গণঅভ্যুত্থানের ফুলবাড়ী এবং গণশত্রুদের নড়াচড়া
ফুলবাড়ী কয়লা খনি নিয়ে আবারও শয়তানচক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আসলে তারা জনরোষে পরাজিত হলেও কখনই চক্রান্ত থামায় নাই। যে কয়লা প্রকল্প শুধু লক্ষ লক্ষ মানুষকে উদ্বাস্তু করবে না, পুরো উত্তরবঙ্গের আবাদ, ভূগর্ভস্থ পানির আধার বিনষ্ট করবে, নদীদূষণ করে সারাদেশকে বিপর্যস্ত করবে, প্রাণবৈচিত্রের ভয়াবহ বিপর্যয়ে পুরো দেশ বিষাক্ত হবে সেই প্রকল্পকে আবার উন্নয়নের নামে বাস্তবায়নের চক্রান্ত শুরু হয়েছে। জনগণের সাথে সরকারের স্বাক্ষরিত ফুলবাড়ী চুক্তির অঙ্গীকারের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে উদ্যত হয়েছে বর্তমান বিএনপি সরকার। জনপ্রতিরোধও নতুন মাত্রা নিতে যাচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে এখানে দুটো লেখা প্রকাশ করা হলো। প্রথম লেখাটি ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লেখা। এই লেখা থেকে সেসময়কার পরিস্থিতি বুঝতে সুবিধা হবে। দ্বিতীয় লেখা লিখেছেন ডক্টর তানজীমউদ্দিন খান। সরকারের সাম্প্রতিক তৎপরতার পরিপ্রেক্ষিতে এই লেখা।
ফুলবাড়ীর মানুষের ইজ্জত আর যখের ধন
আনু মুহাম্মদ
বাবলু এখনও শুয়ে আছে পিজি হাসপাতালে। ওর ওঠে বসার শক্তি নেই। মেরুদন্ডে আর পেটে গুলি লেগেছিল। কোমর থেকে নীচে বাকি শরীর পুরোটাই অবশ। ওর শরীরে পাটাই ছিল ওর উপার্জনের উৎস, ও ভ্যান চালাতো। শরীরে অর্ধেক যখন অবশ তখনও ওর মনে কোন অবসাদ আসেনি। অনেক যোগাযোগ করে বাবলু যখন মোবাইলে ওর দুই শিশুপুত্র, বউ আর মার সাথে কথা বলছিল তখনও ওর গলা ভেঙে আসেনি, সান্তনা দিতে দিতে বলে ‘দেখিস আর কখনও এশিয়া এনার্জি আসতে পারবে না। দেখিস, এক মুখে বলছি।’ ওর সাথে থাকা মামা ফোনে বাবলুর বউ আর নানীর সাথে কথা বলতে গিয়ে কেঁদে আকুল হচ্ছিলেন, ‘মা মা রে ভালো হয়ে যাচ্ছে মা, ভাগ্নে আমার দেশের স্বাধীনতার জন্যি লড়াই করিছে মা।’
প্রদীপ অনেকদিনই অচেতন ছিলেন গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে। তার হাত আর পেট ছিঁড়ে গুলি বের হয়ে গিয়েছিল। অচেতন অবস্থাতেই আস্তে আস্তে অবস্থার উন্নতি হচ্ছিলো। তাঁর বোন ছায়া ছায়ার মতোই লেগে ছিলেন একটানা। একদিন ছায়া বললেন, ‘এখন মনে হয় অবস্থা একটু ভালো।’ ‘কী করে বুঝলেন?’ ‘বুঝলাম, মানে দাদা আমাকে বকা দিচ্ছে তো।’ ঘোরের মধ্যেই প্রদীপ কথা বলছিলেন তখন। এরকম একদিন আমি যখন তাঁর সামনে, তিনি একবার চোখ খুললেন, আমার হাতটা ধরলেন, বললেন বাবু…আবার ঘুমে, হাতটা ধরাই থাকলো। আবার যেন জেগে উঠে ঘোরের মধ্যেই বললেন, ‘বাবু….যে ইজ্জৎ দিতে জানে সে জীবনও দিতে জানে।’ কথাটার অর্থ কী? কথাটার ছন্দ এমন, এমন তার ওজন যে সারাক্ষণই তা মাথায় ঘুরতে থাকে। ইজ্জত আর জীবন একাকার, ইজ্জত কাকে? জীবন কাকে? নিজেকে, নিজের স্বজনদের, নিজের ভূমিকে? যদি নিজেকেও ইজ্জত দিতে হয় তাহলেও জীবন দিতে প্রস্তুত থাকতে হয়। তাই কী?
পার্বতীপুর রাস্তা থেকে অনেক ভেতরে যেতে হয় সালেকীনের বাড়িতে যেতে। চারিদিকে সবুজ আর সবুজ, তার মধ্যে দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা। গ্রামের মানুষ জানালেন এই রাস্তায় এশিয়া এনার্জি সুড়কি ফেলেছিল নিজেদের গাড়ির চলাচলের সুবিধা করবার জন্য। এই রাস্তায় বেশ কয়েকটি স্পট আছে তাদের, এখন সেগুলো এখন আর আস্ত নেই। সালেকীনের বাড়ি মাটির। আগের দিন স্কুলের পরীক্ষা দিয়ে এসেছিল ও। ওর মার বিলাপ এখনও শেষ হযনি। মার বিলাপ শেষ হয় কীভাবে? হাত ধরে বিলাপে বিলাপে বলেন, ‘বাবারে মুই ভুলতে পারি না গো।’ একইরকম কথা আল আমিনের মার কান্নার মধ্যেও। আশেপাশে নারীপুরুষ অনেক। পানি অনেকেরই চোখে, কিন্তু শুধু শোকের ভাব নয়। তাই একজন যখন বলেন, ‘দুশমনেরা মায়ের বুক খালি কর্যা নিল কোম্পানির জন্যি?’ তখন সবার মধ্যে যেন সাড়া পড়ে যায়।
সন্তান কেন মিছিলে গেল সেই আক্ষেপ শুনিনি কোথাও, ক্রোধ দেখেছি বিডিআর আর এশিয়া এনার্জির প্রতি। রিকশা ভ্যান শ্রমিক সমিতি আর দোকান কর্মচারি সমিতি বিডিআর সদস্যদের জন্য অনির্দিষ্টকালের বয়কট ঘোষণা করেছে। কেউ তাদের কাছে কিছু খরচ (বিক্রি) করবে না, কেউ তাদের পরিবহণে তুলবে না। শ্রীমন বাস্কে গুলির যন্ত্রণা নিয়ে, গুলজার রাইফেলের আঘাতে পঙ্গু হয়ে এখনও হাসপাতালে। আরও অনেকে ফুলবাড়ী থানার ঘরে ঘরে পায়ে, হাতে, মাথায় এমনকি চোখে গুলি বা আঘাতের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। তারপরও মনের জোর কমেনি। এই মানুষেরা সরল। কিন্তু যা কিছু করেন বুকের ভেতর থেকে করেন। বললেন তাই একজন, ‘বুকের মধ্যে নিয়ে নিছি। আমাদের এক ইঞ্চি ভূমি কোম্পানিকে দেবো না।’ পায়ে গুলি লেগেছে এরকম এক তরুণ চুটকা একপায়ে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বলে ‘এরপর বুকে গুলি নেবো, দেখবে তুমরা।’
আরও অনেকে ফুলবাড়ী থানার ঘরে ঘরে পায়ে, হাতে, মাথায় এমনকি চোখে গুলি বা আঘাতের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। তারপরও মনের জোর কমেনি। এই মানুষেরা সরল। কিন্তু যা কিছু করেন বুকের ভেতর থেকে করেন। বললেন তাই একজন, ‘বুকের মধ্যে নিয়ে নিছি। আমাদের এক ইঞ্চি ভূমি কোম্পানিকে দেবো না।’ পায়ে গুলি লেগেছে এরকম এক তরুণ চুটকা একপায়ে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বলে ‘এরপর বুকে গুলি নেবো, দেখবে তুমরা।’
এখনও আকছার নিখোঁজ, রবিউল নিখোঁজ। এই দুজনেরই বয়স ১২ থেকে ১৩। আকছারের বাবা আজম জুতার কাজ করে, কিছুই করতে পারেননি এতদিন। মা বাবা দুজনই খালি কাঁদেন। আকছারকে মৃত অবস্থায় হাসপাতাল থেকে মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এই সাক্ষ্য দিচ্ছে অন্য আহতজনেরা যারা তার পাশেই হাসপাতালে ছিল, তারপরও সরকারী প্রশাসন তার লাশের এখনও হদিস দেয়নি। রবিউলের বাবাও মজুর। ছেলের খোঁজে প্রায়ই প্রশাসনের কাছে আসেন। কাঁদতে কাঁদতে জানান কিশোর আকছার নিজে কাজ করে কিছু পয়সা জমিয়েছিলো, সেই পয়সায় বাড়ির চারধারে লাগিয়েছে অনেক গাছ। সেই গাছে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে প্রতিদিন তার মা আর দাদাদাদী কাঁদে।
সেদিন গুলির পর যখন রক্তাক্ত চারপাশ তখন এক অসম্ভব ভার অনুভব করেছি মাথায়। তখন চিৎকার করে কাঁদতে পারলে বোধহয় হালকা হতে পারতাম। কিন্তু পারিনি। বুকে পাষাণ বাঁধার কথা অনেক শুনেছি। সেদিন বুঝলাম। যারা সেদিন শহীদ হলেন তাদের মধ্যে তরিকুলের বয়স সবার বড়, ২০ বছর। আর সবাই, নিখোঁজসহ, ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সের মধ্যে। এই শিশু কিশোরদের কেন গুলি করেছে বিডিআর? এই নিরস্ত্র শিশু কিশোরেরা কি সেদিন সশস্ত্র বিডিআরের জীবন বিপন্ন করেছিল? তারা কি এশিয়া এনার্জির অফিস ভাংচুর করেছিল? করেনি যে এটা প্রশাসন আর তারা যে কোম্পানির জন্য কাজ করেছে তার চাইতে আর ভালো কেউ জানে না।
পুলিশ বিডিআর এশিয়া এনার্জির অফিস থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ব্যারিকেড দিয়েছিল যেখানে আমরা ৭০ থেকে ৮০ হাজার মানুষের জমায়েতে গণরায় ঘোষণা করি। সেই গণরায়ে এশিয়া এনার্জিকে ঐদিন রাতের মধ্যেই চলে যেতে বলা হয়। না গেলে তাদের বিরুদ্ধে যে সামাজিক বয়কট কর্মসূচি চলবে তার বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়। এই ঘোষণা দিয়ে যখন আমরা মূল জমায়েত নিয়ে ফিরে আসছি তখন আছরের আজান হচ্ছিল, গুলি হয় তার পরপরই। ব্যারিকেডের ওখানে তখন মূল জনস্রোতের মানুষেরা ছিলেন না। যারা ছিলেন তাদের অধিকাংশই শিশু কিশোর। নিহত আর আহতদের তালিকা দেখলেই তা স্পষ্ট হয়। বয়স্ক যারা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন যেমন প্রদীপ তিনি গিয়েছিলেন তাঁর কিশোর সন্তানকে খুঁজতে। তাহলে এই গুলি হলো কেন?
এশিয়া এনার্জি এবং তার সমর্থককুলের প্রথমে হয়তো ধারণা ছিল যেহেতু মন্ত্রী, আমলা কিংবা কনসালট্যান্টদের কেনা সম্ভব, সেহেতু গ্রামের দরিদ্র মানুষদের কেনা আর কী? কিন্তু সেখানেই এশিয়া এনার্জি বড় ধাক্কা খায়। কিছু বিত্তশালী লোক কিনতে পারলেও গ্রামের ভেতর তারা বা তাদের দালালেরা ঢুকতে পারেনি। কেউ কেউ বন্ধু বেশে হাজার হাজার টাকা ঘুষের প্রস্তাব নিয়ে গ্রামে ঢুকলেও কৃষক নারীর মুখে ‘গোলামের পুত’ বিশেষণ নিয়ে প্রাণভয়ে দৌড়ে পালায়। অঞ্চলের গরীব মানুষেরা শত অভাবের মধ্যেও ব্যক্তিক স্বার্থকে উপেক্ষা করতে পেরেছেন কারণ হয়তো সেটাই, তারা নিজেদের ইজ্জত দিতে জানেন। তাদের বাগে আনার ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে কোম্পানি আর তার রক্ষাকর্তারা দ্বিতীয় কৌশল আশ্রয় করে। জানা যায়, তারা ধারণা করেছিলো ঘেরাও কর্মসূচিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বা গুলি করে কিছু নেতা কর্মী হত্যা করলে একটা ভীতি সৃষ্টি করা যাবে এবং পুরো আন্দোলন ধ্বসে পড়বে। দালাল আর ভাড়াটে গুন্ডারা সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে।
যারা মনে করেন এই আন্দোলন কতিপয় বহিরাগত ব্যক্তির উস্কে দেয়া তারা এরকম মনে করতেই পারেন। কিন্তু ফুলবাড়ীর মানুষ বলেন, ‘আমরা বুকের ভেতর বুঝে লইছি। আর কেউ আমাদের ঠেকাতে পারবে না।’ আর তাই রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে দমিত হবার বদলে তাঁরা হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য। আক্রান্ত মেয়েরা ঘরের বাইরে হাজারে হাজার সমবেত হন, দিনে দিনে সংখ্যা বাড়তে থাকে। বলেন, ‘আমরা বটি দিয়ে কি সারাজীবন পেঁয়াজ আর আলু কাটবো? দরকার পড়লে যারা আমাদের জীবন ধ্বংস করতে আইসবে সেই দুশমনদেরও কাটবো।’ চার থানার মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির বহুদিনের চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। ১০/১২/১৫ কিলোমিটার রাস্তা পায়ে হেঁটে এসে হাজির হন আশেপাশের থানার হাজার হাজার নারীপুরষ। মসজিদের ইমাম সাহেবেরা তাদের মাইক দিয়েই আন্দোলনের কর্মসূচি প্রচার করতে থাকেন। সারা বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষদেরও ততদিনে ঘুম থেকে টেনে তুলেছে ফুলবাড়ীর আন্দোলন। বাঙালী, আদিবাসী, মুসলমান, হিন্দু, খ্রীষ্টান, শিশু বৃদ্ধ, নারী পুরুষ সবদিকে জনগণের এই অসাধারণ ঐক্য সংহতি আর প্রতিরোধের সামনে কোন পুঁজির শক্তি, অস্ত্রের শক্তি দাঁড়াতে পারে না। সরকার তাই অবশেষে মাথা নত করে। এশিয়া এনার্জি গভীর রাতে পুলিশ নিয়ে এলাকা ছাড়ে।
আক্রান্ত মেয়েরা ঘরের বাইরে হাজারে হাজার সমবেত হন, দিনে দিনে সংখ্যা বাড়তে থাকে। বলেন, ‘আমরা বটি দিয়ে কি সারাজীবন পেঁয়াজ আর আলু কাটবো? দরকার পড়লে যারা আমাদের জীবন ধ্বংস করতে আইসবে সেই দুশমনদেরও কাটবো।’
এ জেড এম আবদুল আলী গত ৮ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোতে ‘আবার যখের ধন’ শিরোনামে যে লেখা লিখেছেন তা এই ফুলবাড়ী বিষয়েই। পড়লে যে কেউ বুঝবেন দেশে এরকম মানুষ দাপটেই আছেন যাদের কাছে দেশ, মানুষ, যুক্তি, বর্তমান, ভবিষ্যৎ, মানুষের জীবনদান সবকিছু তুচ্ছ, সবার ওপর কোম্পানি। লেখক বাংলাদেশের তেল-গ্যাস-কয়লা সম্পদকে ‘যখের ধন’ বলে ব্যঙ্গ করেছেন। ব্যঙ্গ করেছেন আমাদের, তা আমরা ‘পাহারা দিচ্ছি’ বলে। সারাবিশ্বে জ্বালানী সম্পদ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার পরিপ্রেক্ষিতে অনবায়নযোগ্য, সীমিত এই সম্পদ বাংলাদেশের মতো দুর্বল দেশের জন্য যখের ধন তো বটেই। আর ঠিকই, আমরা জনগণকে নিয়ে তা পাহারাও দিচ্ছি, দিচ্ছি জনগণের অবস্থার পরিবর্তনের জন্যই। পাহারা দিচ্ছি এই কারণে যে যেখানে শতকরা ৭০ ভাগ মানুষ এখনও বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত, যেখানে শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ জ্বালানী থেকে বঞ্চিত, সেখানে এই সম্পদ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে যথাযথ পরিকল্পনা করলে শতকরা ১০০ ভাগ মানুষের বিদ্যুৎ, দেশের শিল্পায়ন আর অবকাঠামো নির্মাণ সম্ভব। এই সম্ভব যে সম্পদ দিয়ে সেই সম্পদ বিদেশি বিনিয়োগের নামে লুন্ঠন আর পাচার হবে এবং সম্পদ পরিণত হবে জনগণের জন্য বিপদে, সেটা আমরা কেন হতে দেব? পাহারা দিচ্ছি এই কারণে যে, আমরা মনে করি সম্পদ থাকলে আমরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী তা ব্যবহারের কৌশলও নিতে পারবো। সম্পদ থাকলে জ্বালানী আমদানীর ভার থেকে মুক্ত হয়ে সেই বৈদেশিক মুদ্রা দেশের উৎপাদনশীল বিকাশের কাজে লাগাতে পারবো। প্রযুক্তি নিয়ে দুনিয়াজোড়া গবেষণা হচ্ছে। আরও নিরাপদ ও কার্যকর প্রযুক্তি আমরা ব্যবহার করতে পারবো যদি সম্পদ আমাদের কর্তৃত্বে থাকে। কমিশনভোগী আর মানসিকভাবে পরাজিত ব্যক্তিবর্গ ভাবতে পারেন বা বলতে পারেন বাংলাদেশ এসব কাজ কখনোই পারবে না, আমরা তা মনে করি না। কেন মনে করি না তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণও বহুবার আমরা দিয়েছি। দিয়েছি এই সক্ষমতা অর্জনের সম্ভাব্য রূপরেখা।
দেশে এরকম মানুষ দাপটেই আছেন যাদের কাছে দেশ, মানুষ, যুক্তি, বর্তমান, ভবিষ্যৎ, মানুষের জীবনদান সবকিছু তুচ্ছ, সবার ওপর কোম্পানি।
ডেইলি স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত জাফর সোবহান এবং আরও কয়েকজনের লেখা নিজের সমর্থনে টেনে আনেন আলী সাহেব। তাঁরা বলেন, এশিয়া এনার্জির প্রকল্প সমগ্র দেশ-এরই লাভবান হবার পথ। তাদের মতে এটাই নাকি শিল্পায়ন! আলীসাহেব বলছেন, ‘শিল্পের উন্নয়ন যদি আমরা চাই তবে কিছু বেদনার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।’ কোথায় শিল্পায়ন? একটা ধ্বংসস্তুপ? আর কার জন্য ‘কিছু বেদনা?’ কী বেদনা গ্রহণে রাজী এই উন্নয়ন লেখকেরা তা আমার জানার খুব ইচ্ছা! জাফর সোবহানের লেখা উদ্ধৃত করে ফুলবাড়ী অঞ্চলের মানুষদের সম্পর্কে তিনি বলছেন, ‘উপযুক্ত অর্থ ক্ষতিপূরণ পেলে তারা অন্য কোনো পেশা বা জীবিকায় চলে যেতে পারবে পৃথিবীতে আজ নানা রকম নতুন দরজা উন্মুক্ত হচ্ছে।’
আমি অবাক হয়ে ভাবি শিক্ষিত আর দেশ বিদেশ নিয়ে বিস্তর কথা বলেন যারা তারা কেমন করে এরকম বোধহীন হতে পারেন? তাদের জন্য পৃথিবীর দরজা আর নানা সুযোগ উন্মুক্ত বলে তারা তা ফুলবাড়ীর মানুষদের জন্যও প্রযোজ্য মনে করেন, আসলেই? কেমন করে কোনোরকম বিচার বিবেচনা ছাড়াই তারা যা মনে আসে তাই বলে ফেলতে পারেন? দিয়ে দিতে পারেন এমন সিদ্ধান্ত যার সঙ্গে শুধু এক দুই হাজার মানুষের জীবন নয় লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন, সারা বাংলাদেশের মানুষের সম্পদ আর তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত? বলে ফেলতে পারেন এমন বিষয়ে সিদ্ধান্ত যার সম্পর্কে, তাদের নিজেদের ভাষ্য অনুযায়ীই, তারা কিছু জানেন না? কিন্তু এই লেখকেরাই আবার এক নিশ্বাসে বিরোধিতা করতে পারেন, ব্যঙ্গ আর তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে পারেন তাদের যারা অনেক ভেবেচিন্তে জেনে শুনে সম্পদ রক্ষার জন্য, দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা আর লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন জীবিকার জন্য কথা বলেন, কাজ করেন আর প্রয়োজনে গুলির মুখে গিয়ে দাঁড়ান?
‘বিদেশি বিনিয়োগের কী হবে’ এই নিয়ে হাহাকারই তাঁদের মূল বিষয়। খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে নানা দুর্নীতি আর গোপন চুক্তিওয়ালা বিদেশি বিনিয়োগ এযাবতকালে দেশের যে কীরকম সর্বনাশ করেছে তা নিয়ে আমরা তবে কিছু বলবো না? ৩০ বছর ধরে এশিয়া এনার্জি যে পরিমাণ বিনিয়োগ করবার কথা বলেছে তার থেকে বেশি মূল্যের গ্যাস সম্পদ মাত্র তিনদিনে মাগুড়ছড়া আর টেংরাটিলায় ধ্বংস করেছে এই বিদেশি বিনিয়োগকারিরাই। এর শেকড় ধরতে হবে না আমাদের? এইসব বয়ানকারির কাছে ৩০ বছর ধরে এশিয়া এনার্জির কয়লা পাচার কালে যে হাজার তিনেক কর্মসংস্থান হবে কিংবা কিছু ছোট চায়ের দোকান হবে সেটাই বিরাট প্রাপ্তি, আর লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন জীবিকা আর অসংখ্য চায়ের দোকান আর ছোট প্রতিষ্ঠান যে ধ্বংস হবে তার বিবেচনা কোনমতেই ধর্তব্য নয়। তাদের কাছে কয়লা পাচার আর উত্তরবঙ্গের ধ্বংসস্তুপে কিছু আসে যায় না, কারণ সেখানে এই কয়লা পাচারের জন্য রাস্তা হবে আর মোংলা পোর্ট বাড়বে! এই কাজে সুন্দরবন বিপর্যস্ত করে নতুন টার্মিনাল হলেও তারা উচ্ছসিত। এইসব ব্যক্তির প্রিয় ধারার ‘উন্নয়ন’ করে করে আফ্রিকা আর ল্যাটিন আমেরিকার বহু দেশ রিক্ত আর বিপর্যস্ত হয়েছে। শিল্পায়ন নামের কিছু হয়নি। বহু রাস্তা আর রেললাইন এখন সেখানে পরিত্যক্ত পড়ে আছে। এগুলো করে লাভবান গোষ্ঠীও আছে, চরম দুর্নীতিগ্রস্ত শাসক, জেনারেল আর আমীর ওমরাহ আর তাদের সহযোগীরা।
তাদের কাছে কয়লা পাচার আর উত্তরবঙ্গের ধ্বংসস্তুপে কিছু আসে যায় না, কারণ সেখানে এই কয়লা পাচারের জন্য রাস্তা হবে আর মোংলা পোর্ট বাড়বে! এই কাজে সুন্দরবন বিপর্যস্ত করে নতুন টার্মিনাল হলেও তারা উচ্ছসিত। এইসব ব্যক্তির প্রিয় ধারার ‘উন্নয়ন’ করে করে আফ্রিকা আর ল্যাটিন আমেরিকার বহু দেশ রিক্ত আর বিপর্যস্ত হয়েছে।
১৯৭১ সালের টিক্কা খানের সেই কথা আমরা ভুলি নাই: ‘আমাদের মানুষ দরকার নাই। আমাদের দরকার মাটি।’ এশিয়া এনার্জি আর তাদের প্রতিনিধিদের বক্তব্যও তাই। আর মানুষকে তারা দেখতে চায় নতজানু নিয়তিবাদী হিসেবে। সেটাই তাদের জন্য নিরাপদ। সেই মানুষ যখন রুখে দাঁড়ায় তখন তা তাদের কাছে এক ভয়ংকর বেদনা আর হতাশার ব্যাপার হয়। কিন্তু আমাদের সকলের জন্য ভরসার জায়গা এই যে, ইজ্জতের চেতনায় মানুষের এই উত্থানই বর্তমান অমানবিক অবস্থা থেকে বাংলাদেশের ভবিষ্যতকে মুক্ত করবার উজ্জল সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। যারা মনে করেন মানুষ শুধু ব্যক্তিস্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হয়, তাদের পক্ষে মানুষের এই সামষ্টিক বিশাল উত্থানের মহত্ত্ব অনুধাবন সম্ভব নয়। তাদের জন্য আমরা কেবল করুণাই প্রকাশ করতে পারি।
লেখা: ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৬
‘বিস্মৃত’ ফুলবাড়ী চুক্তি কি শুধুই একটি ‘সমঝোতা স্মারক’?
মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান
মাস খানেক আগে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর কয়লা খনির উন্মুক্ত খননের পরিবেশগত ক্ষতি, সেখানকার অধিবাসীদের উচ্ছেদ এবং তাদের সম্মতি – এই সব বিষয় বিবেচনায় দেশের তীব্র জ্বালানি সংকট নিরসনে, সেই খনি নিয়ে সরকারের মনোভাব কী তা বিরোধীদলীয় একজন সংসদ সদস্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান। সেই প্রশ্নের জবাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জানান, ‘…আমাদের দেশে ফুলবাড়ীয়াতে [ফুলবাড়ী] … পৃথিবীতে যে কয়টি ভালো কয়লা আছে তার মধ্যে একটি। …দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে … দেশের জন্য সেটি ভালো হবে। … সবচেয়ে আগে সিদ্ধান্ত নেব, কীভাবে সেই মানুষগুলোকে আগে সেটেলমেন্ট করা যায়। …পরিবেশের যে বিষয়টি আছে সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে আমরা যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব…।’
জাতীয় সংসদে এই আলোচনার মধ্যদিয়ে পরিবেশ, স্থানীয় জনগণের জীবন-জীবিকা, পুনর্বাসনের মতো স্পর্শকাতর বিষয় গুরুত্ব পেলেও, উত্থাপিত প্রশ্ন এবং উত্তরের প্রকৃতি উপরন্তু এটা নিশ্চিত করেছে, প্রশ্নকর্তা এবং উত্তরদাতা–উভয়ই ‘উন্মুক্ত না, রপ্তানি না, বিদেশি না’–এই স্লোগান নিয়ে চারদলীয় জোটের শাসনামলে গড়ে ওঠা ফুলবাড়ী আন্দোলন এবং ২০০৬ সালের ২৬ আগস্টের সমাবেশে বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি)-এর গুলিতে নিহত আমিন, তরিকুল ও সালেকিনদের নাম বিস্মৃত হয়েছেন! শুধু তাই নয়, আশ্চর্যজনকভাবে তারা বিস্মৃত হয়েছেন, সেই অঞ্চলের মানুষের উন্মুক্ত কয়লা খনিবিরোধী স্পষ্ট অবস্থান বা উন্মুক্ত খননের ব্যাপারে তাদের অগ্নিমূর্তি অসম্মতি!
অথচ স্থানীয় জনগণের রক্তস্নাত এই অসম্মতি প্রাতিষ্ঠানিকতা পেয়েছিল, ওই বছরের ৩০ আগস্ট সরকারের সঙ্গে স্থানীয় জনগণের সম্পাদিত সাত দফা চুক্তির মাধ্যমে। এই চুক্তির মধ্যদিয়ে সরকার অন্যান্য দাবির মধ্যে ফুলবাড়ীসহ বাংলাদেশের কোনো জায়গায় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লাখনি করা হবে না, এশিয়া এনার্জির সঙ্গে সব চুক্তি বাতিল করা হবে এবং কোম্পানিকে এলাকা ত্যাগ করতে হবে – এসব ব্যাপারে সম্মত হয়।
নিঃসন্দেহে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যে কোনো রাষ্ট্রের জন্য অগ্রাধিকার তালিকায় থাকাটাই স্বাভাবিক। তারপরও ফুলবাড়ীর মতো রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল উন্মুক্ত কয়লা খনিবিরোধী আন্দোলন এবং সরকারের সঙ্গে স্থানীয় জনগণের চুক্তির ইতিহাস লুপ্ত করে দিয়ে, নতুন করে জাতীয় সংসদে আবার আলোচনা শুরুর মধ্যদিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে চলে আসে। প্রশ্নটি হলো– এই ইতিহাস বিলুপ্তি ইচ্ছাকৃত কি না, যাতে ফুলবাড়ী চুক্তির নৈতিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনি এবং সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা সহজেই এড়িয়ে যাওয়া যায়। এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে জনপরিসরে আবার অনেকেই এটাও দাবি করেন যে, এই চুক্তিটি একটি ‘সমঝোতা স্মারক’ এবং এর কোনো আইনি তাৎপর্য বা বাধ্যবাধকতা নেই। আসলেই কি তাই? লেখাটিতে ফুলবাড়ী কয়লা খনি এবং উন্মুক্ত খনিবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস পুনর্পাঠ, বাংলাদেশের সংবিধান, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন ও দলিল, উল্লেখযোগ্য বৈশ্বিক উদাহরণ বিশ্লেষণের মধ্যদিয়ে এই প্রশ্নের উত্তরটি খোঁজা হবে।
ফুলবাড়ী কয়লা খনি, এশিয়া এনার্জি ও উন্মুক্ত খনিবিরোধী আন্দোলন
অস্ট্রেলিয়াস্থ বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ের কয়লা উত্তোলনকারী ব্রোকেন হিল প্রোপ্রাইটারি কোম্পানি বা বিএইচপি ১৯৯৪ সালে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর কয়লা খনি সবার নজরে আনে। তবে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির দক্ষিণে অবস্থিত ফুলবাড়ীর কয়লা খনি এলাকার ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতা, নদী-খালের বেষ্টন, বন্যাপ্রবণতা, ১৪,৬৬০ একর বা ৫৯.৩২ কিমি বিস্তৃত খনির ৮০ শতাংশ উন্মুক্ত কৃষিজমি, ঘনবসতি, এক থেকে দেড় লাখ অধিবাসীর বাস্তুচ্যুতি বা বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ বিবেচনায়, বিএইচপি কয়লা খনি খননের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী না থাকায় চার বছর পর অর্থাৎ, ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ শাসনামলে তারা অভিজ্ঞতাহীন সদ্য প্রতিষ্ঠিত এক ভুঁইফোড় ধরনের কোম্পানি, এশিয়া এনার্জি করপোরেশন (বাংলাদেশ)-এর কাছে কয়লা খনিটি পরিচালনার লাইসেন্স হস্তান্তর করে। অস্ট্রেলিয়া সরকারের বিজনেস রেজিস্টার থেকে জানা যায়, ২০০০ সালে রেজিস্ট্রিকৃত কোম্পানিটির অস্ট্রেলিয়ান বিজনেস নম্বর (এবিএন) ৮২০৮০৪০৬৮১৯ (https://abr.business.gov.au/ABN/View?abn=82080406819)।
জীববৈচিত্র্যসহ অন্য সবকিছুকে বিবেচনায় না নিলেও ফুলবাড়ী খনি এলাকার ভূগর্ভস্থ পানি নিষ্কাশন ও খনি থেকে বের হয়ে আসা পাথর, বালি, মাটি যথাযথভাবে সরিয়ে নেওয়াটা ছিল ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতার সবচেয়ে বড় জটিলতা। কেননা পানিসম্পদ বিবেচনায় বাংলাদেশের প্রধান ভূগর্ভস্থ জলাধার অবস্থিত ফুলবাড়ী কয়লা খনি এলাকায়। ১০-১৩ মিটার বা ৩২ ফুট থেকে ৩৯ ফুট মাটি খুঁড়লেই পানির স্তর আর কয়লার স্তর আরও অনেক গভীরে, ১৫০ মিটার থেকে ২৭০ মিটার বা ৪৯২ থেকে ৮৮৬ ফুট নিচে। এক হিসাবে দেখা যায়, খনিটি যদি ৩৬ থেকে ৩৮ বছর কার্যকর থাকে, তাহলে প্রতিদিন ৪০ কোটি থেকে ৮০ কোটি লিটার পানি নিষ্কাশন করতে হবে। আর এই পানি যদি ৫ মিটার (১৬.৪০ ফুট) গভীর এবং ৫০ বর্গমিটার (১৬৪ বর্গফুট) আকারের পুকুরে সংরক্ষণের চিন্তা করা হয়, তাহলে প্রতিদিন খুঁড়তে হবে ৩২টি বর্গাকার পুকুর আর পুকুর বৃত্তাকার হলে এই সংখ্যাটি হবে কমপক্ষে ৪১টি। একই সঙ্গে খনির এই কার্যকালে প্রায় ৪০ লাখ কোটি পাথর, বালি, আর মাটি সরাতে হবে, যার জন্য প্রয়োজন হবে কমপক্ষে ৫ বর্গকিলোমিটার জায়গা।
পানিসম্পদ বিবেচনায় বাংলাদেশের প্রধান ভূগর্ভস্থ জলাধার অবস্থিত ফুলবাড়ী কয়লা খনি এলাকায়। ১০-১৩ মিটার বা ৩২ ফুট থেকে ৩৯ ফুট মাটি খুঁড়লেই পানির স্তর আর কয়লার স্তর আরও অনেক গভীরে, ১৫০ মিটার থেকে ২৭০ মিটার বা ৪৯২ থেকে ৮৮৬ ফুট নিচে।
সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, এশিয়া এনার্জি ফুলবাড়ীর প্রায় ৬৭ বর্গকিলোমিটার জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন এবং উত্তোলিত কয়লা বিদেশে রপ্তানি এবং বাংলাদেশকে মাত্র ৬ শতাংশ রয়্যালটি প্রদানের মাধ্যমে খনিটি পরিচালনা শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু উন্মুক্ত কয়লা খনির কারণে কৃষিজমি ও বসতভিটার সম্ভাব্য ধ্বংস স্থানীয় জনগণ মেনে নিতে পারেনি। মোট কথা, বসতভিটার মালিকানা, খাদ্যনিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রতিবেশগত ভারসাম্য – এই সবকিছু বিবেচনায় স্থানীয় জনগণের কাছে প্রকল্পটি গ্রহণযোগ্য হয়নি। শেষ পর্যন্ত, ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে বিদেশি কোম্পানি এশিয়া এনার্জির বিরুদ্ধে এক গণ-অভ্যুত্থানে তিনজন আন্দোলনকারী শহীদ হন এবং তৎকালীন সরকার সব দাবি মেনে নিয়ে ঘটনার চার দিন পর স্থানীয় জনগণের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং এশিয়া এনার্জি দিনাজপুর পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
এর আগে ২০০৪ সালে এশিয়া এনার্জি লন্ডনের স্টক এক্সচেঞ্জের অন্তর্ভুক্ত অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেটে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং পরবর্তী সময়ে ভাবমূর্তি রক্ষায় নিজেদের নাম পরিবর্তন করে গ্লোবাল কোল ম্যানেজমেন্ট বা জিসিএম পিএলসি পরিচয় নেয় ২০০৭ সালে। গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত এই ভুঁইফোড় কোম্পানিটি নতুন পরিচয়ে এখনো তাদের ওয়েবসাইটে ফুলবাড়ী কয়লা খনির প্রচারণা দিয়ে লন্ডনের শেয়ারবাজারে তাদের ব্যবসায়িক তৎপরতা এখনো জারি রেখেছে (https://www.gcmplc.com/)!
ফুলবাড়ী চুক্তির সাংবিধানিক তাৎপর্য এবং বাধ্যবাধকতা
ফুলবাড়ী চুক্তিটি সাধারণ কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়। প্রকৃত অর্থে এটি একটি জনগণের প্রতি পরম ‘আইনি ও নৈতিক অঙ্গীকার’, যা স্বাক্ষরিত হয়েছে তৎকালীন বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত চারদলীয় জোট সরকার দ্বারা। এই জোটের অন্যতম অংশীদার ছিল জামায়াতে ইসলামীও। বিগত দুই দশকে কোনো সরকারই আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তি বাতিল বা প্রত্যাহার করেনি। ফলে ফুলবাড়ীর কয়লাখনি সংক্রান্ত যে কোনো রূপরেখা বা সিদ্ধান্ত প্রণয়নের ক্ষেত্রে চুক্তিটির আজও সবচেয়ে বড় আইনি ও রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে, যা রাষ্ট্রের জন্য এক রকমের বাধ্যবাধকতাও তৈরি করে।
ফুলবাড়ী চুক্তিটি সাধারণ কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়। প্রকৃত অর্থে এটি একটি জনগণের প্রতি পরম ‘আইনি ও নৈতিক অঙ্গীকার’, যা স্বাক্ষরিত হয়েছে তৎকালীন বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত চারদলীয় জোট সরকার দ্বারা। এই জোটের অন্যতম অংশীদার ছিল জামায়াতে ইসলামীও। বিগত দুই দশকে কোনো সরকারই আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তি বাতিল বা প্রত্যাহার করেনি। ফলে ফুলবাড়ীর কয়লাখনি সংক্রান্ত যে কোনো রূপরেখা বা সিদ্ধান্ত প্রণয়নের ক্ষেত্রে চুক্তিটির আজও সবচেয়ে বড় আইনি ও রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে, যা রাষ্ট্রের জন্য এক রকমের বাধ্যবাধকতাও তৈরি করে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ এটা নিশ্চিত করে যে, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। তাই ক্ষমতার মূল উৎস এই ভূখণ্ডের জনগণের সঙ্গে কোনো সরকার কোনো বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সম্মতি প্রদান করলে তা পরবর্তী সব সরকারের ওপর একটি আইনি ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা তৈরি করে। ইংরেজিতে আইনের ভাষায় এই বাধ্যবাধকতাকে বলা হয়, ‘Binding Obligation’।
আবার, ফুলবাড়ী অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অত্যন্ত সংবেদনশীল, যা ইতোমধ্যে আলোচনা করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করেন যে, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খনন করা হলে বিশাল এলাকা জুড়ে পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যাবে এবং এতে কৃষিজমি স্থায়ীভাবে মরুভূমিতে পরিণত হবে। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(ক) অনুযায়ী, রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। একইভাবে, বাংলাদেশের সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদ সবসময় জনগণের সেবা করার চেষ্টা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করে। তাই ফুলবাড়ী অঞ্চলের ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশ ধ্বংসকারী যে কোনো সিদ্ধান্ত সংবিধানের এই কর্তব্যচেতনার পরিপন্থি। বস্তুত তৎকালীন সরকার নিজেই চুক্তিটি করার মাধ্যমে স্বীকার করেছে যে, উন্মুক্ত খনি ক্ষতিকর। তাই ফুলবাড়ী চুক্তি বাস্তবায়ন না করার মানে হলো, জনগণের সাংবিধানিক অধিকারের প্রতি সরকারের অবজ্ঞা।
অনেকে যুক্তি দেন যে, মাটির নিচে থাকা খনিজ সম্পদের মালিক তো রাষ্ট্র, তাই সরকার যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে উত্তোলন করতে পারে। তবে এই যুক্তি সংবিধানের ১৪৩ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অনুচ্ছেদ ১৪৩(১)(ক) অনুযায়ী, বাংলাদেশের যে কোনো খনিজ সম্পদ প্রজাতন্ত্রের সম্পত্তি। তাই এই অনুচ্ছেদ স্পষ্ট করে যে, ফুলবাড়ীর কয়লা কোনো বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির সম্পত্তি নয়, এটির শতভাগ বাংলাদেশের জনগণের। মাত্র ৬ শতাংশ রয়্যালটির বিনিময়ে অভিজ্ঞতাহীন নতুন এক কোম্পানি এশিয়া এনার্জিকে ফুলবাড়ী কয়লা খনি হস্তান্তর করার মানে হলো, সেই সময় সংবিধানের ১৪৩ নম্বর অনুচ্ছেদের বরখেলাপ করা হয়েছিল! কেননা এই অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে সরকার এই কয়লা সম্পদ সুরক্ষার স্পষ্ট দায়িত্বে। আবার, সংবিধানের ১৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদ সরকারকে চুক্তি করার নির্বাহী ক্ষমতা দিলেও প্রশাসনিক আইন এবং দেশের উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায় অনুযায়ী, এই ক্ষমতা কোনোভাবেই ‘স্বেচ্ছাচারী’ বা ‘জনগণের মৌলিক অধিকার’ পরিপন্থি হতে পারে না।
ভুলে গেলে চলবে না, ফুলবাড়ী চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল দেশের খনিজ সম্পদের ওপর থেকে বিদেশি কোম্পানির একক আধিপত্য বা বন্দোবস্ত (লিজ) বাতিল করে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দেশীয় মালিকানা নিশ্চিত করা। উপরন্তু, ফুলবাড়ী চুক্তিটি দরজার পেছনে বদ্ধ ঘরে সম্পাদিত হয়নি। এটি ফুলবাড়ীর জনগণের রক্ত এবং অভূতপূর্ব গণ-আন্দোলনের ফসল। তাই এই চুক্তিটি একটি সামাজিক চুক্তিও বটে। জন লক এবং রুশোর সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব নিশ্চিত করে যে, কোনো সরকার জনগণের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি ভঙ্গ করলে সেই সরকারের আইনি বৈধতা লোপ পায় বা বৈধতার সংকট তৈরি হয়।
ফুলবাড়ী চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল দেশের খনিজ সম্পদের ওপর থেকে বিদেশি কোম্পানির একক আধিপত্য বা বন্দোবস্ত (লিজ) বাতিল করে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দেশীয় মালিকানা নিশ্চিত করা। উপরন্তু, ফুলবাড়ী চুক্তিটি দরজার পেছনে বদ্ধ ঘরে সম্পাদিত হয়নি। এটি ফুলবাড়ীর জনগণের রক্ত এবং অভূতপূর্ব গণ-আন্দোলনের ফসল। তাই এই চুক্তিটি একটি সামাজিক চুক্তিও বটে।
আন্তর্জাতিক আইন ও দালিলিক তাৎপর্য এবং বাধ্যবাধকতা
উন্মুক্ত খনির বিরুদ্ধে পরিবেশগত ও মানবাধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক দলিল, সনদ, ঘোষণা ও আইনি ভিত্তিগুলো অত্যন্ত জোরালো। জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাকে স্বীকৃতি দেয়। এই ঘোষণার ২১(৩) নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: জনগণের ইচ্ছাই সরকারের সকল কর্তৃত্বের উৎস। তাই, গণ-আন্দোলন এবং নাগরিকদের দাবির প্রেক্ষাপটে সরকার চুক্তি করলে, তা মূলত জনগণের সুনির্দিষ্ট ইচ্ছার একটি আনুষ্ঠানিক দলিল হয়ে ওঠে। নতুন বা পুরোনো যে সরকারই আসুক না কেন, তারা যদি সেই চুক্তিকে ‘সমঝোতা স্মারক’ বলে উড়িয়ে দেয়, তবে তারা প্রকারান্তরে জনগণের ইচ্ছাকেই অস্বীকার করে। এর মধ্যদিয়ে সরকার তার নিজের আইনি ও নৈতিক বৈধতা হারিয়ে ফেলে। একইভাবে একই দলিলের ১৭(২) নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে– ‘কাউকেই তার সম্পত্তি থেকে খেয়ালখুশিমতো বঞ্চিত করা যাবে না।’ সরকার উন্মুক্ত খনিবিরোধী গণ-আন্দোলন এবং তিন আন্দোলনকারীর জীবনের বিনিময়ে স্থানীয় জনগণকে আশ্বস্ত করে চুক্তি স্বাক্ষর করে নিশ্চিত করল যে, তাদের উচ্ছেদ করা হবে না এবং এতে নাগরিকরা তাদের জানমালের একটি আইনি ও নৈতিক নিশ্চয়তা পেল। পরবর্তী সময়ে অন্য কোনো সরকার এসেও যদি দাবি করে যে, ‘ফুলবাড়ী চুক্তিটি রাজনৈতিক চুক্তি ছিল এবং খনি খনন করতে চাই’, তা হবে চরম স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত, যা সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ১৭(২) নম্বর অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।
শুধু তাই নয়, ফুলবাড়ী ও সংলগ্ন অঞ্চলে কমপক্ষে ১৫টি নৃ-গোষ্ঠী বা আদিবাসী সম্প্রদায়ের বসবাস, যাদের মধ্যে অধিকাংশ (৭৫ শতাংশ) সাঁওতাল সম্প্রদায়ভুক্ত। আদিবাসী অধিকার সংক্রান্ত জাতিসংঘের ঘোষণার (United Nations Declaration on the Rights of the Indigenous Peoples (UNDRIP)) বেশ কিছু বিধান, যেমন: অনুচ্ছেদ নম্বর ১০, ১৯, ২৮, ২৯(২), ৩২(২) ও আইএলও কনভেনশন ১৬৯, নৃ-গোষ্ঠী বা আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমির অধিকার রক্ষা করার বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করে। তাদের পূর্বসম্মতি (Free, Prior, and Informed Consent – FPIC) ছাড়া তাদের পৈতৃক ভূমি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ, আন্তর্জাতিক ঘোষণা বা কনভেনশনের স্পষ্ট ব্যত্যয়। যদিও বাংলাদেশ ২০০৭ সালে আদিবাসী অধিকার সংক্রান্ত জাতিসংঘের ঘোষণা (UNDRIP) গ্রহণ করার সময় ভোটদানে বিরত ছিল এবং আইএলও কনভেনশন ১৬৯-এর স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র নয়। তারপরও আমরা জাতিসংঘের মানবাধিকার চুক্তি, যেমন: ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস (আইসিপিপিআর) এবং ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন দি এলিমিনেশন অব অল ফর্মস অব রেসিয়াল ডিসক্রিমিনেশন-এর অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র। আর এ-সংক্রান্ত জাতিসংঘের মনিটরিং কমিটি ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’-এর বা সংখ্যালঘু আদিবাসীর জমি রাষ্ট্র কর্তৃক ব্যবহার বা অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে পরামর্শ এবং সম্মতি নেওয়ার প্রয়োজনের কথা বলে। এ ছাড়াও বিশ্বব্যাংকের পারফরম্যান্স স্ট্যান্ডার্ড সেভেন/এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড সোশ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক, ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন পারফরম্যান্স স্ট্যান্ডার্ড সেভেন, বেসরকারি আন্তর্জাতিক ব্যাংক কর্তৃক গৃহীত নিরক্ষীয় নীতিসমূহ (Equator Principles) IV, ইউএন-আরইডিডি (UN-REDD) প্রোগ্রাম গাইডলাইনস অন ফ্রি, প্রায়র অ্যান্ড ইনফর্মড কনসেন্ট – এগুলোও নৃ-গোষ্ঠী বা আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমির অধিকারের ক্ষেত্রে তাদের পূর্বসম্মতি গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করে।
আইনি মতবাদের তাৎপর্য, বাধ্যবাধকতা এবং বৈশ্বিক উদাহরণ
বিশ্বজুড়ে চুক্তি আইন ও ন্যায়পরায়ণতার আদর্শ বিবেচনায় একটি বহুল সমাদৃত আইনি মতবাদ হলো– ‘প্রমিসরি এস্টপেল’। এই মতবাদ অনুসারে, এক পক্ষ অপর পক্ষকে যদি কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয় এবং সেই প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা রেখে অন্য পক্ষ নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে, তবে প্রথম পক্ষ তার প্রতিশ্রুতি থেকে পিছু হটতে পারে না। বাংলাদেশে ফুলবাড়ীতে, সরকার আন্দোলন থামানো এবং সেখানে শান্তি ফিরিয়ে আনতে চুক্তিতে উল্লিখিত প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিল এবং জনগণ সেই চুক্তির ওপর আস্থা রেখে আন্দোলন থেকে সরে এসেছিল। তাই চুক্তি আইনের প্রমিসরি এস্টোপেল মতবাদ অনুযায়ী, সরকার কোনো অজুহাত দেখিয়ে নিজের দেওয়া লিখিত প্রতিশ্রুতি থেকে পিছু হটতে পারে না। কেননা সরকার নিজের প্রতিশ্রুতির দ্বারা নিজেই জনগণের নিকট আইনিভাবে দায়বদ্ধ হয়ে গেছে।
আবার, আন্তর্জাতিক আইনের মূল দর্শন হলো সদ্বিশ্বাস বা Good Faith। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও রাষ্ট্র যেমন অন্য রাষ্ট্রের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি সদ্বিশ্বাসের সঙ্গে বজায় রাখতে বাধ্য, ঠিক তেমনি দেশের জনগণের অধিকার রক্ষার জন্য দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভাঙা, ‘সদ্বিশ্বাস’-এর পরিপন্থি। ‘প্রমিসরি এস্টোপেল’ মতবাদের প্রেক্ষাপটে ১৯৬৮ সালের ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ইউনিয়ন অব ভারত বনাম ইন্দো-আফগান এজেন্সিস লিমিটেড নামের একটি ঐতিহাসিক মামলার রায় প্রণিধানযোগ্য। মামলায় মহামান্য কোর্ট রায় দেন যে, নাগরিকরা সদ্বিশ্বাসে সরকারের দেওয়া অঙ্গীকার অনুযায়ী কাজ করলে, সরকার তার আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব এবং নিজেদের নীতিগত অঙ্গীকার দ্বারা দায়বদ্ধ হয়ে পড়ে। সংক্ষেপে, এই মামলাটি ভারতের বিচার ব্যবস্থায় এই নীতিটি সুপ্রতিষ্ঠিত করে যে, ‘আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়, এমনকি সরকারও তার নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভাঙতে পারে না।’
একইভাবে প্রশাসনিক আইনে বিশ্বজনীন স্বীকৃত নীতি হলো জনগণের ‘লেজিটিমেট এক্সপেক্টেশন’ বা বৈধ আকাঙ্ক্ষা। ১৯৮৪ সালের যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডসের কাউন্সিল অব সিভিল সার্ভিস ইউনিয়নস বনাম মিনিস্টার ফর দ্য সিভিল সার্ভিস মামলাটি কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে ‘লেজিটিমেট এক্সপেক্টেশন’ তত্ত্বের আধুনিক ভিত্তি স্থাপন করে। এই মামলায় আদালত স্পষ্টভাবে রায় দেয় যে, সরকারের অতীতের কোনো প্রকাশ্য ঘোষণার কারণে জনগণের মনে এমন বিশ্বাস তৈরি করে যে, তারা একটি নির্দিষ্ট সুবিধা বা অধিকার পেতে যাচ্ছে, তাহলে সরকার জনগণকে যুক্তিসংগত শুনানির সুযোগ দেওয়া ছাড়া, সেই সুবিধা একতরফাভাবে কেড়ে নিতে পারবে না। অন্য কথায়, সরকার জনগণের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পাদন করলে বা লিখিত প্রতিশ্রুতি দিলে, তার ওপর নাগরিকের অধিকার তৈরি হয়। সরকার নাগরিকের কাছে দেওয়া সেই লিখিত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে। তাই রাষ্ট্র বা সরকার হুট করে কোনো যৌক্তিক আইনগত কারণ ছাড়া এই চুক্তি লঙ্ঘন করলে তা আদালতের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জযোগ্য।
যেহেতু ২০০৬ সালে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে তৎকালীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ফুলবাড়ী চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, তাই ফুলবাড়ী অঞ্চলের মানুষ এবং বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকদের মনে একটি বৈধ আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল যে, সরকার উন্মুক্ত পদ্ধতিতে আর কয়লা উত্তোলন করবে না। সরকার হুট করে তার আগের অবস্থান থেকে সরে গেলে এই নীতি লঙ্ঘিত হবে।
সবকিছু মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে আজ পরিবেশ ও মানুষের জীবন ধ্বংস করে খনি করার দিন অনেকটাই শেষ হয়ে আসছে। স্থানীয় জনমানুষের তাদের স্ব স্ব আদালতে বহুজাতিক কোম্পানির বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক জয়লাভ করার অনেক নজিরও স্থাপিত হয়েছে। ২০১৮ সালে ইকুয়েডরের কোফান আদিবাসীদের মামলায় দেশটির সুপ্রিম কোর্ট ৫২টি সোনার খনির লাইসেন্স বাতিল করে দেয়। একই বছর, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়া হাইকোর্ট এক্সোলবেনি অঞ্চলের উন্মুক্ত টাইটানিয়াম খনি প্রকল্প বাতিল করে ঐতিহাসিক রায় প্রদান করে। এ রায়ের মাধ্যমে নিশ্চিত করে, স্থানীয় জনগণের স্পষ্ট সম্মতি ছাড়া সরকার কোনো খনির ওপর তার কোনো অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।
একইভাবে, ২০২২ সালে মেক্সিকোর সুপ্রিম কোর্ট কানাডিয়ান কোম্পানি ‘আলমাডেন মিনারেলস’-এর খনি লাইসেন্স বাতিল করে। এমনকি ২০২৬ সালের মে মাসে অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল কোর্ট আদিবাসী ইয়িন্ডজিবার্নি সম্প্রদায়ের অনুমতি ছাড়া জমি ব্যবহারের জন্য খনিজায়ান্ট ‘ফোর্টেসকিউ’ কোম্পানিকে বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঐতিহাসিক নির্দেশ দিয়েছে।
শেষ কথা
তিন কিশোর আর তরুণ আন্দোলনকারীর রক্তাক্ত আত্মত্যাগ আর শত শত মানুষের আহত হয়ে যে কয়লা খনিবিরোধী আন্দোলন গণ-আন্দোলনে রূপ নিল, এশিয়া এনার্জি স্থানীয় জনমানুষের ধাওয়া খেয়ে বিতাড়িত হলো, সেসব ইতিহাস কেউ কেউ বিস্মৃত হয়ে গেলেও উন্মুক্ত কয়লা খনিবিরোধী চুক্তি শুধুই সমঝোতা স্মারক হয়ে পড়ে না! স্থানীয় জনমানুষের সঙ্গে লিখিতভাবে দায়বদ্ধ সরকার জাতীয় আর আন্তর্জাতিক আইন, দালিলিক প্রামাণ্য, আইনি মতবাদ, বৈশ্বিক উদাহরণ বিশ্লেষণ ও বিবেচনায়, চুক্তিটি বাস্তবায়নে সচেষ্ট হওয়ার কথা। তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়, জলবায়ু সংকটকে ঘিরে কয়লাবিরোধী প্রতিবেশগত জাগরণের এই সময়ে, শুধুই জ্বালানি সংকট নিরসনের অজুহাতে বাংলাদেশ কি তবে উল্টোপথে হাঁটবে? যে সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণের অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতাসীন হয়, তারা যে কপট নয়, অঙ্গীকার বাস্তবায়নে অনৈতিক নয়; তা প্রমাণ করার দায়িত্বও তাদের নিজেদের।
তাই বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী উল্টো পথে না চলে ফুলবাড়ীর জিসিএম-এর সাথে সবরকম যোগাযোগ/গোপন সমঝোতা বাতিল করে ২০০৬ সালের ঐতিহাসিক ফুলবাড়ী চুক্তির আইনি বাধ্যবাধকতা নিষ্পত্তি করা বর্তমান সরকারের জন্য জরুরি। দেশের সামগ্রিক প্রতিবেশ, প্রায় দেড় লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা এবং রাষ্ট্রের আইনি মর্যাদা, সরকারের নৈতিকতাকে ঝুঁকিতে ফেলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হয় না। তাই ফুলবাড়ীর স্থানীয় জনগণের রক্তের কালিতে লেখা ফুলবাড়ী চুক্তিকে পাশ কাটিয়ে উন্মুক্ত খনির ভূতকে পুনরায় জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করা হবে, সরকারের লিখিত অঙ্গীকারের বরখেলাপ, আত্মঘাতী এবং চরম আইনি অবজ্ঞার শামিল।
ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: tanzim.ir@du.ac.bd
