সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়

এই সংখ্যা প্রকাশের মধ্য দিয়ে আমরা সর্বজনকথা প্রকাশের তেরো বছরে প্রবেশ করলাম। আমরা আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী অনেক কিছুই করতে পারি নি তবে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি সামাজিক রাজনৈতিক বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব পালন করতে। সেইজন্য গত বারো বছরে প্রকাশিত সংখ্যাগুলোর দিকে তাকালে বাংলাদেশ ও বিশ্বের মানুষের কন্ঠস্বর পাওয়া যাবে। 

গত কয়বছরে সর্বজনকথা থেকে আরও কিছু উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। একাধিক সেমিনার এবং গবেষণা কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সমসাময়িক বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনার জন্য প্রতি মাসে ‘সর্বজনকথা আড্ডা’ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এযাবতকালে প্রকাশিত লেখাগুলো থেকে নির্বাচিত লেখার বিষয়ভিত্তিক সংকলন হিসেবে কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রথমটি প্রকাশিত হতে যাচ্ছে ইউপিএল থেকে স্বৈরশাসনকালে উন্নয়নের বাছবিচার (২০১৪-২০২৪) শিরোনামে। এছাড়া বাঙ্গালা গবেষণা প্রকাশনী আরও তিনটি নির্বাচিত লেখার সংকলন গ্রন্থ প্রকাশের কাজ করছে। এগুলো হলো- জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদ: সংকট ও উত্তরণের পথ, শিক্ষার বৈরী জগত, এবং মজুরের দেশে মজুরের জীবন । এছাড়া আরও বহুমুখী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সর্বজনকথা ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছে। সামনের বছরের জন্য ট্রাস্ট থেকে আরও বেশ কিছু পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।   

বাংলাদেশে গান, নাটক, নারীর চলাফেরা, সংস্কৃতি চর্চার উপর ধর্মের নামে আক্রমণ অব্যাহত আছে। মাদ্রাসাসহ সমাজে শিশু ধর্ষণসহ খুন জখমের ক্রমবর্ধমান ঘটনা ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। জামায়াত ও সহযোগীদের বিভিন্ন ব্যানার থেকে সাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী তৎপরতাও অব্যাহত আছে। এই সংখ্যায় আয়েশা সিদ্দিকার ‘পাকিস্তানের সামরিক অর্থনীতির অন্দরমহল’ শেষ পর্ব এবং তারিক আলীর ‘মৌলবাদের সংঘর্ষ: ক্রুসেড, জিহাদ এবং আধুনিকতা’ শীর্ষক ধারাববাহিক লেখার পঞ্চদশ পর্বে ‘আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা’ বর্তমান বাংলাদেশে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের দাপটের চরিত্র বোঝার জন্য সহায়ক হবে।

বর্তমান নির্বাচিত সরকার খুব দ্রুত অতীতের স্বৈরতন্ত্রী সরকার এবং অনির্বাচিত সরকারের সাথে দূরত্ব ঘুচিয়ে ফেলছে। চাঁদাবাজী, হামলা-মামলা, খুন ধর্ষণ, দলীয়-পুলিশী জুলুম বাড়ছে। চট্টগ্রাম বন্দরে ডিপিওয়ার্ল্ড এর মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার হাসিনার অসমাপ্ত প্রকল্প বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার প্রাণপণ চেষ্টা করেছিল, জনপ্রতিরোধে পারেনি, এই সরকার তা বাস্তবায়ন করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার ট্রাম্প এর হুকুমনামা চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। বর্তমান সরকার তা বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে অনেকদূর এগিয়েছে। জাহাজভাঙা শিল্পকে কলমের খোঁচায় লাল থেকে সরিয়ে প্রাণবিনাশী তৎপরতার পথ খুলে দিয়েছে। হাসিনা সরকার এই একই কাজ সুন্দরবন এলাকায় করেছিল। এছাড়া তিস্তা মহাপরিকল্পনা, পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার অস্বচ্ছতা আর জবরদস্তি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এসব বিষয়ে সর্বজনকথায় বেশ কয়েকটি লেখা ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে।   

ফুলবাড়ী কয়লা খনি নিয়ে আবারও শয়তানচক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। যে কয়লা প্রকল্প শুধু লক্ষ লক্ষ মানুষকে উদ্বাস্তু করবে না, পুরো উত্তরবঙ্গের আবাদ, ভূগর্ভস্থ পানির আধার বিনষ্ট করবে, নদীদূষণ করে সারাদেশকে বিপর্যস্ত করবে, প্রাণবৈচিত্রের ভয়াবহ বিপর্যয়ে পুরো দেশ বিষাক্ত হবে সেই প্রকল্পকে আবার উন্নয়নের নামে বাস্তবায়নের চক্রান্ত শুরু হয়েছে। ২০০৬ সালে জনগণের সাথে সরকারের স্বাক্ষরিত ফুলবাড়ী চুক্তির অঙ্গীকারের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে উদ্যত হয়েছে বর্তমান বিএনপি সরকার। জনপ্রতিরোধও নতুন মাত্রা নিতে যাচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে এই সংখ্যায় দুটো লেখা প্রকাশ করা হলো। প্রথম লেখাটি ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লেখা। দ্বিতীয়টি বর্তমান সরকারের সাম্প্রতিক তৎপরতার পরিপ্রেক্ষিতে লেখা। 

তিস্তা সংকট নিরসনের জন্য কী ধরনের মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন? লেখার চতুর্থ পর্বে ‘পাওয়ার-চায়নার মহাপরিকল্পনার সাতটি অমীমাংসিত প্রশ্ন’ আলোচনা করা হয়েছে। 

একইসাথে ‘পদ্মা/গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্প: উদ্বেগ ও প্রশ্ন’ লেখায় সরকারের সিদ্ধান্তের বিপদ ও অসঙ্গতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এর সাথে অপরিকল্পিত উন্নয়নে বিপন্ন কক্সবাজার শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে কক্সবাজারে পরিবেশবিনাশী কয়েকটি প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।  আরেকটি লেখায় সরেজমিন অনুসন্ধানে মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র কীভাবে উন্নয়নের নামে প্রাণবিনাশী সন্ত্রাস করছে তার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। 

 ‘অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, পছন্দ বা আচরণ বিচার- নব্য ধ্রুপদ ও মার্কসীয় বিশ্লেষণ পদ্ধতির তুলনামূলক পর্যালোচনা  লেখায় ব্যক্তি বা একক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা পছন্দ নির্ধারণে চর্চিত প্রধান তাত্ত্বিক কাঠামোর সাথে এসব সিদ্ধান্ত বা পছন্দ বিচারে সামাজিক সম্পর্ক বা মার্কসীয় বিশ্লেষণ পদ্ধতির গুরুত্ব তুলে ধরে দুই ধারার সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে। ‘শিক্ষা ও সংস্কৃতি: আলো ও হাওয়া’ লেখায় শিক্ষা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা আলোচনা করা হয়েছে। 

বর্তমানে পরিচয়ের রাজনীতি, বিদ্বেষ আর সহিংসতার নিষ্ঠুর বয়ান অন্য বহুদেশের মতো বাংলাদেশেও ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। লিঙ্গীয় বৈচিত্র তার অন্যতম আক্রমণের শিকার। এর কিছু দিক নিয়ে একটি প্রতিক্রিয়া এবং একটি বিবৃতি এখানে প্রকাশ করা হলো।  

প্রশাসনিক বা রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যবস্থা বাংলাদেশে যে আমলাতন্ত্র তৈরি করেছে তা পুরো দেশের ওপর একটা জগদ্দল পাথরের মতো। ‘বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র: ক্ষমতা, দুর্নীতি এবং ঔদ্ধত্যের ধারাবাহিকতা’ লেখায় তারই কিছু প্রামাণ্য চিত্র উপস্থিত করা হয়েছে। 

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় এখন পুরোপুরি বিশ্বব্যাংকের থাবার মধ্যে। এর সূত্র ধরে বিদ্যায়তনিক জগতে পুঁজিবাদী প্রবণতা, বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা, নিউলিবারেল রাষ্ট্রীয় মতাদর্শ, অগণতান্ত্রিক শিক্ষাগত দর্শন নিয়ে একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হলো। এছাড়া ‘বাংলাদেশের ৫০ বছর ও তারপর’ ধারাবাহিক লেখার ত্রয়োদশ পর্বে ১৯৯৫-৯৬ সময়ের চিত্র ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে।

আনু মুহাম্মদ

২৯ অক্টোবর ২০২৬ 

Social Share
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •