উমরের সফল জীবন

উমরের সফল জীবন

আনু মুহাম্মদ

বাংলাদেশের শিক্ষা, গবেষণা ও বিপ্লবী রাজনীতির অন্যতম দিকপাল বদরুদ্দীন উমর তাঁর জীবনের সফল ৯০ বছর পূর্ণ করেছেন গত ২০ ডিসেম্বর। ১৯৩১ সালের এই দিনে তিনি বর্ধমানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি।

বদরুদ্দীন উমরের পিতা আবুল হাশিম ছিলেন এই অঞ্চলে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, তিনি অখণ্ড বাংলার পক্ষে কাজ করেছেন, মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশের নেতা হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পের মধ্যে বর্ধমানের বাড়িতে সাম্প্রদায়িক হামলা হয়, আগুন লাগানো হয়, এর কোনো প্রতিকারের পথ দেখতে পাননি আবুল হাশিম। পরিস্থিতির চাপে, অনিশ্চয়তায় ১৯৫০ সালে তাঁরা ঢাকায় চলে আসতে বাধ্য হন। রাগে, ক্ষোভে, অভিমানে হাশিম সাহেবের সপরিবারে এই নিজ ভূমি ত্যাগ তাঁর সমৃদ্ধ রাজনৈতিক জীবনের জন্য ভালো হয়নি। বদরুদ্দীন উমরও বলেছেন, তাঁর পিতার এই সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না। নিশ্চয়ই, হাশিম সাহেব প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সে দেশে থেকে গেলে ইতিহাস ভিন্ন হতো, হয়তো তিনি সর্বভারতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারতেন। বদরুদ্দীন উমরের জন্যও হয়তো সেই ক্ষেত্রে আরও বৃহত্তর পরিসরে রাজনৈতিক-বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকা পালন সম্ভব হতো। তবে সে ক্ষেত্রে আমরা উমরকে কোথায় পেতাম?

আহমদ শরীফ জানিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে আলাপের সময় আবুল হাশিম বড় ছেলের নামের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, “বালনার দরবেশ বদরুদ্দীন বদরে আলম ছিলেন তাদের আদিপুরুষ, ‘মুহম্মদ’ হলেন নবি আর উমর ছিলেন শ্রেষ্ঠ খলিফা। তাই ছেলের নাম রাখেন বদরুদ্দীন মুহম্মদ উমর।” ধর্মবিশ্বাস না হলেও পিতা আবুল হাশিমের নীতিনিষ্ঠ এবং গণমুখী ভূমিকা উমরকে প্রভাবিত করে থাকবে। বর্ধমানে তিনি যে বৃহৎ পরিবার ও সামাজিক-রাজনৈতিক আবহে বড় হয়েছেন, তা ছোটবেলা থেকেই অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বিপ্লবী ধারার চিন্তা ও রাজনীতির সঙ্গে পরিচিত হতে তাকে সাহায্য করেছিল। উমরের পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে অখণ্ড ভারতের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। কমিউনিস্ট পার্টি, কংগ্রেস, মুসলিম লীগের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের দেখেছেন অনেক কাছ থেকে, তার বৃহৎ পরিবারের অনেক সদস্যই রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের মধ্য দিয়ে উমর পিতার রাষ্ট্রদর্শন থেকে অনেক দূরে নিজের মতাদর্শিক অবস্থান তৈরি করেছিলেন; কিন্তু পরিবারের, বিশেষত পিতার সততা, জনমুখিতা, ন্যায়নিষ্ঠা তিনিও বহন করেছেন।

প্রথমে উমর এবং পরে আবুল হাশিম ও পরিবারের বাকি সদস্যরা ঢাকায় আসার দুই বছরের মাথায় সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক ভাষা-আন্দোলন। ১৯৫২ সালে সেই ভাষা-আন্দোলনে উমর ও তাঁর পিতা দুজনই সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। পরে এই আন্দোলন নিয়ে উমর অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টি, বিশ্লেষণ পদ্ধতি, কঠিন শ্রম দিয়ে গবেষণাকাজ সম্পন্ন করেন। তাতে তিনি ইতিহাস বিশ্লেষণে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবহার, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির ঐক্য ও সংঘাত, রাষ্ট্রের ভূমিকা যে রকম সফলভাবে উপস্থিত করেন তা তাঁকে এদেশে সমাজ, ইতিহাস, আন্দোলন গবেষণায় পথিকৃৎ হিসেবে উপস্থিত করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষে উমর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি গবেষণা প্রকল্পে কিছুদিন কাজ করার পর ১৯৫৬ সালে চট্টগ্রাম কলেজে দর্শন বিভাগে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। এর কিছুদিনের মধ্যেই তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে যোগ দেন। ১৯৫৯ সালে তিনি পাকিস্তান সরকারের বৃত্তি নিয়ে ইংল্যান্ড যান এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কুইন্স কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন ও অর্থশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করেন এবং দেশে ফিরে পুনরায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৬৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ খোলা হয় এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে উমর দর্শন বিভাগ ছেড়ে এই বিভাগ প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৬৪ সালে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ দাঁড় করানোর দায়িত্বও তাকেই দেওয়া হয়।

পাকিস্তানে তখন জেনারেল আইয়ুব খানের নেতৃত্বে সামরিক শাসন চলছিল। রাষ্ট্রীয়ভাবে সাম্প্রদায়িকতা ও জাতিগত বিদ্বেষের পৃষ্ঠপোষকতা চলছিল, পূর্ব পাকিস্তান হয়ে দাঁড়িয়েছিল নব্য উপনিবেশের মতো। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারি কিংবা শাসকদের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান হিসেবেই বিবেচিত হতো, তারা চাইতেন সবসময় সেখানে সরকারের গুণগান হতে হবে। কিন্তু ক্রমেই সারা দেশে শিক্ষা আন্দোলন বিস্তৃত হচ্ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় স্বৈরতন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা, জাতিবিদ্বেষ, শোষণ, পীড়নের বিরুদ্ধে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের তৎপরতা বাড়ছিল। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দমনপীড়ন, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, মতান্ধতা, বৈষম্য, নিপীড়নের বিরুদ্ধে উমরের অবস্থান ক্রমেই স্পষ্ট হতে থাকে। তিনি লেখালিখি, সাময়িকী প্রকাশ, আইয়ুব-মোনেমের স্বৈরশাসনের নানা পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সভা-সমাবেশ বিবৃতিসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেন, বিভিন্ন উদ্যোগে অংশ নেন। সরকার প্রতিবাদী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দমনের জন্য নানারকম ব্যবস্থা নিতে থাকে। আইয়ুব-মোনেমের পান্ডাবাহিনী এনএসএফ বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবু মাহমুদের ওপর শারীরিক হামলাও হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বদরুদ্দীন উমরকে বরখাস্ত করার জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ওপর নানামুখী হুমকি ও চাপ বাড়ছিল, তা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে-বাইরে নানাভাবে তাকে উত্ত্যক্ত করা হচ্ছিল, নিরাপত্তাহীনতাও তৈরি হয়েছিল। এই পরিপ্রেক্ষিতে নিজের সক্রিয়তা অটুট রেখে উমরের পক্ষে আর শিক্ষকতা বহাল রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। তা ছাড়া ততদিনে বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গেও তার যোগাযোগ বেড়েছে। একপর্যায়ে ১৯৬৮ সালে তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে সরাসরি বিপ্লবী রাজনীতিতে যুক্ত হন।

আইয়ুব-মোনেমের পান্ডাবাহিনী এনএসএফ বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবু মাহমুদের ওপর শারীরিক হামলাও হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বদরুদ্দীন উমরকে বরখাস্ত করার জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ওপর নানামুখী হুমকি ও চাপ বাড়ছিল, তা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে-বাইরে নানাভাবে তাকে উত্ত্যক্ত করা হচ্ছিল, নিরাপত্তাহীনতাও তৈরি হয়েছিল। এই পরিপ্রেক্ষিতে নিজের সক্রিয়তা অটুট রেখে উমরের পক্ষে আর শিক্ষকতা বহাল রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। তা ছাড়া ততদিনে বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গেও তার যোগাযোগ বেড়েছে। একপর্যায়ে ১৯৬৮ সালে তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে সরাসরি বিপ্লবী রাজনীতিতে যুক্ত হন।

নিশ্চিত একটি পেশা থেকে এ রকম অনিশ্চয়তায় নিজেকে ছুড়ে দেওয়া খুব স্বাভাবিক ঘটনা নয়, বিশেষত যেখানে উদ্বাস্তু পরিবারের সে রকম আর্থিক কোনো অবলম্বন নেই। এ বিষয়ে তার পিতার উদ্বেগের খবর আমরা পাই সরদার ফজলুল করিমের কাছ থেকে। তার সঙ্গে আবুল হাশিমের শেষ দেখা হয় এক আলোচনা সভায়। সরদার ফজলুল করিম জানাচ্ছেন, ‘সভা থেকে যাওয়ার সময় (আবুল হাশিম) আমায় ডেকে বললেন: উমরটাকে দেখেন না, আপনারা বলে-কয়ে আবার মাস্টারি করতে রাজি করতে পারেন কি না। সংসার করেছে, এখন তো তার দায়িত্ব পড়েছে।… আমি বলেছিলাম: উমরের জন্য আপনি চিন্তা করবেন না। সে এমন তেজি যে, তার সিদ্ধান্ত অপর কেউ করে দিতে পারবে না।’

সরদার এই আলোচনার বিষয়ে আরও জানাচ্ছেন, তবে ‘ছেলে সম্পর্কে তার চিন্তার চেয়ে গর্ব ছিল বেশি। একবার নিজেই কোনো মজলিশে বলেছিলেন: আমায় অনেকে জিজ্ঞাসা করে, হাশিম সাহেব, আপনি আমাদের কী দিয়ে গেলেন? আমি বলি: কেন, বদরুদ্দীন উমরকে দিয়ে গেলাম। এ কথায় তার ছেলে সম্পর্কে আনন্দ ও গর্বের ভাবটি প্রকাশ পেত।’ আসলেই এই গর্ব অনেকের। ভারতের কমিউনিস্ট নেতা ও লেখক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘হাশিম সাহেবের জ্যেষ্ঠপুত্র বদরুদ্দীন উমরকে নিয়ে আজ দুই বাংলা গর্ব করে।’ (আহমদ শরীফ, সরদার ফজলুল করিম ও হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের কথা নিয়েছি আবুল হাশিমকে নিয়ে তাঁদের লেখা থেকে। সূত্র: আবুল হাশিম—তাঁর জীবন ও সময়, সম্পাদক: সৈয়দ মনসুর আহমদ। জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, ঢাকা, ২০০০।)

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে যাঁদের আমি আমার শিক্ষক হিসেবে বিবেচনা করি, যাঁদের প্রতি আমার অপরিসীম কৃতজ্ঞতা, বদরুদ্দীন উমর তাঁদের অন্যতম। গত কয়েক দশকে যাঁদের সঙ্গে আমি এই জগৎ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছি, তা বাস্তবায়নে কাজ করেছি, বদরুদ্দীন উমর তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে তিনি আমার সহযোদ্ধা। দীর্ঘ ২২ বছর আমরা সাংগঠনিকভাবে একসঙ্গে কাজ করেছি। আমার ওপর উমর ভাইয়ের চিন্তা ও কাজের প্রভাববলয় অবশ্য তৈরি হয়েছিল আরও আগে। তাই তাঁকে নিয়ে লিখতে গেলে নিজের কিছু কথাও না এনে উপায় থাকে না।

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ যে অসংখ্য কিশোর-তরুণের মধ্যে নতুন একটি সমাজ-দেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ও সক্রিয়তা তৈরি করেছিল, আমি তাদের একজন। স্বাধীনতার পর ক্রমে ক্রমে স্বপ্নভঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে অনেকের মতো আমার মধ্যেও যে পথ অনুসন্ধান চলতে থাকে, সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেই বদরুদ্দীন উমরের চিন্তা ও সক্রিয়তার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ঘটে। তার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের বেশ কয়েক বছর আগেই আমি তার লেখালিখির সঙ্গে পরিচিত ও আকৃষ্ট হয়েছিলাম। ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি আমি ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হই। তখন আমার বাসা খিলগাঁও। সাইকেলে প্রতিদিন কলেজে যেতাম। সেই অস্থির সময় কলেজে ক্লাস হতো কমই। সাইকেল থাকায় আমি সে সময় আরও অনেক জায়গায় সময় কাটাতে পারতাম বেশি। বলতে দ্বিধা নেই, সেটাই বেশি আনন্দদায়ক ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার, পাবলিক লাইব্রেরি, তথ্য ও প্রকাশনা মন্ত্রণালয়ের গ্রন্থাগার ছিল আমার নিয়মিত গন্তব্য। এ রকম একদিন সম্ভবত বর্তমান নাটমণ্ডলে একটি আলোচনা সভার আয়োজন দেখে সেখানে বসলাম। সেদিনই প্রথম উমরের বক্তৃতা শুনি। এর আগে তিনি বাংলা একাডেমির পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন—এ রকম একটি খবর পত্রিকার পাতায় দেখেই মনে হয় তার ব্যাপারে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। এই ঘোরাঘুরির মধ্যেই, ১৯৭৪ সালে, সংস্কৃতি পত্রিকার সঙ্গেও আমার যোগাযোগ ঘটে।

উপরের কোনো একটি গ্রন্থাগারেই বদরুদ্দীন উমরের সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা, সাম্প্রদায়িকতা পড়েছি। ষাটের দশকে বদরুদ্দীন উমর সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে যে লেখাগুলো লিখেছিলেন, তা তাঁর ভাষায় ‘বাঙালি মুসলমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের’ পর্ব তুলে ধরেছিল। সে সময় পাকিস্তানি সংস্কৃতির নামে আপাদমস্তক সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি দাঁড় করাতে সরকারের সঙ্গে বেশ কিছু ‘পণ্ডিত’ নানা তত্ত্ব হাজির করছিলেন। এসব তত্ত্বকে তাত্ত্বিকভাবে মোকাবিলা, বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত সমাজকে শিক্ষিত ও আত্মোপলব্ধিতে সক্ষম করে তুলতে এবং পাকিস্তানের স্বৈরশাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান স্পষ্ট করতে উমরের এই কাজগুলোর প্রভাব ছিল নির্ধারক।

 

যাই হোক, সত্তরের দশকের শুরুতে বিভিন্ন গ্রন্থাগারে নানা বই নাড়াচাড়া করতে করতেই তাঁর ভাষা-আন্দোলনের প্রথম খণ্ড প্রথম আমার হাতে আসে। ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা-আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ বইটি আমি প্রথম পাঠ করি সে সময় আমার অন্যতম প্রিয় স্থান, তৎকালীন কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরিতে, বেশ কয়েক দিন ধরে। অসাধারণ এই গ্রন্থ পাঠের পর শুধু ভাষা-আন্দোলন নয়; সম্পর্কিত সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত অনুসন্ধানে তার গবেষণা ও লেখার পদ্ধতিও আমাকে আকৃষ্ট করেছিল। আহমদ ছফা পরে যখন একদিন বললেন, ‘আর কিছু দরকার নাই, উমর যদি জীবনে আর কিছু না-ও করতেন তবুও এই গ্রন্থের জন্যই তিনি বাঙালি সমাজে চিরস্মরণীয় থাকবেন’, তা খুবই ঠিক মনে হয়েছে। তবে এরপর সৌভাগ্যক্রমে তিনি আরও অনেক কাজ করেছেন—তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক।

সত্তরের দশকের শুরুতে বিভিন্ন গ্রন্থাগারে নানা বই নাড়াচাড়া করতে করতেই তাঁর ভাষা-আন্দোলনের প্রথম খণ্ড প্রথম আমার হাতে আসে। ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা-আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ বইটি আমি প্রথম পাঠ করি সে সময় আমার অন্যতম প্রিয় স্থান, তৎকালীন কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরিতে, বেশ কয়েক দিন ধরে। অসাধারণ এই গ্রন্থ পাঠের পর শুধু ভাষা-আন্দোলন নয়; সম্পর্কিত সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত অনুসন্ধানে তার গবেষণা ও লেখার পদ্ধতিও আমাকে আকৃষ্ট করেছিল।

শুধু লেখক, গবেষক ও শিক্ষক হিসেবে উমরের যে অবদান, তার তুলনাই খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু তিনি এর মধ্যেই নিজেকে সীমিত রাখতে পারেননি। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মধ্য দিয়ে তাত্ত্বিক হিসেবে তার যে বিপ্লবী অবস্থান তৈরি হয়, তার পূর্ণতার জন্যই তিনি সমাজের বিপ্লবী রূপান্তরের রাজনৈতিক সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। আগেই বলেছি, ষাটের দশকে সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে লেখালিখি করায় আইয়ুব-মোনেম সরকারের রোষানলে পড়ে তিনি এতটুকু উপলব্ধি করেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত থেকে তার পক্ষে বেশি দূর কাজ করা সম্ভব নয়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরেও শিক্ষকতা বা অন্য কোনো পেশা গ্রহণ না-করে, অনিশ্চয়তা ঘাড়ে নিয়ে, একদিকে সমাজ-রাষ্ট্র-ইতিহাস অনুসন্ধান এবং তার ওপর দাঁড়িয়ে নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণে রাজনৈতিক ভূমিকা পালনে আজীবন একনিষ্ঠভাবে আত্মনিয়োগ করেছেন। এই যাত্রা বদরুদ্দীন উমরকে এ দেশের ইতিহাসে অনন্য অবস্থানে স্থাপন করেছে। তবে তাঁর এই কঠিন যাত্রা সফল করতে নি:সন্দেহে যাঁর সার্বিক ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তিনি উমরের স্ত্রী সুরাইয়া হানম।

অনিশ্চয়তা ঘাড়ে নিয়ে, একদিকে সমাজ-রাষ্ট্র-ইতিহাস অনুসন্ধান এবং তার ওপর দাঁড়িয়ে নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণে রাজনৈতিক ভূমিকা পালনে আজীবন একনিষ্ঠভাবে আত্মনিয়োগ করেছেন। এই যাত্রা বদরুদ্দীন উমরকে এ দেশের ইতিহাসে অনন্য অবস্থানে স্থাপন করেছে। তবে তাঁর এই কঠিন যাত্রা সফল করতে নি:সন্দেহে যাঁর সার্বিক ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তিনি উমরের স্ত্রী সুরাইয়া হানম।

বদরুদ্দীন উমর সম্পাদিত ‘সংস্কৃতি’ পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালে। সেই পত্রিকার নিয়মিত প্রধান লেখক ছিলেন বদরুদ্দীন উমর ও ডাক্তার সইফ-উদ-দাহার। অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ লেখা সে সময় তাতে প্রকাশিত হচ্ছিল। বিষয়বস্তু ছিল বাংলাদেশের সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্র বিশ্লেষণ ও বিপ্লবী আন্দোলনের গভীর নির্মোহ পর্যালোচনা করে সঠিক পথ সন্ধান। কয়েক সংখ্যা প্রকাশের পরই জরুরি অবস্থা ও সব পত্রপত্রিকা নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে ‘সংস্কৃতি’ বন্ধ হয়ে যায় ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর মাসে। বন্ধ হওয়ার আগে এই পত্রিকা পাঠ করে আমার নিজের উপলব্ধি ও প্রশ্ন নিয়ে আমি সম্পাদক বরাবর তখন একটা চিঠি লিখেছিলাম। অনেক পরে যখন আমরা একসঙ্গে সংগঠন করি, তখন উমর ভাই তাঁর ফাইলে রাখা সেই চিঠিটি আমাকে দেখিয়েছিলেন। তাঁর সব কাজ বরাবরই খুব গোছানো, তিনি বরাবর সুশৃঙ্খল মানুষ।

উমর ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৭৮ সালে, তখন তিনি বিপ্লবী রাজনীতিতে নতুন ধারা তৈরিতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন। তত দিনে আমি বাঙলাদেশ লেখক শিবিরে যোগদান করেছি। ক্রমে আমি এই ধারার বিভিন্ন সাংগঠনিক ও মতাদর্শিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হই। লেখক শিবির ছাড়াও কৃষক ফেডারেশন, ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটসহ বিভিন্ন ব্যানারে সক্রিয় থাকি, অনেক দায়িত্ব গ্রহণ করি। অসংখ্য সভা-সমাবেশ এবং প্রকাশনায় আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। এর মধ্যে ১৯৮১ সালে আবারও ‘সংস্কৃতি’ প্রকাশ শুরু হয়। এবারও বদরুদ্দীন উমর সম্পাদক হন, আমি দায়িত্ব নিই নির্বাহী সম্পাদকের। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ‘সংস্কৃতি’র এই দায়িত্ব আমার ওপর ন্যস্ত ছিল।

বদরুদ্দীন উমরের সাংগঠনিক কিছু সিদ্ধান্ত ও কাজের পদ্ধতি নিয়ে মতভেদের কারণে ২০০০ সালের শেষদিকে আমি সংগঠন ত্যাগ করি, পরে আমাকে বহিষ্কার করা হয়। আত্মজীবনীতে তিনি আমার সম্পর্কে বেশ কটূক্তি করেছেন, ভুল তথ্যভিত্তিক কিছু সিদ্ধান্তও টেনেছেন, যা আমার প্রাপ্য নয়। কিন্তু এর কারণে তাঁর শক্তি ও রাজনৈতিক মতাদর্শিক ভূমিকা সম্পর্কে আমার মূল্যায়নে কোনো পরিবর্তন হয়নি। সাংগঠনিক সম্পর্কচ্ছেদ ঘটলেই পারস্পরিক বিদ্বেষ ও তিক্ততা সৃষ্টির যে সংস্কৃতি আমাদের বিপ্লবী রাজনীতির অনেক ক্ষতি করেছে, সেই পথ থেকেও সচেতনভাবে দূরে থেকেছি।

৩.

বদরুদ্দীন উমরের লেখার ধার ও ক্রোধের কথা সবাই জানেন। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার একটি প্রান্তদেশ বাংলাদেশ। এই দেশ শাসন করছে একের পর এক বিভিন্ন নামে ও রূপে লুটেরা, দখলদার চোরাই কোটিপতিরা। জনগণের বিরুদ্ধে তাদের হাতে নতুন নতুন দণ্ড থাকে। লুটেরা দখলদারদের রক্ষা ও পৃষ্ঠপোষকতা করার জন্য আইনি কিংবা বেআইনি নানা পথ ও পদ্ধতি আছে, আছে ক্রসফায়ার, খুন-গুমসহ আতঙ্ক সৃষ্টি ও নিপীড়নের নানা পথ। গণতন্ত্র আর শান্তির নামে সাম্রাজ্যবাদী বর্বরতায় বিশ্ব এখন ক্ষতবিক্ষত। এই পুঁজিবাদী বৈশ্বিক ব্যবস্থার আদর্শিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সহযোগী এ দেশের শাসক-শ্রেণি। উন্নয়নের নামে মানুষের জীবনজীবিকা, নিরাপত্তা, প্রাণ-প্রকৃতি বিনাশের বিনিময়ে ফুলে-ফেঁপে উঠছে কতিপয় গোষ্ঠী। শ্রেণী-জাতি-লিঙ্গ-ধর্মভিত্তিক বৈষম্য ও নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা শুধু টিকিয়ে রাখা নয়, তার আরও বিস্তারের মধ্য দিয়েই শাসকগোষ্ঠীর শ্রীবৃদ্ধি। এই বিশ্বে, এই দেশে, কোনো সংবেদনশীল, মননশীল, দায়িত্বশীল মানুষ ক্রোধ থেকে মুক্ত থাকতে পারেন?

কিন্তু আমাদের সমাজে বুদ্ধিবৃত্তি যেন ক্ষমতা আর বাণিজ্যের মধ্যে বসতি গেড়েছে। সরকার, বাজার, কোম্পানি ও এনজিও জগৎ—এই হলো এ ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের প্রধান ক্ষেত্র। এ ধরনের লোকের কাছে বুদ্ধিবৃত্তি তাই ফরমায়েশি বা তোষণমূলক বা অর্থ উপার্জনের মাধ্যম। সুবিধাবাদিতা, লেজুড়বাদিতা কিংবা দেউলিয়াত্ব প্রগতি, চিন্তা ও রাজনীতির প্রবল শক্তিকে এখনো আটকে রেখেছে। বদরুদ্দীন উমরের মতো ব্যক্তি এ রকম সমাজে অস্বস্তির কারণ হওয়ারই কথা।

বাংলা ভাষায় মার্কসীয় সাহিত্য উপস্থাপনে উমর অগ্রণী নিঃসন্দেহে। পাশাপাশি তিনি ইংরেজিতেও লিখেছেন। সর্বশেষ তাঁর প্রথমে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, করাচি ও দিল্লী এবং পরে বাঙ্গালা গবেষণা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত দুই খণ্ডে The Emergence of Bangladesh গ্রন্থে পূর্ব পাকিস্তানের শ্রেণীসংগ্রাম ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে তিনি যা লিখেছেন, তা ইংরেজিভাষী আগ্রহী পাঠক-গবেষকদের অনেক ভ্রান্তি দূর করবে নিশ্চিতভাবেই। বাংলাদেশে শোষণ-নিপীড়ন-বৈষম্য ও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য নিয়ে উমরের ক্ষুরধার লেখা সমাজে অধিপতি চিন্তাকে বিরতিহীনভাবে মোকাবিলা করে যাচ্ছে। যেখানে ক্ষুদ্র তরল লোকজন সমাজের মাথা হিসেবে বিবেচিত হয়, যে সমাজে খলনায়কেরা নায়কের মর্যাদা পায়, সেখানে উমরের মতো পণ্ডিত ও বিপ্লবী তাত্ত্বিকের চিন্তা ও কাজ নিয়ে নীরবতা বিস্ময়কর নয়।

উমরের তত্ত্বচিন্তা, লেখালিখি তার বিপ্লবী সাংগঠনিক অঙ্গীকারের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। তার সব লেখালিখির উদ্দেশ্য সমাজের বিপ্লবী রূপান্তরের চিন্তা ও কাজকে অগ্রসর করা। তার লেখা, গবেষণা, প্রকাশনাকে তারপরও কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়।

প্রথমত, ইতিহাসকে স্বচ্ছভাবে দেখা ও যথাস্থানে উপস্থিত করা। ভাষা-আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তৎকালীন রাজনীতি, পূর্ব বাংলায় শ্রেণীসংগ্রাম, যুদ্ধ-পূর্ব ও যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রভৃতি বিষয়ে গবেষণামূলক গ্রন্থগুলো তারই নিদর্শন।

দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান বৈষম্য, নিপীড়ন ও আধিপত্যমুখী চিন্তার জগৎকে আঘাত করা। সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্র বিশ্লেষণ। সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদসহ বিভিন্ন জটিল ও অধিপতি চিন্তার সমস্যা উন্মোচন করা তিনি একটি দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

তৃতীয়ত, মার্কসীয় তত্ত্বকে যতটা সম্ভব সহজভাবে পরিচিত করা। মার্কসীয় দর্শন, মুক্তি কোন পথেসহ বিভিন্ন লেখা ও বক্তৃতায় উমর বরাবর দক্ষভাবে এ কাজ করেছেন।

চতুর্থত, বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী যে ব্যবস্থায় আমরা বাস করি, তার সম্পর্কে স্বচ্ছ চিন্তা ও উপলব্ধি সৃষ্টির তাগিদে এ বিষয়ে বিশ্লেষণ উমরের লেখা ও আলোচনার অন্যতম ক্ষেত্র।

পঞ্চমত, উমর নিয়মিতভাবে চলতি বিষয় পর্যালোচনা করে লিখেছেন, বিতর্ক করেছেন।

ষষ্ঠত, সর্বোপরি, নিজ দেশের বিপ্লবের জন্য তত্ত্ব নির্মাণ তার বিশেষ মনোযোগের ক্ষেত্র। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত সংস্কৃতি পত্রিকা থেকে গত কয় দশকে এ বিষয়ে তার বহু বিশ্লেষণী লেখা এ দেশের রাজনৈতিক চিন্তাকে সমৃদ্ধ করেছে।

৪.

সততা, নিষ্ঠা, আপসহীনতা, দৃঢ়তা—এই সব কটি শব্দই উমরের পরিচয়ে নির্দ্বিধায় যোগ করা যায়। আবারও বলি, উমরের জীবনে বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ এবং মানুষের মুক্তির রাজনীতির মধ্যে কোনো প্রাচীর নেই; একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। ষাটের দশকের শেষ থেকে সরাসরি রাজনৈতিক দলে যুক্ত হওয়ার পর গত কয়েক দশকে কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থীসহ সমাজের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে তিনি সাংগঠনিকভাবে কাজ করেছেন, বিপ্লবী রাজনীতি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

এ দেশে বিপ্লবী আন্দোলন সংগঠন বিস্তারে ব্যর্থতা তো আছেই, নইলে বাংলাদেশের চেহারা তো ভিন্ন হতো। ব্যর্থতা না থাকলে ১৬ কোটি মানুষ নিজেদের মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করত, মানুষ ও প্রকৃতি মিলে এক অসাধারণ জীবন আমরা প্রত্যক্ষ করতে পারতাম। এটা যে আমরা এখনো পারিনি সেই ব্যর্থতা সামষ্টিক, আমাদের সবারই তাতে দায় আছে। কিন্তু এই ব্যর্থতা চিরস্থায়ী নয়। কারণ, এই সময়ের সব কাজ, ভুল ও সঠিক, ভবিষ্যতের আরও শক্তিশালী যাত্রার ভিত নির্মাণে প্রয়োজনীয় শিক্ষা যোগ করছে।

এ দেশে বিপ্লবী আন্দোলন সংগঠন বিস্তারে ব্যর্থতা তো আছেই, নইলে বাংলাদেশের চেহারা তো ভিন্ন হতো। ব্যর্থতা না থাকলে ১৬ কোটি মানুষ নিজেদের মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করত, মানুষ ও প্রকৃতি মিলে এক অসাধারণ জীবন আমরা প্রত্যক্ষ করতে পারতাম। এটা যে আমরা এখনো পারিনি সেই ব্যর্থতা সামষ্টিক, আমাদের সবারই তাতে দায় আছে। কিন্তু এই ব্যর্থতা চিরস্থায়ী নয়। কারণ, এই সময়ের সব কাজ, ভুল ও সঠিক, ভবিষ্যতের আরও শক্তিশালী যাত্রার ভিত নির্মাণে প্রয়োজনীয় শিক্ষা যোগ করছে।

ব্যক্তি উমর এককভাবে যেখানে সফল, সেটা হলো তিনি হাল ছেড়ে দেননি। বাংলাদেশে এখন বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের যে লড়াই, তা উমরের ভাষায়: ‘৭১-এর অসমাপ্ত মুক্তিসংগ্রামের জের।’ পরাজয়, আত্মসমর্পণ আর দাসত্বের শৃঙ্খল প্রত্যাখ্যান করার শক্তিই এই সংগ্রাম এগিয়ে নেওয়ার পূর্বশর্ত। জীবনের এই পর্যায়ে এসে উমর গভীর তৃপ্তি আর প্রবল অহংকার নিয়ে বলতে পারেন, তিনি আজীবন বিরামহীনভাবে এই শক্তি নিয়েই কাজ করেছেন। তিনি তাঁর যথাসাধ্য ভূমিকা পালনে কিছুমাত্র দ্বিধা বা ক্লান্তি প্রদর্শন করেননি। বদরুদ্দীন উমর তাই সময়ের শিক্ষক ও মুক্তিকামী মানুষের পরীক্ষিত সহযোদ্ধা।

(আবরার চৌধুরী প্রমুখ সম্পাদিত বদরুদ্দীন উমর সম্মাননা গ্রন্থভুক্ত (বাঙ্গালা গবেষণা, ঢাকা। জানুয়ারি, ২০২২) লেখার কিঞ্চিৎ পরিমার্জিত সংস্করণ।)

আনু মুহাম্মদ: শিক্ষক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: anu@juniv.edu

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •