অবলা বসু

স্মরণ

অবলা বসু

তাহেরা বেগম জলি

ছবি: উইকিপিডিয়া

বিদ্যাসাগরের জন্মের ৪৫ বছর পর এবং বেগম রোকেয়ার জন্মের ১৫ বছর আগে আমাদের দেশে জন্মেছিলেন এক বিস্ময়নারী- অবলা বসু। বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর তিনি ছিলেন একান্ত সঙ্গী। স্বামী মিঃ বসুর পাশাপাশি, তিনিও নিজের কর্মজগতে বিচরণ করেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে, এবং নিজের কর্মক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অবিশ্বাস্য উজ্জ্বল। ক্ষণজন্মা এই নারী নিজের সমস্ত জীবনীশক্তি দিয়েই বুঝেছিলেন, নারী এবং শিশুদের জীবনের অন্ধকার দূর করার মধ্যেই নিহিত আছে আমাদের সমাজ এবং জীবনের প্রাণশক্তি। নিজের এই চেতনা নিয়ে তিনি লড়ে গেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। তিনি বেগম রোকেয়া-বিদ্যাসাগরের পথ ধরে হেঁটেছেন, যেন একথা শিরোধার্য করেছিলেন যে, শিক্ষা এবং নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই তাঁর  জন্মদায়।

বিদ্যাসাগর কাল ১৮২০ সেপ্টেম্বর ২৬-১৮৯১ জুলাই ২৯, অবলা বসু কাল ১৮৬৫ (মতান্তরে ১৮৬৪) এপ্রিল ৮-১৯৫১ আগস্ট ২৬, বেগম রোকেয়া কাল ১৮৮০ ডিসেম্বর ৯-১৯৩২ ডিসেম্বর ৯। তাঁদের আবির্ভাব এবং কর্মযজ্ঞের ধারাবাহিকতা দেখলে মনে হবে, দুর্ভেদ্য অন্ধকারের বিরুদ্ধে  ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার তিনজন কাণ্ডারি। একজনের অসমাপ্ত কাজ যেন অন্যজনে পরম মমতায় বহন করে নিয়ে চলেছেন। নারী সমাজের অবরুদ্ধ জীবন এবং শিক্ষা সংকটকে এঁরা দেখেছিলেন সামাজিক অন্ধকারের কেন্দ্র হিসেবে, নারীজাতির জন্য এঁরা ছিলেন সদা যুধ্যমান। 

আজ আমাদের আলোচনার কেন্দ্র হবে শ্রীমতী অবলা বসু। বিদ্যাসাগরের নারী এবং শিক্ষা আন্দোলনের শক্তিশালী উত্তরাধিকারী যদি অবলা বসুকে বলা হয়, তবেই প্রকৃত অবলা বসুকে চিনতে আমাদের সুবিধা হবে। কিন্তু কেন যে তাঁকে বাংলার নারীসমাজের কাছে প্রায় অচেনা করে রাখা হয়েছে, তা প্রকৃতই ভেবে দেখবার বিষয়। বিজ্ঞানাচার্য শ্রী বসু পৃথিবী সেরাদের অন্যতম, এ আমরা সকলেই জানি। কিন্তু কেউ কেউ দুঃখজনকভাবে, অবলা বসুকে শুধুমাত্র বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর সহধর্মিণী হিসেবেই দেখতে পছন্দ করেন বা সেভাবে প্রচারও করেন। অথচ শ্রী বসু এবং তিনি ছিলেন পাশাপাশি চলমান উজ্জ্বল দুই জ্যোতিষ্ক।

বেগম রোকেয়া এবং অবলা বসুর মধ্যে বয়সের পার্থক্য ১৫ বছরের। প্রায় সমসাময়িক সময়েই নারী সমাজের দুই পথিকৃৎ শহর থেকে গ্রাম এবং গ্রামান্তরে ছুটে বেড়িয়েছেন, ঝাঁপিয়ে পড়েছেন নারী সমাজের শৃঙ্খল মুক্তির মহাযজ্ঞে। মহীয়সী বেগম রোকেয়া যখন এক হাতে বই-কলম এবং অন্য হাতে আলোর মশাল নিয়ে ছুটে চলেছেন বিরামহীন। আলোকময়ী অবলা বসুও তখন এক হাতে বই-কলম এবং অন্য হাতে সেই আলোর মশাল হাতেই ছুটে চলেছেন বাংলার পথে প্রান্তরে এবং সমান গতিতেই। বাংলার প্রান্তে প্রান্তে একের পর এক তিনি গড়ে তুলেছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যার সংখ্যা হবে দুশোর উপরে। স্মরণ করা যেতে পারে- বিদ্যাসাগর থেকে রবীন্দ্রনাথ- মাঝে অবলা বসু, বেগম রোকেয়া- এই পুরো সময় কাল পর্যন্তই আমাদের দেশে মহাজাগরণ উঠেছিল শিক্ষা এবং নারী মুক্তি আন্দোলনের।

অবলা বসুর জন্ম বিক্রমপুরের বিখ্যাত দাশ পরিবারে- ৮ আগস্ট ১৮৬৫ (মতান্তরে ১৮৬৪) বরিশালে- বাংলা ১২৭১ সালে। পদ্মার গর্ভে হারিয়ে যাওয়া বিক্রমপুরের ছোট্ট গ্রাম তেলিরবাগের দুর্গামোহন দাশের কন্যা তিনি। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের যোগ্য সৈনিক দুর্গামোহন দাশ- তৎকালীন পূর্ববঙ্গের সমাজের প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে ছিলেন আপোষহীন যোদ্ধা। তিনি বহু বিবাহ বন্ধ, বিধবা বিবাহ প্রবর্তন ও নারী শিক্ষা আন্দোলনের জন্য লড়াই করেছেন আজীবন। দুর্গামোহন দাশ ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের মুখপাত্র। অবলা বসুর মাতা শ্রীমতী ব্রহ্মময়ী দাশ অবরুদ্ধ নারী সমাজের অন্ধকার দূর করতে, নিজের স্বকীয়তা নিয়ে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে এবং বিধবা বিবাহ প্রবর্তনের ক্ষেত্রে ব্রহ্মময়ী দাশের ছিল শক্তিশালী পদচারণা।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এবং ভারতের পঞ্চম মুখ্য বিচারপতি সুধীরঞ্জন দাশ ছিলেন অবলা বসুর দুই কাকা- যথাক্রমে ভূবন মোহন দাশ এবং রাখালচন্দ্র দাশের পুত্র। শ্রীমতী অবলার ভাই তৎকালীন প্রখ্যাত অ্যাডভোকেট জেনারেল সতিশ রঞ্জন দাশ। বোন ‘গোখলে মেমোরিয়াল স্কুলের’ প্রতিষ্ঠাতা শ্রীমতী সরলা রায়।  

গোপাল কৃষ্ণ গোখলে (গোখলে) এখানে কিছু আলোচনার দাবী রাখেন। তিনি ছিলেন ভারতীয় হিসেবে কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি। তবে এর থেকেও তাঁর বড় পরিচয়, তিনি প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার দাবী নিয়ে ১৯১০ সালে প্রথম সরব হয়েছিলেন। নারীসমাজকে তখন ১০ বছর বয়সে প্রাপ্ত বয়স্ক হিসেবে গণ্য করা হতো। মিঃ গোখলেই প্রথম- নারীদের এই প্রাপ্ত বয়স্কতা নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হন। এবং সেই বয়স ১০ থেকে বাড়িয়ে ১২ করা হয় মিঃ গোখলের দাবীর মুখেই। সম্ভবত সে কারণেই, বিদুষী দুবোন অবলা এবং সরলা, তাঁদের প্রতিষ্ঠিত নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নারী এবং শিক্ষা বান্ধব মিঃ গোখলের নাম জড়িয়ে নেন। উল্লেখ থাকে যে এই স্কুল গড়ে তোলার সঙ্গে অবলা বসুর অক্লান্ত পরিশ্রম মিশে আছে।

অবলা বসুর শিক্ষাজীবন শুরু হয় বরিশালে। বরিশালেই তিনি প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ভর্তি হন কলকাতার বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়ে এবং পরবর্তীতে বেথুন স্কুলে। বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয় এবং বেথুন স্কুলের তিনি ছিলেন প্রথম সময়ের ছাত্রীদের অন্যতম। ১৮৮১ সালে ২০ টাকা বৃত্তি প্রাপ্ত হয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন অবলা বসু। বাবা দুর্গামোহন দাশের ইচ্ছা, কন্যা অবলা ডাক্তার হবে। কলকাতা মেডিকেল কলেজে সে সময় মেয়েদের ডাক্তারি শিক্ষার সুযোগ না থাকায়, অবলা বসু ১৮৮২ সালে মাদ্রাজে যান ডাক্তারি পড়তে। অসুস্থতাজনিত কারণে শেষ পর্যন্ত ডাক্তারি পড়া তাঁর আর হয়ে ওঠেনা। ডাক্তারি বিদ্যাশিক্ষা অসমাপ্ত রেখেই ফিরে আসতে হয় তাঁকে। তবে সেখানে তিনি ডাক্তারি বিদ্যার উপর দুবছরের একটি নির্দিষ্ট কোর্স শেষ করেছিলেন। এই কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজের পক্ষ থেকে তাঁকে একটি ‘সার্টিফিকেট অফ অনার’ প্রদান করা হয়েছিল।

১৮৮৭ সালের ২৭ শে জানুয়ারি- বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্র বসু এবং শ্রীমতী অবলা বসু বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। শ্রী জগদীশ চন্দ্র বসুর বাবা শ্রী ভগবানচন্দ্র বসু এবং অবলা বসুর বাবা শ্রী দুর্গামোহন দাশ ছিলেন পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং দুজনেই ছিলেন ব্রাহ্ম মতাদর্শ অনুসারী। এই দুবন্ধুর একান্ত ইচ্ছাতেই নতুন এই দম্পতির দাম্পত্য জীবনের গোড়াপত্তন ঘটে। ১৮৮৫ সালে শ্রী জগদীশচন্দ্র বসু কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান  করেন। যোগদানের অল্পদিন পরই কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তিনি জড়িয়ে পড়েন বিরোধে। ইউরোপীয় অধ্যাপকদের তুলনায় শ্রী বসুকে অর্ধেকেরও কম বেতন দেওয়ার প্রতিবাদে তিনি বেতন নেওয়া বন্ধ করে দেন। বাবা মাসহ বসু পরিবারের পুরো দায়িত্ব এ সময় শ্রীমতী অবলা বসু নিজের কাঁধে তুলে নেন। ১৮৮৫ সালে কলেজে যোগদান করেই শ্রী বসু গবেষণার কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। অবলা বসু কোনোভাবেই চাননি জগদীশ বসুর গবেষণায় বিঘ্ন ঘটুক। তিনি তাই একাই নেমে পড়েন অনটনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। ১৮৮৮ সালে বেতনের ব্যাপারে সম্মানজনক নিষ্পত্তি সহ শ্রী বসু অধ্যাপনার কাজে প্রেসিডেন্সি কলেজে স্থায়ী নিয়োগ পান। শ্রী বসুকে এ সময় তিন বছরের পাওনা বেতন এককালীন প্রদান করা হয়। শ্রীমতী অবলা বসু সংসারের হাল নিজের হাতে রেখেও, নারী সমাজের দুর্গতি নিয়ে কর্মভাবনা এগিয়ে নিয়ে গেছেন। ১৮৯২ সালে বাবা ভগবানচন্দ্র বসু মৃত্যুবরণ করেন। দুবছর পর মা বামা সুন্দরী বসুও স্বামীর পথ ধরেন। বিজ্ঞান সাধক জগদীশ চন্দ্র বসু এর কিছুদিন পরই নিমন্ত্রণ পান পদার্থবিজ্ঞানীদের প্রথম আন্তর্জাতিক প্যারিস সম্মেলনে। অবলা বসুও হয়েছিলেন স্বামীর সফর সঙ্গী। এবং বেশ বড় একটা সময় অবলা বসু এ সময় স্বামীর সঙ্গে ছিলেন ইউরোপ সফরে। দেশে ফেরা এবং মাঝে মধ্যে শ্রী বসুর সফর সঙ্গী হওয়ার মধ্যেই শ্রীমতী অবলা বসু আত্মনিয়োগ করেন বাংলার নারীসমাজের সংকট মোকাবেলায়।

১৯১০ সালে শ্রীমতী অবলা বসু ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয়ের সম্পাদিকা হিসেবে দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তিনি স্কুলটি পরিচালনা করেন। একই সঙ্গে দিদি সরলা রায়ের পাশে দাঁড়িয়ে, গোখলে মেমোরিয়াল স্কুলটি প্রতিষ্ঠার কাজে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে তিনি নিজেকে যুক্ত করেন। ১৯১৯ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘নারী শিক্ষা সমিতি’। সমাজের দানশীল মানুষের সহায়তায় তিনি এটা পরিচালিত করতেন। ‘নারী শিক্ষা  সমিতি’র মাধ্যমে অবলা বসু- গ্রাম বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ৮৮ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১৪ টি শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেন। পরে এই সংস্থা থেকে নারীদের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। অল্পবয়সী বিধবাদের দুর্বিষহ জীবন ভাবিয়ে তুলেছিল মহীয়সী এই বঙ্গকন্যাকে। অপরের গলগ্রহ হয়ে থাকা যুবতী বিধবাদের স্বনির্ভর করে গড়ে তুলবার লক্ষ্যে ১৯২৫ সালে তাই তিনি গড়ে তোলেন ‘বিদ্যাসাগর বাণী ভবন’। ১৯২৬ সালে গড়ে তোলেন ‘মহিলা শিল্প ভবন’। এখান থেকে মেয়েদের স্বনির্ভর হিসেবে গড়ে ওঠার ট্রেনিং দেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে ‘বাণীভবন’ ট্রেনিং স্কুল নামে আর একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন তিনি। বাণীভবন ট্রেনিং স্কুল তিনি গড়ে তুলেছিলেন, তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্কুলের শিক্ষয়িত্রীর অভাব পূরণের জন্য। বিধবা নারীদের এখান থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের শিক্ষিত এবং স্বনির্ভর করে গড়ে তুলে, তাঁর তৈরি বিভিন্ন বিদ্যালয়ে তাদের নিয়োগ দিতেন। পাশাপাশি ‘নারী শিক্ষা সমিতি’র মাধ্যমে পাঠ্যপুস্তক রচনার কাজেও হাত দেন সংগ্রামী এই নারী। তাঁর সকল কর্ম পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি -মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষার কাজও তিনি পরিচালনা করতেন। বলার অপেক্ষা রাখেনা, এতোগুলো প্রকল্পের-সমস্ত কাজই চলছিল প্রধানত তাঁরই উদ্যোগে। শ্রীমতী অবলা বসুর কাজের হিসাব যদি আমরা করতে যাই, তবে এক কথায় বলা যায়, সে ছিল এক মহা কর্মযজ্ঞ। এসব বিবেচনায় আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না, বিদুষী অবলা বসু দেহে মনেই ছিলেন একজন সংগ্রামী মানুষ। বসু বিজ্ঞান মন্দিরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য অবলা বসু স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর সঞ্চিত এক লক্ষ টাকা দিয়ে ‘সিস্টার নিবেদিতা উইমেন্স এডুকেশন ফান্ড’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই ফান্ডের মাধ্যমে ‘অ্যাডাল্‌টস প্রাইমারি এডুকেশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান তিনি গড়ে তোলেন। এখানে উল্লেখ করা দরকার সিস্টার নিবেদিতার সঙ্গে বসু পরিবারের সম্পর্ক ছিল খুবই ঘনিষ্ঠ। ১৯১১ সালে বসু পরিবারের দার্জিলিংয়ের বাড়িতেই সিস্টার নিবেদিতা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। 

নারী মুক্তি এবং নারী শিক্ষা আন্দোলনের সংগঠক হিসাবে অবলা বসুর জীবনের পরতে পরতে মিশে আছে মানুষের প্রতি দায়িত্ব এবং ভালবাসা। সে সময়কার জনপ্রিয় ইংরেজি পত্রিকা ‘মডার্ন রিভিউ’ এ নারী শিক্ষা এবং নারী স্বাধীনতার উপর তাঁর বেশ কিছু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। নারী শিক্ষার উপর সেখানে এক প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, “নারীর শিক্ষাকে যেন ভাল পাত্র পাওয়ার উপলক্ষ্য হিসেবে ভাবা না হয়। প্রতিটি মেয়েরই উচিত গভীর এবং বিস্তৃতভাবে শিক্ষাকে আত্মস্থ করা। কারণ একজন পুরুষের মতোই নারীরও রয়েছে একটি মন, আগে তার চাহিদা পূরণ করতে হবে।” বিভিন্ন বাংলা সাময়িক পত্রিকাতেও সে সময় তাঁর কিছু প্রবন্ধ ও ভ্রমণ কাহিনি বেরিয়েছিল।

অবলা বসুর বিভিন্ন সময়ে লেখা কিছু প্রবন্ধ একটি সংকলনেই পাওয়া যায়, সেটি হলো- শকুন্তলা শাস্ত্রি প্রকাশিত ‘বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্র ও লেডি বসুর প্রবন্ধাবলী’। ১৩০২ থেকে ১৩৩২ এই সময়কালের মধ্যে ‘মুকুল’ এবং ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় নিজের ভ্রমণ বৃত্তান্ত লিখে তিনি দেখাতে সক্ষম হয়েছিলেন, নারী যদি মানুষ হওয়ার সংগ্রাম করে, তবে সে কত উঁচুতে উঠতে পারে এবং জীবনকেও দেখতে পারে কতভাবে! বাংলা ১৩০২ অগ্রাহায়ণ ও পৌষ সংখ্যার মুকুল পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর কাশ্মীর ভ্রমণ কাহিনি। এই কাহিনির শুরুতে অবলা শিশুদের উদ্দেশে লিখেছিলেন, “ইংলণ্ড প্রভৃতি সুসভ্য দেশের বালক বালিকাগণ বাল্যকাল হইতেই ভ্রমণ বৃত্তান্ত পড়িতে ভালবাসে, তাহার সুফল হয় এই যে, বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়া তাহারা নূতন দেশ আবিষ্কারের জন্য প্রাণ পর্যন্ত ত্যাগ করিতে প্রস্তুত হয়।…আমাদের এই ভ্রমণ বৃত্তান্ত পাঠ করিয়া এতটা না হইলেও আশা করি তোমাদের মধ্যে অনেকের মনে নানাস্থান ভ্রমণ করিয়া প্রকৃতির শোভা দেখিবার আগ্রহ জন্মিবে।” অবলা বসুর মনপ্রাণ জুড়ে ছিল আমাদের শিশুরাও। কীভাবে শিশুদের প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা যায়, সে চিন্তা ছিল অবলার মন প্রাণ জুড়ে। ভ্রমণ এবং ভ্রমণের অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের কর্মশক্তির অন্যতম উৎস।

বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু যখন বিজ্ঞানের বাণী পৌঁছে দেওয়ার জন্যে ছুটেছেন বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে। প্রায় সব জায়গাতেই তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন কিংবদন্তী অবলা বসু। অবলা বসুর এই ভ্রমণ যে শুধুই স্বামীসঙ্গ ছিলোনা, তিনি জীবনভর তার প্রমাণ দিয়ে গেছেন তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে। তাঁর ইউরোপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, তিনি ১৯৩২ সালের প্রবাসীতে লিখিত আকারে প্রকাশ করেছিলেন ‘বাঙ্গালী মহিলার পৃথিবী ভ্রমণ’ নামে। সেখানে লিখেছিলেন, “বহুদেশ ভ্রমণে দেশ সেবার নানা উপাদান সংগ্রহ করিতে পারিয়াছি। সে কথা বলিতে গেলে ১৮৯৬ খৃষ্টাব্দ হইতে আরম্ভ করিতে হয়। সেই বৎসর আচার্য বসু মহাশয় অদৃশ্য আলোক সম্বন্ধে তাঁহার নূতন আবিষ্ক্রিয়া বৈজ্ঞানিক সমাজে প্রদর্শন করিবার জন্য ব্রিটিশ এসোসিয়েশনে আহুত হন। তাঁহার সহিত আমিও যাই। এই আমার প্রথম ইউরোপ যাত্রা। ইহার পর ৫/৬ বার তাঁহার সহিত পৃথিবীব্যাপী ভ্রমণে বাহির হইয়াছি। আমার ভ্রমণ কালের মধ্যে পৃথিবীর ইতিহাস নানাভাবে ভাঙ্গিয়াছে ও গড়িয়াছে, এক আমার বয়সেই ইউরোপে কত কত পরিবর্তন দেখিলাম।” 

ভারতীয় বিজ্ঞানের আধুনিক ধারাকে, অক্লান্ত পরিশ্রমে পশ্চিমি দুনিয়ায় পরিচিত করে তুলেছিলেন বাঙ্গালি বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু। এই উপলক্ষ্যেই ছিল তাঁদের ইউরোপ ভ্রমণ। অবলা বসু আরও লিখেছেন, “এতকাল তো ভারতবাসী বিজ্ঞানে অক্ষম এই অপবাদ বহুকণ্ঠে বিঘোষিত হইয়াছে, আজ বাঙ্গালী এই প্রথম বিজ্ঞান সমরে বিশ্বের সম্মুখে যুঝিতে দণ্ডায়মান। ফল কী হইবে ভাবিয়া আশংকায় আমার হৃদয় কাঁপিতেছিল, হাত পা ঠাণ্ডা হইয়া আসিতেছিল। তারপর যে কী হইলো সে সম্বন্ধে আমার মনে স্পষ্ট কোন ছবি আজ আর নাই। তবে ঘন ঘন করতালি শুনিয়া বুঝিতে পারিলাম যে, পরাভব স্বীকার করিতে হয় নাই। বরং জয়ই হইয়াছে।” ভ্রমণের এই সময় কালেই কলকাতায় ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা এই দম্পতির চিন্তায় ঠাঁই করে নিয়েছিল।

অবলা বসু যত ভ্রমণ কাহিনি লিখেছেন, বলা যেতে পারে- ‘ইতালির লুপ্তনগরী’ তাঁর সেরা বিদেশ ভ্রমণ কাহিনী। ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতে ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহর ‘পম্পেই নগরী’ অবলা বসুর মনে ঝড় তুলেছিল বললে ভুল হয়না। একবার-সারাদিন সেই মৃত নগরী ঘুরে, সন্ধ্যায় শেষ বারের মতো শহরটার দিকে চেয়ে, তাঁর কল্পনায় ভেসে উঠলো— “একটি গৃহ ক্রমে ক্রমে ভস্মে ঢাকিয়া যাইতেছিল। সেই গৃহে একটি নারী দুহাতে তার শিশুটিকে উচ্চে ধরিয়া রহিয়াছিল। ভস্মস্তূপ ক্রমে ক্রমে উচ্চ হইয়া দুঃখিনী মাতাকে নিমজ্জিত করিতেছিল। কিন্তু সেই অগ্নির প্রসার হইতে শিশুকে রক্ষা করিতে হইবে। জ্বলন্ত ভস্মস্তূপ তিল তিল করিয়া দগ্ধ করিয়াও জননীকে একেবারে অবসন্ন করিতে পারে নাই। কী যেন এক মহাশক্তি, দুঃসহ যন্ত্রণা দমন করিয়া রাখিয়াছিল! মাতার হস্ত দুইটি মৃত্যু যন্ত্রণাতেও অবশ হইয়া পড়ে নাই। দুই সহস্র বৎসর পরে সেই ঊর্ধ্বত্থিত করপুটে সন্তানটি পাওয়া গিয়াছে। সেই মাতার স্নেহস্পর্শে যেন অতীত বর্তমানের সহিত মিলিয়া গেল। একই দুঃখে, একই স্নেহে, একই মমতায় সেকাল ও একাল, পূর্ব ও পশ্চিম যেন বান্ধা পড়িলো! তখন পম্পেইর মৃত রাজ্য সঞ্জীবিত হইয়া উঠিলো, এবং রাজপথ আমার চক্ষে অকস্মাৎ লোকজন পূর্ণ হইলো!”

একটি গৃহ ক্রমে ক্রমে ভস্মে ঢাকিয়া যাইতেছিল। সেই গৃহে একটি নারী দুহাতে তার শিশুটিকে উচ্চে ধরিয়া রহিয়াছিল। ভস্মস্তূপ ক্রমে ক্রমে উচ্চ হইয়া দুঃখিনী মাতাকে নিমজ্জিত করিতেছিল। কিন্তু সেই অগ্নির প্রসার হইতে শিশুকে রক্ষা করিতে হইবে। জ্বলন্ত ভস্মস্তূপ তিল তিল করিয়া দগ্ধ করিয়াও জননীকে একেবারে অবসন্ন করিতে পারে নাই। কী যেন এক মহাশক্তি, দুঃসহ যন্ত্রণা দমন করিয়া রাখিয়াছিল! মাতার হস্ত দুইটি মৃত্যু যন্ত্রণাতেও অবশ হইয়া পড়ে নাই। দুই সহস্র বৎসর পরে সেই ঊর্ধ্বত্থিত করপুটে সন্তানটি পাওয়া গিয়াছে। সেই মাতার স্নেহস্পর্শে যেন অতীত বর্তমানের সহিত মিলিয়া গেল।

জগদীশচন্দ্র বসু এবং অবলার বসুর একমাত্র সন্তান জন্মের পরেই মারা যায়। পরবর্তী জীবনে আর কোনো সন্তান তাঁদের জীবনে আসেনি। সমাজের হাজারো শিশুদের মাঝে অবলা খুঁজে নিয়েছিলেন নিজের সন্তানের অপূর্ণতা। নৈর্ব্যাক্তিক মাতৃত্ব-পিতৃত্বের কথা আমরা বইয়ে পড়েছি, আশ্চর্যজনক ভাবে সেই নৈর্ব্যাক্তিক পিতৃত্ব-মাতৃত্বের মহান সৌন্দর্য বহু আগেই ধরা দিয়েছিল বসু দম্পতির উচ্চতর মানবিক জীবনে।

আজ এই ঘোর অন্ধকারে, আমাদের অবলা বসুর দিকে ফিরে তাকাতেই হবে। যে দেশে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, লেডি অবলা বসু, মহীয়সী বেগম রোকেয়ার আবির্ভাব ঘটে- সেই দেশের নারী বা শিশুদের জীবনে অন্ধকার কিছুতেই স্থায়ীরূপ পেতে পারেনা। আমাদের নারী এবং শিশুসমাজের জীবন মানবিক অধিকারে উন্নীত করবার লড়াইয়ে, শক্তিমান অবলা বসু আজ হয়ে উঠুন আমাদের আঁধারের আলো। আজ আমাদের নারীসমাজের এই ঘোর দুর্দিনে, অবলা বসু বাংলার ঘরে ঘরে হয়ে উঠুন নারী জাগরণের প্রেরণার উৎস।

তাহেরা বেগম জলি: লেখক, রাজনৈতিক কর্মী।

ইমেইল: taherajolly@gmail.com

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •