সম্পাদকীয় ভূমিকা

সম্পাদকীয় ভূমিকা

করোনাকাল অব্যাহত আছে। করোনা টিকা নিয়ে বিশ্বজুড়ে রাজনীতি, ব্যবসার সাথে সাথে মানুষের আগ্রহ, উদ্বেগ উৎকন্ঠাও দেখা যাচ্ছে। এই সময়ে বাংলাদেশে বিভিন্ন সমীক্ষায় দারিদ্র, বেকারত্ব, ছাঁটাই বেড়ে যাবার পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে এই সংকট একধরনের ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সম্পদ বৃদ্ধি করেছে আর রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক তৎপারতাও বেড়েছে বহু দেশে। বাংলাদেশ তার মধ্যে একটি। এখানে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন দিয়ে এবং আইন ছাড়াই নিপীড়নের বহু অপতৎপরতা দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ে সমতলে সংখ্যালঘু জাতিসমূহের ওপর নিপীড়ন, উচ্ছেদ, প্রাণপ্রকৃতি বিনাশী প্রকল্প, সারাদেশে ধর্ষণ খুন সড়ক দুর্ঘটনা কোনোকিছুতেই বিরতি নেই। প্রতিরোধ বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভাবে চললেও ভরসা করার মতো প্রয়োজনীয় মাত্রা লাভ করেনি।

এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন ও নির্বাচন –উত্তর অভূতপূর্ব সহিংসতা এবং ট্রাম্পের পক্ষে কংগ্রেস ভবন দখলের ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন সমাজে বর্ণবাদ, খ্রীষ্টীয় চরমপন্থা, অভিবাসী বিরোধী রাজনীতির বিস্তার ঘটেছে বৈষম্য ও সম্পদ কেন্দ্রীভবনের সাথে সাথে। ট্রাম্প এদেরই প্রতিনিধি। সারা দুনিয়ায় সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের পাশাপাশি বৃহৎ পুঁজির স্বার্থ রক্ষায় মার্কিন প্রশাসন এতোবছর ধরে যা করেছে তারই ফলাফল দেশের ভেতর এখন পুঞ্জীভূত আকারে জমছে। ট্রাম্প গেলেই এসব উড়ে যাবে না। কাজেই সামনের দিনে সহিংসতা, সংঘাত, বিদ্বেষমূলক তৎপরতা আরও বাড়বে। বিপরীতে বার্ণি স্যান্ডার্স মার্কিন সমাজে নতুন জনপন্থী ধারার প্রতিনিধিত্ব করছেন। এই ধারার শক্তিবৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তনের লড়াইকে জোরদার করবে।     

করোনায় সবচাইতে আঘাতপ্রাপ্ত দেশ যুক্তরাষ্ট্র। কেন? চলমান করোনাসংকট মোকাবিলায় সব দেশ একরকম সাফল্য বা ব্যর্থতা দেখায়নি। কীধরনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী, কীধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও দায়বদ্ধতা এররকম সংকটে সফল ভূমিকা পালন করতে পারে তার শিক্ষা গত কয় মাসে অনেক স্পষ্ট হয়েছে। এই বিষয়েই আলোকপাত করা হয়েছে এই সংখ্যায় এই বিষয়ক একটি লেখায়, অন্য লেখায় বাংলাদেশের কয়েকটি বাস্তব দৃশ্য সম্পর্কে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।

করোনাকালে শ্রমজীবী মানুষের ওপর চাপ বেড়েছে বহুগুণ। ছাঁটাই ছাড়াও কর্মক্ষেত্রে নিহত ও আহত শ্রমিকদের সংখ্যাও বেড়েছে, বস্তিতে আগুন লাগিয়ে জমি দখলও বেড়েছে। এ বিষয়ে দুটো প্রতিবেদন ও পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করা হলো। করোনাসংকটে যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন ও জীবিকা অনিশ্চয়তার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে সেসময় রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল ও চিনিকল বন্ধের ঘোষণা দিয়ে সরকার লক্ষ মানুষকে নতুন করে ছুড়ে ফেলেছে ভয়ংকর পরিস্থিতিতে। গার্মেন্টসসহ বহু কারখানা ছাঁটাই লেঅফ মজুরি বকেয়া রাখা কোনো কিছুই কমায় নি। এই করোনার মধ্যেও তাই শ্রমিকদের এসবের প্রতিবাদে, অস্তিত্বের লড়াইয়ে মাঠে নেমে পুলিশ=সন্ত্রাসীদের হামলা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। পাটকল ও চিনিকল বিষয়ে সর্বজনকথার পক্ষ থেকে সরেজমিন অনুসন্ধান ও গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে গত ২১ ডিসেম্বর। এসব প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ এখানে প্রকাশ করা হলো।

করোনা এবং প্রচন্ড শীতের মধ্যেই ভারতের কৃষকদের খোলা আকাশের নীচে অবস্থান নিতে হয়েছে। সম্প্রতি ভারতের মোদি সরকার কৃষি সম্পর্কিত যে আইন পাশ করেছে তার বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী কৃষক অবরোধ ও আন্দোলন চলছে। পুলিশের সাথে সংঘাত, কৃষকদের লাল কেল্লা দখলের মতো ঘটনাও ঘটেছে। কী সেসব কৃষি আইন আর কেনই বা কৃষকদের এরকম মরণপণ দীর্ঘ প্রস্তুতির লড়াই? ভারতের কৃষিতে এসব নতুন আইনের তাৎপর্য কী? গত কয়েক দশকে ভারতের কৃষিতে কীধরনের পরিবর্তন ঘটেছে? এসব বিষয়ে আদ্যোপান্ত পর্যালোচনা করেছে এবিষয়ক একটি লেখা।

বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনপদ এবং জনজীবনও এক কঠিন পরিবেশ  বিপর্যয়ের  মধ্য  দিয়ে  যাচ্ছে।  আর  এ  বিপর্যয়ের পেছনে আছে নদী ও পানি প্রবাহ বিষয়ে ভুল ও বিপজ্জনক ব্যয়বহুল বিভিন্ন প্রকল্প। একই ধারায় এখন আরও বিস্তৃত পরিকল্পনা সরকার গ্রহণ করছে যা ‘ডেল্টা প্ল্যান -২১০০’ নামে পরিচিত। এবিষয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে দীর্ঘ লেখায়।

করোনাকালে বাংলাদেশে সকল কার্যক্রমই চলছে, শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, তবে অনলাইনে ক্লাশ পরীক্ষা হচ্ছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকলেও বহু প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনের অন্যায়, দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর প্রতি নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা সবই অব্যাহত আছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে তারই এক রূপ দেখা গেল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী  শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বরখাস্ত ও বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে। এর প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক দেশব্যাপী প্রতিবাদ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এখানে সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থাপিত তাঁদের বক্তব্য প্রকাশ করা হলো।  

ইন্টারনেট এবং তার মাধ্যমে ফেসবুক, ইউটিউব আমাদের চিন্তাজগতকে কীভাবে পরিচালিত করছে, কিংবা বলা যায় আমাদের ভেতরের সুপ্ত প্রবণতাগুলো কীভাবে জোরদার করছে, এবং তা গণতান্ত্রিক চিন্তা ও বিতর্ক ক্ষেত্রে কীধরনের প্রভাব ফেলছে সেবিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করা হয়েছে জেমি বার্টলেট-এর “The People Vs Tech” শীর্ষক লেখাতে। লেখাটির গুরুত্ব বিবেচনায় তার অনুবাদ ‘কেন যত কাছে আসি, তত দূরে সরে যাই’ প্রকাশ করা হলো। একইসাথে নারী পুরুষ মানস, অ্যাঞ্জেলা ডেভিসের সাথে কথোপকথন এবং সিপিগ্যাং ও বেশ্যা ব্যানার বিষয়ে ধারাবাহিক লেখাগুলো প্রকাশিত হলো।

কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের জন্মদিন ১২ ফেব্রুয়ারি। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রকাশ করা হলো তাঁর সৃষ্টিতে মানুষ ও রাজনীতি নিয়ে একটি পর্যালোচনা। রাজনীতিবিদ হোক বা না হোক, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কারও সংশ্রব থাকুক বা না থাকুক, প্রতিটি ব্যক্তিরই রাজনৈতিক বোধ আছে, রাজনৈতিক মতাদর্শিক অবস্থান আছে, স্পষ্ট কিংবা অস্পষ্ট। এই অবস্থান জড়াজড়ি করে থাকে মানুষ ও প্রকৃতির প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে, বিশ্ববীক্ষার সাথে। একজন শিল্পীর সৃষ্টিতে সেটাই প্রতিফলিত হয় শিল্পীত উপায়ে।

এবছর বাংলাদেশের ৫০ বছর পূর্তি হচ্ছে। আমরা আগামী সংখ্যাগুলোতে এর নানাদিক নিয়ে পর্যালোচনা প্রকাশ করবো বলে আশা করি।

আনু মুহাম্মদ

৩১ জানুয়ারি ২০২১

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •