কা করছেন না তারা। বালু তোলার কারণে নদীভাঙন বাড়ছে। বিরূপ প্রভাব পড়ছে পরিবেশের ওপরও। ড্রেজার ও পাওয়ার পাম্প লাগিয়ে বালু উত্তোলনে বিধিনিষেধ থাকলেও কিছুই মানছে না বালুখেকোরা। এভাবেই এক হাজারের বেশি বালুমহালে বালু উত্তোলনের মাধ্যমে নদীর সর্বনাশ ডেকে আনছে তারা।

গতকাল শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পর্যটন ভবনে জাতীয় নদী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে বালুমহালের ওপর করা এক গবেষণা ফলাফলে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা) আয়োজিত ‘নদীর অধিকার’ শীর্ষক ওই সেমিনারে ইউএসএআইডির সহায়তায় যুক্ত ছিল ১২টি সংগঠন। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতারা এতে বক্তব্য দেন। সেমিনারে মূল প্রবন্ধে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরেন রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের কোন নদীতে কী পরিমাণে বালু আছে, সেগুলোর কতটুকু উত্তোলন করা যাবে এবং কোথা থেকে তোলা উচিত– এ ব্যাপারে কোনো সমীক্ষা নেই। সরকারি হিসাবে দেশে বালুমহালের সংখ্যা ৭০৭। বিভিন্ন নদনদীর ৫৫৫টি স্থানকে বালুমহাল ঘোষণা করা হয়েছে। এর ৫৪ শতাংশ আবার বালু উত্তোলনের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছে। এগুলোর বাইরেও দেশের ৭৭টি নদীর ১৪২টি এলাকা থেকে বালু উত্তোলন করছেন প্রভাবশালীরা। আবার তারা ইজারা নিচ্ছেন এক জায়গার আর বালু তুলছেন আরেক জায়গা থেকে। ফলে নদী ও বসতি এলাকা– সবখানে পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

কর্ণফুলী দখল করে তৈরি হচ্ছে ‘ড্রাই ডক’

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

কর্ণফুলী নদী দখল করে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় তৈরি হচ্ছে ব্যক্তিমালিকানাধীন ‘ড্রাই ডক’। এতে নদী সংকুচিত হচ্ছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন বলছে, নদীসংক্রান্ত আইন ও হাইকোর্টের রায় লঙ্ঘন করে এই স্থাপনা তৈরি হচ্ছে। এখনই সব ধরনের নির্মাণকাজ বন্ধ করা দরকার।

ড্রাই ডক হচ্ছে বড় বড় জাহাজ বা নৌযান তৈরি, সংস্কার বা রং করার জন্য শুকনা কোনো স্থান। কর্ণফুলী ড্রাই ডক লিমিটেডের মালিক আবদুর রশিদ। ইঞ্জিনিয়ার রশিদ নামে ব্যবসায়ী মহলে তিনি পরিচিত।

কর্ণফুলী নদীর বাম তীরে আনোয়ারা উপজেলার বদলপুরা মৌজায়, সাগরের মোহনা থেকে দুই কিলোমিটার উজানে এই ড্রাই ডক তৈরি হচ্ছে। যেখানে এই নির্মাণকাজ চলছে, নদীর ঠিক অন্য পারে একইভাবে নদী দখল করে আরও স্থাপনা তৈরি হয়েছে, কিছু স্থাপনা তৈরির প্রস্তুতি চলছে। নদীটি এখানে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে এই স্থানে কর্ণফুলীর প্রস্থ ৪৫০ মিটারের কিছু বেশি, দুই দশক আগেও প্রস্থ ছিল প্রায় এক হাজার মিটার।

নদীবিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্দরে জাহাজ চলাচলের জন্য কৌশলগত দিক থেকে কর্ণফুলী নদীর এই স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ড্রাই ডককে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে ব্যক্তিমালিকানাধীন ছোট একটি বন্দর।

কর্ণফুলী ড্রাই ডক লিমিটেডের মালিক আবদুর রশিদের জাহাজ মেরামত ও নদী খননের ব্যবসা আছে। নিজেকে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার পরিচয় দিয়ে আবদুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, ড্রাই ডক তৈরি হচ্ছে বৈধভাবে। কিছু জমি তিনি এলাকাবাসীর কাছ থেকে কিনেছেন। কিছু জমি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে ইজারা নিয়েছেন। কিছু জমি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ তাঁকে ইজারা দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘কর্ণফুলী নদী দখল করে ড্রাই ডক তৈরি হচ্ছে বলে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলেছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ আমাকে জমি দিয়েছে, অনুমতিও দিয়েছে।’

চোখে দেখা ও কানে শোনা

১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর তিনজন প্রতিনিধি আনোয়ারার বদলপুরায় যান। বাংলাদেশ মেরিন একাডেমির ঘাটে নেমে দেখা যায়, বাঁ পাশে বিশাল এলাকাজুড়ে কাজ চলছে। এটাই আবদুর রশিদের কর্ণফুলী ড্রাই ডক। ড্রাই ডক তৈরির স্থানে পাথরের বিশাল স্তূপ, বহু শ্রমিক নানা ধরনের কাজ করছেন, অনেকগুলো ট্রাক মালামাল আনা-নেওয়া করছে।

মেরিন একাডেমির ঘাটের ডান পাশে চরে বিশাল ফাঁকা জায়গা পড়ে আছে। এখানে প্যারাবন ছিল, যা বদলপুরা ফরেস্ট নামে পরিচিত। কয়েক মাস আগে গাছ কাটা হয়েছে। গাছের গুঁড়ি পড়ে আছে। বন কেটে এই জায়গায় কনটেইনার ডিপো তৈরির কাজ শুরু করেছেন আবদুর রশিদ।

ড্রাই ডকের এলাকাটি দেয়ালঘেরা। প্রধান ফটকের ওপরে লেখা: কর্ণফুলী ড্রাই ডক বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল লিমিটেড। তার নিচে লেখা, সংরক্ষিত এলাকা।

ড্রাই ডকের দেয়ালের পশ্চিম পাশ দিয়ে সরু একটি রাস্তা চলে গেছে। রাস্তার পাশে পুরোনো বসতি, বদলপুরা গ্রাম। এই গ্রামের পাঁচজন বাসিন্দা ও একজন চা–বিক্রেতার সঙ্গে প্রথম আলোর প্রতিনিধিদের কথা হয়। তাঁদের প্রত্যেকের বয়স ৫০ বছরের বেশি। তাঁরা বলেছেন, ছয়-সাত বছর আগেও জোয়ারের পানি রাস্তা পর্যন্ত আসত। ড্রাই ডকের মধ্যে গ্রামের কিছু মানুষের জমি আছে, যা তাঁরা বিক্রি করেছেন।

কর্মসূত্রে ৩০ বছর ধরে ওই এলাকায় আছেন, এমন একজন সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গেও কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি প্রথম আলোকে বলেছেন, সব সময় কর্ণফুলীতে পানির প্রবাহ দেখেছেন। কিন্তু নদী দখল করে স্থাপনা তৈরির কারণে এখন জোয়ারের পানি আর তীরে পৌঁছায় না।

ছবি ও কাগজপত্র কী বলে

পূর্ণ জোয়ারে পানি যে পর্যন্ত ওপরে ওঠে এবং শেষ ভাটায় পানি নেমে যে জায়গায় পৌঁছায়, পানির এই দুই স্তরের মধ্যবর্তী স্থান নদীবিজ্ঞানে ফোরশোর নামে পরিচিত। নদীর দুই তীরের ফোরশোর নদীর মতোই গুরুত্বপূর্ণ। এটা নদীরই অংশ। তাই ফোরশোরে স্থাপনা তৈরি করা অবৈধ বলে জানিয়েছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের দেওয়া স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা যায়, ২০০১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত কর্ণফুলী ড্রাই ডকের স্থানে নদী ও ফোরশোর ছিল। ২০০১ সালের ছবি বলছে, ড্রাই ডকের এলাকায় নদী ও ফোরশোর ছিল। ২০০৯ সালের ছবিতেও তা দেখা যায়। ২০১৩ সালের ছবিতে পরিবর্তন চোখে পড়ে। তাতে দেখা যায়, এলাকায় ভরাট করে কিছু স্থাপনা তৈরি হয়েছে। ২০২৩ সালের ছবিতে দেখা যায়, নদীর অনেক ভেতরে ড্রাই ডকের অবস্থান।

শুধু স্যাটেলাইটের ছবি নয়, নথি সূত্রেও কর্ণফুলী দখলের বিষয়টি স্পষ্ট করেছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। কমিশন বলছে, হাইকোর্টের রায়ে বলা আছে সিএস রেকর্ডে (ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে নকশা) যে স্থানকে নদী বলা আছে, তাই নদী। নদী ও নদীর জায়গায় যা গড়ে উঠবে, তা অবৈধ। সিএস নকশা অনুযায়ী দেখা যায়, বদলপুরা মৌজার নদীর জমিতে কর্ণফুলী ড্রাই ডক তৈরি হচ্ছে।

আনোয়ারা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ডের কার্যালয় থেকে ২০১৯ সালে নদীর অবৈধ দখলদারের যে তালিকা তৈরি করা হয়েছিল, তাতেও অবৈধ স্থাপনা হিসেবে কর্ণফুলী ড্রাই ডকের নাম ছিল।

জেলা প্রশাসন থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গত বছরের ৭–৯ নভেম্বরে সরেজমিন ঘুরে কর্ণফুলীর পরিস্থিতি দেখে। ৯ নভেম্বর জেলা নদী রক্ষা কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ‘আনোয়ারা উপজেলার বদলপুরা মৌজা (জেএল নম্বর-২৯) এবং সংলগ্ন স্থানে অবস্থিত কর্ণফুলী ড্রাই ডক লিমিটেড ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রায় সকল স্থাপনা নদীর জমি ও ফোরশোর ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে বিধায় এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।’ এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার কথা ছিল চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে ওই বৈঠকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, কর্ণফুলী ড্রাই ডক কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সূত্র থেকে পাওয়া কাগজপত্রে দেখা যায়, এ বছর ২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক বদলপুরা মৌজার কর্ণফুলী জমির ব্যাপারে মতামত চেয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেন। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত জানতে চায়। ৪ মার্চ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় তাদের সিদ্ধান্ত জানায়।

ওই সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, বন্দরসীমার মধ্যে কোনো ভূমি বা চর সৃষ্টি হলে অন্য কোনো আইনে যা-ই থাকুক না কেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন (২০২২) অনুযায়ী ওই জমি ও চরের মালিক বন্দর কর্তৃপক্ষ। আইন অনুযায়ী বন্দর কর্তৃপক্ষ যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ডক, পিয়ার (বড় স্তম্ভ), নোঙর বা অন্য কোনো স্থাপনা নির্মাণের জন্য অনুমতি দিতে পারে। এতে বলা হয়েছে, ‘বন্দর সীমানার মধ্যে যাবতীয় কার্যাবলির ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারাধীন বিধায় এ বিষয়ে অন্যান্য সংস্থার অযাচিত হস্তক্ষেপ আইনানুগ নয়।’

ড্রাই ডকের জন্য ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক ঋণ দিয়েছে ৮০০ কোটি টাকা। ড্রাই ডকের দৈর্ঘ্য ৩০৫ মিটার, গভীরতা ১৬ মিটার। ২৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের জাহাজ এখানে ঢুকতে পারবে।

কর্ণফুলী ড্রাই ডকের মালিক আবদুর রশিদ

পরে ৫-৬ মার্চ অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম নদী রক্ষা কমিটির সভায় নদীর জায়গায় কর্ণফুলী ড্রাই ডকের স্থাপনা তৈরির প্রসঙ্গটি ওঠে। বৈঠকে কর্ণফুলী ড্রাই ডকের বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অবস্থানের বিষয়টি আলোচনা হয়। তখন বৈঠকে এ বিষয়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরী হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তকে অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, বৈঠকের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি কিছু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছেন। আর বদলপুরা মৌজার বিষয়ে তিনি বলেন, ওই এলাকায় জেলা প্রশাসনের কোনো জমি আছে কি না, তা কাগজপত্র দেখে বলতে হবে।

কর্ণফুলী ড্রাই ডকের বিষয়ে জানতে গতকাল চেষ্টা করেও নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।

নদী রক্ষার বিষয়ে অনেক দিন ধরে আইনি লড়াই করে আসছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বন্দর কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আইনের কথা বলে বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্ণফুলী নদী কাউকে দিয়ে দিতে পারে না। অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যায়, তারা দখলদারের পক্ষ নিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের উচিত ছিল নদীর পক্ষে দাঁড়ানো।

কর্ণফুলী ড্রাই ডকের মালিক আবদুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, ড্রাই ডকের জন্য ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক ঋণ দিয়েছে ৮০০ কোটি টাকা। ড্রাই ডকের দৈর্ঘ্য ৩০৫ মিটার, গভীরতা ১৬ মিটার। ২৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের জাহাজ এখানে ঢুকতে পারবে।

কর্ণফুলী ড্রাই ডক কার্যত চট্টগ্রাম বন্দর এলাকার মধ্যে আরও একটি পূর্ণাঙ্গ বন্দর। সমুদ্রগামী জাহাজ এখানে ভিড়তে পারবে, থাকবে জেটি, বড় বড় কনটেইনার রাখার ব্যবস্থা থাকবে। এটি চালু হলে এই জায়গায় জাহাজের ভিড় থাকবে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং জেলা প্রশাসক সম্মিলিতভাবে অবৈধ দখলদারের পক্ষ নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই, সাধারণভাবেই বোঝা যায় যে এই ড্রাই ডক নদী ও ফোরশোরে গড়ে উঠেছে। আমরা সব ধরনের রেকর্ডপত্র, নকশা পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করে দেখেছি এই ড্রাই ডক সম্পূর্ণ অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে, যা দেশের প্রচলিত আইন ও মহামান্য হাইকোর্টের রায়ের পরিপন্থী।’

মেঘনার অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের সঙ্গে চাঁদপুরের নারী মন্ত্রীর সংশ্লিষ্টতা আছে: নদী কমিশনের চেয়ারম্যান

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেছেন, নদী দখলদারদের পেছনে রাজনৈতিক শক্তি আছে। তিনি অভিযোগ করেছেন, মেঘনা নদী থেকে অবৈধভাবে যাঁরা বালি উত্তোলন করছেন, তাঁদের সঙ্গে চাঁদপুরের একজন নারী মন্ত্রীর সম্পর্ক আছে।

আজ রোববার বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান এ কথা বলেন। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশের নদ–নদী: সংজ্ঞা ও সংখ্যা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন।

প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে চলা অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে সভাপতির বক্তব্য দেন মনজুর আহমেদ চৌধুরী। তিনি বলেন, মেঘনা থেকে এক ব্যক্তি ৬৬৮ কোটি সিএফটি বালু চুরি করেছেন। ওই বালুর আর্থিক মূল্য ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। তাঁকে ২৬৭ কোটি টাকা রয়্যালটি দেওয়ার কথা বলে তাঁর চুরিকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় নদী কমিশনের চেয়ারম্যান আরও বলেন, হায়েনারা দল বেঁধে মেঘনায় হামলে পড়েছে। মেঘনা থেকে আবার বালু তোলার চেষ্টা চলছে। এখানে শত শত ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা হবে। এতে নদীর ক্ষতি হবে, মাছের ক্ষতি হবে, পরিবেশের ক্ষতি হবে। এদের থেকে নদীকে রক্ষা করা যাচ্ছে না। কারও নাম উল্লেখ না করে মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, চাঁদপুরের এক নারী মন্ত্রীর সঙ্গে এদের সম্পর্ক আছে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, ইজারা দেওয়ার নামে কর্ণফুলী নদী বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও জেলা পরিষদ জড়িত। সর্বশেষ যুক্ত হয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। তিনি আরও বলেন, কর্ণফুলী নদী পরিবেশের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নদী। একই সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নদী। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করে নদীর জমি খণ্ড খণ্ড করে মেরে ফেলা হচ্ছে।

ঢাকার বাসযোগ্যতায় ছাড় দিয়েই সংশোধন হলো ড্যাপ

সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৩, বণিক বার্তা

রাজধানী ঢাকার বেশির ভাগ এলাকাই গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে ছবি: মাসফিকুর সোহান

আবাসন প্রকল্পে ভবন নির্মাণের জন্য উচ্চতার ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) ছাড় দিয়ে রাজধানীর বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ ২০১৬-৩৫) সংশোধন করেছে সরকার। এ ছাড় দেয়া হয়েছে আগামী তিন বছরের জন্য। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব তারিক হাসানের সই করা গতকাল প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া প্রজ্ঞাপন হওয়ার আগে জমির মালিক ও ডেভেলপারদের মধ্যে রেজিস্টার্ড চুক্তি হয়ে থাকলে আগের ড্যাপ ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ২০০৮ অনুযায়ী ভবনের পরিকল্পনা অনুমোদনের সুযোগ দেয়া হয়েছে। রাজউকের এমন সিদ্ধান্তকে বাজে উদাহরণ বলে মন্তব্য করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। প্রভাবশালী হাউজিং ও ডেভেলপারদের দাবির মুখে ঢাকার বাসযোগ্যতায় এমন ছাড় দেয়া হয়েছে।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, নতুন ড্যাপ প্রতিষ্ঠার এক বছরের মাথায় এ সংশোধনীর মাধ্যমে তা অকার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রভাবশালীদের চাপের মুখে ধীরে ধীরে পুরো ড্যাপই কাগুজে দলিলে পরিণত হবে বলেও মন্তব্য তাদের। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন অবশ্য বলছেন, ‘ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা কিংবা বাসযোগ্যতায় ছাড় নয়, বরং জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্যই ড্যাপ সংশোধন করা হয়েছে।’

সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নতুন ড্যাপ বাস্তবায়নের জন্য এটা একটা ব্রিদিং টাইম বা স্বস্তির নিঃশ্বাস বলতে পারেন। নির্দিষ্ট সময় পর আবার আমরা নতুন ড্যাপে ফিরে যাব। সংশোধনীতে যে কেবল এফএআর বাড়ানো হয়েছে তা নয়, সেখানে অন্যান্য বিষয়ও বলা হয়েছে। পুরান ঢাকার জনবহুল এলাকার উন্নয়নে একটা সুন্দর প্রস্তাব রয়েছে। পরিকল্পিত এলাকায় তিন বছরের মধ্যে ভবন করলে কিছু বোনাস এফএআর পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এর সঙ্গে ড্যাপে প্রস্তাবিত রাস্তা প্রশস্ত করার জন্য জমির সীমানা বরাবর যে পরিমাণ জমি ছেড়ে দেয়ার শর্ত আরোপ করা হয়েছে, সেটি স্থানীয় সরকারের মালিকানায় দিয়ে দিতে হবে। এতে রাস্তা প্রশস্ত এবং নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত হবে। পার্ক, রাস্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বনভূমি, পুকুর, লেক, জলাশয়, খেলার মাঠসহ অন্যান্য যে নাগরিক সুবিধার শর্তারোপ নতুন ড্যাপে করা হয়েছে সেগুলোর কোনোটিই পরিবর্তন করা হয়নি। এগুলো নিশ্চিত করতে রাজউক নতুন নতুন প্রকল্প নিচ্ছে।’

সংশোধিত ড্যাপের কয়েক ক্যাটাগরিতে ভবনের উচ্চতায় ছাড় দেয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, আগামী তিন বছরের জন্য সরকারি ও রাজউক অনুমোদিত বেসরকারি আবাসন প্রকল্পে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বর্তমান এফএআরের পাশাপাশি অতিরিক্ত আরো দশমিক ৫ এফএআর প্রণোদনা প্রযোজ্য হবে।

এছাড়া যেসব এলাকায় এফএআরের মান ১ দশমিক ৫-এর নিচে সেসব এলাকায় ন্যূনতম ১ দশমিক ৫ এফএআর বিবেচনা করতে হবে। প্লটসংলগ্ন বিদ্যমান রাস্তা ৪ দশমিক ৮ মিটার হলে নতুন ড্যাবে এফএআরের মান দুই। এ বিধান সংশোধন করে বলা হয়েছে, বিচ্ছিন্নভাবে ও অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এলাকা যেমন—বাড্ডা, ডেমরা, খিলক্ষেত, উত্তরখান, দক্ষিণখান, রায়েরবাজার, সাভার, কেরানীগঞ্জসহ এসব এলাকার ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির সামনে ৩ দশমিক ৬৬ মিটার প্রশস্ত রাস্তা থাকলে সেখানে এফএআর বাড়িয়ে দুইয়ে উন্নীত করা হয়েছে।

সংশোধনের কারণে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নতুন ড্যাপ অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নতুন ড্যাপ গেজেটের আগে জমির মালিক ও ডেভেলপারদের মধ্যে রেজিস্টার্ড চুক্তি হয়ে থাকলে আগের ড্যাপ ও ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা, ২০০৮ অনুযায়ী এফএআর প্রযোজ্য হবে। ব্লকভিত্তিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও দশমিক ২৫ এফএআর বাড়ানো হয়েছে সংশোধিত ড্যাপে। এক্ষেত্রে উন্মুক্ত স্থান, পার্ক ও খেলার মাঠ সংরক্ষণেরও শর্ত রয়েছে। তাছাড়া ড্যাপে প্রস্তাবিত রাস্তা প্রশস্তকরণে জমির সীমানা বরাবর যে পরিমাণ জায়গা ছাড়ার শর্ত দেয়া হয়েছে তা যথাযথ রেজিস্টার্ড ইজমেন্ট দলিল করে নিঃশর্তভাবে স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। এর পরই কেবল নির্মাণ অনুমোদনপত্র দেয়ার নির্দেশনা রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি।

বাংলাদেশের সৈকতে ইউরোপের ‘বিষাক্ত’ জাহাজের বোঝা

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

ভেঙে ফেলার জন্য বাংলাদেশের সমুদ্রসৈকতে পরিত্যক্ত জাহাজ এনে ফেলছে ইউরোপের নৌপরিবহন প্রতিষ্ঠানগুলো। বাতিল এই জাহাজগুলো বিপজ্জনক ও দূষিত অবস্থায় থাকে। ফলে সেগুলো ভাঙার কাজে জড়িত শ্রমিকদের অনেকেই মৃত্যুর মুখে পড়ছেন।

 যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বেলজিয়ামভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্মের’ সঙ্গে যৌথভাবে ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এইচআরডব্লিউ।

বাংলাদেশের সীতাকুণ্ড উপজেলার সমুদ্রসৈকত বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান নির্মাণশিল্পের জন্য ইস্পাতের প্রয়োজনীতা দিন দিন বাড়ছে। এসব ইস্পাত সুলভে জোগানোর উৎস হয়ে উঠেছে পরিত্যক্ত জাহাজগুলো।

২০২০ সাল থেকে বাংলাদেশে পাঠানো ৫২০টি পরিত্যক্ত জাহাজের মধ্যে ইউরোপের প্রতিষ্ঠানগুলোর জাহাজও রয়েছে। এসব জাহাজ ভেঙে আয়রোজগার করে থাকেন হাজার হাজার শ্রমিক। তবে জাহাজে থাকা স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি এড়াতে তাঁরা সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারের সুযোগ পান না। 

এইচআরডব্লিউয়ের গবেষক জুলিয়া ব্লেকনার আজ বৃহস্পতিবার বলেছেন, বাংলাদেশের সৈকতে পরিত্যক্ত জাহাজগুলো ফেলার মাধ্যমে মানুষের জীবন ও পরিবেশের বিনিময়ে মুনাফা করছে ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। আন্তর্জাতিক আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করা থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিরত থাকতে হবে। নিজেদের পরিত্যক্ত জিনিস নিরাপদে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তাদের নিতে হবে।

জাহাজ ভাঙার কাজে জড়িত শ্রমিকেরা এইচআরডব্লিউকে জানিয়েছেন, জাহাজের ইস্পাত গলিয়ে কাটার সময় দগ্ধ হওয়া এড়াতে তাঁরা নিজেদের মোজা ও গ্লোভস ব্যবহার করেন। বিষাক্ত গ্যাস থেকে বাঁচতে মুখে শার্ট পেঁচিয়ে নেন। আর ইস্পাত কাটার পর তা খালি পায়ে পরিবহন করেন তাঁরা।

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রমিকেরা বলেছেন, অনেক সময় জাহাজের ইস্পাতের খণ্ড শ্রমিকদের ওপর পড়ে। জাহাজ ভাঙার সময় আগুন লাগলে বা কোনো পাইপে বিস্ফোরণের সময় অনেক শ্রমিক জাহাজের ভেতরে আটকা পড়ে যান। এতে অনেক সময় আহত হন তাঁরা।

পরিবেশ নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশি সংগঠন ‘ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন’ জানিয়েছে, ২০১৯ সাল থেকে সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে নানা দুর্ঘটনায় অন্তত ৬২ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আর বার্তা সংস্থা এএফপিকে পুলিশ জানিয়েছে, গত সপ্তাহেই জাহাজ ভাঙার সময় পড়ে গিয়ে আলাদা দুই ঘটনায় দুজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

সীতাকুণ্ডের পরিত্যক্ত জাহাজের মধ্যে অনেকগুলোতে অ্যাসবেসটস থাকে বলে জানিয়েছেন জাহাজভাঙা শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা দাতব্য প্রতিষ্ঠান ওএসএইচই ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রিপন চৌধুরী। এই অ্যাসবেসটসের কারণে ক্যানসারসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগ হতে পারে। রিপন চৌধুরী বলেন, অ্যাসবেসটস নিয়ে শ্রমিকদের খালি হাতে কাজ করতে বাধ্য করা হয়।

জাহাজ ভাঙার সময় বিষাক্ত অ্যাসবেসটসের সংস্পর্শে আসা ১১০ জন শ্রমিকের ওপর গবেষণা চালিয়েছিল ওএসএইচই ফাউন্ডেশন। ওই শ্রমিকদের মধ্যে ৩৩ জনের শরীরে পদার্থটির উপস্থিতি পাওয়া গেছে। রিপন চৌধুরী বলেন, ‘ওই ৩৩ জনের সবার ফুসফুস বিভিন্ন মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে তিনজন মারা গেছেন। বাকিরা দুর্দশায় জীবন কাটাচ্ছেন।’

বায়ুদূষণ রোধে বৈশ্বিক তহবিল লাভে বাংলাদেশ তৃতীয়

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

তিন বছর ধরে বায়ুদূষণের কারণে বিশ্বের ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের নাম শীর্ষে রয়েছে। আর ক্ষতিগ্রস্ত শহরের তালিকাতেও ঢাকার নাম আছে ওপরের দিকে।

তবে এই ক্ষতি মোকাবিলায় বিশ্বের যে কটি দেশ বৈশ্বিক তহবিল পাচ্ছে, সেই তালিকাতেও বাংলাদেশ তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। আর ঢাকা শহর রয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে। বায়ুদূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশ বেশি অর্থ পেয়েছে।

গতকাল শুক্রবার ক্লাইমেট পলিসি ইনিশিয়েটিভ নামের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বায়ুর মানবিষয়ক সংস্থা ক্লিন এয়ার ফান্ডের অর্থায়নে গবেষণাটির সঙ্গে ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপি, ওয়ার্ল্ড চিলড্রেন ফান্ডসহ মোট ছয়টি সংস্থা যুক্ত ছিল। ২০১৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে নির্মল বায়ুর জন্য বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাপান আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যাংকসহ মোট ১০টি আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার দেওয়া তহবিল বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে উন্নয়ন সহায়তাদানকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতি ১ হাজার ডলার সহায়তার মধ্যে ৭ ডলার ওই খাতে ব্যয় করা হচ্ছে। ২০১৬ সাল থেকে ওই সহায়তা ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০১৯ সালে এসে সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার হয়। এরপরের দুই বছর আবার তা কমতে থাকে। মূলত কোভিড–১৯ মহামারি ছড়িয়ে পড়ার পর ওই তহবিলে অর্থ কমে আসে। ২০২০ সালে তা আবারও বাড়লেও পরের বছর (২০২১) কিছুটা কমে। ২০১৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বৈশ্বিক ওই তহবিলের ৮৬ শতাংশ (১২ বিলিয়ন ডলার) পায় এশিয়ার পাঁচটি দেশ।

বনমন্ত্রীর এলাকায় সংরক্ষিত বন কেটে হবে সাফারি পার্ক, ‘আত্মঘাতী’ প্রকল্প বলছেন পরিবেশবিদেরা

১১ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

সংরক্ষিত বনে স্থাপনা নির্মাণ তো দূরে থাক, প্রবেশ করতেও বন বিভাগের অনুমতি লাগে। কিন্তু মৌলভীবাজারের জুড়ীর সংরক্ষিত বন লাঠিটিলায় এক হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে সাফারি পার্ক নির্মাণ করতে চায় বন বিভাগ।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ভেঙে পাহাড় ও গাছ কেটে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিনের নিজের নির্বাচনী এলাকায় (মৌলভীবাজার-১: বড়লেখা-জুড়ী) ৫ হাজার ৬৩১ একর জায়গাজুড়ে এই সাফারি পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। হেলিপ্যাড নির্মাণের কথাও বলা হয়েছে প্রকল্প প্রস্তাবে। এরই মধ্যে প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের খরচ বাবদ ৩৮২ কোটি টাকা চেয়েছে বন বিভাগ। অবশ্য আইন না মানা, বাড়তি ব্যয়সহ নানা অসংগতির বিষয় উল্লেখ করে গত ৩ সেপ্টেম্বর প্রকল্পটি অনুমোদন না করে ফেরত পাঠিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। কমিশনের আপত্তির জবাব দিয়ে ১ অক্টোবর পুনরায় প্রকল্প প্রস্তাবটি বন বিভাগ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রণালয় তা চূড়ান্ত করে পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের জন্য পাঠাবে। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত পাঠানো হয়নি।

সাফারি পার্কে বন্য প্রাণী উন্মুক্ত অবস্থায় থাকে। পর্যটকেরা নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ সাপেক্ষে ওই পার্ক পরিদর্শন করতে পারেন। এখন দেশে গাজীপুর ও কক্সবাজারে দুটি সাফারি পার্ক রয়েছে। আরেকটি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সংরক্ষিত বন লাঠিটিলায়।

লাঠিটিলা বনটি মৌলভীবাজারের জুড়ী-লাঠিটিলা সড়কের এক পাশে। ১৯২০ সালে একে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হয়। জেলাটিতে বর্শিজোড়া ইকোপার্ক, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড ইকোপার্ক, মাধবকুণ্ড লেক, বাইক্কার বিলসহ বেশ কিছু পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে। বছরে প্রায় পাঁচ লাখ পর্যটক সেখানে যান। পর্যটকদের জন্য হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ, রাস্তাসহ নানা অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। এর ফলে এসব বনভূমি ও জলাভূমির জীববৈচিত্র্য হুমকিতে আছে বলে সরকারি-বেসরকারি নানা গবেষণায় উঠে এসেছে। এর মধ্যে একমাত্র লাঠিটিলা বনভূমিটি সংরক্ষিত ঘোষণা করায় অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থায় আছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনসহ (বাপা) বেশ কিছু সংগঠন লাঠিটিলা বনে সাফারি পার্ক প্রকল্পটিকে বন ধ্বংসের আয়োজন বলে উল্লেখ করে তা বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছে।

ঢাকার ছয় বাজারের ডিমে মাত্রাতিরিক্ত ভারী ধাতু

১৪ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

খামারে উৎপাদিত যেসব ডিম ঢাকা শহরে পাওয়া যায়, তাতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সর্বোচ্চ অনুমোদিত মাত্রার (ম্যাক্সিমাম পার্মিসিবল লিমিট বা এমপিএল) চেয়ে বেশি পরিমাণে দস্তা, তামা, সিসা ও লোহা পাওয়া গেছে ডিমে। মাত্রাতিরিক্ত এসব ভারী ধাতুর কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) এবং হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়জন গবেষকের যৌথ গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।

ডিমের মাধ্যমে বিষাক্ত পদার্থ গ্রহণ এবং ঢাকা নগরীর মানুষের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি পরিমাপ নামের সেই গবেষণা নেদারল্যান্ডসভিত্তিক চিকিৎসা ও বিজ্ঞানবিষয়ক জার্নাল সায়েন্স ডিরেক্টের ওয়েবসাইটে গত ২৮ জুন প্রকাশিত হয়েছে। সায়েন্স ডিরেক্ট অন্তর্ভুক্ত সৌদি আরবের কিং সৌদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যারাবিয়ান জার্নাল অব কেমেস্ট্রির চলতি বছরের অক্টোবর (ভলিউম ১৬, ইস্যু ১০) সংখ্যাতেও গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।

এই গবেষণায় ডিমে ১০টি ভারী ধাতুর উপস্থিতি খোঁজা হয়। তাতে ডিমে সব কটি ধাতুরই উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ছয়টি ধাতুর উপস্থিতি সর্বোচ্চ অনুমোদিত মাত্রার (এমপিএল) মধ্যে রয়েছে। বাকি চারটি (দস্তা, তামা, সিসা ও লৌহ) ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে এমপিএলের চেয়েও বেশি। ডিমে তামার এমপিএল ১০, সেখানে পাওয়া গেছে ২৪.৯ পর্যন্ত; সিসার এমপিএল ০.১, সেখানে পাওয়া গেছে ১.৯ পর্যন্ত; লোহার এমপিএল ১৭.৬, সেখানে পাওয়া গেছে ৬৪.৫৯ পর্যন্ত এবং দস্তার এমপিএল ২০, সেখানে পাওয়া গেছে সর্বোচ্চ ৩৯.২৬।

ক্যানসার, হৃদ্‌রোগ, শ্বাসপ্রশ্বাসে জটিলতা, রক্তশূন্যতা, মস্তিষ্ক-কিডনি-স্নায়ুর ক্ষতিসহ নানা ধরনের শারীরিক সমস্যার জন্য দায়ী থাকে বাড়তি মাত্রায় থাকা এসব ভারী ধাতু। গবেষণায় বলা হয়েছে, ডিমে এসব ভারী ধাতুর উপস্থিতি প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে শিশু ও বয়স্কদের জন্য বেশি ঝুঁকি তৈরি করে।

মন্ত্রীর সমালোচনা করা নদী কমিশনের চেয়ারম্যান মনজুরকে সরিয়ে দেওয়া হলো

১৮ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছে সরকার। আজ বুধবার তাঁর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরীর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ জনস্বার্থে বাতিল করা হলো।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ২০২২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মনজুর আহমেদকে তিন বছরের জন্য জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩’–এর ধারা ৫(২) এবং একই আইনের ধারা ৫(৩) অনুযায়ী তিনি এ নিয়োগ পান। যোগদানের তারিখ থেকে এ নিয়োগ কার্যকর হবে বলে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়।

মনজুর আহমেদ জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনে যোগ দেন ওই বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি। সে হিসাবে তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় দেড় বছর আগে তাঁর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করল সরকার।

মনজুর আহমেদ চৌধুরী দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকে নদী দখল নিয়ে বক্তব্যের কারণে বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছিলেন। গত ২৪ সেপ্টেম্বর বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি সরাসরি নাম না উল্লেখ করে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির সমালোচনা করেন। ওই দিন তিনি বলেন, মেঘনা নদী থেকে অবৈধভাবে যাঁরা বালু উত্তোলন করছেন, তাঁদের সঙ্গে চাঁদপুরের একজন নারী মন্ত্রীর সম্পর্ক আছে। সেদিন তিনি বলেছিলেন, হায়েনারা দল বেঁধে মেঘনায় হামলে পড়েছে। মেঘনা থেকে আবার বালু তোলার চেষ্টা চলছে। এখানে শত শত ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা হবে। এতে নদীর ক্ষতি হবে, মাছের ক্ষতি হবে, পরিবেশের ক্ষতি হবে। এদের থেকে নদীকে রক্ষা করা যাচ্ছে না।

মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মনজুর আহমেদ চৌধুরী আজ প্রথম আলোকে বলেন, এ বিষয়ে তাঁর কিছু জানা নেই। সরকার নিয়োগ দিয়েছে, আবার সরকারই বাতিল করেছে। তিনি বলেন, নদী রক্ষায় কতটা সততার সঙ্গে কাজ করেছি, তার বিচার জনগণ করবে।

বিভিন্ন সময়ে সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমালোচনা করার কারণেই কি চুক্তি বাতিল হয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, এই বদলির মাধ্যমে নদী দখলকারী, নদী দূষণকারী, বালুখেকো–তাঁদের বিজয় হয়েছে।

মনজুর আহমেদ চৌধুরী বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) চেয়ারম্যান। তিনি প্রথম আলোকে বলেছেন, এখন থেকে নিয়মিত সিজিএসে সময় দেবেন।

২০২২ সালে বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম ও ঢাকা ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খানকে মোবাইল কোর্টের (ভ্রাম্যমাণ আদালত) মাধ্যমে বিচার করে কারাগারে পাঠানোর কথা বলেছিলেন মনজুর আহমেদ চৌধুরী। তিনি বলেছিলেন, প্রতিদিন ঢাকা শহরের মানুষ ৫০ লাখ কেজি মল ও ১৫০ কোটি লিটার মূত্র উৎপাদন করে। ঢাকা ওয়াসার দায়িত্ব ছিল এগুলো শোধন করা, কিন্তু এগুলো সিটি করপোরেশনের পানিনিষ্কাশন নালার মাধ্যমে নদ-নদীতে গিয়ে পড়ে। পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ঢাকা ওয়াসার এই ব্যর্থতার কারণে সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে চান বলে উল্লেখ করেছিলেন মনজুর আহমেদ চৌধুরী।

আর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় খাল পরিদর্শনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন, খালের ময়লা-আবর্জনা যাতে নদীতে গিয়ে না পড়ে সে জন্য খালের মুখে নেট দিতে বলা হয়েছিল। উত্তর সিটি করপোরেশন এখনো সে কাজ করেনি। এ জন্য করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামের বিরুদ্ধেও তিনি একই ধরনের শাস্তির কথা বলেন।

সিইটিপির অকেজো যন্ত্রাংশ দূষণ আরও বাড়াচ্ছে

২০ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

সাভার চামড়াশিল্প নগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের (সিইটিপি) বেশির ভাগ যন্ত্রের কার্যক্ষমতা কমে গেছে। বর্তমানে সিইটিপির ২০ টির বেশি যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ নষ্ট। শিল্পনগরীর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে এ প্রতিবেদন তৈরি করে বিসিক।

বিসিক বলছে, যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকায় চামড়াশিল্প নগরীর বর্জ্য পরিশোধনে অধিকাংশ মানমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না। তাই সিইটিপি সংস্কারে নতুন প্রকল্প নিতে চায় শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিক। বিসিক শিল্প মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি সংস্থা।

এদিকে নতুন প্রকল্প নিতে চাইলেও এ জন্য সরকারি অর্থায়ন মিলছে না। তাই বেসরকারি বিনিয়োগে সংস্কার প্রকল্প বাস্তবায়নে বিনিয়োগকারী খুঁজছে সংস্থাটি। ইতিমধ্যে একাধিক দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে প্রস্তাবনা দিয়েছে। কিন্তু নানা জটিলতায় এসব প্রস্তাব আলোর মুখ দেখছে না।

এ বিষয়ে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কমপ্লায়েন্স না থাকায় আমরা সম্ভাবনাময় চামড়া রপ্তানিতে বিপুল আয় হারাচ্ছি। চামড়াশিল্প নগরীর সিইটিপিতে শুরু থেকেই সমস্যা রয়েছে। আমরা সেটি সংস্কারের জন্য নতুন প্রকল্পের বিষয়টি যাচাই করে দেখছি।’

সিইটিপির বর্তমান অবস্থা

বুড়িগঙ্গা নদী ও ঢাকার দূষণ কমাতে ২০০৩ সালে সাভারে চামড়াশিল্প নগরীর প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। প্রকল্পের অধীনে ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকায় সাভারের হেমায়েতপুরে ১৯৯ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ২০১৭ সালে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে নেওয়া হয় সাভারে। সেখানে ২০১২ সালে একটি চীনা কোম্পানি ৫৪৭ কোটি টাকায় সিইটিপি নির্মাণের কাজ পায়। কিন্তু সিইটিপির নির্মাণকাজে ত্রুটি থাকায় শুরু থেকে এটি ঠিকভাবে কার্যকর ছিল না। এখন বিসিক বলছে, সিইটিপির কার্যক্ষমতা অনেক কমে গেছে।

বিসিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিইটিপির ডিওয়াটারিং হাউসের নয়টি ফিল্টার প্রেস যন্ত্রের মধ্যে বর্তমানে সচল আছে মাত্র দুটি। অথচ অন্তত ছয়টি ফিল্টার সব সময় সক্রিয় রাখতে হয়। অন্যথায় ফিল্টার প্রেসের মাধ্যমে স্লাজ আলাদা করা সম্ভব হয় না। সিইটিপিতে স্লাজ ট্রান্সফার পাম্প রয়েছে আটটি। এর মধ্যে চারটিই নষ্ট। এর বাইরে পাম্প, মোটর, ব্লোয়ার ও ইলেকট্রো মেকানিক্যাল উপকরণগুলোও ক্ষয়ে গেছে। ২৭টি ব্লোয়ারের মধ্যে সক্রিয় এখন ৫ টি। এ কারণে বায়োলজিক্যাল ট্রিটমেন্ট ঠিকভাবে কাজ করছে না। আবার ইকুয়ালাইজেশন ট্যাংকের চারটি পাম্পের মধ্যে দুটি নষ্ট। এতে দ্রবীভূত তরলের মধ্যে পর্যাপ্ত বায়ু সঞ্চালনের অভাবে ক্ষতিকর হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস উৎপন্ন হচ্ছে।

সিইটিপির নকশায় কারিগরি ত্রুটি রয়েছে। সিইটিপি দীর্ঘদিন ধরে নিম্ন কার্যক্ষমতায় চালু থাকলেও যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ নিয়মিত মেরামত ও কার্যকরে কর্তৃপক্ষের অদক্ষতা ও উদাসীনতা রয়েছে।

পরিবেশের দূষণ বাড়ছে

বিসিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, সিইটিপিতে দৈনিক প্রায় ২০০ টন কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার বেশির ভাগই উন্মুক্ত ডাম্পিং ইয়ার্ডে ফেলা হচ্ছে। এতে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ।

এ ছাড়া সিইটিপির দৈনিক তরল বর্জ্য পরিশোধনের ক্ষমতা ২৫ হাজার ঘনমিটার। কিন্তু বর্তমানে এই সক্ষমতার ৫৫ ভাগ ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে প্রতিদিনই তরল বর্জ্যের বড় একটি অংশ পরিশোধন ছাড়াই চামড়াশিল্প নগরীর পার্শ্ববর্তী ধলেশ্বরী নদীতে গিয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছে বিসিক।

সংস্থাটি বলছে, কোরবানির সময় এ শিল্পনগরে ৪০ হাজার ঘনমিটার পর্যন্ত তরল বর্জ্য তৈরি হয়। তাই দ্রুত সিইটিপি ঠিক করা না হলে আসছে কোরবানি মৌসুমে দূষণ সব মাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।

বিসিক কর্মকর্তারা জানান, ট্যানারিগুলো থেকে উৎপন্ন ইফ্লুয়েন্টে (বর্জ্য) ক্রোমসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর জৈব-অজৈব দূষক পদার্থ থাকে। পরিবেশে ছাড়ার আগে এগুলো অন্তত ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত পরিশোধন করা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে সিইটিপিতে বর্জ্য পরিশোধনের হার ৮৫-৯০ শতাংশ। অর্থাৎ বর্জ্য পরিশোধনের অধিকাংশ মানমাত্রাই অর্জিত হচ্ছে না।

পরিবেশদূষণের কারণে নিয়মিত জরিমানাও গুনতে হচ্ছে সিইটিপি কর্তৃপক্ষকে। সিইটিপির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট ওয়েস্টেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট কোম্পানি। ২০২১ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত কোম্পানিকে ২ কোটি ৩৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

লুট হয়ে যাচ্ছে সোমেশ্বরী নদী

২১ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

লুট হয়ে যাচ্ছে সোমেশ্বরী নদী। এতকাল দখল, দূষণ—এসব শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল নানা নদীর নাম। কিন্তু পাহাড়ি খরস্রোতা সোমেশ্বরীর দশা দেখে মনে হলো শুধু দখল–দূষণ নয়, দুর্বিনীত তাণ্ডব চলছে তার বুকে। নেত্রকোনার বিরিশিরির বটতলা মোড়ে সোমেশ্বরীর পাড়ে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে এর ক্ষতবিক্ষত চেহারা।

ইজারা নিয়ে নদী থেকে বালু তুলছে ক্ষমতাসীন দলের লোকেরাই। কিন্তু মানা হচ্ছে না ইজারার শর্ত। এককালের চোখজুড়ানো এই নদী রক্ষায় কারও কোনো কার্যকর উদ্যোগও নেই।

শত শত ‘বাংলা ড্রেজারের’ (অননুমোদিত ড্রেজার) কানফাটানো বিকট শব্দ ছড়িয়ে পড়ছে নদীর দুই পাশের প্রায় এক-দেড় কিলোমিটার এলাকায়। দূষিত পরিবেশ। দুর্বিষহ পরিস্থিতি। ক্ষতবিক্ষত সোমেশ্বরীর পাড়ে কিছুক্ষণ দাঁড়ালে কানে প্রায় তালা লেগে যায়। নদীর বুক খুঁড়ে প্রতিদিন তুলে নেওয়া হচ্ছে হাজার হাজার ট্রাক বালু, নুড়ি পাথর আর কয়লা।

বালু তোলার শ্রমিক, ট্রাকচালক আর ইজারাদারের তদারকিতে নিয়োজিত লোকেরা ছাড়া অন্যদের নদীর আশপাশে তেমন দেখা যায় না। সোমেশ্বরীর সৌন্দর্য দেখতে বেড়াতে আসেন না কেউ আর। যে সোমেশ্বরীর পাড় একসময় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা সৌন্দর্যপিপাসু পর্যটকের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত হয়ে উঠত, তার পাড় এখন পাহারা দেয় বালুদস্যুদের নিয়োজিত বিশেষ বাহিনী।

এক যে ছিল পাহাড়ি স্রোতস্বিনী

সোমেশ্বরীর খ্যাতি ছিল তার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর বিরল প্রজাতির মহাশোল মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর জন্য। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়ে জন্ম সোমেশ্বরীর। উত্তর ও পূর্ব দিকে দূরে ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে চলে গেছে গারো পাহাড়ের সারি। নিরিবিলি পাহাড়ি প্রকৃতির কোলজুড়ে এককালে ছুটে যেত স্বচ্ছ সলিলা সোমেশ্বরী। 

গারো পাহাড়ের ঢাল বেয়ে প্রবল বেগে নেমে এসে সোমেশ্বরী বাংলাদেশের সমতলে  প্রবেশ করেছে নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলায়। দুর্গাপুর থেকে হয়ে জারিয়া, বাঞ্জাইল বাজারের পশ্চিম দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মিশেছে কংস নদে।

স্থানীয় জেলেদের জীবিকার প্রধান উৎস ছিল সোমেশ্বরীতে মাছ ধরা। তা ছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেক পর্যটক আসত। পর্যটনও আয়ের একটি অন্যতম উৎস ছিল স্থানীয় বাসিন্দাদের। পাহাড় থেকে নেমে আসায় সোমেশ্বরীর খরস্রোত বহু শতবর্ষ ধরে বয়ে আনত বালু আর নুড়িপাথর। এই বালু আর পাথরই নদীটির কাল হলো অবশেষে।

গত বুধবার দুর্গাপুরের বাবুইপাড়ার মাঝি নয়ন মিয়া তাঁর ডিঙি নিয়ে অপেক্ষা করছিল বিজিবির ঘাটে। কোনো যাত্রী নেই। নয়ন বলছিলেন, লোকজন এখন আর এদিকে আসেন না। বেশির ভাগ দিনমজুরি করেন।

নদী নয়, কেবলই বালুমহাল

সরকার সোমেশ্বরী নদীকে বালুমহাল পরিচিতি দিয়েছে। নদীর নাব্যতা বজায় রাখার জন্য ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালু তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ২০০৫ সালে। কালক্রমে বালুদস্যুরা ড্রেজিংকে নদী লুটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে।

গত বুধবার দুর্গাপুর থেকে সোমেশ্বরীর বাংলাদেশের প্রবেশমুখ পর্যন্ত ঘুরে যে দৃশ্য দেখা গেল, লিখে তার বাস্তবতা প্রকাশ করা কঠিন। ইজারা দেওয়া পাঁচটি বালুমহালের আয়তন প্রায় দুই হাজার একর। নদীর প্রায় ২২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দেখা গেছে বালু পরিবহন ও বালু তুলে নদীকে নিঃশেষ করে বিপুল তৎপরতা।

সোমেশ্বরী নদী থেকে প্রতিদিন ২১ লাখ ঘনফুট বালু তোলা হচ্ছে। দিনে বালু পরিবহন করা হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ট্রাকে। দিন–রাত উচ্চ শব্দে বহু মানুষের সমস্যা দেখা দিয়েছে শ্রবণে।

দুর্গাপুরের শ্যামগঞ্জ থেকে পথের দুই ধারে খানিক পরপরই চোখে পড়ে টিলার মতো বালুর স্তূপ। এসব বালু বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয় ট্রাকে করে। কোথাও কোথাও বিশেষ ধরনের যন্ত্রে বালু থেকে নুড়িপাথর আর কয়লা আলাদা করা হচ্ছে। যন্ত্রের ঘর্ঘর শব্দ আর ট্রাকের আওয়াজ খনখন করে দিচ্ছে গ্রামীণ পরিবেশের নীরবতা।

নদী থেকে ‘বালু তোলা’ শব্দটির বদলে ‘বালু লুট’ কথাটিই বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই। সেই দৃশ্য চোখে পড়ল বিরিশিরি সেতুর ওপরে দাঁড়িয়ে। উত্তর থেকে দক্ষিণে বয়ে যাওয়া সোমেশ্বরীর চওড়া বুকে প্রবাহ এখন সরু খালের মতো। পুরো নদীতে শত শত বাংলা ড্রেজার বসিয়ে চলছে বালু তোলা। বাঁশের খুঁটির ওপরে মাচান বেঁধে বসানো হয়েছে শ্যালো মেশিন আর ছাঁকার যন্ত্র। নদী থেকে বালু উঠিয়ে ট্রাকে তোলা হচ্ছে। শত শত বাংলা ড্রেজার বসানো হয়েছে। প্রতিটি ড্রেজার প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ টন বালু ও পাথর তুলতে পারে। সারা দিন সারা রাত অবিরত চলছে এই কাজ। 

অতিরিক্ত ওজন ও ভেজা বালু বহনে প্রতিদিন প্রায় প্রতিদিন দুই হাজার ট্রাক চলছে। ফলে ভেঙে গেছে ৩১৬ কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কে সড়ক।

ড্রেজার বসানোর জন্য ফেলা রাখা হয়েছে অসংখ্য বাঁশ। ড্রেজারগুলো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নিতে নতুন করে খুঁটি পোতার জন্য এসব বাঁশ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এগুলো পরে আর সরানো হয় না। বাঁশগুলো নদীতেই থেকে যায়, যা পরে নৌচলাচল ও মাছ ধরার জন্য জাল পাতার ক্ষেত্রে মারাত্মক সমস্যা সৃষ্ট করছে বলে জানালেন দেবথৈল গ্রামের বাসিন্দা হারুন সাংমাসহ অনেকে। এ ছাড়া ড্রেজারের তেল গিয়ে মেশে নদীর পানিতে। তাতে দূষিত হচ্ছে পানি। 

‘বোবা–কালা’ হয়ে থাকা

নদীতে বালু তোলার তাণ্ডব উত্তরে নদীর শেষ সীমা ফারংপাড়া হয়ে দেশের শেষ সীমা ‘বটতলা’ পর্যন্ত। এরপরই গারো পাহাড়ের ওপর দিয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের কাঁটাতারের বেড়া। ড্রেজারের বিকট শব্দে চারপাশের যেন নরক গুলজার হয়ে আছে। নদীর পাড়ে গেলে পাশের জনের সঙ্গেও কথা বলতে হয় চিৎকার করে। পেশায় দরজি দুর্গাপুরের শিবগঞ্জের বাসিন্দা মোহাম্মদ রায়হান বললেন, ড্রেজারের শব্দের রাতে তাঁদের ভালো করে ঘুম হয় না। ‘প্রতিবাদ করেন না কেন?’ জিজ্ঞাসা করতেই তীব্র ক্ষোভে  বললেন, ‘কার কাছে প্রতিবাদ করব। কেউ কিছু বলতে গেলেই ইজারাদারের লোকেরা পুলিশ নিয়ে এসে বেঁধে থানায় নিয়ে যাবে। ভয়ে কেউ কিছু বলে না। সবার মুখে তালা।’

দিন–রাত উচ্চ শব্দে বহু মানুষের সমস্যা দেখা দিয়েছে শ্রবণে। বলা যেতে পারে, সোমেশ্বরীর পাশের মানুষেরা ‘বোবা–কালা’ হয়ে অমানবিক পরিবেশে জীবনধারণ করছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নেত্রকোনার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সারওয়ার জাহান প্রথম আলোকে বলেন, ‘অননুমোদিত “বাংলা ড্রেজার” দিয়ে বালু তোলায় নদীটি অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে, পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। তাদের কাছে সঠিক জরিপ নেই, তবে আনুমানিক প্রতিদিন ২১ লাখ ঘনফুট বালু ও পাথর তোলা হচ্ছে। নিয়ম অনুসারে হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ করে সুইং ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা উচিত। আমরা বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পুরো নদীর ওপর সমীক্ষা করে প্রকল্প তৈরির জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডে জমা দিয়েছি।’

ইজারা পান শাসক দলের লোকেরা

বরাবরই শাসক দলের লোকেরাই বালুমহালগুলোর ইজারা পেয়ে আসছেন। এবার সোমেশ্বরী নদীর প্রায় ১ হাজার ৯১৪ দশমিক ৩৪ একর জায়গাজুড়ে পাঁচটি বালুমহাল ঘোষণা করে ইজারা দেওয়া হয়েছে। ভবানীপুর এলাকা থেকে দুর্গাপুর শ্মশানঘাট, শ্মশান ঘাট থেকে চৈতাটি ঘাট, দুর্গাপুরের বিরিশিরি সেতু থেকে কেরনখোলা বাজার, চৈতাটি ঘাট থেকে গাওকান্দিয়া, বাঞ্জাইল থেকে উত্তর শংকরপুর—এই পাঁচটি বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, এবার প্রায় ৭৭ কোটি টাকায় এই পাঁচটি বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়েছে। সব কটিই পেয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালীরা। এর মধ্যে চারটি বালুমহাল ইজারা পেয়েছেন নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোস্তাক আহম্মেদ ওরফে রুহী। তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রুহী এন্টারপ্রাইজের নামে ৭৪ কোটি টাকায় তিনি এই চারটি বালুমহালের ইজারা পেয়েছেন। বাকি বালুমহালের ইজারা পেয়েছেন বিরিশিরি ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা রফিকুল ইসলামের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম।

পানি

বরেন্দ্র অঞ্চলের ৪০ ভাগ এলাকা ‘পানি সংকটাপন্ন’: গবেষণা

৩১ জুলাই ২০২৩, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

কয়েক দশক ধরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে দেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের ৪০ শতাংশেরও বেশি ইউনিয়নে পানিশূন্যতা তৈরি হয়েছে। ফলে এসব এলাকায় খাবার ও সেচের পানির মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে।

ওয়াটার রিসোর্স প্ল্যানিং অর্গানাইজেশনের (ওয়ারপো) পক্ষ থেকে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) পরিচালিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে এবং পানি সংকটাপন্ন অঞ্চলগুলোর পরিধি প্রসারিত হচ্ছে।

সর্বশেষ খবর দ্য ডেইলি স্টার বাংলার গুগল নিউজ চ্যানেলে।

রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলাজুড়ে ‘উঁচু বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূপৃষ্ঠ ও ভূগর্ভস্থ পানি পরিস্থিতির হাইড্রোলজিক্যাল অনুসন্ধান ও মডেলিং’ শীর্ষক গবেষণাটি ২০১৮ সালে শুরু হয় এবং জুন মাসে ওয়ারপো কর্তৃক অনুমোদিত হয়।

সরকার ও সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশনের (এসডিসি) যৌথ অর্থায়নে আগস্ট মাসের প্রথমদিকে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন, ওয়ারপোর মহাপরিচালক রেজাউল মাকসুদ জাহেদী।

পানির পর এবার মিটারের দাম দ্বিগুণ

২৩ আগস্ট ২৩, সমকাল

আলোচনা-সমালোচনার বৃত্ত থেকে কোনোভাবেই বের হতে পারছে না ঢাকা ওয়াসা। এবার পানির মিটারের দাম এক লাফে প্রায় দ্বিগুণ করে ফেলেছে সরকারি এই সংস্থাটি। আগে যে মিটার ৩ হাজার ৪০০ টাকায় গ্রাহক কিনতে পারতেন, এখন সেটার জন্য গুনতে হবে ৬ হাজার ৬৭৫ টাকা। অথচ এ ধরনের একটি মিটার সংগ্রহ করতে ঢাকা ওয়াসার খরচ হয় মাত্র ১ হাজার ৭০০ টাকা। একই সঙ্গে গভীর নলকূপ ও নতুন পানির সংযোগ নেওয়ার আবেদন ফরমের দাম একবারে পাঁচ গুণ বাড়ানো হয়েছে। সঙ্গে আরোপ করা হয়েছে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট)।

 জানা গেছে, সেবামূল্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের অনুমোদন নেওয়ার নিয়ম থাকলেও এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ তা নেয়নি। বোর্ডকে পাশ কাটিয়ে অনেকটা গোপনে দর বাড়ানোর অফিস আদেশ জারি করে ওয়াসার রাজস্ব শাখা, মিটার বিক্রয়কেন্দ্রসহ সংশ্লিষ্ট শাখায় চিঠি পাঠানো হয়। নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত ২২ ডিসেম্বর ঢাকা ওয়াসার সচিব শারমিন আমীর হক এসব সেবামূল্য বাড়ানোর অফিস আদেশ জারি করেন। তবে অফিস আদেশ জারিরও প্রায় এক মাস আগে ১৬ নভেম্বর থেকে সেটা কার্যকর করার কথা বলা হয় আদেশে। ‘কর্তৃপক্ষের কাজের স্বার্থে এ আদেশ জারি করা হলো’ বলে তিনি উল্লেখ করেন। বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার গ্রাহক ৪৩ লাখ ৮৮ হাজারের মতো। এ ছাড়া প্রতিবছর প্রায় ১০ হাজার নতুন গ্রাহক তৈরি হয়।

নতুন ও পুরোনো দর পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এতদিন ২০ মিলিমিটার ব্যাসের পানি সংযোগ মিটারের দাম ছিল ৩ হাজার ৪০০ টাকা। সেটা করা হয়েছে ৬ হাজার ৬৭৫ টাকা ২০ পয়সা। ২৫ মিলিমিটার ব্যাসের মিটারের দাম ছিল ৪ হাজার ৭০০ টাকা। সেটা করা হয়েছে ৯ হাজার ২৮ টাকা ৯৫ পয়সা। ৩৭ মিলিমিটার ব্যাসের মিটারের দাম ছিল ১০ হাজার টাকা। সেটা করা হয়েছে ২০ হাজার ১৩৬ টাকা ১৫ পয়সা। ৫০ মিলিমিটার ব্যাসের মিটার ছিল ১১ হাজার ৪০০ টাকা। সেটা করা হয়েছে ২৫ হাজার ২৬০ টাকা ১৫ পয়সা। জানা গেছে, ২০ মিলিমিটার পাইপের পানি সংযোগের একটি মিটার সরবরাহকারীর কাছ থেকে ঢাকা ওয়াসা কিনছে ১ হাজার ৭০০ টাকায়। সেটা বিক্রি করে একটি মিটারে লাভ করছে ৪ হাজার ৯৭৫ টাকা ২০ পয়সা। একইভাবে ২৫ মিলিমিটার ব্যাসের সংযোগের মিটার ২ হাজার ৬০০ টাকায় কিনে সেটা বিক্রি করে লাভ করছে ৬ হাজার ৪২৮ টাকা ৯০ পয়সা। একইভাবে অন্য ব্যাসের পানি সংযোগের মিটার বিক্রি করেও গ্রাহকের কাছ থেকে বড় অঙ্কের মুনাফা লুটছে ওয়াসা।

যাতায়াত ব্যবস্থা ও দুর্ঘটনা

কেরানীগঞ্জে রাসায়নিক গুদামে বিস্ফোরণে নিহত বেড়ে ৫, সবাই একই পরিবারের

১৫ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

ঢাকার কেরানীগঞ্জের কালিন্দী গদারবাগে আবাসিক এলাকায় থাকা রাসায়নিকের গুদামে বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ আরেকজন মারা গেছেন। আজ মঙ্গলবার বেলা একটার দিকে রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

নিহত সোহাগ মিয়া (৩০) গদারবাগ এলাকার হানিফ মিয়ার ছেলে। বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলে মারা যান সোহাগের স্ত্রী মিনা আক্তার (২০) ও দেড় বছর বয়সী মেয়ে তাইয়েবা আক্তার।

এ ঘটনায় আজ বিকেল পর্যন্ত নিহত ব্যক্তির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচজনে। অপর নিহতরা হলেন সোহাগের বড় ভাই সৌদিপ্রবাসী মিলন মিয়ার স্ত্রী জেসমিন আক্তার (৩২) ও তাঁর মেয়ে ইশা আক্তার (১৪)। নিহত সোহাগের দগ্ধ আরেক মেয়ে তানহা আক্তার (৪) শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন।

পরিবারের পাঁচজনকে হারিয়ে পাগলপ্রায় সোহাগ ও মিলনের বাবা হানিফ মিয়া (৫৫)। কথা বলতে গিয়ে বার বার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন তিনি। হানিফ বলেন, ‘অহন আমি কাগো নিয়া বাঁচুম? আমার মতো এই মর্মান্তিক ঘটনা যেনো আর কারো ভাগ্যে না জুটে। আরেক নাতনি তানহা হাসপাতালে ভর্তি। তারও অবস্থা বেশি ভালো না।’

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুট: সরকারি ব্যবস্থাপনায় আয় বেড়েছে

২৪ আগস্ট, ২০২৩, দৈনিক বাংলা

ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ যাতায়াতে যাত্রীদের একটি বড় অংশ ব্যবহার করে ট্রেন। ভাড়া কম এবং স্বল্প সময়ের পৌঁছানোর নিশ্চয়তা যাত্রীদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে এই রুট। বর্তমানে রেলের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে আট জোড়া ট্রেন চালিয়ে বিগত সময়ের চেয়ে আয় বেড়েছে। কিন্তু ২০১৯ সালে বেসরকারি ব্যবস্থাপনার ১৬ জোড়া ট্রেন চালিয়েও আয় কম ছিল রেলের।

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সড়কপথে বাসের ভাড়া ৮৫ টাকা, সেখানে কমিউটার ট্রেনের ভাড়া ২০ টাকা। সড়কপথে বাসে যেতে ৩ ঘণ্টা সময় লাগে, যেখানে ট্রেনে যেতে লাগে ৪৫ মিনিট। ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন এনে বেসরকারিকে বাদ দিয়ে সরকারিভাবে ট্রেন পরিচালনার কারণে এই রুটের আয় বেড়েছে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় লোকাল ট্রেন চলাচল করত। রেলের সে সময় ১৬ জোড়া (৩২টি) ট্রেন চালিয়ে গড়ে দৈনিক আয় প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। চুক্তির মেয়াদ শেষে ২০১৯ সালের জুলাই থেকে রেলওয়ে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় লোকাল ট্রেন পরিচালনা করে যাতে রেলের আয় বৃদ্ধি পায়। এরপর ২০২০ সালের মার্চ মাসে করোনার কারণে সারা দেশে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দেশব্যাপী করোনার দোলাচলে লোকাল কমিউটার ট্রেন চলাচল বেশ ঝিমিয়ে পড়ে। ২০২১ সালেও ছিল করোনার প্রভাব। এরপর ২০২২ সালে পুরোদমে আবারও এই রুটে রেলের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় লোকাল ট্রেন চালিয়ে গড়ে দৈনিক ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা আয় হয়েছে।

তিন বছরের প্রকল্প সাড়ে ১৪ বছর পর আংশিক উদ্বোধন!

৩০ আগস্ট ২০২৩, শেয়ার বিজ

ঢাকা শহরের উত্তর থেকে দক্ষিণে নির্বিঘœ ও দ্রুত সড়ক যোগাযোগ চালু করতে ২০০৯ সালে নেয়া হয় ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প। ২০১১ সালে এটি নির্মাণ চুক্তি সই হয়। কথা ছিল ২০১৩ সালের মধ্যে এক্সপ্রেসওয়েটি উদ্বোধন করা হবে। তবে নির্ধারিত সময়ের প্রায় ১০ বছর পর আংশিক উদ্বোধন করা হচ্ছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কয়েক দফা নকশাই পরিবর্তন করা হয়েছে। এছাড়া ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা, পিপিপি অংশীদারের অর্থের সংস্থান না হওয়াসহ নানা জটিলতায় এর নির্মাণকাজ শেষ করার সময়সীমা পাঁচবার পিছিয়েছে। সর্বশেষ হিসাবে এটি ২০২৪ সালে পুরোপুরি শেষ হবে বলে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

যদিও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত অংশটি উদ্বোধন করা হচ্ছে আগামী ২ সেপ্টেম্বর।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) তথ্যমতে, ২০০৯ সালে প্রকল্পটি নেয়া হলেও অ্যালাইনমেন্ট চূড়ান্ত ও নকশা প্রণয়নেই দুই বছর ব্যয় হয়। এতে পিপিপি অংশীদারি প্রতিষ্ঠান ইটাল-থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে নির্মাণ চুক্তি সই হয় ২০১১ সালের জুনে। তবে এর আগে ওই বছর ৩০ এপ্রিল এর প্রথম দফা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে অর্থ সংস্থান না হওয়ায় পিপিপি বিনিয়োগকারী প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সময় বাড়ানোর আবেদন করে।

এর মাঝে এক্সপ্রেসওয়ের নকশায় পরিবর্তন আনা হয়। প্রায় তিন বছর পর নকশা সংশোধন করে ২০১৩ সালের নভেম্বরে পিপিপি অংশীদার ইটাল-থাইয়ের সঙ্গে পুনরায় নির্মাণ চুক্তি সই করা হয়। এর পর ২০১৪ সালের ৩০ অক্টোবর ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ কাজ উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এর পরও শুরু হয়নি ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ। যদিও সে সময় ২০১৭ সালে এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মাণকাজ শেষ করার কথা ছিল।

সংশোধিত হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩ সালে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইতালিয়ান থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির আট হাজার ৯৪০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করার কথা ছিল। আর ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফান্ড (ভিজিএফ) হিসেবে দুই হাজার ৪১৪ কোটি টাকা দেয়ার কথা ছিল সরকারের। প্রথম অংশের কাজ সম্পন্নের পর ছয় কিস্তিতে এ অর্থ দেয়ার কথা। এছাড়া জমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও পরিষেবা সংযোগ লাইন স্থানান্তরে ব্যয় ধরা হয় দুই হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা। এটিও বহন করবে সরকার।

যদিও শুরুতে এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় আট হাজার ৭০৩ কোটি টাকা। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সর্বশেষ ট্যাক্স, ভ্যাটসহ নির্মাণ ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার কোটি ৭০ লাখ টাকা।

রাজধানীতে দিনভর যানজট, দুর্ভোগ

০২ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বিমানবন্দর থেকে ফার্মগেট অংশের উদ্বোধন হয়েছে আজ। এ উপলক্ষে রাজধানীর সড়কে যানজটে ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। এর মধ্যে শেরে বাংলা নগরে পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সুধী সমাবেশে আসা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মিছিল এবং সড়কে রাখা গাড়িতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এতে আশাপাশের হাসপাতালগুলোতে রোগীর স্বজনরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ সয়েছেন।

নির্মাণাধীন উড়াল সড়কের বিমানবন্দর-ফার্মগেট অংশের কাওলা থেকে আজ বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর যাত্রা শুরু করে। এর আগে তিনি সড়ক পথে গণভবন থেকে কাওলায় যান। সরকার প্রধানের নিরাপত্তার কারণে মিনিট বিশেক ওই সড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখা হয়।

কারিগরি ও নকশাগত ত্রুটিতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ

সেপ্টেম্বর ০৪, ২০২৩, বণিক বার্তা

পাহাড়ি ভূমির সঙ্গে সমন্বয় করে তৈরি করা হয়েছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক। এ সমন্বয়ের কারণে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার এলাকায় অতিবৃষ্টি কিংবা বন্যায় মহাসড়কের যেমন কোনো ক্ষতি হয়নি, তেমনি মহাসড়ক বন্যা বা জলাবদ্ধতার কারণও হয়ে দাঁড়ায়নি। কিন্তু দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের ক্ষেত্রে পাহাড়ি ভূমির সঙ্গে রেলপথের সমন্বয়ে যথেষ্ট অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে, রেলপথটির জন্য যে সড়কবাঁধ তৈরি করা হয়েছে, তার উচ্চতা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চেয়েও বেশি। স্থানীয়দের দাবি সত্ত্বেও রেলপথটিতে পর্যাপ্তসংখ্যক সেতু-কালভার্ট রাখেনি প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। সেতু-কালভার্টের গঠন এবং এসব কাঠামোয় পানি প্রবেশের ‘‌ক্যাচমেন্ট এরিয়া’ নির্মাণ যথাযথ হয়নি বলে দাবি পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তাদের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন কারিগরি ও নকশাগত ত্রুটির কারণেই আগস্টের প্রথম সপ্তাহের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় এ রেলপথ। যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যতে রেলপথটি আরো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রকল্প এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী বন্যা বা জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাহাড় ও বনাঞ্চল বেষ্টিত চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকায় বর্ষা মৌসুমে বন্যা হলেও তা কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কিন্তু গত আগস্টের প্রথম সপ্তাহে যে বন্যা হয়, তা ছিল এ অঞ্চলের স্মরণকালের সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘস্থায়ী। এ বন্যায় সদ্য নির্মিত দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথের কিছু অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতির মুখে পড়েন এখানকার মানুষ। নষ্ট হয় ঘরবাড়ি ও ক্ষেতের ফসল। পাহাড়ি এলাকায় বন্যা বা জলাবদ্ধতা দ্রুত নিষ্কাশন হওয়ার কথা থাকলেও রেলপথের উঁচু বাঁধ বন্যার পানি নামার ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত করেছে, এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।

এক্সপ্রেসওয়েতে দ্রুতগতি, সড়কে নেমেই যানজট

০৪ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

যান চলাচলের জন্য গতকাল রোববার ভোরে খুলে দেওয়া হয় দেশের প্রথম উড়াল মহাসড়ক তথা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। পুরো সড়কে যানবাহন চলছে বাধাহীন, দ্রুতগতিতে। বিমানবন্দর এলাকার কাওলা র‍্যাম্প দিয়ে উঠে সাড়ে ১১ কিলোমিটার দূরের ফার্মগেট র‍্যাম্প হয়ে ইন্দিরা রোড পর্যন্ত লাগে মাত্র ১২ মিনিট। কিন্তু সেখান থেকে ঘুরে মাত্র কয়েকশ মিটার দূরে ফার্মগেটের প্রধান সড়ক পর্যন্ত লাগে ২২ মিনিট।

এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করে চলা যাত্রীরা গতকাল এ অভিজ্ঞতার কথা জানান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্যান্য দেশেও ফ্লাইওভার এবং উড়াল সড়ক থেকে নামার পথে এমন ভোগান্তি হয়। গাড়ি র‍্যাম্প থেকে নামার পথে আধুনিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই এ সমস্যার সমাধান।

২৫ বছর পর মালিকানা পাবে বাংলাদেশ

০২ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

সরকারি–বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) বড় প্রকল্পের একটি ঢাকা উড়ালসড়ক (ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে) প্রকল্প। বাংলাদেশ ছাড়া থাইল্যান্ড ও চীনভিত্তিক দুটি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ এবং নির্মাণকাজের মাধ্যমে এই উড়ালসড়কের অংশীদার।

চুক্তি অনুসারে, বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান নকশা প্রণয়ন, নির্মাণকাজের অর্থ জোগাড় করবে এবং উড়ালসড়ক চালুর পর তা পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে। ২৫ বছর পর বাংলাদেশ সরকারের কাছে বিনিয়োগকারীরা উড়ালসড়কটি হস্তান্তর করবে। এর আগে টোল আদায় করে বিনিয়োগ করা অর্থ সুদাসলে তুলে নেবে বিনিয়োগকারীরা।

২০০৯ সালে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প নেওয়া হয়। উড়ালসড়কের পথ চূড়ান্ত করা ও নকশা প্রণয়নেই দুই বছর চলে যায়। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে প্রথমে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে থাইল্যান্ডভিত্তিক ইতাল-থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে নির্মাণ চুক্তি সই হয়। ওই বছর ৩০ এপ্রিলে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শুরুতে ইতাল–থাই কোম্পানির সঙ্গে ৮ হাজার ৭০৩ কোটি টাকায় চুক্তি হয়। সাড়ে তিন বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে উড়ালসড়কটি চালু করার কথা ছিল। কিন্তু সময়মতো কাজ শুরু না হওয়ায় ও নকশায় কিছু পরিবর্তন আনার কারণে ২০১৩ সালে ২৩৭ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৮ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে চুক্তি সংশোধন করা হয়।

চুক্তি অনুসারে, মূল কাঠামো নির্মাণ ব্যয়ের ৭৩ শতাংশ জোগান দেবে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। আর ২৭ শতাংশ দেবে বাংলাদেশ সরকার। যা ভায়াবিলিটি গ্যাপ (ভিজিএফ) নামে পরিচিত। ভিজিএফ হিসেবে সরকারের ২ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা দেওয়ার কথা মগবাজার পর্যন্ত অংশের কাজ শেষ হওয়ার পর।

বিনিয়োগকারীর সঙ্গে চুক্তি অনুসারে, উড়ালসড়ক দিয়ে দিনে সর্বোচ্চ প্রায় ৮০ হাজার যানবাহন চলাচল করবে বলে ধারণা করা হয়, আর সর্বনিম্ন যানবাহন চলাচল করতে পারে সাড়ে ১৩ হাজার। ৮০ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচল করলে বাড়তি যে টোল আদায় হবে, এর ২৫ শতাংশ বাংলাদেশ পাবে। অন্যদিকে সাড়ে ১৩ হাজারের চেয়ে কম যানবাহন চলাচল করলে বিনিয়োগকারীকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে সরকারের। চুক্তিতে বলা আছে, একটানা ১৫ দিন দৈনিক গড়ে সাড়ে ১৩ হাজারের কম যানবাহন চলাচল করলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিনিয়োগকারীকে চুক্তির চেয়ে বাড়তি সময় টোল আদায় করার সুযোগ দিতে হবে।

বিনিয়োগকারীর সঙ্গে চুক্তি অনুসারে, উড়ালসড়কটি ২৫ বছর তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এর মধ্যে নির্মাণ সময় সাড়ে তিন বছর। অর্থাৎ বিনিয়োগকারী সাড়ে ২১ বছর টোল আদায় করে অর্থ নিয়ে যাবে। এ সময়ের মধ্যে কখনো টানা ১৫ দিন সাড়ে ১৩ হাজারের কম যানবাহন চলাচল করলে সময় বাড়িয়ে ক্ষতিপূরণ শোধ করতে হবে।

চুক্তি অনুসারে, বিনিয়োগকারীদের অধীনে থাকা অবস্থায় উড়ালসড়ক থেকে বাংলাদেশ ফি হিসেবে পাবে মাত্র ২৭২ কোটি টাকা। তবে তা একবারে নয়, বছর বছর দেবে তারা। কোন বছর কত টাকা দেবে, এর একটা তালিকাও চুক্তিতে রয়েছে।

উড়ালসড়ক নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ফাস্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে লিমিটেড কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। এতে ইতাল–থাই ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কোম্পানির শেয়ার ৫১ শতাংশ। চীনের শেনডং ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো–অপারেশন গ্রুপের মালিকানা ৩৪ শতাংশ। চীনের আরেক প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো করপোরেশনের শেয়ার ১৫ শতাংশ।

এর বাইরে উড়ালসড়কের জন্য জমি দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন, বিভিন্ন সেবা সংস্থার লাইন সরানো ও পরামর্শকদের ব্যয় মেটানোর দায়িত্বও বাংলাদেশ সরকারের। এ জন্য সাপোর্ট টু এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নামে আরেকটি প্রকল্প চলমান রয়েছে সেতু বিভাগের। শুরুতে ২০১১ সালে এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা।

ঘণ্টায় এক্সপ্রেসওয়েতে চলছে হাজার গাড়ি, সবই প্রাইভেটকার

০৪ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

উড়াল মহাসড়ক তথা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে প্রথম ২৪ ঘণ্টায় গাড়ি উঠেছে ২২ হাজার ৮০৫। এসব গাড়ি থেকে টোল আদায় হয়েছে ১৮ লাখ ৫২ হাজার ৮৮০ টাকা। সেতু বিভাগ গাড়ির শ্রেণি না জানালেও টোলের হিসাব অনুযায়ী, প্রথম ২৪ ঘণ্টায় এক্সপ্রেসওয়েতে যতগুলো গাড়ি চলেছে তার প্রায় সবই জিপ, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাসের মতো ব্যক্তিগত গাড়ি। আর বাস, ট্রাকের মতো যানবাহন এক্সপ্রেসওয়েতে উঠছে না বললেই চলে।

সোমবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত ১৩ ঘণ্টায় ১৬ হাজার ৮২৪টি যানবাহন এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করেছে। এ সময় টোল আদায় হয়েছে ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ১২০ টাকা।

এর মধ্যে বিমানবন্দর থেকে বনানী, মহাখালী, ফার্মগেটের পথে ৯ হাজার ৩৮৪টি যানবাহন এক্সপ্রেসওয়েতে উঠেছে। প্রথম ২৪ ঘণ্টার মতো দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়েতে আজও যত গাড়ি চলেছে, তার প্রায় সবই ব্যক্তিগত।

প্রথমদিনের মতো আজও এক্সপ্রেসওয়েতে বাস-ট্রাক চলাচল করতে দেখা যায়নি। তেজগাঁও-সাতরাস্তা হয়ে চলাচল করা গাজীপুর পরিবহনের চালক ইসরাফিল হোসেন বলেছেন, বাসের যাত্রীরা পথে পথে নির্ধারিত স্টপেজে নামেন, ওঠেন। এক্সপ্রেসওয়েতে বাস চললে তেজগাঁও থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার পথে যাত্রী ওঠানামার সুযোগ নেই। তাই উড়াল মহাসড়কে বাস চলছে না।

গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া থেকে ঢাকা শহরের ভেতর দিয়ে রাতের বেলায় চলাচলকারী পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যানও এক্সপ্রেসওয়েতে উঠছে না। ট্রাক মালিক তাজুল ইসলাম সমকালকে বলেছেন, বিমানবন্দর থেকে উঠে ফার্মগেট পর্যন্ত ৪০০ টাকা দিতে হবে। যাত্রাবাড়ি, সায়েদাবাদের দিকে গেলে ফার্মগেট থেকে ঘুরে যানজট ঠেলে যেতে হবে। এতে সময় নষ্ট হবে। তাই এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করছি না।

এদিকে গতকালের মতো আজও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে গাড়ি নামার পর ফার্মগেটের আনোয়ারা উদ্যানের দুই পাশে তীব্র যানজট ছিল। অন্যদিকে এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠার পথ তেজগাঁও-বিজয়সরণি ফ্লাইওভারে দীর্ঘ গাড়ির সারির ছিল। তবে বিমানবন্দরের কাওলা এলাকায় এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠার র‍্যাম্পে যানজটের ভোগান্তি ছিল না। আগের দিনে মতো আজও এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠার পর গাড়ি চলেছে নির্বিঘ্নে।

ঢাকার দ্রুতগতির উড়ালসড়কে যে কারণে উঠতে চাইছে না বাস-মিনিবাস

০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

ঢাকার দ্রুতগতির উড়ালসড়ক (এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে) দিয়ে বাস-মিনিবাস চলাচলের অনুমতি রয়েছে। তবে অনুমতি থাকা সত্ত্বেও এই উড়ালসড়ক দিয়ে চলাচলের ব্যাপারে বাস-মিনিবাসের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।

কিন্তু কেন দ্রুতগতির উড়ালসড়কে বাস-মিনিবাস উঠছে না? সংশ্লিষ্ট বাস-মিনিবাস কোম্পানির মালিকেরা বলছেন, এই উড়ালসড়ক দিয়ে চললে পর্যাপ্ত যাত্রী পাওয়া যাবে না। মূলত, এ কারণেই দ্রুতগতির উড়ালসড়কে বাস-মিনিবাস উঠছে না।

তবে সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসি এই উড়ালসড়ক দিয়ে কিছু বাস চালু করা যায় কি না, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে। কিন্তু সংস্থাটিরই সূত্র বলছে, দ্রুতগতির উড়ালসড়কে বাস চালু করা লাভজনক হবে না।

যানজট এড়িয়ে ঢাকার উত্তর-দক্ষিণমুখী যানবাহনের যাতায়াত নিশ্চিতে এই উড়ালসড়কের কাওলা থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত অংশ দিন কয়েক আগে চালু হয়েছে। ২ সেপ্টেম্বর এই অংশে চলাচল উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধনের পরদিন ৩ সেপ্টেম্বর সকাল ছয়টা থেকে সাধারণ যানবাহনের চলাচল শুরু হয়। তেজগাঁও থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী পর্যন্ত উড়ালসড়কের বাকি অংশ আগামী বছরের জুনে চালু করার লক্ষ্য ঠিক করছে সরকার।

দ্রুতগতির এই উড়ালসড়কের মোট দৈর্ঘ্য ১৯ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছের কাওলা থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত চালু হওয়া অংশের দূরত্ব সাড়ে ১১ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১৫টি স্থানে ওঠানামা করার ব্যবস্থা (র‌্যাম্প) আছে। বিমানবন্দর এলাকায় দুটি, কুড়িলে তিনটি, বনানীতে চারটি, মহাখালীতে তিনটি, বিজয় সরণিতে দুটি ও ফার্মগেট এলাকায় একটি ওঠানামার জায়গা আছে। তবে মহাখালী ও বনানী ১১ নম্বর দিয়ে নামার পথ দুটি পরে চালু হবে।

উড়ালসড়ক দিয়ে আট ধরনের যানবাহন চলাচলের অনুমতি রয়েছে। এগুলো মধ্যে রয়েছে বাস, মিনিবাস, কার (সেডান), মাইক্রোবাস, স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল (এসইউভি, যা জিপ নামে পরিচিত), কয়েক ধরনের পণ্যবাহী ট্রাক ও পিকআপ। মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ তিন চাকার যান ও বাইসাইকেল চলাচলের অনুমতি নেই। পথচারীদেরও চলাচলের অনুমতি নেই। এই চিত্র থেকে অনেকেই বলছেন, উড়ালসড়কটি আসলে ‘ধনীদের’ জন্য। ফলে ১৩ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকার এই প্রকল্প ঢাকার সাধারণ মানুষের তেমন কাজে আসবে না।

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে

ওপরতলা আর নিচতলার যোগাযোগ–বৈষম্য দৃশ্যমান হয়েছে

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

রাজধানীজুড়ে একের পর এক উড়ালসড়ক হয়েছে। কিন্তু যানজট কমাতে পারেনি কোনোটিই। সদ্য আংশিক চালু হওয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েও যানজট কমাতে পারেনি; বরং কিছু জায়গায় বেড়েছে। জনগণের টাকায় এক্সপ্রেসওয়ে হলেও বড় অংশই তা ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে না। ধনী-গরিবের মধ্যে যে বৈষম্য, তা এক্সপ্রেসওয়ের মাধ্যমে আরও দৃশ্যমান করেছে।

 আজ বুধবার ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) উদ্যোগে সমসাময়িক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিশ্লেষণী এক অনুষ্ঠানে এসব কথা উঠে আসে। অনলাইনে ‘ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পরিকল্পনাগত পর্যালোচনা’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠান হয়। 

 আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। সেখানে তিনি বলেন, কাওলা অংশ থেকে ইন্দিরা রোড পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে চালু হয়েছে। এখানে ব্যক্তিগত গাড়িই চলছে বেশি। গণপরিবহন এখনো চলছে না। গণপরিবহন বা সাধারণ মানুষ নগর-পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাচ্ছে কি না, সেটা একটা প্রশ্ন। আংশিক চালু হওয়ায় এখন যেটা হয়েছে, সেটা এক্সপ্রেসওয়ে বলা যায় না। এখন এটাকে উড়ালসড়কই বলা যায়।

বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় উড়ালসড়কের নিচের সড়ক, রেলব্যবস্থারও উন্নয়ন হয়। কিন্তু এখানে  বিপরীতটাই দেখা যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন আদিল মুহাম্মদ। তিনি মেয়র হানিফ উড়ালসড়কের উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে নিচের সড়কের অবস্থা খারাপ। যদি নিচের রাস্তা ভালো থাকে, তাহলে টোল দিয়ে অনেকেই উড়ালসড়কে উঠবেন না। তাই রাস্তা সংস্কারে কোনো উদ্যোগ নেই।

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কারণে ধনী-গরিবের বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়েছে উল্লেখ করে আদিল মুহাম্মদ বলেন, ওপরতলার মানুষ ১০ মিনিটে ফার্মগেট বা কাওলা চলে যাচ্ছেন। আর নিচতলার সাধারণ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকছেন। ওপরতলার মানুষের আপাত সুবিধার কারণে র‌্যাম্পগুলোতে যে যানজট তৈরি হচ্ছে, সেটার ফলাফল নিচতলার মানুষ ভোগ করবেন। তিনি আরও বলেন, আগে বৈষম্য থাকলেও এখন ওপরতলা আর নিচতলার যোগাযোগ-বৈষম্য দৃশ্যমান হয়েছে। মানুষের ভেতরে এটা ক্ষোভের জন্ম দেবে। তিনি মনে করেন, গণপরিবহন বাড়িয়ে ব্যক্তিগত গাড়ির নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই যানজট নিয়ন্ত্রণে আসবে। কারণ, ব্যক্তিগত গাড়ি শহরের অধিকাংশ রাস্তা দখল করে থাকে।

আলোচকেরা জানান, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পুরোপুরি চালু হলেও একাধিক জায়গায় র‌্যাম্প থাকার কারণে যানজট তৈরি হবে। এটা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) তৈরি হচ্ছে। বেসরকারি বিনিয়োগ থাকলেও দিন শেষে জনসাধারণকেই পরোক্ষভাবে ঋণ শোধ করতে হয়। কিন্তু সর্বসাধারণের চলাচলের সুযোগ এখনো নেই। এ ছাড়া বক্তারা বলেন, এক্সপ্রেসওয়েতে যদি এমন হতো যে বিআরটি সেবা ওপর দিয়ে চলবে এবং ব্যক্তিগত গাড়ি নিচ দিয়ে চলবে, তাহলে গণপরিবহন প্রাধান্য পেত এবং ব্যক্তিগত গাড়ির লোকজন গণপরিবহন ব্যবহারের দিকে ঝুঁকতেন। ব্যক্তিগত গাড়িকে নিরুৎসাহিত করে গণপরিবহনবান্ধব ব্যবস্থা করাই পরিবহনব্যবস্থার মূল সূত্র।

১৮শ কোটি টাকার প্রকল্প বেড়ে ১৮ হাজার কোটি

সময়ের আলো, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

২০১০ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন হওয়ার সময় চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার ও রামু থেকে মিয়ানমারের কাছে ঘুমধুম পর্যন্ত ১২৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। তবে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার আগেই ২০১৬ সালে বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন শেষে প্রকল্প ব্যয় এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ নির্মাণ শুরুর আগেই প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যায় ১০ গুণ অর্থাৎ ১৬ হাজার ১৮২ কোটি টাকা বা ৮৭৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। কিন্তু অস্বাভাবিক ব্যয় বাড়ানোর পরও এই প্রকল্পে নিম্নমানের কাজ ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

যথাসময়ে কাজ শেষ করা এবং প্রকল্প ব্যয় না বাড়াতে প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা থাকলেও মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে ১০ গুণ ব্যয় বৃদ্ধিকে অস্বাভাবিক আখ্যা দিয়ে পরিবহন ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে অর্থ আত্মসাতের জন্যই বারবার বিভিন্ন প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর ঘটনা ঘটছে। এর সঙ্গে রেলওয়ে ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের একটি সিন্ডিকেট জড়িত বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে প্রকল্প গ্রহণের আগে মাঠ পর্যায়ে সঠিক সমীক্ষা না করারও। তবে রেলওয়ের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, জমি অধিগ্রহণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং ডাবল লাইন ও ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণের কারণে ব্যয় বেড়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ হাজার ৪৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ১৫৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। এ ছাড়া প্রকল্পটির রামু-ঘুমধুম অংশের সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় ধরা আছে ২ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকল্পটির প্রথম অংশের দুই প্যাকেজের ঠিকাদার নিয়োগ করা হলেও কাজ শুরু হয় পরের বছর। এর মধ্যে দোহাজারী-চকরিয়া পর্যন্ত প্রথম প্যাকেজ যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিআরইসি) ও বাংলাদেশের তমা কনস্ট্রাকশন। এ অংশের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের জুলাইয়ে। আর চকরিয়া-রামু-কক্সবাজার অংশের দ্বিতীয় প্যাকেজে যৌথভাবে কাজ করছে চায়না সার্টিফিকেশন অ্যান্ড ইন্সপেকশন কোম্পানি (সিসিইসিসি) ও বাংলাদেশের ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার। এ অংশের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের মার্চে। দেশীয় প্রভাবশালী এ দুটি প্রতিষ্ঠানই রেলওয়ের বেশিরভাগ বড় কাজ নিয়ন্ত্রণ করে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সম্প্রতি ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে নির্মাণাধীন রেললাইনের একটি অংশে পাথর ও মাটি ভেসে যাওয়ার পাশাপাশি রেললাইন উঁচু-নিচু ও বাঁকা হয়ে যায়। এতে রেলপথ নির্মাণ ও সংস্কারে অনিয়ম এবং দুর্নীতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিকভাবে সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই প্রকল্প গ্রহণ এবং প্রকল্পের নকশায় ত্রুটির কারণে পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় কক্সবাজারের রেলপথ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তা ছাড়া তত্ত্বাবধান, রক্ষণাবেক্ষণ ও সঠিক উপকরণ সঠিকভাবে ব্যবহার না করার কারণে রেললাইন বেঁকে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্রিটিশ আমলে তৈরি রেললাইন বাঁকা হওয়ার কোনো খবর পাওয়া না গেলেও নতুন তৈরি করা লাইন বেঁকে যাওয়ার ঘটনায় প্রকল্পের নির্মাণ কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে প্রকল্পের ব্যয় ১০ গুণ বাড়ানোর পরও নিম্নমানের কাজ হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্টজনরা।

ফায়ার সেফটি ছিল না, নোটিশেও কাজ হয়নি: ফায়ার সার্ভিস

আজকের পত্রিকা, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩

সাড়ে ৫ ঘণ্টার আগুনে মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মার্কেটে কোনো ধরনের ফায়ার সেফটি ছিল না। এমনকি প্রাথমিক ফায়ার ফাইটিংয়ের কোনো ব্যবস্থাও ছিল না। উৎসুক জনতা ও পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় আগুন নেভাতে বেগ পেতে হয়।

আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টায় সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড ম্যানটেনেন্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. তাজুল ইসলাম।

মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘মোহাম্মদপুর নতুন বাজারে (কৃষি মার্কেট) অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ৯ মিনিটের মাথায় আমরা চলে আসি। রাত ৩টা ৫২ মিনিট থেকে আমরা কাজ শুরু করি। সকাল ৯টা ২৫ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ১৭টি ইউনিটের ১৫০ জন ফায়ার ফাইটার কাজ করেছেন। আমাদের বিজিবি, পুলিশ, র‍্যাব, সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী সহযোগিতা করেছে।’

তিনি বলেন, মার্কেটটিতে কোনো সেফটি প্ল্যান নেই। বারবার নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং বিভিন্নভাবে গণসংযোগ করা হলেও কোনো কাজ হয়নি। সচেতনতার প্রোগ্রাম যেভাবে আমরা করেছি, সেভাবে তাঁরা সাড়া দেননি। মার্কেটটা কিছুটা বঙ্গবাজার টাইপের। এখানে ভেতরে অনেক ছোট ছোট সাব হয়েছিল। ভেতরে যতগুলো রাস্তা এবং বাইরের যে ছোট ছোট রাস্তা, পুরোটাই বিভিন্ন মালামাল দিয়ে বন্ধ করা ছিল। পুরো মার্কেট টাইট কলাপসিবল গেট দিয়ে আটকানো ছিল।’

এক কোটি পথচারীর অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ মাত্র ০.২৪%

সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৩, বণিক বার্তা

ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন যত মানুষ চলাচল করে, তার উল্লেখযোগ্য অংশই হেঁটে গন্তব্যে যায়। বর্তমানে প্রতিদিন নগরবাসী এক স্থান থেকে আরেক স্থানে গড়ে ৪ কোটি ২০ লাখ বার যাতায়াত (ট্রিপ প্রডিউস) করে। এ যাতায়াতের ২০ শতাংশই ঘটে পথচারী চলাচলে। এমন চিত্র উঠে এসেছে ২০১৫-২০৩৫ সালের জন্য প্রণীত সরকারের সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (আরএসটিপি)। তবে বুয়েটের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন পথচারী চলাচলের এ হার প্রায় ৩০ শতাংশ। এ দুই হিসাবকে আমলে নিয়ে দেখা যায়, রাজধানীতে প্রতিদিন এক কোটি বা তারও বেশিবার হেঁটে যাতায়াত করে পথচারী। রাজধানীর যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের যত বিনিয়োগ রয়েছে তার মধ্যে এ এক কোটি পথচারীর জন্য বরাদ্দ মাত্র দশমিক ২৪ শতাংশ।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর যাতায়াত ব্যবস্থায় পথচারীদের জন্য নেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। ফুটপাত যা আছে তার বেশির ভাগই হয় অবৈধ দখলে, নয়তো ব্যবহার অনুপযোগী। অধিকাংশ ফুটপাত ও পথচারী পারাপারের জায়গাগুলো ভীষণ রকমের অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। পর্যাপ্তসংখ্যক ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস ও ওভারপাস যেমন নেই, তেমনি এসব অবকাঠামোর গুণগত মান এবং অবস্থান নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থাগুলোও পথচারীবান্ধব নয়। পথচারীর জন্য অবকাঠামো উন্নয়নে যে পরিমাণ বিনিয়োগ হচ্ছে তা তুলনামূলক যৎসামান্য। আবার প্রধান সড়কগুলোয় মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভারের মতো অবকাঠামো তৈরি করতে গিয়ে সংকুচিত করে ফেলা হচ্ছে পথচারীদের হাঁটার পথ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তথ্য বলছে, ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন যত মানুষ চলাচল করে, তার ৩০ শতাংশ হেঁটে গন্তব্যে যায়। আর প্রতিদিন অন্তত আড়াই কিলোমিটার হাঁটে ৩৫-৪০ শতাংশ সড়ক ব্যবহারকারী। যদিও যোগাযোগ অবকাঠামোগুলো পথচারীবান্ধব না হওয়ায় পথচারীরাই দুর্ঘটনায় পড়ে বেশি। ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় যত মানুষের মৃত্যু হয়, তার ৭১ দশমিক ৭২ শতাংশ পথচারী।

পথচারীরা ঢাকার মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের বৃহত্তম অংশীদার হলেও পথচারীবান্ধব উন্নয়নে সরকারের বিনিয়োগের পরিমাণ নগণ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ‘সাসটেইনেবল ট্রান্সপোর্ট ডেভেলপমেন্টস ফর ঢাকা সিটি’ শীর্ষক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার অংশীজনদের জন্য বর্তমানে সরকার যত ব্যয় করছে, সেখানে পথচারীর জন্য বরাদ্দ মাত্র দশমিক ২৪ শতাংশ।

রাজধানীতে ছয়টি মেট্রোরেলের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে সরকার। আরএসটিপির হিসাব অনুযায়ী, ঢাকায় মোট ট্রিপের ৮ শতাংশ বহনে সক্ষম হবে মেট্রোরেল। এ মেট্রোরেল নির্মাণের জন্য ব্যয় হচ্ছে ২৬৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার, যা ঢাকায় যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে চলমান বিনিয়োগের ৬২ দশমিক ৬৬ শতাংশ বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

ঢাকার বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত একটি বাস র‍্যাপিড ট্রানজিটের (বিআরটি) কাজ চলমান। আরেকটি বিআরটি রয়েছে পরিকল্পনাধীন অবস্থায়। এ দুই বিআরটি ঢাকায় মোট ট্রিপের ৪ শতাংশ বহন করতে সক্ষম হবে। বিআরটি দুটি নির্মাণে খরচ হবে ২৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা ঢাকায় চলমান বিনিয়োগের ৬ দশমিক ২৭ শতাংশ। প্রাইভেট কার, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনের জন্য ফ্লাইওভার, ওভারপাস, এক্সপ্রেসওয়েতে ১২৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার ব্যয় হচ্ছে, যা মোট বিনিয়োগের ৩০ দশমিক ১৮ শতাংশ। এর বাইরে ঢাকার বাস ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে মোট বিনিয়োগের দশমিক ৪১ শতাংশ ও জ্বালানিহীন যানবাহন ব্যবস্থার উন্নয়নে দশমিক ২৪ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে।

পথচারীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তুলতে ‘‌খুব বেশি’ বিনিয়োগের দরকার হয় না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে বৃহত্তর ঢাকার পথচারীদের জন্য সরকারের যে বিনিয়োগ, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলছেন তারা। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌ঢাকার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ ফুটপাতে হাঁটেন। এখানে যদি প্রশস্ত ফুটপাত তৈরি করে সেগুলোয় ভালো পরিবেশ দেয়া যায়, তাহলে নিঃসন্দেহে ব্যবহারকারীর সংখ্যা আরো বেড়ে যাবে। এর প্রভাবে যানবাহনের চাপ কমবে রাস্তায়। সব মিলিয়ে যানজটও কমে যাবে। কিন্তু এখানে ফুটপাতসহ পথচারীবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ হচ্ছে সামান্য। দুই মেয়র (ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন) ফুটপাতে যেসব টাইলস লাগিয়েছেন, তার একটা বড় অংশ এখন বলতে গেলে নষ্ট হয়ে গেছে। গুলশান, বনানী, ধানমন্ডিসহ অভিজাত এলাকাগুলোর বিভিন্ন বাসভবনের সামনে ফুটপাত নিচু করে দেয়া হয়েছে। প্রশ্ন হলো এ উঁচু-নিচু ফুটপাত দিয়ে পথচারীরা কতটা স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটতে পারবে? আমরা তো ফুটপাত উন্নয়নে বিনিয়োগ করছিই না, উল্টো ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল বানিয়ে ফুটপাত নষ্ট করে ফেলছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘পথচারীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তুলতে সবচেয়ে জরুরি হলো এনফোর্সমেন্ট ও মনিটরিং। এটা নিয়মিত করে যেতে হবে। পথচারীদের ফুটপাত, রাস্তা পারাপারের ক্রসিং, ওভারব্রিজ, আন্ডারপাসগুলো ব্যবহার উপযোগী রাখতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ঢাকার সিংহভাগ ফুটপাত ও পথচারী পারাপারের জায়গাগুলো ভীষণ রকমের অরক্ষিত অবস্থার মধ্যে রয়েছে।’

প্রাইমারি, সেকেন্ডারি ও ফিডার রোড মিলিয়ে ঢাকায় সড়ক আছে প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার। ২০১৪ সালে করা ‘‌সাসটেইনেবল ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেমস ফর ঢাকা মেট্রোপলিটন সিটি: ইস্যুজ অ্যান্ড অপরচুনিটিস’ শীর্ষক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ঢাকার ১ হাজার ৮৬৮ কিলোমিটার সড়কে ব্যবহার উপযোগী কোনো ফুটপাত নেই। গত এক দশকে এ চিত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি বলে দাবি বিশেষজ্ঞদের। তারা বলছেন, ঢাকায় যত ফুটপাত বিদ্যমান আছে, তার একটা বড় অংশ রয়েছে অবৈধ দখলে। রক্ষণাবেক্ষণ নিয়মিত না হওয়ায় হাঁটার অনুপযোগীও হয়ে আছে অনেক ফুটপাত।

শুধু ফুটপাত নয়, ঢাকায় পথচারী বিড়ম্বনায় পড়েন রাস্তা পার হতে গিয়ে। বেশির ভাগ সড়কেই নেই প্রয়োজনীয় জেব্রা ক্রসিং। আবার যেখানে জেব্রা ক্রসিং আছে, সেগুলোও রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় বিলীন হওয়ার পথে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ফুটওভার ব্রিজ রয়েছে ৮৫টি। আরো ৩৬টি নতুন ফুটওভার ব্রিজ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে উত্তর সিটি করপোরেশন। বিভিন্ন পয়েন্টে রয়েছে একাধিক আন্ডারপাস। যদিও সঠিক অবস্থানে না থাকা ও ব্যবহারজনিত বিভিন্ন সমস্যার কারণে পথচারীদের অনেকেই এসব ফুটওভার ব্রিজ-আন্ডারপাস ব্যবহার করতে চায় না। নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকায় বেশ কয়েকটি ফুটওভার ব্রিজ তৈরি হয়েছিল, যার অনেকগুলোও এখন আর কার্যকর নেই।

রেলকর্তাদের ভুলের মাশুল চার হাজার কোটি টাকা

১৯ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

কুমিল্লার লাকসাম-চিনকি আস্তানা সেকশনে ব্রিটিশ আমলের রেললাইনের সমান্তরালে নির্মাণ করা ৬১ কিলোমিটার মিটারগেজ পথটি ২০১৫ সালের ১৮ এপ্রিল চালু হয়। ১ হাজার ৮১৯ কোটি টাকায় নির্মিত এ রেলপথের মাধ্যমে সেকশনটি উন্নীত হয় ডাবল লাইনে। আয়ুষ্কাল না ফুরালেও রেললাইনটি তুলে ফেলতে হবে। কারণ আট বছর না যেতেই ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার করিডোরের উন্নয়নে এই সেকশনসহ লাকসাম-পাহাড়তলী রেলপথকে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে রূপান্তরে ১৫ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকার প্রকল্প নিতে যাচ্ছে রেলওয়ে।

শুধু লাকসাম-চিনকি আস্তানা নয়, অদূরদর্শী পরিকল্পনার কারণে ২ হাজার ২১৬ কোটি টাকায় নির্মিত ৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ গাজীপুরের টঙ্গী-কিশোরগঞ্জের ভৈরব বাজার মিটারগেজ লাইনটিও তুলে ফেলতে হবে। শতবর্ষী রেলপথের সমান্তরালে রেলপথটি চালু হয় ২০১৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। এই সেকশনসহ টঙ্গী-আখাউড়া রেলপথকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরে ১৪ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা খরচ ধরে আরেকটি প্রকল্পের প্রস্তাব রয়েছে।

ডুয়েলগেজে রূপান্তরের দুই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে মাত্র কয়েক বছর আগে চালু হওয়া ৪ হাজার ৩৬ কোটি টাকায় নির্মিত ১২৫ কিলোমিটার মিটারগেজ বাতিল হবে। অথচ রেললাইনের আয়ুষ্কাল ৩০ বছর। জমি অধিগ্রহণের মতো জটিল ধাপ না থাকায় এবং সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা হয়ে যাওয়ায়, সরকারের অনুমোদন, অর্থায়ন এবং ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে, কাজ শুরু হতে অন্তত তিন বছর লাগবে। তখনও মিটারগেজ রেললাইন দুটির আয়ুষ্কালের বড় অংশ অবশিষ্ট থাকবে। অথচ দেশে আয়ুষ্কাল ফুরানো বহু রেললাইনে ট্রেন চলছে ঝুঁকি নিয়ে।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণে ২০০৬ সালে অনুমোদিত টঙ্গী-ভৈরববাজার সেকশনে মিটারগেজ রেললাইন নির্মাণের কাজ ২০১১ সালে শুরু হয়ে ২০১৮ সালের জুনে শেষ হয়। এতে এডিবি ২০ বছর মেয়াদে ঋণ দিয়েছে ১ হাজার ৮১৬ কোটি টাকা। ঋণ শোধের আগেই লাইনটি তুলে ডুয়েলগেজ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে রেলওয়ে। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ঋণে লাকসাম-চিনকি আস্তানা সেকশনে নতুন মিটারগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প শুরু হয় ২০০৮ সালের জুলাইয়ে। ২০১৮ সালের অক্টোবরে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়। এতে জাইকার ঋণ ৫২৭ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে এখনও ঋণ শোধ হয়নি।

ডুয়েলগেজ লাগবে জেনেও মিটারগেজ বানিয়ে গচ্চা

২০১৪ সালের অক্টোবরে রেলওয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, সব রেললাইন পর্যায়ক্রমে ডুয়েলগেজে রূপান্তর হবে। ২০১৬ সাল থেকে ৩০ বছরে বাস্তবায়নের জন্য যে মহাপরিকল্পনা করেছে সংস্থাটি, তাতেও বলা হয়েছে দেশের প্রধান রেলপথগুলো ডাবল লাইনে উন্নীত করা হবে। এ যুক্তিতেই ৪ হাজার কোটি টাকার ১২৫ কিলোমিটার রেললাইন তুলে ফেলে সেখানে ডুয়েলগেজ নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। আরেকটি যুক্তি হচ্ছে, বহুজাতিক ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে দেশীয় রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তর করতে হবে। ২০১৫ সালে প্রকাশিত রেলওয়ে ইনফরমেশন বুক অনুযায়ী, ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে ২০তম দেশ হিসেবে ২০০৭ সালের ৯ নভেম্বর চুক্তিতে সই করে বাংলাদেশ।

গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক হাদীউজ্জামান বলেন, চুক্তির তারিখ বলছে, রেলওয়ে ২০০৭ থেকে জানত ভবিষ্যতে ব্রডগেজ ও ডুয়েলগেজ লাগবে; মিটারগেজে চলবে না। লাকসাম-চিনকি আস্তনা এবং টঙ্গী-ভৈরববাজার সেকশনে নতুন মিটারগেজ নির্মাণ শুরু হয়েছে চুক্তি সইয়ের পর। দূরদর্শিতা দেখিয়ে ডুয়েলগেজ নির্মাণ করলে ৪ হাজার কোটি টাকা গচ্চা যেত না। সমস্যা হলো, সরকারি সংস্থাগুলো প্রকল্প বাস্তবায়নে যতটা আগ্রহী থাকে, ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে ততটা থাকে না।

ছোট গাড়িতে বড় দুর্ভোগে শহর

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৩, কালের কন্ঠ

ভরদুপুর, রাজধানীর কাকরাইল মোড়। ট্রাফিক সিগন্যাল পড়ায় থেমে আছে দুই সড়ক। দুটি সড়কেই গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে গাড়িগুলো। হাতে গোনা কয়েকটি যাত্রীবাহী বাস বাদে বাকি সব ব্যক্তিগত গাড়ি।

শাহবাগ, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেটে ঘুরেও দেখা গেল একই দৃশ্য।

ছোট গাড়িতে বড় দুর্ভোগে শহরশুধু গতকাল বৃহস্পতিবারই নয়, ঢাকার রাজপথগুলোতে এমন দৃশ্য প্রতিদিনের। রাস্তায় ছুটে চলা বা সিগন্যালে থেমে থাকা বেশির ভাগ গাড়ি ব্যক্তিগত। মূলত ব্যক্তিগত গাড়ির জন্যই বেশির ভাগ সড়কে যানজট লেগে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হলেও বাস্তবে উল্টো পথে হাঁটা হচ্ছে। গণপরিবহনের আশানুরূপ মানোন্নয়ন হচ্ছে না। এতে ব্যক্তিগত গাড়ির প্রতি উৎসাহ দিন দিন বাড়ছে।

এমন পরিস্থিতিতে আজ শুক্রবার পালন করা হচ্ছে ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস।

বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ২০১৬ সাল থেকে ২২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস পালন শুরু হয়।

একসময় এই দিনে প্রতীকী হিসেবে রাজধানীর একটি সড়ক মানিক মিয়া এভিনিউকে গাড়িমুক্ত রাখা হতো। কিন্তু কয়েক বছর ধরে সেই কার্যক্রমে ভাটা পড়েছে। এমনকি এই বছর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দিনটি পালনে কোনো কর্মসূচি নেই।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে ব্যক্তিগত গাড়ির চলাচল বাড়ার ক্ষতিকর দিক।

গবেষণার তথ্য বলছে, স্বল্পসংখ্যক যাত্রী পরিবহনের এই যান সড়কে ব্যাপক জায়গা দখল করে। একই সঙ্গে যেমন যানজট বাড়ায়, তেমনি বাড়ায় বায়ুদূষণ, কার্বন নিঃসরণের মাত্রা। ব্যক্তিগত গাড়িকে জনবান্ধব ও পরিবহনব্যবস্থার পরিপন্থী হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

গবেষণার তথ্য বলছে, মাত্র ৫ শতাংশ বাসে ৩০ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব। অথচ ২৯ শতাংশ গাড়িতে যাত্রী পরিবহন করা হয় মাত্র ৫ শতাংশ।

বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির শহর ঢাকা

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩, আজকের পত্রিকা

বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির শহরের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। ধীরগতির শহরের তালিকায় শীর্ষ ২০টি শহরের মধ্যে তিনটিই বাংলাদেশের। বিপরীতে সবচেয়ে দ্রুত গতির ২০ শহরের মধ্যে ১৯টিই যুক্তরাষ্ট্রের। দেশটির ম্যাসাচুসেটসের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের এক গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে মার্কিন সাময়িকী টাইম এ তথ্য জানিয়েছে।

ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ ১৫২টি দেশের ১ হাজার ২০০-এরও বেশি শহরের মোটরযানের গড় গতির ওপর গবেষণা চালিয়েছে। গবেষণা থেকে দেখা গেছে, দরিদ্র দেশগুলোর তুলনায় ধনী দেশগুলোর শহরগুলোতে মোটরযানের গড় গতি অন্তত ৫০ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা সূচকে ০.৬০ পয়েন্ট নিয়ে ধীরগতির তালিকার শীর্ষে রয়েছে। তালিকার দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে নাইজেরিয়ার দুই শহর লাগোস ও ইকোরদু। তালিকার চতুর্থ স্থানে রয়েছে ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলা। পঞ্চম স্থানে রয়েছে প্রতিবেশী ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের থানে জেলার শহর বিওয়ান্দি। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা রয়েছে তালিকার ৬ নম্বরে।

ধীরগতির শীর্ষ ১০ শহরের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে বাংলাদেশের আরও একটি শহর। বিভাগীয় শহর ময়মনসিংহ রয়েছে তালিকার ৯ নম্বরে। তালিকার ১২ নম্বরে রয়েছে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী বলে খ্যাত শহর চট্টগ্রাম। এর পরেই রয়েছে ভারতের বন্দরনগরী ও প্রাচীন শহর মুম্বাই। তবে একক দেশ হিসেবে ধীরগতির শীর্ষ ২০ শহরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শহর ভারতের। শীর্ষ ২০টির মধ্যে এককভাবে ভারতেরই রয়েছে ৮টি শহর।

মেট্রোরেল, ফ্লাইওভারসহ এত মেগা প্রকল্পের পরেও ঢাকা কেন ধীরগতির শহর

১ অক্টোবর ২০২৩, বিবিসি বাংলা

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির শহর হলো বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। সংস্থাটির তালিকায় শীর্ষ ২০ ধীরগতির শহরের মধ্যে আরো আছে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, খুলনা এবং কুমিল্লা।

অথচ যানজট নিরসন করে শহরকে গতিময় করতে ২০১২ সালের পর থেকে গত এক দশকে সড়ক, সেতু, মেট্রোরেল, উড়ালসড়কসহ নানা প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় এক লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে।

এই সময়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একাংশ এবং মেট্রোরেলের একটি রুটের একাংশ ছাড়াও শহরের মধ্যে ছোট বড়ো অন্তত সাতটি নতুন ফ্লাইওভার নির্মাণ করেছে সরকার।

কিন্তু তাতে কোন কোন জায়গায় কমে আসলেও শহরের সার্বিক যানজট অনেক বেড়েছে, এবং কোন কোন জায়গায় ফ্লাইওভারের ওপরেও দীর্ঘ সময়ের যানজট দেখা যাচ্ছে প্রায়শই।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যানজট নিরসনে শহরকে গতিশীল রাখা কিংবা গতিময় করার চিন্তা থেকে এ শহরে কখনো কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। বরং নগর কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতায় ফ্রাঞ্চাইজি ভিত্তিক বাস সার্ভিস চালুর চেষ্টাও কার্যকর করা যায়নি।

বুয়েটের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ সামছুল হক বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “মানুষকে পর্যাপ্ত গণপরিবহন দেয়ার মতো কৌশলী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মানসিকতাই এখানে নেই। বরং যানজট থেকে গেলে অনেকে খুশী হন কারণ তারা পরের প্রকল্প নিতে পারেন।”

ভূমিকম্প: সময় কম, ঠিক করতে হবে ত্রুটিপূর্ণ ভবন

০৪ অক্টোবর ২৩, সমকাল

জোড়া ভূমিকম্পের আঘাতে গতকাল মঙ্গলবার কেঁপে ওঠে নেপাল। শক্তিশালী এই ভূমিকম্পের আঁচ লাগে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতেও। তবে বাংলাদেশে টের পাওয়া না গেলেও গত আড়াই মাসে ছয়বার ভূমিকম্প শঙ্কা বাড়াচ্ছে। নেপালের বাজহাং জেলায় ৬ দশমিক ৩ এবং ৫ দশমিক ৩ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এতে কি এমন কোনো ভাবনার অবকাশ আছে, শক্তিশালী ভূমিকম্পে বাংলাদেশে তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হবে না? নেপালের ভূমিকম্পের পর বাংলাদেশে কী রকম প্রস্তুতি নেওয়া যেতে পারে– এসব বিষয় নিয়ে সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদি আহমেদ আনসারী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাহিদুর রহমান।

নেপালের ভূমিকম্পে বাংলাদেশ কী বার্তা পেল– এমন প্রশ্নে ড. মেহেদি আহমেদ আনসারী বলেন, এবার বাংলাদেশ রক্ষা পেয়ে গেছে। কারণ, এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল বাংলাদেশ থেকে ৭০০-৭৫০ কিলোমিটার দূরে। তবে নেপালে ২০১৫ সালের ভূমিকম্প নাড়িয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশকেও। এবার উৎপত্তিস্থল থেকে এত দূরে হওয়ার কারণেই আমরা এর তীব্রতা টের পাইনি। নেপালের ভূ-অভ্যন্তরের টেকটোনিক প্লেটগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। নেপালের যেখানে ভূমিকম্প হয়েছে, সেটি আমাদের একই রেখার ওপর। ফলে নেপালে ভূমিকম্প আমাদের জোর প্রস্তুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিল।

বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকিতে আছে এবং কেমন ক্ষতি হতে পারে– এমন প্রশ্নে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, বাংলাদেশের ভূ-অভ্যন্তরে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হতে পারে এমন পাঁচটি ফল্ট লাইন বা টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থল আছে। এর একটি ঢাকা থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে মধুপুরের ওপর দিয়ে গেছে। ওই ফল্ট লাইনে যদি ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্পও হয়, তাতেও ঢাকার ৩০ শতাংশ ভবন মাঝারি থেকে বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হতে পারে। এতে অন্তত ২-৩ লাখ মানুষ প্রাণ হারাতে পারেন। আর অন্তত ৮০ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে।

ফল্ট লাইন হলো, দুটো টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থল, যেখানে সাধারণত ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। অন্য চারটি ফল্ট লাইন হলো– কক্সবাজার-ফেনী প্লেট বাউন্ডারি ১, ফেনী-শ্রীমঙ্গল প্লেট বাউন্ডারি ২, শ্রীমঙ্গল-ভারত প্লেট বাউন্ডারি ৪ এবং ডাউকি ফল্ট লাইন। টেকটোনিক প্লেটগুলো সব সময়ই ধীরগতিতে ভ্রাম্যমাণ থাকে। ফলে এই ফল্ট লাইনগুলো থেকে সব সময়ই শক্তি নিঃসরিত হয় এবং যে কোনো সময় এগুলোর মধ্যে সংঘর্ষে বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা আছে। মধুপুর ফল্ট লাইনে সর্বশেষ বড় ধরনের ভূমিকম্প হয় ১৮৮৫ সালে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ১। ডাউকি ফল্ট লাইনে ১৮৯৭ সালে ৮ মাত্রার কম্পন হয়। আর সর্বশেষ ১৯১৮ সালে ফেনী-শ্রীমঙ্গল প্লেট বাউন্ডারি-২তে ৭ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। বাংলাদেশ বা এর আশপাশের অঞ্চলে প্রতি ১৫০ বছরে সাত বা তার চেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। সেই হিসাবেও বড় মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানার শঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশে গত আড়াই মাসে ছয়বার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। বারবার ভূমিকম্প হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে অধ্যাপক মেহেদি বলেন, গত এক বছরে বাংলাদেশে ৫০ বার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। দুই মাসে এ অঞ্চলে ৩৪টি মৃদু ভূমিকম্প হয়েছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি দেশের মানুষ অনুভব করেছে। এ ধরনের মৃদু ভূমিকম্প বড় ভূমিকম্পের ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশে ভূমিকম্প হওয়ার কারণ সারা বিশ্বের মতোই। মাটির নিচে থাকা টেকটোনিক প্লেটের স্থান পরিবর্তনের ফলে ভূমিতে কম্পন অনুভূত হয়। নেপাল, ভারত, ইন্দোনেশিয়াসহ এসব দেশে ৫-৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলে এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, মানুষকে সচেতন করার মতো সময়ও আমাদের বাকি নেই। জীবন বাঁচাতে ত্রুটিপূর্ণ ভবনগুলো ঠিক করার এখনই সময়। গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি, ভূমিকম্প প্রতিকার ও প্রতিরোধে প্রস্তুতি হতে হবে তিনটি স্তরে। প্রথমটি হলো, সাধারণ মানুষের প্রস্তুতি। এর মধ্যে রয়েছে তিনি যে ভবনটিতে থাকেন, সেটি ভূমিকম্প সহনীয় কিনা। যদি ভূমিকম্প সহনীয় না হয়, তাহলে সেটিকে ভূমিকম্প সহনীয় করে গড়ে তোলা। নতুন ভবন তৈরির ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড মেনে ভূমিকম্প সহনীয় ভবন তৈরি করা। এ ছাড়া ভূমিকম্প পূর্বপ্রস্তুতি, ভূমিকম্পের সময় করণীয় এবং ভূমিকম্পের পরবর্তী সময়ে করণীয়গুলো জেনে রাখা। মোটকথা এ বিষয়ে পুরোপুরি সচেতন থাকা। দ্বিতীয় স্তরে সচেতনতার বিষয়টি হলো জাতীয় প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রস্তুতি এবং সব শেষে সরকারের সমন্বয়।

যেসব ভবন তৈরি হয়ে আছে, সেগুলো কীভাবে ভূমিকম্প সহনীয় হিসেবে গড়ে তোলা যায়, খরচ পড়বে কেমন– এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, শুরুতে ডিটেইলড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্টের মাধ্যমে সমস্যা চিহ্নিত করে নিতে হবে। এ জন্য প্রতি বর্গফুটে খরচ হতে পারে ৫ থেকে ১০ টাকার মতো। অর্থাৎ ২ হাজার বর্গফুটের ছয়তলা একটি ভবনের মূল্যায়ন করতে খরচ হতে পারে আনুমানিক মাত্র ৬০ হাজার টাকা। মূল্যায়নের পর যদি কোনো সমস্যা থাকে, সে সমস্যা সমাধানের জন্য ভবনটিকে রেট্রোফিট করে নিতে হবে।

এ গবেষক বলেন, রেট্রোফিট হলো এমন একটি প্রযুক্তি, যেটা দিয়ে পুরোনো ভবন না ভেঙে যথাযথ শক্তিশালী করা। এ পদ্ধতিটি কিছুটা ব্যয়বহুল, যদিও নিরাপত্তার বিচারে সেটা অনেক বেশি নয়। এটি করতে প্রতি বর্গফুটে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। এ হিসাবে ২ হাজার বর্গফুটের ছয়তলা একটি ভবনের রেট্রোফিট করতে খরচ হতে পারে আনুমানিক ৬০ লাখ টাকা। ওই ভবনটি যদি ১০টি ফ্ল্যাটের একটি অ্যাপার্টমেন্ট হয়, তাহলে প্রতি মালিকের খরচ হবে ৬ লাখ টাকা করে। নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণে দেখলে এটি খুব বড় ব্যয় নয়। তার পরও সরকার যদি স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করে কিংবা কোনো তহবিলের মাধ্যমে ভর্তুকি দেয়, তাহলে এটা অসম্ভব নয়। দুই বছর আগেও একটা ভবন ভূমিকম্প সহনীয় কিনা, তা বলার মতো দক্ষ প্রকৌশলী আগে হয়তো ৫০ থেকে ১০০ জন ছিলেন আমাদের। এখন সংখ্যাটি ৫০০-এর মতো হবে। এখন কমপক্ষে ৫০টি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।

বৃষ্টিতে রাজধানীতে তীব্র যানজট, চরম ভোগান্তি

০৬ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

রাজধানীতে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ছিল থেমে থেমে বৃষ্টি। বিকেলের দিকে বৃষ্টির মাত্রা কিছুটা বাড়ে। এতে বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যায়। এ সময় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার প্রধান প্রধান সড়কে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজটের। চরম ভোগান্তিতে পড়েন হাজারো মানুষ। যানজটের কারণে আধা কিলোমিটার দূরত্বের পথ অনেকে দুই ঘণ্টায়ও যেতে পারেননি।

আজ শুক্রবারও সারা দেশে এমন বৃষ্টি হতে পারে। এদিকে দেশের তিন সমুদ্রবন্দর ও কক্সবাজার উপকূলকে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

এর আগে গত ২১ সেপ্টেম্বরের রাতের বৃষ্টিতে রাজধানীতে জলাবদ্ধতা ও যানজটে আটকে পড়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হন হাজারো মানুষ। সেদিন জলাবদ্ধ রাস্তায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান একই পরিবারের তিনজনসহ চারজন।

গতকাল যানজটে আটকে পড়া লোকজন ও ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিকেলের পর ফার্মগেট, বিজয় সরণি, বনানী, মহাখালী, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর, শাহবাগ ও ধানমন্ডিতে তীব্র যানজট লাগে। এর প্রভাব অন্যান্য সড়কেও ছড়িয়ে যায়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যানজটে আটকে পড়া মানুষের ভোগান্তিও বাড়ে।

গতকাল ঢাকায় বৃষ্টি ঝরেছে ৫২ মিলিমিটার।

বিমানে করে চট্টগ্রামে যাওয়ার কথা ছিল প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তার। এ জন্য সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় তিনি ফার্মগেটের খামারবাড়ি এলাকার প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কার্যালয় থেকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। কিন্তু রাত পৌনে নয়টার দিকেও তিনি বিজয় সরণি এলাকায় যানজটে আটকে ছিলেন।

ওই কর্মকর্তা মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাত সাড়ে আটটায় বিমান ছিল। নির্ধারিত সময়ে বিমান ছেড়ে চলে গেছে। অথচ আমি এখনো (রাত পৌনে ৯টা) বিজয় সরণিতে পড়ে আছি।’

গতকাল কর্মস্থল থেকে বাসায় যেতে সাড়ে চার ঘণ্টা সময় লেগে যায় সরকারি একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সাজেদা আক্তারের। বিকেল পাঁচটায় তিনি কর্মস্থল মতিঝিল থেকে বাসার উদ্দেশে বাসে করে রওনা হন। মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের বাসায় পৌঁছান সাড়ে নয়টার দিকে। সাজেদা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, তেজগাঁও এলাকায় এক জায়গায় দুই ঘণ্টা ও মহাখালীতে এক ঘণ্টা বাস আটকে ছিল। এই সময় বাস একটুও নড়াচড়া করেনি। অন্য সময় বিকেলে বাসায় ফিরতে তাঁর গড়ে দেড় ঘণ্টা সময় লাগে বলে জানান তিনি।

ঢাকা থেকে ভাঙ্গায় ট্রেনভাড়া প্রস্তাব করা হয়েছে বাসের চেয়ে বেশি

০৯ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

আন্তনগর তূর্ণা এক্সপ্রেস ট্রেনের শোভন চেয়ারে বসে (নন-এসি) ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যেতে ভাড়া লাগে ৩৪৫ টাকা। এসি চেয়ারে ভাড়া ৬৫৬ টাকা। এই পথের দূরত্ব ৩২১ কিলোমিটার।

অন্যদিকে ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গার দূরত্ব ৭৭ কিলোমিটার। এই গন্তব্যে যেতে আন্তনগর ট্রেনে (নন-এসি) ভাড়া গুনতে হতে পারে ৩৫০ টাকা। এসি চেয়ারে গেলে ৬৬৭ টাকা।

পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা থেকে যেসব ট্রেন চলাচল করবে, সেগুলোর জন্য এমনই ভাড়া প্রস্তাব করেছে রেলওয়ের কমিটি। এখন প্রস্তাবটি রেল মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। রেলওয়ে সূত্র বলছে, প্রস্তাবিত ভাড়া হারই অনুমোদিত হতে পারে। এমনটা হলে বাসের চেয়ে এই পথে ট্রেনের যাত্রীদের বেশি ভাড়া গুনতে হবে।

রেল কর্তৃপক্ষের বিশ্লেষণে এসেছে, ঢাকা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত নন-এসি বাসের ভাড়া ২৫০ টাকা। আর এসি বাসের ভাড়া ৫০০ টাকা।

ভাড়া প্রস্তাবের ক্ষেত্রে ঢাকা থেকে প্রতিটি গন্তব্যের বাস্তব দূরত্বের সঙ্গে পদ্মা সেতু ও গেন্ডারিয়া-কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত উড়ালপথের জন্য বাড়তি দূরত্ব যোগ করেছে রেলওয়ের কমিটি। এর ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট বা ঢাকা-রাজশাহী পথের তুলনায় ঢাকা-ভাঙ্গা পথে যাত্রীদের বাড়তি ভাড়া গুনতে হবে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, পদ্মা সেতুর প্রতি কিলোমিটারকে ২৫ কিলোমিটার দূরত্ব ধরা হয়েছে। একে রেলওয়ে পন্টেজ চার্জের জন্য বাড়তি দূরত্ব বলছে। আর গেন্ডারিয়া থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত উড়ালপথের প্রতি কিলোমিটারকে ধরা হয়েছে ৫ কিলোমিটার। এ জন্যই ঢাকা থেকে ভাঙ্গার প্রকৃত দূরত্ব ৭৭ কিলোমিটার হলেও রেলওয়ে আদায় করতে চায় ৩৫৩ কিলোমিটার দূরত্বের ভাড়া।

পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত নতুন রেলপথ চালু হতে যাচ্ছে। কাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই রেলপথের উদ্বোধন করবেন।

রেলের কর্মকর্তারা বলছেন, এই রেলপথে আগামী নভেম্বর থেকে যাত্রী নিয়ে পুরোদমে ট্রেন চলাচল শুরু হতে পারে। শুরুতে ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে তিনটি ট্রেন চলাচল করতে পারে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে খুলনাগামী আন্তনগর ট্রেন সুন্দরবন এক্সপ্রেস পদ্মা সেতু হয়ে যাবে। ভাঙ্গা থেকে ট্রেনটি রাজবাড়ী, পাটুরিয়া, কুষ্টিয়ার পোড়াদহ ও যশোর হয়ে খুলনায় যাবে। বর্তমানে ট্রেনটি বঙ্গবন্ধু সেতু, ঈশ্বরদী, কুষ্টিয়া হয়ে চলাচল করে।

অন্যদিকে রাজশাহী থেকে ঢাকা পর্যন্ত একটি ট্রেন চালানোর প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে রাজশাহী থেকে মধুমতি এক্সপ্রেস ট্রেনটি ভাঙ্গা পর্যন্ত চলাচল করে। পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেনটি ঢাকা পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আছে। এ ছাড়া ঢাকা-পদ্মা সেতু-রাজবাড়ী রুটে একটি কমিউটার ট্রেন চালানোর কথাও ভাবছে রেলওয়ে।

পদ্মা সেতু রেল লিংক প্রকল্পের অধীন ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা।

কাল ঢাকা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত রেলপথের উদ্বোধন করা হবে। এর মধ্যে ঢাকার গেন্ডারিয়া থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ২৩ কিলোমিটার রেললাইন উড়ালপথে। আর আগামী বছর যশোর পর্যন্ত রেলপথ চালুর পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে রেলওয়ে।

পুরো রেলপথ চালু হলে পদ্মা সেতু হয়ে ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, নড়াইল, যশোর দিয়ে ট্রেন খুলনায় যেতে পারবে। একইভাবে রাজবাড়ী হয়ে উত্তরবঙ্গের পথেও ট্রেন চলতে পারবে। ভবিষ্যতে বরিশাল হয়ে পটুয়াখালীর পায়রা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা আছে।

পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছে সরকারের সেতু বিভাগ। এই সেতুর ওপর রেললাইন বসিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। ফলে ট্রেন চলাচলের জন্য সেতু কর্তৃপক্ষকে টোল দিতে হবে। তবে এখনো এই টোল হার নিয়ে একমত হতে পারেনি সরকারি প্রতিষ্ঠান দুটি।

ভাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. হুমায়ুন কবীর প্রথম আলোকে বলেন, এই পথে লোকাল ও কমিউটার ট্রেন চলাচল করবে। সেগুলোর ভাড়া অনেক কম হবে। আন্তনগর ট্রেনের ভাড়া কিছুটা বেশিই। তবে যশোর পর্যন্ত পুরো রেলপথ চালু হয়ে গেলে ভাড়া কমে যাবে।

যেভাবে ভাড়া নির্ধারিত হবে

বর্তমানে রেলে কিলোমিটারপ্রতি এসি শ্রেণির ভিত্তি ভাড়া ১ টাকা ৯৫ পয়সা। নন-এসি শ্রেণির ভিত্তি ভাড়া ১ টাকা ১৭ পয়সা।

দেশে লোকাল, মেইল, কমিউটার ও আন্তনগর—এই চার ধরনের ট্রেন চলাচল করে। এর মধ্যে ভাড়াহার কিছুটা কম-বেশি আছে।

এ ছাড়া আন্তনগর ট্রেনেও বিভিন্ন শ্রেণি রয়েছে। এগুলো হলো শোভন চেয়ার, এসি চেয়ার, এসি সিট ও এসি বার্থ (ঘুমিয়ে যাওয়ার আসন)।

লোকাল ট্রেনে সর্বনিম্ন ভাড়া ৫ টাকা। আন্তনগরে তা ৩৫ টাকা। তবে সেতু ও উড়ালপথ থাকলে সর্বনিম্ন ভাড়া বাড়ে।

ঢাকা থেকে পদ্মা সেতুর ওপারের পদ্মা স্টেশনের দূরত্ব ৫৫ কিলোমিটার। এই দূরত্বে শোভন চেয়ারের প্রস্তাবিত ভাড়া ৩৩০ টাকা। এসি চেয়ারের ভাড়া ৬৩৩ টাকা। এসি সিটের ভাড়া ৭৫৯ টাকা।

রেলওয়ে সূত্র বলছে, এখন ঢাকা থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে খুলনা রুটের ট্রেনগুলো চলাচল করে। এই রুটের ট্রেনগুলোকে অনেকটা পথ ঘুরতে হয়। কিন্তু পদ্মা সেতু হয়ে চললে ঘুরতে হবে কম। ফলে যশোর ও খুলনার যাত্রীদের গন্তব্যে যেতে সময় কম লাগবে, ভাড়াও বাড়বে না। তবে মাদারীপুর, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ বা নড়াইল যেতে হলে বেশি ভাড়া গুনতে হবে। একইভাবে মালামাল পরিবহনের ভাড়াও বাড়বে।

কমিটির কার্যক্রম

গত ২৪ সেপ্টেম্বর রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (সিসিএম) নাজমুল ইসলামকে প্রধান করে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে চারটি দায়িত্ব দেওয়া হয়।

দায়িত্ব চারটি হলো ১. পদ্মা সেতুর প্রতি কিলোমিটারের জন্য বাড়তি কত কিলোমিটার যুক্ত করতে (পন্টেজ চার্জ) হবে, তা নির্ধারণ। ২. রেলওয়ের জন্য স্থায়ী একটা পন্টেজ চার্জ নির্ধারণের ফর্মুলা প্রস্তাব করা। ৩. পদ্মা সেতু দিয়ে যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের জন্য ভাড়া নির্ধারণ। ৪. শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মালামাল পরিবহনের কামরার (লাগেজ ভ্যান) ভাড়া নির্ধারণ।

কমিটি ২ অক্টোবর রেলভবনে বৈঠক করে। ৪ অক্টোবর রেলওয়ের মহাপরিচালকের কাছে কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়।

কমিটি বিদ্যমান চারটি সেতুর পন্টেজ চার্জ বিশ্লেষণ করে। তারা জানায়, বর্তমানে রেলে পন্টেজ চার্জ নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি নেই। তাই তারা সব দিক বিবেচনা করে পদ্মা সেতুর প্রতি কিলোমিটারের জন্য বাড়তি ২৫ কিলোমিটার যোগ করার প্রস্তাব করছে। পাশাপাশি উড়ালপথকে সেতু বা ভায়াডাক্ট ধরে প্রতি কিলোমিটারকে বাড়তি ৫ কিলোমিটার বিবেচনা করেছে। ভবিষ্যতে সব নতুন সেতু ও ভায়াডাক্টের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে কমিটির প্রতিবেদনে।

কমিটির প্রতিবেদনে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পদ্মা সেতুকে ১৫৪ কিলোমিটার রেলপথ হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। আর ঢাকার গেন্ডারিয়া থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ২৩ কিলোমিটার উড়ালপথকে ১১৫ কিলোমিটার রেলপথ ধরা হয়েছে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, রেলে বর্তমানে পাঁচটি সেতু পারাপারের ক্ষেত্রে বাড়তি কিলোমিটার যুক্ত করা হচ্ছে। তবে তা পদ্মা সেতুর মতো এত বেশি নয়।

৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ বঙ্গবন্ধু সেতুর ক্ষেত্রে ৮১ কিলোমিটার হিসেবে গণ্য করে ভাড়া আদায় করা হয়। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটার সেতুর জন্য বাড়তি ধরা হয়েছে প্রায় পৌনে ১৭ কিলোমিটার।

১ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ হার্ডিঞ্জ সেতুর জন্য বাড়তি ধরা হচ্ছে ৪১ কিলোমিটার। এখানে প্রতি কিলোমিটার সেতুর জন্য বাড়তি ধরা হচ্ছে পৌনে ২৩ কিলোমিটার।

ভৈরব সেতুর দৈর্ঘ্য ১ কিলোমিটার। এর জন্য ভাড়া নেওয়া হয় ২৩ কিলোমিটারের। ব্রহ্মপুত্র সেতুর দৈর্ঘ্য দশমিক ৪ কিলোমিটার। এই সেতুর জন্য ১৬ কিলোমিটারের ভাড়া নেওয়া হয়।

রেলে সম্প্রতি চালু হয়েছে মালবাহী এসি কামরা (লাগেজ ভ্যান) সেবা। মালবাহী এসি কামরার ভাড়া নন-এসি কামরার দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করেছে কমিটি। বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে ইলেকট্রনিকস পণ্য ছাড়া অন্য মালামাল নন-এসি লাগেজ ভ্যানে পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রতি কেজির জন্য ভাড়া আদায় করা হয় ২ টাকা ৩৫ পয়সা। সে হিসাবে এসি লাগেজ ভ্যানের ভাড়া কেজিপ্রতি ৪ টাকা ৭০ পয়সা হতে পারে।

হানিফ ফ্লাইওভারের ১০ বছর : প্রতি তিন দিনে এক মৃত্যু

১১ অক্টোবর, ২০২৩, কালের কন্ঠ

রাজধানী ঢাকার সবচেয়ে বড় উড়াল সড়ক মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারে গত ১০ বছরে দুর্ঘটনায় এক হাজার ১৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৪৯৯ জন মারা গেছে। এটি মোট মৃত্যুর ৪৪ শতাংশ।

গতকাল মঙ্গলবার সেভ দ্য রোড নামের একটি সংগঠনের প্রকাশিত প্রতিবেদনে মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারে ১০ বছরের এই দুর্ঘটনার চিত্র ফুটে ওঠে।

সাড়ে ১১ কিলোমিটারের এই উড়াল সড়কে প্রতি তিন দিনে একজন করে মানুষ মারা যাচ্ছে। গত এক দশকে সব ধরনের যানবাহন মিলিয়ে আট হাজার ৩৩টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় অন্তত ছয় হাজার ৩১২ জন আহত হয়েছে। দুর্ঘটনার এমন পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে সড়কটি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।

পৌনে দুই হাজার কোটি টাকার রেলপথে ট্রেন চলে দিনে একটি

অক্টোবর ১৬, ২০২৩, বণিক বার্তা

পাবনা হয়ে ঢালারচর-রাজশাহী রুটে সপ্তাহে ছয়দিন যাত্রীবাহী একটি ট্রেন চলাচল করে ছবি : নিজস্ব আলোকচিত্রী

ঈশ্বরদী থেকে পাবনা হয়ে ঢালারচর পর্যন্ত নতুন রেলপথ তৈরিতে ১ হাজার ৭১৪ কোটি টাকার বেশি খরচ করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রায় ৭৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এ পথটি শতভাগ সরকারি অর্থায়নে নির্মাণ হয়েছে, যার কাজ শেষ হয় ২০১৯ সালের জুনে। ঈশ্বরদী-ঢালারচর রেলপথ নির্মাণের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল রেলের রাজস্ব আয় বাড়ানো। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকার ‌ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের প্রসার, রাজধানীর সঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ স্থাপন, ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে এবং রিজিওনাল কানেক্টিভিটির নতুন ও বিকল্প রেল রুট স্থাপন। যদিও বিপুল অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে গড়ে তোলা এ রেলপথে বর্তমানে চলাচল করছে দিনে একটি ট্রেন।

ঢালারচর এক্সপ্রেস-৭৭৯ নামের ট্রেনটি সকাল ৭টা ২৫ মিনিটে ঢালারচর থেকে ছেড়ে বেলা ১১টায় রাজশাহী পৌঁছায়। একই ট্রেন (ঢালারচর এক্সপ্রেস-৭৮০) রাজশাহী থেকে বিকাল সাড়ে ৪টায় ছেড়ে ঢালারচর পৌঁছায় রাত ৮টা ১৫ মিনিটে। ট্রেনটি চলে সপ্তাহে ছয়দিন।

রেলওয়ের তথ্য বলছে, ‘‌বাংলাদেশ রেলওয়ের ঈশ্বরদী থেকে পাবনা হয়ে ঢালারচর পর্যন্ত নতুন লাইন নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০১০ সালের ৫ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদিত হয়। শুরুতে রেলপথটির নির্মাণ ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৯৮৩ কোটি টাকা। মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০১০ সালের জুন থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত। তবে নির্মাণকাজের দীর্ঘসূত্রতার কারণে একাধিকবার মেয়াদ ও ব্যয় সংশোধন করা হয়। প্রকল্পটি শেষ করতে রেলওয়ের সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে ১ হাজার ৭১৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।

ঢাকার সড়কে পথচারীদের মৃত্যু বেশি

২২ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

পথচারীদের জন্য দেশে সবচেয়ে বিপজ্জনক শহর এখন ঢাকা। সড়ক দুর্ঘটনায় ঢাকা শহরে বছরে যত মানুষ নিহত হন, তার চার ভাগের এক ভাগই পথচারী। গত তিন বছরে ধারাবাহিকভাবে ঢাকায় দুর্ঘটনা ও মৃত্যু—দুটোই আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। যার বড় শিকার সাধারণ পথচারীরা।

ঢাকায় প্রয়োজনের তুলনায় সড়ক এমনিতেই কম। মোট সড়কের তুলনায় হাঁটার রাস্তা বা ফুটপাত আরও কম। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে সড়কের মোট দৈর্ঘ্য ২ হাজার কিলোমিটারের কিছু বেশি। এর বিপরীতে ফুটপাত রয়েছে মাত্র ৬০০ কিলোমিটারের মতো। আবার যে ফুটপাত রয়েছে, তার বেশির ভাগই চলাচলের অনুপযোগী।

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার সড়কগুলো একেবারেই পথচারীবান্ধব নয়। বেশির ভাগ ফুটপাতও অবৈধ দখলে, যে কারণে অনেক ক্ষেত্রে মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতে বাধ্য হন পথচারীরা। আবার পথচারীদের মধ্যেও অসচেতনতা রয়েছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সড়কে আধুনিক সংকেতব্যবস্থা না থাকায় সড়কের প্রতিটি মোড় ঝুঁকি নিয়ে পার হতে হয় পথচারীদের। ফলে ঢাকায় দুর্ঘটনায় পথচারীদের মৃত্যু বেশি।

সড়ক পার হতে গিয়ে বাসচাপায় বা অন্য কোনো যানবাহনের ধাক্বায় মৃত্যু-ঢাকা শহরে এ রকম ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। ২০২১ সালের ২৪ নভেম্বর গুলিস্তানে সড়ক পার হওয়ার সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন নটর ডেম কলেজের ছাত্র নাঈম হাসান। তাঁর বাবা শাহ আলম গতকাল রাতে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, রাস্তায় নামলে দেখা যায়, কেউ নিয়ম মানতে চায় না। সরকারও কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে মনে হয় না। অন্তত সড়কে যাতে নিয়মশৃঙ্খলা ঠিকভাবে সবাই মানে, এটুকু সরকার নিশ্চিত করুক।

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ১১৯ জন। ২০২১ সালে ১৩৭ জন। ২০২২ সালে দুর্ঘটনা ও মৃত্যু অনেক বেড়ে যায়। গত বছর নিহত হন ২৪৬ জন। আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে দুর্ঘটনায় নিহত হন ১৮৩ জন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যু গত জুলাই মাসে, ২৯ জন। গত তিন বছরে সড়কে নিহত ব্যক্তির ২৬ শতাংশই পথচারী। দেশের অন্য শহরগুলোর তুলনায় ঢাকা শহরেই পথচারীদের মৃত্যু সবচেয়ে বেশি।

এত মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায় ঢাকায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রিত হয়। আর পথচারীরা চলেন যানবাহনের ফাঁক গলে। পথচারীবান্ধব আধুনিক পারাপারের ব্যবস্থা করা গেলে মানুষ নিজ গরজেই নিরাপদ পথ ধরে চলবেন।

ঢাকার যানজটের নতুন কেন্দ্র এখন ফার্মগেট

২৩ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

রাজধানীর ফার্মগেটের যে জায়গায় ঢাকা উড়ালসড়ক বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একটি পথ (লুপ) নেমেছে, সেখানে গত বৃহস্পতিবার বিকেল চারটার দিকে যানজটে আটকে ছিলেন বাসচালক মো. আশিক। তিনি তানজিল পরিবহনের একটি বাস চালান।

আশিক প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ঢাকায় ছয়–সাত বছর বাস চালান। তবে ফার্মগেট, খামারবাড়ি মোড়, কারওয়ানবাজার, বাংলামোটর ও শাহবাগে এখনকার মতো যানজট কখনো দেখেননি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন করে ওই সব এলাকায় যানজট বাড়ার কারণ ঢাকা উড়ালসড়ক। গত ৩ সেপ্টেম্বর এই উড়ালসড়কের কাওলা থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত অংশ চালু হয়। এরপর প্রতিদিন রাজধানীর উত্তরাংশ থেকে দিনে প্রায় পাঁচ হাজার যানবাহন দ্রুত ফার্মগেটে এসে নামছে। এসব যানবাহনের বড় অংশ খামারবাড়ি মোড় ঘুরে ফার্মগেট হয়ে কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ ধরে কারওয়ানবাজার, শাহবাগ ও অন্যান্য এলাকায় যাচ্ছে।

ঢাকার উত্তরাংশমুখী যানবাহন ঢাকা উড়ালসড়কে উঠতে বিজয় সরণি ও তেজগাঁওয়ের সড়ক ব্যবহার করছে। ফলে যানজট বেড়েছে বিজয় সরণি, তেজগাঁও, সাতরাস্তাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায়। ট্রাফিক পুলিশের হিসাবে আগে থেকেই যানজটের কেন্দ্র হিসেবে গণ্য করা হয় ঢাকার ১৫টি এলাকাকে। সেখানেও দিন দিন যানজট বাড়ছে।

সব মিলিয়ে ঢাকায় যানবাহনের গতি কমছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের গবেষণার ওপর ভিত্তি করে গত সেপ্টেম্বরে প্রভাবশালী সাময়িকী টাইম–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির শহরের তালিকায় এখন ঢাকা শীর্ষে।

প্রতিদিন রাজধানীর উত্তরাংশ থেকে দিনে প্রায় পাঁচ হাজার যানবাহন দ্রুত ফার্মগেটে এসে নামছে। এসব যানবাহনের বড় অংশ খামারবাড়ি মোড় ঘুরে ফার্মগেট হয়ে কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ ধরে কারওয়ানবাজার, শাহবাগ ও অন্যান্য এলাকায় যাচ্ছে।

ঢাকার যানজট কমাতে অর্থ ব্যয়ে কার্পণ্য নেই। গত দুই দশকে রাজধানীতে ৯টি উড়ালসড়ক ও সমজাতীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। আরও একটির (ঢাকা উড়ালসড়ক) কাজ চলছে। এসব প্রকল্পে ব্যয় মোট ১৯ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। দু–একটি উড়ালসড়কের ভালো সুফল পাওয়া যাচ্ছে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উড়ালসড়কগুলোতে ওঠার মুখে ও নামার সময় যানজটে পড়তে হচ্ছে মানুষকে। কোনো কোনো উড়ালসড়ক দোতলা যানজটও তৈরি করছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই বিপুল ব্যয়ের সুফল কতটুকু।

সংকেত অমান্য, নিহত ১৮

২৪ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

‘বড় একটা আওয়াজ হয়। এরপর দেখি আমরা একদিকে হেইল্লা পড়তাছি। সবাই এক পাশে চাপা পড়ি। তখন আর শ্বাস নিতে পারতেছিলাম না। মনে হইতাছিল দম আটকায়া আইতাছে, অহনই মরণ হইব।’ একনাগাড়ে কথাগুলো বললেন কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ট্রেন দুর্ঘটনায় আহত রেশমা বেগম (৩৫)। দুর্ঘটনায় তাঁর এক হাত ভেঙে গেছে। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাঁকে ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের মেঝেতে শুইয়ে রাখা হয়।

গতকাল সোমবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে কথা হয় রেশমার সঙ্গে। তাঁর বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায়। ঢাকায় মেয়ের কাছে যেতে কিশোরগঞ্জ থেকে আন্তনগর এগারসিন্দুর এক্সপ্রেস ট্রেনে ওঠেন। তিনি ছিলেন ট্রেনের একেবারে পেছনের কোচের আগেরটিতে।

গতকাল বেলা সাড়ে তিনটার দিকে ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনের পশ্চিম প্রান্তে এগারসিন্দুর ট্রেনটির পেছনের তিনটি কোচে মালবাহী একটি ট্রেন ধাক্কা দেয়। এতে যাত্রীবাহী ট্রেনের পেছনের দুটি কোচ উল্টে গিয়ে ১৮ জন নিহত ও শতাধিক আহত হন।

দুর্ঘটনার পর ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-কিশোরগঞ্জ—তিন পথে সাড়ে সাত ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। এর আগে ঢাকা ও আখাউড়া থেকে উদ্ধারকারী ট্রেন গিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। ট্রেন বন্ধ থাকায় পথে পথে আটকে থাকে বেশ কিছু যাত্রীবাহী ট্রেন। এসব ট্রেনের যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

উল্টো ছিল ইঞ্জিন, আগের দিনই জানানো হয়েছিল ‘দুর্ঘটনা ঘটতে পারে’

২৩ অক্টোবর ২৩, সমকাল

ঢাকার লোকোশেডে ইঞ্জিন ঘোরানোর যন্ত্র (টার্ন টেবিল) বহু দিন নষ্ট। ঘোরাতে না পেরে ইঞ্জিন উল্টো লাগিয়ে মালবাহী ট্রেন চালানো হয়। উল্টো লাগানো ইঞ্জিনের কারণে চালকের সিগন্যাল দেখতে সমস্যা হওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে জানিয়ে টার্ন টেবিল দ্রুত মেরামতের তাগিদ দিয়ে রোববার ঢাকার বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলীকে (লোকো) চিঠি দেওয়া হয়। এর একদিন পর সোমবার ভৈরব স্টেশনের আউটারে যাত্রীবাহী এগারসিন্দুর গোধূলি এক্সপ্রেসে উল্টো ইঞ্জিনের মালবাহী ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ গেছে ১৭ জনের।

তবে রেলওয়ে বলছে, প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী মালবাহী ট্রেনের চালকের ভুলে দুর্ঘটনা ঘটেছে। রেলের পূর্বাঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম সমকালকে বলেন, চট্টগ্রামগামী মালবাহী ট্রেনটিকে স্টেশনে আউটারে থামতে সিগন্যাল দেওয়া হয়। ট্রেনটির লোকো মাস্টার (চালক) সংকেত অমান্য করে স্টেশনে ঢুকে পড়ায় ভৈরব থেকে ঢাকামুখী যাত্রীবাহী ট্রেনের শেষের তিনটি বগির সঙ্গে মালবাহী ট্রেনের ধাক্কা লাগে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, শুধু চালকের ভুলের নয়, রেলেরও গাফিলতি রয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, ৩০২৮ নম্বরের ইঞ্জিনে মালবাহী ট্রেনটি চালাচ্ছিলেন চালক জাহাঙ্গীর আলম। ২০০৪ সালে চাকরিতে যোগ দেওয়া এই চালক গত ছয় বছর পণ্যবাহী ট্রেন চালানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে।

উল্টো করে লাগানোর কারণে ইঞ্জিনের পেছন দিক ট্রেনের সামনে থাকে। আর চালকের বসার স্থান (ক্যাব) থাকে পণ্যবাহী কন্টেইনারের কাছাকাছি। অর্থাৎ চালক সামনে বসার পরিবর্তে বগির কাছাকাছি বসে ট্রেন চালান। এতে ‘লং হুড’ সমস্যা তৈরি হয়। অর্থাৎ ইঞ্জিনের লম্বা বডি সিগন্যাল এবং চালকের মাঝে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। ফলে চালককে সিগন্যাল দেখতে হয় দূর থেকে। ৩০০০ সিরিজের ইঞ্জিনের দৈর্ঘ্য অন্যান্য ইঞ্জিনের তুলনায় বেশি। এই ইঞ্জিনের দৈর্ঘ্য ১৯ হাজার ৬৯ মিলিমিটার বা প্রায় ৬৩ ফুট। চালকের ক্যাব বাদে দৈর্ঘ্য ৫৮ ফুট। ইঞ্জিন উল্টো করে লাগানোর কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে ৫৮ ফুট দূর থেকে সিগন্যাল দেখতে হয় চালককে।

রেল সূত্রের ভাষ্য, উল্টো ইঞ্জিনের কারণে ভৈরবের দুর্ঘটনায় একই সমস্যা ছিল। চালকের বরাতে তার সহকর্মীরা জানিয়েছেন, লং হুড সমস্যায় আউটারে থামার সিগন্যাল দেরিতে দেখেন। ব্রেক করতে দেরি হওয়ায় মালবাহী ট্রেনের গতি কমলেও, থামেনি।

রেলের আরকটি সূত্রের দাবি, মালবাহী ট্রেনের বগির ডিস্ট্রিবিউটর ভাল্ব (ডিভি) কাজ করেনি। চালক ইঞ্জিনের ব্রেক করলেও, ডিভি কার্যকর না থাকায় বগির ব্রেক কাজ করেনি। তাই ট্রেনটি থামেনি। ৩২ বগির চারটির ডিভি সচল পাওয়া পাওয়া গেছে দুর্ঘটনার পর। তবে সমকাল এই দাবির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।

রোববার রেলের চট্টগ্রামের বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (লোকো) সাজিদ হাসান নির্ঝর স্বাক্ষরিত চিঠিতে ঢাকার বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলীকে (লোকো) জানানো হয়, ‘ঢাকার লোকোশেডের টার্ন টেবিলটি নষ্ট। তাই লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) ঘোরানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ২৬০০, ২৯০০ এবং ৩০০০ সিরিজের ইঞ্জিনগুলো পেছনের দিক সামনে রেখে ট্রেন চালাতে হয়। অনেক স্থানে নিরাপদ দূরত্ব থেকে সিগন্যাল এবং লেভেল ক্রসিং দেখা যায় না।’

টার্ন টেবিলটি দ্রুত মেরামত করার তাগিদ দিয়ে চিঠিতে বলা হয়, ‘বিশেষ করে ৩০০০ সিরিজের ইঞ্জিনগুলো দৈর্ঘ্য বেশি হওয়ায় এই ঝুঁকি আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। ফলে যে কোনো সময়ে সিগন্যাল ওভারশ্যুট বা লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ঘটনার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।’

বিদ্যুৎ-জ্বালানী-খনিজসম্পদ

টেন্ডারের চেয়ে এক্সনে বেশি আগ্রহ সরকারের

২৮ জুলাই ২৩, সমকাল

সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে মডেল পিএসসির (উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি) অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এবারের পিএসসিতে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানির (আইওসি) জন্য বেশ আকর্ষণীয় সুযোগ রাখা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে চলতি বছরের শেষ নাগাদ দরপত্র আহ্বান করার কথা বলা হচ্ছে। তবে এ ধরনের একটি আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মতৎপরতা নেই পেট্রোবাংলার। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এক্সন মোবিলকে নিয়ে বেশ আগ্রহী জ্বালানি বিভাগ। সরকারও মার্কিন কোম্পানিটির বিষয়ে বেশ ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছে। কোম্পানিটি সম্প্রতি সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে কমপক্ষে ২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। আগামী আগস্টের মধ্যে এ-সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করতে চায় এক্সন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক্সনের প্রস্তাব বিবেচনার আগে আন্তর্জাতিক দরপত্র ডাকা উচিত। এতে আরও লাভজনক প্রস্তাব পাওয়া যেতে পারে। যা-ই করা হোক, দ্রুত করতে হবে। সামনে জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচন ঘিরে ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক্সনের প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

মডেল পিএসসি

গত এক দশকে মার্কিন কোম্পানি কনোকোফিলিপস এবং কোরিয়ান কোম্পানি দাইয়ু বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধান কাজ সমাপ্ত না করেই চলে গেছে। এর মধ্যে একাধিকবার আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আইওসির কাছ থেকে তেমন সাড়া মেলেনি। তাদের পরামর্শ অনুসারে একটি আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে পিএসসি পর্যালোচনার কাজে নিয়োগ দেয় পেট্রোবাংলা। সেই কোম্পানির সুপারিশ অনুসারে সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে মডেল পিএসসিতে সংশোধন আনা হয়। গত বুধবার অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় সংশোধিত পিএসসির অনুমোদন দেওয়া হয়।

২০১৯ সালের মডেল পিএসসি অনুযায়ী, অগভীর ও গভীর সমুদ্রের প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম যথাক্রমে ৫ দশমিক ৬ ও ৭ দশমিক ২৫ ডলার। সংশোধিত পিএসসিতে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম ধরা হয়েছে ব্রেন্ড ক্রুডের ১০ শতাংশ দরের সমান। অর্থাৎ বিশ্ববাজারে ক্রুডের দাম ১০০ ডলার হলে গ্যাসের দাম হবে ১০ ডলার। বর্তমান পিএসসি অনুসারে অগভীর সমুদ্রে পাওয়া গ্যাসে বাংলাদেশের হিস্যা ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ এবং গভীর সমুদ্রে ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ রয়েছে। সংশোধিত পিএসসির খসড়ায় বাংলাদেশের হিস্যার অংশ অগভীর সমুদ্রে ৪০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং গভীর সমুদ্রে ৩৫ থেকে ৬০ শতাংশের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি রাখা হয়েছে গ্যাস রপ্তানির সুযোগ।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জনেন্দ্রনাথ সরকার সম্প্রতি জানিয়েছেন, পিএসসি চূড়ান্ত হলে তারা চলতি বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র ডাকবেন। তবে পেট্রোবাংলার একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করার জন্য প্রয়োজনীয় তোড়জোড় দেখা যাচ্ছে না। পিএসসি চূড়ান্ত হওয়ার পর পরবর্তী কার্যক্রম বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। ওই সূত্র আরও জানিয়েছে, এক্সন মবিলের প্রস্তাব নিয়েই ওপরমহলে বেশি আগ্রহ।

এক্সনের প্রস্তাব

বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে গত মার্চে প্রথম আগ্রহ প্রকাশ করে এক্সন মবিল। সে সময় তারা গভীর সমুদ্রের ১৫টি ব্লক ইজারা চেয়েছিল। গত ১৬ জুলাই আরেকটি চিঠি দেয় মার্কিন কোম্পানিটি। এতে এক্সন প্রথমে গভীর সমুদ্রে সম্পদ অনুসন্ধানে ৪ থেকে ৫ কোটি ডলার ব্যয়ে দ্বিমাত্রিক জরিপ করবে। ফলাফল ইতিবাচক হলে ৫ থেকে ১০ কোটি ডলার খরচ করবে ত্রিমাত্রিক জরিপে। কূপ খননে গড়ে ৮-১০ কোটি ডলার খরচের কথা জানিয়েছে এক্সন। কোম্পানিটি বলছে, তাদের পরিকল্পনা অনুসারে গ্যাস মিললে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি কমে যাবে। এতে বছরে ৩ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে বাংলাদেশের।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সমকালকে বলেন, এক্সনের প্রস্তাবকে সরকার ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হচ্ছে। তারা এক্সনের প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দেখবে।

কয়লাসংকটে আবার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ

৩০ জুলাই ২০২৩, প্রথম আলো

যান্ত্রিক ত্রুটি কাটিয়ে উৎপাদনে ফেরার কয়েক দিনের মাথায় আবার বাগেরহাটের রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। কয়লাসংকটে চালু থাকা একমাত্র ইউনিটটি আজ রোববার ভোর থেকে বন্ধ হয়ে যায়। বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (বিআইএফপিসিএল) উপমহাব্যবস্থাপক আনোয়ারুল আজিম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

আনোয়ারুল আজিম প্রথম আলোকে বলেন, কয়লাসংকটের কারণে রাত সাড়ে তিনটায় কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। কয়লা আমদানির জন্য সব ধরনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। ৮ আগস্ট কয়লা এসে পৌঁছালে কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটটি আবার উৎপাদনে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

শহর বাঁচিয়ে গ্রামে লোডশেডিং

০১ আগস্ট ২৩, সমকাল

ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু পৌরসভা এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় (৩০ জুলাই দুপুর ২টা থেকে ৩১ জুলাই দুপুর ২টা পর্যন্ত) এক ঘণ্টা করে মোট ছয়বার লোডশেডিং হয়। উপজেলার আট ইউনিয়নে ওই সময় দুই ঘণ্টা পরপর এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং চলে। এর কারণ হিসেবে বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষ বলছে, হরিণাকুণ্ডুতে বিদ্যুতের চাহিদা ১২ মেগাওয়াট, আর পাওয়া গেছে চাহিদার অর্ধেক, অর্থাৎ ৬ মেগাওয়াট। দুই বিতরণ কোম্পানির তথ্যমতে, এই ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে কোনো লোডশেডিং হয়নি।

এভাবে শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থানের মতো বিদ্যুতেও যেন বাড়তি সুবিধা ভোগ করছে ঢাকার মানুষ। গ্রামে যখন দিনে চার-পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলছে না, তখন ঢাকায় একদম লোডশেডিং নেই। গ্রামের চেয়ে জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোও তুলনামূলক ভালো অবস্থায় রয়েছে। গ্রামের গ্রাহকদের অভিযোগ, লোডশেডিং নিয়ে স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসের সহযোগিতা পাওয়া যায় না। ফোন দিলে কেউ ফোন ধরেন না। অথচ লোডশেডিংয়ে গ্রামাঞ্চলে ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য। জমিতে সেচ দেওয়া যাচ্ছে না, কৃষকরা আমন ধান রোপণ করতে পারছেন না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামে লোডশেডিং হলেও জাতীয় পর্যায়ে সেভাবে আলোচনা হয় না। কিন্তু রাজধানীসহ বড় শহরে লোডশেডিং হলে বেশি আলোচনা হয়, সরকার চাপে পড়ে। সামনে জাতীয় নির্বাচন। এ সময়ে রাজধানীবাসীকে শান্ত রাখতেই লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে না।

বিদ্যুতের আর কোনো সমস্যা থাকবে না: প্রধানমন্ত্রী

০২ আগস্ট ২০২৩, জাগো নিউজ

বাংলাদেশে বিদ্যুতের আর কোনো সমস্যা থাকবে না বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, সবার ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দিতে পেরেছি। কয়লার দাম ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ নিয়ে কয়েকদিন কষ্ট হয়েছে। এরপর এখন ঠিক হয়ে গেছে। বিদ্যুতের আর কোনো সমস্যা থাকবে না।

বুধবার (২ আগস্ট) বিকেলে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে আয়োজিত আওয়ামী লীগের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

এলএনজি ব্যবসার সুযোগ পেল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান

০৩ আগস্ট ২৩, সমকাল

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি, মজুত ও বিক্রি করতে পারবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। নিজের প্রয়োজন কিংবা অন্যের চাহিদা পূরণে আনা যাবে। নিজস্ব পাইপলাইন অথবা পেট্রোবাংলার লাইন ব্যবহার করে এটি সরবরাহ করা যাবে। আর ক্রেতা ও বিক্রেতা আলোচনা করে এলএনজির দাম নির্ধারণ করতে পারবেন।

গত মঙ্গলবার জ্বালানি বিভাগ প্রকাশিত বেসরকারি পর্যায়ে এলএনজি আমদানি স্থাপনা, আমদানি ও সরবরাহের সংশোধিত নীতিমালায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা

আগস্ট ০৬, ২০২৩, বণিক বার্তা

বিদ্যুৎ, শিল্পসহ অন্যান্য খাতের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে আমদানি করা হচ্ছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), কয়লা ও জ্বালানি তেল। এসব খাতে প্রতি বছর ক্রমবর্ধমান হারে দেশে জ্বালানি চাহিদা বাড়ছে। সরকারের জ্বালানি ব্যয়ের প্রাক্কলন ধরে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হবে ২৪ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার।

এ অবস্থায় চলমান ডলার সংকটের প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের ভাষ্য হলো সরকার ২০৪১ সাল নাগাদ দেশে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে। এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনা করতে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে গিয়ে বিপাকে পড়ার জোর আশঙ্কা রয়েছে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় গ্যাসের অনুসন্ধানে জোর দেয়া হলে এ সংকট থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। পাশাপাশি নিজস্ব কয়লা উত্তোলনেও দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার নিয়ে গতকাল ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) আয়োজিত এক সেমিনারে এসব কথা উঠে আসে। সংগঠনটি তাদের মতিঝিলের কার্যালয়ে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে ‘বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার: বঙ্গবন্ধুর দর্শন’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে। এতে ব্যবসায়ীরা দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে বেশকিছু আশঙ্কার চিত্র তুলে ধরেন। পাশাপাশি স্থানীয় গ্যাসের অনুসন্ধান, কয়লা উত্তোলন করা গেলে ডলার সাশ্রয়ীর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউরেনিয়াম পরিবহন

০৫ আগস্ট ২৩, সমকাল

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি ইউরেনিয়াম রডের প্রথম চালান দেশে আসছে সেপ্টেম্বরে। রাশিয়া থেকে বিশেষ বিমানে ঢাকা আনা হবে তেজস্ক্রিয় এই জ্বালানি। এর পর কড়া নিরাপত্তা ও গোপনীয়তায় সড়কপথে পাবনার রূপপুরের প্রকল্প স্থানে নেওয়া হবে। দেশে পরিবহনকালে এবং সংরক্ষণের সময় দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণের জন্য বীমা করা হচ্ছে না। এই দায় নিচ্ছে সরকার। এ জন্য আর্থিক নিশ্চয়তাপত্র ইস্যু করেছে অর্থ বিভাগ।

রূপপুর কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট আগামী বছর উৎপাদনে আসার কথা রয়েছে। এ জন্য অক্টোবরেই ইউরেনিয়াম রড (ফুয়েল রড) চুল্লিতে স্থাপন করা হবে। গত মে মাসে রাশিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদন প্রস্তুতি-সংক্রান্ত সনদ সই করে বাংলাদেশ। ফুয়েল রড উৎপাদন করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশনের (রোসাটম) সহযোগী প্রতিষ্ঠান টিভিইএল। সাইবেরিয়ান অঞ্চলের রাজধানী নভোসিভিরস্ক শহরে ফুয়েল প্রস্তুত হচ্ছে। বিদ্যুতের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু থেকে তিন বছর পর্যন্ত জ্বালানির দাম দিতে হবে না বাংলাদেশকে। দুই ইউনিটে বছরে লাগবে ৭০ থেকে ৮০ টন ইউরেনিয়াম রড।

পরমাণু শক্তি কমিশন সূত্রে জানা গেছে, পারমাণবিক দুর্ঘটনাজনিত আন্তর্জাতিক কনভেনশন এবং বাংলাদেশ অ্যাটোমিক এনার্জি রেগুলেটরি আইন (বিএইআর অ্যাক্ট-২০১২) অনুসারে পারমাণবিক স্থাপনা ও পারমাণবিক জ্বালানি সম্পর্কিত দুর্ঘটনার ক্ষতির দায় সম্পূর্ণরূপে অপারেটর বা লাইসেন্সির।

বিএইআর অ্যাক্টের ৪৫ ধারা অনুসারে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-সংক্রান্ত প্রতিটি পারমাণবিক দুর্ঘটনার আর্থিক ক্ষতিপূরণের পরিমাণ সর্বোচ্চ ৩০ কোটি স্পেশাল ড্রয়িং রাইটসের (এসডিআর) সমান বাংলাদেশি টাকা। এসডিআর হলো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফের এক ধরনের মুদ্রা। বর্তমান বিনিময় হার অনুসারে ৩০ কোটি এসডিআর বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

আইন মতে, ক্ষতিপূরণের জন্য বীমা পলিসি চালু অথবা অন্য কোনো উপায়ে অর্থ জোগান নিশ্চিত করতে হবে। বিএইআর অ্যাক্টের ৪৬ ধারা অনুযায়ী অপারেটর (অ্যাটোমিক এনার্জি কমিশন) দাবি মেটাতে অসমর্থ হলে বাংলাদেশ সরকার ক্ষতিপূরণের পাওনা নিশ্চিত করবে।

এই আর্থিক দায় নিশ্চিতে গত ২ এপ্রিল পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. অশোক কুমার পাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিবকে একটি চিঠি দেন। সেই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় অর্থ বিভাগকে গত ৫ জুন আরেকটি চিঠি পাঠায়।

চিঠি দুটির বক্তব্য অনুসারে পরমাণু শক্তি কমিশন বলছে, বর্তমানে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো একটি বড় বিনিয়োগের এবং প্রযুক্তিঘন স্থাপনার বীমা করার অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা বাংলাদেশের কোনো সরকারি বা বেসরকারি বীমা প্রতিষ্ঠানে নেই। এ ছাড়া রূপপুরের জন্য বর্তমান পর্যায়ে বীমা করা হলে প্রতিবছর প্রিমিয়াম (কিস্তি) হিসেবে যে খরচ হবে, তা প্রকল্প ব্যয় হিসেবে বিবেচিত হবে। এতে বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাবে। তাই বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু এবং প্রকল্পের বিদেশি ঋণের (রাশিয়া) সিংহভাগ পরিশোধের আগ পর্যন্ত পারমাণবিক দুর্ঘটনাজনিত জনসাধারণের স্বাস্থ্য ও সম্পদের ক্ষতিপূরণের দায় সরকার বহন করতে পারে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই প্রকল্পের কারিগরি কমিটির অষ্টম সভায় এই সুপারিশ করা হয়। পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহন-সংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কমিটিতেও এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষতিপূরণ বিষয়ে অপারেটরের দায় মোচন-সংক্রান্ত ‘আর্থিক নিশ্চয়তাপত্র’ জারি করতে অর্থ বিভাগকে অনুরোধ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। অর্থ বিভাগ ২০ জুন ট্রেজারি এবং ঋণ ব্যবস্থাপনা অনু বিভাগকে নিশ্চয়তাপত্র ইস্যুর নির্দেশ দেয়।

রূপপুরের প্রকল্প পরিচালক এবং নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানির (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. শৌকত আকবর বলেন, রূপপুরের জন্য রাশিয়ার সাইবেরিয়ায় পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদন করা হচ্ছে, যা প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক অ্যাটোমিক এনার্জি এজেন্সির (আইএইএ) নীতিমালা অনুসরণে যথাযথ প্রক্রিয়ায় এই জ্বালানি গ্রহণ করবে বাংলাদেশ। তিনি আরও জানান, বর্তমানে প্রথম ইউনিটের কমিশনিংয়ের প্রথম ধাপের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আগামী অক্টোবরের শুরুতে প্রথম ব্যাচের পারমাণবিক জ্বালানি প্রকল্প এলাকায় সরবরাহ করা হবে।

বীমা কাভারেজের বিষয়ে রাশিয়ার কোনো আপত্তি রয়েছে কিনা– প্রশ্ন করা হলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি। রাশিয়ার দূতাবাস এবং রূপপুর প্রকল্পের তত্ত্বাবধানকারী রোসাটমও বীমার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

লাইবরের বিদায়ে সোফর নিয়ে বিপাকে বিদ্যুৎ খাত!

 ১৬ আগস্ট ২০২৩.শেয়ার বিজ

ইসমাইল আলী: বিদ্যুৎ খাতে গত কয়েক বছরে নেয়া হয়েছে সরকারি বেশকিছু বড় প্রকল্প। তবে বেশির ভাগ প্রকল্প কঠিন শর্তের বায়ার্স ক্রেডিট বা ইসিএ (এক্সপোর্ট ক্রেডিট এজেন্সি) ঋণে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। গ্রেস পিরিয়ডসহ এসব ঋণ ১২-১৫ বছরে পরিশোধ করতে হবে। আর সুদহার ছিল ছয় মাস মেয়াদি লাইবর (লন্ডন ইন্টারব্যাংক অফার রেট) প্লাস ৩-৪ শতাংশ।

গত ৩০ জুন বিলুপ্ত হয়েছে লাইবর। ফলে এসব ঋণের জন্য সুদ হবে ছয় মাস মেয়াদি সোফর (সিকিউরড ওভারনাইট ফিন্যান্সিং রেট) প্লাস ৩-৪ শতাংশ। যদিও ঋণ নেয়ার সময় লাইবর হার ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৩ থেকে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। এতে দেড় বছর আগেও এসব ঋণের জন্য সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার শতাংশ সুদ দিতে হতো। তবে বর্তমানে সোফর ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। আর ছয় মাস মেয়াদি সোফর ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। অর্থাৎ ইসিএ ঋণের সুদহার দাঁড়াবে আট থেকে ৯ শতাংশ।

তথ্যমতে, বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে কঠিন শর্তের ঋণ রয়েছে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার কোম্পানি পটুয়াখালী বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ঋণ নিয়েছে প্রায় এক হাজার ৮০০ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণের পরিমাণ এক হাজার ৭৮০ মিলিয়ন ডলার এবং বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানির রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণ এক হাজার ৩৫০ মিলিয়ন ডলার।

এর বাইরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) আট প্রকল্পে ইসিএ ঋণ এক হাজার ৮০ মিলিয়ন ডলার, আশুগঞ্জ ও ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬১০ মিলিয়ন ডলার, নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির ৪০০ মিলিয়ন ডলার এবং বি-আর পাওয়ারজেনের ঋণ ১৫০ মিলিয়ন ডলার। এছাড়া সঞ্চালন লাইন নির্মাণে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নিয়েছে প্রায় দুই হাজার মিলিয়ন ডলার। আর বেসরকারি বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণ রয়েছে চার হাজার ৪২৯ মিলিয়ন ডলার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও দেশি-বিদেশি যৌথ বিনিয়োগের কোম্পানির ঋণে বাংলাদেশ সরকারের সভরেন গ্যারান্টি দেয়া ছিল। ফলে এসব ঋণের সুদহার ছয় মাস মেয়াদি লাইবর প্লাস (গড়ে) ৩ শতাংশ। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে লাইবর ছিল ০.৩১ শতাংশ। এতে গড়ে এসব ঋণে সুদ দিতে হতো ৩.৩১ শতাংশ। তবে বর্তমানে ছয় মাস মেয়াদি সোফর দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ শতাংশ। ফলে ঋণের সুদহার বেড়ে দাঁড়িয়েছে গড়ে প্রায় ৮ শতাংশ।

এদিকে বেসরকারি ঋণে সভরেন গ্যারান্টি না থাকায় সুদহারও বেশি। বিদ্যুৎ খাতের বেসরকারি এসব ঋণের গড় সুদহার ছিল লাইবর প্লাস ৪-৪.৫ শতাংশ। ফলে বেসরকারি ঋণের জন্য আগে সুদ গুনতে হতো ৪.৩১ থেকে ৪.৮১ শতাংশ। তবে ছয় মাস মেয়াদি সোফরের উচ্চ হারের কারণে সুদের হার গিয়ে ঠেকেছে সাড়ে ৯ শতাংশ পর্যন্ত। এতে ইসিএ তথা বায়ার্স ক্রেডিটের সুদ পরিশোধ নিয়ে বিপাকে পড়েছে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতই।

সরকারি প্রকল্পগুলোতে উচ্চ সুদহারের কারণে ক্যাপাসিটি পেমেন্টও বেড়ে যাবে বলে জানান পিডিবির কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণের সুদহার ছিল ছয় মাস মেয়াদি লাইবর প্লাস দুই দশমিক ৮৫ শতাংশ। আর ঋণ নেয়ার সময় লাইবর ছিল শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। এখন ছয় মাস মেয়াদি সোফর প্রায় পাঁচ শতাংশ। এতে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণের জন্য শুরুতে যে সুদহার ছিল তিন দশমিক ৩৫ শতাংশ, এখন তা দাঁড়িয়েছে সাত দশমিক ৮৫ শতাংশ। আর এ সুদের হারের সঙ্গে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ জড়িত। তাই ক্যাপাসিটি চার্জও বেড়ে যাবে।

তথ্যমতে, বিদ্যুৎ খাতের ইসিএ ঋণগুলো গড়ে ১২ বছরে পরিশোধ করতে হবে। এতে বছরে আসল বাবদ পরিশোধ করতে হয় প্রায় এক হাজার ১৪০ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সরকারি খাতে প্রায় ৭৭০ মিলিয়ন ডলার ও বেসরকারি খাতের ৩৭০ মিলিয়ন ডলার আসল পরিশোধ করতে হবে। আর সরকারি খাতের সুদ বাবদ গুনতে হবে প্রায় ৭৪৫ মিলিয়ন ডলার এবং বেসরকারি খাতে সুদ বাবদ ৪০০ মিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে বছরে।

যদিও ডলার সংকটে ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করা যাচ্ছে না। গত কয়েক মাসে এমন একাধিক ঘটনা ঘটেছে। পিডিবির ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুৎ খাতকে সরকার অগ্রাধিকার দিয়ে নানা প্রকল্প গ্রহণ করেছে। বেসরকারি খাতেও বেশকিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তবে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণ পরিশোধ এখন কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ একদিকে বেড়ে গেছে সুদহার, আরেকদিকে ডলার সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এভাবে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ বিলম্বিত হলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে সংকট

২৬ আগস্ট, ২০২৩, দৈনিক বাংলা

কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসার পর তার ক্যাপাসিটি বা পূর্ণ সক্ষমতা ঘোষণা করতে হয়। এই পূর্ণ সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে ওই কেন্দ্রকে প্রতি ইউনিটের জন্য ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বা কেন্দ্র ভাড়া দেয় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এটাকে কমার্শিয়াল অপারেশন ডেট (সিওডি) বা বাণিজ্যিক উৎপাদন তারিখ বলা হয়। সিওডি যেদিন ঘোষণা করা হয়, ওইদিন থেকে পিডিবি কেন্দ্রটিকে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বা কেন্দ্র ভাড়া দিয়ে থাকে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র গত বছরের ডিসেম্বরে প্রাথমিক উৎপাদন তারিখ বা আওডি (ইনিশিয়াল অপারেশন ডেট) ঘোষণা করলেও এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ প্রায় ৯ মাস, কিন্তু এর মধ্যে কেন্দ্রটি সিওডি নিতে পারেনি।

রামপাল কেন্দ্রটি নির্মাণ ত্রুটির কারণে দফায় দফায় বন্ধ হয়েছে। কেন্দ্রটির ১৩২০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিটের ৬৬০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট গত ডিসেম্বর আওডি হয়। এই ইউনিটটি চালুর পর বহুবার নির্মাণ ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। নিয়ম অনুযায়ী কেন্দ্রটিকে সিওডি বা বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে হলে অন্তত ৮৫ শতাংশ প্লান্ট ফ্যাক্টরে চালু করতে হবে। কিন্তু কেন্দ্রটি এখন পর্যন্ত এই ক্ষমতায় চালু করা যায়নি। যতবারই কেন্দ্রটি চালু করা হয়, ৩৫০ মেগাওয়াটের ওপর বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হলেই কেন্দ্রের ভেতরে থাকা টিউবটি ফুটো হয়ে কেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।

রামপাল কেন্দ্রটির নির্মাণ ত্রুটি ধরার জন্য ইতোমধ্যে সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ ফিশনারকে নিয়োগ করেছে। ফিশনার সরকারের কাছে একটি প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে। সেখানে তারা বলেছে, নতুন নির্মাণ করায় এসব সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তবে কিছুদিন গেলে এসব সমস্যা থাকবে না। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফিশনার রামপাল কেন্দ্রের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। যদি কেন্দ্রটির নির্মাণ ও নকশায় ভুল থাকে, সেটার দায় ফিশনারেরও আছে। কারণ এটা তাদের দেখার কথা ছিল। এখন কেন্দ্রটি যখন চালু করা যাচ্ছে না, তখন ফিশনারকে দিয়েই আবার তদন্ত করলে যথাযথ তথ্য পাওয়া যাবে না। বরং নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক মানের তৃতীয় একটি প্রতিষ্ঠান দিয়ে এর কারিগরি পরীক্ষা করা উচিত ছিল বিদ্যুৎ বিভাগের।

লোডশেডিংয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা

২৭ আগস্ট ২৩, সমকাল

১০ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট, ১৪ ঘণ্টা ২৫ মিনিট, ১৮ ঘণ্টা ১০ মিনিট– এগুলো কোনো শিক্ষার্থীর পড়ালেখার সূচি নয়; ২০ আগস্ট থেকে যথাক্রমে তিন দিন ময়মনসিংহের নান্দাইলের চণ্ডীপাশা ইউনিয়নের বাঁশহাটী বাজারের ‘টার্গেট ফাইন নিট’ কারখানায় লোডশেডিংয়ের তালিকা। চণ্ডীপাশার মতো অন্যান্য অঞ্চলেও একই দশা। এর ফলে গত কয়েক বছরে মফস্বলে বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পকারখানার যে প্রসার ঘটেছে, তা ফিকে হতে বসেছে। থমকে দাঁড়িয়েছে হ্যাচারি ও পোলট্রি খাত। বন্ধের পথে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প উদ্যোগ। লোকসান গুনে ব্যবসা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন তরুণ উদ্যোক্তারা। তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ফ্রিল্যান্সিং ও স্টার্টআপ খাতের অগ্রযাত্রায় পড়েছে ছেদ; বাড়ছে বেকারত্ব। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতির পালে যে দুর্বার হাওয়া লেগেছিল, তা টেকসই হওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

টার্গেট ফাইন নিট কারখানার প্রোডাকশন ডিরেক্টর মো. কামরুজ্জামান জানান, বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। ডিজেলে কারখানা চালাতে গিয়ে মাসে বাড়তি ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর দাবি, বৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা কম থাকায় রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে তেমন লোডশেডিং হচ্ছে না। তবে এর মধ্যেও মফস্বল শহর ও গ্রামাঞ্চলে দিনে গড়ে ৬ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। সুষম উন্নয়নের স্বার্থে শহরের মতো মফস্বলেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎসেবা নিশ্চিতের তাগিদ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

‘ক্যাপাসিটি চার্জের’ বোঝা ধারণার চেয়ে বেশি

সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৩, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

এই টাকায় তাদের কর্মকর্তাদের বেতন হয়েছে, স্থাপনা পরিচালনার ব্যয় নির্বাহ হয়েছে কিংবা সরকারি-বেসরকারি ঋণ পরিশোধ হয়েছে। অথচ এই সময়কালে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের বেশিরভাগ শুধু বসেই ছিল।

সরকার পরিচালিত টঙ্গী ১০৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রে ২০১৮-১৯ সালে উৎপাদন হয় এর বার্ষিক সক্ষমতার মাত্র ২ শতাংশ। এর বাইরে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে ২০১৭-১৮ থেকে ২০২১-২২ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়নি ১ ওয়াটও। অথচ এই ৫ বছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পেছনে সরকারের খরচ হয়েছে ১৩৩ কোটি টাকা।

২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন। ওই ৫ বছরের মধ্যে ৩ বছরে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়নি। বাকি ২ বছরে উৎপাদন হয়েছে বার্ষিক সক্ষমতার মাত্র ৩-৮ শতাংশ। দেশের সাধারণ মানুষের করের টাকা থেকে এই প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘ফিক্সড কস্ট’ গুণতে হয়েছে ৪৩১ কোটি টাকা।

সর্বশেষ খবর দ্য ডেইলি স্টার বাংলার গুগল নিউজ চ্যানেলে।

২০১৭ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে এ ২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ অন্তত ৪২টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্র অন্তত ১ বছর বসে ছিল। অথচ সম্মিলিতভাবে এগুলোর জন্য ‘ফিক্সড কস্ট’ বাবদ সরকারের খরচ হয়েছে ১৩ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা।

এই টাকায় তাদের কর্মকর্তাদের বেতন হয়েছে, স্থাপনা পরিচালনার ব্যয় নির্বাহ হয়েছে কিংবা সরকারি-বেসরকারি ঋণ পরিশোধ হয়েছে। অথচ এই সময়কালে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের বেশিরভাগ শুধু বসেই ছিল।

দ্য ডেইলি স্টারের অনুসন্ধানে দেখা যায়, নিষ্ক্রিয় এই সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে দেওয়া ‘ফিক্সড কস্টকে’ ক্যাপাসিটি চার্জ বিবেচনা করলে তা এর আগে প্রকাশিত ক্যাপাসিটি চার্জের সব অংক ছাড়িয়ে প্রাপ্তির তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়ের একটা হিসাবে গিয়ে ঠেকে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা সাধারণত বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে দেওয়া ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেন। যেমন, গত জুনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ২০১৭-১৮ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে দিয়েছে ৫৭ হাজার ৯৭০ কোটি।

বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সরকারের ব্যয় দুই ধরনের। এক জ্বালানি ব্যয় ও অপরটি ক্যাপাসিটি পেমেন্ট। ক্যাপাসিটি পেমেন্টের মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ছাড়াও বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া বাবদ একটা অংক গুণতে হয় সরকারকে, যাকে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বলা হয়।

সিপিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৫ বছরে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে দেওয়া ক্যাপাসিটি চার্জের সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর ‘ফিক্সড কস্ট’ যোগ করলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৯৯ হাজার ২৭৯ কোটি টাকা, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন হোক বা না হোক সরকারকে পরিশোধ করতে হয়েছে।

২০২১-২২ সাল পর্যন্ত দেশে অন্তত ১৫১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল। এগুলোর মধ্যে ৬৩টি সরকারি এবং ৮৮টি বেসরকারি।

এই ১৫১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে দ্য ডেইলি স্টার ৪২টি সরকারি এবং ২৬টি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে চিহ্নিত করেছে যেগুলো গত ৫ অর্থবছরে বার্ষিক সক্ষমতার ১০ শতাংশ বা তার কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে।

এই ৬৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র ৫ বছরের মধ্যে যে বছরগুলোতে কম উৎপাদন করেছে, শুধু ওই সময়ে এগুলোর জন্য সরকারের ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ব্যয় হয়েছে ১১ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা।

এর মধ্যে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পেয়েছে ৪ হাজার ১৪১ কোটি টাকা, আর বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পেয়েছে ৭ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা।

আর ৬৮টি কেন্দ্রের জন্য ৫ বছরে দেওয়া মোট ক্যাপাসিটি চার্জের পরিমাণ ২৯ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের ২৯ শতাংশ।

এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র ওই ৫ বছরের ৫ বছরই সক্ষমতার ১০ শতাংশের কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে এবং ৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র ৫ বছরের মধ্যে ৪ বছর ১০ শতাংশের কম উৎপাদন করেছে। এই ১৪ প্রতিষ্ঠানের ১১টিই সরকারি।

দেশের বাজেটের মোট বার্ষিক ভর্তুকি বরাদ্দের ২৫ শতাংশ বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় হয়। সিপিডির ধারণা, এই বরাদ্দের বেশিরভাগই পরিশোধ করা হয় ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া ১ লাখ কোটি টাকা, কারা কত পেল

০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

বর্তমান সরকারের তিন মেয়াদের সাড়ে ১৪ বছরে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়ার পেছনে ব্যয় হয়েছে এক লাখ কোটি টাকার বেশি। বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল অর্থ পেয়েছে শুধু ভাড়া বাবদ।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া ব্যয়ের চিত্র প্রকাশ করেন। তাঁর দেওয়া হিসাব বলছে, এই সরকারের তিন মেয়াদে গত ৩০ জুন পর্যন্ত ৭৩টি আইপিপি (স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী) ও ৩০টি রেন্টাল (ভাড়ায় চালিত) বিদ্যুৎকেন্দ্রকে প্রায় এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রভাড়া (ক্যাপাসিটি চার্জ/রেন্টাল পেমেন্ট) দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে থাকুক বা না থাকুক, চুক্তি অনুসারে কেন্দ্রভাড়া পায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, যাকে ক্যাপাসিটি চার্জ বলা হয়। সরকার ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের যুক্তি হলো, কেন্দ্রভাড়া না দিলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে না। তাদের আরেকটি যুক্তি হলো, বাসাভাড়া নিয়ে সেখানে কেউ না থাকলেও ভাড়া দিতেই হয়।

এখন যে মানুষকে বিদ্যুতের চড়া দাম দিতে হচ্ছে, তার একটি বড় কারণ বিদ্যুৎকেন্দ্রের অযৌক্তিক ভাড়া।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এম শামসুল আলম

ভোক্তা অধিকার সংগঠন ও জ্বালানি-বিশেষজ্ঞদের মত, কেন্দ্রভাড়া নির্ধারণ করতে হয় প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে। কিন্তু বাংলাদেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি হয়েছে প্রতিযোগিতা ছাড়া, ২০১০ সালের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ আইনের অধীনে। আইনটি দায়মুক্তি আইন নামে পরিচিত। এতে কেন্দ্রভাড়া বেশি পড়েছে। বেশি লাভবান হয়েছেন বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিপুল সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু ততটা বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় না। ফলে সব সময়ই বিদ্যুৎকেন্দ্রের একাংশকে বসিয়ে ভাড়া দিতে হয়।

বিষয়টি নিয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এম শামসুল আলম গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, এখন যে মানুষকে বিদ্যুতের চড়া দাম দিতে হচ্ছে, তার একটি বড় কারণ বিদ্যুৎকেন্দ্রের অযৌক্তিক ভাড়া।

উল্লেখ্য, সরকার বিগত ১৪ বছরে বিদ্যুতের দাম পাইকারিতে ১১ বার ও খুচরায় ১৩ বার বাড়িয়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ায় সারা দেশে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হয়। পাশাপাশি লোডশেডিং প্রায় বিদায় নিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে যথেষ্ট জ্বালানি আমদানি করতে না পারায় লোডশেডিং করতে হয়। আরেকটি দিক হলো, চাহিদা পুরোটা পূরণ করতেও এত বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের দরকার নেই।

সংসদে হিসাব

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপক উৎসাহ দেওয়া হয়। তখন থেকে এ খাতে দেশি বিনিয়োগ বাড়ে। সব মিলিয়ে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের মতো, যদিও বিদ্যুতের চাহিদা থাকে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের নিচে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ায় সারা দেশে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হয়। পাশাপাশি লোডশেডিং প্রায় বিদায় নিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে যথেষ্ট জ্বালানি আমদানি করতে না পারায় লোডশেডিং করতে হয়। আরেকটি দিক হলো, চাহিদা পুরোটা পূরণ করতেও এত বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের দরকার নেই।

বিদ্যুতের বিপুল উৎপাদন সক্ষমতার বিপরীতে বিপুল কেন্দ্রভাড়া নিয়ে বিভিন্ন সময় আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। কেন্দ্রভাড়ার হিসাবটি প্রকাশ করা হয় গণফোরামের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খানের প্রশ্নের জবাবে। তিনি জাতীয় সংসদে জানতে চেয়েছিলেন, বর্তমান সরকারের তিন মেয়াদে কোন কোন বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপরীতে কী পরিমাণ কেন্দ্রভাড়া পরিশোধ করা হয়েছে? ওই সব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিক কোন কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান? তাদের সঙ্গে সরকারের চুক্তির শর্ত কী কী?

সংসদে তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে এটা পরিষ্কার হলো যে কী বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়ার পেছনে ব্যয় হয়েছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম

স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে গতকাল সংসদের বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর টেবিলে এসব প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ কেন্দ্রভাড়ার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।

এর আগে গত বছর জুলাইয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়ার ব্যয়ের বাৎসরিক হিসাব তুলে ধরেছিল। বলা হয়েছিল, ২০২০-২১ অর্থবছরে কেন্দ্রভাড়া দিতে হয়েছিল ১৮ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকার কিছু বেশি।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, সংসদে তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে এটা পরিষ্কার হলো যে কী বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়ার পেছনে ব্যয় হয়েছে। তিনি বলেন, শুরুতে বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কেন্দ্রভাড়ার যুক্তি থাকতে পারে। তবে যথেষ্ট বিনিয়োগ হওয়ার পর দায়মুক্তি আইন ও কেন্দ্রভাড়ার শর্ত বাতিল করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সরকার সেটা করেনি, বরং দায়মুক্তি আইনের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। ফলে সরকার ও জনগণ প্রতিযোগিতামূলক দামে বিদ্যুৎ পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ উৎপাদন পরিকল্পনা, সে অনুযায়ী সরকারের আর্থিক দায়—এসব বিবেচনায় মনে হয়, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) শ্বেতহস্তীতে পরিণত হতে পারে।

কারা কত ভাড়া পেয়েছে

সংসদে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়ার যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, সেটি কেন্দ্রভিত্তিক। বিদেশি ও বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর কোনো কোনোটির একাধিক কেন্দ্র রয়েছে। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য ধরে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশের বিদ্যুৎ খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপ তাদের ৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া পেয়েছে অন্তত ১৭ হাজার ৬১০ কোটি টাকা।

সামিটের পরই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাগ্রিকো ইন্টারন্যাশনাল। তারা সাতটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া পেয়েছে ৮ হাজার ৩১০ কোটি টাকা। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ইউনাইটেড গ্রুপ। তারা ছয়টি কেন্দ্রের বিপরীতে ভাড়া পেয়েছে ৭ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা।

চতুর্থ সর্বোচ্চ ভাড়া পাওয়া প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ বিনিয়োগে করা পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র, যার আনুষ্ঠানিক নাম বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড। তারা পেয়েছে ৭ হাজার ৪৫৫ কোটি। উল্লেখ্য, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর পর প্রায় দেড় বছর সক্ষমতার বড় অংশকে বসিয়ে বসিয়ে ভাড়া দিতে হয়েছে। কারণ, উৎপাদিত বিদ্যুৎ আনার সঞ্চালন লাইন ছিল না।

রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপরীতে পেয়েছে ৭ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। এটি আইপিপি হিসেবে তালিকাভুক্ত হলেও প্রতিষ্ঠানটি মূলত সরকারি সংস্থার মালিকানাধীন।

যে ‘মডেলে’ বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি হয়েছে, সেটা ভুল বলে উল্লেখ করেন ম তামিম। তিনি বলেন, যদি জানা থাকে যে শুধু সর্বোচ্চ চাহিদার সময় ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানো হবে, তাহলে পুরো সময়ের জন্য সারা বছরের চুক্তি কেন?

বাংলা ট্র্যাক গ্রুপের মালিকানাধীন পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ভাড়া দেওয়া হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। ওরিয়ন গ্রুপের মালিকানাধীন পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র পেয়েছে ৪ হাজার ৮০ কোটি টাকা।

সামিট ও ইউনাইটেডের যৌথ মালিকানাধীন খুলনা পাওয়ার কোম্পানি (কেপিসিএল) তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে পেয়েছে ৩ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা। সংসদে দেওয়া তালিকায় ডরিন গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে সাতটি। তারা ভাড়া পেয়েছে ৩ হাজার ৬৬ কোটি টাকা।

এর বাইরে হরিপুর ৩ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা, হোসাফ গ্রুপ ২ হাজার ৮৬০ কোটি, মোহাম্মদী গ্রুপ ২ হাজার ৮৩৪ কোটি, এনডাব্লিউপিসি ২ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা, ম্যাক্স গ্রুপ ২ হাজার ৩৫১ কোটি, কনফিডেন্স গ্রুপ ২ হাজার ১৮৫ কোটি, সিকদার গ্রুপ ১ হাজার ৮৪৩ কোটি, বারাকা গ্রুপ ১ হাজার ৬৯৩ কোটি, প্যারামাউন্ট-বাংলা ট্র্যাক ১ হাজার ৬৩১ কোটি, সিনহা গ্রুপ ১ হাজার ৪৫৪ কোটি, রিজেন্ট গ্রুপ ১ হাজার ১৭২ কোটি এবং এনার্জি প্যাক ১ হাজার ১১৩ কোটি টাকা ভাড়া পেয়েছে।

এর বাইয়ে রয়েছে আরও বিদ্যুৎকেন্দ্র। যেমন এনার্জিস পাওয়ার করপোরেশন পেয়েছে ৬৮৫ কোটি টাকা। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকানা জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদের পরিবারের। রাজশাহীর সরকারদলীয় সংসদ সদস্য এনামুল হকের নর্দার্ন পাওয়ার সলিউশন পেয়েছে ৬৬২ কোটি টাকা।

কিছু কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যেগুলো খুব কম সময় চলে বিপুল অঙ্কের অর্থ নিয়ে গেছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের এপিআর এনার্জির ৩০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তিন বছরে নিয়ে গেছে ২ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা। কেন্দ্রটি বেশির ভাগ সময় বন্ধ থাকত।

সংসদে ১১৪টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তালিকা প্রকাশ করা হলেও এর মধ্যে ১১টি কেন্দ্রের কোনো কেন্দ্র ভাড়া উল্লেখ করা ছিল না।

গ্যাসের সংকটে সার কারখানা

০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

দেশে সাধারণত তিন মাসের জন্য প্রয়োজনীয় সার মজুত থাকে। এখন আছে প্রায় দেড় মাসের চাহিদা পূরণের মতো সার। এরই মধ্যে গ্যাসের সংকটে গত সোমবার বন্ধ হয়ে গেল দেশের সবচেয়ে বেশি সার উৎপাদনকারী কারখানা যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড। এটিসহ এখন বন্ধ তিনটি সার কারখানা।

এমন একটা সময়ে সারের মজুত কম এবং কারখানাটি বন্ধ হলো, যখন চাহিদা অনেক বেশি। দেশে এখন ধানের দ্বিতীয় প্রধান মৌসুম আমনের আবাদ চলছে। জানুয়ারিতে শুরু হবে ধানের প্রধান মৌসুম বোরোর আবাদ। অক্টোবরের শেষ থেকেই শীতকালীন সবজি ও পেঁয়াজের আবাদ শুরু হবে। সাধারণত এই সময়টিতেই সারের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে।

কৃষক পর্যায়ে এখনো সার নিয়ে সংকট হয়নি। তবে কৃষকদের সার কিনতে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দিতে হচ্ছে। গতকাল বুধবার দেশের সাতটি জেলা ঘুরে ছয়টিতে নির্ধারিত দরের চেয়ে কেজিতে ১ থেকে ৩ টাকা বাড়তি দামে সার বিক্রি করতে দেখা যায়।

কৃষকেরা বলছেন, এমনিতেই সরকারিভাবে সারের দাম বাড়ানোয় তাঁদের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে; তার ওপর নির্ধারিত দরের চেয়ে বাড়তি দাম দিতে বাধ্য হওয়ায় তাঁদের খরচ আরও বাড়ছে। সংকট তৈরি হলে কৃষক পর্যায়ে দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। যেমন গত বছরের অক্টোবরে কৃষক পর্যায়ে সার সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। তখন কয়েকটি জেলায় কৃষকেরা বাড়তি দাম চাওয়া এবং সার না পাওয়ায় বিক্ষোভ করেছিলেন।

সারকে একটি সংবেদনশীল পণ্য হিসেবে গণ্য করে সরকার সব সময় যথেষ্ট মজুত নিশ্চিত করেছে। সমস্যা তৈরি হয়েছে দেড় বছর ধরে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমে যাওয়ায় সার আমদানিতে সমস্যা তৈরি হয়েছে। আবার মার্কিন ডলারের অভাবে গ্যাস আমদানি ব্যাহত হওয়ায় দেশেও সার কারখানা পুরো সময় চালানো যায়নি।

দেশে ইউরিয়া সারের মূল জোগান নিশ্চিত করে বাংলাদেশ রাসায়নিক শিল্প করপোরেশন (বিসিআইসি)। করপোরেশনটির চেয়ারম্যান মো. সাইদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, গ্যাসের সংকট তৈরি হওয়ায় কয়েকটি সার কারখানা আপাতত বন্ধ রাখতে হচ্ছে। সংকট কেটে গেলে তা আবারও চালু করা হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা সৌদি আরব, কাতার ও আরব আমিরাত থেকে ইউরিয়া সার কেনার যে চুক্তি করেছি, সেই সার দ্রুত চলে আসবে। ফলে সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই।’

মিউরেট অব পটাশ (এমওপি), ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি), ট্রিপল সুপার ফসফেটসহ (টিএসপি) অন্যান্য সার সরবরাহের বিষয়টি দেখে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। বিএডিসির চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ সাজ্জাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সার আমদানি দ্রুত করার চেষ্টা করছি। চলতি মাসের মধ্যে রাশিয়া, তিউনিসিয়া ও মরক্কো থেকে সার আসছে। আশা করি বড় কোনো সংকট হবে না।’

যে তিনটি কারখানা এখন বন্ধ, সেগুলোতে ইউরিয়া উৎপাদিত হতো। গ্যাস না পেয়ে গত সোমবার যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড বন্ধ করে দেওয়া হয়।

মজুত কত, চাহিদা কত

সার

সারফাইল ছবি

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশে এখন মোট ১৯ লাখ টন সার মজুত আছে। বিপরীতে শুধু চলতি সেপ্টেম্বরের চাহিদা ১২ লাখ টন। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ইউরিয়া সারের মজুত আছে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টন। সেপ্টেম্বরের চাহিদা ৫ লাখ টনের বেশি। সরকারি হিসাবে, আগামী অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে দরকার হবে ১৬ লাখ টন ইউরিয়া সার। ইউরিয়া নিয়ে দুশ্চিন্তার একটি কারণ হলো, এই সার উৎপাদনের তিন কারখানা এখন বন্ধ।

সরকারি সংস্থা বিসিআইসির ছয়টি সার কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে চারটি ইউরিয়া উৎপাদন করে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এই চার কারখানা ১০ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার উৎপাদন করেছিল। যে তিনটি কারখানা এখন বন্ধ, সেগুলোতে ইউরিয়া উৎপাদিত হতো। গ্যাস না পেয়ে গত সোমবার যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বিশ্ববাজারে সারের দাম অনেকটা কমেছিল। এখন আবার বাড়ছে। গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে যে ইউরিয়ার দাম প্রতি টনে গড়ে ৬২৩ ডলার ছিল, তা জুনে ২৮৮ ডলারে নামে। আগস্টে তা বেড়ে ৩৮৬ ডলারে উঠেছে।

চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি লিমিটেড ও আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের (এএফসিসিএল) মেরামতকাজের জন্য বন্ধ করা হয়েছিল। তবে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি গত মার্চ থেকে উৎপাদনে যেতে পারছে না গ্যাসের অভাবে। আর আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি গত জুন থেকে গ্যাসের অভাবে উৎপাদনে যেতে পারছে না।

বিসিআইসির চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্যাস পেলেই আমরা সার কারখানা চালু করতে পারব। সব কটি কারখানা চালু করতে পারলে কোনো সার আমদানি করতে হবে না।’

বিসিআইসি বলছে, নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় চালুর অপেক্ষায় থাকা ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজার পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিকে (জিপিএফপিএলসি) পরীক্ষামূলকভাবে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। এটি উদ্বোধন হওয়ার কথা নভেম্বরের শেষ দিকে। এখন বিসিআইসির অধীনে শুধু শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডে ইউরিয়া উৎপাদিত হয়।

বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ কেনায় আবারও ডলারে চুক্তি করতে যাচ্ছে সরকার

শেয়ার বিজ, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩

বেসরকারি খাতে বায়ু ও সৌরবিদ্যুতের আরও তিনটি কেন্দ্র অনুমোদন দিতে যাচ্ছে সরকার। বিল্ড, ওন অ্যান্ড অপারেট (বিওও) পদ্ধতিতে এ তিন বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স দেয়া হবে। এর মধ্যে একটি বায়ু ও দুটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ২০ বছর বিদ্যুৎ কেনা হবে। এ তিন কেন্দ্র থেকেই বিদ্যুৎ কেনা হবে ডলারে। যদিও দেশে বড় ধরনের ডলার সংকট রয়েছে। বর্তমানে ডলার সংকটে আদানিসহ বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল দিতে পারছে না সরকার।

এ তিন বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়া হবে না। ‘নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট’ (এনইএনপি) তথা বিদ্যুৎ উৎপাদন নাই, মূল্যও নাই ভিত্তিতে কেন্দ্র তিনটির সঙ্গে চুক্তি করা হবে।

তথ্যমতে, কক্সবাজারের চকরিয়ায় বেসরকারি খাতে প্রস্তাবিত বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সক্ষমতা ধরা হয়েছে ২২০ মেগাওয়াট। এটি স্থাপন করবে হংকংয়ের জেটি নিউ এনার্জি কোম্পানি লিমিটেড। অন্যদিকে কক্সবাজার জেলার সদর উপজেলায় ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করবে ডিট্রোলিক এসএ ইন্টারন্যাশনাল পিটিই এবং পাওয়ারনেটিক এনার্জি লিমিটেড কনসোর্টিয়াম। আর কনসোর্টিয়াম অব গ্রিন প্রোগ্রেস রিনোয়েবল বি ভি অ্যান্ড আই আর বি অ্যাসোসিয়েশন লিমিটেড দিনাজপুর জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলায় ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করবে।

এ তিন কেন্দ্র থেকে ২০ বছরে বিদ্যুৎ কিনতে ব্যয় হবে ডলারের বিদ্যমান বিনিময় হারে প্রায় ১৯ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা। যদিও বাস্তবে কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ কিনতে ব্যয় হবে আরও বেশি। কারণ আগামী ২০ বছরে ডলারের বিনিময় হার কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা কেউই ধারণা করতে পারছে না। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য আজ অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সভাপতিত্বে বিদ্যুৎ বিভাগের তিনটি বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ট্যারিফ নির্ধারণের প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপিত হবে।

বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কক্সবাজারের চকরিয়ায় বেসরকারি খাতে বায়ুভিত্তিক ২২০ মেগাওয়াট স্থাপন করছে হংকংয়ের জেটি নিউ এনার্জি কোম্পানি লিমিটেড। প্রাথমিকভাবে ২০০ মেগাওয়াট ও ২৫ বছরের জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছিল কোম্পানিটি। পরে নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে তা ২২০ মেগাওয়াটে উন্নীত ও ২০ বছরের জন্য চুক্তির মেয়াদ ধরা হয়েছে। এ সময় প্রস্তাবিত ট্যারিফও কমিয়ে আনা হয়। এ কেন্দ্রটি বিদ্যুতের ট্যারিফ ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ২৫ সেন্ট বা ১৩ দশমিক ৪১৪ টাকা (১ ডলার = ১০৯.৫০ টাকা)। এতে আগামী ২০ বছরে বিদ্যুৎ কিনতে সরকারের খরচ ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। তবে প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল প্রদানের সময় ওই সময়ের সোনালী ব্যাংকের ডলারের বিনিময় মূল্য ধরা হবে।

এদিকে কক্সবাজার জেলার সদর উপজেলায় ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনেও ২৫ বছরের বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছিল ডিট্রোলিক এসএ ইন্টারন্যাশনাল পিটিই এবং পাওয়ারনেটিক এনার্জি লিমিটেড কনসোর্টিয়াম। পরে তা নেগোসিয়েশন করে ২০ বছর নির্ধারণ করা হয়। এ সময় ট্যারিফও কিছুটা কমানো হয়। এতে ২০ বছর কেন্দ্রটি থেকে সৌরবিদ্যুৎ কিনতে সরকারের খরচ হবে তিন হাজার ৫৪২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। আর প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা সৌরবিদ্যুৎ কেনায় খরচ ধরা হয়েছে ৯ দশমিক ৯৮ সেন্ট বা ১০ দশমিক ৯২৮ টাকা। এ ক্ষেত্রেও ডলারের বিনিময় মূল্য ১০৯.৫০ টাকা ধরা হয়েছে। তবে প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল প্রদানের সময় ওই সময়ের সোনালী ব্যাংকের ডলারের বিনিময় মূল্য ধরা হবে।

অন্যদিকে কনসোর্টিয়াম অব গ্রিন প্রোগ্রেস রিনোয়েবল বি ভি অ্যান্ড আই আর বি অ্যাসোসিয়েশন লিমিটেড দিনাজপুর জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলায় ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে ২০ বছরের জন্যই প্রস্তাব দেয়। তবে নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে বিদ্যুতের দাম কিছুটা কমিয়ে আনা হয়। এতে প্রতি কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কিনতে ব্যয় হবে ৯ দশমিক ৯৮ সেন্ট বা ১০ দশমিক ৮৭৮২ টাকা। এতে ২০ বছরে সরকারের ব্যয় ধরা হয়েছে তিন হাজার ৫২৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এ ক্ষেত্রেও ডলারের বিনিময় মূল্য ১০৯.৫০ টাকা ধরা হয়েছে। তবে প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল প্রদানের সময় ওই সময়ের সোনালী ব্যাংকের ডলারের বিনিময় মূল্য ধরা হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলার সংকট প্রকট আকার ধারণ করায় আদানিসহ বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল দিতে পারছে না সরকার। এরই মধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ভারতের বিদ্যুৎ আমদানির বিল বকেয়া পড়েছে প্রায় ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলারের বেশি। এরপরও ডলারে এ ধরনের চুক্তি ভবিষ্যতে আত্মঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

এলএনজিনির্ভরতা দেশকে বড় বিপদের দিকে নিয়ে যাচ্ছে?

সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৩, বণিক বার্তা

দেশে গ্যাস সরবরাহের বেশিরভাগই আসে স্থানীয়ভাবে উত্তোলনের মাধ্যমে। যদিও এ বাবদ ব্যয়কৃত অর্থের সিংহভাগ চলে যাচ্ছে এলএনজিতে। ২০১৮ সালে দেশে এলএনজি আমদানি শুরুর পর থেকে গত চার অর্থবছরে গ্যাস সরবরাহে জ্বালানি বিভাগের মোট অর্থ ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকার কিছু বেশি। ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত ব্যয়কৃত এ অর্থের ৭৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ খরচ হয়েছে এলএনজি আমদানিতে। দেশে গ্যাস উত্তোলনকারী বিদেশী কোম্পানিগুলোকে (আইওসি) দিতে হয়েছে ১৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ। আর স্থানীয়ভাবে গ্যাস উত্তোলনকারী তিন দেশী কোম্পানির পেছনে ব্যয় হয়েছে ৫ শতাংশের কিছু বেশি।

অন্যদিকে গত চার অর্থবছরের জাতীয় গ্রিডে দৈনিক গ্যাস সরবরাহের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ সময় দৈনিক গড় সরবরাহ হয়েছে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন থেকে ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে আইওসির গ্যাস সরবরাহ ছিল ৫০ শতাংশ। স্থানীয় কোম্পানিগুলোর গ্যাস সরবরাহ ছিল ২৬ শতাংশ। আর আমদানীকৃত এলএনজি সরবরাহ হয়েছে গড়ে ২৪ শতাংশ।

সরবরাহে স্বল্প অবদান রাখা এলএনজি আমদানি করতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে জ্বালানি বিভাগ। এতে আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েছে জ্বালানি খাত। আবার দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে স্থানীয় গ্যাস উত্তোলন ও অনুসন্ধানে বিনিয়োগ ছিল যৎসামান্য। দেশে গ্যাসের সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় চলমান সংকটের পেছনে বিষয়টি অনেকাংশেই দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই এলএনজিনির্ভরতা কাটিয়ে ওঠা না গেলে সামনের দিনগুলোয় বিপত্তির মাত্রা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।

২০১৮ সাল থেকে দেশে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। পেট্রোবাংলার এক হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত জ্বালানি পণ্যটি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৮৫ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা, যা গ্যাস সরবরাহ বাবদ মোট ব্যয়ের ৭৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ। স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাসের উত্তোলনে নিয়োজিত রয়েছে বিদেশী দুটি কোম্পানি শেভরন ও তাল্লো। এ দুই কোম্পানিকে ২০২১-২২ পর্যন্ত চার অর্থবছরে গ্যাস সরবরাহের জন্য অর্থ দেয়া হয়েছে ১৯ হাজার ২০৮ কোটি টাকা, যা ব্যয়কৃত অর্থের ১৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এছাড়া গ্যাস উত্তোলনে স্থানীয় তিন কোম্পানি নিয়োজিত আছে তিনটি—বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড (বিজিএফসিএল), সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড (এসজিএফসিএল) এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)। এ তিন কোম্পানিকে চার অর্থবছরে দেশে গ্যাস সরবরাহের জন্য পরিশোধ করা হয়েছে ৫ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা, যা এ বাবদ ব্যয়কৃত অর্থের ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ।

২০২১-২২ অর্থবছরের পর গত অর্থবছরের এখনো পূর্ণাঙ্গ কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি পেট্রোবাংলা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে পেট্রোবাংলার গত অর্থবছরের (২০২২-২৩) এপ্রিল পর্যন্ত তথ্য হালনাগাদ করে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ব্যয়কৃত অর্থের যে হিসাব তুলে ধরা হয়েছে, সেখানেও আগের অর্থবছরগুলোর ব্যয়ের ধারা অব্যাহত থাকতে দেখা গেছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবারও দেশে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হয়েছে। এর মধ্যেও সবচেয়ে বড় অবদান ছিল আইওসির। আমদানীকৃত এলএনজির অবদান সবচেয়ে কম।

সৌরবিদ্যুৎ কেনার চুক্তিও হচ্ছে উচ্চমূল্যে

সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৩, বণিক বার্তা

টাকার অবমূল্যায়ন, ডলার সংকট ও জ্বালানির প্রাপ্যতা সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে হিমশিম খেতে হয়েছে সরকারকে। এমন পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুতে আগ্রহ বাড়ছে সরকারের। এর ধারাবাহিকতায় গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। গতকালও অনুমোদন পেয়েছে নতুন তিনটি সৌরভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এসব কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনতে ইউনিটপ্রতি খরচ পড়বে ১০ টাকার বেশি। যদিও প্রতিবেশী দেশ ভারতে সৌরবিদ্যুতে ইউনিটপ্রতি ব্যয় এর প্রায় অর্ধেক। জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে এগুলো থেকে বিদ্যুৎ কেনার ব্যয় প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। সৌরবিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে জীবাশ্ম জ্বালানির মডেলটিকেও অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা, সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুষ্ঠিত সভায় গতকাল নতুন করে তিনটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ট্যারিফ অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ২০ বছর মেয়াদে কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ কেনায় সরকারের ব্যয় হবে ১৩ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে দিনাজপুর জেলার বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি এলাকায় ২০০ মেগাওয়াট (এসি) ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ২০ বছর মেয়াদে আনুমানিক ৭ হাজার ১৬৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় হবে। বান্দরবান জেলার লামা উপজেলায় ৭০ মেগাওয়াট (এসি) ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ২০ বছর মেয়াদে আনুমানিক ২ হাজার ৪৮৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয় হবে। ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলায় ১০০ মেগাওয়াট (এসি) ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ২০ বছর মেয়াদে আনুমানিক ৩ হাজার ৫৮০ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় হবে। তবে এ তিন কেন্দ্র থেকে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুৎ কিনতে কত টাকা ব্যয় হবে সে তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

এর আগে গত মাসে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় দুটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ট্যারিফ অনুমোদন করা হয়েছিল। এর মধ্যে বাগেরহাটের রামপালে ৩০০ মেগাওয়াট (এসি) ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সৌদি আরবের এসিডব্লিউএ পাওয়ার কোম্পানি, বাংলাদেশের কমফিট কম্পোজিট নিট লিমিটেড, ভিয়েলাটেক্স স্পিনিং লিমিটেড ও মিডল্যান্ড ইস্ট পাওয়ার লিমিটেডের জয়েন্ট ভেঞ্চারকে অনুমোদন দেয়া হয়। নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্টের ভিত্তিতে ২০ বছর মেয়াদে ১২ শতাংশ ডিসকাউন্ট ফ্যাক্টর, ৬ শতাংশ উৎসে কর ও ১৮ দশমিক ৫০ শতাংশ প্লান্ট ফ্যাক্টরে ট্যারিফ ভিত্তিতে বিদ্যুৎ কেনা হলে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা ১১ টাকা ৭ পয়সা হিসাবে আনুমানিক ১০ হাজার ৭৬১ কোটি ৬০ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হবে।

ওই সময় নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলায় ৫০ মেগাওয়াট (এসি) ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে এএসকে নিউ এনার্জি কো. লিমিটেড, এ জে পাওয়ার কো. লিমিটেড ও এটিএন সলিউশনস লিমিটেডের কনসোর্টিয়ামের ট্যারিফ অনুমোদন দেয়া হয়। এক্ষেত্রে ২০ বছর মেয়াদে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা ১০ টাকা ৭ পয়সা হিসাবে আনুমানিক ১ হাজার ৭৩২ কোটি ৮০ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হবে সরকারকে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্যানুসারে, ২০২১-২২ অর্থবছরেও সৌর শক্তিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনায় কিলোওয়াটপ্রতি ব্যয় হয়েছে ১০ টাকার বেশি। এর মধ্যে এনগ্রিন সোলারের কাছ থেকে প্রতি কিলোওয়াট ১৬ টাকা ৪২ পয়সা, সিম্পা সোলার পাওয়ার লিমিটেডের কাছ থেকে ১১ টাকা ২৬ পয়সা, স্পেকট্রা সোলার পার্ক থেকে ১১ টাকা ৯৬ পয়সা, কেইপিজেড ৯ দশমিক ৮ মেগাওয়াট সোলার থেকে ১২ টাকা ৯৩ পয়সা ও এনারগন রিনিউয়েবলস (বিডি) লিমিটেডের কাছ থেকে ১২ টাকা ১১ পয়সায় বিদ্যুৎ কিনেছে বিপিডিবি।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে সৌরবিদ্যুতের প্রতি কিলোওয়াট উৎপাদন গড় খরচ ছিল ১৩ টাকা থেকে ১৭ টাকার মধ্যে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ১৩ টাকায় নেমে এসেছে। দেশে বৃহৎ কয়েকটি সৌরবিদ্যুতের প্রকল্প গ্রিডে যুক্ত হওয়ায় উৎপাদন খরচ কমে আসছে। আগামী বছর এ খরচ ইউনিটপ্রতি ৯-১০ টাকায় নেমে আসবে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যে, ভারতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে। ফলে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কম পড়ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে বিশেষ আইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে। যেখানে বিশেষ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়ে একটি নির্ধারিত ট্যারিফের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের বিশ্লেষক শফিকুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের ট্যারিফ এখনো বেশি। এর কারণ হলো এখানে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে না। ফলে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়ে বিদ্যুতের ট্যারিফ ঠিক করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষরের পর দীর্ঘসময় লেগে যাওয়ায় এক ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ঝুঁকি অনুভব করে। এ ঝুঁকিও উচ্চ ট্যারিফের কারণ। তৃতীয়ত, সৌরবিদ্যুতের বেশির ভাগ যন্ত্রাংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায়ও ট্যারিফের ওপর প্রভাব পড়ে। খরচ কমাতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে অনুমোদনগত জটিলতা কমিয়ে আনতে হবে, জমি অধিগ্রহণ ও প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে।’

রূপপুরের পথে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউরেনিয়ামের প্রথম চালান

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুরে নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের ‘ফ্রেশ নিউক্লিয়ার ফুয়েল’ বা ইউরেনিয়ামের প্রথম চালান ঢাকা থেকে প্রকল্প এলাকায় নেওয়া হচ্ছে। আজ শুক্রবার সকাল সাতটার দিকে ইউরেনিয়াম বহনকারী গাড়িগুলো গাজীপুর ছেড়ে যায়।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিশেষ নিরাপত্তা বলয়ে ঢাকা থেকে সড়ক পথে এই ইউরেনিয়ামের চালান ভোরে রওনা হয়। ভোর সাড়ে পাঁচটায় গাড়িবহরটি গাজীপুর মহানগরীতে প্রবেশ করে। এরপর ইউরেনিয়াম বহনকারী গাড়িগুলো ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের সফিপুর এলাকায় পৌঁছালে একটি গাড়িতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। পরে মেরামত শেষে সকাল সাতটার দিকে গাড়িগুলো ছেড়ে যায়। এ সময় মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল।

শীতকালে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার ৭০ শতাংশ নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে

০২ অক্টোবর ২০২৩, দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড অনলাইন বাংলা

আগামী শীতে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে। কারণ বেসরকারি খাত থেকে জাতীয় গ্রিডে আরও বিদ্যুৎ যুক্ত হচ্ছে, যা সরকারের ক্যাপাসিটি পেমেন্টর বাধ্যবাধকতা বাড়িয়ে তুলবে। ফলে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ৭০ শতাংশই থাকতে পারে উদ্বৃত্ত বা নিষ্ক্রিয়।

এটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন এরই মধ্যে বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছে সরকারের বকেয়া বিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার।

বিদ্যুৎ বিভাগের সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে, চলতি বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অফ-গ্রিড নবায়নযোগ্য এবং ক্যাপটিভ পাওয়ারসহ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ২৭ হাজার ৮৩৪ মেগাওয়াট, যেখানে একদিনে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৬৪৮ মেগাওয়াট উৎপন্ন হয়।

বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (বিপিডিবি)-এর তথ্যানুযায়ী দেশে গত ২৬ সেপ্টেম্বর ১৪ হাজার ২১ মেগাওয়াট উৎপাদন করায় ১১৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং দিয়ে অতিরিক্ত চাহিদা মেটানো হয়েছে।

এর মানে অর্ধেক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার করা হয়েছে, অন্যদিকে লোডশেডিংও অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিদ্যুৎ শিল্পে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আগামী শীতে উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে এবং আগামী কয়েক মাসে বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে জাতীয় গ্রিডে আরও বেশি বিদ্যুৎ আসবে এবং স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা ৩০ হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করতে পারে; ফলে উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। সাধারণত শীত মৌসুমে প্রায় ৭০ শতাংশের মতো চাহিদা কমে যায়।

এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এস আলম গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট (যার মধ্যে ৬২০ মেগাওয়াটের প্রথম ইউনিট ইতোমধ্যে গ্রিডে এসেছে), মেঘনাঘাটের রিলায়েন্স পাওয়ার এলএনজি ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৭১৮ মেগাওয়াট, এলএনজিভিত্তিক জিই-সামিট মেঘনাঘাট-২ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৫৯০ মেগাওয়াট এবং মেঘনাঘাটে এলএনজিভিত্তিক ইউনিক গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৫৮৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।

এই প্ল্যান্টগুলোর স্পনসররা সরকারকে রাজি করানোর জন্য কঠোর পরিশ্রম করছে। যাতে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের প্ল্যান্ট চালু করার অনুমতি পায়। কারণ, তাদের সবগুলোই উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত হলেও গ্যাস সংকটের কারণে সেগুলো চালু করতে দেওয়া হচ্ছে না।

আদানি গ্রুপেরই ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট কয়লা-চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিট এবং রামপাল পাওয়ার প্ল্যান্টের দ্বিতীয় ইউনিট থেকে ৬২০ মেগাওয়াটসহ সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আরও বিদ্যুৎ ইতোমধ্যেই গ্রিডে এসেছে।

গত শীতে চাহিদা কমে যাওয়ায় বিদ্যুতের উৎপাদন ১০ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে এসেছিল।

বিপিডিবি রেকর্ড অনুযায়ী, ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বরে উৎপাদন ৯ হাজার ১৩৪ মেগাওয়াট রেকর্ড করা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চাহিদা দ্রুত গতিতে না বাড়ায় আগামী শীতে উৎপাদন ১০ হাজার মেগাওয়াটের নিচে থাকবে।

বিপিডিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যদিও ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিষ্ক্রিয় থাকবে, তবুও সরকারের সঙ্গে তাদের চুক্তি অনুযায়ী বিনিয়োগকারীরা ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে তাদের পেমেন্ট পাবেন।

ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা টানতে হবে অনেক বছর

০৩ অক্টোবর ২৩, সমকাল

পরিকল্পনা অনুসারে চাহিদা না বাড়লেও দেশে বাড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা। এখনই উৎপাদন সক্ষমতার ৫০-৬০ শতাংশ বসে থাকে। আগামী দিনগুলোতে অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিমাণ আরও বাড়বে। তবে উৎপাদনে না থাকলেও চুক্তি অনুসারে ক্যাপাসিটি বা রেন্টাল চার্জ নামে পরিচিত ভাড়া পায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। গত সাড়ে ১৪ বছরে বেসরকারি কেন্দ্রমালিকরা এই খাতে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা পেয়েছে সরকারের কাছ থেকে। পাইপলাইনে রয়েছে আরও ৫৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্র। যেগুলো চালু হলে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা টানতে হবে ২০৫০ সাল পর্যন্ত।

খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সঙ্গে চুক্তিতে ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকার নিজের স্বার্থ রক্ষা করেনি। স্বল্প মেয়াদের কথা বলে বেশি চার্জ ধরে কেন্দ্র অনুমোদন করে বছর বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি বেশি বেশি চাহিদা ধরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ও ব্যয়বহুল কেন্দ্র অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা মূলত ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করেছে। জনগণের ওপর চাপিয়েছে বিলের বাড়তি বোঝা। সরকারের এই ভুল পরিকল্পনার মাশুল দিতে এখন চাপে অর্থনীতি।

আদানির কাছ থেকে এখন সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ নিচ্ছে বিপিডিবি

অক্টোবর ০৯, ২০২৩, বণিক বার্তা

দেশে বিদ্যুৎ চাহিদা এখন দৈনিক ১৪ থেকে সাড়ে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। এর বড় একটি অংশ আসছে ভারতের আদানি পাওয়ার লিমিটেডের কাছ থেকে। ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রটি থেকে দৈনিক বিদ্যুৎ আসছে ১২০০-১৪০০ মেগাওয়াট। যদিও চুক্তি অনুযায়ী আদানি থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নিতে পারবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। সে হিসেবে একক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আদানির কাছ থেকেই এখন বিপিডিবি সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ কিনছে।

দেশের বিদ্যুৎ চাহিদায় আদানি পাওয়ার বড় ভূমিকা রাখলেও এরই মধ্যে বিদ্যুতের বিল বাবদ বকেয়া ৪০০ মিলিয়ন (৪০ কোটি) ডলার ছাড়িয়েছে। যদিও বিপিডিবি বলছে, প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করা হচ্ছে। চলতি অক্টোবর পর্যন্ত ৭৫ মিলিয়ন (সাড়ে ৭ কোটি) ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। এ সপ্তাহে আরো বিল পরিশোধ করা হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র।

৪ বছরে জেরার পকেটে ২০৩৪ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ

২২ অক্টোবর ২০২৩, শেয়ার বিজ

২০১৯ সালে সামিট গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালের হাত ধরে বাংলাদেশে বিদ্যুতের ব্যবসা শুরু করে জাপানের প্রতিষ্ঠান জেরা। দুই হাজার ৭৭৩ কোটি টাকা বিনিময়ে জেরা সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালের ২২ শতাংশ শেয়ার কেনে। এরপর আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কিনে নেয় কোম্পানি। বর্তমানে জেরার বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা দাঁড়ায় ৭৮৩ মেগাওয়াট।

ব্যবসা শুরুর পর থেকে গত চার অর্থবছরে (২০১৯-২০ থেকে ২০২২-২৩) বিদেশি এ প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ থেকে দুই হাজার ৩৪ কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে গেছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নিয়েছে এক হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা (প্রায় ২১ কোটি ডলার)। আর এলএনজি টার্মিনাল থেকে ৬৮৬ কোটি টাকা নিয়েছে। বাংলাদেশ বৈদেশিক দেনা-বিষয়ক কর্মজোট বিডব্লিউজিইডির এক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।

বিডব্লিউজিইডি বলেছে, বৈদেশিক মুদ্রার চরম সংকটের সময় এই বিপুল পরিমাণ ডলার দেশের বাইরে চলে যাওয়ায় তা অর্থনীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে জেরা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩৩৫ কোটি এবং এলএনজি টার্মিনাল থেকে ১৪৭ কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ পায়। ওই অর্থবছর দুই খাত থেকে নিয়ে যায় ৪৮২ কোটি টাকা। পরের (২০২০-২১) অর্থবছর বিদুৎকেন্দ্র থেকে ৩৩৮ কোটি এবং এলএনজি টার্মিনাল থেকে ১৬৬ কোটি টাকার ক্যাপাজিটি চার্জ নেয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে মোট ক্যাপাসিটি চার্জ নেয় ৫০৪ কোটি টাকার। এছাড়া ২০২১-২২ অর্থবছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ হয় ৩২১ কোটি এবং এলএনজি টার্মিনাল থেকে ১৮১ কোটি টাকা। ওই অর্থবছরে সর্বমোট ক্যাপাসিটি চার্জ নেয় ৫০২ কোটি টাকা। আর গত অর্থবছর প্রতিষ্ঠানটি ৩৫৪ কোটি টাকা বিদুৎকেন্দ্র এবং ১৯২ কোটি টাকা এলএনজি টার্মিনাল থেকে ক্যাপাজিটি চার্জ নিয়ে যায়। ফলে ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট ক্যাপাসিটি চার্জ হয় ৫৪৭ কোটি টাকার। অর্থাৎ গত চার বছরে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও এলএনজি টার্মিনাল থেকে দুই হাজার ৩৪ কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্যাস সরবরাহ করা হোক বা না হোক এলএনজি টার্মিনাল বাবদ প্রতিদিন দুই লাখ ১৭ হাজার ডলার ( বছরে ৮৭১ কোটি লাখ টাকা) ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়। মালিকানার হার অনুসারে জেরা গত চার অর্থবছরে (২০১৯-২৩) ৬৮৬ কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ গ্রহণ করেছে।

এরই মধ্যে সামিট পাওয়ার ও জেরা যৌথভাবে মহেশখালীতে আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করার জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছে। গত জুনে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির পক্ষ থেকে প্রস্তাবের নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। প্রতিদিন ৬০ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করার ক্ষমতাসম্পন্ন এ টার্মিনাল তৈরিতে প্রায় ৫০ কোটি ডলার খরচ হবে। ২০২৬ সালে চালু হতে যাওয়া এ টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ করা হোক বা না হোক ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ প্রতি মাসে ৭৮ লাখ ডলার বা এক বছরে ৯ কোটি ৩৭ লাখ ডলার দিতে হবে। সংস্থাটির মতে, ওই এলএনজি টার্মিনাল বাংলাদেশকে আরও পরনির্ভর করে তুলবে এবং তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দেবে।

আড়াই টাকার বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ছাড়িয়েছে ১০টাকা!

২২ অক্টোবর ২০২৩, শেয়ার বিজ

দেশে গত ১৫ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা কয়েকগুণ বেড়েছে। যদিও এর প্রায় অর্ধেক নিয়মিতই বসে থাকে। শীতকালে এ বসে থাকার হার বাড়ে। তবে অপরিকল্পিতভাবে সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয়ে। ১৫ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় ব্যয় আড়াই টাকা থেকে বেড়ে ১০ টাকা ছাড়িয়েছে। এতে বাধ্য হয়ে সরকার ভর্তুকি বৃদ্ধি করেছে বিদ্যুৎ খাতে। তবে তাতেও কাজ হয়নি, প্রতি বছর বাড়ছে লোকসান।

এর পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন সময় বিদ্যুতের বাল্ক (পাইকারি) ও গ্রাহক পর্যায়ের দাম বাড়ানো হয়েছে। কয়েক দফা দাম বৃদ্ধির পরও গত অর্থবছর রেকর্ড লোকসান করেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং বিতরণকারী এক সংস্থা ও চার কোম্পানি। এতে আগামী নির্বাচনের পর আবারও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে। তবে এবার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ধরনে কিছুটা পরিবর্তন আনতে চাচ্ছে পিডিবি।

সূত্র জানায়, পিডিবি চাচ্ছে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম তুলনামূলক কম রাখা হবে। এ ধরনের গ্রাহকদের ভর্তুকি দেয়া হবে। তবে ২০০ ইউনিটের বেশি বিলে কোনো ধরনের ভর্তুকি দেয়া হবে না। সেক্ষেত্রে বর্ধিত হারে তথা গড় উৎপাদন ব্যয়ের সমহারে বিল আদায় করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও গত ১৯ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে এ ধরনের ইঙ্গিত দেন।

পিডিবির গত ১৫ বছরের হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৮-০৯ অর্থবছর বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় ছিল দুই টাকা ৫৩ পয়সা। পরের অর্থবছর তা সামান্য বেড়ে হয় দুই টাকা ৫৮ পয়সা। ২০১০-১১ অর্থবছর উৎপাদন সক্ষমতা অনেকটাই বাড়ে। ওই বছর বেশ কয়েকটি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন শুরু করে। এর প্রভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন গড় ব্যয় বেড়ে হয় তিন টাকা ৯৫ টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছর তা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ টাকা ৩৬ পয়সা ও ২০১২-১৩ অর্থবছর পাঁচ টাকা ৭৭ পয়সা।

২০১৩-১৪ অর্থবছর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়ে। ওই অর্থবছর গড় ব্যয় দাঁড়ায় ছয় টাকা ২৮ পয়সা। পরের অর্থবছর তা এক পয়সা কমে দাঁড়ায় ছয় টাকা ২৭ পয়সা। ২০১৫-১৬ অর্থবছর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম নি¤œমুখী হওয়ার প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ে। ওই অর্থবছর গড় ব্যয় কমে দাঁড়ায় পাঁচ টাকা ৫৫ পয়সা। ২০১৬-১৭ অর্থবছর তা সামান্য বেড়ে হয় পাঁচ টাকা ৬৯ পয়সা। ২০১৭-১৮ অর্থবছর বিদ্যুৎ উৎপাদন গড় ব্যয় আবারও ছয় টাকা ছাড়ায়। ওই অর্থবছর গড় উৎপাদন ব্যয় দাঁড়ায় ছয় টাকা ৩৩ পয়সা।

পরের দুই বছর বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় ব্যয় হ্রাস পায়। এর মধ্যে ২০১৮-১৯ অর্থবছর গড় উৎপাদন ব্যয় দাঁড়ায় ছয় টাকা এক পয়সা ও ২০১৯-২০ অর্থবছর পাঁচ টাকা ৯১ পয়সা। ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন আবারও বাড়তে শুরু করে। ওই অর্থবছর তা বেড়ে হয় ছয় টাকা ৬১ পয়সা। ২০২১-২২ অর্থবছর তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় আট টাকা ৮৪ পয়সা। আর সর্বশেষ গত অর্থবছর বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় (সাময়িক হিসাবে) ১০ টাকা ১৭ পয়সা।

 এদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়তে থাকায় সরকারের ভর্তুকি এ খাতে বাড়াতে হয়। তবে তা দিয়ে বাড়তি ব্যয়ের চাপ মেটানো যায়নি। এজন্য বিভিন্ন সময় ধাপে ধাপে পাইকারি ও গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। যদিও পাইকারি মূল্যহার একবার সামান্য কমানো হয়েছিল। তবে গ্রাহক পর্যায়ে কখনোই কমেনি বিদ্যুতের দাম।

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১১ সালের শুরুতে বাল্ক বিদ্যুতের দাম ছিল দুই টাকা ৩৭ পয়সা। বর্তমানে তা ছয় টাকা ৭০ পয়সা। আর ২০১০ সালের শুরুতে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ছিল তিন টাকা ৯২ পয়সা। বর্তমানে তা আট টাকা ২৫ পয়সা। অর্থাৎ বাল্ক মূল্যহার বাড়ানো হয়েছে প্রায় ১৮২ দশমিক ৭০ শতাংশ ও গ্রাহক পর্যায়ে বাড়ানো হয়েছে ১২১ দশমিক ১৮ শতাংশ। যদিও বিদ্যুতের দাম আরও বাড়বে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

সূত্রমতে, গত ফেব্রুয়ারিতে বাল্ক মূল্যহার ছয় টাকা ৭০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। তবে বর্তমানে গড় উৎপাদন ব্যয় ১০ টাকার বেশি। এতে বাল্ক মূল্যহার কমপক্ষে ৫২ শতাংশ বাড়ানো হলে তা উৎপাদন ব্যয়ের সমান হবে। তবে বাল্ক মূল্যহার বৃদ্ধি করলে গ্রাহক পর্যায়েও বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে। গত অর্থবছর গ্রাহক পর্যায়ে তিন ধাপে ১৫ দশমিক ৭১ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। যদিও বাল্ক মূল্যহার দুই ধাপে ২৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল।

গণতন্ত্র মতপ্রকাশের অধিকার

মহাসমাবেশের আগেই বিএনপির ৪৮২ নেতাকর্মী কারাগারে

২৭ জুলাই ২৩, সমকাল

মহাসমাবেশের আগেই গ্রেপ্তার হওয়া বিএনপির ৪৮২ নেতা-কর্মীকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। তাদের জামিন আবেদন নাকচ করে বৃস্পতিবার ঢাকা মেট্রপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এছাড়া চারজনকে একদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, এদিন ঢাকার মহানগর এলাকার ৪১ থানায় পুরনো বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ৩৭৭ জন এবং চারটি থানা থেকে সন্দেহজনক হিসেবে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ও ১৫৪ ধারায় ৯৬ জনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করে পুলিশ।

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে রাতে তল্লাশি জোরদার

২৭ জুলাই ২০২৩, প্রথম আলো

সাভারের আমিনবাজারের ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের সামনের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ঢাকাগামী লেনে বিভিন্ন যাত্রীবাহী বাসের সন্দেহভাজন যাত্রীদের তল্লাশি করছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে তোলাছবি: প্রথম আলো

ঢাকায় বিএনপির মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে সাভারের আমিনবাজারে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে রাতে ঢাকাগামী লেনে তল্লাশি জোরদার করেছে পুলিশ। সকাল থেকে স্থানটিতে কয়েকবার যাত্রীবাহী পরিবহনে তল্লাশি চালালেও রাত ৯টা থেকে এ তল্লাশি জোরদার করা হয়।

আজ বৃহস্পতিবার রাত আটটার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, সাভারের আমিনবাজার ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের সামনে পুলিশের একটি দল জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘণ্টাখানেক পর রাত ৯টায় পুলিশ সদস্যরা মহাসড়কের ঢাকাগামী লেনে যান। পুলিশ সদস্যরা ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক হয়ে ঢাকার উদ্দেশে আসা যাত্রীবাহী পরিবহন থামিয়ে যাত্রীদের তল্লাশি করেন। তাঁরা সন্দেহভাজন যাত্রীদের ব্যাগ তল্লাশিসহ যাত্রীদের ঢাকায় আসার কারণ ও পরিচয় জানতে চান। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে যাত্রীদের যেতে দেওয়া হয়।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস ও ট্রাফিক উত্তর বিভাগ) আবদুল্লাহিল কাফী প্রথম আলোকে বলেন, নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আমিনবাজারে এই এলাকায় সব সময় তল্লাশি চালানো হয়। আগামীকাল শুক্রবার ঢাকায় দুটি দলের কর্মসূচি থাকায় কেউ যাতে কোনো ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটাতে না পারে, সে জন্য আশুলিয়া ও আমিনবাজারের এই এলাকায় তল্লাশিতে জোর দেওয়া হচ্ছে।

জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি

২৮ জুলাই ২০২৩, মানবজমিন

বাংলাদেশকে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ থেকে বহিষ্কার এবং শান্তিরক্ষা মিশনে র‌্যাবসহ মানবাধিকার হরণকারীদের নিষিদ্ধ করতে জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত লিন্ডা টমাস গ্রিনফিল্ডকে চিঠি দিয়েছেন ১৪ কংগ্রেসম্যান। তারা বলেছেন, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকারের সন্ত্রাস, নির্যাতন ও বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যার বিষয়ে আমাদের উদ্বেগ প্রকাশ করার জন্য আপনাকে চিঠি লিখছি। একই চিঠিতে তারা বাংলাদেশে জাতিসংঘের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য ব্যবস্থা নিতে আহবান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের কোন অংশ জাতিসংঘে কোন প্রস্তাব তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করলে তা  জাতিসংঘে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত এর মাধ্যমেই করা হয়ে থাকে। কূটনীতিকরা কংগ্রেসম্যানদের এ ধরনের চিঠি জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপনের প্রক্রিয়া বলে অভিহিত করেছেন। 

ঢাকায় ঢুকতে তল্লাশি, বাসা–হোটেলে অভিযান, গ্রেপ্তার ৪৪৭

২৮ জুলাই ২০২৩, প্রথম আলো

ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে বসানো হয়েছে তল্লাশিচৌকি। ঢাকামুখী সব বাস, মাইক্রোবাস ও প্রাইভেট কার আটকে যাত্রীদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। পাশাপাশি ঢাকায় বিএনপির নেতাদের বাসাবাড়ি এবং হোটেলে হোটেলে তল্লাশি চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। ঢাকার নয়াপল্টনে বিএনপির আজকের মহাসমাবেশ সামনে রেখে গত মঙ্গলবার রাত থেকে পুলিশের এসব তৎপরতা চলছে।

পুলিশের এই অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে অন্তত ৪৪৭ জনকে গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার আদালতে হাজির করা হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার রাতে রাজধানীতে গ্রেপ্তার করা হয় বিএনপির ৭৫ নেতা-কর্মীকে।

সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে বিএনপির এই মহাসমাবেশ সামনে রেখে গ্রেপ্তার অভিযান চলছে দেশের অন্যান্য জায়গাতেও। বিভিন্ন জেলায় বিএনপির নেতা-কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুলিশের তল্লাশির খবর পাওয়া গেছে। ঢাকার আশপাশের তিন জেলা থেকে বুধবার রাতে ১১ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে স্বজনেরা অভিযোগ করেছেন। তার আগের রাতে এই তিন জেলায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা ছিল ১০।

বিএনপির নেতাদের অভিযোগ, মহাসমাবেশে জনসমাগম ঠেকাতে নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করে আতঙ্ক তৈরি করছে পুলিশ। বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক কায়সার কামাল গতকাল ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের কাছে একটি চিঠি দিয়ে হয়রানিমূলক গ্রেপ্তার বন্ধের অনুরোধ জানান। তবে গতকাল বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, আশুরা উপলক্ষে এটা পুলিশের নিয়মিত অভিযান। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

সাভারে যাত্রীদের মুঠোফোন ঘেঁটে সন্দেহজনক তথ্য খুঁজছে পুলিশ

২৮ জুলাই ২০২৩, প্রথম আলো

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বসেছে পুলিশের তল্লাশিচৌকি। ঢাকামুখী বাস, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন পরিবহনে তল্লাশি চালাচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি মুঠোফোন ঘেঁটে সন্দেহজনক তথ্য খুঁজছেন তাঁরা। সদুত্তর না পেলে আটকে রাখা হচ্ছে। পরে আবার অনেককে ছেড়েও দেওয়া হচ্ছে।

ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস ও ট্রাফিক উত্তর বিভাগ) আবদুল্লাহিল কাফী প্রথম আলোকে বলেন, আজ শুক্রবার ঢাকায় দুটি দলের কর্মসূচি আছে। কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধে তল্লাশি জোরালো করা হয়েছে। বিভিন্ন যাত্রীপরিবহনে তল্লাশি চালিয়ে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সন্তোষজনক উত্তর পেলে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে এখনো কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়নি।

আজ ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নবীনগর, সাভার, হেমায়তেপুর, আমিনবাজার এলাকায় তল্লাশি চালাচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এ ছাড়া সাভারের বিরুলিয়া, আশুলিয়ার ধউর, জিরানী, জিরাবো ও বাইপাইলেও তল্লাশি করা হচ্ছে।

ঢাকায় ঢোকার পথগুলোতে পুলিশের তল্লাশি-জেরা, হয়রানি-ভোগান্তি

২৮ জুলাই ২০২৩, প্রথম আলো

ঢাকায় বিএনপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে তল্লাশিচৌকি বসিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার রাত থেকে তল্লাশি শুরু করে পুলিশ। গাড়িতে ঢুকে কিংবা গাড়ি থেকে নামিয়ে নানা বিষয়ে জেরা করা হয় যাত্রীদের। অনেকের মুঠোফোন ঘেঁটে সমাবেশে যাচ্ছেন, এমন প্রমাণ খোঁজার চেষ্টা করেন পুলিশ সদস্যরা। পুলিশের এমন তৎপরতাকে অনেক যাত্রী হয়রানি বলছেন। আবার কোথাও কোথাও গাড়ি চলাচল কম থাকায় দৈনন্দিন কাজে বের হয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা।

ঢাকার আবদুল্লাহপুর, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে গাজীপুরের চন্দ্রা ত্রিমোড় ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তা, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড ও রূপগঞ্জ, ঢাকার অদূরে সাভার, মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর ও কেরানীগঞ্জের খেয়াঘাট এলাকা থেকে পাওয়া তথ্যে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: সমাবেশে না গেলে ‘হলে থাকতে না দেওয়া’র হুমকি

২৮ জুলাই ২০২৩, প্রথম আলো

যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের ডাকা শান্তি সমাবেশে যোগ দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকা শিক্ষার্থীদের বাধ্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগের হল পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, ছাত্রলীগ নেতারা তাঁদের বলেছেন, সমাবেশে না গেলে হলে থাকতে দেওয়া হবে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলভিত্তিক ফেসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপে শান্তি সমাবেশে বাধ্যতামূলকভাবে উপস্থিত থাকার ‘নির্দেশ দিয়েছেন’ হল শাখা ছাত্রলীগের নেতারা। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত থেকেই এই নির্দেশ দেওয়া শুরু হয়। এমন কয়েকটি ‘নির্দেশমূলক’ বার্তার স্ক্রিনশট গত রাতেই ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।

মোবাইলের কল লিস্ট, খুদে বার্তাও তল্লাশি করছে পুলিশ

২৮ জুলাই, ২০২৩, দেশ রুপান্তর

শুক্রবার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে চলাচলকারী বিভিন্ন যানবাহনে তল্লাশি করছে পুলিশ। রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির ডাকা মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে এ তল্লাশি চালানো হয় বলে যাত্রীরা জানান। তাদের অভিযোগ, গত দু’দিন ধরেই এ তল্লাশি চলছে।

একই সঙ্গে গাজীপুরের প্রবেশ পথ শ্রীপুর উপজেলার জৈনাবাজার ও মাওনা চৌরাস্তায় বিভিন্ন যানবাহনে তল্লাশি চালায় পুলিশ। যাত্রীদের দাবি, পুলিশ বিএনপি নেতাকর্মীদের তল্লাশির নামে সাধারণ যাত্রীদের হেনস্তা করছে। তাদের অভিযোগ, অহেতুক যাত্রীদের সময় নষ্ট করছে বাস থামিয়ে থামিয়ে। এতে দুর্ভোগে পড়ছে সাধারণ যাত্রীরা।

তবে পুলিশ বলছে, নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে মহাসড়কে তল্লাশি কার্যক্রম চলছে। নানা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এ তল্লাশি।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বেশ কয়েকটি স্থানে ঘুরে দেখা গেছে পুলিশের এ তল্লাশির দৃশ্য। সেখানে দেখা যায়, কুড়িগ্রাম, রৌমারী, রাজীবপুর, ইসলামপুর, মেলান্দহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুরসহ অন্যান্য এলাকা থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী যানবাহনের প্রবেশপথ জৈনাবাজারে একজন সাব-ইনসপেক্টরের নেতৃত্ব বেশ কিছু পুলিশ সদস্য সড়কে অবস্থান করছেন। এ সময় বিভিন্ন বাস থামিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। পুলিশ ব্যক্তিগত গাড়ি ও দূরপাল্লার বাস থামিয়ে তল্লাশি করছে।

মাওনা চৌরাস্তা ফ্লাইওভারের কাছেও ডিবি পুলিশর একটি দল তল্লাশির কাজ করছে বলে দেখা গেছে। সেখানেও বাস, মিনিবাস, ব্যক্তিগত গাড়িসহ বিভিন্ন যানবাহন থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে দেখা গেছে তাদের।

মাওনা ফ্লাইওভারে আশপাশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক দলকে কাজ করতে দেখা গেছে। তারা সবাই কোনো না কোনো যানবাহন দাঁড় করিয়ে তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ করছে। সাধারণ যাত্রীরা বলেন, অহেতুক হয়রানি করে আমাদের সময় নষ্ট করছে, ভোগান্তি বাড়াচ্ছে পুলিশ।

রাজধানীর প্রবেশমুখগুলোয় কাল অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা বিএনপির

২৮ জুলাই ২০২৩, প্রথম আলো

মহাসমাবেশের পর এবার কাল শনিবার রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশমুখগুলোয় অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। কাল শনিবার বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এই অবস্থান কর্মসূচি পালন করবে তারা।

রাজধানীর নয়াপল্টনে আজ শুক্রবার বিএনপির মহাসমাবেশ থেকে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নতুন এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন। বর্তমান সরকার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে এ মহাসমাবেশ করে বিএনপি।

একই কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গী গণতন্ত্র মঞ্চ ও বিএনপির সমমনা ১২–দলীয় জোট।

এদিকে আজ মহাসমাবেশ শুরুর ৪ ঘণ্টা আগে সকাল ১০টার দিকেই বিএনপির নেতা-কর্মীতে ভরে যায় সমাবেশস্থল। বেলা দেড়টার দিকে পল্টন এলাকায় বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। এ সময় মহাসমাবেশে যোগ দিতে যাওয়া বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী সড়ক ছেড়ে দোকানপাটের সামনে অবস্থান নিতে থাকেন। বেলা দুইটার কিছু আগে বৃষ্টি থেমে যায়। পরে নেতা-কর্মীরা আবার সড়কে অবস্থান নেন।

ঢাকায় তিন দিনে গ্রেপ্তার ১২৪১

২৯ জুলাই ২০২৩, প্রথম আলো

বিএনপির মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে গত বৃহস্পতিবার রাতেও ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাত থেকে গতকাল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত সাত শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ নিয়ে গত তিন দিনে রাজধানীতে মোট ১ হাজার ২৪১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিএনপির অভিযোগ, তাদের কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করতে দলের নেতা-কর্মীদের পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।

এ ছাড়া বিএনপির কর্মসূচি ঘিরে গতকালও ঢাকার বিভিন্ন প্রবেশমুখে পুলিশের তল্লাশিচৌকি ছিল। সেখানে পুলিশ যাত্রীবাহী বাস, মাইক্রোবাস ও কারে তল্লাশি করে। এ সময় যাত্রীদের মুঠোফোন ঘেঁটে বিএনপির মহাসমাবেশে যাচ্ছেন কি না, তা নিয়ে জেরা করা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। কেরানীগঞ্জে বুড়িগঙ্গা নদীর খেয়াঘাটগুলোতে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা অবস্থান নিয়ে নৌকা চলাচল বন্ধ করে দেন বলেও জানা গেছে।

বিএনপির আজ শুক্রবারের মহাসমাবেশ ঘিরে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার আদালতে নেওয়া হয়

আদালত–সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, আগের রাতে বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তার সাত শতাধিক ব্যক্তিকে গতকাল ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করা হয়। তাঁদের অধিকাংশই বিএনপির নেতা-কর্মী বলে জানা গেছে।

বিএনপির অভিযোগ, তাদের মহাসমাবেশ কেন্দ্র করে গত মঙ্গলবার রাত থেকে পুলিশ রাজধানী ও আশপাশের জেলায় অভিযান শুরু করে। এ পর্যন্ত তাদের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীকে আটক করে পুরোনো মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়। অনেককে সন্দেহমূলক বা ভবঘুরে দেখিয়েও গ্রেপ্তার করা হয়।

অপর দিকে পুলিশের দাবি, এটা পুলিশের নিয়মিত অভিযান। তারা মামলা ও পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তার করছে।

কোমর থেকে নিচ পর্যন্ত বেধড়ক পিটিয়েছে: গয়েশ্বর

২৯ জুলাই ২৩, সমকাল

অবস্থান কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় আহত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে তার অফিসে পৌঁছে দিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। শনিবার দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে তাকে নয়াপল্টনের অফিসে পৌঁছে দেওয়া হয়।

গয়েশ্বর বলেন, সংঘর্ষের সময় আমার মাথা ফেটে রক্তাক্ত হয়। পরে কোমর থেকে নিচ পর্যন্ত বেধড়ক পিটিয়েছে। সেখান থেকে পুলিশ ধরে নিয়ে রাজারবাগের পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়। পরে গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়েও নেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে অফিসে দিয়ে গেল।

তিনি বলেন, ডিবি কার্যালয়ে আমাকে খাওয়ানো হয়। সেই সময় ছবি তুলে রাখা হয়। সরকার এটাকে কৌশল হিসেবে যে কোনো সময়ে ছেড়ে দেবে। ওই সময়ের ছবি তোলা, খাওয়ার ঘটনা নিয়ে একটা রাজনীতি করার চেষ্টা হবে।

পুরোনো ছবি-ভিডিও যেভাবে অপতথ্য ছড়াচ্ছে রাজনীতির মাঠে

৩০ জুলাই ২০২৩, প্রথম আলো

‘বাসে আগুনের চেষ্টা, ছাত্রলীগের ৩ নেতা-কর্মী আটক’ শিরোনামে প্রথম আলো পত্রিকায় ২০১৪ সালে প্রকাশিত সংবাদকে বিএনপির সাম্প্রতিক কর্মসূচির খবর বলে প্রচার করা হচ্ছে। মূলত ২০১৪ সালে মাগুরায় একটি বাসে আগুন দিতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তাঁরা। অন্য দুটি ছবিও আগের হলেও তা সাম্প্রতিক বলে প্রচার করা হয়েছে।

বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ বা বিক্ষোভ, কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি পুরোনো ছবি-ভিডিও বা খবরের স্ক্রিনশট শেয়ারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২৮ ও ২৯ জুলাই সরকারি ও বিরোধী দলগুলোর পাল্টাপাল্টি সমাবেশের ঘটনায়ও এমনটিই দেখা গেছে। সামাজিক মাধ্যমে পুরোনো খবরের স্ক্রিনশট অথবা পুরোনো ছবি ও ভিডিওকে সাম্প্রতিক বলে প্রচার করেছে দুই পক্ষই। ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে এমন অন্তত আটটি নজির পাওয়া গেছে, যা একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তিও শেয়ার করেছেন।

ঢাকা-১৭ সংসদীয় আসনের সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এ আরাফাত ২৯ জুলাই বিএনপির অবস্থান কর্মসূচির ছবি হিসেবে টুইটারে চারটি ছবি টুইট করেন। যার ক্যাপশনে বলেন, “আজকে #বিএনপির সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের একঝলক। তারা তাদের আসল চরিত্রে ফিরে আসছে!” কিন্তু যাচাই করে দেখা যায়, তাঁর টুইট করা চারটি ছবির অন্তত তিনটিই পুরোনো। একাধিক ফ্যাক্টচেকার বিষয়টি তখনই তুলে ধরেন।

আরাফাতের পোস্ট করা প্রথম ছবিতে সাদা শার্ট পরা এক যুবককে পুলিশের ওপর চড়াও হতে দেখা যায়। তবে যাচাইয়ে দেখা গেছে, ছবিটি অন্তত আট বছরের পুরোনো। ২০১৫ সালে জাগো নিউজের ‘আবারো নাশকতাকারীদের টার্গেট পুলিশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ছবিটি পাওয়া যায়।

পুলিশের গাড়ির সামনে লাঠি হাতে কয়েকজন যুবকের হামলা করতে যাওয়ার দ্বিতীয় ছবিটিও বিএনপির আহ্বানে পালিত সমাবেশ বা অবরোধের নয়। ২০২১ সালে প্রকাশিত ‘শাহবাগে পুলিশের উপর হামলা: প্রতিবেদন ১৩ মার্চ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ছবিটি পাওয়া যায়। ছবিটি সে বছর রাজধানীর শাহবাগে লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর তদন্ত ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবিতে মশালমিছিলের সময় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা রয়েছে। একইভাবে তৃতীয় ছবিটিও গত বছর ‘পুলিশের সঙ্গে জামায়াত নেতা–কর্মীদের সংঘর্ষ, আটক ১১’ শীর্ষক প্রতিবেদনের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল।

টুইটারে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলমও ২৯ জুলাইয়ের ছবি দাবি করে তাঁর ভেরিফায়েড টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ার করেছেন পুরোনো একটি ছবি। সেখানে আগুনে পুড়তে দেখা যাচ্ছে ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের একটি বাসকে। ছবিটি ২০২০ সালে রাজধানীর প্রগতি সরণির কোকা-কোলা এলাকায় অগ্নিসংযোগের পুরোনো ঘটনার ছবি। তবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর টুইটে যুক্ত করা আরেকটি ভিডিও সাম্প্রতিক সহিংসতাসংশ্লিষ্ট।

সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকের আরেকটি পোস্টে বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের রক্তাক্ত ছবি শেয়ার করে দাবি করা হয়েছে যে সেটি সাম্প্রতিক সময়ের। কিন্তু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের এই রক্তাক্ত ছবিটি আসলে তোলা হয়েছিল ২০১৮ সালে, কেরানীগঞ্জে বিএনপির গণসমাবেশ চলাকালে।

এ ছাড়া ‘বাংলাদেশ বিএনপি নিউজ’সহ আরও কিছু ফেসবুক পোস্টে জেরার মুখে বাসে আগুন লাগানোর কথা স্বীকার করে এক কিশোর নিজেকে ছাত্রলীগের সদস্য দাবি করছে—এমন একটি ভিডিও ছড়াতে দেখা গেছে। তবে ভিডিওটি অন্তত চার বছর আগের। সামাজিক মাধ্যমে ভিডিওটি পাওয়া যায় ২০১৯ সালের ১৯-২০ মার্চ থেকে। মূলত সে বছরের ১৯ মার্চ আবরার আহমেদ চৌধুরী নামের এক বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থীর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার জেরে যে আন্দোলন হয়েছিল, ভিডিওটি ছিল সেই সময়ে ধারণ করা।

এর বাইরে ‘বাসে আগুনের চেষ্টা, ছাত্রলীগের ৩ নেতা-কর্মী আটক’ শিরোনামে প্রথম আলো পত্রিকায় ২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি সংবাদকে বিএনপির সাম্প্রতিক কর্মসূচির খবর বলে প্রচার করা হচ্ছে। মূলত ২০১৪ সালে মাগুরায় একটি বাসে আগুন দিতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন তাঁরা। প্রথম আলো এক বিবৃতিতে এটিকে ‘মিথ্যা প্রচারণা’ বলে নিশ্চিত করেছে।

এর আগে ২৮ জুলাই বিএনপির মহাসমাবেশ চলাকালে ঢাকার নয়াপল্টনে এক পুলিশ কর্মকর্তা একজন সাংবাদিককে ছবি তুলতে বাধা দিচ্ছেন, এমন একটি ছবিও বেশ কয়েকটি (১, ২, ৩) পোস্টে ছড়াতে দেখা গেছে। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, ছবিটি তোলা হয়েছিল ২০১৮ সালে পল্টনে বিএনপি অফিসের সামনে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির বিক্ষোভ চলাকালে। সেখানে বাংলা টিভির প্রতিবেদক আরমান কায়সার ও ক্যামেরাম্যান মানিককে ছবি তুলতে বাধা দিয়েছিলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার আনওয়ার হোসেন।

বিদেশি ‘পর্যবেক্ষকের’ নামে আসলে কাদের আনা হচ্ছে

০১ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

ইলেকশন মনিটরিং ফোরাম নামের একটি সংস্থা চারজন বিদেশি নাগরিককে ঢাকায় নিয়ে এসে তাঁদের নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। বিদেশি এই চারজন ‘পর্যবেক্ষককে’ নিয়ে সংগঠনটি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গেও বৈঠক করেছে। যদিও তাঁদের কেউ আন্তর্জাতিক কোনো নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রতিনিধি নন।

মূলত গত রোববার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের পরই ইলেকশন মনিটরিং ফোরাম (ইএমএফ) নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এই সংগঠনের উদ্দেশ্য কী, কারা এর পেছনে আছেন, বিদেশি পর্যবেক্ষক হিসেবে সংগঠনটি যাঁদের নিয়ে এসেছে, তাঁরা আসলে কারা—এ রকম নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে।

২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় কয়েকজন বিদেশিকে এনে তাঁদের ‘আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ঘটনায় বিতর্কিত হয়েছিল সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন নামের একটি সংস্থা। সংস্থাটির মহাসচিব আবেদ আলী একই সঙ্গে ইলেকশন মনিটরিং ফোরামেরও চেয়ারম্যান। এই ফোরামের আমন্ত্রণে এবার ঢাকায় আসা চারজন বিদেশি নাগরিক জাতীয় পার্টি (জেপি), জাসদসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি সরকারের মন্ত্রীদের সঙ্গেও বৈঠক করছেন।

আবেদ আলীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি পর্যবেক্ষক হিসেবে এখন ঢাকা সফরে থাকা টেরি ইসলে, নিক পল, এন্ডি লিন ও ইউসুকি সুগু—এই চারজন যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র, আয়ারল্যান্ড, চীন ও জাপানের নাগরিক। তবে তাঁরা ওই সব দেশের সরকার বা কোনো নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রতিনিধি নন। চার বিদেশি নাগরিকের দুজন সাংবাদিক আর দুজন সমাজকর্মী। তাঁরা এসেছেন ব্যক্তিগতভাবে, বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের পূর্ববর্তী পরিস্থিতি দেখতে।

ওই চারজন বিদেশি নাগরিক এর আগে অন্য কোনো দেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ইলেকশন মনিটরিং ফোরামের চেয়ার‍ম্যান আবেদ আলী গতকাল সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওনারা বেসিক্যালি সাংবাদিক। নিজ নিজ অবস্থানে হয়তো ভিন্ন ভিন্ন ব্যবসা করতে পারেন, বিভিন্ন কাজ করতে পারেন। দুজন সাংবাদিক, দুজন সমাজকর্মী। ছয়জন আসার কথা ছিল। চারজন এসেছেন। একজন সাংবাদিক তো অবজারভারই (পর্যবেক্ষক)।’

২০১৮ সালে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) নিবন্ধিত ৫৬টি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থার মোর্চা ইলেকশন মনিটরিং ফোরাম। তবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে এই সংস্থাগুলোর নিবন্ধনের মেয়াদ গত ১৭ জুলাই শেষ হয়েছে। এখন কোনো পর্যবেক্ষক সংস্থাই ইসিতে নিবন্ধিত নয়। আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে স্থানীয় পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোকে নতুন করে নিবন্ধন দেওয়ার কাজ চলছে।

‘ঘটনার’ সময় কেউ মৃত, কেউ কারাবন্দী, কেউ বিদেশে, তবু তাঁরা আসামি

০২ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

দা, লাঠিসোঁটা ও রড নিয়ে হামলার পর ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো—এমন একটি মামলায় আসামির তালিকায় নাম রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৪৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক শওকত হোসেনের। তাঁর বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছে গত রোববার ঢাকার গেন্ডারিয়া থানায়। আর মামলায় উল্লেখ করা ঘটনাটি গত শনিবারের।

মামলায় যে ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেটি সত্য হয়ে থাকলে সাত মাস আগে মারা যাওয়া শওকত হয়তো ‘গায়েবিভাবে জীবিত’ আছেন বলে জানান তাঁর চাচা আবুল কাসেম। গতকাল বিকেলে মুঠোফোনে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গত বছরের ডিসেম্বর মাসে হঠাৎ হৃদ্‌রোগে তাঁর ভাতিজা শওকত মারা যান। তাঁকে পুরান ঢাকার ফরিদাবাদ এলাকার একটি কবরস্থানে দাফন করা হয়। মৃত কারও নামে এ রকম মামলা দেওয়া দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এই মামলায় মৃত শওকত ছাড়াও আসামিদের তালিকায় কারাবন্দী ব্যক্তি এবং দেশের বাইরে অবস্থান করা দুজনের নাম রয়েছে।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, গত শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গেন্ডারিয়ার ডিস্টিলারি রোডের মুরগীটোলা মোড়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের ওপর দা, লাঠিসোঁটা ও রড দিয়ে অতর্কিত হামলা করেন শওকতসহ বিএনপির নেতা–কর্মীরা। এ সময় তাঁরা ককটেলের বিস্ফোরণও ঘটান। এতে আওয়ামী লীগের সাতজন নেতা আহত হয়েছেন। ঘটনাস্থলে পুলিশ গেলে ইট ছুড়ে পুলিশকেও আহত করা হয় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার বাদী গেন্ডারিয়ার বাসিন্দা শাহ আলম। স্থানীয়ভাবে তিনি পুলিশের তথ্যদাতা (সোর্স) হিসেবে পরিচিত।

তাঁরা হজে ছিলেন, তবু ‘গায়েবি’ মামলার আসামি

০২ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

পবিত্র হজ পালনের জন্য দেড় মাস সৌদি আরবে ছিলেন চট্টগ্রামের দুই বিএনপি নেতা। তাঁরা ফেরেন গত ৩০ জুলাই। অথচ ২৮ জুলাই এক যুবলীগ নেতার করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আগের দিন সরকারবিরোধী স্লোগান দিয়ে হজে থাকা ওই দুজনসহ ১২০ জন মিলে তাঁকে মারধর করেছেন। ওই সময় তাঁদের হাতে ছিল লাঠিসোঁটা ও পেট্রলবোমা।

বিশেষ ক্ষমতা ও বিস্ফোরক আইন এবং ভাঙচুর-মারধরের অভিযোগে চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ থানায় এই মামলা হয়েছে। ঘটনার সময় উল্লেখ করা হয়েছে ২৭ জুলাই দুপুর সোয়া ১২টা। ঘটনাস্থল পৌরসভার গাছবাড়িয়া এলাকা। মামলার বাদী চন্দনাইশ পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহাদাত হোসেন। হজে থাকা বিএনপির দুই নেতা হলেন চন্দনাইশ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মঞ্জুর মোর্শেদ চৌধুরী ও সাইফুল করিম।

অন্যদিকে ২৭ জুলাই হাটহাজারী থানায় বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক আইন ও ভাঙচুর-মারধরের অভিযোগে আরেকটি মামলা হয়েছে।এ মামলার বাদী চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আয়মান আওসাফ চৌধুরী। তিনি হাটহাজারী সদরের বাসিন্দা। মামলায় আসামি করা হয়েছে ১২১ জনকে।

রাষ্ট্র ও সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

৩১ জুলাই ২০২৩, বাংলা ট্রিবিউন

ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে ঘুরতে আসা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ২৪ জন শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৩৪ শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রাষ্ট্র ও সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে রবিবার (৩০ জুলাই) বিকাল ৫টার দিকে হাওরের উত্তর পাড়ে সীমান্তবর্তী টেকেরঘাট এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়।

সোমবার (৩১ জুলাই) দুপুরে তাদের বিরুদ্ধে তাহিরপুর থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে গ্রেফতার দেখানোর পর বিকালে বিষয়টি সাংবাদিকদের জানায় পুলিশ। দুপুরে ওই থানার এসআই রাশেদুল কবির বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন। মামলার এজাহারে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, জনসাধারণের জানমালের ক্ষতি, গোপন বৈঠক করে জিহাদ সৃষ্টির মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাদের আটকের পর থেকে সোমবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত পুলিশের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে কিছুই জানানো হয়নি স্থানীয় সাংবাদিকদের।

সোমবার বিকালে তাহিরপুর থানার ওসি সৈয়দ ইফতেখার হোসেন বলেন, ‘বুয়েটের এসব শিক্ষার্থী বেড়ানোর নাম করে রাষ্ট্র ও সরকারবিরোধী গোপন বৈঠক করতে এখানে এসেছেন। খবর পেয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে সত্যতা পাওয়ায় রবিবার বিকালে তাদের আটক করা হয়। সোমবার মামলা দিয়ে গ্রেফতার দেখানো হয়। গ্রেফতারকৃতরা ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।’

উপাচার্যের বক্তব্য নিয়ে প্রতিবেদন করায় শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার

০২ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ এফ এম আবদুল মঈনের বক্তব্য নিয়ে প্রতিবেদন করায় ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ইকবাল মনোয়ারকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে কর্তৃপক্ষ। আজ বুধবার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. আমিরুল হক চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের দাবি, উপাচার্যের বক্তব্য বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে। তবে বহিষ্কৃত শিক্ষার্থী বলছেন, তিনি উপাচার্যের বক্তব্য হুবহু উদ্ধৃত করে প্রকাশ করেছেন। তাঁর কাছে বক্তব্যের অডিও রেকর্ড ও তথ্যপ্রমাণ আছে।

মোহাম্মদ ইকবাল মনোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের স্নাতকোত্তর প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। তিনি ‘যায় যায় দিন’ পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত। তাঁর বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার আফজলনগর গ্রামে। তিনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির অর্থ সম্পাদক।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের নবীনবরণ ও বিদায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন উপাচার্য এ এফ এম আবদুল মঈন। ওই বক্তব্য উদ্ধৃত করে ‘যায়যায়দিন’ পত্রিকার অনলাইনে ‘দুর্নীতি হচ্ছে তাই বাংলাদেশের উন্নয়ন হচ্ছে: কুবি উপাচার্য’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন করেন ইকবাল মনোয়ার। ওই প্রতিবেদনে উপাচার্যকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘অনেকেই বলে দেশে দুর্নীতির কারণে উন্নয়ন হচ্ছে না। কিন্তু আমি বলব উল্টো কথা। দেশে দুর্নীতি হচ্ছে বলেই উন্নতি হচ্ছে। এটা নিয়ে অনেকেই বিভিন্ন কথা বলতে পারে। যে ঘুষ খায়, সে পদ্মাপাড়ে যায় ইলিশ খেতে। এতে পদ্মাপাড়ের গরিব মানুষেরা ধনী হচ্ছে। দুর্নীতি এভাবে অর্থনীতিতে অবদান রাখে। তাই অর্থনীতিবিদগণ দুর্নীতি কখনো কোনো বিরূপ মন্তব্য করে না। তবে যারা পলিটিক্যাল ইকোনমি নিয়ে কাজ করে তারা দুর্নীতি নিয়ে কথা বলে থাকে। নৈতিকতার জায়গায়ও এটি প্রশ্নবিদ্ধ। তবে অর্থনীতির জায়গা থেকে যদি বলি, দুর্নীতি কখনোই উন্নয়নের জন্য বাধা নয়।’

ওই প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্নের অভিযোগ তুলে ওই শিক্ষার্থী সাংবাদিককে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের দাবি তুলে আজ বুধবার দুপুরে ক্যাম্পাসে মানববন্ধন হয়। মানববন্ধনে উপাচার্যের বক্তব্য বিকৃত ও আংশিক উপস্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। এ ঘটনায় সন্ধ্যায় এক অফিস আদেশে ওই শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়।

নেতিবাচক প্রচার হলে ফেসবুক থেকে সরানোর অনুরোধ করবে নির্বাচন কমিশন

০৩ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে কোনো প্রচার নেতিবাচক মনে হলে তারা ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করবে। ইসির অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ফেসবুক বলেছে, এমন অনুরোধ পেলে তারা তাদের নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক শেষে এসব কথা জানিয়েছে ইসি।

আজ বেলা ১১টায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয়ে এই বৈঠক শুরু হয়। তা শেষ হয় দুপুর ১২টার দিকে। বৈঠকে ইসির পক্ষে অংশ নেন অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ, আইডিইএ প্রকল্পের (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ সায়েম, এনআইডির সিস্টেম ম্যানেজার মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন। আর ফেসবুকের পক্ষে অংশ নেন ফেসবুকের বাংলাদেশ পাবলিক পলিসির প্রধান রুজান সারওয়ার, এপিএসি গ্লোবাল রেসপন্সের প্রধান আইডেন হোয় ও নিয়ন্ত্রক বিশেষজ্ঞ ইউজিন পো। বৈঠক শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়ালের সঙ্গে দেখা করেন ফেসবুক প্রতিনিধিদলের সদস্যরা।

বৈঠক শেষে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেনি। তবে ইসির পক্ষে কথা বলেন অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ। তিনি বলেন, আলোচনার বিষয় ছিল ফেসবুকে যে ধরনের অপপ্রচার হয়, সেগুলো কীভাবে রোধ করা যায়। বিশেষ করে হেট স্পিচ (বিদ্বেষমূলক বক্তব্য), সাম্প্রদায়িকতা বা ফেসবুকের নীতি ভঙ্গ করে, সে ধরনের অপপ্রচার থাকলে তারা তা ডিলিট (সরিয়ে) করবে, ব্লক করবে। বিষয়টা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’

অশোক দেবনাথ আরও বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে তারা (ফেসবুক) বিভিন্ন সময় যোগাযোগ করবে। বিভিন্ন বিষয় তারা জানবে। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের পরিপ্রেক্ষিতে যদি আমাদের কাছে মনে হয় নির্বাচন বিষয়ে সেটা নেগেটিভ প্রচারণা, আমরা রিকুয়েস্ট করলে তারা রিমুভ (সরিয়ে) করবে। তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেই ফাইন্ড আউট (বের করবে) করবে।’

ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ইসির এই সহযোগিতা নির্বাচনকেন্দ্রিক। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে তা কার্যকর হবে বলেও জানান ইসির এই অতিরিক্ত সচিব।

অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে একজন ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ করেছে। আর ফেসবুকের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ইসির পক্ষ থেকেও একজন ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ করা হবে। তিনি বলেন, ‘এটা হলো প্রাথমিক একটা আলোচনা। পরবর্তী সময় তাদের সঙ্গে আরও আলোচনা হবে, যোগাযোগ হবে।’

সভা সমাবেশে ভাড়াটে কর্মী রেট পুরুষ ৪০০ নারী ৬০০

৪ আগস্ট, ২০২৩, দেশ রুপান্তর

জনা দশেক যুবককে সঙ্গে নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলছেন এক ব্যক্তি। তিনি বলছেন, ‘আবার বিজয়ী হবে ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল…’। হঠাৎ পেছনে থাকা কয়েকজন যুবক ‘জয় বাংলা’ বলে স্লোগান দিতে শুরু করলেন। কথক ব্যক্তি এমন স্লোগানে বিচলিত হয়ে তাদের থামাতে চেষ্টা করলেন। সঙ্গের যুবকদের ‘জয় বাংলা’ বলে স্লোগান না দিয়ে ‘জিয়ার সৈনিক’ বলে স্লোগান দিতে বলেন তিনি।

ভাড়াটে লোক আনলে এমনই হয়। তারা কখন কোন স্লোগান দিতে হবে তা মনে রাখতে পারে না বা একটা বলতে গিয়ে আরেকটা বলে। ‘জিয়ার সৈনিকের জয় বাংলা স্লোগান’ শিরোনামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়েছে।

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ৯ সেকেন্ডের ওই ভিডিও নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। প্রশ্ন উঠেছে রাজনৈতিক দলগুলো ভাড়াটে কর্মী নিয়ে আন্দোলনে নেমেছে। ভাড়ায় ‘রাজনৈতিক কর্মী’ পাওয়া যায় কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদক। পরিচয় গোপন রেখে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে আন্দোলনের জন্য কর্মী ভাড়ার প্রমাণও মেলে। পাওয়া গেছে ভাড়ায় বিভিন্ন আয়োজনে অংশ নেওয়া যুবকদের সন্ধান।

জানা গেছে, ওই যুবকরা আন্দোলন, প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধন, সেমিনার প্রভৃতি সাংগঠনিক ও সামাজিক আয়োজনে অংশ নেয় টাকার বিনিময়ে।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে রাজধানীর পল্টন এলাকায় কথা হয় এক তরুণের সঙ্গে। তার নাম আহসান হাবিব (ছদ্মনাম); রাজধানীর একটি কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। চাকরির জন্য বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে ইন্টারভিউ দিয়েছেন। অভিজ্ঞতা আর সুপারিশের অভাবে চাকরি হয়নি বলে অভিযোগ তার। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের চাকরির জন্যও পরীক্ষা দিচ্ছেন। পরিবার আর খরচ চালাতে না পারায় ঢাকায় থেকে চাকরির চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় মেসের এক বন্ধুর কাছে জানতে পারেন বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে টাকা পাওয়া যায়। এরপর পল্টন-প্রেস ক্লাবকেন্দ্রিক একটি গ্রুপের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে এ কাজে অংশ নেন তিনি।

আহসান হাবিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাধ্য হয়ে এ কাজ করছি। এমন নয় যে এখানে খুব আয় করা যায়। কোনো দিন ৭০০ টাকা পাই, আবার কোনো দিন ১৫০ টাকাও পাই। এসে বসে থাকলে কাজ পাওয়া যায় না। লোক লাগলে বিভিন্ন লিংকে যোগাযোগ করে নেতারা। পরে বিভিন্ন গ্রুপের মাধ্যমে আমার মতো অনেককে ফোন করে হাজিরার স্থান ও টাইম জানিয়ে দেওয়া হয়। তখন আমরা সেখানে যাই। চেষ্টা করি রাজনৈতিক প্রোগ্রামে না যেতে, কারণ ওতে গ্যাঞ্জামের ঝুঁকি থাকে।’

পরিচয় গোপন রেখে কথা বলেন আরও এক যুবক। তার নাম সাইফুল ইসলাম (ছদ্মনাম)। তিনি বলেন, ‘আমি একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানে খ-কালীন কাজ করি। সবসময় কাজ থাকে না ওখানে। তাই পরিচিত এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রোগ্রামে আসি। সবসময় কাজ থাকে না যদিও। তবে যা টাকা পাই তা মন্দ না।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর পল্টন, প্রেস ক্লাব ও গুলিস্তান এলাকায় আহসান হাবিবের মতো অসংখ্য তরুণ এমন কাজে অংশ নেওয়ার অপেক্ষায় থাকেন। তাদের ঘিরে সক্রিয় রয়েছে আরেকটি চক্র; যারা হাবিবের মতো তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে বিভিন্ন দল ও সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে। বিনিময়ে তারা জনপ্রতি এক থেকে দেড়শো টাকা হাতিয়ে নেয়। এই গ্রুপগুলোতে নারীদেরও অংশগ্রহণ রয়েছে। বিভিন্ন কর্মসূচিতে নারীদের চাহিদা বেশি থাকে, জনপ্রতি বাড়তি টাকা দিয়ে ভাড়া করতে হয় তাদের।

ছদ্মবেশে রাজধানীর প্রেস ক্লাব এলাকায় ঘুরে পাওয়া যায় এক দালালের সন্ধান। তার নাম মো. হেলাল। তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাব এলাকার ভাড়াটে কর্মীদের নিয়ন্ত্রকদের একজন। মধ্যবয়সী এ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এ কাজে যুক্ত আছেন। এ প্রতিবেদককে হেলাল জানান, এক থেকে দেড় ঘণ্টার প্রোগ্রামের জন্য দিতে হয় ১৫০ টাকা। দিনব্যাপী হলে সর্বনিম্ন ৪০০ টাকা দিতে হয় জনপ্রতি। নারীদের চাহিদা বেশি, তাই তাদের ৬০০ টাকা দিতে হয়। এ টাকার একটি অংশ তিনি পান। এখন নির্বাচন কেন্দ্র করে লোকের চাহিদা বেড়েছে। তবে টাকা বাড়িয়ে দিলে প্রচুর লোক পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘১৫০-২০০ লোক জোগাড় করতে পারি অনায়াসে। বেশি লাগলেও পারব, তবে সময় আর লোকের সংখ্যা জানাতে হবে।’

জানা গেছে, মৌখিক চুক্তিতে এরকম কর্মী ভাড়া দেওয়ার অন্তত পাঁচটি চক্র সক্রিয় আছে শুধু জাতীয় প্রেস ক্লাব এলাকাতেই। এই এলাকায় বছর জুড়ে রাজনৈতিক, সামাজিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নানা আয়োজন থাকে। ফলে এখানে তাদের চাহিদা অন্য এলাকার চেয়ে অনেক বেশি। কারও সাজানো কর্মী দরকার হলে তারা এখানে এসে খোঁজ করেন। কর্মী ভাড়ার সংস্কৃতিটা এই এলাকা থেকেই গড়ে উঠেছে বলা যায়। আর দালালদের মাধ্যমে ভাড়া খাটার কাজে যোগ দেয় বেকার যুবক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন খ-কালীন কাজে যুক্ত তরুণরা। আবার অনেকে এটাকেই পেশা হিসেবে নিয়েছেন। অনেক মাদকসেবীও ভাড়ায় বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে থাকে।

আ.লীগের উপকমিটিতে সরকারি কর্মকর্তারা

০৪ আগস্ট ২৩, সমকাল

আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক উপকমিটিতে বিসিএস ক্যাডারসহ অন্তত পাঁচজন সরকারি কর্মকর্তা পদ পেয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, এটি চাকরিবিধির গুরুতর লঙ্ঘন ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে পদ পাওয়া কর্মকর্তারা বলছেন, দোষের কিছু নেই। দল তাদের যোগ্য মনে করে পদ দিয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি, এতে সমস্যা নেই।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের স্বাক্ষরে ৭৮ সদস্যের উপকমিটি গত ৮ জুলাই অনুমোদন হয়। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক উপকমিটির চেয়ারম্যান। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রোকেয়া সুলতানা উপকমিটির সদস্য সচিব।

উপকমিটির ১৫ নম্বর সদস্য অধ্যাপক ডা. কামরুল মিলন। তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থক চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) মহাসচিব। স্বাস্থ্য ক্যাডারের এই কর্মকর্তা জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।

সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ১৯৭৯-এর ২৫(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘সরকারি কর্মচারী কোনো রাজনৈতিক দলের বা রাজনৈতিক দলের কোনো অঙ্গসংগঠনের সদস্য হতে অথবা অন্য কোনোভাবে যুক্ত হতে পারবেন না অথবা বাংলাদেশ বা বিদেশে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে বা কোনো প্রকারের সহায়তা করতে পারবেন না।’

বিধিমালায় স্পষ্ট বিধিনিষেধ থাকলেও আরও কয়েকজন শাসক দলের উপকমিটিতে পদ পেয়েছেন। ১৬ নম্বর সদস্য ডা. সেলিম আক্তার চৌধুরী চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। ৩৬ নম্বর সদস্য ডা. জহিরুল ইসলাম লিটন ঢাকা শিশু হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক। তিনি স্বাচিপের শিশু হাসপাতাল শাখার সাধারণ সম্পাদক। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে প্রণীত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল এবং ইনস্টিটিউট আইনে চলে হাসপাতালটি। এই আইনে এখানকার চিকিৎসক, কর্মকর্তাদের জন্যও সরকারি চাকরি বিধিমালা প্রযোজ্য বলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের উপকমিটিতে পিএসসির সদস্য অধ্যাপক দেলোয়ার

২৬ জুলাই ২০২৩, প্রথম আলো

সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সদস্য অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক–বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হয়েছেন। সাংবিধানিক পদে থেকেও দেলোয়ার হোসেনের রাজনৈতিক দলের কমিটির সদস্য হওয়া নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বিভিন্ন মহলে। এর মধ্য দিয়ে পিএসসির সদস্য হিসেবে নেওয়া শপথের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে চাকরির বিধিবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

গত সোমবার আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক–বিষয়ক উপকমিটি ঘোষণা করা হয়। দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এ কমিটির অনুমোদন দেন। উপকমিটিতে অ্যাম্বাসেডর মোহাম্মদ জমিরকে চেয়ারম্যান এবং আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক–বিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহমেদকে সদস্যসচিব করা হয়েছে। এ কমিটি ৫৬ সদস্যের।

৫৩ শতাংশ মানুষের মতে দেশ ভুল পথে যাচ্ছে: আইআরআইয়ের জরিপ

০৯ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

বাংলাদেশের ভোটারদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ মনে করেন দেশ ভুল পথে যাচ্ছে। এ জন্য দ্রব৵মূল্যের ঊর্ধ্বগতিকে প্রধান কারণ বলে মনে করেন তাঁদের ৫০ শতাংশ। অপরদিকে ৪৪ শতাংশ মানুষ মনে করেন দেশ সঠিক পথে এগোচ্ছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে। যদিও ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে জরিপের ফল ছিল, ৭৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন দেশ সঠিক পথে রয়েছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) এক জনমত জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। গত ১ মার্চ থেকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত জরিপটি চালানো হয়। জরিপে অংশ নেন দেশের ৬৪টি জেলার ৫ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ। জরিপের তত্ত্বাবধায়ন করেছে রেডস্টোন সায়েন্টিফিক।

আইআরআইয়ের ওয়েবসাইটে গতকাল মঙ্গলবার জরিপে ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়, ২০১৪ সালের পর এই প্রথম দেশ সঠিক পথে এগোচ্ছে না বলে বেশির ভাগ মত এসেছে।

২০২৪ সালের জানুয়ারির আগে বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জরিপে উঠে এসেছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সরকারের কার্যক্রমের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ৭০ ভাগ মানুষ। অপরদিকে বিরোধী দলের প্রতি জনমত আগের চেয়ে বেড়েছে। দেশের ৬৩ শতাংশ মানুষের সমর্থন পেয়েছে বিরোধী দল, যা ২০১৯ সালে ছিল ৩৬ শতাংশ।

জরিপের ফলে দেখা গেছে, নির্বাচনে স্বচ্ছতা ও সুষ্ঠুতা থাকলে বেশির ভাগ বাংলাদেশি আগামী নির্বাচনে ভোট দিতে আগ্রহী। জরিপে অংশ নেওয়া ৯২ শতাংশ জানিয়েছেন, আগামী নির্বাচনে তাঁদের ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর যাঁরা ভোট দিতে চান না, তাঁরা এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন নির্বাচনে কারচুপি ও ভোটারদের নিবন্ধনসংক্রান্ত বিষয়গুলোকে।

জরিপ অনুযায়ী, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে মত দিয়েছেন ৪৪ শতাংশ মানুষ। এর বিপরীতে বেশির ভাগ মানুষ মনে করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়াই বিরোধী দলকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া উচিত।

সাইবার নিরাপত্তা আইন: নামেই বদল, বিষয়বস্তুতে নয়

১০ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বিভিন্ন ধরনের অপরাধকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, তা প্রায় হুবহু প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনেও রাখা হয়েছে। দুটি আইনের বিষয়বস্তুও প্রায় একই রকমের।

এমনকি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কমিশন, সম্পাদক পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠনের যেসব আপত্তি-উদ্বেগ ছিল, প্রস্তাবিত নতুন আইনেও সেসব দূর করা হয়নি। শুধু কিছু ক্ষেত্রে সাজা কমেছে এবং জামিনযোগ্য ধারা বেড়েছে।

গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের অধীন ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সির ওয়েবসাইটে প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনের খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে। এই খসড়ার সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দুই আইনের মধ্যে পরিবর্তন বলতে প্রথমত শাস্তি কমানো ও জামিনযোগ্য ধারা বাড়ানো হয়েছে। দ্বিতীয়ত, মানহানিকর তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের অপরাধের (প্রমাণিত হলে) ক্ষেত্রে কারাদণ্ডের পরিবর্তে শুধু জরিমানার বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

এ ছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের দুটি ধারা (৩৩ ও ৫৭) প্রস্তাবিত আইনে একেবারে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই দুই ধারায় প্রথমটিতে ‘বেআইনিভাবে তথ্য-উপাত্ত ধারণ, স্থানান্তর ইত্যাদির দণ্ড’ সম্পর্কে বলা আছে। আর দ্বিতীয়টিতে ‘সরল বিশ্বাসে কৃত কাজকর্ম’ সম্পর্কিত অপরাধের কথা বলা আছে।

নতুন আইনের খসড়ায় মোট ধারা ৬০টি, যা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রয়েছে ৬২টি। প্রস্তাবিত আইনে কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে প্রথমবারের জন্য যে সাজা, বারবার করলেও একই সাজা হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার করলে সাজা বেশি রাখার বিধান রয়েছে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৯টি ধারা (৮, ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২, ৪৩ ও ৫৩) স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে উল্লেখ করে তা সংশোধনের দাবি করেছিল সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ। এখন প্রস্তাবিত আইনে এ ক্ষেত্রে সাতটি ধারায় সাজা ও জামিনের বিষয়ে সংশোধন আনা হয়েছে। কিন্তু অপরাধের সংজ্ঞা স্পষ্ট করা হয়নি, আগের মতোই রয়ে গেছে। আর দুটি ধারায় কোনো পরিবর্তনই আনা হয়নি।

অন্যদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের দপ্তর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের দুটি ধারা (২১ ও ২৮) বাতিলের আহ্বান জানিয়েছিল। প্রস্তাবিত আইনে এই দুটি ধারা বাতিল না করে সাজা ও জামিনের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে সংস্থাটি যে আটটি ধারা (৮, ২৫, ২৭, ২৯, ৩১, ৩২, ৪৩ ও ৫৩) সংশোধনের কথা বলেছিল, তার ছয়টিতে পরিবর্তন (মূলত সাজা এবং জামিনের ক্ষেত্রে) করা হয়েছে।

সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনের পাশাপাশি আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের অনেকে বলছেন, প্রস্তাবিত নতুন আইনে সাজা কমানো ও জামিনযোগ্য ধারা বাড়ানোর বিষয়টি ইতিবাচক হলেও আইনের সংজ্ঞা আগের মতোই বহাল রাখা এবং বিষয়বস্তুতে পরিবর্তন না আসায় অপপ্রয়োগ ও অপব্যবহারের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। সাজা কমানোর কিংবা বাড়ানো কিংবা সাজার মাত্রা পরিবর্তনের ঘটনায় নাগরিকদের অধিকার বা সুরক্ষা হবে না। যেসব পরিবর্তন আনা হচ্ছে, তা নাগরিকদের মৌলিক মানবাধিকার সুরক্ষায় খুব একটা কাজে আসবে না।

নিবন্ধন পেয়ে শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের তোড়জোর

১১ আগস্ট ২০২৩, ইত্তেফাক

রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিবন্ধন পেয়েই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের (বিএনএম) শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। বিএনপিতে নিষ্ক্রিয় জাতীয় পর্যায়ের বেশ কয়েক জন নেতাকে বিএনএমের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি না এলে বিএনএমের ব্যানারে দলটির কিছু নেতাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধ্য করা হতে পারে—এমন খবরও আলোচনায় রয়েছে। যদিও বিএনএম গঠনের শুরু থেকে সরকারের সমর্থন ছিল বলে বরাবরই অভিযোগ আসতে থাকে। এমনকি নিবন্ধন প্রক্রিয়ার সময় ইসি সচিবালয় থেকে দলটির তৃণমূলের কার্যক্রমে সহায়তার জন্য জেলা-উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয় বলে ইত্তেফাককে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছিলেন। বিভিন্ন মহল থেকে আপত্তি থাকলেও তা আমলে না নিয়ে বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) নিবন্ধন দিয়েছে ইসি।

শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনএমের মুখপাত্র ও যুগ্ম-আহ্বায়ক ব্যারিস্টার এম সারোয়ার হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ‘পরিস্থিতি ডিমান্ড করলে শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে জাতীয় পর্যায়ের কোনো নেতা যদি দলের নেতৃত্বে আসতে চান, তাহলে আমরা সাদরে গ্রহণ করব।’

২০২১ সালে বিএনএম গঠন করা হয়। বিএনপির সাবেক দুই নেতা অধ্যাপক ড. আব্দুর রহমানকে (বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য) আহ্বায়ক এবং মেজর মু. হানিফকে (অব.) (বিএনপির নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য) সদস্যসচিব করে বর্তমানে ৪৯ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি আছে। তবে নিবন্ধনের সময় ৩১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটির তালিকা জমা দেওয়া হয়েছিল। ঐ ৩১ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটিতে আট জন সাবেক সেনা কর্মকর্তা রয়েছেন। আহ্বায়ক কমিটির বেশির ভাগ সদস্য একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বিএনএমের আহ্বায়ক ড. আব্দুর রহমান প্রাইম ইউনিভার্সিটির ব্যাবসায় প্রশাসন বিভাগের প্রধান ও ডিন। তিনি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরগুনা-১ আসনে বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। সপ্তম সংসদ নির্বাচনে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও তিনি পরাজিত হয়েছিলেন। তিনি বরগুনা জেলা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম-আহ্বায়ক এবং বেতাগী থানা ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বরগুনা জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বেতাগী থানা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। ২০০৬ সালে তিনি বিএনপির রাজনীতি ছেড়ে দেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক দর্শন হলো জাতীয়তাবাদ।’

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বিএনএমের নেতৃত্বে পরিবর্তনের জোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বর্তমান আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবকে দলের শীর্ষ নেতৃত্বে রাখা হচ্ছে না। দ্রুত সময়ের মধ্যে ৪৯ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ভেঙে ১০১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হচ্ছে। বিএনএমের চেয়ারম্যান ও মহাসচিব হিসেবে বিএনপির সাবেক দুই মন্ত্রীকে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যে বিএনএমের নেতৃত্বে আসতে পারেন বিএনপির এমন পাঁচ জন নেতার নাম জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে। এর মধ্যে বরিশাল অঞ্চল থেকে বিএনপির সাবেক তিন মন্ত্রীর নাম আলোচনায় রয়েছে, যারা ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সংসদ সদস্যও ছিলেন। এছাড়া চাঁদপুর ও কিশোরগঞ্জ অঞ্চল থেকে বিএনপির দুই নেতাকে টার্গেট করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা কমিটিতে বিএনপির কোণঠাসা ও দলছুটদের রাখা হবে। কোনো কারণে বিএনপি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বয়কট করলে বিএনপির বড় একটি অংশকে বিএনএমের ব্যানারে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করানো হবে। এজন্য সম্ভাব্য যারা নির্বাচন করবেন, তাদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে সবকিছুই পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন অনুকরণ দলটির আদর্শ।

নামসর্বস্ব ও দল–ঘনিষ্ঠদের সংস্থাও হচ্ছে নির্বাচন পর্যবেক্ষক

১১ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

কোনো কার্যক্রম নেই, এমন কয়েকটি বেসরকারি সংস্থাকে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা হিসেবে নিবন্ধন দেওয়ার জন্য নির্বাচিত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নিবন্ধনের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত মোট ৬৮টি সংস্থার মধ্যে কয়েকটির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততারও অভিযোগ উঠেছে। বেশির ভাগ সংস্থারই পর্যাপ্ত লোকবল নেই। ফলে নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করার মতো দক্ষতা ও সক্ষমতা এসব সংস্থার আসলেই আছে কি না, সে প্রশ্ন সামনে এসেছে।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ‘নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা হিসেবে প্রাথমিকভাবে নিবন্ধনযোগ্য’ ৬৮টি দেশি বেসরকারি সংস্থার তালিকা ইসি প্রকাশ করে গত মঙ্গলবার। এই তালিকা থেকে গত বুধবার ঢাকা ও ঢাকার বাইরের ৩২টি সংস্থার বিষয়ে সরেজমিনে খোঁজখবর নিয়েছেন প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা। এর মধ্যে ৭টি সংস্থার আসলে কোনো কার্যক্রম নেই, এগুলো মূলত নামসর্বস্ব। আর অন্তত ১০টি সংস্থার পরিচালনা পর্ষদে থাকা ব্যক্তিদের বা তাঁদের নিকটাত্মীয়দের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।

সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়ালের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে সাংবাদিকদের জানান ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস

ইসির নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নীতিমালা অনুযায়ী, যেসব সংস্থা গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে আসছে এবং গঠনতন্ত্রে এ বিষয়সহ সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে নাগরিকদের মধ্যে তথ্য প্রচার ও উদ্বুদ্ধ করার অঙ্গীকার রয়েছে, কেবল সেসব বেসরকারি সংস্থাই নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা হিসেবে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে পারে। ইসি যেসব সংস্থাকে বাছাই করেছে, সেগুলোর গঠনতন্ত্রে এমন কথা থাকলেও বাস্তবে প্রায় কোনো সংস্থারই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে তথ্য প্রচার বা জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার কোনো কার্যক্রম নেই।

সেবা সোশ্যাল ফাউন্ডেশন নামের একটি বেসরকারি সংস্থাকে নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে নিবন্ধনযোগ্য সংস্থার তালিকায় রেখেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ৬৮টি নিবন্ধনযোগ্য সংস্থার যে তালিকা ইসি গণবিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করেছে, সেখানে লক্ষ্মীপুরের এই সংস্থাটির অবস্থান ২ নম্বরে। এই সংস্থার পক্ষ থেকে নিবন্ধনের আবেদন করেছেন কমলনগরের হাজির হাটের জসীম উদ্দীন রিপন। তিনি ওই সংস্থার নির্বাহী পরিচালক।

গত বুধবার সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেবা সোশ্যাল ফাউন্ডেশন নামের সংস্থাটির কার্যক্রম পাঁচ বছর ধরে বন্ধ। তাদের কোনো কার্যালয় নেই, কোনো লোকবলও নেই। শুরুতে একটি ভাড়া অফিসে ছোট পরিসরে কার্যক্রম ছিল। তখনো তাদের কোনো জনবল ছিল না। নির্বাহী পরিচালক জসীম উদ্দিন পাঁচ বছর ধরে সৌদি আরবে রয়েছেন।

কমলনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোলাইমান প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচন কমিশন কার্যালয় থেকে সেবা সোশ্যাল ফাউন্ডেশনের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল। সেবার কার্যক্রম দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে বন্ধ এবং পরিচালক জসীম উদ্দিন দেশের বাইরে রয়েছেন। এটি তদন্তে পাওয়া গেছে এবং তদন্ত প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

ইসির তালিকায় থাকা আরেকটি সংস্থা হলো মানিকগঞ্জে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কমিশন। ২০০৩ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মহাসচিব নুরুল ইসলাম সাত্তার। তিনি মানিকগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মো. রমজান আলীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত।

মানিকগঞ্জ পৌর এলাকার দক্ষিণ সেওতা এলাকার একটি চারতলা ভবনের নিচতলার একটি ফ্ল্যাটের তিন কক্ষবিশিষ্ট কার্যালয়। তবে বছরের অধিকাংশ সময় কার্যালয় তালাবদ্ধ থাকে। স্থানীয় বিভিন্ন পেশার ১০ জন ব্যক্তির সঙ্গে কথা হলে তাঁরা জানান, এই সংস্থাটির কোনো কার্যক্রম তাঁদের চোখে পড়েনি। তবে বিগত সময়ে জাতীয় এবং স্থানীয় নির্বাচনে সংস্থাটির মহাসচিব নুরুল ইসলাম সংস্থার পক্ষ থেকে একাধিক ব্যক্তির নামে নির্বাচনের পর্যবেক্ষক কার্ড নিয়েছিলেন। তাঁরা বিশেষ বিশেষ প্রার্থীর পক্ষ হয়ে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সংস্থাটির ব্যাপারে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে।

সংস্থাটির মহাসচিব বর্তমানে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি দাবি করেন, তাঁর সংস্থায় লোকবল আছে।

জামালপুর জেলার সমাজ উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (এসপিকে), সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গনাইজেশন (এসডিও) ও রুরাল অ্যান্ড আরবান ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (রাইডো) নামের তিনটি সংস্থা ইসির তালিকায় আছে। এই তিনটি সংস্থার বিষয়ে সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাস্তবে এখন এই তিন সংস্থার কোনোটিরই কোনো কার্যক্রম নেই। স্থানীয় লোকজনও এসব সংস্থা সম্পর্কে কিছু জানেন না।

পাবনার আজমপুর শ্রমজীবী উন্নয়ন সংস্থা ২০১৮ সালে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছিল। এবারও তাদের নাম তালিকায় আছে। তবে এখন এই সংস্থার তেমন কোনো কার্যক্রম নেই।

নির্বাচনের আগে লোক নিয়োগ করা হবে

তালিকায় থাকা ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার হিউম্যান ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (হিডস) নামের প্রতিষ্ঠানটির কোনো ধরনের কার্যক্রম নেই। নামমাত্র একটি কার্যালয় আর সাইনবোর্ড থাকলেও কোনো কর্মী নেই। সারা বছর সে কার্যালয়ে ঝুলে থাকে তালা।

প্রথম আলো প্রতিনিধি গত বুধবার বেলা ১১টায় ওই কার্যালয়ে গিয়ে তালাবদ্ধ দেখতে পান। এক ঘণ্টা অবস্থান করেও কাউকে সেখানে দেখা যায়নি। স্থানীয় অন্তত ১০ জন মানুষের সঙ্গে হিডসের কার্যক্রম বিষয়ে জানতে চাইলে তাঁদের কেউই সংস্থাটির কোনো কার্যক্রমের কথা জানেন না বলে জানান। তবে সাইবোর্ডে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৯৪ সাল লেখা। হিডসের সাইনবোর্ড ঝোলানো ঘরটি কখনোই খোলা দেখেননি বলে জানান আলাল উদ্দিন নামের স্থানীয় একজন বাসিন্দা।

মুক্তাগাছা উপজেলা সদর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে মইষাদিয়া গ্রামে হিডসের প্রতিষ্ঠাতা রুহুল আমিনের বাড়ি। তবে তিনি থাকেন ঢাকায়। প্রথম আলোর প্রশ্নের জবাবে রুহুল আমিন বলেন, এর আগে মুক্তাগাছার কয়েকটি ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন তাঁরা। তখন কিছু লোক নিয়োগ করা হয়েছিল। এবারও তিনি শুধু মুক্তগাছায় কাজ করবেন। নির্বাচনের আগে এ কাজের জন্য কিছু লোক নিয়োগ দেওয়া হবে। ঢাকায় তাঁর সংস্থার কার্যালয় আছে বলে তিনি দাবি করেন।

রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা

পর্যবেক্ষক নীতিমালায় বলা আছে, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন বা আছেন কিংবা নিবন্ধনের জন্য আবেদন করার সময়ের মধ্যে কোনো নির্বাচনের প্রার্থী হতে আগ্রহী কোনো ব্যক্তি যদি আবেদনকারী কোনো সংস্থার প্রধান নির্বাহী কিংবা পরিচালনা পর্ষদের বা ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য হয়ে থাকেন, তাহলে ওই সংস্থাকে নিবন্ধন দেওয়া হবে না।

তবে ইসি যে তালিকা প্রকাশ করেছে, সেখানে এমন সংস্থাও আছে, যার প্রধান নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। যেমন ফরিদপুরের হাইলাইট ফাউন্ডেশনের প্রধান মো. সহিদুল ইসলাম। তিনি ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে ভাঙ্গা উপজেলায় (তৎকালীন ফরিদপুর-৫) লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন। মো. সহিদুল ইসলাম দাবি করেন, বর্তমানে রাজনীতির সঙ্গে তাঁর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তিনি একজন সমাজসেবক। তিনি বলেন, ২০১১ সালে তাঁর সংস্থা নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষক হিসেবে নিবন্ধিত হয়। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন তাঁরা পর্যবেক্ষণ করেন। তবে মো. সহিদুল ইসলামের পরিবারের সদস্যরা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাঁর ভাই মো. শরিফুজ্জামান ভাঙ্গা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।

জামালপুরের সংস্থা এসডিওর সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম শরীফপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি। ওই সংস্থার কোনো কার্যক্রম নেই। স্থানীয় লোকজন এই সংস্থা সম্পর্কে কিছুই জানেন না।

সরাসরি নিবন্ধিত দলের সঙ্গে না হলেও নিবন্ধিত দলের অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাদের সংস্থাও ইসির তালিকায় আছে। তেমন একটি সংস্থা ‘শিশু প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্র’। সংস্থাটির সভাপতি মো. মিজানুর রহমান ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। রাজশাহীর স্বাস্থ্য শিক্ষা সেবা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আর কে দত্ত রূপন। তিনি রাজশাহী মহানগর তাঁতী লীগের সহসভাপতি। আর কে দত্তের দাবি, তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় নন। তবে ইসির কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের সংস্থাকে নিবন্ধন দেওয়া নীতিমালার লঙ্ঘন নয়।

আবার এমন কিছু সংস্থাও ইসির তালিকায় আছে, যেগুলোর নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের নিকটাত্মীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আবদুল মোমেন খান মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রোকসানা খন্দকার। তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানের স্ত্রী। ডেমোক্রেসি ওয়াচের নির্বাহী পরিচালক তালেয়া রহমান। সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত না হলেও তাঁর স্বামী শফিক রেহমান বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তবে এই দুটি সংস্থা সুপরিচিত। ২০১৫ সালে পৌরসভা নির্বাচনের আগে খান ফাউন্ডেশন ও ডেমোক্রেসি ওয়াচের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ এনে ইসিতে আপত্তি দিয়েছিল আওয়ামী লীগ।

ফরিদপুরে ‘এসো জাতি গড়ি’ নামের সংস্থার নির্বাহী পরিচালক নাজমা আক্তার। তাঁর বাবা প্রয়াত নেজায়েতুল্লা বিএনপির নেতা ছিলেন। তাঁর ভাই মো. আহসানউল্লাহ ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর বোন নাজনীন আক্তার ফরিদপুর পৌরসভার সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর এবং জেলা কৃষক লীগের যুগ্ম সম্পাদক।

২০১৮ সালের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নাজমা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর দেখামতে ওই নির্বাচন অত্যন্ত সুন্দর হয়েছে। তিনি কোনো রাজনীতি করেন না। তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ধ্যান ও জ্ঞান।

যশোরে ‘বাঁচতে শেখা’ সংস্থার পরিচালনা পর্ষদের কোষাধ্যক্ষ মো. শাহজাহানের ভাই নাসির উদ্দীন যশোর-২ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য। অন্যদিকে দিনাজপুরের সংস্থা বেসিকের নির্বাহী পরিচালক শ্যামল চন্দ্র সরকার কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ছাত্রমৈত্রীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বাসায় নির্বাচন প্রশ্নে তিন শীর্ষ দলের বৈঠক

১৩ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি এবং সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির নেতাদের সঙ্গে চা–চক্রে যোগ দেন বাংলাদেশে সফররত যুক্তরাষ্ট্রের দুই কংগ্রেসম্যান।

আজ রোববার বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের গুলশানের বাসায় এ চা–চক্র অনুষ্ঠিত হয়। বিকেল চারটা থেকে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত এ চা–চক্র চলে।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদলে ছিলেন দলটির অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক ও সংসদ সদস্য ওয়াসিকা আয়শা খান, নাহিম রাজ্জাক ও তামান্না নুসরাত। তিনজনই সংসদ সদস্য। অন্যদিকে বিএনপির প্রতিনিধিদলে ছিলেন দলটির প্রচার সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। জাতীয় পার্টির প্রতিনিধিদলে ছিলেন তিন সংসদ সদস্য—শেরিফা কাদের, রানা মোহাম্মদ সোহেল ও নাজমা আকতার।

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার কংগ্রেসম্যান (রিপাবলিকান) রিক ম্যাক্রোরমিক ও হাওয়াইয়ের কংগ্রেসম্যান (ডেমোক্র্যাট) এড কেইস ছাড়াও চা–চক্রে রাষ্ট্রদূত পিটার হাস উপস্থিত ছিলেন।

চা–চক্রে উপস্থিত সূত্র বলছে, বিএনপির পক্ষ থেকে শহীদ উদ্দীন চৌধুরী বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে না উল্লেখ করে তাঁদের দলের অবস্থান তুলে ধরেন। একই সঙ্গে দলটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবে না বলেও ওই বৈঠকে জানান তিনি। তাঁর অভিযোগ ছিল, দেশে এক ব্যক্তির শাসন চলছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শহীদ উদ্দীন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়—এটাই তাঁরা সেখানে বলেছেন। কেন আজকে এক দফা দাবির আন্দোলনে নামতে হয়েছে, এর প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন।

এদিকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়, সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো বিধান রাখা সম্ভব নয়।

সূত্র জানায়, বৈঠকে কংগ্রেসম্যান এড কেইস আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদলকে বলেন, শুধু তোমাদের দেশে নয়, সারা পৃথিবীর কাছে অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে হবে। জবাবে আওয়ামী লীগ নেতারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ হিসেবে তাঁদের আসার জন্য আমন্ত্রণ জানান। একই সঙ্গে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতির কথা জানান।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব কী কারণে, সেই বিষয়টি তুলে ধরেন দুই কংগ্রেসম্যান। এর মধ্যে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইন্দো-প্যাসিফিকে অঞ্চলে বাংলাদেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ, একই সঙ্গে বাংলাদেশের জনসংখ্যা। সারা পৃথিবীতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা কমে যাচ্ছে, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে যেন গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় থাকে, সেটা চায় আমেরিকা।

আইনের মাধ্যমে সরকার নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করেছে বলে মার্কিন প্রতিনিধিদলকে জানান আওয়ামী লীগের এক সদস্য। তিনি আরও বলেন, সামনের অধিবেশনে আরেকটি আইন আসবে। সেখানে নির্বাচনের সময়ে বিশৃঙ্খলা করা বা বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান রাখা হবে।

জাতীয় পার্টির শেরিফা কাদের প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা সব সময় যা বলেন, একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন দরকার এবং নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ যাতে নিশ্চিত হয়, সেটাই তাঁরা বলেছেন।

শোক দিবসের অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রীর জন্য ভোট চাইলেন ওসি

১৫ আগস্ট ২৩, সমকাল

কুমিল্লায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৮তম শাহাদাত বার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবসের আলোচনা সভায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের জন্য ভোট চেয়েছেন নাঙ্গলকোট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফারুক আহমেদ।

মঙ্গলবার দুপুরে নাঙ্গলকোট উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও অর্থমন্ত্রীর জন্য ভোট চান ওসি। উপজেলা প্রশাসন জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করে।

ওসির ভোট চাওয়ার বক্তব্যের ২৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফুটেজ ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।

‘আওয়ামী লীগ আমাদের দল’ ভোট চাইলেন ওসি

আগস্ট ২৪, ২০২৩, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

আওয়ামী লীগকে ‘নিজের দল’ উল্লেখ করে আগামী নির্বাচনে দলকে জেতাতে কাজ করতে বলেছেন জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ মডেল থানার ওসি শ্যামল চন্দ্র ধর।

জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় ওসির এমন বক্তব্যের একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে গেছে।

গত ১৫ আগস্ট দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার আয়োজনে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

দেওয়ানগঞ্জ পৌর মেয়র শেখ মোহাম্মদ নুরুন্নবী অপুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ।

অনুষ্ঠানে দেওয়ানগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শ্যামল চন্দ্র ধরও বক্তব্য রাখেন।

বক্তব্যে তিনি সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদকে ‘দেওয়ানগঞ্জ-বকশিগঞ্জ মানুষের নয়নের মনি’ বলে উল্লেখ করেন।

বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘সামনে নির্বাচন আসছে। আমরা দলের জন্য কাজ করি, যেন আমরা পুনরায় আওয়ামী লীগ সরকারকে বিপুল ভোটে জয়ী করতে পারি।’

বিচারের আগেই কারাগারে খাদিজার এক বছর

২৭ আগস্ট ২৩, সমকাল

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে পুলিশের দায়ের করা দুই মামলায় বিচার শুরুর আগেই এক বছর ধরে কারাগারে বন্দি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী খাদিজাতুল কুবরা। অথচ যে আইনে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে, সেই আইনটিই বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিচার শেষ হওয়ার আগে খাদিজার এক বছরের কারাবাস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

২০২০ সালে খাদিজার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। দুই বছর পর গত বছরের ২৭ আগস্ট পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তিন থেকে সাত বছরের সাজা হতে পারে। বিশিষ্টজন বলেছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের দুর্বলতা এটিই। বিচার শেষ হওয়ার আগে চাইলেই অজামিনযোগ্য ধারায় যে কাউকে দীর্ঘদিন কারাগারে রাখা যায়। এটি আইনের শাসনের পরিপন্থি।

ভিন্নমত দমনে জোর, অপরাধ ঠেকাতে নয়

৩১ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

অনলাইনে ঘাঁটাঘাঁটির সময় অনেকের মুঠোফোনের পর্দায় ভেসে আসছে ‘সান ওয়ালেট–সিকিউর লোন’ নামের একটি অ্যাপের বিজ্ঞাপন। অ্যাপটি মানুষকে ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। তা ডাউনলোড করলে মুঠোফোনে মানুষের সব ধরনের তথ্যে প্রবেশের অনুমতি দিতে হয়। এমনকি ছবি ও ভিডিওতেও।

গুগল প্লে স্টোরে অ্যাপটির রিভিউতে (মূল্যায়ন) একজন নারী লিখেছেন, তিনি ঋণ নিয়ে যথাসময়ে পরিশোধ করেছেন। কিন্তু তাঁর কাছ থেকে এখন বাড়তি টাকা চাওয়া হচ্ছে। তাঁর ব্যক্তিগত তথ্য ও উপাত্ত নিয়ে প্রতারণা (ব্ল্যাকমেল) করা হচ্ছে। তিনি বলেন, অ্যাপটি সরল মানুষের জন্য একটি ফাঁদ।

দেশে অ্যাপ ব্যবহার করে অনুমতি ছাড়া ঋণ দেওয়া নিষিদ্ধ। কিন্তু ডিজিটাল জগতে এভাবে অ্যাপের মাধ্যমে, বিজ্ঞাপন দিয়ে ও গ্রুপ খুলে ঋণ বিতরণ, বৈদেশিক মুদ্রার অবৈধ লেনদেন, জুয়া, জাল নোটের কেনাবেচা, নিষিদ্ধ ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেনসহ নানা ধরনের অপরাধ চলছে। এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারি সংস্থাগুলোর নজরদারি সামান্য, বেশি নজর সরকারবিরোধিতা ঠেকাতে।

যেমন গুগলের কাছে সরকার আধেয় সরানোর জন্য যেসব অনুরোধ করেছে, তার প্রায় ৯০ শতাংশ সরকারের সমালোচনা ও মানহানিবিষয়ক। যদিও গুগল বেশির ভাগ অনুরোধ রাখেনি। এদিকে ডিজিটাল জগৎকে ব্যবহার করে অপরাধমূলক আধেয় সরাতে অনুরোধ কম। এই সুযোগে ডিজিটাল প্রতারণার বড় বড় ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ (এমটিএফই) গ্রুপ ইনকরপোরেটেড নামের একটি বহুস্তর বিপণন বা মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানি দেশের হাজার হাজার মানুষের কাছ কোটি কোটি টাকা নিয়ে সটকে পড়েছে।

সরকারের ইচ্ছার বাইরে যাওয়া জাতীয় পার্টির জন্য কঠিন

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

সংসদ নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, জাতীয় পার্টিতে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব নিয়ে দুই শীর্ষ নেতা রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরের অনুসারীদের মধ্যে বিরোধ ততই বেড়ে চলেছে। প্রায় দেড় দশক ধরে সরকারের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে চলা জাতীয় পার্টির (জাপা) দুই অংশই এখন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলছে।

ক্ষমতার বাইরে থাকতে চান না জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতারা—এমন আলোচনা দলের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। আবার সরকারের ইচ্ছার বাইরে যাওয়া জাতীয় পার্টির জন্য কঠিন—এই বাস্তবতার কথাও বলছেন নেতাদের অনেকে।

জি এম কাদেরের পক্ষের নেতারা জানিয়েছেন, তাঁরা ৩০০ আসনে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং দেশে চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে সংলাপ বা আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার জন্য তাঁরা সরকারকে বার্তা দিয়েছেন।

পুরোনো মামলা চাঙ্গা, যোগ হচ্ছে নতুনও

০৫ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র চার মাস। এ সময় নির্বাচনী আমেজের মধ্যেই থাকার কথা সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর। অতীতে এ রকম সময়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকত জনপদ। তবে এবারের চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। ক্ষমতাসীন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা নির্বাচনী এলাকায় নানাভাবে গণসংযোগ চালিয়ে গেলেও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নেতাকর্মী আছেন ‘দৌড়ের’ মধ্যে। দলটির নেতাকর্মীর প্রতিদিনের রোজনামচা আদালতের বারান্দা, এজলাস কিংবা আইনজীবীর কক্ষ ঘিরে আবর্তিত হয়। কর্মদিবসের শুরুটাই হয় আদালতপাড়ায়। দলের শীর্ষ নেতা থেকে তৃণমূল– সবার একই অবস্থা। প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই রয়েছে ডজন ডজন মামলা; অনেক নেতার বিরুদ্ধে শত শত।

স্বাধীনতার পর দেশের বড় কোনো রাজনৈতিক দলের মহাসচিবের বিরুদ্ধে মামলায়ও ‘রেকর্ড’ হয়েছে। বর্তমানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধেই মামলা রয়েছে ৯৩টি। আর সর্বোচ্চ ৪৫১টি মামলা হয়েছে দলের যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের বিরুদ্ধে।

৩৬ দিনে এক জামালপুর জেলায় বিএনপির নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে ৩০ ‘গায়েবি মামলা’

০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

গত ২৯ আগস্ট রাতে আটক হন জামালপুর শহর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মমিনুর রহমান। পরের দিন নাশকতার মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। ২ সেপ্টেম্বর অপর একটি মামলায় আসামি করা হয় মমিনুরকে। সেই মামলার এজাহার বলছে, ১ সেপ্টেম্বর রাতে নাশকতার উদ্দেশ্যে জামালপুর শহরের একটি মাঠে গিয়েছিলেন মমিনুর।

 ডিবি পুলিশের করা মামলার এজাহার ঠিক থাকলে মমিনুর কারাগার থেকে বেরিয়ে গিয়ে নাশকতার উদ্দেশ্যে গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। বাস্তবে মমিনুর তখনো কারাগারে ছিলেন, এখনো কারাগারেই আছেন।

 জানতে চাইলে জামালপুর কারাগারের জেলার আবু ফাতাহ ৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, চার দিন ধরে (৩০ আগস্ট থেকে) বিএনপির নেতা মমিনুর রহমান কারাগারেই আছেন।

কারাগারে থাকা মমিনুর কীভাবে নাশকতার চেষ্টা করলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে জামালপুর গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ওসি মুশফিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর (মমিনুর) নামে দুটি মামলা আছে। আগের মামলায় তাঁর বাবার নাম মৃত শাহ ফিরোজ মিয়া ও গ্রাম ফুলবাড়ীয়া (জিগাতলা) উল্লেখ করা হয়েছে। আর পরের মামলায় বাবার নাম মৃত ফিরোজ মিয়া, গ্রাম শুধু জিগাতলা উল্লেখ আছে। ফলে একই ব্যক্তির নাম কি না, বিষয়টি তাঁরা যাচাই-বাছাই করছেন।

সহিংসতা ও নাশকতার চেষ্টার অভিযোগ এনে মমিনুরের মতো জামালপুরে বিএনপির দুই হাজারের বেশি নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে গত ৩৬ দিনে কমপক্ষে ৩০টি মামলা হয়েছে। বিএনপির নেতাদের দাবি, এর সবই ‘গায়েবি মামলা’। অর্থাৎ ঘটনা ঘটেনি, তারপরও মামলা দেওয়া হয়েছে। যার কারণে প্রায় সব মামলার বিবরণ ও ধারা প্রায় একই রকম। মূলত দলটির নেতা-কর্মীদের শায়েস্তা করতেই কথিত এসব মামলা দেওয়া হচ্ছে।

গত ২৯ জুলাই থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশ বাদী হয়ে জামালপুর সদরসহ সাতটি উপজেলায় মামলাগুলো করেছে। এসব মামলায় আসামি হিসেবে বিএনপির ৬৫১ নেতা-কর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আর অজ্ঞাতনামা আসামি ১ হাজার ৫৯১ জন।

মামলায় উল্লেখ করা ১০টি ঘটনাস্থল ১, ২ ও ৩ সেপ্টেম্বর ঘুরে দেখেছেন প্রথম আলোর দুই প্রতিনিধি। স্থানীয় লোকজন, প্রত্যক্ষদর্শী ও কয়েকজন সাক্ষীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘটনাস্থলে যানবাহন ভাঙচুর বা নাশকতার চেষ্টার মতো কোনো ঘটনাতো দূরে থাক, বিএনপির নেতা-কর্মী কিংবা লোকজনকে সেসব স্থানে জমায়েত হতেও দেখেননি তাঁরা।

সরকারের প্রশংসা করে লেখা অনেক লেখকের অস্তিত্ব নেই

০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন নীতির প্রশংসা করে অনেক ‘নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের’ শত শত নিবন্ধ নানা সময় জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ ও প্রচার করা হয়েছে। তবে এসব লেখকের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংবাদ সংস্থা এএফপির এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব বিশেষজ্ঞ লেখকের অনেকের বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। এমনকি নিবন্ধে তাঁদের ভুয়া ছবি ব্যবহারের কথাও জানা গেছে।

পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, আগামী জানুয়ারিতে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের আগে ‘অস্তিত্বহীন বিশেষজ্ঞদের’ এসব নিবন্ধ ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার অবিরাম প্রচারণার অংশ। সেই সঙ্গে এই প্রক্রিয়াকে শেখ হাসিনার সরকারকে লাভবান করার উদ্যোগ বলেও মনে করছেন তাঁরা।

এসব নিবন্ধ চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা সিনহুয়াসহ এশিয়াজুড়ে বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে এসব নিবন্ধে ওয়াশিংটনভিত্তিক ফরেন পলিসি সাময়িকীর সাউথ এশিয়া ব্রিফের বরাত দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনা সরকারের সমালোচক এবং রাজনৈতিক ভিন্ন মতাবলম্বীদের দমনের চেষ্টায় উদ্বেগ জানিয়ে আসছে।

এএফপির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের কয়েকজন নিয়মিতভাবে বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসা করে মতামত–নিবন্ধ লিখছেন ও প্রকাশ করছেন। তাঁদের অনেকে নিজেদের পশ্চিমা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদ হিসেবে পরিচয় দেন। কেউ কেউ চুরি করা হেডশট ছবি (নিবন্ধে ব্যবহার করা লেখকের ছবি) ব্যবহার করেছেন। কেউবা অন্য বিশেষজ্ঞ বা বিশ্লেষকের মন্তব্য থেকে ভুয়া উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন।

এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আ-আল মামুন এএফপিকে বলেন, ‘এটি সমন্বিতভাবে প্রভাব খাটানোর একটি চেষ্টা। কেননা এসব নিবন্ধের মূল বক্তব্যই হলো বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সরকারের অনুকূলে বয়ান তৈরি করা।’

এসব নিবন্ধের বেশ কিছু গত বছরের সেপ্টেম্বরে অনলাইনে প্রকাশ করা হয়েছে। ওই সময়টাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ‘নেতিবাচক প্রচারণা’ রুখতে ‘ভালো কলাম লেখকদের’ এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন নীতির প্রশংসা করে অনেক ‘অস্তিত্বহীন বিশেষজ্ঞের’ নিবন্ধের বিষয়ে জানতে পররাষ্ট্র ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে এএফপির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তবে তাঁরা কোনো উত্তর দেননি।

এসব লেখকের সম্পর্কে জানতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে মন্তব্য করার জন্য তাঁর হাতে পর্যাপ্ত সময় নেই।

নামের অস্তিত্ব নেই

সাত শতাধিক নিবন্ধ বিশ্লেষণ করে দেখেছে এএফপি। এসব নিবন্ধ ৬০টির বেশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। নিজ নামে লিখেছেন ৩৫ জন ‘বিশেষজ্ঞ–বিশ্লেষক’। গত বছরই প্রথম এঁদের বেশির ভাগেরই জীবনে প্রথম লেখা অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁদের নিবন্ধের অনেকগুলো বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন ওয়েবসাইটেও আপলোড করা হয়েছে।

এই ৩৫ লেখকের অনেকেই কট্টর চীনপন্থী। নিজেদের নিবন্ধে ওয়াশিংটনের তীব্র সমালোচনা করেছেন তাঁরা। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে ঢাকাকে পশ্চিমাদের সতর্ক করে দেওয়ার বিষয়টি নিবন্ধে উঠে এসেছে।

যদিও এএফপির অনুসন্ধানে এই ৩৫ জন বিশেষজ্ঞ লেখকের বাস্তবে অস্তিত্ব রয়েছে কি না, তা সঠিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে দেখা গেছে, তাঁদের লেখা কোনো নিবন্ধ গত বছরই প্রথম অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের কারোরই অস্তিত্ব নেই। বিশ্বের স্বীকৃত কোনো জার্নালে তাঁদের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়নি।

অনুসন্ধানে ওই ৩৫ জন বিশেষজ্ঞ লেখকের মধ্যে ১৭ জন নিজেদের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন পশ্চিমা ও এশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে পরিচয় দিয়েছেন। তবে এএফপির অনুসন্ধানী প্রতিবেদকেরা এর কোনো সত্যতা খুঁজে পাননি।

এর মধ্যে নয়জন বিশেষজ্ঞ লেখক নিজেদের বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত বলে পরিচয় দিয়েছেন। এ তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়ার ইউনিভার্সিটি, কানাডার টরেন্টো ইউনিভার্সিটি, সুইজারল্যান্ডের লুসার্ন ইউনিভার্সিটি এবং সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মতো বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তবে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা এসব লেখককে চেনে না। তাদের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এসব নামের কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততা নেই।

সন্দেহভাজন এক লেখকের বিষয়ে জানতে এএফপির পক্ষ থেকে ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। জবাবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ‘আমরা আমাদের নথিপত্র ঘেঁটে দেখেছি, এই নামের কেউ আমাদের নথিপত্রে নেই।’

তথাকথিত আটজন লেখক নিবন্ধে নিজেদের যে ছবি ব্যবহার করেছেন, তা ভুয়া—অনুসন্ধানে এমনটাই জানিয়েছে এএফপি। এসব নিবন্ধে জনপ্রিয় ফ্যাশন ইনফ্লুয়েন্সারসহ ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করা অন্য মানুষের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

এমনকি এএফপির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একই নিবন্ধ ইংরেজি ও বাংলায় ভিন্ন লেখকের নাম ব্যবহার করে প্রকাশ করা হয়েছে।

এসব লেখকের মধ্যে একজনের নাম ব্যবহার করা হয়েছে ডরিন চৌধুরী। বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন নীতির প্রশংসা করে তাঁর লেখা অন্তত ৬০টি নিবন্ধ অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে। এসব নিবন্ধে তিনি চীনের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রশংসা করেছেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে একের পর এক বন্দুক হামলা নিয়েও নিবন্ধ লিখেছেন তিনি। বলেছেন, এসব হামলার কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।

লেখকের নামের পাশে ডরিন চৌধুরীর যে ছবি প্রকাশ করা হয়েছে, তা ভুয়া। ওই ছবি ভারতীয় একজন অভিনেতার। নিজের পরিচয় হিসেবে ডরিন চৌধুরী বলেছেন, তিনি নেদারল্যান্ডসের গ্রোনিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন। কিন্তু ওই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই নামে তাদের কোনো নিবন্ধিত শিক্ষার্থী নেই।

সম্পূর্ণ বানোয়াট

সংবাদমাধ্যম ব্যাংকক পোস্ট এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের একটি ব্লগ পোস্টে নিবন্ধ লিখেছেন ফুমিকা ইয়ামাদা। তিনি অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির বাংলাদেশ স্টাডিজের একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন। এএফপির অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই নামে মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটিতে নথিভুক্ত কেউ নেই। এমনকি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ স্টাডিজ বিষয়ে গবেষণার আলাদা কোনো ক্ষেত্র নেই।

নিবন্ধে শেখ হাসিনাকে একজন গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শক হিসেবে তুলে ধরেছেন ফুমিকা ইয়ামাদা। এমনকি গণতন্ত্র ও অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপের জন্য ওয়াশিংটনের তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি। তাঁর মতে, এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে।

এ ছাড়া অনেক নিবন্ধে কোনো বিশেষজ্ঞ–বিশ্লেষকের এমন মন্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে, যা ওই ব্যক্তি কখনোই বলেননি বা লিখেননি।

নেদারল্যান্ডসের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল স্টাডিজের অধ্যাপক জেরার্ড ম্যাককার্থি জানান, মিয়ানমারের পরিস্থিতি নিয়ে ‘পশ্চিমাদের দ্বিচারিতা’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এর লেখক পৃথ্বীরাজ চতুর্বেদী নামের একজন। ওই নিবন্ধে তাঁর (ম্যাককার্থি) একটি উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয়েছে। ম্যাককার্থির ভাষ্য, এ উদ্ধৃতি সম্পূর্ণ বানোয়াট।

মার্কিন দূতাবাসে পরিবারসহ আশ্রয় চেয়েছেন বরখাস্ত ডিএজি এমরান

সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৩, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ থেকে বরখাস্ত এমরান আহমেদ ভূঁইয়া বলেছেন, তিনি তার পরিবারসহ ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে আশ্রয় চেয়েছেন।

আজ শুক্রবার বিকেলে এক ক্ষুদেবার্তার মাধ্যমে তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য জানান।

ক্ষুদেবার্তায় তিনি বলেন, ‘আমি মার্কিন দূতাবাসে আজকে পুরো পরিবারসহ আশ্রয়ের জন্য বসে আছি। বাইরে পুলিশ। আজকে আমাকে চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে ……..। আমার ফেসবুক মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপে গত ৪-৫ দিন যাবত অনবরত হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে। এই সরকার ভালবাসার প্রতিদান দেয় জেল দিয়ে। আমার আমেরিকার কোনো ভিসা নেই। স্রেফ ৩টা ব্যাগে এক কাপড়ে আমার ৩ মেয়েসহ কোনোক্রমে বাসা থেকে বের হয়ে এখানে বসে আছি। দোয়া করবেন আমাদের জন্য।’

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এমরান আহম্মদ বরখাস্ত, প্রজ্ঞাপন জারি

৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩, মানবজমিন

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিচারিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে মন্তব্য করে আলোচনায় আসা ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এমরান আহম্মদ ভূঁইয়াকে বরখাস্ত করা হয়েছে। শুক্রবার আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর রুনা নাহিদ আকতার রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপন জারি করেন।

আইন, বিচার বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, The Bangladesh Law Officers order, 1972 (P.O.No.6 of 1972) এর ৪(১) অনুচ্ছেদ অনুসারে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জনাব এমরান আহম্মদ ভূঁইয়ার নিয়োগাদেশ জনস্বার্থে বাতিলক্রমে তাঁকে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল পদ থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হলো। এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।

এর আগে আজ সকালে আখাউড়া রেলওয়ে জংশন স্টেশনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এমরান আহমেদ ভূঁইয়াকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

এদিকে গত মঙ্গলবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছিলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিষয়ে বিবৃতি-সংক্রান্ত বক্তব্য দিয়ে এমরান আহম্মদ ভূঁইয়া শৃঙ্খলাভঙ্গ করেছেন। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

মঙ্গলবার দুপুরে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের ৫১১ নম্বর রুমের সামনে এমরান আহম্মদ ভূঁইয়ার নেমপ্লেট খুলে ফেলা হয়। পাশাপাশি তার কক্ষে থাকা মামলার সব ফাইল সরিয়ে নেয় অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা।

জামালপুরের ডিসি বললেন, আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় আনতে হবে

১২ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে আওয়ামী লীগ সরকারকে পুনরায় নির্বাচিত করে ক্ষমতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন জামালপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. ইমরান আহমেদ। জামালপুরের মাদারগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান। একই সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্য মির্জা আজমকে আগামী নির্বাচনের পর মন্ত্রী হিসেবে দেখার আশাও প্রকাশ করেন তিনি।

জামালপুরের মাদারগঞ্জ পৌরসভার নবনির্মিত ভবনের উদ্বোধন উপলক্ষে গতকাল সোমবার বিকেলে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জামালপুর-৩ (মাদারগঞ্জ-মেলান্দহ) আসনের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম। সভায় জামালপুরের পুলিশ সুপার মো. কামরুজ্জামানও উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া সভায় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

মার্কিন সংস্থার জরিপ: গণতান্ত্রিক শাসনের পক্ষে দেশের ৯১% মানুষ 

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

বাংলাদেশের মানুষ গণতান্ত্রিক শাসনের পক্ষে। জনগণ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চান। মানবাধিকারকে বিশ্বের কল্যাণের জন্য একটি বড় শক্তি হিসেবে মনে করেন এ দেশের বেশির ভাগ নাগরিক।

বাংলাদেশের মানুষের এই অবস্থান উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন নামের একটি অলাভজনক সংস্থার জরিপে। ‘ওপেন সোসাইটি ব্যারোমিটার: ক্যান ডেমোক্রেসি ডেলিভার?’ শীর্ষক জরিপটি এ মাসে প্রকাশ করা হয়।

বাংলাদেশসহ ৩০টি দেশের ৩৬ হাজার ৩৪৪ জনের অংশগ্রহণে জরিপটি করা হয়েছে। প্রতিটি দেশে গড়ে ১ হাজার জন জরিপে অংশ নেন।

ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা মার্কিন ধনকুবের জর্জ সরোস, যিনি একজন দানশীল ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন ন্যায়বিচার, গণতান্ত্রিক শাসন ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে।

জরিপে প্রশ্নের উত্তরে ৯১ শতাংশ বাংলাদেশি বলেছেন গণতান্ত্রিকভাবে শাসিত একটি দেশে বাস করা তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো সরকারকাঠামোর চেয়ে গণতন্ত্রকে বাংলাদেশের ৫৯ শতাংশ মানুষ পছন্দ করেন। মানবাধিকার প্রশ্নে বাংলাদেশের ৮৮ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, বিশ্বের কল্যাণের জন্য মানবাধিকার একটি বড় শক্তি।

জরিপ প্রতিবেদনের মুখবন্ধে ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট মার্ক মালোক-ব্রাউন বলেছেন, গণতন্ত্রের ক্ষয় নিয়ে যেসব কথা বলা হচ্ছে, তা অতিরঞ্জিত। আসলে গণতন্ত্রের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। তিনি বলেন, গণতন্ত্র বড় যে হুমকিতে রয়েছে, তা কর্তৃত্ববাদের কারণে নয়, বরং রাজনৈতিক নেতারা জনগণকে কতটা দিতে পারছেন, সেটিই বড় বিষয়।

কোন কোন দেশের ওপর জরিপ

জরিপটি করা হয়েছে আর্জেন্টিনা, বাংলাদেশ, ব্রাজিল, চীন, কলম্বিয়া, মিসর, ইথিওপিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, ঘানা, ভারত, ইতালি, জাপান, কেনিয়া, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, পোল্যান্ড, রাশিয়া, সৌদি আরব, সেনেগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা, তিউনিসিয়া, তুরস্ক, ইউক্রেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের ওপর।

জরিপে অংশগ্রহণকারীরা প্রাপ্তবয়স্ক। চলতি বছরের ১৮ মে থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপে গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, সমতা, ন্যায়বিচার, জনগণের চাওয়া, অর্থনীতি, ক্ষমতা ও রাজনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি নানা বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়।

গণতন্ত্র, রাজনৈতিক অধিকার ও মানবাধিকার

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতি উচ্চ সমর্থন জানিয়েছেন জরিপে আসা প্রায় সব কটি দেশের মানুষ। যেমন চীনের ৯৫ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, গণতান্ত্রিক শাসনের মধ্যে বাস করা তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার ক্ষেত্রে হারটি ৬৫ শতাংশ এবং এটাই জরিপে আসা দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম।

বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারতের ৯৩, শ্রীলঙ্কার ৮৫, পাকিস্তানের ৭৯ এবং মালয়েশিয়ার ৮৭ শতাংশ মানুষ গণতান্ত্রিক শাসনের পক্ষে।

■ ৩০টি দেশকে নিয়ে জরিপটি করা হয়েছে।

■ বাংলাদেশ অনন্য। কারণ, এ দেশের মানুষ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

জরিপে গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, সমতা, ন্যায়বিচার, জনগণের চাওয়া, অর্থনীতি, ক্ষমতা ও রাজনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি নানা বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়।

জরিপ প্রতিবেদনে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বলতে বোঝানো হয়েছে ভোটাধিকার, ন্যায়বিচার, বাক্‌স্বাধীনতা সুরক্ষা এবং নির্যাতন ও বৈষম্য বন্ধ করাকে। প্রশ্ন করা হয়েছিল, কোন অধিকার আপনার কাছে বেশি জরুরি? জবাবে বাংলাদেশের ৩৬ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তাঁদের কাছে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ২৮ শতাংশের কাছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার, ১৭ শতাংশের কাছে পরিবেশগত অধিকার এবং ১৩ শতাংশের কাছে ডিজিটাল জগতের অধিকার বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

জরিপ প্রতিবেদনে আলাদাভাবে বলা হয়, দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ এ কারণে অনন্য যে এই দেশের বেশিসংখ্যক উত্তরদাতা অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের চেয়ে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

জরিপে উত্তরদাতাদের কাছে প্রশ্ন ছিল, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে শাস্তি দেওয়ার জন্য পশ্চিমাদের দ্বারা মানবাধিকারকে ব্যবহার করা হয় কি না—এই প্রশ্নে একমত বাংলাদেশের ৭৬ শতাংশ উত্তরদাতা।

অবশ্য জরিপ প্রতিবেদনে এ–ও উঠে আসে যে যখন অধিকার ক্ষুণ্ন হয়, তখন মানুষ জবাবদিহি চায়। মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, ব্যাংক হিসাব জব্দ করার মাধ্যমে জবাবদিহির আওতায় আনাকে বেশি সমর্থন করেছে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলো। সমর্থনের হার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে—৭৯ শতাংশ। এরপরে রয়েছে নাইজেরিয়া ৭৮, মিসর ৭৪, ইথিওপিয়া ও কেনিয়া ৭৩ এবং পাকিস্তান ৭২ শতাংশ।

রাজনৈতিক সহিংসতার আশঙ্কায় মানুষ

আগামী বছর দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সহিংসতার আশঙ্কা করেন কি না, জরিপে উত্তরদাতাদের কাছে প্রশ্ন ছিল। জবাবে বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা সহিংসতার আশঙ্কা করেছেন। হারটি সবচেয়ে বেশি কেনিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায়—৭৯ শতাংশ।

জরিপে ৩০টি দেশের অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে গড়ে ৫৩ শতাংশ মনে করেছেন, তাঁদের দেশ ভুল পথে এগোচ্ছে। মোট ছয়টি বিষয়ে এই প্রশ্ন করা হয়েছিল। দেশভেদে সমস্যা ভিন্ন, তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দারিদ্র্য ও বৈষম্য ছিল বড় সমস্যা। যেমন বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের ৫২ শতাংশ করে উত্তরদাতা খাদ্যনিরাপত্তার উদ্বেগ নিয়ে একমত।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব, চীনের উত্থান

জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও চীনের উত্থান নিয়ে উত্তরদাতাদের কাছে প্রশ্ন করা হয়েছিল। একটি প্রশ্ন ছিল, ২০৩০ সাল নাগাদ কোন দেশের বেশি প্রভাব থাকবে। উত্তরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের নাম ছিল। ‘জানি না’ বলে উত্তর দেওয়ারও সুযোগ ছিল।

উত্তরদাতাদের মধ্যে গড়ে ৩২ শতাংশ মনে করেছেন চীনের প্রভাব বেশি থাকবে। আর ২৬ শতাংশ মনে করেছেন যুক্তরাষ্ট্রই থাকবে প্রভাবশালী। বাংলাদেশের উত্তরদাতাদের মধ্যে ২৭ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র প্রভাবশালী থাকবে বলে মনে করেন। চীন প্রভাবশালী হবে বলে মনে করেন ১৭ শতাংশ।

জরিপে আসা ৩০টি দেশের উত্তরদাতাদের মধ্যে ৪৫ শতাংশ মনে করেন, চীনের উত্থান তাঁদের দেশের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে ২৫ শতাংশ বলছেন, প্রভাব হবে নেতিবাচক। বাংলাদেশের ৬৩ শতাংশ মানুষ চীনের উত্থান ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন। নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন ১৪ শতাংশ।

অবশ্য জরিপে এ–ও উঠে এসেছে, উত্তরদাতাদের তিন-চতুর্থাংশের বেশি দেশের ঋণঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন।

গণতন্ত্র না কর্তৃত্ববাদ, কার্যকর কোনটি

জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করা, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, যুদ্ধে জেতা, সড়ক ও সেতু তৈরি, হাসপাতাল তৈরি, স্কুল প্রতিষ্ঠা, পরিবেশ রক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া, অপরাধ দমন এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা গণতন্ত্রের চেয়ে দক্ষ—এই বিশ্বাসের সঙ্গে একমত কি না, জানতে চাওয়া হয়েছিল উত্তরদাতাদের। বেশির ভাগ উত্তরদাতা বলেছেন, তাঁরা একমত নন।

এমনকি যেসব দেশে কর্তৃত্ববাদের প্রতি সহানুভূতিশীল মানুষ বেশি, সেসব দেশের মানুষও কর্তৃত্ববাদের পারদর্শিতা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেছেন। সড়ক ও সেতু নির্মাণে কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা দক্ষ—এই বিশ্বাসের সঙ্গে একমত নন ৭৯ শতাংশ উত্তরদাতা।

পুলিশের হাতে বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা

১৪ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি ও গ্রেপ্তারে পুলিশের ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তার হাতে ক্ষমতা রেখেই পাস হলো বহুল আলোচিত ‘সাইবার নিরাপত্তা বিল-২০২৩’। তবে কেউ মিথ্যা মামলা দায়ের করলে সেটিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে সাজার বিধান রাখা হয়েছে।

গতকাল বুধবার সংসদের বৈঠকে বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। বিলের ওপর আনা বিরোধী সদস্যদের জনমত যাচাই; বাছাই কমিটিতে প্রেরণ এবং সংশোধনী প্রস্তাব নিষ্পত্তি শেষে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।

বিলের বিভিন্ন ধারার সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় সদস্যরা বলেন, চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের স্বীকৃতি সংবিধানেই দেওয়া হয়েছে। অথচ এই বিলের বিভিন্ন ধারায় সংবিধানস্বীকৃত এসব অধিকার খর্ব করার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হয়েছে। একাধিক সদস্য বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার ও তল্লাশির বিধান সংশোধনের দাবি জানান। এসব সমালোচনার জবাবে প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, ‘চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংবিধানস্বীকৃত হলেও অবারিত নয়। স্বাধীনতা মানে অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করা নয়। আপনার স্বাধীনতা মানে যা ইচ্ছা তা বলা নয়; অন্যকে অসম্মান করা নয়। নারীকে অশ্লীল কথা বলা নয়। এসব বিষয় নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।’ তিনি বলেন, ‘আইনটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিরোধী  সদস্যরা একমত পোষণ করছেন। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরাপদ স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সাইবার নিরপত্তা আইনের বিকল্প নেই।’

দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন রহিত করে সরকার সাইবার নিরাপত্তা আইনের উদ্যোগ নেয়। গত ৫ সেপ্টেম্বর বিলটি সংসদে ওঠার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়। আইনটির খসড়া প্রকাশের পর থেকেই মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন বলে আসছে, সাইবার নিরাপত্তা আইনে আগের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মূল বিষয়বস্তু বহাল রয়েছে। এটি অপব্যবহারের আশঙ্কা ব্যক্ত করে তারা বলেন, প্রস্তাবিত আইনে কিছু ক্ষেত্রে সাজা কমানো ও জামিনযোগ্য ধারা বাড়ানো হলেও অপরাধের সংজ্ঞা সুনির্দিষ্ট করা হয়নি। ফলে মানুষকে হয়রানি করার সুযোগ থেকেই যাবে।

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ধারা ২৫ (মিথ্যা বা আপত্তিকর তথ্য প্রকাশ), ধারা ২৯ (মানহানিকর তথ্য প্রকাশ) এবং ধারা ৩১ (আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর শাস্তি) সাইবার নিরাপত্তা আইনের খসড়ায় অবিকৃত রয়েছে। ২৫ ধারায় ‘রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ও সুনাম ক্ষুণ্ন’-সংক্রান্ত কোনো ব্যাখ্যা না থাকায় এর অপব্যবহারের শঙ্কা রয়েছে।

এদিকে, পাস হওয়া বিলে মিথ্যা মামলা ও অভিযোগ দায়েরের অপরাধ ও দণ্ড নিয়ে নতুন একটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির ক্ষতিসাধনের অভিপ্রায়ে এই আইনের কোনো ধারায় মামলা বা অভিযোগ দায়ের করার জন্য ন্যায্য বা আইনানুগ কারণ না জেনেও মামলা বা অভিযোগ দায়ের করেন বা করান, তাহলে তা হবে একটি অপরাধ। এই অপরাধে মামলা বা অভিযোগ দায়েরকারী ব্যক্তি এবং যিনি অভিযোগ দায়ের করিয়েছেন, ওই ব্যক্তি মূল অপরাধটির জন্য যে দণ্ড নির্ধারিত রয়েছে সে দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। যদি এই আইনের একাধিক ধারায় কোনো মামলা বা অভিযোগ করেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট ধারায় বর্ণিত অপরাধগুলোর মধ্যে মূল অপরাধের জন্য যেটির দণ্ড বেশি হয়, সেটিই দণ্ডের পরিমাণ হিসেবে নির্ধারণ করা যাবে।

বিলে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনাল মিথ্যা মামলা ও অভিযোগ দায়েরের অপরাধে অভিযোগ গ্রহণ ও মামলার বিচার করতে পারবে।

বিলের ৪২ ধারায় বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে পুলিশকে। এই ধারায় সাব-ইন্সপেক্টর পর্যায়ের কর্মকর্তার পরিবর্তন এনে পুলিশ পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) পর্যায়ের কর্মকর্তাকে বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি ও গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই ধারাটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও ছিল। বিলের ৮ ধারায় ডিজিটাল মাধ্যম থেকে তথ্য-উপাত্ত অপসারণ ও ব্লক করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ সাপেক্ষে, বিশ্বাস করার কারণ থাকে যে’ হয় ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত দেশের বা দেশের কোনো অংশের সংহতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করে বা জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণার সঞ্চার করে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ওই তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করার জন্য মহাপরিচালকের মাধ্যমে বিটিআরসিকে অনুরোধ করতে পারবে।

অধিকারের আদিলুরের দুই বছরের কারাদণ্ড

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ৫৭ ধারার মামলায় মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান খানকে দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই মামলায় অধিকারের পরিচালক এ এস এম নাসির উদ্দিনকেও দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁদের ১০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক এ এম জুলফিকার হায়াত আজ বৃহস্পতিবার এ রায় ঘোষণা করেন। ওই ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

রায় ঘোষণার পর আদিলুর রহমান খান ও এ এস এম নাসির উদ্দিনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

কারাগারে নেওয়ার আগে প্রিজন ভ্যানে তোলার সময় আদিলুর রহমান খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি ন্যায়বিচার পাইনি। এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাব।’

আদিলুর রহমানের আইনজীবী মোহাম্মদ রুহুল আমিন ভূঁইয়াও প্রথম আলোকে বলেন, বিচারিক আদালত থেকে ন্যায়বিচার পাননি আদিলুর রহমান ও নাসির উদ্দিন। এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আবেদন করা হবে।

অপর দিকে রাষ্ট্রপক্ষের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর নজরুল ইসলাম বলেন, আসামিদের সাজা বৃদ্ধির জন্য উচ্চ আদালতে আবেদন করা হবে।

এ রায়ের প্রতিক্রিয়ায় মানবাধিকারকর্মী নূর খান প্রথম আলোকে বলেন, বিতর্কিত ৫৭ ধারায় আজ এক স্বনামধন্য অধিকারকর্মীকে সাজা দেওয়া হলো, যেটা মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

এ মামলায় গত ২৪ আগস্ট শুনানি শেষ হয়। সেদিন আদালত রায় ঘোষণার জন্য ৭ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেন। তবে সেদিন আদালত রায় ঘোষণা করেননি। রায় ঘোষণার জন্য ১৪ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেন।

২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান নিয়ে অসত্য ও বিকৃত তথ্য প্রচারের অভিযোগে আদিলুর রহমান খান ও নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। বিকৃত তথ্য প্রচারের মামলায় অধিকারের আদিলুর ২০১৩ সালের ১০ আগস্ট গ্রেপ্তার হন। পরে তাঁকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। ১১ আগস্ট আদালতের অনুমতি নিয়ে অধিকার কার্যালয়ে তল্লাশি চালিয়ে দুটি কম্পিউটার ও দুটি ল্যাপটপ জব্দ করা হয়।

সে বছরই ৪ সেপ্টেম্বর আদিলুর ও নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, আদিলুর ও নাসির উদ্দিন ৬১ জনের মৃত্যুর ‘বানোয়াট, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা’ তথ্যসংবলিত প্রতিবেদন তৈরি ও প্রচার করে জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি করেন, আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নের অপচেষ্টা চালান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকার ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি দেশে-বিদেশে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করেন।

পাশাপাশি তাঁরা মুসলমানদের মনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে বিরূপ মনোভাবের সৃষ্টি করেন, যা তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৭(১) ও (২) ধারায় অপরাধ।

আসামিরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে মুসলমানদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর এবং সরকারকে অন্য রাষ্ট্রের কাছে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চালান, যা দণ্ডবিধির ৫০৫ সি ও ডি এবং ৫০৫ এ ধারায় অপরাধ।

ওই মামলায় ২০১৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আদিলুর রহমান খান এবং এ এস এম নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেন ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল।

আদালতে প্রবেশ করছেন আদিলুর রহমান খান

আদালতে প্রবেশ করছেন আদিলুর রহমান খানছবি: দীপু মালাকার

আরও পড়ুন

মানবাধিকার রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের পুরস্কার পেলেন নূর খান

মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান নিয়ে ২০১৩ সালের ১০ জুন মানবাধিকার সংস্থা অধিকার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে শাপলা চত্বরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে ৬১ জন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়। এরপর ওই বছরের ১০ জুলাই তথ্য মন্ত্রণালয় অধিকারের তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদন ও ৬১ জনের নাম-ঠিকানা চেয়ে পাঠায়।

এরপর অধিকার সেই চিঠির জবাবে হতাহতের কোনো তালিকা না দিয়ে সরকারকে জানিয়েছিল, হাইকোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে এ ঘটনা তদন্তের জন্য নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করতে হবে। সেই কমিটির কাছে তারা তালিকা হস্তান্তর করবে।

ব্যবসায়ী সংগঠনে ভোট ‘উধাও’, বছরের পর বছর নেতৃত্বে সরকার–ঘনিষ্ঠরা

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা নির্বাচনে ভোট প্রায় ‘নাই’ হয়ে গেছে। জেলা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের সংগঠন জেলা চেম্বারগুলোর অধিকাংশের কমিটি হয়েছে ভোটাভুটি ছাড়া। পণ্যভিত্তিক সংগঠনগুলোতেও সমঝোতার মাধ্যমে কমিটি হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, অধিকাংশ জেলা ও পণ্যভিত্তিক ব্যবসায়ী সংগঠনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সরকার–ঘনিষ্ঠ কিংবা আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের পদধারী ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মধ্যে অনেকে বছরের পর বছর ধরে আঁকড়ে আছেন পদ। এর ফলে নিজ সংগঠনের নেতা নির্বাচন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা। আর ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রকৃত চিত্র নিয়েও ব্যবসায়ী সমাজে তেমন আলোচনা হচ্ছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভৈরবসহ দেশের ৬৩টি জেলা চেম্বারের মধ্যে ৪৩টিতে সর্বশেষ কমিটি হয়েছে কোনো রকমের ভোট ছাড়া। আর ভোট হয়েছে ১৭টিতে। ৩টিতে ভোটাভুটি নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে প্রশাসক বসেছে। ২৮টি জেলা চেম্বারের সভাপতি আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের পদে আছেন। ৬টি চেম্বারের সভাপতি পদে আছেন আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা। আবার ৫টি জেলা চেম্বারের সভাপতি নিকট আত্মীয় আওয়ামী লীগের নেতা। অন্যদিকে তিনটি জেলা চেম্বারের সভাপতি বিএনপির সাবেক নেতা আর দুটির সভাপতি জাতীয় পার্টির সাবেক নেতা।

অন্যদিকে নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ, আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব, প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিপিজিএমইসহ অনেক পণ্যভিত্তিক বড় সংগঠনে এখন আর ভোট হচ্ছে না। এমনকি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ে টানা দুই মেয়াদে ভোট হয়নি। সর্বশেষ গত জুলাইয়ের নির্বাচনে আংশিক পদে ভোট হয়েছে। শেষ পর্যন্ত যাঁরা পর্ষদে ঠাঁই পেয়েছেন, তাঁরা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা হতে পারলে স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়া, রাজনৈতিক দলের পদ পাওয়া, এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদেশ সফরে যাওয়ার সুযোগ হয়। নিজ নিজ ব্যবসার ক্ষেত্রেও সুবিধা হয়। এসব কারণে ব্যবসায়ীদের একটি অংশের মধ্যে যেকোনোভাবে নেতা হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন জেলায় রাজনৈতিক দলের নেতারাও ব্যবসায়ী সংগঠনের পদ দখলে রাখতে উদ্যোগী হয়ে উঠেছেন। সরকারি দলের ওপর মহল আবার নিজেদের স্বার্থে তাঁদের ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা করতে সমর্থন দিচ্ছে। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সব ধরনের নির্বাচনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সমঝোতার মাধ্যমেই অধিকাংশ কমিটি হচ্ছে।

এফবিসিসিআইয়ের সদ্য বিদায়ী সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, বেশির ভাগ জেলা চেম্বার ও পণ্যভিত্তিক ব্যবসায়িক সংগঠনে দেখা যায়, যাঁরা নেতৃত্বে আছেন, তাঁরাই থাকতে চান। ব্যবসায়ীদের কথা বলার জন্য এসব সংগঠনে নতুন নেতৃত্ব দরকার। সে জন্য দুই মেয়াদের বেশি নেতৃত্ব থাকা উচিত নয়। যোগ্য ব্যক্তিকে নেতৃত্বে আনতে হলে অবশ্যই বর্তমান নিয়মনীতিতে সংস্কার আনতে হবে। তিনি বলেন, নতুন বাণিজ্য সংগঠন আইন হওয়ার এক বছর না যেতেই সংশোধন করা হলো। অথচ আইনটি বাস্তবায়নের জন্য বিধিমালা করা হয়নি। কঠোর বিধিমালার মাধ্যমে ব্যবসায়ী সংগঠনের সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করা প্রয়োজন।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি ও সহসভাপতি কে হবেন, তা ঠিক করে দেয় সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে। বিগত বেশ কয়েকটি নির্বাচনে সভাপতি পদে সরকার-সমর্থিত প্রার্থীর বিপরীতে কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। ফলে ব্যবসায়ী মহলের আলোচনা হচ্ছে, এফবিসিসিআই সরকারের ব্যবসায়ী শাখা।

সর্বশেষ জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও পুরোপুরি ভোটের ধারায় ফিরতে পারেনি এফবিসিসিআই। আংশিক ভোট হয়েছে। যদিও সভাপতি কে হচ্ছেন, তা ভোটের আগেই চূড়ান্ত হয়ে যায়। ফলে চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি মো. মাহবুবুল আলম বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রথমে পরিচালক ও পরে সভাপতি নির্বাচিত হন। যদিও ভোটে বিরোধী প্যানেল হিসেবে পরিচিত সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ ২৩ পরিচালক পদের মধ্যে ১৫টিতে জয়ী হয়। সভাপতি মাহবুবুল আলম আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপকমিটির সদস্য। জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশ পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিপণন সমিতির প্রতিনিধি মো. আমিন হেলালী।

ছয়জন সহসভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন সুনামগঞ্জ চেম্বারের সভাপতি ও জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক খাইরুল হুদা, গাজীপুর চেম্বারের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের শিল্প-বাণিজ্যবিষয়ক উপকমিটির সদস্য আনোয়ার সাদাত সরকার, বাংলাদেশ চেম্বারের প্রতিনিধি ও ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ যশোদা জীবন দেবনাথ, ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শমী কায়সার, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরীর ছেলে রাশেদুল হোসেন চৌধুরী এবং এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি ও আওয়ামী লীগের শিল্প-বাণিজ্যবিষয়ক উপকমিটির সদস্য মুনির হোসেন। এঁদের মধ্যে শুধু শমী কায়সার ও রাশেদুল হোসেন চৌধুরী নির্বাচনে সরাসরি ভোটে পরিচালক নির্বাচিত হন। বাকিরা মনোনীত ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত পরিচালক।

মাহবুবুল আলম সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ায় এফবিসিসিআইয়ে মো. জসিম উদ্দিনের মেয়াদ শেষ হয়। ২০২১ সালে তিনি ভোট ছাড়াই সভাপতি হন। তার আগে শেখ ফজলে ফাহিম একইভাবে সভাপতি হন। অবশ্য ২০১৭ সালে আংশিক পদে ভোট হয়েছিল। সে সময় সভাপতি হন শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন। তিনি বর্তমানে ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য।

শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিনসহ এফবিসিসিআইয়ের সর্বশেষ ১১ জন সভাপতির ৮ জনই বর্তমানে সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। সদ্য বিদায়ী সভাপতি জসিম উদ্দিন আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপকমিটির সদস্য, তাঁর আগে সভাপতির দায়িত্বে থাকা শেখ ফজলে ফাহিম যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য। সাবেক সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য, ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন কুমিল্লা–৩ আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য। আরেক সাবেক সভাপতি সালমান এফ রহমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা। সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ আওয়ামী লীগ থেকে আগামী সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়া চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে আবদুল আউয়াল মিন্টু বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা।

এ ছাড়া প্রয়াত আনিসুল হক আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন।

২০১৫ সাল থেকে শরীয়তপুর চেম্বারের সভাপতি সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হকের ভাই এ কে এম ইসমাইল হক। তিনিও বিনা ভোটে সভাপতি পদে আছেন। ইসমাইল হক জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও নড়িয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।

জেলা চেম্বারে দলীয় নেতারা

এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি ও সহসভাপতির পদ পেতে সরকারের আশীর্বাদ লাগে। এ ক্ষেত্রে সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাই এগিয়ে থাকেন। জেলা চেম্বারের নেতা হতেও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের সুদৃষ্টির প্রয়োজন হচ্ছে। অবশ্য নিজে আওয়ামী লীগের নেতা হলে ভোট ছাড়াই নেতা হওয়া যাচ্ছে।

দেড় যুগ ধরে গাজীপুর ও বান্দরবান জেলার চেম্বারের সভাপতি পদে আছেন যথাক্রমে আনোয়ার সাদাত সরকার ও কশৈহ্লা মারমা। আনোয়ার সাদাত কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের শিল্প-বাণিজ্যবিষয়ক উপকমিটির সদস্য এবং কশৈহ্লা মারমা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি।

এদিকে ১৩ বছর ধরে বরিশাল চেম্বারের সভাপতি পদে আছেন সাইদুর রহমান। এই লঞ্চ ব্যবসায়ী ভোট ছাড়াই সভাপতি হয়েছেন। তিনি মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। একই সঙ্গে তিনি সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানও। তাঁর মতো একই সময় ধরে খুলনা চেম্বারের সভাপতি আছেন কাজী আমিনুল হক। তিনি মহানগর আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি পদেও আছেন।

১০ বছর ধরে সভাপতি পদে আছেন বগুড়া চেম্বারের মাসুদুর রহমান, সাতক্ষীরার নাসিম ফারুক খান ও চুয়াডাঙ্গার মো. ইয়াকুব হোসেন মালিক। তাঁদের মধ্যে মাসুদুর রহমান ও নাসিম ফারুক ভোট ছাড়া সভাপতি হয়েছেন। মাসুদুর রহমান জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষের পদে আছেন। নাসিম ফারুক জেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক।

এদিকে ২০১৫ সাল থেকে শরীয়তপুর চেম্বারের সভাপতি সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হকের ভাই এ কে এম ইসমাইল হক। তিনিও বিনা ভোটে সভাপতি পদে আছেন। ইসমাইল হক জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও নড়িয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। আবার মাদারীপুর চেম্বারের সভাপতি পদে আছেন সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের ছোট ভাই হাফিজুর রহমান খান। ২০২১ সাল থেকে টানা দুই মেয়াদে বিনা ভোটে সভাপতি হয়েছেন তিনি।

পণ্যভিত্তিক সংগঠনেও ভোট উধাও

সাড়ে ১০ বছর ধরে নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি পদ আঁকড়ে আছেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম সেলিম ওসমান। ২০১২ সালের পর থেকে ব্যবসায়িক সংগঠনটির পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন হচ্ছে না। সর্বশেষ জুলাইয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে বিকেএমইএর কমিটি হয়েছে এবং যথারীতি সভাপতি পদে বসেছেন সেলিম ওসমান।

দেশের শীর্ষ রপ্তানি খাত পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর বর্তমান কমিটির মেয়াদ গত এপ্রিলে শেষ হয়। তার আগেই অবশ্য কমিটির মেয়াদ ছয় মাস বাড়িয়ে নেন বর্তমান সভাপতি ফারুক হাসান। পর্ষদের অতিরিক্ত মেয়াদ শেষ হবে অক্টোবরে, তার আগে অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। আইন অনুযায়ী, নির্বাচনের ৯০ দিন আগে নির্বাচন বোর্ড গঠন এবং ৮০ দিন আগে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বর্তমান পর্ষদ সেটি করেনি।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আগামী পর্ষদের নির্বাচন দাবি করেছে বিজিএমইএর নির্বাচনকালীন জোট ফোরাম। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগের মহাপরিচালকের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দেয় তারা। এতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচনপ্রক্রিয়া শুরু না করায় বর্তমান সভাপতির বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘনে অভিযোগ আনার পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নিতে অনুরোধ জানান ফোরাম নেতারা।

অবশ্য এই জটিলতার মধ্যেই কমিটির মেয়াদ বাড়াতে সরকারের উচ্চ মহলে তোড়জোড় শুরু করে বর্তমান বিজিএমইএ পর্ষদ। এ জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। এত দিন বাণিজ্য সংগঠনগুলোর কমিটির মেয়াদ শেষ হলে বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে ছয় মাস পর্যন্ত সময় বাড়ানোর সুযোগ ছিল। সেটি বাড়িয়ে এক বছর করা হয়েছে। গত ২৯ আগস্ট বাণিজ্য সংগঠন (সংশোধন) আইন ২০২৩-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। গত বৃহস্পতিবার তা জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।

আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবে আগে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটাভুটি হতো। ২০১৪ সাল ভোট ছাড়াই সভাপতি পদে আসেন আলমগীর শামসুল আলামিন। তার পরের তিন মেয়াদেও সমঝোতার মাধ্যমে সভাপতি হয়েছেন তিনি। বর্তমানে সংগঠনটির আগামী মেয়াদের নির্বাচনের প্রক্রিয়া চলছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতিতে (বিপিজিএমইএ) প্রায় এক যুগ ধরে ভোট হচ্ছে না। বর্তমান সভাপতি সামিম আহমেদ টানা তিন মেয়াদে ভোট ছাড়াই সভাপতি হয়েছেন।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে পেশাজীবী সংগঠনের সবগুলোতেই প্রায় একই চিত্র। সংগঠনগুলো বর্তমানে মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত। নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোটও নির্বাসিত। ব্যবসায়ী সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সুরক্ষা, ব্যবসার টেকসই উন্নয়ন ও ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে কাজ করা। অথচ সংগঠনগুলোতে বর্তমানে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে।

ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ব্যবসায়ী সংগঠনের ক্ষমতায় পছন্দের বা নিজেদের লোক বসানোর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা হাসিল করা। এর মাধ্যমে ক্ষমতার সঙ্গে ব্যবসার গভীর যোগসূত্র তৈরি হয়েছে। তাতে ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্বে থাকা লোকজন অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নিচ্ছেন। এই সিন্ডিকেটের বাইরে থাকা ব্যবসায়ীদের মধ্যে যাঁরা সুস্থভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে চান, তাঁরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। তাঁদের সমস্যা সমাধানে সংগঠনগুলো সহায়ক কোনো ভূমিকাও পালন করে না।

কারও ৪৫০, কারও ৩০০, বিএনপি নেতাদের কার বিরুদ্ধে কত মামলা

২০ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

ছুটির দিন ছাড়া বাকি দিনগুলোয় সকালে ঘুম থেকে উঠেই আদালতে আসেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান। তিন মাস ধরে এটা তাঁর রুটিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ৪৫০। একেক দিন শুনানি থাকে চার থেকে পাঁচটি মামলার।

 প্রায় একই রকম রুটিন (নিয়মিত কাজ) বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন (আলাল), বিএনপির চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমানের (শিমুল বিশ্বাস)। রিজভীর মামলা ১৮০টি। আলালের বিরুদ্ধে আড়াই শ আর শিমুল বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দেড় শর বেশি মামলা রয়েছে।

 বিএনপির নেতাদের মামলা পরিচালনা করেন এমন বেশ কয়েকজন আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শতাধিক মামলার আসামি এমন নেতা-কর্মীদের প্রায় সবাইকে ঘুম থেকে উঠেই আদালতে আসতে হয়। এমন পরিস্থিতির মধ্যে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতাই আছেন শতাধিক।

বিএনপির আইনজীবীরা বলছেন, সরকারের শেষ সময়ে এসে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে মামলার বিচারের গতি বেড়ে যাওয়ায় কারাগারের থাকা নেতাদের অনেককেও প্রায় প্রতিদিন আদালতে হাজির করা হচ্ছে। এমন একজন হচ্ছেন ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সভাপতি এবং উপনির্বাচনে ঢাকা-১৮ আসনে সংসদ সদস্য প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন। তাঁর বিরুদ্ধে ৩১৭টি মামলা রয়েছে। দুই মাস ধরে প্রায় প্রতিটি কার্যদিবসে জাহাঙ্গীরকে কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকার আদালতে হাজির করা হয়েছে। প্রায় প্রতিদিন কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে আনা-নেওয়ার ফলে জাহাঙ্গীরসহ অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন জাহাঙ্গীরের স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা। একই অবস্থা যুবদলের সাবেক সভাপতি কারাবন্দী সাইফুল আলমেরও (নিরব)। তাঁর বিরুদ্ধেও সাড়ে তিন শর বেশি মামলা রয়েছে।

ঢাকার আদালতগুলোর মামলার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এরই মধ্যে ছয়টি মামলায় বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের ৪৪ জন নেতা-কর্মীর কারাদণ্ড হয়েছে। আরও ২০০ মামলার বিচার দ্রুত এগোচ্ছে। এর মধ্যে অন্তত ৩০টির বিচার শেষ পর্যায়ে। ১৭০টি মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। এসব মামলায় কেন্দ্রীয় থেকে শুরু করে থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা রয়েছেন।

বিএনপির নেতাদের আইনজীবীরা বলছেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে-পরে বিরোধী দলের আন্দোলনের সময় গাড়ি পোড়ানোসহ নাশকতার অভিযোগে করা মামলাগুলোর বিচার দ্রুত এগোচ্ছে। এ ছাড়া ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে সারা দেশে বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মামলা দেওয়া হয়। ‘গায়েবি মামলা’ নামে পরিচিতি পাওয়া ওই সব মামলার অনেকগুলো এখন বিচারের পর্যায়ে রয়েছে।

বিএনপির নেতারা মনে করছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এবং সরকারবিরোধী আন্দোলন ঠেকাতে সরকার একের পর এক মামলা দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি আন্দোলন ও নির্বাচনের ক্ষেত্রে থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতা-কর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে থাকা পুরোনো মামলার নিষ্পত্তি করে সাজা নিশ্চিতের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি প্রসিকিউশন বিভাগকে পুরোনো মামলা আগে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে বলেছি। পুরোনো মামলা নিষ্পত্তি করতে যেসব উদ্যোগ নেওয়া দরকার, তার সবই নেবে সরকার। এখানে আলাদা করে বিএনপির নেতাদের মামলা নিষ্পত্তির কোনো নির্দেশনা আমরা দিইনি।’

বিএনপির মামলার তথ্য ও সংরক্ষণ শাখার সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে গত ২৫ জুলাই পর্যন্ত বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭১টি মামলা হয়েছে। এসব মামলা আসামির সংখ্যা ৪০ লাখের ওপরে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরের ৫০ থানায় ১৭ হাজার ৫৮৩টি মামলা রয়েছে বলে দাবি বিএনপির।

নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছে না ইইউ

২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩, মানবজমিন

বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পর্যবেক্ষক দল পাঠাচ্ছে না ইউরোপীয় ইউনিয়ন। প্রাক পর্যবেক্ষক দলের তৈরি করা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইইউ’র তরফে বাংলাদেশ সরকারকে বিষয়টি ইতোমধ্যে অবহিত করা হয়েছে। আজ বা আগামীকালের মধ্যে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি আসতে পারে ইইউ সদরদপ্তর ব্রাসেলস থেকে। নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্র মানবজমিনকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। সূত্র জানায়, প্রাক পর্যবেক্ষক দলের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের বিষয়ে ইইউ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আলোচনার পর এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে। নিবাচনে পর্যবেক্ষক দল না পাঠালেও ছোট আকারের বিশেষজ্ঞ দল পাঠানো হতে পারে নির্বাচনী তথ্য সংগ্রহের জন্য। জানা গেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছে যে, তাদের নির্বাচন মূল্যায়ন মিশন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য উপযোগী বলে মনে করছে না।

৬ লাখ প্রচারকর্মী তৈরি করছে আওয়ামী লীগ, অপপ্রচারের ‘জবাব’ দেবেন তাঁরা

২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সারা দেশে ছয় লাখ প্রচারকর্মী তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে আওয়ামী লীগ। এই কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের মুখোমুখি হবেন। ভোট চাইবেন, নানা প্রশ্নের জবাব দেবেন এবং বিরোধী দলের অপপ্রচারের বিপরীতে সরকার ও আওয়ামী লীগের পক্ষে তথ্য তুলে ধরবেন।

উদ্যোগটিকে বলা হচ্ছে ‘অফলাইন ক্যাম্পেইন’। যা ‘রোড টু স্মার্ট বাংলাদেশ’ কর্মসূচির অংশ। এটির উদ্যোক্তা আওয়ামী লীগের জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি। ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় থেকে আওয়ামী লীগের জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন প্রয়াত এইচ টি ইমাম। কমিটির চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্র জানিয়েছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়নি। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব কবির বিন আনোয়ারকে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির হয়ে কাজ করতে বলা হয়েছে।

সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার তিন দিনের মধ্যে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়ে এইচ টি ইমামের চেয়ারে বসতে দেখা যায় কবির বিন আনোয়ারকে। তিনি এখন তাঁর পরিচয় হিসেবে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে উল্লেখ করছেন।

ঘরে ঘরে ভোট চাওয়ার এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, এমন একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা বলছেন, সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের থেকে সারা দেশে ১২টি দল গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি দল ছয়টি জেলার দায়িত্ব পালন করবে। তারা মূলত তৃণমূল থেকে মাঠ পর্যায়ের প্রচারকর্মী বাছাই করবে। এরপর তাদের প্রশিক্ষণ দেবে স্থানীয়ভাবে তৈরি করা প্রশিক্ষক ও মেন্টর। সবার ওপরে থাকবেন ‘মাস্টার ট্রেইনার’। ইতিমধ্যে ২০০ জনের মতো মাস্টার ট্রেইনার বাছাই করা হয়েছে। তাদের সবাই ছাত্রলীগের সাবেক নেতা এবং বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

‘ফ্যাসিবাদ বিরোধী ছাত্রঐক্য’র আত্মপ্রকাশ, নেতৃত্বে ছাত্রদল

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ঢাকা ট্রিবিউন বাংলা

ভোটাধিকার, সন্ত্রাস-দখলদারিমুক্ত নিরাপদ ক্যাম্পাস, সর্বজনীন শিক্ষা ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে “ফ্যাসিবাদ বিরোধী ছাত্রঐক্য” নামে নতুন জোটের আত্মপ্রকাশ হয়েছে। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতৃত্বে এই জোটে রয়েছে ১৫টি ছাত্র সংগঠন।

শুক্রবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নসরুল হামিদ মিলনায়তনে ছাত্র সংগঠনগুলোর এক সভায় এই নতুন ছাত্র জোটের নাম ঘোষণা করেন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাঈফ মাহমুদ জুয়েল।

জোটের ১৫টি সংগঠন হলো- জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র অধিকার পরিষদ, ছাত্রলীগ (জেএসডি), গণতান্ত্রিক ছাত্র দল (এলডিপি), নাগরিক ছাত্র ঐক্য, জাগপা ছাত্রলীগ, ছাত্র ফোরাম (গণফোরাম, মন্টু), ভাসানী ছাত্র পরিষদ, জাতীয় ছাত্র সমাজ (কাজী জাফর), জাতীয় ছাত্র সমাজ (বিজেপি-পার্থ), জাগপা ছাত্রলীগ (খন্দকার লুৎফর), ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ, বিপ্লবী ছাত্র সংহতি এবং রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন।

একাদশ সংসদে আইন প্রণয়নে সময় কম, প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা ও অন্য দলের সমালোচনায় অধিক সময়

২ অক্টোবর ২০২৩, মানবজমিন

জাতীয় সংসদ আইন প্রণয়নে সংসদীয় কার্যক্রমের মাত্র ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ সময় ব্যয় করেছে। অন্যদিকে সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী ও দলের প্রশংসায় ব্যয় করেছে ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ সময়। এ ছাড়া অন্য দলের সমালোচনায় ব্যয় করেছে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ সময়। গতকাল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রকাশিত ‘পার্লামেন্ট ওয়াচ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। টিআইবি ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম থেকে ২২তম অধিবেশন নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। এই সময়কালে সংসদের কার্যক্রমের মোট ৭৪৪ ঘণ্টা ১৩ মিনিট সময় ব্যয় হয়। এ বিষয়ে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংসদ প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে পেরেছে এমন বলার সুযোগ নেই। বিরোধী দল পরিচয়ধারী যে দলটি এখন আছে, তারা আগের তুলনায় কিছুটা সক্রিয় ভূমিকা পালনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা সার্বিকভাবে আত্মপরিচয়ের সংকটে ছিল।

প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসায় ব্যয় প্রায় ১৯.৮ শতাংশ সময়: টিআইবি’র হিসাবে সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ সময় ব্যয় করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রশংসায়। ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ সময় ব্যয় করেছেন সরকারের অর্জন নিয়ে কথা বলে।

এ ছাড়া বর্তমান সরকারের বিভিন্ন অর্জন এবং প্রধানমন্ত্রীর গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রশংসায় ব্যয় হয়েছে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ সময়।

অন্য দলের সমালোচনায় ব্যয় প্রায় ১৮ শতাংশ সময়: সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেছেন মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ সময়। অন্যদিকে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যয় করেছেন অন্য দলের সমালোচনায়। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু ও মুজিববর্ষ নিয়ে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ, স্বাধীনতা ও অর্ধশত বার্ষিকীর জন্য শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ এবং ধন্যবাদ ও প্রারম্ভিক বক্তব্যের জন্য ব্যয় করেছে ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ সময়।

আইন প্রণয়নে সময় ব্যয় মাত্র ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ: জাতীয় সংসদ আইন প্রণয়নে সংসদীয় কার্যক্রমের মাত্র ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ সময় ব্যয় করেছে। টিআইবি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯-২০ সালে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট আইন প্রণয়নে ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ সময় ব্যয় করেছে এবং ২০১৮-১৯ সালে ভারতের সপ্তদশ লোকসভায় এটি ছিল ৪৫ শতাংশ।

কোরাম সংকটে ব্যয় ৮৯.২৮ কোটি টাকা: একাদশ সংসদ কোরাম সংকটে মোট ৫৪ ঘণ্টা ৩৮ মিনিট কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। যা প্রতি কার্যদিবস অনুযায়ী গড় প্রতি ১৪ মিনিট ৮ সেকেন্ড। অধিবেশন শুরুর তুলনায় বিরতি পরবর্তী সময়ে কোরাম সংকটের আধিক্য লক্ষণীয় ছিল। ৮৪ শতাংশ কার্যদিবসে নির্ধারিত সময় হতে বিলম্বে শুরু হয়। কোরাম সংকটে মিনিট প্রতি ব্যয় প্রায় ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা। আর কোরাম সংকটে ব্যয়িত সময়ের প্রাক্কলিত অর্থমূল্য প্রায় ৮৯ কোটি ২৮ লাখ ৮ হাজার ৭৭৯ টাকা। উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদের মোট সদস্য ৩৫০ জন। ন্যূনতম ৬০ সদস্যের উপস্থিতিতে সংসদের কোরাম পূর্ণ হয়। কোরাম পূর্ণ না হলে সংসদের বৈঠক চালানো যায় না।

রাষ্ট্রপতির ভাষণে বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় ব্যয়: বছরের প্রারম্ভিক ৫টি অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ পাঠে ব্যয় ৪ ঘণ্টা ৫৭ মিনিট, যা সংসদ কার্যক্রমের মোট ব্যয়িত সময়ের শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। ভাষণে সরকারের অর্জন বিষয়ক আলোচনা প্রাধান্য পেয়েছে। সরকারের অর্জন নিয়ে ব্যয়িত সময়ের পরিমাণ ৭৮ দশমিক ৭ শতাংশ। শুভেচ্ছা জ্ঞাপন ও প্রারম্ভিক বক্তব্যের জন্য ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, বঙ্গবন্ধু ও মুজিববর্ষ নিয়ে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও দিক নির্দেশনা নিয়ে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ।

বিধি অনুযায়ী হয়নি স্থায়ী কমিটির কার্যক্রম: বিধি অনুযায়ী প্রতিটি (৫০টি) কমিটির প্রতিমাসে ন্যূনতম ১টি করে সভা করার নিয়ম থাকলেও কোনো কমিটিই প্রতিমাসে ন্যূনতম ১টি করে সভা করার নিয়ম পালন করেনি। ন্যূনতম নির্ধারিত সভা সংখ্যার ৬৬.১% সভাই অনুষ্ঠিত হয়নি। এ ছাড়া সংসদে ৫০টি কমিটির মধ্যে বিরোধী দল হতে সভাপতি রয়েছেন ৪টি কমিটিতে। ১৭টি কমিটিতে বিরোধীদলীয় কোনো সদস্য নাই। দশম সংসদের কয়েকজন মন্ত্রীকে একাদশ সংসদে একই মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটিতে সদস্য ও সভাপতি হিসেবে রাখা হয়েছে।

পিটিশন কমিটির মাধ্যমে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের সরাসরি অভিযোগ করার সুযোগ থাকলেও প্রচারণার ঘাটতির কারণে তা কার্যকর নয়। সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহি করা এবং সার্বিকভাবে সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি করা প্রত্যাশিত পর্যায়ে কার্যকর ছিল না।

জন গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে গৃহীত ও অগৃহীত নোটিশের ওপর আলোচনা: এই পর্বে মোট ব্যয়িত সময় ২১ ঘণ্টা ৩৭ মিনিট যা সংসদ কার্যক্রমের মোট ব্যয়িত সময়ের ২ দশমিক ৯ শতাংশ। নির্ধারিত কর্মসূচির ৮ দশমিক ১ শতাংশ কার্যদিবসে কার্যক্রম স্থগিত হয়েছে। ৭ম এবং ৯ম থেকে ২১তম অধিবেশনে অর্থাৎ, মোট ১৪টি অধিবেশনে এই পর্ব সরাসরি অনুষ্ঠিত হয়নি।

জনপ্রতিনিধিত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা: প্রধান বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্য কর্তৃক সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের পর্যালোচনা লক্ষণীয় হলেও বাকি সদস্যরা এক্ষেত্রে অনেকাংশে নীরব ভূমিকা পালন করেছে। বিরোধীদল সমূহের মধ্যে পারস্পরিক মেলবন্ধন না থাকায় সরকারকে জবাবদিহি করার ক্ষেত্র আরও সীমিত হয়ে গেছে। ক্ষেত্র বিশেষে প্রধান বিরোধী দলের সদস্যদের বক্তব্যে অন্যান্য বিরোধী দলের পর্যালোচনা ও সমালোচনা প্রাধান্য পেয়েছে, যা প্রধান বিরোধী দলের দ্বৈত ভূমিকা ও পরিচয়কে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।

সংসদীয় কার্যক্রমে সদস্যদের দায়িত্বশীলতা ও দক্ষতার ঘাটতি: সংসদীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সদস্যদের প্রস্তুতির ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়, যেখানে প্রস্তুতি না থাকার কারণে প্রস্তাব উত্থাপন না করা, প্রশ্নোত্তর পর্বে যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই না করে তথ্য প্রদান করা ইত্যাদি লক্ষ্য করা গেছে। নোটিশ দিয়ে একাধিক কার্যদিবসে অনুপস্থিত থাকার কারণে নোটিশ বারবার স্থগিত হওয়া, সংশোধনী অনুত্থাপিত থাকা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে অন্য মন্ত্রীর দায়সারা উত্তর প্রদান, একজনের নোটিশ অন্যজন উপস্থাপন করতে গিয়ে জটিলতার সৃষ্টি ও সময়ক্ষেপণ করতেও দেখা গেছে। দুটি পর্বে কণ্ঠভোটের সময় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য নিজদলের বিপক্ষে ভোট প্রদানের পর স্পিকার দৃষ্টি আকর্ষণ করায় দ্বিতীয় দফায় ভোটে নিজ দলের পক্ষে ভোট প্রদান করেন যা কার্যক্রমে অমনোযোগী থাকাকে নির্দেশ করে। বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সদস্যদের মধ্যে দক্ষতার ঘাটতিও লক্ষ্য করা যায়। এক্ষেত্রে এক কার্যক্রমে অন্য কার্যক্রমের বিষয় উত্থাপন, প্রস্তাব উত্থাপনের ক্রম ভুল করা, বক্তব্য পেশ করতে না পারা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। সদস্যদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য উদ্যোগের ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে সংসদ কর্তৃক আয়োজিত মোট ২৮টি প্রশিক্ষণের মধ্যে ২টি প্রশিক্ষণ ছিল সংসদ সদস্যদের জন্য।

বিধি বহির্ভূত আচরণ লক্ষ্য করা গেছে: সংসদ সদস্যদের একে অপরের প্রতি এবং সার্বিকভাবে সুশীল সমাজের প্রতি আচরণের ক্ষেত্রে বিধি বহির্ভূত আচরণ লক্ষ্য করা যায়। বিধির ব্যত্যয় ঘটিয়ে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কোনো কোনো নারী সদস্যদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক এবং আপত্তিকর শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে। বিরোধী দলের তুলনায় সরকারি দলের সদস্যদের ক্ষেত্রে এই ব্যত্যয় অধিক মাত্রায় পরিলক্ষিত হয়েছে।

বাজেট কার্যক্রমে ব্যয় ১৯ দশমিক ২ শতাংশ: বাজেট কার্যক্রমে ব্যয়িত সময় ১৪২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট, যা সংসদ কার্যক্রমের মোট ব্যয়িত সময়ের ১৯ দশমিক ২ শতাংশ এবং নির্ধারিত বাজেট অধিবেশনের ব্যয়িত সময়ের ৬০ শতাংশ। বাজেট কার্যক্রমে ব্যয়িত সময়ের ৮০ দশমিক ১ শতাংশ সময় ব্যয় হয় বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায়, ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ সময় ব্যয় হয় মঞ্জুরি দাবির ওপর আলোচনায় এবং ৪ দশমিক ১ শতাংশ সময় ব্যয় হয় বাজেট উপস্থাপনে। বাজেট আলোচনায় ব্যয়িত সময়ের ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ সময় ব্যয় হয় বাজেট সংক্রান্ত আলোচনায় এবং বাকি সময় ব্যয় হয় অন্যান্য আলোচনায়, দলের প্রশংসা এবং অন্য দলের সমালোচনায়। ‘অর্থবিল ২০১৯’ পাস হতে সময় লাগে ৪ ঘণ্টা ০৬ মিনিট এবং বাকি ৩টি অর্থবিল পাস হতে গড়ে ১ ঘণ্টা ২১ মিনিটের মতো সময় ব্যয় হয়। নির্দিষ্টকরণ বিলগুলো পাস হতে গড়ে ৫ মিনিটের মতো সময় ব্যয় হয়।

নির্বাচন সামনে রেখে সক্রিয় ‘কিংস পার্টি’, পেছনে ক্ষমতাসীনেরা

০৩ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

তৃণমূল বিএনপি, বিএনএফ, বিএনএম, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি—কম পরিচিত এসব দলও এবার জাতীয় নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ ধরনের দলগুলোতে বিএনপির দলছুট নেতারা ভিড়বেন এবং তাঁরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন—এমন একটা পরিকল্পনা নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এগোচ্ছে। এরই মধ্যে এমন কিছু দল বা ‘কিংস পার্টি’ সক্রিয় হয়েছে। সরকারের সমর্থনে ইসলামি কিছু দলকেও মাঠে নামানো হয়েছে। আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।

দলটির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা জানিয়েছেন, তাঁদের লক্ষ্য এখন যথাসময়ে নির্বাচন করা এবং সেই নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করা ও ভোটার উপস্থিতি বাড়ানো। সে জন্য সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে আন্দোলনে থাকা বিএনপি ভোটে অংশ নেবে না, এটা ধরে নিয়েই আওয়ামী লীগ এ মুহূর্তে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। আর সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই সরকার ও আওয়ামী লীগের দিক থেকে ছোট কিছু দলকে সক্রিয় করে বিএনপির দলছুটদের ভেড়ানোর তৎপরতা চালানো হচ্ছে। এ ধরনের দলগুলোকে ‘কিংস পার্টি’ বলে অভিযোগ করা হচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।

আওয়ামী লীগ অপেক্ষায় আছে। বিএনপির কারা ভিড়তে পারেন, আগামী মাসের শেষের দিকে তা অনেকটা স্পষ্ট হতে পারে। প্রয়োজন হলে তৃণমূল বিএনপি, বিএনএফ ও বিএনএমের সমন্বয়ে একটি জোটের ধারণা নিয়েও আলোচনা আছে।

বিএনপির নেতারা কিছুদিন ধরে অভিযোগ করছেন, নির্বাচন সামনে রেখে কিছু কিংস পার্টি গঠন করে বিরোধী দলগুলোতে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা করছে সরকার। সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে বিএনপির সাবেক দুই নেতা সমশের মবিন চৌধুরী ও তৈমুর আলম খন্দকারের তৃণমূল বিএনপির নেতৃত্বে আসার ঘটনা। যদিও তৃণমূল বিএনপিসহ নতুন সক্রিয় হওয়া এসব দল কিংস পার্টির অভিযোগ অস্বীকার করছে।

তবে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এমন আলোচনাও রয়েছে যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক দেখাতে জাতীয় পার্টি, ১৪ দলের শরিক এবং বিএনপি থেকে ছেড়ে আসা নেতা ও ইসলামি দলগুলোর মধ্যে ১০০ আসনে ছাড় দেওয়া হতে পারে। ভোটে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হচ্ছে।

তলেতলে সবার সঙ্গে আপস হয়েছে, যথাসময়ে নির্বাচন: ওবায়দুল কাদের

০৩ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

তলেতলে সবার সঙ্গে আপস হয়ে গেছে জানিয়ে নেতা-কর্মীদের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘তলেতলে আপস হয়ে গেছে। আমেরিকার দিল্লিকে দরকার। দিল্লি আছে, আমরাও আছি। শেখ হাসিনা সবার সঙ্গে ভারসাম্য করে ফেলেছেন। আর কোনো চিন্তা নেই। যথাসময়ে নির্বাচন হবে।’

 আজ মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকার অদূরে সাভারের আমিনবাজার ট্রাক টার্মিনাল এলাকায় আয়োজিত ‘শান্তি ও উন্নয়ন সমাবেশে’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে ওবায়দুল কাদের এসব কথা বলেন।

বয়স আশির ওপর, সময় হয়ে গেছে; কান্নাকাটি করে লাভ নাই

৩ অক্টোবর, ২০২৩, শেখ হাসিনা

স্যাংশন নিয়ে ভয় না পাওয়ার বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সোমবার লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার মেথডিস্ট সেন্ট্রাল হলে নাগরিক সংবর্ধনায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি পাল্টা স্যাংশন দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।

সংবিধান অনুযায়ী সরকারের অধীনেই সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলে জানান তিনি। খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা ইস্যু সম্পর্কে প্রশ্ন রাখেন, সাজাপ্রাপ্ত কাউকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠায় কোন দেশ?

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রশ্ন রেখে বলেন, পৃথিবীর কোন দেশের সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠায় বলতে পারেন? কোনো দেশে পাঠায়? তারা এটা দাবি করে। আমাদের কেউ কেউ আঁতেল আছে। তারা বলে, একটু কী সহানুভূতি দেখাতে পারেন না! সে এভারকেয়ার, বাংলাদেশের সবথেকে দামি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। আর রোজই শুনি এই মরে মরে, এই যায় যায়। বয়সতো আশির ওপর। মৃত্যুর সময় তো হয়ে গেছে। তার মধ্যে অসুস্থ। এখানে এত কান্নাকাটি করে লাভ নাই।

বেশি কথা বললে সব বন্ধ করে দিয়ে বসে থাকব: প্রধানমন্ত্রী

অক্টোবর ৬, ২০২৩, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের মানুষ যদি বলে রিজার্ভ রক্ষা করতে হবে, তাহলে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেই, পানি দেওয়া বন্ধ করে দেই, সার দেওয়া বন্ধ করে দেই। সব বন্ধ করে বসিয়ে রাখি, আমাদের রিজার্ভ ভালো থাকবে।

আজ শুক্রবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক শাহরিয়ার খান জানতে চান, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২ বছর আগে অনেক বেশি ছিল। কিন্তু আমাদের রিজার্ভ অনেক কমে গেছে। এ বিষয়ে সরকার কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে কি না।

এ প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘করোনার সময় আমদানি বন্ধ ছিল, যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ ছিল। তখন তো রিজার্ভ বেড়েছিল। এরপর যখন সব খুলে গেল, সবকিছু আমদানি শুরু হলো। তখন রিজার্ভ কমবে, এটা তো স্বাভাবিক ব্যাপার। আমরা যখন ২০০৯ সালে যখন সরকার গঠন করি, তখন রিজার্ভ ১ বিলিয়নও ছিল না। ছিল শূন্য দশমিক সাত। আমি যখন ৯৬ সালে সরকার গঠন করি তখন রিজার্ভ ছিল বিলিয়নের নিচে। যেটুকু বেড়েছে, আমাদের সরকারই বাড়িয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এখন দেশের মানুষ যদি বলে রিজার্ভ রক্ষা করতে হবে, তাহলে আমি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেই, পানি দেওয়া বন্ধ করে দেই, সার দেওয়া বন্ধ করে দেই। সব বন্ধ করে বসিয়ে রাখি, আমাদের রিজার্ভ ভালো থাকবে। রিজার্ভ বেশি রাখা বেশি প্রয়োজন, নাকি দেশের মানুষের ভালো, মানুষের জন্য কাজ করা বেশি প্রয়োজন। ২০০ ডলারে গম কিনতাম, তা এখন ৬০০ ডলার। ৮০০ ডলারের পরিবহন খরচ এখন ৩-৪ হাজার ডলার লাগছে।’  

‘রিজার্ভ নিয়ে অনেকে অনেক কিছু বলতে পারে। আমি তো বলেছি যে যদি এত বেশি কথা হয়, যখন সরকার গঠন করেছিলাম, রিজার্ভ ওইখানে রেখে তারপর ইলেকশন করব। পরে আবার বাড়াব। কিন্তু, করে দেখাব যে এই ছিল। বিদ্যুৎ শতভাগ থেকে কমায়ে ওই ২৮ ভাগে নিয়ে আসব। সবাই একটু টের পাক যে কী ছিল। আমরা তো ভুলে যাই। আমি বিদ্যুৎ মন্ত্রীকে বলেছিলাম, প্রতিদিন যেন কিছু লোডশেডিং দেয়, তাহলে মানুষের মনে থাকবে যে লোডশেডিং আছে। পয়সা খরচ করে তেল কিনে জেনারেটর চালাতে হবে। তখন আক্কেলটা ঠিক হবে যে, না এই অবস্থা তো ছিল,’ যোগ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা তো ভর্তুকি দিচ্ছি। কেন আমরা ভর্তুকি দেব। বিদ্যুৎ ব্যবহার করতেছে সবাই, ভর্তুকির সুযোগ নিচ্ছে অর্থশালী বড়লোকরা। এখন একটা স্লট ঠিক করব কতটুকু সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে। তাদের জন্য আলাদা দাম। তার থেকে বেশি যারা করবে তাদের জন্য আলাদা দাম। ইতোমধ্যে আমি নির্দেশ দিয়েছি ওইভাবে একটা স্লট করতে। যে বেশি ব্যবহার করবে, তাকে বেশি দামে কিনতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘বেশি কথা বললে সব বন্ধ করে দিয়ে বসে থাকব। ইলেকশনের পর যদি আসতে পারি, তাহলে আবার করব। সব গুছিয়ে দেওয়ার পর এখন ইলেকশনের কথা, ভোটের কথা, অর্থনীতির পাকা পাকা কথা শুনতে হয়। আমি এসব শুনতে রাজি না।’

জামিনেও মুক্তি মেলে না বিএনপি নেতাদের

০৭ অক্টোবর ২৩, সমকাল

আদালত পাড়ায় দৌড়ঝাঁপ করে জামিন লাভ করেও কারামুক্তি মিলছে না বিএনপি নেতাদের। একের পর এক পুরোনো মামলায় আটক করা হচ্ছে তাদের। উচ্চ আদালত থেকে ‘নো অ্যারেস্ট, নো হ্যারেজ’ নির্দেশনা থাকার পরও প্রতিকার মিলছে না বেশির ভাগ নেতার। পুরোনো মামলায় ‘অজ্ঞাত’ আসামি হিসেবে তাদের জেলগেট থেকে আটক কিংবা জামিন পাওয়ার পরই নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে তাদের কারাজীবনকে দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ দলটির। আইনজীরীরা বলছেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও মানছেন না নিম্ন আদালত। এটা নজিরবিহীন।

বিএনপি নেতারা জানান, সক্রিয় নেতাদের টার্গেট করে একের পর এক পুরোনো মামলায় আটক দেখিয়ে চরমভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। এর মধ্যে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ রবিউল আলম রবি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব রফিকুল আলম মজনু, ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন, যুবদলের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম নীরব, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মোনায়েম মুন্না, সাবেক সহসভাপতি এসএম জাহাঙ্গীর, যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক গোলাম মাওলা শাহীন, ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মোসাব্বিরসহ আরও অনেকে রয়েছেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমকালকে বলেন, প্রতিদিন পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। যেভাবেই হোক সরকার বিরোধী দলকে মাঠ থেকে সরিয়ে দিয়ে আবার ক্ষমতায় থাকতে চায়। এটাই একমাত্র লক্ষ্য। তাই নির্বাচনের আগে সরকার মাঠ খালি করার মিশন নিয়ে নেমেছে। তিনি বলেন, অবৈধ সরকারের নির্দেশে পুলিশ এসব করছে। বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অন্যান্য বাহিনী একইভাবে কাজ করছে। বিচারপতিদের বলা হচ্ছে, দ্রুত সাজার রায় দিতে। এটা আওয়ামী লীগের পুরোনো খেলা।

দেশটাকে তো জাহান্নাম বানিয়ে ফেলেছেন: ডিএজি রেজাউলকে হাইকোর্ট বেঞ্চ

অক্টোবর ১০, ২০২৩, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

অধিকারের আদিলুর রহমান খান ও নাসিরউদ্দিন এলানের জামিন আবেদনের বিরোধিতা করায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীকে তিরস্কার করে হাইকোর্ট বেঞ্চ বলেছেন, ‘দেশটাকে তো জাহান্নাম বানিয়ে ফেলেছেন।’

আইসিটি আইনে করা মামলায় কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আদিলুর ও নাসিরের আপিল ও জামিন আবেদন আজ মঙ্গলবার বিচারপতি মো. এমদাদুল হক আজাদের বেঞ্চে উপস্থাপন করেন সিনিয়র আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী।

এ সময় ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) মো. রেজাউল করিম জামিন আবেদনের বিরোধিতা করেন। তিনি আদালতকে বলেন, জামিন আবেদনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি আছে।

তখন বিচারপতি মো. এমদাদুল হক তাকে বলেন, ‘আবেদনকারীর আইনজীবীদের আগে তাদের যুক্তি উপস্থাপন করতে দিন। তারপর আপনি আপনার যুক্তি দেবেন। পিটিশনকারীদের আইনজীবীরা যুক্তি দেওয়ার আগেই আপনি কেন লাফিয়ে উঠলেন? (আপনারা) দেশটাকে তো জাহান্নাম বানিয়ে ফেলেছেন।’

বিচারপতিকে ডেকে কথাবার্তার ক্ষেত্রে যত্নশীল হতে বললেন প্রধান বিচারপতি

১০ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

‘দেশটাকে তো জাহান্নাম বানিয়ে ফেলেছেন’—এক শুনানিতে এমন মন্তব্য করা হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. ইমদাদুল হক আজাদকে আজ মঙ্গলবার বিকেলে নিজ কার্যালয়ে ডেকে কথা বলেছেন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। এ সময় আপিল বিভাগের বিচারপতিরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে বিচারপতি ইমদাদুল হক আজাদকে কথাবার্তার ক্ষেত্রে যত্নশীল হতে বলা হয়েছে বলে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের একটি সূত্র প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছে।

এর আগে দুপুরে ওই বিচারপতির মন্তব্যের বিষয়ে প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। এরপর বিকেলে প্রধান বিচারপতির কার্যালয়ে বিচারপতি মো. ইমদাদুল হক আজাদকে ডাকা হয় বলে সূত্র জানায়।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান খান ও পরিচালক এ এস এম নাসির উদ্দিনের করা আপিলের গ্রহণযোগ্যতা–বিষয়ক শুনানিতে আজ সকালে রাষ্ট্রপক্ষের উদ্দেশে বিচারপতি মো. ইমদাদুল হক আজাদের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ মন্তব্য করেন, ‘দেশটাকে তো জাহান্নাম বানিয়ে ফেলেছেন।’

গান কবিতা নাটকে ভোটাধিকারের দাবি

১৩ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

এক সাংবাদিক ছবি তুলছিলেন। হঠাৎই আরেক ব্যক্তির আগমন। সাংবাদিকের মুখ টেপ লাগিয়ে বন্ধ করে দিলেন তিনি। এরপর শিকল পেঁচিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে তালা লাগিয়ে দিলেন সাংবাদিকের গায়ে। তাঁর গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হলো ‘সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট’ লেখা বোর্ড—দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার বিষয়টি প্রতীকী চিত্র ‘পারফরম্যান্স আর্ট’–এর মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হলো মঞ্চে।

শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে আয়োজিত সাংস্কৃতিক সমাবেশের মঞ্চে গণমাধ্যমের বর্তমান বাস্তবতাকে প্রতীকী চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেন সংগীতশিল্পী অমল আকাশ।

‘ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দাবিতে’ এই সাংস্কৃতিক সমাবেশের মঞ্চের আয়োজক ‘লেখক–শিল্পী–শিক্ষক–সাংবাদিক’। সমাবেশে ছিল প্রতিবাদী গান, পথনাটক, মূকাভিনয়, পারফরম্যান্স আর্ট, কবিতা পাঠ ও মুক্ত ক্যানভাসে প্রতিবাদী চিত্রকর্ম অঙ্কন। এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরেন শিল্পীরা।

আয়োজনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সূচনা বক্তব্যে কবি সাখাওয়াত টিপু বলেন, একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে অগণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। নানাভাবে মানুষের অধিকার এখন ভূলুণ্ঠিত। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই। আরেকটি একতরফা নির্বাচনের পাঁয়তারা চলছে। গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার না থাকলে একদিন লিবিয়া, ইরাকের পরিণতি ভোগ করতে হবে।

সমাবেশে পরিবেশনা শুরু হয় শিল্পী অমল আকাশের পারফরম্যান্স আর্টের মধ্য দিয়ে। এর শেষ দৃশ্যটি ছিল—এক সাংবাদিকের গলায় ঝোলানো ‘সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট’ লেখা বোর্ড আগুনে পুড়িয়ে ফেলে হচ্ছে।

এরপর মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করে গানের দল প্যারাফিন। কবিতা পড়ে শোনান ফেরদৌস আরা রুমি ও কায়েস মাহমুদ। উন্নয়নের বঞ্চনা নিয়ে একটি ঘোড়ার ডিম ও তার স্বদেশ ভাবনা নামের নাটক পরিবেশন করে নাটকের দল এই বাংলায়। রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিয়ে এই নাটকের সংলাপ ‘উন্নয়নের ড্রেন দিয়ে নামতে পারছে না বৃষ্টির পানি’ দর্শকদের মধ্যে হাস্যরসের সৃষ্টির করে।

নাটকের দল থিয়েটার ৫২ পরিবেশন করে নাটক একটি সাহসী ফুল দেখা যায়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংক লুট, অর্থ পাচার, ভোটাধিকার হরণের মতো নানা বিষয় উঠে আসে নাটকটিতে।

এই নাটকের পর গান শোনান এলাহী মাসুদ। পরে ছিল শ্রুতি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর মূকাভিনয় উন্নয়নের সন্দেশ ও এক ক্ষুধার্তের গল্প। বিদেশি দাতা সংস্থার ঋণ, সরকারি দলের নেতাদের সম্পদ ফুলেফেঁপে ওঠা আর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুর্দশার চিত্র মূকাভিনয়ে উঠে আসে।

সমাবেশ মঞ্চের ডান পাশে ছিল প্রতিবাদী রাজনৈতিক কার্টুনের প্রদর্শনী। সমাবেশের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিনের জনতার প্রতি সমর্থন জানিয়ে মঞ্চের পাশে ছবি আঁকেন শিল্পীরা। এ ছাড়া সমাবেশ মঞ্চে বিভিন্ন সময় গান শোনান সায়ান, রোমান, আনা নাসরিন ও সোহাগ রহমান। আর কবিতা পাঠ করেন হাসান জামিল, সৈকত আমীন, শোয়েব মাহমুদ, ইকবাল আহমেদ, আমীর খসরু। এ ছাড়া ডেভেলপমেন্ট নামের একটি নাটক পরিবেশন করে নাটকের দল তীরন্দাজ। আরও ছিল সুমনা আকতারের পারফরম্যান্স আর্ট, এতে অনিয়মের বিরুদ্ধে মানুষকে সোচ্চার হতে আহ্বান জানানো হয়।

সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে মঞ্চ থেকে জানানো হয়, প্রশাসন সমাবেশ সংক্ষিপ্ত করতে চাপ দিচ্ছে। যে কারণে সবার নির্ধারিত পরিবেশনা শেষ করা সম্ভব না–ও হতে পারে। এরপর আয়োজকেরা সমাবেশ কিছুটা সংক্ষিপ্ত করেন। তালিকায় থাকা কয়েকটি পরিবেশনা বাদ দেওয়া হয়। সমাবেশ শেষ হয় সমগীত সাংস্কৃতিক প্রাঙ্গণের গানের মধ্য দিয়ে।

এ বিষয়ে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূর মোহাম্মদ শুক্রবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, আয়োজকেরা যা বলেছেন, সেটি ঠিক নয়। সেখানে নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা ছিল না। পুলিশ আয়োজকদের এমন কিছু বলেওনি।

তবে আয়োজকদের একজন অমল আকাশ প্রথম আলোকে বলেন, সমাবেশ চলার সময় সন্ধ্যার একটু আগে পুলিশের এক সদস্য এসে তাঁদের বলছেন নিরাপত্তার শঙ্কা রয়েছে। সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে সমাবেশ শেষ করতে অনুরোধ করেন তিনি। যে কারণে কিছুটা বাধ্য হয়ে সমাবেশ সংক্ষিপ্ত করতে হয়। পুলিশের এ ধরনের অনুরোধ থেকে বোঝা যায়, প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক সমাবেশ হোক, সেটি তারা চায় না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পরিকল্পনা আ. লীগের

অক্টোবর ১৫, ২০২৩, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কেবল শেখ হাসিনাই পারবেন দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে—এমন প্রতিপাদ্য সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার শুরু করার পরিকল্পনা করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

এই ক্যাম্পেইন আগামী নভেম্বর থেকে শুরু করে আগামী বছরের জানুয়ারিতে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত অন্তত চলবে।

আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, ক্ষমতাসীন দলটি ২ কোটি ২০ লাখ সক্রিয় ফেসবুক ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছাতে এই পরিকল্পনা করছে এবং তাদের শীর্ষ নেতারা বিশ্বাস করেন যে এই কাজের জন্য তারা প্রস্তুত।

আওয়ামী লীগের গবেষণা শাখা সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই) প্রায় আট হাজার মানুষকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা পরিকল্পনা ও প্রযোজনার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, যাদের বেশিরভাগই ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সদস্য।

নেতাকর্মীরা ইতোমধ্যে অনলাইন মাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

আওয়ামী লীগ সূত্র জানিয়েছে, এর পাশাপাশি তরুণদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে জেলায় জেলায় জনপ্রিয় গায়ক ও ব্যান্ড দলকে নিয়ে কনসার্ট করবে আওয়ামী লীগ। সেখানে বড় পর্দায় দলের প্রচারণার ভিডিও দেখানো হবে এবং উপস্থিত সবার মাঝে লিফলেট বিতরণ করা হবে।

আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওগুলো বুস্ট করা হবে। ব্যবহারকারীরা তার নিজ এলাকার ওপর তৈরি করা ভিডিওই মূলত দেখতে পাবেন। নির্দিষ্ট এলাকার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও অন্যান্য পরিবর্তন তুলে ধরে ওই এলাকার বাসিন্দা বা ভোটারদের কাছে ভিডিও পৌঁছে দেওয়া হবে।

মে ও জুন মাসে সিআরআই ৬১টি জেলায় সমীক্ষা চালিয়ে দেখেছে, সাধারণ মানুষ মূলত বেকারত্ব ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির কারণে এই সরকারের প্রতি হতাশ।

তারপরও এই সমীক্ষায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ মানুষ শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল বলেও জানা গেছে ওই সমীক্ষা থেকে।

ওই সমীক্ষা অনুযায়ী, মানুষ বিশ্বাস করে যে সরকার করোনা টিকা দেওয়া, মেগা উন্নয়ন প্রকল্প, গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া এবং পাকা রাস্তা নির্মাণে সফল হয়েছে।

এসব ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণায় শেখ হাসিনাকে সেরা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাকারী এবং জনগণ যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে বা ভবিষ্যতে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে, সেগুলোর সমাধানে সেরা নেতা হিসেবে তুলে ধরা হবে।

এই প্রচারণায় এই প্রশ্নও তোলা হবে যে বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশের নেতৃত্ব কে দেবে। বিগত ১৫ বছর ক্ষমতাসীন থেকে আওয়ামী লীগ যে ‘উন্নয়নের মাইলফলক ছুঁয়েছে’, তার সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের ‘দুঃশাসন’র তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হবে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কৃষিখাতে যে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে, তা তুলে ধরার পাশাপাশি বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন ‘সারের দাবিতে বিক্ষোভ করা কৃষকদের গুলি করা’র প্রতিবেদন দেখানো হবে পুরোনো সংবাদপত্র থেকে।

২০০৯ সালের আগে কাঁচা রাস্তার পাশাপাশি দেখানো হবে ২০০৯ সালের পরে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে নির্মিত পাকা রাস্তার সাম্প্রতিক ছবি।

যোগাযোগ করা হলে আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক সেলিম মাহমুদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘একদিকে আমাদের বিরুদ্ধে যেসব অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তা নস্যাৎ করতে কাজ করছি এবং অপরদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের অর্জিত উন্নয়নকে তুলে ধরছি।’

আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, বিএনপি সফলভাবে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছড়িয়ে দিয়েছে বলে দলটির নেতারা বিশ্বাস করেন। এ কারণেই আওয়ামী লীগ ‘গুজবের বিরুদ্ধে’ প্রচারণা চালাবে।

ডিসেম্বরের শেষের দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই প্রচারণা চলবে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের ওপর কেন্দ্র করে। দলটি তাদের প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগী প্রার্থীদের তুলনা তুলে ধরবে।

সিআরআইয়ের সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে, আইন প্রণেতা, শিক্ষক বা অন্য যেকোরো ব্লু টিক (ভ্যারিফায়েড) থাকা প্রোফাইলের পোস্ট গ্রামের মানুষ বেশি বিশ্বাস করে।

দেশের প্রতিটি উপজেলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালাতে কমিটি গঠন করেছে আওয়ামী লীগ। ঢাকা থেকে তাদের কাছে কনটেন্ট পৌঁছে দেওয়া হবে।

যোগাযোগ করা হলে আওয়ামী লীগের ওয়েব টিমের সমন্বয়ক তন্ময় আহমেদ বলেন, ‘আমরা ২০২০ সাল থেকে আমাদের প্রচারণাকারীদের প্রস্তুত করছি।’

ভোটের আগে মুঠোফোন নজরদারির নতুন ব্যবস্থা

১৮ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

নির্বাচনের আগে মুঠোফোনে নজরদারির নতুন ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে সরকার। এ ব্যবস্থায় কোন মুঠোফোন ব্যবহারকারী কোথায় অবস্থান করছেন, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাবে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা। এটি স্থাপন করতে মোবাইল অপারেটরদের ব্যয় হবে প্রায় ২০০ কোটি টাকা।

মুঠোফোন ব্যবহারকারীদের ওপর নজরদারির ব্যবস্থা এখনো আছে। এ ব্যবস্থায় একটি মুঠোফোন নম্বর ব্যবহারকারী কোন এলাকায় রয়েছেন, তা জানা যায়। তবে সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানা যায় না। নতুন ব্যবস্থা হবে আরও সুনির্দিষ্ট।

ধরা যাক, একজন মুঠোফোন ব্যবহারকারী এখন ফার্মগেট মোড়ে রয়েছেন। এখনকার ব্যবস্থায় সেখানকার মোবাইল নেটওয়ার্কের বেজ ট্রান্সসিভার স্টেশনের (বিটিএস, যা টাওয়ার নামে পরিচিত) আওতার তিনটি কেন্দ্রের (সেল) কোনটিতে গ্রাহক অবস্থান করছেন, তা জানা যায়। যেহেতু বিটিএসের আওতা মোটামুটি বড় থাকে, ফলে গ্রাহকের সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানা যায় না।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও টেলিযোগাযোগ খাত সূত্র বলছে, নতুন ব্যবস্থায় ওই ব্যক্তি ফার্মগেট মোড়ের ঠিক কোন জায়গায় আছেন, সেটিও সুনির্দিষ্টভাবে জানা যাবে। ফলে ব্যক্তি কোন ভবনে রয়েছেন, তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ব্যবহার করে জানা যাবে বিপুলসংখ্যক মানুষের গতিবিধি।

নতুন ব্যবস্থায় মুঠোফোন ব্যবহারকারীর ছয় মাসের ‘জিও লোকেশন’ উপাত্ত সংরক্ষণ করা হবে। সেখান থেকে তাঁর গতিবিধির এলাকা শনাক্ত করা সম্ভব। জিও লোকেশন হলো মুঠোফোন গ্রাহকের অবস্থানের তথ্য। একজন গ্রাহক মুঠোফোন নিয়ে যদি কোথাও যান, মুঠোফোন যদি সচল রাখেন, তাহলে তাঁর অবস্থানের তথ্য জানা যায় জিও লোকেশনের মাধ্যমে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞ প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় বেশিসংখ্যক মানুষের তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন। কারণ, প্রত্যেকের তথ্য আলাদা আলাদাভাবে সংগ্রহ করতে হয়। নতুন ব্যবস্থা কাজ করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে। এতে হাজার হাজার মানুষের জিও লোকেশন বিশ্লেষণ করা সহজ হয়ে যাবে।

সরকারি সংশ্লিষ্ট একটি সংস্থার নথি অনুযায়ী, নজরদারির নতুন ব্যবস্থায় সব ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান (আইএসপি), ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) প্রতিষ্ঠান, ন্যাশনাল ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ (এনআইএক্স) সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও মোবাইল অপারেটরের ব্যবস্থা একটি সরকারি সংস্থার ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। এর মাধ্যমে মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে গ্রাহকদের জিও লোকেশন তথ্য পাবে সব আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থা।

নজরদারির নতুন ব্যবস্থাটির নাম ‘ইন্টিগ্রেটেড লফুল ইন্টারসেপশন সিস্টেম’ (আইএলআইএস বা সমন্বিত আইনসম্মত আড়ি পাতার ব্যবস্থা)। নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্রে জানা গেছে, এটি চালুর জন্য ২০১৮ সালের মার্চে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল।

অনুলিপি দেওয়া হয়েছিল সরকারের কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে। তবে সরকারের প্রস্তুতির ঘাটতি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘গড়িমসিতে’ তা চালু হয়নি। তবে সম্প্রতি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডেকে আগামী মাস নভেম্বরের শুরু থেকে ব্যবস্থাটি চালু করতে বলে দেওয়া হয়েছে।

আগামী জানুয়ারি মাসের শুরুর দিকে দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তার আগে মাঠের বিরোধী দলগুলো নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলন জোরদারের কথা বলছে।

বিনিয়োগ অপারেটরদের

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গত ১২ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে এই ব্যবস্থা চালুর কথা বলেছিলেন। তখন তিনি বলেন, রাষ্ট্র ও সরকারবিরোধী বিভিন্ন কার্যক্রম বন্ধে ‘আইনসম্মতভাবে’ আড়ি পাতার ব্যবস্থা চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর একটি হলো আইএলআইএস।

এর আগে ২০২২ সালের ১ জুন সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ‘পার্ট প্রকিউরমেন্ট অব ইন্টিগ্রেটেড লফুল ইন্টারসেপশন (এলআই) সিস্টেম-জিও লোকেশন সিস্টেম অ্যান্ড রিলেটেড সার্ভিসেস’ কেনার প্রস্তাব অনুমোদন দেয়। তখন বলা হয়, এটি ফ্রান্সের ইন্টারসেক এসএর কাছ থেকে সরাসরি ক্রয় করা হবে। ব্যয় হবে ১৭২ কোটি টাকার কিছু বেশি।

সরকার বলছে, ব্যবস্থাটি চালু করা হবে অপরাধ দমনে। এ বিষয়ে ২০১৮ সালের মার্চে দেওয়া এক চিঠিতে বলা হয়, এই ব্যবস্থা ব্যবহার করে জনসাধারণের নিরাপত্তার জন্য অপরাধ ও অপরাধী শনাক্তকরণে প্রয়োজনীয় উপাত্ত সংগ্রহের জন্য পর্যবেক্ষণ কাজ পরিচালনা করা হবে। সব আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থা তাদের চাহিদা অনুযায়ী জিও লোকেশনসহ অন্যান্য সুবিধা পাবে।

২০২২ সালের ১৭ মার্চ ফ্রান্সের সংবাদমাধ্যম ইন্টেলিজেন্স অনলাইন এক প্রতিবেদনে জানায়, বাংলাদেশ ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে আড়ি পাতার প্রযুক্তি কিনেছে। এর আগে ২০১৫ সালে মুঠোফোনে আড়ি পাতা ও নজরদারির জন্য বাংলাদেশের কেনা সরঞ্জাম মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আটকে দিয়েছিল সুইজারল্যান্ড।

বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ও মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটব সূত্র জানিয়েছে, যে জিও লোকেশন-ব্যবস্থা চালুর জন্য বলা হয়েছে, সেটি বাস্তবায়ন করতে অপারেটরদের নতুন সফটওয়্যার ও সরঞ্জাম প্রয়োজন। তা কিনতে বড় অঙ্কের অর্থ দরকার। অ্যামটব এই অর্থ চেয়েছিল বিটিআরসির সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল (এসওএফ) থেকে। তারা যে প্রকল্প দাখিল করেছিল, সেটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২১০ কোটি টাকার সমান।

বিটিআরসি সূত্রে জানা যায়, গত ৮ আগস্ট ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সভাকক্ষে মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের সভাপতিত্বে সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলের ব্যবস্থাপনা কমিটির ২০তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় অ্যামটবের প্রস্তাব নাকচ করা হয় এই বলে যে টেলিযোগাযোগ আইন অনুযায়ী আবেদনটি বিবেচনার সুযোগ নেই। অর্থাৎ অপারেটরগুলোকে নিজস্ব অর্থে নতুন ব্যবস্থাটি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশে চারটি মোবাইল অপারেটর রয়েছে গ্রামীণফোন, রবি-আজিয়াটা, বাংলালিংক ও টেলিটক।

অ্যামটবের কাছে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল, নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা আছে, এমন ক্ষেত্রে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো, যারা মানবাধিকার ও গ্রাহকের গোপনীয়তার অধিকারের ক্ষেত্রে দায়বদ্ধ, তারা কি এ ধরনের উপাত্ত ভাগাভাগি করতে পারে? জবাবে অ্যামটবের মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার লিখিত বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ আইন ও এর আওতায় প্রদত্ত লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী মোবাইল অপারেটররা সেবা পরিচালনা করে আসছে। ওই আইনের নির্দেশনা অনুযায়ী অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও অপারেটররা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করে থাকে।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইনের ৯৭(ক) ধারায় বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার স্বার্থে’ যেকোনো টেলিযোগাযোগ সেবা ব্যবহারকারীর পাঠানো বার্তা ও কথোপকথন প্রতিহত, রেকর্ড ধারণ বা তত্সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহের জন্য সরকার সরকারি সংস্থার কোনো কর্মকর্তাকে ক্ষমতা দিতে পারবে। টেলিযোগাযোগ সেবাদানকারী নির্দেশ পালনে বাধ্য থাকবে।

তবে আইনজীবী ও অধিকারকর্মীদের কারও কারও মত, বার্তা ও কথোপকথনের কথা বলা হলেও ব্যক্তির অবস্থানের তথ্য দেওয়ার বিষয়টি আইনে নেই। এটা মানুষের গোপনীয়তার অধিকারের লঙ্ঘন। আর জনশৃঙ্খলা একটি বিস্তৃত বিষয়। এর সুযোগ নিয়ে সরকার সাধারণত সবার ওপর নজরদারি করে।

মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালয়ার আইন ও উদীয়মান প্রযুক্তি বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক মুহাম্মদ এরশাদুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, সভ্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে নজরদারির সুযোগ রাখা হয়, গণভাবে নয়। বাংলাদেশে ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলা’র কথা বলে গণনজরদারি করা হয়। বিরোধীদের দমাতে এটা যে ব্যবহার করা হয়, তা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

‘সেই নিশ্চয়তা নেই’

সেবাদানকারীরা বলছেন, উন্নত বিশ্বে মুঠোফোন ব্যবহারকারী ব্যক্তি সুনির্দিষ্টভাবে কোথায় অবস্থান করছেন, তার উপাত্ত ব্যবহার করা হয় জরুরি সেবাদানের ক্ষেত্রে। ব্যক্তির নাম ও পরিচয় ব্যবহারকারীরা জানতে পারেন না।

ধরা যাক, কোনো ব্যক্তি জাতীয় জরুরি সেবা নম্বরে ফোন করে বলছেন, তিনি বাসায় একা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাঁর চিকিৎসাসেবা দরকার। তখন তাঁর জিও লোকেশন ব্যবহার করে চিকিৎসাসেবাদাতারা পৌঁছে যান। বাংলাদেশে ৯৯৯-এ ফোন করার পর ঠিকানার খুঁটিনাটি বলতে হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশে জরুরি সেবাদান মূল উদ্দেশ্য নয়, বরং নজরদারির জন্য জিও লোকেশন উপাত্ত নেওয়ার নতুন ব্যবস্থা চালু হচ্ছে।

শুধু সমন্বিত আইনসম্মত আড়ি পাতার ব্যবস্থা নয়, সরকার এর আগেও মুঠোফোনে আড়ি পাতার কিছু প্রযুক্তি কিনেছে। গত ১০ জানুয়ারি ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম হারেৎস এক প্রতিবেদনে জানায়, ইসরায়েলের সাবেক এক গোয়েন্দা কমান্ডার পরিচালিত প্যাসিটোরা নামের একটি কোম্পানির কাছ থেকে মুঠোফোনে নজরদারির অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কিনেছে বাংলাদেশ সরকার।

এই প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে নজরদারির সরঞ্জাম ও গতিবিধি শনাক্ত করতে সক্ষম সফটওয়্যার দিয়ে সজ্জিত একটি গাড়ি, যা আশপাশের প্রায় আধা কিলোমিটারের মধ্যে থাকা মুঠোফোনের ‘এনক্রিপ্টেড’ (সুরক্ষিত) হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা, মেসেঞ্জারে কথোপকথন, যোগাযোগের তালিকা, কল ও খুদে বার্তার (এসএমএস) তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।

২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ফ্রান্সের সংবাদমাধ্যম ইন্টেলিজেন্স অনলাইন এক প্রতিবেদনে জানায়, বাংলাদেশ ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে আড়ি পাতার প্রযুক্তি কিনেছে। এর আগে ২০১৫ সালে মুঠোফোনে আড়ি পাতা ও নজরদারির জন্য বাংলাদেশের কেনা সরঞ্জাম মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আটকে দিয়েছিল সুইজারল্যান্ড।

২৮ অক্টোবর ঘিরে বিএনপিকে মোকাবিলার সর্বাত্মক প্রস্তুতি আওয়ামী লীগের

২১ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

বিএনপির ২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশকে এই মুহূর্তে ‘সর্বোচ্চ’ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার ও আওয়ামী লীগ। দলটির নীতিনির্ধারকদের অনেকে তাঁদের সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে এসে ওই মহাসমাবেশকে বিএনপির ‘মরণ কামড়ের’ শুরু হিসেবে দেখছেন। এ জন্য বিএনপির এই সমাবেশে চাপ প্রয়োগ করে জমায়েত ছোট করা, এমনকি হতে না দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে ক্ষমতাসীন দল।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলো বলছে, বিএনপির মহাসমাবেশ ঘিরে সরকার ও আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে যৌথ পরিকল্পনা করছে। সরকারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কয়েক দিন ধরে যে গ্রেপ্তার অভিযান শুরু করেছে, তা অব্যাহত থাকবে। বিএনপির যেসব নেতা লোক জমায়েতে ভূমিকা রাখেন এবং কর্মীদের ওপর যাঁদের প্রভার রয়েছে—এসব নেতাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। অন্যদিকে ঢাকার প্রবেশমুখগুলোতে কড়া পাহারাও বসানো হবে।

আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, বিএনপিকে চাপে রাখতে ২৮ অক্টোবরেই বড় সমাবেশ থাকবে আওয়ামী লীগের—এখন পর্যন্ত সেই নির্দেশনা আছে। তবে এর বাইরেও প্রয়োজন হলে ‘সতর্ক পাহারা’–এর নামে মিছিল হতে পারে।

অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো ঢাকায় একটি বড় সমাবেশ করবে। এর বাইরে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সতর্ক পাহারার ব্যবস্থাও রাখা হতে পারে।

আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, বিএনপিকে চাপে রাখতে ২৮ অক্টোবরেই বড় সমাবেশ থাকবে আওয়ামী লীগের—এখন পর্যন্ত সেই নির্দেশনা আছে। তবে এর বাইরেও প্রয়োজন হলে ‘সতর্ক পাহারা’–এর নামে মিছিল হতে পারে। রোববার নাগাদ কর্মসূচি চূড়ান্ত হতে পারে। তবে শেষ মুহূর্তে কর্মসূচি পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সরকার ও আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, ২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশের জন্য বিএনপির নেতা-কর্মী যাঁরা আসবেন, তাঁদের দলটি ঢাকায় রেখে দিতে পারে। এরপর লাগাতার সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান ঘেরাও কর্মসূচি দিতে পারে। ২৮ অক্টোবর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত বড় কিছু করার লক্ষ্য বিএনপির। এ পরিস্থিতিতে বিএনপিকে ২৮ অক্টোবর মহাসমাবেশ করতে দেওয়া ঠিক হবে কি না, এই আলোচনাও আছে সরকার ও আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে। তাঁদের কেউ কেউ গত বছরের ১০ ডিসেম্বরের মতো সড়কে সমাবেশের অনুমতি না দেওয়ার পক্ষে।

সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশকে জানিয়ে বিএনপি নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনের সড়কে সমাবেশ করেছে। ২৮ অক্টোবর সেখানে সমাবেশের অনুমতি না দিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অন্য কোনো মাঠে সমাবেশ করার প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। এই কৌশলে সমাবেশ এক-দুই দিন পিছিয়ে দেওয়ার কথাও বলা হতে পারে বিএনপিকে। এ দুটির যেকোনো পরিস্থিতিতে নিশ্চিতভাবেই বিএনপির জমায়েত ছোট হয়ে যাবে। আর বিএনপি বিনা অনুমতিতে সমাবেশ করতে চাইলে গত ২৯ জুলাই ঢাকার প্রবেশমুখে অবস্থান কর্মসূচির মতো তাদের দাঁড়াতেই দেওয়া হবে না।

শতাধিক মামলার বিচারে হঠাৎ দ্রুতগতি

২২ অক্টোবর ২৩, সমকাল

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বিরোধী দলের চূড়ান্ত আন্দোলন ঘিরে প্রবল বেগে চলছে বিএনপি নেতাদের মামলার বিচারকাজ। মামলার কার্যক্রমে এমনই গতি– দিনে তো বটেই, রাতেও চলছে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ। গতি পাওয়া এমন মামলার সংখ্যা শতাধিক। এ পটভূমিতে সাজাভীতিতে আচ্ছন্ন হয়ে আছেন বিএনপির অনেক প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ের পোড়খাওয়া নেতা। এরই মধ্যে বিএনপি নেতাকর্মীর কেউ কেউ শুনছেন মামলার রায়ও। প্রিয় রাজনীতির মাঠকে আপাতত বিদায় বলে সাজা মাথায় নিয়ে তাদের কারও কারও গন্তব্য চৌদ্দ শিকে।

সারাদেশে বিএনপি নেতাকর্মীর নামে মামলা দেড় লক্ষাধিক। নতুন-পুরোনো মামলার মিশেলে আদালত আঙিনায় চক্কর দিতে দিতেই ঘাম ছুটছে তাদের। কাঠগড়া, হাজিরা, জামিন– এসবই আসামিদের এখনকার যাপিত জীবন। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক আর কর্মজীবন হয়ে গেছে তছনছ। নতুন করে ভর করেছে মামলার সাজার শঙ্কা।

এর মধ্যেই গতকাল শনিবার আইনজীবীদের মহাসমাবেশে অগ্নিসন্ত্রাসীদের মামলাগুলোর বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আইনজীবী ও সরকারি কর্মকর্তাদের অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০১৩ সালে যারা অগ্নিসন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত, জেলায় জেলায় যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে– সেগুলো দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে।’

অবশ্য বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল সমকালকে বলেন, ‘আমাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেই প্রমাণ মিলেছে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এ ধরনের নির্দেশনায় এখন আরও দ্রুতগতিতে আদালত বিএনপি নেতাদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে ফরমায়েশি সাজা দিতে উৎসাহিত হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের নেতাদের অতিদ্রুত সাজা দিতে সরকার সেল গঠন করেছে। এটা এখন সারাদেশেই চলছে। সরকার তালিকা ধরে বিভিন্ন জেলায় গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দ্রুত শেষ করতেই ওই সেল করেছে। সরকার বিরোধী দল নির্মূলে পোড়ামাটি নীতি নিয়েছে।’ বিএনপি নেতারা অভিযোগ করে বলছেন, ঢাকা মহানগরে দলের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে প্রায় ১৮ হাজার মামলা রয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক মামলার সাক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে। গত ছয় মাসে ঘোষিত এসব মামলার রায়ে ৯৬ নেতাকর্মীর সাজা হয়েছে। নজিরবিহীনভাবে এসব মামলার কার্যক্রমকে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এসব মামলার ঘন ঘন তারিখ দিয়ে নির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে নেতাকর্মী অভিযোগ করেন।

হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়

দুই বছরের বেশি সাজা পাওয়া ব্যক্তি নির্বাচনে অযোগ্য

২২ অক্টোবর ২৩, সমকাল

দুর্নীতির মামলায় দুই বছরের বেশি সাজা পাওয়া আসামি সাংবিধানিকভাবেই সংসদ নির্বাচনে অযোগ্য হবেন বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। রায়ে আদালত বলেছেন, জামিন বা সাজা স্থগিত থাকলেও তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না, যদি তাঁর সাজা উপযুক্ত আদালতে বাতিল না হয়। আপিল বিচারাধীন থাকা মানে দণ্ডিত ব্যক্তি নির্দোষ নন। একমাত্র উপযুক্ত আদালতে সাজা বাতিল হলে দণ্ডিত ব্যক্তি নির্দোষ হবেন। দণ্ড বাতিল না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত বিএনপির পাঁচ নেতার আলাদা আবেদন খারিজ করে বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলম সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর সংক্ষিপ্ত এ রায় ঘোষণা করেছিলেন। পাঁচ বছর পর সম্প্রতি দুই বিচারপতির সই শেষে ৪৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। আজ রোববার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে রায়টি প্রকাশ করা হয়েছে।

নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিচারে রাতেও চলছে আদালত

অক্টোবর ২৩, ২০২৩, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

গোলাম আক্তার ইকবাল গত ২৮ আগস্ট যখন ঢাকার একটি আদালত থেকে শুনানি শেষে বেরিয়ে আসেন, তখন তাকে বেশ বিমর্ষ লাগছিল। তার চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩ এ সারাদিন কেটেছে তার।

তার এক আইনজীবী দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, পরিপূর্ণ আদালত কক্ষে কার্যক্রম শুরু হয় সকাল সাড়ে ১০টায় এবং চলে বিকেল প্রায় পৌনে ৪টা পর্যন্ত। এরপর প্রায় ১৫ মিনিটের বিরতির পর আবারও শুনানি শুরু হয় ৪টায়। সেদিনের শুনানি শেষ হয় রাত ৮টায়। অথচ, আদালতের অফিস সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। অর্থাৎ, অফিস সময়ের বাইরেও অন্তত তিন ঘণ্টা চলেছে আদালতের কার্যক্রম।

৭১ বছর বয়সী ইকবালের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও প্রস্টেটের সমস্যা রয়েছে। সেই সঙ্গে তিনি চোখে কম দেখেন।

ওয়ার্ড বিএনপির এই নেতার বিরুদ্ধে ৫২টি মামলা আছে। অগ্নিসংযোগ, বিস্ফোরণ, ভাঙচুর ও পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে দায়ের করা এসব মামলায় নিয়মিত তাকে শুনানির জন্য আদালতে হাজিরা দিতে হয়।

রাজধানীর শান্তিনগরের বাসিন্দা ইকবাল গত ১০ বছরের একটা বড় সময় কাটিয়েছেন আদালতের বারান্দায়। তবে, ছুটির দিন ছাড়া গত কয়েক মাসের প্রায় প্রতিটি দিনই তার কেটেছে আদালতে।

আগে মামলার শুনানির তারিখ কয়েক মাসের ব্যবধানে ফেলা হতো। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে খুব কমই উপস্থিত হতেন। শুনানির একটি তারিখ থেকে আরেকটি তারিখের এই ব্যবধান এখন কমে এসেছে। কারণ, ইকবালের মামলার মতো পুরোনো মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে সরকারি নির্দেশের পর বিচার এখন দ্রুত এগোচ্ছে।

চলতি বছরের ২৮ আগস্ট থেকে ১৮ অক্টোবরের মধ্যে এমন সাতটি বিচার কার্যক্রম সম্পর্কে ডেইলি স্টার নিশ্চিত হয়েছে, যেগুলোর কার্যক্রম রাতেও হয়েছে এবং এসব মামলার প্রতিটির সঙ্গেই বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা জড়িত।

উদাহরণ হিসেবে দেখা যায় গত ২৮ আগস্টের মামলার বিচার কার্যক্রমকে। ওই দিন আদালত দুই ধাপে ১৬ সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করেন, যাদের সবাই পুলিশ সদস্য।

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে মামলার এক আইনজীবী ডেইলি স্টারকে জানান, ইকবালের বিরুদ্ধে একটি মামলার শুনানি সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সোয়া ১২টা পর্যন্ত এবং আরেকটি মামলার শুনানি বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলে।

ওই আইনজীবী বলেন, ‘আদালত অফিস সময়ের মধ্যে মাত্র তিন সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করতে পেরেছেন। সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় বাকি সাক্ষীদের জবানবন্দি রেকর্ড করার জন্য আরেকটি তারিখ চেয়ে আদালতের কাছে আবেদন করি। কিন্তু আদালত শুনানি চালিয়ে গেছেন।’

বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা অন্তত ৭০০ মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন মেসবাহ ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমি ১৭ বছর ধরে ঢাকার আদালতে প্র্যাকটিস করছি। এই দীর্ঘ কর্মজীবনে কখনো রাতে বিচার কার্যক্রম দেখিনি।’

গণতান্ত্রিক ও নিরাপদ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে চায় বিএনপি

২৩ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

একটি অবাধ, মুক্ত, উদার, গণতান্ত্রিক ও নিরাপদ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় (ইন্দো-প্যাসিফিক) অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় বিএনপি কাজ করতে চায় বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা। ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল’ শিরোনামে আজ সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সেমিনারে এ কথা বলেন তাঁরা।

বিএনপি আয়োজিত ওই সেমিনারে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, কানাডা, জাপান, নেদারল্যান্ডস, কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদের সঞ্চালনায় সেমিনারে মির্জা ফখরুল ছাড়াও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, অধ্যাপক শাহিদুজ্জামান, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান (মান্না), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম ও গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হকসহ অনেকে বক্তব্য দেন।

সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল বলেন, এ সময়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা অনেক চ্যালেঞ্জের। এই চ্যালেঞ্জ উত্তরণের জন্য সমমনা দেশগুলোকে একই ফ্রেমওয়ার্কের (রূপরেখা) ভাবনা নিয়ে এগোতে হবে। ভারত–প্রশান্ত মহাসাগরীয় (ইন্দো-প্যাসিফিক) অঞ্চলে বিএনপি মিত্র হিসেবে কাজ করতে চায় বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বর্তমান সময়টা জাতির জন্য সবচেয়ে সংকটময় বলে মন্তব্য করেন বিএনপি মহাসচিব। প্রতিহিংসার কারণে শাসকগোষ্ঠী বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিনা চিকিৎসায় মুমূর্ষু অবস্থায় রেখেছে বলেও দাবি করেন তিনি। বিএনপি মহাসচিব অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকার আমলে প্রায় ৭০০ ব্যক্তিকে গুম করা হয়েছে। ৪৫ লাখ মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে।

মির্জা ফখরুল অভিযোগ করেন, বিরোধী কেউ যাতে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে, সেই নির্বাচনী পরিকল্পনা সরকার তৈরি করেছে। তার অংশ হিসেবে বিএনপি নেতা–কর্মীদের ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত করা হচ্ছে, যাতে তাঁরা নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন। সব রাজনৈতিক দল এখন সরকারের পদত্যাগ চাইছে, মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই দাবি আদায়ে সক্ষম হবেন বলে তিনি আশাবাদী।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাতে তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৭ বছরে কর্তৃত্ববাদী সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অন্যায়ের শিকার হয়েছে বিএনপি। আমির খসরুও বলেন, বিএনপি জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রেখে একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল ইন্দো–প্যাসিফিক অঞ্চল নিশ্চিত করতে চায়। তিনি বলেন, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলোর যথাযথ সংরক্ষণই ইন্দো–প্যাসিফিক কৌশলের ভিত্তি পাকা করবে বলে তাঁরা বিশ্বাস করেন।

আটকের ক্ষমতা পাচ্ছেন আনসার সদস্যরা, বিল উঠল সংসদে

২৩ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমোদনক্রমে অপরাধীকে আটক করার ক্ষমতা পাচ্ছেন আনসার ব্যাটালিয়ন সদস্যরা। এ বিধান রেখে ‘আনসার ব্যাটালিয়ন বিল, ২০২৩’ জাতীয় সংসদে তোলা হয়েছে।

আজ সোমবার সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বিলটি উত্থাপনের অনুমতি চাইলে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম আপত্তি জানান। তবে তাঁর আপত্তি কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। চলতি সংসদেই বিলটি পাস হতে পারে। এতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দায়িত্ব পালনের সময় আনসার সদস্যরা তাঁদের নতুন ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ পাবেন।

বিলটি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে ফখরুল ইমাম বলেন, ‘কথায় আছে, বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড়। এখানে বাঁশের চেয়ে কঞ্চি শক্ত হয়ে গেছে। পুলিশের কাজটা যদি বিভক্ত এবং সমান্তরাল করা হয়, তাহলে কাজটা করা যাবে না। দেশে সেনা, নৌ, বিমানবাহিনীর আলাদা আলাদা কাজ আছে। এলিট বাহিনীও করা হয়েছে।’

ফখরুল ইমাম বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তার জন্য আনসার বাহিনী তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এই বিল পাস হলে পুলিশ যা করে, আনসার বাহিনীও তা করতে পারবে।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, দুর্যোগ এলে আনসার বাহিনীর সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে পরিমাণ সদস্য প্রয়োজন, পুলিশ বাহিনীতে এত পরিমাণ সদস্য নেই। এ পর্যন্ত ছয় লাখ আনসার সদস্য নিয়োগ করতে হয়েছে। নির্বাচনের সময় সমপরিমাণ আনসার সদস্য মোতায়েন করতে হবে। ২০১৩ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনকে ঘিরে ‘অগ্নিসন্ত্রাসের’ কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তখন দেশ অচল করে দেওয়ার সময় আনসার বাহিনী যানবাহন চলাচলের জন্য নিশ্চয়তা প্রদান করেছে। তিনি বলেন, পুলিশের সমান্তরাল বাহিনী হিসেবে আনসারকে তৈরির পরিকল্পনা সরকারের নেই। প্রস্তাবিত বিলে কোনো সাংঘর্ষিক বিধান থাকলে তা সংসদীয় কমিটিতে সংশোধন করা যাবে

আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি

 

পুলিশের কথায় এজাহারে সই করেছেন বাদী

৩১ জুলাই ২০২৩, প্রথম আলো

ঢাকার অদূরে সাভারের আশুলিয়ায় একটি যাত্রীবাহী বাসে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গত শনিবার রাতে আশুলিয়া থানায় মামলা করেন ক্ষতিগ্রস্ত বাসের চালক মো. আনোয়ার হোসেন। মামলার এজাহারে ৩২ জনের নাম-পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা সবাই বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে বাদী বলছেন, আসামিদের কাউকে তিনি চেনেন না। পুলিশের কথামতো এজাহারে সই করেছেন।

মামলার আসামি ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব মো. আসাদুজ্জামান মোহন প্রথম আলোকে বলেন, ‘কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা ছাড়াই রাজনৈতিক বিবেচনায় আমাদের হয়রানি করার জন্য মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আমরা সবাই দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিতে গাবতলীতে ছিলাম। এরপরও আমাদের আসামি করা হয়েছে। আসামি ৩২ জনের অধিকাংশই বিএনপির সাবেক ও বর্তমান পদধারী নেতা।’

বিএনপির নেতা-কর্মীরা জানান, মামলায় আসামি নেতা-কর্মীদের মধ্যে রকি দেওয়ান জেলা যুবদলের সহসভাপতি, আনোয়ার হোসেন (রানা) আশুলিয়া থানা বিএনপির প্রচার সম্পাদক, আইয়ুব খান জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক, তমিজ উদ্দিন ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক।

মামলার বর্ণনায় বলা হয়েছে, বাদী আনোয়ার হোসেন বিকাশ পরিবহনের বাস নম্বর ঢাকা মেট্রো-ব-১১-০৬০৬-এর চালক। গত শনিবার তিনি বাসটি নিয়ে বেলা ৩টা ৫ মিনিটে নিরিবিলি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র হাসপাতাল-সংলগ্ন শাহজালাল হোটেলের সামনে থেকে ঢাকার আজিমপুর যাওয়ার উদ্দেশে রওনা হন। ৩টা ১০ মিনিটের দিকে আশুলিয়ার নিরিবিলি এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে পৌঁছালে বাদী আসামিদের বিএনপির অবস্থান কর্মসূচি সফল করার লক্ষ্যে মহাসড়কের ওপর অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দিয়ে রাস্তায় চলাচলরত যানবাহন ভাঙচুর করতে দেখেন। একপর্যায়ে আসামিরা বাসের সামনে এসে বাসের সব কাচ ভাঙচুর করে গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেন। ওই সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ওই স্থানে পৌঁছালে আসামিরা পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যান। পরে ফায়ার সার্ভিস এসে বাসের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এতে ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া আশুলিয়া থানা-পুলিশ ৩টা ২৫ মিনিটে ঘটনাস্থল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত বাস ও দুটি বিস্ফোরিত ককটেলের অংশবিশেষ জব্দ করে। স্থানীয়ভাবে আসামিদের নাম-ঠিকানা জানতে পারেন আনোয়ার হোসেন। ঘটনার পর বাসমালিকের সঙ্গে আলোচনা করে এবং আসামিদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে থানায় অভিযোগ করা হয়।

বাদী মো. আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার গাড়ি থিকা ২০০ মিটার আগে (সামনে) হবে, দেখি কতগুলা গাড়ি ভাঙতাছে, চুরমার করে দিচ্ছে। এদিকে আমার স্টাফ (চালকের সহকারী) আইসা বলতেছে, “ওস্তাদ গাড়ি ভাঙতেছে, আপনি গাড়ি ব্যাক (পেছনে ঘুরিয়ে) দিয়া তাড়াতাড়ি করে গাড়িটা ঘুরাইয়া দেন।” তখন আমি গাড়ি ব্যাক দিছি। তখনই ওরা দৌড়াইয়া আইসা কইতাছে, “ওই গাড়ি ঘুরাইতাছে, ওই গাড়ি ধর।” আমি গাড়ি ঘুরাইতে ঘুরাইতে ওরা গাড়ির গ্লাস ভাঙচুর করে। আমারে বলে, “তরে গাড়ি বাইর করতে কে কইছে?” আমারে বাড়ি মারতে চাইছে, মনে হয় ওটা দায়ের কোপ ছিল। আমি লাফও মারছি, কোপটাও গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে পড়ছে। আমি দৌড় মারছি। পরে কোনো গ্যাঞ্জাম নাই দেইখা আসছি, দেখি গাড়িতে আগুন জ্বলতেছে। ওরা ৭০-৮০ জন ছিল।’

এজাহারে উল্লেখিত নাম-পরিচয়ের বিষয়ে বাদী মো. আনোয়ার হোসেন কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন। তিনি শুধু সই করেছেন বলে জানান।

আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাকে যে জায়গাতে পুলিশ সিগনেচার (সই) দিতে বলছে, আমি ঠিক সে জায়গাতেই দিয়েছি। কাউরে কোনো অবস্থায় আমি চিনতে পারি নাই। জান বাঁচে না আমার, আমি লোক চিনব না জান বাঁচাব। ককটেল বা কোনো কিছু ফোটার শব্দ আমি শুনি নাই। আমি দৌড়াইয়া যখন গেছি, তখন হইতে পারে।’

আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস এম কামরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, বাস ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা প্রকাশ্যে করেছেন আসামিরা। তাঁরা সবাই বিএনপির নেতা-কর্মী।

প্রতিবেদন জমার সময় পেছাবে আর কতবার

০৮ আগস্ট ২৩, সমকাল

সে সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তারের অঙ্গীকার করেছিলেন। ৪৮ ঘণ্টার পর সপ্তাহ, মাস, বছর পেরিয়ে যুগ পার হতে চললেও সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির হত্যাকারীদের ধরা তো যায়ইনি; উল্টো মামলার তদন্ত গতিহারা। আলোচিত এই জোড়া খুনের ১১ বছর পাঁচ মাস ২৬ দিন পেরিয়েছে গতকাল। এত বছরেও এ হত্যা মামলার তদন্ত একই বৃত্তে ঘুরছে। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য গতকাল সোমবার র‍্যাবকে শততম বার সময় দিয়েছেন আদালত। শিগগিরই এই মামলার রহস্যভেদ হবে– এমন কোনো আলামতও নেই। দীর্ঘ দিনেও তদন্ত শেষ না হওয়ায় হতাশ সাগর-রুনির পরিবার ও সাংবাদিক মহল।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। ঘটনার দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তার করা হবে। খুনের দুই দিন পর পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকারও বলেছিলেন, তদন্তের প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।

সাগরের মা সালেহা মনির সমকালকে বলেন, তদন্তে সময় পেছানোর সেঞ্চুরি হলো। কবে শুনব যে, ডাবল সেঞ্চুরি হয়েছে। প্রতিবারই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগে থেকে আশায় থাকি– সুসংবাদ পাব। নামাজের সময় দোয়া করতে থাকি। এবারও সুসংবাদ পেলাম না। মাঝেমাঝে দমে যাই, হতাশ হই, তবু আমি বিচার চাইতেই থাকব। যে দু’জনকে শনাক্ত হওয়ার কথা শুনি, তাদের ধরতে চিরুনি অভিযান চালানো হোক। কত বড় বড় ঘটনায় অপরাধীরা অল্প সময়ের মধ্যে ধরা খাচ্ছে!

সাগর-রুনির খুনিদের কেন ধরা যাবে না? খবরে দেখি– পিবিআই কত বছর আগের মামলায় খুনিদের চিহ্নিত করছে! র‍্যাব যদি না পারে, এই মামলার তদন্তভার পিবিআইকে দেওয়া হোক।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মুহাম্মদ নুরুল হুদা সমকালকে বলেন, আদালত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় বেঁধে দিতে পারেন। কেন বারবার সময় পেছানো হচ্ছে, তার কারণ তারা জানতে চাইতে পারেন। যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া শতবার সময় চাওয়া অগ্রহণযোগ্য।

র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন,  যুক্তরাষ্ট্রে আলামত পাঠিয়ে দুই সন্দেহভাজনের ডিএনএ নমুনা মিললেও তাদের শনাক্ত করা যায়নি। সন্দেহভাজন দু’জনের পরিচয় বেরিয়ে এলেই তাদের তদন্ত এগিয়ে যাবে। র‍্যাব সর্বোচ্চ গুরুত্ব এবং আন্তরিকতার সঙ্গে এ মামলার তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। গুরুত্ব না দিলে প্রায় ২৫ জনের আলামত যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো যেত না। নির্দোষ কেউ যেন কোনোভাবে জড়িয়ে না যান– সেই ব্যাপারটিও তদন্তে গুরুত্ব দিয়ে দেখছি আমরা। 

মঈন আরও বলেন, সাগর-রুনি হত্যার তদন্তের দায়িত্ব আমাদের দেওয়া হয়েছিল আদালতের নির্দেশে। আমরা যখন তদন্ত প্রতিবেদন দেব, তখন কোনোভাবেই যেন কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি ভিক্টিমাইজড না হন– এ বিষয়টি আমলে নিয়ে তদন্ত করে যাচ্ছি। মঈন বলেন, আপনারা জনেন, খুব কম হত্যাকাণ্ডের আলামত ডিএনএ পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছে। এই মামলার আলামত আমরা যুক্তরাষ্ট্রের একটি কোম্পানিতে পরীক্ষার জন্য পাঠাই। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেই আমরা তা পাঠিয়েছিলাম।

র‍্যাবের মুখপাত্র আরও বলেন, যাদের প্রাথমিকভাবে সন্দেহ হয়েছিল, তাদের ডিএনএ আলামত পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছিলাম। যে প্রতিবেদন পেয়েছি, সেটি যাচাই-বাছাই করে সেখানে আমরা দু’জনকে পেয়েছি। ডিএনএ পরীক্ষা থেকে যে দু’জন সাসপেক্ট পাওয়া গেছে তাদের আমরা এখনও শনাক্ত করতে পারিনি।

তদন্ত শেষ করতে এতদিন সময় লাগা স্বাভাবিক কিনা– এমন প্রশ্নে র‍্যাবের মুখপাত্র বলেন, আমাদের মূল উদ্দেশ্য তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করা। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত আসামি শনাক্ত করতে বিশ্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলায়ও বেশি সময় লাগার উদাহরণ আছে।

খুনি কারা– এটা জানা হয়নি রুনির মা নুরুন নাহারের। গত বছর তিনি মারা যান। সাগরের মা-ও এখন বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছেন। খুনের সময় এই সাংবাদিক দম্পতির ৪ বছরের ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘ এখন ‘ও’ লেভেলে পড়ছে।

২০১২ সালে সাংবাদিক দম্পতি হত্যার পর রুনির ভাই নওশের আলম বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন। প্রথমে মামলাটি তদন্ত করে  শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ। চার দিনের মাথায় মামলাটির তদন্তভার যায় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ-ডিবির কাছে। তদন্তের ৬২ দিনের মাথায় উচ্চ আদালতে ব্যর্থতা স্বীকার করে ডিবি। পরে উচ্চ আদালতের নির্দেশে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল মামলাটি র‍্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়। হত্যার ৭৬ দিনের মাথায় ওই বছরের ২৬ এপ্রিল ফের ময়নাতদন্তের জন্য কবর থেকে তোলা হয় সাগর-রুনির লাশ।

মামলার বাদী নওশের আলম রোমান বলেন, ‘এখন মানসিকভাবে এমন অবস্থায় রয়েছি, কোনো কিছুতেই নতুনভাবে হতাশ হই না। এটা যেন আমাদের জন্য কাঙ্ক্ষিত। তদন্ত যে-ই করুক, আমরা বিচার চাই।’

তদন্ত প্রতিবেদন পেছানোর যত ঘটনা

শুধু সাগর-রুনি হত্যা মামলা নয়, তদন্তের জন্য প্রতিবেদন জমা দিতে সময় নেওয়ার নজির রয়েছে আরও অনেক মামলায়। আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজের শিক্ষক অঞ্জলী দেবী হত্যা মামলায় ১৩৬ বার, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলায় ৭২ বার, ছাত্রলীগের সাবেক সহসম্পাদক দিয়াজ ইরফান চৌধুরী হত্যা মামলায় ৬৯ বার, বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া বার্নিকাটের গাড়ি বহরে হামলার মামলায় ৬৬ বার, নারায়ণগঞ্জের কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যা মামলায় ৬৪ বার সময় নিয়েছেন সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা। এ ছাড়া কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যা ও  দৃক গ্যালারির কর্মকর্তা ইরফানুল ইসলাম হত্যা মামলা ৭ বছর ধরে তদন্তের অপেক্ষায় ঝুলে আছে। এসব মামলায় দফায় দফায় তদন্ত কর্মকর্তা বদলিয়েও সুফল মেলেনি।

সুপ্রিম কোর্টের বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের সব আদালতে ৪২ লাখ ৮ হাজার ৯৮৭ মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে ৬৪ জেলা আদালতে বিচারাধীন ফৌজদারি মামলার সংখ্যা ১৯ লাখ ২৪ হাজার ১৮২টি। এসব মামলা ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী থানা পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), রেল ও নৌ পুলিশ মামলার অধিক্ষেত্র অনুযায়ী তদন্ত করে। র‍্যাব ও আদালত নির্ধারিত কমিশনও মামলার তদন্ত করে থাকে। চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচার দীর্ঘায়িত হলে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদারক সেলে পাঠানো হয়। সেখানে পর্যালোচনার পর অনেক মামলা নিষ্পত্তির জন্য  পাঠানো হয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে। এরপরও তদন্ত শেষ না হওয়ায় হাজারও মামলার বিচার থমকে আছে।

বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্‌দীন মালিক বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় ব্যস্ত। তারা অনেক ক্ষেত্রে তদন্তের জন্য সময় দিতে পারছে না। ২০১০ সালে দেশে যত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এক যুগ পরে এসে তার কতটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে এবং বিচার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে ও কতজন দোষী প্রমাণিত হয়েছে, সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। এর হার যদি ২৫ ভাগের নিচে হয় তাহলে বুঝতে হবে অপরাধ তদন্তের পুলিশ বাহিনী দক্ষতা নিম্নমানের।

২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি খুন হন চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজের শিক্ষক অঞ্জলী দেবী। ৮ বছরেও খুনের রহস্য উদ্ঘাটিত না হওয়ায় বিচারের আশা ছেড়ে দিয়েছে অঞ্জলীর পরিবার। গোয়েন্দা পুলিশের পর মামলাটি এখন পিবিআই তদন্ত করছে। এ পর্যন্ত ৯ বার তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছে। তারা ১৩৬ বার আদালত থেকে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সময় নিয়েছেন।

২০১৬ সালের ২০ নভেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বাসা থেকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসম্পাদক দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ হত্যা মামলার তদন্ত এখনও থামকে আছে। সিআইডি ৬৪ দফা সময় নেওয়ার পর গত ২৩ ফেব্রুয়ারি আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। তবে ওই প্রতিবেদন আমলে না নিয়ে পিবিআইকে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। পিবিআই এরপর ৫ দফা সময় নিলেও তদন্ত প্রতিবেদন এখনও জমা দেয়নি।

তদন্তের অপেক্ষায় বিচার থমকে রয়েছে নারায়ণগঞ্জের ত্বকী হত্যা মামলাও। ২০১৩ সালের ৮ মার্চ শহরের ৫ নম্বর ঘাট এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর শাখা খাল থেকে ত্বকীর লাশ উদ্ধার করা হয়। র‍্যাব তদন্ত করছে। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য এ পর্যন্ত ৬৪ বার সময় দিয়েছেন আদালত।

 

সাঈদীর জানাজাকে কেন্দ্র করে চকরিয়ায় সংঘর্ষে একজন নিহত, ওসিসহ ২০ পুলিশ আহত

১৫ আগস্ট ২০২৩, বাংলা ট্রিবিউন

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর গায়েবানা জানাজা শেষে ফেরার পথে কক্সবাজারের চকরিয়ায় পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় বাধা দিতে গেলে জামায়াত নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ফোরকানুর রহমান নামের এক ব্যক্তি নিহত ও চকরিয়া থানার ওসি জাবেদ মাহমুদসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। একই দিন বিকালে পেকুয়া উপজেলায় সাঈদীর গায়েবানা জানাজা শেষে ফেরার পথে পুলিশের ওপর হামলায় ১৫ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

মঙ্গলবার (১৫ আগস্ট) বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে চকরিয়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের লামার চিরিঙ্গা বায়তুশ শরফ সড়কে এ ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মো. মাহফুজুর রহমান।

নিহত ফোরকানুর রহমান (৪৫) চকরিয়া পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেতপাড়ার মৃত ফজলুর রহমানের ছেলে। আহত পুলিশ সদস্যদের চকরিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। ফোরকানুর রহমান জামায়াতের সমর্থক বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা।

 

ছাত্রদলের ছয় নেতাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ বিএনপির

১৯ আগস্ট ২০২৩, প্রতিদিনের বাংলাদেশ

রাজধানীর আজিমপুর থেকে ছাত্রদলের ছয় নেতাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি।

শুক্রবার (১৮ আগস্ট) রাতে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ছাত্রদল নেতাদের তুলে নেওয়ার অভিযোগ করে এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, ‘আজ (বৃহস্পতিবার) বেলা ১১টায় আজিমপুরে নিজ বাসা থেকে বের হওয়ার পর ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সিনিয়র যুগ্মসম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসানকে আর পাওয়া যাচ্ছে না। জিসানের খোঁজ নেওয়ার জন্য তার বাসার সামনে গেলে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসাধারণ সম্পাদক শাহাদত হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সহসভাপতি মো. হাসানুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল রিয়াদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ রহমান হল ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জহির উদ্দীন মোহাম্মদ বাবরকে সাদা পোশাকধারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকেরা তুলে নিয়ে যায়। এখন পর্যন্ত তাদের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।’

এখনো নিখোঁজ ১৫৩ জন, অপেক্ষায় স্বজনেরা

৩০ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

পুরান ঢাকার বংশালের মো. সোহেল যখন নিখোঁজ হন, তখন তাঁর মেয়ে সাফার বয়স ছিল মাত্র ২ মাস। সাফার বয়স এখন ১০ বছর, তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। বাচ্চাদের অনেকে বাবার হাত ধরে স্কুলে যায়, বাবাকে নিয়ে গল্প বলে। সাফা বাসায় ফিরে প্রশ্ন করে বাবা কোথায়? বায়না ধরে, বাবার সঙ্গে স্কুলে যাবে। উত্তর দিতে পারেন না সাফার মা নিলুফার ইয়াসমিন।

সোহেল বংশাল থানা ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর ঢাকার শাহবাগ থেকে আরও তিনজনসহ নিখোঁজ হন তিনি। নিলুফার ইয়াসমিনের অভিযোগ, ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এঁদের ধরে নিয়ে যায়। এরপর আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। নিলুফার গতকাল মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখনো অপেক্ষায় আছি, সোহেল একদিন ফিরে আসবে।’

নিলুফারের মতো অপেক্ষার প্রহর গুনছেন এখনো নিখোঁজ থাকা ব্যক্তিদের স্বজনেরা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের (এএইচআরসি) হিসাবে, এ রকম এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ১৫৩ ব্যক্তি। যাঁরা গত ১৩ বছরে বিভিন্ন সময়ে গুম হয়েছেন। হংকংভিত্তিক এই সংস্থা বলছে, ২০০৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশে ৬২৩ ব্যক্তি গুমের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৮৪ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। জীবিত অবস্থায় ফিরে এসেছেন বা পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে ৩৮৩ জনকে। আর তিনজনের বিষয়ে কোনো তথ্য জানা যায়নি।

ছয় জেলায় ৪৮০৭ নেতাকর্মীর নামে মামলা, গ্রেপ্তার ৪৮

০৩ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন দল ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ককটেল বিস্ফোরণসহ বিভিন্ন অভিযোগে শুক্রবার রাত থেকে গতকাল শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত অন্তত ছয় জেলায় মামলা হয়েছে। এসব মামলায় বিএনপির ৪ হাজার ৪৫৩ জনের বেশি নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ৪৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গায়েবি অভিযোগে হয়রানি করতেই এসব মামলা ও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন বিএনপির নেতারা।

ময়মনসিংহ বিভাগের ১১টি থানায় পৃথক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ২ হাজার ৩৯১ জনকে। তাদের মধ্যে ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করে শনিবার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশের এডিসি হারুনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো

১১ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

ছাত্রলীগের তিন কেন্দ্রীয় নেতাকে থানায় মারধর করার ঘটনায় পুলিশের রমনা বিভাগ থেকে বদলি হওয়া অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) হারুন অর রশিদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির আদেশে আজ সোমবার বিকেলে এডিসি হারুনকে সাময়িক বরখাস্তের প্রজ্ঞাপনে সই করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমান।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, হারুন অর রশিদকে জনস্বার্থে সরকারি কর্ম থেকে বিরত রাখা আবশ্যক ও সমীচীন। তাঁকে সরকারি চাকরি আইনের বিধান অনুযায়ী ১১ সেপ্টেম্বর (২০২৩) থেকে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।

‘র‍্যাব পরিচয়ে’ তুলে নেওয়ার ১৭ দিনেও খোঁজ মিলছে না তরুণের, অভিযোগ পরিবারের

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

ঢাকার ধামরাই উপজেলার গাঙ্গুটিয়া ইউনিয়নের বড়নালাই গ্রাম থেকে এক তরুণকে র‍্যাব পরিচয়ে তুলে নেওয়ার ১৭ দিনেও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে তাঁর পরিবারের অভিযোগ। ওই তরুণের নাম রহমত উল্লাহ (২০)। তিনি বড়নালাই গ্রামের মৃত আবদুর রউফের ছেলে।

দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে রহমত উল্লাহ সবার ছোট। বড় ভাই সৌদিপ্রবাসী। বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। মা ও ভাবীর সঙ্গে বাড়িতেই থাকতেন রহমত উল্লাহ। তিন মাস ধরে ইলেকট্রিকের কাজ শিখছিলেন তিনি। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, রহমত উল্লাহকে ২৯ আগস্ট র‍্যাব পরিচয়ে একটি দল তুলে নিয়ে যায়। এর পর থেকে নিখোঁজ তিনি। এ বিষয়ে কোথাও আইনি সহায়তাও পাচ্ছে না পরিবারটি।

দেশের কারাগারগুলোয় বিচার ছাড়াই আটক ৭৫ শতাংশ

সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৩, বণিক বার্তা

দেশের প্রায় সব কারাগারেই বন্দির সংখ্যা ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি। কাশিমপুরে একমাত্র মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের মোট ধারণক্ষমতা ২০০ হলেও আটক আছেন প্রায় ৬৫০ বন্দি। এতে একদিকে যেমন থাকা-খাওয়ার কষ্ট, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পেতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত তাদের। অতিরিক্ত বন্দির চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষকে। খাবারসহ অন্যান্য খাতে গুনতে হচ্ছে বাড়তি ব্যয়ও। রাজনৈতিক মামলায় আটক ও বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণেই মূলত কারাগারে বন্দির সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে বিচারের অপেক্ষায় আটক রয়েছেন প্রায় ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ বন্দি। সে প্রেক্ষাপটে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৮ নম্বরে।

বিভিন্ন দেশের কারাগারের ধারণক্ষমতা ও বন্দিদের নিয়ে কাজ করে থাকে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফ (ডব্লিউপিবি)। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যের বরাত দিয়ে বাংলাদেশের কারাগারের ধারণক্ষমতা নিয়েও একটি জরিপ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫৫টি জেলা কারাগার এবং ১৩টি কেন্দ্রীয় কারাগারে ৪২ হাজার ৬২৬ বন্দির ধারণক্ষমতা রয়েছে। এর বিপরীতে বন্দির সংখ্যা ৭৭ হাজার ২০৩ জন, যেখানে নারী হার ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। সব মিলিয়ে ধারণক্ষমতার ১৯০ দশমিক ৪ শতাংশ বন্দি রয়েছেন দেশের কারাগারগুলোয়। গত বছরের ২৫ নভেম্বরের তথ্য তুলে ধরে সংস্থাটি জানায়, বাংলাদেশে ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশই আটক রয়েছেন বিচারের অপেক্ষায় বা জিজ্ঞাসাবাদ পর্যায়ে।

মিথ্যা ও গায়েবি মামলার কারণে দেশের কারাগারগুলোয় বিচারের অপেক্ষাধীন বন্দির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ইদানীংকালে গ্রেফতার ও মামলা দেয়া রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে গেছে। মিথ্যা ও গায়েবি মামলায় হাজার হাজার মানুষকে জেলে রাখা হচ্ছে। অথচ সাজাপ্রাপ্ত বন্দির সংখ্যা ২০ শতাংশেরও কম। বাকি ৮০ ভাগই বিচারের অপেক্ষায় কারাগারে আটক। দীর্ঘ সময় কারাবাসের পর ওই বন্দি যখন নির্দোষ প্রমাণিত হন, তখন আর তার সামাজিক অবস্থান থাকে না। অথচ পুলিশ ও সরকারের দায়িত্বশীল ভূমিকার মাধ্যমেই এ সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব।’

ডব্লিউপিবির হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে দেশের কারাগারগুলোয় বিচারের অপেক্ষায় থাকা বন্দির সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৩৬৮ জন, যা মোট কারাবন্দির ৭৪ দশমিক ৬ শতাংশ। সে হিসাবে দেশের প্রতি লাখ মানুষের ৩৪ জনই তখন বিচারের অপেক্ষায় কারাবন্দি ছিলেন। ২০০৩ সালে কারাগারগুলোয় বিচারের অপেক্ষাধীন বন্দি ছিল ৪৫ হাজার ১৭৩ জন, মোট বন্দির ৬৭ দশমিক ১ শতাংশ। বিচারের অপেক্ষাধীন বন্দির সংখ্যা ২০০৬ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮ হাজার ৩৫৪ জনে, যা ওই বছরের মোট বন্দির ৬৭ দশমিক ১ শতাংশ। ওই বছর প্রতি লাখ জনসংখ্যার বিপরীতে বিচারের অপেক্ষাধীন বন্দি ছিলেন ৩৩ জন। ২০১০ সালে কারাগারগুলোয় মোট বন্দির ৭৩ দশমিক ২ শতাংশ বা ৫০ হাজার ৫৭৬ জন বিচারের অপেক্ষাধীন ছিলেন। বিচারের অপেক্ষাধীন বন্দির সংখ্যা ২০১৫ সালে আরো বেড়ে ৫২ হাজার ৮৭৬ জনে দাঁড়ায়, যা মোট বন্দির ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ। ওই বছরগুলোয় প্রতি লাখ জনসংখ্যার বিপরীতে ৩৩ জন কারাবন্দি ছিলেন সাজা ছাড়াই। আর ২০২২ সালে বিচারের অপেক্ষায় থাকা বন্দি ছিলেন ৬১ হাজার ৩৬৭ জন, যা মোট কারাবন্দির ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ওই বছর দেশের জনসংখ্যার প্রতি লাখের বিপরীতে বিচারের অপেক্ষায় কারাগারে আটক ছিলেন ৩৫ বন্দি।

র‍্যাব পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর নিখোঁজ

‘পোলাডা আমার মইরা গেল না বাঁইচা আছে, কিছুই কইতে পারি না’

০৪ অক্টোবর ২০২৩, প্রথম আলো

‘আমি মহিলা মানুষ, কোথাও যাইতে পারি না। খালি কান্দি, পোলাডা আমার মইরা গেল না বাঁইচা আছে, কিছুই কইতে পারি না। আমরা র‍্যাবের হেডকোয়ার্টারে গেছিলাম, ওরা জিডির কপি চায়। আবার থানায় গেলে জিডি নেয় না। পোলাডার গায় অনেক জ্বর আছাল। ধইরা নেওয়ার আগে সে আট দিন জ্বরে ভুগছে। যেদিন পোলাডারে ধইরা নিয়া যায়, তার আগের দিন বাবায় আমার কাছে মাফ চাইছে। বলছে, আমি বাঁচুম না মা, আমারে মাফ দাও।’

বিলাপ করতে করতে প্রথম আলোকে এসব কথা বলছিলেন র‍্যাব পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর নিখোঁজ তরুণ রহমত উল্লাহর মা মমতাজ বেগম। রহমত উল্লাহ ঢাকার ধামরাইয়ের গাঙ্গুটিয়া ইউনিয়নের বড়নালাই গ্রামের বাসিন্দা। গত ২৯ আগস্ট জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে বাড়ি থেকে র‍্যাব পরিচয়ে তাঁকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ঘটনার ৩৬ দিন পেরোলেও তাঁর কোনো খোঁজ পাননি স্বজনেরা।

পররাষ্ট্র বিষয়ক

হাসিনাকে দুর্বল করলে ক্ষতি সবার, বার্তা আমেরিকাকে

১৮ অগস্ট ২০২৩, আনন্দবাজার

বাংলাদেশে হাসিনা সরকার দুর্বল হলে তা ভারত এবং আমেরিকা কারও পক্ষেই সুখকর হবে না বলে মনে করে নয়াদিল্লি। কূটনৈতিক সূত্রের খবর, একাধিক স্তরের বৈঠকে নয়াদিল্লি এ কথা জানিয়েছে বাইডেন প্রশাসনকে। সূত্রের খবর— বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আমেরিকার বর্তমান ভূমিকায় ভারত যে খুশি নয়, ওয়াশিংটনকে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে সেই বার্তাও।

নয়াদিল্লির বক্তব্য, ঢাকায় সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হোক এটা ওয়াশিংটনের মতো ভারতও চায়। কিন্তু যে ভাবে হাসিনা সরকারকে অস্থির করার জন্য আমেরিকার তরফ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে, তা প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসাবে ভারত তথা দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক নিরাপত্তার জন্য ইতিবাচক নয়।

আর তিন সপ্তাহ পরেই নয়াদিল্লিতে এক মঞ্চে বসবেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার আগে ভারতের এই বার্তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। সাউথ ব্লক মনে করে, জামাতে ইসলামিকে ‘রাজনৈতিক ছাড়’ দেওয়া হলে অদূর ভবিষ্যতে ঢাকা মৌলবাদের দখলে চলে যাবে। উদার পরিবেশ যেটুকু রয়েছে, তা-ও আর থাকবে না।

কূটনৈতিক শিবিরের বক্তব্য, আফগানিস্তান থেকে আমেরিকা সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরেই গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়েছে। ভারতের উত্তরপূর্ব সীমান্ত অঞ্চল বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে। তালিবান এখন আফগানিস্তানের ক্ষমতার শীর্ষে। মনে করা হচ্ছে, আফগানিস্তানের নারী, শিশু এবং সংখ্যালঘুদের কথা বিবেচনা না করেই আমেরিকা আফগানিস্তান নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে চুক্তি করে নিয়েছিল, এখন যার ফল ভুগতে হচ্ছে। বিদেশ মন্ত্রক মনে করছে কাবুলের পাশাপাশি ভারতের অন্য প্রতিবেশী সম্পর্কে আমেরিকার নীতিও নয়াদিল্লির জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে অস্বস্তি বাড়াচ্ছে। ভারতের সঙ্গে দীর্ঘতম স্থলসীমান্ত রয়েছে বাংলাদেশের। ফলে সে দেশের যে কোনও প্রতিকূল পরিস্থিতি ভারতেও প্রভাব ফেলে। সূত্রের মতে, নয়াদিল্লি এ কথাই বাইডেন প্রশাসনকে জানিয়েছে যে জামাতকে আস্কারা দিলে এক দিকে যেমন ভারতের আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাস বাড়তে পারে, তেমনই চিনের প্রভাব বাংলাদেশে অনেকটাই বেড়ে যাবে, যা কাঙ্ক্ষিত নয় ওয়াশিংটনেরও। মনে করা হচ্ছে, আমেরিকা জামাতকে বরাবর রাজনৈতিক ইসলামিক সংগঠন হিসাবেই দেখানোর চেষ্টা করে। মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে তাকে তুলনা করে আমেরিকা। কিন্তু বাস্তবে জামাত যে উগ্র মৌলবাদী সংগঠন এবং পাকিস্তানের হাতে তামাক খায়, এ বিষয়ে নিঃসন্দেহ নয়াদিল্লি।

শুধুমাত্র বাংলাদেশের জন্য পৃথক একটি ভিসা নীতি ঘোষণা করেছে বাইডেন প্রশাসন। সূত্রের খবর, এটা আদৌ উচিত বলে মনে করছে না নয়াদিল্লি। এই নয়া ভিসা নীতির ফলে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন যারা বানচাল করার চেষ্টা করবে, তারা আমেরিকায় প্রবেশের অধিকার পাবে না। কূটনৈতিক শিবির মনে করছে আমেরিকার প্রশাসন সরাসরি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলাতেই নিজের দেশের আইন প্রয়োগ করে সে দেশের জন্য পৃথক ভিসা নীতি গ্রহণ করল।

সম্প্রতি বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দল নয়াদিল্লি এসে বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব তথা কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করে গিয়েছেন। সেখানে তাঁরাও বার্তা দিয়েছেন, আঞ্চলিক স্থিতি বজায় রাখার প্রশ্নে বিএনপি-জামাত জোট বিপজ্জনক। প্রতিনিধি দলের নেতা বাংলাদেশের কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে একটি ইতিবাচক বৈঠক সেরেছেন। ওই বৈঠকের ঠিক পরেই তাঁর বক্তব্য, “আমরা ভারতকে এটাই বলেছি যে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা উভয় রাষ্ট্রের জন্যই জরুরি। হাসিনা সরকার এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে বাংলাদেশের মাটিকে ভারত-বিরোধী কার্যকলাপে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।”

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে এক বাংলাদেশির মৃত্যু, লাশ নিয়ে গেছে বিএসএফ

২৩ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার চকপাড়া সীমান্তের উনিশবিঘি এলাকার বিপরীতে কাঁটাতারের বেড়ার কাছে বাবলু হক (৪০) নামের এক বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ভারতে অনুপ্রবেশের সময় বিএসএফের গুলিতে ওই যুবক নিহত হতে পারেন বলে স্থানীয় লোকজন ধারণা করছেন। গতকাল মঙ্গলবার দিবাগত রাতের কোনো এক সময় এ ঘটনা ঘটে।

আজ বুধবার দুপুরের দিকে বিএসএফ ওই যুবকের লাশ নিয়ে যায়। নিহত বাবলু চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পাকা ইউনিয়নের বাবুপুর মধ্যপাড়া গ্রামের হোসেন আলীর ছেলে।

ব্রিকসের সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণ পেল ছয় দেশ, তালিকায় নেই বাংলাদেশ

২৪ আগস্ট, দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা অনলাইন

উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকসের সদস্য হওয়ার জন্য ছয়টি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। নতুন সদস্য হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ পাওয়া ছয় দেশের তালিকায় নেই বাংলাদেশ। যদিও সম্মেলনের আগে এ জোটে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়টি জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছিল।

সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণ পাওয়া দেশ ছয়টি হলো—আর্জেন্টিনা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।

বৃহস্পতিবার (২৪ আগস্ট) এই দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হয় বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

ব্রিকসের বর্তমান সদস্য রাষ্ট্রগুলো হলো: ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা।

এর আগে জোটটির সম্প্রসারণ ইস্যুতে ব্যাপক আলোচনা চলে। নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারছিল না সদস্যরা। বাংলাদেশসহ ২০টি দেশ ব্রিকসে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। অবশেষে আগ্রহী দেশগুলোর মধ্যে থেকে ছয়টি দেশকে সদস্যপদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।

বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি যুবক নিহত

০৩ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে মানিক মিয়া (৩৫) নামের এক বাংলাদেশি যুবক নিহত হয়েছেন। শনিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে আন্তর্জাতিক সীমানা পিলার ১০৬২-২এস এর কাছে শৌলমারী ইউনিয়নের বেহুলারচর সীমান্তে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত মানিক মিয়া উপজেলার শৌলমারী ইউনিয়নের বেহুলারচর গ্রামের আব্দুল বাতেনের ছেলে।

ঢাকায় লাভরভের ২৪ ঘণ্টার ‘রাজনৈতিক’ সফর

০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

ঢাকায় ভারত মহাসাগরীয় দেশগুলোর সহযোগিতা জোটের (আইওআরএ) মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ যোগ দেবেন বলে কথা ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি আসেননি।

আইওআরএর বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২২ সালের নভেম্বরে। তখন সের্গেই লাভরভের সফরের কথা শুনে অনেকেই কৌতূহলী হয়ে উঠেছিলেন। কারণ, রাশিয়ার ক্ষমতার পরিমণ্ডলে লাভরভ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়া যুদ্ধে জড়ানোর পর বিশ্বের নানা প্রান্ত ঘুরে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার দায়িত্বটা তাঁর কাঁধে।

ওদিকে রাশিয়া তখন সবে আইওআরএর পর্যবেক্ষক হয়েছে। এরপরই মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে যোগ দিতে সের্গেই লাভরভের বাংলাদেশ আসার বিষয়টি ঠিক হয়েছিল, যা অনেককে অবাক করেছিল।

সেবার ঢাকা সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সের্গেই লাভরভের সৌজন্য সাক্ষাতের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। শেষ মুহূর্তে অনিবার্য কারণ দেখিয়ে লাভরভের ঢাকা সফর বাতিল করে মস্কো।

ফ্রান্সের কাছ থেকে ১০টি এয়ারবাস বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ: মাখোঁ

১১ সেপ্টেম্বর ২০২৩, দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, এয়ারবাস কোম্পানির কাছ থেকে ১০টি বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। সোমবার (১১ সেপ্টেম্বর) সাংবাদিকদের এ কথা জানান ঢাকা সফররত ফরাসি প্রেসিডেন্ট।

ইউরোপীয় বিমান প্রস্তুতকারী কোম্পানিটির সঙ্গে এই প্রথম চুক্তি করছে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের বিমান বহরে মূলত বোয়িং কোম্পানির বিমানই বেশি ব্যবহার করা হয়।

ফরাসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এয়ারবাসের এ৩৫০ ওয়াইডবডি বিমান কিনবে বাংলাদেশ। যদিও চুক্তি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এসব বিমান পরিচালনা করবে।

সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক শেষে মাখোঁ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ইউরোপীয় বিমান শিল্পের ওপর আস্থা রাখার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। এয়ারবাসের ১০টি এ৩৫০ উড়োজাহাজ কেনার এই প্রতিশ্রুতিটি গুরুত্বপূর্ণ।’

ঢাকা-প্যারিসের মধ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক সই

১১ সেপ্টেম্বর ২০২৩, দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

অবকাঠামো ও স্যাটেলাইটসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে ঢাকা ও প্যারিসের মধ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

সোমবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের করবী হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর উপস্থিতিতে নথিপত্রে সই করা হয়।

এগুলো হলো–

১. বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং ফ্রান্সের ফ্রান্স ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (এফডিএ)-এর মধ্যে ‘ইমপ্রুভিং আরবান গভর্নেন্স অ্যান্ড ইনফ্রাস্টাকচার প্রোগ্রাম’- বিষয়ে একটি ক্রেডিট সুবিধা চুক্তি এবং

২. বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল) এবং ফ্রান্সের এয়ারবাস ডিফেন্স অ্যান্ড স্পেস এসএএস- এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু-২ আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম সম্পর্কিত সহযোগিতার বিষয়ে লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই)।

ফরাসি প্রেসিডেন্টের সফর

১২ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

ফরাসি প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর এবার একই প্রতিষ্ঠান থেকে বঙ্গবন্ধু-২ স্যাটেলাইট নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ এমন সিদ্ধান্তের জন্য বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

গতকাল সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মাখোঁ এ মন্তব্য করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পাশে রেখে এমানুয়েল মাখোঁ বলেন, ‘ইউরোপীয় অ্যারোনটিকসে (বিমানকৌশল) আস্থা রাখার জন্য এবং ১০টি এ-৩৫২ নেওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার জন্য আমি আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই।’

বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সার্বভৌম নীতি, স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা ও সমর্থন প্রকাশ করেছে ফ্রান্স।

শীর্ষ বৈঠকের পর গতকাল সন্ধ্যায় প্রচারিত যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ শান্তি, সমৃদ্ধি এবং জনগণের কল্যাণে দুই দেশের অংশীদারত্বকে ‘কৌশলগত’ পর্যায়ে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দুই শীর্ষ নেতা যেকোনো দেশে অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতার পরিবর্তন এবং সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণের নিন্দা জানিয়েছেন।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রস্তাবে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩, প্রথম আলো

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের এক যৌথ প্রস্তাবে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতিতে গভীর উদ্বেগ জানানো হয়েছে। প্রস্তাবে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চর্চার বিষয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, মানবাধিকারকর্মী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কাজের নিরাপদ ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।

 ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মধ্য ডানপন্থী, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট, বামপন্থীসহ সাতটি গ্রুপ এই প্রস্তাব এনেছে। ফ্রান্সের স্ত্রাসবুর্গে স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার রাতে প্রস্তাবটি নিয়ে পার্লামেন্ট অধিবেশনের বিতর্কে ছয় সদস্য অংশ নেন।

প্রস্তাবে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার ও বাংলাদেশে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগের কারণে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এতে ২০২৪ সালে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

‘বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিশেষ করে অধিকারের মামলা’ শীর্ষক প্রস্তাবের ওপর স্ত্রাসবুর্গের স্থানীয় সময় আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে ভোটাভুটি হওয়ার কথা।

প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বিচারবহির্ভূত হত্যা, বলপূর্বক অন্তর্ধান বা গুম, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শ্রমিকদের অধিকার খর্ব করাসহ বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ওই প্রস্তাবে মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অবিলম্বে নিঃশর্তভাবে প্রত্যাহার এবং সংগঠনটির নিবন্ধন পুনরায় চালু করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো যেন অনুমোদিত বিদেশি অনুদান কাজে লাগাতে পারে, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সরকারকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

বলপূর্বক অন্তর্ধানের অভিযোগ তদন্তে একটি বিশেষ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের সঙ্গে সহযোগিতা করার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে উৎসাহিত করা হয়েছে প্রস্তাবে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের আদালতের শুনানিতে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করার জন্য সরকারের প্রতি পুনরায় আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্য রেখে সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রণয়নে উৎসাহিত করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

গুম নিয়ে স্বাধীন তদন্তের বিষয়টি আবার এল মানবাধিকার পরিষদে

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা তাঁদের প্রস্তাবে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তুলে ধরতে ইউরোপীয় এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিস, ইইউ প্রতিনিধি ও বাংলাদেশে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর দূতাবাসকে অনুরোধ জানিয়েছেন।

বাংলাদেশে ১ সপ্তাহে কত আয় করল ‘জওয়ান’

ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩

বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খান অভিনীত ‘জওয়ান’ গত ৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতে একইদিনে মুক্তি পেয়েছে। গত এক সপ্তাহে বিশ্বব্যাপী সিনেমাটি আয় করেছে প্রায় ৯০০ কোটির কাছাকাছি।

একইদিনে বাংলাদেশে মুক্তি পেয়ে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ‘জওয়ান’ আয় করেছে ৭০ লাখের বেশি।

‘জওয়ান’ সিনেমাটি বাংলাদেশে আমদানি করেছে রংধনু গ্রুপ ও অ্যাকশন কাট এন্টারটেইনমেন্ট।

বাংলাদেশের ৪৬টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে সিনেমাটি। স্টার সিনেপ্লেক্সের ৭টি শাখায় প্রতিদিন সিনেমাটির ৫৫টি শো চলছে।। এছাড়া লায়ন সিনেমাস, ব্লকবাস্টার সিনেমা, মধুমিতা, শ্যামলী, যশোরের মনিহারে চলছে সিনেমাটি।

বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বাধাদানকারীদের প্রতি মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞা শুরু

২২ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বাধাদানকারীদের বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞা শুরু করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে শুক্রবার এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।

নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন ব্যক্তিবর্গের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং সরকারদলীয় ও বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীরাও থাকবেন বলে জানানো হয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথু মিলার জানান, সরকারের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি এদের পরিবারের সদস্যরাও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হতে পারেন। এই নীতির আওতায়, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়া ব্যাহত করার কাজে যুক্ত ব্যক্তিরা আগামীতে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাওয়ার অযোগ্যও বিবেচিত হতে পারেন।

ছেলের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করলে করবে, তাতে কিছু আসে যায় না: প্রধানমন্ত্রী

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, যুগান্তর

আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমার ছেলেও এখানে আছে। সে ব্যবসা-বাণিজ্য করছে, বিয়ে করেছে, তার মেয়ে আছে, সম্পত্তি আছে, বাড়িঘর আছে। যদি বাতিল করে, করবে। তাতে কিছু আসে যায় না। আমাদের বাংলাদেশ তো আছেই।

শুক্রবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাতে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আওয়ামী লীগেরও চাওয়া। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি বাংলাদেশের বাইরে থেকে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করে, সে ক্ষেত্রে এই দেশের জনগণ ওই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে স্যাংশন (নিষেধাজ্ঞা) দেবে।

তিনি বলেন, মার্কিন ভিসানীতি প্রয়োগের ঘোষণায় বিরোধীদের কথাও বলা হয়েছে। এবার বিএনপি জ্বালাও-পোড়াও করতে পারবে না। এতে জনগণের জীবন বাঁচবে।

সরকারপ্রধান বলেন, কে নিষেধাজ্ঞা দিল আর কে দিল না, তাতে কিছু যায় আসে না। আমার ছেলেও এখানে আছে। সে ব্যবসা-বাণিজ্য করছে, বিয়ে করেছে, তার মেয়ে আছে, সম্পত্তি আছে, বাড়িঘর আছে। যদি বাতিল করে, করবে। তাতে কিছু আসে যায় না। আমাদের বাংলাদেশ তো আছেই।

নিজ দেশের কোম্পানির বকেয়া আদায়ে সক্রিয় ঢাকার মার্কিন দূতাবাস

সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৩, বণিক বার্তা

দেশের বিভিন্ন খাতে বড় অংকের বিনিয়োগ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর। বিশেষ করে গ্যাস ও জ্বালানি এবং আর্থিক খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি। তবে বড় অংকের এ বিনিয়োগের বিপরীতে ডলারে পাওনা অর্থ আদায় করা নিয়ে বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনাকারী মার্কিন কোম্পানিগুলো। বিশেষ করে পেট্রোবাংলার কাছে বড় অংকের পাওনা আটকে রয়েছে জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠান শেভরনের। প্রতিষ্ঠানটিসহ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানিগুলোর পাওনা আদায়ে এবার তৎপর হয়েছেন বাংলাদেশে মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারা। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে বিষয়টি নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করছেন তারা। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, খোদ মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসও এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

দেশে পুঞ্জীভূত প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই স্টক) উৎস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান শীর্ষে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, এ বছরের মার্চ শেষে দেশে মোট এফডিআই স্টকের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৬১ কোটি ৩৩ লাখ ডলার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে, যার পরিমাণ ৪০৫ কোটি ১২ লাখ ডলার। গ্যাস ও জ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের এফডিআই স্টক সবচেয়ে বেশি, যার পরিমাণ ২৮৭ কোটি ১৮ লাখ ডলার। এছাড়া বীমা খাতে ২৬ কোটি ৯৮ লাখ ডলার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে ২৩ কোটি ৭৬ লাখ, ব্যাংক খাতে ২০ কোটি ২৮ লাখ, বিদ্যুৎ খাতে ১৬ কোটি ১৬ লাখ, বস্ত্র খাতে ১২ কোটি ৭১ লাখ, ট্রেডিংয়ে ৭ কোটি ৮৩ লাখ, কেমিক্যাল ও ওষুধ খাতে ৯১ লাখ, টেলিযোগাযোগ খাতে ৫৭ লাখ, কৃষি ও মৎস্য খাতে ৩১ লাখ, খাদ্য খাতে ২২ লাখ, নির্মাণ খাতে ১৮ লাখ ও অন্যান্য খাতে ৭ কোটি ৯৯ লাখ ডলারের এফডিআই স্টক রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।

মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি জ্বালানি খাতের জায়ান্ট শেভরনের। উত্তোলনকৃত গ্যাস বিক্রির বিল হিসেবে পেট্রোবাংলার কাছে বিপুল অর্থ আটকে রয়েছে কোম্পানিটির। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, গ্যাস বিক্রির বিল বাবদ বহুজাতিক কোম্পানিটি কম-বেশি ২৩ কোটি ডলারের মতো অর্থ পাবে পেট্রোবাংলার কাছে। এ অর্থ পরিশোধের জন্য কোম্পানিটি কয়েক দফা চিঠি দিলেও কোনো সুরাহা মেলেনি।

বকেয়া বিলের পাশাপাশি মার্কিন কোম্পানি শেভরনের বড় অংকের মুনাফার অর্থও আটকে আছে। কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশের অর্থও পাঠাতে পারছে না। এছাড়া বীমা খাতের কোম্পানি মেটলাইফের ক্ষেত্রেও লভ্যাংশের অর্থ যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো যাচ্ছে না। কিছুদিন আগে ২০১৯ সালের লভ্যাংশের অর্থ পাঠিয়েছে মেটলাইফ। এছাড়া আরো বেশকিছু মার্কিন কোম্পানিও এ ধরনের সমস্যায় পড়েছে।

বাংলাদেশে ব্যবসা করা মার্কিন কোম্পানিগুলোর আটকে থাকা বকেয়া অর্থ পরিশোধসহ লভ্যাংশের অর্থ প্রত্যাবাসন এবং কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জ নিয়ে এখন দিনে দিনে আরো সরব হয়ে উঠছে মার্কিন দূতাবাস। কোম্পানিগুলোর বকেয়া অর্থ দ্রুত পরিশোধ করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর কাছে দূতাবাসের পক্ষে লিখিত ও মৌখিক অনুরোধ জানানো হয়েছে। এর পরও বকেয়া পরিশোধ নিয়ে জ্বালানি বিভাগ বা পেট্রোবাংলার দিক থেকে খুব বেশি অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

উজান থেকে রেকর্ড পানিপ্রবাহ, উত্তরের পাঁচ জেলায় বন্যার শঙ্কা

অক্টোবর ০৫, ২০২৩, বণিক বার্তা

উজানের ঢলে তিস্তার পানি বাড়ায় কুড়িগ্রামের নিম্নাঞ্চলে ভেসে গেছে ফসলের মাঠ ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী

ভারতের উত্তর সিকিমে প্রবল বৃষ্টিপাতে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যার কারণে খুলে দেয়া হয়েছে গজলডোবা বাঁধ। পানি ছাড়া হয়েছে রেকর্ড পরিমান। ফলে তিস্তার বাংলাদেশ অংশে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে পানিপ্রবাহ। ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কায় মানুষদের সতর্ক করতে মাইকিং করা হচ্ছে। নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার তিস্তা নদী অববাহিকার নিম্নাঞ্চল ও চরের বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে মাঠে নেমেছে স্থানীয় প্রশাসন। এদিকে ভারি বর্ষণের কারণে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার চক কল্যাণী এলাকায় বাঙ্গালী নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে ভাঙন শুরু হয়েছে। নদীতে বিলীন হয়েছে বাঁধটির অন্তত ১০০ মিটার অংশ।

জানা গেছে, ভারি বৃষ্টিতে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় ভাসছে সিকিমের বিস্তীর্ণ এলাকা। ভেসে গেছে বাড়িঘর। তলিয়ে গেছে হ্রদ। পানির তোড়ে ভেঙে পড়েছে সেতু। সিকিমের অন্যান্য অংশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে চুংথাং এলাকা। উত্তর সিকিমে ভেঙে গেছে তিস্তা নদীর চুংথাং ড্যাম। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভারতীয় সেনাছাউনিও। নদীতে তলিয়ে গেছে বাহিনীটির ৪১টি গাড়ি। খোঁজ মিলছে না ২৩ সেনাসদস্যের।

পানির চাপ সামাল দিতে তিস্তার গজলডোবা ব্যারাজ থেকে গতকাল সকাল ৭টায় রেকর্ড ২ লাখ ৪৮ হাজার ১২০ কিউসেক পানি বাংলাদেশের দিকে ছাড়ে ভারত। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে সকাল ১০টায় গজলডোবার সবক’টি গেট খুলে দিয়ে ছাড়া হয় ৮ হাজার ২৫৪ কিউমেক অর্থাৎ ২ লাখ ৯১ হাজার ৪৮৭ কিউসেক পানি, বিগত কয়েক বছরের হিসাবে যা সর্বোচ্চ বলে জানা গেছে।

বিবিধ

দুর্ভোগের ধারাপাত

২৬ আগস্ট, ২০২৩, দেশ রুপান্তর

এনআইডি সংশোধনে বছর পার

ভোগান্তির আরেক নাম হয়ে উঠেছে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) ভুল সংশোধন প্রক্রিয়ার। এনআইডি সংশোধন করতে গিয়ে পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে অনেককে। নির্বাচন কমিশনের এনআইডি অনুবিভাগ নতুন এনআইডি তৈরি ও ভুল হলে তা সংশোধন করে। সংশোধনের ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা একের পর এক নানারকম কাগজ চেয়ে থাকেন। সঠিক কাগজ উপস্থাপনের পরও সংশোধন করতে হয়রানি হতে হয় নাগরিকদের।

জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনে জীবন যায়

জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন সার্ভারের অবস্থা এই আছে, এই নেই। এতে জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহার করে ১৭ ধরনের সেবা পেতে সারা দেশের মানুষের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। পাশাপাশি মৃত্যুনিবন্ধন করতে না পারায় মৃত ব্যক্তি উত্তরাধিকারদের সম্পত্তি বণ্টন, পারিবারিক পেনশন প্রাপ্তিতেও হয়রানিতে পড়ছে তারা। আর মৃত্যুনিবন্ধন না করলে প্রকৃত জনসংখ্যাও নির্ণয় করতে পারে না সরকার।

পাসপোর্টে ভুল কর্তাদের ভোগান্তি মানুষের

আহসান বারী পড়াশোনার জন্য দেশের বাইরে যাচ্ছেন। তিনি নতুন করে পাসপোর্ট নেওয়ার জন্য নিয়ম অনুযায়ী ই-পাসপোর্টের আবেদন করেন। পরে ছবি তোলার নির্ধারিত সময় গত ৩০ এপ্রিল আগের পাসপোর্ট (এমআরপি) নিয়ে উপস্থিত হন যাত্রাবাড়ী (বর্তমানে কেরানীগঞ্জে অবস্থিত) পাসপোর্ট অফিসে। কিন্তু তার তথ্য যাচাই করতে গিয়ে অবাক হয়ে যান সেখানকার দায়িত্বরত ব্যক্তি। তিনি জানতে পারেন তার পাসপোর্ট অন্য কারও পরিচয়ে করা হয়েছে।

সার্টিফিকেটের এক ভুলে শত বিড়ম্বনা

জামিল আহমেদের বাবার নাম মিজানুর রহমান। কিন্তু সার্টিফিকেটে (সনদ) লেখা হয়েছে নিজাবুর রহমান। এই ভুল সংশোধনের জন্য তিনি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ঘোরাঘুরি করছেন দুই মাস ধরে। কিন্তু সমাধান হয়নি। সুনামগঞ্জের বাসিন্দা জামিল লক্ষ্মীপুর তাওয়াক্কোলিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে পাস করেছেন। বর্তমানে একটি কলেজে স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী তিনি। তার সার্টিফিকেটে বাবার নামে ভুল থাকায় তা দিয়ে কোনো কাজই করতে পারছেন না।

মামলার নথি পেতে পৃষ্ঠা গুনে টাকা

ফৌজদারি মামলার বিচারে ভোগান্তি ও হয়রানি জানা কথা। শুরুটা হয় মামলার প্রাথমিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ নথি তোলার মধ্য দিয়ে। মামলার এজাহার, প্রাথমিক তথ্যবিবরণী, জামিন কিংবা জামিন নামঞ্জুরের আদেশ, অভিযোগপত্র, রায়সহ বিভিন্ন সময়ের আদেশের অনুলিপির প্রয়োজন হয় বিচারপ্রত্যাশী ও আইনজীবীদের। কিন্তু বিচারের আগে কিংবা বিচার চলাকালে নথি পেতেও ভোগান্তির শেষ নেই।

তিন বছরেও হয় না ড্রাইভিং লাইসেন্স

মো. মাইনুদ্দীন কেরানীগঞ্জ এলাকার একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ের কাজে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তাকে মোটরসাইকেল নিয়ে যেতে হয়। কেরানীগঞ্জে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) ইকুরিয়া কার্যালয়ে তিন বছর ধরে ঘুরেও পাচ্ছেন না ড্রাইভিং লাইসেন্সের স্মার্ট কার্ড। মাইনুদ্দীন জানালেন, এই তিন বছরে কতবার যে তিনি ইকুরিয়া কার্যালয়ে যাওয়া-আসা করেছেন গুনে বলা যাবে না। যখনই আসেন, তখন নতুন তারিখ দেওয়া হয়। সব রকম পরীক্ষা ও টাকা দেওয়ার পরেও ড্রাইভিং লাইসেন্সের সেই কাক্সিক্ষত স্মার্ট কার্ড পাচ্ছেন না।

ভূমি অফিসে পথ হারানো বৃদ্ধা

এই দুর্ভোগের শুরু আছে, শেষ নেই। উলের সোয়েটারের সেলাইয়ের মতো শুধু খুলতেই থাকে। তাকে বশে আনা যায় না। অনেকটা তেপান্তরের মাঠের মতো, পথ হারিয়ে ফেলি। দুর্ভোগের আদ্যোপান্ত বলতে বলতে এভাবেই শেষ করেছিলেন মিনতি দত্ত। ষাটোর্ধ্ব এই নারীর চোখে ছিল দূর প্রতিবিম্বিত অশ্রু। অথচ শুরুর গল্পটা মোটেও এমন ছিল না। রাজধানীর কাঁটাবনের ধানম-ি রাজস্ব সার্কেল অফিসের সহকারী কমিশনারের সঙ্গে দেখা করার পর তার কাছে মনে হয়েছিল, খুব সহজেই নামজারির কাজটা হয়ে যাবে। প্রতিবেশী যারা তাকে নানা কথা বলেছিল, তাদের ওপর রাগ হয়েছিল মিনতি দত্তের। অথচ শেষে তাদের কথাটাই কি না ঠিক হচ্ছে! নাওয়া-খাওয়া শিকেয় তুলে ভূমি অফিসের অলিন্দে অলিন্দে ঘুরে কূল-কিনারা করতে পারেননি। শেষে অফিস প্রাঙ্গণের হেল্প ডেস্কে বসা ব্যক্তিটির কাছে নিজের বিবেক বুদ্ধি সঁপে দেন।

জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে আমলাদের প্রাধান্য

আগস্ট ২৭, ২০২৩, বণিক বার্তা

দেশের জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় একটি অংশ পরিচালিত হচ্ছে সরকারি আমলাদের দিয়ে। তাদের অনেকেরই আবার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রায়োগিক অভিজ্ঞতা নেই। শিক্ষাজীবনে পড়াশোনার ক্ষেত্রও ছিল পুরোপুরি ভিন্ন। কেউ কেউ পদাধিকারবলে আবার কেউ সরকারের নিয়োগের ভিত্তিতে এসব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বণিক বার্তার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অন্তত এক ডজনের মতো গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা সংস্থার নেতৃত্ব দিচ্ছেন সরকারি আমলারা। সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতের অন্য একটি সংস্থা বা প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতার জোরেই এসব সংস্থার নেতৃত্বে উঠে এসেছেন তারা।

দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ, শিল্পোদ্যোক্তা, পরিকল্পনাবিদ, নীতিনির্ধারক, শিক্ষার্থী-শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত তথ্যসেবা দেয়ার জন্য স্থাপন করা হয়েছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল ডকুমেন্টেশন সেন্টার (ব্যান্সডক)। মহাপরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বে রয়েছেন সরকারের অতিরিক্ত সচিব মীর জহুরুল ইসলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এ শিক্ষার্থী দশম বিসিএসে যোগদান করেন। মাঠ পর্যায়ে নানা দায়িত্ব পালনের পর তিনি চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের পরিচালক পদে ছিলেন। তার আগে ব্যান্সডকের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন একজন অতিরিক্ত সচিব ও দুজন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা।

নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সরকারের যুগ্ম সচিব আবু হোরায়রা। এর আগে তিনি ২০২১ সালে রংপুরের গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে রংপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন। জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত সচিব সালেহ আহমদ মোজাফফর। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ সালাউদ্দিন।

ইউনূস ইস্যুতে খোলা চিঠির প্রতিবাদে বাংলাদেশের ৫০ সম্পাদকের বিবৃতি

০২ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ইত্তেফাক

শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে চলমান মামলা স্থগিত চেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেওয়া বিশ্বের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের খোলা চিঠির প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের ৫০ সম্পাদক।

শনিবার (২ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তারা এ উদ্বেগ জানান।

বিবৃতিতে তারা বলেন, গত ২৮ আগস্ট কয়েকজন নোবেল বিজয়ী, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং সুশীল সমাজের সম্মানিত সদস্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেওয়া একটি খোলা চিঠিতে বাংলাদেশের শ্রম আইনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে চলমান মামলা স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীকে লেখা এ ধরনের খোলা চিঠি সার্বভৌম দেশের স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই।

বিচার প্রক্রিয়ার ওপর হস্তক্ষেপে ১৭১ জন বিশিষ্ট নাগরিক ও বুদ্ধিজীবীর বিবৃতি

১ সেপ্টেম্বর, ২০২৩, আজকালের খবর

সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিভিন্ন দেশের কয়েকজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সুশীল সমাজের সদস্যের লেখা খোলাচিঠিকে বাংলাদেশের  বিচার  প্রক্রিয়ার ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ বলে মন্তব্য করে বিবৃতি দিয়েছেন দেশের ১৭১ জন বিশিষ্ট নাগরিক ও বুদ্ধিজীবী।

আজ শুক্রবার দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা বলেন, এই খোলা চিঠি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। উক্ত খোলাচিঠির বক্তব্য বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীন বিচার বিভাগের ওপর স্পষ্ট হুমকি হিসেবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। চিঠিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে আদালতে দায়েরকৃত চলমান মামলাসমূহের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। দেশের বিবেকবান নাগরিক হিসেবে আমরা বাংলাদেশের বিচার প্রক্রিয়ার ওপর এ ধরনের অযাচিত হস্তক্ষেপের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি।

দেশে ঢুকছে মহিষের সেদ্ধ মাংস

০৯ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের দেয়ালে দেয়ালে মহিষের সেদ্ধ মাংস বিক্রির বাহারি বিজ্ঞাপন ঘুরছে। কেনা যাচ্ছে একেবারে পানির দরে! অনলাইনে চাহিদার কথা জানালে মাংস পৌঁছে যাচ্ছে রেস্তোরাঁর দুয়ারে কিংবা ক্রেতার ঘরে। লবণ-হলুদের মিশেলে সেদ্ধ এসব মহিষের মাংস কৌশলে পাশের দেশ ভারত থেকে আনছেন আমদানিকারকরা। হিমায়িত মাংস আমদানিতে কড়াকড়ি থাকলেও এটি দেশে ঢুকছে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের ঘোমটা পরে।

এ সেদ্ধ মাংস এমনই জাদুকরী, এক কেজি রান্না করলে ফুলেফেঁপে হয়ে যায় তিন কেজি। এ কারণে কেজি ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকায় নেওয়া হলেও আদতে দাম পড়ে মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। দেশের বাজারে এখন কাঁচা মহিষের মাংসের কেজি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। এ কারণে সারাদেশের রেস্তোরাঁ মালিকরা এই সেদ্ধ মাংস কিনতে হুমড়ি খাচ্ছেন।

জন্মনিবন্ধন সনদ পেতে ছুটছে ঘাম

২৭ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

স্কুলে ভর্তি, পাসপোর্ট কিংবা জাতীয় পরিচয়পত্র– এ রকম ১৯ কাজে প্রয়োজন পড়ছে জন্মসনদের। এই জন্মসনদ এখন ‘সোনার হরিণ’। একজন নাগরিকের এমন গুরুত্বপূর্ণ দলিল নিবন্ধন নিয়ে রীতিমতো চলছে ছেলেখেলা। মাস চারেক হয়ে গেল জন্ম-মৃত্যুনিবন্ধন কার্যক্রম অনেকটাই অকার্যকর। সার্ভার জটিলতায় বেশির ভাগ মানুষ ঢুকতে পারছেন না স্থানীয় সরকার বিভাগের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে। নানা কসরত করে ঢোকা গেলেও ডেটা এন্ট্রি দেওয়ার আগেই সার্ভার বিগড়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় মহাসংকটে পড়েছেন লাখ লাখ মানুষ।

আর কিছুদিন বাদেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শ্রেণিতে শুরু হবে ভর্তি কার্যক্রম। প্রতিবছর প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয় ৩৫ লাখ শিশু। এ ছাড়া অনেক শিশু প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতেও ভর্তি হয়। স্কুলে ভর্তির জন্য জন্মসনদ বাধ্যতামূলক। এ জন্য আগেভাগেই অভিভাবকরা সন্তানের জন্মসনদ সংগ্রহ করেন। জন্মসনদ নিবন্ধনের গোলমেলে পরিস্থিতিতে লাখ লাখ শিশুর অভিভাবক আছেন উৎকণ্ঠায়। স্কুলে ভর্তি ছাড়াও যাদের নানা কারণে জন্মসনদ প্রয়োজন, তারাও আছেন গভীর সংকটে। কয়েক বছরের হিসাব ঘেঁটে দেখা গেছে, প্রতিবছর ৩২ থেকে ৩৬ লাখ জন্মসনদ নিবন্ধন হয়। এর মধ্যে ২০ লাখই হয় বছরের শেষ তিন মাসে। সে হিসাবে এই ২০ লাখ মানুষের এখন ঘুম হারাম! সম্প্রতি জন্ম-মৃত্যুনিবন্ধন সার্ভারটি হ্যাক হলে পাঁচ কোটি মানুষের তথ্য চুরি হয়ে যায়। এর পর থেকে সার্ভারের অবস্থা আরও নাজুক। এ সুযোগে দেশের প্রতিটি সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে গড়ে উঠেছে দালাল চক্র। যারা দালালদের খুশি করতে পারছেন, তাদের হাতে উঠছে জন্মসনদ। অন্য সেবাগ্রহীতারা পড়ে থাকছেন হয়রানির বৃত্তে। ২০২১ সালে সার্ভার থেকে সাত কোটি মানুষের জন্মনিবন্ধনের তথ্য গায়েব হয়ে যায়। নতুন করে নিবন্ধন করতে গিয়ে সেসব মানুষকে পড়তে হচ্ছে ভোগান্তিতে।

রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সারাদেশে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, জেলা প্রশাসনের প্রায় ছয় হাজার আইডি থেকে জন্মনিবন্ধন করা যায়। সার্ভার দুর্বল থাকায় ওই আইডি থেকেও ডেটা এন্ট্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।

ফাঁস হওয়া ভোটারের তথ্য এখন টেলিগ্রাম চ্যানেলে

অক্টোবর ৫, ২০২৩, ডেইলিস্টার অনলাইন বাংলা

দেশের স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্রধারী (এনআইডি) নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য এখন প্রকাশ্যে একটি টেলিগ্রাম চ্যানেলে থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কর্মকর্তারা।

ইসির তথ্য অনুযায়ী, এনআইডি সার্ভারে ১২ কোটি নাগরিকের তথ্য আছে। তাদের মধ্যে সাড়ে পাঁচ কোটি নাগরিকের স্মার্ট এনআইডি আছে।

অনেকে বলছেন, টেলিগ্রাম বটে ১০ সংখ্যার এনআইডি নম্বর দিলেই মানুষের নাম, ফোন নম্বর, ঠিকানা, ছবিসহ অন্যান্য তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

ইসির এনআইডি শাখার সিস্টেম ম্যানেজার মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, তিনি গত মঙ্গলবার বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। তবে টেলিগ্রাম চ্যানেলটির পেছনে কারা রয়েছেন, সেটি তিনি জানেন না।

তিনি বলেন, এটি শনাক্ত করা হয়েছে যে, এনআইডি সার্ভারে অ্যাক্সেস রয়েছে, এমন ১৭৪টি সংস্থার একটির মাধ্যমেই এই তথ্য ফাঁস হয়েছে।

দেশকে নিরক্ষরমুক্ত করার সরকারি সব কার্যক্রম বন্ধ

০৮ সেপ্টেম্বর ২৩, সমকাল

আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ২০১৪ সালের মধ্যে দেশকে নিরক্ষরমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এর পর ২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতিতেও একই লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে টানা তিন মেয়াদেও তা পূরণ করা যায়নি। বর্তমানে নিরক্ষরমুক্ত করার সরকারি সব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে নিরক্ষরমুক্ত করার কথা বলা হলেও তা সম্ভব  হবে না।

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন জানান, দেশে সাত বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সের নাগরিকদের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে এখনও প্রায় ২৩ দশমিক ২ শতাংশ জনগোষ্ঠী নিরক্ষর। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এ অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেন, শতভাগ জনগোষ্ঠীকে সাক্ষর করাতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •