শিক্ষা ও সংস্কৃতি: আলো ও হাওয়া
আলমগীর খান
শিক্ষা ও সংস্কৃতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। শিক্ষা নিজেও সংস্কৃতির একটি বড় উপাদান। শিক্ষা সংস্কৃতিকে নির্মাণ করে আর সাংস্কৃতিক বিকাশ শিক্ষাকে শক্তিশালী করে। শিক্ষা ও সংস্কৃতি মিলে যে ইকোসিস্টেম তৈরি হয় সে সম্পর্কে আমাদের দেশে ধারণা সামান্য। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমাদের ধারণায় শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এমনও ধারণা আছে যে, শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরস্পরবিরোধী কোনো দুই আলাদা বস্তু। আমাদের সমাজপতি ও শিক্ষা কর্মকর্তারা শিক্ষাগৃহে যাতে সংস্কৃতির বাতাস প্রবেশ না করে সে জন্য খুবই উদগ্রীব। এ বিষয়ে বিভিন্ন স্বাধীন পন্ডিত ব্যক্তির চিন্তা এবং দেশের নীতিমালা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এই লেখায়।
কিছুদিন আগে একটি স্কুলে একটি গানের সঙ্গে একজন শিক্ষিকার একটুখানি নাচ নিয়ে যেসব বিতর্ক দেখা গেল তাতে অচিরেই বোঝা গেল এই একটুখানি নাচ এক ঝোড়ো বাতাসের নাম। এই ঝোড়ো বাতাস মানুষের বিকাশের জন্য প্রয়োজন, কূপমণ্ডূকের কাছে যতই আতঙ্কজনক হোক-না কেন।
ইউনেস্কো কী বলছে
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থার (ইউনেস্কো) ‘ফ্রেমওয়ার্ক ফর কালচার অ্যান্ড আর্টস এডুকেশন: ইমপ্যাক্টিং গাইড্যান্স’-এর সারকথা শুরু হয়েছে এভাবে– ‘শিল্প ও সংস্কৃতি অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাভিত্তিক ও মানসম্মত শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এগুলো সৃজনশীলতা, প্রশ্নমূলক বুদ্ধিমত্তা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে লালন করে যা শিক্ষার্থীদের বিশ্বের সঙ্গে সার্থকভাবে যুক্ত করতে এবং ন্যায়পরায়ণ, টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাজ নির্মাণে সক্ষম করে। কিন্তু বিভিন্ন দেশ এখনো শিক্ষার সর্বস্তরে শিল্পসংস্কৃতি চর্চাকে একীভূত করেনি।’১
ইউনেস্কোর এই ফ্রেমের মুখবন্ধে বলা হয়েছে: ‘বিশ্বায়ন, দেশান্তর ও দ্রুত প্রযুক্তিগত অগ্রগতির দ্বারা পরিচালিত হয়ে বিশ্বব্যাপী সমাজসমূহ নানা গভীর ও দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একইসঙ্গে মানুষকে জলবায়ু সংকট থেকে যুদ্ধ ও ব্যাপক অসাম্যের মতো অনেক জরুরি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এসবের মুখোমুখি হওয়ার কেন্দ্রীয় শক্তি শিক্ষার মাঝে নিহিত; কেবল জ্ঞানের বাহন হিসেবে নয়, পরিবর্তনের শক্তিশালী প্রভাবক হিসেবেও। শিক্ষাকে হয়ে উঠতে হবে শিক্ষার্থীদের প্রাসঙ্গিক জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও আচরণ দ্বারা এমনভাবে সক্ষম করা যাতে তারা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য অনুধাবন করতে পারে, জীবনের জটিলতা মোকাবিলা করতে পারে এবং শান্তিপূর্ণ ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক শক্তিশালী করা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’
গবেষণা কী বলছে
সেই ১৯৬৩-এর ৭ জুন দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে একটি লেখার শিরোনাম ছিল: ‘জাপানের বিদ্যালয়ে প্রাথমিক পর্যায়েই সংগীতের ওপর জোর দেওয়া হয়; সপ্তাহে দুই ঘণ্টা প্রত্যেকে কিছু না কিছু বাজায়।’ স্কুলে সংগীত শেখানোর উদ্দেশ্য কিন্তু একটি সংগীতবিশারদ জাতি তৈরি নয়, উদ্দেশ্য ছিল গানবাজনার ক্লাস তাদেরকে আরও মনোযোগী করে তুলবে ও অঙ্ক শিখতে সহায়তা করবে।২
আমাদের দেশের কারো ছেলেমেয়ে জাপানের কোনো বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলে তার মা-বাবা চারদিকে ঢাকঢোল পিটিয়ে খবরটা চারদিকে ছড়াবেন, অথচ এ দেশে কোনো গরিব ছেলেমেয়ে স্কুলে গিয়ে গান শিখলে হয়তো তারাই আবার ‘শিক্ষা গেল গেল’ বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় চেঁচামেচির হাট বসাবে। আমাদের দেশে অনেকেই যখন শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সংস্কৃতি চর্চাকে উচ্ছেদ করতে উঠেপড়ে লেগেছেন, তখন সংগীত সম্পর্কে সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা কী বলে খানিকটা দেখা যাক। বিখ্যাত সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট-এ ‘ইজ প্লেয়িং মিউজিক গুড ফর দ্য ব্রেইন?’ শীর্ষক এক লেখায় বলা হয়েছে,
‘২০২০-এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে যে সংগীতশিল্পীদের মস্তিষ্কের নির্বাহী ফাংশন ভালো যা পরিকল্পনা ও সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে। ২০১৭ সালের এক মেটা-অ্যানালিসিস থেকে দেখা যায় যে সংগীতশিল্পীদের স্মৃতিশক্তি ভালো। গত বছরের এক গবেষণায় দেখা যায়, তারা ব্যথায় কম কাতর হয়। … ২০১০-এর একটি প্রবন্ধে দেখা গেছে সাত বছর বয়সের আগে যারা সংগীত শেখা শুরু করে তাদের মস্তিষ্কের করপাস ক্যালোসাম বড় যা মস্তিষ্কের দুই গোলার্ধের স্নায়বিক সেতু স্বরূপ।’৩
ইকোনমিস্টে প্রকাশিত উক্ত প্রতিবেদনে মস্তিষ্কে সংগীতের যতগুলো প্রভাবের কথা বলা হচ্ছে তা শিক্ষার উদ্দেশ্য অর্জনে বাধা দেয়, নাকি সহায়তা করে? শিক্ষাক্ষেত্রে শিল্পসংস্কৃতির সব বিভাগেরই অনুরূপ ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষায় শিল্পসংস্কৃতির ভূমিকার বাইরে তার আরও এক বিরাট পরিচয় আছে। শিল্পসংস্কৃতি শিক্ষারও বাহন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যাত্রা-কথকতাকে লোকশিক্ষার বাহন মনে করতেন।
নাইজেরিয়ান শিক্ষাগবেষক ওলু-ওজো বেয়োড তার ‘আর্ট অ্যান্ড কালচার: দ্য রোল অব এডুকেশন ইন দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুর’ গবেষণা-প্রবন্ধে এ বিষয়ে উল্লেখ করেছেন,
‘একবিংশ শতাব্দীর দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে শিল্পসংস্কৃতি ও শিক্ষার মধ্যেকার মিথস্ক্রিয়া আবির্ভূত হয়েছে বিশ্বব্যাপী ভবিষ্যৎ সমাজ নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে। … শিল্পসংস্কৃতির নানারূপের সঙ্গে পরিচয় যেমন: দৃশ্যশিল্প, সংগীত, নৃত্য, নাটক, সাহিত্য ইত্যাদি সৃজনশীলতাকে লালন করে এবং সহমর্মিতা, যুক্তিবাদী চিন্তা ও বিশ্ব সম্পর্কে বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি জন্ম দেয়। তদুপরি সাংস্কৃতিক শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির চেতনা গড়ে তুলতে।’৪
গবেষণা-প্রবন্ধটির উপসংহারে বলা হয়েছে, ‘শিল্প শিক্ষণীয় একটি বিষয়ের চেয়েও বেশি কিছু; এটি মানুষের অস্তিত্বের এক মৌলিক পরিচয়। এটি সংস্কৃতিকে ধারণ করে, সৃজনশীলতার শিখা প্রজ্বালিত করে, কল্পনার চাষাবাদ করে এবং আবেগিক বুদ্ধিমত্তাকে বিকশিত করে।’
এতে যে সুপারিশসমূহ করা হয়েছে তা হলো: শিল্পসংস্কৃতিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে; শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে যাতে তারা শিখনপদ্ধতিতে শিল্পসংস্কৃতিকে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারে; শিক্ষার্থীদের কাছে শিল্পের উপকরণসমূহ সহজলভ্য করতে হবে ও তাদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আয়োজন করতে হবে; স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিল্পীদের সঙ্গে যৌথভাবে অনুষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা বিনিময়; অভিভাবক, স্থানীয় সমাজ ও নীতিনির্ধারকদের আরও উদ্যোগী হওয়া এবং প্রয়োজনীয় অর্থসংস্থান করা; এবং শিক্ষার্থীদের বুদ্ধিবৃত্তিক, আবেগিক ও সামাজিক বিকাশে সাংস্কৃতিক চর্চার প্রভাব নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা।
কিউবার অভিজ্ঞতা
পৃথিবীর বহু দেশে শিল্পসংস্কৃতিকে শিক্ষা বিস্তারের জন্য শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সম্প্রতি জ্যাকোবিন সাময়িকীতে প্রকাশিত কিউবার বিখ্যাত রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী আবেল প্রিয়েতোর একটি সাক্ষাৎকারে এ ব্যাপারে দেশটির অনন্য অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। সাক্ষাৎকারটির শিরোনামেই এর মর্মার্থ প্রকাশিত: ‘কিউবার বিপ্লব ছিল শিল্প ও সংস্কৃতির বিপ্লব।’৫ প্রিয়েতো বলেছেন,
‘ফিদেল নিশ্চিত ছিলেন যে, মানুষকে গড়ে তোলা যায় যাতে তারা শৈল্পিক ও সাহিত্যিক উপাদানগুলো বুঝতে ও উপভোগ করতে পারে: চাবিকাঠি শিক্ষা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে। তার মতে, যা তিনি হাজারবার বলেছেন– সংস্কৃতি ছাড়া স্বাধীনতা সম্ভব নয়। এ হলো সংস্কৃতি ও মুক্তি সম্পর্কে মার্তিয়ান ধারণা: হোসে মার্তি (কবি, দার্শনিক ও কিউবার জাতীয় বীর) বলেছিলেন, মুক্ত হওয়ার একমাত্র উপায় সংস্কৃতিবান হওয়া। ফিদেল বলেছেন, সংস্কৃতি ছাড়া স্বাধীনতা সম্ভব নয়; কেননা সংস্কৃতি ব্যতীত সহজেই ব্যবহৃত হওয়ার সমূহ বিপদ বিদ্যমান।’
বই পড়া নিজেই সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। কিউবা কীভাবে বই পড়াকে উৎসাহিত করেছে সে সম্পর্কে প্রিয়েতো ওই সাক্ষাৎকারে বলেছেন,
‘আর এই দেশ পাঠকের দেশে পরিণত হলো। এখানে আমরা ফিওদর দস্তয়েভস্কি ছেপেছি বিশ হাজার থেকে পঞ্চাশ হাজার কপি, সমস্ত শ্রেষ্ঠ রুশ সাহিত্য; আবার বেনিতো পেরেজ গালডোস, ভিক্টর হুগোর লা মিজারেবলস এবং মার্ক টোয়েন থেকে গোর ভিদাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যসমূহ।’
আমাদের দুশ্চিন্তা
আমাদের দেশে শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাঝে যে বিভেদের দেয়াল খাড়া আছে আর যাকে এখন আরও পাকাপোক্ত করা হচ্ছে তা এই পুরো ইকোসিস্টেমেই ধস নামাবে। মনে হবে শিক্ষা খুব এগোচ্ছে। অবশ্যই, তবে সে যে উল্টা মুখে এগোচ্ছে তা বুঝতে বুঝতে অনেক সময় পেরিয়ে যাবে!
আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বই হচ্ছে কেবল স্কুল-কলেজের পাঠ্য বিষয়, পরীক্ষা পাসের জন্য প্রয়োজনীয়। সে কারণে টেক্সটবুক ছাড়া বাকি সব ‘আউট বই’, যা পড়ালেখার ক্ষতি করে, অতএব না পড়াই ভালো! আর টেক্সটবুকের চেয়েও বেশি কদর নোট-গাইড বইয়ের, ছাত্রছাত্রীর কাছে যত কদর, শিক্ষকের কাছে তারচেয়ে কয়েকগুণ বেশি।
আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বই হচ্ছে কেবল স্কুল-কলেজের পাঠ্য বিষয়, পরীক্ষা পাসের জন্য প্রয়োজনীয়। সে কারণে টেক্সটবুক ছাড়া বাকি সব ‘আউট বই’, যা পড়ালেখার ক্ষতি করে, অতএব না পড়াই ভালো! আর টেক্সটবুকের চেয়েও বেশি কদর নোট-গাইড বইয়ের, ছাত্রছাত্রীর কাছে যত কদর, শিক্ষকের কাছে তারচেয়ে কয়েকগুণ বেশি।
এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধে অনেক আগেই লিখেছেন, ‘যতটুকু কেবলমাত্র শিক্ষা অর্থাৎ অত্যাবশ্যক তাহারই মধ্যে শিশুদিগকে একান্ত নিবদ্ধ রাখিলে কখনোই তাহাদের মন যথেষ্ট পরিমাণে বাড়িতে পারে না। অত্যাবশ্যক শিক্ষার সহিত স্বাধীন পাঠ না মিশাইলে ছেলে ভালো করিয়া মানুষ হইতে পারে না– বয়ঃপ্রাপ্ত হইলেও বুদ্ধিবৃত্তি সম্বন্ধে সে অনেকটা পরিমাণে বালক থাকিয়াই যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের হাতে কিছুমাত্র সময় নাই। যত শীঘ্র পারি বিদেশীয় ভাষা শিক্ষা করিয়া পাস দিয়া কাজে প্রবিষ্ট হইতে হইবে। কাজেই শিশুকাল হইতে ঊর্ধ্বশ্বাসে দ্রুতবেগে, দক্ষিণে বামে দৃক্পাত না করিয়া পড়া মুখস্থ করিয়া যাওয়া ছাড়া আর কোনো কিছুর সময় পাওয়া যায় না। সুতরাং ছেলেদের হাতে কোনো শখের বই দেখিলেই সেটা তৎক্ষণাৎ ছিনাইয়া লইতে হয়।’৬
‘আউট বই’-এর চেয়েও বেশি আউট শিল্পসংস্কৃতি! তৈরি হচ্ছে নোটগাইড ‘বই’-এ ঠাসা ও কোচিংয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এক ‘স্মার্ট’ প্রজন্ম। তারা কি স্বাধীনতা লাভ করছে, এমন স্বাধীন যে কারো দ্বারা ব্যবহৃত হবে না? এমন মুক্ত যারা সত্যি হতে পারে শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ হোসে মার্তির স্বপ্নের মতো স্বাধীন মানুষ।
জাতীয় সংস্কৃতি নীতি
আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি নীতি-২০০৬-এ ‘গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার’ বিষয়ে বলা হয়েছে– ‘দেশের সাংস্কৃতিক জীবনের অন্যতম অপরিহার্য অঙ্গ হচ্ছে গ্রন্থ।’ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের মধ্যে আছে গ্রন্থাগার স্থাপন, সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে পাঠাভ্যাস সৃষ্টির উদ্যোগ, বইমেলার আয়োজন ইত্যাদি। জাতীয় সংস্কৃতি নীতির ভূমিকায় বলা হয়েছে– ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতির পরিধি বিস্তৃত ও ব্যাপক।’ এ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে লালন, পরিচর্যা, বিকাশ ও উন্নয়নে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ‘সংগীত, নৃত্য, নাট্যকলা, চারুকলাসহ শিল্পকলার বিভিন্ন বিষয়ের যথাযথ বিকাশ, উন্নয়ন এবং এর ওপর প্রয়োজনীয় গবেষণা পরিচালনা করা’র প্রসঙ্গ উল্লিখিত হয়েছে।৭
জাতীয় শিক্ষানীতি
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ শিক্ষা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কটি ভালোভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এখানে ‘কারুকলা ও সুকুমারবৃত্তি শিক্ষা’ অধ্যায়ে গুরুত্বের সঙ্গে বলা হয়েছে– ‘একটি সংস্কৃতিবান, সুরুচিসম্পন্ন, ঐতিহ্যসচেতন সুশৃঙ্খল জাতি ও নাগরিকগোষ্ঠী সৃষ্টির জন্য কারুকলা ও সুকুমারবৃত্তি শিক্ষাদান অত্যন্ত জরুরি। এ শিক্ষার অন্তর্গত সংগীত, চিত্রকলা, কারুশিল্প ও হস্তশিল্প, আবৃত্তি, অভিনয়, নৃত্য বা অঙ্গবিক্ষেপ ইত্যাদি বিষয় শিক্ষার্থীর মন ও মননকে বিকশিত করে এবং তার চিত্তবৃত্তিকে সমৃদ্ধ করে। দেশের চিত্রকলা, ভাস্কর্য, সংগীত, নাটক, যাত্রা ও থিয়েটার ইত্যাদি সম্পর্কে যেমন এর মাধ্যমে ধারণা লাভ করা যায়, তেমনি বিভিন্ন দেশের শিল্প সংস্কৃতি সম্পর্কেও জ্ঞানলাভ করা যায়। এ শিক্ষার ফলে শিক্ষার্থীদের একদিকে চিত্তোৎকর্ষ সাধন করা যায়, অন্যদিকে এই বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে।’
এ অধ্যায়ে একটি উদ্দেশ্য হিসেবে যথার্থই বলা হয়েছে– ‘বর্তমান বিশ্বে মাদক-এর ভয়াবহ বিস্তারের কারণে দেশে যুব সমাজের অবক্ষয় মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এ অবক্ষয় রোধে সুষ্ঠু মনন চর্চার মাধ্যমে কার্যকর ভূমিকা রাখা।’ শুধু মাদক সেবন নয়, বিভিন্ন ধরনের মানসিক বিকৃতিতে আজ আমাদের যুবসমাজ আক্রান্ত। আবার শুধু যুবসমাজ কেন, নানারকমের অসুস্থ চর্চা আজ আমাদের তরুণ ও কিশোর থেকে শিশুদের পর্যন্ত গ্রাস করছে। সাংস্কৃতিক চর্চা শিক্ষার একটি অনিবার্য অংশ। সাংস্কৃতিক বিকাশের মাধ্যমে আমরা এমনসব সামাজিক সমস্যার সমাধান করতে পারি যা প্রথাগত টেক্সট বই মুখস্থ করিয়ে কোনোদিনই সম্ভব নয়। শিশুর ওপর বইয়ের বড় বড় বোঝা চাপিয়ে দিয়ে পণ্ডিত বানানোর অশুভ চেষ্টার মধ্যদিয়ে মানসিক বিকৃতিকে কেবল প্রশস্তই করা সম্ভব। যা দরকার তা হলো শিশুর সুকুমারবৃত্তিসমূহের বিকাশ– তাকে মিথ্যুক, অন্যায় প্রতিদ্বন্দ্বী, স্বার্থপর ও চতুর বানানো নয়, দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে যা করে আসছে।
শিশুর ওপর বইয়ের বড় বড় বোঝা চাপিয়ে দিয়ে পণ্ডিত বানানোর অশুভ চেষ্টার মধ্যদিয়ে মানসিক বিকৃতিকে কেবল প্রশস্তই করা সম্ভব। যা দরকার তা হলো শিশুর সুকুমারবৃত্তিসমূহের বিকাশ– তাকে মিথ্যুক, অন্যায় প্রতিদ্বন্দ্বী, স্বার্থপর ও চতুর বানানো নয়, দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে যা করে আসছে।
কারুকলা ও সুকুমারবৃত্তি শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়নের ৭ নম্বর কৌশল হিসেবে বলা হয়েছে– ‘সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং শহর ও গ্রাম পর্যায়ে চিত্রকলা ও কারুশিল্পের ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনী, সংগীত, নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হবে।’৮ এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
যদিও অনেক ভালো ভালো কথা দিয়ে জাতীয় শিক্ষানীতিটি ভরপুর, এসবের কার্যকর বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আবার শিক্ষাব্যবস্থাটিও জাতীয় শিক্ষানীতি অনুসরণ করে পরিচালিত হয়নি। ফলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বহুমুখী মানবিক বিকাশের মাধ্যম হিসেবে ভূমিকা রাখতে বাধ্য হয়েছে। এখানে তৈরি হচ্ছে কেবল উচ্চ নম্বর পাওয়া সব একপেশে মানুষ। উচ্চ নম্বর অর্জনকারী তথাকথিত ‘মেধাবী’ ছাড়া বাকি সবাইকে ব্যর্থতার তালিকাভুক্ত করা কোনো উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার পরিচায়ক নয়। শিক্ষা ও সংস্কৃতির বৃহৎ ইকোসিস্টেমে মানুষের বাস, শিশুকিশোরদের পূর্ণাঙ্গ মানবিক বিকাশ সে আলোকেই ভাবা উচিত।
উচ্চ নম্বর অর্জনকারী তথাকথিত ‘মেধাবী’ ছাড়া বাকি সবাইকে ব্যর্থতার তালিকাভুক্ত করা কোনো উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার পরিচায়ক নয়।
শিক্ষা-আনন্দ-সংস্কৃতি
কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১) তাঁর ‘আনন্দ ও মুসলমান গৃহ’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন–
‘আনন্দের উৎস হৃদয়ের প্রাচুর্য এবং তা থেকেই পৃথিবীর নব নব সৃষ্টি হয়। তাই আজ আমরা সাহিত্য, চিত্র, সংগীত প্রভৃতি লাভ করেছি। যে-সমাজ প্রাণ খুলে আনন্দ করতে পারে, তার মধ্যে সংকোচ, দ্বিধা বা ভীরুতার বন্ধন নেই– সে সমাজ বলবান স্বাধীন, প্রাণময়; সে-সমাজের গৃহে আনন্দের ফোয়ারা ছোটে, বাহিরে প্রত্যেক কাজে তেজ ও উৎসাহ প্রকাশ পায়; তার মন সরস ও সচেতন। সেই সমাজের আনন্দরসেই প্রতিভার জন্ম হয়। আমরা একটু চোখ মেললেই দেখতে পাই, যাদের আনন্দ আছে, তারাই জীবন্ত– তারাই পৃথিবী শাসন করছে। যাদের আনন্দ নেই, তারা তো মৃত– তাদের এ বিড়ম্বিত জীবন নিয়ে বেঁচে থাকায় লাভ কি আছে? তাই আজ প্রাণ খুলে বলতে চাই, আমরা বাঁচার মতো বেঁচে থাকব– জীবনকে সার্থক করব, সুন্দর করব, উপভোগ করব, আনন্দ রসে অভিষিক্ত করব– আমরা প্রতিভার জন্ম দিব, জগতে ধন্য হব, বরেণ্য হব।’
লিখেছেন,
‘মুসলমানের যে গৃহ নাই, তার একটা কারণ, আনন্দের উপকরণের অভাব। মুসলমান গান গাইবে না, ছবি আঁকবে না, এক কথায় মনোরঞ্জনকর ললিতকলার কোনো সংশ্রবেই থাকবে না। মুসলমান পুরুষরা কাজ করবে, আর ঘর শাসন করবে; মেয়েরা কেবল রাঁধবে বাড়বে আর ব’সে ব’সে স্বামীর পা টিপে দেবে;– তা’ ছাড়া খেলাধুলা, হাসিতামাশা বা কোনো প্রকার আনন্দ তারা করবে না– সব সময় আদব-কায়দা নিয়ে দুরস্ত হয়ে থাকবে।’৯
‘শিক্ষিত মুসলমানের কর্তব্য’ প্রবন্ধে তিনি আরও লিখেছেন–
‘চারিদিকে অভাব যখন প্রচণ্ড, তখনও নিত্য-অভাবের অতিরিক্ত কিছু প্রাণে চায়। সেটুকু না হইলে মানুষের জীবন অতিশয় দুঃসহ হইয়া পড়ে। … কৃষকের জীবনে এই আনন্দ— হাডু-ডু-ডু খেলা, পর্ব বুঝিয়া গাঁতা করিয়া মাছ ধরিতে যাওয়া, ধর্মগ্রন্থ ও পুঁথি পাঠ করা, মৌলুদ শরিফ এবং সাময়িক যাত্রা-থিয়েটার প্রভৃতিতে যোগদান করা, বৈঠকী, ভাটিয়ালি, জারি, সারি প্রভৃতি গান করা বা উৎসবাদি উপলক্ষে একটু আমোদ-আহ্লাদ করা– অত্যন্ত আবশ্যক। এইগুলি হইতে তাহাদিগকে বঞ্চিত করিলে, উহাদের তৃষিত আত্মাকে একেবারে শুকাইয়া মারা হয়। যাত্রা-থিয়েটার, লণ্ঠন-লেকচার, বায়োস্কোপ প্রভৃতির সাহায্যে যথেষ্ট শিক্ষাদান করিতে পারা যায়। … মনে হয়, ওলী-পয়গম্বর এবং ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক পুরুষদের চরিত্র অবলম্বন করিয়া নাটক রচনা করিয়া যাত্রা-থিয়েটার ও বায়স্কোপের সাহায্যে জ্ঞান প্রচার করা যাইতে পারে। এ বিষয়ে শিক্ষিত মুসলমান সমাজের বিশেষ করিয়া অবহিত হওয়ার সময় আসিয়াছে।’
সবশেষে তিনি লিখেছেন– ‘তথাপি বর্তমানে আমাদের সাহিত্য, আর্ট, সংগীত, সুরুচিপূর্ণ আলোচনা প্রভৃতি বিষয়ে অভাববোধকে মনের মধ্যে জাগাইয়া রাখিয়া তাহার সমাধানচেষ্টা করিতে হইবে। বিশেষত ছাত্রসমাজ, যাহারা কয়েক বৎসর পরে দেশের নেতৃস্থানীয় হইবে, এখন হইতেই তাহদের মধ্যে জ্ঞানচর্চা, বিদ্যাবত্তা ও রুচিসৌষ্ঠবের অনুশীলন করা আবশ্যক।’১০
আলো ও হাওয়া
‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ আরও লিখেছেন–
‘বাল্যকাল হইতে আমাদের শিক্ষার সহিত আনন্দ নাই। কেবল যাহা-কিছু নিতান্ত আবশ্যক তাহাই কণ্ঠস্থ করিতেছি। তেমন করিয়া কোনোমতে কাজ চলে মাত্র, কিন্তু বিকাশলাভ হয় না। হাওয়া খাইলে পেট ভরে না, আহার করিলে পেট ভরে, কিন্তু আহারটি রীতিমতো হজম করিবার জন্য হাওয়া খাওয়ার দরকার। তেমনই একটা শিক্ষাপুস্তককে রীতিমতো হজম করিতে অনেকগুলো পাঠ্যপুস্তকের সাহায্য আবশ্যক। আনন্দের সহিত পড়িতে পড়িতে পড়িবার শক্তি অলক্ষিতভাবে বৃদ্ধি পাইতে থাকে; গ্রহণশক্তি ধারণাশক্তি চিন্তাশক্তি বেশ সহজে এবং স্বাভাবিক নিয়মে বললাভ করে। কিন্তু এই মানসিকশক্তি-হ্রাসকারী নিরানন্দ শিক্ষার হাত বাঙালি কী করিয়া এড়াইবে, কিছুতেই ভাবিয়া পাওয়া যায় না।’১১
১৮৯২ সালে রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশনে পঠিত প্রায় দেড়শ বছর আগের এই প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ যে দুশ্চিন্তার কথা প্রকাশ করেছেন তা এখন আমাদের জাতীয় দুশ্চিন্তায় রূপান্তরিত। এই দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির উপায় শিক্ষা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন।
বাংলা ভাষায় ‘মানুষ হও’ বলে গুরুজনের আশীর্বাদে যে আশা ব্যক্ত করা হয়– এমন মানুষ তৈরি করতে, অর্থাৎ শিক্ষাব্যবস্থাকে পুরোপুরি সার্থক করতে হলে, কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করতে হলে আমাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির এই মেলবন্ধন জরুরি। এই বোধ জরুরি যে শিক্ষা ও সংস্কৃতি ততটুকুই আলাদা যতটুকু আলো ও হাওয়া। একটাকে বাদ দিলে আরেকটাও অর্থহীন, তাই শিক্ষা ও সংস্কৃতি দুই-ই চাই।
আলমগীর খান: নির্বাহী সম্পাদক, শিক্ষালোক| ইমেইল: alamgirhkhan@gmail.com
সহায়ক প্রবন্ধ ও গ্রন্থ
১. UNESCO Framework for Culture and Arts Education: implementation guidance, ২০২৫
২. Schools in Japan Stress Music at an Early Age; Two Hours a Week Everyone Plays Something, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, জুন ৭, ১৯৬৩
৩. ‘Is playing music good for the brain?’, দ্য ইকনমিস্ট, ২০ মার্চ ২০২৬
৪. Olu-Ojo Bayode, ‘Art and Culture: The Role of Education in the 21st Century’, 2023, https://internationalpolicybrief.org/wp-content/uploads/2024/10/FULL-BOOK-OF-PROCEEDINGS-2.pdf
৫. ‘The Cuban Revolution Was a Revolution in Art and Culture’, Interview with Abel Prieto, জ্যাকোবিন সাময়িকী, আগস্ট ১, ২০২৬
৬. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘শিক্ষার হেরফের’, শিক্ষালোক, জুন ২০১৪
৭. জাতীয় সংস্কৃতি নীতি-২০০৬
৮. জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০
৯. কাজী মোতাহার হোসেন, ‘আনন্দ ও মুসলমান গৃহ’, প্রবন্ধ সংগ্রহ, নবযুগ প্রকাশনী, অক্টোবর ২০১৩
১০. কাজী মোতাহার হোসেন, ‘শিক্ষিত মুসলমানের কর্তব্য’, প্রবন্ধ সংগ্রহ, নবযুগ প্রকাশনী, অক্টোবর ২০১৩
১১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পূর্বোক্ত
