রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ কার স্বার্থে?

পাটশিল্প বিশেষ ক্রোড়পত্র-৩

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ কার স্বার্থে?

কল্লোল মোস্তফা

গত ২ জুলাই ২০২০ বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) ব্যবস্থাপনাধীন ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। করোনা মহামারির মধ্যে সারাদুনিয়ার সরকারগুলো যখন নানান প্রণোদনার মাধ্যমে মানুষের কর্মসংস্থান ধরে রাখবার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ সরকার সেখানে করোনা মহামারির সুযোগ নিয়ে প্রায় ২৫ হাজার স্থায়ী ও সমসংখ্যক অস্থায়ী শ্রমিককে চাকুরিচ্যুত করে বিপুল জমিসহ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো পিপিপির মাধ্যমে বেসরকারি পুঁজিপতিদের কাছে বিক্রির সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজম বা দুর্যোগের পুঁজিবাদের ধ্রুপদী দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধের কারণ হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছরের মধ্যে ৪৪ বছরই লোকসানে ছিল বিজেএমসি, বর্তমানে সংস্থাটির পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বন্ধের পর সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে নতুন ব্যবস্থাপনায় এসব পাটকল আবার চালু করা হবে । নতুন ব্যবস্থাপনায় এসব কারখানায় পুরোনো শ্রমিকদের চাকরির নিশ্চয়তা থাকবে।(সূত্র: রাষ্ট্রায়ত্ত সব পাটকল বন্ধ ঘোষণা, ৩ জুলাই ২০২০, বণিক বার্তা) বাংলাদেশ সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত নিল এমন এক সময়ে যখন সারা বিশ্বেই অপচনশীল কৃত্রিম তন্তুর বিপরীতে পচনশীল তন্তু হিসেবে পাটের জনপ্রিয়তা ও চাহিদা উত্তোরত্তর বেড়ে চলেছে। আমরা এই লেখায় রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের লোকসানের কার্যকারণ বিশ্লেষণ করে দেখব লোকসান ঠেকাতে পাটকল বন্ধ করে দেয়াটা অবশ্যম্ভাবী ছিল কিনা, সেই সাথে দেখব রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের ফলে পাটকল শ্রমিক ও পাট চাষিদের উপর কি ধরণের প্রভাব পড়তে পারে এবং সবশেষে রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা বেসরকারি করণের পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে বিচার করব বর্তমান উদ্যোগের ফলে পাটশিল্পের বিকাশ ঘটবে নাকি পাটশিল্পখাত উল্টো সংকুচিত হবে।

এই লেখায় রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের লোকসানের কার্যকারণ বিশ্লেষণ করে দেখব লোকসান ঠেকাতে পাটকল বন্ধ করে দেয়াটা অবশ্যম্ভাবী ছিল কিনা, সেই সাথে দেখব রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের ফলে পাটকল শ্রমিক ও পাট চাষিদের উপর কি ধরণের প্রভাব পড়তে পারে এবং সবশেষে রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা বেসরকারি করণের পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে বিচার করব বর্তমান উদ্যোগের ফলে পাটশিল্পের বিকাশ ঘটবে নাকি পাটশিল্পখাত উল্টো সংকুচিত হবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে লোকসানের কারণ

২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিজেএমসি’র লোকসান হয় ৫৭৩.৫৮ কোটি টাকা । বিজেএমসির ২০১৮-১৯ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন(খসড়া) অনুসারে এইসব লোকসানের চিহ্নিতক্ষেত্রসমূহ নিম্নরূপঃ

  • সক্ষমতা অনুসারে উৎপাদন না হওয়া ৩৩৪.৪১ কোটি টাকা (৫৮.৩০%)
  • ব্যাংক ঋণের সুদ ৭৫.১১ কোটি টাকা (১৩.১০%)
  • গেট মিটিং/শ্রমিক আন্দোলন ৬৫.৮৭ কোটি টাকা (১১.৪৮%)
  • অতিরিক্ত ৯১৭৭ জন অস্থায়ী শ্রমিক ৪৫.১৪ কোটি টাকা (৭.৮৭%)
  • বিদ্যুৎ বিভ্রাট ২৭.২৫ কোটি টাকা (৪.৭৫%)
  • সামাজিক দায়বদ্ধতা ২২.৬৭ কোটি টাকা (৩.৯৫%)
  • সিবিএ এর কার্যক্রম ৩.১৩ কোটি টাকা (০.৫৫%)

বিজেএমসি’র চিহ্নিত করা কারণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দায়ী হলো সক্ষমতা অনুসারে উৎপাদন করতে না পারা। প্রশ্ন হলো সক্ষমতা অনুসারে উৎপাদন না হওয়ার কারণ কী? তার ব্যাখ্যাও বিজেএমসির ২০১৭-১৮ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে দেখা যাক:

  • দীর্ঘদিনের পুরাতন মেশিনারিজ বিএমআরআই না করায় মেশিনের দক্ষতা হ্রাস পাওয়া(৫৬%)
  • মৌসুমের শুরুতে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী গুণগত মানসম্পন্ন পাটক্রয় নিশ্চিত করতে না পারা
  • দক্ষ স্পিনার ও তাঁতির অভাব
  • দক্ষ মিস্ত্রির অভাবে মেশিনসমূহের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়া
  • বকেয়া বেতন ও মজুরি হালনাগাদ না করায় শ্রমিকগণ অন্য পেশায় সাময়িকভাবে নিয়োজিত হওয়ায় বহুলাংশে উৎপাদন হ্রাস পায়
  • মেশিনারিজ ব্রেকডাউন
  • শ্রমিক অসন্তোষ, গেট মিটিং ও ধর্মঘট

এছাড়া আরো যে সমস্যার কথা ২০১৭-১৮ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয় তা হলো:

ক) ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জানুয়ারি মাসে ভারত বিজেএমসি’র উৎপাদিত পাট পণ্যের উপর এন্টি ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে যা ২০১৭-১৮ অর্থ বছরেও বলবৎ ছিল। উপরন্তু ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মার্চ মাস থেকে ভারত বাংলাদেশে উৎপাদিত স্যাকিং ক্লথের উপরও এন্টি ডাম্পিং শুল্ক কার্যকর করায় দেশটিতে পাটপণ্য রপ্তানি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

খ) আন্তর্জাতিক বাজারে কূটনৈতিক তৎপরতা দিয়ে ভারত যেভাবে পাটশিল্পকে নীতিসহায়তা ও ছাড় দিচ্ছে সেভাবে বাংলাদেশ দিতে পারছে না। ফলে দেশে ও বিদেশে ভারতের সাথে আমাদের পাট পণ্য অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হচ্ছে।

প্রতিবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনেই ঘুরে ফিরে এই সংকটগুলোর কথা উঠে আসে। যেমন ২০১৮-১৯ সালের খসড়া বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে বিজেএমসির সংকটসমূহ নিম্নরূপ:

  • নগদ অর্থের অভাবে মৌসুমের শুরুতে পাটক্রয় করতে না পারা।
  • পুরাতন মেশিন এবং পর্যাপ্ত পাট না থাকায় সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে না পারা।
  • বিপণনের ক্ষেত্রে প্রচলিত পদ্ধতির বিকল্প উপায় না থাকা।
  • MPA-2010 আইনটির শতভাগ বাস্তবায়ন না হওয়া।
  • নিজস্ব সক্ষমতায় নিয়মিত মজুরী পরিশোধ করতে না পারা।
  • ব্যক্তি মালিকানাধীন মিলসমূহে এবং বিজেএমসি’র মিলসমূহে ভিন্ন ভিন্ন মজুরি কাঠামোর বিদ্যামানতা।
  • সর্বস্তরে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবলের অভাব।
  • বিশ্ব বাজারের চাহিদা অনুযায়ী বহুমুখীপাটপণ্য উৎপাদনের ব্যবস্থা না থাকা।
  • বাজার গবেষণা, পণ্যের মান উন্নয়ন ও বহুমুখীকরণের জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ গবেষণা ও মান-উন্নয়নের ব্যবস্থা না থাকা
  • ভারত সরকার কর্তৃক আরোপিত এন্টি-ডাম্পিং এর কারণে ভারতের বাজারে পণ্য সরবরাহ করতে না পারা।

এইসব সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বিজেএমসি অনেকগুলো সুপারিশ করে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ‌্য কতগুলো সুপারিশ হলো:

  • MPA-2010 আইনটির সফল বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
  • ব্যক্তি মালিকানাধীন মিলসমূহে এবং বিজেএমসি’র মিলসমূহে অভিন্ন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়ন করা এবং উভয়ের ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক পণ্য বিক্রয়ের Standard Price নির্ধারণ।
  • আদমজী হস্তান্তর বাবদ ৩২২৮ (তিন হাজার দুইশত আটাশ) কোটি টাকা এবং বিজেএমসি’র নিয়ন্ত্রনাধীন মিল সমূহের অব্যবহৃত জমি বিক্রয় করে সমুদয় অর্থ বিজেএমসি’র নামে এফডিআর করার ব্যবস্থা করা। এফডিআর হতে প্রাপ্ত অর্থে বিজেএমসি ও মিলসমূহের সার্বিক ব্যয় পরিচালনা করা।
  • মৌসুমের শুরুতে স্বল্প মূল্যে/ন্যায্য মূল্যে পাটক্রয়ের জন্য আবর্তক তহবিল গঠন করা।
  • বিজেএমসি’র আওতায়ভুক্ত ছোট ছোট মিলগুলিকে বড় মিলের আওতাভুক্ত করে প্রশাসনিক ব্যয় কমানো।
  • বিজেএমসি’র পর্ষদে পরিচালক (উৎঃ ও পাট) এবং পরিচালক (বিপণন) পদে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা করা।
  • মিলসমূহের পর্ষদ-এর মাধ্যমে মনিটরিং জোরদারকরণ।
  • বাজার অনুসন্ধানে অভিজ্ঞ টিম গঠন ও নতুন বাজার অনুসন্ধান।
  • এন্টি ডাম্পিং এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।
  • মজুদ পণ্য দাম কমিয়ে বিক্রির উদ্যোগ গ্রহণ।
  • মিলগুলোর কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে Enterprise Resources Planing (ERP) বাস্তবায়ন।
  • স্কুলগুলোকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় MPO ভূক্তকরণ।

শুধু বিজেএমসি নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর সমস্যা সমাধানের জন্য পুরনো যন্ত্রপাতির বদলে আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট লিখিত প্রস্তাব দিয়েছিল শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ বা স্কপ।(সূত্র: পাটকল বাঁচাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার চায় স্কপ, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৯) স্কপ মনে করে পাটকলের অতিপুরতান তাঁতগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা অনেক কম এবং এগুলো সংস্কারের অযোগ্য, ফলে এগুলো সংস্কার (বিএমআর) করার নামে অর্থ অপচয় না করে অধিক উৎপাদনক্ষমতা সম্পন্ন স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে হবে। আর এজন্য মোটামুটি ১ হাজার কোটি টাকা খরচ করা হলেই উৎপাদনের হার বৃদ্ধি করে মাথাপিছু ব্যয় কমানোর মাধ্যমে বিজেএমসি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।

কাঁচা পাটের অভাবে খুলনার প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলের তাঁতগুলো অলস পড়ে আছে, ছবি: ডেইলি স্টার, ২৮ মে ২০১৯

স্কপের প্রস্তাব অনুসারে, বর্তমানে বিজেএমসি পরিচালিত ২২টি কারখানায় হেসিয়ান, সেকিং এবং সিবিসি এই তিন ধরনের মোট ১০৮৩৫ টি তাঁত বিদ্যমান। যার মধ্যে হেসিয়ান তাঁত ৬২৩২ টি, সেকিং তাঁত ৩৬৯৬ টি এবং সিবিসি তাঁত ১০০০ টি। আধুনিক স্বয়ংক্রিয় তাঁতের তুলনায় এই তাঁত সমুহের উৎপাদন ক্ষমতা এমনিই কম, তার উপর পুরাতন হয়ে যাওয়ায় এগুলির উৎপাদন ক্ষমতা আরও হ্রাস পেয়েছে। হেসিয়ান তাঁতের পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতা বার্ষিক মাত্র ১৬ মেঃ টন, সেকিং তাঁতের ৩৯ মেঃ টন এবং সিবিসি তাঁতের ১৮ মেঃ টন। অথচ চাইনিজ Tungda TD 788 Model  এবং Victor 1101 Jute repier Loom স্বয়ংক্রিয় তাঁত বার্ষিক ৩৬ মেঃ টন উৎপাদন করতে সক্ষম। আর দক্ষতার সাথে সরবরাহ চুক্তি করতে পারলে স্বয়ংক্রিয় তাঁত সরবরাহকারী কোম্পানিই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে শ্রমিকদের দক্ষ করে গড়ে তোলার দায়িত্ব নেবে। অনেকাংশে স্বয়ংক্রিয় তাঁতে উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরবরাহ লাইনে প্রয়োজনীয় শ্রমিকের সংখ্যা বাড়বে যা নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। স্কপের প্রস্তাব মতে, বিদ্যমান শত বছরের পুরনো স্কটল্যান্ড টেকনোলজি পর্যায়ক্রমে ৩ ধাপে আমূল পরিবর্তন করতে হবে:

প্রথমধাপ: ৬২৩২ টি হেসিয়ান তাঁত এর পরিবর্তে আধুনিক চাইনিজ Tungda TD 788 Model এবং Victor 1101 Jute rapier loom এর মধ্যে থেকে স্বল্পব্যয়ে অধিক উৎপাদন করা যায় এরূপ একটি মডেল আমাদেরকে বাছাই করতে হবে। ৬২৩২ টি হেসিয়ান তাঁতের সমপরিমাণ উৎপাদন এইসকল আধুনিক মডেলের ৩০০০ তাঁতেই করা সম্ভব।

দ্বিতীয় ধাপ: প্রথম ধাপের সাফল্যের উপর নির্ভর করে ৩৬৯৬ টি সেকিং তাঁতের পরিবর্তে ২০০০টি আধুনিক স্বয়ংক্রিয় তাঁত বসাতে হবে।

তৃতীয় ধাপ: উপরোক্ত দুইটি ধাপের সাফল্যের উপর নির্ভর করে মিল সাইট (ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ) স্পিনিং, ড্রইং, প্রিপারিং ও ব্যাচিং বিভাগের যন্ত্রপাতি আধুনিকায়নের মাধ্যমে তৃতীয় ধাপটি সম্পন্ন হবে।

প্রথম ধাপের হেসিয়ান তাঁতের জন্য উল্লেখিত কোম্পানিগুলির ৩০০০ স্বয়ংক্রিয় আধুনিক তাঁত এর সম্ভাব্য মূল্য ৩ শত কোটি টাকা হতে পারে। যেহেতু আধুনিকায়নের ফলে তাঁতের উৎপাদন অনেক বৃদ্ধি পাবে, তাই সেই বর্ধিত চাহিদা পূরণ করার জন্য প্রয়োজনীয় নতুন প্রি-ভিম এবং ভিম মেশিন প্রতিস্থাপন করতে হবে। ওয়ার্প ওয়েন্ডিং এবং ভিমের সম্ভাব্য ব্যয় ১৫০ কোটি টাকা হতে পারে।

উল্লেখিত পরিবর্তনের ফলে বিজেএমসি এর হেসিয়ান তাঁতের উৎপাদন প্রায় ৮০ হাজার মেট্রিক টন হতে ১ লক্ষ টনে উন্নিত হতে পারে। এই উৎপাদন অব্যাত রাখার জন্য ৬ মাসের পাটের মজুদ গড়ে তুলতে হবে। উক্ত পাট মজুদের জন্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা এবং মেশিনারিজের মেরামত, স্থাপন ও পরিবহন এবং সমগ্র প্রক্রিয়া সমাপ্তি ঘটাতে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতে হবে। মেইনটেনেন্সের ক্ষেত্রে যে যন্ত্রাংশ প্রয়োজন হবে তা বিজেএমসির ঘালফা হাবিব ও সামরিক বাহিনী পরিচালিত মেশিন টুলস কারখানা হতে সংগ্রহ করতে হবে। মেইনটেনেন্সের ক্ষেত্রে মেশিন টুলস কারখানার ইঞ্জিনিয়ারদের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। সংস্কার কর্মকাণ্ড চলমান অবস্থায় শ্রমিকদের সাময়িক কর্মহীন থাকার সময় প্রায় চার মাস শ্রমিকদের ৫০ ভাগ মজুজি দিতে হবে সেই জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতে হবে। সর্ব সাকুল্যে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় বর্তমানে কর্মরত শ্রমিক উদ্বৃত্ত হবে না বরং উৎপাদন অনেকাংশে বৃদ্ধি হওয়ায় কিছু নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।

এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হলে বিশেষত, স্কপের প্রস্তাব অনুসারে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন এর আওতাধীন ২২টি মিল আধুনিকায়ন করা হলে এবং বিজেএমসির প্রস্তাব অনুসারে বিজেএমসির সমুদয় ঋণ এককালীন পরিশোধ করে পাট মৌসুমে কৃষকদের নিকট থেকে ন্যায্যমূল্যে পাটক্রয়ের জন্য ১ হাজার কোটি টাকার ১টি আবর্তক তহবিল গঠন করা হলে বিজেএমসি মৌসুমের শুরুতেই পাটকলগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণ পাট স্বল্প মূল্যে সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে কিনে ফেলতে পারত এবং বিএমআরআই করা মেশিনের মাধ্যমে পূর্ণক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারত। এভাবে পূর্ণক্ষমতায় পাটকলগুলোর যন্ত্রপাতি ও শ্রম শক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হলে প্রতি ইউনিট উৎপাদন খরচ কমে যেত ও লোকসান কমে আসত। কিন্তু আমরা দেখলাম এই বহুল আলোচিত সমস্যাগুলোর সমাধানের কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করেই লোকসান কমানোর কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রায়াত্ত পাটকলগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হলো।

বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন এর আওতাধীন ২২টি মিল আধুনিকায়ন করা হলে এবং বিজেএমসির প্রস্তাব অনুসারে বিজেএমসির সমুদয় ঋণ এককালীন পরিশোধ করে পাট মৌসুমে কৃষকদের নিকট থেকে ন্যায্যমূল্যে পাটক্রয়ের জন্য ১ হাজার কোটি টাকার ১টি আবর্তক তহবিল গঠন করা হলে বিজেএমসি মৌসুমের শুরুতেই পাটকলগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণ পাট স্বল্প মূল্যে সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে কিনে ফেলতে পারত এবং বিএমআরআই করা মেশিনের মাধ্যমে পূর্ণক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারত।

রাষ্ট্রায়াত্ত পাটকলের শ্রমিক বেসরকারিকরণের ফলে কী পাবেন?

পাটকল বন্ধ করে শ্রমিকদের এককালীন পাওনা পরিশোধের সিদ্ধান্তের বিষয়ে ৩ জুলাই এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী জানিয়েছেন, “২০১৪ সাল থেকে অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকদের (৮,৯৫৪ জন) প্রাপ্য সব বকেয়া, বর্তমানে কর্মরত ২৪ হাজার ৮৮৬ জন শ্রমিকের প্রাপ্য বকেয়া মজুরি, শ্রমিকদের পিএফ জমা, গ্র্যাচুইটি এবং সেই সঙ্গে গ্র্যাচুইটির সর্বোচ্চ ২৭ শতাংশ করে অবসায়ন সুবিধা একসঙ্গে শতভাগ পরিশোধ করা হবে। এজন্য সরকারি বাজেট থেকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হবে। অবসায়নের পর মিলগুলো সরকারি নিয়ন্ত্রণে পিপিপি, যৌথ উদ্যোগ, জিটুজি, লিজ মডেলে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। নতুন মডেলে পুনরায় চালু করা মিলে অবসায়নকৃত বর্তমান শ্রমিকরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজের সুযোগ পাবেন। একইসঙ্গে এসব মিলে নতুন কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হবে।”(সূত্র: পাটকল শ্রমিকরা ঠকবেন না, দুই কিস্তিতে পাওনা পরিশোধ: গোলাম দস্তগীর, ৩ জুলাই ২০২০, বাংলা ট্রিবিউন)

খেয়াল করার বিষয় হলো, এখানে কর্মরত স্থায়ী শ্রমিকদের প্রাপ্যের কথা বলা হলেও সমসংখ্যক অস্থায়ী বদলি শ্রমিকের প্রাপ্যের ব্যাপারে কোনো কথা নেই। এখন আমরা যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেই যে স্থায়ী শ্রমিকরা তাদের সমুদয় বকেয়া যথাসময়ে পাবেন এবং বন্ধ হওয়া পাটকলগুলো আসলেই পিপিপি মডেলে পুনরায় চালু হবে এবং সেখানে বর্তমান শ্রমিকদেরই কর্মসংস্থান হবে, সেক্ষেত্রেও প্রশ্ন আসে শ্রমিকদের সেই কর্মসংস্থান কেমন হবে? তাদের মজুরি ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা কি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের মতোই হবে নাকি বেসরকারি খাতের বিদ্যমান পাটকল শ্রমিকদের মতো হবে? বেসরকারিখাতের পাটকলের সাথে তুলনাটা আসছে কারণ এর আগে ২৮ জুন ২০২০ এ বস্ত্র ও পাট মন্ত্রীর সংবাদ ব্রিফিং এ রাষ্ট্রায়াত্ত পাটকল বন্ধ করার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এক পর্যায়ে বলা হয়:  “বেসরকারি খাতে মাসিক মূল মজুরি ২৭০০ টাকার বিপরীতে উৎপাদনশীলতা ও মজুরি কমিশন ২০১৫ বাস্তবায়নের পর বিজেএমসি’র পাটকলগুলোতে তা ৮৩০০ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। ফলে সরকারি মিলে ইউনিটপ্রতি উৎপাদন খরচে মজুরির অংশ ৬০-৬৩ শতাংশ, যা বেসরকারি খাতের প্রায় তিনগুণ।উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক বেশি হওয়ার বিপরীতে বাজারে টিকে থাকার জন্য বিজেএমসিকে হ্রাসকৃত দরে পণ্য বিক্রয় করতে হয়। এতে করে পাট খাতে সার্বিক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত ও বিনষ্ট হয়। এছাড়াও বেসরকারি খাতের মিলগুলোর উৎপাদিত পণ্যের দর নির্ধারণের ক্ষেত্রেও অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। এটি পাট খাতের সামগ্রিক ভারসাম্য ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করছে। (সূত্র: ৩৪ হাজার শ্রমিকের বকেয়া মেটাবে বিজেএমসি, ২৯ জুন ২০২০, বণিক বার্তা; রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল থাকছে না, ২৮ জুন ২০২০, বাংলা ট্রিবিউন)

২ হাজার ৭০০ টাকা মূল মজুরি হলে বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের সর্বমোট মজুরি দাঁড়ায় ৫ হাজার থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে ৮ হাজার ৩ শ টাকা মূল মজুরির স্কেল বাস্তবায়িত হলে সরকারি খাতের পাটকল শ্রমিকদের সর্বমোট মজুরি দাঁড়াতো ১৪/১৫ হাজার টাকা। এখন প্রশ্ন হলো, বেসরকারি খাতের ৫ হাজার টাকার মজুরি কি বর্তমান বাজার দরে বেঁচে থাকার মতো মজুরি? তাহলে কী করে বেসরকারি খাতের এই মানবেতর মজুরির সাথে তুলনা করে রাষ্ট্রীয়খাতের মজুরিকে “তিনগুণ বেশি” মজুরি হিসেবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে! বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত পুষ্টিহার অনুযায়ী খাদ্য গ্রহণ ও জীবনধারণের জন্য শ্রমিকের আরো অনেক বেশি মজুরির প্রয়োজন। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) হিসেবে, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য মূলত তিনটি মডেলকে বিবেচনায় নেওয়া হয়। এর প্রথম মডেলটি হচ্ছে, দারিদ্র্যসীমার ওপরে অবস্থানকারী একজন শ্রমিকের মাসিক খরচের হিসাব বিবেচনায় নিয়ে ন্যূনতম মজুরি ঠিক করা। দ্বিতীয় মডেলটি হলো, কাঙ্ক্ষিত পুষ্টি অর্জনের জন্য একজন মানুষের যে সুষম খাবার, তা বিবেচনায় নিয়ে ন্যূনতম মজুরি ঠিক করা। তৃতীয় মডেলটি হলো, শ্রমিকদের বর্তমান জীবনধারণের খরচের হিসাব বিবেচনা করে তার ওপর ভিত্তি করে ন্যূনতম মজুরি ঠিক করা। ২০১৮ সালে সিপিডির করা হিসেব অনুসারে, দারিদ্র্যসীমার ওপরের স্তরে অবস্থানকারী প্রায় পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারে ‘জাতীয় খানা আয়-ব্যয় জরিপ’ অনুযায়ী খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবা কেনার ব্যয় মাসে ৯ হাজার ২৮০ টাকা। পরিবারের প্রধান উপার্জনকারীকে এক্ষেত্রে আয় করতে হবে ৬ হাজার ৪৪৫ টাকা। সিপিডির হিসেবে পরবর্তী দু’টি মডেলে এই পরিমাণ আরও বাড়ে। কাঙ্ক্ষিত পুষ্টিহার অনুযায়ী খাবার গ্রহণ ও জীবনধারণের জন্য একজন শ্রমিকের প্রতিমাসে ন্যূনতম মজুরি প্রয়োজন ১৭ হাজার ৮৩৭ টাকা। (সূত্র: গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন কত হবে?, জানুয়ারি ১৬, ২০১৮, বাংলা ট্রিবিউন)

তাহলে কি করে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকদের মজুরিকে “বাড়তি মজুরি” হিসেব আখ্যায়িত করে রাষ্ট্রায়াত্ত পাটকল বন্ধের যুক্তি তৈরি করা যেতে পারে! সরকারের তো বরং উচিত ছিল বেসরকারি পাটকলের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে বাঁচার মতো মজুরি নির্ধারণ করে দেয়া!

শ্রমিক অধিকারের জায়গা থেকে দেখলে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বনাম বেসরকারি পাটকলের তুলনার ক্ষেত্রে মজুরি ছাড়াও আরো অনেক অধিকার ও সুবিধার বিষয় যুক্ত যার মধ্যে রয়েছে পেনশন, গ্র্যাচুইটি, শ্রমিক ও শ্রমিক পরিবারের চিকিৎসা, শিক্ষা ও বিনোদনের সুযোগের প্রশ্ন। বেসরকারি পাটকলে কি শ্রমিক কর্মচারীদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা দেয়া হয়? শ্রমিকের সন্তানদের টিকাদান, কৃমি নাশক ঔষধ সেবন, রক্তের শর্করা ও রক্ত চাপ পরীক্ষা, রক্তের লিপিড প্রোফাইল, ইসিজি ও হেপাটাইটিস-বি পরীক্ষা করা হয়? বেসরকারি পাটকলে কি শ্রমিক কর্মচারী কর্মকর্তা ও তাদের সন্তানদের জন্য বিদ্যালয়, এ্যাথলেটিকস, সাইক্লিং, ভলিবল, হ্যান্ডবল, কাবাডি, ভারোত্তোলন, তাইকোয়ান্ডো, উশু, জিমন্যাস্টিক, ফুটবল টিম থাকতে পারে? হ্যাঁ, বিজেএমসির অধীনে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোতে শ্রমিক কর্মচারী ও তার সন্তানদের জন্য এই সুযোগ সুবিধাগুলো ছিল, যা শুধু পাটকল কেন, কোনো বেসরকারি কারখানাতেই কল্পনা করা যায় না!

শ্রমিক অধিকারের জায়গা থেকে দেখলে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বনাম বেসরকারি পাটকলের তুলনার ক্ষেত্রে মজুরি ছাড়াও আরো অনেক অধিকার ও সুবিধার বিষয় যুক্ত যার মধ্যে রয়েছে পেনশন, গ্র্যাচুইটি, শ্রমিক ও শ্রমিক পরিবারের চিকিৎসা, শিক্ষা ও বিনোদনের সুযোগের প্রশ্ন। বেসরকারি পাটকলে কি শ্রমিক কর্মচারীদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা দেয়া হয়? শ্রমিকের সন্তানদের টিকাদান, কৃমি নাশক ঔষধ সেবন, রক্তের শর্করা ও রক্ত চাপ পরীক্ষা, রক্তের লিপিড প্রোফাইল, ইসিজি ও হেপাটাইটিস-বি পরীক্ষা করা হয়? বেসরকারি পাটকলে কি শ্রমিক কর্মচারী কর্মকর্তা ও তাদের সন্তানদের জন্য বিদ্যালয়, এ্যাথলেটিকস, সাইক্লিং, ভলিবল, হ্যান্ডবল, কাবাডি, ভারোত্তোলন, তাইকোয়ান্ডো, উশু, জিমন্যাস্টিক, ফুটবল টিম থাকতে পারে? হ্যাঁ, বিজেএমসির অধীনে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোতে শ্রমিক কর্মচারী ও তার সন্তানদের জন্য এই সুযোগ সুবিধাগুলো ছিল, যা শুধু পাটকল কেন, কোনো বেসরকারি কারখানাতেই কল্পনা করা যায় না!

বিজেএমসির ২০১৮-১৯ সালের বার্ষিক(খসড়া) প্রতিবেদন অনুসারে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তারা নিম্নোক্ত সুযোগ সুবিধাগুলো পেয়েছেন:

চিকিৎসা

  • বিজেএমসি প্রধান কার্যালয়, আঞ্চলিক কার্যালয় ও মিল সমূহে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা দেয়া হয়ে থাকে। ২০১৮-১৯ সালে মোট ৯৯,১৬৬ শ্রমিক, কর্মচারী, কর্মকর্তাদেরকে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা দেয়া হয়।
  • মিলসমূহের শ্রমিক, কর্মচারী, কর্মকর্তাদের সন্তানদের সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী টিকাদান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করানো হয়ে থাকে।
  • প্রধান কার্যালয় ও মিলসমূহে প্রায় ১১,৫০০ জনকে কৃমিনাশক ঔষধ সেবন করানো হয়।
  • প্রধান কার্যালয় ও মিলসমূহে শ্রমিক, কর্মচারী, কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রায় ৪,০০০ জনের রক্তের শর্করা পরীক্ষা ও প্রায় ১৮,৫০০ জনের রক্তচাপ পরীক্ষা করা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসার পরামর্শ দেয়া হয়।
  • প্রধান কার্যালয় ও মিলসমূহের প্রায় ১,০০০ জন কর্মচারী, কর্মকর্তাদের হৃদরোগ, স্ট্রোক ও উচ্চ রক্তচাপ ঝুঁকি নির্ণয়ের জন্য এসি আর ফরম পূরণের সময় রক্তে চর্বি (Lipid profile) ও ইসিজি করানো হয় এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হয়।
  • মিলসমূহের প্রায় ১,৫০০ জন শ্রমিক, কর্মচারী, কর্মকর্তাদের রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করা হয় ও ০৮ জনের হেপাটাইটিস বি ভাইরাস শনাক্ত করা হয়।

সামাজিক দায়বদ্ধতা

সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসাবে বিজেএমসি বিভিন্ন শিক্ষামূলক, সেবামূলক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে থাকে। যার মধ্যে রয়েছে ১৩টি বিদ্যালয়, ৩টি মাদ্রাসা, ২৫টি ক্যান্টিন, ক্লিনিক, ২০টি প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র এবং এ্যাথলেটিকস, সাইক্লিং, ভলিবল (মহিলা), হ্যান্ডবল (মহিলা), কাবাডি (মহিলা), ভারোত্তোলন (মহিলা), তাইকোয়ান্ডো, উশু, জিমন্যাস্টিক, ফুটবল (মহিলা), ফুটবল (পুরুষ) ও মাস্টার্স এ্যাথলেটিকস টিম রয়েছে।

বিদ্যালয় বাতায়ন

বিজেএমসি’র প্রায় ১১১৯ জন কর্মকর্তা ২১৭৫ জন কর্মচারী ও ২৮০০০ শ্রমিক-কর্মচারীর সন্তানদের স্বল্প খরচে শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে মোট ১৩ টি বিদ্যালয় চালু রয়েছে। তন্মধ্যে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ০৯টি, নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় ০৩টি এবং প্রাথমিক বিদ্যালয় ০১টি। শিক্ষার মান বেশ ভালো হওয়ায় কর্মচারী-শ্রমিকের সন্তান ছাড়াও এই বিদ্যালয়গুলোতে বাইরের অনেক শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করে থাকে। এখানে সর্বমোট ১৩৫ জন শিক্ষক নিয়োজিত রয়েছেন।

বিগত ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন পরীক্ষায় যেমন- পিইসি-তে ৫৩৮ জন, জেএসসি-তে ৮৩৭ জন এবং এসএসসি-তে ১০১৬ জন পরীক্ষার্থী অংশ গ্রহণ করে ২২২৫ পাশ করেছে। যার মধ্যে পিইসি-তে ৩৫ জন, জেএসসি-তে ০৮ জন এবং এসএসসিতে ৩৭ জন পরীক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। স্কুলগুলোর শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতাদি নিয়ন্ত্রণাধীন মিলসমূহের ফান্ড হতে জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী প্রদান করা হয়ে থাকে। (সূত্র: বিজেএমসি’র বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৮-১৯)

নিও লিবারেল পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এই মডেলের বৃহৎ শিল্পকে হয়তো বলা হবে অদক্ষ। নিও লিবারেল নমনীয় শ্রমবাজারের চাহিদা অনুসারে শ্রমিক হতে হবে অস্থায়ী, মজুরি হবে যথাসম্ভব কম। এই মডেলে শ্রমিককে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা ও সেই অনুযায়ী তার ও তার পরিবারের চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা বিনোদনের দায়িত্ব নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। এই মডেল অনুসারেই বিদ্যমান বেসরকারি পাটকলগুলো চলছে যেখানে শ্রমিকদের চাকুরি স্থায়ী নয়, মজুরি স্কেল মাত্র ২৭০০ টাকা যেখানে পেনশন গ্র্যাচুইটি থেকে শুরু করে চিকিৎসা শিক্ষা বিনোদনের সুযোগ সুবিধা থাকার প্রশ্নই উঠেনা! একই বাজারে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের মডেল আর বেসরকারি পাটকলের নিওলিবারেল মডেল একসাথে থাকলে বেসরকারি পাটকল মালিকগোষ্ঠীর জন্য হয়তো মুশকিল, সেই মুশকিলের অবসান ঘটানোও হয়তো রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর মৃত্যুঘণ্টা বাজানোর আরেকটা কারণ!

ছবি: বিজেএমসি’র বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৭-১৮

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ অবস্থায় পাট চাষিদের কী হবে?

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান বিজেএমসি’র বার্ষিক প্রতিবেদনে বিজেএমসি’র যেসব কৌশলগত সাধারণ উদ্দেশ্যের কথা লেখা আছে তার প্রথমেই আছে “ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি কাঁচাপাট ক্রয়” এর কথা। পাটকল শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ছাড়াও রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো সরকার নির্ধারিত দরে পাটচাষিদের উৎপাদিত পাটের একটা অংশ ক্রয় করা যেন কৃষকরা উৎপাদিত পাটের ন্যায্যমূল্য পায়।

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যান অনুসারে ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ সালে দেশে মোট পাট উৎপাদিত হয় যথাক্রমে ১৩.৭৪ এবং ১৬.৬৭ লক্ষ টন। বিজেএমসি’র ২০১৭-১৮ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে কৃষকের কাছ থেকে বিজেএমসির পাট ক্রয়ের পরিমাণ ২০১৫-১৬ সালে ছিল ১১.৪৬ লক্ষ কুইন্টাল বা ১.১৪ লক্ষ টন (১০ কুইন্টাল=১ টন) যা ২০১৫-১৬ এর মোট উৎপাদনের ৮.২ শতাংশ এবং ২০১৬-১৭ সালে পাট ক্রয়ের পরিমাণ ছিল ১৭.০৯ লক্ষ কুইন্টাল বা ১.৭ লক্ষ টন যা ২০১৬-১৭ এর মোট উৎপাদনের ১০ শতাংশ। যদিও এই পাট ক্রয়ের পরিমাণ বিজেএমসি’র লক্ষমাত্রা ও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম এবং অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে পাট ক্রয় করায় কৃষকরা তার আগেই মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের কাছে পাট বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছে, তবুও দেশে ধান-পাট ইত্যাদির বাজার পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, নির্ধারিত দামে বিজেএমসি’র পাটক্রয়ের এই চাহিদাটুকু না থাকলে বর্তমানে কৃষকরা কাঁচা পাটের যতটুকু মূল্য পান, বেসরকারি পাটকল ও কাঁচাপাট রপ্তানিকারকদের সিন্ডিকেটের পাল্লায় পড়ে ততটুকুও পাবেন কিনা সন্দেহ রয়েছে।

বেসরকারিকরণের ফলে কি পাটশিল্পের সম্প্রসারণ হবে নাকি সংকোচন ঘটবে?

বলা হচ্ছে রাষ্টায়াত্ত পাটশিল্প বেসরকারিকরণের মধ্যে দিয়ে পাটশিল্পের আরো সম্প্রসারণ হবে, ফলে শ্রমিকের কর্মসংস্থান বাড়বে! বাস্তবে কী ঘটবে তার একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে পূর্বের বেসরকারিকরণগুলোর ফলাফল কী হয়েছিল তার একটা খতিয়ান নিলে।

১৯৯৩ সাল থেকে ২০১০ পর্যন্ত মোট ৭৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিরাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। বাংলাদেশ প্রাইভেটাইজেশন কমিশন ২০১০ সালে বেসরকারিকৃত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে একটি সমীক্ষা করে। “বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সমীক্ষা ২০১০” নামের এই প্রতিবেদন থেকে দেখা যায় ৭৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩১টি শিল্প প্রতিষ্ঠানকেই বন্ধ পাওয়া গেছে। পানির দরে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান বেসরকারি করে দেয়ার ফলে কেমন করে বিশিল্পায়ন হয় তার একটা ধারণা আমরা পেতে পারি বন্ধ থাকা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে সমীক্ষায় পাওয়া তথ্য ও মন্তব্য থেকে:

২০০৪ সালে বেসরকারিকরণ করা বাওয়া জুট মিলস সম্পর্কে ২০১০ সালের সমীক্ষা প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে: “মিলটির মূল ক্রেতা যন্ত্রপাতি গাছপালাসহ জমি বিক্রি করে দিয়েছে।… বর্তমান মালিক বসুন্ধরা গ্রুপ প্রতিষ্ঠানের ভূমি রিয়েল এস্টেটে রূপান্তরিত করেছেন।” ২০০৪ সালে বিক্রি হওয়া নোয়াখালি টেক্সটাইল মিলসে বেসরকারিকরণের পূর্বে ৭৫০ জন শ্রমিক কাজ করতেন, বিক্রির পর বস্ত্র সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে চালু করা যায় নি, ক্রেতা বিকল্প পণ্য উৎপাদনের চেষ্টা করছেন, কর্মসংস্থান ২৫ জনের। কিশোরগঞ্জ টেক্সটাইল মিলস পারিবারিক বিরোধের জের ধরে বন্ধ হয়ে আছে, ঢাকা ভেজিটেবল ওয়েলস বিক্রি করা হয় ১৩.৭৫ কোটি টাকায় যার এক টাকাও ক্রেতা পরিশোধ করেনি, ৫৫৯ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থানের যোগানদাতা এই প্রতিষ্ঠানটি তা ১৯৯৪ সাল থেকেই বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। ১৯৯৯ সালে মাত্র ১১ লক্ষ টাকায় ৪.১৬ একর জমিসহ বিক্রয় হওয়া বিজিবাংলা রাইস মিলস সম্পর্কে সমীক্ষা প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে: “শিল্প প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির কোনো অস্তিত্ব নেই। কারখানা প্রাঙ্গণের ভূমি আবাসিক প্লট আকারে বিক্রয় করা হয়েছে।” ৬.১৭ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত কর্নফ্লাওয়ার মিলস এর যন্ত্রপাতি খোয়া গেছে।

১৬.১১ লক্ষ টাকায় বিক্রি হওয়া বাংলাদেশ অয়েল মিলস সম্পর্কে সমীক্ষাতে লেখা হয়েছে: “প্রতিষ্ঠানটি চালু করা হয়নি; এটির যন্ত্রপাতি বিক্রি করে সংকুচিত করা হয়েছে।“৩২.২৪৫ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত হাফিজ টেক্সটাইল মিলস লি:, কুমিরা চট্ট্রগ্রাম এর নাম পরিবর্তন করে করা হয়েছে কেডিএস লজিস্টিকস লি: যা চট্টগ্রাম বন্দরের আমদানি রপ্তানি সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে চালু আছে। ঔষধ সামগ্রী নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান স্কুইব বাংলাদেশ লি: সম্পর্কে লেখা হয়েছে: “ক্রেতার নিকট হতে কয়েক দফা শেয়ার হস্তান্তরিত হয়েছে…। প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব না থাকায় কর্মসংস্থান ও সম্প্রসারণ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় নি।“মৎস প্রক্রিয়াকরণকারী প্রতিষ্ঠান ফিশ এক্সপোর্ট লি: সম্পর্কে লেখা হয়েছে: “প্রতিষ্ঠানটি চালু করা হয়নি; এটির যন্ত্রপাতি, ঘরের দরজা জানালা আসবাবপত্র ইত্যাদি লুট হয়ে গেছে…”।

২০০৪ সালে বেসরকারিকরণ করা বাওয়া জুট মিলস সম্পর্কে ২০১০ সালের সমীক্ষা প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে: “মিলটির মূল ক্রেতা যন্ত্রপাতি গাছপালাসহ জমি বিক্রি করে দিয়েছে।… বর্তমান মালিক বসুন্ধরা গ্রুপ প্রতিষ্ঠানের ভূমি রিয়েল এস্টেটে রূপান্তরিত করেছেন।” ২০০৪ সালে বিক্রি হওয়া নোয়াখালি টেক্সটাইল মিলসে বেসরকারিকরণের পূর্বে ৭৫০ জন শ্রমিক কাজ করতেন, বিক্রির পর বস্ত্র সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে চালু করা যায় নি, ক্রেতা বিকল্প পণ্য উৎপাদনের চেষ্টা করছেন, কর্মসংস্থান ২৫ জনের। কিশোরগঞ্জ টেক্সটাইল মিলস পারিবারিক বিরোধের জের ধরে বন্ধ হয়ে আছে, ঢাকা ভেজিটেবল ওয়েলস বিক্রি করা হয় ১৩.৭৫ কোটি টাকায় যার এক টাকাও ক্রেতা পরিশোধ করেনি, ৫৫৯ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থানের যোগানদাতা এই প্রতিষ্ঠানটি তা ১৯৯৪ সাল থেকেই বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। ১৯৯৯ সালে মাত্র ১১ লক্ষ টাকায় ৪.১৬ একর জমিসহ বিক্রয় হওয়া বিজিবাংলা রাইস মিলস সম্পর্কে সমীক্ষা প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে: “শিল্প প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির কোনো অস্তিত্ব নেই। কারখানা প্রাঙ্গণের ভূমি আবাসিক প্লট আকারে বিক্রয় করা হয়েছে।” ৬.১৭ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত কর্নফ্লাওয়ার মিলস এর যন্ত্রপাতি খোয়া গেছে।

এতো গেল বিভিন্ন ধরণের বেসরকারিকৃত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিস্থিতি সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রাইভেটাইজেশান কমিশনের পর্যবেক্ষণ। এবার দেখা যাক বাংলাদেশের পাটশিল্প বেসরকারিকরণের প্রধানতম কুশীলব বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে কী আছে। লোকসান কমানো ও পাটশিল্পের বিকাশের নামে বিশ্বব্যাংকের জুট ইন্ডাস্ট্রি রিহ্যাবিলিটিয়েশান ক্রেডিট প্রোগ্রাম চলাকালে ১৯৮২ সালের নতুন শিল্পনীতির আওতায় ৩৫টি বেসরকারিকরণের পর রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল দাঁড়ায় ৩৩টি। এরপর ১৯৯৪ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশে জুট সেক্টর এডজাষ্টমেন্ট ক্রেডিট (জেএসএসি) প্রোগ্রাম যখন হাতে নেয়া হয় তখন বিজেএমসির হাতে ২৯ পাট কলের সম্পূর্ণ মালিকানাসহ বেসরকারি খাতের ৪৫টি মিলে ৪৩% অংশীদ্বারিত্ব ছিল। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুসারে এই ঋণ প্রকল্পের ঘোষিত প্রধাণ উদ্দেশ্যগুলো ছিল:

১) রাষ্ট্রায়ত্ত ২৯টি পাটকলের মধ্যে ৯টি’কে পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া এবং ১টি বৃহৎ পাটকলের ‘বাড়তি’ উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস বা ডাউন সাইজিং;

২) রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো থেকে ২০ হাজার শ্রমিক ছাটাই;

৩) বাকি ২০টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের মধ্যে থেকে কমপক্ষে ১৯টি পাটকল বেসরকারিকরণ;

এই কর্মসূচি নেয়ার সময় বিশ্বব্যাংকের ডকুমেন্টেই স্বীকার করা হয়েছে পাট খাতের উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ নির্ভরশীল। তারপরও রাষ্ট্রীয় কারখানা বন্ধ করা, ডাউন সাইজ করা ও শ্রমিক ছাটাই করার পেছনে যুক্তি দেয়া হয়েছিল: লস কমিয়ে শহুরে ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানের একটি লাভজনক খাত হিসেবে পাটশিল্পকে প্রতিষ্ঠা করা। বলাই বাহুল্য, বিশ্বব্যাংকের অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের মতোই এই প্রকল্পও শেষ পর্যন্ত পাটশিল্পের বিশিল্পায়নই কেবল ঘটিয়েছে যার মাধ্যমে পাট উৎপাদনকারী চাষি থেকে শুরু করে পাট শিল্পের শ্রমিক এমনকি বেসরকারি খাতও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের এই প্রকল্পের মাধ্যমে ৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করার লক্ষ্য থাকলেও শেষ পর্যন্ত বন্ধ করা সম্ভব হয়েছিল ৪টি এবং উৎপাদন ক্ষমতা কমানো হয়েছিলো ১টি মিলের। ১৯টি মিল বেসরকারিকরণের কথা থাকলেও বেসরকারিখাতের ব্যবসায়ীদের যথাযথ সাড়া না পাওয়ায় সেসময় একটিও বেসরকারিকরণ করা সম্ভব হয়নি। বিশ্বব্যাংক তার মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এই জুট সেক্টর এডজাষ্টমেন্ট ক্রেডিট (জেএসএসি) প্রোগ্রামের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার ২০ হাজার শ্রমিক ছাটাই এবং রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের মজুরির সাথে বেসরকারি খাতের মজুরির পৃথকীকরণ(ডি-লিংকড) ঘটিয়ে বেসরকারি খাতের মজুরি রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের চেয়ে ৪০ শতাংশ কমানোর ‘সাফল্যে’ সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও স্বীকার করছে::

১) সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে চালু থাকা ৬০টি পাটকলের বেশিরভাগেরই আর্থিক ভাবে টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে

২) ১৯৯৬ সালে বেসরকারি পাটকল মালিকেরা অভিযোগ করেছে এই প্রোগ্রামের কারণে বেসরকারিখাতের উন্নতির বদলে অবনতি ঘটেছে

৩) টেন্ডার এবং বিডিং এর ফলাফল থেকে দেখা যায় খুব কম বেসরকারি উদ্যোক্তারই পাটকলগুলো কিনে নিয়ে নতুন করে চালানোর ব্যাপারে আগ্রহ আছে। বেশিরভাগেরই আগ্রহ হলো পাটকলগুলোর জমি ও অন্যান্য সম্পদের দিকে যা তারা অন্যকাজে ব্যবহার করবে।

৪) এই প্রোগ্রাম নেয়ার সময় পাট উৎপাদনকারী চাষিদের উপর কী প্রভাব পড়বে তা একেবারেই বিবেচনা করা হয়নি।

মূল্যায়ন প্রতিবেদনের এক পর্যায়ে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের পাট মন্ত্রণালয়ের মনোভাব সম্পর্কে বলতে গিয়ে লিখেছে: Confronted with the options of a rapid privatization of public mills or close them down, it felt that the Program really implied to do away with jute and the jute industry.

অর্থাৎ “হয় সরকারি পাটকলগুলোকে দ্রুত বেসরকারি করণ কর অথবা বন্ধ কর – এরকম একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে এই প্রোগ্রামটিকে বাস্তবে পাট এবং পাটশিল্প ধ্বংসের প্রোগ্রাম হিসেবেই অনুভূত হয়েছে।“ (সূত্র: Implentation completion report, Bangladesh Jute Sector Adjustement Credit, Article 28, The World Bank, March 10, 1998)

বস্তুত, অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে বেসরকারিকরণের ফলে পাটশিল্প সংকোচন বিষয়ে আমাদের এ আশংকা যে অমূলক নয় তা পাটখাতের ব্যবসায়ি ও রপ্তানিকারকদের সংশয় থেকেও পরিষ্কার। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এর “পাটকল: পিপিপি পরিকল্পনায় উদ্যোক্তাদের সংশয়” শীর্ষক প্রতিবেদন অনুসারে, সেকেলে যন্ত্রপাতি আর ‘দুর্নীতি-অপচয়ের’ দায়ে ডুবে যাওয়া সরকারি পাটকলগুলো পিপিপির ভিত্তিতে চালু করতে বেসরকারি খাত সহসা এগিয়ে আসবে না বলে মনে করছেন তাদের কেউ কেউ। আবার কেউ বলেছেন, পিপিপি যদি সফলও হয়, সেজন্য দীর্ঘ সময় লেগে যাবে, তাতে বাজার চলে যাবে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোর হাতে। এর বদলে মিল বন্ধ না রেখেও আধুনিকায়নের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব ছিল।

বাংলাদেশ জুট গুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান লুৎফুর রহমান বলেন, “এখন হয়ত সরকার এটা টেকনিক্যালি বলছে যে ছয় মাসের মধ্যে তারা এটা চালু করবে। ছয় মাসের মধ্যে এটা কে নেবে? যে ভাঙাচোরা মিল, মিলের যে অবস্থা… ৫০-৬০ বছর আগের মেশিনারিজ, প্রাইভেট সেক্টরের কেউ এই মুহূর্তে এগিয়ে আসবে না।..

“আসতে হলেও তাদের প্রচুর সময় দিয়ে, প্রচুর ইনভেস্টমেন্ট করে… সরকারের ইনভেস্টমেন্ট, ব্যাংকের ইনভেস্টমেন্ট, ব্যাংকের কী দায়দেনা, লোন কী পর্যায়ে আছে…এগুলো করতেই ৬ মাস-এক বছর চলে যাবে। তারপর সরকার টেন্ডার দেবে, তারপর হয়ত করতে পারবে।”

“আসতে হলেও তাদের প্রচুর সময় দিয়ে, প্রচুর ইনভেস্টমেন্ট করে… সরকারের ইনভেস্টমেন্ট, ব্যাংকের ইনভেস্টমেন্ট, ব্যাংকের কী দায়দেনা, লোন কী পর্যায়ে আছে…এগুলো করতেই ৬ মাস-এক বছর চলে যাবে। তারপর সরকার টেন্ডার দেবে, তারপর হয়ত করতে পারবে।”

বেসরকারি পাটকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএমএ) মহাসচিব আব্দুল বারিক খান মনে করেন, পিপিপির রাস্তায় না গিয়ে এসব পাটকল চালু রেখেই আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করা ভালো হত।

“মিলগুলো তো চালু আছে। হয়ত মেশিনারিজ চেইঞ্জ করতে হবে। এখন যেভাবে রয়েছে সেভাবেই চালু করেন। আধুনিকায়ন করতে হয়ত ৬ মাস লাগবে।”

সরকারের আহ্বানে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা পিপিপির মাধ্যমে এসব জুট মিল পরিচালনায় শরিক হলেও পুরনো দায় নিতে রাজি হবে না বলেই বারিক খানের ধারণা। তিনি বলেন, “সরকার দাম ধরুক… সরকার ৪৯ পারসেন্ট, বেসরকারি ৫১ পারসেন্ট…। সেটা আমাদের লায়াবিলিটি ফ্রি করে দিতে হবে। পুরনো ক্ষয়ক্ষতির দায়, ব্যাংকের দেনা, শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, সাপ্লায়ারদের দেনা, মেশিন যারা দেয়, তাদের টাকা- সেসব দায় সরকারকে নিতে হবে।”

“সরকার কোনো মিলের দাম হয়ত ধরল ৫০০ কোটি টাকা, না হয় বলল ডাউন পেমেন্ট দাও…, কিন্তু পুরনো দায় আমরা নেব না। মিলগুলো যখন বন্ধ হয়ে যায় তখন তা হয়ে যায় খাদে পড়ে যাওয়া হাতির মত।”

তবে বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) মহাসচিব শহীদুল করিম বলছেন একেবারে অন্য কথা। তার দাবি, পাটপণ্যের বাজার চাহিদা দ্রুত কমে আসায় পাটকলের জায়গায় বরং নতুন শিল্প স্থাপন করা যেতে পারে।(পাটকল: পিপিপি পরিকল্পনায় উদ্যোক্তাদের সংশয়, ৫ জুলাই ২০২০,বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এর)

উপসংহার

সরকার কোনো কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে না পারলেই যদি তার সমাধান হয় বেসরকারিকরণ, তাহলে সেই যুক্তিতে গোটা দেশটাই বেসরকারিকরণ করে দিতে হবে! কারণ সরকার তো স্বাস্থ্য, শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে দেশের কোনো কিছুই ঠিকঠাক চালাতে পারছেনা! একটা কথা খুব জনপ্রিয় করা হয়েছে- “সরকার কেন ব্যবসা করবে”! সরকারের কাজ নাকি শুধু ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টি করা! যারা এইকথাগুলো বলেন তাদের কাছে প্রশ্ন, এই যে সরকারের দায়িত্ব পাবলিক হাসপাতাল, পাবলিক স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা, রেলওয়ে পরিচালনা, ডাক বিভাগ পরিচালনা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদন- এইগুলো কি ব্যবসা করা? নাকি এগুলো কতগুলো কৌশলগত খাতের নিয়ন্ত্রণ হাতে রেখে জনগণকে সেবা প্রদান ও জনগণের সর্বোচ্চ কল্যাণ সাধন? এমনকি বাজার অর্থনীতির দেশে এরকম বহু খাত থাকে যেগুলো কৌশলগত কারণে সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়, সরকারকে ড্রাইভিং ফোর্স হিসেবে কাজ করতে হয়- নইলে তা দেশি বিদেশি ব্যবসায়িগোষ্ঠীর লুটপাটের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায়। কিছু সেক্টর আছে সব দেশের জন্যই রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের আওতায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ যেমন স্বাস্থ্য, শিক্ষা ইত্যাদি আবার কিছু খাত আছে যেগুলো একেক দেশের জন্য একেক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। পাটখাত নানা কারণেই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, পাটশিল্পের উপর একদিকে বিপুল সংখ্যক কৃষিজীবী ও অন্যদিকে বহু দক্ষ শ্রমিক জীবিকার জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। এটা এমন একটা শিল্প যে বিষয়ে প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক নানা কারণেই বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলক সুবিধাজনক- বিশ্বের যে অল্প কয়েকটা দেশে উন্নতমানের পাট উৎপাদন হয় বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম, পাট খাতের দক্ষ শ্রমিক বাংলাদেশে রয়েছে, পরিবেশ বান্ধব পণ্য হিসেবে বিশ্ব বাজারে পাট ও পাট জাত দ্রব্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এই বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন কেবল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, যথাযথ ব্যবস্থাপনা, দুনীতি রোধ করা ও বৈচিত্রময় পাটজাত পণ্য উৎপাদন ও দেশে বিদেশে বাজারজাত করণ- এইকাজগুলো একটা দেশের পাবলিক সেক্টর করতে না পারার কোনো অন্তর্গত কারণ নেই। পাবলিক সেক্টরের মাধ্যমে এই কাজগুলো করা হলে তা রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি উভয় ধরণের পাটশিল্পের বিকাশের কাজে লাগবে। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল থাকা মানে এই নয় যে বেসরকারি পাটকলের বিকাশ রুদ্ধ করা, বেসরকারি পাটকলগুলোকে তো কেউ বাধা দিচ্ছে না উৎপাদন বাড়াতে বা বাজার বিস্তৃত করতে। তাহলে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর জমি ও যন্ত্রপাতি কেন বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাতে তুলে দিতে হবে? বেসরকারি উদ্যোক্তারা তো চাইলেই পাটকল স্থাপন করতে পারেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতিযোগিতামূলক ভাবে আরো বৈচিত্রময় ও গুণগত মানের পণ্য উৎপাদন করতে পারেন!

পাবলিক সেক্টরের মাধ্যমে এই কাজগুলো করা হলে তা রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি উভয় ধরণের পাটশিল্পের বিকাশের কাজে লাগবে। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল থাকা মানে এই নয় যে বেসরকারি পাটকলের বিকাশ রুদ্ধ করা, বেসরকারি পাটকলগুলোকে তো কেউ বাধা দিচ্ছে না উৎপাদন বাড়াতে বা বাজার বিস্তৃত করতে। তাহলে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর জমি ও যন্ত্রপাতি কেন বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাতে তুলে দিতে হবে? বেসরকারি উদ্যোক্তারা তো চাইলেই পাটকল স্থাপন করতে পারেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতিযোগিতামূলক ভাবে আরো বৈচিত্রময় ও গুণগত মানের পণ্য উৎপাদন করতে পারেন!

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বেসরকারিকরণ করা হলে বরং বেসরকারি খাতসহ সার্বিকভাবে পাটখাতের বিকাশের পথে বাধা তৈরি হবে- অন্তত এর আগের বেসরকারিকরণের অভিজ্ঞতাগুলো তাই বলে। টেন্ডার ও বিডিং প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির মাধ্যমে পাটকলগুলো কিনে নিয়ে তার জমি ও যন্ত্রপাতি লুণ্ঠনের ঘটনা ঘটেছে, শ্রমিক ছাটাই হয়েছে, বহু দক্ষ স্থায়ী শ্রমিক চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকের অনিশ্চিত জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে, পাটের চাহিদা কমায় পাটচাষিও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। অবশিষ্ট রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বেসরকারিকরণের মাধ্যমে যে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

কল্লোল মোস্তফা: প্রকৌশলী লেখক।

ইমেইল: kallol_mustafa@yahoo.com

Social Share
  •  
  •  
  • 51
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *