সমসাময়িক “প্রযুক্তি” “আদিবাসী” ভাব-ভাবনা-চর্চার বিকাশের সুরতহাল

“আর রাত থাকবে না” এবং “প্রিপিকুরা”:

সমসাময়িক “প্রযুক্তি” “আদিবাসী” ভাব-ভাবনা-চর্চার বিকাশের সুরতহাল

মুহম্মদ আনোয়ার হোসেন

‘বিশ্বব্যবস্থায় একটা বড় ধরনের বাঁকবদল ঘটছে এবং গোটা বিশ্বকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো করে গড়ে তোলার যে প্রকল্প, তা ব্যর্থ হয়েছে। আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগছে পশ্চিমা বিশ্ব। কার্যত তারা নিজেদের একটি সুশোভিত বাগান আর বাকি বিশ্বকে জঙ্গল মনে করে।’ -ইব্রাহিম রাইসি, ইরানের প্রেসিডেন্ট। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৮তম অধিবেশনের ভাষণ। জাতিসংঘ সদর দপ্তর, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র, ১৯ সেপ্টেম্বর,২০২৩।

 আর রাত থাকবে না

নির্মাণ: এলিয়োনোর ওয়েবার।প্রযোজক: গায়েল জোন্স। ৭৫ মিনিট। ২০২০। ফ্রান্স।

রাত না থাকার শুরু

পৃথিবীর তথাকথিত সভ্য, উন্নত এবং মানবাধিকার নিয়ে সরব দেশগুলোতে, দেশে দেশে যুদ্ধসহ নানা উপায়ে মানুষ খুনের পাশাপাশি, শিশুদের এসব কুকর্মের সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত করার জন্য, একের পর এক যুদ্ধ-বিগ্রহ আর মানুষ খুন করার দারুণ (!) সব গেম বানানো চলছে। আর এসব নিয়ে চলছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ব্যাবসা-পুরষ্কার-স্বীকৃতি-উদযাপনের রমরমা সংস্কৃতি। এসব অধিকাংশ গেমের মূল হলো কত আকর্ষণীয়, মনোহর উপায়ে মানুষ খুন করা যায়। আর গেমের পাত্র-পাত্রীদের শরীরের গঠন, পোশাক, আচরণ উপস্থাপন প্রচণ্ড “যৌনবাদী” (SEXIST) এবং “যৌন অপরাধ”মূলক (SEX OFFENDING)। এসব নানানভাবে পিতৃতান্ত্রিক, পুঁজিবাদী জেন্ডার ভুমিকার প্রসারে সহায়তা করে এবং প্রথাগত নারী-পুরুষ, সাদা-কালো বাইনারি বিভাজন টিকিয়ে রাখে। আর এসবের সাথে জড়িত যারা, তারা “যৌন অপরাধী” (SEX OFFENDER) নয়? ধোয়া তুলসি পাতা, “নয়াউদারবাদি” “মুক্ত” সংস্কৃতির ধারক বাহক ‘প্রগতিশীল’ ‘মুক্তমনা’ দেবতাকূল!?

অধিকাংশ গেমের মূল হলো কত আকর্ষণীয়, মনোহর উপায়ে মানুষ খুন করা যায়। আর গেমের পাত্র-পাত্রীদের শরীরের গঠন, পোশাক, আচরণ উপস্থাপন প্রচণ্ড “যৌনবাদী” (SEXIST) এবং “যৌন অপরাধ”মূলক (SEX OFFENDING)।

আমাদের দেশের নতুন প্রজন্মের খুব কম মানুষ আছে যারা এসব গেমে আসক্ত নয়। এর ফলে মা-বাবা, বন্ধু-বান্ধবসহ তাদের সবার সাথে একপ্রকার সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হচ্ছে। ফলে ধীরে ধীরে তারা একজন “একা” “অসহায়” “অস্থির” “বিষাদগ্রস্ত” মানুষে পরিণত হচ্ছে এবং “মুক্তির” টোটকা হিসেবে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় কেন্দ্রিক যাপনে অভ্যস্ত হচ্ছে। ফলে একধরনের ভোগবাদী বস্তুকেন্দ্রিকতা তৈরি হচ্ছে এবং পশ্চিমা প্রযুক্তির সাথে সংস্কৃতির প্রশ্নহীন আমদানি ও অনুকরণ হচ্ছে অন্ধভাবে, মানুষের মস্তিস্কের ভিতরে গেমের মাধ্যমে রোপিত হচ্ছে নব্য উপনিবেশায়নের বীজ! ফলে একধরনের একমুখী, চিন্তাহীন, প্রশ্নহীন আনুগত্য তৈরি হচ্ছে পশ্চিমা ভোগবাদী সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতি যা ক্ষতিকর, সীমাবদ্ধ এবং পরিবেশ-প্রাণ বিনাশী। সাথে রয়েছে অতিরিক্ত রাত জেগে থাকার অভ্যাস, প্রতিক্রিয়া হিসেবে নানান ব্যাধি, পড়ালেখা-শোনার প্রতি অনাগ্রহ, নানান নেশায় আসক্তি, অপরাধে সম্পৃক্ততা। এসব গেম অনলাইনে আপনি দিনের রাতের যে কোনো সময়ে খেলতে পারবেন, সবার জন্য, সব বয়সের জন্য উন্মুক্ত! এখানে কোনো দিন বা রাত নেই! সব একাকার। প্রাপ্তবয়স্কদের না হয় বাদ দেয়া গেল কিন্তু যারা অপ্রাপ্তবয়স্ক তাদের অধিকার কোথায় সুরক্ষা হচ্ছে? এসব নিয়ে কিন্তু দেশবিদেশের মানবাধিকার সংস্থা, ইন্টারপোল, ইউরোপোলসহ কোন পোলের কোন বিকার বা দায় নেই। বিদেশি মানবাধিকারকর্মী/সংস্থা বা দেশের বাহারি নামের এনজিও বা গালভরা নামের “উন্নয়নকর্মী” “শিল্পী” কারো কোন ভাবনা বা বক্তব্য নেই। এসব চটকদার গেমে আসক্তির ফলে অপ্রাপ্তবয়স্কদের যে মানসিক বিকৃতি এবং সেইসাথে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বোধ তৈরি হচ্ছে, এসবের দায় কার? এসব নিয়ে কেন কোনো আইন তৈরি হয়না? এসব গেম যারা বানাচ্ছে তারাসহ জড়িত সংস্থা কেন অপরাধী নয়? শিশু অধিকার রক্ষায় নাকিকান্না করা ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং পুঁজিকেন্দ্রিক সাম্রাজ্যবাদের মোড়ল যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হয় এসবের অধিকাংশ গেম, তাদের কে বিচার করবে? তারা প্রযুক্তির জাদু দেখিয়ে বাংলাদেশের মত গরিব গরিব দেশের দু চারটে তথাকথিত “অপরাধ” “সাইবার অপরাধ” মেধা আইনের লঙ্ঘন ইত্যাদি ইত্যাদি বের করে দিয়ে রাস্তার ঘেয়ো কুকুরের মত ভাব নেয় বটে, কিন্তু সাইবার দুনিয়া তাদের পুঁজিকেন্দ্রিক দর্শনের ভিত্তি করে বানানো এবং কলাটা-মুলোটা নানান রসে কষে না খেলে তাদের আজন্ম খালি পেট ভরেনা।

একধরনের একমুখী, চিন্তাহীন, প্রশ্নহীন আনুগত্য তৈরি হচ্ছে পশ্চিমা ভোগবাদী সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতি যা ক্ষতিকর, সীমাবদ্ধ এবং পরিবেশ-প্রাণ বিনাশী। সাথে রয়েছে অতিরিক্ত রাত জেগে থাকার অভ্যাস, প্রতিক্রিয়া হিসেবে নানান ব্যাধি, পড়ালেখা-শোনার প্রতি অনাগ্রহ, নানান নেশায় আসক্তি, অপরাধে সম্পৃক্ততা।

ভাবনার আরেক পিঠ নিয়ে বলা যায়, আপনি বিমান, হেলিকপ্টার চালাতে পারেন, ভালো। আপনি যদি ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র ইত্যাদি দেশের সামরিক বাহিনীর এসব সাঁজোয়া যান চালাতে চান তাহলে কিন্তু আপনার এসব ভিডিও গেম খেলার খুব ভালো পরিমাণে দক্ষতা থাকতে হবে, যোগ্যতা হিসেবে! কারণ আপনি এসব বাহিনিতে যোগ দিয়ে ইরাক, ইরান, সিরিয়া, পাকিস্তান, ফিলিস্তিন বা আফগানিস্তানে আপনার গেমের দক্ষতা ব্যবহার করে সরাসরি সত্যি সত্যি মানুষ খুন করবেন, হেলিকপ্টার থেকে বা আরো আরামের ঠাণ্ডা ঘরে বসে, ড্রোনের মাধ্যমে, সভ্যতা, গণতন্ত্র, সংস্কৃতি এবং মানবাধিকার রক্ষার জন্য! এসবের জন্য কারো না কারো খুন হতে হবে! কে খুন হবে গরিবেরা ছাড়া! এসব মানুষ দায়ী গণতন্ত্র-সভ্যতা ধ্বংসের জন্য আর ফ্রান্স-যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল-চীন-রাশিয়া-ভারত পরিবেশ-প্রাণ বিনাশী প্রযুক্তি, সংস্কৃতি চালু রেখে পৃথিবী নামক গ্রহ ধ্বংস করে দিলেও তার কোন প্রকার জবাবদিহির দরকার নেই। সব ধ্বংস করে হলেও পুঁজির বিজয় রথ এই সভ্য ক্ষমতাবানেরা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু মাতালের মতো তারা ভুলে যাচ্ছেন, পৃথিবী ধ্বংস হলে তারাও যাবেন! গরিবেরা একা যাবেনা। নির্মাতা এলিয়োনোর ওয়েবারের কথার সাথে তাল না মিলিয়ে উপায় কী? তিনি সমর প্রযুক্তির অন্ধ ব্যবহার দেখে সতর্ক করে “আর রাত থাকবে না” (There Will Be No More Night) সিনেমার বরাত দিয়ে এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে বলেছেন “আমাদের নিজেদের সহিংসতা একদিন আমাদের তাড়া করতে ফিরে আসবে” (“Our own violence is destined to come back to haunt us one day.” (মূল সাক্ষাৎকারে ফরাসি ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে।) ।

শিশু অধিকার রক্ষায় নাকিকান্না করা ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং পুঁজিকেন্দ্রিক সাম্রাজ্যবাদের মোড়ল যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হয় এসবের অধিকাংশ গেম, তাদের কে বিচার করবে?

আর রাত নেই

এলিয়োনোর ওয়েবারের “আর রাত থাকবে না” ঠিক প্রথাগত সিনেমার মতো নয় বা প্রামাণ্যচিত্র হিসেবে যে ধারণা আমাদের রয়েছে তার সাথে ঠিক যথাযথ মিল নেই। বরং “মনোকামনা” (২০১৩) সিনেমার মতো (নির্মাণের ধরণ ধরে মিল হিসাব করা হয়েছে, বিষয় বা লক্ষ্য দু সিনেমার সম্পূর্ণ ভিন্ন।) “আর রাত থাকবে না” ৭৫ মিনিটের এক ধ্যানমগ্ন ব্যাক্তিগত যাত্রায় নিয়ে যাবে আমাদের, যেখানে আপনি অবাক হতে হতে আর অবাক হবেন না! আপনার অবাক হওয়ার ক্ষমতা “নাই” হয়ে যাবে। শুরুতে বর্ণিত গেম সম্পর্কিত যে ধারণা দিয়ে লেখার শুরু আপনি সেই গেম দেখতে পাবেন সিনেমা হিসেবে। একের পরে এক মানুষকে খুন করা হচ্ছে ঠিক গেমের মতো করে। আপনি পাইলটের কথাবার্তা শুনতে পারবেন এবং একসময় মনে হবে ককপিটে আপনি নিজে বসে মনের আনন্দে একের পরে এক মানুষ খুন করতে পারছেন কোন প্রকার জবাবদিহি ছাড়া। এবং দৃশ্যের বা ভিসুয়ালের ধরণ আপনার অপরাধবোধহীনতা নিশ্চিত করবে কারন প্রযুক্তি প্রণেতাগণ তাদের লাভ-লোকসান, নৈতিকতা এবং মূল্যবোধ মাথায় রেখে প্রযুক্তি প্রনয়ন করে। প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, আইন-কানুন কোনো জড় বস্তু নয় এবং এসব সবার জন্য সমান সুবিধা নিশ্চিত করেনা। ভেবে দেখুন প্রতি বছর ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার জন্য হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারায় কিন্তু যেতে পারে কয়জন আর তাদের শরনার্থি হিসেবে কি মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়“সভ্য” পশ্চিমে!?

এসব ব্যাপারে কিন্তু পশ্চিমা আইনকানুন, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, মানুষজন, সংস্কৃতি নীরব, কারো মুখে কোন কার্যকর কথা নেই। ফলে আফগানিস্তানের কৃষকের হাতের মই, লাঙ্গল আপনার মনে হতে পারে কোনপ্রকার অস্ত্র এবং মনে হওয়ার উপর ভিত্তি করে তাকে আপনি খুন করতে পারেন রাতের অন্ধকারে, প্রযুক্তির সাহায্যে দিন বানিয়ে, কোনো সমস্যা নেই, কারণ পৃথিবীর কোনো আদালতে আপনার বিচার হবেনা, আপনার কোন দায় নেই, সামজিক বয়কটের সামনে আপনার দাঁড়াতে হবেনা।

চলমান সংস্কৃতি নিরপেক্ষ নয়, সামাজিক সংস্কৃতি তৈরি করে দেয়া হয়, হচ্ছে মুষ্টিমেয় পুঁজিপতিদের লাভের হিসাব কষে! নয়াউদারবাদি সংস্কৃতিতে খুন, পরিবেশ বিনাশের জন্য আপনার কোন বিচার হবেনা বরং আপনি নানানসব পদক-পুরস্কারে ভূষিত হবেন। আর জবাবদিহি, বিচার, আইন-কানুন, এসব গরিব তালেবান এবং তার চেয়ে অধিক গরিব তালেবান শোষণের শিকার সাধারণ আফগান, ফিলিস্তিনি, ইরাকি বা ইরানি বা কাশ্মীরিদের জন্য। সাধারণ গরিব মানুষের বিচার, জবাবদিহি ও উন্নয়নের নামে শোষণ চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তালেবান-যুক্তরাষ্ট্র-ইন্টারপোল-বাংলা সরকার-নেতা-শিল্পী-সাংবাদিক-সংবাদমাধ্যম সবাই ভাইবোন, এক পরিবার! দিনে রাতে যেকোনো সময়ে আপনি মানুষ শিকারে বের হতে পারবেন। রাত আর মানুষ শিকারে কোনপ্রকার বাধা নয়।

বিজ্ঞান ক্যান্সার বা এইডসের চিকিৎসা সহজলভ্য এবং বিনামূল্যে দিতে পারেনা, সে মুরোদ নয়াউদারবাদি পুঁজির নেই কিন্তু প্রভুদের সেবায় বিজ্ঞানী-মেজর-জেনারেল-কবি-গায়ক-ইমাম-নেতা সবাই দিনরাত একাকার করে দিয়ে এমন প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে, সাথে এমন লোলচাটা এক সংস্কৃতি যেখানে অন্ধ-বধির-বোবা-অস্বাভাবিক থাকা সবচেয়ে “স্বাভাবিক” । আর এ সমস্ত কিছুই আইন, সংস্কৃতি, ধর্ম দিয়ে হালাল করে দেয়া হবে, কোথাও কোন প্রশ্ন থাকবেনা, প্রশ্ন করার মতো মনোভঙ্গী যেন না তৈরি হয় সেজন্য ছোটবেলা থেকেই আপনাকে আমাকে তৈরি করে রাখা হয়েছে নানান নীতি, নৈতিকতা, আইন-কানুন আর সামাজিক, রাষ্ট্রীয় বিধি-নিষেধ এবং শিক্ষা ও শিক্ষিত করে তোলার মাধ্যমে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, ফরাসি সরকার নানা দেশে নানা নামের তথাকথিত “সন্ত্রাসী” খুন করতে পারে তাদের ইচ্ছে মতো, কোন জবাবদিহি নেই বরং জাতিসঙ্ঘ, বিশ্বব্যাংক, মানবাধিকার সংস্থা, ইন্টারপোল বা এরূপ রঙ্গিন সব নামের ভাঁড়েরা তাদের প্রভুর সাথে গলা মিলিয়ে একই সুরে একই ফাটা গলার গান গাইতে থাকবে। এলিয়োনোর ওয়েবারের “আর রাত থাকবে না” সিনেমার যাত্রার ভিতর দিয়ে যেতে যেতে নানা তরিকায়, উছিলায় পুঁজিপতিদের নির্বাচিত সরকারের মানুষ খুন দেখতে দেখতে এমন নানানসব ভাবনা, প্রশ্ন আমাদের নেতিয়ে পড়া নৈতিকতাকে জবাবদিহির সামনে দাঁড় করাতে চায়। “আর রাত থাকবে না” আমাদের মন জোগাতে নয়, জাগাতে চায়।

এলিয়োনোর ওয়েবারের “আর রাত থাকবে না” সিনেমার যাত্রার ভিতর দিয়ে যেতে যেতে নানা তরিকায়, উছিলায় পুঁজিপতিদের নির্বাচিত সরকারের মানুষ খুন দেখতে দেখতে এমন নানানসব ভাবনা, প্রশ্ন আমাদের নেতিয়ে পড়া নৈতিকতাকে জবাবদিহির সামনে দাঁড় করাতে চায়। “আর রাত থাকবে না” আমাদের মন জোগাতে নয়, জাগাতে চায়।

“প্রিপিকুরা” যোগাযোগহীন আদিবাসীঃ সংযোগ, সংবাদ, সমাধান, উপস্থাপন পরিস্থিতি

নির্মাতাঃ ব্রুনোজর্জে, মারিয়ানাঅলিভা, রেনেতাতেররা। প্রযোজনা সংস্থাঃ জেজাফিল্মস। ২০১৭। ৮১ মিনিট। ব্রাজিল। 

‘অত্যধিক দরকারী জিনিসপত্রের উত্পাদনের ফলাফল অনেক অকেজো মানুষ’।- কার্লমার্কস। দার্শনিক।

আদিবাসী মানুষ, জঙ্গলের জীবন ও স্বাধীনতা

প্রিপিকুরা জনগোষ্ঠীর দুজন মানুষ থাকেন আমাজন জঙ্গলের ১ হাজার বর্গমাইল এলাকায় এবং এখানেই কুনজর পড়েছে ব্রাজিল সরকারের মাধ্যমে বড় বড় খামারি, কাঠ ব্যাবসায়ীদের আর তাদের খামারের উৎপাদিত পণ্য, কাঠ ইত্যাদি যায় ইউরোপ-আমেরিকার নানান ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানিতে, বিশেষ করে মার্কিন মুল্লুকে যেখানে দারুণ চাহিদা রয়েছে এসব কাঠ দিয়ে মেঝে বানানোর। এই হচ্ছে মার্কিন দেশ, মুখে বড় বড় বুলি আর আমাজন ধ্বংস করে সখের মেঝে। আর কিছু অংশ ব্যয় হয় স্থানীয় পশ্চিমা জীবনধারায় প্রশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর ভোগে।এসব বড় বড় নামি দামি কোম্পানির গোড়া কিন্তু সুসভ্য(!?) ইউরোপ-আমেরিকায়, তাদের নানান বড় সুশীল গবেষক, মানবাধিকারকর্মী, সংস্থা, রাজনীতিবিদদের মাধ্যমেই প্রণীত হয় এসব কোম্পানিসহ ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোর আইনকানুন। জাতিসঙ্ঘ, ইন্টারপোলসহ আরো এরূপ নানান নামের সংগঠনের মাধ্যমে তারা বাকি বিশ্বে তাদের তাবেদার ক্ষমতালোভী গোষ্ঠীকে সরকারসহ নানানরূপে ক্ষমতাকেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত করে যেন তাদের ইচ্ছামত “আইন” নামের শোষণের হাতিয়ার তৈরি করে পুলিশ, প্রশাসন ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে। তাদের সংস্কৃতি সারা দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠা করা যায় জীবনযাপন সহ সকল ক্ষেত্রে। ব্রাজিল এর বাইরে নয়। এমন শোষণ কাঠামোর ফলে পুঁজিকেন্দ্রিক জীবনযাপনের বিষ সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে খুব সহজে, যদিও খালি চোখে তা বোঝা বেশ মুশকিল। পুঁজির এরূপ বিকাশের ফলে খোদ ইউরোপ-আমেরিকায় লাখ লাখ মানুষ হতদরিদ্র, গৃহহীন অবস্থায় রয়েছে কিন্তু খুব সহজে এসবকে এই মানুষদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়, দেখানো হয় এবং এভাবেই এড়িয়ে যাওয়া হয় কাঠামোগত ব্যর্থতা, খুন, পরিবেশ বিনাশ।

প্রিপিকুরা মানুষদের সাথে প্রথম যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮০র দশকে, তাদের একজন রিতা প্রিপিকুরা (Rita Piripkura)। তিনি জানান কী করে খুব ভোরে সাদা মানুষেরা তাদের জঙ্গলের জীবনে হানা দিয়ে কয়েক মিনিটের ভিতরে খুন করে নয়জনকে এবং বাকিদের বাধ্য করে জঙ্গলের অন্যত্র চলে যেতে। দুঃস্বপ্নের মতো করে বদলে যায় প্রিপিকুরাদের জীবন, তাদের কৃষিকেন্দ্রিক যাপন থেকে শুরু হয় শিকার নির্ভর জীবন এবং নিজ জমিনে চোরের মতন করে পালিয়ে বেড়ানো। কারণ সাদা চামড়ার মানুষেরা দেখলেই তাদের খুন করে ফেলবে, বা অন্য আদিবাসিদের ক্ষেত্রে যা হয়েছে, জোর করে সভ্য(!?) করে তোলা হবে খ্রীষ্টান ধর্মে রূপান্তরিত করে, বস্তিতে বাস করতে বাধ্য করে এবং পুঁজিবাদী বাজার কেন্দ্রিক ব্যবস্থার তলানির সস্তা শ্রমিক ও যৌনকর্মী হিসেবে রূপান্তরিত হতে বাধ্য করে।

আবার জঙ্গলের কিছু অংশ গ্রাস করে “ইকোপার্কে” রূপান্তরিত করে চলবে পরিবেশবিনাশী পরিবেশবান্ধব পর্যটনের ব্যবসা। আর এসব পর্যটক কিন্তু সাদা চামড়ার মানুষেরা বা তাদের প্রশিক্ষিত বাদামি মানুষেরা মানে রসুনের কোয়ার মতো, সবার গোঁড়া কিন্তু সেই মহান(!?) ইউরোপ-আমেরিকা এবং তাদের পুঁজিবাদী আইনকানুন, জীবনযাপন, শিক্ষা ও সংস্কৃতি। রিতা ছাড়া যে দুজন এখনো বেঁচে আছেন প্রিপিকুরা জনগোষ্ঠীর সে দুজনের একজন তার ভাই আরেকজন ভাগ্নে। রিতা থাকেন “ফুনাই” নামক ব্রাজিল সরকার চালিত সংগঠনের এক আধা-বস্তি বসতিতে, তিনি অন্য গোত্রের এক আদিবাসিকে বিয়ে করে থিতু হয়েছেন কিন্তু তার ভাই “পাকি” ও ভাগ্নে “তামানদুয়া” (Pakyî and Tamandua) বিয়ে করেননি এবং বিয়ে করার কোনো আগ্রহ তাদের ভিতরে দেখা যাচ্ছেনা। দুজনে দারুণ মানিয়ে গেছে জঙ্গলের সাথে এবং নিজেদের ইচ্ছায় জঙ্গলের স্বাধীন যাযাবর জীবন বেছে নিয়েছে তারা। তাদের সাথে সবসময় আগুনের মশাল থাকে, গায়ে কোনো প্রকার জামাকাপড় নেই, জঙ্গলের যেখানে যখন সুবিধা হয় সেখানেই ডালপালা দিয়ে একটা আশ্রয় তৈরি করে থাকে আবার মন চাইলে অন্যত্র চলে যায়। সভ্য মানুষের সাথে যোগাযোগ ঘটে ৪-৫ বা ৮-১০ বছরে একবার সেও যদি তাদের মশালের আগুন নিভে যায় তখন আর এরূপ নিঃসঙ্গচারী জীবনযাপনের ফলে তারা এখনো ভাড়াটে এবং সরকারি খুনিদের চোখ এড়িয়ে টিকে আছে। তারা দুজন মারা গেলে সবার বড় লাভ কারণ কোনো প্রকার আদর্শিক, মানবিক কারণ বা প্রতিরোধ থাকবে না জঙ্গলের এ অংশ টিকিয়ে রাখার, আধুনিক মানুষের ছোঁয়ায়, বিদ্যুতের আলোয়। পশ্চিমা সভ্যতার ওহি নাজিল হবে একের পরে এক, যেমন খনিজ সম্পদ উত্তোলন, পরিবেশ সংরক্ষণ, বননির্ভর টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, স্থানীয় আদিবাসী সংস্কৃতির সংরক্ষণ ইত্যাদি, ইত্যাদি। লাভ, লাভ এবং লাভ, টাকা এবং টাকা, পরিবেশ, জঙ্গল এসব টিকিয়ে রেখে কী লাভ? আর সাথে এরকম দুজন লেঙটা পুরুষ যাদের আবার নারী শরীর, টাকাপয়সা, সভ্যতা, ল্যাপটপ, মোবাইল, গাড়ি-বাড়ি কোন কিছুর চাহিদা নেই বেঁচে থাকার জন্য! আদিবাসী এরূপ সাধারণ জীবনযাপনের উপস্থিতি বা টিকে থাকা পুঁজিবাদের জন্য একধরনের আদর্শিক হুমকি।

ভেবে দেখুন আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এসব দেশ তৈরি হয়েছে আদিবাসী গণহত্যার ভিত্তির উপর দাড়িয়ে আর ইউরোপের আজকের ধনী দেশগুলোর ধনের পিছনে রয়েছে উপনিবেশায়নের, গণহত্যার কলঙ্কজনক ইতিহাস। মনে করে দেখুন দক্ষিন এশিয়ার ব্রিটিশ কলোনিয়াল পিরিয়ডের কথা। উপনিবেশায়নের এ মডেল যখন টিকিয়ে রাখা লাভজনক হচ্ছিল না তখন একে একে স্বাধীনতার বড়ি বিক্রি হতে শুরু হলো কিন্তু রাষ্ট্রীয় কাঠামো রইলো আগের মতন ফলে স্বাধীনতা বড়ি কোন কাজে আসেনি। আর যারা বিশ্বজুড়ে এসবের বিরোধিতা করেছেন, করছেন এবং করবেন নানানভাবে, তাদের পরিণতি কী হবে, কীভাবে হত্যা করা হবে, সে কথা ভাবার দরকার নেই।

এরূপ লক্ষ লক্ষ নাম থেকে কয়েকটা নাম উল্লেখ করছি, তাহলে বুঝে যাবেন পশ্চিমা সভ্যতার মুখোশের আড়ালের মুখ কত ভয়ানক যা দুঃস্বপ্নকে হার মানাবে। থমাস শঙ্কর(Thomas Sankara (২১ শে ডিসেম্বর ১২৪৯ – ১৫ই অক্টোবর ১৯৮৭)), চে গেভারা (Che Guevara (১৪ই জুন ১৯২৮– ৯ই অক্টোবর ১৯৬৭)), সাদ্দাম হোসেন (Saddam Hussein ( ২৮শে এপ্রিল ১৯৩৭– ৩০ শে ডিসেম্বর ২০০৬)), মুয়াম্মর গাদ্দাফি (Muammar Gaddafi (৭ই জু্‌ন ১৯৪২ – ২০শে অক্টোবর ২০১১)), সালভাদোর আইয়েন্দে (Salvador Allende (২৬ শে জুন ১৯০৮– ১১ ই সেপ্টেম্বর ১৯৭৩)) এমন লাখ লাখ নাম যোগ করা যায় কিন্তু পশ্চিমাদের জেগে থেকে ঘুমানোর ভনিতা তাতে দূর হবেনা। 

প্রিপিকুরা

জাইর কান্দর (এখন বয়স ৬৩ বছর) (Jair Candor) ৮০র দশক থেকে ব্রাজিল আমাজনের আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করছেন। বিশেষত তার আগ্রহ এবং কাজের জায়গা হলো “যোগাযোগহীন মানুষ/বিচ্ছিন্ন মানুষ” বা ইংরেজিতে “Uncontacted peoples” তিনি আমাজনের এরূপ একাধিক গোষ্ঠীর উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন এবং তাদের জন্য আমাজন জঙ্গলকে বাঁচিয়ে তাদের প্রথাগত যাপন নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করার কাজে নিয়োজিত আছেন কয়েক দশক ধরে। মুলত তাকে ধরে প্রিপিকুরা গোষ্ঠীর শেষ তিন জীবিত সদস্য রিতা, পাকি ও তামানদুয়া এবং তাদের অবস্থা, যাপন, আশঙ্কা, ইতিহাস এবং তাদের প্রতি আমাদের মূলধারার মানুষদের অপরাধ, অবজ্ঞা ইত্যাদির এক সরল কিন্তু গভীর বয়ান, অনুসন্ধান “প্রিপিকুরা” (২০১৭) প্রামাণ্যচিত্র। প্রিপিকুরাদের জীবনযাপনের উপাদান খুব সামান্য, আগুনের মশাল যা খুব যত্ন করে বানানো এবং অনেকটা আমাদের পাটের রশির আগায় বা শহরে গার্মেন্টসের ঝুটের কাপড়ের দড়ির জ্বলতে থাকা আগুনের মত যা দিয়ে সিগারেট ধরানো হয়, লেলিহান শিখা নেই কিন্তু আগুন আছে, সাথে হ্যামক এবং ভোঁতা ম্যাসাটে (এক ধরনের দা বা ছুরি বিশেষ), শেষ। এ দিয়েই নাঙা শরীরে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিয়েছে আমাজনে পাকি এবং তামানদুয়া। তাদের খুঁজে পাওয়ার, যোগাযোগ তৈরির এবং তাদের সভ্যতার আগ্রাসনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার আশঙ্কার গল্প দেখি আমরা ৮১ মিনিট ধরে।

কিছু খবর, ভাব-ভাবনাঃ বিক্ষিপ্ত কিন্তু বিচ্ছিন্ন নয়

কিছু বিষয় সাথে কিছু ভাবনার উল্লেখঃ 

১। তামানদুয়ার ব্রেইন সার্জারির জন্য সাও পাওলো শহরে নেয়া হয়েছিল, সাথে পাকি ছিল, হয়তো তাকে একা যেতে রাজি করানো যায়নি।

২। তারা বিমানবন্দরে খোলা জায়গায় মুতার/প্রসাব করার চেষ্টা করেছে।

৩। পাকি বিমানে এক মহিলার বুকে হাত দিয়েছিল। এখানে নিজের কিছু মতামত জুড়ে দিতে চাই, প্রথম আলোর “প্রধানমন্ত্রীও যাকে বাধা দেননি সেই ফারদিনের পার্কে হাঁটায় নিষেধাজ্ঞা” শিরোনামের খবর মনে আছে? এ খবরে ফারদিনের মানসিক বিকাশ ঠিকভাবে হয়নি জানানো হয়েছিল যদিও তার শারীরিক বিকাশ তরুণ পর্যায়ের, তো সে ঢাকার উত্তরা এক পার্কে তার মায়ের সাথে হাঁটছিল এবং এ সময়ে সে এক মহিলার হাত ধরে টান দেয় এবং সে মহিলা ফারদিনের নামে শ্লীলতাহানির অভিযোগ আনে। পরে অনেক বাধা বিপত্তি পার করে ফারদিনের মা সবাইকে বোঝাতে সক্ষম হয় এর ভিতরে আর যাই থাক যৌনতা নেই। তো এ বিষয় প্রথম আলোর একজন সাংবাদিকও বোঝেন কিন্তু নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক বোঝেননা তাই তারা অনায়াসে এ তথ্যকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করতে পারে কোন ফুটনোট ছাড়া! কারণ পুঁজিকেন্দ্রিক অর্থনীতির এক মূল চালিকা শক্তি হচ্ছে দিনরাত একাকার করে দিয়ে যেকোনো উপায়ে মানুষকে যৌনতাকেন্দ্রিক চিন্তা ও যাপনে ব্যস্ত রাখা। এখানে মহিলা, বাচ্চা, পুরুষ কেউ এই লোলুপ শিকারের বাইরে নয় তাই বেবি শ্যাম্পু থেকে কোকের বিজ্ঞাপন সব জায়গায় আপনি অতিরিক্ত যৌন আবেদনের ছড়াছড়ি দেখতে পাবেন। বাংলাদেশ বা দেশি গণমাধ্যম এর বাইরের বা ব্যতিক্রম কিছু নয় কারণ এখানেও পুঁজিবাদী অর্থনীতি প্রচলিত।

৪। দুজন শহরের হাসপাতালে ৪৫ দিন ছিল, হ্যামকে ঘুমিয়েছে এবং সব সময় ট্রমাটাইজ ছিল আর বারবার জঙ্গলে ফিরে যেতে চেয়েছে।

৫। নানানভাবে তাদের প্রজননকর্মে আগ্রহী করে তোলার প্রয়াস আছে প্রিপকুরা জনগোষ্ঠীকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য। (তাদের বাঁচানো না গেলে সংরক্ষণ সংরক্ষণ খেলার লাখ লাখ ডলারের ব্যাবসা টিকে থাকবে কী করে? কিন্তু কখনো ভুল করেও প্রশ্ন তোলা হবেনা বিদ্যমান পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ভূমিকা নিয়ে। আর পুঁজিকেন্দ্রিক অর্থনীতি, জীবনযাপন, সংস্কৃতি টিকিয়ে রেখে পরিবেশ, প্রাণ কোন কিছুই নিরাপদে রাখা যাবেনা, পুঁজির করাল গ্রাসে পড়বেই, আজ হোক কাল, সে হোক সুন্দরবন, বান্দরবন বা আমাজন। জোর করে তাদের প্রজনন করিয়ে পুঁজির রসদ যোগানোর বাইরে কিছুই করা হবেনা।)!

৬। পাকি ও রিতা খানিক বয়স্ক বলে প্রজননের ক্ষেত্রে অযোগ্য ধরে নিয়ে তামানদুয়াকে টার্গেট করে আগানো হয়েছিল কিন্তু সে উধাও, (এসব বোঝার পরে থেকে তামানদুয়ার আর দেখা পাওয়া যায়নি) যদিও জাইর কান্দর তার একা একা জঙ্গলে বেঁচে থাকার প্রমাণ পেয়েছেন।

৭। বয়স এবং নানান বিবেচনায় পাকি এখন ফুনাইয়ের আশেপাশের সংরক্ষিত জঙ্গলে থাকে মানে চাইলে এখন তাকে আপনি খুঁজে পাবেন কিন্তু সে জানিয়েছে একা একা তামানদুয়া জঙ্গলে ভালো আছে এবং সভ্য মানুষের সংস্পর্শে সে আসতে ইচ্ছুক নয়।

৮। পাকি কেন রিতার ছেলেমেয়েদের খুন করেছে তা পরিষ্কার নয়। আর প্রিপিকুরা মানুষের তারা তিনজনই শেষ মানুষ, যদিও কখনো তাদের কথায় মনে হয়েছে আরো ১২/১৩ জন কোথাও টিকে আছে (হতে পারে ভাষাগত দূরত্বের ফলাফল!) কিন্তু এ কথার সত্যতা নিশ্চিত নয়। তাদের এলাকায় জাইর কান্দরের নিবিড় গবেষণায় বিগত তিন দশকে এরূপ কিছুর প্রমাণ পাওয়া যায়নি।    

উপরের তথ্যগুলো নিউইয়র্ক টাইমস আগস্ট ১৯, ২০২৩ এর। এখানে উল্লেখ্য বিষয় হচ্ছে রিপ্রডাক্টিভ গেমের ভিক্টিম হতে রাজি নয় তামানদুয়া কিন্তু সভ্য মানুষেরা সানন্দে লাখ, কোটি টাকা ব্যয় করে, ঢাকঢোল পিটিয়ে এ গেম খেলছে!! সভ্য মানুষেরাই কিন্তু পুঁজির দাসত্ব মেনে নিয়েছে, জঙ্গলের মানুষেরা নয়। আর পুঁজিকেন্দ্রিক অর্থনীতি কিন্তু প্রজননকেন্দ্রিক সভ্যতায় খুব আগ্রহী কারণ তাতে একই সাথে বুদ্ধিহীন জড় মস্তিষ্ক ভোক্তা আর সস্তা শ্রমিক (অধিকাংশ ক্ষেত্রে) দুটোই মেলা সম্ভব। সাথে মায়া-মমতার নাম করে পুঁজিকেন্দ্রিক নৈতিকতা চালু করে দেয়া যায় খুব সহজে। আর এসব সভ্য মানুষই কিন্তু বংশের বাতি জ্বালিয়ে রাখার প্রয়াসে জনসংখ্যার চাপে পৃথিবীর বাতি নিভিয়ে দেয়ার তালে আছে। এবং মূলধারার এসব মানুষের ভিতরে যে সবচেয়ে মিনিমাল জীবনযাপন করে তার থেকেও কিন্তু পাকি বা তামানদুয়া প্রিপিকুরা হাজার হাজার গুণ মিনিমাল!   

মুহম্মদ আনোয়ার হোসেন: চলচ্চিত্রকার ও চলচ্চিত্র সমালোচক।maangorepublik@gmail.com

তথ্যসূত্র:  

There Will Be No More Night (2020)

https://www.prothomalo.com/world/middle-east/s784w2ru73

https://mubi.com/en/bd/films/there-will-be-no-more-night

https://www.imdb.com/title/tt10917134/

https://www.youtube.com/watch?v=8G5yk5o9t3Q&ab_channel=ACTHumanRightsFilmFestival

There Will Be No More Night: Documentary raises ethical questions about using war footage

Published: March 16, 2023 9.10pm GMT

https://theconversation.com/there-will-be-no-more-night-documentary-raises-ethical-questions-about-using-war-footage-197490

‘There Will Be No More Night review – chilling meditation on modern warfare’

Éléonore Weber’s documentary, air-strike footage of pilots on night missions, could work well in a gallery

https://www.theguardian.com/film/2022/jan/24/there-will-be-no-more-night-review-chilling-meditation-on-modern-warfare

There will be no more night — Eléonore Weber (2020)

https://theartsofslowcinema.com/2021/11/17/there-will-be-no-more-night-eleonore-weber-2020/

Review: There Will Be No More Night (2020)

https://ubiquarian.net/2020/12/review-there-will-be-no-more-night-2020/

https://cineuropa.org/en/newsdetail/387189/

Piripkura (2017) 

https://news.mongabay.com/2021/12/they-will-die-fears-for-the-last-piripkura-as-amazon-invasion-ramps-up/

https://www.imdb.com/title/tt8041618/

‘Brazil Found the Last Survivors of an Amazon Tribe. Now What?

Pakyi and Tamandua are the final known isolated members of the Piripkura people. They are posing a tricky challenge for Brazil.’

By Jack Nicas and Manuela Andreoni

(The journalists spent more than a year, including two trips into the Amazon rainforest, to report this article.)

https://www.nytimes.com/2023/08/19/world/americas/brazil-amazon-tribe-piripkura.html

বাংলাদেশ | প্রধানমন্ত্রীও যাঁকে বাধা দেননি সেই ফারদিনের পার্কে হাঁটায় নিষেধাজ্ঞা | মানসুরা হোসাইন, ঢাকা | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১৮: ২৯

https://www.prothomalo.com/bangladesh/wuuvb8ed1f

Jair Candor: Defender of the Piripkura People

‘The backwoodsman’s dedication to the protection of isolated Indians is portrayed in an award-winning documentary’

Jair Candor: Defender of the Piripkura People

 

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •